যে সকল হারামকে মানুষ তুচ্ছ মনে করে থাকে!! পার্ট – এক।


ক্রম বিষয়
1. ভূমিকা
2. শির্ক
3. কবরপূজা
4. গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা
5. হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল মনে করা
6. জাদু ও ভাগ্যগণনা
7. রাশিফল ও মানব জীবনের ওপর গ্রহ-
নক্ষত্রের প্রভাব সম্পর্কিত বিশ্বাস
8. স্রষ্টা যেসব বস্তুতে যে কল্যাণ রাখে নি
তাতে সে কল্যাণ থাকার আকীদা পোষণ করা
9. লোক দেখানো ইবাদত
10. কুলক্ষণ
11. আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে কসম করা
12. খাতির জমানোর জন্য মুনাফিক ও ফাসিকদের
সঙ্গে উঠাবসা করা
13. সালাতে ধীরস্থিরতা পরিহার করা
14. সালাতে অনর্থক কাজ ও বেশি বেশি নড়াচড়া
করা
15. সালাতে ইচ্ছাপূর্বক ইমামের আগে মুক্তাদীর
গমন
16. পেঁয়াজ-রসুন কিংবা দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু খেয়ে
মসজিদে গমন
17. ব্যভিচার
18. পুংমৈথুন বা সমকামিতা
19. শর‘ঈ ওযর ব্যতীত স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর
শয্যা গ্রহণ অস্বীকার করা
20. শর‘ঈ কারণ ব্যতীত স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর
নিকট তালাক প্রার্থনা করা
21. যিহার
22. মাসিকের সময় স্ত্রী সহবাস করা
23. পশ্চাৎদ্বার দিয়ে স্ত্রীগমন
24. স্ত্রীদের মধ্যে সমতা রক্ষা না করা
25. গায়ের মাহরাম মহিলার সাথে নির্জনে অবস্থান
26. বিবাহ বৈধ এমন মহিলার সাথে করমর্দন
27. পুরুষের মাঝে সুগন্ধি মেখে নারীর
গমনাগমন
28. মাহরাম আত্মীয় ছাড়া স্ত্রীলোকের সফর
29. গায়ের মাহরাম মহিলার প্রতি ইচ্ছাপূর্বক দৃষ্টিপাত
করা
30. দাইয়ূছী
31. পালক সন্তান গ্রহণ ও নিজ সন্তানের পিতৃত্ব
অস্বীকার করা
32. সূদ খাওয়া
33. বিক্রিত পণ্যের দোষ গোপন করা
34. দালালী করা
35. জুমু‘আর সালাতের আযানের পরে কেনা-
বেচা করা
36. জুয়া
37. চুরি করা
38. জমি আত্মসাৎ করা
39. ঘুষ
40. সুপারিশের বিনিময়ে উপহার গ্রহণ
41. শ্রমিক থেকে ষোলআনা শ্রম আদায় করে
পুরো মজুরী না দেওয়া
42. সন্তানদের উপহার প্রদানে সমতা রক্ষা না করা
43. ভিক্ষাবৃত্তি
44. ঋণ পরিশোধে অনীহা প্রকাশ করা
45. হারাম ভক্ষণ
46. মদ্যপান
47. সোনা-রূপার পাত্র ব্যবহার ও তাতে পানাহার করা
48. মিথ্যা সাক্ষ্যদান
49. বাদ্যযন্ত্র ও গান
50. গীবত বা পরনিন্দা
51. চোগলখুরী করা
52. অনুমতি ব্যতীত অন্যের বাড়ীতে উকি
দেওয়া ও প্রবেশ করা
53. তৃতীয় জনকে বাদ দিয়ে দু’জনে
শলাপরামর্শ করা
54. টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা
55. পুরুষদের স্বর্ণালংকার ব্যবহার করা
56. মহিলাদের খাটো, পাতলা ও আঁটসাঁট পোষাক
পরিধান করা
57. পরচুলা ব্যবহার করা
58. পোশাক-পরিচ্ছদ ও কথা-বার্তায় নারী-পুরুষ
পরস্পরের বেশ ধারণ
59. সাদা চুলে কালো খেযাব ব্যবহার করা
60. ক্যানভাস, প্রাচীর গাত্র, কাগজ ইত্যাদিতে
প্রাণীর ছবি অঙ্কন করা
61. মিথ্যা স্বপ্ন বলা
62. কবরের উপর বসা, কবর পদদলিত করা ও
কবরস্থানে মল-মূত্র ত্যাগ করা
63. পেশাবের পর পবিত্র না হওয়া
64. লোকদের অনীহা সত্ত্বেও গোপনে
তাদের আলাপ শ্রবণ করা
65. প্রতিবেশীর সাথে অসদাচরণ করা
66. অসীয়ত দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত করা
67. দাবা খেলা
68. কোনো মুসলিমকে অভিশাপ দেওয়া এবং যে
অভিশাপ পাওয়ার যোগ্য নয় তাকে অভিশাপ দেওয়া
69. বিলাপ ও মাতম করা
70. মুখমণ্ডলে আঘাত করা ও দাগ দেওয়া
71. শর‘ঈ কারণ ব্যতীত তিন দিনের ঊর্ধ্বে
কোনো মুসলিমের সাথে সম্পর্কেছেদ করা
ভূমিকা
আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় বান্দাদের ওপর কিছু জিনিস
ফরয করেছেন, যা পরিত্যাগ করা জায়েয নয়, কিছু
সীমা বেঁধে দিয়েছেন, যা অতিক্রম করা বৈধ নয়
এবং কিছু জিনিস হারাম করেছেন, যার ধারে কাছে
যাওয়াও ঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন:
‏« ﻣَﺎ ﺃَﺣَﻞَّ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻓِﻲ ﻛِﺘَﺎﺑِﻪِ ﻓَﻬُﻮَ ﺣَﻠَﺎﻝٌ، ﻭَﻣَﺎ ﺣَﺮَّﻡَ ﻓَﻬُﻮَ ﺣَﺮَﺍﻡٌ،
ﻭَﻣَﺎ ﺳَﻜَﺖَ ﻋَﻨْﻪُ ﻓَﻬُﻮَ ﻋَﺎﻓِﻴَﺔٌ، ﻓَﺎﻗْﺒَﻠُﻮﺍ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺍﻟْﻌَﺎﻓِﻴَﺔَ، ﻓَﺈِﻥَّ
ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻟَﻢْ ﻳَﻜُﻦْ ﻧَﺴِﻴًّﺎ ‏» ﺛُﻢَّ ﺗَﻠَﺎ ﻫَﺬِﻩِ ﺍﻟْﺂﻳَﺔَ ﴿ﻭَﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﺭَﺑُّﻚَ ﻧَﺴِﻴّٗﺎ
﴾ ‏[ﻣﺮﻳﻢ : ٦٤‏]
‘‘আল্লাহ তা‘আলা তার কিতাবে যা হালাল করেছেন তা
হালাল, যা হারাম করেছেন তা হারাম, আর যে বিষয়ে
তিনি নীরব থেকেছেন তা ক্ষমা। সুতরাং তোমরা
আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমাকে গ্রহণ কর। কেননা
আল্লাহ তা‘আলা বিস্মৃত হন না। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ
করেন, ‘তোমার রব বিস্মৃত হন না”। [সূরা মারইয়াম,
আয়াত: ৬] [1]
আর এ হারামসমূহই আল্লাহ তা‘আলার সীমারেখা।
আল্লাহ বলেন,
﴿ﺗِﻠۡﻚَ ﺣُﺪُﻭﺩُ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﻓَﻠَﺎ ﺗَﻘۡﺮَﺑُﻮﻫَﺎۗ﴾ ‏[ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ١٨٧‏]
“এসব আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা
এগুলোর নিকটেও যেয়ো না”। [সূরা আল-বাকারা,
আয়াত: ১৮৭]
আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘনকারী ও হারাম
অবলম্বনকারীদেরকে আল্লাহ তা‘আলা
ভীতিপ্রদর্শন করেছেন। তিনি বলেছেন,
﴿ﻭَﻣَﻦ ﻳَﻌۡﺺِ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺭَﺳُﻮﻟَﻪُۥ ﻭَﻳَﺘَﻌَﺪَّ ﺣُﺪُﻭﺩَﻩُۥ ﻳُﺪۡﺧِﻠۡﻪُ ﻧَﺎﺭًﺍ
ﺧَٰﻠِﺪٗﺍ ﻓِﻴﻬَﺎ ﻭَﻟَﻪُۥ ﻋَﺬَﺍﺏٞ ﻣُّﻬِﻴﻦٞ ١٤﴾ ‏[ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ١٤‏]
“যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশের অবাধ্যতা
করে এবং তাঁর সীমারেখাসমূহ লংঘন করে আল্লাহ
তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সেখানে সে
চিরস্থায়ী হবে। আর তার জন্য রয়েছে
লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪]
এ জন্যেই হারাম থেকে বিরত থাকা ফরয। রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‏« ﻣَﺎ ﻧَﻬَﻴْﺘُﻜُﻢْ ﻋَﻨْﻪُ، ﻓَﺎﺟْﺘَﻨِﺒُﻮﻩُ ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻣَﺮْﺗُﻜُﻢْ ﺑِﻪِ ﻓَﺎﻓْﻌَﻠُﻮﺍ ﻣِﻨْﻪُ
ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺘُﻢْ‏»
‘‘আমি তোমাদেরকে যা কিছু নিষেধ করি তোমরা
সেসব থেকে বিরত থাক। আর যা কিছু আদেশ করি
তা যথাসাধ্য পালন কর”। [2]
লক্ষ্যণীয় যে, প্রবৃত্তিপূজারী, দুর্বলমনা ও
স্বল্প জ্ঞানের অধিকারী কিছু লোক যখন এক
সঙ্গে কিছু হারামের কথা শুনতে পায় তখন আঁতকে
ওঠে এবং বিরক্তির সুরে বলে, ‘সবই তো হারাম
হয়ে গেল। তোমরা তো দেখছি আমাদের জন্য
হারাম ছাড়া কিছুই বাকী রাখলে না। তোমরা আমাদের
জীবনটাকে সংকীর্ণ করে ফেললে, মনটাকে
বিষিয়ে দিলে! জীবনটা একেবারে মাটি হযে
গেল। কোনো কিছুর সাধ আহ্লাদই আমরা ভোগ
করতে পারলাম না। শুধু হারাম হারাম ফতওয়া দেওয়া ছাড়া
তোমাদের দেখছি আর কোনো কাজ নেই।
অথচ আল্লাহর দীন সহজ-সরল। তিনি নিজেও
ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর শরী‘আতের গণ্ডিও
