স্বর্ণ ক্রয় -বিক্রয় সংক্রান্ত বিবিধ প্রশ্ন -উত্তর


স্বর্ণ ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত বিবিধ প্রশ্ন-উত্তর নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য; আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি এবং তাঁর নিকট তাওবা করি; আর আমাদের নফসের জন্য ক্ষতিকর এমন সকল খারাপি এবং আমাদের সকল প্রকার মন্দ আমল থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের জন্য লেনদেনের ব্যাপারে ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক সুস্পষ্ট পরিপূর্ণ নিয়ম-পদ্ধতি বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন, অন্য কোন ব্যবস্থা বা পদ্ধতিই তার সমকক্ষ হবে না; আর লেনদেনের ক্ষেত্রে যদি তা সুদের সাথে সম্পৃক্ত হয়, তাহলে তা হবে যুলুম এবং ন্যায় ও সঠিক পথ থেকে দূরে সরে যাওয়ার অন্তর্ভুক্ত; যে সুদ থেকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবের মধ্যে এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন; আর সকল মুসলিম তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর যেই কিতাবটি মানবজাতির প্রতি অবতীর্ণ করেছেন যাতে তারা তাকে তাদের মধ্যকার বিরোধ মীমাংসার ব্যাপারে ফায়সালাকারীরূপে গ্রহণ করে, সেই কিতাবটির মধ্যে বলেছেন: ﴿ ﻳَٰٓﺄَﻳُّﻬَﺎ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺀَﺍﻣَﻨُﻮﺍْ ﭐﺗَّﻘُﻮﺍْ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺫَﺭُﻭﺍْ ﻣَﺎ ﺑَﻘِﻲَ ﻣِﻦَ ﭐﻟﺮِّﺑَﻮٰٓﺍْ ﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻢ ﻣُّﺆۡﻣِﻨِﻴﻦَ ٢٧٨ ﻓَﺈِﻥ ﻟَّﻢۡ ﺗَﻔۡﻌَﻠُﻮﺍْ ﻓَﺄۡﺫَﻧُﻮﺍْ ﺑِﺤَﺮۡﺏٖ ﻣِّﻦَ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺭَﺳُﻮﻟِﻪِۦۖ ﻭَﺇِﻥ ﺗُﺒۡﺘُﻢۡ ﻓَﻠَﻜُﻢۡ ﺭُﺀُﻭﺱُ ﺃَﻣۡﻮَٰﻟِﻜُﻢۡ ﻟَﺎ ﺗَﻈۡﻠِﻤُﻮﻥَ ﻭَﻟَﺎ ﺗُﻈۡﻠَﻤُﻮﻥَ ٢٧٩ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ٢٧٨، ٢٧٩ ‏] “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও যদি তোমরা মুমিন হও। অতঃপর যদি তোমরা না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও। আর যদি তোমরা তাওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই; তোমরা যুলুম করবে না এবং তোমাদের উপরও যুলুম করা হবে না।”[1] তিনি আরও বলেন: ﴿ ﻳَٰٓﺄَﻳُّﻬَﺎ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺀَﺍﻣَﻨُﻮﺍْ ﻟَﺎ ﺗَﺄۡﻛُﻠُﻮﺍْ ﭐﻟﺮِّﺑَﻮٰٓﺍْ ﺃَﺿۡﻌَٰﻔٗﺎ ﻣُّﻀَٰﻌَﻔَﺔٗۖ ﻭَﭐﺗَّﻘُﻮﺍْ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢۡ ﺗُﻔۡﻠِﺤُﻮﻥَ ١٣٠ ﻭَﭐﺗَّﻘُﻮﺍْ ﭐﻟﻨَّﺎﺭَ ﭐﻟَّﺘِﻲٓ ﺃُﻋِﺪَّﺕۡ ﻟِﻠۡﻜَٰﻔِﺮِﻳﻦَ ١٣١ ﻭَﺃَﻃِﻴﻌُﻮﺍْ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻭَﭐﻟﺮَّﺳُﻮﻝَ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢۡ ﺗُﺮۡﺣَﻤُﻮﻥَ ١٣٢ ﴾ ‏[ ﺍﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ : ١٣٠، ١٣٢‏] “হে মুমিনগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ খেয়ো না এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। আর তোমরা সে আগুন থেকে বেঁচে থাক, যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আর তোমরা আল্লাহর ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা কৃপা লাভ করতে পার।”