অন্তর বিধ্বংসী বিষয়সমূহ : অহংকার


অন্তর বিধ্বংসী বিষয়সমূহ : অহংকাৃর

অহংকার বা কিবিরের সংজ্ঞা
কিবিরের আভিধানিক অর্থ:
আল্লামা ইবনে ফারেছ রহ. বলেন, কিবির অর্থ: বড়ত্ব, বড়াই, অহংকার ইত্যাদি। অনুরূপভাবে الكبرياء অর্থও বড়ত্ব, বড়াই, অহংকার। প্রবাদে আছে:
ورثوا المجد كابرًا عن كابر.
অর্থাৎ, ইজ্জত সম্মানের দিক দিয়ে যিনি বড়, তিনি তার মত সম্মানীদের থেকে সম্মানের উত্তরসূরি বা উত্তরাধিকারী হন।
আর আল্লামা ইবনু মানযূর উল্লেখ করেন, الكِبْر শব্দটিতে কাফটি যের বিশিষ্ট। এর অর্থ হল, বড়ত্ব, অহংকার ও দাম্ভিক।
আবার কেউ কেউ বলেন, তাকাব্বারা শব্দটি কিবির হতে নির্গত। আর تَكابَر من السن শব্দটি দ্বারা বার্ধক্য বুঝায়। আর তাকাব্বুর ও ইস্তেকবার শব্দটির অর্থ হল, বড়ত্ব, দাম্ভিক ও অহমিকা।[1]
ইসলামী পরিভাষায় কিবিরের সংজ্ঞা:
রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] নিজেই স্বীয় হাদিসে কিবিরের সংজ্ঞা বর্ণনা করেন।
অর্থ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, যার অন্তরে একটি অণু পরিমাণ অহংকার থাকে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এ কথা বললে, এক লোক দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, কোন কোন লোক এমন আছে, সে সুন্দর কাপড় পরিধান করতে পছন্দ করে, সুন্দর জুতা পরিধান করতে পছন্দ করে, এসবকে কি অহংকার বলা হবে? উত্তরে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বললেন, আল্লাহর তা‘আলা নিজেই সুন্দর, তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন। [সুন্দুর কাপড় পরিধান করা অহংকার নয়] অহংকার হল, সত্যকে গোপন করা এবং মানুষকে নিকৃষ্ট বলে জানা।[2]
এ হাদিসে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] দুটি অংশে অহংকারের সংজ্ঞা তুলে ধরেন।
এক:
হককে অস্বীকার করা, হককে কবুল না করে তার প্রতি অবজ্ঞা করা এবং হক কবুল করা হতে বিরত থাকা। বর্তমান সমাজে আমরা অধিকাংশ মানুষকে দেখতে পাই, যখন তাদের নিকট এমন কোন লোক হকের দাওয়া নিয়ে আসে, যে বয়স বা সম্মানের দিক দিয়ে তার থেকে ছোট, তখন সে তার কথার প্রতি কোন প্রকার গুরুত্ব দেয় না। আর তা যদি তাদের মতামত অথবা তারা যা নির্ধারণ ও যার উপর তারা আমল করছে, তার পরিপন্থী হয়, তখন তারা তা অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে। আর অধিকাংশ মানুষের স্বভাব হল, যে লোকটি তাদের নিকট দাওয়াত নিয়ে আসবে, তাকে ছোট মনে করবে এবং তার বিরোধিতায় অটল ও অবিচল থাকবে, যদিও কল্যাণ নিহিত থাকে সত্য ও হকের আনুগত্যের মধ্যে এবং তারা যে অন্যায়ের অপর অটুট রয়েছে, তাতে তাদের ক্ষতি ছাড়া কোনই কল্যাণ না থাকে। আমাদের সমাজে এ ধরনের লোকের অভাব নাই। বিশেষ করে ছোট পরিসরে এ ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটতে থাকে। যেমন, পরিবার, স্কুল মাদ্রাসায়, অফিস আদালত ও বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা নিত্যদিন ঘটে থাকে।
অহংকারীরা যে বিষয়টির আশংকা করে অপর থেকে সত্যকে গ্রহণ করে না, তা হল, সে যদি অপর ব্যক্তি থেকে প্রমাণিত সত্যকে গ্রহণ করে, তাকে মানুষ সম্মান দেবে না, মানুষ অপর লোকটিকে সম্মান দেবে। তখন সম্মান অপরের হাতে চলে যাবে এবং সেই মানুষের সামনে বড় ও সম্মানী লোক হিসেবে বিবেচিত হবে, অহংকারীকে কেউ সম্মান করবে না। এ কারণেই সে কাউকে মেনে নিতে পারে না, সে মনে করে সত্যকে গ্রহণ করলে তার সম্মান নিয়ে টানাটানি হবে এবং মানুষ তার প্রতি আর আকৃষ্ট হবে না। মানুষ সে লোকটিকেই বড় মনে করবে এবং তাকেই মানবে। আর বাধ্য হয়ে অহংকারীকেও অপরের অনুসারী হতে হবে।
কিন্তু এ অহংকারী লোকটি যদি বুঝতে পারত, তার জন্য সত্যিকার ইজ্জত ও সম্মান হল, হকের অনুসরণ ও আনুগত্য করার মধ্যে, বাতিলের মধ্যে ডুবে থাকাতে নয়, তা ছিল তার জন্য অধিক কল্যাণকর ও প্রশংসনীয়।
ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. আবু মুসা আশয়ারী রা. এর নিকট চিঠি লিখেন, তুমি গত কাল যে ফায়সালা দিয়েছিলে, তার মধ্যে তুমি চিন্তা ফিকির করে যখন সঠিক ও সত্য তার বিপরীতে পাও, তাহলে তা থেকে ফিরে আসাতে যেন তোমার নফস তোমাকে বাধা না দেয়। কারণ, সত্য চিরন্তন, সত্যের পথে ফিরে আসা বাতিলের মধ্যে সময় নষ্ট করার চেয়ে অনেক উত্তম।[3]
আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী রহ. বলেন, একদা আমরা একটি জানাজায় উপস্থিত হলাম, তাতে কাজী উবাইদুল্লা ইবনুল হাসান রহ. হাজির হল। আমি তাকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে, সে ভুল উত্তর দেয়, আমি তাকে বললাম, আল্লাহ আপনাকে সংশোধন করে দিক, এ মাসআলার সঠিক উত্তর এভাবে…। তিনি কিছু সময় মাথা নিচু করে চুপ করে বসে থাকলেন, তারপর মাথা উঠিয়ে বললেন, আমি আমার কথা থেকে ফিরে আসলাম, আমি লজ্জিত। সত্য গ্রহণ করে লেজ হওয়া আমার নিকট মিথ্যার মধ্যে থেকে মাথা হওয়ার চেয়ে অধিক উত্তম।[4]
দ্বিতীয়: [غمط الناس] মানুষকে নিকৃষ্ট জানা।
الغمط বলা হয়, নিকৃষ্ট মনে করা, ছোট মনে করা ও অবজ্ঞা করাকে।
সুতরাং, [غمط الناس] অর্থ, মানুষ কে নিকৃষ্ট মনে করা, অবজ্ঞা করা, তুচ্ছ মনে করা ও মানুষকে ঘৃণা করা। মানুষের গুণের থেকে নিজের গুণকে বড় মনে করা। কারো কোন কর্মকে স্বীকৃতি না দেয়া, কোন ভালো গুণকে মেনে নেয়ার মানসিকতা না থাকা।
মনে রাখতে হবে, যারা মানুষকে খারাপ জানে, তাদের কর্মের পরিণতি হল, মানুষ তাদের খারাপ জানবে। এ ধরনের লোকেরা মানুষের সুনামকে ক্ষুণ্ণ এবং তাদের যোগ্যতাকে ম্লান করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে। সে অন্যদের উপর তার নিজের বড়ত্ব ও উচ্চ মর্যাদা প্রকাশ করার লক্ষ্যে, মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন ও ছোট করে। মানুষের সম্মানহানি ঘটানোর উদ্দেশ্যে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে ও অপবাদ রটায়। অহংকারীরা কখনোই মানুষের চোখে ভালো হতে পারে না, মানুষ তাদের ভালো চোখে দেখে না।
অহংকারী তার নিজের কর্ম ও গুণ দিয়ে কখনোই উচ্চ মর্যাদা বা সম্মান লাভ করতে সক্ষম নয়। তাই সে নিজে সম্মান লাভ করতে না পেরে নিজের মর্যাদা ঠিক রাখার জন্য অন্যদের কৃতিত্বকে নষ্ট করে এবং তাদের মান-মর্যাদাকে খাট করে দেখে।
কিবির (অহংকার) ও ‘উজব (আত্মতৃপ্তি) দুটির মধ্যে পার্থক্য
আবু ওহাব আল-মারওয়ারজি রহ. বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারককে জিজ্ঞাসা করলাম কিবির কি? উত্তরে তিনি বলেন, মানুষকে অবজ্ঞা করা।
তারপর আমি তাকে উজব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘উজব কি? উত্তরে তিনি বললেন, তুমি তোমাকে মনে করলে যে, তোমার নিকট এমন কিছু আছে, যা অন্যদের মধ্যে নাই। তিনি বলেন, নামাজিদের মধ্যে ‘উজব বা আত্মতৃপ্তির চেয়ে খারাপ আর কোন মারাত্মক ত্রুটি আমি দেখতে পাই না।[5]
কিবিরের কারণসমূহ
একজন অহংকারী মনে করে, সে তার সাথী সঙ্গীদের চেয়ে জাতিগত ও সত্তাগতভাবেই বড় এবং সে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র, তার সাথে কারো কোন তুলনা হয় না। ফলে সে কাউকেই কোন প্রকার তোয়াক্কা করে না, কাউকে মূল্যায়ন করতে চায় না এবং কারো আনুগত্য করার মানসিকতা তার মধ্যে থাকে না। যার কারণে সে সমাজে এমনভাবে চলা ফেরা করে মনে হয় তার মত এত বড় আর কেউ নাই।
অহংকারের কারণসমূহ নিম্নরূপ:
এক. কারো প্রতি নমনীয় না হওৎয়া বা আনুগত্য না করার স্পৃহা:
একজন অহংকারী কখনোই চায় না, সে কারো আনুগত্য করুক বা কারো কোন কথা শুনুক। সে চিন্তা করে আমার কথা মানুষ শোনবে আমি কেন মানুষের কথা শোনবো। আমি মানুষকে উপদেশ দেবো আমাকে কেন মানুষ উপদেশ দেবে। এভাবেই তার দিন অতিবাহিত হয়। দিন যত যায়, অহংকারীর অহংকারের স্পৃহা আরও বাড়তে থাকে এবং তার অহংকারও দিন দিন বৃদ্ধি পায়। ফলে সে দুনিয়াতে আর কাউকেই মানতে বা কারো আনুগত্য করতে রাজি হয় না। তার অহংকার করার স্পৃহাটি ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায় পৌঁছে, শেষ পর্যন্ত যে আল্লাহর হাতে আসমান ও জমিনের কর্তৃত্ব, তার আনুগত্যও সে আর করতে চায় না। তার এ ধরনের স্পৃহার কারণে তার মধ্যে এ অনুভূতি জাগে যে, সে কারো মুখাপেক্ষী নয়, সে নিজেই সর্বেসর্বা, তার কারো প্রতি আনুগত্য করার প্রয়োজন নাই। অহংকারীর এ ধরনের দাম্ভিকতা থেকে সৃষ্টি হয়, হঠকারিতা ও কুফরী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿كَلَّآ إِنَّ ٱلۡإِنسَٰنَ لَيَطۡغَىٰٓ ٦ أَن رَّءَاهُ ٱسۡتَغۡنَىٰٓ ٧ إِنَّ إِلَىٰ رَبِّكَ ٱلرُّجۡعَىٰٓ ٨﴾ [سورة العلق: 6- 8[
অর্থ, কখনো নয়, নিশ্চয় মানুষ সীমালঙ্ঘন করে থাকে। কেননা সে নিজকে মনে করে স্বয়ংসম্পূর্ণ। নিশ্চয় তোমার রবের দিকেই প্রত্যাবর্তন। [সূরা আলাক, আয়াত: ৬-৮]
আল্লামা বাগাবী রহ. বলেন, মানুষ তখনই সীমালঙ্ঘন এবং তার প্রভুর বিরুদ্ধাচরণ করে, যখন সে দেখতে পায়, সে নিজেই স্বয়ংসম্পন্ন।[6] তার আর কারো প্রতি নত হওয়া বা কারো আনুগত্য করার কোন প্রয়োজন নাই।
দুই. অন্যদের উপর প্রাধান্য বিস্তারের জন্য অপ্রতিরোধ্য অভিলাষ:
একজন অহংকারী, সে মনে করে, সমাজে তার প্রাধান্য বিস্তার, সবার নিকট প্রসিদ্ধি লাভ ও নেতৃত্ব দেয়ার কোন বিকল্প নাই। তাকে এ লক্ষ্যে সফল হতেই হবে। কিন্তু যদি সমাজ তার কর্তৃত্ব বা প্রাধান্য মেনে না নেয়, তখন সে চিন্তা করে, তাকে যে কোন উপায়ে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে হবে। চাই তা বড়াই করে হোক অথবা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। তখন সে যা ইচ্ছা তাই করে এবং সমাজে হট্টগোল সৃষ্টি করে।
তিন. নিজের দোষকে আড়াল করা:
একজন অহংকারী তার স্বীয় কাজ কর্মে নিজের মধ্যে যে সব দুর্বলতা অনুভব করে, তা গোপন রাখতে আগ্রহী হয়। কারণ, তার আসল চরিত্র যদি মানুষ জেনে যায়, তাহলে তারা তাকে আর বড় মনে করবে না ও তাকে সম্মান দেবে না। যেহেতু একজন অহংকারী সব সময় মানুষের চোখে বড় হতে চায়, এ কারণে সে পছন্দ করে, তার মধ্যে যে সব দুর্বলতা আছে, তা যেন কারো নিকট প্রকাশ না পায় এবং কেউ যাতে জানতে না পারে। কিন্তু মূলত: সে তার অহংকার দ্বারা নিজেকে অপমানই করে, মানুষকে সে নিজেই তার গোপনীয় বিষয়ের দিকে পথ দেখায়। কারণ, সে যখন নিজেকে বড় করে দেখায়, তখন মানুষ তার বাস্তব অবস্থা জানার জন্য তার সম্পর্কে গবেষণা করতে আরম্ভ করে, তার কোথায় কি আছে, না আছে তা অনুসন্ধান করতে থাকে। তখন তার আসল চেহারা প্রকাশ পায়, আসল রূপ খুলে যায়, তার যাবতীয় দুর্বলতা প্রকাশ পায় এবং তার অবস্থান সম্পর্কে মানুষ বুঝতে পারে। ফলে মানুষ আর তাকে শ্রদ্ধা করে না, বড় করে দেখে না, তাকে নিকৃষ্ট মনে করে এবং ঘৃণা করে।
একজন অহংকারী ইচ্ছা করলে তার দোষগুণ গুলো বিনয়, নম্রতা, মানুষের সাথে বন্ধুত্ব ও চুপ-চাপ থাকার মাধ্যমে গোপন রাখতে পারত, কিন্তু তা না করে অহংকার করার কারণে তার সব গোমর ফাঁ‍‌‍ক হয়ে যায়। এ ছাড়াও মানুষ যা পছন্দ করে না, তা নিয়ে দু:খ প্রকাশ করা, কোন বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করা হতে দুরে থাকা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য মিথ্যা দাবি করা হতে বিরত থাকার মাধ্যমে, সে তার যাবতীয় দুর্বলতা ও গোপন বিষয়গুলো দামা-চাপা দিতে পারত। কিন্তু তা না করে সে অহংকার করাতে তার অবস্থা আরও প্রতিকুলে গেল এবং ফলাফল তার বিপক্ষে চলে গেল। তার বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে তার যাবতীয় অপকর্ম মানুষ জানতে পারল।
