কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর অর্থ, শর্তসমূহ এবং ব্যক্তি ও সমাজ জীবন


الحمد لله رب العالمين و العاقبة للمتقين والصلاة و السلام على رسوله الأمين وعلى آله و صحبه أجمعين و بعد ،
বর্তমান পৃথিবীর এক পঞ্চমাংশ মানুষ মুসলিম হলেও প্রকৃত মুসলিম ও ঈমানদারের সংখ্যা উল্লেখিত অংকের যে বহুগুণ নীচে তা অস্বীকার করার উপায় নেই; কারণ অনেক লোক নামধাম দিয়ে ইসলাম ও ঈমানের দাবী করলেও প্রকৃত অর্থে তারা শির্কের বেড়াজাল থেকে নিজদের মুক্ত করতে পারেনি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَمَا يُؤۡمِنُ أَكۡثَرُهُم بِٱللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشۡرِكُونَ ١٠٦ ﴾ [يوسف: ١٠٦]
‘‘অনেক মানুষ আল্লাহর উপর ঈমান আনলেও তারা কিন্তু মুশরিক’’। (সূরা ইউসূফ, আয়াত ১০৬)

 

অনেক মানুষ তাদের জীবনে কোনো এক সময় ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’’ এ কালেমার মৌখিক স্বীকৃতি দান করেই নিজদেরকে খাটি ঈমানদার মনে করে থাকে, যদিও তাদের কাজ কর্ম ঈমান আক্বীদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী হোক না কেন। এর কারণ হলো ঐ ব্যক্তিরা কেন আল্লাহ্‌র উপর ঈমান এনেছে, অথবা তাদের নিকট ঈমান কি দাবী করে এবং কি কাজ করলে ঈমানের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যাবে এসম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল নয়।
 গনেশ নামে কোনো ব্যক্তি একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করার পরেও কালি পূজা করে বলে অথবা লক্ষ্ণীর নিকট কল্যাণ কামনা করে বলে তাকে মুশরিক বলা হয়। আবার ‘আবদুল্লাহ্ নামক কোনো ব্যক্তি আল্লাহ্‌র একত্ববাদে বিশ্বাস করার পর যদি গোর পূজা বা পীর পূজা করে অথবা খাজাকে সাজদা করে বা মৃত ব্যক্তির নিকট কল্যাণ কামনা করে তাহলে গনেশের মধ্যে ও এ আব্দুল্লার মধ্যে পার্থক্য কোথায়? মূলতঃ এদের দুজনের নামে পার্থক্য থাকলেও উভয়ের কর্ম এবং পথ কিন্তু একই। দ্বিতীয় ব্যক্তি তার জীবনের কোনো এক সময় ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’’ এ কালেমা সাক্ষ্য দান করে থাকলেও তা ছিল একান্তই গতানুগতিকভাবেই সে তা করেছে, তাই সে তাওহীদের রাজপথকে পরিহার করে ঘুরপাক খাচ্ছে শির্কের অন্ধকার গলিতে। অন্তত মুসলিমদের জীবনে এমনটি যেন না ঘটে এ দৃষ্টিকে সামনে রেখে লেখক এই পুস্তিকাটিতে কালেমা ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’’ এর অর্থ এবং এর দাবী ইত্যাদি প্রসঙ্গে তথ্য ভিত্তিক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন। নির্ভেজাল ইসলামী আক্বীদাহ নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য বইটিকে মাইল ফলক হিসাবে ধরা যায়। বইটির অপরিসীম গুরুত্ব অনুধাবন করে বাংলা ভাষায় বইটি অনুবাদ করার জন্য আমি প্রয়াসী হই।
যথাসময়ে অনুবাদের কাজ শেষ করতে পেরে আমি আল্লাহ্‌র শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। বইটি পড়ে একজন পাঠক ও যদি সঠিক ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত হতে পারেন তাহলে আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা সার্থক হবে বলে মনে করি। আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে খাঁটি ঈমানদার হয়ে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করার তাওফীক দান করুন। (আমীন)
