তাওহীদ ও ঈমান (১ম পর্ব)


তাওহীদ ও ঈমান (১ম পর্ব)

হে মানব সকল! তোমরা স্বীয় প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদের এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, এতে তোমরা আল্লাহ ভীরু ও মুত্তাকী হতে পারবে। যিনি তোমাদের জন্যে ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদ স্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন। আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্যে ফল-ফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসাবে। অতএব তোমরা জেনে- শুনে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকেও সমকক্ষ করোনা। (সূরা বাকারা : ২১-২২)

১- তাওহীদ:

তাওহীদ হচ্ছে বান্দাকে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যে আল্লাহ তাআলা এক ও অদ্বিতীয়। রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব), উলুহিয়্যাত (উপাস্যত্ব) এবং আসমা ও সিফাত (নির্ধারিত সত্ত্বাবাচক ও গুনবাচক নাম)-এর ক্ষেত্রে তাঁর কোন শরীক ও সমকক্ষ নেই।
বিশ্লেষণ :
অর্থ্যাৎ বান্দাকে সুনিশ্চিতভাবে জানা ও স্বীকার করা, যে আল্লাহ তাআলা এককভাবে সকল বস্তুর মালিক ও প্রতিপালক। সকল কিছুর তিনিই সৃষ্টিকর্তা, সমগ্র বিশ্বকে তিনিই এককভাবে পরিচালনা করছেন, (তাই) একমাত্র তিনিই সকল ইবাদত- উপসনার উপযুক্ত, এতে তাঁর কোন শরীক ও অংশীদার নেই। তিনি ভিন্ন সকল উপাস্য বাতিল ও অসত্য। তিনি সর্বোতভাবে যাবতীয় পরিপূর্ণ গুণাবলী ও বৈশিষ্টে বৈশিষ্টমন্ডিত। সকল প্রকার দোষ ও অপূর্ণাঙ্গতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র।
সকল সুন্দর নাম ও উচ্চ গুণাবলি তাঁর জন্যেই নির্দিষ্ট।

২- তাওহীদের প্রকারভেদ

সকল নবী-রাসূল মানুষদের যে তাওহীদের প্রতি দাওয়াত দিয়েছেন এবং যে তাওহীদ বিষয়ে সকল ঐশী গ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছে সেটি দু’ভাগে বিভক্ত।
প্রথম : আল্লাহকে জানা ও মানার ক্ষেত্রে তাঁর একত্ববাদ। এটাকে তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ ওয়াস সিফাত বলা যায়। অর্থ্যাৎ প্রভূত্ব, নাম ও গুণাবলির ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদ।
এ একত্ববাদের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার অস্তিত্বকে প্রমাণ করা হয় এবং তাঁর নাম, সিফাত এবং কর্মাবলীর ক্ষেত্রে তাঁকে এক ও অদ্বিতীয় বলে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করলে এভাবে বলা যায়। বান্দা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করবে এবং স্বীকৃতি দেবে যে এককভাবে আল্লাহ তা’আলাই এ নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা, মালিক এবং পালনকর্তা। তিনিই একে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি স্বীয় সত্ত্বা, নাম, গুণাবলি ও কর্মের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। তিনি সর্বজ্ঞ, সবকিছু পরিবেষ্টন ও নিয়ন্ত্রণকারী। রাজত্ব তাঁরই হাতে। সকল কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। তাঁর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম ও সুমহান গুণাবলি।
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
‘কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন, সব দেখেন।'[১]
দ্বিতীয় : কর্ম ও উপাসনা-প্রার্থনার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ
একে তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ ওয়াল ইবাদাহ বলা হয়। অর্থাৎ যাবতীয় ইবাদত-উপাসনা যেমন: দো’আ, সালাত, ভয়, আশা ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলাকে এক বলে বিশ্বাস করা, মেনে নেয়া এবং সকল প্রকার ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিরংকুশ করা।
একটু বিশ্লেষণে গিয়ে আমরা এভাবে বলতে পারি, বান্দাকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস ও স্বীকার করা যে, একমাত্র আল্লাহ তা’আলাই এককভাবে সমস্ত সৃষ্টির ইবাদত-উপাসনার অধিকার সংরক্ষণ করেন। সকল মাখলূকের উপাস্য হওয়ার অধিকার একমাত্র তাঁরই। তিনিই ইবাদতের উপযুক্ত, তিনি ভিন্ন অন্য কেউ এ অধিকার রাখে না বরং কেউ উপযুক্তও নয়। সুতরাং দো’আ, সালাত, সাহায্য প্রার্থনা, তাওয়াক্কুল, ভয়, আশা, যবেহ ও মান্নতসহ যাবতীয় ইবাদতের যে কোন একটি ইবাদতও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে সম্পাদন ও নিবেদন করা যাবে না। যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি মাত্র ইবাদতও সম্পাদন-নিবেদন করবে শরীয়তের দৃষ্টিতে সে কাফের ও মুশরকি বলে বিবেচিত হবে। যেমন আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন:
وَمَنْ يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِنْدَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ
‘আর যে কেউ আল্লাহর সাথে অন্য উপাস্যকে ডাকে, তার কাছে যার কোন সনদ নেই। তার হিসাব তার পালনকর্তার নিকট। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না।'[২]
এই তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ কে-ই অধিকাংশ মানুষ অস্বীকার করেছে। আর তাই আল্লাহ তা’আলা অসংখ্য নবী-রাসূল মানুষদের নিকট প্রেরণ করেছেন। তাঁরা এসে তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত এবং তিনি ভিন্ন অন্যদের উপাসনা-বন্দনা পরিত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
(১) এরশাদ হচ্ছে:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
‘আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই পাঠিয়েছি তাঁকে এ প্রত্যাদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং একমাত্র আমারই ইবাদত কর।'[৩]
(২) আরো এরশাদ হচ্ছে:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
‘আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে দূরে থাক।'[৪]

