হযরত আইয়ুব আঃ এর জীবনী



হযরত আইয়ূব(আলাইহিস সালাম)1.আইয়ূবেরঘটনাবলী1.শিক্ষণীয় বিষয় সমূহহযরত আইয়ূব (আঃ)ছবরকারী নবীগণেরমধ্যে শীর্ষস্থানীয় এবংঅনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন। ইবনু কাছীরের বর্ণনাঅনুযায়ী তিনি ইসহাক (আঃ)-এর দুই যমজ পুত্র ঈছ ওইয়াকূবের মধ্যেকার প্রথম পুত্র ঈছ-এর প্রপৌত্রছিলেন। আর তাঁর স্ত্রী ছিলেন ইয়াকূব-পুত্র ইউসুফ(আঃ)-এর পৌত্রী ‘লাইয়া’ বিনতে ইফরাঈম বিন ইউসুফ।কেউ বলেছেন, ‘রাহমাহ’। তিনি ছিলেন স্বামীভক্তি ও পতিপরায়ণতায় বিশ্বের এক অতুলনীয়দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশে তিনি ‘বিবি রহীমা’ নামে পরিচিত।তাঁর পতিভক্তি বিষয়ে উক্ত নামে জনপ্রিয় উপন্যাসসমূহ বাজারে চালু রয়েছে। অথচ এ নামটির উৎপত্তিকাহিনী নিতান্তই হাস্যকর। পবিত্র কুরআনে সূরাআম্বিয়া ৮৪ আয়াতে ﺭَﺣْﻤَﺔً ﻣِّﻦْ ﻋِﻨْﺪِﻧَﺎ (‘আমরাআইয়ূবকে…. আরও দিলাম আমার পক্ষ হ’তে দয়াপরবশে’) বাক্যাংশের ‘রাহমাতান’ বা ‘রাহ্মাহ’) ﺭَﺣْﻤَﺔً(শব্দটিকে ‘রহীমা’ করে এটিকে আইয়ূবেরস্ত্রীর নাম হিসাবে একদল লোক সমাজে চালুকরে দিয়েছে। ইহুদী-নাছারাগণ যেমন তাদেরধর্মগ্রন্থের শাব্দিক পরিবর্তন ঘটাতো, এখানেওঠিক ঐরূপ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ যেনবলছেন যে, আইয়ূবের স্ত্রী রহীমা তারস্বামীকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। পরে আমরাতাকে আইয়ূবেরকাছে ফিরিয়ে দিলাম’। বস্ত্ততঃ এটিএকটি উদ্ভট ব্যাখ্যা বৈ কিছু নয়। মূলতঃ আইয়ূবেরস্ত্রীরনাম কি ছিল, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য কুরআন বাহাদীছে নেই। এ বিষয়ের ভিত্তি হ’ল ইহুদীধর্মনেতাদের রচিত কাহিনী সমূহ। যার উপরেপুরোপুরি বিশ্বাস স্থাপন করাটা নিতান্তই ভুল।তাফসীরবিদ ও ঐতিহাসিকগণ আইয়ূবের জনপদের নামবলেছেন ‘হূরান’ অঞ্চলের ‘বাছানিয়াহ’ এলাকা। যাফিলিস্তীনের দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর দামেষ্ক ওআযরূ‘আত-এর মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত।[1]পবিত্রকুরআনে ৪টি সূরার ৮টি আয়াতে আইয়ূব (আঃ)-এর কথাএসেছে। যথা- নিসা ১৬৩, আন‘আম ৮৪, আম্বিয়া৮৩-৮৪ এবং ছোয়াদ ৪১-৪৪।