হযরত ইউসুফ আঃ এর জীবনী পার্ট -এক


  1. হযরত ইউসুফ (আ:) part 1. হযরত ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)সূচীপত্র সূরা নাযিলের কারণ সুন্দরতম কাহিনীআরবী ভাষায় কেন?কাহিনীর সার-সংক্ষেপসূরাটিমক্কায় নাযিল হওয়ার কারণইউসুফ (আঃ)-এরকাহিনীমিসরে ইউসুফের সময়কালশৈশবে ইউসুফেরলালন-পালন ও চুরির ঘটনাইউসুফ-এর স্বপ্নভাইদের হিংসারশিকার হলেনইউসুফ অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হ’লেনপিতারনিকটে ভাইদের কৈফিয়তকাফেলার হাতে ইউসুফইউসুফমিসরের অর্থমন্ত্রীর গৃহেইউসুফ যৌবনে পদার্পণকরলেনযৌবনের মহা পরীক্ষায় ইউসুফমহিলাদেরসমাবেশে ইউসুফনবীগণ নিষ্পাপ মানুষছিলেনইউসুফের সাক্ষী কে ছিলেন?ইউসুফজেলে গেলেনকারাগারের জীবনজেলখানারসাথীদের নিকটে ইউসুফের দাওয়াতইউসুফেরদাওয়াতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহবাদশাহর স্বপ্ন ওকারাগার থেকে ইউসুফের ব্যাখ্যা দানবাদশাহর দূতকেফেরৎ দানে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহবাদশাহর দরবারেইউসুফ (আঃ)ইউসুফের অর্থমন্ত্রীর পদ লাভ এবংসাথে সাথে বাদশাহীর ক্ষমতা লাভইউসুফের দক্ষশাসন ও দুর্ভিক্ষ মুকাবিলায় অপূর্ব ব্যবস্থাপনাভাইদেরমিসরে আগমনইউসুফের কৌশল অবলম্বন ওবেনিয়ামীনের মিসর আগমনবেনিয়ামীনকেআটকে রাখা হ’লশিক্ষণীয় বিষয়বেনিয়ামীনকেফিরিয়ে নেবার জন্য ভাইদেরপ্রচেষ্টাবেনিয়ামীনকে রেখেই মিসর থেকেফিরল ভাইয়েরাপিতার নিকটে ছেলেদেরকৈফিয়তপিতার নির্দেশে ছেলেদের পুনরায় মিসরেগমনইউসুফের আত্মপ্রকাশ এবং ভাইদের ক্ষমাপ্রার্থনাইউসুফের ব্যবহৃত জামা প্রেরণভাইদের প্রতিক্ষমা প্রদর্শনের তাৎপর্যইয়াকূব (আঃ) দৃষ্টিশক্তিফিরে পেলেনঘামের গন্ধে দৃষ্টিশক্তি ফেরাসম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্যপিতার নিকটেছেলেদের ক্ষমা প্রার্থনাইয়াকূব-পরিবারের মিসরউপস্থিতি ও স্বপ্নের বাস্তবায়নইউসুফেরদো‘আইউসুফের প্রশংসায় আল্লাহতা‘আলাশেষনবীর প্রতি আল্লাহর সম্বোধন ওসান্ত্বনা প্রদানইউসুফের কাহিনী এক নযরেইয়াকূব(আঃ)-এর মৃত্যুইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যুসংশয়নিরসনইউসুফের নিষ্পাপত্ব‘বুরহান’ কি?ইউসুফেরকাহিনীতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ।আব্দুল্লাহ ইবনুওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইউসুফ (আঃ)সম্পর্কে বলেন, ﺍﻟﻜﺮﻳﻢُ ﺑﻦُ ﺍﻟﻜﺮﻳﻢِ ﺑﻦِ ﺍﻟﻜﺮﻳﻢِ ﺑﻦِﺍﻟﻜﺮﻳﻢِ ﻳﻮﺳﻒُ ﺑﻦُ ﻳﻌﻘﻮﺏَ ﺑﻦِ ﺍﺳﺤﺎﻕَ ﺑﻦِ ﺍﺑﺮﺍﻫﻴﻢَ ﻋﻠﻴﻬﻢُﺍﻟﺴﻼﻡُ- ‘নিশ্চয়ই মর্যাদাবানের পুত্র মর্যাদাবান, তাঁর পুত্রমর্যাদাবান, তাঁর পুত্র মর্যাদাবান। তাঁরা হলেনইবরাহীমের পুত্র ইসহাক, তাঁর পুত্র ইয়াকূব ও তাঁরপুত্র ইউসুফ ‘আলাইহিমুস সালাম’ (তাঁদের উপর শান্তিবর্ষিত হৌক!)।[1]নবীগণের মধ্যে হযরত ইউসুফ(আঃ) হ’লেন একমাত্র নবী, যাঁর পুরা কাহিনী একটিমাত্র সূরায় ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরা ইউসুফ-এর ১১১টি আয়াতের মধ্যে ৩ থেকে ১০১ আয়াতপর্যন্ত ৯৯টি আয়াতে ইউসুফের কাহিনী বিবৃতহয়েছে। এ ছাড়া অন্যত্র কেবল সূরা আন‘আম ৮৪এবং সূরা মুমিন ৩৪ আয়াতে তাঁর নাম এসেছে।সূরানাযিলের কারণ : সত্যনবী এবং শেষনবীজেনেও কপট ইহুদীরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রতিপদে পদে কষ্ট দিত এবং পরীক্ষা করার চেষ্টাকরত। তাদেরসমাজনেতা ও ধর্মনেতাদের কাজইছিল সর্বদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এরবিরুদ্ধে চক্রান্ত করা ওতাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করা। এ সময় মক্কায় কোনআহলে কিতাব বসবাস করত না এবং মক্কার লোকেরাইউসুফ বা অন্য নবীদের সম্পর্কে কিছু জানতও না।ফলে মদীনার কুচক্রী ইহুদীদের একটি দলমক্কায় এসে একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রশ্ন করলযে, বলুন দেখি, কোন নবী শামে (সিরিয়ায়)ছিলেন। অতঃপর তার ছেলেকে সেখান থেকেমিসরে বহিষ্কার করা হয়। তাতে ঐ ব্যক্তি কেঁদেঅন্ধ হয়ে যান? (এটি বানোয়াট কথা। কেননাকেবলমাত্র কেঁদে কারু চোখ অন্ধ হয় না এবং এটিনবীগণের মর্যাদার খেলাফ)। একথারজওয়াবেঅতঃপর সূরা ইউসুফ পুরাটা একত্রেনাযিল হয়।[2] তাদের পন্ডিতেরা তওরাত-ইঞ্জীলে বর্ণিতউক্ত ঘটনাআগে থেকেই জানতো। তাওরাত-যবূর-ইনজীল সবই ছিল হিব্রু ভাষায় রচিত। আমাদের রাসূলনিজের ভাষাতেই লেখাপড়া জানতেন না, অন্যেরভাষা জানা তো দূরের কথা। ইহুদী নেতাদেরসূক্ষ্ম পলিসি ছিল এই যে, উক্ত বিষয়ে উম্মীনবী মুহাম্মাদ-এর পক্ষে জবাব দেওয়া আদৌ সম্ভবহবে না। ফলে লোকদের মধ্যে তার নবুঅতেরব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হবে এবংতার বিরুদ্ধেপ্রোপাগান্ডা যোরদার করা যাবে।বস্ত্ততঃ তাদেরপ্রশ্নের উত্তরে ইউসুফ (আঃ) ও ইয়াকূব পরিবারেরপ্রকৃত ঘটনা ‘অহি’ মারফত ধারাবাহিকভাবে আল্লাহ তাঁররাসূলকে বর্ণনা করে দেন। যা ছিল রাসূলের জন্যনিঃসন্দেহেএকটি গুরুত্বপূর্ণ মু‘জেযা।[3] শুধুইউসুফের ঘটনাই নয়, আদম থেকে ঈসা পর্যন্তকুরআনে বর্ণিতবাকী ২৪ জন নবী ও তাঁদেরকওমের ঘটনাবলী বর্ণনা ছিল শেষনবী মুহাম্মাদ(ছাঃ)-এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য মু‘জেযা। কেননাতাঁদের কারু সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়নি। তাদেরসম্পর্কে লিখিত কোন বই-পত্র সে যুগে ছিল না।আর তিনি নিজে কারু কাছে কখনো লেখাপড়াশিখেননি। অথচ বিশ্ব ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়েবিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া বিগত যুগের শিক্ষণীয়ঘটনাবলী তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে উম্মতকেশুনিয়ে গেছেন কুরআনের মাধ্যমে। এগুলিই তাঁরনবুঅতের অন্যতম প্রধান দলীল ছিল।এরপরেওখাছ করে ইউসুফ (আঃ) ও তাঁর পিতা ইয়াকূব(আঃ)-এর পরিবারের ঘটনাবলী ছিল বিগত ইতিহাসেরএক অনন্য সাধারণ ঘটনা। যার প্রয়োজনীয় অংশগুলিগুছিয়ে একত্রিতভাবে উপস্থাপন করাই হ’ল সূরাইউসুফের অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য।সুন্দরতম কাহিনী:অন্যান্য নবীদের কাহিনী কুরআনের বিভিন্নস্থানে প্রয়োজন অনুসারে বিক্ষিপ্তভাবে বর্ণিতহয়েছে। কিন্তু ইউসুফ নবীর ঘটনাবলী একত্রেসাজিয়ে একটি সূরাতে সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে।সম্ভবতঃ সেকারণে এটিকে ﺃَﺣْﺴَﻦُ ﺍﻟْﻘَﺼَﺺِ‘সুন্দরতম কাহিনী’ বলা হয়েছে (ইউসুফ ১২/৩)।দ্বিতীয়তঃ এর মধ্যে যেসব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে,তা যেমনি অলৌকিক,তেমনি চমকপ্রদ ও শিক্ষণীয়।তৃতীয়তঃ অন্যান্য নবীদের কাহিনীতে প্রধানতঃউম্মতের অবাধ্যতা ও পরিণামে তাদের উপরেআপতিত গযবের কাহিনী এবং অন্যান্য উপদেশ ওহিকমত সমূহ প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু ইউসুফ (আঃ)-এর কাহিনীতে রয়েছে দুনিয়ার তিক্ত বাস্তবতা এবংআল্লাহর উপরে অকুণ্ঠ নির্ভরতার সমন্বয়ে সৃষ্টএক অতুলনীয় ও অভাবনীয় এক ট্রাজিক জীবননাট্য। যা পাঠ করলে যেকোন বোদ্ধা পাঠকেরজীবনে সৃষ্টি হবেসর্বাবস্থায় আল্লাহর উপরেভরসা ও তাঁর নিকটে আত্মসমর্পণেরএক অনুপমউদ্দীপনা।