হযরত দাউদ আঃ এর জীবনী


হযরত দাঊদ (আ:) জীবনিহযরত দাঊদ(আলাইহিস সালাম)1.জালূত ও তালূতের কাহিনী এবং দাঊদের বীরত্ব2.শিক্ষণীয়বিষয়3.দাঊদ (আঃ)-এর কাহিনী4.দাঊদ (আঃ)-এর বৈশিষ্ট্য সমূহ1.দাঊদ (আঃ)-এর জীবনেরস্মরণীয় ঘটনাবলী2.সংশয় নিরসন3.দাঊদ (আঃ)-এর জীবনীতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহবিপুলশক্তি ও রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারী নবী ছিলেন মাত্র দু’জন। তাঁরা হ’লেন পিতা ও পুত্র দাঊদ ওসুলায়মান (আঃ)। বর্তমান ফিলিস্তীন সহ সমগ্র ইরাক ও শাম (সিরিয়া) এলাকায় তাঁদের রাজত্ব ছিল।পৃথিবীর অতুলনীয় ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তাঁরা ছিলেন সর্বদা আল্লাহর প্রতি অনুগত ওসদা কৃতজ্ঞ। সেকারণ আল্লাহ তার শেষনবীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ﻭﺍﺻْﺒِﺮْ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﺎﻳَﻘُﻮﻟُﻮﻥَ ﻭَﺍﺫْﻛُﺮْ ﻋَﺒْﺪَﻧَﺎ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَ ﺫَﺍ ﺍﻟْﺄَﻳْﺪِ ﺇِﻧَّﻪُ ﺃَﻭَّﺍﺏٌ – ‏)ﺹ ১৭(-‘তারা যেসব কথা বলে তাতে তুমি ছবর করএবং আমার শক্তিশালী বান্দা দাঊদকে স্মরণ কর। সে ছিল আমার প্রতিসদাপ্রত্যাবর্তনশীল’(ছোয়াদ ৩৮/১৭)।দাঊদ হলেন আল্লাহর একমাত্র বান্দা, যাকে খুশীহয়ে পিতা আদম স্বীয় বয়স থেকে ৪০ বছর কেটে তাকেদান করার জন্য আল্লাহরনিকটে সুফারিশ করেছিলেন এবং সেমতে দাঊদের বয়স ৬০ হ’তে ১০০ বছরে বৃদ্ধি পায়[1]উল্লেখ্য যে, হযরত দাঊদ (আঃ) সম্পর্কে কুরআনের ৯টি সূরায় ২৩টি আয়াতে বর্ণিতহয়েছে।[2]তিনি ছিলেন শেষনবী (ছাঃ)-এর আগমনের প্রায় দেড় হাযার বছরের পূর্বেকারনবী[3]দাঊদ কেবল রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেয়েই শক্তিশালী হননি, বরং তিনি জন্মগতভাবেইছিলেন দৈহিকভাবে শক্তিশালী এবং একই সাথে ঈমানী শক্তিতে বলিয়ান। নিম্নোক্ত ঘটনায় তাবর্ণিত হয়েছে।-জালূত ও তালূতের কাহিনী এবং দাঊদের বীরত্ব :সাগরডুবি থেকে নাজাতপেয়ে মূসা ও হারূণ (আঃ) যখন বনু ইস্রাঈলদের নিয়ে শামে এলেন এবং শান্তিতে বসবাসকরতে থাকলেন, তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের পিতৃভূমি ফিলিস্তীনে ফিরে যাবার আদেশদিলেন এবং ফিলিস্তীন দখলকারী শক্তিশালী আমালেক্বাদের সঙ্গে জিহাদের নির্দেশদিলেন। সাথে সাথে এ ওয়াদাও দিলেন যে, জিহাদে নামলেই তোমাদের বিজয় দান করা হবে(মায়েদাহ ৫/২৩)। কিন্তু এই ভীতু ও জিহাদ বিমুখ বিলাসী জাতি তাদের নবী মূসাকে পরিষ্কারবলে দিল, ﺍﺫْﻫَﺐْ ﺃَﻧﺖَ ﻭَﺭَﺑُّﻚَ ﻓَﻘَﺎﺗِﻼ ﺇِﻧَّﺎ ﻫَﺎﻫُﻨَﺎ ﻗَﺎﻋِﺪُﻭْﻥَ- ‏) ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ ২৫(-‘তুমি ও তোমার রব গিয়ে যুদ্ধকর গে। আমরা এখানেবসে রইলাম’(মায়েদাহ ৫/২৪)। এতবড় বেআদবীর পরে মূসা (আঃ)তাদের ব্যাপারে নিরাশ হ’লেন এবং কিছু দিনের মধ্যেই দু’ভাই পরপর তিন বছরের ব্যবধানেমৃত্যু বরণ করলেন।জিহাদের আদেশ অমান্য করার শাস্তি স্বরূপ মিসর ও শামের মধ্যবর্তীতীহ প্রান্তরে চল্লিশ বছর যাবত উন্মুক্ত কারাগারে অতিবাহিত করার পর মূসার শিষ্য ও ভাগিনা এবংপরবর্তীতে নবী ইউশা‘ বিন নূনের নেতৃত্বে জিহাদ সংঘটিত হয় এবং আমালেক্বাদেরহটিয়ে তারা ফিলিস্তীন দখল করে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তারা পুনরায় বিলাসিতায় গা ভাসিয়েদেয় এবং নানাবিধ অনাচারে লিপ্ত হয়। তখন আল্লাহ তাদের উপরে পুনরায় আমালেক্বাদেরচাপিয়ে দেন। বনু ইস্রাঈলরা আবার নিগৃহীত হ’তে থাকে। এভাবে বহু দিন কেটে যায়। একসময় শ্যামুয়েল) ﺷﻤﻮﻳﻞ (নবীর যুগ আসে। লোকেরা বলে আপনি আমাদের জন্য একজনসেনাপতি দানেরজন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ করুন, যাতে আমরা আমাদের পূর্বের ঐতিহ্যফিরে পাই এবং বর্তমান দুর্দশা থেকে মুক্তি পাই। এই ঘটনা আল্লাহ তার শেষনবীকেশুনিয়েছেন নিম্নোক্ত ভাষায়- ﺃَﻟَﻢْ ﺗَﺮَ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟْﻤَﻺِ ﻣِﻦ ﺑَﻨِﻲ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪِ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻟِﻨَﺒِﻲٍّ ﻟَّﻬُﻢُﺍﺑْﻌَﺚْ ﻟَﻨَﺎ ﻣَﻠِﻜﺎً ﻧُﻘَﺎﺗِﻞْ ﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻗَﺎﻝَ ﻫَﻞْ ﻋَﺴَﻴْﺘُﻢْ ﺇِﻥْ ﻛُﺘِﺐَ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢُ ﺍﻟْﻘِﺘَﺎﻝُ ﺃَﻻَّ ﺗُﻘَﺎﺗِﻠُﻮْﺍ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻭَﻣَﺎ ﻟَﻨَﺎﺃَﻻَّ ﻧُﻘَﺎﺗِﻞَ ﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﻗَﺪْ ﺃُﺧْﺮِﺟْﻨَﺎ ﻣِﻦْ ﺩِﻳَﺎﺭِﻧَﺎ ﻭَﺃَﺑْﻨَﺂﺋِﻨَﺎ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻛُﺘِﺐَ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢُ ﺍﻟْﻘِﺘَﺎﻝُ ﺗَﻮَﻟَّﻮْﺍ ﺇِﻻَّ ﻗَﻠِﻴﻼً ﻣِّﻨْﻬُﻢْﻭَﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠِﻴﻢٌ ﺑِﺎﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴْﻦَ- ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ২৪৬(-‘তুমি কি মূসার পরে বনু ইস্রাঈলদের একদল নেতাকেদেখনি, যখন তারা তাদের নবীকে বলেছিল, আমাদের জন্য একজন শাসক প্রেরণ করুন,যাতে আমরা (তার নেতৃত্বে) আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি। নবী বললেন, তোমাদেরপ্রতি কি এমনধারণা করা যায় যে, লড়াইয়ের নির্দেশ দিলে তোমরা লড়াই করবে? তারা বলল,আমাদের কি হয়েছে যে, আমরা আল্লাহর পথে লড়াই করব না? অথচ আমরা বিতাড়িত হয়েছিনিজেদেরঘর-বাড়ি ও সন্তান-সন্ততি হ’তে! অতঃপর যখন লড়াইয়ের নির্দেশ হ’ল তখন সামান্যকয়েকজন ছাড়া বাকীরাসবাই ফিরে গেল। বস্ত্ততঃ আল্লাহযালেমদের ভাল করেইজানেন’(বাক্বারাহ ২/২৪৬)। ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:- ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻟَﻬُﻢْ ﻧَﺒِﻴُّﻬُﻢْ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻗَﺪْ ﺑَﻌَﺚَ ﻟَﻜُﻢْ ﻃَﺎﻟُﻮﺕَ ﻣَﻠِﻜﺎًﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺃَﻧَّﻰ ﻳَﻜُﻮﻥُ ﻟَﻪُ ﺍﻟْﻤُﻠْﻚُ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﻭَﻧَﺤْﻦُ ﺃَﺣَﻖُّ ﺑِﺎﻟْﻤُﻠْﻚِ ﻣِﻨْﻪُ ﻭَﻟَﻢْ ﻳُﺆْﺕَ ﺳَﻌَﺔً ﻣِّﻦَ ﺍﻟْﻤَﺎﻝِ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﺍﺻْﻄَﻔَﺎﻩُﻋَﻠَﻴْﻜُﻤْﻮَﺯَﺍﺩَﻩُ ﺑَﺴْﻄَﺔً ﻓِﻲ ﺍﻟْﻌِﻠْﻢِ ﻭَﺍﻟْﺠِﺴْﻢِ ﻭَﺍﻟﻠﻪُ ﻳُﺆْﺗِﻲ ﻣُﻠْﻜَﻪُ ﻣَﻦ ﻳَّﺸَﺂﺀُ ﻭَﺍﻟﻠﻪُ ﻭَﺍﺳِﻊٌ ﻋَﻠِﻴﻢٌ- ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻟَﻬُﻢْ ﻧِﺒِﻴُّﻬُﻢْﺇِﻥَّ ﺁﻳَﺔَ ﻣُﻠْﻜِﻪِ ﺃَﻥ ﻳَّﺄْﺗِﻴَﻜُﻢُ ﺍﻟﺘَّﺎﺑُﻮْﺕُ ﻓِﻴْﻪِ ﺳَﻜِﻴْﻨَﺔٌ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْ ﻭَﺑَﻘِﻴَّﺔٌ ﻣِّﻤَّﺎ ﺗَﺮَﻙَ ﺁﻝُ ﻣُﻮْﺳَﻰ ﻭَﺁﻝُ ﻫَﺎﺭُﻭﻥَ ﺗَﺤْﻤِﻠُﻪُﺍﻟْﻤَﻶﺋِﻜَﺔُ ﺇِﻥَّ ﻓِﻲ ﺫَﻟِﻚَ ﻟَﺂﻳَﺔً ﻟَّﻜُﻢْ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺘُﻢ ﻣُّﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ – ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ২৪৭-২৪৮(-‘তাদের নবী তাদেরবললেন, নিশ্চয়ইআল্লাহ তালূতকে তোমাদের জন্য শাসক নিযুক্ত করেছেন। তারা বলল,সেটা কেমন করে হয় যে, তার শাসন চলবে আমাদের উপরে। অথচ আমরাই শাসন ক্ষমতাপাওয়ার অধিক হকদার।তাছাড়া সে ধন-সম্পদের দিক দিয়েও সচ্ছল নয়। জওয়াবে নবীবললেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপরে তাকে মনোনীত করেছেন এবং স্বাস্থ্য ওজ্ঞানের দিক দিয়ে তাকে প্রাচুর্য দান করেছেন। বস্ত্ততঃ আল্লাহ যাকে ইচ্ছা রাজ্য দানকরেন। তিনি হ’লেন প্রাচুর্য দানকারী ও সর্বজ্ঞ’। ‘নবী তাদেরকে বললেন, তালূতেরনেতৃত্বের নিদর্শন এই যে, তোমাদের কাছে (তোমাদের কাংখিত) সিন্দুকটি আসবেতোমাদের প্রভুর পক্ষ হ’তে তোমাদের হৃদয়ের প্রশান্তি রূপে। আর তাতে থাকবে মূসা,হারূণ ও তাদের পরিবার বর্গের ব্যবহৃত কিছু পরিত্যক্ত সামগ্রী। সিন্দুকটিকে বহন করেআনবে ফেরেশতাগণ। এতেই তোমাদের (শাসকের) জন্য নিশ্চিত নিদর্শন রয়েছে, যদিতোমরা বিশ্বাসী হও’(বাক্বারাহ ২/২৪৭-২৪৮)।বিষয়টি এই যে, বনু ইস্রাঈলগণের নিকটে একটাসিন্দুক ছিল। যার মধ্যে তাদের নবী মূসা, হারূণ ও তাঁদের পরিবারের ব্যবহৃত কিছু পরিত্যক্তসামগ্রী ছিল। তারা এটাকে খুবই বরকতময় মনে করত এবং যুদ্ধকালে একে সম্মুখে রাখত।একবার আমালেক্বাদের সাথে যুদ্ধের সময় বনু ইস্রাঈলগণ পরাজিত হ’লে আমালেক্বাদেরবাদশাহ জালূত উক্ত সিন্দুকটি নিয়ে যায়। এক্ষণে যখন বনু ইস্রাঈলগণ পুনরায় জিহাদের সংকল্পকরল, তখন আল্লাহ তাদেরকে উক্ত সিন্দুক ফিরিয়ে দিতে মনস্থকরলেন। অতঃপর এইসিন্দুকটির মাধ্যমে তাদের মধ্যেকার নেতৃত্ব নিয়ে ঝগড়ার নিরসন করেন।সিন্দুকটি তালূতেরবাড়ীতে আগমনের ঘটনা এই যে, জালূতের নির্দেশে কাফেররা যেখানেই সিন্দুকটিরাখে, সেখানেই দেখা দেয় মহামারী ও অন্যান্য বিপদাপদ। এমনিভাবে তাদের পাঁচটি শহরধ্বংস হয়ে যায়। অবশেষে অতিষ্ট হয়ে তারা একে তার প্রকৃত মালিকদের কাছে পাঠিয়েদেবার সিদ্ধান্ত নিল এবং গরুর গাড়ীতে উঠিয়ে হাঁকিয়ে দিল। তখন ফেরেশতাগণ আল্লাহরনির্দেশমতে গরুর গাড়ীটিকে তাড়িয়ে এনে তালূতের ঘরের সম্মুখে রেখে দিল।বনুইস্রাঈলগণ এই দৃশ্য দেখে সবাই একবাক্যে তালূতের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনকরল। অতঃপর তালূত আমালেক্বাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার প্রস্ত্ততি শুরু করলেন।সকলপ্রস্ত্ততি সম্পন্ন হ’লে তিনি কথিত মতে ৮০,০০০ হাযার সেনাদল নিয়ে রওয়ানা হন। ইবনুকাছীর এই সংখ্যায় সন্দেহ পোষণ করে বলেন, ক্ষুদ্রায়তন ফিলিস্তীন ভূমিতে এই বিশালসেনাদলের সংকুলান হওয়াটা অসম্ভব ব্যাপার।[4]অল্প বয়ষ্ক তরুণ দাঊদ ছিলেন উক্ত সেনাদলের সদস্য। পথিমধ্যে সেনাপতি তালূত তাদের পরীক্ষা করতে চাইলেন। সম্মুখেই ছিলএক নদী। মৌসুম ছিল প্রচন্ড গরমের। পিপাসায় ছিল সবাই কাতর। এ বিষয়টি কুরআন বর্ণনাকরেছে নিম্নরূপ: ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻓَﺼَﻞَ ﻃَﺎﻟُﻮْﺕُ ﺑِﺎﻟْﺠُﻨُﻮْﺩِ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﻣُﺒْﺘَﻠِﻴْﻜُﻢْ ﺑِﻨَﻬَﺮٍ ﻓَﻤَﻦْ ﺷَﺮِﺏَ ﻣِﻨْﻪُ ﻓَﻠَﻴْﺲَ ﻣِﻨِّﻲﻭَﻣَﻦْ ﻟَّﻢْ ﻳَﻄْﻌَﻤْﻪُ ﻓَﺈِﻧَّﻪُ ﻣِﻨِّﻲْ ﺇِﻻَّ ﻣَﻦِ ﺍﻏْﺘَﺮَﻑَ ﻏُﺮْﻓَﺔً ﺑِﻴَﺪِﻩِ ﻓَﺸَﺮِﺑُﻮْﺍ ﻣِﻨْﻪُ ﺇِﻻَّ ﻗَﻠِﻴﻼً ﻣِّﻨْﻬُﻢْ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺟَﺎﻭَﺯَﻩُ ﻫُﻮَﻭَﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮْﺍ ﻣَﻌَﻪُ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻻَ ﻃَﺎﻗَﺔَ ﻟَﻨَﺎ ﺍﻟْﻴَﻮْﻡَ ﺑِﺠَﺎﻟُﻮْﺕَ ﻭَﺟُﻨُﻮْﺩِﻩِ ﻗَﺎﻝَ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻳَﻈُﻨُّﻮْﻥَ ﺃَﻧَّﻬُﻢ ﻣُّﻼَﻗُﻮ ﺍﻟﻠﻪِ : ﻛَﻢﻣِّﻦْ ﻓِﺌَﺔٍ ﻗَﻠِﻴْﻠَﺔٍ ﻏَﻠَﺒَﺖْ ﻓِﺌَﺔً ﻛَﺜِﻴْﺮَﺓً ﺑِﺈِﺫْﻥِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﺍﻟﻠﻪُ ﻣَﻊَ ﺍﻟﺼَّﺎﺑِﺮِﻳْﻦَ – ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ২৪৯(-‘অতঃপর তালূত যখনসৈন্যদল নিয়ে বের হ’ল, তখন সে বলল, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেনএকটি নদীর মাধ্যমে। যে ব্যক্তি সেই নদী হ’তে পান করবে, সে ব্যক্তি আমারদলভুক্ত নয়। আর যে ব্যক্তি স্বাদ গ্রহণ করবে না,সেই-ই আমার দলভুক্ত হবে। তবেহাতের এক অাঁজলা মাত্র। অতঃপর সবাই সে পানি থেকে পান করল, সামান্য কয়েকজনব্যতীত। পরে তালূত যখন নদী পার হ’ল এবং তার সঙ্গে ছিল মাত্র কয়েকজন ঈমানদারব্যক্তি(তখন অধিক পানি পানকারী সংখ্যাগরিষ্ট) লোকেরা বলতে লাগল, আজকের দিনে জালূত ওতার সেনাবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। (পক্ষান্তরে) যাদের বিশ্বাস ছিলযে, আল্লাহর সম্মুখে তাদের একদিন উপস্থিত হ’তেই হবে, তারা বলল, কত ছোট ছোটদল বিজয়ী হয়েছে বড় বড় দলের বিরুদ্ধে আল্লাহর হুকুমে। নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদেরসাথে আল্লাহ থাকেন’(বাক্বারাহ ২/২৪৯)।