হযরত ইউনূস আঃ এর জীবনী


হযরত ইউনুস (আ:)১৬. হযরত ইউনুস (আলাইহিস সালাম)সূচীপত্রইউনুস (আঃ)-এর কওম♦মাছের পেটে ইউনুস♦ইউনুস কেন মাছের পেটে গেলেন?♦ইউনুসমুক্তি পেলেন♦শিক্ষণীয় বিষয় সমূহহযরত ইউনুস বিন মাত্তা (আঃ)-এর কথা পবিত্রকুরআনের মোট ৬টি সূরার ১৮টি আয়াতে[1] বর্ণিতহয়েছে। সূরা ইউনুস ৯৮ আয়াতে তাঁর নাম ইউনুস, সূরাআম্বিয়া ৮৭ আয়াতে ‘যুন-নূন’ ( ﺫﻭ ﺍﻟﻨﻮﻥ ) এবংসূরা ক্বলম৪৮ আয়াতে তাঁকে ‘ছাহেবুল হূত’ ( ﺻﺎﺣﺐ ﺍﻟﺤﻮﺕ )বলা হয়েছে। ‘নূন’ ও ‘হূত’ উভয়ের অর্থ মাছ। যুন-নূন ও ছাহেবুল হূত অর্থমাছওয়ালা। একটি বিশেষঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি উক্ত নামে পরিচিত হন।সামনে তা বিবৃত হবে।ইউনুস (আঃ)-এর কওম :ইউনুস(আঃ) বর্তমান ইরাকের মূছেলনগরীর নিকটবর্তী‘নীনাওয়া’ ( ﻧﻴﻨﻮﻯ) জনপদের অধিবাসীদের প্রতিপ্রেরিত হন। তিনি তাদেরকেতাওহীদের দাওয়াতদেন এবং ঈমান ও সৎকর্মের প্রতি আহবান জানান।কিন্তু তারা তাঁর প্রতি অবাধ্যতা প্রদর্শন করে।বারবারদাওয়াত দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হ’লে আল্লাহরহুকুমে তিনি এলাকা ত্যাগ করে চলে যান। ইতিমধ্যেতার কওমের উপরে আযাব নাযিল হওয়ার পূর্বাভাসদেখা দিল। জনপদ ত্যাগ করার সময় তিনি বলেগিয়েছিলেন যে, তিনদিন পর সেখানে গযব নাযিলহ’তে পারে। তারা ভাবল, নবী কখনো মিথ্যাবলেননা। ফলে ইউনুসের কওম ভীত-সন্ত্রস্তহয়ে দ্রুত কুফর ও শিরক হ’তে তওবা করে এবংজনপদের সকল আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এবং গবাদিপশু সবনিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তারাবাচ্চাদের ও গবাদিপশু গুলিকে পৃথক করে দেয় এবংনিজেরা আল্লাহর দরবারে কায়মনোচিত্তে কান্নাকাটিশুরু করে দেয়। তারা সর্বান্ত:করণে তওবা করেএবং আসন্ন গযব হ’তে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনাকরে। ফলে আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেনএবং তাদের উপর থেকে আযাব উঠিয়ে নেন। এবিষয়ে আল্লাহ বলেন, ﻓَﻠَﻮْﻻَ ﻛَﺎﻧَﺖْ ﻗَﺮْﻳَﺔٌ ﺁﻣَﻨَﺖْ ﻓَﻨَﻔَﻌَﻬَﺎﺇِﻳﻤَﺎﻧُﻬَﺎ ﺇِﻻَّ ﻗَﻮْﻡَ ﻳُﻮْﻧُﺲَ ﻟَﻤَّﺎ ﺁﻣَﻨُﻮْﺍ ﻛَﺸَﻔْﻨَﺎ ﻋَﻨْﻬُﻢْ ﻋَﺬَﺍﺏَﺍﻟْﺨِﺰْﻱِ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺤَﻴَﺎﺓِ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﻭَﻣَﺘَّﻌْﻨَﺎﻫُﻢْ ﺇِﻟَﻰ ﺣِﻴْﻦٍ- ‏(ﻳﻮﻧﺲ৯৮)-‘অতএব কোন জনপদ কেন এমন হ’ল না যে,তারা এমন সময় ঈমান নিয়ে আসত, যখন ঈমান আনলেতাদের উপকারে আসত?