জান্নাতে যাওয়ার জন্য কতটুকু আমল প্রয়োজন?


জান্নাতে যাওয়ার জন্য কতটুকু আমাল
প্রয়োজন ?
JANNATER POTH
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে শুধুমাত্র তাঁর
ইবাদাত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন । এবং তিনি তাঁর ইবাদাত
আনুগত্যকে মানুষের দৈনন্দিন মুআমালাত মুআশারাত সমস্ত
কিছুর ভিতরেই দিয়ে দিয়েছেন এবং এর সীমারেখাও
দিয়ে দিয়েছেন । কিন্তু তারপরও কিছু মানুষ শয়তানের
ধোঁকায় পড়ে বৈরাগ্যবাদের নামে , সুফিবাদের নামে ,
যুহদের নামে , সমাজ-সংসারের দ্বায়িত্ব কর্তব্য ভুলে
শুধু ইবাদাত , জিকির-আযকার , খানকা , চিল্লা নিয়ে পড়ে
থাকতে চায় । তাদের এই নীতি ইসলামের সাথে
কতটুকু সম্পর্ক রাখে আজকে আমরা তাই যাচাই করে
দেখবো । আরও দেখবো একজন মানুষকে
জান্নাতে যাবার জন্য কতটুকু আমাল করতে হবে ।
আসুন আমরা আজকে এমনই কিছু হাদীস নিয়ে
আলোচনা করি ……
এক.
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) থেকে
বর্ণিত , তিনি বলেন :
রাসূল ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) আমার নিকট এসে
বললেন : আমাকে সংবাদ দেয়া হয়েছে তুমি পুরো
রাত স্বালাত আদায় কর এবং প্রতিদিন স্বিয়াম রাখো । এ
সংবাদ কি সঠিক নয় ? আমি বললাম অবশ্যই । তিনি
বললেন : তাহলে তুমি আর এমন করো না । তুমি
রাত্রে স্বালাতও আদায় করবে এবং ঘুমাবেও । স্বিয়াম
পালন করবে এবং কখনো কখনো আবার রাখবেনা ।
কারণ , তোমার উপর তোমার শরীরেরও অধিকার
আছে । তেমনিভাবে চোখ , মেহমান এবং
স্ত্রীরও । হয়তোবা তুমি বেশি দিন বেঁচে
থাকবে । তাই তোমার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে ,
তুমি প্রতি মাসে তিনটি স্বিয়াম পালন করবে । কারণ , তুমি
একটি নেকী করলে দশটি নেকীর সাওয়াব পাবে
। এ হিসাবে প্রতি মাসে তিনটি স্বিয়াম পালন করলে
পুরো বছর স্বিয়াম পালন করার সাওয়াব পাবে । হযরত
আব্দুল্লাহ বলেন : আমি কঠোরতা দেখিয়েছি । তাই
আমার উপর কঠিন করা হয়েছে । আমি বললাম : আমি
এর চাইতেও বেশি পারি । তিনি বললেন : তাহলে প্রতি
সপ্তাহে তিনটি স্বিয়াম পালন করবে । হযরত আব্দুল্লাহ
বলেন : আমি কঠোরতা দেখিয়েছি । তাই আমার
উপর কঠিন করা হয়েছে । আমি বললাম : আমি এর
চাইতেও বেশি পারি । তিনি বললেন : তাহলে আল্লাহর
নাবী দাউদ ( ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺴّﻼﻡ ) এর ন্যায় স্বিয়াম পালন
করবে । আমি বললাম : দাউদ ( ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺴّﻼﻡ ) এর স্বিয়াম
কেমন ? তিনি বললেন : অর্ধ বছর । অর্থাৎ একদিন
পর একদিন । অন্য বর্ণনায় রয়েছে , আমি এর
চাইতেও ভালো পারি । তিনি বললেন : এর চাইতে
আর ভালো হয় না । শেষ জীবনে হযরত
আব্দুল্লাহ বলেন : এখন তিনদিন মেনে নেয়ায়
আমার নিকট আমার পরিবার , ধন-সম্পদ চাইতেও বেশি
পছন্দনীয় যা রাসূলুল্লাহ ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ )
বলেছিলেন ।
(বুখারী , হা/৬১৩৪ ; মুসলিম হা/১১৫৯)
অন্য বর্ণনায় তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ
ﻭﺳﻠﻢ ) আমাকে বলেছেন :
তুমি প্রতি মাসে কুরআন মাজীদ এক খতম দিবে ।
হযরত আব্দুল্লাহ বলেন : আমি বললাম : হে
আল্লাহর নাবী ! ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) আমি আরো
ভাল পারি । তিনি বললেন : তাহলে প্রতি বিশ দিনে এক
খতম দিবে । আমি বললাম : হে আল্লাহর
নাবী ! ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) আমি আরো ভাল পারি ।
