দানে বাড়ে সম্পদ বৃদ্ধি পায় মর্যাদা


দানে বাড়ে সম্পদ বৃদ্ধি পায় মর্যাদা

আল্লাহ তাআলা চাইলে সব মানুষকে ধনী বানিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি । আসলে বিত্তশালীরা, বিত্তহীনদের সাথে কেমন আচরণ করে আল্লাহ তাআলা তা দেখতে চান। চলমান সময়ে মুসলমানদের অধিকাংশই আল্লাহর কোনো বিধানই যথাযথভাবে পালন করছে না। মুসলিম সমাজ যদি জাকাত, সদকা সম্বন্ধে আল্লাহর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করত;  তবে বিশ্ব মুসলিম আজকের মত দারিদ্র্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হতো না। মুসলমানদের সকল কাজে মৌলিক একটি উদ্দেশ্য থাকে, আর তাহলো আল্লাহর রেজামন্দি বা সন্তুষ্টি। যে কোনো দাতা দানের প্রাক্কালে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কাজটি সম্পাদন করেন তাহলে এতে তার অফুরন্ত সাওয়াবও হবে এবং সম্পদও বৃদ্ধি পাবে ।صَدَقَةٌ  ‘সাদাকাতুন’ একটি আরবি শব্দ, বাংলা অর্থ হলো: দান করা। আর এ দান প্রধানত: দুই প্রকার,

এক, ওয়াজিব যা অপরিহার্য ও বাধ্যতামূলক ।

যেমন,

(১) নিসাবের মালিক তথা শরিয়ত নির্ধারিত নির্দিষ্ট পরিমাণ মালের মালিক হলে প্রতি বছর নির্ধারিত হারে অর্থের জাকাত দেওয়া ও জমিনে উৎপন্ন শস্যাদির ওশর প্রদান করা।

(২) সামর্থ্য থাকলে প্রতি বছর কোরবানি করা।

আর এ শ্রেণীর দানগুলো সাধারণত: একটা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই সম্পন্ন করতে হয়। যথা জমাকৃত বা সঞ্চিত অর্থের উপর যখন এক বছর পূর্ণ হবে তখন তাতে জাকাত ফরজ হবে এবং তা থেকে নির্ধারিত হারে জাকাত দিতে হবে। উৎপাদিত শস্যাদি মাড়াই শেষে যখন ঘরে উঠবে, তখন তা থেকে ওশর আদায় করতে হবে। উল্লেখ্য, শস্যাদির ক্ষেত্রে বছর পূর্ণ হওয়া পূর্ব শর্ত নয়। তাই এ ওশর প্রদান একই বছরে একাধিকবারও হতে পারে। যেমন ইরিধানের মৌসুম শেষে যদি আমন ধানও নিসাব পরিমাণ হয়, তবে তা থেকেও একই বছরে পুনরায় ওশর দেয়া অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে ইরিধানের ওশর দেয়া হয়েছে বলে আমনের ওশর দেয়া থেকে বিরত থাকা চলবে না। অন্যথায় ওশর অনাদায়ের আজাব ভোগ করতে হবে। লক্ষণীয় যে এ জাতীয় বাধ্যতামূলক দান, সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য নয়। বরং কেবলমাত্র বিত্তশালী বা সামর্থবান ও ধনীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

(৩) রমজানের রোজার ফিৎরা প্রদান করা

(৪) নজর বা মানত পূর্ণ করা।

তিন ও চার নম্বর দানও বাধ্যতামূলক। তবে এ জাতীয় দান কেবলমাত্র ধনী নয় বরং ধনী গরিব নির্বিশেষে সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। এ ছাড়া এ শ্রেণীর দান তথা ফিৎরা আদায় ও মানত পূর্ণ করা দানগুলোও পূর্বোক্ত দানের ন্যায় একটা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রদান করা আব্যশক অর্থাৎ সর্বোচ্চ ঈদুল ফিতরের নামাজের পূর্বেই ফিৎরা আদায় করা এবং কৃত মানতের সময় সীমার মধ্যেই তা পূর্ণ করা জরুরি। অন্যথায় তা যথাযথভাবে আদায় বলে গণ্যে হবে না। তাই সংশ্লিষ্ট সকলকে এ ব্যাপারে সর্বাত্মক সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

দুই, নফল যা ইচ্ছাধীন।

আর এই দ্বিতীয় প্রকারের দান অর্থাৎ নফল বা সাধারণ দানসমূহ নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা যেমন: মসজিদ, মাদরাসা নির্মাণ করা, গরিব, এতিম, কাঙ্গাল, ভিক্ষুক ও ফকির-মিসকিনদের মাঝে সাধ্যমত দান করা, আত্মীয়, অনাত্মীয়,  মুসাফির এবং বিপদ ও ঋণগ্রস্ত কে সাহায্য করা ইত্যাদি। আর এ জাতীয় দান অধিকাংশ ক্ষেত্রে পূর্বোক্ত দানের ন্যায় সময়ের সাথে সম্পৃক্ত নয়। স্থান, কাল ও পাত্রভেদে কম বেশী এবং দানের প্রকৃতিও পরিবর্তন হতে পারে। মোট কথা অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া । এ ছাড়া দিবারাত্রির যে কোনো সময় ও যে কোনো স্থানে,  গোপনে ও প্রকাশ্যে দান করার সুযোগ রয়েছে। সুতরাং দাতা তার ইচ্ছা ও সামর্থ্য অনুযায়ী যে কোনো সময় নেক পথে দান করে উপকৃত হতে পারেন।

সেই সাথে এ কথা সকলকেই সবর্দা স্মরণ রাখতে হবে যে, সর্ব প্রকার দানই কেবলমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে হতে হবে, অন্য কোনো উদ্দেশে নয়। অন্যথায় সব দানই বিফলে যাবে এবং তার জন্য মহা বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। তখন শত আফসোস করেও কোনো লাভ হবে না। স্মরণযোগ্য যে, বৈধ উপার্জন থেকে নেক নিয়তে প্রদত্ত সকল প্রকার দান খয়রাতই নি:সন্দেহে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। তাই দান খয়রাতের বিপরীত চিন্তা চেতনা ও ধ্যান ধারণা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার জন্য আপ্রাণ চেস্টা করা প্রতিটি দ্বীনদার ও সচেতন মুসলমানের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য।

জাকাত বা ওশর প্রসঙ্গ

زكاة জাকাত এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে বৃদ্ধি ও পবিত্র হওয়া। ইসলামি পরিভাষায় জাকাত বলা হয়, শরিয়তের নির্দেশ অনুযায়ী স্বীয় মালের একটা নির্ধারিত অংশ তার হকদারদের মাঝে বন্টন করা এবং তার আয় হতে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা।

عُشْرٌ  ওশর এর অর্থ হচ্ছে উৎপন্ন শস্যের এক দশমাংশ দান করা। অর্থাৎ বৃষ্টির পানিতে ও বিনা সিঞ্চনে উৎপাদিত শস্যের দশ ভাগের এক ভাগ বা বিশ মণে দুই মণ, আর সিঞ্চনের মাধ্যমে উৎপাদিত হলে নিসফ ওশর বা বিশ মণে এক মণ বর্ণিত নিয়মানুসারে দান করে দেয়া।

উল্লেখ্য, হিজরি ২য় সনে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে জাকাত বিস্তারিত বিবরণসহ ফরজ হয়।
স্মর্তব্য,  জাকাত আদায়ের মাধ্যমে মাল-সম্পদ বৃদ্ধি পায় ও পবিত্র হয়। আর আদায়কারী (জাকাত দাতা) কৃপণতার দোষ হতে প্রবিত্রতা লাভে ধন্য হয়। সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলাও খুশি হন। বস্তুত: জাকাত হচ্ছে ইসলামের ৩য় স্তম্ভ। যেমন হাদিসে বলা হয়েছে:

