হযরত ইবরাহীম আঃ এর জীবনী


হযরত ইবরাহীম (আ:) জীবনিহযরত ইবরাহীম(আলাইহিস সালাম)1.আবুল আম্বিয়া ও সাইয়েদুল আম্বিয়া2.নবীইবরাহীম3.সামাজিক অবস্থা4.ইবরাহীম (আঃ)-এর দাওয়াত : মূর্তিপূজারী কওমের প্রতি5.পিতারপ্রতি6.পিতার জবাব7.ইবরাহীমের জবাব8.পিতাকে ও নিজ সম্প্রদায়কে একত্রেদাওয়াত9.দাওয়াতের সারকথা ও ফলশ্রুতি10.তারকা পূজারীদের সাথে বিতর্ক11.একটি সংশয় ও তারজওয়াব12.ইবরাহীম মূর্তি ভাঙ্গলেন13.নমরূদের সঙ্গে বিতর্ক ওঅগ্নিপরীক্ষা14.হিজরতের পালা15.ইবরাহীমের হিজরত-পূর্ব বিদায়ী ভাষণ16.কেন‘আনেরজীবন17.মিসর সফর1.শিক্ষণীয় বিষয়2.ইবরাহীমের কথিত তিনটি মিথ্যারব্যাখ্যা3.তাওরিয়া ওতাক্বিয়াহ4.কেন‘আনে প্রত্যাবর্তন5.ইবরাহীমী জীবনের পরীক্ষা সমূহ6.বাবেলজীবনের পরীক্ষা সমূহ7.কেন‘আনী জীবনের পরীক্ষা সমূহ8.শিক্ষণীয়বিষয়9.খাৎনা করণ10.পুত্র কুরবানী11.শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ12.অন্যান্য উল্লেখযোগ্যঘটনাবলী13.(১) ইসহাক জন্মের সুসংবাদ14.(২) মৃতকে জীবিত করার দৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ15.(৩) বায়তুল্লাহ নির্মাণ16.পরীক্ষা সমূহের মূল্যায়ন17.শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ18.উপসংহারইবরাহীম(আলাইহিস সালাম)ছিলেন হযরত নূহ (আঃ)-এর সম্ভবত: এগারোতমঅধঃস্তন পুরুষ। নূহথেকে ইবরাহীম পর্যন্ত প্রায় ২০০০ বছরের ব্যবধান ছিল। হযরত ছালেহ (আঃ)-এর প্রায়২০০ বছর পরে ইবরাহীমের আগমন ঘটে। ঈসা থেকে ব্যবধান ছিল ১৭০০ বছর অথবা প্রায়২০০০ বছরের। তিনি ছিলেন ‘আবুল আম্বিয়া’ বা নবীগণের পিতা এবং তাঁর স্ত্রী ‘সারা’ ছিলেন‘উম্মুল আম্বিয়া’ বা নবীগণের মাতা। তাঁর স্ত্রী সারার পুত্র হযরত ইসহাক্ব-এর পুত্র ইয়াকূব(আঃ)-এর বংশধর ‘বনু ইসরাঈল’ নামে পরিচিত এবং অপর স্ত্রী হাজেরার পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশে জন্ম নেন বিশ্বনবী ও শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ(ছাল্লাল্লা-হু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)। যাঁর অনুসারীগণ ‘উম্মতে মুহাম্মাদী’ বা ‘মুসলিম উম্মাহ’ বলে পরিচিত।বাবেল হ’তেতিনি কেন‘আনে (ফিলিস্তীন) হিজরত করেন। সেখান থেকে বিবি সারা-র বংশজাতনবীগণের মাধ্যমে আশপাশে সর্বত্র তাওহীদের দাওয়াত বিস্তার লাভ করে। অপর স্ত্রীহাজেরার পুত্র ইসমাঈলের মাধ্যমে বায়তুল্লাহ ও তার আশপাশএলাকায় তাওহীদের প্রচার ওপ্রসার হয় এবং অবশেষে এখানেই সর্বশেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমনঘটে। এভাবে ইবরাহীমের দুই স্ত্রীর বংশজাত নবীগণ বিশ্বকে তাওহীদের আলোয়আলোকিত করেন। শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দেহসৌষ্ঠব ও চেহারা মুবারক পিতা ইবরাহীম(আঃ)-এর ন্যায় ছিল। যা তিনি মে‘রাজ থেকে ফিরে এসে উম্মতকে খবর দেন।[1]আবুলআম্বিয়া ও সাইয়েদুল আম্বিয়া :ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন ইহুদী-খৃষ্টান-মুসলমান সকল ধর্মীয়সম্প্রদায়ের পিতা। কেননা আদম (আঃ) হ’তে ইবরাহীম (আঃ) পর্যন্ত ১০/১২ জন নবী বাদেশেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) পর্যন্ত ১ লাখ ২৪ হাযার পয়গম্বরের প্রায় সকলেইছিলেন ইবরাহীম(আঃ)-এর বংশধর। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ﺇﻥَّ ﺍﻟﻠّﻪَ ﺍﺻْﻄَﻔَﻰ ﺁﺩَﻡَ ﻭَﻧُﻮْﺣﺎً ﻭَﺁﻝَ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَﻭَﺁﻟَﻌِﻤْﺮَﺍﻥَ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ- ‏) ﺁﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ ৩৩(-‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ, আলে ইবরাহীম ও আলেইমরানকে বিশ্ববাসীর উপরে নির্বাচিত করেছেন’(আলে ইমরান ৩/৩৩)। এই নির্বাচন ছিল বিশ্বসমাজে আল্লাহর তাওহীদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ীকরার জন্য। ইবরাহীম ছিলেন নবীগণের পিতা এবংপুত্র মুহাম্মাদ ছিলেন নবীগণের নেতা,এ বিষয়টি সর্বদা মুমিনের মানসপটে জাগরুক রাখার জন্য দৈনিক ছালাতের শেষ বৈঠকে পঠিতদরূদের মধ্যে ইবরাহীম ও মুহাম্মাদের উপরে এবং উভয়ের পরিবার বর্গের উপরেআল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষণের জন্য দো‘আ করার বিধান রাখা হয়েছে। ইবরাহীমের বংশেবরকত হ’ল নবুঅত ও ঐশী কিতাবের বরকত এবং মুহাম্মাদের ওতাঁর বংশে বরকত হ’ল বিজ্ঞানময়কুরআন ও হাদীছ এবং তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার বরকত।ইবরাহীম ও তাঁর বংশধরসম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﻭَﻭَﻫَﺒْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﺇِﺳْﺤَﺎﻕَ ﻭَﻳَﻌْﻘُﻮْﺏَ ﻭَﺟَﻌَﻠْﻨَﺎ ﻓِﻲْ ﺫُﺭِّﻳَّﺘِﻪِ ﺍﻟﻨُّﺒُﻮَّﺓَ ﻭَﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏَ ﻭَﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻩُﺃَﺟْﺮَﻩُ ﻓِﻲ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﻭَﺇِﻧَّﻪُ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺂﺧِﺮَﺓِ ﻟَﻤِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴْﻦَ- ‏) ﺍﻟﻌﻨﻜﺒﻮﺕ ২৭(-‘আমরা তাকে দান করলাম ইসহাক্বও ইয়াকূবকে এবং তার বংশধরগণের মধ্যে প্রদান করলাম নবুঅত ও কিতাব। তাকে আমরাদুনিয়াতে পুরষ্কৃত করলাম। নিশ্চয়ই পরকালে সে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে’(আনকাবূত২৯/২৭)।অতঃপর শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﻟَﻘَﺪْ ﻛَﺎﻥَ ﻟَﻜُﻢْ ﻓِﻲ ﺭَﺳُﻮْﻝِ ﺍﻟﻠﻪِﺃُﺳْﻮَﺓٌ ﺣَﺴَﻨَﺔٌ ﻟِّﻤَﻦْ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﺮْﺟُﻮ ﺍﻟﻠﻪَ ﻭَﺍﻟْﻴَﻮْﻡَ ﺍﻟْﺂﺧِﺮَ ﻭَﺫَﻛَﺮَ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻛَﺜِﻴﺮﺍً – ‏) ﺍﻷﺣﺰﺍﺏ ২১(-‘যারা আল্লাহ ওশেষদিবসের (অর্থাৎ আখেরাতে মুক্তির) আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক হারে স্মরণকরে, তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের (মুহাম্মাদের) মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে’(আহযাব৩৩/২১)। অতঃপর তাঁর পরিবার সম্পর্কে বলা হয়েছে, ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﻳُﺮِﻳْﺪُ ﺍﻟﻠﻪُ ﻟِﻴُﺬْﻫِﺐَ ﻋَﻨْﻜُﻢُ ﺍﻟﺮِّﺟْﺲَ ﺃَﻫْﻞَﺍﻟْﺒَﻴْﺖِ ﻭَﻳُﻄَﻬِّﺮَﻛُﻢْ ﺗَﻄْﻬِﻴْﺮﺍً- ‏) ﺍﻷﺣﺰﺍﺏ ৩৩(-‘হে নবী পরিবারের সদস্যগণ! আল্লাহ কেবল চানতোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পূত-পবিত্ররাখতে’(আহযাব ৩৩/৩৩)।শেষ যামানায় ইমাম মাহদী আসবেন হযরত ফাতেমা (রাঃ)-এরবংশধরগণের মধ্য হ’তে এ বিষয়ে বহু ছহীহ হাদীছ বর্ণিত হয়েছে।[2]এইভাবেইবরাহীম ও মুহাম্মাদের নাম পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত দিকে দিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিতহ’তে থাকবে।ফালিল্লাহিল হাম্দ।নবী ইবরাহীম :আদম, ইয়াহ্ইয়া, ঈসা প্রমুখ দু’তিন জনেরব্যতিক্রম বাদে নূহ (আঃ) সহ অন্যান্য সকল নবীর ন্যায় ইবরাহীমকেও আমরা ধরে নিতেপারি যে, তিনি ৪০ বছর বয়সে নবুঅত লাভ করেন। উম্মতে মুসলিমার পিতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)পশ্চিম ইরাকেরবছরার নিকটবর্তী ‘বাবেল’ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এই শহরটিপরবর্তীতে সুলায়মান (আঃ)-এর সময়েজাদুর জন্য বিখ্যাত হয়(বাক্বারাহ ২/১০২)।এখানে তখনকালেডীয় ( ﻛﻠﺪﺍﻧﻰ) জাতি বসবাস করত। তাদের একচ্ছত্র সম্রাট ছিলেন নমরূদ। যিনি তৎকালীনপৃথিবীতে অত্যন্ত উদ্ধত ও অহংকারী সম্রাট ছিলেন। তিনি প্রায় চারশো বছর রাজত্বকরেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজে ‘উপাস্য’ হবার দাবী করেন।[3]আল্লাহ তারই মন্ত্রী ওপ্রধান পুরোহিত ‘আযর’-এর ঘরে বিশ্বনেতা ওবিশ্ব সংস্কারক নবী ইবরাহীমকে মুখ্যত:কালেডীয়দের প্রতি প্রেরণ করেন। ইবরাহীমের নিজ পরিবারের মধ্যে কেবলসহধর্মিনী ‘সারা’ ও ভ্রাতুষ্পুত্র ‘লূত’ মুসলমান হন।স্ত্রী ‘সারা’ ছিলেন আদি মাতা বিবি হাওয়ার পরেপৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী মহিলা। তিনি ১২৭ বছর বয়সে ‘হেবরনে’ মৃত্যু ববণকরেন ওসেখানেই কবরস্থ হন।[4]সারার মৃত্যুর পরে ইবরাহীম ক্বানতূরা বিনতে ইয়াক্বতিন ও হাজূনবিনতে আমীন নামে পরপর দুজন নারীকে বিয়ে করেন এবং ৬+৫=১১টি সন্তান লাভকরেন।[5]তিনি প্রায় দু’শো বছর জীবন পান বলে কথিত আছে।উল্লেখ্য যে, হযরতইবরাহীম (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ২৫টি সূরায় ২০৪টি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।[6]নিম্নে আমরা আয়াত সমূহথেকে নিয়ে সাধ্যতম সাজিয়ে কাহিনী আকারে পেশ করারচেষ্টা পাব ইনশাআল্লাহ।-সামাজিক অবস্থা:ইবরাহীমের আবির্ভাবকালীন সময়ে কালেডীয়সমাজ শিক্ষা ও সভ্যতায় শীর্ষস্থানীয় ছিল। এমনকি তারা সৌরজগত নিয়েও গবেষণা করত। কিন্তুঅসীলা পূজার রোগে আক্রান্ত হয়ে তারা আল্লাহকে পাবার জন্য বিভিন্ন মূর্তি ও তারকাসমূহের পূজা করত। হযরত ইবরাহীম উভয় ভ্রান্ত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাওহীদের দাওয়াতনিয়ে প্রেরিত হন।ইবরাহীম (আঃ)-এর দাওয়াত : মূর্তিপূজারী কওমের প্রতি-সকল নবীর ন্যায়ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় কওমকে প্রথমে তাওহীদের দাওয়াত দেন। যেমন আল্লাহবলেন, ﻭََﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴﻢَ ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﻟِﻘَﻮْﻣِﻪِ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺍﺗَّﻘُﻮﻩُ ﺫَﻟِﻜُﻢْ ﺧَﻴْﺮٌ ﻟَّﻜُﻢْ ﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻢْ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ،ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭﻥَ ﻣِﻦﺩُﻭﻥِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺃَﻭْﺛَﺎﻧﺎً ﻭَﺗَﺨْﻠُﻘُﻮﻥَ ﺇِﻓْﻜﺎً ﺇِﻥَّ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭﻥَ ﻣِﻦ ﺩُﻭﻥِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻟَﺎ ﻳَﻤْﻠِﻜُﻮﻥَ ﻟَﻜُﻢْ ﺭِﺯْﻗﺎً ﻓَﺎﺑْﺘَﻐُﻮﺍ ﻋِﻨﺪَ ﺍﻟﻠَّﻪِﺍﻟﺮِّﺯْﻕَ ﻭَﺍﻋْﺒُﺪُﻭﻩُ ﻭَﺍﺷْﻜُﺮُﻭﺍ ﻟَﻪُ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺗُﺮْﺟَﻌُﻮﻥَ- ‏( ﺍﻟﻌﻨﻜﺒﻮﺕ ১৬-১৭)-‘স্মরণ কর ইবরাহীমকে, যখন তিনিতার সম্প্রদায়কে বললেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁকে ভয় কর। এটাইতোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝ’। ‘তোমরা তো আল্লাহর পরিবর্তে কেবলপ্রতিমারই পূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করছ,তারা তোমাদের রিযিকের মালিক নয়। কাজেই আল্লাহর নিকটে রিযিক তালাশ কর। তাঁর ইবাদত করএবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।তাঁরই নিকটে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’(আনকাবূত৩৩/১৬-১৭)।ইবরাহীম (আঃ) উক্ত দাওয়াতের মধ্যে কেবল আল্লাহর স্বীকৃতি কামনাকরেননি। বরং স্বীকৃতির ফলাফল) ﺛﻤﺮﺓ ﺍﻹﻗﺮﺍﺭ (আশা করেছিলেন। অর্থাৎ তারা যেন আল্লাহরআদেশ-নিষেধকে মান্য করে এবং কোন অবস্থায় তা লংঘন না করে। কেননা স্বীকৃতিরবিপরীত কাজ করা তা লংঘন করার শামিল।পিতার প্রতি : ﻭَﺍﺫْﻛُﺮْ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏِ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﺇِﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﺻِﺪِّﻳْﻘﺎًﻧَّﺒِﻴًّﺎ،ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﻟِﺄَﺑِﻴْﻪِ ﻳَﺎ ﺃَﺑَﺖِ ﻟِﻢَ ﺗَﻌْﺒُﺪُ ﻣَﺎ ﻻَﻳَﺴْﻤَﻊُ ﻭَﻻَ ﻳُﺒْﺼِﺮُ ﻭَﻻَ ﻳُﻐْﻨِﻲ ﻋَﻨﻚَ ﺷَﻴْﺌﺎً، ﻳَﺎ ﺃَﺑَﺖِ ﺇِﻧِّﻲ ﻗَﺪْ ﺟَﺎﺀﻧِﻲْ ﻣِﻦَﺍﻟْﻌِﻠْﻢِ ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﻳَﺄْﺗِﻚَ ﻓَﺎﺗَّﺒِﻌْﻨِﻲْ ﺃَﻫْﺪِﻙَ ﺻِﺮَﺍﻃﺎً ﺳَﻮِﻳّﺎً، ﻳَﺎ ﺃَﺑَﺖِ ﻻَ ﺗَﻌْﺒُﺪِ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥَ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥَ ﻛَﺎﻥَ ﻟِﻠﺮَّﺣْﻤَﻦِﻋَﺼِﻴّﺎً، ﻳَﺎ ﺃَﺑَﺖِ ﺇِﻧِّﻲْ ﺃَﺧَﺎﻑُ ﺃَﻥ ﻳَﻤَﺴَّﻚَ ﻋَﺬَﺍﺏٌ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦ ﻓَﺘَﻜُﻮْﻥَ ﻟِﻠﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﻭَﻟِﻴّﺎً- ‏)ﻣﺮﻳﻢ ৪১-৪৫(-‘তুমিএই কিতাবে ইবরাহীমের কথা বর্ণনা কর। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন সত্যবাদী ও নবী’(১৯/৪১)।‘যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, হে আমার পিতা! তুমি তার পূজা কেন কর, যে শোনে না,দেখে না এবং তোমার কোন উপকারে আসে না?(৪২)। ‘হে আমার পিতা! আমার কাছে এমনজ্ঞান এসেছে, যা তোমার কাছে আসেনি। অতএব তুমি আমার অনুসরণ কর। আমি তোমাকেসরল পথ দেখাব’(৪৩)। ‘হে আমার পিতা! শয়তানের পূজা করো না।নিশ্চয়ই শয়তান দয়াময়েরঅবাধ্য’(৪৪)। ‘হে আমার পিতা! আমি আশংকা করছি যে, দয়াময়ের একটি আযাব তোমাকে স্পর্শকরবে, অতঃপর তুমি শয়তানের বন্ধু হয়ে যাবে’(মারিয়াম ১৯/৪১-৪৫)।অন্যত্র আল্লাহবলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ ﻷَﺑِﻴْﻪِ ﺁﺯَﺭَ ﺃَﺗَﺘَّﺨِﺬُ ﺃَﺻْﻨَﺎﻣﺎً ﺁﻟِﻬَﺔً ﺇِﻧِّﻲْ ﺃَﺭَﺍﻙَ ﻭَﻗَﻮْﻣَﻚَ ﻓِﻲْ ﺿَﻼَﻝٍ ﻣُّﺒِﻴْﻦٍ – ‏( ﺍﻷﻧﻌﺎﻡ৭৪)-‘স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বললেন, তুমি কি প্রতিমা সমূহকে উপাস্যমনে কর? আমি দেখতে পাচ্ছি যে, তুমি ও তোমার সম্প্রদায় স্পষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যেরয়েছ’(আন‘আম ৬/৭৪)।কিন্তু ইবরাহীমের এই প্রাণভরা আবেদন পিতা আযরের হৃদয় স্পর্শকরল না। রাষ্ট্রের প্রধান পুরোহিত এবং সম্রাটের মন্ত্রী ওপ্রিয়পাত্র হওয়ায় সম্ভবত: বিষয়টিতার প্রেস্টিজ ইস্যু হয়।যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫَﺍ ﻗِﻴﻞَ ﻟَﻪُ ﺍﺗَّﻖِ ﺍﻟﻠّﻪَ ﺃَﺧَﺬَﺗْﻪُ ﺍﻟْﻌِﺰَّﺓُ ﺑِﺎﻹِﺛْﻢِ ﻓَﺤَﺴْﺒُﻪُﺟَﻬَﻨَّﻢُ ﻭَﻟَﺒِﺌْﺲَ ﺍﻟْﻤِﻬَﺎﺩُ ، ‘যখন তাকে বলা হয়, আল্লাহকে ভয় কর, তখন তার সম্মান তাকে পাপেস্ফীত করে। অতএব তার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট। আর নিঃসন্দেহে তা হ’ল নিকৃষ্টতমঠিকানা’(বাক্বারাহ ২/২০৬)। বস্ত্ততঃ অহংকারীদের চরিত্র সর্বত্র ও সর্বযুগে প্রায় একই হয়েথাকে।পিতার জবাব :পুত্রের আকুতিপূর্ণ দাওয়াতের উত্তরে পিতা বলল, ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺭَﺍﻏِﺐٌ ﺃَﻧْﺖَ ﻋَﻦْﺁﻟِﻬَﺘِﻲْ ﻳَﺎ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ ﻟَﺌِﻦ ﻟَّﻢْ ﺗَﻨْﺘَﻪِ ﻟَﺄَﺭْﺟُﻤَﻨَّﻚَ ﻭَﺍﻫْﺠُﺮْﻧِﻲْ ﻣَﻠِﻴًّﺎ – ‏)ﻣﺮﻳﻢ ৪৬(-‘হে ইবরাহীম!