হযরত মুসা ও হারুন আঃ এর জীবনী


হযরত মূসা ও হারূণ (আলাইহিমাস সালাম)সূচীপত্রফেরাঊনের পরিচয়বনু ইস্রাঈলেরপূর্ব ইতিহাসমূসা (আঃ)-এর পরিচয়মূসা ও ফেরাঊনের কাহিনীমূসা নদীতেনিক্ষিপ্ত হ’লেনযৌবনে মূসাযুবক মূসা খুনী হ’লেনমূসার পরীক্ষা সমূহনবুঅত-পূর্ব ১মপরীক্ষা : হত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া২য় পরীক্ষা : মাদিয়ানে হিজরতমাদিয়ানেরজীবন : বিবাহ ও সংসারপালন৩য় পরীক্ষা: মিসর অভিমুখে যাত্রা ও পথিমধ্যেনবুঅত লাভনয়টি নিদর্শনসিনাই হ’তে মিসরমূসার পাঁচটি দো‘আমূসা হ’লেনকালীমুল্লাহমূসা (আঃ)-এর মিসরে প্রত্যাবর্তনফেরাঊনের নিকটে মূসা (আঃ)-এরদাওয়াতদাওয়াতের সার-সংক্ষেপদাওয়াতের ফলশ্রুতিমু‘জেযা ও জাদুমূসারদাওয়াতের পর ফেরাঊনী অবস্থানফেরাঊনের জবাবের সার-সংক্ষেপনবুঅত-পরবর্তী ১ম পরীক্ষা : জাদুকরদের মুকাবিলাফেরাঊনের ছয়টি কুটচালফেরাঊনীকুটনীতির বিজয় ও জনগণের সমর্থন লাভজাদুকরদের সত্য গ্রহণজাদুরকদেরপরিণতিজনগণের প্রতিক্রিয়াফেরাঊনের স্ত্রীর প্রতিক্রিয়াকুরআনে বর্ণিতচারজন নারীর দৃষ্টান্তনবুঅত-পরবর্তী ২য় পরীক্ষা: বনু ইস্রাঈলদের উপরে আপতিতফেরাঊনী যুলুম সমূহ১ম যুলুম: বনু ঈস্রাঈলের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যার নির্দেশজারি২য় যুলুমঃ ইবাদতগৃহ সমূহ ধ্বংসকরাফেরাঊনের বিরুদ্ধে মূসার বদদো‘আফেরাঊনী আচরণ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষণীয় বিষয় সমূহফেরাঊনী সম্প্রদায়েরউপরে আপতিত গযব সমূহ এবং মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযা সমূহ১ম নিদর্শন : দুর্ভিক্ষ২য়নিদর্শন : তূফান৩য় নিদর্শন : পঙ্গপাল৪র্থ নিদর্শন : উকুন৫ম নিদর্শন : ব্যাঙ৬ষ্ঠনিদর্শন : রক্ত৭ম নিদর্শন : প্লেগ৮ম নিদর্শন : সাগর ডুবিনবুঅত-পরবর্তী ৩য় পরীক্ষাও নাজাত লাভআশূরার ছিয়ামবনু ইস্রাঈলের পরবর্তী গন্তব্যবনু ইস্রাঈলেরঅবাধ্যতা ও তাদেরউপরে আপতিত পরীক্ষা সমূহের বিবরণ(১) মূর্তি পূজারআবদারতওরাত লাভ(২) গো-বৎস পূজাগো-বৎস পূজার শাস্তিতূর পাহাড় তুলে ধরাহ’লসামেরীর কৈফিয়তসামেরী ও তার শাস্তি(৩) আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখারযিদও তার পরিণতি(৪) বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযানের নির্দেশপবিত্র ভূমিরপরিচিতিনবুঅত-পরবর্তী ৪র্থ পরীক্ষা : বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযানমিসর থেকেহিজরতের কারণশিক্ষণীয় বিষয়বাল‘আম বা‘ঊরার ঘটনাতীহ্ প্রান্তরে ৪০ বছরেরবন্দীত্ব বরণতীহ্ প্রান্তরের ঘটনাবলীশিক্ষণীয় বিষয়তওরাতের শব্দগত ও অর্থগতপরিবর্তনগাভী কুরবানীর হুকুম ও হত্যাকারী চিহ্নিত করণগাভী কুরবানীর ঘটনায়শিক্ষণীয় বিষয় সমূহচিরস্থায়ী গযবে পতিত হওয়ামূসা ও খিযিরের কাহিনীঘটনারপ্রেক্ষাপটতাৎপর্য সমূহশিক্ষণীয় বিষয়খিযির কে ছিলেন?সংশয় নিরসনমূসা ওফেরাঊনের কাহিনীতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ।আল্লাহর গযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীরআদি ৬টি জাতির মধ্যে কওমে নূহ, ‘আদ, ছামূদ, লূত্ব ও কওমে মাদইয়ানের বর্ণনার পরষষ্ঠ গযবপ্রাপ্ত জাতি হিসাবে কওমে ফেরাঊন সম্পর্কে আল্লাহ পাক কুরআনের২৭টি সূরায় ৭৫টি স্থানে বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন।[1] কুরআনেসর্বাধিক আলোচিত বিষয় হ’ল এটি। যাতে ফেরাঊনের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য ও তারযুলুমের নীতি-পদ্ধতি সমূহ পাঠকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় এবং এযুগেরফেরাঊনদের বিষয়ে উম্মতে মুহাম্মাদী হুঁশিয়ার হয়। ফেরাঊনের কাছে প্রেরিতনবী মূসাও হারূণ (আঃ) সম্পর্কে কুরআনে সর্বাধিক আলোচনা স্থান পেয়েছে।কারণ মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযা সমূহ অন্যান্য নবীদের তুলনায় যেমন বেশী ছিল, তাঁরসম্প্রদায় বনী ইস্রাঈলের মূর্খতা ও হঠকারিতার ঘটনাবলীও ছিল বিগত উম্মতগুলিরতুলনায় অধিক এবং চমকপ্রদ। এতদ্ব্যতীত মূসা (আঃ)-কে বারবার পরীক্ষা নেবারমধ্যে এবং তাঁর কওমের দীর্ঘ কাহিনীর আলোচনা প্রসঙ্গে বহু জ্ঞাতব্য বিষয় ওআদেশ-নিষেধের কথাও এসেছে। সর্বোপরি শাসক সম্রাট ফেরাঊন ও তার ক্বিবতীসম্প্রদায় কর্তৃক সংখ্যালঘু অভিবাসী বনু ইস্রাঈল সম্প্রদায়ের উপর যুলুম-অত্যাচারের বিবরণ ও তার প্রতিরোধে মূসা (আঃ)-এর প্রচেষ্টা এবং দীর্ঘ বিশবছর ধরে যালেম সম্প্রদায়ের উপরে আপতিত বিভিন্ন গযবের বর্ণনা ও অবশেষেফেরাঊনের সদলবলে সলিল সমাধির ঘটনা যেন জীবন্ত বাণীচিত্র হয়ে ফুটে উঠেছেবিভিন্ন সূরায় বর্ণিত কুরআনের অনুপম বাকভঙ্গীতে। মোটকথা কুরআন পাক মূসা(আঃ)-এর কাহিনীকে এত গুরুত্ব দিয়েছে যে, অধিকাংশ সূরায় এর কিছু না কিছুবর্ণিত হয়েছে। কারণ এই কাহিনীতে অগণিতশিক্ষা, আল্লাহ তা‘আলার অপারশক্তি ও অনুগ্রহের বিস্ময়কর রহস্য সমূহ সন্নিবেশিত হয়েছে। এগুলোতেকর্মোদ্দীপনা ও চারিত্রিক সংশোধনের নির্দেশিকা সমূহ প্রচুর পরিমাণেবিদ্যমান রয়েছে।মূসা (আঃ) ও ফেরাঊনের ঘটনা কুরআনে বারবার উল্লেখ করারঅন্যতম উদ্দেশ্য হ’ল, এলাহী কিতাবধারী ইহুদী-নাছারাদের পিছনের কথা স্মরণকরিয়ে দেওয়াএবং শেষনবীর উপরে ঈমান আনার পক্ষে যৌক্তিকতা উপস্থাপনকরা। উল্লেখ্য যে, পরবর্তী রাসূল দাঊদ, সুলায়মান ও ঈসা (আলাইহিমুস সালাম)সবাই ছিলেন বনু ইস্রাঈল-এর সম্প্রদায়ভুক্ত এবং তাদের প্রতি প্রেরিত নবী। মূসা(আলাইহিস সালাম) ছিলেন এঁদের সবার মূল ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।উল্লেখ্য যে,কওমে মূসা ও ফেরাঊনসম্পর্কে পবিত্র কুরআনের মোট ৪৪টি সূরায় ৫৩২টি আয়াতেবর্ণিত হয়েছে।[2] ফেরাঊনের পরিচয় :‘ফেরাঊন’ কোন ব্যক্তির নাম নয়। বরং এটিহ’ল তৎকালীন মিসরের সম্রাটদের উপাধি। ক্বিবতী বংশীয় এই সম্রাটগণ কয়েকশতাব্দী ব্যাপী মিসর শাসন করেন।এই সময় মিসর সভ্যতা ও সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছেগিয়েছিল। লাশ মমিকরণ, পিরামিড (PYRAMID), স্ফিংক্স (SPHINX) প্রভৃতিতাদেরসময়কার বৈজ্ঞানিক উন্নতির প্রমাণ বহন করে। হযরত মূসা (আঃ)-এর সময়েপরপর দু’জন ফেরাঊন ছিলেন। সর্বসম্মত ইস্রাঈলী বর্ণনাও হ’ল এটাই এবং মূসা(আঃ) দু’জনেরই সাক্ষাৎ লাভ করেন। লুইস গোল্ডিং (LOUIS GOLDING)-এরতথ্যানুসন্ধানমূলক ভ্রমণবৃত্তান্ত IN THE STEPS OF MOSSES, THE LAW GIVER অনুযায়ীউক্ত ‘উৎপীড়ক ফেরাঊন’-এর (PHARAOH, THE PERSECUTOR) নাম ছিল‘রেমেসিস-২’ (RAMSES-11) এবং ডুবে মরা ফেরাঊন ছিল তার পুত্র মানেপতাহ ( ﻣﻨﻔﻄﻪ )বা মারনেপতাহ (MERNEPTAH)। লোহিত সাগর সংলগ্ন তিক্ত হরদে তিনি সসৈন্যেডুবে মরেন। যার ‘মমি’ ১৯০৭ সালে আবিষ্কৃত হয়। সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিম তীরে‘জাবালে ফেরাঊন’ নামে একটি ছোট পাহাড় আছে। এখানেই ফেরাঊনের লাশপ্রথম পাওয়া যায় বলে জনশ্রুতি আছে। গোল্ডিংয়ের ভ্রমণ পুস্তক এবংএনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকারনিবন্ধে বলা হয়েছে যে, ‘থেব্স’ (THEBES) নামকস্থানের সমাধি মন্দিরে ১৮৯৬ সালে একটি স্তম্ভ আবিষ্কৃত হয়, যাতেমারনেপতাহ-এর আমলের কীর্তি সমূহ লিপিবদ্ধ ছিল। অতঃপর ১৯০৬ সালে বৃটিশনৃতত্ত্ববিদ স্যার ক্রাঁফো ইলিয়ট স্মিথ (SIR CRAFTON ELLIOT SMITH) মমিগুলো খুলেমমিকরণের কলাকৌশল অনুসন্ধান শুরু করেন। এভাবে তিনি ৪৪টি মমি পরীক্ষাকরেন এবং অবশেষে ১৯০৭ সালে তিনি ফেরাঊন মারনেপতাহ-এর লাশশনাক্তকরেন। ঐসময় তার লাশের উপরে লবণের একটি স্তর জমে ছিল। যা দেখেসবাই স্তম্ভিত হন। এ কারণে যে, অন্য কোন মমি দেহে অনুরূপ পাওয়া যায়নি।[3]উক্ত লবণের স্তর যে সাগরের লবণাক্ত পানি তা বলাই বাহুল্য। এভাবে সূরা ইউনুস৯২আয়াতের বক্তব্য দুনিয়াবাসীর নিকটে সত্য প্রমাণিত হয়ে যায়। যেখানে আল্লাহবলেছিলেন যে, ‘আজকে আমরা তোমার দেহকে (বিনষ্ট হওয়া থেকে)বাঁচিয়েদিলাম। যাতে তুমি পরবর্তীদের জন্য দৃষ্টান্ত হ’তেপার’… (ইউনুস ১০/৯২)। বস্ত্ততঃফেরাঊনের লাশ আজও মিসরের পিরামিডে রক্ষিত আছে। যা দেখে লোকেরাউপদেশ হাছিল করতে পারে।মূসা ও ফেরাঊন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ﻧَﺘْﻠُﻮﺍ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻣِﻦ ﻧَّﺒَﺈِﻣُﻮﺳَﻰ ﻭَﻓِﺮْﻋَﻮْﻧَﺒِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻟِﻘَﻮْﻡٍ ﻳُﺆْﻣِﻨُﻮﻥَ – ﺇِﻥَّ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻋَﻼَﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻭَﺟَﻌَﻞَ ﺃَﻫْﻠَﻬَﺎ ﺷِﻴَﻌﺎً ﻳَﺴْﺘَﻀْﻌِﻒُ ﻃَﺎﺋِﻔَﺔًﻣِّﻨْﻬُﻢْ ﻳُﺬَﺑِّﺢُ ﺃَﺑْﻨَﺎﺀَﻫُﻢْ ﻭَﻳَﺴْﺘَﺤْﻴِﻲ ﻧِﺴَﺎﺀَﻫُﻢْﺇِﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﻔْﺴِﺪِﻳْﻦَ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ৩-৪)-‘আমরা আপনার নিকটে মূসা ও ফেরাঊনের বৃত্তান্ত সমূহথেকে সত্য সহকারে বর্ণনা করব বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য’। ‘নিশ্চয়ই ফেরাঊনতার দেশে উদ্ধত হয়েছিল এবং তার জনগণকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল।তাদের মধ্যকার একটি দলকে সে দুর্বল করে দিয়েছিল। সে তাদের পুত্র সন্তানদেরহত্যা করত ও কন্যা সন্তানদের বাঁচিয়ে রাখত। বস্ত্ততঃ সে ছিল অনর্থসৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ (ক্বাছাছ ২৮/৩-৪)।পবিত্র কুরআনে ফেরাঊনের আলোচনাযত এসেছে, পূর্ব যুগের অন্য কোন নরপতি সম্পর্কে এত বেশী আলোচনাআসেনি। এরমাধ্যমে ফেরাঊনী যুলুমের বিভিন্ন দিক স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যাতেইঙ্গিত রয়েছে এ বিষয়ে যে, যুগে যুগে ফেরাঊনরা আসবে এবং ঈমানদারসৎকর্মশীলদের উপরে তাদের যুলুমের ধারা ও বৈশিষ্ট্য প্রায় একই রূপ হবে। যদিওপদ্ধতি পরিবর্তিত হবে। কোনযুগই ফেরাঊন থেকে খালি থাকবে না। তাই ফেরাঊনসম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়ার জন্য আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এই নরাধম সম্পর্কে এতবেশী আলোচনা করেছেন। যাতে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা সাবধান হয় এবংযালেমদের ভয়ে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত না হয়। মুসলিম নামধারীবর্তমানমিসরীয় জাতীয়তাবাদী নেতারা ফেরাঊনকে তাদের ‘জাতীয় বীর’ বলেআখ্যায়িত করছেন এবং কায়রোর ‘ময়দানে রেমেসীস’-এর প্রধান ফটকে তারবিশাল প্রস্তর মূর্তি খাড়া করেছেন’।[4]বনু ইস্রাঈলের পূর্ব ইতিহাস :হযরতইবরাহীম (আঃ)-এর কনিষ্ঠ পুত্র হযরত ইসহাক্ব (আঃ)-এর পুত্র ইয়াকূব (আঃ)-এর অপরনাম ছিল ‘ইস্রাঈল’। হিব্রু ভাষায় ‘ইস্রাঈল’ অর্থ ‘আল্লাহর দাস’। সে হিসাবেইয়াকূব (আঃ)-এর বংশধরগণকে ‘বনু ইস্রাঈল’ বলা হয়। কুরআনে তাদেরকে ‘বনুইস্রাঈল’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, যাতে ‘আল্লাহর দাস’ হবার কথাটি তাদেরবারবার স্মরণে আসে।ইয়াকূব (আঃ) ও বনু ইস্রাঈলদের আদি বাসস্থান ছিলকেন‘আনে, যা বর্তমান ফিলিস্তীন এলাকায় অবস্থিত। তখনকার সময় ফিলিস্তীন ওসিরিয়া মিলিতভাবে শাম দেশ ছিল। বলা চলে যে, প্রথম ও শেষনবী ব্যতীত প্রায়সকল নবীর আবাসস্থল ছিল ইরাক ও শাম অঞ্চলে। যার গোটা অঞ্চলকে এখন‘মধ্যপ্রাচ্য’ বলা হচ্ছে। ইয়াকূব (আঃ)-এর পুত্র হযরত ইউসুফ (আঃ) যখন মিসরেরঅর্থমন্ত্রী ও পরে শাসনকর্তা নিযুক্ত হন এবং অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় কেন‘আনঅঞ্চলেও চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তখন ইউসুফ (আঃ)-এর আমন্ত্রণে পিতা ইয়াকূব(আঃ) স্বীয় পুত্রগণ ও পরিবারবর্গ সহ হিজরত করে মিসরে চলে যান। ক্রমে তাঁরাসেখানে আধিপত্য বিস্তার করেন ও সুখে-শান্তিতে দিনাতিপাত করতে থাকেন।তারীখুল আম্বিয়া-র লেখকবলেন, ইউসুফ (আঃ)-এর কাহিনীতে কোথাও ফেরাঊনেরনাম উল্লেখ না থাকায় প্রমাণিত হয় যে, ঐ সময় ফেরাঊনদের হটিয়ে সেখানে‘হাকসূস’ ( ﻣﻠﻮﻙ ﺍﻟﻬﻜﺴﻮﺱ ) রাজাদের রাজত্ব কায়েম হয়। যারা দু’শো বছর রাজত্ব করেনএবং যা ছিল ঈসা (আঃ)-এর জন্মের প্রায়দু’হাযার বছর আগের ঘটনা।[5] অতঃপরমিসর পুনরায় ফেরাঊনদের অধিকারে ফিরে আসে। ইউসুফ (আঃ)-এর মৃত্যুর পরে তাঁরপঞ্চম অধঃস্তনপুরুষ মূসা ও হারূনের সময় যে নিপীড়ক ফেরাঊন শাসন ক্ষমতায় ছিলতার নাম ছিল রেমেসীস-২। অতঃপর তার পুত্র মারনেপতাহ-এর সময় সাগরডুবিরঘটনা ঘটে এবং সৈন্য-সামন্ত সহ তার সলিল সমাধি হয়।‘ফেরাঊন’ ছিল মিসরেরক্বিবতী বংশীয় শাসকদের উপাধি। ক্বিবতীরা ছিল মিসরের আদি বাসিন্দা।এক্ষণে তারা সম্রাট বংশের হওয়ায় শাম থেকে আগত সুখী-স্বচ্ছল বনু ইস্রাঈলদেরহিংসা করতে থাকে। ক্রমে তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের রূপ পরিগ্রহকরে।এক বর্ণনায় এসেছে যে, ইয়াকূবের মিসরে আগমন থেকে মূসার সাথে মিসরথেকে বিদায়কালে প্রায় চারশত বছর সময়ের মধ্যে তাদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিলকাছাকাছি প্রায় তিন মিলিয়ন[6] এবং এ সময় তারা ছিল মিসরের মোটজনসংখ্যার ১০ থেকে ২০ শতাংশ’।[7] তবে এগুলি সবই ইস্রাঈলীদের কাল্পনিকহিসাব মাত্র। যার কোন ভিত্তি নেই’। বরং কুরআন বলছে ﺇِﻥَّ ﻫَﺆُﻵﺀ ﻟَﺸِﺮْﺫِﻣَﺔٌ ﻗَﻠِﻴﻠُﻮﻥَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ৫৪)- ‘নিশ্চয়ই তারা ছিল ক্ষুদ্র একটি দল’ (শো‘আরা ২৬/৫৪)। এই বহিরাগত নবী বংশও ক্ষুদ্র দলের সুনাম-সুখ্যাতিই ছিল সংখ্যায় বড় ও শাসকদল ক্বিবতীদের হিংসারকারণ। এরপর জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী ফেরাঊনকে ভীত ও ক্ষিপ্ত করেতোলে।মূসা (আঃ)-এর পরিচয় : ﻣﻮﺳﻰ ﺑﻦ ﻋﻤﺮﺍﻥ ﺑﻦ ﻗﺎﻫﺚ ﺑﻦ ﻋﺎﺯﺭ ﺑﻦ ﻻﻭﻯ ﺑﻦ ﻳﻌﻘﻮﺏ ﺑﻦ ﺍﺳﺤﺎﻕ ﺑﻦﺍﺑﺮﺍﻫﻴﻢ ﻋﻠﻴﻬﻢ ﺍﻟﺴﻼﻡ -মূসা ইবনে ইমরান বিন ক্বাহেছ বিন ‘আযের বিন লাভী বিন ইয়াকূব বিন ইসহাক্ববিন ইবরাহীম (আঃ)।[8]অর্থাৎ মূসা হ’লেন ইবরাহীম (আঃ)-এর ৮ম অধঃস্তন পুরুষ।মূসা (আঃ)-এর পিতার নাম ছিল ‘ইমরান’ ও মাতার নাম ছিল ‘ইউহানিব’। তবেমায়ের নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে।[9] উল্লেখ্য যে, মারিয়াম (আঃ)-এরপিতার নামও ছিল ‘ইমরান’। যিনি ছিলেন হযরত ঈসা (আঃ)-এর নানা। মূসা ও ঈসাউভয় নবীই ছিলেন বনু ইস্রাঈল বংশীয় এবং উভয়ে বনু ইস্রাঈলের প্রতি প্রেরিতহয়েছিলেন (সাজদাহ ৩২/২৩, ছফ ৬১/৬)। মূসার জন্ম হয় মিসরে এবং লালিত-পালিতহন মিসর সম্রাট ফেরাঊনের ঘরে। তাঁর সহোদর ভাই হারূণ (আঃ) ছিলেন তাঁর চেয়েতিন বছরের বড় এবং তিনি মূসা (আঃ)-এর তিন বছর পূর্বেই মৃত্যুবরণ করেন। উভয়েরমৃত্যু হয় মিসর ও শাম-এর মধ্যবর্তী তীহ্ প্রান্তরে বনু ইস্রাঈলের ৪০ বছর আটকথাকাকালীন সময়ে। মাওলানা মওদূদী বলেন, মূসা (আঃ) পঞ্চাশ বছর বয়সে নবীহয়ে ফেরাঊনের দরবারে পৌঁছেন। অতঃপর তেইশ বছর দ্বন্দ্ব-সংগ্রামেরপরফেরাঊন ডুবে মরে এবং বনু ইস্রাঈল মিসর থেকে বেরিয়ে যায়। এ সময় মূসা(আঃ)-এর বয়স ছিল সম্ভবতঃ আশি বছর।[10] তবে মুফতী মুহাম্মাদ শফী বলেন,ফেরাঊনের জাদুকরদের সাথে মুকাবিলার ঘটনার পর ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ীমূসা (আঃ) বিশ বছর যাবত মিসরে অবস্থান করেন। এ সময় আল্লাহ মূসা (আঃ)-কেনয়টি মু‘জেযা দান করেন।উল্লেখ্য যে, আদম, ইয়াহ্ইয়া ও ঈসা (আঃ) ব্যতীত প্রায়সকল নবীই চল্লিশ বছর বয়সে নবুঅত লাভ করেছিলেন। মূসাও চল্লিশ বছর বয়সে নবুঅতলাভ করেছিলেন বলে অধিকাংশ বিদ্বান মত পোষণ করেছেন।[11] সেমতে আমরামূসা (আঃ)-এর বয়সকে নিম্নরূপে ভাগ করতে পারি। যেমন, প্রথম ৩০ বছর মিসরে,তারপর ১০ বছর মাদিয়ানে, তারপর মিসরে ফেরার পথে তূর পাহাড়ের নিকটে‘তুবা’ ( ﻃُﻮَﻯ) উপত্যকায় ৪০ বছর বয়সে নবুঅত লাভ। অতঃপর ২০ বছর মিসরে অবস্থানকরে সেখানকার অধিবাসীদেরকে তাওহীদের দাওয়াত প্রদান। তারপর ৬০ বছরবয়সে বনু ইস্রাঈলদের নিয়ে মিসর হ’তে প্রস্থান এবং ফেরাঊনের সলিল সমাধি।অতঃপর আদিবাসস্থান কেন‘আন অধিকারী আমালেক্বাদের বিরুদ্ধে জিহাদেরহুকুম অমান্য করায় অবাধ্য ইস্রাঈলীদের নিয়ে ৪০ বছর যাবত তীহ্ প্রান্তরে উন্মুক্তকারাগারে অবস্থান ও বায়তুল মুক্বাদ্দাসের সন্নিকটে মৃত্যু সম্ভবতঃ ৮০ থেকে ১০০বছর বয়সের মধ্যে। মূসা (আঃ)-এর কবর হয় বায়তুল মুক্বাদ্দাসের উপকণ্ঠে। আমাদেরনবী (ছাঃ) সেখানে একটি লাল ঢিবির দিকে ইশারা করে সেস্থানেই মূসা(আঃ)-এর কবর হয়েছে বলে জানিয়েছেন।[12] উল্লেখ্য যে, আদম (আঃ) থেকেইবরাহীম (আঃ) পর্যন্ত ১০/১২ জন নবী বাদে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর আগমনেরপূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীতে আগত সর্বমোট এক লক্ষ চবিবশ হাযার নবী-রাসূলের[13] প্রায়সবাই ইস্রাঈল বংশের ছিলেন এবং তাঁরা ছিলেন সেমেটিক।কেননা ইব্রাহীম(আঃ) ছিলেন সাম বিন নূহ-এর ৯ম অধঃস্তন পুরুষ। এজন্য ইবরাহীমকে ‘আবুলআম্বিয়া’ বা নবীদের পিতা বলা হয়।মূসা ও ফেরাঊনের কাহিনী :সুদ্দী ও মুররাহপ্রমুখ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস ও আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রাঃ) এবং বহু সংখ্যকছাহাবী থেকে বর্ণনা করেন যে, ফেরাঊন একদা স্বপ্নে দেখেন যে, বায়তুলমুক্বাদ্দাসের দিক হ’তে একটি আগুন এসে মিসরের ঘর-বাড়ি ও মূল অধিবাসীক্বিবতীদের জ্বালিয়ে দিচ্ছে। অথচ অভিবাসী বনু ইস্রাঈলদের কিছুই হচ্ছে না।ভীত-চকিত অবস্থায় তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। অতঃপর দেশের বড় বড়জ্যোতিষী ও জাদুকরদের সমবেত করলেন এবং তাদের সম্মুখে স্বপ্নের বৃত্তান্তবর্ণনা দিলেন ও এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলেন। জ্যোতিষীগণ বলল যে, অতি সত্বর বনুইস্রাঈলের মধ্যে একটিপুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে। যার হাতে মিসরীয়দের ধ্বংসনেমেআসবে’।[14]মিসর সম্রাট ফেরাঊন জ্যোতিষীদের মাধ্যমে যখন জানতেপারলেন যে, অতি সত্বর ইস্রাঈল বংশে এমন একটা পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, যেতার সাম্রাজ্যের পতন ঘটাবে। তখন উক্ত সন্তানের জন্ম রোধের কৌশল হিসাবেফেরাঊন বনু ইস্রাঈলদের ঘরে নবজাত সকল পুত্র সন্তানকে ব্যাপকহারে হত্যারনির্দেশ দিল। উদ্দেশ্য ছিল, এভাবে হত্যা করতে থাকলে এক সময় বনু ইস্রাঈল কওমযুবক শূন্য হয়ে যাবে। বৃদ্ধরাও মারা যাবে। মহিলারা সবদাসীবৃত্তিতে বাধ্য হবে।অথচ বনু ইস্রাঈলগণ ছিল মিসরের শাসক শ্রেণী এবং উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন জাতি।এই দূরদর্শী কপট পরিকল্পনা নিয়ে ফেরাঊন ও তার মন্ত্রীগণ সারা দেশে একদলধাত্রী মহিলা ও ছুরিধারী জাল্লাদ নিয়োগ করে। মহিলারা বাড়ী বাড়ী গিয়েবনু ইস্রাঈলের গর্ভবতী মহিলাদের তালিকা করত এবং প্রসবের দিন হাযির হয়েদেখত, ছেলে না মেয়ে।ছেলে হ’লে পুরুষ জাল্লাদকে খবর দিত। সে এসে ছুরিদিয়েমায়ের সামনে সন্তানকে যবহ করে ফেলে রেখে চলে যেত।[15] এভাবে বনুইস্রাঈলের ঘরে ঘরে কান্নার রোল পড়ে গেল। ইবনু কাছীর বলেন, একাধিকমুফাসসির বলেছেন যে, শাসকদল ক্বিবতীরা ফেরাঊনের কাছে গিয়ে অভিযোগকরল যে, এভাবেপুত্র সন্তান হত্যা করায় বনু ইস্রাঈলের কর্মজীবী ও শ্রমিকশ্রেণীর ঘাটতি হচ্ছে। যাতে তাদের কর্মী সংকট দেখা দিয়েছে।তখন ফেরাঊনএক বছর অন্তর অন্তর পুত্র হত্যার নির্দেশ দেয়। এতেবাদ পড়া বছরে হারূণের জন্মহয়। কিন্তু হত্যার বছরে মূসার জন্ম হয়।[16] ফলে পিতা-মাতা তাদের নবজাতসন্তানের নিশ্চিত হত্যার আশংকায় দারুণভাবে ভীত হয়ে পড়লেন। এমতাবস্থায়আল্লাহ মূসা (আঃ)-এর মায়ের অন্তরে ‘ইলহাম’ করেন। যেমন আল্লাহ পরবর্তীতেমূসাকে বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻣَﻨَﻨَّﺎ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻣَﺮَّﺓً ﺃُﺧْﺮَﻯ – ﺇِﺫْ ﺃَﻭْﺣَﻴْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻰ ﺃُﻣِّﻚَ ﻣَﺎ ﻳُﻮﺣَﻰ – ﺃَﻥِ ﺍﻗْﺬِ ﻓِﻴﻪِ ﻓِﻲﺍﻟﺘَّﺎﺑُﻮﺕِ ﻓَﺎﻗْﺬِ ﻓِﻴﻪِ ﻓِﻴﺎﻟْﻴَﻢِّ ﻓَﻠْﻴُﻠْﻘِﻪِ ﺍﻟْﻴَﻢُّﺑِﺎﻟﺴَّﺎﺣِﻞِ ﻳَﺄْﺧُﺬْﻩُ ﻋَﺪُﻭٌّ ﻟِّﻲ ﻭَﻋَﺪُﻭٌّ ﻟَّﻪُ ﻭَﺃَﻟْﻘَﻴْﺖُ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻣَﺤَﺒَّﺔً ﻣِّﻨِّﻲ ﻭَﻟِﺘُﺼْﻨَﻊَ ﻋَﻠَﻰ ﻋَﻴْﻨِﻲ – ‏( ﻃﻪ৩৭-৩৯)-‘আমরা তোমার উপরআরো একবার অনুগ্রহ করেছিলাম’। ‘যখন আমরা তোমার মাকে প্রত্যাদেশকরেছিলাম, যা প্রত্যাদেশ করা হয়’। ‘(এই মর্মে যে,) তোমার নবজাত সন্তানকেসিন্দুকে ভরে নদীতে ভাসিয়ে দাও’। ‘অতঃপর নদী তাকে তীরে ঠেলে দেবে।অতঃপর আমার শত্রু ও তার শত্রু (ফেরাঊন) তাকে উঠিয়ে নেবে এবং আমি তোমারউপর আমার পক্ষ হ’তে বিশেষ মহববত নিক্ষেপ করেছিলাম এবং তা এজন্য যে, তুমিআমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও’ (ত্বোয়াহা ২০/৩৭-৩৯)। বিষয়টি আল্লাহঅন্যত্র বলেন এভাবে, ﻭَﺃَﻭْﺣَﻴْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻰ ﺃُﻡِّ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺃَﻥْ ﺃَﺭْﺿِﻌِﻴْﻪِ ﻓَﺈِﺫَﺍ ﺧِﻔْﺖِ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻓَﺄَﻟْﻘِﻴْﻪِ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻴَﻢِّ ﻭَﻻَﺗَﺨَﺎﻓِﻲ ﻭَﻻَ ﺗَﺤْﺰَﻧِﻲ ﺇِﻧَّﺎ ﺭَﺍﺩُّﻭﻩُﺇِﻟَﻴْﻚِ ﻭَﺟَﺎﻋِﻠُﻮﻩُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺮْﺳَﻠِﻴﻦَ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ৭)-‘আমরা মূসার মায়ের কাছে প্রত্যাদেশ করলাম এইমর্মেযে, তুমি ছেলেকে দুধ পান করাও। অতঃপর তার জীবনের ব্যাপারে যখন শংকিতহবে, তখন তাকে নদীতে নিক্ষেপ করবে। তুমি ভীত হয়ো না ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়োনা। আমরা ওকে তোমার কাছেই ফিরিয়ে দেব এবং ওকে নবীদেরঅন্তর্ভুক্তকরব’ (ক্বাছাছ ২৮/৭)। মূলতঃ শেষেরদু’টি ওয়াদাই তাঁর মাকে নিশ্চিন্ত ওউদ্বুদ্ধ করে। যেমনআল্লাহ বলেন, ﻭَﺃَﺻْﺒَﺢَ ﻓُﺆَﺍﺩُ ﺃُﻡِّ ﻣُﻮْﺳَﻰ ﻓَﺎﺭِﻏﺎً ﺇِﻥْ ﻛَﺎﺩَﺕْ ﻟَﺘُﺒْﺪِﻱْ ﺑِﻪِ ﻟَﻮْﻻَ ﺃَﻥﺭَّﺑَﻄْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻗَﻠْﺒِﻬَﺎ ﻟِﺘَﻜُﻮْﻥَ ﻣِﻦَﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ১০)-‘মূসা জননীর অন্তর (কেবলি মূসার চিন্তায়) বিভোর হয়ে পড়ল। যদিআমরা তার অন্তরকে সুদৃঢ় করে না দিতাম, তাহ’লে সে মূসার (জন্য অস্থিরতার)বিষয়টি প্রকাশ করেইফেলত। (আমরা তার অন্তরকে দৃঢ় করেছিলাম এ কারণে যে)সে যেন আল্লাহর উপরে প্রত্যয়শীলদের অন্তর্ভুক্ত থাকে’ (ক্বাছাছ ২৮/১০)।মূসানদীতে নিক্ষিপ্ত হ’লেন :ফেরাঊনের সৈন্যদের হাতে নিহত হবার নিশ্চিতসম্ভাবনা দেখা দিলে আল্লাহর প্রত্যাদেশ (ইলহাম) অনুযায়ী পিতা-মাতাতাদের প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে সিন্দুকে ভরে বাড়ীর পাশের নীল নদীতেভাসিয়ে দিলেন।[17] অতঃপর স্রোতের সাথে সাথে সিন্দুকটি এগিয়ে চলল।ওদিকে মূসার (বড়) বোন তার মায়ের হুকুমে (ক্বাছাছ ২৮/১১) সিন্দুকটিকে অনুসরণকরে নদীর কিনারা দিয়ে চলতে লাগল (ত্বোয়াহা ২০/৪০)। এক সময় তা ফেরাঊনেরপ্রাসাদের ঘাটে এসে ভিড়ল। ফেরাঊনের পুণ্যবতী স্ত্রী আসিয়া ( ﺁﺳﻴﺔ ) বিনতেমুযাহিম ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চাটিকে দেখে অভিভূত হয়ে পড়লেন। ফেরাঊন তাকে বনুইস্রাঈল সন্তান ভেবে হত্যা করতেচাইল। কিন্তু সন্তানহীনা স্ত্রীর অপত্যস্নেহের কারণে তাসম্ভব হয়নি। অবশেষে ফেরাঊন নিজে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েপড়েন। কারণ আল্লাহ মূসার চেহারার মধ্যে বিশেষ একটা মায়াময় কমনীয়তা দানকরেছিলেন (ত্বোয়াহা ২০/৩৯)। যাকে দেখলেই মায়া পড়ে যেত। ফেরাঊনেরহৃদয়ের পাষাণ গলতে সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। বস্ত্ততঃ এটাও ছিল আল্লাহর মহাপরিকল্পনারই অংশ বিশেষ। ফুটফুটে শিশুটিকে দেখে ফেরাঊনের স্ত্রী তারস্বামীকে বললেন, ﻭَﻗَﺎﻟَﺖِ ﺍﻣْﺮَﺃَﺕُ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻗُﺮَّﺕُ ﻋَﻴْﻦٍ ﻟِّﻲ ﻭَﻟَﻚَ ﻻَ ﺗَﻘْﺘُﻠُﻮﻩُ ﻋَﺴَﻰ ﺃَﻥ ﻳَّﻨْﻔَﻌَﻨَﺎ ﺃَﻭْﻧَﺘَّﺨِﺬَﻩُﻭَﻟَﺪﺍً ﻭَﻫُﻢْ ﻻَ ﻳَﺸْﻌُﺮُﻭْﻥَ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ৯)-‘এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি। একে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারেআসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি’। আল্লাহ বলেন, ‘অথচতারা (আমার কৌশল) বুঝতে পারল না’ (ক্বাছাছ ২৮/৯)। মূসা এক্ষণে ফেরাঊনেরস্ত্রীর কোলে পুত্রস্নেহ পেতে শুরু করলেন। অতঃপর বাচ্চাকে দুধখাওয়ানোর জন্যরাণীর নির্দেশে বাজারে বহু ধাত্রীর কাছে নিয়ে যাওয়া হ’ল। কিন্তু মূসা কারুরইবুকে মুখ দিচ্ছেন না। আল্লাহ বলেন, ﻭَﺣَﺮَّﻣْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺍﻟْﻤَﺮَﺍﺿِﻊَ ﻣِﻦ ﻗَﺒْﻞُ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ১২)- ‘আমরাপূর্বথেকেই অন্যের দুধ খাওয়া থেকে মূসাকে বিরত রেখেছিলাম’ (ক্বাছাছ ২৮/১২)। এমনসময় অপেক্ষারত মূসার ভগিনী বলল, ‘আমি কি আপনাদেরকে এমন এক পরিবারেরখবর দিব, যারা আপনাদের জন্য এ শিশু পুত্রের লালন-পালন করবে এবং তারা এরশুভাকাংখী’? (ক্বাছাছ ২৮/১২)। রাণীর সম্মতিক্রমে মূসাকে প্রস্তাবিতধাত্রীগৃহে প্রেরণ করা হ’ল। মূসা খুশী মনে মায়ের দুধ গ্রহণ করলেন। অতঃপরমায়ের কাছে রাজকীয় ভাতা ও উপঢৌকনাদি প্রেরিত হ’তে থাকল।[18] এভাবেআল্লাহর অপার অনুগ্রহে মূসা তারমায়ের কোলে ফিরে এলেন। এভাবে একদিকেপুত্র হত্যার ভয়ংকর আতংক হ’তে মা-বাবা মুক্তি পেলেন ও নদীতে ভাসিয়েদেওয়া সন্তানকে পুনরায় বুকে ফিরে পেয়ে তাদের হৃদয় শীতল হ’ল। অন্যদিকে বহুমূল্যের রাজকীয় ভাতা পেয়ে সংসার যাত্রা নির্বাহের দুশ্চিন্তা হ’তেতারামুক্ত হ’লেন। সাথে সাথে সম্রাট নিয়োজিত ধাত্রী হিসাবে ও সম্রাটপরিবারের সাথে বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার ফলে তাঁদের পরিবারের সামাজিকমর্যাদাও বৃদ্ধি পেল। এভাবেই ফেরাঊনী কৌশলের উপরে আল্লাহর কৌশল বিজয়ীহ’ল। ফালিল্লাহিল হাম্দ।আল্লাহ বলেন, ﻭَﻣَﻜَﺮُﻭﺍ ﻣَﻜْﺮﺍً ﻭَﻣَﻜَﺮْﻧَﺎ ﻣَﻜْﺮﺍً ﻭَﻫُﻢْ ﻻَ ﻳَﺸْﻌُﺮُﻭﻥَ – ‏( ﺍﻟﻨﻤﻞ ৫০)-‘তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমরাও কৌশল করেছিলাম। কিন্তু তারা (আমাদেরকৌশল) বুঝতে পারেনি’ (নমল ২৭/৫০)।যৌবনে মূসা :দুগ্ধ পানের মেয়াদ শেষে মূসাঅতঃপর ফেরাঊন-পুত্র হিসাবে তার গৃহে শান-শওকতের মধ্যে বড় হ’তে থাকেন।আল্লাহর রহমতে ফেরাঊনের স্ত্রীর অপত্য স্নেহ ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে বড়দুনিয়াবী রক্ষাকবচ। এভাবে ﻭَﻟَﻤَّﺎ ﺑَﻠَﻎَ ﺃَﺷُﺪَّﻩُ ﻭَﺍﺳْﺘَﻮَﻯ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻩُ ﺣُﻜْﻤﺎً ﻭَﻋِﻠْﻤﺎً ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴﻦَ -‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ১৪)-‘যখন তিনি যৌবনে পদার্পণ করলেন এবং পূর্ণবয়ষ্ক মানুষে পরিণত হ’লেন, তখনআল্লাহ তাকে বিশেষ প্রজ্ঞা ও জ্ঞান সম্পদে ভূষিত করলেন’ (ক্বাছাছ ২৮/১৪)।মূসা সমসাময়িক সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্যকভাবে উপলব্ধি করলেন।দেখলেন যে, পুরা মিসরীয় সমাজ ফেরাঊনের একচ্ছত্র রাজনৈতিক কর্তৃত্বেরঅধীনে কঠোরভাবে শাসিত। ‘বিভক্ত কর ও শাসন কর’ এই সুপরিচিত ঘৃণ্য নীতিরঅনুসরণে ফেরাঊন তার দেশবাসীকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেছিল ও একটি দলকেদুর্বল করে দিয়েছিল (ক্বাছাছ ২৮/৪)। আর সেটি হ’ল বনু ইস্রাঈল। প্রতিদ্বন্দ্বীজন্মাবার ভয়ে সে তাদের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যা করত ও কন্যা সন্তানদেরবাঁচিয়ে রাখত। এভাবে একদিকে ফেরাঊন অহংকারে স্ফীত হয়ে নিজেকে‘সর্বোচ্চ পালনকর্তা ও সর্বাধিপতি’ ভেবে সারা দেশে অনর্থ সৃষ্টি করছিল।এমনকি সে নিজেকে ‘একমাত্র উপাস্য’ ﻣَﺎﻋَﻠﻤْﺖُ ﻟَﻜُﻢْ ﻣِﻦْ ﺇﻟَﻪٍ ﻏَﻴْﺮِﻯْ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ৩৮)- (ক্বাছাছ২৮/৩৮) বলতেও লজ্জাবোধ করেনি। অন্যদিকে মযলূম বনু ইস্রাঈলদের হাহাকার ওদীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। অবশেষে আল্লাহমযলূমদের ডাকে সাড়াদিলেন। আল্লাহ বলেন, ‘দেশে যাদেরকে দুর্বল করা হয়েছিল, আমরা চাইলামতাদের উপরে অনুগ্রহ করতে, তাদেরকে নেতা করতে ও দেশেরউত্তরাধিকারীকরতে’। ‘এবং আমরা চাইলাম তাদেরকে দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে এবংফেরাঊন, হামান ও তাদের সেনাবাহিনীকে তা দেখিয়ে দিতে, যা তারা সেইদুর্বল দলের তরফ থেকে আশংকা করত’ (ক্বাছাছ ২৮/৫-৬)।যুবক মূসা খুনী হ’লেন:মূসার হৃদয় মযলূমদের প্রতি করুণায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু কি করবেনভেবে পাচ্ছিলেন না। ওদিকে আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। মূসা একদিন দুপুরেরঅবসরে শহরে বেড়াতে বেরিয়েছেন। এমন সময় তাঁর সামনে এক কান্ড ঘটে গেল।তিনি দুই ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখতে পেলেন। যাদের একজন যালেম সম্রাটেরক্বিবতী বংশের এবং অন্যজন মযলূম বনু ইস্রাঈলের। মূসা তাদের থামাতে গিয়েযালেম লোকটিকে একটা ঘুষি মারলেন। কি আশ্চর্য লোকটি তাতেই অক্কা পেল।মূসা দারুণভাবে অনুতপ্ত হলেন। এবিষয়ে আল্লাহ বলেন, ﻭَﺩَﺧَﻞَ ﺍﻟْﻤَﺪِﻳْﻨَﺔَ ﻋَﻠَﻰ ﺣِﻴْﻦِ ﻏَﻔْﻠَﺔٍ ﻣِّﻦْﺃَﻫْﻠِﻬَﺎ ﻓَﻮَﺟَﺪَﻓِﻴْﻬَﺎ ﺭَﺟُﻠَﻴْﻦِ ﻳَﻘْﺘَﺘِﻼَﻧِﻬَﺬَﺍ ﻣِﻦْ ﺷِﻴْﻌَﺘِﻪِ ﻭَﻫَﺬَﺍ ﻣِﻦْ ﻋَﺪُﻭِّﻩِ ﻓَﺎﺳْﺘَﻐَﺎﺛَﻪُ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻣِﻦْ ﺷِﻴْﻌَﺘِﻪِ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻣِﻦْ ﻋَﺪُﻭِّﻩِﻓَﻮَﻛَﺰَﻩُ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻓَﻘَﻀَﻰ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻗَﺎﻝَ ﻫَﺬَﺍ ﻣِﻦْﻋَﻤَﻞِ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﺇِﻧَّﻪُ ﻋَﺪُﻭٌّ ﻣُّﻀِﻞٌّ ﻣُّﺒِﻴْﻦٌ- ﻗَﺎﻟَﺮَﺏِّ ﺇِﻧِّﻲْ ﻇَﻠَﻤْﺖُ ﻧَﻔْﺴِﻲْ ﻓَﺎﻏْﻔِﺮْ ﻟِﻲْ ﻓَﻐَﻔَﺮَ ﻟَﻪُ ﺇِﻧَّﻪُ ﻫُﻮَ ﺍﻟْﻐَﻔُﻮْﺭُﺍﻟﺮَّﺣِﻴْﻢُ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ১৫-১৬)-‘একদিন দুপুরে তিনি শহরে প্রবেশ করলেন, যখন অধিবাসীরা ছিলদিবানিদ্রার অবসরে। এ সময় তিনিদু’জন ব্যক্তিকে লড়াইরত দেখতে পেলেন। এদেরএকজন ছিল তার নিজ গোত্রের এবং অপরজন ছিল শত্রুদলের। অতঃপর তার নিজদলের লোকটি তার শত্রুদলের লোকটির বিরুদ্ধে তার কাছে সাহায্য চাইল। তখনমূসা তাকে ঘুষি মারলেন এবং তাতেই তার মৃত্যু হয়ে গেল। মূসা বললেন, ‘নিশ্চয়ইএটি শয়তানের কাজ। সে মানুষকে বিভ্রান্তকারী প্রকাশ্য শত্রু’। ‘হে আমার প্রভু!আমি নিজের উপরে যুলুম করেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর। অতঃপর আল্লাহ তাকেক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (ক্বাছাছ ২৮/১৫-১৬)।পরের দিন‘জনৈক ব্যক্তি ছুটে এসে মূসাকে বলল, হে মূসা! আমি তোমার শুভাকাংখী।তোমাকে পরামর্শ দিচ্ছি যে, এই মুহূর্তে তুমি এখান থেকে বের হয়ে চলে যাও।কেননা সম্রাটের পারিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছে’ (ক্বাছাছ২৮/২০)। এই লোকটি মূসার প্রতি আকৃষ্ট ও তাঁর গুণমুগ্ধ ছিল। একথা শুনে ভীত হয়েমূসা সেখান থেকে বের হয়ে পড়লেন নিরুদ্দেশ যাত্রাপথে। যেমন আল্লাহ বলেন,ﻓَﺨَﺮَﺝَﻣِﻨْﻬَﺎ ﺧَﺎﺋِﻔﺎً ﻳَّﺘَﺮَﻗَّﺐُ ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺏِّ ﻧَﺠِّﻨِﻲْ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴْﻦَ – ﻭَﻟَﻤَّﺎ ﺗَﻮَﺟَّﻪَ ﺗِﻠْﻘَﺎﺀَ ﻣَﺪْﻳَﻦَ ﻗَﺎﻝَ ﻋَﺴَﻰ ﺭَﺑِّﻲْﺃَﻧْﻴَّﻬْﺪِﻳَﻨِﻲْ ﺳَﻮَﺍﺀَ ﺍﻟﺴَّﺒِﻴْﻞِ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ২১-২২)-‘অতঃপর তিনি সেখান থেকে ভীত অবস্থায় বের হয়ে পড়লেন পথ দেখতেদেখতে এবং বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের কবলথেকে রক্ষা কর’। ‘এরপর যখন তিনি (পার্শ্ববর্তী রাজ্য) মাদিয়ান অভিমুখেরওয়ানা হ’লেন, তখন (দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে) বলে উঠলেন, ‘নিশ্চয়ই আমার প্রভু আমাকেসরল পথ দেখাবেন’ (ক্বাছাছ ২৮/২১-২২)।আসলে আল্লাহ চাচ্ছিলেন, ফেরাঊনেররাজপ্রাসাদ থেকে মূসাকে বের করে নিতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনাচারেরসঙ্গে পরিচিত করতে। সাথে সাথে আল্লাহ তাঁকে তৎকালীন একজন শ্রেষ্ঠ নবীরগৃহে লালিত-পালিত করে তাওহীদের বাস্তব শিক্ষায় আগাম পরিপক্ক করে নিতেচাইলেন।মূসার পরীক্ষা সমূহ :অন্যান্য নবীদের পরীক্ষা হয়েছে সাধারণতঃ নবুঅতলাভের পরে। কিন্তু মূসার পরীক্ষা শুরুহয়েছে তার জন্ম লাভের পর থেকেই।বস্ত্ততঃ নবুঅত প্রাপ্তির পূর্বে ও পরে তাঁর জীবনে বহু পরীক্ষা হয়েছে।যেমনআল্লাহ মূসা (আঃ)-কে শুনিয়ে বলেন, ﻭَﻓَﺘَﻨَّﺎﻙَ ﻓُﺘُﻮْﻧًﺎ ‘আর আমরা তোমাকে অনেকপরীক্ষায় ফেলেছি’ (ত্বোয়াহা ২০/৪০)।নবুঅত লাভের পূর্বে তাঁর প্রধানপরীক্ষাছিল তিনটি। যথাঃ (১) হত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া (২) মাদিয়ানে হিজরত (৩)মাদিয়ান থেকে মিসর যাত্রা।অতঃপর নবুঅত লাভের পর তাঁর পরীক্ষা হয়প্রধানতঃ চারটিঃ (১)জাদুকরদের মুকাবিলা (২) ফেরাঊনের যুলুমসমূহ মুকাবিলা (৩)সাগরডুবির পরীক্ষা (৪) বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযান।নবুঅত-পূর্ব ১ম পরীক্ষা : হত্যাথেকে বেঁচে যাওয়ামূসার জন্ম হয়েছিল তাঁর কওমের উপরে আপতিত রাষ্ট্রীয়হত্যাযজ্ঞের ভয়ংকর বিভীষিকার মধ্যে। আল্লাহ তাঁকে অপূর্ব কৌশলের মাধ্যমেবাঁচিয়ে নেন। অতঃপর তাঁর জানী দুশমনের ঘরেই তাঁকে নিরাপদে ও সসম্মানেলালন-পালন করালেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মা ও পরিবারকে করলেন উচ্চতরসামাজিক মর্যাদায় উন্নীত। অথচ মূসার জন্মকে ঠেকানোর জন্যই ফেরাঊন তারপশুশক্তির মাধ্যমে বনু ইস্রাঈলের শত শত শিশু পুত্রকে হত্যা করে চলছিল। এ বিষয়েইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে।২য় পরীক্ষা : মাদিয়ানে হিজরতঅতঃপর যৌবনকালে তাঁরদ্বিতীয় পরীক্ষা হ’ল- হিজরতের পরীক্ষা। মূলতঃ এটাই ছিল তাঁর জ্ঞানবুদ্ধিহবার পরে ১ম পরীক্ষা। শেষনবী সহ অন্যান্য নবীর জীবনে সাধারণতঃনবুঅতপ্রাপ্তির পরে হিজরতের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। কিন্তু মূসা (আঃ)-এরজীবনে নবুঅত প্রাপ্তির আগেই এই কঠিন পরীক্ষাউপস্থিত হয়। অনাকাংখিত ওআকস্মিক হত্যাকান্ডের আসামী হয়ে জীবনের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত্র মূসাফেরাঊনের রাজ্যসীমা ছেড়ে কপর্দকহীন অবস্থায় পার্শ্ববর্তী রাজ্য মাদিয়ানেগিয়ে উপস্থিত হ’লেন।ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় কাতর মূসা এইভীতিকর দীর্ঘ সফরে কিভাবেচলেছেন, কি খেয়েছেন সেসব বিষয়ে তাফসীরকারগণ বিভিন্ন চমকপ্রদ ঘটনাবলীউল্লেখ করেছেন। কিন্তু কুরআন এসব বিষয়ে চুপ থেকেছে বিধায় আমরাওচুপ থাকছি।তবে রওয়ানা হবার সময় যেহেতু মূসা নিজেকে সম্পূর্ণরূপে স্বীয় পালনকর্তাআল্লাহর উপরে সমর্পণ করেছিলেন এবং প্রত্যাশা করেছিলেন ‘নিশ্চয়ই আমারপালনকর্তা আমাকে সরল পথ দেখাবেন’ (ক্বাছাছ ২৮/২২), অতএব তাঁকে মাদিয়ানেরমত অপরিচিত রাজ্যে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়াও সসম্মানে সেখানে বসবাস করারযাবতীয় দায়িত্ব আল্লাহ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়রয়েছে যে, সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর উপরে নিজেকে সঁপে দিলে আল্লাহ তাঁর নেককারবান্দাদের সব দায়িত্ব নিজে নিয়ে থাকেন। উল্লেখ্য যে, বর্তমান পূর্ব জর্দানেরমো‘আন ( ﻣﻌﺎﻥ ) সামুদ্রিক বন্দরের অনতিদূরেই ‘মাদইয়ান’ অবস্থিত।মাদিয়ানেরজীবন : বিবাহ ও সংসারপালনমাদিয়ানে প্রবেশ করে তিনি পানির আশায় একটাকূপের দিকে গেলেন। সেখানে পানি প্রার্থী লোকদের ভিড়ের অদূরে দু’টিমেয়েকে তাদের তৃষ্ণার্ত পশুগুলি সহ অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাঁরহৃদয় উথলে উঠলো। কেউ তাদের দিকে ভ্রুক্ষেপই করছে না। মূসা নিজে মযলূম। তিনিমযলূমের ব্যথাবুঝেন। তাই কিছুক্ষণ ইতঃস্তত করে মেয়ে দু’টির দিকে এগিয়েগেলেন। তিনি তাদের সমস্যার কথা জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, ‘আমরা আমাদেরপশুগুলিকে পানি পান করাতে পারি না, যতক্ষণ না রাখালরা তাদের পশুগুলিকেপানি পান করিয়ে চলে যায়। অথচ আমাদের পিতা খুবই বৃদ্ধ’ (যিনি ঘরে বসেআমাদের অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে আছেন)। ‘অতঃপর তাদের পশুগুলি এনে মূসা পানিপান করালেন’ (তারপর মেয়ে দু’টি পশুগুলি নিয়ে বাড়ী চলে গেল)। মূসা একটিগাছের ছায়ায় বসে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, ﺭَﺏِّ ﺇِﻧِّﻲ ﻟِﻤَﺎ ﺃَﻧﺰَﻟْﺖَ ﺇِﻟَﻲَّ ﻣِﻦْ ﺧَﻴْﺮٍ ﻓَﻘِﻴﺮٌ-‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ২৪)- ‘হে আমার পালনকর্তা! তুমি আমার উপর যে অনুগ্রহ নাযিল করবে, আমিতার মুখাপেক্ষী’ (ক্বাছাছ ২৮/২৪)। হঠাৎ দেখা গেল যে ‘বালিকাদ্বয়ের একজনসলজ্জ পদক্ষেপে তাঁর দিকে আসছে’। মেয়েটি এসে ধীর কণ্ঠে তাকে বলল,‘আমারপিতা আপনাকে ডেকেছেন, যাতে আপনি যে আমাদেরকে পানি পান করিয়েছেন,তার বিনিময় স্বরূপ আপনাকে পুরস্কার দিতে পারেন’ (ক্বাছাছ ২৮/২৩-২৫)।উল্লেখ্যযে, বালিকাদ্বয়ের পিতা ছিলেন মাদইয়ান বাসীদের নিকটে প্রেরিত বিখ্যাতনবী হযরতশু‘আয়েব (আঃ)। মূসা ইতিপূর্বে কখনো তাঁর নাম শোনেননি বা তাঁকেচিনতেন না। তাঁর কাছে পৌঁছে মূসা তাঁর বৃত্তান্ত সব বর্ণনা করলেন। শু‘আয়েব(আঃ) সবকিছু শুনে বললেন, ﻻَﺗَﺨَﻒْ ﻧَﺠَﻮْﺕَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟْﻈَﺎﻟِﻤِﻴْﻦَ ، ‘ভয় করো না। তুমি যালেমসম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি পেয়েছ’। ‘এমন সময় বালিকাদ্বয়ের একজন বলল,আববা! এঁকে বাড়ীতে কর্মচারী হিসাবে রেখে দিন। কেননা ﺇِﻥَّ ﺧَﻴْﺮَ ﻣَﻦِ ﺍﺳْﺘَﺄْﺟَﺮْﺕَ ﺍﻟْﻘَﻮِﻱُّﺍﻟْﺄَﻣِﻴﻦُআপনার কর্ম সহায়ক হিসাবে সেই-ই উত্তম হবে, যে শক্তিশালী ওবিশ্বস্ত’ (ক্বাছাছ ২৮/২৬)। ‘তখন তিনি মূসাকে লক্ষ্য করে বললেন, আমি আমার এইকন্যাদ্বয়ের একজনকে তোমার সাথে বিবাহ দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছরআমার বাড়ীতে কর্মচারী থাকবে। তবে যদি দশ বছর পূর্ণ করো, সেটা তোমারইচ্ছা। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না। আল্লাহ চাহেন তো তুমি আমাকেসদাচারী হিসাবে পাবে’। ‘মূসা বলল, আমার ও আপনার মধ্যে এই চুক্তি স্থির হ’ল।দু’টিমেয়াদের মধ্য থেকে যেকোন একটি পূর্ণ করলে আমার বিরুদ্ধে কোনঅভিযোগথাকবে না। আমরা যা বলছি, আল্লাহ তার উপরে তত্ত্বাবধায়ক’(ক্বাছাছ২৮/২৫-২৮)। মূলতঃ এটাই ছিল তাদের বিয়ের মোহরানা। সেযুগে এ ধরনের রেওয়াজঅনেকের মধ্যে চালু ছিল। যেমন ইতিপূর্বেইয়াকূব (আঃ) তাঁর স্ত্রীর মোহরানাবাবদ সাত বছর শ্বশুর বাড়ীতে মেষ চরিয়েছেন। এভাবে অচেনা-অজানা দেশেএসে মূসা (আঃ) অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান এবং অন্যান্য নিরাপত্তাসহ অত্যন্তমর্যাদাবান ও নির্ভরযোগ্য একজন অভিভাবক পেয়ে গেলেন। সেই সঙ্গেপেলেনজীবন সাথী একজন পতি-পরায়ণা বুদ্ধিমতী স্ত্রী। অতঃপর সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে মূসারদিনগুলি অতিবাহিত হ’তে থাকলো। সময় গড়িয়ে এক সময় মেয়াদ পূর্ণ হ’য়ে গেল।আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, তিনি চাকুরীর বাধ্যতামূলকআট বছর এবংঐচ্ছিক দু’বছর মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন। কেননা এটাই নবীচরিত্রের জন্য শোভনীয়যে, কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ঐচ্ছিক দু’বছরওতিনি পূর্ণ করবেন’।[19]আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ(রাঃ) বলেন, ﺃﻓﺮﺱُ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﺛﻼﺛﺔٌ : ﺻﺎﺣﺐُ ﻳﻮﺳﻒَ ﺣﻴﻦ ﻗﺎﻝ ﻹﻣﺮﺃﺗﻪ ﺃﻛﺮﻣﻰ ﻣﺜﻮﺍﻩ ﻋﺴﻰ ﺃﻥ ﻳﻨﻔﻌﻨﺎ،ﻭﺻﺎﺣﺒﺔُ ﻣﻮﺳﻰ ﺣﻴﻦ ﻗﺎﻟﺖ ﻳﺎﺍﺑﺖ ﺍﺳﺘﺄﺟﺮﻩ ﺇﻥ ﺧﻴﺮ ﻣﻦ ﺍﺳﺘﺄﺟﺮﺕ ﺍﻟﻘﻮﻯُّ ﺍﻻﻣﻴﻦ، ﻭﺍﺑﻮﺑﻜﺮ ﺍﻟﺼﺪﻳﻖ ﺣﻴﻦ ﺍﺳﺘﺨﻠﻒ ﻋﻤﺮَ ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪﻋﻨﻪ -‘সর্বাধিক দূরদর্শীব্যক্তি ছিলেন তিনজন: ১- ইউসুফকে ক্রয়কারী মিসরের আযীয (রাজস্বমন্ত্রী), যখনতিনি তার স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘একে সম্মানের সাথে রাখ, হয়তবা সে আমাদেরকল্যাণে আসবে’ ২- মূসার স্ত্রী, যখন (বিবাহের পূর্বে) তিনি স্বীয় পিতাকেবলেছিলেন, ‘হে পিতা, এঁকে কর্মচারী নিয়োগ করুন। নিশ্চয়ই আপনার শ্রেষ্ঠসহযোগী তিনিই হ’তে পারেন, যিনি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত’ এবং ৩- আবুবকরছিদ্দীক, যখন তিনি ওমরকে তাঁর পরবর্তী খলীফা মনোনীত করেন’।[20]৩য় পরীক্ষা:মিসর অভিমুখে যাত্রা ও পথিমধ্যে নবুঅত লাভমোহরানার চুক্তির মেয়াদ শেষ।এখন যাবার পালা। পুনরায় স্বদেশে ফেরা। দুরু দুরু বক্ষ। ভীত-সন্ত্রস্ত্র মন।চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ। তবুও যেতে হবে। পিতা-মাতা, ভাই-বোন সবাইরয়েছেন মিসরে। আল্লাহর উপরে ভরসা করে স্ত্রী-পরিবার নিয়ে বের হ’লেনপুনরায় মিসরের পথে। শুরু হ’ল তৃতীয় পরীক্ষার পালা।উল্লেখ্য, দশ বছরে তিনি দু’টিপুত্র সন্তান লাভ করেন এবং শ্বশুরের কাছ থেকে পান এক পাল দুম্বা। এছাড়াতাক্বওয়া ও পরহেযগারীর আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ তো তিনি লাভকরেছিলেনবিপুলভাবে।পরিবারের কাফেলা নিয়ে মূসা রওয়ানা হ’লেন স্বদেশঅভিমুখে। পথিমধ্যে মিসর সীমান্তে অবস্থিত সিনাই পর্বতমালার তূর পাহাড়েরনিকটবর্তী স্থানে পৌঁছলে হঠাৎ স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু হ’ল। এখুনি প্রয়োজনআগুনের। কিন্তু কোথায় পাবেন আগুন। পাথরে পাথরে ঘষে বৃথা চেষ্টা করলেনকতক্ষণ। প্রচন্ড শীতে ও তুষারপাতের কারণে পাথর ঘষায় কাজ হ’ল না। দিশেহারাহয়ে চারিদিকে দেখতে লাগলেন। হঠাৎ অনতিদূরে আগুনের হলকা নজরে পড়ল।আশায় বুক বাঁধলেন। স্ত্রী ও পরিবারকে বললেন, ‘তোমরা এখানে অবস্থান কর।আমি আগুন দেখেছি। সম্ভবতঃ আমি তা থেকে তোমাদের জন্য কিছু আগুনজ্বালিয়ে আনতে পারব অথবা সেখানে পৌঁছে পথের সন্ধান পাব’ (ত্বোয়াহা২০/১০)। একথা দৃষ্টে মনে হয়, মূসা পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন।[21] পথিমধ্যে শামঅঞ্চলের শাসকদের পক্ষ থেকে প্রধান সড়কে বিপদাশংকা ছিল। তাই শ্বশুরেরউপদেশ মোতাবেক তিনি পরিচিত রাস্তা ছেড়ে অপরিচিত রাস্তায় চলতে গিয়েমরুভূমির মধ্যে পথ হারিয়ে ডান দিকে চলে তূর পাহাড়ের পশ্চিম প্রান্তে পৌঁছেগেলেন। মূলতঃ এ পথ হারানোটা ছিল আল্লাহর মহা পরিকল্পনারই অংশ।মূসাআশান্বিত হয়ে যতই আগুনের নিকটবর্তী হন, আগুনের হল্কা ততই পিছাতে থাকে।আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, সবুজ বৃক্ষের উপরে আগুন জ্বলছে। অথচ গাছের পাতা পুড়ছেনা; বরং তার উজ্জ্বলতা আরও বেড়েযাচ্ছে। বিস্ময়ে অভিভূত মূসা এক দৃষ্টেআগুনটির দিকে তাকিয়েরইলেন। হঠাৎ এক গুরুগম্ভীর আওয়ায কানে এলো তাঁর চারপাশ থেকে। মনে হ’ল পাহাড়ের সকল প্রান্ত থেকে একই সাথে আওয়ায আসছে।মূসা তখন তূর পাহাড়ের ডান দিকে ‘তুবা’ ( ﻃُﻮَﻯ ) উপত্যকায় দন্ডায়মান। আল্লাহবলেন, ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺃَﺗَﺎﻫَﺎ ﻧُﻮﺩِﻱَ ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ – ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﻧَﺎ ﺭَﺑُّﻚَ ﻓَﺎﺧْﻠَﻊْ ﻧَﻌْﻠَﻴْﻚَ ﺇِﻧَّﻚَ ﺑِﺎﻟْﻮَﺍﺩِ ﺍﻟْﻤُﻘَﺪَّﺱِ ﻃُﻮًﻯ – ‏( ﻃﻪ১১-১২)-‘অতঃপর যখনতিনি আগুনের কাছে পৌঁছলেন, তখন আওয়ায এলো, হে মূসা!’ ‘আমিই তোমারপালনকর্তা। অতএব তুমি তোমার জুতা খুলে ফেল। তুমি পবিত্র উপত্যকা তুবায়রয়েছ’ (ত্বোয়াহা ২০/১১-১২)। এর দ্বারা বিশেষ অবস্থায় পবিত্র স্থানে জুতাখোলার আদব প্রমাণিতহয়। যদিও পাক জুতা পায়ে দিয়ে ছালাত আদায় করাজায়েয।[22] অতঃপর আল্লাহ বলেন, ﻭَﺃَﻧَﺎ ﺍﺧْﺘَﺮْﺗُﻚَ ﻓَﺎﺳْﺘَﻤِﻊْ ﻟِﻤَﺎ ﻳُﻮﺣَﻰ – ﺇِﻧَّﻨِﻲ ﺃَﻧَﺎ ﺍﻟﻠﻪُ ﻵ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻻَّ ﺃَﻧَﺎﻓَﺎﻋْﺒُﺪْﻧِﻲ ﻭَﺃَﻗِﻢِ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓَﻟِﺬِﻛْﺮِﻱ- ﺇِﻥَّ ﺍﻟﺴَّﺎﻋَﺔَ ﺀﺍَﺗِﻴَﺔٌ ﺃَﻛَﺎﺩُ ﺃُﺧْﻔِﻴﻬَﺎ ﻟِﺘُﺠْﺰَﻯ ﻛُﻞُّ ﻧَﻔْﺲٍ ﺑِﻤَﺎ ﺗَﺴْﻌَﻰ- ﻓَﻼَ ﻳَﺼُﺪَّﻧَّﻚَ ﻋَﻨْﻬَﺎ ﻣَﻦْ ﻻَ ﻳُﺆْﻣِﻦُ ﺑِﻬَﺎﻭَﺍﺗَّﺒَﻊَ ﻫَﻮَﺍﻩُ ﻓَﺘَﺮْﺩَﻯ – ‏( ﻃﻪ১৩-১৬)-‘আর আমি তোমাকে মনোনীত করেছি। অতএব তোমাকে যা প্রত্যাদেশকরা হচ্ছে তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাক’। ‘নিশ্চয় আমিই আল্লাহ। আমি ব্যতীতকোন উপাস্য নেই। অতএব আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণে ছালাত কায়েম কর’।‘ক্বিয়ামত অবশ্যই আসবে, আমি তা গোপন রাখতে চাই; যাতে প্রত্যেকে তারকর্মানুযায়ী ফল লাভ করতে পারে’। ‘সুতরাং যে ব্যক্তি ক্বিয়ামতে বিশ্বাসরাখে না এবংনিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে (ক্বিয়ামত বিষয়েসতর্ক থাকা হ’তে) নিবৃত্ত না করে। তাহ’লে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে’ (ত্বোয়াহা২০/১৩-১৬)।এ পর্যন্ত আক্বীদা ও ইবাদতগত বিষয়ে নির্দেশ দানের পর এবার কর্মগতনির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলছেন, ﻭَﻣَﺎ ﺗِﻠْﻚَ ﺑِﻴَﻤِﻴﻨِﻚَ ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ – ﻗَﺎﻝَ ﻫِﻲَ ﻋَﺼَﺎﻱَ ﺃَﺗَﻮَﻛَّﺄُ ﻋَﻠَﻴْﻬَﺎ ﻭَﺃَﻫُﺶُّﺑِﻬَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﻏَﻨَﻤِﻲ ﻭَﻟِﻲَﻓِﻴﻬَﺎ ﻣَﺂﺭِﺏُ ﺃُﺧْﺮَﻯ – ﻗَﺎﻝَ ﺃَﻟْﻘِﻬَﺎ ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ – ﻓَﺄَﻟْﻘَﺎﻫَﺎ ﻓَﺈِﺫَﺍ ﻫِﻲَ ﺣَﻴَّﺔٌ ﺗَﺴْﻌَﻰ- ﻗَﺎﻝَ ﺧُﺬْﻫَﺎ ﻭَﻻَ ﺗَﺨَﻒْ ﺳَﻨُﻌِﻴﺪُﻫَﺎﺳِﻴﺮَﺗَﻬَﺎ ﺍﻟْﺄُﻭﻟَﻰ – ‏( ﻃﻪ১৭-২১)-‘হে মূসা! তোমার ডান হাতে ওটা কি?’ ‘মূসা বললেন, এটা আমার লাঠি। এরউপরে আমি ভর দেই এবং এর দ্বারা আমার ছাগপালের জন্য গাছের পাতা ঝেড়েনামাই। তাছাড়া এর দ্বারাআমার অন্যান্য কাজও চলে’। ‘আল্লাহ বললেন, হে মূসা!তুমি ওটা ফেলে দাও’। ‘অতঃপর তিনি ওটা (মাটিতে) ফেলে দিতেই তা সাপ হয়েছুটাছুটি করতে লাগল’। ‘আল্লাহ বললেন, তুমি ওটাকে ধর, ভয় করো না,আমি এখুনিওকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেব’ (ত্বোয়াহা ২০/১৭-২১)।এটি ছিল মূসাকে দেওয়া ১মমু‘জেযা। কেননা মিসর ছিল ঐসময় জাদুবিদ্যায় শীর্ষস্থানে অবস্থানকারী দেশ।সেখানকার শ্রেষ্ঠ জাদুকরদের হারিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই নবুঅতের শ্রেষ্ঠত্বপ্রমাণ করা আবশ্যক ছিল। সেজন্যই আল্লাহ মূসাকে সবদিক দিয়ে প্রস্ত্তত করেদিচ্ছিলেন। এর ফলে মূসা নিজের মধ্যে অনেকটা শক্তি ও স্বস্তি লাভ করলেন।১মমু‘জেযা প্রদানের পর আল্লাহ তাকে দ্বিতীয় মু‘জেযা প্রদানেরউদ্দেশ্যেবললেন, ﻭَﺍﺿْﻤُﻢْ ﻳَﺪَﻙَ ﺇِﻟَﻰ ﺟَﻨَﺎﺣِﻚَ ﺗَﺨْﺮُﺝْ ﺑَﻴْﻀَﺎﺀﻣِﻦْ ﻏَﻴْﺮِ ﺳُﻮﺀٍ ﺁﻳَﺔً ﺃُﺧْﺮَﻯ – ﻟِﻨُﺮِﻳَﻚَ ﻣِﻦْ ﺁﻳَﺎﺗِﻨَﺎ ﺍﻟْﻜُﺒْﺮَﻯ-‏( ﻃﻪ ২২-২৩)-‘তোমারহাত বগলে রাখ। তারপর দেখবে তা বের হয়ে আসবে উজ্জ্বল ও নির্মল আলো হয়ে,অন্য একটি নিদর্শন রূপে’। ‘এটা এজন্য যে, আমরা তোমাকে আমাদের বিরাটনিদর্শনাবলীর কিছু অংশ দেখাতে চাই’ (ত্বোয়াহা ২০/২২-২৩)।নয়টিনিদর্শন:আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺗِﺴْﻊَ ﺁﻳَﺎﺕٍ ﺑَﻴِّﻨَﺎﺕٍ- ‏( ﺇﺳﺮﺍﺀ 101 )- ‘আমরা মূসাকে নয়টিনিদর্শন প্রদান করেছিলাম’ (ইসরা ১৭/১০১; নামল ২৭/১২)। এখানে ‘নিদর্শন’ অর্থএকদল বিদ্বান ‘মু‘জেযা’ নিয়েছেন। তবে ৯ সংখ্যা উল্লেখ করায় এর বেশী নাহওয়াটা যরূরী নয়। বরং এর চেয়ে অনেক বেশী মু‘জেযা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল।যেমন পাথরে লাঠি মারায় ১২টি গোত্রের জন্য বারোটি ঝর্ণাধারা নির্গমন, তীহ্প্রান্তরে মেঘের ছায়া প্রদান, মান্না-সালওয়া খাদ্য অবতরণ প্রভৃতি। তবে এনয়টি ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ নিদর্শন সমূহের অন্তর্ভুক্ত, যা ফেরাঊনীসম্প্রদায়কে প্রদর্শন করা হয়েছিল।আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) উক্ত ৯টিমু‘জেযা নিম্নরূপে গণনা করেছেন। যথা- (১) মূসা (আঃ)-এর ব্যবহৃত লাঠি, যানিক্ষেপকরা মাত্র অজগর সাপের ন্যায় হয়ে যেত (২) শুভ্র হাত, যা বগলের নীচথেকে বের করতেই জ্যোতির্ময়হয়ে সার্চ লাইটের মত চমকাতে থাকত (৩) নিজেরতোতলামি, যা মূসারপ্রার্থনাক্রমে দূর করে দেওয়া হয় (৪) ফেরাঊনী কওমের উপরপ্লাবণের গযব প্রেরণ (৫) অতঃপর পঙ্গপাল (৬) উকুন (৭) ব্যাঙ (৮) রক্ত এবং অবশেষে(৯) নদী ভাগ করে তাকে সহ বনু ইস্রাঈলকে সাগরডুবিহ’তে নাজাত দান। তবে প্রথমদু’টিইছিল সর্বপ্রধান মু‘জেযা, যা নিয়ে তিনি শুরুতে ফেরাঊনের নিকটেগিয়েছিলেন (নমল ২৭/১০, ১২)।অবশ্য কুরআনে বর্ণিত আয়াত সমূহথেকে প্রতীয়মান হয়যে, প্রথমে ফেরাঊনের সম্প্রদায়ের উপরে দুর্ভিক্ষের গযব এসেছিল। যেমনআল্লাহবলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺃَﺧَﺬْﻧَﺎ ﺁﻝَ ﻓِﺮْﻋَﻮﻥَ ﺑِﺎﻟﺴِّﻨِﻴﻦَ ﻭَﻧَﻘْﺺٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺜَّﻤَﺮَﺍﺕِ ﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﻳَﺬَّﻛَّﺮُﻭﻥَ – ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৩০)-‘আমরাপাকড়াওকরেছিলাম ফেরাঊনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে এবং ফল-ফসলাদিরক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে’ (আ‘রাফ ৭/১৩০)।হাফেয ইবনুকাছীর ‘তোতলামী’টা বাদ দিয়ে ‘দুর্ভিক্ষ’সহ নয়টি নিদর্শন বর্ণনা করেছেন।অবশ্য ফেরাঊন সম্প্রদায়ের উপরে আরও একটি নিদর্শন এসেছিল ‘প্লেগ-মহামারী’ (আ‘রাফ ৭/১৩৪)। যাতে তাদের ৭০ হাযার লোক মারা গিয়েছিল এবংপরে মূসা (আঃ)-এর দো‘আর বরকতে মহামারী উঠে গিয়েছিল। এটাকে গণনায় ধরলেসর্বমোট নিদর্শন ১১টি হয়। তবে ‘নয়’ কথাটি ঠিক রাখতে গিয়ে কেউ তোতলামি ওপ্লেগ বাদ দিয়েছেন। কেউ দুর্ভিক্ষ ও প্লেগ বাদ দিয়েছেন। মূলতঃ সবটাই ছিলমূসা(আঃ)-এর নবুঅতের অকাট্ট দলীল ও গুরুত্বপূর্ণ মু‘জেযা, যা মিসরে ফেরাঊনীসম্প্রদায়ের উপরে প্রদর্শিত হয়েছিল। এগুলি সবই হয়েছিল মিসরে। অতএব আমরাসেখানে পৌঁছে এসবের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করব ইনশাআল্লাহ।সিনাই হ’তেমিসরপ্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীর জন্য আগুন আনতে গিয়ে মূসা এমন এক নতুনঅভিজ্ঞতার সম্মুখীন হ’লেন, যা রীতিমত ভীতিকর, শিহরণমূলক ও অভূতপূর্ব। তিনিস্ত্রীর জন্য আগুন নিয়ে যেতে পেরেছিলেন কি-না বা পরিবারের সেবায় তিনিপরে কি কি ব্যবস্থা নিলেন- এসব বিষয়ে কুরআন চুপ রয়েছে। কুরআনের গৃহীতবাকরীতি অনুযায়ী এ সবের বর্ণনা কোন যরূরী বিষয় নয়। কেননা এগুলি সাধারণমানবিক তাকীদ, যা যেকোন স্বামীই তার স্ত্রী ও পরিবারের জন্য করে থাকে।অতএব এখন আমরা সামনের দিকে আগাব।আল্লাহ পাক মূসাকে নবুঅত ও প্রধান দু’টিমু‘জেযা দানের পর নির্দেশ দিলেন, ﺇﺫْﻫَﺐْ ﺇِﻟَﻰ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﺇِﻧَّﻪُ ﻃَﻐَﻰ- ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺏِّ ﺍﺷْﺮَﺡْ ﻟِﻲْ ﺻَﺪْﺭِﻱْ -ﻭَﻳَﺴِّﺮْ ﻟِﻲْ ﺃَﻣْﺮِﻱ-ﻭَﺍﺣْﻠُﻞْ ﻋُﻘْﺪَﺓً ﻣِّﻦ ﻟِّﺴَﺎﻧِﻲْ – ﻳَﻔْﻘَﻬُﻮْﺍ ﻗَﻮْﻟِﻲْ – ﻭَﺍﺟْﻌَﻞْ ﻟِّﻲْ ﻭَﺯِﻳْﺮﺍً ﻣِّﻦْ ﺃَﻫْﻠِﻲْ- ﻫَﺎﺭُﻭْﻥَ ﺃَﺧِﻲ – ﺍﺷْﺪُﺩْ ﺑِﻪِ ﺃَﺯْﺭِﻱْ -ﻭَﺃَﺷْﺮِﻛْﻪُ ﻓِﻲْ ﺃَﻣْﺮِﻱْ- ﻛَﻲْ ﻧُﺴَﺒِّﺤَﻚَﻛَﺜِﻴﺮﺍً – ﻭَّﻧَﺬْﻛُﺮَﻙَ ﻛَﺜِﻴْﺮﺍً – ﺇِﻧَّﻚَ ﻛُﻨْﺖَ ﺑِﻨَﺎ ﺑَﺼِﻴْﺮﺍً – ‏( ﻃﻪ ২৪-৩৫)-হে মূসা! ‘তুমি ফেরাঊনের কাছেযাও। সেউদ্ধত হয়ে গেছে’। ভীত সন্ত্রস্ত মূসা বলল, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমার বক্ষউন্মোচন করে দিন’ ‘এবং আমার কাজ সহজ করে দিন’। ‘আমার জিহবা থেকে জড়তাদূরকরে দিন’ ‘যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে’ ‘এবং আমার পরিবারের মধ্যথেকে একজনকে আমার সাহায্যকারী নিযুক্ত করে দিন’। ‘আমার ভাই হারূণকেদিন’। ‘তার মাধ্যমে আমার কোমর শক্ত করুন’ ‘এবং তাকে (নবী করে) আমার কাজেঅংশীদার করুন’। ‘যাতে আমরা বেশী বেশী করে আপনার পবিত্রতা ঘোষণা করতেপারি’ ‘এবং অধিক পরিমাণে আপনাকে স্মরণ করতে পারি’। ‘আপনি তো আমাদেরঅবস্থা সবই দেখছেন’ (ত্বোয়াহা ২০/২৪-৩৫)।মূসার উপরোক্ত দীর্ঘ প্রার্থনারজবাবে আল্লাহ বললেন, ﻗَﺎﻝَ ﻗَﺪْ ﺃُﻭﺗِﻴﺖَ ﺳُﺆْﻟَﻚَ ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ، ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻣَﻨَﻨَّﺎ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻣَﺮَّﺓً ﺃُﺧْﺮَﻯ- ‏( ﻃﻪ৩৬-৩৭)- ‘হে মূসা!তুমি যা যা চেয়েছ, সবই তোমাকে দেওয়া হ’ল’। শুধু এবার কেন, ‘আমি তোমারউপরে আরও একবার অনুগ্রহ করেছিলাম’ (ত্বোয়াহা ২০/৩৬-৩৭)। বলেই আল্লাহমূসাকে তার জন্মের পর নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ও ফেরাঊনের ঘরে লালন-পালনের চমকপ্রদ কাহিনী শুনিয়ে দিলেন।আল্লাহর খেলা বুঝা ভার। হত্যারটার্গেট হয়ে জন্মলাভ করে হত্যার ঘোষণা দানকারী সম্রাট ফেরাঊনের গৃহেপুত্রস্নেহে লালিত-পালিত হয়ে পরে যৌবনকালে পুনরায় হত্যাকান্ডের আসামীহয়ে প্রাণভয়ে ভীত ও কপর্দকশূন্য অবস্থায় স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমালেন।অতঃপর সেখানে দীর্ঘ দশ বছর মেষপালকের চাকুরী করে স্ত্রী-পরিবার নিয়েস্বদেশ ফেরার পথে রাহযানির ভয়ে মূল রাস্তা ছেড়ে অপরিচিত রাস্তায় এসেকনকনে শীতের মধ্যে অন্ধকার রাতেপ্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীকে নিয়ে মহাবিপদগ্রস্ত স্বামী যখন অদূরে আলোর ঝলকানি দেখে আশায় বুক বেঁধে সেদিকেছুটেছেন। তখন তিনি জানতেন না যে,সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে এমন একমহা সুসংবাদ যা দুনিয়ার কোন মানুষ ইতিপূর্বে দেখেনি, শোনেনি, কল্পনাওকরেনি। বিশ্ব চরাচরের পালনকর্তা আল্লাহ স্বয়ং স্বকণ্ঠে, স্বশব্দে ও স্ব-ভাষায়তাকে ডেকে কথা বলবেন,এও কি সম্ভব? শংকিত, শিহরিত, পুলকিত মূসা সবকিছুভুলে পুরা দেহ-মন দিয়ে শুনছেন স্বীয় প্রভুর দৈববাণী। দেখলেন তাঁর নূরেরতাজাল্লী। চাইলেন প্রাণভরে যা চাওয়ার ছিল। পেলেনসাথে সাথেপরিপূর্ণভাবে। এতে বুঝা যায়, পারিবারিক সমস্যা ও রাস্তাঘাটের সমস্যা সবইআল্লাহর মেহেরবানীতে সুন্দরভাবে সমাধান হয়ে গিয়েছিল যা কুরআনেউল্লেখের প্রয়োজন পড়েনি।ওদিকে মূসার প্রার্থনা কবুলের সাথে সাথে আল্লাহহারূণকে মিসরেঅহীর মাধ্যমে নবুঅত প্রদান করলেন (মারিয়াম ১৯/৫৩) এবং তাকেমূসার আগমন বার্তা জানিয়ে দিলেন। সেই সঙ্গে মূসাকে সার্বিক সহযোগিতাকরার এবং তাকেমিসরের বাইরে এসে অভ্যর্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তিনিবনু ইস্রাঈলের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে এগিয়ে এসে যথাযথভাবে সে নির্দেশ পালনকরেন।[23]মূসার পাঁচটি দো‘আ :নবুঅতের গুরু দায়িত্ব লাভের পরমূসা (আঃ) এর গুরুত্বউপলব্ধি করে তা বহনের ক্ষমতা অর্জনের জন্য আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেন।ইতিপূর্বে বর্ণিত দীর্ঘ প্রার্থনা সংক্ষেপে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হ’ল, যানিম্নরূপ:প্রথম দো‘আ : ﺭَﺏِّ ﺍﺷْﺮَﺡْ ﻟِﻰْ ﺻَﺪْﺭِﻯ ‘হে আমার পালনকর্তা! আমার বক্ষ উন্মোচনকরে দিন’। অর্থাৎ নবুঅতের বিশাল দায়িত্ব বহনের উপযুক্ত জ্ঞান ও দূরদর্শিতারউপযোগী করে দিন এবং আমার হৃদয়কে এমন প্রশস্ত করে দিন, যাতে উম্মতের পক্ষথেকে ভবিষ্যতে প্রাপ্ত অপবাদ ও দুঃখ-কষ্ট বহনে তা সক্ষম হয়।দ্বিতীয় দো‘আ :ﻭَﻳَﺴِّﺮْﻟِﻰْ ﺍَﻣْﺮِﻯْ ‘আমার কর্ম সহজ করে দিন’। অর্থাৎ নবুঅতের কঠিন দায়িত্ব বহনের কাজআমার জন্য সহজ করে দিন। কেননা আল্লাহর অনুগ্রহ ব্যতীত কারু পক্ষেই কোন কাজসহজ ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। স্বীয় অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে মূসা (আঃ)বুঝতে পেরেছিলেন যে, ফেরাঊনের মত একজন দুর্ধর্ষ, যালেম ও রক্ত পিপাসুসম্রাটের নিকটে গিয়ে দ্বীনের দাওয়াত পেশ করা মোটেই সহজসাধ্যব্যাপার নয়,আল্লাহর একান্ত সাহায্য ব্যতীত।তৃতীয় দো‘আ : ﻭَﺍﺣْﻠُﻞْ ﻋُﻘْﺪَﺓً ﻣِّﻦْ ﻟِّﺴَﺎﻧِﻰْ ﻳَﻔْﻘَﻬُﻮْﺍ ﻗَﻮْﻟِﻰْ ‘আমারজিহবার জড়তা দূর করে দিন, যাতে লোকেরা আমার কথা বুঝতে পারে’। কেননারেসালাত ও দাওয়াতের জন্যরাসূল ও দাঈকে স্পষ্টভাষী ও বিশুদ্ধভাষী হওয়াএকান্ত আবশ্যক। মূসা (আঃ) নিজের এ ত্রুটি দূর করে দেওয়ার জন্য আল্লাহর নিকটেবিশেষভাবে প্রার্থনা করেন। পরবর্তী আয়াতে যেহেতু তাঁর সকল প্রার্থনা কবুলেরকথা বলা হয়েছে’ (ত্বোয়াহা ২০/৩৬), সেহেতু এ প্রার্থনাটিও যে কবুল হয়েছিলএবং তাঁর তোতলামি দূর হয়ে গিয়েছিল, সেকথা বলা যায়।এ বিষয়ে বিভিন্নতাফসীর গ্রন্থে বিভিন্ন চমকপ্রদ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। যেমন শৈশবে তিনিমুখে আগুন পুরেছিলেনবলে তাঁর জিভ পুড়ে গিয়েছিল। কেননা ফেরাঊনের দাড়িধরে চপেটাঘাত করার জন্য মূসাকে ফেরাঊন হত্যা করতে চেয়েছিল। তাকেবাঁচানোর জন্য ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়ার উপস্থিত বুদ্ধির জোরে তিনি বেঁচেযান। সেটি ছিল এই যে, তাকে অবোধ শিশু প্রমাণ করার জন্য ফেরাঊনের স্ত্রীদু’টি পাত্র এনে মূসার সামনে রাখেন। মূসা তখন জিবরাঈলের সাহায্যেমণিমুক্তার পাত্রে হাত না দিয়েআগুনের পাত্রে হাত দিয়ে একটা স্ফূলিঙ্গ তুলেনিজের গালে পুরেনেন। এতে তার জিভ পুড়ে যায় ও তিনি তোৎলা হয়ে যান।ওদিকে ফেরাঊনও বুঝে নেন যে মূসা নিতান্তই অবোধ। সেকারণ তাকে ক্ষমা করেদেন। যদিও এসব কাহিনী কুরতুবী, মাযহারী প্রভৃতি প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থেবর্ণিত হয়েছে, তবুও এগুলোর কোন বিশুদ্ধ ভিত্তি নেই। তাই তোৎলামির বিষয়টিস্বাভাবিক ত্রুটি ধরে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।উল্লেখ্য যে, ইবনু আববাস (রাঃ) কর্তৃকনাসাঈতে বর্ণিত ‘হাদীছুলফুতূনে’ কেবল আগুনের পাত্রে হাত দেওয়ার কথারয়েছে। কিন্তু আগুন মুখে দেওয়ার কথা নেই। এর ফলে তিনি ফেরাঊনের হাতেনিহত হওয়া থেকে বেঁচে যান। এ জন্য এ ঘটনাকে উক্ত হাদীছে ৩নং ফিৎনা বাপরীক্ষা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।[24]চতুর্থ দো‘আ : ﻭَﺍﺟْﻌَﻞْ ﻟِّﻰْ ﻭَﺯِﻳْﺮًﺍ ﻣِّﻦْ ﺃَﻫْﻠِﻰ، ﻫَﺎﺭُﻭْﻥَﺃَﺧِﻰْ‘আমার পরিবার থেকে আমার জন্য একজন উযীর নিয়োগ করুন’। ‘আমার ভাইহারূণকে’। পূর্বের তিনটি দো‘আ ছিল তাঁর নিজ সত্তা সম্পর্কিত। অতঃপর চতুর্থদো‘আটি ছিল রেসালাতের দায়িত্ব পালন সম্পর্কিত। ‘উযীর’ অর্থ বোঝাবহনকারী। মূসা (আঃ) স্বীয় নবুঅতের বোঝা বহনে সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান উপায়হিসাবে একজন যোগ্য ও বিশ্বস্ত সহযোগী প্রার্থনা করে দায়িত্ব পালনে স্বীয়আন্তরিকতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন এবং নির্দিষ্টভাবে নিজের বড় ভাইহারূণের নাম করে অশেষ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। কারণ ভাই হারূণআজন্মমিসরেই অবস্থান করার কারণে তাঁরঅভিজ্ঞতা ছিল অনেক বেশী। অধিকন্তুতার উপরে ফেরাঊনের কোনক্রোধ বা ক্ষোভ ছিল না। সর্বোপরি তিনি ছিলেনএকজন অত্যন্ত বিশুদ্ধভাষী ব্যক্তি, দ্বীনের দাওয়াত প্রদানের জন্য যা ছিলসবচাইতে যরূরী।পঞ্চম দো‘আ : ﻭَﺃَﺷْﺮِﻛْﻪُ ﻓِﻰْ ﺍَﻣْﺮِﻯْ ‘এবং তাকে আমার কাজে শরীক করেদিন’। অর্থাৎ তাকে আমার নবুঅতের কাজে শরীক করে দিন। ‘যাতে আমরা বেশীবেশী আপনার যিকর ও পবিত্রতা বর্ণনা করতে পারি’ (ত্বোয়াহা ২০/৩৩-৩৪)। এটাঅনস্বীকার্য যে, আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে এবং আল্লাহর যিকরে মশগুলথাকার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ যরূরী। একারণেই তিনি সৎ ও নির্ভরযোগ্য সাথী ওসহযোগী হিসাবে বড় ভাই হারূণকে নবুঅতে শরীক করার জন্য আল্লাহর নিকটেদো‘আ করেন। তাছাড়া তিনি একটি আশংকার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘হে আমারপালনকর্তা, আমি তাদের এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলাম। তাই আমি ভয় করছি যে,তারা আমাকে হত্যা করবে’। ‘আমার ভাই হারূণ, সে আমার অপেক্ষাপ্রাঞ্জলভাষী। অতএব তাকে আমার সাথে সাহায্যের জন্য প্রেরণ করুন। সেআমাকে সমর্থন যোগাবে। আমি আশংকা করি যে, তারা আমাকে মিথ্যাবাদীবলবে’ (ক্বাছাছ ২৮/৩৩-৩৪)।উক্ত পাঁচটি দো‘আ শেষ হবার পর সেগুলি কবুল হওয়ারসুসংবাদ দিয়ে আল্লাহ বলেন, ﻗَﺪْ ﺃُﻭْﺗِﻴْﺖَ ﺳُﺆْﻟَﻚَ ﻳَﺎ ﻣُﻮْﺳَﻰ ‘হে মূসা! তুমি যাযা চেয়েছ, সবইতোমাকে প্রদান করা হ’ল’ (ত্বোয়াহা ২০/৩৬)। এমনকি মূসার সাহস বৃদ্ধির জন্য ﺳَﻨَﺸُﺪُّﻋَﻀُﺪَﻙَ ﺑِﺄَﺧِﻴْﻚَ ‘আমরা তোমার ভাইয়ের মাধ্যমে তোমার বাহুকে সবল করব এবংতোমাদের দু’জনকে আধিপত্য দান করব। ফলে শত্রুরা তোমাদের কাছেই ঘেঁষতেপারবে না।তাছাড়া আমার নিদর্শনাবলীর জোরে তোমরা (দু’ভাই) এবংতোমাদের অনুসারীরা (শত্রুপক্ষের উপরে) বিজয়ী থাকবে’ (ক্বাছাছ ২৮/৩৫)।মূসাহ’লেন কালীমুল্লাহ :তুবা প্রান্তরের উক্ত ঘটনা থেকেমূসা কেবল নবী হ’লেন না।বরং তিনিহ’লেন ‘কালীমুল্লাহ’ বা আল্লাহর সাথে বাক্যালাপকারী। যদিওশেষনবী (ছাঃ) মে‘রাজে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু দুনিয়াতে এভাবেবাক্যালাপের সৌভাগ্য কেবলমাত্র হযরত মূসা (আঃ)-এর হয়েছিল। আল্লাহবিভিন্ননবীকে বিভিন্ন বিষয়ে বিশিষ্টতা দান করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন,‘হে মূসা! আমি আমার বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে এবং আমার বাক্যালাপেরমাধ্যমে তোমাকে লোকদের উপরে বিশিষ্টতা দান করেছি। অতএব আমি তোমাকেযা কিছু দান করলাম, তা গ্রহণ কর এবং কৃতজ্ঞ থাক’ (আ‘রাফ ৭/১৪৪)। এভাবেআল্লাহ পাক মূসা (আঃ)-এর সাথে আরেকবার কথা বলেন, সাগর ডুবি থেকে নাজাতপাবার পরে শামে এসে একই স্থানে ‘তওরাত’ প্রদানের সময় (আ‘রাফ ৭/১৩৮, ১৪৫)।এভাবে মূসা হ’লেন ‘কালীমুল্লাহ’।মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে সরাসরিবাক্যালাপের পর উৎসাহিত ও পুলকিত মূসা এখানে তূর পাহাড়ের পাদদেশ এলাকায়কিছু দিন বিশ্রাম করলেন। অতঃপর মিসর অভিমুখে রওয়ানা হ’লেন। সিনাই থেকেঅনতিদূরে মিসর সীমান্তে পৌঁছে গেলে যথারীতি বড় ভাই হারূণ ও অন্যান্যআত্মীয়-স্বজনএসে তাঁদেরকে সাদর অভ্যর্থনা করে নিয়ে গেলেন (কুরতুবী, ইবনুকাছীর)।মূসা (আঃ)-এর মিসরে প্রত্যাবর্তন:ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গেরবিরুদ্ধে অলৌকিক লাঠি ও আলোকিত হস্ত তালুর দু’টি নিদর্শন নিয়ে মূসা (আঃ)মিসরে পৌঁছলেন (ক্বাছাছ ২৮/৩২)। ফেরাঊন ও তার সভাসদ বর্গকে আল্লাহ ( ﺃَﺋَّﻤِﺔً ﻳَّﺪْﻋُﻮْﻥَﺇِﻟَﻰ ﺍﻟﻨَّﺎﺭِ ) ‘জাহান্নামের দিকে আহবানকারী নেতৃবৃন্দ’ (ক্বাছাছ ২৮/৪১) হিসাবে এবংতাদের সম্প্রদায়কে ‘ফাসেক’ বা পাপাচারী (ক্বাছাছ ২৮/৩২) বলে আখ্যায়িতকরেছেন। আল্লাহ পাক মূসাকে বললেন ‘তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শনবলীসহযাও এবং আমারস্মরণে শৈথিল্য করো না’। ‘তোমরা উভয়ে ফেরাঊনের কাছেযাও। সে খুব উদ্ধত হয়ে গেছে’। ‘তোমরা তারকাছে গিয়ে নম্রভাষায় কথা বলবে।তাতে হয়ত সে চিন্তা-ভাবনা করবে অথবা ভীত হবে’। ‘তারা বলল, হে আমাদেরপালনকর্তা, আমরা আশংকা করছি যে, সে আমাদের উপরে যুলুম করবে কিংবাউত্তেজিত হয়েউঠবে’। ‘আল্লাহ বললেন, ﻗَﺎﻝَ ﻻَ ﺗَﺨَﺎﻓَﺎ ﺇِﻧَّﻨِﻲْ ﻣَﻌَﻜُﻤَﺎ ﺃَﺳْﻤَﻊُ ﻭَﺃَﺭَﻯ ‘তোমরা ভয়করোনা। আমি তোমাদের সাথে আছি। আমি তোমাদের (সব কথা) শুনবো ও (সব অবস্থা)দেখব’ (ত্বোয়াহা ২০/৪২-৪৬)।ফেরাঊনের নিকটে মূসা (আঃ)-এর দাওয়াত :আল্লাহরনির্দেশমত মূসা ও হারূণফেরাঊন ও তার সভাসদবর্গের নিকটেপৌঁছে গেলেন।অতঃপর মূসা ফেরাঊনকে বললেন, ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻳَﺎ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥُ ﺇِﻧِّﻲْ ﺭَﺳُﻮﻝٌ ﻣِّﻦ ﺭَّﺏِّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ – ﺣَﻘِﻴﻖٌﻋَﻠَﻰ ﺃَﻥ ﻻَّ ﺃَﻗُﻮْﻝَ ﻋَﻠَﻰﺍﻟﻠﻪِ ﺇِﻻَّ ﺍﻟْﺤَﻖَّ ﻗَﺪْ ﺟِﺌْﺘُﻜُﻢْ ﺑِﺒَﻴِّﻨَﺔٍ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْ ﻓَﺄَﺭْﺳِﻞْ ﻣَﻌِﻲَ ﺑَﻨِﻴْﺈِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ – ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১০৪-১০৫)-‘হেফেরাঊন! আমিবিশ্বপ্রভুর পক্ষ হ’তে প্রেরিত রাসূল’। ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে যে সত্য এসেছে, তারব্যতিক্রম কিছু না বলার ব্যাপারে আমি দৃঢ়চিত্ত। আমি তোমাদের নিকটেতোমাদের পালনকর্তার নিদর্শন নিয়ে আগমন করেছি। অতএব তুমি বনু ইস্রাঈলগণকেআমার সাথে পাঠিয়ে দাও’ (আ‘রাফ ৭/১০৪-১০৫)। মূসার এদাবী থেকে বুঝা যায় যে,ঐ সময় বনু ইস্রাঈলের উপরে ফেরাঊনের ও তার সম্প্রদায়ের যুলুম চরম পর্যায়েপৌঁছেছিল এবং তাদের সঙ্গে আপোষে বসবাসের কোন রাস্তাছিল না। ফলেতিনি তাদেরকে সেখান থেকে বের করে আনতে চাইলেন। তবে এটা নিশ্চিত যে,মূসা তখনই বনু ইস্রাঈলকে নিয়ে বের হয়ে যাননি। এ বিষয়ে আমরা পরে বিস্তারিতবর্ণনা করব।মূসা ফেরাঊনকে বললেন, ﻭَﻻَ ﺗُﻌَﺬِّﺑْﻬُﻢْ ﻗَﺪْ ﺟِﺌْﻨَﺎﻙَ ﺑِﺂﻳَﺔٍ ﻣِّﻦْ ﺭَّﺑِّﻚَ ﻭَﺍﻟﺴَّﻼَﻡُ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻦِ ﺍﺗَّﺒَﻊَﺍﻟْﻬُﺪَﻯ – ﺇِﻧَّﺎﻗَﺪْﺃُﻭﺣِﻲَ ﺇِﻟَﻴْﻨَﺎ ﺃَﻥَّ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏَ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻦْ ﻛَﺬَّﺏَ ﻭَﺗَﻮَﻟَّﻰ – ‏( ﻃﻪ ৪৭-৪৮)- ….‘তুমি বনু ইস্রাঈলদের উপরেনিপীড়নকরো না’। ‘আমরা আল্লাহর নিকট থেকে অহী লাভ করেছি যে, যে ব্যক্তিমিথ্যারোপ করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার উপরে আল্লাহর আযাব নেমেআসে’ (ত্বোয়াহা ২০/৪৭-৪৮)। একথা শুনে ফেরাঊন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, ‘মূসা!