হযরত শোয়াইব আঃ এর জীবনী


হযরত শোআয়েব (আ:)১৩. হযরত শো‘আয়েব (আলাইহিসসালাম)সূচীপত্রহযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতকওমে শো‘আয়েব-এর ধর্মীয় ও সামাজিকঅবস্থা এবং দাওয়াতের সারমর্মশো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতের ফলশ্রুতিশিক্ষণীয় বিষয় সমূহআহলেমাদইয়ানের উপরে আপতিত গযবের বিবরণ।আল্লাহরগযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান ৬টি প্রাচীন জাতিরমধ্যেপঞ্চম জাতি হ’ল ‘আহলে মাদইয়ান’। ‘মাদইয়ান’হ’ল লূত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাযেরসীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। যা অদ্যাবধিপূর্ব জর্ডনের সামুদ্রিক বন্দর ‘মো‘আন’ ( ﻣﻌﺎﻥ )-এরঅদূরে বিদ্যমান রয়েছে। কুফরী করা ছাড়াও এইজনপদের লোকেরা ব্যবসায়ের ওযন ও মাপেকম দিত, রাহাজানি ও লুটপাট করত। অন্যায়পথেজনগণের মাল-সম্পদ ভক্ষণ করত।[1] ইয়াকূত হামাভী(মৃঃ ৬২৬/১২২৮খৃঃ) বলেন, ইবরাহীম-পুত্র মাদইয়ানেরনামে জনপদটি পরিচিত হয়েছে।[2] হযরতশো‘আয়েব(আঃ) এদের প্রতি প্রেরিতহয়েছিলেন। ইনি হযরত মূসা (আঃ)-এর শ্বশুর ছিলেন।কওমে লূত-এর ধ্বংসের অনতিকাল পরে কওমেমাদইয়ানের প্রতি তিনি প্রেরিত হন (হূদ ১১/৮৯)।চমৎকার বাগ্মিতার কারণে তিনি ( ﺧﻄﻴﺐ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ )‘খাত্বীবুল আম্বিয়া’ (নবীগণের মধ্যে সেরাবাগ্মী) নামে খ্যাত ছিলেন।[3] আহলে মাদইয়ান-কে পবিত্র কুরআনে কোথাও কোথাও ‘আছহাবুলআইকাহ’ ( ﺍﺻﺤﺎﺏ ﺍﻷﻳﻜﺔ ) বলা হয়েছে। যার অর্থ‘জঙ্গলের বাসিন্দাগণ’। এটা বলার কারণ এই যে, এইঅবাধ্য জনগোষ্ঠী প্রচন্ড গরমে অতিষ্ট হয়েনিজেদের বসতি ছেড়ে জঙ্গলেআশ্রয় নিলেআল্লাহ তাদেরকে সেখানেই ধ্বংস করে দেন।এটাও বলা হয় যে, উক্ত জঙ্গলে ‘আইকা’ ( ﺍﻷﻳﻜﺔ )বলে একটা গাছকে তারা পূজা করত। যার আশপাশেজঙ্গল বেষ্টিত ছিল।মাদইয়ান ( ﻣﺪﻳﻦ ) ছিলেন হাজেরাওসারাহর মৃত্যুর পরে হযরত ইবরাহীমের আরববংশোদ্ভূত কেন‘আনী স্ত্রী ক্বানতূরাবিনতেইয়াক্বত্বিন ( ﻗﻨﻄﻮﺭﺍ ﺑﻨﺖ ﻳﻘﻄﻦ ) -এর ৬টি পুত্রসন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র।[4]উল্লেখ্য যে,হযরত শো‘আয়েব (আঃ) সম্পর্কে পবিত্রকুরআনের ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াতে বর্ণিতহয়েছে।[5]হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এর দাওয়াত:ধ্বংসপ্রাপ্ত বিগত কওমগুলোর বড় বড় কিছু অন্যায়কর্ম ছিল। যার জন্য বিশেষভাবে সেখানে নবীপ্রেরিত হয়েছিলেন। শো‘আয়েব-এরকওমেরওতেমনি মারাত্মক কয়েকটি অন্যায় কর্ম ছিল, যেজন্যখাছ করে তাদের মধ্য থেকে তাদের নিকটেশো‘আয়েব (আঃ)-কে প্রেরণ করা হয়। তিনি তাঁরকওমকে যে দাওয়াত দেন, তার মধ্যেইবিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে। যেমন আল্লাহবলেন, ﻭَﺇِﻟَﻰ ﻣَﺪْﻳَﻦَ ﺃَﺧَﺎﻫُﻢْ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭﺍﺍﻟﻠﻪَ ﻣَﺎ ﻟَﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﺇِﻟَـﻪٍ ﻏَﻴْﺮُﻩُ ﻗَﺪْ ﺟَﺎﺀﺗْﻜُﻢ ﺑَﻴِّﻨَﺔٌ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْﻓَﺄَﻭْﻓُﻮﺍ ﺍﻟْﻜَﻴْﻞَ ﻭَﺍﻟْﻤِﻴﺰَﺍﻥَ ﻭَﻻَ ﺗَﺒْﺨَﺴُﻮﺍ ﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﺃَﺷْﻴَﺎﺀﻫُﻢْ ﻭَﻻَﺗُﻔْﺴِﺪُﻭﺍ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﺑَﻌْﺪَ ﺇِﺻْﻼَﺣِﻬَﺎ ﺫَﻟِﻜُﻢْ ﺧَﻴْﺮٌ ﻟَّﻜُﻢْ ﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻢﻣُّﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ- ﻭَﻻَ ﺗَﻘْﻌُﺪُﻭﺍ ﺑِﻜُﻞِّ ﺻِﺮَﺍﻁٍ ﺗُﻮﻋِﺪُﻭﻥَ ﻭَﺗَﺼُﺪُّﻭﻥَ ﻋَﻦﺳَﺒِﻴﻞِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣَﻦْ ﺁﻣَﻦَ ﺑِﻬِﻮَﺗَﺒْﻐُﻮﻧَﻬَﺎ ﻋِﻮَﺟﺎً ﻭَﺍﺫْﻛُﺮُﻭﺍ ﺇِﺫْ ﻛُﻨﺘُﻢْﻗَﻠِﻴﻼً ﻓَﻜَﺜَّﺮَﻛُﻢْ ﻭَﺍﻧﻈُﺮُﻭﺍ ﻛَﻴْﻒَ ﻛَﺎﻥَ ﻋَﺎﻗِﺒَﺔُ ﺍﻟْﻤُﻔْﺴِﺪِﻳﻦَ – ﻭَﺇِﻥْﻛَﺎﻥَ ﻃَﺂﺋِﻔَﺔٌ ﻣِّﻨﻜُﻢْ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺑِﺎﻟَّﺬِﻱ ﺃُﺭْﺳِﻠْﺖُ ﺑِﻪِ ﻭَﻃَﺂﺋِﻔَﺔٌ ﻟَّﻢْﻳْﺆْﻣِﻨُﻮﺍ ﻓَﺎﺻْﺒِﺮُﻭﺍ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺤْﻜُﻢَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﻫُﻮَ ﺧَﻴْﺮُﺍﻟْﺤَﺎﻛِﻤِﻴﻦَ – ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ৮৫-৮৭)-‘আমি মাদইয়ানের প্রতিতাদের ভাই শো‘আয়েবকে প্রেরণ করেছিলাম।