তুমি কি আমারউপাস্যদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও, তবে আমি অবশ্যই পাথর মেরেতোমার মাথা চূর্ণ করে দেব। তুমি আমার সম্মুখ হ’তে চিরতরের জন্য দূর হয়ে যাও’(মারিয়াম১৯/৪৬)।ইবরাহীমের জবাব:পিতার এই কঠোর ধমকি শুনে পুত্র ইবরাহীম বললেন, ﻗَﺎﻝَ ﺳَﻼَﻡٌﻋَﻠَﻴْﻚَ ﺳَﺄَﺳْﺘَﻐْﻔِﺮُ ﻟَﻚَ ﺭَﺑِّﻲ ﺇِﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﺑِﻲ ﺣَﻔِﻴّﺎً، ﻭَﺃَﻋْﺘَﺰِﻟُﻜُﻢْ ﻭَﻣَﺎ ﺗَﺪْﻋُﻮﻥَ ﻣِﻦ ﺩُﻭﻥِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻭَﺃَﺩْﻋُﻮ ﺭَﺑِّﻲ ﻋَﺴَﻰ ﺃَﻻَّﺃَﻛُﻮﻥَ ﺑِﺪُﻋَﺎﺀ ﺭَﺑِّﻲ ﺷَﻘِﻴّﺎً – ‏)ﻣﺮﻳﻢ ৪৭-৪৮(-‘তোমার উপরে শান্তি বর্ষিত হৌক! আমি আমার পালনকর্তারনিকটে তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রতি মেহেরবান’। ‘আমি পরিত্যাগকরছি তোমাদেরকে এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদের তোমরা পূজা কর তাদেরকে। আমি আমারপালনকর্তাকে আহবান করব। আশা করি আমার পালনকর্তাকে আহবান করে আমি বঞ্চিত হবনা’(মারিয়াম ১৯/৪৭-৪৮)।পিতাকে ও নিজ সম্প্রদায়কে একত্রে দাওয়াত:আল্লাহ বলেন, ﻭَﺍﺗْﻞُ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْﻧَﺒَﺄَ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ، ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﻟِﺄَﺑِﻴْﻪِ ﻭَﻗَﻮْﻣِﻪِ ﻣَﺎ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭْﻥَ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻧَﻌْﺒُﺪُ ﺃَﺻْﻨَﺎﻣﺎً ﻓَﻨَﻈَﻞُّ ﻟَﻬَﺎ ﻋَﺎﻛِﻔِﻴْﻦَ، ﻗَﺎﻝَ ﻫَﻞْﻳَﺴْﻤَﻌُﻮﻧَﻜُﻢْ ﺇِﺫْ ﺗَﺪْﻋُﻮْﻥَ، ﺃَﻭْ ﻳَﻨْﻔَﻌُﻮْﻧَﻜُﻢْ ﺃَﻭْ ﻳَﻀُﺮُّﻭْﻥَ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺑَﻞْ ﻭَﺟَﺪْﻧَﺎ ﺁﺑَﺎﺀﻧَﺎ ﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻳَﻔْﻌَﻠُﻮْﻥَ، ﻗَﺎﻝَ ﺃَﻓَﺮَﺃَﻳْﺘُﻢ ﻣَّﺎﻛُﻨْﺘُﻢْ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭْﻥَ، ﺃَﻧﺘُﻢْ ﻭَﺁﺑَﺎﺅُﻛُﻢُ ﺍﻟْﺄَﻗْﺪَﻣُﻮْﻥَ، ﻓَﺈِﻧَّﻬُﻢْ ﻋَﺪُﻭٌّ ﻟِّﻲ ﺇِﻻَّ ﺭَﺏَّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ، ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﺧَﻠَﻘَﻨِﻲْ ﻓَﻬُﻮَ ﻳَﻬْﺪِﻳْﻦِ،ﻭَﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻫُﻮَ ﻳُﻄْﻌِﻤُﻨِﻲْ ﻭَﻳَﺴْﻘِﻴْﻦِ، ﻭَﺇِﺫَﺍ ﻣَﺮِﺿْﺖُ ﻓَﻬُﻮَ ﻳَﺸْﻔِﻴْﻦِ، ﻭَﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻳُﻤِﻴْﺘُﻨِﻲْ ﺛُﻢَّ ﻳُﺤْﻴِﻴْﻦِ، ﻭَﺍﻟَّﺬِﻱْ ﺃَﻃْﻤَﻊُ ﺃَﻥﻳَّﻐْﻔِﺮَ ﻟِﻴْﺨَﻄِﻴﺌَﺘِﻲْ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟﺪِّﻳْﻦِ، ﺭَﺏِّ ﻫَﺐْ ﻟِﻲْ ﺣُﻜْﻤﺎً ﻭَﺃَﻟْﺤِﻘْﻨِﻲْ ﺑِﺎﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴْﻦَ، ﻭَﺍﺟْﻌَﻞ ﻟِّﻲْ ﻟِﺴَﺎﻥَ ﺻِﺪْﻕٍ ﻓِﻲﺍﻟْﺂﺧِﺮِﻳْﻦَ، َﺍﺟْﻌَﻠْﻨِﻲْ ﻣِﻦ ﻭَّﺭَﺛَﺔِ ﺟَﻨَّﺔِ ﺍﻟﻨَّﻌِﻴْﻢِ، ﻭَﺍﻏْﻔِﺮْ ﻟِﺄَﺑِﻲْ ﺇِﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻀَّﺎﻟِّﻴْﻦَ، ﻭَﻻَ ﺗُﺨْﺰِﻧِﻲْ ﻳَﻮْﻡَ ﻳُﺒْﻌَﺜُﻮْﻥَ،ﻳَﻮْﻡَ ﻻَ ﻳَﻨﻔَﻊُ ﻣَﺎﻝٌ ﻭَّﻻَ ﺑَﻨُﻮْﻥَ، ﺇِﻻَّ ﻣَﻦْ ﺃَﺗَﻰ ﺍﻟﻠﻪَ ﺑِﻘَﻠْﺐٍ ﺳَﻠِﻴْﻢٍ، ﻭَﺃُﺯْﻟِﻔَﺖِ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔُ ﻟِﻠْﻤُﺘَّﻘِﻴْﻦَ، ﻭَﺑُﺮِّﺯَﺕِ ﺍﻟْﺠَﺤِﻴْﻢُﻟِﻠْﻐَﺎﻭِﻳْﻦَ، ﻭَﻗِﻴْﻞَ ﻟَﻬُﻢْ ﺃَﻳْﻦَ ﻣَﺎ ﻛُﻨْﺘُﻤْﺘَﻌْﺒُﺪُﻭْﻥَ، ﻣِﻦْ ﺩُﻭْﻥِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻫَﻞْ ﻳَﻨْﺼُﺮُﻭْﻧَﻜُﻢْ ﺃَﻭْ ﻳَﻨْﺘَﺼِﺮُﻭْﻥَ، ﻓَﻜُﺒْﻜِﺒُﻮْﺍ ﻓِﻴْﻬَﺎ ﻫُﻢْﻭَﺍﻟْﻐَﺎﻭُﻭْﻥَ، ﻭَﺟُﻨُﻮْﺩُ ﺇِﺑْﻠِﻴْﺲَ ﺃَﺟْﻤَﻌُﻮْﻥَ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻭَﻫُﻢْ ﻓِﻴْﻬَﺎ ﻳَﺨْﺘَﺼِﻤُﻮْﻥَ، ﺗَﺎﻟﻠﻪِ ﺇِﻥْ ﻛُﻨَّﺎ ﻟَﻔِﻲْ ﺿَﻼَﻝٍ ﻣُّﺒِﻴْﻦٍ، ﺇِﺫْﻧُﺴَﻮِّﻳْﻜُﻢ ﺑِﺮَﺏِّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ، ﻭَﻣَﺎ ﺃَﺿَﻠَّﻨَﺎ ﺇِﻻَّ ﺍﻟْﻤُﺠْﺮِﻣُﻮْﻥَ، َﻣَﺎ ﻟَﻨَﺎ ﻣِﻦْ ﺷَﺎﻓِﻌِﻴْﻦَ، ﻭَﻻَ ﺻَﺪِﻳْﻖٍ ﺣَﻤِﻴْﻢٍ، ﻓَﻠَﻮْ ﺃَﻥَّ ﻟَﻨَﺎﻛَﺮَّﺓً ﻓَﻨَﻜُﻮْﻥَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ، ﺇِﻥَّ ﻓِﻲْ ﺫَﻟِﻜَﻠَﺂﻳَﺔً ﻭَﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﺃَﻛْﺜَﺮُﻫُﻢ ﻣُّﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ ৬৯-১০৪)-‘আরতাদেরকে ইবরাহীমের বৃত্তান্ত শুনিয়ে দিন’(শো‘আরা ২৬/৬৯)। ‘যখন সে স্বীয় পিতা ওসম্প্রদায়কে ডেকে বলল, তোমরা কিসের পূজা কর’?(৭০)। তারা বলল, আমরা প্রতিমার পূজাকরি এবং সর্বদা এদেরকেই নিষ্ঠার সাথে আঁকড়ে থাকি’(৭১)। ‘সে বলল, তোমরা যখন আহবানকর, তখন তারা শোনে কি’?(৭২)। ‘অথবা তারা তোমাদের উপকার বা ক্ষতি করতে পারে কি’?(৭৩)। ‘তারা বলল, না। তবে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি, তারা এরূপই করত’(৭৪)।ইবরাহীম বলল, তোমরা কি তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ, যাদের তোমরা পূজাকরে আসছ’?(৭৫)। ‘তোমরা এবং তোমাদের পূর্ববর্তী পিতৃপুরুষেরা’(৭৬)। ‘তারা সবাই আমারশত্রু, বিশ্ব পালনকর্তা ব্যতীত’(৭৭)। ‘যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর আমাকে পথপ্রদর্শন করেছেন’(৭৮)। ‘যিনি আমাকে আহার দেশ ও পানীয় দান করেন’(৭৯)। ‘যখন আমিপীড়িত হই, তখনতিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন’(৮০)। ‘যিনি আমার মৃত্যু ঘটাবেন, অতঃপরপুনর্জীবন দান করবেন’(৮১)। ‘আশা করি শেষ বিচারের দিন তিনি আমার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমাকরেদিবেন’(৮২)। ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে প্রজ্ঞা দান কর এবং আমাকেসৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত কর’(৮৩)। ‘এবং আমাকে পরবর্তীদের মধ্যে সত্যভাষীকর’(৮৪)। ‘তুমি আমাকে নে‘মতপূর্ণ জান্নাতের উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর’(৮৫)।(হে প্রভু) ‘তুমি আমার পিতাকে ক্ষমা কর। তিনি তো পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত’(৮৬)(হেআল্লাহ) ‘পুনরুত্থান দিবসে তুমি আমাকে লাঞ্ছিত কর না’(৮৭)। ‘যে দিনে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না’(৮৮)‘কিন্তু যে ব্যক্তি সরল হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছেআসবে’(৮৯)। ‘(ঐ দিন) জান্নাত আল্লাহভীরুদের নিকটবর্তী করা হবে’(৯০)। ‘এবং জাহান্নামবিপথগামীদের সামনে উন্মোচিত করা হবে’(৯১)। ‘(ঐ দিন) তাদেরকে বলা হবে, তারাকোথায় যাদেরকে তোমরা পূজা করতে’?(৯২)‘আল্লাহর পরিবর্তে। তারা কি (আজ)তোমাদের সাহায্য করতে পারে কিংবা তারা কি কোনরূপ প্রতিশোধ নিতে পারে’?(৯৩)।‘অতঃপর তাদেরকে এবং (তাদের মাধ্যমে) পথভ্রষ্টদেরকে অধোমুখী করে নিক্ষেপকরা হবে জাহান্নামে’(৯৪)‘এবং ইবলীস বাহিনীর সকলকে’(৯৫)। ‘তারা সেখানে ঝগড়ায় লিপ্তহয়ে বলবে’(৯৬)‘আল্লাহর কসম! আমরা প্রকাশ্য ভ্রান্তিতে ছিলাম’(৯৭), ‘যখন আমরাতোমাদেরকে (অর্থাৎ কথিত উপাস্যদেরকে) বিশ্বপালকের সমতুল্য গণ্যকরতাম’(৯৮)।‘আসলে আমাদেরকে পাপাচারীরাই পথভ্রষ্টকরেছিল’(৯৯)। ‘ফলে (আজ)আমাদের কোনসুফারিশকারী নেই’(১০০)‘এবং কোন সহৃদয় বন্ধুও নেই’(১০১)। ‘হায়! যদিকোনরূপে আমরা পৃথিবীতে ফিরেযাবার সুযোগ পেতাম, তাহ’লে আমরা ঈমানদারগণেরঅন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম’(১০২)। ‘নিশ্চয়ই এ ঘটনার মধ্যে নিদর্শন রয়েছে। বস্ত্ততঃ তাদেরঅধিকাংশই বিশ্বাসী ছিল না’(১০৩)। ‘নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তা পরাক্রান্ত ও দয়ালু’(শো‘আরা২৬/৬৯-১০৪)।স্বীয় পিতা ও সম্প্রদায়ের নিকটেইবরাহীমের দাওয়াত ও তাদের জবাবকেআল্লাহ অন্যত্র নিম্নরূপে বর্ণনা করেন। যেমন- ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﻟِﺄَﺑِﻴْﻪِ ﻭَﻗَﻮْﻣِﻪِ ﻣَﺎ ﻫَﺬِﻩِ ﺍﻟﺘَّﻤَﺎﺛِﻴْﻞُ ﺍﻟَّﺘِﻲْﺃَﻧْﺘُﻢْ ﻟَﻬَﺎ ﻋَﺎﻛِﻔُﻮْﻥَ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻭَﺟَﺪْﻧَﺎ ﺁﺑَﺎﺀﻧَﺎ ﻟَﻬَﺎ ﻋَﺎﺑِﺪِﻳْﻦَ، ﻗَﺎﻝَ ﻟَﻘَﺪْ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﺃَﻧْﺘُﻢْ ﻭَﺁﺑَﺎﺅُﻛُﻢْ ﻓِﻲْ ﺿَﻼَﻝٍ ﻣُّﺒِﻴْﻦٍ، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍﺃَﺟِﺌْﺘَﻨَﺎ ﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﺃَﻡْ ﺃَﻧْﺘَﻤِﻦَ ﺍﻟﻼَّﻋِﺒِﻴْﻦَ، ﻗَﺎﻝَ ﺑَﻞ ﺭَّﺑُّﻜُﻢْ ﺭَﺏُّ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﻭَﺍﺕِ ﻭَﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻓَﻄَﺮَﻫُﻦَّ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﺫَﻟِﻜُﻢﻣِّﻦَ ﺍﻟﺸَّﺎﻫِﺪِﻳْﻦَ، ﻭَﺗَﺎﻟﻠﻪِ ﻟَﺄَﻛِﻴْﺪَﻥَّ ﺃَﺻْﻨَﺎﻣَﻜُﻢ ﺑَﻌْﺪَ ﺃَﻥ ﺗُﻮَﻟُّﻮْﺍ ﻣُﺪْﺑِﺮِﻳْﻦَ – ‏)ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ৫২-৫৭(-ইবরাহীম স্বীয়পিতা ও সম্প্রদায়কে বলল, ‘এই মূর্তিগুলি কী যাদের তোমরা পূজারী হয়ে বসে আছ’?(আম্বিয়া ২১/৫২)। ‘তারা বলল, আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এরূপ পূজা করতেদেখেছি’(৫৩)। ‘সে বলল, তোমরা প্রকাশ্য গুমরাহীতে লিপ্ত আছ এবং তোমাদের বাপ-দাদারাও’(৫৪)। ‘তারা বলল, তুমি কি আমাদের কাছে সত্যসহ এসেছ, না কেবল কৌতুক করছ’?(৫৫)।‘সে বলল, না। তিনিই তোমাদের পালনকর্তা, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের পালনকর্তা, যিনিএগুলো সৃষ্টি করেছেন এবং আমি এ বিষয়ে তোমাদের উপর অন্যতম সাক্ষ্যদাতা’(৫৬)।‘আল্লাহর কসম! যখন তোমরা ফিরে যাবে, তখন আমি তোমাদের মূর্তিগুলোর ব্যাপারেএকটা কিছু করে ফেলব’(আম্বিয়া ২১/৫২-৫৭)।দাওয়াতের সারকথা ও ফলশ্রুতি :মূর্তিপূজারী পিতাও সম্প্রদায়ের নেতাদের নিকটে ইবরাহীমের দাওয়াত ও তাদের প্রদত্ত জবাবের সারকথাগুলি নিম্নরূপ:১. ইবরাহীম তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে দাওয়াত দেন। তিনিমূর্তি পূজার অসারতার বিষয়টি তাদের সামনে বলে দেন। কেননা এটি ছিল সকলেরসহজবোধ্য। কিন্তু তারা মূর্তিপূজার অসীলা ছাড়তে রাযী হয়নি। কারণ শিরকী প্রথার মধ্যেনেতাদের লাভ ছিল মাল-সম্পদ ও দুনিয়াবী সম্মানের নগদ প্রাপ্তি। পক্ষান্তরে আল্লাহরইবাদতের মধ্যে এসবের প্রাপ্তি যোগ নেই। শিরকী পূজা-পার্বনের মধ্যে গরীবদেরলাভ ছিল এই যে, এর ফলে তারা নেতাদের কাছ থেকে দুনিয়াবী সহযোগিতা পেত। এছাড়াও বিভিন্ন কাল্পনিক ও ভ্রান্ত বিশ্বাস তাদেরকে মূর্তিপূজায় প্ররোচিত করত। পক্ষান্তরেএকনিষ্ঠ তাওহীদ বিশ্বাস তাদেরকে এসব থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। যেখানেএক আল্লাহর গোলামীর অধীনে বড়-ছোট সবার জন্য সামাজিক সমানাধিকার নিশ্চিত হয়েযায়।২. মূর্তিপূজারীদের কোন সঙ্গত জবাব ছিল না। তারা কেবল একটা কথাই বলেছিল যে,এটা আমাদের বাপ-দাদাদের আমল থেকে চলে আসা প্রথা।৩. ইবরাহীমের এত কিছুবক্তব্যের পরেও এই অন্ধপূজারীরা বলল, আসলেই তুমি কোন সত্য এনেছ, না আমাদেরসাথে কৌতুক করছ? কারণ অদৃশ্য অহীর বিষয়টি তাদের বাস্তব জ্ঞানে আসেনি। কিন্তুমূর্তিকে তারা সামনে দেখতে পায়।সেখানে সেবা ও পূজা করে তারা তৃপ্তি পায়।৪. পিতাতাঁকে মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার হুমকি দিল এবং বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিল। কিন্তু তিনি পিতার জন্যআল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনার ওয়াদা করলেন। এর মধ্যে পিতার প্রতি সন্তানের কর্তব্যবোধ ফুটে উঠেছে, যদিও তিনি মুশরিক হন। পরে পিতার কুফরী পরিষ্কার হয়ে গেলে তিনিবিরত হন(তওবাহ ৯/১১৪)।৫. পিতা বহিষ্কার করলেও সম্প্রদায় তখনও বহিষ্কার করেনি। তাই তিনিপুনরায় দাওয়াতেমনোনিবেশ করলেন। যদিও তার ফলশ্রুতি ছিল পূর্বের ন্যায় শূন্য।তারকাপূজারীদের সাথে বিতর্ক :মূর্তি পূজারীদের সাথে বিতর্কের পরে তিনি তারকাপূজারীনেতাদের প্রতি তাওহীদের দাওয়াত দেন। কিন্তু তারাও মূর্তি পূজারীদের ন্যায় নিজ নিজবিশ্বাসে অটল রইল। অবশেষে তাঁর সাথে তাদের নেতাদের তর্কযুদ্ধ আবশ্যিক হয়েপড়ে। কেউ কেউ বলেছেন, ইবরাহীমের কওমের লোকেরাএকই সাথে মূর্তি ওতারকার পূজা করত। সেটাও অসম্ভব কিছু নয়।পবিত্র কুরআনে এই তর্কযুদ্ধ একটি অভিনব ওনাটকীয় ভঙ্গিতে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে সহজে আরবীয় পাঠক হৃদয়ে রেখাপাতকরে। কেননা হযরত ইবরাহীম (আঃ) ছিলেন সমগ্র আরবের লোকদের পিতামহ। তাঁর প্রতিগোটা আরব জাতি সম্মান প্রদর্শন করত। অথচ তাদেরপিতামহ যার বিরুদ্ধে জীবনভর লড়াইকরলেন জাহিল আরবরা সেই সব শিরকে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিল। যে কা‘বা গৃহকেইবরাহীম (আঃ) নির্মাণ করেন এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য। তারা সেখানেই মূর্তিপূজা শুরুকরে দিয়েছিল। অথচ মুখে আল্লাহকে স্বীকার করত এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈল (আঃ)-এরপ্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করত। আজকের মুসলমানদের জন্য এর মধ্যেশিক্ষণীয় বিষয়রয়েছে। কেননা তারাও মুখে আল্লাহকে স্বীকার করে এবং শেষনবীর প্রতি গভীরশ্রদ্ধা পোষণ করে। অথচ নিজেরা কবর পূজা ও স্থানপূজার শিরকে লিপ্ত রয়েছে। আল্লাহরবিধানের অবাধ্যতা ও তার পরিবর্তে নিজেদের মনগড়া বিধান সমূহের আনুগত্য তোরয়েছেই। এক্ষণে আমরাকুরআনে বর্ণিত ইবরাহীমের অপর বিতর্ক যুদ্ধটির বিবরণ পেশকরব।