মুহাম্মদ মতিউল ইসলাম ইবন আলী আহমাদ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য। আমরা তাঁরই নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁরই নিকট তওবা করি। আমাদের নাফসের সকল প্রকার বিপর্যয় ও কুকীর্তি হতে রক্ষা করার জন্য তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করি। আল্লাহ্ যাকে হিদায়েত দান করেন তার কোনো পথভ্রষ্টকারী নেই, আর যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার কোনো পথ প্রদর্শনকারী নেই।
অতঃপর আমি সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ্ এক এবং অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরীক নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্‌র বান্দাহ্ ও রাসুল। আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে কিয়ামত পর্যন্ত সালাত ও সালাম বর্ষিত হউক তাঁর রাসূল, আহলে বাইত এবং সমস্ত সাহাবারদের উপর আর ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের উপর যারা অনুসরণ করেছেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এবং আঁকড়ে ধরেছেন তাঁর সুন্নাতকে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাঁর যিকির করার জন্য আদেশ করেছেন এবং তিনি তাঁর যিকিরকারীদের প্রশংসা করেছেন ও তাদের জন্য পুরস্কারের ওয়াদা করেছেন। তিনি আমাদেরকে সাধারণভাবে সর্বাবস্থায় তাঁর যিকির করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আবার বিভিন্ন ইবাদত সম্পন্ন করার পর তাঁর যিকির করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেন,
﴿ فَإِذَا قَضَيۡتُمُ ٱلصَّلَوٰةَ فَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ قِيَٰمٗا وَقُعُودٗا وَعَلَىٰ جُنُوبِكُمۡۚ﴾ [النساء: ١٠٣]
“অতঃপর তোমরা যখন সালাত সমাপ্ত কর তখন দণ্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহর যিকির কর’’। (সূরা আন্ নিসা, ১০৩) আল্লাহ্ আরো বলেন,
﴿ فَإِذَا قَضَيۡتُم مَّنَٰسِكَكُمۡ فَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ كَذِكۡرِكُمۡ ءَابَآءَكُمۡ أَوۡ أَشَدَّ ذِكۡرٗاۗ﴾ [البقرة: ٢٠٠]
‘‘আর যখন তোমরা হজ্জের যাবতীয় অনুষ্ঠানাদি সমাপ্ত করবে তখন আল্লাহর যিকির করবে, যেমন করে স্মরণ করতে তোমাদের পিতৃপুরুষদেরকে, বরং (আল্লাহকে) এর চেয়েও বেশী স্মরণ করবে’’। (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২০০)
বিশেষ করে হজ্জ পালনের সময় তাঁর যিকির করার জন্য বলেন,
﴿فَإِذَآ أَفَضۡتُم مِّنۡ عَرَفَٰتٖ فَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ عِندَ ٱلۡمَشۡعَرِ ٱلۡحَرَامِۖ﴾ [البقرة: ١٩٨]
“অতঃপর যখন আরাফাত থেকে তোমরা ফিরে আসবে তখন (মুযদালেফায়) মাশ্আরে হারাম এর নিকট আল্লাহ্‌র যিকির কর। (সূরা আল-বাক্বারাহ, ১৯৮)
তিনি আরো বলেন,
﴿ لِّيَشۡهَدُواْ مَنَٰفِعَ لَهُمۡ وَيَذۡكُرُواْ ٱسۡمَ ٱللَّهِ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡلُومَٰتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّنۢ بَهِيمَةِ ٱلۡأَنۡعَٰمِۖ﴾ [الحج: ٢٨]
“এবং তারা যেন নির্দিষ্ট দিনগুলিতে আল্লাহ্ তাদেরকে চতুস্পদ জন্তুর মধ্য থেকে যে সমস্ত রিযক দিয়েছেন তার উপর আল্লাহ্‌র নাম স্মরণ করে। (সূরা-আল-হাজ্জ, ২৮)
তিনি আরো বলেন,
﴿ ۞وَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ فِيٓ أَيَّامٖ مَّعۡدُودَٰتٖۚ﴾ [البقرة: ٢٠٣]
