অন্তর বিধ্বংসী বিষয়সমূহ : অহংকার


অন্তর বিধ্বংসী বিষয়সমূহ : অহংকাৃর

অহংকার বা কিবিরের সংজ্ঞা
কিবিরের আভিধানিক অর্থ:
আল্লামা ইবনে ফারেছ রহ. বলেন, কিবির অর্থ: বড়ত্ব, বড়াই, অহংকার ইত্যাদি। অনুরূপভাবে الكبرياء অর্থও বড়ত্ব, বড়াই, অহংকার। প্রবাদে আছে:
ورثوا المجد كابرًا عن كابر.
অর্থাৎ, ইজ্জত সম্মানের দিক দিয়ে যিনি বড়, তিনি তার মত সম্মানীদের থেকে সম্মানের উত্তরসূরি বা উত্তরাধিকারী হন।
আর আল্লামা ইবনু মানযূর উল্লেখ করেন, الكِبْر শব্দটিতে কাফটি যের বিশিষ্ট। এর অর্থ হল, বড়ত্ব, অহংকার ও দাম্ভিক।
আবার কেউ কেউ বলেন, তাকাব্বারা শব্দটি কিবির হতে নির্গত। আর تَكابَر من السن শব্দটি দ্বারা বার্ধক্য বুঝায়। আর তাকাব্বুর ও ইস্তেকবার শব্দটির অর্থ হল, বড়ত্ব, দাম্ভিক ও অহমিকা।[1]
ইসলামী পরিভাষায় কিবিরের সংজ্ঞা:
রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] নিজেই স্বীয় হাদিসে কিবিরের সংজ্ঞা বর্ণনা করেন।
অর্থ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, যার অন্তরে একটি অণু পরিমাণ অহংকার থাকে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এ কথা বললে, এক লোক দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, কোন কোন লোক এমন আছে, সে সুন্দর কাপড় পরিধান করতে পছন্দ করে, সুন্দর জুতা পরিধান করতে পছন্দ করে, এসবকে কি অহংকার বলা হবে? উত্তরে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বললেন, আল্লাহর তা‘আলা নিজেই সুন্দর, তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন। [সুন্দুর কাপড় পরিধান করা অহংকার নয়] অহংকার হল, সত্যকে গোপন করা এবং মানুষকে নিকৃষ্ট বলে জানা।[2]
এ হাদিসে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] দুটি অংশে অহংকারের সংজ্ঞা তুলে ধরেন।
এক:
হককে অস্বীকার করা, হককে কবুল না করে তার প্রতি অবজ্ঞা করা এবং হক কবুল করা হতে বিরত থাকা। বর্তমান সমাজে আমরা অধিকাংশ মানুষকে দেখতে পাই, যখন তাদের নিকট এমন কোন লোক হকের দাওয়া নিয়ে আসে, যে বয়স বা সম্মানের দিক দিয়ে তার থেকে ছোট, তখন সে তার কথার প্রতি কোন প্রকার গুরুত্ব দেয় না। আর তা যদি তাদের মতামত অথবা তারা যা নির্ধারণ ও যার উপর তারা আমল করছে, তার পরিপন্থী হয়, তখন তারা তা অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে। আর অধিকাংশ মানুষের স্বভাব হল, যে লোকটি তাদের নিকট দাওয়াত নিয়ে আসবে, তাকে ছোট মনে করবে এবং তার বিরোধিতায় অটল ও অবিচল থাকবে, যদিও কল্যাণ নিহিত থাকে সত্য ও হকের আনুগত্যের মধ্যে এবং তারা যে অন্যায়ের অপর অটুট রয়েছে, তাতে তাদের ক্ষতি ছাড়া কোনই কল্যাণ না থাকে। আমাদের সমাজে এ ধরনের লোকের অভাব নাই। বিশেষ করে ছোট পরিসরে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটতে থাকে। যেমন, পরিবার, স্কুল মাদ্রাসায়, অফিস আদালত ও বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা নিত্যদিন ঘটে থাকে।
অহংকারীরা যে বিষয়টির আশংকা করে অপর থেকে সত্যকে গ্রহণ করে না, তা হল, সে যদি অপর ব্যক্তি থেকে প্রমাণিত সত্যকে গ্রহণ করে, তাকে মানুষ সম্মান দেবে না, মানুষ অপর লোকটিকে সম্মান দেবে। তখন সম্মান অপরের হাতে চলে যাবে এবং সেই মানুষের সামনে বড় ও সম্মানী লোক হিসেবে বিবেচিত হবে, অহংকারীকে কেউ সম্মান করবে না। এ কারণেই সে কাউকে মেনে নিতে পারে না, সে মনে করে সত্যকে গ্রহণ করলে তার সম্মান নিয়ে টানাটানি হবে এবং মানুষ তার প্রতি আর আকৃষ্ট হবে না। মানুষ সে লোকটিকেই বড় মনে করবে এবং তাকেই মানবে। আর বাধ্য হয়ে অহংকারীকেও অপরের অনুসারী হতে হবে।