[2] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: ﴿ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳَﺄۡﻛُﻠُﻮﻥَ ﭐﻟﺮِّﺑَﻮٰﺍْ ﻟَﺎ ﻳَﻘُﻮﻣُﻮﻥَ ﺇِﻟَّﺎ ﻛَﻤَﺎ ﻳَﻘُﻮﻡُ ﭐﻟَّﺬِﻱ ﻳَﺘَﺨَﺒَّﻄُﻪُ ﭐﻟﺸَّﻴۡﻄَٰﻦُ ﻣِﻦَ ﭐﻟۡﻤَﺲِّۚ ﺫَٰﻟِﻚَ ﺑِﺄَﻧَّﻬُﻢۡ ﻗَﺎﻟُﻮٓﺍْ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﭐﻟۡﺒَﻴۡﻊُ ﻣِﺜۡﻞُ ﭐﻟﺮِّﺑَﻮٰﺍْۗ ﻭَﺃَﺣَﻞَّ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﭐﻟۡﺒَﻴۡﻊَ ﻭَﺣَﺮَّﻡَ ﭐﻟﺮِّﺑَﻮٰﺍْۚ ﻓَﻤَﻦ ﺟَﺎٓﺀَﻩُۥ ﻣَﻮۡﻋِﻈَﺔٞ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻪِۦ ﻓَﭑﻧﺘَﻬَﻰٰ ﻓَﻠَﻪُۥ ﻣَﺎ ﺳَﻠَﻒَ ﻭَﺃَﻣۡﺮُﻩُۥٓ ﺇِﻟَﻰ ﭐﻟﻠَّﻪِۖ ﻭَﻣَﻦۡ ﻋَﺎﺩَ ﻓَﺄُﻭْﻟَٰٓﺌِﻚَ ﺃَﺻۡﺤَٰﺐُ ﭐﻟﻨَّﺎﺭِۖ ﻫُﻢۡ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺧَٰﻠِﺪُﻭﻥَ ٢٧٥ ﻳَﻤۡﺤَﻖُ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﭐﻟﺮِّﺑَﻮٰﺍْ ﻭَﻳُﺮۡﺑِﻲ ﭐﻟﺼَّﺪَﻗَٰﺖِۗ ﻭَﭐﻟﻠَّﻪُ ﻟَﺎ ﻳُﺤِﺐُّ ﻛُﻞَّ ﻛَﻔَّﺎﺭٍ ﺃَﺛِﻴﻢٍ ٢٧٦ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ٢٧٥، ٢٧٦ ‏] “যারা সুদ খায় তারা তার ন্যায় দাঁড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, ‘ক্রয়-বিক্রয় তো সূদেরই মত’। অথচ আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল ও সুদকে হারাম করেছেন। অতএব, যার নিকট তার রব-এর পক্ষ হতে উপদেশ আসার পর সে বিরত হল, তাহলে অতীতে যা হয়েছে তা তারই; এবং তার ব্যাপার আল্লাহর ইখতিয়ারে। আর যারা পুনরায় আরম্ভ করবে তারাই আগুনের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন। আর আল্লাহ অধিক কুফরকারী কোন পাপী ব্যক্তিকে ভালবাসেন না।”[3] আর সহীহ মুসলিমের মধ্যে হাদিস বর্ণিত আছে, জাবির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: ‏« ﻟَﻌَﻦَ ﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺁﻛِﻞَ ﺍﻟﺮِّﺑَﺎ , ﻭَﻣُﻮﻛِﻠَﻪُ , ﻭَﻛَﺎﺗِﺒَﻪُ , ﻭَﺷَﺎﻫِﺪَﻳْﻪِ , ﻭَﻗَﺎﻝَ : ﻫُﻢْ ﺳَﻮَﺍﺀٌ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ ‏) . “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুদ গ্রহিতা, সুদ দাতা, সুদের লেখক এবং সুদের সাক্ষীদ্বয়ের উপর অভিশাপ দিয়েছেন এবং তিনি বলেছেন: তারা সকলেই সমান (অপরাধী)।” [4] আর ‘লানত’ (অভিশাপ) মানে: আল্লাহর রহমত থেকে বিতাড়িত করা ও দূরে সরিয়ে রাখা; আল্লাহ তা‘আলা জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের মধ্যে বিবেক-বুদ্ধি ও বোধশক্তি দিয়েছেন; আর তিনি তাদের মাঝে পাঠিয়েছেন রাসূলগণকে এবং তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন ভয়-ভীতি, যাতে তারা তাঁর দাসত্ব করতে পারে এবং তাদের প্রবৃত্তির দাবিকে উপেক্ষা করে তাঁর ও তাঁর রাসূলের আদেশ-নির্দেশকে প্রাধান্য দিয়ে নিজেদেরকে তাঁর আনুগত্যের অধীন করে নেয়; কারণ, এটাই হল আল্লাহ ‘ইবাদত তথা দাসত্বের বাস্তব চিত্র এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার প্রতি ঈমানের দাবি; যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ﴿ ﻭَﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﻟِﻤُﺆۡﻣِﻦٖ ﻭَﻟَﺎ ﻣُﺆۡﻣِﻨَﺔٍ ﺇِﺫَﺍ ﻗَﻀَﻰ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﻭَﺭَﺳُﻮﻟُﻪُۥٓ ﺃَﻣۡﺮًﺍ ﺃَﻥ ﻳَﻜُﻮﻥَ ﻟَﻬُﻢُ ﭐﻟۡﺨِﻴَﺮَﺓُ ﻣِﻦۡ ﺃَﻣۡﺮِﻫِﻢۡۗ ﻭَﻣَﻦ ﻳَﻌۡﺺِ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺭَﺳُﻮﻟَﻪُۥ ﻓَﻘَﺪۡ ﺿَﻞَّ ﺿَﻠَٰﻠٗﺎ ﻣُّﺒِﻴﻨٗﺎ ٣٦ ﴾ ‏[ﺍﻻﺣﺰﺍﺏ : ٣٦‏] “আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ের ফয়সালা দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোন (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল, সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো।”