রাসুলুল্লাহ সঃ এর জীবনী পার্ট -দুইদুই


হযরত মুহাম্মদ স :নবী জীবনীমুর্তি পূজাই ছিল আরব দেশে প্রচলিত ধর্ম। সত্যধর্মের পরিপন্থী এ ধরনের মূর্তিপূজাবাদঅবলম্বন করার কারণে তাদরে এ যুগকেআইয়্যামে জাহেলিয়াত তথা মুর্খতার যুগ বলা হয়। লাত,উযযা, মানাত ও হুবল ছিল তাদের প্রসিদ্ধউপাস্যগুলোর অন্যতম। আরবের কিছু লোকইয়াহূদী বা খৃষ্টান ধর্ম বা অগ্নি পুজকদের ধর্মগ্রহণ করেছিল। আবার স্বল্প সংখ্যক লোক ছিল যারাইবরাহিম আলাইহিস সালাম এর প্রদর্শিত পথে ছিলঅবিচল, আঁকড়ে ধরেছিল তাঁর আদর্শ। অর্থনৈতিক দিকদিয়ে বেদুঈনরা সম্পূর্ণভাবে পশু সম্পদের উপরনির্ভর করত। আর নগরবাসীদের নিকট অর্থনৈতিকজীবনেরও ভিত্তি ছিল কৃষি কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্য।ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে আরব দেশে মক্কাইছিল বৃহত্তর বাণিজ্য নগরী। অন্যান্য বিভিন্নঅঞ্চলে উন্নয়ন ও নাগরিক সভ্যতা ছিল। সামাজিক দিকদিয়ে যুলুম সবর্ত্র বিরাজমান ছিল, সেখানেদুর্বলের ছিলনা কোন অধিকার। কন্যা সন্তানকেজীবদ্দশায় দাফন করা হতো। মান-ইজ্জত ওসম্মানকে করা হতো পদদলিত। সবল দুর্বলেরঅধিকার হরণ করতো। বহুবিবাহ প্রথার কোন সীমাছিল না। ব্যভিচার অবাধে চলতো। নগন্য ও তুচ্চকারণে যুদ্ধের অগ্নিশিখা জ্বলে উঠতো।সংক্ষেপে বলতে গেলে-ইসলামেরআবির্ভাবের পূর্বে আরব দ্বীপের সার্বিকপরিস্থিতি এ ধরনের ভয়াবহই ছিল।ইবনুয্যাবিহাঈনরাসূলের দাদা আব্দুল মুত্তালিবের সাথে কুরাইশরাছেলে-সন্তান ও সম্পদের গৌরব ও অহংকারপ্রদর্শন করতো। তাই তিনি মানত করলেন যে,আল্লাহ যদি তাকে দশ জন ছেলে দান করেনতাহলে তিনি এক জনকে কথিত ইলাহের নৈকট্যপ্রাপ্তির লক্ষ্যে যবেহ করবেন। তাঁর সাধ বাস্তবরূপ পেল। দশ জন ছেলে জুটলো তাঁর ভাগ্যে।তাদের একজন ছিলেন নবীর পিতা আব্দুল্লাহ।আব্দুল মুত্তালিব মানব পুরোন করতে চাইলেলোকজন তাকে বাধা দেয়, যাতে এটা মানুষেরমধ্যে প্রথা না হয়ে যায়। অতঃপর সবাই আব্দুল্লাহ এবংদশটি উটের মধ্যে লটারীর তীর নিক্ষেপকরতে সম্মত হয়। যদি লটারীতে আব্দুল্লাহ নামআসে তাহলে প্রতিবার ১০টি করে উট সংখ্যায় বৃদ্ধিকরা হবে। লটারী বারংবার আব্দুল্লাহর নামে আসতেথাকে। দশমবারে লটারী উটের নামে আসে যখনতার সংখ্যা ১০০ তে দাড়ায়। ফলে তাঁরা উট যবেহ করলএবং রক্ষা পেল আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহ তাঁর পিতাআব্দুল মুত্তালিবের সব চাইতে প্রিয় ছেলে ছিল।আব্দুল্লাহ তরুণ্যের সীমায় পা রাখলে তাঁর পিতাবনী যোহরা গোত্রের আমেনা বিনতে ওয়াহাবনামক এক তরুণীর সাথে তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা করে।বিয়ের পর আমেনা অন্তঃসত্বা হবার তিন মাস পরআব্দুল্লাহ এক বানিজ্যিক কাফেলার সাথে সিরিয়ারউদ্দেশ্যে রাওয়ানা হয়। কিন্তু প্রত্যাবর্তনেরপথে রোগাক্রান্ত হয়ে মদিনায় বনী নাজ্জারগোত্রে তাঁর মামাদের কাছে অবস্থান করে এবংসেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়সেখানে। এদিকে গর্ভের মাসগুলো পুরোহয়ে প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসলো। আমেনাঅবশেষে সন্তান প্রসব করলো। আর এ ঐতিহাসিকঘটনা সংঘটিত হয় ৫৭১ ইং এর ১২ই রবিউল আওয়ালসোমবার ভোরবেলায়। উল্লেখ্য যে সেবছরেই হস্তী বাহিনীর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল।হস্তী বাহিনীর ঘটনাহস্তী বাহিনীর সংক্ষিপ্ত ঘটনা হলো:আবরাহা ছিল ইথিওপিয়ার শাসক কর্তৃক নিযুক্ত ইয়ামানেরগভর্নর। সে আরবদেরকে কাবা শরিফে হজ্জকরতে দেখে সানআতে (বর্তমানে ইয়ামানেররাজধানী) এক বিরাট গির্জা নির্মাণ করলো যেনআরবরা এ নব নির্মিত গির্জায় হজ্জ করে। কেননাগোত্রের এক লোক (আরবের একটা গোত্র)তা শুনার পর রাতে প্রবেশ করে, গির্জারদেয়ালগুলোকে পায়খানা ও মলদ্বারা পঙ্কিল করেদেয়। আবরাহা এ কথা শুনার পর রাগে ক্ষেপেউঠলো। ৬০ হাজারের এক বিরাট সেনা বাহিনী নিয়েকাবা শরিফ ধ্বংস করার জন্য রওয়ানা হলো। নিজেরজন্য সে সব চেয়ে বড় হাতিটা পছন্দ করলো।সেনাবাহিনীর মধ্যে নয়টি হাতি ছিল। মক্কারনিকটবর্তী হওয়া পর্যন্ত তাঁরা যাত্রা অব্যাহতরাখলো। তাঁর পর সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করেমক্কা প্রবেশ করায় উদ্ধত হলো কিন্তু হাতি বসেগেল কোনক্রমেই কাবার দিকে অগ্রসর করানোগেলনা। যখন তারা হাতীকে কাবার বিপরীত দিকেঅগ্রসর করাতো দ্রুত সে দিকে অগ্রসর হতোকিন্তু কাবার দিকে অগ্রসর করাতে চাইলে বসেপড়তো। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাদের প্রতি প্রেরণকরেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি যা তাদের উপর পাথরেরটুকরা নিক্ষেপকরা শুরু করে দিয়েছিল। অতঃপরতাদরেকে ভক্ষিত ভৃণ সদৃশ করে দেয়া হয়।প্রত্যেক পাখি তিনটি করে পাথর বহন করছিল। ১টিপাথর ঠোঁটে আর দুটি পায়ে। পাথর দেহেপড়ামাত্র দেহের সব অঙ্গ-প্রতঙ্গ টুকরোটুকরো হয়ে যেতো। যারা পলায়ন করে তাঁরাওপথে মৃত্যুর ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি।আবরাহা এমনি একটি রোগে আক্রান্ত হয় যার ফলেতাঁর সব আঙ্গুল পড়ে যায় এবং সে সানআয় পাখির ছানারমত পৌছলো এবং সেখানে মৃত্যু হলো। কুরাইশরাগিরিপথে বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল এবং সেনাবাহিনীরভয়ে পর্বতে আশ্রয় নিয়েছিল। আবরাহারসেনাবাহিনীর এ অশুভ পরিণামের পর তাঁরা নিরাপদেঘরে ফিরে আসে। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের ৫০ দিন পূর্বে এঘটনা সংঘটিত হয়।দুগ্ধ পানআরবদের প্রথা ছিল যে তাঁরা তাদের শিশুদেরকেবেদুঈন অধ্যুষিত মরু অঞ্চলে লালন-পালন করারউদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিত। সেখানে তাদের দৈহিকসুস্থতার অনুকুল পরিবেশ ছিল। রাসূলের পবিত্র জন্মলাভের পর বনী সা‘দ গোত্রের কিছু বেদুঈনলোক মক্কায় আসে। তাদের মহিলারা মক্কার ঘরেঘরে শিশুর অনুসন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তুরাসূলের পিতৃহীনতা ও দারিদ্রের কারণে কেউতাকে নেয়নি। হালিমা সা‘দিয়াও ছিল তাদের মধ্যেএকজন। সবার মত সেও ছিল বিমুখ। শিশু পালনেরপারিশ্রমিক দিয়ে জীবনের অভাব অনটন বিমোচনকরার লক্ষ্যে মক্কার অধিকাংশ ঘরে শিশুর অনুসন্ধানকরেও সফল হয়নি সে। অধিকন্তু সে বছরে ছিলঅনাবৃষ্টি ও খরা। তাই স্বল্প পরিশ্রমিকে এতিমসন্তানকে নেয়ার উদ্দেশ্যে আমেনার ঘরেআবার ফিরে আসে সে। হালিমা আপন স্বামীরসাথে মক্কায় মন্থর গতিতে চলে এমন একটি দূর্বলগাধিনী নিয়ে এসেছিল। কিন্তু প্রত্যাবর্তনেরপথে রাসূলকে কুলে নেয়ার পর গাধিনী অত্যন্তদ্রুত গতিতে চলতেছিল এবং অন্যান্য সবজানোয়ারকে পিছনে ফেলে আসছিল। ফলেসফর সঙ্গীরা অত্যন্ত আশ্চর্যাম্বিত হয়। হালিমাআরো বর্ণনা করেন যে, তাঁর স্তনে কোন দুধছিল না, তাঁর ছেলে ক্ষুধায় সর্বদা কাঁদতো। রাসূলেকরীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পবিত্র মুখস্তনে রাখার পর প্রচুর পরিমাণে দুধ তাঁর স্তনেআসতে লাগলো। বনী সা‘দ গোত্রের অধ্যুষিতঅঞ্চলের অনাবৃষ্টি সম্পর্কে বলে যে, এ শিশু(মহাম্মদ) দুধ পান করার বদৌলতে জামিতে উৎপন্নহতে লাগলো ফল মুল এবং ছাগল ও অন্যান্য পশুদিতে লাগলো বাচ্চা। অবস্থা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।