ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহঃ এর জিহাদ ও দৃঢ়তা এবং খালকে কুরআনের ফিতনা!


খালকে কুরআনের ফিতনা এবং ইমাম
আহমাদ (র:)এর জিহাদ ও দৃঢ়তা
নভেম্বর ১৬th, ২০১৪ আব্দুল্লাহ শাহেদ
আল মাদানী
Download article as PDF
কুরআন আল্লাহর কালাম; ইহা আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্ট
বস্তুর মত নয়। কুরআন আল্লাহর নিকট থেকে
এসেছে এবং আল্লাহর নিকট ফিরে যাবে। উপরে
উল্লেখিত দলীলগুলো সে কথারই প্রমাণ করে।
সাহাবী, তাবেঈ, সালাফে সালেহীন এবং সম্মানিত
ইমামগণের মতও তাই। সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল
জামাআতের আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে কুরআন
আল্লাহর কালাম। তবে মতাযেলা এবং আহলে
সুন্নাতের মধ্যে এই মাআলাটি নিয়ে বিরাট মতভেদ
রয়েছে। এই মতভেদের কারণে আহলে সুন্নাত
ওয়াল জামাআতের লোকদের বিরাট ক্ষতি হয়েছে।
আহলে সুন্নাতের ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রঃ) এই
মাসআলার কারণেই কঠোর নির্যাতন ভুগ করেছেন।
কতিপয় আলেম বলেনঃ রিদ্দার যুদ্ধের দিন আল্লাহ
তাআলা আবু বকর (রাঃ)এর মাধ্যমে যেমন ইসলামের
হেফাজত ও সাহায্য করেছেন তেমনি যেদিন ইমাম
আহমাদ বিন হাম্বালের উপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল
সেদিন তার মাধ্যমে ইসলামের হেফাজত
করেছেন।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল যেই ফিতনায় পড়েছিলেন,
তার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, আব্বাসী খলীফা মামুনুর
রশিদের যুগে মুতাযেলা আলেমদের খুব প্রভাব
ছিল। তাদের প্রভাবে স্বয়ং খলীফা মামুনও প্রভাবিত
হয়ে গিয়েছিলেন। মুতাযেলাদের মতে কুরআন
আল্লাহর মাখলুক। তারা খলীফাকে এই কথা বুঝাতে
সক্ষম হয়েছিল। তাই খলীফা মামুন মানুষকে এই
মতবাদ মানতে বাধ্য করলেন। তার কথার সাথে
যেসব আলেম অমত পোষণ করতেন, তিনি
তাদের উপর নির্যাতন চালাতেন এবং হত্যা করতেন।
অধিকাংশ আলেম তখন মনে করলেন যে, বল
প্রয়োগ করে যেহেতু কুরআনকে মাখলুক
বলতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং তা না বললে তাদের
উপর নির্যাতন চালানো হয়, তাই বাধ্য হয়ে তারা
খলীফার কথা মেনে নিলেন। বিশেষ করে যখন
ইসলামে এই সুযোগ রয়েছে যে, বাধ্য হয়ে
কুফুরী বাক্য উচ্চারণ করলে কোন মুসলিম কাফের
হয়ে যায়না। ঈমানের দ্বারা অন্তর পরিপূর্ণ রেখে
জান চলে যাওয়ার কিংবা নির্যাতেন ভয়ে মুখে
কুফুরী বাক্য উচ্চারণ করলে তা জায়েয রাখা
হয়েছে এবং এই অবস্থায় কুফুরী বাক্য
উচ্চারণকারীকে ক্ষমা করে দেয়া হয়।
তাই এক অধিকাংশ আলেম মাসআলাটিকে এই পর্যায়ে
রেখে স্বীকার করে নিলেন যে, কুরআন
আল্লাহর সৃষ্টি। তবে সেখানে এমন কিছু আলেম
থাকার কথাও উড়িয়ে দেয়া যায়না, যারা কেবল খলীফার
নৈকট্য ও পার্থিব স্বার্থ হাসিলের জন্যই কুরআনকে