আরবী ভাষায় কেন?আল্লাহ বলেন,‘আমরা একে আরবী কুরআন হিসাবে নাযিল করেছি,যাতে তোমরা বুঝতে পার’ (ইউসুফ ১২/২)। এরঅন্যতম কারণ ছিল এই যে, ইউসুফ (আঃ)-এর কাহিনীযারা জানতে চেয়েছিল, তারা ছিল আরবীয় ইহুদীএবং মক্কার কুরায়েশ নেতৃবৃন্দ। তাই তাদেরবোধগম্য হিসাবে আরবী ভাষায় উক্ত কাহিনীবর্ণনাকরা হয়েছে এবং আরবীতেই সমগ্র কুরআন নাযিলকরা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন ভাষাগর্বীআরবরা কুরআনের অপূর্ব ভাষাশৈলীর কাছে হারমেনেছে, অন্যদিকে তেমনি কিতাবধারী ইহুদী-নাছারা পন্ডিতেরা কুরআনের বিষয়বস্ত্ত ও বক্তব্যসমূহের সত্যতা ও সারবত্তা উপলব্ধি করে নিশ্চুপহয়েছে।কাহিনীর সার-সংক্ষেপ :কাহিনীটি শৈশবেদেখা ইউসুফের একটি স্বপ্ন দিয়ে শুরু হয়েছেএবং তার সমাপ্তি ঘটেছে উক্ত স্বপ্নের সফলবাস্তবায়নের মাধ্যমে। মাঝখানের ২২/২৩ বছরমতান্তরে চল্লিশ বছর অনেকগুলি বিয়োগান্ত ওচমকপ্রদ ঘটনায় পূর্ণ। কাহিনী অনুযায়ী ইউসুফশৈশবকালে স্বপ্ন দেখেন যে, ১১টি নক্ষত্র এবংসূর্য ও চন্দ্র তাকে সিজদা করছে। তিনি এই স্বপ্নপিতা হযরত ইয়াকূবকে বললে তিনি তাকে সেটাগোপন রাখতে বলেন। কিন্তু তা ফাঁস হয়ে যায়।ফলে এটা তার সুন্দর ভবিষ্যতের হাতছানি ভেবে সৎভাইয়েরা হিংসায় জ্বলে ওঠে এবংতারা তাকে দুনিয়াথেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করে। অতঃপরতারা তাকে জঙ্গলের একটি পরিত্যক্ত অন্ধকূপেনিক্ষেপ করে। তিনদিন পরে পথহারা ব্যবসায়ীকাফেলার নিক্ষিপ্ত বালতিতে করে তিনি উপরেউঠে আসেন। পরে ঐ ব্যবসায়ীরা তাকেমিসরের রাজধানীতে বিক্রি করে দেয়।ভাগ্যক্রমে মিসরের অর্থ ওরাজস্ব মন্ত্রীক্বিৎফীর ( ﻗﻄﻔﻴﺮ ) তাকে খরিদ করে বাড়ীতেনিয়ে যান ক্রীতদাস হিসাবে। কয়েক বছরেরমধ্যে যৌবনে পদার্পণকারী অনিন্দ্য সুন্দরইউসুফের প্রতি মন্ত্রীর নিঃসন্তান স্ত্রী যুলায়খারআসক্তি জন্মে। ফলে শুরু হয় ইউসুফেরজীবনে আরেক পরীক্ষা। একদিন যুলায়খাইউসুফকে তার ঘরেডেকে নিয়ে কুপ্রস্তাবদেয়। তাতে ইউসুফ সম্মত না হয়ে বেরিয়েআসতে চাইলে পিছন থেকে যুলায়খা তার জামাটেনে ধরলে তা ছিঁড়ে যায়। দরজা খুলেবেরিয়েআসতেই দু’জনে ধরা পড়ে যায় বাড়ীরমালিক ক্বিৎফীরের কাছে। পরে যুলায়খার সাজানোকথামতে নির্দোষ ইউসুফের জেল হয়। যুলায়খাছিলেন মিসররাজ রাইয়ান ইবনু অলীদেরভাগিনেয়ী।[4]অন্যূন সাত বছর জেল খাটার পরবাদশাহর এক স্বপ্নের ব্যাখ্যা দানের পুরস্কার স্বরূপতাঁর মুক্তি হয়। পরে তিনি বাদশাহর অর্থ ও রাজস্বমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং বাদশাহর আনুকূল্যে তিনিইহনসমগ্র মিসরের একচ্ছত্র শাসক।ইতিমধ্যেক্বিৎফীরের মৃত্যু হ’লে বাদশাহর উদ্যোগেবিধবা যুলায়খার সাথে তাঁর বিবাহ হয়।[5] বাদশাহর দেখাস্বপ্ন মোতাবেক মিসরে প্রথম সাত বছর ভাল ফসলহয় এবং পরের সাত বছর ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখাদেয়। দুর্ভিক্ষের সময় সুদূর কেন‘আন থেকেতাঁর বিমাতা দশ ভাই তাঁর নিকটে খাদ্য সাহায্য নিতে এলেতিনি তাদের চিনতে পারেন। কিন্তুনিজ পরিচয় গোপনরাখেন। পরে তাঁর সহোদর একমাত্র ছোট ভাইবেনিয়ামীনকে আনা হ’লে তিনি তাদের সামনেনিজের পরিচয় দেন এবং নিজের ব্যবহৃত জামাটিভাইদের মাধ্যমে পিতার নিকটে পাঠিয়ে দেন।বার্ধক্য তাড়িত অন্ধ পিতা ইয়াকূবের মুখেরউপরেউক্ত জামা রেখে দেওয়ার সাথে সাথে তাঁরদু’চোখ খুলে যায়। অতঃপর ইউসুফের আবেদনক্রমে তিনিসপরিবারে মিসর চলে আসেন। ইউসুফতার ভাইদের ক্ষমা করে দেন। অতঃপর ১১ ভাই ওবাপ-মা তাঁর প্রতি সম্মানের সিজদা করেন। এভাবেইশৈশবে দেখা ইউসুফের স্বপ্ন সার্থক রূপ পায়(অবশ্য ইসলামী শরী‘আতে কারু প্রতি সম্মানেরসিজদা নিষিদ্ধ)। সংক্ষেপে এটাই হ’ল ইউসুফ (আঃ) ওইয়াকূব পরিবারের ফিলিস্তীন হ’তে মিসরেহিজরতের কারণ ও প্রেক্ষাপট, যে বিষয়েইহুদীরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রশ্ন করেছিল মূলতঃতাঁকে ঠকাবার জন্য।সূরাটি মক্কায় নাযিল হওয়ার কারণ:মক্কায় কোন ইহুদী-নাছারা বাস করত না। ইউসুফ ওইয়াকূব পরিবারের ঘটনা মক্কায় প্রসিদ্ধ ছিল না এবংমক্কার কেউ এ বিষয়ে অবগতও ছিল না। তাহ’লে সূরাইউসুফ কেন মক্কায় নাযিল হ’ল?এর জবাব এই যে,রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আবির্ভাবের সংবাদ মদীনায় পৌঁছেগেলে সেখানকার ইহুদী-নাছারা নেতৃবর্গ তাওরাত-ইনজীলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তাঁকে ঠিকইচিনে ফেলে (বাক্বারাহ ২/১৪৬; আন‘আম ৬/২০)।কিন্তু অহংকার বশে মানতে অস্বীকার করে এবংতাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল বুনতেশুরু করে।সে মোতাবেক শেষনবী (ছাঃ) যাতেমদীনায় হিজরত করতে না পারেন এবং মক্কাতেইতাঁকে শেষ করে ফেলা যায়, সেই কপটউদ্দেশ্য নিয়ে তাদের একদল ধুরন্ধর লোকমক্কায় প্রেরিত হয়। তারা এসে অস্পষ্ট ভঙ্গিতেপ্রশ্ন করতে লাগল যে, বলুন কোন্ নবীর একপুত্রকে শাম হ’তে মিসরে স্থানান্তরিত করা হয়।কোন্ নবীসন্তানের বিরহ-বেদনায় কেঁদেকেঁদে অন্ধ হয়ে যান ইত্যাদি।জিজ্ঞাসার জন্য এঘটনাটি বাছাই করার অন্যতম কারণ ছিল এই যে, এ ঘটনাটিমক্কায় ছিল অপরিচিত এবংএকটি সম্পূর্ণ নতুন বিষয়।অতএবমক্কার লোকেরাই যে বিষয়ে জানে না,সে বিষয়ে উম্মী নবী মুহাম্মাদ-এর জানার প্রশ্নইওঠেনা। ফলে নিশ্চয়ই তিনি বলতে পারবেন না এবংঅবশ্যই তিনি অপদস্থ হবেন। তখন মক্কারকাফেরদের কাছে একথা রটিয়ে দেওয়া সম্ভবহবে যে, মুহাম্মাদ কোন নবী নন, তিনি একজনভন্ড ও মতলববাজ লোক। বাপ-দাদার ধর্মেরবিরোধিতা করার কারণে তখন লোকেরাতাকে হয়তপিটিয়ে মেরে ফেলবে।যাইহোক ইহুদীদেরএ কুটচাল ও কপট উদ্দেশ্য সফল হয়নি। তাদেরপ্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে সূরা ইউসুফ নাযিল হয় এবংতাতে ইউসুফ ও ইয়াকূব-পরিবারের ঘটনাবলীএমননিখুঁতভাবে পরিবেশিত হয়, যা তওরাত ওইনজীলেও ছিল না। বস্ত্ততঃ এটি ছিল শেষনবী(ছাঃ)-এর একটি প্রকাশ্য মু‘জেযা।ইউসুফ (আঃ)-এরকাহিনী :ইউসুফ (আঃ)-এর পিতা ছিলেন ইয়াকূব ইবনেইসহাক্ব ইবনে ইবরাহীম (আঃ)। তাঁরা সবাইকেন‘আনবা ফিলিস্তীনের হেবরন এলাকার বাসিন্দাছিলেন। ইয়াকূব (আঃ)-এরদ্বিতীয়া স্ত্রীর গর্ভেজন্মগ্রহণ করেন ইউসুফ ও বেনিয়ামীন।শেষোক্ত সন্তান জন্মের পরপরই তার মামৃত্যুবরণ করেন। পরে ইয়াকূব (আঃ) তাঁর স্ত্রীরঅপর এক বোন লায়লা-কে বিবাহ করেন। ইউসুফ-এরসাথে মিসরে পুনর্মিলনের সময় ইনিই মাহিসাবেসেখানে পিতার সাথে উপস্থিত ছিলেন।[6]হযরতইয়াকূব (আঃ) মিসরে পুত্র ইউসুফের সাথে ১৭ বছরমতান্তরে ২০ বছরের অধিককাল অতিবাহিত করেন।অতঃপর ১৪৭ বছর বয়সে সেখানেই ইন্তেকালকরেন। মৃত্যুকালে অছিয়ত করে যান যেন তাঁকেবায়তুল মুক্বাদ্দাসের নিকটবর্তী হেবরন মহল্লায়পিতা ইসহাক ও দাদা ইবরাহীম (আঃ)-এর পাশে সমাহিতকরা হয় এবং তিনি সেখানেই সমাধিস্থ হন। যা এখন‘খলীল’ মহল্লা বলে খ্যাত। হযরত ইউসুফ (আঃ) ১১০বছর বয়সে মিসরে ইন্তেকাল করেন এবং তিনিওহেবরনের একই স্থানে সমাধিস্থ হওয়ার জন্যসন্তানদের নিকটে অছিয়ত করে যান। এর দ্বারাবায়তুল মুক্বাদ্দাস অঞ্চলের বরকত ও উচ্চ মর্যাদাপ্রমাণিত হয়। হযরত ইয়াকূব-এর বংশধরগণ সকলে ‘বনুইসরাঈল’ নামে খ্যাত হয়। তাঁর বারো পুত্রের মধ্যেমাত্র ইউসুফ নবী হয়েছিলেন। তাঁর রূপ-লাবণ্য ছিলঅতুলনীয়।রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আমি মি‘রাজরজনীতে ইউসুফ (আঃ)-এর সাথেসাক্ষাৎ হলেদেখলাম যে, আল্লাহ তাকে সমগ্র বিশ্বের রূপ-সৌন্দর্যের অর্ধেক দান করেছেন’।[7] উল্লেখ্যযে, ছাহাবী বারা ইবনে আযেব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চেহারাকে ‘পূর্ণ চনেদ্রর’ সাথে তুলনাকরেছেন’।[8] যেদিকে ইঙ্গিত করেই ফারসীকবি গেয়েছেন- ﺣﺴﻦ ﻳﻮﺳﻒ ﺩﻡ ﻋﻴﺴﻰ ﻳﺪ ﺑﻴﻀﺎﺩﺍﺭﻯﺂﻧﭽﻪ ﺧﻮﺑﻪ ﻫﻤﻪ ﺩﺍﺭﻧﺪ ﺗﻮ ﺗﻨﻬﺎ ﺩﺍﺭﻯ ‘ইউসুফেরসৌন্দর্য, ঈসার ফুঁক ও মূসার দীপ্ত হস্ততালু- সবকিছুইযে হে নবী, তোমার মাঝেই একীভূত’।যুলায়খা-র গর্ভে ইউসুফ (আঃ)-এর দু’টি পুত্র সন্তান হয়।তাদের নাম ছিল ইফরাঈম ও মানশা। ইফরাঈমের একটিপুত্র ও একটি কন্যা সন্তান হয়। পুত্র ছিলেন ‘নূন’ যারপুত্র ‘ইউশা’ নবী হন এবং কন্যা ছিলেন ‘লাইয়া’ অথবা‘রাহ্মাহ’, যিনি আইয়ূব (আঃ)-এর স্ত্রী ছিলেন’।[9]উল্লেখ্য যে, বিগত নবীদের বংশ তালিকার অধিকাংশনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।মিসরে ইউসুফের সময়কাল :মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্ব(৮০-১৫০ হিঃ) বলেন, ঐ সময় মিসরের সম্রাট ছিলেন‘আমালেক্বা’ জাতির জনৈক রাইয়ান ইবনে ওয়ালীদ।তিনি পরবর্তীকালে ইউসুফের কাছে মুসলমান হনএবং ইউসুফকে মিসরের সর্বময় ক্ষমতায় বসিয়েবলেন, ﻟﺴﺖُ ﺃﻋﻈﻢَ ﻣﻨﻚ ﺇﻻ ﺑﺎﻟﻜﺮﺳﻰ ‘আমি আপনারচাইতে বড় নই, সিংহাসন ব্যতীত’। এ সময় ইউসুফেরবয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর।[10] পক্ষান্তরে তারীখুলআম্বিয়ার লেখক বলেন, ইউসুফ (আঃ)-এরকাহিনীতে মিসরে যুগ যুগ ধরে রাজত্বকারীফেরাঊন রাজাদের কোন উল্লেখ না থাকায়অনেকে প্রমাণ করেন যে, ঐ সময় ‘হাকসূস’ রাজারা( ﻣﻠﻮﻙ ﺍﻟﻬﻜﺴﻮﺱ ) ফেরাঊনদের হটিয়ে মিসর দখলকরেন এবং দু’শো বছর যাবত তারা সেখানে রাজত্বকরেন। যা ছিল ঈসা (আঃ)-এর আবির্ভাবের প্রায় দু’হাযারবছরপূর্বের ঘটনা’।[11]উল্লেখ্য যে, ইউসুফ (আঃ)-এর সময়কাল ছিল ঈসা (আঃ)-এর অন্যূন আঠারশ’ বছরপূর্বেকার। তবে সুলায়মান মানছূরপুরী বলেন,আনুমানিক ১৬৮৬ বছর পূর্বের। হ’তে পারে কেউইউসুফের সময়কালের শুরু থেকে এবং কেউ তাঁরমৃত্যু থেকে হিসাব করেছেন।তবে তাঁর সময়থেকেই বনু ইস্রাঈলগণ মিসরে বসবাস শুরু করে।শৈশবে ইউসুফের লালন-পালন ও চুরির ঘটনা :হাফেযইবনু কাছীর বর্ণনা করেন যে, ইউসুফ-এরজন্মের কিছুকাল পরেই বেনিয়ামীন জন্মগ্রহণকরেন। বেনিয়ামীন জন্মের পরপরই তাদেরমায়ের মৃত্যু ঘটে।[12] তখন মাতৃহীন দুই শিশুর লালন-পালনের ভার তাদের ফুফুর উপরে অর্পিত হয়।আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফকে এত বেশী রূপ-লাবণ্যএবং মায়াশীল ব্যবহার দান করেছিলেন যে, যেই-ইতাকে দেখত, সেই-ই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েপড়ত। ফুফু তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।একদন্ড চোখের আড়াল হ’তে দিতেন না।এদিকে বিপত্নীক ইয়াকূব (আঃ)মাতৃহীনা দুই শিশুপুত্রের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই অধিকতর দুর্বল এবংসর্বদা ব্যাকুল থাকতেন। ইতিমধ্যে ইউসুফ একটু বড়হ’লে এবং হাঁটাচলা করার মত বয়স হ’লে পিতা ইয়াকূব(আঃ) তাকে ফুফুর নিকট থেকে আনতে চাইলেন।কিন্তু ফুফু তাকে ছাড়তে নারায।ওদিকে পিতাও তাকেনিয়ে আসতে সংকল্পবদ্ধ। শুরু হ’ল পিতা ও ফুফুরমধ্যে মহববতের টানাপড়েন। ফলে ঘটে গেলএক অঘটন।অধিক পীড়াপীড়ির কারণে ইউসুফকেযখন তার পিতার হাতে তুলে দিতেই হ’ল, তখনস্নেহান্ধ ফুফু গোপনে এক ফন্দি করলেন। তিনিস্বীয় পিতা হযরত ইসহাক্ব (আঃ)-এর নিকট থেকেযে একটা হাঁসুলি পেয়েছিলেন এবং যেটাকেঅত্যন্ত মূল্যবান ও বরকতময় মনেকরা হ’ত, ফুফুসেই হাঁসুলিটিকে ইউসুফ-এর কাপড়ের নীচেগোপনে বেঁধে দিলেন।অতঃপর ইউসুফ তার পিতারসাথে চলে যাওয়ার পর ফুফু জোরেশোরেপ্রচার শুরু করলেন যে, তার মূল্যবান হাঁসুলিটি চুরি হয়েগেছে। পরে তল্লাশী করে তা ইউসুফেরকাছে পাওয়া গেল। ইয়াকূবী শরী‘আতের বিধানঅনুযায়ী ফুফু ইউসুফকে তার গোলাম হিসাবে রাখারঅধিকার পেলেন। ইয়াকূব (আঃ)ও দ্বিরুক্তি না করেসন্তানকে তারফুফুর হাতে পুনরায় সমর্পণ করলেন।এরপর যতদিন ফুফু জীবিত ছিলেন, ততদিন ইউসুফ তারকাছেই রইলেন।[13]এই ছিল ঘটনা, যাতে ইউসুফনিজের অজান্তে চুরির অপরাধে অভিযুক্তহয়েছিলেন। এরপর বিষয়টি সবার কাছেদিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছিল যে,তিনি ছিলেন এ ব্যাপারে একেবারেই নির্দোষ।ফুফুর অপত্য স্নেহই তাকে ঘিরে এ চক্রান্ত জালবিস্তার করেছিল। এসত্য কথাটি তার সৎভাইদেরও জানাছিল। কিন্তু এটাকেই তারা ইউসুফের মুখের উপরেবলে দেয় যখন আরেক বানোয়াট চুরিরঅভিযোগে বেনিয়ামীনকে মিসরে গ্রেফতারকরা হয়। ইউসুফ তাতে দারুণ মনোকষ্ট পেলেও তাচেপে রাখেন।বলা বাহুল্য, শৈশবে যেমন ইউসুফস্বীয় ফুফুর স্নেহের ফাঁদে পড়ে চোর (?)সাব্যস্ত হয়ে ফুফুরগোলামী করেন, যৌবনেতেমনি যুলায়খার চক্রান্তে পড়ে মিথ্যা অপবাদেঅন্যূন সাত বছর জেল খাটেন- যে ঘটনা পরেবর্ণিত হবে।ইউসুফ-এর স্বপ্ন :বালক ইউসুফ একদিনতার পিতা ইয়াকূব (আঃ)-এর কাছে এসে বলল, ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَﻳُﻮْﺳُﻒُ ﻟِﺄَﺑِﻴْﻪِ ﻳَﺎ ﺃَﺑﺖِ ﺇِﻧِّﻲْ ﺭَﺃَﻳْﺖُ ﺃَﺣَﺪَ ﻋَﺸَﺮَ ﻛَﻮْﻛَﺒﺎًﻭَّﺍﻟﺸَّﻤْﺲَ ﻭَﺍﻟْﻘَﻤَﺮَ ﺭَﺃَﻳْﺘُﻬُﻢْ ﻟِﻲْ ﺳَﺎﺟِﺪِﻳْﻦَ -‘আমি স্বপ্নদেখেছি যে, ১১টি নক্ষত্র এবং সূর্য ও চন্দ্রআমাকে সিজদা করছে’। একথা শুনে পিতা বললেন,ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺑُﻨَﻲَّ ﻻَ ﺗَﻘْﺼُﺺْ ﺭُﺅْﻳَﺎﻙَ ﻋَﻠَﻰ ﺇِﺧْﻮَﺗِﻚَ ﻓَﻴَﻜِﻴْﺪُﻭﺍْ ﻟَﻚَﻛَﻴْﺪﺍً ﺇِﻥَّ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥَ ﻟِﻠْﺈِﻧﺴَﺎﻥِ ﻋَﺪُﻭٌّ ﻣُّﺒِﻴْﻦٌ – ‘বৎস, তোমারভাইদের সামনে এ স্বপ্ন বর্ণনা করো না। তাহ’লেওরা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। নিশ্চয় শয়তানমানুষের প্রকাশ্য শত্রু (ইউসুফ ১২/৪-৫)। ইবনু আববাস(রাঃ) ও ক্বাতাদাহ বলেন, এগারোটি নক্ষত্রের অর্থহচ্ছে ইউসুফ (আঃ)-এর এগারো ভাই এবং সূর্য ওচন্দ্রের অর্থ পিতা ও মাতা বা খালা’।[14] বস্ত্ততঃ এস্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রকাশ পায় যখন মিসরে পিতা-পুত্রের মিলন হয়।উল্লেখ্য যে, স্বপ্ন ব্যাখ্যা করাজ্ঞানের একটি পৃথক শাখা। হযরত ইবরাহীম, ইসহাক্বও ইয়াকূব সকলে এ বিষয়ে পারদর্শীছিলেন।সম্ভবতঃ একারণেই ইয়াকূব (আঃ) নিশ্চিত ধারণাকরেছিলেন যে, বালক ইউসুফ একদিন নবী হবে।