মুক্তিপ্রাপ্ত দলের পাথেয় (১ম পর্ব)


মুক্তিপ্রাপ্ত দলের পাথেয় (১ম পর্ব)

মুক্তিপ্রাপ্ত দলের পাথেয় (১ম পর্ব)

ভূমিকা
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম
(পরম দয়ালু, করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি)
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের। আমরা তাঁর প্রশংসা করছি, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তাঁর নিকট ক্ষমা চাচ্ছি । অন্তরের অনিষ্ট (কুমন্ত্রণা) এবং মন্দ আমল হতে তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যাকে আল্লাহ হিদায়েত দান করেন তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না, আর যে গোমরাহ হয়ে যায় তাকে কেউ হিদায়েত দিতে পারে না।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো মাবুদ নেই এবং তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।
পূর্ব যুগে মানুষের দু:খ-দুর্দশা বিশেষত: মুসলমানদের কষ্ট-মুসিবত, যুদ্ধ-ফেতনা ইত্যাদির কারণ অনুসন্ধান করে দেখা গেছে তাওহিদ সম্পর্কে জ্ঞানের অপ্রতুলতা, উদাসীনতা ও নানা শিরকি কাজে জড়িয়ে পড়াই ছিল এর মূল কারণ। শিরকমুক্ত তাওহিদের চর্চ-অনুশীলন না থাকার সুযোগটি শয়তান গ্রহণ করেছে । এবং তাদের বিভ্রান্ত করে বিভিন্ন বিপদে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। তাই আমরা এ ছোট্ট বইটিতে তাওহিদ, শিরকসহ ইসলামের বেশ কিছু মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করার চেষ্ট করেছি। এবং বইয়ের মাধ্যমেই বিশ্বের সকল ইসলাম অনুসারীকে যাবতীয় শিরকি কর্মকাণ্ড হতে বিরত থেকে খালেছ তাওহিদের ছায়াতলে অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। পাঠকের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি বিষয় সংক্ষেপে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি যাতে তারা বিষয়গুলো সহজে বুঝতে পারে।
এটি রচনার মাধ্যমে আমরা -মুক্তি প্রাপ্ত দলের আক্বিদাহ ও সাহায্যপ্রাপ্ত দলের রাস্তা- খোঁজার চেষ্টা করেছি যাতে ঐ রাস্তায় চলে জয়যুক্ত ও কামিয়াব হতে পারি।
মহান আল্লাহর নিকট আকুল আবেদন, হে আল্লাহ তুমি আমাদেরকে নাযাতপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভূক্ত করে নাও।
শায়খ মুহাম্মাদ বিন জামীল যাইনু
শিক্ষক, দারুল হাদিস
মক্কা,সৌদি আরব।

 

জয়যুক্ত দল
১। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا (آل عمران 103)
অর্থাৎ : আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না।  (সূরা আলে ইমরান, ৩: ১০৩ আয়াত)।
২। অন্যত্র বলেন :
وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ ﴿31﴾ مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ ﴿الروم32﴾
অর্থাৎ : তোমরা ঐ মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হয়ো না, যারা দ্বীনকে টুকরা টুকরা করে ফেলেছে এবং যারা দলে দলে বিভক্ত হয়েছে, প্রত্যেক দল তাদের কাছে যা ছিল তাই নিয়েই খুশি। (সূরা রূম, ৩০: ৩১ ও ৩২ আয়াত)।
৩। প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
 وَقَالَ صلى اللّه عليه وسلَّمَ: أٌوْصِيْكُمْ بتَقْوَى اللَّه عَزَّ وَجَلَّ وَالسًّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإنْ تأمَّرَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ حَبَشِيٌ فَإنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرى اخْتِلافًا كَثِيْرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلفَاءِ الرَّاشِدينَ الْمَهْديِّينَ تَمَسَّكُوْا بِهَا وَ عَضُّوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَاِيَّاكُمْ وَ مُحْدَثاتِ الأمُوْرِ فَإنَّ كُلَّ مُحْدَثةٍ بِدْعَةٌ وَ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلالَةٌ وَ كُلُّ ضَلالَةٍ فِى النَّارِ (رواه أبو داود وغيره)