মাখলুক বলেছিল।
কিন্তু ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল এবং মুহাম্মাদ বিন নূহ (রঃ)
কুরআনকে মাখলুক বলতে অস্বীকার করলেন।
তারা উভয়েই বললেনঃ কুরআন আল্লাহর কালাম।
আল্লাহর নিকট থেকে ইহা নাযিল হয়েছে। ইহা
অন্যান্য সৃষ্টির মত সৃষ্ট জিনিষ নয়; বরং তা আল্লাহর
কালাম ও সিফাত। তারা মনে করলেনঃ বাধ্য হয়ে
যেসব মাসআলায় সত্যের বিপরীত বলা যায়, এটি
সেরকম কোন সাধারণ ও ব্যক্তিগত মাসআলা নয়।
সুতরাং এই ক্ষেত্রে তাদের জন্য সেই সুযোগ
গ্রহণ করা জায়েয নেই। কারণ এই মাসআলাটি
ব্যক্তিগত মাসআলা নয়, যাতে বাধ্য হয়ে সত্যের
খেলাফ বললে ক্ষমা করে দেয়া হবে। যেসব
মাসআলার সম্পর্ক ইসলামী শরয়তের সংরক্ষণের
সাথে, সেখানে নিজের গর্দান বির্জন দিয়ে
হলেও মুসলিমরা কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামের হেফাজত
করবে।
সুতরাং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রঃ) যদি তখন নির্যাতন
থেকে বাঁচার জন্য এবং বাধ্য হয়ে এই কথা বলতেন
যে, কুরআন আল্লাহর মাখলুক, তখন সকল মানুষই বলতঃ
কুরআন আল্লাহর মাখলুক। নির্যাতনের ভয়ে এই কথা
বলা হলে ইসলামী সমাজ পরিবর্তন হয়ে যেত এবং
একটি চিরসত্য ইসলামী আকাদাহ হয়ত মুসলিমগণ হারিয়ে
ফেলতেন। তাই তিনি খলীফার কথায় সম্মতি না দিয়ে
সত্য প্রকাশ করার সুদৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করলেন এবং
এই জন্য অমানিবক নির্যাতন ভুগ করলেন।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালের ফিতনার বিষয়টি ভাল করে
বুঝার জন্য আরেকটু খোলাসা করে লিখার
প্রয়োজন অনুভব করছি। বলা হয়েছে যে,
মুতাযেলী আলেম আহমাদ বিন আবু দাউদ এবং বিশর
আলমুরাইসী খলীফা মামুনকে পরামর্শ দিল, তিনি
যেন রাজ্যের আলেমদেরকে এই কথা বলতে
বাধ্য করেন যে, কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি। মামুন
এতে রাজী হয়ে বাগদাদের পুলিশ প্রধান ইসহাক বিন
ইবরাহীমকে দেশের সমস্ত বিজ্ঞ আলেমকে
একত্র করার আদেশ দিলেন। ইসহাক সকল
আলেমকে একত্র করে মামুনের চিঠি পড়ে
শুনালেন এবং কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি,- এ কথা বলার
আহবান জানালেন। সেই সাথে এই কথাও জানিয়ে
দেয়া হলো যে, খলীফার আদেশ অমান্য করে
যেই আলেম কুরআনকে আল্লাহর কালাম বলবে,
তাকে সরকারী পদ থেকে বহিস্কার করা হবে এবং
মামুনের অনুদান থেকেও বঞ্চিত করা হবে।
উল্লেখ্য যে, খলীফার আদেশ অমান্য করার
ভয়াবহ পরিণতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়া হলো।
এখান থেকেই ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালের
জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ইমামকে
অন্যান্য আলেমের সাথে ইসহাকের কার্যালয়ে
হাজির করা হলো। আলেমগণ এক এক করে
সকলেই নির্যাতনের ভয়ে কুরআনকে মাখলুক বলা
শুরু করলেন। কিন্তু ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল এই অবস্থা
দেখে ক্রোধে ফেটে পড়লেন এবং
ক্রোধে তাঁর চেহারা ও চোখ লাল হয়ে গেল।
অথচ এর আগে তিনি ছিলেন একজন নরম ও
কোমল প্রকৃতির মানুষ। কিন্তু তাঁর সেই নরম স্বভাব
চলে গেল এবং তিনি আল্লাহর জন্য রাগান্বিত হলেন।
এটি ছিল সেই দিনের ঘটনা। অতঃপর তিনি তাঁর মসজিদে
ফিরে এলেন এবং পাঠ দানে নিয়োজিত হলেন।
লোকেরা এরপর থেকে ইমাম আহমাদ বিন
হাম্বালকে এই মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস
করতে লাগলেন। প্রথম দিকে তিনি এই মাসআলার
জবাব দিতে অস্বীকার করতেন। কিন্তু ফিতনাটি যখন
চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন মানুষ জেনে
ফেলল যে, কোন্ কোন্ আলেম এই মাসআলায়
খলীফার মর্জী মোতাবেক ফতোয়া দিয়েছেন
এবং ক্ োকোন্ আলেম খলীফার বিরোধীতা
করেছেন।
খলীফা মামুনের কাছেও খবর পৌঁছে গেল। তিনি
তখন বাইজানটাইনের সীমান্তবর্তী অঞ্চল
তারতুসে অবস্থান করছিলেন। তিনি পুলিশ প্রধান
ইসহাককে দ্বিতীয়ার আলেমদের সাথে বসার
আদেশ দিলেন এবং যারা কুরআনকে আল্লাহর সৃষ্টি না
বলে আল্লাহর কালাম বলবে, তাদেরকে কঠোর
শাস্তি দেয়ার আদেশ করলেন। ইসহাক তাই
করলেন। এতে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ও মুহাম্মাদ বিন
নুহ ব্যতীত সকলেই খলীফার কথা মেনে নিল।
এ পর্যায়ে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল এবং মুমহাম্মাদ বিন
নুহকে জেলে বন্দী করা হলো। ইসহাক শপথ
করে বললঃ তারা যদি কুরআনকে মাখলুক বলতে নারাজ
হয়, তা হলে সে উভয়কে নিজ হাতে হত্যা করবে।
এ জন্য সে তলোয়ার উঁচিয়ে ভয় দেখালো।
কিন্তু তারা উভয়েই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।
এইবার ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালকে বাগদাদ থেকে
তারতুসের যেখানে খলীফা মামুন অবস্থান
করছিলেন, সেখানে নিয়ে যাওয়ার আদেশ করা
হলো। তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। যাওয়ার
পথে অনেক ঘটনাই ঘটে যায়। এসব ঘটনা ইমামকে
সত্যের উপর দৃঢ়পদ থাকতে সহায়তা করেছিল। এ
সময় সমস্ত মানুষের দৃষ্টি ছিল ইমাম আহমাদ বিন
হাম্বালের দিকে। তিনি কী বলেন, তারা তার
অপেক্ষায় ছিল। লোকেরা তাকে এই মাসআলায়
সত্যের উপর অটল থাকতে সাহস দিতেন।
কথিত আছে যে, তারতুসে যাওয়ার পথে ইরাকের
একজন গ্রাম্য লোক তাঁর সাথে দেখা করে এই
বলে সাহাস দিল যে, হে ইমাম আহমাদ! আপনি
সত্যের পথেই আছেন। সুতরাং আপনি অটল থাকুন।
আপনাকে যদি হত্যাও করা হয়, তাহলেও আপনি
খলীফার কথায় সম্মতি দেবন না। শহীদ হয়ে মৃত্যু
বরণ করুন। আর বেঁচে থাকলে সম্মানিত ও প্রশংসিত
হয়ে বেঁচে থাকুন। এই দুনিয়াতে নিহত হয়ে
পরকালে জান্নাতে যাওয়াই আপনার জন্য ভাল। এসব
কথা শুনে ইমামের মনোবল বৃদ্ধি পেত এবং তাঁর
ঈমান মজবুত হতো।
