ভ্রান্ত তাবিজ-কবচ


ভ্রান্ত তাবিজ-কবচ

ভ্রান্ত তাবিজ-কবচ
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্ব জগতের ঘটনা প্রবাহের জন্য সঙ্গত কারণ বা মাধ্যম নির্ধারণ করেছেন। আবার কখনো কখনো এ সমস্ত কারণ ও মাধ্যমকে তিনি পরিহার করেছেন। যাতে করে মানুষ এসব কিছুকে তাদের রব বা প্রতিপালক মনে না করে। এবং তিনি এ সমস্ত কারণ ও ঘটনা প্রবাহকে এমন এক অমোঘ নিয়মে বেঁধে দিয়েছেন যার ফলে কোন কিছুই বৃথা যাবার নয় । সালাত ও সালাম ঐ রাসূলের উপর যাঁকে তিনি সমস্ত জগতের জন্য রহমত করে প্রেরণ করেছেন, যাতে করে সকলই তাঁর প্রিয় হতে পারে। অতঃপর, আল্লাহ এ বিশ্ব জগতকে অনস্তিত্ব থেকেই সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি একে তাঁর ইচছা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে যেভাবে চান সেভাবেই পরিচালনা করেন এবং তিনিই তাঁর সৃষ্টির সকল বস্তুকে একটির উপর অপরটির অস্তিত্ব বিন্যাস করেছেন, আর এ কারণেই একটি বস্তুকে অপরটির জন্য কারণ বা মাধ্যম বানিয়েছেন ।
পূর্বেকার মুশরিকরা আল্লাহকে এই পৃথিবীতে পরিপূর্ণ ক্ষমতা, পরিচালনা, পরিকল্পনা এবং সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করত।
তারা এমন বিশ্বাস পোষণ করতনা যে, তাদের বাতিল উপাস্য বা দেবতাগুলো বিশ্ব জগতের কোন কিছু নিয়ন্ত্রণ করে, অথবা সেগুলো কোন প্রকার কল্যাণ বা অকল্যাণ সাধনের ক্ষমতা রাখে। বরং তাদের দৃঢ় প্রত্যয় ছিল যে, এসব কিছু একমাত্র আল্লাহই পরিচালনা করে থাকেন, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন :
ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ
“অতঃপর যখন তোমাদেরকে অকল্যাণ ¯পর্শ করে তখন তোমরা তাঁর (আল্লাহর) নিকট বিনয় সহকারে প্রার্থনা কর। ”(সূরা আননাহাল ৫৩)

আল্লাহ তাআলা আরো এরশাদ করেন :

وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ
“তুমি যদি তাদের(মুশরিকদের) কে জিজ্ঞাসা কর, কে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন? তারা নিশ্চয়ই বলবে ‘আল্লাহ।”
এবং এ জন্যই আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ করেছেন যে, তিনি যেন মুশরিকদেরকে আল্লাহর বাণীর উত্তর দিতে বাধ্য করেন।
قُلْ أَفَرَأَيْتُم مَّا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ إِنْ أَرَادَنِيَ اللَّهُ بِضُرٍّ هَلْ هُنَّ كَاشِفَاتُ ضُرِّهِ أَوْ أَرَادَنِي بِرَحْمَةٍ هَلْ هُنَّ مُمْسِكَاتُ رَحْمَتِهِ قُلْ حَسْبِيَ اللَّهُ عَلَيْهِ يَتَوَكَّلُ الْمُتَوَكِّلُونَ

“বলুন, তোমরা ভেবে দেখেছ কি যদি আল্লাহ আমার অনিষ্ট করার ইচছা করেন তবে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ডাক তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারে? অথবা তিনি আমার প্রতি রহমত করার ইচছা করলে তারা কি সে রহমত রোধ করতে পারে ? বলুন, আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, ভরসাকারীরা তাঁর উপরই ভরসা করে ”(সূরা যুমার ৩৮ )
এবং প্রকৃত অর্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন তখন তারা চুপকরে রইল। কেননা মূলতঃ তারা তাদের উপাস্যদের সম্পর্কে এ ধরনের বিশ্বাস পোষণ করত না। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকাল অনেক মুসলমানকে শয়তান পদস্খলিত করেছে -আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত দান করুন – যার ফলে তারা তাদের ভবিষ্যত বিষয়াদি এবং কার্যক্রমকে নির্ভরশীল করেছে হয়ত এক টুকরা কাপড়ের পট্রি বা সূতা অথবা একটি জুতার টুকরার উপর। এবং তারা মনে করে যে, এ গুলোর মধ্যে মানুষের জন্য কল্যাণ বা অকল্যাণ রয়েছে।