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর স্থাপিত। এক. সাক্ষ্য দেয়া যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো (সত্য) মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রাসূল। দুই. নামাজ কায়েম করা। তিন. জাকাত প্রদান করা। চার.  হজ্জ সম্পাদন করা। পাঁচ. রমজান মাসে রোজা রাখা। বোখারি।
এ হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাকাতকে ইসলামরে ৩য় স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে জাকাতের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই তো দেখা যায় পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অনেক বেশি পরিমাণে এর উপকারিতার বর্ণনা এসেছে। প্রায় জায়গাতেই নামাজের পাশাপাশি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জাকাত প্রদানের নির্দেশ দিয়ে নামাজের মতই এর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। পার্থক্য এই যে নামজ কায়িম করা প্রাপ্ত বয়স্ক ধনী গরিব নির্বিশেষে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক, আর জাকাত আদায় করা কেবল ধনীদের জন্য ফরজ। এছাড়া নামাজের হুকম দৈনিক পাঁচ বার পালনীয়। আর জাকাত প্রতি বছর মাত্র একবার আদায় করা কর্তব্য। বস্তুত: নামজ হচ্ছে ইবাদতে বদনি বা শারীরিক ইবাদত, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের দ্বারা সম্পাদন করতে হয়। আর জাকাত হচ্ছে, ইবাদতে মালী বা আর্থিক ইবাদত যা সাধারণত: অর্থ, সম্পদ ব্যয় ও দানের মাধ্যমে সম্পাদন করতে হয়।

জাকাত প্রদানের নির্দেশ অবশ্য পালনীয়। এ ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআনুল কারিমে অনেক আয়াত নাজিল করেছেন। বিশেষত: নামাজের নির্দেশের পরপরই জাকাতের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই জাকাতের গুরুত্বকে কোনোক্রমেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অপরিহার্য বা বাধ্যতামূলক দানসমূহের মধ্যে জাকাতই হচ্ছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাপকদের অভাব পূরণে প্রধানতম সহায়ক দান। তাই এখানে জাকাতের গুরুত্ব ও ফজিলত এবং জাকাত না দেয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।

নামাজের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:
‘আর তোমরা সালাত কায়েম কর ও জাকাত দাও এবং যে নেক আমল তোমরা নিজেদের জন্য আগে প্রেরণ করবে তাই আল্লাহর নিকট পাবে। সূরা বাকারা, ১১০

জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে বলেন:
‘ তুমি তাদের মাল হতে সদকাহ (জাকাত) গ্রহণ কর। যা দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে। ( সূরা তাওবা : ১০৩)

জাকাত ও ওশর গ্রহণ এবং উত্তম বস্তু ব্যয়ের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:
হে মুমিনগণ, তোমরা ব্যয় কর উত্তম বস্তু, তোমরা যা অর্জন করেছ এবং আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা উৎপন্ন করেছি তা থেকে এবং নিকৃষ্ট বস্তুর ইচ্ছা করো না যে, তা থেকে তোমরা ব্যয় করবে। অথচ চোখ বন্ধ করা ছাড়া যা তোমরা গ্রহণ করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, সপ্রশংসিত। (সূরা বাকারা: ২৬৭)

জাকাত ফরজ হওয়া সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম. বলেন:

‘ছুমামা বিন আব্দুল্লাহ বিন আনাস বলেন, আনাস রাদিয়াল্লাহু তাকে বলেছেন যে, তাকে যখন খলিফা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বাহরাইনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠাচ্ছিলন, তখন তাকে এ নির্দেশ নামাটি লিখে দিয়েছিলেন। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এটা ফরজ সদকা বা জাকাত যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের প্রতি ফরজ করে দিয়েছেন এবং যার নির্দেশ আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে দিয়েছেন। যে কোনো মুসলমানের নিকট এটা নির্দিষ্ট নিয়মে চাওয়া হবে, সে যেন তা দিয়ে দেয়। আর যার নিকট এর অধিক চাওয়া হবে সে যেন না দেয়। ……..বোখারি।

একই বিষয়ে অপর এক হাদিসে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

‘ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত,  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়ায বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়েমের উদ্দেশ্যে পাঠানোর সময় বললেন: তুমি আহলে কিতাবদের নিকট যাচ্ছ। তুমি প্রথমে তাদেরকে এ ঘোষণা বা সাক্ষ্য দিতে আহবান জানাবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো (সত্য) উপাস্য নেই। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল। যদি তারা তোমার এ কথা মেনে নেয়, তবে তাদেরকে বলবে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। অত:পর তারা যদি এটাও মেনে নেয় তখন তাদেরকে বলবে যে, আল্লাহ তাদের উপর সদকা (জাকাত) ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের নিকট হতে গ্রহণ করে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করা হবে। যদি তারা তোমার এ কথা মেনে নেয় তবে সাবধান!  জাকাত গ্রহণের সময় তুমি বেছে বেছে শুধু তাদের উত্তম জিনিসসমূহ নিবে না। আর সতর্ক থাকবে মজলুমের অভিশাপ হতে। কেননা মজলুমের বদদুআ ও আল্লাহর মধ্যে কোন আড়াল নেই। বোখারি।

জাকাত ফরজ হওয়ার প্রমাণে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াত নাজিল হল, ‍‍‍‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌যারা সোনা রুপা জমা করে’ মুসলমানদের নিকট এটা কষ্টসাধ্য বোধ হলো। অত:পর ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: আমি তোমাদের এ কষ্ট দূর করব। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট গেলেন এবং বললেন: হে আল্লাহর নবী! এ আয়াতটি আপনার সহচরদের উপর ভারিবোধ হচ্ছে। তখন তিনি বললেন: ‌‌‌‌’ আল্লাহ তাআলা এজন্যই জাকাত ফরজ করেছেন, যাতে তোমাদের অবশিষ্ট মালকে পবিত্র করে নেন। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ মীরাস ফরজ করেছেন। যাতে তা তোমাদের পরবর্তীদের জন্য হয়। এ কথা শুনে উমর রা. ‌’আল্লাহু আকবার’  বলে উঠলেন। অত:পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: আমি কি তোমাকে মানুষ যা সংরক্ষণ করে, তার মধ্যে উত্তম কোনটি সে বিষয়ে বলব না ? সেটি হলো নেককার নারী (স্ত্রী), যখন সে তার দিকে তাকায় সন্তুষ্ট (ও আনন্দিত) করে দেয়। যখন কোনো নির্দেশ দেয় তা পালন করে আর যখন সে তার নিকট হতে দূরে থাকে সে তার হক সংরক্ষণ করে। ( বর্ণনায় আবু দাউদ)

বাধ্যতামূলক দানসমূহের মধ্যে জাকাত ও ওশর প্রদানের হুকুম যে অবশ্য পালনীয়, তার প্রমাণে আল্লাহর পবিত্র কালাম কোরআন মাজিদের পাশাপাশি উপরের তিনটি হাদীসও বিশেষভাবে প্রনিধান যোগ্য। যাতে বিদালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে জাকাতের ফরজিয়ত বা আবশ্যিকতা বিবৃত হয়েছে। ফলে জাকাত ফরজ হওয়ার ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। 

জাকাত অস্বীকারীর পরিণতি

জাকাত না দেয়ার পরিণতি সম্পর্কে সহিহ মুসলিমে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে,

‘যায়েদ বিন আসলাম হতে বর্ণিত, আবু সালেহ যাকওয়ান তাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলতে শুনেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক সোনা রুপার মালিক যে এর হক আদায় করে না, কিয়ামতের দিন তার জন্য আগুনের বহু পাত বানানো হবে, অত:পর সেগুলোকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে ছেকা দেয়া হবে। যখনই তা ঠাণ্ডা হয়ে আসবে, পুনরায় গরম করা হবে অর্থাৎ এভাবে তার শাস্তি হতে থাকবে। সেই দিনে, যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছেরর সমান। চলতে থাকবে এ আজাব যতক্ষণ না বান্দাদের বিচার শেষ হবে। অত:পর সে তার পথ দেখতে পাবে জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে

‘জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূর ! উট সম্পর্কে কী হুকম ? অর্থাৎ কেউ যদি উটের জাকাত না দেয়, তার কী হবে? তিনি বললেন: উটের মালিক, যে তার জাকাত না দিবে, আর তার হকসমূহ থেকে পানি পানের তারিখে তার দুধ দোহন করাও একটি হক। যখন কিয়ামতের দিন আসবে, নিশ্চয় সেদিন তাকে এক সমতল ধু ধু ময়দানে উপুড় করে ফেলা হবে, আর তার উটের একটি বাচ্চাও সেদিন হারাবে না, আর তাকে তাদের ক্ষুর দ্বারা মাড়াতে থাকবে,  এবং মুখ দ্বারা কামড়াতে থাকবে। এভাবে যখন শেষদল অতিক্রম করবে পুন:রায় প্রথমদল এসে পৌছবে। এরূপ করা হবে সেই দিনে যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে ফয়সালা চূড়ান্ত না হবে। অত:পর সে তার পথ দেখতে পাবে জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে।
ِ ‘জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল ! গরু এবং ছাগলের ক্ষেত্রে কী হবে ? তিনি বললেন; গরু ছাগলের মালিক যে তার হক আদায় করবে না অর্থাৎ জাকাত দিবে না, কিয়ামত দিবসে অবশ্যই তাকে এক ধু-ধু মাঠে উপুড় করে ফেলা হবে আর তার গরু ছাগলগুলির একটিও অনুপস্থিত থাকবে না, এবং তাতে একটিও ল্যাংড়া, শিং বিহীন ও কান কাটা হবে না। সেগুলো তাকে শিং দিয়ে মারতে থাকবে, ও ক্ষুর দ্বারা মাড়াতে থাকবে। যখন তাদের প্রথমদল অতিক্রম করবে, শেষদল এসে পৌছবে। এরূপ করা হবে সেদিন যেদিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর বান্দাদের বিচারকার্য শেষ না হবে। অত:পর সে তার পথ দেখতে পাবে জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে।
‘তারপর বলা হলো, হে আল্লাহর রসূল !  ঘোড়ার হুকুম কী?  তিনি বললেন: ঘোড়া তিন প্রকারের (ক) কারো জন্য গুনাহর কারণ (খ) কারো জন্য ঢাল স্বরূপ (গ) কারো জন্য সাওয়াবের উপকরণ স্বরূপ । যে ঘোড়া তার মালিকের জন্য গোনাহের কারণ, তা হলো সে ব্যক্তির ঘোড়া, যে তাকে বেধে রেখেছে লোক দেখানো, গর্ববোধ এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতার উদ্দেশ্যে, এ ঘোড়া হলো মালিকের জন্য গুনাহের কারণ। আর যে ঘোড়া তার মালিকের পক্ষে ঢাল স্বরূপ, তা হলো সে ব্যক্তির ঘোড়া যে তাকে আল্লাহর রাস্তায় বেধেছে অপ:পর তার ও তার পিঠ সম্পর্কে আল্লাহর হক বি:স্মৃত হয়নি । এ ঘোড়া হলো তার ঢাল স্বরূপ। আর যে ঘোড়া মালিকের পক্ষে সাওয়াবের কারণ, তা হলো সে ব্যক্তির ঘোড়া যে তাকে বেধেছে কোনো চারণ ভূমিতে বা ঘাসের বাগানে শুধু আল্লাহর রাস্তায় মুসলমানের জন্য। তখন তার ঘোড়া চারণভূমি অথবা বাগানের যা কিছু খাবে, সে পরিমাণে তার মালিকের জন্য নেকি লেখা হবে। আরো লেখা হবে তার গোবর ও প্রস্রাব সমপরিমাণ নেকি। আর যদি ঘোড়া তার রশি ছিড়ে একটি কিংবা দুটি মাঠও বিচরণ করে তবে নিশ্চয় তার পদচিহ্ন ও গোবরসমূহ পরিমাণ নেকী মালিকের জন্য লেখা হবে। আর যদি ঘোড়ার মালিক কোন নদীর পাশ দিয়ে অতিক্রম কালে ঘোড়া ঐ নদী থেকে পানি পান করে অথচ মালিকের পান করানো ইচ্ছা ছিল না। তার পরও আল্লাহ তাআলা পানি পানের পরিমাণ তাকে সাওয়াব দান করবেন।
‘অত:পর তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! গাধার ক্ষেত্রে হুকুম কী?  তিনি বললেন: গাধার ব্যাপারে আমার প্রতি কিছু অবর্তীণ হয়নি, ব্যাপক অর্থবোধক এই আয়াতটি ব্যতীত যার অর্থ-যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ ভাল কাজ করবে, সে তা প্রত্যক্ষ করবে আর যে এক অণু পরিমাণ মন্দকাজ করবে, সে তা প্রত্যক্ষ করবে। (অর্থাৎ গাধার জাকাত দিলে তারও সাওয়াব পাওয়া যাবে)  [সহিহ মুসলিম]

জাকাত আদায় না করার শাস্তি

‘আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, অথচ সে তার জাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার জন্য তার সম্পদকে বিষধর (অজগর) সাপের রূপ ধারণ করানো হবে-যার দুই চোখের উপর দুটি কালো দাগ থাকবে । অত:পর তার গলার বেড়ী হয়ে তার মুখের দুদিক তাকে দংশন করতে থাকবে। এবং বলতে থাকবে আমি তোমার মাল, আমি তোমার সংরক্ষিত সম্পদ। অত:পর তিনি এই আয়াত পাঠ করলেন:
ﯲ   ﯳ  ﯴ  ﯵ  ﯶ    ﯷ  ﯸ  ﯹ  ﯺ
[বর্ণনায় সহিহ বোখারি, জাকাত অধ্যায় ]

উল্লেখিত বিষয়ে আল্লাহর নবী আরো বলেন:

‘আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কারো কারো সংরক্ষিত মাল কিয়ামতের দিন বিষাক্ত সাপ হবে, তা থেকে তার মালিক পলায়ন করতে চাইবে। কিন্তু উক্ত সাপ তাকে অনুসন্ধান করতে থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার নিজ আঙ্গুলসমূহ সাপের মুখে পুরে না দিবে। [মুসনাদে আহমদ]

জাকাত অস্বীকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ড

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করলেন।(আমাদের মাঝে তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত খলিফা) ছিলেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। এবং আরবদের অনেকেই কাফের হয়ে গেল। তখন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমারা কিভাবে মানুষের সাথে যুদ্ধ করব? অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আমি মানুষের সাথে যুদ্ধের আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি যতক্ষণ না তারা বলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। যখনই কেউ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল, সে আমার থেকে তার জান মাল রক্ষা করল। তবে ইসলামের অপরাপর বিধানের কারণে এবং তার হিসাব আল্লাহর উপর। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আল্লাহর কসম ! যে জাকাত এবং নামাজের মাঝে পার্থক্য করবে নিশ্চয়ই আমি তার সাথে যুদ্ধ করব। কেননা জাকাত হচ্ছে সম্পদের হক। আল্লাহর শপথ তারা যদি ছাগলের একটি বাচ্চা আমাকে দিতে অস্বীকার করে যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রদান করতো। তবও আমি তা না দেয়ার কারণে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন,  অত:পর আমি বুঝতে পারলাম আল্লাহ তাআলা (প্রকৃত সত্য উপলদ্ধি করার জন্য) আবু বকরের বক্ষ উন্মোচিত করে (তাওফিক) দিয়েছেন। এবং বুঝলাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সিদ্ধান্তই সঠিক।

