তাক্বদীরঃ আল্লাহ্‌র এক গোপন রহস্য (১ম পর্ব)


তাক্বদীরঃ আল্লাহ্‌র এক গোপন রহস্য (১ম পর্ব)

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য। দরূদ এবং সালাম বর্ষিত হোক আমাদের শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উপর।
তাক্বদীর ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ। প্রকৃত মুমিন হতে হলে অবশ্যই তাক্বদীরে বিশ্বাস করতে হবে, তাক্বদীরে বিশ্বাস স্থাপন বৈ কেউ মুমিন হতে পারবে না। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে তাক্বদীর সংক্রান্ত অসংখ্য বর্ণনা এসেছে। সেজন্য ইসলামে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বিষয়টি সরাসরি আল্লাহ্‌র সাথে সম্পর্কিত হওয়ার কারণে এর গুরুত্ব এবং তাৎপর্য যারপর নেই বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ আল্লাহ্‌র কতিপয় নাম ও গুণাবলীর সাথেই এর সরাসরি সম্পর্ক।
তাক্বদীরে বিশ্বাস মানুষের স্বভাবগত বিষয়। সেজন্য এমনকি জাহেলী যুগেও মানুষ এতে বিশ্বাস করত। জাহেলী অনেক কবির কবিতায় এমন বিশ্বাসের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কবি আনতারা তার প্রেমিকা আবলাকে লক্ষ্য করে বলেন,
يا عَبلُ أينَ من المَنيَّة ِ مَهْربي إن كانَ ربي في السَّماءِ قَضاها
‘হে আবলা! আমার প্রভূ আসমানে যদি আমার মৃত্যুর ফায়ছালা করেই রাখেন, তাহলে মৃত্যু থেকে আমার পালাবার পথ কোথায়!’[1]
এরপর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এসে তাক্বদীরের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তুলে ধরেন। ছাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম) রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট থেকে সরাসরি দ্বীনের জ্ঞান লাভ করেন। সেজন্য তাঁরা ছিলেন তাক্বদীর উপলব্ধির ক্ষেত্রে সর্বাধিক অগ্রগণ্য এবং এর প্রতি তাঁদের বিশ্বাসও ছিল অটুট। ফলে তাঁরা তাক্বওয়া এবং শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কিন্তু ছাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম)-এর যুগের শেষের দিকে ইসলামের ব্যাপক বিস্তৃতির পর মুসলিম দেশসমূহে গ্রীক, পারসিক, ভারতীয় দর্শনের অনুপ্রবেশ ঘটতে শুরু করে। ফলে তাক্বদীর অস্বীকারের মত নিকৃষ্ট মতবাদের জন্ম হয়। তারপর উমাইয়া যুগে জন্ম হয় জাবরিইয়াহ মতবাদের। এসব ভ্রান্ত মতবাদের অপতৎপরতা আজও অব্যাহত রয়েছে।
মহান আল্লাহ আহলুস্‌ সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতকে তাক্বদীরের সঠিক উপলব্ধি দান করেছেন। কারণ তারা সরাসরি পবিত্র কুরআন, ছহীহ হাদীছ এবং সালাফে ছালেহীনের বক্তব্য অনুযায়ী তাক্বদীর বুঝার চেষ্টা করেছেন। মূলতঃ তাক্বদীরসহ শরী‘আতের  যেকোনো বিষয় বুঝার ক্ষেত্রে এই পথেই মুক্তি নিহিত রয়েছে।
তাক্বদীরের মৌলিক বিষয়গুলি উপলব্ধি করতে পারলে একজন মুমিনের ঈমান পরিপক্ক হবে, আল্লাহ সম্পর্কে তার ধারণা সুন্দর হবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সে প্রভূত কল্যাণ অর্জন করতে পারবে। পক্ষান্তরে তাক্বদীরে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হলে উভয় জীবনে নেমে আসবে চরম হতাশা এবং মর্মন্তুদ শাস্তি।
আমরা এ প্রবন্ধে তাক্বদীরের মৌলিক বিষয়গুলি সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহই একমাত্র তাওফীক্বদাতা।
তাক্বদীর নিয়ে আলোচনা করা কি নিষেধ?