“আর এই নির্দিষ্ট সংখ্যক কয়েক দিনে আল্লাহর যিকির কর”। (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২০৩)
এছাড়া আল্লাহর যিকিরের লক্ষ্যে তিনি সালাত প্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,
﴿وَأَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ لِذِكۡرِيٓ ١٤ ﴾ [طه: ١٤]
“আমার যিকিরের জন্য সালাত প্রতিষ্ঠিত কর”। (সূরা ত্বাহা, ১৪)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«َإِنَّ هَذِهِ الْأَيَّامَ أَيَّامُ أَكْلٍ وَشُرْبٍ وَذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ»
“তাশরিকের দিনগুলো হচ্ছে খাওয়া পানাহার এবং আল্লাহর যিকিরের জন্য।” (মুসলিম: ১১৪১; আবু দাউদ: ২৮১৩)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ ذِكۡرٗا كَثِيرٗا ٤١ وَسَبِّحُوهُ بُكۡرَةٗ وَأَصِيلًا ٤٢ ﴾ [الاحزاب: ٤١،  ٤٢]
“হে ঈমানদারগণ আল্লাহকে বেশী বেশী করে যিকির কর এবং সকাল সন্ধ্যা তাঁর তাসবীহ পাঠ কর। (সূরা আল-আহযাব, ৪১-৪২)
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, সবচেয়ে উত্তম যিক্‌র হলো,
(لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ(
“আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য মাবুদ নেই, তিনি একক তাঁর কোনো শরীক নেই।
 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সবচেয়ে উত্তম দো‘আ আরাফাত দিবসের দো‘আ এবং সবচেয়ে উত্তম কথা যা আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ বলেছেন, তা হলো:
(لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ ، لَهُ الـمُـلْكُ وَ لَهُ الحَمْدُ وَ هُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ)
উচ্চারণঃ লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা- শারীকালাহু, লাহুল মুলক ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।
“আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য মাবুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই, রাজত্ব একমাত্র তাঁরই জন্য এবং প্রশংসা একমাত্র তাঁরই জন্য, আর তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান”।
·         ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ আল্লাহর যিকিরসমূহের মধ্যে অন্যতম। 
এই মহামূল্যবান বাণীর রয়েছে বিশেষ মর্যাদা এবং এর সাথে সম্পর্ক রয়েছে বিভিন্ন হুকুম আহকামের। আর এই কালেমার রয়েছে এক বিশেষ অর্থ ও উদ্দেশ্য এবং কয়েকটি শর্ত, ফলে এ কালেমাকে গতানুগতিক মুখে উচ্চারণ করাই ঈমানের জন্য যথেষ্ট নয়। এ জন্যই আমি আমার লেখার বিষয়বস্তু হিসাবে এ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছি এবং আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাকে এবং আপনাদেরকে এই মহান কালেমার ভাবাবেগ ও মর্মার্থ অনুধাবন করতঃ এর দাবী অনুযায়ী তাঁর সমস্ত কাজ করার তাওফিক দান করেন এবং আমাদেরকে ঐ সমস্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন যাঁরা এই কালেমাকে সঠিক অর্থে বুঝতে পেরেছেন।
 প্রিয় পাঠক, এ কালেমার ব্যাখ্যা দানকালে আমি নিম্নবর্তী বিষয়গুলোর উপর আলোকপাত করব:
·         মানুষের জীবনে এ কালেমার মর্যাদা
·         এর ফযিলত
·         এর ব্যাকরণিক ব্যাখ্যা
·         এর স্তম্ভ বা রুকনসমূহ
·         এর শর্তাবলী
·         এর অর্থ এবং দাবী
·         কখন মানুষ এ কালেমা পাঠে উপকৃত হবে আর কখন উপকৃত হবে না
·         আমাদের সার্বিক জীবনে এর প্রভাব কি ?
