প্রশ্নোত্তরে রমযান ও ঈদ (১ম পর্ব)


প্রশ্নোত্তরে রমযান ও ঈদ (১ম পর্ব)

১ম অধ্যায়
সিয়াম : অর্থ ও হুকুম
প্রশ্ন ১ : সিয়ামের শাব্দিক অর্থ কি?
উত্তর : সিয়ামের শাব্দিক অর্থ বিরত থাকা। ফার্সী ভাষায় এটাকে রোযা বলা হয়।
প্রশ্ন ২ : রমযান মাসের সিয়ামের হুকুম কি?
উত্তর : এটা ফরয।
প্রশ্ন ৩ : এটা কোন হিজরী সালে ফরয হয়েছে?
উত্তর : দ্বিতীয় হিজরীতে।
প্রশ্ন ৪ : সিয়াম ফরয হওয়ার দলীল জানতে চাই।
উত্তর :
(ক) আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣]
[১] ঈমানদারগণ!, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের উপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (বাকারাহ : ১৮৩)

﴿ شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ هُدٗى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٖ مِّنَ ٱلۡهُدَىٰ وَٱلۡفُرۡقَانِۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ ٱلشَّهۡرَ فَلۡيَصُمۡهُۖ …١٨٥ ﴾ [البقرة: ١٨٥]
[২] রমযান হলো সেই মাস যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছিল। মানবজাতির জন্য হিদায়াত ও সুস্পষ্ট পথ নির্দেশক এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়কারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যারাই এ মাস পাবে তারা যেন অবশ্যই সিয়াম পালন করে। (বাকারাহ : ১৮৫)
(খ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
بُنِيَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ وَإِقَامِ الصَّلاَةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَصَوْمِ رَمَضَانَ وَحَجِّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيْلاً
ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি : এ মর্মে সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর সত্যিকার কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত দেয়া, হজ করা এবং রমযান মাসের সিয়াম পালন করা। (বুখারী : ৮; মুসলিম : ১৬)
২য় অধ্যায়
فضل شهر رمضان
রমযান মাসের ফযীলত
প্রশ্ন ৫ : রমযান মাসের ফযীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে জানতে চাই।
উত্তর : চন্দ্র মাসের এটা এক অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ মাস। এ মাসের ফযীলত অপরিসীম। নীচে ধারাবাহিকভাবে রমযান মাসের কিছু ফযীলত তুলে ধরা হল :
[১] ইসলামের পাঁচটি রুকনের একটি রুকন হল সিয়াম। আর এ সিয়াম পালন করা হয় এ মাসেই।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣]
অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (বাকারাহ : ১৮৩)
[২] এ মাসের সিয়াম পালন জান্নাত লাভের একটি মাধ্যম।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ آمَنَ بِاللهِ وَبِرَسُولِهِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وآتى الزَّكَاةَ وَصَامَ رَمَضَانَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللهِ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনল, সালাত কায়েম করল, যাকাত আদায় করল, রমযান মাসে সিয়াম পালন করল তার জন্য আল্লাহর উপর সে বান্দার অধিকার হল তাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেয়া। (বুখারী : ২৭৯০)
[৩] রমযান হল কুরআন নাযিলের মাস
﴿ شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ هُدٗى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٖ مِّنَ ٱلۡهُدَىٰ وَٱلۡفُرۡقَانِۚ …١٨٥ ﴾ [البقرة: ١٨٥]
অর্থাৎ ‘‘রমাযান মাস- যার মধ্যে কুরআন নাযিল করা হয়েছে লোকেদের পথ প্রদর্শক এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনারূপে এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।’’ (আল-বাকারা : ১৮৫)
সিয়াম যেমন এ মাসে, কুরআনও নাযিল হয়েছে এ মাসেই। ইতিপূর্বেকার তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জীলসহ যাবতীয় সকল আসমানী কিতাব এ মাহে রমযানেই নাযিল হয়েছিল। (সহীহ আল জামে)
এ মাসেই জিবরীল আলাইহিস সালাম নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কুরআন শুনাতেন এবং তাঁর কাছ থেকে তিলাওয়াত শুন্তেন। আর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের শেষ রমযানে পূর্ণ কুরআন দু’বার খতম করেছেন। (মুসলিম)
[৪] রমযান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়।
إِذَا جَاءَ رَمَضَانَ فُتِحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةَ وَأُغْلِقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ وَصُفِّدَتِ الشَّيَاطِيْنَ (وَفِيْ لَفْظٍ سُلْسِلَتِ الشَّيَاطِيْنَ)
‘‘যখন রমযান আসে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয় আর জাহা্ন্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়।’’ (মুসলিম : ২৫৪৭)
আর এজন্যই এ মাসে মানুষ ধর্ম-কর্ম ও নেক আমলের দিকে অধিক তৎপর হয় এবং মসজিদের মুসল্লীদের ভীড় অধিকতর হয়।
[৫] এ রমযান মাসের লাইলাতুল কদরের এক রাতের ইবাদত অপরাপর এক হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি। অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদতের চেয়েও বেশি সাওয়াব হয় এ মাসের ঐ এক রজনীর ইবাদতে।
(ক) আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٞ مِّنۡ أَلۡفِ شَهۡرٖ ٣ تَنَزَّلُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَٱلرُّوحُ فِيهَا بِإِذۡنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمۡرٖ ٤ سَلَٰمٌ هِيَ حَتَّىٰ مَطۡلَعِ ٱلۡفَجۡرِ ٥ ﴾ [القدر: ٣،  ٥]
অর্থাৎ ‘‘কদরের এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতে ফেরেশতা আর রূহ (জিরীল আঃ) তাদের রবের অনুমতিক্রমে প্রত্যেক কাজে দুনিয়ায় অবতীর্ণ হয়। (এ রাতে বিরাজ করে) শান্তি আর শান্তি- তা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত থাকে।’’ (সূরা ক্বদর : ৪-৫)
(খ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
…..لله فِيْهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ مَنْ حَرُمَ خَيْرُهَا فَقَدْ حَرُمَ
‘‘এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল সে মূলতঃ সকল কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হল।’’ (নাসায়ী : ২১০৬)
[৬] এ পুরো মাস জুড়ে দু‘আ কবূল হয়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
لِكُلِّ مُسْلِمٍ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ يَدْعُوْ بِهَا فِيْ رَمَضَانَ
অর্থাৎ ‘‘এ রমযান মাসে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর সমীপে যে দু‘আই করে থাকে-তা মঞ্জুর হয়ে যায়।’’ (আহমাদ : ২/২৫৪)
[৭] এ মাসে মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হয়
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
إِنَّ لِلَّهِ عُتَقَاءَ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، لِكُلِّ عَبْدٍ مِنْهُمْ دَعْوَةٌ مُسْتَجَابَةٌ
অর্থাৎ (মাহে রমাযানে) প্রতিরাত ও দিনের বেলায় বহু মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম থেকে মুক্তির ঘোষণা দিয়ে থাকেন এবং প্রতিটি রাত ও দিনের বেলায় প্রত্যেক মুসলিমের দু‘আ- মুনাজাত কবূল করা হয়ে থাকে। (মুসনাদ আহমদ : ৭৪৫০)
[৮] এ মাস জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাস
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
يُنَادِيْ مُنَادٍ كُلَّ لَيْلَةٍ : يَا بَاغِىَ الْخَيْرَ أَقْبِلْ وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أَقْصِرْ وَلله عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ وَذَلِكَ فِيْ كُلِّ لَيْلَةٍ
‘‘(এ মাসের)  প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে আহবান করতে থাকে যে, হে কল্যাণের অনুসন্ধানকারী তুমি আরো অগ্রসর হও! হে অসৎ কাজের পথিক, তোমরা অন্যায় পথ চলা বন্ধ কর। (তুমি কি জান?) এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তা‘আলা কত লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিযে থাকেন। (তিরমিযী : ৬৮২)
[৯] এ মাস ক্ষমা লাভের মাস
এ মাস ক্ষমা লাভের মাস। এ মাস পাওয়ার পরও যারা তাদের আমলনামাকে পাপ-পঙ্কিলতা মুক্ত করতে পারল না রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ধিক্কার দিয়ে বলেছেন :
رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ دَخَلَ عَلَيْهِ رَمَضَانَ ثُمَّ انْسَلَخَ قَبْلَ أَن يَّغْفِرَلَهُ
‘‘ঐ ব্যক্তির নাক ধূলায় ধুসরিত হোক যার কাছে রমযান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না।’’ (তিরমিযী : ৩৫৪৫)
[১০] রমযান মাসে সৎ কর্মের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেয়া হয়
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
مَنْ تَقَرَّبَ فِيْهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى فَرِيْضَةً فِيْمَا سِوَاهُ وَمَنْ أَدَّى فِيْهِ فَرِيْضَةٌ كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِيْنَ فَرِيْضَةً فِيْمَا سِوَاهُ
‘যে ব্যক্তি রমযান মাসে কোন একটি নফল ইবাদত করল, সে যেন অন্য মাসের একটি ফরয আদায় করল। আর রমযানে যে ব্যক্তি একটি ফরয আদায় করল, সে যেন অন্য মাসের ৭০টি ফরয আদায় করল।’ (সহীহ ইবন খুযাইমা : ১৮৮৭, হাদীসটি দুর্বল)
[১১] এ মাসে একটি উমরা করলে একটি হজ্জ আদায়ের সওয়াব হয় এবং তা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে হজ্জ আদায়ের মর্যাদা রাখে।
ক- হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
فَإِنَّ عُمْرَةً فِيْ رَمَضَانَ ةَقْضِيْ حَجَّةً مَعِيْ
‘‘রমযান মাসে উমরা করা আমার সাথে হজ্জ আদায় করার সমতুল্য’’। (বুখারী : ১৮৬৩)
হাদীসে আছে,
খ-একজন মেয়েলোক এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করল,
مَا يَعْدِلُ حَجَّةٌ مَعَكَ؟ فَقَالَ : عُمْرَةُ فِيْ رَمَضَانَ
‘‘কোন ইবাদতে আপনার সাথী হয়ে হজ্জ করার সমতুল্য সাওয়াব পাওয়া যায়? তিনি উত্তর দিলেন, ‘‘রমযান মাসে উমরা করা’’ (আবূ দাউদ : ১৮৯৯০)
৩য় অধ্যায়
فضل الصيام
সিয়াম পালনের ফযীলত
প্রশ্ন ৬ : সিয়াম পালনকারীকে আল্লাহ কী কী পুরস্কার দেবেন?
উত্তর : সিয়াম পালনকারীকে যেসব পুরস্কার ও প্রতিদান আল্লাহ তা‘আলা দেবেন তার অংশ বিশেষ এখানে উল্লেখ করা হল :
[১] আল্লাহ স্বয়ং নিজে সিয়ামের প্রতিদান দেবেন।
হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
كُلُّ عَمَلِ بَنِىْ آَدَمَ لَهُ إِلاَّ الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِيْ وَأَنَا أَجْزِئ بِهِ
‘‘মানুষের প্রতিটি ভাল কাজ নিজের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু সিয়াম শুধুমাত্র আমার জন্য, অতএব আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। (বুখারী : ১৯০৪)
[২] সিয়াম অতি উত্তম নেক আমল
আবূ হুরাইরাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র একটি হাদীসে তিনি বলেছিলেন :
يَا رَسُوْلَ اللهِ مُرْنِيْ بِعَمَلٍ، قَالَ عَلَيْكَ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لاَ عَدْلَ لَهُ
‘‘হে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাকে একটি অতি উত্তম নেক আমলের নির্দেশ দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর সমমর্যাদা সম্পন্ন কোন আমল নেই।’’ (নাসাঈ : ২২২২)
অন্যান্য ইবাদত মানুষ দেখতে পায়। কিন্তু সিয়ামের মধ্যে তা নেই। লোক দেখানোর কোন আলামত সিয়াম পালনে থাকে না। শুধুই আল্লাহকে খুশী করার জন্য তা করা হয়। তাই এ ইবাদতের মধ্যে রয়েছে বিশুদ্ধ ইখলাস।
হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَدَعُ شَهْوَتَهُ وَطَعَامَهُ مِنْ أَجْلِيْ
‘‘সিয়াম পালনকারী শুধুমাত্র আমাকে খুশী করার জন্যই পানাহার ও যৌন উপভোগ পরিহার করে।’ (১৮৯৪)
[৩] ক- জান্নাত লাভ সহজ হয়ে যাবে।
সহীহ ইবনু হিববান কিতাবে আছে আবূ উমামা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলেন-
يَا رَسُوْلَ اللهِ دُلُّنِيْ عَلَى عَمَلٍ أَدْخُلُ بِهِ الْجَنَّةَ قَالَ عَلَيْكَ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لاَ مِثْلَ لَهُ
আবূ উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যার কারণে আমি জান্নাতে যেতে পারি। তিনি বললেন, তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর সমমর্যাদাসম্পন্ন কোন ইবাদাত নেই। (নাসাঈ : ২২২১)
খ. সিয়াম পালনকারীকে বিনা হিসেবে প্রতিদান দেয়া হয়
অন্যান্য ইবাদতের প্রতিদান আল্লাহ তা‘আলা তার দয়ার বদৌলতে ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু সিয়ামের প্রতিদান ও তার সাওয়াব এর চেয়েও বেহিসেবী সংখ্যা দিয়ে গুণ দিয়ে বাড়িয়ে দেয়া হবে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন,
كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ يُضَاعَفُ الْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ قَالَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ (إِلاَّ الصَّوْمَ فَإِنَّهُ لِيْ وَأَنَا أَجْزِي بِهِ(
‘‘মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, কিন্তু সিয়ামের বিষয়টি ভিন্ন। কেননা সিয়াম শুধুমাত্র আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব। (মুসলিম : ১১৫১)
অর্থাৎ কি পরিমাণ সংখ্যা দিয়ে গুণ করে এর প্রতিদান বাড়িয়ে দেয়া হবে এর কোন হিসাব নেই, শুধুমাত্র আল্লাহই জানেন সিয়ামের পুণ্যের ভান্ডার কত সুবিশাল হবে।
[৪] জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সিয়াম ঢাল স্বরূপ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
اَلصِّيَامُ جُنَّةٌ يَسْتَجِنُّ بِهَا الْعَبْدُ مِنَ النَّارِ
‘‘সিয়াম ঢাল স্বরূপ। এ দ্বারা বান্দা তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পার।’’ (আহমাদ : ১৫২৯৯)
[৫] জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য সিয়াম একটি মজবুত দূর্গ
হাদীসে আছে,
اَلصِّيَامُ جُنَّةٌ وَحِصْنُ حَصِيْنٌ مِنَ النَّارِ
‘‘সিয়াম ঢালস্বরূপ এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার এক মজবুত দূর্গ।’’ (আহমাদ : ৯২২৫)
[৬] আল্লাহর পথে সিয়াম পালনকারীকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে দূরে রাখেন।
এ বিষয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
ا- مَا مِنْ عَبْدٍ يَصُوْمُ يَوْمًا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ إِلاَّ بَاعَدَ اللهُ بِذَلِكَ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِيْنَ خَرِيْفًا
(ক) ‘‘যে কেউ আল্লাহর রাস্তায় (অর্থাৎ শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য) একদিন সিয়াম পালন করবে, তদ্বারা আল্লাহ তাকে জাহান্নামের অগ্নি থেকে সত্তর বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরবর্তীস্থানে রাখবেন। (বুখারী : ২৮৪০; মুসলিম : ১১৫৩)
ب-مَنْ صَامَ يَوْمًا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ بَاعَدَ اللهُ وَجْهَهُ عَنِ النَّارِ سَبْعِيْنَ خَرِيْفًا
(খ) ‘‘যে ব্যক্তি একদিন আল্লাহর পথে সিয়াম পালন করবে আল্লাহ তার কাছ থেকে জাহান্নামকে সত্তর বছরের রাস্তা দূরে সরিয়ে নেবেন। (মুসলিম : ১১৫৩)
ج-عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ يَا رَسُولَ اللهِ مُرْنِي بِأَمْرٍ يَنْفَعُنِي اللهُ بِهِ قَالَ عَلَيْكَ بِالصِّيَامِ فَإِنَّهُ لاَ مِثْلَ لَهُ
(গ) আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, ‘‘আমি আল্লাহর রাসূলকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি কাজের নির্দেশ দিন যার দ্বারা আমি লাভবান হতে পারি। তিনি বললেন, তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর সমকক্ষ (মর্যাদা সম্পন্ন) কোন ইবাদত নেই। (নাসাঈ : ২২২১)
[৭] ইফতারের সময় বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।
হাদীসে আছে :
إِنَّ للهِ تَعَالَى عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ، وَذَلِكَ كُلّ لَيْلَةٍ
ইফতারের মূহূর্তে আল্লাহ রাববুল ‘আলামীন বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। মুক্তির এ প্রক্রিয়াটি রমাযানের প্রতি রাতেই চলতে থাকে। (আহমাদ : ৫/২৫৬)
[৮] সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশ্কের চেয়েও উত্তম (সুগন্ধিতে পরিণত হয়)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
وَالَّذِيْ نَفْسِ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَخُلُوْفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ مِنْ رِيْحِ الْمِسْكِ.
