রাসূল যেভাবে রমজান যাপন করেছেন (২য় পর্ব)


রাসূল যেভাবে রমজান যাপন করেছেন (২য় পর্ব)

১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
রমজানে প্রিয় সহধর্মিণীদের সাথে রাসূলের আচরণ
সহধর্মিণীদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ বিশ্লেষণ করলে আমাদের সামনে ফুটে উঠবে তার আচরণের অসাধারণ এক ভারসাম্য, জীবনের সূচনা থেকে সমাপ্তি অবধি যা তিনি বজায় রেখেছেন অত্যন্ত সার্থকতার সাথে। রাসূল নিজ গুণ সম্পর্কে বলেন :
إنَّ أتقاكم وأعلمكم بالله أنا.
তোমাদের মাঝে সর্বাধিক আল্লাহভীরু ও আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞাত হলাম আমি।[১৮৯]

ভিন্ন এক হাদিসে তিনি এরশাদ করেন :
قد علمتم أني أتقاكم لله وأصدقكم وأبركم.
তোমরা জেনেছ যে, আমি তোমাদের মাঝে সর্বাধিক আল্লাহভীরু, সত্যবাদী ও সৎ।[১৯০]
হাদিসে আরো এসেছে,
أنا أتقاكم لله وأعلمكم بحدود الله.
আমি তোমাদের মাঝে সর্বাধিক আল্লাহভীরু এবং আল্লাহ প্রবর্তিত সীমারেখা সম্পর্কে জ্ঞাত।[১৯১] আল্লাহর সাথে রাসূলের আচরণের আলোচনার নানা-পর্বে এ বিষয়ে পাঠককে ধারণা দিতে আমরা প্রয়াস পেয়েছি।
পক্ষান্তরে স্ত্রী ও সহধর্মিণীদের সাথে তার আচরণ কেমন ছিল্তসে সম্পর্কে রাসূলের হাদিস :
خيركم خيركم لأهله، وأنا خيركم لأهلي.
তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের নিকট উত্তম। আমি তোমাদের মাঝে আমার পরিবারের নিকট সর্বাধিক উত্তম ব্যক্তি।[১৯২]্তপর্যালোচনা করলেই আমরা জানতে পারব। রাসূল তার স্ত্রীদের সাথে কীরূপ আচরণ করতেন, বক্ষ্যমাণ পরিচ্ছেদে আমরা সে বিষয়ে আলোচনার প্রয়াস পাব।
শিক্ষাদান
রাসূল রমজান মাসে নানাভাবে তার স্ত্রী-গণকে শিক্ষা দান করতেন। হাদিসের পাঠক মাত্রই বিষয়টি স্বীকার করবেন, কারণ, রমজান বিষয়ক অধিকাংশ হাদিস তার স্ত্রী-গণ কর্তৃক বর্ণিত। স্ত্রীদের শিক্ষা ব্যাপারে রাসূলের গুরুত্বারোপের উত্তম প্রমাণ এগুলো। প্রমাণ স্বরূপ কয়েকটি হাদিস এ স্থানে উল্লেখ করা যেতে পাের্ত
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, ‘হে আল্লাহর রাসূল আপনার কি মত ? আমি যদি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জ্ঞাত হই, তাহলে আমি কি দোয়া পাঠ করব ?’্তএ প্রশ্ন করার পর রাসূল তাকে বললেন :
قولي: اَللّهُم إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيْمٌ تٌحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْ.
তুমি দোয়া করবে ‘হে আল্লাহ ! আপনি ক্ষমাশীল সম্মানিত, আপনি ক্ষমা পছন্দ করেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন।[১৯৩]
জনৈকা নারী আয়েশা রা.-কে প্রশ্ন করল : যে হায়েজা নারী রোজার কাজা করে, সালাতের কাজা করে না, তার কী হুকুম ? তিনি বললেন : আমাদেরও এমন হয়েছিল, আমদেরকে কেবল রোজা কাজা করার আদেশ দেয়া হয়েছে, সালাত কাজা করার হুকুম দেয়া হয়নি।[১৯৪]
আয়েশা রা. অপর হাদিসে বর্ণনা করেন : বেলাল রাত থাকতেই আজান দিয়ে দিতেন, রাসূল তাই সকলকে বললেন ইবনে উম্মে মাকতুম আজান দেয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার করে যাও, কারণ, ফজর উদয় হওয়া ব্যতীত সে আজান দেয় না।[১৯৫]
এ দু প্রকার হাদিস থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যায়।
প্রথমত : শরিয়তের সাব্যস্ত নসের প্রতি সম্মান জ্ঞাপন ও সর্বান্তঃকরণে তা গ্রহণ আবশ্যক। এ, সন্দেহ নেই, দ্বীনের খুবই মৌলিক একটি বিষয়, মোমিনদের আবশ্যিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন :
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ [النور: ৫১]
যখন মোমিনদের মাঝে ফায়সালা করার জন্য তাদেরকে আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয়, তখন তাদের উক্তি হয় এই্তআমরা শ্রবণ করালাম এবং আনুগত্য করলাম। আর তারাই সফলকাম।[১৯৬]
فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّىَ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُواْ فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجاً مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسْلِيماً [النساء:৬৫].
কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ ! যতক্ষণ না তারা তাদের বিবাদের বিচারের দায়িত্ব আপনার উপর অর্পণ না করে, অত:পর আপনার সিদ্ধান্ত বিষয়ে তাদের মনে কোন-রূপ দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা মোমিন হবে না।[১৯৭]
এ বিষয়টি সাহাবিদের জীবন ও জীবনাচারে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সাহাবি আব্দুল্লাহ বিন মুগাফ্‌ফাল একবার দেখতে পেলেন জনৈক সাহাবি পাথর ছুঁড়ে মারছে। তিনি বললেন, তুমি পাথর ছুঁড়ে মের না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথর ছুঁড়ে মারতে নিষেধ করেছেন, কিংবা তিনি একে অপছন্দ করতেন। কিন্তু এরপরও তিনি দেখতে পেলেন যে, উক্ত সাহাবি পাথর ছুঁড়ে মারছে। তাই তিনি বললেন, আমি তোমাকে হাদিস বর্ণনা করছি যে, রাসূল পাথর ছোঁড়া হতে নিষেধ করেছেন, কিংবা তিনি একে অপছন্দ করেছেন, অথচ তুমি পাথর ছুঁড়ছ! তোমার সাথে এ ব্যাপারে আর কিছুই বলব না।[১৯৮] ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বললেন্ত
تمتع النبي صلي الله عليه و سلم، فقال عروة: نهى أبو بكر وعمر عن المتعة، فقال: أراهم سيهلكون، أقول: قال النبي صلي الله عليه و سلم، ويقولون: نهى أبو بكر وعمر.
রাসূল তামাত্তু হজ পালন করেছেন। তার বিরোধিতা করে উরওয়া মন্তব্য করেন যে, আবু বকর ও উমর রা. তামাত্তুর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। উত্তরে ইবনে আব্বাস বলেন যে, আমি দেখছি তারা ধ্বংস হবে। আমি বলছি রাসূল বলেছেন। আর তারা বলছে যে, আবু বকর ও উমর নিষেধ করেছেন।[১৯৯]
দ্বিতীয়ত : ফজরের আজানের মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে সকলকে ফজরের উদয় সম্পর্কে সচেতন করা। মুয়াজ্জিনের আজানের সূচনার পর কোনভাবে পানাহার বৈধ নয়, তবে যদি নিশ্চিত হওয়ার যায় যে, মুয়াজ্জিন ফজর উদয়ের পূর্বেই আজান দিচ্ছেন, তবে অবৈধ নয়। যে ব্যক্তি ফজর উদয়ের ক্ষেত্রে মুয়াজ্জিনের আজানের মাধ্যমে সচেতন হয় না, তার কথা ভিন্ন ; তার রোজা হবে কি-না সন্দেহ। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
তৃতীয়ত : মাগরিবের ক্ষেত্রে সূর্যাস্তের পরও আজানে কিছুটা বিলম্ব করার যে রীতি ক্যালেন্ডার ও কোন কোন মুয়াজ্জিনের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়, তার শরয়ি কোন ভিত্তি নেই। এমনিভাবে, সতর্কতা বশত: ফজরে সাদেক উদিত হওয়ার পূর্বেই যে আজান দেওয়া হয়, তারও কোন বৈধতা পাওয়া যায় না। এ ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন খুবই অসিদ্ধ একটি বিষয়। কারণ, এর ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে অসময়ে সালাত আদায় করে, পানাহার ত্যাগ করে সময় শেষ হওয়ার পূর্বে। নাজাত প্রত্যাশী ব্যক্তি মাত্রই যেন এ বিষয়গুলো এড়িয়ে যায় সযত্নে। দ্বীনের ক্ষেত্রে এগুলো বাড়াবাড়িতুল্য, রাসূলের স্পষ্ট উক্তির মাধ্যমে যার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূল এরশাদ করেন্ত
هلك المتنطعون، قالها ثلاثاً .
অতিরঞ্জনকারীরা ধ্বংস হয়েছ্তেতিনি এটি তিন বার বললেন।[২০০]
কল্যাণকর ও পূর্ণাঙ্গ হেদায়েতের একমাত্রিক নিদর্শন হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেদায়েত। বেদআত মাত্রই বিভ্রান্তির নামান্তর, যে কোন বিভ্রান্তির অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি জাহান্নাম। রাসূল ও তার সম্মানিত সাহাবিগণ যখন সূর্যাস্তের ব্যাপারে প্রবল ধারণায় উপনীত হতেন্তএমনকি, মেঘলা দিনেও, খোঁজ-অনুসন্ধানের বাহুল্য ছাড়াই দ্রুত ইফতার করে নিতেন। আসমা বিনতে আবু বকর রা.-এর হাদিসে পাওয়া যায়, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত থাকাকালীন একবার মেঘলা দিনে আমরা ইফতার করার পর সূর্যোদয় হল।[২০১]
তার বর্ণিত অপর এক হাদিসে পাওয়া যায়, তিনি বলেন :
أن النبي صلي الله عليه و سلم قال: إن ابن أم مكتوم يؤذن بليل، فكلوا واشربوا حتى يؤذن بلال، وكان بلال يؤذن حين يرى الفجر.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইবনে উম্মে মাকতুম রাতে আজান দেয়, সুতরাং তোমরা বেলালের আজান অবধি পানাহার কর। বেলাল রা. ফজর দেখে অত:পর আজান দিতেন।[২০২]
ভিন্ন এক হাদিসে তিনি বর্ণনা করেন, রাসূল এরশাদ করেছেন:
مـن مـات وعليه صيام صام عنه وليه.
রোজার দায়িত্ব রেখে কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার পক্ষ হতে তার উত্তরাধিকারী রোজা আদায় করে নিবে।[২০৩]
হাফসা রা. বর্ণনা করেন :
أن رسول الله صلي الله عليه و سلم قال: من لم يُجمع الصيام قبل الفجر فلا صيام له.
রাসূল বলেছেন, যে ফজরের পূর্বেই রোজার সূচনা না করে, তার রোজা নেই।[২০৪] বর্তমান সময়ের নারী সমাজের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, তারা নানা রকম মূর্খতা ও বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত, এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে তারা অনবগত, যা কোনভাবেই বরদাশত করা যায় না। যদিও এর দায়-দায়িত্ব পুরোটাই নারীর উপর বর্তে, যেহেতু রাসূল এরশাদ করেছেন :
من عمل عملاً ليس عليه أمرنا فهو رد.
যে এমন কাজ করবে, যা আমাদের ধর্মে নেই, তা পরিত্যাজ্য।্তকিন্তু পরিবারের কর্তাব্যক্তি যে, তার পক্ষে কখনো দায় এড়ানো যাবে না। সন্দেহ নেই, আমানত নষ্ট ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার পুরো দায় চাপবে তার ঘাড়ে। এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার জন্য রাসূলের এ উক্তিই যথেষ্ট :
كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته، فالرجل راع في بيته وهو مسؤول عن رعيته.
তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে, ব্যক্তি তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে।[২০৫]
অপর হাদিসে এসেছে, রাসূল বলেন :
كفى بالمرء إثماً أن يضيع من يقوت.
ব্যক্তির জন্য পাপ হিসেবে এ-ই যথেষ্ট যে, যার ভোরণ-পোষণ তার দায়িত্ব তাকে সে বিনষ্ট করে দেয়।[২০৬]
সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের সাথে তুলনা বা বিচার করলে আমাদের পরিবার ও তার ব্যবস্থাপনার দৈন্যের প্রকট রূপ ধরা পড়বে। রাসূলের সাহাবিগণ তাদের নারীদের প্রতি লক্ষ্য রাখার পাশাপাশি শিশুদের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতেন। রুবাইয়ি বিনতে মুআউয়িজ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আশুরার ভোরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার প্রান্তিক এলাকায় অবস্থিত আনসারদের গ্রামে বার্তা পাঠালেন : যে ব্যক্তি রোজা রেখেছে, সে যেন রোজা পূর্ণ করে নেয়, আর পানাহার করছে যে, সে যেন পূর্ণ দিবস এভাবেই অতিবাহিত করে। এরপর আল্লাহ চাহে তো নিশ্চয় আমরা রোজা পালন করব, ছোট ছোট শিশুদেরও রোজা রাখতে বলব। তাদের নিয়ে আমরা মসজিদে গমন করব, তাদের হাতে তুলে দেব পশমের খেলনা। খাবারের জন্য কেউ যদি কাঁদে, তবে ইফতারের সময়ে তাদের খেতে দেব।[২০৭]
শিশুদের এই দিকটি সম্পর্কে আমরা খুবই অবহেলা প্রবণ। আমাদের কেউ কেউ বরং, শিশুদের আগ্রহ সত্ত্বেও, তাদের রোজা, রাত-জাগরণ ও এবাদত হতে বিরত রাখে। শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়বে, এ ভয়ে তারা ভীত। তাদেরকে নিরাপদ ও বিপদমুক্ত রাখার এ হচ্ছে ভুল ও বিভ্রান্তিকর কৌশল। আল্লাহই ভাল জানেন।
রাসূল সম্পর্কে তার সহধর্মিণীদের অবগতি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী-গণ হতে বর্ণিত বিভিন্ন হাদিস ও উক্তি থেকে প্রমাণ হয়, তার জীবন-যাপন, আচার-পদ্ধতি ও অভ্যাস বিষয়ে তারা ছিলেন পূর্ণ অবগত-সজাগ। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত,
… كان نبي الله صلي الله عليه و سلم إذا صلى صلاة أحب أن يداوم عليها، وكان إذا غلبه نوم أو وجع عن قيام الليل صلى من النهار ثنتي عشرة ركعة، ولا أعلم نبي الله صلي الله عليه و سلم قرأ القرآن كله في ليلة، ولا صلى ليلة إلى الصبح، ولا صام شهراً كاملاً غير رمضان.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন সালাত আদায় করতেন, পছন্দ করতেন তাতেই অতিবাহিত করতে, যখন নিদ্রা প্রবল হত, রাত-জাগরণের ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, তখন দিবসে বার রাকাত সালাত আদায় করে নিতেন। আমি রাসূলকে রমজান ব্যতীত এক রাতে[২০৮] পূর্ণ কোরআন তেলাওয়াত করতে, কিংবা পূর্ণ রাত্রি সালাতে কাটিয়ে দিতে অথবা পূর্ণ মাস রোজায় অতিবাহিত করতে দেখিনি।[২০৯]
তাকে রাসূলের সালাতের ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন : রমজান কিংবা অন্য সময়ে তিনি (রাতে) এগারো রাকাতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। তিনি (প্রথমে) চার রাকাত আদায় করতেন, তা হত খুবই অতুলনীয় ও দীর্ঘ। অত:পর আদায় করতেন চার রাকাত, সেটিও হত অতুলনীয় ও দীর্ঘ। অত:পর তিন রাকাত আদায় করতেন। আমি (একবার) বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ! আপনি বিতিরের পূর্বে নিদ্রা যাবেন ? তিনি এরশাদ করলেন : হে আয়েশা ! আমার দু-চোখ নিদ্রা যায়, কিন্তু অন্তর থাকে বিনিদ্র।[২১০]
আয়েশা রা. রাসূলের রমজানের কয়েকটি রাতের সালাত সম্পর্কে বলেন :্ত …রাসূল নিরলস রাত্রি যাপন করলেন, লোকেরা যার যার অবস্থানে স্থির থাকল, এমনকি ফজর ঘনিয়ে এল।[২১১]
রাসূলের সাথে তার পুণ্যবতী স্ত্রী-গণের সময় যাপন, জ্ঞানার্জন অত:পর উম্মতকে সে বিষয়ে অবগত করা ছিল রমজান সম্পর্কে রাসূলের হেদায়েত সম্পর্কের জানার অন্যতম মাধ্যম ও উৎস। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন :
كان النبي صلي الله عليه و سلم إذا دخل العشر شدَّ مئزره وأحيا ليله وأيقظ أهله.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শেষ দশ দিবসে প্রবেশ করতেন, পূর্ণভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন, রাত জাগতেন এবং জাগিয়ে তুলতেন পরিবার-পরিজনকে।[২১২]
আয়েশা ও উম্মে সালামা রা. হতে বর্ণিত,
إن كان رسول الله صلي الله عليه و سلم لَيصبح جُنباً من جماع غير احتلام في رمضان ثم يصوم.
স্বপ্নদোষে নয়, সহবাস জনিত কারণে রাসূল রমজান দিবসের সূচনা করতেন, অত:পর রোজা পালন করতেন।[২১৩]
আয়েশা রা. হতে আবু সালামা বিন আব্দুর রহমান বর্ণনা করেন : রাসূল রোজা অবস্থায় কোন কোন স্ত্রীকে চুম্বন করতেন। আমি আয়েশাকে বললাম, ফরজ ও নফল রোজায় ? তিনি বললেন : ফরজ ও নফল্তসকল ক্ষেত্রেই।[২১৪]
আত্মিক ও অনুভবীয় প্রাপ্তি ছাড়াও এ হাদিসগুলো জুড়ে আছে নানা কল্যাণ ; পরিবারের জন্য তাতে রয়েছে শিক্ষা ও তরবিয়ত, এবং রাসূলের অনুবর্তন-অনুসরণের জন্য উৎসাহ ও প্রেরণা।
পরিবার-পরিজনকে দূরে রেখে, সমাজ থেকে বিলগ্ন হয়ে যারা যাপন করছে দাওয়াতি ও ইলমি জীবন, এ হাদিসগুলোর আলোকে তাদের পরিণতি সহজেই অনুমেয়। আল্লাহর কাছে আমরা কায়মনোবাক্যে সঠিক পথের দিশা প্রার্থনা করি।
কল্যাণ কর্মে উৎসাহ প্রদান
‘হিস’ বা উৎসাহ হচ্ছে প্রতিদান ও ফলাফল বিষয়ে উদ্দীপনা ও প্রেরণ প্রদান করা, শিক্ষার পাশাপাশি এ বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আলী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন্তরাসূল তার পরিবারকে রমজানের শেষ দশ দিনে রাতে জাগিয়ে দিতেন।[২১৫] রাসূল তার পরিবারকে কতটা গুরুত্ব প্রদান করতেন, এ হাদিসটি থেকে তা প্রমাণিত হয়, কারণ, তিনি এ সময়ে গৃহে অবস্থান করতেন না, মসজিদে এতেকাফরত থাকতেন।
আয়েশা রা. বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিন অনেককে সাথে নিয়ে যাপন করতেন। বলতেন : রমজানের শেষ দশ দিনে তোমরা কদরের রাত অনুসন্ধান কর।[২১৬]
আবু যর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : …অত:পর মাসের তিন দিন অবশিষ্ট অবধি তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন না। তৃতীয় দিনে তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন, তার পরিবার ও স্ত্রী-গণকে আহ্বান করলেন, এতটা দীর্ঘ সময় তিনি জাগরণ করলেন যে, আমরা সেহরি পরিত্যাগের আশঙ্কা করলাম।[২১৭] অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে : চার দিন অবশিষ্ট থাকা পর্যন্তও তিনি আমাদের নিয়ে রাত্রি যাপন করলেন না। অত:পর যখন অবশিষ্ট ছিল মাত্র তিন দিন, তখন তিনি তার কন্যা ও স্ত্রীদের নিকট সংবাদ পাঠালেন, এবং লোকেরা জমায়েত হল। তিনি আমাদের নিয়ে এতটা সময় জাগরণ করলেন যে, সেহরি ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা হল।[২১৮]
জয়নব বিনতে উম্মে সালামা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : যখন মাসের মাত্র দশ দিন অবশিষ্ট থাকত, তখন পরিবারের সক্ষম সকলকে রাসূল রাত্রি জাগরণ করাতেন।[২১৯]
তারাবীহের জামাতে নারীদের অংশ গ্রহণের বৈধতা সম্পর্কে হাদিসগুলো স্পষ্ট প্রমাণ ; তবে ‘তাদের গৃহই তাদের জন্য উত্তম’।[২২০]
গৃহে যে নারী সালাত আদায়ে পূর্ণ মনোযোগি নয়, তার জন্য মসজিদে উপস্থিত হওয়া আবশ্যক, অনৈতিকতা ও ফেতনা আশঙ্কা না হলে, নারী যদি শালীনভাবে, উগ্রতা পরিহার করে পর্দা আবৃত হয়ে গমন করে, তবে, এ ক্ষেত্রে নারীর অভিভাবক তাতে বাধা প্রদান করতে পারবে না। রাসূলের হাদিসে এসেছে :
لا تمنعوا إماء الله مساجد الله.