অর্থাৎ, আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহকে ভয় করার, শোনা ও মান্য করার, যদিও তোমাদের আমীর হয় কোনো হাবশি দাস। কারণ তোমাদের মধ্যে যারা বেঁচে থাকবে নানা মতবিরোধ দেখতে পাবে। তখন তোমাদের করণীয় হবে, আমার সুন্নত এবং হেদায়েত প্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনদের সুন্নতকে নিজেদের উপর অপরিহার্য করে নেওয়া। সেসব সুন্নতকে মুজবুতভাবে, চোয়ালের দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরার ন্যায় আঁকড়ে ধরবে । দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনো আমল সংযোজনের ব্যাপারে খুবই সাবধান থাকবে; নিশ্চয়ই সমস্ত নতুন আমলই বিদআত এবং সমস্ত বিদআতই গোমরাহী এবং সমস্ত গোমরাহি জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে)। (আবু দাউদ এবং অন্যান্য, ছহীহ)।
৪। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেনঃ
وَقَالَ صلى اللّه عليه وسلَّمَ: ألاَ وَإنَّ مَنْ قَبْلَكُمْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ افْتَرَقُوْا عَلى ثِنْتَيْنِ وَسِبْعِيْنَ مِلَّةً وَإنَّ هذهِ الْمِلَّةَ سَتَفْتَرِقُ على ثَلاثٍ وَسَبْعيْنَ‌‌: ثِنْتَانِ وَسَبْعِوْنَ فى النَّارِ وَوَحِدَةً فى الْجَنَّةِ وهِىَ الْجَمَاعَةُ.   (رواه أحمد وغيره وحسنه الحافظ))
অর্থাৎ: ওহে! তোমাদের পূর্বে আগত আহলে কিতাব (ইহুদি ও নাসারা)-রা ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল এবং এ উম্মত বিভক্ত হবে ৭৩ দলে। ৭২ দল যাবে জাহান্নামে এবং একটি মাত্র দল প্রবেশ করবে জান্নাতে। তারাই হল (আহলে সুন্নাত ওয়াল) জামাআত। (আহমদ, হাসান)।
অন্য হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
كُلُّهُمْ فى النَّارِ إلاَّ مِلّةٌ واحِدَةٌ ما أنا عَلَيْهِ وَأصْحَابيْ      (الترمذي حسن)
আর্থাৎ,একমাত্র আমি এবং আমার সাহাবিদের মতের অনুসারী দল ব্যতীত সকলেই জাহান্নামে যাবে। (তিরমিযি, হাসান)।
৫। ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিতঃ
خَطَّ لَنَا رَسُوْل الله صلى اللّه عليه وسلَّمَ خَطًّا بِيَدِهِ ثُمَّ قَالَ: هذا سَبِيْلُ الله مُسْتَقِيْمًا. وَ خَطّ خُطُوْطًا عَنْ يَمِيْنِهِ وَ شِمَالِهِ ثُمَّ قَالَ: هذه السُّبُلُ لَيْسَ مِنْها سَبِيْلٌ إلا عَلَيْهِ شَيْطَانٌ يَدْعُوا إلَيْهِ ثُمَّ قَرَأَ قَولهُ تَعَالى: (وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ) ﴿الانعام153﴾(رواه أحمد والنسائي صحيح)
অর্থাৎ : আমাদের জন্য নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি দাগ টানলেন। তারপর বললেন: এটা আল্লাহর সোজা (সঠিক) রাস্তা। তারপর তার ডানে ও বামে আরো কিছু দাগ টানলেন। তারপর বললেনঃ এ রাস্তাগুলোর সবকটিতে শয়তান বসে মানুষদেরকে তার দিকে ডাকছে। এরপর কুরআন থেকে পাঠ করলেন: আর এটি তো আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। (আহমদ, নাসাঈ, হাকেম। সহিহ)।
৬। আব্দুল কাদের জিলানী রহঃ তাঁর গুনিয়াতুততালেবীন গ্রন্থে বলেছেন : জয়জুক্ত দল হল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত এবং তাঁদের একমাত্র নাম হল আসহাবুল হাদিস বা হাদিসের অনুসারী। অর্থাৎ যারা হাদিস ও কুরআন মত চলে।
৭। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হুকুম করছেনঃ আমরা যেন সকলে কুরআনকে আঁকড়ে ধরি এবং ঐ মুশরিকদের মত যেন না হই যারা তাদের দ্বীনের মধ্যে দলে দলে, গোত্রে গোত্রে বিভক্ত হয়েছে। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জানাচ্ছেন, ইহুদি ও খৃষ্টানরা বহু দলে বিভক্ত হয়েছে। আর মুসলিমরা তাদের থেকেও বেশী দলে বিভক্ত হবে। এই দলে দলে বিচ্ছিন্নতার কারণে তারা জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে। তাদের এ বিভক্তির কারণ হচ্ছে সঠিক পথ হতে বিচ্যুতি, আল্লাহ তাআলার কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ থেকে দূরে সরে থাকা। তাদের একদল মুক্তি পেয়ে জয়জুক্ত হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তাঁরাই সে দল যারা আল্লাহর কালাম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহিহ হাদিসকে আঁকড়ে ধরবে এবং সাহাবিদের রা. আমলসমূহ অনুসরণ করবে।
