হযরত মুসা ও হারুন আঃ এর জীবনী


হযরত মূসা ও হারূণ (আলাইহিমাস সালাম)সূচীপত্রফেরাঊনের পরিচয়বনু ইস্রাঈলেরপূর্ব ইতিহাসমূসা (আঃ)-এর পরিচয়মূসা ও ফেরাঊনের কাহিনীমূসা নদীতেনিক্ষিপ্ত হ’লেনযৌবনে মূসাযুবক মূসা খুনী হ’লেনমূসার পরীক্ষা সমূহনবুঅত-পূর্ব ১মপরীক্ষা : হত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া২য় পরীক্ষা : মাদিয়ানে হিজরতমাদিয়ানেরজীবন : বিবাহ ও সংসারপালন৩য় পরীক্ষা: মিসর অভিমুখে যাত্রা ও পথিমধ্যেনবুঅত লাভনয়টি নিদর্শনসিনাই হ’তে মিসরমূসার পাঁচটি দো‘আমূসা হ’লেনকালীমুল্লাহমূসা (আঃ)-এর মিসরে প্রত্যাবর্তনফেরাঊনের নিকটে মূসা (আঃ)-এরদাওয়াতদাওয়াতের সার-সংক্ষেপদাওয়াতের ফলশ্রুতিমু‘জেযা ও জাদুমূসারদাওয়াতের পর ফেরাঊনী অবস্থানফেরাঊনের জবাবের সার-সংক্ষেপনবুঅত-পরবর্তী ১ম পরীক্ষা : জাদুকরদের মুকাবিলাফেরাঊনের ছয়টি কুটচালফেরাঊনীকুটনীতির বিজয় ও জনগণের সমর্থন লাভজাদুকরদের সত্য গ্রহণজাদুরকদেরপরিণতিজনগণের প্রতিক্রিয়াফেরাঊনের স্ত্রীর প্রতিক্রিয়াকুরআনে বর্ণিতচারজন নারীর দৃষ্টান্তনবুঅত-পরবর্তী ২য় পরীক্ষা: বনু ইস্রাঈলদের উপরে আপতিতফেরাঊনী যুলুম সমূহ১ম যুলুম: বনু ঈস্রাঈলের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যার নির্দেশজারি২য় যুলুমঃ ইবাদতগৃহ সমূহ ধ্বংসকরাফেরাঊনের বিরুদ্ধে মূসার বদদো‘আফেরাঊনী আচরণ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষণীয় বিষয় সমূহফেরাঊনী সম্প্রদায়েরউপরে আপতিত গযব সমূহ এবং মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযা সমূহ১ম নিদর্শন : দুর্ভিক্ষ২য়নিদর্শন : তূফান৩য় নিদর্শন : পঙ্গপাল৪র্থ নিদর্শন : উকুন৫ম নিদর্শন : ব্যাঙ৬ষ্ঠনিদর্শন : রক্ত৭ম নিদর্শন : প্লেগ৮ম নিদর্শন : সাগর ডুবিনবুঅত-পরবর্তী ৩য় পরীক্ষাও নাজাত লাভআশূরার ছিয়ামবনু ইস্রাঈলের পরবর্তী গন্তব্যবনু ইস্রাঈলেরঅবাধ্যতা ও তাদেরউপরে আপতিত পরীক্ষা সমূহের বিবরণ(১) মূর্তি পূজারআবদারতওরাত লাভ(২) গো-বৎস পূজাগো-বৎস পূজার শাস্তিতূর পাহাড় তুলে ধরাহ’লসামেরীর কৈফিয়তসামেরী ও তার শাস্তি(৩) আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখারযিদও তার পরিণতি(৪) বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযানের নির্দেশপবিত্র ভূমিরপরিচিতিনবুঅত-পরবর্তী ৪র্থ পরীক্ষা : বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযানমিসর থেকেহিজরতের কারণশিক্ষণীয় বিষয়বাল‘আম বা‘ঊরার ঘটনাতীহ্ প্রান্তরে ৪০ বছরেরবন্দীত্ব বরণতীহ্ প্রান্তরের ঘটনাবলীশিক্ষণীয় বিষয়তওরাতের শব্দগত ও অর্থগতপরিবর্তনগাভী কুরবানীর হুকুম ও হত্যাকারী চিহ্নিত করণগাভী কুরবানীর ঘটনায়শিক্ষণীয় বিষয় সমূহচিরস্থায়ী গযবে পতিত হওয়ামূসা ও খিযিরের কাহিনীঘটনারপ্রেক্ষাপটতাৎপর্য সমূহশিক্ষণীয় বিষয়খিযির কে ছিলেন?সংশয় নিরসনমূসা ওফেরাঊনের কাহিনীতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ।আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীরআদি ৬টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ, ‘আদ, ছামূদ, লূত্ব ও কওমে মাদইয়ানের বর্ণনার পরষষ্ঠ গযবপ্রাপ্ত জাতি হিসাবে কওমে ফেরাঊন সম্পর্কে আল্লাহ পাক কুরআনের২৭টি সূরায় ৭৫টি স্থানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন।[1] কুরআনেসর্বাধিক আলোচিত বিষয় হ’ল এটি। যাতে ফেরাঊনের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ও তারযুলুমের নীতি-পদ্ধতি সমূহ পাঠকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় এবং এযুগেরফেরাঊনদের বিষয়ে উম্মতে মুহাম্মাদী হুঁশিয়ার হয়। ফেরাঊনের কাছে প্রেরিতনবী মূসাও হারূণ (আঃ) সম্পর্কে কুরআনে সর্বাধিক আলোচনা স্থান পেয়েছে।