হযরত ইউসুফ আঃ এর জীবনী পার্ট -এক


  1. হযরত ইউসুফ (আ:) part 1. হযরত ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)সূচীপত্র সূরা নাযিলের কারণ সুন্দরতম কাহিনীআরবী ভাষায় কেন?কাহিনীর সার-সংক্ষেপসূরাটিমক্কায় নাযিল হওয়ার কারণইউসুফ (আঃ)-এরকাহিনীমিসরে ইউসুফের সময়কালশৈশবে ইউসুফেরলালন-পালন ও চুরির ঘটনাইউসুফ-এর স্বপ্নভাইদের হিংসারশিকার হলেনইউসুফ অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হ’লেনপিতারনিকটে ভাইদের কৈফিয়তকাফেলার হাতে ইউসুফইউসুফমিসরের অর্থমন্ত্রীর গৃহেইউসুফ যৌবনে পদার্পণকরলেনযৌবনের মহা পরীক্ষায় ইউসুফমহিলাদেরসমাবেশে ইউসুফনবীগণ নিষ্পাপ মানুষছিলেনইউসুফের সাক্ষী কে ছিলেন?ইউসুফজেলে গেলেনকারাগারের জীবনজেলখানারসাথীদের নিকটে ইউসুফের দাওয়াতইউসুফেরদাওয়াতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহবাদশাহর স্বপ্ন ওকারাগার থেকে ইউসুফের ব্যাখ্যা দানবাদশাহর দূতকেফেরৎ দানে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহবাদশাহর দরবারেইউসুফ (আঃ)ইউসুফের অর্থমন্ত্রীর পদ লাভ এবংসাথে সাথে বাদশাহীর ক্ষমতা লাভইউসুফের দক্ষশাসন ও দুর্ভিক্ষ মুকাবিলায় অপূর্ব ব্যবস্থাপনাভাইদেরমিসরে আগমনইউসুফের কৌশল অবলম্বন ওবেনিয়ামীনের মিসর আগমনবেনিয়ামীনকেআটকে রাখা হ’লশিক্ষণীয় বিষয়বেনিয়ামীনকেফিরিয়ে নেবার জন্য ভাইদেরপ্রচেষ্টাবেনিয়ামীনকে রেখেই মিসর থেকেফিরল ভাইয়েরাপিতার নিকটে ছেলেদেরকৈফিয়তপিতার নির্দেশে ছেলেদের পুনরায় মিসরেগমনইউসুফের আত্মপ্রকাশ এবং ভাইদের ক্ষমাপ্রার্থনাইউসুফের ব্যবহৃত জামা প্রেরণভাইদের প্রতিক্ষমা প্রদর্শনের তাৎপর্যইয়াকূব (আঃ) দৃষ্টিশক্তিফিরে পেলেনঘামের গন্ধে দৃষ্টিশক্তি ফেরাসম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্যপিতার নিকটেছেলেদের ক্ষমা প্রার্থনাইয়াকূব-পরিবারের মিসরউপস্থিতি ও স্বপ্নের বাস্তবায়নইউসুফেরদো‘আইউসুফের প্রশংসায় আল্লাহতা‘আলাশেষনবীর প্রতি আল্লাহর সম্বোধন ওসান্ত্বনা প্রদানইউসুফের কাহিনী এক নযরেইয়াকূব(আঃ)-এর মৃত্যুইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যুসংশয়নিরসনইউসুফের নিষ্পাপত্ব‘বুরহান’ কি?ইউসুফেরকাহিনীতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ।আব্দুল্লাহ ইবনুওমর (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইউসুফ (আঃ)সম্পর্কে বলেন, ﺍﻟﻜﺮﻳﻢُ ﺑﻦُ ﺍﻟﻜﺮﻳﻢِ ﺑﻦِ ﺍﻟﻜﺮﻳﻢِ ﺑﻦِﺍﻟﻜﺮﻳﻢِ ﻳﻮﺳﻒُ ﺑﻦُ ﻳﻌﻘﻮﺏَ ﺑﻦِ ﺍﺳﺤﺎﻕَ ﺑﻦِ ﺍﺑﺮﺍﻫﻴﻢَ ﻋﻠﻴﻬﻢُﺍﻟﺴﻼﻡُ- ‘নিশ্চয়ই মর্যাদাবানের পুত্র মর্যাদাবান, তাঁর পুত্রমর্যাদাবান, তাঁর পুত্র মর্যাদাবান। তাঁরা হলেনইবরাহীমের পুত্র ইসহাক, তাঁর পুত্র ইয়াকূব ও তাঁরপুত্র ইউসুফ ‘আলাইহিমুস সালাম’ (তাঁদের উপর শান্তিবর্ষিত হৌক!)।[1]নবীগণের মধ্যে হযরত ইউসুফ(আঃ) হ’লেন একমাত্র নবী, যাঁর পুরা কাহিনী একটিমাত্র সূরায় ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। সূরা ইউসুফ-এর ১১১টি আয়াতের মধ্যে ৩ থেকে ১০১ আয়াতপর্যন্ত ৯৯টি আয়াতে ইউসুফের কাহিনী বিবৃতহয়েছে। এ ছাড়া অন্যত্র কেবল সূরা আন‘আম ৮৪এবং সূরা মুমিন ৩৪ আয়াতে তাঁর নাম এসেছে।