সে তাদের বলল, হে আমারসম্প্রদায়! তোমরাআল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদেরকোন উপাস্য নেই। তোমাদের কাছেতোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে সুস্পষ্টপ্রমাণ এসে গেছে। অতএবতোমরা মাপ ও ওযনপূর্ণ কর। মানুষকে তাদের মালামাল কম দিয়োনা।ভূপৃষ্ঠে সংস্কার সাধনের পরতোমরা সেখানেঅনর্থ সৃষ্টি করো না। এটাই তোমাদের জন্যকল্যাণকর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও’। ‘তোমরাপথে-ঘাটে এ কারণে বসে থেকো না যে,ঈমানদারদের হুমকি দেবে, আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টিকরবে ও তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করবে। স্মরণকর, যখন তোমরা সংখ্যায় অল্প ছিলে, অতঃপরআল্লাহ তোমাদেরকে আধিক্য দান করেছেন এবংলক্ষ্য কর কিরূপ অশুভ পরিণতি হয়েছেঅনর্থকারীদের’। ‘আর যদি তোমাদের একদল ঐবিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে যা নিয়ে আমিপ্রেরিত হয়েছি এবং আরেক দল বিশ্বাস স্থাপন নাকরে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর যে পর্যন্ত নাআল্লাহ আমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন।কেননা তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়ছালাকারী’ (আ‘রাফ৭/৮৫-৮৭)।কওমে শো‘আয়েব-এর ধর্মীয় ওসামাজিক অবস্থা এবং দাওয়াতের সারমর্ম:উপরোক্তআয়াত সমূহে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি প্রতীয়মান হয়।প্রথমতঃ তারা আল্লাহর হক ও বান্দার হক দু’টিই নষ্টকরেছিল। আল্লাহর হক হিসাবে তারা বিশ্বাসেরজগতে আল্লাহকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির পূজায় লিপ্তহয়েছিল কিংবা আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে শরীককরেছিল। তারা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দিয়েছিল।দুনিয়াবী ধনৈশ্বর্যে ও বিলাস-ব্যসনে ডুবে গিয়েতারা আল্লাহরসত্তা ও গুণাবলী এবং তাঁর হক সম্পর্কেগাফেল হয়ে গিয়েছিল। সেই সাথে নিজেদেরপাপিষ্ঠ জীবনের মুক্তির জন্য বিভিন্ন সৃষ্টবস্ত্তকে শরীক সাব্যস্ত করে তাদের অসীলায়মুক্তি কামনাকরত। এভাবে তারা আল্লাহ ও তাঁর গযবেরব্যাপারে নিঃশংক হয়ে গিয়েছিল। সেকারণ সকলনবীর ন্যায় শো‘আয়েব (আঃ) সর্বপ্রথমআক্বীদা সংশোধনের জন্য ‘তাওহীদেইবাদত’-এর আহবান জানান। যাতে তারা সবদিক থেকে মুখফিরিয়ে স্রেফ আল্লাহর ইবাদত করে এবং সকলব্যাপারে স্রেফ আল্লাহর ও তাঁর নবীর আনুগত্যকরে। তিনি নিজের নবুঅতের প্রমাণ স্বরূপতাদেরকে মু‘জেযা প্রদর্শন করেন।যা স্বয়ংপ্রতিপালকের পক্ষ হ’তে ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’ রূপেতাঁরনিকটে আগমন করে।দ্বিতীয়তঃ তারা মাপ ওওযনে কম দিয়ে বান্দার হক নষ্ট করত। সেদিকেইঙ্গিত করে শো‘আয়েব (আঃ) বলেন, ‘তোমরামাপ ও ওযন পূর্ণ কর এবং মানুষের দ্রব্যাদিতে কমদিয়ে তাদের ক্ষতি করো না’ (আ‘রাফ ৭/৮৫)।আয়াতের প্রথমাংশে খাছভাবে মাপ ও ওযন পূর্ণ করারনির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং শেষাংশে সর্বপ্রকারহকে ত্রুটি করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সে হকমানুষের ধন-সম্পদ, ইযযত-আবরূ বা যেকোনবস্ত্তর সাথে সম্পর্কযুক্ত হৌক না কেন। বস্ত্ততঃদ্রব্যাদির মাপ ও ওযনেকম দেওয়া যেমন মহাঅপরাধ, তেমনিকারু ইযযত-আবরূ নষ্ট করা, কারুপদমর্যাদা অনুযায়ী তাকে সম্মান না করা, যাদেরআনুগত্য করা যরূরী তাদের আনুগত্যে ত্রুটি করাঅথবা যাকে সম্মান করা ওয়াজিব তার সম্মানে ত্রুটিকরাইত্যাদি সবই এ অপরাধের অন্তর্ভুক্ত, যাশো‘আয়েব (আঃ)-এরসম্প্রদায় করত। সে সমাজেমানীরমান ছিল না বা গুণীর কদর ছিল না।