আফসোস! কোথায় উপরোল্লেখিত আয়াতের বাস্তবতা তাদের জীবনে! কোথায় তাদের বিশ্বাস যে, আল্লাহই তাদের জন্য যথেষ্ট? কাপড়ের পট্রি, সূতা বা জুতা নয়। এ সমস্ত হীন ও তুচ্ছ বস্তুর উপর ভরসা না করে কোথায় আল্লাহর উপর ভরসার আকীদাহ? তুমি কি জাননা যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট এবং তিনি তাকে সমস্ত অকল্যণ থেকে রক্ষা করবেন।
وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
“যে আল্লাহর উপর ভরসা করবে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট ” ( সূরা আত্ তালাক: ৩ )
আল্লাহ তোমার জন্য যথেষ্ট হওয়ার পরেও তোমার জন্য অন্য কিছুর প্রয়োজন আছে? এটাকি সম্ভব যে সুতা, জুতা, কাপড় বা চামড়ার টুকরা ব্যবহার কারীর জন্য এগুলো যথেষ্ট হতে পারে বা বিপদ থেকে তাকে বাধা দিতে পারে ? সুবহানাল্লাহ! (আল্লাহ পূত পবিত্র)
آللَّهُ خَيْرٌ أَمَّا يُشْرِكُونَ
অর্থাৎ “ শ্রেষ্ঠ কে ! আল্লাহ না ওরা, যাদেরকে তারা শরীক সাব্যস্ত করে? ” (সূূরা আন্ নামল ৫৯)
শুধু তাই নয় এ তুচ্ছ জিনিসগুলো কি তাদের নিজদের উপর থেকে কোন কিছুকে ঠেকাতে পারে? তুমি নিজেই যদি এগুলোকে ছিঁড়ে ফেল বা আগুনে পুড়ে ফেলার ইচ্ছা কর, তাহলে কি তোমাকে তারা বাধা দিতে পারে?  তাহলে বল দেখি হে মানুষ! তোমার উপর থেকে কিভাবে তারা বিপদ ঠেকাতে পারে ?
وَلاَ تَدْعُ مِن دُونِ اللّهِ مَا لاَ يَنفَعُكَ وَلاَ يَضُرُّكَ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ – وَإِن يَمْسَسْكَ اللّهُ بِضُرٍّ فَلاَ كَاشِفَ لَهُ إِلاَّ هُوَ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلاَ رَآدَّ لِفَضْلِهِ يُصَيبُ بِهِ مَن يَشَاء مِنْ عِبَادِهِ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“(হে রাসূল!) আর তুমি আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকবে না যে তোমার ভালও করতে পারবে না এবং মন্দও করতে পারবে না । বস্তুতঃ তুমি যদি এমন কাজ কর, তাহলে তুমিও জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আর আল্লাহ যদি তোমার উপর কোন বিপদ আরোপ করেন তাহলে তিনি ছাড়া কেউ নেই তা থেকে মুক্ত করার, পক্ষান্তরে যদি তিনি তোমার কল্যাণ চান তবে তার কল্যাণ ঠেকাবার মতও কেউ নেই। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি অনুগ্রহ করতে চান, তাকে অনুগ্রহ করেন। বস্তুতঃ তিনি ক্ষমাশীল দয়ালু” ( সূরা ইউনুস ১০৬ – ১০৭ )
হে মানুষ! তোমাকে আল্লাহ বিবেক দান করে সম্মানিত করেছেন, আরো সম্মানিত করেছেন তোমাকে রিসালাতসমূহের মাধ্যমে। তুমি কি কয়েক মুহূর্তের জন্য একটু চিন্তা করতে পার? সূতা, জুতা, আর পট্রি এ সমস্ত জিনিসের মধ্যে এবং অন্যান্য জিনিসের মধ্যে কিসের পার্থক্য? হয়ত তুমি বলতে পার, নিশ্চয়ই আমিতো শুধুমাত্র এগুলোতে গিঁট দেই এবং ঝাড় ফুঁক দেই। তা হলে আমি তোমাকে বলব, কেন তুমি শরীয়ত সম্মত কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত ঝাড় ফুঁকে সীমাবদ্ধ থাক না এবং এটাই তো তোমার জন্য