আল্লাহ বলেন, ﻭَﺃَﻳُّﻮْﺏَ ﺇِﺫْﻧَﺎﺩَﻯ ﺭَﺑَّﻪُ ﺃَﻧِّﻲْ ﻣَﺴَّﻨِﻲَ ﺍﻟﻀُّﺮُّ ﻭَﺃَﻧْﺖَ ﺃَﺭْﺣَﻢُ ﺍﻟﺮَّﺍﺣِﻤِﻴْﻦَ-ﻓَﺎﺳْﺘَﺠَﺒْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﻓَﻜَﺸَﻔْﻨَﺎ ﻣَﺎﺑِﻪِ ﻣِﻦْ ﺿُﺮٍّ ﻭَّﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻩُ ﺃَﻫْﻠَﻪُ ﻭَﻣِﺜْﻠَﻬُﻢﻣَّﻌَﻬُﻢْ ﺭَﺣْﻤَﺔً ﻣِّﻦْ ﻋِﻨْﺪِﻧَﺎ ﻭَﺫِﻛْﺮَﻯ ﻟِﻠْﻌَﺎﺑِﺪِﻳْﻦَ -‘আর স্মরণ করআইয়ূবের কথা, যখন তিনি তার পালনকর্তাকে আহবানকরেবলেছিলেন, আমি কষ্টে পতিত হয়েছি এবংআপনি সর্বোচ্চ দয়াশীল’। ‘অতঃপর আমরা তারআহবানে সাড়া দিলাম এবং তার দুঃখ-কষ্ট দূর করেদিলাম।তার পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সাথেতাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমাদের পক্ষ হ’তেদয়া পরবশে। আর এটা হ’ল ইবাদতকারীদের জন্যউপদেশ স্বরূপ’(আম্বিয়া ২১/৮৩-৮৪)।অন্যত্র আল্লাহবলেন, ﻭَﺍﺫْﻛُﺮْ ﻋَﺒْﺪَﻧَﺎ ﺃَﻳُّﻮْﺏَ ﺇِﺫْ ﻧَﺎﺩَﻯ ﺭَﺑَّﻪُ ﺃَﻧِّﻲْ ﻣَﺴَّﻨِﻲَﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ ﺑِﻨُﺼْﺐٍ ﻭَﻋَﺬَﺍﺏٍ، ﺍﺭْﻛُﺾْ ﺑِﺮِﺟْﻠِﻚَ ﻫَﺬَﺍ ﻣُﻐْﺘَﺴَﻞٌﺑَﺎﺭِﺩٌ ﻭَﺷَﺮَﺍﺏٌ، ﻭَﻭَﻫَﺒْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﺃَﻫْﻠَﻪُ ﻭَﻣِﺜْﻠَﻬُﻢ ﻣَّﻌَﻬُﻢْ ﺭَﺣْﻤَﺔً ﻣِّﻨَّﺎﻭَﺫِﻛْﺮَﻯ ﻟِﺄُﻭْﻟِﻲ ﺍﻟْﺄَﻟْﺒَﺎﺏِ، ﻭَﺧُﺬْ ﺑِﻴَﺪِﻙَ ﺿِﻐْﺜﺎً ﻓَﺎﺿْﺮِﺏ ﺑِّﻪِ ﻭَﻻَﺗَﺤْﻨَﺚْ ﺇِﻧَّﺎ ﻭَﺟَﺪْﻧَﺎﻩُ ﺻَﺎﺑِﺮﺍً ﻧِﻌْﻢَ ﺍﻟْﻌَﺒْﺪُ ﺇِﻧَّﻪُ ﺃَﻭَّﺍﺏٌ – ‏) ﺹ৪১-৪৪(-‘আর তুমি বর্ণনা কর আমাদের বান্দাআইয়ূবের কথা। যখন সে তার পালনকর্তাকে আহবানকরে বলল, শয়তান আমাকে (রোগের) কষ্ট এবং(সম্পদ ও সন্তান হারানোর) যন্ত্রণাপৌঁছিয়েছে’(ছোয়াদ ৩৮/৪১)। ‘(আমরা তাকেবললাম,) তুমি তোমার পা দিয়ে (ভূমিতে) আঘাত কর।(ফলে পানি নির্গত হ’ল এবং দেখা গেল যে,) এটিগোসলের জন্য ঠান্ডা পানি ও (পানের জন্য উত্তম)পানীয়’(৪২)। ‘আর আমরা তাকে দিয়ে দিলাম তারপরিবারবর্গ এবং তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণআমাদের পক্ষ হ’তে রহমত স্বরূপ এবংজ্ঞানীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ’(৪৩)। ‘(আমরাতাকে বললাম,) তুমি তোমার হাতে একমুঠো তৃণশলানাও। অতঃপর তা দিয়ে (স্ত্রীকে) আঘাত কর এবংশপথ ভঙ্গ করো না (বরং শপথ পূর্ণ কর)। এভাবেআমরা তাকে পেলাম ধৈর্যশীলরূপে। কতই নাচমৎকার বানদা সে। নিশ্চয়ই সে ছিল (আমার দিকে)অধিক প্রত্যাবর্তনশীল’(ছোয়াদ ৩৮/৪১-৪৪)।অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْﻦَ ‘আরএভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করেথাকি’(আন‘আম ৬/৮৪)।