হযরত ইউসুফকেও আল্লাহ এ ক্ষমতা দানকরেছিলেন। যেমন আল্লাহ এদিকে ইঙ্গিত দিয়েবলেন, ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻳَﺠْﺘَﺒِﻴْﻚَ ﺭَﺑُّﻚَ ﻭَﻳُﻌَﻠِّﻤُﻚَ ﻣِﻦ ﺗَﺄْﻭِﻳْﻞِﺍﻷَﺣَﺎﺩِﻳْﺚِ ﻭَﻳُﺘِﻢُّ ﻧِﻌْﻤَﺘَﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻭَﻋَﻠَﻰ ﺁﻝِ ﻳَﻌْﻘُﻮْﺏَ ﻛَﻤَﺎ ﺃَﺗَﻤَّﻬَﺎﻋَﻠَﻰ ﺃَﺑَﻮَﻳْﻚَ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞُ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﻭَﺇِﺳْﺤَﺎﻕَ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑَّﻚَ ﻋَﻠِﻴْﻢٌﺣَﻜِﻴْﻢٌ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৬)-‘এমনিভাবে তোমার পালনকর্তাতোমাকে মনোনীত করবেন (নবী হিসাবে)এবং তোমাকে শিক্ষা দিবেন বাণী সমূহের (অর্থাৎস্বপ্নাদিষ্ট বাণী সমূহের) নিগুঢ় তত্ত্ব এবং পূর্ণকরবেন স্বীয় অনুগ্রহ সমূহ (যেমন মিসরেররাজত্ব, সর্বোচ্চ সম্মানও ধন-সম্পদ লাভ এবং পিতারসাথে মিলন প্রভৃতি) তোমার প্রতি ও ইয়াকূব-পরিবারের প্রতি, যেমন তিনি পূর্ণ করেছিলেনইতিপূর্বে তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাক্বেরপ্রতি। নিশ্চয়ই তোমার পালনকর্তা সর্বজ্ঞ ওপ্রজ্ঞাময়’ (ইউসুফ ১২/৬)।উপরোক্ত ৫ ও ৬আয়াতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি ফুটে ওঠে। যেমন,(১) ইয়াকূব (আঃ) ইউসুফের দেখা স্বপ্নকে একটিসত্য স্বপ্ন হিসাবে গণ্য করেছিলেন এবং এটাওউপলব্ধি করেছিলেন যে, ইউসুফ-এর জীবনেএকটি সুন্দর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। সেজন্য তারজীবনেআসতে পারে কঠিন পরীক্ষা সমূহ। (২)ভাল স্বপ্নের কথা এমন লোকের কাছে বলা উচিতনয়, যারা তার হিতাকাংখী নয়। সেজন্যেই ইযাকূব (আঃ)বালক ইউসুফকে তার স্বপ্ন বৃত্তান্ত তার সৎভাইদেরকাছে বলতে নিষেধ করেছিলেন। (৩)ইউসুফকে আল্লাহ তিনটি নে‘মত দানের সুসংবাদদেন। (ক) আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেননবী হিসাবে (খ) তাকে স্বপ্ন বৃত্তান্ত ব্যাখ্যা করারযোগ্যতা দান করবেন (গ) তার প্রতি স্বীয় নে‘মতসমূহ পূর্ণ করবেন। বলা বাহুল্য, এগুলির প্রতিটিইপরবর্তীতে বাস্তবায়িত হয়েছে অত্যন্তসুন্দরভাবে, যা আমরা পরবর্তী কাহিনীতেঅবলোকন করব।এক্ষণে ইউসুফকে উপরোক্ত৬ আয়াতে বর্ণিত অহী আল্লাহ কখন নাযিলকরেছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়না। তবে ১৫ আয়াতের মর্মে বুঝা যায় যে, তাঁকেকূপে নিক্ষেপ করার আগেই উপরোক্ত অহীরমাধ্যমে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়। এটি নবুঅতের‘অহিয়ে কালাম’ ছিল না। বরং এটি ছিল মূসার মায়ের কাছেঅহী করার ন্যায় ‘অহিয়ে ইলহাম’। কেননা নবুঅতের‘অহি’ সাধারণতঃ চল্লিশ বছর বয়সে হয়েথাকে।ভাইদের হিংসার শিকার হলেন :এটা একটা স্বভাবগতরীতি যে, বিমাতা ভাইয়েরা সাধারণতঃ পরস্পরেরবিদ্বেষী হয়ে থাকে। সম্ভবতঃ এই বিদ্বেষযাতে মাথাচাড়া না দেয়, সেকারণ ইয়াকূব (আঃ) একইশ্বশুরের পরপর তিন মেয়েকে বিয়েকরেছিলেন। এরপরেও শ্বশুর ছিলেন আপন মামু।পরস্পরে রক্ত সম্পর্কীয় এবং ঘনিষ্ঠ নিকটাত্মীয়হওয়া সত্ত্বেও এবং নবী পরিবারের সার্বক্ষণিকদ্বীনী পরিবেশ ও নৈতিক প্রশিক্ষণ থাকাসত্ত্বেও বৈমাত্রেয় হিংসার কবল থেকে ইয়াকূব(আঃ)-এর দ্বিতীয় পক্ষেরসন্তানেরা রক্ষা পায়নি।তাই বলা চলে যে, ইউসুফের প্রতি তার সৎভাইদেরহিংসার প্রথম কারণ ছিলবৈমাত্রেয় বিদ্বেষ। দ্বিতীয়কারণ ছিল- সদ্য মাতৃহীন শিশু হওয়ার কারণে তাদেরদু’ভাইয়ের প্রতি পিতার স্বভাবগত স্নেহের আধিক্য।তৃতীয় কারণ ছিল, ইউসুফের অতুলনীয় রূপ-লাবণ্য,অনিন্দ্যসুন্দর দেহসৌষ্ঠব, আকর্ষণীয় ব্যবহার-মাধুর্য এবং অনন্য সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। চতুর্থইউসুফের স্বপ্নবৃত্তান্তের কথা যেকোন ভাবেইহৌক তাদের কানে পৌঁছে যাওয়া। বলা চলে যে,শেষোক্ত কারণটিই তাদের হিংসার আগুনে ঘৃতাহুতিদেয় এবং তাকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়েদেওয়ার শয়তানী চক্রান্তে তারা প্ররোচিত হয়।কিন্তু শয়তান যতই চক্রান্ত করুক, আল্লাহ বলেন, ﺇِﻥَّﻛَﻴْﺪَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﻛَﺎﻥَ ﺿَﻌِﻴْﻔًﺎ – ‘শয়তানের চক্রান্ত সর্বদাইদুর্বল হয়ে থাকে’ (নিসা৪/৭৬)। ইউসুফের মধ্যেভবিষ্যৎ নবুঅত লুকিয়ে আছে বুঝতে পেরেইইয়াকূব (আঃ) তার প্রতি অধিক স্নেহশীল ছিলেন।আর সেকারণে সৎ ভাইয়েরাও ছিল অধিক হিংসাপরায়ণ।বস্ত্ততঃ এই হিংসাত্মক আচরণের মধ্যেই লুকিয়েছিল ইউসুফের ভবিষ্যৎ উন্নতির সোপান।ইউসুফঅন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হ’লেন:দশ জন বিমাতা ভাই মিলেইউসুফকে হত্যার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্যতাকে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতারণারআশ্রয় নিল। তারা একদিন পিতা ইয়াকূব (আঃ)-এর কাছেএসে ইউসুফকে সাথে নিয়ে পার্শ্ববর্তীজঙ্গলে আনন্দ ভ্রমণে যাবার প্রস্তাব করল। তারাপিতাকে বলল যে, ‘আপনি তাকে আগামীকালআমাদের সাথে প্রেরণ করুন। সে আমাদেরসঙ্গে যাবে, তৃপ্তিসহ খাবে আর খেলাধূলাকরবেএবং আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করব’।জবাবে পিতা বললেন, আমার ভয় হয় যে, তোমরাতাকে নিয়ে যাবে, আর কোন এক অসতর্কমুহূর্তে তাকে বাঘে খেয়ে ফেলবে’। ‘তারাবলল, আমরা এতগুলো ভাই থাকতে তাকে বাঘেখেয়ে ফেলবে, তাহ’লে তো আমাদের সবইশেষ হয়ে যাবে’ (ইউসুফ ১২/১২-১৪)। উল্লেখ্যযে, কেন‘আন অঞ্চলে সে সময়ে বাঘেরপ্রাদুর্ভাব ছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস(রাঃ)প্রমুখাত বর্ণিত হয়েছে যে, ইয়াকূব (আঃ)পূর্বরাতে স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, তিনি পাহাড়েরউপরে আছেন। নীচে পাহাড়ের পাদদেশেইউসুফ খেলা করছে। হঠাৎ দশটি বাঘ এসে তাকেঘেরাও করে ফেলে এবং আক্রমণ করতে উদ্যতহয়। কিন্তু তাদের মধ্যকার একটি বাঘ এসে তাকেমুক্ত করে দেয়। অতঃপর ইউসুফ মাটির ভিতরেলুকিয়ে যায়’। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন যে, উক্তস্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইয়াকূব (আঃ) তার দশপুত্রকেই দশ ব্যাঘ্র গণ্য করেছিলেন। কিন্তুতাদের কাছে রূপকভাবে সেটা পেশ করেন।যাতে তারা বুঝতে না পারে (কুরতুবী)।যাইহোকছেলেদের পীড়াপীড়িতে অবশেষে তিনিরাযী হলেন। কিন্তু তাদের কাছ থেকেঅঙ্গীকার নিলেন যাতে তারা ইউসুফকে কোনরূপকষ্ট না দেয় এবং তার প্রতি সর্বদা খেয়াল রাখে।অতঃপর তিনি জ্যেষ্ঠ পুত্র ইয়াহুদা বা রুবীল-এর হাতেইউসুফকে সোপর্দ করলেন এবং বললেন, তুমিইএর খাওয়া-দাওয়া ও অন্যান্য সকল ব্যাপারে দেখাশুনাকরবে। কিন্তু জঙ্গলে পৌঁছেই শয়তানী চক্রান্তবাস্তবায়নের জন্য তারা তৎপর হয়ে উঠলো। তারাইউসুফকে হত্যা করার জন্য প্রস্ত্তত হ’ল। তখন বড়ভাই ইয়াহুদা তাদের বাধা দিল এবং পিতার নিকটে তাদেরঅঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিল। কিন্তু শয়তানতাদেরকে আরও বেশী যেদী করে তুলল।অবশেষে বড় ভাই একা পেরে না উঠে প্রস্তাবকরল, বেশ তবে ওকে হত্যা না করে বরং ঐদূরের একটা পরিত্যক্ত কূয়ায় ফেলে দাও। যাতেকোন পথিক এসে ওকেউঠিয়ে নিয়ে যায়। তাতেতোমাদের দু’টো লাভ হবে। এক- সে পিতার কাছথেকে দূরে চলে যাবে ও তোমরা তখন পিতারনিকটবর্তী হবে।