সূরানাযিলের কারণ : সত্যনবী এবং শেষনবীজেনেও কপট ইহুদীরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রতিপদে পদে কষ্ট দিত এবং পরীক্ষা করার চেষ্টাকরত। তাদেরসমাজনেতা ও ধর্মনেতাদের কাজইছিল সর্বদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এরবিরুদ্ধে চক্রান্ত করা ওতাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করা। এ সময় মক্কায় কোনআহলে কিতাব বসবাস করত না এবং মক্কার লোকেরাইউসুফ বা অন্য নবীদের সম্পর্কে কিছু জানতও না।ফলে মদীনার কুচক্রী ইহুদীদের একটি দলমক্কায় এসে একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রশ্ন করলযে, বলুন দেখি, কোন নবী শামে (সিরিয়ায়)ছিলেন। অতঃপর তার ছেলেকে সেখান থেকেমিসরে বহিষ্কার করা হয়। তাতে ঐ ব্যক্তি কেঁদেঅন্ধ হয়ে যান? (এটি বানোয়াট কথা। কেননাকেবলমাত্র কেঁদে কারু চোখ অন্ধ হয় না এবং এটিনবীগণের মর্যাদার খেলাফ)। একথারজওয়াবেঅতঃপর সূরা ইউসুফ পুরাটা একত্রেনাযিল হয়।[2] তাদের পন্ডিতেরা তওরাত-ইঞ্জীলে বর্ণিতউক্ত ঘটনাআগে থেকেই জানতো। তাওরাত-যবূর-ইনজীল সবই ছিল হিব্রু ভাষায় রচিত। আমাদের রাসূলনিজের ভাষাতেই লেখাপড়া জানতেন না, অন্যেরভাষা জানা তো দূরের কথা। ইহুদী নেতাদেরসূক্ষ্ম পলিসি ছিল এই যে, উক্ত বিষয়ে উম্মীনবী মুহাম্মাদ-এর পক্ষে জবাব দেওয়া আদৌ সম্ভবহবে না। ফলে লোকদের মধ্যে তার নবুঅতেরব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি হবে এবংতার বিরুদ্ধেপ্রোপাগান্ডা যোরদার করা যাবে।বস্ত্ততঃ তাদেরপ্রশ্নের উত্তরে ইউসুফ (আঃ) ও ইয়াকূব পরিবারেরপ্রকৃত ঘটনা ‘অহি’ মারফত ধারাবাহিকভাবে আল্লাহ তাঁররাসূলকে বর্ণনা করে দেন। যা ছিল রাসূলের জন্যনিঃসন্দেহেএকটি গুরুত্বপূর্ণ মু‘জেযা।[3] শুধুইউসুফের ঘটনাই নয়, আদম থেকে ঈসা পর্যন্তকুরআনে বর্ণিতবাকী ২৪ জন নবী ও তাঁদেরকওমের ঘটনাবলী বর্ণনা ছিল শেষনবী মুহাম্মাদ(ছাঃ)-এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য মু‘জেযা। কেননাতাঁদের কারু সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়নি। তাদেরসম্পর্কে লিখিত কোন বই-পত্র সে যুগে ছিল না।আর তিনি নিজে কারু কাছে কখনো লেখাপড়াশিখেননি। অথচ বিশ্ব ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়েবিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া বিগত যুগের শিক্ষণীয়ঘটনাবলী তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে উম্মতকেশুনিয়ে গেছেন কুরআনের মাধ্যমে। এগুলিই তাঁরনবুঅতের অন্যতম প্রধান দলীল ছিল।এরপরেওখাছ করে ইউসুফ (আঃ) ও তাঁর পিতা ইয়াকূব(আঃ)-এর পরিবারের ঘটনাবলী ছিল বিগত ইতিহাসেরএক অনন্য সাধারণ ঘটনা। যার প্রয়োজনীয় অংশগুলিগুছিয়ে একত্রিতভাবে উপস্থাপন করাই হ’ল সূরাইউসুফের অতুলনীয় বৈশিষ্ট্য।সুন্দরতম কাহিনী:অন্যান্য নবীদের কাহিনী কুরআনের বিভিন্নস্থানে প্রয়োজন অনুসারে বিক্ষিপ্তভাবে বর্ণিতহয়েছে। কিন্তু ইউসুফ নবীর ঘটনাবলী একত্রেসাজিয়ে একটি সূরাতে সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে।সম্ভবতঃ সেকারণে এটিকে ﺃَﺣْﺴَﻦُ ﺍﻟْﻘَﺼَﺺِ‘সুন্দরতম কাহিনী’ বলা হয়েছে (ইউসুফ ১২/৩)।দ্বিতীয়তঃ এর মধ্যে যেসব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে,তা যেমনি অলৌকিক,তেমনি চমকপ্রদ ও শিক্ষণীয়।