বিভিন্ন সম্পদের নিসাবের পরিমান বর্ণনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, পাঁচ ওয়াসাকের কম খেজুরে জাকাত নেই। পাঁচ উকিয়া এর কম রূপাতে জাকাত নেই, পাঁচ যাউদ এর কম উটে জাকাত নেই। (বোখারি, মুসলিম)

(১)  ৬০ সা- এ এক ওয়াসাক হয়। আর এক সা সমান দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম সে হিসাব অনুযায়ী মোটামুটি ৫ ওয়াসাক সমান ২০ মণ। অর্থাৎ উৎপাদিত খেজুর ২০ মণ হলে তার উপর জাকাত ফরজ হয় এর কম হলে জাকাত ফরজ হবে না।

(২) ৪০ দিরহামে হয় এক উকিয়া। ৫ উকিয়া সমান ২০০ দিরহাম। ২০০ দিরহাম সমান সাড়ে বায়ান্ন তোলা। এর কম পরিমাণ রূপায় জাকাত ফরজ হয় না।

(৩) যাউদ, তিন হতে দশ পর্যন্ত উটের পালকে যাউদ বলে। এখানে হাদীসের মর্ম এই যে, 5 উটের কমে জাকাত ফরজ হয় না। যা অন্যান্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যেমন গরু ৩০ টির কম, ছাগল ভেড়া ৪০ টির কমে জাকাত ফরজ হয় না।

জাকাত- ওশর আদায়ে সর্তকতা

আদী ইবনে আমীরাহ আল কিনদী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, তোমাদের মধ্যে থেকে আমি যাকে কোনো কর্মে নিযুক্ত করি,  আর সে আমাদের নিকট হতে একটি সুচ অথবা তদপেক্ষা ছোট কিছু গোপন করে, তবে তা হবে খিয়ানত, যা নিয়ে সে কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। সহিহ মুসলিম,

জাকাত ফরজ হওয়ার সময় ও নিয়ম

عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ اسْتَفَادَ مَالًا فَلَا زَكَاةَ عَلَيْهِ حَتَّى يَحُولَ عَلَيْهِ الْحَوْلُ سنن الترمذي
‘ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: কারো অর্জিত সম্পদে জাকাত নেই যতক্ষণ না তার উপর এক বছর অতিবাহিত হয়। (তিরমিজি)

একই প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আরো একটি হাদীস

‘আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন। যখন তোমার নিকট দু‌’শত দিরহাম ( সাড়ে বায়ান্ন ভরি রূপা) জমা হয় এবং একটি বছর তার উপর পূর্ণ হবে, তখন তাতে ৫ দিরহাম জাকাত দিতে হবে। আর তোমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত জাকাত দিতে হবে না যতক্ষণ না তোমার নিকট ২০টি দীনার (সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ)  জমা হওয়ার পর এক বছর পূর্ণ হবে। এতে তোমাকে দিতে হবে (৪০ ভাগের এক ভাগ) অর্ধ দীনার। আর এর অধিক হলে, ঐ অনুপাতে হিসাব করে জাকাত দিতে হবে। বর্ণনাকারী বলেন: আমার জানা নেই ‘ঐ অনুপাতে হিসাব করে জাকাত দিতে হবে’ বাক্যটি আলী নিজে থেকে বলেছেন নাকি রাসূল সা. থেকে বর্ণনা করেছে। আর জমাকৃত কোনো সম্পদে এক বছর অতিবাহিত না হলে জাকাত দিতে হবে না। ( সুনান আবু দাউদ)

ওশর আদায় প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

‘সালেম বিন আব্দুল্লাহ তার পিতা হতে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে জমি আসমানের পানি এবং নদী খাল বিল প্রভৃতির পানি দ্বারা সিক্ত হয়েছে অথবা যে জমির মাটি খুব উর্বর ও রসালো, সে জমিতে উৎপাদিত ফসলের এক দশমাংশ ওশর দিতে হবে। আর যে জমিতে পানি সিঞ্চন করতে হয় তা হতে উৎপাদিত ফসলের বিশভাগের এক ভাগ অর্থাৎ অর্ধওশর দিতে হবে।
সুনান আবু দাউদে আরো একটু ব্যাখ্যা আছে, তাহলো জমির মাটি রসালো হলে দশ ভাগের একভাগ আর পশুর সাহায্যে অথবা অন্য কোনোভাবে সিঞ্চিত পানি দ্বারা উৎপাদিত ফসলের বিশভাগের একভাগ দিতে হবে।

অগ্রিম জাকাত প্রদান প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম:
عَنْ عَلِيٍّ أَنَّ الْعَبَّاسَ سَأَلَ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي تَعْجِيلِ صَدَقَتِهِ قَبْلَ أَنْ تَحِلَّ فَرَخَّصَ لَهُ فِي ذَلِكَ.  سنن الترمذي
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বছর পূর্ণ হওয়ার আগে অগ্রিম জাকাত প্রদান প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করলে তিনি তাকে অনুমতি দিয়েছেন। ( সুনান তিরমিজি)

কৃপণতা করে যারা জাকাত ও ওশর প্রদান করে না তাদের শাস্তি

মহান আল্লাহ বলেন:
আর যারা সোনা রূপা জমা করে রাখে অথচ তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না। তাদের যন্ত্রণাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দিন। যেদিন সেগুলো জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে, অত:পর তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ এবং তাদের পৃষ্ঠদেশসমূহে দাগ দেয়া হবে। ( এবং বলা হবে) এ হলো যা তোমরা তোমাদের জন্য সঞ্চয় করেছিলে, এখন তার স্বাদ গ্রহণ করো যা তোমরা সঞ্চয় করেছিলে। (সূরা তাওবা:৩৪-৩৫)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহ থেকে যাদের দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে, তারা যেন এরূপ মনে না করে যে তারা ভালো করেছে। বরং তা তাদের জন্য অমঙ্গলজনক। কিয়ামত দিবসে যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছে তা দিয়ে বেড়ি পরিয়ে দেয়া হবে। (সূরা আলে ইমরান : ১৮০)

অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে,
যারা কৃপণতা করে এবং মানুষকে কৃপণতার নির্দেশ দেয়, আর গোপন করে তা, যা আল্লাহ তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে দান করেছেন। আর আমি প্রস্তুত করে রেখেছি কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাকর আজাব। ( সূরা নিসা : ৩৭)

আরো ইরশাদ হচ্ছে
নিশ্চয় আমি এদেরকে পরীক্ষা করেছি,  যেভাবে পরীক্ষা করেছিলাম বাগানের মালিকদের। যখন তারা কসম করেছিল যে, অবশ্যই তারা সকাল বেলা বাগানের ফল আহরণ করবে। আর তারা ইনশা আল্লাহ বলেনি। অত:পর তোমার রবের পক্ষ থেকে এক প্রদক্ষিণকারী (আগুন) বাগানের ওপর দিয়ে প্রদক্ষিণ করে গেল,  আর তারা ছিল ঘুমন্ত। ফলে তা (পুড়ে) কালো বর্ণের হয়ে গেল। তারপর সকাল বেলা তারা একে অপরকে ডেকে বলল, তোমরা যদি ফল আহরণ করতে চাও তাহলে বাগানে যাও। তারপর তারা চলল, নিম্নস্বরে একথা বলতে বলতে যে, আজ সেখানে তোমাদের কাছে কোনো অভাবী যেন প্রবেশ করতে না পারে। আর তারা ভোর বেলা দৃঢ় ইচ্ছা শক্তি নিয়ে সক্ষম অবস্থায় (বাগানে) গেল। তারপর তারা যখন বাগানটি দেখল, তখন তারা বলল, অবশ্যই আমরা পথভ্রষ্ট। বরং আমরা বঞ্চিত। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাল ব্যক্তিটি বলল, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, তোমরা কেন (আল্লাহর) তাসবীহ পাঠ করছ না ?  তারা বলল, আমরা আমাদের রবের পবিত্রতা ঘোষণা করছি। অবশ্যই আমরা যালিম ছিলাম। তারপর তারা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করতে লাগল। তারা বলল, হায় আমাদের ধবংস! নিশ্চয় আমরা সীমা লঙ্ঘনকারী ছিলাম। সম্ভবত: আমাদের রব আমাদেরক এর চেয়েও উৎকৃষ্টতর বিনিময় দেবেন। অবশ্যই আমরা আমাদের রবের প্রতি আগ্রহী। এভাবেই হয় আজাব। আর পরকালের আজাব অবশ্যই আরো বড়, যদি তারা জানত। ( সূরা কলম: ১৭-৩৩)