ব্যাপকতর। সুতরাং হারাম এত সংখ্যক হতে পারে না।’
এদের জবাবে আমরা বলব, ‘আল্লাহ তা‘আলা যা ইচ্ছা
আদেশ করতে পারেন। তাঁর আদেশকে খণ্ডন
করার কেউ নেই। তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। সুতরাং
তিনি যা ইচ্ছা হালাল করেছেন এবং যা ইচ্ছা হারাম
করেছেন। তিনি পবিত্র। আল্লাহর দাস হিসেবে
আমাদের নীতি হবে তাঁর আদেশের প্রতি সন্তুষ্ট
থাকা এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেওয়া। কেননা
তাঁর দেওয়া বিধানাবলী জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ইনছাফ
মোতাবেকই প্রকাশ পেয়েছে। সেগুলো
নিরর্থক ও খেলনার বস্তু নয়। যেমন, তিনি
বলেছেন,
﴿ﻭَﺗَﻤَّﺖۡ ﻛَﻠِﻤَﺖُ ﺭَﺑِّﻚَ ﺻِﺪۡﻗٗﺎ ﻭَﻋَﺪۡﻟٗﺎۚ ﻟَّﺎ ﻣُﺒَﺪِّﻝَ ﻟِﻜَﻠِﻤَٰﺘِﻪِۦۚ ﻭَﻫُﻮَ
ﭐﻟﺴَّﻤِﻴﻊُ ﭐﻟۡﻌَﻠِﻴﻢُ ١١٥﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﻌﺎﻡ : ١١٥‏]
“তোমার রবের বাণী সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে
পরিপূর্ণ হলো। তাঁর বাণীসমূহকে পরিবর্তনকারী
কেউ নেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” [সূরা আল-
আন‘আম, আয়াত: ১১৫]
যে নিয়মের ভিত্তিতে হালাল-হারাম নির্ণিত হয়েছে
আল্লাহ তা‘আলা তাও আমাদেরকে জানিয়ে
দিয়েছেন। তিনি বলেছেন,
﴿ﻭَﻳُﺤِﻞُّ ﻟَﻬُﻢُ ﭐﻟﻄَّﻴِّﺒَٰﺖِ ﻭَﻳُﺤَﺮِّﻡُ ﻋَﻠَﻴۡﻬِﻢُ ﭐﻟۡﺨَﺒَٰٓﺌِﺚَ﴾ ‏[ﺍﻻﻋﺮﺍﻑ :
١٥٧‏]
“তিনি পবিত্র বস্তুকে তাদের জন্য হালাল এবং অপবিত্র
বস্তুকে হারাম করেন।” [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত:
১৫৭]
সুতরাং যা পবিত্র তা হালাল এবং যা অপবিত্র তা হারাম।
কোনো কিছু হালাল ও হারাম করার অধিকার একমাত্র
আল্লাহরই। কোনো মানুষ নিজের জন্য তা দাবী
করলে কিংবা কেউ তা অন্যের জন্য সাব্যস্ত
করলে সে হবে একজন বড় কাফির ও মুসলিম উম্মাহ
বহির্ভূত ব্যক্তি। আল্লাহ বলেন,
﴿ﺃَﻡۡ ﻟَﻬُﻢۡ ﺷُﺮَﻛَٰٓﺆُﺍْ ﺷَﺮَﻋُﻮﺍْ ﻟَﻬُﻢ ﻣِّﻦَ ﭐﻟﺪِّﻳﻦِ ﻣَﺎ ﻟَﻢۡ ﻳَﺄۡﺫَﻥۢ ﺑِﻪِ ﭐﻟﻠَّﻪُۚ
﴾ ‏[ ﺍﻟﺸﻮﺭﻯ : ٢١ ‏]
“তবে কি তাদের এমন সব উপাস্য রয়েছে, যারা
তাদের জন্য দীনের এমন সব বিধান দিয়েছে যার
অনুমতি আল্লাহ দেন নি?” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ২১]
কুরআন-হাদীসে পারদর্শী আলেমগণ ব্যতীত
হালাল-হারাম সম্পর্কে কথা বলার অধিকার অন্য কারো
নেই। যে ব্যক্তি না জেনে হালাল-হারাম সম্পর্কে
কথা বলে আল-কুরআনে তার সম্পর্কে কঠোর
হুঁশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন:
﴿ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻘُﻮﻟُﻮﺍْ ﻟِﻤَﺎ ﺗَﺼِﻒُ ﺃَﻟۡﺴِﻨَﺘُﻜُﻢُ ﭐﻟۡﻜَﺬِﺏَ ﻫَٰﺬَﺍ ﺣَﻠَٰﻞٞ ﻭَﻫَٰﺬَﺍ
ﺣَﺮَﺍﻡٞ ﻟِّﺘَﻔۡﺘَﺮُﻭﺍْ ﻋَﻠَﻰ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﭐﻟۡﻜَﺬِﺏَۚ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺤﻞ : ١١٦‏]
“তোমাদের জিহ্বায় মিথ্যা উচ্চারিত হয় বলে তোমরা
আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপের মানসে যেন না
বলো যে, এটা হালাল, ওটা হারাম”। [সূরা আন-নাহল,
আয়াত: ১১৬]
যেসব বস্তু অকাট্যভাবে হারাম তা কুরআন ও
হাদীসে উল্লেখ আছে। যেমন, আল্লাহ
বলেছেন:
﴿ﻗُﻞۡ ﺗَﻌَﺎﻟَﻮۡﺍْ ﺃَﺗۡﻞُ ﻣَﺎ ﺣَﺮَّﻡَ ﺭَﺑُّﻜُﻢۡ ﻋَﻠَﻴۡﻜُﻢۡۖ ﺃَﻟَّﺎ ﺗُﺸۡﺮِﻛُﻮﺍْ ﺑِﻪِۦ ﺷَﻴۡٔٗﺎۖ
ﻭَﺑِﭑﻟۡﻮَٰﻟِﺪَﻳۡﻦِ ﺇِﺣۡﺴَٰﻨٗﺎۖ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻘۡﺘُﻠُﻮٓﺍْ ﺃَﻭۡﻟَٰﺪَﻛُﻢ ﻣِّﻦۡ ﺇِﻣۡﻠَٰﻖٖ﴾ ‏[ﺍﻻﻧﻌﺎﻡ :
١٥١ ‏]
“আপনি বলুন, এসো, তোমাদের প্রতিপালক
তোমাদের ওপর যা হারাম করেছেন তা পড়ে শুনাই।
তোমরা তার সঙ্গে কাউকে শরীক করো না,