তৃতীয়তঃ অন্যান্য নবীদের কাহিনীতে প্রধানতঃউম্মতের অবাধ্যতা ও পরিণামে তাদের উপরেআপতিত গযবের কাহিনী এবং অন্যান্য উপদেশ ওহিকমত সমূহ প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু ইউসুফ (আঃ)-এর কাহিনীতে রয়েছে দুনিয়ার তিক্ত বাস্তবতা এবংআল্লাহর উপরে অকুণ্ঠ নির্ভরতার সমন্বয়ে সৃষ্টএক অতুলনীয় ও অভাবনীয় এক ট্রাজিক জীবননাট্য। যা পাঠ করলে যেকোন বোদ্ধা পাঠকেরজীবনে সৃষ্টি হবেসর্বাবস্থায় আল্লাহর উপরেভরসা ও তাঁর নিকটে আত্মসমর্পণেরএক অনুপমউদ্দীপনা।আরবী ভাষায় কেন?আল্লাহ বলেন,‘আমরা একে আরবী কুরআন হিসাবে নাযিল করেছি,যাতে তোমরা বুঝতে পার’ (ইউসুফ ১২/২)। এরঅন্যতম কারণ ছিল এই যে, ইউসুফ (আঃ)-এর কাহিনীযারা জানতে চেয়েছিল, তারা ছিল আরবীয় ইহুদীএবং মক্কার কুরায়েশ নেতৃবৃন্দ। তাই তাদেরবোধগম্য হিসাবে আরবী ভাষায় উক্ত কাহিনীবর্ণনাকরা হয়েছে এবং আরবীতেই সমগ্র কুরআন নাযিলকরা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন ভাষাগর্বীআরবরা কুরআনের অপূর্ব ভাষাশৈলীর কাছে হারমেনেছে, অন্যদিকে তেমনি কিতাবধারী ইহুদী-নাছারা পন্ডিতেরা কুরআনের বিষয়বস্ত্ত ও বক্তব্যসমূহের সত্যতা ও সারবত্তা উপলব্ধি করে নিশ্চুপহয়েছে।কাহিনীর সার-সংক্ষেপ :কাহিনীটি শৈশবেদেখা ইউসুফের একটি স্বপ্ন দিয়ে শুরু হয়েছেএবং তার সমাপ্তি ঘটেছে উক্ত স্বপ্নের সফলবাস্তবায়নের মাধ্যমে। মাঝখানের ২২/২৩ বছরমতান্তরে চল্লিশ বছর অনেকগুলি বিয়োগান্ত ওচমকপ্রদ ঘটনায় পূর্ণ। কাহিনী অনুযায়ী ইউসুফশৈশবকালে স্বপ্ন দেখেন যে, ১১টি নক্ষত্র এবংসূর্য ও চন্দ্র তাকে সিজদা করছে। তিনি এই স্বপ্নপিতা হযরত ইয়াকূবকে বললে তিনি তাকে সেটাগোপন রাখতে বলেন। কিন্তু তা ফাঁস হয়ে যায়।ফলে এটা তার সুন্দর ভবিষ্যতের হাতছানি ভেবে সৎভাইয়েরা হিংসায় জ্বলে ওঠে এবংতারা তাকে দুনিয়াথেকে সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করে। অতঃপরতারা তাকে জঙ্গলের একটি পরিত্যক্ত অন্ধকূপেনিক্ষেপ করে। তিনদিন পরে পথহারা ব্যবসায়ীকাফেলার নিক্ষিপ্ত বালতিতে করে তিনি উপরেউঠে আসেন। পরে ঐ ব্যবসায়ীরা তাকেমিসরের রাজধানীতে বিক্রি করে দেয়।ভাগ্যক্রমে মিসরের অর্থ ওরাজস্ব মন্ত্রীক্বিৎফীর ( ﻗﻄﻔﻴﺮ ) তাকে খরিদ করে বাড়ীতেনিয়ে যান ক্রীতদাস হিসাবে। কয়েক বছরেরমধ্যে যৌবনে পদার্পণকারী অনিন্দ্য সুন্দরইউসুফের প্রতি মন্ত্রীর নিঃসন্তান স্ত্রী যুলায়খারআসক্তি জন্মে। ফলে শুরু হয় ইউসুফেরজীবনে আরেক পরীক্ষা। একদিন যুলায়খাইউসুফকে তার ঘরেডেকে নিয়ে কুপ্রস্তাবদেয়। তাতে ইউসুফ সম্মত না হয়ে বেরিয়েআসতে চাইলে পিছন থেকে যুলায়খা তার জামাটেনে ধরলে তা ছিঁড়ে যায়। দরজা খুলেবেরিয়েআসতেই দু’জনে ধরা পড়ে যায় বাড়ীরমালিক ক্বিৎফীরের কাছে। পরে যুলায়খার সাজানোকথামতে নির্দোষ ইউসুফের জেল হয়। যুলায়খাছিলেন মিসররাজ রাইয়ান ইবনু অলীদেরভাগিনেয়ী।[4]অন্যূন সাত বছর জেল খাটার পরবাদশাহর এক স্বপ্নের ব্যাখ্যা দানের পুরস্কার স্বরূপতাঁর মুক্তি হয়। পরে তিনি বাদশাহর অর্থ ও রাজস্বমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং বাদশাহর আনুকূল্যে তিনিইহনসমগ্র মিসরের একচ্ছত্র শাসক।ইতিমধ্যেক্বিৎফীরের মৃত্যু হ’লে বাদশাহর উদ্যোগেবিধবা যুলায়খার সাথে তাঁর বিবাহ হয়।[5] বাদশাহর দেখাস্বপ্ন মোতাবেক মিসরে প্রথম সাত বছর ভাল ফসলহয় এবং পরের সাত বছর ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখাদেয়। দুর্ভিক্ষের সময় সুদূর কেন‘আন থেকেতাঁর বিমাতা দশ ভাই তাঁর নিকটে খাদ্য সাহায্য নিতে এলেতিনি তাদের চিনতে পারেন। কিন্তুনিজ পরিচয় গোপনরাখেন। পরে তাঁর সহোদর একমাত্র ছোট ভাইবেনিয়ামীনকে আনা হ’লে তিনি তাদের সামনেনিজের পরিচয় দেন এবং নিজের ব্যবহৃত জামাটিভাইদের মাধ্যমে পিতার নিকটে পাঠিয়ে দেন।