মানুষ কিভাবে মানুষের রব হয়ে যায়?


ইমাম ইবনে কাইয়্যিম (রহঃ) অনুবাদঃ ইউসুফইয়াসীন Printমানুষ কিভাবে মানুষের রব হয়ে যায়যে শিরোনাম দিয়ে আমি লেখাটি শুরু করেছি, তাশুনে হয়তো আপনি আশ্চর্য হচ্ছেন। আসলেইতো! মানুষ আবার মানুষের ‘রব’ হয় কি করে? আমরাতো জানি ‘রব’ একমাত্র আল্লাহ তা’আয়ালা। অথচ তিনিনিজেই বলেছেন -“তারা তাদের সণ্যাসী ও ধর্মযাজক (পীর,নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে) আল্লাহরপরিবর্তে ‘রব’ বানিয়ে নিয়েছে—–।” (সূরা তওবা ৯:৩১)অন্য আয়াতে আল্লাহ তা’আয়ালা তাঁর নবীকেদাওয়াতী পদ্ধতি শিক্ষা দিতে গিয়েও বলেছেন -“বলো (হে নবী), ‘হে আহলে কিতাবরা! এসোএমন একটি কথার ওপর আমরা একমত হই, যেব্যাপারে তোমাদের ও আমাদের মাঝে কোনবিরোধ নেই। তা হলো আমরা আল্লাহ তা’আলা ছাড়াঅন্য কারো গোলামী করবো না, তার সাথেকাউকে শরীক করবো না এবং আমরা একেঅপরকে আল্লাহর পরিবর্তে ‘রব’ বানিয়ে নেবোনা।” (সূরা আলি-’ইমরান ৩: ৬৪)সরাসরি কোরআনের আয়াত থেকে আমরা জানতেপারলাম যে, মানুষ মানুষকে ‘রব’ বানিয়ে নেয়। যদিওকারো পক্ষে ‘রব’ হওয়া সম্ভব নয়, তাই এখানেবুঝতে হবে যে অজ্ঞতা, জ্ঞানের স্বল্পতা,একগুয়েমী কিংবা বিভিন্ন কারণে অনেক সময় মানুষকোনো কোনো মানুষকে এমন স্থানেবসিয়ে দেয়, এমন ক্ষমতা মানুষের হাতে তুলেদেয়; যার কারণে একান্তভাবে আল্লাহর জন্যসংরক্ষিত ক্ষমতার আসনে মানুষকে বসিয়ে ‘রব’বানিয়ে ফেলে। আর এভাবে নিজেদেরকর্মকান্ডের দ্বারা তারা নিজেদের জন্য চিরকালীনজাহান্নাম কিনে নেয়। অথচ এই লোকগুলোরভেতরে হয়তো এমন মানুষও আছে যারা নামাযপড়ে, রোযা রাখে, হজ্জ করে, যাকাত দেয়, দাড়িআছে, একান্ত নিষ্ঠার সাথে তাসবীহ জপে, এমনকিতাহাজ্জুদ, এশরাক, আওয়াবীন নামাযও পড়ে। তাই মানুষকিভাবে মানুষের ‘রব’ হয়ে যায়, অর্থাৎ কোনবৈশিষ্ট, গুণাবলী ও ক্ষমতা হাতে তুলে দিলেমানুষকেই রবের আসনে বসিয়ে দেয়া হয়, এসম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকার কারণে এই জঘন্যতমঅপরাধ যদি আমরা কেউ করে বসি, তাহলে যত নেকআমলই করি না কেন তা কোনো কাজে আসবে নাএবং কোনো ইবাদতই কবুল হবে না। এ ব্যাপারেকেয়ামতের দিন কোনো ওজর ওজুহাত চলবে না,জানতাম না বলেও পার পাওয়া যাবে না। কেননা, আল্লাহতা’আলা স্পষ্ট করে কোরআনে বলে দিয়েছেনঃ“(হে মানবজাতি) স্মরণ করো সেই সময়ের কথা,যখন তোমাদের ‘রব’ আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশথেকে তাদের পরবর্তী বংশধরদের বের করেএনেছেন এবং তাদেরকেই তাদের নিজেদেরব্যাপারে সাক্ষ্য রেখে বলেছেন, ‘আমি কিতোমাদের একমাত্র ‘রব’ নই? তারা সবাই বললো,‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম (যে আপনিই আমাদেরএকমাত্র ‘রব’)’, এই সাক্ষ্য আমি এ জন্যই নিলাম যে,হয়তো কেয়ামতের দিন তোমরা বলে বসবেযে, আমরা আসলে বিষয়টি জানতামই না।