নারীদের মসজিদ গমনে বাধা প্রদান কর না।[২২১]
উমর রা. অতুলনীয় পদ্ধতিতে আল্লাহর বিধান পালনে প্রয়াস চালিয়েছেন। ইবনে উমর বর্ণনা করেন : উমর রা.-এর কালে এক নারী এশা ও ফজরের সালাত মসজিদে এসে জামাতের সাথে আদায় করত। তাকে বলা হল : উমরের অপছন্দ ও মর্যাদাহানীকর মনে করা সত্ত্বেও কেন তুমি বের হও ? নারী বলল : সে আমাকে বাধা দিচ্ছে না কেন ? লোকটি বলল : কেননা, রাসূলের স্পষ্ট হাদিস আছে যে : তোমরা নারীদের মসজিদে গমনে বাধা প্রদান কর না।[২২২]
স্ত্রীদের সাথে রাসূলের আচরণ, তাদের শিক্ষা, নসিহত ও উপদেশ দান দ্বীনের ক্ষেত্রে ক্রমশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়্তাইত্যাদি হাদিসের মাধ্যমে তার অধিক সংখ্যক স্ত্রী গ্রহণের হিকমত আমরা অনুধাবন করতে পারি। অন্যান্য ক্ষেত্রে উম্মতকে দিক নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি নারীদের সাথে ব্যবহার, আচার-পদ্ধতি, দিক নির্দেশনা প্রদানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল যদি তাদের ব্যাপারে এমন ব্যাপক গুরুত্ব প্রদান না করতেন, তবে সামগ্রিকভাবে ইসলামকে নারীগণ কখনোই অনুধাবন করতে সক্ষম হতেন না।
রাসূলের সাথে এতেকাফ যাপনে অনুমতি প্রদান
রাসূল তার স্ত্রী-গণকে তার সাথে এতেকাফ পালনের অনুমতি প্রদান করতেন। আয়েশা রা. বর্ণিত আছে : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশ দিনে এতেকাফের উল্লেখ করলেন, আয়েশা অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দিলেন। হাফসা আয়েশা রা.-কে তার জন্য অনুমতির কথা বললে তিনি অনুমতি নিলেন…।[২২৩]
অন্য রেওয়ায়েতে আছে : আমি তার কাছে অনুমতি চাইলে আমাকে অনুমতি দিলেন। হাফসাও অনুমতি প্রার্থনা করল, তিনি তাকেও অনুমতি দিলেন।[২২৪]
অনুমতি গ্রহণের এই পর্ব হতে দায়বদ্ধতার বিষয়টি প্রবলভাবে ধরা পড়ে। মুসলিম পরিবার ও তার কাঠামো এ দায়বদ্ধতা ও অনুমতি গ্রহণের নীতির উপর অনেকটাই নির্ভর করে, এর মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের মাঝে পারস্পরিক সম্মান, স্থিরতা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
এতেকাফের ক্ষেত্রে উম্মাহাতুল মোমিনীনদের অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে প্রমাণ হয়, এতেকাফ কেবল পুরুষের জন্য নয়, বরং নারীদের জন্যও বৈধ। নারীদের জন্য শর্ত হচ্ছে অভিভাবকের অনুমতি লাভ্তহাদিস থেকে যেমন প্রমাণ হয়। নারীদের এতেকাফের পরিবেশ হতে হবে ফেতনার যাবতীয় সম্ভাবনা হতে মুক্ত, পর পুরুষের সংস্পর্শ হতে নিরাপদ। কারণ, কল্যাণ আনয়নের পূর্বে মন্দের অপনয়ন আবশ্যক।[২২৫]
রাসূলের সাথে সম্মিলিত এবাদত পালন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মিলিতভাবে তার স্ত্রী-গণের সাথে এবাদত পালন করতেন। রমজানের কিছু কিছু রাতে তার সাথে স্ত্রী-গণ জামাতের সাথে সালাত আদায় করতেন। আবু যর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : …অত:পর তিনি মাসের তিন দিন অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন না, তৃতীয় দিন আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। ডেকে নিলেন তার পরিবার ও স্ত্রী-গণকে। এত দীর্ঘ সময় আমাদের নিয়ে রাত্রি জাগরণ করলেন যে, আমাদের ভয় হল সেহরির সময় অতিক্রান্তের।[২২৬]
রাসূলের স্ত্রী-গণ তার সাথে এতেকাফ পালন করতেন। আয়েশা রা. বর্ণিত হাদিসে আছে, রাসূলের সাথে তার একজন স্ত্রী হায়েজা অবস্থায় এতেকাফ পালন করল, সে স্রাব দেখতে পাচ্ছিল, এবং নিম্নদেশে একটি পাত্র রেখে দিল।[২২৭]
রাসূল যদি গভীরভাবে তার স্ত্রী-গণের প্রতি লক্ষ্য না রাখতেন, প্রচেষ্টা না করতেন তাদের পরকালীন মুক্তির, তবে এবাদত ও কল্যাণের ক্ষেত্রে এ পারস্পরিক সম্মিলন কখনো সম্ভব হত না। এবাদতে রাসূলের সাথে তাদের এ অংশগ্রহণ কোন অর্থেই প্রতিযোগিতামূলক ছিল না, বরং, তার ভিত্তির পুরোটাই গড়ে উঠেছিল ব্যক্তিগত আগ্রহকে কেন্দ্র করে। নারীর সম্ভাবনা, প্রকৃতিভেদ, একে অপরের সাথে স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যগত মৌলিক পার্থক্য্তইত্যাদির সফল উন্মোচন পাওয়া যায় এতে।
এ কারণেই, উদাহরণত:, আমরা দেখতে পাই রাসূলের অধিকাংশ স্ত্রীই তার সাথে এতেকাফ পালন করেননি, সাফিয়া বর্ণিত হাদিসে আছে : রাসূল মসজিদে অবস্থান করছিলেন, তার স্ত্রী-গণ তার সংসর্গে আনন্দ যাপন করছিল, তিনি সাফিয়া বিনতে হাই-কে লক্ষ্য করে বললেন : তুমি তাড়াহুড়ো কর না, আমি তোমার সাথে বেরুব।[২২৮]
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল এতেকাফের ইচ্ছা পোষণ করলেন। যে স্থানে এতেকাফের ইচ্ছা করেছিলেন, তথায় পৌঁছে অনেকগুলো তাঁবু দেখতে পেলেন : আয়েশা, হাফসা ও জয়নবের তাঁবু। তিনি বললেন : (সাহাবিদের উদ্দেশ্যে) তোমরা কি একে নারীদের জন্য পুণ্যের কাজ মনে কর ? অত:পর তিনি এতেকাফ পালন না করেই প্রস্থান করলেন। পরবর্তীতে শাওয়ালের দশ দিন তিনি এতেকাফে (কাজা স্বরূপ) অতিবাহিত করেছিলেন।[২২৯]
দেখা যাচ্ছে, মাত্র তিন জন স্ত্রী তথায় তাঁবু টানিয়ে ছিলেন। অথচ, রাসূলের তিরোধানের পর তার সকল স্ত্রীই এতেকাফ পালন করেছেন। আয়েশা রা. বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাত পর্যন্ত রমজানের শেষ দশ দিন এতেকাফ পালন করেছেন। তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী-গণ এতেকাফ পালন করেছেন।[২৩০]
এগুলো প্রমাণ করে, পরিবারের যে কর্তা ও অভিভাবক, তার দায়িত্ব পরিবার-ভুক্ত সকলের আগ্রহ ও প্রবণতাকে শনাক্ত করা। তাদের কেউ হয়তো সালাতে অধিক আগ্রহী, কারো আকর্ষণ এতেকাফে, অপর কেউ হয়তো কোরআন তেলাওয়াত ও জিকিরে মগ্নতাই অধিক পছন্দ করে, কেউ কেউ নিজেকে পরিব্যাপ্ত রাখে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞানার্জন ও দাওয়াতে। নারীর এ প্রবণতা ও আগ্রহের কেন্দ্রগুলো শনাক্ত করতে সক্ষম না হলে, তার মাধ্যমে এবাদত ও সম্ভাবনার উন্মেষ কোনভাবেই সম্ভব হবে না।
স্ত্রী-গণের সাথে রাসূলের বান্ধব সুলভ আচরণ ও সম্পর্ক
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রী-গণের সাথে খুবই বান্ধব সুলভ আচরণ করতেন, অভ্যাস-আচরণের এ বৈশিষ্ট্য আজীবন তিনি বজায় রেখেছেন। রমজান মাসের সাথে সম্পৃক্ত করে এ বৈশিষ্ট্যের যে কয়টি হাদিস ও বর্ণনা পাওয়া যায়, তার উদাহরণ নিম্নরূপ :
রাসূল তাদের প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখতেন, সচেষ্ট থাকতেন পরিবারের ভিতকে দৃঢ় রাখতে ; তিনি পরিবারকে পরিচালনা করতেন এমন এক আবহে, যা হত লোক-দেখানো চাকচিক্য, ঘৃণা-বিদ্বেষ ও রিয়া হতে মুক্ত। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রী-গণের মাঝে ন্যুনতম অহংকার সৃষ্টির ভয়ে এতেকাফ বর্জন করেছিলেন।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত : তিনি বলেন,
كان النبي صلى الله عليه و سلم يعتكف في العشر الأواخر من رمضان؛ فكنت أضرب له خباء فيصلي الصبح ثم يدخله، فاستأذنت حفصة عائشة أن تضرب خباء فأذنت لها فضربت خباء؛ فلما رأته زينب بنت جحش ضربت خباء آخر؛ فلما أصبح النبي صلى الله عليه و سلم رأى الأخبية، فقال: ما هذا؟ فأُخْبِر فقال النبي صلى الله عليه و سلم: آلبر تُرَونَ بهن؟ فترك الاعتكاف ذلك الشهر، ثم اعتكف عشراً من شوال.
রাসূল রমজানের শেষ দশ দিনে এতেকাফ পালন করতেন। আমি তার জন্য একটি তাঁবু টানালাম, তিনি ফজরের সালাত আদায় করে তাতে প্রবেশ করলেন। হাফসা তাঁবু টানানোর জন্য অনুমতি চাইলে তিনি তাকে অনুমতি দিলেন, এবং হাফসা আরেকটি তাঁবু টানালেন। জয়নব বিনতে জাহাশ দেখতে পেয়ে তার নিজের জন্য আরেকটি তাঁবু টানালেন। সকালে রাসূল অনেকগুলো তাঁবু দেখে বললেন : এগুলো কি ? তাকে বলা হলে তিনি এরশাদ করলেন : তোমরা (সাহাবিদের উদ্দেশ্যে) কি একে পুণ্যের মনে কর ? সে মাসে তিনি এতেকাফ পরিত্যাগ করলেন, অত:পর (কাজা স্বরূপ) শাওয়ালের দশ দিন এতেকাফ করলেন।[২৩১]
ইবনে হাজার রহ. বলেন : রাসূল হয়তো আশঙ্কা করেছিলেন যে, তাদের এবাদত হবে রাসূলের দৃষ্টি ও ভালোবাসা লাভের ক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এবং অহংকারের কারণে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়। ফলে এতেকাফ তার মৌলিকত্ব হারাবে। এ কারণেই তিনি তথা হতে প্রস্থান করেছিলেন।[২৩২]
আল্লামা বাজি বলেন : হয়তো রাসূল তাদের সকলকে প্রত্যাবর্তন করাতে চেয়েছিলেন, বিধায় নিজেই প্রস্থান করেছেন। তার প্রস্থানকেই সকলের জন্য কল্যাণকর, শিক্ষণীয় ও সন্তুষ্টির কারণ মনে করেছিলেন। মোমিনদের প্রতি তিনি ছিলেন খুবই দয়ার্দ্র।[২৩৩]
বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাই যে, অনেক মহান (!) ব্যক্তিবর্গ, বিশেষভাবে রমজান মাসে উমরা, রাত্রি জাগরণ, ও এতেকাফ ইত্যাদি এবাদতে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন, অথচ পরিবার-পরিজনকে রেখে আসেন সম্পূর্ণ অরক্ষিতে। এ ব্যাপারে রাসূলই আমাদের সর্বোচ্চ আদর্শ, মোস্তাহাব এবাদত পরিত্যাগ করে তিনি পরিবারের প্রতি মনোযোগ দেয়াকেই শ্রেয় মনে করেছেন।
রমজানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনকি এতেকাফ সত্ত্বেও, আপন বেশ-ভূষা ও দেহে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন :
كان النبي صلي الله عليه و سلم إذا اعتكف يدني إلي رأسه فأرجله، وكان لا يدخل البيت إلا لحاجة الإنسان.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতেকাফকালীন আমার নিকট মস্তক এগিয়ে দিতেন, আমি তার কেশবিন্যাস করে দিতাম, মানবিক প্রয়োজন ব্যতীত তিনি গৃহে প্রবেশ করতেন না।[২৩৪]
অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে : এতেকাফকালীন তিনি তার মস্তক আমার নিকট এগিয়ে দিতেন, আমি হায়েজা অবস্থাতেও তা ধৌত করে দিতাম।[২৩৫] স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক ও প্রীতির এর চেয়ে উত্তম নিদর্শন রয়েছে বলে আমি অবগত নই।
রোজা অবস্থাতেও রাসূল তার স্ত্রী-গণকে চুম্বন করতেন, মেলামেশা করতেন ঘনিষ্ঠভাবে। উম্মুল মোমিনীন আয়েশা রা.-এর হাদিসে আছ্তেরমজান মাসেও রাসূল চুম্বন করতেন।[২৩৬] অপর রেওয়ায়েতে আছে : রাসূল রমজানে রোজা রেখে চুম্বন করতেন।[২৩৭] ভিন্ন এক রেওয়ায়েতে এসেছে, আয়েশা রা. বলেন : রাসূল চুম্বনের জন্য আমার নিকট ঝুঁকে এলেন, আমি বললাম : আমি তো রোজাদার ! তিনি বললেন, আমিও রোজাদার। আয়েশা বলেন : অত:পর তিনি ঝুঁকে এসে আমাকে চুম্বন করলেন।[২৩৮]
হাফসা রা. বলেন : রাসূল রোজা রাখা অবস্থায় চুম্বন করতেন।[২৩৯]
অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজা রেখেই তার কোন কোন স্ত্রীর মুখমণ্ডলে চুম্বন করতেন।[২৪০]
উম্মে হাবিবা হতে বর্ণিত, রাসূল রোজা রেখেই চুম্বন করতেন।[২৪১]
ঘনিষ্ঠ মেলামেশার প্রমাণ স্বরূপ আয়েশা রা, বর্ণিত হাদিস : তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করলে আমি তাকে বললাম, আমি তো রোজাদার ! তিনি বললেন : আমিও রোজাদার।[২৪২] রোজা অবস্থায় মেলামেশা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আয়েশা রা. মাসরুক ও আসওয়াদকে জানান : হ্যা, (তিনি মেলামেশা করতেন) কিন্তু তিনি ছিলেন তোমাদের মাঝে সর্বাধিক নিয়ন্ত্রণশীল।[২৪৩]
এ হাদিসগুলো প্রমাণ করে চুম্বন ও মেলামেশার ক্ষেত্রে সকল রোজাদারই সমকাতারভুক্ত নয়। যে ব্যক্তি রাসূলের অনুরূপ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম, তার জন্য বৈধ, অন্যথায় বীর্যপাত কিংবা সংগমের অবস্থায় এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে যে ব্যক্তি আশঙ্কা করে রোজা বিনষ্ট হওয়ার, তার জন্য চুম্বন বা ঘনিষ্ঠ মেলামেশা বৈধ নয়। আমলের ক্ষেত্রে মৌলনীতি হচ্ছে, যা ওয়াজিব পূর্ণ করার অবলম্বন, তাকে রক্ষা করা ওয়াজিব। এ ক্ষেত্রে যে মাঝামাঝি প্রকৃতির, তার জন্য মাকরূহ।
আয়েশা হতে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূল রোজা রেখে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা করতেন।[২৪৪] ভিন্ন এক রেওয়ায়েতে আছ্তেরাসূল রোজা অবস্থায় ঘনিষ্ঠ মেলামেশা করতেন, অত:পর উভয় অঙ্গের মাঝে একটি কাপড় স্থাপন করে দিতেন।[২৪৫]
চুম্বন, আলিঙ্গন ও প্রীতি প্রকাশের নির্দোষ বিষয়গুলোকে রোজা বাধা প্রদান করবে না। তবে, শর্ত হচ্ছে একে একটি নির্দিষ্ট সীমায় সীমাবদ্ধ রাখতে হবে, শরিয়তের অবশ্য বিধান লঙ্ঘন করা যাবে না।
তবে, যারা নিজেদের পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি নিয়ে এতটাই মগ্ন হয়ে আছে যে, পার্থিব অর্জনের নিমিত্তে ভুলে বসেছে পরকালের অর্জন ও সাফল্য। পরিবারকে ব্যস্ত রাখছে ইহকালীন নানা ঘটনায়, সুযোগ তৈরি করছে না এবাদত, আনুগত্য ও সওয়াবের কার্জেততাদের পরিণতি খুবই ভয়াবহ ও আতঙ্ককর। আল্লাহ তাআলা বান্দার এ প্রবণতার ফলে পরিবার-পরিজনকে শত্রু হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। কোরআনে এসেছে,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوّاً لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ. [التغابن: ১৪]
হে ইমানদারগণ ! তোমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের মাঝে রয়েছে তোমাদের শত্রু। সুতরাং, তাদের ভয় কর।[২৪৬] অর্থাৎ, তাদের আকাঙ্ক্ষা ও প্রবণতা তোমাকে যে পথে নিয়ে যাবে, তা শত্রুতার, সুতরাং…।
রমজানের প্রথম বিশ দিনে রাসূল স্ত্রীদের সাথে সহবাসে মিলিত হতেন, তবে শেষ দশ দিনে এতেকাফকালীন তা হতে বিরত থাকতেন, ব্যস্ত থাকতেন নির্জন এবাদতে। রাসূলের এ আচরণ প্রমাণ করে, অধিক-হারে এবাদত সত্ত্বেও পরিবার-পরিজনের হক আদায়ে কোন প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি হয় না।
রাসূলের প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : স্বপ্নদোষে নয়, (সহবাসের কারণে) রমজানে অপবিত্র অবস্থায় রাসূলের ফজর হয়ে যেত। অত:পর তিনি গোসল করে রোজা পালন করতেন।[২৪৭]
উম্মে সালামা কর্তৃক বর্ণিত অন্য রেওয়ায়েতে আছে :্তস্ত্রী সহবাসের ফলে অপবিত্র অবস্থাতেও রাসূলের ফজর হয়ে যেত। অত:পর তিনি গোসল করে রোজা পালন করতেন।[২৪৮]
ভিন্ন রেওয়ায়েতে আছে : স্বপ্নদোষের কারণে নয়, রাসূল অবশ্যই রমজানে সহবাসের কারণে অপবিত্র অবস্থায় সকাল করতেন, অত:পর রোজা রাখতেন।[২৪৯]
তবে, রাসূল কেবল রমজানের প্রথম বিশ দিনে স্ত্রী সহবাস করতেন, শেষ দশ দিনে তিনি এতেকাফ পালন করতেন। আয়েশা রা. বর্ণিত হাদিসে এসেছে,
كان النبي صلي الله عليه و سلم إذا دخل العشر شد مئزره وأحيا ليله وأيقظ أهله.
শেষ দশ দিনে রাসূল স্ত্রী সহবাস বর্জন করতেন, রাত্রি জাগরণ করতেন, এবং জাগিয়ে দিতেন পরিবারকে।[২৫০]
ইবনে হাজার شد المئزر -কে ব্যাখ্যা করেছেন স্ত্রী সহবাস পরিত্যাগ অর্থে।[২৫১]
ইমাম বাইহাকি বর্ণিত একটি হাদিসে বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে। আলী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিনে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন, বর্জন করতেন স্ত্রী সহবাস।[২৫২] সালাত আদায়, কোরআন তেলাওয়াত, ধ্যান, আত্মিক ও মৌখিক জির্কিতইত্যাদির মাধ্যমে রাতকে এবাদত-শোভিত করাই ছিল তার উদ্দেশ্য।
এ হচ্ছে রাসূলের খুবই ভারসাম্যপূর্ণ গুণ। উল্লেখিত হাদিসগুলোতে রাসূলের কর্ম দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত হয়, আবু দারদা বর্ণিত একটি হাদিসে মৌখিক স্বীকৃতি পাওয়া যায়, সালমান ফারসির এক উক্তি শ্রবণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন, বলেছেন : সালমান সত্য বলেছে। সালমান রা.-এর উক্ত উক্তি ছিল : তোমার উপর হক রয়েছে তোমার রবের, তোমার আত্মার এবং তোমার পরিবারের ; সুতরাং, তুমি প্রত্যেক হকদারের প্রাপ্য বুঝিয়ে দাও।[২৫৩]
এতেকাফগাহে রাসূলের সাথে তার স্ত্রী-গণের সাক্ষাৎ ও কথোপকথন
সাফিয়া রা. হতে বর্ণিত, তিনি রমজানের শেষ দশ দিনে রাসূলের মসজিদে এতেকাফরত অবস্থায় সাক্ষাৎ করতে এলেন, তিনি কিছু সময় তথায় অবস্থান করে কথা বললেন, অত:পর উঠে প্রস্থান করলেন।[২৫৪]
অন্য রেওয়ায়েতে আছে : রাসূল মসজিদে ছিলেন, তার স্ত্রী-গণ আনন্দে তার সংসর্গ যাপন করছিলেন। সাফিয়া বিনতে হাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, তুমি তাড়াহুড়ো কর না…।[২৫৫]
এতেকাফের কারণে পরিবারের সাথে যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করা আবশ্যক নয়, এতেকাফরত অবস্থায়ও মানুষ তার পরিবারকে সময় দিতে পারে, লক্ষ্য রাখতে পারে তাদের প্রয়োজনের প্রতি।
রাসূল রোজা রেখে, এতেকাফে থেকেও স্ত্রীদের প্রতি কতটা লক্ষ্য রাখতেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় সাফিয়া বর্ণিত হাদিস্তেতাতে আছে : তিনি রমজানের শেষ দশ দিনে মসজিদে এতেকাফরত রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ করতে এলেন, কিছুটা সময় তথায় যাপন করে অত:পর প্রস্থানোদ্যত হলেন, রাসূলও তাকে পৌঁছে দেয়ার জন্য এগিয়ে এলেন।[২৫৬]
অন্য রেওয়ায়েতে আছে : রাসূল মসজিদে অবস্থান করছিলেন, তার স্ত্রী-গণ তাকে ঘিরে আনন্দ উদযাপন করছিলেন। সাফিয়াকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন : তাড়াহুড়ো কর না, আমি তোমার সাথে বেরুব। তার আবাস ছিল উসামার বাড়িতে, (রাসূল পৌঁছে দেয়ার জন্য) বেরিয়ে এলেন।[২৫৭]
একই হাদিস ভিন্ন বর্ণনায় এসেছে এভাবে : এতেকাফরত অবস্থায় রাসূলের সাথে সাফিয়া সাক্ষাৎ করতে এলেন। প্রস্থানকালে তিনি তার সাথে এগিয়ে গেলেন।[২৫৮]
যারা এবাদতের নামে পরিবাব-পরিজন ত্যাগ করে আশ্রয় নিয়েছে সমাজের অন্ধকার কোণে,্তযদিও আল্লাহর রহমতে, তাদের সংখ্যা অতি নগণ্য্তকিংবা পরিবার যে অভিভাবকের কাছ থেকে মন্দ ও রুক্ষ স্বভাবই পেয়েছে কেবল, বঞ্চিত হয়েছে তার সময়, গুরুত্ব ও ভাবনা হতে, রাসূলের প্রদর্শিত পথ ও শিষ্টাচার হতে তারা সতত বিক্ষিপ্ত ; রাসূল মানব জাতির জন্য সর্বক্ষেত্রে প্রদর্শন করেছেন সর্বোত্তম ও উন্নত আদর্শ। রাসূলের অনুসরণের মাঝেই রয়েছে মানব মুক্তির সনদ।
রাসূলের উদ্দেশ্যে তার স্ত্রীদের সেবার্ঘ্য
পুরুষের নিকটতম সঙ্গী হচ্ছে তার স্ত্রী, পুরুষের একান্ত বিষয়গুলো স্ত্রীর দায়িত্বে অর্পণ জন্ম দেয় সুন্দর সম্প্রীতি, প্রেম ও অগাধ ভালোবাসা। রমজান ও অন্যান্য সময়ে রাসূলের জীবনাচার থেকে এমনই চিত্র আমাদের সামনে ফুটে উঠে।
এতেকাফরত অবস্থাতে রাসূলের স্ত্রী-গণ তার মস্তক ধৌত করে দিতেন, করে দিতেন তার কেশবিন্যাস।
হিশাম বিন ওরওয়া হতে বর্ণিত, তাকে প্রশ্ন করা হল : হায়েজা কিংবা অপবিত্র অবস্থায় নারী কি আমার সেবা অথবা নিকটবর্তী হতে পারবে ? তিনি বললেন : এ সবই আমার কাছে অত্যন্ত সহজ। সব অবস্থাতেই নারী আমার সেবা করে। এ ব্যাপারে কারো উপর কোন বিধি-নিষেধ নেই। আয়েশা রা. আমাকে জানিয়েছেন, রাসূল মসজিদে এতেকাফকালীন তিনি রাসূলের মস্তকের কেশবিন্যাস করে দিতেন। রাসূল তার মস্তক গৃহে অবস্থানরতা আয়েশার নিকট বাড়িয়ে দিতেন, হায়েজা অবস্থাতেই তিনি তার কেশবিন্যাস করে দিতেন।[২৫৯]
আসওয়াদ আয়েশা রা. হতে বর্ণনা করেন : এতেকাফরত অবস্থাতে রাসূল তার মস্তক বাড়িয়ে দিতেন, হায়েজা অবস্থাতে আমি তার মাথা ধৌত করে দিতাম।[২৬০]
এতেকাফের সময় হলে স্ত্রী-গণ তার জন্য তাঁবু খাটিয়ে দিয়েছিলেন। আয়েশা রা.-এর হাদিসে এসেছ্তেরমজানের শেষ দশ দিনে তিনি মসজিদে এতেকাফ করতেন, আমি তার জন্য তাঁবু টানিয়ে ছিলাম, রাসূল ফজরের সালাত আদায় করে তাতে প্রবেশ করলেন।[২৬১]
সালাতের জন্য তার স্ত্রী-গণ চাটাই বিছিয়ে দিতেন, এবং গুটিয়ে নিতেন সালাত শেষে। আয়েশা রা. বর্ণিত হাদিসে এসেছ্তেরমজানে লোকেরা দলে দলে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করত। রাসূল আমাকে নির্দেশ করলে আমি তার জন্য চাটাই বিছিয়ে দিলাম।[২৬২]
ভিন্ন রেওয়ায়েতে আছে,
فأمرني رسول الله صلى الله و عليه و سلم ليلة من ذلك أن أنصب له حصيراً على باب حجرتي -إلى أن قال:- اطوِ عنَّا حصيرك يا عائشة…
তখনকার এক রাতে রাসূল আমাকে আমার গৃহের দরজায় একটি চাটাই টানিয়ে দেওয়ার আদেশ দিলেন। …অত:পর বললেন : হে আয়েশা, তোমার চাটাই গুটিয়ে নাও।[২৬৩]
রাসূলের স্ত্রী-গণ তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতেন। আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদিসে এসেছে,
أن رسول الله صلى الله و عليه و سلم قال: أُريت ليلة القدر، ثم أيقظني بعض أهلي فنسيتها، فالتمسوها في العشر الغوابر.
আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হল, অত:পর আমার একজন স্ত্রী আমাকে জাগিয়ে তুললে আমি তা বিস্মৃত হলাম। সুতরাং, তোমরা তা শেষ দশ দিনে তালাশ কর।[২৬৪]
বর্তমান যুগের নারীরা রাসূলের সহধর্মিণীদের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারে। উলঙ্গপনা ও সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতার এই পতনের যুগে, আমরা দেখতে পাই, নারীগণ তাদের স্বামীদের প্রতি বিন্দুমাত্র দায় বোধ করে না, সবকিছুতেই থাকে তাদের বঞ্চনার অভিযোগ। ‘মহান যে কোন পুরুষের আড়ালে আছে মহান কোন নারীর হাত’্তএ উক্তি সত্যিই যথার্থ। নারী পুরুষকে জোগায় শক্তি ও সাহস, প্রেরণা দেয় আড়াল থেকে, সৌভাগ্য ও সাফল্যে উদ্দীপিত করে চূড়ান্তভাবে। সততা, সত্যবাদিতা এবং কল্যাণ কর্মের জন্য প্রয়োজন মানসিক স্থিরতা, পারিবারিক স্থিতিশীলত্তাএকজন নারী যা সফল ভাবে পুরুষের মাঝে সঞ্চার করতে সক্ষম।
রমজানে রাসূলের বিবাহ
জয়নব বিনতে খুযাইমার জীবনালেখ্য উল্লেখ করতে গিয়ে ইবনে সাদ বলেন : হিজরি একত্রিশতম মাসে রাসূলের সাথে তার বিবাহ সম্পন্ন হয়।[২৬৫] আল্লামা তাবারি বলেন : চতুর্থ হিজরিতে রমজান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মুল মাসাকিন জয়নব বিনতে খুযাইমার সাথে ঘর বাঁধেন ও বাসর যাপন করেন।[২৬৬]
ইবনুল আম্মাদ বলেন : হিজরি তৃতীয় বর্ষের রমজান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যথাক্রমে উম্মুল মোমিনীন হাফসা, জয়নব বিনতে জাহাশ এবং জয়নব বিনতে খুযাইমা রা.-র সাথে বাসর যাপন করেন।[২৬৭]
নবুয়্যতি ভারসাম্য ও মধ্যপন্থার এ হচ্ছে এক উত্তম ও অনুসরণীয় উদাহরণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা মানব জাতির সামনে প্রত্যক্ষ কর্মের মাধ্যমে হাজির করেছেন। রাসূল তার জীবনাচারে বাস্তবতাকে স্বীকার করেছেন, সে অনুসারেই আচার পদ্ধতি সাজিয়েছেন, বর্জন করেছেন লোক-দেখানো, ঠুনকো যুহুদের প্রকাশ- যা একই সাথে প্রকৃতি, স্বভাব ও ইসলাম ধর্মের পূর্ণাঙ্গতার নীতি ও বৈশিষ্ট্য বিরোধী।
ব্যাপকভাবে পরিবারের কর্তাব্যক্তি ও বিশেষভাবে দায়িদের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম কর্তব্য : পরিবার-পরিজনকে ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা, উদ্বুদ্ধ করা তাদেরকে ইলম ও আমলের যাবতীয় অনুষঙ্গে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন,
وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ.
আপনি আপনার নিকটবর্তী পরিবার-পরিজনকে সতর্ক করুন।[২৬৮]
পরিবারের ভরন-পোষণই যদি হয় ব্যক্তির জন্য পরিণাম বিচারে প্রদত্ত সর্বোত্তম সদকা, তবে, শিক্ষা-দীক্ষা, উত্তম ব্যবহার ও আচরণ- সন্দেহ নেই, তার জন্য বয়ে আনবে সদকার তুলনায় অধিক পরকালীন সওয়াব ও প্রতিফল। ‘সূচনা হোক তোমার পরিবার থেকে’, ‘প্রথমে পরিবার’- এ বিশ্বাস ও ধারণাগুলো আবার জাগিয়ে তুলতে হবে, সচেতন করতে হবে সকলকে এ বিষয়ে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে দিতে হবে ভারসাম্যপূর্ণ স্থিতিশীল নববী আদর্শের বিস্তার।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
রমজানে উম্মতের সাথে রাসূলের আচরণ
বছরের পুরোটা সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের সাথে যেভাবে কাটাতেন, রমজানে তার ব্যত্যয় হত না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে রাসূলের মৌলিক প্রবণতা ও দায়িত্ব-কর্ম সম্পর্কে যা এরশাদ করেছেন, তাই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান, একান্ত সাধনা। কোরআনে এসেছে,
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ .الجمعة: ২
তিনিই সে সত্তা, যিনি নিরক্ষরদের মাঝে তাদেরই মধ্য হতে একজন রাসূল প্রেরণ করলেন, যিনি তাদেরকে তার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে শোনাবেন, পবিত্র করবেন তাদের, শিক্ষা দিবেন কিতাব ও হিকমত্তযদিও তারা ইতিপূর্বে ছিল স্পষ্ট ভ্রান্তিতে।[২৬৯]
অপর এক স্থানে রাসূল সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন :
لَقَدْ جَاءكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُم بِالْمُؤْمِنِينَ رَؤُوفٌ رَّحِيمٌ . التوبة: ১২৮.
অবশ্যই তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতেই একজন রাসূল আগমন করেছেন, যা তোমাদের বিপন্ন করে, তা তার জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মোমিনদের প্রতি দয়ার্দ্র, করুণাময়।[২৭০] তবে, বরকতময় রমজান মাসে তিনি উম্মতের প্রতি, তাদের আমল ও পরকালীন উন্নতির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতেন, তাদের উৎসাহিত উদ্দীপ্ত করতেন কল্যাণ-কর্মে।
রাসূলের সিরাত ও জীবনাচারের যে কোন মগ্ন পাঠকই দেখতে পাবেন, এ বরকতময় মাসে তিনি তার সাহাবিদের নিয়ে বিভিন্ন অবস্থা ও আমলের নতুন নতুন বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাপন করেছেন। আত্মশুদ্ধি ও পৃষ্ঠপোষণের এক মূর্ত পরিবেশ বিরাজ করত তার মাঝে, ভরে উঠত তার চার পাশ করুণা ও রহমতের বিচ্ছুরণে, উম্মতের জন্য তিনি হয়ে উঠতেন দয়া ও সহিষ্ণুতার অনুপম প্রতীক। পার্থিব বিষয়ে সৌভাগ্য ও দৃঢ়তা আনয়ন এবং পরকালের সাক্ষাৎ দিবসে নাজাত লাভই ছিল তার যাবতীয় কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য।
সাহাবিদের তালিম দান
সাহাবিদের তালিম-তরবিয়তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালাতেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এ ক্ষেত্রে প্রমাণের দ্বারস্থ হওয়া এক প্রকার বাতুলতা। কারণ, তার জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, মৌলিক দায়িত্বই ছিল সাহাবিদের তালিমকে কেন্দ্র করে।
সামুরা বিন জুন্দুব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
لا يغرَّنَّ أحدكم نداء بلال من السحور، ولا هذا البياض حتى يستطير
সেহরির জন্য বেলালের আজান এবং পূর্ণ বিকশিত ও ছড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত এ ফর্সা আলো যেন তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে।[২৭১]
উমর বিন খাত্তাব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সা. বলেছেন,
إذا أقبل الليل من ها هنا، وأدبر النهار من ها هنا، وغربت الشمس فقد أفطر الصائم.
রাত্রি যখন এ-স্থলে এগিয়ে যাবে, দিবস সরে যখন হটে যাবে এখান থেকে এখানে, সূর্য অস্তমিত হবে, তখন রোজাদার ইফতার করবে।[২৭২]
এ জাতীয় হাদিস ও কোরআনের এ উক্তি,
وَكُلُواْ وَاشْرَبُواْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ ثُمَّ أَتِمُّواْ الصِّيَامَ إِلَى الَّليْلِ [البقرة: ১৮৭]
আর তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ না রাত্রির কৃষ্ণ-রেখা হতে উষার শুভ্র-রেখা প্রতিভাত হয়। অত:পর রাত্রি পর্যন্ত রোজা পূর্ণ কর।[২৭৩]
্তপ্রমাণ করে, রোজার সময়ের সূচনা ফজরের উদয় হতে, এবং তার বিস্তৃতি সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত। রোজাদার পূর্ণ দিবস পানাহার হতে বিরত থাকবে। দীর্ঘ হোক কিংবা সংক্ষিপ্ত্তদিবসের বিস্তৃতি যতক্ষণ প্রচলিত সময় অনুসারে ২৪ ঘন্টায় সীমাবদ্ধ থাকবে, ততক্ষণ রোজাদারকে এ সময়টুকু পানাহার হতে বিরত থেকে রোজা রাখার যাবতীয় বিধি ও নিয়ম পালন করতে হবে। তবে, যে সকল স্থানে প্রচলিত নিয়ম অনুসারে দিবস ও রাত্রির গমনাগমন হয় না, তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিকটবর্তী দেশের হুকুম পালন করতে হবে, যেখানে প্রচলিত নিয়ম অনুসারে সময়ের আবর্তন-বিবর্তন হয়।[২৭৪]
শাদ্দাদ বিন আউস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের আঠারতম দিন অতিক্রান্তের পর আমার হাত ধরে বাকি’ অঞ্চলে এক ব্যক্তির নিকট গেলেন, সে সিংগা নিচ্ছিল। রাসূল বললেন :
أفطر الحاجم والمحجوم.
সিংগাগ্রহণকারী ও প্রদানকারী উভয়ের রোজা নষ্ট হয়ে গেছে।[২৭৫]
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি এরশাদ করেছেন,
من أفطر في شـهر رمضـان ناسـياً فلا قضاء عليه ولا كفارة.
রমজানে কেউ যদি ভুলে খাদ্যগ্রহণ করে, তবে তার উপর কাজা ও কাফ্‌ফার্তা কোনটিরই প্রয়োজন নেই।[২৭৬]
অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে,
من أكل ناسيا وهو صائم فليتم صومه، فإنما أطعمه الله وسقاه
রোজা অবস্থায় যে ব্যক্তি ভুলে খাবার গ্রহণ করবে, সে যেন রোজা পূর্ণ করে নেয়, কারণ, আল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন।[২৭৭]
আবু যর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : …অত:পর রাসূল বললেন, ইমাম সালাত সমাপ্ত করা অবধি যে ব্যক্তি তার সাথে সালাত আদায় করে যাবে, তাকে পূর্ণ রাত্রির সওয়াব প্রদান করা হবে।[২৭৮]
আব্দুল্লাহ বিন আউফা বর্ণিত হাদিসে আমরা দেখতে পাই, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্মের মাধ্যমে সাহাবিদের সামনে নমুনা পেশ করে তাদের শিক্ষা প্রদান করেছেন। উক্ত সাহাবি বলেন : একবার আমরা রমজান মাসে রাসূলের সাথে সফরে ছিলাম। সূর্য অস্তমিত হলে তিনি বলেন : হে অমুক ! নেমে এসে আমাদের জন্য ছাতু-মিশ্রিত ইফতার পেশ কর। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল ! এখনও তো দিবস অবশিষ্ট রয়েছে !? তিনি পুনরায় বললেন : নেমে এসে ছাতু মিশ্রিত ইফতার পেশ কর। লোকটি তখন নেমে খাবার পেশ করল। অত:পর রাসূলের নিকট তা উপস্থিত করলে তিনি তা পান করলেন। এরপর হাতের ইশারায় বললেন, সূর্য যখন এ স্থান হতে এ স্থানে অস্ত যাবে, এবং রাত্রি এ অবধি চলে আসবে, তখন রোজাদার ইফতার করবে।[২৭৯]
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল এরশাদ করেছেন :
من ذرعه القيء فليس عليه قضاء، ومن استقاء فليقضِ.
যার অনিচ্ছায় বমি হবে, তার কাজা নেই, আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করবে, সে কাজা করে নেয়।[২৮০]
তালিম ও শিক্ষাদানই পৃথিবীতে আগত নবি ও রাসূলদের কর্তব্য, যারা অনুসারী দায়ি ও সালিহীন, তাদের কর্তব্যও তাই হব্তেএতে সন্দেহের অবকাশ নেই। রাসূল এরশাদ করেছেন,
إن الله لم يبعثني معنتاً ولا متعنتاً، ولكن بعثني معلماً ميسراً.
নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আমাকে (অপরকে) কষ্ট প্রদানকারী কিংবা কষ্টে নিপতিতরূপে প্রেরণ করেননি ; বরং, তিনি আমাকে প্রেরণ করেছেন সারল্য আনয়নকারী শিক্ষকরূপে।[২৮১]
উমর বিন খাত্তাব কূফাবাসীর নিকট বার্তা পাঠালেন যে, আমি আম্মারকে আমিররূপে প্রেরণ করেছি, আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদকে প্রেরণ করেছি শিক্ষক ও গভর্ণররূপে।[২৮২]
তালিম উম্মতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক দায়িত্ব, যা একই সাথে সম্মানের ও মর্যাদার, ব্যক্তির মর্যাদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় যাকে কেন্দ্র করে, বৃদ্ধি পায় পরকালীন পুরস্কার, সৎকাজের অপার সম্ভাবনা, বিস্তৃত হয় সার্বিক কল্যাণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়টির প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করেছেন, কথায়-বক্তব্যে, কর্মে-প্রতিফলনে রূপ দিয়েছেন পূর্ণাঙ্গভাবে। রাসূলের পুণ্যবান সাহাবিগণ এ ব্যাপারে নানা সাক্ষ্য দিয়েছেন। মুআবিয়া বিন হাকাম হতে বর্ণিত, রাসূলের তালিমের উল্লেখ করে তিনি বলেন : আমার পিতা-মাতা তার তরে উৎসর্গিত, আমি তার পূর্বে কিংবা পরে তার তুলনায় উত্তম কোন শিক্ষকের সন্ধান পাইনি। আল্লাহর শপথ ! তিনি কখনো আমার সাথে কঠোরতা করেননি, প্রহার করেননি কখনো, কিংবা কটুবাক্য বলেননি।[২৮৩]
রমজান হচ্ছে আলেম ও দায়িদের জন্য তালিম ও দাওয়াতের এক গুরুত্বপূর্ণ ও উপযুক্ত সময়,্তইসলাম ও ঈমানের হাকিকত এবং স্বরূপ মানুষের সামনে তুলে ধরে, সর্বাত্মক শ্রম ব্যয়ে তাদের সামনে ইসলামি জীবন-যাপনের মাহাত্ম্য ও ফলশ্রুতির উত্তম নমুনা পেশ করে তারা এ সময়টির সর্বোত্তম ব্যবহার করতে পারেন। রমজানে অধিক হারে মানুষের মসজিদমুখী হওয়ার ফলে সময়টি আমাদের জন্য খুবই উপযোগ্তিসন্দেহ নেই। এতে আমরা মানুষকে দ্বীনের ব্যাপারে আরো গভীর অনুসন্ধানী ও আগ্রহী করে তুলতে পারি, উদ্দীপিত করতে পারি কল্যাণ ও সৎকাজের পথে।
বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাই, সমাজে যারা বিভ্রান্ত মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর, শ্রমে ও নিষ্ঠায় নানা উপকরণ ব্যবহার করে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে তাদের ভ্রষ্ট মতবাদ। বরং, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, মতবাদ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ পরিকল্পনা ও পদ্ধতি নির্ধারণে তারা খুইয়ে দিচ্ছে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, ফলশ্রুতিতে ক্রমে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যাচ্ছে তাদের বিভ্রান্ত মতবাদ ও জীবনাচার, সত্যপথ-বিচ্যুত হচ্ছে অগণিত জনগোষ্ঠী।
তাই, এ ক্ষেত্রে পদ্ধতি ও প্রস্তুতিগত সূচনায় দাওয়াত ও ইসলাহের মহান ব্যক্তিবর্গকে অত্যন্ত সচেতন কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে। উদ্ভাবন করতে হবে পদ্ধতিগত নতুনত্ব। ফলে মানুষ সৎকাজ ও সৎপথে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবে, তাদের মাঝে বিস্তার ঘটবে ইলম ও আমলের, রক্ষা পাবে প্রবৃত্তির আকর্ষণ হতে।
সাহাবিদের উদ্দেশ্যে রাসূলের ওয়াজ ও বয়ান
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে সাহাবিদের বিভিন্নভাবে উপদেশ দিতেন, বাতলে দিতেন সত্য ও ন্যয়ের পথ। এ ব্যাপারে বিভিন্ন হাদিস হতে প্রমাণ পাওয়া যায়।
ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিনে এতেকাফ পালন করতেন, মসজিদে খেজুর গাছের শাখায় বানানো তাঁবু টানাতেন। তিনি বলেন : একদা তিনি মুখমণ্ডল বের করে এরশাদ করলেন, সালাত আদায়কারী তার রবের সাথে মোনাজাত করে, তোমাদের প্রত্যেকের ভাবা উচিত, সে কীসের মাধ্যমে তার রবের সাথে মোনাজাত করবে। তোমাদের কেউ (অপরকে কষ্ট প্রদান করে এমন) উচ্চস্বরে পাঠ করবে না।[২৮৪]
মানুষের আত্মা সৎ ও সঠিক পথে বহাল ও দৃঢ় থাকার জন্য প্রয়োজন তাকে সর্বদা সজাগ রাখা, ওয়াজ ও উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে সতেজ রাখা, উদ্বুদ্ধ করা এবাদতের পথে। রমজানের দিবস ও রাত্রিগুলো, সন্দেহ নেই, মানুষকে উপদেশ প্রদান ও ওয়াজ-নসিহতের জন্য খুবই উপযোগী। এ মহান সময়গুলোতে দায়ি ও মুসলিহগণ আল্লাহর মহত্ত্ব ও সিফাত বিষয়ে মানুষকে জানাবে, উন্মোচন করবে আত্মার স্বরূপ, তার দৌর্বল্য ও প্রয়োজনগুলো ; পার্থিব বিষয়ের প্রকৃতি, তার ক্ষণস্থায়িত্ব, আখেরাতের মাহাত্ম্য ও চিরস্থায়িত্ব্তইসলামি জীবনাচারের এ মৌলিক বিষয়গুলোর ব্যাপারে সকলকে অবহিত করবে। তাদের জানাবে, বান্দার পরিণতি হয়তো চিরস্থায়ী জান্নাত কিংবা জাহান্নামের লেলিহান অগ্নিশিখায় অঙ্গারে পরিণত হওয়া। কোরআনে এসেছে,
وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَائِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ [التحريم: ৬]
যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর ; তার পাহারায় থাকবে কঠিন-কঠোর ফেরেশতাগণ, যারা আল্লাহর নির্দেশ বিষয়ে অবাধ্যতায় লিপ্ত হয় না, বরং, পালন করে যায়, যা তাদের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।[২৮৫]
সৎকর্মে সাহাবিদেরকে রাসূলের সর্বাত্মক নিয়োগ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে সাহাবিদেরকে সর্বাত্মক সৎকর্মে নিয়োগ করতেন, তাদেরকে উৎসাহ উদ্দীপনা জোগাতেন নানা কল্যাণ-কর্মে। আবু হুরায়রা রা. বর্ণিত হাদিসে এসেছ্তেরাসূল এক হাদিসে কুদসিতে এরশাদ করেন:
والذي نفسـي بيده لخلوف فم الصائم أطيب عند الله تعالى من ريح المسك؛ يترك طعامه وشرابه وشهوته من أجلي؛ الصيام لي وأنا أجزي به، والحسنة بعشر أمثالها.