বার্ধক্য তাড়িত অন্ধ পিতা ইয়াকূবের মুখেরউপরেউক্ত জামা রেখে দেওয়ার সাথে সাথে তাঁরদু’চোখ খুলে যায়। অতঃপর ইউসুফের আবেদনক্রমে তিনিসপরিবারে মিসর চলে আসেন। ইউসুফতার ভাইদের ক্ষমা করে দেন। অতঃপর ১১ ভাই ওবাপ-মা তাঁর প্রতি সম্মানের সিজদা করেন। এভাবেইশৈশবে দেখা ইউসুফের স্বপ্ন সার্থক রূপ পায়(অবশ্য ইসলামী শরী‘আতে কারু প্রতি সম্মানেরসিজদা নিষিদ্ধ)। সংক্ষেপে এটাই হ’ল ইউসুফ (আঃ) ওইয়াকূব পরিবারের ফিলিস্তীন হ’তে মিসরেহিজরতের কারণ ও প্রেক্ষাপট, যে বিষয়েইহুদীরা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে প্রশ্ন করেছিল মূলতঃতাঁকে ঠকাবার জন্য।সূরাটি মক্কায় নাযিল হওয়ার কারণ:মক্কায় কোন ইহুদী-নাছারা বাস করত না। ইউসুফ ওইয়াকূব পরিবারের ঘটনা মক্কায় প্রসিদ্ধ ছিল না এবংমক্কার কেউ এ বিষয়ে অবগতও ছিল না। তাহ’লে সূরাইউসুফ কেন মক্কায় নাযিল হ’ল?এর জবাব এই যে,রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর আবির্ভাবের সংবাদ মদীনায় পৌঁছেগেলে সেখানকার ইহুদী-নাছারা নেতৃবর্গ তাওরাত-ইনজীলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তাঁকে ঠিকইচিনে ফেলে (বাক্বারাহ ২/১৪৬; আন‘আম ৬/২০)।কিন্তু অহংকার বশে মানতে অস্বীকার করে এবংতাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল বুনতেশুরু করে।সে মোতাবেক শেষনবী (ছাঃ) যাতেমদীনায় হিজরত করতে না পারেন এবং মক্কাতেইতাঁকে শেষ করে ফেলা যায়, সেই কপটউদ্দেশ্য নিয়ে তাদের একদল ধুরন্ধর লোকমক্কায় প্রেরিত হয়। তারা এসে অস্পষ্ট ভঙ্গিতেপ্রশ্ন করতে লাগল যে, বলুন কোন্ নবীর একপুত্রকে শাম হ’তে মিসরে স্থানান্তরিত করা হয়।কোন্ নবীসন্তানের বিরহ-বেদনায় কেঁদেকেঁদে অন্ধ হয়ে যান ইত্যাদি।জিজ্ঞাসার জন্য এঘটনাটি বাছাই করার অন্যতম কারণ ছিল এই যে, এ ঘটনাটিমক্কায় ছিল অপরিচিত এবংএকটি সম্পূর্ণ নতুন বিষয়।অতএবমক্কার লোকেরাই যে বিষয়ে জানে না,সে বিষয়ে উম্মী নবী মুহাম্মাদ-এর জানার প্রশ্নইওঠেনা। ফলে নিশ্চয়ই তিনি বলতে পারবেন না এবংঅবশ্যই তিনি অপদস্থ হবেন। তখন মক্কারকাফেরদের কাছে একথা রটিয়ে দেওয়া সম্ভবহবে যে, মুহাম্মাদ কোন নবী নন, তিনি একজনভন্ড ও মতলববাজ লোক। বাপ-দাদার ধর্মেরবিরোধিতা করার কারণে তখন লোকেরাতাকে হয়তপিটিয়ে মেরে ফেলবে।যাইহোক ইহুদীদেরএ কুটচাল ও কপট উদ্দেশ্য সফল হয়নি। তাদেরপ্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে সূরা ইউসুফ নাযিল হয় এবংতাতে ইউসুফ ও ইয়াকূব-পরিবারের ঘটনাবলীএমননিখুঁতভাবে পরিবেশিত হয়, যা তওরাত ওইনজীলেও ছিল না। বস্ত্ততঃ এটি ছিল শেষনবী(ছাঃ)-এর একটি প্রকাশ্য মু‘জেযা।ইউসুফ (আঃ)-এরকাহিনী :ইউসুফ (আঃ)-এর পিতা ছিলেন ইয়াকূব ইবনেইসহাক্ব ইবনে ইবরাহীম (আঃ)। তাঁরা সবাইকেন‘আনবা ফিলিস্তীনের হেবরন এলাকার বাসিন্দাছিলেন। ইয়াকূব (আঃ)-এরদ্বিতীয়া স্ত্রীর গর্ভেজন্মগ্রহণ করেন ইউসুফ ও বেনিয়ামীন।শেষোক্ত সন্তান জন্মের পরপরই তার মামৃত্যুবরণ করেন। পরে ইয়াকূব (আঃ) তাঁর স্ত্রীরঅপর এক বোন লায়লা-কে বিবাহ করেন। ইউসুফ-এরসাথে মিসরে পুনর্মিলনের সময় ইনিই মাহিসাবেসেখানে পিতার সাথে উপস্থিত ছিলেন।