তিনি বললেন : তাহলে প্রতি দশ দিনে এক খতম
দিবে । আমি বললাম : হে আল্লাহর নাবী ! ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ
ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) আমি আরো ভাল পারি । তিনি বললেন :
তাহলে প্রতি সপ্তাহে এক খতম দিবে । কিন্তু এর
চাইতে আর বেশি পড়বে না । অন্য বর্ণনায়
রয়েছে , হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ
ﻋﻨﻪ) বলেন : আমি এর চাইতেও বেশি পড়তে
সক্ষম । তখন রাসূল ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) বললেন :
তাহলে তুমি তিন দিনে এক খতম দিবে । ও ব্যক্তি
কুর’আন কিছুই বুঝেনি যে তিন দিনের কমে
কুর’আন খতম করেছে ।
(মুসলিম , হা/১১৫৯ ; আবু দাউদ , হা/১৩৯০ , ১৩৯১ ,
১৩৯৪ ; তিরমিযী , হা/২৯৪৯ ; ইবনু মাজাহ , হা/১৩৬৪)
একদা হযরত সালমান ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) তার অনুসারী ভাই
হযরত আবুদ্দারদা ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) এর সাক্ষাতে তার
বাড়ি গেলেন । দেখলেন , উম্মুদ্দারদা ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ
ﻋﻨﻪ) ময়লা কাপড় পরিহিতা । তখন তিনি তাকে বললেন :
তুমি এমন কাপড়ে কেন ? তোমার তো স্বামী
আছে । তিনি বললেন : তোমার ভাই আবুদ্দারদা’র
দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ নাই ।
ইতিমধ্যে আবুদ্দারদা ঘরে ফিরে সালমান ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ
ﻋﻨﻪ) এর জন্য খানা প্রস্তুত করে বললেন : খাও ।
আবুদ্দারদা ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) বললেন : আমি এখন
খাবোনা । কারণ , আমি রোজাদার । সালমান ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ
ﻋﻨﻪ) বললেন : আমি খাবোনা যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি না
খাবে । অতএব আবুদ্দারদা ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) খানা
খেলেন । যখন রাত্র হয়ে গেল তখন
আবুদ্দারদা ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) নফল স্বালাত আদায়
করতে গেলেন । এমন সময় হযরত সালমান ( ﺭﺿﻲ
ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) বললেন : ঘুমাও । তখন আবুদ্দারদা ( ﺭﺿﻲ
ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) ঘুমিয়ে গেলেন । অতঃপর আবারো হযরত
আবুদ্দারদা ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) নফল স্বালাত আদায়
করতে গেলেন । এমন সময় হযরত সালমান ( ﺭﺿﻲ
ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) বললেন : ঘুমাও । তবে রাত্রের শেষ
ভাগে হযরত সালমান ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) হযরত
আবুদ্দারদা ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) কে বললেন : এখন
উঠতে পারো । অতএব উভয়ে উঠে স্বালাত আদায়
করলেন । অতঃপর হযরত সালমান ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ )
হযরত আবুদ্দারদা ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) কে উদ্দেশ্য
করে বললেন : নিশ্চয়ই তোমার উপর তোমার
প্রভুর অধিকার রয়েছে । তেমনি ভাবে তোমার
এবং তোমার পরিবারেও । অতএব প্রত্যেক অধিকার
পাওনাদারকে তার অধিকার অবশ্যই দিতে হবে ।
ভোর বেলায় হযরত আবুদ্দারদা ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ )
নাবী ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) কে উক্ত ঘটনা জানালে
তিনি বলেন : সালমান ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) সত্যই