মাতা-পিতার সাথে সদাচরণ করবে আর দারিদ্র্যের
কারণে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো
না”। [সূরা আল-আন‘আম ১৫১]
অনুরূপভাবে হাদীসেও বহু হারাম জিনিসের বিবরণ
এসেছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
‏« ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺭَﺳُﻮﻟَﻪُ ﺣَﺮَّﻡَ ﺑَﻴْﻊَ ﺍﻟﺨَﻤْﺮِ، ﻭَﺍﻟﻤَﻴْﺘَﺔِ ﻭَﺍﻟﺨِﻨْﺰِﻳﺮِ
ﻭَﺍﻷَﺻْﻨَﺎﻡِ‏»
“আল্লাহ তা‘আলা মদ, মৃত প্রাণী, শূকর ও মূর্তি কেনা-
বেচা হারাম করেছেন”। [3]
অপর হাদীসে এসেছে,
‏« ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﺇِﺫَﺍ ﺣَﺮَّﻡَ ﺷَﻴْﺌًﺎ ﺣَﺮَّﻡَ ﺛَﻤَﻨَﻪُ‏»
“আল্লাহ যখন কোনো কিছু হারাম করেন তখন তার
মূল্য তথা কেনা-বেচাও হারাম করে দেন”। [4]
কোনো কোনো আয়াতে কখনো একটি
বিশেষ শ্রেণির হারামের আলোচনা দেখতে
পাওয়া যায়। যেমন, হারাম খাদ্যদ্রব্য প্রসঙ্গে আল্লাহ
বলেছেন:
﴿ﺣُﺮِّﻣَﺖۡ ﻋَﻠَﻴۡﻜُﻢُ ﭐﻟۡﻤَﻴۡﺘَﺔُ ﻭَﭐﻟﺪَّﻡُ ﻭَﻟَﺤۡﻢُ ﭐﻟۡﺨِﻨﺰِﻳﺮِ ﻭَﻣَﺎٓ ﺃُﻫِﻞَّ
ﻟِﻐَﻴۡﺮِ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﺑِﻪِۦ ﻭَﭐﻟۡﻤُﻨۡﺨَﻨِﻘَﺔُ ﻭَﭐﻟۡﻤَﻮۡﻗُﻮﺫَﺓُ ﻭَﭐﻟۡﻤُﺘَﺮَﺩِّﻳَﺔُ ﻭَﭐﻟﻨَّﻄِﻴﺤَﺔُ
ﻭَﻣَﺎٓ ﺃَﻛَﻞَ ﭐﻟﺴَّﺒُﻊُ ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﺎ ﺫَﻛَّﻴۡﺘُﻢۡ ﻭَﻣَﺎ ﺫُﺑِﺢَ ﻋَﻠَﻰ ﭐﻟﻨُّﺼُﺐِ ﻭَﺃَﻥ
ﺗَﺴۡﺘَﻘۡﺴِﻤُﻮﺍْ ﺑِﭑﻟۡﺄَﺯۡﻟَٰﻢِۚ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ : ٣‏]
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী,
রক্ত, শূকরের গোশত, আল্লাহ ব্যতীত অন্যের
নামে যবেহকৃত প্রাণী, গলা টিপে হত্যাকৃত প্রাণী,
পাথরের আঘাতে নিহত প্রাণী, উপর থেকে নিচে
পড়ে গিয়ে মৃত প্রাণী, শিং এর আঘাতে মৃত প্রাণী,
হিংস্র প্রাণীর ভক্ষিত প্রাণী। অবশ্য (উল্লিখিত
ক্ষেত্রগুলোতে যে সব হালাল প্রাণীকে)
তোমরা যবেহ করতে সক্ষম হও সেগুলো হারাম
হবে না। আর (তোমাদের জন্য হারাম) সেইসব
প্রাণীও যেগুলো পূজার বেদীমূলে যবেহ
করা হয় এবং ভাগ্য নির্ণায়ক তীরের সাহায্যে যে
গোশত তোমরা বন্টন কর”। [সূরা আল-মায়েদাহ,
আয়াত: ৩]
হারাম বিবাহ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
﴿ﺣُﺮِّﻣَﺖۡ ﻋَﻠَﻴۡﻜُﻢۡ ﺃُﻣَّﻬَٰﺘُﻜُﻢۡ ﻭَﺑَﻨَﺎﺗُﻜُﻢۡ ﻭَﺃَﺧَﻮَٰﺗُﻜُﻢۡ ﻭَﻋَﻤَّٰﺘُﻜُﻢۡ
ﻭَﺧَٰﻠَٰﺘُﻜُﻢۡ ﻭَﺑَﻨَﺎﺕُ ﭐﻟۡﺄَﺥِ ﻭَﺑَﻨَﺎﺕُ ﭐﻟۡﺄُﺧۡﺖِ ﻭَﺃُﻣَّﻬَٰﺘُﻜُﻢُ ﭐﻟَّٰﺘِﻲٓ
ﺃَﺭۡﺿَﻌۡﻨَﻜُﻢۡ ﻭَﺃَﺧَﻮَٰﺗُﻜُﻢ ﻣِّﻦَ ﭐﻟﺮَّﺿَٰﻌَﺔِ ﻭَﺃُﻣَّﻬَٰﺖُ ﻧِﺴَﺎٓﺋِﻜُﻢۡ
﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ٢٣‏]
“তোমাদের ওপর হারাম করা হয়েছে তামাদের
মাতৃকুল, কন্যাকুল, ভগ্নিকুল, ফুফুকুল, খালাকুল,
ভ্রাতুষ্পুত্রীকুল, ভগ্নিকন্যাকুল, স্তন্যদাত্রী
মাতৃকুল, স্তন্যপান সম্পর্কিত ভগ্নীকুল ও
শাশুড়ীদেরকে”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ২৩]
উপার্জন বিষয়ক হারাম সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
﴿ﻭَﺃَﺣَﻞَّ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﭐﻟۡﺒَﻴۡﻊَ ﻭَﺣَﺮَّﻡَ ﭐﻟﺮِّﺑَﻮٰﺍْۚ﴾ ‏[ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ٢٧٥ ‏]
“আল্লাহ তা‘আলা কেনা-বেচা হালাল করেছেন এবং
সূদকে হারাম করেছেন’। [সূরা আল-বাকারা, আয়াত:
২৭৫]
বস্তুতঃ মানুষের প্রতি পরম দয়ালু আল্লাহ তা‘আলা
আমাদের জন্য সংখ্যা ও শ্রেণিগতভাবে এত পবিত্র
জিনিস হালাল করেছেন যে, তা গননা করে শেষ
করা সম্ভব নয়। এ কারণেই তিনি হালাল জিনিসগুলোর
বিস্তারিত বিবরণ দেন নি। কিন্তু হারামের সংখ্যা
যেহেতু সীমিত এবং সেগুলো জানার পর মানুষ