যথেষ্ট। বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম যার উপর ছিলেন তাই তুমি মেনে চল। এর মধ্যেই সমস্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আমার ভয় হয় যে, হয়ত তুমি বলবে যে, আমি যাদুকরের নিকট গিয়েছি সে এগুলোর উপর ঝাড় ফুঁক করেছে। কাবার রব্বের শপথ! এ কথাতো আরো জঘন্যতম। নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি গণক বা জ্যোতিষের নিকট আসে তার চল্লিশ দিনের নামায গৃহীত হয় না । আর যে তাদের কথাকে বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর যা নাযিল হয়েছে তার সাথে কুফরি করল। আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি এসব বিষয় থেকে।
তোমার চারপাশে আল্লাহর যত সৃষ্টি জগত রয়েছে সে সবের সাথে তোমার আদান প্রদান কি ভাবে হবে তা স্পষ্ট ভাবে আল্লাহর দ্বীন ইসলামে বর্ণিত হয়েছে । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নুতন কোন কাজ শুরু করতেন তখন তিনি এর উপর আল্লাহর প্রশংসা করতেন এবং সে কাজের মধ্যে যে কল্যাণ রয়েছে বা যে কল্যাণের জন্য উহাকে তৈরী করা হয়েছে তা আল্লাহর নিকট কামনা করতেন এবং ঐ কাজের মধ্যে যে অকল্যাণ রয়েছে বা যে অকল্যাণের জন্য তাকে তৈরি করা হয়েছে তা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। আল্লাহর হুকুমে এভাবে চাওয়ার পর ঐকাজ থেকে কল্যাণ ব্যতীত অন্য কিছু তোমার কাছে আসবে না । হে বন্ধু ! কোথায় তোমার সকাল সন্ধার যিকির বা দুআগুলো? সেগুলোই তো আল্লাহর ইচ্ছায় আসল রক্ষা কবচ এবং হেফাজতের দূর্গ। তোমার হেফাজতের জন্য আল্লাহ ফেরেশতাদের মত যে সমস্ত সৈনিক তৈরী করে রেখেছেন তাদের থেকে তোমার অবস্থান কোথায় ?
لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِّن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللّهِ
“তার পক্ষ থেকে প্রহরী রয়েছে তার অগ্রে এবং পশ্চাতে আল্লাহর নির্দেশে তারা তাকে হেফাজত করে ”। (সূরা র্আ রাদ ১১)
তুমি যত বেশী ইসলামের নিদর্শনসমূহের সংরক্ষণ করবে, তত বেশী তুমি নিরাপদ থাকবে। তুমি যখন ফজরের নামায জামাত সহকারে আদায় কর, তখন থেকে তুমি সন্ধা পর্যন্ত আল্লাহর দায়িত্বে ও তাঁর হেফাজতে থাকবে। এরপরও কি তুমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো মুখাপেক্ষী? তুমি যখন তোমার ঘর থেকে বের হও তখন তুমি বলবে:
بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ، وَ لاَ حَوْلَ وَ لاَ قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ، اللهُمَّ إِنِّـيْ أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ أَوْ أُضَلَّ، أَوْ أَزِلَّ أَوْ أُزَلَّ، أَوْ أَظْلِمَ أَوْ أُظُلَمَ، أَوْ أَجْهل أَوْ يُـجَـهَلَ عَلَيَّ
অর্থাৎ“আল্লাহর নাম নিয়ে তাঁরই উপর ভরসা করে বের হলাম। আল্লাহর অনুগ্রহ ব্যতীত প্রকৃত পক্ষে কোন শক্তি সামর্থ নেই। হে আল্লাহ ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি অন্যকে পথভ্রষ্ট করতে অথবা কারো দ্বারা আমি পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে, আমি অন্যকে পদস্খলন করা অথবা অন্যের দ্বারা পদস্খলিত হওয়া থেকে, আমি অন্যকে নির্যাতন করা অথবা অন্যের দ্বারা নির্যাতিত হওয়া থেকে এবং আমি অন্যকে মূর্খ অজ্ঞতায় ফেলা অথবা অন্যের দ্বারা অজ্ঞতায় পতিত হওয়া থেকে।” এই দুআ পড়ার পর তোমাকে বলা হবে: ‘তোমার জন্য যথেষ্ট হয়েছে, তুমি সঠিক পথে প্রদর্শিত হয়েছ এবং তুমি বেঁচে গেলে।’ শয়তান তোমার থেকে কেটে পড়বে এবং দূর হয়ে যাবে তার সঙ্গীদেরকে এ কথা বলতে বলতে, ‘তোমাদের আর কি করার আছে একজন ব্যক্তির ব্যাপারে যার জন্য যথেষ্ট হয়েছে, যে সঠিক পথে প্রদর্শিত হয়েছে, যে বেঁচে গেছে।’