কারণ মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযা সমূহ অন্যান্য নবীদের তুলনায় যেমন বেশী ছিল, তাঁরসম্প্রদায় বনী ইস্রাঈলের মূর্খতা ও হঠকারিতার ঘটনাবলীও ছিল বিগত উম্মতগুলিরতুলনায় অধিক এবং চমকপ্রদ। এতদ্ব্যতীত মূসা (আঃ)-কে বারবার পরীক্ষা নেবারমধ্যে এবং তাঁর কওমের দীর্ঘ কাহিনীর আলোচনা প্রসঙ্গে বহু জ্ঞাতব্য বিষয় ওআদেশ-নিষেধের কথাও এসেছে। সর্বোপরি শাসক সম্রাট ফেরাঊন ও তার ক্বিবতীসম্প্রদায় কর্তৃক সংখ্যালঘু অভিবাসী বনু ইস্রাঈল সম্প্রদায়ের উপর যুলুম-অত্যাচারের বিবরণ ও তার প্রতিরোধে মূসা (আঃ)-এর প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘ বিশবছর ধরে যালেম সম্প্রদায়ের উপরে আপতিত বিভিন্ন গযবের বর্ণনা ও অবশেষেফেরাঊনের সদলবলে সলিল সমাধির ঘটনা যেন জীবন্ত বাণীচিত্র হয়ে ফুটে উঠেছেবিভিন্ন সূরায় বর্ণিত কুরআনের অনুপম বাকভঙ্গীতে। মোটকথা কুরআন পাক মূসা(আঃ)-এর কাহিনীকে এত গুরুত্ব দিয়েছে যে, অধিকাংশ সূরায় এর কিছু না কিছুবর্ণিত হয়েছে। কারণ এই কাহিনীতে অগণিতশিক্ষা, আল্লাহ তা‘আলার অপারশক্তি ও অনুগ্রহের বিস্ময়কর রহস্য সমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। এগুলোতেকর্মোদ্দীপনা ও চারিত্রিক সংশোধনের নির্দেশিকা সমূহ প্রচুর পরিমাণেবিদ্যমান রয়েছে।মূসা (আঃ) ও ফেরাঊনের ঘটনা কুরআনে বারবার উল্লেখ করারঅন্যতম উদ্দেশ্য হ’ল, এলাহী কিতাবধারী ইহুদী-নাছারাদের পিছনের কথা স্মরণকরিয়ে দেওয়াএবং শেষনবীর উপরে ঈমান আনার পক্ষে যৌক্তিকতা উপস্থাপনকরা। উল্লেখ্য যে, পরবর্তী রাসূল দাঊদ, সুলায়মান ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)সবাই ছিলেন বনু ইস্রাঈল-এর সম্প্রদায়ভুক্ত এবং তাদের প্রতি প্রেরিত নবী। মূসা(আলাইহিস সালাম) ছিলেন এঁদের সবার মূল ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।উল্লেখ্য যে,কওমে মূসা ও ফেরাঊনসম্পর্কে পবিত্র কুরআনের মোট ৪৪টি সূরায় ৫৩২টি আয়াতেবর্ণিত হয়েছে।[2] ফেরাঊনের পরিচয় :‘ফেরাঊন’ কোন ব্যক্তির নাম নয়। বরং এটিহ’ল তৎকালীন মিসরের সম্রাটদের উপাধি। ক্বিবতী বংশীয় এই সম্রাটগণ কয়েকশতাব্দী ব্যাপী মিসর শাসন করেন।এই সময় মিসর সভ্যতা ও সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছেগিয়েছিল। লাশ মমিকরণ, পিরামিড (PYRAMID), স্ফিংক্স (SPHINX) প্রভৃতিতাদেরসময়কার বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রমাণ বহন করে। হযরত মূসা (আঃ)-এর সময়েপরপর দু’জন ফেরাঊন ছিলেন। সর্বসম্মত ইস্রাঈলী বর্ণনাও হ’ল এটাই এবং মূসা(আঃ) দু’জনেরই সাক্ষাৎ লাভ করেন। লুইস গোল্ডিং (LOUIS GOLDING)-এরতথ্যানুসন্ধানমূলক ভ্রমণবৃত্তান্ত IN THE STEPS OF MOSSES, THE LAW GIVER অনুযায়ীউক্ত ‘উৎপীড়ক ফেরাঊন’-এর (PHARAOH, THE PERSECUTOR) নাম ছিল‘রেমেসিস-২’ (RAMSES-11) এবং ডুবে মরা ফেরাঊন ছিল তার পুত্র মানেপতাহ ( ﻣﻨﻔﻄﻪ )বা মারনেপতাহ (MERNEPTAH)। লোহিত সাগর সংলগ্ন তিক্ত হরদে তিনি সসৈন্যেডুবে মরেন। যার ‘মমি’ ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত হয়। সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম তীরে‘জাবালে ফেরাঊন’ নামে একটি ছোট পাহাড় আছে। এখানেই ফেরাঊনের লাশপ্রথম পাওয়া যায় বলে জনশ্রুতি আছে। গোল্ডিংয়ের ভ্রমণ পুস্তক এবংএনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকারনিবন্ধে বলা হয়েছে যে, ‘থেব্স’ (THEBES) নামকস্থানের সমাধি মন্দিরে ১৮৯৬ সালে একটি স্তম্ভ আবিষ্কৃত হয়, যাতেমারনেপতাহ-এর আমলের কীর্তি সমূহ লিপিবদ্ধ ছিল। অতঃপর ১৯০৬ সালে বৃটিশনৃতত্ত্ববিদ স্যার ক্রাঁফো ইলিয়ট স্মিথ (SIR CRAFTON ELLIOT SMITH) মমিগুলো খুলেমমিকরণের কলাকৌশল অনুসন্ধান শুরু করেন। এভাবে তিনি ৪৪টি মমি পরীক্ষাকরেন এবং অবশেষে ১৯০৭ সালে তিনি ফেরাঊন মারনেপতাহ-এর লাশশনাক্তকরেন। ঐসময় তার লাশের উপরে লবণের একটি স্তর জমে ছিল। যা দেখেসবাই স্তম্ভিত হন। এ কারণে যে, অন্য কোন মমি দেহে অনুরূপ পাওয়া যায়নি।