কেবল ইউনুসের কওমব্যতীত। যখন তারা ঈমান আনল, তখন আমরা তাদেরউপর থেকে পার্থিব জীবনের অপমানজনক আযাবতুলে নিলাম এবং তাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্তজীবনোপকরণ ভোগ করার অবকাশ দিলাম’ (ইউনুস১০/৯৮)। অত্রআয়াতে ইউনুসের কওমের প্রশংসাকরা হয়েছে।ওদিকে ইউনুস (আঃ) ভেবেছিলেনযে, তাঁর কওম আল্লাহর গযবে ধ্বংস হয়ে গেছে।কিন্তু পরে যখন তিনি জানতে পারলেন যে, আদৌগযব নাযিল হয়নি, তখন তিনি চিন্তায় পড়লেন যে, এখনতার কওম তাকে মিথ্যাবাদী ভাববে এবং মিথ্যাবাদীরশাস্তি হিসাবে প্রথা অনুযায়ী তাকে হত্যা করবে।তখন তিনি জনপদে ফিরে না গিয়ে অন্যত্রহিজরতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। এসময় আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষা করাটাই যুক্তিযুক্তছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি।মাছের পেটে ইউনুস:আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﻥَّ ﻳُﻮﻧُﺲَ ﻟَﻤِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺮْﺳَﻠِﻴْﻦَ – ﺇِﺫْ ﺃَﺑَﻖَ ﺇِﻟَﻰﺍﻟْﻔُﻠْﻚِ ﺍﻟْﻤَﺸْﺤُﻮْﻥِ – ﻓَﺴَﺎﻫَﻢَ ﻓَﻜَﺎﻥَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺪْﺣَﻀِﻴْﻦَ- ﻓَﺎﻟْﺘَﻘَﻤَﻪُﺍﻟْﺤُﻮْﺕُ ﻭَﻫُﻮَ ﻣُﻠِﻴْﻢٌ- ‏(ﺍﻟﺼﺎﻓﺎﺕ ১৩৯-১৪২)-‘আর ইউনুসছিল পয়গম্বরগণের একজন’। ‘যখন সে পালিয়েযাত্রী বোঝাই নৌকায় গিয়ে পৌঁছল’। ‘অতঃপরলটারীতে সে অকৃতকার্য হ’ল’। ‘অতঃপর একটি মাছতাকে গিলে ফেলল। এমতাবস্থায় সে ছিলনিজেকে ধিক্কার দানকারী’ (ছাফফাত ৩৭/১৩৯-১৪২)।আল্লাহর হুকুমের অপেক্ষা না করেনিজস্বইজতিহাদের ভিত্তিতে ইউনুস (আঃ) নিজ কওমকেছেড়ে এই হিজরতে বেরিয়েছিলেন বলেইঅত্র আয়াতে তাকে মনিবের নিকট থেকেপলায়নকারী বলা হয়েছে। যদিও বাহ্যত এটা কোনঅপরাধ ছিল না। কিন্তু পয়গম্বর ও নৈকট্যশীলগণেরমর্তবা অনেক ঊর্ধ্বে। তাই আল্লাহ তাদেরছোট-খাট ত্রুটির জন্যও পাকড়াও করেন। ফলে তিনিআল্লাহর পরীক্ষায় পতিত হন।