অনেকেই বলে তাক্বদীর সম্পর্কে আলোচনা করা মোটেই ঠিক নয়। কারণ এ সম্পর্কে আলোচনা করলে হৃদয়ের মণিকোঠায় সন্দেহের ধূম্রজাল বাসা বাধতে পারে। তবে বিষয়টি আসলে তেমন নয়। কারণঃ
১. তাক্বদীর ঈমানের অন্যতম একটি রুকন। এর প্রতি  ঈমান না আনয়ন করা পর্যন্ত কারো ঈমান পূর্ণ হবে না। কিন্তু এ সম্পর্কে আলোচনা না করলে একজন মুসলিম তা কিভাবে বুঝবে?!
২. অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদীছ ‘হাদীছে জিবরীল’-এ প্রসঙ্গে আলোচনা এসেছে। বলা বাহুল্য যে, জিবরীল (‘আলাইহিস্‌সালাম) মানুষের রূপ ধরে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও ছাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম)-এর নিকটে হাদীছটি নিয়ে এসেছিলেন এবং ঘটনাটি ছিল রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শেষ জীবনে। সেদিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছিলেন,
«فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ أَتَاكُمْ يُعَلِّمُكُمْ دِينَكُمْ»
‘তিনি হচ্ছেন জিবরীল (‘আলাইহিস্‌সালাম)। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন’।[2] বুঝা গেল, তাক্বদীর সম্পর্কে জানা দ্বীনের অংশ; তাক্বদীরের অন্ততঃ প্রাথমিক জ্ঞানটুকু থাকা যরূরী।
৩. এ বিষয়ে অসংখ্য আয়াতে তাক্বদীরের বিবরণ এসেছে। আর মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের আয়াতসমূহ গবেষণার নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে,
﴿كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ﴾ [سورة ص: 29]
‘এটি একটি বরকতময় কিতাব। এটিকে আমি আপনার উপর অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ গবেষণা করে’ (ছোয়াদ ২৯)।  তাহলে আমরা কিভাবে বলতে পারি যে, এ বিষয়ে আলোচনা করা ঠিক নয়?!
৪. তাক্বদীর সম্পর্কে অনেক হাদীছ এসেছে। ছাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম) রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে তাক্বদীরের সূক্ষ্ম বিষয়েও জিজ্ঞেস করতেন এবং তিনি তাঁদেরকে সঠিক জবাব দিতেন। অনুরূপভাবে ছাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম)ও তাঁদের ছাত্র তাবেঈনকে তাক্বদীর বিষয়ে শিক্ষা দিতেন।
৫. ছাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম)সহ আমাদের পূর্বসূরী প্রায় সকল আলেম তাক্বদীর সম্পর্কে কথা বলেছেন, পৃথক বই-পুস্তক, প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তাহলে কি তাঁরা রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নির্দেশের বিরোধিতা করেছেন? কখনই না। মানুষ যাতে পথভ্রষ্ট না হয়ে যায় এবং তারা যাতে জাগ্রত জ্ঞান সহকারে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে, সেজন্য তাদেরকে তাক্বদীর বিষয়ক হক্ব কথাটি বুঝানো কি উচিৎ নয়? এ বিষয়ে উত্থাপিত নানা প্রশ্ন এবং জটিলতার সঠিক জবাব দেওয়া কি করণীয় নয়?