যার হাতে আমার প্রাণ, তার শপথ ! রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ মেশকের তুলনায় আল্লাহ তাআলার নিকট অধিক প্রিয় ; সে আমার উদ্দেশ্যে তার পানাহার ও প্রবৃত্তিকে পরিত্যাগ করে, রোজা আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান। পুণ্যকর্মের প্রতিদান দশগুণ।[২৮৬]
ভিন্ন শব্দে একই হাদিস এসেছে এভাবে,
كل عمل ابن آدم يضاعف، الحسنة عشرة أمثالها إلى سبعمائة ضعف، قال الله عز و جل:إلا الصوم فإنه لي وأنا أجزي به، يدع شهوته وطعامه من أجلي. للصائم فرحتان: فرحة عند فطره، وفرحة عند لقاء ربه. ولخلوف فيه أطيب عند الله من ريح المسك.
আদম সন্তানের যাবতীয় আমলই বৃদ্ধি পায়। পূন্যকর্মের প্রতিফল দশ থেকে সাত শত গুণ বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন : …তবে রোজা এর ব্যতিক্রম, নিশ্চয় তা আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান। রোজাদার তার প্রবৃত্তি ও পানাহার পরিত্যাগ করেছে আমার জন্য। রোজাদারের আনন্দের মুহূর্ত দুট্তিইফতারকালিন ও রবের সাথে সাক্ষাৎকালীন। নিশ্চয় তার মুখের দুর্গন্ধ মেশকের সুগন্ধি হতেও আল্লাহর নিকট অধিক উত্তম।[২৮৭]
উসমান বিন আবুল আস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি রাসূলকে বলতে শুনেছি যে,
الصيام جُنَّة من النار، كجُنَّة أحدكم من القتال.
রোজা তোমাদের ব্যবহৃত যুদ্ধের ঢালের মত জাহান্নাম হতে রক্ষা পাওয়ার ঢাল।[২৮৮]
আবু হুরায়রা রা. রাসূল হতে বর্ণনা করেন, তিনি এরশাদ করেছেন:
الصيام جُنَّة، وحصن حصين من النار.
রোজা ঢাল, এবং জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী মজবুত দুর্গ।[২৮৯]
আবু সাইদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
من صام يوما في سبيل الله بَعَّد الله وجهه عن النار سبعين خريفا.
যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একদিন রোজা রাখবে, আল্লাহ তার মুখমন্ডলকে জাহান্নাম হতে সত্তুর বছর দূরে রাখবেন।[২৯০]
আব্দুল্লাহ বিন আমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
الصيام والقرآن يشفعان للعبد، فيقول الصيام: أي رب، إني منعته الطعام والشهوات بالنهار فشفعني فيه، ويقول القرآن: منعته النوم بالليل فشفعني فيه، فيُشَفَّعان.
সিয়াম ও কোরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে : হে প্রতিপালক ! দিবসে আমি তাকে পানাহার ও প্রবৃত্তি হতে বাধা দিয়েছি, সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কোরআন বলবে : রাতে আমি তাকে নিদ্রা হতে বিরত রেখেছি, সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন ; তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।[২৯১]
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
من قام ليلة القدر إيماناً واحتساباً غفر له ما تقدم من ذنبه، ومن صام رمضان إيماناً واحتساباً غفر له ما تقدم من ذنبه.
ইমান ও ইহতেসাবের সাথে যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর যাপন করবে, তার ইতিপূর্বের যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি রমজান মাস জুড়ে ইমান ও ইহতেসাবের সাথে রোজা রাখবে, তারও ইতিপূর্বের যাবতীয় পাপ মোচন করে দেয়া হবে।[২৯২]
তারই বর্ণিত ভিন্ন এক হাদিসে এসেছে,
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে রমজানে রাত যাপনের জন্য উৎসাহ প্রদান করতেন। তিনি বলতেন :
من صام رمضان إيماناً واحتساباً غفر له ما تقدم من ذنبه.
যে ব্যক্তি ইমান ও ইহতেসাবের সাথে রমজান মাসে রোজা রাখবে, তার ইতিপূর্বের যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে।[২৯৩]
অপর হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা বলেন : আমি রাসূলকে রমজানের রাত যাপনে উৎসাহ দিতে শুনেছি।
আবু সাইদ খুদরি বর্ণিত হাদিসে এসেছে,
… ثم قال: كنت أجاور هذه العشر، ثم قد بدا لي أن أجاور هذه العشر الأواخر، فمن كان اعتكف معي فليثبت في معتكفه، وقد أُريت هذه الليلة ثم أُنسيتها؛ فابتغوها في العشر الأواخر، وابتغوها في كل وتر.
অত:পর তিনি বললেন : আমি এ দশে সম্মিলিতভাবে এতেকাফ যাপন করতাম, অত:পর আমাকে জানান হল শেষ দশ দিনে সম্মিলিতভাবে যাপনের জন্য। যে আমার সাথে এতেকাফে আগ্রহী, সে যেন তার এতেকাফগাহে অবস্থান করে। এ রাত আমাকে দেখানো হয়েছিল, কিন্তু আমি তা বিস্মৃত হয়েছি। তোমরা শেষ দশ দিনে তার সন্ধান কর। তোমরা প্রত্যেক বেজোড়ে তা অনুসন্ধান কর।[২৯৪]
অন্য রেওয়ায়েতে আছে,
যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এতেকাফে আগ্রহী, সে যেন ফিরে আসে (এতেকাফে বসে), আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছিল, আমি তা বিস্মৃত হয়েছি। নিশ্চয় তা শেষ দশ দিনের বেজোড়ে।[২৯৫]
উবাদা বিন সামেত বর্ণিত হাদিসে এসেছ্তেলাইলাতুল কদর সম্বন্ধে অবগত করানোর জন্য রাসূল বের হলেন, তখন দেখতে পেলেন, মুসলমানদের দু ব্যক্তি বাদানুবাদে লিপ্ত, অত:পর তিনি বললেন : আমি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে তোমাদের জানানোর জন্য বেরিয়ে ছিলাম। অমুক অমুক ব্যক্তির বাদানুবাদের ফলে তা তুলে নেয়া হয়। হয়তো তাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। সুতরাং, তোমরা (শেষ দশ দিনের) সাত, নয় ও পাঁচে তার অনুসন্ধান কর।[২৯৬]
আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
ثلاثة لا ترد دعوتهم: الإمام العادل، والصائم حتى يفطر، ودعوة المظلوم تحمل على الغمام، وتفتح لها أبواب السماء، ويقول الرب عزو جل: وعزتي لأنصرنك ولو بعد حين.
তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেয়া হয় না : ন্যায়পরায়ণ শাসক, ইফতার করা অবধি রোজাদার, এবং মজলুমের দোয়্তাযা মেঘকে ছাড়িয়ে যায় এবং আকাশের দ্বার যার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়, আল্লাহ পাক বলেন : আমার ইজ্জত ও মর্যাদার শপথ ! বিলম্বে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করব।[২৯৭]
আবু সাইদ খুদরি রা, বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন :
إن لله تبارك وتعالى عتقاء في كل يوم وليلة – يعني في رمضان -، وإن لكل مسلم في كل يوم وليلة دعوة مستجابة.
রমজানের প্রতি দিবসে ও রাতে আল্লাহ তাআলা অনেককে মুক্ত করে দেন। প্রতি রাতে ও দিবসে প্রতি মুসলমানের দোয়া কবুল করা হয়।[২৯৮]
যায়েদ বিন খালেদ জুহানি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন :
من فطّر صائماً كان له مثل أجرهم، من غير أن ينقص من أجورهم شيئاً.
যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে, তাদের উভয়ের সওয়াব হতে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।[২৯৯] ইফতার পরিমাণে স্বল্প হোক কিংবা অধিক্তউভয় ক্ষেত্রে একই হুকুম। এ আল্লাহ তাআলার রহমত, ফজিলত ও এহসানের অনুপম নিদর্শন।
জাবের রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
عمرة في رمضان تعدل حجة.
রমজানে ওমরা হজের সমতুল্য।[৩০০]
অপর এক হাদিসে তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন :
إن لله عند كل فطر عتقاء. وذلك في كل ليلة.
প্রতি ইফতারকালে আল্লাহ তাআলা অনেককে মুক্তি প্রদান করেন, আর তা প্রতি রাতেই ঘটে থাকে।[৩০১]
সাহাবিদেরকে ক্রমাগত সৎকাজে এভাবে উদ্বুদ্ধ করার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, রাসূল তাদের কল্যাণ বিষয়ে ছিলেন সর্বোচ্চ সচেতন। আত্মা পূর্ণতার যতই ঊর্ধ্বে আরোহণ করুক না কেন, তা সর্বদা উপদেশ ও দিক নির্দেশনার মুখাপেক্ষী।
ওয়াজ এক ধরনের উপদেশ প্রদান পদ্ধতি, যা নববি আদর্শে উজ্জ্বল ও মহিমান্বিত, যা সকলের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, যে ওয়াজ করবেন, স্থান-কাল-পাত্রের ভেদ ও পদ্ধতিগত কৌশল সম্পর্কে তাকে সজাগ থাকতে হবে।
ইবনে মাসঊদ রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব যত্নের সাথে সে দিনগুলোতে আমাদের ওয়াজ করতেন, এবং আমরা বিরক্ত হচ্ছি কি না তার প্রতিও খেয়াল রাখতেন।[৩০২] স্বত:স্ফূর্ত থাকাকালীন তিনি আমাদের ওয়াজ-নসীহত করতেন, এবং সর্বদা তা করতেন না।
উম্মতের মহান পূর্বসূরীগণের মাঝে আমরা এমন কয়েকজন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি লক্ষ্য করি, ওয়াজ পদ্ধতি অবলম্বনের ক্ষেত্রে যারা ছিলেন প্রবাদতুল্য ; যেমন হাসান বসরি, ইবনে জাওজি।
ইমাম আহমদ বলেন : মানুষের জন্য একজন সত্য গল্পকারের খুবই প্রয়োজন।[৩০৩] তবে, বর্তমান যুগে একটি শ্রেণি সেই মহান পূর্বসূরীগণের অনুসরণের নামে প্রচলন করেছে ওয়াজের এমন পদ্ধতি, কৌশলগতভাবে যা খুবই বিভ্রান্তিকর ও দুর্বল। আত্মায় তার সামান্য প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। তাদের ওয়াজ কখনো হয় দুর্বল, সকলের মন জুগিয়ে বলা, ফলে শুভ-পরিণাম শূন্য, আর কখনো কঠোর, মানুষের মন-মানসিকতার প্রতি পরোয়াহীনভাবে বল্তাএ ধরনের ভারসাম্যহীন ওয়াজ পদ্ধতির ফলে আমরা দেখছি এই সমাজে ওয়াজ হয়ে পড়েছে খুবই ঠুনকো ব্যাপার, যা বিন্দুমাত্র প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় না।
পূর্বের মহান ওয়ায়েজগণ মানুষের বিবেক ও আকলের দ্বারে আঘাত করতেন, জাগিয়ে তুলতেন শুভবুদ্ধির প্রাণ। কোরআন এক ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে সকলকে সত্য পথে আহ্বানের কর্মপন্থা বাতলে দিয়েছে, কোরআন একই সাথে ওয়াজ করে, এবং সম্বোধন করে বিবেককে, বিবেকের দ্বারে বারংবার হানা দেয়, তাকে জাগিয়ে তোলে-উৎসাহিত করে সত্য-সুন্দর পথে পরিচালিত হতে।।
রমজানে রাসূলের বিভিন্ন সমস্যার শরয়ি সমাধান প্রদান
রমজানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নানা সমস্যার শরয়ি সমাধান বাতলে দিতেন, সাহাবিদের কেউ প্রশ্ন করলে তার স্পষ্ট উত্তর দিয়েছেন, পাপ ঘটে যাওয়ার পরও, তওবা করে যে ব্যক্তি তার কাছে সমাধানের জন্য এসেছে, তাকেও ভর্ৎসনা করেননি তিনি।
আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত : এক ব্যক্তি রমজানে স্ত্রীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়েছিল। সে রাসূলকে এ বিষয়ে সমাধান জিজ্ঞেস করলে, তিনি বললেন, তোমার কি দাস রয়েছে ? সে বলল, না। তিনি পুনরায় বললেন : তুমি কি দু মাস রোজা রাখতে পারবে ? সে বলল : না। রাসূল বললেন : তাহলে তুমি ষাট জন মিসকিনকে খাবার দিয়ে দিয়ো।[৩০৪]
এক রেওয়ায়েতে আয়েশা রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন : রমজানে এক ব্যক্তি মসজিদে রাসূলের নিকট আগমন করে বলল : হে আল্লাহর রাসূল ! আমি বরবাদ হয়ে গেলাম ! রাসূল বললেন : কি ব্যাপার? তিনি বললেন, আমি স্ত্রীর সাথে মিলিত হয়েছি। রাসূল বললেন : তুমি সদকা কর। সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর নবি ! আল্লাহর শপথ, আমার কিছুই নেই, আমি কিছুরই মালিক নই। তিনি বললেন, তুমি বস। সে বসে পড়ল। ইত্যবসরে এক লোক গাধার পিঠে খাবার বোঝাই করে নিয়ে উপস্থিত হল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কিছুক্ষণ পূর্বের বরবাদ হওয়া সে লোকটি কোথায় ? লোকটি দণ্ডায়মান হলে রাসূল বললেন, তুমি এগুলো দিয়ে সদকা আদায় কর। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসূল ! আমি ব্যতীত অন্য কাউকে দেব ? আল্লাহর শপথ ! আমরা ক্ষুধার্ত, আমাদের কিছুই নেই। রাসূল বললেন, তবে তোমরাই সেগুলো খাও।[৩০৫]
সালাম বিন ছাখার আল আনসারি হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
كنت رجلاً قد أوتيت من جماع النساء ما لم يؤتَ غيري، فلما دخل رمضان تظاهرت من امرأتي حتى ينسلخ رمضان، فَرَقاً من أن أصيب منها في ليلتي فأتتابع في ذلك إلى أن يدركني النهار وأنا لا أقدر أن أنزع، فبينما هي تخدمني ذات ليلة إذ تكشف لي منها شيء فوثبت عليها، فلما أصبحت غدوت على قومي فأخبرتهم خبري فقلت: انطلقوا معي إلى رسول الله صلى الله عليه و سلم فأخبره بأمري، فقالوا: لا والله لا نفعل، نتخوف أن ينزل فينا قرآن أو يقول فينا رسول الله صلى الله عليه و سلم مقالة يبقى علينا عارها، ولكن اذهب أنت فاصنع ما بدا لك، قال: فخرجت فأتيت رسول الله صلى الله عليه و سلم فأخبرته خبري، فقال: أنت بذاك؟، قلت: أنا بذاك، قال: أنت بذاك؟، قلت: أنا بذاك، قال: أنت بذاك؟، قلت: أنا بذاك، وها أنا ذا، فأمْضِ فيَّ حكم الله فإني صابر لذلك، قال: أعتق رقبة، قال: فضربت صفحة عنقي بيدي فقلت: لا، والذي بعثك بالحق لا أملك غيرها، قال: صم شهرين، قلت: يا رسول الله، وهل أصابني ما أصابني إلا في الصيام؟، قال: فأطعم ستين مسكيناً، قلت: والذي بعثك بالحق لقد بتنا ليلتنا هذه وحْشَى، ما لنا عشاء!، قال: اذهب إلى صاحب صدقة بني زُرَيق فقل له: فليدفعها إليك، فأطعم عنك منها وسقاً ستين مسكيناً، ثم استعن بسائره عليك وعلى عيالك، قال: فرجعت إلى قومي فقلت: وجدت عندكم الضيق وسوء الرأي، ووجدت عند رسول الله صلى الله عليه و سلم السعة والبركة؛ أمر لي بصدقتكم فادفعوها إليَّ، فدفعوها إلي.
তিনি বলেন : আমাকে সহবাসের এমন শক্তি দান করা হয়েছিল, যা অপর কাউকে প্রদান করা হয়নি। রমজান এলে আমি রমজান শেষ অবধি আমার স্ত্রীর সাথে জেহার[৩০৬] করলাম। কারণ, আমার ভয় ছিল রাতে তার সাথে আমি সহবাসে লিপ্ত হব, দিবস আগমন পর্যন্ত আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হতাম কিন্তু আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হতাম না। এক রাতে আমার স্ত্রী আমার সেবা করছিল, হঠাৎ তার দেহের কিছু প্রকাশিত হয়ে গেল, আমি তার উপর ঝাপিয়ে পড়লাম। ভোর হলে আমি আমার গোত্রের কাছে গিয়ে বললাম : আমার সাথে রাসূলের নিকট চল, আমি তাকে আমার বিষয়টি (রাতের ঘটনা) জানাই। তারা উত্তর দিল, আমরা কোনভাবেই তোমার সাথে যাব না। আমরা আশঙ্কা করছি যে, আমাদের ব্যাপারে কোরআন নাজিল হবে কিংবা রাসূল আমাদের এমন কিছু বলবেন, যার কলঙ্ক আমাদের জন্য স্থায়ী হয়ে যাবে। বরং, তুমিই যাও, এবং যা ভালো মনে কর তাই কর। তিনি বলেন : অত:পর আমি একাই বের হলাম এবং রাসূলের দরবারে এসে তাকে বিষয়টি খুলে বললাম। রাসূল বললেন : তুমিই সেই ব্যক্তি ? আমি বললাম, হ্যা, আমিই। রাসূল বললেন : তুমিই সেই ব্যক্তি ? আমি বললাম, হ্যা, আমিই। রাসূল বললেন : তুমিই সেই ব্যক্তি ? আমি বললাম, হ্যা, আমিই। আমিই তো। আপনি আমার ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম কার্যকর করুন। আমি এ ব্যাপারে ধৈর্য ধরব। তিনি বললেন : তুমি একজন দাসী আজাদ কর।
তিনি বলেন : আমি হাত দ্বারা আমার ঘাড়ে চাপড় মেরে বললাম, যে সত্ত্বা আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন, তার শপথ ! আমি (আমার ঘাড় ব্যতীত) কিছুরই মালিক নই। রাসূল বললেন, তবে দু মাস রোজা রাখ। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ! রোজা রাখতে গিয়েই তো আজ আমার এ দশা। তিনি বললেন, তবে ষাটজন মিসকিনকে খাইয়ে দাও। আমি বললাম, সে সত্ত্বার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দিয়ে প্রেরণ করেছেন গত রাত শূন্য অবস্থাতে আমরা কাটিয়েছি রাতের খাদ্য হিসেবে কিছুই ছিল না।
রাসূল বললেন, তুমি বনি জুরাইকের সদকা উসূলকারীর নিকট যাও, এবং বল। সে তোমাকে সদকার পণ্য প্রদান করবে। তুমি সেই পণ্য হতে নিজের পক্ষ হতে ষাটজন মিসকিনকে এক ওসাক[৩০৭] পরিমাণ
প্রদান করবে, বাকি সব দিয়ে তোমার ও তোমার পরিবারের প্রয়োজন পুরণ করবে। তিনি বলেন, আমি অত:পর আমার গোত্রের নিকট আগমন করে বললাম, আমি তোমাদের কাছ থেকে পেয়েছি সঙ্কীর্ণতা আর ভুল মত। আর রাসূলের নিকট পেয়েছি প্রশস্ততা ও বরকত। আমাকে তোমাদের সদকা গ্রহণের আদেশ দিয়েছেন, সুতরাং তোমরা তা আমার কাছে হস্তান্তর কর। অত:পর তারা তাই করল।[৩০৮]
বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে লোকেরা তার নিকট আগমন করত, তাকে প্রশ্ন করে আলোচনায় অংশ নিত। তাদের স্থির বিশ্বাস ছিল যে, তারা একজন সম্মানিত দয়ার্দ্র শিক্ষকের আশ্রয়ে আছে।
বিভিন্ন পদ্ধতিতে তিনি সকলের সমাধান হাজির করতেন, কখনো রসিকতা করতেন, ঠাট্রাচ্ছলে তাদের সংশয় দূর করতেন। আদি বিন হাতেম রা. হতে বর্ণিত এক হাদিসে আমরা এর উত্তম উদাহরণ পাই। তিনি বলেন :
لما نزلت هذه الآية:{حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ}، قال: أخذت عقالا أبيض وعقالا أسود فوضعتهما تحت وسادتي، فنظرت فلم أتبين، فذكرت ذلك لرسول الله صلي الله عليه و سلم فضحك، فقال:إن وسادك إذن لعريض طويل، إنما هو الليل والنهار.