নাজাতপ্রাপ্ত দলের  রাস্তা (পথ নির্দেশিকা)
১। নাজাতপ্রাপ্ত দল বলে সে দলকে বুঝানো হয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত থাকা কালে তাঁর রাস্তাকে আঁকড়ে ধরেছেন দৃঢ়ভাবে। তাঁর ওফাতের পর অনুসরণ করেছেন তাঁর সাহাবিদের রাস্তা। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবতীর্ণ আল-কোরআন প্রদর্শিত এবং তাঁর কর্ম-বক্তব্য-সমর্থনের মাধ্যমে কোরআনের ব্যাখ্যায় যে রাস্তা উদ্ভাসিত হয়েছে। কাল পরিক্রমায় সহিহ হাদিসের মাধ্যমে যা আমাদের পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং তিনি নিজ উম্মতকে মজবুতভাতে ধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন সেটিই হলো নাজাতপ্রাপ্ত দলের রাস্তা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ
تَرَكْتُ فِيْكُم شَيْئَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا بَعْدَهُمَا: كِتَابَ اللهِ وَسُنَّتِي  (صححه الالباني في الجامع)
অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে আমি দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যদি তোমরা সেগুলোকে আঁকড়ে ধর তাহলে কখনও পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ। (ছহীহ, জামে সগীর)।
২। সে দলের অনন্য বৈশিষ্ট্য হল, তারা নিজেদের মাঝে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে আল্লাহর নির্দেশ পালনার্থে সাথে সাথে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদিসের দিকে প্রত্যার্পণ করে।
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ
فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآَخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿النساء59﴾
অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ কর তাহলে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যার্পণ করাও- যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখ। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর। (সূরা নিসা, ৪ : ৫৯ আয়াত)।
আল্লাহ আরো বলেন :
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ﴿النساء65﴾
অর্থাৎ, অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। (সূরা নিসা ৪ : ৬৫ আয়াত)।
৩। এ দল আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার উপর কারও কথার প্রাধান্য দেয় না।
কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ﴿الحجرات1﴾
অর্থাৎ, হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রবর্তী হয়ো না এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।(সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১ আয়াত)
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন : আমার আশঙ্কা হচ্ছে, না জানি তোমাদের উপর আকাশ থেকে আযাবের পাথর বর্ষিত হয়। আমি তোমাদের বলি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে বলেছেন, আর তোমরা বল আবু বকর রা. ও উমর রা. এভাবে বলেছেন।
৪। নাজাতপ্রাপ্ত দলের আরো একটি পরিচয় হলো, সর্বক্ষেত্রে তারা তাওহিদকে অগ্রাধিকার দেয়। তাদের সব কথা ও কাজে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একত্ববাদের বিকাশ ঘটে, কেবল তাঁরই ইবাদত করে, তাঁর নিকটই সাহায্য প্রার্থনা করে, বিপদে তাঁকেই ডাকে, তাঁর নামেই যবেহ করে, নযর দেয়-মানত করে এবং তাঁর উপরই তাওয়াক্কুল করে। ইবাদত-বন্দেগি, বিচার-আচার, লেন-দেন এক কথায় জীবনের যাবতীয় কাজ-কর্ম আল্লাহ প্রবর্তিত শরিয়তের অনুবর্তিতায়ই সম্পাদন করে। এ গুলোর উপর ভিত্তি করেই মূলত: সত্যিকারের ইসলামী রাষ্ট্র গঠিত হয়। তবে তাওহিদকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে শিরকের বিষয়টিকে অবহেলা করলে চলবে না। অবশ্যই শিরককে বিতাড়িত করতে হবে জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে। বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশ প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ও ছোট-বড় শিরকের সমস্যায় জর্জরিত। আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত করণ কর্মসূচিকে স্বার্থক করতে হলে অবশ্যই সেসব শিরক নির্মূল করতে হবে। কারণ, তাওহিদের দাবিই হচ্ছে যাবতীয় শিরক দূর করা। শিরকের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে না তুলে এবং তাওহিদকে পশ্চাতে রেখে কোনো দলই আল্লাহর সাহায্য পেতে পারে না। পৃথিবীতে আগমনকারী সকল রাসূলই এসব কথার উত্তম নিদর্শন। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি নিজ জীবনে এ সত্য প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন স্বার্থকভাবে এবং পরবর্তিদের দেখিয়ে গিয়েছেন সে রাস্তা।
৫। এ দল ইবাদত, চরিত্র গঠন ও যাবতীয় কর্মে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে তাঁর সুন্নতকে জীবিত করে। ফলে, নিজেদের সমাজে তারা (স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের নান্দনিকতায়) অপরিচিত-অচেনা মত হয়ে যায়। এদের সম্বন্ধে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
إنَّ الاِسْلامَ بَدَأ غَرِيْبًا وسيعود غريبا كَمَا بَدَأ، فَطُوْبى لِلغُرَبَاءِ (رواه مسلم)
অর্থাৎ, ইসলাম শুরু হয়েছিল অপরিচিতর মত এবং আবার ফিরে আসবে অপরিচিতর মত যেমন শুরুতে ছিল। সেই অপরিচিতদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। (মুসলিম)।
ইমাম মুসলিম আরও বলেছেন :
فَطُوْبى لِلغُرَبَاءِ : اَلذِيْنَ يَصْلِحُونَ إذا فَسَدَ النَّاسُ. (رواه أبو عمرو والدانى بسند صحيح)
অর্থৎ, ঐ সমস্ত অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ যারা মানুষের সংশোধনে আত্মনিয়োগ করে যখন তারা নষ্ট হয়ে যায়। (ছহীহ, আবু আমর)।
৬। এ দল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার বাইরে অন্য কারও অন্ধ অনুসরণ করে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন নির্দোষ (গোনাহ থেকে পবিত্র), মনগড়া কোনো কথা বলেননি। তিনি ছাড়া অন্যান্য মানুষ যতই বড় হোন না কেন ভুল করতে পারেন। কেউই ভুল-ত্রুটির উর্দ্ধে নন।
এ প্রসঙ্গে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
كُلُّ بَنِى آدمَ خَطَّاءٌ وَ خَيرُ الْخَطًّائِيْنَ التَّوَّابُوْنَ (حسن رواه أحمد)
অর্থাৎ, আদম সন্তান প্রত্যেকেই ভুলকারী। ভুলকারীদের উত্তম ঐ ব্যক্তি যারা তওবা করে। (এবং ভ্রান্ত পথ হতে ফেরত আসে।) (আহমাদ, হাসান) ।
ইমাম মালেক র. বলেছেন, রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত এমন কোনো ব্যক্তি নেই যার সমস্ত কথা গ্রহণ করা যায়, অথবা পরিত্যাগ করা যায়।
৭। নাজাত প্রাপ্ত দল হল তারা যারা হাদিস ও কুরআন অনুযায়ী চলে। যাদের  সম্বন্ধে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
لا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أمَّتِى ظَاهِرِيْنَ عَلى الْحَقِّ لا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتّى يَأتِيَ أمْرُ الله (رواه مسلم)
অর্থাৎ, আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা হকের উপর প্রতিষ্ঠিত ও বিজয়ী থাকবে। আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামত) আসা অবধি যারা তাদের পিছপা-অপমান করবে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। (মুসলিম)