[6]হযরতইয়াকূব (আঃ) মিসরে পুত্র ইউসুফের সাথে ১৭ বছরমতান্তরে ২০ বছরের অধিককাল অতিবাহিত করেন।অতঃপর ১৪৭ বছর বয়সে সেখানেই ইন্তেকালকরেন। মৃত্যুকালে অছিয়ত করে যান যেন তাঁকেবায়তুল মুক্বাদ্দাসের নিকটবর্তী হেবরন মহল্লায়পিতা ইসহাক ও দাদা ইবরাহীম (আঃ)-এর পাশে সমাহিতকরা হয় এবং তিনি সেখানেই সমাধিস্থ হন। যা এখন‘খলীল’ মহল্লা বলে খ্যাত। হযরত ইউসুফ (আঃ) ১১০বছর বয়সে মিসরে ইন্তেকাল করেন এবং তিনিওহেবরনের একই স্থানে সমাধিস্থ হওয়ার জন্যসন্তানদের নিকটে অছিয়ত করে যান। এর দ্বারাবায়তুল মুক্বাদ্দাস অঞ্চলের বরকত ও উচ্চ মর্যাদাপ্রমাণিত হয়। হযরত ইয়াকূব-এর বংশধরগণ সকলে ‘বনুইসরাঈল’ নামে খ্যাত হয়। তাঁর বারো পুত্রের মধ্যেমাত্র ইউসুফ নবী হয়েছিলেন। তাঁর রূপ-লাবণ্য ছিলঅতুলনীয়।রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আমি মি‘রাজরজনীতে ইউসুফ (আঃ)-এর সাথেসাক্ষাৎ হলেদেখলাম যে, আল্লাহ তাকে সমগ্র বিশ্বের রূপ-সৌন্দর্যের অর্ধেক দান করেছেন’।[7] উল্লেখ্যযে, ছাহাবী বারা ইবনে আযেব (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর চেহারাকে ‘পূর্ণ চনেদ্রর’ সাথে তুলনাকরেছেন’।[8] যেদিকে ইঙ্গিত করেই ফারসীকবি গেয়েছেন- ﺣﺴﻦ ﻳﻮﺳﻒ ﺩﻡ ﻋﻴﺴﻰ ﻳﺪ ﺑﻴﻀﺎﺩﺍﺭﻯﺂﻧﭽﻪ ﺧﻮﺑﻪ ﻫﻤﻪ ﺩﺍﺭﻧﺪ ﺗﻮ ﺗﻨﻬﺎ ﺩﺍﺭﻯ ‘ইউসুফেরসৌন্দর্য, ঈসার ফুঁক ও মূসার দীপ্ত হস্ততালু- সবকিছুইযে হে নবী, তোমার মাঝেই একীভূত’।যুলায়খা-র গর্ভে ইউসুফ (আঃ)-এর দু’টি পুত্র সন্তান হয়।তাদের নাম ছিল ইফরাঈম ও মানশা। ইফরাঈমের একটিপুত্র ও একটি কন্যা সন্তান হয়। পুত্র ছিলেন ‘নূন’ যারপুত্র ‘ইউশা’ নবী হন এবং কন্যা ছিলেন ‘লাইয়া’ অথবা‘রাহ্মাহ’, যিনি আইয়ূব (আঃ)-এর স্ত্রী ছিলেন’।[9]উল্লেখ্য যে, বিগত নবীদের বংশ তালিকার অধিকাংশনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।মিসরে ইউসুফের সময়কাল :মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্ব(৮০-১৫০ হিঃ) বলেন, ঐ সময় মিসরের সম্রাট ছিলেন‘আমালেক্বা’ জাতির জনৈক রাইয়ান ইবনে ওয়ালীদ।তিনি পরবর্তীকালে ইউসুফের কাছে মুসলমান হনএবং ইউসুফকে মিসরের সর্বময় ক্ষমতায় বসিয়েবলেন, ﻟﺴﺖُ ﺃﻋﻈﻢَ ﻣﻨﻚ ﺇﻻ ﺑﺎﻟﻜﺮﺳﻰ ‘আমি আপনারচাইতে বড় নই, সিংহাসন ব্যতীত’। এ সময় ইউসুফেরবয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর।[10] পক্ষান্তরে তারীখুলআম্বিয়ার লেখক বলেন, ইউসুফ (আঃ)-এরকাহিনীতে মিসরে যুগ যুগ ধরে রাজত্বকারীফেরাঊন রাজাদের কোন উল্লেখ না থাকায়অনেকে প্রমাণ করেন যে, ঐ সময় ‘হাকসূস’ রাজারা( ﻣﻠﻮﻙ ﺍﻟﻬﻜﺴﻮﺱ ) ফেরাঊনদের হটিয়ে মিসর দখলকরেন এবং দু’শো বছর যাবত তারা সেখানে রাজত্বকরেন। যা ছিল ঈসা (আঃ)-এর আবির্ভাবের প্রায় দু’হাযারবছরপূর্বের ঘটনা’।[11]উল্লেখ্য যে, ইউসুফ (আঃ)-এর সময়কাল ছিল ঈসা (আঃ)-এর অন্যূন আঠারশ’ বছরপূর্বেকার। তবে সুলায়মান মানছূরপুরী বলেন,আনুমানিক ১৬৮৬ বছর পূর্বের। হ’তে পারে কেউইউসুফের সময়কালের শুরু থেকে এবং কেউ তাঁরমৃত্যু থেকে হিসাব করেছেন।তবে তাঁর সময়থেকেই বনু ইস্রাঈলগণ মিসরে বসবাস শুরু করে।শৈশবে ইউসুফের লালন-পালন ও চুরির ঘটনা :হাফেযইবনু কাছীর বর্ণনা করেন যে, ইউসুফ-এরজন্মের কিছুকাল পরেই বেনিয়ামীন জন্মগ্রহণকরেন। বেনিয়ামীন জন্মের পরপরই তাদেরমায়ের মৃত্যু ঘটে।[12] তখন মাতৃহীন দুই শিশুর লালন-পালনের ভার তাদের ফুফুর উপরে অর্পিত হয়।