তোমার পালনকর্তা কে’? ‘মূসা বললেন, আমার পালনকর্তা তিনি, যিনি প্রত্যেকবস্ত্তকে তার যোগ্য আকৃতি দান করেছেন। অতঃপর পথ প্রদর্শন করেছেন’। ‘ফেরাঊনবলল, তাহ’লে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কি?’ ‘মূসা বললেন, তাদের খবর আমারপ্রভুর কাছে লিখিত আছে। আমার পালনকর্তা ভ্রান্ত হননা এবং বিস্মৃতও হন না’।একথা বলার পর মূসা আল্লাহর নিদর্শন সমূহ বর্ণনা শুরু করলেন, যাতে ফেরাঊন তারযৌক্তিকতা মেনে নিতেবাধ্য হয়। তিনি বললেন, আমার পালনকর্তা তিনি, ‘যিনিতোমাদের জন্য পৃথিবীকে বিছানা স্বরূপ বানিয়েছেন এবং তাতে চলার পথ সমূহতৈরী করেছেন। তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তা দ্বারা বিভিন্নপ্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেন’। ‘তোমরা তা আহার কর ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুসমূহচরিয়ে থাক। নিশ্চয়ই এতে বিবেকবানদের জন্য নিদর্শন সমূহ রয়েছে’ (ত্বোয়াহা২০/৪৯-৫৪)।মূসা (আঃ)-এর দাওয়াতের সার-সংক্ষেপ :১. বিশ্বের পালনকর্তাআল্লাহর দিকে আহবান।২. আল্লাহ প্রেরিত সত্যই প্রকৃত সত্য। তার ব্যতিক্রম কিছুনা বলা বা না করার ব্যাপারে সর্বদা দৃঢ়চিত্ত থাকার ঘোষণা প্রদান।৩. আল্লাহরগযবের ভয় প্রদর্শন।৪. আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব বিশ্লেষণ।৫. পিছনের লোকদেরকৃতকর্মের হিসাব আল্লাহর উপরে ন্যস্ত করে বর্তমান অবস্থার সংশোধনের প্রতিআহবান।৬. মযলূম বনু ইস্রাঈলের মুক্তির জন্য যালেম ফেরাঊনের নিকটে আবেদন।মূসা (আঃ)-এর দাওয়াতের ফলশ্রুতি:ফেরাঊনের অহংকারী হৃদয়ে মূসার দাওয়াত ওউপদেশবাণী কোনরূপ রেখাপাত করল না। বরং সে পরিষ্কার বলে দিল, ﻣَﺎ ﻫَﺬَﺍ ﺇِﻻَّ ﺳِﺤْﺮٌﻣُّﻔْﺘَﺮًﻯ ﻭَﻣَﺎ ﺳَﻤِﻌْﻨَﺎ ﺑِﻬَﺬَﺍ ﻓِﻲْ ﺁﺑَﺎﺋِﻨَﺎ ﺍﻟْﺄَﻭَّﻟِﻴْﻦَ- ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺭَﺑِّﻲْ ﺃَﻋْﻠَﻢُ ﺑِﻤَﻦْ ﺟَﺎﺀ ﺑِﺎﻟْﻬُﺪَﻯ ﻣِﻨْﻌِﻨﺪِﻩِ ﻭَﻣَﻦْﺗَﻜُﻮْﻥُ ﻟَﻪُ ﻋَﺎﻗِﺒَﺔُ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ ﺇِﻧَّﻪُ ﻻَ ﻳُﻔْﻠِﺢُﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤُﻮْﻥَ – ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ ৩৬-৩৭)- ‘তোমার এসব অলীক জাদু মাত্র। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে এসব কথা শুনিনি’। ‘মূসা বললেন, ‘আমার পালনকর্তা সম্যক জানেনকে তার নিকট থেকে হেদায়াতের কথা নিয়ে আগমন করেছে এবং কে প্রাপ্ত হবেপরকালের গৃহ। নিশ্চয়ই যালেমরা সফলকাম হবে না’ (ক্বাছাছ ২৮/৩৬-৩৭)।ফেরাঊনতার সভাসদগণকে উদ্দেশ্য করে বলল, ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟْﻤَﻠَﺄُ ﻣَﺎ ﻋَﻠِﻤْﺖُ ﻟَﻜُﻢْ ﻣِّﻦْ ﺇِﻟَﻪٍ ﻏَﻴْﺮِﻱْ ‘হেপারিষদবর্গ!আমি ব্যতীত তোমাদেরকোন উপাস্য আছে বলে আমি জানি না’ (ক্বাছাছ ২৮/৩৮)।এরপর সে মূসার প্রতিশ্রুত ‘পরকালের গৃহ’ ( ﻋَﺎﻗِﺒَﺔُ ﺍﻟﺪَّﺍﺭِ ) দেখার জন্য জনগণকে ধোঁকাদেওয়ার উদ্দেশ্যে তার উযীরকে বলে উঠল, ﻓَﺄَﻭْﻗِﺪْ ﻟِﻲْ ﻳَﺎ ﻫَﺎﻣَﺎﻥُ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻄِّﻴْﻦِ ﻓَﺎﺟْﻌَﻞ ﻟِّﻲْﺻَﺮْﺣﺎً ﻟَّﻌَﻠِّﻲْ ﺃَﻃَّﻠِﻊُ ﺇِﻟَﻰﺇِﻟَﻬِﻤُﻮﺳَﻰ ﻭَﺇِﻧِّﻲْ ﻟَﺄَﻇُﻨُّﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻜَﺎﺫِﺑِْﻴﻦَ – ﻭَﺍﺳْﺘَﻜْﺒَﺮَ ﻫُﻮَ ﻭَﺟُﻨُﻮﺩُﻩُ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﺍﻟْﺤَﻖِّ ﻭَﻇَﻨُّﻮﺍ ﺃَﻧَّﻬُﻢْ ﺇِﻟَﻴْﻨَﺎ ﻻَﻳُﺮْﺟَﻌُﻮﻥَ- ‏( ﺍﻟﻘﺼﺺ 38-39 )-‘হেহামান! তুমি ইট পোড়াও। অতঃপরআমার জন্য একটি প্রাসাদ নির্মাণকর, যাতেআমি মূসার উপাস্যকে উঁকি মেরে দেখতে পারি। আমার ধারণা সে একজনমিথ্যাবাদী’। একথা বলে ‘ফেরাঊন ও তার বাহিনী অন্যায়ভাবে অহংকারে ফেটেপড়ল। তারা ধারণা করল যে, তারা কখনোই আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তিত হবেনা’ (ক্বাছাছ ২৮/৩৮-৩৯; গাফির/মুমিন ২৩/৩৬-৩৭)।অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে যে, মূসাও হারূণ যখন ফেরাঊনের কাছে গিয়ে বললেন, ‘আমরা বিশ্বজগতের পালনকর্তাররাসূল’। ‘তুমি বনু ইস্রাঈলকে আমাদের সাথে যেতে দাও’ (শো‘আরা ২৬/১৬-১৭)।ফেরাঊন তখন বাঁকা পথ ধরে প্রশ্ন করে বসলো, ‘আমরা কি তোমাকে শিশু অবস্থায়আমাদের মধ্যে লালন-পালন করিনি? এবং তুমি কি আমাদের মাঝে তোমারজীবনের বহু বছর কাটাওনি? (১৮)। ‘আর তুমি করেছিলে (হত্যাকান্ডের) সেই অপরাধ,যা তুমি করেছিলে। (এরপরেওতুমি আমাকে পালনকর্তা না মেনে অন্যকেপালনকর্তা বলছ?) আসলে তুমিই হ’লে কাফির বা কৃতঘ্নদের অন্তর্ভুক্ত ( ﻭَﺃَﻧﺖَ ﻣِﻦَﺍﻟْﻜَﺎﻓِﺮِﻳْﻦَ =১৯)’। জবাবে মূসা বললেন, ‘আমি সে অপরাধ তখন করেছি যখন আমি ভ্রান্তছিলাম’ (২০)। ‘অতঃপর আমি ভীত হয়ে তোমাদের কাছ থেকে পলায়ন করেছিলাম।এরপর আমার পালনকর্তা আমাকে প্রজ্ঞা দান করেছেন ও আমাকে রাসূলগণেরঅন্তর্ভুক্ত করেছেন’ (২১)। ‘অতঃপর আমার প্রতি তোমার যে অনুগ্রহের কথা বলছ তাএই যে, তুমি বনু ইস্রাঈলকে গোলাম বানিয়ে রেখেছ’ (২২)। ফেরাঊন একথার জবাবনা দিয়ে আক্বীদাগত প্রশ্ন তুলে বলল, তোমাদের কথিত ‘বিশ্বজগতের পালনকর্তাআবার কে?’(২৩) মূসা বললেন, ‘তিনি নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তীসবকিছুর পালনকর্তা, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও’(২৪)। এ জবাব শুনে ‘ফেরাঊন তারপারিষদবর্গকে বলল, তোমরা কি শুনছ না’?(২৫)। ….‘আসলে তোমাদের প্রতিপ্রেরিত এ রাসূলটি একটা আস্ত পাগল ( ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺃُﺭْﺳِﻞَ ﺇِﻟَﻴْﻜُﻢْ ﻟَﻤَﺠْﻨُﻮﻥٌ ﻗَﺎﻝَ ﺇِﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻟَﻜُﻢُ =২৭)।…‘অতঃপরফেরাঊন মূসাকে বলল, ﻟَﺌِﻦِ ﺍﺗَّﺨَﺬْﺕَ ﺇِﻟَﻬﺎً ﻏَﻴْﺮِﻱ ﻟَﺄَﺟْﻌَﻠَﻨَّﻚَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤَﺴْﺠُﻮﻧِﻴﻦَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ ২৯)- ‘যদি তুমিআমারপরিবর্তে অন্যকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাকে কারাগারেনিক্ষেপ করব’(২৯)। মূসা বললেন, ‘আমি তোমার কাছে কোন স্পষ্ট নিদর্শন নিয়েআগমন করলেও কি (তুমি আমাকে কারাগারে নিক্ষেপ করবে)? (শো‘আরা২৬/১৮-৩০)।তখন ফেরাঊন তাচ্ছিল্যভরে বলল, হে মূসা! ‘যদি তুমি কোন নিদর্শননিয়ে এসে থাক, তাহ’লে তা উপস্থিতকর, যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাক’(৩১)। ‘মূসাতখন নিজের হাতের লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ করলেন। ফলেতৎক্ষণাৎ তা একটাজ্বলজ্যান্ত অজগর সাপে পরিণত হয়ে গেল’(৩২)। ‘তারপর (বগল থেকে) নিজের হাতবের করলেন এবং তা সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের চোখে ধবধবে আলোকোজ্জ্বলদেখাতেলাগল’ (শো‘আরা ২৬/৩১-৩৩; আ‘রাফ ৭/১০৬-১০৮)।ইবনু আববাস (রাঃ) বর্ণিত‘হাদীছুল ফুতূনে’ বলা হয়েছে যে, বিশাল ঐ অজগর সাপটি যখন বিরাট হাকরেফেরাঊনের দিকে এগিয়ে গেল, তখন ফেরাঊন ভয়ে সিংহাসন থেকে লাফিয়েমূসার কাছে গিয়ে আশ্রয় চাইল এবং তিনি তাকে আশ্রয় দিলেন (ইবনু কাছীর,তাফসীর সূরা ত্বোয়াহা ২০/৪০)।উল্লেখ্য যে, মূসার প্রদর্শিত লাঠির মো‘জেযাটিছিল অত্যাচারী সম্রাট ও তার যালেম সম্প্রদায়ের ভয় দেখানোর জন্য। এর দ্বারাতাদের যাবতীয় দুনিয়াবী শক্তিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হয়। অতঃপর প্রদীপ্তহস্ততালুর দ্বিতীয় মো‘জেযাটি দেখানো হয়, এটা বুঝানোর জন্যে যে, তাঁর আনীতএলাহী বিধান মেনে চলার মধ্যেই রয়েছে অন্ধকার থেকে আলোর পথের দিশা।যাতে রয়েছে মানুষের সার্বিক জীবনে শান্তি ও কল্যাণের আলোকবর্তিকা।মু‘জেযা ও জাদু :মু‘জেযা অর্থ মানুষের বুদ্ধিকে অক্ষমকারী। অর্থাৎ এমন কর্ম সংঘটিত হওয়া যামানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতা বহির্ভূত। (১) ‘মু‘জেযা’ কেবল নবীগণের জন্য খাছ এবং‘কারামত’ আল্লাহ তাঁর নেককার বান্দাদের মাধ্যমে কখনো কখনো প্রকাশ করেথাকেন। যা ক্বিয়ামতপর্যন্ত জারি থাকবে। (২) মু‘জেযা নবীগণের মাধ্যমেসরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। পক্ষান্তরে জাদু কেবল দুষ্ট জিনও মানুষেরমাধ্যমেই হয়ে থাকে এবং তা হয় অদৃশ্য প্রাকৃতিক কারণের প্রভাবে। (৩) জাদুকেবল পৃথিবীতেই ক্রিয়াশীল হয়, আসমানে নয়। কিন্তু মু‘জেযা আল্লাহর হুকুমেআসমান ও যমীনে সর্বত্র ক্রিয়াশীল থাকে। যেমন শেষনবী (ছাঃ)-এর অঙ্গুলীসংকেতে আকাশের চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হয়েছিল। (৪) মু‘জেযা মানুষের কল্যাণের জন্যহয়ে থাকে। কিন্তু জাদু স্রেফ ভেল্কিবাজি ওপ্রতারণা মাত্র এবং যা মানুষেরকেবল ক্ষতিই করে থাকে।জাদুতে মানুষের সাময়িক বুদ্ধি বিভ্রম ঘটে। যা মানুষকেপ্রতারিত করে। এজন্যে একে ইসলামে হারাম করা হয়েছে। মিসরীয় জাতি তথাফেরাঊনের সম্প্রদায় ঐ সময় জাদু বিদ্যায় পারদর্শী ছিল এবং জ্যোতিষীদেরপ্রভাব ছিল তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে অত্যধিক। সেকারণ তাদেরচিরাচরিত ধারণা অনুযায়ী মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযাকে তারা বড় ধরনেরএকটা জাদুভেবেছিল মাত্র। তবে তারা তাঁকে সাধারণ জাদুকর নয়, বরং ‘বিজ্ঞ জাদুকর’ ( ﺳَﺎﺣِﺮٌﻋَﻠِﻴْﻢٌ ) বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল (আ‘রাফ ৭/১০৯)। কারণ তাদের হিসাব অনুযায়ী মূসারজাদু ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির, যা তাদের আয়ত্তাধীন জাদু বিদ্যার বাইরেরএবং যা ছিল অনুপম ও অনন্যবৈশিষ্ট্য মন্ডিত।পরবর্তীকালে সুলায়মান (আঃ)-এরসময়ে ইরাকের বাবেল নগরী তৎকালীন পৃথিবীতে জাদু বিদ্যায় শীর্ষস্থান লাভকরে। তখন আল্লাহ সুলায়মান (আঃ)-কে জিন, ইনসান, বায়ু ও পশুপক্ষীর উপর ক্ষমতাদিয়ে পাঠান। এগুলিকে লোকেরা জাদু ভাবে এবং তার নবুঅতকে অস্বীকার করে।তখন আল্লাহ হারূত ও মারূত ফেরেশতাদ্বয়কে জাদু ও মু‘জেযারপার্থক্য বুঝানোরজন্য প্রেরণ করেন। যাতে লোকেরা জাদুকরদের তাবেদারী ছেড়ে নবীর তাবেদারহয়।মূসার দাওয়াতের পর ফেরাঊনী অবস্থান :মূসার মো‘জেযা দেখে ফেরাঊন ওতার পারিষদবর্গ দারুণভাবে ভীত হয়ে পড়েছিল। তাই মূসার বিরুদ্ধে তার সম্মুখেআর টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেনি। কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করে তারাতাদের লোকদের বলতে লাগল যে,‘লোকটা বিজ্ঞ জাদুকর’। ‘সে তোমাদেরকেদেশথেকে বের করে দিতে চায় (অর্থাৎ সে নিজে দেশেরশাসক হ’তে চায়), এক্ষণে এব্যাপারে তোমাদের মত কি? ‘লোকেরাফেরাঊনকে বলল, ‘আপনি তাকে ও তারভাইকে অবকাশ দিন এবং শহর ও নগরী সমূহের সর্বত্র খবর পাঠিয়ে দিনলোকদেরজমা করার জন্য’। ‘যাতে তারা সকল বিজ্ঞ জাদুকরদের সমবেতকরে’ (আ‘রাফ৭/১০৯-১১২)।ফেরাঊন মূসা (আঃ)-কে বলল, ‘হে মূসা!তুমি কি তোমার জাদুর জোরেআমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেবার জন্য আগমন করেছ’? ‘তাহ’লে আমরাওতোমার মুকাবিলায় তোমার নিকট অনুরূপ জাদু উপস্থিত করব। অতএব আমাদের ওতোমার মধ্যে কোন একটি উন্মুক্ত প্রান্তরে একটা ওয়াদার দিন ধার্য কর, যারখেলাফআমরাও করব না, তুমিও করবে না’। ‘মূসা বললেন, ‘তোমাদের ওয়াদার দিনহবে তোমাদের উৎসবের দিন এবং সেদিন পূর্বাহ্নেই লোকজন সমবেতহবে’ (ত্বোয়াহা ২০/৫৭-৫৯)।ফেরাঊনের জবাবের সার-সংক্ষেপ :১. অদৃশ্যপালনকর্তা আল্লাহ্কে অস্বীকার করে দৃশ্যমান পালনকর্তা হিসাবে নিজেকেইসর্বোচ্চ পালনকর্তা বলে দাবী করা (নাযে‘আত ৭৯/২৪)।২. শৈশবে লালন-পালনেরদোহাই পেড়ে তাকে পালনকর্তা বলে স্বীকার না করায় উল্টা মূসাকেই‘কাফির’বা কৃতঘ্ন বলে আখ্যায়িত করা (শো‘আরা ২৬/১৯)।৩. পূর্ব পুরুষের কারু কাছে এমনকথা না শোনার বাহানা পেশ করা (ক্বাছাছ ২৮/৩৬)।৪. আল্লাহর কাছে ফিরেযাওয়ার কথা অস্বীকার করা (ক্বাছাছ ২৮/৩৮)।৫. পরকালকে অস্বীকার করা(ক্বাছাছ ২৮/৩৭)।৬. মূসাকে কারাগারে নিক্ষেপ করার ও হত্যার হুমকি প্রদান করা(শো‘আরা ২৬/২৯; মুমিন/গাফির ৪০/২৬)।৭. নবুঅতের মু‘জেযাকে অস্বীকার করা এবংএকে জাদু বলে অভিহিত করা(ক্বাছাছ ২৮/৩৬)।৮. মূসার নিঃস্বার্থ দাওয়াতকেরাজনৈতিক স্বার্থ প্রণোদিত বলে অপবাদ দেওয়া (আ‘রাফ ৭/১১০; ত্বোয়াহা২০/৬৩)।৯. নিজের কথিত ধর্ম রক্ষা ও নিজেদের রচিত বিধি-বিধান সমূহ রক্ষারদোহাই দিয়ে মূসার বিরুদ্ধে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলা (মুমিন/গাফির ৪০/২৬;ত্বোয়াহা ২০/৬৩)।১০. মূসাকে দেশে ফেৎনা সৃষ্টিকারী বলে দোষারোপ করা(মুমিন/গাফির ৪০/২৬)।বস্ত্ততঃ এই ধরনের অপবাদসমূহ যুগে যুগে প্রায় সকল নবীকে ওতাঁদের অনুসারী সমাজ সংস্কারক গণকে দেওয়া হয়েছে এবং আজও দেওয়া হচ্ছে।নবুঅত পরবর্তী ১ম পরীক্ষা : জাদুকরদের মুকাবিলামূসা (আঃ) ও ফেরাঊনের মাঝেজাদু প্রতিযোগিতার দিন ধার্য হবার পরমূসা (আঃ) পয়গম্বর সূলভ দয়া প্রকাশেনেতাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ﻭَﻳْﻠَﻜُﻢْ ﻻَ ﺗَﻔْﺘَﺮُﻭﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﻛَﺬِﺑﺎً ﻓَﻴُﺴْﺤِﺘَﻜُﻢْ ﺑِﻌَﺬَﺍﺏٍ ﻭَﻗَﺪْﺧَﺎﺏَ ﻣَﻦِ ﺍﻓْﺘَﺮَﻯ – ‏( ﻃﻪ৬১)- ‘দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করো না। তাহ’লেতিনি তোমাদেরকে আযাব দ্বারা ধ্বংস করে দেবেন। যারাই মিথ্যারোপ করে,তারাই বিফল মনোরথ হয়’ (ত্বোয়াহা ২০/৬১)। কিন্তু এতে কোন ফলোদয় হ’ল না।ফেরাঊন উঠে গিয়ে ‘তার সকল কলা-কৌশল জমা করল, অতঃপর উপস্থিতহ’ল’ (ত্বোয়াহা ২০/৬০)। ‘অতঃপর তারা তাদের কাজে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক করলএবং গোপনে পরামর্শ করল’। ‘তারা বলল, এই দু’জন লোক নিশ্চিতভাবেই জাদুকর।তারা তাদের জাদু দ্বারাআমাদেরকে আমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করতে চায়এবং আমাদের উৎকৃষ্ট জীবনধারা রহিত করতে চায়’। ‘অতএব (হে জাদুকরগণ!)তোমরাতোমাদের যাবতীয় কলা-কৌশল সংহত কর। অতঃপর সারিবদ্ধভাবে এসো।আজযে জয়ী হবে, সেই-ই সফলকাম হবে’ (ত্বোয়াহা ২০/৬৩-৬৪)।জাদুকররাফেরাঊনের নিকট সমবেত হয়ে বলল, জাদুকর ব্যক্তিটি কি দিয়ে কাজ করে? সবাইবলল, সাপ দিয়ে। তারা বলল, আল্লাহর কসম! পৃথিবীতে আমাদের উপরে এমন কেউনেই, যে লাঠি ও রশিকে সাপ বানিয়ে কাজ করতে পারে (‘হাদীছুলকুতূন’ নাসাঈ,ইবনু জারীর, ইবনু কাছীর)। অতএব ‘আমাদের জন্য কি বিশেষ কোন পুরস্কার আছে,যদি আমরা বিজয়ী হই’? ‘সে বলল, হ্যাঁ। তখন অবশ্যই তোমরা আমার নিকটবর্তীলোকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’ (আ‘রাফ ৭/১১৩-১১৪)।জাদুকররা উৎসাহিত হয়েমূসাকে বলল, ‘হে মূসা! হয় তুমি (তোমার জাদুর লাঠি) নিক্ষেপ কর, না হয় আমরাপ্রথমে নিক্ষেপ করি’ (ত্বোয়াহা ২০/৬৫)। মূসা বললেন, ‘তোমরাই নিক্ষেপ কর।অতঃপর যখন তারা ‘তাদের রশি ও লাঠি নিক্ষেপ করল’ (শো‘আরা ২৬/৪৪), তখনলোকদের চোখগুলিকে ধাঁধিয়ে দিল এবং তাদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল ও একমহাজাদু প্রদর্শন করল’ (আ‘রাফ ৭/১১৬)। ‘তাদের জাদুর প্রভাবে মূসার মনে হ’ল যেনতাদের রশিগুলো ও লাঠিগুলো (সাপের ন্যায়) ছুটাছুটি করছে’। ‘তাতে মূসার মনেকিছুটা ভীতির সঞ্চার হ’ল’ (ত্বোয়াহা ২০/৬৬-৬৭)। এমতাবস্থায় আল্লাহ ‘অহি’নাযিল করে মূসাকে অভয় দিয়ে বললেন, ﻗُﻠْﻨَﺎ ﻻَ ﺗَﺨَﻒْ ﺇِﻧَّﻚَ ﺃَﻧْﺖَ ﺍﻟْﺄَﻋْﻠَﻰ – ﻭَﺃَﻟْﻖِ ﻣَﺎ ﻓِﻲ ﻳَﻤِﻴْﻨِﻚَﺗَﻠْﻘَﻒْ ﻣَﺎ ﺻَﻨَﻌُﻮﺍ ﺇِﻧَّﻤَﺎﺻَﻨَﻌُﻮﺍ ﻛَﻴْﺪُ ﺳَﺎﺣِﺮٍ ﻭَﻻَ ﻳُﻔْﻠِﺢُ ﺍﻟﺴَّﺎﺣِﺮُ ﺣَﻴْﺚُ ﺃَﺗَﻰ – ‏( ﻃﻪ 68-69 )- ‘তুমিই বিজয়ী হবে’ ‘তোমার ডানহাতেযা আছে, তা (অর্থাৎ লাঠি) নিক্ষেপ কর। এটা তাদের সবকিছুকেযা তারা করেছে,গ্রাস করে ফেলবে।তাদের ওসব তো জাদুর খেল মাত্র। বস্ত্ততঃ জাদুকর যেখানেইথাকুক সে সফল হবে না’ (ত্বোয়াহা ২০/৬৮-৬৯)।জাদুকররা তাদের রশি ও লাঠি সমূহনিক্ষেপ করার সময় বলল, ﻭَﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺑِﻌِﺰَّﺓِ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻨَﺤْﻦُ ﺍﻟْﻐَﺎﻟِﺒُﻮْﻥَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ ৪৪)- ‘ফেরাঊনেরমর্যাদারশপথ! আমরা অবশ্যই বিজয়ী হব’ (শো‘আরা ২৬/৪৪)। তারপর মূসা (আঃ) আল্লাহরনামে লাঠি নিক্ষেপ করলেন। দেখা গেল তা বিরাট অজগর সাপের ন্যায় রূপ ধারণকরল এবং জাদুকরদের সমস্ত অলীক কীর্তিগুলোকে গ্রাস করতে লাগল’ (শো‘আরা২৬/৪৫)।এদৃশ্য দেখে যুগশ্রেষ্ঠ জাদুকরগণ বুঝে নিল যে, মূসার এ জাদু আসলে জাদু নয়।কেননা জাদুর সর্বোচ্চ বিদ্যা তাদের কাছেই রয়েছে। মূসা তাদের চেয়েবড় জাদুকরহ’লে এতদিন তার নাম শোনা যেত। তার উস্তাদের খবর জানা যেত। তাছাড়া তারযৌবনকাল অবধি সে আমাদের কাছেই ছিল। কখনোই তাকে জাদু শিখতে বা জাদুখেলা দেখাতে বা জাদুর প্রতি কোনরূপ আকর্ষণও তার মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।তার পরিবারেও কোন জাদুকর নেই। তার বড় ভাই হারূণ তো সর্বদা আমাদেরমাঝেই দিনাতিপাত করেছে। কখনোই তাকে এসব করতে দেখা যায়নি বা তারমুখে এখনকার মত বক্তব্য শোনা যায়নি। হঠাৎ করে কেউ বিশ্বসেরাজাদুকর হয়েযেতে পারে না। নিশ্চয়ই এর মধ্যে অলৌকিক কোন সত্তার নিদর্শন রয়েছে, যাআয়ত্ত করা মানুষের ক্ষমতার বাইরে। এ সময় মূসার দেওয়া তাওহীদের দাওয়াত ওআল্লাহর গযবের ভীতি তাদের অন্তরে প্রভাববিস্তার করল। আল্লাহ বলেন, َﻓﻮَﻗَﻊَ ﺍﻟْﺤَﻖُّﻭَﺑَﻄَﻞَ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮﺍْ ﻳَﻌْﻤَﻠُﻮﻥَ، ﻓَﻐُﻠِﺒُﻮﺍْ ﻫُﻨَﺎﻟِﻚَ ﻭَﺍﻧﻘَﻠَﺒُﻮﺍْ ﺻَﺎﻏِﺮِﻳﻦَ – ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১১৮-১১৯)- ‘অতঃপর সত্যপ্রতিষ্ঠিত হ’লএবং বাতিল হয়ে গেল তাদের সমস্ত জাদুকর্ম’। ‘এভাবে তারা সেখানেই পরাজিতহ’ল এবং লজ্জিত হয়ে ফিরে গেল’ (আ‘রাফ ৭/১১৮-১১৯)। অতঃপর ﻓَﺄُﻟْﻘِﻲَ ﺍﻟﺴَّﺤَﺮَﺓُ ﺳَﺎﺟِﺪِﻳﻦَ،ﻗَﺎﻟُﻮﺍﺁﻣَﻨَّﺎ ﺑِﺮَﺏِّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴﻦَ، ﺭَﺏِّ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻭَﻫَﺎﺭُﻭﻥَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ ৪৬-৪৮)- ‘তারা সিজদায় পড়ে গেল’। এবং ‘বলেউঠল,আমরা বিশ্বচরাচরের পালনকর্তার উপরে বিশ্বাস স্থাপন করলাম, যিনি মূসা ওহারূণের রব’ (শো‘আরা ২৬/৪৬-৪৮; ত্বোয়াহা ২০/৭০; আ‘রাফ ৭/১২০-১২১)।পরাজয়ের এদৃশ্য দেখে ভীত-বিহবল ফেরাঊন নিজেকে সামলে নিয়ে উপস্থিত লাখো জনতারমনোবলচাঙ্গা রাখার জন্য জাদুকরদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো, – ﺁﻣَﻨﺘُﻢْ ﻟَﻪُ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﺁﺫَﻥَ ﻟَﻜُﻢْﺇِﻧَّﻪُﻟَﻜَﺒِﻴﺮُﻛُﻢُ ﺍﻟَّﺬِﻳﻌَﻠَّﻤَﻜُﻢُ ﺍﻟﺴِّﺤْﺮَ – ‏( ﻃﻪ ৭১) ‘আমার অনুমতি দানের পূর্বেই তোমরা তাকে মেনেনিলে? নিশ্চয়ই সে (অর্থাৎ মূসা) তোমাদের প্রধান, যে তোমাদেরকে জাদুশিক্ষা দিয়েছে’ (ত্বোয়াহা ২০/৭১; আ‘রাফ ৭/১২৩; শো‘আরা ২৬/৪৯)। অতঃপরসম্রাট সূলভ হুমকি দিয়ে বলল, ﻓَﻠَﺴَﻮْﻑَ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ ﻟَﺄُﻗَﻄِّﻌَﻦَّ ﺃَﻳْﺪِﻳَﻜُﻤْﻮَﺃَﺭْﺟُﻠَﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﺧِﻼَﻑٍ ﻭَﻟَﺄُﺻَﻠِّﺒَﻨَّﻜُﻢْﺃَﺟْﻤَﻌِﻴﻦَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ ৪৯)-‘শীঘ্রই তোমরা তোমাদের পরিণাম ফল জানতে পারবে। আমি অবশ্যই তোমাদেরহাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং তোমাদের সবাইকে শূলেচড়াব’ (শো‘আরা ২৬/৪৯)। জবাবে জাদুকররা বলল, ﻻَ ﺿَﻴْﺮَ ﺇِﻧَّﺎ ﺇِﻟَﻰ ﺭَﺑِّﻨَﺎ ﻣُﻨﻘَﻠِﺒُﻮﻥَ -ﺇِﻧَّﺎ ﻧَﻄْﻤَﻊُ ﺃَﻥ ﻳَّﻐْﻔِﺮَﻟَﻨَﺎ ﺭَﺑُّﻨَﺎﺧَﻄَﺎﻳَﺎﻧَﺎ ﺃَﻥْ ﻛُﻨَّﺎ ﺃَﻭَّﻝَ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ ৫০-৫১)- ‘কোন ক্ষতি নেই। আমরা আমাদেরপালনকর্তারকাছে প্রত্যাবর্তন করব’(৫০)। ‘আশা করি আমাদের পালনকর্তা আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি সমূহ ক্ষমা করবেন’ (শো‘আরা ২৬/৪৯-৫১; ত্বোয়াহা ২০/৭১-৭৩; আ‘রাফ৭/১২৪-১২৬)।উল্লেখ্য যে, জাদুকরদের সাথে মুকাবিলার এই দিনটি ( ﻳﻮﻡ ﺍﻟﺰﻳﻨﺔ ) ছিল ১০ইমুহাররম আশূরার দিন ( ﻳﻮﻡ ﻋﺎﺷﻮﺭﺍﺀ ) (ইবনু কাছীর, ‘হাদীছুল ফুতূন’)। তবে কোন কোনবিদ্বান বলেছেন, এটি ছিল তাদের ঈদের দিন। কেউ বলেছেন, বাজারের দিন। কেউবলেছেন, নববর্ষের দিন (তাফসীরে কুরতুবী, ত্বোয়াহা ৫৯)।ফেরাঊনের ছয়টিকুটচাল :জাদুকরদের পরাজয়ের পর ফেরাঊন তার রাজনৈতিক কুটচালের মাধ্যমেজনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে দিতে চাইল। তার চালগুলিছিল, (১) সে বলল: এইজাদুকররা সবাই মূসার শিষ্য। তারা চক্রান্ত করেই তার কাছে নতি স্বীকারকরেছে। এটা একটা পাতানো খেলা মাত্র। আসলে ‘মূসাই হ’ল বড়জাদুকর’ (ত্বোয়াহা ২০/৭১)। (২) সেবলল, মূসা তার জাদুর মাধ্যমে ‘নগরীরঅধিবাসীদেরকে সেখান থেকেবের করে দিতে চায়’ (আ‘রাফ ৭/১১০) এবং মূসা ওতার সম্প্রদায় এদেশে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। (৩) সে বলল মূসা যেসব কথাবলছে ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে সেসব কথা কখনো শুনিনি’ (ক্বাছাছ২৮/৩৬)। (৪)সে বলল, হে জনগণ! এ লোকটি তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে ওদেশময় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে’ (মুমিন/গাফের ৪০/২৬)। (৫) সে বলল, মূসা তোমাদেরউৎকৃষ্ট (রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক)জীবন ব্যবস্থা রহিত করতেচায়’ (ত্বোয়াহা ২০/৬৩)। (৬) সে মিসরীয় জনগণকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করেদিয়েছিল (ক্বাছাছ ২৮/৪) এবং একটির দ্বারা অপরটিকে দুর্বল করার মাধ্যমেনিজের শাসনও শোষণ অব্যাহত রেখেছিল। আজকের বহুদলীয় গণতন্ত্র বা দলতন্ত্রফেলে আসা ফেরাঊনী তন্ত্রের আধুনিক রূপ বলেই মনে হয়। নিজেই সবকিছু করলেওলোকদের খুশী করার জন্য ফেরাঊন বলল, ﻓَﻤَﺎﺫَﺍ ﺗَﺄْﻣُﺮُﻭﻥَ ‘অতএব হে জনগণ! তোমরাএখন কিবলতে চাও’? (শো‘আরা ২৬/৩৫; আ‘রাফ ৭/১১০)। এযুগের নেতারা যেমন নিজেদেরসকলঅপকর্ম জনগণের দোহাই দিয়ে করে থাকেন।ফেরাঊনী কুটনীতির বিজয় ওজনগণের সমর্থন লাভ :অধিকাংশের রায় যে সবসময় সঠিক হয় না বরং তা আল্লাহরপথ হ’তে মানুষকে বিভ্রান্ত করে, তার বড় প্রমাণ হ’ল ফেরাঊনী কুটনীতির বিজয় ওমূসার আপাত পরাজয়। ফেরাঊনের ভাষণে উত্তেজিত জনগণের পক্ষে নেতারাসঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো, হে সম্রাট! ﺃَﺗَﺬَﺭُ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻭَﻗَﻮْﻣَﻪُ ﻟِﻴُﻔْﺴِﺪُﻭﺍْ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﻭَﻳَﺬَﺭَﻙَﻭَﺁﻟِﻬَﺘَﻚَ- ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১২৭)-‘আপনি কি মূসা ও তার সম্প্রদায়কে এমনিই ছেড়ে দেবেন দেশময় ফাসাদ সৃষ্টিকরারজন্য এবং আপনাকে ও আপনার উপাস্যদেরকে বাতিল করে দেবারজন্য’ (আ‘রাফ ৭/১২৭)।জাদুকরদের সত্য গ্রহণ :ধূর্ত ও কুটবুদ্ধি ফেরাঊন বুঝলোযে, তারঔষধ কাজে লেগেছে। এখুনি মোক্ষম সময়। সে সাথে সাথে জাদুকরদের হাত-পাবিপরীতভাবে কেটে অতঃপর খেজুর গাছের সাথে শূলে চড়িয়ে হত্যা করার আদেশদিল। সে ভেবেছিল, এতে জাদুকররা ভীত হয়ে তার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবে।কিন্তু ফল উল্টা হ’ল। তারা একবাক্যে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলে দিল, ﻟَﻦ ﻧُّﺆْﺛِﺮَﻙَ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﺎ ﺟَﺎﺀﻧَﺎﻣِﻦَﺍﻟْﺒَﻴِّﻨَﺎﺕِ ﻭَﺍﻟَّﺬِﻱ ﻓَﻄَﺮَﻧَﺎ ﻓَﺎﻗْﺾِ ﻣَﺎ ﺃَﻧﺖَ ﻗَﺎﺽٍ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﺗَﻘْﻀِﻲ ﻫَﺬِﻩِ ﺍﻟْﺤَﻴَﺎﺓَ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ- ﺇِﻧَّﺎ ﺁﻣَﻨَّﺎ ﺑِﺮَﺑِّﻨَﺎ ﻟِﻴَﻐْﻔِﺮَ ﻟَﻨَﺎﺧَﻄَﺎﻳَﺎﻧَﺎ ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻛْﺮَﻫْﺘَﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴِّﺤْﺮِﻭَﺍﻟﻠﻪُ ﺧَﻴْﺮٌ ﻭَﺃَﺑْﻘَﻰ – ‏( ﻃﻪ ৭২-৭৩)-‘আমরা তোমাকে ঐসব সুস্পষ্ট নিদর্শন (ও মু‘জেযার)উপরেপ্রাধান্য দিতে পারি না, যেগুলো (মূসার মাধ্যমে) আমাদের কাছে পৌঁছেছে এবংপ্রধান্য দিতে পারিনা তোমাকে সেই সত্তার উপরে যিনি আমাদেরকে সৃষ্টিকরেছেন। অতএব তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পার। তুমি তো কেবল এই পার্থিবজীবনেই যা করার করবে’(৭২)। ‘আমরা আমাদের পালনকর্তার উপরে বিশ্বাস স্থাপনকরেছি, যাতে তিনি আমাদের পাপসমূহ এবং তুমি আমাদেরকে যে জাদু করতেবাধ্য করেছ, (তার পাপসমূহ) তা মার্জনা করেন। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ ওচিরস্থায়ী’ (ত্বোয়াহা ২০/৭২-৭৩)।তারা আরও বলল, ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺇِﻧَّﺎ ﺇِﻟَﻰ ﺭَﺑِّﻨَﺎ ﻣُﻨﻘَﻠِﺒُﻮﻥَ – ﻭَﻣَﺎ ﺗَﻨﻘِﻢُ ﻣِﻨَّﺎ ﺇِﻻَّ ﺃَﻥْﺁﻣَﻨَّﺎﺑِﺂﻳَﺎﺕِ ﺭَﺑِّﻨَﺎ ﻟَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀﺗْﻨَﺎ ، ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺃَﻓْﺮِﻍْ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﺻَﺒْﺮﺍً ﻭَّﺗَﻮَﻓَّﻨَﺎ ﻣُﺴْﻠِﻤِﻴﻦََ – – ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১২৫-১২৬)- ‘আমরা(তো মৃত্যুর পরে)আমাদের পরওয়ারদিগারের নিকটে ফিরে যাব’। ‘বস্ত্ততঃ আমাদের সাথে তোমারশত্রুতা তো কেবল একারণেই যে, আমরা ঈমান এনেছি আমাদের পালনকর্তারনিদর্শন সমূহের প্রতি, যখন তা আমাদের নিকটে পৌঁছেছে। অতএব ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺃَﻓْﺮِﻍْ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﺻَﺒْﺮًﺍﻭَّﺗَﻮَﻓَّﻨَﺎﻣُﺴْﻠِﻤِﻴﻦَ ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের জন্য ধৈর্যের দুয়ার খুলে দাও এবং আমাদেরকে‘মুসলিম’ হিসাবে মৃত্যু দান কর’ (আ‘রাফ ৭/১২৫-১২৬)।এটা ধারণা করা অযৌক্তিকহবে না যে, ইতিপূর্বে ফেরাঊনের দরবারে মূসার লাঠির মু‘জেযা প্রদর্শনেরঘটনাথেকেই জাদুকরদের মনে প্রতীতি জন্মেছিল যে, এটা কোন জাদু নয়, এটা মু‘জেযা।কিন্তু ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গের ভয়েতারা মুখ খুলেনি। অবশেষে তাদেরকেসমবেত করার পর তাদেরকে সম্রাটের নৈকট্যশীল করার ও বিরাট পুরস্কারের লোভদেখানো হয়। এগুলো নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রলোভনের চাপ ভিন্নকিছুই ছিল না।জাদুকরদের মুসলমান হয়ে যাবার অন্যতম কারণ ছিল মুকাবিলারপূর্বে ফেরাঊন ও তার জাদুকরদের উদ্দেশ্যে মূসার প্রদত্ত উপদেশমূলক ভাষণ।যেখানে তিনি বলেছিলেন, ﻭَﻳْﻠَﻜُﻢْ ﻟَﺎ ﺗَﻔْﺘَﺮُﻭﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﻛَﺬِﺑﺎً ﻓَﻴُﺴْﺤِﺘَﻜُﻢْ ﺑِﻌَﺬَﺍﺏٍ ﻭَﻗَﺪْ ﺧَﺎﺏَ ﻣَﻦِ ﺍﻓْﺘَﺮَ- ‏( ﻃﻪ ৬১)-‘দুর্ভোগ তোমাদের! তোমরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করো না। তাহ’লে তিনিতোমাদেরকে আযাব দ্বারা ধ্বংস করে দেবেন। বস্ত্ততঃ তারাই বিফল মনোরথ হয়,যারা মিথ্যারোপ করে’ (ত্বোয়াহা ২০/৬১)।মূসার মুখে একথা শুনে ফেরাঊন ও তারসভাসদরা অহংকারে স্ফীত হ’লেও জাদুকর ও সাধারণ জনগণের মধ্যে দারুণপ্রতিক্রিয়া হয়। ফলে জাদুকরদের মধ্যে গ্রুপিং হয়ে যায় এবং তারা আপোষেবিতর্কে লিপ্ত হয়। যদিও গোপন আলোচনার ভিত্তিতে সম্ভবতঃ রাজকীয় সম্মান ওবিরাট অংকের পুরস্কারের লোভে পরিশেষে তারা একমত হয়।জাদুরকদের পরিণতি:জাদুকরদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়েছিল কি-না, সে বিষয়ে কুরআনে স্পষ্টভাবেকিছু বলা না হ’লেও ত্বোয়াহা ৭২ হ’তে ৭৬ পর্যন্ত বর্ণিত আয়াত সমূহেরবাকভঙ্গিতে বুঝা যায় যে, তা তৎক্ষণাৎ কার্যকর হয়েছিল। কেননা নিষ্ঠুরতারপ্রতীক ফেরাঊনের দর্পিত ঘোষণার জবাবে দৃঢ়চিত্ত ঈমানদার জাদুকরদের মুখদিয়ে যে কথাগুলো বের হয়েছিল, তা সকল ভয় ও দ্বিধা-সংকোচের ঊর্ধ্বে উঠেকেবলমাত্র মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির মুখেই শোভা পায়। সেকারণ হযরত আব্দুল্লাহইবনু আববাস, উবায়েদইবনু উমায়ের ও অন্যান্য বিদ্বানগণ বলেন, ﺃَﺻْﺒَﺤُﻮْﺍ ﺳَﺤَﺮَﺓً ﻭَﺃَﻣْﺴَﻮْﺍ ﺷُﻬَﺪَﺍﺀَ‘যারা সকালে জাদুকর ছিল, তারা সন্ধ্যায় শহীদ হয়ে মৃত্যুবরণ করল’।[25] মূলতঃএটাই হ’ল প্রকৃত মা‘রেফাত, যা যেকোন ভয়-ভীতির মুকাবিলায় মুমিনকে দৃঢ়হিমাদ্রির ন্যায় অবিচল রাখে আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্বেষায়। সুবহা-নাল্লা-হিওয়া বেহামদিহী।জনগণের প্রতিক্রিয়া :আল্লাহ বলেন, ﻓَﻤَﺎ ﺁﻣَﻦَ ﻟِﻤُﻮﺳَﻰ ﺇِﻻَّ ﺫُﺭِّﻳَّﺔٌ ﻣِّﻦْ ﻗَﻮْﻣِﻪِ ﻋَﻠَﻰﺧَﻮْﻑٍ ﻣِّﻦْ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻭَﻣَﻠَﺌِﻬِﻢْ ﺃَﻥ ﻳَّﻔْﺘِﻨَﻬُﻢْ ﻭَﺇِﻥَّ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻟَﻌَﺎﻝٍ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﻭَﺇِﻧَّﻪُ ﻟَﻤِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺴْﺮِﻓِﻴﻦَ – ‏( ﻳﻮﻧﺲ৮৩)- ‘ফেরাঊন ও তারপারিষদবর্গের নির্যাতনের ভয়ে তার সম্প্রদায়ের কিছু লোক ব্যতীত কেউ তারপ্রতি ঈমান আনেনি। আর ফেরাঊন তার দেশে ছিল পরাক্রান্তএবং সে ছিলসীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত’ (ইউনুস ১০/৮৩)। এতে বুঝা যায় যে, ক্বিবতীদেরমধ্যে গোপনে ঈমান আনয়নকারীর সংখ্যা বেশী থাকলেও প্রকাশ্যে ঈমানআনয়নকারীর সংখ্যা নিতান্তই কম ছিল।উল্লেখ্য যে, অত্র আয়াতে ‘তার কওমেরকিছু লোক ব্যতীত’ ( ﺇِﻻَّ ﺫُﺭِّﻳَّﺔَّ ﻣِّﻦْ ﻗّﻮْﻣِﻪِ ) বলতে ইবনু আববাস (রাঃ) ‘ফেরাঊনের কওমেরকিছু লোক’ বলেছেন। কিন্তু ইবনু জারীর ও অনেক বিদ্বান মূসার নিজ কওম ‘বনুইস্রাঈলের কিছু লোক’ বলেছেন। এর জবাবে হাফেয ইবনু কাছীর বলেন, এটা প্রসিদ্ধকথা যে, বনু ইস্রাঈলের সকলেই মূসাকে নবী হিসাবে বিশ্বাস করত একমাত্র ক্বারূণব্যতীত। কেননা সে ছিল বিদ্রোহী এবং ফেরাঊনের সাথী। আরমূসার কারণেই বনুইস্রাঈলগণ মূসার জন্মের আগে ও পরে সমানভাবে নির্যাতিত ছিল (আ‘রাফ ৭/১২৯)।অতএব অত্র আয়াতে যে মুষ্টিমেয় লোকের ঈমান আনার কথাবলা হয়েছে, তারানিশ্চিতভাবেই ছিলেন ক্বিবতী সম্প্রদায়ের। আর তারা ছিলেন, ফেরাঊনেরস্ত্রী আসিয়া, ফেরাঊনের চাচাতো ভাই জনৈক মুমিন ব্যক্তি যিনি তার ঈমানগোপন রেখেছিলেন এবং ফেরাঊনের খাজাঞ্চি ও তার স্ত্রী। যেকথা ইবনু আববাস(রাঃ) বলেছেন।[26]ফেরাঊনের স্ত্রীর প্রতিক্রিয়া :জাদুকরদের সঙ্গে মুকাবিলাতথা সত্য ও মিথ্যার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় ফেরাঊনের নেককার স্ত্রী ওমূসারপালক মাতা ( ﺃﻣﻪ ﺍﻟﺒﺪﻳﻠﺔ ) ‘আসিয়া’ উক্ত মুকাবিলার শুভ ফলাফলের জন্য সদাউদগ্রীব ছিলেন। যখন তাঁকে মূসা ও হারূণের বিজয়ের সংবাদ শোনানো হ’ল, তখনতিনি কালবিলম্ব না করে বলে ওঠেন, ﺁﻣَﻨْﺖُ ﺑِﺮَﺏِّ ﻣُﻮْﺳَﻰ ﻭَ ﻫَﺎﺭُﻭْﻥَ ‘আমি মূসা ও হারূণেরপালনকর্তার উপরে ঈমান আনলাম’। নিজ স্ত্রীর ঈমানের এ খবর শুনে রাগেঅগ্নিশর্মা হয়ে ফেরাঊন তাকে মর্মান্তিকভাবে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যাকরে।[27] মৃত্যুর পূর্বে বিবি আসিয়া কাতর কণ্ঠে স্বীয় প্রভুর নিকটে প্রার্থনাকরেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺿَﺮَﺏَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻣَﺜَﻼً ﻟِﻠَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺍِﻣْﺮَﺃَﺓَ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﺇِﺫْ ﻗَﺎﻟَﺖْ ﺭَﺏِّ ﺍﺑْﻦِ ﻟِﻲﻋِﻨﺪَﻙَ ﺑَﻴْﺘﺎً ﻓِﻲ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔِ ﻭَﻧَﺠِّﻨِﻲﻣِﻦْ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻭَﻋَﻤَﻠِﻪِ ﻭَﻧَﺠِّﻨِﻲ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴﻦَ -‘আল্লাহ ঈমানদারগণের জন্য দৃষ্টান্ত বর্ণনাকরেনফেরাঊনের স্ত্রীর, যখন সে বলেছিল, ‘হে আমার পালনকর্তা! তোমার নিকটেজান্নাতে আমার জন্যএকটি গৃহ নির্মাণ কর! আমাকে ফেরাঊন ও তারপারিষদবর্গের হাত থেকে উদ্ধার কর এবং আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকেমুক্তি দাও’ (তাহরীম ৬৬/১১)।কুরআনে বর্ণিত চারজন নারীর দৃষ্টান্ত :পবিত্রকুরআনের সূরা তাহরীমের ১০-১২ আয়াতে আল্লাহ পাক চারজন নারীর দৃষ্টান্তবর্ণনা করে তা থেকে সকলকে উপদেশ হাছিল করতে বলেছেন। প্রথম দু’জন দু’নবীরপত্নী। একজন নূহ (আঃ)-এর স্ত্রী, অন্যজন লূত্ব (আঃ)-এর স্ত্রী। এ দু’জন নারীতাওহীদ বিষয়ে আপন আপন স্বামীর তথা স্ব স্ব নবীর দাওয়াতে বিশ্বাস আনয়নকরেননি। বরং বাপ-দাদার আমলের শিরকী আক্বীদা ও রীতি-নীতির উপরেবিশ্বাসী ছিলেন। ফলে তারা জাহান্নামের অধিবাসী হয়েছেন। পয়গম্বরগণেরসাথে বৈবাহিক সাহচর্য তাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে পারেনি।বাকী দু’জন নারীর একজন বিশ্বসেরা নাস্তিক ও দাম্ভিক সম্রাট ফেরাঊনেরপুণ্যশীলা স্ত্রী ‘আসিয়া’ বিনতে মুযাহিম। তিনি মূসা (আঃ)-এর দাওয়াতে সাড়াদিয়ে স্বীয় ঈমান ঘোষণা করেন। ফেরাঊনের ঘোষিত মৃত্যুদন্ড তিনি হাসিমুখেবরণ করে নেন। কোন কোন রেওয়ায়াত অনুসারে আল্লাহ পাক দুনিয়াতেই তাঁকেজান্নাতের গৃহ প্রদর্শন করেছেন।