৬. আমরা যদি তাক্বদীর সম্পর্কে আলোচনা করা ছেড়ে দিই, তাহলে সাধারণ মানুষ এ বিষয়ে অজ্ঞ হয়ে যাবে। এই সুযোগে বাতিল মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে এবং তাক্বদীর সম্পর্কে মুসলিমদের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পথ সহজ হয়ে যাবে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, তাহলে যেসব হাদীছে তাক্বদীরের আলোচনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেগুলির সঠিক ব্যাখ্যা কি? এক্ষণে, আমরা নীচে এজাতীয় কয়েকটি হাদীছ এবং সেগুলির সঠিক ব্যাখ্যা উল্লেখ করছিঃ
১. রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
 «إذا ذُكِرَ أصْحابِي فأمْسِكُوا وإذا ذُكِرَتِ النُّجُومُ فأَمْسِكُوا وَإذا ذُكِرَ القَدَرُ فأمْسِكُوا»
‘আমার ছাহাবা (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম)-এর কথা উঠলে তোমরা আলোচনায় প্রবৃত্ত হবে না। তারকারাজির বিধিবিধান, প্রভাব ইত্যাদি বিষয়ে কথা উঠলে তোমরা আলোচনায় প্রবৃত্ত হবে না। অনুরূপভাবে তাক্বদীর সম্পর্কে কথা উঠলে তোমরা আলোচনায় প্রবৃত্ত হবে না’।[3]
২. আবু হুরায়রাহ (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
‘আমরা তাক্বদীর নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছিলাম, এমন সময় আমাদের নিকট রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আসলেন। অতঃপর তিনি ভীষণ রেগে গেলেন, রাগের প্রচণ্ডতায় তাঁর চেহারা মোবারক লাল হয়ে গেল; মনে হচ্ছিল, তাঁর কপোলদ্বয়ে ডালিম ভেঙ্গে তার রস লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর তিনি বললেন, তোমরা কি এমন তর্ক-বিতর্ক করার জন্য আদিষ্ট হয়েছ নাকি আমি এ মর্মে তোমাদের নিকট প্রেরিত হয়েছি! তোমাদের পূর্ববর্তীরা তো তখনই ধ্বংস হয়েছিল, যখন তারা এ বিষয়ে ঝগড়া করেছিল। তোমাদের প্রতি আামার কঠোর নির্দেশ রইলো যে, তোমরা এ নিয়ে তর্ক করবে না’।[4]
হাদীছগুলির সঠিক ব্যাখ্যাঃ
 ১. হাদীছগুলির উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাক্বদীর নিয়ে বিনা দলীলে এবং বিনা জ্ঞানে অহেতুক এবং বিভ্রান্তিকর আলোচনা করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন,
 ﴿وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ﴾ [سورة الاسراء: 36]
‘যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে তুমি মাথা ঘামাইও না’ (ইসরা ৩৬)।  কারণ কুরআন-হাদীছের দিকনির্দেশনা বাদ দিয়ে শুধুমাত্র মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান দ্বারা তাক্বদীরের সবকিছু অনুধাবন আদৌ সম্ভব নয়। অতএব, বিতর্কমূলক এবং আল্লাহ্‌র সিদ্ধান্তে সামান্যতম আপত্তিকর কোন আলোচনা করা যাবে না।
তবে কুরআন ও ছহীহ হাদীছের দলীল ভিত্তিক তাক্বদীর বুঝার উদ্দেশ্যে এ প্রসঙ্গে আলোচনা করা যাবে; বরং আলোচনা করা উচিৎ।
২. হাদীছগুলিতে তাক্বদীর নিয়ে আপত্তিকর প্রশ্ন উত্থাপন করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমনঃ কেউ একগুঁয়েমী প্রশ্ন করতে পারে, আল্লাহ কেন অমুককে হেদায়াত করলেন, আর অমুককে পথভ্রষ্ট করলেন? এত সৃষ্টি থাকতে আল্লাহ কেন মানুষের উপর শরী‘আতের দায়িত্ব ভার অর্পণ করলেন? আল্লাহ কেন অমুককে ধনী করলেন, আর অমুককে গরীব করলেন? ইত্যাদি…সেজন্য আবূ হুরায়রাহ (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বর্ণিত উক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় মোল্লা আলী ক্বারী