তাওহীদের সার-নির্যাস:

পৃথিবীতে সঙ্ঘটিত ও সঙ্ঘটিতব্য সকল ঘটনা-অনুঘটনা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকেই এবং তাঁর ইশারাতেই হয়ে থাকে। এখানে অন্য কোন মাধ্যম ও কার্যকারণের ন্যূনতম ভূমিকা নেই। প্রত্যেক মানুষ সকল বিষয়কে উপরোক্ত বিশ্বাসের আলোকে বিচার করবে। এটিই হচ্ছে মূলত তাওহীদের সার কথা। সুতরাং ভাল-মন্দ, উপকার-ক্ষতি সবকিছু এক আল্লাহর পক্ষ থেকেই। এখানে অন্য কিছুর কোন দখল নেই। আর তাই একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে, যে ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর একত্ববাদকে প্রতিষ্ঠিত করবে। তাঁর সাথে অন্য কারো ইবাদত-উপাসনা করবে না।

তাওহীদের ফলাফল

সর্বক্ষেত্রে এক আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করা, মাখলূকের বিরুদ্ধে অভিযোগ-অনুযোগ, তাদেরকে তিরস্কার-ভর্ৎসনা পরিহার করা। আল্লাহ তা’আলাকে ভালবাসা, তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত ও নির্দেশাবলী প্রসন্নচিত্তে মেনে নেয়া।
• মানুষ তার সহজাত প্রকৃতি এবং এ নিখিল বিশ্বের প্রতি চিন্তা-গবেষণা, এর সাভাবিক কর্মকান্ড সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হওয়া ইত্যাদির প্রতি সজাগ দৃষ্টিপাত ও পর্যবেক্ষনের কারণে অতি সহজেই তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ কে স্বীকার করে নেয়। তবে শুধু মাত্র এটুকুন স্বীকারোক্তিই ঈমান বিল্লাহ তথা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং আযাব থেকে মুক্তির জন্যে যথেষ্ট নয়। এ স্বীকারোক্তিতো ইবলিসও দিয়েছিল। তাবত মুশরিকরাও আল্লাহকে রব বলে স্বীকার করে। তাসত্ত্বেও এ স্বীকৃতি তাদের কোন উপকারে আসেনি। কারণ তারা তাওহীদুল ইবাদাহ বা আল্লাহকে একমাত্র মা’বূদ বলে স্বীকার করেনি। সুতরাং যে ব্যক্তি শুধুমাত্র তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহর স্বীকৃতি দেবে সে মুসলিম ও একত্ববাদী বলে স্বীকৃতি পাবে না এবং তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ তথা আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ বলে স্বীকার করা পর্যন্ত তার জীবন ও সম্পদ নিরাপদ বলে বিবেচিত হবে না। তাকে অবশ্যই সাক্ষ্য দিতে হবে যে আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত সত্যিকার কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক-সমকক্ষ নেই, তিনিই সকল ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত। সাথে সাথে সকল এবাদতে নিজেকে যুক্ত করতে হবে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করা চলবে না।

তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ ও তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, একটি ছাড়া অপরটিকে গ্রহণযোগ্য নয়।
(১) তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ, তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ-কে আবশ্যক করে অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলাকে রব বলে মেনে নিলে ইলাহ (উপাস্য) বলেও মানতে হবে। সুতরাং যিনি একথা স্বীকার করবেন যে আল্লাহ তা’আলাই একমাত্র প্রতিপালক, সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও রিযিক দাতা। তাকে অবশ্যই এ কথাও মানতে হবে যে তাহলে আল্লাহ তা’আলাই এককভাবে ইবাদতের উপযুক্ত। অতএব, বিপদাপদে একমাত্র তাঁকেই ডাকতে হবে। তাঁর নিকটই প্রার্থনা করতে হবে। তাঁর কাছেই ফরিয়াদ করতে হবে। তাঁর উপরই ভরসা করতে হবে। কোন একটি ইবাদতও তাঁকে ভিন্ন অন্য কারো দিকে ফিরানো যাবে না, অন্য কারো নিমিত্তে সম্পাদন করা যাবে না। অনুরূপভাবে তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ, তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহকে আবশ্যক করে সুতরাং যিনি একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত উপসনা করেন তাঁর সাথে কাউকে শরীক করেন না তাঁর ব্যাপারে অবশ্যই বলা যায় যে তিনি আল্লাহ তা’আলাকে প্রতিপালক, স্রষ্টা ও মালিক বলেও বিশ্বাস করেন।
(২) রুবুবিয়্যাহ ও উলূহিয়্যাহ যখন একত্রে উল্লেখিত হবে তখন উভয়ের অর্থ ভিন্ন ভিন্ন হবে। রবের (الرب) অর্থ হবে মালিক, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাকারী আর ইলাহ্‌ এর অর্থ হবে সত্যিকারের উপাস্য যিনি এককভাবে সকল ইবাদতের উপযুক্ত।
যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন-
قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ ﴿১﴾ مَلِكِ النَّاسِ ﴿২﴾ إِلَهِ النَّاسِ ﴿৩﴾
‘বলুন আমি আশ্রয় চাই মানুষের প্রতিপালকের নিকট, মানুষের মালিকের নিকট, মানুষের ইলাহ ও উপাস্যের নিকট।'[৫]
আবার কখনো কখনো শুধুমাত্র একটিকে উল্লেখ করে উভয় অর্থ বুঝানো হয়। অর্থাৎ রব বলে ইলাহ ও রব, আবার ইলাহ বলে রব ও ইলাহ। যেমন আল্লাহ তা’আলার বাণী-
قُلْ أَغَيْرَ اللَّهِ أَبْغِي رَبًّا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيْءٍ (الأنعام:১৬৪)
‘আপনি বলুন, আমি কি আল্লাহ ব্যতীত অন্য ইলাহ খোঁজব, অথচ তিনিই সবকিছুর প্রতিপালক।'[৬]