আরো কথিত আছে যে, তারতুস যাওয়ার পথে ইমাম
আহমাদের অন্যতম সাথী আবু জা’ফর আলআন্বারী
ফুরাত নদী পার হয়ে ইমামের সাথে সাক্ষাৎ করতে
আসলেন। ইমাম তাকে দেখে বললেনঃ হে আবু
জা’ফর! এত কষ্ট করে আমার সাথে দেখা করতে
আসার কী প্রয়োজন ছিল? জবাবে আবু জা’ফর
বললেনঃ ওহে আহমাদ! শুন! তুমি আজ মানুষের নয়ন
মনি, তুমি সকলের মাথা! মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে
আছে। তারা তোমার অনুসরণ করবে। আল্লাহর
কসম! তুমি যদি কুরআকে মাখলুক বলো, তাহলে
আল্লাহর বান্দারা তাই বলবে। আর তুমি যদি তা বলতে
অস্বীকার করো, তাহলে অগণিত মানুষ কুরআনকে
মাখলুক বলা হতে বিরত থাকবে। হে বন্ধু! ভাল করে
শুন। খলীফা যদি তোমাকে এইবার হত্যা নাও করে,
তাহলে তুমি একদিন মৃত্যু বরণ করবে। মরণ একদিন
আসবেই। সুতরাং তুমি আল্লাহকে বয় করো।
খলীফার কথায় তুমি কুরআনকে সৃষ্টি বলতে
যেয়োনা।
কথাগুলো শুনে ইমাম আহমাদ কাঁদতে লাগলেন এবং
বললেনঃ ﻣﺎ ﺷﺎﺀ ﺍﻟﻠﻪ আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন। অতঃপর
তিনি বললেনঃ হে আবু জা’ফর! কথাগুলো তুমি
আরেকবার বলো। আবু জা’ফর কথাগুলো পুনরাবৃত্তি
করলেন। এবারও ইমাম কাঁদলেন এবং বললেনঃ ﻣﺎ ﺷﺎﺀ
ﺍﻟﻠﻪ।
তারতুস যাওয়ার পথে ইমাম আহমাদ গভীর রাতে
তাহাজ্জুদের নামায পড়তেন এবং আল্লাহর কাছে এই
বলে দুআ করতেনঃ আল্লাহ যেন তাঁকে মামুনের
সামনে হাজির না করেন এবং মামুনকে যেন না
দেখান। দুআয় তিনি এই কথা বারবার বলতেন। কথিত
আছে যে, তারতুস পৌঁছার আগেই বিনা অসুখে
মামুন মৃত্যুমুখে পতিত হয়। এটি ছিল ২১৮ হিজরী
সালের রজব মাসের ঘটনা।
মামুনের মৃত্যু সংবাদ আসার পর রক্ষীরা ইমামকে
মুহাম্মাদ নুহএর সাথে বাগাদের জেলে ফেরত
নিয়ে আসল। মামুনের পরে মুতাসেম খলীফা
নিযুক্ত হলেন। মুতাসেম যদিও মুতাযেলা মতাদর্শে
বিশ্বাসী ছিলেন না, কিন্তু মামুনের গৃহীত নীতি
থেকে ফিরে আসাও তার পক্ষে সম্ভব ছিলনা। কারণ
খলীফা মামুন মুতাসেমকে মুতাযেলা মতাদর্শের
উপর অটল থাকার অসীয়তও করেছিলেন। তাই
মামুনের প্রতি মুতাসেমের অগাধ ভালবাসার কারণেই
মুতাসেম খলীফা হয়ে সর্বপ্রথম যে সিদ্বান্তটি
গ্রহণ করেন তা হলো তিনি ইমাম আহমাদকে হাত-পা
বেঁধে বাগদাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি জেলে
ফেলে রাখলেন। তাতে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে
পড়লে বাগদাদের বড় জেলে সাধারণ
কয়েদীদের সাথে স্থানান্তর করলেন। এখানে
তিনি ত্রিশ মাস অবস্থান করেন। এরই মধ্যে দীর্ঘ
কারাভোগ এবং নির্যাতনের কারণে জেলের
মধ্যেই মুহাম্মাদ বিন নূহ মারা গেলেন। তাঁর মৃত্যুর পর
ইমাম আহমাদ একাই ময়দানে বাতিলের মোকাবেলা
করতে থাকলেন।
জেলের মধ্যে মুতাযেলা সম্প্রদায়ের বড় বড়
আলেমরা প্রবেশ করে ইমামের সাথে খালকে
কুরআনের মাসআলায় তর্কে লিপ্ত হতো এবং যুক্তি
ও দলীল-প্রমাণ পেশ করতো। কিন্তু ইমাম