কিন্তু এ অহংকারী লোকটি যদি বুঝতে পারত, তার জন্য সত্যিকার ইজ্জত ও সম্মান হল, হকের অনুসরণ ও আনুগত্য করার মধ্যে, বাতিলের মধ্যে ডুবে থাকাতে নয়, তা ছিল তার জন্য অধিক কল্যাণকর ও প্রশংসনীয়।
ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. আবু মুসা আশয়ারী রা. এর নিকট চিঠি লিখেন, তুমি গত কাল যে ফায়সালা দিয়েছিলে, তার মধ্যে তুমি চিন্তা ফিকির করে যখন সঠিক ও সত্য তার বিপরীতে পাও, তাহলে তা থেকে ফিরে আসাতে যেন তোমার নফস তোমাকে বাধা না দেয়। কারণ, সত্য চিরন্তন, সত্যের পথে ফিরে আসা বাতিলের মধ্যে সময় নষ্ট করার চেয়ে অনেক উত্তম।[3]
আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী রহ. বলেন, একদা আমরা একটি জানাজায় উপস্থিত হলাম, তাতে কাজী উবাইদুল্লা ইবনুল হাসান রহ. হাজির হল। আমি তাকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে, সে ভুল উত্তর দেয়, আমি তাকে বললাম, আল্লাহ আপনাকে সংশোধন করে দিক, এ মাসআলার সঠিক উত্তর এভাবে…। তিনি কিছু সময় মাথা নিচু করে চুপ করে বসে থাকলেন, তারপর মাথা উঠিয়ে বললেন, আমি আমার কথা থেকে ফিরে আসলাম, আমি লজ্জিত। সত্য গ্রহণ করে লেজ হওয়া আমার নিকট মিথ্যার মধ্যে থেকে মাথা হওয়ার চেয়ে অধিক উত্তম।[4]
দ্বিতীয়: [غمط الناس] মানুষকে নিকৃষ্ট জানা।
الغمط বলা হয়, নিকৃষ্ট মনে করা, ছোট মনে করা ও অবজ্ঞা করাকে।
সুতরাং, [غمط الناس] অর্থ, মানুষ কে নিকৃষ্ট মনে করা, অবজ্ঞা করা, তুচ্ছ মনে করা ও মানুষকে ঘৃণা করা। মানুষের গুণের থেকে নিজের গুণকে বড় মনে করা। কারো কোন কর্মকে স্বীকৃতি না দেয়া, কোন ভালো গুণকে মেনে নেয়ার মানসিকতা না থাকা।
মনে রাখতে হবে, যারা মানুষকে খারাপ জানে, তাদের কর্মের পরিণতি হল, মানুষ তাদের খারাপ জানবে। এ ধরনের লোকেরা মানুষের সুনামকে ক্ষুণ্ণ এবং তাদের যোগ্যতাকে ম্লান করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। সে অন্যদের উপর তার নিজের বড়ত্ব ও উচ্চ মর্যাদা প্রকাশ করার লক্ষ্যে, মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন ও ছোট করে। মানুষের সম্মানহানি ঘটানোর উদ্দেশ্যে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে ও অপবাদ রটায়। অহংকারীরা কখনোই মানুষের চোখে ভালো হতে পারে না, মানুষ তাদের ভালো চোখে দেখে না।
অহংকারী তার নিজের কর্ম ও গুণ দিয়ে কখনোই উচ্চ মর্যাদা বা সম্মান লাভ করতে সক্ষম নয়। তাই সে নিজে সম্মান লাভ করতে না পেরে নিজের মর্যাদা ঠিক রাখার জন্য অন্যদের কৃতিত্বকে নষ্ট করে এবং তাদের মান-মর্যাদাকে খাট করে দেখে।
কিবির (অহংকার) ও ‘উজব (আত্মতৃপ্তি) দুটির মধ্যে পার্থক্য
আবু ওহাব আল-মারওয়ারজি রহ. বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারককে জিজ্ঞাসা করলাম কিবির কি? উত্তরে তিনি বলেন, মানুষকে অবজ্ঞা করা।
তারপর আমি তাকে উজব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘উজব কি? উত্তরে তিনি বললেন, তুমি তোমাকে মনে করলে যে, তোমার নিকট এমন কিছু আছে, যা অন্যদের মধ্যে নাই। তিনি বলেন, নামাজিদের মধ্যে ‘উজব বা আত্মতৃপ্তির চেয়ে খারাপ আর কোন মারাত্মক ত্রুটি আমি দেখতে পাই না।[5]
কিবিরের কারণসমূহ