হিজরতকালে নদীপার হওয়ার সময় মাঝ নদীতে হঠাৎ নৌকা ডুবে যাবারউপক্রম হ’লে মাঝি বলল, একজনকে নদীতেফেলে দিতে হবে। নইলে সবাইকে ডুবেমরতে হবে। এজন্য লটারী হ’লে পরপর তিনবারতাঁর নাম আসে। ফলে তিনি নদীতে নিক্ষিপ্ত হন।সাথে সাথে আল্লাহর হুকুমে বিরাটকায় এক মাছ এসেতাঁকে গিলে ফেলে। কিন্তু মাছের পেটে তিনিহযম হয়ে যাননি। বরং এটা ছিল তাঁর জন্য নিরাপদকয়েদখানা(ইবনে কাছীর, আম্বিয়া ৮৭-৮৮)।মাওয়ার্দী বলেন, মাছের পেটে অবস্থান করাটাতাঁকে শাস্তি দানের উদ্দেশ্যে ছিল না। বরং আদবশিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে ছিল। যেমন পিতা তার শিশুসন্তানকে শাসন করে শিক্ষাদিয়েথাকেন’ (কুরতুবী, আম্বিয়া ৮৭)।ইউনুস (আঃ)মাছের পেটে কত সময় বাকতদিন ছিলেন, সেবিষয়ে মতভেদ রয়েছে। যেমন- (১) এক ঘণ্টাছিলেন(২) তিনি পূর্বাহ্নে প্রবেশ করে অপরাহ্নেবেরিয়ে আসেন (৩) ৩ দিন ছিলেন (৪) ৭ দিনছিলেন (৫) ২০ দিন ছিলেন (৬) ৪০ দিন ছিলেন।[2]আসলে এইসব মতভেদের কোন গুরুত্ব নেই।কেননা এসবের রচয়িতা হ’ল ইহুদী গল্পকারগণ।প্রকৃত ঘটনা আল্লাহ ভাল জানেন।ইউনুস কেনমাছের পেটে গেলেন?এ বিষয়ে জনৈক আধুনিকমুফাসসির বলেন, রিসালাতের দায়িত্ব পালনেত্রুটি ঘটায়এবং সময়ের পূর্বেই এলাকা ত্যাগ করায় তাকেএইপরীক্ষায় পড়তে হয়েছিল। আরনবী চলে যাওয়ারকারণেই তার সম্প্রদায়কে আযাব দানে আল্লাহসম্মত হননি’। অথচ পুরা দৃষ্টিকোণটাই ভুল। কেননাকোন নবী থেকেই তাঁর নবুঅতের দায়িত্বপালনে ত্রুটির কল্পনা করা নবীগণের নিষ্পাপত্বেরআক্বীদার ঘোর বিপরীত। বরং তিনদিন পর আযাবআসবে, আল্লাহর পক্ষ হ’তে এরূপ নির্দেশনাপেয়ে তাঁর হুকুমেই তিনি এলাকা ত্যাগ করেছিলেন।আর তার কওম থেকে আযাব উঠিয়ে নেওয়াহয়েছিল তাদের আন্তরিক তওবার কারণে, নবীচলে যাওয়ার কারণে নয়।[3]ইউনুস মুক্তি পেলেন:আল্লাহ বলেন, ﻓَﻠَﻮْﻻَ ﺃَﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺴَﺒِّﺤِﻴْﻦَ – ﻟَﻠَﺒِﺚَ ﻓِﻲْﺑَﻄْﻨِﻪِ ﺇِﻟَﻰ ﻳَﻮْﻡِ ﻳُﺒْﻌَﺜُﻮْﻥَ- ﻓَﻨَﺒَﺬْﻧَﺎﻩُ ﺑِﺎﻟْﻌَﺮَﺍﺀِ ﻭَﻫُﻮَ ﺳَﻘِﻴْﻢٌ-ﻭَﺃَﻧﺒَﺘْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺷَﺠَﺮَﺓً ﻣِّﻦ ﻳَّﻘْﻄِﻴْﻦٍ- ﻭَﺃَﺭْﺳَﻠْﻨَﺎﻩُ ﺇِﻟَﻰ ﻣِﺌَﺔِ ﺃَﻟْﻒٍﺃَﻭْ ﻳَﺰِﻳْﺪُﻭْﻥَ – ﻓَﺂﻣَﻨُﻮْﺍ ﻓَﻤَﺘَّﻌْﻨَﺎﻫُﻢْ ﺇِﻟَﻰ ﺣِﻴْﻦٍ- ‏(ﺍﻟﺼﺎﻓﺎﺕ১৪৩-১৪৮)-‘অতঃপর যদি সে আল্লাহরগুণগানকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হ’ত’(ছাফফাত ১৪৩)।