অথবা তোমরা হয়তো বলে বসবে যে, আমরাতো দেখেছি আমাদের বাপ-দাদারা আগেথেকেই এই শিরকি কর্মকান্ড করে আসছে (সুতরাংআমরা তো অপরাধী না, কারণ) আমরা তো তাদেরপরর্বতী বংশধর মাত্র। তারপরও কি তুমি পূর্ববর্তীবাতিলপন্থীদের কর্মকান্ডের কারণেআমাদেরকে ধ্বংস করে দেবে?” (সূরা আরাফ৭:১৭২-১৭৩)আল্লাহ (সুব) কোরআনের মাধ্যমে আমাদেরজানিয়ে দিয়েছেন যে, এ ব্যাপারে কোনোঅজুহাত চলবে না, জানতাম না বলেও কোন লাভহবে না। তাই আসুন আমরা কোরআনের উপস্থাপিতবাস্তব ঘটনার আলোকে বুঝতে চেষ্টা করিকিভাবে মানুষ মানুষের ‘রব’ হয়ে যায়। কেননাকোরআনের আলোকে বুঝতে চেষ্টা করলেআমাদের জন্য বিষয়টি নির্ভূলভাবে বোঝা অনেকসহজ হয়ে যাবে। মূল আলোচনায় যাওয়ার আগেএকটি বিষয় জেনে নিন, কোরআনে যখন কোনব্যক্তি বা জাতির ইতিহাস তুলে ধরা হয় তখন বুঝতেহবে ইতিহাস বা গল্প শোনানোই এখানে উদ্দেশ্যনয়, বরং ব্যক্তি কিংবা জাতি কী কাজ করেছিলো এবংএর ফলে তাদের কী পরিণতি হয়েছে তাপর্যালোচনার মাধ্যমে ঐ কাজের পুনরাবৃত্তিথেকে উম্মতে মুহাম্মদীকে সতর্ক করাই ইতিহাসতুলে ধরার উদ্দেশ্য।আর একটি বিষয় মনে রাখতেহবে যে, কোরআনে যখনই কোন চরিত্রেরউল্লেখ হবে, বুঝতে হবে এ ধরনের চরিত্রকেয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকবে।কোরআনের আলোকে মানুষ কিভাবে মানুষের‘রব’ হয়ে যায় তা খতিয়ে দেখতে গিয়ে মানব জাতিরঅতীত ইতিহাসেই শুধু নয় বর্তমান বিশ্বেও অসংখ্য(মিথ্যা) রবের পদচারণা আমরা সচরাচর দেখতে পাই।তবে তারা শুধু মুখ দিয়ে বলে না যে, আমরাতোমাদের ‘রব’।‘রব’ দাবী করা বলতে মূলতঃ কী দাবী করা হয় তাযদি আমরা সত্যিই বুঝতে চাই তাহলে কিছুক্ষণেরজন্যে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবেফেরাউনের ইতিহাসের দিকে। কারণ সে যেপ্রকাশ্য নিজেকে ‘রব’ ঘোষণা করেছিলো তাকোরআন সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেঃ“দেশবাসীকে জড় করে সে ভাষণ দিলো,অতপর সে বললো, আমিই তোমাদের সবচেয়েবড় ‘রব’।” (সূরা নাযিয়াত ৭৯: ২৩-২৪)এখন কথা হলো, ফেরাউন নিজেকে ‘রব’ বলতেকী বুঝিয়েছে? সে কি দাবী করেছিলো যে,সে আসমান যমীন সৃষ্টি করেছে, মানব জাতিকেসৃষ্টি করেছে কিংবা পাহাড়-পর্বত যমীনের বুকেগেড়ে যমীনকে সে স্থিতিশীল করেরেখেছে?