রমযানের বিষয়ভিত্তিক হাদিস : শিক্ষা ও মাসায়েল (৩য় পর্ব)


রমযানের বিষয়ভিত্তিক হাদিস : শিক্ষা ও মাসায়েল (৩য় পর্ব)

১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

 ২য় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
৩৬. রোযাদারের জন্য শিঙ্গা ব্যবহার করা
শাদ্দাদ ইব্‌ন আউস রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে ‘বাকি’ নামক স্থানে এক ব্যক্তির নিকট আগমন করেন, যে শিঙ্গা লাগাচ্ছিল, তখন আঠারো রমযান। তিনি বললেন:
«أَفْطَرَ الحَاجِمُ والمحْجُومُ» رواه أبو داود وصححه أحمد والبخاري.
“যে শিঙ্গা লাগায় আর যার লাগানো হয় উভয় ইফতার করল”।[1]

 

সাওবান[2], রাফে ইব্‌ন খাদিজ[3] ও একদল সাহাবি থেকে অনুরূপ বর্ণিত আছে, এ জন্য একদল আলেম এ হাদিসকে মুতাওয়াতির বলেছেন।
ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহরাম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন, তিনি সওম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন”।
আবু দাউদের এক বর্ণনা আছে: “তিনি সওম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন”।[4]
শু‘বা রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমি সাবেত আল-বুনানিকে বলতে শুনেছি, তিনি মালিক ইব্‌ন আনাসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: আপনারা কি রোযাদারের জন্য শিঙ্গা অপছন্দ করতেন” তিনি বললেন: না, তবে দুর্বলতার কারণে”।[5]
আবু দাউদের এক বর্ণনায় আনাস থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: “দুর্বলতার কারণে আমরা রোযাদারের জন্য শিঙ্গা অপছন্দ করতাম”।[6]
শিক্ষা ও মাসায়েল:‎
এক. একাধিক হাদিস প্রমাণ করে যে, শিঙ্গা উভয়ের সওম ভঙ্গ করে: যে লাগায় ও যার লাগানো হয়। আবার এর বিপরীতে অন্যান্য হাদিস রয়েছে, যা প্রমাণ করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওম অবস্থায় শিঙ্গা লাগিয়েছেন। তাই শিঙ্গার ব্যাপারে আলেমদের ইখতিলাফ সৃষ্টি হয়েছে। জমহুর আলেম বলেন রোযাদারের জন্য শিঙ্গা লাগানো বৈধ। নিষেধাজ্ঞার হাদিসগুলো বৈধতার হাদিস দ্বারা রহিত ও মানসুখ।[7]
ইমাম আহমদের মাযহাব হচ্ছে, শিঙ্গা সওম ভঙ্গকারী। শায়খুল ইসলাম ও তার শিষ্য ইব্নুল কাইয়্যেম এ মত গ্রহণ করেছেন।[8]
সৌদি আরবের লাজনায়ে দায়েমা অনুরূপ ফতোয়া প্রদান করেছে।[9]
সৌদি আরবের অধিকাংশ আলেম এটাই গ্রহণ করেছেন। অতএব রোযাদারের দিনে শিঙ্গা পরিহার করাই সতর্কতা, এতে কোন ইখতিলাফ থাকে না।
দুই. আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু‎র হাদিস প্রমাণ করে যে, শিঙ্গা রোযা দুর্বল করে, তাই নিষেধ করা হয়েছে। এটা শরিয়তের এক বৈশিষ্ট্য, সে তার অনুসারীদের থেকে কষ্ট দূরীভূত করে।