‘তাহ’লে সে ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত মাছেরপেটেই থাকত’? (১৪৪)।‘অতঃপর আমরা তাকে একটিবিজন প্রান্তরে নিক্ষেপ করলাম, তখন সে রুগ্নছিল’(১৪৫)। ‘আমরা তার উপরে একটি লতা বিশিষ্ট বৃক্ষউদ্গত করলাম’(১৪৬)। ‘এবং তাকে লক্ষ বা তদোধিকলোকের দিকে প্রেরণ করলাম’(১৪৭)। ‘তারা ঈমানআনল। ফলে আমরা তাদেরকে নির্ধারিত সময়পর্যন্ত জীবন উপভোগ করার সুযোগদিলাম’ (ছাফফাত ৩৭/১৪৩-১৪৮)।আলোচ্য আয়াতে‘ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত সে মাছের পেটেই থাকত’-এরঅর্থ সে আর জীবিত বেরিয়ে আসতেপারতো না। বরং মাছের পেটেই তার কবর হ’ত এবংসেখান থেকেই ক্বিয়ামতের দিন তার পুনরুত্থানহ’ত।অন্যত্র আল্লাহ তাঁর শেষনবীকে উদ্দেশ্যকরে বলেন, ﻓَﺎﺻْﺒِﺮْ ﻟِﺤُﻜْﻢِ ﺭَﺑِّﻚَ ﻭَﻻَ ﺗَﻜُﻦْ ﻛَﺼَﺎﺣِﺐِﺍﻟْﺤُﻮْﺕِ ﺇِﺫْ ﻧَﺎﺩَﻯ ﻭَﻫُﻮَ ﻣَﻜْﻈُﻮْﻡٌ- ﻟَﻮْﻻَ ﺃَﻥْ ﺗَﺪَﺍﺭَﻛَﻪُ ﻧِﻌْﻤَﺔٌ ﻣِّﻦﺭَّﺑِّﻪِ ﻟَﻨُﺒِﺬَ ﺑِﺎﻟْﻌَﺮَﺍﺀِ ﻭَﻫُﻮَ ﻣَﺬْﻣُﻮْﻡٌ- ﻓَﺎﺟْﺘَﺒَﺎﻩُ ﺭَﺑُّﻪُ ﻓَﺠَﻌَﻠَﻪُ ﻣِﻦَﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴْﻦَ- ‏(ﺍﻟﻘﻠﻢ ৪৮-৫০)-‘তুমি তোমার পালনকর্তারআদেশের অপেক্ষায় ধৈর্য ধারণ কর এবং মাছওয়ালার(ইউনুসের) মত হয়ো না। যখন সে দুঃখাকুল মনেপ্রার্থনা করেছিল’। ‘যদি তার পালনকর্তার অনুগ্রহতাকে সামাল না দিত, তাহ’লে সে নিন্দিত অবস্থায়জনশূন্য প্রান্তরে পড়ে থাকত’। ‘অতঃপর তারপালনকর্তা তাকে মনোনীত করলেন এবং তাকেসৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করেনিলেন’ (ক্বলম ৬৮/৪৮-৫০)।‘যদি আল্লাহর অনুগ্রহতাকে সামাল না দিত, তাহ’লে সে নিন্দিত অবস্থায়জনশূন্য প্রান্তরে পড়ে থাকত’-এর অর্থ আল্লাহ যদিতাকে তওবা করার তাওফীক্ব না দিতেন এবং তারদো‘আ কবুল না করতেন, তাহ’লে তাকে জীবিতঅবস্থায় নদী তীরে মাটির উপর ফেলতেন না।যেখানে গাছের পাতা খেয়ে তিনি পুষ্টি ও শক্তি লাভকরেন। বরং তাকে মৃত অবস্থায় নদীর কোনবালুচরে ফেলে রাখা হ’ত, যা তার জন্য লজ্জাষ্করহ’ত।‘অতঃপর তার পালনকর্তা তাকে মনোনীতকরলেন’ অর্থ এটা নয় যে, ইতিপূর্বে আল্লাহইউনুসকে মনোনীত করেননি; বরং এটা হ’লবর্ণনার আগপিছ মাত্র। কুরআনের বহু স্থানে এরূপরয়েছে। এখানে এর ব্যাখ্যা এই যে, ইউনুসমাছের পেটে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করায় আল্লাহতাকে পুনরায় কাছেটানলেন ও সৎকর্মশীলদেরঅন্তর্ভুক্ত করলেন।