পিতামাতার অবাধ্যতার কারণ, কিছু বাজ্জিক চিত্র ও প্রতিকারের উপায়। পর্ব -2


অবাধ্যতার কারণ পিতামাতার অবাধ্য হওয়ার পিছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে, তন্মধ্যে কতগুলো কারণ নিম্নরূপ: ১. অজ্ঞতা ও মূর্খতা: কেননা, মূর্খতা হল প্রাণ বিধ্বংসী ব্যাধি; আর মূর্খব্যক্তি তার নিজ জীবনের শত্রু; সুতরাং যখন কোনো ব্যক্তি মাতাপিতার অবাধ্যতার ইহকালীন ও পরকালীন খারাপ পরিণতির কথা না জানে এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার ইহকালীন ও পরকালীন সুফলের ব্যাপারে অজ্ঞ থাকে, তখন এই অজ্ঞতা ও মূর্খতা তাকে অবাধ্যতার দিকে পরিচালিত করে এবং সদ্ব্যবহার করা থেকে বিরত রাখে। ২. কুশিক্ষা: কেননা, পিতামাতা যখন তাদের সন্তানদেরকে তাকওয়া (আল্লাহভীতি), উত্তম আচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ও উচ্চ মর্যাদা অনুসন্ধানের বিষয়ে শিক্ষা না দিবে, তখন এটা তাদেরকে ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যতার দিকে নিয়ে যাবে। ৩. অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ: এটা হল পিতামাতা যখন সন্তানকে কোনো (ভালো) বিষয়ে শিক্ষা দেয়, অথচ তারা তাদের প্রদত্ত শিক্ষা অনুযায়ী আমল করে না, বরং এর বিপরীত কাজ করে, তখন এই বিষয়টি ঔদ্ধত্য ও অবাধ্যতার উপলক্ষ হয়ে উঠে। ৪. সন্তানদের অসৎ সঙ্গ: এটা এমন একটি কারণ, যা সন্তানদেরকে নষ্ট করে ফেলে এবং তাদেরকে পিতামাতার অবাধ্য হওয়ার ব্যাপারে দুঃসাহস যোগায়। যেমনিভাবে তা পিতামাতার প্রতি অত্যাচার ও নির্দয় ব্যবহার করতে উস্কানি দেয় এবং সন্তানদেরকে সুশিক্ষা দেওয়ার ব্যাপারে তাদের প্রভাব ঐতিহ্যকে দুর্বল করে দেয়। ৫. পিতামাতা কর্তৃক তাদের পিতামাতার অবাধ্যতার কারণে সন্তান কর্তৃক তাদের অবাধ্যতা: এটা হল অবাধ্য হওয়ার আবশ্যকীয় কারণসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি কারণ; কেননা, যখন পিতামাতা তাদের পিতামাতার সাথে অবাধ্য আচরণ করে থাকে, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদেরকে তাদের সন্তানদের অবাধ্যতা দ্বারা শাস্তি দেওয়া হয়ে থাকে; আর এটা দুইভাবে হয়ে থাকে— প্রথমত: সন্তানগণ অবাধ্য আচরণ করার ক্ষেত্রে তাদের পিতামাতার অনুসরণ করে। দ্বিতীয়ত: একই রকম কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিদান পাওয়া। ৬. বিবাহ বিচ্ছেদ অবস্থায় আল্লাহর ভয়ের কমতি: কেননা, কোনো কোনো পিতামাতার মাঝে যখন বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে, তখন তারা এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলাকে ভয় করে না এবং তাদের মধ্যকার বিবাহ বিচ্ছেদের কাজটি উত্তম পদ্ধিতিতে সম্পাদন হয় না। বরং দেখা যায়, তাদের প্রত্যেকে একে অপরের বিরুদ্ধে সন্তানদেরকে উত্তেজিত করে তোলে; কেননা, তারা যখন মায়ের কাছে যায়, তখন সে তাদের পিতার দোষ-ত্রুটি চর্চায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তাদেরকে তার সাথে কথা না বলতে ও তাকে এড়িয়ে চলতে উপদেশ দেয়; আর অনুরূপভাবে তারা যখন পিতার কছে যায়, তখন সে তাদের মায়ের মত একই কাজ করতে বলে। ফলে সন্তানেরা পিতামাতা সকলেরই অবাধ্য হয়ে উঠে; আর এই অবাধ্য হয়ে উঠার পিছনে পিতামাতা উভয়ে দায়ী, যেমনটি আবূ যুয়াইব আল-হুযালী বলেন: ﻓﻼ ﺗﻐﻀﺒَﻦْ ﻓﻲ ﺳﻴﺮﺓٍ ﺃﻧﺖ ﺳﺮﺗَﻬﺎ * ﻭﺃﻭﻝ ﺭﺍﺽٍ ﺳُﻨَّﺔً ﻣﻦ ﻳﺴﻴﺮﻫﺎ (সুতরাং তুমি এমন আচরণের ব্যাপারে ক্ষুব্ধ হয়ো না, যে আচরণ তুমি করেছ, আর তুমি এ পথে চলতে প্রথম পছন্দ করেছিলে)। ৭.সন্তানদের মাঝে বিভেদ: কেননা, এ কাজটি সন্তানদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতার জন্ম দেয়, ফলে তাদের আত্মা কলুষিত হয় এবং এটা তাদেরকে পিতামাতার প্রতি ঘৃণা পোষণ ও তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার দিকে নিয়ে যায়। ৮. সুখ-শান্তি ও আবেগকে অগ্রাধিকার দেওয়া: কারণ, কোনো কোনো মানুষের নিকট যখন বৃদ্ধ ও অসুস্থ পিতামাতা বিদ্যমান থাকে, তখন সে তার ধারণা ও বিশ্বাস অনুযায়ী নিজের সুখ-শান্তিকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে তাদের থেকে মুক্তি পেতে চায়— হয় তাদেরকে অক্ষম অবস্থায় ছেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে, অথবা তাদেরকে বাড়িতে রেখে অন্য কোথাও বসবাস করার মাধ্যমে, অথবা অন্য কোনোভাবে; অথচ সে জানে না যে, তার সুখ-শান্তি নিহিত রয়েছে তার পিতামাতার সাথে সার্বক্ষণিক অবস্থান ও তাদের সেবা-যত্ন করার মধ্যে। ৯. সঙ্কীর্ণ মানসিকতা: কেননা, কিছু কিছু সন্তান সঙ্কীর্ণ মানসিকতার হয়ে থাকে; ফলে সে চায় না যে, তার ঘরে কেউ সার্বক্ষণিক অবস্থান ও চলাফেরা করুক; সুতরাং সে যখন একটা গ্লাস ভেঙ্গে ফেলে, অথবা ঘরের আসবাবপত্র নষ্ট করে, তখন সে এ কারণে ভীষণভাবে রেগে যায় এবং ঘরকে সোজাসুজি আগের অবস্থায় ফিরেয়ে নিয়ে যায়। আর এটা পিতামাতাকে কষ্ট দেয় এবং তাদের হৃদ্যতাকে নষ্ট করে দেয়। অনুরূপভাবে আপনি কোনো কোনো সন্তানকে দেখতে পাবেন যে, সে তার পিতামাতার আদেশ-নিষেধ পালন করতে বিরক্তি প্রকাশ করে, বিশেষ করে পিতামাতা উভয়ে অথবা কোনো একজন যখন রূঢ় ও কঠোর প্রকৃতির হয়, তখন আপনি দেখতে পাবেন যে, সন্তান তাদের ব্যাপারে হাত গুটিয়ে নেয় এবং তাদের জন্য তার হৃদয়কে উদার করে দেয় না। ১০. সন্তানদেরকে সদ্ব্যবহার করার ব্যাপারে পিতামাতা কর্তৃক সহযোগিতার কমতি: কোনো কোনো পিতামাতা সদ্ব্যবহার করার ব্যাপারে তাদের সন্তানদেরকে সহযোগিতা করে না এবং তারা যখন ইহসান তথা ভাল ব্যবহার করে, তখন তারা তাদেরকে সুন্দর আচরণের জন্য উৎসাহিত করে না। বস্তুত পিতামাতার অধিকারের বিষয়টি অনেক বড় বিষয় এবং এই অধিকার আদায় করা সকল অবস্থায় ওয়াজিব। কিন্তু সন্তানগণ যখন পিতামাতার পক্ষ থেকে উৎসাহ-উদ্দীপনা, দো‘আ ও সহযোগিতা না পায়, তখন অনেক সময় তারা বিরক্তিবোধ করে এবং পিতামাতার সাথে ভাল ব্যবহার করা ছেড়ে দেয় অথবা এই ক্ষেত্রে কমতি করে। ১১. স্ত্রীর দুশ্চরিত্র: কখনও কখনও মানুষ তার মন্দ চরিত্রের অধিকারী স্ত্রীর দ্বারা বিপদগ্রস্ত হয়, সে আল্লাহকে ভয় করে না এবং কারও অধিকার সংরক্ষণ করে না; কারণ সে তার (স্বামীর) গণ্ডিতে মানসিক কষ্টে থাকে; ফলে আপনি তাকে দেখতে পাবেন যে, সে তার স্বামীকে তার পিতামাতার অবাধ্য হওয়ার জন্য অথবা তাদেরকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য অথবা তাদের প্রতি ইহসান তথা উত্তম ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করে, যাতে তার স্বামীর দ্বারা তার পরিবেশ ঝামেলামুক্ত হয়ে যায় এবং নিজেকে শুধু স্বামীর জন্য নির্দিষ্ট করে নিতে পারে। ১২. পিতামাতার কষ্ট অনুভবের কমতি: ছেলেদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা পিতার খোজ-খবর নেয় না; আর মেয়েদের মধ্যে কেউ কেউ আছে যারা মাতার খোজ-খবর রাখে না; ফলে এমতাবস্থায় আপনি দেখতে পাবেন যে, সে তার পিতামাতার প্রতি কোনো খেয়ালই রাখে না, চাই যখন সে রাতের বেলায় বাসায় আসতে বিলম্ব করুক, অথবা সে যখন তাদের থেকে দূরে থাকে, অথবা সে (সরাসরি) তাদের প্রতি দুর্ব্যবহার করে। এ হল কতগুলো কারণ, যা পিতামাতার অবাধ্য হওয়ার দিকে ধাবিত করে। * * * প্রতিকারের উপায় আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি পিতামাতার মহান হক সম্পর্কে, তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার ব্যাপারে উৎসাহ দান ও তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্কীকরণ প্রসঙ্গে; আরো আলোচনা হয়েছে পিতামাতার অবাধ্যতার কিছু বাহ্যিক রূপ, চিত্র, কাহিনী ও কারণ প্রসঙ্গে। বিষয়টি যখন এই রকম, তখন প্রত্যেক বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য উচিত হবে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মনে প্রাণে আগ্রহী হওয়া এবং তাদের সাথে অসদ্ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা— এই আশায় যে, আল্লাহ তা‘আলার নিকট অনেক সাওয়াবের ব্যবস্থা রয়েছে এবং এই ভয়ে যে, তাঁর নিকট ইহকালে ও পরকালে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। জানা দরকার— পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার বলতে কী বুঝায়? আর তাদের সাথে কী ধরনের আদব (শিষ্টাচার) রক্ষা করে চলা উচিত? আর সদ্ব্যবহারে সহায়ক কর্মকাণ্ডসমূহ কী কী? * * * পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের পরিচয় পিতামাতার বাধ্য বা অনুগত হওয়া বলতে বুঝায়, অবাধ্য না হওয়া। কুরআনে কারীমে সেটাকে ” ﺍﻟﺒﺮ “বলা হয়েছে। অর্থ বাধ্য বা অনুগত হওয়া, সদ্ব্যবহার করা; ইবনু ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সৎকর্মশীল বলে নামকরণ করেছেন এই জন্য যে, তারা পিতামাতা ও সন্তানদের সাথে সদ্ব্যবহার করেছেন। তিনি আরও বলেন: যেমনিভাবে তোমার সন্তানের উপর তোমার অধিকার রয়েছে, ঠিক অনুরূপভাবে তোমার উপরও তোমার সন্তানের অধিকার রয়েছে।