তৃতীয়তঃ বলাহয়েছে, ‘তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করোনা, সেখানে সংস্কার সাধিত হওয়ার পর’ (আ‘রাফ ৭/৮৫)।অর্থাৎ আল্লাহ পৃথিবীকে যেভাবেআভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সবদিক দিয়ে সুন্দর ওসামঞ্জস্যশীল করে সৃষ্টি করেছেন, তোমরাতাতে ব্যত্যয় ঘটিয়ো না এবং কোনরূপ অনর্থ সৃষ্টিকরো না।চতুর্থতঃ তোমরা মানুষকে ভীতিপ্রদর্শন ও আল্লাহর পথে বাধা দানের উদ্দেশ্যেপথে-ঘাটে ওঁৎ পেতে থেকো না (আ‘রাফ৭/৮৬)। এর দ্বারা মাদইয়ান বাসীদের আরেকটিমারাত্মক দোষের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে,তারা রাস্তার মোড়ে চৌকি বসিয়ে লোকদের কাছথেকে অবৈধভাবে চাঁদাআদায় করত ও লুটপাট করত।সাথে সাথে তারা লোকদেরকে শো‘আয়েব(আঃ)-এর উপরে ঈমান আনতে নিষেধ করতও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করত। তারা সর্বদা আল্লাহর পথেবক্রতার সন্ধান করত’ (আ‘রাফ ৭/৮৬) এবং কোথাওঅঙ্গুলি রাখার জায়গা পেলে আপত্তি ও সন্দেহেরঝড় তুলে মানুষকে সত্যধর্ম হ’তে বিমুখ করারচেষ্টায় থাকত।মাদইয়ানবাসীদের আরেকটি দুষ্কর্মছিল যে, তারা প্রচলিত স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রারপার্শ্বহ’তে সোনা ও রূপার কিছু অংশ কেটেরেখে সেগুলো বাজারে চালিয়ে দিত।শো‘আয়েব (আঃ) তাদেরকে একাজ থেকেনিষেধ করেন।[6]পঞ্চমতঃ তাদের অকৃতজ্ঞতারবিষয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলাহয়েছে যে, ‘স্মরণকর তোমরা যখন সংখ্যায় কম ছিলে, অতঃপর আল্লাহতোমাদের বংশবৃদ্ধি করে তোমাদেরকে একটিবিরাট জাতিতে পরিণত করেছেন’ (আ‘রাফ ৭/৮৬)।তোমরা ধন-সম্পদে হীন ছিলে, অতঃপরআল্লাহতোমাদের প্রাচুর্য দান করেছেন। অথচ তোমরাআল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে নানাবিধ শিরক ওকুফরীতে লিপ্ত হয়েছ। অতএব তোমরা সাবধানহও এবং তোমাদের পূর্ববর্তী কওমে নূহ, ‘আদ,ছামূদ ও কওমে লূত-এর ধ্বংসলীলার কথা স্মরণ কর(আ‘রাফ ৭/৮৬)। তাদের মর্মান্তিক পরিণাম ওঅকল্পনীয় গযবের কথা মনে রেখে হিসাব-নিকাশকরে পা বাড়াও।ষষ্ঠতঃ মাদইয়ানবাসীদের উত্থাপিতএকটি সন্দেহের জবাব দেওয়া হয়েছে। তারা বলতযে, ঈমানদারগণ যদি ভাল ও সৎ হয়, আর আমরা কাফিররাযদি মন্দ ও পাপী হই, তাহ’লে আমাদের উভয়দলের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা একরূপ কেন?কাফিররা অপরাধী হ’লে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের শাস্তিদিতেন। এর উত্তরে নবী বলেন, ﻓَﺎﺻْﺒِﺮُﻭﺍ ﺣَﺘَّﻰﻳَﺤْﻜُﻢَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﻫُﻮَ ﺧَﻴْﺮُ ﺍﻟْﺤَﺎﻛِﻤِﻴﻦَ ، ‘অপেক্ষা করযতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মাঝে ফায়ছালা করেনবস্ত্ততঃ তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী’ (আ‘রাফ ৭/৮৭)।অর্থাৎ আললাহ স্বীয় সহনশীলতা ও কৃপাগুণেপাপীদের অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর তারা যখনচূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়, তখন সত্য ও মিথ্যার ফায়ছালানেমে আসে। তোমাদের অবস্থাও তদ্রূপ হবে।অবিশ্বাসী ও পাপীদের উপরে আল্লাহর চূড়ান্তগযব সত্বর নাযিল হয়ে যাবে। একই ধরনেরবক্তব্য উল্লেখিত হয়েছে সূরা হূদে (১১/৮৪-৮৬আয়াতে)।হযরত শো‘আয়েব (আঃ) একথাও বলেনযে,‘(আমার এ দাওয়াতের জন্য) আমি তোমাদেরকাছে কোন প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদানবিশ্বপালনকর্তাই দেবেন’ (শু‘আরা ২৬/১৮০)। তিনিবললেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও শেষদিবসের আশা রাখ। তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টিকরো না’ (আনকাবূত ২৯/৩৬)।