অন্যত্র ইউনুসের ক্রুদ্ধহয়ে নিজ জনপদ ছেড়ে চলে আসা, মাছেরপেটে বন্দী হওয়া এবং ঐ অবস্থায় আল্লাহরনিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করা সম্পর্কে আল্লাহবলেন, ﻭَﺫَﺍ ﺍﻟﻨُّﻮْﻥِ ﺇِﺫْ ﺫَﻫَﺐَ ﻣُﻐَﺎﺿِﺒﺎً ﻓَﻈَﻦَّ ﺃَﻥ ﻟَّﻦْ ﻧَﻘْﺪِﺭَﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻓَﻨَﺎﺩَﻯ ﻓِﻲ ﺍﻟﻈُّﻠُﻤَﺎﺕِ ﺃَﻥ ﻻَّ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧْﺖَ ﺳُﺒْﺤَﺎﻧَﻚَ ﺇِﻧِّﻲْﻛُﻨْﺖُ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴْﻦَ – ﻓَﺎﺳْﺘَﺠَﺒْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﻭَﻧَﺠَّﻴْﻨَﺎﻫُﻤِﻦَ ﺍﻟْﻐَﻢِّ ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَﻧُﻨْﺠِﻲ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ- ‏(ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ৮৭-৮৮ )-‘এবং মাছওয়ালা(ইউনুস)-এর কথা স্মরণ কর, যখন সে (আল্লাহরঅবাধ্যতার কারণে লোকদের উপর) ক্রুদ্ধ হয়েচলে গিয়েছিল এবং বিশ্বাসী ছিল যে, আমরা তারউপরে কোনরূপ কষ্ট দানের সিদ্ধান্ত নেব না’।[4]‘অতঃপর সে (মাছের পেটে)ঘন অন্ধকারেরমধ্যে আহবান করল (হে আল্লাহ!) তুমি ব্যতীতকোন উপাস্য নেই। তুমি পবিত্র। আমি সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত’। ‘অতঃপর আমরা তারআহবানে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা হ’তে মুক্তকরলাম। আর এভাবেই আমরা বিশ্বাসীদের মুক্তিদিয়ে থাকি’ (আম্বিয়া ২১/৮৭-৮৮)।ইউনুস (আঃ)-এর উক্তদো‘আ ‘দো‘আয়ে ইউনুস’ নামে পরিচিত।রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ﺩﻋﻮﺓُ ﺫﻯ ﺍﻟﻨﻮﻥ ﺇﺫْ ﺩﻋﺎ ﺭَﺑَّﻪُ ﻭﻫﻮﻓﻰ ﺑﻄﻦ ﺍﻟﺤﻮﺕِ ‏( ﻵ ﺇﻟﻪ ﺇﻻ ﺃﻧﺖ ﺳُﺒْﺤَﺎﻧَﻚَ ﺇﻧﻰ ﻛﻨﺖُ ﻣﻦﺍﻟﻈﺎﻟﻤﻴﻦ ‏) ﻟﻢ ﻳَﺪْﻉُ ﺑﻬﺎﺭﺟﻞٌ ﻣﺴﻠﻢٌ ﻓﻰ ﺷﻲﺀٍ ﺇﻻَّ ﺍﺳْﺘَﺠَﺎﺏَﻟَﻪُ،ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻯ -‘বিপদগ্রস্ত কোন মুসলমান যদি(নেক মকছূদ হাছিলের নিমিত্তে) উক্ত দো‘আ পাঠকরে, তবে আল্লাহ তা কবুল করেন’।