বস্ত্ততঃ নদী পার হওয়া এই স্বল্প সংখ্যকঈমানদারগণের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন, যা শেষনবীর সাথে কাফেরদের বদর যুদ্ধকালেযুদ্ধরত ছাহাবীগণের সংখ্যার সাথে মিলে যায়। পানি পানকারী হাযারো সৈনিক নদী পারেআলস্যে ঘুমিয়ে পড়ল। অথচ পানি পান করা থেকে বিরত থাকা স্বল্প সংখ্যক ঈমানদার সাথীনিয়েই তালূত চললেন সেকালের সেরা সেনাপতি ও শৌর্য-বীর্যেরপ্রতীকআমালেক্বাদের বাদশাহ জালূতের বিরুদ্ধে। বস্ত্তবাদীগণের হিসাব মতে এটা ছিলনিতান্তই আত্মহননের শামিল। এই দলেই ছিলেনদাঊদ। আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟَﻤَّﺎ ﺑَﺮَﺯُﻭْﺍ ﻟِﺠَﺎﻟُﻮْﺕَﻭَﺟُﻨُﻮْﺩِﻩِ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺃَﻓْﺮِﻏْﻌَﻠَﻴْﻨَﺎ ﺻَﺒْﺮﺍً ﻭَّﺛَﺒِّﺖْ ﺃَﻗْﺪَﺍﻣَﻨَﺎ ﻭَﺍﻧْﺼُﺮْﻧَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟْﻜَﺎﻓِﺮِﻳْﻦَ – ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ২৫০(-‘আরযখন তারা জালূত ও তার সেনাবাহিনীর সম্মুখীন হ’ল, তখন তারা বলল, হে আমাদের পালনকর্তা!আমাদের ধৈর্য দান কর ও আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখ এবং আমাদেরকে তুমি কাফির সম্প্রদায়েরবিরুদ্ধে সাহায্য কর’(বাক্বারাহ ২/২৫০)।জালূত বিরাট সাজ-সজ্জা করে হাতীতে সওয়ার হয়েসামনে এসে আস্ফালন করতে লাগল এবং সে যুগের যুদ্ধরীতি অনুযায়ীপ্রতিপক্ষেরসেরা যোদ্ধাকে আহবান করতে থাকল।অল্পবয়ষ্ক বালক দাঊদ নিজেকেসেনাপতি তালূতের সামনে পেশ করলেন। তালূত তাকে পাঠাতে রাযী হ’লেন না। কিন্তুদাঊদ নাছোড় বান্দা। অবশেষে তালূত তাকে নিজের তরবারি দিয়ে উৎসাহিত করলেন এবংআল্লাহর নামে জালূতেরমোকাবিলায় প্রেরণ করলেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি এ ঘোষণাআগেই দিয়েছিলেন যে, যে ব্যক্তি জালূতকে বধ করে ফিলিস্তীন পুনরুদ্ধার করতেপারবে, তাকে রাজ্য পরিচালনায় শরীক করা হবে। অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত জালূতকে মারাখুবই কঠিন ছিল। কেননা তার সারা দেহ ছিল লৌহ বর্মে আচ্ছাদিত। তাই তরবারি বা বল্লম দিয়েতাকে মারা অসম্ভব ছিল। আল্লাহর ইচ্ছায় দাঊদ ছিলেনপাথর ছোঁড়ায় উস্তাদ। সমবয়সীদেরসাথে তিনি মাঠে গিয়ে নিশানা বরাবর পাথর মারায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। দাঊদ পকেটথেকে পাথর খন্ড বের করে হাতীর পিঠে বসা জালূতের চক্ষু বরাবর নিশানা করেএমনজোরে মারলেন যে, তাতেই জালূতের চোখশুদ্ধ মাথা ফেটে মগযবেরিয়ে চলেগেল। এভাবে জালূত মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তার সৈন্যরাপালিয়ে গেল। যুদ্ধে তালূত বিজয় লাভকরলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻓَﻬَﺰَﻣُﻮْﻫُﻢْ ﺑِﺈِﺫْﻥِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﻗَﺘَﻞَ ﺩَﺍﻭُﻭﺩُ ﺟَﺎﻟُﻮْﺕَ ﻭَﺁﺗَﺎﻩُ ﺍﻟﻠﻪُ ﺍﻟْﻤُﻠْﻚَﻭَﺍﻟْﺤِﻜْﻤَﺔَ ﻭَﻋَﻠَّﻤَﻪُ ﻣِﻤَّﺎ ﻳَﺸَﺂﺀُ ﻭَﻟَﻮْﻻَ ﺩَﻓْﻊُ ﺍﻟﻠﻪِ ﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﺑَﻌْﻀَﻬُﻢْ ﺑِﺒَﻌْﺾٍ ﻟَّﻔَﺴَﺪَﺕِ ﺍﻷَﺭْﺽُ ﻭَﻟَـﻜِﻦَّ ﺍﻟﻠﻪَ ﺫُﻭْ ﻓَﻀْﻞٍﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ – ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ২৫১(-‘অতঃপর তারা আল্লাহর হুকুমে তাদেরকে পরাজিত করল এবং দাঊদজালূতকে হত্যা করল। আর আল্লাহ দাঊদকে দান করলেন রাজ্য ও দূরদর্শিতা এবং তাকে শিক্ষাদানকরলেন, যা তিনি চাইলেন। বস্ত্ততঃ আল্লাহ যদি এভাবে একজনকে অপরজনের দ্বারাপ্রতিহত না করতেন, তাহ’লে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু আল্লাহ বিশ্ববাসীর প্রতিএকান্তই দয়াশীল’(বাক্বারাহ ২/২৫১)।শিক্ষণীয় বিষয় :(১) নেতৃত্বের জন্য সর্বাধিকপ্রয়োজন হ’ল জ্ঞান ও দৈহিক স্বাস্থ্য, যা তালূতের মধ্যে ছিল।(২) নেতৃত্বের জন্য বংশ ওঅর্থ-সম্পদের চাইতে বড় প্রয়োজন দৃঢ় ঈমান ও আল্লাহর উপরে নির্ভরশীলতা।(৩)নেতার জন্য অবশ্য কর্তব্য হ’ল কর্মীদের পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করা। যেমন তালূতকরেছিলেন।(৪) চিরকাল সংখ্যালঘু ঈমানদারগণ সংখ্যাগুরু অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেথাকে। যা তালূত ও জালূতের ঘটনায় প্রমাণিতহয়।(৫) আল্লাহর উপরে নির্ভরশীল, দৃঢ় প্রতিজ্ঞও কুশলী সেনাপতি এবং স্বল্পসংখ্যক নিবেদিত প্রাণ লোকই যথেষ্ট হয় বিজয় লাভেরজন্য। তালূত ও দাঊদ যার জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ।(৬) অস্ত্রবল ও জনবলের চাইতে ঈমানী বলযেকোন বিজয়ের মূল শক্তি।(৭) উপরোক্ত ঘটনায় আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে, তালূতকর্তৃক পরীক্ষা গ্রহণের ফলে তাঁর আমলেইবনু ইস্রাঈলগণের মধ্যে দু’টি দলের সৃষ্টিহয়। একদল তালূতের অনুগত মুমিন। যারা নিজেদেরকে ‘বনূ ইস্রাঈল’ বলেই পরিচিত করে।অর্থ ‘আল্লাহর দাস’-এর বংশ। অপর দল ছিল মুনাফিক- যাদেরকে ‘ইয়াহুদী’ বলা হ’ত। প্রকৃত বনুইস্রাঈলগণ ‘ইয়াহুদী’ নামকে ঘৃণারসাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আজও পৃথিবীতে তারাঘৃণিত হয়েই আছে। অতদিন কিয়ামত হবেনা যতদিন না মুসলমানরা একে একে এদেরকে হত্যাকরবেন। গাছ ও পাথর পর্যন্ত এদের পালিয়ে থাকা অবস্থান মুসলমানদের জানিয়ে দেবে।[5]দাঊদ (আঃ)-এর কাহিনী :তালূত ‘আমালেক্বা দখলদারদের হটিয়ে শামের শাসনকর্তার পদ লাভকরেন। অতঃপর দাঊদ কতদিন পরে নবী হন এবং তালূতের পরে কখন তিনি শাসনক্ষমতায়আসেন, এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। তবে অন্যান্য নবীদের ন্যায় তিনি চল্লিশ বছরবয়সে নবুঅত লাভ করেন বলে আমরা ধরে নিতে পারে। তিনি শতায়ু ব্যক্তি ছিলেন এবং তাঁরপুত্র সন্তানের সংখ্যা ছিল ১৯ জন। তন্মধ্যে সুলায়মান (আঃ) নবুঅত ও শাসন ক্ষমতা উভয় দিকদিয়ে(নমল ২৭/১৬)পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। আল্লাহপিতা ও পুত্রকে অনন্যবৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে সৃষ্টি করেছিলেন। আমরা কুরআন থেকে যা প্রাপ্ত হয়েছি সেটুকুইপেশ করব সত্যসন্ধানী পাঠকের জন্য। মনে রাখা আবশ্যক যে, কুরআন কোন গল্পগ্রন্থনয়। মানুষের হেদায়াতের জন্য যতটুকু প্রয়োজন,ততটুকুই মাত্র সেখানে পাওয়া যায়। বাকীতথ্যাবলীর উৎস হ’ল ইস্রাঈলী বর্ণনা সমূহ, যার কোন নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। বরংসেখানে অন্যান্য নবীগণের ন্যায় দাঊদ ও সুলায়মানের চরিত্রকে মসীলিপ্ত করাহয়েছে। আর সেইসব নোংরা কাহিনীকে ভিত্তি করে আরবী, উর্দূ, ফার্সী এমনকিবাংলাভাষায়ও লিখিত হয়েছে ‘নবীদের কাহিনী’ নামে বহু বাজে বই-পুস্তিকা। নবীগণেরনিষ্পাপত্বে বিশ্বাসী ঈমানদার পাঠকগণ ঐসব বইপত্র থেকে দূরে থাকবেন, এটাই আমরাএকান্তভাবে কামনা করব। বরং আমাদের পরামর্শ থাকবে, ঐসব উদ্ভট ও নোংরা গল্পগুজবেভরা তথাকথিত ধর্মীয় (?) বই-পত্র আগুনে পুড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দিন। তাতে নিজের ওপরিবারের এবং অন্যদের ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া থেকে বেঁচে যাবে।