মূলত: আয়াগুলোতে ঐতিহাসিক একটি ঘটনা আমাদেরকে অবগত করানোর জন্য অবর্তীণ হয়েছে। যা ঈসা আ: কে আসমানে উঠিয়ে নেয়ার কিছুকাল পরে সংঘটিত হয়। ইয়েমেনের রাজধানী সানআ শহর থেকে ৬ মাইল দূরে আয়াতে বর্ণিত বাগানটি অবস্থিত ছিল। বাগানের মালিক আসমানি কিতাবে বিশ্বাসী ছিল। বাগানের মালিক বাগান থেকে যে ফলমূল আহরণ করতেন তা থেকে একটি বৃহৎ অংশ গরিব মিসকিনদের মাঝে বিতরণ করতেন। এ কারণে ফল আহরণের সময় বিপুল সংখ্যক গরিব -মিসকিন সেখানে জমা হতো। এভাবে মিসকিনদের সাহায্য করা, বাগানের মালিকের চিরাচরিত অভ্যাসে পরিণত হলো। এ নেক কাজের বরকতে বাগানে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রচুর ফলন হতো। বাগানের মালিকের ইন্তেকালের পর তার ওয়ারিসগণ পিতার দানের সিলসিলাকে তাদের সুখের অন্তরায় মনে করল। বলল: আমাদের পিতা হলো আহমক। দান খয়রাত না করলে আমাদের সম্পদ অনেক জমা হতো। দান খয়রাত আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ফসল কাটার সময় হলে তারা পরামর্শ করে অতি সঙ্গোপনে খুব ভোরে ফসল কাটার সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করে নিল। যাতে ফকির মিসকিন জানতে না পারে। তারা দান না করার জন্য এতোই বেসামাল হয়ে পড়েছিল যে, ভোরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ইনশা আল্লাহ বলাও ভুলে গিয়েছিল। তাদের এই দূরভিসন্ধির কারণে সে রাতেই তারা ঘুমে থাকতেই বাগানে আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন আজাব আপতিত হলো যে, নিমিষের মধ্যেই সব পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। পরামর্শ মত ভোরে যখন তারা সেখানে পৌছলো, বাগানের ধবংসলীলা দেখে প্রথমে তারা ভাবলো আমরা রাস্তা ভুল করে এখানে এসে পড়েছি। পরক্ষণে বাগানের পাশের অন্যান্য চিহ্ন দেখে বুঝতে পারলো যে, রাস্তা ভুল হয়নি বরং এটা গরিবের হক নষ্ট করার মত কু-চিন্তার ফল । যদিও তারা পরক্ষণে আপনাপন ভুল বুঝতে পেরে তওবা করেছিল। তাফসিরে ইবনে কাসিরসহ অনেক তাফসির গ্রন্থে এ ঘটনার বর্ণনা এসেছে।

বনী ইসরাঈলের শিক্ষণীয় একটি ঘটনা:

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন। বনী ইসরাইলের মধ্যে তিন জন রুগ্ন ব্যক্তি ছিল, একজন শ্বেতকুষ্ঠ রোগী, একজন টেকো ব্যক্তি এবং অপরজন অন্ধ । আল্লাহ তাদের পরীক্ষা করার ইচ্ছা করলেন, তাই তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন।ফেরেশতা প্রথমে শ্বেতকুষ্ঠ রোগীর কাছে এসে বললেন: তোমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় বস্তু কী ? সে বলল উত্তম রং ও উত্তম চামড়া,  লোকজন আমাকে ঘৃণা করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, অত:পর ফেরেশতা তার শরীরে হাত বুলিয়ে নিলেন। ফলে তার ঘৃণার বস্তু দূর হয়ে গেল এবং তাকে উত্তম রং ও উত্তম চামড়া দান করা হলো। তারপর ফেরেশতা তাকে বলল: কোন সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয় সে বলল:  উট অথবা গরু (বর্ণনাকারীর সন্দেহ ) বর্ণনাকারী ইসহাক সন্দেহ করে বলেন যে, কুষ্ঠরোগী, অথবা মাথায় টাকপড়া ব্যক্তি এ দু’জনের একজন উট অপরজন গরু চেয়েছিলেন। অত:পর তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী মাদী উট দেয়া হল এবং ফেরেশতা দুআ করে বললেন: এতে তোমার বরকত হোক।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অত:পর ফেরেশতা টেকো ব্যক্তির নিকট এসে বললেন:  তোমার নিকট প্রিয় বস্তু কী ? সে বললো, উত্তম চুল ; যার কারণে মানুষ আমাকে ঘৃণা করে, তা আমার থেকে চলে যাওয়া। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে তার টাক দূর হয়ে গেল, তিনি বললেন: এবং তাকে উত্তম চুল দান করা হলো। ফেরেশতা বললেন:  তোমার নিকট কোন সম্পদ অধিক প্রিয় ?  সে বলল:  গরু। অত:পর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করা হলো। ফেরেশতা বললেন : তোমার এতে বরকত হোক।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: অত:পর ফেরেশতা অন্ধ লোকটির কাছে এসে বললেন: তোমার নিকট সর্বাধিক প্রিয় বস্তু কী? সে বললো, আল্লাহ যেন আমার চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেন, যা দ্বারা আমি লোকজন দেখতে পাই। নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:  ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত ফিরালেন, ফলে আল্লাহ তাআলা তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিকট কোন সম্পদ অধিক প্রিয়? লোকটি বলল, ছাগল। সুতরাং তাকে প্রসব সম্ভবা ছাগল প্রদান করা হল।
অত:পর প্রথমোক্ত দুজনের উট, গরু বাচ্চা জন্ম দিতে থাকলো, এবং শেষোক্ত জনের ছাগল ছানা প্রসব করতে থাকলো। এমনকি প্রত্যেকের এক উপত্যকা ভরা উট, এক উপত্যকা ভরা গরু এবং এক উপত্যকা ভরা ছাগল হয়ে গেল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তারপর সেই ফেরেশতা (লোকদেরকে পরীক্ষা করার জন্য) পূর্ব অবয়বে প্রথমোক্ত শ্বেতকুষ্ঠ রোগীর কাছে এসে বললেন: আমি একজন মিসকিন ব্যক্তি, মুসাফির, সফরে আমার সব সামর্থ্য শেষ হয়ে গেছে। এখন আল্লাহর দয়া ছাড়া নিজ ঘরে পৌঁছার কোনো উপায় নেই, অত:পর আপনার সাহায্য। আমি ঐ আল্লাহর নামে আপনার নিকট একটি উট কামনা করছি, যিনি আপনাকে এহেন সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া এবং অধিক পরিমাণ উট দান করেছেন, যাতে আমি আমার বাড়ি পৌছেতে পারি। লোকটি বলল: আপনার দাবী অনেক বড়। ফেরেশতা বললেন: মনে হয় যেন আমি আপনাকে চিনি। আপনি কি দরিদ্র, কুষ্ঠ রোগী ছিলেন না ? যাতে লোকজন আপনাকে ঘৃণা করতো। এবং দরিদ্র ছিলেন অত:পর আল্লাহ আপনাকে সম্পদশালী করেছেন। তখন লোকটি বলল: এসব ধন-সম্পদ আমি বংশানুক্রমে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছি। ফেরেশতা বলল: তুমি যদি মিথ্যাবাদী হও, তবে আল্লাহ তোমাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিন।
তারপর ফেরেশতা আপন ছুরতে টেকো ব্যক্তির কাছে এসে তাই বলল যা প্রথম ব্যক্তিকে বলল। উত্তরে টেকো ব্যক্তিও তাই বলল, যা প্রথম ব্যক্তি বলেছিল। অত:পর ফেরেশতা বলল: যদি তুমি মিথ্যাবাদী হও তবে আল্লাহ তোমাকে আগের মত বানিয়ে দিন।
ফেরেশতা পূর্ব অবয়বে পূর্ব বেশে অন্ধ ব্যক্তির নিকট এসে বললেন, আমি একজন দারিদ্র মুসাফির। সফরে আমার সব অর্থ শেষ হয়ে গেছে, বাড়ি পৌঁছার আল্লাহ ব্যতীত আর কোন উপায় নেই, অত:পর আপনার সাহায্য। যে আল্লাহ আপনার চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন, তার নামে আমি আপনার কাছে একটা ছাগল ভিক্ষা চাইছি, যা দ্বারা আমি আমার বাড়ি পৌছতে পারি। তখন সে বলল: আমি অন্ধ ছিলাম অত:পর আল্লাহ দয়া করে আমাকে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আপনি যা ইচ্ছা নিয়ে যান আল্লাহর জন্য আপনি যা নিবেন তাতে আমি কোনো বাধা দিব না। তখন ফেরেশতা বলল: আপনার সম্পদ আপনার কাছেই থাক। মূলত আল্লাহ আপনাদের পরীক্ষা নিয়েছেন। আল্লাহ আপনার উপর রাজি হয়েছেন আর আপনার দুইসাথীর উপর অসন্তষ্ট হয়েছেন। (সহিহ বোখারি)