আল্লাহ তা‘আলা ইউসুফকে এত বেশী রূপ-লাবণ্যএবং মায়াশীল ব্যবহার দান করেছিলেন যে, যেই-ইতাকে দেখত, সেই-ই তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েপড়ত। ফুফু তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।একদন্ড চোখের আড়াল হ’তে দিতেন না।এদিকে বিপত্নীক ইয়াকূব (আঃ)মাতৃহীনা দুই শিশুপুত্রের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই অধিকতর দুর্বল এবংসর্বদা ব্যাকুল থাকতেন। ইতিমধ্যে ইউসুফ একটু বড়হ’লে এবং হাঁটাচলা করার মত বয়স হ’লে পিতা ইয়াকূব(আঃ) তাকে ফুফুর নিকট থেকে আনতে চাইলেন।কিন্তু ফুফু তাকে ছাড়তে নারায।ওদিকে পিতাও তাকেনিয়ে আসতে সংকল্পবদ্ধ। শুরু হ’ল পিতা ও ফুফুরমধ্যে মহববতের টানাপড়েন। ফলে ঘটে গেলএক অঘটন।অধিক পীড়াপীড়ির কারণে ইউসুফকেযখন তার পিতার হাতে তুলে দিতেই হ’ল, তখনস্নেহান্ধ ফুফু গোপনে এক ফন্দি করলেন। তিনিস্বীয় পিতা হযরত ইসহাক্ব (আঃ)-এর নিকট থেকেযে একটা হাঁসুলি পেয়েছিলেন এবং যেটাকেঅত্যন্ত মূল্যবান ও বরকতময় মনেকরা হ’ত, ফুফুসেই হাঁসুলিটিকে ইউসুফ-এর কাপড়ের নীচেগোপনে বেঁধে দিলেন।অতঃপর ইউসুফ তার পিতারসাথে চলে যাওয়ার পর ফুফু জোরেশোরেপ্রচার শুরু করলেন যে, তার মূল্যবান হাঁসুলিটি চুরি হয়েগেছে। পরে তল্লাশী করে তা ইউসুফেরকাছে পাওয়া গেল। ইয়াকূবী শরী‘আতের বিধানঅনুযায়ী ফুফু ইউসুফকে তার গোলাম হিসাবে রাখারঅধিকার পেলেন। ইয়াকূব (আঃ)ও দ্বিরুক্তি না করেসন্তানকে তারফুফুর হাতে পুনরায় সমর্পণ করলেন।এরপর যতদিন ফুফু জীবিত ছিলেন, ততদিন ইউসুফ তারকাছেই রইলেন।[13]এই ছিল ঘটনা, যাতে ইউসুফনিজের অজান্তে চুরির অপরাধে অভিযুক্তহয়েছিলেন। এরপর বিষয়টি সবার কাছেদিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছিল যে,তিনি ছিলেন এ ব্যাপারে একেবারেই নির্দোষ।ফুফুর অপত্য স্নেহই তাকে ঘিরে এ চক্রান্ত জালবিস্তার করেছিল। এসত্য কথাটি তার সৎভাইদেরও জানাছিল। কিন্তু এটাকেই তারা ইউসুফের মুখের উপরেবলে দেয় যখন আরেক বানোয়াট চুরিরঅভিযোগে বেনিয়ামীনকে মিসরে গ্রেফতারকরা হয়। ইউসুফ তাতে দারুণ মনোকষ্ট পেলেও তাচেপে রাখেন।বলা বাহুল্য, শৈশবে যেমন ইউসুফস্বীয় ফুফুর স্নেহের ফাঁদে পড়ে চোর (?)সাব্যস্ত হয়ে ফুফুরগোলামী করেন, যৌবনেতেমনি যুলায়খার চক্রান্তে পড়ে মিথ্যা অপবাদেঅন্যূন সাত বছর জেল খাটেন- যে ঘটনা পরেবর্ণিত হবে।ইউসুফ-এর স্বপ্ন :বালক ইউসুফ একদিনতার পিতা ইয়াকূব (আঃ)-এর কাছে এসে বলল, ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَﻳُﻮْﺳُﻒُ ﻟِﺄَﺑِﻴْﻪِ ﻳَﺎ ﺃَﺑﺖِ ﺇِﻧِّﻲْ ﺭَﺃَﻳْﺖُ ﺃَﺣَﺪَ ﻋَﺸَﺮَ ﻛَﻮْﻛَﺒﺎًﻭَّﺍﻟﺸَّﻤْﺲَ ﻭَﺍﻟْﻘَﻤَﺮَ ﺭَﺃَﻳْﺘُﻬُﻢْ ﻟِﻲْ ﺳَﺎﺟِﺪِﻳْﻦَ -‘আমি স্বপ্নদেখেছি যে, ১১টি নক্ষত্র এবং সূর্য ও চন্দ্রআমাকে সিজদা করছে’। একথা শুনে পিতা বললেন,ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺑُﻨَﻲَّ ﻻَ ﺗَﻘْﺼُﺺْ ﺭُﺅْﻳَﺎﻙَ ﻋَﻠَﻰ ﺇِﺧْﻮَﺗِﻚَ ﻓَﻴَﻜِﻴْﺪُﻭﺍْ ﻟَﻚَﻛَﻴْﺪﺍً ﺇِﻥَّ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥَ ﻟِﻠْﺈِﻧﺴَﺎﻥِ ﻋَﺪُﻭٌّ ﻣُّﺒِﻴْﻦٌ – ‘বৎস, তোমারভাইদের সামনে এ স্বপ্ন বর্ণনা করো না। তাহ’লেওরা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। নিশ্চয় শয়তানমানুষের প্রকাশ্য শত্রু (ইউসুফ ১২/৪-৫)। ইবনু আববাস(রাঃ) ও ক্বাতাদাহ বলেন, এগারোটি নক্ষত্রের অর্থহচ্ছে ইউসুফ (আঃ)-এর এগারো ভাই এবং সূর্য ওচন্দ্রের অর্থ পিতা ও মাতা বা খালা’।