দাঊদ (আঃ)-এরবৈশিষ্ট্য সমূহ :আল্লাহ প্রত্যেক নবীকে স্বতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য দান করেছেন। সেমতেদাঊদ (আঃ)-কে প্রদত্ত বৈশিষ্ট্য সমূহ নিম্নে বিবৃত হ’ল।-১. আল্লাহ দাঊদ (আঃ)-কে আধ্যাত্মিকও দৈহিক শক্তিতে বলিয়ান করে সৃষ্টি করেছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺍﺫْﻛُﺮْ ﻋَﺒْﺪَﻧَﺎ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَﺫَﺍ ﺍﻟْﺄَﻳْﺪِ ﺇِﻧَّﻪُ ﺃَﻭَّﺍﺏٌ – ‏)ﺹ ১৭(-‘স্মরণ কর, আমার বান্দা দাঊদকে। সে ছিল শক্তিশালী এবং আমারপ্রতি সদা প্রত্যাবর্তনশীল’(ছোয়াদ ৩৮/১৭)।আয়াতের প্রথমাংশে তাঁর দৈহিক ও দুনিয়াবী শাসনশক্তির কথা বলা হয়েছে এবং শেষাংশে তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির কথা বলা হয়েছে। এজন্য যে,বিরাট ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাদশাহ হওয়া সত্ত্বেও তিনি সর্বদা আল্লাহর প্রতি নিবেদিতপ্রাণছিলেন। সকল কাজে তাঁর দিকেই ফিরে যেতেন।বুখারী ও মুসলিমের এক হাদীছেরাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলার নিকটে সর্বাধিক পসন্দনীয় ছালাত হ’ল দাঊদ (আঃ)-এরছালাত এবং সর্বাধিক পসন্দনীয় ছিয়াম ছিল দাঊদ (আঃ)-এর ছিয়াম। তিনি অর্ধরাত্রি পর্যন্ত ঘুমাতেন।অতঃপর এক তৃতীয়াংশ ছালাতে কাটাতেন এবং শেষ ষষ্টাংশে নিদ্রা যেতেন। তিনি একদিন অন্তরএকদিন ছিয়াম রাখতেন। শত্রুর মোকাবিলায় তিনি কখনো পশ্চাদপসরণ করতেন না’।[6]২.পাহাড় ওপক্ষীকুল তাঁর অনুগত ছিল। যেমন আল্লাহ বলেন, ﺇِﻧَّﺎ ﺳَﺨَّﺮْﻧَﺎ ﺍﻟْﺠِﺒَﺎﻝَ ﻣَﻌَﻪُ ﻳُﺴَﺒِّﺤْﻦَ ﺑِﺎﻟْﻌَﺸِﻲِّﻭَﺍﻟْﺈِﺷْﺮَﺍﻕِ- ﻭَﺍﻟﻄَّﻴْﺮَ ﻣَﺤْﺸُﻮْﺭَﺓً، ﻛُﻞٌّ ﻟَّﻪُ ﺃَﻭَّﺍﺏٌ – ‏)ﺹ ১৮-১৯(-‘আমরা পর্বতমালাকে তার অনুগত করেদিয়েছিলাম। তারা সকাল-সন্ধ্যায় তার সাথে পবিত্রতা বর্ণনা করত’। ‘আর পক্ষীকুলকেও, যারা তারকাছে সমবেত হ’ত। সবাই ছিল তার প্রতি প্রত্যাবর্তনশীল’(ছোয়াদ ৩৮/১৮-১৯)। একই মর্মেবক্তব্য এসেছে সূরা সাবা ১০ আয়াতে। অন্যদিকে আল্লাহ দাঊদ-পুত্র সুলায়মানের অধীনস্তকরে দিয়েছিলেন বায়ুকে ও জিনকে। পাহাড় ও পক্ষীকুল হযরত দাঊদ (আঃ)-এর কিভাবেআনুগত্য করত- সে বিষয়ে কোন বক্তব্য কুরআনে আসেনি। তাফসীরবিদগণ নানাবিধসম্ভাবনা ব্যক্ত করেছেন। আমরা সেগুলিকে এড়িয়ে গেলাম। কেননা ইবনু আববাস (রাঃ)বলেছেন, ﺃَﺑْﻬِﻤُﻮﺍ ﻣَﺎ ﺃَﺑْﻬَﻤَﻪُ ﺍﻟﻠﻪُ ‘আল্লাহ যে বিষয়কে অস্পষ্ট রেখেছেন, তোমরাওতাকে অস্পষ্ট থাকতে দাও’।[7]৩, ৪ ও ৫.তাঁকে দেওয়া হয়েছিল সুদৃঢ় সাম্রাজ্য, গভীরপ্রজ্ঞা ও অনন্য বাগ্মিতা। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺷَﺪَﺩْﻧَﺎ ﻣُﻠْﻜَﻪُ ﻭَﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻩُ ﺍﻟْﺤِﻜْﻤَﺔَ ﻭَﻓَﺼْﻞَﺍﻟْﺨِﻄَﺎﺏِ – ‏)ﺹ ২০(-‘আমরা তার সাম্রাজ্যকে সুদৃঢ় করেছিলাম এবং তাকে দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ওফায়ছালাকারী বাগ্মিতা’(ছোয়াদ ৩৮/২০)। উল্লেখ্য, আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) ও ইমাম শাবীবলেন যে, ‘তিনিই সর্বপ্রথম বক্তৃতায় হাম্দ ও ছালাতের পর ﺃﻣﺎ ﺑﻌﺪ (‘অতঃপর’) শব্দ যুক্তকরেন’।[8]পূর্বেই আমরা বলেছি যে, তাঁর এই সাম্রাজ্য ছিল শাম ও ইরাক ব্যাপী। যা আধুনিকসিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ফিলিস্তীন ও ইরাককে শামিল করে। আল্লাহ বলেন, ﻳَﺎ ﺩَﺍﻭُﻭﺩُ ﺇِﻧَّﺎﺟَﻌَﻠْﻨَﺎﻙَ ﺧَﻠِﻴْﻔَﺔً ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻓَﺎﺣْﻜُﻢْ ﺑَﻴْﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﺘَّﺒِﻊِ ﺍﻟْﻬَﻮَﻯ ﻓَﻴُﻀِﻠَّﻚَ ﻋَﻦْ ﺳَﺒِﻴْﻞِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺇِﻥَّ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَﻳَﻀِﻠُّﻮْﻥَ ﻋَﻨْﺴَﺒِﻴْﻞِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻟَﻬُﻢْ ﻋَﺬَﺍﺏٌ ﺷَﺪِﻳْﺪٌ ﺑِﻤَﺎ ﻧَﺴُﻮْﺍ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﺤِﺴَﺎﺏِ – ‏)ﺹ ২৬(-‘হে দাঊদ! আমরাতোমাকে পৃথিবীতে খলীফা করেছি। অতএব তুমি মানুষেরমাঝে ন্যায়সঙ্গত ফায়ছালা করএবংখেয়াল-খুশীর অনুসরণ কর না। তাহ’লে তা তোমাকে আল্লাহর পথ হ’তেবিচ্যুত করবে।নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর পথ হ’তে বিচ্যুত হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি এ কারণেযে, তারা হিসাব দিবসকে ভুলে যায়’(ছোয়াদ ৩৮/২৬)।৬.লোহাকে আল্লাহ তাঁর জন্য নরমকরে দিয়েছিলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَ ﻣِﻨَّﺎ ﻓَﻀْﻼً ﻳَﺎ ﺟِﺒَﺎﻝُ ﺃَﻭِّﺑِﻲْ ﻣَﻌَﻪُﻭَﺍﻟﻄَّﻴْﺮَ ﻭَﺃَﻟَﻨَّﺎ ﻟَﻪُ ﺍﻟْﺤَﺪِﻳْﺪَ – ﺃَﻥِ ﺍﻋْﻤَﻞْ ﺳَﺎﺑِﻐَﺎﺕٍ ﻭَﻗَﺪِّﺭْ ﻓِﻲ ﺍﻟﺴَّﺮْﺩِ ﻭَﺍﻋْﻤَﻠُﻮْﺍ ﺻَﺎﻟِﺤﺎً ﺇِﻧِّﻲْ ﺑِﻤَﺎ ﺗَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَﺑَﺼِﻴْﺮٌ- ‏) ﺳﺒﺎ ১০-১১(-‘…এবং আমরা তার জন্য লোহাকে নরম করে দিয়েছিলাম’ ‘এবং তাকেবলেছিলাম প্রশস্ত বর্ম তৈরী কর ও কড়াসমূহ যথাযথভাবে সংযুক্ত করএবং তোমরা সৎকর্মসম্পাদন কর। তোমরা যা কিছু কর, তা আমরা দেখে থাকি’(সাবা ৩৪/১০-১১)।উল্লেখ্য যে, হযরতদাঊদ (আঃ) একজনদক্ষ কর্মকার ছিলেন। বিশেষ করে শত্রুর মোকাবিলার জন্য উন্নতমানের বর্ম নির্মাণে তিনি ছিলেনএকজন কুশলী কারিগর। যা বিক্রি করে তিনি সংসার যাত্রা নির্বাহকরতেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিজের ভরণপোষণের জন্য কিছুই নিতেন না।