• তাওহীদের ফযীলত

(১) আল্লাহ তা’আলা বলেন:
الَّذِينَ آَمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ أُولَئِكَ لَهُمُ الْأَمْنُ وَهُمْ مُهْتَدُونَ ﴿৮২﴾
‘যারা ঈমান এনেছে এবং স্বীয় ঈমান ও বিশ্বাসকে যুলুমের (শিরক) সাথে মিশ্রিত করেনি তাদের জন্যেই রয়েছে শান্তি ও নিরাপত্তা এবং তাঁরই হিদায়াত প্রাপ্ত।'[৭]
(২)
وعن عبادة بن الصامت رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : من شهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له, و أن محمدا عبده و رسوله, و أن عيسى عبد الله ورسوله وكلمته ألقاها إلى مريم وروح منه والجنة حق والنار حق, أدخله الله الجنة على ما كان من العمل. (متفق عليه)
‘সাহাবী উবাদা বিন সামেত রাদিয়াল্লহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোন ইলাহ নেই তিনি এক তাঁর কোন শরীক নেই। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা এবং রাসূল। ঈসা আলাইহিস সালাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, তাঁর কালেমা যা তিনি মারইয়াম কে প্রদান করেছেন এবং প্রদান করেছেন তাঁর পক্ষ থেকে রূহ। এবং আরো সাক্ষ্য দেবে জান্নাত সত্য এবং জাহান্নাম সত্য, আল্লাহ তা’আলা তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন তাঁর আমল যা-ই থাকুক।'[৮]

তাওহীদ পন্থীদের পুরস্কার

(১) আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন:
وَبَشِّرِ الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِنْ ثَمَرَةٍ رِزْقًا قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ وَأُتُوا بِهِ مُتَشَابِهًا وَلَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ
‘হে নবী! যারা ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে, আপনি তাদের এমন জান্নাতের সুসংবাদ দিন, যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহমান থাকবে। যখনই তারা খাবার হিসাবে কোন ফলপ্রাপ্ত হবে, তখনই তারা বলবে, এতো অবিকল সে ফলই যা আমরা ইতিপূর্বেও লাভ করেছিলাম। বস্তুত: তাদেরকে একই সাদৃশ্যপূর্ণ ফল প্রদান করা হবে এবং সেখানে তাদের জন্যে শুদ্ধচারিনী (পূতপবিত্র) রমণীকূল থাকবে। তারা সেখানে অনন্তকাল অবস্থান করবে।'[৯]
(২)
وعن جابر رضي الله عنه قال: أتى النبي صلى الله عليه وسلم رجل فقال : يا رسول الله ما الموجبتان ؟ فقال : من مات لا يشرك بالله شيئا دخل الجنة, ومن مات يشرك بالله شيئا دخل النار . متفق عليه
‘সাহাবী জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে জানতে চাইলো ইয়া রাসূলাল্লাহ! অবধারিতকারী বিষয় দুটো কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন: যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মারা যাবে যে, আল্লাহর সাথে কোন (কিছুকে) শরীক করেনি, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে আল্লাহর সাথে শিরক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।'[১০]

• কালেমায়ে তাওহীদের মহত্ব ও মর্যাদা

عن عبد الله بن عمرو بن العاص رضي الله عنهما أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: إن نبي الله نوحا عليه السلام لما حضرته الوفاة قال لابنه : إني قاصّ عليك الوصية : آمرك باثنتين و أنهاك عن اثنتين, آمرك بـ( لا إله إلا الله ) فإن السماوات السبع و الأرضين السبع لو وضعت في كفة ووضعت لا إله إلا الله في كفة, رجحت بهن لا إله إلا الله, ولو أن السماوات السبع, والأرضين السبع, كن حلقة مبهمة قصمتهن لا إله إلا الله, وسبحان الله وبحمده, فإنها صلاة كل شيء, وبها يرزق الخلق, وأنهاك عن الشرك والكبر… أخرجه أحمد والبخاري في الأدب المفرد.
‘সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: আল্লাহর নবী নূহ আলাইহিস সালাম মৃত্যুমুখে পতিত হলে স্বীয় ছেলেকে অসিয়ত করে বললেন: আমি তোমাকে দু’টো বিষয়ে আদেশ করছি এবং অন্য দু”টো সম্পর্কে নিষেধ করছি। আদেশ করছি- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ((لا إله إلا الله সম্পর্কে। অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলাকে একমাত্র ইলাহ বলে মেনে নেবে। কারণ সাতটি আকাশ এবং সাতটি যমীনকে যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ অন্য পাল্লায়, তাহলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ঐ সকল আকাশ যমীনকে নিয়ে ঝুলে পড়বে। আর সাত আকাশ ও সাত যমীন যদি পরস্পর শৃংখলাবদ্ধ থাকত। তাহলে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তাদের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিত।
আর সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুল্লিাহ বেশী বেশী করে বলবে। কারণ এটি সকল বস্তুর সালাত ও তাসবীহ, এর মাধ্যমেই সৃষ্টিজীবকে রিযিক দেয়া হয়। আর নিষেধ করছি শিরক ও অহংকার থেকে…।'[১১]

