হযরত ইদ্রিস আঃ এর জীবনী


হযরত ইদরীস (আ:) জীবনিহযরত ইদরীস(আলাইহিস সালাম)আল্লাহ বলেন, ﻭَﺍﺫْﻛُﺮْﻓِﻲ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏِ ﺇِﺩْﺭِﻳْﺲَ ﺇِﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﺻِﺪِّﻳﻘًﺎ ﻧَّﺒِﻴًّﺎ، ﻭَﺭَﻓَﻌْﻨَﺎﻩُ ﻣَﻜَﺎﻧﺎًﻋَﻠِﻴّﺎً-‘তুমি এই কিতাবে ইদরীসের কথা আলোচনাকর। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও নবী’। ‘আমরাতাকে উচ্চমর্যাদায় উন্নীত করেছিলাম’(মারিয়াম১৯/৫৬-৫৭)।ইদরীস (আঃ)-এর পরিচয়:তিনি ছিলেনএকজন বিখ্যাত নবী। তাঁর নামে বহু উপকথাতাফসীরের কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে। যেকারণে জনসাধারণ্যে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে।হযরত ইদরীস (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর পূর্বেরনবী ছিলেন, না পরের নবী ছিলেন এ নিয়েমতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ ছাহাবীর মতেতিনি নূহ (আঃ)-এর পরের নবী ছিলেন।[1]সূরামারিয়ামে হযরত ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক্ব, ইয়াকূব,হারূণ, মূসা, যাকারিয়া, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা ইবনে মারিয়াম ওইদরীস (আঃ)-এর আলোচনা শেষে আল্লাহবলেন, ﺃُﻭْﻟَﺌِﻚَ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻢَ ﺍﻟﻠﻪ ُﻋَﻠَﻴْﻬِﻢ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻴِّﻴﻦَ ﻣِﻦﺫُﺭِّﻳَّﺔِ ﺁﺩَﻡَ ﻭَﻣِﻤَّﻦْ ﺣَﻤَﻠْﻨَﺎ ﻣَﻊَ ﻧُﻮﺡٍ ﻭَﻣِﻦ ﺫُﺭِّﻳَّﺔِ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَﻭَﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ ﻭَﻣِﻤَّﻦْ ﻫَﺪَﻳْﻨَﺎ ﻭَﺍﺟْﺘَﺒَﻴْﻨَﺎ ﺇِﺫَﺍ ﺗُﺘْﻠَﻰ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﺁﻳَﺎﺕُﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦ ﺧَﺮُّﻭْﺍ ﺳُﺠَّﺪﺍً ﻭَﺑُﻜِﻴّﺎً -‘এঁরাই হ’লেন সেই সকলনবী, যাদেরকে নবীগণের মধ্য হ’তে আল্লাহবিশেষভাবে অনুগৃহীত করেছেন। এঁরা আদমেরবংশধর এবং যাদেরকে আমরা নূহের সাথে নৌকায়আরোহণ করিয়েছিলাম তাদের বংশধর এবং ইবরাহীমও ইসরাঈল (ইয়াকূব)-এর বংশধর এবং যাদেরকে আমরা(ইসলামের) সুপথ প্রদর্শন করেছি ও (ঈমানেরজন্য) মনোনীত করেছি তাদের বংশধর। তাদেরকাছে যখন দয়াময় আল্লাহর আয়াত সমূহ পাঠ করা হ’ত,তখন তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ত ও ক্রন্দন করত’(মারিয়াম১৯/৫৮)। অত্র আয়াতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে,ইদরীস (আঃ) হযরত নূহ (আঃ)-এর পরের নবীছিলেন।তবে নূহ ও ইদরীস হযরত আদম (আঃ)-এরনিকটবর্তী নবী ছিলেন, যেমন ইবরাহীম (আঃ)হযরত নূহ (আঃ)-এর নিকটবর্তী এবং ইসমাঈল, ইসহাক্বও ইয়াকূব হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকটবর্তীনবী ছিলেন।[2]নূহ পরবর্তী সকল মানুষ হ’লেননূহের বংশধর।[3]উল্লেখ্য যে, হযরত আব্দুল্লাহইবনু আববাস, কা‘ব আল-আহবার, সুদ্দী প্রমুখেরবরাতে হযরত ইদরীস (আঃ)-এর জান্নাত দেখতেযাওয়ার উদ্দেশ্যে ফেরেশতার মাধ্যমেসশরীরে আসমানে উত্থান ও৪র্থ আসমানেমালাকুল মউত কর্তৃকতাঁর জান কবয করা, অতঃপরসেখানেইঅবস্থান করা ইত্যাদি বিষয়ে যেসববর্ণনাতাফসীরের কিতাব সমূহে দেখতে পাওয়া যায়, তারসবই ভিত্তিহীন ইস্রাঈলিয়াত মাত্র।