যেন তা থেকে বিরত থাকতে পারে সেজন্য তিনি
তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। আল্লাহ
বলেন,
﴿ﻭَﻗَﺪۡ ﻓَﺼَّﻞَ ﻟَﻜُﻢ ﻣَّﺎ ﺣَﺮَّﻡَ ﻋَﻠَﻴۡﻜُﻢۡ ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﺎ ﭐﺿۡﻄُﺮِﺭۡﺗُﻢۡ ﺇِﻟَﻴۡﻪِۗ
﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﻌﺎﻡ : ١١٩ ‏]
“তিনি তোমাদের ওপর যা হারাম করেছেন তার
বিস্তারিত বিবরণ তোমাদেরকে দান করেছেন।
তবে তোমরা যে হারামটা বাধ্য হয়ে বা ঠেকায়
পড়ে করে ফেল তা ক্ষমার্হ”। [সূরা আল-আন‘আম,
আয়াত: ১১৯]
হারামকে এভাবে বিস্তারিত পেশের কথা বললেও
হালালকে কিন্তু সংক্ষেপে সাধারণভাবে তুলে ধরা
হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
﴿ ﻳَٰٓﺄَﻳُّﻬَﺎ ﭐﻟﻨَّﺎﺱُ ﻛُﻠُﻮﺍْ ﻣِﻤَّﺎ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽِ ﺣَﻠَٰﻠٗﺎ ﻃَﻴِّﺒٗﺎ﴾ ‏[ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ :
١٦٨‏]
“হে মানবকুল! তোমরা যমীনের বুকে যা কিছু
হালাল ও উৎকৃষ্ট সেগুলো খাও।” [সূরা আল-বাকারা,
আয়াত: ১৬৮]
হারামের দলীল সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত সব
জিনিসের মূল হুকুম হালাল হাওয়াটা মহান আল্লাহর পরম
করুণা। এটা মহান আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁর বান্দাদের
ওপর সহজীকরণের নিদর্শনস্বরূপ। সুতরাং তাঁর
আনুগত্য প্রকাশ, প্রশংসা ও শুকরিয়া জ্ঞাপন করা
আমাদের অপরিহার্য কর্তব্য।
কিন্তু পূর্বোল্লিখিত ঐসব লোক যখন তাদের
সামনে হারামগুলো বিস্তারিত দেখতে পায় তখন
শরী‘আতের বিধি বিধানের ব্যাপারে তাদের মন
সংকীর্ণতায় ভোগে। এটা তাদের ঈমানী দুর্বলতা
ও শরী‘আত সম্পর্কে জ্ঞানের স্বল্পতার ফসল।
আসলে তারা কি চায় যে, হালালের
শ্রেণিবিভাগগুলোও তাদের সামনে এক এক করে
গণনা করা হোক; যাতে তারা দীন যে একটা সহজ
বিষয় তা জেনে আত্মতৃপ্ত হতে পারে?
তারা কি চায় যে, নানা শ্রেণির পবিত্র জিনিসগুলো
তাদের এক এক করে তুলে ধরা হোক, যাতে তারা
নিশ্চিত হতে পারে যে, শরী‘আত তাদের
জীবনকে দুর্বিষহ করে দেয় নি? তারা কি চায় যে
এভাবে বলা হোক?
– উট, গরু, ছাগল, খরগোশ, হরিণ, পাহাড়ী ছাগল,
মুরগী, কবুতর, হাঁস, রাজহাঁস, উটপাখি ইত্যাকার যবেহ
করার মত যবেহকৃত প্রাণীর গোশত হালাল।
– মৃত পঙ্গপাল ও মাছ হালাল।
-শাক-সবজি, ফলমূল, সকল দানাশস্য ও উপকারী ফল-
ফুল হালাল। পানি, দুধ, মধু তেল ও শিরকা হালাল। লবণ,
মরিচ ও মসলা হালাল।
-লোহা, বালু, খোয়া, প্লাস্টিক, কাঁচ ও রাবার ইত্যাদি
ব্যবহার হালাল।
-খাট, চেয়ার, টেবিল, সোফা, তৈজসপত্র, আসবাবপত্র
ইত্যাদি ব্যবহার হালাল।
-জীবজন্তু, মোটরগাড়ী, রেলগাড়ী, নৌকা, জাহাজ
ও বিমানে আরোহণ হালাল।
-এয়ারকন্ডিশন, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, পানি
শুকানোর যন্ত্র, পেষণ যন্ত্র, আটা খামির করার
যন্ত্র, কিমা তৈরীর যন্ত্র, নির্মাণ বিষয়ক যন্ত্রপাতি,
হিসাব রক্ষণ, পর্যবেক্ষণ যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার এবং
পানি, পেট্রোল, খনিজদ্রব্য উত্তোলন ও
শোধন, মুদ্রণ যন্ত্রপাতি ইত্যাদি হালাল।
-সূতী, কাতান, পশম, নাইলন, পলেস্টার ও বৈধ চামড়ার
তৈরি বস্ত্র হালাল।
-বিবাহ, বেচা-কেনা, যিম্মাদারী, চেক, ড্রাফট,
মনিঅর্ডার, ইজারা বা ভাড়া প্রদান হালাল।
-বিভিন্ন পেশা যেমন কাঠমিস্ত্রীগিরি, কর্মকারগিরি,
যন্ত্রপাতি মেরামত, ছাগলপালের রাখালী ইত্যাদি হালাল।
এভাবে গুনলে আর বর্ণনা করলে পাঠকের কি
মনে হয় আমরা হালালের ফিরিস্তি দিয়ে শেষ
করতে পারব? তাহলে এসব লোকের কি হলো
যে, তারা কোনো কথাই বুঝতে চায় না?