আহমাদের যুক্তি-প্রমাণ সবসময়ই মুতাযেলাদের
যুক্তি-প্রমাণের উপর জয়লাভ করতো। যতবারই ইমাম
আহমাদ যুক্তি-তর্কে মুতাযেলা আলেমদের উপর
জয়লাভ করতেন, ততবারই তার উপর যুলুমের মাত্রা
বাড়িয়ে দেয়া হতো। এভাবে কিছুদিন পার হওয়ার পর
খলীফা মুতাসেমের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে
বিতর্কের আয়োজন করা হলো।
প্রিয় পাঠক! আপনি পরিস্থিতির ভয়াবহতার প্রতি একটু
খেয়াল করুন। একদিকে ইমাম আহমাদ একা।
অন্যদিকে খলীফা। খলীফার সাথে রয়েছে
বিদআতী আলেমগণ, মন্ত্রীপরিষদ, রাষ্ট্রের
উপরস্থ সেনাকর্মকর্তাগণ, পুলিশবাহিনী এবং
জল্লাদের দল। বিতর্কের শুরুতে খলীফা নিজেই
ইমামকে নরম করার চেষ্টা করতেন এবং
কুরআনকে মাখলুক বলে ফতোয়া জারী করার
জন্য উৎসাৎ দিতেন। অতঃপর মুতাযেলী
আলেমদেরকে তার সাথে মুনাযারা (তর্ক) করার
আদেশ দিতেন। কিন্তু ইমাম আহমাদ কুরআন, হাদীছ
দিয়ে দলীল পেশ করে সকলকে পরাজিত করে
দিতেন। বিদআতীরা দার্শনিকদের যুক্তি পেশ
করতো। ইমাম আহমাদের দলীল তাদের কথার
উপর জয়লাভ করতো। তিনি বলতেনঃ আমাকে
কুরআন ও সুন্নার একটি দলীল দিয়ে বুঝিয়ে দাও
যে কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি।
ঐদিকে পুলিশ প্রধান আব্দুর রাহমান বিন ইসহাক বিন
ইবরাহীম বলতেন। হে আমীরুল মুমিনীন! আমি
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালকে ত্রিশ বছর যাবৎ চিনি। তিনি
আপনার আনুগত্য করাকে ওয়াজিব মনে করেন,
আপনার শাসনকে সমর্থন করেন এবং আপনার সাথে
জিহাদ করাকে ফরয মনে করেন। সেই সাথে তিনি
একজন বিজ্ঞ আলেম এবং ফকীহ।
অপর দিকে আহমাদ বিন দাউদ এবং অন্যান্য বিদআতীরা
খলীফাকে ইমামের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে
তুলত এবং বঝাতো যে, ইমাম আহমাদ একজন
গোমরাহ, কাফের এবং বিদআতী।
এভাবে বিতর্ক দীর্ঘ হওয়ার কারণে খলীফা
মুতাসেম বিরক্তিবোধ করতে লাগলেন। কিন্তু
বিদআতী আলেম আহমাদ বিন দাউদ খলীফাকে
পুনরায় ইমাম আহমাদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে
তুলল। তাই আহমাদ বিন দাউদের প্ররোচনায় এবং
উৎসাহে ইমামকে চাবুক মারা শুরু হলো। ইমামের
দৃঢ়তা দেখে স্বয়ং খলীফা আশ্চর্যবোধ
করলেন এবং ইমামের উপর তাঁর দয়ার উদ্রেক
হলো। তৎক্ষণাৎ আহমাদ বিন দাউদ বলতে লাগলঃ হে
আমীরুল মুমিনীন! আপনি যদি তাঁকে ছেড়ে
দেন, তাহলে লোকেরা বলাবলি করবে যে, ইমাম
আহমাদের সামনে দুইজন আব্বাসী খলীফা পরাজয়
বরণ করেছে। এই নিকৃষ্ট কথাটির কারণে খলীফা
পূর্বের অবস্থানে ফিরে যায় এবং জল্লাদরা তার
আদেশে ইমামকে পুনরায় বেত্রাঘাত শুরু করে
দেয়।
এভাবে জল্লাদরা পালাক্রমে তাঁর শরীরকে
বেত্রাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলল। সতেরবার
বেত্রাঘাত করার পর সেই দিন খলীফা মুতাসেম ইমাম
আহমাদকে বললেনঃ হে আহমাদ! কী কারণে তুমি
এভাবে নিজের জান শেষ করছো? আল্লাহর কসম!