তিন. শিঙ্গা শরীর দুর্বল করে, তাই সওম ভঙ্গকারী। যে শিঙ্গা লাগায় তার সওম ভঙ্গের কারণ হচ্ছে, রক্ত চোষণের ফলে তার মুখে রক্ত প্রবেশ করার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। হ্যাঁ যদি সে মুখে না চোষে, আধুনিক যন্ত্র দ্বারা টেনে বের করে, তাহলে তার সওম ভঙ্গ হবে না।[10]
চার. অপারেশন দ্বারা বিষাক্ত রক্ত বের করলে সাওম পালনকারীর সওম ভেঙ্গে যাবে, তবে ডাক্তারের সওম ভঙ্গ হবে না।[11]
পাঁচ. মাথা হালকা করা বা কোন কারণে স্বেচ্ছায় নাক থেকে রক্ত বের করলে সওম ভেঙ্গে যাবে, অনিচ্ছায় অধিক রক্ত বের হলেও সওম ভঙ্গ হবে না।[12] রক্ত বের হওয়ার কারণে যদি শরীর দুর্বল হয় ও রোযা ভাঙ্গার প্রয়োজন হয়, তাহলে তার অনুমতি রয়েছে, কারণ সে অসুস্থ।
ছয়. রক্ত পরীক্ষা করলে সওম ভঙ্গ হবে না, হ্যাঁ ইখতিলাফ এড়িয়ে থাকার জন্য এসব কাজ রাতে করা উত্তম। তবে রক্ত বেশী বের হলে সওম ভেঙ্গে যাবে, তাই রাত ব্যতীত এসব কাজ না করা উত্তম। অসুখের জন্য প্রয়োজন হলে করবে, তবে সওম ভেঙ্গে যাবে, পরে তা কাযা করবে।[13]
সাত. অনিচ্ছাকৃতভাবে রোযাদারের শরীর থেকে দুর্ঘটনা অথবা যখমের কারণে অধিক রক্ত বের হলে, সওম নষ্ট হবে না। যদি দুর্বলতার কারণে সওম ভাঙ্গতে বাধ্য হয়, তাহলে সে অসুস্থ ব্যক্তির ন্যায় সওম ভাঙ্গবে ও কাযা করবে।[14]
আট. দাঁত বের করার কারণে সওম ভাঙ্গবে না, যদিও বেশী রক্ত বের হয়, কারণ সে রক্ত বের করার জন্য তা বের করেনি, রক্ত তার ইচ্ছা ব্যতীত বের হয়েছে, কিন্তু সে রক্ত গিলবে না, যদি ইচ্ছাকৃত রক্ত গিলে ফেলে, সওম ভেঙ্গে যাবে।[15]
নয়. ডাক্তারি যন্ত্র দ্বারা কিডনি পরিষ্কার করে সে রক্ত বিভিন্ন কেমিক্যাল যেমন সুগার, লবন ইত্যাদি মিশিয়ে পুনরায় তা শরীরে প্রতিস্থাপন করলে সওম ভেঙ্গে যাবে।[16]
দশ. শিঙ্গার ন্যায় রক্ত দান করলে সওম ভেঙ্গে যাবে, তাই রাত ব্যতীত এ কাজ করবে না, তবে কাউকে বাঁচানোর জন্য রক্ত দেয়ার প্রয়োজন হলে দিবে, রোযা ভঙ্গ করবে ও পরে কাযা করবে।[17]
এগারো. খাদ্য জাতীয় ইনজেকশনের ফলে সওম ভেঙ্গে যাবে।[18]

৩৭. সিয়ামের ফযিলত
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الصِّيَامُ جُنَّة» رواه الشيخان.
“সিয়াম ঢাল”।[19] মুসনাদে আহমদের এক বর্ণনায় আছে:
«الصِّيَامُ جُنَّةٌ وحِصْنٌ حَصِينٌ من النَّار».
“সিয়াম ঢাল ও জাহান্নাম থেকে সুরক্ষার মজবুত কিল্লা”।[20]
জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إنَّ الصِّيامَ جُنَّـةٌ يَستَجِنُّ بها العَبدُ من النَّارِ».
“নিশ্চয় সিয়াম ঢাল, বান্দা এর দ্বারা জাহান্নাম থেকে সুরক্ষা লাভ করবে”।[21]
উসমান ইব্‌ন আবুল আস সাকাফি রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
«الصِّيامُ جُنَّـةٌ مِنَ النَّارِ كَجُنَّةِ أَحَدِكُم من القِتَال».
“সিয়াম জাহান্নাম থেকে ঢাল, তোমাদের কারো যুদ্ধের ময়দানের ঢালের ন্যায়”।[22]
আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
«الصَّومُ جُنَّـةٌ ما لم يَخْرِقْهَا».