তাক্বদীর নিয়ে ছাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম)-এর ঐদিনের আলোচনার ধরণ তুলে ধরেন এভাবে, আমরা তাক্বদীর নিয়ে বিতণ্ডা করছিলাম। আমাদের কেউ কেউ বলছিলেন, সবকিছু যদি তাক্বদীর অনুযায়ী হয়ে থাকে, তাহলে কেন বান্দাকে সুখ বা শাস্তি দেওয়া হবে? যেমনটি মু‘তাযিলারা বলে থাকে। আবার কেউ কেউ বলছিলেন, একদলকে জান্নাতী এবং অপর দলকে জাহান্নামী হিসাবে নির্ধারণ করার তাৎপর্য কি? এর জবাবে তাঁদের কেউ কেউ বলছিলেন, কেননা বান্দার নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। এর জবাবে আবার কেউ কেউ বলছিলেন, তাহলে তার সেই ইচ্ছাশক্তি কে সৃষ্টি করেছেন?[5] আর এমন বিতণ্ডার কারণেই সেদিন রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রেগে গিয়েছিলেন এবং তাঁদেরকে এত্থেকে নিষেধ করেছিলেন।
তবে কেউ সত্যিকার অর্থে তাক্বদীর জানার জন্য প্রশ্ন করলে তাতে কোন দোষ নেই।
৩. ইবনে মাসঊদ (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বর্ণিত উক্ত হাদীছেই আমরা আমাদের এ মতের পক্ষে বক্তব্য পাই। কেননা হাদীছটিতে বলা হয়েছে, ছাহাবায়ে করাম (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম)-এর কথা উঠলে তোমরা আলোচনায় প্রবৃত্ত হবে না। তার মানে কি এই যে, তাঁদের মর্যাদা-মাহাত্ম্যের কথা বলা যাবে না? নিশ্চয়ই তা নয়। বরং এখানে তাঁদের মাঝে সৃষ্ট মতানৈক্য, কলহ-দ্বন্দ্ব নিয়ে আলোচনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাক্বদীরের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক তদ্রূপই।
৪. রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এসব হাদীছে ছাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম) কে তাক্বদীর নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করতে নিষেধ করেছেন। কারণ তর্ক-বিতর্ক হলে মতানৈক্য সৃষ্টি হয় আর মতানৈক্য সৃষ্টি হলে সেখানে অসত্য প্রবেশ করে। তবে ভ্রান্ত ফের্কাগুলির বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের জবাব দেওয়া নিষিদ্ধ আলোচনার অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং তা হক্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সংগ্রামের শামিল।
একটি প্রশ্ন এবং তার সমাধান: বিদ্বানগণ বলছেন, তাক্বদীর আল্লাহ্‌র এক গোপন রহস্য। তাহলে আমরা কিভাবে এমন একটি বিষয়ে কথা বলতে পারি? জবাবে বলব, আমরাও অকপটে স্বীকার করি, তাক্বদীর আল্লাহ্‌র গোপন রহস্য। কিন্তু তাক্বদীর গোপন রহস্য হওয়ার বিষয়টি বেশীরভাগ ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌র বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের হিকমতের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন: আল্লাহ পথভ্রষ্ট করেন, পথ প্রদর্শন করেন, মৃত্যু ঘটান, জীবন দান করেন, কাউকে দেন আবার কাউকে মাহরূম করেন ইত্যাদি বিষয়ে আল্লাহ্‌র হিকমত জানতে চাওয়া বৈধ নয়।[6]
হাযার চেষ্টা সত্ত্বেও তাক্বদীরের সবকিছু বুঝা সম্ভব নয়। কারণ, তাক্বদীরের জ্ঞান গায়েবী বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত; যা আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ জানেন না, তিনি যদি কাউকে না জানিয়ে থাকেন, তবে অন্যরা সেটা কিভাবে জানবে? এমনকি আল্লাহ্‌র নিকটতম কোন ফেরেশতা এবং নবী-রাসূল (আলাইহিমুস সালাম)গণও গায়েবের কোনই খবর রাখেন না। সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ স্বয়ং রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে লক্ষ্য করে মহান আল্লাহ বলেন,