দীন যে সহজ তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
তবুও একথা বলে যারা সব কিছুই হালাল প্রমাণ করতে
চায়, তাদের কথা সত্য হলেও কিন্তু তাদের
উদ্দেশ্য খারাপ। কেননা দীনের মধ্যে
কোনো কিছু মানুষের মর্যি মাফিক সহজ হয় না। তা
কেবল শরী‘আতে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে
সেভাবেই নির্ধারিত হবে। অপর দিকে ‘দীন সহজ’
এরূপ দলীল দিয়ে হারাম কাজ করা আর
শরী‘আতের অবকাশমূলক দিক গ্রহণ করার মধ্যে
অনেক পার্থক্য রয়েছে। অবকাশমূলক কাজের
উদাহরণ হলো সফরে দু’ওয়াক্তের সালাত একত্রে
পড়া, কসর করা, সফরে সিয়াম ভঙ্গ করা, মুকীমের
জন্য একদিন এক রাত এবং মুসাফিরের জন্য তিনদিন তিন
রাত মোজার উপর মাসেহ করা, পানি ব্যবহারের অসুবিধা
থাকলে তায়াম্মুম করা, অসুস্থ হলে কিংবা বৃষ্টি নামলে
দু’ওয়াক্তের সালাত একত্রে পড়া, বিবাহের
প্রস্তাবদাতার জন্য গায়ের মাহরাম মহিলাকে দেখা,
শপথের কাফফারায় দাস মুক্তি, আহার করানো, বস্ত্র
দান, ছিয়াম পালনের যে কোনো একটি ব্যবস্থা
গ্রহণ করা [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৮৯], নিরূপায় হলে
মৃত প্রাণীর গোশত ভক্ষণ করা ইত্যাদি।
মোটকথা, শরী‘আতে যখন হারাম আছে তখন
সকল মুসলিমের জন্যই তার মধ্যে যে গূঢ় রহস্য বা
তত্ত্ব লুকিয়ে আছে তা জানা দরকার। যেমন,
(১) আল্লাহ তা‘আলা হারাম দ্বারা তার বান্দাদের পরীক্ষা
করেন। তারা এ সম্পর্কে কেমন আচরণ করে তা
তিনি লক্ষ্য করেন।
(২) কে জান্নাতবাসী হবে আর কে জাহান্নামবাসী
হবে হারামের মাধ্যমে তা নির্ণয় করা চলে। যারা
জাহান্নামী তারা সর্বদা প্রবৃত্তির পূজায় মগ্ন থাকে, যা
দিয়ে জাহান্নামকে ঘিরে রাখা হয়েছে। আর যারা
জান্নাতী তারা দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে, যে, দুঃখ-
কষ্ট দিয়ে জান্নাতকে বেষ্টন করে রাখা
হয়েছে। এ পরীক্ষা না থাকলে বাধ্য থেকে
অবাধ্যকে পৃথক করা যেত না।
(৩) যারা ঈমানদার তারা হারাম ত্যাগজনিত কষ্ট সহ্য করাকে
সাক্ষাৎ পূণ্য এবং আল্লাহ তা‘আলার যে কোনো
নির্দেশ পালনকে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উপায় বলে
মনে করে। ফলে কষ্ট স্বীকার করা তাদের
জন্য সহজ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যারা কপট ও
মুনাফিক্ব তারা কষ্ট সহ্য করাকে যন্ত্রণা, বেদনা ও
বঞ্চনা বলে মনে করে। ফলে ইসলামের পথে
চলা তাদের জন্য কঠিন এবং সৎ কাজ সম্পাদন ও
আনুগত্য স্বীকার করা ততধিক কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।
(৪) একজন সৎ লোক আল্লাহর সস্তুষ্টি
অর্জনার্থে হারাম পরিহার করলে বিনিময়ে তার
চেয়ে যে উত্তম কিছু পাওয়া যায় তা ভালোমত
অনুধাবন করতে পারে। এভাবে সে তার
মনোরাজ্যে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করতে
পারে।
আলোচ্য পুস্তকের মধ্যে সম্মানিত পাঠক
শরী‘আতে হারাম বলে গণ্য এমন কিছু সংখ্যক
নিষিদ্ধ বিষয়ের বিবরণ পাবেন কুরআন-সুন্নাহ থেকে
সেগুলো হারাম হওয়ার দলীলসহ। এসব হারাম এমনই
যা আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে
এবং বহুসংখ্যক মুসলিম নির্দ্বিধায় তা হরহামেশা করে
চলেছে। আমরা কেবল মানুষের কল্যাণ কামনার্থে
তাদের সামনে এগুলো তুলে ধরেছি অতি
সংক্ষেপে।
১- শির্ক
আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করা যে কোনো বিচারে
সবচেয়ে বড় হারাম ও মহাপাপ। আবু বাকরা রাদিয়াল্লাহু
‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বললেন,
‏« ﺃَﻻَ ﺃُﻧَﺒِّﺌُﻜُﻢْ ﺏِﺃَﻛْﺒَﺮِ ﺍﻟﻜَﺒَﺎﺋِﺮ ؟ِ‏» ﺛَﻼَﺛًﺎ، ﻗَﺎﻟُﻮﺍ : ﺑَﻠَﻰ ﻳَﺎ ﺭَﺳُﻮﻝَ
ﺍﻟﻠَّﻪِ، ﻗَﺎﻝَ : ‏« ﺍﻹِﺷْﺮَﺍﻙُ ﺑِﺎﻟﻠَّﻪِ … ‏»