[14] বস্ত্ততঃ এস্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রকাশ পায় যখন মিসরে পিতা-পুত্রের মিলন হয়।উল্লেখ্য যে, স্বপ্ন ব্যাখ্যা করাজ্ঞানের একটি পৃথক শাখা। হযরত ইবরাহীম, ইসহাক্বও ইয়াকূব সকলে এ বিষয়ে পারদর্শীছিলেন।সম্ভবতঃ একারণেই ইয়াকূব (আঃ) নিশ্চিত ধারণাকরেছিলেন যে, বালক ইউসুফ একদিন নবী হবে।হযরত ইউসুফকেও আল্লাহ এ ক্ষমতা দানকরেছিলেন। যেমন আল্লাহ এদিকে ইঙ্গিত দিয়েবলেন, ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻳَﺠْﺘَﺒِﻴْﻚَ ﺭَﺑُّﻚَ ﻭَﻳُﻌَﻠِّﻤُﻚَ ﻣِﻦ ﺗَﺄْﻭِﻳْﻞِﺍﻷَﺣَﺎﺩِﻳْﺚِ ﻭَﻳُﺘِﻢُّ ﻧِﻌْﻤَﺘَﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻭَﻋَﻠَﻰ ﺁﻝِ ﻳَﻌْﻘُﻮْﺏَ ﻛَﻤَﺎ ﺃَﺗَﻤَّﻬَﺎﻋَﻠَﻰ ﺃَﺑَﻮَﻳْﻚَ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞُ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﻭَﺇِﺳْﺤَﺎﻕَ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑَّﻚَ ﻋَﻠِﻴْﻢٌﺣَﻜِﻴْﻢٌ- ‏( ﻳﻮﺳﻒ ৬)-‘এমনিভাবে তোমার পালনকর্তাতোমাকে মনোনীত করবেন (নবী হিসাবে)এবং তোমাকে শিক্ষা দিবেন বাণী সমূহের (অর্থাৎস্বপ্নাদিষ্ট বাণী সমূহের) নিগুঢ় তত্ত্ব এবং পূর্ণকরবেন স্বীয় অনুগ্রহ সমূহ (যেমন মিসরেররাজত্ব, সর্বোচ্চ সম্মানও ধন-সম্পদ লাভ এবং পিতারসাথে মিলন প্রভৃতি) তোমার প্রতি ও ইয়াকূব-পরিবারের প্রতি, যেমন তিনি পূর্ণ করেছিলেনইতিপূর্বে তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাক্বেরপ্রতি। নিশ্চয়ই তোমার পালনকর্তা সর্বজ্ঞ ওপ্রজ্ঞাময়’ (ইউসুফ ১২/৬)।উপরোক্ত ৫ ও ৬আয়াতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি ফুটে ওঠে। যেমন,(১) ইয়াকূব (আঃ) ইউসুফের দেখা স্বপ্নকে একটিসত্য স্বপ্ন হিসাবে গণ্য করেছিলেন এবং এটাওউপলব্ধি করেছিলেন যে, ইউসুফ-এর জীবনেএকটি সুন্দর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। সেজন্য তারজীবনেআসতে পারে কঠিন পরীক্ষা সমূহ। (২)ভাল স্বপ্নের কথা এমন লোকের কাছে বলা উচিতনয়, যারা তার হিতাকাংখী নয়। সেজন্যেই ইযাকূব (আঃ)বালক ইউসুফকে তার স্বপ্ন বৃত্তান্ত তার সৎভাইদেরকাছে বলতে নিষেধ করেছিলেন। (৩)ইউসুফকে আল্লাহ তিনটি নে‘মত দানের সুসংবাদদেন। (ক) আল্লাহ তাকে মনোনীত করেছেননবী হিসাবে (খ) তাকে স্বপ্ন বৃত্তান্ত ব্যাখ্যা করারযোগ্যতা দান করবেন (গ) তার প্রতি স্বীয় নে‘মতসমূহ পূর্ণ করবেন। বলা বাহুল্য, এগুলির প্রতিটিইপরবর্তীতে বাস্তবায়িত হয়েছে অত্যন্তসুন্দরভাবে, যা আমরা পরবর্তী কাহিনীতেঅবলোকন করব।এক্ষণে ইউসুফকে উপরোক্ত৬ আয়াতে বর্ণিত অহী আল্লাহ কখন নাযিলকরেছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু জানা যায়না। তবে ১৫ আয়াতের মর্মে বুঝা যায় যে, তাঁকেকূপে নিক্ষেপ করার আগেই উপরোক্ত অহীরমাধ্যমে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়। এটি নবুঅতের‘অহিয়ে কালাম’ ছিল না। বরং এটি ছিল মূসার মায়ের কাছেঅহী করার ন্যায় ‘অহিয়ে ইলহাম’। কেননা নবুঅতের‘অহি’ সাধারণতঃ চল্লিশ বছর বয়সে হয়েথাকে।ভাইদের হিংসার শিকার হলেন :এটা একটা স্বভাবগতরীতি যে, বিমাতা ভাইয়েরা সাধারণতঃ পরস্পরেরবিদ্বেষী হয়ে থাকে। সম্ভবতঃ এই বিদ্বেষযাতে মাথাচাড়া না দেয়, সেকারণ ইয়াকূব (আঃ) একইশ্বশুরের পরপর তিন মেয়েকে বিয়েকরেছিলেন। এরপরেও শ্বশুর ছিলেন আপন মামু।