‘আপনি বলে দিন, আমি আমার নিজের কল্যাণ সাধনের এবং অকল্যাণ সাধনের মালিক নই, কিন্তু আল্লাহ চান, তা ব্যতীত। আর আমি যদি গায়েবের কথা জানতাম, তাহলে অনেক কল্যাণ অর্জন করতে পারতাম এবং কোন অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারত না। আমি ঈমানদারগণের জন্য শুধুমাত্র একজন ভীতিপ্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা বৈ আর কিছুই নই’ (আ‘রাফ ১৮৮)
মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান দিয়ে তাক্বদীরের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ে গভীর চিন্তা করলে পথভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। অতএব একজন প্রকৃত মুমিনের আল্লাহ্‌র বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই। একজন মুমিনকে রীতিমত সৎকর্ম করে যেতে হবে এবং অসৎকর্ম বর্জন করতে হবে।[7]
তাক্বদীরের অর্থ
‘আল-ক্বাদার’ (اَلْقَدَرُ) বা তাক্বদীরের আভিধানিক অর্থঃ
‘আল-ক্বাদার’ (اَلْقَدَرُ) শব্দটির ‘দাল’ বর্ণে যবর দিয়ে অথবা সাকিন করে দু’ভাবেই পড়া যায়। ‘মুজমালুল্লুগাহ’ (مجمل اللغة) অভিধান প্রণেতা বলেন, ‘আল-ক্বাদ্‌র’ (اَلْقَدْرُ) অর্থঃ কোন কিছুর পরিধি, সীমা বা পরিমাণ। অনুরূপভাবে ‘আল-ক্বাদার’ (اَلْقَدَرُ)-এরও একই অর্থ।[8] ‘মু‘জামু মাক্বায়ীসিল্লুগাহ’ (معجم مقاييس اللغة) প্রণেতা বলেন, ‘আল-ক্বাদার’ (اَلْقَدَرُ) শব্দটি কোন কিছুর পরিধি বা শেষ সীমানা নির্দেশ করে। তিনি বলেন, আল্লাহ কর্তৃক তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী সবকিছুর পরিমাণ, শেষ সীমা ইত্যাদি নির্ধারণ করার নাম ‘আল-ক্বাদ্‌র’ (اَلْقَدْرُ)। ‘আল-ক্বাদার’ (اَلْقَدَرُ)ও একই অর্থে ব্যবহৃত হয়।[9] ইবনে মানযূর (রহেমাহুল্লাহ) লেহ্‌ইয়ানী (রহেমাহুল্লাহ) থেকে উল্লেখ করেন, যবর যোগে শব্দটি বিশেষ্য (اسم) এবং সাকিন যোগে ক্রিয়ামূল (مصدر) হিসাবে ব্যবহৃত হয়।[10]
তাক্বদীরের পারিভাষিক অর্থঃ
সবকিছু ঘটার আগেই সে সম্পর্কে আল্লাহ্‌র সম্যক জ্ঞান, সেগুলি লাউহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ করণ, তদ্বিষয়ে তাঁর পূর্ণ ইচ্ছার সমন্বয় এবং অবশেষে সেগুলিকে সৃষ্টি করাকে তাক্বদীর বলে।[11]
তাক্বদীরে বিশ্বাসের অপরিহার্যতাঃ
ঈমানের ছয়টি রুকনের মধ্যে তাক্বদীর অন্যতম। ঈমানের এ গুরুত্বপূর্ণ রুকনটির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করা পর্যন্ত কেউ মুমিন হতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেন,
 ﴿إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَرٍ﴾ [سورة القمر: 49]
‘নিশ্চয় প্রত্যেকটি জিনিসকে আমরা ‘ক্বাদর’ তথা পরিমিতরূপে সৃষ্টি করেছি (আল-ক্বামার ৪৯)। ইবনু কাছীর (রহেমাহুল্লাহ) বলেন, আহলে সুন্নাতের আলেমগণ এই আয়াত দ্বারা তাক্বদীর সাব্যস্ত হওয়ার দলীল গ্রহণ করেন।[12] অন্য আয়াতে এসেছে,
 ﴿وَكَانَ أَمْرُ اللَّهِ قَدَرًا مَّقْدُورًا﴾ [سورة الأحزاب 38]
‘আর আল্লাহ্‌র বিধান সুনির্দিষ্ট, অবধারিত’ (আল-আহযাব ৩৮)। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হাফেয ইবনু কাছীর (রহেমাহুল্লাহ) বলেন, অর্থাৎ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিষয় অবশ্যই ঘটবে, এর সামান্যতম কোন ব্যত্যয় ঘটবে না। তিনি যা চান, তা ঘটে। আর যা তিনি চান না, তা ঘটে না।[13]