এবার আল্লাহর সাহায্য কামনা করে কালেমা ” لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ “ এর গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে এখন আমি আলোচনা শুরু করছি।
1.  ব্যক্তি জীবনে কালেমা لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ এর গুরুত্ব ও মর্যাদা
এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বাণী যা মুসলিমগণ তাদের আযান, ইকামাত, বক্তৃতা-বিবৃতিতে বলিষ্ঠ কন্ঠে ঘোষণা করে থাকে, এটি এমন এক কালেমা যার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আসমান জমিন, সৃষ্টি হয়েছে সমস্ত মাখলুকাত। আর এর প্রচারের জন্য আল্লাহ যুগে যুগে পাঠিয়েছেন অসংখ্য রাসুল এবং নাযিল করেছেন আসমানি কিতাবসমূহ,  প্রণয়ন করেছেন অসংখ্য বিধান। প্রতিষ্ঠিত করেছেন মীযান এবং ব্যবস্থা করেছেন পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবের, তৈরী করেছেন জান্নাত এবং জাহান্নাম। এই কালেমাকে স্বীকার করা এবং অস্বীকার করার মাধ্যমে মানব সম্প্রদায় ঈমানদার এবং কাফির এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। অতএব সৃষ্টি জগতে মানুষের কর্ম, কর্মের ফলাফল, পুরস্কার অথবা শাস্তি সব কিছুরই উৎস হচ্ছে এই কালেমা। এরই জন্য উৎপত্তি হয়েছে সৃষ্টি কুলের, এ সত্যের ভিত্তিতেই আখেরাতের জিজ্ঞাসাবাদ এবং এর ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হবে সওয়াব ও শাস্তি। এই কালেমার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মুসলিমদের কিবলা এবং এ হলো মুসলিমদের জাতি সত্তার ভিত্তি-প্রস্তর এবং এর প্রতিষ্ঠার জন্য খাপ থেকে খোলা হয়েছে জিহাদের তরবারী।
বান্দার উপর এটাই হচ্ছে আল্লাহর অধিকার, এটাই ইসলামের মূল বক্তব্য ও শান্তির আবাসের (জান্নাতের) চাবিকাঠি এবং পূর্বা-পর সকলই জিজ্ঞাসিত হবে এই কালেমা সম্পর্কে।
আল্লাহ কিয়ামতের দিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি কার ইবাদত করেছ? নবীদের  ডাকে কতটুকু সাড়া দিয়েছ? এ দুই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ব্যতীত কোনো ব্যক্তি তার দুটো পা সামান্যতম নাড়াতে পারবে না। আর প্রথম প্রশ্নের সঠিক উত্তর হবে ” لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ “কে ভালোভাবে জেনে এর স্বীকৃতি দান করা এবং এর দাবী অনুযায়ী কাজ করার মাধ্যমে। আর দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর সঠিক হবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাসূল হিসাবে মেনে তাঁর নির্দেশের আনুগত্যের মাধ্যমে। আর এ কালেমাই হচ্ছে কুফর ও ইসলামের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টিকারী। এ হচ্ছে আল্লাহ ভীতির কালেমা ও মজবুত অবলম্বন।
এবং এ কালেমাই ইব্রাহীম আলাইহিস্‌সালাম রেখে গেলেন
﴿ وَجَعَلَهَا كَلِمَةَۢ بَاقِيَةٗ فِي عَقِبِهِۦ لَعَلَّهُمۡ يَرۡجِعُونَ ٢٨ ﴾ [الزخرف: ٢٨]
“অক্ষয় বাণীরূপে তাঁর পরবর্তীতে তাঁর সন্তানদের জন্য যেন তারা ফিরে আসে এ পথে”। [সূরা আয-যুখরুফ: ২৮]
এই সেই কালেমা যার সাক্ষ্য আল্লাহ তা‘আলা স্বয়ং নিজেই নিজের জন্য দিয়েছেন, আরো দিয়েছেন ফিরিশতাগণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿شَهِدَ ٱللَّهُ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَأُوْلُواْ ٱلۡعِلۡمِ قَآئِمَۢا بِٱلۡقِسۡطِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ ١٨ ﴾ [ال عمران: ١٨]
“আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন, নিশ্চয় তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য মাবুদ নেই এবং ফিরেশতাগণ ও ন্যায়নিষ্ঠ জ্ঞানীগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়’’। (সূরা আলে ইমরান, ১৮)