[28] চতুর্থ জন হ’লেন হযরতঈসা (আঃ)-এর মাতামারিয়াম বিনতে ইমরান। স্বীয় ঈমান ও সৎকর্মের বদৌলতে তিনি আল্লাহরনিকটে মহানমর্যাদার অধিকারিণী হন। এ থেকে বুঝানো হয়েছে যে, পুরুষ হৌক বানারী হৌক প্রত্যেকে স্ব স্ব ঈমান ও আমলের কারণে জান্নাতের অধিকারী হবে,অন্য কোন কারণে নয়।মূসা (আঃ)-এর উপরে ঈমান আনয়নকারিনী আসিয়াকেশেষনবী (ছাঃ) জগৎ শ্রেষ্ঠ চারজন মহিলার মধ্যে শামিল করেছেন। উক্তচারজনহ’লেন ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিম, মারিয়াম বিনতেইমরান, খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদও ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ।[29]নবুঅত-পরবর্তী ২য় পরীক্ষা : বনুইস্রাঈলদের উপরে আপতিত ফেরাঊনী যুলুম সমূহ :জাদুরপরীক্ষায় পরাজিত ফেরাঊনের যাবতীয় আক্রোশ গিয়ে পড়ল এবার নিরীহ বনুইস্রাঈলগণের উপর। জাদুকরদের ঈমান আনয়ন, অতঃপর তাদের মৃত্যুদন্ড প্রদান, বিবিআসিয়ার ঈমান আনয়ন ও তাঁকে মৃত্যুদন্ড প্রদান ইত্যাদি নিষ্ঠুর দমন নীতিরমাধ্যমে এবং অত্যন্ত নোংরা কুটচাল ও মিথ্যা অপবাদ সমূহের মাধ্যমে মূসারঈমানী আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চক্রান্ত করেছিল ফেরাঊন। কিন্তু এর ফলেজনগণের মধ্যে মূসার দাওয়াত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। তাতে ফেরাঊন ওতারঅহংকারী পারিষদবর্গ নতুনভাবে দমন নীতির কৌশলপত্র প্রণয়ন করল। তারানিজেরা বিধর্মী হ’লেও সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ধর্মকে হাতিয়ারহিসাবে ব্যবহার করল। অন্যদিকে ‘বিভক্ত কর ও শাসন কর’-এই কুটনীতির অনুসরণেফেরাঊনের ক্বিবতী সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে কেবল বনু ইস্রাঈলদের উপরে চূড়ান্তযুলুম ও নির্যাতনের পরিকল্পনা করল।১ম যুলুমঃ বনু ইস্রাঈলেরনবজাতকপুত্রসন্তানদের হত্যার নির্দেশ জারি :ফেরাঊনী সম্প্রদায়ের নেতারাইতিপূর্বে ফেরাঊনকে বলেছিল, ﺃَﺗَﺬَﺭُﻣُﻮﺳَﻰ ﻭَﻗَﻮْﻣَﻪُ ﻟِﻴُﻔْﺴِﺪُﻭﺍْ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﻭَﻳَﺬَﺭَﻙَ ﻭَﺁﻟِﻬَﺘَﻚَ ‘আপনিকি মূসাওতার সম্প্রদায়কে এমনি ছেড়ে দিবেন দেশময় ফাসাদ সৃষ্টি করারজন্য এবংআপনাকে ও আপনার উপাস্যদেরকে বাতিল করে দেবার জন্য? (আ‘রাফ ৭/১২৭)।নেতারা মূসা ও হারূণের ঈমানী দাওয়াতকে ‘ফাসাদ’ বলে অভিহিত করেছিল।এক্ষণে দেশময় মূসার দাওয়াতের ব্যাপক প্রসার বন্ধ করার জন্য এবং ফেরাঊনেরনিজ সম্প্রদায়ের সাধারণ লোকদের ব্যাপকহারে মূসার দ্বীনের প্রতি আকৃষ্টহওয়ার স্রোত বন্ধ করার জন্য নিজেদের লোকদের কিছু না বলে নিরীহ বনুইস্রাঈলদের উপরে অত্যাচার শুরু করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে ফেরাঊন বলল, ﺳَﻨُﻘَﺘِّﻞُﺃَﺑْﻨَﺎﺀَﻫُﻢْ ﻭَﻧَﺴْﺘَﺤْﻴِـﻲ ﻧِﺴَﺎﺀَﻫُﻢْ ﻭَﺇِﻧَّﺎ ﻓَﻮْﻗَﻬُﻢْ ﻗَﺎﻫِﺮُﻭﻥَ – ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১২৭)- ‘আমি এখুনি টুকরা টুকরা করেহত্যা করবওদের পুত্র সন্তানদেরকে এবংবাঁচিয়ে রাখব ওদের কন্যা সন্তানদেরকে। আর আমরাতো ওদের উপরে (সবদিক দিয়েই) প্রবল’ (আ‘রাফ৭/১২৭)। এভাবে মূসার জন্মকালে বনুইস্রাঈলের সকল নবজাতক পুত্রহত্যা করার সেই ফেলে আসা লোমহর্ষক নির্যাতনেরপুনরাবৃত্তির ঘোষণা প্রদান করা হ’ল।দল ঠিক রাখার জন্য এবং সম্প্রদায়েরনেতাদের রোষাগ্নি প্রশমনের জন্য ফেরাঊন অনুরূপ ঘোষণা দিলেও মূসা ও হারূণসম্পর্কে তার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হয়নি। যদিও ইতিপূর্বে সে মূসাকে কারারুদ্ধকরার এমনকি হত্যা করার হুমকি দিয়েছিল (শো‘আরা ২৬/২৯; মুমিন ৪০/২৬)। কিন্তুজাদুকরদের পরাজয়ের পর এবং নিজে মূসার সর্পরূপী লাঠির মু‘জেযা দেখে ভীতবিহবল হয়ে পড়ার পর থেকে মূসার দিকে তাকানোর মত সাহসও তার ছিল না।যাইহোক ফেরাঊনের উক্ত নিষ্ঠুর ঘোষণা জারি হওয়ার পর বনু ইস্রাঈলগণ মূসার নিকটেএসে অনুযোগের সুরে বলল, ﺃُﻭْﺫِﻳﻨَﺎ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞِ ﺃَﻥ ﺗَﺄْﺗِﻴﻨَﺎ ﻭَﻣِﻦْ ﺑَﻌْﺪِ ﻣَﺎ ﺟِﺌْﺘَﻨَﺎ ‘তোমারআগমনের পূর্বেওআমাদেরকেনির্যাতন করা হয়েছে। আবার এখন তোমার আগমনের পরেও তাই করাহচ্ছে’ (আ‘রাফ ৭/১২৯)। অর্থাৎ তোমার আগমনের পূর্বে তো এ আশায় আমাদের দিনকাটত যে, সত্বর আমাদের উদ্ধারের জন্য একজন নবীরআগমন ঘটবে। অথচ এখনতোমারআগমনের পরেও সেই একই নির্যাতনেরপুনরাবৃত্তি হচ্ছে। তাহ’লে এখন আমাদেরউপায় কি?আসন্ন বিপদের আশংকায় ভীত-সন্ত্রস্ত কওমের লোকদের সান্ত্বনাদিয়ে মূসা (আঃ) বললেন, ﻋَﺴَﻰ ﺭَﺑُّﻜُﻢْ ﺃَﻥ ﻳُّﻬْﻠِﻚَ ﻋَﺪُﻭَّﻛُﻢْ ﻭَﻳَﺴْﺘَﺨْﻠِﻔَﻜُﻢْ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﻓَﻴَﻨْﻈُﺮَ ﻛَﻴْﻒَ ﺗَﻌْﻤَﻠُﻮﻥَ‘তোমাদেরপালনকর্তা শীঘ্রই তোমাদের শত্রুদের ধ্বংস করে দেবেন এবং তোমাদেরকেদেশে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন। তারপর দেখবেন, তোমরা কেমন কাজকর’ (আ‘রাফ ৭/১২৯)। তিনি বললেন, ﺍﺳْﺘَﻌِﻴﻨُﻮﺍ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻭَﺍﺻْﺒِﺮُﻭْﺍ ﺇِﻥَّ ﺍﻷَﺭْﺽَ ِﻟﻠﻪِ ﻳُﻮْﺭِﺛُﻬَﺎ ﻣَﻦْ ﻳَّﺸَﺂﺀُ ﻣِﻦْﻋِﺒَﺎﺩِﻩِ ﻭَﺍﻟْﻌَﺎﻗِﺒَﺔُﻟِﻠْﻤُﺘَّﻘِﻴﻦَ ‘তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর আল্লাহর নিকটে এবং ধৈর্য ধারণ কর। নিশ্চয়ইএ পৃথিবী আল্লাহর। তিনি স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এর উত্তরাধিকারীবানিয়ে দেন। বস্ত্ততঃ চূড়ান্ত পরিণাম ফল আল্লাহভীরুদের জন্যইনির্ধারিত’ (আ‘রাফ ৭/১২৮)।মূসা (আঃ) তাদেরকে আরও বলেন, ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺇِﻥْ ﻛُﻨﺘُﻢْ ﺁﻣَﻨﺘُﻢْ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻓَﻌَﻠَﻴْﻪِﺗَﻮَﻛَّﻠُﻮْﺍ ﺇِﻥْ ﻛُﻨﺘُﻢ ﻣُّﺴْﻠِﻤِﻴﻦَ – ﻓَﻘَﺎﻟُﻮﺍْ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﺗَﻮَﻛَّﻠْﻨَﺎ ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﻻَ ﺗَﺠْﻌَﻠْﻨَﺎ ﻓِﺘْﻨَﺔً ﻟِّﻠْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴﻦَ – ﻭَﻧَﺠِّﻨَﺎ ﺑِﺮَﺣْﻤَﺘِﻚَﻣِﻦَ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟْﻜَﺎﻓِﺮِﻳﻦَ – ‏( ﻳﻮﻧﺲ৮৪-৮৬)- ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা যদি আল্লাহর উপরে ঈমান এনে থাক, তবেতাঁরই উপরে ভরসা কর যদি তোমরা আনুগত্যশীল হয়ে থাক’। জবাবে তারা বলল,আমরা আল্লাহর উপরে ভরসা করছি। হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের উপরে এযালেম কওমের শক্তি পরীক্ষা করো না’। ‘আরআমাদেরকে অনুগ্রহ করে কাফেরসম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দাও’ (ইউনুস ১০/৮৪-৮৬)।উপরোক্ত আয়াত সমূহে বুঝাযায় যে, পয়গম্বর সূলভ দরদ ও দূরদর্শিতার আলোকে মূসা (আঃ) স্বীয় ভীত-সন্ত্রস্তকওমকে মূলতঃ দু’টি বিষয়ে উপদেশ দেন। এক- শত্রুর মোকাবেলায় আল্লাহরসাহায্য প্রার্থনা করা এবং দুই- আল্লাহর সাহায্য না আসা পর্যন্তসাহসের সাথেধৈর্য ধারণ করা। সাথে সাথে একথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে, সমগ্র পৃথিবীরমালিকানা আল্লাহর। তিনি যাকে খুশী এর উত্তরাধিকারী নিয়োগ করেন এবংনিঃসন্দেহে শেষফল মুত্তাক্বীদের জন্যই নির্ধারিত।২য় যুলুমঃ ইবাদতগৃহ সমূহধ্বংসকরা :পুত্র শিশু হত্যাকান্ডের ব্যাপক যুলুমের সাথে সাথে ফেরাঊন বনুইস্রাঈলদের ইবাদতগৃহ সমূহ ধ্বংস করার নির্দেশ দেয়। বনু ইস্রাঈলদের ধর্মীয় বিধানছিল এই যে, তাদের সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে উপাসনালয়ে গিয়ে উপাসনা করতেহ’ত। এক্ষণে সেগুলি ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেওয়ায় বনু ইস্রাঈলগণ দিশেহারা হয়ে পড়ে। এসময় মূসা ও হারূণের প্রতি আল্লাহ পাক নিম্নোক্ত নির্দেশ পাঠান- ﻭَﺃَﻭْﺣَﻴْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻰ ﻣُﻮﺳَﻰﻭَﺃَﺧِﻴﻪِ ﺃَﻥْ ﺗَﺒَﻮَّﺀَﺍ ﻟِﻘَﻮْﻣِﻜُﻤَﺎ ﺑِﻤِﺼْﺮَ ﺑُﻴُﻮﺗﺎً ﻭَﺍﺟْﻌَﻠُﻮْﺍ ﺑُﻴُﻮﺗَﻜُﻢْ ﻗِﺒْﻠَﺔً ﻭَﺃَﻗِﻴﻤُﻮﺍ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓَ ﻭَﺑَﺸِّﺮِ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ -‏( ﻳﻮﻧﺲ ৮৭)-‘আর আমরা নির্দেশপাঠালাম মূসা ও তার ভাইয়ের প্রতি যে, তোমরা তোমাদের সম্প্রদায়ের জন্যমিসরের মাটিতে বাসস্থান নির্ধারণ কর এবং তোমাদের ঘরগুলিকে কিবলামুখীকরে তৈরী করও সেখানে ছালাত কায়েম কর এবং মুমিনদের সুসংবাদ দাও’।(ইউনুস১০/৮৭)।বলা বাহুল্য যে, উপরোক্ত বিধান নাযিলের ফলে বনু ইস্রাঈলগণ স্ব স্ব ঘরেইছালাত আদায়ের সুযোগ লাভ করে। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তাদেরকেযে ক্বিবলার দিকে ফিরে ছালাত আদায় করতে নির্দেশ দেন, সেটা ছিল কা‘বাশরীফ’ (কুরতুবী, রূহুল মা‘আনী)। বরং কোন কোন বিদ্বান বলেছেন যে, বিগত সকলনবীর ক্বিবলা ছিল কা‘বা গৃহ। লক্ষণীয় যে, মূসার অতুলনীয় নবুঅতী মো‘জেযাথাকা সত্ত্বেও এবং তাদেরকে সাহায্য করার ব্যাপারে আল্লাহর স্পষ্ট ওয়াদাথাকা সত্ত্বেও ফেরাঊনী যুলুমের বিরুদ্ধে আল্লাহ মূসাকে যুদ্ধ ঘোষণার নির্দেশদেননি। বরং যুলুম বরদাশত করার ও ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেন। ইবাদতগৃহ সমূহভেঙ্গে দিয়েছে বলে তা রক্ষার জন্য জীবন দিতে বলা হয়নি। (টীকা: অতএবউপাসনালয় ধ্বংস করা ফেরাঊনী কাজ)। বরং স্ব স্ব গৃহকে কেবলামুখী বানিয়েসেখানেই ছালাত আদায় করতে বলা হয়েছে। এর দ্বারা একটা মূলনীতিবেরিয়েআসে যে, পরাক্রান্ত যালেমের বিরুদ্ধে দুর্বল মযলূমের কর্তব্য হ’ল ধৈর্যধারণ করা ও আল্লাহর উপরেই সবকিছু সোপর্দ করা।ফেরাঊনের বিরুদ্ধে মূসার বদদো‘আ : ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺇِﻧَّﻚَ ﺁﺗَﻴْﺖَ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﻭَﻣَﻸَﻩُ ﺯِﻳﻨَﺔً ﻭَﺃَﻣْﻮَﺍﻻً ﻓِﻲ ﺍﻟْﺤَﻴَﺎﺓِ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﻟِﻴُﻀِﻠُّﻮْﺍﻋَﻦْ ﺳَﺒِﻴﻠِﻚَ ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺍﻃْﻤِﺲْ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﻣْﻮَﺍﻟِﻬِﻢْﻭَﺍﺷْﺪُﺩْ ﻋَﻠَﻰ ﻗُﻠُﻮﺑِﻬِﻢْ ﻓَﻼَ ﻳُﺆْﻣِﻨُﻮْﺍ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺮَﻭُﺍ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏَ ﺍﻷَﻟِﻴﻢَ – ﻗَﺎﻝَ ﻗَﺪْ ﺃُﺟِﻴﺒَﺖْ ﺩَّﻋْﻮَﺗُﻜُﻤَﺎ ﻓَﺎﺳْﺘَﻘِﻴﻤَﺎ ﻭَﻻَﺗَﺘَّﺒِﻌَﺂﻥِّ ﺳَﺒِﻴﻞَ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻻَ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ-‏( ﻳﻮﻧﺲ ৮৮-৮৯)-‘মূসা বলল, হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি ফেরাঊনকে ও তারসর্দারদেরকে পার্থিব আড়ম্বর সমূহ ও সম্পদরাজি দান করেছ, যা দিয়ে তারালোকদেরকে তোমার রাস্তা থেকে বিপথগামী করে। অতএবহে আমাদের প্রভু! তুমিতাদের সম্পদরাজি ধ্বংস করে দাও ও তাদের অন্তরগুলিকে শক্ত করে দাও, যাতেতারা অতক্ষণ পর্যন্ত ঈমান না আনে, যতক্ষণ না তারা মর্মান্তিক আযাব প্রত্যক্ষকরে’(৮৮)। জবাবে আল্লাহ বললেন, তোমাদের দো‘আ কবুল হয়েছে। অতএবতোমরাদু’জন অটল থাক এবং অবশ্যই তোমরা তাদের পথে চলো না, যারা জানে না’ (ইউনুস১০/৮৮-৮৯)।মূসা ও হারূণের উপরোক্ত দো‘আ আল্লাহ কবুল করলেন। কিন্তু তারবাস্তবায়ন সঙ্গে সঙ্গে করলেননা। বরং সময় নিলেন অন্যূন বিশ বছর। এরূপপ্রলম্বিত কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে আল্লাহ মাযলূমের ধৈর্য পরীক্ষার সাথে সাথেযালেমেরও পরীক্ষা নিয়ে থাকেন এবং তাদের তওবা করার ও হেদায়াত প্রাপ্তিরসুযোগ দেন। যাতে পরে তাদের জন্য ওযর পেশ করার কোন সুযোগ না থাকে।যেমনআল্লাহ বলেন, ﻭَﻟَﻮْ ﻳَﺸَﺎﺀُ ﺍﻟﻠﻪُ ﻻَﻧﺘَﺼَﺮَ ﻣِﻨْﻬُﻢْ ﻭَﻟَﻜِﻦ ﻟِّﻴَﺒْﻠُﻮَ ﺑَﻌْﻀَﻜُﻢ ﺑِﺒَﻌْﺾٍ ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলেতাদের কাছথেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের কতককে কতকের দ্বারাপরীক্ষা করতে চান’ (মুহাম্মাদ ৪৭/৪)।প্রশ্ন হ’তে পারে, এত যুলুম সত্ত্বেও আল্লাহতাদের হিজরত করার নির্দেশ না দিয়ে সেখানেই পুনরায় ঘর বানিয়ে বসবাসেরনির্দেশ দিলেন কেন? এর জবাব দু’ভাবে দেওয়া যেতে পারে।এক- ফেরাঊনতাদেরকে হিজরতে বাধা দিত। কারণ বনু ইস্রাঈলগণকে তারাতাদের জাতীয়উন্নয়নের সহযোগী হিসাবে এবং কর্মচারী ও সেবাদাস হিসাবে ব্যবহার করত।তাছাড়া পালিয়ে আসারও কোন পথ ছিল না। কেননা নীলনদ ছিল বড় বাধা। নদীপার হওয়ার চেষ্টা করলে ফেরাঊনীসেনারা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করত।দুই-ফেরাঊনী সম্প্রদায়ের মধ্যে মূসা ও হারূণের দাওয়াত সম্প্রসারণ করা। মূলতঃএটিই ছিলআল্লাহর মূল উদ্দেশ্য। কেননা যতদিন তারা মিসরে ছিলেন, সেখানকারঅধিবাসীদের নিকটে দ্বীনের দাওয়াত পেশ করেছেন এবংতার ফলে বহু আল্লাহরবান্দা পথের সন্ধান পেয়ে ধন্য হয়েছেন। ফেরাঊন দেখেছিল তার দুনিয়াবী লাভও শান-শওকত। কিন্তু আল্লাহ চেয়েছিলেন তাওহীদের প্রচার ও প্রসার ও মানুষেরহেদায়াত। সেটিই হয়েছে। ফেরাঊনেরা এখন মিসরের পিরামিডের দর্শনীয়বস্ত্ততে পরিণত হয়েছে। অথচ মিসর সহ বলা চলে পুরা আফ্রিকায় এখন ইসলামেরজয়-জয়কার অব্যাহত রয়েছে। ফালিল্লা-হিল হাম্দ।ফেরাঊনী আচরণ থেকে প্রাপ্তশিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :(১) দুষ্টু শাসকগণ তার পদে অন্য কাউকে ভাবতে পারে না।আল্লাহ বলেন, ‘ফেরাঊন পৃথিবীতে উদ্ধত হয়ে উঠেছিল’ (ইউনুস ১০/৮৩)। সে দাবীকরেছিল, ‘আমিই তোমাদের সর্বোচ্চ পালনকর্তা’ (নাযে‘আত ৭৯/২৪)। অতএব ‘আমিব্যতীত তোমাদের অন্য কোন উপাস্য আছে বলে আমি জানি না’ (ক্বাছাছ ২৮/৩৮)।যেহেতু সে তৎকালীন পৃথিবীর এক সভ্যতাগর্বী ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের একচ্ছত্র সম্রাটছিল, সেহেতু তার এ দাবী মিথ্যা ছিল না। এর দ্বারা সে নিজেকে ‘সৃষ্টিকর্তা’দাবী করত না বটে, কিন্তু নিজস্ব বিধানে প্রজাপালনের কারণে নিজেকেইসর্বোচ্চ পালনকর্তা ভেবেছিল। তার অহংকার তার চক্ষুকে নবী মূসার অহীরবিধান মান্য করা থেকে অন্ধ করে দিয়েছিল। যুগে যুগে আবির্ভূত স্বেচ্ছাচারীশাসকদের অবস্থা এ থেকে মোটেই পৃথক ছিল না। আজও নয়। প্রত্যেকে নিজেকেশ্রেষ্ঠ শাসক মনে করে এবং ঐ পদে কাউকে শরীক ভাবতে পারে না।(২) তারাতাদের বিরোধীদেরকে ধর্মবিরোধী ও সমাজ বিরোধী বলে। ফেরাঊন বলেছিল,তোমরা আমাকে ছাড়, মূসাকে হত্যা করতে দাও। সেডাকুক তার পালনকর্তাকে।আমি আশংকা করছি যে, সে তোমাদের দ্বীনএবং প্রচলিত উৎকৃষ্ট রীতিনীতিপরিবর্তন করতে চায় এবং দেশে ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায় (মুমিন ৪০/২৬, ত্বোয়াহা২০/৬৩)। সকল যুগের ফেরাঊনরা তাদের বিরুদ্ধ বাদীদের উক্ত কথাই বলে থাকে।(৩)তারা সর্বদা নিজেদেরকে জনগণের মঙ্গলকামী বলে। নিজ সম্প্রদায়ের জনৈকগোপন ঈমানদার ব্যক্তি যখন মূসাকে হত্যা না করার ব্যাপারে ফেরাঊনকে উপদেশদিল, তখন তার জবাবে ফেরাঊন বলল, ‘আমি তোমাদেরকে কেবল মঙ্গলের পথইদেখিয়ে থাকি’ (মুমিন ৪০/২৯)। সকলযুগের ফেরাঊনরাও একই কথা বলে আল্লাহরবিধানকে এড়িয়ে চলে এবং নিজেদের মনগড়া বিধান প্রতিষ্ঠায় জনগণের নামেজনগণের উপরে যুলুমের স্টীম রোলার চালিয়ে থাকে।(৪) তাদের দেওয়া জেল-যুলুমওহত্যার হুমকির বিপরীতে ঈমানদারগণ সর্বদা আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করেন ওপরিণামে মযলূম বিজয়ী হয় ও যালেম পর্যুদস্ত হয়। যেমন কারাদন্ড ও হত্যার হুমকি ওফেরাঊনী যুলুমের উত্তরে মূসার বক্তব্য ছিল: ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺇِﻧِّﻲ ﻋُﺬْﺗُﺒِﺮَﺑِّﻲ ﻭَﺭَﺑِّﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﻛُﻞِّﻣُﺘَﻜَﺒِّﺮٍ ﻻَّ ﻳُﺆْﻣِﻦُ ﺑِﻴَﻮْﻡِﺍﻟْﺤِﺴَﺎﺏِ ‘আমি আমার ও তোমাদের পালনকর্তার আশ্রয় প্রার্থনা করছি সকলঅহংকারী থেকে যে বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না’ (মুমিন ৪০/২৭)। ফলে‘আল্লাহ তাকে তাদের চক্রান্তের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং পরে ফেরাঊনগোত্রকে শোচনীয় আযাব গ্রাস করল’ (মুমিন ৪০/৪৫)। এযুগেও মযলূমের কাতরপ্রার্থনা আল্লাহ কবুল করে থাকেন ও যালেমকে বিভিন্নভাবে শাস্তি দিয়েথাকেন।ফেরাঊনী সম্প্রদায়ের উপরে আপতিত গযব সমূহ এবং মূসা (আঃ)-এরমু‘জেযা সমূহ :ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী ফেরাঊনের জাদুকরদের সাথে শক্তিপরীক্ষার ঘটনার পর মূসা (আঃ) অন্যূন বিশ বছর যাবত মিসরে অবস্থান করেসেখানকার অধিবাসীদেরকে আল্লাহর বাণী শোনান এবং সত্য ও সরল পথের দিকেদাওয়াত দিতে থাকেন। এ সময়কালের মধ্যে আল্লাহ মূসা (আঃ)-কে প্রধান ৯টিমু‘জেযা দান করেন। তবে প্লেগ মহামারী সহ (আ‘রাফ ৭/১৩৪)। মোট নিদর্শনেরসংখ্যা দাঁড়ায় ১০টি। যার মধ্যে প্রথম দু’টি শ্রেষ্ঠ মু‘জেযা ছিল অলৌকিক লাঠিও আলোকময় হস্ততালু। যার পরীক্ষা শুরুতেই ফেরাঊনের দরবারে এবং পরেজাদুকরদের সম্মুখে হয়ে গিয়েছিল। এরপর বাকীগুলি এসেছিল ফেরাঊনী কওমেরহেদায়াতের উদ্দেশ্যে তাদেরকে সাবধান করার জন্য। মূলতঃ দুনিয়াতে প্রেরিতসকল এলাহী গযবের মূল উদ্দেশ্য থাকে মানুষের হেদায়াত। যেমন আল্লাহ বলেন,ﻭَﻟَﻨُﺬِﻳﻘَﻨَّﻬُﻢْ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏِ ﺍﻟْﺄَﺩْﻧَﻰ ﺩُﻭﻥَ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏِ ﺍﻟْﺄَﻛْﺒَﺮِ ﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﻳَﺮْﺟِﻌُﻮﻥَ- ‏( ﺍﻟﺴﺠﺪﺓ ২১)- ‘কাফির ওফাসিকদেরকে(জাহান্নামের) কঠিন শাস্তির পূর্বে (দুনিয়াতে) আমরা অবশ্যই লঘু শাস্তিআস্বাদনকরাব, যাতে তারা (আমার দিকে) ফিরেআসে’ (সাজদাহ ৩২/২১)।মযলূম বনুইস্রাঈলদের কাতর প্রার্থনা এবং মূসা ও হারূণের দো‘আ আল্লাহ কবুল করেছিলেন।সেমতে সর্বপ্রথম অহংকারী ফেরাঊনী কওমের দুনিয়াবী জৌলুস ও সম্পদরাজিধ্বংসের গযব নেমে আসে। তারপর আসে অন্যান্য গযব বা নিদর্শন সমূহ। আমরাসেগুলি একে একে বর্ণনা করার প্রয়াস পাব। যাতে এযুগের মানুষ তা থেকে উপদেশহাছিল করে।মোট নিদর্শন সমূহ, যা মিসরে প্রদর্শিত হয়-(১) লাঠি (২) প্রদীপ্ত হস্ততালু (৩)দুর্ভিক্ষ (৪) তূফান (৫) পঙ্গপাল (৬) উকুন (৭) ব্যাঙ (৮) রক্ত (৯) প্লেগ (১০) সাগরডুবি।প্রথম দু’টি এবং মূসার ব্যক্তিগত তোতলামি দূর হওয়াটা বাদ দিয়ে বাকী ৮টিনিদর্শন নিম্নে বর্ণিত হ’ল-১ম নিদর্শন : দুর্ভিক্ষমূসা (আঃ)-এর দো‘আ কবুল হওয়ারপর ফেরাঊনী সম্প্রদায়ের উপরে প্রথম নিদর্শন হিসাবে দুর্ভিক্ষের গযব নেমেআসে। যেমনআল্লাহ বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺃَﺧَﺬْﻧَﺎ ﺁﻝَ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥَ ﺑِﺎﻟﺴِّﻨِﻴْﻦَ ﻭَﻧَﻘْﺺٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺜَّﻤَﺮَﺍﺕِ ﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﻳَﺬَّﻛَّﺮُﻭْﻥَ- ‏( ﺃﻋﺮﺍﻑ ১৩০)-‘তারপর আমরা পাকড়াও করলাম ফেরাঊনের অনুসারীদেরকে দুর্ভিক্ষের মাধ্যমেএবং ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতির মাধ্যমে, যাতে তারা উপদেশ হাছিল করে’ (আ‘রাফ৭/১৩০)।নিরীহ বনু ইস্রাঈলগণের উপরে দুর্ধর্ষ ফেরাঊনী যুলুম প্রতিরোধে এটা ছিলমযলূমদের সমর্থনে আল্লাহ প্রেরিত প্রথম হুঁশিয়ারী সংকেত। এর ফলেতাদেরক্ষেতের ফসল ও বাগ-বাগিচার উৎপাদন চরমভাবে হরাস পেয়েছিল।খাদ্যাভাবে তাদের মধ্যে হাহাকার পড়ে যায়। ফলে কোন উপায়ান্তর না দেখেফেরাঊনী সম্প্রদায়ের নেতারা মূসা (আঃ)-এর কাছে এসে কাকুতি-মিনতি করতেথাকে। দয়ার্দ্রচিত্ত মূসা (আঃ) অবশেষে দো‘আ করলেন। ফলে দুর্ভিক্ষ রহিত হয়েগেল এবং তাদের বাগ-বাগিচা ও মাঠ-ময়দান পুনরায় ফল-ফসলে ভরে উঠলো। কিন্তুফেরাঊনী সম্প্রদায় এতে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় না করে বরং অহংকারে স্ফীতহয়ে খোদ মূসাকেই দায়ী করে তাঁকে ‘অলক্ষুণে-অপয়া’ বলে গালি দেয় এবংউদ্ধতভাবে বলে ওঠে যে, ﻭَﻗَﺎﻟُﻮْﺍﻣَﻬْﻤَﺎ ﺗَﺄْﺗِﻨَﺎ ﺑِﻪِ ﻣِﻦْ ﺁﻳَﺔٍ ﻟِّﺘَﺴْﺤَﺮَﻧَﺎ ﺑِﻬَﺎ ﻓَﻤَﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﻟَﻚَ ﺑِﻤُﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ -‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৩২)-‘আমাদের উপরে জাদু করার জন্য তুমি যে নিদর্শনই নিয়ে আস না কেন, আমরাতোমার উপরে কোন মতেই ঈমান আনব না’ (আ‘রাফ ৭/১৩২)। আল্লাহ বলেন, ﻓَﺄَﺭْﺳَﻠْﻨَﺎﻋَﻠَﻴْﻬِﻢُﺍﻟﻄُّﻮْﻓَﺎﻥَ ﻭَﺍﻟْﺠَﺮَﺍﺩَ ﻭَﺍﻟْﻘُﻤَّﻞَ ﻭَﺍﻟﻀَّﻔَﺎﺩِﻉَ ﻭَﺍﻟﺪَّﻡَ ﺁﻳَﺎﺕٍ ﻣُّﻔَﺼَّﻼَﺕٍ ﻓَﺎﺳْﺘَﻜْﺒَﺮُﻭْﺍ ﻭَﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻗَﻮْﻣﺎً ﻣُّﺠْﺮِﻣِﻴْﻦَ -‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৩৩)-‘অতঃপর আমরাতাদের উপরে পাঠিয়ে দিলাম তূফান, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত প্রভৃতি বহুবিধনিদর্শন একের পরে এক। তারপরেও তারা অহংকার করতে থাকল। বস্ত্ততঃ তারাছিল পাপী সম্প্রদায়’ (আ‘রাফ ৭/১৩৩)। অত্র আয়াতে দুর্ভিক্ষের পরে পরপর পাঁচটিগযব নাযিলের কথা বলা হয়েছে। তারপর আসে প্লেগ মহামারী ও অন্যান্য ছোট-বড়আযাব’ (আ‘রাফ ৭/১৩৪)। এরপরে সর্বশেষ গযব হ’ল সাগরডুবি’ (ইউনুস১০/৯০)। যারমাধ্যমে এই গর্বিত অহংকারীদের একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়া হয়। হযরতআব্দুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ)-এর তাফসীর অনুযায়ী ﺁﻳَﺎﺕٌ ﻣُﻔَﺼَّﻼَﺕٌ বা ‘একের পর এক আগতনিদর্শনসমূহ’ অর্থ হ’ল, এগুলোর প্রত্যেকটি আযাবই নির্ধারিত সময় পর্যন্ত থেকেরহিত হয়ে যায় এবং কিছু দিন বিরতির পর অন্যান্য আযাবগুলি আসে’। ফেরাঊনসম্প্রদায়ের সুবিধাবাদী চরিত্র ফুটে ওঠে নিম্নোক্ত বর্ণনায়। যেমন আল্লাহবলেন, ﻭَﻟَﻤَّﺎ ﻭَﻗَﻊَ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢُ ﺍﻟﺮِّﺟْﺰُ ﻗَﺎﻟُﻮﺍْ ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺍﺩْﻉُ ﻟَﻨَﺎ ﺭَﺑَّﻚَ ﺑِﻤَﺎ ﻋَﻬِﺪَ ﻋِﻨﺪَﻙَ ﻟَﺌِﻦْ ﻛَﺸَﻔْﺖَ ﻋَﻨَّﺎ ﺍﻟﺮِّﺟْﺰَﻟَﻨُﺆْﻣِﻨَﻦَّ ﻟَﻚَ ﻭَﻟَﻨُﺮْﺳِﻠَﻦَّ ﻣَﻌَﻚَ ﺑَﻨِﻲﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ – ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻛَﺸَﻔْﻨَﺎ ﻋَﻨْﻬُﻢُ ﺍﻟﺮِّﺟْﺰَ ﺇِﻟَﻰ ﺃَﺟَﻞٍ ﻫُﻢ ﺑَﺎﻟِﻐُﻮﻩُ ﺇِﺫَﺍ ﻫُﻢْ ﻳَﻨﻜُﺜُﻮﻥَ – ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৩৪-১৩৫ )‘আরযখন তাদের উপরকোন আযাব পতিত হ’ত, তখন তারা বলত, হে মূসা! তুমি আমাদের জন্য তোমার প্রভুরনিকট দো‘আ কর, যা (কবুলের) ওয়াদা তিনি তোমাকে দিয়েছেন। যদি তুমিআমাদের উপর থেকে এ আযাব দূর করে দাও, তাহ’লে অবশ্যই আমরা তোমার উপরঈমান আনব এবং তোমার সাথে বনুইস্রাঈলদের অবশ্যই পাঠিয়ে দেব’। ‘অতঃপর যখনআমরা তাদের উপর থেকে আযাব উঠিয়ে নিতাম নির্দিষ্ট একটা সময়ে, যে পর্যন্ততাদের পৌঁছানো উদ্দেশ্য হ’ত, তখন তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করত’ (আ‘রাফ৭/১৩৪-৩৫)। এই নির্ধারিত সময়ের মেয়াদ কত ছিল, সে বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্যরয়েছে, যার প্রায় সবই ধারণা প্রসূত। অতএব আমরা তা থেকে বিরত রইলাম।এব্যাপারে কুরআনে একটি মৌলিক বক্তব্য এসেছে এভাবে যে, ﻓَﺈِﺫَﺍ ﺟَﺎﺀﺗْﻬُﻢُ ﺍﻟْﺤَﺴَﻨَﺔُ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻟَﻨَﺎﻫَـﺬِﻩِﻭَﺇِﻥْ ﺗُﺼِﺒْﻬُﻢْ ﺳَﻴِّﺌَﺔٌ ﻳَﻄَّﻴَّﺮُﻭْﺍ ﺑِﻤُﻮْﺳَﻰ ﻭَﻣَﻦ ﻣَّﻌَﻪُ ﺃَﻻَ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﻃَﺎﺋِﺮُﻫُﻢْ ﻋِﻨﺪَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﻟَـﻜِﻦَّ ﺃَﻛْﺜَﺮَﻫُﻢْ ﻻَ ﻳَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ -‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৩১)-‘যখন তাদেরশুভদিন ফিরে আসত, তখন তারা বলত যে, এটাই আমাদের জন্য উপযুক্ত। পক্ষান্তরেঅকল্যাণ উপস্থিত হ’লে তারা মূসা ও তার সাথীদের ‘অলক্ষুণে’ বলে অভিহিত করত।জেনে রাখ যে, তাদের অলক্ষুণে চরিত্র আল্লাহর ইলমে রয়েছে। কিন্তু তাদেরঅধিকাংশ তা জানে না’ (আ‘রাফ ৭/১৩১)। এতে বুঝা যায় যে, একটা গযব শেষহওয়ার পর শুভদিন আসতে এবং পিছনের ভয়াবহ দুর্দশার কথা ভুলতে ও পুনরায় গর্বেস্ফীত হ’তে নিশ্চয়ই বেশ দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হ’ত। আমরা পূর্বেই ঐতিহাসিকবর্ণনায় জেনেছি যে, জাদুকরদের সাথে পরীক্ষার পর মূসা (আঃ) বিশ বছরের মতমিসরে ছিলেন। তারপরে সাগর ডুবির গযব নাযিল হয়। অতএব জাদুকরদেরসাথেমুকাবিলার পর হ’তে সাগর ডুবি পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দুর্ভিক্ষ ওপ্লেগ সহ আয়াতে বর্ণিত আটটি গযব নাযিল হয়েছিল বলে প্রতীয়মান হয়। ইবনুআববাস(রাঃ)-এর বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে ইবনুল মুনযির যে বলেছেন যে, প্রতিটিআযাব শনিবারে এসে পরের শনিবারে চলে যেত এবং পরবর্তী আযাব আসা পর্যন্ততিন সপ্তাহের অবকাশ দেওয়া হ’ত কথাটি তাই মেনে নেওয়া মুশকিল বৈ-কি।২য়নিদর্শন : তূফানদুর্ভিক্ষের পরে মূসা (আঃ)-এর দো‘আর বরকতে পুনরায় ভরা মাঠ ওভরা ফসল পেয়ে ফেরাঊনী সম্প্রদায় পিছনের সব কথা ভুলে যায় ও গর্বে স্ফীত হয়েমূসা (আঃ)-এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটাতে থাকে। তারা সাধারণ লোকদের ঈমানগ্রহণে বাধা দিতে থাকে। তারা তাদের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে পুনরায় ঔদ্ধত্যপ্রকাশ করতে থাকে। ফলে তাদের উপরে গযব আকারে প্লাবন ও জলোচ্ছ্বাস নেমেআসে। যা তাদের মাঠ-ঘাট, বাগান-ফসল, ঘর-বাড়ি সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এতেভীত হয়ে তারা আবার মূসা (আঃ)-এর কাছে এসে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।আবারতারা ঈমান আনার প্রতিজ্ঞা করে ও আল্লাহর নিকটে দো‘আ করার জন্যমূসা (আঃ)-কে পীড়াপীড়ি করতে থাকে। ফলে মূসা (আঃ) দো‘আ করেন ও আল্লাহররহমতে তূফান চলে যায়। পুনরায় তারা জমি-জমা আবাদ করে ওঅচিরেই তা সবুজ-শ্যামল হয়ে ওঠে। এ দৃশ্য দেখে তারা আবার অহংকারী হয়ে ওঠে এবং বলতেথাকে,আসলে আমাদের জমির উৎপাদন ক্ষমতাবৃদ্ধি করার জন্যেই প্লাবন এসেছিল,আর সেকারণেই আমাদের ফসল এবার সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করেছে ও বাম্পারফলন হয়েছে। আসলে আমাদের কর্ম দক্ষতার ফল হিসাবে এটাই উপযুক্ত। এভাবেতারা অহংকারে মত্ত হয়ে আবার শুরু করল বনী ইস্রাঈলদের উপরে যুলুম-অত্যাচার।ফলে নেমে এল তৃতীয় গযব।৩য় নিদর্শন : পঙ্গপালএকদিন হঠাৎ হাযার হাযারপঙ্গপালকোত্থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে এসে ফেরাঊনীদের সব ফসল খেয়ে ছাফ করেগেল। তারা তাদের বাগ-বাগিচার ফল-ফলাদি খেয়ে সাবাড় করে ফেলল। এমনকিকাঠের দরজা-জানালা, আসবাব-পত্র পর্যন্ত খেয়ে শেষ করল। অথচ পাশাপাশি বনুইস্রাঈলদের ঘরবাড়ি, শস্যভূমি ও বাগ-বাগিচা সবই সুরক্ষিত থাকে।এবারওফেরাঊনী সম্প্রদায় ছুটে এসে মূসা (আঃ)-এর কাছে কাতর কণ্ঠেনিবেদন করতেথাকে, যাতে গযব চলে যায়। তারা এবার পাকা ওয়াদা করল যে, তারা ঈমানআনবে ও বনু ইস্রাঈলদের মুক্তি দেবে। মূসা (আঃ) দো‘আ করলেন ও আযাব চলেগেল। পরে ফেরাঊনীরা দেখল যে, পঙ্গপালে খেয়ে গেলেও এখনও যা অবশিষ্টআছে, তা দিয়ে বেশ কিছুদিন চলে যাবে। ফলে তারা আবার শয়তানী ধোঁকায়পড়ে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করল ও পূর্বের ন্যায় ঔদ্ধত্য প্রদর্শন শুরু করল। ফলে নেমে এলপরবর্তী গযব ‘উকুন’।৪র্থ নিদর্শন : উকুন‘উকুন’ সাধারণতঃ মানুষের মাথার চুলেজন্মে থাকে। তবে এখানে ব্যাপক অর্থে ঘুণ পোকা ও কেড়ি পোকাকেও গণ্য করাহয়েছে। যা ফেরাঊনীদের সকল প্রকার কাঠের খুঁটি, দরজা-জানালা, খাট-পালংকও আসবাব-পত্রে এবং খাদ্য-শস্যে লেগেছিল। তাছাড়া দেহের সর্বত্র সর্বদাউকুনের কামড়ে তারা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো। এভাবে উকুন ও ঘুণপোকার অত্যাচারেদিশেহারা হয়ে এক সময় তারা কাঁদতে কাঁদতে মূসা (আঃ)-এর দরবারে এসে লুটিয়েপড়ে ক্ষমা চাইতে লাগলো এবং প্রতিজ্ঞার পরেপ্রতিজ্ঞা করে বলতে লাগলোযে, এবারে আযাব ফিরে গেলে তারা অবশ্যই ঈমান আনবে, তাতে বিন্দুমাত্রঅন্যথা হবে না। মূসা (আঃ) তাদের জন্য দো‘আ করলেন এবং আযাব চলে গেল।কিন্তু তারা কিছু দিনের মধ্যেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করল এবং পূর্বের ন্যায় অবাধ্যআচরণ শুরু করল। আল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার অবকাশ দেওয়াকে তারা তাদেরভালত্বের পক্ষে দলীল হিসাবে মনে করতে লাগল এবং হেদায়াত দূরে থাক, তাদেরঅহংকার ক্রমে বাড়তে লাগল। মূলতঃ এগুলো ছিল তাদের নেতৃস্থানীয় লোকদেরঅবস্থা। নইলে সাধারণ মানুষ মূসা ও হারূণের দাওয়াত অন্তরে কবুল করে যাচ্ছিলএবং তাদের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আর এতেইছিল মূসা (আঃ)-এরসান্ত্বনা। আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺃَﺭَﺩْﻧَﺎ ﺃَﻥ ﻧُّﻬْﻠِﻚَ ﻗَﺮْﻳَﺔً ﺃَﻣَﺮْﻧَﺎ ﻣُﺘْﺮَﻓِﻴﻬَﺎ ﻓَﻔَﺴَﻘُﻮْﺍ ﻓِﻴﻬَﺎ ﻓَﺤَﻖَّ ﻋَﻠَﻴْﻬَﺎ ﺍﻟْﻘَﻮْﻝُﻓَﺪَﻣَّﺮْﻧَﺎﻫَﺎ ﺗَﺪْﻣِﻴﺮًﺍ-‏( ﺍﻹﺳﺮﺍﺀ ১৬)- ‘যখন আমরা কোনজনপদকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করি, তখন সেখানকারনেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে উদ্বুদ্ধ করি। অতঃপর তারা পাপাচারে লিপ্ত হয়।ফলেউক্ত জনগোষ্ঠীর উপরে আদেশ অবধারিত হয়ে যায়। অতঃপর আমরা উক্ত জনপদকেসমূলে বিধ্বস্ত করি’ (ইসরা ১৭/১৬)। ফেরাঊনীদের উপরে সেই অবস্থা এসেগিয়েছিল। তাদের নেতারা স্বাভাবিক বুদ্ধি-বিবেচনা হারিয়ে ফেলেছিল।তারা তাদের লোকদের বুঝাতে লাগলো যে, এসবই মূসার জাদুর খেল। আসলেআল্লাহ বলে কিছুই নেই। ফলে নেমে এল এবার ‘ব্যাঙ’-এর গযব।৫ম নিদর্শন :ব্যাঙবারবার বিদ্রোহ করা সত্ত্বেও দয়ালু আল্লাহ তাদের সাবধান করার জন্য ওআল্লাহর পথে ফিরিয়ে আনার জন্য পুনরায় গযব পাঠালেন। এবার এল ব্যাঙ।ব্যাঙেব্যাঙে ভরে গেল তাদের ঘর-বাড়ি, হাড়ি-পাতিল, জামা-কাপড়, বিছানা-পত্তর সবকিছু। বসতে ব্যাঙ, খেতে ব্যাঙ, চলতে ব্যাঙ, গায়ে-মাথায় সর্বত্র ব্যাঙেরলাফালাফি। কোন জায়গায় বসা মাত্র শত শত ব্যাঙের নীচে তলিয়ে যেতে হ’ত।এই নরম জীবটির সরস অত্যাচারে পাগলপরা হয়ে উঠলপুরা ফেরাঊনী জনপদ।অবশেষে কান্নাকাটি করে ও কাকুতি-মিনতি করে তারা এসে ক্ষমা প্রার্থনাকরতে লাগলো মূসা (আঃ)-এর কাছে। এবার পাকাপাকি ওয়াদা করল যে, আযাব চলেযাবার সাথে সাথে তারা ঈমান আনবেই। কিন্তু না, যথা পূর্বং তথা পরং। ফলেপুনরায় গযব অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল। এবারে এল ‘রক্ত’।৬ষ্ঠ নিদর্শন : রক্ততাদেরঅহংকার ও ঔদ্ধত্য চরমে উঠলে হঠাৎ একদিন দেখা গেল ‘রক্ত’।খাদ্য ও পানপাত্রেরক্ত, কূয়া ওপুকুরে রক্ত, তরি-তরকারিতে রক্ত,কলসি-বালতিতে রক্ত। একই সাথেখেতে বসে বনু ইস্রাঈলের থালা-বাটি স্বাভাবিক। কিন্তু ফেরাঊনী ক্বিবতীরথালা-বাটি রক্তে ভরা। পানি মুখে নেওয়া মাত্র গ্লাসভর্তি রক্ত। অহংকারীনেতারা বাধ্য হয়ে বনু ইস্রাঈলী মযলূমদের বাড়ীতে এসে খাদ্য ও পানি ভিক্ষাচাইত। কিন্তু যেমনি তাদের হাতে তা পৌঁছত, অমনি সেগুলো রক্তে পরিবর্তিতহয়ে যেত। ফলে তাদের খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। না খেয়ে তাদের মধ্যেহাহাকার পড়ে গেল। অবশেষে পূর্বের ন্যায় আবার এসে কান্নাকাটি। মূসা (আঃ)দয়া পরবশে আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করলেন। ফলে আযাব চলে গেল। কিন্তু ঐনেতাগুলো পূর্বের মতই তাদের গোমরাহীতে অনড় রইল এবং ঈমান আনলো না। এদেরএই হঠকারিতা ও কপটআচরণের কথা আল্লাহ বর্ণনা করেন এভাবে, ﻓَﺎﺳْﺘَﻜْﺒَﺮُﻭْﺍ ﻭَﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻗَﻮْﻣًﺎﻣُّﺠْﺮِﻣِﻴْﻦَ- ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৩৩)- ‘অতঃপর তারা আত্মম্ভরিতা দেখাতে লাগলো। বস্ত্ততঃ এরাছিল পাপাসক্ত জাতি’ (আ‘রাফ ৭/১৩৩)। ফলে নেমে এল এবার প্লেগ মহামারী।৭মনিদর্শন : প্লেগরক্তের আযাব উঠিয়ে নেবার পরও যখন ওরা ঈমান আনলো না, তখনআল্লাহ ওদের উপরে প্লেগ মহামারীপ্রেরণ করেন (আ‘রাফ ৭/১৩৪)। অনেকেএটাকে‘বসন্ত’ রোগ বলেছেন। যাতে অল্প দিনেই তাদের সত্তর হাযার লোক মারা যায়।অথচ বনু ইস্রাঈলরা ভাল থাকে। এলাহী গযবের সাথে সাথে এগুলি ছিল মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযা এবং নবুঅতের নিদর্শন। কিন্তু জাহিল ও আত্মগর্বী নেতারা একে‘জাদু’ বলে তাচ্ছিল্য করত।প্লেগের মহামারীর ফলে ব্যাপক প্রাণহানিতে ভীতহয়ে তারা আবারএসে মূসা (আঃ)-এর নিকটে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে লাগল।