অতঃপর আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃকবর্ণিত হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আইয়ূবএকদিন নগ্নাবস্থায় গোসল করছিলেন (অর্থাৎ বাথরুমছাড়াই খোলা স্থানে)। এমন সময় তাঁর উপরেসোনার টিড্ডি পাখি সমূহ এসে পড়ে। তখন আইয়ূবসেগুলিকে ধরে কাপড়ে ভরতে থাকেন।এমতাবস্থায় আল্লাহ তাকে ডেকে বলেন, হেআইয়ূব! ﺃَﻟَﻢْ ﺍَﻛُﻦْ ﺃُﻏْﻨِﻴَﻨَّﻚَ ﻋَﻤَّﺎ ﺗَﺮَﻯ؟ আমি কিতোমাকেএসব থেকে মুখাপেক্ষীহীন করিনি? আইয়ূববললেন, ﺑَﻠَﻰ ﻭَﻋِﺰَّﺗِﻚَ ﻭﻟﻜﻦ ﻻﻏِﻨَﻰ ﺑِﻰ ﻋَﻦْﺑَﺮَﻛَﺘِﻚَ তোমার ইযযতের কসম! অবশ্যই তুমি আমাকেতা দিয়েছ। কিন্তু তোমার বরকত থেকে আমিমুখাপেক্ষীহীন নই’।[2]আইয়ূবের ঘটনাবলী:আইয়ূব (আঃ) সম্পর্কে কুরআনে ও হাদীছেউপরোক্ত বক্তব্যগুলির বাইরে আর কোনবক্তব্য বা ইঙ্গিত নেই। কুরআন থেকে মূল যেবিষয়টি প্রতিভাত হয়, তা এই যে, আল্লাহ আইয়ূবকেকঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। সে পরীক্ষায়আইয়ূব উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। যার পুরস্কার স্বরূপআল্লাহ তাকে হারানো নে‘মত সমূহের দ্বিগুণফেরৎ দিয়েছিলেন। আল্লাহ এখানে ইবরাহীম,মূসা, দাঊদ, সুলায়মান, আইয়ূব, ইউনুস প্রমুখনবীগণের কষ্ট ভোগের কাহিনী শুনিয়েশেষনবীকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং সেই সাথেউম্মতে মুহাম্মাদীকে যেকোন বিপাদপদেদ্বীনের উপর দৃঢ় থাকার উপদেশ দিয়েছেন।বিপদে ধৈর্য ধারণ করায় এবং আল্লাহর পরীক্ষাকেহাসিমুখে বরণ করে নেওয়ায় আল্লাহ আইয়ূবকে‘ছবরকারী’ হিসাবে ও ‘সুন্দর বান্দা’ হিসাবে প্রশংসাকরেছেন(ছোয়াদ ৪৪)। প্রত্যেক নবীকেইকঠিন পরীক্ষাসমূহ দিতে হয়েছে। তারা সকলেইসে সব পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করেছেন ওউত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু আইয়ূবেরআলোচনায় বিশেষ ভাবে ﺇِﻧَّﺎ ﻭَﺟَﺪْﻧَﺎﻩُ ﺻَﺎﺑِﺮﺍً ‘আমরাতাকে ধৈর্যশীল হিসাবেপেলাম’(ছোয়াদ ৪৪)বলারমধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আল্লাহ তাঁকেকঠিনতম কোন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। তবেসে পরীক্ষা এমন হ’তে পারে না, যা নবীরমর্যাদার খেলাফ ও স্বাভাবিক ভদ্রতার বিপরীত এবং যাফাসেকদের হাসি-ঠাট্টার খোরাক হয়। যেমন তাকেকঠিন রোগে ফেলে দেহে পোকা ধরানো,দেহের সব মাংস খসে পড়া, পচে-গলে দুর্গন্ধময়হয়ে যাওয়ায় ঘর থেকে বের করে জঙ্গলেফেলে আসা, ১৮ বা ৩০ বছর ধরে রোগ ভোগকরা, আত্মীয়-স্বজন সবাই তাকে ঘৃণাভরে ছেড়েচলে যাওয়া ইত্যাদিসবই নবীবিদ্বেষী ও নবীহত্যাকারী ইহুদী গল্পকারদের বানোয়াট মিথ্যাচার বৈকিছুই নয়।