[5] রাসূলুল্লাহ(ছাঃ) বলেন, ﻻ ﺗُﻔَﻀِّﻠُﻮْﺍ ﺑﻴﻦ ﺃﻧﺒﻴﺎﺀ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﻣﺎ ﻳَﻨْﺒَﻐِﻲْ ﻟﻌﺒﺪٍﺃﻥ ﻳَّﻘﻮﻝَ : ﺇﻧِّﻲ ﺧﻴﺮٌ ﻣِّﻦْ ﻳُﻮْﻧُﺲَ ﺑْﻦِ ﻣَﺘَّﻰ، ﻣﺘﻔﻖﻋﻠﻴﻪ-‘তোমরা আল্লাহর নবীগণের মধ্যে মর্যাদারতারতম্য করো না। আর কোন বান্দার জন্য এটা বলাউচিত নয় যে, আমি ইউনুস বিন মাত্তার চাইতে উত্তম’।[6] কুরতুবী এর ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহর রাসূল(ছাঃ)এটা এজন্য বলেছেন যে, তিনি যেমন (মি‘রাজে)সিদরাতুল মুনতাহায় আল্লাহর নিকটবর্তী হয়েছিলেন,নদীর অন্ধকার গর্ভে মাছের পেটের মধ্যেতেমনি আল্লাহইউনুস-এর নিকটবর্তী হয়েছিলেন(কুরতুবী, আম্বিয়া ৮৭)। বস্ত্ততঃ এটা ছিল রাসূলেরনিরহংকার স্বভাব ও বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।উপরোক্ত আয়াত সমূহে প্রতীয়মান হয় যে,ইউনুস (আঃ) মাছের পেটে থাকার পরে আল্লাহরহুকুমে নদীতীরে নিক্ষিপ্ত হন। মাছের পেটেথাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি রুগ্ন ছিলেন। ঐঅবস্থায় সেখানে উদ্গতলাউ জাতীয় গাছের পাতাতিনি খেয়েছিলেন, যা পুষ্টিসমৃদ্ধ ছিল। অতঃপর সুস্থহয়ে তিনি আল্লাহর হুকুমে নিজ কওমেরনিকটেচলে যান। যাদের সংখ্যা এক লক্ষ বা তারবেশী ছিল। তারা তাঁর উপরেঈমান আনলো। ফলেপুনরায় শিরকী কর্মকান্ডে লিপ্ত না হওয়া পর্যন্তআল্লাহ তাদেরকে অনুগ্রহ করেন এবং দুনিয়া ভোগকরার সুযোগ দেন।শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :(১)বিভ্রান্ত কওমের দুর্ব্যবহারে অতিষ্ট হয়েতাদেরকে ছেড়ে চলে যাওয়া কোন সমাজসংস্কারকের উচিত নয়।(২) আল্লাহ তার নেক বান্দারউপর শাস্তি আরোপ করবেন না, যেকোন সংকটেএরূপ দৃঢ় বিশ্বাস রাখতে হবে।(৩) আল্লাহর পরীক্ষাকিরূপ হবে, তা পরীক্ষা আগমনের এক সেকেন্ডপূর্বেও জানা যাবে না।(৪) কঠিনতম কষ্টেরমুহূর্তে কেবলমাত্র আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতেহবে।(৫) খালেছ তওবা ও আকুল প্রার্থনার ফলেঅনেক সময় আল্লাহ গযব উঠিয়ে নিয়ে থাকেন।যেমন ইউনুসের কওমের উপর থেকে আল্লাহগযব ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।(৬) আল্লাহ ইচ্ছা করলেযেকোন পরিবেশে ঈমানদারকে রক্ষা করেথাকেন।(৭) পশু-পক্ষী, বৃক্ষ-লতা ও জলচর প্রাণীসবাই আল্লাহর হুকুমে ঈমানদার ব্যক্তির সেবায়নিয়োজিত হয়। যেমন মাছ ও লতা জাতীয় গাছইউনুসের সেবায় নিযুক্ত হয়েছিল।