-আল্লাহ বলেন, ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧُﺮِﻱْ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﻣَﻠَﻜُﻮْﺕَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﻭَﺍﺕِ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽِ ﻭَﻟِﻴَﻜُﻮْﻥَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﻮْﻗِﻨِﻴْﻦَ، ﻓَﻠَﻤَّﺎﺟَﻦَّ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞُ ﺭَﺃَﻯ ﻛَﻮْﻛَﺒﺎً ﻗَﺎﻝَ ﻫَـﺬَﺍ ﺭَﺑِّﻲ ﻓَﻠَﻤَّﺎﺃَﻓَﻞَ ﻗَﺎﻝَ ﻻ ﺃُﺣِﺐُّ ﺍﻵﻓِﻠِﻴْﻦَ، ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺭَﺃَﻯ ﺍﻟْﻘَﻤَﺮَ ﺑَﺎﺯِﻏﺎً ﻗَﺎﻝَﻫَـﺬَﺍ ﺭَﺑِّﻲْ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺃَﻓَﻞَ ﻗَﺎﻝَ ﻟَﺌِﻦ ﻟَّﻤْﻴَﻬْﺪِﻧِﻲْ ﺭَﺑِّﻲ ﻟَﺄَﻛُﻮْﻧَﻦَّ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟﻀَّﺂﻟِّﻴْﻦَ، ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺭَﺃَﻯ ﺍﻟﺸَّﻤْﺲَ ﺑَﺎﺯِﻏَﺔً ﻗَﺎﻝَﻫَـﺬَﺍ ﺭَﺑِّﻲْ ﻫَـﺬَﺍ ﺃَﻛْﺒَﺮُ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺃَﻓَﻠَﺖْ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺇِﻧِّﻲْ ﺑَﺮِﻱﺀٌ ﻣِّﻤَّﺎ ﺗُﺸْﺮِﻛُﻮْﻥَ، ﺇِﻧِّﻲ ﻭَﺟَّﻬْﺖُ ﻭَﺟْﻬِﻲَ ﻟِﻠَّﺬِﻱْ ﻓَﻄَﺮَﺍﻟﺴَّﻤَﺎﻭَﺍﺕِ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽَ ﺣَﻨِﻴْﻔﺎً ﻭَّﻣَﺎ ﺃَﻧَﺎْ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺸْﺮِﻛِﻴْﻦَ، ﻭَﺣَﺂﺟَّﻪُ ﻗَﻮْﻣُﻪُ ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺗُﺤَﺎﺟُّﻮﻧِّﻲ ﻓِﻲ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﻗَﺪْ ﻫَﺪَﺍﻥِﻭَﻻَ ﺃَﺧَﺎﻑُ ﻣَﺎ ﺗُﺸْﺮِﻛُﻮْﻥَ ﺑِﻪِ ﺇِﻻَّ ﺃَﻥ ﻳَّﺸَﺂﺀَ ﺭَﺑِّﻲْ ﺷَﻴْﺌﺎً ﻭَﺳِﻊَ ﺭَﺑِّﻲْ ﻛُﻞَّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻋِﻠْﻤﺎً ﺃَﻓَﻼَ ﺗَﺘَﺬَﻛَّﺮُﻭْﻥَ، ﻭَﻛَﻴْﻒَﺃَﺧَﺎﻑُ ﻣَﺎ ﺃَﺷْﺮَﻛْﺘُﻢْ ﻭَﻻَ ﺗَﺨَﺎﻓُﻮْﻥَ ﺃَﻧَّﻜُﻢْ ﺃَﺷْﺮَﻛْﺘُﻢْ ﺑِﺎﻟﻠّﻪِ ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﻳُﻨَﺰِّﻝْ ﺑِﻪِ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﺳُﻠْﻄَﺎﻧﺎً ﻓَﺄَﻱُّ ﺍﻟْﻔَﺮِﻳْﻘَﻴْﻦِ ﺃَﺣَﻖُّﺑِﺎﻷَﻣْﻦِ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ، ﺍﻟَّﺬِﻳْﻨَﺂﻣَﻨُﻮﺍ ﻭَﻟَﻢْ ﻳَﻠْﺒِﺴُﻮْﺍ ﺇِﻳﻤَﺎﻧَﻬُﻢْ ﺑِﻈُﻠْﻢٍ ﺃُﻭﻟَـﺌِﻚَ ﻟَﻬُﻢُ ﺍﻷَﻣْﻦُ ﻭَﻫُﻢﻣُّﻬْﺘَﺪُﻭْﻥَ- ‏) ﺍﻷﻧﻌﺎﻡ ৭৫-৮২(-‘আমি এরূপভাবেই ইবরাহীমকে নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলেরঅত্যাশ্চর্য বস্ত্তসমূহ দেখাতেলাগলাম, যাতে সে দৃঢ়বিশ্বাসীদেরঅন্তর্ভুক্ত হয়েযায়’(আন‘আম ৬/৭৫)। ‘অনন্তর যখন রাত্রির অন্ধকার তার উপরে সমাচ্ছন্ন হ’ল, তখন সে তারকাদেখে বলল যে, এটি আমার পালনকর্তা। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হ’ল, তখন বলল, আমিঅস্তগামীদের ভালবাসি না’(৭৬)। ‘অতঃপর যখন চন্দ্রকে ঝলমল করতে দেখল, তখন সেবলল, এটি আমার পালনকর্তা। কিন্তু পরে যখন তা অস্তমিত হ’ল, তখন বলল, যদি আমার প্রতিপালকআমাকে পথ প্রদর্শন নাকরেন, তাহ’লে অবশ্যই আমি পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তহয়ে যাব’(৭৭)। ‘অতঃপর যখন উদীয়মান সূর্যকে ডগমগে দেখতে পেল, তখন বলল, এটিইআমার পালনকর্তা এবং এটিই সবচেয়েবড়। কিন্তু পরে যখন তা ডুবে গেল,তখন বলল, হেআমার সম্প্রদায়! তোমরা যেসব বিষয়কে শরীক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত’(৭৮)। ‘আমিআমার চেহারাকে ঐ সত্তার দিকে একনিষ্ঠকরছি, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডল সৃষ্টি করেছেনএবং আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই’(৭৯)। ‘(তখন) তার সম্প্রদায় তার সাথে বিতর্ক করল।সে বলল, তোমরা কি আমার সাথে আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করছ? অথচ তিনি আমাকে সরলপথ দেখিয়েছেন। আর আমি ভয় করিনা তাদের, যাদেরকে তোমরা তাঁর সাথে শরীক কর,তবে আমার পালনকর্তা যদিকিছু (কষ্ট দিতে) চান। আমার প্রভুর জ্ঞান সবকিছুতেই পরিব্যপ্ত।তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না’?(৮০)। ‘কিভাবে আমিঐসব বস্ত্তকে ভয় করব,যাদেরকে তোমরা তাঁর সাথে শরীক করেছ? অথচ তোমরা এ বিষয়ে ভয় পাওনা যে,তোমরা আল্লাহর সাথে এমন সব বস্ত্তকে শরীক করেছ, যাদের সম্পর্কে আল্লাহতোমাদের প্রতি কোন প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি। এক্ষণে উভয় দলের মধ্যে কেবেশী নিরাপত্তা লাভের অধিকারী? যদি তোমরা জ্ঞানী হয়ে থাক’(৮১)। ‘যারাঈমান আনেএবং স্বীয় ঈমানকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যই রয়েছে নিরাপত্তা এবংতারাই হ’ল সুপথপ্রাপ্ত’(আন‘আম৬/৭৫-৮২)।উপরের বর্ণনা ভঙ্গিতে মনে হয় যেন ইবরাহীমঐ দিনই প্রথম নক্ষত্র, চন্দ্র ও সূর্য দেখলেন এবং ‘এটি আমার পালনকর্তা’ বলে সাময়িকভাবেমুশরিক হয়েছিলেন। পরে শিরক পরিত্যাগ করে মুসলিম হ’লেন। অথচ ঘটনা মোটেই তা নয়।কেননা ঐ সময় ইবরাহীম (আঃ) অন্যূন সত্তরোর্ধ্ব বয়সের নবী। আর নবীগণ জন্মথেকেই নিষ্পাপ ও শিরকমুক্ত থাকেন। আসল কথা হ’ল এইযে, মূর্তি পূজার অসারতা বুঝানোযতটা সহজ ছিল, তারকা পূজার অসারতা বুঝানো ততটা সহজ ছিল না। কেননা ওটা মানুষেরধরাছোঁয়ার বাইরে। তাই ইবরাহীম (আঃ) এখানে বৈজ্ঞানিক পন্থা বেছে নিলেন এবংজনগণেরসহজবোধ্য এমন একটি প্রমাণ উপস্থাপন করলেন, যাতে তাদের লা-জওয়াব হওয়া ব্যতীতকোন উপায় ছিল না। তিনি সৌরজগতের গতি-প্রকৃতি যে আল্লাহর হুকুমেরঅধীন, সে কথা নাবলে তাদের অস্তমিত হওয়ার বিষয়টিকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করেন। কারণ এটাই ছিল তাদেরজন্যে সহজবোধ্য। তিনি বলেন, যা ক্ষয়ে যায়, ডুবে যায়, হারিয়ে যায়, নিজেকে টিকিয়েরাখতে পারে না, ধরে রাখতে পারে না, বরং দৈনিক ওঠে আর ডোবে, সে কখনোমানুষের প্রতিপালক হ’তে পারে না। বরং সর্বোচ্চ পালনকর্তা কেবল তিনিই হ’তে পারেন, যিনিএসব কিছুর সৃষ্টিকর্তা ও বিধানদাতা। আর তিনিই হ’লেন ‘আল্লাহ’। আমি তাঁর দিকেই ফিরে গেলামএবং বাপ-দাদার আমল থেকে তোমরা যে শিরক করে আসছ, আমি তা থেকে নিজেকেমুক্ত ঘোষণা করলাম।বলা বাহুল্য, এর অন্তর্নিহিত দাওয়াত ছিল এই যে, হে আমার জাতি!তোমরাও আমার মত আল্লাহর দিকে ফিরে এসো এবং শিরক হ’তে মুক্ত হও। কিন্তুইবরাহীমের এই তর্কযুদ্ধ নিষ্ফল হ’ল। সম্প্রদায়ের নেতারা নিজ নিজ মতের উপরে দৃঢ়রইল। কেউ তাঁর আহবানে সাড়া দিল না।একটি সংশয় ও তার জওয়াব :৭৫ হ’তে ৮২ পর্যন্ত ৮টিআয়াতে যে বিষয়গুলি আলোচিত হয়েছে, এটি ইবরাহীমের শিশুকালে জ্ঞান-বুদ্ধির বয়সহবার সময়কার ঘটনা, নাকি নবী হবার পরের তর্কানুষ্ঠান, এ বিষয়ে বিদ্বানগণ মতভেদকরেছেন। ইবনু জারীর (মৃঃ ৩১০ হিঃ) প্রথমোক্ত মত পোষণ করেন। তিনি এ বিষয়েআলী ইবনে ত্বালহার সূত্রে ইবনু আববাস (রাঃ)-এর বর্ণনা পেশ করেছেন। তবে এইবর্ণনাটির সনদ যঈফ।[7]মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক্ব (৮৫-১৫০ হিঃ) বর্ণিত কিছু অলৌকিক ঘটনা উল্লেখিতহয়েছে, যা উক্ত মতকে সমর্থন করে। যেমন বাদশাহ নমরূদ যখন জানতে পারেন যে,অচিরেই একটিপুত্র সন্তান জন্মলাভ করবে, যে তার রাজ্য হারানোর কারণ হবে, তখনতিনিনবজাতক সকল পুত্র সন্তানকেহত্যা করার নির্দেশ জারি করেন। ইবরাহীমের মা তখন একটিপাহাড়ের গোপন গুহায় লুকিয়ে ইবরাহীমকে প্রসব করেন এবং ইবরাহীম একাকীসেখানে বড় হন। ইবরাহীমের এক আঙ্গুল দিয়ে দুধ বের হ’ত, এক আঙ্গুল দিয়ে মধুবের হ’ত ও এক আঙ্গুল দিয়ে পানি বের হ’ত। এভাবেতিনি সেখানে তিন বছর কাটান। তারপরতিনি সেখান থেকে বের হয়ে এসে মাকে বলেন, আমার প্রভু কে? মাবললেন, নমরূদ।তিনি বললেন, নমরূদের প্রভু কে? তখন মা তাকে চড় মারলেন এবং তিনি বুঝলেন এটিই হ’লসেই ছেলে, যার সম্পর্কে বাদশাহ নমরূদ আগেই স্বপ্ন দেখেছেন। সুদ্দী, যাহহাকপ্রমুখের বরাতে কাসাঈ স্বীয় ক্বাছাছুল আম্বিয়ার মধ্যে এ ধরনের অনেক অলৌকিক ঘটনাবর্ণনা করেছেন(ইবনু কাছীর, কুরতুবী)। অতঃপর ইবরাহীম গুহা থেকে বের হয়ে প্রথমতারকা দেখলেন, তারপর চন্দ্র দেখলেন, তারপর সূর্য দেখলেন। অতঃপর সবকিছুর ডুবেযাওয়া দেখে নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন যে, প্রকৃত পালনকর্তা তিনি, যিনি এগুলিকে সৃষ্টিকরেছেন(কুরতুবী)। ইবনু জারীর দলীল এনেছেন ইবরাহীমের একথা দ্বারা,যেখানে তিনি বলেছেন, ﻟَﺌِﻦ ﻟَّﻢْ ﻳَﻬْﺪِﻧِﻲ ﺭَﺑِّﻲ ﻷﻛُﻮﻧَﻨَّﻤِﻦَ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟﻀَّﺎﻟِّﻴﻦَ ، ‘যদি আমার প্রতিপালকআমাকে পথ না দেখান, তাহ’লে অবশ্যই আমি পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’(আন‘আম৬/৭৭)।ইবনু কাছীর (৭০১-৭৭৪ হিঃ) বলেন, বরং সঠিক কথা এই যে, ইবরাহীমের উপরোক্তঘটনা ছিল তার কওমের সাথে একটি তর্কানুষ্ঠান মাত্র। এটি কখনোই তার শিশুকালের ঘটনা নয় এবংতিনি ক্ষণিকের তরেও কখনো মুশরিক হননি। কেননা তাঁর সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﺇِﻥَّﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴﻢَ ﻛَﺎﻥَ ﺃُﻣَّﺔً ﻗَﺎﻧِﺘﺎً ﻟِﻠّﻪِ ﺣَﻨِﻴﻔﺎً ﻭَﻟَﻢْ ﻳَﻚُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺸْﺮِﻛِﻴﻦَ ، ‘নিশ্চয়ই ইবরাহীম ছিলেন একটি উম্মতএবং আল্লাহর প্রতি অনুগত ও একনিষ্ঠ। আর তিনি কখনোই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেননা’(নাহল ১৬/১২০)। তাছাড়া প্রত্যেক মানব শিশুই জন্মগতভাবে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ থাকে।যেমন আল্লাহ বলেন, ﺧَﻠَﻘْﺖُ ﻋﺒﺎﺩﻯ ﺣُﻨَﻔَﺎﺀَ ‘আমি আমার বান্দাদের সৃষ্টি করি আল্লাহর প্রতিএকনিষ্ঠ হিসাবে’।[8]সাধারণ মানবশিশু যদি এরূপ হয়, তাহ’লে শিশু ইবরাহীম কেন মুশরিক হবেন?আর এটা যে কওমের নেতাদের সাথে তাঁর একটি তর্কানুষ্ঠান ছিল, তার বড় প্রমাণ এই যে, ৮০নং আয়াতে বলা হয়েছে ﻭَﺣَﺂﺟَّﻪُ ﻗَﻮْﻣُﻪُ ‘তাঁর কওম তাঁর সাথে বিতর্ক করল’।তাছাড়া তর্ক শেষেতিনি তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺇِﻧِّﻲ ﺑَﺮِﻱﺀٌﻣِّﻤَّﺎ ﺗُﺸْﺮِﻛُﻮﻥَ ، ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরাযেসব বিষয়কে শরীক কর, আমি ওসব থেকে মুক্ত’(আন‘আম ৬/৭৮)।বলা বাহুল্য তারকাপূজারী নেতাদের সাথে ইবরাহীম (আঃ)-এর বিতর্কের ঘটনাটি কুরআন অত্যন্ত উঁচুমানেরআলংকরিক ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছে, যা একটি বাস্তব ও অতুলনীয় বাণীচিত্রের রূপ ধারণকরেছে। যেমন ইবরাহীম (আঃ) উক্ত নেতাদের বলছেন, তোমাদের ধারণা অনুযায়ীধরে নিলাম আকাশের ঐ নক্ষত্র, চন্দ্র ও সূর্য সকলেই ‘আমার রব’। কিন্তু ওরা যে ডুবেগেল। যারা নিজেরা ডুবে যায়, তারাআমাকে বা তোমাদেরকে কিভাবে রক্ষা করবে? অতএবআমি তোমাদের শিরকী আক্বীদা হ’তে মুক্ত। আমি এদের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতিএকনিষ্ঠ ও অনুগত রইলাম। তোমরাও এদিকে ফিরে এসো। যেমন ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহমুশরিকদের ডেকে বলবেন, ﺃَﻳْﻦَ ﺷُﺮَﻛَﺎﺋِﻴَﺎﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻛُﻨﺘُﻢْ ﺗَﺰْﻋُﻤُﻮﻥَ ‘তোমাদের ধারণা অনুযায়ীআমার শরীকরা কোথায়?(ক্বাছাছ ২৮/৬২)। অর্থাৎ তোমাদের দাবী অনুযায়ী ওরা আমারশরীক। অথচ আল্লাহর কোন শরীক নেই।ইবরাহীম মূর্তি ভাঙ্গলেন :জ্ঞানীদেরইশারাই যথেষ্ট। কিন্তু মানুষ যখন কোন কিছুর প্রতি অন্ধভক্তি পোষণ করে, তখন শতযুক্তিও কোন কাজ দেয় না। ফলে ইবরাহীম ভাবলেন, এমন কিছু একটা করা দরকার, যাতে পুরাসমাজ নড়ে ওঠে ও ওদের মধ্যে হুঁশ ফিরে আসে।সাথে সাথে তাদের মধ্যেতাওহীদী চেতনার উন্মেষ ঘটে। সেমতে তিনি সম্প্রদায়ের কেন্দ্রীয় দেবমন্দিরেগিয়ে মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলার সংকল্প করলেন।ইবরাহীম (আঃ)-এর সম্প্রদায়বছরেরএকটা বিশেষ দিনে উৎসব পালন করত ওসেখানে নানারূপ অপচয় ও অশোভন কাজকরত। যেমন আজকাল প্রবৃত্তি পূজারী ও বস্ত্তবাদী লোকেরা করেথাকে কথিতসংস্কৃতির নামে। এইসবমেলায় সঙ্গত কারণেই কোন নবীর যোগদান করা সম্ভব নয়।কওমের লোকেরা তাকে উক্ত মেলায় যোগদানের আমন্ত্রণ জানালো। কিন্তু তিনিঅসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে সেখানে যেতে অপারগতা প্রকাশ করলেন(ছাফফাত ৩৭/৮৯)।অতঃপর তিনি ভাবলেন, আজকের এই সুযোগে আমি ওদের দেবমন্দিরে প্রবেশ করেমূর্তিগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেব। যাতে ওরা ফিরে এসে ওদের মিথ্যাউপাস্যদের অসহায়ত্বের বাস্তব দৃশ্য দেখতে পায়। হয়তবা এতে তাদের অনেকেরমধ্যে হুঁশ ফিরবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান জাগ্রত হবে ও শিরক থেকে তওবা করবে।অতঃপর তিনি দেবালয়ে ঢুকে পড়লেন ও দেব-দেবীদের দিকে লক্ষ্য করে বললেন,(তোমাদের সামনে এত নযর-নেয়ায ও ভোগ-নৈবেদ্য রয়েছে)।অথচ ‘তোমরা তা খাচ্ছনা কেন? কি ব্যাপার তোমরা কথা বলছ না কেন? তারপর তিনি ডান হাতে রাখা (সম্ভবতঃ কুড়ালদিয়ে) ভীষণ জোরে আঘাত করে সবগুলোকে গুঁড়িয়ে দিলেন(ছাফফাত ৩৭/৯১-৯৩)।তবে বড় মূর্তিটাকে পূর্বাবস্থায় রেখে দিলেন, যাতে লোকেরা তার কাছে ফিরে যায়(আম্বিয়া ২১/৫৮)।মেলা শেষে লোকজন ফিরে এল এবং যথারীতি দেবমন্দিরে গিয়েপ্রতিমাগুলির অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে গেল। ‘তারা বলাবলি করতে লাগল, এটা নিশ্চয়ইইবরাহীমের কাজ হবে। কেননা তাকেইআমরা সবসময় মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে বলতে শুনি।অতঃপর ইবরাহীমকে সেখানে ডেকে আনা হ’ল এবং জিজ্ঞেস করল, ﺃَﺃَﻧﺖَ ﻓَﻌَﻠْﺖَ ﻫَﺬَﺍﺑِﺂﻟِﻬَﺘِﻨَﺎ ﻳَﺎ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴﻢُ؟ ‘হে ইবরাহীম! তুমিই কি আমাদের উপাস্যদের সাথেএরূপ আচরণ করেছ’?(আম্বিয়া ২১/৬২)।ইবরাহীম বললেন, ﺑَﻞْ ﻓَﻌَﻠَﻪُ ﻛَﺒِﻴﺮُﻫُﻢْ ﻫَﺬَﺍﻓَﺎﺳْﺄَﻟُﻮﻫُﻢْ ﺇِﻥْ ﻛَﺎﻧُﻮﺍ ﻳَﻨْﻄِﻘُﻮْﻥَ -‘বরং এই বড়মূর্তিটাই একাজ করেছে। নইলে এদেরকে জিজ্ঞেস কর, যদি তারা কথাবলতেপারে’(আম্বিয়া ২১/৬৩)। সম্প্রদায়ের নেতারা একথা শুনে লজ্জা পেল এবং মাথা নীচু করেবলল, ﻗَﺪْ ﻋَﻠِﻤْﺖَ ﻣَﺎ ﻫَﺆُﻻَﺀ ﻳَﻨْﻄِﻘُﻮْﻥَ -‘তুমি তো জানো যে, এরা কথা বলে না’। ‘তিনি বললেন, ﻗَﺎﻝَﺃَﻓَﺘَﻌْﺒُﺪُﻭْﻥَ ﻣِﻦْ ﺩُﻭْﻥِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣَﺎﻻَ ﻳَﻨﻔَﻌُﻜُﻢْ ﺷَﻴْﺌﺎً ﻭَّﻻَ ﻳَﻀُﺮُّﻛُﻢْ -‘তোমরাকি আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুরইবাদত কর, যা তোমাদের উপকারও করতে পারে না, ক্ষতিও করতে পারে না’(আম্বিয়া২১/৬৫-৬৬)। তিনি আরও বললেন, ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺗَﻌْﺒُﺪُﻭﻥَ ﻣَﺎ ﺗَﻨْﺤِﺘُﻮﻥَ، ﻭَﺍﻟﻠﻪ ﺧَﻠَﻘَﻜُﻢْ ﻭَﻣَﺎ ﺗَﻌْﻤَﻠُﻮﻥَ -‘তোমরাএমন বস্ত্তর পূজা কর, যা তোমরা নিজ হাতে তৈরী কর’? ‘অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে ওতোমাদের কর্মসমূহকে সৃষ্টি করেছেন’(ছাফফাত ৩৭/৯৫-৯৬)। ﺃُﻑٍّ ﻟَّﻜُﻢْ ﻭَﻟِﻤَﺎ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭﻥَ ﻣِﻦْ ﺩُﻭﻥِﺍﻟﻠﻪِ ﺃَﻓَﻼَ ﺗَﻌْﻘِﻠُﻮﻥَ -‘ধিক তোমাদের জন্য এবং আল্লাহ ব্যতীততোমরা যাদের পূজা কর, ওদেরজন্য।তোমরা কি বুঝ না’?(আম্বিয়া ২১/৬৭)।তারপর যা হবার তাই হ’ল। যিদ ও অহংকারের বশবর্তীহয়ে সম্প্রদায়ের নেতারা ইবরাহীমকে চূড়ান্ত শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করল। তারা সিদ্ধান্তনিল যে, একে আর বাঁচতে দেওয়া যাবে না। শুধু তাই নয়, একে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়েমারতে হবে, যেন কেউ এর দলে যেতে সাহস না করে। তারা তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়েমারার প্রস্তাব গ্রহণ করল এবং সেটা বাদশাহ নমরূদের কাছে পেশ করল। সম্রাটের মন্ত্রীওদেশের প্রধান পুরোহিতের ছেলে ইবরাহীম। অতএব তাকে সরাসরি সম্রাটের দরবারেআনা হ’ল।