৮। এ দল চার মুজতাহিদ ইমামকে যথাযথ সম্মান করে। নির্দিষ্ট কারো অন্ধ অনুসরণ করে না। সকলের  থেকেই কুরআন ও ফিকাহ’র মাসআলা গ্রহণ করে। প্রত্যেকের কথাই গ্রহণ করে যদি সে কথা সহিহ হাদিসের সাথে মিলে যায়। তাদের অনুসরণের প্রকৃত রূপ এটিই। কারণ তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ অনুসারীদের সহিহ হাদিস অনুযায়ী আমল করার তাগিদ দিয়েছেন এবং হাদিসের সাথে সাঙ্ঘর্ষিক যাবতীয় মতবাদকে ত্যাগ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
৯। এ দল সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অন্যায় কাজে নিষেধ করে। বিদআতের সমস্ত রাস্তা ত্যাগ ও অস্বীকার করে। আরো অস্বীকার করে সে সব দলকে যারা ইসলাম ও উম্মতকে শতধা বিভক্ত করছে, দ্বীনের মধ্যে বিদআতের প্রবর্তন করছে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবিদের রাস্তা হতে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে।
১০। এ দল সকল মুসলিমকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবাদের আদর্শ আঁকড়ে ধরার প্রতি আহ্বান জানায়। যাতে তাঁরা পৃথিবীতে জয়যুক্ত হতে পারেন। এবং পরকালে আল্লাহর করুণা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাফায়াতে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারেন।
১১। এ দল ইসলাম ও শরীয়ত পরিপন্থী মানব রচিত আইন ও বিচারের বিরোধিতা করে। বরং এরা মানব জাতিকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কিতাব অনুযায়ী বিচার কায়েম করার প্রতি আহ্বান করে। আর এতেই রয়েছে তাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ। কারণ, এটি মহান আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান। তিনিই জানেন কিসে তাদের কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ। তাছাড়া এ কিতাব অপরিবর্তনীয়- সময়ের বিবর্তনের সাথে কখনোই এর পরিবর্তন হবে না। এটি সর্ব কালের সর্ব শ্রেণীর লোকদের জন্য প্রযোজ্য। বর্তমান বিশ্বমানবতা বিশেষ করে মুসলমানদের দুর্ভোগ ও পেরেশানির অন্যতম কারণ হচ্ছে তারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান বাদ দিয়ে মানব রচিত অসার সংবিধানে বিচার কার্য পরিচালনা করছে। জীবনাচারে কোরআন ও সুন্নাহর অনুবর্তন অনুপস্থিত। তাদের অপমান-অপদস্ত হবার এটিই মূল কারণ। এ অবস্থার পরিবর্তন কখনোই হবে না যদি না তারা পরিপূর্ণরূপে ইসলামের শিক্ষার দিকে ফিরে আসে। ব্যক্তিগতভাবে হোক বা সমষ্টিগতভাবে। সামাজিকভাবে হোক কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ (الرعد 11)
নিশ্চয় আল্লাহ কোনো কওমের অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। (সূরা রাদ, ১৩: আয়াত ১১)।
১২। এ দল সকল মুসলিমকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের প্রতি আহ্বান করে। জিহাদ সার্মথ্য অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিমের উপর ফরজ। তবে সে জিহাদ হতে হবে নীচের নিয়ম অনুযায়ী,
প্রথমত: জিহবা ও লেখনীর মাধ্যমে। মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষকে সত্যিকারের ইসলাম আঁকড়ে ধরার দাওয়াত দিতে হবে। আরো দাওয়াত দিতে হবে শিরকমুক্ত তাওহিদ লালন করার প্রতি। আর এ দিকটির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে, কারণ শিরক আজ বেশীর ভাগ মুসলিম দেশে ছড়িয়ে পড়েছে মহামারির মত। এ সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছেনঃ
لا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتّى تَلْحَقَ قَبَائِلٌ مِنْ أمَّتِى بِالْمٌشْرِكِيْنَ وَ حَتَّى تَعْبُدَ قَبَائِلٌ مِنْ أمَّتِي الْاوْثَانَ (صحيح رواه أبو داود ومعناه في مسلم)
অর্থাৎ, কিয়ামত সংগঠিত হবে না যতক্ষণ না আমার উম্মতের কিছু কবিলা মুশরিকদের সাথে মিলে যায় এবং যতক্ষণ না আমার উম্মতের কিছু কবিলা (পাথরের) মূর্তি পূজা করে। (আবু দাউদ, সহিহ)।
দ্বিতীয়ত: সম্পদের মাধ্যমে। যেমন ইসলাম প্রচার ও দাওয়াত কাজে সম্পদ ব্যয় করা। এ সংক্রান্ত বই-পত্র ছাপিয়ে বিতরণ করা। দুর্বল ঈমানদারদের ঈমানকে মজবুত করে তুলতে বহুমুখী কর্মসূচী গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন কল্পে ব্যয় করা।