একজন অহংকারী মনে করে, সে তার সাথী সঙ্গীদের চেয়ে জাতিগত ও সত্তাগতভাবেই বড় এবং সে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র, তার সাথে কারো কোন তুলনা হয় না। ফলে সে কাউকেই কোন প্রকার তোয়াক্কা করে না, কাউকে মূল্যায়ন করতে চায় না এবং কারো আনুগত্য করার মানসিকতা তার মধ্যে থাকে না। যার কারণে সে সমাজে এমনভাবে চলা ফেরা করে মনে হয় তার মত এত বড় আর কেউ নাই।
অহংকারের কারণসমূহ নিম্নরূপ:
এক. কারো প্রতি নমনীয় না হওৎয়া বা আনুগত্য না করার স্পৃহা:
একজন অহংকারী কখনোই চায় না, সে কারো আনুগত্য করুক বা কারো কোন কথা শুনুক। সে চিন্তা করে আমার কথা মানুষ শোনবে আমি কেন মানুষের কথা শোনবো। আমি মানুষকে উপদেশ দেবো আমাকে কেন মানুষ উপদেশ দেবে। এভাবেই তার দিন অতিবাহিত হয়। দিন যত যায়, অহংকারীর অহংকারের স্পৃহা আরও বাড়তে থাকে এবং তার অহংকারও দিন দিন বৃদ্ধি পায়। ফলে সে দুনিয়াতে আর কাউকেই মানতে বা কারো আনুগত্য করতে রাজি হয় না। তার অহংকার করার স্পৃহাটি ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায় পৌঁছে, শেষ পর্যন্ত যে আল্লাহর হাতে আসমান ও জমিনের কর্তৃত্ব, তার আনুগত্যও সে আর করতে চায় না। তার এ ধরনের স্পৃহার কারণে তার মধ্যে এ অনুভূতি জাগে যে, সে কারো মুখাপেক্ষী নয়, সে নিজেই সর্বেসর্বা, তার কারো প্রতি আনুগত্য করার প্রয়োজন নাই। অহংকারীর এ ধরনের দাম্ভিকতা থেকে সৃষ্টি হয়, হঠকারিতা ও কুফরী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿كَلَّآ إِنَّ ٱلۡإِنسَٰنَ لَيَطۡغَىٰٓ ٦ أَن رَّءَاهُ ٱسۡتَغۡنَىٰٓ ٧ إِنَّ إِلَىٰ رَبِّكَ ٱلرُّجۡعَىٰٓ ٨﴾ [سورة العلق: 6- 8[
অর্থ, কখনো নয়, নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে থাকে। কেননা সে নিজকে মনে করে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিশ্চয় তোমার রবের দিকেই প্রত্যাবর্তন। [সূরা আলাক, আয়াত: ৬-৮]
আল্লামা বাগাবী রহ. বলেন, মানুষ তখনই সীমালঙ্ঘন এবং তার প্রভুর বিরুদ্ধাচরণ করে, যখন সে দেখতে পায়, সে নিজেই স্বয়ংসম্পন্ন।[6] তার আর কারো প্রতি নত হওয়া বা কারো আনুগত্য করার কোন প্রয়োজন নাই।
দুই. অন্যদের উপর প্রাধান্য বিস্তারের জন্য অপ্রতিরোধ্য অভিলাষ:
একজন অহংকারী, সে মনে করে, সমাজে তার প্রাধান্য বিস্তার, সবার নিকট প্রসিদ্ধি লাভ ও নেতৃত্ব দেয়ার কোন বিকল্প নাই। তাকে এ লক্ষ্যে সফল হতেই হবে। কিন্তু যদি সমাজ তার কর্তৃত্ব বা প্রাধান্য মেনে না নেয়, তখন সে চিন্তা করে, তাকে যে কোন উপায়ে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে হবে। চাই তা বড়াই করে হোক অথবা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তখন সে যা ইচ্ছা তাই করে এবং সমাজে হট্টগোল সৃষ্টি করে।
তিন. নিজের দোষকে আড়াল করা:
একজন অহংকারী তার স্বীয় কাজ কর্মে নিজের মধ্যে যে সব দুর্বলতা অনুভব করে, তা গোপন রাখতে আগ্রহী হয়। কারণ, তার আসল চরিত্র যদি মানুষ জেনে যায়, তাহলে তারা তাকে আর বড় মনে করবে না ও তাকে সম্মান দেবে না। যেহেতু একজন অহংকারী সব সময় মানুষের চোখে বড় হতে চায়, এ কারণে সে পছন্দ করে, তার মধ্যে যে সব দুর্বলতা আছে, তা যেন কারো নিকট প্রকাশ না পায় এবং কেউ যাতে জানতে না পারে। কিন্তু মূলত: সে তার অহংকার দ্বারা নিজেকে অপমানই করে, মানুষকে সে নিজেই তার গোপনীয় বিষয়ের দিকে পথ দেখায়। কারণ, সে যখন নিজেকে বড় করে দেখায়, তখন মানুষ তার বাস্তব অবস্থা জানার জন্য তার সম্পর্কে গবেষণা করতে আরম্ভ করে, তার কোথায় কি আছে, না আছে তা অনুসন্ধান করতে থাকে। তখন তার আসল চেহারা প্রকাশ পায়, আসল রূপ খুলে যায়, তার যাবতীয় দুর্বলতা প্রকাশ পায় এবং তার অবস্থান সম্পর্কে মানুষ বুঝতে পারে। ফলে মানুষ আর তাকে শ্রদ্ধা করে না, বড় করে দেখে না, তাকে নিকৃষ্ট মনে করে এবং ঘৃণা করে।