আমি তোমার উপর দয়া করতে চাই, কিন্তু……….।
ঐ সময় আব্বাসীয় খেলাফতের একজন তুর্কী
সেনাপতি স্বীয় তরবারি দ্বারা ইমামের শরীরে গুঁতা
মেরে বললঃ তুমি কি এই সব মানুষকে পরাজিত
করতে চাও? আরেকজন বললঃ মরণ হোক
তোমার! তোমার খলীফা আমীরুল মুমিনীন
তোমার মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে। অথচ তুমি তার
কথা অমান্য করছো? আরেকজন বলে উঠলঃ হে
আমীরুল মুমিনীন! একে হত্যা করে ফেলুন।
অন্য একজন বললঃ হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি
রোজাদার অবস্থায় রোদ্রে দাঁড়িয়ে কষ্ট
করছেন? তাকে হত্যা করে ফেলুন এবং নিজেকে
শান্ত করুন। এমনি আরো অনেক কথাই হয়ত সেদিন
হয়েছিল সেখানে।
পরিশেষে খলীফা মুতাসেম ইমামকে লক্ষ্য
করে বললেনঃ হে আহমাদ! আফসোস তোমার
জন্য! আমাদের কথার জবাব দাও। ইমাম অত্যন্ত দৃঢ়
কণ্ঠে জবাব দিলেনঃ আমার কাছে কুরআন থেকে
অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত
থেকে একটি দলীল নিয়ে আসুন। আমি
আপনাদের কথার সাথে একমত হবো। এতে তাঁর
শরীরে পুনরায় বেত্রাঘাত করা শুরু হলো। অতঃপর
ইমামকে লক্ষ্য করে খলীফা মুতাসেম বললেনঃ
আমার কথাকে সরাসরি সমর্থন না করলেও তুমি এমন
একটি কথা বলো, যাতে আমি সামান্যতম সন্তুষ্ট হতে
পারি এবং তোমাকে ছেড়ে দিতে পারি। কিন্তু ইমাম
তাঁর অবস্থান থেকে সামান্যতম পিছপা হলেন না।
জল্লাদরা তাঁর উপর বেত্রাঘাত অব্যাহত রাখলো এবং
কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি, -এ কথা জোর করে তাঁর
কাছে থেকে আদায় করার সর্বপ্রকার চেষ্টা
করলো। কিন্তু কিছুতেই লাভ হলোনা। পরিশেষে
খলীফা ইমামের পর্বত সদৃশ দৃঢ়তা দেখে তাঁর
আত্মীয় স্বজনকে ডেকে এনে সকলের
সামনে মুক্ত করে দিলেন। মুক্ত করার আগে
ইমামের আত্মীয় স্বজন থেকে এই মর্মে
স্বীকারোক্তি নিলেন যে, ইমামকে তারা স¤পূর্ণ
সুস্থ অবস্থায় বুঝে নিচ্ছে। এই স্বীকারোক্তি
নেয়ার কারণ হলো খলীফার ভয় ছিল, সাধারণ
লোকেরা যদি জানতে পারে যে তাদের প্রাণপ্রিয়
ইমামকে নির্যাতন করা হয়েছে, তাহলে তারা
খলীফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে
পারে।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল মুক্তি পেলেন, কিন্তু
মুতাযেলা ও বিদআতী আলেমদের দাপটের
কারণে নির্বিঘেœ সত্যের দাওয়াত প্রচারের মত
পরিবেশ ছিলনা। তাই তিনি প্রতিকূল পরিবেশের
মোকাবেলা জুমআ ও জামআতে হাজির হতেন,
মানুষকে হাদীছ ও সুন্নাতের দারস প্রদান করতেন
এবং ফতোয়া দিতেন।
এরই মধ্যে মুতাসেম মৃত্যু বরণ করে এবং তার পুত্র