চার. অহংকারী যেভাবে অহংকারের সুযোগ পায়:
কতক লোকের অধিক বিনয়ের কারণে অহংকারীরা অহংকারের সুযোগ পায়।
অহংকারীরা যখনই কোন সুযোগ পায়, তা তারা কাজে লাগাতে কার্পণ্য করে না। অনেক সময় দেখা যায় কিছু লোক এমন আছে, যারা বিনয় করতে গিয়ে অধিক বাড়াবাড়ি করে, তারা নিজেদের খুব ছোট মনে করে, নিজেকে যে কোন প্রকার দায়িত্ব আদায়ের অযোগ্য বিবেচনা করে এবং যে কোন ধরনের আমানতদারিতা রক্ষা করতে সে অক্ষম বলে দাবি করে, তখন অহংকারী চিন্তা করে এরা সবাইতো নিজেদের অযোগ্য ও আমাকে যোগ্য মনে করছে, প্রকারান্তরে তারা সবাই আমার মর্যাদাকে স্বীকার করছে, তাহলে আমিই এসব কাজের জন্য একমাত্র যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তি। সুতরাং, আমিতো তাদের সবার উপর নেতা। শয়তান তাকে এভাবে প্রলোভন দিতে ও ফুঁসলাতে থাকে, আর লোকটি নিজে নিজে ফুলতে থাকে। ফলে এখন সে অহংকার বশতঃ আর কাউকে পাত্তা দেয় না সবাইকে নিকৃষ্ট মনে করে। আর নিজেকে যোগ্য মনে করে।
পাঁচ. মানুষকে মূল্যায়ন করতে না জানা:
মানুষ শ্রেষ্ঠ হওয়ার মানদণ্ড কি এবং মানুষকে কিসের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে, তা আমাদের অবশ্যই জানা থাকতে হবে। অহংকারের অন্যতম কারণ হল, মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নির্ধারণে ত্রুটি করা। একজন মানুষ শ্রেষ্ঠ হওয়ার মানদণ্ড কি তা আমাদের অনেকেরই অজানা। যার কারণে তুমি দেখতে পাবে, যারা ধনী ও পদ মর্যাদার অধিকারী তাদের প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে, যদিও তারা পাপী বা অপরাধী হয়। অন্যদিকে একজন পরহেজগার, মুত্তাকী ও সৎ লোক তার ধন সম্পদ ও পদমর্যাদা না থাকাতে সমাজে তাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয় না এবং তাকে মূল্যায়ন করা হয় না। অনৈতিক, চোর, বাটপার যাদের অগ্রাধিকার দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়, বর্তমান সমাজে তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। তাদের অগ্রাধিকার দেয়ার কারণে বা অনুপযুক্ত ও অযোগ্য ব্যক্তিদের দায়িত্ব বা নেতৃত্ব দেয়ার কারণেই বর্তমান সমাজের করুণ অবস্থা। স্বার্থান্বেষী ও ভোগবাদীরা সমাজের হোমরাচোমরা হওয়ার কারণে তারা অন্যদের নিকৃষ্ট মনে করে এবং তাদের উপর বড়াই দেখায় ও অহংকার করে। ইসলাম মানুষকে মূল্যায়নের একটি মাপকাঠি ও মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। বর্তমান সমাজে যদি তা অনুসরণ করা হত, তবে সামাজিক অবক্ষয় সম্পূর্ণ দুর হয়ে যেত এবং সমাজের এ করুণ পরিণতি হতে মানব জাতি রক্ষা পেত।
রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] তার সাহাবীদের একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তব দৃষ্টান্ত দিয়ে বুঝিয়ে দেন যে, একজন মানুষকে কিসের ভিত্তিতে মূল্যায়ন ও অগ্রাধিকার দেয়া হবে এবং তাকে কিসের ভিত্তিতে অবমূল্যায়ন ও পিছনে ফেলে রাখা হবে। মানুষের মর্যাদা তার পোষাকে নয়, বরং মানুষের মর্যাদা, তার অন্তরনিহীত সততা, স্বচ্ছতা ও আল্লাহ-ভীতির উপর নির্ভর করে। যার মধ্যে যতটুকু আল্লাহ-ভীতি থাকবে, সে তত বেশি সৎ ও উত্তম লোক হিসেবে বিবেচিত হবে।
অর্থ, সাহাল ইবনে সা’দ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর সামনে দিয়ে এক ব্যক্তি অতিক্রম করে যাচ্ছিল, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] সমবেত লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এ লোকটি সম্পর্কে কি বল, তারা উত্তরে বলল, লোকটি যদি কাউকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, তাহলে তার ডাকে সাড়া দেয়া হয়, যদি কারো বিষয়ে সুপারিশ করে, তাহলে তার সুপারিশ গ্রহণ করা হয়, আর যদি কোন কথা বলে, তার কথা শোনা হয়। তাদের কথা শোনে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] চুপ করে থাকেন। একটু পর অপর একজন দরিদ্র মুসলিম রাস্তা দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছিল, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] তাকে দেখে সাহাবীদের জিজ্ঞাসা করে বলেন, তোমরা এ লোকটি সম্পর্কে মতামত দাও! তারা বলল, যদি সে প্রস্তাব দেয়, তাহলে তার প্রস্তাবে সাড়া দেয়া হয় না, আর যদি সে কারো বিষয়ে সুপারিশ করে তার সুপারিশ গ্রহণ করা হয় না,  আর যদি সে কোন কথা বলে তার কথায় কান দেয়া হয় না। তখন রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বললেন, এ লোকটি যমিন ভরপুর যত কিছু আছে, তার সব কিছু হতে উত্তম।[7]
ছয়. আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতকে অন্যদের নেয়ামতের সাথে তুলনা করা ও আল্লাহকে ভুলে যাওয়া:
কিবির বা অহংকারের অন্যতম কারণ হল, একজন মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা যে সব নেয়ামত দান করছে, সে সব নেয়ামতকে ঐ লোকের সাথে তুলনা করা যাকে আল্লাহ তা‘আলা কোন হিকমতের কারণে ঐ সব নেয়ামতসমূহ দেয়নি। তখন সে মনে করে, আমিতো ঐ সব নেয়ামতসমূহ লাভের যোগ্য ও উপযুক্ত ব্যক্তি, তাই আল্লাহ তা‘আলা আমাকে আমার যোগ্যতার দিক বিবেচনা করেই নেয়ামতসমূহ দান করেছেন। ফলে সে নিজেকে সব সময় বড় করে দেখে এবং অন্যদের ছোট করে দেখে ও নিকৃষ্ট মনে করে। অন্যদেরকে সে মনে করে তারা নেয়ামত লাভের উপযুক্ত নয়, তাদের যদি যোগ্যতা থাকতো তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের অবশ্যই নেয়ামতসমূহ দান করত।
মানুষ যে সব জিনিষ নিয়ে অহংকার করে তার বর্ণনা
মানুষ বিভিন্ন জিনিষ নিয়ে অহংকার করে থাকে। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে বিভিন্ন ধরনের যোগ্যতা ও গুণ দিয়ে সৃষ্টি করেন। কারো সৌন্দর্য আছে কিন্তু ধন সম্পদ নাই, সে সৌন্দর্য নিয়ে অহংকার করে, আবার কেউ আছে তার সম্পদ আছে, কিন্তু সৌন্দর্য নাই, সে তার সম্পদ নিয়ে বড়াই বা অহংকার করে। এভাবে এক একজন মানুষ এক একটি নিয়ে অহংকার করে। নিম্নে মানুষ যে সব নেয়ামত নিয়ে অহংকার করে, তার কয়েকটি আলোচনা করা হল।
এক. ধন-সম্পদ:
মানুষ আল্লাহর দেয়া ধন-সম্পদ নিয়ে অহংকার বা বড়াই করে থাকে। তারা মনে করে ধন-সম্পদ লাভ তাদের যোগ্যতার ফসল, তারা নিজেরা তাদের যোগ্যতা দিয়ে ধন-সম্পদ উপার্জন করে থাকে। সুতরাং, যাদের ধন-সম্পদ থাকে না তারা অযোগ্য ও অক্ষম। আল্লাহ তা‘আলা কুরান করীমে দুইজন বাগান মালিক সম্পর্কে বলেন,
﴿وَكَانَ لَهُۥ ثَمَرٞ فَقَالَ لِصَٰحِبِهِۦ وَهُوَ يُحَاوِرُهُۥٓ أَنَا۠ أَكۡثَرُ مِنكَ مَالٗا وَأَعَزُّ نَفَرٗا﴾ [الكهف: 34[
অর্থ, আর (এতে) তার ছিল বিপুল ফল-ফলাদি। তাই সে তার সঙ্গীকে কথায় কথায় বলল, ‘সম্পদে আমি তোমার চেয়ে অধিক এবং জনবলেও অনেক শক্তিশালী’। [সূরা কাহাফ, আয়াত: ৩৪]
এখানে লোকটি তার ধন-সম্পদ নিয়ে তার অপর ভাইয়ের উপর অহংকার করে থাকে। আল্লাহ তার অহংকারের নিন্দা করেন আর যে ভাই অহংকার করত না তার প্রশংসা করেন।
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
অর্থ, নিশ্চয় কারূন ছিল মূসার কওমভুক্ত। অতঃপর সে তাদের উপর ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে। অথচ আমি তাকে এমন ধনভাণ্ডার দান করেছিলাম যে, নিশ্চয় তার চাবিগুলো একদল শক্তিশালী লোকের উপর ভারী হয়ে যেত। স্মরণ কর, যখন তার কওম তাকে বলল, ‘দম্ভ করো না। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিকদের ভালবাসেন না’। আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ কর। আর যমীনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না’। [সূরা কাসাস, আয়াত: ৭৬,৭৭]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿فَإِذَا مَسَّ ٱلۡإِنسَٰنَ ضُرّٞ دَعَانَا ثُمَّ إِذَا خَوَّلۡنَٰهُ نِعۡمَةٗ مِّنَّا قَالَ إِنَّمَآ أُوتِيتُهُۥ عَلَىٰ عِلۡمِۢۚ بَلۡ هِيَ فِتۡنَةٞ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَهُمۡ لَا يَعۡلَمُون﴾ [الزمر: 49[.
অর্থ, অতঃপর কোন বিপদাপদ মানুষকে স্পর্শ করলে সে আমাকে ডাকে। তারপর যখন আমি আমার পক্ষ থেকে নি‘আমত দিয়ে তাকে অনুগ্রহ করি তখন সে বলে, ‘জ্ঞানের কারণেই কেবল আমাকে তা দেয়া হয়েছে’। বরং এটা এক পরীক্ষা। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না। [সূরা যুমার, আয়াত: ৪৯]
মানুষ যখন ধন-সম্পদ লাভ করে, তখন সে মনে করে এ তো তার যোগ্যতার ফসল। সে তার বুদ্ধি, বিবেক ও জ্ঞান দিয়েই ধন-সম্পদ লাভ করে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলেন, আসলে মানুষের জ্ঞান খুবই সীমিত তারা এও জানে না যে, তাদের ধন-সম্পদ কোথা থেকে আসে।
দুই. ইলম বা জ্ঞান:
অহংকারের অন্যতম একটি কারণ হল, ইলম বা জ্ঞান। একটি কথা মনে রাখতে হবে, আলেম, ওলামা, তালিবে ইলম ও তথাকথিত পীর মাশায়েখদের মধ্যে অহংকার খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, শয়তান তাদের পিছনে লেগে থাকে, চেষ্টা করে কীভাবে তাদের ধোকায় ফেলা যায়। এ কারণেই বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, আলেমদের মধ্যে ফিতনা ফ্যাসাদ, ঝগড়া-বিবাদ ও মতবিরোধ খুব বেশি। একজন আলেম মনে করে, ইলমের দিক দিয়ে সেই হল পরিপূর্ণ ও স্বয়ং সম্পন্ন, তারমত এত বড় জ্ঞানী জগতে আর কেউ নেই। অনেক সময় দেখা যায়, একজন আলেম অন্য আলেমকে একেবারেই মূল্যয়ন করে না এবং নিজেকে মনে করে বড় আলেম, আর অন্যদের সে জাহেল ও নিকৃষ্ট মনে করে। এ ধরনের স্বভাব একজন আলেমের জন্য কত যে জঘন্য তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
ইলম নিয়ে অহংকার করার কারণ দুটি:
প্রথম কারণ.
ইলম হল, আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক কায়েমের মাধ্যম। ফলে যাদের মধ্যে ইলম আছে তারা আল্লাহর একে বারেই কাছের লোক। তারা কখনোই তাদের ইলম দ্বারা গর্ব বা অহংকার করতে পারে না। যে ইলম মানুষের মধ্যে অহংকার সৃষ্টি করে তা হল, তথাকথিত ইলম বা জ্ঞান। এ ধরনের ইলম নিয়ে ব্যস্ত থাকার কোন অর্থ হতে পারে না। কারণ, বাস্তব ও সত্যিকার ইলম হল, যে ইলম বা জ্ঞান দ্বারা বান্দা তার প্রভুকে চিনতে পারে এবং নিজেকে জানতে পারে। সত্যিকার ইলম একজন বান্দার মধ্যে আল্লাহর ভয় ও বিনয়কে সৃষ্টি করে, অহংকার সৃষ্টি করে না। একজন মানুষের মধ্যে যখন সত্যিকার ইলম বা জ্ঞান থাকবে, তখন সে সর্বাধিক বিনয়ী হবে এবং আল্লাহকেই ভয় করতে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّمَا يَخۡشَى ٱللَّهَ مِنۡ عِبَادِهِ ٱلۡعُلَمَٰٓؤُاْۗ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ﴾ [فاطر :28[
অর্থ, বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, পরম ক্ষমাশীল। [সূরা ফাতের, আয়াত: ২৮]
দ্বিতীয় কারণ:
ইলম বা জ্ঞান হল, পবিত্র আমানত, যা পবিত্র পাত্রেই মানায়, অপবিত্র পাত্রে তা কখনোই মা-নায়না। আর এমন ব্যক্তির ইলম নিয়ে মগ্ন হওয়া, যার অন্তর নাপাকিতে ভরপুর ও চারিত্রিক দিক দিয়ে সে অত্যন্ত নিকৃষ্ট, তা কখনোই শুভ হয় না। এ লোকটি যখন কোন কিছু শিখে, তা নিয়ে সে অহংকার করা আরম্ভ করে এবং যত বেশি শিখে তার অহংকার আরও বাড়তে থাকে। ফলে তার জ্ঞান মানুষের জন্য অশান্তির কারণ হয়।
যেমনটি বলেছিল, মুয়াররি, যে তার নিজের প্রশংসা নিজেই করেছিল, অথচ তার মধ্যে কোন ভালো গুণ আছে বলে কখনোই দেখা যায়নি!