যার হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র জীবন সে সত্তার শপথ করে বলছি, সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তা‘আলার কাছে মিশকের ঘ্রাণের চেয়েও প্রিয় হয়ে যায়। (বুখারী : ১৯০৪;   মুসলিম : ১১৫১)
[৯] সিয়াম পালনকারীর জন্য রয়েছে দু’টি বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ فَرْحَةٌ عِنْدَ فِطْرِهِ وَفَرْحَةٌ عِنْدَ لِقَاءِ رَبِّهِ
সিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টো বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত রয়েছে : একটি হল ইফতারের সময়, আর দ্বিতীয়টি হল তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। (বুখারী : ৭৪৯২; মুসলিম : ১১৫১)
[১০] সিয়াম কিয়ামাতের দিন সুপারিশ করবে
হাদীসে আছে,
اَلصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ الصِّيَامُ أَيْ رَبِّ مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ وَيَقُولُ الْقُرْآنُ مَنَعْتُهُ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ قَالَ فَيُشَفَّعَانِ
সিয়াম ও কুরআন কিয়ামাতের দিন মানুষের জন্য এভাবে সুপারিশ করবে যে, সিয়াম বলবে হে আমার রব, আমি দিনের বেলায় তাকে (এ সিয়াম পালনকারীকে) পানাহার ও যৌনতা থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবূল কর।
অনুরূপভাবে কুরআন বলবে, হে আমার রব, আমাকে অধ্যয়নরত থাকায় রাতের ঘুম থেকে আমি তাকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবূল কর। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবূল করা হবে। (আহমাদ : ২/১৭৪)
[১১] সিয়াম হল গুনাহের কাফফারা
(ক) আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ … إِنَّ ٱلۡحَسَنَٰتِ يُذۡهِبۡنَ ٱلسَّيِّ‍َٔاتِۚ ١١٤ ﴾ [هود: ١١٤]
নিশ্চয়ই নেক আমল পাপরাশি দূর করে দেয়। (সূরা হুদ : ১১৪)
(খ) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
فِتْنَةُ الرَّجُلِ فِي أَهْلِهِ وَمَالِهِ وَوَلَدِهِ وَجَارِهِ تُكَفِّرُهَا الصَّلَاةُ وَالصَّوْمُ وَالصَّدَقَةُ (بخارى ومسلم(
পরিবার পরিজন, ধন-সম্পদ ও প্রতিবেশিদের নিয়ে জীবন চলার পথে যেসব গুনাহ মানুষের হয়ে যায় সালাত, সিয়াম ও দান খয়রাত সেসব গুনাহ মুছে ফেলে দেয়। (বুখারী : ৫২৫; মুসলিম : ১৪৪)
[১২] সিয়াম পালনকারীর এক রমযান থেকে পরবর্তী রমাযানের মধ্যবর্তী সময়ে হয়ে যাওয়া ছগীরা গুনাহগুলোকে মাফ করে দেয়া হয়।
ক- আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿ إِن تَجۡتَنِبُواْ كَبَآئِرَ مَا تُنۡهَوۡنَ عَنۡهُ نُكَفِّرۡ عَنكُمۡ سَيِّ‍َٔاتِكُمۡ وَنُدۡخِلۡكُم مُّدۡخَلٗا كَرِيمٗا ٣١ ﴾ [النساء: ٣١]
‘‘তোমরা যদি নিষিদ্ধ কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাক তাহলে তোমাদের ছগীরা গুনাহগুলোকে মুছে দেব এবং (জান্নাতে) তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। (সূরা নিসা : ৩১)
খ-রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
اَلصَّلَوَاتُ الْخَمْسُ وَالْجُمُعَةُ إِلَى الْجُمُعَةِ وَرَمَضَانُ إِلَى رَمَضَانَ مُكَفَّرَاتٌ لِمَا بَيْنَهُنَّ إِذَا اجْتَنِبَتِ الْكَبَائِرُ
পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এর মধ্যবর্তী সময় ও এক জুমুআ থেকে অপর জুমুআ এবং এক রমযান থেকে অপর রমযান পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে হয়ে যাওয়া ছগীরা গুনাহগুলোকে (উল্লেখিত ইবাদতের) কাফ্ফারাস্বরূপ মুছে দেয়া হয় সে যদি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। (মুসলিম : ২৩৩)
[১৩] সিয়াম পালনকারীর পূর্বেকার গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমযানে সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (বুখারী  : ৩৮; মুসলিম : ৭৬৯)
[১৪] সিয়াম যৌনপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণে রাখে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنْ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ
হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টি ও লজ্জাস্থানের হেফাযতকারী। আর যে ব্যক্তি বিবাহের সামর্থ রাখেনা সে যেন সিয়াম পালন করে। কারণ এটা তার জন্য নিবৃতকারী। (অর্থাৎ সিয়াম পালন যৌন প্রবৃত্তি নিবৃত করে রাখে) (বুখারী : ১৯০৫; মুসলিম : ১৪০০)
[১৫] সিয়াম পালনকারীরা রাইয়ান নামক মহিমান্বিত এক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لاَ يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ يُقَالُ أَيْنَ الصَّائِمُونَ فَيَقُومُونَ لاَ يَدْخُلُ مِنْهُ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ فَإِذَا دَخَلُوا أُغْلِقَ فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ أَحَدٌ
জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে। যার নাম রাইয়্যান। কিয়ামতের দিন শুধু সিয়ামপালনকারীরা ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তাদের ছাড়া অন্য কেউ সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। সেদিন ঘোষণা করা হবে, সিয়াম পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়িয়ে যাবে ঐ দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য। তারা প্রবেশ করার পর ঐ দরজাটি বন্ধ করে দেয়া হবে। ফলে তারা ব্যতীত অন্য কেউ আর সেই দরজা দিয়ে জান্নাতে ঢুকতে পারবেনা। (বুখারী : ১৮৯৬; মুসলিম : ১১৫২)
প্রশ্ন ৭ : কী ধরনের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে উপরে বর্ণিত অফুরন্ত ফযীলত ও সওয়াব হাসিল করা যাবে?
উত্তর : সিয়ামের বরকতময় সাওয়াব ও পুরস্কার হাসিলের জন্য নিম্নোক্ত শর্তাবলী পূরণ করা আবশ্যক
[১] শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য সিয়াম পালন করতে হবে। মনের মধ্যে লোক দেখানোর ইচ্ছা বা অপরকে শুনানোর কোন ক্ষুদ্র অনুভূতি থাকতে পারবে না।
[২] সিয়াম পালন, সাহরী, ইফতার ও তারাবীহসহ সকল ইবাদত রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাত তরীকামত পালন করতে হবে।
[৩] খাওয়া-দাওয়া ও যৌনাচার ত্যাগের মত মিথ্যা, প্রতারণা, সুদ, ঘুষ, অশ্লীলতা, ধোঁকাবাজি ও ঝগড়াবিবাদসহ সকল অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। চোখ, কান, জিহবা ও হাত পা সকল ইন্দ্রীয়কে অন্যায় কাজ থেকে হেফাযতে রাখতে হবে।
রাসূলু্ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أ-مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْلَ فَلَيْسَ للهِ حَاجَةٌ أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ (بخارى)
ক) যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মুর্খতা পরিত্যাগ করতে পারলনা, তার রোযা রেখে শুধুমাত্র পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী : ১৯০৩)
ب-…فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفَثْ يَوْمَئِذٍ وَلاَ يَصْخَبْ فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ
খ) তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করবে সে যেন অশ্লীল আচরণ ও চেচামেচি করা থেকে বিরত থাকে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার দিকে মারমুখী হয়ে আসে তবে সে যেন তাকে বলে ‘আমি রোযাদার’। (অর্থাৎ রোযা অবস্থায় আমি গালিগালাজ ও মারামারি করতে পারি না। (মুসলিম : ১১৫১)
ج-رُبَّ صَائِمٍ حَظُّهُ مِنْ صِيَامِهِ الْجُوعُ وَالْعَطَشُ وَرُبَّ قَائِمٍ حَظُّهُ مِنْ قِيَامِهِ السَّهَرُ (رواه أحمد)
গ) এমন অনেক রোযাদার আছে যার রোযা থেকে প্রাপ্তি হচ্ছে শুধুমাত্র ক্ষুধা ও তৃষ্ণা। তেমনি কিছু নামাযী আছে যাদের নামায কোন নামাযই হচ্ছে না। শুধু যেন রাত জাগছে। (অর্থাৎ সালাত আদায় ও সিয়াম পালন সুন্নাত তরীকামত না হওয়ার কারণে এবং মিথ্যা প্রতারণা ও পাপাচার ত্যাগ না করায় তাদের রোযা ও নামায কোনটাই কবুল হচ্ছে না) (আহমাদ : ৮৮৪৩)
[৪] চতুর্থতঃ ঈমান ভঙ্গ হয়ে যায় বা ঈমান থেকে বহিস্কৃত হয়ে যায় এমন কোন পাপাচার থেকে বিরত থাকা
প্রশ্ন ৮ : কোন ধরনের পাপ করলে একজন মুসলিম ইসলাম থেকে বহিস্কৃত হয়ে যায়? একজন মুসলমান হয়ে যায় অমুসলমান- এ বিষয়ে জানতে চাই।
উ: অযু যেমন ছুটে যায়, নামায যেমন নষ্ট হয়, রোযাও যেমন ভঙ্গ হয়ে যায় তেমনি ইসলামও ছুটে যায়, ঈমানও ভঙ্গ হয় গুরুতর কিছু পাপের কারণে, ফলে ঐ পাপি ব্যক্তি মুসলমানের মিল্লাত থেকে বহিস্কৃত হয়ে যায়। অযূ, নামায, রোযা কী কারণে ভঙ্গ হয় তা আমরা জানি, কিন্তু ঈমান ভঙ্গ হয় এবং সেটা কী কারণে হয় তা আমরা অনেকেই জানি না। আর এটাই সবচেয়ে বড় বিপজ্জনক বিষয়। যে সব পাপের কারণে ইসলাম থেকে মানুষ বহিস্কৃত হয়ে যায় এবং তওবাহ না করলে কাফেরদের মতই চিরস্থায়ী জাহান্নামী হতে হবে সে বিষয়গুলো মাক্কা শরীফের দারুল হাদীসের শিক্ষক ও বহু গ্রন্থ প্রণেতা আল্লামা মুহাম্মদ বিন জামিল যাইনুর রচনাবলী থেকে এর সার সংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলো :
ঈমান ভঙ্গকারী আমলসমূহ :
ঈমান ভঙ্গকারী কিছু পাপ কাজ আছে, যদি কোন মুসলিম এগুলোর কোন একটি পাপও করে ফেলে তবে সে শির্ক বা কুফুরী করে ফেলল। যার পরিণতিতে তার সমস্ত নেক আমল বরবাদ হয়ে যায়। এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। তবে জীবদ্দশায় তাওবাহ করে ফিরে এলে আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দিতে পারেন।
নিচে এ জাতীয় পাপকাজের একটি তালিকা তুলে ধরা হলো :
[১] আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট দু‘আ করা। যেমন নবী বা মৃত আওলিয়াদের নিকট কিছু চাওয়া। অথবা কোন ওলি আওলিয়ার অনুপস্থিতিতে দূর থেকে তার কাছে সাহায্য চাওয়া। অথবা ঐ পীর বুজুর্গের উপস্থিতিতে তার কাছে এমন কিছু চাওয়া যা দেয়ার ক্ষমতা তার নেই।
এ সম্বন্ধে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَلَا تَدۡعُ مِن دُونِ ٱللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَۖ فَإِن فَعَلۡتَ فَإِنَّكَ إِذٗا مِّنَ ٱلظَّٰلِمِينَ ١٠٦ ﴾ [يونس: ١٠٦]
‘‘আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে ডেকো না, যে না করতে পারে তোমার কোন উপকার, আর না করতে পারে তোমার ক্ষতি। আর যদি তা করেই ফেল, তবে অবশ্যই তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।’’ (অর্থাৎ তুমি মুশরিক হয়ে যাবে।’’) (ইউনুস : ১০৬)
এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
(مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَدْعُو مِنْ دُوْنِ اللهِ نِدًّا دَخَلَ النَّارَ)
অর্থাৎ যে, ব্যক্তি এ অবস্থায় মারা যায় যে, সে আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে সমকক্ষ দাঁড় করিয়ে তার কাছে সাহায্য চায়, তাহলে সে জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে। (বুখারী : ৪২২)
[২] তাওহীদের কথা শুনে যাদের মনে বিতৃষ্ণা আসে এবং বিপদে আপদে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া থেকে দূরে থাকে। আর অন্তরে মুহাববতের সাথে ডাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং মৃত ওলি আওলিয়া ও জীবিত (অনুপস্থিত), পীর মাশায়েখদেরকে এবং সাহায্য চায় তাদেরই কাছে। এ বিষয়ে মুশরিকদের উদাহরণ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَإِذَا ذُكِرَ ٱللَّهُ وَحۡدَهُ ٱشۡمَأَزَّتۡ قُلُوبُ ٱلَّذِينَ لَا يُؤۡمِنُونَ بِٱلۡأٓخِرَةِۖ وَإِذَا ذُكِرَ ٱلَّذِينَ مِن دُونِهِۦٓ إِذَا هُمۡ يَسۡتَبۡشِرُونَ ٤٥ ﴾ [الزمر: ٤٥]
‘‘যখন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন আখিরাতের উপর বেঈমান লোকদের অন্তর বিতৃষ্ণায় ভরে যায়। আর যখন আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্য (পীর বুজুর্গের) নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন তাদের মনে আনন্দ লাগে। (যুমার : ৪৫)
[৩] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অথবা কোন ওলির নাম নিয়ে পশু যবাই করা। এটা নিষেধ করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَٱنۡحَرۡ ٢ ﴾ [الكوثر: ٢]
‘‘সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর এবং তাঁরই জন্য যবেহ কর।’’ (কাওসার : ২)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ
যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে যবাই কার্য করে আল্লাহ তা‘আলা প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করেন। (মুসলিম : ১৯৭৮)
উল্লেখ্য যে, যবাইয়ের সময় কেউ যদি বলে, ‘‘খাজা বাবা জিন্দাবাদ’’ তাহলে এটা তার ঈমান ভঙ্গের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
[৪] কোন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মান্নত করা, যেমন কবরে মাযারে মান্নত করা (শিরনী দেয়া) অত্যন্ত গর্হিত কাজ ও ঈমান বিনষ্টকারী শির্ক ও কবীরা গুনাহ। কারণ, মান্নত একমাত্র আল্লাহর জন্যই হতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ … رَبِّ إِنِّي نَذَرۡتُ لَكَ مَا فِي بَطۡنِي مُحَرَّرٗا …٣٥ ﴾ [ال عمران: ٣٥]
‘‘হে পালনকর্তা! আমার গর্ভে যে সন্তান রয়েছে আমি তাকে তোমার উদ্দেশ্যে মান্নত করলাম।’’ (আলে-ইমরান : ৩৫)
[৫] নৈকট্য লাভ ও ইবাদতের নিয়তে কোন কবরের চতুষ্পার্শে প্রদক্ষিণ বা তাওয়াফ করা
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ ثُمَّ لۡيَقۡضُواْ تَفَثَهُمۡ وَلۡيُوفُواْ نُذُورَهُمۡ وَلۡيَطَّوَّفُواْ بِٱلۡبَيۡتِ ٱلۡعَتِيقِ ٢٩ ﴾ [الحج: ٢٩]
‘‘অতঃপর তারা যেন তাদের দৈহিক অপরিচ্ছন্নতা দূর করে, তাদের মান্নত পূর্ণ করে, আর তারা যেন বেশি বেশি এ প্রাচীনতম (কাবা) ঘরের তাওয়াফ করে। (হাজ্জ : ২৯)
[৬] আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন
﴿ … فَعَلَيۡهِ تَوَكَّلُوٓاْ إِن كُنتُم مُّسۡلِمِينَ ٨٤ ﴾ [يونس: ٨٤]
‘‘একমাত্র আল্লাহর উপরই ভরসা কর যদি তোমরা মুসলিম হয়ে থাক।’’ (ইউনুস : ৮৪)
[৭] জেনে বুঝে কোন রাজা, বাদশা বা সম্মানিত কোন পীর বুজুর্গ জীবিত বা মৃত ব্যক্তিকে ইবাদতের নিয়তে রুকু বা সিজদা করা। কেননা রুকু বা সিজদা একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্ধারিত ইবাদত।
[৮] ইসলামের রুকনসমূহ হতে কোন একটি রুকন বা ভিত্তিকে অস্বীকার করা। যথা : সালাত, সওম, হজ্জ ও যাকাত। অথবা ঈমানের ভিত্তিসমূহের কোন একটি ভিত্তিকে অস্বীকার করা। আর সেগুলো হলো আল্লাহ, তাঁর রাসূলগণ, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাকদীরের ভালমন্দ আল্লাহর পক্ষ হতে এবং আখেরাতের প্রতি ঈমান আনা। এছাড়াও দীনের অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় কার্যসমূহ যা দীনের অন্তর্ভুক্ত বলে সর্বজন বিদিত। এসবগুলোর উপর ঈমান আনতেই হবে। এর কোন একটিকে অস্বীকার করলেও ঈমান বিনষ্ট হয়ে যায়।
[৯] ইসলামী জীবন বিধান বা এর অংশ বিশেষকে ঘৃণা করা। এর কোন কোন বিধান পুরাতন ও অকেজো হয়ে গেছে মনে করা। আলেমগণ একমত হয়েছে এমন কোন ইবাদতের ক্ষেত্রে বা বৈষয়িক লেনদেন কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকান্ড অথবা চারিত্রিক বিষয়ে ইসলামের উপদেশাবলীকে ঘৃণার চোখে দেখা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ وَٱلَّذِينَ كَفَرُواْ فَتَعۡسٗا لَّهُمۡ وَأَضَلَّ أَعۡمَٰلَهُمۡ ٨ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ كَرِهُواْ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأَحۡبَطَ أَعۡمَٰلَهُمۡ ٩ ﴾ [محمد: ٨،  ٩]
‘‘আর যারা কুফুরী করেছে তাদের জন্য রয়েছে নিশ্চিত ধ্বংস। আর তাদের কর্মফল বরবাদ করে দেয়া হবে। ঐ কারণে যে, আল্লাহর নাযিল করা (কুরআন বা তার অংশ বিশেষকে) তারা অপছন্দের দৃষ্টিতে দেখে। ফলে আল্লাহ তাদের সকল নেক আমল বরবাদ করে দিবেন। (মুহাম্মাদ : ৯)
[১০] কুরআন কারীম বা সহীহ হাদীসের কোন বিষয় নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করা। কিংবা ইসলামের কোন হুকুম আহকাম নিয়ে তামাশা করা।
এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ … قُلۡ أَبِٱللَّهِ وَءَايَٰتِهِۦ وَرَسُولِهِۦ كُنتُمۡ تَسۡتَهۡزِءُونَ ٦٥ لَا تَعۡتَذِرُواْ قَدۡ كَفَرۡتُم بَعۡدَ إِيمَٰنِكُمۡۚ … ٦٦ ﴾ [التوبة: ٦٥،  ٦٦]
‘‘বল, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করেছিলে? (কাজেই আজ আমার সামনে) তোমরা কোন ওজর আপত্তি পেশ করার চেষ্টা করোনা। ঈমান আনার পরও (সে বিদ্রূপের কারণে) পুনরায় অবশ্যই তোমরা কুফুরী করেছ।’’ (তাওবাহ : ৬৫-৬৬)
[১১] জেনে শুনে ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআন কারীমের কিংবা বিশুদ্ধ হাদীসের কোন অংশ বা কথা অস্বীকার করলে ইসলাম থেকে একেবারেই বহিস্কার হয়ে যায়। যদিও তা কোন ক্ষুদ্র বিষয়ে হোক।