যখন কোরআনের এ আয়াত নাজিল হল্তযতক্ষণ না সাদা সুতো কাল সুতো হতে পৃথক হব্তেআমি একটি সাদা এবং একটি কাল সুতো নিলাম, (রাতে) বালিশের নীচে রেখে দিলাম। কিছুক্ষণ পর সেগুলোর দিকে তাকিয়ে তাকে পৃথক-স্পষ্ট দেখতে পেলাম না। আমি বিষয়টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবগত করালে তিনি হেসে ফেললেন। বললেন : তবে তো তোমার বালিশ খুবই লম্বা ও প্রশস্ত ! (কোরআনে বর্ণিত) এর মর্ম হচ্ছে রাত ও দিন।[৩০৯]
রাসূল, উক্ত হাদিসে, তাকে কাজা করার আদেশ প্রদান করেননি। সুতরাং এতে প্রমাণ হয়, হুকুম সম্পর্কে অনবগতি কাজার ওয়াজিবকে তুলে নেয়।[৩১০]
রাসূলের জীবনের এ ঘটনা প্রবাহ, কর্মপন্থায় এমন ভারসাম্য আচরণ ও নীতি অবলম্বন, সন্দেহ নেই, সকলের কাছে রেসালাতকে করে তুলেছে আন্তরিক, সৌহার্দ্যময়, তাদের হৃদয়কে ভরিয়ে দিয়েছে দয়ার্দ্রতায়। দাওয়াতি জনগোষ্ঠীদের সাথে আচরণে তাদের করে তুলেছে সতত করুণাময়, সহিষ্ণু ; প্রশ্নের ব্যাপারে সহনশীল, অপরাধের ক্ষেত্রে রহম-দিল।
এ এমন এক গুণ ও আচরণ, বর্তমান সময়ে ইলম, দাওয়াত, ও ইসলাহের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকের মাঝে যার দুর্বলতা খুবই প্রতীয়মান। অপরাধী ও পাপে নিমজ্জিতদের ক্ষেত্রে যাদের ধারণা ও ভাবনা হল, ভর্ৎসনা, লাঞ্ছনা, ও ক্রমাগত কোণঠাসা করে ফেলাই হচ্ছে তাদের পাপ স্খলনের একমাত্র উপায় ও প্রতিকার, রাসূলের এ আচরণ তাদের চোখে আঙুল দিয়ে শিক্ষা দেয়। বিস্মৃত হয় তারা রাসূলের হেদায়েতের আলোকময় পথ ও পদ্ধতি ;্তরমজানে স্ত্রী সহবাসে আক্রান্ত সাহাবির সাথে আচরণ[৩১১] ; যে ব্যক্তি মসজিদে মূত্র ত্যাগ করেছিল[৩১২], কিংবা যে কথা বলে উঠেছিল সালাত আদায়কালীন[৩১৩], এমনকি যে ব্যক্তি যিনার অনুমতি চেয়ে রাসূলের কাছে আবেদন করেছিল[৩১৪] তাদেরকে সুপথ বাতলে দেয়ার যে পদ্ধতি তিনি অবলম্বন করেছিলেন, তা তারা ভুলে যায়, এবং কঠোরতা আরোপের ফলে দাওয়াতি জনগোষ্ঠীকে ক্রমে দূরে ঠেলে দেয় ইসলাম ও ইসলামি বিশ্বাস হতে।
অপরের সাথে বন্ধুভাব বজায় রাখা, করুণা, ব্যক্তির কাছে স্বত:স্ফূর্তভাবে এগিয়ে যাওয়া, মনোযোগ সহকারে তার বক্তব্য শ্রবণ, উত্তর প্রদানে সহনশীল হওয়া, সহাস্যমুখে কথোপকথন…মানুষের অন্তর জয় ও তাতে প্রভাব বিস্তারের প্রাথমিক ও অব্যর্থ মাধ্যম, এভাবে মানুষের অনুভূতিতে নিজের কথা-বক্তব্য ও ভাবনা অনায়াসে সঞ্চার করে দেয়া যায়।
মানুষের মুক্তি, তাদের জ্ঞানগত প্রবৃদ্ধি, আল্লাহর দ্বীনের প্রতি তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অভিবাসন্তইত্যাদি ক্ষেত্রে আলেম সমাজ, দায়ি ও মুসলিহদের এর প্রতি লক্ষ্য বৈ পথ নেই। বিশেষত, দাওয়াতের এক গুরুত্বপূর্ণ কাল হওয়ার ফলে বরকতময় রমজান মাসে এর প্রতি সবিশেষ লক্ষ্য রাখা কর্তব্য বলেই আমার বিশ্বাস। এ সময় মানুষ দলে দলে মসজিদে সমবেত হয়, দ্বীনের কাজে অংশগ্রহণের তাড়না বোধ করে আন্তরিকভাবে, সিয়াম, জাকাত ও এতেকাফ বিষয়ে তারা নানাভাবে প্রশ্ন করে জানার আগ্রহ প্রকাশ করে, শরিয়তের অন্যান্য হুকুম-আহকাম, জান্নাত-জাহান্নাম, সওয়াব ও গোনাহ বিষয়ে তাদের নানা প্রশ্ন থাকে, সুতরাং, এ সময়টি দায়িদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়, ইসলামি ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস ও আচার পদ্ধতি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার এক উত্তম সময় রমজান মাস।
দ্বীনের এ প্রার্থীদের জন্য প্রয়োজন আন্তরিক ও করুণাময় দায়ির, যারা ক্ষতে হাত বুলিয়ে দেবে পরম মমতায়, তার চিকিৎসা করবে সৌহার্দ্য ও আন্তরিকতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে, পাপক্ষালন করবে ধীরে ধীরে, এভাবে একসময় পাপীর সামনে বিষয়টির মন্দত্ব ফুটে উঠবে, সে এতে প্রত্যাবর্তনকে ঘৃণা করবে চূড়ান্তভাবে। সৎ ও সঠিক পথকে চেনে নিবে, তাকে আঁকড়ে ধরবে চিরকালীন আবেগে।
বিভিন্নভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের রমজান ও রোজা বিষয়ে সমাধান দিয়েছেন। উমর বিন আবি সালামা হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলকে প্রশ্ন করলেন, রোজাদার কি চুম্বন করতে পারবে ? রাসূল তাকে বললেন, তুমি উম্মে সালামাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করে জেনে নাও। উম্মে সালামা তাকে জানালেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ (চুম্বন) করতেন। উমর রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ! আল্লাহ পাক তো আপনার পূর্বাপর যাবতীয় গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন ! রাসূল বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম তাকওয়া অবলম্বনকারী ও আল্লাহ ভীরু।[৩১৫]
যামারা বিন আব্দুল্লাহ বিন আনিস তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন : আমি বনি সালামার এক মজলিশে ছিলাম। আমি ছিলাম তাদের সর্বকনিষ্ঠ। তারা বলাবলি করল, আমাদের হয়ে কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লাইলাতুল কদর বিষয়ে জিজ্ঞেস করবে ? এ ছিল রমজানের একুশ তারিখের ভোরবেলার ঘটনা। আমি বেরুলাম, মাগরিবের সালাতকালীন রাসূলের সাথে আমার সাক্ষাৎ হল। আমি তার গৃহের দরজায় দণ্ডায়মান হলে তিনি আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন ; বললেন, প্রবেশ কর ! আমি প্রবেশ করলে আমাকে তার রাতের খাবার দেয়া হল, তিনি দেখতে পেলেন খাবার স্বল্পতার কারণে আমি আহার হতে বিরত থাকছি। আহার শেষে তিনি আমাকে বললেন, আমার জুতো এনে দাও। তিনি দণ্ডায়মান হলে আমিও তার সাথে দ৭াড়ালাম। তিনি বললেন, তোমার কি কোন প্রয়োজন ছিল? আমি বললাম, হ্যা। বনি সালামার একদল লোক আমাকে আপনার কাছে লাইলাতুল কদর বিষয়ে জিজ্ঞেস করার জন্য প্রেরণ করেছে। তিনি বললেন, (আজ) কততম রাত্রি ? বললাম, বাইশতম রাত্রি,্তবর্ণনাকারী পরবর্তীতে তার মত পাল্টে বলতেন, না বরং পরের রাত্রি, অর্থাৎ তেইশতম রাত্রি।[৩১৬]
জাবের বিন আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : উবাই বিন কা’ব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ! আজ রাতে একটি ঘটনা ঘটেছে। তিনি বললেন, উবাই, কি ঘটেছে ? উবাই বললেন, আমার গৃহের কয়েকজন নারী বলল : আমরা কোরআন তেলাওয়াত করব না, বরং, আপনার সাথে সালাত আদায় করব। তিনি বলেন, আমি তাদের নিয়ে আট রাকাত সালাত আদায় করলাম, অত:পর বিতির পড়ে নিলাম। তিনি বলেন, মনে হল, রাসূল অনেকটা সম্মত, কিন্তু তিনি কিছু বললেন না।[৩১৭]
নানা বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত হলেও, দ্বীন ও দ্বীনাচারে উম্মত খুবই আগ্রহী, এ ব্যাপারে কেউ কেউ ঘোর অলসতা ও অন্ধকারে নিমজ্জিত হলেও, অধিকাংশের মাঝেই আমরা এই প্রবণতা ও আগ্রহ দেখতে পাই। সুতরাং, উম্মতের দায়িত্বশীল আলেম সমাজের কর্তব্য ও পালনীয় হল : মানুষের কাছে দ্বীনের পরিপূর্ণ উন্মোচন, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য জ্ঞাপন করে, বিস্তৃত আকারে শরিয়তের যাবতীয় আহকাম সম্পর্কে তাদেরকে জ্ঞাত করা, স্বতঃস্ফূর্ততা ও উত্তম উত্তর প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে ধর্মাচার প্রবণ করে তোলা। যারা বেদআতে আক্রান্ত, প্রবৃত্তির পূজায় নিবিষ্ট, বিচ্ছিন্নভাবে উম্মতকে নতুন জাহেলি দীক্ষায় দীক্ষিত করবার পাঁয়তারায় লিপ্ত, তাদেরকে সুযোগগুলো গ্রহণে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না। উম্মতের সাধারণ জনগোষ্ঠী জ্ঞান ও মূর্খতা নির্ধারণে হয়ে পড়েছে অপরাগ, তাদের সামনে জাহেল ও আলেম একই রূপে প্রতিভাত হচ্ছে। সৎ-অসতের মাঝের পার্থক্য নিরূপণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে নিদারুণভাবে। এমন করুন পরিস্থিতি, সন্দেহ নেই, সময়কে করে তুলছে আরো বিপদাক্রান্ত ও সংকটাপন্ন।
ইলমের প্রসার ও বিস্তার, অসৎ কাজে বাধা প্রদান করে সৎকাজের প্রতি সকলকে আগ্রহী ও বেগবান করে তোলায় আলেমদের ভূমিকার নবায়ন কি আমরা দেখতে পাব ? দায়ি ও মুখলিসগণ কি তাদের শ্রম উজাড় করে এ পথে সফল হওয়ার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করবেন ? কাটিয়ে দিবেন আলস্য ও মূর্খতার ঘোর অমানিশা ? তারা কি সতর্ক হবেন ? হয়তো, কিন্তু সময় ততদিনে অতিবাহিত হয়ে যাবে, হাতছাড়া হয়ে যাবে যাবতীয় সহায়-সুযোগ, আমরা ব্যর্থ হব পতনোন্মুখ একটি জাতিকে রক্ষা করতে।
পাশাপাশি, তালিবুল ইলমদের যে বিষয়ে সতর্ক থাকা একান্ত কর্তব্য, তা হচ্ছে কঠোরতা ও সহজতা আরোপের মাঝে সরল ভারসাম্য বজায় রাখা। অতি রক্ষণশীলতা আরোপ করে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে সকলকে অনাগ্রহী করে তুলবে না। কারণ, যা হারাম, তাকে হালাল করা যেমন পাপের, তেমনি পাপের যা হালাল, তাকে হারাম করা। এবং যা ওয়াজিব নয়, তাকে ওয়াজিব করাও ওজুব ভাঙ্গার নামান্তর। কিংবা সহজতা ও সারল্য আরোপ করবে না, এবং করুণা-পরবশ হয়ে শরিয়তের হুকুম লঙ্ঘনও করবে না। কোরআন ও সুন্নাহ যে বিষয়ে স্পষ্ট বর্ণনা উপস্থাপন করেছে, রক্ষণশীলতা ও সহজতার যে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে, কঠোর মনে হোক কিংবা সহজ, তাতে নিজেকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত করা সকলের কর্তব্য ও দায়িত্ব।
রাসূলের ইমামতি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণ বছরই ইমামতি করতেন, সকলে তার পিছনে সালাত আদায় করত। তবে, বিশেষভাবে রমজান মাসে তার ইমামতির কিছু প্রমাণ আমরা নিম্নে উল্লেখ করছি,
আব্দুল্লাহ বিন আনিস রা. হতে বর্ণিত :
أن رسول الله صلي الله عليه و سلم قال: أُريت ليلة القدر ثم أنسيتها، وأراني صبحها أسجد في ماء وطين. قال: فمطرنا ليلة ثلاث وعشرين فصلى بنا رسول الله صلي الله عليه و سلم فانصرف وإن أثر الماء والطين على جبهته وأنفه.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছিল, অত:পর আমি তা বিস্মৃত হয়েছি। সে ভোরে আমাকে দেখানো হয় যে, আমি পানি আর কাদায় সেজদা দিচ্ছি। রাবি বলেন, তেইশতম রাত্রিতে বৃষ্টি হল, রাসূল আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন এবং প্রস্থান করলেন ; পানি ও কাদার চি‎হ্ন ছিল তার কপাল ও নাকে।[৩১৮]
আয়েশা রা. বর্ণিত হাদিসে এসেছে,
حتى خرج لصلاة الصبح، فلما قضى الفجر أقبل على الناس فتشهد ثم قال: أما بعد: فإنه لم يخْفَ عليَّ مكانكم، لكني خشيت أن تفرض عليكم فتعجزوا عنها.
…ফজরের সালাতের জন্য তিনি বেরুলেন ; ফজর সালাত সমাপ্ত করে মানুষের দিকে অভিমুখ হলেন, তাশাহ্‌হুদ পাঠ করে বললেন, আমি তোমাদের অবস্থানের ব্যাপারে অবিদিত নই, কিন্তু আমার ভয় হয় তোমাদের উপর তা ফরজ করে দেয়া হবে এবং তোমরা তা পালনে অক্ষম হয়ে পড়বে।[৩১৯]
রাসূল কেবল ফরজ সালাতেই ইমামতি করতেন না, কারণ, রমজানের কোন কোন রাত্রিতে তিনি সাহাবিদের নিয়ে সালাত জামাতের সাথে আদায় করেছেন, ইমামতি করেছেন স্বয়ং। এ আশঙ্কায় তিনি রাত জেগে জামাতের সাথে সালাত আদায়ের বিষয়টি অব্যাহত রাখেননি যে এর ফলে তা ফরজ করে দেয়া হবে, এবং উম্মত যথা নিয়মে তা পালনে অক্ষম হয়ে পড়বে।
এ ব্যাপারে আরো হাদিস প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়,
আবু যর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমরা রাসূলের সাথে রমজান মাসে রোজা পালন করেছি, কিন্তু তিনি রমজানের সাত দিবস বাকি থাকা অবধি আমাদের নিয়ে রাত জেগে সালাত আদায় করেননি। সপ্তম রাত্রিতে আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন, এমনকি রাতের এক তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হয়ে গেল। ষষ্ঠ রাতে তিনি আমাদের নিয়ে রাত্রি জাগরণ করলেন না।
পঞ্চম রাত্রিতে আমাদের নিয়ে অর্ধ রাত্রি পর্যন্ত সালাত আদায় করলেন। আমি বললাম, আপনি যদি পূর্ণ রাত্রি আমাদের সাথে নফল সালাত আদায় করতেন ?! তিনি বললেন, ব্যক্তি যদি ইমামের সালাত শেষ করা অবধি তার সাথে সালাত আদায় করে, তবে তার জন্য পূর্ণ এক রাত্রি জাগরণের সওয়াব লিখে দেয়া হয়। আবু যর বলেন, চতুর্থ রাত্রিতে তিনি আমাদের নিয়ে রাত জাগলেন না।
তৃতীয় রাত্রিতে তার পরিবার-পরিজন, স্ত্রী-গণ, অন্যান্য সকলকে একত্রিত করলেন, তিনি আমাদের নিয়ে এতটা সময় সালাত আদায় করলেন যে, সেহরির সময় অতিক্রান্তের আশঙ্কা হল। এর পর বাকি মাস আর রাত্রি জাগলেন না।[৩২০]
উম্মুল মোমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
أن رسول الله صلي الله عليه و سلم صلى في المسجد ذات ليلة فصلى بصلاته ناس، ثم صلى من القابلة فكثر الناس، ثم اجتمعوا من الليلة الثالثة أو الرابعة فلم يخرج إليهم رسول الله صلي الله عليه و سلم، فلما أصبـح قـال: قد رأيت الذي صنعتم فلم يمنعني من الخروج إليكم إلا أني خشيت أن تفرض عليكم، قال: وذلك في رمضان.
এক রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে সালাত আদায় করলেন, লোকেরাও তার সাথে সালাতে যোগ দিল। পরবর্তী রাতেও সালাত আদায় করলেন, অংশগ্রহণকারী লোকদেরও সংখ্যা বেড়ে গেল।
তৃতীয় কিংবা চতুর্থ রাত্রিতে সকলে সমবেত হলেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরিয়ে এলেন না। ভোর হলে তিনি বললেন, তোমরা যা করেছ, আমি তা দেখেছি। কেবল এ আশঙ্কাই আমাকে বেরুতে বাধা দিয়েছে যে, হয়তো তা তোমাদের জন্য ফরজ করে দেয়া হবে। তিনি বলেন, আর তা রমজানে।[৩২১]
ফজিলতময় এ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতে মুসলমানদের ইমাম হবেন্তএটাই স্বাভাবিক, কারণ, তিনি ছিলেন হেদায়েতকারী, সুসংবাদদাতা, আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে শরিয়ত পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব ছিল তার উপর অর্পিত দায়িত্ব ; পরকাল দিবসে আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়ার কালে কি করে মানুষ জাহান্নাম হতে মুক্তি পাব্তেঅহরাত্র সেই চিন্তায় বিভোর থাকতেন তিনি।
ইমামত হচ্ছে হেদায়েত, নসিহত, ও মানুষকে শরিয়তের অনুবর্তী করে তোলার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম্তযে ব্যক্তি ইমামতের সুযোগ লাভ করেছে, এ মহান দায়িত্ব পালনের মত নিজেকে যদি সে পুরোপুরি যোগ্য ও উপযুক্ত-প্রস্তুত মনে করে, তবে তা গ্রহণ করাই উত্তম। সন্তুষ্ট চিত্তে, শুভ পরিণতির মনে করে সে এ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিবে, পরকালে আল্লাহ কর্তৃক সওয়াব লাভের আশায় পূর্ণভাবে দায়িত্ব পালনের যথাসাধ্য শ্রম ব্যয় করবে।
যে ব্যক্তি মানুষকে হেদায়েতের পথে আহ্বান করবে, অনুসরণকারী সকলের সমপরিমাণ সওয়াব তাকেও দান করা হব্তেবিন্দুমাত্র তারতম্য করা হবে না। ইসলামকে মানুষের হৃদয়ের খুব কাছাকাছি প্রতিস্থাপন করবার এ এক অনিন্দ কৌশল। এভাবেই, ইসলাম বাধাহীনভাবে পৌঁছে গেছে মানুষ ও মানুষের বিবেকের দুয়ারে দুয়ারে, যা আর কখনো প্রতিরোধ্য হবার নয়।
সালাত শেষে রাসূলের আলোচনা ও খুতবা প্রদান
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে কোন কোন সালাত শেষে খুতবা প্রদান করতেন, আলোচনা করতেন বিভিন্ন বিষয়ে। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত হাদিসে এসেছ,
فطفق رجال منهم يقولون: الصلاة! فلم يخرج إليهم رسول الله صلي الله عليه وسلم حتى خرج لصلاة الفجر، فلما قضى الفجر أقبل على الناس ثم تشهد فقال: أما بعد: فإنه لم يخفَ علي شأنكم، ولكني خشيت أن تفرض عليكم صلاة الليل فتعجزوا عنها.
তাদের অনেকে বলছিল : ‘সালাত’ ! কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সালাতের পূর্বে বেরুলেন না। ফজরের সালাত শেষে তিনি মানুষের মুখোমুখি হলেন, তাশাহহুদ পাঠ শেষে তিনি এরশাদ করলেন : তোমাদের ব্যাপারটি আমার অবিদিত নয়। কিন্তু, আশঙ্কা হয়েছিল যে, তোমাদের জন্য (এ সালাত) ফরজ করে দেয়া হবে এবং তোমরা তা (পালনে) অক্ষম হয়ে পড়বে।[৩২২]
আবু সাইদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমরা রাসূলের সাথে রমজানের দশ দিন এতেকাফে যাপন করলাম। বিশ তারিখ ভোরে তিনি আমাদের উদ্দেশ্যে খুতবায় বললেন, আমাকে লাইলাতুল কদর প্রদর্শন করা হয়েছিল, কিন্তু আমি তা বিস্মৃত হয়েছি।[৩২৩]
ভিন্ন রেওয়ায়েতে আছে,
তিনি তাদের উদ্দেশ্যে খুতবা প্রদান করলেন, নির্দেশ দিলেন তাদের আল্লাহর ইচ্ছা সম্বন্ধে।[৩২৪]
খতিব ও ইমামদের মাঝে যাদের রয়েছে এ বিষয়ে সুপ্ত প্রতিভা, তাদের দায়িত্ব হল এর প্রতি পূর্ণ লক্ষ্য রাখা, এর সফল রূপায়ণে সর্বস্ব নিয়োগ করা। আমরা এমন এক সময় যাপন করছি, যখন মসজিদ ও মসজিদ ভিত্তিক প্রভাব অনেকাংশেই খর্ব হয়ে গিয়েছে, ইমাম ও খতিবদের প্রভাব-পরিধি ক্রমান্বয়ে ক্ষীণ হয়ে চলেছে। সামাজিক এ দিকটির প্রতি যদি দায়ি ও ইমামদের অনীহা একটি স্থায়ী সমস্যায় রূপ নেয়, তবে এক সময় আমরা এক ভয়াবহ কেন্দ্রিকতার মুখোমুখি হব, আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ব সমাজ ও সামাজিক অনুষঙ্গ থেকে, সৃষ্টি হবে পরিচয়গত সংকট। প্রবল সতর্কতা ও দ্বীনের কাজে পরিপূর্ণ আত্মনিয়োগই কেবল এ সংকট উত্তরণের পথ তৈরি করতে পারে।
একদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত ও অপরদিকে বর্তমান পরিস্থিতি যার একান্ত নখদর্পণে, যে পাঠ করেছে সমাজ ও নৈতিকতার এ বিষয়গুলো, তিনি নি:সন্দেহে অনুভব করতে সক্ষম হবেন যে, সমাজ ও সামাজিকতার অধিকাংশ স্তরে মসজিদ ভিত্তিক এ ক্ষমতা ও কেন্দ্রিকতা লুপ্ত হয়ে গিয়েছে, ভেঙে পড়েছে এ ব্যবস্থা। মসজিদ ভিত্তিক ধর্মীয় আন্দোলন ও চারিত্রিক অবগঠন ইসলামের অধিকাংশ এলাকাতেই আজ ভঙ্গুর-হীনদশায় আক্রান্ত। এর স্থলে আপন অবস্থান মজবুত করছে অন্যান্য অপসংস্কৃতির কর্তৃত্ব, বিভ্রান্তিকর মতবাদ, পুরোনো যাবতীয় চারিত্রিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বসে গিয়ে জন্ম নিচ্ছে নতুন চেতনা, নতুন জীবনাচার পদ্ধতি।
ইসলাহ ও সংস্কারের কার্যকারিতা ও ফললাভের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সময়, ধৈর্য, ও বিপুল পরিশ্রম। বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থার অবনমনে ব্যয় হয়েছে যতটা সময়, কৌশল ও শ্রম, সন্দেহ নেই, এর তুলনাতেও তার পরিধি ও ব্যাপ্তি হবে আরো ব্যাপক ও সামগ্রিক। সাফল্য, মুক্তি ও মৌলিক নীতিমালার যা এখনও ক্ষীণ হয়ে টিকে আছে, তার সংরক্ষণ, প্রথমে, খুবই জরুরি। অবনতির এ দীর্ঘকালে যা আমাদের হাত ছাড়া হয়ে গেছে, তাকে পুনরায় প্রতিস্থাপন করবার লক্ষ্যে গড়ে তুলতে হবে সর্বব্যাপী এক সামাজিক বিপ্লব।
ইসলামের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল, উদ্ভাসিত, যার বিচ্ছুরণ আলোকিত করবে প্রতিটি কোণ। আগামী হবে, আল্লাহ চাহে তো, ইসলাম ও মুসলমানদের। আমরা জানি রমজান এক মহান সুযোগ বয়ে আনে আমাদের জন্য, বিদ্যমান ব্যবস্থাকে পালটানোর এক মোক্ষম উপায় হচ্ছে রমজানকে পূর্ণভাবে ব্যবহার করা ; কিন্তু মনে রাখতে হবে এই বিবর্তন ও পরিবর্তন কেবল তখুনি আমাদের হাতে ঘটতে পারে, যখন ইখলাস, দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ সচেতনতা, তালিম ও চরিত্র গঠনে বিপুল শ্রম নিয়োগে আমরা অতুলনীয় দৃষ্টান্ত পেশ করতে পারব। একটি জাতি হিসেবে, এ ক্রমান্বয় পরিশ্রম, বিপুল কর্মযজ্ঞের দৃষ্টান্ত স্থাপন, সফলরূপে সকলের কাছে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে একদিন নিশ্চয় জগতসভায় আমরা শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন হব।
রোজার আহকাম ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে রাসূলের নির্দেশনা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে সাহাবিদের রোজা বিষয়ক বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞাত করাতেন, রমজানের উদ্দেশ্য ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করতেন সকলকে। বিশেষভাবে তিনি সকলকে বলতেন রমজানে আত্মার পবিত্রতা অর্জন করতে, পাপ পরিহার করে চলতে, কারণ, রমজান ও অন্যান্য সময় সমকাতারের নয়।
জ্ঞান ও চরিত্রের গঠনমূলক কাজে যারা নিয়োজিত, তাদের ক্ষেত্রে এ এক কঠিন সত্য, এই দুর্বলতা হতে তারা কোনভাবেই মুক্ত নয়।
এ বিষয়ে রাসূল কতটা গুরুত্ব প্রদান করতেন, তার একটি উত্তম উদাহরণ পাই আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত হাদিসে। তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন :
من لم يدع قول الزور والعمل به والجهل فليس لله حاجة أن يدع طعامه وشرابه.