“আমি কি তোমাদেরকে বৃহত্তম কবীরা গুনাহ
সম্পর্কে অবহিত করব না (তিনবার)? সাহাবীগণ
বললেন, অবশ্যই বলবেন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি
বললেন, আল্লাহর সাথে শির্ক করা …..”। [5]
শির্ক ব্যতীত প্রত্যেক পাপের ক্ষেত্রেই
আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা প্রাপ্তির একটি সম্ভাবনা আছে।
তাওবাই শির্কের একমাত্র প্রতিকার। আল্লাহ
বলেছেন,
﴿ﺇِﻥَّ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻟَﺎ ﻳَﻐۡﻔِﺮُ ﺃَﻥ ﻳُﺸۡﺮَﻙَ ﺑِﻪِۦ ﻭَﻳَﻐۡﻔِﺮُ ﻣَﺎ ﺩُﻭﻥَ ﺫَٰﻟِﻚَ ﻟِﻤَﻦ
ﻳَﺸَﺎٓﺀُۚ﴾ ‏[ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ٤٨‏]
“নিশ্চয় আল্লাহ তার সঙ্গে কৃত শির্ককে ক্ষমা
করবেন না। তাছাড়া যত গুনাহ আছে তা তিনি যাকে ইচ্ছা
ক্ষমা করবেন”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮]
এমন বড় শির্ক রয়েছে যা দীন ইসলাম থেকে
খারিজ হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এরূপ শির্ককারী
ব্যক্তি যদি ঐ অবস্থায় মারা যায় তাহলে সে চিরস্থায়ী
জাহান্নামী হবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক মুসলিম দেশেই
আজ শির্কের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ছে।
২. কবরপূজা
মৃত ওলী-আউলিয়া মানুষের অভাব পূরণ করেন,
বিপদাপদ দূর করেন, তাঁদের অসীলায় সাহায্য প্রার্থনা
ও ফরিয়াদ করা যাবে ইত্যাকার কথা বিশ্বাস করা শির্ক।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,
﴿ﻭَﻗَﻀَﻰٰ ﺭَﺑُّﻚَ ﺃَﻟَّﺎ ﺗَﻌۡﺒُﺪُﻭٓﺍْ ﺇِﻟَّﺎٓ ﺇِﻳَّﺎﻩُ﴾ ‏[ ﺍﻻﺳﺮﺍﺀ : ٢٣ ‏]
“তোমার রব চুড়ান্ত ফয়সালা দিয়েছেন যে,
তোমরা তাঁকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত
করবে না”। [সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৩]
অনুরূপভাবে শাফা‘আতের নিমিত্তে কিংবা বালা-মুসীবত
থেকে মুক্তির লক্ষ্যে মৃত-নবী-ওলী
প্রমুখের নিকট দো‘আ করাও শির্ক। আল্লাহ তা‘আলা
বলেন,
﴿ﺃَﻣَّﻦ ﻳُﺠِﻴﺐُ ﭐﻟۡﻤُﻀۡﻄَﺮَّ ﺇِﺫَﺍ ﺩَﻋَﺎﻩُ ﻭَﻳَﻜۡﺸِﻒُ ﭐﻟﺴُّﻮٓﺀَ ﻭَﻳَﺠۡﻌَﻠُﻜُﻢۡ
ﺧُﻠَﻔَﺎٓﺀَ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽِۗ ﺃَﺀِﻟَٰﻪٞ ﻣَّﻊَ ﭐﻟﻠَّﻪِۚ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﻤﻞ : ٦٢ ‏]
“বল তো কে নিঃসহায়ের আহ্বানে সাড়া দেন যখন
সে তাঁকে আহ্বান জানায় এবং দুঃখ-কষ্ট দূর করেন
আর পৃথিবীতে তোমাদেরকে পূর্ববর্তীদের
স্থলাভিষিক্ত করেন? আল্লাহর সঙ্গে কি অন্য
কোনো ইলাহ আছে? [সূরা আন-নামল, আয়াত: ৬২]
অনেকেই উঠতে, বসতে বিপদাপদে পীর
মুরশিদ, ওলী-আউলিয়া, নবী-রাসূল ইত্যাকার
মহাজনদের নাম নেওয়া অভ্যাসে পরিণত করে
নিয়েছে। যখনই তারা কোনো বিপদে বা কষ্টে
বা সংকটে পড়ে তখনই বলে ইয়া মুহাম্মাদ, ইয়া
আলী, ইয়া হুসাইন, ইয়া বাদাভী, ইয়া জীলানী, ইয়া
শাযেলী, ইয়া রিফা‘ঈ। কেউ যদি ডাকে
‘আইদারূসকে তো অন্যজন ডাকে মা যায়নাবকে,
আরেকজন ডাকে ইবন উলওয়ানকে। অথচ আল্লাহ
বলেন,
﴿ ﺇِﻥَّ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺗَﺪۡﻋُﻮﻥَ ﻣِﻦ ﺩُﻭﻥِ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﻋِﺒَﺎﺩٌ ﺃَﻣۡﺜَﺎﻟُﻜُﻢۡۖ
﴾ ‏[ﺍﻻﻋﺮﺍﻑ : ١٩٤‏]
“আল্লাহ ব্যতীত আর যাদেরকে তোমরা ডাক তারা
তোমাদেরই মত দাস”। [সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত:
১৯৪]
কিছু কবরপূজারী আছে যারা কবরকে তাওয়াফ করে,
কবরগাত্র চুম্বন করে, কবরে হাত বুলায়, লাল শালুতে
মাথা ঠেকিয়ে পড়ে থাকে, কবরের মাটি তাদের গা-
গতরে মাখে, কবরকে সাজদাহ করে, তার সামনে
মিনতিভরে দাঁড়ায়, নিজের উদ্দেশ্য ও অভাবের কথা
তুলে ধরে। সুস্থতা কামনা করে, সন্তান চায় অথবা