দারিদ্র ও অভাব-অনটনের পরিবর্তে সুখ ও সমৃদ্ধিসর্বত্র রিাজমান। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামহালিমার পরিচর্যায় দুবছর পালিত হয়।হালিমা তাঁকে দারুণ ভাবে চাইতো। হালিমা নিজেইহৃদয়ের গভীরে এ শিশুকে ঘিরে রাখা অস্বাভাবিককিছু জিনিস পুরো অনুভব করতো। দু’বছর শেষহবার পর হালিমা তাকে মক্কায় মাতা ও দাদার কাছে নিয়েআসলো। কিন্তু হালিমা রাসূলের বরকত অবলোকনকরে যে, বরকত তাঁর অবস্থায় পরিবর্তন ঘটায়আমেনার কাছে রাসূলকে দ্বিতীয় বার দেয়ারজন্য আবেদন করলো। আমেনা তাতে সম্মত হয়।হালিমা এতিম শিশুকে নিয়ে নিজ এলাকায় আনন্দ ওসন্তোষ সহকারে ফিরে আসে।বক্ষ বিদারণএক দিন শিশু মুহাম্মাদ হালিমার ছেলেরে সাথে তাবুথেকে দূরে খেলা-ধুলা করতেছিল। এ সময় তাঁরবয়স ছিল চার বছরের কাছাকাছি, এমতাবস্থায় হালিমারছেলে ভীত সন্ত্রস্ত ও আতংকগ্রস্ত হয়েমায়ের কাছে দৌড়ে এসে তাকে কুরাইশী ভায়েরসাহায্যে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানালো। ঘটনা কিজিজ্ঞেস করা হলে সে উত্তর দেয় যে, দু’জনসাদা পোষাক পরিহিত লোককে আমাদরে কাছথেকে মুহাম্মাদকে নিয়ে মাটিতে চিৎকরে তাঁরবক্ষ বিদীর্ণ করতে দেখেছি। তাঁর বর্ণনা শেষনা করতেই হালিমা ঘটনা স্থলের দিকে দৌড়ে যান।গিয়ে দেখেন মুহাম্মদ নিজ স্থানে স্থিরভাবেদাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখমন্ডল হলুদ বর্ণ, দেহফ্যাকাশে। তাঁকে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলেঅত্যন্ত শান্ত ভাবে জবাব দেন যে তিনি ভালআছেন। তিনি আরো বলেন: সাদা পোষাক পরিহিতদু’ব্যিক্তি এসে তাঁর বক্ষবিদীর্ণ করে হৃদয় বেরকরে কাল জমাট বাধা রক্ত বের করে ফেলেদেয়, এবং হৃদয়কে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে আবারযথাস্থানে রেখে দেয়। বক্ষ মুছিয়ে দৃষ্টিরঅন্তরালে চলে যায়। হালিমা বক্ষের সে স্থানটিস্থির করার চেষ্টা করেও কোন চিহ্ন দেখতেপেলেন না। এরপর মুহাম্মদকে নিয়ে তাবুতেফিরে আসেন। পরের দিন ভোর হতেই হালিমামুহাম্মাদকে তাঁর মায়ের কাছে মক্কায় নিয়ে আসে।আমেনা অনির্ধারিত সময়ে হালিমাকে ছেলে নিয়েআসতে দেখে আশ্চর্যাম্বিত হন, অথচ তিনিছেলেকে অন্তর থেকে দেখতে চাচ্ছিলেন।কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে হালিমা বক্ষ বিদারণের ঘটনারপুরো বিবরণ দেন।আমেনার মৃত্যুআমেনা নিজের এতিম শিশু মুহা্ম্মাদকে নিয়েইয়াসরাবে বনী নাজ্জার গোত্রে মামাদের সাথেমিলিত হওয়ার জন্য যাত্রা করে। সেখনে কিছু দিনঅবস্থান করে ফেরার পথে “আবওয়া” নামক স্থানেমৃত্যু বরণ করে এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।ফলে মুহাম্মাদ চার বছর বয়সে মাতৃ-স্নেহ ওআদরের ছায়া থেকে বঞ্চিত হন। দাদা আব্দুলমুত্তালিবকে এ অপূরণীয় ক্ষতির কিছু লাঘব করতেহবে। তাই তিনি তাঁর দেখা-শুনা ও পরিচর্যার দায়িত্বনেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছয়বছর বয়সে পা রাখেন তখন তাঁর দাদা ইহকাল ত্যাগকরেন। অতঃপর চাচা আবু তালিব আর্থিক অভাব-অনটন ওপরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশী থাকা সত্বেও তাঁরদেখা-শুনার দায়িত্ব নেন। রাসূলের চাচা আবূ তালেবও তাঁর স্ত্রী রাসূলের সাথে আপন ছেলের ন্যায়আচরণ করেন। এতিম ছেলের সম্পর্কে আপনচাচার সাথে অনকটা গভীর হয়ে যায়। এ পরিবেশেতিনি বড় হয়ে উঠেন। সততা ও সত্যবাদিতার মত গুণেগুণাম্বিত হয়ে যৌবন কাল অতিবাহিত করেন। এমন কিকেউ যদি বলে আল-আমিন উপস্থিত হয়েছেন বুঝাহতো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমনকরেছেন। রাসূল যখন কিছুটা বড় হয়ে যৌবনেপদার্পন করেন, তখন স্বনির্ভরতা অর্জনেরলক্ষ্যে জীবিকার্জনের চেষ্টা শুরু করেন। শ্রমব্যয় ও উপার্জনের পালা আরম্ভ হলো। তিনিপারিশ্রমিকের বিনিময়ে কুরাইশের কিছু লোকেরছাগলের রাখাল হিসেবে কাজ করেন। খাদিজাবিনতে খোয়াইলিদ কর্তৃক আয়োজিত এক বানিজ্যিকভ্রমনে সিরিয়া গমন করেন। খাদিজা ছিলেনবিত্তশালীনী মহিলা। সে ভ্রমণে সম্পদ ওব্যবসায়িক সামগ্রির তত্বাবধায়ক ছিল তাঁরই দাস“মাইসেরাহ”। রাসূলের বরকত ও সততার কারণেখাদিজার এ ব্যবসায়ে নজীরবিহীন লাভ হয়। তিনিস্বীয় দাস মাইসেরাহর কাছে এর কারণ জানতেচাইলে বল হয় মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ নিজেই বেচা-কেনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ক্রেতার ঢল নামে।ফলে কোন যুলম করা ব্যতিরেকেই আয় হয়প্রচুর। খাদিজা তাঁর দাসের বর্ণনা মনোযোগ দিয়েশুনেন। এমনিতেও তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অনেক কিছু জানতেন। তিনিমুহাম্মদের প্রতি হয়ে পড়েন মুগ্ধ ও অভিভূত।ইতিপূর্বে তিনি একবার বিয়ে করেছিলেন। স্বামীমারা যাওয়ার পরে বিধবাই রইলেন। এখন পুনরায় তাঁরমধ্যে মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহর সাথে নতুনঅভীজ্ঞতায় প্রবেশ করার তীব্র আকাঙ্খাজাগে। তাই এ ব্যাপারে মুহাম্মদের মনোভাব জানারউদ্দেশ্যে নিজের এক আত্মীয়কে পাঠান।রাসূলের নিকট খাদীজার আত্মীয় বিয়ের প্রস্তাবরাখলে তিনি তা গ্রহণ করেন। বিয়ে সম্পাদিত হলো।একে অপরের দ্বারা সুখী হন। তিনি খাদিজার অর্থসম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচারনায় যোগ্যতা ওদক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। খাদিজার ঔরসে জন্ম লাভকরেন যয়নাব, রুকাইয়্যাহ, উম্মেকুলসুম ও ফাতিমা। এবংকাসিম ও আব্দুল্লাহ নামক দু’ছেলে যারা শৈশবেই মারাযান।তাঁর বয়স চল্লিশের নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথেমক্কার আদূরে অবস্থিত হেরা নামক এক গুহায় তিনিনিরিবিলি ও নির্জন অবস্থায় কয়েক দিন করে কাটিয়েদিতেন। পবিত্র রমযানের ২১ তারিখের রাতে হেরাগুহায় তাঁর কাছে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আসেন।