[১২] মহান রবকে গালি দেয়া, দ্বীন ইসলামকে অভিশাপ দেয়া, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দেয়া বা তাঁর কোন অবস্থা নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রূপ করা, তার প্রদর্শিত জীবন বিধানের সমালোচনা করা। এ জাতীয় কর্মকান্ডের কোন একটি কাজ করলেও সে কাফির হয়ে যাবে।
[১৩] আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ অথবা তাঁর গুণাবলীর কোন একটিকেও অস্বীকার করা অথবা কুরআন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আল্লাহর কোন কার্যাবলী অস্বীকার করা বা এগুলোর অপব্যাখ্যা করা।
[১৪] রাসূলগণের প্রতি বিশ্বাস না করা, বা সবাইকে বিশ্বাস করলেও কোন একজন নবীকে অবিশ্বাস করা। অথবা নবী রাসূলদের কাউকে তুচ্ছ ধারণা করা বা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ … لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّن رُّسُلِهِۦۚ …  ٢٨٥ ﴾ [البقرة: ٢٨٥]
‘‘আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কারো ব্যাপারে তারতম্য করি না।’’ (বাকারা : ২৮৫)
[১৫] আল্লাহ প্রদত্ত বিধান বাদ দিয়ে (মানব রচিত আইন দিয়ে) বিচার ফায়সালা করা- এ ধারণা করে যে, এ যুগে ইসলামের আইন কানুন আর চলবে না। কারণ এ আইন অনেক পুরাতন। অথবা আল্লাহ প্রদত্ত আইনের বিপরীতে মানব রচিত আইনকে জায়েয মনে করা এবং আল্লাহর আইনের উপর মানুষের তৈরী আইনকে প্রাধান্য দেয়া। ঈমান ভঙ্গের কারণ হিসেবে এটি একটি ধ্বংসাত্মক আকীদা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ … وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ ٤٤ ﴾ [المائ‍دة: ٤٤]
‘‘আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী শাসন কার্য পরিচালনা করে না, তারা কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।’’ (আল-মায়িদা : ৪৪)
[১৬] ইসলামী বিচারে সন্তুষ্ট না হওয়া। ইসলামী বিচারে অন্তরে সংকোচ বোধ করা ও কষ্ট পাওয়া। বরং ইসলাম বহির্ভুত আইনের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে স্বস্তি বোধ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [النساء: ٦٥]
‘‘কিন্তু না, (হে মুহাম্মদ!) তোমার রবের শপথ। তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসম্ববাদের মীমাংসার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে, অতঃপর তোমার ফায়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কোন দ্বিধা না থাকে, আর তারা সর্বান্তকরণে তার সামনে নিজেদেরকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে।’’ (নিসা : ৬৫)
[১৭] আল্লাহর আইনের সাথে সাংঘর্ষিক এমন ধরনের আইন প্রণয়নের জন্য কোন মানুষকে ক্ষমতা প্রদান করা বা তা সমর্থন করা। অথবা ইসলামী আইনের সাথে সাংঘর্ষিক এমন ধরনের কোন আইনকে সঠিক বলে মেনে নেয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ أَمۡ لَهُمۡ شُرَكَٰٓؤُاْ شَرَعُواْ لَهُم مِّنَ ٱلدِّينِ مَا لَمۡ يَأۡذَنۢ بِهِ ٱللَّهُۚ … ٢١ ﴾ [الشورا: ٢١]
‘‘তাদের কি এমন অংশীদার আছে যারা তাদের জন্য এমন কোন জীবন বিধান প্রণয়ন (ও আইন কানুন তৈরী) করে নিয়েছে যার অনুমতি আল্লাহ তাদেরকে দেননি। (শূরা : ২১)
[১৮] আল্লাহ কর্তৃক বৈধকৃত কাজকে অবৈধ করে নেয়া এবং অবৈধ কাজকে বৈধ করে ফেলা। যেমন সুদকে বৈধ বা হালাল কাজ বলা কিংবা হালাল মনে করা ইত্যাদি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿… وَأَحَلَّ ٱللَّهُ ٱلۡبَيۡعَ وَحَرَّمَ ٱلرِّبَوٰاْۚ … ﴾ [البقرة: ٢٧٥]
‘‘আর আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম।’’ (আল-বাকারা : ১৭৫)
[১৯] আকীদা ধ্বংসাত্মক মতবাদের উপর ঈমান আনা। যেমন নাস্তিক্যবাদ, মাসুনিয়া, মার্কসবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা বা ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ, বা এমন জাতীয়তাবাদ যা আরবের অমুসলিমদেরকে অনাবর (আজমী) মুসলিমদের উপর প্রাধান্য দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ وَمَن يَبۡتَغِ غَيۡرَ ٱلۡإِسۡلَٰمِ دِينٗا فَلَن يُقۡبَلَ مِنۡهُ وَهُوَ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ ٨٥ ﴾ [ال عمران: ٨٥]
‘‘আর যে কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কিছুকে দীন হিসেবে (অর্থাৎ জীবন বিধান হিসেবে) গ্রহণ করতে চাইবে, (আল্লাহর সমীপে) কক্ষনো তা কবূল করা হবে না। বরং সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (আলে ইমরান : ৮৫)
[২০] দ্বীনের বিধি বিধান পরিবর্তন করা, এবং ইসলাম ছেড়ে অন্য কোন ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করা অর্থাৎ মুরতাদ হয়ে যাওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَمَن يَرۡتَدِدۡ مِنكُمۡ عَن دِينِهِۦ فَيَمُتۡ وَهُوَ كَافِرٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ حَبِطَتۡ أَعۡمَٰلُهُمۡ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِۖ وَأُوْلَٰٓئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ ٢١٧ ﴾ [البقرة: ٢١٧]
‘‘আর তোমাদের যে কেউ নিজের দ্বীন (ইসলাম) থেকে (অন্য ধর্মে) ফিরে যায়, অতঃপর সে ব্যক্তি কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে তবে ঐ ধরনের লোকের (সমস্ত নেক) আমল, ইহকাল ও পরকাল উভয়জাহানেই বাতিল হয়ে যাবে। ফলে তারা হয়ে যাবে আগুনের বাসিন্দা। সেখানে (জাহান্নামে) তারা স্থায়ী হবে চিরকাল। (বাকারা : ২১৭)
[২১] মুসলমানদের বিরুদ্ধে অমুসলিমদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ لَّا يَتَّخِذِ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ ٱلۡكَٰفِرِينَ أَوۡلِيَآءَ مِن دُونِ ٱلۡمُؤۡمِنِينَۖ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ فَلَيۡسَ مِنَ ٱللَّهِ فِي شَيۡءٍ إِلَّآ أَن تَتَّقُواْ مِنۡهُمۡ تُقَىٰةٗۗ…  ﴾ [ال عمران: ٢٨]
‘‘মুমিনগণ যেন মুমিন লোক ছাড়া কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব না করে। যদি কেউ এমন কাজ করে তবে আল্লাহর সাথে তার আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। তবে ব্যতিক্রম হলো যদি তোমরা তাদের যুল্ম হতে আত্মরক্ষার জন্য সতর্কতা অবলম্বন কর। (আলে ইমরান : ২৮)
[২২] অমুসলিমদেরকে অমুসলিম না বলা। কেননা আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে তাদেরকে কাফির বলে আখ্যা দিয়েছেন। অতঃপর বলেছেন :
﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ مِنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَٰبِ وَٱلۡمُشۡرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَٰلِدِينَ فِيهَآۚ أُوْلَٰٓئِكَ هُمۡ شَرُّ ٱلۡبَرِيَّةِ ٦ ﴾ [البينة: ٦]
‘‘নিশ্চয় কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফুরী করেছে, আর যারা মুশরিক তারা জাহান্নামের আগুনে চিরস্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই হল সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টতম।’’ (আর বাইয়্যেনা : ৬)
[২৩] এ আকীদা পোষণ করা যে, সবকিছুর মধ্যেই আল্লাহ রয়েছে। এমনকি কুকুর শুকরের মধ্যেও। গীর্জার পাদ্রীর মধ্যেও আল্লাহ রয়েছেন। আল্লাহই পাদ্রী। আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান এ আকীদাকে অহদাতুল উজূদ বলা হয়। এটা শির্কী চিন্তাধারা। এতে ঈমান ভঙ্গ হয়ে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়ে যায়।
[২৪] দীনকে রাষ্ট্রীয় বিষয় হতে পৃথক করা। আর একথা বলা যে, ইসলামে রাজনীতি নেই। এরূপ ধারণা ও মন্তব্যও রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনাদর্শকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।
[২৫] কিছু কিছু বিভ্রান্ত সুফীরা বলে যে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া পরিচালনার চাবি কুতব নামধারী কয়েকজন আওলিয়ার হাতে অর্পণ করেছেন। তাদের এ ধারণা আল্লাহর কার্যাবলীর সাথে শিরক বলে পরিগণিত হয়। এ আকীদা আল্লাহর বাণীর বিপক্ষে চলে যায়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ لَّهُۥ مَقَالِيدُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۗ ﴾ [الزمر: ٦٣]
‘‘আসমান ও যমীনের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার চাবি শুধুমাত্র আল্লাহরই হাতে। (যুমার : ৬৩)
উপরে বর্ণিত বিষয়গুলো অযূ ভঙ্গের কারণসমূহের মতই ঈমান ভঙ্গকারী বিপজ্জনক উপাদান। এর কোন একটি আকীদা বা আমল কেউ যদি করে তাহলে সে লোকটি মুসলিম থেকে বহিষ্কার হয়ে যায়। ফলে তার সালাত, সাওম ইবাদত কবূলতো হবেই না। বরং অমুসলমান হয়ে আখিরাতে কাফিরদের সাথে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়ে যাবে। (নাউযুবিল্লাহ)
প্রশ্ন ৯ : জেনে না জেনে বা ভুলে উপরে বর্ণিত কোন এক বা একাধিক পাপ যদি কেউ করে ফেলে তাহলে এ থেকে শুধরানোর উপায় কি?
উ: তাকে আবার নতুন করে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে। তাওবা করতে হবে খালেছ দিলে, অনুশোচনা করা ও অনুতপ্ত হতে হবে। ভবিষ্যতে এমন পাপের ধারে কাছেও আর যাবেনা, এরূপ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে হবে। তার এ তাওবা হতে হবে মৃত্যুর পূর্বে। এতে ইনশাআল্লাহ তা‘আলা তাওবা কবুল হবে এবং আল্লাহ তাকে মাফ করে দেবেন। আল্লাহর নামতো তওয়াব এবং তিনি গাফুরুর রাহীম।
৪র্থ অধ্যায় :
فوائد الصيام
সিয়ামের শিক্ষা ও উপকারিতা
প্রশ্ন ১০ : সিয়ামের মধ্যে মানুষের জীবনে কী কী উপকার রয়েছে?
উত্তর : এর উপকারিতা বহুবিধ যার অংশবিশেষ নিম্নে তুলে ধরা হলঃ
(ক) প্রথমতঃ মানসিক উপকারিতা
[১] সিয়াম তাকওয়া অর্জন ও আল্লাহ ভীরু হতে সহায়তা করে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُتِبَ عَلَيۡكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ ١٨٣ ﴾ [البقرة: ١٨٣]
[১] ঈমানদারগণ!, তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মাতের উপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (বাকারাহ : ১৮৩)
[২] শয়তানী শক্তি ও কু-প্রবৃত্তির ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। মানবদেহের শরীরের যে শিরা উপশিরা দিয়ে শয়তান চলাচল করে সিয়ামের ফলে সেগুলো নিস্তেজ ও কর্মহীন হয়ে পড়ে।
[৩] সিয়াম হল আল্লাহর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পন ও ইবাদতের প্রশিক্ষণ।
[৪] আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্য ধারণ ও হারাম বস্ত্ত থেকে দূরে থাকার সহনশীলতার প্রশিক্ষণ দেয় এ সিয়াম।
[৫] ঈমান দৃঢ়করণ এবং বান্দার প্রতি আল্লাহর সার্বক্ষণিক নজরদারীর অনুভূতি সৃষ্টি করে দেয়। এজন্য রোযাদার লোকচক্ষুর আড়ালে গোপনেও কোন কিছু খায় না।
[৬] দুনিয়ার ভোগ বিলাসের মোহ কমিয়ে সিয়াম পালনকারীকে আখিরাতমূখী হওয়ার দীক্ষা দেয় এবং ইবাদতের প্রতি তার ক্ষেত্র প্রসারিত করে দেয়।
[৭] সিয়াম সাধনার ফলে বান্দা সৎ গুণাবলী ও সচ্চরিত্রের অধিকারী হয়ে থাকে।
[৮] সিয়ামে ক্ষুধার অনুভূতিতে অভাবী ও দরীদ্র জনগোষ্ঠীর দূরাবস্থা অনুধাবন করতে শিখায়। ফলে তাকে বঞ্চিত ও অনাহারী মানুষের প্রতি দয়াদ্র ও সহানুভুতিশীল করে তুলে।
[৯] সৃষ্ট জীবের সেবা করার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
[১০] সিয়াম পালন আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সাহায্য করে।
[১১] এ রমযান বান্দাকে নিয়ম-শৃঙ্খলা ও সময়ানুবর্তিতা শিক্ষা দেয়।
(খ) দ্বিতীয়তঃ দৈহিক উপকারিতা :
[১] সিয়াম মানব দেহে নতুন সূক্ষ্ম কোষ (ঈবষষ) গঠন করে থাকে।
[২] সিয়াম পাকস্থলী ও পরিপাকতন্ত্রকে বিশ্রাম দিয়ে থাকে। ফলে এগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় এবং তা আবার সতেজ ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।
[৩]মোটা মানুষের স্থূলতা কমিয়ে আনতে সিয়াম সাহায্য করে।
[৪] মাত্রাতিরিক্ত ওজন কমিয়ে এনে অনেক রোগবালাই থেকে হিফাযত করে।
[৫] অনেক অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতে ডাইবেটিস ও গ্যাস্ট্রিক রোগ নিরাময়ে সিয়াম ফলদায়ক ও এক প্রকার সহজ চিকিৎসা।
৫ম অধ্যায়
عقوبة تارك الصيام
সিয়াম ত্যাগকারীর শাস্তি
প্রশ্ন ১১ : যারা বিনা উযরে সিয়াম ভঙ্গ করে তাদের শাস্তি কী হবে?
উ: তারা ভীষণ শাস্তির সম্মুখীন হবে। এ বিষয়ে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কয়েকটি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হল :
[১] আবু উমামা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, একটি সম্প্রদায় উল্টোভাবে ঝুলছে। তাদের গালটি ফাড়া। তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম এরা কারা? বলা হল, এরা ঐসব ব্যক্তি যারা বিনা উযরে রমযান মাসের সিয়াম ভঙ্গ করেছিল। (সহীহ ইবনে খুযাইমাহ)
[২] যে ব্যক্তি (রমাযানের) এ মুবারক মাসেও আল্লাহকে রাজী করাতে পারল না, সে বড়ই দুর্ভাগা। (ইবনে হিববান)
[৩] যে ব্যক্তি শরীয়তী উযর ছাড়া এ (রমযান) মাসে একটি রোযাও ছেড়ে দেবে, সে যদি এর বদলে সারা জীবনও সিয়াম পালন করে তবু তার পাপের খেসারত হবে না। (বুখারী)
৬ষ্ঠ অধ্যায়
رؤية الهلال
চাঁদ দেখা
প্রশ্ন ১২ : কিসের ভিত্তিতে সিয়াম পালন শুরু করতে হয়?
উত্তর : চাঁদ দেখার ভিত্তিতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
صُومُوا لِرُؤْيَتِهِ وَأَفْطِرُوا لِرُؤْيَتِهِ
[১] তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখেই তা ভঙ্গ কর (অর্থাৎ ঈদ কর)। (বুখারী : ১৯০৯; নাসাঈ : ২১১৬)
تَرَاءَى النَّاسُ الْهِلاَلَ فَأَخْبَرْتُ رَسُولَ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- أَنِّي رَأَيْتُهُ فَصَامَهُ وَأَمَرَ النَّاسَ بِصِيَامِهِ
[২] ইবনে ‘উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, মানুষ দলে দলে চাঁদ দেখতে শুরু করল। এমনি সময় আমি চাঁদ দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালাম। আমার এ সংবাদের উপর ভিত্তি করে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখলেন এবং সবাইকে রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন। (আবূ দাঊদ :  ২৩৪)
جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ إِنِّي رَأَيْتُ الْهِلاَلَ يَعْنِي رَمَضَانَ فَقَالَ أَتَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلٰهَ إِلاَّ اللهُ قَالَ : نَعَمْ، قَالَ : أَتَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ : يَا بِلاَلُ أَذِّنْ فِي النَّاسِ فَلْيَصُومُوا غَدًا
[৩] এক গ্রাম্য ব্যক্তি এসে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানালেন, আমি তো চাঁদ দেখেছি অর্থাৎ রমাযানের চাঁদ। অতঃপর রাসূল বললেন, তুমি কি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-(কালিমার) উপর ঈমান এনেছ? লোকটি উত্তর দিল : হ্যাঁ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেন : তুমি কি আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ (অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল) এ কথার উপর ঈমান এনেছ? লোকটি উত্তর দিল : হ্যাঁ। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবী বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু কে বললেন, হে বেলাল! মানুষকে জানিয়ে দাও, তারা যেন আগামীকাল থেকে রোযা রাখে। (আবূ দাঊদ : ২৩৪০ হাদীসটি দুর্বল)
প্রশ্ন ১৩ : কমপক্ষে কতজন লোকে চাঁদ দেখলে এ সাক্ষী গ্রহণযোগ্য হবে?
উত্তর : কমপক্ষে একজন লোকে দেখলেও হবে। উপরে বর্ণিত হাদীসগুলো এর দলীল।
প্রশ্ন ১৪ : চাঁদ দেখার ক্ষেত্রে সাক্ষীর কি ধরণের গুণাবলী থাকা দরকার?
উত্তর : একজন সাধারণ মানুষের সাক্ষ্যও গ্রহণ করা যাবে যদি তার সততা প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। যদি তার আকল বুদ্ধিতে কোন দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন না করে এবং এর মধ্যে যদি কোন ব্যক্তির স্বার্থ না থাকে।
প্রশ্ন ১৫ : আকাশ মেঘলা হলে বা অন্য কোন কারণে চাঁদ দেখা না গেলে কি করব?
উত্তর : এমন হলে ৩০ দিন পুরা করবে এবং এরপরের দিন থেকে সিয়াম পালন শুরু করবে। হাদীসে আছে-
الشَّهْرُ تِسْعٌ وَعِشْرُونَ لَيْلَةً فَلاَ تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلاَثِينَ
মাস হল ২৯ রাত্রি। তবে চাঁদ না দেখে তোমরা রোযা রেখ না। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে ফলে চাঁদ দেখা না যায়, তবে ত্রিশ দিন পূর্ণ কর। (বুখারী : ১৮০৮)
প্রশ্ন ১৬ : পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী রোযা রাখা যাবে কি?
উত্তর : না, চাঁদ না দেখে শুধুমাত্র পঞ্জিকার লেখা বা ক্যালেন্ডার অনুযায়ী রোযা বা ঈদ করা যাবে না।
প্রশ্ন ১৭ : বিভিন্ন কারণে চাঁদ দেখতে না পারলেও রমযান হয়তো শুরু হয়ে গেছে এমন সন্দেহ করে রোযা রাখা শুরু করা যাবে কি?