[3]উক্ত লবণের স্তর যে সাগরের লবণাক্ত পানি তা বলাই বাহুল্য। এভাবে সূরা ইউনুস৯২আয়াতের বক্তব্য দুনিয়াবাসীর নিকটে সত্য প্রমাণিত হয়ে যায়। যেখানে আল্লাহবলেছিলেন যে, ‘আজকে আমরা তোমার দেহকে (বিনষ্ট হওয়া থেকে)বাঁচিয়েদিলাম। যাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য দৃষ্টান্ত হ’তেপার’… (ইউনুস ১০/৯২)। বস্ত্ততঃফেরাঊনের লাশ আজও মিসরের পিরামিডে রক্ষিত আছে। যা দেখে লোকেরাউপদেশ হাছিল করতে পারে।মূসা ও ফেরাঊন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﻧَﺘْﻠُﻮﺍ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻣِﻦ ﻧَّﺒَﺈِﻣُﻮﺳَﻰ ﻭَﻓِﺮْﻋَﻮْﻧَﺒِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻟِﻘَﻮْﻡٍ ﻳُﺆْﻣِﻨُﻮﻥَ – ﺇِﻥَّ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻋَﻼَﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻭَﺟَﻌَﻞَ ﺃَﻫْﻠَﻬَﺎ ﺷِﻴَﻌﺎً ﻳَﺴْﺘَﻀْﻌِﻒُ ﻃَﺎﺋِﻔَﺔًﻣِّﻨْﻬُﻢْ ﻳُﺬَﺑِّﺢُ ﺃَﺑْﻨَﺎﺀَﻫُﻢْ ﻭَﻳَﺴْﺘَﺤْﻴِﻲ ﻧِﺴَﺎﺀَﻫُﻢْﺇِﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﻔْﺴِﺪِﻳْﻦَ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ৩-৪)-‘আমরা আপনার নিকটে মূসা ও ফেরাঊনের বৃত্তান্ত সমূহথেকে সত্য সহকারে বর্ণনা করব বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য’। ‘নিশ্চয়ই ফেরাঊনতার দেশে উদ্ধত হয়েছিল এবং তার জনগণকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল।তাদের মধ্যকার একটি দলকে সে দুর্বল করে দিয়েছিল। সে তাদের পুত্র সন্তানদেরহত্যা করত ও কন্যা সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখত। বস্ত্ততঃ সে ছিল অনর্থসৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ (ক্বাছাছ ২৮/৩-৪)।পবিত্র কুরআনে ফেরাঊনের আলোচনাযত এসেছে, পূর্ব যুগের অন্য কোন নরপতি সম্পর্কে এত বেশী আলোচনাআসেনি। এরমাধ্যমে ফেরাঊনী যুলুমের বিভিন্ন দিক স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যাতেইঙ্গিত রয়েছে এ বিষয়ে যে, যুগে যুগে ফেরাঊনরা আসবে এবং ঈমানদারসৎকর্মশীলদের উপরে তাদের যুলুমের ধারা ও বৈশিষ্ট্য প্রায় একই রূপ হবে। যদিওপদ্ধতি পরিবর্তিত হবে। কোনযুগই ফেরাঊন থেকে খালি থাকবে না। তাই ফেরাঊনসম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়ার জন্য আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এই নরাধম সম্পর্কে এতবেশী আলোচনা করেছেন। যাতে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সাবধান হয় এবংযালেমদের ভয়ে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত না হয়। মুসলিম নামধারীবর্তমানমিসরীয় জাতীয়তাবাদী নেতারা ফেরাঊনকে তাদের ‘জাতীয় বীর’ বলেআখ্যায়িত করছেন এবং কায়রোর ‘ময়দানে রেমেসীস’-এর প্রধান ফটকে তারবিশাল প্রস্তর মূর্তি খাড়া করেছেন’।[4]বনু ইস্রাঈলের পূর্ব ইতিহাস :হযরতইবরাহীম (আঃ)-এর কনিষ্ঠ পুত্র হযরত ইসহাক্ব (আঃ)-এর পুত্র ইয়াকূব (আঃ)-এর অপরনাম ছিল ‘ইস্রাঈল’। হিব্রু ভাষায় ‘ইস্রাঈল’ অর্থ ‘আল্লাহর দাস’। সে হিসাবেইয়াকূব (আঃ)-এর বংশধরগণকে ‘বনু ইস্রাঈল’ বলা হয়। কুরআনে তাদেরকে ‘বনুইস্রাঈল’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, যাতে ‘আল্লাহর দাস’ হবার কথাটি তাদেরবারবার স্মরণে আসে।