হযরত ইউসুফ আঃ এর জীবনী পার্ট -দুই


হযরত ইউসুফ (আ:) part 3কারাগারের জীবন :বালাখানা থেকে জেলখানায়নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর এক করুণ অভিজ্ঞতা শুরু হ’লইউসুফের জীবনে। মনোকষ্ট ও দৈহিক কষ্ট,সাথে সাথে স্নেহান্ধ ফুফু ও সন্তানহারা পাগলপরা বৃদ্ধপিতাকে কেন‘আনে ফেলে আসার মানসিক কষ্টসব মিলিয়ে ইউসুফেরজীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।কেন‘আনে ভাইয়েরা শত্রু, মিসরে যুলায়খা শত্রু।নিরাপদ আশ্রয় কোথাও নেই। অতএবজেলখানাকেই আপাতত: জীবনসাথী করেনিলেন এবং নিজেকে আল্লাহর আশ্রয়ে সমর্পণকরে কয়েদী সাথীদের মধ্যে দ্বীনেরদাওয়াতে মনোনিবেশ করলেন। ইতিপূর্বেই বলাহয়েছে যে, ইউসুফকে আল্লাহ স্বপ্ন ব্যাখ্যাদানের বিশেষ জ্ঞান দানকরেছিলেন (ইউসুফ১২/৬)। দ্বীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে এবিষয়টিও তাঁর জন্য সহায়ক প্রমাণিত হয়।জেলখানারসাথীদের নিকটে ইউসুফের দাওয়াত :ইউসুফকারাগারে পৌঁছলে সাথে আরওদু’জন অভিযুক্ত যুবককারাগারে প্রবেশ করে। তাদের একজন বাদশাহকেমদ্য পান করাতো এবং অপরজন বাদশাহর বাবুর্চি ছিল।ইবনু কাছীর তাফসীরবিদগণের বরাত দিয়েলেখেন যে, তারা উভয়েই বাদশাহর খাদ্যে বিষমিশানোর দায়ে অভিযুক্ত হয়ে জেলে আসে।তখনও মামলার তদন্ত চলছিল এবং চূড়ান্ত রায় বাকীছিল। তারা জেলে এসে ইউসুফের সততা, বিশ্বস্ততা,ইবাদতগুযারী ও স্বপ্ন ব্যাখ্যা দানের ক্ষমতাসম্পর্কে জানতে পারে। তখন তারা তাঁর নৈকট্যলাভে সচেষ্ট হয় এবং তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধুতে পরিণতহয়।বন্ধুত্বের এই সুযোগকে ইউসুফতাওহীদের দাওয়াতে কাজে লাগান। তাতেপ্রতীতি জন্মে যে, সম্ভবতঃ কারাগারেইই্উসুফকে ‘নবুঅত’ দান করা হয়। ইউসুফের কারাসঙ্গীদ্বয় এবং তাদের নিকটে প্রদত্ত দাওয়াতেরবিবরণ আল্লাহ দিয়েছেন নিম্নোক্তভাবে: ﻭَﺩَﺧَﻞَﻣَﻌَﻪُ ﺍﻟﺴِّﺠْﻦَ ﻓَﺘَﻴَﺎﻥَ ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺣَﺪُﻫُﻤَﺎﺇِﻧِّﻲ ﺃَﺭَﺍﻧِﻲ ﺃَﻋْﺼِﺮُ ﺧَﻤْﺮﺍًﻭَﻗَﺎﻝَ ﺍﻵﺧَﺮُ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﺭَﺍﻧِﻲ ﺃَﺣْﻤِﻞُ ﻓَﻮْﻕَ ﺭَﺃْﺳِﻲْ ﺧُﺒْﺰﺍً ﺗَﺄْﻛُﻞُﺍﻟﻄَّﻴْﺮُ ﻣِﻨْﻪُ ﻧَﺒِّﺌْﻨَﺎ ﺑِﺘَﺄْﻭْﻳﻠِﻪِ ﺇِﻧَّﺎ ﻧَﺮَﺍﻛَﻤِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْﻦَ- ﻗَﺎﻝَ ﻻَﻳَﺄْﺗِﻴﻜُﻤَﺎ ﻃَﻌَﺎﻡٌ ﺗُﺮْﺯَﻗَﺎﻧِﻪِ ﺇِﻻَّ ﻧَﺒَّﺄْﺗُﻜُﻤَﺎ ﺑِﺘَﺄْﻭِﻳﻠِﻪِ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥ ﻳَﺄْﺗِﻴﻜُﻤَﺎﺫَﻟِﻜُﻤَﺎ ﻣِﻤَّﺎ ﻋَﻠَّﻤَﻨِﻲ ﺭَﺑِّﻲ ﺇِﻧِّﻲ ﺗَﺮَﻛْﺖُ ﻣِﻠَّﺔَ ﻗَﻮْﻡٍ ﻻَّ ﻳُﺆْﻣِﻨُﻮﻥَﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻭَﻫُﻢ ﺑِﺎﻵﺧِﺮَﺓِ ﻫُﻢْ ﻛَﺎﻓِﺮُﻭﻥَ – ﻭَﺍﺗَّﺒَﻌْﺖُ ﻣِﻠَّﺔَ ﺁﺑَﺂﺋِـﻲﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴﻢَ ﻭَﺇِﺳْﺤَﺎﻕَ ﻭَﻳَﻌْﻘُﻮﺏَ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﻟَﻨَﺎ ﺃَﻥ ﻧُّﺸْﺮِﻙَ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻣِﻦﺷَﻲْﺀٍ ﺫَﻟِﻚَ ﻣِﻦ ﻓَﻀْﻞِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﻭَﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﻭَﻟَـﻜِﻦَّ ﺃَﻛْﺜَﺮَﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﻻَ ﻳَﺸْﻜُﺮُﻭﻥَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৩৬-৩৮)-‘ইউসুফের সাথেকারাগারে দু’জন যুবক প্রবেশ করল। তাদের একজনবলল, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি মদ নিঙড়াচ্ছি।অপরজন বলল, আমি দেখলাম যে, আমি মাথায় করেরুটি বহন করছি। আর তা থেকে পাখি খেয়েনিচ্ছে।আমাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিন।কেননা আমরা আপনাকে সৎকর্মশীলগণেরঅন্তর্ভুক্ত দেখতে পাচ্ছি’ (৩৬)।‘ইউসুফ বলল,তোমাদেরকে প্রত্যহ যে খাদ্য দান করা হয়, তাতোমাদের কাছে আসার আগেই আমি তার ব্যাখ্যাবলে দিতে পারি। এ জ্ঞান আমার পালনকর্তা আমাকেদানকরেছেন। আমি ঐসব লোকদের ধর্ম ত্যাগকরেছি, যারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস পোষণ করে নাএবং আখেরাতকে অস্বীকার করে’(৩৭)। ‘আমিআমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক্ব ও ইয়াকূবের ধর্মঅনুসরণ করি। আমাদের জন্য শোভা পায় না যে,কোন বস্ত্তকে আল্লাহর অংশীদার করি। এটাআমাদের প্রতি এবং অন্য সব লোকদের প্রতিআল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। কিন্তু অধিকাংশ লোককৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না’ (ইউসুফ১২/৩৬-৩৮)।অতঃপর তিনি সাথীদের প্রতি তাওহীদের দাওয়াতদিয়ে বলেন, ﻳَﺎ ﺻَﺎﺣِﺒَﻲِ ﺍﻟﺴِّﺠْﻦِ ﺃَﺃَﺭْﺑَﺎﺏٌ ﻣُّﺘَﻔَﺮِّﻗُﻮْﻥَ ﺧَﻴْﺮٌﺃَﻡِ ﺍﻟﻠﻪُ ﺍﻟْﻮَﺍﺣِﺪُ ﺍﻟْﻘَﻬَّﺎﺭُ- ﻣَﺎ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭْﻥَ ﻣِﻦْ ﺩُﻭْﻧِﻪِ ﺇِﻻَّ ﺃَﺳْﻤَﺎﺀٌﺳَﻤَّﻴْﺘُﻤُﻮْﻫَﺎ ﺃَﻧﺘُﻢْ ﻭَﺁﺑَﺂﺅُﻛُﻢْ ﻣَّﺎ ﺃَﻧﺰَﻝَ ﺍﻟﻠﻪ ُﺑِﻬَﺎ ﻣِﻦْ ﺳُﻠْﻄَﺎﻥٍ، ﺇِﻥِﺍﻟْﺤُﻜْﻢُ ﺇِﻻَّ ِﻟﻠﻪِ ﺃَﻣَﺮَ ﺃَﻻَّ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭﺍْ ﺇِﻻَّ ﺇِﻳَّﺎﻩُ ﺫَﻟِﻚَ ﺍﻟﺪِّﻳْﻦُ ﺍﻟْﻘَﻴِّﻢُﻭَﻟَـﻜِﻦَّ ﺃَﻛْﺜَﺮَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﻻَ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৩৯-৪০)-‘হেকারাগারের সাথীদ্বয়! পৃথক পৃথক অনেক উপাস্যভাল, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ’? ‘তোমরাআল্লাহ্কে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের পূজাকরে থাক। যেগুলো তোমরা এবং তোমাদেরবাপ-দাদারা সাব্যস্ত করে নিয়েছ। এদের পক্ষেআল্লাহ কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। আল্লাহব্যতীত কারু বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশদিয়েছেন যে, তাঁকে ব্যতীত তোমরা অন্য কারুইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশলোক তা জানে না’ (ইউসুফ ১২/৩৯-৪০)। এভাবেতাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার পর তিনি স্বীয়কারাসাথীদ্বয়ের প্রশ্নের জওয়াব দিতে শুরুকরলেন।- ﻳَﺎ ﺻَﺎﺣِﺒَﻲِ ﺍﻟﺴِّﺠْﻦِ ﺃَﻣَّﺎ ﺃَﺣَﺪُﻛُﻤَﺎ ﻓَﻴَﺴْﻘِﻲ ﺭَﺑَّﻪُﺧَﻤْﺮﺍً ﻭَﺃَﻣَّﺎ ﺍﻵﺧَﺮُ ﻓَﻴُﺼْﻠَﺐُ ﻓَﺘَﺄْﻛُﻞُ ﺍﻟﻄَّﻴْﺮُ ﻣِﻦ ﺭَّﺃْﺳِﻪِ ﻗُﻀِﻲَﺍﻷَﻣْﺮُ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﻓِﻴﻪِ ﺗَﺴْﺘَﻔْﺘِﻴَﺎﻥِ- ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻟِﻠَّﺬِﻱ ﻇَﻦَّ ﺃَﻧَّﻪُ ﻧَﺎﺝٍ ﻣِّﻨْﻬُﻤَﺎﺍﺫْﻛُﺮْﻧِﻲ ﻋِﻨﺪَ ﺭَﺑِّﻚَ ﻓَﺄَﻧﺴَﺎﻩُ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ ﺫِﻛْﺮَ ﺭَﺑِّﻪِ ﻓَﻠَﺒِﺚَ ﻓِﻲﺍﻟﺴِّﺠْﻦِ ﺑِﻀْﻊَ ﺳِﻨِﻴﻦَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৪১-৪২)-‘হে কারাগারেরসাথীদ্বয়! তোমাদের একজন তার মনিবকেমদ্যপান করাবে এবং দ্বিতীয়জন, তাকে শূলেচড়ানো হবে। অতঃপর তার মস্তক থেকে পাখি(ঘিলু) খেয়ে নিবে। তোমরা যে বিষয়ে জানতেআগ্রহী, তার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে’। ‘অতঃপর যেব্যক্তি সম্পর্কে (স্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী) ধারণাছিল যে, সে মুক্তি পাবে, তাকে ইউসুফ বলেদিলযে, তুমি তোমার মনিবের কাছে (অর্থাৎ বাদশাহরকাছে) আমার বিষয়ে আলোচনা করবে (যাতেআমাকে মুক্তি দেয়)। কিন্তু শয়তান তাকে তারমনিবের কাছে বলার বিষয়টি ভুলিয়ে দেয়। ফলেতাকেকয়েক বছর কারাগারে থাকতে হ’ল’ (ইউসুফ১২/৪১-৪২)।