তাবলীগ জামাত কি ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে?


তাবলীগ জামাত কি ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করে? ইসলামই আল্লাহ্র নিকট একমাত্র দীন”। …… সূরা আলে ইমরান ৩:১৯।“আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করিলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করিলাম”। ……….সূরা মায়িদা ৫:৩। “আল্লাহ্ কাহাকেও সৎপথে পরিচালিত করিতে চাহিলে তিনি তার বক্ষ ইসলামের জন্য প্রশস্ত করিয়া দেন এবং কাহাকোও বিপথগাম ী করিতে চাহিলে তিনি তাহার বক্ষকে অতিশয় সকীর্ণ করিয়া দেন”। ….সূরা আনাম ৬:১২৫।“কেহ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দীন গ্রহন করিতে চাহিলে তাহলে তাহা কখনও কবূল করা হইবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্থ অন্তর্ভুক্ত হইবে”। ………সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫।“হে মু’মিনগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করিও না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”। ……….. সূরা বাকারা ২:২০৮। “বিধান দিবার অধিকার কেবল আল্লাহ্রই। তিনি আদেশ দিয়াছেন অন্য কাহারও ইবাদত না করিতে, কেবল তাঁহার ব্যতীত; ইহাই সত্য-সঠিক দীন কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না”।……..সূরা ইউসুফ ১২:৪০। “আল্লাহ্ ইসলামের জন্য যাহার বক্ষ উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছেন এবং যে তাহার প্রতিপালক প্রদত্ত আলোতে রহিয়াছে, সে কি তাহার সমান যে এরূপ নহে”? …….. সূরা যুমার ৩৯:২২। তাবলীগ জামাত শব্দ দুইটি আরবী যার অর্থ: তাবলীগ = প্রচার, জামাত = দল। অর্থাৎ যে দল প্রচার করে। এখন সাধারনভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হবে এই দল কি প্রচার করে। আমরা সাধারনভাবে তাদেরকে দেখতে পাই তারা দীনের প্রচার করে বা মানুষদেরকে দীনের দাওয়াত দেয়। তাহলে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন আসবে দীন কি জিনিস বা দীন কাকে বলে। দীন বলতে আমরা কুরআন ও সুন্নাহ্র আলোকে যেটা বুঝি তা হচ্ছে আল্লাহ্তালার মনোনিত এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে প্রেরিত মানুষের জন্য জীবন বিধান। যার মাধ্যমে মানবজাতি তাদের দুনিয়ার জীবনকে পরিচালিত করবে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ্তালার নৈকট্য লাভ ও তার পুরষ্কার স্বরূপ আল্লাহ্তালার দেয়া নিয়ামত জান্নাত লাভের যোগ্যতা অর্জন করবে। জীবন বিধান বলতে আমরা কি বুঝি? জীবন বিধান বলতে মানুষের জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের প্রয়োজনীয় সকল প্রকার বিধিবিধান বুঝায়। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মসজিদ থেকে শুরু করে রণাঙ্গন পর্যন্ত যার মধ্যে ব্যবসা- বাণিজ্য, লেন-দেন, অফিস-আদালত, পার্লামেন্ট শামিল রয়েছে। আল্লাহ্তালা বলেন, “আমি জিন্ন ও মানুষকে শুধু এইজন্যেই সৃষ্টি করেছি যে, তাহারা আমারই ইবাদত করবে”।