[5] সুতরাং যে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো সত্যিকার মুমিনের জন্য মানা না মানার ইখতিয়ার বা স্বাধীনতা নেই এবং তার সামনে তা সন্তুষ্ট চিত্তে পরিপূর্ণভাবে মেনে নেয়া ছাড়া ভিন্ন কোন পথও নেই, চাই তা তার প্রবৃত্তির চাহিদা মাফিক হউক, অথবা তা তার প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যাক; এর ব্যতিক্রম হলে সে মুমিন নয়; যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ﴿ ﻓَﻠَﺎ ﻭَﺭَﺑِّﻚَ ﻟَﺎ ﻳُﺆۡﻣِﻨُﻮﻥَ ﺣَﺘَّﻰٰ ﻳُﺤَﻜِّﻤُﻮﻙَ ﻓِﻴﻤَﺎ ﺷَﺠَﺮَ ﺑَﻴۡﻨَﻬُﻢۡ ﺛُﻢَّ ﻟَﺎ ﻳَﺠِﺪُﻭﺍْ ﻓِﻲٓ ﺃَﻧﻔُﺴِﻬِﻢۡ ﺣَﺮَﺟٗﺎ ﻣِّﻤَّﺎ ﻗَﻀَﻴۡﺖَ ﻭَﻳُﺴَﻠِّﻤُﻮﺍْ ﺗَﺴۡﻠِﻴﻤٗﺎ ٦٥ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ٦٥‏] “কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।”[6] যখন এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেল, তখন জেনে রাখুন যে, আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশসমূহ দুই ভাগে বিভক্ত: এক প্রকার নির্দেশ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সাথে সম্পর্ক ও আচার-আচরণ সংশ্লিষ্ট, যেমন: পবিত্রতা অর্জন করা, সালাত, সাওম ও হাজ্জ; আর এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার ‘ইবাদত হওয়ার ব্যাপারে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করে না; আর অপর প্রকার নির্দেশটি সৃষ্টির সাথে সম্পর্ক ও আচার-আচরণ সংশ্লিষ্ট; আর তা হল তাদের মধ্যকার প্রচলিত ক্রয়, বিক্রয়, ইজারা, বন্ধক ইত্যাদি ধরনের লেনদেনসমূহ। আর যেমনিভাবে প্রথম প্রকারের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশসমূহ বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর শরী‘য়তকে যথাযথরূপে গ্রহণ করা প্রত্যেকের জন্য একটি আবশ্যকীয় সর্বজনবিদিত বিষয়; ঠিক অনুরূপভাবে দ্বিতীয় প্রকারের ক্ষেত্রেও তাঁর নির্দেশসমূহ বাস্তবায়ন করা এবং তাঁর শরী‘য়তকে যথাযথরূপে গ্রহণ করা একটি আবশ্যকীয় (ফরয) বিষয়; কারণ, প্রত্যেকটিই আল্লাহ তা‘আলার বান্দাগণের প্রতি তাঁর হুকুম বা নির্দেশ; সুতরাং এ ক্ষেত্রে এবং ঐ ক্ষেত্রে— সকল ক্ষেত্রেই আল্লাহ তা‘আলার হুকুম বাস্তবায়ন ও তাঁর শরী‘য়তকে যথাযথরূপে গ্রহণ করা প্রত্যেক মুমিনের উপর আবশ্যক। অতঃপর…, এগুলো হচ্ছে স্বর্ণ [7] বিক্রয়, ক্রয় ও ব্যবহারের বিষয়ে আমাদের শাইখ মুহাম্মদ ইবন সালেহ আল-‘উসাইমীনের নিকট করা কিছু প্রশ্ন, তিনি এগুলোর জওয়াব দিয়েছেন আল্লাহ তা‘আলার নিকট এ প্রত্যাশা যে, যে ব্যক্তি তা পাঠ করে অথবা তা শ্রবণ করে, তিনি যেন তাকে উপকৃত করেন এবং যিনি তা লেখেন অথবা মুদ্রণ করেন অথবা প্রকাশ করেন অথবা তার সাথে সংশ্লিষ্ট কোন কাজ করেন, তিনি যেন তাকে বড় ধরনের পুরস্কার ও সাওয়াব দান করেন; আর তিনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং উত্তম অভিভাবক। * * * প্রথম প্রশ্ন: অনেক স্বর্ণের দোকানদার ব্যবহৃত (ভাঙ্গাচূরা) স্বর্ণ ক্রয়ের কারবার করে, অতঃপর তা নিয়ে স্বর্ণ ব্যবসায়ীর নিকটে যায় এবং সমাস সমান ওজনে তৈরি করা নতুন স্বর্ণের দ্বারা তা পরিবর্তন করে নেয়, আর সাথে তারা নতুন স্বর্ণের জন্য তৈরি বাবদ বাড়তি পারিশ্রমিক গ্রহণ করে— এমতাবস্থায় এর বিধান কী হবে? উত্তর: ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺍﻟﺮﺣﻴﻢ ﻭ ﺍﻟﺤﻤﺪ ﻟﻠﻪ ﺭﺏ ﺍﻟﻌﺎﻟﻤﻴﻦ ﻭ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻭ ﺍﻟﺴﻼﻡ ﻋﻠﻰ ﻧﺒﻴﻨﺎ ﻣﺤﻤﺪ ﻭ ﻋﻠﻰ ﺁﻟﻪ ﻭ ﺃﺻﺤﺎﺑﻪ ﺃﺟﻤﻌﻴﻦ . (রহমান, রহীম আল্লাহর নামে; আর সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য; আর সালাত ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও সকল সাহাবীর প্রতি)। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিস বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন: ‏« ﺍﻟﺬَّﻫَﺐُ ﺑِﺎﻟﺬَّﻫَﺐِ ﻭَﺍﻟْﻔِﻀَّﺔُ ﺑِﺎﻟْﻔِﻀَّﺔِ ﻭَﺍﻟْﺒُﺮُّ ﺑِﺎﻟْﺒُﺮِّ ﻭَﺍﻟﺸَّﻌِﻴﺮُ ﺑِﺎﻟﺸَّﻌِﻴﺮِ ﻭَﺍﻟﺘَّﻤْﺮُ ﺑِﺎﻟﺘَّﻤْﺮِ ﻭَﺍﻟْﻤِﻠْﺢُ ﺑِﺎﻟْﻤِﻠْﺢِ ﻣِﺜْﻼً ﺑِﻤِﺜْﻞٍ ﺳَﻮَﺍﺀً ﺑِﺴَﻮَﺍﺀٍ ﻳَﺪًﺍ ﺑِﻴَﺪٍ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ ‏) . “স্বর্ণ স্বর্ণের বিনিময়ে, রৌপ্য রৌপ্যের বিনিময়ে, গম গমের বিনিময়ে, যব যবের বিনিময়ে, খেজুর খেজুরের বিনিময়ে এবং লবন লবনের বিনিময়ে লেনদেন সমান সমান ও নগদ নগদ হতে হবে।”[8] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আরও বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: ‏« ﻣَﻦْ ﺯَﺍﺩَ ﺃَﻭِ ﺍﺳْﺘَﺰَﺍﺩَ ﻓَﻘَﺪْ ﺃَﺭْﺑَﻰ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ ‏) . “যে ব্যক্তি তার অতিরিক্ত কিছু দিবে অথবা অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করবে, তবে তা সুদ হবে।”[9] নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও হাদিস বর্ণিত আছে যে, তাঁর নিকট উৎকৃষ্ট মানের খেজুর নিয়ে আসা হলে তিনি সেই ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেন, তখন জবাবে সাহাবীগণ বলেন: “আমরা দুই সা‘ খেজুরের বিনিময়ে এ উৎকৃষ্ট মানের এক সা‘ এবং তিন সা‘য়ের বিনিময়ে দুই সা‘ খেজুর ক্রয় করে থাকি।” তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরেনের কেনাবেচাকে পরিহার করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় নির্ভেজাল সুদ। অতঃপর তিনি তাঁদেরকে নির্দেশনা প্রদান করে বলেন, তাঁরা যেন নিম্ন মানের খেজুর বিক্রয় করে দেয়, তারপর সেই বিক্রয়লব্ধ দিরহাম দিয়ে উৎকৃষ্ট মানের খেজুর ক্রয় করে।” [10] এসব হাদিস থেকে আমরা এটা গ্রহণ করতে পারি যে, স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ পরিবর্তনের পর যে কোনো একটির সাথে (গহনা বানানো বাবদ) অতিরিক্ত মজুরি ধার্য করার ব্যাপারে প্রশ্নকর্তা যা উল্লেখ করেছেন, তা একটি হারাম লেনদেন তথা অবৈধ এবং সুদের অন্তর্ভুক্ত, যা থেকে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। তাই এ ব্যাপারে সঠিক পদ্ধতি হল: কোনো প্রকার পূর্ব চুক্তি ব্যতীত ভিন্ন জাতের কোনো মুদ্রার মূল্যের বিনিময়ে ভাঙ্গাচুরা পুরাতন স্বর্ণ বিক্রয় করা এবং স্বর্ণের মালিক কর্তৃক মূল্য গ্রহণ করার পর নতুন জিনিস ক্রয় করা। আর সবচেয়ে উত্তম হল অন্য দোকানে গিয়ে নতুন জিনিস অনুসন্ধান করা; তারপর যদি তা না পাওয়া যায়, তাহলে যার নিকট সে স্বর্ণ বিক্রয় করেছিল তার নিকট ফিরে আসবে এবং দিরহাম তথা প্রচলিত মুদ্রার মাধ্যমে তা ক্রয় করবে; আর এ অবস্থায় যদি দিরহামের পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণের লেনদেন না হওয়ার কারণে তাতে কোনও প্রকার সমস্যা নেই; আর যদি দোকানদার নিজেই স্বর্ণকার হয়, তাহলে তার (বিক্রেতার) জন্য এ কথা বলার সুযোগ রয়েছে যে, তুমি এ স্বর্ণ গ্রহণ কর এবং তা দিয়ে আমার জন্য পছন্দসই অলংকার তৈরি করে দাও; আর যখন অলংকার তৈরির কাজ শেষ হবে, তখন আমি তোমাকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দেব; আর তাতেও কোনো প্রকার অসুবিধা নেই। * * * দ্বিতীয় প্রশ্ন: কোনো কোনো স্বর্ণের দোকানদার যারা তাদের নিকট থেকে ক্রয় করতে আগ্রহী এমন গ্রাহকের নিকট