দুই- নিরপরাধ বালককে হত্যা করারপাপ থেকে তোমরা বেঁচে যাবে।ভাইদের এইচক্রান্তের কথা আল্লাহ ব্যক্ত করেছেননিম্নোক্তভাবে- ﻟَﻘَﺪْ ﻛَﺎﻥَ ﻓِﻲْ ﻳُﻮﺳُﻒَ ﻭَﺇِﺧْﻮَﺗِﻪِ ﺁﻳَﺎﺕٌﻟِّﻠﺴَّﺎﺋِﻠِﻴْﻦَ، ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻟُﻮﺍْ ﻟَﻴُﻮْﺳُﻒُ ﻭَﺃَﺧُﻮْﻩُ ﺃَﺣَﺐُّ ﺇِﻟَﻰ ﺃَﺑِﻴْﻨَﺎ ﻣِﻨَّﺎﻭَﻧَﺤْﻦُ ﻋُﺼْﺒَﺔٌ ﺇِﻥَّ ﺃَﺑَﺎﻧَﺎ ﻟَﻔِﻲْ ﺿَﻼَﻝٍ ﻣُّﺒِﻴْﻦٍ، ﺍﻗْﺘُﻠُﻮﺍْ ﻳُﻮﺳُﻒَ ﺃَﻭِﺍﻃْﺮَﺣُﻮْﻩُ ﺃَﺭْﺿﺎً ﻳَﺨْﻞُ ﻟَﻜُﻢْ ﻭَﺟْﻪُ ﺃَﺑِﻴﻜُﻢْ ﻭَﺗَﻜُﻮْﻧُﻮﺍْ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪِﻩِﻗَﻮْﻣﺎً ﺻَﺎﻟِﺤِﻴْﻦَ، ﻗَﺎﻝَ ﻗَﺂﺋِﻞٌ ﻣَّﻨْﻬُﻢْ ﻻَ ﺗَﻘْﺘُﻠُﻮﺍْ ﻳُﻮْﺳُﻒَ ﻭَﺃَﻟْﻘُﻮْﻩُﻓِﻲ ﻏَﻴَﺎﺑَﺔِ ﺍﻟْﺠُﺐِّ ﻳَﻠْﺘَﻘِﻄْﻪُ ﺑَﻌْﺾُ ﺍﻟﺴَّﻴَّﺎﺭَﺓِ ﺇِﻥْ ﻛُﻨﺘُﻢْﻓَﺎﻋِﻠِﻴْﻦَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৭-১০)-‘নিশ্চয়ই ইউসুফ ও তার ভাইদেরকাহিনীতে জিজ্ঞাসুদের জন্য রয়েছেনিদর্শনাবলী’ (৭)। ‘যখন তারা বলল, অবশ্যই ইউসুফ ওতার ভাই আমাদের পিতার কাছে আমাদের চাইতেঅধিক প্রিয়। অথচ আমরা একটা ঐক্যবদ্ধ শক্তিবিশেষ। নিশ্চয়ই আমাদের পিতা স্পষ্ট ভ্রান্তিতেরয়েছেন’ (৮)। ‘তোমরা ইউসুফকে হত্যা করঅথবা তাকে কোথাও ফেলে আস। এতে শুধুতোমাদের প্রতিই তোমাদের পিতার মনোযোগনিবিষ্ট হবে এবং এরপর তোমরাই (পিতার নিকটে)যোগ্য বিবেচিত হয়ে থাকবে’ (৯)। ‘তখন তাদেরমধ্যেকার একজন (বড় ভাই) বলে উঠল, তোমরাইউসুফকে হত্যা করো না, বরং ফেলে দাও তাকেঅন্ধকূপে, যাতে কোন পথিক তাকে উঠিয়েনিয়ে যায়, যদি একান্তই তোমাদের কিছু করতেহয়’ (ইউসুফ ১২/৭-১০)।বড় ভাইয়ের কথায় সবাই একমতহয়ে ইউসুফকে কূয়ার ধারে নিয়েগেল। এ সময়তারা তার গায়ের জামা খুলে নিল। নিঃসন্দেহে ধরেনেওয়া যায় যে, এ সময় ৬/৭ বছরেরকচি বালকইউসুফ তার ভাইদের কাছে নিশ্চয়ই কান্নাকাটি করেপ্রাণভিক্ষা চেয়েছিল। কিন্তু শয়তান তাদেরকে হিংসায়উন্মত্ত করে দিয়েছিল। এই কঠিন মুহূর্তেইউসুফকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আল্লাহ তারনিকটে অহী নাযিল করেন। নিঃসন্দেহেএটিনবুঅতের অহী ছিল না। কেননা সাধারণতঃ চল্লিশবছর বয়স হওয়ার পূর্বে আল্লাহ কাউকেনবীকরেন না। এ অহী ছিল সেইরূপ, যেরূপঅহী বা ইলহাম এসেছিল শিশু মূসার মায়ের কাছেমূসাকে বাক্সে ভরে নদীতে ভাসিয়েদেবারজন্য (ত্বোয়াহা ২০/৩৮-৩৯)।এসময়কার মর্মন্তুদ অবস্থা আল্লাহ বর্ণনা করেনএভাবে, ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺫَﻫَﺒُﻮْﺍ ﺑِﻪِ ﻭَﺃَﺟْﻤَﻌُﻮْﺍ ﺃَﻥ ﻳَﺠْﻌَﻠُﻮْﻩُ ﻓِﻲْ ﻏَﻴَﺎﺑَﺔِﺍﻟْﺠُﺐِّ ﻭَﺃَﻭْﺣَﻴْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﻟَﺘُﻨَﺒِّﺌَﻨَّﻬُﻢ ﺑِﺄَﻣْﺮِﻫِﻢْ ﻫَـﺬَﺍ ﻭَﻫُﻢْ ﻻَﻳَﺸْﻌُﺮُﻭْﻥَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ১৫)-‘যখন তারা তাকে নিয়ে চললএবং অন্ধকূপে নিক্ষেপ করতে একমত হ’ল,এমতাবস্থায় আমি তাকে (ইউসুফকে) অহী (ইলহাম)করলাম যে, (এমন একটা দিন আসবে, যখন) অবশ্যইতুমি তাদেরকে তাদের এ কুকর্মের কথা অবহিতকরবে। অথচ তারা তোমাকে চিনতে পারবেনা’ (ইউসুফ ১২/১৫)।ইমাম কুরতুবী বলেন যে,কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পূর্বেই অথবা পরেইউসুফকে সান্ত্বনা ও মুক্তির সুসংবাদ দিয়ে এ অহীনাযিল হয়েছিল। ইউসুফকে তার ভাইয়েরা কূপেনিক্ষেপ করল। সেখানেও আল্লাহ তাকে সাহায্যকরলেন। তিনি কূয়ার নীচে একখন্ডপাথরেরউপরে স্বচ্ছন্দে বসে পড়লেন। বড় ভাই ইয়াহুদাগোপনেতার জন্য দৈনিক একটা পাত্রের মাধ্যমেউপর থেকে খাদ্য ও পানীয় নামিয়ে দিত এবং দূরথেকে সর্বক্ষণ তদারকি করত।পিতার নিকটেভাইদের কৈফিয়ত :ইউসুফকে অন্ধকূপে ফেলেদিয়ে একটা ছাগলছানা যবেহ করে তার রক্তইউসুফের পরিত্যক্ত জামায় মাখিয়ে তারা সন্ধ্যায়বাড়ী ফিরল এবং কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে হাযিরহয়ে ইউসুফকে বাঘে নিয়ে গেছে বলেকৈফিয়ত পেশ করল। প্রমাণ স্বরূপ তারা ইউসুফেররক্ত মাখা জামা পেশ করল। হতভাগারা এটা বুঝেনি যে,বাঘে নিয়ে গেলে জামাটা খুলে রেখে যায় না।আর খুললেও বাঘের নখের অাঁচড়ে জামা ছিন্নভিন্নহয়ে যাবার কথা। তাছাড়া যে পিতার কাছে তারা মিথ্যাকৈফিয়তপেশ করছে, তিনি একজন নবী। অহীরমাধ্যমে তিনি সবই জানতে পারবেন।কিন্তু হিংসায় অন্ধহয়ে গেলে মানুষ সবকিছু ভুলে যায়।ইউসুফেরভাইদের দেওয়া কৈফিয়ত ও পিতার প্রতিক্রিয়া আল্লাহবর্ণনা করেন নিম্নোক্ত রূপে, ﻭَﺟَﺎﺅُﻭْﺍ ﺃَﺑَﺎﻫُﻢْ ﻋِﺸَﺎﺀًﻳَّﺒْﻜُﻮْﻥَ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻳَﺎ ﺃَﺑَﺎﻧَﺎ ﺇِﻧَّﺎ ﺫَﻫَﺒْﻨَﺎ ﻧَﺴْﺘَﺒِﻖُ ﻭَﺗَﺮَﻛْﻨَﺎ ﻳُﻮْﺳُﻒَ ﻋِﻨْﺪَﻣَﺘَﺎﻋِﻨَﺎ ﻓَﺄَﻛَﻠَﻪُ ﺍﻟﺬِّﺋْﺐُ ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻧْﺖَ ﺑِﻤُﺆْﻣِﻦٍ ﻟَّﻨَﺎ ﻭَﻟَﻮْ ﻛُﻨَّﺎﺻَﺎﺩِﻗِﻴْﻦَ، ﻭَﺟَﺂﺅُﻭْﺍ ﻋَﻠَﻰ ﻗَﻤِﻴْﺼِﻪِ ﺑِﺪَﻡٍ ﻛَﺬِﺏٍ ﻗَﺎﻝَ ﺑَﻞْ ﺳَﻮَّﻟَﺖْﻟَﻜُﻢْ ﺃَﻧﻔُﺴُﻜُﻢْ ﺃَﻣْﺮﺍً ﻓَﺼَﺒْﺮٌ ﺟَﻤِﻴﻞٌ ﻭَﺍﻟﻠﻪُ ﺍﻟْﻤُﺴْﺘَﻌَﺎﻥُ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﺎﺗَﺼِﻔُﻮْﻥَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ১৬-১৮)-‘তারা (ভাইয়েরা) রাতেরবেলায় কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে এল’। ‘এবং বলল,হে পিতা! আমরা দৌড় প্রতিযোগিতা করছিলাম এবংইউসুফকে আসবাবপত্রের কাছে বসিয়েরেখেছিলাম। এমতাবস্থায় তাকে বাঘে খেয়েফেলেছে। আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাসকরবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী’। ‘এ সময় তারা তারমিথ্যা রক্ত মাখানো জামা হাযির করল। (এটা দেখেঅবিশ্বাস করে ইয়াকূব বললেন, কখনোই নয়) বরংতোমাদের মন তোমাদের জন্য একটা কথা তৈরীকরে দিয়েছে। (এখন আর করার কিছুই নেই),অতএব ‘ছবর করাই শ্রেয়। তোমরা যা কিছু বললেতাতে আল্লাহই আমার একমাত্র সাহায্যস্থল’ (ইউসুফ১২/১৬-১৮)।কাফেলার হাতে ইউসুফ :সিরিয়া থেকেমিসরে যাওয়ার পথেএকটি ব্যবসায়ী কাফেলা পথভুলে জঙ্গলের মধ্যে উক্ত পরিত্যক্ত কূয়ারনিকটে এসে তাঁবু ফেলে।[15] তারা পানির সন্ধানেতাতে বালতি নিক্ষেপ করল। কিন্তুবালতিতে উঠেএল তরতাযা সুন্দর একটি বালক ‘ইউসুফ’। সাধারণদৃষ্টিতে এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হ’লেওসবকিছুই ছিল আল্লাহর পূর্ব পরিকল্পিত এবং পরস্পরসংযুক্ত অটুট ব্যবস্থাপনারই অংশ। ইউসুফকে উদ্ধারকরার জন্যই আল্লাহ উক্ত কাফেলাকে পথ ভুলিয়েএখানে এনেছেন। তাঁর গোপন রহস্য বুঝবারসাধ্যবান্দার নেই। আবুবকর ইবনুআইয়াশ বলেন, ইউসুফকূয়াতে তিনদিন ছিলেন।[16] কিন্তু আহলে কিতাবগণবলেন, সকালে নিক্ষেপের পর সন্ধ্যার আগেইব্যবসায়ী কাফেলা তাকে তুলে নেয়।[17] আল্লাহসর্বাধিক অবগত।কাফেলার মধ্যকার জনৈক ব্যক্তিরনিক্ষিপ্ত বালতিতে ইউসুফ উপরে উঠে আসেন।অনিন্দ্য সুন্দর বালকদেখে সে আনন্দে আত্মহারাহয়ে বলে উঠলো ‘কি আনন্দের কথা। এ যেএকটি বালক!’ এরপর তারা তাকে মালিকবিহীনপণ্যদ্রব্য মনে করে লুকিয়ে ফেলল। কেননাসেযুগে মানুষ কেনাবেচা হ’ত। কিন্তু তারা গোপনকরতে পারল না। কারণ ইতিমধ্যে ইউসুফের বড় ভাইএসে কূয়ায় তাকে না পেয়ে অনতিদূরেকাফেলারখোঁজ পেয়ে গেল। তখন সে কাফেলার কাছেগিয়ে বলল, ছেলেটি আমাদের পলাতক গোলাম।তোমরা ওকে আমাদের কাছ থেকে খরিদ করেনিতে পার’। কাফেলা ভাবল খরিদ করে না নিলেচোর সাব্যস্ত হয়ে যেতে পারি। অতএব তারা দশভাইকে হাতে গণা কয়েকটি দিরহাম দিয়ে নিতান্ত সস্তামূল্যে ইউসুফকে খরিদ করে নিল। এর দ্বারাইউসুফের ভাইদের দু’টি উদ্দেশ্য ছিল। এক- যাতেইউসুফ তার বাপ-ভাইদের নাম করে পুনরায় বাড়ীফিরে আসার সুযোগ না পায়। দুই- যাতে ইউসুফদেশান্তরী হয়ে যায় ও অন্যের ক্রীতদাস হয়েজীবন অতিবাহিত করে এবং কখনোই দেশেফিরতে না পারে। এই সময়কার দৃশ্য কল্পনা করতেওগা শিউরে ওঠে। নিজের ভাইয়েরা ইউসুফকেপরদেশী কাফেলার হাতে তাদের পলাতক গোলামহিসাবে বিক্রি করে দিচ্ছে। নবীপুত্র ইউসুফেরমনের অবস্থা ঐ সময় কেমন হচ্ছিল। কল্পনা করা যায়কি? বালক ইউসুফ ঐ সময় বাড়ী যাওয়ার জন্য কান্নাকাটিকরাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তেমন কোনকথাকুরআনে বর্ণিত হয়নি। তাতে মনে হয়,বিক্রয়ের ঘটনাটি তার অগোচরে ঘটেছিল।ভাইদের সাথে পুনরায় দেখা হয়নি (আল্লাহ সর্বাধিকঅবগত)। ইউসুফকে কূয়া থেকে উদ্ধার ও পরেপলাতক গোলাম হিসাবে স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করেদেবার ঘটনা আল্লাহর ভাষায় নিম্নরূপ- ﻭَﺟَﺂﺀَﺕْ ﺳَﻴَّﺎﺭَﺓٌﻓَﺄَﺭْﺳَﻠُﻮﺍْ ﻭَﺍﺭِﺩَﻫُﻢْ ﻓَﺄَﺩْﻟَﻯﺪَﻟْﻮَﻩُ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺑُﺸْﺮَﻯ ﻫَـﺬَﺍ ﻏُﻼَﻡٌﻭَﺃَﺳَﺮُّﻭْﻩُ ﺑِﻀَﺎﻋَﺔً ﻭَﺍﻟﻠﻪ ُ ﻋَﻠِﻴْﻢٌ ﺑِﻤَﺎ ﻳَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ- ﻭَﺷَﺮَﻭْﻩُ ﺑِﺜَﻤَﻦٍﺑَﺨْﺲٍ ﺩَﺭَﺍﻫِﻢَ ﻣَﻌْﺪُﻭْﺩَﺓٍ ﻭَﻛَﺎﻧُﻮﺍْ ﻓِﻴْﻪِ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺰَّﺍﻫِﺪِﻳْﻦَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ১৯-২০)-‘অতঃপর একটা কাফেলা এল এবং তারা তাদেরপানি সংগ্রহকারীকে পাঠালো। সে বালতি নিক্ষেপকরল। (বালতিতে ইউসুফের উঠে আসা দেখেসে খুশীতে বলে উঠল) কি আনন্দের কথা!এযে একটি বালক! অতঃপর তারা তাকে পণ্যদ্রব্য গণ্যকরে গোপন করে ফেলল। আল্লাহ ভালইজানেন, যাকিছু তারা করেছিল’। ‘অতঃপর ওরা(ইউসুফের ভাইয়েরা) তাকে কম মূল্যে বিক্রয়করে দিল হাতে গণা কয়েকটি দিরহামের (রৌপ্যমুদ্রার)বিনিময়ে এবং তারা তার (অর্থাৎ ইউসুফের) ব্যাপারেনিরাসক্ত ছিল’ (ইউসুফ ১২/১৯-২০)। মূলতঃ ইউসুফকেদূরে সরিয়ে দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য ছিল।ইউসুফমিসরের অর্থমন্ত্রীর গৃহে :অন্ধকূপ থেকেউদ্ধার পাওয়ার পরব্যবসায়ী কাফেলা তাকে বিক্রিরজন্য মিসরের বাজারে উপস্থিত করল। মানুষ কেনা-বেচার সেই হাটে এই অনিন্দ্য সুন্দর বালককেদেখেবড় বড় ধনশালী খরিদ্দাররা রীতিমতপ্রতিযোগিতা শুরু করল। কিন্তু আল্লাহ পাক তাকেমর্যাদার স্থানে সমুন্নত করতে চেয়েছিলেন। তাইসব খরিদ্দারকে ডিঙিয়ে মিসরের তৎকালীন অর্থ ওরাজস্বমন্ত্রী ক্বিৎফীর ( ﻗﻄﻔﻴﺮ) তাকে বহুমূল্যদিয়ে খরিদ করে নিলেন। ক্বিৎফীর ছিলেননিঃসন্তান।মিসরের অর্থমন্ত্রীর উপাধি ছিল ‘আযীয’বা ‘আযীয মিছর’। ইউসুফকে ক্রয় করে এনে তিনিতাকে স্বীয় স্ত্রীর হাতে সমর্পণ করলেন এবংবললেন, একে সন্তানের ন্যায় উত্তম রূপে লালন-পালন কর। এর থাকার জন্য উত্তম ব্যবস্থা কর।ভবিষ্যতে সে আমাদের কল্যাণে আসবে’।বস্ত্ততঃ ইউসুফের কমনীয়চেহারা ও নম্র-ভদ্রব্যবহারে তাদের মধ্যে সন্তানের মমতাজেগেওঠে। ক্বিৎফীর তার দূরদর্শিতার মাধ্যমেইউসুফের মধ্যে ভবিষ্যতের অশেষ কল্যাণদেখতে পেয়েছিলেন। আর সেজন্য তাকেসর্বোত্তম যত্ন সহকারে রাখার ব্যবস্থাকরেছিলেন। মূলতঃ এসবই ছিল আল্লাহর পূর্ব-নির্ধারিত। এবিষয়ে কুরআনী বক্তব্য নিম্নরূপঃ ﻭَﻗَﺎﻝَﺍﻟَّﺬِﻱ ﺍﺷْﺘَﺮَﺍﻩُ ﻣِﻦ ﻣِّﺼْﺮَ ﻻِﻣْﺮَﺃَﺗِﻪِ ﺃَﻛْﺮِﻣِﻲْ ﻣَﺜْﻮَﺍﻩُ ﻋَﺴَﻰ ﺃَﻥﻳَّﻨْﻔَﻌَﻨَﺎ ﺃَﻭْ ﻧَﺘَّﺨِﺬَﻩُ ﻭَﻟَﺪﺍً ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻣَﻜَّﻨِّﺎ ﻟِﻴُﻮْﺳُﻒَ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِﻭَﻟِﻨُﻌَﻠِّﻤَﻪُ ﻣِﻦْ ﺗَﺄْﻭِﻳْﻞِ ﺍﻷَﺣَﺎﺩِﻳْﺚِ ﻭَﺍﻟﻠﻪُ ﻏَﺎﻟِﺐٌ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﻣْﺮِﻩِﻭَﻟَـﻜِﻨَّﺄَﻛْﺜَﺮَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﻻَ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ২১)-‘মিসরে যেব্যক্তি তাকে ক্রয় করল, সে তার স্ত্রীকে বলল,একে সম্মানজনকভাবে থাকার ব্যবস্থা কর। সম্ভবতঃসে আমাদের কল্যাণে আসবে অথবা আমরা তাকেপুত্ররূপে গ্রহণ করে নেব। এভাবে আমরাইউসুফকে সেদেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম এবংএজন্যে যে তাকে আমরা বাক্যাদির পূর্ণ মর্মঅনুধাবনের পদ্ধতি বিষয়ে শিক্ষা দেই। আল্লাহস্বীয় কর্মে সর্বদা বিজয়ী। কিন্তু অধিকাংশ লোকতা জানে না’ (ইউসুফ ১২/২১)।আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ(রাঃ) বলেন, দুনিয়াতে তিন ব্যক্তি ছিলেন সর্বাধিকসূক্ষ্ম দৃষ্টি সম্পন্ন ( ﺃﻓﺮﺱ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﺛﻼﺛﺔ )। একজনহ’লেন ‘আযীযে মিছর’ (যিনি ইউসুফের চেহারাদেখেই তাঁকে চিনেছিলেন)। দ্বিতীয়শো‘আয়েব (আঃ)-এর ঐ কন্যা, যে মূসা (আঃ)সম্পর্কে স্বীয় পিতাকে বলেছিল,হে পিতা! আপনিএঁকে আপনার কর্মসহযোগী হিসাবে রেখেদিন। কেননা উত্তম সহযোগী সেই-ই, যেশক্তিশালী ও বিশ্বস্ত হয়’ (ক্বাছাছ ২৮/২৬)। তৃতীয়হযরত আবুবকর ছিদ্দীক্ব, যিনি ওমর ফারূককেপরবর্তী খলীফা নিয়োগ করেছিলেন’।[18]ইউসুফ যৌবনে পদার্পণ করলেনআযীযেমিছরের গৃহে কয়েক বছর পুত্র স্নেহে লালিতপালিত হয়ে ইউসুফ অতঃপর যৌবনে পদার্পণ করলেন।আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟَﻤَّﺎ ﺑَﻠَﻎَ ﺃَﺷُﺪَّﻩُ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻩُ ﺣُﻜْﻤﺎً ﻭَّﻋِﻠْﻤﺎًﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْﻦَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ২২)-‘অতঃপর যখনসে পূর্ণ যৌবনে পৌঁছে গেল, তখন আমরা তাকেপ্রজ্ঞা ও ব্যুৎপত্তি দান করলাম। আমরা এভাবেইসৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি’ (ইউসুফ১২/২২)।উক্ত আয়াতে দু’টি বিষয় বর্ণিত হয়েছে।পূর্ণ যৌবন প্রাপ্তি এবং প্রজ্ঞা ও ব্যুৎপত্তি লাভ করা।সকলে এ বিষয়ে একমত যে, প্রজ্ঞা ও ব্যুৎপত্তিলাভের অর্থ হ’ল নবুঅত লাভ করা। আর সেটাসাধারণতঃ চল্লিশ বছর বয়সে হয়েথাকে। অন্যদিকেপূর্ণ যৌবন লাভ তার পূর্বেই হয়। যা বিশ বছর থেকেত্রিশ বা তেত্রিশের মধ্যে হয়ে থাকে। হযরতইবনু আববাস, মুজাহিদ, ক্বাতাদাহ প্রমুখ বিদ্বান তেত্রিশবছর বলেছেন এবংযাহহাক বিশ বছর বলেছেন।যাহহাক সম্ভবতঃ প্রথম যৌবন এবং ইবনু আববাস পূর্ণযৌবনের কথা বলেছেন।