[4]উল্লেখ্য যে,পবিত্র কুরআনে হযরত ইদরীস (আঃ) সম্পর্কে সূরামারিয়াম ৫৬, ৫৭ এবং সূরা আম্বিয়া৮৫ আয়াতে বর্ণিতহয়েছে।কুরতুবী বলেন, ইদরীস (আঃ)-এর নাম‘আখনূখ’ ছিল এবং তিনি হযরত নূহ (আঃ)-এর পরদাদাছিলেন বলে বংশবিশারদগণ যে কথা বলেছেন, তাধারণা মাত্র। এমনিভাবে অন্যান্য নবীদের যেদীর্ঘ বংশধারা সাধারণতঃ বর্ণনা করা হয়ে থাকে, সেসবের কোন সঠিক ভিত্তি নেই। এসবের প্রকৃতইল্ম কেবলমাত্র আল্লাহর নিকটে রয়েছে।ইদরীস (আঃ)-কে ৩০টি ছহীফা প্রদান করা হয়েছিলবলে হযরত আবু যর গেফারী (রাঃ) থেকে ইবনুহিববানে(নং ৩৬১)যে বর্ণনা এসেছে, তার সনদযঈফ।[5]কুরতুবী বলেন, তিনি যে নূহেরপূর্বেকার নবী ছিলেন না, তার বড় প্রমাণ হ’ল এইযে, মি‘রাজে যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে ১মআসমানে আদম (আঃ)-এর সাক্ষাৎ হয়, তখন তিনিরাসূলকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেন, ﻣﺮﺣﺒﺎ ﺑﺎﻻﺑﻦﺍﻟﺼﺎﻟﺤﻮﺍﻟﻨﺒﻰ ﺍﻟﺼﺎﻟﺢ ‘নেককার সন্তান ও নেককারনবীর জন্য সাদর সম্ভাষণ’। অতঃপর ৪র্থ আসমানেহযরত ইদরীস (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ হ’লে তিনিরাসূলকে বলেন, ﻣﺮﺣﺒﺎ ﺑﺎﻻﺥ ﺍﻟﺼﺎﻟﺢ ﻭﺍﻟﻨﺒﻰﺍﻟﺼﺎﻟﺢ ‘নেককার ভাই ও নেককার নবীর জন্য সাদরসম্ভাষণ’।[6]ক্বাযী আয়ায বলেন, যদি ইদরীস (আঃ)নূহ (আঃ)-এর পূর্বেকার নবী হ’তেন, তাহ’লেতিনিশেষনবী (ছাঃ)-কে ‘নেককার ভাই’ না বলে‘নেককার সন্তান’ বলে সম্ভাষণ জানাতেন। যেমনআদম, নূহ ও ইবরাহীম বলেছিলেন। তিনি বলেন,নূহ ছিলেন সকল মানুষের প্রতি প্রেরিত প্রথমরাসূল। যেমন শেষনবী ছিলেন সকল মানুষেরপ্রতিপ্রেরিত শেষ রাসূল। আর ইদরীস (আঃ)ছিলেন স্বীয় কওমের প্রতি প্রেরিত নবী।যেমন ছিলেন হূদ, ছালেহ প্রমুখ নবী’।[7]উল্লেখ্য যে, এখানে আদম, নূহ ওইবরাহীমকে ‘পিতা’ হিসাবে খাছ করার কারণ এই যে,আদম হ’লেন মানবজাতির আদি পিতা। নূহ হ’লেনমানবজাতির দ্বিতীয় পিতা এবং ইবরাহীম হ’লেন তাঁরপরবর্তী সকল নবীর পিতা ‘আবুল আম্বিয়া’।বর্ণিতহয়েছে যে, হযরত ইদরীস (আঃ)হ’লেন প্রথমমানব, যাঁকে মু‘জেযা হিসাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান ওঅংকবিজ্ঞান দান করা হয়েছিল। তিনিই সর্বপ্রথম মানব,যিনি আল্লাহর ইলহাম মতে কলমের সাহায্যে লিখনপদ্ধতি ও বস্ত্র সেলাই শিল্পের সূচনা করেন।তাঁরপূর্বে মানুষ সাধারণতঃ পোশাক হিসাবেজীবজন্তুর চামড়া ব্যবহার করত। ওযন ও পরিমাপেরপদ্ধতি তিনিই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন এবং লোহাদ্বারা অস্ত্র-শস্ত্র তৈরীর পদ্ধতি আবিষ্কার ও তারব্যবহার তাঁর আমল থেকেই শুরু হয়। তিনিঅস্ত্রনির্মাণ করে ক্বাবীল গোত্রের বিরুদ্ধেজেহাদ করেন।[[1]. তাফসীর মা‘আরেফুল কুরআন পৃঃ ৪৫২।[2].কুরতুবী, মারিয়াম ৫৮-এর ব্যাখ্যা।[3]. কুরতুবী, আ‘রাফ৫৯-এর ব্যাখ্যা; ইবনু কাছীর, ঐ।[4]. কুরতুবী, মারিয়াম৫৭ আয়াতের টীকা।[5]. কুরতুবী, মারিয়াম ৫৬আয়াতের টীকা দ্রষ্টব্য।[6]. কুরতুবী, সূরা আ‘রাফ৫৯-এর ব্যাখ্যা; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫৮৬২‘মি‘রাজ’ অনুচ্ছেদ।[7]. কুরতুবী, সূরা আ‘রাফ ৫৯-এরব্যাখ্যা।[8]. কুরতুবী, মারিয়াম ৫৬; তাফসীরমা‘আরেফুল কুরআন পৃঃ ৮৩৮।