ইয়াকূব (আঃ) ও বনু ইস্রাঈলদের আদি বাসস্থান ছিলকেন‘আনে, যা বর্তমান ফিলিস্তীন এলাকায় অবস্থিত। তখনকার সময় ফিলিস্তীন ওসিরিয়া মিলিতভাবে শাম দেশ ছিল। বলা চলে যে, প্রথম ও শেষনবী ব্যতীত প্রায়সকল নবীর আবাসস্থল ছিল ইরাক ও শাম অঞ্চলে। যার গোটা অঞ্চলকে এখন‘মধ্যপ্রাচ্য’ বলা হচ্ছে। ইয়াকূব (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইউসুফ (আঃ) যখন মিসরেরঅর্থমন্ত্রী ও পরে শাসনকর্তা নিযুক্ত হন এবং অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় কেন‘আনঅঞ্চলেও চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন ইউসুফ (আঃ)-এর আমন্ত্রণে পিতা ইয়াকূব(আঃ) স্বীয় পুত্রগণ ও পরিবারবর্গ সহ হিজরত করে মিসরে চলে যান। ক্রমে তাঁরাসেখানে আধিপত্য বিস্তার করেন ও সুখে-শান্তিতে দিনাতিপাত করতে থাকেন।তারীখুল আম্বিয়া-র লেখকবলেন, ইউসুফ (আঃ)-এর কাহিনীতে কোথাও ফেরাঊনেরনাম উল্লেখ না থাকায় প্রমাণিত হয় যে, ঐ সময় ফেরাঊনদের হটিয়ে সেখানে‘হাকসূস’ ( ﻣﻠﻮﻙ ﺍﻟﻬﻜﺴﻮﺱ ) রাজাদের রাজত্ব কায়েম হয়। যারা দু’শো বছর রাজত্ব করেনএবং যা ছিল ঈসা (আঃ)-এর জন্মের প্রায়দু’হাযার বছর আগের ঘটনা।[5] অতঃপরমিসর পুনরায় ফেরাঊনদের অধিকারে ফিরে আসে। ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যুর পরে তাঁরপঞ্চম অধঃস্তনপুরুষ মূসা ও হারূনের সময় যে নিপীড়ক ফেরাঊন শাসন ক্ষমতায় ছিলতার নাম ছিল রেমেসীস-২। অতঃপর তার পুত্র মারনেপতাহ-এর সময় সাগরডুবিরঘটনা ঘটে এবং সৈন্য-সামন্ত সহ তার সলিল সমাধি হয়।‘ফেরাঊন’ ছিল মিসরেরক্বিবতী বংশীয় শাসকদের উপাধি। ক্বিবতীরা ছিল মিসরের আদি বাসিন্দা।এক্ষণে তারা সম্রাট বংশের হওয়ায় শাম থেকে আগত সুখী-স্বচ্ছল বনু ইস্রাঈলদেরহিংসা করতে থাকে। ক্রমে তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের রূপ পরিগ্রহকরে।এক বর্ণনায় এসেছে যে, ইয়াকূবের মিসরে আগমন থেকে মূসার সাথে মিসরথেকে বিদায়কালে প্রায় চারশত বছর সময়ের মধ্যে তাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলকাছাকাছি প্রায় তিন মিলিয়ন[6] এবং এ সময় তারা ছিল মিসরের মোটজনসংখ্যার ১০ থেকে ২০ শতাংশ’।[7] তবে এগুলি সবই ইস্রাঈলীদের কাল্পনিকহিসাব মাত্র। যার কোন ভিত্তি নেই’। বরং কুরআন বলছে ﺇِﻥَّ ﻫَﺆُﻵﺀ ﻟَﺸِﺮْﺫِﻣَﺔٌ ﻗَﻠِﻴﻠُﻮﻥَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ৫৪)- ‘নিশ্চয়ই তারা ছিল ক্ষুদ্র একটি দল’ (শো‘আরা ২৬/৫৪)। এই বহিরাগত নবী বংশও ক্ষুদ্র দলের সুনাম-সুখ্যাতিই ছিল সংখ্যায় বড় ও শাসকদল ক্বিবতীদের হিংসারকারণ। এরপর জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী ফেরাঊনকে ভীত ও ক্ষিপ্ত করেতোলে।মূসা (আঃ)-এর পরিচয় : ﻣﻮﺳﻰ ﺑﻦ ﻋﻤﺮﺍﻥ ﺑﻦ ﻗﺎﻫﺚ ﺑﻦ ﻋﺎﺯﺭ ﺑﻦ ﻻﻭﻯ ﺑﻦ ﻳﻌﻘﻮﺏ ﺑﻦ ﺍﺳﺤﺎﻕ ﺑﻦﺍﺑﺮﺍﻫﻴﻢ ﻋﻠﻴﻬﻢ ﺍﻟﺴﻼﻡ -মূসা ইবনে ইমরান বিন ক্বাহেছ বিন ‘আযের বিন লাভী বিন ইয়াকূব বিন ইসহাক্ববিন ইবরাহীম (আঃ)।[8]অর্থাৎ মূসা হ’লেন ইবরাহীম (আঃ)-এর ৮ম অধঃস্তন পুরুষ।মূসা (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল ‘ইমরান’ ও মাতার নাম ছিল ‘ইউহানিব’। তবেমায়ের নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে।[9] উল্লেখ্য যে, মারিয়াম (আঃ)-এরপিতার নামও ছিল ‘ইমরান’। যিনি ছিলেন হযরত ঈসা (আঃ)-এর নানা। মূসা ও ঈসাউভয় নবীই ছিলেন বনু ইস্রাঈল বংশীয় এবং উভয়ে বনু ইস্রাঈলের প্রতি প্রেরিতহয়েছিলেন (সাজদাহ ৩২/২৩, ছফ ৬১/৬)। মূসার জন্ম হয় মিসরে এবং লালিত-পালিতহন মিসর সম্রাট ফেরাঊনের ঘরে। তাঁর সহোদর ভাই হারূণ (আঃ) ছিলেন তাঁর চেয়েতিন বছরের বড় এবং তিনি মূসা (আঃ)-এর তিন বছর পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেন। উভয়েরমৃত্যু হয় মিসর ও শাম-এর মধ্যবর্তী তীহ্ প্রান্তরে বনু ইস্রাঈলের ৪০ বছর আটকথাকাকালীন সময়ে। মাওলানা মওদূদী বলেন, মূসা (আঃ) পঞ্চাশ বছর বয়সে নবীহয়ে ফেরাঊনের দরবারে পৌঁছেন। অতঃপর তেইশ বছর দ্বন্দ্ব-সংগ্রামেরপরফেরাঊন ডুবে মরে এবং বনু ইস্রাঈল মিসর থেকে বেরিয়ে যায়। এ সময় মূসা(আঃ)-এর বয়স ছিল সম্ভবতঃ আশি বছর।[10] তবে মুফতী মুহাম্মাদ শফী বলেন,ফেরাঊনের জাদুকরদের সাথে মুকাবিলার ঘটনার পর ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ীমূসা (আঃ) বিশ বছর যাবত মিসরে অবস্থান করেন। এ সময় আল্লাহ মূসা (আঃ)-কেনয়টি মু‘জেযা দান করেন।উল্লেখ্য যে, আদম, ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা (আঃ) ব্যতীত প্রায়সকল নবীই চল্লিশ বছর বয়সে নবুঅত লাভ করেছিলেন। মূসাও চল্লিশ বছর বয়সে নবুঅতলাভ করেছিলেন বলে অধিকাংশ বিদ্বান মত পোষণ করেছেন।[11] সেমতে আমরামূসা (আঃ)-এর বয়সকে নিম্নরূপে ভাগ করতে পারি। যেমন, প্রথম ৩০ বছর মিসরে,তারপর ১০ বছর মাদিয়ানে, তারপর মিসরে ফেরার পথে তূর পাহাড়ের নিকটে‘তুবা’ ( ﻃُﻮَﻯ) উপত্যকায় ৪০ বছর বয়সে নবুঅত লাভ। অতঃপর ২০ বছর মিসরে অবস্থানকরে সেখানকার অধিবাসীদেরকে তাওহীদের দাওয়াত প্রদান। তারপর ৬০ বছরবয়সে বনু ইস্রাঈলদের নিয়ে মিসর হ’তে প্রস্থান এবং ফেরাঊনের সলিল সমাধি।অতঃপর আদিবাসস্থান কেন‘আন অধিকারী আমালেক্বাদের বিরুদ্ধে জিহাদেরহুকুম অমান্য করায় অবাধ্য ইস্রাঈলীদের নিয়ে ৪০ বছর যাবত তীহ্ প্রান্তরে উন্মুক্তকারাগারে অবস্থান ও বায়তুল মুক্বাদ্দাসের সন্নিকটে মৃত্যু সম্ভবতঃ ৮০ থেকে ১০০বছর বয়সের মধ্যে। মূসা (আঃ)-এর কবর হয় বায়তুল মুক্বাদ্দাসের উপকণ্ঠে। আমাদেরনবী (ছাঃ) সেখানে একটি লাল ঢিবির দিকে ইশারা করে সেস্থানেই মূসা(আঃ)-এর কবর হয়েছে বলে জানিয়েছেন।[12] উল্লেখ্য যে, আদম (আঃ) থেকেইবরাহীম (আঃ) পর্যন্ত ১০/১২ জন নবী বাদে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমনেরপূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীতে আগত সর্বমোট এক লক্ষ চবিবশ হাযার নবী-রাসূলের[13] প্রায়সবাই ইস্রাঈল বংশের ছিলেন এবং তাঁরা ছিলেন সেমেটিক।কেননা ইব্রাহীম(আঃ) ছিলেন সাম বিন নূহ-এর ৯ম অধঃস্তন পুরুষ। এজন্য ইবরাহীমকে ‘আবুলআম্বিয়া’ বা নবীদের পিতা বলা হয়।মূসা ও ফেরাঊনের কাহিনী :সুদ্দী ও মুররাহপ্রমুখ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস ও আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) এবং বহু সংখ্যকছাহাবী থেকে বর্ণনা করেন যে, ফেরাঊন একদা স্বপ্নে দেখেন যে, বায়তুলমুক্বাদ্দাসের দিক হ’তে একটি আগুন এসে মিসরের ঘর-বাড়ি ও মূল অধিবাসীক্বিবতীদের জ্বালিয়ে দিচ্ছে। অথচ অভিবাসী বনু ইস্রাঈলদের কিছুই হচ্ছে না।ভীত-চকিত অবস্থায় তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। অতঃপর দেশের বড় বড়জ্যোতিষী ও জাদুকরদের সমবেত করলেন এবং তাদের সম্মুখে স্বপ্নের বৃত্তান্তবর্ণনা দিলেন ও এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। জ্যোতিষীগণ বলল যে, অতি সত্বর বনুইস্রাঈলের মধ্যে একটিপুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। যার হাতে মিসরীয়দের ধ্বংসনেমেআসবে’।