[19] * * * পিতামাতার সাথে আচার-আচরণের লক্ষণীয় দিক এখানে কতগুলো আদব বা শিষ্টাচারের বিষয় রয়েছে, যেগুলো আমাদের জন্য মেনে চলা উচিত এবং পিতামাতার সাথে সে অনুযায়ী আচরণ করলে আমাদের জন্য তা যথাযথ হবে; আমরা আশা করতে পারি যে, আমরা তাদের কিছু ঋণ পরিশোধ করতে পারব এবং আল্লাহ তা‘আলা আমাদের উপর তাদের ব্যাপারে যা ওয়াজিব (আবশ্যক) করে দিয়েছেন তার কিছু হলেও বাস্তবায়ন করতে পারব— যাতে আমরা আমাদের প্রতিপালক আল্লাহকে খুশি করতে পারি, আমাদের হৃদয় উদার ও প্রশস্ত হয়, আমাদের জীবন পবিত্র হয়, আমাদের কর্মকাণ্ডসমূহ সহজ হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা‘আলা আমাদের হায়াতে (জীবনকালে) বরকত দান করেন। [20] সে আদব তথা শিষ্টাচার সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের মধ্য থেকে কিছু বিষয় নিম্নরূপ [21] । ১. পিতামাতার আনুগত্য করা ও তাদের সাথে অবাধ্য আচরণ থেকে বিরত থাকা: মুসলিম ব্যক্তির উপর ওয়াজিব হল, তার পিতামাতার আনুগত্য করা এবং তাদের সাথে অবাধ্য আচরণ করা থেকে বিরত থাকা; আর তারা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবাধ্য হওয়ার নির্দেশ না দিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সকল মানুষের আনুগত্যের উপর তাদের আনুগত্য করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, তবে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর আনুগত্যের বিষয়টি ভিন্ন; কারণ, সে তার পিতামাতার আনুগত্যের উপর তার স্বামীর আনুগত্য করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিবে। ২. তাদের সাথে উত্তম আচরণ করা: কথায়, কাজে ও সামগ্রিক বিষয়ে তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করা। ৩. বিনয় ও নম্রতার ডানা বিছিয়ে দেওয়া: আর এটা সম্ভব হবে তাদের প্রতি বিনয়, নম্রতা, কোমলতা প্রকাশ করার মাধ্যমে। ৪. তাদেরকে ধমক দেওয়া থেকে দূরে থাকা: আর এটা সম্ভব হবে নরম সুরে ডাকা ও কোমল ভাষায় কথা বলার মাধ্যমে; আর তাদেরকে ধমক দেওয়া ও তাদের সাথে উচ্চঃস্বরে কথা বলা থেকে সর্বোচ্চ সজাগ ও সতর্কতা অবলম্বন করা। ৫. তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করা: আর এটা সম্ভব হবে যখন তারা কথা বলবেন, তখন সামনাসামনি হয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনা এবং কথা বলার সময় তাদের সাথে কথা কাটাকাটি বা তর্ক-বিতর্ক পরিহার করা; আর তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা থেকে অথবা তাদের কথা প্রত্যাখ্যান করা থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা। ৬. তাদের নির্দেশে খুশি হওয়া এবং তাদের কারণে রাগ ও দুঃখ প্রকাশ পরিহার করা: যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ﴿ ﻓَﻠَﺎ ﺗَﻘُﻞ ﻟَّﻬُﻤَﺎٓ ﺃُﻑّٖ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻨۡﻬَﺮۡﻫُﻤَﺎ ﴾ ‏[ ﺍﻻﺳﺮﺍﺀ : ٢٣‏] “তাদেরকে ‘উফ্’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না ।”[22] ৭. তাদের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করা: আর এটা হবে হাসি-খুশি ও অভিবাদন জানানোর মাধ্যমে তাদের মুখোমুখি হওয়া এবং ভ্রূকুটিপূর্ণ কঠোর দৃষ্টি ও কপাল ভাঁজ করে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা থেকে দূরে থাকা। ৮. তাদের প্রতি ভালবাসা ও বন্ধুত্ব প্রকাশ করা: যেমন— তাদেরকে আগে আগে সালাম প্রদান করা, তাদের হাত ও মাথায় চুম্বন করা, মাজলিসে তাদের জন্য জায়গা প্রশস্ত করে দেওয়া, তাদের আগে খাবারের দিকে হাত বাড়িয়ে না দেওয়া, দিনের বেলায় তাদের পিছনে পিছনে হাঁটা এবং রাতের বেলায় তাদের সামনে হাঁটা— বিশেষ করে রাস্তা যখন অন্ধকারাচ্ছন্ন বা ভয়ঙ্কর হয়; আর রাস্তা পরিষ্কার, উজ্জ্বল ও নিরাপদ হলে তাদের পিছনে হাঁটাতে কোনো দোষ নেই। ৯. তাদের সামনে আদব ও সম্মান রক্ষা করে বসা: আর এটা হবে সঠিকভাবে বসার মাধ্যমে এবং এমনভাবে বসা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে যা নিকট থেকে বা দূর থেকে তাদের প্রতি অপমান করা হয় বলে অনুভব হয়, যেমন— পা বাড়িয়ে দিয়ে বসা, অথবা তাদের উপস্থিতিতে অট্টহাসি হাসা, অথবা হেলান দিয়ে বসা, অথবা বিবস্ত্র হওয়া, অথবা তাদের সামনে অশ্লীল আচরণ করা, অথবা এগুলো ছাড়া অন্য এমন কোনো আচরণ করা যা তাদের সাথে পরিপূর্ণ শিষ্টাচার পরিপন্থী আচরণ বলে গণ্য। ১০. সেবা অথবা কোনো অবদানের ক্ষেত্রে খোঁটা পরিহার করা: কারণ, খোঁটা সকল অনুগ্রহ বা অবদানকে ধ্বংস করে দেয়; আর এটা মন্দ চরিত্রের অংশবিশেষ, আর এটা যখন হয় পিতামাতার অধিকারের ক্ষেত্রে, তখন তার খারাপি আরও বেড়ে যায়। সুতরাং সন্তানের আবশ্যকীয় করণীয় হল সাধ্যানুসারে তার পিতামাতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার কমতি বা ঘাটতি হলে তা স্বীকার করে নেওয়া; আর তার পিতামাতার অধিকার পূরণে সক্ষম না হলে অক্ষমতা প্রকাশ করে ক্ষমা চাওয়া। ১১. মায়ের অধিকারকে অগ্রাধিকার দেওয়া: এ বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা দরকার যে, পিতার আনুগত্য, তার প্রতি সহানুভূতি ও ইহসান করার উপর মাতার আনুগত্য, তার প্রতি সহানুভূতি ও ইহসান করার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে; আর এটা এই জন্য যে, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসের মধ্যে এসেছে, তিনি বলেন: ‏« ﺟَﺎﺀَ ﺭَﺟُﻞٌ ﺇِﻟَﻰ ﺭَﺳُﻮﻝِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓَﻘَﺎﻝَ : ﻣَﻦْ ﺃَﺣَﻖُّ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﺑِﺤُﺴْﻦِ ﺻَﺤَﺎﺑَﺘِﻰ ؟ ﻗَﺎﻝَ : ‏« ﺃُﻣُّﻚَ ‏» . ﻗَﺎﻝَ : ﺛُﻢَّ ﻣَﻦْ ؟ ﻗَﺎﻝَ : ‏« ﺛُﻢَّ ﺃُﻣُّﻚَ ‏» . ﻗَﺎﻝَ ﺛُﻢَّ ﻣَﻦْ ؟ ﻗَﺎﻝَ : ‏« ﺛُﻢَّ ﺃُﻣُّﻚَ ‏» . ﻗَﺎﻝَ ﺛُﻢَّ ﻣَﻦْ ؟ ﻗَﺎﻝَ : ‏« ﺛُﻢَّ ﺃَﺑُﻮﻙَ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭ ﻣﺴﻠﻢ ‏) . “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিজ্ঞাসা করল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন: তোমার মা। লোকটি জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল: তারপর কে? তিনি বললেন: তারপর তোমার পিতা।”[23] ইবনু বাত্তাল র. এই হাদিসের ব্যাখ্যা করার সময় বলেন: “তার দাবি হল, মাতার জন্য পিতার তিন গুণ পরিমাণ সদ্ব্যবহার পাওয়ার অধিকার থাকবে; তিনি বলেন: আর এটা গর্ভধারণের কষ্ট, অতঃপর প্রসব বেদনার কষ্ট এবং তারপর দুধ পান করনোর কষ্টের জন্য; কেননা, এই কষ্টগুলো এককভাবে মা করে থাকেন; অতঃপর পিতা লালনপালন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মায়ের সাথে অংশগ্রহণ করেন। [24] কখনও কখনও বলা হয়: মাতাকে সদ্ব্যবহার, ইহসান ও সহানুভূতির ক্ষেত্রে প্রাধান্য ও মর্যাদা দেওয়া হবে; আর আনুগত্যের ক্ষেত্রে পিতাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে; কারণ, পিতা হলেন ঘরের কর্তা ও নৌকার মাঝি। ১২. কাজের ক্ষেত্রে তাদেরকে সহযোগিতা করা: সুতরাং কোনো সন্তানের জন্য শোভনীয় নয় যে, তার পিতামাতা কাজ করবেন, আর সে তাদের সহযোগিতা না করে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে। ১৩. তাদেরকে বিরক্ত করা থেকে দূরে থাকা: চাই তারা যখন ঘুমন্ত অবস্থায় থাকেন, তখন বিরক্ত করা হউক, অথবা হৈচৈ ও উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ করে তাদেরকে বিরক্ত করা হউক, অথবা কোনো দুঃসংবাদ দেওয়ার মাধ্যমে, অথবা এগুলো ভিন্ন অন্য কোনো ধরনের বিরক্তিকর কিছু দ্বারা বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকা। ১৪. তাদের সামনে তর্ক-বিতর্ক করা ও ঝগড়া-বিবাদের উস্কানি দেওয়া থেকে বিরত থাকা: আর এটা সম্ভব হবে ভাই-বোন ও পরিবারের লোকজনের সাথে সাধারণভাবে তাদের (পিতামাতার) দৃষ্টির আড়ালে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান করার ব্যাপারে উৎসাহিত করা। ১৫. তাদের ডাকে দ্রুত সাড়া দেওয়া: মানুষ ব্যস্ত থাকুক অথবা অবসর থাকুক— সর্বাবস্থায় কর্তব্য হচ্ছে, পিতামাতার ডাকে দ্রুত সাড়া দেওয়া। কারণ, কোনো কোনো মানুষকে যখন তার পিতামাতার কোনো একজন ডাকে এবং সে তখন ব্যস্ত থাকে, তখন সে এমন ভাব প্রকাশ করে যে, সে কোনো আওয়াজই শুনেনি, আর যদি অবসর থাকে, তবে সে তাদের ডাকে সাড়া দেয়। কবির ভাষায়: ﺃﺻﻢٌّ ﻋﻦ ﺍﻷﻣﺮ ﺍﻟﺬﻱ ﻻ ﺃﺭﻳﺪﻩ * ﻭﺃﺳْﻤﻊ ﺧﻠﻖِِِ ﺍﻟﻠﻪ ﺣﻴﻦ ﺃﺭﻳﺪُ (যা আমি শুনতে চাই না তা শোনার ব্যাপারে আমি বধির, আর যখন আমি শুনতে চাই তখন আমি আল্লাহর সবচেয়ে অধিক শ্রোতা বান্দা। সুতরাং সন্তানের জন্য শোভনীয় হল, পিতামাতার ডাক শোনা মাত্রই তাদের ডাকে সাড়া দেওয়া। ১৬. সন্তানদেরকে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে অভ্যস্থ করা: আর এটা সম্ভব হবে ব্যক্তিকে তাদের জন্য আদর্শ নমুনা হওয়ার মাধ্যমে; আর সে সাধ্যানুসারে চেষ্টা করবে তার সন্তানসমষ্টি ও তার পিতামাতার মাঝে সম্পর্ক মজবুত করার জন্য। ১৭. পিতামাতার মাঝে বিরোধ সৃষ্টি হলে তাদের মাঝে শান্তিপূর্ণ সমাধান করে দেওয়া: কেননা, অনেক সময় পিতামাতার মাঝে যখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তখন তাদের মাঝে সম্পর্কের উন্নতি ও শান্তিপূর্ণ সমাধান করার জন্য সন্তানগণ ভালো ভূমিকা নিতে পারে এবং তারা যখন কোনো বিষয়ে মতবিরোধ করবে, তখন সন্তানগণ চাইবে তাদের মধ্যকার দৃষ্টিভঙ্গিকে কাছাকাছি নিয়ে আসতে। ১৮. তাদের নিকট প্রবেশ করার সময় অনুমতি প্রার্থনা করা: কারণ, তাঁরা উভয়ে অথবা তাঁদের কোনো একজন এমন অবস্থায় থাকেন, যে অবস্থায় তাঁকে কেউ দেখুক তিনি তা পছন্দ করেন না। ১৯. তাদেরকে সবসময় আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া: আর এটা হবে দীনের বিষয়ে তারা যা জানে না, তা তাদেরকে শিখিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে; আর তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশনা প্রদান করবে এবং অসৎকাজ থেকে বারণ করবে, যখন তাদের মাঝে কোনো প্রকার অন্যায় ও পাপকর্মের বাহ্যিক রূপ পরিলক্ষিত হবে, তবে এই ক্ষেত্রে অবশ্যই সর্বোচ্চ বিনয়- নম্রতা ও সহানুভূতি প্রদর্শনের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে; আর তাদের ব্যাপারে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিবে, যখন তারা তা গ্রহণ না করবে। ২০. তাদের থেকে অনুমতি গ্রহণ করা এবং তাদের মতামত চাওয়া: চাই বন্ধুবান্ধবের সাথে কোথাও যাওয়ার ব্যাপারে হউক, অথবা দেশের বাইরে পড়ালেখা বা অনুরূপ কোনো উদ্দেশ্যে সফর করার ব্যাপারে হউক, অথবা জিহাদের জন্য যাওয়ার ব্যাপারে হউক, অথবা ঘর থেকে বের হওয়া ও ঘরের বাইরে বসবাস করার ব্যাপারে হউক; সুতরাং তারা যদি অনুমতি দেন, তাহলে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নিবে; আর অনুমতি না দিলে নিজের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় বর্জন করবে, বিশেষ করে যখন তাদের অভিমতের যুক্তিসংগত কারণ থাকে, অথবা তা জ্ঞান ও অভিজ্ঞতালব্ধ মতামত হয়ে থাকে। ২১. তাদের সুনাম রক্ষা করা: আর এটা সম্ভব হবে ভালদের সাথে মিশার মাধ্যমে এবং মন্দদের থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে; আর সন্দেহজনক স্থান থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার মাধ্যমে। ২২. তাদের নিন্দা করা ও মনে আঘাত দেওয়া থেকে দূরে থাকা: আর এটা হল যখন তাদের থেকে এমন কোনো কাজ হয়, যা সন্তান পছন্দ করে না, (তখন তাদেরকে তিরস্কার না করা এবং তাদের মনে আঘাত না দেওয়া) যেমন— লালনপালন ও শিক্ষার ব্যাপারে তাদেরকে খাট করা; অতীতে তাদের পক্ষ থেকে ঘটেছে এমন কাজের কথা তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া, যা তারা শুনতে পছন্দ করেন না। ২৩. তারা নির্দেশ না দিলেও এমন কাজ করা, যা তাদেরকে আনন্দ দেয়: যেমন— ভাই-বোনের দেখাশুনা করা, অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলা, অথবা ঘর গোছানো বা কৃষি ক্ষেতের পরিচর্যা করা, অথবা উপহার দেওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা করা, অথবা এই জাতীয় কোনো কাজ করা, যা তাদেরকে আনন্দ দেয় এবং তাদের অন্তরে খুশির সঞ্চার করে। ২৪. তাদের স্বভাব ও মেজাজ বুঝা এবং সেই অনুযায়ী তাদের সাথে ব্যবহার করা: সুতরাং তারা যখন উভয়ে অথবা তাদের কোনো একজন খুব রাগী বা কঠোর স্বভাবের হয়, অথবা যে কোনো প্রকারের অপছন্দনীয় গুণের অধিকারী হয়, তখন সন্তানের জন্য যথাযথ কর্তব্য হল, তার পিতামাতার মধ্যকার ঐ স্বভাবকে ভালভাবে অনুধাবন করা এবং তাদের সাথে উচিত মত ব্যবহার করা। ২৫. তাদের জীবদ্দশায় তাদের জন্য বেশি বেশি দো‘আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﻗُﻞ ﺭَّﺏِّ ﭐﺭۡﺣَﻤۡﻬُﻤَﺎ ﻛَﻤَﺎ ﺭَﺑَّﻴَﺎﻧِﻲ ﺻَﻐِﻴﺮٗﺍ ٢٤ ﴾ ‏[ ﺍﻻﺳﺮﺍﺀ : ٢٤ ‏] “আর বলো: ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া কর, যেভাবে তারা শৈশবে আমাকে প্রতিপালন করেছিলেন।”