হাদীছে জিবরীলে ঈমানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে,
 «أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ»
‘আল্লাহ্‌র প্রতি, তাঁর ফেরেশতামণ্ডলী, আসমানী কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, শেষ দিবস এবং তাক্বদীরের ভাল-মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের নাম ঈমান’।[14]
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনিল আছ (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন, ‘আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছি,
«كَتَبَ اللَّهُ مَقَادِيرَ الْخَلاَئِقِ قَبْلَ أَنْ يَخْلُقَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ بِخَمْسِينَ أَلْفَ سَنَةٍ -قَالَ- وَعَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ»
‘আসমান-যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাযার বছর পূর্বে আল্লাহ সবকিছুর তাক্বদীর লিখে রেখেছেন। তিনি বলেন, আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে’।[15]
ত্বাঊস (রহেমাহুল্লাহ) বলেন, আমি অনেকজন ছাহাবীকে পেয়েছি, যাঁরা বলতেন, সবকিছু তাক্বদীর অনুযায়ীই হয়। তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) কে বলতে শুনেছি, তিনি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন, ‘সবকিছু তাক্বদীর মোতাবেকই ঘটে থাকে, এমনকি অপারগতা এবং বিচক্ষণতাও, অথবা বিচক্ষণতা ও অপারগতাও।[16] অন্য এক হাদীছে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন,
« لَا يُؤْمِنُ الْمَرْءُ حَتَّى يُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ »
‘তাক্বদীরের ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান না আনা পর্যন্ত কেউ মুমিন হতে পারবে না’।[17]
এ ধরনের আরো বহু আয়াত এবং হাদীছ আছে, যেগুলি অকাট্যভাবে তাক্বদীরের প্রতি ঈমান আনার অপরিহার্যতা প্রমাণ করে।
এছাড়া মুসলিম আলেমগণ সর্বসম্মতিক্রমে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, তাক্বদীরের ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান আনা অপরিহার্য। ইমাম নববী (রহেমাহুল্লাহ), শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিইয়াহ (রহেমাহুল্লাহ), ইবনে হাজার (রহেমাহুল্লাহ)সহ অনেকেই এই ইজমা উল্লেখ করেছেন।[18]
তাক্বদীরের স্তরসমূহ
 তাক্বদীরের স্তর চারটি। মূলতঃ এই চারটি স্তরের উপর তাক্বদীরের ভিত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত বলে অনেকেই এগুলিকে তাক্বদীরের রুকন বা স্তম্ভ হিসাবে আখ্যা দিয়েছেন।[19]
এগুলিকে আবার তাক্বদীর উপলব্ধির প্রবেশদ্বারও বলা হয়। সেজন্য প্রত্যেক মুসলিমের এ চারটি স্তর সম্পর্কে অন্ততঃ প্রাথমিক জ্ঞানটুকু থাকা অতীব যরূরী। এগুলির একটি আরেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে ব্যক্তি এই চারটি স্তরের প্রত্যেকটি জানবে এবং বিশ্বাস করবে, তাক্বদীরের প্রতি তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি এই চারটির কোন একটি বা একাধিক অমান্য করবে, তাক্বদীরের প্রতি তার ঈমান ত্রুটিপূর্ণ থেকে যাবে।[20]
ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রহেমাহুল্লাহ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি এই চারটি স্তরে বিশ্বাসী নয়, সে মূলতঃ তাক্বদীরকেই বিশ্বাস করে না’।[21]  নিম্নে উক্ত চারটি স্তরের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হলঃ