ইহুদী নেতাদের কুকীর্তির বিরুদ্ধেযখনই নবীগণ কথা বলেছেন, তখনই তারা তাদেরবিরুদ্ধে খÿহস্ত হয়েছে এবং যা খুশী তাই লিখেকেতাব ভরেছে। ধর্ম ও সমাজ নেতারা তাদেরঅনুসারীদের বুঝাতে চেয়েছে যে, নবীরাসব পথভ্রষ্ট। সেজন্য তাদের উপর আল্লাহর গযবএসেছে। তোমরা যদি তাদের অনুসারী হও,তাহ’লে তোমরাও অনুরূপ গযবে পড়বে। এব্যাপারে মুসলিম মুফাসসিরগণও ধোঁকায় পড়েছেনএবং ঐসব ভিত্তিহীন কাল্পনিক গল্প ছাহাবী ওতাবেঈগণের নামে নিজেদের তাফসীরেরকেতাবে জমা করেছেন। এ ব্যাপারে ছাহাবীইবনুআববাস ও তাবেঈ ইবনু শিহাব যুহরীর নামেইবেশী বর্ণনা করা হয়েছে। যে সবের কোনছহীহ ভিত্তি নেই।এক্ষণে আমরা আইয়ূব (আঃ)-এরবিষয়ে কুরআনী বক্তব্যগুলির ব্যাখ্যায়মনোনিবেশকরব। (১) সূরা আম্বিয়া ও সূরা ছোয়াদের দু’স্থানেইআইয়ূবের আলোচনার শুরুতে আল্লাহর নিকটেআইয়ূবের আহবানের) ﺇِﺫْ ﻧَﺎﺩَﻯ (কথা আনা হয়েছে।তাতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আইয়ূব নিঃসন্দেহেকঠিন বিপদে পড়েছিলেন। যেজন্য তিনিআকুতিভরে আল্লাহকে ডেকেছিলেন। আরবিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকা ও তার নিকটে বিপদমুক্তির জন্য প্রার্থনা করা নবুঅতের শানের খেলাফনয়। বরং এটাই যেকোন অনুগত বান্দার কর্তব্য। তিনিবিপদে ধৈর্য হারিয়ে এটা করেননি, বরং বিপদ দূর করেদেবার জন্য আল্লাহর নিকটে প্রার্থনাকরেছিলেন। তবে সেই বিপদ কি ধরনের ছিল,সে বিষয়ে কিছুই উল্লেখিত হয়নি। অতএব আল্লাহএ বিষয়ে সর্বাধিক অবগত।(২) কষ্টে পড়ারবিষয়টিকে তিনি শয়তানের দিকে সম্বন্ধ করেছেন( ﻣَﺴَّﻨِﻲَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻧُﺒِﻨُﺼْﺐٍ (( ছোয়াদ ৪১), আল্লাহর দিকেনয়। এটা তিনি করেছেন আল্লাহর প্রতি শিষ্টাচারেরদিকে লক্ষ্য রেখে। কেননা শয়তান নবীদেরউপর কোন ক্ষমতা রাখে না। এমনকি কোননেককার বান্দাকেও শয়তান পথভ্রষ্ট করতে পারেনা। তবে সে ধোঁকা দিতে পারে, বিপদেফেলতে পারে, যা আল্লাহর হুকুম ব্যতীতকার্যকর হয় না। যেমন মূসা (আঃ)-এরসাথী যুবকথলে থেকে মাছ বেরিয়ে যাবার কথা মূসাকেবলতে ভুলে গিয়েছিল। সে কথাটি মূসাকে বলারসময় তিনি বলেছিলেন, ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻧْﺴَﺎﻧِﻴْﻪُ ﺇِﻻَّﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ‘আমাকে ওটা শয়তান ভুলিয়ে দিয়েছিল’(কাহফ৬৩)। আসলে শয়তানের ধোঁকা আল্লাহ কার্যকরহ’তে দিয়ে ছিলেন বিশেষ উদ্দেশ্যে, যা মূসা ওখিযিরের কাহিনীতে বর্ণিত হয়েছে। এখানেওতেমনি শয়তানের ধোঁকার কারণে আইয়ূব তাকেইদায়ী করেছেন। কিন্তু ঐ ধোঁকা কার্যকর করা এবংতা থেকে মুক্তি দানের ক্ষমতা যেহেতু আল্লাহরহাতে, সেকারণ তিনি আল্লাহর নিকটেই প্রার্থনাকরেছেন।