এ কালেমাই ইখলাস তথা সত্যনিষ্ঠার বাণী, এটাই সত্যের সাক্ষ্য ও তার দাওয়াত এবং শির্ক এর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার বাণী এবং এ জন্যই সমস্ত সৃষ্টি জগতের সৃষ্টি। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ ٥٦ ﴾ [الذاريات: ٥٦]
“আমি জ্বীন ও ইনসানকে শুধুমাত্র আমার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি”। (সূরা আয-যারিয়াত-৫৬)
এই কালেমা প্রচারের জন্য আল্লাহ সমস্ত রাসূল এবং আসমানি কিতাবসমূহ প্রেরণ করেছেন, তিনি বলেন,
﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥ ﴾ [الانبياء: ٢٥]
“আমরা তোমার পূর্বে যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তাঁর নিকট এই প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছি যে, আমি ছাড়া অন্য কোনো সত্য মাবুদ নেই অতএব তোমরা আমারই ইবাদত কর’’। (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ২৫)
আল্লাহ আরো বলেন,
﴿ يُنَزِّلُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةَ بِٱلرُّوحِ مِنۡ أَمۡرِهِۦ عَلَىٰ مَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦٓ أَنۡ أَنذِرُوٓاْ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱتَّقُونِ ٢ ﴾ [النحل: ٢]
“তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছা স্বীয় নির্দেশে রূহ (ওহী) সহ ফিরিশ্তা প্রেরণ করেন এই বলে যে, তোমরা সতর্ক কর যে, আমি ছাড়া আর কোনো সত্য মাবুদ নেই, অতএব তোমরা আমাকেই ভয় কর। (আন-নাহল-২)
ইবনে উইয়াইনা বলেন, “বান্দার উপর আল্লাহ তা‘আলার সবচেয়ে প্রধান এবং বড় নিয়ামত হলো তিনি তাদেরকে  ” لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ” তাঁর এই একত্ববাদের সাথে পরিচয় করে দিয়েছেন। দুনিয়ার পিপাসা কাতর তৃষ্ণার্ত একজন মানুষের নিকট ঠাণ্ডা পানির যে মূল্য, আখেরাতে জান্নাতবাসিদের জন্য এ কালেমা তদ্রূপ’’[1]।
তাছাড়া যে ব্যক্তি এ কালেমার স্বীকৃতি দান করল সে তার সম্পদ এবং জীবনের নিরাপত্তা গ্রহণ করল। আর যে ব্যক্তি তা অস্বীকার করল সে তার জীবন ও সম্পদ নিরাপদ করল না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مَنْ دُونِ اللهِ، حَرُمَ مَالُهُ، وَدَمُهُ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللهِ»
“যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এর স্বীকৃতি দান করল এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সব উপাস্যকে অস্বীকার করল, তার ধন- সম্পদ ও জীবন নিরাপদ হল এবং তার কৃতকর্মের হিসাব আল্লাহর উপর বর্তাল। [মুসলিম:২৩]
একজন কাফেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বানের জন্য প্রথম এই কালেমার স্বীকৃতি চাওয়া হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মু‘আয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে ইয়ামানে ইসলামের দাওয়াতের জন্য পাঠান তখন তাঁকে বলেন,
«إِنَّكَ تَأْتِي قَوْمًا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ، فَادْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنَّ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ»
তুমি আহলে কিতাবের নিকট যাচ্ছ, অতএব সর্বপ্রথম তাদেরকে ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’’ এর সাক্ষ্য দান করার জন্য আহবান করবে। (বুখারী: ৪৩৪৭; মুসলিম: ১৯)
প্রিয় পাঠকগণ এবার চিন্তা করুন, দ্বীনের দৃষ্টিতে কোনো পর্যায়ে এ কালেমার স্থান এবং এর গুরুত্ব কতটুকু।  এজন্যই বান্দার প্রথম কাজ হলো এ কালেমার স্বীকৃতি দান করা; কেননা এ হলো সমস্ত কর্মের মূল ভিত্তি।