ইউসুফের দাওয়াতে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ:(১) দাওয়াত দেওয়ার সময় নিজের পরিচয়স্পষ্টভাবে তুলে ধরা আবশ্যক। যাতে শ্রোতারমনে কোনরূপ দ্বৈত চিন্তা ঘর না করে। ইউসুফ তাঁরদাওয়াতের শুরুতেই বলে দিয়েছেন যে, আমিঐসব লোকের ধর্ম পরিত্যাগ করেছি, যারা আল্লাহরপ্রতি বিশ্বাস পোষণ করেনা এবং আখেরাতেজবাবদিহিতায় বিশ্বাস করে না’ (ইউসুফ ১২/৩৭)।(২)দাওয়াত দেওয়ার সময় নিজের অভিজাত বংশের পরিচয়তুলে ধরা মোটেই অসমীচীন নয়। এতেশ্রোতারমনে দাওয়াতের প্রভাব দ্রুত বিস্তার লাভকরে। ইউসুফ (আঃ) সেকারণ নিজের নবী বংশেরপরিচয় শুরুতেই তুলে ধরেছেন’ (ইউসুফ ১২/৩৮)।(৩) শ্রোতার সম্মুখে অনেক সময় নিজেরকোন বাস্তব কৃতিত্ব তুলে ধরাও আবশ্যক হয়।যেমন ইউসুফ (আঃ) স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ারআগে নিজের আরেকটি মু‘জেযার কথা বর্ণনাকরেন যে, কয়েদীদের খানা আসার আগেইআমি তার প্রকার, গুণাগুণ, পরিমাণ ও আসার সঠিক সময়বলে দিতে পারি (ইউসুফ ১২/৩৭)।(৪) নিজেকেকোনরূপ অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী কিংবাভবিষ্যদ্বক্তা বলে পেশ করা যাবেনা। সেকারণইউসুফ সাথে সাথে বলে দিয়েছিলেন যে, ‘এজ্ঞান আমার পালনকর্তা আমাকে দানকরেছেন’ (ইউসুফ ১২/৩৭)।(৫) প্রশ্নের জওয়াবদানের পূর্বে প্রশ্নকারীর মন-মানসিকতাকেআল্লাহমুখী করে নেওয়া আবশ্যক। সেকারণইউসুফ তাঁর মুশরিক কারাসঙ্গীদের জওয়াব দানেরপূর্বে তাদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন(১২/৩৯)।(৬) প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে শ্রোতারমস্তিষ্ক যাচাই করে দাওয়াত দেওয়া একটি উত্তমপদ্ধতি। সেজন্য ইউসুফ (আঃ) তাঁর কারা সঙ্গীদেরজিজ্ঞেস করলেন, ‘পৃথক পৃথক অনেক উপাস্যভাল, না পরাক্রমশালী একক উপাস্য ভাল’? (ইউসুফ১২/৩৯)।(৭) শিরকের অসারতা হাতেনাতে ধরিয়েদিয়ে মুশরিককে প্রথমেই লা-জওয়াব করে দেওয়াআবশ্যক। সেকারণ ইউসুফ (আঃ) বললেন, তোমরাআল্লাহ্কে ছেড়ে নিছক কিছু নামের পূজা করমাত্র। এদের পূজা করার জন্য আল্লাহ কোনআদেশ প্রেরণ করেননি’ (ইউসুফ ১২/৪০)।(৮)তাওহীদের মূল কথা সংক্ষেপে বা এক কথায় পেশকরা আবশ্যক, যাতে শ্রোতার মগয সহজে সেটাধারণ করতে পারে। সেজন্য ইউসুফ (আঃ)সোজাসুজি এক কথায় বলে দিলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া কারুকোন বিধান নেই… এবং এটাই সরল পথ’ (ইউসুফ১২/৪০)।(৯) বিপদ হ’তে মুক্তি কামনা করা ও সেজন্যচেষ্টা করা আল্লাহর উপরেতাওয়াক্কুলেরপরিপন্থী নয়। সেজন্য ইউসুফ (আঃ) কারাগারথেকে মুক্তি চেয়েছেন এবং নিরপরাধ হওয়াসত্ত্বেও তাঁকে যে কারাগারে দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে হচ্ছে, সে বিষয়টি বাদশাহর কাছেতুলে ধরার জন্য মুক্তিকামীকারা সাথীকে বলেদিলেন (ইউসুফ ১২/৪২)।(১০) বান্দা চেষ্টা করারমালিক। কিন্তু অবশেষে তাক্বদীর জয়লাভ করে।সেকারণ ইউসুফের মুক্তিপ্রাপ্ত কয়েদী বন্ধুবাদশাহর কাছে তার কথা বলতে ভুলে গেল এবংকয়েক বছর তাকে কয়েদখানায় থাকতে হ’ল।কুরআনে ﺑﻀﻊ ﺳﻨﻴﻦ শব্দ উল্লেখ করা হয়েছে(ইউসুফ ১২/৪২)। যা দ্বারা তিন থেকে নয় পর্যন্তসংখ্যা বুঝানো হয়। অধিকাংশ তাফসীরবিদগণ তাঁরকারাজীবনের মেয়াদ সাত বছর বলেছেন।এভাবে অবশেষে তাক্বদীর বিজয়ী হ’ল। কারণআল্লাহর মঙ্গল ইচ্ছা বান্দা বুঝতে পারেনা।