এক্ষণে শয়তান তাকে কী ধরনেরবিপদে ফেলেছিল, কেমন রোগে তিনি আক্রান্তহয়েছিলেন, দেহের সর্বত্র কেমন পোকাধরেছিল, জিহবা ও কলিজা ব্যতীত দেহের সব মাংসতার খসে পড়েছিল, পচা দুর্গন্ধে সবাই তাকেনির্জন স্থানে ফেলে পালিয়েছিল, ইত্যাকার ১৭রকমের কাল্পনিক কাহিনী যা কুরতুবী স্বীয়তাফসীরে জমা করেছেন(কুরতুবী, আম্বিয়া৮৪)এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ আরও যেসব কাহিনীবর্ণনা করেছেন, সে সবের কোন ভিত্তি নেই।বরং স্রেফ ইস্রাঈলীউপকথা মাত্র।(৩) আল্লাহবলেন, ‘আমরা তার দো‘আ কবুল করেছিলাম এবং তারদুঃখ-কষ্ট দূর করে দিয়েছিলাম’(আম্বিয়া ৮৪)।কীভাবে দূর করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আল্লাহবলেন যে, তিনি তাকে ভূমিতে পদাঘাত করতেবলেন। অতঃপর সেখান থেকে স্বচ্ছ পানির ঝর্ণাধারা বেরিয়েআসে। যাতে গোসল করায় তারদেহের উপরের কষ্ট দূর হয় এবং উক্ত পানিপানকরায় তার ভিতরের কষ্ট দূর হয়ে যায়(ছোয়াদ ৪২)।এটি অলৌকিক মনে হলেও বিষ্ময়কর নয়। ইতিপূর্বেশিশু ইসমাঈলের ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে।পরবর্তীকালে হোদায়বিয়ার সফরে রাসূলেরহাতের বরকতে সেখানকার শুষ্ক পুকুরে পানিরফোয়ারা ছুটেছিল, যা তাঁর সাথী ১৪০০ ছাহাবীর পানিরকষ্ট নিবারণে যথেষ্ট হয়। বস্ত্ততঃ এগুলিনবীগণের মু‘জেযা। নবী আইয়ূবের জন্য তাইএটা হতেই পারে আল্লাহর হুকুমে।এক্ষণে কতদিনতিনি রোগভোগ করেন সে বিষয়ে ৩ বছর, ৭বছর, সাড়ে ৭ বছর, ৭ বছর ৭ মাস ৭ দিন ৭ রাত, ১৮বছর, ৩০ বছর, ৪০ বছর ইত্যাদি যা কিছু বর্ণিতহয়েছে[3], সবই ইস্রাঈলী উপকথা মাত্র। যারকোন ভিত্তি নেই। বরং নবীগণের প্রতি ইহুদীনেতাদের বিদ্বেষ থেকে কল্পিত।(৪) আল্লাহবলেন, ‘আমরা তার পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে দিলাম এবংতাদের সাথে সমপরিমাণ আরও দিলাম আমাদেরপক্ষহ’তে দয়া পরবশে(আম্বিয়া ৮৪; ছোয়াদ ৪৩)।