থেকে ব্যবহৃত স্বর্ণের বিনিমেয়ে তাদের নিকট রক্ষিত নতুন স্বর্ণের বদ-বদল করে থাকেন এবং তার উপর তৈরি বাবদ বাড়তি পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন— এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী? উত্তর: আমার নিকট এ প্রশ্ন এবং তার পূর্বের প্রশ্নের মধ্যে আলাদা কোনো পার্থক্য আছে বলে মনে হয় না; সুতরাং উভয় প্রশ্নের ব্যাপারে একই হুকুম। * * * তৃতীয় প্রশ্ন: কোনো কোনো স্বর্ণের দোকানদার বাকিতে স্বর্ণ ক্রয় করে এমন বিশ্বাসে যে, এটা বৈধ এবং তাদের যুক্তি হল— এটা ব্যবসার পণ্যসামগ্রীর অন্তর্ভুক্ত, অথচ এ ব্যাপারে তাদের বড় বড় ব্যবসায়ীদের সাথে যখন পেশ করা হলো যে, এ ধরনের কারবার বৈধ নয়; তখন তারা বলে যে, এ ধরনের লেনদেন বা কারবারের ব্যাপারে আলেমগণের জানা নেই। উত্তর: নিশ্চয় এটি অর্থাৎ দিরহাম তথা মুদ্রার বিনিময়ে বাকিতে স্বর্ণ ক্রয়- বিক্রয় করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম; কারণ, তা ‘রিবায়ে নাসিয়া’ বা বিলম্বজনিত সুদ; আর ‘উবাদা ইবন সামিত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‏« ﺍﻟﺬَّﻫَﺐُ ﺑِﺎﻟﺬَّﻫَﺐِ , ﻭَﺍﻟْﻔِﻀَّﺔُ ﺑِﺎﻟْﻔِﻀَّﺔِ , ﻭَﺍﻟْﺒُﺮُّ ﺑِﺎﻟْﺒُﺮِّ , ﻭَﺍﻟﺸَّﻌِﻴﺮُ ﺑِﺎﻟﺸَّﻌِﻴﺮِ , ﻭَﺍﻟﺘَّﻤْﺮُ ﺑِﺎﻟﺘَّﻤْﺮِ , ﻭَﺍﻟْﻤِﻠْﺢُ ﺑِﺎﻟْﻤِﻠْﺢِ ﻣِﺜْﻼً ﺑِﻤِﺜْﻞٍ ﺳَﻮَﺍﺀً ﺑِﺴَﻮَﺍﺀٍ ﻳَﺪًﺍ ﺑِﻴَﺪٍ , ﻓَﺈِﺫَﺍ ﺍﺧْﺘَﻠَﻔَﺖْ ﻫَﺬِﻩِ ﺍﻷَﺻْﻨَﺎﻑُ ﻓَﺒِﻴﻌُﻮﺍ ﻛَﻴْﻒَ ﺷِﺌْﺘُﻢْ ﺇِﺫَﺍ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﺪًﺍ ﺑِﻴَﺪٍ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ ‏) . “স্বর্ণ স্বর্ণের বিনিময়ে, রৌপ্য রৌপ্যের বিনিময়ে, গম গমের বিনিময়ে, যব যবের বিনিময়ে, খেজুর খেজুরের বিনিময়ে এবং লবন লবনের বিনিময়ে লেনদেন সমান সমান ও নগদ নগদ হতে হবে; তবে এ জাতীয় দ্রব্যগুলোর বিনিময় যখন একটা অপরটার সাথে হবে (অর্থাৎ পণ্য যখন এক জাতীয় না হয়ে ভিন্ন রকমের হবে), তখন তোমরা যেভাবে খুশি বিক্রয় করতে পারবে, যদি তা হাতে হাতে তথা নগদ নগদ হয়।” [11] এভাবে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন। ‘আলেমগণ এ ব্যাপারে জানে না’— তার এ উক্তিটি আলেমগণের উপর এক প্রকার অপবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়; কারণ, ঐ ব্যক্তি তো নিজেই আলেমদেরকে ‘আহলুল ‘ইলম’ ( ﺃﻫﻞ ﺍﻟﻌﻠﻢ ) তথা ‘বিজ্ঞজন’ বলে আখ্যায়িত করেছে; আর ‘ইলম ( ﺍﻟﻌﻠﻢ ) তথা জ্ঞান শব্দটি ‘জাহল’ ( ﺍﻟﺠﻬﻞ ) তথা মূর্খতা শব্দের বিপরীত; সুতরাং তারা যদি না জানেন, তাহলে তাদেরকে ‘আহলুল ‘ইলম’ ( ﺃﻫﻞ ﺍﻟﻌﻠﻢ ) বলে নামকরণ করাটা শুদ্ধ হয় না; অথচ তাঁরা আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক তাঁর রাসূলের উপর নাযিল করা বিধানের সীমা-পরিসীমা সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন এবং তারা জানেন ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের কারবার একটি নিষিদ্ধ কারবার, যা হারাম হওয়ার ব্যাপারে শরী‘য়তের স্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে। * * * চতুর্থ প্রশ্ন: কোন কোন স্বর্ণের দোকানদার ব্যবহৃত স্বর্ণের বিক্রেতার উপর তার নিকট থেকে নতুন স্বর্ণ ক্রয় করার জন্য শর্তারোপ করে— এ ক্ষেত্রে হুকুম কী? উত্তর: এই ধরনের শর্তারোপ করাও বৈধ নয়; কারণ, এটা কম-বেশি করে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণের ক্রয়-বিক্রয় করার একটা হীন কৌশল; আর এ ধরনের অপকৌশল ইসলামী শরী‘য়তে নিষিদ্ধ; কেননা, তা এক ধরনের প্রতারণা এবং আল্লাহ তা‘আলার