  2.  لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ এর ফযীলত
এ কালেমার অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে এবং আল্লাহর নিকট এর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
·       যে ব্যক্তি সত্য-সত্যিই কায়মনোবাক্যে এ কালেমা পাঠ করবে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যে ব্যক্তি মিছে-মিছি এ কালেমা পাঠ করবে তা দুনিয়াতে তার জীবন ও সম্পদের হেফাজত করবে বটে, তবে তাকে এর হিসেব আল্লাহর নিকট দিতে হবে।
·       এটি একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য, হাতেগোনা কয়েকটি বর্ণ এবং শব্দের সমারোহ মাত্র, উচ্চারণেও অতি সহজ কিন্তু কিয়ামতের দিন মীযানের পাল্লায় হবে অনেক ভারী।
ইবনে হিব্বান এবং আল হাকেম আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«قَالَ مُوسَى يَا رب عَلمنِي شَيْئا أذكرك وأدعوك بِهِ قَالَ يَا مُوسَى قل لَا إِلَه إِلَّا الله قَالَ كل عِبَادك يَقُولُونَ هَذَا قَالَ يَا مُوسَى لَو أَن السَّمَوَات السَّبع وعامرهن غَيْرِي والأرضيين السَّبع فِي كفة وَلَا إِلَه إِلَّا الله فِي كفة مَالَتْ بِهن لَا إِلَه إِلَّا الله»
“মূসা ‘আলাইহিস সালাম একদা আল্লাহ তা‘আলাকে বললেন, হে রব, আমাকে এমন একটি বিষয় শিক্ষা দান করুন যা দ্বারা আমি আপনাকে স্মরণ করব এবং আপনাকে আহ্বান করব। আল্লাহ বললেন, হে মূসা বলো, ” لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ “ মূসা ‘আলাইহিস সালাম বললেন, এতো আপনার সকল বান্দাই বলে থাকে। আল্লাহ বললেন, হে মূসা, আমি ব্যতীত সপ্তাকাশ ও এর মাঝে অবস্থানকারী সকল কিছু এবং সপ্ত জমীন যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর ” لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ ” এক পাল্লায় রাখা হয় তা হলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর পাল্লা ভারী হবে”। (হাকেম বলেন, হাদিসটি সহীহ)।[2]
অতএব এ হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণ পাওয়া গেল যে, লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ হচ্ছে, সবচেয়ে উত্তম যিকির।
আব্দুল্লাহ ইবন ওমর হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সবচেয়ে উত্তম দো‘আ আরাফাত দিবসের দো‘আ এবং সবচেয়ে উত্তম কথা যা আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ বলেছেন, তা হলো,
 (لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ ، لَهُ الـمُـلْكُ وَ لَهُ الحَمْدُ وَ هُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ)
“একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য মাবুদ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব একমাত্র তাঁরই জন্য এবং প্রশংসা একমাত্র তাঁরই জন্য, তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান’’।[3]
·       এ কালেমা যে সমস্ত কিছু থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও ভারী তার আরেকটি প্রমাণ হলো, আবদুল্লাহ ইবন ‘আমর থেকে অপর একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِنَّ اللَّهَ سَيُخَلِّصُ رَجُلًا مِنْ أُمَّتِي عَلَى رُءُوسِ الخَلَائِقِ يَوْمَ القِيَامَةِ فَيَنْشُرُ عَلَيْهِ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ سِجِلًّا كُلُّ سِجِلٍّ مِثْلُ مَدِّ البَصَرِ، ثُمَّ يَقُولُ: أَتُنْكِرُ مِنْ هَذَا شَيْئًا؟ أَظَلَمَكَ كَتَبَتِي الحَافِظُونَ؟ فَيَقُولُ: لَا يَا رَبِّ، فَيَقُولُ: أَفَلَكَ عُذْرٌ؟ فَيَقُولُ: لَا يَا رَبِّ، فَيَقُولُ: بَلَى إِنَّ لَكَ عِنْدَنَا حَسَنَةً، فَإِنَّهُ لَا ظُلْمَ عَلَيْكَ اليَوْمَ، فَتَخْرُجُ بِطَاقَةٌ فِيهَا: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ، فَيَقُولُ: احْضُرْ وَزْنَكَ، فَيَقُولُ: يَا رَبِّ مَا هَذِهِ البِطَاقَةُ مَعَ هَذِهِ السِّجِلَّاتِ، فَقَالَ: إِنَّكَ لَا تُظْلَمُ “، قَالَ: «فَتُوضَعُ السِّجِلَّاتُ فِي كَفَّةٍ وَالبِطَاقَةُ فِي كَفَّةٍ، فَطَاشَتِ السِّجِلَّاتُ وَثَقُلَتِ البِطَاقَةُ، فَلَا يَثْقُلُ مَعَ اسْمِ اللَّهِ شَيْءٌ»
“কিয়ামতের দিন আমার উম্মাতের এক ব্যক্তিকে সকল মানুষের সামনে ডাকা হবে, তার সামনে নিরানব্বইটি (পাপের) নিবন্ধ পুস্তক রাখা হবে এবং একেকটি পুস্তকের পরিধি হবে চক্ষুদৃষ্টির সীমারেখার সমান। এর পর তাকে বলা হবে, এই নিবন্ধ পুস্তকে যা কিছু লিপিবদ্ধ হয়েছে তা কি তুমি অস্বীকার কর? উত্তরে ঐ ব্যক্তি বলবে, হে রব আমি তা অস্বীকার করি না। তারপর বলা হবে, এর জন্য তোমার কোনো আপত্তি আছে কিনা? অথবা এর পরিবর্তে তোমার কোনো নেক কাজ আছে কিনা? তখন সে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় বলবে, না তাও নেই। অতঃপর বলা হবে, আমার নিকট তোমার কিছু পুণ্যের কাজ আছে এবং তোমার উপর কোনো প্রকার অত্যাচার করা হবে না, অতঃপর তার জন্য একখানা কার্ড বের করা হবে তাতে লেখা থাকবে,
” أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ وَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَ رَسُوْلُهُ “
‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্য মা‘বুদ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।’ তখন ঐ ব্যক্তি বিস্ময়ের সাথে বলবে, হে আমার রব, এই কার্ডখানা কি নিরানব্বইটি নিবন্ধ পুস্তকের সমতুল্য হবে? তখন বলা হবে, তোমার উপর কোনো প্রকার অত্যাচার করা হবে না। এর পর ঐ নিরানব্বইটি পুস্তক এক পাল্লায় রাখা হবে এবং ঐ কার্ড খানা এক পাল্লায় রাখা হবে তখন ঐ পুস্তক গুলোর ওজন কার্ড খানার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য হবে এবং কার্ডের পাল্লা ভারী হবে।”[4]
হাফেয ইবনে রজব রহ. তাঁর ‘‘কালেমাতুল ইখলাস’’ নামক গ্রন্থে এ মহামূল্যবান কালেমার আরো বহু ফযীলত বর্ণনা করেছেন এবং প্রত্যেকটির সপক্ষে দলীল-প্রমাণাদি উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে রয়েছে, এই কালেমা হবে জান্নাতের মূল্য, কোনো ব্যক্তি জীবনের শেষ মূহুর্তেও এ কালেমা পাঠ করে মারা গেলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, এটাই জাহান্নাম থেকে মুক্তির একমাত্র পথ এবং আল্লাহর ক্ষমা নিশ্চিত করার মাধ্যম, সমস্ত পূণ্য কাজগুলোর মধ্যে এ কালেমাই শ্রেষ্ঠ, এটি পাপ পঙ্কিলতাকে দূর করে, হৃদয় মনে ঈমানের যা কিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এ কালেমা সেগুলোকে সজীব করে, স্তুপকৃত পাপ-রাশি সম্বলিত বালাম গ্রন্থগুলোর উপর এ কালেমা ভারী হবে। আল্লাহকে পাওয়ার পথে যতসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সব কিছুকে এ কালেমা ছিন্ন-ভিন্ন করে আল্লাহর নিকট পৌঁছে দিবে। এ কালেমার স্বীকৃতি দানকারীকে আল্লাহ সত্যায়িত করবেন। নবীদের কথার মধ্যে উত্তম কথা হলো এটাই, সবচেয়ে উত্তম আমল হচ্ছে এটিই, আর এটি হচ্ছে এমন আমল যা বহুগুণ বর্ধিত হয়। এটি গোলাম আযাদ করার সমতুল্য। শয়তান থেকে হেফাযতকারী। কবর ও হাশরের বিভীষিকাময় অবস্থার নিরাপত্তা দানকারী। কবর থেকে দণ্ডায়মান হওয়ার পর এ কালেমাই হবে মুমিনদের শ্লোগান।
 এ কালেমার ফযীলতের মধ্যে আরো হচ্ছে, এই কালেমার স্বীকৃতি দানকারির জন্য জান্নাতের আটটি দ্বার খুলে দেয়া হবে এবং সে ইচ্ছামত যে কোনো দ্বার দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে।