এখানে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তারবিপদেধৈর্য ধারণের পুরস্কার দ্বিগুণভাবেপেয়েছিলেন দুনিয়াতে এবং আখেরাতে। বিপদেপড়ে যা কিছু তিনি হারিয়েছিলেন, সবকিছুই তিনিবিপুলভাবে ফেরত পেয়েছিলেন। অন্যত্র আল্লাহবলেছেন, ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْﻦَ ‘এভাবেই আমরাআমাদের সৎকর্মশীল বান্দাদের পুরস্কৃত করেথাকি’(আন‘আম ৮৪)। এক্ষণে তাঁর মৃত সন্তানাদিপুনর্জীবিত হয়েছিল, না-কি হারানো গবাদি পশু সবফেরৎ এসেছিল, এসব কষ্ট কল্পনার কোনপ্রয়োজন নেই। এতটুকুই বিশ্বাস রাখা যথেষ্ট যে,তিনি তাঁর ধৈর্যধারণের পুরস্কার ইহকালে ও পরকালেবহুগুণ বেশী পরিমাণে পেয়েছিলেন। যুগেযুগে সকল ধৈর্যশীল ঈমানদার নর-নারীকে আল্লাহএভাবে পুরস্কৃত করে থাকেন। তাঁর রহমতের দরিয়াকখনো খালি হয় না।(৫) উপরোক্ত পুরস্কার দানেরপর আল্লাহ বলেন, ﺭَﺣْﻤَﺔً ﻣِّﻦْ ﻋِﻨْﺪِﻧَﺎ ‘আমাদের পক্ষহতে দয়া পরবশে’(আম্বিয়া ৮৪)। এর দ্বারা বুঝিয়েদেওয়া হয়েছেযে, আল্লাহ কারু প্রতি অনুগ্রহকরতে বাধ্য নয়। তিনি যা খুশী তাইকরেন, যাকেখুশী যথেচ্ছ দান করেন। তিনি সবকিছুতে একককর্তৃত্বশীল। কেউ কেউ অত্র আয়াতে বর্ণিত‘রাহমাতান’) ﺭَﺣْﻤَﺔً (থেকে আইয়ূব (আঃ)-এর স্ত্রীরনাম ‘রহীমা’ কল্পনা করেছেন। যা নিতান্তই মূর্খতাছাড়া কিছুই নয়’।[4](৬) ছহীহ বুখারীতে আইয়ূবেরউপর এক ঝাঁক সোনার টিড্ডি পাখি এসে পড়ার যেকথা বর্ণিত হয়েছে, সেটা হ’ল আউয়ূবের সুস্থতালাভের পরের ঘটনা। এর দ্বারা আল্লাহ বিপদমুক্তআইয়ূবের উচ্ছ্বল আনন্দ পরখ করতেচেয়েছেন। আল্লাহর অনুগ্রহ পেয়ে বান্দাকতখুশী হ’তে পারে, তা দেখে যেন আল্লাহনিজেই খুশী হন। এজন্য আইয়ূবকে খোঁচা দিয়েকথা বললে অনুগ্রহ বিগলিত আইয়ূব বলে ওঠেন,‘আল্লাহর বরকত থেকে আমি মুখাপেক্ষীহীননই’। অর্থাৎ বান্দা সর্বদা সর্বাবস্থায় আল্লাহর রহমত ওবরকতের মুখাপেক্ষী। নিঃসন্দেহে উক্ত ঘটনাটিওএকটি মু‘জেযা। কেননা কোন প্রাণীই স্বর্ণনির্মিত হয় না।(৭) আল্লাহ আইয়ূবকে বলেন, ﻭَﺧُﺬْﺑِﻴَﺪِﻛَﻀِﻐْﺜﺎً ﻓَﺎﺿْﺮِﺏْ ﺑِّﻪِ ﻭَﻻَ ﺗَﺤْﻨَﺚْ ‘আর তুমি তোমারহাতে এক মুঠো তৃণশলা নাও। অতঃপর তা দিয়ে(স্ত্রীকে) আঘাত কর এবং তোমার শপথ ভঙ্গকরো না’(ছোয়াদ ৪৪)। অত্র আয়াতে আরেকটিঘটনার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে যে, রোগ অবস্থায়আইয়ূব শপথ করেছিলেনযে, সুস্থ হ’লে তিনিস্ত্রীকে একশ’ বেত্রাঘাত করবেন। রোগতাড়িত স্বামী কোন কারণে স্ত্রীরউপরক্রোধবশে এরূপ শপথ করেও থাকতে পারেন।