নমরূদের সঙ্গে বিতর্ক ও অগ্নিপরীক্ষা :ইবরাহীম (আঃ) এটাকে সর্বোচ্চপর্যায়ে তাওহীদের দাওয়াত দেওয়ার সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করলেন। নমরূদ ৪০০ বছরধরে রাজত্ব করায় সে উদ্ধত ও অহংকারী হয়ে উঠেছিল এবং নিজেকে একমাত্র উপাস্যভেবেছিল। তাই সে ইবরাহীমকে জিজ্ঞেস করল, বল তোমার উপাস্য কে? নমরূদভেবেছিল, ইবরাহীম তাকেই উপাস্য বলে স্বীকার করবে। কিন্তু নির্ভীক কণ্ঠেইবরাহীম জবাব দিলেন, ﺭَﺑِّﻲَ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻳُﺤْﻴِـﻲْ ﻭَﻳُﻤِﻴْﺖُ ‘আমার পালনকর্তা তিনি, যিনি মানুষকে বাঁচান ওমারেন’। মোটাবুদ্ধির নমরূদ বলল, ﺃَﻧَﺎ ﺃُﺣْﻴِـﻲْ ﻭَﺃُﻣِﻴْﺖُ ‘আমিও বাঁচাই ও মারি’। অর্থাৎ মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তআসামীকে খালাস দিয়ে মানুষকে বাঁচাতে পারি। আবার খালাসের আসামীকে মৃত্যুদন্ড দিতেপারি। এভাবে সেনিজেকেই মানুষের বাঁচা-মরার মালিক হিসাবে সাব্যস্ত করল। ইবরাহীম তখনদ্বিতীয় যুক্তি পেশকরে বললেন, ﻓَﺈِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻳَﺄْﺗِﻲْ ﺑِﺎﻟﺸَّﻤْﺲِ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤَﺸْﺮِﻕِ ﻓَﺄْﺕِ ﺑِﻬَﺎ ﻣِﻦَﺍﻟْﻤَﻐْﺮِﺏِ ‘আমার আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, আপনি তাকে পশ্চিম দিকহ’তেউদিত করুন’। ﻓَﺒُﻬِﺖَ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻛَﻔَﺮَ ‘অতঃপর কাফের (নমরূদ) এতে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লো’(বাক্বারাহ২/২৫৮)।কওমের নেতারাই যেখানে পরাজয়কে মেনে নেয়নি, সেখানে দেশেরএকচ্ছত্র সম্রাট কেন পরাজয়কে মেনে নিবেন। যথারীতি তিনিও অহংকারে ফেটেপড়লেন এবং ইবরাহীমকে জ্বলন্ত হুতাশনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার নির্দেশ জারিকরলেন। সাথে সাথে জনগণকে ধর্মের দোহাই দিয়ে বললেন, ﺣَﺮِّﻗُﻮﻩُ ﻭَﺍﻧﺼُﺮُﻭﺍ ﺁﻟِﻬَﺘَﻜُﻢْﺇِﻥْ ﻛُﻨﺘُﻢْ ﻓَﺎﻋِﻠِﻴْﻦَ ‘তোমরা একে পুড়িয়ে মার এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদিতোমরা কিছু করতে চাও’(আম্বিয়া ২১/৬৮)। উল্লেখ্য যে, কুরআন কোথাও নমরূদের নামউল্লেখ করেনিএবং সে যে নিজেকে ‘সর্বোচ্চ উপাস্য’ দাবী করেছিল, এমন কথাওস্পষ্টভাবে বলেনি। তবে ‘আমিও বাঁচাতে পারি ও মারতে পারি’(বাক্বারাহ ২/২৫৮)তার এই কথারমধ্যে তার সর্বোচ্চ অহংকারী হবার এবং ইবরাহীমের ‘রব’-এর বিপরীতে নিজেকেএভাবে উপস্থাপন করায় সে নিজেকে ‘সর্বোচ্চ রব’ হিসাবে ধারণা করেছিল বলেপ্রতীয়মান হয়। প্রধানত: ইস্রাঈলী বর্ণনাসমূহের উপরে ভিত্তি করেই ‘নমরূদ’-এর নাম ওতার রাজত্ব সম্পর্কে জানা যায়। কুরআন কেবল অতটুকুই বলেছে, যতটুকু মানব জাতিরহেদায়াতের জন্য প্রয়োজন।যুক্তিতর্কে হেরে গিয়ে নমরূদ ইবরাহীম (আঃ)-কেজীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুকুম দিল। অতঃপর তার জন্য বিরাটাকারের আয়োজন শুরু হয়ে গেল।আল্লাহ বলেন, ﻭَﺃَﺭَﺍﺩُﻭْﺍ ﺑِﻪِ ﻛَﻴْﺪﺍً ﻓَﺠَﻌَﻠْﻨَﺎﻫُﻢُ ﺍﻟْﺄَﺧْﺴَﺮِﻳْﻦَ ، ‘তারা ইবরাহীমের বিরুদ্ধে মহা ফন্দিঅাঁটতে চাইল। অতঃপর আমরা তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্তকরে দিলাম’(আম্বিয়া ২১/৭০)।অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ﻓَﺠَﻌَﻠْﻨَﺎﻫُﻢُ ﺍﻟْﺄَﺳْﻔَﻠِﻴﻦَ ، ‘আমরা তাদেরকে পরাভূত করেদিলাম’(ছাফফাত৩৭/৯৮)।অতঃপর ‘একটা ভিত নির্মাণ করা হ’ল এবং সেখানে বিরাট অগ্নিকুন্ড তৈরী করা হ’ল। তারপরসেখানে তাকেনিক্ষেপ করা হ’ল’(ছাফফাত ৩৭/৯৭)। ছহীহ বুখারীতে হযরত আব্দুল্লাহইবনে আববাস (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে যে, জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপের সময়ইবরাহীম (আঃ) বলে ওঠেন, ﺣَﺴْﺒُﻨَﺎ ﺍﻟﻠﻪُ ﻭَﻧِﻌْﻢَ ﺍﻟْﻮَﻛِﻴﻞُ ، ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতইনা সুন্দর তত্ত্বাবধায়ক’।[9]একই প্রার্থনা শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) করেছিলেন, ওহোদ যুদ্ধেআহত মুজাহিদগণ যখন শুনতেপান যে, আবু সুফিয়ান মক্কায় ফিরেনা গিয়ে পুনরায় ফিরে আসছেমদীনায় মুসলিম শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য, তখন ‘হামরাউল আসাদে’ উপনীত তারপশ্চাদ্ধাবনকারী ৭০ জন আহত ছাহাবীর ক্ষুদ্র দল রাসূলের সাথে সমস্বরে বলেউঠেছিল ﺣَﺴْﺒُﻨَﺎ ﺍﻟﻠّﻪُ ﻭَﻧِﻌْﻢَ ﺍﻟْﻮَﻛِﻴْﻞُ ، ‘আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কতই না সুন্দরতত্ত্বাবধায়ক’ ঘটনাটি কুরআনেও বর্ণিত হয়েছে’।[10]এভাবে পিতা ইবরাহীম ও পুত্রমুহাম্মাদের বিপদ মুহূর্তের বক্তব্যে শব্দে শব্দে মিল হয়ে যায়। তবে সার্বিক প্রচেষ্টারসাথেই কেবল উক্ত দো‘আ পাঠ করতে হবে। নইলে কেবল দো‘আ পড়ে নিষ্ক্রিয়বসে থাকলে চলবে না। যেমন ইবরাহীম (আঃ) সর্বোচ্চ পর্যায়ে দাওয়াত দিয়ে চূড়ান্তবিপদের সময় এ দো‘আ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বিরোধী পক্ষের সেনাপতি আবুসুফিয়ানের পশ্চাদ্ধাবনের পরেই উক্ত দো‘আ পড়েছিলেন।বস্ত্ততঃ এই কঠিন মুহূর্তেরপরীক্ষায় জয়লাভ করার পুরস্কার স্বরূপ সাথে সাথে আল্লাহর নির্দেশ এল ﻗُﻠْﻨَﺎ ﻳَﺎ ﻧَﺎﺭُ ﻛُﻮﻧِﻲْﺑَﺮْﺩﺍً ﻭَّﺳَﻼَﻣﺎً ﻋَﻠَﻰ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴﻢَ ، ‘হে আগুন! ঠান্ডা হয়ে যাও এবং ইবরাহীমের উপরে শান্তিদায়কহয়ে যাও’(আম্বিয়া ২১/৬৯)। অতঃপর ইবরাহীম মুক্তি পেলেন।অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণহয়ে ইবরাহীম (আঃ) ফিরে আসেন এবং এভাবে আল্লাহ কাফিরদের সমস্ত কৌশল বরবাদ করেদেন। এরপর শুরু হ’ল জীবনের আরেক অধ্যায়।হিজরতের পালা :ইসলামী আন্দোলনেদাওয়াত ও হিজরতঅঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তৎকালীন পৃথিবীর সমৃদ্ধতম নগরী ছিল বাবেল, যাবর্তমানে ‘বাগদাদ’ নামেপরিচিত।[11]তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে এবং মূর্তিপূজারী ওতারকাপূজারী নেতাদের সাথে তর্কযুদ্ধে জয়ী হয়ে অবশেষে অগ্নিপরীক্ষায়উত্তীর্ণ হওয়ার ফলে ইবরাহীমের দাওয়াত ও তার প্রভাব সকলের নিকটে পৌঁছেগিয়েছিল। যদিও সমাজপতি ও শাসকদের অত্যাচারের ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ ইসলাম কবুলেরঘোষণা দেয়নি। কিন্তু তাওহীদের দাওয়াত তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল এবং তা সাধারণজনগণের হৃদয়ে আসন গেড়ে নিয়েছিল।অতএব এবার অন্যত্র দাওয়াতের পালা। ইবরাহীম(আঃ) সত্তরোর্ধ্ব বয়সে অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হন। এই দীর্ঘ দিন দাওয়াত দেওয়ারপরেও নিজের স্ত্রী সারাহ ও ভাতিজা লূত ব্যতীত কেউ প্রকাশ্যে ঈমান আনেনি। ফলেপিতাও সম্প্রদায় কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে তিনি আল্লাহর হুকুমে হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন।যাওয়ার পূর্বে তিনি নিজ সম্প্রদায়কে ডেকে যে বিদায়ী ভাষণ দেন, তার মধ্যে সকলযুগের তাওহীদবাদী গণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় লুকিয়ে রয়েছে।ইবরাহীমের হিজরত-পূর্ব বিদায়ী ভাষণ:আল্লাহর ভাষায়, ﻗَﺪْ ﻛَﺎﻧَﺖْ ﻟَﻜُﻢْ ﺃُﺳْﻮَﺓٌ ﺣَﺴَﻨَﺔٌ ﻓِﻲ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴﻢَﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻣَﻌَﻪُ ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻟِﻘَﻮْﻣِﻬِﻢْ ﺇِﻧَّﺎ ﺑُﺮَﺁﺅُﺍ ﻣِﻨﻜُﻢْ ﻭَﻣِﻤَّﺎ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭْﻥَ ﻣِﻦْ ﺩُﻭْﻥِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻛَﻔَﺮْﻧَﺎ ﺑِﻜُﻢْ ﻭَﺑَﺪَﺍ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﺑَﻴْﻨَﻜُﻢُﺍﻟْﻌَﺪَﺍﻭَﺓُ ﻭَﺍﻟْﺒَﻐْﻀَﺎﺀُ ﺃَﺑَﺪﺍً ﺣَﺘَّﻰ ﺗُﺆْﻣِﻨُﻮْﺍ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻭَﺣْﺪَﻩُ ﺇِﻻَّ ﻗَﻮْﻝَ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﻟِﺄَﺑِﻴْﻪِ ﻟَﺄَﺳْﺘَﻐْﻔِﺮَﻥَّ ﻟَﻚَ ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻣْﻠِﻚُ ﻟَﻚَﻣِﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣِﻦْ ﺷَﻲْﺀٍ، ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﺗَﻮَﻛَّﻠْﻨَﺎ ﻭَﺇِﻟَﻴْﻚَ ﺃَﻧَﺒْﻨَﺎ ﻭَﺇِﻟَﻴْﻚَ ﺍﻟْﻤَﺼِﻴﺮُ -‘তোমাদের জন্য ইবরাহীম ওতার সাথীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে। যখন তারা তাদের সম্প্রদায়কেবলেছিল, আমরা সম্পর্ক ছিন্ন করছি তোমাদের সাথে এবং তাদের সাথে যাদেরকেতোমরা পূজা কর আল্লাহ্কে বাদ দিয়ে। আমরা তোমাদেরকে প্রত্যাখ্যান করছি এবংআমাদের ওতোমাদের মাঝে স্থায়ী শত্রুতা ওবিদ্বেষ বিঘোষিত হ’ল যতদিন না তোমরাকেবলমাত্র এক আল্লাহর উপরে বিশ্বাস স্থাপন করবে। … প্রভু হে! আমরা কেবল তোমারউপরেইভরসা করছি এবং তোমার দিকেই মুখ ফিরাচ্ছি ও তোমার নিকটেই আমাদেরপ্রত্যাবর্তনস্থল’(মুমতাহানাহ ৬০/৪)। এরপর তিনি কওমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ﺇِﻧِّﻲ ﺫَﺍﻫِﺐٌ ﺇِﻟَﻰ ﺭَﺑِّﻲﺳَﻴَﻬْﺪِﻳْﻦِ، ‘আমি চললাম আমার প্রভুর পানে, সত্বর তিনি আমাকে পথ দেখাবেন’(ছাফফাত ৩৭/৯৯)।অতঃপর তিনি চললেন দিশাহীন যাত্রাপথে।আল্লাহ বলেন, ﻭَﻧَﺠَّﻴْﻨَﺎﻩُ ﻭَﻟُﻮﻃﺎً ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟْﺄَﺭْﺿِﺎﻟَّﺘِﻲ ﺑَﺎﺭَﻛْﻨَﺎﻓِﻴﻬَﺎ ﻟِﻠْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ ، ‘আর আমরা তাকে ও লূতকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলাম সেই দেশে,যেখানে বিশ্বের জন্য কল্যাণ রেখেছি’(আম্বিয়া ২১/৭১)। এখানে তাঁর সাথী বিবি সারা-র কথাবলা হয়নি নারীর গোপনীয়তা রক্ষার শিষ্টাচারের প্রতি খেয়াল করে। আধুনিকনারীবাদীদের জন্য এর মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।অতঃপর আল্লাহ তাঁকে এবং তাঁরস্ত্রী সারা ও ভাতিজা লূতকে পথ প্রদর্শন করে নিয়ে গেলেন পার্শ্ববর্তী দেশ শাম বাসিরিয়ার অন্তর্গত বায়তুল মুক্বাদ্দাসের অদূরে কেন‘আন নামক স্থানে, যা এখন তাঁর নামানুসারে‘খালীল’ ( ﺍﻟﺨﻠﻴﻞ ) নামে পরিচিত হয়েছে। ঐ সময় সেখানে বায়তুল মুক্বাদ্দাসের অস্তিত্বছিল না। এখানেই ইবরাহীম (আঃ) বাকী জীবন অতিবাহিতকরেন ও এখানেই কবরস্থ হন।এখানে হিজরতের সময় তাঁর বয়স ৮০ থেকে ৮৫-এর মধ্যে ছিল এবং বিবি সারা-র ৭০ থেকে৭৫-এর মধ্যে। সঙ্গী ভাতিজা লূতকে আল্লাহ নবুঅত দান করেন ও তাকে পার্শ্ববর্তীসমৃদ্ধ নগরী সাদূমসহ পাঁচটি নগরীর লোকদের হেদায়াতের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় ওতিনি সেখানেই বসবাস করেন। ফলে ইবরাহীমের জীবনে নিঃসঙ্গতার এক কষ্টকর অধ্যায়শুরু হয়।উল্লেখ্য যে, মানবজাতির প্রথম ফসল ডুমুর (তীন) বর্তমান ফিলিস্তীনেই উৎপন্নহয়েছিল আজ থেকে এগারো হাযার বছর আগে। সম্প্রতি সেখানে প্রাপ্ত শুকনো ডুমুরপরীক্ষা করে এ তথ্য জানা গেছে।[12]কেন‘আনের জীবন :জন্মভূমি বাবেল শহরেজীবনের প্রথমাংশ অতিবাহিত করার পর হিজরত ভূমি শামের কেন‘আনে তিনি জীবনেরবাকী অংশ কাটাতে শুরু করেন। তাঁর জীবনের অন্যান্য পরীক্ষা সমূহ এখানেই অনুষ্ঠিত হয়।কিছু দিন অতিবাহিত করার পর এখানে শুরু হয় দুর্ভিক্ষ। মানুষসব দলে দলে ছুটতে থাকেমিসরের দিকে। মিসর তখন ফেরাঊনদের শাসনাধীনে ছিল। উল্লেখ্য যে, মিসরেরশাসকদের উপাধি ছিল ‘ফেরাঊন’। ইবরাহীম ও মূসার সময় মিসর ফেরাঊনদের শাসনাধীনেছিল। মাঝখানে ইউসুফ-এর সময়ে ২০০ বছরের জন্য মিসর হাকসূস ( ﺍﻟﻬﻜﺴﻮﺱ) রাজাদেরঅধীনস্থ ছিল।যা ছিল ঈসা (আঃ)-এর আবির্ভাবের প্রায় ২০০০ বছর আগেকার ঘটনা’।[13]মিসরসফর :দুর্ভিক্ষ তাড়িত কেন‘আন হ’তে অন্যান্যদের ন্যায় ইবরাহীম (আঃ) সস্ত্রীক মিসরেরওয়ানা হ’লেন। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তাঁর জন্য এখানেই রূযী পাঠাতে পারতেন। কিন্তু না। তিনিমিসরে কষ্টকর সফরে রওয়ানা হ’লেন। সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল এক কঠিন ওমর্মান্তিক পরীক্ষা এবং সাথে সাথে একটি নগদ ও অমূল্য পুরষ্কার।ঐ সময় মিসরের ফেরাঊনছিল একজন নারী লোলুপ মদ্যপ শাসক। তার নিয়োজিত লোকেরা রাস্তার পথিকদের মধ্যেকোন সুন্দরী মহিলা পেলেই তাকে ধরে নিয়ে বাদশাহকে পৌঁছে দিত। যদিও বিবি ‘সারা’ ঐসময় ছিলেন বৃদ্ধা মহিলা, তথাপি তিনি ছিলেন সৌন্দর্য্যের রাণী। মিসরীয় সম্রাটের নিয়ম ছিলএইযে, যে মহিলাকে তারা অপহরণ করত, তার সাথী পুরুষ লোকটি যদি স্বামী হ’ত, তাহ’লেতাকে হত্যা করে মহিলাকে নিয়ে যেত। আর যদি ভাই বা পিতা হ’ত, তাহ’লে তাকে ছেড়েদিত।তারা ইবরাহীমকে জিজ্ঞেস করলে তিনি সারাকে তাঁর ‘বোন’ পরিচয় দিলেন। নিঃসন্দেহে‘সারা’ তার ইসলামী বোন ছিলেন। ইবরাহীম তাকে আল্লাহর যিম্মায় ছেড়ে দিয়েছালাতেদাঁড়িয়ে গেলেন ও আল্লাহরনিকটে স্বীয় স্ত্রীর ইয্যতের হেফাযতের জন্যআকুলভাবে প্রার্থনা করতে থাকলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহ নিশ্চয়ই তার স্ত্রীরইয্যতের হেফাযত করবেন।সারাকে যথারীতি ফেরাঊনের কাছে আনা হ’ল। অতঃপরপরবর্তী ঘটনা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ﻓﻠﻤَّﺎ ﺩَﺧﻠﺖْ ﺳﺎﺭﺓُ ﻋﻠﻰ ﺍﻟْﻤَﻠِﻚِ ﻗﺎﻡَ ﺇﻟﻴﻬﺎ ﻓﺄَﻗﺒﻠﺖْﺗﺘﻮﺿﺄُ ﻭ ﺗُﺼَﻠﻰِّ ﻭﺗﻘﻮﻝُ : ﺃﻟﻠَّﻬﻢ ﺇِﻥْ ﻛﻨﺖَ ﺗﻌﻠﻢُ ﺃَﻧِّﻲ ﺁﻣﻨﺖُ ﺑِﻚَ ﻭﺑﺮﺳﻮﻟﻚَ ﻭﺃَﺣْﺼﻨﺖُ ﻓَﺮْﺟِﻲ ﺇﻻ ﻋﻠﻰﺯﻭﺟﻲ ﻓﻼ ﺗُﺴﻠِّﻂْ ﻋﻠﻰَّ ﺍﻟﻜﺎﻓﺮَ ু ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻯُّ ﻭ ﺃﺣﻤﺪ ﺑﺈِﺳﻨﺎﺩٍ ﺻﺤﻴﺢٍ -‘যখন সারা সম্রাটের নিকটেনীত হ’লেন এবং সম্রাট তার দিকে এগিয়েএল, তখন তিনি ওযূ করার জন্য গেলেন ও ছালাতেরত হয়ে আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করে বললেন, হে আল্লাহ! যদি তুমি জেনে থাক যে,আমি তোমার উপরে ও তোমার রাসূলের উপরে ঈমান এনেছি এবং আমি আমার একমাত্রস্বামীর জন্য সতীত্ব বজায় রেখেছি, তাহ’লে তুমি আমার উপরে এই কাফিরকে বিজয়ীকরো না’।[14]সতীসাধ্বী স্ত্রী সারার দো‘আ সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে গেল। সম্রাটএগিয়ে আসার উপক্রম করতেইহাত-পা অবশ হয়ে পড়ে গিয়ে গোঙাতে লাগলো। তখনসারাহ প্রার্থনা করেবললেন, হে আল্লাহ! লোকটি যদি এভাবে মারা যায়, তাহ’লে লোকেরাভাববে আমি ওকে হত্যা করেছি’। তখনআল্লাহ সম্রাটকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দিলেন। কিন্তুশয়তান আবার এগিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে আবার মরার মত পড়ে রইল।এভাবে সেদুই অথবা তিনবার বেহুঁশ হয়ে পড়লো আর সারা-র দো‘আয় বাঁচলো। অবশেষে সে বলল,তোমরা আমার কাছে একটা শয়তানীকে পাঠিয়েছ। যাও একে ইবরাহীমের কাছে ফেরতদিয়ে আসো এবং এর খেদমতের জন্য হাজেরাকে দিয়ে দাও। অতঃপর সারাহ তার খাদেমাহাজেরাকে নিয়ে সসম্মানে স্বামী ইবরাহীমের কাছে ফিরে এলেন’(ঐ)। এই সময়ইবরাহীম ছালাতের মধ্যে সারার জন্য প্রার্থনায় রত ছিলেন। সারা ফিরে এলে তিনি আল্লাহরশুকরিয়া আদায় করেন। আল-হামদুলিল্লাহ! যে আল্লাহ তাঁর বান্দা ইবরাহীমকে নমরূদেরপ্রজ্জ্বলিত হুতাশন থেকে বাঁচিয়ে এনেছেন, সেই আল্লাহ ইবরাহীমের ঈমানদারস্ত্রীকে ফেরাঊনের লালসার আগুন থেকে কেন বাঁচিয়ে আনবেন না? অতএবসর্বাবস্থায় যাবতীয় প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য।