হযরত ইয়াকুব আঃ এর জীবনী


হযরত ইয়াকুব (আ:) জীবনিহযরত ইয়াকূব(আলাইহিস সালাম)ইসহাক্ব (আঃ)-এর দুই যমজ পুত্র ঈছও ইয়াকূব-এর মধ্যে ছোটছেলে ইয়াকূব নবী হন। ইয়াকূবের অপর নাম ছিল ‘ইস্রাঈল’।[1]যার অর্থ আল্লাহর দাস।নবীগণের মধ্যে কেবল ইয়াকূব ও মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর দু’টি করে নাম ছিল। মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এরঅপর নাম ছিল ‘আহমাদ’(ছফ ৬১/৬)। ইয়াকূব তার মামুর বাড়ী ইরাকের হারান) ﺣﺮﺍﻥ (যাবার পথে রাতহয়ে গেলে কেন‘আনেরঅদূরে একস্থানে একটি পাথরের উপরে মাথা রেখে ঘুমিয়েপড়েন। সে অবস্থায় স্বপ্ন দেখেন যে, একদল ফেরেশতা সেখান থেকে আসমানেউঠানামা করছে। এরি মধ্যে আল্লাহতাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ﺇﻧﻰ ﺳﺄﺑﺎﺭﻙ ﻋﻠﻴﻚ ﻭﺍﻛﺜﺮﺫﺭﻳﺘﻚ ﻭﺍﺟﻌﻞ ﻟﻚ ﻫﺬﻩ ﺍﻷﺭﺽ ﻭﻟﻌﻘﺒﻚ ﻣﻦ ﺑﻌﺪﻙ -‘অতিসত্ত্বর আমি তোমার উপরে বরকত নাযিলকরব, তোমার সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করে দেব, তোমাকে ওতোমার পরে তোমারউত্তরসূরীদের এই মাটির মালিক করে দেব’। তিনি ঘুম থেকে উঠে খুশী মনে মানতকরলেন, যদি নিরাপদে নিজ পরিবারের কাছে ফিরে আসতে পারেন, তাহ’লে এই স্থানে তিনিএকটি ইবাদতখানা প্রতিষ্ঠা করবেন এবং আল্লাহ তাকে যা রূযী দেবেন তার এক দশমাংশআল্লাহর পথে ব্যয় করবেন’। অতঃপর তিনি ঐ স্থানে পাথরটির উপরে একটি চিহ্ন এঁকেদিলেন যাতে তিনি ফিরে এসে সেটাকে চিনতে পারেন। তিনি স্থানটির নাম রাখলেন, ﺑﻴﺖﺇﻳﻞ অর্থাৎ আল্লাহর ঘর।[2]এই স্থানেই বর্তমানে ‘বায়তুল মুক্বাদ্দাস’ অবস্থিত, যা পরবর্তীতেপ্রায় ১০০০ বছর পরে হযরত সুলায়মান (আঃ) পুনর্নির্মাণ করেন। মূলতঃ এটিই ছিল ‘বায়তুলমুক্বাদ্দাসের’ মূল ভিত্তি ভূমি, যা কা‘বা গৃহের চল্লিশ বছর পরে ফেরেশতাদের দ্বারা কিংবা আদমপুত্রদের হাতেকিংবা ইসহাক্ব (আঃ) কর্তৃক নির্মিত হয়। নিশ্চিহ্ন হওয়ার কারণে আল্লাহ ইয়াকূব(আঃ)-কে স্বপ্নে দেখান এবং তাঁর হাতে সেখানে পুনরায় ইবাদতখানা তৈরী হয়।ইস্রাঈলীবর্ণনা অনুযায়ী ইয়াকূব হারানে মামুর বাড়ীতে গিয়ে সেখানে তিনি তার মামাতো বোন‘লাইয়া’) ﻟﻴّﺎ (ও পরে ‘রাহীল’ ( ﺭﺍﺣﻴﻞ )-কে বিবাহ করেন এবং দু’জনের মোহরানা অনুযায়ী৭+৭=১৪ বছর মামুর বাড়ীতে দুম্বা চরান। ইবরাহীমী শরী‘আতে দু’বোন একত্রে বিবাহকরা জায়েয ছিল। পরে মূসা (আঃ)-এর শরী‘আতে এটা নিষিদ্ধ করা হয়। শেষোক্ত স্ত্রীরগর্ভে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বসেরা সুন্দর পুরুষ ‘ইউসুফ’। অতঃপর দ্বিতীয় পুত্রবেনিয়ামীনের জন্মের পরেই তিনি মারা যান। তাঁর কবর বেথেলহামে) ﺑﻴﺖ ﻟﺤﻢ (অবস্থিত এবং‘ক্ববরে রাহীল’ নামে পরিচিত। পরে তিনি আরেক শ্যালিকাকে বিবাহ করেন। ইয়াকূবের ১২পুত্রের মধ্যে ইউসুফ নবী হন। প্রথমা স্ত্রীর পুত্র লাভী) ﻻﻭﻯ (-এর পঞ্চম অধঃস্তনপুরুষ মূসা ও হারূণ নবী হন। এভাবে ইয়াকূব (আঃ)-এর বংশেই নবীদের সিলসিলা জারি হয়ে যায়।