“সওম ঢাল, যতক্ষণ না তা ভাঙ্গা হয়”।[23]
الجُنَّةُ শব্দের অর্থ: সুরক্ষা ও পর্দা। অর্থাৎ সিয়াম জাহান্নামের আগুন থেকে সুরক্ষা ও পর্দা স্বরূপ।[24]
শিক্ষা ও মাসায়েল:‎
এক. সিয়াম কু-প্রবৃত্তিকে বশীভূত করে, যে কু-প্রবৃত্তি ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। এ জন্য সওম জাহান্নামের ঢাল স্বরূপ। ইরাকি বলেন: “সওম জাহান্নামের ঢাল, কারণ সে প্রবৃত্ত থেকে বিরত রাখে, আর জাহান্নাম প্রবৃত্তি দ্বারা আবৃত”।[25]
দুই. সওম ফযিলত পূর্ণ, মুসলিমদের উচিত অধিক পরিমাণ নফল সওম পালন করা, যদি সে তার ক্ষমতা রাখে ও তার চেয়ে উত্তম আমলের প্রতিবন্ধক না হয়, যেমন জিহাদ ইত্যাদি।
তিন. সে সওম জাহান্নামের ঢাল স্বরূপ, যে সওমে সওয়াব হ্রাসকারী বা সওম বিনষ্টকারী কথা বা কর্ম সংঘটিত হয়নি, যেমন গীবত, নামীমা, মিথ্যা ও গালি। কারণ আবু উবাইদার বর্ণনা এসেছে: “সওম ঢাল, যতক্ষণ না সে তা ভেঙ্গে ফেলে”। সওম ভঙ্গ হয় হারাম কর্ম দ্বারা, অতএব সওম পালনকারীর উচিত তার সওমকে সওয়াব বিনষ্টকারী অথবা সওয়াব হ্রাসকারী কর্মকাণ্ড থেকে হিফজত করা, যেন তার সওম তার জন্য জাহান্নামের ঢাল হয়।
চার. সওমের উদ্দেশ্য নফসকে পবিত্র করা ও অন্তর সংশোধন করা, শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়।
৩৮. নাপাক অবস্থায় প্রভাতকারীর সিয়াম
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿أُحِلَّ لَكُمۡ لَيۡلَةَ ٱلصِّيَامِ ٱلرَّفَثُ إِلَىٰ نِسَآئِكُمۡۚ﴾ [البقرة: 187]
“সিয়ামের রাতে তোমাদের জন্য তোমাদের ‎‎স্ত্রীদের নিকট গমন হালাল করা হয়েছে”।[26] ‎তিনি আরো বলেন:
﴿فَٱلۡـَٰٔنَ بَٰشِرُوهُنَّ وَٱبۡتَغُواْ مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَكُمۡۚ وَكُلُواْ وَٱشۡرَبُواْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلۡخَيۡطُ ٱلۡأَبۡيَضُ مِنَ ٱلۡخَيۡطِ ٱلۡأَسۡوَدِ مِنَ ٱلۡفَجۡرِۖ ﴾ [البقرة: 187]
“অতএব, এখন তোমরা তাদের সাথে মিলিত ‎হও এবং আল্লাহ তোমাদের জন্য যা লিখে ‎দিয়েছেন, তা অনুসন্ধান কর। আর আহার কর ‎ও পান কর যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা ‎কাল রেখা থেকে স্পষ্ট হয়”।[27]
আয়েশা ও উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রভাত কখনো হত এমতাবস্থায় যে, স্ত্রীগমনের কারণে তিনি নাপাক থাকতেন। অতঃপর গোসল করতেন ও সওম রাখতেন”।[28]
মুসলিমের এক হাদিসে উম্মে সালামা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্ন দোষের কারণে নয়, বরং স্ত্রীগমনের কারণে নাপাক অবস্থায় প্রভাত করতেন, অতঃপর সওম পালন করতেন, কাযা করতেন না”।[29]
মুসলিমের অপর বর্ণনায় আছে: আবু বকর ইব্‌ন আব্দুর রহমান রহ. বলেন: “আমি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ঘটনা বলতে শুনেছি, তিনি তার ঘটনায় বলেন: নাপাক অবস্থায় যার ভোর হয়, সে সওম রাখবে না। আমি এ ঘটনা আবু বকরের পিতা আব্দুর রহমান ইব্‌ন হারেসকে বললাম, তিনি অস্বীকার করলেন। আব্দুর রহমান রওয়ানা করলেন, আমি তার সাথী হলাম, অবশেষে আমরা আয়েশা ও উম্মে সালামার নিকট এসে পৌঁছলাম। আব্দুর রহমান তাদেরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন: তিনি বলেন: তারা উভয়ে বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্ন দোষ ব্যতীত নাপাক অবস্থায় ভোর করতেন, অতঃপর সওম রাখতেন। তিনি বলেন: আমরা রওনা করে মারওয়ানের নিকট পৌঁছলাম, আব্দুর রহমান তাকে ঘটনা বললেন: মারওয়ান বললেন: আমি তোমাকে বলছি তুমি অবশ্যই আবু হুরায়রার কাছে গিয়ে তার কথার প্রতিবাদ কর। তিনি বলেন: আমরা আবু হুরায়রার নিকট গেলাম, আবু বকর এসব ঘটনায় উপস্থিত ছিল। তিনি বলেন: আব্দুর রহমান তাকে এ কথা বললেন। অতঃপর আবু হুরায়রা বললেন:  তারা উভয়ে তোমাকে এ কথা বলেছে? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আবু হুরায়রা বললেন: তারা আমার চেয়ে বেশী জানেন। অতঃপর আবু হুরায়রা এ বিষয়ে যা বলতেন, ফযল ইব্‌ন আব্বাসের বরাতে বলতেন। আবু হুরায়রা বলতেন: আমি ফযল ইব্‌ন আব্বাস থেকে শুনেছি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনি নি। তিনি বলেন: আবু হুরায়রা তার পূর্বের কথা থেকে ফিরে যান। আমি আব্দুল মালেককে বললাম: তারা কি রমযানের ব্যাপারে বলেছেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ, তিনি স্বপ্ন দোষ ব্যতীত নাপাক অবস্থায় ভোর করতেন, অতঃপর সওম পালন করতেন”।[30]
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত: “এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফতোয়া তলবের জন্য এসেছে, তিনি দরজার আড়াল থেকে শুনতে ছিলেন, সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আমার নাপাক অবস্থায় সালাতের সময় হয়, আমি কি সওম রাখব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমারও নাপাক অবস্থায় সালাতের সময় হয়, অতঃপর আমি সওম রাখি। সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল, আপনি আমাদের মত নয়, আল্লাহ আপনার অগ্র-পশ্চাতের সকল পাপ মোচন করে দিয়েছেন। তিনি বললেন: আল্লাহর শপথ আমি তোমাদের মধ্যে অধিক আল্লাহ ভীরু এবং তাকওয়া সম্পর্কে তোমাদের চাইতে অধিক জ্ঞাত”।[31]

শিক্ষা ও মাসায়েল:‎
এক. রমযানের রাতে স্ত্রীগমন বৈধ, তা থেকে পরহেয করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের বিপরীত, তবে শেষ দশকে ইতিকাফকারী ব্যতীত।
দুই. রমযানের রাতে সহবাস অথবা স্বপ্ন দোষের পর ফজর উদিত হওয়ার পরবর্তী সময় পর্যন্ত যে গোসল বিলম্ব করল, সে সওম পালন করবে, তার ওপর কিছু আবশ্যক হবে না। এ ব্যাপারে সকল আলেম একমত।[32]
তিন. এ হাদিসে উম্মুল মুমিনীনদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হয়, যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘর ও তার পরিবার সংশ্লিষ্ট বিশেষ জ্ঞানের ধারক ও প্রচারকারী ছিলেন।
চার. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার সংক্রান্ত জ্ঞানের ব্যাপারে উম্মুল মুমিনীনদের কথা অন্য সবার ঊর্ধ্বে।
পাঁচ. ফরয গোসল ভোর পর্যন্ত দেরি করা শুধু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং তা উম্মতের সবার জন্য প্রযোজ্য।
ছয়. উম্মে সালামার বাণী: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহবাসের কারণে নাপাক অবস্থায় ভোর করতেন, স্বপ্ন দোষের কারণে নয়”। এখানে দু’টি শিক্ষা:
(১). নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৈধতা বর্ণনা করার জন্য রমযানে সহবাস করতেন ও ফজর উদয় পর্যন্ত গোসল বিলম্ব করতেন।
(২). নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহবাসের কারণে নাপাক অবস্থায় ভোর করতেন, স্বপ্ন দোষের কারণে নয়, কারণ স্বপ্ন দোষ শয়তানের পক্ষ থেকে, তিনি ছিলেন শয়তান থেকে নিরাপদ।[33]