শো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতের ফলশ্রুতি :হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এরনিঃস্বার্থ ও আন্তরিকতাপূর্ণ দাওয়াত তাঁর উদ্ধতকওমের নেতাদের হৃদয়ে রেখাপাত করল না।তারাবরং আরও উদ্ধত হয়ে তাঁর দরদ ভরা সুললিত বয়ান ওঅপূর্ব চিত্তহারী বাগ্মীতার জবাবে পূর্ববর্তীধ্বংসপ্রাপ্ত কওমের পাপিষ্ঠ নেতাদের ন্যায়নবীকে প্রত্যাখ্যান করল এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ওতাচ্ছিল্য করেবলল, ﺃَﺻَﻼَﺗُﻚَ ﺗَﺄْﻣُﺮُﻙَ ﺃَﻥْ ﻧَﺘْﺮُﻙَ ﻣَﺎ ﻳَﻌْﺒُﺪُﺁﺑَﺎﺅُﻧَﺎ ﺃَﻭْ ﺃَﻥْ ﻧَﻔْﻌَﻞَ ﻓِﻲ ﺃَﻣْﻮَﺍﻟِﻨَﺎﻣَﺎ ﻧَﺸَﺂﺀ ﺇِﻧَّﻚَ ﻟَﺄَﻧﺖَ ﺍﻟْﺤَﻠِﻴﻢُﺍﻟﺮَّﺷِﻴﺪُ – ‘তোমার ছালাত কি তোমাকে একথা শিখায়যে, আমরা আমাদের ঐসব উপাস্যের পূজা ছেড়েদিই, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যুগ যুগ ধরে যেসবের পূজা করে আসছে? আর আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত আমরা যা কিছু করে থাকি, তা পরিত্যাগকরি? তুমি তো একজন সহনশীল ও সৎ ব্যক্তি’ (হূদ১১/৮৭)। অর্থাৎ তুমি একজন জ্ঞানী, দূরদর্শী ওসাধু ব্যক্তি হয়ে একথা কিভাবে বলতে পার যে,আমরা আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসাদেব-দেবীর পূজা ও শেরেকী প্রথা সমূহপরিত্যাগ করি এবং আমাদের আয়-উপাদানে ও রূযী-রোজগারে ইচ্ছামত চলা ছেড়ে দেই। আয়-ব্যয়ে কোন্টা হালাল কোন্টাহারাম তা তোমার কাছথেকে জেনে নিয়ে কাজ করতে হবে এটা কিকখনো সম্ভব হ’তে পারে? তাদের ধারণা মতেতাদের সকল কাজ চোখ বুঁজে সমর্থন করা ওতাতে বরকতের জন্য দো‘আ করাই হ’ল সৎ ও ভালমানুষদের কাজ। ঐসব কাজে শিরক ও তাওহীদ, হারামও হালালের প্রশ্ন তোলা কোন ধার্মিক (?) ব্যক্তিরকাজ নয়।দ্বিতীয়তঃ তারা ইবাদাত ও মু‘আমালাতকেপরস্পরের প্রভাবমুক্ত ভেবেছিল। ইবাদতকবুলের জন্য যে রূযী হালাল হওয়া যরূরী, একথাতাদের বুঝে আসেনি। সেজন্য তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে হালাল-হারামের বিধান মানতে রাযী ছিল না।যদিও ছালাত আদায়ে কোন আপত্তি তাদের ছিল না।কেননা দেব-দেবীর পূজা সত্ত্বেও সৃষ্টিকর্তাহিসাবে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও স্বীকৃতি সবারইছিল (লোকমান ৩১/২৫)। তাদের আপত্তি ছিল কেবলএকখানে যে, সবকিছু ছেড়ে কেবলমাত্রআল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং দুনিয়াবীক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-নিষেধমেনেচলতে হবে। তারা ধর্মকে কতিপয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমিত মনে করত এবংব্যবহারিক জীবনে তার কোন দখল দিতেপ্রস্ত্তত ছিল না। শো‘আয়েব (আঃ) অধিকাংশ সময়ছালাত ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন বলে তাকেবিদ্রূপ করে কোন কোন মূর্খ নেতা এরূপ কথাওবলে ফেলে যে, তোমার ছালাত কি তোমাকেএসব আবোল-তাবোল কথা-বার্তা শিক্ষা দিচ্ছে?কওমের লোকদের এসব বিদ্রূপবান ও রূঢ় মন্তব্যসমূহে বিচলিত না হয়ে অতীব ধৈর্য ও দরদেরসাথে তিনি তাদের সম্বোধন করে বললেন, ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎﻗَﻮْﻡِ ﺃَﺭَﺃَﻳْﺘُﻢْ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖُ ﻋَﻠَﻰ ﺑَﻴِّﻨَﺔٍ ﻣِﻦ ﺭَّﺑِّﻲ ﻭَﺭَﺯَﻗَﻨِﻲ ﻣِﻨْﻪُﺭِﺯْﻗًﺎ ﺣَﺴَﻨًﺎ ﻭَﻣَﺎ ﺃُﺭِﻳْﺪُ ﺃَﻥْ ﺃُﺧَﺎﻟِﻔَﻜُﻢْ ﺇِﻟَﻰ ﻣَﺎ ﺃَﻧْﻬَﺎﻛُﻢْ ﻋَﻨْﻪُ ﺇِﻥْﺃُﺭِﻳْﺪُ ﺇِﻻَّ ﺍﻹِﺻْﻼَﺡَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ ﻭَﻣَﺎ ﺗَﻮْﻓِﻴْﻘِﻲْ ﺇِﻻَّ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻋَﻠَﻴْﻪِﺗَﻮَﻛَّﻠْﺖُ ﻭَﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺃُﻧِﻴْﺐُ – ﻭَﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻻَ ﻳَﺠْﺮِﻣَﻨَّﻜُﻢْ ﺷِﻘَﺎﻗِﻲْ ﺃَﻥﻳُّﺼِﻴْﺒَﻜُﻢْ ﻣِﺜْﻞُ ﻣَﺎ ﺃَﺻَﺎﺏَ ﻗَﻮْﻡَ ﻧُﻮْﺡٍ ﺃَﻭْﻗَﻮْﻡَ ﻫُﻮْﺩٍ ﺃَﻭْ ﻗَﻮْﻡَﺻَﺎﻟِﺢٍ ﻭَﻣَﺎ ﻗَﻮْﻡُ ﻟُﻮْﻁٍ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﺑِﺒَﻌِﻴْﺪٍ- ﻭَﺍﺳْﺘَﻐْﻔِﺮُﻭﺍ ﺭَﺑَّﻜُﻢْﺛُﻤَّﺘُﻮْﺑُﻮْﺍ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲ ﺭَﺣِﻴْﻢٌ ﻭَﺩُﻭْﺩٌ – ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻳَﺎ ﺷُﻌَﻴْﺐُ ﻣَﺎﻧَﻔْﻘَﻪُ ﻛَﺜِﻴﺮًﺍ ﻣِّﻤَّﺎ ﺗَﻘُﻮْﻝُ ﻭَﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻨَﺮَﺍﻙَ ﻓِﻴْﻨَﺎ ﺿَﻌِﻴْﻔًﺎﻭَﻟَﻮْﻻَ ﺭَﻫْﻄُﻚَﻟَﺮَﺟَﻤْﻨَﺎﻙَ ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻧْﺖَ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﺑِﻌَﺰِﻳْﺰٍ- ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺃَﺭَﻫْﻄِﻲْ ﺃَﻋَﺰُّﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﺍﺗَّﺨَﺬْﺗُﻤُﻮْﻩُ ﻭَﺭَﺍﺀَﻛُﻢْ ﻇِﻬْﺮِﻳًّﺎ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲْ ﺑِﻤَﺎﺗَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ ﻣُﺤِﻴْﻂٌ – ﻭَﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﻋْﻤَﻠُﻮْﺍ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻜَﺎﻧَﺘِﻜُﻢْ ﺇِﻧِّﻲْﻋَﺎﻣِﻞٌ ﺳَﻮْﻑَ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ، ﻣَﻦ ﻳَّﺄْﺗِﻴﻪِ ﻋَﺬَﺍﺏٌ ﻳُّﺨْﺰِﻳْﻪِ ﻭَﻣَﻦْ ﻫُﻮَﻛَﺎﺫِﺏٌ ﻭَﺍﺭْﺗَﻘِﺒُﻮْﺍ ﺇِﻧِّﻲ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺭَﻗِﻴْﺐٌ – ‏( ﻫﻮﺩ ৮৮-৯৩)-‘হেআমার জাতি! তোমরা কি মনে কর আমি যদি আমারপালনকর্তার পক্ষ হ’তে সুস্পষ্ট দলীলের উপরেকায়েম থাকি, আর তিনি যদি নিজের তরফ থেকেআমাকে (দ্বীনী ও দুনিয়াবী) উত্তম রিযিক দানকরে থাকেন, (তবে আমি কি তাঁর হুকুম অমান্যকরতে পারি?)। আর আমি চাই না যে, আমিতোমাদেরকে যে বিষয়ে নিষেধ করি, পরেনিজেই সে কাজে লিপ্ত হই। আমি আমার সাধ্যমততোমাদের সংশোধন চাই মাত্র। আর আমার কোনইক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত। আমি তাঁরউপরেইনির্ভর করি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই’ (৮৮)।‘হে আমার জাতি! আমার প্রতি হঠকারিতা করে তোমরানিজেদের উপরে নূহ, হূদ বা ছালেহ-এর কওমেরমত আযাব ডেকে এনো না। আর লূতের কওমেরঘটনা তো তোমাদের থেকে দূরে নয়’ (৮৯)।‘তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনাকর ও তাঁর দিকেই ফিরে এস। নিশ্চয়ই আমারপালনকর্তা অতীব দয়ালু ও প্রেমময়’ (৯০)। ‘তারাবলল, হে শো‘আয়েব! তোমার অত শত কথাআমরা বুঝি না। তোমাকে তো আমাদের মধ্যকারএকজন দুর্বল ব্যক্তি বলে আমরা মনে করি। যদিতোমার জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা না থাকত,তাহ’লে এতদিন আমরা তোমাকে পাথর মেরে চূর্ণকরে ফেলতাম। তুমি আমাদের উপরে মোটেইপ্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি নও’ (৯১)। ‘শো‘আয়েববলল, হে আমার কওম! আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী কিতোমাদের নিকটে আল্লাহর চেয়ে অধিকক্ষমতাশালী? অথচ তোমরা তাঁকে পরিত্যাগ করেপিছনে ফেলে রেখেছ? মনে রেখতোমাদের সকল কার্যকলাপ আমার পালনকর্তারআয়ত্তাধীন’ (৯২)। ‘অতএব হে আমার জাতি!তোমরা তোমাদের স্থানে কাজ কর, আমিওকাজকরে যাই। অচিরেই তোমরা জানতে পারবেকার উপরে লজ্জাষ্কর আযাব নেমে আসে, আরকে মিথ্যাবাদী। তোমরা অপেক্ষায় থাক, আমিওঅপেক্ষায় রইলাম’ (হূদ ১১/৮৮-৯৩)।