وإني وإن كنتُ الأخيرَ زمانُهُ
لآتٍ بما لم يَأْتِ به الأوائلُ
অর্থ, যুগের দিক দিয়ে যদিও আমি সবার শেষে, তবে আমি এমন কিছু নিয়ে আসবো, যা আমার পূর্বের লোকেরা নিয়ে আসতে পারেনি।
অহংকারের আরেকটি প্রকার হল, বর্তমানে অনেক ছোট ছোট তালিবে ইলমকে বড় বড় আলেমদের সমকক্ষ বিবেচনা করে বিভিন্ন ধরনের কথা বলতে দেখা যায়। কোন মাসআলাতে বড় আলেমদের মতামতকে উপেক্ষা করে তারা নিজেরা মতামত দেয় এবং বলে, তারাও মানুষ আমরাও মানুষ!! এ ধরনের উক্তি তাদের জন্য কখনোই উচিত নয়।
আইউব আল আততার বলেন, আমি বিশির ইবনুল হারেসকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমাকে হাম্মাদ ইবনে যায়েদ হাদিস বর্ণনা করেন। তারপর তিনি বলেন, আসতাগফিরুল্লাহ! সনদ উল্লেখ করার কারণে অন্তরে অহংকার জন্মেছিল। অর্থাৎ সনদ বর্ণনা করে হাদিস বর্ণনাতে তার মধ্যে অহংকার সৃষ্টি হয়, তাই সে সাথে সাথে তা হতে বিরত থাকে। কারণ, যখন একজন মানুষ সনদসহ হাদিস বর্ণনা করে, তখন মানুষ মনে করে লোকটি হাদিসের সনদসহ মুখস্থ করেছে। এতে হাদিস বর্ণনা কারীর অন্তরে অহংকার আসতে পারে, তাই তিনি সনদ বর্ণনা করাকে পরিহার করেন। বর্তমানে অনেক আলেমকে দেখা যায়, তারা হাদিসের সনদ বর্ণনা করেন, যাতে মানুষ তাকে বড় আলেম মনে করে। এ উদ্দেশ্যে হাদিস সনদসহ বর্ণনা না করাই উত্তম। কিন্তু যদি কেউ হাদিসটিকে মজবুত বলে প্রমাণ করার জন্য সনদসহ বর্ণনা করে তাতে কোন অসুবিধা নাই।
তিন. আমল ও ইবাদত:
অনেকেই তাদের ইবাদত ও আমল নিয়ে গর্ব ও অহংকার করে। সে মনে করে মানুষের কর্তব্য হল, তারা তাকে সম্মান করবে, সব কাজে তাকে অগ্রাধিকার দিবে এবং তার তাকওয়া, তাহারাত ও বুজুর্গি নিয়ে বিভিন্নভাবে আলোচনা করবে। আর সে মনে করে সব মানুষ ধ্বংসের মধ্যে আছে, শুধু সে একাই নিরাপদ। এ কারণে সে মাঝে মধ্যে বলে থাকে সব মানুষ ধ্বংস হয়ে গেছে। অথচ, কোন একজন মানুষের জন্য সবাই ধ্বংস হয়ে গেছে বলা কোন ক্রমেই উচিত নয়।
عن أبي هريرة قال :قال رسول الله صلى الله عليه و سلم « إذَِا قَالَ الرَُّجُل هَلَك الناَّسُ فَهُوَ أَْهلَكُهُمْ»
অর্থ, আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, যখন কোন লোক বলে মানুষ ধ্বংস হয়ে গেছে, মূলত: সেই তাদের মধ্যে সবচেয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তি। আল্লামা আবু ইসহাক বলেন, আমি জানি না أَْهلَكُهُمْ শব্দটি যবর বিশিষ্ট যার অর্থ ‘সে তাদের ধ্বংস করল’, নাকি পেশ বিশিষ্ট যার অর্থ ‘সেই তাদের চেয়ে অধিক ধ্বংসের মধ্যে আছে’।
ইমাম নববী রহ. বলেন, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর বাণী- إذا قال الرجل هلك الناس فهو أهلكهم এর দুটি প্রসিদ্ধ অর্থ আছে। এক হল, কাফ এর উপর পেশ, আর একটি হল, কাফ এর উপর যবর। পেশ হওয়াটা অধিক প্রসিদ্ধ ও যুক্তিযুক্ত। অর্থাৎ, তাদের মধ্য হতে সে নিজেই অধিক ধ্বংসপ্রাপ্ত। আর যখন যবর বিশিষ্ট হবে, তখন অর্থ হবে, সে তাদের ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দিল, বাস্তবে তারা ধ্বংস হয় নাই। ওলামারা এ বিষয়ে একমত যে, এখানে যে দূষণীয় বিষয়টি আলোচনা করা হয়, তা সে ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যে মানুষকে নিকৃষ্ট জেনে, নিজেকে তাদের উপর প্রাধান্য দেয়, আর তাদের মন্দ মনে করে এবং তাদের উপর বড়াই করে, এ ধরনের কথা বলে। কারণ, সে কাউকে ভালো বা মন্দ বলার অধিকার রাখে না। এ তো হল কেবল আল্লাহর বৈশিষ্ট্য। তবে যদি তার নিজের মধ্যে ও বর্তমান মুসলিমদের মধ্যে দ্বীনের ব্যাপারে যে দুরবস্থা বিদ্যমান তার উপর আফসোস ও দু:খ প্রকাশ করে এ ধরনের কথা বলে, তখন তাতে কোন ক্ষতি নাই।
যেমনটি বলেছিল উম্মে দারদা; তিনি বলেন, একদিন আবু দারদা বিক্ষুব্ধ হয়ে ঘরে প্রবেশ করে, আমি তাকে বললাম, তোমাকে কিসে ক্ষুব্ধ করল? তখন সে বলল, আমি মুহাম্মদের উম্মতের বিষয়ে কিছুই বুঝতে পারছি না, তারা সবাই জাহান্নামে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। ইমাম মালেক রহ. হাদিসটি ব্যাখ্যা এ রকমই করেছেন এবং অন্যান্য লোকেরাও তার অনুকরণ করেছেন।[8]
আর আল্লামা ইবনে যাওজী রহ. বলেন, কতক অসতর্ক ছুফী আছে, যারা তাদের নিজেদের মনে করে, তারা আল্লাহর মাহবুব ও মকবুল বান্দা আর অন্যরা সবাই নিকৃষ্ট ও পাপি বান্দা। তারা আরও ধারণা করে, তার মান-মর্যাদা অতি উচ্চে, তাই সবাই তাকে সম্মান করে, তার মান মর্যাদা যদি উচ্চে না হত তাহলে তাকে কেউ সম্মান করত না। আবার কখনো কখনো সে এ ধারণা করে, সে যমিনের কুতুব, সে যে মর্যাদায় পৌঁছেছে তার এ আসন পর্যন্ত পৌছার মত আর কেউ দুনিয়াতে নাই।[9]
আল্লামা খাত্তাবী রহ. তার আযলা কিতাবে বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক খোরাসানে পৌছলে, মানুষের মুখে শুনতে পেলেন, এখানে একজন লোক আছে যিনি তাকওয়া ও পরহেজগারিতে প্রসিদ্ধ ও বিখ্যাত। এ কথা শোনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. তাকে দেখতে গেলেন। তিনি তার ঘরে প্রবেশ করেন, কিন্তু লোকটি তার দিকে একটুও তাকাল না এবং তার প্রতি বিন্দু পরিমাণও ভ্রুক্ষেপ করেনি। তার অবস্থা দেখে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক কাল ক্ষেপণ না করে তার ঘর থেকে বের হয়ে চলে আসেন। তারপর তার সাথীদের থেকে এক লোক তাকে বলল, তুমি কি জান এ লোকটি কে? সে বলল, না। তখন সে বলল, এ হল আমীরুল মুমিনীন আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, এ কথা শোনে লোকটি হতভম্ব ও নির্বাক হল এবং দৌড়ে আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রহ. এর নিকট গেল, তার নিকট ক্ষমা চাইল এবং তার আচরণের জন্য দু:খ প্রকাশ করল। তারপর বলল, হে আবু আব্দুর রহমান! তুমি আমাকে ক্ষমা কর এবং উপদেশ দাও!
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক বলল, যখন তুমি ঘর থেকে বের হও, তখন যাকেই দেখ, মনে করবে সে তোমার থেকে উত্তম, আর তুমি তাদের চেয়ে অধম ও নিকৃষ্ট। তাকে এ উপদেশ দেয়ার কারণ হল, লোকটি নিজেকে বড় মনে করত এবং অহংকার করত। এ ছিল ধোঁকায় নিমজ্জিত একজন অহংকারীর অবস্থা। সালফে সালেহীন ও আমাদের পূর্বসূরিদের অবস্থা হল, এ লোকটি হতে সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা কখনোই এ ধরনের আচরণ করত না। তাদের থেকে একজন লোকের কথা বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আরাফায় অবস্থান কারীদের নিকট তাকিয়ে দেখি, আমার মত পাপিষ্ঠ ও গুনাহগার লোক যদি না থাকত, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা সকল আরাফাবাসীকে ক্ষমা করে দিত।
একজন মুমিন সব সময় নিজেকে ছোট ও নিকৃষ্ট মনে করবে এটাই স্বাভাবিক। তার আমল, ইবাদত ও বন্দেগী যতই বেশি হোক না কেন, সে তার যাবতীয় সব ইবাদতকে খুব কমই বিবেচনা করবে। ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ রহ. কে বলা হল, যদি তুমি মারা যাও তবে আমরা তোমাকে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর কামরায় দাফন করব, তখন তিনি বললেন, একমাত্র শিরক ছাড়া আর বাকী সব গুনাহ নিয়ে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করা,  আমার নিকট রাসুল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর ঘরে দাফনের যোগ্য মনে করা হতে উত্তম।
চার. বংশ:
কতক লোক আছে তারা উচ্চ বংশীয় হওয়ার কারণে অন্যদের উপর বংশ নিয়ে গর্ব ও অহংকার করে। সে অহংকার বসত মানুষের সাথে মিশতে চায়না, তাদের সাথে মিশতে অপছন্দ করে এবং মানুষকে ঘৃণা করে। অনেক সময় অবস্থা এমন হয়, তার মুখ দিয়েও অহংকার প্রকাশ পায়। ফলে সে মানুষকে বলতে থাকে, তুমি কে? তোমার পিতা কে? তুমি আমার মত লোকের সাথে কথা বলছ?!!
ইসলামের আদর্শ হল, বংশ মর্যাদা না থাকার কারণে কাউকে হেয় প্রতি-পন্ন করা যাবে না। একজন লোক সে যে বংশেরই হোক না কেন, তার পরিচয় ঈমান ও আমলের মাধ্যমে। এ কারণেই রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর নিকট হাবশী গোলাম বেলাল রা. এর মূল্য মক্কার কাফের সরদার আবু জাহল হতে বেশি। একমাত্র ঈমানের কারণে হাবশী গোলাম বেলাল রা. কে খলিফা-তুল মুসলিমিন ওমর রা. তার নিজের সরদার বলে আখ্যায়িত করেন।
যেমন হাদীসে বর্ণিত,
عن جابر بن عبد الله قال: «كان عمر يقول أبو بكر سيدنا وأعتق سيدنا]يعني بلالًا] »
অর্থ, যাবের ইবনে আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ওমর রা. বলতেন, আবু বকর রা. আমাদের সরদার এবং তিনি আমাদের সরদার বিলাল রা. কে দাসত্ব ও গোলামী হতে মুক্ত করেন।
অর্থ, মা’রুর ইবনে সুয়াইদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু যর রা. কে একটি চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখি এবং তার গোলামকেও ঠিক একই চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখি। আমি তাকে বললাম, যদি তুমি এ চাদরটি নিতে এবং তা পরিধান করতে, তাহলে তোমার জন্য একটি সেট হয়ে যেত! আর গোলামকে তুমি অন্য একটি কাপড় পরতে দিতে পারতে। তখন তিনি বললেন, আমি ও অপর এক লোকের সাথে আমার কথাবার্তা, আলাপ আলোচনা হত। তার মা ছিল একজন অনারবী মহিলা। ঘটনা ক্রমে আমি তার সাথে মেলামেশা করি। তারপর আমার বিষয়টি রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর নিকট আলোচনা হলে, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] আমাকে ডেকে বলল, তুমি কি অমুককে বন্দী করছ? আমি উত্তর দিলাম হাঁ, তারপর তিনি বললেন, তুমি কি তার মায়ের সাথে মেলামেশা করছ? আমি বললাম হাঁ, তখন রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বললেন, তুমি এমন এক লোক, তোমার মধ্যে এখনও জাহেলিয়াত রয়ে গেছে। আমি বললাম, আমি এখন বুড়ো হয়ে গেছি, তা সত্ত্বেও আমার মধ্যে জাহেলিয়াত! তারপর রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বললেন, তারা তোমাদের ভাইয়ের মত, আল্লাহ তা‘আলা তাদের তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। মনে রাখবে, যদি আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের কোন ভাইকে তোমাদের অধীনস্থ করে দেয়, সে যেন নিজে যা খায় তাকেও তা খেতে দেয়, আর সে যা পরিধান করে তাকেও যেন তা পরিধান করতে দেয়। তার উপর এমন কোন কাজ চাপিয়ে দিবে না, যা তার কষ্টের কারণ হয় ও তাকে পরাহত করে। আর যদি এ ধরনের কোন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়, তাহলে সে যেন তাকে সহযোগিতা করে।
আল্লামা ইবনে হাজার রহ. বলেন, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর বাণী তারা তোমাদের ভাই এ কথার অর্থ হল, তোমাদের চাকর ও খাদেম। অর্থটি এ জন্য করা হল, যাতে যারা কৃতদাস নয় তারাও বিধানের অন্তর্ভুক্ত থাকে। এখানে একটি কথা স্পষ্ট হয়, চাকর, খাদেম ও গোলামদের গাল দেয়া একেবারেই নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত কাজ। কারণ, এতে একজন মুসলিমের ইজ্জত সম্মানের উপর আঘাত করা হয়। আর ইসলামের আদর্শ হল, মুসলিমদের মাঝে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমতা নিশ্চিত করা। কে গোলাম আর কে আজাদ বা স্বাধীন, তা ইসলাম কখনোই বিবেচনা করে না, মুসলিম হিসেবে সবাই ভাই ভাই। কেউ কারো পর নয়। ইসলামে কারোর উপর কারো কোন প্রাধান্য নাই একমাত্র প্রাধান্য হল, তাকওয়ার ভিত্তিতে। সুতরাং, একজন উচ্চ বংশের লোক তার মধ্যে যদি তাকওয়া না থাকে, তা হলে তার উচ্চ বংশীয় মর্যাদা কোন কাজে আসবে না। আর একজন লোক সে নিম্ন বংশের, কিন্তু তার মধ্যে তাকওয়া আছে, তাহলে সে তার তাকওয়ার কারণে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنَّا خَلَقۡنَٰكُم مِّن ذَكَرٖ وَأُنثَىٰ وَجَعَلۡنَٰكُمۡ شُعُوبٗا وَقَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوٓاْۚ إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٞ﴾ [الحجرات: 13[
অর্থ, হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত। [সূরা হুজরাত, আয়াত: ১৩][10]
রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন,
«إنِّك امِرُؤٌ فيِك جَاهِليَّة»
অর্থাৎ, তোমার মধ্যে এমন একটি স্বভাব রয়ে গেছে, যা জাহিলি যুগে তোমাদের মধ্যে ছিল। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে, আবু যর রা. হতে এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার কারণ হল, তিনি বিষয়টি যে, হারাম করা হয়েছে, তা এখনও জানতেন না। অন্যথায় তার মত একজন বিশিষ্ট সাহাবী হতে এ ধরনের একটি অনৈতিক কাজ প্রকাশ পাওয়ার কোন অবকাশ দেখি না। তিনি বিষয়টি জানতেন না বলেই জাহিলি যুগের এ স্বভাবটি এখনো পর্যন্ত তার কাছে অবশিষ্ট ছিল। এ কারণেই তিনি বলেন,
]قلت: على ساعتي هذه من كبر السن؟ قال: نَعَمْ[
অর্থাৎ, বুড়ো হয়ে যাওয়ার পরও। তার কাছে বিষয়টি জানা না থাকায় সে আশ্চর্য বোধ করল। তারপর তাকে জানিয়ে দেয়া হল যে, কাজটি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। [11]
যে সব অহংকারীকে তার অহংকার হকের অনুকরণ হতে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, তাদের দৃষ্টান্ত
এক- ইবলিস:
অভিশপ্ত ইবলিসের কুফরি করা ও আল্লাহর আদেশের অবাধ্য হওয়ার একমাত্র কারণ, তার অহংকার।
আল্লাহ তা‘আলা তার বর্ণনা দিয়ে বলেন,
অর্থ, তিনি বললেন, ‘স্মরণ কর, যখন তোমার রব ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আমি মাটি হতে মানুষ সৃষ্টি করব। যখন আমি তাকে সুষম করব এবং তার মধ্যে আমার রূহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তার উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে যাও। ফলে ফেরেশতাগণ সকলেই সিজদাবনত হল। ইবলীস ছাড়া, সে অহঙ্কার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ল। আল্লাহ বললেন, ‘হে ইবলীস, আমার দু’হাতে আমি যাকে সৃষ্টি করেছি তার প্রতি সিজদাবনত হতে কিসে তোমাকে বাধা দিল? তুমি কি অহঙ্কার করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন? সে বলল, ‘আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন অগ্নি থেকে আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে। তিনি বললেন, তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। কেননা নিশ্চয় তুমি বিতাড়িত। আর নিশ্চয় বিচার দিবস পর্যন্ত তোমার প্রতি আমার লা‘নত বলবৎ থাকবে। সে বলল, ‘হে আমার রব, আমাকে সে দিন পর্যন্ত অবকাশ দিন যেদিন তারা পুনরুত্থিত হবে।’  তিনি বললেন, আচ্ছা তুমি অবকাশপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হলে- ‘নির্ধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত।’ সে বলল, ‘আপনার ইজ্জতের কসম! আমি তাদের সকলকেই বিপথগামী করে ছাড়ব।’ তাদের মধ্য থেকে আপনার একনিষ্ঠ বান্দারা ছাড়া। আল্লাহ বললেন, ‘এটি সত্য আর সত্য-ই আমি বলি’, তোমাকে দিয়ে এবং তাদের মধ্যে যারা তোমার অনুসরণ করত তাদের দিয়ে নিশ্চয় আমি জাহান্নাম পূর্ণ করব।’ বল, ‘এর বিনিময়ে আমি তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না আর আমি ভানকারীদের অন্তর্ভুক্ত নই। সৃষ্টিকুলের জন্য এ তো উপদেশ ছাড়া আর কিছু নয়। [সূরা সাদ, আয়াত: ৭১-৮৭]