যে ব্যক্তি মিথ্যা কথন, সে অনুসারে আমল ও মূর্খতাপূর্ণ আচরণ পরিত্যাগ করবে না, তার পানাহার পরিত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই (আল্লাহ তাকে কোন সওয়াব প্রদান করবেন না)।[৩২৫]
অপর এক হাদিসে আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
رب صائم حظه من صيامه الجوع والعطش، ورب قائم حظه من قيامه السهر.
কেউ কেউ আছে, ক্ষুৎপিপাসাই যার রোজার ফলাফল, অনেক রাত জেগে সালাত আদায়কারী আছে, যার প্রাপ্তি কেবল রাত্রি জাগরণ।[৩২৬]
তিনি আরো বলেন : রাসূল বলেছেন,
الصيام جُنَّة فلا يرفث ولا يجهل، وإن امرؤ قاتله أو شاتمه فليقل: إني صائم -مرتين-
রোজা হচ্ছে ঢাল স্বরূপ, সুতরাং, তাতে কটু কথা বলবে না, এবং অজ্ঞতাপূর্ণ আচরণ করবে না। যদি কেউ তার সাথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, কিংবা গালমন্দ করে, তবে সে বলবে : আমি রোজাদার। …দু বার…।[৩২৭]
ভিন্ন রেওয়ায়েতে আছে,
لا تسابّ وأنت صائم، فإن سابَّك أحد، فقل: إني صائم، وإن كنت قائماً فاجلس.
তুমি রোজা রেখে গালমন্দ কর না, যদি কেউ তোমাকে গালমন্দ করে, তবে বল: আমি রোজাদার। তুমি যদি দাঁড়িয়ে থাক, তবে বসে পড়।[৩২৮]
আবু উবাইদা বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন : আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, রোজা ঢাল স্বরূপ- যতক্ষণ না তা ফুটো করা হয়। আবু মোহাম্মদ ব্যাখ্যা করে বলেন : অর্থাৎ যতক্ষণ না গিবতের মাধ্যমে তা ফুটো করা হয়। যে ব্যক্তি তার রোজাকে আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নিষিদ্ধ বিষয় হতে বিরত-মুক্ত না রাখবে, তার রোজা অপূর্ণ। কখনো কখনো এমনকি রোজার মৌলিক উদ্দেশ্যই এতে ব্যাহত হয়ে পড়ে।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ [البقرة:১৮৩].
হে মোমিনগণ ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।[৩২৯] আয়তটি বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে তোলে।
উক্ত আয়াত ও হাদিস এবং এ জাতীয় অন্যান্য শরয়ি বর্ণনা হতে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহ তাআলা রমজানের রোজা, তার আদব ও আমলের মাধ্যমে আদেশ-নিষেধ বাস্তবায়নের দিকে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা রেখেছেন। এর গূঢ় উদ্দেশ্য হচ্ছে- তাকওয়া, বিনয়, আত্মসমর্পণ, আল্লাহর তরে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বান্দা আপনাকে শোভিত করে তুলবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, জান্নাতের অনপনেয় নেয়ামত ও জাহান্নামের অগ্নিশিখা হতে মুক্তি লাভের মাধ্যমে মহান করে তুলবে তার ঐহিক ও পারত্রিক জীবন। ধৈর্য ও শয়তানের আক্রমণকে দুর্বল করে দেওয়ার ক্রমাগত অনুশীলনে নিজেকে ঋদ্ধ করবে। আত্মার নিয়ন্ত্রণ, তার লাগাম সঠিক হাতে স্থাপন, ইহকাল ও পরকালের যা কল্যাণকর ও সৌভাগ্যময়, তাতে পূর্ণ আত্মনিয়োগ, অন্তরের অন্তস্তলে আল্লাহ-ভীতি ও ধ্যান সর্বদা জাগরূক রাখা, হৃদয়কে প্রজ্বলিত রাখা, কঠোরতা দুরিকরণ, জিকির ও পরকাল চিন্তায় তাকে নিয়োগ করা, নেয়ামতের মহিমা, মানুষের মানবিক দুর্বলতা, শারীরিক ও মানসিকভাবে যাবতীয় রোগ-ব্যাধি হতে দেহের মুক্তি ও সংরক্ষণ- ইত্যাদির মাধ্যমে ব্যক্তি নিজেকে উত্তরোত্তর উন্নতির চরম শিখরে নিয়ে যাবে।
রোজা, তাই,- ইমাম রাজির বক্তব্য অনুসারে- দম্ভ, ঔদ্ধত্য, অহংকার আর মন্দ বিষয় হতে মানুষকে বিরত রাখে, পার্থিবের আস্বাদ ও তার কর্তৃত্ব খর্ব করে। কারণ, রোজা উদর এবং যৌনাঙ্গের কামনা প্রশমিত রাখে। যে ব্যক্তি অধিক-হারে রোজা রাখবে, তার জন্য এ দুটিকে সামলানো সহজ হয়ে যাবে, বাধা প্রাপ্ত হবে এর সরবরাহ। রোজা ব্যক্তিকে হারাম ও অশ্লীল বিষয় হতে বাধা প্রদান করবে, পার্থিবের কর্তৃত্ব শিথিল করে দেবে। এসবই তাকওয়ার সমন্বয়ক।[৩৩০]
নফস- যেমন বলেছেন আবু সোলাইমান দারানি- যখন ক্ষুধার্ত হয়, আক্রান্ত হয় অসহনীয় পিপাসায়, বিশুদ্ধ হয় তখন, হয়ে উঠে তীক্ষ্ন। আর যখন তা ভরপুর পরিতৃপ্ত থাকে, অন্ধ হয়ে যায় তখন।[৩৩১]
এই ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি, যে ব্যক্তি তার রোজাকে পূর্ণাঙ্গ করতে চায়, পেতে চায় পূর্ণ সওয়াব, আগ্রহী যে ব্যক্তি রোজার মর্যাদায় নিজেকে মর্যাদাবান করে তুলতে, তার কর্তব্য, রোজার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে যথারীতি জ্ঞান অর্জন করা, এ ব্যাপারে যাবতীয় আলস্য পরিত্যাগ করে কেবল সমাজ ও প্রচলিত রীতি অনুসরণ করে নয় ; এবাদত করা স্বেচ্ছায়, স্বত:স্ফূর্তভাবে, বুঝে-শুনে। সামাজিক প্রচলনের বশবর্তী হয়ে এবাদত এক প্রকার অপূর্ণতা ও বিপদের সৃষ্টিকারী- শায়েখ দাউসারি মন্তব্য করেন- পরকালীন জীবনারম্ভের পূর্বেই যদি মানুষ ইলাহি নীতিমালা প্রণয়নের হিকমত সম্পর্কে জ্ঞাত না হয়, সজাগ না হয় তার ইহকালীন ফলাফলের ব্যাপারে, তবে তার পক্ষে একে পূর্ণতায় কিংবা বিশুদ্ধ প্রক্রিয়ায় তুলে আনা কখনো সম্ভব হবে না।[৩৩২]
এমনিভাবে, তাকে পালন করতে হবে যাবতীয় অবশ্য পালনীয় বিধানগুলো, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বর্জনীয় কর্ম-কথা হতে পবিত্র রাখতে হবে নিজেকে। ইখলাসকে করে তুলতে হবে পূর্ণাঙ্গ, মহীয়ান। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণই হবে তার একমাত্র অবলম্বন। ব্যক্তি ওয়াজিব আদায়ের পাশাপাশি মোস্তাহাব আমল আদায়ের মাধ্যমেও তার পরকালীন প্রাপ্তিকে বৃদ্ধির প্রয়াস চালাবে। কারণ, বান্দা এর মাধ্যমে পূর্ণতার উচ্চ শিখরে উন্নীত হয়। জাবের রা. মন্তব্য করেন- যখন তুমি রোজা রাখ, তখন তোমার শ্রবণ, দৃষ্টি, ও কথাকে মিথ্যা ও পাপ হতে মুক্ত রাখ। তুমি তোমার রোজা ও পানাহারের দিবসকে সম-কাতারের করে ফেল না।[৩৩৩]
আবু হুরায়রা রা. বলতেন : গিবত রোজাকে ফুটো করে দেয়, এস্তেগফার সে ফুটোতে তালি দেয়। পরবর্তী দিবসে তোমাদের যার পক্ষে রোজা রেখে ফুটো বন্ধ করা সম্ভব, সে যেন তাই করে।[৩৩৪]
তরবিয়ত বিষয়ে রাসূলের হেদায়েত সম্পর্কে যার ন্যুনতম পাঠ রয়েছে, দেখতে পাবে তার নীতিমালা ও ভিত্তি গড়ে উঠেছে আন্তর নীতিমালার প্রতি লক্ষ্য রেখে, একেই নিরূপণ করা হয়েছে এবাদতের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে। তাই অন্তর পূর্ণতা লাভ করে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্মের মাধ্যমে। ‘সে তার প্রবৃত্তি ও পানাহার আমার কারণে পরিত্যাগ করেছে'[৩৩৫]- হাদিসে কুদসির এ বাক্যাংশের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে ইবনে কায়্যিম বর্ণনা করেন- রোজাদারের বাহ্যিক ও প্রকাশ্য পানাহার বিষয়েই কেবল সকলে অবগত হতে পারে, অন্যথায় আল্লাহর উদ্দেশ্যে পানাহার ও প্রবৃত্তি হতে নিজেকে মুক্ত রাখা এমন এক বিষয়, যা কোন বান্দাই অবগত হতে সক্ষম না। এটাই হল রোজার হাকিকত ও প্রকৃত রূপ।[৩৩৬]
সুতরাং, বর্তমান সময়ে চরিত্র ও অভ্যাস গঠনমূলক অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই আমরা দেখতে পাই, বাহ্যিক গঠনের প্রতিই কেবল জোর দেওয়া হচ্ছে, তাতে আরোপ করা হচ্ছে নানারূপ কঠোরতা, পাপ ও অপরাধের যা প্রকাশ্য ও দৃশ্যমান, অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা হচ্ছে কেবল তার প্রতি। অন্যদিকে যা বান্দার আন্তর সম্পর্কিত, সম্পর্কিত তার পাপ ও সওয়াবের সাথে, তার প্রতি প্রদর্শিত হচ্ছে সীমাহীন দৌর্বল্য ও আলস্য। রাসূলের বিভিন্ন হাদিস দ্বারা আমরা জানতে পারি যে, আন্তর সম্পর্কিত বিষয়ই মূলত: অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শুদ্ধতা ও বিনষ্টের গভীরতার মাপকাঠি।
হাদিসে এসেছে, রাসূল বলেছেন,
ألا وإن في الجسد مضغة، إذا صلحت صلح الجسد كله، وإذا فسدت فسد الجسد كله؛ ألا وهي القلب.
নিশ্চয়, দেহে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে, যখন তা ভাল থাকে, ভাল থাকে পুরো দেহ। আর যখন তা নষ্ট হয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায় পুরো দেহ। শোন, তা হচ্ছে অন্তর।[৩৩৭] আন্তর বিষয়ের প্রতি এভাবে উদাসীন থাকা বোকামি ব্যতীত কিছু নয়। আত্মিক সমর্পণের চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে, কেননা, অন্তরের বিনয়, কথায় ও কাজে পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর তরে নিজেকে বিলীন করে দেয়া। আল্লাহর ভালোবাসা ও মহত্ত্ব সঞ্জাত এ বিনয় যখন অর্জিত হবে, নিশ্চয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাকে অনুসরণ করবে।
আত্মিকভাবে স্বত:প্রণোদিত হয়ে, স্বত:স্ফূর্তভাবে পাপ ও অপরাধ ত্যাগ করার মাধ্যমেই কেবল আত্মার পরিশুদ্ধিতে সাফল্য লাভ সম্ভব। মানুষের আন্তর বিষয়গুলো তার সর্বোচ্চ মনোযোগ প্রাপ্তির অধিকারী। এভাবে, মানুষ আল্লাহ তাআলার রহমত, বরকত ও বিশেষ দৃষ্টির মাধ্যমে সফল হয়ে উঠবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে এরশাদ করেছেন,
إن الله لا ينظر إلى صوركم وأموالكم، ولكن ينظر إلى قلوبكم وأعمالكم.
আল্লাহ তাআলা তোমাদের বাহ্যিক প্রতিমূর্তি ও সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তাকান অন্তর ও কর্মের প্রতি।[৩৩৮]
রমজান হচ্ছে এ ক্ষেত্রে এক বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন সাধনের সুবর্ণ সুযোগ। নৈর্ব্যক্তিক, সামাজিক বা ব্যক্তিক যে উপায়েই তা সংঘটিত হোক না কেন, উম্মতের জন্য তা বয়ে আনবে সমূহ কল্যাণ ও প্রাপ্তি।
নববি আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু রীতি ও ধারা আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে, যা চরমভাবে রোজার উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। কেউ কেউ রোজার ওজর পেশ করে সময় মত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করেন না, বরং, বিষয়টি কখনো কখনো এতদূর গড়ায় যে, কেউ কেউ সালাতই ত্যাগ করে বসে ! সালাত হচ্ছে রোজা ও যাকাতেরই সমকাতারের- বরং, তার তুলনাতেও অধিক ফজিলতপূর্ণ। যে ব্যক্তি একে সহজভাবে নিবে, সে অবশ্যই বিপদাপন্ন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
بين الرجل وبين الشرك والكفر ترك الصلاة.
ব্যক্তি এবং শিরক-কুফরের মাঝে পার্থক্যকারী হচ্ছে সালাত ত্যাগ।[৩৩৯]
অপর স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন :
العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة فمن تركها فقد كفر.
আমাদের ও তাদের মাঝে অঙ্গিকার হচ্ছে সালাত, যে তা ত্যাগ করবে, সে কাফেরে পরিণত হবে।[৩৪০] অপর হাদিসে রাসূল সালাত অস্বীকারকে নয়, ত্যাগ করাকেই কুফরে প্রবেশের কারণ বলেছেন।[৩৪১]
ওয়াজিব আদায়ে যদি কারো অপূর্ণতা থেকে যায়, কিংবা স্খলন ঘটে কোন প্রকার, তাহলে দেখা যায়, কোন কোন মূর্খ একে রোজা ভঙ্গের কারণ হিসেবে ঘোষণা করেন। এ ক্ষেত্রে তার অনুসরণীয় হচ্ছে ইবনে হাযম-এর মত আহলে জাওয়াহেরগণ, কিংবা যে মনে করে যে, যে-কোন পাপের কারণে রোজা বিনষ্ট হয়ে যায়। কারণ- তাদের মত- রোজা রেখে পাপের ফলে সঠিক উপায়ে রোজা রাখা হয় না, পালিত হয় না ঠিক যেভাবে আল্লাহ তাআলা রোজা পালনের নির্দেশ প্রদান করেছেন।[৩৪২]
এ খুবই বিভ্রান্তিকর একটি ফতওয়া। বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, রোজা পালনকালীন পাপ করলে সওয়াব কমে যায়, বরং কখনো কখনো সওয়াব বিনষ্টই হয়ে যায়। কিন্তু এর ফলে রোজা বাতিল হয়ে যায় না, এবং কাজাও ওয়াজিব হয় না।
লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানে উৎসাহ প্রদান
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করার জন্য উৎসাহ প্রদান করতেন। এ ব্যাপারে অনেক হাদিস রয়েছে। রাসূল এ মহান রাত্রিকে গনিমত মনে করে কাজে লাগাতে বলতেন, এর কল্যাণ অর্জনে উদ্বুদ্ধ করতেন সকলকে। একবার তিনি সাহাবিদেরকে এ রাতের ফজিলত বর্ণনা করে বলেন :
من قام ليلة القدر إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه.
যে ব্যক্তি ইমান ও ইহতেসাবের সাথে এ রাত্রি জাগরণ করবে, তার পূর্বের যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে।[৩৪৩]
ভিন্ন হাদিসে রাসূল এ রাতের সময়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন :
تحروا ليلة القدر في العشر الأواخر من رمضان.
রমজানের শেষ দশ দিনে তোমরা লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।[৩৪৪]
বেজোড় সংখ্যক রাত্রির প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রাখার নির্দেশ প্রদান করে বলেন :
تحروا ليلة القدر في الوتر من العشر الأواخر من رمضان.
রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় সংখ্যক রাতে তোমরা লাইলাতুর কদর অনুসন্ধান কর।[৩৪৫]
তবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যারা দুর্বল ও অসুস্থ, তাদের ক্ষেত্রে কেবল শেষ সাত রাত্রিতে অনুসন্ধানের আদেশ দিয়েছেন। এক হাদিসে রাসূল বলেছেন,
التمسوها في العشر الأواخر ু يعني ليلة القدر -، فإن ضعف أحدكم أو عجز فلا يغلبن على السبع البواقي.
তোমরা শেষ দশে তা, অর্থাৎ লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান কর। যদি তোমাদের কেউ দুর্বল হয়, কিংবা অক্ষম হয়ে পড়ে, তবে শেষ সাতে যেন পরাভূত হয়ে না পড়ে ( শেষ সাত রাতে অবশ্যই যেন তালাশ করে)।[৩৪৬]
রাসূল, অত:পর শেষ সাত রাত্রির মাঝে লাইলাতুল কদরের জন্য সর্বাধিক সম্ভাবনাময় রাত্রি হিসেবে সাতাশের রাত্রিকে নির্ধারণ করেছেন, তিনি এক হাদিসে এরশাদ করেছেন,
من كان متحريها فليتحرها ليلة سبع وعشرين، وقال: تحروها ليلة سبع وعشرين، يعني: ليلة القدر.
যে তা (লাইলাতুল কদর) অনুসন্ধান করবে, সে যেন অনুসন্ধান করে সাতাশের রাতে। এবং তিনি বলেছেন- তোমরা তা অর্থাৎ লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর সাতাশের রাতে।[৩৪৭]
এ জাতীয় নানা হাদিস বর্ণিত হওয়ার কারণেই সাহাবি উবাই বিন কাব রা. শপথ করে বলতেন যে, তা সাতাশের রাত্রিতেই ঘটে। তিনি বলেন :
والله إني لأعلمها، وأكثر علمي هي الليلة التي أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم بقيامها، هي ليلة سبع وعشرين.
আল্লাহর শপথ ! আমি তার ব্যাপারে অবগত। আমার দৃঢ় ধারণা হচ্ছে, তা হল, সেই রাত্রি, যাতে রাত যাপনের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন। তা হচ্ছে সাতাশের রাত্রি।[৩৪৮]
মূলত: কিছু কিছু বছরে সাতাশের রাত্রিতে লাইলাতুল কদর ঘটেছিল, এবং সাহাবিগণ এ রাতের ব্যাপারে দৃঢ় ধারণা পোষণ করতেন। তবে, একুশের রাত ও তেইশের রাতেও লাইলাতুল কদর হয়েছ্তেএমন প্রমাণও হাদিসে পাওয়া যায়।
একুশের রাতের প্রমাণ হল : আবু সাইদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
إني اعتكفت العشر الأول ألتمس هذه الليلة، ثم اعتكفت العشر الأوسط، ثم أُتيت فقيل لي إنها في العشر الأواخر فمن أحب منكم أن يعتكف فليعتكف، فاعتكف الناس معه، قال: وإني أُريتها ليلة وتر وأني أسجد صبيحتها في طين وماء، فأصبح من ليلة إحدى وعشرين وقد قام إلى الصبح، فمطرت السماء فوكف المسجد، فأبصرت الطين والماء، فخرج حين فرغ من صلاة الصبح وجبينه وروثة أنفه فيهما الطين والماء، وإذا هي ليلة إحدى وعشرين.