জবাবে ‘তাদেরদাম্ভিক নেতারা চূড়ান্তভাবে বলে দিল, ﻟَﻨُﺨْﺮِﺟَﻨَّﻚَ ﻳَﺎﺷُﻌَﻴْﺐُ ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﻣَﻌَﻚَ ﻣِﻦْ ﻗَﺮْﻳَﺘِﻨَﺎ ﺃَﻭْ ﻟَﺘَﻌُﻮﺩُﻥَّ ﻓِﻲﻣِﻠَّﺘِﻨَﺎ – ‘হে শো‘আয়েব! আমরা অবশ্যইতোমাকে ও তোমার সাথী ঈমানদারগণকে শহরথেকে বের করে দেব অথবা তোমরাআমাদের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে’ (আ‘রাফ৭/৮৮)। তারা আরও বলল, ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﺃَﻧْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺴَﺤَّﺮِﻳﻦَ- ﻭَﻣَﺎﺃَﻧْﺖَ ﺇِﻟَّﺎ ﺑَﺸَﺮٌ ﻣِﺜْﻠُﻨَﺎ ﻭَﺇِﻥْ ﻧَﻈُﻨُّﻚَ ﻟَﻤِﻦَ ﺍﻟْﻜَﺎﺫِﺑِﻴﻦَ – ﻓَﺄَﺳْﻘِﻂْﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﻛِﺴَﻔًﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ187-185 )-‘নিঃসন্দেহে তুমি জাদুগ্রস্তদের অন্যতম’।‘তুমি আমাদের মত একজন মানুষ বৈ কিছুই নও।আমাদের ধারণা তুমি অবশ্যই মিথ্যাবাদীদেরঅন্তর্ভুক্ত’। ‘এক্ষণে যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবেআকাশের কোন টুকরা আমাদের উপরে ফেলেদাও’ (শো‘আরা ২৬/১৮৫-১৮৭)। শো‘আয়েব (আঃ)তখন নিরাশ হয়ে প্রথমে কওমকে বললেন, ﻗَﺪِﺍﻓْﺘَﺮَﻳْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﻛَﺬِﺑﺎً ﺇِﻥْ ﻋُﺪْﻧَﺎ ﻓِﻲ ﻣِﻠَّﺘِﻜُﻢ ﺑَﻌْﺪَ ﺇِﺫْ ﻧَﺠَّﺎﻧَﺎﺍﻟﻠﻪُ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﻭَﻣَﺎ ﻳَﻜُﻮﻥُ ﻟَﻨَﺎ ﺃَﻥْ ﻧَﻌُﻮﺩَ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺇِﻻَّ ﺃَﻥ ﻳَّﺸَﺂﺀَ ﺍﻟﻠﻪُﺭَﺑُّﻨَﺎ ﻭَﺳِﻊَ ﺭَﺑُّﻨَﺎ ﻛُﻞَّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻋِﻠْﻤﺎً ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﺗَﻮَﻛَّﻠْﻨَﺎ ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ৮৯)-‘আমরা আল্লাহর উপরে মিথ্যারোপকারী হয়েযাব যদি আমরা তোমাদের ধর্মে ফিরে যাই। অথচআল্লাহ আমাদেরকে তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন।ঐ ধর্মে ফিরে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়,তবে যদি আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ সেটা চান।আমাদের পালনকর্তা স্বীয় জ্ঞান দ্বারা প্রত্যেকবস্ত্তকে বেষ্টন করে আছেন। (অতএব)আল্লাহর উপরেই আমরাভরসা করলাম।’অতঃপর তিনিআল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে বললেন, ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺍﻓْﺘَﺢْﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﺑَﻴْﻦَ ﻗَﻮْﻣِﻨَﺎ ﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻭَﺃَﻧﺖَ ﺧَﻴْﺮُ ﺍﻟْﻔَﺎﺗِﺤِﻴﻦَ – ‘হেআমাদের পালনকর্তা! আমাদের ও আমাদেরকওমের মধ্যে তুমি যথার্থ ফায়ছালা করে দাও। আরতুমিই তো শ্রেষ্ঠ ফায়ছালাকারী’ (৮৯)। ‘তখন তারকওমের কাফের নেতারা বলল, ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻤَﻸُ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَﻛَﻔَﺮُﻭﺍ ﻣِﻦْ ﻗَﻮْﻣِﻪِ ﻟَﺌِﻦِ ﺍﺗَّﺒَﻌْﺘُﻢْ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﺇِﻧَّﻜُﻢْ ﺇِﺫﺍً ﻟَّﺨَﺎﺳِﺮُﻭﻥَ -যদি তোমরা শো‘আয়েবের অনুসরণ কর, তবেতোমরা নিশ্চিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে’ (আ‘রাফ৭/৮৯-৯০)।অতঃপর শো‘আয়েব (আঃ) স্বীয়কওমের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এ বিষয়েআল্লাহ বলেন, ﻓَﺘَﻮَﻟَّﻰ ﻋَﻨْﻬُﻢْ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻟَﻘَﺪْ ﺃَﺑْﻠَﻐْﺘُﻜُﻢْﺭِﺳَﺎﻻَﺕِ ﺭَﺑِّﻲ ﻭَﻧَﺼَﺤْﺖُ ﻟَﻜُﻢْ ﻓَﻜَﻴْﻒَ ﺁﺳَﻰ ﻋَﻠَﻰ ﻗَﻮْﻡٍﻛَﺎﻓِﺮِﻳﻦَ – ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ৯৩)-‘অনন্তর তিনি তাদের কাছথেকে প্রস্থান করলেন এবং বললেন, হে আমারসম্প্রদায়! আমি তোমাদেরকেআমার প্রতিপালকেরপয়গাম পৌছে দিয়েছি এবং তোমাদের উপদেশদিয়েছি। এখন আমি কাফেরদের জন্যআর কিভাবেসহানুভূতি দেখাব’ (আ‘রাফ ৭/৯৩)।শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ:হযরত শো‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর কওমেরনেতাদের মধ্যকার উপরোক্ত কথোপকথনেরমধ্যে নিম্নোক্ত শিক্ষণীয় বিষয়গুলি ফুটে ওঠে।