সাত. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক আল্লাহ ভীরু, অধিক মুত্তাকী ও তাকওয়া সম্পর্কে অধিক জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।
আট. এসব হাদিস থেকে বুঝা যায়, নারী যদি মাসিক ঋতু বা নিফাস থেকে ফজরের পূর্বে পবিত্র হয়, অতঃপর ফজর উদয় পর্যন্ত গোসল বিলম্ব করে, তার সওম বিশুদ্ধ, ইচ্ছা বা অনিচ্ছা বা যে কারণে গোসল বিলম্ব করুক, যেমন নাপাক ব্যক্তি।[34]
নয়. এসব হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে, নিন্দা জানানো হয়েছে চরম পন্থা, বৈধ বস্তু ত্যাগ করা ও লৌকিকতাপূর্ণ প্রশ্নকে।[35]
দশ. রমযান বা গায়রে রমযান সর্বদা ফজরের পর নাপাক, হায়েস ও নেফাস থেকে পবিত্রতা অর্জনকারীদের সওম বিশুদ্ধ। এ ক্ষেত্রে ওয়াজিব অথবা মানত অথবা কাযা অথবা নফল সওমে কোন পার্থক্য নেই।
এগারো. কোন বিষয়ে দ্বিধা বা বিরোধের সৃষ্টি হলে জ্ঞানীদের শরণাপন্ন হওয়া জরুরী, যেমন আবু হুরায়রা বলেছেন: “তারা বেশী জানে” অর্থাৎ আয়েশা ও উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা‎। কারণ তারা পারিবারিক ব্যাপারে অন্যদের চেয়ে অধিক জ্ঞাত।
বারো. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত বিরোধের সময় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও অকাট্য দলিল।
তেরো. ভুল হলে ভুল স্বীকার করা ও ইলমের ক্ষেত্রে আমানতদারী রক্ষা করা জরুরী, যেমন আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ স্বীকার করেছেন তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শ্রবণ করেন নি, বরং অন্য কারো থেকে শ্রবণ করেছেন।
৩৯. ইতিকাফের বিধান
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَعَهِدۡنَآ إِلَىٰٓ إِبۡرَٰهِ‍ۧمَ وَإِسۡمَٰعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيۡتِيَ لِلطَّآئِفِينَ وَٱلۡعَٰكِفِينَ وَٱلرُّكَّعِ ٱلسُّجُودِ ١٢٥﴾ [البقرة: 125]
“আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলকে দায়িত্ব ‎দিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার গৃহকে ‎তাওয়াফকারী, ‘ইতিকাফকারী ও রুকূকারী-‎সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর”।[36]
অন্যত্র বলেন:
﴿وَلَا تُبَٰشِرُوهُنَّ وَأَنتُمۡ عَٰكِفُونَ فِي ٱلۡمَسَٰجِدِۗ تِلۡكَ حُدُودُ ٱللَّهِ فَلَا تَقۡرَبُوهَاۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ ءَايَٰتِهِۦ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمۡ يَتَّقُونَ ١٨٧﴾ [البقرة: 187]
“আর তোমরা মাসজিদে ইতিকাফরত অবস্থায় ‎‎স্ত্রীদের সাথে মিলিত হয়ো না”।[37]
আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশক ইতিকাফ করতেন”।[38]
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু পর্যন্ত রমযানের শেষ দশক ইতিকাফ করতেন, অতঃপর তার স্ত্রীগণ তার পরবর্তীতে ইতিকাফ করেছেন”।[39]
শিক্ষা ও মাসায়েল:‎
এক. ইতিকাফ পূর্বের উম্মতে বিদ্যমান ছিল।
দুই. ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। ইতিকাফ মহান ইবাদত, বান্দা এর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা ইতিকাফ করেছেন”।
ইমাম যুহরি রহ. বলেছেন: মুসলিমদের দেখে আশ্চর্য লাগে, তারা ইতিকাফ ত্যাগ করেছে, অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনাতে আসার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কখনো ইতিকাফ ত্যাগ করেন নি”।[40]