(৮) বাহ্যদৃষ্টিতেকোন বস্ত্ত খারাব মনে হ’লেও নেককারব্যক্তির জন্য আল্লাহ উত্তম ফায়ছালা করে থাকেন।যেমন লটারীতে নদীতে নিক্ষেপের সিদ্ধান্তনিজের জন্য অতীব খারাব মনে হ’লেও আল্লাহইউনুসের জন্য উত্তম ফায়ছালা দান করেন ও তাকেমুক্ত করেন।(৯) আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ব্যতীতদো‘আ কবুল হয় না। যেমন গভীর সংকটে নিপতিতহবার আগে ও পরে ইউনুস আল্লাহর প্রতিআনুগত্যশীল ছিলেন। ফলে আল্লাহ তার দো‘আকবুল করেন।১০) আল্লাহর প্রতিটি কর্ম তারনেককার বান্দার জন্য কল্যাণকর হয়ে থাকে। যা বান্দাসঙ্গে সঙ্গে বুঝতে না পারলেও পরে বুঝতেপারে। যেমন ইউনুস পরে বুঝতে পেরেআল্লাহর প্রতি অধিক অনুগত হন এবং এজন্য তিনিআল্লাহর প্রতি অধিক প্রত্যাবর্তনশীল ( ﺃَﻭَّﺍﺏٌ) বলেআল্লাহর প্রশংসা পান।[1]. যথাক্রমে (১) সূরা নিসা৪/১৬৩; (২) আন‘আম ৬/৮৬; (৩) ইউনুস ১০/৯৮; (৪)আম্বিয়া ২১/৮৭-৮৮; (৫) ছাফফাত ৩৭/১৩৯-১৪৮; (৬)ক্বলম ৬৮/৪৮-৫০। সর্বমোট = ১৮টি \[2]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/২১৮ পৃঃ; কুরতুবী, তাফসীর সূরাছাফফাত ১৪৪।[3]. দ্রঃ তাফসীর মা‘আরেফুল কুরআন(বঙ্গানুবাদ, সংক্ষেপায়িত) পৃঃ ৬১৭-১৮।[4]. অধিকাংশতাফসীর গ্রন্থে এখানে অনুবাদে মারাত্মক ভুলকরাহয়েছে। যেমন (১) বঙ্গানুবাদ তাফসীর ইবনুকাছীরে বলা হয়েছে ‘তিনি মনে করেছিলেনআমি তার উপর কোন ক্ষমতা রাখি না’। অথচ কোননবীকখনো আল্লাহ সম্পর্কে এরূপ ধারণা করতেপারেন না। এখানে অনুবাদক ‘কুদরত’ মাদ্দাহ থেকেশব্দার্থ করেছেন, যেটা এখানে ভুল শুধু নয় বরংঅন্যায়। (২) সঊদী সরকার প্রকাশিত বঙ্গানুবাদতাফসীর মা‘আরেফুল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তিনিমনে করেছিলেন যে, আমি তাকে ধৃত করতেপারব না’ (৩) একই মর্মে অনুবাদ করাহয়েছেসঊদী সরকার প্রকাশিত উর্দূ তাফসীরে এবং (৪)আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলী অনুদিত ইংরেজীতাফসীরে।[5]. তিরমিযী হা/৩৭৫২ ‘দো‘আ সমূহ’অধ্যায়, ৮৫ অনুচ্ছেদ; মিশকাত হা/২২৯২ ‘দো‘আসমূহ’ অধ্যায় ‘আল্লাহর নাম সমূহ’ অনুচ্ছেদ-২।[6].মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৭০৯-১০, ক্বিয়ামতেরঅবস্থা’অধ্যায়, ‘সৃষ্টির সূচনা ও নবীগণেরআলোচনা’ অনুচ্ছেদ- ৯।

Advertisements