ইয়াকূব-এর অপর নাম ‘ইসরাঈল’ অনুযায়ী তাঁর বংশধরগণ ‘বনু ইস্রাঈল’ নামে পরিচিত হয়। হঠকারীইহুদী-নাছারাগণ যাতে তারা ‘আল্লাহর দাস’ একথা বারবার স্মরণ করে, সেকারণ আল্লাহ পবিত্রকুরআনে তাদেরকে ‘বনু ইস্রাঈল’ বলেই স্মরণ করেছেন।হারান থেকে ২০ বছর পরইয়াকূব তাঁর স্ত্রী-পরিজন সহ জন্মস্থান‘হেবরনে’ ফিরে আসেন। যেখানে তাঁর দাদাইবরাহীম ও পিতা ইসহাক্ব বসবাস করতেন। যা বর্তমানে ‘আল-খলীল’ নামে পরিচিত। পূর্বেরমানত অনুসারে তিনি যথাস্থানে বায়তুল মুক্বাদ্দাস মসজিদ নির্মাণ করেন(ঐ)।কেন‘আন-ফিলিস্তীন তথা শাম এলাকাতেই তাঁর নবুঅতের মিশন সীমায়িত থাকে। ইউসুফ কেন্দ্রিক তাঁরজীবনের বিশেষ ঘটনাবলী ইউসুফ (আঃ)-এর জীবনীতে আলোচিত হবে। তিনি ১৪৭বছর বয়সে মিসরে মৃত্যুবরণ করেন এবং হেবরনে পিতাইসহাক (আঃ)-এর কবরের পাশেসমাধিস্থ হন।উল্লেখ্য যে, হযরত ইয়াকূব (আঃ) সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ১০টি সূরায় ৫৭টিআয়াতে বর্ণিত হয়েছে।[3]ইয়াকূবের অছিয়ত:কেন‘আন থেকে মিসরে আসার ১৭ বছর পরমতান্তরে ২৩ বছরের অধিক কাল পরে ইয়াকূবের মৃত্যু ঘনিয়ে এলে তিনি সন্তানদের কাছেডেকে অছিয়তকরেন। সে অছিয়তটির মর্ম আল্লাহ নিজ যবানীতে বলেন, ﻭَﻭَﺻَّﻰ ﺑِﻬَﺎﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢُ ﺑَﻨِﻴْﻪِ ﻭَﻳَﻌْﻘُﻮْﺏُ ﻳَﺎ ﺑَﻨِﻲَّ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﺍﺻْﻄَﻔَﻰ ﻟَﻜُﻢُ ﺍﻟﺪِّﻳْﻦَ ﻓَﻼَ ﺗَﻤُﻮْﺗُﻦَّ ﺇَﻻَّ ﻭَﺃَﻧﺘُﻢْ ﻣُّﺴْﻠِﻤُﻮْﻥَ -ﺃَﻡْ ﻛُﻨﺘُﻢْﺷُﻬَﺪَﺁﺀَ ﺇِﺫْ ﺣَﻀَﺮَ ﻳَﻌْﻘُﻮْﺏَ ﺍﻟْﻤَﻮْﺕُ ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﻟِﺒَﻨِﻴْﻪِ ﻣَﺎ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭْﻥَ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪِﻱ ﻗَﺎﻟُﻮﺍْ ﻧَﻌْﺒُﺪُ ﺇِﻟَـﻬَﻚَ ﻭَﺇِﻟَـﻪَ ﺁﺑَﺎﺋِﻚَﺇِﺑْﺮَﺍﻫِﻴْﻢَ ﻭَﺇِﺳْﻤَﺎﻋِﻴْﻞَ ﻭَﺇِﺳْﺤَﺎﻕَ ﺇِﻟَـﻬﺎً ﻭَّﺍﺣِﺪﺍً ﻭَّﻧَﺤْﻦُ ﻟَﻪُ ﻣُﺴْﻠِﻤُﻮْﻥَ – ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ১৩৩(-‘এরই অছিয়ত করেছিলইবরাহীম তার সন্তানদের এবং ইয়াকূবও যে, হে আমার সন্তানগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্যদ্বীনকে মনোনীত করেছেন। অতএব তোমরা অবশ্যই মুসলিম না হয়ে মরোনা’(বাক্বারাহ ১৩২)। ‘তোমরা কি তখন উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকূবের মৃত্যু ঘনিয়ে আসে?যখনসে সন্তানদের বলল, আমার পরে তোমরা কার ইবাদত করবে? তারা বলল, আমরাআপনার উপাস্য এবং আপনার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাক্বের উপাস্যের ইবাদত করব-যিনি একক উপাস্য এবং আমরা সবাই তাঁর প্রতি সমর্পিত’(বাক্বারাহ ২/১৩৩)।