বাদশাহরস্বপ্ন ও কারাগার থেকে ইউসুফের ব্যাখ্যাদান:মিসরের বাদশাহ একটি স্বপ্ন দেখলেন এবং এটিইছিল আল্লাহর পক্ষ হ’তে ইউসুফের কারামুক্তিরঅসীলা। অতঃপর বাদশাহ তার সভাসদগণকে ডেকেস্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু কেউজবাব দিতে পারল না। অবশেষে তারা বাদশাহকেসান্ত্বনা দেবার জন্য বলল, এগুলি ‘কল্পনা প্রসূতস্বপ্ন’ ( ﺃﺿﻐﺎﺙ ﺃﺣﻼﻡ ) মাত্র। এগুলির কোন বাস্তবতানেই। কিন্তু বাদশাহ তাতে স্বস্তি পাননা। এমন সময়কারামুক্ত সেই খাদেম বাদশাহর কাছে তার কারাসঙ্গীও বন্ধু ইউসুফের কথা বলল। তখন বাদশাহ ইউসুফেরকাছে স্বপ্ন ব্যাখ্যা জানার জন্য উক্ত খাদেমকেকারাগারে পাঠালেন। সে স্বপ্নব্যাখ্যা শুনে এসেবাদশাহকে সব বৃত্তান্তবলল। উক্ত বিষয়ে কুরআনীবর্ণনানিম্নরূপ: ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻤَﻠِﻚُ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﺭَﻯ ﺳَﺒْﻊَ ﺑَﻘَﺮَﺍﺕٍ ﺳِﻤَﺎﻥٍﻳَﺄْﻛُﻠُﻬُﻦَّ ﺳَﺒْﻊٌ ﻋِﺠَﺎﻑٌ ﻭَﺳَﺒْﻊَ ﺳُﻨْﺒُﻼَﺕٍ ﺧُﻀْﺮٍ ﻭَﺃُﺧَﺮَ ﻳَﺎﺑِﺴَﺎﺕٍ،ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎﺍﻟْﻤَﻸُ ﺃَﻓْﺘُﻮْﻧِﻲْ ﻓِﻲ ﺭُﺅْﻳَﺎﻱَ ﺇِﻥْ ﻛُﻨﺘُﻤْﻠِﻠﺮُّﺅْﻳَﺎ ﺗَﻌْﺒُﺮُﻭﻥَ-ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﺃَﺿْﻐَﺎﺙُ ﺃَﺣْﻼَﻡٍ ﻭَﻣَﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﺑِﺘَﺄْﻭِﻳﻞِ ﺍﻷَﺣْﻼَﻡِ ﺑِﻌَﺎﻟِﻤِﻴْﻦَ-‏( ﻳﻮﺳﻒ ৪৩-৪৪)-‘বাদশাহ বলল, আমি স্বপ্নেদেখলাম,সাতটি মোটা-তাজা গাভী, এদেরকে সাতটিশীর্ণ গাভী খেয়ে ফেলছে এবং সাতটি সবুজশিষ ও অন্যগুলো শুষ্ক। হে সভাসদবর্গ! তোমরাআমাকে আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দাও, যদিতোমরা স্বপ্ন ব্যাখ্যায় পারদর্শী হয়ে থাক’।‘তারাবলল, এটি কল্পনা প্রসূত স্বপ্ন মাত্র। এরূপ স্বপ্নেরব্যাখ্যা আমাদের জানা নেই’ (ইউসুফ ১২/৪৩-৪৪)।‘তখনদু’জন কারাবন্দীর মধ্যে যে ব্যক্তি মুক্তিপেয়েছিল, দীর্ঘকাল পরে তার (ইউসুফের কথা)স্মরণ হ’ল এবং বলল, আমি আপনাদেরকেএস্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দেব, আপনারা আমাকে(জেলখানায়) পাঠিয়ে দিন’। ‘অতঃপর সে জেলখানায়পৌঁছে বলল, ইউসুফ হে আমার সত্যবাদী বন্ধু!(বাদশাহ স্বপ্ন দেখেছেন যে,) সাতটি মোটাতাজাগাভী, তাদেরকে খেয়ে ফেলছে সাতটি শীর্ণগাভী এবং সাতটি সবুজ শিষ ও অন্যগুলি শুষ্ক। আপনিআমাদেরকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিন, যাতেআমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তা জানাতেপারি’ (ইউসুফ ১২/৪৫-৪৬)। জবাবে ইউসুফ বলল,ﻗَﺎﻝَﺗَﺰْﺭَﻋُﻮﻥَ ﺳَﺒْﻊَ ﺳِﻨِﻴْﻦَ ﺩَﺃَﺑﺎً ﻓَﻤَﺎ ﺣَﺼَﺪﺗُّﻢْ ﻓَﺬَﺭُﻭﻩُ ﻓِﻲ ﺳُﻨْﺒُﻠِﻪِﺇِﻻَّ ﻗَﻠِﻴﻼً ﻣِّﻤَّﺎ ﺗَﺄْﻛُﻠُﻮﻥَ- ﺛُﻢَّ ﻳَﺄْﺗِﻲ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪِ ﺫَﻟِﻚَ ﺳَﺒْﻊٌ ﺷِﺪَﺍﺩٌﻳَﺄْﻛُﻠْﻦَ ﻣَﺎ ﻗَﺪَّﻣْﺘُﻢْ ﻟَﻬُﻦَّ ﺇِﻻَّ ﻗَﻠِﻴﻼً ﻣِّﻤَّﺎ ﺗُﺤْﺼِﻨُﻮﻥَ- ﺛُﻢَّ ﻳَﺄْﺗِﻲْﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪِ ﺫَﻟِﻚَ ﻋَﺎﻡٌ ﻓِﻴﻪِ ﻳُﻐَﺎﺙُ ﺍﻟﻨَّﺎﺱُ ﻭَﻓِﻴﻪِ ﻳَﻌْﺼِﺮُﻭﻥَ-‏( ﻳﻮﺳﻒ ৪৭-৪৯)-‘তোমরা সাত বছর উত্তমরূপেচাষাবাদ করবে। অতঃপর যখন ফসল কাটবে, তখনখোরাকি বাদে বাকী ফসলশিষ সমেত রেখেদিবে’ (৪৭)। ‘এরপর আসবে দুর্ভিক্ষের সাত বছর।তখন তোমরা খাবে ইতিপূর্বে যা রেখেদিয়েছিলে, তবে কিছু পরিমাণ ব্যতীত যা তোমরা(বীজ বা সঞ্চয় হিসাবে) তুলে রাখবে’ (৪৮)।‘এরপরে আসবে এক বছর, যাতে লোকদেরউপরে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং তখন তারা (আঙ্গুরের)রস নিঙড়াবে (অর্থাৎ উদ্বৃত্ত ফসল হবে)’ (ইউসুফ১২/৪৭-৪৯)।ঐ খাদেমটি ফিরে এসে স্বপ্ন ব্যাখ্যাবর্ণনা করলে বাদশাহ তাকে বললেন, ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻤَﻠِﻚُﺍﺋْﺘُﻮﻧِﻲْ ﺑِﻪِ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀَﻩُ ﺍﻟﺮَّﺳُﻮﻝُ ﻗَﺎﻝَ ﺍﺭْﺟِﻊْ ﺇِﻟَﻰ ﺭَﺑِّﻚَﻓَﺎﺳْﺄَﻟْﻪُ ﻣَﺎ ﺑَﺎﻝُ ﺍﻟﻨِّﺴْﻮَﺓِ ﺍﻟﻼَّﺗِﻲ ﻗَﻄَّﻌْﻦَ ﺃَﻳْﺪِﻳَﻬُﻦَّ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲﺑِﻜَﻴْﺪِﻫِﻦَّ ﻋَﻠِﻴﻢٌ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৫০)-‘তুমি পুনরায় কারাগারে ফিরেযাও এবং তাকে (অর্থাৎ ইউসুফকে) আমার কাছেনিয়ে এস। অতঃপর যখন বাদশাহর দূত তার কাছেপৌঁছলো, তখন ইউসুফ তাকে বলল, তুমি তোমারমনিবের (অর্থাৎ বাদশাহর) কাছে ফিরে যাও এবংতাঁকে জিজ্ঞেস কর যে, নগরীর সেইমহিলাদের খবর কি? যারা নিজেদের হাত কেটেফেলেছিল।