যেমন:(১) শো‘আয়েব (আঃ) একটি সম্ভ্রান্তগোত্রের মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। নবুঅতেরসম্পদ ছাড়াও তিনি দুনিয়াবী সম্পদে সমৃদ্ধিশালীছিলেন। বস্ত্ততঃ সকল নবীই স্ব স্ব যুগেরসম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তারাউচ্চমর্যাদাশীল ব্যক্তি ছিলেন। (২) কওমেরনেতারা ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় বিধি-বিধানমানতে প্রস্ত্তত থাকলেও বৈষয়িক জীবনেধর্মীয় বাধা-নিষেধ মানতেরাযী ছিল না (৩)আল্লাহকে স্বীকার করলেও তাদের মধ্যেঅসীলা পূজা ও মূর্তিপূজার শিরকের প্রাদুর্ভাবঘটেছিল (৪) বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসারসমপূজা ছেড়ে নির্ভেজাল তাওহীদের সংস্কারধর্মী দাওয়াত তারা কবুল করতে প্রস্ত্তত ছিল না (৫)মূলতঃ দুনিয়া পূজা ও প্রবৃত্তি পূজারকারণেই তারা শিরকীরেওয়াজ এবং বান্দার হক বিনষ্টকারী অপকর্মসমূহের উপরে যিদ ধরেছিল।(৬) প্রচলিত কোনঅন্যায় রসমের সঙ্গে আপোষ করে তা দূর করাসম্ভবনয়। বরং শত বাধা ও ক্ষতি স্বীকার করেহ’লেও স্রেফ আল্লাহর উপরে ভরসা করেআপোষহীনভাবে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াইপ্রকৃত সমাজ সংস্কারকের কর্তব্য (৭) সংস্কারককেসর্বদা স্পষ্ট দলীলের উপরে কায়েম থাকতেহবে (৮) তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল ও প্রকৃতসমাজদরদী হ’তে হবে (৯) কোনরূপ দুনিয়াবীপ্রতিদানের আশাবাদী হওয়া চলবে না (১০) সকলব্যাপারে কেবল আল্লাহর তাওফীক কামনা করতেহবে এবং প্রতিদান কেবল তাঁর কাছেই চাইতে হবে(১১) শিরক-বিদ‘আত ও যুলুম অধ্যুষিত সমাজেতাওহীদের দাওয়াতের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রমচালিয়ে যাওয়াকে দুনিয়াদার সমাজনেতারা ‘ফাসাদ’ ও‘ক্ষতিকর’ মনে করলেও মূলতঃ সেটাই হ’ল ‘ইছলাহ’বা সমাজ সংশোধনের কাজ। সকল বাধা উপেক্ষাকরেতাওহীদের দাওয়াত দিয়ে যাওয়াই হ’ল সংস্কারকেরমূল কর্তব্য (১২) চূড়ান্ত অবস্থায় আল্লাহর নিকটেইফায়ছালা চাইতে হবে।আহলে মাদইয়ানের উপরেআপতিত গযবের বিবরণ :হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এর শত উপদেশ উপেক্ষা করে যখন কওমেরনেতারা তাদের অন্যায় কর্মসমূহ চালিয়ে যাবারব্যাপারে অনড় রইল এবং নবীকে জনপদ থেকেবের করেদেবার ও হত্যা করার হুমকি দিল ওসর্বোপরি হঠকারিতা করে তারা আল্লাহর গযবপ্রত্যক্ষ করতে চাইল, তখন তিনি বিষয়টি আল্লাহরউপরে সোপর্দ করলেন এবং কওমেরনেতাদের বললেন, ﻭَﺍﺭْﺗَﻘِﺒُﻮْﺍ ﺇِﻧِّﻲ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺭَﻗِﻴْﺐٌ ‘(ঠিকআছে), তোমরা এখন আযাবের অপেক্ষায় থাক।আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় রইলাম’ (হূদ১১/৯৩)।বলা বাহুল্য, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় চিরন্তনবিধান অনুযায়ী শো‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর ঈমানদারসাথীগণকে উক্ত জনপদ হ’তে অন্যত্র নিরাপদেসরিয়ে নিলেন। অতঃপর জিবরীলের একগগণবিদারী নিনাদে অবাধ্য কওমের সকলেনিমেষে ধ্বংস হয়ে গেল। এ বিষয়ে আল্লাহবলেন, ﻭَﻟَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀَ ﺃَﻣْﺮُﻧَﺎ ﻧَﺠَّﻴْﻨَﺎ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮْﺍ ﻣَﻌَﻪُﺑِﺮَﺣْﻤَﺔٍ ﻣِّﻨَّﺎ ﻭَﺃَﺧَﺬَﺕِ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮْﺍ ﺍﻟﺼَّﻴْﺤَﺔُ ﻓَﺄَﺻْﺒَﺤُﻮْﺍ ﻓِﻲﺩِﻳَﺎﺭِﻫِﻢْ ﺟَﺎﺛِﻤِﻴْﻦَ- ﻛَﺄَﻥ ﻟَّﻢْ ﻳَﻐْﻨَﻮْﺍﻓِﻴﻬَﺎ ﺃَﻻَ ﺑُﻌْﺪﺍً ﻟِّﻤَﺪْﻳَﻦَ ﻛَﻤَﺎﺑَﻌِﺪَﺕْ ﺛَﻤُﻮْﺩُ- ‏(ﻫﻮﺩ ৯৪-৯৫)-‘অতঃপর যখন আমারআদেশ এসে গেল, তখন আমি শো‘আয়েব ওতার ঈমানদার সাথীদের নিজ অনুগ্রহে রক্ষা করলাম।আর পাপিষ্ঠদের উপর বিকট গর্জন আপতিত হ’ল।ফলে তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে মরেপড়ে রইল’। ‘(তারা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হ’ল) যেন তারাকখনোই সেখানে বসবাস করেনি। সাবধান! ছামূদজাতির উপর অভিসম্পাতের ন্যায় মাদইয়ানবাসীরউপরেও অভিসম্পাত’ (হূদ ১১/৯৪-৯৫)। যদিও তারাদুনিয়াতে মযবুত ও নিরাপদ অট্টালিকায় বসবাস করত।