এরপর তুমি আর কি চাও ?! তুমি কি এসব মূল্যবান দুআ ছেড়ে তুচছ জুতা, কাটা, কাপড়ের পট্রি ইত্যাদি জিনিসের দিকে ফিরে যাবে? তুমি দৃঢ় থাক যে, এগুলো তোমার জন্য অপমান ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করবে না । গভীর মনোযোগ সহকারে রাসূলের এই হাদীস শ্রবণ কর, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা এক ব্যক্তির হাতে পিতলের একখানা বালা দেখতে পেয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার হাতে এটাকি? উত্তরে লোকটি বলল, ‘এটা রোগের জন্য।’ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “দ্রুত ইহা খুলে ফেল, কেননা ইহা তোমার দুর্বল করা ছাড়া আর কিছুই বাড়ায় না। আর তুমি যদি এর উপরই মৃত্যু বরণ কর তাহলে কখনই সফলতা লাভ করবে না।’ ইমাম আহমদ ইমরান বিন হুসাইন থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেন।
মূলতঃ লোকটি রোগের কারণে মৃত্যুর ভয়ে কল্পনা প্রসূত এই কবচ হাতে ধারণ করেছিল। তুমি কি জান না যে এই কল্পনা প্রসূত তাবিজ কবচ যে পর্যস্ত তুমি পরিহার না করবে সে পর্যন্ত তুমি গাণিতিক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে, এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বদ-দুআর মধ্যে পতিত হওয়াই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে । তিনি বলেন:
من تعلق تميمة فلا أ تم الله له ومن تعلق ودعة فلا ودع الله له
“যে ব্যক্তি তাবিজ ঝুলাবে, আল্লাহ তার কাজের পূর্ণতা দান না করুন, আর যে ব্যক্তি কড়ি ঝুলাবে আল্লাহ তাকে স্বস্তি বা শান্তি দান না করুন।”  ইমাম আহমাদ উকবাহ বিন আমের থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেন।
এখানে বুঝা গেল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বদ-দুআ সব সময় তাদের উপর পতিত হতেই থাকবে। অতএব যে ব্যক্তি তাবিজ গ্রহণ করবে আল্লাহ তার কাজের পূর্ণতা দান করবেন না। তা হলে কি লাভ এ সমস্ত অহেতুক তাবিজ কবচ ব্যবহার করে? আর যে ব্যক্তি কড়ি ঝুলাবে আল্লাহ তাকে স্বস্তি বা শান্তি দান করবেন না। এ কথার মধ্যে ঐ ব্যক্তির জন্য বদ-দুআ রয়েছে। সার্বক্ষণিক সে চিন্তা ভাবনা, ভীতি ও অশান্তির মধ্যে থাকবে। স্বস্তি ও শান্তি তার থেকে হারিয়ে যাবে। যেখানে সে নিরাপত্তা চেয়েছে সেখানে ভয় ভীতিই চলতে থাকবে, যে পর্যন্ত এই অশুভ তাবীজ কবচের সাথে স¤পর্ক থাকবে ।
যে ব্যক্তি এ সকল তাবিজ-কবচের সাথে স¤পর্ক রাখে সে নিজের উপর আল্লাহর হেফাজত ও সংরক্ষণের দ্বার বন্ধ করে দেয়। হায় আফসোস! এটা তার জন্য কতবড় ধ্বংস যে আল্লাহর হেফাজত ও নিরাপত্তাকে বাদ দিয়ে পট্রি, সূতা, জুতা ইত্যাদির দিকে ফিরে যায় এবং সে উত্তমকে অধম দ্বারা পরিবর্তন করে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
من علق شيئاً فقد وكل إليه