না, এমন দাবী সে কখনো করেনি। সে যদি এমনদাবী করতো তাহলে তার সংগী-সাথীরাই তাকেপাগল বলে উড়িয়ে দিতো। বরং সে নিজেও বিভিন্নপূজা-পার্বনে অংশ নিতো। তারও অনেক ধরনেরইলাহ, মাবুদ বা উপাস্য ছিলো। কোরআন থেকেইএর প্রমাণ দেখে নিনঃ“ফেরাউনের জাতির নেতারা (ফেরাউনকে)বললো, আপনি কি মূসা ও তার দলবলকে রাজ্যেবিপর্যয় সৃষ্টির সুযোগ দিবেন আর তারা আপনাকে ওআপনার ইলাহদের এভাবে বর্জন করেচলবে?” (সূরা আরাফ ৭: ১২৭)দেখুন আয়াত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে,তারও অনেক ইলাহ বা উপাস্য ছিলো। তাহলে তার‘রব’ দাবী বলতে আসলে কী বুঝায়? রব বলেসে কী দাবী করেছিলো? আসমান-যমীন,গ্রহ-নক্ষত্র, মানব জাতিসহ কোনো সৃষ্টি জগতেরস্রষ্টা বলে কেউ কোনো দিন দাবীতোলেনি। মক্কার কাফের মোশরেকরাওএসবের সৃষ্টিকর্তা যে আল্লাহ তা’আলা এটাসর্বান্তঃকরণে মানতো। যেমনঃ“জিজ্ঞাসা কর, ‘এই পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা আছেতারা কার, যদি তোমরা জান?’ তারা বলবে ‘আল্লাহর’।বল, ‘তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না?’জিজ্ঞাসা কর, ‘কে সপ্ত আকাশ এবং মহা আরশেরঅধিপতি?’ তারা বলবে ‘আল্লাহ’।বল, ‘তবুও কি তোমরাভয় করবে না?’ জিজ্ঞাসা কর, ‘সকল কিছুর কর্তৃত্বকার হাতে, যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যার উপরেআশ্রয়দাতা নেই, যদি তোমরা জান?’ তারা বলবে‘আল্লাহর’। বল, ‘তবুও তোমরা কেমন করেমোহগ্রস্থ হয়ে আছ?’”(সূরা মু’মিনুন ২৩ঃ ৮৪-৮৯)এমন আরো অসংখ্য আয়াত আছে যা প্রমাণ করেযে, তারা সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা, লালনকর্তা, পালনকর্তাও রিযিকদাতা হিসাবে আল্লাহকে মানতো, সুতরাংসমস্যাটা কোথায় ? এই বিশ্বাস থাকার পরও কেন তারাকাফের-মোশরেক, কেন তাদের জন্য জাহান্নামঅবধারিত ? ফেরাউন তাহলে কী দাবীকরেছিলো ? এই প্রশ্নগুলো শুনে হয়তোঅনেকে বিভ্রান্তিতে পড়ে যাবেন। কিন্তু বিভ্রান্তহওয়ার কিংবা অন্ধকারে হাতড়ে মরার কোনোপ্রয়োজনই নেই। সরাসরি আল্লাহর কালামকোরআনই আমাদেরকে স্পষ্ট করে জানিয়েদিচ্ছে যে, ফেরাউনের দাবী ছিল সার্বভৌমত্বেরদাবী। সারা পৃথিবীতে নয় তার দাবী ছিল কেবলমিশরের শাসন ক্ষমতার উপর নিরংকুশ আধিপত্যেরদাবী। তার দাবী ছিলো মিশরের সাধারণ জনগণেরজন্যে তার ইচ্ছানুযায়ী যেমন খুশী তেমন আইন-কানুন ও মূল্যবোধ নির্ধারনের ক্ষমতার দাবী।দেখুন কোরআন কী বলেছেঃ“ফেরাউন তার জাতির উদ্দেশ্যে (এক) ভাষণদিলো। সে বললো, মিশরের সার্বভৌমত্ব কি আমারনয়? তোমরা কি দেখছো না যে, এই নদীগুলোআমার (রাজত্বের ) অধীনেই বয়ে চলছে——–।” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৫১)“এসব বলে সে তার জাতিকে ভীতসন্ত্রস্ত করেতুললো, এক পর্যায়ে তারা তার আনুগত্য মেনেওনিলো। এটি প্রমাণ করে যে,নিঃসন্দেহে তারানিজেরাও ছিলো এক পাপীষ্ঠ জাতি।” (সূরা যুখরুফ৪৩:৫৪)কোরআনের আয়াতগুলো এবং বাস্তব প্রেক্ষাপটযদি আমরা চিন্তা করি তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারি যে,আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী,চক্র বা যে কারো সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ামানেই হলো তাকে বা তাদেরকে ‘রব’ বানিয়েনেয়া। কারণ অন্য কারো সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ামানেই হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকারকরে আইন-কানুন রচনা করার অধিকারসহ নিরংকুশ শাসনকর্তৃত্ব তাদের হাতে তুলে দেয়া।তারা কিভাবে তাদেরকে আল্লাহর পরিবর্তে ‘রব’বানিয়ে নিয়েছিলো তা আমরা সরাসরি আল্লাহর রাসূল(সাঃ)-এর করা এই আয়াতের তাফসীরেরআলোকে একেবারে স্পষ্ট করে বুঝতেপারবো ইনশাআল্লাহ। তিরমিযীতে উদ্ধৃত হাদিসেহযরত আদী ইবনে হাতেম (রাঃ) বলেন, আমিএকবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে এসে দেখলাম তিনিসূরা তওবার এই আয়াতটি তেলাওয়াত করছিলেনঃ“তারা তাদের সন্ন্যাসী ও ধর্মযাজক (পীর,নেতৃস্থানীয় লোকদেরকে) আল্লাহরপরিবর্তে ‘রব’ বানিয়ে নিয়েছে——।” (সূরা তওবা৯:৩১)অতপর রাসূল (সাঃ) বলেন তোমরা শোনো তারাতাদেরকে (শাব্দিক অর্থে) পূজা/ উপাসনা করতোনা, কিন্তু তারা যখন মনগড়া ভাবে কোনো কিছুকেবৈধ ঘোষনা করতো, জনগণ তা মেনে নিতো,আর যখন কোনো কিছুকে অবৈধ ঘোষণাকরতো তখন তারা তা অবৈধ বলে মেনে নিতো।তাফসীরে ইবনে কাসীরে ইমাম আহমদ তিরমিযীও ইবনে জারীরের সূত্রে আদী ইবনেহাতেম (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে,তার কাছেইসলামের দাওয়াত আসার পরে প্রথমে তিনি সিরিয়ায়পালিয়ে গিয়েছিলেন, পরে যখন রাসূল (সাঃ) এরকাছে তিনি এলেন তখন তার গলায় ক্রুশ ঝুলানোছিলো। তখন রাসূল (সাঃ) উল্লেখিত আয়াতটিপড়ছিলেন। হযরত আদী (রাঃ) বলেন, আহলেকিতাবরা (ইহুদী ও খৃষ্টানরা) তো আলেম/দরবেশদের (তথা নেতাদের)পূজা উপাসনা করতোনা ! রাসূল (সাঃ) বললেন, তা সত্য। তবে তারা মনমতোকোনো কিছুকে বৈধ কিংবা অবৈধ ঘোষনা করলেজনগণ তা নির্বিচারে মেনে নিতো। এটাই তাদেরপূজা-উপাসনা/ ইবাদত।বর্তমান তাগুতী (সীমালঙ্ঘনকারী) সরকার ব্যবস্থায়এর উদাহরণ দেখুন, ১. মদ, ২. জুয়া, ৩. লটারী, ৪.সুদ, ৫. বেপর্দা, ৬.নারী নেতৃত্ব, ৭. বেশ্যাবৃত্তি(ব্যভিচার) ৮. এমন আরো অসংখ্য বিষয় রয়েছে,যেগুলো আল্লাহ তা’আলা কঠোর ভাবে অবৈধঘোষণা করেছেন, পক্ষান্তরে, তারা এগুলোকেবৈধতার সার্টিফিকেট দিয়েছে। দন্ডবিধির বিষয়টিদেখুন, চুরি ও ডাকাতির দন্ড, ব্যভিচারের দন্ড, সন্ত্রাসদমন আইন, বিবাহ বিধিসহ আরো অনেক বিষয়েআল্লাহ তা’আলা যে বিধান আল-কোরআনেরমাধ্যমে ঘোষনা করেছেন, তা বাদ দিয়ে তারানিজেদের মনমতো দন্ড বিধি