[25] আল্লাহ তা‘আলা বলেন, নূহ আলাইহিস সালাম বলেছিলেন: ﴿ ﺭَّﺏِّ ﭐﻏۡﻔِﺮۡ ﻟِﻲ ﻭَﻟِﻮَٰﻟِﺪَﻱَّ ﻭَﻟِﻤَﻦ ﺩَﺧَﻞَ ﺑَﻴۡﺘِﻲَ ﻣُﺆۡﻣِﻨٗﺎ ﻭَﻟِﻠۡﻤُﺆۡﻣِﻨِﻴﻦَ ﻭَﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖِۖ ﴾ ‏[ﻧﻮﺡ : ٢٨‏] “হে আমার রব! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে।”[26] ২৬. তাদের মৃত্যুর পর তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা: সুতরাং যেসব কারণে পিতামাতার মহান হক বা অধিকারের বিষয়টি প্রমাণিত, জগতসমূহের প্রতিপালকের দয়ার ব্যাপকতার কারণে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার বিষয়টি কখনও বন্ধ হয়ে যায় না, বরং মৃত্যুর পরেও অব্যাহত থাকে; কারণ, কোনো কোনো মানুষ তাদের পিতামাতার জীবদ্দশায় তাদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে কমতি করে থাকে; অতঃপর যখন তারা মৃত্যুবরণ করেন, তখন সে পিতামাতার অধিকার আদায়ে অবহেলা ও সময় নষ্ট করার কারণে লজ্জিত হয়ে তার হাত কামড়ায় এবং দাঁতে আঘাত করে; আর আফসোসের সুরে কামনা করে তারা যদি আবার দুনিয়ায় ফিরে আসত, তাহলে সে তাদের সাথে ভাল আচরণ করত! আর সেখান থেকেই মুসলিম ব্যক্তি যে সুযোগ হারিয়েছে সে তা পেতে সক্ষম হবে— সে তার পিতামাতার মৃত্যুপরবর্তী সময়ে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে; আর এটা কয়েকটি কাজের মাধ্যমে হতে পারে, যেমন— ক. সন্তান স্বয়ং নিজেই ভাল হয়ে যাবে। খ. তাদের জন্য বেশি বেশি দো‘আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। গ. তাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা। ঘ. তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা। ঙ. তাদের পক্ষ থেকে দান-সাদকা করা। এ হল কতিপয় বিষয়, যেগুলোর দ্বারা আমরা যথাযথভাবে সুন্দর পদ্ধতিতে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে পারি। * * * সদ্ব্যবহারে সহায়ক কর্মকাণ্ডসমূহ পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করাটা আল্লাহ তা‘আলার অন্যতম নি‘আমত, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা করেন তাকে এই নি‘আমত দ্বারা ধন্য করেন। এখানে এমন কতগুলো কর্মকাণ্ড বা বিষয় রয়েছে, যেগুলো কোনো মানুষ গ্রহণ করে চেষ্টা- সাধনা করলে সেগুলো তাকে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে সহযোগিতা করবে; এসব কর্মকাণ্ড ও বিষয়াদির কতিপয় দিক নিম্নরূপ: [27] ১. আল্লাহ তা‘আলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা: আর এটা সম্ভব হবে শরী‘আত সম্মত পন্থা অবলম্বন করে ‘ইবাদত ও দো‘আর মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সর্বোত্তম সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে, আশা করা যায় যে, তিনি আপনাকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য তাওফীক দিবেন এবং সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবেন। ২. সদ্ব্যবহারের সুফল ও অবাধ্যতার কুফল সামনে রাখা: কেননা, (পিতামাতার আনুগত্যের) কাজটি যথাযথভাবে সম্পাদন করা ও তা বাস্তবায়নের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করার অন্যতম বড় উপায় হল সদ্ব্যবহার করার ফলাফল সম্পর্কে জানা এবং তার উত্তম পরিণতি সামনে রাখা। অনুরূপভাবে অবাধ্যতার কুফল এবং তার কারণে যে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, পরিতাপ ও অপমানের আমদানি হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি দেওয়া; আর এসবই পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে সাহায্য করবে এবং তাদের অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত রাখবে। ৩. অন্যসব মানুষের উপর পিতামাতার মর্যাদার বিষয়টি সামনে রাখা: কেননা, তারা হলেন এই দুনিয়ায় তার অস্তিত্বের উপলক্ষ; আর তারা তার জন্য কষ্ট করেছেন, তাকে অকৃত্রিম স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়েছেন এবং বড় হওয়া পর্যন্ত লালনপালন করেছেন; সুতরাং সন্তান তাদের জন্য যত কিছুই করুক না কেন, সে কখনও তাদের হক (অধিকার) আদায় করতে সক্ষম হবে না; অতএব, এই বিষয়টি মনে রাখলে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার মত কাজটি সহজ হবে। ৪. পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারে আত্মনিয়োগ করা: ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হলো তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা এবং এর সকল দায়-দায়িত্ব বহন করা; আর এ কাজে নিজেকে এমনভাবে বিলিয়ে দেওয়া, যাতে তা তার স্বভাব ও অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। ৫. তালাকের অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করা: পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য হল তারা যদি তাদের মধ্যকার দাম্পত্য জীবন বহাল রাখতে অপারগ হয় এবং তাদের মাঝে তালাকের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে, তাহলে তাদের প্রত্যেকেই যেন সন্তানদেরকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য উপদেশ দেয় এবং তাদের প্রত্যেকে যেন সন্তানদেরকে পিতামাতার সাথে দুর্ব্যবহার করতে প্ররোচিত না করে; কারণ, সন্তানরা যখন পিতামাতার অবাধ্য বলে পরিচিত হবে, তখন এর জন্য পিতামাতাই দায়ী হবেন; ফলে তারা নিজেরা হতভাগ্য হবে এবং সন্তানদেরকেও হতভাগ্য করবে। ৬. পিতামাতার সততা: ছেলে-সন্তানদের সততা ও তাদের কর্তৃক তাদের পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জন্য অন্যতম উপায় ও উপলক্ষ হল পিতামাতার সততা। ৭. পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের উপদেশ দেওয়া: আর এটা হবে সদ্ব্যবহারকারীদেরকে উৎসাহ দান এবং তাদেরকে সদ্ব্যবহার করার ফযীলত বর্ণনা করে উপদেশ দেওয়ার মাধ্যমে; আর অবাধ্যদেরকে উপদেশ দান এবং অবাধ্যতার খারাপ পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। ৮. সদ্ব্যবহার করার জন্য সন্তানদেরকে সহযোগিতা করা: আর এটা হল সদ্ব্যবহার করার জন্য পিতামাতা কর্তৃক সন্তানদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া; আর এটা সম্ভব হয়ে উঠবে তাদেরকে উৎসাহ ও ধন্যবাদ দেওয়ার মাধ্যমে এবং তাদের জন্য দো‘আ করার মাধ্যমে। আমি কোনো কোনো পিতামাতার ব্যাপারে জানি, যাকে ছেড়ে তার সন্তান-সন্তুতি ও নাতি-নাতনীগণ এক মুহূর্তও থাকতে পারে না, অথচ তার বয়স একশ বছর পার হয়ে গেছে। কারণ, তারা তার সাথে অনেক বেশি উত্তম আচরণ করে এবং তার সেবায় পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে যায়; বরং তারা এর দ্বারা মজা ও আনন্দ পায়। আর আল্লাহ তা‘আলা তাওফীক দান করার পর তাদেরকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য যে কারণটি সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করে তা হল— এই পিতা তার সাথে উত্তম ব্যবহার করার ব্যাপারে তাদের (সন্তানদের) উত্তম সাহায্যকারী, যেমন— তিনি তার সন্তানদেরকে ভালবাসেন, তাদের জন্য বেশি বেশি দো‘আ করেন, আগ্রহের সাথে তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তাদের প্রশংসা ও গুণ-গান করেন, তাদের মনে আনন্দ দেন এবং তাদেরকে তাদের সবচেয়ে প্রিয় নামে ডাকেন। ৯. সন্তান কর্তৃক তার নিজকে মাতাপিতার অবস্থানে রেখে চিন্তা করা: হে ছেলে! আগামীতে যখন তুমি বার্ধক্যে উপনীত হবে, তোমার অস্থিমজ্জা দুর্বল হয়ে যাবে, চুল সাদা হয়ে যাবে এবং তুমি চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে যাবে, তখন যদি তোমার সন্তানদের কাছ থেকে তুমি দুর্ব্যবহার পাও, নিষ্ঠুর অবহেলার শিকার হও এবং স্পষ্ট অবজ্ঞার পাত্র হয়ে যাও, তাহলে কি তা তোমাকে আনন্দ দিবে?! ১০. সদ্ব্যবহারকারী ও অবাধ্য সন্তানদের জীবনবৃত্তান্ত পাঠ করা: কেননা, সদ্ব্যবহারকারীদের জীবনী আগ্রহ-উদ্দীপনাকে সতেজ ও তীক্ষ্ন করবে, সংকল্প ও সিদ্ধান্তকে পবিত্র করবে এবং সদ্ব্যবহার করতে অনুপ্রাণিত করবে। আর অবাধ্য সন্তানদের জীবনী পাঠ এবং তাদের অর্জিত খারাপ পরিণতি অবাধ্য হওয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, তাতে ঘৃণার জন্ম দিবে, সদ্ব্যবহারের দিকে আহ্বান করবে এবং তার ব্যাপারে আগ্রহ ও উৎসাহের জন্ম দিবে। ১১. সদ্ব্যবহার দ্বারা পিতামাতার খুশি ও অবাধ্যতার কারণে তাদের কষ্ট পাওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করা: মানুষ যদি এই বিষয়টি বুঝতে পারে, তাহলে সে আগ্রহ সহকারে সদ্ব্যবহারের দিকে অগ্রসর হবে এবং তাদের অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত থাকবে। কবি সত্যই বলেছেন: ﻟﻮ ﻛﺎﻥ ﻳﺪﺭﻱ ﺍﻻﺑﻦُ ﺃﻳَّﺔ ﻏُﺼَّﺔٍ * ﻗﺪ ﺟﺮَّﻋﺖْ ﺃﺑﻮﻳﻪ ﺑﻌﺪ ﻓﺮﺍﻗﻪ (যদি ছেলে জানতে পারত কোন্ যন্ত্রণা তার পিতামাতাকে গিলতে হয় তার বিচ্ছেদের পর)। ﺃﻡٌ ﺗﻬﻴﻢُ ﺑِﻮﺟﺪِﻩِ ﺣﻴﺮﺍﻧﺔ * ﻭﺃﺏٌ ﻳَﺴِﺢُّ ﺍﻟﺪﻣﻊ ﻣﻦ ﺁﻣﺎﻗﻪ (মা তাকে পাওয়ার জন্য দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর পিতা তাকে হারিয়ে অবিরত চোখের জলে বুক ভাসায়)। ﻳﺘﺠﺮﻋﺎﻥ ﻟﺒﻴﻨﻪ ﻏﺼﺺ ﺍﻟﺮﺩﻯ * ﻭﻳﺒﻮﺡُ ﻣﺎ ﻛﺘﻤﺎﻩ ﻣﻦ ﺃﺷﻮﺍﻗﻪ (তারা তার বিচ্ছেদের কারণে ধ্বংসের ঢোক গিলতে বাধ্য হন, তার প্রতি প্রবল আগ্রহের আতিশয্যে যা কিছু তারা গোপন করেছিল তা প্রকাশে করে দিতে বাধ্য হয়)। ﻟﺮﺛﺎ ﻷﻡٍّ ﺳُﻞَّ ﻣﻦ ﺃﺣﺸﺎﺋﻬﺎ * ﻭﺑﻜﻲ ﻟﺸﻴﺦٍ ﻫﺎﻡ ﻓﻲ ﺁﻓﺎﻗﻪ (অবশ্যই শোক প্রকাশ করতে হবে সে মায়ের জন্য যার পেটের নাড়ি- ভুড়ি থেকে তাকে আলাদা করা হয়েছে, আর এমন বৃদ্ধ পিতার জন্য ক্রন্দন করতে হবে যিনি তাকে পাগলের মত ভালোবাসত)। ﻭﻟﺒﺪَّﻝ ﺍﻟﺨﻠﻖَ ﺍﻷﺑﻲَّ ﺑﻌﻄﻔِﻪ * ﻭﺟﺰﺍﻫﻤﺎ ﺑﺎﻟﻌَﺬْﺏ ﻣﻦ ﺃﺧﻼﻗﻪ (আর অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে তার দাম্ভিক আচরণকে মায়া-দয়া দ্বারা, আর তাদেরকে তার মধুর চরিত্র দ্বারা পুরস্কার দিতে হবে)। [28] * * * স্ত্রী ও পিতামাতার মাঝে সমন্বয় করা এ অনুচ্ছেদটি এমনসব আদব বা শিষ্টাচারকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা পিতামাতার সাথে রক্ষা করে চলা আবশ্যক এবং পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারে সহায়ক কর্মকাণ্ডসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে; আর এর কিছু বিষয়ের আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। পৃথক ও এককভাবে এই অনুচ্ছেদটির অবতারণা হয়েছে তার ব্যাপক গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কারণে; স্বামী কখনও কখনও তার স্ত্রী ও পিতামাতার মাঝে সমন্বয়সাধন করার ব্যাপারে কথা বলে, যখন তার পিতামাতা ও স্ত্রীর মাঝে পারস্পরিক ঘৃণা ও অবজ্ঞার কারণে বিরক্তিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। কারণ, তার স্ত্রী স্বীয় স্বামীকে নিজের জন্য খাস করে নেওয়ার নিমিত্তে অন্ধ ভালবাসার কারণে অনেক সময় আল্লাহকে কম ভয় করে থাকে, যা পূর্বে আলোচনা হয়েছে। আর কখনও কখনও তার পিতামাতা উভয়ে অথবা তাদের কোনো একজন তীক্ষ্ন মেজাজের হয়ে থাকে, ফলে তাদেরকে কোনো মানুষ পছন্দ করে না; আবার কখনও তারা সন্তানের উপর চাপ প্রয়োগ করে তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ব্যাপারে, অথচ সে এমন কোনো অপরাধ করেনি, যা তার জীবনে এই তালাকের মত পরিস্থিতিকে অপরিহার্য করে তোলে। আবার কখনও কখনও তারা তার অন্তরে ক্রেধের সঞ্চার করে এবং তাকে অবহিত করে যে, তার স্ত্রী নিজ ইচ্ছামত কাজ করে, ফলে সে এটাকে বিশ্বাস করে, অথচ সে তাকে তার অনেক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে অথবা তার সাথে অনেক বিষয়ে হক আদায়ে ঘাটতি বা কমতি করেছে। সুতরাং এই ধরনের পরিস্থিতিতে তার সমাধান কী হবে? মানুষ কি হাত- পা গুটিয়ে বসে থাকবে? সে কি তার পিতামাতার অবাধ্য হবে এবং তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করবে? সে কি তাদের মতামতের অমর্যাদা করবে এবং তার স্ত্রীকে খুশি করার জন্য নির্দয় ও নিষ্ঠুরভাবে তাদেরকে তাড়িয়ে দিবে? নাকি তার স্ত্রীর অধিকারের প্রশ্নে তার পিতামাতা তাকে যা কিছুই বলবে, সব ক্ষেত্রেই সে তাদের সাথে একমত হয়ে যাবে এবং তার স্ত্রী নির্দোষ ও পিতামাতা ভুলের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও তার স্ত্রীকে দোষারোপ করে তারা যত বক্তব্য পেশ করবে, তার সবকিছুকেই সে বিশ্বাস করবে? না, বিষয়টি আসলে এ রকম নয়; বরং তার দায়িত্ব হল তাদের মাঝে মীমাংসা করা এবং তাদের মধ্যকার ভাঙ্গন রোধে সর্বাত্মক চেষ্টা প্রচেষ্টা চালানো। নিশ্চয় ব্যক্তিত্বের শক্তি মানুষের মধ্যে অধিকার এবং এমন সব দায়িত্ব- কর্তব্যের মধ্যকার তুলনা করার মত সামর্থ্য ও ক্ষমতার সূচনা করে, যেসব দায়িত্ব ও কর্তব্য কোনো কোনো মানুষের সামনে কখনও কখনও পরস্পর বিরোধী হয়ে উঠে; ফলে তার কাছে ব্যাপারটি সন্দেহপূর্ণ হয়ে উঠে এবং তাকে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থার মধ্যে ফেলে দেয়। আর তা থেকেই একে অপরের প্রতি কোনো প্রকার অন্যায় ও জুলুমের সম্পৃক্ততা ছাড়াই প্রত্যেক অধিকারওয়ালা ব্যক্তির অধিকার আদায়ের শক্তি ও সামর্থ্যের প্রশ্নে বুদ্ধিমান মানুষের বিচক্ষণতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। বস্তুত ইসলামী শরী‘য়তের অন্যতম মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব হল— তা এমন কতগুলো বিধিবিধান নিয়ে এসেছে, যা বিভিন্ন প্রকার কার্যকারণ ও প্রতিকারের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করে; আর আল্লাহ তা‘আলা তাওফীক দিলে বুদ্ধিমান বিচক্ষণ ব্যক্তি প্রত্যেক অধিকারওয়ালা ব্যক্তিকে তার অধিকার বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হন। এ ভারসাম্যতার মাঝে ত্রুটি বা ফাটল সৃষ্টির কারণে অনেক সামাজিক ট্রাজেডি বা দুঃখজনক ঘটনা এবং পারিবারিক সমস্যার জন্ম হয়। এসব সংঘটিত সমস্যার সমাধানে অন্যতম সহায়ক শক্তি হল এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে যথাযথ ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে সকল পক্ষকে সচেষ্ট হওয়া। নিম্নে কিছু নির্দেশনা আসছে এবং পূর্বেও কিছু দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করা হয়েছে, যা এই ব্যাপারে সহায়তা করবে: এসব নির্দেশনা ও দৃষ্টিভঙ্গি বিবাহিত পুত্র, তার স্ত্রী এবং তার পিতামাতাকে— বিশেষ করে তার মাতাকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো, প্রথমত: বিবাহিত ছেলের ভূমিকা: বিবাহিত ছেলে তার স্ত্রী ও পিতামাতার মাঝে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে যে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে তা নিম্নরূপ: (ক) পিতামাতার সেবা-যত্ন করা ও তাদের মেজাজ অনুধাবন করা: আর এটার মানে হল বিয়ের পরেও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার অব্যাহত রাখা এবং পিতামাতার সামনে তার স্ত্রীর প্রতি ভালবাসার বিষয়টি প্রকাশ না করা— বিশেষ করে তার পিতামাতা উভয়ে অথবা তাদের কোনো একজন যখন তীক্ষ্ন মেজাজের হয়ে থাকে। কারণ, সে যখন তাদের সামনে এটা প্রকাশ করবে, তখন ক্রোধে তাদের অন্তর পূর্ণ হয়ে যাবে এবং তাদের মাঝে ঈর্ষার জন্ম দিবে, বিশেষ করে মায়ের মনে। অনুরূপভাবে তার কর্তব্য হল তার পিতামাতার সাথে কোমল আচরণ করা; আর তাদেরকে সন্তুষ্ট করা ও তাদের মন পাওয়ার জন্য আগ্রহ সহকারে চেষ্টা করা। (খ) স্ত্রীর প্রতি ইনসাফপূর্ণ আচরণ করা: আর এটা সম্ভব হবে তার অধিকার সম্পর্কে জানার মাধ্যমে এবং তার সম্পর্কে তার পিতামাতার পক্ষ থেকে যা শুনবে, তার সবকিছু গ্রহণ না করার মাধ্যমে; বরং তার দায়িত্ব হল তার সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করা এবং তার সম্পর্কে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা ও যথার্থতা যাচাই করা। (গ) পরস্পরের মধ্যে ভালবাসা ও আন্তরিকতা তৈরি করা: উদাহরণস্বরূপ সে তার স্ত্রীকে উপদেশ দিবে তার পিতামাতাকে বিভিন্ন ধরনের হাদিয়া বা উপহার সামগ্রী প্রদান করার জন্য, অথবা সে নিজেই কিছু উপহার সামগ্রী ক্রয় করবে এবং তা তার স্ত্রীকে দিয়ে বলবে তা পিতামাতাকে প্রদান করার জন্য— বিশেষ করে মাকে প্রদান করার জন্য; কেননা, এটা এমন জিনিস, যা মনকে বিগলিত করে, আস্তে আস্তে ক্রোধ বা বিদ্বেষ দূর করবে, ভালবাসার আমদানি করবে এবং তার খারাপ ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণিত করবে। (ঘ) স্ত্রীর সাথে বুঝাপড়া বা সমঝোতা করা: সুতরাং সে তাকে উদাহরণস্বরূপ বলবে, আমার পিতামাতা এমন এক অংশ, যা আমার থেকে বিভক্ত বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার নয়; আর আমার অনুভূতি শক্তি যদি কখনও ক্ষীণও হয়ে যায়, তবুও আমি কিছুতেই তাদের অবাধ্য হব না এবং তাদের কোনো অপমান আমি কখনও সহ্য করব না। আর আমার পিতামাতার ব্যাপারে তোমার ধৈর্যধারণ ও তাদেরকে তোমার সেবা- যত্ন করার দ্বারাই তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা উত্তর উত্তর বৃদ্ধি পাবে। অনুরূপভাবে সে তার স্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিবে যে, সেও অচিরেই কোনো একদিন মা হবে; আর কখনও কখনও তার পিতামাতার সাথে তার অবস্থার অনুরূপ অবস্থা তার জীবনেও আসতে পারে, তখন কি তার সাথে অনুরূপ আচরণ করাটাকে সে পছন্দ করবে? অনুরূপভাবে তাকে আরও স্মরণ করিয়ে দিবে যে, নিশ্চয় কলহ বা কঠোরতা কোনো কাজ বা বিষয়ের শুধু কঠোরতা ও জটিলতাই বৃদ্ধি করে; আর কোনো কিছুর মধ্যকার কোমলতা শুধু তাকে সৌন্দর্য দান করে এবং অনুরূপভাবে ইত্যাদি ইত্যাদি [29] । দ্বিতীয়ত: পুত্রবধুর ভূমিকা: পুত্রবধু এ ব্যাপারে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম; যেমন— তার পক্ষে সম্ভব তার স্বামীকে তার নিজের উপর অগ্রাধিকার দেওয়া, তার (স্বামীর) আত্মীয়-স্বজনকে সম্মান করা এবং তার পিতামাতা তথা শ্বশুর- শাশুড়ীকে বেশি বেশি সম্মান ও সেবা- যত্ন করা, বিশেষ করে তার শাশুড়ীকে; আর এ সবকিছুই মূলত স্বামীকে সম্মান ও তার প্রতি ইহসান করা। ঠিক তেমনিভাবে তাতে রয়েছে তার প্রতি লক্ষ্য রাখা, দাম্পত্য সম্পর্ক শক্তিশালী করা এবং ফেতনা- ফ্যাসাদের আগুন নিভিয়ে দেওয়ার বিষয়। যখন স্ত্রীর উপর তার (স্ত্রীর) পিতামাতার চেয়ে স্বামীর হক বেশি এবং জাতির সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করার জন্য সে যখন তার আত্মীয়-স্বজন ও তার পিতার প্রিয় বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সম্পর্ক রক্ষার জন্য শরী‘আতসম্মতভাবে আদিষ্ট, তখন দাম্পত্য সম্পর্ক মজবুত করার জন্য স্ত্রী তো আরও অতি উত্তমভাবেই তার স্বামীর প্রিয়জনদের অধিকার রক্ষার জন্য শরী‘আতসম্মতভাবে আদিষ্ট। অতঃপর স্ত্রী কর্তৃক (তার পিতামাতার মত) তার স্বামীর পিতামাতার সম্মান ও সেবাযত্ন করার বিষয়টি তো মৌলিকভাবে ইসলামী নৈতিকতা ও চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়, যা ব্যক্তির আভিজাত্য ও বংশের মহত্ত্বের প্রমাণ বহন করে। আর যদিও সে এই কাজটি করবে শুধু তার স্বামীর সন্তুষ্টির জন্য, অথবা নিকটাত্মীয়দের ভালবাসা পাওয়ার জন্য এবং যাবতীয় বিরোধ ও ঝগড়া-বিবাদ থেকে নিরাপদে থাকার উদ্দেশ্যে— উপরন্তু দো‘আ তো পাবেই। অনুরূপভাবে একজন ভাল স্ত্রীর আবশ্যকীয় করণীয় হল, সে শুরু থেকেই একথা ভুলবে না যে, তার স্বামীর ব্যাপারে যে নারীটি মনে করে সে তার প্রতিদ্বন্দ্বী, সে নারীটি হল এ স্বামীর মা; আর যতই তার অনুভূতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যাক তার পক্ষে সম্ভব নয় যে, সে তার মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে; কারণ, সে তার মা, যিনি তাকে নয় মাস তার পেটে ধারণ করেছেন, তার দুধ খাইয়ে তাকে শক্তিশালী করেছেন, তার আদর ও স্নেহ দ্বারা তাকে উদ্ভাসিত করেছেন এবং তার জন্য নিজের জীবনকে উজাড় করে দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়েছে। অনুরূপভাবে হে স্ত্রী! তোমার ভুলে গেলে চলবে না যে, এ নারীটি তোমার সন্তানদের আশ্রয়কেন্দ্র; কারণ, তিনি হলেন তাদের দাদী এবং তার সাথে রয়েছে তাদের মজবুত সম্পর্ক; সুতরাং তোমার জন্য তার সাথে সতীনের মত ব্যবহার করা শোভনীয় হবে না; যদিও সে কখনও কখনও তোমার সাথে সতীনের মত ব্যবহার করবে কিন্তু তুমি তার সাথে মায়ের মত ব্যবহার কর, তাহলে সে তোমার সাথে মেয়ের মত ব্যবহার করবে। আর মায়ের নিকট থেকে কখনও কখনও কঠোরতা বা দুর্ব্যবহারের মত আচরণ হলে মেয়ের জন্য উচিৎ হবে সাওয়াব ও প্রতিদানের আশায় ধৈর্যধারণ করা। অতঃপর যখন ঘরে ও পরিবারে ইসলামের আদব বা শিষ্টাচার ছড়িয়ে পড়বে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তার সুবিধা ও অসুবিধা সম্পর্কে জানতে পারবে, তখন পরিবারটি চলতে থাকবে একটি সন্তোষজনক চরিত্র নিয়ে; আর সেই পরিবারটি অধিকাংশ সময় আনন্দময় জীবনযাপন করবে। আর জেনে রাখবে, হে স্ত্রী! নিশ্চয় তোমার স্বামী তোমার পরিবারের চেয়ে তার পরিবার- পরিজনকে বেশি ভালবাসবে; আর এ ক্ষেত্রে তুমি তাকে তিরস্কার করো না। আর তুমিও তো তার পরিবারের চেয়ে তোমার পরিবার-পরিজনকে অধিক ভালবাস; সুতরাং তুমি তার পরিবার- পরিজনকে অবজ্ঞা করার মাধ্যমে অথবা তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে অথবা তাদের অধিকারের ব্যাপারে কমতি করার মাধ্যমে তাকে আঘাত দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হও; কেননা, তাকে এই ধরনের আচরণ তোমাকে অপছন্দ করতে এবং তোমার থেকে অন্য দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য করবে। আর স্বামীর পরিবার-পরিজনকে সম্মান করার ক্ষেত্রে অবহেলা করা মানেই স্বয়ং স্বামীকে সম্মান করার ক্ষেত্রে অবহেলা করা; আর যখন সে অপরিপক্ক চিন্তায় কোনো কিছু দ্বারা এর মোকাবিলা করতে পারবে না তখন সে আঘাত ও বিরক্তির কারণে স্ত্রীর জন্য কখনও তার ভালবাসাকে উজাড় করে দিবে না। অতঃপর যে ব্যক্তি তার পরিবার- পরিজনকে ভালবাসে এবং তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে, সে তো একজন ভদ্র, সম্মানিত ও সৎ মানুষ; তার স্ত্রীর জন্য যথাযথ হবে— তাকে সম্মান করা, শ্রদ্ধা করা এবং তার মধ্যে ভালো কিছু আশা করা; কারণ, যে ব্যক্তির মধ্যে তার পিতামাতার জন্য ভালো কিছু নেই, অধিকাংশ সময় সে ব্যক্তির মধ্যে স্ত্রী, অথবা সন্তান, অথবা অপর কোনো মানুষের জন্য কোনো কল্যাণ নেই। হে স্ত্রী! যখন তুমি তোমার স্বামী কর্তৃক তার পিতামাতার সাথে অবাধ্য আচরণ করা এবং তাদের সাথে তোমার দুর্ব্যবহার করাটাকে মেনে নিবে, তখন কি তুমি তোমার ভাইয়ের স্ত্রী তথা ভাবিদের পক্ষ থেকে তোমার মায়ের সাথে অনুরূপ করাটাকে মেনে নিতে পারবে? নাকি তুমি পছন্দ করবে তোমার পুত্রবধুদের পক্ষ থেকে তোমার সাথে এমন (খারাপ) ব্যবহার করাটাকে, যখন তোমার অস্থি দুর্বল হয়ে যাবে এবং বার্ধক্যে মাথার চুল সাদা হয়ে যাবে? পরিশেষে, সমস্যাসমূহের সমাধান, জটিলতা নিরসন, মহৎ গুণের সমাবেশ ও ভাঙ্গন বা বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক তাওফীক দানের পর পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য স্বামীর সহযোগিতার ব্যাপারে অধিকাংশ সময় একজন সৎ স্ত্রী দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে; কারণ, পিতামাতা যখন তাদের পুত্রবধুর কাছ থেকে সত্যিকার ভালবাসা ও উদার সহানুভূতি প্রত্যক্ষ করবে, তখন তারা এই চমৎকার অনুগ্রহের কথা অবশ্যই মনে রাখবে। আর এ কারণেই আমার দেখতে পাই যে, অনেক পিতামাতা তাদের পুত্রবধুদেরকে তাদের আপন মেয়েদের মত করে অথবা তার চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। আর এটা আল্লাহ তা‘আলার তাওফীক ছাড়া সম্ভব নয়; অতঃপর ঐসব স্ত্রীদের প্রজ্ঞা এবং স্বামীদের পিতামাতার সাথে উত্তম ব্যবহারের প্রবল আকাঙ্খার কারণেই এটা সম্ভব হয়ে উঠে। আর পূর্বোক্ত বিষয়গুলো ছাড়া স্ত্রীকে স্বামীর পিতামাতা তথা শ্বশুর-শাশুড়ীর হৃদয়ে প্রবেশ করতে হলে আরও যেসব বিষয় সাহায্য করবে সেগুলো হল: (তাদের পক্ষ থেকে) দুর্ব্যবহারের সময় ধৈর্যধারণ করা, প্রতিদান পাওয়ার বিষয়টি সামনে রাখা, পরিণাম ফল নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, তাছাড়া তাদেরকে উপহার সামগ্রী প্রদান করা, তাদের সাথে আগ্রহসহকারে উত্তম কথা বলা এবং মনোযোগ দিয়ে শ্বশুর- শাশুড়ীর কথা শ্রবণ করা; আর কোমল ভাষায় কথা বলা, সালাম দেওয়া এবং উত্তম প্রতিশ্রুতি দেওয়া। এর মধ্য থেকে আরেকটি হল- তার স্বামীকে তার পিতামাতার সেবা-যত্ন করার জন্য উপদেশ দেওয়া এবং সাথে সাথে তাদেরকে একথা বুঝতে না দেওয়া— তার মন তাদেরকে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণভাবে তার (স্ত্রীর) দিকে ঝুঁকে গেছে। আর এর মধ্য থেকে আরেকটি হল- আল্লাহ তা‘আলার কাছে বিনয়ের হাতগুলো উত্তোলন করা, যাতে তিনি তার শ্বশুর-শাশুড়ীর হৃদয়কে তার প্রতি দয়াময় করে দেন এবং তাকে তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করার ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করেন। সুতরাং হে প্রিয় স্ত্রী! এসব কথার তাৎপর্য উপলব্ধি কর; তোমার জন্য দুনিয়ার জীবনে থাকবে সুন্দর প্রশংসা ও সুখ্যাতি এবং পরকালে থাকবে অনেক প্রতিদান ও এক নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার। [30] তৃতীয়ত: স্বামীর মায়ের (শাশুড়ীর) ভূমিকা: মায়েদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছেন (আল্লাহ তাদেরকে হেদায়াত করুন), যিনি না বুঝেই তার ছেলেকে জটিলতার মধ্যে ফেলে দেন; কেননা, তিনি তাকে ভালবাসেন এবং তার সৌভাগ্য কামনা করেন; আবার কখনও কখনও তার জন্য পাত্রী দেখা, প্রস্তাব দেওয়া ও তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা-সাধনা করেন। কিন্তু তার মন্দ হস্তক্ষেপের কারণে কোনো কোনো সময় তার নিজের ও তার সন্তানের জন্য ক্ষতি ডেকে আনেন; কারণ, যখন ছেলে বিয়ে করে, তখন তার মা মনে করে যে, তার কাছ থেকে তার সন্তানকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তার মন তাকে ছেড়ে অন্য দিকে ঝুঁকে গেছে; ফলে সে তাকে এবং হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা আবার ফিরে পেতে চায়; আর সব সময় তার অন্তরে তার স্ত্রীর ব্যাপারে বিদ্বেষের আগুন প্রজ্বলিত করে এবং তার মধ্যে তার (স্ত্রীর) ব্যাপারে অবিশ্বাসের প্ররোচনা চালিয়ে যায়; আবার কখনও কখনও সে স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য তাকে সুন্দর করে বুঝায় এবং তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, সে তার জন্য তার চেয়ে আরও ভাল বউ খুঁজে নিয়ে আসব, অথচ অনেক সময় স্ত্রী চরিত্রবান ও সুন্দরী হওয়া সত্ত্বেও সে এই ধরনের কাজ করে। আবার কোনো কোনো মা এমন আছেন যখন তিনি দেখেন তার ছেলে তার স্ত্রীকে নিয়ে আনন্দিত ও সুখী, অথবা দেখেন যে সে তার স্ত্রীকে সম্মান বা মর্যাদা প্রদান করে, তখন তার হৃদয়ে হিংসার আগুন জ্বলে উঠে; আবার কখনও কখনও অবস্থা আরও খারাপ পরিণতির দিকে মোড় নেয়…। আবার কোনো কোনো মা আছেন এমন, যিনি তার পুত্রবধুর সাথে আচার- ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর এবং নিষ্ঠুর; ফলে আপনি তাকে দেখতে পাবেন যে, তিনি দোষগুলো বড় করে দেখান এবং ভাল দিকগুলো গোপন করে রাখেন; আবার কখনও কখনও পুত্রবধুর উপর মিথ্যা অপবাদ দেন; আবার কখনও কখনও তার নির্দোষ কর্মকাণ্ড ও অতীতের কথাবার্তার ব্যাখ্যায় বিভিন্ন জায়গায় চলে যান। অতএব, হে প্রিয় মা! হে— যিনি আপন ছেলেকে ভালবাসেন এবং তার সৌভাগ্য কামনা করেন! আপনি ধ্বংস ও সর্বনাশের কুঠার হবেন না; আপনার ঈর্ষাকে জ্বলন্ত আগুনে পরিণত করবেন না, যা পরিবারের পরিবেশকে জ্বালিয়ে দেয়; আর এমন আন্দাজ ও অনুমানের অনুসরণ করবেন না, যা আপনার কল্পনার তৈরি; এমন করলে আপনি পরিষ্কার বিষয়কে ঘোলা করে ফেলবেন এবং কঠিন দুশ্চিন্তা ও সংশয়ের মধ্যে পড়ে যাবেন। সুতরাং আপনার পুত্রবধুর সাথে আপনার সম্পর্ককে দা- কুমড়ার মত শত্রুতার সম্পর্ক বানাবেন না; বরং আপনি তার মা হয়ে যান, সে আপনার মেয়ে হয়ে যাবে। অতএব, আপনার পক্ষে সুন্দর হবে— আপনি তাকে ভালোবাসবেন এবং তার থেকে কোনো (মন্দ) কিছু প্রকাশ হয়ে গেলে দেখেও না দেখার ভান করবেন; আর যখন কোনো ত্রুটি দেখবেন, তখন নরম ও কোমল ভাষায় তাকে উপদেশ দিতে পদক্ষেপ নিন; তখন সেও সৌভাগ্যবান হবে এবং আপনিও সৌভাগ্যবান হবেন। বরং আপনার জন্য আরও ভালো হবে— উপহার, উপঢৌকন ইত্যাদির মাধ্যমে আপনি তার নিকট প্রিয় হয়ে উঠবেন; আর আপনি আপনার বড় মন, উদার স্নেহ-মমতা, নির্ভেজাল দো‘আ ও বাস্তবসম্মত প্রশংসা নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যান; আর আল্লাহ তা‘আলাও তাঁর তত্ত্বাবধানের দ্বারা আপনাকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবেন এবং তাঁর দয়া ও স্নেহ দ্বারা আপনাকে সাহায্য করবেন। * * * সদ্ব্যবহারের কিছু নমুনা কাহিনী পূর্বে আমরা পিতামাতার আনুগত্য ও তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহারের বিষয়ে আলোচনা করেছি; আরও আলোচনা করেছি এমন সব আদব বা শিষ্টাচার সম্পর্কে, আমাদের জন্য তাঁদের সাথে যেসব আদব রক্ষা করা যথাযথ ও একান্তভাবে কাম্য; আরও আলোচনা করেছি এমন সব উপায়, যেগুলো পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারে সহায়তা করে। সুতরাং এসব আদব রক্ষা করাটা আমাদের জন্য কতই না উপযুক্ত! আর ঐসব উপায় গ্রহণ করাটা আমাদের পক্ষে কতটাই না যথাযথ! ফলে আমরা অবশ্যই ঐসব পুণ্যবান ও ভাল মানুষের কাতারে শামিল হতে পারব, যাঁরা যখন তাঁদের রবকে ডাকে, তখন তিনি তাঁদের ডাকে সাড়া দেন এবং তাঁরা যখন তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তখন তিনি তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেন। অতঃপর এ ব্যাপারে নবী ও রাসূলগণের মধ্যে এবং আমাদের আজকের দিন পর্যন্ত তাঁদেরকে যারা যথাযথভাবে অনুসরণ করেছে তাদের মধ্যে আমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ; কেননা, তাঁরা পিতামাতার আনুগত্য ও তাঁদের সাথে সদ্ব্যবহার করার প্রশ্নে অতি চমৎকার দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন; ফলে আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের মর্যাদাকে ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতে সমুন্নত করেছেন এবং স্থায়ীভাবে তাঁদের স্মরণকে উন্নত করে রেখেছেন। আপনার উদ্দেশ্যে নিম্নে এমন কতগুলো সুরভিত নমুনা বা দৃষ্টান্ত ও চমৎকার কাহিনী পেশ করা হল, যা তার সুগন্ধ ছড়াবে যুগ যুগ ধরে ঐসব পুণ্যবান ভাল মানুষের জন্য, যাদেরকে তাদের পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার তাওফীক দেওয়া হয়েছে; আশা করা যায় এসব দৃষ্টান্ত ও কাহিনী আমাদের প্রাণে উত্তম ও কল্যাণকর দিকগুলো আন্দোলিত করবে এবং সৎকর্ম ও (পিতামাতার) আনুগত্যের দিকে ধাবিত করবে। • নবীগণ কর্তৃক পিতামাতার প্রতি আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের কিছু নমুনা: ১. এই তো আল্লাহর নবী নূহ ‘আলাইহিস্ সালাম, তিনি তাঁর পিতামাতার সাথে যে সদ্ব্যবহার করেছেন, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য তার একটা নমুনা উপস্থাপন করেছেন; যেমন তিনি তাঁর পিতামাতার জন্য দো‘আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর (নূহ আ. এর) পক্ষ থেকে বলেছেন: ﴿ ﺭَّﺏِّ ﭐﻏۡﻔِﺮۡ ﻟِﻲ ﻭَﻟِﻮَٰﻟِﺪَﻱَّ ﻭَﻟِﻤَﻦ ﺩَﺧَﻞَ ﺑَﻴۡﺘِﻲَ ﻣُﺆۡﻣِﻨٗﺎ ﻭَﻟِﻠۡﻤُﺆۡﻣِﻨِﻴﻦَ ﻭَﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖِۖ ﴾ ‏[ﻧﻮﺡ : ٢٨‏] “হে আমার রব! আপনি ক্ষমা করুন আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং যারা মুমিন হয়ে আমার ঘরে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে।”