দুই: ফেরআউন ও তার সম্প্রদায়ের লোকেরা:
অনুরূপভাবে ফেরআউনের কুফরি করার কারণ ছিল, তার অহংকার। আল্লাহ তা‘আলা তার বর্ণনা দিয়ে বলেন,
অর্থ, আর ফির‘আউন বলল, ‘হে পারিষদবর্গ, আমি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ আছে বলে আমি জানি না। অতএব হে হামান, আমার জন্য তুমি ইট পোড়াও, তারপর আমার জন্য একটি প্রাসাদ তৈরী কর। যাতে আমি মূসার ইলাহকে দেখতে পাই। আর নিশ্চয় আমি মনে করি সে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত’। আর ফির‘আউন ও তার সেনাবাহিনী অন্যায়ভাবে যমীনে অহঙ্কার করেছিল এবং তারা মনে করেছিল যে, তাদেরকে আমার নিকট ফিরিয়ে আনা হবে না। অতঃপর আমি তাকে ও তার সেনাবাহিনীকে পাকড়াও করলাম, তারপর তাদেরকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম। অতএব, দেখ যালিমদের পরিণাম কিরূপ হয়েছিল? আর আমি তাদেরকে নেতা বানিয়েছিলাম, তারা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করত এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। এ যমীনে আমি তাদের পিছনে অভিসম্পাত লাগিয়ে দিয়েছি আর কয়ামতের দিন তারা হবে ঘৃণিতদের অন্তর্ভুক্ত। [সূরা কাসাস, আয়াত: ৩৮-৪২]
তিন: সালেহ আ. এর কওম, সামুদ গোত্র:
সামুদ গোত্রের কুফরির কারণও একই। অর্থাৎ, তাদের অহংকার। আল্লাহ তা’আলা বলেন,
অর্থ, তার কওমের অহঙ্কারী নেতৃবৃন্দ তাদের সেই মুমিনদেরকে বলল যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত, ‘তোমরা কি জান যে, সালিহ তার রবের পক্ষ থেকে প্রেরিত’? তারা বলল, ‘নিশ্চয় সে যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছে, আমরা তাতে বিশ্বাসী’। যারা অহংকার করেছিল তারা বলল, ‘নিশ্চয় তোমরা যার প্রতি ঈমান এনেছ, আমরা তার প্রতি অস্বীকারকারী’ [সূরা আরাফ, আয়াত: ৭৫,৭৬]
চার: হুদ আ. এর কাওম আদ সম্প্রদায়:
অর্থ, আর ‘আদ সম্প্রদায়, তারা যমীনে অযথা অহঙ্কার করত এবং বলত, ‘আমাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী কে আছে’? তবে কি তারা লক্ষ্য করেনি যে, নিশ্চয় আল্লাহ যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাদের চেয়ে অধিক শক্তিশালী? আর তারা আমার আয়াতগুলোকে অস্বীকার করত।
তারপর আমি তাদের উপর অশুভ দিনগুলোতে ঝঞ্ঝাবায়ু পাঠালাম যাতে তাদেরকে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক আযাব আস্বাদন করাতে পারি। আর আখিরাতের আযাব তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং তাদেরকে সাহায্য করা হবে না। [সূরা ফুসসলিাত, আয়াত: ১৫-১৬]
পাঁচ: শুয়াইব আ. এর কওম মাদায়েনের অধিবাসী:
আল্লাহ তা‘আলা তাদের ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন,
অর্থ, তার কওম থেকে যে নেতৃবৃন্দ অহঙ্কার করেছিল তারা বলল, ‘হে শু‘আইব, আমরা তোমাকে ও তোমার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে অবশ্যই আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে।’ সে বলল, ‘যদিও আমরা অপছন্দ করি তবুও?’ [সূরা আরাফ, আয়াত: ৮৮]
ছয়: নুহ আ. এর কওম:
অর্থ, সে বলল, ‘হে আমার রব! আমি তো আমার কওমকে রাত-দিন আহবান করেছি। ‘অতঃপর আমার আহ্বান কেবল তাদের পলায়নই বাড়িয়ে দিয়েছে’। ‘আর যখনই আমি তাদেরকে আহ্বান করেছি ‘যেন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন’, তারা নিজদের কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়েছে, নিজদেরকে পোশাকে আবৃত করেছে, [অবাধ্যতায়] অনড় থেকেছে এবং দম্ভভরে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে’। ‘তারপর আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে আহবান করেছি’।  অতঃপর তাদেরকে আমি প্রকাশ্যে এবং অতি গোপনেও আহ্বান করেছি। [সূরা নুহ, আয়াত: ৫-৯]
সাত. বনী ইসরাঈল:
অর্থ, আর আমি নিশ্চয় মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তার পরে একের পর এক রাসূল প্রেরণ করেছি এবং মারইয়াম পুত্র ঈসাকে দিয়েছি সুস্পষ্ট নিদর্শনসমূহ। আর তাকে শক্তিশালী করেছি ‘পবিত্র আত্মা’র মাধ্যমে। তবে কি তোমাদের নিকট যখনই কোন রাসূল এমন কিছু নিয়ে এসেছে, যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখন তোমরা অহঙ্কার করেছ, অতঃপর [নবীদের] একদলকে তোমরা মিথ্যাবাদী বলেছ আর একদলকে হত্যা করেছ। আর তারা বলল, আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত; বরং তাদের কুফরীর কারণে আল্লাহ তাদেরকে লা‘নত করেছেন। অতঃপর তারা খুব কমই ঈমান আনে। [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ৮৭-৮৮]
আট. আরবের মুশরিকরা:
অর্থ, আর তোমার পূর্বে যত নবী আমি পাঠিয়েছি, তারা সবাই আহার করত এবং হাট-বাজারে চলাফেরা করত। আমি তোমাদের একজনকে অপরজনের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ করেছি। তোমরা কি ধৈর্যধারণ করবে? আর তোমার রব সর্বদ্রষ্টা। আর যারা আমার সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করে না, তারা বলে, ‘আমাদের নিকট ফেরেশতা নাযিল হয় না কেন? অথবা আমরা আমাদের রবকে দেখতে পাই না কেন’? অবশ্যই তারা তো তাদের অন্তরে অহঙ্কার পোষণ করেছে এবং তারা গুরুতর সীমালংঘন করেছে। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ২০, ২১]
মানব জীবনে অহংকারের প্রভাব
একটি কথা মনে রাখতে হবে, অহংকারের পরিণতি মানবজাতির জন্য খুবই খারাপ ও করুণ। নিম্নে অহংকারের কয়েকটি পরিণতি আলোচনা করা হল।
এক. আল্লাহর উপর ঈমান আনা, তার ইবাদত করা হতে বিরত থাকা:
অর্থ, মাসীহ কখনো আল্লাহর বান্দা হতে [নিজকে] হেয় মনে করে না এবং নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারাও না আর যারা তাঁর ইবাদাতকে হেয় জ্ঞান করে এবং অহঙ্কার করে, তবে অচিরেই আল্লাহ তাদের সবাইকে তাঁর নিকট সমবেত করবেন। পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তিনি তাদেরকে তাদের পুরস্কার পরিপূর্ণ দেবেন এবং তাঁর অনুগ্রহে তাদেরকে বাড়িয়ে দেবেন। আর যারা হেয় জ্ঞান করেছে এবং অহঙ্কার করেছে, তিনি তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন এবং তারা তাদের জন্য আল্লাহ ছাড়া কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। [সূরা নিসা, আয়াত: ১৭২, ১৭৩]
আল্লাহ আরও বলেন,[
অর্থ, নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে এবং তার ব্যাপারে অহঙ্কার করেছে, তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না উট সূঁচের ছিদ্রতে প্রবেশ করে। আর এভাবেই আমি অপরাধীদেরকে প্রতিদান দেই। তাদের জন্য থাকবে জাহান্নামের বিছানা এবং তাদের উপরে থাকবে [আগুনের] আচ্ছাদন। আর এভাবেই আমি যালিমদেরকে প্রতিদান দেই। [সূরা আরাফ, আয়াত: ৪০, ৪১]
দুই. অহংকারের পরিণতির মুখোমুখি হওয়া:
লোকমান হাকিম তার ছেলেকে যে নছিহত করে, তা থেকে তুমি অহংকারের পরিণতি কি তা জানতে পারবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَا تُصَعِّرۡ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمۡشِ فِي ٱلۡأَرۡضِ مَرَحًاۖ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخۡتَالٖ فَخُورٖ ﴾ ]لقمان : 18[
‘অর্থ, আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর যমীনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক, অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না’। [সূরা লোকমান, আয়াত: ১৮]
وتصعير الخد للناس এ কথাটির অর্থ হল, অহংকার করে মানুষের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া। আরفي الأرض   والمشي অর্থ হল জমিনে অহংকার করে হাঁটা, বুক ফুলিয়ে হাটা।
إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخۡتَالٖ فَخُورٖ নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা কোন দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করে না। অর্থাৎ, যারা মানুষের উপর বড়াই করে তাদের সাথে অহংকার ও গরিমা দেখায়, তাদের আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করে না।
فَخُورٖ অর্থাৎ, শক্তির বড়াই, জ্ঞানের বড়াই, ধন-সম্পদের বড়াই ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা যমিনে বুক ফুলিয়ে হাঁটা ও অহংকার করে চলাচল করা হতে সম্পূর্ণ নিষেধ করেন। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে করীমে এরশাদ করে বলেন,
﴿وَلَا تَمۡشِ فِي ٱلۡأَرۡضِ مَرَحًاۖ إِنَّكَ لَن تَخۡرِقَ ٱلۡأَرۡضَ وَلَن تَبۡلُغَ ٱلۡجِبَالَ طُولٗا﴾ ]الإسراء: 37[
অর্থ, আর যমীনে বড়াই করে চলো না; তুমি তো কখনো যমিনকে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড় সমান পৌঁছতে পারবে না। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৭]
অহংকারীদের অভ্যাস হল, যমিনে অহংকার ও বুক ফুলিয়ে হাটা। পক্ষান্তরে মুমিনদের গুণ হল, তারা যমিনে বিনয়ের সাথে হাটে। তারা লোক দেখানোর জন্য রাস্তায় বের হয় না। তারা তাদের জরুরি প্রয়োজনে রাস্তায় বের হয়, মানুষকে ছোট মনে করে না এবং ঘৃণার চোখে দেখে না। আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের গুণের বর্ণনা দিয়ে এরশাদ করেন,
অর্থ, আর রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে ‘সালাম’। আর যারা তাদের রবের জন্য সিজদারত ও দণ্ডায়মান হয়ে রাত্রি যাপন করে। আর যারা বলে, হে আমাদের রব, তুমি আমাদের থেকে জাহান্নামের আযাব ফিরিয়ে নাও। নিশ্চয় এর আযাব হল অবিচ্ছিন্ন’। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৩-৬৫]
আমাদের সলফগণ যখন ঘর থেকে বের হতেন, তারা তাদের হাঁটার পথে নিজেদের খুব হেফাযতে ও সংকোচিত করতেন এবং বিনয়ের সাথে হাঁটতেন। খালেদ ইবনে মেদান রহ. বর্ণনা করেন, আমর ইবনে আসওয়াদ আল-আনাসি যখন মসজিদ থেকে বের হতেন, তখন তিনি ডান হাত দ্বারা বাম হাতকে চেপে ধরতেন। তাকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বলেন, আমি আশংকা করি, আমার হাত আমার সাথে বেঈমানি করবে!।[12]
আল্লামা হাফেয যাহবী রহ. বলেন, তিনি হাঁটার সময় হাত নড়াচড়া করা ও দোলানোর আশংকায় হাত-দ্বয় জোড়া করে রাখতেন। কারণ, হাত দোলানো অহংকারের অন্তর্ভুক্ত।
আলী ইবনে হুছাইন রা. যখন হাঁটতেন, তার হাত-দ্বয় তার উরু অতিক্রম করত না এবং সে হাত নড়াচড়া করত না।[13]
তিন. কাপড় ঘোরালির নিচে ঝুলিয়ে পরিধান করা ও যমিনে তা ছেঁচানো:
অহংকারীদের অভ্যাস হল, তারা তাদের কাপড় ঘোরালির নিচে পরিধান করে মাটির সাথে ছেঁচাতে থাকে। রাসূল সা. এ থেকে নিষেধ করেন।
عن ابن عمر أن رسول الله صلى الله عليه و سلم  قال: « لا يَنظُر الله إِلَى مَنْ جَرَّ ثَوْبَهُ خُيَلَاءَ»
অর্থ, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তির দিকে তাকাবে না, যে অহংকার করে তার কাপড়কে ঝুলিয়ে পরিধান করে।
ইমাম নববী রহ. বলেন, الخيلاء، والمخيلة، والبطر، والكبر، والزهو،
والتبختر، সব কটি শব্দের অর্থ একই, অর্থাৎ অহংকার। আর অহংকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও হারাম।
خالَ الرجل واختالَ اختيالاً
যখন কোন লোক অহংকার করে, তখন এ কথাটি বলা হয়।
অর্থ, যাবের ইবনে সুলাইম রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি কি কাজ করবো না সে বিষয়ে আমার থেকে আপনি প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করুন,। রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] আমাকে বললেন, তুমি কাউকে গালি দিবে না। তিনি বলেন, তারপর থেকে আমি কোন স্বাধীন, গোলাম, উট ও বকরীকে গাল দেইনি। আর কোন ভাল কাজকে তুমি কখনোই ছোট মনে করবে না। তুমি তোমার ভাইয়ের সাথে হাসি মুখে কথা বলবে। মনে রাখবে, এটি অবশ্যই একটি ভালো কাজ। আর তুমি তোমার পরিধেয়কে অর্ধ নলা পর্যন্ত উঠাও, যদি তা সম্ভব না হয়, তবে গোড়ালি পর্যন্ত। পরিধেয়কে গোড়ালির নিচে ঝুলিয়ে পরিধান করা হতে বিরত থাক। কারণ, তা অহংকার। আর আল্লাহ তা‘আলা অহংকারকে পছন্দ করে না। যদি কোন ব্যক্তি তোমাকে গাল দেয় বা তোমার মধ্যে আছে, এমন কোন দোষ জেনে, তোমাকে অনর্থক দোষারোপ করে বা তোমাকে লজ্জা দেয়, তুমি তার মধ্যে বিদ্যমান এমন কোন দোষ জেনে, তাকে দোষারোপ করবে না ও লজ্জা দেবে না। কারণ, তার কর্মের পরিণাম তার উপরই বর্তাবে।
বর্তমান যুগে ঝুলিয়ে পরিধান করা ছাড়াও পোশাকের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন ও পদ্ধতি আছে যা অহংকারকে প্রমাণ করে। অনেকে আছে অহংকার করে খুব পাতলা কাপড় পরিধান করে। আবার কেউ কেউ আছে খুব মূল্যবান কাপড় পরিধান করে, যাতে লোকেরা বলে লোকটি দামি কাপড় পরিধান করছে।
চার. অহংকারীর সম্মানে ছুটাছুটি করা ও দাঁড়িয়ে সম্মান করাকে পছন্দ করা।
অর্থ, আবি মিজলায রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মুয়াবিয়া রা. আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর ও আব্দুল্লাহ ইবনে আমের রা. এর দরবারে উপস্থিত হলে, আব্দুল্লাহ ইবনে আমের রা. তার সম্মানে দাঁড়াল, আর আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা. বসেছিল, সে দাঁড়ায়নি। মুয়াবিয়া রা. ইবনে আমেরকে বলল, তুমি বস! আমি রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি পছন্দ করে, লোকেরা তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান করুক, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে করে নেয়।[14]
পাঁচ. অতিরিক্ত কথা বলা:
অর্থ, যাবের রা. হতে বর্ণিত রাসুল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, কিয়ামত দিবসে আমার নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি এবং মজলিশের দিক দিয়ে আমার সর্বাধিক কাছের লোক সে হবে, তোমাদের মধ্যে যার চরিত্র খুব সুন্দর। আর কিয়ামত দিবসে তোমাদের মধ্যে আমার নিকট সর্বাধিক ঘৃণিত ব্যক্তি, মজলিশের দিক দিয়ে আমার থেকে সর্বাধিক দুরের লোক, যে ইচ্ছা করে বেশি কথা বলে, কথার মাধ্যমে মানুষের উপর অহংকার করে এবং যে ব্যক্তি দীর্ঘ কথা বলে অন্যের উপর নিজের ফযিলত বর্ণনা করে।
ছয়, ঠাট্টা-বিদ্রূপ, চোগলখোরি ও নাম পরিবর্তন করা:
অহংকারী নিজেকে অনেক বড় করে দেখে, ফলে সে মানুষকে ঘৃণা করে তাদের উপহাস করে এবং তিরস্কার করে।
সাত, গীবত করা:
অহংকারী এ কথা প্রকাশ করতে চায় যে, নিশ্চয় সে অন্যদের তুলনায় অধিক সম্মানী। আর গীবত, অন্যদের দোষ প্রকাশ ও তাদের দুর্বলতা বর্ণনা করাকে, সে তার বড়ত্ব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে।
আট, গরীব, মিসকিন, অসহায় ও দুর্বল লোকদের সাথে উঠা বসা করা হতে বিরত থাকা:
একজন অহংকারী যাকে ধন-সম্পদ, বংশ মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে তার থেকে দুর্বল মনে করে, তার সাথে উঠবস করাকে ঘৃণার চোখে দেখে। রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর যুগে অনেক মুশরিকদের ইসলামে প্রবেশ না করার কারণও এটি ছিল, তারা যখন দেখত যে, অনেক লোক যারা ইসলামে প্রবেশ করেছে, তারা ধন-সম্পদ, বংশ মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানের দিক দিয়ে তাদের থেকে দুর্বল, তারা যদি ইসলামে প্রবেশ করে তাদেরও তাদের সাথে উঠবস করতে হবে, এ আশংকায় তারা ইসলামে প্রবেশ হতে বিরত থাকে।