একজন অহংকারী ইচ্ছা করলে তার দোষগুণ গুলো বিনয়, নম্রতা, মানুষের সাথে বন্ধুত্ব ও চুপ-চাপ থাকার মাধ্যমে গোপন রাখতে পারত, কিন্তু তা না করে অহংকার করার কারণে তার সব গোমর ফাঁ‍‌‍ক হয়ে যায়। এ ছাড়াও মানুষ যা পছন্দ করে না, তা নিয়ে দু:খ প্রকাশ করা, কোন বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করা হতে দুরে থাকা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য মিথ্যা দাবি করা হতে বিরত থাকার মাধ্যমে, সে তার যাবতীয় দুর্বলতা ও গোপন বিষয়গুলো দামা-চাপা দিতে পারত। কিন্তু তা না করে সে অহংকার করাতে তার অবস্থা আরও প্রতিকুলে গেল এবং ফলাফল তার বিপক্ষে চলে গেল। তার বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে তার যাবতীয় অপকর্ম মানুষ জানতে পারল।
চার. অহংকারী যেভাবে অহংকারের সুযোগ পায়:
কতক লোকের অধিক বিনয়ের কারণে অহংকারীরা অহংকারের সুযোগ পায়।
অহংকারীরা যখনই কোন সুযোগ পায়, তা তারা কাজে লাগাতে কার্পণ্য করে না। অনেক সময় দেখা যায় কিছু লোক এমন আছে, যারা বিনয় করতে গিয়ে অধিক বাড়াবাড়ি করে, তারা নিজেদের খুব ছোট মনে করে, নিজেকে যে কোন প্রকার দায়িত্ব আদায়ের অযোগ্য বিবেচনা করে এবং যে কোন ধরনের আমানতদারিতা রক্ষা করতে সে অক্ষম বলে দাবি করে, তখন অহংকারী চিন্তা করে এরা সবাইতো নিজেদের অযোগ্য ও আমাকে যোগ্য মনে করছে, প্রকারান্তরে তারা সবাই আমার মর্যাদাকে স্বীকার করছে, তাহলে আমিই এসব কাজের জন্য একমাত্র যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তি। সুতরাং, আমিতো তাদের সবার উপর নেতা। শয়তান তাকে এভাবে প্রলোভন দিতে ও ফুঁসলাতে থাকে, আর লোকটি নিজে নিজে ফুলতে থাকে। ফলে এখন সে অহংকার বশতঃ আর কাউকে পাত্তা দেয় না সবাইকে নিকৃষ্ট মনে করে। আর নিজেকে যোগ্য মনে করে।
পাঁচ. মানুষকে মূল্যায়ন করতে না জানা:
মানুষ শ্রেষ্ঠ হওয়ার মানদণ্ড কি এবং মানুষকে কিসের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে, তা আমাদের অবশ্যই জানা থাকতে হবে। অহংকারের অন্যতম কারণ হল, মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নির্ধারণে ত্রুটি করা। একজন মানুষ শ্রেষ্ঠ হওয়ার মানদণ্ড কি তা আমাদের অনেকেরই অজানা। যার কারণে তুমি দেখতে পাবে, যারা ধনী ও পদ মর্যাদার অধিকারী তাদের প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে, যদিও তারা পাপী বা অপরাধী হয়। অন্যদিকে একজন পরহেজগার, মুত্তাকী ও সৎ লোক তার ধন সম্পদ ও পদমর্যাদা না থাকাতে সমাজে তাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয় না এবং তাকে মূল্যায়ন করা হয় না। অনৈতিক, চোর, বাটপার যাদের অগ্রাধিকার দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়, বর্তমান সমাজে তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তাদের অগ্রাধিকার দেয়ার কারণে বা অনুপযুক্ত ও অযোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব বা নেতৃত্ব দেয়ার কারণেই বর্তমান সমাজের করুণ অবস্থা। স্বার্থান্বেষী ও ভোগবাদীরা সমাজের হোমরাচোমরা হওয়ার কারণে তারা অন্যদের নিকৃষ্ট মনে করে এবং তাদের উপর বড়াই দেখায় ও অহংকার করে। ইসলাম মানুষকে মূল্যায়নের একটি মাপকাঠি ও মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। বর্তমান সমাজে যদি তা অনুসরণ করা হত, তবে সামাজিক অবক্ষয় সম্পূর্ণ দুর হয়ে যেত এবং সমাজের এ করুণ পরিণতি হতে মানব জাতি রক্ষা পেত।
রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] তার সাহাবীদের একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তব দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়ে দেন যে, একজন মানুষকে কিসের ভিত্তিতে মূল্যায়ন ও অগ্রাধিকার দেয়া হবে এবং তাকে কিসের ভিত্তিতে অবমূল্যায়ন ও পিছনে ফেলে রাখা হবে। মানুষের মর্যাদা তার পোষাকে নয়, বরং মানুষের মর্যাদা, তার অন্তরনিহীত সততা, স্বচ্ছতা ও আল্লাহ-ভীতির উপর নির্ভর করে। যার মধ্যে যতটুকু আল্লাহ-ভীতি থাকবে, সে তত বেশি সৎ ও উত্তম লোক হিসেবে বিবেচিত হবে।
অর্থ, সাহাল ইবনে সা’দ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর সামনে দিয়ে এক ব্যক্তি অতিক্রম করে যাচ্ছিল, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] সমবেত লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এ লোকটি সম্পর্কে কি বল, তারা উত্তরে বলল, লোকটি যদি কাউকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, তাহলে তার ডাকে সাড়া দেয়া হয়, যদি কারো বিষয়ে সুপারিশ করে, তাহলে তার সুপারিশ গ্রহণ করা হয়, আর যদি কোন কথা বলে, তার কথা শোনা হয়। তাদের কথা শোনে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] চুপ করে থাকেন। একটু পর অপর একজন দরিদ্র মুসলিম রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছিল, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] তাকে দেখে সাহাবীদের জিজ্ঞাসা করে বলেন, তোমরা এ লোকটি সম্পর্কে মতামত দাও! তারা বলল, যদি সে প্রস্তাব দেয়, তাহলে তার প্রস্তাবে সাড়া দেয়া হয় না, আর যদি সে কারো বিষয়ে সুপারিশ করে তার সুপারিশ গ্রহণ করা হয় না,  আর যদি সে কোন কথা বলে তার কথায় কান দেয়া হয় না। তখন রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বললেন, এ লোকটি যমিন ভরপুর যত কিছু আছে, তার সব কিছু হতে উত্তম।[7]
ছয়. আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতকে অন্যদের নেয়ামতের সাথে তুলনা করা ও আল্লাহকে ভুলে যাওয়া:
কিবির বা অহংকারের অন্যতম কারণ হল, একজন মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা যে সব নেয়ামত দান করছে, সে সব নেয়ামতকে ঐ লোকের সাথে তুলনা করা যাকে আল্লাহ তা‘আলা কোন হিকমতের কারণে ঐ সব নেয়ামতসমূহ দেয়নি। তখন সে মনে করে, আমিতো ঐ সব নেয়ামতসমূহ লাভের যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তি, তাই আল্লাহ তা‘আলা আমাকে আমার যোগ্যতার দিক বিবেচনা করেই নেয়ামতসমূহ দান করেছেন। ফলে সে নিজেকে সব সময় বড় করে দেখে এবং অন্যদের ছোট করে দেখে ও নিকৃষ্ট মনে করে। অন্যদেরকে সে মনে করে তারা নেয়ামত লাভের উপযুক্ত নয়, তাদের যদি যোগ্যতা থাকতো তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের অবশ্যই নেয়ামতসমূহ দান করত।
মানুষ যে সব জিনিষ নিয়ে অহংকার করে তার বর্ণনা
মানুষ বিভিন্ন জিনিষ নিয়ে অহংকার করে থাকে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে বিভিন্ন ধরনের যোগ্যতা ও গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেন। কারো সৌন্দর্য আছে কিন্তু ধন সম্পদ নাই, সে সৌন্দর্য নিয়ে অহংকার করে, আবার কেউ আছে তার সম্পদ আছে, কিন্তু সৌন্দর্য নাই, সে তার সম্পদ নিয়ে বড়াই বা অহংকার করে। এভাবে এক একজন মানুষ এক একটি নিয়ে অহংকার করে। নিম্নে মানুষ যে সব নেয়ামত নিয়ে অহংকার করে, তার কয়েকটি আলোচনা করা হল।