উত্তর : সন্দেহের দিন থেকে রোযা রাখা শুরু করা- এটা কোন বুজুর্গী কাজ নয় বরং এটা গুনাহের কাজ। সন্দেহের দিন রোযা রাখতে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পূর্ণ নিষেধ করেছেন। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করা বৈধ নয়। হাদীসে আছে,
مَنْ صَامَ الْيَوْمَ الَّذِي يَشُكُّ فِيهِ النَّاسُ فَقَدْ عَصَى أَبَا الْقَاسِمِ -صلى الله عليه وسلم-
যে ব্যক্তি সন্দেহ সংশয়পূর্ণ দিনে রোযা রাখবে সে নিশ্চিতই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অমান্য করল। (তিরমিযী : ৬৮৬)
প্রশ্ন ১৮ : অধিক পরহেযগারী কাজ মনে করে যদি কেউ দু’ একদিন আগে থেকেই রোযা পালন শুরু করে তাহলে কি সওয়াব হবে?
উত্তর : না, হবে না। বরং এটা গুনাহের কাজ। হাদীসে আছে,
لاَ تَصُومُوا قَبْلَ رَمَضَانَ صُومُوا لِلرُّؤْيَةِ وَأَفْطِرُوا لِلرُّؤْيَةِ فَإِنْ حَالَتْ دُونَهُ غَيَابَةٌ فَأَكْمِلُوا ثَلَاثِينَ
‘‘তোমরা রমযান শুরু হওয়ার আগেই রোযা রাখা শুরু করো না। চাঁদ দেখে রোযা শুরু কর এবং পরবর্তী চাঁদ দেখেই রোযা রাখা বন্ধ কর। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে আরো একদিন অপেক্ষা করে (শাবান মাস) ত্রিশ দিন পূরণ কর।’’ (নাসাঈ : ২১৩০)
প্রশ্ন ১৯ : যে ব্যক্তি শাবান মাসে আগে থেকেই নফল রোযা রাখার অভ্যস্ত সে কি রমযান শুরু হওয়ায় আগের দু’ একদিন নফল রোযা রাখতে পারবে?
উত্তর : হ্যাঁ, ঐ ব্যক্তি পারবে। এ ধরণের লোকের জন্য তা বৈধ। হাদীসে আছে,
لاَ تَقَدَّمُوا رَمَضَانَ بِصَوْمِ يَوْمٍ وَلاَ يَوْمَيْنِ إِلاَّ رَجُلٌ كَانَ يَصُومُ صَوْمًا فَلْيَصُمْهُ
চাঁদ না দেখেই রোযা রাখা শুরু করে তোমরা রমযানকে এক বা দু’দিন এগিয়ে নিয়ে এসো না। (অর্থাৎ এক বা দু’দিন আগে থেকেই রোযা রাখা শুরু করে দিও না)।
তবে যে ব্যক্তি আগে থেকে নফল রোযা রাখতে অভ্যস্ত তার বিষয়টি ভিন্ন। (মুসলিম : ১০৮২)
প্রশ্ন ২০ : চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত হতে না পারায় কেউ যদি এমনভাবে নিয়ত করে যে, যদি চাঁদ উঠে থাকে তাহলে এটা আমার ফরজ রোযা আর যদি না উঠে থাকে তাহলে হবে নফল রোযা এরূপ দোদুল্যমান নিয়ত করা কি জায়েয হবে?
উত্তর : না, এরূপ নিয়ত করা জায়েয নয়। এমন সন্দেহজনক কোন রোযা শুদ্ধ হবে না।
প্রশ্ন ২১ : কেউ যদি দূরবীন দিয়ে চাঁদ দেখে তবে কি তা জায়েয?
উত্তর : হ্যাঁ, দেখতে পারে। এতে নিষেধের কিছু নেই। তবে দূরবীন ব্যবহার করা জরুরী নয়। মানুষের স্বাভাবিক দৃষ্টির উপর নির্ভর করাই যথেষ্ট।
প্রশ্ন ২২ : কখনো কখনো অনিশ্চিত ও উড়ো খবর পাওয়া যায় যে, চাঁদ দেখা গেছে সে ক্ষেত্রে কি করব?
উত্তর : যারা চাঁদ দেখবে তাদের প্রধান দায়িত্ব হল সরকারী কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো। অতঃপর সরকার বিষয়টি যাচাই করে যে সিদ্ধান্ত দেবে সে অনুযায়ীই জনগণ রোযা রাখবে। এক্ষেত্রে একক কোন ব্যক্তি বা কিছু লোক কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সিদ্ধান্ত নেবে শুধু সরকার। অন্যেরা শুধু সরকারকে সহায়তা করতে পারে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
الصَّوْمُ يَوْمَ تَصُومُونَ وَالْفِطْرُ يَوْمَ تُفْطِرُونَ وَالأَضْحٰى يَوْمَ تُضَحُّونَ
‘যেদিন সকলে রোযা রাখবে তোমরাও সেদিন রোযা রাখবে ; যেদিন সকলে ঈদ করবে তোমরাও সেদিন ঈদ করবে। যেদিন সকলে ঈদুল আযহা উদযাপন করবে তোমরাও সেদিনই তা করবে। (অর্থাৎ জনগণ বা জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোন কিছু করো না)’। (তিরমিযী : ৬৯৭)
প্রশ্ন ২৩ : যদি এমন হয় যে, আমি চাঁদ দেখলাম। কিন্তু আমার সাক্ষ্য সরকার গ্রহণ করল না। এমতাবস্থায় কী করব?
উত্তর : এ অবস্থায় চুপচাপ থাকাই উত্তম। যাচাই বাছাই পূর্বক সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে সেটাই মেনে নেবেন। জামাতচ্যুত হওয়া বৈধ নয়। সকলের সাথে থাকাই এক্ষেত্রে ওয়াজিব। (ফতওয়া ইবনে তাইমিয়া খণ্ড ২৫, পৃঃ ২১৪-২১৮)
এ বিষয়ে উলামায়ে কিরামের ২য় আরেকটি মত হল, যে ব্যক্তি স্বচক্ষে চাঁদ দেখবে সে একাকী হলেও রোযা রাখবে। আর রাখতে না পারেল তা পরে কাযা করে নিবে। (কুদুরী)
৭ম অধ্যায়
على من يجب الصيام
সিয়াম কাদের উপর ফরয
প্রশ্ন ২৪ : কাদের উপর সিয়াম পালন ফরয?
উত্তর : (১) প্রাপ্ত বয়স্ক, (২) সুস্থ বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন, (৩) মুকীম ও সমর্থবান এমন সব গুণ সম্পন্ন প্রত্যেক মুসিলম নর-নারীর উপর সিয়াম পালন করা ফরয।
প্রশ্ন ২৫ : কী অবস্থায় কাদের উপর সিয়াম ফরয নয়?
উ: নিম্নবর্ণিত দশপ্রকার মানুষের উপর সিয়াম পালন ফরয নয়, তারা হল :
[১] অমুসলিম
[২] অপ্রাপ্ত বয়স্ক/ অর্থাৎ নাবালেগ
[৩] পাগল
[৪] এমন বৃদ্ধলোক যে ভাল-মন্দ পার্থক্য করতে পারে না
[৫] এমন বৃদ্ধ ব্যক্তি যে রোযা রাখতে সমর্থ নয়। বা এমন রোগী যার রোগমুক্তির সম্ভাবনা নেই। এমন ব্যক্তিদের উপর ফিদইয়া দেয়া ওয়াজিব।
[৬] মুসাফির
[৭] রোগাক্রান্ত ব্যক্তি
[৮] ঋতুবতী মহিলা
[৯] গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারী
[১০] দুর্ঘটনায় পতিত বা বিপদগ্রস্ত লোককে রক্ষাকারী ব্যক্তি।
৮ম অধ্যায়
সিয়াম অবস্থায় যা অবশ্য করণীয়
প্রশ্ন ২৬ : সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে কী কী কাজ ও আমল অত্যাবশ্যক?
উত্তর : সিয়াম অবস্থায় অত্যাবশ্যকীয় আমলসমূহ :
[১] পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাত আদায় করা। কোন শরয়ী উযর না থাকলে সালাত মাসজিদে গিয়ে জামাআতের সাথে আদায় করা। জামাআতে সালাত আদায়কে বিজ্ঞ ওলামায়ে কিরাম ওয়াজিব বলেছেন। যারা জামাআতের সাথে সালাত আদায় করে না তারা ২৭ গুণ সাওয়াব থেকে বঞ্চিততো হয়ই, উপরন্তু ফজর ও ঈশার জামাআত পরিত্যাগকারীকে হাদীসে মুনাফিকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। যারা অবহেলা করে বিনা ওযরে সালাত দেরী করে আদায় করে তার সালাত একশবার পড়লেও তা কবুল হবে না বলে উলামায়ে কিরাম মন্তব্য করেছেন। আর মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় থেকে বিরত থাকতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্ধ ব্যক্তিকেও অনুমতি প্রদান করেন নি।
[২] মিথ্যা না বলা।
[৩] গীবত না করা- আর তা হলো অসাক্ষাতে কারো দোষত্রুটি বা সমালোচনা করা
[৪] চোগলখোরী না করা- আর তা হলো এক জনের বিরুদ্ধে আরেকজনকে কিছু বলে ক্ষেপিয়ে তোলা ও ঝগড়া লাগিয়ে দেয়া।
[৪] ক্রয় বিক্রয় ও অন্যান্য কাজে কাউকে ধোঁকা না দেয়া।
[৫] গান গাওয়া ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো থেকে বিরত থাকা, মধুর কণ্ঠে গাওয়া যৌন উত্তেজনামূলক গান থেকে আরো বেশি সাবধান থাকা।
[৬] সকল প্রকার হারাম কাজ-কর্ম পরিহার করা।
জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
إِذَا صُمْتَ فَلْيَصُمْ سَمْعُكَ وَبَصَرُكَ وَلِسَانُكَ عِنْدَ الْكَذِبِ وَالْمَحَارِمِ وَدَعْ عَنْكَ أَذَى الْجَارِ وَلْيَكُنْ عَلَيْكَ وَقَار وَسَكِيْنَة وَلاَ يَكُنْ يَوْمُ صَوْمِكَ وَيَوْمُ فِطْرِكَ سَوَاء
যখন তুমি রোযা রাখবে তখন যেন তোমার কর্ণ, চক্ষু এবং জিহবাও মিথ্যা ও হারাম কাজ থেকে রোযা রাখে। তুমি প্রতিবেশিকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকো। আত্মমর্যাদা ও প্রশান্তভাব যেন তোমার উপর বজায় থাকে এমন হলে তোমার রোযা রাখা ও না রাখা সমান হবে না। (ইবন আবী শাইবা : ৮৮৮০)
[৭] ইসলামকে জীবনের সকলক্ষেত্রে অনুসরণ করা।
মসজিদে যেমনভাবে ইসলাম তেমনি পরিবার, সমাজ, ব্যবসা এবং রাষ্ট্রীয় জীবনেও ইসলামকে একমাত্র জীবন বিধান হিসেবে বাস্তবায়ন করা।
আল্লাহ বলেন,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱدۡخُلُواْ فِي ٱلسِّلۡمِ كَآفَّةٗ ﴾ [البقرة: ٢٠٨]
‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা ইসলামে দাখিল হও পরিপূর্ণভাবে (অর্থাৎ জীবনের সর্বক্ষেত্রে)। (বাকারাহ ২০৮)
[৮] সিয়াম আবস্থায় পাপাচার ত্যাগ করা এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকা।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
كَمْ مِنْ صَائِمِ لَيْسَ لَهُ مِنْ صِيَامِهِ إِلاَّ الظَّمْأَ وَكَمْ مِنْ قَائِمِ لَيْسَ لَهُ مِنْ قِيَامِهِ إِلاَّ السَّهْر
(ক) কত সিয়াম পালনকারী আছে যাদের রোযা হবে শুধু উপোস থাকা। আর কতলোক রাতের ইবাদতকারী আছে যাদের রাত জাগরণ ছাড়া ইবাদতের কিছুই হবে না। (অর্থাৎ পাপকাজ থেকে বিরত না হওয়ার কারণে তার রোযা যেন রোযা নয়, তার রাতের সালাতও যেন ইবাদত নয়)। (আহমাদ : ৯৬৮৩; দারেমী : ২৭৬২)
فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفُثْ يَوْمَئِذٍ وَلاَ يَصْخَبْ فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ
(খ) তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রোযা রাখে, সে যেন তখন অশ্লীল কাজ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। রোযা রাখা অবস্থায় কেউ যদি তাকে গালাগালি ও তার সাথে মারামারি করতে আসে, সে যেন বলে ‘‘আমি রোযাদার’’। (মুসলিম : ১১৫১)
لَيْسَ الصِّيَامُ مِنَ الأَكْلِ وَالشُّرْبِ إِنَّمَا الصِّيَامُ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ
(গ) শুধুমাত্র পানাহার ত্যাগের নাম রোযা নয়, প্রকৃত রোযা হল (সিয়াম অবস্থায়) বেহুদা ও অশ্লীল কথা এবং কাজ থেকে বিরত থাকা। (ইবনু খুযাইমা : ১৯৯৬)
مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْلَ فَلَيْسَ للهِ حَاجَةٌ أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ
(ঘ) যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং অজ্ঞতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি সে ব্যক্তির শুধুমাত্র পানাহার বর্জনের (এ সিয়ামে) আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (বুখারী : ৬০৫৭)
[৯] রোযা রাখা (ও অন্যান্য ইবাদত) একমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য করা। আল্লাহ বলেন,
﴿ وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ … ﴾ [البينة: ٥]
‘‘মানুষকে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তাদের ইবাদত যেন শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য হয়।’’ (বাইয়্যেনাহ : ৫)
[১০] সকল হুকুম আহকাম পালনে নাবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র সুন্নাত তরীকা অনুসরণ করা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ عَمِلَ عَمَلاً لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ
‘‘যে ব্যক্তি এমন (তরীকায়) কোন আমল করল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক নির্দেশিত সেই কাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য তো হবেই না রবং) তা হবে প্রত্যাখ্যাত’। (মুসলিম : ১৭১৮)
[১১] সিয়াম ভঙ্গের সহায়ক কাজ-কর্ম পরিহার করা স্বামী-স্ত্রীর আলিঙ্গন, চুম্বন বা একত্রে শয়ন জায়েয হলেও তা যেন রোযা ভঙ্গের পর্যায়ে নিয়ে না যায় সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।
[১২] অন্তরে ভয় ও আশা পোষণ করা।
কোন অজানা ভুলের জন্য রোযাটি ভেঙ্গে যায় কিনা এ ধরনের ভয় থাকা এবং আল্লাহর কাছে এর প্রতিদান পাবো এ আশাও পোষণ করা। অন্তরকে এ দু’য়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করে রাখতে হবে।
৯ম অধ্যায়
সিয়ামের সুন্নাত আদব
প্রশ্ন ২৭ : প্রত্যেক ইবাদতেরই কিছু আদব কায়দা ও শিষ্টাচার রয়েছে, সিয়ামের আদবগুলো কী কী?