যদিও সেটা নেওয়া কোন দোষের ছিল না। এখানে লোহাকে বাস্তবে মোমের মতনরম করার প্রকাশ্য অর্থ নিলে সেটা হবে তাঁর জন্য মু‘জেযা স্বরূপ, যা মোটেই অসম্ভবনয়। অবশ্য নরম করে দেওয়ার অর্থ লোহাকে সহজে ইচ্ছামত রূপ দেওয়ার ওউন্নতমানের নির্মাণ কৌশল শিক্ষাদানও হ’তে পারে। যেমন অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ﻭَﻋَﻠَّﻤْﻨَﺎﻩُﺻَﻨْﻌَﺔَ ﻟَﺒُﻮْﺱٍ ﻟَّﻜُﻢْ ﻟِﺘُﺤْﺼِﻨَﻜُﻢْ ﻣِّﻦْ ﺑَﺄْﺳِﻜُﻢْ ﻓَﻬَﻞْ ﺃَﻧْﺘُﻢْ ﺷَﺎﻛِﺮُﻭْﻥَ- ‏)ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ৮০(-‘আর আমরা তাকেতোমাদের জন্য বর্মনির্মাণ কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলাম,যাতে তা যুদ্ধের সময় তোমাদেরকেরক্ষা করে। অতএব তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে?(আম্বিয়া ২১/৮০)।ইতিহাস থেকে জানা যায় যে,ভারতবর্ষের বাদশাহ আওরঙ্গযেব (১৬৫৮-১৭০৭ খৃ:) নিজ হাতে টুপী সেলাই করে তাবাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কিছুই নিতেন না।বস্ত্ততঃ নবী-রাসূলগণই ছিলেন সকল উন্নত চরিত্রের পথিকৃৎ।৭.আল্লাহ পাক দাঊদকেনবুঅত দান করেন এবং তাকে এলাহী কিতাব ‘যবূর’দান করে কিতাবধারী রাসূলের মর্যাদায়অভিষিক্ত করেন। যেমন তিনি বলেন, – ﻭَﺁﺗَﻴْﻨَﺎ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَ ﺯَﺑُﻮْﺭﺍً ‘আমরা দাঊদকে ‘যবূর’ প্রদানকরেছিলাম’(নিসা ৪/১৬৩)। হযরত দাঊদকে যে আল্লাহ অতুলনীয় সাম্রাজ্য দান করছিলেন,সেটা যেন যবূরের ভবিষ্যদ্বাণীরই বাস্তব রূপ। কেননা যবূরে আল্লাহ তাঁর সৎকর্মশীলবান্দাদেরকে পৃথিবীরঅধিকারী হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻛَﺘَﺒْﻨَﺎﻓِﻲ ﺍﻟﺰَّﺑُﻮْﺭِ ﻣِﻦْ ﺑَﻌْﺪِ ﺍﻟﺬِّﻛْﺮِ ﺃَﻥَّ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽَ ﻳَﺮِﺛُﻬَﺎ ﻋِﺒَﺎﺩِﻱَ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤُﻮْﻥَ- ‏)ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ১০৫(-‘আমরা বিভিন্নউপদেশের পর যবূরে একথা লিখে দিয়েছি যে, আমার সৎকর্মশীল বান্দাগণ অবশেষেপৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে’(আম্বিয়া ২১/১০৫)।৮.তাঁকে অপূর্ব সুমধুর কণ্ঠস্বর দান করাহয়েছিল। যখন তিনি যবূর তেলাওয়াত করতেন, তখন কেবল মানুষ নয়, পাহাড় ওপক্ষীকুলপর্যন্ত তা একমনে শুনত। এ দিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَﻣِﻨَّﺎ ﻓَﻀْﻼً ﻳَﺎ ﺟِﺒَﺎﻝُ ﺃَﻭِّﺑِﻲْ ﻣَﻌَﻪُ ﻭَﺍﻟﻄَّﻴْﺮَ ﻭَﺃَﻟَﻨَّﺎ ﻟَﻪُ ﺍﻟْﺤَﺪِﻳْﺪَ- ‏) ﺳﺒﺎ ১০(-‘আমরা দাঊদের প্রতি আমাদেরপক্ষ হ’তে অনুগ্রহ প্রদান করেছিলাম এই মর্মে আদেশ দান করে যে, হে পর্বতমালা!তোমরা দাঊদের সাথে বারবার তাসবীহ সমূহ আবৃত্তি কর এবং (একই নির্দেশ দিয়েছিলামআমরা) পক্ষীকুলকেও …’(সাবা ৩৪/১০)। আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করে দিয়েছে যে, পাহাড়ও মাটির এক ধরনের জীবন রয়েছে, যা তাদের জন্যউপযোগী।[9]এ বিষয়টি আল্লাহঅন্যত্র বলেন এভাবে, ﻭَﺳَﺨَّﺮْﻧَﺎ ﻣَﻊَ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَ ﺍﻟْﺠِﺒَﺎﻝَ ﻳُﺴَﺒِّﺤْﻦَ ﻭَﺍﻟﻄَّﻴْﺮَ ﻭَﻛُﻨَّﺎ ﻓَﺎﻋِﻠِﻴْﻦَ – ‏)ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ৭৯(-‘আমরা পাহাড়কে ও পক্ষীকুলকে দাঊদের অনুগত করে দিয়েছিলাম, তারা তাসবীহ পাঠকরত এবং আমরা এটা করে থাকি’(আম্বিয়া ২১/৭৯)।অতএব দাঊদের কণ্ঠস্বর শোনা, তাঁর অনুগতহওয়া ও আল্লাহর বাণী যবূরের আয়াতসমূহের প্রতি মনোযোগী হওয়া এবং আল্লাহরপবিত্রতা ঘোষণা করা পাহাড় ও পক্ষীকুলের জন্য মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয়।শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর জন্য বনের পশু, পাহাড়, বৃক্ষ তাঁর সামনে মাথা নুইয়েছে ও ছায়াকরেছে, এমনকি স্বস্থান থেকে উঠে এসে বৃক্ষ তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়েছে, এগুলি সবচাক্ষুষ ঘটনা।[10]একদারাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ও তাঁর তিন সাথী আবুবকর, ওমর ও ওছমান একটি পাহাড়েউঠলেন। তখন পাহাড়টি কাঁপতে শুরু করল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) পাহাড়টিকে ধমক দিয়ে বললেন, স্থিরহও! তোমার উপরে আছেন একজন নবী, একজন ছিদ্দীক্ব ও দু’জন শহীদ’।[11]এরদ্বারা উদ্ভিদ ও পর্বতের জীবন ও অনুভূতি প্রমাণিত হয়। অতএব আল্লাহর অপর নবী দাঊদ(আঃ)-এর জন্য পাহাড়, পক্ষী, লৌহ ইত্যাদি অনুগত হবে, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। যদিওবস্ত্তবাদীরা চিরকাল সন্দেহের অন্ধকারে থেকেছে, আজও থাকবে। আল্লাহর রহমত নাহ’লে ওরা অন্ধকারের ক্রিমিকীট হয়েই মরবে।দাঊদ (আঃ)-এর জীবনের স্মরণীয়ঘটনাবলী :(১) ছাগপাল ও শস্যক্ষেতের মালিকের বিচার:ইমাম বাগাভী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনেআববাস, ক্বাতাদাহ ও যুহরী থেকে বর্ণনা করেন যে, একদা দু’জন লোক হযরত দাঊদেরনিকটে একটি বিষয়ে মীমাংসার জন্য আসে। তাদের একজন ছিল ছাগপালের মালিক এবংঅন্যজন ছিল শস্য ক্ষেতের মালিক। শস্যক্ষেতের মালিক ছাগপালের মালিকের নিকট দাবীপেশ করল যে, তার ছাগপাল রাত্রিকালে আমার শস্যক্ষেতে চড়াও হয়ে সম্পূর্ণ ফসল বিনষ্টকরে দিয়েছে। আমি এর প্রতিকার চাই। সম্ভবতঃ শস্যের মূল্য ও ছাগলের মূল্যের হিসাব সমানবিবেচনা করে হযরত দাঊদ (আঃ) শস্যক্ষেতের মালিককে তার বিনষ্ট ফসলের বিনিময় মূল্যহিসাবে পুরা ছাগপাল শস্যক্ষেতের মালিককে দিয়ে দিতে বললেন। বাদী ও বিবাদী উভয়েবাদশাহ দাঊদ-এর আদালত থেকে বেরিয়ে আসার সময় দরজার মুখে পুত্র সুলায়মানের সাথেদেখা হয়।