এক. ধন-সম্পদ:
মানুষ আল্লাহর দেয়া ধন-সম্পদ নিয়ে অহংকার বা বড়াই করে থাকে। তারা মনে করে ধন-সম্পদ লাভ তাদের যোগ্যতার ফসল, তারা নিজেরা তাদের যোগ্যতা দিয়ে ধন-সম্পদ উপার্জন করে থাকে। সুতরাং, যাদের ধন-সম্পদ থাকে না তারা অযোগ্য ও অক্ষম। আল্লাহ তা‘আলা কুরান করীমে দুইজন বাগান মালিক সম্পর্কে বলেন,
﴿وَكَانَ لَهُۥ ثَمَرٞ فَقَالَ لِصَٰحِبِهِۦ وَهُوَ يُحَاوِرُهُۥٓ أَنَا۠ أَكۡثَرُ مِنكَ مَالٗا وَأَعَزُّ نَفَرٗا﴾ [الكهف: 34[
অর্থ, আর (এতে) তার ছিল বিপুল ফল-ফলাদি। তাই সে তার সঙ্গীকে কথায় কথায় বলল, ‘সম্পদে আমি তোমার চেয়ে অধিক এবং জনবলেও অনেক শক্তিশালী’। [সূরা কাহাফ, আয়াত: ৩৪]
এখানে লোকটি তার ধন-সম্পদ নিয়ে তার অপর ভাইয়ের উপর অহংকার করে থাকে। আল্লাহ তার অহংকারের নিন্দা করেন আর যে ভাই অহংকার করত না তার প্রশংসা করেন।
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
অর্থ, নিশ্চয় কারূন ছিল মূসার কওমভুক্ত। অতঃপর সে তাদের উপর ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। অথচ আমি তাকে এমন ধনভাণ্ডার দান করেছিলাম যে, নিশ্চয় তার চাবিগুলো একদল শক্তিশালী লোকের উপর ভারী হয়ে যেত। স্মরণ কর, যখন তার কওম তাকে বলল, ‘দম্ভ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিকদের ভালবাসেন না’। আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ কর। আর যমীনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না’। [সূরা কাসাস, আয়াত: ৭৬,৭৭]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿فَإِذَا مَسَّ ٱلۡإِنسَٰنَ ضُرّٞ دَعَانَا ثُمَّ إِذَا خَوَّلۡنَٰهُ نِعۡمَةٗ مِّنَّا قَالَ إِنَّمَآ أُوتِيتُهُۥ عَلَىٰ عِلۡمِۢۚ بَلۡ هِيَ فِتۡنَةٞ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَهُمۡ لَا يَعۡلَمُون﴾ [الزمر: 49[.
অর্থ, অতঃপর কোন বিপদাপদ মানুষকে স্পর্শ করলে সে আমাকে ডাকে। তারপর যখন আমি আমার পক্ষ থেকে নি‘আমত দিয়ে তাকে অনুগ্রহ করি তখন সে বলে, ‘জ্ঞানের কারণেই কেবল আমাকে তা দেয়া হয়েছে’। বরং এটা এক পরীক্ষা। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না। [সূরা যুমার, আয়াত: ৪৯]
মানুষ যখন ধন-সম্পদ লাভ করে, তখন সে মনে করে এ তো তার যোগ্যতার ফসল। সে তার বুদ্ধি, বিবেক ও জ্ঞান দিয়েই ধন-সম্পদ লাভ করে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলেন, আসলে মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত তারা এও জানে না যে, তাদের ধন-সম্পদ কোথা থেকে আসে।
দুই. ইলম বা জ্ঞান:
অহংকারের অন্যতম একটি কারণ হল, ইলম বা জ্ঞান। একটি কথা মনে রাখতে হবে, আলেম, ওলামা, তালিবে ইলম ও তথাকথিত পীর মাশায়েখদের মধ্যে অহংকার খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, শয়তান তাদের পিছনে লেগে থাকে, চেষ্টা করে কীভাবে তাদের ধোকায় ফেলা যায়। এ কারণেই বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, আলেমদের মধ্যে ফিতনা ফ্যাসাদ, ঝগড়া-বিবাদ ও মতবিরোধ খুব বেশি। একজন আলেম মনে করে, ইলমের দিক দিয়ে সেই হল পরিপূর্ণ ও স্বয়ং সম্পন্ন, তারমত এত বড় জ্ঞানী জগতে আর কেউ নেই। অনেক সময় দেখা যায়, একজন আলেম অন্য আলেমকে একেবারেই মূল্যয়ন করে না এবং নিজেকে মনে করে বড় আলেম, আর অন্যদের সে জাহেল ও নিকৃষ্ট মনে করে। এ ধরনের স্বভাব একজন আলেমের জন্য কত যে জঘন্য তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
ইলম নিয়ে অহংকার করার কারণ দুটি:
প্রথম কারণ.