“যে ব্যক্তি তাবিজ কবচ জাতীয় কিছু পরল তাকে এর দায়িত্বেই ছেড়ে দেয়া হবে।” (আহমদ ও তীরমিযি থেকে বর্ণিত হাদীস)  এ ছাড়াও শিরকের মধ্যে সে পতিত হবে। আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি।
 অন্য এক বর্ণনায় এসেছে :
 ( من تعلق تميمة فقد أشرك )

“যে ব্যক্তি তাবিজ বাঁধল সে শিরক করল।”
হুযাইফা (রাঃ) এক ব্যক্তিকে দেখলেন নিরাপত্তার জন্য হাতে সূতা বেঁধেছে তখন তিনি তা ছিড়ে ফেললেন এবং আল্লাহর এই বাণী পড়লেন:

وَ مَا يُـؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللهِ إِلاَّ وَ هُمْ مُشْرِكُوْنَ
“অনেক মানুষ আল্লাহর উপর ঈমান রাখলেও কিন্তু তারা মুশরিক ” (সূরা ইউসুফ ১০৬)
ইবনে আবি হাতেম থেকে বর্ণিত । হুযাইফা (রাঃ)  ঐ ব্যক্তিকে ধমক দিয়ে বললেন,
)لو مت وهو عليك ما صليت عليك(
“তুমি যদি এর উপর মৃত্যু বরণ কর তা হলে আমি তোমার জানাযার নামায পড়ব না। ”
এ ধরনের শিরক হলো বড় শিরক যদি ঐ ব্যক্তি মনে করে যে, এ সকল তাবীজ-কবচ ভাল বা মন্দ করতে পারে। অথবা কোন বিপদ আসার পূর্বে তা ফিরাতে পারে। তখন এটা হবে আল্লাহর রবুবিয়্যাতে শিরক। এর দ্বারা আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করা হল। কারণ ; তার বিশ্বাস এ সকল তাবীজ-কবচ নিয়ন্ত্রণকরার ক্ষমতা রাখে। এ কারণে আল্লাহর ইবাদতেও শিরক করা হল। কেননা, এগুলোকে সে উপাস্য তুল্য মনে করেছে, আশা এবং ভয় নিয়ে এর কল্যাণের প্রতি নিজকে আকৃষ্ট করেছে। আর যদি মনে করে যে, আল্লাহ – ই একমাত্র মালিক, তিনিই নিয়ন্তা, তিনিই একমাত্র বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারেন ও তা ঠেকাতে পারেন, আর এ সকল তাবীজ-কবচ অসীলা মাত্র তা হলে এটা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু এটাও কবীরা গুনার চাইতে মারাতœক। তা হলে বুঝা গেল যে, এটা শরীয়ত সম্মত উপায় নয়। এমন কি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর মানুষের জন্য যে সম¯ত ঔষধ পত্রে উপকারের প্রমাণ রয়েছে, এটা তেমন ও নয়। তাহলে বুঝা গেল যে এ ধরনের কাজের অর্থ ঐ সমস্ত লোকদের বিবেক ও দ্বীন নিয়ে শয়তান খেলা করা ছাড়া আর কিছুই করছে না। এবং যে ঘণ্টা বাঁধল বা এ জাতীয় অশুভ রক্ষা কবচ গ্রহণ করল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ঐ ব্যক্তির স¤পর্ক কেটে যাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট। যেমনটি বর্ণনা করেছেন, ইমাম আহমদ রুওয়াইফা ইবনে সাবেত (রাঃ) থেকে। তা হলে এরপর তুমি আর কি আশা করতে পার? বরং চরম দুর্দশা ও দুর্ভোগ রয়েছে ঐ সমস্ত জিনিসের মধ্যে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন,  এবং তৎকালীন সময়ের যান বাহন – উট – এর গলা থেকে ঘন্টা কেটে ফেলার জন্য তিনি লোকের নিকট বার্তা নিয়ে একজন দূত পাঠিয়ে ছিলেন সে যেন তাদের মাঝে এই বলে ঘোষনা দেয় যে ঃ
( لايبقين في رقبة بعير قلادة من وتر (أوقلادة ) إلاقطعت )
“ঘন্টায় নির্মিত গলাবন্ধনী উটের গলায় না রেখে অবশ্যই যেন তা কেটে ফেলা হয়।” (ইমাম বুখারী ও মুসলিম থেকে বর্ণিত হাদীস)
অতএব কারণে সকলের উপর কর্তব্য যে এ ধরনের শিরক থেকে মানুষকে বাধা দেয়া এবং যারা এর মধ্যে পড়ে আছে তাদেরকে সৎ উপদেশ দেয়া, এবং গাড়ি বা যান-বাহনে এ ধরনের তাবিজ-কবচ দেখলে তা ছিড়ে ফেলা।
আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর প্রতি যদি কারো মনের আসক্তি হয় যে, এগুলোর মাধ্যমে কল্যাণ লাভ করা যায় এবং অকল্যাণ রোধ করা যায় তাহলে বুঝতে হবে যে, সবচেয়ে বড় নোংরামি ঐ ব্যক্তিকে ¯পর্শ করেছে। এ আসক্তি কখনো মনের দিক থেকে হতে পারে, কখনো কাজের মাধ্যমে হতে পারে, আবার কখনো উভয়ের মাধ্যমে হতে পারে,  এ তো আরো বড় জঘন্য এবং এর সকল অবস্থাই গর্হিত। এমনকি যে সমস্ত বিষয়কে আল্লাহ মাধ্যম বানিয়েছেন কোন বান্দার উচিৎ নয় এককভাবে সে সব মাধ্যমের উপর নির্ভর করা বরং তার উচিৎ হবে কারণ বা মাধ্যম যিনি সৃষ্টি করেছেন এবং ইহাকে যিনি নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁর উপর ভরসা করা। এর সাথে বিধি সম্মত ভাবে ঐ সমস্ত মাধ্যমকে অবলম্বন করা, এর উপকারী দিকগুলো কামনা করা। তবে মনে রাখা দরকার যে, কারণ বা মাধ্যম যত বড় এবং যত মযবুতই হোকনা কেন তা আল্লাহর ইচছা ও নিয়ন্ত্রণের অধীন। এক চুল পরিমাণ ও এর বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। তাহলে যিনি একমাত্র মালিক, আমরা কেন তার নিকট বালা মুসিবত দূরকরা, দুর্দশা উঠিয়ে নেয়া, ফয়সালাতে সহজ করা এবং তাতে দয়া করার জন্য প্রার্থনা করব না? অতএব যার মন আল্লাহর দিকে ফিরে যাবে তার সকল সমস্যা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তিত হবে তখন তার সকল উপায় উপকরণের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হয়ে যাবেন। তার সকল দুরূহ কাজকে তিনি সহজ করে দিবেন, সুদূর প্রসারী বিষয়কে নিকটতর করে দিবেন। আর অসহায় ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের প্রতি প্রত্যাবর্তিত হবে আল্লাহ তাকে অসম্মানিত করবেন। দুর্বল ও নিকৃষ্ট বস্তুর দিকেই তাকে সোপর্দ করবেন।
আর যে এই শিরকের ধ্বংস থেকে অন্য ব্যক্তিকে রক্ষা করতে চেষ্টা করবে তার জন্য থাকবে আল্লাহর নিকট বিরাট সওয়াব। এবং যে ব্যক্তি নুন্যতম এ কাজকে প্রতিহত করতে চেষ্টা করবে তার জন্যও থাকবে অফুরন্ত পুরস্কার। আমি তার জন্য আশা করব ঐ প্রতিদান যে প্রতিদানের কথা বলেছেন সাইদ বিন যোবায়ের (রাঃ)।  তিনি বলেন  من قطع تميمة من إنسان كان كعدل رقبة
“যে ব্যক্তি কোন মানুষের হাত থেকে তাবিজ কেটে ফেলবে সে গোলাম আজাদ করার অনুরূপ সাওয়াব পাবে।” অর্থাৎ সে যেন একটি ক্রীতদাসকে আযাদ করে দিল।
সর্বশেষে আল্লাহর বাণী দিয়েই আমি আমার কথার ইতি টানতে চাই আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءكُمُ الْحَقُّ مِن رَّبِّكُمْ فَمَنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَمَا أَنَاْ عَلَيْكُم بِوَكِيلٍ
“বলুন, হে মানবসকল! তোমাদের নিকট সত্য এসেছে তোমাদের রব্বের পক্ষ থেকে। অতএব যে এ পথে আসতে চায় সে স্বীয় মঙ্গলের জন্য- ই আসবে। আর যে পথভ্রষ্ট হতে চায় সে স্বীয় অকল্যাণের জন্যই বক্রপথ অবলম্বন করবে এবং আমি তোমাদের উপর কর্মবিধায়ক নই।’ (সুরা ইউনুস ১০৮ )
পরিশেষে সমস্ত প্রশংসা সকল জগতের প্রতিপালকের জন্য। এবং আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশ্ব¯ত নবীর উপর সালাত, সালাম ও বরকত নাযিল করুন।
সমাপ্ত
লেখক : মুহাম্মদ বিন সোলায়মান আল-মুফাদ্দা
تأليف: محمد بن سليمان المفدى
অনুবাদ : মতিউল ইসলাম বিন আলী আহমাদ
ترجمة : مطيع الإسلام بن علي أحمد
সম্পাদনা : আব্দুননূর বিন আব্দুল জাব্বার
مراجعة : عبد النور بن عبد الجبار
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s