প্রথম স্তর: সবকিছু সম্পর্কে আল্লাহ্‌র চিরন্তন জ্ঞানের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনঃ
একথার অর্থ হচ্ছে, সবকিছু সম্পর্কে আল্লাহ্‌র পরিপূর্ণ জ্ঞান আছে এমর্মে আমাদেরকে দৃঢ় বিশ্বাস করতে হবে। যা কিছু ঘটেছে এবং যা কিছু ঘটবে, সে সম্পর্কে তিনি জানেন। আর যা ঘটেনি, তা যদি ঘটত, তাহলে কিভাবে ঘটত, তাও তিনি জানেন। সৃষ্টির ভাল-মন্দ, আনুগত্য-অবাধ্যতা ইত্যাদি সার্বিক কার্যকলাপ সম্পর্কে তিনি খবর রাখেন। তাদের যাবতীয় অবস্থা, হায়াত-মউত, আয়ূস্কাল, রিযিক্ব, নড়াচড়া, স্থির থাকা ইত্যাদি বিষয়ে তিনি সম্যক অবগত। তাদের মধ্যে কে দুর্ভাগা ও কে সৌভাগ্যবান হবে, বরযখী জীবনে তাদের ভাগ্যে কি ঘটবে, পুনরুত্থানের পরে তাদের কি হবে ইত্যাদি সব বিষয়েই তিনি চিরন্তন জ্ঞানের অধিকারী।[22]
ইবনে তায়মিইয়াহ (রহেমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমাদেরকে এ বিশ্বাস করতে হবে যে, সৃষ্টি জীব কি করবে, সে বিষয়ে আল্লাহ তাঁর চিরন্তন জ্ঞানের মাধ্যমে চিরস্থায়ীভাবে সম্যক অবগত। তিনি তাদের সৎকাজ, পাপকাজ, রিযিক্ব, আয়ূসহ সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে ওয়াক্বিফহাল’।[23]
উছমান ইবনে সাঈদ (রহেমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আমাদেরকে অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, সৃষ্টি জীবকে সৃষ্টির আগে থেকেই আল্লাহ তাদের সম্পর্কে ও তাদের আমল সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও জ্ঞাত থাকবেন। সৃষ্টি জগতকে সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর চিরন্তন জ্ঞানের সাথে একটি সরিষার দানা পরিমাণও যোগ হয় নি’।[24]
মহান আল্লাহ বলেন,
‘তাঁর কাছেই গায়েবী বিষয়ের চাবিসমূহ রয়েছে; এগুলি তিনি ব্যতীত কেউ জানে না। স্থলে ও জলে যা কিছু আছে, তিনিই জানেন। তাঁর জানার বাইরে (গাছের) কোন পাতাও ঝরে না। তাক্বদীরের লিখন ব্যতীত কোন শস্যকণা মৃত্তিকার অন্ধকার অংশে পতিত হয় না এবং কোন আর্দ্র ও শুষ্ক দ্রব্যও পতিত হয় না’ (আন‘আম ৫৯)
অন্যত্রে তিনি বলেন,
‘নিশ্চয় আল্লাহ্‌র কাছেই ক্বিয়ামতের জ্ঞান রয়েছে। তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং গর্ভাশয়ে যা থাকে, তিনি তা জানেন। কেউ জানে না আগামীকাল সে কি উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না কোথায় সে মৃত্যুবরণ করবে। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে সম্যক জ্ঞাত’ (লুক্বমান ৩৪)
মহান আল্লাহ আরও বলেন,
﴿عَلِمَ أَن سَيَكُونُ مِنكُم مَّرْضَىٰ ۙ وَآخَرُونَ يَضْرِبُونَ فِي الْأَرْضِ يَبْتَغُونَ مِن فَضْلِ اللَّهِ ۙ وَآخَرُونَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ﴾ [سورة المزمل: 20]
‘তিনি জানেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ অসুস্থ হবে, কেউ কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধানে যমীনে বিচরণ করবে এবং কেউ কেউ আল্লাহর পথে জিহাদে লিপ্ত হবে’ (মুয্‌যাম্মেল ২০)
 অন্যত্র আল্লাহ বলেন,
﴿هُوَ اللَّهُ الَّذِي لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ﴾ [سورة الحشر: 22]
‘তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ, যিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। তিনি অদৃশ্য এবং দৃশ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত’ (হাশর ২২)