ওয়াছেক খলীফা হয়। সেও তার পূর্ব পুরুষের ন্যায়
মুতাযেলা মতবাদ ও বিদআতের পৃষ্ঠপোষক ছিল।
২৩১ হিজরী সালে ওয়াছেকের মৃত্যু হলে
মুতাওয়াক্কিল খলীফা নিযুক্ত হন। মুতাওয়াক্কিল
খলীফা হওয়ার সাথে সাথেই ইমাম আহমাদ বিন
হাম্বালের দাওয়াতের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ
মুতাওয়াক্কিল আহলে সুন্নাতের মতাদর্শের
অনুসারী ছিলেন। তাই তিনি বিদআতীদের পথ
সংকীর্ণ করে ইমাম আহমাদসহ সকল সুন্নী
আলেমদের পথ প্রশস্ত করে দিলেন।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রঃ) যেই কঠিন পরীক্ষার
সম্মুখনী হয়েছিলেন এবং তিনি যেই যুলুম নির্যাতন
সহ্য করে সত্যের পতাকাকে সমুন্নত
রেখেছেন, তাতে আমাদের জন্য অনেক
শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। তিনি এমন একটি
বিদআতের মোকাবেলায় সত্য বলেছেন, যেই
বিদআতকে পরপর তিনজন খলীফা পৃষ্ঠপোষকতা
দিয়েছেন, তাদের সাথে ছিলেন সমস্ত বিদআতী
আলেম, রাজ্যের সকল মন্ত্রী, বিচারক এবং
সশস্ত্র বাহিনী। অপর দিকে ইমাম আহমাদ ছিলেন
একা। একাই তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং জেল-
যুলুম সহ্য করে সত্যকে জয়যুক্ত করেছেন। তিনি
যখন যুলুম-নির্যাতন সহ্য করছিলেন, তখন লোকেরা
তাঁর কাছে এসে আবেদন করছিল যে, আমাদের
যদি অনুমতি দেন, তাহলে আমরা খলীফার বিরুদ্ধে
বিদ্রোহ করে আপনাকে মুক্ত করবো। কিন্তু
ইমাম তাতে সম্মতি দেন নি। বরং নিজে একাই যুলুম-
নির্যাতন সহ্য করতে লাগলেন এবং মুসলিমদেরকে
সবর করার আদেশ দিলেন। তিনি মনে করেছিলেন,
বিদ্রোহ করে তাঁকে মুক্ত করতে গেলে
অসংখ্য মানুষের রক্তপাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই হরে বেশী। তাই
তিনি সবর করলেন, দলীল-প্রমাণ পেশ করার
পথকেই বেছে নিলেন এবং এ পথেই ভাল ফল
হবে মনে করলেন। বাস্তবেও তাই হয়েছিল।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালের এই পরীক্ষা থেকে
দ্বীনের দাঈ ও আলেমদেরকেও শিক্ষা নিতে
হবে। তারা যেন পরিস্থিতির প্রতিকূলতা, জেল-যুলুম
এবং নির্যাতনের ভয়ে বিদআত ও ইসলাম বিরোধী
কার্যকলাপের সামনে মুখ বন্ধ করে বসে না
থাকেন। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালের মত সৎসাহস ও
পর্বত সদৃশ মনোবল এবং সাহস নিয়ে সুন্নাত ও
সত্যের দাওয়াতকে কিয়ামত পর্যন্ত সমুন্নত রাখতে
হবে। হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে সেই
তাওফীক দাও। আমীন। তথ্যসূত্রঃ সিয়ারু আলামিন নুবলা
এবং অন্যান্য গ্রন্থ।

Advertisements