…… সূরা যারিয়াত ৫১:৫৬। সূরা যারিয়াতের এই আয়াতে ‘ইবাদত’ শব্দটিকে শুধু সালাত, সাওম, হজ্জ এবং এ ধরনের অনান্য ইবাদত অর্থে ব্যবহার করা হয়নি। তাই এই অর্থ কেউ গ্রহন করতে পারে না, যে জিন্ন ও মানুষকে শুধু সালাত, সাওম, হজ্জ, তাসবীহ্ তাহ্লীল ইত্যাদি করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। এ অর্থটিও এর মধ্যে শামিল আছে বটে, তবে এটা তার পূর্ণাঙ্গ অর্থ নয়। পূর্ণাঙ্গ অর্থ হবে জিন্ন ও মানুষকে আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের পূজা, আনুগত্য, আদেশ নিষেধ পালন এ বিনীত প্রার্থনার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। অন্য কারো সামনে নত হওয়া, অন্য কারো নির্দেশ পালন করা, অন্য কাউকে ভয় করা, অন্য কারো রচিত দীন বা আদেশের অনুসরণ করা, অন্য কারো নিজের ভাগ্য নিয়ন্তা মনে করা এবং অন্য কোন সত্তার কাছে প্রার্থনার জন্য হাত বাড়ানো তাদের কাজ নয়। আল্লাহ্র আহ্কাম মুতাবিক দুনিয়ার কাজ- কর্ম পরিচালনা করাও ইবাদতের অন্তর্গত। খিলাফতের যিম্মাদারী পালনে যতসব কাজ- কর্ম করা হোক না কেন, আর তা আপাত দৃষ্টিতে যত পার্থিব মনে করা হউক না কেন, তা ইবাদতের মধ্যে শামিল। কারণ এ খিলাফতের জিম্মাদারী আল্লাহ্র পক্ষ থেকে প্রদত্ত দায়িত্ব। এ যিম্মাদারী পালনের জন্য আম্বিয়া কিরাম (আ) দুনিয়ায় আগমন করেছেন এবং দিন- রাত কঠোর পরিশ্রম করে তাঁরা তা করেছেন। যেমন আল্লাহ্তালা বলেন, “তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করিয়াছেন দীন যাহার নির্দেশ দিয়াছিলেন তিনি নূহ্কে, আর যাহা আমি ওহী করিয়াছি তোমাকে এবং যাহার নির্দেশ দিয়াছিলাম ইব্রাহিম, মূসা ও ঈসাকে, এই বলিয়া যে, তোমরা দীনকে প্রতিষ্ঠিত কর এবং ইহাতে মতভেদ করিও না”। …… সূরা শূরা ৪২:১৩। আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম দিনের বেলা ইসলামের প্রচার প্রসার, ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা, এ রাষ্ট্রের হিফাযত করা, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার গঠন করা, প্রচলিত আইনের পরিবর্তে কুরআনী আইন চালু করা, ইনসাফপূর্ণ বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা, আল্লাহ্ প্রদত্ত রিয্ক হতে কেউ যাতে বঞ্চিত না হয়, এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করা এসব অগনিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাজ-কর্ম, যুদ্ধ যাত্রার প্রস্তু তি প্রভৃতি কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। আর রাতের বেলা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে আল্লাহ্র ইবাদত করতেন। অধিকন্তু তিনি পরিবার পরিজনের ভরন-পোষন ও দেখাশুনা করতেন। তিনি হাটবাজারে যাতায়ত করতেন, সাহাবে কিরাম (রা) ও অনান্য সাক্ষাত প্রার্থীদের সাথে মুলাকাত করতেন, দুঃস্থদের সাহায্য করতেন। ছোটদের সাথে হাসি-তামাশা করতেন। এ সব কিছুই তাঁর ইবাদতের মধ্যে শামিল ছিল। সুতরাং আমরা আমাদের রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-এর জীবনী থেকেই ইসলাম যে একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান তার সঠিক ধারনা লাভ করতে পারি। তাই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন বলেন, “তোমাদের মধ্যে যাহারা আল্লাহ্ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহ্কে অধিক স্মরণ করে তাহাদের জন্য রাসূলুল্লাহ্র মধ্যে উত্তম আদর্শ রহিয়াছে”।……..