এ কালেমার অন্য ফযীলত হচ্ছে, এর সাক্ষ্যদানকারী এর দাবী অনুযায়ী পূর্ণভাবে কাজ না করার ফলে এবং বিভিন্ন অপরাধের ফল স্বরূপ জাহান্নামে প্রবেশ করলেও অবশ্যই কোনো এক সময় জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে।
ইবনে রজব রহ. তাঁর উক্ত বইতে এই কালেমার এ সব ফযীলত বর্ণনার জন্য যে পরিচ্ছেদ রচনা করেছেন এ হচ্ছে তার বর্ণনা। তিনি এসবগুলো দলীল প্রমাণাদিসহ বর্ণনা করেছেন।[5]
  3.  এ কালেমার ব্যকরণগত আলোচনা, এর স্তম্ভ ও শর্তসমূহ
·   এ কালেমার ব্যাকরণগত আলোচনা:
যেহেতু অনেক বাক্যের অর্থ বুঝা নির্ভর করে তার ব্যকরণগত আলোচনার উপর, সেহেতু ওলামায়ে কেরাম “لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ” এই বাক্যের ব্যকরণগত আলোচনার প্রতি তাঁদের দৃষ্টি নিবন্ধ করেছেন এবং তারা বলেছেন যে, এই বাক্যে “لا” শব্দটি ‘নাফিয়া লিল জিনস’ (সমগোত্রীয় অর্থ নিষিদ্ধকারী নিষেধসূচক বাক্য) এবং إِله (ইলাহ) শব্দটি এর ইসম (উদ্দেশ্য), মাবনি আলাল ফাতহ্ (যা সর্বাবস্থায় ফাতহ বা যবর বিশিষ্ট হয়)। আর এর খবরটি এখানে উহ্য, যা হচ্ছে حق শব্দটি। অর্থাৎ কোনো হক বা সত্য ইলাহ নেই। إِلاَّ اللهُ হচ্ছে খবর, (বিধেয়) যা মারফু (পেশ হওয়ার স্থানে; কারণ তা) حق শব্দ হতে ইসতেসনা বা ভিন্নতর। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত হক বা সত্য ইলাহ বলতে কেউ নেই।
إِلهَ শব্দের অর্থ ‘‘মা‘বুদ’’  আর তিনি হচ্ছেন ঐ সত্তা যে সত্তার প্রতি কল্যাণের আশায় এবং অকল্যান থেকে বাঁচার জন্য হৃদয়ের আসক্তি সৃষ্টি হয় এবং মন তার উপাসনা করে।
এখানে কেউ যদি মনে করে যে, উক্ত খবরটি হচ্ছে ‘‘মাউজুদুন’’ বা ‘‘মা‘বুদুন’’ অথবা এ ধরনের কোনো শব্দ তা হলে এটা হবে অত্যন্ত ভুল। কারণ বাস্তব তো এই যে, আল্লাহ ব্যতীত অনেক মা‘বুদ বিদ্যমান রয়েছে যেমন মূর্তি, মাজার ইত্যাদি। তবে আল্লাহ হচ্ছে সত্য মাবুদ, আর তিনি ব্যতীত অন্য যত মা‘বুদ রয়েছে বা অন্য যেগুলোর ইবাদত করা হয় তা হচ্ছে অসত্য ও ভ্রান্ত। আর এটাই হচ্ছে ” لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ “ এর না বাচক ও হাঁ বাচক এ দুই স্তম্ভের মূল দাবী।
·   لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ এই কালেমার রুকনসমূহ:
এ কালেমার রয়েছে দুটি স্তম্ভ বা রুকন। তন্মধ্যে প্রথম রুকন হচ্ছে না বাচক আর অপরটি হলো হাঁ বাচক।
না বাচক কথাটির অর্থ হচ্ছে, আল্লাহ ব্যতীত সমস্ত কিছুর ইবাদতকে অস্বীকার করা, আর হাঁ সূচক কথাটির অর্থ হচ্ছে একমাত্র আল্লাহই সত্য মা‘বুদ। আর মুশরিকগণ আল্লাহ ব্যতীত যেসব মা‘বুদের উপাসনা করে সবগুলো মিথ্যা এবং বানোয়াট মা‘বুদ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ذَٰلِكَ بِأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدۡعُونَ مِن دُونِهِۦ هُوَ ٱلۡبَٰطِلُ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡكَبِيرُ ٦٢ ﴾ [الحج: ٦٢]
“এটা এ জন্য যে, আল্লাহ-ই প্রকৃত সত্য, আর তিনি ব্যতীত যাদেরকে তারা ডাকে সে সব কিছুই বাতিল। (আল্ হাজ্ব-৬২)
ইমাম ইবনুল কাইয়েম বলেন, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা ইলাহ বা মাবুদ’’ এ কথার চেয়ে ‘‘আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো সত্য মাবুদ নেই’’ এই বাক্যটি আল্লাহর উলুহিয়াত প্রতিষ্ঠার জন্য অধিকতর মজবুত দলিল; কেননা ‘‘আল্লাহ ইলাহ’’ একথা দ্বারা অন্যসব যত ভ্রান্ত ইলাহ রয়েছে তাদের ইলাহ বা মা‘বুদ হওয়াকে অস্বীকার করা হয় না। আর ‘‘আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই’’ এ কথাটি উলুহিয়্যাতকে একমাত্র আল