তিনি মোকদ্দমার রায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা সব খুলে বলল। তিনি পিতাদাঊদের কাছে গিয়ে বললেন, আমি রায় দিলে তা ভিন্নরূপহ’ত এবং উভয়ের জন্য কল্যাণকরহ’ত’। অতঃপর পিতার নির্দেশে তিনি বললেন, ছাগপাল শস্যক্ষেতের মালিককে সাময়িকভাবেদিয়ে দেওয়া হউক। সে এগুলোর দুধ, পশম ইত্যাদিদ্বারা উপকার লাভ করুক। পক্ষান্তরেশস্যক্ষেতটি ছাগপালের মালিককে অর্পণ করা হউক। সে তাতে শস্য উৎপাদন করুক। অতঃপরশস্যক্ষেত্র যখন ছাগপালে বিনষ্ট করার পূর্বের অবস্থায় পৌঁছে যাবে, তখন তা ক্ষেতেরমালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং ছাগপাল তার মালিককে ফেরৎ দেওয়া হবে’। হযরত দাঊদ(আঃ) রায়টি অধিক উত্তম গণ্য করে সেটাকেই কার্যকরকরার নির্দেশ দেন। এই ঘটনার প্রতিইঙ্গিত করে আল্লাহ বলেন, ﻭَﺩَﺍﻭُﻭﺩَ ﻭَﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﺇِﺫْ ﻳَﺤْﻜُﻤَﺎﻥِ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺤَﺮْﺙِ ﺇِﺫْ ﻧَﻔَﺸَﺖْ ﻓِﻴﻪِ ﻏَﻨَﻢُ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِﻭَﻛُﻨَّﺎ ﻟِﺤُﻜْﻤِﻬِﻤْﺸَﺎﻫِﺪِﻳﻦَ – ﻓَﻔَﻬَّﻤْﻨَﺎﻫَﺎ ﺳُﻠَﻴْﻤَﺎﻥَ ﻭَﻛُﻼًّ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎ ﺣُﻜْﻤﺎً ﻭَّﻋِﻠْﻤﺎً – ‏)ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ ৭৮-৭৯(-‘আর স্মরণ করদাঊদ ও সুলায়মানকে, যখন তারা একটি শস্যক্ষেত সম্পর্কে বিচার করেছিল, যাতে রাত্রিকালেকারু মেষপাল ঢুকে পড়েছিল। আর তাদের বিচারকার্য আমাদের সম্মুখেই হচ্ছিল’।‘অতঃপরআমরা সুলায়মানকে মোকদ্দমাটির ফায়ছালা বুঝিয়ে দিলাম এবং আমরা উভয়কে প্রজ্ঞা ওজ্ঞান দান করেছিলাম’(আম্বিয়া ২১/৭৮-৭৯)।বস্ত্ততঃ উভয়ের রায় সঠিক ও সুধারণা প্রসূত ছিল।কিন্তু অধিক উত্তম বিবেচনায় হযরত দাঊদ স্বীয় পুত্রের দেওয়া পরামর্শকেই কার্যকর করারনির্দেশ দেন। আর সেকারণেই আল্লাহ উভয়কে সমগুণে ভূষিত করে বলেছেন যে,‘আমরা উভয়কে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করেছি’। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বিচারক উত্তম মনেকরলে তার পূর্বের রায় বাতিল করে নতুন রায় প্রদান করতে পারেন।(২) ইবাদত খানায়প্রবেশকারী বাদী-বিবাদীর বিচার:হযরত দাঊদ (আঃ) যেকোন ঘটনায় যদি বুঝতেন যে, এটিআল্লাহর তরফ থেকে পরীক্ষা, তাহ’লে তিনি সাথে সাথে আল্লাহর দিকে রুজু হ’তেন ওক্ষমা প্রার্থনায় রত হ’তেন। এরই একটি উদাহরণ বর্ণিত হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতগুলিতে।যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﻫَﻞْ ﺃَﺗَﺎﻙَ ﻧَﺒَﺄُ ﺍﻟْﺨَﺼْﻢِ ﺇِﺫْ ﺗَﺴَﻮَّﺭُﻭﺍ ﺍﻟْﻤِﺤْﺮَﺍﺏَ – ﺇِﺫْ ﺩَﺧَﻠُﻮْﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺩَﺍﻭُﻭﺩَ ﻓَﻔَﺰِﻉَ ﻣِﻨْﻬُﻢْﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻻَ ﺗَﺨَﻒْ ﺧَﺼْﻤَﺎﻥِ ﺑَﻐَﻰ ﺑَﻌْﻀُﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﺑَﻌْﺾٍ ﻓَﺎﺣْﻜُﻢ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻭَﻻَ ﺗُﺸْﻄِﻂْ ﻭَﺍﻫْﺪِﻧَﺎ ﺇِﻟَﻰ ﺳَﻮَﺍﺀِﺍﻟﺼِّﺮَﺍﻁِ – ﺇِﻥَّ ﻫَﺬَﺍ ﺃَﺧِﻲْ ﻟَﻪُ ﺗِﺴْﻊٌ ﻭَﺗِﺴْﻌُﻮْﻥَ ﻧَﻌْﺠَﺔً ﻭَﻟِﻲَ ﻧَﻌْﺠَﺔٌ ﻭَﺍﺣِﺪَﺓٌ ﻓَﻘَﺎﻝَ ﺃَﻛْﻔِﻠْﻨِﻴْﻬَﺎ ﻭَﻋَﺰَّﻧِﻲْ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺨِﻄَﺎﺏِ-ﻗَﺎﻝَ ﻟَﻘَﺪْ ﻇَﻠَﻤَﻚَ ﺑِﺴُﺆَﺍﻝِ ﻧَﻌْﺠَﺘِﻚَ ﺇِﻟَﻰ ﻧِﻌَﺎﺟِﻪِ ﻭَﺇِﻥَّ ﻛَﺜِﻴْﺮﺍًﻣِّﻦَ ﺍﻟْﺨُﻠَﻄَﺎﺀِ ﻟَﻴَﺒْﻐِﻲْ ﺑَﻌْﻀُﻬُﻢْ ﻋَﻠَﻰ ﺑَﻌْﺾٍ ﺇِﻻَّ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَﺁﻣَﻨُﻮْﺍ ﻭَﻋَﻤِﻠُﻮﺍ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤَﺎﺕِ ﻭَﻗَﻠِﻴْﻞٌ ﻣَّﺎ ﻫُﻢْ ﻭَﻇَﻦَّ ﺩَﺍﻭُﻭﺩُ ﺃَﻧَّﻤَﺎ ﻓَﺘَﻨَّﺎﻩُ ﻓَﺎﺳْﺘَﻐْﻔَﺮَ ﺭَﺑَّﻪُ ﻭَﺧَﺮَّ ﺭَﺍﻛِﻌﺎً ﻭَّﺃَﻧَﺎﺏَ – ﻓَﻐَﻔَﺮْﻧَﺎﻟَﻪُ ﺫَﻟِﻚَ ﻭَﺇِﻥَّ ﻟَﻪُ ﻋِﻨْﺪَﻧَﺎ ﻟَﺰُﻟْﻔَﻰ ﻭَﺣُﺴْﻦَ ﻣَﺂﺏٍ ‏)ﺹ ২১-২৫(-‘আপনার কাছে কি সেই বাদী-বিবাদীরখবর পৌঁছেছে, যখন তারা পাঁচিল টপকিয়ে দাঊদের ইবাদতখানায় ঢুকে পড়েছিল’?(ছোয়াদ ২১)‘যখন তারা দাঊদের কাছে অনুপ্রবেশ করল এবং দাঊদ তাদের থেকে ভীতহয়ে পড়ল, তখন তারা বলল, আপনি ভয় পাবেন না, আমরা দু’জন বিবদমান পক্ষ। আমরা একেঅপরের প্রতি বাড়াবাড়ি করেছি। অতএব আমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করুন, অবিচার করবেন না।আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করুন’(২২)। ‘(বিষয়টি এই যে,) সে আমার ভাই। সে ৯৯টি দুম্বারমালিক আর আমি মাত্র একটি মাদী দুম্বার মালিক। এরপরও সে বলে যে, এটি আমাকে দিয়েদাও। সে আমার উপরে কঠোর ভাষা প্রয়োগ করে’(২৩)। ‘দাঊদবলল, সে তোমারদুম্বাটিকে নিজের দুম্বাগুলির সাথে যুক্ত করার দাবী করে তোমার প্রতি অবিচার করেছে।শরীকদের অনেকে একে অপরেরপ্রতি বাড়াবাড়ি করে থাকে, কেবল তারা ব্যতীত, যারাঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। অবশ্য এরূপ লোকের সংখ্যা কম। (অত্র ঘটনায়) দাঊদ ধারণাকরল যে, আমরা তাকে পরীক্ষাকরছি। অতঃপর সে তার পালনকর্তার নিকটে ক্ষমা প্রার্থনাকরল এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়ল ও আমার দিকে প্রণত হ’ল’(২৪)। অতঃপর আমরা তাকে ক্ষমাকরে দিলাম। নিশ্চয়ই তার জন্য আমাদের নিকটে রয়েছে নৈকট্যও সুন্দর প্রত্যাবর্তনস্থল’(ছোয়াদ ৩৮/২১-২৫)।উপরোক্ত পাঁচটি আয়াতে বা অন্য কোথাও এরূপ কোন ব্যাখ্যাদেওয়া হয়নি যে, সে পরীক্ষা কি ছিল, দাঊদ(আঃ) কি ভুল করেছিলেন, যে কারণে তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন এবং যা আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। ফলে সেই প্রাচীনযুগের কোন ঘটনার ব্যাখ্যা নবী ব্যতীত অন্য কারু পক্ষে এ যুগে দেওয়া সম্ভব নয়।তাই ধারণা ও কল্পনার মাধ্যমে যেটাই বলা হবে, তাতে ভ্রান্তির আশংকা থেকেই যাবে। কিন্তুপথভ্রষ্ট ইহুদী পন্ডিতেরা তাদের স্বগোত্রীয় এই মর্যাদাবান নবীর উক্ত ঘটনাকে এমননোংরাভাবে পেশ করেছে, যা কল্পনা করতেও গা শিউরে ওঠে। বলা হয়েছে, দাঊদ(আঃ)-এর নাকি ৯৯ জন স্ত্রী ছিল। এ সত্ত্বেও তিনি তাঁর এক সৈন্যের স্ত্রীকেজোরপূর্বক অপহরণ করেন। অতঃপর উক্ত সৈনিককে হত্যা করে তার স্ত্রীকে বিয়েকরেন। এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আল্লাহ দু’জন ফেরেশতাকে বাদী ও বিবাদীর বেশেপাঠিয়ে তাকে শিক্ষা দেন(নাঊযুবিল্লাহ)।(৩) শনিবার ওয়ালাদের পরিণতি:বনু ইস্রাঈলদের জন্যশনিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন এবং ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট ও পবিত্র দিন। এ দিন তাদের জন্যমৎস্য শিকার নিষিদ্ধ ছিল। তারা সমুদ্রোপকুলের বাসিন্দা ছিল এবং মৎস্য শিকার ছিল তাদের পেশা।