আতা আল-খুরাসানি রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আগে বলা হত: ইতিকাফকারীর উদাহরণ সে বান্দার মত, যে নিজেকে আল্লাহর সামনে পেশ করে বলছে: হে আল্লাহ যতক্ষণ না তুমি ক্ষমা কর, আমি তোমার দরবার ত্যাগ করব না, হে আমার রব, যতক্ষণ না তুমি আমাকে ক্ষমা কর, আমি তোমার দরবার ত্যাগ করব না”।[41]
তিন. মসজিদ ব্যতীত ইতিকাফ শুদ্ধ নয়, পাঞ্জেগানা মসজিদে ইতিকাফ শুদ্ধ। জুমার জন্য মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ ভাঙ্গবে না, যদিও জুমআর সালাতে যাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি মসজিদ থেকে বের হোক না কেন।
চার. যার ওপর জামাতে উপস্থিত হওয়া ওয়াজিব নয়, সে এমন মসজিদে ইতিকাফ করতে পারবে, যেখানে জামাত হয় না, যেমন পরিত্যক্ত মসজিদ, বাজারের মসজিদ ও কৃষি জমির মসজিদ ইত্যাদি।[42]
পাঁচ. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশক ইতিকাফ করতেন, অনুরূপ তার স্ত্রীগণ ইতিকাফ করতেন। ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য লাইলাতুল কদর তালাশ করা।
ছয়. ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রীগমন বৈধ নয়, ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রীগমনের ফলে ইতিকাফ নষ্ট হবে, তবে তার ওপর কাফফারা বা কাযা ওয়াজিব হবে না। ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, “ইতিকাফকারী সহবাস করলে তার ইতিকাফ ভেঙ্গে যাবে, পুনরায় সে ইতিকাফ আরম্ভ করবে”।[43]
সাত. ইতিকাফকারী ভুলক্রমে সহবাস করলে তার ইতিকাফ ভঙ্গ হবে না, যেমন ভঙ্গ হবে না তার সিয়াম।
৪০. একুশে রমযান লাইলাতুল কদর তালাশ করা
আবু সালামা ইব্‌ন আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমরা লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আলোচনা করলাম, অতঃপর আমি আবু সায়িদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট যাই, তিনি আমার একান্ত বন্ধু ছিলেন। আমি তাকে বললাম: চলুন না খেজুর বাগানে যাই? তিনি বের হলেন, গায়ে উলের কালো চাদর। আমি তাকে বললাম: আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বলতে শুনেছেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ,। আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে রমযানের মধ্য দশক ইতিকাফ করলাম। তিনি একুশের সকালে বের হয়ে আমাদেরকে খুতবা দিলেন। তিনি বললেন:
إني أُرِيتُ لَيلَةَ القَدرِ، وإنِّي نَسِيتُها أو أُنْسِيتُها، فَالتَمِسُوهَا في العَشْرِ الأَوَاخِرِ من كُلِّ وِتْرٍ، وإنِّي أُرِيتُ أَنِّي أَسْجُدُ في ماءٍ وطِين فَمن كَانَ اعْتَكَفَ مع رَسُولِ الله ﷺ فَليَرجِع،
“আমি লাইলাতুল কদর দেখেছি, কিন্তু আমি তা ভুলে গেছি অথবা আমাকে তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অতএব তোমরা তা শেষ দশকের প্রত্যেক বেজোড় রাতে তালাশ কর। আমাকে দেখানো হয়েছে আমি মাটি ও পানিতে সেজদা করছি, যে রাসূলের সাথে ইতিকাফ করেছিল সে যেন ফিরে আসে”। তিনি বলেন: আমরা ফিরে গেলাম, কিন্তু আসমানে কোন মেঘ দেখিনি। তিনি বলেন: মেঘ আসল ও আমাদের উপর বর্ষিত হল, মসজিদের ছাদ টপকে বৃষ্টির পানি পড়ল, যা ছিল খেজুর পাতার। সালাত কায়েম হল, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলাম পানি ও মাটিতে সেজদা করছেন। তিনি বলেন: আমি তার কপালে পর্যন্ত মাটির দাগ দেখেছি”।[44]