ইলম হল, আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক কায়েমের মাধ্যম। ফলে যাদের মধ্যে ইলম আছে তারা আল্লাহর একে বারেই কাছের লোক। তারা কখনোই তাদের ইলম দ্বারা গর্ব বা অহংকার করতে পারে না। যে ইলম মানুষের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে তা হল, তথাকথিত ইলম বা জ্ঞান। এ ধরনের ইলম নিয়ে ব্যস্ত থাকার কোন অর্থ হতে পারে না। কারণ, বাস্তব ও সত্যিকার ইলম হল, যে ইলম বা জ্ঞান দ্বারা বান্দা তার প্রভুকে চিনতে পারে এবং নিজেকে জানতে পারে। সত্যিকার ইলম একজন বান্দার মধ্যে আল্লাহর ভয় ও বিনয়কে সৃষ্টি করে, অহংকার সৃষ্টি করে না। একজন মানুষের মধ্যে যখন সত্যিকার ইলম বা জ্ঞান থাকবে, তখন সে সর্বাধিক বিনয়ী হবে এবং আল্লাহকেই ভয় করতে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّمَا يَخۡشَى ٱللَّهَ مِنۡ عِبَادِهِ ٱلۡعُلَمَٰٓؤُاْۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ﴾ [فاطر :28[
অর্থ, বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল। [সূরা ফাতের, আয়াত: ২৮]
দ্বিতীয় কারণ:
ইলম বা জ্ঞান হল, পবিত্র আমানত, যা পবিত্র পাত্রেই মানায়, অপবিত্র পাত্রে তা কখনোই মা-নায়না। আর এমন ব্যক্তির ইলম নিয়ে মগ্ন হওয়া, যার অন্তর নাপাকিতে ভরপুর ও চারিত্রিক দিক দিয়ে সে অত্যন্ত নিকৃষ্ট, তা কখনোই শুভ হয় না। এ লোকটি যখন কোন কিছু শিখে, তা নিয়ে সে অহংকার করা আরম্ভ করে এবং যত বেশি শিখে তার অহংকার আরও বাড়তে থাকে। ফলে তার জ্ঞান মানুষের জন্য অশান্তির কারণ হয়।
যেমনটি বলেছিল, মুয়াররি, যে তার নিজের প্রশংসা নিজেই করেছিল, অথচ তার মধ্যে কোন ভালো গুণ আছে বলে কখনোই দেখা যায়নি!