তৃতীয়ত: জীবন দিয়ে জিহাদ করা। যেমন, ইসলামকে জয়যুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করা। যাতে আল্লাহর কালেমা ঊঁচু হয় এবং কাফিরদের কথা নীচু হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন :
جَاهِدُوْا الْمُشْرِكِيْنَ بِأًمْوالِكُمْ وَ اَنْفُسِكُمْ وَالْسِنَتِكُمْ (صحيح رواه أبو داود)
অর্থাৎ, তোমরা নিজ সম্পদ, জীবন ও জিহ্বার মাধ্যমে মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর। (আবু দাউদ, সহিহ)।
জিহাদের প্রকার ও তার বিধান
১। ফরযে আইন
কাফিররা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রকে আক্রমন করলে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা সকল মুসলমানের উপর সমানভাবে ফরয হয়ে পড়ে। যেমন অধুনা ফিলিস্তীন। যা আজ ইহুদিরা জোর করে দখল করে আছে। এদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে মাসজিদুল আকসাকে মুক্ত করার জন্য জান-মাল দিয়ে অব্যহত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সামর্থবান সকল মুসলমানের উপর ফরজ। এ দায়িত্বে কেউ অবহেলা করলে অথবা পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করলে জিহাদ শুরা করা পর্যন্ত সকলে পাপী বলে সাব্যস্ত হবে।
২। ফরযে কিফায়া
প্রয়োজনীয় সংখাক মুসলিম এ জিহাদের জন্য তৈরী হয়ে গেলে বাকীরা দায়মুক্তি পেয়ে যাবে।
তবে পৃথিবীর সকল মানুষ যাতে ইসলামি বিধান মেনে চলতে শুরু করে সে লক্ষ্যে ইসলামের দাওয়াত দুনিয়া ব্যাপি  ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এ কাজে কেউ বাধা দিলে দাওয়াতের কাজ নির্বিঘ্ন করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে।
মুক্তিপ্রাপ্ত দলের নিদর্শনসমূহ
প্রথমত: এদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জন্য নিম্নোক্ত দুআ করেছেন :
طُوْبى لِلغُرَبَاءِ: أُنَاسٌ صَالِحُوْنَ فِى أُنَاسٍ سُوءٍ كَثِيْرٍ مَنْ يَعْصِيْهِمْ أَكْثَرُ مِمَّنْ يُطِيعُهُمْ (صحيح رواه أحمد)
অর্থাৎ, সুসংবাদ সে সব অপরিচিতদের জন্য । কিছু সৎলোক যারা অনেক অসৎ লোকের মাঝে (বসবাস করবেন) । তাদের যারা অমান্য করবে তাদের সংখ্যা মান্যকারীর সংখ্যা অপেক্ষা অধিক হবে। (আহমেদ, সহিহ)।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাদের প্রশংসা করে বলেনঃ
وَقَلِيلٌ مِنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ ﴿سبا 13﴾
অর্থাৎ, এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ। (সূরা সাবা, ৩৪ : ১৩ আয়াত)।
দ্বিতীয়ত:
তাদের সঙ্গে বেশীর ভাগ লোকেরা শত্রুতা করে। তাদের উপর নানাবিধ দোষারোপ করে। নানা রকম বিকৃত নাম দিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। নবীদের সাথে যে দুর্ব্যরবহার করা হত ঠিক সে রকম ব্যবহার তাদের সাথেও করা হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাদের সম্বন্ধে বলেন :
وَكَذَلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنْسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا )الانعام 112)
অর্থাৎ, আর এভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর শত্রু করেছি মানুষ ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানদেরকে, তারা প্রতারণার উদ্দেশ্যে একে অপরকে চাকচিক্যপূর্ণ কথার কুমন্ত্রণা দেয়। (সূরা আন্‌আম, ৬: ১১২ আয়াত)।
আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মানুষদের তাওহিদের দিকে ডেকেছিলেন তখন তাঁর কওমের লোকেরা তাঁকে চরম মিথ্যাবাদী ও যাদুকর বলেছিল। অথচ পূর্বে তারা তাঁকে সত্যবাদী ও বিশ্বাসী বলে অভিহিত করত।
গ্রান্ড মুফতি শায়খ বিন বাযকে এঁদের সম্বন্ধে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেনঃ
তাঁরাই ওরা, যারা সকল কাজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবিদের অনুসরণ করে এবং সালাফে সালেহীনের রাস্তায় চলে।
কারা জয়যুক্ত দল?