বৈধ করছে। এইঅধিকার তারা পেলো কোথা থেকে। কে দিলোতাদেরকে এই অধিকার। যারা এদেরকে সমর্থন,রক্ষনাবেক্ষণ, সম্মান এবং প্রতিষ্ঠিত করার জন্যআমরণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্যেআমার বক্তব্য হচ্ছে, তোমরা আল্লাহকে ভয়করো ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো ! তোমরাআল্লাহকে ভয় করো ! ঐ দিন (বিচার দিবস) আসারপূর্বেই নিজেদের আমলকে শুধরে নাও, যেদিনকেউ কারো সাহায্য করবে না এবং প্রত্যেককেতার নিজের কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে এবংতওবা করে আল্লাহর মনোনীত জীবন ব্যবস্থায়(ইসলামে) ফিরে এসো। কেননা আল্লাহ তা’আলামুসলিমদেরকে ঈমান আনার পূর্বে শর্ত দিয়েছেনএসব তাগুতী সরকারদের সাথে কুফরী/অস্বীকার করার এবং এসব শয়তানী মতাদর্শকেভেঙ্গে চুরমার করে দিয়ে একমাত্র ইসলামকেসেখানে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।কোরআনের আয়াতের আলোকে তাওহীদ এবংশিরকের সংজ্ঞা নির্ধারণে ইসলামের আইন কানুন ওআক্বীদা বিশ্বাস একই গুরুত্ব বহন করে। আক্বীদাবিশ্বাস থেকেই এর আইন কানুন উৎসারিত। আরোসতর্কভাবে বলতে গেলে, এর আইন কানুনঅবিকল এর আক্বীদা বিশ্বাস। আইন কানুন আক্বীদাবিশ্বাসেরই বাস্তব রূপ। এই মৌলিক সত্যটিকোরআনের আয়াতসমূহ থেকে এবংকোরআনের বর্ণনাভংগি থেকে সূর্যেরআলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অথচ শত শতবছর ধরে মুসলমানদের মনে বিরাজমান ধর্ম সংক্রান্তবিশ্বাস থেকে এই সত্যাটিকে অত্যান্ত সুক্ষষঢ়যন্ত্রের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এমনকিপরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এতোদূর গড়িয়েছে যে,ইসলামের শত্রুরা তো দূরের কথা, এর উৎসাহীভক্তরা পর্যন্ত শাসন ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বকেইসলামী আক্বীদা বিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন একটাব্যাপার বলে মনে করতে আরম্ভ করেছে।ইসলামের খুঁটিনাটি আমলের জন্য তারা যেমন উতালা ওআবেগোদীপ্ত হয়, রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা ওসার্বভৌমত্বের জন্যে কিছুতেই তেমন হয় না।ইসলামের ছোটখাটো আমল আখলাক থেকেবিচ্যুতিকে যেমন তারা বিচ্যুতি গণ্য করে, ইসলামেররাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় বিধান থেকেবিচ্যুতিকে সে ধরনের বিচ্যুতি গন্য করে না। অথচইসলাম এমন একটা জীবন বিধান, যার আক্বীদা, আমলআখলাক, চরিত্র ও আইন কানুনে কোন বিভাজননেই। কিছু কুচক্রী মহল সুপরিকল্পিত পন্থায় শত শতবছর ধরে এর মধ্যে বিভাজন ঢুকানোর চেষ্টাকরেছে। এরই ফলে ইসলামের রাষ্ট্রীয় ওরাজনৈতিক ক্ষমতা তথা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব সংক্রান্তএমন মৌলিক বিষয়টি এতো তুচ্ছ ও ঐচ্ছিক বিষয়েপরিণত হয়েছে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, এমনকিইসলামের সবচেয়ে আবেগাপুত ভক্তরাও আজকালএকে কম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐচ্ছিক বিষয় ভাবতে শুরুকরেছে।যারা মূর্তিপূজা করাকে শেরেক বলে অভিহিত করে,অথচ আল্লাহদ্রোহী শক্তির শাসন মান্য করাকেশেরেক বলে আখ্যায়িত করে না এবং মূর্তিপূজারীকে মোশরেক মনে করে, কিন্তুতাগুতী শক্তি তথা মানবরচিত আইনের অনুসারীদেরমোশরেক মনে করে না, তারা আসলেকোরআন অধ্যায়ন করে না এবং ইসলামকে চেনেনা। রাসূল (সাঃ)-এর ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনকেপর্যবেক্ষণ করে না। তাদের উচিত যেভাবেআল্লাহ তা’আলা কোরআন নাযিল করেছেন, সেইভাবেই তা পড়া।আরো দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ইসলামের এইদরদী ভক্তদের কেউ কেউ প্রচলিত তাগুতীরাষ্ট্র ব্যবস্থার কিছু কিছু আইন, পদক্ষেপ ও কথাবার্তাসম্পর্কে মাঝে মধ্যে খুঁত ধরেন যে, অমুক কাজইসলাম বিরোধী। কোথাও কোথাও কিছু ইসলামবিরোধী আইন বা বিধি ব্যবস্থা দেখে তারা রেগেযান। তাদের ভাব দেখে মনে হয়, যেন ইসলামতো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েই আছে,তাই অমুকঅমুক ত্র“টি যেন তার পূর্নতার ক্ষেত্রে বাধা হয়েআছে।এই সকল দ্বীনদরদী (!) ব্যক্তি তাদেরঅজান্তেই ইসলামের ক্ষতি সাধন করে থাকেন।তাদের সেই মূল্যবান শক্তিকে তারা এসব অহেতুককাজে অপচয় করেন, অথচ তা ইসলামের মৌলিকআক্বীদা বিশ্বাস প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করা যেতো। এসবকাজ দ্বারা তারা আসলে জাহেলী সমাজ রাষ্ট্রেরপক্ষেই সাফাই গান। কেননা, এর দ্বারা বোঝা যায়যে, ইসলাম তো এখানে কায়েম আছেই,কেবলঅমুক অমুক ত্রুটি শুধরালেই তা পূর্ণতা লাভ করবে।অথচ এখানে সার্বভৌম ক্ষমতা অর্থাৎ আইন প্রনয়ন,শাসন ও বিচার ফয়সালার সর্বময় চূড়ান্ত ক্ষমতা ওএখতিয়ার যতক্ষণ মানুষের হাত থেকে পরিপূর্ণভাবেছিনিয়ে এনে আল্লাহর হাতে ন্যস্ত না হবে,ততক্ষণ ইসলামের অস্তিত্ব বলতেই এখানে কিছুনেই। কারণ অন্যের সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়াঅর্থই হলো আল্লাহকে অস্বীকার করা। আরযেখানে আল্লাহকে অস্বীকার করা হয় সেখানেইসলামের অস্তিত কিভাবে থাকে। এটি কাফেরমোশরেকদের এমন এক সূক্ষ-ষড়যন্ত্র, যারমাধ্যমে আল্লাহকে কার্যত অস্বীকার করাসত্তেও সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারে না। আপনিলক্ষ্য করলে দেখতে পারেন, তারা বলে নাতোমরা ইসলাম ছাড়ো, তারা বলে, গণতন্ত্র(জনগনের আইন) গ্রহণ কর,কেননা তারা ভালোকরেই জানে, গণতন্ত্র গ্রহণ অর্থই হলোইসলামকে বর্জন করা।