কিন্তু কেন তিনি এ শপথ করলেন, তার স্পষ্ট কোনকারণ কুরআন বা হাদীছে বলা হয়নি। ফলেতাফসীরের কেতাব সমূহে নানা কল্পনার ফানুসউড়ানো হয়েছে, যা আইয়ূব নবীর পুণ্যশীলাস্ত্রীর উচ্চ মর্যাদার একেবারেই বিপরীত। নবীআইয়ূবের স্ত্রী ছিলেন আল্লাহর প্রিয়বান্দীদের অন্যতম। তাকে কোনরূপ কষ্টদানআল্লাহ পসন্দ করেননি। অন্য দিকেশপথ ভঙ্গকরাটাও ছিল নবীর মর্যাদার খেলাফ। তাই আল্লাহএকটি সুন্দর পথ বাৎলে দিলেন, যাতে উভয়েরসম্মান বজায় থাকে এবং যা যুগে যুগে সকলনেককার নর-নারীর জন্য অনুসরণীয় হয়। তা এইযে, স্ত্রীকে শিষ্টাচারের নিরিখে প্রহার করাযাবে। কিন্তুতা কোন অবস্থায় শিষ্টাচারের সীমালংঘন করবে না। আর সেকারণেই এখানেবেত্রাঘাতের বদলে তৃণশলা নিতে বলা হয়েছে,যার আঘাত মোটেই কষ্টদায়ক নয়’(কুরতুবী,ছোয়াদ ৪৪)।(৮) আইয়ূবের ঘটনা বর্ণনার পর সূরাআম্বিয়া ও সূরা ছোয়াদে আল্লাহ কাছাকাছি একইরূপবক্তব্য রেখেছেন যে, এটা হ’ল ﻭَﺫِﻛْﺮَﻯﻟِﻠْﻌَﺎﺑِﺪِﻳْﻦَ‘ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ’(আম্বিয়া ৮৪)এবং ﻭَﺫِﻛْﺮَﻯ ﻟِﺄُﻭْﻟِﻲﺍﻟْﺄَﻟْﺒَﺎﺏِ ‘জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ’(ছোয়াদ৪৪)। এতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহরদাসত্বকারী ব্যক্তিই প্রকৃত জ্ঞানী এবং প্রকৃতজ্ঞানী তিনিইযিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রেআল্লাহর দাসত্বকারী। অবিশ্বাসীকাফের-নাস্তিক এবংআল্লাহর অবাধ্যতাকারী ফাসেক-মুনাফিক কখনোইজ্ঞানী ও বুদ্ধিমান নয়। যদিও তারা সর্বদা জ্ঞানেরবড়াই করে থাকে।ক্বাযী আবুবকর ইবনুল ‘আরাবীবলেন, আইয়ূব সম্পর্কে অত্র দু’টিআয়াতে(আম্বিয়া৮৩ ও ছোয়াদ ৪১)আল্লাহ আমাদেরকে যা খবরদিয়েছেন, তার বাইরে কিছুই বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিতনয়। অনুরূপভাবে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) হ’তে (উপরেবর্ণিত) হাদীছটি ব্যতীত একটি হরফও বিশুদ্ধভাবেজানা যায়নি। তাহ’লে কে আমাদেরকে আইয়ূবসম্পর্কে খবর দিবে? অন্য আর কার যবানে আমরাএগুলো শ্রবণ করব? আর বিদ্বানগণের নিকটেইস্রাঈলী উপকথা সমূহ একেবারেই পরিত্যক্ত।অতএব তাদের লেখা পাঠকরা থেকে তোমারচোখ বন্ধ রাখো। তাদের কথা শোনা থেকেতোমার কানকে বধির করো’(কুরতুবী, ছোয়াদ৪১-৪২)।আইয়ূব (আঃ) ৭০ বছর বয়সে পরীক্ষায়পতিত হন। পরীক্ষা থেকে মুক্ত হবার অনেকপরে ৯৩ বছর বা তার কিছু বেশী বয়সে তিনিমৃত্যুবরণ করেন।তাবেঈ বিদ্বান মুজাহিদ হ’তে বর্ণিতহয়েছে যে, ক্বিয়ামতের দিন ধনীদের সম্মুখেপ্রমাণ স্বরূপ পেশ করা হবে হযরত সুলায়মান (আঃ)-কে (২) ক্রীতদাসদেরসামনে পেশ করা হবেহযরত ইউসুফ (আঃ)-কে এবং (৩) বিপদগ্রস্তদেরসামনে পেশ করা হবে হযরত আইয়ূব (আঃ)-কে।