[14]মিসর সম্রাট ফেরাঊন জ্যোতিষীদের মাধ্যমে যখন জানতেপারলেন যে, অতি সত্বর ইস্রাঈল বংশে এমন একটা পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, যেতার সাম্রাজ্যের পতন ঘটাবে। তখন উক্ত সন্তানের জন্ম রোধের কৌশল হিসাবেফেরাঊন বনু ইস্রাঈলদের ঘরে নবজাত সকল পুত্র সন্তানকে ব্যাপকহারে হত্যারনির্দেশ দিল। উদ্দেশ্য ছিল, এভাবে হত্যা করতে থাকলে এক সময় বনু ইস্রাঈল কওমযুবক শূন্য হয়ে যাবে। বৃদ্ধরাও মারা যাবে। মহিলারা সবদাসীবৃত্তিতে বাধ্য হবে।অথচ বনু ইস্রাঈলগণ ছিল মিসরের শাসক শ্রেণী এবং উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন জাতি।এই দূরদর্শী কপট পরিকল্পনা নিয়ে ফেরাঊন ও তার মন্ত্রীগণ সারা দেশে একদলধাত্রী মহিলা ও ছুরিধারী জাল্লাদ নিয়োগ করে। মহিলারা বাড়ী বাড়ী গিয়েবনু ইস্রাঈলের গর্ভবতী মহিলাদের তালিকা করত এবং প্রসবের দিন হাযির হয়েদেখত, ছেলে না মেয়ে।ছেলে হ’লে পুরুষ জাল্লাদকে খবর দিত। সে এসে ছুরিদিয়েমায়ের সামনে সন্তানকে যবহ করে ফেলে রেখে চলে যেত।[15] এভাবে বনুইস্রাঈলের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেল। ইবনু কাছীর বলেন, একাধিকমুফাসসির বলেছেন যে, শাসকদল ক্বিবতীরা ফেরাঊনের কাছে গিয়ে অভিযোগকরল যে, এভাবেপুত্র সন্তান হত্যা করায় বনু ইস্রাঈলের কর্মজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর ঘাটতি হচ্ছে। যাতে তাদের কর্মী সংকট দেখা দিয়েছে।তখন ফেরাঊনএক বছর অন্তর অন্তর পুত্র হত্যার নির্দেশ দেয়। এতেবাদ পড়া বছরে হারূণের জন্মহয়। কিন্তু হত্যার বছরে মূসার জন্ম হয়।[16] ফলে পিতা-মাতা তাদের নবজাতসন্তানের নিশ্চিত হত্যার আশংকায় দারুণভাবে ভীত হয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায়আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর মায়ের অন্তরে ‘ইলহাম’ করেন। যেমন আল্লাহ পরবর্তীতেমূসাকে বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻣَﻨَﻨَّﺎ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻣَﺮَّﺓً ﺃُﺧْﺮَﻯ – ﺇِﺫْ ﺃَﻭْﺣَﻴْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻰ ﺃُﻣِّﻚَ ﻣَﺎ ﻳُﻮﺣَﻰ – ﺃَﻥِ ﺍﻗْﺬِ ﻓِﻴﻪِ ﻓِﻲﺍﻟﺘَّﺎﺑُﻮﺕِ ﻓَﺎﻗْﺬِ ﻓِﻴﻪِ ﻓِﻴﺎﻟْﻴَﻢِّ ﻓَﻠْﻴُﻠْﻘِﻪِ ﺍﻟْﻴَﻢُّﺑِﺎﻟﺴَّﺎﺣِﻞِ ﻳَﺄْﺧُﺬْﻩُ ﻋَﺪُﻭٌّ ﻟِّﻲ ﻭَﻋَﺪُﻭٌّ ﻟَّﻪُ ﻭَﺃَﻟْﻘَﻴْﺖُ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻣَﺤَﺒَّﺔً ﻣِّﻨِّﻲ ﻭَﻟِﺘُﺼْﻨَﻊَ ﻋَﻠَﻰ ﻋَﻴْﻨِﻲ – ‏( ﻃﻪ৩৭-৩৯)-‘আমরা তোমার উপরআরো একবার অনুগ্রহ করেছিলাম’। ‘যখন আমরা তোমার মাকে প্রত্যাদেশকরেছিলাম, যা প্রত্যাদেশ করা হয়’। ‘(এই মর্মে যে,) তোমার নবজাত সন্তানকেসিন্দুকে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দাও’। ‘অতঃপর নদী তাকে তীরে ঠেলে দেবে।অতঃপর আমার শত্রু ও তার শত্রু (ফেরাঊন) তাকে উঠিয়ে নেবে এবং আমি তোমারউপর আমার পক্ষ হ’তে বিশেষ মহববত নিক্ষেপ করেছিলাম এবং তা এজন্য যে, তুমিআমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও’ (ত্বোয়াহা ২০/৩৭-৩৯)। বিষয়টি আল্লাহঅন্যত্র বলেন এভাবে, ﻭَﺃَﻭْﺣَﻴْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻰ ﺃُﻡِّ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺃَﻥْ ﺃَﺭْﺿِﻌِﻴْﻪِ ﻓَﺈِﺫَﺍ ﺧِﻔْﺖِ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻓَﺄَﻟْﻘِﻴْﻪِ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻴَﻢِّ ﻭَﻻَﺗَﺨَﺎﻓِﻲ ﻭَﻻَ ﺗَﺤْﺰَﻧِﻲ ﺇِﻧَّﺎ ﺭَﺍﺩُّﻭﻩُﺇِﻟَﻴْﻚِ ﻭَﺟَﺎﻋِﻠُﻮﻩُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺮْﺳَﻠِﻴﻦَ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ৭)-‘আমরা মূসার মায়ের কাছে প্রত্যাদেশ করলাম এইমর্মেযে, তুমি ছেলেকে দুধ পান করাও। অতঃপর তার জীবনের ব্যাপারে যখন শংকিতহবে, তখন তাকে নদীতে নিক্ষেপ করবে। তুমি