[31] ২. আর তিনি হলেন একত্ববাদীদের নেতা ইবরাহীম খলীল ‘আলাইহিস্ সালাম, যিনি তাঁর পিতাকে নির্মল নম্র ভাষায় ও দরদ ভরা কণ্ঠে সম্বোধন করেছেন তার হোদায়েত ও মুক্তির আশা নিয়ে এবং তার পথভ্রষ্টতা ও ধ্বংসের আশঙ্কা নিয়ে; সুতরাং তিনি বলেন, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পক্ষ থেকে পবিত্র কুরআনে জানিয়ে দিয়েছেন; আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﭐﺫۡﻛُﺮۡ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﻜِﺘَٰﺐِ ﺇِﺑۡﺮَٰﻫِﻴﻢَۚ ﺇِﻧَّﻪُۥ ﻛَﺎﻥَ ﺻِﺪِّﻳﻘٗﺎ ﻧَّﺒِﻴًّﺎ ٤١ ﺇِﺫۡ ﻗَﺎﻝَ ﻟِﺄَﺑِﻴﻪِ ﻳَٰٓﺄَﺑَﺖِ ﻟِﻢَ ﺗَﻌۡﺒُﺪُ ﻣَﺎ ﻟَﺎ ﻳَﺴۡﻤَﻊُ ﻭَﻟَﺎ ﻳُﺒۡﺼِﺮُ ﻭَﻟَﺎ ﻳُﻐۡﻨِﻲ ﻋَﻨﻚَ ﺷَﻴۡٔٗﺎ ٤٢ ﻳَٰٓﺄَﺑَﺖِ ﺇِﻧِّﻲ ﻗَﺪۡ ﺟَﺎٓﺀَﻧِﻲ ﻣِﻦَ ﭐﻟۡﻌِﻠۡﻢِ ﻣَﺎ ﻟَﻢۡ ﻳَﺄۡﺗِﻚَ ﻓَﭑﺗَّﺒِﻌۡﻨِﻲٓ ﺃَﻫۡﺪِﻙَ ﺻِﺮَٰﻃٗﺎ ﺳَﻮِﻳّٗﺎ ٤٣ ﻳَٰٓﺄَﺑَﺖِ ﻟَﺎ ﺗَﻌۡﺒُﺪِ ﭐﻟﺸَّﻴۡﻄَٰﻦَۖ ﺇِﻥَّ ﭐﻟﺸَّﻴۡﻄَٰﻦَ ﻛَﺎﻥَ ﻟِﻠﺮَّﺣۡﻤَٰﻦِ ﻋَﺼِﻴّٗﺎ ٤٤ ﻳَٰٓﺄَﺑَﺖِ ﺇِﻧِّﻲٓ ﺃَﺧَﺎﻑُ ﺃَﻥ ﻳَﻤَﺴَّﻚَ ﻋَﺬَﺍﺏٞ ﻣِّﻦَ ﭐﻟﺮَّﺣۡﻤَٰﻦِ ﻓَﺘَﻜُﻮﻥَ ﻟِﻠﺸَّﻴۡﻄَٰﻦِ ﻭَﻟِﻴّٗﺎ ٤٥ ﴾ ‏[ ﻣﺮﻳﻢ : ٤١، ٤٥‏] “আর স্মরণ করুন এ কিতাবে ইবরাহীমকে; তিনি তো ছিলেন এক সত্যনিষ্ঠ, নবী। যখন তিনি তার পিতাকে বললেন, ‘হে আমার পিতা! আপনি তার ‘ইবাদাত করেন কেন যে শুনে না, দেখে না এবং আপনার কোনো কাজেই আসে না?’ ‘হে আমার পিতা! আমার কাছে তো এসেছে জ্ঞান যা আপনার কাছে আসেনি; কাজেই আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সঠিক পথ দেখাব। ‘হে আমার পিতা! শয়তানের ‘ইবাদাত করবেন না। শয়তান তো দয়াময়ের অবাধ্য। ‘হে আমার পিতা! নিশ্চয় আমি আশংকা করছি যে, আপনাকে দয়াময়ের শাস্তি স্পর্শ করবে, তখন আপনি হয়ে পড়বেন শয়তানের বন্ধু ।”[32] তিনি এসব প্রভাব বিস্তারকারী কথামালা ও হৃদয়গ্রাহী বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁর পিতাকে সম্বোধন করে কথা বলেছেন, যা হৃদয়ের গভীর পর্যন্ত পৌঁছায়। এ কথাগুলো যদি তার হৃদয়কে কঠোর, শক্ত, আবরণযুক্ত ও কৃষ্ণ কালো অবস্থায় না পেত, তাহলে তা তাকে প্রভাবিত করত এবং তা তার হেদায়েত ও মুক্তির অন্যতম কারণ হতো। ৩. এই তো ইসমা‘ঈল ইবন ইবরাহীম ‘আলাইহিমাস্ সালাম, যাঁকে দিয়ে মানবতার ইতিহাসে পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের ভয়ঙ্কর লোমহর্ষক দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়; আর এটা হল— যখন তাঁকে উদ্দেশ্য করে তাঁর পিতা বললেন: ﴿ ﻳَٰﺒُﻨَﻲَّ ﺇِﻧِّﻲٓ ﺃَﺭَﻯٰ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﻤَﻨَﺎﻡِ ﺃَﻧِّﻲٓ ﺃَﺫۡﺑَﺤُﻚَ ﻓَﭑﻧﻈُﺮۡ ﻣَﺎﺫَﺍ ﺗَﺮَﻯٰۚ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺼﺎﻓﺎﺕ : ١٠٢ ‏] ‘হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ্ করছি, এখন তোমার অভিমত কী বল?’।”[33] অতঃপর এই সৎ ছেলেটি কী প্রতিউত্তর করেছিলেন? তিনি কি আমতা আমতা করেছিলেন, নাকি গড়িমসি করেছিলেন? তিনি কি দ্বিধাদ্বন্দ্ব প্রকাশ করেছিলেন, নাকি বিলম্ব করেছিলেন? না, বরং তিনি বলেছেন, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পক্ষ থেকে পবিত্র কুরআনে জানিয়ে দিয়েছেন; তিনি বলেন: ﴿ ﻳَٰٓﺄَﺑَﺖِ ﭐﻓۡﻌَﻞۡ ﻣَﺎ ﺗُﺆۡﻣَﺮُۖ ﺳَﺘَﺠِﺪُﻧِﻲٓ ﺇِﻥ ﺷَﺎٓﺀَ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﻣِﻦَ ﭐﻟﺼَّٰﺒِﺮِﻳﻦَ ١٠٢ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺼﺎﻓﺎﺕ : ١٠٢‏] “হে আমার পিতা! আপনি যা আদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন তা-ই করুন। আল্লাহর ইচ্ছায় আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।”[34] বর্ণিত আছে যে, ইবরাহীম ‘আলাইহিস্ সালাম যখন তাঁর স্বপ্নের মধ্যে দেখা বিষয়ে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করলেন, তখন তিনি তাঁর ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন: হে আমার প্রিয় বৎস! তুমি রশি ও ছুরি নাও এবং চল ঐ পাহাড়ের গিরিপথে, আমরা সেখানে কাঠ সংগ্রহ করব; অতঃপর তিনি যখন তাঁকে নিয়ে ‘ছাবীর’ নামক গিরিপথে নির্জন এলাকায় পৌঁছলেন, তখন তিনি স্বপ্নে আদিষ্ট হওয়ার বিষয়ে তাঁকে অবহিত করলেন; অতঃপর যখন তিনি তাঁকে যবেহ্ করতে চাইলেন, তখন তিনি (ইসমা‘ঈল আ.) তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললেন: হে আমার আব্বু! আমাকে শক্ত করে বেঁধে ফেলুন যাতে আমি আপনার কাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারি এবং আমার থেকে আপনি আপনার কাপড় গুটিয়ে নিন, যাতে তাতে কোনো রকম রক্ত লেগে না যায়, অতঃপর তা আমার মা তা দেখে ফেলে; আর আপনার ছুরিতে ভালভাবে ধার দিয়ে নিন এবং আমার গলায় দ্রুত ছুরি চালিয়ে দিন, যাতে তা আমার জন্য স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়; আর যখন আপনি আমার মায়ের নিকট ফিরে যাবেন, তখন আমার পক্ষ থেকে তাঁকে সালাম দিবেন। ইবরাহীম ‘আলাইহিস্ সালাম বললেন: হে আমার প্রিয় বৎস! তুমি কত উত্তম সাহায্যকারী! অতঃপর তিনি তাঁর নিকট এগিয়ে গেলেন এমতাবস্থায় যে, তাঁরা দু’জনই কাঁদছেন; অতঃপর তিনি তাঁর গলার উপরে ছুরি চালালেন, কিন্তু ছুরি কাটতে পারল না; অতঃপর তিনি ছুরিতে দুইবার বা তিনবার পাথর দ্বারা ধার দিলেন, কিন্তু তার পরেও তা কাটতে ব্যর্থ হল; ঠিক এই মুহূর্তে ছেলে বলল: হে আমার আব্বাজান! আপনি আমাকে উপুড় করে শুইয়ে দিন; কেননা, আপনি যদি আমার চেহারের দিকে নজর করেন, তাহলে আমার প্রতি আপনার মায়া হবে এবং আপনাকে এমন মায়া- মমতায় পেয়ে বসবে, যা আপনার ও আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশ পালনের মাঝে অন্তরায় সৃষ্টি করবে; আর আমিও ছুরির দিকে তাকাতে পারব না, যার ফলে আমি অস্থিরতা প্রকাশ করব; অতঃপর ইবরাহীম ‘আলাইহিস্ সালাম তাই করলেন এবং তাঁর ঘাড়ে ছুরি চালিয়ে দিলেন, কিন্তু ছুরি ফিরে আসল এবং তাঁকে আহ্বান করা হল এই বলে: ﴿ ﻳَٰٓﺈِﺑۡﺮَٰﻫِﻴﻢُ ١٠٤ ﻗَﺪۡ ﺻَﺪَّﻗۡﺖَ ﭐﻟﺮُّﺀۡﻳَﺎٓۚ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺼﺎﻓﺎﺕ : ١٠٤، ١٠٥ ‏] “হে ইবরাহীম! আপনি তো স্বপ্নের আদেশ সত্যই পালন করলেন!”[35] ৪. আর তিনিই তো ‘ঈসা ইবন মারইয়াম ‘আলাইহিমাস্ সালাম, যাঁর ব্যাপারে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সুরভিত প্রশংসা ও উচ্চ মর্যাদার কথা এসেছে, আর তিনি তো দোলনায় থাকা অবস্থায় তাঁর মায়ের অনুগত ছিলেন; আর এটাই তাঁর প্রতিপালক আল্লাহ তা‘আলার প্রতি তাঁর দাসত্বের কথা ইঙ্গিত করে; আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর পক্ষ থেকে পবিত্র কুরআনে জানিয়ে দিয়েছেন; তিনি বলেন: ﴿ ﻭَﺑَﺮَّۢﺍ ﺑِﻮَٰﻟِﺪَﺗِﻲ ﻭَﻟَﻢۡ ﻳَﺠۡﻌَﻠۡﻨِﻲ ﺟَﺒَّﺎﺭٗﺍ ﺷَﻘِﻴّٗﺎ ٣٢ ﴾ ‏[ ﻣﺮﻳﻢ : ٣٢‏] “আর তিনি আমাকে আমার মায়ের প্রতি অনুগত করেছেন এবং আমাকে তিনি করেননি উদ্ধত, হতভাগ্য।”[36] • পূর্ববর্তী কালের সৎ ব্যক্তিগণের পিতামাতার প্রতি আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের কিছু নমুনা: আমরা যখন পূর্ববর্তী কালের সৎ ব্যক্তিগণের জীবন-বৃত্তান্তের দিকে নজর দিব, তখন আমরা এমন অনেক উজ্জ্বল পৃষ্ঠা দেখতে পাব, যেগুলো প্রমাণ করে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের ব্যপারে তারা কঠোরভাবে গুরুত্বারোপ করতেন; এসব ঘটনা প্রবাহের মধ্য থেকে কয়েকটি নিম্নরূপ: ১. উম্মু হানী বিনতে আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা’র মাওলা (আযাদকৃত গোলাম) আবূ মুর্রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত: ‏« ﺃﻧﻪ ﺭﻛﺐ ﻣﻊ ﺃﺑﻰ ﻫﺮﻳﺮﺓ ﺇﻟﻰ ﺃﺭﺿﻪ ﺑﺎﻟﻌﻘﻴﻖ ، ﻓﺈﺫﺍ ﺩﺧﻞ ﺃﺭﺿﻪ ﺻﺎﺡ ﺑﺄﻋﻠﻰ ﺻﻮﺗﻪ : ﻋﻠﻴﻚ ﺍﻟﺴﻼﻡ ﻭﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺑﺮﻛﺎﺗﻪ ﻳﺎ ﺃﻣﺎﻩ . ﺗﻘﻮﻝ : ﻭﻋﻠﻴﻚ ﺍﻟﺴﻼﻡ ﻭﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﺑﺮﻛﺎﺗﻪ . ﻳﻘﻮﻝ : ﺭﺣﻤﻚ ﺍﻟﻠﻪ ﻛﻤﺎ ﺭﺑﻴﺘﻨﻰ ﺻﻐﻴﺮﺍ . ﻓﺘﻘﻮﻝ : ﻳﺎ ﺑﻨﻰ ! ﻭﺃﻧﺖ ﻓﺠﺰﺍﻙ ﺍﻟﻠﻪ ﺧﻴﺮﺍ ﻭﺭﺿﻰ ﻋﻨﻚ ﻛﻤﺎ ﺑﺮﺭﺗﻨﻰ ﻛﺒﻴﺮﺍ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ‏) . “একদা তিনি আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র সাথে বাহনে করে তাঁর ভূমি ‘আকীকের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তারপর যখন তিনি তাঁর ভূমিতে প্রবেশ করলেন, তখন উচ্চস্বরে আওয়াজ দিয়ে বললেন: হে মা! আপনার উপর শান্তি এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হউক; তখন প্রতিত্তুরে তাঁর মা বললেন: তোমার উপরও শান্তি এবং আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হউক। এবার তিনি বললেন: আপনার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা ঠিক তেমনিভাবে রহম করুন, যেমনিভাবে আপনি ছোটকালে আমাকে লালন-পালন করেছেন; অতঃপর মাতা বললেন: হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহ তা‘আলা তোমাকেও উত্তম পুরস্কার দান করুক এবং তোমার প্রতি তিনি তেমনি সন্তুষ্ট থাকুক, যেমন সদ্ব্যবহার তুমি আমার বৃদ্ধকালে আমার প্রতি করেছ।”