[5]শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :(১) বড় পরীক্ষায় বড়পুরস্কার লাভ হয়। ধন-সম্পদ ও পুত্র-কন্যা হারিয়েঅবশেষে রোগ জর্জরিত দেহেপতিত হয়েওআইয়ূব (আঃ) আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হননি এবংআল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। এরূপ কঠিনপরীক্ষা বিশ্ব ইতিহাসে আর কারো হয়েছেবলে জানা যায় না। শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাইবলেন, ﺇﻥَّ ﻋِﻈَﻢِ ﺍﻟﺠﺰﺍﺀِ ﻣﻊ ﻋﻈَﻢِ ﺍﻟﺒﻼﺀ …‘নিশ্চয়ই বড়পরীক্ষায় বড় পুরস্কার লাভ হয়ে থাকে’।[6]আরদুনিয়াতে দ্বীনদারীর কঠোরতা ও শিথিলতারতারতম্যের অনুপাতে পরীক্ষায় কমবেশী হয়েথাকে। আর সেকারণে নবীগণ হ’লেনসবচেয়ে বেশী বিপদগ্রস্ত।[7](২) প্রকৃতমুমিনগণ আনন্দে ও বিষাদে সর্বাবস্থায় আল্লাহররহমতের আকাংখী থাকেন। বরং বিপদেপড়লে তারাআরও বেশী আল্লাহর নিকটবর্তী হন। কোনঅবস্থাতেই নিরাশ হন না।(৩) প্রকৃত স্ত্রী তিনিই, যিনিসর্বাবস্থায় নেককার স্বামীর সেবায় নিজেকেবিলিয়ে দেন। আইয়ূবের স্ত্রী ছিলেন বিশ্বেরপুণ্যবতী মহিলাদের শীর্ষস্থানীয় দৃষ্টান্ত।(৪)প্রকৃত ছবরকারীর জন্যই দুনিয়া ও আখেরাতেরসফলতা। আইয়ূবদম্পতি ছিলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।(৫) শয়তান প্রতি মুহূর্তে নেককারমানুষের দুশমন।শিরকী চিন্তাধরার জাল বিস্তার করে সে সর্বদামুমিনকে আল্লাহর পথ হ’তে সরিয়ে নিতে চায়।একমাত্র আল্লাহনির্ভরতা এবং দৃঢ় তাওহীদ বিশ্বাসইমুমিনকে শয়তানের প্রতারণা হ’তে রক্ষা করতেপারে।[1]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১/২০৬-১০পৃঃ; কুরতুবী, ছোয়াদ ৪১।[2]. বুখারী, মিশকাতহা/৫৭০৭ ‘ক্বিয়ামতের অবস্থা’ অধ্যায় ‘সৃষ্টির সূচনা ওনবীগণের আলোচনা’ অনুচ্ছেদ।[3]. কুরতুবী,আম্বিয়া ৮৪; ছোয়াদ ৪২; ইবনু কাছীর, আম্বিয়া৮৩-৮৪।[4]. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/২০৯ পৃঃ।[5].আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/২০৭, ২১০ পৃঃ।[6]. তিরমিযী,ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৫৬৬ সনদ হাসান, ‘জানায়েয’অধ্যায় ‘রোগীর সেবা ও রোগের ছওয়াব’অনুচ্ছেদ।[7]. তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারেমী,মিশকাত হা/১৫৬২, সনদ হাসান, ‘জানায়েয’অধ্যায়‘রোগীর সেবা ও রোগের ছওয়াব’ অনুচ্ছেদ।