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্বন্ধে বলেছেন :
لا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أمَّتِى ظَاهِرِيْنَ عَلى الْحَقِّ لا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتّى يَأتِيَ أمْرُ الله (رواه مسلم)
অর্থাৎ, আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা হকের উপর প্রতিষ্ঠিত ও বিজয়ী থাকবে। আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামত) আসা অবধি যারা তাদের পিছপা-অপমান করবে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। (মুসলিম)
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেনঃ
إذا فَسَدَ أهْلُ الشَّامِ فلا خيْرَ فِيْكُمْ وَلا تَزالُ طَائِفَةٌ مِنْ أمَّتي مَنْصُورُونَ لا يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتّى تَقُومُ الساعَةُ (صحيح رواه أحمد)
অর্থাৎ, যখন সিরিয়াবাসীরা ফিৎনা ফাসাদে লিপ্ত হয়ে যাবে তখন তোমাদের মধ্যে কোনো মঙ্গল নেই। আমার উম্মতের একদল সর্বদাই জয়যুক্ত হবে কিয়ামাহ পর্যন্ত। যারা তাদের অপদস্ত করতে চাবে তারা তাদের কোনোই ক্ষতি করতে পারবে না। (আহমদ, সহিহ )।
৩। ইমাম ইবনে মোবারক রহ. বলেছেন : তারা হলেন হাদিসের অনুসারী।
৪। ইমাম বুখারি রহ. স্বীয় উস্তাদ আলী ইবনে মাদানী রহ. থেকে উদ্ধৃত করে বলেছেন : তারা হচ্ছেন হাদিসের অনুসারী।
৫। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. বলেছেন: যদি তারা হাদিসের আনুসারী না হন, তাহলে জানি না তাঁরা কারা।
৬। ইমাম শাফেয়ী রহ. ইমাম আহমাদ রহ.-কে বলেছেন : হাদিস সম্বন্ধে তোমরা আমার চেয়ে অভিজ্ঞ। কোনো সহিহ হাদিসের সন্ধান পেলে আমাকে জানাবে। তা হতে আমি মাযহাব (মতবাদ) উৎসারিত করব। হাদিসটি যারাই বর্ণনা করুক, হেজাজবাসী কি কূফাবাসী কিংবা বসরাবাসী।
৭। প্রতি কাজে তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ খুঁজে বের করে সে অনুযায়ী আমল করে। তাঁর চরিত্রের রঙে রঞ্জিত হতে চায়। কোনো ব্যক্তির অন্ধ অনুসরণ করে না। সর্বক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহর অনুসরণ করে।
৮। খতীব বাগদাদী রহ. তাঁর আহলুল হাদিস কিতাবে লিখেছেন, কোরআন-সুন্নাহ বাদ দিয়ে যারা নিজ রায় ও মতবাদ অনুযায়ী আমল করে। তারা যদি সে সব উপকারী ইলম নিয়ে ব্যস্ত হত এবং সব বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত তালাশ করত তাহলে দেখতে পেত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতই তাদের জন্য যথেষ্ট। কারণ মহান আল্লাহর একত্ববাদের সূত্রগুলো, তাঁর  সিফাতসমূহ, জান্নাত-জাহান্নামের খবরদি সুসংবাদ হোক কিংবা দু:সংবাদ- সবই হাদীসে বিদ্যমান।
আরও বিদ্যমান- মুত্তাকী ও পাপীদের জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাত ও জাহান্নামে কি কি নেয়ামত ও শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন। আসমান-যমীনে তিনি কি কি সৃষ্টি করেছেন।
তাতে রয়েছে পূর্ববর্তী নবীদের ঘটনাসমূহ, দুনিয়া বিমুখ আল্লাহর ওলীদের ঘটনাবলী, ফিকাহ শাস্ত্রবিদদের কথা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষণ ও তাঁর মোজেযাসমূহ। আরো রয়েছে পবিত্র কুরআনের তাফসীর, বিশেষ বিশেষ ঘটনাপঞ্জী, জ্ঞানগর্ভ আলোচনা এবং সাহাবায়ে কেরামের নানা বক্তব্য- যার মধ্যে অনেক শরয়ী হুকুমের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা রাসূলের হাদিসকে করেছেন শরীয়তের মূল ভিত্তি । এর মাধ্যমে নিকৃষ্ট বিদআদসমূহকে ধ্বংস করেছেন।
হাদিস পন্থীরা হচ্ছেন তাঁর সৃষ্টির মাঝে সবচে আম