মূসা (আঃ) আবারও তাদের জন্য দো‘আ করলেন। ফলে আযাব চলে গেল। কিন্তু তারাপূর্বের ন্যায় আবারো ওয়াদা ভঙ্গ করল। ফলে তাদের চূড়ান্ত ধ্বংস অবধারিত হয়েগেল। আল্লাহবলেন, ﺇِﻥَّ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺣَﻘَّﺖْ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﻛَﻠِﻤَﺖُ ﺭَﺑِّﻚَ ﻻَ ﻳُﺆْﻣِﻨُﻮْﻥَ- ﻭَﻟَﻮْ ﺟَﺎﺀﺗْﻬُﻢْ ﻛُﻞُّ ﺁﻳَﺔٍ ﺣَﺘَّﻰﻳَﺮَﻭُﺍ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏَ ﺍﻷَﻟِﻴْﻢَ – ‏( ﻳﻮﻧﺲ৯৬-৯৭)- ‘নিশ্চয়ই যাদের উপরে তোমার প্রভুর আদেশ নির্ধারিত হয়ে গেছে, তারাকখনো বিশ্বাস আনয়ন করে না, যদিও সব রকমের নিদর্শনাবলী তাদের নিকটেপৌছে যায়, এমনকি তারা মর্মান্তিক আযাব প্রত্যক্ষ করে’ (ইউনুস ১০/৯৬-৯৭)।৮মনিদর্শন : সাগর ডুবিক্রমাগত পরীক্ষা ও অবকাশ দানের পরও যখন কোন জাতিসম্বিত ফিরে পায় না। বরং উল্টা তাদের অহংকার বাড়তে বাড়তে তুঙ্গে ওঠে,তখন তাদের চূড়ান্ত ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। আল্লাহ পাক বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺃَﻭْﺣَﻴْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻰ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺃَﻥْﺃَﺳْﺮِ ﺑِﻌِﺒَﺎﺩِﻱ ﻓَﺎﺿْﺮِﺏْ ﻟَﻬُﻢْ ﻃَﺮِﻳﻘﺎً ﻓِﻲ ﺍﻟْﺒَﺤْﺮِ ﻳَﺒَﺴﺎً ﻻَّ ﺗَﺨَﺎﻑُ ﺩَﺭَﻛﺎً ﻭَّﻻَ ﺗَﺨْﺸَﻰ – ‏( ﻃﻪ ৭৭)-‘আমরা মূসারপ্রতি এই মর্মেঅহী করলাম যে, আমার বান্দাদের নিয়ে রাত্রিযোগে বের হয়ে যাও এবং তাদেরজন্য সমুদ্রে শুষ্কপথ নির্ধারণ কর। পিছন থেকে এসে তোমাদের ধরে ফেলারআশংকা কর না এবং (পানিতে ডুবে যাওয়ার) ভয় কর না’ (ত্বোয়াহা ২০/৭৭)।আল্লাহর হুকুম পেয়ে মূসা (আঃ) রাত্রির সূচনা লগ্নে বনু ইস্রাঈলদের নিয়েরওয়ানা হ’লেন। তাঁরা সমুদ্রের দিকে রওয়ানা হয়ে গেলেন। এ সমুদ্র কোনটা ছিল এব্যাপারে মুফতী মুহাম্মাদ শফী তাফসীর রূহুল মা‘আনীর বরাত দিয়ে ৮৬০ পৃষ্ঠায়লিখেছেন যে, ওটা ছিল ‘ভূমধ্যসাগর’।[30] একই তাফসীরে ৪৭৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন‘লোহিত সাগর’। কিন্তু মাওলানা মওদূদী খ্যাতনামা পাশ্চাত্য মনীষী লুইসগোল্ডিং-এর তথ্যানুসন্ধান মূলক ভ্রমণ কাহিনী IN THE STEPS OF MOSSES, THE LAWGIVER -এর বরাতে লিখেছেন যে, ওটা ছিল ‘লোহিতসাগর সংলগ্ন তিক্ত হরদ’।মিসরের আধুনিক তাফসীরকার তানতাভীও (মৃঃ১৯৪০ খৃঃ) বলেন যে, লোহিত সাগরেডুবে মরা ফেরাঊনের লাশ ১৯০০ খৃষ্টাব্দের মে মাসে পাওয়া গিয়েছিল’।[31] যদিওতা ১৯০৭ সালেপাওয়া যায়।[32]উল্লেখ্য যে, হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর বারো জন পুত্রমিসরে এসেছিলেন। পরবর্তী চারশত বছরে তাদের বংশ বৃদ্ধি পেয়ে ইস্রাঈলীবর্ণনা অনুযায়ী ছয় লাখ ৩০ হাযার ছাড়িয়ে যায়। মাওলানা মওদূদী বলেন, ঐ সময়মিসরে মুসলিম অধিবাসীর সংখ্যা ছিল ১০ থেকে ২০ শতাংশের মাঝামাঝি।[33]তবে কুরআন ও হাদীছথেকে কেবল এতটুকু জানা যায় যে, তাদের বারোটি গোত্রছিল এবং প্রত্যেক গোত্রের জনসংখ্যা ছিল বিপুল।নবুঅত-পরবর্তী ৩য় পরীক্ষা ওনাজাত লাভমূসার নবুঅতী জীবনে এটি ছিল একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা। ইবরাহীমেরঅগ্নি পরীক্ষার ন্যায় এটিও ছিল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক মহা পরীক্ষা। পিছনেফেরাঊনের হিংস্র বাহিনী, সম্মুখে অথৈ সাগর। এই কঠিন সময়ে বনু ইস্রাঈলেরআতংক ও হাহাকারের মধ্যেও মূসা ছিলেন স্থির ও নিস্কম্প। দৃঢ় হিমাদ্রির ন্যায়তিনি আল্লাহর উপরে বিশ্বাসে অটল থাকেন এবং সাথীদের সান্ত্বনা দিয়েআল্লাহর রহমত কামনা করেন। হিজরতের রাতে একইরূপ জীবন-মরণ পরীক্ষারসম্মুখীন হয়েছিলেন শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)।যাই হোক ফেরাঊন খবর জানতেপেরে তার সেনাবাহিনীকে বনু ইস্রাঈলদের পশ্চাদ্ধাবনের নির্দেশ দিল।আল্লাহ বলেন, ﻓَﺄَﺗْﺒَﻌُﻮﻫُﻢ ﻣُّﺸْﺮِﻗِﻴﻦَ- ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺗَﺮَﺍﺀﻯ ﺍﻟْﺠَﻤْﻌَﺎﻥِ ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺻْﺤَﺎﺏُ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻤُﺪْﺭَﻛُﻮﻥَ – ﻗَﺎﻝَﻛَﻼَّ ﺇِﻥَّ ﻣَﻌِﻲَ ﺭَﺑِّﻲ ﺳَﻴَﻬْﺪِﻳﻦِ -ﻓَﺄَﻭْﺣَﻴْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻰ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺃَﻥِ ﺍﺿْﺮِﺏْ ﺑِﻌَﺼَﺎﻙَ ﺍﻟْﺒَﺤْﺮَ ﻓَﺎﻧﻔَﻠَﻖَ ﻓَﻜَﺎﻥَ ﻛُﻞُّ ﻓِﺮْﻕٍ ﻛَﺎﻟﻄَّﻮْﺩِ ﺍﻟْﻌَﻈِﻴﻢِ – ﻭَﺃَﺯْﻟَﻔْﻨَﺎ ﺛَﻢَّﺍﻟْﺂﺧَﺮِﻳﻦَ- ﻭَﺃَﻧﺠَﻴْﻨَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻭَﻣَﻦ ﻣَّﻌَﻪُﺃَﺟْﻤَﻌِﻴﻦَ – ﺛُﻢَّ ﺃَﻏْﺮَﻗْﻨَﺎ ﺍﻟْﺂﺧَﺮِﻳﻦَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ ৬০-৬৬)-‘সূর্যোদয়ের সময় তারা তাদের পশ্চাদ্ধাবনকরল’ (শো‘আরা ২৬/৬০)।‘অতঃপর যখন উভয় দল পরস্পরকে দেখল, তখন মূসার সঙ্গীরা(ভীত হয়ে) বলল, ﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻤُﺪْﺭَﻛُﻮﻥَ ‘আমরা তো এবার নিশ্চিত ধরা পড়ে গেলাম’ (৬১)। ‘তখনমূসা বললেন, কখনই নয়, আমার সাথে আছেন আমার পালনকর্তা।তিনি আমাকেসত্বর পথ প্রদর্শন করবেন’(৬২)। ‘অতঃপর আমরা মূসাকে আদেশ করলাম, তোমারলাঠি দ্বারা সমুদ্রকে আঘাত কর। ফলে তা বিদীর্ণ হয়ে গেল এবং প্রত্যেক ভাগবিশাল পাহাড় সদৃশ হয়ে গেল’(৬৩)। ‘ইতিমধ্যে আমরা সেখানে অপরদলকে (অর্থাৎফেরাঊন ও তার সেনাবাহিনীকে) পৌঁছে দিলাম’(৬৪)।‘এবং মূসা ও তার সঙ্গীদেরসবাইকে বাঁচিয়ে দিলাম’(৬৫)। ‘অতঃপর অপর দলটিকে ডুবিয়ে দিলাম’ (শো‘আরা২৬/৬০-৬৬)।এখানে ‘প্রত্যেক ভাগ’ বলতে তাফসীরকারগণ বারো গোত্রের জন্যবারোটি ভাগ বলেছেন। প্রত্যেক ভাগের লোকেরা পানির দেওয়াল ভেদকরেপরস্পরকে দেখতে পায় ও কথা বলতে পারে, যাতে তারা ভীত না হয়ে পড়ে। আমরামনে করি এগুলো কল্পনা না করলেও চলে। বরং উপরে বর্ণিত কুরআনী বক্তব্যেরউপরে ঈমান আনাই যথেষ্ট। সাড়ে ছয় লক্ষ লোক এবং তাদের সওয়ারী ও গবাদি পশুও সাংসারিক দ্রব্যাদিনিয়ে নদী পার হবার জন্য যে বিরাট এলাকা প্রয়োজন,সেই এলাকাটুকু বাদে দু’পাশে দু’ভাগে যদি সাময়িকভাবে পানি দাঁড়িয়ে থাকে,তবে সেটাতে বিশ্বাস করাই শ্রেয়। ২০০৪ সালের ২৬শে ডিসেম্বরে ইন্দোনেশিয়াও শ্রীলংকার সাগরে যে ‘সুনামী’ (TSUNAMI) হয়ে গেল, তাতে ৩৩ ফুট উঁচু ঢেউ দীর্ঘসময় যাবত দাঁড়িয়ে ছিল বলে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। তাই মূসার যামানায়সাগর বিদীর্ণ হয়ে তলদেশ থেকে দু’পাশে পানি দাঁড়িয়ে থাকা মোটেই বিচিত্রনয়। আল্লাহর হুকুমে সবকিছুই হওয়া সম্ভব।মূসা ও বনু ইস্রাঈলকে সাগর পাড়ি দিয়েওপারে চলে যেতে দেখে ফেরাঊন সরোষে ঘোড়া দাবড়িয়ে সর্বাগ্রে শুষ্ক সাগরবক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পিছনে তার বিশাল বাহিনীর সবাই সাগরের মধ্যে নেমেএলো। যখন তারা সাগরের মধ্যস্থলে পৌঁছে গেল, তখন আল্লাহর হুকুমে দু’দিক থেকেবিপুল পানি রাশি ধেয়ে এসে তাদেরকে নিমেষে গ্রাস করে ফেলল।আল্লাহ বলেন,ﻓَﺄَﺗْﺒَﻌَﻬُﻢْ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥُ ﺑِﺠُﻨُﻮﺩِﻩِ ﻓَﻐَﺸِﻴَﻬُﻢ ﻣِّﻦَ ﺍﻟْﻴَﻢِّ ﻣَﺎ ﻏَﺸِﻴَﻬُﻢْ – ‏( ﻃﻪ ৭৮)- ‘অতঃপর ফেরাঊন তারসৈন্যবাহিনীনিয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল। কিন্তু সমুদ্র তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করেফেলল’ (ত্বোয়াহা ২০/৭৮)।অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ﻭَﺟَﺎﻭَﺯْﻧَﺎ ﺑِﺒَﻨِﻲ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ ﺍﻟْﺒَﺤْﺮَ ﻓَﺄَﺗْﺒَﻌَﻬُﻢْﻓِﺮْﻋَﻮْﻥُ ﻭَﺟُﻨُﻮﺩُﻩُ ﺑَﻐْﻴﺎًﻭَﻋَﺪْﻭﺍًﺣَﺘَّﻰ ﺇِﺫَﺍ ﺃَﺩْﺭَﻛَﻪُ ﺍﻟْﻐَﺮَﻕُ ﻗَﺎﻝَ ﺁﻣَﻨﺖُ ﺃَﻧَّﻪُ ﻵ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻻَّ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺁﻣَﻨَﺖْ ﺑِﻪِ ﺑَﻨُﻮ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺴْﻠِﻤِﻴﻦَ- ‏( ﻳﻮﻧﺲ ৯০)-‘আর বনুইস্রাঈলকে আমরা সাগর পার করে দিলাম। তারপর তাদের পশ্চাদ্ধাবন করলফেরাঊন ও তার সেনাবাহিনী বাড়াবাড়ি ও শত্রুতা বশতঃ। অতঃপর যখন সে(ফেরাঊন) ডুবতে লাগল, তখন বলে উঠল, আমি ঈমান আনছি এ বিষয়ে যে, সেই সত্তাব্যতীত কোন উপাস্য নেই, যার উপরে ঈমান এনেছে বনু ইস্রাঈলগণ এবং আমিআত্মসমর্পণকারীদের একজন’ (ইউনুস১০/৯০)। আল্লাহ বললেন, ﺁﻵﻥَ ﻭَﻗَﺪْ ﻋَﺼَﻴْﺖَ ﻗَﺒْﻞُﻭَﻛُﻨﺖَ ﻣِﻦَﺍﻟْﻤُﻔْﺴِﺪِﻳﻦَ- ﻓَﺎﻟْﻴَﻮْﻡَ ﻧُﻨَﺠِّﻴﻚَ ﺑِﺒَﺪَﻧِﻚَ ﻟِﺘَﻜُﻮﻥَ ﻟِﻤَﻦْ ﺧَﻠْﻔَﻚَ ﺁﻳَﺔً ﻭَﺇِﻥَّ ﻛَﺜِﻴﺮﺍً ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﻋَﻦْ ﺁﻳَﺎﺗِﻨَﺎ ﻟَﻐَﺎﻓِﻠُﻮﻥَ -‏( ﻳﻮﻧﺲ ৯১-৯২)- ﺁﻵﻥ ‘এখন একথাবলছ? অথচ তুমি ইতিপূর্বে না-ফরমানী করেছিলে এবং ফাসাদ সৃষ্টিকারীদেরঅন্তর্ভুক্ত ছিলে’। ‘অতএব আজ আমরা তোমার দেহকে (বিনষ্ট হওয়া থেকে) বাঁচিয়েদিচ্ছি। যাতে তোমার পশ্চাদ্বর্তীদের জন্য তুমি নিদর্শন হ’তে পার। বস্ত্ততঃ বহুলোক এমন রয়েছে যারা আমাদের নিদর্শনাবলীর বিষয়ে বেখবর’ (ইউনুস ১০/৯১-৯২)।স্মর্তব্য যে, সাগরডুবির দৃশ্য স্বচক্ষে দেখার পরেও ভীত-সন্ত্রস্ত বনু ইস্রাঈলীরাফেরাঊন মরেছে কি-না বিশ্বাস করতে পারছিল না। ফলে মূসা (আঃ) আল্লাহরনিকট দো‘আ করলেন। তখন আল্লাহ তার প্রাণহীন দেহ বের করে দিলেন। অতঃপরমূসার সাথীরা নিশ্চিন্ত হ’ল।[34]উল্লেখ্য যে, ফেরাঊনের মমিকৃত দেহ অক্ষতভাবেপাওয়া যায় ১৯০৭সালে এবং বর্তমানে তা মিসরের পিরামিডে রক্ষিত আছে।এতেএকথাও প্রমাণিত হয় যে, ফেরাঊনের সময় মিসরীয় সভ্যতা অনেক উন্নত ছিল।তাদের সময়ে লাশ ‘মমি’ করার মত বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল আবিষ্কৃত হয়।পিরামিড,স্ফিংক্স হাযার হাযার বছর ধরে আজও সেই প্রাচীন সভ্যতারস্মৃতিধারণ করে আছে, যা নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। আজকের যুগের কোন কারিগরপ্রাচীন এসব কারিগরী কলা-কৌশলের ধারে-কাছেও যেতে পারবে কি-না সন্দেহ।আশূরার ছিয়াম :ফেরাঊনের সাগরডুবি ও মূসার মুক্তি লাভের এ অলৌকিক ঘটনাটিঘটেছিল ১০ই মুহাররম আশূরার দিন।এ দিনের স্মরণে আল্লাহর শুকরিয়া স্বরূপ মূসা(আঃ) ও বনু ইস্রাঈলগণ প্রতি বছর এ দিন একটি নফল ছিয়াম পালন করেন। এই ছিয়ামযুগ যুগ ধরে চলে আসছে। জাহেলী আরবেও এ ছিয়াম চালু ছিল। নবুঅত-পূর্ব কালে ওপরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আশূরার ছিয়াম রাখতেন। ২রা হিজরীতে রামাযানেরছিয়াম ফরয হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আশূরার ছিয়াম মুসলমানদের জন্য ‘ফরয’ ছিল। এরপরেএটি নফল ছিয়ামে পরিণত হয়।[35] হিজরতের পর মদীনায় ইহুদীদের এ ছিয়াম পালনকরতে দেখে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আমরাই মূসা (আঃ)-এর নাজাতে শুকরিয়াআদায় করার অধিক হকদার। আগামী বছর বেঁচে থাকলে আমি ৯ তারিখে (অর্থাৎ ৯ও ১০ দু’দিন) ছিয়াম পালন করব’।[36] অন্য হাদীছে ১০ ও ১১ দু’দিন ছিয়াম পালনেরকথাও এসেছে।[37] অতএব নাজাতে মূসার শুকরিয়া আদায়ের নিয়তে নফল ছিয়ামহিসাবে ১০ তারিখ সহ উক্ত দু’দিন অথবা কেবল ১০ই মুহাররম তারিখে আশূরারছিয়াম পালন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কর্তব্য। এ ছিয়ামের ফলে মুমিনেরবিগত এক বছরের সকল ছগীরা গুনাহ মাফ হয়ে যাবার কথা হাদীছে এসেছে।[38]উল্লেখ্য যে, ১০ই মুহাররম তারিখে পৃথিবীতে আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ন্যায় ৬১হিজরী সনে হযরত হোসায়েন (রাঃ)-এর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনাও ঘটেছে।কিন্তু সেজন্য নফলছিয়াম পালনের বা কোন অনুষ্ঠান বা দিবস পালনের বিধানইসলামে নেই। অতএব আশূরার ছিয়াম পালনেরনিয়ত হবে ‘নাজাতে মূসার শুকরিয়া’হিসাবে, ‘শাহাদাতে হোসায়েন-এর শোক’ হিসাবে নয়। এরূপ নিয়ত করলে নেকীরবদলে গোনাহ হবে।বনু ইস্রাঈলের পরবর্তী গন্তব্য:আল্লাহ বলেন, ﻓَﺎﻧﺘَﻘَﻤْﻨَﺎ ﻣِﻨْﻬُﻢْﻓَﺄَﻏْﺮَﻗْﻨَﺎﻫُﻢْ ﻓِﻲﺍﻟْﻴَﻢِّ ﺑِﺄَﻧَّﻬُﻢْ ﻛَﺬَّﺑُﻮْﺍ ﺑِﺂﻳَﺎﺗِﻨَﺎ ﻭَﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻋَﻨْﻬَﺎ ﻏَﺎﻓِﻠِﻴْﻦَ – ﻭَﺃَﻭْﺭَﺛْﻨَﺎ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡَ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻨَﻜَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳُﺴْﺘَﻀْﻌَﻔُﻮْﻥَ ﻣَﺸَﺎﺭِﻕَ ﺍﻷَﺭْﺽِﻭَﻣَﻐَﺎﺭِﺑَﻬَﺎ ﺍﻟَّﺘِﻲْ ﺑَﺎﺭَﻛْﻨَﺎ ﻓِﻴﻬَﺎ ﻭَﺗَﻤَّﺖْ ﻛَﻠِﻤَﺖُﺭَﺑِّﻚَ ﺍﻟْﺤُﺴْﻨَﻰ ﻋَﻠَﻰ ﺑَﻨِﻲ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ ﺑِﻤَﺎ ﺻَﺒَﺮُﻭْﺍ ﻭَﺩَﻣَّﺮْﻧَﺎ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﻳَﺼْﻨَﻊُ ﻓِﺮْﻋَﻮْﻥُ ﻭَﻗَﻮْﻣُﻪُ ﻭَﻣَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻌْﺮِﺷُﻮْﻥَ- ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৩৬-১৩৭)-‘ফলেআমরা তাদের কাছ থেকে (অর্থাৎ ফেরাঊনীদের কাছ থেকে) বদলা নিলাম ওতাদেরকে সাগরে ডুবিয়ে মারলাম। কারণ তারা মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলআমাদের নিদর্শন সমূহকে ও তার প্রতি অনীহা প্রদর্শন করেছিল’। ‘আর যাদেরকেদুর্বল মনে করা হ’ত, তাদেরকে আমরা উত্তরাধিকার দান করলাম সেই ভূখন্ডেরপূর্বের ও পশ্চিমের, যাতে আমরা বরকত নিহিত রেখেছি এবং এভাবে পূর্ণ হয়েগেল তোমার প্রভুর (প্রতিশ্রুত) কল্যাণময় বাণীসমূহ বনু ইস্রাঈলীদের জন্য তাদেরধৈর্যধারণের কারণে। আর ধ্বংস করে দিলাম সে সবকিছু, যা তৈরী করেছিলফেরাঊন ও তার সম্প্রদায়এবং যা কিছু তারা নির্মাণ করেছিল’ (আ‘রাফ৭/১৩৬-১৩৭)।উপরোক্ত আয়াত দু’টিতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি পরিস্ফূট হয়। (১)অহংকার ও সীমালংঘনের কারণে ফেরাঊন ও তার সাথীদেরকে ডুবিয়ে মারা হয়এবং তাদের সভ্যতার সুউচ্চ নির্মাণাদি ধ্বংস হয় (২) আল্লাহর উপরে পূর্ণ আস্থা ওফেরাউনের যুলুমে ধৈর্যধারণের পুরস্কার হিসাবে বনু ইস্রাঈলগণকে উদয়াচল ওঅস্তাচল সমূহের উপরে কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়। (৩) এখানে ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳُﺴْﺘَﻀْﻌَﻔُﻮﻥَ‘যাদেরকেহীন মনে করা হয়েছিল’ বলা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আল্লাহতা‘আলা যে জাতির বা যে ব্যক্তির সহায় থাকেন, বাহ্যিক অবস্থাদৃষ্টে লোকেরাতাদের দুর্বল ভেবে বসে। কিন্তু আসলে তারা মোটেই হীন ও দুর্বল নয়। কারণ প্রকৃতশক্তি ও মর্যাদা সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর হাতে। এখানে বাহ্যিক দৃষ্টিতে ফেরাঊনসবল হ’লেও আল্লাহর সাহায্য পাওয়ায় বনু ইস্রাঈলগণ অবশেষে বিজয়ী হয়েছে। একারণে হযরত হাসান বছরী বলেন, অত্র আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে এ বিষয়ে যে, মানুষযদি এমন কোন লোক বা দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয়, যাকে প্রতিহত করাতার ক্ষমতার বাইরে, তবে সে ক্ষেত্রে কৃতকার্যতা ও কল্যাণের সঠিক পথ হ’ল তারমুকাবিলা না করে ছবর করা।কেননা যখন সে যুলুমের পাল্টা যুলুমের মাধ্যমেপ্রতিশোধ নেবার চিন্তা করে, আল্লাহ তখন তাকে তার শক্তি-সামর্থ্যেরউপরেছেড়ে দেন। পক্ষান্তরে যখন সে তার মুকাবিলায় ছবর করে এবং আল্লাহরসাহায্য প্রার্থনা করে,তখন আল্লাহ স্বয়ং তার জন্য রাস্তা খুলে দেন’।বনুইস্রাঈলগণ মূসা (আঃ)-এর পরামর্শে আল্লাহর নিকটে প্রার্থনা করেছিল, ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﻻَ ﺗَﺠْﻌَﻠْﻨَﺎﻓِﺘْﻨَﺔً ﻟِّﻠْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴﻦَ، ﻭَﻧَﺠِّﻨَﺎ ﺑِﺮَﺣْﻤَﺘِﻚَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟْﻜَﺎﻓِﺮِﻳﻦَ ‘হে আমাদের পালনকর্তা!আমাদেরকে এ যালেমকওমের ফেৎনায় নিক্ষেপ করো না’। ‘এবং আমাদেরকে অনুগ্রহ করে কাফেরসম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দাও’ (ইউনুস ১০/৮৫-৮৬)। বস্ত্ততঃ আল্লাহ তাদেরপ্রার্থনা কবুল করেছিলেন এবং যথাসময়ে তাদের মুক্তি দিয়েছিলেন।এক্ষণেপ্রশ্ন হ’ল, সাগরডুবি থেকে নাজাত পেয়েই কি বনু ইস্রাঈলগণ মিসরে প্রত্যাবর্তনকরল এবং ফেরাঊনের অট্টালিকা সমূহ ধ্বংস করে ফেরাঊনী রাজত্বের মালিকবনে গেল? এ ব্যাপারে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে উল্লেখিত এতদসংক্রান্ত আয়াতসমূহে প্রমাণিত হয় যে, মূসা (আঃ) ও বনু ইস্রাঈলগণ ঐসময় মিসরে ফিরে যাননি।বরং তাঁরা আদি বাসস্থান কেন‘আনের উদ্দেশ্যে শাম-এর দিকে রওয়ানাহয়েছিলেন। অতঃপর পথিমধ্যে তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয় জিহাদ করে তাদেরআদি বাসস্থান কেন‘আন দখল করার জন্য। সেখানে তখন আমালেক্বাদের রাজত্বছিল। যারা ছিল বিগত ‘আদ বংশের লোক এবং বিশালদেহী ও দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। নবীমূসার মাধ্যমে আল্লাহ তাদের আগাম বিজয়ের সুসংবাদ দেন। তথাপি তারা ভীতহয় এবং জিহাদে যেতে অস্বীকার করে। শক্তিশালী ফেরাঊন ও তার বিশালবাহিনীর চাক্ষুস ধ্বংস দেখেও তারা আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করতেপারেনি। ফলে আল্লাহর অবাধ্যতার শাস্তিস্বরূপ মিসর ও শামের মধ্যবর্তী তীহ্প্রান্তরের উন্মুক্ত জেলখানায় তারা ৪০ বছর অবরুদ্ধ জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্যহয় এবং সেখানে থাকা অবস্থাতেই হারূণ ও মূসা (আঃ)-এর মৃত্যু হয়।পরবর্তীতেমূসা (আঃ)-এর শিষ্য ও পরবর্তী নবী ইউশা‘ বিন নূন-এর নেতৃত্বে তারা জিহাদেঅগ্রসর হয় এবং তার মাধ্যমে আমালেক্বাদের হারিয়ে কেন‘আন দখল করে তারাতাদের আদি বাসস্থানে ফিরে আসে। এভাবে আল্লাহর ওয়াদা সত্যে পরিণত হয়।উল্লেখ্য যে, আলোচ্য সূরা আ‘রাফ ১৩৬-৩৭ আয়াত ছাড়াও শো‘আরা ৫৯, ক্বাছাছ ৫ও দুখান ২৫-২৮ আয়াত সমূহে বাহ্যতঃ ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বনু ইস্রাঈলগণকেফেরাঊনীদের পরিত্যক্ত সম্পদ সমূহের মালিক করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে এবিষয়েরও সুস্পষ্ট অবকাশ বিদ্যমান রয়েছে যে, বনু ইস্রাঈলগণকে ফেরাঊনীদেরন্যায় বাগ-বাগিচা ওধন-সম্পদের মালিক করা হয়েছিল। এর জন্য তাদের মিসরেপ্রত্যাবর্তন করা যরূরী নয়। বরং অনুরূপ বাগ-বাগিচা শাম দেশেও অর্জিত হ’তেপারে। সূরা আ‘রাফের আলোচ্য ১৩৭ আয়াতে ‘যাতে আমরা বরকত নিহিত রেখেছি’বলে শাম দেশকে বুঝানো হয়েছে। একই বাক্যসূরা বনু ইস্রাঈলের ১ম আয়াতেও বলাহয়েছে। সেকারণ ক্বাতাদাহ বলেন, উপরোক্ত মর্মের সকল আয়াতে শাম দেশকেবুঝানো হয়েছে। যেখানে গিয়ে বনু ইস্রাঈলগণ দুনিয়াবী শান-শওকতের মালিকহয়। পূর্বের ও পশ্চিমের বলে শামের চারপাশ বুঝানো হয়েছে। হ’তে পারে এসময়মাশারেক্ব ও মাগারেব (পূর্ব ও পশ্চিম) তথা শাম ও মিসর উভয় ভূখন্ডের উপরেতাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।[39]প্রশ্ন হয়, ফেরাঊন ও তার সেনাবাহিনী সমূলেধ্বংস হওয়ার পরও হযরত মূসা (আঃ) কেন মিসরে ফিরে গিয়ে তার সিংহাসন দখলকরে বনু ইস্রাঈলের শাসন প্রতিষ্ঠা করলেন না? এর জবাব প্রথমতঃ এটাই যে, এব্যাপারে তিনি আল্লাহর নির্দেশ পাননি। দ্বিতীয়তঃ তাঁর দূরদর্শিতায় হয়তএটাই প্রতীয়মান হয়েছিল যে, রাজনৈতিক বিজয়ের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থে দ্বীনেরবিজয় সম্ভব নয়। তাছাড়া দ্বীনের প্রচার-প্রসারের জন্য রাজনৈতিক সীমানাশর্ত নয়; বরং তা অঞ্চলগতসীমানা পেরিয়ে সর্বত্র প্রচার আবশ্যক। তাই তিনিমিসর এলাকায় দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব পালন শেষে এবার শাম এলাকায় দ্বীনপ্রচারের সিদ্ধান্ত নেন। তৃতীয়তঃ এটা হ’তে পারে যে, নবীগণের পিতা ইবরাহীম(আঃ) সহ বনু ইস্রাঈলের মূল ব্যক্তি হযরতইয়াকূব (আঃ) ও অন্যান্যনবীগণেরজন্মস্থান শাম এলাকার বরকতমন্ডিত অঞ্চলে জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোব্যয় করার সুপ্ত বাসনা তাঁর মধ্যে কাজ করে থাকতে পারে। বস্ত্ততঃ আল্লাহ পাকতাঁরমৃত্যুর জন্য কেন‘আনের মাটিকেই নির্ধারিত করেছিলেন এবং সেখানেই তিনিমৃত্যুবরণ করেন। বায়তুল মুক্বাদ্দাসের উপকণ্ঠে একটি লাল ঢিবি দেখিয়ে শেষনবীমুহাম্মাদ (ছাঃ) তাঁর কবরনির্দেশ করেছিলেন।[40]উপরোক্ত আলোচনারউপসংহারে আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে, সাগরডুবি থেকে নাজাতপাবার পর মূসা (আঃ) ও বনু ইস্রাঈলগণ তখনই মিসরে ফিরে যাননি। বরং তারাকেন‘আনের উদ্দেশ্যে শাম অভিমুখেরওয়ানা হয়েছিলেন। শামে যাত্রাপথে এবংসেখানে পৌঁছে তাদেরকে নানাবিধ পরীক্ষার সম্মুখীন হ’তে হয়। এক্ষণে আমরাসেদিকে মনোনিবেশ করব।বনু ইস্রাঈলের অবাধ্যতা ও তাদেরউপরে আপতিতপরীক্ষা সমূহের বিবরণ:১. মূর্তি পূজার আবদারবনু ইস্রাঈল কওম মূসা (আঃ)-এরমু‘জেযার বলে লোহিত সাগরে নির্ঘাত ডুবে মরা থেকে সদ্য নাজাত পেয়েএসেছিল এবং গোটা ফেরাঊনী গোষ্ঠীকে সাগরে ডুবে মরার মর্মান্তিক দৃশ্যস্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করে এসেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও সিরিয়া আসার পথে কিছুদূরঅগ্রসর হ’তেই তারা এমন এক জনপদের উপর দিয়ে অতিক্রম করল, যারা বিভিন্নমূর্তির পূজায় লিপ্ত ছিল। তাদের পূজা-অর্চনার জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান দেখেতাদের মন সেদিকে আকৃষ্ট হ’ল এবং মূসা (আঃ)-এর কাছে গিয়ে আবেদন করল, ﺍﺟْﻌَﻞ ﻟَّﻨَﺎﺇِﻟَـﻬﺎً ﻛَﻤَﺎ ﻟَﻬُﻢْ ﺁﻟِﻬَﺔٌ ‘তাদের মূর্তিসমূহের ন্যায় আমাদের জন্যও একটা মূর্তি বানিয়ে দিন’।মূসা বললেন, ﺇِﻧَّﻜُﻢْ ﻗَﻮْﻡٌ ﺗَﺠْﻬَﻠُﻮﻥَ ‘তোমরা দেখছি মূর্খতায় লিপ্ত জাতি’। তিনি বলেন, ﺇِﻥَّﻫَـﺆُﻻﺀ ﻣُﺘَﺒَّﺮٌ ﻣَّﺎ ﻫُﻢْ ﻓِﻴﻪِ ﻭَﺑَﺎﻃِﻞٌ ﻣَّﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻌْﻤَﻠُﻮﻥَ ‘এরা যে কাজে নিয়োজিত রয়েছে, তা ধ্বংসহবেএবং যা কিছু তারা করছে, তা সব বাতিল’। ‘তিনি আরও বললেন, ﺃَﻏَﻴْﺮَ ﺍﻟﻠﻪِ ﺃَﺑْﻐِﻴْﻜُﻢْ ﺇِﻟَـﻬﺎً‘আমি কি তোমাদেরজন্য আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য সন্ধান করব? অথচ তিনিতোমাদেরকে সারা বিশ্বের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন’ (আ‘রাফ ৭/১৩৮-১৪০)।বস্ত্ততঃ মানুষ সর্বদা আনুষ্ঠানিকতা প্রিয় এবং অদৃশ্য সত্তার চেয়ে দৃশ্যমানবস্ত্তর প্রতি অধিকতর আসক্ত। ফলে নূহ (আঃ)-এর যুগ থেকেই অদৃশ্যআল্লাহর নৈকট্যহাছিলের অসীলা কল্পনা করে নিজেদের হাতে গড়া দৃশ্যমান মূর্তি সমূহের পূজা-অর্চনা চলে আসছে। অবশেষে আল্লাহ্কে ও তাঁর বিধানকে ভুলে গিয়ে মানুষমূর্তিকে ও নিজেদেরমনগড়া বিধানকে মুখ্য গণ্য করেছে। মক্কার মুশরিকরাওশেষনবীর কাছে তাদের মূর্তিপূজাকে আল্লাহর নৈকট্যের অসীলা বলে অজুহাতদিয়েছিল’ (যুমার ৩৯/৩)। তাদের এইঅজুহাত অগ্রাহ্য হয় এবং তাদের রক্ত হালালগণ্য হয়। বদর, ওহোদ, খন্দক প্রভৃতি যুদ্ধসহ পরবর্তীকালের সকল জিহাদ মূলতঃ এইশিরকের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নিজহাতে মূর্তি ভেঙ্গে অতঃপর পানি দিয়েধুয়ে কা‘বা গৃহ ছাফ করেন এবং আয়াতপাঠ করেন, ﺟَﺎﺀ ﺍﻟْﺤَﻖُّ ﻭَﺯَﻫَﻖَ ﺍﻟْﺒَﺎﻃِﻞُ ‘সত্য এসে গেল, মিথ্যা বিদূরিত হ’ল’ (ইসরা ১৭/৮১)।কিন্তুদুর্ভাগ্য! মূর্তিপূজার সে স্থান আজ দখল করেছে মুসলমানদের মধ্যে কবর পূজা, ছবি-মূর্তি ও প্রতিকৃতি পূজা, স্মৃতিসৌধ, স্থানপূজা, শহীদ মিনার ও বেদী পূজা, শিখাও আগুন পূজা ইত্যাদি। বস্ত্ততঃ এগুলি স্পষ্ট শিরক, যা থেকে নবীগণ যুগেযুগেমানুষকে সাবধান করেছেন। মূসা (আঃ) স্বীয় কওমকে তাদের মূর্খতাসূলভ আচরণেরজন্য ধমকানোর পর তাদের হুঁশ ফিরলো এবং তারা বিরত হ’ল।তওরাত লাভ :অতঃপরআল্লাহ মূসাকে অহীর মাধ্যমে ওয়াদা করলেন যে, তাকে সত্বর ‘কিতাব’ (তওরাত)প্রদান করা হবে এবং এজন্য তিনি বনু ইস্রাঈলকে সাথে নিয়ে তাকে ‘তূর পাহাড়েরদক্ষিণ পার্শ্বে’ চলে আসতে বললেন (ত্বোয়াহা ২০/৮৩-৮৪)। অতঃপর মূসা (আঃ)আগে এসে আল্লাহর হুকুমে প্রথমে ত্রিশ দিন ছিয়াম ও এ‘তেকাফে মগ্ন থাকেন।এরপর আল্লাহ আরও দশদিন মেয়াদ বাড়িয়ে দেন (আ‘রাফ ৭/১৪২)। ইবনু আববাস(রাঃ) বলেন,& এই দশদিন ছিল যিলহজ্জের প্রথম দশদিন, যা অতীব বরকতময়। ইবনুকাছীর বলেন, ১০ই যিলহজ্জ কুরবানীর দিন মূসার মেয়াদ শেষ হয় ও আল্লাহর সাথেকথা বলার সৌভাগ্য লাভ হয়। একই দিন শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর দ্বীনপরিপূর্ণতার আয়াত নাযিল হয় (মায়েদাহ ৩)।=( ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা আ‘রাফ১৪২)। যথাসময়ে আল্লাহ মূসার সঙ্গে কথা বললেন (আ‘রাফ ৭/১৪৩)। অতঃপর তাঁকেতওরাত প্রদান করলেন, যা ছিল সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী ও সরল পথপ্রদর্শনকারী (বাক্বারাহ ২/৫৩)। দীর্ঘ বিশ বছরের অধিককাল পূর্বে মিসর যাওয়ারপথে এই স্থানেই মূসা প্রথম আল্লাহর সাথে কথোপকথনের ওনবুঅত লাভের মহাসৌভাগ্য লাভ করেন। আজ আবার সেখানেই বাক্যালাপ ছাড়াও এলাহী গ্রন্থতওরাত পেয়ে খুশীতে অধিকতর সাহসী হয়ে তিনি আল্লাহর নিকটে দাবী করেবসলেন, ﺭَﺏِّ ﺃَﺭِﻧِﻲ ﺃَﻧﻈُﺮْ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ﻗَﺎﻝَ ﻟَﻦْ ﺗَﺮَﺍﻧِﻲ ﻭَﻟَـﻜِﻦِ ﺍﻧﻈُﺮْ ﺇِﻟَﻰ ﺍﻟْﺠَﺒَﻞِ ﻓَﺈِﻥِ ﺍﺳْﺘَﻘَﺮَّ ﻣَﻜَﺎﻧَﻪُ ﻓَﺴَﻮْﻑَﺗَﺮَﺍﻧِﻲ، ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺗَﺠَﻠَّﻰ ﺭَﺑُّﻪُ ﻟِﻠْﺠَﺒَﻞِ ﺟَﻌَﻠَﻪُ ﺩَﻛًّﺎﻭََّﺧَﺮَّ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺻَﻌِﻘًﺎ- ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺃَﻓَﺎﻕَ ﻗَﺎﻝَ ﺳُﺒْﺤَﺎﻧَﻚَ ﺗُﺒْﺖُ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﺃَﻭَّﻝُ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ – ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৪৩)-‘হেআমার পালনকর্তা!আমাকে দেখা দাও। আমি তোমাকে স্বচক্ষে দেখব।আল্লাহ বললেন, তুমি আমাকে(এ দুনিয়াতে) কখনোই দেখতে পাবে না। তবে তুমি (তূর) পাহাড়ের দিকে দেখতেথাক। সেটি যদি স্বস্থানে স্থির থাকে, তাহ’লে তুমি আমাকে দেখতে পাবে।অতঃপর যখন তার প্রভু উক্ত পাহাড়ের উপরে স্বীয় জ্যোতির বিকীরণ ঘটালেন,সেটিকে বিধ্বস্ত করে দিলেন এবং মূসা জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল। অতঃপর যখনতার জ্ঞান ফিরে এল, তখন বলল, হে প্রভু! মহা পবিত্র তোমার সত্তা! আমি তোমারনিকটে তওবা করছি এবং আমি বিশ্বাসীদের মধ্যে অগ্রণী’ (আ‘রাফ ৭/১৪৩)।আল্লাহ বললেন, ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺇِﻧِّﻲ ﺍﺻْﻄَﻔَﻴْﺘُﻚَ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﺑِﺮِﺳَﺎﻻَﺗِﻲ ﻭَﺑِﻜَﻼَﻣِﻲْ ﻓَﺨُﺬْ ﻣَﺎ ﺁﺗَﻴْﺘُﻚَﻭَﻛُﻦْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺸَّﺎﻛِﺮِﻳْﻦَ ‏( 144 ‏) ﻭَﻛَﺘَﺒْﻨَﺎﻟَﻪُ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﻟْﻮَﺍﺡِ ﻣِﻦْ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻣَﻮْﻋِﻈَﺔً ﻭَﺗَﻔْﺼِﻴْﻼً ﻟِﻜُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍﻓَﺨُﺬْﻫَﺎ ﺑِﻘُﻮَّﺓٍ ﻭَﺃْﻣُﺮْ ﻗَﻮْﻣَﻚَ ﻳَﺄْﺧُﺬُﻭﺍ ﺑِﺄَﺣْﺴَﻨِﻬَﺎﺳَﺄُﺭِﻳْﻜُﻢْ ﺩَﺍﺭَ ﺍﻟْﻔَﺎﺳِﻘِﻴْﻦَ ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ144-145 )- হে মূসা! আমি আমার ‘রিসালাত’ তথা বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে এবংবাক্যালাপের মাধ্যমে লোকদের (নবীগণের) উপরে তোমাকে বিশিষ্টতা দানকরেছি। সুতরাং যাকিছু আমি তোমাকে দান করলাম তা গ্রহণ কর ও কৃতজ্ঞ থাক’।‘আর আমরা তার জন্য ফলক সমূহে লিখে দিয়েছিলাম সর্বপ্রকার উপদেশ ও সকলবিষয় বিস্তারিতভাবে। অতএব তুমি এগুলিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং স্বজাতিকেএর কল্যাণকর বিষয়সমূহ দৃঢ়তার সাথে পালনের নির্দেশ দাও। শীঘ্রই আমিতোমাদেরকে দেখাব পাপাচারীদের বাসস্থান’ (আ‘রাফ ৭/১৪৪-১৪৫)।উপরোক্তআয়াত দ্বারা বুঝা যায়যে, তখতী বা ফলকে লিখিত অবস্থায়তাঁকে কিতাব প্রদানকরা হয়েছিল। আর এই তখতীগুলোর নামই হ’ল ‘তওরাত’।(২) গো-বৎস পূজা :মূসা যখনবনী ইস্রাঈলকে নিয়ে তূর পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হয়েগেলেন। তখন তিনি হারূণ(আঃ)-কে কওমের দায়িত্ব দিয়ে গেলেন এবংতাদেরকে পশ্চাতে আসার নির্দেশদিয়ে নিজে আগে চলে গেলেন এবং সেখানে গিয়ে ৪০ দিন ছিয়াম ও ই‘তেকাফেকাটানোর পরে তওরাত লাভ করলেন। তাঁর ধারণা ছিল যে, তার কওম নিশ্চয়ই তারপিছে পিছে তূর পাহাড়ের সন্নিকটে এসে শিবির স্থাপন করেছে। কিন্তু তাঁরধারণা ছিল সম্পূর্ণ ভুল।আল্লাহ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ﻭَﻣَﺎﺃَﻋْﺠَﻠَﻚَ ﻋَﻦْ ﻗَﻮْﻣِﻚَ ﻳَﺎ ﻣُﻮْﺳَﻰ – ﻗَﺎﻝَﻫُﻢْﺃُﻭﻻَﺀِ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﺛَﺮِﻱ ﻭَﻋَﺠِﻠْﺖُ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ﺭَﺏِّ ﻟِﺘَﺮْﺿَﻰ – ﻗَﺎﻝَ ﻓَﺈِﻧَّﺎ ﻗَﺪْ ﻓَﺘَﻨَّﺎ ﻗَﻮْﻣَﻚَ ﻣِﻦْ ﺑَﻌْﺪِﻙَ ﻭَﺃَﺿَﻠَّﻬُﻢُ ﺍﻟﺴَّﺎﻣِﺮِﻱُّ -‏( ﻃﻪ 83-85 )- ‘হে মূসা!তোমার সম্প্রদায়কে পিছনে ফেলে তুমি দ্রুত চলে এলে কেন?’ ‘তিনি বললেন,তারা তো আমার পিছে পিছেই আসছে এবং হে প্রভু! আমি তাড়াতাড়ি তোমারকাছে এলাম, যাতে তুমি খুশীহও’। আল্লাহ বললেন, ‘আমি তোমার সম্প্রদায়কেপরীক্ষা করেছি তোমার পর এবং সামেরী তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে’ (ত্বোয়াহা২০/৮৩-৮৫)।একথা জেনে মূসা (আঃ) হতভম্ব হয়ে গেলেন এবং দুঃখে ও ক্ষোভেঅস্থির হয়ে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻓَﺮَﺟَﻊَ ﻣُﻮْﺳَﻰﺇِﻟَﻰ ﻗَﻮْﻣِﻪِ ﻏَﻀْﺒَﺎﻥَ ﺃَﺳِﻔًﺎ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺃَﻟَﻢْ ﻳَﻌِﺪْﻛُﻢْ ﺭَﺑُّﻜُﻤْﻮَﻋْﺪًﺍ ﺣَﺴَﻨًﺎ ﺃَﻓَﻄَﺎﻝَ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢُ ﺍﻟْﻌَﻬْﺪُ ﺃَﻡْ ﺃَﺭَﺩْﺗُﻢْ ﺃَﻥْﻳَﺤِﻞَّ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﻏَﻀَﺐٌ ﻣِّﻦْ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْ ﻓَﺄَﺧْﻠَﻔْﺘُﻢْﻣَﻮْﻋِﺪِﻱ – ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﻣَﺎ ﺃَﺧْﻠَﻔْﻨَﺎ ﻣَﻮْﻋِﺪَﻙَ ﺑِﻤَﻠْﻜِﻨَﺎ ﻭَﻟَﻜِﻨَّﺎ ﺣُﻤِّﻠْﻨَﺎﺃَﻭْﺯَﺍﺭًﺍ ﻣِّﻦْ ﺯِﻳْﻨَﺔِ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﻓَﻘَﺬَﻓْﻨَﺎﻫَﺎ ﻓَﻜَﺬَﻟِﻚَ ﺃَﻟْﻘَﻰﺍﻟﺴَّﺎﻣِﺮِﻱُّ- ﻓَﺄَﺧْﺮَﺝَ ﻟَﻬُﻢْ ﻋِﺠْﻼً ﺟَﺴَﺪًﺍ ﻟَﻪُﺧُﻮَﺍﺭٌ ﻓَﻘَﺎﻟُﻮﺍ ﻫَﺬَﺍ ﺇِﻟَﻬُﻜُﻢْ ﻭَﺇِﻟَﻪُ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻓَﻨَﺴِﻲَ – ‏( ﻃﻪ 86-88 )- ‘অতঃপর মূসা তার সম্প্রদায়ের কাছেফিরেগেলেন ক্রুদ্ধ ও অনুতপ্ত অবস্থায়। তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদেরপালনকর্তা কি তোমাদের একটি উত্তম প্রতিশ্রুতি (অর্থাৎ তওরাৎ দানেরপ্রতিশ্রুতি) দেননি? তবে কি প্রতিশ্রুতির সময়কাল (৪০ দিন) তোমাদের কাছেদীর্ঘ হয়েছে? না-কি তোমরা চেয়েছ যে তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তারক্রোধ নেমে আসুক, যে কারণে তোমরা আমার সাথে কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করলে’? (৮৬)‘তারা বলল,আমরা আপনার সাথে কৃত ওয়াদা স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করিনি। কিন্তুআমাদের উপরে ফেরাঊনীদের অলংকারের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।অতঃপর আমরা তা নিক্ষেপকরে দিয়েছি এমনিভাবে সামেরীও নিক্ষেপকরেছে’(৮৭)। ‘অতঃপর সে তাদের জন্য (সেখান থেকে) বের করে আনলো একটাগো-বৎসের অবয়ব, যার মধ্যে হাম্বা হাম্বা রব ছিল। অতঃপর (সামেরী ও তারলোকেরা) বলল,এটাই তোমাদের উপাস্য এবং মূসারওউপাস্য, যা পরে মূসা ভুলেগেছে’ (ত্বোয়াহা ২০/৮৬-৮৮)।ঘটনা ছিল এই যে, মিসর থেকে বিদায়ের দিন যাতেফেরাঊনীরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন না করে এবং তারা কোনরূপ সন্দেহ না করে,সেজন্য (মূসাকে লুকিয়ে) বনু ইস্রাঈলরা প্রতিবেশী ক্বিবতীদের কাছ থেকেঅলংকারাদি ধার নেয় এই কথা বলে যে, আমরা সবাই ঈদ উৎসব পালনের জন্যযাচ্ছি। দু’একদিনের মধ্যে ফিরে এসেই তোমাদের সব অলংকার ফেরৎ দিব। কিন্তুসাগর পার হওয়ার পর যখন আর ফিরে যাওয়া হ’ল না, তখন কুটবুদ্ধি ও মূসার প্রতি কপটবিশ্বাসী সামেরী মনে মনে এক ফন্দি আটলো যে, এর দ্বারা সে বনু ইস্রাঈলদেরপথভ্রষ্ট করবে। অতঃপর মূসা (আঃ) যখন তার সম্প্রদায়কে হারূণের দায়িত্বে দিয়েনিজে আগেভাগে তূর পাহাড়ে চলে যান, তখন সামেরীসুযোগ বুঝে তার ফন্দিকাজে লাগায়। সে ছিল অত্যন্ত চতুর। সাগর ডুবি থেকে নাজাত পাবার সময় সেজিব্রীলের অবতরণ ও তার ঘোড়ার প্রতি লক্ষ্য করেছিল। সেদেখেছিল যে,জিব্রীলের ঘোড়ার পা যে মাটিতে পড়ছে, সে স্থানের মাটি সজীব হয়ে উঠছে ওতাতে জীবনের স্পন্দন জেগে উঠছে। তাই সবার অলক্ষ্যে এ পদচিহ্নের এক মুঠোমাটি সে তুলে সযতনে রেখে দেয়।মূসা (আঃ) চলে যাবার পর সে লোকদেরবলে যে,‘তোমরা ফেরাঊনীদের যেসব অলংকারাদি নিয়ে এসেছ এবং তা ফেরত দিতেপারছ না, সেগুলি ভোগ-ব্যবহার করা তোমাদের জন্য হালাল হবে না। অতএব এগুলিএকটি গর্তে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দাও’। কথাটি অবশেষে হারূণ (আঃ)-এরকর্ণগোচর হয়। নাসাঈ-তে বর্ণিত ‘হাদীছুল ফুতূনে’ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস(রাঃ)-এর রেওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, হযরত হারূণ (আঃ) সব অলংকার একটিগর্তে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেবার নির্দেশ দেন, যাতে সেগুলি একটি অবয়বেপরিণত হয় এবং মূসা (আঃ)-এর ফিরে আসার পর এ সম্পর্কে করণীয় নির্ধারণ করাযায়। হযরতহারূণ (আঃ)-এর নির্দেশ মতে সবাই যখন অলংকার গর্তে নিক্ষেপ করছে,তখন সামেরীও হাতের মুঠি বন্ধ করে সেখানে পৌঁছল এবং হযরত হারূণ (আঃ)-কেবলল, আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হৌক- এই মর্মে আপনি দো‘আ করলে আমি নিক্ষেপকরব, নইলে নয়।’ হযরত হারূণ তার কপটতা বুঝতে না পেরে সরল মনে দো‘আ করলেন।আসলে তার মুঠিতে ছিল জিব্রীলের ঘোড়ার পায়ের সেই অলৌকিক মাটি। ফলেউক্ত মাটির প্রতিক্রিয়ায় হৌক কিংবা হযরত হারূণের দো‘আর ফলে হৌক-সামেরীর উক্ত মাটি নিক্ষেপের পরপরই গলিতঅলংকারাদির অবয়বটি একটি গো-বৎসের রূপ ধারণ করে হাম্বা হাম্বা রব করতে থাকে। মুনাফিক সামেরী ও তারসঙ্গী-সাথীরা এতে উল্লসিত হয়ে বলে উঠল, ﻫَﺬَﺍ ﺇِﻟَﻬُﻜُﻢْ ﻭَﺇِﻟَﻪُ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻓَﻨَﺴِﻲَ ‘এটাই হ’লতোমাদের উপাস্য ও মূসার উপাস্য।যা সে পরে ভুলে গেছে’ (ত্বোয়াহা ২০/৮৮)।মূসা(আঃ)-এর তূর পাহাড়ে গমনকে সে অপব্যাখ্যা দিয়ে বলল, মূসা বিভ্রান্ত হয়েআমাদের ছেড়ে কোথাও চলে গিয়েছে। এখন তোমরা সবাই গো-বৎসের পূজা কর’।কিছু লোক তার অনুসরণ করল। বলা হয়ে থাকে যে, বনু ইস্রাঈল এই ফিৎনায়পড়ে তিনদলে বিভক্ত হয়ে গেল। ফলে মূসা (আঃ)-এর পিছে পিছে তূর পাহাড়ে গমনেরপ্রক্রিয়া পথিমধ্যেই বানচাল হয়ে গেল।হারূণ (আঃ) তাদেরকে বললেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻗَﺎﻝَ ﻟَﻬُﻢْﻫَﺎﺭُﻭﻥُ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞُ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﻓُﺘِﻨْﺘُﻢْ ﺑِﻪِ ﻭَﺇِﻥَّ ﺭَﺑَّﻜُﻢُ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦُ ﻓَﺎﺗَّﺒِﻌُﻮﻧِﻲ ﻭَﺃَﻃِﻴﻌُﻮﺍ ﺃَﻣْﺮِﻱ – ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﻟَﻨْﻨَﺒْﺮَﺡَﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻋَﺎﻛِﻔِﻴﻦَ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺮْﺟِﻊَ ﺇِﻟَﻴْﻨَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ-‏( ﻃﻪ 90-91 )- কওম! তোমরা এই গো-বৎস দ্বারা পরীক্ষায় পতিত হয়েছ। তোমাদেরপালনকর্তা অতীব দয়ালু। অতএব তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশমেনে চল’(৯০)। কিন্তু সম্প্রদায়ের লোকেরা বলল, ‘মূসা আমাদের কাছে ফিরে নাআসা পর্যন্ত আমরা এর পূজায় রত থাকব’ (ত্বোয়াহা ২০/৯০-৯১)।অতঃপর মূসা (আঃ)এলেন এবং সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে সব কথা শুনলেন। হারূণ (আঃ)ও তাঁর বক্তব্যপেশ করলেন। সামেরীও তারকপটতার কথা অকপটে স্বীকার করল। অতঃপর মূসা(আঃ) আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী শাস্তি ঘোষণা করলেন।গো-বৎস পূজার শাস্তি :মূসা(আঃ) গো-বৎস পূজায় নেতৃত্ব দানকারী হঠকারী লোকদের মৃত্যুদন্ড দিলেন। যেমনআল্লাহ বলেন, ‘আর যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলল, ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻟِﻘَﻮْﻣِﻪِ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺇِﻧَّﻜُﻢْﻇَﻠَﻤْﺘُﻢْ ﺃَﻧْﻔُﺴَﻜُﻢْﺑِﺎﺗِّﺨَﺎﺫِﻛُﻢُ ﺍﻟْﻌِﺠْﻞَ ﻓَﺘُﻮﺑُﻮﺍ ﺇِﻟَﻰ ﺑَﺎﺭِﺋِﻜُﻢْ ﻓَﺎﻗْﺘُﻠُﻮﺍ ﺃَﻧْﻔُﺴَﻜُﻢْ ﺫَﻟِﻜُﻢْ ﺧَﻴْﺮٌ ﻟَﻜُﻢْ ﻋِﻨْﺪَ ﺑَﺎﺭِﺋِﻜُﻢْ … হে আমারসম্প্রদায়! তোমরা গো-বৎসকে উপাস্য নির্ধারণ করে নিজেদের উপরে যুলুম করেছ। অতএব এখন তোমাদেরপ্রভুর নিকটে তওবা কর এবং নিজেদেরকে পরস্পরে হত্যাকর। এটাই তোমাদের জন্যতোমাদের স্রষ্টার নিকটে কল্যাণকর’… (বাক্বারাহ ২/৫৪)। এভাবে তাদের কিছুলোককে হত্যা করা হয়, কিছু লোক ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়।তূর পাহাড় তুলে ধরা হ’ল:এরপরেও কপট বিশ্বাসী ও হঠকারী কিছু লোক থাকে, যারা তওরাতকে মানতেঅস্বীকার করে। ফলে তাদের মাথার উপরে আল্লাহ তূর পাহাড়েরএকাংশ উঁচু করেঝুলিয়ে ধরেন এবং অবশেষে নিরুপায় হয়ে তারা সবাই আনুগত্য করতে স্বীকৃত হয়।যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﺃَﺧَﺬْﻧَﺎ ﻣِﻴْﺜَﺎﻗَﻜُﻢْ ﻭَﺭَﻓَﻌْﻨَﺎ ﻓَﻮْﻗَﻜُﻢُ ﺍﻟﻄُّﻮْﺭَ ﺧُﺬُﻭْﺍ ﻣَﺎ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻛُﻢ ﺑِﻘُﻮَّﺓٍ ﻭَﺍﺫْﻛُﺮُﻭْﺍﻣَﺎ ﻓِﻴْﻪِ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗَﺘَّﻘُﻮْﻥَ- ‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ৬৩)-‘আর যখন আমি তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তূরপাহাড়কে তোমাদের মাথার উপরে তুলে ধরেছিলাম এই বলে যে, তোমাদের যেকিতাব দেওয়া হয়েছে, তা মযবুতভাবে ধারণ কর এবং এতে যা কিছু রয়েছে তাস্মরণে রাখ, যাতে তোমরা আল্লাহভীরু হ’তে পার’ (বাক্বারাহ ২/৬৩)। কিন্তু গো-বৎসের মহববত এদের হৃদয়ে এমনভাবে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, এতকিছুর পরেওতারা শিরক ছাড়তে পারেনি। আল্লাহ বলেন, ﻭَﺃُﺷْﺮِﺑُﻮﺍْ ﻓِﻲ ﻗُﻠُﻮﺑِﻬِﻢُ ﺍﻟْﻌِﺠْﻞَ ﺑِﻜُﻔْﺮِﻫِﻢْ ‘কুফরেরকারণে তাদের অন্তরে গোবৎস প্রীতি পান করানো হয়েছিল’ (বাক্বারাহ ২/৯৩)।যেমন কেউ সরাসরি শিরকে নেতৃত্ব দিয়েছে, কেউবা মুখে তওবা করলেও অন্তরেপুরোপুরি তওবা করেনি। কেউবা শিরককে ঘৃণা করতে পারেনি। কেউ বা মনে মনেঘৃণা করলেও বাহ্যিকভাবে মেনে নিয়েছিল এবং বাধা দেওয়ার কোন চেষ্টাকরেনি।আল্লাহ যখন তূর পাহাড় তুলে ধরে ভয় দেখিয়ে তাদের আনুগত্যেরপ্রতিশ্রুতি নেন, তখনও তাদের কেউ কেউ (পরবর্তীতে) বলেছিল, ﺳَﻤِﻌْﻨَﺎ ﻭَﻋَﺼَﻴْﻨَﺎ‘আমরাশুনলাম ও অমান্য করলাম’ (বাক্বারাহ ২/৯৩)। যদিও অমান্য করলাম কথাটি ছিলপরের এবং তা প্রমাণিত হয়েছিল তাদের বাস্তব ক্রিয়াকর্মে। যেমন আল্লাহ এইসবপ্রতিশ্রুতি দানকারীদের পরবর্তী আচরণ সম্বন্ধে বলেন, ﺛُﻢَّ ﺗَﻮَﻟَّﻴْﺘُﻢ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِ ﺫَﻟِﻚَ ﻓَﻠَﻮْﻻَﻓَﻀْﻞُ ﺍﻟﻠﻪِ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْﻭَﺭَﺣْﻤَﺘُﻪُ ﻟَﻜُﻨﺘُﻢ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺨَﺎﺳِﺮِﻳﻦَ – ‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ৬৪)-‘অতঃপর তোমরা উক্ত ঘটনার পরে (তোমাদেরপ্রতিশ্রুতি থেকে) ফিরে গেছ। যদি আল্লাহর বিশেষ করুণা ও অনুগ্রহ তোমাদেরউপরে না থাকত, তাহ’লে অবশ্যই তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে’ (বাক্বারাহ ২/৬৪)।তওরাত লাভ :অতঃপর আল্লাহ মূসাকে অহীর মাধ্যমে ওয়াদা করলেন যে, তাকেসত্বর ‘কিতাব’ (তওরাত) প্রদান করা হবে এবং এজন্য তিনি বনু ইস্রাঈলকে সাথেনিয়ে তাকে ‘তূর পাহাড়ের দক্ষিণ পার্শ্বে’ চলে আসতে বললেন (ত্বোয়াহা২০/৮৩-৮৪)। অতঃপর মূসা (আঃ) আগে এসে আল্লাহর হুকুমে প্রথমে ত্রিশ দিনছিয়াম ও এ‘তেকাফে মগ্ন থাকেন। এরপর আল্লাহ আরও দশদিন মেয়াদ বাড়িয়ে দেন(আ‘রাফ ৭/১৪২)। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন,& এই দশদিন ছিল যিলহজ্জের প্রথমদশদিন, যা অতীব বরকতময়। ইবনু কাছীর বলেন, ১০ই যিলহজ্জ কুরবানীর দিন মূসারমেয়াদ শেষ হয় ও আল্লাহর সাথে কথা বলার সৌভাগ্য লাভ হয়। একই দিন শেষনবীমুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর উপর দ্বীন পরিপূর্ণতার আয়াত নাযিল হয় (মায়েদাহ ৩)।=( ইবনুকাছীর, তাফসীর সূরা আ‘রাফ ১৪২)। যথাসময়ে আল্লাহ মূসার সঙ্গে কথা বললেন(আ‘রাফ ৭/১৪৩)। অতঃপর তাঁকে তওরাত প্রদান করলেন, যা ছিল সত্য-মিথ্যারপার্থক্যকারী ও সরল পথ প্রদর্শনকারী (বাক্বারাহ ২/৫৩)। দীর্ঘ বিশ বছরেরঅধিককাল পূর্বে মিসর যাওয়ার পথে এই স্থানেই মূসা প্রথম আল্লাহর সাথেকথোপকথনের ওনবুঅত লাভের মহা সৌভাগ্য লাভ করেন। আজ আবার সেখানেইবাক্যালাপ ছাড়াও এলাহী গ্রন্থ তওরাত পেয়ে খুশীতে অধিকতর সাহসী হয়েতিনি আল্লাহর নিকটে দাবী করে বসলেন, ﺭَﺏِّ ﺃَﺭِﻧِﻲ ﺃَﻧﻈُﺮْ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ﻗَﺎﻝَ ﻟَﻦْ ﺗَﺮَﺍﻧِﻲ ﻭَﻟَـﻜِﻦِ ﺍﻧﻈُﺮْ ﺇِﻟَﻰﺍﻟْﺠَﺒَﻞِ ﻓَﺈِﻥِﺍﺳْﺘَﻘَﺮَّ ﻣَﻜَﺎﻧَﻪُ ﻓَﺴَﻮْﻑَ ﺗَﺮَﺍﻧِﻲ، ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺗَﺠَﻠَّﻰ ﺭَﺑُّﻪُ ﻟِﻠْﺠَﺒَﻞِ ﺟَﻌَﻠَﻪُ ﺩَﻛًّﺎ ﻭََّﺧَﺮَّ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺻَﻌِﻘًﺎ – ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺃَﻓَﺎﻕَ ﻗَﺎﻝَﺳُﺒْﺤَﺎﻧَﻚَ ﺗُﺒْﺖُ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﺃَﻭَّﻝُ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ-‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৪৩)-‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে দেখা দাও। আমি তোমাকে স্বচক্ষেদেখব।আল্লাহ বললেন, তুমি আমাকে (এ দুনিয়াতে) কখনোই দেখতে পাবে না। তবেতুমি (তূর) পাহাড়ের দিকে দেখতে থাক। সেটি যদি স্বস্থানে স্থির থাকে,তাহ’লে তুমি আমাকে দেখতে পাবে। অতঃপর যখন তার প্রভু উক্ত পাহাড়ের উপরেস্বীয় জ্যোতির বিকীরণ ঘটালেন, সেটিকে বিধ্বস্ত করে দিলেন এবং মূসা জ্ঞানহারিয়ে পড়ে গেল। অতঃপর যখন তার জ্ঞান ফিরে এল, তখন বলল, হে প্রভু! মহাপবিত্র তোমার সত্তা! আমি তোমার নিকটে তওবা করছি এবং আমি বিশ্বাসীদেরমধ্যে অগ্রণী’ (আ‘রাফ ৭/১৪৩)।আল্লাহ বললেন, ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺇِﻧِّﻲ ﺍﺻْﻄَﻔَﻴْﺘُﻚَ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِﺑِﺮِﺳَﺎﻻَﺗِﻲ ﻭَﺑِﻜَﻼَﻣِﻲْﻓَﺨُﺬْ ﻣَﺎ ﺁﺗَﻴْﺘُﻚَ ﻭَﻛُﻦْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺸَّﺎﻛِﺮِﻳْﻦَ ‏( 144 ‏) ﻭَﻛَﺘَﺒْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﻟْﻮَﺍﺡِ ﻣِﻦْ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻣَﻮْﻋِﻈَﺔً ﻭَﺗَﻔْﺼِﻴْﻼً ﻟِﻜُﻞِّﺷَﻲْﺀٍﻓَﺨُﺬْﻫَﺎ ﺑِﻘُﻮَّﺓٍ ﻭَﺃْﻣُﺮْ ﻗَﻮْﻣَﻚَ ﻳَﺄْﺧُﺬُﻭﺍﺑِﺄَﺣْﺴَﻨِﻬَﺎ ﺳَﺄُﺭِﻳْﻜُﻢْ ﺩَﺍﺭَ ﺍﻟْﻔَﺎﺳِﻘِﻴْﻦَ ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ 144-145 )- হে মূসা! আমি আমার ‘রিসালাত’ তথা বার্তাপাঠানোর মাধ্যমে এবং বাক্যালাপের মাধ্যমে লোকদের (নবীগণের) উপরেতোমাকে বিশিষ্টতা দান করেছি। সুতরাং যাকিছু আমি তোমাকে দান করলামতা গ্রহণ কর ও কৃতজ্ঞ থাক’। ‘আর আমরা তার জন্য ফলক সমূহে লিখে দিয়েছিলামসর্বপ্রকার উপদেশ ও সকল বিষয় বিস্তারিতভাবে। অতএব তুমি এগুলিকে দৃঢ়ভাবেধারণ কর এবং স্বজাতিকে এর কল্যাণকর বিষয়সমূহ দৃঢ়তার সাথে পালনের নির্দেশদাও। শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে দেখাব পাপাচারীদের বাসস্থান’ (আ‘রাফ৭/১৪৪-১৪৫)।উপরোক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায়যে, তখতী বা ফলকে লিখিতঅবস্থায়তাঁকে কিতাব প্রদান করা হয়েছিল। আর এই তখতীগুলোর নামই হ’ল‘তওরাত’।(২) গো-বৎস পূজা :মূসা যখন বনী ইস্রাঈলকে নিয়ে তূর পাহাড়ের দিকেরওয়ানা হয়েগেলেন। তখন তিনি হারূণ (আঃ)-কে কওমের দায়িত্ব দিয়ে গেলেনএবংতাদেরকে পশ্চাতে আসার নির্দেশ দিয়ে নিজে আগে চলে গেলেন এবংসেখানে গিয়ে ৪০ দিন ছিয়াম ও ই‘তেকাফে কাটানোর পরে তওরাত লাভ করলেন।তাঁর ধারণা ছিল যে, তার কওম নিশ্চয়ই তার পিছে পিছে তূর পাহাড়ের সন্নিকটেএসে শিবির স্থাপন করেছে। কিন্তু তাঁর ধারণা ছিল সম্পূর্ণ ভুল।আল্লাহ তাঁকেজিজ্ঞেস করলেন, ﻭَﻣَﺎﺃَﻋْﺠَﻠَﻚَ ﻋَﻦْ ﻗَﻮْﻣِﻚَ ﻳَﺎ ﻣُﻮْﺳَﻰ – ﻗَﺎﻝَ ﻫُﻢْ ﺃُﻭﻻَﺀِ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﺛَﺮِﻱ ﻭَﻋَﺠِﻠْﺖُ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ﺭَﺏِّﻟِﺘَﺮْﺿَﻰ – ﻗَﺎﻝَ ﻓَﺈِﻧَّﺎ ﻗَﺪْ ﻓَﺘَﻨَّﺎ ﻗَﻮْﻣَﻚَﻣِﻦْ ﺑَﻌْﺪِﻙَ ﻭَﺃَﺿَﻠَّﻬُﻢُ ﺍﻟﺴَّﺎﻣِﺮِﻱُّ – ‏( ﻃﻪ 83-85 )- ‘হে মূসা! তোমার সম্প্রদায়কে পিছনে ফেলেতুমিদ্রুত চলে এলে কেন?’ ‘তিনি বললেন, তারা তো আমার পিছে পিছেই আসছে এবংহে প্রভু! আমি তাড়াতাড়ি তোমার কাছে এলাম, যাতে তুমি খুশীহও’। আল্লাহবললেন, ‘আমি তোমার সম্প্রদায়কে পরীক্ষা করেছি তোমার পর এবং সামেরীতাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে’ (ত্বোয়াহা ২০/৮৩-৮৫)।একথা জেনে মূসা (আঃ) হতভম্বহয়ে গেলেন এবং দুঃখে ও ক্ষোভে অস্থির হয়ে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরেগেলেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻓَﺮَﺟَﻊَ ﻣُﻮْﺳَﻰ ﺇِﻟَﻰ ﻗَﻮْﻣِﻪِ ﻏَﻀْﺒَﺎﻥَ ﺃَﺳِﻔًﺎ ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺃَﻟَﻢْ ﻳَﻌِﺪْﻛُﻢْﺭَﺑُّﻜُﻤْﻮَﻋْﺪًﺍ ﺣَﺴَﻨًﺎ ﺃَﻓَﻄَﺎﻝَ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢُﺍﻟْﻌَﻬْﺪُ ﺃَﻡْ ﺃَﺭَﺩْﺗُﻢْ ﺃَﻥْ ﻳَﺤِﻞَّ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﻏَﻀَﺐٌ ﻣِّﻦْ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْ ﻓَﺄَﺧْﻠَﻔْﺘُﻢْ ﻣَﻮْﻋِﺪِﻱ- ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﻣَﺎ ﺃَﺧْﻠَﻔْﻨَﺎ ﻣَﻮْﻋِﺪَﻙَ ﺑِﻤَﻠْﻜِﻨَﺎﻭَﻟَﻜِﻨَّﺎ ﺣُﻤِّﻠْﻨَﺎﺃَﻭْﺯَﺍﺭًﺍ ﻣِّﻦْ ﺯِﻳْﻨَﺔِ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﻓَﻘَﺬَﻓْﻨَﺎﻫَﺎﻓَﻜَﺬَﻟِﻚَ ﺃَﻟْﻘَﻰ ﺍﻟﺴَّﺎﻣِﺮِﻱُّ – ﻓَﺄَﺧْﺮَﺝَ ﻟَﻬُﻢْ ﻋِﺠْﻼً ﺟَﺴَﺪًﺍ ﻟَﻪُ ﺧُﻮَﺍﺭٌ ﻓَﻘَﺎﻟُﻮﺍ ﻫَﺬَﺍ ﺇِﻟَﻬُﻜُﻢْ ﻭَﺇِﻟَﻪُ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻓَﻨَﺴِﻲَ -‏( ﻃﻪ 86-88 )- ‘অতঃপর মূসাতার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেলেন ক্রুদ্ধ ও অনুতপ্ত অবস্থায়। তিনি বললেন, হেআমার সম্প্রদায়! তোমাদের পালনকর্তা কি তোমাদের একটি উত্তম প্রতিশ্রুতি(অর্থাৎ তওরাৎ দানের প্রতিশ্রুতি) দেননি? তবে কি প্রতিশ্রুতির সময়কাল (৪০দিন) তোমাদের কাছে দীর্ঘ হয়েছে? না-কি তোমরা চেয়েছ যে তোমাদের উপরতোমাদের পালনকর্তার ক্রোধ নেমে আসুক, যে কারণে তোমরা আমার সাথে কৃতওয়াদা ভঙ্গ করলে’? (৮৬) ‘তারা বলল,আমরা আপনার সাথে কৃত ওয়াদা স্বেচ্ছায়ভঙ্গ করিনি। কিন্তু আমাদের উপরে ফেরাঊনীদের অলংকারের বোঝা চাপিয়েদেওয়া হয়েছিল। অতঃপর আমরা তা নিক্ষেপকরে দিয়েছি এমনিভাবে সামেরীওনিক্ষেপ করেছে’(৮৭)। ‘অতঃপর সে তাদের জন্য (সেখান থেকে) বের করেআনলোএকটা গো-বৎসের অবয়ব, যার মধ্যে হাম্বা হাম্বা রব ছিল। অতঃপর (সামেরী ও তারলোকেরা) বলল,এটাই তোমাদের উপাস্য এবং মূসারওউপাস্য, যা পরে মূসা ভুলেগেছে’ (ত্বোয়াহা ২০/৮৬-৮৮)।ঘটনা ছিল এই যে, মিসর থেকে বিদায়ের দিন যাতেফেরাঊনীরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন না করে এবং তারা কোনরূপ সন্দেহ না করে,সেজন্য (মূসাকে লুকিয়ে) বনু ইস্রাঈলরা প্রতিবেশী ক্বিবতীদের কাছ থেকেঅলংকারাদি ধার নেয় এই কথা বলে যে, আমরা সবাই ঈদ উৎসব পালনের জন্যযাচ্ছি। দু’একদিনের মধ্যে ফিরে এসেই তোমাদের সব অলংকার ফেরৎ দিব। কিন্তুসাগর পার হওয়ার পর যখন আর ফিরে যাওয়া হ’ল না, তখন কুটবুদ্ধি ও মূসার প্রতি কপটবিশ্বাসী সামেরী মনে মনে এক ফন্দি আটলো যে, এর দ্বারা সে বনু ইস্রাঈলদেরপথভ্রষ্ট করবে। অতঃপর মূসা (আঃ) যখন তার সম্প্রদায়কে হারূণের দায়িত্বে দিয়েনিজে আগেভাগে তূর পাহাড়ে চলে যান, তখন সামেরীসুযোগ বুঝে তার ফন্দিকাজে লাগায়। সে ছিল অত্যন্ত চতুর। সাগর ডুবি থেকে নাজাত পাবার সময় সেজিব্রীলের অবতরণ ও তার ঘোড়ার প্রতি লক্ষ্য করেছিল। সেদেখেছিল যে,জিব্রীলের ঘোড়ার পা যে মাটিতে পড়ছে, সে স্থানের মাটি সজীব হয়ে উঠছে ওতাতে জীবনের স্পন্দন জেগে উঠছে। তাই সবার অলক্ষ্যে এ পদচিহ্নের এক মুঠোমাটি সে তুলে সযতনে রেখে দেয়।মূসা (আঃ) চলে যাবার পর সে লোকদেরবলে যে,‘তোমরা ফেরাঊনীদের যেসব অলংকারাদি নিয়ে এসেছ এবং তা ফেরত দিতেপারছ না, সেগুলি ভোগ-ব্যবহার করা তোমাদের জন্য হালাল হবে না। অতএব এগুলিএকটি গর্তে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দাও’। কথাটি অবশেষে হারূণ (আঃ)-এরকর্ণগোচর হয়। নাসাঈ-তে বর্ণিত ‘হাদীছুল ফুতূনে’ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস(রাঃ)-এর রেওয়ায়াত থেকে জানা যায় যে, হযরত হারূণ (আঃ) সব অলংকার একটিগর্তে নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দেবার নির্দেশ দেন, যাতে সেগুলি একটি অবয়বেপরিণত হয় এবং মূসা (আঃ)-এর ফিরে আসার পর এ সম্পর্কে করণীয় নির্ধারণ করাযায়। হযরতহারূণ (আঃ)-এর নির্দেশ মতে সবাই যখন অলংকার গর্তে নিক্ষেপ করছে,তখন সামেরীও হাতের মুঠি বন্ধ করে সেখানে পৌঁছল এবং হযরত হারূণ (আঃ)-কেবলল, আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হৌক- এই মর্মে আপনি দো‘আ করলে আমি নিক্ষেপকরব, নইলে নয়।’ হযরত হারূণ তার কপটতা বুঝতে না পেরে সরল মনে দো‘আ করলেন।আসলে তার মুঠিতে ছিল জিব্রীলের ঘোড়ার পায়ের সেই অলৌকিক মাটি। ফলেউক্ত মাটির প্রতিক্রিয়ায় হৌক কিংবা হযরত হারূণের দো‘আর ফলে হৌক-সামেরীর উক্ত মাটি নিক্ষেপের পরপরই গলিতঅলংকারাদির অবয়বটি একটি গো-বৎসের রূপ ধারণ করে হাম্বা হাম্বা রব করতে থাকে। মুনাফিক সামেরী ও তারসঙ্গী-সাথীরা এতে উল্লসিত হয়ে বলে উঠল, ﻫَﺬَﺍ ﺇِﻟَﻬُﻜُﻢْ ﻭَﺇِﻟَﻪُ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻓَﻨَﺴِﻲَ ‘এটাই হ’লতোমাদের উপাস্য ও মূসার উপাস্য।যা সে পরে ভুলে গেছে’ (ত্বোয়াহা ২০/৮৮)।মূসা(আঃ)-এর তূর পাহাড়ে গমনকে সে অপব্যাখ্যা দিয়ে বলল, মূসা বিভ্রান্ত হয়েআমাদের ছেড়ে কোথাও চলে গিয়েছে। এখন তোমরা সবাই গো-বৎসের পূজা কর’।কিছু লোক তার অনুসরণ করল। বলা হয়ে থাকে যে, বনু ইস্রাঈল এই ফিৎনায়পড়ে তিনদলে বিভক্ত হয়ে গেল। ফলে মূসা (আঃ)-এর পিছে পিছে তূর পাহাড়ে গমনেরপ্রক্রিয়া পথিমধ্যেই বানচাল হয়ে গেল।হারূণ (আঃ) তাদেরকে বললেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻗَﺎﻝَ ﻟَﻬُﻢْﻫَﺎﺭُﻭﻥُ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞُ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﻓُﺘِﻨْﺘُﻢْ ﺑِﻪِ ﻭَﺇِﻥَّ ﺭَﺑَّﻜُﻢُ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦُ ﻓَﺎﺗَّﺒِﻌُﻮﻧِﻲ ﻭَﺃَﻃِﻴﻌُﻮﺍ ﺃَﻣْﺮِﻱ – ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﻟَﻨْﻨَﺒْﺮَﺡَﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻋَﺎﻛِﻔِﻴﻦَ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺮْﺟِﻊَ ﺇِﻟَﻴْﻨَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ-‏( ﻃﻪ 90-91 )- কওম! তোমরা এই গো-বৎস দ্বারা পরীক্ষায় পতিত হয়েছ। তোমাদেরপালনকর্তা অতীব দয়ালু। অতএব তোমরা আমার অনুসরণ কর এবং আমার আদেশমেনে চল’(৯০)। কিন্তু সম্প্রদায়ের লোকেরা বলল, ‘মূসা আমাদের কাছে ফিরে নাআসা পর্যন্ত আমরা এর পূজায় রত থাকব’ (ত্বোয়াহা ২০/৯০-৯১)।অতঃপর মূসা (আঃ)এলেন এবং সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে সব কথা শুনলেন। হারূণ (আঃ)ও তাঁর বক্তব্যপেশ করলেন। সামেরীও তারকপটতার কথা অকপটে স্বীকার করল। অতঃপর মূসা(আঃ) আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী শাস্তি ঘোষণা করলেন।গো-বৎস পূজার শাস্তি :মূসা(আঃ) গো-বৎস পূজায় নেতৃত্ব দানকারী হঠকারী লোকদের মৃত্যুদন্ড দিলেন। যেমনআল্লাহ বলেন, ‘আর যখন মূসা তার সম্প্রদায়কে বলল, ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻟِﻘَﻮْﻣِﻪِ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺇِﻧَّﻜُﻢْﻇَﻠَﻤْﺘُﻢْ ﺃَﻧْﻔُﺴَﻜُﻢْﺑِﺎﺗِّﺨَﺎﺫِﻛُﻢُ ﺍﻟْﻌِﺠْﻞَ ﻓَﺘُﻮﺑُﻮﺍ ﺇِﻟَﻰ ﺑَﺎﺭِﺋِﻜُﻢْ ﻓَﺎﻗْﺘُﻠُﻮﺍ ﺃَﻧْﻔُﺴَﻜُﻢْ ﺫَﻟِﻜُﻢْ ﺧَﻴْﺮٌ ﻟَﻜُﻢْ ﻋِﻨْﺪَ ﺑَﺎﺭِﺋِﻜُﻢْ … হে আমারসম্প্রদায়! তোমরা গো-বৎসকে উপাস্য নির্ধারণ করে নিজেদের উপরে যুলুম করেছ। অতএব এখন তোমাদেরপ্রভুর নিকটে তওবা কর এবং নিজেদেরকে পরস্পরে হত্যাকর। এটাই তোমাদের জন্যতোমাদের স্রষ্টার নিকটে কল্যাণকর’… (বাক্বারাহ ২/৫৪)। এভাবে তাদের কিছুলোককে হত্যা করা হয়, কিছু লোক ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়।তূর পাহাড় তুলে ধরা হ’ল:এরপরেও কপট বিশ্বাসী ও হঠকারী কিছু লোক থাকে, যারা তওরাতকে মানতেঅস্বীকার করে। ফলে তাদের মাথার উপরে আল্লাহ তূর পাহাড়েরএকাংশ উঁচু করেঝুলিয়ে ধরেন এবং অবশেষে নিরুপায় হয়ে তারা সবাই আনুগত্য করতে স্বীকৃত হয়।যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﺃَﺧَﺬْﻧَﺎ ﻣِﻴْﺜَﺎﻗَﻜُﻢْ ﻭَﺭَﻓَﻌْﻨَﺎ ﻓَﻮْﻗَﻜُﻢُ ﺍﻟﻄُّﻮْﺭَ ﺧُﺬُﻭْﺍ ﻣَﺎ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻛُﻢ ﺑِﻘُﻮَّﺓٍ ﻭَﺍﺫْﻛُﺮُﻭْﺍﻣَﺎ ﻓِﻴْﻪِ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗَﺘَّﻘُﻮْﻥَ- ‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ৬৩)-‘আর যখন আমি তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম এবং তূরপাহাড়কে তোমাদের মাথার উপরে তুলে ধরেছিলাম এই বলে যে, তোমাদের যেকিতাব দেওয়া হয়েছে, তা মযবুতভাবে ধারণ কর এবং এতে যা কিছু রয়েছে তাস্মরণে রাখ, যাতে তোমরা আল্লাহভীরু হ’তে পার’ (বাক্বারাহ ২/৬৩)। কিন্তু গো-বৎসের মহববত এদের হৃদয়ে এমনভাবে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল যে, এতকিছুর পরেওতারা শিরক ছাড়তে পারেনি। আল্লাহ বলেন, ﻭَﺃُﺷْﺮِﺑُﻮﺍْ ﻓِﻲ ﻗُﻠُﻮﺑِﻬِﻢُ ﺍﻟْﻌِﺠْﻞَ ﺑِﻜُﻔْﺮِﻫِﻢْ ‘কুফরেরকারণে তাদের অন্তরে গোবৎস প্রীতি পান করানো হয়েছিল’ (বাক্বারাহ ২/৯৩)।যেমন কেউ সরাসরি শিরকে নেতৃত্ব দিয়েছে, কেউবা মুখে তওবা করলেও অন্তরেপুরোপুরি তওবা করেনি। কেউবা শিরককে ঘৃণা করতে পারেনি। কেউ বা মনে মনেঘৃণা করলেও বাহ্যিকভাবে মেনে নিয়েছিল এবং বাধা দেওয়ার কোন চেষ্টাকরেনি।আল্লাহ যখন তূর পাহাড় তুলে ধরে ভয় দেখিয়ে তাদের আনুগত্যেরপ্রতিশ্রুতি নেন, তখনও তাদের কেউ কেউ (পরবর্তীতে) বলেছিল, ﺳَﻤِﻌْﻨَﺎ ﻭَﻋَﺼَﻴْﻨَﺎ‘আমরাশুনলাম ও অমান্য করলাম’ (বাক্বারাহ ২/৯৩)। যদিও অমান্য করলাম কথাটি ছিলপরের এবং তা প্রমাণিত হয়েছিল তাদের বাস্তব ক্রিয়াকর্মে। যেমন আল্লাহ এইসবপ্রতিশ্রুতি দানকারীদের পরবর্তী আচরণ সম্বন্ধে বলেন, ﺛُﻢَّ ﺗَﻮَﻟَّﻴْﺘُﻢ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِ ﺫَﻟِﻚَ ﻓَﻠَﻮْﻻَﻓَﻀْﻞُ ﺍﻟﻠﻪِ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْﻭَﺭَﺣْﻤَﺘُﻪُ ﻟَﻜُﻨﺘُﻢ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺨَﺎﺳِﺮِﻳﻦَ – ‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ৬৪)-‘অতঃপর তোমরা উক্ত ঘটনার পরে (তোমাদেরপ্রতিশ্রুতি থেকে) ফিরে গেছ। যদি আল্লাহর বিশেষ করুণা ও অনুগ্রহ তোমাদেরউপরে না থাকত, তাহ’লে অবশ্যই তোমরা ধ্বংস হয়ে যেতে’ (বাক্বারাহ ২/৬৪)।সামেরীর কৈফিয়ত :সম্প্রদায়ের লোকদের শাস্তি দানের পর মূসা (আঃ) এবারসামেরীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে সামেরী! তোমার ব্যাপার কি?’ ‘সে বলল, আমিদেখলাম, যা অন্যেরা দেখেনি। অতঃপর আমি সেই প্রেরিত ব্যক্তির (অর্থাৎজিব্রীলের) পদচিহ্নের নীচ থেকে এক মুষ্টি মাটি নিয়ে নিলাম। অতঃপর আমিতা (আগুনে গলিত অলংকারের অবয়বের প্রতি) নিক্ষেপ করলাম। আমার মন এটাকরতে প্ররোচিত করেছিল (অর্থাৎ কারু পরামর্শে নয় বরং নিজস্ব চিন্তায় ওশয়তানী কুমন্ত্রণায় আমি একাজ করেছি)’। ‘মূসা বললেন, দূর হ, তোর জন্যসারাজীবন এই শাস্তিই রইল যে, তুই বলবি, ‘আমাকে কেউ স্পর্শ করো না’ এবংতোর জন্য (আখেরাতে) একটা নির্দিষ্ট ওয়াদা রয়েছে (অর্থাৎ জাহান্নাম), যারব্যতিক্রম হবে না। এক্ষণে তুই তোর সেই ইলাহের প্রতি লক্ষ্য কর,যাকে তুই সর্বদাপূজা দিয়ে ঘিরে থাকতিস। আমরা ওটাকে (অর্থাৎ কৃত্রিম গো-বৎসটাকে) অবশ্যইজ্বালিয়ে দেব এবং অবশ্যই ওকে বিক্ষিপ্ত করে সাগরেছিটিয়ে দেব’ (ত্বোয়াহা৯৫-৯৭)।সামেরী ও তার শাস্তি :পারস্য অথবা ভারতবর্ষের অধিবাসী সামেরীগো-পূজারী সম্প্রদায়ের লোক ছিল। পরে মিসরে পৌঁছে সে মূসা (আঃ)-এরউপরেবিশ্বাস স্থাপন করে। অত্যন্ত চতুর এই ব্যক্তিটি পরে কপট বিশ্বাসী ওমুনাফিক হয়ে যায়। কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ না পাওয়ায় সে বনু ইস্রাঈলদের সাথেসাগর পার হওয়ার সুযোগ পায়। মূসা (আঃ)-এর বিপুল নাম-যশ ও অলৌকিক ক্ষমতায়সে তার প্রতি মনে মনে ঈর্ষা পরায়ণ ছিল। মূসার সান্নিধ্য ও নিজস্বসুক্ষ্মদর্শিতার কারণে সে জিব্রাঈল ফেরেশতা সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সেইআগ্রহের কারণেই সাগর পার হওয়ার সময় সে জিব্রীলকে চিনতে পারে ও তারঘোড়ার পদচিহ্নের মাটি সংগ্রহ করে। তার ধারণা ছিল যে, মূসার যাবতীয়ক্ষমতার উৎস হ’ল এই ফেরেশতা। অতএব তার স্পর্শিত মাটি দিয়ে সেও এখন মূসারন্যায় অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হবে।মূসা (আঃ) সামেরীর জন্য পার্থিবজীবনে এই শাস্তি নির্ধারণ করেন যে, সবাই তাকে বর্জন করবে এবং কেউ তারকাছে ঘেঁষবে না। তিনি তাকেও নির্দেশ দেন যে, সে কারও গায়ে হাত লাগাবেনা। সারা জীবন এভাবেই সে বন্য জন্তুর ন্যায় সবার কাছ থেকে আলাদা থাকবে।এটাও সম্ভবপর যে, পার্থিব আইনগত শাস্তির ঊর্ধ্বে খোদ তার সত্তায় আল্লাহরহুকুমে এমন বিষয় সৃষ্টি হয়েছিল, যদ্দরুন সে নিজেও অন্যকে স্পর্শ করতে পারত নাএবং অন্যেরাও তাকে স্পর্শ করতে পারত না। যেমন এক বর্ণনায় এসেছে যে, মূসা(আঃ)-এর বদদো‘আয় তার মধ্যে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, সে কাউকেহাতলাগালে বা কেউ তাকে হাত লাগালে উভয়েই জ্বরাক্রান্ত হয়ে যেত’ (কুরতুবী,ত্বোয়াহা ৯৫)। এই ভয়ে সে সবার কাছ থেকে আলাদা হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতঘোরাফেরা করত। কাউকে নিকটে আসতে দেখলেই সে চীৎকার করে বলেউঠতোﻻﻣِﺴَﺎﺱَ ‘আমাকে কেউ স্পর্শ করো না’। বস্ত্ততঃ মৃত্যুদন্ডের চাইতে এটিই ছিল কঠিনশাস্তি। যা দেখে অপরের শিক্ষা হয়। বলা বাহুল্য, আজও ভারতবর্ষের হিন্দুদেরমধ্যে গো-মাতার পূজা অব্যাহত রয়েছে। যদিও উদারমনা উচ্চ শিক্ষিত হিন্দুগণক্রমেই এ অলীকবিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসছেন এবংগাভীকে দেবী নয় বরংমানুষের ব্যবহারযোগ্য ও খাদ্যযোগ্য প্রাণী হিসাবে বিশ্বাস করেন।কুরতুবী বলেন,এর মধ্যে দলীল রয়েছে এ বিষয়ে যে, বিদ‘আতী ও পাপাচারী ব্যক্তি থেকে দূরেথাকা যরূরী। তাদের সঙ্গে কোনরূপমেলামেশা ও আদান-প্রদান না করাই কর্তব্য।যেমন আচরণ শেষনবী (ছাঃ)জিহাদ থেকে পিছু হটা মদীনার তিনজন ধনীলোকেরসাথে (তাদের তওবা কবুলের আগ পর্যন্ত) করেছিলেন (কুরতুবী)।(৩) আল্লাহকেস্বচক্ষে দেখার যিদও তার পরিণতি :মূসা (আঃ) তূর পাহাড়ে তওরাৎ প্রাপ্ত হয়ে বনুইস্রাঈলের কাছে ফিরে এসে তা পেশ করলেন এবং বললেন যে, এটা আল্লাহ প্রদত্তকিতাব। তোমরা এর অনুসরণ কর। তখন কিছু সংখ্যক উদ্ধত লোক বলে উঠলো,যদিআল্লাহ স্বয়ং আমাদের বলে দেন যে, এটি তাঁর প্রদত্ত কিতাব, তাহ’লেই কেবলআমরা বিশ্বাস করব, নইলে নয়। হতে পারে তুমি সেখানে চল্লিশ দিন বসে বসেএটা নিজে লিখে এনেছ। তখন মূসা (আঃ) আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদেরকে তাঁরসাথে তূর পাহাড়ে যেতে বললেন। বনু ইস্রাঈলরা তাদের মধ্যে বাছাই করা সত্তরজনকে মনোনীত করে মূসা (আঃ)-এর সাথে তূরপাহাড়ে প্রেরণ করল। সেখানেপৌঁছে তারা আল্লাহর বাণী স্বকর্ণে শুনতে পেল। এরপরেও তাদের অবাধ্য মনশান্ত হ’ল না। শয়তানী ধোঁকায় পড়ে তারা নতুনএক অজুহাত তুলে বলল, এগুলোআল্লাহর কথা না অন্য কারু কথা, আমরা বুঝবো কিভাবে? অতএব যতক্ষণ আমরাতাঁকে সশরীরে প্রকাশ্যে আমাদের সম্মুখে না দেখব, ততক্ষণ আমরা বিশ্বাস করবনা যে, এসব আল্লাহর বাণী। কিন্তু যেহেতু এ পার্থিব জগতে চর্মচক্ষুতে আল্লাহকেদেখার ক্ষমতা কারু নেই, তাই তাদের এই চরম ধৃষ্টতার জবাবে আসমান থেকে ভীষণএক নিনাদ এল, যাতে সব নেতাগুলোই চোখের পলকে অক্কা পেল।অকস্মাৎ এমনঘটনায় মূসা (আঃ) বিস্মিত ও ভীত-বিহবল হয়ে পড়লেন। তিনি প্রার্থনা করেবললেন, হে আল্লাহ! এমনিতেই ওরা হঠকারী। এরপরে এদের এই মৃত্যুতেলোকেরাআমাকেই দায়ী করবে। কেননা মূল ঘটনার সাক্ষী কেউ থাকল না আমি ছাড়া।অতএব হে আল্লাহ! ওদেরকে পুনর্জীবন দান কর। যাতে আমি দায়মুক্ত হ’তে পারিএবং ওরাও গিয়ে সাক্ষ্য দিতে পারে। আল্লাহ মূসার দো‘আ কবুল করলেন এবং ওদেরজীবিত করলেন। এ ঘটনা আল্লাহ বর্ণনা করেন এভাবে- ﻭَﺇِﺫْ ﻗُﻠْﺘُﻢْ ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻟَﻦ ﻧُّﺆْﻣِﻦَ ﻟَﻚَ ﺣَﺘَّﻰﻧَﺮَﻯ ﺍﻟﻠﻪَﺟَﻬْﺮَﺓً ﻓَﺄَﺧَﺬَﺗْﻜُﻢُ ﺍﻟﺼَّﺎﻋِﻘَﺔُ ﻭَﺃَﻧﺘُﻢْ ﺗَﻨﻈُﺮُﻭﻥَ – ﺛُﻢَّ ﺑَﻌَﺜْﻨَﺎﻛُﻢ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِ ﻣَﻮْﺗِﻜُﻢْ ﻟَﻌَﻠَّﻜُﻢْ ﺗَﺸْﻜُﺮُﻭﻥَ – ‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ৫৫-৫৬)-‘আর যখন তোমরাবললে, হে মূসা! কখনোই আমরা তোমাকে বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আমরাআল্লাহকে প্রকাশ্যে দেখতে পাব। তখন তোমাদেরকে পাকড়াও করল এক ভীষণনিনাদ (বজ্রপাত), যা তোমাদের চোখের সামনেই ঘটেছিল’। ‘অতঃপর তোমাদেরমৃত্যুর পর আমরা তোমাদেরকে পুনর্জীবিত করলাম, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বীকার কর’ (বাক্বারাহ ২/৫৫-৫৬)।(৪) বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযানের নির্দেশ:সাগরডুবি থেকে মুক্তি পাবার পর হ’তে সিনাই উপত্যকা পেরিয়ে তূর পাহাড়েপৌঁছা পর্যন্ত সময়কালে মূর্তিপূজার আবদার, গো-বৎস পূজা ও তার শাস্তি, তওরাৎলাভ ও তা মানতে অস্বীকার এবং তূরপাহাড় উঠিয়ে ভয় প্রদর্শন, আল্লাহ্কেস্বচক্ষে দেখার যিদ ওতার পরিণতি প্রভৃতি ঘটনা সমূহেরপর এবার তাদের মূলগন্তব্যে যাত্রার জন্য আদেশ করা হ’ল।অবাধ্য জাতিকে তাদের আদি বাসস্থানেরওয়ানার প্রাক্কালে মূসা (আঃ) তাদেরকে দূরদর্শিতাপূর্ণ উপদেশবাণী শুনানএবং যেকোন বাধা সাহসের সাথে অতিক্রম করার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন।সাথে সাথে তিনি তাদেরকে বিগত দিনে আল্লাহর অলৌকিক সাহায্য লাভেরকথা স্মরণকরিয়ে দিয়ে অভয়বাণী শুনান। যেমন আল্লাহর ভাষায়, ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﻣُﻮﺳَﻰ ﻟِﻘَﻮْﻣِﻪِ ﻳَﺎﻗَﻮْﻡِ ﺍﺫْﻛُﺮُﻭْﺍﻧِﻌْﻤَﺔَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﺇِﺫْ ﺟَﻌَﻞَ ﻓِﻴْﻜُﻢْ ﺃَﻧﺒِﻴَﺎﺀَ ﻭَﺟَﻌَﻠَﻜُﻢْ ﻣُﻠُﻮْﻛﺎً ﻭَﺁﺗَﺎﻛُﻢْ ﻣَّﺎ ﻟَﻢْ ﻳُﺆْﺕِ ﺃَﺣَﺪﺍً ﻣِّﻦَﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴْﻦَ – ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﺩْﺧُﻠُﻮﺍ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽَ ﺍﻟْﻤُﻘَﺪَّﺳَﺔَ ﺍﻟَّﺘِﻲْﻛَﺘَﺐَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻟَﻜُﻢْ ﻭَﻻَ ﺗَﺮْﺗَﺪُّﻭْﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﺩْﺑَﺎﺭِﻛُﻢْ ﻓَﺘَﻨْﻘَﻠِﺒُﻮْﺍ ﺧَﺎﺳِﺮِﻳْﻦَ – ‏( ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ ২০-২১)-‘আর যখন মূসা স্বীয়সম্প্রদায়কেবলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহরাজি স্মরণ কর, যখনতিনি তোমাদের মধ্যে নবীগণকেসৃষ্টি করেছেন, তোমাদেরকে রাজ্যাধিপতিবানিয়েছেন এবং তোমাদেরকে এমন সব বস্ত্ত দিয়েছেন, যা বিশ্বজগতের কাউকেদেননি’। ‘হে আমার সম্প্রদায়! পবিত্র ভূমিতে (বায়তুল মুক্বাদ্দাস শহরে) প্রবেশকর, যাআল্লাহ তোমাদের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছেন। আর তোমরাপশ্চাদদিকে প্রত্যাবর্তন করবে না। তাতে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে’ (মায়েদাহ৫/২০-২১)।পবিত্র ভূমির পরিচিতি :বিভিন্ন রেওয়ায়াত অনুযায়ী বায়তুল মুক্বাদ্দাসসহ সমগ্র শাম অর্থাৎ সিরিয়া অঞ্চল পবিত্র ভূমির অন্তর্গত। আমাদের রাসূল(ছাঃ) কর্তৃক শাম পবিত্র ভূমি হওয়ার বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে।[41] আবহাওয়াগত দিকদিয়ে সিরিয়া প্রাচীন কাল থেকেই শস্য-শ্যামল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধএলাকা হিসাবে খ্যাত। জাহেলী যুগে মক্কার ব্যবসায়ীগণ নিয়মিত ভাবে ইয়ামনও সিরিয়ায় যথাক্রমে শীতকালে ও গ্রীষ্মকালে ব্যবসায়িক সফরে অভ্যস্ত ছিল।বলা চলে যে, এই দু’টি সফরের উপরেই মক্কাবাসীদের জীবিকা নির্ভর করত। সূরাকুরায়েশ-য়ে এ বিষয়ে উল্লেখিত হয়েছে।আল্লাহ সূরা বনু ইস্রাঈলের ১ম আয়াতে এইএলাকাকে ﺑَﺎﺭَﻛْﻨَﺎ ﺣَﻮْﻟَﻪُ বা‘বরকতময় এলাকা’ বলে অভিহিত করেছেন। এর বরকত সমূহ ছিলদ্বিবিধ: ধর্মীয় ও পার্থিব। ধর্মীয় দিকে বরকতের কারণ ছিল এই যে, এ অঞ্চলটিহ’ল, ইবরাহীম, ইয়াকূব, দাঊদ, সুলায়মান, ঈসা (আঃ) সহ কয়েক হাযার নবীরজন্মস্থান, বাসস্থান, কর্মস্থল ও মৃত্যুস্থান। মূসা (আঃ)-এর জন্ম মিসরে হ’লেও তাঁরমৃত্যু হয় এখানে এবং তাঁর কবর হ’ল বায়তুল মুক্কাদ্দাসের উপকণ্ঠে। নিকটবর্তী তীহ্প্রান্তরে মূসা, হারূণ, ইউশা‘ প্রমুখ নবী বহু বৎসর ধরে তাওহীদের প্রচার ও প্রসারঘটিয়েছেন। তাঁদের প্রচারের ফল অন্ততঃ এটুকু ছিল এবং এখনও আছে যে, আরবউপদ্বীপে কোন নাস্তিক বাকাফির নেই।