এক্ষণে ইউসুফের প্রতিযুলায়খার আসক্তির ঘটনা নবুঅত লাভের পূর্বের নাপরের, এ বিষয়েবিদ্বানগণ একমত নন। আমাদেরপ্রবল ধারণা এই যে, যদিও যৌবন ও নবুঅতের কথাএকই আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। তথাপি ঘটনা একইসময়ের নয়। নবুঅত তিনি চল্লিশ বছর বয়সেইপেয়েছেন ধরে নিলে যুলায়খার ঘটনা অবশ্যই তারপূর্বে তার পূর্ণ যৌবনেই ঘটেছে।কারণ ঐ সময়ইউসুফের রূপ-লাবণ্য নিশ্চয়ই শৈশবের ও প্রৌঢ়বয়সের চাইতে বেশী ছিল, যা যুলায়খার ধৈর্যচ্যুতিঘটায়। অথচ ইউসুফের চরিত্রের কোন পরিবর্তনঘটেনি। কেননা নবীগণ ছোটবেলা থেকেইপাপ হ’তে পবিত্র থাকেন।যৌবনের মহা পরীক্ষায়ইউসুফ :রূপ-লাবণ্যে ভরা ইউসুফের প্রতিমন্ত্রীপত্নী যুলায়খার অন্যায় আকর্ষণ জেগেউঠলো। সে ইউসুফকে খারাব ইঙ্গিত দিতে লাগল।এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ﻭَﺭَﺍﻭَﺩَﺗْﻪُ ﺍﻟَّﺘِﻲْ ﻫُﻮَ ﻓِﻲْ ﺑَﻴْﺘِﻬَﺎﻋَﻦ ﻧَّﻔْﺴِﻪِ ﻭَﻏَﻠَّﻘَﺖِ ﺍﻷَﺑْﻮَﺍﺏَ ﻭَﻗَﺎﻟَﺖْ ﻫَﻴْﺖَ ﻟَﻚَ ﻗَﺎﻝَ ﻣَﻌَﺎﺫَﺍﻟﻠﻪِ ﺇِﻧَّﻪُ ﺭَﺑِّﻲ ﺃَﺣْﺴَﻦَ ﻣَﺜْﻮَﺍﻱَ ﺇِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳُﻔْﻠِﺢُ ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤُﻮْﻥَ- ﻭَﻟَﻘَﺪْﻫَﻤَّﺖْ ﺑِﻪِ ﻭَﻫَﻢَّ ﺑِﻬَﺎ ﻟَﻮْﻻ ﺃَﻥ ﺭَّﺃَﻯ ﺑُﺮْﻫَﺎﻥَ ﺭَﺑِّﻪِ ﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻟِﻨَﺼْﺮِﻑَﻋَﻨْﻪُ ﺍﻟﺴُّﻮﺀَ ﻭَﺍﻟْﻔَﺤْﺸَﺎﺀَ ﺇِﻧَّﻪُ ﻣِﻦْ ﻋِﺒَﺎﺩِﻧَﺎ ﺍﻟْﻤُﺨْﻠَﺼِﻴْﻦَ – ﻭَﺍﺳْﺘَﺒَﻘَﺎﺍﻟْﺒَﺎﺏَ ﻭَﻗَﺪَّﺕْ ﻗَﻤِﻴﺼَﻪُ ﻣِﻦ ﺩُﺑُﺮٍ ﻭَﺃَﻟْﻔَﻴَﺎ ﺳَﻴِّﺪَﻫَﺎ ﻟَﺪَﻯ ﺍﻟْﺒَﺎﺏِﻗَﺎﻟَﺖْ ﻣَﺎ ﺟَﺰَﺍﺀُ ﻣَﻦْ ﺃَﺭَﺍﺩَ ﺑِﺄَﻫْﻠِﻜَﺴُﻮْﺀﺍً ﺇِﻻَّ ﺃَﻥ ﻳُّﺴْﺠَﻦَ ﺃَﻭْﻋَﺬَﺍﺏٌ ﺃَﻟِﻴﻢٌ – ﻗَﺎﻝَ ﻫِﻲَ ﺭَﺍﻭَﺩَﺗْﻨِﻲ ﻋَﻦ ﻧَّﻔْﺴِﻲ ﻭَﺷَﻬِﺪَ ﺷَﺎﻫِﺪٌﻣِّﻦْ ﺃَﻫْﻠِﻬَﺎ ﺇِﻥْ ﻛَﺎﻥَ ﻗَﻤِﻴْﺼُﻪُ ﻗُﺪَّ ﻣِﻦ ﻗُﺒُﻞٍ ﻓَﺼَﺪَﻗَﺖْ ﻭَﻫُﻮَ ﻣِﻦَﺍﻟﻜَﺎﺫِﺑِﻴْﻦَ – ﻭَﺇِﻥْ ﻛَﺎﻥَ ﻗَﻤِﻴْﺼُﻪُ ﻗُﺪَّ ﻣِﻦ ﺩُﺑُﺮٍ ﻓَﻜَﺬَﺑَﺖْ ﻭَﻫُﻮَ ﻣِﻦَﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴْﻦَ – ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺭَﺃَﻯ ﻗَﻤِﻴْﺼَﻪُ ﻗُﺪَّ ﻣِﻦ ﺩُﺑُﺮٍ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻧَّﻪُ ﻣِﻦْﻛَﻴْﺪِﻛُﻦَّ ﺇِﻥَّ ﻛَﻴْﺪَﻛُﻦَّ ﻋَﻈِﻴْﻢٌ- ﻳُﻮﺳُﻒُ ﺃَﻋْﺮِﺽْ ﻋَﻦْ ﻫَـﺬَﺍﻭَﺍﺳْﺘَﻐْﻔِﺮِﻱْ ﻟِﺬَﻧْﺒِﻚِ ﺇِﻧَّﻚِ ﻛُﻨْﺖِ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺨَﺎﻃِﺌِﻴْﻦَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ২৩-২৯)-‘আর সে যে মহিলার বাড়ীতে থাকত, ঐমহিলা তাকে ফুসলাতে লাগল এবং (একদিন) দরজা সমূহবন্ধ করে দিয়ে বলল, কাছে এসো! ইউসুফ বলল,আল্লাহ আমাকে রক্ষা করুন! তিনি (অর্থাৎ আপনারস্বামী) আমার মনিব। তিনি আমার উত্তম বসবাসেরব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয়ই সীমা লংঘনকারীগণসফলকাম হয় না’ (২৩)। ‘উক্ত মহিলা তার বিষয়ে কুচিন্তাকরেছিল এবং ইউসুফ তার প্রতি (অনিচ্ছাকৃত) কল্পনাকরেছিল। যদি না সে স্বীয় পালনকর্তার প্রমাণঅবলোকন করত’ (অর্থাৎ আল্লাহ নির্ধারিতউপদেশদাতা ‘নফসে লাউয়ামাহ’ তথা শাণিত বিবেক যদিতাকে কঠোরভাবে বাধা না দিত)। এভাবেই এটাএজন্য হয়েছে যাতে আমরা তার থেকে যাবতীয়মন্দ ও নির্লজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয়ই সেআমাদেরমনোনীত বান্দাগণের একজন’ (২৪)।‘তারা উভয়ে ছুটে দরজার দিকে গেল এবং মহিলাটিইউসুফের জামা পিছন দিক থেকে ছিঁড়ে ফেলল।উভয়ে মহিলার স্বামীকে দরজার মুখে পেল।তখন মহিলাটি তাকে বলল, যে ব্যক্তি তোমারস্ত্রীর সাথে অন্যায় বাসনা করে, তাকে কারাগারেনিক্ষেপ করা অথবা (অন্য কোন) যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিদেওয়া ব্যতীত আর কি সাজা হ’তে পারে’? (২৫)।‘ইউসুফ বলল, সেই-ই আমাকে (তার কুমতলব সিদ্ধকরার জন্য) ফুসলিয়েছে। তখন মহিলার পরিবারেরজনৈক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল যে, যদি ইউসুফের জামাসামনের দিকে ছেঁড়া হয়, তাহ’লে মহিলা সত্য কথাবলেছে এবং ইউসুফ মিথ্যাবাদী’ (২৬)। ‘আর যদি তারজামা পিছন দিক থেকে ছেঁড়া হয়, তবে মহিলা মিথ্যাবলেছে এবংইউসুফ সত্যবাদী’ (২৭)। ‘অতঃপরগৃহস্বামী যখন দেখল যে, ইউসুফের জামা পিছনদিক থেকে ছেঁড়া, তখন সে (স্বীয় স্ত্রীকেউদ্দেশ্য করে) বলল, এটা তোমাদের ছলনা।নিঃসন্দেহে তোমাদের ছলনা খুবই মারাত্মক’ (২৮)।(অতঃপর তিনি ইউসুফকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,)‘ইউসুফ! এ প্রসঙ্গ ছাড়। আর হে মহিলা! এ পাপেরজন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চিতভাবে তুমিইপাপাচারিনী’ (ইউসুফ ১২/২৩-২৯)।মহিলাদেরসমাবেশে ইউসুফ :গৃহস্বামী দু’জনকে নিরস্তকরে ঘটনা চেপে যেতে বললেও ঘটনা চেপেথাকেনি। বরং নানা ডাল-পালা গজিয়ে শহরময় বাষ্ট্র হয়েগেলযে, আযীযের স্ত্রী স্বীয় পুত্রসমগোলামের সাথে অন্যায় কর্মে উদ্যোগীহয়েছিলেন। তখন বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য যুলায়খাশহরের উচ্চশ্রেণীর মহিলাদের নিজ বাড়ীতেভোজসভায় দাওয়াত দেবার মনস্থ করল। এ বিষয়েকুরআনী বর্ণনা নিম্নরূপঃ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻧِﺴْﻮَﺓٌ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻤَﺪِﻳْﻨَﺔِ ﺍﻣْﺮَﺃَﺓُﺍﻟْﻌَﺰِﻳْﺰِ ﺗُﺮَﺍﻭِﺩُ ﻓَﺘَﺎﻫَﺎ ﻋَﻦ ﻧَّﻔْﺴِﻪِ ﻗَﺪْ ﺷَﻐَﻔَﻬَﺎ ﺣُﺒًّﺎ ﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻨَﺮَﺍﻫَﺎﻓِﻲْ ﺿَﻼَﻝٍ ﻣُّﺒِﻴْﻦٍ – ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺳَﻤِﻌَﺖْ ﺑِﻤَﻜْﺮِﻫِﻦَّ ﺃَﺭْﺳَﻠَﺘْﺈِﻟَﻴْﻬِﻦَّﻭَﺃَﻋْﺘَﺪَﺕْ ﻟَﻬُﻦَّ ﻣُﺘَّﻜَﺄً ﻭَﺁﺗَﺖْ ﻛُﻞَّ ﻭَﺍﺣِﺪَﺓٍ ﻣِّﻨْﻬُﻦَّ ﺳِﻜِّﻴْﻨﺎً ﻭَﻗَﺎﻟَﺖِﺍﺧْﺮُﺝْ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻦَّ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺭَﺃَﻳْﻨَﻪُ ﺃَﻛْﺒَﺮْﻧَﻪُ ﻭَﻗَﻄَّﻌْﻦَ ﺃَﻳْﺪِﻳَﻬُﻦَّ ﻭَﻗُﻠْﻦَﺣَﺎﺵَ ِﻟﻠﻪِ ﻣَﺎ ﻫَـﺬَﺍ ﺑَﺸَﺮﺍًﺇِﻥْ ﻫَـﺬَﺍ ﺇِﻻَّ ﻣَﻠَﻚٌ ﻛَﺮِﻳْﻢٌ- ﻗَﺎﻟَﺖْﻓَﺬَﻟِﻜُﻦَّ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻟُﻤْﺘُﻨَّﻨِﻲْ ﻓِﻴْﻪِ ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺭَﺍﻭَﺩﺗُّﻪُ ﻋَﻦ ﻧَّﻔْﺴِﻪِﻓَﺎﺳَﺘَﻌْﺼَﻢَ ﻭَﻟَﺌِﻦ ﻟَّﻢْ ﻳَﻔْﻌَﻞْ ﻣَﺎ ﺁﻣُﺮُﻩُ ﻟَﻴُﺴْﺠَﻨَﻦَّ ﻭَﻟَﻴَﻜُﻮﻧﺎً ﻣِّﻦَﺍﻟﺼَّﺎﻏِﺮِﻳْﻦَ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৩০-৩২)-‘নগরে মহিলারা বলাবলিকরতে লাগল যে, আযীযের স্ত্রী স্বীয়গোলামকে অন্যায় কাজে ফুসলিয়েছে। সে তারপ্রতি আসক্তহয়ে গেছে। আমরা তো তাকেপ্রকাশ্য ভ্রষ্টতার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি’ (৩০)।‘যখন সে (অর্থাৎ যুলায়খা) তাদের চক্রান্তের কথাশুনল, তখন তাদের জন্য একটা ভোজসভারআয়োজন করল এবং (ফল কাটার জন্য) তাদেরপ্রত্যেককে একটা করে চাকু দিল। অতঃপরইউসুফকে বলল, এদের সামনে চলে এস।(সেমতে ইউসুফ সেখানে এল) অতঃপর যখন তারাতাকে স্বচক্ষে দেখল, তখন সবাই হতভম্ব হয়েগেল এবং (ফল কাটতে গিয়ে নিজেদেরঅজান্তে) স্ব স্ব হাত কেটে ফেলল।(ইউসুফেরসৌন্দর্য দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে তারা) বলেউঠল, হায় আল্লাহ! এ তো মানুষ নয়। এ যে মর্যাদাবানফেরেশতা!’ (৩১)। ‘(মহিলাদের এই অবস্থা দেখেউৎসাহিত হয়ে) যুলায়খা বলে উঠল,এই হ’ল সেইযুবক, যার জন্য তোমরা আমাকে ভৎর্সনা করেছ।আমি তাকে প্ররোচিত করেছিলাম। কিন্তু সেনিজেকে সংযত রেখেছে। এক্ষণে আমিতাকেযা আদেশ দেই, তা যদি সে পালন না করে, তাহ’লেসে অবশ্যই কারাগারে নিক্ষিপ্ত হবে এবং সেঅবশ্যই লাঞ্ছিত হবে’ (ইউসুফ ১২/৩০-৩২)।উপরোক্ত আয়াতে যুলায়খার প্রকাশ্য দম্ভোক্তিথেকে বুঝা যায় যে, উপস্থিত মহিলারাও ইউসুফেরপ্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েএবং যুলায়খার কুপ্রস্তাবেরসাথে তারাও ঐক্যমত পোষণ করে। যা ইউসুফেরপ্রার্থনায় বহুবচন ব্যবহার করায় বুঝা যায়। যেমন এইকঠিন পরীক্ষার সময়ে ইউসুফ আল্লাহর আশ্রয়প্রার্থনা করে বলেন, ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺏِّ ﺍﻟﺴِّﺠْﻦُ ﺃَﺣَﺐُّ ﺇِﻟَﻲَّ ﻣِﻤَّﺎﻳَﺪْﻋُﻮْﻧَﻨِﻲْ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﻭَﺇِﻻَّ ﺗَﺼْﺮِﻑْ ﻋَﻨِّﻲْ ﻛَﻴْﺪَﻫُﻦَّ ﺃَﺻْﺐُ ﺇِﻟَﻴْﻬِﻦَّﻭَﺃَﻛُﻦ ﻣِّﻦَ ﺍﻟْﺠَﺎﻫِﻠِﻴْﻦَ – ﻓَﺎﺳْﺘَﺠَﺎﺏَ ﻟَﻪُ ﺭَﺑُّﻪُ ﻓَﺼَﺮَﻓَﻌَﻨْﻪُ ﻛَﻴْﺪَﻫُﻦَّﺇِﻧَّﻪُ ﻫُﻮَ ﺍﻟﺴَّﻤِﻴْﻊُ ﺍﻟْﻌَﻠِﻴْﻢُ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৩৩-৩৪)-‘হে আমারপালনকর্তা! এরা আমাকে যেকাজের দিকে আহবানজানাচ্ছে, তার চাইতে কারাগারই আমার নিকটেঅধিকপসন্দনীয়। (হে আল্লাহ!) যদি তুমি এদেরচক্রান্তকে আমার থেকেফিরিয়ে না নাও, তবেআমি (হয়ত) তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবংআমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’। ‘অতঃপর তারপালনকর্তা তার প্রার্থনা কবুল করলেন ও তাদেরচক্রান্ত প্রতিহত করলেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতাও সর্বজ্ঞ’ (ইউসুফ ১২/৩৩-৩৪)।শহরের সম্ভ্রান্তমহিলাদের নিজ বাড়ীতে জমা করে তাদের সামনেযুলায়খার নিজের লাম্পট্যকে প্রকাশ্যে বর্ণনারমাধ্যমে একথাও অনুমিত হয় যে, সেসময়কারমিসরীয় সমাজে বেহায়াপনা ও ব্যভিচারব্যাপকতর ছিল।নবীগণ নিষ্পাপ মানুষ ছিলেন:ইউসুফের প্রার্থনায় ‘আমি তাদেরপ্রতি আকৃষ্ট হয়েপড়ব’ কথার মধ্যে এ সত্য ফুটে উঠেছে যে,নবীগণ মানুষ ছিলেন এবং মনুষ্যসুলভ স্বাভাবিকপ্রবণতা তাদের মধ্যেও ছিল। তবে আল্লাহরবিশেষ অনুগ্রহ ও ব্যবস্থাধীনে তাঁরা যাবতীয়কবীরা গোনাহ হ’তে মুক্ত থাকেন এবং নিষ্পাপথাকেন।বেগানা নারী ও পুরুষের মাঝে চৌম্বিকআকর্ষণ এটা আল্লাহ সৃষ্ট প্রবণতা, যা অপরিহার্য।ফেরেশতাদের মধ্যে আল্লাহ এই প্রবণতা ওক্ষমতা সৃষ্টি করেননি। তাই তারা এসব থেকেস্বাভাবিকভাবেই মুক্ত।রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হাদীছেকুদসীতে বলেন, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয়ফেরেশতামন্ডলীকে বলেন, আমার বান্দা যখনকোন সৎকর্মের আকাংখা করে, তখন তার ইচ্ছারকারণে তার আমলনামায় একটা নেকী লিখে দাও। যদিসে সৎকাজটি সম্পন্ন করে, তবে দশটি নেকীলিপিবদ্ধ কর। পক্ষান্তরে যদি কোন পাপকাজেরইচ্ছা করে, অতঃপর আল্লাহর ভয়ে তা পরিত্যাগ করে,তখন পাপের পরিবর্তে তার আমলনামায় একটিনেকী লিখে দাও। আর যদি পাপকাজটি সে করেইফেলে, তবে একটির বদলে একটি গোনাহলিপিবদ্ধ কর’।[19]অতএব ইউসুফ-এর অন্তরেঅনিচ্ছাকৃত অপরাধ প্রবণতা সৃষ্টির আশংকাটি কেবলধারণার পর্যায়ে ছিল। সেটা ছগীরা বা কবীরাকোনরূপ গোনাহের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।নিঃসন্দেহে ইউসুফ ছিলেন নির্দোষ ও নিষ্পাপ এবংপূত চরিত্রের যুবক।ইউসুফের সাক্ষী কেছিলেন?উপরের আলোচনায় ২৬নং আয়াতে আল্লাহবলেছেন, ﻭَﺷَﻬِﺪَ ﺷَﺎﻫِﺪٌ ﻣِّﻦْ ﺃَﻫْﻠِﻬَﺎ ‘ঐ মহিলারপরিবারের জনৈক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল’- কিন্তু কেসেইব্যক্তি, সে বিষয়ে কুরআনে কিছু বলা হয়নি। তবেইবনু জারীর,আহমাদ, ত্বাবারাণী, হাকেম প্রমুখহযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) থেকে একটিহাদীছ বর্ণনা করেছেন, যেখানে বলা হয়েছেযে, চারটি শিশু দোলনায় থাকতে কথা বলেছিল।তন্মধ্যে ‘ইউসুফের সাক্ষী’ ( ﺷﺎﻫﺪ ﻳﻮﺳﻒ )হিসাবে একটি শিশুর কথা এসেছে। শায়খ আলবানীবলেন, হাদীছটি যঈফ।[20] কুরতুবী বলেন, উক্তব্যক্তি ছিলেন, গৃহস্বামী ‘আযীযে মিছরের’সাথী তাঁর একান্ত পরামর্শদাতা দূরদর্শী জ্ঞানীব্যক্তি। যিনি যুলায়খার চাচাতো ভাই ছিলেন। তিনিইউসুফেরজামা সম্মুখ থেকে বা পিছন থেকেছেঁড়া কি-না প্রমাণ হিসাবে পেশ করার কথা বলেন(ইউসুফ ১২/২৬-২৮)। যদি দোলনার শিশু সাক্ষ্য দিত,তাহ’লে সেটা অলৌকিক ঘটনা হ’ত এবং সেটাই যথেষ্টহ’ত। অন্য কোন প্রমাণের দরকার হতো না’।[21]ইউসুফ জেলে গেলেন :শহরের বিশিষ্টমহিলাদের সমাবেশে যুলায়খা নির্লজ্জভাবেবলেছিল, ইউসুফ হয়আমার ইচ্ছা পূরণ করবে, নয়জেলে যাবে’। অন্য মহিলারাও যুলায়খাকে সমর্থনকরেছিল। এতে বুঝা যায় যে, সে যুগে নারীস্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা চরমে উঠেছিল। তাদেরচক্রান্তের কাছে পুরুষেরা অসহায় ছিল।নইলেস্ত্রীর দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরেওমন্ত্রী তার স্ত্রীকে শাস্তি দেওয়ার সাহস নাকরে নির্দোষ ইউসুফকে জেলে পাঠালেনকেন? অবশ্য লোকজনের মুখ বন্ধ করার জন্য ওনিজের ঘর রক্ষার জন্যও এটা হ’তে পারে।ইউসুফযখন বুঝলেন যে, এই মহিলাদের চক্রান্ত থেকেউদ্ধার পাওয়ার কোন উপায় নেই, তখন তিনিআল্লাহরআশ্রয় প্রার্থনা করে বললেন, আল্লাহ এরা আমাকেযে কাজেআহবান করছে, তার চেয়ে কারাগারইআমার জন্য শ্রেয়:। আল্লাহ তার দো‘আ কবুলকরলেন এবং তাদের চক্রান্তকে হটিয়ে দিলেন(ইউসুফ১২/২৩-২৪)। এতে বুঝা যায় যে, চক্রান্তটাএকপক্ষীয় ছিল এবং তাতে ইউসুফের লেশমাত্রসম্পৃক্ততা ছিল না। দ্বিতীয়তঃ ইউসুফ যদিজেলখানাকে ‘অধিকতর পসন্দনীয়’ না বলতেন এবংশুধুমাত্র আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন, তাহ’লেহয়তবা আল্লাহ তার জন্য নিরাপত্তার অন্য কোনব্যবস্থা করতেন।যাইহোক আযীযে মিছরেরগৃহে বাস করে চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করা অসম্ভববিবেচনা করে ইউসুফ যুলায়খার হুমকি মতেজেলখানাকেই অধিকতর শ্রেয়: বলেন। ফলেকারাগারই তার জন্য নির্ধারিত হয়ে যায়।আল্লাহ তা‘আলামহিলাদের চক্রান্তজাল থেকে ইউসুফকেবাঁচানোর জন্য কৌশল করলেন। ‘আযীযে মিছর’ ওতার সভাসদগণের মধ্যে ইউসুফের সততা ওসচ্চরিত্রতা সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা জন্মেছিল। তথাপিলোকজনের কানা-ঘুষা বন্ধ করার জন্য এবংসর্বোপরি নিজের ঘর রক্ষা করার জন্য ইউসুফকেকিছুদিনের জন্য কারাগারে আবদ্ধ রাখাকেই তারাসমীচীন মনে করলেন এবং সেমতে ইউসুফজেলে প্রেরিত হলেন। যেমন আল্লাহ বলেন,ﺛُﻢَّ ﺑَﺪَﺍ ﻟَﻬُﻢ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِ ﻣَﺎﺭَﺃَﻭُﺍ ﺍﻵﻳَﺎﺕِ ﻟَﻴَﺴْﺠُﻨُﻨَّﻪُ ﺣَﺘَّﻰ ﺣِﻴْﻦٍ -‘অতঃপর এসব (সততার) নিদর্শন দেখার পর তারা(আযীয়ে মিছর ও তার সাথীরা) তাকে(ইউসুফকে) কিছুদিন কারাগারে রাখা সমীচীন মনেকরল’ (ইউসুফ ১২/৩৫)।