উত্তর : সিয়াম পালনের কিছু মুস্তাহাব বা সুন্নাত আদব আছে যেগুলো পালন করলে সাওয়াব বেড়ে যাবে। আর তা ছেড়ে দিলে রোযা ভঙ্গ হবে না বা গোনাহও হবে না। তবে পুণ্যে ঘাটতি হবে। কিন্তু তা আদায় করলে সওয়াবের পরিপূর্ণতা আসে। নিম্নে এসব আদব উল্লেখ করা হল :
[১] সাহরী খাওয়া।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً
(ক) তোমরা সাহরী খাও, কারণ সাহরীতে বরকত রয়েছে। (বুখারী : ১৯২৩; মুসলিম : ১০৯৫)
مَا بَيْنَ صِيَامِنَا وَصِيَامِ أَهْلِ الْكِتَابِ أَكْلَةُ السَّحَرِ
(খ) আমাদের (মুসলিমদের) ও ইয়াহূদী-নাসারাদের সিয়ামের মধ্যে পার্থক্য হল সাহরী খাওয়া। (মুসলিম : ১০৯৬)
অর্থাৎ আমরা সিয়াম পালন করি সাহরী খেয়ে, আর ইয়াহূদী-নাসারারা রোযা রাখে সাহরী না খেয়ে।
نِعْمَ سَحُورُ الْمُؤْمِنِ التَّمْرُ
(গ) মু’মিনের সাহরীতে উত্তম খাবার হল খেজুর। (আবূ দাঊদ : ২৩৪৫)
السَّحُورُ أَكْلُهُ بَرَكَةٌ فَلاَ تَدَعُوهُ وَلَوْ أَنْ يَجْرَعَ أَحَدُكُمْ جُرْعَةً مِنْ مَاءٍ فَإِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ وَمَلاَئِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى الْمُتَسَحِّرِينَ
(ঘ) (রোযাদারদের জন্য) সাহরী হল একটি বরকতময় খাবার। তাই কখনো সাহরী খাওয়া বাদ দিও না। এক ঢোক পানি পান করে হলেও সাহরী খেয়ে নাও। কেননা সাহরীর খাবার গ্রহণকারীকে আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর ফেরেশতারা স্মরণ করে থাকেন। (আহামদ : ১০৭০২)
[২] সাহরী দেরী করে খাওয়া।
অর্থাৎ তা শেষ ওয়াক্তে খাওয়া উত্তম। রাতের শেষাংশে গ্রহণকৃত খাবারকে সাহরী বলা হয়।
[৩] সাহরীর সময়কে ইবাদতে কাজে লাগানো। প্রতিরাতের শেষ তৃতীয়াংশ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরশ থেকে প্রথম আসমানে নেমে আসেন। আর বান্দাদেরকে এই বলে আহবান করেন :
مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ وَمَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ وَمَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ
‘‘এখন যে ব্যক্তি আমার কাছে দু‘আ করবে আমি তা কবূল করব, যা কিছু আমার কাছে এখন চাইবে আমি তাকে তা দিব এবং যে আমার কাছে এখন মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দিব। (বুখারী : ৬৩২১;  মুসলিম : ৭৫৮)
অতএব তখন কুরআন অধ্যয়ন, তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদের সালাত আদায়, তাওবাহ-ইস্তিগফার ও দু‘আ কবূলের জন্য এটা এক উত্তম সময়। তাদের প্রশংসায় আল্লাহ বলেন :
﴿ وَبِٱلۡأَسۡحَارِ هُمۡ يَسۡتَغۡفِرُونَ ١٨ ﴾ [الذاريات: ١٨]
‘‘তারা শেষ রাতে জেগে উঠে তাওবাহ-ইস্তিগফার করে।’’ (সূরাহ যারিয়াত-১৮)
[৪] সূর্য অস্ত যাওয়ামাত্র ইফতার করা অর্থাৎ তাড়াতাড়ি ইফতার করা। অতিরঞ্জিত সাবধানতার নামে ইফতার বিলম্ব না করা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لاَ يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ
(ক) অর্থাৎ মানুষ যতদিন পর্যন্ত তাড়াতাড়ি ইফতার করবে ততদিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে। (বুখারী : ১৯৫৭; মুসলিম : ১০৯৮)
لاَ يَزَالُ الدِّينُ ظَاهِرًا مَا عَجَّلَ النَّاسُ الْفِطْرَ لِأَنَّ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى يُؤَخِّرُونَ
(খ) যতদিন মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে ততদিন দীন ইসলাম বিজয়ী থাকবে। কেননা, ইয়াহূদী ও নাসারাদের অভ্যাস হল ইফাতর দেরীতে করা। (আবূ দাঊদ : ২৩৫৩)
ثَلاَثَةُ مِنْ أَخْلاَقِ النَّبُوَّةِ : تَعْجِيْلُ الإِفْطَارِ وَتَأْخِيْرُ السَّحُوْرِ وَوَضْعِ الْيَمِيْنِ عَلَى الشِّمِالِ فِي الصَّلاَةِ
(গ) তিনটি বিষয় নাবী চরিত্রের অংশ : সময় হওয়ামাত্র ইফতার করে ফেলা, সাহরী শেষ ওয়াক্তে খাওয়া এবং সালাতে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা। (মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ১০৫)
كَانَ أَصْحَابُ مُحَمَّدٍ -صلى الله عليه وسلم- أَسْرَعُ النَّاسَ إِفْطَارًا وَأَبْطَأُهُمْ سُحُوْرًا
(ঘ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবীগণ সকলের আগে তাড়াতাড়ি ইফতার করতেন এবং সকলের চেয়ে দেরীতে সাহরী খেতেন। (মুসান্নাফ আঃ রাযযাক : ৭৫৯১)
[৬] মাগরিবের সালাতের পূর্বে ইফতার করা এবং খেজুর বা পানি দ্বারা ইফতার করা।
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন,
كَانَ رَسُولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- يُفْطِرُ عَلَى رُطَبَاتٍ قَبْلَ أَن يُّصَلِّيَ…
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মাগরিবের) সালাতের পুর্বে তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। যদি তাজা খেজুর পাওয়া না যেত তবে শুকনো খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। আর যদি শুকনা খেজুর পাওয়া না যেত তাহলে কয়েক ঢোক পানি দ্বারা ইফতার করতেন। (আহমাদ : ৩/১৬৪)
তবে পেট ভর্তি করে খাওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
مَا مَلأُ ابْنُ آدَمَ وِعَاءُ بَطْنِهِ
‘‘যে ব্যক্তি পেট ভর্তি করে খানা খায় তার ঐ পেট (আল্লাহর কাছে) একটি নিকৃষ্ট পাত্র।’’ (তিরমিযী : ২৩৮০)
সুন্নাত হল পেটের তিন ভাগের একভাগ খাবার খাবে, আর তিনভাগের একভাগ পানি পান করবে। বাকী এক তৃতীয়াংশ শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য খালী রেখে দিবে। (তিরমিযী : ২৩৮০)
[৫] ইফতারের সময় দু‘আ করা
এ মুহূর্তটি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়ার সময়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ للهِ تَعَالَى عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ وَذَلِكَ كُلّ لَيْلَةٍ لِكُلِّ عَبْدٍ مِنْهُمْ دَعْوَةً مُسْتَجَابَةً
(ক) ইফতারের সময় আল্লাহ রববুল ‘আলামীন বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। আর এ মুক্তি দানের পালা রমাযানের প্রতি রাতেই চলতে থাকে। সে সময় সিয়াম পালনকারী প্রত্যেক বান্দার দু‘আ কবূল হয়।’’ (আহমাদ : ৭৪৫০)
(খ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইফতার করতেন তখন বলতেন :
اَللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ
হে আল্লাহ! তোমার জন্য রোযা রেখেছি, আর তোমারই রিযিক দ্বারা ইফতার করছি।
উল্লেখ্য যে, আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী উপরোক্ত হাদীসটিকে দুর্বল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
 (ঙ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফতারের সময় নিম্নের এ দুআটি পাঠ করতেন :
ذَهَبَ الظَّمَاءُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوْقُ وَثَبَتَ الأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللهُ
অর্থ : ‘‘পিপাসা নিবারিত হল, শিরা উপশিরা সিক্ত হল এবং আল্লাহর ইচ্ছায় পুরস্কারও নির্ধারিত হল।’’ (আবূ দাউদ : ২৩৫৭, দারাকুতনী : ২২৭৯ আলবানী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন)
ইফতারের সময় যখন আযান হয় তখন আযানের পরের সময়টা দু‘আ কবূলের সময়। হাদীসে আছে আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দু‘আ কবূল হয়।
[৬] বেশি বেশি কুরআন পাঠ করা, সালাত আদায়, যিকর ও দু‘আ করা।
রমযান যেহেতু কুরআন নাযিলের মাস সেহেতু এ মাসে কুরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন অন্য সময়ের চেয়ে বেশি করা উচিত।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ الصِّيَامُ أَيْ رَبِّ مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ وَيَقُولُ الْقُرْآنُ مَنَعْتُهُ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ قَالَ فَيُشَفَّعَانِ
সিয়াম ও কুরআন কিয়ামতের দিন (আল্লাহর কাছে) মানুষের জন্য এভাবে সুপারিশ করবে যে, সিয়াম বলবে, হে রব! দিনের বেলায় আমি তাকে পানাহার ও যৌন উপভোগ থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবূল কর।
কুরআনও বলবে, হে রব! (রাতে কুরআন পাঠের কারণে) রাতের নিদ্রা থেকে আমি তাকে বিরত রেখেছি। তাই এ পাঠকের ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ মঞ্জুর কর। তিনি বলেন, অতঃপর উভয়েরই সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। (আহমাদ : ৬৫৮৯)
[৭] ইবাদতের তাওফীক কামনা ও আল্লাহর দয়া অনুধাবন করা
আমরা যে ইবাদত করি তাও আল্লাহর দয়া। তিনি যে এ কাজে আমাদেরকে তাওফীক দিয়েছেন সেজন্য আমরা তার শুকরিয়া আদায় করি। অনেকের ভাল কাজও আবার কবূল হয় না। আল্লাহ বলেন :
﴿  …إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ ٱللَّهُ مِنَ ٱلۡمُتَّقِينَ ٢٧ ﴾ [المائ‍دة: ٢٧]
‘‘কেবলমাত্র মুত্তাকীদের কাজই আল্লাহ কবূল করেন। (মায়িদাহ : ২৭)
ভয় ও আশা নিয়ে যেন আমরা ইবাদত করি। গর্ব-অহঙ্কার ও হিংসা বান্দার ইবাদতকে নষ্ট করে দেয় এবং কুফরী ও শির্ক করলে তার কোন নেকই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, বরং ইবাদতসমূহ ধ্বংস ও বাতিল হয়ে যায়।
[৮] ইয়াতীম, বিধবা ও গরীব মিসকীনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া ও বেশি বেশি দান খয়রাত করা।
তাদেরকে যাকাত, ফিত্‌রা ও সাদাকাহ দেয়া। হাদীসে এসেছে :
كَانَ رَسُولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- أَجْوَدَ النَّاسِ بِالْخَيْرِ وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي شَهْرِ رَمَضَانَ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল আর রমাযানে তাঁর এ দানশীলতা আরো বেড়ে যেত। (মুসলিম : ২৩০৮)
[৯] উত্তম চরিত্র গঠনের অনুশীলন করা।
রমযান ধৈর্যধারনের মাস। আর সিয়াম হল এ কার্য প্রশিক্ষণের ইনিষ্টিটিউট। কাজেই এ সময় আমাদেরকে সুন্দর চরিত্র গঠনের অনুশীলন করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
فَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلاَ يَرْفُثْ يَوْمَئِذٍ وَلاَ يَصْخَبْ فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ
‘তোমাদের মধ্যে কেউ যদি রোযা রাখে, সে যেন তখন অশ্লীল কাজ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। রোযা রাখা অবস্থায় কেউ যদি তার সাথে গালাগালি ও মারামারি করতে আসে সে যেন বলে, ‘‘আমি রোযাদার’’। (মুসলিম : ১১৫১)
[১০] অপচয় ও অযথা খরচ থেকে বিরত থাকা।
খাওয়া দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ ও আরাম আয়েশে অনেকেই অপচয় ও অপব্যয় করে থাকে। এটা এক গর্হিত কাজ। এ থেকে বিরত থাকা।
[১১] রুটিন করে সময়টাকে কাজে লাগানো।
অহেতুক কথাবার্তা, আড্ডা বাজি, গল্প-গুজব, বেহুদা তর্কবিতর্ক পরিহার করা। রুটিন করে পরিকল্পনা ভিত্তিক কাজ করা। এতে জীবন অধিকতর ফলপ্রসূ হবে।
[১২] দুনিয়াবী ব্যস্ততা কমিয়ে দেয়া।
রমাযানের এ বরকতময় মাসে অর্থ উপার্জন ও ব্যবসা বাণিজ্যের ব্যস্ততা কমিয়ে দিয়ে আখিরাতের মুনাফা অর্জনের জন্য অধিকতর বেশি সময় দেয়া আবশ্যক। দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী আর আখিরাত চিরস্থায়ী।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ وَٱلۡأٓخِرَةُ خَيۡرٞ وَأَبۡقَىٰٓ ١٧ ﴾ [الاعلا: ١٧]
‘‘আর আখিরাতের জীবন সর্বোত্তম এবং চিরস্থায়ী।’’ (সূরা আ‘লা : ১৭)
[১৩] খাওয়া ও নিদ্রায় ভারসাম্য রক্ষা করা।
কেউ কেউ এতো বেশি খাবার খায় যে নাস্তা ও দুপুরের খাবার শুধু ইফাতের এক বেলায়ই তা পুষিয়ে নেয়। আবার তারাবীহ ও সেহরীর ওয়াক্তের দ্বিগুণ দিনের বেলায় ঘুমিয়ে তা কাযা করে। এভাবে চললে খাবার ও ঘুমের কুরবানী হলো কীভাবে? তাই এ বিষয়ে রোযাদারকে ত্যাগ তীতিক্ষা করতে হবে এবং এ দু’এর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে সিয়াম পালন করে যেতে হবে।
[১৪] ফজর উদয় হওয়ার পূর্বেই রোযার নিয়ত করা।
[১৫] আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা।
রমাযানের পবিত্র দিন ও রাতগুলোতে ইবাদত করার তাওফীক দেয়ায় মাবুদের প্রশংসা করা।
১০ম অধ্যায়
نية الصوم ووقته وطريقته
সিয়ামের নিয়ত : সময় ও পদ্ধতি
প্রশ্ন ২৮ : ফরয রোযার নিয়ত কখন করতে হয়?
উত্তর : ফজর উদয় হওয়ার আগেই অর্থাৎ রাতের মধ্যেই নিয়ত করে ফেলতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
مَنْ لَمْ يُجْمِعْ الصِّيَامَ قَبْلَ الْفَجْرِ فَلاَ صِيَامَ لَهُ
১. যে ব্যক্তি ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই সিয়াম পালনের নিয়ত করল না তার সিয়াম শুদ্ধ হল না। (আবূ দাঊদ : ২৪৫৪)
مَنْ لَمْ يَبِيْتِ الصِّيَامَ مِنَ اللَّيْلِ فَلاَ صِيَامَ لَهُ
২. যে ব্যক্তি রাতের মধ্যেই সিয়ামের নিয়ত করল না তার সিয়াম শুদ্ধ হল না। (এ নির্দেশ শুধুমাত্র ফরয রোযার ক্ষেত্রে) (নাসাঈ : ৪/১৯৬)
প্রশ্ন ২৯ : নিয়ত কাকে বলে? এটা কীভাবে করব?
উত্তর : নিয়ত হল মনের ইচ্ছা, সঙ্কল্প বা প্রতিজ্ঞা করা। এটা অন্তরের কাজ, মুখে উচ্চারণ করার বিষয় নয়। জিহবার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কোন কাজের প্রারম্ভে মনের মধ্যে যে ইচ্ছা পোষণ করা হয় এটাকেই নিয়ত বলা হয়।
প্রশ্ন ৩০ : কেউ কেউ নিয়ত করার বদলে নিয়ত পড়েন এবং আরবীতে نَوَيْتُ أَنْ أَصُوْمَ غَدًا ‘‘নাওয়াইতু আন’’ বলে আরবীতে নিয়ত শুরু করেন এমন করলে কি সওয়াব বেশি হবে?
উত্তর : নিয়ত কখনই পড়তে বলা হয় নি। করতে বলা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরাম এবং চার মাযহাবের ইমামগণ কেউই মুখে মুখে নিয়ত পড়েননি। কাজেই যারা নিয়ত পড়েন, মুখে মুখে বলেন এটা শুদ্ধ নয়। আর সওয়াব বেশি হওয়ারতো প্রশ্নই আসে না। করতে নির্দেশ দিয়েছেন পড়তে নয়। কাজেই মুখে মুখে আরবীতে নিয়ত পড়লে এজন্য কোন সওয়াব হবে না।
বিজ্ঞ উলামায়ে কিরাম বরং এটাকে বিদ্আত বলেছেন। বিশুদ্ধ পদ্ধতি হল মনে মনে কল্পনা করে নিয়ত করা।
প্রশ্ন ৩১ : ‘‘নাওয়াইতু আন’’ বলে নিয়ত শুরু করার প্রচলনটা কীভাবে হল?
উত্তর : কারো কারো ধারণা কায়েদা বাগদাদীর লেখক নিজে থেকে বানিয়ে এটা শুরু করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে অন্যান্য বইয়ের লেখকেরা কোন যাচাই বাছাই ছাড়াই তাদের বইগুলোতেও এগুলো নকল করেছেন। এগুলোর কোন অস্তিত্ব বা দলীল কুরআন-হাদীসে কোথাও নেই।
প্রশ্ন ৩২ : রাতের সাহরী খাওয়া নিয়তের জন্য যথেষ্ট হবে কি?
উত্তর : রোযার জন্য নিয়ত করা ফরয। যে ব্যক্তি সিয়াম পালনের জন্য সাহরী খেল- এ সাহরী প্রমাণ করে যে এটা তার শুধুমাত্র সিয়াম পালনের জন্যই খাওয়া হয়েছে। কাজেই এ সাহরী নিয়তের স্থলাভিষিক্ত বলে ধরে নেয়া যায়।
প্রশ্ন ৩৩ : পুরো রমাযানের জন্য শুরুর দিন একবার নিয়ত করে নিলে কি তা যথেষ্ট হবে?
উত্তর : হাঁ, তা হবে। তবে প্রতিদিনই নিয়ত করা মুস্তাহাব বা সুন্নাত।
উল্লেখ্য যে, সাহরী খাওয়া সুন্নাত, কিন্তু নিয়ত করা ফরয।
১১শ অধ্যায়
أقسام الصيام
সিয়ামের প্রকারভেদ
প্রশ্ন ৩৪ : সিয়াম কত প্রকার ও কী কী?
উত্তর : চার প্রকার। যথা ১. ফরজ, ২. নফল, ৩. মাকরূহ ৪. হারাম।
প্রথমত : ফরয সিয়াম :
(ক) রমযান মাসের সিয়াম
(খ) কাযা সিয়াম
(গ) কাফফারার সিয়াম
(ঘ) মান্নত সিয়াম
দ্বিতীয়ত : নফল সিয়াম
(ক) শাওয়াল মাসের ছয়টি সিয়াম
(খ) যিলহাজ্জ মাসের প্রথম দশকের সিয়াম
(গ) আরাফাতের দিনের সিয়াম
(ঘ) মুহাররম মাসের সিয়াম
(ঙ) আশুরার সিয়াম
(চ) প্রতি চন্দ্রমাসের ১৩. ১৪, ১৫- এ তিন দিনের সিয়াম
(ছ) সাপ্তাহিক সোম ও বৃহস্পতিবারের সিয়াম
(জ) শাবান মাসের সিয়াম
(ঝ) দাঊদ (আঃ)’র সিয়াম
(ঞ) বিবাহে অসামর্থ ব্যক্তিদের সিয়াম।
তৃতীয়ত : মাকরূহ সিয়াম
(ক) হাজ্জ পালনরত অবস্থায় আরাফাতের দিনের সিয়াম
(খ) বিরতীহীনভাবে সিয়াম পালন
(গ) পানাহার বিহীন সিয়াম
(ঘ) কেবলমাত্র জুমুআর দিনের সিয়াম
(ঙ) শুধুমাত্র শনিবারে সিয়াম
চতুর্থত : হারাম সিয়াম :
(ক) দু’ ঈদের দিন এবং কুরবানীর ঈদের পরবর্তী ৩ দিন
(খ) সন্দেহ পূর্ণ দিনের (৩০শে শাবান) সিয়াম
(গ) স্বামীর বিনা অনুমতিতে স্ত্রীর নফল সিয়াম
(ঘ) মহিলাদের হায়েয নিফাসকালীন সময়ের সিয়াম
(ঙ) গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় সিয়াম।
১২শ অধ্যায়
مفسدات الصوم
সিয়াম ভঙ্গ হওয়ার কারণসমূহ
প্রশ্ন ৩৫ : কী কী কারণে সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যায়?
উত্তর : নিম্নোক্ত যে কোন কারণ দেখা গেলে সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে :
১. ইচ্ছা পূর্বক পানাহার ও ধুমপান করা।
২. স্বেচ্ছায় বমি করা
৩. স্বামীস্ত্রীর মিলন
৪. বৈধ অবৈধ যে কোন প্রকার যৌনক্রিয়া।
৫. পানাহারের বিকল্প কিছু গ্রহণ করা, যেমন- ইনজেকশান বা রক্ত গ্রহণ করা। আর তা এমন ইনজেকশান যার মাধ্যমে খাবার সরবরাহ করা হয়।
৬. মাসিক স্রাব ও প্রসবোত্তর স্রাব
প্রশ্ন ৩৬ : কেউ যদি ভুলক্রমে কিছু খেয়ে ফেলে তবে কি তার সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে?