তাওহীদের পূর্ণতা

বান্দার তাওহীদ ও একত্ববাদ তখনই পূর্ণতা লাভ করবে যখন সে কেবলমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং সকল প্রকার তাগুতকে এড়িয়ে চলবে।
যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেন :
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اُعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
‘আমি সকল উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এ মর্মে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাক, তাদের এড়িয়ে চল।'[১২]

• তাগুতের পরিচয়
তাগুত বলা হয় ঐ ব্যক্তি বা বস্তুকে যার ব্যাপারে বান্দা সীমা লঙ্ঘন করে। সেটি বাতিল মা’বূদও হতে পারে যেমন মূর্তি-প্রতিমা আবার অনুসৃত নেতাও হতে পারে যেমন গণক-পুরোহিত, পাদ্রী, ধর্ম যাজক, উলামায়ে সূ কিংবা মান্যতা ও আনুগত্য গ্রহণকারীও হতে পারে যেমন, আল্লাহর আনুগত্য ত্যাগকারী আমীর উমারা ও কর্তৃত্বশীল নেতা-কর্তাবৃন্দ ইত্যাদি।

• প্রধান প্রধান তাগুত।
তাগুতের সংখ্যা অনেক, এদের মাঝে প্রধান হচ্ছে পাঁচটি।
(ক) ইবলিস। আল্লাহ তার অনিষ্ট থেকে আমাদের পানাহ দান করুন।
(খ) যার ইবাদত করা হয় এবং সে এতে সন্তুষ্ট।
(গ) যে ব্যক্তি লোকদের নিজের ইবাদতের প্রতি আহ্বান করে।
(ঘ) যে ব্যক্তি ইলমে গায়েব জানে বলে দাবী করে।
(ঙ) যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলা নাযিলকৃত বিধান বাদ দিয়ে ভিন্ন আইনে বিচার-শাসন পরিচালনা করে।

মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন :
اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آَمَنُوا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُمْ مِنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ﴿২৫৭﴾
‘যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তাদেরকে তিনি অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরী করে তাদের অভিভাবক হচ্ছে তাগুত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। এরাই হলো দোযখের অধিবাসী। চিরকাল তারা সেখানেই থাকবে।'[১৩]

৩। ইবাদত

• ইবাদতের অর্থ ও তাৎপর্য:
ইবাদতের একমাত্র উপযুক্ত ও যোগ্য দাবিদার হচ্ছেন মহান আল্লাহ তা’আলা। ইবাদতের ভেতর দু’টি দিক আছে, সেই বিষয়দ্বয়ের উপর ইবাদত প্রয়োগ হয়।
(এক) দাসত্ব : অর্থাৎ পূর্ণ ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সাথে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশাবলী পালন ও নিষেধাবলী বর্জন করার মাধ্যমে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করা ও তাঁর অনুগত হয়ে থাকা।
(দুই) যার মাধ্যমে ইবাদত করা হয় : আর এটি অনেক ব্যাপক, সংক্ষেপে বলা যায়, প্রত্যেক কথা ও কাজ যা আল্লাহ তা’আলা পছন্দ ও অনুমোদন করেন। সেটি যাহেরী (দৃশ্যমান) হতে পারে কিংবা বাতেনী (অদৃশ্যমান)। যেমন দু’আ, যিকির, সালাত, মুহাব্বত ইত্যাদি।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়- সালাত একটি ইবাদত, এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ। অতএব আমরা সালাতের মাধ্যমে পূর্ণ ভক্তি-শ্রদ্ধা, মুহাব্বত-ভালবাসার সাথে হীন ও নত হয়ে এক আল্লাহর ইবাদত করি। আর শুধুমাত্র অনুমোদিত ইবাদতই সম্পাদন করি।