আছহাবে মাদইয়ানের উপরে গযবের ব্যাপারেকুরআনে ﻇُﻠَّﺔٌ (শো‘আরা ১৮৯), ﺭَﺟْﻔَﺔٌ (হূদ ৯৪),ﺻَﻴْﺤَﺔٌ (আ‘রাফ ৮৮) তিন ধরনের শব্দ ব্যবহৃতহয়েছে। যার অর্থ মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, বিকট নিনাদ,ভূমিকম্প। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন,আহলে মাদইয়ানের উপরে প্রথমে সাতদিন এমনভীষণ গরম চাপিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা দহনজ্বালায় ছটফট করতে থাকে। অতঃপরআল্লাহ তা‘আলাএকটি ঘন কালো মেঘমালা পাঠিয়ে দিলেন, যার নীচদিয়ে শীতল বায়ু প্রবাহিত হচ্ছিল। তখন কওমেরলোকেরা ঊর্ধ্বশ্বাসে সেখানে দৌড়ে এল।এভাবে সবাই জমা হবার পর হঠাৎ ভূমিকম্প শুরু হ’ল এবংমেঘমালা হ’তে শুরু হল অগ্নিবৃষ্টি। তাতে মানুষ সবপোকা-মাকড়ের মত পুড়ে ছাই হ’তে লাগল। ইবনুআববাস (রাঃ) ওমুহাম্মাদ বিন কা‘ব আল-কুরাযী বলেন,অতঃপর তাদের উপর নেমে আসে এক বজ্রনিনাদ।যাতে সব মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল’।[7] এভাবেকোনরূপ গ্রেফতারী পরোয়ানা ও সিপাই-সান্ত্রীর প্রহরা ছাড়াই আল্লাহদ্রোহীরা সবাইপায়ে হেঁটে স্বেচ্ছায় বধ্যভূমিতে উপস্থিত হয়এবং চোখের পলকে সবাই নিস্তনাবুদ হয়ে যায়।মক্কা থেকে সিরিয়া যাওয়ার পথেএসব ধ্বংসস্থলনযরে পড়ে। আল্লাহ বলেন, ﻭَﻛَﻢْ ﺃَﻫْﻠَﻜْﻨَﺎ ﻣِﻦْ ﻗَﺮْﻳَﺔٍﺑَﻄِﺮَﺕْ ﻣَﻌِﻴْﺸَﺘَﻬَﺎ ﻓَﺘِﻠْﻚَ ﻣَﺴَﺎﻛِﻨُﻬُﻢْ ﻟَﻢْ ﺗُﺴْﻜَﻦ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِﻫِﻢْ ﺇِﻟَّﺎﻗَﻠِﻴْﻼً ﻭَﻛُﻨَّﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﺍﻟْﻮَﺍﺭِﺛِﻴﻦَ ، ‘এসব জনপদ ধ্বংস হওয়ার পরপুনরায় আবাদ হয়নি অল্প কয়েকটি ব্যতীত।অবশেষে আমরাই এ সবের মালিক রয়েছি’ (ক্বাছাছ২৮/৫৮)। তিনি বলেন, ﺇِﻥَّ ﻓِﻲ ﺫَﻟِﻚَ ﻵﻳَﺎﺕٍ ﻟِّﻠْﻤُﺘَﻮَﺳِّﻤِﻴْﻦَ ،‘নিশ্চয়ই এর মধ্যে চিন্তাশীলদের জন্যনিদর্শনসমূহ রয়েছে’ (হিজর ১৫/৭৫)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)যখন এসব স্থান অতিক্রম করতেন, তখন আল্লাহরভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন ও সওয়ারীকে দ্রুতহাঁকিয়ে নিয়ে স্থান অতিক্রম করতেন।[8] অথচএখনকার যুগের বস্ত্তবাদী লোকেরা এসবস্থানকে শিক্ষাস্থল না বানিয়ে পর্যটন কেন্দ্রেরনামে তামাশার স্থলে পরিণত করেছে। আল্লাহআমাদের সুপথ প্রদর্শন করুন- আমীন!ওয়াহাব বিনমুনাবিবহ বলেন, শু‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর মুমিন সাথীগণমক্কায় চলে যান ও সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। কা‘বাগৃহের পশ্চিম দিকে দারুন নাদওয়া ও দার বনু সাহ্মেরমধ্যবর্তী স্থানে তাদের কবর হয়’।[9] তবে এইসকল বর্ণনার ভিত্তি সুনিশ্চিত নয়। আর থাকলেওসেগুলি সবই এখন নিশ্চিহ্ন এবং সবই বায়তুল্লাহরচতুঃসীমার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।[1]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৩।[2]. মু‘জামুলবুলদান, বৈরুত : দার ছাদের, ১৯৭৯), ৫/৭৭ পৃঃ, ।[3].আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৩।[4]. ইবনু কাছীর,আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৬৪ পৃঃ।[5]. যথাক্রমে সূরাআ‘রাফ ৭/৮৫-৯৩=৯; তওবাহ ৯/৭০; হূদ ১১/৮৪-৯৫=১২;হিজর ১৫/৭৮-৭৯; হজ্জ ২২/৪৪;শো‘আরা২৬/১৭৬-১৯১=১৬; ক্বাছাছ ২৮/২৩-২৮=৬; আনকাবূত২৯/৩৬-৩৭; ছোয়াদ ৩৮/১৩-১৫=৩; ক্বাফ ৫০/১৪।সর্বমোট = ৫৩টি।[6]. তাফসীরে কুরতুবী, হূদ৮৭।[7]. তাফসীর ইবনে কাছীর, শো‘আরা ১৮৯;কুরতুবী, ঐ।[8]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫১২৫‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়, ‘যুলুম’ অনুচ্ছেদ।[9]. আল-বিদায়াহওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৯।

Advertisements