উত্তর : না, ভাঙ্গবে না।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِذَا نَسِيَ فَأَكَلَ وَشَرِبَ فَلْيُتِمَّ صَوْمَهُ فَإِنَّمَا أَطْعَمَهُ اللَّهُ وَسَقَاهُ
১. যদি কেউ ভুলক্রমে পানাহার করে তবে সে যেন তার সিয়াম পূর্ণ করে নেয়, কেননা আল্লাহ তা‘আলাই তাকে এ পানাহার করিয়েছেন (অর্থাৎ এতে তার রোযা ভাঙ্গেনি)। (বুখারী : ১৯৩৩; মুসলিম : ১১৫৫)
مَنْ أَفْطَرَ فِيْ رَمَضَانَ نَاسِيًا فَلاَ قَضَاءَ عَلَيْهِ وَلاَ كَفَّارَةَ
২. যে ব্যক্তি ভুল বশতঃ রমাযানের দিনে বেলায় কিছু খেয়ে ফেলল : সেজন্য কোন কাযা ও কাফফারা দিতে হবে না। (দারাকুতনী : ২৪; বায়হাকী : ৭৮৬৩)
প্রশ্ন ৩৭ : অযু গোসলের সময় অসাবধানতা বশতঃ হঠাৎ করে কিছু পানি গলায় ঢুকে গেলে বা জোরপূর্বক খাওয়ানো হলে সিয়াম কি ভঙ্গ হয়ে যাবে?
উত্তর : না, ভঙ্গ হবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
إِنَّ اللهَ وَضعَ عَنْ أُمَّتِى الْخَطَأ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتَكْرَهُوْا عَلَيْهِ
‘‘আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মাতের ভুল-ভ্রান্তি ও বাধ্য হয়ে ঘটে যাওয়া পাপরাশি মাফ করে দিবেন। (ইবন মাজা : ২০৪৫)
প্রশ্ন ৩৮ : সিয়াম অবস্থায় কেউ যদি ইচ্ছাকৃত বমি করে তাহলে তাকে কী করতে হবে?
উত্তর : এ সিয়াম আবার কাযা করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
مَنْ ذرعه قىء فَلَيْسَ عَلَيْهِ قَضَاءً وإن استقاء فليقض
যে ব্যক্তি অনিচ্ছা বমি করল তাকে উক্ত সিয়াম কাযা করতে হবে না। কিন্তু যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় বমি করল তাকে উক্ত সিয়াম অবশ্যই কাযা করতে হবে। (আবূ দাঊদ : ২৩৮০)
প্রশ্ন ৩৯ : রমযান মাসে দিনের বেলায় স্বেচ্ছায় স্বজ্ঞানে স্বামী-স্ত্রীর মিলন হলে এর হুকুম কি?
উত্তর : এতে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে। এর ফলে কাযাও করতে হবে এবং কাফফারাও দিতে হবে।
(ক) একদিনের রোযার জন্য একাধারে দু’মাস রোযা রাখতে হবে। মাঝখানে একদিন বাদ গেলে এর পরের দিন থেকে আবার একাধারে পূর্ণ দু’ মাস রোযা রাখতে হবে। অথবা
(খ) ষাটজন মিসকিনকে এক বেলা আহার করাতে হবে।
প্রশ্ন ৪০ : উপরোক্ত ঘটনায় কারণে কে কাযা করবে? স্বামী নাকি স্ত্রী?
উত্তর : উভয়েই কাযা করবে এবং কাফফারা দিবে। তবে স্ত্রীকে যদি জোরপূর্বক সঙ্গম করে থাকে তাহলে কাযা ও কাফফারা দিবে শুধু স্বামী, স্ত্রী নয়।
উল্লেখ্য যে, বৈধ ও অবৈধ যে কোন উপায়ে বীর্যপাত ঘটানো হলে সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে।
প্রশ্ন ৪১ : রমযান মাসে রাতের বেলায় কি স্ত্রীসহবাস করা যাবে?
উত্তর : হা, তা জায়েয আছে।
প্রশ্ন ৪২ : কোন প্রকার ইনজেকশানে সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে?
উত্তর :
(ক) রক্তশূন্যতা পূরণ জনিত ইনজেকশান
(খ) শক্তি বর্ধক ইনজেকশান
(গ) স্যালাইন ও পানাহারের স্থলাভিষিক্ত ইনজেকশান। এর কোন একটা পুশ করলে সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে।
তবে শুধুমাত্র ঔষধজনিত হলে সিয়াম ভঙ্গ হবে না।
প্রশ্ন ৪৩ : দিবসের কোন অংশে রক্তস্রাব শুরু হলে সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে?
উত্তর : দিবসের শুরু বা শেষ যে কোন অংশে স্রাব শুরু হলে সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে।
প্রশ্ন ৪৪ : মাসিক স্রাব শুরু হওয়া অনুভব করছে কিন্তু হয় নি। এ অবস্থায় কি সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে?
উত্তর : শুরু না হওয়া পর্যন্ত ভঙ্গ হবে না।
প্রশ্ন ৪৫ : ঋতুবর্তী মহিলারা কি কাযা করবে?
উত্তর : শুধুমাত্র সিয়াম কাযা করবে। সালাত কাযা করতে হবে না। আয়িশাহ বলেন :
كَانَ يُصِيبُنَا ذَلِكَ فَنُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّوْمِ وَلاَ نُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّلاَةِ
আমাদেরও এটা ঘটত (অর্থাৎ মাসিক হতো)। তখন আমরা শুধু সিয়াম কাযা করতে আদিষ্ট হতাম। কিন্তু সালাত কাযা করতে আদিষ্ট হতাম না। (মুসলিম : ৩৩৫)
প্রশ্ন ৪৬ : ফাজরের ওয়াক্ত হয়নি মনে করে ফজর শুরু হওয়ার পর পানাহার করল, এমনিভাবে সূর্যাস্ত হয়ে গেছে মনে করে অস্ত যাওয়ার আগেই ইফতার করে ফেলল- এ সিয়াম কি শুদ্ধ হবে?
উত্তর : হা, শুদ্ধ হবে এ জন্য যে, এটি তার অজানা ও অজ্ঞতাবশতঃ হয়ে গেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ وَلَيۡسَ عَلَيۡكُمۡ جُنَاحٞ فِيمَآ أَخۡطَأۡتُم بِهِۦ وَلَٰكِن مَّا تَعَمَّدَتۡ قُلُوبُكُمۡۚ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمًا ٥ ﴾ [الاحزاب: ٥]
‘ভুলক্রমে কোনকিছু করে ফেললে এতে কোন গুনাহ হবে না। তবে জেনে শুনে ইচ্ছাকৃত ভাবে কোন অপরাধ করলে অবশ্যই এতে গুনাহ হবে। আল্লাহ তা‘আলা অতিশয় ক্ষমাশীল ও মেহেরবান’। (আহযাব : ৫)
প্রশ্ন ৪৭ : সিয়াম অবস্থায় ভুলে পানাহার শুর করে দিল। এমন সময় হঠাৎ স্মরণ হল। এ ব্যক্তি কি করবে?
উত্তর : মনে হওয়ামাত্র মুখের বাকীখানা বা পানীয় ফেলে দেবে আর যতটুকু ভুলে খাওয়া হয়ে গেছে সেজন্য সিয়াম ভঙ্গ হবে না। তবে এ দৃশ্য যে দেখবে তার উপর ফরয হল সিয়াম পালনকারীকে স্মরণ করিয়ে দেয়া।
প্রশ্ন ৪৮ : কেউ যদি কোন সিয়ামকারীকে জবরদস্তি করে কোন কিছু খাওয়ায় তাহলে কি হবে?
উত্তর : এতে সিয়াম ভঙ্গ হবে না। অনুরূপভাবে জোর করে কোন মুমিনকে কাফির বানাতে চাইলে সে কাফির হবে না।
অনুরূপভাবে স্ত্রীর সম্মতি ব্যতিরেকে স্ত্রীকে জোর করে সঙ্গম করলে স্ত্রীর সিয়াম ভাঙ্গবে না কিন্তু স্বামীর সিয়াম অবশ্যই ভেঙ্গে যাবে।
প্রশ্ন ৪৯ : বিনা উযরে যে ইচ্ছা করে অতীতের সিয়াম ভঙ্গ করেছে তার কি করতে হবে?
উত্তর : এটি একটি মহাপাপ। তাকে তাওবা করতে হবে এবং এসব রোযা কাযা করতে হবে।
প্রশ্ন ৫০ : দিনের বেলায় ঘুমন্ত অবস্থায় যদি স্বপ্নদোষ হয়ে যায় তাহলে কি হবে?
উত্তর : এতে রোযা ভাঙ্গবে না। কারণ স্বপ্নদোষ নিজের ইচ্ছাকৃত কোন ঘটনা নয়।
প্রশ্ন ৫১ : সিয়াম অবস্থায় থুথু কাশি গিলে ফেলা কেমন?
উত্তর : মুখে থাকা থুথু গিলে ফেললে অসুবিধা নেই। তবে কাশি গিলে ফেলা জায়েয নয়। কেননা কাশি থুথুর মত নয়।
প্রশ্ন ৫২ : নাক দিয়ে রক্ত পড়লে কিংবা দাঁত উঠলে অথবা আহত হয়ে রক্ত প্রবাহিত হলে কি সিয়ামের কোন ক্ষতি হবে?
উত্তর : না, এতে সিয়াম ভাঙ্গবে না। কোন ক্ষতিও হবে না।
প্রশ্ন ৫৩ : কোন রোযাদার ব্যক্তি তার সিয়াম ভঙ্গ করার নিয়ত করল কিন্তু সে তখনো কোন খানাপিনা খায়নি- তার সিয়াম কি ঠিক আছে, নাকি ভেঙ্গে গেছে?
উত্তর : তার সিয়াম ভঙ্গ হয়ে গেছে। কারণ সিয়ামের জন্য নিয়ত ফরয। আর এ ফরয তার তরক হয়ে গেছে। কাজেই রোযা তার ভেঙ্গে গেছে খাবার বা পানীয় গ্রহণ ছাড়াই।
১৩শ অধ্যায়
مكروهات الصوم
 যেসব কারণে সওম মাকরূহ হয়ে যায়
প্রশ্ন ৫৪ : সওম মাকরূহ হওয়ার অর্থ কি?
উত্তর : মাকরূহ শব্দের অর্থ অপছন্দনীয়। আর সওমের মাকরূহ হল সিয়াম পালন অবস্থায় যেসব কাজ করা অপছন্দনীয়। এ জাতীয় কাজ সিয়াম ভঙ্গ করে না কিন্তু এসব চর্চা করা কখনো কখনো সিয়াম বিনষ্টের কাছাকাছি নিয়ে যায়। এসব কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকা উচিত।
প্রশ্ন ৫৫ : কী কী কারণে সিয়াম মাকরূহ হয়?
উত্তর : সিয়াম অবস্থায় নিম্ন বর্ণিত যে কোন কাজ করলে সিয়াম মাকরূহ হয়ে যায় :
(১) অযুর সময় গড়গড়া করে কুলি করা, জোড় দিয়ে নাকে পানি টানা। এতে গলা বা নাক দিয়ে ভিতরে পানি প্রবেশ করার সম্ভাবনা থেকে যায়।
(২) বিনা প্রয়োজনে খাদ্যের স্বাদ দেখা। তবে প্রয়োজন হলে দেখতে পারে।
(৩) থুথু কফ মুখে জমিয়ে গিলে ফেলা। অল্প অল্প থুথু গিলে ফেললে কোন অসুবিধা নেই।
(৪) যৌন অনুভূতি নিয়ে স্ত্রীকে চুম্বন ও আলিঙ্গন করা, বারবার তার দিকে তাকানো, বারবার সহবাসের কল্পনা করা। কারণ এসব কার্যক্রমে বীর্যপাত ঘটা বা সহবাসে লিপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
প্রশ্ন ৫৬ : বিনা প্রয়োজনে যদি কোন মহিলা স্বীয় বাচ্চাকে রোযা অবস্থায় খাদ্য চিবিয়ে দেয় তবে তার হুকুম কী?
উ: রোযা মাকরূহ হবে অর্থাৎ অন্য লোকে যদি খাদ্য চিবিয়ে দেয়ার মতো থাকে বা অন্য কোন উপায়ে যদি শিশুকে খাদ্য চিবিয়ে দেয়া যায়, তাহলে রোযাদার মহিলার জন্য চিবিয়ে দেয়া মাকরূহ হবে।
বি: দ্র:- প্রয়োজনবশত: চিবিয়ে দিলে তা মাকরূহ হবে না বরং চিবিয়ে দেয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে যাতে পেটে খাদ্যের কিছু অংশ চলে না যায়।
১৪শ অধ্যায়
مباحات الصيام
সিয়াম অবস্থায় যেসব কাজ মুবাহ অর্থাৎ বৈধ
প্রশ্ন ৫৭ : কী কী কাজ করলে সিয়াম ভঙ্গ হয় না? অথবা সিয়াম অবস্থায় কী কী কাজ বৈধ?
উত্তর : সিয়াম অবস্থায় নিম্নোক্ত কাজ করলে সিয়ামের কোন ক্ষতি হবে না :
[১] শুধুমাত্র রোগ আরোগ্যের জন্য যে ইনজেকশান দেয়া হয়।
[২] কুলি করা, নাকে পানি দেয়া। তবে গড়গড়া করবে না। নাকের খুব ভিতরে পানি টান দিয়ে নেবে না।
[৩] মিসওয়াক করা, মাজন ও টুথপেস্ট ব্যবহার করতে পারবে। তবে গলার ভিতর যাতে না ঢুকে সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে।
[৪] গরম থেকে বাঁচার জন্য মাথায় শীতল পানি দেয়া, গোসল করা, ভিজা কাপড় গায়ে জড়িয়ে রাখা।
[৫] জিহবা দিয়ে খাদ্য বা তরী-তরকারীর স্বাদ দেখা।
[৬] সুরমা ব্যবহার, চোখে বা কানে ঔষধ ব্যবহার।
[৭] স্ত্রীকে স্পর্শ করা।
[৮] রাত্রিবেলায় স্ত্রী সহবাস করা।
[৯] কোন কিছুর ঘ্রাণ নেয়া। তবে ধুমপান, আগরবাতি ও চন্দন কাঠের ধোঁয়া বা ধুপ গ্রহণ করবে না।
[১০] সিংগা লাগানো।
উপরোক্ত কয়েকটি বিষয়ে দলীল নিম্নে দেয়া হল :
بَالِغْ فِي الاِسْتِنْشَاقِ إِلاَّ أَنْ تَكُونَ صَائِمًا
(ক) সিয়াম অবস্থায় না থাকলে অযুর সময় নাকের ভিতর উত্তমরূপে পানি টেনে নেবে। (তিরমিযী : ৭৮৮)
لَوْلاَ أَنْ أَشُقَّ عَلَى أُمَّتِي لَأَمَرْتُهُمْ بِالسِّوَاكِ عِنْدَ كُلِّ وُضُوءٍ
(খ) আমার উম্মতের কষ্টবোধ হবে এ আশঙ্কা না থাকলে প্রত্যেক অযুর সময় মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম। (বুখারী : ৭২৪০)
كان رَسُولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- يَصُبُّ الْمَاءَ عَلَى رَأْسِهِ وَهُوَ صَائِمٌ مِنْ الْعَطَشِ أَوْ مِنْ الْحَرِّ
(গ) সিয়াম অবস্থায় তাপ বা পিপাসার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাথায় পানি ঢালতেন। (আবূ দাঊদ : ২৩৬৫)
لاَ بَأْسَ أَن يَّذُوْقَ الْخَلَّ أَوِ الشَّيْءَ مَالَمْ يَدْخُلْ حَلْقِهِ وَهُوَ صَائِمٌ
(ঘ) গলার ভিতর প্রবেশ না করলে সিয়াম অবস্থায় তরকারী বা খাদ্যের স্বাদ দেখতে কোন অসুবিধা নেই। (বুখারী : ৯২৭৭)
لَمْ يَرَ أَنَسٌ وَالْحَسَنُ وَإِبْرَاهِيْمُ بِالْكُحْلِ لِلصَّائِمِ بَأْسًا
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, হাসান ও ইবরাহীম (রহ.) সিয়াম পালনকারীদের জন্য সুরমা ব্যবহার কোনরূপ অসুবিধা মনে করতেন না। (বুখারী : ১৯২৯)
كَانَ النَّبِيُّ -صلى الله عليه وسلم- يُقَبِّلُ وَيُبَاشِرُ وَهُوَ صَائِمٌ وَلكِنْ كَانَ أَمْلَكَكُمْ لِإِرْبِهِ
(ঙ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম অবস্থায় (স্ত্রী) চুম্বন করতেন, শরীরে শরীর স্পর্শ করতেন। কেননা, তিনি তার প্রবৃত্তির (যৌন চাহিদা) উপর তোমাদের চেয়ে অধিক নিয়ন্ত্রক ছিলেন। (বুখারী : ১৯২৭)
أَنَّ النَّبِيَّ -صلى الله عليه وسلم- احْتَجَمَ وَهُوَ صَائِمٌ
(চ) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিয়াম অবস্থায় নিজের শরীরে শিঙ্গা লাগিয়েছেন। (বুখারী : ১৯৩৮)
أَنَّ النَّبِيَّ -صلى الله عليه وسلم- كَانَ يُدْرِكُهُ الْفَجْرُ وَهُوَ جُنُبٌ مِنْ أَهْلِهِ ثُمَّ يَغْتَسِلُ وَيَصُومُ
(ছ) বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে সহবাস করে ফজর পর্যন্ত কাটিয়েছেন। অতঃপর গোসল করে ফজরের সালাত আদায় করছেন। (বুখারী : ১৯২৬; মুসলিম : ১১০৯)
প্রশ্ন ৫৮ : কিডনী পরিষ্কার করলে, চোখে বা কানে ড্রপ দিলে, দাঁত উঠলে, ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ লাগালে, রক্ত পরীক্ষা করার জন্য রক্ত নিলে রোযা কি ভেঙ্গে যাবে বা ক্ষতি হবে?
উত্তর : না, এতে রোযা ভাঙ্গবেও না ক্ষতিও হবে না।
প্রশ্ন ৫৯ : যদি সুবহে সাদেক হয়ে যায় বা ফজরের আযান শুরু হয়ে যায় আর মুখে খাবার বা পানীয় থাকে তাহলে কি করবে?
উত্তর : মুখে যেটুকু খাবার বা পানি আছে তা ফেলে দেবে। ফলে তার রোযা শুদ্ধ হয়ে যাবে। এটা ফকীহদের ঐক্যমতের রায়।
প্রশ্ন ৬০ : রোযাদার যদি আহত হয় বা নাক দিয়ে রক্ত ঝরে কিংবা কোন কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে গলায় পানি বা তেল ঢুকে যায় তাহলে রোযার কি হবে?
উত্তর : এতে রোযা নষ্ট হবে না।
প্রশ্ন ৬১ : চোখের অশ্রু যদি গলায় প্রবেশ করে তাহলে কি রোযা ভেঙ্গে যাবে?
উত্তর : না, এতে রোযা ভাঙ্গবে না।
প্রশ্ন ৬২ : রোযাদার ব্যক্তি যদি আতরের গন্ধ, চন্দন কাঠ বা আগরবাতির ঘ্রাণ শুঁকে তাহলে কি হবে?