সূ রা আহ্যাব ৩৩:২১। উপরে সূরা শূরার ১৩নং আয়াতে আল্লাহ্তালা যে দীনের কথা বললেন, সে দীনটি কি? সে দীনটি কি ইসলাম নয়? তারপর আল্লাহ্তালা বললেন যে, দীনটি প্রতিষ্ঠিত কর। এই দীন প্রতিষ্ঠা কি? এই দীন প্রতিষ্ঠা কাকে বলে এবং দীন প্রতিষ্ঠা কিভাবে করতে হয় তা আমাদের প্রিয় নবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম আমাদেরক ে হাতে কলমে শিখিয়ে দিয়ে গেছেন সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-এর দেখানো পথ ব্যতীত দীন কায়েম বা প্রতিষ্ঠা করার ভিন্ন কোন পথ নেই। যে-ই রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-এর দেখানো পথ ব্যতীত ভিন্ন কোন পথের উদ্ভাবন করবে সে ইসলামের পথ থেকে ছিটকে পড়তে বাধ্য। আমরা কি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-কে কুরআনের আলোকে একটি পরিপূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেখিনি? আল্লাহ্তালা কুরআনে যে সমস্ত বিধি বিধান দিয়েছেন যেমন ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়, সব পর্যায়ের এই বিধি বিধানকে তিনি কি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় এনে প্রয়োগ করেননি? এই ধারাবাহিকতায় তাঁর ইন্তেকালের পর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-এর সাহাবাগণের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা) এরপর হযরত উমর(রা), হযরত ঊসমান (রা) এবং হযরত আলী(রা) তথা খুলাফায়ে রাশেদীন- রা খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহন করে এই ইসলামী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে কি এগিয়ে নিয়ে যাননি? এই যে ইসলামী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলার যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, এটাকেই দীন প্রতিষ্ঠা বলে। পরবর্তীতে এর ধারাবাহিকতা ক্ষুন্ন হয়েছে বটে ,তাই বলে এর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি এবং যাবেও না, তাছাড়া এ হুকুমটিও ফরয। আর এই ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যেই সমস্ত কল্যাণ নিহিত রয়েছে। আজ মুসলিম জাতি যে গভীর সংকটের মধ্যে নিপতিত তার কারণই হচ্ছে ইসলামকে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মাধ্যমে সীমিত রাখা। সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র, কোথাও ইসলাম নেই। ইসলামকে কেবলই মসজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ইসলামে যদি সমাজ, অর্থনীতি, রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থা না-ই থাকবে তাহলে ইসলাম তো পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হতে পারে না। ইসলাম এই জন্যই পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা যে, ইসলাম জীবনের প্রতিটি প্রয়োজন পূরণ করে এবং প্রতিটি বিষয়ের সমাধান দেয়। তাহলে আমাদের তাবলীগ ও দাওয়াত কিসের হবে? আমাদের তাবলীগ ও দাওয়াত কি শুধুমাত্র কালেমা, সালাত, যাকাত, সাওম, হজ্জের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? আবার দাওয়াতের ব্যপারে বিভ্রান্তি আছে। দাওয়াত আপনি কাকে দিবেন? মুসলিমকে না অমুসলিমকে? মুসলিমকে তো দাওয়াত দেওয়ার কিছুই নেই সে তো কালেমাকে গ্রহন করেছেই। হতে পারে কালেমার দাবী অনুযায়ী তার আমল হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে তাকে সৎ পরামর্শের মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করানোর জন্য আহ্বান জানাতে হবে, কিন্তু সেটাকে তো দাওয়াত বলা যাবে না, সেটার নাম হচ্ছে ইসলাহ। দাওয়াত দিতে হবে তাদেরকে যারা ইসলামকে তাদের দীন হিসাবে গ্রহন করেনি, অর্থাৎ অমুসলিমগণ। তাবলীগ জামাত কোন দীনের প্রচার করে, কোন দীনের দাওয়াত দেয় এবং কাদেরকে দেয়? এর উত্তর কি হতে পারে? আমরা সাধারনতঃ তাদেরকে দেখি তারা মানুষ দাওয়াত দেন কিন্তু কখনো ইসলাম শব্দটি তাদের মুখ থেকে উচ্চারিত হয় না। তারা কখনো বলেন না আমরা মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি বা ইসলামের দিকে আহ্বান করছি। দীন শব্দের অর্থ যেহেতু জীবন ব্যবস্থা সুতরাং প্রশ্ন করা যায়, যেহেতু তারা ইসলাম শব্দটি ব্যবহার করেন না, তাহলে তারা কোন দীনের দাওয়াত দেন? তাবলীগ জামাতের কর্মকান্ড অনেক প্রশ্নের উদ্রেক করে যার জবাব পাওয়া যায় না। কুরআনের সাথে তাবলীগ জামাতের সম্পর্কহীনতা খুবই দৃষ্টিকটুভাবে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। তাবলীগ জামাতের লোকদেরকে কখনো কুরআন নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায় না। এমনকি মসজিদগুলিতে যে সাপ্তাহিক কুরআনের তাফসীর করা হয় সেখানেও তারা অংশ গ্রহন করেন না, খুবই সযত্নে তারা সেগুলি পরিহার করে চলেন। তারা সব সময় যে বইটি নিয়ে বয়ান করেন তার নাম ফাযায়েলের আমল। এই বইটি ছাড়া অন্য কোন বই তাদেরকে পড়তে দেখা যায় না। এই বইটির প্রতি তাদের এত মহব্বত দেখে যে কারো কাছে মনে হতে পারে আল্লাহ্ কুরআন নাযিল করেননি, ফাযায়েলের আমল নাযিল করেছেন (নাউজুবিল্লাহ্)। কোন হাদীসের কিতাব যেমন বুখারী, মুসলিম এমন কি রিয়াদুস সালেহীনও তাদেরকে পড়তে দেখা যায় না। তাহলে ফাযায়েলের আমল কিতাবটি কি তাদের কাছে এতই মূল্যবান যে তার কাছে অন্য কোন কিতাব, কিতাবই না? যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয় যে আল্লাহ্তা’লা কুরআনের কোন কোন সূরার কোন কোন আয়াতে দীন সম্পর্কে বলেছেন এবং তার মাধ্যমে আল্লাহ্তা’লা দীন বলতে কি বুঝিয়েছেন তা বলতে পারে না। অথচ দেখা যাবে তাদের কথা অনুযায়ী তারা বহু বছর যাবৎ আল্লাহ্র রাস্তায় মেহনত করছেন, বহু চিল্লা দিয়েছেন মানুষকে দীন সম্পর্কে জ্ঞান দিয়েছেন কিন্তু কুরআনের আলোকে দীন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে পারেন না। তাহলে তারা মানুষকে কোন দীনের দাওয়াত দেন? তারা যখন মসজিদে তাদের হলকায় বসার জন্য ঘোষনা দেন তখন বলেন, ঈমান আমলের মেহনত সম্পর্কে কথা হবে আপনারা সব্বাই বসুন বহুত ফায়দা হবে। কিন্তু সেখানে বসলে দেখা যায় তারা তাদের গৎবাধা কিছু কথা বলছে যার সাথে ঈমান আমলের সম্পর্ক কমই আছে। মাঝে মাঝে বিদেশ থেকে লোকজন আসেন দীনের দাওয়াত নিয়ে, তখন কারো মনে হতে পারে আল্লাহ্তা’লা মনে হয় নতুন কোন দীন পাঠিয়েছেন তাই বিদেশ থেকে লোক এসেছে দীনের দাওয়াত নিয়ে। যে বিদেশি ভাইয়েরা এখানে আসেন দীনের কথা বলতে তারা কি তাদের দেশের সব লোকদেরকে দীনের দাওয়াত দেওয়া শেষ করে ফেলেছেন আর কেহই অবশিষ্ট নেই, তাই তারা অন্য দেশে গিয়ে দীনের দাওয়াত দিচ্ছেন? তাবলিগ জামাত ছয়টি মূলনীতির দ্বারা পরিচালিত হয়। যথাঃ- ১) কালিমা, ২) সালাহ্, ৩) ইল্ম