পরস্পরে রক্ত সম্পর্কীয় এবং ঘনিষ্ঠ নিকটাত্মীয়হওয়া সত্ত্বেও এবং নবী পরিবারের সার্বক্ষণিকদ্বীনী পরিবেশ ও নৈতিক প্রশিক্ষণ থাকাসত্ত্বেও বৈমাত্রেয় হিংসার কবল থেকে ইয়াকূব(আঃ)-এর দ্বিতীয় পক্ষেরসন্তানেরা রক্ষা পায়নি।তাই বলা চলে যে, ইউসুফের প্রতি তার সৎভাইদেরহিংসার প্রথম কারণ ছিলবৈমাত্রেয় বিদ্বেষ। দ্বিতীয়কারণ ছিল- সদ্য মাতৃহীন শিশু হওয়ার কারণে তাদেরদু’ভাইয়ের প্রতি পিতার স্বভাবগত স্নেহের আধিক্য।তৃতীয় কারণ ছিল, ইউসুফের অতুলনীয় রূপ-লাবণ্য,অনিন্দ্যসুন্দর দেহসৌষ্ঠব, আকর্ষণীয় ব্যবহার-মাধুর্য এবং অনন্য সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। চতুর্থইউসুফের স্বপ্নবৃত্তান্তের কথা যেকোন ভাবেইহৌক তাদের কানে পৌঁছে যাওয়া। বলা চলে যে,শেষোক্ত কারণটিই তাদের হিংসার আগুনে ঘৃতাহুতিদেয় এবং তাকে দুনিয়ার বুক থেকে সরিয়েদেওয়ার শয়তানী চক্রান্তে তারা প্ররোচিত হয়।কিন্তু শয়তান যতই চক্রান্ত করুক, আল্লাহ বলেন, ﺇِﻥَّﻛَﻴْﺪَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﻛَﺎﻥَ ﺿَﻌِﻴْﻔًﺎ – ‘শয়তানের চক্রান্ত সর্বদাইদুর্বল হয়ে থাকে’ (নিসা৪/৭৬)। ইউসুফের মধ্যেভবিষ্যৎ নবুঅত লুকিয়ে আছে বুঝতে পেরেইইয়াকূব (আঃ) তার প্রতি অধিক স্নেহশীল ছিলেন।আর সেকারণে সৎ ভাইয়েরাও ছিল অধিক হিংসাপরায়ণ।বস্ত্ততঃ এই হিংসাত্মক আচরণের মধ্যেই লুকিয়েছিল ইউসুফের ভবিষ্যৎ উন্নতির সোপান।ইউসুফঅন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হ’লেন:দশ জন বিমাতা ভাই মিলেইউসুফকে হত্যার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্যতাকে জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতারণারআশ্রয় নিল। তারা একদিন পিতা ইয়াকূব (আঃ)-এর কাছেএসে ইউসুফকে সাথে নিয়ে পার্শ্ববর্তীজঙ্গলে আনন্দ ভ্রমণে যাবার প্রস্তাব করল। তারাপিতাকে বলল যে, ‘আপনি তাকে আগামীকালআমাদের সাথে প্রেরণ করুন। সে আমাদেরসঙ্গে যাবে, তৃপ্তিসহ খাবে আর খেলাধূলাকরবেএবং আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করব’।জবাবে পিতা বললেন, আমার ভয় হয় যে, তোমরাতাকে নিয়ে যাবে, আর কোন এক অসতর্কমুহূর্তে তাকে বাঘে খেয়ে ফেলবে’। ‘তারাবলল, আমরা এতগুলো ভাই থাকতে তাকে বাঘেখেয়ে ফেলবে, তাহ’লে তো আমাদের সবইশেষ হয়ে যাবে’ (ইউসুফ ১২/১২-১৪)। উল্লেখ্যযে, কেন‘আন অঞ্চলে সে সময়ে বাঘেরপ্রাদুর্ভাব ছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস(রাঃ)প্রমুখাত বর্ণিত হয়েছে যে, ইয়াকূব (আঃ)পূর্বরাতে স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, তিনি পাহাড়েরউপরে আছেন। নীচে পাহাড়ের পাদদেশেইউসুফ খেলা করছে। হঠাৎ দশটি বাঘ এসে তাকেঘেরাও করে ফেলে এবং আক্রমণ করতে উদ্যতহয়। কিন্তু তাদের মধ্যকার একটি বাঘ এসে তাকেমুক্ত করে দেয়। অতঃপর ইউসুফ মাটির ভিতরেলুকিয়ে যায়’। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন যে, উক্তস্বপ্নের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইয়াকূব (আঃ) তার দশপুত্রকেই দশ ব্যাঘ্র গণ্য করেছিলেন। কিন্তুতাদের কাছে রূপকভাবে সেটা পেশ করেন।যাতে তারা বুঝতে না পারে (কুরতুবী)।যাইহোকছেলেদের পীড়াপীড়িতে অবশেষে তিনিরাযী হলেন। কিন্তু তাদের কাছ থেকেঅঙ্গীকার নিলেন যাতে তারা ই