উত্তর : এতে রোযার কোন ক্ষতি হবে না। তবে ধোঁয়া যাতে গলায় প্রবেশ না করে সে ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে।
আরো যে সব কারণে রোযা ভঙ্গ হয়না তা হল :
১। ভুলক্রমে কোন কিছু পানাহার করলে ২। ভুলক্রমে যৌনসম্ভোগ করলে ৩। স্বপ্নদোষ হলে ৪। স্ত্রীর দিকে দৃষ্টিপাতের দরুন বীর্যপাত হলে ৫। তেল মালিশ করলে ৬। শিঙ্গা লাগালে ৭। সুরমা লাগালে ৮। স্ত্রীকে চুম্বন করলে ৯। আপনা আপনি বমি হলে ১০। মূত্রণালীতে ঔষধ দিলে ১১। কানে পানি গেলে, ১২। ধূলা প্রবেশ করলে।
১৫শ অধ্যায়
أحكام القضاء والكفارة
সিয়ামের কাযা ও কাফফারার বিধান
প্রশ্ন ৬৩ : সিয়ামের কাযা ও কাফফারা কী জিনিস? এগুলো কীভাবে আদায় করতে হয়?
উত্তর : অনিচ্ছাকৃত বা উযরবশত ছুটে যাওয়া সাওমের বদলে কাযা, আর উযরছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেয়া সাওমের বদলে দিতে হয় কাফফারা। কাযা হলে সম পরিমাণ সাওম আদায় করতে হয়। আর কাফ্ফারা হলে, সাওম না রাখার কারণে সুনির্দিষ্ট কিছু কর্তব্য পালন করতে হয়। কাফফারা তিন ধরনের। (১) গোলাম আযাদ করা, আর তা সম্ভব না হলে (২) একাধারে ৬০টি রোযা রাখা, আর সেটিও সম্ভব না হলে (৩) ৬০ জন মিসকীনকে এক বেলা খানা খাওয়ানো।
প্রশ্ন ৬৪ : যে ব্যক্তি বিনা উযরে বিনা করণে অতীতে সিয়াম ভঙ্গ করেছে সে কীভাবে কাযা ও কাফফারা আদায় করবে?
উত্তর : এক রমযানের সাওম তাকে পরবর্তী রমযানের আগে আদায় করতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয় তবে সারা জীবনে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তা কাযা করে নিতে হবে। এবং প্রতি রোযার বদলে একটি রোযা পালন করতে হবে। আর তা রাখতে শারীরিকভাবে অক্ষম হলে একজন মিসকীনকে এক বেলা খানা খাওয়াতে হবে।
প্রশ্ন ৬৫ : দিনের বেলায় সহবাসের কারণে সিয়াম ভঙ্গ হলে তার কি করতে হবে।
উত্তর : এজন্য তাকে কাযাও করতে হবে এবং কাফফারাও দিতে হবে। এ দু’টিই তার জন্য ফরয? সহবাসের কারণে যে রোযা ভঙ্গ হয় ঐ একটা রোযার বদলে একাধারে ষাট দিন রোযা রাখতে হবে। এবং এর মাঝখানে সঙ্গত কারণ ছাড়া কোন বিরতি দেয়া যাবে না।
যদি মাঝখানে বিরতি দেয়া হয় তাহলে এরপর থেকে আবার নতূন করে ষাট দিন বিরতীহীনভাবে সিয়াম পালন করতে হবে।
প্রশ্ন ৬৬ : একটি রোযা ভাঙ্গার কারণে ষাটটি রোযা রাখা, তাও আবার বিরতীহীনভাবে এভাবে আদায় করতে যদি কেউ অক্ষম বা অপারগ হয় তাহলে কি করবে?
উত্তর : ৬০ জন অভাবী মানুষকে একবেলা খানা খাওয়াবে। প্রতিজনের খাবারের পরিমাণ হবে কমপেক্ষ ৫১০ গ্রাম।
প্রশ্ন ৬৭ : কাউকে চুমু দেয়ার কারণে বা স্ত্রী বা কোন মেয়ের গা স্পর্শ হওয়ার কারণে অনচ্ছিকৃতভাবে বীর্যপাত হয়ে গেলে ঐ দিনের সিয়াম কীভাবে কাযা করবে?
উত্তর : সাধারণ নিয়মেই এক সাওমের বিপরীতে এক সাওম হিসেবে কাযা করবে
প্রশ্ন ৬৮ : কোন্ কারণে রোযা ভঙ্গ হলে কাযা ও কাফ্ফারা উভয়ই ওয়াজিব হয়?
উ: রোযাবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস করলে কাযা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে ১টি রোযা কাযা করবে, অতঃপর ৬০টি রোযা কাফফারা হিসেবে আদায় করবে। অর্থাৎ ১ রোযার বদলে বিরতিহীনভাবে মোট ৬১টি রোযা পালন করবে।
প্রশ্ন ৬৯ : ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করলে কী করবে, কাযা না কাফফারা?
উ: অধিকাংশ আলেমদের মতে শুধু কাযা করবে। অর্থাৎ এক রোযার বদলে একটি রোযা পালন করবে। তবে কোন কোন আলেমের মতে কাযা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হয়ে যাবে। অর্থাৎ ১ রোযার বদলে বিরতিহীনভাবে মোট ৬১টি রোযা পালন করবে।
প্রশ্ন ৭০ : কোন কোন কারণে রোযা ভঙ্গ হলে শুধু কাযা ওয়াজিব হয়?
উ: ১। স্ত্রীকে চুম্বন/স্পর্শ করার কারণে বীর্যপাত ঘটলে। ২। ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ ভরে বমি করলে ৩। পাথর, লোহার, টুকরা, ফলের আঁটি ইত্যাদি গিলে ফেললে ৪। ভুলক্রমে কিছু খেতে আরম্ভ করে রোযা ভঙ্গ হয়েছে মনে করে পুনরায় আহার করলে। ৫। কুলি করার করার সময় পেটে পানি চলে গেলে ৬। মুখে বমি এলে পুনরায় তা পেটে প্রবেশ করালে ৭। দাঁতের ফাঁক থেকে খাদ্য কণা খেয়ে ফেললে ৮। রোযার নিয়ত না করে ভুল করে রোযা ভঙ্গ হয়ে গেছে মনে করে পানাহার করলে।
প্রশ্ন ৭১ : রমযানের রোযা কাযা করার হুকুম কি? কেউ যদি একাধিক রোযা ভঙ্গ করে তবে সে কি এগুলো একাধারে কাযা করবে?
উ: ধারাবাহিকভাবে কাযা করা মুস্তাহাব। তবে পৃথক পৃথকভাবে কাযা করা জায়েয আছে। কাযাকারী পরবর্তী রমজান আসার পূর্বে করা উত্তম। তবে যে কোন সময়ে তা করতে পারবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ فَعِدَّةٞ مِّنۡ أَيَّامٍ أُخَرَۚ ﴾ [البقرة: ١٨٤]
‘‘অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করে নেবে। (বাকারা : ১৮৪)
প্রশ্ন ৭২ : এক রমযানের কাযা আদায়ের পূর্বে অন্য রমযান আগমন করলে কী করবে?
উ: এমতাবস্থায় চলতি রমযানের রোযা আদায় করার পর পূর্বের রোযাগুলোর কাযা পালন করবে।
১৬শ অধ্যায়
অসুস্থ ব্যক্তির সিয়াম
প্রশ্ন ৭৩ : কী পরিমাণ অসুস্থ হলে সিয়াম ভঙ্গ করতে হবে?
উত্তর : রোগের কারণে যদি স্বাভাবিক সুস্থতা হারিয়ে ফেলে, ডাক্তার যদি বলে যে, এ সিয়ামের কারণে রোগের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে, বা রোগীর ক্ষতি হতে পারে বা সুস্থতা বিলম্বিত হতে পারে তবেই রোযা ভাঙ্গবে। কিন্তু সামান্য অসুখ যেমন মাথা ব্যাথা, শর্দি, কাশি অনুরূপ কোন সাধারণ রোগ বালাইয়ের কারণে সিয়াম ভঙ্গ করা জায়েয হবে না। মনে রাখতে হবে যে, রোগের কারণে যেসব সিয়াম ভঙ্গ হবে ঠিক অনুরূপ সংখ্যক সিয়াম পরে কাযা করতে হবে।
প্রশ্ন ৭৪ : অসুস্থ হলেও সিয়াম পালনে খুব কষ্ট হচ্ছে না এবং কোনরূপ ক্ষতির আশঙ্কাও নেই এমতাবস্থায় কি করব?
উত্তর : সিয়াম পালন করবে। এমন হলে ভঙ্গ করা জায়েয হবে না।
প্রশ্ন ৭৫ : সিয়াম পালনে কষ্ট হচ্ছে কিন্তু রোগীর কোন ক্ষতির আশঙ্কা নেই- কি করবে?
উত্তর : এ রোগী সিয়াম ভেঙ্গে ফেলবে। কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দার প্রতি অতিশয় দয়ালু। অবশ্য পরে এটা কাযা করে নেবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوۡ عَلَىٰ سَفَرٖ فَعِدَّةٞ مِّنۡ أَيَّامٍ أُخَرَۗ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلۡيُسۡرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلۡعُسۡرَ وَلِتُكۡمِلُواْ ٱلۡعِدَّةَ ١٨٥ ﴾ [البقرة: ١٨٥]
‘‘কাজেই তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ (রমযান) মাস পাবে, সে যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে আর যে পীড়িত কিংবা সফরে আছে, সে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করবে, আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান, যা কষ্টদায়ক তা চান না যেন তোমরা মেয়াদ পূর্ণ করতে পার। (বাকারা : ১৮৫)
প্রশ্ন ৭৬ : সিয়াম পালনে রোগীর কষ্ট হচ্ছে, তবু সে সিয়াম ভঙ্গ করতে রাজী নয়- এর হুকুম কি?
উত্তর : এ রোগীর রোযা পালন সঠিক নয়, বরং মাকরূহ। কারণ সে আল্লাহর দেয়া সুবিধা গ্রহণ না করে বরং নিজেকে শাস্তি দিচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ اللهَ يُحِبُّ أَنْ تُؤْتَى رُخَصَهُ كَمَا يَكْرِهُ أَنْ تُؤْتَى مَعَاصِيْهِ
আল্লাহর অবাধ্য হওয়াকে মাবুদ যেমন অপছন্দ করেন, তার দেয়া সুবিধাদি গ্রহণ করাকেও তিনি তেমন পছন্দ করেন। (আহমাদ : ২/১০৮)
প্রশ্ন ৭৭ : সিয়াম পালনে রোগ বৃদ্ধি পাবে এবং ক্ষতিও হবে। তবু পরহেজগারী মনে করে সিয়াম পালন করে যাওয়া কেমন?
উত্তর : অবস্থা এমন হলে সিয়াম চালিয়ে যাওয়া কোন পরহেজগারী কাজ নয়। বরং এ অবস্থায় সিয়াম পালন করা নিষেধ এবং সওম ভঙ্গ করা জরুরী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ … وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَنفُسَكُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِكُمۡ رَحِيمٗا ٢٩ ﴾ [النساء: ٢٩]
তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের প্রতি অতিশয় দয়ালু। (সূরা নিসা : ২৯)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ لِنَفْسِكَ عَلَيْكَ حَقًّا
‘‘তোমার উপর তোমার আত্মার হক রয়েছে।’’ (আবূ দাঊদ : ১৩৬৯ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।)
নিজের বা অন্যের কারোরই ক্ষতি করার কোন অধিকার মানুষের নেই।
প্রশ্ন ৭৮ : কোন সুস্থ ব্যক্তি দিনের কোন অংশে অসুস্থ হয়ে পড়ল, বাকী অংশ সিয়াম পালনে কষ্ট হচ্ছে- কী করবে?
উত্তর : সিয়াম ভঙ্গ করে ফেলবে এবং পরে কাযা করে নেবে।
প্রশ্ন ৭৯ : কোন রোগী দিনের মধ্যভাগে সুস্থ হয়ে গেল, সেকি দিনের বাকী অংশ সিয়াম পালন করবে?
উত্তর : না, কারণ দিনের শুরুতে যেহেতু সিয়াম ছিল না কাজেই দিনের বাকী অংশে খানা-পিনা ত্যাগের দরকার নেই।
ক্ষুধা ও পিপাসায় কাতর হয়ে পড়ে এবং জীবন নাশের আশঙ্কা করে তবে কী করবে?
উত্তর : রোযা ভঙ্গ করবে এবং পরে এটা কাযা করবে।
প্রশ্ন ৮০ : রোযা অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে গেলে কী করবে?
উত্তর : রোযা ভেঙ্গে ফেলবে এবং পরে তা কাযা করবে।
প্রশ্ন ৮১ : কোন রোগী সুস্থ হওয়ার পর কাযা আদায় করার আগেই মৃত্যুবরণ করল তার জন্য কী করতে হবে?
উত্তর : তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে প্রতি একদিনের রোযার বদলে একজন মিসকিনকে একবেলা খানা খাওয়াবে। অথবা তার কোন আত্মীয় যদি তারপক্ষ থেকে কাযা আদায় করে তবে মাইয়্যেতের জন্য তা আদায় হয়ে যাবে।
প্রশ্ন ৮২ : কোন অসুস্থ ব্যক্তির কাযা রোযা সুস্থ হওয়ার পর কাযা না করে শুধু ফিদইয়া দিলে কি চলবে?
উত্তর : না, তা জায়েয হবে না। কাযা করতে হবে।
প্রশ্ন ৮৩ : কঠিন শারীরিক পরিশ্রম যারা করে তারা কি রমযানের ফরয রোযা ভাঙ্গতে পারবে?
উত্তর : না, পারবে না।
৮৪ প্রশ্ন : পরীক্ষার্থী ছাত্র-ছাত্রীরা অধ্যয়নের চাপের কারণে রোযা কি ভাঙ্গতে পারবে?
উত্তর : না, তাও পারবে না। অধ্যয়ন রোযা ভঙ্গের উযর হিসেবে গণ্য হবে না।
১৭শ অধ্যায়
অতি বৃদ্ধ, অচল ও চিররোগীদের সিয়াম
প্রশ্ন ৮৫ : খুবই বৃদ্ধ লোক। সিয়াম পালন তার জন্য খুবই কষ্টকর। তার সিয়াম পালনের কি হুকুম?
উত্তর : তার উপর সিয়াম পালন জরুরী নয়। তবে এ ব্যক্তি অন্য কাউকে দিয়ে কাযা আদায় করাবে অথবা ফিদইয়া দিবে। প্রতি এক রোযার জন্য একজন মিসকিনকে এক বেলা খাবার খাওয়াবে। (পরিমাণ ৫১০ গ্রাম পরিমাণ ভাল খাবার)
﴿ وَعَلَى ٱلَّذِينَ يُطِيقُونَهُۥ فِدۡيَةٞ طَعَامُ مِسۡكِينٖۖ ﴾ [البقرة: ١٨٤]
অর্থাৎ ‘‘শক্তিহীনদের উপর কর্তব্য হচ্ছে ফিদ্য়া প্রদান করা, এটা একজন মিসকীনকে অন্নদান করা।’’ (আল-বাকারা : ১৮৪)
প্রশ্ন ৮৬ : এমন চিররোগী যার আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা নেই। যেমন- ক্যান্সার বা এ ধরণের কোন রোগ। এসব লোকের সিয়াম পালনের হুকুম কি?
উত্তর : এ ধরণের চির রোগীদের উপর সিয়াম ফরয নয়। তবে তাদেরকে পূর্বের নিয়মে ফিদইয়া দিতে হবে। আর রোযার ফিদইয়া হলো মিসকীনকে খাবার খাওয়ানো।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ … ﴾ [التغابن: ١٦]
[১] তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করে চলো। (তাগাবুন : ১৬)
﴿ لَا يُكَلِّفُ ٱللَّهُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۚ ﴾ [البقرة: ٢٨٦]
[২] সাধ্যের বাইরে কোনকিছু আল্লাহ কারোর উপর চাপিয়ে দেন না। (বাকারাহ : ২৮৬)
প্রশ্ন ৮৭ : এমন বৃদ্ধলোক যে ভাল মন্দ পার্থক্য করতে পারে না। বিবেক বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। তার সিয়ামের হুকুম কি?
উত্তর : এমন বৃদ্ধলোকের উপর সিয়াম ফরয নয়। তাদের কাযা ও কাফফারা কিছুই নেই।
প্রশ্ন ৮৮ : পূর্বোক্ত বৃদ্ধলোকের যদি কখনো কখনো হুশ ফিরে আসে, জ্ঞান ফিরে পায় তাহলে কি করবে?
উত্তর : তাহলে হুশ অবস্থায় সিয়াম পালন করবে, সালাতও আদায় করবে, সিয়াম সালাত তখন ফরয হয়ে যাবে।
১৮শ অধ্যায়
মুসাফিরের সিয়াম
প্রশ্ন ৮৯ : মুসাফির কাকে বলে?
উত্তর : যে ব্যক্তি ভ্রমণ বা সফর করে তাকে সফররত অবস্থায় মুসাফির বলে। আবার যখন নিজ বাড়ী বা বাসভবনে চলে আসে তখন শরীয়াতের পরিভাষায় তাকে বলে মুকীম। মুকীম অর্থ হলো নিজ বাসস্থানে অবস্থানকারী ব্যক্তি অর্থাৎ মুসাফির নন।
পশ্ন ৯০। কমপক্ষে কী পরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করলে অর্থাৎ সফর করলে একজন ভ্রমণকারী বা যাত্রীকে মুসাফির বলা যায়?
উত্তর : হানাফী মাযহাবে কমপক্ষে ৪৮ মাইল। অন্যান্য মাযহাবে সফরের নিম্নতম দূরত্ব আরো কম।
প্রশ্ন ৯১ : মুসাফির অবস্থায় সিয়াম ও সালাতের নিয়ম কি?
উত্তর : মুসাফির অবস্থায় সিয়াম ভঙ্গ করা জায়েয এবং চার রাকআত বিশিষ্ট ফরয সালাতগুলো ২ রাকআত করে পড়বে। সে সময় ফরয নামাযের আগে বা পরে যে সমস্ত সুন্নাতে রাতেবাহ আছে সেগুলো পড়তে হবে না।
প্রশ্ন ৯২ : সফরে থাকা অবস্থায় সিয়াম ভঙ্গ করা জায়েয এ নিয়তে রোযার মাসে সফরে বের হওয়া কি বৈধ হবে?
উত্তর : এ নিয়তে সফরে বের হলে সিয়াম ভঙ্গ করা হারাম।
প্রশ্ন ৯৩ : কোন ধরণের ভ্রমণে সিয়াম ভঙ্গ করা যাবে?
উত্তর : হজ্জ, উমরা, জিহাদ, পড়াশুনা, ব্যবসা, বেড়ানো, পর্যটন ইত্যাদি। তবে অধিকাংশ সত্যনিষ্ঠ আলেমদের মতে অন্যায় ও অবৈধ কাজের সফরে সিয়াম ভঙ্গ করা হারাম।
প্রশ্ন ৯৪ : মুসাফিরের রোযা ভঙ্গ করলে পরবর্তীকালে তা কাযা করবে কি না?