আমার পালনকর্তা তো তাদের ছলনাসবই জানেন’ (ইউসুফ ১২/৫০)।বাদশাহর দূতকেফেরৎ দানের শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ:(১) দীর্ঘকারাভোগের দুঃসহ যন্ত্রণায় অতিষ্ট হয়ে ইউসুফ(আঃ) নিশ্চয়ই মুক্তির জন্য উন্মুখ ছিলেন। কিন্তুবাদশাহর পক্ষ থেকে মুক্তির নির্দেশ পাওয়াসত্ত্বেও তিনি দূতকে ফেরত দিলেন। এর কারণএই যে, উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ কারামুক্তিরচাইতে তার উপরে আপতিত অপবাদ মুক্তিকে অধিকগুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ইউসুফ (আঃ)সেকারণেই ঘটনারমূলে যারা ছিল, তাদের অবস্থা জানতেচেয়েছিলেন।(২) তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, জেলথেকে বের হওয়ার আগেই বাদশাহ বা গৃহস্বামী‘আযীযে মিছর’ তাঁর ব্যাপারে সন্দেহ মুক্ত কি-নাসেটা জেনে নেওয়া এবং ঐ মহিলাদের মুখ দিয়েতার নির্দোষিতার বিষয়টি প্রকাশিত হওয়া।(৩) ইউসুফ তারবক্তব্যে ‘মহিলাদের’ কথা বলেছেন। আযীয-পত্নী যুলায়খার কথা নির্দিষ্টভাবে বলেননি। অথচসেই-ই ছিল ঘটনার মূল। এটার কারণ ছিল এই যে, (ক)ঐ মহিলাগণ সবাই যুলায়খার কু-প্রস্তাবের সমর্থকহওয়ায় তারা সবাই একই পর্যায়ে চলে এসেছিল (খ)তাছাড়াআরেকটি কারণ ছিল- সৌজন্যবোধ। কেননানির্দিষ্টভাবে তার নাম নিলে আযীযের মর্যাদায়আঘাত আসত। এতদ্ব্যতীত আযীয ছিলেনইউসুফের আশ্রয়দাতা ও লালন-পালনকারী। তার প্রতিকৃতজ্ঞতাবোধের আধিক্য ইউসুফকে আযীয-পত্নীর নাম নিতে দ্বিধান্বিত করেছে। ইউসুফ(আঃ)-এর এবম্বিধ উন্নত আচরণের মধ্যেযেকোন মর্যাদাবান ব্যক্তির জন্য শিক্ষণীয় বিষয়লুকিয়ে রয়েছে।(৪) ইউসুফ চেয়েছিলেন এসত্য প্রমাণ করে দিতে যে, প্রত্যেক মানুষেরমধ্যে মন্দপ্রবণতা থাকলেও তা নেককার মানুষকেপথভ্রষ্ট করতে পারে না আল্লাহর বিশেষঅনুগ্রহের কারণে। যদি আমিসেই অনুগ্রহ নাপেতাম, তাহ’লে হয়ত আমিও পথভ্রষ্ট হয়েযেতাম।অতএব আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁরঅনুগ্রহ লাভে সদা সচেষ্ট থাকাই বান্দার সর্বাপেক্ষাবড় কর্তব্য। বস্ত্ততঃ এইরূপ পবিত্র হৃদয়কেকুরআনে ‘নফসে মুত্বমাইন্নাহ’ বা প্রশান্ত হৃদয় বলাহয়েছে (ফাজর ৮৯/২৭)। যা অর্জন করারজন্যসকলকেই সচেষ্ট হওয়া উচিত। নবীগণ সবাইছিলেন উক্ত প্রশান্তহৃদয়ের অধিকারী। আল্লাহরবিশেষ অনুগ্রহে ইউসুফ (আঃ)ও অনুরূপ পবিত্রহৃদয়ের অধিকারী ছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেনবাদশাহও তাঁর পবিত্রতা সম্পর্কে নিশ্চিত হৌন।(৫)পবিত্রতার অহংকারঃ বাদশাহর দূতকে ফিরিয়ে দেবারমধ্যে ইউসুফের হৃদয়ে পবিত্রতার যে অহংকারজন্মেছিল, তা প্রত্যেক নির্দোষ মানুষেরমধ্যে থাকা উচিত। ইউসুফের এই সাহসী আচরণেঅভিভূত হয়ে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) বলেন, ﺇﻥَّﺍﻟﻜﺮﻳﻢَ ﺍﺑﻦَ ﺍﻟﻜﺮﻳﻢِ ﺍﺑﻦِ ﺍﻟﻜﺮﻳﻢِ ﺑﻦِ ﺍﻟﻜﺮﻳﻢِ : ﻳﻮﺳﻒُ ﺑﻦُﻳﻌﻘﻮﺏَ ﺑﻨِﺎﺳﺤﺎﻕَ ﺑﻦِ ﺇﺑﺮﺍﻫﻴﻢَ، ﻭَﻟَﻮ ﻟﺒِﺜْﺖُ ﻓﻰ ﺍﻟﺴﺠﻦﻣﺎﻟﺒﺚَ ﺛﻢ ﺟﺎﺀﻧﻰ ﺍﻟﺮﺳﻮﻝُ ﻷَﺟَﺒْﺖُ ﺛﻢ ﻗﺮﺃ ‏(ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀَﻩُﺍﻟﺮَّﺳُﻮْﻝُ ﻗَﺎﻝَ ﺍﺭْﺟِﻊْ ﺇِﻟَﻰ ﺭَﺑِّﻚَ ﻓَﺎﺳْﺄَﻟْﻪُ ﻣَﺎ ﺑَﺎﻝُ ﺍﻟﻨِّﺴْﻮَﺓِ ﺍﻟﻼَّﺗِﻲﻗَﻄَّﻌْﻦَ ﺃَﻳْﺪِﻳَﻬُﻦَّ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲ ﺑِﻜَﻴْﺪِﻫِﻦَّ ﻋَﻠِﻴﻢٌ ‏) ، ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻯﺑﺴﻨﺪ ﺣﺴﻦ -‘নিশ্চয়ই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির পুত্র সম্ভ্রান্ত,তার পুত্র সম্ভ্রান্ত, তার পুত্র সম্ভ্রান্ত- (তাঁরা হ’লেন)ইবরাহীমের পুত্র ইসহাক্ব, তাঁর পুত্র ইয়াকূব ও তাঁরপুত্র ইউসুফ। যদি আমি অতদিন কারাগারে থাকতাম, যতদিনতিনি ছিলেন, তাহ’লেবাদশাহর দূত প্রথমবার আসারসাথে সাথে আমি তার প্রস্তাব কবুল করতাম’। এ কথাবলার পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সূরা ইউসুফ ৫০আয়াতটি পাঠকরেন’।