٥٢[
অর্থ, সায়াদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা ছয় ব্যক্তি রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর মজলিশে উপস্থিত ছিলাম, তখন মুশরিকরা রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে বলল, তাদেরকে দূরে সরিয়ে দাও, যাতে তারা আমাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার না করে। তাদের কথা শুনে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] অন্তরে যা জাগার জন্য আল্লাহ চাইল, তা জাগল এবং তিনি নমনীয় হলেন। তারপর সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন,
٢[
র্অথ, আর তুমি তাড়িয়ে দিয়ো না তাদেরকে, যারা নিজ রবকে সকাল সন্ধ্যায় ডাকে, তারা তার সন্তুষ্টি চায়। তাদের কোন হিসাব তোমার উপর নেই এবং তোমার কোন হিসাব তাদের উপর নেই যে, তুমি তাদেরকে তাড়িয়ে দিবে, এরূপ করলে তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। [আল-আন’আম : ৫২]
আল্লাহ তা‘আলার উল্লেখিত বাণী সম্পর্কে খাব্বাব রা. বলেন, একদিন আকরা ইবনে হাবেস আত-তামীমি ও উয়াইনা ইবনে হিসন আল ফাযারী উভয়ে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর দরবারে এসে দেখেন রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এ দরবারে উপস্থিত ছিল, ছুহাইব রা. বিলাল রা. ও খাব্বাব রা.। তাদের ছাড়াও আরও কতক দুর্বল মুমিনদের নিয়ে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বসা ছিল। তারা যখন তাদের রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর দরবারে দেখল, তাদের অপছন্দ করল, তারপর তারা তার নিকট উপস্থিত হয়ে, একান্তে বলল, আমরা চাই তুমি আমাদের বিশেষ একটি মজলিশ নির্ধারণ করবে, যাতে আরবরা আমাদের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে জানতে পারবে। কারণ, আমরা আরবরা যখন তোমার নিকট উপস্থিত হই, তখন আরবরা আমাদেরকে এসব গোলাম ও নিকৃষ্ট লোকদের সাথে দেখাকে আমরা আমাদের জন্য অপমান বোধ করছি। আমরা যখন উপস্থিত হই, তখন তাদেরকে তোমার দরবার থেকে দুরে সরিয়ে দিবে। আর যখন আমরা তোমার সাথে আলোচনা শেষ করব, তখন তুমি ইচ্ছা করলে তাদের সাথে বসবে। রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] তাদের প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করলেন এবং বললেন, হাঁ। তখন তারা বলল, ঠিক আছে তাহলে এ বিষয়ের উপর একটি চুক্তি সাক্ষরিত হোক, বর্ণনাকারী বলেন, তারপর রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কাগজ কলম নিয়ে আসার জন্য বলেন এবং চুক্তি লিপিবদ্ধ করার জন্য আলী রা. কে ডেকে পাঠালেন, আমরা সবাই এক কোনে বসা ছিলাম, তারপর জিবরীল আ. যমিনে এসে এ আয়াত নাযিল করেন :
তারপর আকরা ইবনে হাবেস ও উয়াইনাহ ইবনে হিসনের আলোচনা করে বলেন-
: ﴿وَكَذَٰلِكَ فَتَنَّا بَعۡضَهُم بِبَعۡضٖ لِّيَقُولُوٓاْ أَهَٰٓؤُلَآءِ مَنَّ ٱللَّهُ عَلَيۡهِم مِّنۢ بَيۡنِنَآۗ أَلَيۡسَ ٱللَّهُ بِأَعۡلَمَ بِٱلشَّٰكِرِينَ﴾ [الأنعام:53]
অর্থ, আর এভাবেই আমি এককে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করেছি, যাতে তারা বলে, ‘এরাই কি, আমাদের মধ্য থেকে যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন? আল্লাহ কি কৃতজ্ঞদের ব্যাপারে পূর্ণ জ্ঞাত নয়? [সূরা আনআম, আয়াত: ৫৩] তারপর আল্লাহ বলেন,
অর্থ, আর যারা আমার আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনে, তারা যখন তোমার কাছে আসে, তখন তুমি বল, ‘তোমাদের উপর সালাম’। তোমাদের রব তাঁর নিজের উপর লিখে নিয়েছেন দয়া, নিশ্চয় যে তোমাদের মধ্য থেকে না জেনে খারাপ কাজ করে তারপর তাওবা করে এবং শুধরে নেয়, তবে তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সূরা আনআম, আয়াত: ৫৪] তিনি বলেন, তারপর আমরা তার একে বারে কাছাকাছি গেলাম এমনকি আমাদের হাঁটু তার হাঁটুর উপর রাখলাম এ অবস্থায় রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] আমাদের সাথে বসে থাকতো। আর রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] যখন উঠতে চাইত, আমরা তাকে ছেড়ে দিতাম। তারপর আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন,
﴿وَٱصۡبِرۡ نَفۡسَكَ مَعَ ٱلَّذِينَ يَدۡعُونَ رَبَّهُم بِٱلۡغَدَوٰةِ وَٱلۡعَشِيِّ يُرِيدُونَ وَجۡهَهُۥۖ وَلَا تَعۡدُ عَيۡنَاكَ عَنۡهُمۡ تُرِيدُ زِينَةَ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ وَلَا تُطِعۡ مَنۡ أَغۡفَلۡنَا قَلۡبَهُۥ عَن ذِكۡرِنَا وَٱتَّبَعَ هَوَىٰهُ وَكَانَ أَمۡرُهُۥ فُرُطٗا ٢٨﴾ ]الكهف:28[
অর্থ, আর তুমি নিজকে ধৈর্যশীল রাখ তাদের সাথে, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবকে ডাকে, তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশে এবং দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে। তোমার দু’চোখ যেন তাদের থেকে ঘুরে না যায়। আর ওই ব্যক্তির আনুগত্য করো না, যার অন্তরকে আমি আমার যিকির থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে এবং যার কর্ম বিনষ্ট হয়েছে। [সূরা কাহাফ, আয়াত: ২৮]
খাব্বাব রা. বলেন, আমরা রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর সাথে বসে থাকতাম। আর যখন রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] মজলিশ থেকে উঠার সময় হত, তখন আমরা উঠে যেতাম এবং রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে ছেড়ে দিতাম, যাতে তিনি উঠতে পারেন।
নয়. নিকৃষ্ট ও দোষনীয় কাজের উপর অটুট থাকা:
অহংকারী কখনো তার নিজের সংশোধন ও তার দোষের চিকিৎসা বিষয়ে চিন্তা করে না, কারণ, সে মনে করে তার চেয়ে নির্দোষ, নিরপরাধ ও কামেল ব্যক্তি আর কেউ হতেই পারে না এবং সে পরিপূর্ণ ও কামিল ব্যক্তি। ফলে তার মধ্যে কোন দোষ থাকতে পারে, তা কখনো সে চিন্তাও করে না এবং কারো কোন উপদেশ সে শুনে না। যার ফলে সে তার অহংকারের মধ্যে আজীবন পড়ে থাকে। তাকে দোষনীয় গুণ ও কু অভ্যাস নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়। শেষ পর্যন্ত মৃত্যু এসে যায় এবং তার হায়াত শেষ হয়ে যায়। আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুক!
অবশেষে তার অবস্থা তাদের মত হয়, যাদের বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿قُلۡ هَلۡ نُنَبِّئُكُم بِٱلۡأَخۡسَرِينَ أَعۡمَٰلًا ١٠٣ ٱلَّذِينَ ضَلَّ سَعۡيُهُمۡ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَهُمۡ يَحۡسَبُونَ أَنَّهُمۡ يُحۡسِنُونَ صُنۡعًا ١٠٤﴾  ]الكهف: 103-104[
অর্থ, বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন লোকদের কথা জানাব, যারা আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত’? দুনিয়ার জীবনে যাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করছে যে, তারা ভাল কাজই করছে’! [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১০৩-১০৪]
দশ. কারো উপদেশ গ্রহণ না করা:
অহংকারী ব্যক্তি কখনো কারো উপদেশ গ্রহণ করে না। সে মনে করে আমিতো কামিল ব্যক্তি আমার থেকে বড় আর কে হতে পারে? যে আমাকে উপদেশ দিবে। এছাড়াও সে কিভাবে মানুষের উপদেশ গ্রহণ করবে? সে নিজেই মানুষকে উপদেশ দিয়ে বেড়ায়। এ ধরনের অহংকারীদের বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَإِذَا قِيلَ لَهُ ٱتَّقِ ٱللَّهَ أَخَذَتۡهُ ٱلۡعِزَّةُ بِٱلۡإِثۡمِۚ فَحَسۡبُهُۥ جَهَنَّمُۖ وَلَبِئۡسَ ٱلۡمِهَادُ ٢٠٦﴾ ]البقرة: 206]
অর্থ, আর যখন তাকে বলা হয়, ‘আল্লাহকে ভয় কর’ তখন আত্মাভিমান তাকে পাপ করতে উৎসাহ দেয়। সুতরাং জাহান্নাম তার জন্য যথেষ্ট এবং তা কতই না মন্দ ঠিকানা। [সূরা বাকারা, আয়াত: ২০৬]
এগার. জ্ঞান অর্জন না করা:
অহংকারী ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন হতে বঞ্চিত হয়। সে তার অহংকারের কারণে পড়া লেখা করতে পারে না। সে মনে করে আমিতো সব জানি তাহলে আমাকে আবার পড়তে হবে কেন?
আল্লামা মুজাহিদ বলেন, অহংকারী ও লজ্জিত লোক কখনোই জ্ঞান অর্জন করতে পারে না।[15] একজন অহংকারীকে তার অহংকার সব সময় তাকে বড় করে ও সে সবার ঊর্ধ্বে দেখায়। ফলে সে অন্যের নিকট থেকে কোন ইলম, জ্ঞান, হিকমত, অভিজ্ঞতা ও টেকনিক শিখতে রাজি না। তাই আজীবন সে অজ্ঞ, অনভিজ্ঞ, মূর্খ ও জাহিল হয়েই বেঁচে থাকে।
বার. অহংকারীর সাথে সাক্ষাত হলে, সে সালাম দেয় না।
আর যখন কেউ তাকে সালাম দেয় তখন চিন্তা করে, সে অনেক বড় হয়ে গেছে। কারো জন্য নত হয় না, তার মত কোন লোকই হয় না। তার উপর কারো কোন অধিকার বা পাওনা নাই, সেই শুধু মানুষের নিকট পায়। মানুষ তার কাছে কৃতজ্ঞ সে কারো কাছে কৃতজ্ঞ নয়। কাউকে সে তার চেয়ে উত্তম মনে করে না, বরং সেই সবার থেকে উত্তম। এ ধরনের ধ্যান ধারণার ফলে সে প্রতিদিনই আল্লাহর রহমত থেকে দুরে সরতে থাকে। আর মানুষের নিকট ঘৃণার পাত্র ও নিকৃষ্ট মানুষ বলে গণ্য হয়।[16]
তের. হাঁটার সময় যদি তার সাথে অন্য কেউ থাকে, তাকে তার পিছনে হাটতে পছন্দ করা:
হাঁটার সময় তার সামনে কেউ হাঁটুক তা সে পছন্দ করে না। নিজেই আগে আগে হাঁটতে পছন্দ করে। আর কোন মজলিশে উপস্থিত হলে অহংকারী সব সময় মজলিশের সামনে বসতে পছন্দ করে। সবার পরে এসে সামনে চলে যায়, পিছনে বসে না। মানুষের মধ্যে সুনাম সুখ্যাতি ও প্রসিদ্ধটা অর্জন করতে পছন্দ করে। কিন্তু একজন বিনয়ী কখনোই এ গুলো পছন্দ করে না। সে এসব থেকে পলায়ন করে।
অর্থ, আমের ইবনে সায়াদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা সায়াদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. স্বীয় উটে সাওয়ার ছিল, তাকে দেখে তার ছেলে ওমর সামনে অগ্রসর হল। সায়াদ রা. তাকে দেখে বলল, এ আরোহণকারীর অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। তারপর সে নিচে অবতরণ করলে তাকে বলা হল, তুমি তোমার উট ও ছাগল নিয়ে ব্যস্ত হলে, অথচ লোকেরা পরস্পর বাদশাহকে নিয়ে বিবাদ করছে। এ কথা শোনে সায়াদ রা. তার বাহুতে আঘাত করে বলল, তুমি চুপ কর! আমি রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা‘আলা নিরুত্তাপ, মুত্তাকী, গণিকে অধিক পছন্দ করেন।
ইমাম নববী রহ. বলেন, হাদিসে ‘গিনা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, নফসের গিনা। অন্তরের দিক দিয়ে যে গণি সেই হল, আল্লাহর প্রিয় গণি বান্দা। কারণ, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, সত্যিকার গেনা হল, নফসের গেনা।[17] আর এখানে নিরুত্তাপ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যে লোক দুনিয়ার ঝামেলা বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকে এবং ব্যক্তিগত কাজেই মনোযোগী হয়।[18]
অহংকারীর শাস্তি
একজন অহংকারীকে আল্লাহ তা‘আলা অবশ্যই শাস্তি দেবেন। আল্লাহ তা‘আলা তার শাস্তি দুনিয়াতেও দেবেন এবং আখেরাতেও দেবেন।
দুনিয়াতে অহংকারীর শাস্তি:
১. একজন অহংকারীকে তার চাহিদার বিপরীত দান করার মাধ্যমে শাস্তি দেয়া হয়। যেমন, সে মানুষের নিকট চায় সম্মান কিন্তু মানুষ তাকে বিপরীতটি উপহার দেয়, অর্থাৎ ঘৃণা করে।
অহংকারীকে লোকেরা নিকৃষ্ট মানুষ মনে করে এবং ঘৃণা করে। এটি হল, একজন অহংকারীর জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে বিশেষ শাস্তি। দুনিয়ার চিরন্তন নিয়মই হল, অহংকারীকে কেউ ভালো চোখে দেখে না, সবাই তাকে ঘৃণা করে। আর যে ব্যক্তি অহংকার করে, নিজেকে বড় মনে করে আল্লাহ তা‘আলা তাকে ছোট করে, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করে, আল্লাহ তা‘আলা তার মর্যাদাকে বৃদ্ধি করে। আর যে ব্যক্তি হকের বিপক্ষে বড়াই করে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে অসম্মান ও অপমান করে।
২. চিন্তা-ফিকির, উপদেশ গ্রহণ করা ও আল্লাহর আয়াতসমূহ হতে নছিহত অর্জন করা হতে বঞ্চিত হয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
অর্থ, যারা অন্যায়ভাবে যমীনে অহঙ্কার করে আমার আয়াতসমূহ থেকে তাদেরকে আমি অবশ্যই ফিরিয়ে রাখব। আর তারা সকল আয়াত দেখলেও তাতে ঈমান আনবে না এবং তারা সঠিক পথ দেখলেও তাকে পথ হিসাবে গ্রহণ করবে না। আর তারা ভ্রান্ত পথ দেখলে তা পথ হিসাবে গ্রহণ করবে। এটা এ জন্য যে, তারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে এবং সে সম্পর্কে তারা ছিল গাফেল। [সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ১৪৬]
আল্লামা সাদী রহ. বলেন, আমার আয়াতসমূহ হতে তাদের আমি ফিরিয়ে রাখবো এ কথার অর্থ হল, আমি তাদের আমার আয়াত হতে উপদেশ গ্রহণ করতে এবং আমার আয়াতের মর্মার্থ বুঝা হতে ফিরিয়ে রাখবো।
অর্থাৎ, যারা আমার বান্দাদের উপর অহংকার করে, হকের বিরুদ্ধাচরণ করে ও যারা হক নিয়ে যারা আসছে, তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, আমি তাদের আমার আয়াতসমূহ থেকে উপদেশ গ্রহণ করা হতে বিরত রাখবো। আর যারা এ ধরনের গুণে গুণান্বিত হবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে অনেক কল্যাণ হতে বঞ্চিত ও অপমান অপদস্থ করবে। আল্লাহর আয়াতসমূহ হতে যা তার উপকারে আসবে তা হতে তাকে ফিরিয়ে রাখা হবে। বরং, অনেক সময় অবস্থা এমন হবে, তার নিকট সব কিছুর বাস্তবতা উলট পলট হয়ে যাবে। তখন সে ভালোকে খারাপ জানবে আর খারাপকে ভালো জানবে।
৩. দুনিয়াতে তাদের শাস্তি দেয়া হয়।
রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] অহংকারীদের দুনিয়াতে শাস্তির ঘোষণা দেন।
عن سلمة بن الأكوع قال:« قال رسول الله صلى الله عليه و سلم  لَا يَزَاُل الرَّجُلُ يَذْهَبُ بنِفْسِهِ حَتَّى يُكْتَبَ فِي الَّجَبارِينَ فَيُصيبُهُ مَا أَصَابَهُمْ»
অর্থ, একজন মানুষ সর্বদা অহংকার করতে থাকে। অত:পর একটি সময় আসে তখন তার নাম জাব্বারিনদের খাতায় লিপিবদ্ধ করা হয়, তখন তাকে এমন আযাব আক্রান্ত বা গ্রাস করে, যা অহংকারীদের গ্রাস করেছিল।[19]
মানুষ অহংকার করতে করতে নিজেকে অনেক বড় মনে করে, সে মনে করে তার মর্যাদা অন্য মানুষের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে, এভাবে চলতে চলতে একটি সময় আসে, তখন তার নাম অহংকারী যালেমদের খাতায় লিখা হয়। ফেরআউন হামান ও কারুনের কাতারে তাকে শামিল করা হয়। এ হাদিসটি একটি বাস্তব নমুনা তুলে ধরে, তা হল, একজন মানুষ প্রথমেই বড় ধরনের যালিম হয়ে যায় না। বরং তা হল চলমান পক্রিয়া। একটা সময় আসে তখন সে আর ইচ্ছা করলে ফিরে আসতে পারে না। এ কারণেই আমরা বলি, হে জ্ঞানীরা তোমরা অহংকারের পরিণতিকে ভয় কর। প্রথম থেকেই তোমরা অহংকার থেকে বাঁচতে চেষ্টা কর। রোগ যখন ছোট থাকে তখন চিকিৎসা করতে হয়, অন্যথায় যখন বড় হয়ে যায়, তখন চিকিৎসা করা সম্ভব নাও হতে পারে। অনুরূপভাবে যত বড় বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তা প্রথমে ছোট কয়লা থেকেই শুরু হয় তারপর তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। যদি প্রথমেই তা নিভিয়ে দেয়া যেত, তা হলে এতবড় বিপদ হত না।