অতঃপর পার্থিব বরকত এই যে, সিরিয়াঅঞ্চল ছিল চিরকাল উর্বরএলাকা। এখানে রয়েছে অসংখ্য ঝরণা, বহমান নদ-নদীএবং অসংখ্য ফল-ফসলের বাগ-বাগিচা সমূহ। বিভিন্ন সুমিষ্ট ফল উৎপাদনেরক্ষেত্রে এ অঞ্চলটি সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে বলা যায় অতুলনীয়। একটি হাদীছে এসেছে,দাজ্জাল সমগ্র পৃথিবীতে বিচরণ করবে কিন্তু চারটি মসজিদে পৌঁছতে পারবে না;বায়তুল্লাহ, মসজিদে নববী, বায়তুল মুক্বাদ্দাস ও মসজিদে তূর’।[42]মূসা (আঃ)-এরআগমনকালে বায়তুল মুক্বাদ্দাস সহ সমগ্র শাম এলাকাআমালেক্বা সম্প্রদায়েরঅধীনস্থ ছিল। তারা ছিল কওমে ‘আদ-এর একটি শাখা গোত্র। দৈহিক দিক দিয়েতারা ছিল অত্যন্ত সুঠাম, বলিষ্ঠ ও ভয়াবহ আকৃতি বিশিষ্ট। তাদের সাথে যুদ্ধ করেবায়তুল মুক্বাদ্দাস অধিকার করার নির্দেশ মূসা (আঃ) ও তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহদিয়েছিলেন। হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর মিসরে হিজরতের পর কেন‘আন সহ শামএলাকা আমালেক্বাদের অধীনস্থ হয়। আয়াতে বর্ণিত ‘রাজ্যাধিপতিবানিয়েছেন’ বাক্যটি ভবিষ্যদ্বাণী হ’তে পারে, যার সম্পর্কে মূসা (আঃ)আল্লাহর নিকট থেকে নিশ্চিত ওয়াদা পেয়েছিলেন। তবে শর্ত ছিল যে, তারাজিহাদ করে কেন‘আন দখল করবে। অর্থাৎ আল্লাহর উপরে ভরসা করে জিহাদেঅগ্রসর হ’লে তারা অবশ্যই জয়লাভ করবে। যেভাবে ফেরাঊনের বিরুদ্ধে তারাঅলৌকিক বিজয় অর্জন করেছিল মাত্র কিছুদিন পূর্বে।অতঃপর ‘তাদেরকে এমন সববস্ত্ত দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বের কাউকে দেওয়া হয়নি’ বলতে তাদের দেওয়াধর্মীয় নেতৃত্ব ও সামাজিক নেতৃত্ব উভয়কে বুঝানো হয়েছে, যা একত্রে কাউকেইতিপূর্বে দেওয়া হয়নি। এটাও ভবিষ্যদ্বাণী হ’তে পারে, যা তাদের বংশেরপরবর্তী নবী দাঊদ ও সুলায়মানের সময়ে পূর্ণতা লাভ করেছিল। তাদের সময়েও এটাসম্ভবছিল, যদি নাকি তারা নবী মূসা (আঃ)-এর নেতৃত্বে জিহাদে বেরিয়েপড়ত।কিন্তু হতভাগারা তা পারেনি বলেই বঞ্চিত হয়েছিল।নবুঅত-পরবর্তী ৪র্থ পরীক্ষা: বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযানআল্লাহ পাক মূসা (আঃ)-এর মাধ্যমে বনু ইস্রাঈলকেআমালেক্বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে জিহাদ করে শাম দখল করতে বলেছিলেন। সাথেসাথে এ সুসংবাদও দিয়েছিলেন যে, শামের ভূখন্ড তাদের ভাগ্যে লেখা হয়েগেছে (মায়েদাহ ৫/২১)। কাজেই তোমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। কিন্তু এইসব বিলাসীকাপুরুষেরা আল্লাহর কথায় দৃঢ় বিশ্বাস আনতে পারেনি।মূসা (আঃ) আল্লাহরনির্দেশ পালনের জন্য বনী ইস্রাঈলকে সাথেনিয়ে মিসর থেকে শাম অভিমুখেরওয়ানা হ’লেন। যথা সময়ে তাঁরা জর্দান নদী পার হয়ে ‘আরীহা’ ( ﺃﺭﻳﺤﺔ ) পৌঁছেশিবির স্থাপন করলেন। এটি ছিল পৃথিবীর প্রাচীনতম মহানগরী সমূহের অন্যতম, যাজর্দান নদী ও বায়তুলমুক্বাদ্দাসের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। যা আজওস্বনামেবিদ্যমান রয়েছে। মূসা (আঃ)-এর সময়ে এ শহরের অত্যাশ্চর্য জাঁক-জমক ওবিস্তৃতি ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে।শিবির স্থাপনের পর মূসা (আঃ) বিপক্ষ দলেরঅবস্থা ও অবস্থান পর্যবেক্ষণের জন্য ১২ জন সর্দারকে প্রেরণ করলেন। যারাছিলেন হযরত ইয়াকূব (আঃ)-এর বারো পুত্রের বংশধরগণের ‘বারোজন প্রতিনিধি,যাদেরকে তিনি আগেই নির্বাচন করেছিলেন স্ব স্ব গোত্রের লোকদেরদেখাশুনার জন্য’(মায়েদাহ ৫/১২)। তারা রওয়ানা হবার পর বায়তুল মুক্বাদ্দাসশহরের উপকণ্ঠে পৌঁছলে বিপক্ষ দলের বিশালদেহী বিকট চেহারার একজন লোকেরসঙ্গে সাক্ষাত হয়। ইস্রাঈলী রেওয়ায়াত সমূহে লোকটির নাম ‘আউজ ইবনে ওনুক’ ( ﻋﻮﺝﺑﻦ ﻋﻨﻖ ) বলা হয়েছে এবং তার আকার-আকৃতি ও শক্তি-সাহসের অতিরঞ্জিত বর্ণনাসমূহ উদ্ধৃত হয়েছে (ইবনু কাছীর)। যাই হোক উক্ত ব্যক্তি একাই বনু ইস্রাঈলের এই বারজন সরদারকে পাকড়াও করে তাদের বাদশাহর কাছেনিয়ে গেল এবং অভিযোগ করলযে, এই লোকগুলি আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতলব নিয়ে এসেছে। বাদশাহ তারনিকটতম লোকদের সাথে পরামর্শের পর এদের ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন এইউদ্দেশ্যে যে, এরা গিয়ে তাদের নেতাকে আমালেক্বাদের জাঁক-জমক ও শৌর্য-বীর্যের স্বচক্ষে দেখা কাহিনী বর্ণনা করবে। তাতে ওরা ভয়ে এমনিতেই পিছিয়েযাবে। পরবর্তীতে দেখা গেল যে, বাদশাহর ধারণাই সত্যে পরিণত হয়েছিল।এইভীত-কাপুরুষ সর্দাররা জিহাদ দূরে থাক, ওদিকে তাকানোর হিম্মতও হারিয়েফেলেছিল।বনু ইস্রাঈলের বারো জন সর্দার আমালেক্বাদের হাত থেকে মুক্ত হয়েস্বজাতির কাছে ফিরে এল এবং আমালেক্বাদের বিস্ময়কর উন্নতি ও অবিশ্বাস্যশক্তি-সামর্থ্যের কথা মূসা (আঃ)-এর নিকটে বর্ণনা করল। কিন্তু মূসা (আঃ) এতেমোটেই ভীত হননি। কারণ তিনি আগেই অহী প্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং বিজয়সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। সেমতে তিনি গোত্রনেতাদের যুদ্ধ প্রস্ত্ততি গ্রহণেরনির্দেশ দিলেন এবং আমালেক্বাদের শৌর্য-বীর্যের কথা অন্যের কাছেপ্রকাশকরতে নিষেধ করলেন। কিন্তু দেখা গেল যে, ইউশা‘ বিন নূন ও কালেববিনইউক্বেন্না ব্যতীত বাকী সর্দাররা গোপনে সব ফাঁস করে দিল (কুরতুবী, ইবনুকাছীর)। ফলে যা হবার তাই হ’ল। এই ভীতু আরামপ্রিয় জাতি একেবারে বেঁকেবসলো। ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺇِﻥَّ ﻓِﻴﻬَﺎ ﻗَﻮْﻣﺎً ﺟَﺒَّﺎﺭِﻳْﻦَ ﻭَﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻦْ ﻧَﺪْﺧُﻠَﻬَﺎ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺨْﺮُﺟُﻮﺍ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﻓَﺈِﻥ ﻳَّﺨْﺮُﺟُﻮﺍﻣِﻨْﻬَﺎ ﻓَﺈِﻧَّﺎ ﺩَﺍﺧِﻠُﻮﻥَ – ‏( ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ২২)-‘তারা বলল, হে মূসা! সেখানে একটি প্রবল পরাক্রান্ত জাতি রয়েছে। আমরাকখনো সেখানে যাব না, যে পর্যন্ত না তারা সেখান থেকে বের হয়ে যায়। যদিতারা সেখান থেকে বের হয়ে যায়, তবে নিশ্চিতই আমরা সেখানে প্রবেশকরব’ (মায়েদাহ ৫/২২)। অর্থাৎ ওরা চায় যে, মূসা (আঃ) তার মু‘জেযার মাধ্যমেযেভাবে ফেরাঊনকে ডুবিয়ে মেরে আমাদের উদ্ধার করেএনেছেন, অনুরূপভাবেআমালেক্বাদের তাড়িয়ে দিয়ে তাদের পরিত্যক্ত অট্টালিকা ও সম্পদরাজিরউপরে আমাদের মালিক বানিয়ে দিন। অথচ আল্লাহর বিধানএই যে, বান্দাকেচেষ্টা করতে হবেএবং আল্লাহর উপর ভরসা করতে হবে। কিন্তু বনু ইস্রাঈলরা একপাও বাড়াতে রাযী হয়নি। এমতাবস্থায় ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺟُﻼَﻥِ ﻣِﻦَ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻳَﺨَﺎﻓُﻮْﻥَ ﺃَﻧْﻌَﻢَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻤَﺎ ﺍﺩْﺧُﻠُﻮْﺍ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢُﺍﻟْﺒَﺎﺏَ ﻓَﺈِﺫَﺍﺩَﺧَﻠْﺘُﻤُﻮْﻩُ ﻓَﺈِﻧَّﻜُﻢْ ﻏَﺎﻟِﺒُﻮْﻥَ ﻭَﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﻓَﺘَﻮَﻛَّﻠُﻮْﺍ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺘُﻢ ﻣُّﺆْﻣِﻨِﻴْﻦَ – ‏( ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ ২৩)-‘তাদের মধ্যকার দু’জনআল্লাহভীরুব্যক্তি (সম্ভবতঃ পূর্বের দু’জন সর্দার হবেন, যাদের মধ্যে ইউশা‘ পরে নবীহয়েছিলেন), যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছিলেন, তারা বলল, (মূসা (আঃ)-এরআদেশ মতে) ‘তোমরা ওদের উপর আক্রমণ করে (শহরের মূল) দরজায় প্রবেশ কর।(কেননা আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস যে,) যখনই তোমরা তাতে প্রবেশ করবে, তখনইতোমরা অবশ্যই জয়ী হবে। আর তোমরা আল্লাহর উপরে ভরসা কর, যদিতোমরা মুমিনহয়ে থাক’ (মায়েদাহ৫/২৩)।কিন্তু ঐ দুই নেককার সর্দারের কথার প্রতি তারাদৃকপাত করল না। বরং আরও উত্তেজিত হয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে মূসা (আঃ)-কেউদ্দেশ্য করে বলল, ﻳَﺎ ﻣُﻮﺳَﻰ ﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻦْ ﻧَﺪْﺧُﻠَﻬَﺎ ﺃَﺑَﺪﺍً ﻣَﺎ ﺩَﺍﻣُﻮْﺍ ﻓِﻴﻬَﺎ، ﻓَﺎﺫْﻫَﺐْ ﺃَﻧﺖَ ﻭَﺭَﺑُّﻚَ ﻓَﻘَﺎﺗِﻼ، ﺇِﻧَّﺎﻫَﺎﻫُﻨَﺎ ﻗَﺎﻋِﺪُﻭْﻥَ – ‏( ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ ২৪)-‘হে মূসা! আমরা কখনোই সেখানে প্রবেশ করব না, যতক্ষণ তারা সেখানে আছে।অতএব তুমি ও তোমার পালনকর্তা যাও এবং যুদ্ধ কর গে। আমরা এখানেই বসেরইলাম’ (মায়েদাহ ৫/২৪)। নবীর অবাধ্যতার ফলস্বরূপ এই জাতিকে ৪০ বছর তীহ্প্রান্তরের উন্মুক্ত কারাগারে বন্দী থাকতে হয় (মায়েদাহ ৫/২৬)। অতঃপর এইসবদুষ্টমতি নেতাদের মৃত্যুর পর পরবর্তী বংশধররা হযরত ইউশা‘ বিন নূন (আঃ)-এরনেতৃত্বে জিহাদ করে বায়তুল মুক্বাদ্দাস পুনর্দখল করে (কুরতুবী, ইবনু কাছীর)।বনুইস্রাঈলের এই চূড়ান্ত বেআদবী ছিল কুফরীর নামান্তর এবংঅত্যন্ত পীড়াদায়ক। যাপরবর্তীতে প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়ে গেছে। বদরের যুদ্ধের সময়েশেষনবীমুহাম্মাদ (ছাঃ) কিছুটা অনুরূপ অবস্থায় পতিত হয়েছিলেন। অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনাও ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর অল্প সংখ্যক সবেমাত্র মুহাজির মুসলমানের মোকাবেলায়তিনগুণ শক্তিসম্পন্ন সুসজ্জিত বিরাট কুরায়েশ সেনাবাহিনীর আগমনে হতচকিত ওঅপ্রস্ত্তত মুসলমানদের বিজয়ের জন্য যখন নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর নিকটেসাহায্য প্রার্থনা করছিলেন, তখন মিক্বদাদ ইবনুল আসওয়াদ আনছারী (রাঃ) দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কস্মিনকালেও ঐকথা বলব না,যা মূসা (আঃ)-এর স্বজাতি তাঁকে বলেছিল, ﻓَﺎﺫْﻫَﺐْ ﺃَﻧْﺖَ ﻭَﺭَﺑُّﻚَ ﻓَﻘَﺎﺗِﻼَ ﺇِﻧَّﺎ ﻫَﺎﻫُﻨَﺎ ﻗَﺎﻋِﺪُﻭْﻥَ – ‘তুমি ওতোমার প্রভু যাও যুদ্ধ করগে। আমরা এখানে বসে রইলাম’ (মায়েদাহ ৫/২৪)। বরংআমরা আপনার ডাইনে, বামে, সামনে ও পিছনে থেকে শত্রুরআক্রমণ প্রতিহত করব।আপনি নিশ্চিন্তে যুদ্ধের প্রস্ত্ততি গ্রহণ করুন’। বিপদ মুহূর্তে সাথীদের এরূপবীরত্বব্যঞ্জক কথায় আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) অত্যন্ত প্রীত হয়েছিলেন।[43]মিসরথেকে হিজরতের কারণ :ইউসুফ হ’তে মূসা পর্যন্ত দীর্ঘ চার/পাঁচশ’ বছর মিসরেঅবস্থানের পর এবং নিজেদের বিরাট জনসংখ্যা ছাড়াও ফেরাঊনীদের বহু সংখ্যকলোক গোপনে অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও এবং মূসা (আঃ)-এর মত শক্তিশালী একজননবীকে পাওয়া সত্ত্বেও বনু ইস্রাঈলকে কেন রাতের অন্ধকারে মিসর থেকেপালিয়ে আসতে হ’ল? অতঃপর পৃথিবীরকোথাও তারা আর স্থায়ীভাবে একত্রেবসবাস করতে পারেনি, তার একমাত্র কারণ ছিল ‘জিহাদ বিমুখতা’। এই বিলাসী,ভীরু ও কাপুরুষের দল ‘ফেরাঊন ও তার দলবলের ভয়ে এতই ভীত ছিল যে, তাদেরনিষ্ঠুরতম নির্যাতনের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করত না। বরং মূসা (আঃ)-এর কাছে পাল্টাঅভিযোগ তুলতো যে, তোমার কারণেই আমরা বিপদে পড়ে গেছি’। যেমন সূরাআ‘রাফ ১২৯ আয়াতে এ বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। ‘অথচ ঐ সময় মিসরে মুসলমানেরসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১০ থেকে ২০ শতাংশ ছিল’।[44]মিসর থেকে বেরিয়েবায়তুল মুক্বাদ্দাস নগরী দখলের জন্যও তাদেরকে যখন জিহাদের হুকুম দেওয়া হ’ল,তখনও তারা একইভাবে পিছুটান দিল। যার পরিণতি তারা সেদিনের ন্যায় আজওভোগ করছে। বস্ত্ততঃ বিলাসী জাতি ভীরু হয় এবং জিহাদ বিমুখ জাতি কখনোইকোথাও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।শিক্ষণীয় বিষয় :মূসা (আঃ)-এরজীবনের এই শেষ পরীক্ষায় দৃশ্যত: তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন বলে অনুমিত হ’লেওপ্রকৃতঅর্থে তিনি ব্যর্থ হননি।বরং তিনি সকল যুগের ঈমানদারগণকেজানিয়ে গেছেন যে,কেবল মু‘জেযা বা কারামত দিয়ে দ্বীন বিজয়ী হয় না। তার জন্য প্রয়োজনআল্লাহর উপরে দৃঢ় বিশ্বাসী একদল মুমিনের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা। আর এটাই হ’লজিহাদ। ৪০ বছর পর যখন তারা পুনরায় জিহাদে নামল, তখনই তারা বিজয়ী হ’ল।যুগে যুগে এটাই সত্য হয়েছে।বাল‘আম বা‘ঊরার ঘটনা :ফিলিস্তীন দখলকারী‘জাববারীন’ তথা আমালেক্বা সম্প্রদায়ের শক্তিশালী নেতারা মূসা (আঃ)প্রেরিত ১২ জন প্রতিনিধিকে ফেরৎপাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনি। কারণতারা মূসা (আঃ)-এর মু‘জেযার কারণে ফেরাঊনের সসৈন্যে সাগরডুবির খবর আগেইজেনেছিল। অতএব মূসা (আঃ)-এর বায়তুল মুক্বাদ্দাস অভিযান বন্ধ করার জন্য তারাবাঁকা পথ তালাশ করল। তারা অত্যন্ত গোপনে বনু ইস্রাঈলের ঐ সময়কার একজননামকরা সাধক ও দরবেশ আলেম বাল‘আম ইবনে বা‘ঊরার ( ﺑﻠﻌﻢ ﺑﻦ ﺑﺎﻋﻮﺭﺍﺀ ) কাছে বহুমূল্যবান উপঢৌকনাদিসহ লোক পাঠাল। বাল‘আম তার স্ত্রীর অনুরোধে তা গ্রহণকরল। অতঃপর তার নিকটে আসল কথা পাড়া হ’ল যে, কিভাবে আমরা মূসারঅভিযান ঠেকাতে পারি। আপনি পথ বাৎলে দিলে আমরা আরও মহামূল্যবানউপঢৌকনাদি আপনাকে প্রদান করব। বাল‘আম উঁচুদরের আলেম ছিল। যে সম্পর্কেতার নাম না নিয়েই আল্লাহ বলেন, ﻭَﺍﺗْﻞُ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﻧَﺒَﺄَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻩُ ﺁﻳَﺎﺗِﻨَﺎ ﻓَﺎﻧﺴَﻠَﺦَ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﻓَﺄَﺗْﺒَﻌَﻪُ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُﻓَﻜَﺎﻥَ ﻣِﻦَﺍﻟْﻐَﺎﻭِﻳْﻦَ – ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৭৫)-‘আপনি তাদেরকে শুনিয়ে দিন সেই লোকটির অবস্থা, যাকেআমরা আমাদের নিদর্শন সমূহ দান করেছিলাম। অথচ সে তা পরিত্যাগ করেবেরিয়ে গেল। আর তার পিছনে লাগল শয়তান। ফলে সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়েগেল’ (আ‘রাফ ৭/১৭৫)।কথিত আছে যে, বাল‘আম ‘ইসমে আযম’ জানত। সে যা দো‘আকরত, তা সাথে সাথে কবুল হয়ে যেত। আমালেক্বাদের অনুরোধ ও পীড়াপীড়িতেসে অবশেষে মূসার বিরুদ্ধে দো‘আ করল। কিন্তু তার জিহবা দিয়ে উল্টা দো‘আ বেরহ’তে লাগল যা আমালেক্বাদের বিরুদ্ধে যেতে লাগল। তখন সে দো‘আ বন্ধ করল।কিন্তু অন্য এক পৈশাচিক রাস্তা সে তাদের বাৎলে দিল। সে বলল, বনুইস্রাঈলগণের মধ্যে ব্যভিচার ছড়িয়ে দিতে পারলে আল্লাহ তাদের উপরে নারাযহবেন এবং তাতে মূসার অভিযান বন্ধ হয়ে যাবে’। আমালেক্বারা তার পরামর্শগ্রহণ করল এবং তাদের সুন্দরী মেয়েদেরকে বনু ইস্রাঈলের নেতাদের সেবাদাসীহিসাবে অতি গোপনে পাঠিয়ে দিল। বড় একজন নেতা এফাঁদে পা দিল। আস্তেআস্তে তা অন্যদের মধ্যেও সংক্রমিত হ’ল। ফলে আল্লাহর গযব নেমে এল। বনুইস্রাঈলীদের মধ্যেপ্লেগ মহামারী দেখা দিল। কথিত আছে যে, একদিনেই সত্তরহাযার লোকমারা গেল। এ ঘটনায় বাকী সবাই তওবা করল এবং প্রথম পথভ্রষ্টনেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করে রাস্তার উপরে ঝুলিয়ে রাখা হ’ল। অতঃপর আল্লাহরগযব উঠে গেল। এগুলি ইস্রাঈলী বর্ণনা।=(কুরতুবী ও ইবনু কাছীর উভয়ে এ ঘটনাবর্ণনা করেছেন উক্ত আয়াতের শানে নুযূল হিসাবে। আয়াতের মর্মে বুঝা যায় যে,ঘটনার কিছু সারবত্তা রয়েছে। যদিও সত্য বা মিথ্যা আল্লাহই ভালো জানেন। –লেখক)।সম্ভবতঃ সম্প্রদায়ের নেতাদের ক্রমাগত অবাধ্যতা, শঠতা ও পাপাচারেঅতিষ্ঠ হ’য়ে এবং একসাথে এই বিরাট জনশক্তি বিনষ্টহওয়ায় মূসা (আঃ) বায়তুলমুক্বাদ্দাস অভিযানের সংকল্প পরিত্যাগ করেন।তীহ্ প্রান্তরে ৪০ বছরের বন্দীত্ববরণ :মূসা (আঃ)-এর প্রতি অবাধ্যতা ও জিহাদ থেকে বিমুখ হওয়ার শাস্তিস্বরূপ বনুইস্রাঈলগণকে মিসর ও শাম-এর মধ্যবর্তী একটি উন্মুক্তপ্রান্তরে দীর্ঘ ৪০ বছরেরজন্য বন্দী করা হয়। তাদের অবাধ্যতায় বিরক্ত ও হতাশ হয়ে নবী মূসা (আঃ)আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করেন, ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺏِّ ﺇِﻧِّﻲ ﻻ ﺃَﻣْﻠِﻚُ ﺇِﻻَّ ﻧَﻔْﺴِﻲ ﻭَﺃَﺧِﻲْ ﻓَﺎﻓْﺮُﻕْ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﺑَﻴْﻦَ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِﺍﻟْﻔَﺎﺳِﻘِﻴْﻦَ – ‏( ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ২৫)-‘হে আমার পালনকর্তা! আমি কোন ক্ষমতা রাখি না কেবল আমার নিজের উপরও আমার ভাইয়ের উপর ব্যতীত। অতএব আপনি আমাদের ও পাপাচারী কওমের মধ্যেফায়ছালা করে দিন’ (মায়েদাহ ৫/২৫)। জবাবে আল্লাহ বলেন, ﻗَﺎﻝَ ﻓَﺈِﻧَّﻬَﺎ ﻣُﺤَﺮَّﻣَﺔٌ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﺃَﺭْﺑَﻌِﻴْﻦَﺳَﻨَﺔً ﻳَّﺘِﻴْﻬُﻮْﻥَ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﻓَﻼَ ﺗَﺄْﺳَﻌَﻠَﻰ ﺍﻟْﻘَﻮْﻡِ ﺍﻟْﻔَﺎﺳِﻘِﻴْﻦَ – ‏( ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ ২৬)-‘এদেশটি (বায়তুল মুক্বাদ্দাস সহশামদেশ) চল্লিশ বছর পর্যন্ত তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হ’ল। এ সময় তারা ভূপৃষ্ঠেউদ্ভ্রান্ত হয়ে ফিরবে। অতএব তুমি অবাধ্য কওমের জন্য দুঃখ করো না’ (মায়েদাহ৫/২৬)। ﺗَﺎﻩَ ﻳَﺘِﻴْﻪُ ﺗِﻴْﻬًﺎ অর্থ গর্ব করা, পথ হারিয়ে ঘোরা ইত্যাদি। এখান থেকেই উক্তপ্রান্তরের নাম হয়েছে ‘তীহ্’ ( ﺗِﻴْﻪ )। বস্ত্ততঃ এই উন্মুক্ত কারাগারে না ছিল কোনপ্রাচীর, নাছিল কোন কারারক্ষী। তারা প্রতিদিন সকালে উঠে মিসর অভিমুখেরওয়ানা হ’ত। আর সারাদিন চলার পর রাতে আবার সেখানে এসেই উপস্থিত হ’ত,যেখান থেকে সকালে তারা রওয়ানা হয়েছিল। কিন্তু কোনভাবেই তারা অদৃশ্যকারা প্রাচীর ভেদ করে যেতে পারত না। এভাবে চল্লিশ বছর পর্যন্ত হতবুদ্ধিঅবস্থায় দিগ্বিদিক ঘুরে এই হঠকারী অবাধ্য জাতি তাদের দুনিয়াবী শাস্তিভোগ করতে থাকে। যেমন ইতিপূর্বে নূহ (আঃ)-এর অবাধ্য কওম দুনিয়াবী শাস্তিহিসাবে প্লাবণে ডুবে নিশ্চিহ্ন হয়েছিল। বস্ত্ততঃ চল্লিশ বছরের দীর্ঘ সময়েরমধ্যে হারূণও মূসা (আঃ)-এর তিন বছরের বিরতিতেমৃত্যু হয়। অতঃপর শাস্তিরমেয়াদ শেষে পরবর্তী নবী ইউশা‘ বিন নূন-এর নেতৃত্বে জিহাদের মাধ্যমে তারাবায়তুল মুক্কাদ্দাস জয়ে সমর্থ হয় এবংসেখানে প্রবেশ করে। বর্ণিত হয়েছে যে, ১২জন নেতার মধ্যে ১০ জন অবাধ্য ও ভীরু নেতা এরি মধ্যেমারা যায় এবং মূসার অনুগতইউশা‘ ও কালেব দুই নেতাই কেবল বেঁচে থাকেন, যাদের হাতে বায়তুল মুক্বাদ্দাসবিজিত হয় (কুরতুবী, ইবনু কাছীর, তাফসীর মায়েদাহ ২৬)।তীহ্ প্রান্তরের ঘটনাবলী:নবীর সঙ্গে যে বেআদবী তারা করেছিল, তাতে আল্লাহর গযবে তাদের ধ্বংস হয়েযাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আল্লাহ পাক হয়ত এ জাতিকে আরও পরীক্ষাকরতে চেয়েছিলেন এবং আল্লাহর অপার অনুগ্রহপুষ্ট একটি জাতি নিজেদেরঅবাধ্যতা ও হঠকারিতার ফলে কিভাবে আল্লাহর অভিসম্পাৎগ্রস্ত হয় এবংক্বিয়ামত পর্যন্ত চিরস্থায়ী লাঞ্ছনার শিকার হয়, পৃথিবীর মানুষের নিকটেদৃষ্টান্ত হিসাবে তা পেশ করতে চেয়েছিলেন।ঠিক যেভাবে দৃষ্টান্ত হয়েছেফেরাঊন একজন অবাধ্য ও অহংকারী নরপতি হিসাবে। আর তাই বনু ইস্রাঈলেরপরীক্ষার মেয়াদ আরও বর্ধিত হ’ল। নিম্নে তাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কিছুনিদর্শন বর্ণিত হ’ল।-১. মেঘ দ্বারা ছায়া প্রদান :ছায়াশূন্য তপ্ত বালুকা বিস্তৃতমরুভূমিতে কাঠফাটা রোদে সবচেয়ে প্রয়োজন যেসব বস্ত্তর, তন্মধ্যে ‘ছায়া’ হ’লসর্বপ্রধান। হঠকারী উম্মতের অবাধ্যতায় ত্যক্ত-বিরক্ত মূসা (আঃ) দয়াপরবশ হয়েআল্লাহর নিকটে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রার্থনা নিবেদন করেছেন। দয়ালুআল্লাহ তাঁর দো‘আ সমূহ কবুল করেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তাঁরবিশেষ রহমত সমূহ নাযিল করেছেন। তন্মধ্যে একটি হ’ল উন্মুক্ত তীহ্ প্রান্তরেরউপরে শামিয়ানা সদৃশ মেঘমালার মাধ্যমে শান্তিদায়ক ছায়া প্রদান করা। যেমনআল্লাহ এই অকৃতজ্ঞ জাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ﻭَﻇَﻠَّﻠْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢُ ﺍﻟْﻐَﻤَﺎﻡَ ‘স্মরণ করসেকথা, যখন আমরা তোমাদেরকে ছায়া দান করেছিলাম মেঘমালারমাধ্যমে’ (বাক্বারাহ ২/৫৭)।২. ঝর্ণাধারার প্রবাহ :ছায়ার পরেই গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্তহ’ল পানি। যার অপর নাম জীবন। পানি বিহনে তৃষ্ণার্ত পিপাসার্ত উম্মতেরআহাজারিতে দয়া বিগলিত নবী মূসা স্বীয় প্রভুর নিকটে কাতর কণ্ঠে পানিপ্রার্থনা করলেন। কুরআনের ভাষায়, ﻭَﺇِﺫِ ﺍﺳْﺘَﺴْﻘَﻰ ﻣُﻮْﺳَﻰ ﻟِﻘَﻮْﻣِﻪِ ﻓَﻘُﻠْﻨَﺎ ﺍﺿْﺮِﺏْ ﺑِﻌَﺼَﺎﻙَ ﺍﻟْﺤَﺠَﺮَﻓَﺎﻧْﻔَﺠَﺮَﺕْ ﻣِﻨْﻪُ ﺍﺛْﻨَﺘَﺎﻋَﺸْﺮَﺓَ ﻋَﻴْﻨﺎً ﻗَﺪْ ﻋَﻠِﻢَ ﻛُﻞُّ ﺃُﻧَﺎﺱٍ ﻣَّﺸْﺮَﺑَﻬُﻢْ ﻛُﻠُﻮْﺍ ﻭَﺍﺷْﺮَﺑُﻮْﺍﻣِﻦ ﺭِّﺯْﻕِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﻻَ ﺗَﻌْﺜَﻮْﺍ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﻣُﻔْﺴِﺪِﻳْﻦَ -‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ৬০)-‘আর মূসা যখনস্বীয় জাতির জন্য পানি চাইল, তখন আমি বললাম, তোমার লাঠি দিয়ে পাথরেরউপরে আঘাত কর। অতঃপর তা থেকে বেরিয়ে এলো (১২টি গোত্রের জন্য) ১২টিঝর্ণাধারা। তাদের সব গোত্রই চিনে নিল (অর্থাৎ মূসার নির্দেশ অনুযায়ীনির্ধারণ করে নিল) নিজ নিজ ঘাট। (আমি বললাম,) তোমরা আল্লাহর দেওয়ারিযিক খাও আর পান কর। খবরদার যমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়িয়োনা’ (বাক্বারাহ ২/৬০)।বস্ত্ততঃ ইহুদী জাতি তখন থেকে এযাবত পৃথিবী ব্যাপীফাসাদ সৃষ্টি করেই চলেছে। তারা কখনোই আল্লাহর কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনি।৩.মান্না ও সালওয়া খাদ্য পরিবেশন :মরুভূমির বুকে চাষবাসের সুযোগ নেই। নেই শস্যউৎপাদন ও বাইরে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ। কয়েকদিনের মধ্যেই মওজুদ খাদ্যশেষ হয়ে গেলে হাহাকার পড়ে গেল তাদের মধ্যে। নবী মূসা (আঃ) ফের দো‘আকরলেন আল্লাহর কাছে। এবার তাদের জন্য আসমান থেকে নেমে এলো জান্নাতীখাদ্য ‘মান্না ও সালওয়া’- যা পৃথিবীর আর কোন নবীর উম্মতের ভাগ্যে জুটেছেবলেজানা যায় না।‘মান্না’ এক প্রকার খাদ্য, যা আল্লাহ তা‘আলা বনু ইস্রাঈলদেরজন্য আসমান থেকে অবতীর্ণ করতেন।আর তা ছিল দুধের চেয়েও সাদা এবংমধুরচেয়েও মিষ্টি। আর ‘সালওয়া’ হচ্ছে আসমান থেকে আগত এক প্রকার পাখি।[45]প্রথমটি দিয়ে রুটি ও দ্বিতীয়টি দিয়ে গোশতের অভাব মিটত। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)বলেছেন, ﺍﻟْﻜَﻤْﺄَﺓُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤَﻦِّ ‘কামআহ হ’ল মান্ন-এর অন্তর্ভুক্ত’।[46] এতে বুঝা যায় ‘মান্ন’কয়েক প্রকারের ছিল। ইংরেজীতে ‘কামআহ’ অর্থ করা হয়েছে‘মাশরূম’ (Mashroom)। আধুনিক গবেষণায় বলা হয়েছে যে, মান্ন একপ্রকার আঠাজাতীয় উপাদেয় খাদ্য। যা শুকিয়ে পিষেরুটি তৈরী করে তৃপ্তির সাথে আহারকরা যায়। ‘সালওয়া’ একপ্রকার চড়ুই পাখি, যা ঐসময় সিনাই এলাকায় প্রচুর পাওয়াযেত। ব্যাঙের ছাতার মত সহজলভ্য ও কাই জাতীয় হওয়ায় সম্ভবত একে মাশরূম-এরসাথে তুলনীয় মনে করা হয়েছে। তবে মাশরূম ও ব্যাঙের ছাতা সম্পূর্ণ পৃথক জিনিস।কয়েক লাখ বনু ইস্রাঈল কয়েক বছর ধরে মান্না ও সালওয়া খেয়ে বেঁচে ছিল। এতেবুঝা যায় যে, মান্ন ছিল চাউল বা গমের মত কার্বো-হাইড্রেট-এর উৎস এবংসালওয়া বা চড়ুই জাতীয় পাখির গোশত ছিল ভিটামিন ও চর্বির উৎস। সব মিলেতারা পরিপূর্ণ খাবার নিয়মিত খেয়ে বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। দক্ষিণইউরোপের সিসিলিতে, আরব উপদ্বীপের ইরাকে ও ইরানে, অস্ট্রেলিয়া ওভারতবর্ষে মান্না জাতীয় খাদ্য উৎপন্ন হয়।[47] অবাধ্য বনু ইস্রাঈলরা এগুলোসিরিয়ার তীহ্ প্রান্তরে ৪০ বছরের বন্দী জীবনেবিপুলভাবে পেয়েছিল আল্লাহরবিশেষ রহমতে। ঈসার সাথী হাওয়ারীগণ এটা চেয়েছিল (মায়েদাহ ৫/১১২-১১৫)।কিন্তু পেয়েছিল কি-না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।দুনিয়ায় বসেইজান্নাতের খাবার, এ এক অকল্পনীয় অনির্বচনীয় আনন্দের বিষয়। কিন্তু এইহতভাগারা তাতেও খুব বেশীদিন খুশী থাকতে পারেনি। তারা গম, তরকারি,ডাল-পেঁয়াজ ইত্যাদি খাওয়ার জন্য পাগল হয়েউঠলো। যেমন আল্লাহ বলেন,… ﻭَﺃَﻧْﺰَﻟْﻨَﺎﻋَﻠَﻴْﻜُﻢُ ﺍﻟْﻤَﻦَّ ﻭَﺍﻟﺴَّﻠْﻮَﻯ ﻛُﻠُﻮْﺍ ﻣِﻦْ ﻃَﻴِّﺒَﺎﺕِ ﻣَﺎ ﺭَﺯَﻗْﻨَﺎﻛُﻢْ ﻭَﻣَﺎ ﻇَﻠَﻤُﻮْﻧَﺎ ﻭَﻟَـﻜِﻦْ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﺃَﻧْﻔُﺴَﻬُﻢْ ﻳَﻈْﻠِﻤُﻮْﻥَ – ‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ৫৭)-‘… আমরাতোমাদের জন্য খাবার পাঠিয়েছি ‘মান্না’ ও ‘সালওয়া’। (আমরা বললাম) এসবপবিত্র বস্ত্ত তোমরা ভক্ষণ কর (কিন্তু ওরা শুনলনা, কিছু দিনের মধ্যেই তা বাদদেওয়ার জন্য ও অন্যান্য নিম্নমানের খাদ্য খাবার জন্য যিদ ধরলো)। বস্ত্ততঃ (এরফলে) তারা আমার কোন ক্ষতি করতে পারেনি, বরং নিজেদেরই ক্ষতি সাধনকরেছে’ (বাক্বারাহ ২/৫৭)।আল্লাহ তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﻗُﻠْﺘُﻢْ ﻳَﺎ ﻣُﻮْﺳَﻰ ﻟَﻦ ﻧَّﺼْﺒِﺮَﻋَﻠَﻰَﻃَﻌَﺎﻡٍ ﻭَﺍﺣِﺪٍ ﻓَﺎﺩْﻉُ ﻟَﻨَﺎ ﺭَﺑَّﻚَ ﻳُﺨْﺮِﺝْ ﻟَﻨَﺎ ﻣِﻤَّﺎ ﺗُﻨْﺒِﺖُ ﺍﻷَﺭْﺽُ ﻣِﻦْ ﺑَﻘْﻠِﻬَﺎ ﻭَﻗِﺜَّﺂﺋِﻬَﺎ ﻭَﻓُﻮْﻣِﻬَﺎ ﻭَﻋَﺪَﺳِﻬَﺎ ﻭَﺑَﺼَﻠِﻬَﺎ ﻗَﺎﻝَﺃَﺗَﺴْﺘَﺒْﺪِﻟُﻮْﻥَ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻫُﻮَ ﺃَﺩْﻧَﻰ ﺑِﺎﻟَّﺬِﻱْ ﻫُﻮَﺧَﻴْﺮٌ؟ ﺇِﻫْﺒِﻄُﻮْﺍ ﻣِﺼْﺮﺍً ﻓَﺈِﻥَّ ﻟَﻜُﻢْ ﻣَّﺎ ﺳَﺄَﻟْﺘُﻢْ ﻭَﺿُﺮِﺑَﺖْ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢُ ﺍﻟﺬِّﻟَّﺔُ ﻭَﺍﻟْﻤَﺴْﻜَﻨَﺔُ ﻭَﺑَﺂﺅُﻭْﺍ ﺑِﻐَﻀَﺐٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ، ﺫَﻟِﻚَﺑِﺄَﻧَّﻬُﻢْ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻜْﻔُﺮُﻭْﻥَ ﺑِﺂﻳَﺎﺕِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﻳَﻘْﺘُﻠُﻮْﻥَﺍﻟﻨَّﺒِﻴِّﻴْﻦَ ﺑِﻐَﻴْﺮِ ﺍﻟْﺤَﻖِّ ﺫَﻟِﻚَ ﺑِﻤَﺎ ﻋَﺼَﻮْﺍ ﻭَﻛَﺎﻧُﻮْﺍ ﻳَﻌْﺘَﺪُﻭْﻥَ- ‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ৬১)-‘যখন তোমরা বললে, হে মূসা!আমরা একইধরনের খাদ্যের উপরে কখনোই ধৈর্য ধারণ করতে পারব না। কাজেই তুমি তোমারপ্রভুর নিকটে আমাদেরপক্ষে প্রার্থনা কর তিনি যেন আমাদের জন্য এমন খাদ্য-শস্য দান করেন, যা জমিতে উৎপন্ন হয়; যেমন তরি-তরকারি, কাকুড়, গম, রসুন, ডাল,পেঁয়াজ ইত্যাদি। মূসা বললেন, তোমরা উত্তম খাদ্যের বদলে এমন খাদ্য পেতে চাওযা নিম্নস্তরের? তাহ’লে তোমরা অন্য কোন শহরে চলে যাও। সেখানে তোমরাতোমাদের চাহিদা মোতাবেক সবকিছু পাবে’ (বাক্বারাহ ২/৬১)।৪. পার্শ্ববর্তীজনপদে যাওয়ার হুকুম ও আল্লাহর অবাধ্যতা :বনু ইস্রাঈলগণ যখন জান্নাতী খাদ্যবাদ দিয়ে দুনিয়াবী খাদ্য খাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে যিদ ধরে বসলো, তখন আল্লাহতাদের পার্শ্ববর্তী জনপদে যেতে বললেন। যেখানে তাদের চাহিদামত খাদ্য-শস্যাদি তারা সর্বদা প্রাপ্ত হবে। উক্ত জনপদে প্রবেশের সময় আল্লাহর শুকরিয়াআদায় করার জন্য তিনি কতগুলি আদব ও শিষ্টাচার মান্য করার নির্দেশ দিলেন।কিন্তু তারা তাতে কর্ণপাত করল না। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﻗُﻠْﻨَﺎ ﺍﺩْﺧُﻠُﻮْﺍ ﻫَـﺬِﻩِ ﺍﻟْﻘَﺮْﻳَﺔَ ﻓَﻜُﻠُﻮْﺍﻣِﻨْﻬَﺎﺣَﻴْﺚُ ﺷِﺌْﺘُﻢْ ﺭَﻏَﺪﺍً ﻭَﺍﺩْﺧُﻠُﻮﺍ ﺍﻟْﺒَﺎﺏَ ﺳُﺠَّﺪﺍً ﻭَّﻗُﻮْﻟُﻮْﺍ ﺣِﻄَّﺔٌ ﻧَّﻐْﻔِﺮْ ﻟَﻜُﻢْ ﺧَﻄَﺎﻳَﺎﻛُﻢْ ﻭَﺳَﻨَﺰِﻳْﺪُ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْﻦَ -‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ৫৮)-‘আর যখন আমরাবললাম, তোমরা প্রবেশকর এ নগরীতে এবং এতে যেখানে খুশীখেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যেবিচরণ কর এবং নগরীর ফটক দিয়ে প্রবেশ করার সময় সিজদা কর ও বলতে থাক (হেআল্লাহ!) ‘আমাদিগকে ক্ষমা করে দাও’- তাহ’লে আমরা তোমাদের অপরাধসমূহক্ষমা করে দেব এবং সৎকর্মশীলদের আমরা সত্বর অতিরিক্তভাবে আরও দানকরব’ (বাক্বারাহ ২/৫৮)। কিন্তু এই অবাধ্য জাতি এতটুকু আনুগত্য প্রকাশ করতেওরাযী হয়নি। তাদেরকে শুকরিয়ার সিজদা করতে বলা হয়েছিল এবং আল্লাহরনিকটে ক্ষমা চেয়ে ‘হিত্ত্বাহ’ ( ﺣﻄﺔ ) অর্থাৎ ﺣُﻂ ﺫﻧﻮﺑﻨﺎ অথবা ﺍﺣﻄﻂ ﻋﻨﺎ ﺫﻧﻮﺑﻨﺎ ﺣﻄﺔ‘আমাদেরপাপসমূহ পুরোপুরি মোচন করুন’ বলতে বলতে শহরে প্রবেশের নির্দেশ দেওয়াহয়েছিল। কিন্তু বেআদবীর চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে তারা হিত্ত্বাহ-এর বদলে‘হিন্ত্বাহ’ ( ﺣﻨﻄﺔ) অর্থাৎ ‘গমের দানা’ বলতে বলতে এবং সিজদা বা মাথা নীচুকরার পরিবর্তে পিছন দিকে পিঠ ফিরে প্রবেশ করল।[48] এর মাধ্যমেতারানিজেদেরকে আল্লাহ পূজারীর বদলে পেটপূজারী বলে প্রমাণ করল।এখানে ﻫﺬﻩﺍﻟﻘﺮﻳﺔবা ‘এই নগরী’ বলতে বায়তুল মুক্বাদ্দাসকে বুঝানো হয়েছে। যার ব্যাখ্যা মায়েদাহ২১ আয়াতে এসেছে, ﺍﻷَﺭْﺽَ ﺍﻟْﻤُﻘَﺪَّﺳَﺔَ বলে। তীহ্ প্রান্তরে ৪০ বছর বন্দী জীবনকাটানোরপর নবী ইউশা‘ বিন নূন-এর নেতৃত্বে জিহাদের মাধ্যমে তারা বিজয় লাভকরে ওনগরীতে প্রবেশ করে (ইবনু কাছীর)। এভাবে তাদের দীর্ঘ বন্দীত্বের অবসানঘটে।অথচ যদি প্রথমেই তারা মূসার হুকুম মেনে নিয়ে জিহাদে অবতীর্ণ হ’ত, তাহ’লেতখনই তারা বিজয়ী হয়ে নগরীতে প্রবেশ করত।কিন্তু নবীর অবাধ্যতা করারকারণেই তাদের ৪০ বছর কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হ’ল। পরিশেষে তাদেরকে সেইজিহাদই করতে হ’ল, যা তারা প্রথমে করেনি ভীরুতা ও কাপুরুষতার কারণে।বস্ত্ততঃ ভীরু ব্যক্তি ও জাতি কখনো সম্মানিত হয় না। উল্লেখ্য যে, বায়তুলমুক্বাদ্দাসের উক্ত প্রধান ফটককে আজও ‘বাব হিত্ত্বাহ’ ( ﺑﺎﺏ ﺣﻄﺔ ) বলা হয়ে থাকে(কুরতুবী)।আল্লাহ বলেন, ﻓَﺒَﺪَّﻝَ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮﺍْ ﻗَﻮْﻻً ﻏَﻴْﺮَ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻗِﻴْﻞَ ﻟَﻬُﻢْ ﻓَﺄَﻧْﺰَﻟْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮْﺍﺭِﺟْﺰﺍً ﻣِّﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ ﺑِﻤَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍﻳَﻔْﺴُﻘُﻮْﻥَ – ‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ৫৯)-‘অতঃপর যালেমরা সে কথা পাল্টে দিল, যা তাদেরকে বলতে বলাহয়েছিল। ফলে আমরা যালেমদের উপরতাদের অবাধ্যতার কারণে আসমান থেকেগযব নাযিল করলাম’ (বাক্বারাহ ২/৫৯)। তবে সেটা যে কিধরনের গযব ছিল, সেবিষয়ে কুরআন পরিষ্কার করে কিছু বলেনি। ইতিহাসও এ ব্যাপারে নীরব। তবেসাধারণতঃ এগুলি প্লেগ-মহামারী, বজ্রনিনাদ, ভূমিকম্প প্রভৃতি হয়ে থাকে। যাবিভিন্ন নবীর অবাধ্য উম্মতদের বেলায় ইতিপূর্বে হয়েছে।শিক্ষণীয় বিষয়:হিনত্বাহ ও হিত্ত্বাহ বলার মাধ্যমে আল্লাহ বস্ত্তবাদী ও আদর্শবাদী দু’প্রকারমানুষের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। বস্ত্তবাদীরা বস্ত্ত পাওয়ার লোভে মানবতাকে ওমানব সভ্যতাকে ধ্বংস করে। পক্ষান্তরে ধার্মিক ও আদর্শবাদীরা তাদের ধর্ম ওআদর্শ রক্ষার জন্য বস্ত্তকে উৎসর্গ করে। ফলে মানবতা রক্ষা পায় ও মানবসভ্যতা স্থায়ী হয়। বাস্তবিক পক্ষে সে যুগ থেকে এ যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন নামেবস্ত্তবাদীগণ মানবতার ধ্বংসকারী হিসাবে নিজেদেরকে চিহ্নিত করেছে। ১ম ও২য় বিশ্বযুদ্ধ এবং বর্তমানের ইরাক ও আফগানিস্তানে স্রেফ তেল লুটেরজন্যতথাকথিত গণতন্ত্রী, ধর্মনিরপেক্ষ ও বস্ত্তবাদী রাষ্ট্রগুলির নেতাদের হুকুমে টনকে টন বোমা মেরে লাখ লাখ নিরীহ বনু আদমের হত্যাকান্ড এরইপ্রমাণ বহন করে।অথচ কেবলমাত্র ধর্মই মানবতাকে বাঁচিয়ে রাখে।তওরাতের শব্দগত ও অর্থগতপরিবর্তন :ইহুদীরা তাদের এলাহী কিতাব তওরাতের শাব্দিক পরিবর্তন নবী মূসা(আঃ)-এর জীবদ্দশায় যেমন করেছিল, অর্থগত পরিবর্তনও তারা করেছিল। যেমন মূসা(আঃ) যখন তাদের ৭০ জন নেতাকে সাথে নিয়ে তূর পাহাড়ে গেলেন। অতঃপরআল্লাহর গযবে মৃত্যুবরণ করে পুনরায় তাঁর রহমতে জীবিত হয়ে ফিরে এল, তখনও এইগর্বিত জাতি তওরাত যে আল্লাহর নাযিলকৃত গ্রন্থ এ সাক্ষ্য দেওয়ার সাথে সাথেএকথাও জুড়ে দিল যে, আল্লাহতা‘আলা সবশেষে একথাও বলেছেন যে, তোমরা যতটুকুপার, আমল কর। আর যা না পার তা আমি ক্ষমা করে দিব’। অথচ এটা ছিল সম্পূর্ণবানোয়াট কথা। তাদের এই মিথ্যা সাক্ষ্যেরফলে লোকেরা বলে দিল যে,তওরাতের বিধান সমূহ মেনে চলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।তখনই আল্লাহর হুকুমেফেরেশতাগণ তূর পাহাড়ের একাংশ উপরে তুলে ধরে তাদের হুকুম দিলেন, হয়তোমরা তওরাত মেনে নাও, না হয় ধ্বংস হও। তখন নিরুপায় হয়ে তারা তওরাতমেনে নেয়।[49]মূসা (আঃ)-এর মৃত্যুর পরেও তওরাত,যবূর ও ইঞ্জীল গ্রন্থগুলিতে তারাঅসংখ্য শব্দগত ও অর্থগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ফলে এই কিতাবগুলি আসল রূপেকোথাও আর পৃথিবীতে অবশিষ্ট নেই। ইহুদীদের তওরাত পরিবর্তনের ধরন ছিলতিনটি। এক. অর্থ ও মর্মগত পরিবর্তন, যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। দুই. শব্দগত পরিবর্তনযেমন আল্লাহ বলেন, ﻣِّﻦَ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻫَﺎﺩُﻭﺍْ ﻳُﺤَﺮِّﻓُﻮﻥَ ﺍﻟْﻜَﻠِﻢَ ﻋَﻦ ﻣَّﻮَﺍﺿِﻌِﻪِ ، ‘ইহুদীদের মধ্যে একটাদল আছে,যারা আল্লাহর কালামকে (যেখানে শেষনবীর আগমন সংবাদ ও তাঁর গুণাবলীসম্বন্ধে বর্ণিত হয়েছে) তার স্বস্থান হ’তে পরিবর্তন করে দেয়’ (নিসা ৪/৪৬;মায়েদাহ ৫/১৩, ৪১)। এই পরিবর্তন তারা নিজেদের দুনিয়াবী স্বার্থেশাব্দিকভাবে এবং মর্মগতভাবে উভয়বিধ প্রকারে করত। ‘এভাবে তারা কখনোশব্দে, কখনো অর্থে এবং কখনো তেলাওয়াতে(মুখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে) পরিবর্তন করত।