হাদীছে এসেছে, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে যখন মুশরিকদের ছেলে-মেয়ে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘তারা বেঁচে থাকলে কি আমল করত, সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবগত’।[25]
ইমরান ইবনে হুছাইন (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী তা কি পরিজ্ঞাত বিষয়? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’। লোকটি বললেন, তাহলে মানুষ কেন আমল করবে? তিনি বললেন,
 «كُلٌّ يَعْمَلُ لِمَا خُلِقَ لَهُ أَوْ لِمَا يُيَسِّرُ لَهُ»
‘যাকে যেজন্য সৃষ্টি করা হয়েছে বা যার জন্য যা সহজ করা হয়েছে, সে তা-ই করবে’।[26] এরকম অসংখ্য আয়াত এবং হাদীছ রয়েছে, যেগুলি সর্ব বিষয়ে মহান আল্লাহ্‌র চিরন্তন জ্ঞানের প্রমাণ বহন করে।
দ্বিতীয় স্তর: আল্লাহ তাঁর চিরন্তন জ্ঞান অনুযায়ী লাউহে মাহ্‌ফূযে ক্বিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে তার সবই লিখে রেখেছেন এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করাঃ[27]
অর্থাৎ আমাদেরকে দৃঢ় বিশ্বাস করতে হবে যে, মহান আল্লাহ লাউহে মাহফূযে তাঁর চিরন্তন জ্ঞান মোতাবেক সৃষ্টিজগতের সবকিছুর তাক্বদীর কলম দ্বারা বাস্তবেই লিখে রেখেছেন; তাঁর চিরন্তন জ্ঞানের কোন কিছুই এই লেখনী থেকে বাদ পড়ে নি। আর লাউহে মাহ্‌ফূযের এই লিখন ছিল আসমান-যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাযার বছর পূর্বে। তখন আল্লাহ কলম সৃষ্টি করে তাকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে সবকিছু লেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন।[28]
ইবনে তায়মিইয়াহ (রহেমাহুল্লাহ) বলেন, ‘অতঃপর তিনি লাউহে মাহ্‌ফূযে সৃষ্টির তাক্বদীর লিখেন। সর্বপ্রথম তিনি কলম সৃষ্টি করে তাকে বলেন, লিখ। সে বলে, আমি কি লিখব? আল্লাহ বলেন, ক্বিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু হবে, তার সবই লিখ’।[29]
মহান আল্লাহ বলেন,
﴿أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ۗ إِنَّ ذَٰلِكَ فِي كِتَابٍ ۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ﴾ [سورة الحج: 70]
‘তুমি কি জান না যে, আসমান-যমীনে যা কিছু আছে, সব বিষয়ে আল্লাহ জানেন। এ সবকিছুই কিতাবে লিখিত আছে। এটা আল্লাহ্‌র কাছে সহজ’ (হাজ্জ ৭০)
 অন্যত্র মহান আল্লাহ এরশাদ করেন,
﴿مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِّن قَبْلِ أَن نَّبْرَأَهَا ۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ﴾ [سورة الحديد: 22]
‘যমীনে এবং ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর এমন কোন মুছীবত আসে না, যা জগত সৃষ্টির পূর্বেই কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই। নিশ্চয়ই এটি আল্লাহ্‌র পক্ষে সহজ’ (আল-হাদীদ ২২)
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনিল আছ (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) বলেন, ‘আমি রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, ‘আসমান-যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাযার বছর পূর্বে আল্লাহ সবকিছুর তাক্বদীর লিখে রেখেছেন। তিনি বলেন,  আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে’।[30]
ইমরান ইবনে হুছাইন (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘আল্লাহ ছিলেন; তাঁর পূর্বে কিছুই ছিল না। আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপরে। অতঃপর আল্লাহ আসমান-যমীন সৃষ্টি করলেন এবং লাউহে মা