আবু সায়িদ রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত অপর বর্ণনায় আছে, তিনি বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মধ্যম দশক ইতিকাফ করেছি, যখন বিশ রমযানের সকাল হল আমরা আমাদের বিছানা-পত্র স্থানান্তর করলাম, অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আসলেন, তিনি বললেন: যে ইতিকাফ করছিল সে যেন তার ইতিকাফে ফিরে যায়, কারণ আমি আজ রাতে (লাইলাতুল কদর) দেখেছি, আমি দেখেছি আমি পানি ও মাটিতে সেজদা করছি। যখন তিনি তার ইতিকাফে ফিরে যান, বলেন: আসমান অশান্ত হল, ফলে আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হল। সে সত্ত্বার কসম, যে তাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছে, সেদিন শেষে আসমান অশান্ত হয়েছিল, তখন মসজিদ ছিল চালাঘর ও মাচার তৈরি, আমি তার নাক ও নাকের ডগায় পানি ও মাটির আলামত দেখেছি”।[45]
অপর বর্ণনায় আছে, আবু সায়িদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের মধ্যম দশক ইতিকাফ করতেন, যখন তিনি প্রস্থানরত বিশের রাতে সন্ধ্যা করে একুশের রাতে পদার্পন করতেন, নিজ ঘরে ফিরে যেতেন। যে তার সাথে ইতিকাফ করত সেও ফিরে যেত। তিনি কোন এক রমযান মাসে যে রাতে সাধারণত ইতিকাফ থেকে ফিরে যেতেন সে রাতে ফিরে না গিয়ে কিয়াম (অবস্থান) করলেন, অতঃপর খুতবা প্রদান করলেন, আল্লাহর যা ইচ্ছা ছিল তাই তিনি লোকদের নির্দেশ করলেন। অতঃপর বললেন:
«كُنْتُ أُجَاوِرُ هَذِهِ العَشْرَ، ثُمَّ قَدْ بَدَا لي أَنْ أُجَاوِرَ هَذِهِ العَشْرَ الأَوَاخِرَ، فَمَنْ كَانَ اعْتَكَفَ مَعِيَ فَلْيَثْبُتْ في مُعْتَكَفِهِ، وَقَدْ أُريتُ هَذَهَ الَّليْلَةَ ثُمَّ أُنْسيتُهَا فَابْتَغُوهَا في العَشْرِ الأَوَاخِرِ، وابْتَغُوهَا في كُلِّ وِتْرٍ، وَقَدْ رَأَيْتُني أَسْجُدُ في مَاءٍ وَطِينٍ»
“আমি এ দশক ইতিকাফ করতাম, অতঃপর আমার নিকট স্পষ্ট হল যে আমি ইতিকাফ করব এ শেষ দশক, অতএব যে আমার সাথে ইতিকাফ করেছে, সে যেন তার ইতিকাফে বহাল থাকে। আমাকে এ রাত দেখানো হয়েছিল, অতঃপর তা ভুলিয়ে দেয়া হয়েছে, তোমরা তা তালাশ কর শেষ দশকে। আর তা তালাশ কর প্রত্যেক বেজোড় রাতে। আমি দেখেছি, আমি পানি ও মাটিতে সেজদা করছি”। সে রাতে আসমান গর্জন করে সৃষ্টি বর্ষণ করল। একুশের রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাতের জায়গায় মসজিদ ফোটা ফোটা বৃষ্টির পানি ফেলল। আমার দু’চোখ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছে, আমি তার দিকে দৃষ্টি দিলাম, তিনি সকালের সালাত থেকে ফিরলেন, তখন তার চেহারা মাটি ও পানি ভর্তি ছিল”।[46]
শিক্ষা ও মাসায়েল[47]:‎
এক. ইলম অন্বেষণের জন্য সফর করা এবং উপযুক্ত স্থান ও সময়ে আলেমদের জিজ্ঞাসা করা।
দুই. শিক্ষকদের কর্তব্য ছাত্রদের সুযোগ দেয়া, যেন তারা সুন্দরভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে।
তিন. মুসল্লির চেহারায় সেজদার সময় যে ধুলা-মাটি লাগে তা দূর করা উচিত নয়, তবে তা যদি কষ্টের কারণ হয়, সালাতের একাগ্রতা নষ্ট করে, তাহলে মুছতে সমস্যা নেই।[48] মাটিতে সেজদা দেয়া ও সালাত আদায় করা বৈধ।[49]