‘আবুল আম্বিয়া’ ( ﺃﺑﻮ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ) হিসাবেআল্লাহ পাক যেভাবে ইবরাহীমের পরীক্ষা নিয়েছেন, উম্মুল আম্বিয়া ( ﺃﻡ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ) হিসাবেতিনি তেমনি বিবি সারা-র পরীক্ষা নিলেন এবং উভয়ে পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণহ’লেন।ফালিল্লাহিল হাম্দ।ধারণা করা চলে যে, ফেরাঊন কেবল হাজেরাকেই উপহার স্বরূপদেয়নি। বরং অন্যান্য রাজকীয় উপঢৌকনাদিও দিয়েছিল। যাতে ইবরাহীমের মিসর গমনেরউদ্দেশ্য পূর্ণ হয়ে যায় এবং বিপুল মাল-সামান ও উপঢৌকনাদি সহ তিনি কেন‘আনে ফিরে আসেন।শিক্ষণীয় বিষয় :উপরোক্ত ঘটনার মধ্যে শিক্ষণীয় বিষয় এই যে, বান্দা যখন নিজেকেসম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উপরে সোপর্দ করে দেয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যেইসকল কাজ করে, তখন আল্লাহ তার পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে নেন। তার জান-মাল-ইয্যত সবকিছু তিনিইহেফাযত করেন। আলোচ্য ঘটনায় ইবরাহীম ও সারাহ ছিলেন একেবারেই অসহায়। তারাস্রেফ আল্লাহর উপরেই নির্ভর করেছেন, তাঁর কাছেই কেঁদেছেন, তাঁর কাছেইচেয়েছেন। ফলে আল্লাহ তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন।দ্বিতীয় শিক্ষণীয় বিষয় এইযে, বান্দার দায়িত্ব হ’ল, যেকোন মূল্যে হক-এর উপরে দৃঢ় থাকা ও অন্যকে হক-এর পথেদাওয়াত দেওয়া। ইবরাহীম দারিদ্রে্যর তাড়নায় কাফেরের দেশ মিসরে গিয়েছিলেন। কিন্তুনিজেরা যেমন ‘হক’ থেকে বিচ্যুত হননি, তেমনি অন্যকে দাওয়াত দিতেও পিছপা হননি। ফলেআল্লাহ তাঁকে মর্মান্তিক বিপদের মধ্যে ফেলে মহা পুরষ্কারে ভূষিত করলেন।ইবরাহীমের কথিত তিনটি মিথ্যার ব্যাখ্যা :হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, ﻟﻢ ﻳَﻜْﺬِﺏْ ﺇﺑﺮﺍﻫﻴﻢُﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺼﻼﺓُ ﻭﺍﻟﺴﻼﻡ ﺇﻻّﺛﻼﺙَ ﻛَﺬَﺑﺎﺕٍ ، ‘ইবরাহীম (আঃ) তিনটি ব্যতীত কোন মিথ্যা বলেননি’।উক্ত তিনটি মিথ্যা ছিল- (১) মেলায়না যাবার অজুহাত হিসাবে তিনি বলেছিলেন ﺇِﻧِّﻲْ ﺳَﻘِﻴْﻢٌ ‘আমিঅসুস্থ’(ছাফফাত ৩৭/৮৯)। (২) মূর্তি ভেঙ্গেছে কে? এরূপ প্রশ্নের জবাবে তিনিবলেন, ﺑَﻞْ ﻓَﻌَﻠَﻪُ ﻛَﺒِﻴﺮُﻫُﻢْ ﻫَﺬَﺍ ‘বরং এই বড় মূর্তিটাই এ কাজ করেছে’(আম্বিয়া ২১/৬৩)। (৩)মিসরের লম্পট রাজার হাত থেকে বাঁচার জন্য স্ত্রী সারা-কে তিনি বোন হিসাবে পরিচয়দেন।[15]হাদীছে উক্ত তিনটি বিষয়কে ‘মিথ্যা’ শব্দে উল্লেখ করা হ’লেও মূলতঃ এগুলিরএকটাও প্রকৃত অর্থে মিথ্যা ছিল না। বরং এগুলি ছিল আরবী অলংকার শাস্ত্রের পরিভাষায়‘তাওরিয়া’) ﺍﻟﺔﻭﺭﻳﺔ (বা দ্ব্যর্থ বোধক পরিভাষা। যেখানে শ্রোতা বুঝে এক অর্থ এবং বক্তারনিয়তে থাকে অন্য অর্থ। যেমন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একদিন হযরত আয়েশার কাছে তার এক বৃদ্ধাখালাকে দেখে বললেন, কোন বৃদ্ধা জান্নাতে যাবে না। একথা শুনে খালা কান্না শুরু করলেরাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তারা তখন সবাই যুবতী হয়ে যাবে’।[16]হিজরতের সময় পথিমধ্যেরাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সম্পর্কে জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের জওয়াবে আবুবকর (রাঃ) বলেন, ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺮﺟﻞُﻳَﻬْﺪﻳﻨﻲ ﺍﻟﻄﺮﻳﻖَ ‘ইনি আমাকে পথ দেখিয়ে থাকেন’।[17]এতে লোকটি ভাবল, উনি একজনসাধারণ পথপ্রদর্শক ব্যক্তি মাত্র। অথচ আবুবকরের উদ্দেশ্য ছিল তিনি আমাদের নবী অর্থাৎধর্মীয় পথপ্রদর্শক) ﻳﻬﺪﻳﻨﻲ ﺍﻟﻰ ﻃﺮﻳﻖ ﺍﻟﺠﻨﺔ (। অনুরূপভাবে যুদ্ধকালে রাসূল )ছাঃ( একদিকেবেরিয়ে অন্য দিকে চলে যেতেন। যাতে তাঁর গন্তব্য পথ গোপন থাকে। এগুলিহ’লউক্তিগত ও কর্মগত তাওরিয়ার উদাহরণ।তাওরিয়া ও তাক্বিয়াহঃউল্লেখ্য যে, এই তাওরিয়া ওশী‘আদের তাক্বিয়াহর) ﺓﻗﻴﺔ(মধ্যে পার্থক্য এই যে, সেখানে পুরাটাই মিথ্যা বলা হয় ওসেভাবেই কাজ করাহয়। যেমন উদাহরণ স্বরূপ, (১) শী‘আদের ৬ষ্ঠ ইমাম আবু আব্দুল্লাহজাফর, যিনি আছ-ছাদিক্ব বা সত্যবাদী বলে উপাধিপ্রাপ্ত, একদিন তাঁর নিকটতম শিষ্য মুহাম্মাদ বিনমুসলিম তাঁর নিকটে উপস্থিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার জন্য আমার জীবনউৎসর্গীত হৌক! গতরাতে আমি একটি অদ্ভূত স্বপ্ন দেখেছি। তখনতিনি বললেন, তোমারস্বপ্ন বৃত্তান্ত বর্ণনা কর। এখানে একজন স্বপ্ন বিশেষজ্ঞ মওজূদ আছেন। বলে তিনিসেখানে উপবিষ্ট অন্যতম শিষ্য ইমাম আবু হানীফার দিকে ইঙ্গিত করলেন। অতঃপরশিষ্যমুহাম্মাদ বিন মুসলিম তার স্বপ্ন বর্ণনা করলেন এবং আবু হানীফা তার ব্যাখ্যা দিলেন। ব্যাখ্যাশুনে ইমাম জাফর ছাদেক খুশী হয়ে বললেন, আল্লাহর কসম! আপনি সঠিক বলেছেন হেআবু হানীফা। রাবী বলেন, অতঃপর আবু হানীফা সেখান থেকে চলে গেলে আমিইমামকে বললাম, আপনার প্রতি আমার জীবন উৎসর্গীত হৌক! এই বিধর্মীর (নাছেবী)স্বপ্ন ব্যাখ্যা আমার মোটেই পসন্দ হয়নি। তখন ইমাম বললেন, হে ইবনু মুসলিম! এতে তুমি মনখারাব করো না। এদের ব্যাখ্যা আমাদের ব্যাখ্যা থেকে ভিন্ন হয়েথাকে। আবু হানীফা যেব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। আমি বললাম, তাহ’লে আমি আল্লাহর কসম করে তার ব্যাখ্যাকেসঠিক বললেন কেন? ইমাম বললেন, ﻧﻌﻢ ﺣﻠﻔﺖ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻧﻪ ﺍﺻﺎﺏ ﺍﻟﺨﻄﺄ হ্যাঁ, আমি কসম করে এটাইবলেছি যে, উনি যথাযর্থভাবেই ভুল বলেছেন।’অথচ এই মিথ্যা বলার জন্য সেখানে কোনভয়-ভীতির কারণ ছিল না। কেননাউভয়ে ইমামের শিষ্য ছিলেন। উপরন্তু আবু হানীফা তখনসরকারেরঅপ্রিয় ব্যক্তি ছিলেন।’[18]এটাই হ’ল শী‘আদের তাক্বিয়া নীতি, যা স্রেফ মিথ্যাব্যতীত কিছুই নয় এবং যার মাধ্যমে তারা মানুষকে ধোঁকা দিয়ে থাকে ও প্রতারণা করেথাকে। এই মিথ্যাচারকে ইমাম জাফরছাদেক তাদের দ্বীনের ১০ ভাগের নয় ভাগ মনেকরেন। তিনি বলেন, ঐ ব্যক্তির দ্বীন নেই, যার তাক্বিয়া নেই(ঐ, পৃঃ ১৫৩)।(২) ব্যাকরণবিদহুসায়েন বিন মু‘আয বিন মুসলিম বলেন, আমাকে একদিন ইমাম জাফর ছাদিক বললেন, শুনছি তুমি নাকিজুম‘আ মসজিদে বসছ এবং লোকদের ফৎওয়া দিচ্ছ? আমি বললাম, হাঁ। তবে আপনার কাছথেকে বের হবার আগেই আমি আপনাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম যে,আমি জুম‘আ মসজিদে বসি, তারপর লোকেরা এসে আমাকে প্রশ্ন করে। আমি যখন বুঝিযে, লোকটি আমার ইচ্ছার বিরোধী, তখন আমি তাকে তার চাহিদাঅনুযায়ী ফৎওয়া দেই।’একথা শোনার পর ইমাম জাফর ছাদিক আমাকে বললেন, ﺍﺻﻨﻊ ﻛﺬﺍ ﻓﺎﻧﻰ ﺍﺻﻨﻊ ﻛﺬﺍ ‘তুমি এভাবেইকরো। কেননা আমিও এভাবে করে থাকি’ (ঐ, পৃঃ ১৭১-৭২)।অথচ সত্য কখনোই মিথ্যারসঙ্গে মিশ্রিত হয় না এবং সত্য সংখ্যক সর্বদা একটিই হয়, তা কখনোই বহু হয় না। আল্লাহ বলেন,যদি সত্য তাদের প্রবৃত্তির অনুগামী হ’ত, তাহ’লে আকাশ ও পৃথিবী এবং এর মধ্যস্থিত সবকিছুধ্বংস হয়ে যেত’(মুমিনূন ২৩/৭১)। বস্ত্তত: এই তাক্বিয়া নীতি শী‘আদের ধর্মীয় বিশ্বাসেরঅঙ্গীভূত। যা ইসলামের মৌল নীতির ঘোর বিরোধী। কিন্তু তাওরিয়ায় বক্তা যেঅর্থেউক্ত কথা বলেন তা সম্পূর্ণ সত্য হয়ে থাকে। যেমন- (১) ইবরাহীমনিজেকে ﺳﻘﻴﻢ (অসুস্থ) বলেছিলেন, কিন্তু ﻣﺮﻳﺾ (পীড়িত) বলেননি। নিজ সম্প্রদায়েরশিরকী কর্মকান্ডে এমনিতেই তিনি ত্যক্ত-বিরক্ত ও বিতৃষ্ণ ছিলেন।তদুপরি শিরকী মেলায়যাওয়ার আবেদন পেয়ে তাঁর পক্ষে মানসিকভাবে অসুস্থ) ﺳﻘﻴﻢ ﻣﻦ ﻋﻤﻠﻬﻢ (হয়ে পড়াটাইস্বাভাবিক ছিল। এরপরেও তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকতেও পারেন। (২) সব মূর্তি ভেঙ্গেতিনি বড় মূর্তিটার গলায় বা হাতে কুড়াল ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। যাতে প্রমাণিত হয় যে, সেই-ইএকাজ করেছে। এর দ্বারা তাঁর উদ্দেশ্যছিল কওমের মূর্খতাকে হাতে নাতে ধরিয়ে দেওয়াএবং তাদের মূর্তিপূজার অসারতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া। তাই মূর্তি ভাঙ্গারকাজটি তিনি বড় মূর্তির দিকে সম্বন্ধ করেন রূপকভাবে। তাছাড়া ঐ বড় মূর্তিটির প্রতিইলোকেদের ভক্তি ও বিশ্বাস ছিল সর্বাধিক। এর কারণেই মানুষ পথভ্রষ্ট হয়েছিল বেশী।ফলে সেই-ই মূলতঃ ইবরাহীমকে মূর্তি ভাঙ্গায় উদ্বুদ্ধ করেছিল। অতএব একদিক দিয়েসেই-ই ছিল মূল দায়ী।(৩) সারা-কে বোন বলা। নিঃসন্দেহে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরেদ্বীনী ভাই-বোন। স্ত্রীর ইযযত ও নিজের জীবন রক্ষার্থে এটুকু বলামোটেইমিথ্যার মধ্যে পড়ে না।এক্ষণে প্রশ্ন হ’ল, তবুও হাদীছে একে ‘মিথ্যা’ বলেঅভিহিত করা হ’ল কেন? এর জবাব এই যে, নবী-রাসূলগণের সামান্যতম ত্রুটিকেও আল্লাহ বড়করে দেখেন তাদেরকে সাবধান করার জন্য। যেমনভুলক্রমে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফলখাওয়াকে আল্লাহ আদমের ‘অবাধ্যতাও পথভ্রষ্টতা’ ( ﻭَﻋَﺼَﻰ ﺁﺩَﻡُ ﺭَﺑَّﻪُ ﻓَﻐَﻮَﻯ ‏) ‏[19 ]বলে অভিহিতকরেছেন। অথচ ভুলক্রমে কৃত অপরাধ ক্ষমার যোগ্য। উল্লেখ্য যে, মাওলানা মওদূদীরন্যায় কোন কোন মুফাসসিরএখানে হাদীছের রাবী আবু হুরায়রাকেই উক্ত বর্ণনার জন্যদায়ী করেছেন, যা নিতান্ত অন্যায়।কেন‘আনে প্রত্যাবর্তন :ইবরাহীম (আঃ) যথারীতি মিসরথেকে কেন‘আনে ফিরে এলেন। বন্ধ্যা স্ত্রী সারা তার খাদেমা হাজেরাকে প্রাণপ্রিয়স্বামী ইবরাহীমকে উৎসর্গ করলেন। ইবরাহীম তাকে স্ত্রীত্বে বরণ করে নিলেন।পরে দ্বিতীয়া স্ত্রীহাজেরার গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন তার প্রথম সন্তান ইসমাঈল (আঃ)।এই সময় ইবরাহীমের বয়স ছিল অন্যূন ৮৬ বছর। নিঃসন্তান পরিবারে আনন্দের বন্যা বয়েগেল।শুষ্ক মরুতে যেন প্রাণের জোয়ার এলো। বস্ত্তত: ইসমাঈল ছিলেন নিঃসন্তানইবরাহীমের দো‘আর ফসল।কেননা তিনি বৃদ্ধ বয়সে আল্লাহর নিকটে ‘নেককার সন্তান’কামনা করেছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﺭَﺏِّ ﻫَﺐْ ﻟِﻲ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴْﻦَ، ﻓَﺒَﺸَّﺮْﻧَﺎﻩُ ﺑِﻐُﻼَﻡٍﺣَﻠِﻴْﻢٍ -‘(ইবরাহীম বললেন,) হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি সৎকর্মশীল সন্তান দাও।অতঃপর আমরা তাকে একটি ধৈর্য্যশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম।’(ছাফফাত৩৭/১০০-১০১)।ইবরাহীমী জীবনের পরীক্ষা সমূহ :ইবরাহীমী জীবন মানেই পরীক্ষার জীবন।নবী হবার পর থেকে আমৃত্যু তিনি পরীক্ষা দিয়েই জীবনপাত করেছেন। এভাবেপরীক্ষার পর পরীক্ষা নিয়ে তাঁকে পূর্ণত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করাহয়েছে। অবশেষে তাঁকে ‘বিশ্বনেতা’ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫِ ﺍﺑْﺘَﻠَﻰﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴﻢَ ﺭَﺑُّﻪُ ﺑِﻜَﻠِﻤَﺎﺕٍ ﻓَﺄَﺗَﻤَّﻬُﻦَّ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻧِّﻲ ﺟَﺎﻋِﻠُﻚَ ﻟِﻠﻨَّﺎﺱِ ﺇِﻣَﺎﻣﺎً ﻗَﺎﻝَ ﻭَﻣِﻦْ ﺫُﺭِّﻳَّﺘِﻲْ ﻗَﺎﻝَ ﻻَ ﻳَﻨَﺎﻝُ ﻋَﻬْﺪِﻱﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴﻦَ – ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ১২৪(-‘যখন ইবরাহীমকে তার পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষাকরলেন, অতঃপর তিনি তাতে উত্তীর্ণ হ’লেন,তখন আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকেমানবজাতির নেতা করব। তিনি বললেন, আমার বংশধর থেকেও। তিনি বললেন, আমার অঙ্গীকারযালেমদের পর্যন্ত পৌঁছবে না’(বাক্বারাহ ২/১২৪)। বস্ত্ততঃ আল্লাহ ইবরাহীম ও তাঁরবংশধরগণের মধ্যেই বিশ্ব নেতৃত্ব সীমিত রেখেছেন। যেমন অন্যত্র আল্লাহবলেন, ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠّﻪَ ﺍﺻْﻄَﻔَﻰ ﺁﺩَﻡَ ﻭَﻧُﻮﺣﺎً ﻭَﺁﻝَ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴﻢَ ﻭَﺁﻟَﻌِﻤْﺮَﺍﻥَ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴﻦَ- ﺫُﺭِّﻳَّﺔً ﺑَﻌْﻀُﻬَﺎ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺾٍﻭَﺍﻟﻠﻪ ُﺳَﻤِﻴﻊٌ ﻋَﻠِﻴﻢٌ- ‏) ﺁﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ ৩৩-৩৪(-‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আদম, নূহ, ইবরাহীম-এর বংশধর ওইমরানের বংশধরকে নির্বাচিত করেছেন’। ‘যারা ছিল পরস্পরের বংশজাত। আল্লাহ সর্বশ্রোতাও সর্বজ্ঞ’(আলে ইমরান ৩/৩৩, ৩৪)।বস্ত্ততঃ ইবরাহীম (আঃ)-এর পরবর্তী সকল নবী তাঁরবংশধর ছিলেন। আলে ইমরান বলতে ইমরান-পুত্র মূসা ও হারূণ ও তাঁদের বংশধর দাঊদ, সুলায়মান,ঈসা প্রমুখ নবীগণকে বুঝানো হয়েছে। যাঁরা সবাই ছিলেন ইবরাহীমের পুত্র ইসহাকেরবংশধর। অপরপক্ষে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) ছিলেন ইবরাহীমেরজ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাঈলের বংশধর। সে হিসাবে আল্লাহ ঘোষিত ইবরাহীমের বিশ্বনেতৃত্বযেমন বহাল রয়েছে, তেমনি নবীদের প্রতি অবাধ্যতা, বংশীয় অহংকার এবং যিদ ও হঠকারিতারজন্য যালেম ইহুদী-নাছারাগণ আল্লাহর অভিশাপ কুড়িয়ে বিশ্বের সর্বত্র ধিকৃত ওলাঞ্ছিতহয়েছে। এক্ষণে ‘নবীদের পিতা’ ও মিল্লাতে ইসলামিয়াহর নেতা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-কে কি কি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল, আমরা সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করব।ইবরাহীম(আঃ)-এর পরীক্ষা সমূহ ছিল দু’ভাগে বিভক্ত। (এক) বাবেল জীবনের পরীক্ষা সমূহ এবং(দুই) কেন‘আন জীবনের পরীক্ষা সমূহ। শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জীবনের সঙ্গেপিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবনের সুন্দর একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। মুহাম্মাদী জীবনেরপ্রথমাংশ কেটেছে মক্কায় ও শেষাংশ কেটেছে মদীনায় এবং সেখানেই তিনি পূর্ণতা লাভকরেন ও মৃত্যুবরণ করেন। ইবরাহীমী জীবনের প্রথমাংশ কেটেছে বাবেল শহরেএবং শেষাংশ কেটেছে কেন‘আনে। সেখানেই তিনি পূর্ণতা পেয়েছেন ও সেখানেইমৃত্যুবরণ করেছেন।