চার. অহংকারীদের থেকে নেয়ামতসমূহ ছিনিয়ে নেয়া হয়।
অহংকার নেয়ামতসমূহ ছিনিয়ে নেয়া ও আল্লাহর আযাব অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হয়ে থাকে।
عن سلمة بن الأكوع قال:  «أن رجلا أكل عند رسول الله صلى الله عليه و سلم  بشماله فقال: كُلْ بيَمِينكَِ قال لا أستطيع قال: لَا اسَتَطْعَت ما منعه إلا الكبر. قال: فما رفعها إلى فيه»
সালামাহ ইবনুল আকূ’ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন এক লোক রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর দরবারে বাম হাত দিয়ে খাওয়া শুরু করলে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] তাকে বললেন, তুমি ডান হাত দিয়ে খাও। উত্তরে লোকটি বলল, আমি পারছিনা! তার কথার প্রেক্ষাপটে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] তাকে বলল, তুমি পারবে না? মূলত: রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর কথার অনুকরণ করা হতে তাকে তার অহংকারই বিরত রাখে। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি আর কখনোই তার হাতকে তার মুখ পর্যন্ত উঠাতে পারেনি।[20]
ইমাম নববী রহ. বলেন, এ হাদিসটি দ্বারা প্রমাণিত হয়, যে ব্যক্তি কোন প্রকার অপারগতা ও যুক্তি ছাড়া শরিয়তের বিধানের বিরোধিতা করে তার জন্য বদদোয়া করা জায়েয আছে। এ লোকটিকে তার অহংকার রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর অনুকরণ ও তার নির্দেশ মানা হতে বিরত রাখে, তার অহংকারের তড়িৎ শাস্তি হল, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] তার অক্ষমতার জন্য বদদোয়া করেন। আল্লাহ তা‘আলা তার নবীর বদদোয়া কবুল করেন এবং সাথে সাথে লোকটি আক্রান্ত হয়। ফলে সে আর কখনোই তার হাতকে তার মুখ পর্যন্ত উঠাতে সক্ষম হননি।
ঐ সব অহংকারী যাদেরকে তাদের অহংকার সত্যের অনুকরণ করা হতে নিষেধ করে, তারা কি ভয় করে না যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের সে সব নেয়ামতসমূহ ছিনিয়ে নেবেন যে সব নেয়ামতের তারা নাফরমানি করে এবং অহংকার করে।
৫. অহংকার জমি ধ্বস ও কবর আযাবের কারণ হয়।
রাসূল সা. হাদিসে বিষয়টি স্পষ্ট করেন। যেমন-
অর্থ, আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, তোমাদের পূর্বের যুগের এক লোক একটি কাপড় ও লুঙ্গি পরিধান করে ও তার চুল গুলো তার কাঁধের উপর ঝুলিয়ে অহংকার করে হাঁটছিল। কাপড়দ্বয় লোকটিকে অহংকারের দিকে নিয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা লোকটিকে যমিনের অভ্যন্তরে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত পুঁততে থাকবে। আর সে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত এ দিক সেদিক নড়াচড়া করতে থাকবে।[21]
আল্লামা ফিরোজ আবাদি রহ. বলেন, স্থান ধ্বসে যাওয়া অর্থ হল, সে ভু-গর্বে চলে গেল। আর আল্লাহ অমুককে যমিনে ধ্বসে দিল, অর্থাৎ, তাকে যমিনে গায়েব করে ফেলল।
আল্লামা ইবনে হাজার রহ. বলেন, يمشي في حلة এর অর্থ হল, একটি চাদর ও লুঙ্গি পরিধান করে হাঁটছিল। আর মুসলিম শরিফে আবু হুরাইরা রা. হতে হাদিসটি এ শব্দে বর্ণিত-
«بَيْنمَا رجُل يتَبخْتَر فِي بُرْدَيْهِ»
مرجل جمته এ কথাটির অর্থ, চুলগুলোকে একত্র করে মাথা থেকে নিয়ে কাঁধ পর্যন্ত অথবা তার চেয়ে আরও বেশি ঝুলিয়ে দেয়া। الشعر ترجيل “তারজীলুশ শার” কথাটির অর্থ, মাথা আঁচড়ানো ও মাথায় তেল লাগানো।
]إذْ خَسَفَ الله بهِِ الْأرَْض فَهَو يتَجَلْجَل فيِهَا إلَى يَوْم الْقِيَامَة[
:التجلجل  التحركতাজালজুল শব্দের অর্থ হল, নড়াচড়া করা। আবার কেউ কেউ বলেন, আওয়াযের সাথে নড়াচড়া করা। আর আল্লামা ইবনে ফারেস রহ. বলেন, التجلجل শব্দের অর্থ, কঠিন ভু-কম্পনসহ যমিনে ধ্বসে যাওয়া এবং এদিক সেদিক নড়বড় করা। সুতরাং,  يتجلجل في الأرض শব্দের অর্থ হল, যমিনে নামতে থাকবে কঠিন কম্পন ও হরকত সহ। আর হাদিসের অর্থ হল, যমিন এ লোকটির দেহকে ভক্ষণ করবে না ফলে তাকে ধ্বংস করা সহজ হবে। আর বলা হবে সে এমন এক কাফের যার দেহ মৃত্যুর পর নি:শেষ হবে না।[22]
পরকালের জীবনে অহংকারের শাস্তি:
১. অহংকারী ধ্বংসপ্রাপ্ত লোকদের সাথে ধ্বংস হবে।
অর্থ, ফুযালা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. হতে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, তিন ব্যক্তির পরিণতি সম্পর্কে তোমরা আমাকে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করবে না। এক-যে ব্যক্তি আল্লাহ বড়ত্ব নিয়ে আল্লাহর সাথে ঝগড়া করে। কারণ, বড়ত্ব হল আল্লাহর চাদর আর তার পরিধেয় হল ইজ্জত। দুই- যে ব্যক্তি আল্লাহর বিধানের বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে। তিন. যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়।[23]
দুই. অহংকারীরা কিয়ামত দিবসে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর নিকট সবচেয়ে ঘৃণিত ও অবস্থানের দিক দিয়ে\ অনেক দুরে হবে।
অর্থ, জাবের রা. হতে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, কিয়ামত দিবসে তোমাদের মধ্যে যে আমার খুব প্রিয় ও মজলিশের দিক দিয়ে আমার একেবারে নিকটে অবস্থান করবে, সে হল তোমাদের মধ্যে যারা আখলাক ও চরিত্রে উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে যে সর্বাধিক ঘৃণিত এবং মজলিশের দিক দিয়ে আমার অনেক দুরে অবস্থান করবে, সে হল, যে অতিরিক্ত ও দীর্ঘ কথা বলে এবং মানুষের নিকট মুখ ভরে কথা বলে। সাহাবারা বললেন, যারা অতিরিক্ত ও দীর্ঘ কথা বলে, তাদের আমরা জানলাম, কিন্তু যারা মানুষের নিকট মুখ ভরে কথা বলে, তারা কারা? তিনি বললেন, অহংকারীরা।[24]
তিন. অহংকারীরা আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে, যে অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা তার উপর ক্ষুব্ধ:
অর্থ, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি মনে মনে নিজেকে বড় মনে করে এবং হাঁটার সময় অহংকার করে, সে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে যে অবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা তার উপর রাগান্বিত।[25]
চার. অহংকারীদের আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন অত্যন্ত অপমান অপদস্ত করে একত্র করবে:
অর্থ, আমর ইবনে শোয়াইব হতে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, অহংকারীদের কিয়ামতের দিন বড় মানুষের আকৃতিতে ছোট ছোট পিপড়ার মত করে একত্র করা হবে। অপমান অপদস্থ সব দিক থেকে তাকে গ্রাস করে ফেলবে। তারপর তাকে জাহান্নামের মধ্যে একটি জেলখানা যার নাম ‘বুলাস’, তার দিকে টেনে হেঁচড়ে নেয়া হবে। তাদেরকে জাহান্নামের প্রজ্বলিত আগুন চতুর্দিক থেকে গ্রাস করে ফেলবে। আর তাদেরকে জাহান্নামীদের পিত্ত, পুঁজ ও বমি থেকে তাদের পানীয় দেয়া হবে।[26]
হাদিসের ব্যাখ্যা:
রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর বাণী-  يحشرالمتكبرون يوم القيامة أمثال الذرএখানে الذر শব্দটির অর্থ নিহায়া কিতাবে, ছোট ছোট লাল পিপড়ার দল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আরيحشرالمتكبرون يوم القيامة أمثال الذر এ কথাটির অর্থ হল, নিকৃষ্ট ও ছোট হওয়ার দিক দিয়ে তারা গুড়ো গুড়ো পিপড়ার মত। আর [في صور الرجال ] এর অর্থ হল, তারা আকৃতিতে মানুষের আকৃতি, কিন্তু তাদের দেহ পিপড়ার মত ছোট। [يغشاهم الذل من كل مكان] এ কথাটির অর্থ হল, তারা কিয়ামতের দিন এতই অপমান অপদস্ত হবে, আল্লাহ তা‘আলার দরবারে তাদের কোন মান-সম্মান বলতে কিছুই থাকবে না। হাশরবাসীরা তাদের পা দিয়ে তাদেরকে পা-পৃষ্ট করবে, তাদের প্রতি কোন কোন প্রকার ভ্রুক্ষেপ করবে না। [يساقون إلى سجن في جهنم يسمى بولس ] এ কথাটির অর্থ হল, জাহান্নামের মধ্যে একটি জেলখানার দিকে তাদের টেনে নেয়া হবে, যার নাম বুলুস। [تعلوهم نار الأنيار يسقون من عصارة أهل النار] এ কথাটির অর্থ হল, জাহন্নামের আগুন তাদের গ্রাস করে ফেলবে এবং ঢেকে ফেলবে এবং জাহান্নামীদের দেহ হতে যে সব পুঁজ, বমি ও রক্ত বের হবে, তাই তাদের খেতে দেয়া হবে। কারণ, একজন অহংকারী দুনিয়াতে বড় একটি আকার ধারণ করেছিল এবং দুনিয়াতে বড় ধরনের আসন দখল করে নিয়েছিল। তাই আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন সমগ্র মানুষের সামনে তাকে ছোট ছোট পিপড়ার পালের মত করে একত্র করে তাকে লজ্জা ও শাস্তি দিবেন।
পাঁচ. অহংকার জান্নাতে প্রবেশের প্রতিবন্ধক:
অর্থ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ রা. হতে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, যার অন্তরে একটি অণু পরিমাণ অহংকার থাকে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এ কথা বললে, এক লোক দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, কোন কোন লোক এমন আছে, সে সুন্দর কাপড় পরিধান করতে পছন্দ করে, সুন্দর জুতা পরিধান করতে পছন্দ করে, এসবকে কি অহংকার বলা হবে? রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বললেন, আল্লাহর তা‘আলা নিজেই সুন্দর তিনি সুন্দরকে পছন্দ করেন। অহংকার হল, সত্যকে গোপন করা এবং মানুষকে নিকৃষ্ট বলে জানা।[27]
ছয়. অহংকারীদের জন্য জাহান্নামের ওয়াদা দেয়া আছে:
অর্থ, হারেসা ইবনে ওহাব আল খাজায়ী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে বলতে শুনেছি, আমি তোমাদের থেকে কারা জান্নাতি তাদের বিষয়ে খবর দিব কি? তারা হল সব দুর্বল ও অসহায় লোকেরা তারা যদি আল্লাহর শপথ করে আল্লাহ তা‘আলা তাদের দায় মুক্ত করে। তারপর রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, আমি কি তোমাদের কারা জাহান্নামে যাবে তাদের বিষয়ে খবর দিব? তারা হল, সব অহংকারী, দাম্ভিক ও হঠকারী লোকেরা।[28]
অর্থ, আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়ে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে বিতর্ক করে, জাহান্নাম বলে, আমার নিকট বড় বড় দাম্ভিক ও অহংকারীরা প্রবেশ করবে আর জান্নাত আল্লাহকে বলে, কি ব্যাপার আমার ভিতর শুধু দুর্বল ও বিতাড়িত লোকেরা প্রবেশ করে। তখন আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামকে বলে, তুমি হলে আমার আযাব। আমি তোমার মাধ্যমে যাকে চাই তাকে আযাব দিব। অথবা আল্লাহ বলেন, তোমার মাধ্যমে আমি যাকে চাই তাকে পাকড়াও করবো আর জান্নাতকে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, তুমি আমার রহমত আমি তোমার দ্বারা যাকে চাই তাকে রহম করব। আর তোমাদের উভয়ের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে যথাযোগ্য অধিবাসী।[29]
আল্লামা ইবনে হাজার রহ. বলেন, হাদিসে দুটি শব্দ অর্থাৎ, المُتَكِّبِرينَ ও المتَجِّبرينَ উল্লেখ করা হয়, কেউ কেউ বলেন, শব্দ দুটির অর্থ একই। আবার কেউ কেউ বলেন, না, দুটি শব্দের অর্থ দুটি المُتَكِّبِرينَ শব্দের অর্থ হল ঐ সব অহংকারী যারা তাদের মধ্যে নাই এমন কিছু নিয়ে অহংকার করে। আর المتَجِّبرينَ শব্দের অর্থ, তার নিকট যা আছে তা নিয়ে বড়াই করা।
আর হাদিসে যে দুর্বল লোকের কথা বলা হয়েছে, তারা হল, যারা অহংকারীদের দৃষ্টিতে দুর্বল ও নিকৃষ্ট এবং তাদের চোখে তারা মানুষ হিসেবে গণ্য নয়। অন্যথায় আল্লাহ তা‘আলার দরবারে তারা অনেক সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী। তাদের অন্তরে আল্লাহর বড়ত্ব ও কুদরতের অনুভূতি থাকার কারণে তারা তাদের নিকট যা আছে তাকে তুচ্ছ মনে করে এবং আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত বন্দেগীতে তারা অত্যধিক বিনয়ী ও ছোট হয়ে থাকে। এ কারণেই হাদিসে তাদের দুর্বল লোক বলা হয়েছে।
সাত. অহংকারীদের অপমান অপদস্ত করে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
অর্থ, আর কাফিরদেরকে দলে দলে জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন জাহান্নামের কাছে এসে পৌঁছবে তখন তার দরজাগুলো খুলে দেয়া হবে এবং জাহান্নামের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, ‘তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে কি রাসূলগণ আসেনি, যারা তোমাদের কাছে তোমাদের রবের আয়াতগুলো তিলাওয়াত করত এবং এ দিনের সাক্ষাৎ সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ক করত’? তারা বলবে, ‘অবশ্যই এসেছিল’; কিন্তু কাফিরদের উপর আযাবের বাণী সত্যে পরিণত হল। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা জাহান্নামের দরজা দিয়ে প্রবেশ কর চিরকাল তোমরা সেখানে অবস্থান করবে। অহংকারীদের বাসস্থান কতই না মন্দ।[সূরা যুমার, আয়াত: ৭১,৭২]
আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَسۡتَكۡبِرُونَ عَنۡ عِبَادَتِي سَيَدۡخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ﴾ ]غافر: 60[
অর্থ, আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহঙ্কার বশতঃ আমার ইবাদত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই লাঞ্ছিত অবস্থায় জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ [সূরা গাফের, আয়াত: ৬০]
অর্থ, আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, অহংকার হল আমার চাদর আর বড়ত্ব হল আমার পরিধেয়। যে ব্যক্তি আমার এ দুটির যে কোন একটি নিয়ে টানাটানি করবে আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।[30]
অহংকারের চিকিৎসা
একটি কথা মনে রাখতে হবে, কিবির তথা অহংকার এমন একটি কবীরা গুনাহ যা মানুষকে ধ্বংস করে দেয় এবং একজন মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতকে নষ্ট করে দেয়। এ কারণেই একজন মানুষের জন্য অহংকার থেকে দুরে থাকা বা তার জীবন থেকে তা দুর করা অকাট্য ফরয। আর এ কথাও সত্য যার মধ্যে অহংকার থাকে সে শুধু আশা করলে বা ইচ্ছা করলেই অহংকারকে দুর করতে বা অহংকার হতে বাঁচতে পারবে না। তাকে অবশ্যই এ মারাত্মক ব্যাধির চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। অহংকারের চিকিৎসা নিম্নরূপ:
১. অন্তর থেকে অহংকারের মূলোৎপাটন করা:
প্রথমে অহংকারী নিজেকে চিনতে হবে, তারপর তাকে তার প্রভুকে চিনতে হবে। একজন মানুষ যখন নিজেকে ভালোভাবে চিনতে পারবে এবং আল্লাহ তা‘আলা বড়ত্ব ও মহত্বকে সঠিকভাবে বুঝতে পারবে তখন তার মধ্যে বিনয় ও নম্রতা ছাড়া আর কিছুই থাকতে পারে না, অহংকার তার থেকে এমনিতেই দুর হয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালাকে যখন ভালোভাবে চিনবে, তখন সে অবশ্যই জানতে পারবে বড়ত্ব ও মহত্ব একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য প্রযোজ্য নয়।
মানুষ তাকে চেনার জন্য প্রথমে তাকে তার নিজের সৃষ্টির মধ্যে চিন্তা করতে হবে। সে নিজে প্রথমে কি ছিল, তারপর দুনিয়াতে আসার পর মাঝখানে তার অবস্থা কেমন ছিল এবং তার পরিণতি কি হবে?