চার. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষ, তিনি মানুষের ন্যায় ভুলে যান, তবে আল্লাহ তাকে যা পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়েছেন তা ব্যতীত, কারণ সে ক্ষেত্রে আল্লাহ তাকে ভুল থেকে হিফাজত করেন। নবীদের স্বপ্ন সত্য, তারা যেভাবে দেখেন সেভাবে তা ঘটে।
পাঁচ. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লাইলাতুল কদর দেখার অর্থ তিনি তা জেনেছেন, অথবা তার আলামত দেখেছেন। আবু সায়িদ রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে ইমাম বুখারি বর্ণনা করেন: জিবরিল তাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, লাইলাতুল কদর শেষ দশকে।[50]
ছয়. আলেম যদি কোন বিষয় জানার পর ভুলে যায়, তাহলে সাথীদের বলে দেয়া ও তা স্বীকার করা।[51]
সাত. এ হাদিস প্রমাণ করে যে, রমযানে ইতিকাফ করা মোস্তাহাব। তবে প্রথম দশক থেকে মধ্যম দশক উত্তম, আবার মধ্যম দশক থেকে শেষ দশক উত্তম।[52]
আট. জনসাধারণের উদ্দেশ্যে ইমামের খুতবা দেয়া ও তাদের জরুরী বিষয় বর্ণনা করা বৈধ।
নয়. এ হাদিস প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে তাদের কল্যাণের বস্তু জানানোর জন্য উদগ্রীব ছিলেন। লাইলাতুল কদর তালাশে তিনি ও তার সাহাবিগণ সচেষ্ট থাকতেন।
দশ. রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করার ফযিলত, বরং সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ, যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো তা ত্যাগ করেননি।
এগারো. লাইলাতুল কদর শেষ দশকে, বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে, আরো বিশেষ একুশের রাত।
বারো. সেজদায় কপাল ও নাক স্থির রাখা ওয়াজিব, যেরূপ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেখেছেন।
তেরো. এ হাদিস প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মুসলিমগণ দুনিয়ার সামান্য বস্তু ও সাধারণ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তাদের মসজিদ ছিল খেজুর পাতার, যখন বৃষ্টি হত, সালাতে থাকাবস্থায় তাদের ওপর বৃষ্টির পানি ঝরে পড়ত।
চৌদ্দ. একুশে রমযানের ফযিলত, এটা সম্ভাব্য লাইলাতুল কদরের রাত, অতএব এ রাতে অবহেলা করা মুসলিমদের উচিত নয়।

৪১.  রমযানের শেষ দশকে রাত্রি জাগরণ
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন (রমযানের) শেষ দশক উপস্থিত হত, নবী সাল্লাল্লাহু ‎আলাইহি ওয়া সাল্লাম লুঙ্গি শক্ত করে বাঁধতেন, রাত্রি জাগরণ করতেন ও পরিবারের সদস্যদের জাগিয়ে তুলতেন”।[53]
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশকে ‎এমন মুজাহাদা করতেন, যা তিনি অন্য সময় করতেন না।[54]‎
আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশকে নিজ পরিবারকে ‎জাগ্রত করতেন।[55]‎ ‎
হাদিসটি ইমাম আহমদ রাহিমাহুল্লাহ এভাবে বর্ণনা করেন: “রমযানের শেষ দশক শুরু হলে নবী ‎সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবারে লোকদের জাগাতেন ও লুঙ্গি উঁচু করে নিতেন। আবু ‎বকর ইব্‌ন আইইয়াশকে জিজ্ঞেস করা হল, লুঙ্গি উঁচু করে পরার অর্থ কী? তিনি বললেন : স্ত্রীদের সঙ্গ ত্যাগ।‎[56]
শিক্ষা ও মাসায়েল:‎
এক. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদতের জন্য অধিক পরিশ্রম করতেন, অথচ আল্লাহ তার পূর্বাপর সকল গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন, তবে অন্যান্য রাতের তুলনায় রমযানের শেষ দশকের রাতসমূহে তার পরিশ্রম অধিক ছিল।
দুই. রমযানের শেষ দশকে স্ত্রী-সঙ্গ ত্যাগ