ভীত হয়ো না ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়োনা। আমরা ওকে তোমার কাছেই ফিরিয়ে দেব এবং ওকে নবীদেরঅন্তর্ভুক্তকরব’ (ক্বাছাছ ২৮/৭)। মূলতঃ শেষেরদু’টি ওয়াদাই তাঁর মাকে নিশ্চিন্ত ওউদ্বুদ্ধ করে। যেমনআল্লাহ বলেন, ﻭَﺃَﺻْﺒَﺢَ ﻓُﺆَﺍﺩُ ﺃُﻡِّ ﻣُﻮْﺳَﻰ ﻓَﺎﺭِﻏﺎً ﺇِﻥْ ﻛَﺎﺩَﺕْ ﻟَﺘُﺒْﺪِﻱْ ﺑِﻪِ ﻟَﻮْﻻَ ﺃَﻥﺭَّﺑَﻄْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻗَﻠْﺒِﻬَﺎ ﻟِﺘَﻜُﻮْﻥَ ﻣِﻦَﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ১০)-‘মূসা জননীর অন্তর (কেবলি মূসার চিন্তায়) বিভোর হয়ে পড়ল। যদিআমরা তার অন্তরকে সুদৃঢ় করে না দিতাম, তাহ’লে সে মূসার (জন্য অস্থিরতার)বিষয়টি প্রকাশ করেইফেলত। (আমরা তার অন্তরকে দৃঢ় করেছিলাম এ কারণে যে)সে যেন আল্লাহর উপরে প্রত্যয়শীলদের অন্তর্ভুক্ত থাকে’ (ক্বাছাছ ২৮/১০)।মূসানদীতে নিক্ষিপ্ত হ’লেন :ফেরাঊনের সৈন্যদের হাতে নিহত হবার নিশ্চিতসম্ভাবনা দেখা দিলে আল্লাহর প্রত্যাদেশ (ইলহাম) অনুযায়ী পিতা-মাতাতাদের প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে সিন্দুকে ভরে বাড়ীর পাশের নীল নদীতেভাসিয়ে দিলেন।[17] অতঃপর স্রোতের সাথে সাথে সিন্দুকটি এগিয়ে চলল।ওদিকে মূসার (বড়) বোন তার মায়ের হুকুমে (ক্বাছাছ ২৮/১১) সিন্দুকটিকে অনুসরণকরে নদীর কিনারা দিয়ে চলতে লাগল (ত্বোয়াহা ২০/৪০)। এক সময় তা ফেরাঊনেরপ্রাসাদের ঘাটে এসে ভিড়ল। ফেরাঊনের পুণ্যবতী স্ত্রী আসিয়া ( ﺁﺳﻴﺔ ) বিনতেমুযাহিম ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চাটিকে দেখে অভিভূত হয়ে পড়লেন। ফেরাঊন তাকে বনুইস্রাঈল সন্তান ভেবে হত্যা করতেচাইল। কিন্তু সন্তানহীনা স্ত্রীর অপত্যস্নেহের কারণে তাসম্ভব হয়নি। অবশেষে ফেরাঊন নিজে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েপড়েন। কারণ আল্লাহ মূসার চেহারার মধ্যে বিশেষ একটা মায়াময় কমনীয়তা দানকরেছিলেন (ত্বোয়াহা ২০/৩৯)। যাকে দেখলেই মায়া পড়ে যেত। ফেরাঊনেরহৃদয়ের পাষাণ গলতে সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। বস্ত্ততঃ এটাও ছিল আল্লাহর মহাপরিকল্পনারই অংশ বিশেষ। ফুটফুটে শিশুটিকে দেখে ফেরাঊনের স্ত্রী তারস্বামীকে বললেন, ﻭَﻗَﺎﻟَﺖِ ﺍﻣْﺮَﺃَﺕُ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻗُﺮَّﺕُ ﻋَﻴْﻦٍ ﻟِّﻲ ﻭَﻟَﻚَ ﻻَ ﺗَﻘْﺘُﻠُﻮﻩُ ﻋَﺴَﻰ ﺃَﻥ ﻳَّﻨْﻔَﻌَﻨَﺎ ﺃَﻭْﻧَﺘَّﺨِﺬَﻩُﻭَﻟَﺪﺍً ﻭَﻫُﻢْ ﻻَ ﻳَﺸْﻌُﺮُﻭْﻥَ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ৯)-‘এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি। একে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারেআসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি’। আল্লাহ বলেন, ‘অথচতারা (আমার কৌশল) বুঝতে পারল না’ (ক্বাছাছ ২৮/৯)। মূসা এক্ষণে ফেরাঊনেরস্ত্রীর কোলে পুত্রস্নেহ পেতে শুরু করলেন। অতঃপর বাচ্চাকে দুধখাওয়ানোর জন্যরাণীর নির্দেশে বাজারে বহু ধাত্রীর কাছে নিয়ে যাওয়া হ’ল। কিন্তু মূসা কারুরইবুকে মুখ দিচ্ছেন না। আল্লাহ বলেন, ﻭَﺣَﺮَّﻣْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺍﻟْﻤَﺮَﺍﺿِﻊَ ﻣِﻦ ﻗَﺒْﻞُ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ১২)- ‘আমরাপূর্বথেকেই অন্যের দুধ খাওয়া থেকে মূসাকে বিরত রেখেছিলাম’ (ক্বাছাছ ২৮/১২)। এমনসময় অপেক্ষারত মূসার ভগিনী বলল, ‘আমি কি আপনাদেরকে এমন এক পরিবারেরখবর দিব, যারা আপনাদের জন্য এ শিশু পুত্রের লালন-পালন করবে এবং তারা এরশুভাকাংখী’? (ক্বাছাছ ২৮/১২)। রাণীর সম্মতিক্রমে মূসাকে প্রস্তাবিতধাত্রীগৃহে প্রেরণ করা হ’ল। মূসা খুশী মনে মায়ের দুধ গ্রহণ করলেন। অতঃপরমায়ের কাছে রাজকীয় ভাতা ও উপঢৌকনাদি প্রেরিত হ’তে থাকল।