দান সর্বাবস্থায় কল্যাণকর

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন। (অতীত কালে) এক ব্যক্তি বলল, অবশ্যই আমি একটি দান করব, অত:পর লোকটি স্বীয় দান নিয়ে বের হল, এবং তা (অজ্ঞাতসারে) এক চোরর হাতে অর্পণ করল। সকাল হলে লোকেরা বলতে লাগল, রাতে একজন চোরকে দান করা হয়েছে। লোকটি বলল:  হে আল্লাহ সকল প্রশংসা তোমার জন্য। অবশ্যই আমি আবার দান করব, এবলে লোকটি পুনরায় তার দান নিয়ে বের হলো, অত:পর তা একজন ব্যভিচারী নারীকে দান করল। সকালে লোকেরা বলাবলি করল, গত রাতে একজন ব্যভিচারী নারীকে দান করা হয়েছে। লোকটি বলল:  হে আল্লাহ সকল প্রশংসা তোমার জন্য। অবশ্য আমি আবারো দান করব। এবং সে আপন দান নিয়ে বের হল, এবার সে একজন ধনী লোককে দান করল। সকালে লোকেরা বলাবলি করতে লাগল, একজন ধনীকে দান করা হয়েছে। লোকটি বলল: হে আল্লাহ সকল প্রশংসা তোমার জন্যে যে, আমি চোর, বেশ্যা ও ধনীলোককে দান করতে সক্ষম হয়েছি। অত:পর তাকে (স্বপ্নের মাধ্যমে) বলা হলো যে, তোমার যে দান চোর পেয়েছে সম্ভবত: সে তা দ্বারা চুরি হতে বিরত থাকবে। আর বেশ্যা তা দ্বারা বেশ্যাবৃত্তি হতে বাঁচতে চেষ্টা করে নিজের পবিত্রতা অবলম্বন করবে। আর মালদার এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে অত:পর নিজেও দান করতে থাকবে যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন তা থেকে। (বর্ণনায় সহিহ বোখারি)
এখান থেকে শিক্ষনীয় বিষয় হলো, মূলত সকল কাজের প্রতিদান নিয়তের উপর নির্ভরশীল। লোকটির অজ্ঞাতসারে নিজ দান মন্দ লোকদের হাতে চলে যাওয়ার পরও লোকটি দানে নিরুৎসাহিত হয়নি। এখলাসের সাথে দান করলে কোনো আমলই বিনষ্ট হয় না। অজ্ঞাতসারে অপাত্রে দান চলে গেলেও দাতার সওয়াবের কমতি হয় না। বরং নিয়তের প্রভাবে ঐসব খারাপ লোকও ভালো হয়ে যায়। এ হাদিস তাই প্রমাণ করে।

দাতার জন্য ফেরেশতার দুআ

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,  প্রত্যহ ভোরেই দুই জন ফেরেশতা আসমান থেকে নেমে আসে। তাদের একজন বলে,  হে আল্লাহ!  ব্যয়কারীকে দানকর । অপরজন বলে, হে আল্লাহ! ব্যয় না করে যে ধরে রাখে (তার সম্পদ) ধবংস করে দাও। (সহিহ বোখারি)

জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা যুলুম থেকে বেচে থাক, কারণ যুলুম কিয়ামত দিবসের অন্ধকার। আর কৃপণতা হতে বেঁচে থাক, কারণ কৃপণতা তোমাদের পূর্বেকার লোকদের ধবংস করে দিয়েছে। উদ্ধুদ্ধ করেছে তাদেরকে রক্তপাত ঘটাতে এবং হারামকে হালাল করতে। ( সহিহ মুসলিম)

দুইটি স্বভাব মুমিন ব্যক্তির চরিত্র বিরোধী

আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লম বলেছেন: মুমিনের মাঝে দুইটি স্বভাব একত্র হতে পারে না, কৃপণতা ও অসৎচরিত্র।
(বর্ণনায় তিরমিজি, ইমাম আবু ঈসা তিরমিজি বলেন, এই হাদিসটি সনদের দিক থেকে গরিব। সাদাকাহ বিন মূসা হতেই কেবল আমরা তা জেনেছি।)

সাদাকাতুল ফিতর (বাধ্যতামূলক দানের ২য় প্রকার)

অবশ্যই আদায়াবশ্যিক দ্বিতীয় দানটি হচ্ছে সাদাকাতুল ফিতর। এটাকে আমরা বলতে পারি রমজানের রোজার ফিৎরা আদায় করা। এটা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলকেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদায় করতে হয়। স্পষ্টভাবে কোরআনে ফিৎরা আদায় বিষয়ে কোনো নির্দেশ নাই। তবে হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
রাসূলের সকল আদেশ নিষেধ আমাদের জন্য বিনা বাক্যে মেনে নেয়া ফরজ। ফলে কোরআনে বর্ণনা না আসলেও রাসূলের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত এ আমলটি সম্পাদন করা আমাদের জন্য আবশ্যিক বা ওয়াজিব।
এ ব্যাপারে বোখারি শরিফের মূল্যবান একখানা হাদিস হলো
আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমান গোলাম-স্বাধীন, পুরুষ-নারী এবং ছোট-বড় সকলের উপর এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব জাকাতুল ফিতর আদায় করা ফরজ করেছেন। এবং আদেশ করেছেন, লোকজনের ঈদগাহে যাওয়ার আগেই যেন তা আদায় করা হয়। (সহিহ বোখারি)

সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব কেন?