তখন তাঁর বয়স ছিল ৪০। জিবরাঈল বলেন, পড়ুন। তিনিবললেন, আমি পড়তে জানি না। জিবরাঈল দ্বিতীয় বারও তৃতীয়বারের মত পুনরায় বললেন। তৃতীয়বারজিবরাঈল বলেন,﴿ ﭐﻗۡﺮَﺃۡ ﺑِﭑﺳۡﻢِ ﺭَﺑِّﻚَ ﭐﻟَّﺬِﻱ ﺧَﻠَﻖَ ١ ﺧَﻠَﻖَ ﭐﻟۡﺈِﻧﺴَٰﻦَ ﻣِﻦۡ ﻋَﻠَﻖٍ ٢ﭐﻗۡﺮَﺃۡ ﻭَﺭَﺑُّﻚَ ﭐﻟۡﺄَﻛۡﺮَﻡُ ٣ ﭐﻟَّﺬِﻱ ﻋَﻠَّﻢَ ﺑِﭑﻟۡﻘَﻠَﻢِ ٤ ﻋَﻠَّﻢَ ﭐﻟۡﺈِﻧﺴَٰﻦَ ﻣَﺎ ﻟَﻢۡﻳَﻌۡﻠَﻢۡ ٥﴾ ‏[ ﺍﻟﻌﻠﻖ 5-1: ]অর্থ: পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টিকরেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তথেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহাদয়ালু, যিনিকলমেন সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষাদিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না। [সূরা আল-আলাক: ১-৫] অতঃপর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম চলেগেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরহেরা গুহায় অবস্থান করতে পারলেন না। তিনি ঘরেএসে খাদিজাকে হ্নদয় স্পন্দিত অবস্থায় বললেন,আমাকে বস্ত্রাচ্ছাদিত করে. আমাকে বস্ত্রাচ্ছাদিতকর। অতঃপর তিনি বস্ত্রাচ্ছাদিত হয়ে শুয়ে পড়লেন।ভীত ও আতংক দূর হয়ে গেলে তিনি সব কিছুখাদিজাকে খুলে বললেন। এরপর তিনি বললেন-আমিনিজের ব্যাপারে আশংকা বোধ করছি। খাদীজাদৃঢ়তার সাথে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “কখনো নয়,আল্লাহর শপথ! আল্রাহ আপনাকে অপমানিত করবেননা। নিশ্চয় আপনি আত্মীয় স্বজনের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখেন, গরীব ও নিঃস্ব ব্যক্তিকেসাহায্য করেন। অতিথিকে সমাদর করেন। এবংবিপদগ্রস্থদের সহায়তা করেন”। কিছু দিন পরে তিনিআল্লাহর ইবাদত অব্যাহত রাখার জন্য আবার হেরা গুহায়ফিরে আসেন।রমযানের অবশিষ্ট দিনগুলো কাটান।রমযান শেষে হেরা গুহা থেকে অবতরণ করেমক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। উপত্যকায় পৌঁছালেজিবরাঈলকে আকাশ ও যমিনের মধ্যবর্তী স্থানেএকটি চেয়ারে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখেন। অতঃপরনিম্নোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। “হেচাদরাবৃত্ত ! উঠুন, সর্তক করুন, আপনার পালন কর্তারমাহাত্ম্য ঘোষণা করুন। আপনার পোষাক পবিত্র করুনএবং অপবিত্রতা দূর করুন।” (মুদ্দাস্সির -১-৫)পরবর্তী সময়ে ওহী অব্যাহত থাকে। রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র দাওয়াতী ব্রতশুরু করলে সর্ব প্রথম তাঁর গুণাবর্তী স্ত্রীখাদীজা (রা) ঈমানের ডাকে সাড়া দেন। আল্লাহরএকত্ববাদ ও তাঁর স্বামীর নবুওয়াতের সাক্ষ্য দেন।তাই তিনি ছিলেন সর্ব প্রথম মুসলমান। রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন চাচা আবুতালিবের স্নেহে,পরিচর্যা ও অবদানের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, যেরাসূলের মাতা ও দাদার পর দেখা-শুনার দায়িত্ব বহনকরেন, তাঁর ছেলে আলির লালন-পালন ও দেখা-শুনারদায়িত্ব নিয়েছিলেন। এ সুন্দর পরিবেশে আলিরঅন্তর ও বিবেক খুলে। তিনিও ঈমান গ্রহণ করেন।অত:পর খাদিজার দাস যাইদ বিন হারেসাহ ইসলামেরসুশীতল ছায়াতলে সমবেত হন। অতঃপর রাসূল তাঁরঅন্তরঙ্গ বন্ধু আবু বাকারের সাথে ইসলামেরব্যাপারে আলাপ করলে দ্বিদাহীন চিত্তে তিনিইসলামে গ্রহণ করেন এবং সত্যতার সাক্ষ্য দেন।রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপন ভাবেদাওয়াতী মিশন চালিয়ে যেতে থাকলেন। আরগোপন বলতে এখানে বোঝানো হয়েছেগোপনীয় স্থান যেখানে তাঁর সাহাবী, শিষ্য ওআরোঅনেক লোক সমবেত হতেন তিনিতাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করতেন অতঃপরতাঁরা ইসলাম গ্রহণ করতেন। এ ভাবে অনেক লোকইসলামের পতাকাতলে একত্রিত হয়েছিলেন কিন্তুসবাই ইসলামকে গোপনে রাখতেন। কারো ইসলামগ্রহণের বিষয়টা প্রকাশ হয়ে গেলে কুরাইশেরকাফেরদের কঠিন নির্যাতনের শিকার হতেন।এসময়ে ব্যক্তিগত ভাবে টার্গেট ভিত্তিক দাওয়াতীকাজ করা হতো।এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৩ বছরপর্যন্ত ব্যক্তিগত দাওয়াতের গোপন ব্রতে ব্রস্তথাকেন। অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশআসে আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দেন যা আপনাকেআদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেননা। (হিজর: ৯৪) এ আদেশ পেয়ে এক দিন তিনি সাফাপর্বতে আরোহন কের কুরাইশদেরকে ডাকদেন। তাঁর ডাক শুনে অনেক লোকের সমাগমঘটে। তন্মধ্যে তাঁর চাচা আবূ লাহাবও এক জন ছিল।সে কুরাইশদের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সবচাইতে কট্রর শক্র ছিল। মানুষ সমবেত হবার পর রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি যদিআপনাদেরকে একথার সংবাদ দিই যে পাহাড়েরপেছনে এক শক্রদল আপনাদের উপর আক্রমণকরার জন্য অপেক্ষা করছে। আপনারা আমার কথাবিশ্বাস করবেন? সবাই এক স্বরে বললো আমরাআপনার মধ্যে সততা ও সত্যবাদিতা ছাড়া কিছুই দেখিনি।তিনি বললেন, আমি আপনাদেরকে কঠিন শাস্তিরব্যাপারে সতর্ক করছি। অতঃপর তিনি তাদেরকেআল্লাহর পথে আহ্বান করলেন এবং মুর্তিপূজা বর্জনকরতে বরলেন। একথা শুনে আবু লাহাব রাগেক্ষেপে উঠে বলে, তোমার ধ্বংস হোক। এজন্যেই কি আমাদেরকে একত্রিত করেছ। এঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক সূরা লাহাবঅবতীর্ণ করেন। “ আবূ লাহাবের হস্তদয় ধ্বংসহোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে। কোন কাজেআসেনি তাঁর ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে।সত্বর সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে এবংতাঁর স্ত্রীও যে ইন্ধন বহন করে। তাঁর গলদেশেখর্জুরের রশি নিয়ে।” (লাহাব-১-৫)রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতী কাজপুরো দমে অব্যাহত রাখলেন। জন সমাবেশস্থলে তিনি প্রকাশ্য ভাবে ইসলামের প্রতি আহ্বানজানাতেন। তিনি কা’বা শরিফের নিকটে নামায আদায়করতেন। মুসলমানদের উপরে কাফেরদেরঅত্যাচার ও নিপীড়নের মাত্রা বেড়ে গেলো।ইয়াসের, সুমাইয়্যা ও তাদের সন্তান আম্মারেরবেলায় তাই ঘটেছে। খোদাদ্রোহীদেরনির্যাতনে পিতা-মাতা শহীদ হন। নির্যাতনের কারণেইতাঁর মৃত্যু হয়। বিলাল বিন রাবাহ আবুজেহেলের ওউমায়্যা বিন খালাফের অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন।অবশ্যই বিলাল আবূ বাকারের (রা) মাধ্যমে ইসলামগ্রহণ করেন। এ খবর শুনে তাঁর মালিক অত্যাচারেরশিকার হন। অবশ্যই বিলাল হযরত আবু বাকারের (রাঃ)মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ খবর শুনে তাঁরমালিক অত্যাচারের সব পন্থা অবলম্বন করে যাতেবিলাল ইসলাম ত্যাগ করে। কিন্তু তিনি আকঁড়ে ধরেনইসলামকে এবং অস্বীকার করেন ইসলাম ত্যাগকরতে। উমায়্যা তাঁকে শিকলাবন্ধ করে মক্কারবাইরে নিয়ে গিয়ে বুকের উপর বিরাট পাথর রেখেউত্তপ্ত বালিতে হেঁচড়িয়ে টানতো। অতঃপর সে ওতাঁর সঙ্গীরা বেত্রাঘাত করতো আর বিলাল শুধুআহাদ, আহাদ, এক, এক, বলতে থাকতেন। এহেনঅবস্থায় একবার আবূ বকর তাকে দেখেন। তিনিবিলালকে উমায়্যার কাছ থেকে ক্রয় করে নিয়েআল্লাহর নিমিত্তে স্বাধীন করে দেন। এ সবপৈশাচিক ও বর্বর অত্যাচারের কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে ইসলাম প্রকাশকরতে নিষেধ করেন। তাদের সাথে মিলিত হতেনঅত্যন্ত সংগোপনে। কেননা প্রকাশ্যভাবে মিলিতহলে মুশরিকরা রাসূলের শিক্ষা প্রদানের পথেঅন্তরায়ের সৃষ্টি করবে কখনো দুদলেরসংঘর্ষের আশংকাও ছিল। এ কথা সুবিদিত যে এহেননাজুক পরিস্থিতিতে সংঘর্ষ মুসলমানদের ধ্বংস ওসমূলে বিনাশই ডেকে আনবে। কারণ মুসলমানদেরসংখ্যা ও শক্তি সামর্থ্য ছিল খুবই স্বল্প। তাই তাদেরইসলাম গোপন রাখাটাই ছিল দূরদর্শিতা। অবশ্য রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের অত্যাচারসত্ত্বেও প্রকাশ্যভাবে দাওয়াত ও ইবাদতের কাজকরতেন।