পরিবর্তনের এ প্রকারগুলি কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। আজকাল পাশ্চাত্যেরকিছু সংখ্যক খ্রীষ্টানও একথা কিছু কিছু স্বীকার করে’।[50]আল্লাহর কিতাবেরএইসব পরিবর্তন তাদের মধ্যকার আলেম ও যাজক শ্রেণীর লোকেরাই করত, সাধারণমানুষ যাদেরকে অন্ধ ভক্তির চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছে দিয়েছিল। যেমন আল্লাহবলেন, ﻭَﻳْﻞٌ ﻟِّﻠَّﺬِﻳْﻦَ ﻳَﻜْﺘُﺒُﻮْﻥَ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏَ ﺑِﺄَﻳْﺪِﻳْﻬِﻢْ ﺛُﻢَّ ﻳَﻘُﻮْﻟُﻮْﻥَ ﻫَـﺬَﺍ ﻣِﻦْ ﻋِﻨْﺪِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻟِﻴَﺸْﺘَﺮُﻭْﺍ ﺑِﻪِ ﺛَﻤَﻨﺎً ﻗَﻠِﻴْﻼً-‏(ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ৭৯)-‘ধ্বংস ঐসবলোকদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব লিখে বলত, এটি আল্লাহর পক্ষ হ’তেঅবতীর্ণ হয়েছে- যাতে এর বিনিময়ে তারা সামান্য অর্থ উপার্জন করতেপারে’ (বাক্বারাহ ২/৭৯)।আল্লাহ বলেন, ﺳَﻤَّﺎﻋُﻮﻥَ ﻟِﻠْﻜَﺬِﺏِ ﺃَﻛَّﺎﻟُﻮﻥَ ﻟِﻠﺴُّﺤْﺖِ ‘এইসব লোকেরামিথ্যা কথা শোনাতে এবং হারাম ভক্ষণে অভ্যস্ত’ (মায়েদাহ ৫/৪২)। জনগণ তাদেরকথাকেই সত্য ভাবত এবং এর বিপরীত কিছুই তারা শুনতে চাইত না। এভাবে তারাজনগণের রব-এর আসন দখল করেছিল। যেমন আল্লাহ বলেন, ﺍﺗَّﺨَﺬُﻭﺍْ ﺃَﺣْﺒَﺎﺭَﻫُﻢْ ﻭَﺭُﻫْﺒَﺎﻧَﻬُﻢْﺃَﺭْﺑَﺎﺑﺎً ﻣِّﻦْ ﺩُﻭﻥِﺍﻟﻠﻪِ ‘তারা তাদের আলেম ও দরবেশগণকে ‘রব’ হিসাবে গ্রহণ করেছিল আল্লাহ্কেবাদ দিয়ে’ (তওবাহ ৯/৩১)। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ﺇِﻧَّﻬُﻢْ ﻟَﻢْ ﻳَﺄﻣُﺮُﻭْﻫُﻢْ ﺃَﻥْ ﻳَّﺴْﺠُﺪُﻭْﺍ ﻟَﻬُﻢْ ﻭَﻟَﻜِﻦْﺃَﻣَﺮُﻭْﻫُﻢْ ﺑِﻤَﻌْﺼِﻴَﺔِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻓَﺄَﻃَﺎﻋُﻮْﻫُﻢْ ﻓَﺴَﻤَّﺎﻫُﻢُ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑِﺬَﺍﻟِﻚَ ﺃَﺭْﺑَﺎﺑﺎً – ‘তারা তাদেরকে সিজদা করতে বলতনাবটে। কিন্তু মানুষকে তারা আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কাজের নির্দেশ দিত এবংতারা তা মেনে নিত। সেকারণ আল্লাহ তাদেরকে ‘রব’ বলে আখ্যায়িত করেন’।খৃষ্টান পন্ডিত ‘আদী বিন হাতেম যখন বললেন যে, ﻟَﺴْﻨَﺎ ﻧَﻌْﺒُﺪُﻫُﻢْ ‘আমরা আমাদের আলেম-দরবেশদের পূজা করি না’। তখনতার জবাবে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ﺃَﻟَﻴْﺲَ ﻳُﺤَﺮِّﻣُﻮْﻥَ ﻣَﺎ ﺃﺣَّﻞﺍﻟﻠﻪُ ﻓَﺘُﺤَﺮِّﻣُﻮْﻧَﻪُ ﻭَ ﻳُﺤِﻠُّﻮْﻥَ ﻣَﺎ ﺣَﺮَّﻡَ ﺍﻟﻠﻪُ ﻓَﺘُﺤِﻠُّﻮْﻧَﻪُ ‘তারা কি আল্লাহকৃত হালালকে হারাম এবংহারামকে হালাল করে না? আর তোমরাও কি সেটা মেনে নাও না? ‘আদী বললেন,হাঁ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ﻓَﺘِﻠْﻚَ ﻋِﺒَﺎﺩَﺗُﻬُﻢْ ‘সেটাই তো ওদের ইবাদত হ’ল’।[51]গাভীকুরবানীর হুকুম ও হত্যাকারী চিহ্নিত করণ :বনু ইস্রাঈলের জনৈক যুবক তার একমাত্রচাচাতো বোনকে বিয়ে করেতার চাচার অগাধ সম্পত্তির একক মালিক বনতে চায়।কিন্তু চাচা তাতে রাযী না হওয়ায় সে তাকে গোপনে হত্যা করে। পরের দিনবাহ্যিকভাবে কান্নাকাটি করে চাচার রক্তের দাবীদার সেজে কওমের নেতাদেরকাছে বিচার দেয়।কিন্তু সাক্ষীর অভাবে আসামী শনাক্ত করা যাচ্ছিল না।ইতিমধ্যে মূসা (আঃ) অহী মারফত জেনে গিয়েছিলেন যে, বাদী স্বয়ং আসামীএবং সেই-ই একমাত্র হত্যাকারী। এমতাবস্থায় সম্প্রদায়ের নেতারা এসে বিষয়টিফায়ছালার জন্য মূসা (আঃ)-কে অনুরোধ করল। মূসা (আঃ) তখনআল্লাহর হুকুমমোতাবেক যে ফায়ছালা দিলেন, সে বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺘَﻠْﺘُﻢْ ﻧَﻔْﺴﺎً ﻓَﺎﺩَّﺍﺭَﺃْﺗُﻢْ ﻓِﻴْﻬَﺎﻭَﺍﻟﻠﻪُﻣُﺨْﺮِﺝٌ ﻣَّﺎ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﺗَﻜْﺘُﻤُﻮْﻥَ ‘যখন তোমরা একজনকে হত্যাকরে পরে সে সম্পর্কে একেঅপরকেদায়ী করছিলে। অথচ আল্লাহ তা প্রকাশ করে দিলেন, যা তোমরা গোপনকরতেচাচ্ছিলে’ (বাক্বারাহ ২/৭২)। কিভাবে আল্লাহ সেটা প্রকাশ করে দিলেন, তারবিবরণ নিম্নরূপ:‘যখন মূসা স্বীয় কওমকে বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে একটা গাভীযবেহ করতে বলেছেন। তারা বলল, আপনি কি আমাদের সাথে উপহাস করছেন? তিনিবললেন, জাহিলদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনাকরছি’(বাক্বারাহ ৬৭)। ‘তারা বলল, তাহ’লেআপনি আপনার পালনকর্তার নিকটেআমাদের জন্য প্রার্থনা করুন, যেন তিনি বলে দেন, গাভীটি কেমন হবে? তিনিবললেন, আল্লাহ বলেছেন গাভীটি এমন হবে, যা না বুড়ী না বকনা, বরং দু’য়েরমাঝামাঝি বয়সের হবে। এখন তোমাদের যা আদেশ করা হয়েছে, তা সেরেফেল’ (৬৮)। ‘তারা বলল, আপনার প্রভুর নিকটে আমাদের পক্ষ থেকে প্রার্থনা করুনযে, গাভীটির রং কেমন হবে। তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন, গাভীটি হবেচকচকে গাঢ় পীত বর্ণের, যা দর্শকদের চক্ষু শীতল করবে’ (৬৯)। ‘লোকেরা আবারবলল, আপনি আপনার প্রভুর নিকটে আমাদের পক্ষে প্রার্থনা করুন, যাতে তিনি বলেদেন যে, গাভীটি কিরূপ হবে। কেননা একই রংয়ের সাদৃশ্যপূর্ণ গাভী অনেক রয়েছে।আল্লাহ চাহে তো এবার আমরা অবশ্যই সঠিক দিশা পেয়ে যাব’ (৭০)। ‘তিনিবললেন, আল্লাহ বলেছেন, সে গাভীটি এমন হবে, যে কখনো ভূমি কর্ষণ বা পানিসেচনের শ্রমে অভ্যস্ত নয়, সুঠামদেহী ও খুঁৎহীন’। ‘তারা বলল, এতক্ষণে আপনি সঠিকতথ্য এনেছেন। অতঃপর তারা সেটা যবেহ করল। অথচ তারা (মনের থেকে) তা যবেহকরতে চাচ্ছিল না’ (বাক্বারাহ ২/৬৭-৭১)।আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি বললাম,যবেহকৃত গরুর গোশতের একটি টুকরাদিয়ে মৃত ব্যক্তির লাশের গায়েআঘাত কর।এভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন এবং তোমাদেরকে তাঁর নিদর্শন সমূহ প্রদর্শনকরেন। যাতে তোমরা চিন্তা কর’ (বাক্বারাহ ২/৭৩)।বলা বাহুল্য, গোশতের টুকরাদিয়ে আঘাত করার সাথে সাথে মৃত লোকটি জীবিত হ’ল এবং তার হত্যাকারীভাতিজার নাম বলে দিয়ে পুনরায় মারা গেল। ধারণা করা চলে যে, মূসা (আঃ)সেমতে শাস্তি বিধান করেন এবং হত্যাকারী ভাতিজাকে হত্যার মাধ্যমে‘ক্বিছাছ’ আদায় করেন।কিন্তু এতবড় একটা অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেও এইহঠকারী কওমেরহৃদয় আল্লাহর প্রতি অনুগত হয়নি। তাই আল্লাহ বলেন, ﺛُﻢَّ ﻗَﺴَﺖْ ﻗُﻠُﻮْﺑُﻜُﻢْ ﻣِّﻦْﺑَﻌْﺪِ ﺫَﻟِﻚَ ﻓَﻬِﻲَ ﻛَﺎﻟْﺤِﺠَﺎﺭَﺓِ ﺃَﻭْ ﺃَﺷَﺪُّ ﻗَﺴْﻮَﺓً ‘অতঃপর তোমাদের হৃদয় শক্ত হয়ে গেল। যেন তাপাথর,এমনকি তার চেয়েও শক্ত… (বাক্বারাহ ২/৭৪)।গাভী কুরবানীর ঘটনায় শিক্ষণীয়বিষয় সমূহ :(১) এখানে প্রথম যে বিষয়টি ফুটে উঠেছে, সেটি এই যে, আল্লাহর উপরেপূর্ণরূপে ভরসা করলে অনেক সময় যুক্তিগ্রাহ্য বস্ত্তর বাইরের বিষয় দ্বারা সত্যপ্রকাশিত হয়। যেমন এখানে গরুর গোশতের টুকরা মেরে মৃতকে জীবিত করারমাধ্যমে হত্যাকারী শনাক্ত করানোর ব্যবস্থা করা হ’ল। অথচ বিষয়টি ছিল যুক্তি ওস্বাভাবিকজ্ঞানের বিরোধী।(২) মধ্যম বয়সী গাভী কুরবানীর মধ্যে ইঙ্গিতরয়েছে যে, নৈতিকভাবে মৃত জাতিকে পুনর্জীবিত করতে হ’লে পূর্ণ নৈতিকতাসম্পন্ন ঈমানদার যুবশক্তির চূড়ান্ত ত্যাগ ও কুরবানী আবশ্যক।(৩) নবী-রাসূলগণেরআনুগত্য এবং তাঁদের প্রদত্ত শারঈ বিধান সহজভাবে মেনে নেওয়ার মধ্যেই জাতিরমঙ্গল নিহিত। বিতর্কে লিপ্ত হ’লে বিধান কঠোর হয় এবং আল্লাহর গযবঅবশ্যম্ভাবী হয়। যেমন বনু ইস্রাঈলগণ যদি প্রথম নির্দেশ অনুযায়ী যেকোন একটাগাভী যবেহ করত, তবে তাতেই যথেষ্টহ’ত। কিন্তু তারা যত বেশী প্রশ্ন করেছে, ততবেশী বিধান কঠোর হয়েছে। এমনকি অবশেষে হত্যাকারী চিহ্নিত হ’লেও আল্লাহরক্রোধে তাদের হৃদয়গুলো পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে।(৪) এই গুরুত্বপূর্ণ ওশিক্ষণীয়ঘটনাকে চির জাগরুক করে রাখার জন্য আল্লাহ পাক গাভীর নামে সূরাবাক্বারাহ নামকরণ করেন। এটিই কুরআনের ২৮৬টি আয়াত সমৃদ্ধ সবচেয়ে বড় ওবরকতমন্ডিত সূরা। এই সূরার ফযীলত বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, তোমরাতোমাদের গৃহগুলিকে কবরে পরিণত করো না। নিশ্চয়ই শয়তান ঐ ঘর থেকে পালিয়েযায়, যে ঘরে সূরা বাক্বারাহ পাঠ করা হয়’।[52] এ সূরার মধ্যে আয়াতুল কুরসী (২৫৫নং আয়াত) রয়েছে, যাকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ‘শ্রেষ্ঠতম’ ( ﺍﻋﻈﻢ ) আয়াত বলে বর্ণনাকরেছেন।[53] চিরস্থায়ী গযবে পতিত হওয়া :নবী মূসা (আঃ)-এর সঙ্গে বারবারবেআদবী ও অবাধ্যতার পরিণামে এবংআল্লাহর আয়াত সমূহকে অস্বীকার ওপরবর্তীতে নবীগণকে অন্যায় ভাবে হত্যার কারণে আল্লাহ তাদেরউপরেচিরস্থায়ী গযব ও অভিসম্পাৎ নাযিল করলেন। আল্লাহ বলেন, ﻭَﺿُﺮِﺑَﺖْ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢُ ﺍﻟﺬِّﻟَّﺔُ ﻭَﺍﻟْﻤَﺴْﻜَﻨَﺔُﻭَﺑَﺂﺅُﻭْﺍ ﺑِﻐَﻀَﺐٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ ‘আর তাদের উপরে লাঞ্ছনা ও পরমুখাপেক্ষিতা আরোপিত হ’ল এবংতারা আল্লাহর রোষানলে পতিত হ’ল’ (বাক্বারাহ ২/৬১)।ইবনু কাছীর বলেন, এলাঞ্ছনা ও অবমাননার প্রকৃতি হ’ল, ইহুদীরা সর্বদা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবেঅপরের দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ থাকবে। এ মর্মে সূরা আলে ইমরানে আল্লাহবলেন, ﺿُﺮِﺑَﺖْ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢُ ﺍﻟﺬِّﻟَّﺔُ ﺃَﻳْﻦَ ﻣَﺎ ﺛُﻘِﻔُﻮﺍْ ﺇِﻻَّ ﺑِﺤَﺒْﻞٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﺣَﺒْﻞٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ‘তাদের উপরেলাঞ্ছনা আরোপিতহ’ল যেখানেই তারা অবস্থান করুক না কেন। তবে আল্লাহ প্রদত্ত ও মানব প্রদত্তমাধ্যম ব্যতীত’ (আলে ইমরান ৩/১১২)। ‘আল্লাহ প্রদত্ত মাধ্যম’ বলতে বুঝানোহয়েছে, যাদেরকে আল্লাহ নিজ চিরন্তন বিধান অনুযায়ী আশ্রয় ও অভয় দিয়েছেন।যেমন শিশু ও রমণীকুল এবং এমন সাধক ও উপাসকগণ, যারা যুদ্ধ-বিগ্রহ থেকে দূরেথাকেন। এরা নিরাপদে থাকবে। অতঃপর ‘মানব প্রদত্ত মাধ্যম’ হ’ল, অন্যেরসাথেশান্তি চুক্তির মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভ করা, যা মুসলমান বা অন্য যেকোনজাতির সাথে হ’তে পারে। যেমন বর্তমানে তারা আমেরিকা ও পাশ্চাত্য শক্তিবলয়ের সাথে গাটছড়া বেঁধে টিকেআছে।ইহুদীদের উপর চিরস্থায়ী গযব নাযিলেরব্যাপারে সূরা আ‘রাফে আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﺗَﺄَﺫَّﻥَ ﺭَﺑُّﻚَ ﻟَﻴَﺒْﻌَﺜَﻦَّ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﺇِﻟَﻰ ﻳَﻮْﻡِ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﻣَﻦ ﻳَّﺴُﻮْﻣُﻬُﻢْﺳُﻮْﺀَ ﺍﻟْﻌَﺬَﺍﺏِﺇِﻥَّ ﺭَﺑَّﻚَ ﻟَﺴَﺮِﻳْﻊُ ﺍﻟْﻌِﻘَﺎﺏِ ﻭَﺇِﻧَّﻪُ ﻟَﻐَﻔُﻮْﺭٌ ﺭَّﺣِﻴْﻢٌ – ‏( ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৬৭)-‘স্মরণ কর সে সময়ের কথা, যখনতোমার প্রভুজানিয়ে দিয়েছিলেন যে, নিশ্চয়ই তিনি তাদের (ইহুদীদের) উপরে প্রেরণ করতেথাকবেন ক্বিয়ামত পর্যন্ত এমন সব শাসক, যারা তাদের প্রতি পৌঁছাতে থাকবেকঠিন শাস্তিসমূহ। নিশ্চয়ই তোমার প্রভু দ্রুত বদলা গ্রহণকারী এবংনিশ্চয়ই তিনিক্ষমাশীল ও দয়াবান’ (আ‘রাফ ৭/১৬৭)।উপরোক্ত আয়াত সমূহের আলোকে আমরাইহুদীদের উপরে বিগত ও বর্তমান যুগের লাঞ্ছনা ও অবমাননার দীর্ঘ ইতিহাসপর্যালোচনা করতে পারি। তবে এখানে এতটুকু বলা আবশ্যক যে, হাযার বছর ধরেবসবাসকারী ফিলিস্তীনের স্থায়ী মুসলিম নাগরিকদের তাড়িয়ে দিয়ে ১৯৪৮ সালথেকে বৃটেন, আমেরিকা, রাশিয়া প্রমুখ অশুভ শক্তি বলয়ের মাধ্যমেযবরদস্তিমূলকভাবে প্রতিষ্ঠিত তথাকথিত ‘ইস্রাঈল’ নামক রাষ্ট্র মূলতঃ কোনরাষ্ট্রই নয়। বরং মধ্যপ্রাচ্যের তৈলভান্ডার নিজেদের করায়ত্তে রাখার জন্য বৃহৎশক্তিবর্গের বিশেষ করে আমেরিকা ও বৃটেনের ঘাঁটি বা অস্ত্রগুদাম মাত্র। বৃহৎশক্তিগুলো হাত গুটিয়ে নিলে তারা একমাসও নিজের শক্তিতে টিকতে পারবেকি-না সন্দেহ। এতেই কুরআনী সত্য ﺣَﺒْﻞٍ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ বা ‘মানব প্রদত্ত মাধ্যম’-এর বাস্তব রূপপ্রকাশিত হয়। ইনশাআল্লাহ এমাধ্যমও তাদের ছিন্ন হবে এবং তাদেরকে এই পবিত্রভূমি মুসলমানদের হাতে ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে অথবা ইসলাম কবুলকরে শান্তিতে বসবাস করতে হবে।মূসা ও খিযিরের কাহিনী :এ ঘটনাটি বনুইস্রাঈলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং ঘটনাটি ব্যক্তিগতভাবে মূসা (আঃ)-এর সঙ্গেজড়িত। পিতা ইবরাহীম (আঃ) সহ বড় বড় নবী-রাসূলগণের জীবনে পদে পদে পরীক্ষাদিতে হয়েছে। মূসা (আঃ)-এর জীবনে এটাও ছিল অনুরূপ একটি পরীক্ষা। যেপরীক্ষায় জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ রয়েছে। আনুষঙ্গিক বিবরণ দৃষ্টেপ্রতীয়মান হয় যে, ঘটনাটি তীহ্ প্রান্তরের উন্মুক্ত বন্দীশালায় থাকাকালীনসময়ে ঘটেছিল। ঘটনাটি নিম্নরূপ:ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে হযরত উবাই বিন কা‘ব(রাঃ) প্রমুখাৎ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হ’তে বর্ণিত হাদীছ হ’তে[54] এবং সূরা কাহফ ৬০হ’তে ৮২ পর্যন্ত ২৩টি আয়াতে বর্ণিত বিবরণ থেকে যা জানা যায়,তার সংক্ষিপ্তসার নিম্নে বিবৃতহ’ল।-ঘটনার প্রেক্ষাপট :রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, একদিন হযরতমূসা (আঃ) বনু ইস্রাঈলের এক সভায় ভাষণ দিচ্ছিলেন। এমন সময়জনৈক ব্যক্তি প্রশ্নকরল, লোকদের মধ্যে আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী কেউ আছে কি? ঐ সময়েযেহেতুমূসা ছিলেন শ্রেষ্ঠ নবী এবং তাঁর জানা মতে আর কেউ তাঁর চাইতে অধিকজ্ঞানী ছিলেন না, তাইতিনি সরলভাবে ‘না’ সূচক জবাব দেন।জবাবটি আল্লাহরপসন্দ হয়নি। কেননা এতে কিছুটা অহংকার প্রকাশপেয়েছিল। ফলে আল্লাহ তাঁকেপরীক্ষায় ফেললেন। তাঁর উচিৎ ছিল একথা বলা যে, ‘আল্লাহই সর্বাধিক অবগত’।আল্লাহ তাঁকে বললেন, ‘হে মূসা! দুই সমুদ্রের সংযোগস্থলে অবস্থানকারী আমারএক বান্দা আছে, যে তোমার চেয়ে অধিক জ্ঞানী’। একথা শুনে মূসা (আঃ)প্রার্থনা করে বললেন, হে আল্লাহ! আমাকে ঠিকানা বলে দিন, যাতে আমিসেখানে গিয়ে জ্ঞান লাভ করতে পারি’। আল্লাহ বললেন, থলের মধ্যে একটি মাছনিয়ে নাও এবং দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলের (সম্ভবতঃ লোহিত সাগর ও ভূমধ্যসাগরেরমিলনস্থল) দিকে সফরে বেরিয়ে পড়। যেখানে পৌঁছার পর মাছটি জীবিত হয়েবেরিয়ে যাবে, সেখানেই আমার সেই বান্দার সাক্ষাৎ পাবে’। মূসা (আঃ) স্বীয়ভাগিনা ও শিষ্য (এবং পরবর্তীকালে নবী) ইউশা‘ বিন নূনকে সাথে নিয়েবেরিয়ে পড়লেন। পথিমধ্যে এক স্থানে সাগরতীরে পাথরের উপর মাথা রেখে দু’জনঘুমিয়ে পড়েন। হঠাৎ সাগরের ঢেউয়ের ছিটা মাছের গায়ে লাগে এবং মাছটিথলের মধ্যে জীবিত হয়ে নড়েচড়ে ওঠে ও থলে থেকে বেরিয়ে সাগরে গিয়েপড়ে।ইউশা‘ ঘুম থেকে উঠে এই বিস্ময়কর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। কিন্তু মূসা (আঃ) ঘুম থেকেউঠলে তাঁকে এই ঘটনা বলতে ভুলে গেলেন। অতঃপর তারা আবার পথ চলতে শুরুকরলেন এবং একদিন একরাত চলার পর ক্লান্ত হয়ে এক স্থানে বিশ্রামের জন্যবসলেন। অতঃপর মূসা (আঃ) নাশতা দিতে বললেন। তখন তার মাছের কথা মনে পড়লএবং ওযর পেশ করে আনুপূর্বিক সব ঘটনা মূসা (আঃ)-কে বললেন এবং বললেন যে,‘শয়তানই আমাকে একথা ভুলিয়ে দিয়েছিল’ (কাহফ ১৮/৬৩)। তখন মূসা(আঃ) বললেন,ঐ স্থানটিই তো ছিল আমাদের গন্তব্য স্থল।ফলে তাঁরা আবার সেপথে ফিরেচললেন। অতঃপর সেখানে পৌঁছে দেখতে পেলেন যে, একজন লোক আপাদ-মস্তকচাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। মূসা (আঃ) তাকে সালাম করলেন। লোকটি মুখ বেরকরে বললেন,এদেশে সালাম? কে আপনি? বললেন, আমি বনু ইস্রাঈলের মূসা। আপনারকাছ থেকে ঐ জ্ঞান অর্জন করতে এসেছি, যা আল্লাহ আপনাকে বিশেষভাবে দানকরেছেন’।খিযির বললেন, আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না হেমূসা! আল্লাহ আমাকে যে জ্ঞান দানকরেছেন, তা তিনি আপনাকে দেননি।পক্ষান্তরে আপনাকে তিনি যে জ্ঞান দান করেছেন, তা আমাকে দেননি’। মূসাবললেন, ‘আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনারকোন আদেশ অমান্য করব না’ (কাহফ ১৮/৬৯)। খিযির বললেন, ‘যদি আপনি আমারঅনুসরণ করেনই, তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যে পর্যন্ত না আমিনিজে সে সম্পর্কে আপনাকে কিছু বলি’।(১) অতঃপর তাঁরা চলতে লাগলেন। কিছু দূরগিয়ে নদী পার হওয়ার জন্য একটা নৌকা পেলেন। অতঃপর নৌকা থেকে নামারসময় তাতে ছিদ্র করে দিলেন। শারঈ বিধানের অধিকারী নবী মূসা বিষয়টিকেমেনে নিতে পারলেন না। কেননা বিনা দোষে অন্যের নৌকা ছিদ্র করে দেওয়াস্পষ্টভাবেই অন্যায়। তিনি বলেই ফেললেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি একটা গুরুতর মন্দ কাজকরলেন’। তখন খিযির বললেন, আমি কি পূর্বেই বলিনি যে, ‘আপনি আমার সাথেধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না’। মূসা ক্ষমা চাইলেন। ইতিমধ্যে একটা কালো চড়ুইপাখিএসে নৌকার এক প্রান্তে বসল এবং সমুদ্র থেকে এক চঞ্চু পানি তুলে নিল। সেদিকে ইঙ্গিত করে খিযির মূসা (আঃ)-কে বললেন, ﻋﻠﻤﻲ ﻭ ﻋﻠﻤﻚ ﻭ ﻋﻠﻢ ﺍﻟﺨﻼﺋﻖ ﻓﻰ ﻋﻠﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﺇﻻﻣﻘﺪﺍﺭﻣﺎ ﻏﻤﺲ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﻌﺼﻔﻮﺭ ﻣﻨﻘﺎﺭﻩ ‘আমার ও আপনার এবং সমস্ত সৃষ্টিজগতের জ্ঞান মিলিতভাবেআল্লাহর জ্ঞানের মুকাবিলায় সমুদ্রের বুক থেকে পাখির চঞ্চুতে উঠানো একফোঁটা পানির সমতুল্য’।[55](২) তারপর তাঁরা সমুদ্রের তীর বেয়ে চলতে থাকলেন।কিছু দূর গিয়ে তাঁরা সাগরপাড়ে খেলায় রত একদল বালককে দেখলেন। খিযিরতাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও বুদ্ধিমান ছেলেটিকে ধরে এনে নিজহাতে তাকেহত্যা করলেন। এ দৃশ্য দেখে মূসা আৎকে উঠে বললেন, একি! একটা নিষ্পাপ শিশুকেআপনি হত্যাকরলেন? এ যে মস্তবড় গোনাহের কাজ’। খিযির বললেন, আমি তোপূর্বেই বলেছিলাম, আপনি ধৈর্য ধারণ করতে পারবেন না’। মূসা আবার ক্ষমাচাইলেন এবং বললেন, ‘এরপর যদি আমি কোন প্রশ্ন করি, তাহ’লে আপনি আমাকেআর সাথে রাখবেন না’ (কাহফ ১৮/৭৫)।(৩) ‘অতঃপর তারা চলতে লাগলেন। অবশেষেযখন একটি জনপদে পৌঁছলেন, তখন তাদের কাছে খাবার চাইলেন। কিন্তু তারাতাদের আতিথেয়তা করতে অস্বীকার করল। অতঃপর তারা সেখানে একটিপতনোন্মুখ প্রাচীর দেখতে পেয়ে সেটাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিলেন।তখনমূসা বললেন, আপনি ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে এর বিনিময়ে পারিশ্রমিকনিতে পারতেন’। খিযিরবললেন ﻫَﺬَﺍ ﻓِﺮَﺍﻕُ ﺑَﻴْﻨِﻲ ﻭَﺑَﻴْﻨِﻚَ ﺳَﺄُﻧَﺒِّﺌُﻚَ ﺑِﺘَﺄْﻭِﻳﻞِ ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﺗَﺴْﺘَﻄِﻊْ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺻَﺒْﺮﺍً‘এখানেইআমার ও আপনার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হ’ল। এখন যেসব বিষয়ে আপনি ধৈর্য ধারণ করতেপারেননি, আমি সেগুলির তাৎপর্য বলে দিচ্ছি’ (কাহফ ১৮/৭৮)।তাৎপর্য সমূহ:প্রথমতঃ নৌকা ছিদ্র করার বিষয়।সেটা ছিল কয়েকজন মিসকীন দরিদ্রব্যক্তির।তারা এ দিয়ে সমুদ্রেজীবিকা অন্বেষণ করত। আমি সেটিকেছিদ্র করে দিলামএজন্য যে, ঐ অঞ্চলে ছিল এক যালেম বাদশাহ। সে বলপ্রয়োগে লোকদের নৌকাছিনিয়ে নিত’। নিশ্চয়ই ছিদ্র নৌকা সে নিবে না। ফলে দরিদ্র লোকগুলি নৌকারসামান্য ত্রুটি সেরে নিয়ে পরে তাদের কাজে লাগাতে পারবে।দ্বিতীয়তঃবালকটিকে হত্যার ব্যাপার। তার পিতা-মাতা ছিল ঈমানদার। আমি আশংকাকরলাম যে, সেবড় হয়ে অবাধ্য হবে ও কাফের হবে। যা তার বাপ-মায়ের জন্যফিৎনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তাইআমি চাইলাম যে, দয়ালু আল্লাহ তার পিতা-মাতাকে এর বদলে উত্তম সন্তান দান করুন, যে হবে সৎকর্মশীল ও বিশুদ্ধ চরিত্রেরঅধিকারী। যে তার পিতা-মাতাকে শান্তি দান করবে’।তৃতীয়তঃ পতনোন্মুখপ্রাচীর সোজা করে দেওয়ার ব্যাপার। উক্তপ্রাচীরের মালিক ছিল নগরীর দু’জনপিতৃহীন বালক। ঐ প্রাচীরের নীচে তাদের নেককার পিতার রক্ষিত গুপ্তধন ছিল।আল্লাহ চাইলেন যে, বালক দু’টি যুবক হওয়া পর্যন্ত প্রাচীরটি খাড়া থাক এবংতারা তাদের প্রাপ্য গুপ্তধন হস্তগত করুক। (খিযির বলেন,) ﻭَﻣَﺎ ﻓَﻌَﻠْﺘُﻪُ ﻋَﻦْ ﺃَﻣْﺮِﻯْ ‘বস্ত্ততঃআমি নিজ ইচ্ছায় এ সবের কিছুই করিনি’ (কাহফ ১৮/৮২)।শিক্ষণীয় বিষয় :(১) বড় যুলুমথেকে বাঁচানোর জন্য কারু উপরে ছোট-খাট যুলুম করা যায়। যেমন নৌকা ছিদ্র করাথেকে এবং বালকটিকে হত্যা করা থেকে প্রমাণিত হয়। তবে শরী‘আতেমুহাম্মাদীতে এগুলি সবই সামাজিক বিধি-বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিশেষকরে হত্যাকান্ডের মত বিষয় একমাত্র রাষ্ট্রানুমোদিত বিচার কর্তৃপক্ষ ব্যতীতকারু জন্য অনুমোদিত নয়। (২) পিতা-মাতার সৎকর্মের ফল সন্তানরাও পেয়েথাকে। যেমন সৎকর্মশীল পিতার রেখে যাওয়া গুপ্তধন তার সন্তানরা যাতে পায়,সেজন্য খিযির সাহায্য করলেন। তাছাড়া এবিষয়েও ইঙ্গিত রয়েছে যে, আলেম ওসৎকর্মশীলগণের সন্তানদের প্রতি সকলেরই স্নেহ পরায়ণ হওয়া কর্তব্য। (৩) মানুষঅনেক সময় অনেক বিষয়কে ভাল মনে করে। কিন্তু সেটি তার জন্য ক্ষতির কারণ হয়।যেমন আল্লাহ বলেন, ﻋَﺴَﻰ ﺃَﻥ ﺗَﻜْﺮَﻫُﻮْﺍ ﺷَﻴْﺌﺎً ﻭَﻫُﻮَ ﺧَﻴْﺮٌ ﻟَّﻜُﻤْﻮَﻋَﺴَﻰ ﺃَﻥ ﺗُﺤِﺒُّﻮْﺍ ﺷَﻴْﺌﺎً ﻭَﻫُﻮَ ﺷَﺮٌّ ﻟَّﻜُﻢْﻭَﺍﻟﻠﻪُ ﻳَﻌْﻠَﻢُ ﻭَﺃَﻧﺘُﻢْ ﻻَ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮﻥ -‏( ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ২১৬)-‘তোমরা অনেক বিষয়কে অপসন্দ কর। অথচ সেটি তোমাদের জন্যকল্যাণকর। আবার অনেক বিষয় তোমরা ভাল মনে কর, কিন্তু সেটি তোমাদের জন্যক্ষতিকর। বস্ত্ততঃ আল্লাহই প্রকৃত অবস্থা জানেন, তোমরা জানোনা’ (বাক্বারাহ ২/২১৬)। রাসূলুল্লাহ(ছাঃ) বলেন, ﻻﻳَﻘْﻀِﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﻟﻠﻤﺆﻣﻨﻤﻦ ﻗﻀﺎﺀٍ ﺍﻻ ﻛﺎﻥ ﺧﻴﺮًﺍ ﻟﻪ‘আল্লাহ তার মুমিন বান্দার জন্য যা ফায়ছালা করেন, তা কেবল তার মঙ্গলেরজন্যই হয়ে থাকে’।[56](৪) অতঃপর আরেকটি মৌলিক বিষয় এখানে রয়েছে যে, মূসাও খিযিরেরএ শিহরণমূলক কাহিনীটি ছিল ‘আগাগোড়া একটি বিশেষ প্রশিক্ষণেরবহিঃপ্রকাশ’। থলের মধ্যেকার মরা মাছ জীবিত হয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে সাগরেচলে যাওয়া যেমন সাধারণ নিয়ম বহির্ভূত বিষয়, তেমনি আল্লাহ পাক কোনফেরেশতাকে খিযিরের রূপ ধারণ করে মূসাকে শিক্ষা দেওয়ারজন্যও পাঠিয়েথাকতে পারেন। যাকে তিনি সাময়িকভাবে শরী‘আতী ইলমের বাইরে অলৌকিক ওঅতীন্দ্রিয় জ্ঞান দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, যা মূসার জ্ঞানেরবাইরে ছিল। এরদ্বারা আল্লাহ মূসা সহ সকল মানুষের জ্ঞানের স্বল্পতার কথা জানিয়েদিয়েছেন।(৫) বান্দার জন্য যে অহংকার নিষিদ্ধ, অত্র ঘটনায় সেটাই সবচেয়ে বড়শিক্ষণীয় বিষয়।খিযির কে ছিলেন?কুরআনে তাঁকে ﻋَﺒْﺪﺍً ﻣِّﻦْ ﻋِﺒَﺎﺩِﻧَﺎ ‘আমাদের বান্দাদেরএকজন’ (কাহফ ১৮/৬৫) বলা হয়েছে। বুখারী শরীফেতাঁর নাম খিযির ( ﺧﻀﺮ ) বলেউল্লেখ করা হয়েছে’। সেখানে তাঁকে নবী বলা হয়নি। জনশ্রুতি মতে তিনি একজনওলী ছিলেন এবং মৃত্যু হয়ে গেলেও এখনও মানুষের বেশ ধরে যেকোন সময়যেকোনমানুষের উপকারকরেন। ফলে জঙ্গলে ও সাগর বক্ষে বিপদাপদ থেকে বাঁচার জন্যআজও অনেকে খিযিরের অসীলা পাবার জন্যতার উদ্দেশ্যে মানত করে থাকে। এসবধারণার প্রসার ঘটেছে মূলতঃ বড় বড় প্রাচীন মনীষীদের নামে বিভিন্নতাফসীরের কেতাবে উল্লেখিত কিছু কিছু ভিত্তিহীন কল্পকথার উপরে ভিত্তিকরে।যারা তাকে নবী বলেন, তাদের দাবীরভিত্তি হ’ল, খিযিরের বক্তব্য ﻭَﻣَﺎ ﻓَﻌَﻠْﺘُﻪُ ﻋَﻦْﺃَﻣْﺮِﻱْ ‘আমি এসব নিজের মতে করিনি’ (কাহফ ১৮/৮২)। অর্থাৎ সবকিছু আল্লাহরনির্দেশে করেছি। অলীগণের কাশ্ফ-ইলহাম শরী‘আতের দলীল নয়। কিন্তুনবীগণেরস্বপ্নও আল্লাহর অহী হয়ে থাকে। যেজন্য ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পুত্রকে যবেহকরতে উদ্যতহয়েছিলেন। অতএব বালক হত্যার মতঘটনা কেবলমাত্র নবীর পক্ষেইসম্ভব, কোন অলীর পক্ষে আদৌ নয়। কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন থেকে যায় যে, নবীকখনো শরী‘আত বিরোধী কাজ করতে পারেন না। ঐ সময় শরী‘আতধারী নবী ওরাসূল ছিলেন হযরত মূসা (আঃ)। আর সে কারণেই খিযিরের শরী‘আত বিরোধী কাজদেখে তিনি বারবার প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠেছিলেন। এ ব্যাপারে সবাই একমতযে,খিযির কোন কেতাবধারী রাসূল ছিলেন না, বা তাঁর কোন উম্মত ছিল না।এখানেআমরা যদি বিষয়টিকে কুরআনের প্রকাশ্য অর্থের উপরে ছেড়ে দিই এবং তাঁকে‘আল্লাহর একজন বান্দা’ হিসাবে গণ্য করি, যাঁকে আল্লাহর ভাষায় ﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻩُ ﺭَﺣْﻤَﺔً ﻣِﻦْ ﻋِﻨﺪِﻧَﺎﻭَﻋَﻠَّﻤْﻨَﺎﻩُ ﻣِﻦ ﻟَّﺪُﻧَّﺎ ﻋِﻠْﻤﺎً ‘আমরা আমাদের পক্ষ হ’তে বিশেষ রহমত দান করেছিলাম এবংআমাদের পক্ষ হ’তে দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান’ (কাহফ ১৮/৬৫)। তাহ’লে তিনিনবী ছিলেন কি অলী ছিলেন, তিনি এখনো বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন, এসববিতর্কের আর কোনঅবকাশ থাকে না। যেভাবে মূসার মায়ের নিকটে আল্লাহ অহী(অর্থাৎ ইলহাম) করেছিলেন এবং যারফলে তিনি তার সদ্য প্রসূত সন্তান মূসাকেবাক্সে ভরে সাগরেনিক্ষেপ করতে সাহসী হয়েছিলেন (ত্বোয়াহা ২০/৩৮-৩৯) এবংযেভাবে জিব্রীল মানুষের রূপ ধরে এসে রাসূল (ছাঃ)-এর সাথে প্রশ্নোত্তরেরমাধ্যমে ছাহাবীগণকে দ্বীনের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন[57] একই ধরনের ঘটনা মূসাও খিযিরের ক্ষেত্রে হওয়াটাও বিস্ময়কর কিছু নয়।মনে রাখা আবশ্যক যে, লোকমানঅত্যন্ত উঁচুদরের একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। তাঁর জ্ঞানপূর্ণ উপদেশসমূহ কুরআনেবর্ণিত হয়েছে এবং তার নামে একটি সূরা নাযিল হয়েছে। কিন্তু তিনি নবীছিলেন না। লোকমানকে আল্লাহ যেমনবিশেষ ‘হিকমত’ দান করেছিলেন (লোকমান৩১/১২)। খিযিরকেও তেমনি বিশেষ ‘ইল্ম’ দান করেছিলেন (কাহফ ১৮/৬৫)। এটাবিচিত্র কিছু নয়।সংশয় নিরসন(১) মূসা (আঃ)-এর সিন্দুক ও নবীগণের ছবি:বাক্বারাহ ২৪৮ : ﺇِﻥَّ ﺁﻳَﺔَ ﻣُﻠْﻜِﻪِ ﺃَﻥ ﻳَّﺄْﺗِﻴَﻜُﻢُ ﺍﻟﺘَّﺎﺑُﻮْﺕُ ‘তাদের নবী (শ্যামুয়েল) তাদেরকেবললেন(ত্বালূতের) রাজা হওয়ার নিদর্শন এই যে, তোমাদের নিকটে সেই ‘তাবূত’ (সিন্দুক)আসবে…।’এখানে তাবূত-এর ব্যাখ্যায় (ক) তাফসীর জালালাইনে বলা হয়েছে, ﺍﻟﺼﻨﺪﻭﻕﻛﺎﻥ ﻓﻴﻪ ﺻﻮﺭ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ، ﺃﻧﺰﻟﻪ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻰ ﺃﺩﻡ – ‘সেই সিন্দুক, যা আল্লাহ আদম (আঃ)-এর উপরেনাযিলকরেন এবং যার মধ্যে রয়েছে নবীদের ছবিসমূহ’। (খ) তাফসীর কাশশাফেবলা হয়েছে, ﺍﻟﺘﺎﺑﻮﺕ ﻫﻲ ﺻﻮﺭﺓ ﻛﺎﻧﺖ ﻓﻴﻪ ﻣﻦ ﺯﺑﺮﺟﺪ ﺃﻭ ﻳﺎﻗﻮﺗﻠﻬﺎ ﺭﺃﺱ ﻛﺮﺃﺱ ﺍﻟﻬﺮ ﻭﺫﻧﺐ ﻛﺬﻧﺒﻪﻭﺟﻨﺎﺣﺎﻥ ‘উক্ত তাবূতহ’ল একটি মূর্তি, যার মধ্যে যবরজদ ও ইয়াকূত মণি-মুক্তা সমূহ রয়েছে। উক্ত তাবূতেরমাথা ও লেজ মদ্দা বিড়ালের মাথা ও লেজের ন্যায়, যার দু’টি ডানা রয়েছে।’ (গ)তাফসীর বায়যাবীতে বলা হয়েছে, ﻭﻓﻴﻪ ﺻﻮﺭﺓ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀﻣﻦ ﺁﺩﻡ ﺇﻟﻰ ﻣﺤﻤﺪ ‘তাতেনবীগণের ছবিরয়েছে আদম (আঃ) থেকে মুহাম্মাদ (ছাঃ) পর্যন্ত।’(ঘ) ইসলামিক ফাউন্ডেশনবাংলাদেশ প্রকাশিত বঙ্গানুবাদ কুরআন শরীফে (পৃঃ ৬৩ টীকা ১৭০) বলা হয়েছে,‘বিধর্মীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা কালে হযরত মূসা (আঃ) ইহা সম্মুখে স্থাপনকরিতেন’।উপরে বর্ণিত কোন ব্যাখ্যাই কুরআন ও হাদীছ সম্মত নয়। বরং প্রকৃত কথাএই যে, এটি হ’ল আল্লাহর হুকুম মোতাবেক মূসা (আঃ)-এর তৈরী সেই সিন্দুক, যারমধ্যে তাঁর লাঠি, তাওরাত এবং তাঁর ও হারূণ (আঃ)-এর পরিত্যক্ত অন্যান্য পবিত্রবস্ত্তসমূহ সংরক্ষিত ছিল। বনু ইস্রাঈলগণ এটিকে বরকত হিসাবে ও বিজয়ের নিদর্শনহিসাবে মনে করত।(২) তাওরাতের পৃষ্ঠা সমূহ :আ‘রাফ ১৪৫ : ﻭَﻛَﺘَﺒْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﻟْﻮَﺍﺡِ ﻣِﻦْ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍﻣَّﻮْﻋِﻈَﺔً ﻭَّﺗَﻔْﺼِﻴْﻼً ﻟِّﻜُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ‘আমরা তার (মূসা) জন্য ফলকে (তাওরাতে পৃষ্ঠাসমূহে) সকলবিষয়েউপদেশ ও স্পষ্ট ব্যাখ্যাসমূহ লিখে দিয়েছি’। এরব্যাখ্যায় তাফসীরে জালালাইনেবলা হয়েছে, ﺃﻱ ﺃﻟﻮﺍﺡ ﺍﻟﺘﻮﺭﺍﺓ ﻭﻛﺎﻧﺘﻤﻦ ﺳﺪﺭ ﺍﻟﺠﻨﺔ ﺃﻭ ﺯﺑﺮﺟﺪ ﺃﻭ ﺯﻣﺮﺩ ﺳﺒﻌﺔ ﺃﻭ ﻋﺸﺮﺓ ‘অর্থাৎতাওরাতের ফলকসমূহ, যা ছিল জান্নাতের পত্র সমূহ বা যবরজাদ অথবা যুমুর্রুদ, যা ছিল ৭টি অথবা১০টি’। অথচ এসব কথার কোন ভিত্তি নেই। ঐ ফলকগুলির সংখ্যা কত ছিল, কি দিয়েতৈরী ছিল, কতটুকু তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ছিল, কি দিয়ে ও কিভাবে সেখানে লেখাছিল, এগুলি বিষয় জানা বা তার উপরে ঈমান আনার কোন বাধ্যবাধকতা আমাদেরউপরে নেই। কুরআন-হাদীছ এবিষয়ে চুপ রয়েছে। আমরাও এ বিষয়ে চুপ থাকব।বস্ত্ততঃ এগুলি স্রেফ ইস্রাঈলী কল্পকাহিনী মাত্র।মূসা ও ফেরাঊনেরকাহিনীতে শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :১. আল্লাহ যালেম শাসক ও ব্যক্তিদেরকেনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা সংশোধিত না হ’লেসরাসরি আসমানী বা যমীনী গযব প্রেরণ করেন অথবা অন্য কোন মানুষকে দিয়েতাকে শাস্তি দেন ও যুলুম প্রতিরোধ করেন। যেমন আল্লাহ উদ্ধত ফেরাঊনের কাছেপ্রথমে মূসাকে পাঠান। ২০ বছরের বেশী সময় ধরে তাকে উপদেশ দেওয়ার পরেওএবং নানাবিধ গযব পাঠিয়েও তার ঔদ্ধত্য দমিত না হওয়ায় অবশেষে সাগরডুবিরগযব পাঠিয়ে আল্লাহ তাদেরকে সমূলে উৎখাত করেন।২. দুনিয়াদার সমাজনেতারাসর্বদা যালেম শাসকদের সহযোগী থাকে। পক্ষান্তরে মযলূম দ্বীনদার ব্যক্তিগণসর্বদা দ্বীনদার সমাজ সংস্কারক নেতৃত্বের মুখাপেক্ষী থাকে।৩. দুনিয়া লোভীআন্দোলন নিজেকে অপদস্থ ও সমাজকে ধ্বংস করে। পক্ষান্তরে আখেরাত পিয়াসীআন্দোলন নিজেকে সম্মানিত ও সমাজকে উন্নত করে। যেমন দুনিয়াদার শাসকফেরাঊন নিজেকে ও নিজের সমাজকে ধ্বংস করেছে এবং নিজে এমনভাবে অপদস্থহয়েছে যে, তার নামে কেউ নিজ সন্তানের নাম পর্যন্ত রাখতে চায় না।পক্ষান্তরে মূসা (আঃ)-এর দ্বীনী আন্দোলন তাঁকে ও তাঁর ঈমানদার সাথীদেরকেবিশ্ব মাঝে স্থায়ী সম্মান দান করেছে।৪. দুনিয়াতে যালেম ও মযলূম উভয়েরইপরীক্ষা হয়ে থাকে। যালেম তার যুলুমের চরম সীমায় পৌঁছে গেলে তাকে ধ্বংসকরা হয়। অনুরূপভাবে মযলূম সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপরে ভরসা করলে নির্দিষ্টসময়ে তাকেসাহায্য করা হয়। অধিকন্তু পরকালে সে জান্নাত লাভে ধন্য হয়।৫.দ্বীনদার সংস্কারককে সর্বদা আল্লাহর সাহায্যের উপরে নির্ভরশীল থাকতে হয়এবং কথায় ও আচরণে সামান্যতম অহংকার প্রকাশ করা হ’তে বিরত থাকতে হয়।মূসা ও খিযিরের ঘটনায় আল্লাহ এ প্রশিক্ষণ দিয়ে সবাইকে সেকথা বুঝিয়েদিয়েছেন।৬. অহীর বিধানের অবাধ্যতা করলে আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত জাতিওচিরস্থায়ী গযবের শিকার হ’তে পারে। বনু ইস্রাঈলগণ তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ।নবীগণের শিক্ষার বিরোধিতা করায় তাদের উপর থেকে আল্লাহর রহমত উঠে যায়এবং তারা চিরস্থায়ী গযব ও লাঞ্ছনার শিকার হয়। ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এটিএকইভাবে প্রযোজ্য। ইস্রাঈলী দরবেশ আলেম বাল‘আম বা‘ঊরার ঘটনা এর প্রকৃষ্টপ্রমাণ।৭. জিহাদ বিমুখ জাতি কখনোই সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে দুনিয়ায় বাঁচতেপারে না। আর সেকারণেই মিসরীয় জনগণের ১০ হ’তে ২০ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও বনুইস্রাঈলগণকে রাতের অন্ধকারে সেদেশ ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়। অতঃপরজিহাদে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করায় তারা তাদের পিতৃভূমি বায়তুল মুক্বাদ্দাসঅধিকারে ব্যর্থ হয়। যার শাস্তি স্বরূপ দীর্ঘ চল্লিশ বছর যাবত তীহপ্রান্তরেরউন্মুক্ত কারাগারে তারা বন্দীত্ব বরণে বাধ্য হয়। অবশেষে নবী ইউশা-র নেতৃত্বে জিহাদ করেই তাদের পিতৃভূমি দখল করতে হয়।৮. সংস্কারককে জাতিরনিকট থেকে লাঞ্ছনা ভোগ করতে হয়। দুনিয়ায় তাঁর নিঃস্বার্থ সঙ্গী হাতে গণাকিছু লোক হয়ে থাকে। তাঁকে স্রেফ আল্লাহর উপরেভরসা করেই চলতে হয়।বিনিময়ে তিনি আখেরাতে পুরস্কৃত হন ও পরবর্তী বংশধরের নিকটে যুগ যুগ ধরেপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকেন। যেমন মূসার প্রকৃত সাথী ছিলেন তার ভাই হারূণ ওভাগিনা ইউশা‘ বিননূন।