ও জিক্র, ৪) ইকরাম-ই- মুসলিম, ৫) বিশুদ্ধ নিয়্যত, ৬) দাওয়াত ও তাবলীগ। (সূত্রঃ- উইকিপিডিয়া) তাবলীগ জামাতের এই ছয় মূলনীতির ভিত্তি কি, আর কেনই বা এই ছয় মূলনীতি? ইসলামের মধ্যে এরকম আলাদা করে নীতি প্রতিষ্ঠার কোন সুযোগ রয়েছে কিনা? কোন মানুষ ইসলামকে তার দীন হিসাবে নিতে চাইলে কালিমার সাক্ষ্য দিয়েই সে ইসলামের সীমায় প্রবেশ করে। সুতরাং যিনি নিজেকে মুসলিম হিসাবে পরিচয় দেন তিনি তো কালিমার সক্ষ্য দিয়েছেনই। তাদের অনান্য মূলনীতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোয্য। এখানে তাবলীগের মূলনীত ি হিসাবে যা বলা হয়েছে তা তো ইসলা কথা। তবে তাদের কর্মকান্ডের সাথে এই মূলনীতিকে যাচাই করলে অবশ্য তাদের এই মূলনীতি কেন তা বুঝা যায়। আগেই বলেছি তারা ইসলাম শব্দটি খুব সযত্নে এড়িয়ে যান, পরিবর্তে তারা বলেন দীন। ইসলাম একটি ব্যাপক বিষয়, ইসলাম শুধু মাত্র কালিমা, সালাত, যাকাত, সাওম হজ্জের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ্তা’লার আনুষ্ঠানিক ইবাদত যেমন সালাত, যাকাত, সাওম, হজ্জ থেকে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যন্ত সবকিছুই ইসলামের আওতাভুক্ত। এর কোন একটিকে ছেড়ে দিলে ইসলামের ওই অংশটুকু অপূর্ণই থেকে গেল। ওই অপূর্ণ থাকা অংশটুকু যদি ইসলামের আওতাভুক্ত না হয়, তাহলে অবশ্যই তা অইসলামী বিষয়াদি দিয়েই পূর্ণ হবে। কিন্তু ইসলামের মধ্যে অইসলামী বিষয় থাকার অবকাশ কোথায়। ইসলামে কোন ককটেল গ্রহনযোগ্য নয়। এই জন্যেই আল্লাহ্ সুবহানাহুতা’লা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করিও না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু”। ……….. সূরা বাকারা ২:২০৮। এখন আমরা যদি আমাদের সমাজকে, রাষ্ট্রেকে ইসলামের আলোকে মূল্যায়ন করি, তাহলে আমরা কি বলতে পারি যে আমরা পরি আছি? যদি হিসাব করে দেখা হয় তাহলে দেখা যাবে আনুষ্ঠানিক ইবাদত ব্যতীত আর কিছুই ইসলামিক নয়। আল্লাহ্তা’লা যে বললেন শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না, এখন আমাদের যে সব অংশটুকু ইসলামের বাহিরে রয়েছে নিশ্চয়ই আমরা সেখানে শয়তানের পদাংক অনুসরণ করেই চলছি? তাহলে আমাদের দাওয়াতে, তাবলীগে কি এই বিষয়গুলি উঠে আসার কথা নয়? সম্পূর্ণ কুরআন কি আমাদের জন্য সিলেবাস নয়, নাকি আংশিক? এই জন্যেই মনে হয় তাবলীগ জামাতের ভাইয়েরা তারা যে ছয়টি মূলনীতি ঠিক করে নিয়েছেন এর বাইরে ইসলামের কোন কিছুর ব্যাপারে তারা আলাপ করেন না, কথা বলেন না এবং এই জন্যেই কি তারা ইসলাম শব্দটিকে সযত্নে এড়িয়ে চলেন? ঈমানদারদেরকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ্তালা বলেনঃ “হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক বাণিজ্যের কথা বলে দিব, যা তোমাদেরকে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি থেকে রেহাই দিবে? তা এই যে, তোমরা ঈমান আন আল্লাহ্র প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং জিহাদ করবে আল্লাহ্র পথে তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝতে। আল্লাহ্ ক্ষমা দিবেন তোমাদের সমস্ত গুনাহ্ এবং দাখিল করবেন এমন জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত এবং স্থায়ী জান্নাতের উত্তম বাসগৃহে। ইহাই মহা সাফল্য”।