হাবশার দিকে হিজরতযার ইসলামের কথা ফাঁস হয়ে যেত তিনি মুশরিকদেরনিপীড়নের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতেন।বিশেষত দুর্বল মুসলিমরা। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহাবীদেরকেদ্বীন নিয়ে হাবশায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার নির্দেশদেন। তিনি সেখানকার শাসক নাজাসীর নিকট নিরাপত্তাপাওয়ার আশ্বাস দেন। অনেক মুসলমান নিজের জানও পরিবার বর্গের ব্যাপারে নিরাপত্তাহীনতায়ভূগতো। তাই নবুওয়াতের ৫ম বছরে প্রায় ৭০ জনমুসলিম সপরিবারে হিজরত করেন। তাঁদের মধ্যেউসমান বিন আফফান ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাও ছিলেন।এ দিকে কুরাইশরা ইথিওপিয়ায় হিজরত কারীদেরঅবস্থান ব্যাহত করার চেষ্টা করে। সে দেশেররাজার জন্য পাঠায় উৎকোচ। পলায়নকারীদের(মুহাজির) বহিস্কারের অনুরোধ জানায়। তারা আরোবলে যে, মুসলিমরা ঈসা আলাইহিস সালাম ও মরিয়ামসম্পর্কে অপমানকর ও অশিষ্ট বাক্য ব্যবহার করে।নাজাসী তাদেরকে ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কেজিজ্ঞেস করলে তাঁরা সত্যটি সুস্পষ্ট ভাবে বলেদেন, শাসক মুসলিমদের আশ্রয় দেন এবং বহিস্কারঅনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। এ বছরের রমযানমাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারামশরীফে যান। সেখানে ছিল কুরাইশেরএক দললোক। তিনি দাঁড়িয়ে হঠাৎ করে তাদের সামনেসুরায়ে নাজম তেলাওয়াত করতে লাগলেন। এ সবকাফেররা ইতিপূর্বে কখনো আল্লাহর বাণীশুনেনি। কেননা তাঁরা রাসূলের কিছুই না শুনার পদ্ধতিঅনুসরণ করে আসতেছিলো। আকস্মাৎতেলাওয়াতের মধুর ধ্বনি তাদের কর্ণে গেলেতাঁরা আল্লাহর হৃদয়গ্রাহী চিত্তাকর্ষক বাণী ওসাবলীল ভাষা একাগ্রচিত্তে শুনে। অন্তরে তা ছাড়াঅন্য কিছুই নেই। এক পর্যায়ে রাসূল—﴿ ﻓَﭑﺳۡﺠُﺪُﻭﺍْۤ ﻟِﻠَّﻪِۤ ﻭَﭐﻋۡﺒُﺪُﻭﺍْ۩ ٦٢﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺠﻢ 62: ]আয়াতটি পড়ে সেজদায় চলে যান। উপস্থিতব্যাক্তিদের মধ্যে কেউ নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রনকরতে পারেনি। তাঁরাও সেজদায় চলে যায়।অনুপস্থিত মুশরিকরা তাদেরকে তিরস্কার করে, ভৎসনাকরে। অন্য কোন উপায় না দেখে এরা রাসূলেরবিরুদ্ধে মিথ্যা রচনা করে যে, তিনি তাদের মূর্তিরপ্রশংসা করেন এবং বলেন, “তাদের (মুর্তিসমূহের)সুপারিশের আশা করা যায়” সেজদা করার অজুহাত স্বরুপএ ভিত্তিহীন, নিরেট মিথ্যার বেসাতী করে তারা।ওমরের ইসলাম গ্রহণওমরের রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ মুসলমানদেরজন্য বড় বিজয় ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম তাঁকে ফারুক বলে আখ্যায়িত করেছেন।কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মাধ্যমে সত্য ও বাতিলেরমধ্যে পার্থক্য সূচিত করেছেন। ইসলাম গ্রহনেরকয়েক দিন পরে ওমার রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরাকি সত্যের উপরে নই? তদুত্তোরে তিনি বললেনকেন নয়, নিশ্চয় আমরা সত্যের মধ্যে। ওমরবললেন তাহলে এত গোপনীয়তা কি জন্যে।তখন আরকামের বাড়ীতে সমাবেতমুসলিমদেরকে নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবংতাদেরকে দুদলে বিভক্ত করে দেন। হামযা বিনআব্দুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে একদল এবং ওমার বিনখাত্তাবের নেতৃত্বে আর একদলের নব সঞ্চারিতশক্তির ঈঙ্গিত দেয়ার জন্যে মক্কার বিভিন্ন অলি-গলিপ্রদক্ষিণ করে। কুরাইশরা দাওয়াত দমন করার জন্যবিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে। শাস্তি, নির্যাতন,নিপীড়ন, প্রলোভন ও হুমকি প্রদর্শনের মতোসর্ব প্রকার পন্থা গ্রহণ করে। কিন্তু এসবকুপরিকল্পিত ব্যবস্থাসমূহ মুসলমানদের ঈমান বৃদ্ধি ওদ্বীন ইসলামকে অধিকতর আঁকড়ে ধরা ছাড়া আরকোন ভুমিকা রাখতে পারেনি।এক নতুন দুরভিসন্ধি ও মন্দ অভিপ্রায় তাদের অন্তরেজন্ম নিল। আর তা হচ্ছে মুসলমান ও বনীহাশেমকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন ও একঘরে করেরাখার এক চুক্তিনামা লিখে, যাতে সবাই সাক্ষর করবে,কাবা শরিফের অভ্যন্তরে ঝুলিয়ে দেবে। চুক্তিঅনুসারে তাদের সাথে বেচা- কেনা, বিয়ে শাদি,সাহায্য সহযোগিতা, ও লেন-দেন সম্পূর্ণভাবে বন্ধথাকবে। এ চুক্তির ফলে মুসলিমরা বাধ্য হয়ে মক্কাথেকে বের হয়ে (শো’বে আবি তালেব নামক)এক উপত্যাকায় গিয়ে আশ্রয় নেন। তাঁরা অবর্ণনীয়ক্লেশ ও দুঃখের শিকার হন সেখানে। ক্ষুধা ওঅর্ধাহারের বিষাক্ত ছবোল থেকে কেউ রক্ষাপায়নি। স্বচ্ছল ও সামর্থবান ব্যক্তিরা নিজেদেরসমস্ত ধন-সম্পদ ব্যয় করে ফেলেন। খাদীজা তাঁরসম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করেন। বিভিন্ন রোগ ছাড়িয়েপড়লো। অধিকাংশ লোকই মৃত্যূর প্রায়-দ্বারপ্রান্তে এসে দাড়ালেন। কিন্ত তাঁরা ধৈর্য অবিচলতারপরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। তাঁদের মধ্যে একজনওপশ্চাদপদ হননি। অবরোধ একাধারে তিন বছর স্থায়ীরইল। অতঃপর বনী হাশেমের সাথে আত্মীয়তাআছে এমন কিছু শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিজনসমাবেশে চুক্তি ভঙ্গ করার কথা ঘোষনা করে।চুক্তির কাগজ বের করা হলে দেখা যায় যে সেটাখেয়ে ফেলা হয়েছে। শুধুমাত্র কাগজের এককোণ যেখানে “বিসমিকা আল্লাহুম্মা” লেখাছিলসেটাই অক্ষত রয়েছে। সংকটের অবসান হল। আরমুসলিম ও বনী হাশেম মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তুকুরাইশরা মুসলিমদের দমন ও মুকাবিলায় সেই রকম রুঢ়তাও কঠোরতা ক্ষনিকের তরেও পরিহার করেনি।দুঃখের বছরকঠিন রোগ ব্যধি আবু তালেবের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে যায়। মৃত্যু শয্যায় শায়িত হয়েজীবনের অবশিষ্ট মুহুর্তগুলো গুনতে লাগলেন।মুমূর্ষাবস্থায় যখন সে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর তখন রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথার পার্শ্বে বসেতাকে কালেমায়ে তাওহীদ ( ﻻ ﺇﻟﻪ ﺇﻻ ﺍﻟﻠﻪ ) পড়ারঅনুরোধ জানান। কিন্তু আবু জেহেল সহ অসৎসঙ্গীরা যারা তাঁর পার্শ্বে ছিল তাকে বললো-শেষমূহুর্তে পূর্ব পুরুষের ধর্ম ত্যাগ করো না।