বিধানাবলীর সাথে খেল- তামাশা করা। * * * পঞ্চম প্রশ্ন: কোনো স্বর্ণকার অপর কোনো স্বর্ণকারের কাছ থেকে বিক্রির জন্য স্বর্ণ নিয়ে আসলে সেখানে কি তাকে শব্দ উচ্চারণ করে ওকীল বানাতে হবে? নাকি তাদের মধ্যে প্রচলিত নিয়মে এটা থাকাই যথেষ্ট যে লোকটি তার কাছ থেকে যা গ্রহণ করেছে তা জানা দরেই বিক্রয় করবে? উত্তর: ওকীল বা প্রতিনিধি বানানো এমন একটি চুক্তি যা বুঝা যায় এমন প্রত্যেক কথা ও কাজ দ্বারা সংঘটিত হয়। সুতরাং যখন দোকানদারগণের মাঝে স্বাভাবিকভাবে প্রচলন থাকে যে, যখন তাদের কারও নিকট ক্রেতা গিয়ে দাঁড়ায় এবং তার নিকট কাঙ্খিত পণ্যটি পাওয়া না যায়, তখন সে তার পাশের দোকানে যায় এবং তার নিকট থেকে পণ্যটি এ শর্তে গ্রহণ করে যে, সে তার পণ্যটি বিক্রয় করে দিবে, আর এমতাবস্থায় গৃহীত পণ্যটির মূল্য নির্ধারণ করা থাকবে এবং সে পণ্যের মালিকের পক্ষে তা উভয়ের মধ্যকার নির্ধারণ করা মূল্যে বিক্রয় করে দিল; সুতরাং এ ধরনের চুক্তিতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ, ওকীল বা প্রতিনিধি বানানোর ব্যাপারে আলেমগণ বলেন যে, এটি এমন একটি চুক্তি যা বুঝা যায় এমন প্রত্যেক কথা ও কাজ দ্বারা সংঘটিত হয়। * * * ষষ্ঠ প্রশ্ন: সেই ক্ষেত্রে কী বিধান হবে— যখন কোনো ক্রেতা এসে (কোনো দোকান থেকে) স্বর্ণের পণ্যদ্রব্য ক্রয় করে, অতঃপর শর্ত করে যে, যদি তা ভালো না হয়, তাহলে সে পরিবর্তন করার জন্য অথবা তার মূল্য ফেরত নেওয়ার জন্য তা দোকানে ফিরিয়ে দিবে? আর এ ধরনের পরিস্থিতিতে শরী‘য়তসম্মত পদ্ধতি কী হবে— যেখানে কোনো কোনো ব্যক্তি শহর থেকে অনেক দূরে অবস্থান করার কারণে তার পক্ষে ঐ দিনে অথবা দ্বিতীয় দিনে দোকানে পুনরায় ফিরে আসা অসম্ভব হয়ে উঠে? উত্তর: এইরূপ পরিস্থিতিতে তার জন্য সবচেয়ে উত্তম ও সুন্দর পদ্ধতি হল চুক্তি সম্পন্ন করার আগেই স্বর্ণের পণ্যদ্রব্য নিয়ে তার পরিবারের নিকট চলে যাওয়া; অতঃপর যদি তা পছন্দ হয়, তাহলে সে দোকানদারের নিকট ফিরে আসবে এবং তার সাথে নতুন করে ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করবে, আর এটাই হল সবচেয়ে উত্তম। তবে যখন সে দোকানদারের নিকট থেকে তা ক্রয় করে এবং চুক্তি সম্পন্ন করে, তারপর সে তার জন্য ‘খিয়ার’ (পছন্দের স্বাধীনতা)-এর শর্ত করল, যদি তা তার পরিবারের পছন্দসই হয়, তাহলে তো কোনো সমস্যাই নেই; আর যদি পছন্দ না হয়, তাহলে তা ফেরত দিবে— তখন এ ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতবিরোধ দেখা যায়; তাঁদের কেউ কেউ এটাকে বৈধ মনে করেন এবং তার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয় মুসলিমগণ তাদের শর্ত অনুযায়ী কাজ-কারবার করবে’। আবার তাঁদের কেউ কেউ এটাকে অবৈধ মনে করেন এবং তার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, এটা এমন শর্ত যা হারামকে হালাল করে দেয়, আর তা হলো, চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পূর্বেই অনিবার্যভাবে (ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে) পৃথকীকরণ করা। প্রথম মতটি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যার মত বলে সাধারণভাবে প্রতীয়মান হয়। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় মতটি হাম্বলী মাযহাবের মত হিসেবে প্রসিদ্ধ। কারণ তাদের নিকট এমন প্রত্যেকটি চুক্তি, যার মধ্যে পারস্পরিক কবজাকরণ বা দখল নেয়ার শর্ত রয়েছে তাতে ‘খিয়ার’ (পছন্দের স্বাধীনতা)-এর শর্ত করা ঠিক নয়। আর এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, যে ব্যক্তি নিজেকে নিরাপদ ও দায়মুক্ত রাখতে চাইবে সে যেন প্রথম পদ্ধতিটি অনুসরণ করে— অর্থাৎ সে তা গ্রহণ করবে এবং চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পূর্বেই তার ব্যাপারে পরামর্শ করবে। * ‘চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে’ এর অর্থ কী? অর্থাৎ সে তাদেরকে বন্ধক হিসেবে কিছু মুদ্রা প্রদান করবে অথবা তার পক্ষ থেকে এমন কোনো পণ্য হস্তান্তর করবে, যাতে তারা এর মাধ্যমে তাকে (সম্পদ ফেরৎপাওয়ার ব্যাপারে) বিশ্বাস করতে পারে, এ অর্থে নয় যে, সে যা প্রদান করছে তা ঐ স্বর্ণের মূল্য, যা সে ক্রয় করতে যাচ্ছে। * * * সপ্তম প্রশ্ন: সেই ক্ষেত্রে কী বিধান হবে— কোনো কোনো স্বর্ণের দোকানদার ব্যবহার করা সোনা চকচকে থাকলে তা ক্রয় করার পর নতুন সোনার মূল্যে বিক্রি করার জন্য পেশ করে। এ জাতীয় বিক্রয় বৈধ হবে কি; নাকি ক্রেতাকে তা ব্যবহৃত বলে জানিয়ে দেওয়াটা জরুরি হবে; কিংবা তাকে অবহিত করার প্রয়োজন হবে না। কারণ ক্রেতাদের কেউ কেউ এ কথা জিজ্ঞাসা করে না যে, সেটা নতুন না পুরাতন? উত্তর: এ অবস্থায় বিক্রেতার জন্য আবশ্যক হলো, কল্যাণকামী হওয়া এবং নিজের জন্য যা ভাল মনে করে তার ভাইয়ের জন্যও তাই ভাল মনে করা। আর এটা সর্বজন বিদিত যে, যদি কোনো ব্যক্তি তোমার নিকট এমন কোনো জিনিস বিক্রি করল, যা হালকাভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং তাতে ব্যবহারের কোন চিহ্ন পড়েনি, আর সে তোমার কাছে তা নতুন বলে বিক্রি করেছে, তাহলে তুমি নিঃসন্দেহে এটাকে তার পক্ষ থেকে প্রতারণা ও ধোকাবাজি বলে গণ্য করবে; সুতরাং তুমি যখন পছন্দ কর না যে, জনগণ তোমার সাথে এ ধরনের আচরণ করুক, তখন কিভাবে তোমার জন্য মানানসই হবে যে, তুমি অন্যের সাথে এ ধরনের (প্রতারণামূলক) আচরণ করবে; আর এর উপর ভিত্তি করেই কোনো মানুষের জন্য এ ধরনের কাজ করা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ হবে না, যতক্ষণ না সে ক্রেতাকে বিষয়টি স্পষ্ট না করবে এবং তাকে বলে দিবে যে, এ জিনিসটি হালকা ব্যবহার করা হয়েছে অথবা এ ধরনের কিছু। * * * অষ্টম প্রশ্ন: কোন ব্যক্তি স্বর্ণের কারখানায় গহনা তৈরির জন্য তার স্বর্ণ হস্তান্তর করে, তারপর কখনও কখনও কারখানায় স্বর্ণ গলানোর সময় তার স্বর্ণ অন্যের স্বর্ণের সাথে মিশে যায়, কিন্তু কারখানা থেকে মালিকপক্ষ তার নিকট তা (গহনা) হস্তান্তর করার সময় তার দেয়া স্বর্ণের সম ওজনেই হস্তান্তর করে— এমতাবস্থায় তার বিধান কী হবে? উত্তর: কারখানার কারিগরের উপর আবশ্যকীয় কর্তব্য হল মানুষের সম্পদসমূহের ক্ষেত্রে একজনের সম্পদ অপরজনের সম্পদের সাথে মিশ্রিত না করা, যখন স্বর্ণের মান বিভিন্ন রকম হয়, তখন প্রত্যেকটিকে পৃথক পৃথক করে রাখা। আর যখন যখন স্বর্ণের মান বিভিন্ন রকম না হয়ে একই মানের হয়, তখন এ ধরনের মিশ্রণে কোন সমস্যা নেই; কেননা, তাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। প্রশ্ন: স্বর্ণ হস্তান্তর করার সময় গহনা তৈরির মজুরি দিয়ে দেওয়া কি জরুরি, নাকি আমরা চলমান প্রক্রিয়ায় পরেও তা আদায় করতে পারব? উত্তর: মজুরি তখনই দিয়ে দেওয়া জরুরি নয়; কারণ, এ পারিশ্রমিক তো কাজের উপর নির্ভর করবে (স্বর্ণের সাথে নয়)। সুতরাং মজুরি যদি গহনা গ্রহণ করার সময় প্রদান করে, তাহলে তা ভালো, নতুবা পরবর্তীতে প্রদান করলেও তা শুদ্ধ হবে। * * * নবম প্রশ্ন: যখন কোন কোন স্বর্ণ ক্রয়কারী ব্যক্তি নতুন স্বর্ণের মূল্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, অতঃপর যখন তার মূল্য সম্পর্কে জানতে পারে, তখন দাঁড়িয়ে তার নিকটে থাকা ব্যবহৃত স্বর্ণ বের করে এবং তা বিক্রি করে দেয়; আর তাকে দিরহাম বা প্রচলিত মুদ্রায় তার মূল্য পরিশোধ করে দেয়ার সময় সে দাঁড়িয়ে যায় এবং নতুন সামগ্রী ক্রয় করে— এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? উত্তর: এটা দোষনীয় নয়, যখন সেখানে পূর্ব থেকেই কোন প্রকার সমঝোতা ও বুঝাপড়া না থাকে; তবে ইমাম আহমদ র. এর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সে চলে যাবে এবং অন্য জায়গায় অনুসন্ধান করবে, তারপর সেখান থেকে ক্রয় করবে; আর এটা যদি সহজ না হয়, তাহলে সে যার নিকট প্রথমে বিক্রয় করেছে, তার নিকট ফিরে আসবে এবং তার নিকট থেকে ক্রয় করবে, এইভাবে তার অপকৌশল গ্রহণ করার সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকা হবে। * * * দশম প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তি দোকানদারের নিকট স্বর্ণ বিক্রি করল (কিন্তু অর্থ গ্রহণ করেনি), অতঃপর সে দোকানদারের নিকট থেকে অন্য স্বর্ণ ক্রয় করল প্রায় সেই পরিমাণ, যেই পরিমাণ সে তার কাছে বিক্রি করেছে। অতঃপর ক্রেতা ক্রয়কৃত স্বর্ণের মূল্য ঐ অর্থ থেকে পরিশোধ করল যা সে দোকানদারের নিকট বিক্রি করেছিল কিন্তু উক্ত মূল্য গ্রহণ না করে দোকানদারের কাছে রেখে দিয়েছিল। — এমতাবস্থায় তার বিধান কী হবে? উত্তর: এই ধরনের ক্রয়-বিক্রয় জায়েয নয়; কেননা, যখন কেউ কোনো জিনিস এমন কোনো মূল্যে বিক্রি করে যে মূল্য ক্রেতা থেকে বিক্রেতা নিজের আয়ত্বে নিয়ে আসে নি, আর সে ঐ মূল্যের বিনিময়ে বিক্রেতার নিকট থেকে এমন কিছু ক্রয় করতে চাচ্ছে যা বাকিতে বিক্রয় করা বৈধ নয়, তখন ইসলামী আইনশাস্ত্রবিদগণের সুস্পষ্ট বক্তব্য হল— এমন করাটা হারাম; কারণ হতে পারে সে এভাবে মূল্য কবজা করার পূর্বেই অন্য কিছু ক্রয় করে সেটাকে অপকৌশল করে এমন জিনিস বিক্রি করতে চায় যা বাকীতে বিক্রয় করা জায়েয নয়। আর যখন তা একই শ্রেণীভুক্ত হবে, তখন তো অপকৌশলটি হবে (দু’ কারণে নিষিদ্ধ, তা হচ্ছে) ‘অতিরিক্ত গ্রহণ জনিত সুদ’ ( ﺭﺑﺎ ﺍﻟﻔﻀﻞ ) [12] এবং ‘বাকি তথা বিলম্ব জনিত সুদ’ ( ﺭﺑﺎ ﺍﻟﻨﺴﻴﺌﺔ ) [13] ভিত্তিক। * * * একাদশ প্রশ্ন: যে ব্যক্তি স্বর্ণ ক্রয় করল কিন্তু তার কিছু মূল্য বাকী রাখল এবং বলল: যখন সম্ভব হবে, তখন আমি তোমার মূল্য পরিশোধ করে দিব— এমতাবস্থায় তার বিধান কী হবে? উত্তর: এই কাজ বৈধ নয়; আর যখন এ ধরনের কাজ করবে, তখন যেটুকুর বিনিময় গ্রহণ করা হয়েছে ততটুকুর ক্রয়-বিক্রয় শুদ্ধ হবে; আর যেটুকুর বিনিময় গ্রহণ করা হয়নি ততটুকুতে ক্রয়-বিক্রয় বাতিল বলে গণ্য হবে। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‏« … ﺑِﻴﻌُﻮﺍ ﻛَﻴْﻒَ ﺷِﺌْﺘُﻢْ ﺇِﺫَﺍ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﺪًﺍ ﺑِﻴَﺪٍ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ ‏) . “ … তোমরা যেভাবে খুশি বিক্রয় কর, যদি তা হাতে হাতে তথা নগদ নগদ হয়।” [14] * * * দ্বাদশ প্রশ্ন: সেই ক্ষেত্রে বিধান কী হবে— যে ব্যক্তি স্বর্ণ ক্রয় করল এবং তার উপরই ক্রয়-বিক্রয় শেষ করল, অতঃপর মূল্য পরিশোধ করল এবং মোট মূল্যের কিছু অংশ বাকি থাকল; ফলে সে কি বাকী মূল্য নিয়ে আসার জন্য যে কোনো জায়গায় (যেমন— গাড়ি কিংবা ব্যাংক থেকে নিয়ে আসার জন্য) যাওয়া জায়েয হবে? আর এ ক্ষেত্রে সে কি বাকি মূল্য নিয়ে আসার পরেই স্বর্ণ গ্রহণ করবে? এ ধরনের কাজ ঠিক হবে কিনা, নাকি বাকি মূল্য নিয়ে আসার পরে পুনরায় চুক্তি নবায়ন করা আবশ্যক হবে? উত্তর: সবচেয়ে উত্তম হল বাকি মূল্য নিয়ে আসার পরে চুক্তি নবায়ন করা এবং এতে কোন ক্ষতি নেই, যা চুক