• মানব ও জিন সৃষ্টির তাৎপর্য :
মহাপ্রজ্ঞাময় আল্লাহ তা’আলা জিন ও মানুষ অহেতুক সৃষ্টি করেননি। এজন্যে সৃষ্টি করেননি যে, তারা শুধুমাত্র খাবে, পান করবে, ক্রীড়া-কৌতুক ও খেলাধুলায় মত্ত থাকবে। বরং এক মহৎ ও মহান উদ্দেশ্যে সৃজন করেছেন। আর তা হচ্ছে তারা তাঁর ইবাদত করবে, তাঁকে এক বলে জানবে, তাঁর সম্মান প্রদর্শন করবে, তাঁর বড়ত্ব প্রকাশ করবে, এক কথায় তাঁর আনুগত্য করবে। আর এসব উদ্দেশ্য সমুন্নত রাখতে গিয়ে তারা তাঁর সকল নির্দেশাবলী বাস্তবায়ন করবে সর্বোচ্চ আন্তরিকতায়। সকল নিষেধাবলী থেকে বিরত থাকবে সর্বোচ্চ সতর্কতায়। তাঁর নির্ধারিত সীমাতে অবস্থান করবে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় এবং তিনি ভিন্ন সকল কিছুর ইবাদত পরিহার করবে সর্বোচ্চ ঘৃণায়। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন-
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
‘আমি মানব ও জিন সৃজন করেছি শুধুমাত্র আমারই ইবাদত করার জন্যে।'[১৪]

ইবাদত ও দাসত্ব প্রকাশের পদ্ধতি:
মহান রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও দাসত্ব ভিত্তিশীল হচ্ছে দুটি মূলনীতির উপর।
• আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভালবাসা ও পরিপূর্ণ ভক্তি-শ্রদ্ধা।
• নিজেকে একেবারে তুচ্ছ ও হীন জ্ঞান করে তাঁর পূর্ণ বশ্যতা স্বীকার করা।
আর এ মূলনীতিদুটো নির্ভর করে আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতির উপর।
• আল্লাহ তা’আলার অপরিসীম ইহসান-অনুগ্রহ, দয়া ও রহমত, ফযল ও করম -যেগুলো সে প্রতিনিয়ত গ্রহণ করে চলেছে- সবসময় হৃদয়পটে উপস্থিত রাখা এবং চিন্তার দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করা। যা আল্লাহকে ভালবাসতে বাধ্য করবে, হৃদয়ে-মনে তাঁর মুহব্বত ও আজমত সৃষ্টি করবে।
• নিজ ত্রুটি-বিচ্যুতি, অযোগ্যতা, অপূর্ণতা এবং কর্ম ও আমলের প্রতি দৃষ্টি দেয়া, নিজের অক্ষমতা, অসহায়ত্ব ও দীনতা সম্পর্কে চিন্তা করা। এগুলো আল্লাহর বশ্যতা স্বীকারের মানসিকতা সৃষ্টি করবে এবং তাঁকে মান্য করার প্রেরণা যোগাবে।
বান্দা তার রব পর্যন্ত পৌঁছার সবচে নিকটতম ও সহজ রাস্তা হচ্ছে তাঁর প্রতি সব সময় মুখাপেক্ষী হয়ে থাকা, পাশাপাশি নিজেকে অসহায় ও দীন-হীন জ্ঞান করা। নিজের অবস্থা-অবস্থান, যোগ্যতা ও ক্ষমতা ইত্যাদির প্রতি দৃষ্টি না দেয়া, এসব গুণাবলী তার মধ্যে আছে বলেও চিন্তা না করা বরং নিজের সকল জরুরত-হাজত সবকিছুই আল্লাহর নিকট উপস্থাপন করা। সাথে সাথে এ বিশ্বাস অটুট রাখা যে আল্লাহ যদি তাকে ত্যাগ করেন তাহলে অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্থ হবে বরং একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন-
وَمَا بِكُمْ مِنْ نِعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْأَرُونَ ﴿৫৩﴾ ثُمَّ إِذَا كَشَفَ الضُّرَّ عَنْكُمْ إِذَا فَرِيقٌ مِنْكُمْ بِرَبِّهِمْ يُشْرِكُونَ ﴿৫৪﴾ لِيَكْفُرُوا بِمَا آَتَيْنَاهُمْ فَتَمَتَّعُوا فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ ﴿৫৫﴾ (النحل/৫৩-৫৫)
‘তোমাদের কাছে যে সমস্ত নিয়ামত আছে, তা আল্লাহরই পক্ষ থেকে। অতঃপর তোমরা যখন দুঃখ-কষ্টে পতিত হও তখন তাঁরই নিকট কান্নাকাটি কর-ব্যাকুল ভাবে, তাকেই আহ্বান কর। এরপর যখন আল্লাহ তোমাদের বিপদ-কষ্ট দূরীভূত করে দেন, তখনই তোমাদের একদল স্বীয় পালনকর্তার সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করতে থাকে। যাতে অস্বীকার করে ঐ নিয়ামত, যা আমি তাদের দিয়েছি। অতএব মজা ভোগ করে নাও-সত্বরই তোমরা জানতে পারবে।'[১৫]
• ইবাদত করার দিক থেকে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ মানুষ।
ইবাদত ও দাসত্বের দিক থেকে মানুষদের মধ্যে সবচে পরিপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠতম হচ্ছেন নবী ও রাসূলগণ। কারণ, মানুষদের মধ্যে তাঁরাই আল্লাহকে পরিপূর্ণ রূপে চিনেছেন ও তাঁর সম্পর্কে সবচে বেশী জেনেছেন। অন্যদের তুলনায় তাঁদের হৃদয়েই আল্লাহর প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা বেশী।
তাছাড়া আল্লাহ তাঁদেরকে মানুষদের নিকট রাসূল বানিয়ে প্রেরণ করার মাধ্যমে তাঁদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন। সুতরাং তাঁরা দু’দিক থেকে মর্যাদাবান। রিসালাতের মর্যাদা এবং নির্ভেজাল দাসত্বের মর্যাদা।
শ্রেষ্ঠত্বের দিক থেকে নবীদের পরবর্তী স্থনেই আছেন সিদ্দীকবৃন্দ। আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি যাদের বিশ্বাস ও স্বীকৃতি পূর্ণতা পেয়েছে এবং যারা আল্লাহর নির্দেশের প্রতি সদা অবিচল থেকেছেন। অতঃপর শহীদগণ এরপর সৎকর্মশীল সাধারণ মুসলমানবৃন্দ।
আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا {النساء/৬৯}
‘আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ মান্য করবে, তাহলে যাঁদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন, সে তাঁদের সঙ্গী হবে। তাঁরা হলেন নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ। আর তাঁদের সান্নিধ্যই হল উত্তম।'[১৬]