[37] ২. আর এই তো আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা’র কথা, জনৈক বেদুঈন তাঁর সাথে মক্কার পথে মিলিত হল। আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা তাকে সালাম দিলেন এবং যে গাধার উপর তিনি সওয়ার ছিলেন, তাকেও তাতে উঠিয়ে নিলেন; আর তাকে তাঁর মাথার পাগড়িটি দিয়ে দিলেন। ইবনু দিনার রহ. বলেন: আমরা তাঁকে উদ্দেশ্য করে বললাম: আল্লাহ আপনাকে কল্যাণ দান করুন, নিশ্চয় তারা বেদুঈন এবং তারা অল্প কিছু পেলেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। অতঃপর আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন: ‏« ﺇِﻥَّ ﺃَﺑَﺎ ﻫَﺬَﺍ ﻛَﺎﻥَ ﻭُﺩًّﺍ ﻟِﻌُﻤَﺮَ ﺑْﻦِ ﺍﻟْﺨَﻄَّﺎﺏِ ﻭَﺇِﻧِّﻰ ﺳَﻤِﻌْﺖُ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ – ﻳَﻘُﻮﻝُ : ‏« ﺇِﻥَّ ﺃَﺑَﺮَّ ﺍﻟْﺒِﺮِّ ﺻِﻠَﺔُ ﺍﻟْﻮَﻟَﺪِ ﺃَﻫْﻞَ ﻭُﺩِّ ﺃَﺑِﻴﻪِ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ ﻭ ﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ ‏) . “এই ব্যক্তির পিতা ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র বন্ধু ছিলেন; আর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “সৎকাজগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় সৎকাজ হলো পিতার বন্ধুদের পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।”[38] ৩. মুমিন জননী ‘আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‏« ﺩَﺧَﻠْﺖُ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔَ ، ﻓَﺴَﻤِﻌْﺖُ ﻓِﻴﻬَﺎ ﻗِﺮَﺍﺀَﺓً ، ﻓَﻘُﻠْﺖُ : ﻣَﻦْ ﻫﺬَﺍ ؟ ﻗَﺎﻟُﻮﺍ : ﺣَﺎﺭﺛَﺔُ ﺑْﻦُ ﺍﻟﻨُّﻌْﻤَﺎﻥِ ، ﻛَﺬَﻟِﻜُﻢُ ﺍﻟْﺒِﺮُّ ، ﻛَﺬَﻟِﻜُﻢُ ﺍﻟْﺒِﺮُّ ، ﻭَﻛَﺎﻥَ ﺃَﺑَﺮَّ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﺑﺄُﻣِّﻪِ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺣﻤﺪ ﻭ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﺮﺯﺍﻕ ‏) . “আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম, তারপর সেখানে আমি ক্বিরাত (আবৃতি) শুনতে পেলাম, অতঃপর আমি জিজ্ঞাসা করলাম: এই ব্যক্তি কে? তারা বলল: হারেছা ইবন নু‘মান; ভালকাজ এ রকমই! ভালকাজ এ রকমই! আর মানুষের মাঝে সে ছিল তার মাতার সাথে সর্বোত্তম সদ্ব্যবহারকারী ব্যক্তি।”[39] ৪. আবূ আবদির রাহমান রহ. থেকে ঘটনা বর্ণিত, তিনি বলেন: “কাহমাস ইবন হাসান ঘরের মধ্যে একটি বিচ্ছু দেখতে পেলেন; তিনি এটাকে হত্যা করতে অথবা ধরতে চাইল, কিন্তু এটা তাকে পিছনে ফেলে দিয়ে এক গর্তের মধ্যে প্রবেশ করল; অতঃপর তিনি তাকে ধরার জন্য গর্তের মধ্যে তার হাত ঢুকিয়ে দিলেন, তারপর বিচ্ছুটি তাকে দংশন করতে শুরু করল; অতঃপর তাকে বলা হল: তুমি কেন এটা করতে গেল? জবাবে সে বলল: আমি আশঙ্কা করেছি যে, গর্ত থেকে বিচ্ছুটি বের হবে, তারপর আমার মায়ের নিকট গিয়ে তাঁকে দংশন করবে।” [40] ৫. আর এই তো আবূল হাসান ইবন আলী ইবন হুসাইন ইবন আলী ইবন আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র কথা, আর তিনি যাইনুল ‘আবেদীন নামেও পরিচিত; তিনি তাবে‘ঈদের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, তিনি তাঁর মায়ের সাথে বেশি বেশি ভাল ব্যবহার করতেন, এমনকি তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা হত: নিশ্চয় আপনি আপনার মায়ের সাথে সর্বোত্তম সদ্ব্যবহারকারী মানুষ; আর আমরা আপনাকে আপনার মায়ের সাথে খেতে দেখি না; তখন তিনি বলেন: “আমি আশঙ্কা করি যে, আমার হাত এমন খাদ্য বস্তুর দিকে চলে যাবে, যার দিকে পূর্ব থেকেই তাঁর (আমার মায়ের) পছন্দের চোখ পড়ে আছে, ফলে আমি তাঁর অবাধ্য সন্তানে পরিণত হব।” [41] ৬. হিশাম ইবন হাস্সান বলেন: “হাফসা বিনতে সিরীন আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: মুহাম্মাদ ইবন সিরীনের মা ছিলেন হিজাযী নারী; বিভিন্ন রঙ তাকে মুগ্ধ করত; আর মুহাম্মাদ যখন তার জন্য কাপড় ক্রয় করতেন, তখন তিনি যথাসম্ভব উজ্জ্বল রঙের কাপড় ক্রয় করতেন; অতঃপর যখন ঈদ আসত, তখন তার কাপড়গুলো রঙ করে দিতেন; আর আমি কখনও তাকে তার মায়ের সাথে উচ্চ আওয়াজে কথা বলতে দেখিনি, তিনি যখন তার সাথে কথা বলতেন, তখন তিনি ঐ ব্যক্তির ন্যায় কথা বলতেন, যার কথা কান পেতে শুনতে হয়।” [42] সিরীনের বংশের কেউ কেউ বলেন: “আমি কখনও মুহাম্মাদ ইবন সিরীনকে তার মায়ের সাথে বিনম্র না হয়ে কথা বলতে দেখিনি।” ইবনু ‘আউন থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: “মুহাম্মাদ ইবন সিরীন যখন তাঁর মায়ের কাছে অবস্থান করতেন, তখন যদি কোনো ব্যক্তি তাকে দেখতেন, তখন তার নিকটে তার নিম্নস্বরে কথা বলার কারণে তিনি ধারণা করতেন যে, তিনি মনে হয় অসুস্থ।” [43] ইবনু ‘আউন আরও বলেন: “এক ব্যক্তি মুহাম্মাদ ইবন সিরীনের নিকট প্রবেশ করলেন, তখন তিনি তাঁর মায়ের নিকট অবস্থান করছেন; অতঃপর সেই লোকটি বলল: মুহাম্মাদের একি অবস্থা? তিনি কোনো কষ্টে আছেন নাকি? উপস্থিত লোকজন বলল: না; বরং তিনি তাঁর মায়ের নিকট এভাবেই থাকেন।”[44] ৭. জা‘ফর ইবন সুলাইমান রহ. মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির থেকে বর্ণনা করেন যে, “তিনি তার গাল (গণ্ডদেশ) যমীনের উপর রাখতেন, অতঃপর তিনি তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলতেন: আপনি উঠুন, আপনার পা আমার গালের উপর রাখুন।” [45] ৮. ইবনু ‘আউন আল-মুযানী রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “তাঁর মা তাঁকে ডাকলেন, অতঃপর তিনি তার ডাকে সাড়া দিলেন, কিন্তু এতে তাঁর মায়ের আওয়াজের চেয়ে তাঁর গলার আওয়াজ উঁচু হয়ে গেল; ফলে তিনি দু’টি গোলাম আযাদ (মুক্ত) করে দিলেন।” [46] ৯. আর ওমর ইবন যরকে বলা হল: “আপনার প্রতি আপনার ছেলের আনুগত্য বা সদ্ব্যবহারের অবস্থাটা কেমন ছিল? তখন তিনি বলেন: আমি দিনের বেলায় হাঁটলে সে আমার পিছনে পিছনে হাঁটত; আর রাতের বেলায় হাঁটলে সে আমার সামনে সামনে হাঁটত; আর আমি নিচে থাকলে সে কখনও ছাদের উপরে উঠত না।”[47] ১০. সালেহ আল-‘আব্বাসী একবার খলীফা আল-মানসুরের মাজলিসে হাযির হলেন এবং তাকে হাদিস শুনাচ্ছিলেন, আর তিনি তার কথায় বেশি বেশি বলতে লাগলেন: আমার পিতা, তাঁর প্রতি আল্লাহ রহম করুন ( ﺃﺑﻲ ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ); তখন রবী‘ তাকে উদ্দেশ্য করে বলল: তুমি আমীরুল মুমিনীনের সামনে তোমার বাপের ব্যাপারে এত বেশি বেশি ‘রহমত’-এর বিষয়টি প্রকাশ করো না। তখন তিনি তাকে বললেন: আমি তোমাকে তিরস্কার করব না; কারণ, তুমি তো পিতার মজা উপভোগ করনি। অতঃপর খলিফা আল-মানসুর মুসকি হাসলেন এবং বললেন: যে ব্যক্তি বনু হাশিমের মুখোমুখি হবে, এটাই তার পুরস্কার।[48] ১১. আর পিতামাতার প্রতি অনুগত ও সদ্ব্যবহারকারীগণের অন্যতম একজন হলেন মুহাদ্দিস বুন্দার; তাঁর ব্যাপারে যাহাবী রহ. বলেন: “তিনি বসরার হাদিস সংকলন করেছেন, কিন্তু তিনি তাঁর মায়ের প্রতি অনুগত থাকার কারণে কোনো সফর করেন নি।”[49] আবদুল্লাহ ইবন জা‘ফর ইবন খাকান আল- মাররুযী বলেন: “আমি বুন্দারকে বলতে শুনেছি: আমি জ্ঞান অনুসন্ধানে বের হতে বা সফর করার ইচ্ছা করলাম, কিন্তু আমার মা আমাকে নিষেধ করলেন, আমি তার আনুগত্য করলাম, ফলে সে ব্যাপারে আমার বরকত হয়েছে।” [50] ১২. আর আসমা‘য়ী বলেন: আরবের এক ব্যক্তি আমার নিকট বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি সবচেয়ে অবাধ্য মানুষ ও সবচেয়ে অনুগত মানুষের সন্ধানে বের হলাম; অতঃপর আমি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম, শেষ পর্যন্ত আমি দ্বিপ্রহরে প্রচণ্ড গরমের সময় এক বৃদ্ধের দেখা পেলাম, পানি উঠানোর জন্য যার গলায় রশি দিয়ে বালতি বেঁধে দেওয়া হয়েছে , যা টেনে উঠানো উটের পক্ষেও সম্ভব নয়, আর তার পিছনে চামরার পেঁচানো রশি (চাবুক) হাতে এক যুবক তাকে প্রহার করছে; আর সে এ রশি দ্বারা পিটিয়ে তার পিঠ রক্তাক্ত করে ফেলেছে। অতঃপর আমি বললাম: তুমি কি এই দুর্বল বৃদ্ধের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে না? তার ঘাড়ে রশি লাগিয়ে দেওয়াটা কি যথেষ্ট হয়নি যে, তুমি তাকে আবার প্রহার করছ? তখন সে বলে: তাতো আমি আমার পিতার সাথে এই ব্যবহার করছি (তাতে তোমার কি); তখন আমি বললাম: তাহলে তো আল্লাহ তোমাকে ভালো পুরস্কার দিবেন না। তখন সে বলল: চুপ কর, সে তো তার পিতার সাথে এরূপ ব্যবহার করত; আর তার পিতাও তার দাদার সাথে অনুরূপ ব্যবহার করত; তখন আমি বললাম: এই হল সবচেয়ে অবাধ্য মানুষ। অতঃপর আমি ঘুরতে লাগলাম, শেষ পর্যন্ত দেখা পেলাম এক যুবকের, যার ঘাড়ে একটি ঝুড়ির মধ্যে রয়েছে এক বৃদ্ধলোক, মনে হচ্ছিল যেন একটি মুরগীর বাচ্চা; তারপর সে সব সময় তাকে তার সামনে রাখত এবং তাকে খাওয়াতো যেমনিভাবে মুরগীর বাচ্চাকে খাওয়ানো হয়; তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম: ওনি কে? সে বলল: আমার আব্বা, বয়সের ভারে তার বুদ্ধি লোপ পেয়েছে, আমি তাকে দেখাশুনার দায়িত্ব নিয়েছি; তখন আমি বললাম: এই হল আরবের সবচেয়ে অনুগত ও ভাল মানুষ। [51] ১৩. ত্বলক ইবন হাবীব আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও আলেমগণের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন; তিনি তাঁর মায়ের মাথায় চুম্বন করতেন; আর তাঁর মা ঘরের নীচে অবস্থান করা অবস্থায় তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার জন্য তিনি কখনও ঘরের ছাদের উপর হাঁটতেন না। [52] ১৪. ‘আমের ইবন আবদিল্লাহ ইবন যুবায়ের রহ. বলেন: “আমার পিতা মারা গেছেন, আর আমি পরিপূর্ণ এক বছর আল্লাহ তা‘আলার নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছি।” [53] ‏« ﺁﺧﺮ ﺩﻋﻮﺍﻧﺎ ﺃﻥ ﺍﻟﺤﻤﺪ ﻟﻠﻪ ﺭﺏ ﺍﻟﻌﺎﻟﻤﻴﻦ , ﻭ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻋﻠﻰ ﻧﺒﻴﻨﺎ ﻣﺤﻤﺪ ﻭ ﻋﻠﻰ ﺁﻟﻪ ﻭ ﺻﺤﺒﻪ ﺃﺟﻤﻌﻴﻦ ‏» . (আর আমাদের শেষ ধ্বনি হবে: ‘সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর প্রাপ্য’; আর আল্লাহ তা‘আলা সালাত ও সালাম পেশ করুন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সকল সঙ্গী-সাথীর উপর)। * * * সূচীপত্র – ভূমিকা – অবাধ্যতার সংজ্ঞা। – পিতামাতার অবাধ্যতার বাহ্যিক রূপ-প্রকৃতি। – পিতামাতার অবাধ্যতার ৩৩টি বাহ্যিক রূপ। – অবাধ্যতার কিছু নমুনা কাহিনী। – অবাধ্যতার ১২টি কারণ। – প্রতিকারের