মুসলমান হওয়া ব্যতিরেকে তাঁর মৃত্যু হওয়ায় রাসূলেরদুঃখ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। আবু তালেবের মৃত্যুর দু’মাসপরে খাদীজা (রা) ওফাত বরণ করেন। ফলেরাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত চিন্তিতহন। তাদের মৃত্যুর পরে কুরাইশের ঔদ্ধত্য ওউপদ্রব আরো বেড়ে যায়।তায়েফের পথেকুরাইশের ধৃষ্ঠ্যতা, এবং মুসলমানদের প্রতি তাদেরনির্যাতন ও নিপীড়নের নীতি অব্যাহত থাকার পররাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সংশোধনও ইসলাম গ্রহণ থেকে নিরাশ হয়ে তায়েফগমনের সিদ্ধান্ত নেন। হতে পারে আল্লাহতাদেরকে হেদায়েত দান করবেন। তায়েফ গমনসহজ ব্যপার ছিল না। আকাশ চুম্বি উচুঁ উচুঁ পাহাড়েরকারণে পথ ছিল দুর্গম। কিন্তু আল্লাহর পথেপ্রত্যেক দুরুহ বস্তু সহজ হয়ে পড়ে।তায়েফবাসীরা রাসূলের সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামসাথে সর্বাপেক্ষা মন্দ আচরণ করে। তাঁরা শিশুকিশোরদেরকে লেলিয়ে দেয়। প্রস্তরনিক্ষেপ করে তাঁর গোড়ালী করে রক্তেরঞ্জিত। তিনি ভীষণ চিন্তিত হয়ে মক্কা অভিমুখেরওয়ানা হন। পথিমধ্যে জিবরাইল আলাইহিস সালামপাহাড়ের দায়িত্বে নিযুক্ত ফেরেশতাসহ এসেবলেন, আল্লাহ পাহাড়ের দায়িত্বে নিযুক্তফেরেশতাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। আপনিযা ইচ্ছা নির্দেশ দিতে পারেন। ফেরেশতা আরজকরলো, হে মুহাম্মদ ! আপনি যদি চান আমি তাদেরউপর আখসাবাইন (মক্কাকে ঘিরে রাখা পাহাড়) চেপেদিবো। তিনি বললেন, বরং আমি আশা করি আল্লাহতাদের বংশ থেকে এমন লোক সৃষ্টি করবেন, যারাশুধু মাত্র আল্লাহরই ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কোনশরিক স্থাপন করবে না।চন্দ্র দু টুকরা হওয়ামুশরিকরা অনেক সময় রাসূলকে অপারগ, অক্ষমসাব্যস্ত করার ফন্দিতে বিভিন্ন অলৌকিক নির্দশনদেখানোর দাবী করতো। আর এধরনের দাবীজানায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহরকাছে দোয়া করলে তাদেরকে চন্দ্র দু’টুকরোকরে দেখানো হয়। কুরাইশরা এ নিদর্শন দীর্ঘসময় পর্যন্ত দেখতে থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেওতাঁরা ঈমান গ্রহণ করেনি। বরং তাঁরা বলে, মুহাম্মাদআমাদেরকে যাদু করেছে তন্মধ্যে এক ব্যক্তিবললো, আমাদের যাদু করলেও সব মানুষকেওতো আর যাদু করতে পারবে না। দূতের অপেক্ষাকর। বিভিন্ন দূত আসলে জিজ্ঞেস করা হয় এবং তাঁরাবলে হ্যাঁ আমরাও দেখেছি। কিন্তু কুরাইশরানিজেদের কুফরে জেদ ধরে রয়ে গেলো।চন্দ্র দু’টুকরা হওয়া এক বৃহত্তর অলৌকিক ঘটনার পটভূমিও অবতরনিকা ছিলো। আর তা হল মেরাজের ঘটনা।মেরাজতায়েফ থেকে ফিরে আসা, তাদের রুঢ় ও অমানবিকআচরণ এবং আবু তালিব ও খাদিজার মৃত্যুর পর কুরাইশেরঅত্যাচার বহু গুণে বৃদ্ধি পায়। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরে একাধিক চিন্তাএকত্রিত হয়। মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষথেকে শোকাহত ও দুঃখে কাতর নবীর সান্তনাআসে। নবুওয়াতের ১০ম সালে রজবের ২৭তারিখের রাতে তিনি যখন নিদ্রারত ছিলেন, জিবরাঈলবুরাক নিয়ে আসেন। বোরাক ঘোড়া সদৃশ একজন্তু যার দু’টি দ্রুতমান পাখা আছে বিদ্যুতের ন্যায়।রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তাতেআরোহণ করানো হয় এবং জিবরাঈল তাকেফিলিস্তীনে বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রথমে নিয়ে যান।অতঃপর সেখান থেকে আসামান পর্যন্ত নিয়ে যান।এ ভ্রমনে তিনি পালনকর্তার বড় বড় নিদর্শন পরিদর্শনকরেন। আসমানেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয়।তিনি একই রাত্রে তুষ্ট মন ও সুদৃঢ় বিশ্বাস নিয়েমক্কায় প্রত্যাগমন করেন। ভোর বেলায় কাবাশরিফে গিয়ে তিনি লোকদেরকে একথা শুনালেকাফেরদের মিথ্যার অভিযোগ ও ঠাট্রা বিদ্রুপআরোপ বেড়ে যায়। উপস্থিত কয়েক জন লোকতাঁকে বাইতুল মুকাদ্দাসের বিবরণ দিতে বলে। মূলতউদ্দেশ্য ছিল তাঁকে অপারগ ও অক্ষম প্রমাণিত করা।তিনি তন্ন তন্ন করে সব কিছু বলতে লাগলেন।কাফেররা এতে ক্ষান্ত না হয়ে বলে, আমরা আরএকটি প্রমাণ চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামবললেন, আমি পথে মক্কাগামী একটি কাফেলারসাক্ষাৎ পাই এবং তিনি কাফেলার বিস্তারিত বিবরণসহউটের সংখ্যা ও আগমনের সময়ও বলে দিলেন।রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যই বলেছেনকিন্তু কাফেররা হটকারিতা, কুফর ও সত্যকেঅস্বীকার করার দরুণ ভ্রান্ত রয়ে গেল। সকালবেলায় জিবরাঈল এসে রাসূলকে পাঁচ ওয়াক্তনামাজের পদ্ধতি ও সময়সুচী শিখিয়ে দিলেন।ইতিপূর্বে নামায শুধু সকাল বেলায় দু’রাকআত ওবিকেল বলায় দু’রাকআত ছিলো। কুরাইশরা সত্যঅস্বীকার করতে থাকায় এ দিনগুলোতে তিনিমক্কায় আগমণকারী ব্যক্তিদের মাঝে দাওয়াতীতৎপরতা চালাতে লাগলেন। তিনি তাদের অবস্থানস্থলে মিলিত হয়ে দাওয়াত পেশ করতেন এবং তাঁরসুন্দর ব্যাখ্যা দিতেন। আবু লাহাব তাঁর পিছনে তোলেগেই থাকতো। সে লোকদেরকে তাঁরথেকে ও তাঁর দাওয়াত থেকে সতর্ক থাকতেবলতো। এক বার ইয়াসরিব থেকে আগত একদলকে ইসলামের আহবান জানালে তাঁরা মনোযোগদিয়ে শুনে এবং তাঁর অনুসরণ ও তাঁর প্রতি ঈমানআনতে ঐক্যবদ্ধ হয়। ইয়াসরিববাসী ইয়াহূদীদেরকাছে শুনতো যে অদূর ভবিষ্যতে একনবীপ্রেরিত হবেন। তাঁর আবির্ভাবের যুগ নিকটে এসেগেছে। তাদেরকে যখন তিনি ইসলামের দাওয়াতদেন, তাঁরা বুঝতে পারলো যে তিনি সেই নবী যারকথা ইয়াহূদীরা বলেছে। তাঁরা সত্ত্বর ইসলাম গ্রহণকরে ফেলে এবং বলে ইয়াহূদীরা যেন আমাদেরঅগ্রগামী না হয়। তাঁরা ছিল ৬ জন, পরবর্তী বছর ১২জন আসে। তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম মৌলিক শিক্ষা দেন। প্রত্যাবর্তনের সময়তাদের সাথে তিনি মুসআব বিন উমাইরকে কুরআন ওদ্বীনের বিধানাবলী শিক্ষা দেয়ার জন্য পাঠান।মুসআব মদিনায় বিরাট প্রভাব ফেলতে সক্ষমহয়েছিল। এক বছর পর তিনি যখন মদিনায় আসেন,তখন তাঁর সাথে ৭২ জন পুরুষ ও দু’জন মহিলা ছিল। রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে মিলিত হনএবং তাঁরা দ্বীনের সহযোগিতা ও এর প্রতি যথাযথদায়িত্ব পালনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।অতঃপর তাঁরা মদিনায় ফিরে যান।মদীনার দিকে হিজরতমদিনা সত্য ও সত্যের ধারকদের আশ্রয়ে পরিণতহয়। মুসলিমরা সে দিকে হিজরত করতে লাগলেন।তবে কুরাইশরা ছিল মুসলিমদেরকে হিজরত করতেবাধা দেয়া ও প্রতিরোধ সৃষ্টি করার জন্য বদ্ধপরিকর। পরে কতিপয় মুহাজির বিভিন্ন প্রকার শাস্তি ওনির্যাতনের শিকার হন। কুরাইশদের ভয়ে মুসলিমরাগোপনে হিজরত করতেন কিন্তু ওমরের(রাদিয়াল্লাহু আনহু) হিজরত ছিল ব্যতিক্রম। তাঁর হিজরতছিলো সাহসিকতা, নির্ভীকতা ও চ্যালেঞ্জের একউজ্জল দৃষ্টান্ত। তরবারী উম্মোচিত করে এবংতীর বের করে কা‘বায় গিয়ে তাওয়াফ করেন।