আমি (প্রথমে) এ রাতের সন্ধানে প্রথম দশে এতেকাফ পালন করি। অত:পর এতেকাফ পালন করি মাঝের দশে। পরবর্তীতে ওহির মাধ্যমে আমাকে জানানো হয় যে, এ রাত শেষ দশে রয়েছে। সুতরাং তোমাদের মাঝে যে (এ দশে) এতেকাফ পালনে আগ্রহী, সে যেন তা পালন করে। লোকেরা তার সাথে এতেকাফ পালন কর। রাসূল বলেন- আমাকে তা এক বেজোড় রাতে দেখানো হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে যে, আমি সে ভোরে কাদা ও মাটিতে সেজদা দিচ্ছি। অত:পর রাসূল একুশের রাতের ভোর যাপন করলেন, ফজর পর্যন্ত তিনি কিয়ামুল্লাইল করেছিলেন। তিনি ফজর আদায়ের জন্য দণ্ডায়মান হয়েছিলেন। তখন আকাশ ঝেপে বৃষ্টি নেমে এল, এবং মসজিদে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ল। আমি কাদা ও পানি দেখতে পেলাম। ফজর সালাত শেষে যখন তিনি বের হলেন, তখন তার কপাল ও নাকের পাশে ছিল পানি ও কাদা। সেটি ছিল একুশের রাত।[৩৪৯]
আব্দুল্লাহ বিন আনিস বর্ণিত হাদিস দ্বারা আমরা তেইশের রাত্রি সম্পর্কে জানতে পারি, তাতে আছে- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন :
أُريت ليلة القدر ثم أنسيتها، وأراني صبحها أسجد في ماء وطين، قال: فمطرنا ليلة ثلاث وعشرين فصلى بنا رسول الله صلى الله عليه وسلم فانصرف، وإن أثر الماء والطين على جبهته وأنفه.
প্রথমে আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হলেও পরে আমি তা বিস্মৃত হয়ে যাই। আমাকে দেখানো হয়েছিল যে, সে ভোরে পানি ও কাদায় আমি সেজদা দিচ্ছি। রাবি বলেন, তেইশের রাতে আমরা বৃষ্টিস্নাত হলাম, রাসূল আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন এবং প্রস্থান করলেন। তার কপাল ও নাকে ছিল পানি ও কাদার চি‎‎হ্ন।[৩৫০]
এ সকল বর্ণনা ও বিভিন্ন মতের মাধ্যমে আমরা অবগত হই যে, লাইলাতুল কদরকে গোপন করা হয়েছে, এবং শেষ দশের বেজোড় রাতগুলোতে- নির্দিষ্ট এক রাতে নয়, ভিন্ন ভিন্ন রাতে উপস্থিত হয়। মানুষের জন্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে রহমত ও এহসান স্বরূপ কখনো এক রাতে, কখনো ভিন্ন রাতে তা হাজির হয়। আমলে আকাঙ্ক্ষী ও উদাসীনদের মাঝে এক সরল পার্থক্য রেখা টেনে দেয়।
সাহাবিদের জীবনাচার যে পুঙ্খানুপুঙ্খ দৃষ্টিতে বিচার করবে, দেখতে পাবে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অনুসারীদেরকে যার মাধ্যমে লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে সর্বাধিক উৎসাহিত ও উদ্দীপিত করেছেন, তাহল, কর্মের মাধ্যমে মূর্ত আদর্শ সকলের সামনে তুলে ধরা। রাসূল যে রাতকে ভাবতেন লাইলাতুল কদর হিসেবে, তার কাছে মনে হত যে, এ রাতই প্রতিশ্রুত লাইলাতুল কদর, সে রাতে তিনি কঠিন পরিশ্রম করতেন, নানাভাবে এবাদতে কাটিয়ে দিতেন, তাই সাহাবিগণ সরাসরি রাসূলের সংস্পর্শে সে রাত যাপন করতেন এবং উৎসাহিত হতেন এ ব্যাপারে। প্রকাশ্যে রাসূলের এ পরিশ্রম ও মোজাহাদার কারণ হচ্ছে তিনি ছিলেন উম্মতের সকলের জন্য অনুসরণীয় ও ইমাম। লাইলাতুল কদর হচ্ছে এমন রাত, যাতে কোরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং যে রাতের আমল হাজার বছরের আমলের তুলনায় অধিক সওয়াব আনয়নকারী। আল্লাহ তাআলা আমাদের জানিয়েছেন- এ রাতে আকাশের ফেরেশতা ও জিবরাইল আ: মর্ত্যলোকে নেমে আসেন, এবং তা শান্তি ও নিরাপত্তার রাত, বিপুলভাবে এ রাতে তিনি বান্দাদের মর্যাদা ও করুণায় ভূষিত করেন, ক্ষমা করেন তাদের, মুক্ত-বিধৌত করেন পাপ ও গোমরাহির ক্লেদাক্ততা হতে।
বর্তমান সময়ে এ রাত সংক্রান্ত মানুষের আবেগ ও অনুভূতি বিচার করলে আমরা দেখতে পাব যে, অধিকাংশ মানুষই এ রাতে নিজেকে কল্যাণ-কর্মে নিজেকে ব্যাপৃত রাখতে উদ্যমী হয়, আগ্রহ বোধ করে বিপুলভাবে, এ রাতের রহমত-বরকত ও করুণা লাভের মাধ্যমে নিজেকে ভূষিত-সুরভিত করতে প্রয়াস চালায়। তবে, সাধারণ মানুষের এ আবেগ ও অনুভূতি, সৎকাজে ক্রমাগত নিজেকে জড়িয়ে নেয়ার আগ্রহ তখনি সঠিক উপায়ে, বিশুদ্ধ গতিতে সুফল পরিণামে পর্যবসিত হবে, যখন আলেম ও মুসলিহ, এবং দায়িগণ তাদের জন্য উপস্থাপন করবেন কর্মের মূর্ত এক আদর্শ। রাসূল হতে বর্ণিত-সাব্যস্ত আমলগুলো তারা তাদের সামনে তুলে ধরবেন, এ অনুসারে আমলের জন্য উদ্বুদ্ধ করবেন সকলকে। বিচ্যুতি ও প্রমাদগুলো সংশোধন করে, এবং উত্তম-অনুত্তম সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নিয়ে যাতে মানুষ আমল করতে পারে- এ ব্যাপারে আলেমগণ সবিশেষ দৃষ্টি প্রদান করবেন।
যে পদ্ধতি ও নববি পন্থা অনুসরণ করে আমরা এ বিষয়ে নিজেদের ও সকলকে গড়ে তুলতে পারি, তা নিম্নরূপ :
* যে সকল পদ্ধতি অনুসরণ করে এ রাতের জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা যায়, তার পূর্ণ রূপায়ণ : যেমন- দিবসে বিশ্রামে যাপন, অনর্থক সংশ্রব এড়িয়ে নীরবে সময়টি যাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ, এতেকাফে না থাকলে দ্রুত মসজিদমুখী হওয়া, স্বল্পাহার, পারিবারিক প্রয়োজন পুরণ- যেমন শেষ দশ আগমনের পূর্বে ঈদ সংক্রান্ত যাবতীয় কেনাকাটা সম্পন্ন করা ইত্যাদি।
* পাপ ও গোমরাহি হতে আত্মায় ও মননে পূর্ণ পরিচ্ছন্ন হওয়া। এ জন্য যাবতীয় কবিরা গোনাহ হতে পরিপূর্ণরূপে তওবা করে নিবে। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদিস,
من قام رمضان إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه، ومن قام ليلة القدر إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه.
যে ইমান ও ইহতেসাবের সাথে রমজান যাপন করবে, তার পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে। আর যে ব্যক্তি ইমান ও ইততেসাবের সাথে লাইলাতুল কদরের রাত্রি যাপন করবে, তারও পূর্বের যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে।[৩৫১]- বর্ণনার পাশাপাশি এও এরশাদ করেছেন যে,
الصلوات الخمس، والجمعة إلى الجمعة، ورمضان إلى رمضان مكفرات ما بينهن إذا اُجتُنب الكبائر.
পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমা হতে অপর জুমা, এক রমজান হতে অপর রমজান মধ্যবর্তী সকল পাপের কাফ্‌ফারা- যদি কবিরা গোনাহ হতে বেঁচে থাকা হয়।[৩৫২] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদিসে কবিরা গোনাহ হতে বেচে থাকার উপর নির্ভরশীল রেখেছেন।
* আল্লাহ প্রেম, তার মহত্ত্ববোধ, আত্মিক ও বাহ্যিক জগতে তার কর্তৃত্বের
বিস্তৃতি, তার ভীতি, তার ফজিলত ও এহসানের মাহাত্ম্য উপলব্ধি, নেয়ামতের বিপুলতা, শাস্তির ভয়াবহতা- ইত্যাদি বোধ ও চেতনার মাধ্যমে নিজেকে ভরিয়ে তোলা। আল্লাহই হচ্ছেন বান্দার শেষতম শরণ ও আশ্রয়। বান্দা যে পরিমাণ নিজেকে আল্লাহর তরে নতজানুরূপে পেশ করতে পারবে, উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে তার মহত্ত্ব ও বড়ত্ব, জানতে পারবে তার পরিচয়, ঠিক সে পরিমাণেই তার আমল কবুল হওয়ার মত পরিবেশ সৃষ্টি হবে, এবং পুরস্কার লাভ করবে বহু গুণে। সুতরাং, যে ব্যক্তি বাহ্যিক আমলেই নিজেকে সন্তুষ্ট করে রেখেছে, আন্তর সম্পর্কিত আমলে নিজেকে বিন্দুমাত্র জড়াইনি, হে মুসলিম ভাই ! তার সমকাতারভুক্ত হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাও !
* কোন কোন আলেমের পক্ষ হতে গোসল করা, সাজ-সজ্জা ও সুগন্ধি ব্যবহার সংক্রান্ত যে বর্ণনা পাওয়া, তা অনুসরণ করা যেতে পারে। ইবনে জাওযি বলেন : সালফে সালিহীনগণ এ রাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। তামিম দারি যে রাতকে লাইলাতুল কদর মনে করতেন, সে রাতে এক হাজার দেরহামের পোশাক পরিধান করতেন। এমনিভাবে, সাবেত ও হামিদ এ রাতে গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন ও উত্তম পোশাক পরিধান করতেন।
* নিজের জন্য এ রাতে সর্বোত্তম আমল নির্বাচন, যে আমল বান্দাকে ক্রমান্বয়ে বান্দাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে তোলে। আন্তর ও বাহ্যিক আমলগুলোর রয়েছে নানা স্তরক্রম- ভীতি, বিনয় বিনম্র আচরণ, আল্লাহর তরে নিজেকে বিলীন করে উপস্থাপন ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের কাছে এমন কিছু উন্মোচিত হয়, যা আমরা অন্য কোথাও পাই না।
* রমজানের পুরোটা সময়েই বান্দা রাত যাপনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে। কেবল লাইলাতুল কদরকে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করে নিবে না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
من قام رمضان إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه.
যে ব্যক্তি ইমান ও ইহতেসাবের সাথে রমজানে রাত যাপন করবে, আল্লাহ পাক তার পূর্বের যাবতীয় পাপ ক্ষমা করে দিবেন।[৩৫৩]
আমলের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের রাতগুলোতে তারতম্য করতেন- বিষয়টিকে আমরা কোনভাবেই অস্বীকার করি না ; কারণ আয়েশা রা. রাসূলের রমজানের রাত্রিকালীন আমলের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন,
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يجتهد في العشر الأواخر ما لا يجتهد في غيره.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশে এতটা পরিশ্রম করতেন, যেমন করতেন না অন্য সময়ে।[৩৫৪]
এমনকি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশের রাতগুলোতেও আমলের মাঝে তারতম্য করতেন ; আবু যর রা. হতে বর্ণিত হাদিসে বিষয়টি স্পষ্টরূপে ধরা দেয়। তিনি বর্ণনা করেন,
صمنا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم رمضان فلم يقم بنا شيئا من الشهر حتى بقي سبع، فقام بنا حتى ذهب ثلث الليل، فلما كانت السادسة لم يقم بنا، فلما كانت الخامسة قام بنا حتى ذهب شطر الليل، فقلت يارسول الله: لو نفلتنا قيام هذه الليلة، قال: فقال: ্রإن الرجل إذا صلى مع الإمام حتى ينصرف حسب له قيام ليلة، قال: فلما كانت الرابعة لم يقم، فلما كانت الثالثة جمع أهله ونساءه والناس فقام بنا حتى خشينا أن يفوتنا الفلاح، قال: قلت: ما الفلاح؟، قال: السحور، ثم لم يقم بنا بقية الشهر.
আমরা রাসূলের সাথে রমজানে সিয়াম পালন করেছি, সাত দিবস অবশিষ্ট থাকা অবধি তিনি আমাদের নিয়ে রাত্রি জাগরণ করলেন না। (সপ্তম রাত্রিতে) তিনি আমাদের নিয়ে রাতের এক তৃতীয়াংশ অবধি রাত জাগরণ করলেন। ষষ্ঠ রাত্রিতে তিনি আমাদের নিয়ে রাত যাপন করলেন না। পঞ্চম রাত্রিতে তিনি অর্ধ রাত্রি অবধি সালাতে কাটালেন। আমি বললাম : হে আল্লাহর রাসূল ! পুরো রাতই যদি আপনি আমাদের নিয়ে নফল আদায় করতেন ! আবু যর বলেন, রাসূল বললেন : ইমাম প্রস্থান করা অবধি যে ব্যক্তি তার সালাত আদায় করে, তার জন্য পুরো রাত যাপনের সওয়াব লিখে দেয়া হয়। অত:পর চতুর্থ রাত্রিতে তিনি আমাদের নিয়ে যাপন করলেন না। তৃতীয় রাত্রিতে তিনি তার পরিবার-পরিজন, স্ত্রী-গণ ও লোকদের সকলকে একত্রিত করলেন এবং আমাদের নিয়ে এতটা সময় রাত্রি জাগরণ করলেন যে, সেহরির সময় অতিক্রান্তের ভয় হল।[৩৫৫]
কিন্তু মনে রাখতে হবে, সংখ্যা তারতম্যই এখানে মুখ্য বিষয় নয়। বরং, যাবতীয় কল্যাণ নিহিত সংখ্যায় ও পদ্ধতিতে পূর্ণাঙ্গরূপে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ ও অনুবর্তনে। মানুষ, বরং, হারাম কর্মে যোগদান এবং ওয়াজিব আমল বিনষ্টের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে বিপদে। জামাত ত্যাগ, অনর্থক কাজে সময় ব্যয়, সুন্নত ও সুন্নতে মোয়াক্কাদা পরিত্যাগ, কোরআন তেলাওয়াত ও তার অনুশীলন বর্জন, আত্মিক উন্নয়নে অবহেলা, জিকির, দোয়া, সদকা ও অন্যান্য সৎকাজে অবহেলা- মূলত: এগুলোই মানুষকে সত্য পথ বিচ্যুত করে নিপতিত করে অন্ধকারের গহিনে। এমনকি, কারো কারো রমজানে আসে কোন প্রকার বিশেষত্বহীনভাবে, অন্য কোন সময়ের সাথে কোন পার্থক্য বা তারতম্য নেই। এবং মানুষের এ সকল মনোবৃত্তির উপস্থিতি হয় সময়ের গুরুত্বহীনতা, সুযোগ হাতছাড়া করা, সালফে সালেহিনের বিরোধিতায় লিপ্ত হওয়া, সর্বোপরি, যারা রমজানের পুরো সময়টিকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে নিজের দ্বীনী জীবনকে পূর্ণাঙ্গ আলোকিত করে তুলতে চায়, তাদের বিরোধিতায় লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে। সন্দেহ নেই এ খুবই গর্হিত কর্ম।
যাদের মাঝে এ সকল মনোবৃত্তির উপস্থিতি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে, তাদের মনে রাখতে হবে রাসূলের এক ভয়াবহ উক্তি তাদের সামনে খড়গ হয়ে ঝুলছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার মিম্বরে আরোহণ করছিলেন। তিনি আপাত এক অদ্ভুত উক্তি করেন : হাদিসটিতে আছে,
فلما ارتقى درجة قال: آمين، فلما ارتقى الدرجة الثانية قال: آمين، فلما ارتقى الدرجة الثالثة قال: آمين، فلما نزل قلنا: يا رسول الله لقد سمعنا منك اليوم شيئا ما كنا نسمعه!، قال: إن جبريل عرض لي فقال: بُعْدا لمن أدرك رمضان فلم يغفر له، قلت: آمين. فلما رقيت الثانية قال: بُعْدا لمن ذكرت عنده فلم يصل عليك، قلت: آمين. فلما رقيت الثالثة قال: بُعْدا لمن أدرك أبواه الكبر عنده فلم يُدخلاه الجنة، قلت: آمين.
অত:পর যখন তিনি আরেকটি স্তরে উন্নীত হলেন, বললেন, আমিন! দ্বিতীয় স্তরে উন্নীত হয়ে বললেন, আমিন ! তৃতীয় স্তরে উন্নীত হয়েও বললেন আমিন ! যখন তিনি নেমে এলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ! আজ আমরা আপনার কাছ থেকে এমন কিছু শ্রবণ করেছি, যা ইতিপূর্বে শ্রবণ করিনি। তিনি বললেন : জিবরাইল আমাকে বললেন : যে ব্যক্তি রমজান পেয়েছে অথচ তাকে ক্ষমা করা হয়নি, সে ধ্বংস হোক, আমি তার এ কথার প্রেক্ষিতে বলেছি আমিন। যখন দ্বিতীয় সিঁড়িতে উঠেছি, তখন সে বলল, ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি যার নিকট আপনার নাম উচ্চারিত হল, অথচ সে আপনার উপর সালাত পাঠ করল না। আমি উত্তরে বললাম আমিন। তৃতীয় সিঁড়িতে উঠলে জিবরাইল বললেন : ধ্বংস হোক সে ব্যক্তি পিতা-মাতাকে বৃদ্ধ বয়সে লাভ করেছে, অথচ তারা তার জান্নাত লাভের কারণ হয়নি। আমি বললাম, আমিন।
এ হাদিসটি রমজান অবহেলায় যাপনকারীদের জন্য এক অশনি সংকেত- সন্দেহ নেই। আমরা দেখতে পাই, কেউ কেউ লাইলাতুল কদর বলতে কেবল সাতাশের রাতকেই বুঝেন। বিশুদ্ধ মত অনুসারে, অথচ, লাইলাতুল কদর কেবল সাতাশের রাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তবে, অন্যান্য রাতের তুলনায় এ রাতের ব্যাপারে প্রবল ধারণা পোষণ করা যায়।
আমরা দেখতে পাই, কেউ কেউ লাইলাতুল কদর হিসেবে সাতাশের রাতকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করেন, যা এক প্রকারে
নিষিদ্ধ কর্মে বাঁধা দান
তার প্রমাণ :
أن رسول الله صلي الله عليه و سلم خرج عام الفتح إلى مكة في رمضان، فصام حتى بلغ كراع الغميم فصام الناس، ثم دعا بقدح من ماء فرفعه حتى نظر الناس إليه ثم شرب، فقيل له بعد ذلك: إن بعض الناس قد صام، فقال: أولئك العصاة أولئك العصاة.
জাবের (রা:) এর হাদিস্তআমুল ফাতাহ-বিজয়ের বছর রাসূল যখন মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, রাসূল (সা:) তখন ‘কিরাউল গামীম’ পৌঁছা পর্যন্ত রোজা রাখলেন। তার সাথে অন্যরাও রোজা রাখল। অত:পর তিনি একটি পানির পাত্র আনিয়ে, সবাই দেখতে পায় এমনভাবে উঁচু করে পান করলেন। তখন তাঁকে বলা হল, কেউ কেউ তো রোজা রেখেছে ! তিনি বললেন : ‘তারা অবাধ্য, তারা অবাধ্য’।[৩৫৬]
এই হাদিসে দেখা যাচ্ছে সফরে রোজা জায়েজ হওয়া সত্ত্বেও রাসূল তা থেকে বাধা দিচ্ছেন। এর দুটি কারণ হতে পারে : এই কাজ ছিল মানুষের জন্মজাত স্বভাব উপযোগী আদেশের বিরোধী কিংবা তখন রোজা রাখা তাদের জন্য ক্ষতিকর ও কষ্টকর হতে পারত।[৩৫৭] এইভাবে উত্তম না হওয়ার ফলেই একটি জায়েজ আমল থেকে যখন রাসূল এইভাবে বাধা দিচ্ছেন তখন তা থেকে অতি সহজেই বুঝা যায়, প্রতি মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে : সাধ্য অনুসারে ভাল কাজের প্রচার-প্রসার করা এবং এই মহান মাসকে ধ্বংসাত্মক বিষয়গুলো থেকে পবিত্র রাখা, যেগুলো অনেক সময় শুধুই ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি বা ছোট-খাটো কোন অপরাধ থাকে না। বরং পরিকল্পিত ও সচেতন ইচ্ছেজাত অপরাধ হয়ে উঠে। প্রতিটি মুসলমানকেই এই কাজটি করতে হবে। কারণ আমাদের রাসূল আদেশ করেছেন :
من رأى منكم منكرا فليغيره بيده، فإن لم يستطع فبلسانه، ومن لم يستطع فبقلبه، وذلك أضعف الإيمان.
অর্থাৎ্ততোমাদের কেউ যখন কোন অপকর্ম দেখে তখন সে যেন কর-জোর প্রয়োগ করে তাকে বদলে দেয়, যদি তা না পারে তাহলে যেন মুখের ভাষায় তার প্রতিবাদ করে। যদি তাও না পারে তাহলে মনে মনে তার প্রতিবাদ করে।[৩৫৮]
না-ছোড়দের শিক্ষাদান
এটা মূলত শিক্ষাদান ও চরিত্র প্রশিক্ষণের একটি বিশেষ শৈলী, প্রজ্ঞাবান প্রশিক্ষক অনেক সময় যা অবলম্বন না করে পারেন না।
তার প্রমাণ : উমর বিন আবু সালামা (রা:) এর হাদিস,
أنه سأل رسول الله صلي الله عليه و سلم أيقبل الصائم؟، فقال له رسول الله صلي الله عليه و سلم: سل هذه ্রلأم سلمةগ্ধ، فأخبرته أن رسول الله صلي الله عليه و سلم يصنع ذلك، فقال: يا رسول الله، قد غفر الله لك ما تقدم من ذنبك وما تأخر، فقال له رسول الله:: أما والله إني لأتقاكم لله وأخشاكم له.
তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, রোজাদার কি (স্ত্রীকে) চুম্বন করতে পারবে ? তিনি বললেন, উম্মে সালামাকে জিজ্ঞেস কর। তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করে থাকেন। তখন সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আল্লাহ তো আপনার পূর্বাপর যাবতীয় গোনাহ মাফ করে দিয়েছেন !! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : ‘জেনে রাখ আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকী ও আল্লাহ-ভীরু।'[৩৫৯]
তার আরেকটি প্রমাণ :
نهى رسول الله صلي الله عليه وسلم عن الوصال في الصوم، فقال له: رجل من المسلمين: إنك تواصل يا رسول الله؟، قال: وأيكم مثلي؟!، إني أبيت يطعمني ربي ويسقين، فلما أبوا أن ينتهوا عن الوصال واصل بهم يوماً ثم يوماً ثم رأوا الهلال، فقال: ্রلو تأخر لزدتكم!গ্ধ كالتنكيل لهم حين أبوا أن ينتهوا.