[18] এভাবেআল্লাহর অপার অনুগ্রহে মূসা তারমায়ের কোলে ফিরে এলেন। এভাবে একদিকেপুত্র হত্যার ভয়ংকর আতংক হ’তে মা-বাবা মুক্তি পেলেন ও নদীতে ভাসিয়েদেওয়া সন্তানকে পুনরায় বুকে ফিরে পেয়ে তাদের হৃদয় শীতল হ’ল। অন্যদিকে বহুমূল্যের রাজকীয় ভাতা পেয়ে সংসার যাত্রা নির্বাহের দুশ্চিন্তা হ’তেতারামুক্ত হ’লেন। সাথে সাথে সম্রাট নিয়োজিত ধাত্রী হিসাবে ও সম্রাটপরিবারের সাথে বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার ফলে তাঁদের পরিবারের সামাজিকমর্যাদাও বৃদ্ধি পেল। এভাবেই ফেরাঊনী কৌশলের উপরে আল্লাহর কৌশল বিজয়ীহ’ল। ফালিল্লাহিল হাম্দ।আল্লাহ বলেন, ﻭَﻣَﻜَﺮُﻭﺍ ﻣَﻜْﺮﺍً ﻭَﻣَﻜَﺮْﻧَﺎ ﻣَﻜْﺮﺍً ﻭَﻫُﻢْ ﻻَ ﻳَﺸْﻌُﺮُﻭﻥَ – ‏( ﺍﻟﻨﻤﻞ ৫০)-‘তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমরাও কৌশল করেছিলাম। কিন্তু তারা (আমাদেরকৌশল) বুঝতে পারেনি’ (নমল ২৭/৫০)।যৌবনে মূসা :দুগ্ধ পানের মেয়াদ শেষে মূসাঅতঃপর ফেরাঊন-পুত্র হিসাবে তার গৃহে শান-শওকতের মধ্যে বড় হ’তে থাকেন।আল্লাহর রহমতে ফেরাঊনের স্ত্রীর অপত্য স্নেহ ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে বড়দুনিয়াবী রক্ষাকবচ। এভাবে ﻭَﻟَﻤَّﺎ ﺑَﻠَﻎَ ﺃَﺷُﺪَّﻩُ ﻭَﺍﺳْﺘَﻮَﻯ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻩُ ﺣُﻜْﻤﺎً ﻭَﻋِﻠْﻤﺎً ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴﻦَ -‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ১৪)-‘যখন তিনি যৌবনে পদার্পণ করলেন এবং পূর্ণবয়ষ্ক মানুষে পরিণত হ’লেন, তখনআল্লাহ তাকে বিশেষ প্রজ্ঞা ও জ্ঞান সম্পদে ভূষিত করলেন’ (ক্বাছাছ ২৮/১৪)।মূসা সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্যকভাবে উপলব্ধি করলেন।দেখলেন যে, পুরা মিসরীয় সমাজ ফেরাঊনের একচ্ছত্র রাজনৈতিক কর্তৃত্বেরঅধীনে কঠোরভাবে শাসিত। ‘বিভক্ত কর ও শাসন কর’ এই সুপরিচিত ঘৃণ্য নীতিরঅনুসরণে ফেরাঊন তার দেশবাসীকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল ও একটি দলকেদুর্বল করে দিয়েছিল (ক্বাছাছ ২৮/৪)। আর সেটি হ’ল বনু ইস্রাঈল। প্রতিদ্বন্দ্বীজন্মাবার ভয়ে সে তাদের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যা করত ও কন্যা সন্তানদেরবাঁচিয়ে রাখত। এভাবে একদিকে ফেরাঊন অহংকারে স্ফীত হয়ে নিজেকে‘সর্বোচ্চ পালনকর্তা ও সর্বাধিপতি’ ভেবে সারা দেশে অনর্থ সৃষ্টি করছিল।এমনকি সে নিজেকে ‘একমাত্র উপাস্য’ ﻣَﺎﻋَﻠﻤْﺖُ ﻟَﻜُﻢْ ﻣِﻦْ ﺇﻟَﻪٍ ﻏَﻴْﺮِﻯْ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ৩৮)- (ক্বাছাছ২৮/৩৮) বলতেও লজ্জাবোধ করেনি। অন্যদিকে মযলূম বনু ইস্রাঈলদের হাহাকার ওদীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। অবশেষে আল্লাহমযলূমদের ডাকে সাড়াদিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘দেশে যাদেরকে দুর্বল করা হয়েছিল, আমরা চাইলামতাদের উপরে অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতা করতে ও দেশেরউত্তরাধিকারীকরতে’। ‘এবং আমরা চাইলাম তাদেরকে দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে এবংফেরাঊন, হামান ও তাদের সেনাবাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তারা সেইদুর্বল দলের তরফ থেকে আশংকা করত’ (ক্বাছাছ ২৮/৫-৬)।যুবক মূসা খুনী হ’লেন:মূসার হৃদয় মযলূমদের প্রতি করুণায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু কি করবেনভেবে পাচ্ছিলেন না। ওদিকে আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। মূসা একদিন দুপুরেরঅবসরে শহরে বেড