বাবেল জীবনের পরীক্ষা সমূহ :ইবরাহীম (আঃ)-এর বাবেলজীবনের পরীক্ষা সমূহের মধ্যে (১) মূর্তিপূজারী নেতাদের সাথে তর্কযুদ্ধেরপরীক্ষা (২) পিতার পক্ষ থেকে বহিষ্কারাদেশ প্রাপ্তির পরীক্ষা (৩) স্ত্রী ও ভাতিজাব্যতীত কেউ তাঁর দাওয়াত কবুল না করা সত্ত্বেও তীব্র সামাজিক বিরোধিতার মুখে একাকীদাওয়াত চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অটল থাকার মাধ্যমে আদর্শ নিষ্ঠার কঠিন পরীক্ষা (৪)তারকাপূজারীদের সাথে যুক্তিগর্ভ তর্কযুদ্ধের পরীক্ষা (৫) কেন্দ্রীয় দেবমন্দিরেঢুকে মূর্তি ভাঙ্গার মত দুঃসাহসিক পরীক্ষা (৬) অবশেষে রাজদরবারে পৌঁছে সরাসরি সম্রাটেরসাথে তর্কযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পরীক্ষা এবং বিনিময়ে (৭) জ্বলন্তহুতাশনে জীবন্তপুড়িয়ে হত্যা করার মর্মান্তিক শাস্তি হাসিমুখে বরণ করে নেবার অতুলনীয়অগ্নি পরীক্ষারসম্মুখীন হওয়া। এছাড়াও সমাজ সংস্কারক হিসাবে জীবনের প্রতি পদে পদে যে অসংখ্যপরীক্ষার সম্মুখীন তাঁকে হর-হামেশা হ’তে হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য।উপরে বর্ণিতপরীক্ষাগুলির সবটিতেই ইবরাহীম (আঃ) জয়লাভ করেছিলেন এবং সেগুলির আলোচনা আমরাইতিপূর্বে করে এসেছি। এক্ষণে আমরা তাঁর কেন‘আনী জীবনের প্রধান পরীক্ষাসমূহবিবৃত করব ইনশাআল্লাহ।কেন‘আনী জীবনের পরীক্ষা সমূহ :১ম পরীক্ষা: দুর্ভিক্ষেপতিত হয়ে মিসর গমন :কেন‘আনী জীবনে তাঁর প্রথম পরীক্ষা হ’ল কঠিন দুর্ভিক্ষেতাড়িত হয়ে জীবিকার সন্ধানে মিসরে হিজরত করা। এ বিষয়ে পূর্বেই আলোচনা করাহয়েছে।২য় পরীক্ষা: সারাকে অপহরণ :মিসরে গিয়ে সেখানকার লম্পট সম্রাট ফেরাঊনেরকুদৃষ্টিতে পড়ে স্ত্রী সারাকে অপহরণের মর্মান্তিক পরীক্ষা। এ বিষয়ে পূর্বেআলোচনা করা হয়েছে।৩য় পরীক্ষা: হাজেরাকে মক্কায় নির্বাসন :মিসর থেকে ফিরেকেন‘আনে আসার বৎসরাধিককাল পরে প্রথম সন্তান ইসমাঈলের জন্ম লাভহয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি শিশু সন্তান ও তার মা হাজেরাকে মক্কার বিজন পাহাড়ী উপত্যকায়নিঃসঙ্গভাবে রেখে আসার এলাহী নির্দেশ লাভ করেন। বস্ত্ততঃ এটা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিকপরীক্ষা। এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নরূপ:হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন আল্লাহর পক্ষথেকে শিশু পুত্র ইসমাঈল ও তার মাকে মক্কায় নির্বাসনে রেখেআসার নির্দেশ পান, তখনইতার অন্তরে বিশ্বাস জন্মেছিল যে, নিশ্চয়ই এ নির্দেশের মধ্যে আল্লাহর কোন মহতীপরিকল্পনা লুক্কায়িত আছে এবং নিশ্চয়ই তিনিইসমাঈল ও তার মাকে ধ্বংস করবেন না।অতঃপর একথলে খেজুর ও এক মশক পানি সহ তাদের বিজনভূমিতে রেখে যখন ইবরাহীম (আঃ)একাকী ফিরে আসতে থাকেন, তখন বেদনা-বিস্মিত স্ত্রী হাজেরা ব্যাকুলভাবে তার পিছেপিছে আসতে লাগলেন। আর স্বামীকে এর কারণ জিজ্ঞেস করতে থাকেন। কিন্তু বুকেবেদনার পাষাণ বাঁধা ইবরাহীমের মুখ দিয়েকোন কথা বেরুলো না। তখন হাজেরা বললেন,আপনি কি আল্লাহর হুকুমে আমাদেরকে এভাবে ফেলে যাচ্ছেন? ইবরাহীম ইশারায়বললেন, হ্যাঁ। তখন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে অটল বিশ্বাস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে হাজেরা বলেউঠলেন, ﺇﺫَﻥْ ﻻﻳُﻀَﻴِّﻌُﻨَﺎ ﺍﻟﻠﻪُ ‘তাহ’লে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না’। ফিরে এলেন তিনিসন্তানের কাছে। দু’একদিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে পানি ও খেজুর। কি হবে উপায়? খাদ্য ওপানি বিহনে বুকের দুধ শুকিয়ে গেলে কচি বাচ্চা কি খেয়ে বাঁচবে। পাগলপরা হয়ে তিনিমানুষের সন্ধানে দৌঁড়াতে থাকেন ছাফা ও মারওয়া পাহাড়ের এ মাথা আরও মাথায়। এভাবেসপ্তমবারে তিনি দূর থেকে দেখেন যে, বাচ্চার পায়ের কাছ থেকে মাটির বুক চিরেবেরিয়ে আসছে ঝর্ণার ফল্গুধারা, জিব্রীলের পায়ের গোড়ালি বা তার পাখার আঘাতে যাসৃষ্টি হয়েছিল। ছুটে এসে বাচ্চাকে কোলে নিলেন অসীম মমতায়। স্নিগ্ধ পানি পান করেআল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। হঠাৎ অদূরে একটি আওয়ায শুনে তিনি চমকে উঠলেন। উনিজিবরীল। বলে উঠলেন, ﻻ ﺗﺨﺎﻓﻮﺍ ﺍﻟﻀَّﻴﻌﺔَ، ﺇﻥَّ ﻫﺬﺍ ﺑﻴﺖُ ﺍﻟﻠﻪ ﻳَﺒْﻨﻰ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﻐﻼﻡُ ﻭﺃﺑﻮﻩ ﻭﺇﻥ ﺍﻟﻠﻪﻻﻳُﻀﻴﻊُ ﺃﻫﻠَﻪ -‘আপনারা ভয়পাবেন না। এখানেই আল্লাহর ঘর। এই সন্তান ও তার পিতা এ ঘর সত্বরপুনর্নির্মান করবেন। আল্লাহ তাঁর ঘরের বাসিন্দাদের ধ্বংস করবেন না’। বলেই শব্দ মিলিয়েগেল’।অতঃপর শুরু হ’ল ইসমাঈলী জীবনের নব অধ্যায়। পানি দেখে পাখি আসলো। পাখি ওড়াদেখে ব্যবসায়ী কাফেলা আসলো। তারা এসে পানির মালিক হিসাবে হাজেরার নিকটে অনুমতিচাইলে তিনি এই শর্তে মনযুর করলেন যে, আপনাদের এখানে বসতি স্থাপন করতে হবে।বিনা পয়সায় এই প্রস্তাব তারা সাগ্রহেকবুল করল। এরাই হ’ল ইয়ামন থেকে আগত বনু জুরহুমগোত্র। বড় হয়ে ইসমাঈল এই গোত্রে বিয়ে করেন। এঁরাই কা‘বা গৃহের খাদেম হন এবংএদের শাখা গোত্র কুরায়েশ বংশে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমন ঘটে।ওদিকেইবরাহীম (আঃ) যখন স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে যান তখন হাজেরার দৃষ্টির আড়ালে গিয়েআল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন এই বলে, ﺭَّﺑَّﻨَﺎ ﺇِﻧِّﻲْ ﺃَﺳْﻜَﻨْﺖُ ﻣِﻦْ ﺫُﺭِّﻳَّﺘِﻲْ ﺑِﻮَﺍﺩٍ ﻏَﻴْﺮِ ﺫِﻱْ ﺯَﺭْﻉٍﻋِﻨْﺪَﺑَﻴْﺘِﻚَ ﺍﻟْﻤُﺤَﺮَّﻡِ ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﻟِﻴُﻘِﻴْﻤُﻮﺍ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓَ ﻓَﺎﺟْﻌَﻞْ ﺃَﻓْﺌِﺪَﺓً ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﺗَﻬْﻮِﻱْ ﺇِﻟَﻴْﻬِﻢْ ﻭَﺍﺭْﺯُﻗْﻬُﻢ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺜَّﻤَﺮَﺍﺕِﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﻳَﺸْﻜُﺮُﻭْﻥَ- ‏) ﺍﺑﺮﺍﻫﻴﻢ ৩৭(-‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমি আমার পরিবারের কিছু সদস্যকেতোমার মর্যাদামন্ডিত গৃহের সন্নিকটে চাষাবাদহীন উপত্যকায় বসবাসের জন্য রেখে যাচ্ছি।প্রভুহে! যাতে তারা ছালাত কায়েম করে। অতএব কিছু লোকের অন্তরকে তুমি এদেরপ্রতি আকৃষ্ট করে দাও এবং তাদেরকে ফল-ফলাদি দ্বারা রূযী দান কর। সম্ভবত: তারা কৃতজ্ঞতাপ্রকাশ করবে’।[20]শিক্ষণীয় বিষয়:(১) ইবরাহীম (আঃ) তাঁর স্ত্রী ও দুগ্ধপোষ্যসন্তানকে জনমানব শূন্য ও চাষাবাদহীন এক শুষ্ক মরু উপত্যকায় রেখে আসলেন, কোনসুস্থ বিবেক এ কাজকে সমর্থন করতে পারে না। কিন্তু যারা আল্লাহতে বিশ্বাসী, তাদেরজন্য বিষয়টি মোটেই আশ্চর্যজনক নয়। আরসেকারণেই হাজেরা গভীর প্রত্যয়ে বলেউঠেছিলেন, ﺇﺫَﻥْ ﻻ ﻳُﻀَﻴِّﻌُﻨِﻲَ ﺍﻟﻠﻪُ ‘তাহ’লে আল্লাহ আমাকে ধ্বংস করবেন না’। আল্লাহ যেকেবল বিশ্বাসের বস্ত্ত নয়, বরং তিনি সার্বক্ষণিকভাবে বান্দার তত্ত্বাবধায়ক, ইবরাহীমেরউক্ত কর্মনীতির মধ্যে তার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। অতি যুক্তিবাদী ওবস্ত্তবাদীদেরজন্য এর মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের এক শিক্ষণীয় বিষয়।(২) ইবরাহীমের দো‘আআল্লাহ এমন দ্রুত কবুল করেছিলেন যে, দু’একদিনের মধ্যেই সেখানে সৃষ্টি হয় পানিরফোয়ারা, যা যমযমকূয়া নামে পরিচিত হয় এবং যার উৎসধারা বিগত প্রায় সোয়া চার হাযার বছর ধরেআজও সমভাবে বহমান। কিন্তু এই পানির রূপ-রস-গন্ধ কিছুরই কোন পরিবর্তন হয়নি।এ পানিরকোন হ্রাস-বৃদ্ধি নেই। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, এ পানিতে এমন সবউপাদান রয়েছে, যা মানুষের জন্য খাদ্য ও পানীয় উভয় চাহিদা মেটাতে সক্ষম। পৃথিবীর অন্যকোনপানিতে এ গুণ নেই। দৈনিক লাখ লাখগ্যালন পানি ব্যয় হওয়া সত্ত্বেওএ পানির কোন ক্ষয়নেই, লয় নেই, কমতি নেই। এর কারণ অনুসন্ধানে বছরের পর বছর চেষ্টা করেওবৈজ্ঞানিকেরা ব্যর্থ হয়েছেন।ফালিল্লা-হিল হাম্দ।(৩) তখন থেকে অদ্যাবধি মক্কা মু‘আয্যমায়চাষাবাদের তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। কিন্তু সারা পৃথিবী হ’তে তাবৎ ফল-ফলাদি সর্বদাসেখানে আমদানী হয়ে থাকে এবং সর্বদা অধিকহারে মওজূদ থাকে। আধুনিক বিশ্বেরকোন শহরই এর সাথে তুলনীয় নয়। নিঃসন্দেহে এটা হ’ল ইবরাহীমের দো‘আর অন্যতমফসল।(৪) ইবরাহীম (আঃ)-এর দো‘আয় বলা হয়েছিল, ‘আমি আমার সন্তানকে এখানে রেখেযাচ্ছি যেন তারা এখানে ছালাত কায়েম করে’। আল্লাহর রহমতে সেদিন থেকে অদ্যাবধিএখানে ছালাত, ত্বাওয়াফও অন্যান্য ইবাদত সর্বদা জারি আছে।(৫) দো‘আয় তিনি বলেছিলেন,‘মানব সমাজের কিছু অংশের হৃদয়কে তুমি এদের প্রতি ঝুঁকিয়ে দাও’। নিঃসন্দেহে সেই অংশটিহ’ল সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজ। ইবরাহীম (আঃ) জানতেন যে, বিশ্বের সমস্ত লোককখনো মুমিন হবে না। তাছাড়া তাবৎ বিশ্ব যদি কা‘বার প্রতি ঝুঁকে পড়ত, তাহ’লে সেখানেবসবাস, স্থান সংকুলান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংকট দেখা দেওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল। তখন থেকেএযাবত সর্বদা একদল শক্তিশালী ও ধর্মপরায়ণ মানুষ মক্কার সুরক্ষা ও নিরাপত্তার কাজেনিয়োজিত রয়েছে। দেড় হাযার বছর পূর্বে খৃষ্টান গভর্ণর আবরাহার সকল প্রচেষ্টা যেমনব্যর্থ হয়েছিল, ক্বিয়ামত অবধি শত্রুদেরসকল চক্রান্ত এভাবেই ব্যর্থ হবেইনশাআল্লাহ।৪র্থপরীক্ষা: খাৎনা করণ:ইবরাহীমের প্রতি আদেশ হ’ল খাৎনা করার জন্য। এসময় তাঁর বয়স ছিলঅন্যূন ৮০ বছর। হুকুম পাওয়ার সাথে সাথে দেরী না করে নিজেই নিজের খাৎনার কাজসম্পন্ন করলেন।[21]বিনা দ্বিধায় এই কঠিনও বেদনাদায়ক কাজ সম্পন্ন করার মধ্যে আল্লাহরহুকুম দ্রুত পালনকরার ও এ ব্যাপারে তাঁর কঠোর নিষ্ঠার প্রমাণ পাওয়া যায়।খাৎনার এই প্রথাইবরাহীমের অনুসারী সকল ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে আজও চালু আছে। বস্ত্ততঃখাৎনার মধ্যে যে অফুরন্ত কল্যাণনিহিত রয়েছে, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীগণ তাঅকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেছেন। এর ফলে খাৎনাকারীগণ অসংখ্য অজানা রোগ-ব্যাধিহ’তে মুক্ত রয়েছেন এবং সুস্থ জীবন লাভে ধন্য হয়েছেন। এটি মুসলিম এবং অমুসলিমেরমধ্যে একটি স্থায়ী পার্থক্যও বটে।৫ম পরীক্ষা: পুত্র কুরবানী:একমাত্র শিশু পুত্র ও তারমাকে মক্কায় রেখে এলেও ইবরাহীম (আঃ) মাঝে-মধ্যে সেখানে যেতেন ও দেখা-শুনা করতেন। এভাবে ইসমাঈল ১৩/১৪ বছর বয়সে উপনীত হ’লেন এবং পিতার সঙ্গেচলাফেরা করার উপযুক্ত হ’লেন। বলা চলে যে, ইসমাঈল যখন বৃদ্ধ পিতার সহযোগী হ’তেচলেছেন এবং পিতৃহৃদয় পুরোপুরি জুড়ে বসেছেন, ঠিক সেই সময় আল্লাহ ইবরাহীমেরমহববতের কুরবানী কামনা করলেন। বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র নয়নের পুত্তলী ইসমাঈলেরমহববত ইবরাহীমকে কাবু করে ফেলল কি-না, আল্লাহ যেন সেটাই যাচাই করতে চাইলেন।ইতিপূর্বে অগ্নিপরীক্ষা দেবার সময় ইবরাহীমের কোন পিছুটান ছিল না। কিন্তু এবাররয়েছে প্রচন্ড রক্তের টান।দ্বিতীয়তঃ অগ্নি পরীক্ষায় বাদশাহ তাকে বাধ্য করেছিল।কিন্তু এবারের পরীক্ষা স্বেচ্ছায় ও স্বহস্তে সম্পন্ন করতে হবে। তাই এ পরীক্ষাটি ছিলপূর্বের কঠিন অগ্নি পরীক্ষার চেয়ে নিঃসন্দেহে কঠিনতর। সূরা ছাফফাত ১০২ আয়াত হ’তে১০৯ আয়াত পর্যন্ত এ বিষয়ে বর্ণিত ঘটনাটি নিম্নরূপ: ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺑَﻠَﻎَ ﻣَﻌَﻪُ ﺍﻟﺴَّﻌْﻲَ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺑُﻨَﻲَّ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﺭَﻯ ﻓِﻲﺍﻟْﻤَﻨَﺎﻡِ ﺃَﻧِّﻲ ﺃَﺫْﺑَﺤُﻚَ ﻓَﺎﻧﻈُﺮْ ﻣَﺎﺫَﺍ ﺗَﺮَﻯ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﺃَﺑَﺖِ ﺍﻓْﻌَﻞْ ﻣَﺎ ﺗُﺆْﻣَﺮُ ﺳَﺘَﺠِﺪُﻧِﻲ ﺇِﻥ ﺷَﺂﺀَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻣِﻦَﺍﻟﺼَّﺎﺑِﺮِﻳﻦَ- ‏)ﺍﻟﺼﺎﻓﺎﺕ ১০২(-‘যখন (ইসমাঈল) পিতার সাথে চলাফেরা করার মত বয়সে উপনীতহ’ল, তখন (ইবরাহীম) তাকে বললেন, হে আমার বেটা! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমিতোমাকে যবহ করছি। এখন বল তোমার অভিমত কি? সে বলল, হে পিতা! আপনাকে যানির্দেশ করা হয়েছে, আপনি তা কার্যকর করুন। আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকেধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত দেখতেপাবেন’(ছাফফাত ৩৭/১০২)।ইবনু আববাস (রাঃ) হ’তেবর্ণিত হয়েছে যে, মক্কা থেকে বের করে ৮ কি: মি: দক্ষিণ-পূর্বে মিনা প্রান্তরেনিয়ে যাওয়ার পথে বর্তমানে যে তিন স্থানে হাজীগণ শয়তানকে পাথর মেরে থাকেন, ঐতিন স্থানে ইবলীস তিনবার ইবরাহীম (আঃ)-কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। আর তিনবারইইবরাহীম (আঃ)শয়তানের প্রতি ৭টি করে কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন।[22]সেই স্মৃতিকেজাগরুক রাখার জন্য এবংশয়তানের প্রতারণার বিরুদ্ধে মুমিনকে বাস্তবে উদ্বুদ্ধ করার জন্য এবিষয়টিকে হজ্জ অনুষ্ঠানের ওয়াজিবাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানেই অনতিদূরেপূর্ব দিকে ‘মসজিদে খায়েফ’ অবস্থিত।অতঃপর পিতা-পুত্র আল্লাহ নির্দেশিত কুরবানগাহ ‘মিনায়’উপস্থিত হ’লেন। সেখানে পৌঁছে পিতা পুত্রকে তাঁর স্বপ্নের কথাবর্ণনা করলেন এবংপুত্রের অভিমতচাইলেন। পুত্র তার অভিমত ব্যক্তকরার সময় বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ আপনিআমাকে ছবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত দেখতে পাবেন’। ইনশাআল্লাহ না বললে হয়ত তিনিধৈর্য ধারণের তাওফীক পেতেন না। এরপর তিনি নিজেকে ‘ছবরকারী’ না বলে‘ছবরকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ বলেছেন এবং এর মাধ্যমে নিজের পিতা সহ পূর্বেকার বড় বড়আত্মোৎসর্গকারীদের মধ্যে নিজেকে শামিল করে নিজেকে অহমিকামুক্তকরেছেন। যদিও তাঁর ন্যায় তরুণের এরূপ স্বেচ্ছায় আত্মোৎসর্গের ঘটনা ইতিপূর্বেঘটেছিল বলে জানা যায় না। আল্লাহ বলেন, ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺃَﺳْﻠَﻤَﺎ ﻭَ ﺗَﻠَّﻪُ ﻟِﻠْﺠَﺒِﻴﻦِ، ﻭَﻧَﺎﺩَﻳْﻨَﺎﻩُ ﺃَﻥ ﻳَّﺂ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ، ﻗَﺪْﺻَﺪَّﻗْﺖَ ﺍﻟﺮُّﺅْﻳَﺎ ﺇِﻧَّﺎ ﻛَﺬَﺍﻟِﻚَ ﻧَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْﻦَ، ﺇِﻥَّ ﻫَﺬَﺍ ﻟَﻬُﻮَ ﺍﻟْﺒَﻶﺀُ ﺍﻟْﻤُﺒِﻴْﻦُ، ﻭَﻓَﺪَﻳْﻨَﺎﻩُ ﺑِﺬِﺑْﺢٍ ﻋَﻈِﻴْﻢٍ، ﻭَﺗَﺮَﻛْﻨَﺎﻋَﻠَﻴْﻬِﻔِﻲ ﺍﻟْﺂﺧِﺮِﻳْﻦَ، ﺳَﻼَﻡٌ ﻋَﻠَﻰ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ – ‏)ﺍﻟﺼﺎﻓﺎﺕ ১০৩-১০৯(-‘অতঃপর (পিতা-পুত্র) উভয়ে যখনআত্মসমর্পণ করল এবং পিতা পুত্রকে উপুড় করে শায়িত করল’। ‘তখন আমরা তাকে ডাক দিয়েবললাম, হে ইবরাহীম’! ‘তুমি তোমার স্বপ্ন সত্যে পরিণত করেছ। আমরা এভাবেইসৎকর্মশীলগণের প্রতিদান দিয়ে থাকি’। ‘নিশ্চয়ই এটি একটি সুস্পষ্ট পরীক্ষা’। ‘আর আমরা তারপরিবর্তে একটি মহান যবহ প্রদান করলাম’ ‘এবং আমরা এ বিষয়টি পরবর্তীদের মধ্যে রেখেদিলাম’। ‘ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হৌক’(ছাফফাত ৩৭/১০৩-১০৯)। বর্তমানে উক্ত মিনাপ্রান্তরেই হাজীগণ কুরবানী করে থাকেন এবং বিশ্ব মুসলিম ঐ সুন্নাত অনুসরণে১০ইযুলহিজ্জাহ বিশ্বব্যাপী শরী‘আত নির্ধারিত পশু কুরবানী করে থাকেন।শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :(১) ইবরাহীমকে আল্লাহ স্বপ্নাদেশ করেছিলেন, সরাসরি আদেশ করেননি। এর মধ্যেপরীক্ষা ছিল এই যে, স্বপ্নের বিভিন্ন ব্যাখ্যা হ’তে পারত। যেমন নিরপরাধ মানুষকে হত্যাকরা মহাপাপ। অধিকন্তু পিতা হয়ে নির্দোষ পুত্রকে নিজ হাতে হত্যাকরা আরও বড় মহাপাপ।নিশ্চয়ই এমন অন্যায় কাজের নির্দেশ আল্লাহ দিতে পারেন না। অতএব এটা মনের কল্পনা-নির্ভর স্বপ্ন ( ﺃﺿﻐﺎﺙ ﺃﺣﻼﻡ ) হ’তে পারে। কিন্তু ইবরাহীম ঐসব ব্যাখ্যায় যাননি। তিনি নিশ্চিতছিলেন যে, এটা ‘অহি’। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি পরপরতিনদিন একই স্বপ্নদেখেন। প্রশ্ন হ’তে পারে, আল্লাহ জিব্রীল মারফত সরাসরি নির্দেশ না পাঠিয়ে স্বপ্নেরমাধ্যমে নির্দেশ পাঠালেন কেন? এর জবাব এই যে, তাহ’লে তো পরীক্ষা হ’ত না, কেবলনির্দেশ পালন হ’ত। ইবরাহীমকে তার স্বপ্নের কাল্পনিক ব্যাখ্যার ফাঁদে ফেলার জন্যই তোশয়তান মাঝপথে বন্ধু সেজে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। এর দ্বারাআরেকটিবিষয় প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর নির্দেশ পালনের সময় অহেতুক প্রশ্ন সমূহউত্থাপন ও অধিক যুক্তিবাদের আশ্রয় নেওয়া যাবে না। বরং সর্বদা তার প্রকাশ্য অর্থেরউপরে সহজ-সরলভাবে আমল করে যেতে হবে।(২) আল্লাহর মহববত ও দুনিয়াবী কোনমহববত একত্রিত হ’লে সর্বদা আল্লাহর মহববতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং দুনিয়াবীমহববতকে কুরবানী দিতে হবে। ইবরাহীম এখানে সন্তানের গলায় ছুরি চালাননি। বরংসন্তানের মহববতের গলায় ছুরি চালিয়েছিলেন। আর এটাইছিল পরীক্ষা। যদি কেউ আল্লাহরমহববতের উপরে দুনিয়াবী মহববতকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেটা হয়ে যায় ﺍﻹﺷﺮﺍﻙ ﻓﻲﺍﻟﻤﺤﺒﺔবা ভালোবাসায় শিরক। ইবরাহীম ও ইসমাঈল দু’জনেই উক্ত শিরক হ’তে মুক্ত ছিলেন।(৩) পিতা ও পুত্রের বিশ্বাসগত সমন্বয় ব্যতীত কুরবানীর এই গৌরবময় ইতিহাস রচিত হ’ত না।ইসমাঈল যদি পিতার অবাধ্য হ’তেন এবং দৌড়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে যেতেন, তাহ’লে আল্লাহরহুকুম পালন করা ইবরাহীমের পক্ষে হয়তবাআদৌ সম্ভব হ’ত না। তাই এ ঘটনার মধ্যে ইঙ্গিতরয়েছে যে, সমাজের প্রবীণদের কল্যাণময় নির্দেশনা এবং নবীনদের আনুগত্য ওউদ্দীপনাএকত্রিত ও সমন্বিত না হ’লে কখনোইকোন উন্নত সমাজ গঠন করা সম্ভব নয়।(৪)এখানে মা হাজেরার অবদানও ছিল অসামান্য। যদি তিনি ঐ বিজন ভূমিতে কচি সন্তানকে তিলেতিলে মানুষ করে না তুলতেন এবং স্রেফ আল্লাহর উপরে ভরসা করে বুকে অসীম সাহসনিয়ে সেখানে বসবাস না করতেন, তাহ’লে পৃথিবী পিতা-পুত্রের এই মহান দৃশ্য অবলোকনকরতে পারত না। এজন্যেই বাংলার বুলবুল কাজী নজরুল ইসলামগেয়েছেন,মা হাজেরা হৌকমায়েরা সবযবীহুল্লাহ হৌক ছেলেরা সবসবকিছু যাক সত্য রৌকবিধির বিধান সত্য হৌক।বলা চলেযে, এই কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর ইবরাহীম (আঃ) বিশ্ব নেতৃত্বের সম্মানেভূষিত হন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫِ ﺍﺑْﺘَﻠَﻰ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﺭَﺑُّﻪُ ﺑِﻜَﻠِﻤَﺎﺕٍ ﻓَﺄَﺗَﻤَّﻬُﻦَّ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻧِّﻲْ ﺟَﺎﻋِﻠُﻚَ ﻟِﻠﻨَّﺎﺱِﺇِﻣَﺎﻣﺎً، ‏)ﺑﻘﺮﺓ ১২৪(-‘যখন ইবরাহীমকে তার পালনকর্তা কয়েকটি বিষয়ে পরীক্ষা করলেন,অতঃপর তিনি তাতে উত্তীর্ণ হ’লেন,তখন আল্লাহ বললেন, আমি তোমাকে মানবজাতির নেতাকরলাম’(বাক্বারাহ ২/১২৪)।উপরোক্ত আয়াতে পরীক্ষাগুলির সংখ্যা কত ছিল, তা বলা হয়নি। তবেইবরাহীমের পুরো জীবনটাই যে ছিল পরীক্ষাময়, তা ইতিপূর্বেকার আলোচনায় প্রতিভাতহয়েছে।অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী :বাবেল জীবনে ৭টি ও কেন‘আনজীবনে ৫টি বড় বড় পরীক্ষা বর্ণনার পর এবারে আমরা ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবনেরঅন্যান্য উল্লেখযোগ্য ও শিক্ষণীয় ঘটনাবলী বিবৃত করব।-(১) ইসহাক জন্মের সুসংবাদ:পুত্র কুরবানীর ঘটনার পরে ইবরাহীম (আঃ) কেন‘আনে ফিরে এলেন। এসময় বন্ধ্যাস্ত্রী সারাহ্-র গর্ভে ভবিষ্যৎ সন্তান ইসহাক জন্মের সুসংবাদ নিয়ে ফেরেশতাদের শুভাগমনঘটে। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, উক্ত ফেরেশতাগণ ছিলেন হযরত জিবরাঈল, মীকাঈল ওইসরাফীল। তারা মানুষেররূপ ধারণ করে এসেছিলেন। এ বিষয়ে কুরআনী বক্তব্যনিম্নরূপ: ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺟَﺎﺀَﺕْ ﺭُﺳُﻠُﻨَﺎ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﺑِﺎﻟْﺒُـﺸْﺮَﻯ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺳَﻼَﻣﺎً ﻗَﺎﻝَ ﺳَﻼَﻡٌ ﻓَﻤَﺎ ﻟَﺒِﺚَ ﺃَﻥْ ﺟَﺎﺀ ﺑِﻌِﺠْﻞٍﺣَﻨِﻴْﺬٍ- ‏)ﻫﻮﺩ ৬৯(-‘আর আমাদের প্রেরিত সংবাদবাহকগণ(অর্থাৎ ফেরেশতাগণ) ইবরাহীমেরনিকটে সুসংবাদ নিয়ে এল এবং বলল, সালাম। সেও বলল, সালাম। অতঃপর অল্পক্ষণের মধ্যেইসে একটা ভূণাকরা বাছুর এনে (তাদের সম্মুখে) পেশ করল’(হূদ ১১/৬৯)। ‘কিন্তু সে যখনদেখল যে, মেহমানদের হাত সেদিকে প্রসারিত হচ্ছে না, তখন সে সন্দেহে পড়েগেল ও মনে মনে তাদের সম্পর্কে ভয় অনুভব করতে লাগল (কারণ এটা তখনকার যুগেরখুনীদের নীতি ছিল যে, যাকে তারা খুন করতো, তার বাড়ীতে তারা খেত না)। তারা বলল,আপনি ভয় পাবেন না।আমরা লূত্বের কওমের প্রতি প্রেরিত হয়েছি। তার স্ত্রী (সারা)নিকটেই দাঁড়িয়েছিল, সে হেসে ফেলল। আমরা তাকে ইসহাকের জন্মের সুখবর দিলাম এবংইসহাকেরপরে (তার পুত্র) ইয়াকূবেরও। সে বলল, হায় কপাল! আমি সন্তান প্রসব করব? অথচআমি বার্ধক্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি। আর আমার স্বামীও বৃদ্ধ। এতো ভারীআশ্চর্য কথা! তারা বলল, আপনি আল্লাহর নির্দেশের বিষয়ে আশ্চর্য বোধ করছেন? হেগৃহবাসীগণ! আপনাদের উপরে আল্লাহর রহমত ও প্রভূত বরকত রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহপ্রশংসিত ও মহিমময়’(হূদ ১১/৭০-৭৩)। একই ঘটনা আলোচিত হয়েছে সূরা হিজর ৫২-৫৬ ও সূরাযারিয়াত ২৪-৩০ আয়াত সমূহে।উল্লেখ্য যে, অধিক মেহমানদারীর জন্য ইবরাহীমকে ‘আবুযযায়ফান’) ﺍﺑﻮﺍﻟﻀﻴﻔﺎﻥ(বা মেহমানদের পিতা বলা হ’ত। এই সময় বিবি সারাহর বয়স ছিল অন্যূন ৯০ ওইবরাহীমের ছিল ১০০ বছর। সারাহ নিজেকে বন্ধ্যা মনে করতেন এবং সেকারণেই সেবিকাহাজেরাকে স্বামীর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন ও তাঁর সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন সন্তানলাভের জন্য। অথচ সেই ঘরে ইসমাঈল জন্মের পরেও তাকে তার মা সহ মক্কায় নির্বাসনেরেখে আসতে হয় আল্লাহরহুকুমে। ফলে সংসার ছিল আগের মতই নিরানন্দময়। কিন্তুআল্লাহর কি অপূর্ব লীলা! তিনি শুষ্ক নদীতে বান ডাকাতে পারেন। তাই নিরাশ সংসারে তিনিআশার বন্যা ছুটিয়ে দিলেন। যথাসময়ে ইসহাকের জন্ম হ’ল। যিনি পরে নবী হ’লেন এবং তাঁরইপুত্র ইয়াকূবের বংশধারায় ঈসা পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে হাযার হাযার নবী প্রেরিতহ’লেন। ফলে হতাশ ও বন্ধ্যা নারী সারাহ এখন কেবল ইসহাকের মা হ’লেন না। বরং তিনিহ’লেন হাযার হাযার নবীর মা বা ‘উম্মুল আম্বিয়া’) ﺍﻡ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ (। ওদিকে মক্কায় ইসমাঈলের বয়সতখন ১৩/১৪ বৎসর। যাকে বলা হয়ে থাকে ‘আবুল আরব’) ﺍﺑﻮ ﺍﻟﻌﺮﺏ (বা আরব জাতির পিতা।(২)মৃতকে জীবিত করার দৃশ্য প্রত্যক্ষকরণ :বন্ধ্যা স্ত্রী সারাহর বৃদ্ধ বয়সে সন্তান লাভেরমাধ্যমে আল্লাহ যেভাবে তাদের ঈমান বর্ধিত ও মযবূত করেছিলেন। সম্ভবত: তাতেউৎসাহিত হয়ে ইবরাহীম (আঃ) একদিন আল্লাহর কাছেদাবী করে বসলেন, আপনি কিভাবেমৃতকে জীবিত করেন, তা আমাকে একটুদেখান, যাতে হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। এ বিষয়েকুরআনী বর্ণনা নিম্নরূপ: ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ ﺭَﺏِّ ﺃَﺭِﻧِﻲْ ﻛَﻴْﻒَ ﺗُﺤْﻴِـﻲ ﺍﻟْﻤَﻮْﺗَﻰ ﻗَﺎﻝَ ﺃَﻭَﻟَﻢْ ﺗُﺆْﻣِﻦْ ﻗَﺎﻝَ ﺑَﻠَﻰﻭَﻟَـﻜِﻦ ﻟِّﻴَﻄْﻤَﺌِﻦَّ ﻗَﻠْﺒِﻲْ ﻗَﺎﻝَ ﻓَﺨُﺬْ ﺃَﺭْﺑَﻌَﺔً ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻄَّﻴْﺮِ ﻓَﺼُﺮْﻫُﻦَّ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ﺛُﻢَّ ﺍﺟْﻌَﻞْ ﻋَﻠَﻰ ﻛُﻞِّ ﺟَﺒَﻞٍ ﻣِّﻨْﻬُﻦَّ ﺟُﺰْﺀﺍً ﺛُﻢَّﺍﺩْﻋُﻬُﻦَّ ﻳَﺄْﺗِﻴْﻨَﻚَ ﺳَﻌْﻴﺎً ﻭَﺍﻋْﻠَﻢْ ﺃَﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻋَﺰِﻳْﺰٌ ﺣَﻜِﻴْﻢٌ- ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ২৬০(-‘আর স্মরণ কর, যখন ইবরাহীমবলল, হেআমার পালনকর্তা! আমাকে দেখাও কিভাবে তুমি (ক্বিয়ামতের দিন) মৃতকে জীবিতকরবে। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বিশ্বাস কর না? (ইবরাহীম) বলল, অবশ্যই করি। কিন্তুদেখতে চাই কেবল এজন্য, যাতে হৃদয়ে প্রশান্তি লাভ করতে পারি। বললেন, তাহ’লে চারটিপাখি ধরে নাও এবং সেগুলিকে নিজের পোষ মানিয়ে নাও। অতঃপর সেগুলোকে (যবেহকরে) সেগুলির দেহের একেকটিঅংশ বিভিন্ন পাহাড়ের উপরে রেখে আস। তারপরসেগুলিকে ডাক দাও। (দেখবে) তোমার দিকে দৌড়ে চলে আসবে (উড়তে উড়তে নয়।কেননা তাতে অন্যান্য পাখির সাথে মিশে গিয়ে তোমার দৃষ্টি বিভ্রম ঘটতে পারে যে, সেইচারটি পাখি কোন্ কোন্টি)। জেনে রেখ যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রান্ত ওজ্ঞানময়’(বাক্বারাহ ২/২৬০)।উপরোক্ত ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ মুশরিক ও নাস্তিক সমাজকেদেখিয়েদিলেন যে, কিভাবে মাটিতে মিশে যাওয়া মৃত মানুষকে তিনি ক্বিয়ামতের দিনপুনর্জীবন দান করবেন।(৩) বায়তুল্লাহ নির্মাণ:বায়তুল্লাহ প্রথমে ফেরেশতাগণ নির্মাণকরেন। অতঃপর হযরত আদম (আঃ) পুনর্নিমাণ করেন জিব্রীলের ইঙ্গিত মতে। তারপরনূহের তূফানের সময় বায়তুল্লাহর প্রাচীর বিনষ্ট হ’লেও ভিত্তি আগের মতই থেকে যায়।পরবর্তীতে আল্লাহর হুকুমে একই ভিত্তিভূমিতে ইবরাহীম তা পুনর্নির্মাণ করেন। এইনির্মাণকালে ইবরাহীম (আঃ) কেন‘আনথেকে মক্কায় এসে বসবাস করেন। ঐ সময় মক্কায়বসতি গড়ে উঠেছিল এবং ইসমাঈল তখন বড় হয়েছেন এবং বাপ-বেটা মিলেই কা‘বা গৃহ নির্মাণকরেন। আল্লাহর ইচ্ছায় তখন থেকে অদ্যাবধি কা‘বা গৃহে অবিরত ধারায় হজ্জ ও ত্বাওয়াফ চালুআছে এবং হরম ও তার অধিবাসীগণ পূর্ণ শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সহকারে সেখানে বসবাসকরে আসছেন। এ বিষয়ে কুরআনী বর্ণনা সমূহ নিম্নরূপ:আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﺑَﻮَّﺃْﻧَﺎ ﻟِﺈِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَﻣَﻜَﺎﻥَ ﺍﻟْﺒَﻴْﺖِ ﺃَﻥ ﻻَّ ﺗُﺸْﺮِﻙْ ﺑِﻲْ ﺷَﻴْﺌﺎً ﻭَﻃَﻬِّﺮْ ﺑَﻴْﺘِﻲَ ﻟِﻠﻄَّﺎﺋِﻔِﻴْﻦَ ﻭَﺍﻟْﻘَﺎﺋِﻤِﻴْﻦَ ﻭَﺍﻟﺮُّﻛَّﻊِ ﺍﻟﺴُّﺠُﻮْﺩِ- ‏(ﺍﻟﺤﺞ ২৬)-‘আরযখন আমরা ইবরাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েবলেছিলাম যে, আমার সাথেকাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখো তাওয়াফকারীদের জন্য, ছালাতেদন্ডায়মানদের জন্যও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্য’(হজ্জ ২২/২৬)। আল্লাহ বলেন, ﻭَﺃَﺫِّﻥ ﻓِﻲﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﺑِﺎﻟْﺤَﺞِّ ﻳَﺄْﺗُﻮﻙَ ﺭِﺟَﺎﻻً ﻭَﻋَﻠَﻯﻜُﻞِّ ﺿَﺎﻣِﺮٍ ﻳَﺄْﺗِﻴﻦَ ﻣِﻦْ ﻛُﻞِّ ﻓَﺞٍّ ﻋَﻤِﻴْﻖٍ – ﻟِﻴَﺸْﻬَﺪُﻭﺍ ﻣَﻨَﺎﻓِﻊَ ﻟَﻬُﻢْ ﻭَﻳَﺬْﻛُﺮُﻭﺍ ﺍﺳْﻢَﺍﻟﻠﻬِﻔِﻲ ﺃَﻳَّﺎﻡٍ ﻣَّﻌْﻠُﻮﻣَﺎﺕٍ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﺎ ﺭَﺯَﻗَﻬُﻢ ﻣِّﻦ ﺑَﻬِﻴﻤَﺔِ ﺍﻟْﺄَﻧْﻌَﺎﻡِ ﻓَﻜُﻠُﻮﺍ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﻭَﺃَﻃْﻌِﻤُﻮﺍ ﺍﻟْﺒَﺎﺋِﺲَ ﺍﻟْﻔَﻘِﻴﺮَ- ‏) ﺍﻟﺤﺞ২৭-২৮(-‘আর তুমি মানুষের মধ্যে হজ্জের ঘোষণা জারি করে দাও। তারা তোমার কাছেআসবে পায়ে হেঁটে এবং (দীর্ঘসফরের কারণে) সর্বপ্রকার কৃশকায়উটের পিঠে সওয়ারহয়ে দূর-দূরান্ত হ’তে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং (কুরবানীর)নির্দিষ্ট দিনগুলিতে(১০, ১১, ১২ই যিলহাজ্জ)তাঁর দেওয়া চতুষ্পদ পশু সমূহ যবেহ করার সময়তাদের উপরে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং আহারকরাও অভাবী ও দুস্থদেরকে’(হজ্জ ২২/২৭-২৮)।উপরোক্ত আয়াতগুলিতে কয়েকটি বিষয়জানা যায়। যেমন- (১) বায়তুল্লাহ ও তার সন্নিকটে কোনরূপ শিরক করা চলবে না (২) এটিস্রেফ তাওয়াফকারী ও আল্লাহর ইবাদতকারীদের জন্য নির্দিষ্ট হবে (৩) এখানে কেবলমুমিন সম্প্রদায়কে হজ্জের আদেশ দেওয়া হয়েছে।হযরত ইবরাহীম (আঃ) মাক্বামেইবরাহীমে দাঁড়িয়ে এবং কোন কোন বর্ণনা মতে আবু কুবায়েস পাহাড়েরউপরে দাঁড়িয়েদুই কানে আঙ্গুল ভরে সর্বশক্তি দিয়ে উচ্চ কণ্ঠে চারদিকে ফিরে বারবার হজ্জের উক্তঘোষণা জারি করেন।ইমাম বাগাভী হযরত ইবনু আববাসের সূত্রে বলেন যে, ইবরাহীমেরউক্ত ঘোষণা আল্লাহ পাক সাথে সাথে বিশ্বের সকল প্রান্তে মানুষের কানে কানে পৌঁছেদেন। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ইবরাহীমী আহবানের জওয়াবই হচ্ছে হাজীদের‘লাববায়েক আল্লা-হুম্মা লাববায়েক’ (হাযির, হে প্রভু আমি হাযির) বলার আসল ভিত্তি। সেদিনথেকে এযাবত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত হ’তে মানুষ চলেছে কা‘বার পথে কেউ পায়েহেঁটে, কেউ উটে, কেউগাড়ীতে, কেউ বিমানে, কেউ জাহাযে ও কেউ অন্যপরিবহনে করে। আবরাহার মত অনেকে চেষ্টা করেও এ স্রোত কখনো ঠেকাতেপারেনি। পারবেও না কোনদিন ইনশাআল্লাহ। দিন-রাত, শীত-গ্রীষ্ম উপেক্ষা করে সর্বদাচলছে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ ও ছাফা-মারওয়ার সাঈ। আর হজ্জের পরে চলছে কুরবানী।এভাবেইবরাহীম ও ইসমাঈলের স্মৃতি চির অম্লান হয়ে আছে মানব ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে।এক কালের চাষাবাদহীন বিজন পাহাড়ী উপত্যকা ইবরাহীমের দো‘আর বরকতে হয়েউঠলো বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের সম্মিলন স্থল হিসাবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﺟَﻌَﻠْﻨَﺎﺍﻟْﺒَﻴْﺖَ ﻣَﺜَﺎﺑَﺔً ﻟِّﻠﻨَّﺎﺱِ ﻭَﺃَﻣْﻨﺎً ﻭَﺍﺗَّﺨِﺬُﻭْﺍ ﻣِﻦ ﻣَّﻘَﺎﻡِ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﻣُﺼَﻠًّﻰ ﻭَﻋَﻬِﺪْﻧَﺎ ﺇِﻟَﻰ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﻭَﺇِﺳْﻤَﺎﻋِﻴْﻞَ ﺃَﻥْ ﻃَﻬِّﺮَﺍﺑَﻴْﺘِﻲَ ﻟِﻠﻄَّﺎﺋِﻔِﻴْﻦَ ﻭَﺍﻟْﻌَﺎﻛِﻔِﻴْﻦَ ﻭَﺍﻟﺮُّﻛَّﻊِ ﺍﻟﺴُّﺠُﻮْﺩِ- ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ১২৫(-‘যখন আমরা কা‘বা গৃহকে লোকদেরজন্য সম্মিলনস্থল ও শান্তিধামে পরিণত করলাম (আর বললাম,) তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়ানোরস্থানটিকে ছালাতের স্থান হিসাবে গ্রহণ কর।