[22]বাদশাহর দরবারে ইউসুফ (আঃ):কারাগারথেকে পাঠানো ইউসুফের দাবী অনুযায়ীমহিলাদের কাছে বাদশাহ ঘটনার তদন্ত করলেন।আল্লাহ বলেন, বাদশাহ মহিলাদের ডেকে বলল, ﻗَﺎﻝَﻣَﺎ ﺧَﻄْﺒُﻜُﻦَّ ﺇِﺫْ ﺭَﺍﻭَﺩﺗُّﻦَّ ﻳُﻮْﺳُﻒَ ﻋَﻦ ﻧَّﻔْﺴِﻪِ ‘তোমাদেরখবর কি যখন তোমরা ইউসুফকে কুকর্মেফুসলিয়েছিলে? তারা বলল, ﺣَﺎﺵَ ِﻟﻠﻪِ ﻣَﺎ ﻋَﻠِﻤْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻣِﻦْﺳُﻮْﺀٍ ‘আল্লাহ পবিত্র। আমরা তাঁর (ইউসুফ) সম্পর্কেমন্দ কিছুই জানি না’। আযীয-পত্নী বলল, ﺍﻵﻥَﺣَﺼْﺤَﺺَ ﺍﻟْﺤَﻖُّ ﺃَﻧَﺎ ﺭَﺍﻭَﺩﺗُّﻪُ ﻋَﻦْ ﻧَّﻔْﺴِﻪِ ﻭَﺇِﻧَّﻪُ ﻟَﻤِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ‘এখন সত্য প্রকাশিত হ’ল। আমিই তাকে ফুসলিয়েছিলামএবং সে ছিল সত্যবাদী’ (ইউসুফ ১২/৫১)। ইতিপূর্বেএকবার শহরের মহিলাদের সম্মুখে যুলায়খা উক্তস্বীকৃতি দিয়ে বলেছিল, ﻟَﻘَﺪْ ﺭَﺍﻭَﺩﺗُّﻪُ ﻋَﻦ ﻧَّﻔْﺴِﻪِﻓَﺎﺳَﺘَﻌْﺼَﻢَ ‘আমি তাকে ফুসলিয়েছিলাম। কিন্তু সেনিজেকে সংযত রেখেছিল’ (ইউসুফ ১২/৩২)।অতঃপরআযীয-পত্নী বলল, ﺫَﻟِﻚَ ﻟِﻴَﻌْﻠَﻢَ ﺃَﻧِّﻲ ﻟَﻢْ ﺃَﺧُﻨْﻪُ ﺑِﺎﻟْﻐَﻴْﺐِﻭَﺃَﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻻَ ﻳَﻬْﺪِﻱ ﻛَﻴْﺪَ ﺍﻟْﺨَﺎﺋِﻨِﻴْﻦَ ‘এটা (অর্থাৎ এইস্বীকৃতিটা) এজন্যে যেন গৃহস্বামী জানতেপারেন যে, তার অগোচরে আমি তার প্রতিবিশ্বাসঘাতকতা করিনি। বস্ত্ততঃ আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদেরষড়যন্ত্র সফল করেন না’ (৫২)। ‘আর আমিনিজেকে নির্দোষ মনে করি না। নিশ্চয়ই মানুষেরমন মন্দপ্রবণ। কেবল ঐ ব্যক্তি ছাড়া যার প্রতি আমারপ্রভু দয়া করেন। নিশ্চয়ই আমারপ্রতিপালক ক্ষমাশীলও দয়াবান’ (৫৩)।এভাবে আযীয-পত্নী ও নগরীরমহিলারা যখন বাস্তব ঘটনা স্বীকার করল, তখন বাদশাহনির্দেশ দিলেন, ইউসুফকে আমার কাছে নিয়েএস। কুরআনের ভাষায়- ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻤَﻠِﻚُ ﺍﺋْﺘُﻮْﻧِﻲْ ﺑِﻪِﺃَﺳْﺘَﺨْﻠِﺼْﻪُ ﻟِﻨَﻔْﺴِﻲْ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻛَﻠَّﻤَﻪُ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻧَّﻚَ ﺍﻟْﻴَﻮْﻡَ ﻟَﺪَﻳْﻨَﺎ ﻣِﻜِﻴْﻦٌﺃَﻣِﻴْﻦٌ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৫৪)-‘বাদশাহ বলল, তাকে তোমরা আমার কাছে নিয়েএসো। আমি তাকে আমার নিজের জন্য একান্তসহচর করে নেব। অতঃপর যখন বাদশাহ ইউসুফেরসাথে মতবিনিময় করলেন, তখন তিনি তাকে বললেন,নিশ্চয়ই আপনি আজ থেকে আমাদের নিকট বিশ্বস্তও মর্যাদাপূর্ণ স্থানের অধিকারী’ (ইউসুফ ১২/৫৪)।ইউসুফের অর্থমন্ত্রীর পদ লাভ এবং সাথে সাথেবাদশাহীর ক্ষমতা লাভ:কারাগার থেকে মুক্ত হয়েফিরে এসে বাদশাহর সাথে কথোপকথনের একপর্যায়ে বাদশাহ যখন দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় দক্ষ ওবিশ্বস্ত লোককোথায় পাবেন বলে নিজেরঅসহায়ত্ব প্রকাশ করছিলেন, তখন ইউসুফ (আঃ)নিজেকে এজন্য পেশ করেন। যেমন আল্লাহরভাষায়- ﻗَﺎﻝَ ﺍﺟْﻌَﻠْﻨِﻲْ ﻋَﻠَﻰ ﺧَﺰَﺁﺋِﻦِ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﺇِﻧِّﻲْ ﺣَﻔِﻴْﻆٌ ﻋَﻠِﻴْﻢٌ -‏( ﻳﻮﺳﻒ ৫৫)-‘ইউসুফ বলল, আপনি আমাকে দেশেরধন-ভান্ডারের দায়িত্বে নিয়োজিত করুন। আমিবিশ্বস্ত রক্ষক ও (এ বিষয়ে) বিজ্ঞ’ (ইউসুফ১২/৫৫)।