ফলে দাঊদ (আঃ)-এর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই তারা ঐদিন মৎস্য শিকার করতে থাকে। এতেতাদের উপরে আল্লাহর পক্ষ হ’তে ‘মস্খ’ বা আকৃতি পরিবর্তনের শাস্তি নেমে আসে এবংতিনদিনের মধ্যেই তারা সবাই মৃত্যু মুখে পতিত হয়। ঘটনাটি পবিত্র কুরআনে নিম্নরূপে বর্ণিতহয়েছে। যেমন আল্লাহ মদীনার ইহুদীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻋَﻠِﻤْﺘُﻢُ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَﺍﻋْﺘَﺪَﻭْﺍ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻓِﻲ ﺍﻟﺴَّﺒْﺘِﻔَﻘُﻠْﻨَﺎ ﻟَﻬُﻢْ ﻛُﻮْﻧُﻮْﺍ ﻗِﺮَﺩَﺓً ﺧَﺎﺳِﺌِﻴْﻦَ- ﻓَﺠَﻌَﻠْﻨَﺎﻫَﺎ ﻧَﻜَﺎﻻً ﻟِّﻤَﺎ ﺑَﻴْﻦَ ﻳَﺪَﻳْﻬَﺎ ﻭَﻣَﺎ ﺧَﻠْﻔَﻬَﺎﻭَﻣَﻮْﻋِﻈَﺔً ﻟِّﻠْﻤُﺘَّﻘِﻴْﻦَ- ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ৬৫-৬৬(-‘আর তোমরা তো তাদেরকে ভালভাবে জানো, যারাশনিবারের ব্যাপারে সীমা লংঘন করেছিল। আমরা তাদের বলেছিলাম, তোমরা নিকৃষ্ট বানরহয়ে যাও’। ‘অতঃপর আমরা এ ঘটনাকে তাদের সমসাময়িক ও পরবর্তীদের জন্য দৃষ্টান্তহিসাবে এবং আল্লাহভীরুদের জন্য উপদেশ হিসাবে রেখে দিলাম’(বাক্বারাহ ২/৬৫-৬৬)।তাফসীরে কুরতুবীতে বলা হয়েছে যে, ইহুদীরা প্রথমে গোপনে ও বিভিন্নকৌশলে এবং পরে ব্যাপকভাবে নিষিদ্ধ দিনে মৎস্য শিকার করতে থাকে। এতে তারা দু’দলেবিভক্ত হয়ে যায়। সৎ ও বিজ্ঞ লোকেরা একাজে বাধা দেন। অপরদল বাধা অমান্য করে মাছধরতে থাকে। ফলে প্রথম দলের লোকেরা শেষোক্তদের থেকে পৃথক হয়ে যান।তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।এমনকি তাদের বাসস্থানও পৃথক করেনেন। একদিন তারাঅবাধ্যদের এলাকায় চরম নীরবতা লক্ষ্য করেন।অতঃপর তারা সেখানে পৌঁছেদেখলেনযে, সবাই বানর ও শূকরে পরিণত হয়ে গেছে। ক্বাতাদাহ বলেন যে, বৃদ্ধরাশূকরে এবং যুবকেরা বানরে পরিণত হয়েছিল। রূপান্তরিত বানরেরা নিজ নিজ আত্মীয়-স্বজনকে চিনতে পেরেছিল এবং তাদের কাছে গিয়ে অঝোর নয়নে অশ্রু বিসর্জনকরেছিল।উক্ত বিষয়ে সূরা আ‘রাফের ১৬৪-৬৫ আয়াতের বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে,সেখানে তৃতীয় আরেকটি দল ছিল, যারা উপদেশ দানকারীদের উপদেশ দানে বিরত রাখারচেষ্টা করত। বাহ্যতঃ এরা ছিল শান্তিবাদী এবংঅলস ও সুবিধাবাদী। এরাও ফাসেকদের সাথেশূকর-বানরে পরিণতহয় ও ধ্বংস হয়ে যায়। যেমন আল্লাহবলেন, ﻭَﺇِﺫَ ﻗَﺎﻟَﺖْ ﺃُﻣَّﺔٌ ﻣِّﻨْﻬُﻢْ ﻟِﻢَ ﺗَﻌِﻈُﻮﻥَﻗَﻮْﻣﺎً ﺍَﻟﻠﻪُ ﻣُﻬْﻠِﻜُﻬُﻢْ ﺃَﻭْ ﻣُﻌَﺬِّﺑُﻬُﻢْ ﻋَﺬَﺍﺑﺎً ﺷَﺪِﻳﺪﺍً، ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻣَﻌْﺬِﺭَﺓً ﺇِﻟَﻰ ﺭَﺑِّﻜُﻢْ ﻭَﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﻳَﺘَّﻘُﻮﻥَ- ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻧَﺴُﻮْﺍ ﻣَﺎﺫُﻛِّﺮُﻭْﺍ ﺑِﻪِ ﺃَﻧﺠَﻴْﻨَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳَﻨْﻬَﻮْﻥَ ﻋَﻦِ ﺍﻟﺴُّﻮﺀِ ﻭَﺃَﺧَﺬْﻧَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮْﺍ ﺑِﻌَﺬَﺍﺏٍ ﺑَﺌِﻴﺲٍ ﺑِﻤَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍﻳَﻔْﺴُﻘُﻮﻥَ- ‏)ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৬৪-১৬৫(-‘আর যখন তাদের মধ্যকার একদল বলল, কেন আপনারা ঐলোকদের উপদেশ দিচ্ছেন, যাদেরকে আল্লাহ ধ্বংস করে দিতে চান কিংবা তাদের আযাবদিতে চান কঠিন আযাব? ঈমানদারগণ বলল, তোমাদের পালনকর্তার নিকট ওযর পেশ করার জন্যএবং এজন্য যাতে ওরা সতর্ক হয়’। ‘অতঃপর তারা যখন উপদেশ ভুলে গেল, যা তাদেরকেদেওয়া হয়েছিল, তখন আমরা সেসব লোকদের মুক্তি দিলাম, যারা মন্দ কাজ থেকে নিষেধকরত এবং পাকড়াও করলাম যালেমদেরকে নিকৃষ্ট আযাবের মাধ্যমে তাদের পাপাচারেরকারণে’(আ‘রাফ ৭/১৬৪-৬৫)।এতে স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ন্যায়ের আদেশ ওঅন্যায়ের নিষেধকারীদের পক্ষাবলম্বন না করে নিরপেক্ষতা অবলম্বনকারী ব্যক্তিগণযালেম ও ফাসেকদের সাথেই আল্লাহর গযবে ধ্বংস হবে। অতএব হকপন্থীদের জন্যজীবনের সর্বক্ষেত্রে আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি ‘আনিল মুনকার ব্যতীত অন্য কোন পথখোলা নেই।ছহীহ মুসলিমে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস‘ঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছেযে, একদা কয়েকজন ছাহাবী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে রাসূল! এ যুগেরবানর-শূকরগুলো কি সেই আকৃতি পরিবর্তিত ইহুদী সম্প্রদায়? তিনি বললেন, আল্লাহ তা‘আলাযখন কোন সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেন, কিংবা তাদের উপরে আকৃতি পরিবর্তনের আযাব নাযিলকরেন, তখন তাদের বংশধারা থাকে না। আর বানর-শূকর পৃথিবীতে পূর্বেও ছিল, ভবিষ্যতেওথাকবে।[12]ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, তারা খায় না, পান করে না এবং তিন দিনের বেশী বাঁচে না।[13]তালূতের পরে বনু ইস্রাঈলগণের অবস্থা ক্রমেই শোচনীয় পর্যায়ে চলে যায়।যালেম বাদশাহদের দ্বারা তারা শাম দেশ হ’তে বিতাড়িত হয়। বিশেষ করে পারস্যরাজ বুখতানছরযখন তাদেরকে শাম থেকে বহিষ্কার করলেন, তখন তাদের একদল হেজাযে গিয়েবসবাসের সিদ্ধান্ত নিল। এইউদ্দেশ্যে যে, আমরা দাঊদ ও সুলায়মানের নির্মিত বায়তুলমুক্বাদ্দাস হারিয়েছি। ফলে এক্ষণে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষ ইবরাহীম-ইসমাঈলের নির্মিতকা‘বাগৃহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। যাতে আমরা বা আমাদের বংশধররা শেষনবীর সাক্ষাৎলাভে ধন্য হয়। সেমতে তারা আরবে হিজরত করে এবং ইয়াছরিবে বসবাস শুরু করে।