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অর্নথক কথা, অশ্লীল ব্যবহার হতে রোজাদারকে পবিত্র করা এবং মিসকিনদেরকে খাদ্য দানের জন্য সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। (সুনান আবি দাউদ)

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে সাদাকাতুল ফিতর প্রদান

أَنَّ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيَّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ يَقُولُ كُنَّا نُخْرِجُ زَكَاةَ الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ أَقِطٍ أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيبٍ. صحيح البخاري

আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু বলেছেন, আমরা জাকাতুল ফিরত আদায় করতাম এক সা’ করে খাদ্য অথবা যব অথবা খেজুর অথবা পনীর কিংবা আঙ্গুর থেকে। (সহিহ বোখারি)

কোরবানি (বাধ্যতামূল দানের ৩য় প্রকার)

কোরবানি সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলিম ব্যক্তি প্রতি বছর ঈদুল আজহার নামজ আদায়ের পর আদায় করবে। বহু পূর্ব হতে চলে আসা বিশেষ এ ইবাদতটি উম্মতে মুহাম্মদির এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এর ইতিহাস, গুরুত্ব ও ফজিলতের বিবরণ পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে এসেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন
প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরন করতে পারে,  যে সমস্ত জন্তু তিনি রিযক হিসেবে দিয়েছেন তার উপর। তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ অতএব তারই কাছে আত্মপসমর্পণ কর, আর অনুগতদেরকে সুসংবাদ দাও। (সূরা হজ্জ : ৩৪)

১.নিশ্চয় আমি তোমাকে আল-কাউসার দান করেছি। ২. অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং কোরবানি কর। ৩. নিশ্চয় তোমার প্রতি শত্রুতা পোষণকারীই নির্বংশ। ( সূরা কাউসার: ১-৩)

হাদিসে রাসূল ও কোরবানি

বারা ইবনে আজিব রাদিয়াল্লাহু আনাহু হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আজকের -ঈদের- দিনে আমাদের প্রথমে যা করতে হবে তা হল নামজ। অত:পর ফিরে গিয়ে আমরা কোরবানি করব। যে এ নিয়ম মানলো সে সুন্নতের উপর আমাল করল। আর যে নামজ আদায়ের আগে কোরবানি করল তা হবে সাধারণ গোশত যা নিজ পরিবারের জন্য ব্যবস্থা করল। এটা কোরবানি হবে না। ( সহিহ বোখারি)

عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ أَقَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالْمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ يُضَحِّي.
قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ . سنن الترمذي

ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ বছর মদিনায় অবস্থান করেছেন এবং প্রতি বছর কোরবানি করেছেন। ( সুনান তিরমিজি, সনদ হাসান)

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তির (কোরবানি করার) সামর্থ্য আছে অথচ কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে। ( সুনান ইবনে মাজাহ, সনদ হাসান)

মানত (বাধ্যতামূল দানের ৪র্থ প্রকার)

আপনার জন্য কাজটি করা ওয়াজিব বা ফরজ ছিল না। কিন্তু মানত করার মাধ্যমে আপনি তা আপনার জন্য আবশ্যক করে নিয়েছেন। যেমন, আপনি বললেন: আমার এবারের সন্তানটি যদি সহজভাবে প্রসব হয় তা হলে আমি আমাদের গ্রামের জামে মসজিদে দুই হাজার টাকা দান করব। বস্তুত সন্তান প্রসব হলে দুই হাজার টাকা দান করা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না। কিন্তু মানত করার মাধ্যমে আপনি আপনার জন্য তা বাধ্যতামূলক করে নিয়েছেন। এ প্রেক্ষিতে তা পুরা করা আপনার জন্য ওয়াজিব হয়ে গেল।

মহান আল্লাহর বাণী:
তার পর তারা যেন পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হয়, তাদের মানতসমূহ পূরণ করে এবং প্রাচীন ঘরের তাওয়াফ করে। ( সূরা হজ্জ : ২৯)

মানত করার জন্য ইসলামি শরিয়ত কাউকে বাধ্য করেনি। এবং মানত ভাগ্যের কোনো পরিবর্তনও করতে পারে না। তাই মানত করা একটি মুবাহ কাজ বলা যেতে পারে। কিন্তু মানত করার পর তা অবশ্যই পূরণ করতে হবে। মানত বিষয়ক বর্ণনা কোরআনের বহু জায়গাতে এসেছে। এবং মানত পূর্ণ সৎকর্মশীলদের একটি গুণ বলেও কোরআনে (সূরা দাহার: ৭) বর্ণিত হয়েছে।

শরিয়ত সম্মত মানতের নমুনা:

• আল্লাহ আমাকে এ রোগ থেকে আরোগ্য দান করলে , আমি দুইটি রোজা রাখবো। মসজিদে দুই হাজার টাকা দান করবো।
• এবার যদি আমার চাকুরি হয় প্রথম বেতনের টাকা গরিব মেসকিনদের দান করবো অথবা গরিব এলাকায় একটি টিউবঅয়েল স্থাপন করে এলাকার পানি সমস্যা দূর করবো।
• আমার ছেলে হলে তাকে মাদরাসায় পড়তে দিবো।

মানত পূর্ণ না করলে কাফফারা

عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ كَفَّارَةُ النَّذْرِ كَفَّارَةُ الْيَمِينِ صحيح مسلم

ওকবা ইবনে আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: মানতের কাফফারা কসমের কাফফারার অনুরূপ। ( সহিহ মুসলিম)

কসম বা শপথের কাফফারা হচ্ছে, দশজন দরিদ্রকে মধ্যম শ্রেণীর খাদ্য দান কিংবা বস্ত্র দান অথবা একজন ক্রতদাস মুক্ত করে দেয়া। আর যে ব্যক্তি এর কোনোটিরই সামর্থ্য রাখে না সে একাধারে তিন দিন রোজা রাখবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অর্থহীন কসমের ব্যাপারে, কিন্তু যে কসম তোমরা দৃঢ়ভাবে কর সে কসমের জন্য তোমাদের পাকড়াও করেন। সুতরাং এর কাফ্ফারা হল দশজন মিসকিনকে খাবার দান করা, মধ্যম ধরনের খাবার, যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে খাইয়ে থাক, অথবা তাদের বস্ত্র দান, কিংবা একজন দাস-দাসী মুক্ত করা। অত:পর সে সামর্থ্য রাখে না তবে তিন দিন সিয়াম পালন করা। এটা তোমাদের কসমের কাফফারা যদি তোমরা কসম কর, আর তোমরা তোমাদের কসমের হেফাজত কর। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা শোকর আদায় কর।(সূরা মায়েদা: ৮৯)

মানত সম্পর্কে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে । মানতও একটি ইবাদত অন্য সকল ইবাদতের মত এটাও হওয়া চাই একমাত্র আল্লাহর জন্য। কিন্তু আজ কাল এহেন একটি ইবাদতকে মানুষ আল্লাহর নামে না করে পীর, মাজার, কবর, খানকা, দরগা ইত্যাদির নামে করে থাকে। আর শরিয়তের পরিভাষায় একেই শিরক বলা হয়। হায়! আফসোস…

নফল দানের উপযুক্ত সময় ও নিয়ম :

জাকাত ও অন্যান্য বাধ্যতামূলক দান ছাড়াও ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার রয়েছে। আবশ্যিক দান- জাকাত ফিৎরা ইত্যাদি আদায়ের একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে। তবে নফল দানের কোনো নির্ধারিত সময় নেই । দাতা অভাবী লোকদেরকে যে কোনো সময় দান করলে সাওয়াব পেয়ে যাবেন। দিবা-রাত্র যে কোনো সময়ে দান করা যায়। তা হতে পারে গোপনে অথবা প্রকাশ্যে। কোরআন ও হাদিসে উভয়ভাবে দানের অনুমতি রয়েছে। সুতরাং আমাদের উচিত সামর্থ্য হলেই দান সদকা করা, এতে বিলম্ব না করা এবং সুস্থ আবস্থায় দান করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
আর আমি যা তোমাদেরকে দিয়েছি, তোমাদের কারো মৃত্যু আসার আগেই তা থেকে ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবে, হে আমার রব, আমাকে আরো কিছুকাল সময় দিলে না কেন? তাহলে আমি দান করতাম এবং নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। ( সূরা মুনাফিকুন : ১০)
আয়াত থেকে বুঝা গেল, মৃত্যু আসার আগে দান করা উত্তম। মৃত্যু মুহূর্তে মালাকুল মওত আসার আগের দানে আল্লাহ বেশি খুশি হন।