উপায়। – পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহারের পরিচয়। – পিতামাতার সাথে আচার- আচরণের ২৬টি লক্ষণীয় দিক। – সদ্ব্যবহারে সহায়ক ১২টি বিষয় বা কর্মকাণ্ড। – স্ত্রী ও পিতামাতার মাঝে সমন্বয়। প্রথমত: বিবাহিত ছেলে কর্তৃক তার স্ত্রী ও পিতামাতার মাঝে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে ভূমিকা। দ্বিতীয়ত: পুত্রবধুর ভূমিকা। তৃতীয়ত: স্বামীর মায়ের (শাশুড়ীর) ভূমিকা। – সদ্ব্যবহারের কিছু নমুনা কাহিনী। – নবীগণ কর্তৃক পিতামাতার প্রতি আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের কিছু নমুনা। – পূর্ববর্তী কালের সৎ ব্যক্তিগণের পিতামাতার প্রতি আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের কিছু নমুনা। * * * [1] সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬ [2] সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৫১ [3] সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩ – ২৪ [4] সূরা লোকমান, আয়াত: ১৪ [5] বুখারী, হাদিস নং- ৫০৪ ও ৬৫২৫; মুসলিম, হাদিস নং- ২৬৪ [6] সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩ [7] বুখারী, হাদিস নং- ৬২৯৮ [8] লিসানুল আরব: ১০/২৫৬ [9] লিসানুল আরব: ১০/২৫৭ [10] দেখুন: ড. মুস্তফা আস-সাবা‘য়ী, ‘আখলাকুনা আল-ইজতিমা‘য়ীয়্যাহ’ ( ﺃﺧﻼﻗﻨﺎ ﺍﻻﺟﺘﻤﺎﻋﻴﺔ), পৃ. ১৬৬; আবদুর রউফ আল-হানাবী, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইন’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ), পৃ. ১৪৩; হাসান আইয়ূব, ‘আস-সুলুকুল ইজতিমা‘য়ী’ ( ﺍﻟﺴﻠﻮﻙ ﺍﻻﺟﺘﻤﺎﻋﻲ ), পৃ. ২৫৮ – ২৫৯; উম্মু আবদিল কারীম, ‘কুর্রাতুল ‘আইনাইন ফী ফাদায়েলি বির্রিল ওয়ালিদাইন’ ( ﻗﺮﺓ ﺍﻟﻌﻴﻨﻴﻦ ﻓﻲ ﻓﻀﺎﺋﻞ ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ); সা‘আদ বিনতে মুহাম্মাদ ফারাজ, ‘বিল ওয়ালিদাইনে ইহসানা’ ( ﺑﺎﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ﺇﺣﺴﺎﻧﺎ ), পৃ. ৪৪ – ৪৮; নিযাম সাকাজিহা, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইনে ফিল কুরআনিল কারীমে ওয়াস সুন্নাহ আস-সহীহা’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ﻓﻲ ﺍﻟﻘﺮﺁﻥ ﺍﻟﻜﺮﻳﻢ ﻭﺍﻟﺴﻨﺔ ﺍﻟﺼﺤﻴﺤﺔ ), পৃ. ৩৫ – ৪১ ও ৬৩ – ৬৫; ড. আবদুল্লাহ আত-ত্বাইয়ার, ‘ফয়দুর রাহীম আর-রাহমান’ ( ﻓﻴﺾ ﺍﻟﺮﺣﻴﻢ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ), পৃ. ৯৬; আহমাদ ‘ঈসা ‘আশুরা, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইনে ওয়া হুকুকুল আবায়ে ওয়াল আবনায়ে ওয়াল আরহাম’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ﻭ ﺣﻘﻮﻕ ﺍﻵﺑﺎﺀ ﻭ ﺍﻷﺑﻨﺎﺀ ﻭ ﺍﻷﺭﺣﺎﻡ ), পৃ. ৩৩ – ৪৫; ইবরাহীম আল-হাযেমী, ‘আল-ই‘লাম বেবির্রিল ওয়ালিদাইনে ওয়া সিলাতিল আরহাম’ ( ﺍﻹﻋﻼﻡ ﺑﺒﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ﻭ ﺻﻠﺔ ﺍﻷﺭﺣﺎﻡ ), পৃ. ৩৫ – ৪১; ড. মুহাম্মাদ ইবন আহমাদ আস-সালেহ, ‘আত-তাকাফুলুল ইজতিমা‘য়ী ফিশ শারী‘য়াতিল ইসলামিয়্যা’ ( ﺍﻟﺘﻜﺎﻓﻞ ﺍﻻﺟﺘﻤﺎﻋﻲ ﻓﻲ ﺍﻟﺸﺮﻳﻌﺔ ﺍﻹﺳﻼﻣﻴﺔ ), পৃ. ৯৮ – ১০৫ [11] সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩ [12] সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩ [13] যাহাবী, ‘সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ ( ﺳﻴﺮ ﺃﻋﻼﻡ ﺍﻟﻨﺒﻼﺀ ): ৪/৪৩৩ [14] বুখারী, হাদিস নং- ৫৬২৮; মুসলিম, হাদিস নং- ২৭৩; হাদিসের শব্দগুলো ইমাম মুসলিম রহ. এর। [15] ইবনু কুতাইবা, ‘উয়ূনুল আখবার’ ( ﻋﻴﻮﻥ ﺍﻷﺧﺒﺎﺭ ): ৩/৮৬ – ৮৭; ‘কিতাবুল ইখওয়ান’ ( ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻹﺧﻮﺍﻥ); আরও দেখুন: আল-হানাভী, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইন’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ), পৃ. ১৩৮ – ১৩৯ [16] এই পংক্তিগুলো ইয়াহইয়া ইবন সা‘ঈদ, ইবনু আবদুল আ‘লা ও আবূল ‘আব্বাস আল- আ‘মা-এর বলে উল্লেখ করা হয়; তাছাড়া উমাইয়া ইবন আবি সালত-এর সাথেও এই পংক্তিগুলো সম্বন্ধযুক্ত করা হয়। দেখুন: ইবনু কুতাইবা, ‘উয়ূনুল আখবার’ ( ﻋﻴﻮﻥ ﺍﻷﺧﺒﺎﺭ ): ৩/৮৭; আল-‘আজলুওনী, ‘কাশফুল খাফা’ ( ﻛﺸﻒ ﺍﻟﺨﻔﺎﺀ ): ১/২০৭ – ২০৮; ইমাম তারতূশী, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইন’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ), পৃ. ১০৮ – ১০৯ [17] ড. মুহাম্মাদ ইবন লুতফী আস-সাব্বাগ, ‘নাযরাত ফিল উসরাতিল মুসলিমা’ ( ﻧﻈﺮﺍﺕ ﻓﻲ ﺍﻷﺳﺮﺓ ﺍﻟﻤﺴﻠﻤﺔ ), পৃ. ৪৯ [18] আল-হানাভী, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইন’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ), পৃ. ১৩৫ [19] লিসানুল আরব: ৪/৫৩ [20] দেখুন: ‘কাদাউদ্ দাইন’ ( ﻗﻀﺎﺀ ﺍﻟﺪﻳﻦ ), পৃ. ১৩ – ২১; ‘ওয়া বিল- ওয়ালিদাইনে ইহসানা’ ( ﻭ ﺑﺎﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ﺇﺣﺴﺎﻧﺎ ), পৃ. ৬৩ – ৬৬ [21] দেখুন: মুহাম্মদ সা‘ঈদ মুবীদ, ‘আদাবুল মুসলিম ফীল ‘আদাতে ওয়াল ‘ইবাদাতে ওয়াল মু‘আমিলাত’ ( ﺃﺩﺏ ﺍﻟﻤﺴﻠﻢ ﻓﻲ ﺍﻟﻌﺎﺩﺍﺕ ﻭ ﺍﻟﻌﺒﺎﺩﺍﺕ ﻭ ﺍﻟﻤﻌﺎﻣﻼﺕ ), পৃ. ১৫৮ – ১৬০; নিজাম ইয়া‘কুবী, ‘কুর্রাতুল ‘আইনাইন ফী ফাদায়েলি বির্রিল ওয়ালিদাইন’ ( ﻗﺮﺓ ﺍﻟﻌﻴﻨﻴﻦ ﻓﻲ ﻓﻀﺎﺋﻞ ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ), পৃ. ৪৬ – ৫২; আবদুল্লাহ ‘উলওয়ান, ‘তারবিয়্যাতুল আওলাদ ফিল ইসলাম’ ( ﺗﺮﺑﻴﺔ ﺍﻷﻭﻻﺩ ﻓﻲ ﺍﻹﺳﻼﻡ ), ১/২৮৫ – ২৮৬; আল-হাযেমী, ‘আল-ই‘লাম ফী মা ওয়ারাদা ফী বির্রিল ওয়ালিদাইনে ওয়া সিলাতিল আরহাম’ ( ﺍﻹﻋﻼﻡ ﻓﻲ ﻣﺎ ﻭﺭﺩ ﻓﻲ ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ﻭ ﺻﻠﺔ ﺍﻷﺭﺣﺎﻡ), পৃ. ২৬; আহমাদ ‘ঈসা ‘আশুর, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইনে ওয়া হুকুকুল আবায়ে ওয়াল আবনায়ে ওয়াল আরহাম’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ﻭ ﺣﻘﻮﻕ ﺍﻵﺑﺎﺀ ﻭ ﺍﻷﺑﻨﺎﺀ ﻭ ﺍﻷﺭﺣﺎﻡ ), পৃ. ১৬ – ২০; ড. মুহাম্মাদ আস-সালেহ, ‘আত-তাকাফুলুল ইজতিমা‘য়ী ফিশ শারী‘য়াতিল ইসলামিয়্যা’ ( ﺍﻟﺘﻜﺎﻓﻞ ﺍﻻﺟﺘﻤﺎﻋﻲ ﻓﻲ ﺍﻟﺸﺮﻳﻌﺔ ﺍﻹﺳﻼﻣﻴﺔ ), পৃ. ৯৮ – ১০৫; আলী মুহাম্মাদ জাম্মায, ‘ওয়াসিয়্যাতু লুকামান লি- ইবনেহি’ ( ﻭﺻﻴﺔ ﻟﻘﻤﺎﻥ ﻻﺑﻨﻪ ), পৃ. ২৩ – ৩৩ [22] সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩ [23] বুখারী, হাদিস নং- ৫৬২৬; মুসলিম, হাদিস নং- ৬৬৬৪ [24] ফাতহুল বারী: ১০/৪১৬ [25] সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩ – ২৪ [26] সূরা নূহ, আয়াত: ২৮ [27] দেখুন: মুহাম্মাদ ইবন লুতফী আস- সাব্বাগ, ‘ওসায়া লিয-যাওজাইন’ ( ﻭﺻﺎﻳﺎ ﻟﻠﺰﻭﺟﻴﻦ) [ স্বামী-স্ত্রী’র জন্য অসীয়ত], পৃ. ৫৬ – ৬৪ [28] হাফেয তারতূশী, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইন’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ), পৃ. ১৮৮ [29] দেখুন: লেখক (মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম আল-হামাদ), ‘মিন আখতাইল আযওয়াজ’ ( ﻣﻦ ﺃﺧﻄﺎﺀ ﺍﻷﺯﻭﺍﺝ ), পৃ. ৫ – ৯ [30] দেখুন: লেখকের নিজস্ব গ্রন্থ, ‘মিন আখতাইল আযওয়াজ’ ( ﻣﻦ ﺃﺧﻄﺎﺀ ﺍﻷﺯﻭﺍﺝ ), পৃ. ১১ – ১৬ [31] সূরা নূহ, আয়াত: ২৮ [32] সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৪১ – ৪৫ [33] সূরা আস-সাফ্ফাত, আয়াত: ১০২ [34] সূরা আস-সাফ্ফাত, আয়াত: ১০২ [35] সূরা আস-সাফ্ফাত, আয়াত: ১০৪ – ১০৫ [36] সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৩২ [37] বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং- ১৪; আলবানী সহীহ আল-আদাব আল- মুফরাদের মধ্যে বলেন: হাদিসটির সনদ হাসান পর্যায়ের। [38] মুসলিম, হাদিস নং- ৬৬৭৭; আবূ দাউদ, হাদিস নং- ৫১৪৫ [39] ইমাম আহমদ: ৬/১৫১; আবদুর রাযযাক, আল- মুসান্নাফ (২০১১৯); বাগভী রহ. ‘শরহুস সুন্নাহ: ১৩/৭; হাকেম রহ. হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন: ৩/২০৮ এবং যাহাবী রহ.ও হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। [40] হুল্লিয়াতুল আওলিয়া ( ﺣﻠﻴﺔ ﺍﻷﻭﻟﻴﺎﺀ ): ৬/২১১; আরও দেখুন: ‘সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ ( ﺳﻴﺮ ﺃﻋﻼﻡ ﺍﻟﻨﺒﻼﺀ ): ৬/৩১৮ [41] ‘উয়ুনুল আখবার ( ﻋﻴﻮﻥ ﺍﻷﺧﺒﺎﺭ ): ৩/৯৭ [42] ‘সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ ( ﺳﻴﺮ ﺃﻋﻼﻡ ﺍﻟﻨﺒﻼﺀ ): ৪/৬১৯ [43] ইবরাহীম আল-বায়হাকী, ‘আল- মাহাসেন ওয়াল মাসাওয়ী’ ( ﺍﻟﻤﺤﺎﺳﻦ ﻭﺍﻟﻤﺴﺎﻭﺉ ), পৃ. ৬১৪; ‘হিলইয়াতুল আওলিয়া’ ( ﺣﻠﻴﺔ ﺍﻷﻭﻟﻴﺎﺀ ): ২/২৭৩ [44] ‘সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ ( ﺳﻴﺮ ﺃﻋﻼﻡ ﺍﻟﻨﺒﻼﺀ ): ৬/১২৮ [45] ‘সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ ( ﺳﻴﺮ ﺃﻋﻼﻡ ﺍﻟﻨﺒﻼﺀ ): ৪/৬২০ [46] ‘সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ ( ﺳﻴﺮ ﺃﻋﻼﻡ ﺍﻟﻨﺒﻼﺀ ): ৬/৩৬৬ [47] ‘উয়ুনুল আখবার ( ﻋﻴﻮﻥ ﺍﻷﺧﺒﺎﺭ ): ৩/৯৭ [48] আল-হানাওয়ী, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইন’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ), পৃ. ৯৮; উদ্ধৃত: ‘মুহাদারাতুল উদাবায়ে ওয়া মুহাওয়ারাতুশ শু‘য়ারায়ে’ ( ﻣﺤﺎﺿﺮﺍﺕ ﺍﻷﺩﺑﺎﺀ ﻭ ﻣﺤﺎﻭﺭﺍﺕ ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ ) নামক গ্রন্থ থেকে: ১/২০৩ [49] ‘সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ ( ﺳﻴﺮ ﺃﻋﻼﻡ ﺍﻟﻨﺒﻼﺀ ): ১২/১৪৪; আরও দেখুন: সিয়ারু আ‘লামিন নুবালায় ‘বুন্দার’ এর জীবনী: ১২/১৪৪ – ১৪৯ [50] ‘সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা’ ( ﺳﻴﺮ ﺃﻋﻼﻡ ﺍﻟﻨﺒﻼﺀ ): ১২/১৪৫ [51] ইবরাহীম আল-বায়হাকী, ‘আল- মাহাসেন ওয়াল মাসাওয়ী’ ( ﺍﻟﻤﺤﺎﺳﻦ ﻭ ﺍﻟﻤﺴﺎﻭﺉ), পৃ. ৬১৪ [52] হাফেয তারতূশী, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইন’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ), পৃ. ৭৮ [53] হাফেয তারতূশী, ‘বির্রুল ওয়ালিদাইন’ ( ﺑﺮ ﺍﻟﻮﺍﻟﺪﻳﻦ ), পৃ. ৭৮ _________________________________________________ ________________________________ সংকলন: শাইখ মুহাম্মদ ইবন ইবরাহীম আল- হামাদ অনুবাদক: মোঃ আমিনুল ইসলাম সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া সূত্র: ইসলামহাউজ

One response to “পিতামাতার অবাধ্যতার কারণ, কিছু বাজ্জিক চিত্র ও প্রতিকারের উপায়। পর্ব -2

  1. Pingback: পিতামাতার অবাধ্যতার কারণ, কিছু বাজ্জিক চিত্র ও প্রতিকারের উপায়। পর্ব -2 – rabxhasan

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s