মনে রাখতে হবে যে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বহালথাকলেই অর্থাৎ আল্লাহকে একমাত্র নিরংকুশআইনদাতা মানলেই ইসলামের অস্তিত্ব অক্ষুন্নথাকে।আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বজায় না থাকলেসেখানে ইসলামের অস্তিত এক মুহুর্তও থাকতেপারে না। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, আজকেরপৃথিবীতে ইসলামের একমাত্র সমস্যা এই যে,আল্লাহর যমীনে আল্লাহদ্রোহী তাগুতী শক্তিরাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ওপ্রভুত্বের ওপর ভাগ বসাচ্ছে, তা ছিনতাই করার ধৃষ্টতাদেখাচ্ছে আর নামাযী, দাড়ী-টুপিওয়ালা, তাসবীহওয়ালা লোকরা তাদেরকে সমর্থন দেয়া থেকেশুরু করে সরকারের অধীনে বিভিন্ন পদ গ্রহণকরে তাদের সহায়তা করে বৈষয়িক ফায়দা লুটছে।এই শাসক শ্রেনী তাদের আইন প্রণয়নেরক্ষমতা নিশ্চিত করছে এবং স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র,অর্থনীতি, সমাজ, পরিবার তথা সাধারণ মানুষেরজীবন, সহায় সম্পদ ও তাদের মধ্যে বিবাদমানবিষয়ে নিজেদের খেয়ালখুশী মতো বিধি নিষেধপ্রয়োগ করছে। এটাই সেই সমস্যা যারমোকাবেলা করার জন্য কোরআন নাযিল হয়েছেএবং সে আইন প্রনোয়ণ ও বিধি নিষেধ প্রনোয়ণও প্রয়োগের ক্ষমতাকে দাসত্ব ও প্রভুত্বেরসাথে স¤পৃক্ত করেছে এবং স্পষ্ট ভাষায় ঘোষনাকরেছে যে, এর আলোকেই সিদ্ধান্ত আসবেকে মুসলিম-কে অমুসলিম, কে মু’মিন ও কে কাফির।ইসলাম তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রথমযে লড়াই চালিয়েছে, তা নাস্তিকতার বিরুদ্ধে পরিচালিতলড়াই ছিলনা। এ লড়াই সামাজিক ও নৈতিক উচ্ছৃংখলতারবিরুদ্ধেও ছিল না। কেননা এসব হচ্ছে ইসলামেরঅস্তিত্বের লড়াইয়ের পরবর্তী লড়াই। বস্তুতঃইসলাম নিজের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বপ্রথমযে লড়াই করেছে, তা ছিল সার্বভৌমত্বেরঅধিকারী কে হবে সেটা স্থীর করার লড়াই।এজন্য ইসলাম মক্কায় থাকা অবস্থাতে এ লড়াইয়েরসূচনা করেছিল। সেখানে সে কেবল আক্বিদাবিশ্বাসের পর্যায়ে এ কাজ করেছিল, রাষ্ট্র ওসরকার প্রতিষ্ঠা বা আইন প্রণয়নের চেষ্টা করেনি।তখন কেবল মানুষের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধ মূলকরার চেষ্টা করেছে যে, সার্বভৌমত্ব তথা প্রভুত্বও সর্বময় ক্ষমতা এবং আইন বা হুকুম জারির ক্ষমতা ওশর্তহীন আনুগত্য লাভের অধিকার একমাত্রআল্লাহর। কোন মুসলমান এই সার্বভৌমত্বের দাবীকরতে পারে না এবং অন্য কেউ দাবী করলেজীবন গেলেও সেই দাবী মেনে নেবে না।