অতঃপর আমরা ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশকরলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ই‘তেকাফকারী ও রুকূ-সিজদাকারীদের জন্যপবিত্র কর’(বাক্বারাহ ২/১২৫)। ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ ﺭَﺏِّ ﺍﺟْﻌَﻞْ ﻫَـَﺬَﺍ ﺑَﻠَﺪﺍً ﺁﻣِﻨﺎً ﻭَﺍﺭْﺯُﻕْ ﺃَﻫْﻠَﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺜَّﻤَﺮَﺍﺕِ ﻣَﻦْﺁﻣَﻦَ ﻣِﻨْﻬُﻢ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻭَﺍﻟْﻴَﻮْﻡِ ﺍﻵﺧِﺮِ ﻗَﺎﻝَ ﻭَﻣَﻦ ﻛَﻔَﺮَ ﻓَﺄُﻣَﺘِّﻌُﻪُ ﻗَﻠِﻴْﻼً ﺛُﻢَّ ﺃَﺿْﻄَﺮُّﻩُ ﺇِﻟَﻰ ﻋَﺬَﺍﺏِ ﺍﻟﻨَّﺎﺭِﻭَﺑِﺌْﺲَﺍﻟْﻤَﺼِﻴْﺮُ – ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ১২৬(-‘(স্মরণ কর) যখন ইবরাহীম বলল, পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তিরনগরীতে পরিণত কর এবং এর অধিবাসীদেরকে তুমি ফল-ফলাদি দ্বারা রূযী দান কর- যারাতাদের মধ্যে আল্লাহ ও ক্বিয়ামত দিবসেরউপরে বিশ্বাস স্থাপন করে। (আল্লাহ) বললেন,যারা অবিশ্বাস করে, আমি তাদেরকেও কিছু ভোগের সুযোগ দেব। অতঃপর তাদেরকেআমি যবরদস্তি জাহান্নামের আযাবে ঠেলে দেব। কতই না মন্দ ঠিকানা সেটা’(বাক্বারাহ ২/১২৬)।ইবরাহীমের উপরোক্ত প্রার্থনা অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে সামান্য শাব্দিক পার্থক্য সহকারে।যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ ﺭَﺏِّ ﺍﺟْﻌَﻞْ ﻫَـﺬَﺍ ﺍﻟْﺒَﻠَﺪَ ﺁﻣِﻨﺎً ﻭَﺍﺟْﻨُﺒْﻨِﻲْ ﻭَﺑَﻨِﻲَّ ﺃَﻥْ ﻧَّﻌْﺒُﺪَ ﺍﻷَﺻْﻨَﺎﻡَ -ﺭَﺏِّ ﺇِﻧَّﻬُﻦَّ ﺃَﺿْﻠَﻠْﻨَﻜَﺜِﻴﺮﺍً ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﻓَﻤَﻦْ ﺗَﺒِﻌَﻨِﻲ ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻣِﻨِّﻲْ ﻭَﻣَﻦْ ﻋَﺼَﺎﻧِﻲ ﻓَﺈِﻧَّﻚَ ﻏَﻔُﻮﺭٌ ﺭَّﺣِﻴْﻢٌ- ‏) ﺇﺑﺮﺍﻫﻴﻢ৩৫-৩৬(-‘যখন ইবরাহীম বলল, হে আমার পালনকর্তা! এ শহরকে তুমি শান্তিময় করে দাও এবংআমাকে ও আমার সন্তান-সন্ততিকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখ’(ইবরাহীম ৩৫)। ‘হে আমারপালনকর্তা! এরা (মূর্তিগুলো) অনেক মানুষকে পথভ্রষ্ট করেছে। অতএব যে আমারঅনুসরণ করে, সে আমার দলভুক্ত। আর যে আমার অবাধ্যতা করে, নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল ওদয়াবান’(ইবরাহীম ১৪/৩৬)।অতঃপর কা‘বা গৃহ নির্মাণ শেষে পিতা-পুত্র মিলে যে প্রার্থনা করেন,তা যেমন ছিল অন্তরভেদী, তেমনি ছিল সুদূরপ্রসারী ফলদায়ক। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْﻳَﺮْﻓَﻊُ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ ﺍﻟْﻘَﻮَﺍﻋِﺪَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺒَﻴْﺖِ ﻭَﺇِﺳْﻤَﺎﻋِﻴْﻞُ ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺗَﻘَﺒَّﻞْ ﻣِﻨَّﺎ ﺇِﻧَّﻚَ ﺃَﻧْﺖَ ﺍﻟﺴَّﻤِﻴْﻊُ ﺍﻟْﻌَﻠِﻴْﻢُ- ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﻭَﺍﺟْﻌَﻠْﻨَﺎﻣُﺴْﻠِﻤَﻴْﻦِ ﻟَﻚَ ﻭَﻣِﻦْ ﺫُﺭِّﻳَّﺘِﻨَﺎ ﺃُﻣَّﺔً ﻣُّﺴْﻠِﻤَﺔً ﻟَّﻚَ ﻭَﺃَﺭِﻧَﺎ ﻣَﻨَﺎﺳِﻜَﻨَﺎ ﻭَﺗُﺐْ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﺇِﻧَّﻚَ ﺃَﻧْﺖَ ﺍﻟﺘَّﻮَّﺍﺏُ ﺍﻟﺮَّﺣِﻴْﻢُ- ﺭَﺑَّﻨَﺎﻭَﺍﺑْﻌَﺚْ ﻓِﻴﻬِﻢْ ﺭَﺳُﻮﻻً ﻣِّﻨْﻬُﻢْ ﻳَﺘْﻠُﻮ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﺁﻳَﺎﺗِﻚَ ﻭَﻳُﻌَﻠِّﻤُﻬُﻢُ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏَ ﻭَﺍﻟْﺤِﻜْﻤَﺔَ ﻭَﻳُﺰَﻛِّﻴْﻬِﻢْ ﺇِﻧَّﻚَ ﺃَﻧْﺖَ ﺍﻟﻌَﺰِﻳﺰُﺍﻟﺤَﻜِﻴﻢُ- ‏(ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ১২৭-১২৯)-‘স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা‘বা গৃহের ভিত নির্মাণ করলএবংদো‘আ করল- ‘প্রভু হে! তুমি আমাদের (এই খিদমত) কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতাও সর্বজ্ঞ’। ‘হে প্রভু! তুমি আমাদের উভয়কে তোমার আজ্ঞাবহে পরিণত কর এবংআমাদের বংশধরগণের মধ্য থেকেও তোমার প্রতি একটা অনুগত দল সৃষ্টি কর। তুমিআমাদেরকে হজ্জের নীতি-নিয়মশিখিয়ে দাও এবং আমাদের তওবা কবুল কর। নিশ্চয়ই তুমিতওবা কবুলকারী ও দয়াবান’। ‘হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি এদের মধ্য থেকেই এদেরনিকটে একজন রাসূল প্রেরণ কর, যিনি তাদের নিকটে এসেতোমার আয়াতসমূহ পাঠ করেশুনাবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদের পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই তুমিপরাক্রমশালী ও দূরদৃষ্টিময়’(বাক্বারাহ ২/১২৭-১২৯)।ইবরাহীম ও ইসমাঈলের উপরোক্তদো‘আ আল্লাহ কবুল করেছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে তাদের বংশে চিরকাল একদল মুত্তাকীপরহেযগার মানুষের অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিল। তাঁদের পরের সকল নবী তাঁদের বংশধর ছিলেন।কা‘বার খাদেম হিসাবেও চিরকাল তাদের বংশের একদল দ্বীনদার লোক সর্বদানিয়োজিত ছিল।কা‘বার খেদমতের কারণেই তাদের সম্মান ও মর্যাদা সারা আরবে এমনকি আরবের বাইরেওবিস্তার লাভ করেছিল। আজও সঊদী বাদশাহদের লক্বব হ’ল ‘খাদেমুল হারামায়েন আশ-শারীফায়েন’ (দুই পবিত্র হরমের সেবক)। কেননা বাদশাহীতে নয়, হারামায়েন-এর সেবকহওয়াতেই গৌরব বেশী।ইবরাহীমের দো‘আর ফসল হিসাবেই মক্কায় আগমন করেনবিশ্বনবী ও শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)। তিনি বলতেন, ﺃَﻧَﺎ ﺩَﻋْﻮَﺓُ ﺃَﺑِﻲْ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﻭَﺑُﺸْﺮَﻯ ﻋِﻴْﺴَﻰ -‘আমিআমার পিতা ইবরাহীমের দো‘আর ফসল ও ঈসার সুসংবাদ’।[23]এই মহানগরীটি সেইইবরাহীমী যুগ থেকেই নিরাপদ ও কল্যাণময় নগরী হিসাবে অদ্যাবধি তার মর্যাদা বজায়রেখেছে। জাহেলী আরবরাও সর্বদা একে সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখত। এমনকিকোন হত্যাকারীএমনকি কোন পিতৃহন্তাও এখানে এসেআশ্রয় নিলে তারা তার প্রতিশোধনিত না। হরমের সাথে সাথে এখানকার অধিবাসীরাও সর্বত্র সমাদৃত হ’তেন এবং আজও হয়েথাকেন।পরীক্ষা সমূহের মূল্যায়ন :ইবরাহীমের পরীক্ষা সমূহ তাঁর যোগ্যতা যাচাইয়েরজন্য ছিল না বা তাঁর কোন অপরাধের সাজা হিসাবে ছিল না। বরং এর উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্নপরীক্ষার মাধ্যমে লালন করে পূর্ণত্বের মহান স্তরেপৌছে দেওয়া এবং তাঁকে আগামীদিনে বিশ্বনেতার মর্যাদায় সমাসীন করা। সঙ্গে সঙ্গে সবাইকেএটা দেখিয়ে দেওয়া যে,আল্লাহর নিকটে প্রিয় ও সম্মানিত বান্দাগণকে দুনিয়াতে বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হ’তেহয়। আল্লাহর সুন্দর গুণাবলীর মধ্যেﺭَﺑُّﻪُ(‘তার পালনকর্তা’) গুণটিকে খাছকরে বলার মধ্যেস্বীয় বন্ধুর প্রতি স্নেহ ও তাকে বিশেষ অনুগ্রহে লালন করার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে।এক্ষণে তাঁর পরীক্ষার সংখ্যা কত ছিল সে বিষয়ে কুরআন নির্দিষ্টভাবে কিছু উল্লেখকরেনি। কেবল বলেছে, ﺑِﻜَﻠِﻤَﺎﺕٍ ‘অনেকগুলি বাণী দ্বারা’(বাক্বারাহ ২/১২৪)। অর্থাৎশরী‘আতের বহুবিধ আদেশ ও নিষেধ সমূহ দ্বারা। ‘কালেমাত’ শব্দটি বিবি মারিয়ামের জন্যেওব্যবহৃত হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, ﻭَﺻَﺪَّﻗَﺖْ ﺑِﻜَﻠِﻤَﺎﺕِ ﺭَﺑِّﻬَﺎ ‘মারিয়াম তার পালনকর্তার বাণীসমূহকে সত্যে পরিণত করেছিল’(তাহরীম ৬৬/১২)।ইবরাহীমের জীবনে পরীক্ষারসংখ্যা কত ছিল এরূপ এক প্রশ্নের জবাবে ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ইসলামের ৩০টি অংশরয়েছে। যার ১০টি সূরা তওবায়(১১২ আয়াতে), ১০টি সূরা মুমিনূনে(১-৯ আয়াতে)ও সূরামা‘আরিজে(২২-৩৪ আয়াতে)এবং বাকী ১০টি সূরা আহযাবে(৩৫ আয়াতে)বর্ণিত হয়েছে। যারসব ক’টিইবরাহীম (আঃ) পূর্ণ করেন। অতঃপর আল্লাহ তাকে সনদ দিয়ে বলেন, ﻭَﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﺍﻟَّﺬِﻯْﻭَﻓَّﻰ ‘এবং ইবরাহীমের ছহীফায়, যিনি (আনুগত্যের অঙ্গীকার) পূর্ণ করেছিলেন’(নাজম৫৩/৩৭)।[24]তবে ইবনু জারীর ও ইবনু কাছীর উভয়ে বলেন, ইবরাহীমের জীবনে যতসংখ্যক পরীক্ষাই আসুক না কেন আল্লাহ বর্ণিত ‘কালেমাত’ বহু বচনের শব্দটি সবকিছুকেশামিল করে’(ইবনু কাছীর)।বস্ত্ততঃ পরীক্ষা সমূহের সংখ্যা বর্ণনা করা কিংবা ইবরাহীমেরসুক্ষ্মদর্শিতা ও জ্ঞানের গভীরতা যাচাই করা এখানেমুখ্য বিষয় নয়, বরং আল্লাহর প্রতি তাঁরআনুগত্যশীলতা ও নিখাদ আত্মসমর্পণ এবং কার্যক্ষেত্রে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা যাচাই করাই ছিলমুখ্য বিষয়।শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ :(১) ইবরাহীমী জীবন থেকে প্রধান শিক্ষণীয় বিষয় হ’লসর্বাবস্থায় আল্লাহর নিকটে আত্মসমর্পণ। যাকে বলা হয় ‘ইসলাম’। যেমন আল্লাহবলেন, ﺇِﺫْﻗَﺎﻝَ ﻟَﻪُ ﺭَﺑُّﻪُ ﺃَﺳْﻠِﻢْ ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺳْﻠَﻤْﺖُ ﻟِﺮَﺏِّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ، ﻭَﻭَﺻَّﻰ ﺑِﻬَﺎ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ ﺑَﻨِﻴْﻪِ ﻭَﻳَﻌْﻘُﻮْﺏُ- ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ১৩১-১৩২(-‘স্মরণ কর যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেন, তুমি আত্মসমর্পণ কর। তখন সেবলল, আমি আত্মসমর্পণ করলাম বিশ্ব চরাচরের প্রতিপালকের নিকট’। ‘এবংএকই বিষয়েসন্তানদেরকে অছিয়ত করে যান ইবরাহীম ও ইয়াকূব’(বাক্বারাহ ২/১৩১-৩২)। অন্যত্র আল্লাহবলেন, ﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ ﻳَﻬُﻮْﺩِﻳًّﺎ ﻭَﻻَ ﻧَﺼْﺮَﺍﻧِﻴًّﺎ ﻭَﻟَﻜِﻦْ ﻛَﺎﻥَ ﺣَﻨِﻴْﻔًﺎ ﻣُّﺴْﻠِﻤًﺎ- ‏)ﺁﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ ৬৭(-‘ইবরাহীমইহুদী বা নাছারা ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠরূপে ‘মুসলিম’বা আত্মসমর্পিত’ (আলেইমরান ৩/৬৭)।অতএব ইহুদী, নাছারা ইত্যাদি দলীয় রং দিয়ে তাঁকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারকরা বাতুলতা মাত্র। বরং তিনি ছিলেন নিখাদ আল্লাহ প্রেমিক। আর সেকারণ সকল আল্লাহভীরুমানুষের তিনি নেতা ছিলেন।(২) আল্লাহর কাছে বড় হ’তে গেলে তাকে আল্লাহর পক্ষথেকেই বড় বড় পরীক্ষায় ফেলা হয়। আর তাতে উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যেই থাকেইহকালীন ও পরকালীন সফলতা।(৩) পরীক্ষা এলে সাহসিকতার সাথে মুকাবিলা করতে হয়।শয়তানী প্ররোচনায় পিছিয়ে গেলেই ব্যর্থ হ’তে হয়। যেমন পুত্র যবহের পূর্বেশয়তানী ধোঁকার বিরুদ্ধে ইবরাহীম (আঃ) কংকর নিক্ষেপ করেছিলেন ও পরে সফলকামহয়েছিলেন।উপসংহার :ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রায় দু’শো বছরের পুরা জীবনটাই ছিলপরীক্ষার জীবন। সুখে-দুখে, আনন্দে-বিষাদে সর্বাবস্থায় তিনি ছিলেন আল্লাহর উপরেএকান্তনির্ভরশীল। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রশক্তির বিরোধিতা তাঁকে তাঁর বিশ্বাস থেকে এক চুলটলাতে পারেনি। অবশেষে জন্মভূমি ত্যাগ করে হিজরত করে আসতেও তিনি পিছপাহননি।আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় বৃদ্ধ বয়সের নয়নের মণি একমাত্র শিশু পুত্রকে তার মা সহ মক্কারবিজনভূমিতে নির্বাসনে দিয়ে আসতেও তাঁর হৃদয় টলেনি। অবশেষে ঐ সন্তানকে যবেহকরার মত কঠিনতম উদ্যোগ নিতেও তাঁর হাত কেঁপে ওঠেনি। এভাবে জীবনভর অগণিতপরীক্ষার চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে পূর্ণ-পরিণত ইবরাহীম পেলেন ‘বিশ্বনেতা’ হবার মত বিরলদুনিয়াবী পুরস্কারের মহান এলাহী ঘোষণা। হ’লেন ভবিষ্যৎ নবীগণের পিতা ‘আবুল আম্বিয়া’এবং মিল্লাতে ইসলামিয়াহর নেতা হবার মত দুর্লভ সম্মান। আজও যদি পৃথিবীর দিকে দিকেইবরাহীমী ঈমানের জ্যোতি বিকীরিত হয়, আবার মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সে ঈমান ফিরেআসে, তবে বর্তমান অশান্ত পৃথিবীর নমরূদী হুতাশন আবারও পুষ্পকাননে পরিণত হবেইনশাআল্লাহ। ইকবাল তাই গেয়েছেন, ﺍﮔﺮ ﻫﻮ ﭘﮩﺮ ﺍﺑﺮﺍﮬﯿﻢ ﮐﺎ ﺍﻳﻤﺎﮞ ﭘﻴﺪﺍﺁﮒ ﮐﺮﺳﮑﺘﻲ ﻫﮯ ﭘﻬﺮﺍﻧﺪﺍﺯ ﮔﻠﺴﺘﺎﮞ ﭘﻴﺪﺍ ‘বিশ্বে যদি সৃষ্টি হয় ফের ইবরাহিমী ঈমানহুতাশনে তবে সৃষ্টি হবে ফেরপুষ্পের কানন’\[1]. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৮৬৬ ‘মে‘রাজ’ অনুচ্ছেদ।[2]. আবুদাঊদ, তিরমিযী,মিশকাত হা/৫৪৫৩-৫৪; হাকেম ৪/৫৫৭-৫৮ পৃঃ প্রভৃতি।[3]. তারীখুল আম্বিয়া পৃঃ ৬৮।[4]. তারীখুলআম্বিয়া, পৃঃ ৭৪।[5]. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৬৪ পৃ:।[6]. যথাক্রমে সূরা বাক্বারাহ২/১২৪-১৩৩=১০; ১৩৫, ১৩৬, ১৪০, ২৫৮, ২৬০; আলে ইমরান ৩/৩৩, ৩৪, ৬৫-৬৮=৪; ৮৪, ৯৫, ৯৬,৯৭;নিসা ৪/৫৪, ১২৫, ১৬৩; আন‘আম ৬/৭৪-৮৩=১০;১৬১; তওবাহ ৯/৭০, ১১৪; হূদ ১১/৬৯-৭৬=৮;ইউসুফ ১২/৬, ৩৮; ইবরাহীম ১৪/৩৫-৪১=৭; হিজর ১৫/৫১-৬০=১০; নাহ্ল ১৬/১২০-১২৩=৪; মারিয়াম১৯/৪১-৫০=১০; ৫৮; আম্বিয়া ২১/৫১-৭৩=২৩; হজ্জ ২২/২৬, ৪৩,৭৮; শো‘আরা ২৬/৬৯-৮৯=২১;আনকাবূত ২৯/১৬-২৭=১২; ৩১; আহযাব ৩৩/৭; ছাফফাত ৩৭/৮৩-১১৩=৩১; ছোয়াদ ৩৮/৪৫-৪৭=৩;শূরা ৪২/১৩; যুখরুফ ৪৩/২৬, ২৭; যারিয়াত ৫১/২৪-৩৪=১১; নাজম ৫৩/৩৭; হাদীদ ৫৭/২৬, ২৭; মুমতাহানা৬০/৪-৬=৩;আ‘লা ৮৭/১৯, সর্বমোট = ২০৪টি \[7]. কুরতুবী, আন‘আম ৭৬ টীকা।[8].মুসলিম ‘জান্নাত’ অধ্যায়; মিশকাত হা/৫৩৭১ ‘রিক্বাক্ব’ অধ্যায় ৮ অনুচ্ছেদ।[9].বুখারী, হা/৪৫৬৩তাফসীর অধ্যায়, সূরা আলে-ইমরান ।[10]. আলে ইমরান ৩/১৭৩; আর-রাহীক্ব পৃঃ ২৮৬।[11].কুরতুবী, আন‘আম ৭৫-এর টীকা।[12]. ঢাকা, দৈনিক ইনকিলাব তাং ৭/৬/০৬ পৃঃ ১৩।[13]. তারীখুলআম্বিয়া, পৃঃ ১২৪।[14]. বুখারী হা/২২১৭ ‘ক্রয়-বিক্রয়’ অধ্যায়; আহমাদ, সনদ ছহীহ।[15]. ছহীহবুখারী হা/৩৩৫৮ ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়।[16]. শামায়েলে তিরমিযী; সিলসিলা ছহীহাহহা/২৯৮৭।[17]. বুখারী (দেওবন্দ ১৯৮৫) ১/৫৫৬ পৃঃ হা/৩৯১১ ‘নবীর হিজরত’ অনুচ্ছেদ ; আর-রাহীক্ব পৃঃ ১৬৮।[18]. ইহসান ইলাহী যহীর, আশ-শী‘আহ ওয়াসসুন্নাহ (লাহোর, পাকিস্তান :ইদারা তারজুমানুস সুন্নাহ, তাবি), পৃঃ ১৬৪-৬৫।[19]. ত্বোয়াহা ২০/১২১।[20]. ইবরাহীম ১৪/৩৭;বুখারী ইবনু আববাস (রাঃ) বর্ণিত দীর্ঘ হাদীছের সারসংক্ষেপ; ‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়হা/৩৩৬৪।[21]. বুখারী, আবু হুরায়রা হ’তে হা/৩৩৫৬, ৬২৯৭; কুরতুবী হা/৬৫১-এর আলোচনাদ্রষ্টব্য।[22]. ইবনু আববাস হ’তে মুসনাদে আহমাদ হা/২৭০৭, ২৭৯৫, সনদ ছহীহ,শো‘আয়েব আরনাঊত্ব।[23]. আহমাদ ও ছহীহ ইবনে হিববান, সিলসিলা ছাহীহাহ হা/১৫৪৫।[24].হাকেম ২/৫৫২ সনদ ছহীহ; তাফসীর ইবনে কাছীর, বাক্বারাহ ১১৪-এর টীকা দ্রষ্টব্য।