অতঃপর মুশরিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, যেব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীকে বিধবা বা সন্তান-সন্ততিকেএতীম বানানোর ইচ্ছা করে সে যেন আমার পিছুধাওয়া করে। আমি আল্লাহর পথে হিজরত করছি।অতঃপর তিনি চলে গেলেন। কেউ পিছু ধাওয়া করারসাহস করেনি। আবু বকর সিদ্দিক রাসূলের নিকটহিজতের অনুমতি চাইলে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন, তাড়াহুড়া করো না। আশা করিআল্লাহ তোমার জন্য এক জন সঙ্গী নির্ধারণকরবেন। অধিকাংশ মুসলিম ইতি পূর্বে হিজরতকরেছেন। কুরাইশরা প্রায় উন্মাদ হয়ে গেল।মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাওয়াতেরউন্নতি ও উজ্জল ভবিষ্যতের ভয় ও আশংকা বোধকরলো। সবাই পরামর্শ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলো।আবু জাহেল প্রস্তাব পেশ করলো যেপ্রত্যেক গোত্রের এক এক জন নির্ভীকযুবককে তরবারী দেয়া হবে। এরা মুহাম্মাদকেচতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে এক যোগেআত্রমণ করে হত্যা করবে। ফলে তার রক্ত বিভিন্নগোত্রের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে। বনি হাশেম এরপর সব কবিলার সাথে লড়াই করার হিম্মত করবে না।আল্লাহ তাঁর নবীকে তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কেঅবহিত করে দেন। তিনি আবু বকরের সাথে হিজরতকরার সিদ্ধান্ত নেন। রাতে আলি কে (রাদিয়াল্লাহুআনহু) নিজের বিছানায় শুয়ে থাকতে বললেন, যাতেলোকেরা মনে করে যে, রাসূল বাড়ীতেইআছেন, এবং আলিকেও এ আশ্বাসও দিলেন যেকোন ক্ষতি তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।ইতিমধ্যে কাফেররা বাড়ী ঘেরাও করেফেলেছে। বিছানায় আলিকে দেখে তারা নিশ্চিতহয় যে, রাসূল বাড়ীতে আছেন এবং হত্যা করারজন্য তাঁর বের হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলো।এ দিকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরহয়ে সবার মাথার উপর বালু ছিটিয়ে দিলে আল্লাহতাদের দৃষ্টি শক্তি ছিনিয়ে নেন। ফলে তাঁরা আঁচওকরতে পারলো না যে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম বেরিয়ে গেলেন। অত:পর আবু বকর(রাদিয়াল্লাহু আনহু) সহ প্রায় পাঁচ মাইল অতিক্রম করে“ছওর” গুহায় লকিয়ে থাকেন। কুরাইশ যুবকরা ভোরবেলা পর্যন্ত অপেক্ষা করে অন্যদিকে আলিকেরাসূলের বিছানায় দেখতে পেয়ে হতাশ, বিস্মিত ওক্ষেপে যায়। তারা আলিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধরকরে ও কোন হদিস বের করতে না পেয়েচতুর্দিকে লোক জন পাঠালো। তাঁকেজীবিত বামৃত্যু অবস্থায় ধরে দিতে পারার জন্য ১০০ উটপুরস্কার ঘোষণা করা হলো। লোকজন চারিদিকেহন্যে হয়ে খুজতে লাগলো। এমন কি তারা যদিএকটু ঝুকে গুহার ভিতর তাকায়, তাহলে তাদেরদেখতে পায়। এমন শাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতেরাসূলের ব্যাপারে আবু বকারের (রাদিয়াল্লাহু আনহু)চিন্তা ও উদ্বেগ বেড়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: « ﻻ ﺗﺤﺰﻥ ﺇﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﻌﻨﺎ »চিন্তা করো না আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।অনুসন্ধানকারীরা তাদের সন্ধান আর পেল না।গুহায় তাঁরা তিন দিন অবস্থান করে মদিনার পথে যাত্রা শুরুকরেন। পথ ছিল সুদীর্ঘ ও দুর্গম। সূর্য ছিলঅতীব উত্তপ্ত। দ্বিতীয় দিন বিকেল বেলায় একতাবুর পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন যেখানে উম্মেমা’বাদ নামে এক মহিলা বাস করতো। রাসূল তাঁর কাছেখাবার ও পানি চাইলে সে কিছুই দিতে পারেনি। কিন্তুএকটি স্ত্রী ছাগল এতই দুর্বল ছিল যে ঘাস খেতেযেতে পারেনি। এক ফোটা দুধ তার স্তনে ছিল না।রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্তনের উপর তাঁরহাত মুবারক বুলিয়ে দিয়ে দুধ দোহন করে এক বড়পাত্র ভরে নেন। উম্মে মা‘বাদ এ অলৌকিক ঘটনাদেখে বিস্মিয় ও বিহবল হয়ে পড়ে। সবাই পানকরেন এবং ক্ষুধা নিবারণ করেন। অতঃপর আর একপাত্র ভরে উম্মে মা‘বাদকে দিয়ে তিনি যাত্রা শুরুকরেন।মদিনাবাসী এদিকে তাঁর শুভাগমনের জন্য অধীরআগ্রহে অপেক্ষা করতেছিলেন। প্রতিদিন তাঁরামদিনার বাইরে প্রতীক্ষায় থাকতেন। যে দিন তাঁরআগমন হয় সে দিন সবাই পুলকিত হৃদয়ে তাঁকে সাদরসম্ভাষণ জানান। তিনি মদীনার নিকটে কুবায় যাত্রা বিরতিকরেন এবং সেখানে চান দিন অবস্থান করেন। তিনিএ সময় কুবা মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। আরএটাই ইসলামের প্রথম মসজিদ। ৫ম দিন তিনি মদীনারপথে যাত্রা শুরু করেন। অনেক আনসারী সাহাবীরাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অতিথি হিসাবেবরণ করার চেষ্টা করেন এবং তার উটের লাগামধরেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরশুকরিয়া আদায় করে বলেন, উট ছেড়ে দাও, সেনির্দেশপ্রাপ্ত। আল্লাহর নির্দেশ যেখানে হলসেখানে গিয়ে উট বসে যায়। তিনি অবতরণ নাকরতেই উঠে সে অগ্রভাগে কিছু পথ চলে আবারপিছনে এসে প্রথম স্থানে বসে যায়। সেটাই ছিলমসজিদে নব্বীর স্থান। তিনি আবু আইয়্যুবআনসারীর অতিথি হন। আলি ইবন আবু তালিব নবীরসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের পর তিন দিনমক্কায় অবস্থান করেন। অতঃপর কুবায় রাসূলের সাথেমিলিত হন।মসজিদে নব্বীর নির্মাণউট যেখানে বসে গিয়েছিলো জায়গাটি প্রকৃতমালিক থেকে কেনার পর সেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ নির্মাণ করেন। একজনমুহাজির ও আনসারী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন।ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক গভীর ও সুদৃঢ় হয়। মদীনারইয়াহুদিদের সাথে কুরাইশদের সম্পর্ক ছিল। তারামুসলিমদের মাঝে বিশৃংখলা, নৈরাজ্য ও কলহ-বিবাদ সৃষ্টিরপায়তারা চালাতো। কুরাইশরা মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করারহুমকিও প্রদর্শন করতো। এ ভাবে বিপদ ও আশংকামুসলিমদেরকে ভিতর ও বাইরে ঘিরে ছিল। পরিস্থিতিএ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে সাহাবায়ে কেরাম রাতেঘুমাবার সময় অস্ত্র রাখতেন।বদরের যুদ্ধএমন বিপদজনক ও বিপদ সংকুল পরিস্থিতিতি আল্লাহতা‘আলা সশস্ত্র যুদ্ধের অনুমতি দেন। রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্রদের তৎপরতা জানারলক্ষ্যে সামরিক মিশন চালানো আরম্ভ করেন।শক্রদের বানিজ্যিক কাফেলার পিছু নেয়া ওপ্রতিরোধ সৃষ্টি করতে লাগলেন, যাতে তারামুসলিমদের শক্তির কথা উপলদ্ধি করে শান্তি ও সন্ধিপ্রক্রিয়ায় এসে ইসলাম প্রচারের স্বাধিনতায় ও তাবাস্তবায়েন কোন ধরনের বিঘ্ন না ঘটায়। কতিপয়গোত্রের সাথে মৈত্রি চুক্তি ও দ্বি-পাক্ষিক চুক্তিওস্বাক্ষরিত হয়। একবার তিনি কুরাইশের এক বানিজ্যিককাফেলার পথ রুদ্ধ করা কল্পে তিন শত তের জনসাথী নিয়ে বের হন। সাথে ছিল ২টি ঘোড়া ৭০টিউট। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশী কাফেলায়উট ছিলো ১০০০ এবং ৪০ জন লোক। আবু সুফিয়ানমুসলিমদের বের হবার কথা শুনে জরুরী ভিত্তিতেএক লোক পাঠিয়ে মক্কায় খবর দেয় এবং সাহায্যেরআবেদন জানিয়ে রাস্তা পরিবর্তন করে অন্য পথধরে। ফলে মুসলিমরা তাদেরকে ধরতে পারেননি। অন্য দিকে কুরাইশরা এ খবর পেয়ে ১০০০যোদ্ধা নিয়ে বের হয়ে পড়ে কাফেলারসাহায্যের জন্য। আবু সুফিয়ান কাফেলার নিরাপদেচলে আসার খবর জানিয়ে তাদেরকে মক্কায় ফিরেযাবার অনুরোধ জানায়। কিন্তু আবু জাহেল ফিরেযেতে অস্বীকার করে এবং যোদ্ধারা বদর নামকস্থান পর্যন্ত যাত্রা অব্যাহত রাখে। কুরাইশের বেরহবার কথা জেনে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামসাহাবায়ে কেরামদের সাথে পরামর্শ করলে সবাইকাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার রায় দেন। হিজরী২য় সনে ১৭ই রমজান শুক্রবার ভোর বেলায়উভয়দল মুখো মুখি হয় এবং তমুল যুদ্ধ চলে। মুসলিমরাবিপুলভাবে জয়লাভ করেন। তাদের মধ্যে ১৪জনশাহাদতের অমীয় সুধা পান করেন। ৭০ জন কাফেরনিহত এবং ৭০ জন গ্রেফতার হয়। যুদ্ধকালীন সময়েনবী কন্যা রুকাইয়্যা মৃত্যুবরণ করেন। ওসমান(রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলের নির্দেশে তাঁররোগাক্রান্ত স্ত্রীর পরিচর্যা ও দেখা-শুনার জন্যমদীনায় থেকে যাওয়ার ফলে বদর যুদ্ধেঅংশগ্রহন করতে পারেন নি। যুদ্ধের পরে রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আর এক মেয়েউম্মে কুলসুমকে ওসমানের সাথে বিয়ে দেন।তাই তাঁর উপাধি ছিল “যিন্নূরাইন” কারণ তিনি রাসূলেরদু’কন্যা বিয়ে করেছিলেন। যুদ্ধ শেষে মুসলিমরাআল্লাহর সাহায্যে উল্লাসিত ও আনন্দিত হয়েমদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। সাথে ছিল যুদ্ধবন্দী ও মালে গনিমত। যুদ্ধ বন্দীদের মধ্যেকিছু লোককে পণ্যের বিনিময়ে, আবারঅনেককে এমনিতে মুক্তি দেয়া হয়। তাদেরমধ্যে কিছু লোকের মুক্তিপণ ছিলো মুসলিমদের১০জন ছেলেকে লেখা পড়া শিখিয়ে দেয়া।ওহুদের যুদ্ধবদর যুদ্ধের পর মুসলিম ও মক্কার কাফেরদেরমধ্যে যেসব যুদ্ধ সংঘটিত হয় ওহুদ যুদ্ধ হচ্ছেতন্মধ্যে দ্বিতীয়। এতে মুশরিকরা জয়লাভ করে।কারণ কিছু সংখ্যক মুসলিম রাসূলের নির্দেশযথাযথভাবে পালন করেন নি। ফলে সুপরিকল্পিত কলাকৌশলকে ব্যাহত করে। যুদ্ধে কাফেরদের সংখ্যাছিল ৩০০০। পক্ষান্তরে মুসলিম ছিলেন ৭০০ জন।খন্দকের বা পরিখা যুদ্ধএ যুদ্ধের পর মদীনার কিছু ইয়াহুদী মক্কায় গিয়েমক্কাবাসীকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করারউস্কানি দেয় এবং নিজেদের সমর্থন, সাহায্যসহযোগিতার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ফলেকাফেররা ইতবাচক সাড়া দেয়। অতঃপর ইয়াহুদীরাঅন্যান্য গোত্র সমুহকে উস্কানি দিলে তারাওমুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়ার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে।মুশরিকরা প্রত্যেক এলাকা থেকে মদীনা অভিমুখেরওয়ানা দেয়। ১০,০০০ যোদ্ধা সমবেত হল। নবীসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্রপক্ষের তৎপরতারকথা জেনে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেন।সালমান ফারসী মদীনার যে দিকে পাহাড় নেই, সেদিকে পরিখা খননের পরামর্শ দেন। সব মুসলিমউদ্যম ও প্রেরণা সহকারে পরিখা খননে অংশগ্রহণকরেন এবং কাজ সত্ত্বর সমাপ্ত হয়। মুশরিকরা এক মাসপর্যন্ত অবস্থান করেও পরিখা অতিক্রম করতেসক্ষম হয়নি। অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা প্রচন্ডবাতাস প্রেরণ করে কাফেরদের তাবু সমূহ উপড়েফেলেন । তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবংশীঘ্রই নিজ নিজ শহরে ফিরে যায়।মক্কা বিজয়হিজরি ৮ম সনে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামমক্কা অভিযান চালানোর ইচ্ছা করেন। ১০ই রমজান১০০০০ সদস্যের বাহিনী নিয়ে মক্কাঅভিমুখেরওয়ানা হন। মক্কায় যুদ্ধ ছাড়াই প্রবেশ করেন।কুরাইশরা আত্মসমর্পন করে। আল্লাহ তা‘আলামুসলিমদেরকে বিজয় দান করেন। নবী সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা‘বা শরীফ তাওয়াফ করে কা‘বারঅভ্যন্তরে দু’রাকআত নামায আদায় করেন। অতঃপরভেতরে রাখা সব মুর্তি চুর্ণ বিচুর্ণ করেন। কা‘বাশরীফের দরজায় দাড়িয়ে মসজিদে হারামেকাতারবদ্ধভাবে অপেক্ষারত সমবেতকুরাইশদেরকে বলেন, হে কুরাইশরা ! তোমাদেরসাথে কি আচরণ করবো বলে মনে করো। তাঁরাবলে ভালো আচরণ, দয়াবান ভাই, দয়াবান ভাই এর পুত্র।তিনি বলেন, যাও তোমরা সবাই মুক্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষমার উজ্জল ও বৃহত্তম দৃষ্টান্তপেশ করেন। তারাই সেই লোক যারা তাঁর সাহাবাদেরউপর চালিয়ে ছিল অত্যাচারের স্ট্রীম রোলার, খুনকরেছে অনেককে, কষ্ট দিয়েছে স্বয়ং তাঁকেএবং নিজের মাতৃভুমি থেকে বহিস্কার করেছে।মক্কা বিজয়ের পর লোকজন দলে দলে আল্লাহরদ্বীনের ছায়াতলে সমবেত হয়। হিজরি ১০ম সনেরাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জ করেন। এটাতাঁর একমাত্র হজ্জ ছিল। তাঁর সাথে এক লাখ লোকহজ্জ করেন। হজ্জ পালন শেষে তিনি মদীনায়প্রত্যাগমন করেন।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুপ্রায় আড়াই মাস পর তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন।দৈনন্দিন রোগ বেড়ে যায়। তীব্রভাবেরোগাক্রান্ত হয়ে ইমামতি করতে অক্সম হয়েপড়লে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)কে ইমামতিকরতে বলেন। হিজরি ১১ সনে ১২ ই রবিউল আওয়ালসোমবার ৬৩ বছর বয়সে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন। এ খবর শুনে সাহাবায়েকেরাম প্রায় জ্ঞান ও স্বস্থি হারিয়েফেলেছিলেন। এ খবর বিশ্বাস করতে পারছিলেননা। এমন সময় আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একভাষণে লোক জনকে শান্ত করেন। তিনি বলেন,রাসূল একজন মানুষ ছিলেন। যিনি মৃত্যু বরণ করেন।তিনি রাসূল এক জন মানুষ ছিলেন। যিনি মত্যু বরণকরেন যেমন অন্যান্য মানুষ মৃত্যু বরণ করে। মানুষশান্ত হয়ে যায়। রাসূলের গোসল দেয়া, কাফনপরানো ও দাফন করা সম্পুর্ণ হলো। অতঃপর মুসলিমরাআবু বকরকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নিজেদের খলিফানির্বাচন করেন। তিনি ছিলেন খোলাফয়েরাশেদীনের মধ্যে প্রথম। রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে চল্লিশবছর ও পরে তের বছর মক্কায় এবং দশ বছর মদিনায়অতিবাহিত করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৬৩ বছর।