……….সূরা আস্সফ, আয়াত ১০-১২। উপরের আয়াত সমূহের মাধ্যমে আল্লাহ্তালা আমাদেরকে জানিয়ে দি কিভাবে আযাব থেকে বাঁচা যাবে, কিভাবে ক্ষমা পাওয়া যাবে, কিভাবে জান্নাত লাভের মাধ্যমে মহাসাফল্য অর্জন করা যাবে। আমাদের তাবলীগ জামাতের ভাইয়েরা তো মানুষকে আল্লাহ্র দিকে ডাকেন জান্নাত অর্জন করার জন্যই। কিন্তু আল্লাহ্তা’লা জান্নাত পাওয়ার যে ফর্মুলার কথা এখানে বললেন তা কি তারা বয়ান করেন? করেন না। হযরত আবূ হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি এরূপ অবস্থায় ইন্তিকাল করেছে যে, সে জিহাদে অংশ গ্রহন করেনি, আর জিহাদের চিন্তাও করেনি, না এর নিয়্যত করেছে তবে এক প্রকার মুনাফিকের অবস্থায় সে ইন্তিকাল করেছে। (মুসলিম)। মুনাফিক অবস্থায় যদি কারো ইন্তিকাল হয় তাহলে তার পরিণতি কি হবে তা নিশ্চয়ই আমাদের সবারই জানা আছে? তাহলে এই জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ্র কথা কি তাবলীগ জামাতের ভাইয়েরা কখনো বলেন? বলেন না। যেখানে জিহাদ নেই সেখানে ইসলাম নেই। সেটা হোক ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক। ব্যক্তিগতভাবে কেউ যদি তার নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ না করেন, তাহলে তার পক্ষে ইসলামের হুকুম আহ্কাম মেনে চলা সম্ভব হবে না। যেমন সালাত, যাকাত, সাওম পালন, অন্যায় থেকে সমস্ত হারাম থেকে বেঁচে থাকা ইত্যাদি। তেমনি সামষ্টিকভাবে আমরা যদি আমরা জিহ না করি, তাহলে ইসলামের যে সমস্ত হুকুম আহ্কাম সামষ্টিকভাবে পালন করতে হয় তা পালন করা সম্ভব হবে না। যেমন সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় এই বিষয়গুলি সামষ্টিকভাবে পালন করতে হয়। আমরা যদি লক্ষ্য করি তাহলে আমরা দেখতে পাই এ সৃষ্টির যেখানেই যা কিছু টিকে আছে তা জিহাদ করেই টিকে আছে। দেখুন একটি প্লেনকে উপরে টিকে থাকার ও চলার জন্য চেষ্টার প্রয়োজন, ইঞ্জিন সে চেষ্টাটি করে যায়, কিন্তু নীচে নামার জন্য কোনো চেষ্টার প্রয়োজন হয় না। প্লেন উপরে উঠে তার নিজস্ব চেষ্টায়, আর নীচে নামে প্রাকৃতিক শক্তি মধ্যাকর্ষনের টানে। এভাবে বিপরীত শক্তির সঙ্গে মুকাবিলা বা চরম শক্তি প্রয়োগ করে টিকে থাকার নামই জিহাদ। বলুন এই জিহাদ কোথায় নেই। ঠিক তেমনিভাবে ইসলামকে সত্যিকার জীবিত ইসলাম হিস াবে টিকে থাকতে হলে তাকে জিহাদ করেই টিকে থাকতে হবে। এ জিহাদ হতে হবে সার্বক্ষনিক। যেমন উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় প্লেনের ইঞ্জিনের চেষ্টায় কোনো বিরতি দিলে ঠিক সেই মুহূর্তেই প্লেনকে মাধ্যাকর্ষনশক্ত ি টেনে মাটিয়ে নামিয়ে ফেলবে। ঠিক তেমনি মুসলমান যে মুহূর্তেই ইসলামের সার্বক্ষনিক জিহাদ বন্ধ করবে সেই মুহূর্তেই তার বিপরীত শক্তি অর্থাৎ তাগূত ইসলামকে টেনে নামাবে জাহিলিয়াতের অন্ধকারের মধ্যে। বাঁচার চেষ্টা বাদ দিলে যেমন মরণ অনিবার্য ঠিক তেমনি জিহাদ ত্যাগ করলেও জাহিলিয়াত অনিবার্য। আবার মনে রাখতে হবে জিহাদ মানে যুদ্ধ নয়, জিহাদ অর্থ চরম প্রচেষ্টা। এ জিহাদ ছেড়ে দেওয়াতেই আজ ইসলামকে পরাজিত অবস্থায় বা অন্যের অধীনে থাকতে হচ্ছে। অথচ ইসলাম এসেছে বিজয়ী শক্তি হিসাবে থাকার জন্যে। (দেখুন সূরা আস্ সফ ৬১:৯) তাবলীগ জামাতের ভাইদেরকে যদি কুরআন থেকে বয়ান করতে বলা হয়, তখন তাদের উত্তর হয় মুরুব্বীদের মানা আছে। শুধু কুরআন নয় হাদীসের কোন কিতাবও তাদের পড়তে নিষেধ করা আছে, এর কারণ কি? অথচ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলে গিয়েছেন, “আমি তোমাদের কাছে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, যারা এই দুটি জিনিস আকড়ে ধরে থাকবে তারা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না”। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে দুটি জিনিস রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম আমাদেরক ে আঁকড়ে ধরে থাকতে বলেছেন, সে দুটি জিনিসই তারা ছেড়ে দিয়েছেন। তার পরিবর্তে তারা পড়েন ফাযায়েলের আমল। যারা কুরআন থেকে জ্ঞান আরোহণ করেন না, হাদীস গ্রন্থ থেকে জ্ঞান আরোহন করেন না তাহলে তারা ইসলামের পরিপূর্ণ জ্ঞান কিভাবে লাভ করে থাকেন? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম বলেন, সর্বোত্তম কথা আল্লাহ্র কিতাব, সর্বোত্তম পথ রাসূলুল্লাহ্ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-এর প্রদর্শিত পথ। আর নিকৃষ্টতম কাজ হচ্ছে, যা দীনে নতুন উদ্ভাবন করা হয়। প্রত্যেকটি নতুন উদ্ভাবনই বিদআত, প্রত্যেটি বিদআতই গোমরাহী বা পথভ্রষ্টতা এবং গোমরাহী বা প পরিণতি জাহান্নাম। (মুসলিম)। তাহলে সর্বোত্তম কথাকে ছেড়ে দিয়ে অর্থাৎ আল্লাহ্র কিতাব আল কুরআনকে বাদ দিয়ে, সর্বোত্তম পথ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম- এর পথ (সুন্নাহ্)-কে বাদ দিয়ে কেউ কি ইসলামের উপর টিকে থাকতে পারে, নিশ্চয়ই না। যারা তাবলীগ জামাতকে অনুসরণ করছেন এ বিরাট সংখ্যক মুসলিমকে যারা জিহাদের চেতনা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছেন আল্লাহ্র দরবারে তাদের কৈফিয়ত কি? এটা কি ইহুদী খৃষ্টানদের চক্রান্ত কিনা এ বিপুল সংখ্যক মুসলিমকে ইসলামের মূল জিহাদী চেতনা পরিপন্থী ডোজ গিলিয়ে দিয়ে ইসলামের শক্তিকে দূর্বল করে ফায়দা নিচ্ছে কিনা তাও গভীর ভাবে দেখা উচিত। ইসলামে বৈরাগ্যের কোন স্থান নেই। নিজের ইচ্ছামত আল্লাহ্র রাস্তায় চলা যায় না। আল্লাহ্র রাস্তায় চলতে হয়, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-এর দেখানো পথে। এখানে কোন ওলী, বুজুর্গ, মুরুব্বী, মুর্শীদে কামেলের কথার দুই পয়সার দাম নেই যদি না তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-এর দেখানো পথে না হয়। হযরত আলী মুর্তাযা(রা) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি কুরআনের বাইরে হিদায়াত অন্বেষন করবে, আল্লাহ্র পক্ষ থেকে তার জন্য আসবে কেবল গুমরাহী। (তিরমিযী) যারা ইসলাম শব্দটি উচ্চারণ করতে লজ্জাবোধ করেন, সযত্নে এড়িয়ে যান তাদের সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক আছে কি? যারা আল্লাহ্র কিতাব আল-কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না, তাদের সঙ্গে আল্লাহ্তা’লার সম্পর্ক আছে কি? যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম –এর হাদীস বা সুন্নাহ্র সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন না, তাদের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম-এর সম্পর্ক থাকে কি?

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below