এ মর্মে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন,

لَوْ كَانَ لِي مِثْلُ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا يَسُرُّنِي أَنْ لَا يَمُرَّ عَلَيَّ ثَلَاثٌ وَعِنْدِي مِنْهُ شَيْءٌ إِلَّا شَيْءٌ أُرْصِدُهُ لِدَيْنٍ.
رَوَاهُ صَالِحٌ وَعُقَيْلٌ عَنْ الزُّهْرِيِّ  . صحيح البخاري

যদি আমার নিকট উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ মওজুদ থাকে, আমার খুশির কারণ হবে ঋণ পরিশোধ পরিমাণ রেখে বাকীগুলো তিন দিনের মধ্যে দান করে দেওয়া। (বর্ণনায় সহিহ বোখারি)

মৃত ব্যক্তির নামে দান

সাআদ বিন উবাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! উম্মে সাআদ মারা গেছেন, এখন তার জন্য কোন সদকা উত্তম? নবীজী বললেন, পানি। অত:পর সাআদ একটি কূপ খনন করে বললেন, এ কূপ সাআদের মাতার (নামে দান করা হলো)। ( বর্ণনায় সুনান আবি দাউদ, শায়খ আলবানি একে হাসান বলে মন্তব্য করেছেন।)

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমার মা আকম্মিক মারা গেছেন। আমার ধারণা তিনি যদি কথা বলতে পারতেন, তবে সদকা করে যেতেন। এখন আমি তার পক্ষে দান করলে তিনি কি সাওয়াব পাবেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: হ্যাঁ। ( সহিহ বোখারি)

দানের উদ্দেশ্য কি হওয়া উচিৎ

দান সদকা অন্যান্য ইবাদতের মত একটি ইবাদত। কোন ইবাদতেই রিবা বা লৌকিকতা গ্রহণযোগ্য নয়। রিয়া বা লোক দেখানোর জন্য দান হলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। আবশ্যিক ও অনাবশ্যিক সকল দান-সদকাতেই রিয়া মুক্ত হয়ে এ কাজ সম্পন্ন করার গুরুত্ব অপরিসীম।

আল্লাহ তাআলা বলেন-
হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি। অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অত:পর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখে না। আর আল্লাহ কাফির জাতিকে হিদায়েত দেন না। (সূরা বাকারা : ২৬৪)

দান করার পূর্বে যাচাই করা

দানের দ্বারা দাতা এবং গ্রহীতা উভয়ে যেন উপকৃত হতে পারে সে জন্য প্রকৃত হকদারের নিকট দান সদকা পৌছানো জরুরি। প্রকৃত অভাবী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত না করা গেলে, দান প্রকারান্তরে দাতার ইচ্ছা বহির্ভূত হয়ে যায়। তাই আল্লাহ তাআলা দানের পূর্বে প্রকৃত অভাবীকে অনুসন্ধানের গুরুত্ব দিয়ে বলেন-
(সদকা) সেসব দরিদ্রের জন্য যারা আল্লাহর রাস্তায় আটকে গিয়েছে, তারা জমিনে চলতে পারে না। না চাওয়ার কারণে অনবগত ব্যক্তি তাদেরকে অভাবমুক্ত মনে করে। তুমি তাকেরকে চিনতে পারবে তাদের চিহ্ন দ্বারা। তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে চায় না। আর তোমরা যে সম্পদ ব্যয় কর, অবশ্যই আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞানী। (সূরা বাকারা : ২৭৩)

মহান আল্লাহ অন্যত্র ইরশাদ করেন,

নিশ্চয় সদকা হচ্ছে ফকির ও মিসকিনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য, দাস আযাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। আর আল্লাহ মহা জ্ঞানী। ( সূরা তাওবা : ৬০)

বাধ্যতামূলক দান আদায় না করলে গুনাহ হবে। কারণ ঐ সব দান আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন কারণে ফরজ করেছেন। যার বর্ণনা কোরআন এবং হাদীসে সবিস্তারে এসেছে। এই পুস্তিকায়ও আংশিক বর্ণিত হয়েছে। এ সকল দান আদায় করার পর আল্লাহ তাআলা কোনো সাওয়াব যদি বরাদ্দ না দিতেন তাতে বে-ইনসাফি হতো না । কিন্তু আল্লাহ তাআলা আপন করুণায় এসব ফরজ দানেও বান্দাকে সাওয়াব দিয়ে থাকেন।

দানের ফজিলত সম্পর্কে আরো কয়েকটি হাদিস:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ قَالَ اللَّهُ أَنْفِقْ يَا ابْنَ آدَمَ أُنْفِقْ عَلَيْكَ.  صحيح البخاري

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,  ব্যয় কর হে আদম সন্তান! তোমার উপরও ব্যয় করা হবে। (সহিহ বোখারি)

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের কেউ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের মধ্যে সর্ব প্রথম কে আপনার সাথে মিলিত হবে। তিনি বললেন,  তোমাদের মধ্যে যার হাত লম্বা সে। তারপর তারা এক টুকরা কাঠ নিয়ে নিজেদের হাত মাপতে লাগলেন। দেখা গেল সাওদা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাত অধিক লম্বা ছিল। পরে আমরা বুঝলাম যে, তার লম্বা হাত দ্বারা সদকায় তার অগ্রসরমানতাকে বুঝানো হয়েছে। আর আমাদের মধ্যে সওদাই প্রথমে তার সাথে মিলিত হয়েছেন। তিনি দান-সদকাকে বেশি ভালোবাসতেন। ( সহিহ বোখারি)

উকবা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আমি মদিনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে আসরের নামজ আদায় করলাম। তিনি সালাম ফিরালেন অত:পর দ্রুত উঠে দাড়ালেন এবং মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে তার কোনো এক স্ত্রীর কামরায় গেলেন। তাঁর তাড়াহুড়ো দেখে লোকজন আতঙ্কিত হলো। অত:পর তিনি আবার ফিরে এলেন এবং বুঝতে পারলেন যে লোকজন তার তাড়াহুড়ো দেখে বিস্মিত হয়েছে। তখন তিনি বললেন, আমাদের কাছে রক্ষিত কিছু স্বর্ণের কথা আমার স্মরণ হয়েছে। তাই আমি অপছন্দ করলাম যে, এটা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে যেন আমার অন্তরায় হয়। ফলে আমি তা বন্টন করে দেয়ার জন্য আদেশ করে এলাম। ( সহিহ বোখারি)

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সদকা সম্পদ হ্রাস করে না। কাউকে ক্ষমা করলে এর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বান্দার ইজ্জত বৃদ্ধিই করে থাকেন। এবং যে কেউ আল্লাহর জন্য বিনম্র হয়, আল্লাহ তার মর্যদা বাড়িয়েই দেন। (সহিহ মুসলিম)
সম্মানিত পাঠক, সম্পদ মহান আল্লাহর দান। যার পূর্ণ ও প্রকৃত মালিকানা তাঁরই। আমাদের কেবলমাত্র নির্দিষ্ট মেয়াদে ভোগ করার অধিকার দিয়েছেন। মৃত্যুর পর এই সম্পদই অন্যের হয়ে যাবে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো সময় থাকতেই পরকালের জন্য এ সম্পদ থেকে প্রেরণ করে সেই জীবনের রাস্তা সুগম করা এবং দান-সদকার মাধ্যমে গরিব-দুখি-অনাথদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে আল্লাহর নেয়ামতের যথাযথ শুকরিয়া আদায় ও ভ্রাতৃত্বের হক পূরণে সচেষ্ট থাকা। মহান আল্লাহ আমাদের জন্য তা সহজ করে দিন। আমিন।

সমাপ্ত
সংকলন : কামাল উদ্দিন মোল্লা
সম্পাদানা : ইকবাল হোছাইন মাছুম
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s