শুরুতে বলা হয়েছে ‘এরইঅছিয়ত করেছিলেন ইবরাহীম। কিন্তু সেটা কি ছিল? আল্লাহ বলেন, ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﻟَﻪُ ﺭَﺑُّﻪُ ﺃَﺳْﻠِﻢْ ﻗَﺎﻝَﺃَﺳْﻠَﻤْﺖُ ﻟِﺮَﺏِّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ- ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ১৩১(-‘স্মরণ কর যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেন,আত্মসমর্পণ কর। সে বলল, আমি বিশ্বপালকের প্রতি আত্মসমর্পণ করলাম’(বাক্বারাহ ২/১৩১)।অর্থাৎ ইবরাহীমের অছিয়ত ছিল তাঁর সন্তানদের প্রতি ইসলামের। তাঁর পৌত্র ইয়াকূবেরওঅছিয়ত ছিল স্বীয় সন্তানদের প্রতি ইসলামের। এজন্য ইবরাহীম তার অনুসারীদের নামরেখেছিলেন- ‘মুসলিম’ বা আত্মসমর্পিত(হজ্জ ২২/৭৮)। ইবরাহীম তাঁর অপর প্রার্থনায় মুসলিম-এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে ﻓَﻤَﻦ ﺗَﺒِﻌَﻨِﻲ ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻣِﻨِّﻲ ﻭَﻣَﻦْ ﻋَﺼَﺎﻧِﻲ ﻓَﺈِﻧَّﻚَ ﻏَﻔُﻮﺭٌ ﺭَّﺣِﻴﻢٌ ، ‘যে ব্যক্তিআমার অনুসরণ করল, সে ব্যক্তি আমার দলভুক্ত। কিন্তু যে ব্যক্তি আমার অবাধ্যতা করল, তারবিষয়ে আল্লাহ তুমি ক্ষমাশীলও দয়াবান’(ইবরাহীম ১৪/৩৬)।বুঝা গেল যে, ইবরাহীম, ইসমাঈল,ইসহাক, ইয়াকূব প্রমুখ নবীগণের ধর্ম ছিল ‘ইসলাম’। তাদের মূল দাওয়াত ছিল তাওহীদ তথাআল্লাহর ইবাদতে একত্ব। শুধুমাত্র আল্লাহর স্বীকৃতির মধ্যে তা সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁরবিধানের প্রতি আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের মধ্যেই তার যথার্থতা নিহিত ছিল। কিন্তুপরবর্তীকালে তাদের অনুসারী হবার দাবীদার ইহুদী-নাছারাগণ তাদের নবীগণের সেইঅছিয়ত ভুলে যায় এবং অবাধ্যতা, যিদ ও হঠকারিতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়ে তারা আল্লাহরঅভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট) ﺍﻟﻤﻐﻀﻮﺏ ﻭﺍﻟﻀﺂﻟﻴﻦ (জাতিতে পরিণত হয়।[4]ইবরাহীম ও ইয়াকূবেরঅছিয়তে এটা প্রমাণিত হয় যে, সন্তানের জন্য দুনিয়াবী ধন-সম্পদ রেখে যাওয়ার চাইতেতাদেরকে ঈমানী সম্পদে সম্পদশালী হওয়ার অছিয়ত করে যাওয়াই হ’ল দূরদর্শী পিতারপ্রধানতম দায়িত্ব ও কর্তব্য।[1]. আলে-ইমরান ৩/৯৩ ; মারিয়াম ১৯/৫৮।[2]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৮২।[3].যথাক্রমে সূরা বাক্বারাহ ২/১৩২-১৩৩; ১৩৬, ১৪০; আলে ইমরান ৩/৮৪; নিসা ৪/১৬৩; মায়েদাহ৫/৮৪-৮৫; হূদ ১১/৭১; ইউসুফ ১২/৪-৯=৬; ১১-১৪=৪; ১৫-১৮=৪; ৩৮; ৬৩-৬৮=৬; ৭৮-৮৭=১০;৯৩-১০০=৮ মোট ৩৯; মারিয়াম ১৯/৬, ৪৯-৫০; আম্বিয়া ২১/৭২-৭৩; আনকাবূত ২৯/২৭; ছোয়াদ৩৮/৪৫-৪৭=৩। সর্বমোট= ৫৭টি\[4]. ছহীহ তিরমিযী হা/২৯৫৪ ‘তাফসীর’ অধ্যায়; ছহীহুলজামে‘ হা/৮২০২।