• বান্দার উপর আল্লাহর অধিকার :
আকাশ ও যমীনে বসবাসকারী সকলের উপর আল্লাহর হক ও অধিকার হচ্ছে, তারা তাঁর ইবাদত করবে এবং (কোন কিছুকে) তাঁর সাথে শরীক করবে না। তাঁর আনুগত্য করবে নাফরমানী করবে না। তাঁকে স্মরণ করবে-ডাকবে, ভুলে থাকবে না। তাঁর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করবে, কুফরী করবে না। এবং যে উদ্দেশ্যে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সে উদ্দেশ্যের বিপরীত তার থেকে কোন কিছু প্রকাশ পাবে না। অজ্ঞতার কারণেই হোক বা অপারগতার কারণে, বাড়াবাড়ির আঙ্গিকেই হোক বা অলসতার আঙ্গিকে। সুতরাং আল্লাহ তা’আলা যদি আকাশ ও পৃথিবীবাসীকে শাস্তি প্রদান করেন, তাহলে সে অধিকার তাঁর রয়েছে, শাস্তি দিলে সেটিও অন্যায্য হবে না। আর যদি দয়া করেন তাহলে সেটি হবে তাদের আমলের তুলনায় অনেক বেশী।
عن معاذ بن جبل رضي الله عنه قال : كنت ردف النبي صلى الله عليه وسلم على حمار يقال له نفير قال: فقال : (( يا معاذ تدري ما حق الله على العباد, وما حق العباد على الله؟ قال: قلت:الله و رسوله أعلم . قال: فإن حق الله على العباد أن يعبدوا الله و لا يشركوا به شيئا و حق العباد على الله عز و جل أن لا يعذب من لا يشرك به شيئا )) قال: قلت يا رسول الله, أفلا أبشر الناس ؟ قال:(( لا تبشرهم فيتكلوا . متفق عليه.
সাহাবী মু’আয বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করছেন, আমি ‘নুফাইর’ নামক গাধার উপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাঁর পিছনে বসা ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন: মু’আয তুমি কি জান, বান্দার উপর আল্লাহর কি হক রয়েছে? এবং বান্দারই বা আল্লাহর কাছে কি অধিকার (পাওনা) রয়েছে? আমি বললাম: এ বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভাল জানেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: বান্দার উপর আল্লাহর হক (অধিকার) হচ্ছে। তারা তাঁর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর নিকট বান্দার অধিকার হচ্ছে, যে ব্যক্তি তাঁর সাথে শরীক করবে না তিনি তাকে শাস্তি দেবেন না। শুনে আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কি এ সুসংবাদ লোকদের শোনাব না? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: না, শোনাবে না। তাহলে তারা এর উপর ভরসা করে আমল ছেড়ে দেবে।[১৭]