তাঁর এই পদ প্রার্থনা ও নিজের যোগ্যতানিজ মুখে প্রকাশ করার উদ্দেশ্য নিজেরশ্রেষ্ঠত্ব ও অহংকার প্রকাশের জন্য ছিল না। বরংকুফরী হুকূমতের অবিশ্বস্ত ওঅনভিজ্ঞ মন্ত্রীও আমলাদের হাত থেকে আসন্ন দুর্ভিক্ষ পীড়িতসাধারণ জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্য ও তাদের প্রতিদয়ার্দ্র চিত্ততার কারণে ছিল। ইবনু কাছীরবলেন,এর মধ্যে নেতৃত্ব চেয়ে নেওয়ার দলীলরয়েছে ঐ ব্যক্তিরজন্য, যিনি কোন বিষয়েনিজেকে আমানতদার ও যোগ্য বলে নিশ্চিতভাবেমনে করেন’।[23] কুরতুবী বলেন, যখন কেউনিশ্চিতভাবে মনে করবেন যে, এ ব্যাপারে তিনিব্যতীত যোগ্য আর কেউ নেই, তখন তাকে ঐপদ বা দায়িত্ব চেয়ে নেওয়া ওয়াজিব হবে।পক্ষান্তরে যদি অন্য কেউ যোগ্য থাকে, তবেচেয়ে নেওয়া যাবে না। মিসরে ঐ সময় ইউসুফেরচাইতে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় যোগ্য ও আমানতদারকেউ ছিল না বিধায় ইউসুফ উক্ত দায়িত্ব চেয়ে নিয়েছিলেন’।[24] আত্মস্বার্থ হাছিল বা পাপকাজে সাহায্যকরা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না।আহলে কিতাবগণের বর্ণনামতে এই সময় বাদশাহ তাঁকে কেবল খাদ্য মন্ত্রণালয়নয়, বরং পুরা মিসরের শাসন ক্ষমতা অর্পণ করেন এবংবলেন, আমি আপনার চাইতে বড় নই, কেবল সিংহাসনব্যতীত’। ইবনু ইসহাকের বর্ণনা মতে এ সময়বাদশাহ তাঁর হাতে মুসলমান হন। একথাও বলা হয়েছেযে, এই সময় ‘আযীযে মিছর’ ক্বিৎফীর মারা যান।ফলে ইউসুফকে উক্ত পদে বসানো হয় এবং তারবিধবা স্ত্রী যুলায়খাকে বাদশাহ ইউসুফের সাথে বিবাহদেন।[25] জ্ঞান ও যুক্তি একথা মেনে নিলেওকুরআন এ বিষয়ে কিছু বলেনি। যেমন রাণীবিলক্বীসের মুসলমান হওয়া সম্পর্কে কুরআনস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছে (নমল ২৭/৪৪)।যেহেতু কুরআন ও হাদীছ এ বিষয়ে কিছু বলেনি,অতএব আমাদের চুপ থাকা উত্তম। আর আহলেকিতাবগণের বর্ণনা বিষয়ে রাসূলের দেওয়ামূলনীতি অনুসরণ করা উচিত যে, তাওরাত ও ইনজীলবিষয়ে আমরা তাদের কথা সত্যও বলব না, মিথ্যাওবলবনা বরং আমাদের নিকটে শেষনবীর মাধ্যমে যেবিধান এসেছে, কেবল তারই অনুসরণ করব।।[26]নবী হিসাবে সুলায়মান (আঃ)-এর যেমনউদ্দেশ্য ছিল বিলক্বীসের মুসলমান হওয়া ও তাররাজ্য থেকে শিরক উৎখাত হওয়া। অনুরূপভাবে নবীহিসাবে ইউসুফ (আঃ)-এরও উদ্দেশ্য থাকতে পারেবাদশাহর মুসলমান হওয়া এবং মিসর থেকে শিরক উৎখাতহওয়া ও সর্বত্র আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত হওয়া। বাদশাহযখন তার ভক্ত ও অনুরক্ত ছিলেন এবং নিজেরবাদশাহী তাকে সোপর্দ করেছিলেন, তখন ধরেনেওয়া যায় যে, তিনি শিরকী ধ্যান-ধারণা পরিত্যাগকরেতাওহীদের অনুসারী হয়েছিলেন এবংইউসুফকে নবী হিসাবে স্বীকারকরে তাঁরশরী‘আতের অনুসারী হয়ে বাকী জীবনকাটিয়েছিলেন। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।এভাবেআল্লাহর ইচ্ছায় ইউসুফ (আঃ) মিসরের সর্বোচ্চপদে সসম্মানে বরিত হ’লেন এবং অন্ধকূপেহারিয়ে যাওয়া ইউসুফ পুনরায় দীপ্ত সূর্যের ন্যায়পৃথিবীতে বিকশিত হয়ে উঠলেন। আল্লাহবলেন, ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻣَﻜَّﻨَّﺎ ﻟِﻴُﻮﺳُﻒَ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﻳَﺘَﺒَﻮَّﺃُ ﻣِﻨْﻬَﺎﺣَﻴْﺚُ ﻳَﺸَﺂﺀُ ﻧُﺼِﻴْﺐُ ﺑِﺮَﺣْﻤَﺘِﻨَﺎ ﻣَﻦْ ﻧَﺸَﺂﺀُ ﻭَﻻَ ﻧُﻀِﻴﻊُ ﺃَﺟْﺮَﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْﻦَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৫৬)-‘এমনিভাবে আমরা ইউসুফকেসেদেশে প্রতিষ্ঠা দান করি। সে তথায় যেখানেইচ্ছা স্থান করে নিতে পারত। আমরা আমাদের রহমতযাকে ইচ্ছা তাকে পৌঁছে দিয়ে থাকি এবং আমরাসৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করি না’ (ইউসুফ১২/৫৬)। উপরোক্ত আয়াতে স্পষ্ট ইঙ্গিতরয়েছে ইউসুফের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারীহওয়ার এবং মিসরের সর্বত্র বিধান জারি করার। ইবনুকাছীর বলেন, এই সময় তিনি দ্বীনী ও দুনিয়াবীউভয় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন’।