প্রয়োজনাদি পূরণ কামনা করে। অনেক সময়
কবরে শায়িত ব্যক্তিকে ডেকে বলে, ‘বাবা হুযুর,
আমি আপনার হুযূরে অনেক দূর থেকে হাযির
হয়েছি। কাজেই আপনি আমাকে নিরাশ করবেন না’।
অথচ আল্লাহ বলেন,
﴿ﻭَﻣَﻦۡ ﺃَﺿَﻞُّ ﻣِﻤَّﻦ ﻳَﺪۡﻋُﻮﺍْ ﻣِﻦ ﺩُﻭﻥِ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﻣَﻦ ﻟَّﺎ ﻳَﺴۡﺘَﺠِﻴﺐُ ﻟَﻪُۥٓ
ﺇِﻟَﻰٰ ﻳَﻮۡﻡِ ﭐﻟۡﻘِﻴَٰﻤَﺔِ ﻭَﻫُﻢۡ ﻋَﻦ ﺩُﻋَﺎٓﺋِﻬِﻢۡ ﻏَٰﻔِﻠُﻮﻥَ ٥ ﴾ ‏[ﺍﻻﺣﻘﺎﻑ :
٥ ‏]
“তাদের থেকে অধিকতর দিক ভ্রান্ত আর কে
আছে, যারা আল্লাহ ব্যতীত এমন সব উপাস্যকে
ডাকে যারা কিয়ামত পর্যন্তও তাদের ডাকে সাড়া
দেবে না। অধিকন্তু তারা ওদের ডাকাডাকি সম্বন্ধে
কোনো খবর রাখে না।” [সূরা আল-আহক্বাফ,
আয়াত: ৫]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‏« ﻣَﻦْ ﻣَﺎﺕَ ﻭَﻫْﻮَ ﻳَﺪْﻋُﻮ ﻣِﻦْ ﺩُﻭﻥِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻧِﺪًّﺍ ﺩَﺧَﻞَ ﺍﻟﻨَّﺎﺭَ ‏»
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে তার সমকক্ষ
বা অংশীদার মনে করে তাকে আহ্বান করে, আর
ঐ অবস্থায় (ঐ কাজ থেকে তাওবা না করে) মারা যায়
তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে”। [6]
কবর পূজারীরা অনেকেই কবরের পাশে মাথা
মূণ্ডন করে। তারা অনেকে ‘মাযার যিয়ারতের
নিয়মাবলী’ নামের বই সাথে রাখে। এসব মাযার
বলতে তারা ওলী আউলিয়া বা সাধু-সন্তানদের
কবরকে বুঝে থাকে। অনেকের আবার বিশ্বাস,
ওলী আউলিয়াগণ সৃষ্টিজগতের ওপর প্রভাব খাটিয়ে
থাকেন, তাঁরা ক্ষতিও করেন; উপকারও করেন।
অথচ আল্লাহ বলেন,
﴿ﻭَﺇِﻥ ﻳَﻤۡﺴَﺴۡﻚَ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﺑِﻀُﺮّٖ ﻓَﻠَﺎ ﻛَﺎﺷِﻒَ ﻟَﻪُۥٓ ﺇِﻟَّﺎ ﻫُﻮَۖ ﻭَﺇِﻥ ﻳُﺮِﺩۡﻙَ
ﺑِﺨَﻴۡﺮٖ ﻓَﻠَﺎ ﺭَﺍٓﺩَّ ﻟِﻔَﻀۡﻠِﻪِۦۚ﴾ ‏[ﻳﻮﻧﺲ : ١٠٧ ‏]
‘‘আর যদি আপনার রব্ব আপনাকে কোনো
অমঙ্গলের স্পর্শে আনেন, তবে তিনি ব্যতীত
অন্য কেউ সেটার বিমোচনকারী নেই। আর যদি
তিনি আপনার কোনো মঙ্গল করতে চান, তাহলে
তাঁর অনুগ্রহকে তিনি ব্যতীত রূখবারও কেউ
নেই”। [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১০৭]
একইভাবে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে মান্নত
করাও শির্ক। মাযার ও দরগার নামে মোমবাতি, আগরবাতি
মান্নত করে অনেকেই এরূপ শির্কে জড়িয়ে
পড়েন।
৩. গায়রুল্লাহর নামে যবেহ করা
আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নামে পশু যবেহ ও বলি
দেওয়া শির্কে আকবর বা বড় শির্ক-এর অন্যতম।
আল্লাহ বলেন,
﴿ﻓَﺼَﻞِّ ﻟِﺮَﺑِّﻚَ ﻭَﭐﻧۡﺤَﺮۡ ٢ ﴾ ‏[ﺍﻟﻜﻮﺛﺮ : ٢ ‏]
“আপনার প্রভূর উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং
যবেহ করুন” [সূলা আল-কাওসার, আয়াত: ২]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
‏« ﻟَﻌَﻦَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻣَﻦْ ﺫَﺑَﺢَ ﻟِﻐَﻴْﺮِ ﺍﻟﻠﻪِ‏»
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে
যবেহ করে তার ওপর আল্লাহর লা‘নত”। [7]
যবেহ-এর সঙ্গে জড়িত হারাম দু’প্রকার। যথা:
১. আল্লাহ ছাড়া অন্যের উদ্দেশ্যে যবেহ করা।
যেমন, দেবতার কৃপা লাভের জন্য।
২. আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নাম নিয়ে যবেহ করা।
উভয় প্রকার যবেহকৃত পশুর গোশত খাওয়া হরাম।
জাহেলী আরবে জিনের উদ্দেশ্যে প্রাণী
যবেহ-এর রেওয়াজ ছিল, যা আজও বিভিন্ন আঙ্গিকে
কোনো কোনো মুসলিম দেশে চালু আছে।
সে সময়ে কেউ বাড়ী ক্রয় করলে কিংবা তৈরি
করলে অথবা কূপ খনন করলে তাদের ওপর
জিন্নের উপদ্রব হতে পারে ভেবে পূর্বাহ্নেই
তারা সেখানে বা দরজার চৌকাঠের উপরে প্রাণী
যবেহ করত। এরূপ যবেহ সম্পূর্ণরূপে হারাম।
৪. হালালকে হারাম ও হারামকে হালাল মনে ক