وإني وإن كنتُ الأخيرَ زمانُهُ
لآتٍ بما لم يَأْتِ به الأوائلُ
অর্থ, যুগের দিক দিয়ে যদিও আমি সবার শেষে, তবে আমি এমন কিছু নিয়ে আসবো, যা আমার পূর্বের লোকেরা নিয়ে আসতে পারেনি।
অহংকারের আরেকটি প্রকার হল, বর্তমানে অনেক ছোট ছোট তালিবে ইলমকে বড় বড় আলেমদের সমকক্ষ বিবেচনা করে বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে দেখা যায়। কোন মাসআলাতে বড় আলেমদের মতামতকে উপেক্ষা করে তারা নিজেরা মতামত দেয় এবং বলে, তারাও মানুষ আমরাও মানুষ!! এ ধরনের উক্তি তাদের জন্য কখনোই উচিত নয়।
আইউব আল আততার বলেন, আমি বিশির ইবনুল হারেসকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমাকে হাম্মাদ ইবনে যায়েদ হাদিস বর্ণনা করেন। তারপর তিনি বলেন, আসতাগফিরুল্লাহ! সনদ উল্লেখ করার কারণে অন্তরে অহংকার জন্মেছিল। অর্থাৎ সনদ বর্ণনা করে হাদিস বর্ণনাতে তার মধ্যে অহংকার সৃষ্টি হয়, তাই সে সাথে সাথে তা হতে বিরত থাকে। কারণ, যখন একজন মানুষ সনদসহ হাদিস বর্ণনা করে, তখন মানুষ মনে করে লোকটি হাদিসের সনদসহ মুখস্থ করেছে। এতে হাদিস বর্ণনা কারীর অন্তরে অহংকার আসতে পারে, তাই তিনি সনদ বর্ণনা করাকে পরিহার করেন। বর্তমানে অনেক আলেমকে দেখা যায়, তারা হাদিসের সনদ বর্ণনা করেন, যাতে মানুষ তাকে বড় আলেম মনে করে। এ উদ্দেশ্যে হাদিস সনদসহ বর্ণনা না করাই উত্তম। কিন্তু যদি কেউ হাদিসটিকে মজবুত বলে প্রমাণ করার জন্য সনদসহ বর্ণনা করে তাতে কোন অসুবিধা নাই।
তিন. আমল ও ইবাদত:
অনেকেই তাদের ইবাদত ও আমল নিয়ে গর্ব ও অহংকার করে। সে মনে করে মানুষের কর্তব্য হল, তারা তাকে সম্মান করবে, সব কাজে তাকে অগ্রাধিকার দিবে এবং তার তাকওয়া, তাহারাত ও বুজুর্গি নিয়ে বিভিন্নভাবে আলোচনা করবে। আর সে মনে করে সব মানুষ ধ্বংসের মধ্যে আছে, শুধু সে একাই নিরাপদ। এ কারণে সে মাঝে মধ্যে বলে থাকে সব মানুষ ধ্বংস হয়ে গেছে। অথচ, কোন একজন মানুষের জন্য সবাই ধ্বংস হয়ে গেছে বলা কোন ক্রমেই উচিত নয়।
عن أبي هريرة قال :قال رسول الله صلى الله عليه و سلم « إذَِا قَالَ الرَُّجُل هَلَك الناَّسُ فَهُوَ أَْهلَكُهُمْ»
অর্থ, আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, যখন কোন লোক বলে মানুষ ধ্বংস হয়ে গেছে, মূলত: সেই তাদের মধ্যে সবচেয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তি। আল্লামা আবু ইসহাক বলেন, আমি জানি না أَْهلَكُهُمْ শব্দটি যবর বিশিষ্ট যার অর্থ ‘সে তাদের ধ্বংস করল’, নাকি পেশ বিশিষ্ট যার অর্থ ‘সেই তাদের চেয়ে অধিক ধ্বংসের মধ্যে আছে’।
ইমাম নববী রহ. বলেন, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর বাণী- إذا قال الرجل هلك الناس فهو أهلكهم এর দুটি প্রসিদ্ধ অর্থ আছে। এক হল, কাফ এর উপর পেশ, আর একটি হল, কাফ এর উপর যবর। পেশ হওয়াটা অধিক প্রসিদ্ধ ও যুক্তিযুক্ত। অর্থাৎ, তাদের মধ্য হতে সে নিজেই অধিক ধ্বংসপ্রাপ্ত। আর যখন যবর বিশিষ্ট হবে, তখন অর্থ হবে, সে তাদের ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দিল, বাস্তবে তারা ধ্বংস হয় নাই। ওলামারা এ বিষয়ে একমত যে, এখানে যে দূষণীয় বিষয়টি আলোচনা করা হয়, তা সে ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে মানুষকে নিকৃষ্ট জেনে, নিজেকে তাদের উপর প্রাধান্য দেয়, আর তাদের মন্দ মনে করে এবং তাদের উপর বড়াই করে, এ ধরনের কথা বলে। কারণ, সে কাউকে ভালো বা মন্দ বলার অধিকার রাখে না। এ তো হল কেবল আল্লাহর বৈশিষ্ট্য। তবে যদি তার নিজের মধ্যে ও বর্তমান মুসলিমদের মধ্যে দ্বীনের ব্যাপারে যে দুরবস্থা বিদ্যমান তার উপর আফসোস ও দু:খ প্রকাশ করে এ ধরনের কথা বলে, তখন তাতে কোন ক্ষতি নাই।
যেমনটি বলেছিল উম্মে দারদা; তিনি বলেন, একদিন আবু দারদা বিক্ষুব্ধ হয়ে ঘরে প্রবেশ করে, আমি তাকে বললাম, তোমাকে কিসে ক্ষুব্ধ করল? তখন সে বলল, আমি মুহাম্মদের উম্মতের বিষয়ে কিছুই বুঝতে পারছি না, তারা সবাই জাহান্নামে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। ইমাম মালেক রহ. হাদিসটি ব্যাখ্যা এ রকমই করে