[27]ইউসুফেরদক্ষ শাসন ও দুর্ভিক্ষ মুকাবিলায় অপূর্বব্যবস্থাপনা:সুদ্দী, ইবনু ইসহাক্ব, ইবনু কাছীর প্রমুখবিদ্বানগণ ইসরাঈলী রেওয়ায়াত সমূহের ভিত্তিতেযে বিবরণ দিয়েছেন, তার সারকথা এই যে, ইউসুফ(আঃ)-এর হাতে মিসরের শাসনভার অর্পিত হওয়ার পরস্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রথম সাত বছর সমগ্রদেশে ব্যাপক ফসল উৎপন্ন হয়। ইউসুফ (আঃ)-এরনির্দেশক্রমে উদ্বৃত্ত ফসলের বৃহদাংশ সঞ্চিত রাখাহয়। এতে বুঝা যায় যে, আধুনিক কালের এলএসডি,সিএসডি খাদ্য গুদামের অভিযাত্রা বিগত দিনে ইউসুফ(আঃ)-এর মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল।এরপর স্বপ্নেরদ্বিতীয় অংশের বাস্তবতা শুরু হয় এবং দেশে ব্যাপকদুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তিনি জানতেন যে, এ দুর্ভিক্ষসাতবছর স্থায়ী হবে এবং আশপাশের রাজ্যসমূহেবিস্তৃত হবে। তাই সংরক্ষিত খাদ্যশস্য খুব সতর্কতারসাথে ব্যয় করা শুরু করলেন। তিনি ফ্রি বিতরণ না করেস্বল্পমূল্যে খাদ্য বিতরণের সিদ্ধান্ত নেন। সেইসাথে মাথাপ্রতি খাদ্য বিতরণের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণনির্ধারণ করে দেন। তাঁর আগাম হুঁশিয়ারি মোতাবেকমিসরীয় জনগণের অধিকাংশের বাড়ীতে সঞ্চিতখাদ্যশস্য মওজূদ ছিল। ফলে পার্শ্ববর্তীদুর্ভিক্ষপীড়িতরাজ্যসমূহ থেকে দলে দলেলোকেরা মিসরে আসতে শুরু করে। ইউসুফ (আঃ)তাদের প্রত্যেককে বছরে এক উট বোঝাইখাদ্য-শস্য স্বল্প মূল্যের বিনিময়ে প্রদানেরনির্দেশ দেন।[28] অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ারকারণে খাদ্য বিতরণের তদারকি ইউসুফ (আঃ) নিজেইকরতেন। এতে ধরে নেওয়া যায় যে, খাদ্য-শস্যের সরকারী রেশনের প্রথা বিশ্বে প্রথমইউসুফ (আঃ)-এর হাতেই শুরু হয়।ভাইদের মিসরেআগমন:মিসরের দুর্ভিক্ষ সে দেশের সীমানাপেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দূর-দূরান্ত এলাকা সমূহেবিস্তৃত হয়। ইবরাহীম, ইসহাক্ব ও ইয়াকূবের আবাসভূমিকেন‘আনও দুর্ভিক্ষের করালগ্রাসে পতিত হয়।ফলে ইয়াকূবের পরিবারেও অনটন দেখা দেয়। এসময় ইয়াকূব (আঃ)-এর কানে এ খবর পৌঁছে যায় যে,মিসরের নতুন বাদশাহ অত্যন্ত সৎ ও দয়ালু। তিনিস্বল্পমূল্যে একউট পরিমাণ খাদ্যশস্য অভাবীব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করছেন। এ খবর শুনেতিনি পুত্রদের বললেন,তোমরাও মিসরে গিয়েখাদ্যশস্য নিয়ে এসো। সেমতে দশ ভাই দশটিউটনিয়ে রওয়ানা হয়ে গেল। বৃদ্ধ পিতার খিদমত ওবাড়ী দেখাশুনার জন্য ছোট ভাই বেনিয়ামীনএকাকী রয়ে গেল। কেন‘আন থেকে মিসরেররাজধানী প্রায় ২৫০ মাইলের ব্যবধান।যথাসময়েদশভাই কেন‘আন থেকে মিসরে উপস্থিত হ’ল।ইউসুফ (আঃ) তাদেরকে চিনে ফেললেন। কিন্তুতারা তাঁকে চিনতে পারেনি। যেমন আল্লাহবলেন, ﻭَﺟَﺎﺀ ﺇِﺧْﻮَﺓُ ﻳُﻮْﺳُﻒَ ﻓَﺪَﺧَﻠُﻮْﺍ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻓَﻌَﺮَﻓَﻬُﻢْ ﻭَﻫُﻢْﻟَﻪُ ﻣُﻨْﻜِﺮُﻭْﻥَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৫৮)-‘ইউসুফের ভাইয়েরা আগমনকরল এবং তার কাছে উপস্থিত হ’ল। ইউসুফতাদেরকে চিনতে পারল। কিন্তু তারা তাকে চিনতেপারেনি’ (ইউসুফ ১২/৫৮)।ইউসুফের কৌশল অবলম্বনও বেনিয়ামীনের মিসর আগমন :সুদ্দী ওঅন্যান্যদের বরাতে কুরতুবী ও ইবনু কাছীরবর্ণনা করেন যে, দশ ভাই দরবারে পৌঁছলে ইউসুফ(আঃ) তাদেরকে দোভাষীর মাধ্যমে এমনভাবেজিজ্ঞাসাবাদ করেন, যেমন অচেনা লোকদেরকরা হয়। উদ্দেশ্য ছিল তাদের সম্পর্কে নিশ্চিতহওয়া এবং পিতা ইয