উ: হ্যাঁ, কাযা করতে হবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوۡ عَلَىٰ سَفَرٖ فَعِدَّةٞ مِّنۡ أَيَّامٍ أُخَرَۚ ﴾ [البقرة: ١٨٤]
‘‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অসুস্থ কিংবা মুসাফির সে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করে (কাযা করে) নিবে। (বাকারা : ১৮৪)
প্রশ্ন ৯৫ : সফরে সিয়াম ভঙ্গ করা কি বাধ্যতামূলক নাকি ইচ্ছাধীন?
উত্তর : ইচ্ছাধীন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
صُمْ إِنْ شِئْتَ وَأَفْطِرْ إِنْ شِئْتَ
‘‘ইচ্ছা করলে সিয়াম পালন কর এবং চাইলে ভেঙ্গেও ফেলতে পার।’’ (মুসলিম : ১১২১)
প্রশ্ন ৯৬ : সফরে সিয়াম পালন করা উত্তম না ভঙ্গ করা উত্তম।
উত্তর : মুসাফিরের জন্য যেটা সহজ সেটাই উত্তম। সফররত অবস্থায় সিয়াম পালন যদি কষ্টকর হয়ে যায় তাহলে ভেঙ্গে ফেলাই উত্তম। অতি বেশি কষ্টকরে সিয়াম পালন করা ঠিক নয়।
(ক) আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
﴿ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلۡيُسۡرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلۡعُسۡرَ ﴾ [البقرة: ١٨٥]
‘‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না।’’ (বাকারাহ : ১৮৫)
(খ) মাক্কাহ বিজয়ের বৎসর মাক্কার উদ্দেশ্যে কুরা আলগামীম নামক স্থানে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের সামনে আসর বাদ সিয়াম ভঙ্গ করে পানি পান করলেন। (মুসলিম : ১১১৪)
(গ) জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু’র এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, সফরে কষ্ট হওয়ার পর ও একদল লোক সিয়াম পালন করেই যাচ্ছে। বিষয়টি জানার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
أُولَئِكَ الْعَصَاةُ أُولَئِكَ الْعَصَاةُ
‘‘তারা পাপী তারা পাপী।’’ (মুসলিম : ১১১৪)
উপরোক্ত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সফররত অবস্থায়- অতিমাত্রায় কষ্ট করে সিয়াম পালন করা পরহেজগারীর কাজ নয়, বরং এটা পাপের কাজ।
(ঘ) একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজায়গায় কিছু মানুষের ভীড় দেখে এগিয়ে দেখলেন যে, এক লোককে ছায়া দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেলেন, সে কে? লোকেরা বলল, এ ব্যক্তি রোযাদার। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন :
لَيْسَ مِنَ الْبِرِّ اَلصِّيَامُ فِي السَّفَرِ
‘‘সফরে সিয়াম পালন করা ভালকাজ নয়। (বুখারী : ১৯৪৬; মুসলিম : ১১১৫)
এসব দলীলের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় যে, সফর কষ্টকর হলে রোযা না রাখাই শ্রেয়। আর ভ্রমণ যদি খুব বেশি কষ্টের না হয় তাহলে সিয়াম পালন করাই উত্তম।
প্রশ্ন ৯৭ : সফরে সবল ও দুর্বল ব্যক্তির সিয়ামের হুকুম কি?
উত্তর : সবল হলে পালন করা এবং দুর্বল হলে ভেঙ্গে ফেলা উত্তম।
প্রশ্ন ৯৮ : সফর যদি বাড়ীতে থাকার মতই আরামদায়ক হয় তাহলে সিয়াম কি করবে?
উত্তর : সেক্ষেত্রে সিয়াম পালনই উত্তম। কারণ এতে অতিদ্রুত দায়িত্বমুক্ত হওয়া যায়, সকলের সাথে সিয়াম পালন হয় এবং মাসটাও থাকে ফযীলাতপূর্ণ।
প্রশ্ন ৯৯ : মুসাফির কখন তার সিয়াম ভঙ্গ করবে?
উত্তর : তার গ্রাম বা মহল্লা থেকে বের হওয়ার আগে নয়। সিয়াম ভঙ্গ করতে হলে তার এলাকা থেকে বের হওয়ার পর ভঙ্গ করবে।
প্রশ্ন ১০০ : সূর্যাস্তের পর ইফতারী করে বিমানে আকাশে উঠে দেখল সূর্য দেখা যায়- সে কি করবে?
উত্তর : তার রোযা হয়ে গেছে। কাযা করার কোন কারণ নেই।
প্রশ্ন ১০১ : এক ব্যক্তি মুকীম অবস্থায় রোযা রাখল। অতঃপর দিনের বেলায় সফর শুরু করল। সে কি করবে?
উত্তর : ইচ্ছা করলে রোযা ভঙ্গতে পারবে।
প্রশ্ন ১০২ : সফরই যাদের চাকুরী যেমন ডাক বিভাগের কর্মচারী; বাস ও ট্রেনের ড্রাইভার, বিমানের পাইলট ও জাহাজের নাবিক তারা কি করবে?
উত্তর : তারা রোযা ভঙ্গ করতে পারবে। তবে তাদেরকে পরে অবশ্যই কাযা আদায় করতে হবে।
প্রশ্ন ১০৩ : কেউ যদি এক দেশে রোযা রাখে অতঃপর ভিন্ন রাষ্ট্রে চলে যায় তাহলে রোযা শুরু বা শেষ কোন দেশের সময় অনুযায়ী করবে?
উত্তর : যখন যে দেশে অবস্থান করবে সে দেশের লোকদের সাথে ঐ দেশের সময় অনুযায়ী রোযা রাখবে ও ঈদ পালন করবে। তারপর যদি রোযার সংখ্যা ২৯ এর কম হয় তবে ঈদের পরে ১দি কাযা করবে।
প্রশ্ন ১০৪ : অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হয়ে এবং মুসাফির মুকীম হয়ে কিছুদিন অবস্থান করার পর মারা গেলে তাদের কাযার ফায়সালা কি?
উ: সুস্থ এবং মুকীম অবস্থায় যে কয়দিন জীবিত ছিল সে কয়দিনের রোযার কাযা ওয়াজিব হবে। যেমন কোন রুগ্ন ব্যক্তি অসুস্থ অবস্থায় ১০টি রোযা ছেড়ে দিল এবং সুস্থ হয়ে ৫দিন অবস্থানের পর মারা গেল উক্ত ব্যক্তির উপর ৫দিনের ৫টি রোযার কাযা ওয়াজিব হবে। অতএব, উক্ত দিনের রোযা না রাখলে ফিদইয়াহ আদায়ের জন্য অসিয়ত করলে মৃত ব্যক্তির মাল হতে ফিদইয়াহ আদায় করা ওয়াজিব। কিন্তু অসিয়ত না করলে ওয়াজিব হবে না বরং মুস্তাহাব হবে।
১৯শ অধ্যায়
গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের সিয়াম
প্রশ্ন ১০৫ : গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীরা কি সিয়াম পালন করবে নাকি ভঙ্গ করবে?
উত্তর : গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারীণী সিয়াম পালন করলে নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকুক বা না থাকুক উভয় অবস্থায় তাদের সিয়াম ভঙ্গ করা জায়েজ আছে এবং পরে তা কাযা করে নেবে। পরে করলে তারা সিয়াম পালনও করতে পারে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
إِنَّ اللهَ تَعَالَى وَضَعَ عَنْ الْمُسَافِرِ الصَّوْمَ وَشَطْرَ الصَّلاَةِ وَعَنْ الْحَامِلِ أَوْ الْمُرْضِعِ الصَّوْمَ أَوْ الصِّيَامَ
‘‘আল্লাহ রববুল ‘আলামীন মুসাফিরদের সালাত অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছেন এবং গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের সিয়াম না রেখে পরে আদায় করার অবকাশ দিয়েছেন। (তিরমিযী : ৭১৫)
তাদের বিষয়টি সাধারণ রোগী ও মুসাফিরের সিয়ামের মাসআলার অনুরূপ।
তাছাড়া মহিলা শারীরিকভবে যদি শক্তিশালী হয় এবং সন্তানের কোন ক্ষতির আশঙ্কা না করে তাহলে সিয়াম পালন করতে পারে। আর যদি সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তাহলে সিয়াম ভেঙ্গে ফেলা ওয়াজিব।
প্রশ্ন ১০৬ : গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারিনী মহিলার ভাঙ্গা রোযার বদলে কি শুধু কাযা করবে নাকি ফিদইয়া দিবে?
উত্তর : শুধু কাযা করবে।
প্রশ্ন ১০৭ : ফিদইয়ার পরিমাণ কত?
উত্তর : এক মুদ (৫১০ গ্রাম) পরিমাণ গম।
تُفْطِرُ وَتُطْعِمُ مَكَانَ كُلِّ يَوْمٍ مِسْكِيْنًا مُدًّا مِنْ حِنْطَةٍ
অর্থাৎ প্রতি একদিনের রোযার বদলে একজন মিসকীনকে এক মুদ (৫১০ গ্রাম) পরিমাণ গম (ভাল খাবার) প্রদান করবে। (বাইহাকী : ৪/৩৮৯)
তবে এ বিষয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছ থেকে সরাসরি কোন হাদীস না থাকায় এতে অনেক মতবিরোধ রয়েছে।
প্রশ্ন ১০৮ : গর্ভবতী নারীর পক্ষ থেকে কে ফিদইয়া দেবে?
উত্তর : সন্তানের পিতা বা তার ভরণ-পোষণের যিম্মাদার ব্যক্তি।
প্রশ্ন ১০৯ : গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী নারীরা কাযা রোযা কখন করবে?
উত্তর : যখন তার জন্য সহজ হবে এবং সন্তানের ক্ষতির কোন আশঙ্কা যখন থাকবে না তখন কাযা করবে।
২০শ অধ্যায়
ঋতুবতী মহিলাদের সিয়াম
প্রশ্ন ১১০ : ঋতুবতী মহিলা বলতে কী বুঝায়?
উত্তর : বালেগ হওয়ার পর মহিলাদের প্রতিমাসে ৬/৭ দিন বা কমবেশি মেয়াদে শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হয়। এটাকে বলা হয় মাসিক ঋতুস্রাব বা হায়েয। আর সন্তান প্রসবের পর রক্ত রক্তক্ষরণ হয় প্রায় ৪০ দিন ব্যাপী। এটাকে বলা হয় নিফাস। এ দু’ অবস্থায়ই মহিলাদেরকে ঋতুবর্তী বলা হয়। তখন তারা নাপাক বা অপবিত্র থাকে।
প্রশ্ন ১১১ : এ দু’ অবস্থায় মেয়েদের কী কী কাজ ও ইবাদত নিষিদ্ধ?
উত্তর : সালাত, সাওম ও স্বামী-স্ত্রীর যৌন মিলন, কুরআন স্পর্শ করা, মাসজিদে যাওয়া ও কাবা তাওয়াফ করা।
প্রশ্ন ১১২ : হায়েয ও নিফাস থেকে পবিত্র হওয়ার পর সালাত, রোযা কীভাবে কাযা করবে?
উত্তর : সালাত কাযা করতে হবে না। তবে এ কারণে যতটা রোযা ভাঙ্গা গেছে ঠিক ততটা রোযাই আবার কাযা করতে হবে।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেছেন :
فَنُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّوْمِ وَلاَ نُؤْمَرُ بِقَضَاءِ الصَّلاَةِ
‘‘সিয়াম কাযা করতে আমাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছিল, কিন্তু সালাত কাযা করতে আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয় নি।’’ (মুসিলম : ৩৩৫)
প্রশ্ন ১১৩ : যদি কোন সিয়াম পালনকারী নারীর সূর্যাস্তের সামান্য কিছু পূর্বে মাসিক স্রাব শুরু হয়ে যায় তাহলে কি করবে?
উত্তর : উক্ত সিয়াম বাতিল হয়ে যাবে এবং পরে এটা কাযা করতে হবে।
প্রশ্ন ১১২ : যদি কোন মেয়ে রমযান মাসের দিনের বেলায় কোন অংশে হায়েয বা নিফাস থেকে পবিত্র হয় তাহলে দিবসের বাকী অংশে কি রোযা রাখবে?
উত্তর : না, রাখবে না। কারণ সিয়ামের শুরু দিনের প্রথম থেকে হতে হবে। কাজেই এ সিয়াম পরে কাযা করবে। তবে দিনের বাকী অংশে খাওয়া দাওয়া থেকে বিরত থাকবে।
প্রশ্ন ১১৪ : যদি ফজরের সামান্য আগে হায়েয বা নিফাস থেকে পবিত্র হয় তাহলে কি করবে?
উত্তর : তাহলে ঐ দিনে সিয়াম পালন করা তার উপর ফরয। এমনকি গোসল করার সময় না থাকলেও।
প্রশ্ন ১১৫ : ফজরের পূর্বক্ষণে হায়েয বা নিফাস থেকে পবিত্র হল। কিন্তু গোসল করার সময় পেল না। এ অবস্থায় কি রোযা রাখার নিয়ত করবে?
উত্তর : হা, এ অবস্থায় রোযার নিয়ত করতেই হবে। ঐ দিন সিয়াম পালন করা তার ফরয। ফরয গোসল ছাড়াই রোযা শুরু করতে পারবে। কিন্তু ফজরের সালাত পড়তে হবে গোসলের কাজ সেরে।
প্রশ্ন ১১৬ : অভ্যাসের কারণে যে মহিলা জানে যে, আগামী কাল থেকে তার মাসিক শুরু হবে সে রোযার নিয়ত করবে কি করবে না?
উত্তর : অবশ্যই রোযার নিয়ত করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত রক্ত দেখতে না পাবে ততক্ষণ রোযা ভঙ্গ করবে না।
প্রশ্ন ১১৭ : সন্তান প্রসবের কারণে নিফাসওয়ালী মহিলা যদি ৪০ দিনের পূর্বেই পাক হয়ে যায় তাহলে কী করবে?
উ: গোসল করে পাক হয়ে রোযা রাখা ও নামায পড়া শুরু করে দিবে।
প্রশ্ন ১১৮ : নিফাসওয়ালী নারীর যদি ৪০ দিন পার হওয়ার পরও রক্ত বন্ধ না হয় তাহলে কি করবে?
উত্তর : চল্লিশতম দিন পার হলে গোসল করে রোযা রাখা শুরু করবে। অতিরিক্ত মেয়াদের এ অবস্থাকে ধরে নেবে ইস্তেহাদা বা রক্তপ্রদর রোগ। আর রক্তপ্রদর হলে রোযা ভঙ্গ করা জায়েয নয়।
প্রশ্ন ১১৯ : যদি কোন নারী মনে করে যে, টেবলেট খেয়ে হায়েয বা মাসিক বন্ধ করে ফরয রোযা চালিয়ে যাবে। এ কাজটির হুকুম কী?
উত্তর : এটাকে জায়েয তবে কৃত্রিম উপায়ে স্বাভাবিক ঋতুস্রাবকে দেরী করানো উচিত নয়। এ ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে।
প্রশ্ন ১২০ : হায়েয ও নিফাসওয়ালী মহিলা কীভাবে বুঝবে যে সে ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হয়ে গেছে?
উত্তর : যখন দেখবে যে তার ঋতুস্রাব সাদা রঙে পরিণত হয়ে গেছে, তখন বুঝবে সে পাক হয়ে গেছে। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলতেন :
لاَ تَعْجَلْنَ حَتَّى تَرَيِنَّ الْقِصَّةَ الْبَيْضَاءَ
‘‘তোমরা তাড়াহুড়া করে হায়েয বন্ধ হয়ে গেছে মনে করো না। যতক্ষণ না শুভ্র পানি দেখতে পাও।’’ (বুখারী : ৩১৯)
প্রশ্ন ১২১ : যে মহিলা বালেগ হওয়ার পর কোন রোযা রাখে নি। সে এখন লজ্জিত, অনুতপ্ত ও তাওবাহ করতে চায়। সে কি করবে?
উত্তর : এখন থেকে ভবিষ্যতে আর সিয়াম ভঙ্গ না করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করবে। পূর্বের গোনাহের জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাইবে, তাওবাহ করবে। ছেড়ে দেয়া প্রত্যেক রোযার জন্য একটি করে রোযা কাযা করতে হবে।
প্রশ্ন ১২২ : যে মহিলা মাসিকের সময় না রাখা রোযাগুলো কাযা করেনি সে কি করবে?
উত্তর : উপরে বর্ণিত একই কায়দায় সমপরিমাণ রোযা কাযা করবে।
প্রশ্ন ১২৩ : স্বামী উপস্থিত। স্ত্রী নফল বা সুন্নাত রোযা রাখতে চায়, কি করবে?
উত্তর : স্বামীর অনুমতি নিতে হবে। নতুবা জায়েয নয়।
প্রশ্ন ১২৪ : স্ত্রী ফরয রোযা রাখছে। এমতাবস্থায় স্বামীকে সহবাসের অনুমতি দিল। এর হুকুম কী?
উত্তর : স্বামীর মতই স্ত্রীকেও এ অপরাধে কাযা ও কাফফারা দিতে হবে। অর্থাৎ দু’জনের প্রত্যেককেই একাধারে ৬০ দিন রোযা রাখতে হবে। মাঝখানে কোন বিরতি দেয়া যাবে না। বিরতি দিলে শুরু থেকে আবার নতুন করে ১+৬০= ৬১ রোযা রাখবে। এভাবে চালিয়ে যাবে। এতে অপারগ হলে প্রতি একটা রোযার জন্য ৬০ জন মিসকীনকে এক বেলা খানা খাওয়াতে হবে।
প্রশ্ন ১২৫ : স্রাবের কারণে কাযা সিয়াম কোন উযর বা যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া পরবর্তী রমযান চলে আসার আগে কাযা করতে পারল না। এ অবস্থায় কি করবে?
উত্তর : এরূপ বিলম্বিত হওয়া গোনাহের কাজ। এজন্য তাওবাহ করতে হবে এবং পূর্বে বর্ণিত নিয়মে কাযা করবে অর্থাৎ যে কটা রোযা ভাঙ্গা হয়েছে শুধু সেক’টিই কাযা করতে হবে। চলতি রমযানের ফরয রোযা শেষ করার পর।
প্রশ্ন ১২৬ : কাযা ও কাফফারা উভয় ওয়াজিব। সেক্ষেত্রে কাযা কোনটি ও কাফফারা কোনটি?
উত্তর : কাযা হল সিয়ামের বদলে সিয়াম পালন করা। আর কাফফারা হলো মিসকীনকে খাবার খাওয়ানো।
অধ্যাপক মোঃ নূরুল ইসলাম
সম্পাদনা 
ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
আলী হাসান তৈয়ব
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s