• ইবাদত ও দাসত্বের উৎকর্ষ ও পরিপূর্ণতা
১- মানুষ বলতেই তিন অবস্থার যে কোন একটিতে অবস্থান করে।
*আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত নেয়ামতসমূহ যেমন সচ্ছলতা, সুস্থতা, নিরাপত্তার মধ্যে। তখন তার দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
*পাপ অন্যায় ও অপরাধ মূলক কাজে লিপ্ত অবস্থায় থাকা। তখন তার কর্তব্য হচ্ছে উক্ত পাপ পরিহার করে কৃত অপরাধের জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা।
* বিপদ ও মুসীবতের মধ্যে থাকা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করতে চান। এ অবস্থায় তার করণীয় হচ্ছে সবর ও ধৈর্য ধারণ করা। যে ব্যক্তি উক্ত তিন অবস্থায় বর্ণিত তিন করণীয় সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারবে সে ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতেই সুখী হবে।
২- মহান আল্লাহ তা’আলা স্বীয় বান্দাদের উবূদিয়্যত তথা দাসত্ব ও ধৈর্য্য পরায়ণতা যাচাই করার উদ্দেশ্যে মাঝে মধ্যে বিপদ-মুসীবতে নিপতিত করেন। এর মাধ্যমে তাঁর উদ্দেশ্য মূলত তাদের ধৈর্য ও দাসত্বের অবস্থা পরীক্ষা করা। তাদের শাস্তি দেয়া কিংবা ধ্বংস করা তাঁর লক্ষ্য নয়।
সুতরাং প্রতিটি বান্দার উপর আল্লাহ তা’আলার অধিকার রয়েছে যে, তারা তাঁর দাসত্ব বরণ করে তাঁর আনুগত্য করবে দুঃসময়ে, যেমনি দাসত্ব করে থাকে সুসময়ে। আনুগত্য করবে নিজেদের অপছন্দনীয় ক্ষেত্রে, যেভাবে করে থাকে পছন্দনীয় বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে। অধিকাংশ মানুষ সহজ ও নিজ পছন্দনীয় বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে উবূদিয়্যতের হক আদায় করে থাকে ঠিকই। তবে অধিক কৃতিত্বপূর্ণ ও মর্যাদাকর হচ্ছে কষ্টকর ও অপছন্দনীয় ক্ষেত্রে উবূদিয়্যতের হক আদায় করা। বান্দাদের অবস্থান এক্ষেত্রে বিভিন্ন ও তারতম্যপূর্ণ।
সুতরাং প্রচণ্ড উষ্ণতার সময় ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করা উবূদিয়্যত। সুন্দরী নারী বিবাহ করা উবূদিয়্যত। অনুরূপভাবে প্রচন্ড শীতে ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করাও উবূদিয়্যত। তীব্র মানসিক চাহিদা সত্ত্বেও মানুষের ভয়ে নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে পাপের কাজ বর্জন করা উবূদিয়্যত। ক্ষুধার কষ্ট স্বীকার করে ধৈর্য ধারণ করাও উবূদিয়্যত। ত