এসব নিয়ে চিন্তা করলে তার মধ্যে অহংকার থাকতেই পারে না। কিভাবে অহংকার করবে? আল্লাহ তা‘আলা তাকে প্রথমে এক ফোটা নিকৃষ্ট পানি থেকে বীর্য হিসেবে তৈরি করেন তারপর তিনি বীর্যকে আলাকায় রূপান্তরিত করেন তারপর আলাকাকে গোশতের টুকরা তারপর গোশতের টুকরাকে হাঁড়ে পরিণত করেন। তারপর আবার হাঁড়কে গোশতের আবরণ দিয়ে সাজান।
এ ছিল তার সৃষ্টির সূচনা আল্লাহ তা‘আলা তাকে প্রথমেই পরিপূর্ণ মাখলুক রূপে সৃষ্টি করেননি, বরং আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে তার হায়াতের পূর্বে মৃত্যু দিয়েই শুরু করেন। অনুরূপভাবে শক্তির পূর্বে দুর্বলতা, ইলমের পূর্বে অজ্ঞতা, হেদায়েতের পূর্বে গোমরাহি এবং সম্পদশালী হওয়ার পূর্বে অভাব ও দরিদ্রতা দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করেন। এতদসত্ত্বেও তার কিসের অহংকার, বড়াই, গৌরব ও অহমিকা?!!
তারপর যখন লোকটি দুনিয়াতে বসবাস করতে থাকে তখন সে তার নিজের ইচ্ছায় বেঁচে থাকতে পারে না, সে যে রকম চায় সবকিছু তার মনের মত হয় না। সে চায় সুস্থ থাকতে কিন্তু পারে না, চায় ধনী ও অভাব মুক্ত থাকতে কিন্তু তা হয় না। তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার উপর বিপদ-আপদ আসতেই থাকে। সে পিপাসিত, ক্ষুধার্ত ও অসুস্থ হতে বাধ্য হয়, কোন কিছু তাকে বিরত রাখতে পারে না। কোন কিছু মনে রাখতে চাইলে সে পারে না, ভুলে যায়। আবার কোন কিছু ভুলতে চাইলে তা ভুলতে পারে না এবং কোন কিছু শিখতে চাইলে তা শিখতে পারে না। মোট কথা, সে একজন অধীনস্থ গোলাম, সে তার নিজের কোন উপকার করতে পারে না, আবার কোন ক্ষতিকে সে নিজের থেকে প্রতিহত করতে পারে না। নিজের কোন কল্যাণ ভয়ে আনতে পারে না এবং কোন অকল্যাণ বা ক্ষতিকে ঠেকাতে পারে না।
এর চেয়ে অপমানকর আর কি হতে পারে, যদি সে নিজেকে চিনতে পারে!
তারপর সর্বশেষ অবস্থা ও পরিণতি হল, মৃত্যু। মৃত্যু তার জীবন, শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টিকে কেড়ে নিবে। আর কোন কিছু দেখতে পারবে না, শুনতে পারবে না। তার জ্ঞান, বুদ্ধি শক্তি ও অনুভূতি আর অবশিষ্ট থাকবে না। বন্ধ হয়ে যাবে তার দেহের নড়চড় ও অনুভূতি, সে একেবারেই নিস্তেজ ও জড় পদার্থে রূপান্তরিত হবে, যেমনটি সৃষ্টির প্রথমে ছিল। তারপর তাকে মাটিতে পুঁতে রাখা হবে। তখন সে হয়ে যাবে দুর্গন্ধযুক্ত অপবিত্র লাশ।
তারপরও যদি এই হত তার শেষ পরিণতি এবং এ অবস্থার উপর যদি শেষ হত সব কিছু!! আর যদি জীবিত করা না হত! কিন্তু না, এতো শেষ নয় বরং শুরু। চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ার পর তাকে আবারো জীবিত করা হবে, যাতে তাকে কঠিন বিচারের সম্মুখীন করা হয়। তাকে তার কবর থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হবে কিয়ামতের ভয়াবহতায় ও উত্তপ্ত মাঠে। তারপর তার কর্মের দফতর তার সম্মুখে খুলে দেয়া হবে আর তাকে বলা হবে, তুমি তোমার কর্মের দফতর পড়। আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা দিয়ে বলেন,
﴿ وَكُلَّ إِنسَٰنٍ أَلۡزَمۡنَٰهُ طَٰٓئِرَهُۥ فِي عُنُقِهِۦۖ وَنُخۡرِجُ لَهُۥ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ كِتَٰبٗا يَلۡقَىٰهُ مَنشُورًا ١٣ ٱقۡرَأۡ كِتَٰبَكَ كَفَىٰ بِنَفۡسِكَ ٱلۡيَوۡمَ عَلَيۡكَ حَسِيبٗا ١٤﴾ ]الإسراء: 14[
অর্থ, আর আমি প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার ঘাড়ে সংযুক্ত করে দিয়েছি এবং কিয়ামতের দিন তার জন্য আমি বের করব একটি কিতাব, যা সে পাবে উন্মুক্ত। পাঠ কর তোমার কিতাব, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশকারী হিসেবে যথেষ্ট। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১৪]
যখন সে তার আমল নামা প্রত্যক্ষ করবে, তখন বলবে-
﴿وَوُضِعَ ٱلۡكِتَٰبُ فَتَرَى ٱلۡمُجۡرِمِينَ مُشۡفِقِينَ مِمَّا فِيهِ وَيَقُولُونَ يَٰوَيۡلَتَنَا مَالِ هَٰذَا ٱلۡكِتَٰبِ لَا يُغَادِرُ صَغِيرَةٗ وَلَا كَبِيرَةً إِلَّآ أَحۡصَىٰهَاۚ وَوَجَدُواْ مَا عَمِلُواْ حَاضِرٗاۗ وَلَا يَظۡلِمُ رَبُّكَ أَحَدٗا ٤٩﴾ ]الكهف: 49[
অর্থ, আর আমলনামা রাখা হবে। তখন তুমি অপরাধীদেরকে দেখতে পাবে ভীত, তাতে যা রয়েছে তার কারণে। আর তারা বলবে, ‘হায় ধ্বংস আমাদের! কী হল এ কিতাবের! তা ছোট-বড় কিছুই ছাড়ে না, শুধু সংরক্ষণ করে’ এবং তারা যা করেছে, তা হাযির পাবে। আর তোমার রব কারো প্রতি যুলম করেন না। [সূরা কাহাফ, আয়াত: ৪৯]
আল্লামা আখনফ রহ. বলেন, আমার আশ্চর্য হয়, যে লোকটি প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে দুইবার আগমন করল, সে কিভাবে অহংকার করে।
মাতরাফ ইবনে শাখির ইয়াযিদ ইবনে মাহলাবকে দেখল, সে তার পরিধেয় নিয়ে অহংকার করছে। তখন সে তাকে বলল, তোমার এ হাঁটাকে আল্লাহ তা‘আলা অপছন্দ করে। এ কথা শুনে বলল, তুমি কি আমাকে চিন না? তখন বলল, হাঁ আমি তোমাকে চিনি, তোমার শুরু হল, এক ফোটা নাপাক বীর্য, আর তোমার শেষ হল, দুর্গন্ধময় লাশ আর এ দুটির মাঝে তুমি একজন পায়খানা ও ময়লা বহনকারী।
এ কথাগুলোকে আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ আল-বাছছামী আল-খাওয়ারেজমী পদ্য আকারে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,
عجبتُ من مُعْجَبٍ بصورتهِ
وكان مِنْ قبلُ نطفًة مِذَره
وفي غدٍ بعد حسنِ صورتهِ
يصيرُ في الأرضِ جيفةً قذره
وهو على عُجْبِه ونَخْوَتِهِ
ما بين ثوبيهِ يحملُ العذره
অর্থ, যে ব্যক্তি তার সুন্দর সুরত নিয়ে অহংকার করে তার বিষয়ে আশ্চর্য না হয়ে পারি না। [সে কিভাবে অহংকার করে?] সে তো ইতিপূর্বে এক ফোটা নিকৃষ্ট বীর্য ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আর তার এত সুন্দর আকৃতির পর তার পরিণাম হল, আগামী কাল তাকে একটি দুর্গন্ধময় লাশ হিসেবে মাটিতে পুঁতে রাখা হবে। সে দুনিয়াতে যতই বড়াই আর অহংকার করুক না কেন, সে তো তার দুই কাপড়ের মাঝে আজীবন ময়লাই বহনকারী ছিল।
অপর এক কবি বলেন,
অর্থ, স্বীয় সৌন্দর্য ও সুরত নিয়ে হে অহংকার-কারী! মনে রাখ, তুমি অবশ্যই তোমার অহংকারের পর বিলুপ্ত হবে।
যদি মানুষ তাদের পেটের মধ্যে কি আছে তা নিয়ে চিন্তা করত! কোন যুবক বা বৃদ্ধ কারো মধ্যেই অহংকার করার মানসিকতা জাগত না।
হে মাটির ছেলে ও আগামী দিনের মাটির খাদ্য, তুমি অহংকার থেকে বিরত থাক! কারণ, তুমি অবশ্যই একদিন খাদ্য ও পানীয়তে রূপান্তরিত হবে।
২. অহংকারের বস্তুসমূহ নিয়ে চিন্তা করা:
যে সব বস্তু নিয়ে অহংকার করে তাতে চিন্তা ফিকির করা এবং মেনে নেয়া যে তার জন্য এসব বস্তু নিয়ে অহংকার করা উচিত নয়। কেউ যদি তার বংশ মর্যাদা নিয়ে অহংকার করে, তখন তাকে বুঝতে হবে যে এটি একটি মূর্খতা বৈ কিছুই হতে পারে না। কারণ, সে তো তার নিজের ভিতরের কোন যোগ্যতা নিয়ে অহংকার করছে না। সে অহংকার করছে অন্যদের যোগ্যতা নিয়ে, যা একেবারেই বিবেক ও বুদ্ধিহীন কাজ।
অর্থ, উবাই ইবনে কায়াব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর যুগে দুই লোক বংশ নিয়ে বিবাদ করে। অতঃপর তাদের একজন বলল, আমি অমুকের ছেলে অমুক তুমি কে? তোমার মাতা নাই। তাদের বিবাদ শোনে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বললেন, মুসা আ. এর যুগে দুই ব্যক্তি বংশ নিয়ে ঝগড়া করে। তখন তাদের একজন অপর জনকে বলে, আমি অমুকের ছেলে অমুক, অমুকের ছেলে অমুক, এভাবে সে তার নয় পুরুষ পর্যন্ত গণনা করে, আর বলে তুমি কে? তোমার মা নাই। তখন সে বলল, আমি অমুকের ছেলে অমুক, আর অমুক হল ইসলামের ছেলে। তিনি বলেন, তাদের বিতর্কের কারণে আল্লাহ তা‘আলা মুসা আ. কে ওহী দিয়ে পাঠান যে, আপনি এ দুই ব্যক্তি যারা বংশ নিয়ে বিবাদ করছে তাদের বলেন, হে নয় পর্যন্ত গণনাকারী! তুমি যে নয় জনের নাম উল্লেখ করছ, তারা সবাই জাহান্নামে, আর তুমি হলে তাদের দশম ব্যক্তি। আর অপর ব্যক্তিকে বলেন, হে দুই পুরুষ পর্যন্ত গণনাকারী তুমি যে দুইজনের নাম নিলে তারা উভয়ে জান্নাতে যাবে আর তুমি হলে তৃতীয় ব্যক্তি।[31]
আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এরশাদ করেন, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের থেকে জাহিলি যুগের কুসংস্কার ও বাপ-দাদাদের নিয়ে অহংকার করাকে দূর করে দিয়েছেন। মানুষ দু’ধরনের : একজন ঈমানদার মুত্তাকী ব্যক্তি, আর একজন দূরাচার দুর্ভাগা ব্যক্তি। সমগ্র মানুষ আদম আ. এর সন্তান, আর আদম আ. হল, মাটির তৈরি। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এমন এক সম্প্রদায়ের আগমন ঘটবে যারা তাদের বংশের লোকদের নিয়ে অহংকার করবে। মনে রাখবে তারা জাহান্নামের কয়লা হতে একরকম কয়লা অথবা তারা আল্লাহ তা‘আলার নিকট নাকের থেকে শিন নিক্ষেপ করার নেকড়ার চেয়ে আরও অধিক নিকৃষ্ট।[32]
হাদিসের ব্যাখ্যা:
عبية الجاهلية এ শব্দের অর্থ হল, জাহিলি যুগের অহংকার, বড়াই ও কুসংস্কার। [مومن تقي و فاجر شقي] এ কথাটির অর্থ সম্পর্কে আল্লামা খাত্তাবী রহ. বলেন, মানুষ দুই ধরনের হতে পারে। এক ধরনের মানুষ হল, মুমিন মুত্তাকী সে হল, উত্তম ব্যক্তি যদিও সে তার সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে কোন গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানী ব্যক্তি নয়। আর একজন ব্যক্তি হল, ফাজের বদখত যদিও সে তার সমাজে সম্মানী ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আবার কেউ কেউ বলেন, অহংকারী হয় মুমিন হবে, তাহলে তার জন্য কারো উপর অহংকার করা উচিত নয়। অথবা সে ফাজের গুনাহগার, সে এমনিতেই আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট তার অহংকার করার অধিকারই নাই। সুতরাং, অহংকার সর্বাবস্থায় রহিত। অহংকার করার কোন সুযোগই নাই।
[أنتم بنو آدم و آدم من تراب ] আর তোমরা হলে আদম সন্তান আর আদম আ. কে সৃষ্টি করা হয়েছে, মাটি থেকে। সুতরাং যার মুল হল মাটি, তার জন্য অহংকার করা কোন ক্রমেই উচিত নয়।
অর্থ, আবু রাইহানা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার বংশের নয়জন লোকের কথা উল্লেখ করে এবং তা দ্বারা তার উদ্দেশ্য হল, ইজ্জত সম্মান লাভ করা, তারা সবাই জাহান্নামে যাবে আর লোকটি তাদের দশম ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হবে।[33] হাফেজ ইবনে হাজার রহ. ফাতহুল বারীতে বলেন, হাদিসটির সনদ বিশুদ্ধ।
যে ব্যক্তি ইলমের কারণে অহংকার করে, তাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, যারা আহলে ইলম তাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার পাকড়াও আরও অধিক কঠিন। আর যে ব্যক্তি ইলম থাকা সত্বেও আল্লাহর নাফরমানি করে তাকে মনে রাখতে হবে তার অপরাধ খুবই মারাত্মক।
আর একজন অহংকারীকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, অহংকার কেবল আল্লাহ তা‘আলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আর কারো জন্য অহংকার প্রযোজ্য নয়। যখন কোন ব্যক্তি অহংকার করে, তখন সে আল্লাহর নিকট ঘৃণিত ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হবে। এসব চিন্তা যদি একজন মানুষ করে তাহলে তার মধ্যে অহংকার থাকতে পারে না। তাকে বিনয়ের দিকে টেনে নিয়ে যাবে।
একটি কথা মনে রাখতে হবে, ইবাদত বন্দেগী ও নেক আমল নিয়ে অহংকার করা মানুষের জন্য একটি বড় ধরনের ফিতনা। এ বিষয়ে হাদিসে একটি ঘটনা বর্ণিত,