সংশয়নিরসন(১) দাঊদ (আঃ)-এর উপরে প্রদত্ত তোহমত :ছোয়াদ ২৪: ﻭَﻇَﻦَّ ﺩَﺍﻭُﻭْﺩُ ﺃَﻧَّﻤَﺎ ﻓَﺘَﻨَّﺎﻩُ ‘দাঊদধারণা করল যে, আমরা তাকে পরীক্ষা করছি’। উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরেজালালাইনে বলা হয়েছে, ﺃﻭﻗﻌﻨﺎﻩ ﻓﻲ ﻗﺔﻧﺔ ﺃﻯ ﺑﻠﻴﺔﺑﻤﺤﺒﺔﻩ ﺓﻟﻚ ﺍﻟﻤﺮﺃﺓ ‘অর্থাৎ উক্ত মহিলার প্রতিআসক্তির মাধ্যমে আমরা তাকে পরীক্ষায় ফেলেছি’। ভিত্তিহীন এই তাফসীরের মাধ্যমেনবীগণের উচ্চ মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়েছে। বিশেষ করেদাঊদ (আঃ)-এর মত একজনমহান রাসূলের উপরে পরনারীর প্রতি আসক্ত হওয়ার অমার্জনীয় তোহমত আরোপ করাহয়েছে। অথচ এটি পরিষ্কারভাবে ইহুদী-নাছারাদের বানোয়াট গল্প ব্যতীত কিছুই নয়। যারাতাদের নবীদের বিরুদ্ধে চুরি, যেনা ও অনুরূপ অসংখ্য নোংরা তোহমত লাগিয়েছে ও হাযারহাযার নবীকে হত্যা করেছে(বাক্বারাহ ৯১)। তাদের রচিত তথাকথিত তওরাত-ইঞ্জীল সমূহ(বাক্বারাহ ৭৯)এ ধরনের কুৎসায় ভরপুর হয়ে আছে।(২)একই সূরায় ২২ আয়াতের ব্যাখ্যায়মাননীয় তাফসীরকার বর্ননা করেছেন যে, দাঊদ (আঃ)-এর ৯৯ জন স্ত্রী ছিল। অথচ তিনিঅন্যজনের একমাত্র স্ত্রীকে তলব করেন এবং তাকে বিবাহ করেন ও তার সাথে সহবাসকরেন’ (নাঊযুবিল্লাহ)। একাজটি যে অন্যায় ছিল, সেটা বুঝানোর জন্য দু’জন ফেরেশতামানুষের বেশ ধরে বাদী-বিবাদী সেজে অতর্কিতভাবে তাঁর এবাদতখানায় প্রবেশ করে।অতঃপর বিবাদী তাকে বলে যে, সে আমার ভাই। সে ৯৯টি দুম্বার মালিক আর আমি মাত্র একটিদুম্বার মালিক। এরপরেও সে বলে এটি আমাকে দিয়ে দাও এবং কথাবার্তায় আমার উপরেকঠোরতা আরোপ করে’(ছোয়াদ ২৩)। দাঊদ (আঃ) এটিকে অন্যায় হিসাবে বর্ণনা বর্ণনাকরলেন। অতঃপর তিনি বুঝতেপারলেন যে, এর মাধ্যমে তাঁকে পরীক্ষা করা হয়েছে।ফলে তিনি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেন ও সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন, যা২৪ আয়াতেবর্ণিত হয়েছে।এ ঘটনাটিকে সাদা চোখে দেখলে একেবারেই স্বাভাবিক বিষয় বলেমনে হয় হবে, যা সাধারণতঃ যেকোন বিচারকের নিকটে বা রাজদরবারে হয়ে থাকে। অথচকাল্পনিকভাবে দু’জনকে ফেরেশতা সাজিয়ে ও দুম্বাকে স্ত্রী কল্পনা করেতাফসীরের নামে রসালো গল্প পরিবেশন করা হয়েছে।প্রশ্ন হ’তে পারে, তাহ’লেদাঊদ (আঃ)-এর ক্ষমা প্রার্থনা করার কারণ কি?জবাব এই যে, দাঊদ (আঃ) আল্লাহর ইবাদতের জন্যএকটা সময় নির্দিষ্ট করেছিলেন। ঐ সময়টুকু তিনি কেবল ইবাদতেই রত থাকতেন। কিন্তু হঠাৎপাঁচিল টপকিয়ে দু’জন অপরিচিত লোক ইবাদতখানায় প্রবেশ করায় তিনি ভড়কে যান। কিন্তু পরেতাদের বিষয়টি বুঝতে পারেন ও ফায়ছালা করে দেন। তাদের থেকে ভীত হওয়ার বিষয়টিযদিও কোন দোষের ব্যাপার ছিল না, তবুও এটাকে তিনি আল্লাহর উপরে তাওয়াক্কুলেরখেলাফ মনে করে লজ্জিত হন এবং বুঝতে পারেন যে, এই ঘটনার দ্বারা আল্লাহ তাঁরতাওয়াক্কুলের পরীক্ষা নিলেন। দ্বিতীয়তঃ অধিক ইবাদতের কারণে প্রজাস্বার্থের ক্ষতিহচ্ছে মনে করে তিনি লজ্জিত হন এবং এজন্য আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করেন ওসিজদায় লুটিয়েপড়েন।দাঊদ (আঃ)-এর জীবনীতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :১. নেতৃত্বেরজন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যবান ও আমানতদার হওয়া। আরও প্রয়োজন প্রজ্ঞা, ন্যায়নিষ্ঠা ওউন্নতমানের বাগ্মিতা। যার সব কয়টি গুণ হযরত দাঊদ (আঃ)-এর মধ্যে সর্বাধিক পরিমাণে ছিল।২.এলাহী বিধান দ্বীন ও দুনিয়া দু’টিকেই নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে। বরং দ্বীনদার শাসকেরহাতেইদুনিয়া শান্তিময় ও নিরাপদ থাকে।হযরত দাঊদ-এর শাসনকাল তার জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ।৩.দ্বীনদার শাসককে আল্লাহ বারবার পরীক্ষা করেন। যাতে তার দ্বীনদারী অক্ষুণ্ণথাকে। দাঊদ (আঃ) সে পরীক্ষা দিয়েছেন এবং উত্তীর্ণ হয়েছেন। বস্ত্ততঃ তিনি ছিলেনআল্লাহর দিকে সদা প্রত্যাবর্তনশীল।৪. যে শাসক যত বেশী আল্লাহর শুকরগুযারীকরেন, আল্লাহ তার প্রতি তত বেশী সদয় হন এবং ঐ রাজ্যে শান্তি ও সমৃদ্ধি নাযিল করেন।বস্ত্ততঃ দাঊদ (আঃ) সর্বাধিক ইবাদতগুযার ছিলেন এবং একদিন অন্তর একদিন ছিয়াম পালন করতেন।৫. যে শাসক আল্লাহর প্রতি অনুগত হন, আল্লাহ দুনিয়ার সকল সৃষ্টিকে তার প্রতি অনুগত করেদেন। যেমন দাঊদ (আঃ)-এর জন্য পাহাড়-পর্বত, পক্ষীকুল এবং লোহাকে অনুগত করেদেওয়া হয়েছিল।[1]. তিরমিযী, হাসান ছহীহ, মিশকাত হা/১১৮, ‘ঈমান’ অধ্যায় ‘তাক্বদীরেবিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ-৩।[2]. যথাক্রমে (১) বাক্বারাহ ২/২৫১; (২)নিসা ৪/১৬৩; (৩) মায়েদাহ ৫/৭৮;(৪) আন‘আম৬/৮৪; (৫) ইসরা ১৭/৫৫; (৬) আম্বিয়া ২১/৭৮-৮০; (৭) নমল ২৭/১৫-১৬; (৮) সাবা৩৪/১০-১১,১৩; (৯) ছোয়াদ ৩৮/১৭-২৬= ১০; মোট ২৩টি আয়াত।[3]. তাফসীর মা‘আরেফুলকুরআন পৃঃ ৯৯০।[4]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ২/৮; আমরা মনে করি স্থান সংকুলান বড়কথা নয়। যুদ্ধটাই বড় কথা। কেননা আমরা দেখেছি যে, পরবর্তীতৈ এর পাশেই আজনাদাইন ওইয়ারমূক যুদ্ধে ২,৪০,০০০ রোমক সৈন্যের মুকাবিলায় মুসলমানরা ৪০,০০০ সৈন্য নিয়ে যুদ্ধকরেছে ও বিজয়ী হয়েছে (ঐ, ৭/৭)।[5]. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৪১৪ ‘ফিতান’ অধ্যায়, ১অনুচ্ছেদ।[6]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/১২২৫ ‘রাত্রিতে নফল ছালাতে উৎসাহদান’অনুচ্ছেদ-৩৩।[7]. বায়হাক্বী, মা‘রেফাতুস সুনান ওয়াল আছার, হা/৪৩৮৮।[8]. কুরতুবী বলেন,‘যদি উক্ত বক্তব্য সঠিক হয়, তবে সেটি ছিল দাঊদ (আঃ)-এর নিজের ভাষায়, আরবী ভাষায়নয়’ (ঐ, তাফসীর ছোয়াদ ২০)।[9]. দ্রঃ হামীম সাজদাহ ৪১/১১; মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, স্রষ্টাও সৃষ্টিতত্ত্ব (ই,ফা,বা, ২০০৩) পৃঃ ৩৫৭, ৩৮৬-৮৯।[10]. তিরমিযী, শারহুস সুন্নাহ, দারেমী, মিশকাতহা/৫৯১৮, ২২,২৪-২৬ ‘মো‘জেযা’ অনুচ্ছেদ-৯।[11]. তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাতহা/৬০৬৬‘ওছমানের মর্যাদা’ অনুচ্ছেদ; হাদীছ হাসান, ইরওয়া হা/১৫৯৪-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য,৬/৩৯-৪০ পৃ:। এর দ্বারা আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হয় যে, আমৃত্যু ওছমান (রাঃ) ছিলেন সত্যেরউপর প্রতিষ্ঠিত। আর তার বিরোধীরা ছিল স্রেফ মিথ্যারোপকারী। এযুগেও তারা মিথ্যারটনাকারী। অতএব সত্যসন্ধানীরা এদের অপপ্রচার থেকে সাবধান থাকবেন। -লেখক ।[12]. মুসলিম, ‘তাক্বদীর’ অধ্যায় হা/৬৭৭০।[13]. কুরতুবী, তাফসীর সূরা বাক্বারাহ ৬৫, পৃ: ১