তাঁর চরিত্রতিনি সর্বাপেক্ষা নির্ভীক ও সাহসী ছিলেন। আলিবিন আবূ তালিব বলেন, যখন তমুল যুদ্ধ শুরু হতো,এক দল অন্য দলের মুখোমুখি যুদ্ধ করতো,আমরা রাসূলকে আড়াল হিসাবে রাখতাম। তিনিসর্বাপেক্ষা দানবীর ছিলেন। কখনো কো জিনিসচাওয়া হলে তিনি না’ করেন নি। তিনি সর্বাপেক্ষাধৈর্যশীল ছিলেন। নিজের জন্য কোনপ্রতিশোধ নেন নি। নিজের স্বার্থের জন্যকখনো রাগাম্বিত হন নি। তবে হ্যাঁ, আল্লাহর হুকুম-বিধান লংঘন করা হলে আল্লাহর নিমিত্তেই প্রতিশোধনিয়েছেন। অধিকারের ব্যাপারে তাঁর নিকটেআত্মীয় অনাত্মীয়, দুর্বল, সবল সমান ছিলো।তিনি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন যে, তাকওয়া ছাড়াআল্লাহর কাছে কেউ কারো চাইতে শ্রেয় নয়।সব মানুষ সমান ও সমকক্ষ। পূর্ববর্তী জাতিগুলোএ জন্য ধ্বংস হয়েছে যে, কোন সম্ভ্রান্তলোক চুরি করলে ছেড়ে দিতো, আর কোনদুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে শাস্তি দিতো। তিনি বললেন,আল্লাহর শপথ,ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ যদি চুরিকরে,তবে তার হাত কর্তন করবো। কখনোকোন খাবারের দোষ বর্ণনা করেন নি। রুচি সম্মতহলে আহার করতেন। অন্যথায় বর্জন করতেন।কোন কোন সময় এক মাস দু’মাস পর্যন্ত তাঁরবাড়িতে আগুন প্রজ্জলিত করা হতো না। তিনি ও তাঁরপরিবার শুধু খেজুর ও পানি আহার করেছেন। ক্ষুধারতীব্র জ্বালা প্রশমিত করার জন্য মাঝে মাঝে উদরমুবারকে প্রস্তর বেধে রাখতেন। অসুস্থব্যক্তিদের দেখতে যেতেন। তিনি জুতা সিলাইকরতেন, কাপড়ে তালি লাগাতেন এবং গৃহ কর্মে তাঁরপরিবারবর্গের সহযোগিতা করতেন। তিনি অতি নম্রছিলেন। ধনী গরীব, সম্ভ্রান্ত অসম্ভ্রান্ত সবারদাওয়াত গ্রহণ করতেন। ভাল বাসতেন গরীবমিসকীনকে প্রচুর। জানাযায় হাজির হতেন। পীড়িতলোকদের দেখতে যেতেন। কোন দরিদ্রব্যক্তিকে দারিদ্রের জন্য ঘৃণা করতেন না। কোনরাজা বা শাসককে তাঁর রাজত্ব ও যশ ঐশর্যের কারণেভয় করতেন না। ঘোড়া, উট, গাধা, ও খচ্চরের উপরআরোহন করতেন। সর্বাপেক্ষা সুদর্শন ছিলেন।সব চাইতে বেশি স্নিগ্ধ হাসতেন। অথচ দুঃখ্ বিপদঅনবরত আসতে থাকতো। সুগদ্ধি ভালবাসতেন।দূর্গন্ধ ঘৃণা করতেন। আল্লাহ পাক চারিত্রিক উৎকর্ষও সুন্দর কর্মের অনুপম সন্নিবেশ ঘটিয়েছিলেনতাঁর মধ্যে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন জ্ঞান দানকরেছিলেন যা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অন্যকাউকে দান করা হয়নি।তিনি ছিলেন নিরক্ষর। জানতেন না লেখা-পড়া।মানুষের মধ্যে কেউ তাঁর শিক্ষক ছিলো না।আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে আসেন মহানগ্রন্থআল কুরআন যার সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ পাকবলেন, বলুন, যদি মানুষ ও জ্বীন এই কুরআনেরঅনুরূপ রচনা করার জন্য জড়ো হয় এবং তাঁরাপরস্পরের সাহায্যকারী হয়, তবুও তাঁরা কখনো এরঅনুরূপ রচনা করতে পারবেনা। ইসরা-৮৮.রাসূলের সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরক্ষরহওয়াটাই মিথ্যা অপবাদ কারীদের সব অহেতুকপ্রলাপের অকাট্য, অপ্রতিরোধ্য ও অখণ্ডনীয়উত্তর। যাতে একথা বলতে না পারে যে তিনিস্বহস্তে লিখেছেন বা অন্যের কাছেশিখেছেন বা অন্য সুত্র থেকে পাঠ করে সংগ্রহকরেছেন।তাঁর কতিপয় মু‘জিযাতাঁর সব চাইতে বড় মু‘জিযা কুরআন, যা আরবি সাহিত্যেরবড় বড় পন্ডিত ও সাহিত্যিকদের অপারগ করেদিয়েছে এবং সবাইকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেযে, কুরআনের অনুরুপ ১০ টি সূরা অথবা ১টি সূরা বাঅন্তত: পক্ষে ১টি আয়াত রচনা করে আনো।মুশরিকরা নিজেদের অক্ষমতার কথা স্বীকারকরেছ। মুশরিকরা একবার তাঁকে একটি নিদর্শনদেখানোর কথা বললে তিনি চন্দ্র বিদীর্ণহওয়াকে দেখান। চন্দ্র বিদীর্ন হওয়াকে দেখান।চন্দ্র বিদীর্ন হয়ে দু’টুকরো হয়ে গিয়েছিলো।অনেক বার তাঁর আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে পানি উৎসারিতহয়েছে। তাঁর হাতে পাথর তাসবীহ পাঠ করেছে,।অতঃপর যথাক্রমে আবু বকর, ওমার ও উসমানেরহাতেও তাসবীহ পাঠ করেছে। খাবার আহারকরাকালীন তাঁর কাছে তাসবীহ পাঠ করতো এবং এরধ্বনি সাহাবায়ে কেরাম শুনতে পেতেন। নবুওয়াতপ্রাপ্তির রাত সমূহে পাথর ও গাছপালা সালাম করেছে।এক ইয়াহূদী নারী রাসূলকে বিষপানে হত্যা করারজন্য ছাগলের এক পা খেতে দেয় যা বিষ মাখাছিলো। সে পা রাসূলের সাথে কথা বলে। একবারএক বেদুইন তাঁকে একটি নিদর্শন দেখাতে বলে।তিনি একটি গাছকে নির্দেশ দিলে রাসূলের কাছেআসে। আবার নির্দেশ দিলে যথা স্থানে চলে যায়।এক দুধ বিহীন ছাগলের স্থনে হাত মুবারাক স্পর্শকরায় দুগ্ধ আসে। তিনি তা দোহন করে নিজেও পানকরেন এবং আবু বকরকেও পান করতে দেন। আলিইবন আবুতালিবের ব্যথিত চোখে তিনি থুথু দিলেসঙ্গে সঙ্গে তা ভাল হয়ে যায়। এক সাহাবীপায়ের আঘাতে আহত হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত মুছিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গেভাল হয়ে যায়। আনাস ইবন মালিকের জন্য সুদীর্ঘায়ূ,স্বচ্ছলতা এবং সন্তান-সন্ততি এত বরকত দান করেনযে, তাঁর স্ত্রীসমূহের ঔরসে ১২০ জন সন্তানজন্ম নেয়; তাঁর খেজুর গাছে বছরে দু’বার ফলধরত, অথচ এ কথা সুবিদিত যে খেজুর গাছে বছরেএক বারই ফল আসে। আর তিনি ১২০ বছর বয়সপেয়েছিলেন। এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম মিম্বারে ছিলেন, এমতাবস্থায় এক লোকএসে অনাবৃষ্টি ও খরা অবসানের জন্য দোয়ারআরজ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামদোয়া করলেন। আকাশে কোন মেঘ ছিল না।হঠাৎ পর্বত সম মেঘ ছেয়ে গেল। মুষল ধারা বৃষ্টিহলো পরবর্তী জুমা পর্যন্ত। একই ব্যাক্তিঅতিবৃষ্টির অবসান হওয়ার জন্য দোয়ার আবেদনকরলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়াকরলে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ সূর্যের তাপেবের হয়ে গেলো। একটি ছাগল ও প্রায় তিনকিলো গ্রাম গম দিয়ে এক হাজার পরিখা যুদ্ধেরমুজাহিদগণকে পেট ভরে খাওয়ান। সাবাই খাওয়ারপরেও খাবার সামান্যও কম হয়নি। অনুরূপ ভাবে অল্পখেজুর দিয়ে পরিখা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদেরখাওয়ান যে খেজুর বাশির বিন সা’দের কন্যা তাঁর পিতা ওমামার জন্য এনে ছিলো এবং আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহুআনহু স্বল্প খাদ্য দ্বারা পরিখা যুদ্ধের মুজাহিদগণকেপেট ভরে খাওয়ান। তিনি একশ’জন কুরাইশ ব্যক্তি যারাতাঁকে হত্যা করার জন্য অপেক্ষা করতে ছিলো,এর মুখের দিকে মাটি ছিটিয়ে দিলে কেউ তাকেদেখতে সক্ষম হয়নি। তিনি তাদের নাকের ডগায়চলে গেলেন। সুরাকা বিন মালেক তাঁকে হত্যা করারজন্যে পিছু ধাওয়া করে আর রাসূল দোয়া করলেতার পা যমিনে ধসে যায়।গ্রন্থনা ও অনুবাদ:মক্তব তাওয়িয়াতুল জালিয়াত আল-জুলফিসম্পাদনা : ড. মো: আবদুল কাদেরসূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব

Advertisements