অর্থ, আবু হুরাইরা রা. বলেন, আমি রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন, বনী ইসরাইলের মধ্যে দুইজন লোক ছিল, তারা একে অপরের বন্ধু। তাদের একজন গুনাহ করত আর অপরজন ইবাদতে লিপ্ত থাকত। যে লোকটি ইবাদতে লিপ্ত থাকতো সে সব সময় দেখত তার অপর ভাই গুনাহে মগ্ন। তখন সে তাকে বলত, তুমি গুনাহের কাজ ছেড়ে দাও! কিন্তু সে তার কথা শুনত না। তারপর একদিন তাকে গুনাহ করতে দেখে বলল, তুমি গুনাহ করো না গুনাহ হতে বিরত থাক! সে তার কথায় কোন ভ্রুক্ষেপ করল না এবং বলল, তুমি আমাকে আমার মত করে চলতে দাও। আমি এবং আমার রবের মাঝে আমাকে ছেড়ে দাও। তুমি কি আমার দায়িত্বশীল হিসেবে দুনিয়াতে প্রেরিত? তখন সে রাগ হয়ে তাকে বলল, আল্লাহর শপথ করে বলছি আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে ক্ষমা করবে না। অথবা বলল, আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে না। তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের উভয়ের রুহকে কবজ করল, তারা উভয়ে আল্লাহ তা‘আলার দরবারে একত্র হল, আল্লাহ তা‘আলা ইবাদতে যে লোকটি লিপ্ত থাকতো তাকে বলল, তুমি কি আমার সম্পর্কে জানতে অথবা বলল, তুমি কি আমার হাতে কি আছে তা করার ক্ষমতা রাখতে? আর অপরাধীকে বলল, তুমি আমার রহমতের বদৌলতে জান্নাতে প্রবেশ কর! আর অপরজনের বিষয়ে ফেরেশতাদের ডেকে বলল, তোমরা তাকে জাহান্নামে নিয়ে যাও এবং তাতে তাকে নিক্ষেপ কর। আবু হুরাইরা রা. বলেন, আমি ঐ সত্ত্বার কসম করে বলছি, তুমি এমন একটি কথা বলে থাক, যার দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতকে বরবাদ করে দাও।[34]
আবু ইয়াযিদ আল-বুসতামী বলেন, যখন কোন মানুষ মনে করে যে, মানুষের মধ্যে কোন মানুষ তার থেকে খারাপ আছে, তা হলে সে অবশ্যই অহংকারী।
আর আল্লাহ তা‘আলা যারা কল্যাণের প্রতি অগ্রগামী তাদের বিষয়ে বলেন, তারা হলেন, যারা ইবাদত ও আমলে সালেহ করেন আর ভয় করেন যে, তা তাদের থেকে কবুল করা হবে না। আল্লাহ তা‘আলা তাদের বিষয়ে বলেন,
﴿وَٱلَّذِينَ يُؤۡتُونَ مَآ ءَاتَواْ وَّقُلُوبُهُمۡ وَجِلَةٌ أَنَّهُمۡ إِلَىٰ رَبِّهِمۡ رَٰجِعُونَ ٦٠ أُوْلَٰٓئِكَ يُسَٰرِعُونَ فِي ٱلۡخَيۡرَٰتِ وَهُمۡ لَهَا سَٰبِقُونَ ٦١﴾ [المؤمنون: 60- 61]
অর্থ, আর যারা যা দান করে তা ভীত-কম্পিত হৃদয়ে করে থাকে এজন্য যে, তারা তাদের রবের দিকে প্রত্যাবর্তনশীল। তারাই কল্যাণসমূহের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এবং তাতে তারা অগ্রগামী।
অর্থ, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] এর স্ত্রী আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে এ আয়াত… সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে বলি তারা ঐ সব লোক যারা মদ পান করে এবং চুরি করে? তখন রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] উত্তর দিলেন না, হে সিদ্দিক কন্যা! তারা হল, যারা রোজা রাখে, সালাত আদায় করে এবং সদকা করে তবে তারা আশংকা করে যে, তাদের আমল আল্লাহ তা‘আলা কবুল করবে না। এরা তারাই যারা কল্যাণকর কাজে অগ্রসর।[35]
তিন. দো‘আ করা ও আল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া:
দো‘আ ও আল্লাহর নিকট সাহায্য চাওয়া হল, অহংকার থেকে বাঁচার জন্য সব চেয়ে উপকারী ও কার্যকর ঔষধ। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা যাদের হেফাযত করেন, তারাই অহংকার থেকে বাঁচতে পারে। আর আল্লাহর সাহায্য ছাড়া বাঁচার কোন উপায় নাই। এ কারণে রাসূল সা. উম্মতদের দো‘আ শিখিয়ে দেন এবং তিনি নিজেও সালাতে বেশি বেশি করে আল্লাহর নিকট দো‘আ মুনাজাত করেন।
অর্থ, যুবাইর ইবনে মুতয়েম হতে বর্ণিত তিনি রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে একবার সালাত আদায় করতে দেখেন, তখন তিনি রাসূল সা, কে সালাতে এ কথাগুলো বলতে শোনেন।
]الله أَكْبر كَبِيًرا الله أَكبر كَبِيًرا الله أَكبر كَبِيًرا وَالحَمْدُ لله كَثيِراً وَالحَمْدُ لله كَثِيراً وَالحَمْدُ لله كَثِيراً وَسبحَانَ الله بُكْرَةً وََأِصيلًا ثَلَاًثا، أَعُوذُ باِلله مِنْ الشَّيطْاَنِ الرجيم مِنْ نَفْخِهِ وَنَفْثِهِ وَهمْزِه [
অর্থ, “আল্লাহ তা‘আলা সব কিছু হতে বড়, আল্লাহ তা‘আলা সব কিছু হতে বড়, আল্লাহ তা‘আলা সব কিছু হতে বড়। আর সর্বাধিক প্রশংসা কেবলই আল্লাহর, সর্বাধিক প্রশংসা কেবলই আল্লাহর, সর্বাধিক প্রশংসা কেবলই আল্লাহর। আমি বিতাড়িত শয়তান হতে তোমার নিকট আশ্রয় চাচ্ছি, আমি আরও আশ্রয় চাচ্ছি তার অহংকার থেকে তার প্ররোচনা থেকে ও ষড়যন্ত্র থেকে”।[36]
চার. বিনয় অবলম্বন করা:
عن أنس بن مالك قال: « إن كانت الأمة من إماء أهل المدينة لتأخذ بيد رسول الله صلى الله عليه و سلم  فتنطلق به حيث شاءت»
আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মদিনার অনেক কৃতদাস গোলামদের দেখা যেত, তারা রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] হাত ধরে তাকে তাদের ইচ্ছামত এদিক সেদিক নিয়ে যেত।[37]
عن الأسود قال: «سألت عائشة ما كان النبي يصنع في بيته؟ قالت: كان يكون في مهنة أهله. تعني خدمةأهله فإذا حضرت الصلاة خرج إلى الصلاة »
আসওয়াদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা রা. কে জিজ্ঞাসা করি রাসূল সা. ঘরে কি কাজ করতেন? তিনি বলেন, রাসূল সা. ঘরের মধ্যে তার পরিবারের খেদমত করতেন, যখন সালাতের সময় হত, তখন তিনি সালাতের জন্য বের হয়ে যেতেন।[38]
একই অর্থের অপর একটি হাদিস ইমাম তিরমিযি আয়েশা রা. হতে নকল করেন। আয়েশা রা. বলেন,
]ما كان إلا بشرا من البشر: يفلي ثوبه، ويحلب شاته، ويخدم نفسه[
রাসূল সা. অন্যান্য মানুষের মত একজন মানুষ, তিনি নিজের কাজ নিজে করতেন, নিজেই কাপড় সিলাই করতেন এবং বকরীর দুধ ধোয়াতেন।
আর আহমদ ও ইবনে হাব্বান ওরওয়া হতে এবং ওরওয়া আয়েশা রা. হতে বর্ণনা করেন,
“يخيط ثوبه، ويخصف نعله”.
তিনি নিজে তার কাপড় সিলাই করতেন এবং জুতায় তালি লাগাতেন। হাদিসে অহংকার ছেড়ে দেয়া, বিনয় অবলম্বন করা ও পরিবারের খেদমত করার প্রতি বিশেষ উৎসাহ দেয়া হয়।
অর্থ, যুবাইর ইবনে মুতয়েম রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা বল, আমার মধ্যে অহংকার আছে! অথচ আমি গাধায় আরোহণ করছি, বস্তা পরিধান করছি এবং বকরীর দুধ দো‘আই-ছি। আর রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] বলেছেন, যে ব্যক্তি এ ধরনের কাজ করে তার মধ্যে কোন অহংকার থাকতেই পারেনা।[39]
অহংকারী এ ধরনের কোন কাজ করতে পছন্দ করে না। তারা এ ধরনের কাজ হতে নাক ছিটকায়। সুতরাং, যে এ ধরনের কাজগুলো করে তার মধ্যে অহংকার না থাকাই বাঞ্ছনীয়।
অর্থ, আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম হতে বর্ণিত, তিনি একদিন বাজার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন আর তার মাথার উপর একটি লাকড়ির বোঝা। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তুমি কি কারণে মাথায় বোঝা বহন করছ? অথচ আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে এসব করার প্রতি মুখাপেক্ষী রাখেননি বরং তোমাকে এসব হতে মুক্ত করেছেন! তিনি বললেন, আমি আমার অন্তর থেকে অহংকারকে দুর করতে চাই। আমি রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কে বলতে শুনেছি তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে একবিন্দু পরিমাণও অহংকার থাকে।[40]
আমরা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি যে, তিনি যেন আমাদের ঐ সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন যারা আল্লাহ ও তার মাখলুকের প্রতি বিনয়ী। আর আমাদের যেন অহংকার ও অহংকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে হেফাযত করেন।
পরিশিষ্ট
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন,
গুনাহের মৌলিক উপাদান তিনটি: এক, অহংকার: অহংকারই অভিশপ্ত ইবলিশকে ধ্বংসে নিপতিত করে এবং করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। দুই, লোভ: এ লোভই আদম আ. কে জান্নাত থেকে বের করে। তিন, বিদ্বেষ: হিংসা বিদ্বেষই আদম সন্তানদের একজনকে তার ভাইকে হত্যার প্রতি বাধ্য করে। যে ব্যক্তি এ তিন অপরাধ থেকে মুক্ত থাকবে, সে যাবতীয় সব অন্যায় অপরাধ থেকে বেঁচে থাকবে। কুফরির উৎপত্তি অহংকার থেকে আর গুনাহের উৎপত্তি লোভ থেকে এবং অন্যায়, অনাচার ও জুলুমের উৎপত্তি হিংসা বিদ্বেষ থেকে।[41]
وصلى الله وسلم على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.
—    সালেহ আল-মুনাজ্জেদ
অনুশীলনী
এখানে দুই ধরনের প্রশ্ন পেশ করা হল, এক ধরনের প্রশ্ন যেগুলোর উত্তর সাথে সাথে দেয়া যাবে। আর এক ধরনের উত্তর সাথে সাথে দেয়া যাবে না, বরং একটু চিন্তাভাবনা করে উত্তর দিতে হবে।
প্রথম প্রকার প্রশ্ন:
১- কিবিরের আভিধানিক অর্থ কি?
২- রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম] কিবিরের পরিপূর্ণ ও প্রশ্নাতীত একটি সংজ্ঞা দেন, সে সংজ্ঞাটি কি?
৩- কিবির বা অহংকারের বিভিন্ন কারণ রয়েছে কারণ গুলো কি?
৪- অহংকার বা কিবির কি কারণে হাসিল হয়?
৫- গুনাহের মৌলিক উপাদান কয়টি ও কি কি?
দ্বিতীয় প্রকার প্রশ্ন:
১- কিবর ও উজব দুইয়ে মধ্যে পার্থক্য কি?
২- কখন ইলম অহংকারের কারণ হয়?
৩- দুনিয়াতে একজন অহংকারীকে কি দ্বারা শাস্তি দেয়া হবে?
৪- আখেরাতে একজন অহংকারীকে কি দ্বারা শাস্তি দেয়া হবে?
৫- কিভাবে একজন অহংকারীর চিকিৎসা করা যাবে?
[1] লিসানুল আরব ১২৫/৫০
[2] মুসলিম ৯১
[3]  দারা কুতনী ২০৬/৪
[4] তারিখ বাগদাদ ৩০৭/১০
[5] সীয়ারু আলামিন নুবালা ৪০৭/৭
[6]  মায়ালেমুত তানযীল ৪৭৯/৮
[7] বুখারি ৫০৯১
[8] ইমাম নববী রহ. এর শরহে মুসলিম ১৭৫/১৬
[9] সাইদুল খাতের ১৩৫
[10] ফাতহুল বারী ৪৬৮/১০
[11] ফাতহুল বারী ৮৭/১
[12] সীয়ারু আলামীন নুবালা ৮০/৪
[13] সীয়ারু আলামীন নুবালা ৩৯৬/৪ তারিখে দেমেশক ৪১৭/৪৫
[14] আবু দাউদ ৫৬৬৯, আল্লামা আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেন।
[15]  বুখারি সংক্ষিপ্ত সনদে কথাটি বর্ণনা করেন। পরিচ্ছেদ: ইলম অর্জনে লজ্ঝা, আর আবু নয়াই হুলিয়াতে ২৮৭/৩ বর্ণনা করেন, আল্লামা ইবনে হাজর ফতহুল বারীতে [২২৯/১] বলেন, মুজাহিদের এ কথাটি আলী ইবনে আল মাদীনের সনদে আবু নুয়াইমের নিকট পোছে। তিনি ইবনে উয়াইনা থেকে আর তিনি মানছুর থেকে বর্ণনা করেন। মুসান্নিফের শর্তানুযায়ী সনদটি বিশুদ্ধ।
[16]  আর-রুহ ২৩৬
[17] মুসলিম ২৯৬৫
[18] ইমাম নববীর মুসলিম শরিফের ব্যাখ্যা ১০০/১৮
[19] তিরমিযি: ২০০০ এবং তিনি বলেন হাদীসটি হাসান।
[20] মুসলিম ২০২১
[21] বুখারী ৫৭৮৯ মুসলিম ২০৮৮
[22] ফাতহুল বারী ২৬১/১০
[23] ইবনে হাব্বান ৪৫৫৯
[24] তিরমিযি ২০১৮
[25] আহমদ: ৫৯৫৯
[26] তিরমিযি ২৪৯২ তিনি বলেন হাদীসটি হাসান।
[27] মুসলিম ৯১
[28] বুখারি ৪৯১৮, মুসলিম ২৮৫৩
[29]  বুখারি: ৪৮৫০ মুসলিম: ২৮৪৬
[30] আবুদাউদ:৪০৯০, আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেন।
[31] আহমদ ২০৬৭৪,আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেন।
[32] আবু দাউদ, ৫১১৬ আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেন।
[33]  বর্ণনায় আহমদ ১৬৭৬১
[34] আবু দাউদ ৪৯০১, আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেন।
[35] তিরমিযি ৩১৭৫ আলবানি হাদিসটিকে সহীহ বলেন।
[36] ইবনে হাব্বান ১৭৮০
[37] বুখারি ৬০৭২
[38] বুখারি ৬৭৬
[39] তিরমিযি ২০০১ এবং তিনি বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ গরীব।
[40] তাবরাণী ১২৯
[41] আল ফাওয়ায়েদ: ৫৮
_____________________________________________________
সংকলন : মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ
অনুবাদক : জাকের উল্লাহ আবুল খায়ের
সম্পাদনা : ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s