মক্কায় অবস্থান কালে মুসলমানদের মনে যখন এইআক্বিদা দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হলো, তখন আল্লাহতা’আয়ালা তাদেরকে তা বাস্তবে প্রয়োগেরসুযোগ দিলেন মদিনায়।সুতরাং আজকালকার ইসলামের একনিষ্ঠ ওআবেগোদ্দীপ্ত ভক্তরা ভেবে দেখুন, তারাইসলামের প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করেছেন কি না?যারা একমাত্র আল্লাহর গোলামী করে এবংমানুষকে ‘রব’-এর আসনে বসায় না তারাই মুসলমান। এইবৈশিষ্ট্যই তাদেরকে দুনিয়ার সকল জাতি ও গোষ্ঠিরউর্ধে স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করে এবং দুনিয়ার সকলজাতির জীবন যাপন পদ্ধতির মধ্য থেকে তাদেরজীবন পদ্ধতির স্বকীয়তার নির্দেশ করে।উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে থাকলে তারামুসলমান, নচেত তারা অমুসলিম, চাই তারা যতইনিজেদের মুসলমান বলে দাবী করুক না কেন।মানবরচিত সকল জীবন ব্যবস্থায় মানুষ মানুষকেইআল্লাহর আসনে বসায়। কোন দেশেসর্বোচ্চমানের গণতন্ত্র কিংবা সর্বনিম্নমানেরস্বৈরাতন্ত্র- যা-ই থাকুক সর্বত্র এই একই অবস্থা।প্রভূত্বের সর্বপ্রথম বৈশিষ্ট্য হলো মানুষকেগোলাম বানানোর অধিকার এবং মানুষের জন্য আইন-কানুন, মূলবোধ ও মানদন্ড রচনার অধিকার। পরিমার্জিতপরিশোধ বা অঘোষিতভাবে হোক,মানবরচিত সকলব্যবস্থায় একটি মানবগোষ্ঠী কোন না কোনআকারে এই অধিকারের দাবীদার। এতে করেএকটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর লোকেরা অবৈধভাবেসার্বভৌম ক্ষমতা সম্পন্ন হয়ে পড়ে। এই নির্দিষ্টগোষ্ঠীটি বাদ বাকী দেশবাসীর দন্ডমূন্ডেরকর্তা হয়ে তাদের জন্য আইন কানুন,রীতি নীতি,মূল্যবোধ ও মানদন্ড নির্ধারণ করে।কোরআনের আয়াতে একেই বলা হয়েছেমানুষকে মানুষের ‘রব’ বানিয়ে নেয়া। এভাবেইবর্তমান বিশ্বের সকল দেশের সাধারণ জনগণতাদের শাসক শ্রেণীর ইবাদত/অনুগত্য/গোলামীকরে, যদিও তারা তাদের উদ্দেশ্যে রুকু-সিজদাকরেনা।এই অর্থেই ইসলাম আল্লাহর দেয়া একমাত্র জীবনব্যবস্থা। দুনিয়ার সকল নবী ও রাসূল এই ইসলাম নিয়েইএসেছিলেন। আল্লাহ তা’আয়ালা মানুষকে মানুষেরদাসত্ব থেকে মুক্ত করে তার নিজের দাসত্বেরঅধীন করার জন্য এবং মানুষকে যুলুম থেকে মুক্তকরে আল্লাহর ন্যায়-বিচারের ছায়াতলে আশ্রয়দানের জন্যই নবীদেরকে যুগে যুগে ইসলামীবিধান সহকারে পাঠিয়েছেন। যারা তা অগ্রাহ্য করে,তারা মুসলমান নয়, তা সে যতই সাফাই গেয়েনিজেকে মুসলমান প্রমাণ করার চেষ্টা করুক নাকেন এবং তাদের নাম আব্দুর রহমান, আব্দুর রহিম যাইহোক না কেন।আল্লাহ আমাদের হক্ককে হক্ক হিসেবে চেনারও তা পালন করার তৌফিক দান করুন এবং বাতিলকে বাতিলহিসেবে চেনার ও তা থেকে দূরে থাকার তৌফিকদান করুন। হে আল্লাহ! সমস্ত তাগুতী শক্তিকেধ্বংস করুন। ———- আমিন।