বলেছে । (বুখারী , হা/৬১৩৯)
হযরত আনাস ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) বলেন : একদা তিন
ব্যক্তি নবী ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) এর স্ত্রীদের
নিকট এসে তাঁর ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে
তাদেরকে সে সম্পর্কে জানিয়ে দেয়া হলো ।
তারা তা সামান্য মনে করলো এবং বললো : নবী
( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) এর সাথে আমাদের কোন
তুলনাই হয়না । তাঁর আগের-পরের সকল গুণাহ ক্ষমা
করে দেয়া হয়েছে । অতঃপর তাদের একজন
বললো : আমি কিন্তু যতদিন বেঁচে থাকবো সর্বদা
পুরো রাত নফল স্বালাত আদায় করবো ।
দ্বিতীয়জন বললো : আমি পুরো জীবন নফল
সিয়াম পালন করবো । কখনো সিয়াম ছাড়বোনা ।
তৃতীয়জন বললো : আমি কখনও বিবাহ করবোনা
এমনকি কখনও মহিলাদের সংস্পর্শেও যাবোনা ।
রাসূল ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) কে এ সম্পর্কে
জানানো হলে তিনি বলেন : “তোমরাই কি এমন
এমন বলেছো ? জেনে রাখো , আল্লাহর
কসম ! নিশ্চয়ই আমি তোমাদের চাইতেও
অনেক বেশি আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করি । তবুও
আমি কখনও কখনও সিয়াম পালন করি । আবার কখনও
ছেড়ে দেই । রাত্রে স্বালাত আদায় করি । আবার
ঘুমও যাই । বিবাহও করি । অতএব যে ব্যক্তি আমার
আদর্শ থেকে বিমুখ হলো সে আমার উম্মাত
নয় ।” (সহীহুল বুখারী , হা/৫০৬৩ ; মুসলিম ,
হা/১৪০১)
অধিক পরিমাণে ইবাদাত করতে গেলে যদি উম্মাহ
থেকেই খারিজ হয়ে যেতে হয় , তাহলে
জান্নাতে যাওয়ার জন্য কতটুকু আমাল প্রয়োজন ?
আবু হুরাইরাহ ( ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠّﻪ ﻋﻨﻪ ) হতে বর্ণিত । তিনি
বলেন , এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ )
এর নিকট এসে নিবেদন করলো , হে আল্লাহর
রাসূল ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) ! আমাকে এমন একটি
কাজের কথা বলুন যা করলে আমি জান্নাতে প্রবেশ
করবো । নাবী ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) বললেন ,
আল্লাহর ইবাদাত কর , কাউকে তার শরীক করো না
, ফরজ স্বালাত ক্বায়িম করবে , ফরজ যাকাত প্রদান
করবে এবং রামাদ্বান মাসের সিয়াম পালন করবে । এ
কথা শুনে লোকটি বললো , সেই সত্তার ক্বসম ,
যাঁর হাতে আমার জীবন ! আমি এর চেয়ে বেশিও
করবো না , কমও করবো না । সেই ব্যক্তি চলে
যাবার পর নাবী ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ) বললেন ,
কেউ যদি কোন জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখে
খুশী হতে চায় , সে যেন এই ব্যক্তিকে
দেখে নেয় । (তাহক্বীক্ক মিশকাতুল মাসাবিহ ,
হা/১৪ ; সহীহুল বুখারী , হা/১৩৯৭ ; সহীহ মুসলিম ,
হা/১৪)
হাদীসে উল্লেখিত “আমি এর চেয়ে বেশিও
করবো না , কমও করবো না ।” এর অর্থ এটা নয়
যে , আমি হাদীসে উল্লেখিত কয়েকটি আমালের
বেশি বা কম আর কোন আমালই করবো না । বরং
আমি যা কিছু করবো দলীল ভিত্তিক করবো ,
দলীলের বাহিরে , নাবী ( ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ )
এর সুন্নাহর বাহিরে আমি কোন আমাল করবো না
আবার এর থেকে কমও করবো না । আর এর
মাধ্যমেই আমাদের আমাল হবে জান্নাতীদের
মতো আমাল এবং জান্নাতের পথ আমাদের জন্য
সহজ হয়ে যাবে ।
তাই আসুন আমরা আমাদের কৃত আমালগুলি একটু যাচাই
করে দেখি সেগুলি দলীলভিত্তিক হচ্ছে কিনা ,
কম/বেশি হয়ে যাচ্ছে কিনা ? মহান আল্লাহ আমাদের
তাওফীক্ক দান করুন । আমীন !