আবু হুরায়রা (রা:) এর হাদিস, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ছওমে ওসাল’ বিরামহীন (মাঝে ইফতার ও সেহরি না খেয়ে রোজা রাখা) রোজা রাখতে নিষেধ করলেন। তখন এক সাহাবি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আপনি তো তা করে থাকেন। উত্তরে তিনি বললেন ‘তোমাদের কে আমার মত ? রাতে আমার রব আমাকে পানাহার করান’। এরপরও যখন তারা লাগাতার রোজা থেকে বিরত থাকল না তখন তিনি তাদের নিয়ে লাগাতার রোজা রাখতে থাকলেন, এক দিন তারপর আরেক দিন। তৃতীয় দিন চাঁদ দেখা গেল। তখন, যারা সওমে ওসাল থেকে বিরত থাকতে অস্বীকার করেছিল তাদের ভর্ৎসনা করে বললেন : যদি চাঁদ উঠতে আরো বিলম্ব হত তাহলেও তোমাদের নিয়ে আরো ওসাল করতাম’।[৩৬০]
এর আরেকটি প্রমাণ : আনাস (রা:) এর হাদিস :
فأخذ يواصل رسول الله صلى الله عليه و سلم، وذاك في آخر الشهر، فأخذ رجال من أصحابه يواصلون، فقال النبي صلى الله عليه و سلم: ما بال رجال يواصلون؟ إنكم لستم مثلي!، أما والله لو تَمَادَّ لَي الشهر لواصلت وصالاً يدع المتعمقون تعمقهم.
‘…তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওসাল করতে লাগলেন। ব্যাপারটি ঘটল মাসের শেষ দিকে। তখন তাঁর দেখাদেখি কিছু সাহাবিও ওসাল শুরু করলেন। তা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু বললেন, এই লোকদের ব্যাপারটা কি, তারা ওসাল শুরু করল কেন ? তোমরা তো আমার মত নও। আল্লাহর কছম ! যদি মাস দীর্ঘ হত তাহলে আমি ওসাল করে যেতাম যাতে না-ছোড়রা তাদের না-ছোড়ামী ছেড়ে দিতে বাধ্য হত’।[৩৬১]
ইসলামি শরিয়ত মূলত সহজ ও অনায়াস সাধ্য শরিয়ত। তার একটি প্রধান মূলনীতি হচ্ছে, সহজতা, কঠিনতা দূর করা, সহমর্মিতা প্রদর্শন। এই ক্ষেত্রে অনেক ‘নস’ পাওয়া যায়। ‘এই দ্বীন নিয়ে যারা বাড়া-বাড়ি করে দ্বীন নিজেই তাদের উপর প্রবল হয়ে যায়’।[৩৬২]
এটি মূলত রাব্বানি, ঐশী দ্বীনের বৈশিষ্ট্য, যা মানুষের বাস্তবতা এবং প্রাকৃতিক স্বভাবের প্রতি লক্ষ রেখে প্রণীত। এবং এই দ্বীনকেই আল্লাহ কেয়ামত অবধি বহাল রাখতে চান। আমাদেরকে এই মহান নেয়ামতে ভূষিত করার জন্য আল্লাহর অশেষ শুকরিয়া।
সওমে ওসাল নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ভর্ৎসনা মূলত: এই মূলনীতির উপর নির্ভর করেই করা হয়েছে। কারণ রাসূল দেখেছিলেন এই রোজা সাহাবায়ে কেরামের জন্য কঠিন ও কষ্টসাধ্য হয়ে যাবে। কিন্তু যখন কারো কারো বেলায় মৌখিক ভর্ৎসনা ব্যর্থ হল তখন মৃদু শাস্তির প্রয়োজন পড়ল। তবে মনে রাখতে হবে, এই শাস্তি কোন হারাম কাজের জন্য ছিল না। কারণ যদি হারামই হত তাহলে তা সাহাবায়ে কেরাম নিজেরাও করতেন না এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তার উপর তাদের বহাল রাখতেন না। বরং তা ছিল একটি জায়েজ এবাদত। তবে তা তাদের জন্য কষ্ট সাধ্য ছিল। তারপরও যখন তারা তা করতে চাইলেন তখন রাসূল তা আরো বেশি করে করতে দিলেন যাতে তারা নিজেদের সাথে রাসূলের পার্থক্য বুঝতে পারে। এইভাবে অভূতপূর্ব এক সহমর্মীপ্রবণ ও মমতাময়ী পদ্ধতিতে রাসূল বিষয়টির সমাধান করেন।
ফিতরা আদায়ের আদেশ
তার প্রমাণ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক হাদিসে আছে-
فرض رسول الله صلي الله عليه وسلم زكاة الفطر صاعاً من تمر أو صاعاً من شعير، على العبد والحر والذكر والأنثى والصغير والكبير من المسلمين، وأمر بها أن تؤدّى قبل خروج الناس إلى الصلاة.
ইবনে উমর (রা:) এর হাদিস : তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিতরা নির্ধারণ করলেন এক সাআ’ খেজুর বা এক সাআ’ জব। তিনি স্বাধীন, দাস, নারী-পুরুষ সবার উপর ফেতরা ওয়াজিব করলেন। এবং ঈদের সালাতে যাওয়ার পূর্বে তা আদায় করার আদেশ দিলেন।[৩৬৩]
আব্দুল্লাহ ইবনে সা’লাবা (রা:)-এর হাদিস, তিনি বলেন, ঈদুল ফিতরের একদিন বা দুই দিন পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন, তিনি তাতে বললেন, তোমারা দুই জনের জন্য এক সাআ’ গম বা প্রতি জনের জন্য এক সাআ’ খেজুর বা এক সাআ’ জব আদায় কর, ছোট বড় সবার পক্ষ থেকে।[৩৬৪]
আবু সাঈদ খুদরি (রা:) এর হাদিস : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ঈদের দিন আমরা এক সাআ’ খাবার দান করতাম। তিনি বলেন, আমাদের সেই খাদ্য ছিল জব, কিসমিস, খেজুর এবং পনির।[৩৬৫]
ইবনে আব্বাস (রা:) এর হাদিস, তিনি বলেন রোজাদারকে ত্রুটিমুক্ত করার জন্য এবং মিসকিনদের আহারের ব্যবস্থার লক্ষ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাকাতুল ফিতর ওয়াজিব করেন। যে ব্যক্তি ঈদের নামাজে যাওয়ার পূর্বে তা আদায় করবে তারটাই নির্ধারিত জাকাতে আদায় বলে বিবেচিত হবে। আর কেউ যদি তার পর আদায় করে তাহলে তা সাধারণ ছদকা হিসেবে বিবেচিত হবে।[৩৬৬]
কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি সালাত হয়ে যাওয়ার পর ঈদের কথা জানতে পারে বা জাকাত আদায় কালে সে পল্লিতে (যেখানে ঈদের নামাজ হয় না) কিংবা সেই সময় সে এমন কোন স্থানে থাকে যেখানে জাকাতের অধিকারী কেউ নেই, তাহলে নামাজের পর যখন তার পক্ষে সম্ভব হয় তখন আদায় করলেই হবে। কারণ এতটুকই তার সাধ্যের মধ্যে আছে। রহমান আল্লাহ কারো উপরে তার সাধ্যের অধিক কোন কিছু চাপিয়ে দেন না।[৩৬৭]
আমাদের এই কালে নিঃসন্দেহে মুসলমানদের দান ও বিভিন্ন ভাল কাজের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ইসলামের এই বিধানটি তার সঠিক ও শরিয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে আদায়ের ক্ষেত্রে নানা দুর্বলতা রয়েছে। তাই দায়িদের উচিত এই ক্ষেত্রে সময় দেওয়া, এই বিধান পালনে উৎসাহিত করা এবং তা আদায়ের সঠিক সময় ও পদ্ধতির দিক নির্দেশনা দেয়া। তাহলেই তার যে লক্ষ্য তা বাস্তবায়িত হবে : ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে ধনী-দরিদ্র প্রতিটি মুসলিম পরিবারের মাঝে।
তারাবীহ নামাজের রাকাতের মত এটি একটি বাৎসরিক বিতর্কিত মাসআলা। এই ক্ষেত্রে আমাদেরকে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। সম্ভবত তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে :
১. বিরোধী চিন্তাকে- যারা নগদ টাকায় ফেতরা আদায়ের কথা বলেন- উদারভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা চর্চা করা। আমাদের বুঝতে শিখতে হবে যে, যারা এই ক্ষেত্রে ভিন্ন মত পোষণ করছেন তারা- যদিও আমরা এর বিপরীত মতটাকেই সঠিক মনে করছি- মূলত একটি নির্দিষ্ট চিন্তা-যুক্তি থেকেই তা বলছেন এবং তাদেরও উদ্দেশ্য জাকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে শরিয়তের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা। জাকাতুল ফিতর নিয়ে বিতর্ক অনেক পুরোনো এবং সম্পূর্ণভাবে তা দূর করা সম্ভব নয় এবং তা আমাদের লক্ষ্য হওয়াও উচিত নয়। এই ক্ষেত্রে সর্বোত্তম কর্মপন্থা হচ্ছে জ্ঞান সাধক তার নিকট যে মতটি শক্তিশালী গ্রহণযোগ্য প্রমাণসিদ্ধ মনে করে সে তাই গ্রহণ করবে এবং যে কোন বিরোধী মতকে উদারতার সাথে গ্রহণ করবে এবং সবাই মিলে সাধারণ মুসলমানদেরকে বিতর্কের অনিষ্ট থেকে উদ্ধার করা এবং শরিয়তি এবাদতগুলোর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন এবং মুসলিম শরিয়া বিশেষজ্ঞদের প্রতি সাধারণের আস্থা বজায় রাখার চেষ্টা করবে। এ ছাড়া অর্থহীন, মন-মানসিকতা বিনষ্টকারী যে সব বিতর্ক হয় তাতে জড়িয়ে কোন লাভ নেই। এই সব বিতর্ক আমাদের অনেক ক্ষতি করছে। অনেক সময় তা বরকত থেকে বঞ্চনার কারণ হয়ে উঠে। আমাদের মনে রাখা উচিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে শবে কদর নিয়ে দুই ব্যক্তির ঝগড়ার কারণ এই সংক্রান্ত জ্ঞানকে ঊর্ধ্বাকাশে চির দিনের জন্য তুলে নেওয়া হয়েছিল।
২. যে নিরাপদ ও বিতর্ক মুক্ত থাকতে চায় এই ক্ষেত্রে তার জন্য সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে তার নিজ দেশে প্রচলিত খাবার দ্বারা ফিতরা আদায় করা। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করতেন এবং এই ক্ষেত্রে কারো কোন বিতর্ক নেই। পক্ষান্তরে নগদ টাকায় আদায় করলে হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
৩. সাদকায়ে ফিতরের যে লক্ষ্য- ঈদের দিনে দরিদ্রদের প্রয়োজন পূরণ করা, তাদের আনন্দে সহযোগিতা করা, সদকা আদায়ের সময় তার প্রতি মনোযোগী থাকা উচিত। দরিদ্রদের চাহিদা এবং প্রয়োজনের দিকে না তাকিয়ে নিজেদের ইচ্ছে মত খাবার দান করার দ্বারা এই লক্ষ্য অনেক সময় বাস্তবায়িত হয় না। এর মাধ্যমে নি:সন্দেহে জাকাত আদায় হয়ে যাবে। তবে যেহেতু তা সদকার মূল লক্ষ্য পূরণ করছে না, তাই তা উত্তম হওয়ার কথা নয়। আল্লাহই ভাল জানেন।
অনুরূপ নিম্নমানের খাদ্য দানের ক্ষেত্রে এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হয় না। এই ক্ষেত্রে মিসকিনরা তা ব্যবসায়ীর নিকট বা অন্যান্য সদকা দানকারীদের নিকট সেই খাদ্য বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। ফলে ব্যবসায়ীরা লাভবান হয় এবং ঈদের দিনে দরিদ্রের প্রয়োজন পূরণের যে লক্ষ্য ছিল তা অনর্জিত থেকে যায়।
এই ভুলের উৎস হচ্ছে সদকার জন্য সঠিক ও উপযোগী খাদ্য নির্বাচন ও তার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। যদি দানকারীরা সঠিক উপযোগী খাদ্য দ্বারা সদকা আদায় করত তাহলে অবশ্যই খাদ্য দ্বারা সদকা করার নানা হিকমত আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে উঠত।
৪. জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে মূল বিধান হচ্ছে নিজেদের দেশ-মহল্লাতেই তা আদায় করা। অন্য কোন দেশ বা নিজ দেশেরও অন্য কোন এলাকায় তা পাঠানো উচিত নয়। এই ক্ষেত্রে যে নির্বাধভাবে তা করা হয় তা সঠিক পদ্ধতি নয়। যদি নিজ দেশে জাকাতের আদায়ের মত দরিদ্র না থাকে তাহলে আমরা বলি অন্য দেশ বা এলাকায় তা পাঠানো যায়। তবে এই ক্ষেত্রে শরিয়তি দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়া এবং সঠিকভাবে তা আদায় করার জন্য বিশ্বস্ত হাতে তা অর্পণ করা উচিত।
. অনেক ব্যক্তি যে জাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সেবা সংস্থাকে উকিল নিয়োগ করেন, সে ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় কিছু ভুল করা হয়। যেমন উক্ত সংস্থা মিসকিনের পক্ষ থেকে উকিল হয়ে তা গ্রহণ করেন না বরং তিনি হন আদায়ের ক্ষেত্রে দানকারীর উকিল। এর প্রমাণ, আদায়ের সময় তিনি যাকে ইচ্ছে তাকে দান করতে পারেন। মাসআলার বিচারে এই ওকালত সুদ্ধ নয়। সদকা দানকারী যদি বিশ্বস্ত কাউকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে দরিদ্রের উকিল নিয়োগ করেন তাহলেই ওকালাত সুদ্ধ হবে। অন্যথায় এই ওকালত সুদ্ধ হবে না এবং জাকাতও আদায় হবে না।
কোন কোন কাজে অন্যদের দায়িত্ব দেয়া
প্রমাণ :
وَكَلني رسول الله صلي الله عليه وسلم بحفظ زكاة رمضان؛ فأتاني آتٍ فجعل يحثو من الطعام؛ فأخذته فقلت: لأرفعنك إلى رسول الله صلي الله عليه وسلم…
আবু হুরায়রা (রা:)-এর হাদিস : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রমজানের জাকাত সংরক্ষণের দায়িত্ব দিলেন। তখন আমার নিকট এক আগন্তুক এসে মুঠো ভরে খাবার নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে বললাম : আমি তোমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে যাব…।[৩৬৮] এই ভাবে তিনি তার দায়িত্ব-ভার কিছুটা লাঘব করতেন।
ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষ সব কাজ নিজে নিজে আদায় করতে পারেন না। তাই অনিবার্য কারণবশতই দায়িত্বশীলকে অন্যকে তার প্রতিনিধী দায়িত্বশীল নিয়োগ করতে হয়। এইভাবে তিনি অনেক কাজ আঞ্জাম দিতে পারেন। তবে এই লক্ষ্য তখনই বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব যখন যাদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে তারা প্রধান দায়িত্বশীলের আস্থাভাজন ব্যক্তি হন এবং তিনি তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের জায়গাগুলো সম্পর্কে সম্মক অবগত থাকেন। যাতে তিনি সবাইকে তাদের উপযোগী কাজগুলোর দায়িত্ব দিতে পারেন। এবং তারাও দায়িত্বটি সঠিকভাবে আদায় করতে পারে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে এভাবেই কাজ করেছেন। তাদেরকে বিভিন্ন কাজের দায়িত্বশীল বানিয়েছেন। এই অনুশীলনের মধ্য দিয়ে এক সময় তারা হয়ে উঠেছিলেন আলোকিত দীপ, উম্মাহর পথপ্রদর্শক, বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বশীল। আল্লাহ তাআলা তাদের মাধ্যমে পৃথিবীকে নতুন জীবন দান করেছেন এবং মানব ইতিহাসের আকাশকে আলোকিত করেছেন।
আজকাল দেখা যায় অনেক সালেহ, মহান ব্যক্তিগণ, সৎ কাজের প্রতি অতি আগ্রহের কারণে, নিজেই সব দায়িত্ব পালন করতে চান। ফলত কোনটাই তারা ্পূর্ণাঙ্গ করতে পারেন না। কিংবা এক সাথে অনেক কাজে হাত দেন, অথচ তার জন্য উপযোগী ছিল এর মাঝে প্রধান কাজগুলো আঞ্জাম দেওয়া। আবার অনেকে এমন ব্যক্তিদের হাতে দায়িত্ব ছেড়ে দেন যারা এই সব দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম না। নি:সন্দেহে এ এক দু:খজনক বাস্তবতা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে তার সাহাবিদের হাতে বিভিন্ন দায়িত্ব ছেড়ে দিতেন, আজ আমাদের উলামারাও তার প্রয়োজন বোধ করছেন। এই সংকট অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় এখন অনেক তীব্র। বিশেষত রমজানে এই সংকট তীব্র হয়ে উঠে। কারণ এই সময় তারা অনেক মহান কাজের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। এই সংকট থেকে মুক্তির জন্য তাঁদের উচিত দায়ি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা এবং যোগ্য দায়ি গড়ে তোলা, যাদের হাতে বিভিন্ন দায়িত্ব ছেড়ে তারা তাদেরকে উপযুক্ত করে তুলবেন এবং তাদের মূল্যবান সময়কে তুচ্ছ কাজে জড়ানো থেকে হেফাজত করতে পারবেন। ফলত তারা আরো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর প্রতি মনোযোগ দিতে পারবেন।
দ্বীনের জ্ঞান চর্চা এবং দ্বীনের ময়দানে দাওয়ার ক্ষেত্রে যা আমাদের জন্য কল্যাণকর, উপযোগী, যাতে ইসলাম ও মুসলমানদের সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে, রহমান আল্লাহর নিকট আকুল প্রার্থনা আল্লাহ যেন তা করার তওফিক দান করেন।
রমজানের পরও এবাদত অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদান
এবাদত এবং আল্লাহ আনুগত্যে অব্যাহত থাকতে পারা এবাদত পালনে বান্দা সফল, যথার্থ তওফিকপ্রাপ্ত এবং আল্লাহ তার আমল কবুল করেছেন্ততার অন্যতম প্রমাণ। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবিদেরকে, রমজান অতিবাহিত হওয়ার পরও রমজান মাসের সে এবাদত্তসিয়াম, তা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। রাসূল বলেন :
من صام رمضان، ثم أتبعه بست من شوال فكأنما صام الدهر.
‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখে অত:পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখে সে যেন গোটা বছর রোজা রাখে’।[৩৬৯]
বস্তুত আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আমল হচ্ছে য্তাস্বল্প হলেও্তস্থায়ী। আর পুণ্য ও পাপ দুটিই তার সমগোত্রীয়কে ডেকে আনে। এই কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যাবতীয় আমল ছিল স্থির স্থায়ী।[৩৭০] তিনি যখন কোন আমল শুরু করতেন তখন তা স্থায়ীভাবে পালন করতেন।[৩৭১]
যে ব্যক্তি রাসূলের আদর্শের প্রত্যয়ী, অনুসারী সে স্বাভাবিকভাবেই এই পবিত্র মাসের পর এবাদত, আল্লাহর আনুগত্য অব্যাহত রাখবে। কারণ, সব মাসের রব তো অভিন্নই এবং সময় দ্রুত ধাবমান, জীবন প্রতি মুহূর্তে সংকুচিত হয়ে আসছে, আর আল্লাহর পণ্য অনেক মূল্যবান, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও আনুগত্যের পরম ও চরম সাধনা না করলে মানুষ এই মূল্যবান বস্তু অর্জন করতে পারবে না। অব্যাহত এবাদত ও সাধনাই একমাত্র বান্দাকে তা অর্জনের তওফিক ও রহমত দান করতে পারে।
অন্যান্য সময়ের তুলনায় রমজানে বান্দা অধিক এবাদত করব্তেসন্দেহ নেই এটাই সুন্নতি পদ্ধতি। যেমন ইবনে আব্বাস (রা:)-এর হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন:
كان رسول الله صلي الله عليه وسلم أجود الناس بالخير، وكان أجود ما يكون في رمضان.
‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচেয়ে বড় দানবীর আর রমজানে তিনি (অন্য সময়ের তুলনায়) বেশি দানবীর হয়ে উঠতেন’।[৩৭২] এবং আয়েশা (রা:) এর হাদিস :
كان رسول الله صلي الله عليه وسلم يجتهد في العشر الأواخر ما لا يجتهد في غيرها.
‘রমজানের শেষ দশ দিনে রাসূল অন্য সময়ের তুলনায় বেশি এবাদত করতেন’।[৩৭৩]
তবে এর অর্থ এই নয় যে, রমজান হচ্ছে এবাদতের মৌসুম, ফলে রমজানেই এবাদত করবে অন্য সময়ে বেশি এবাদত করতে হবে না। এই হাদিস এবং এই ধরনের অন্যান্য নসগুল্তোযা রমজানের ও অন্যান্য মাসের এবাদতের তুলনামূলক পার্থক্য প্রমাণ র্কতেস্বয়ং এই নসগুলো থেকেই প্রমাণ করা সম্ভব যে, এবাদত কোন মৌসুমি বিষয় নয় যে নির্দিষ্ট মৌসুমে তা করা হবে অন্য সময় বেশি না করলেও হবে। তার প্রমাণ হাদিসে উল্লেখিত أجود (অধিক দানশীল হয়ে উঠতেন) শব্দটি। মানে রমজানে রাসূল অন্য সময়ের তুলনায় বেশি দান করতেন। এ থেকে প্রমাণিত হয় না যে, তিনি অন্য সময়েই এই কাজ, দান করতেন না ; তবে এই নির্দিষ্ট সময়ে তা হত তুলনামূলক বেশি।
অনুরূপ ‘يجتهد في العشر الأخير ما لا يجتهد في غيرها (শেষ দশ দিনে তিনি তুলনামূলক বেশি এবাদত করতেন) এ থেকেই কিন্তু প্রমাণিত হয় যে, অন্য সময়েও এই এবাদত করতেন। তবে এই সময়ে তুলনামূলক বেশি করতেন। বস্তুত রমজান হচ্ছে তাকওয়ার পাথেয় সংগ্রহের কাল। এই সময়েই যে যথার্থ পরিমাণে পাথেয় সংগ্রহ করবে, তার উপর নির্ভর করেই সে নিরাপদে ও উদ্দীপনার সাথে পরবর্তীতে স্টেশন অর্থাৎ পরবর্তী পাথেয় অর্জনের কাল দ্বিতীয় রমজানে পৌঁছে যাবে।
তবে স্বাভাবিকভাবেই, এবাদতের বৃত্তিগুলোকে শক্তিশালী করার আগ পর্যন্ত বান্দা এই শক্তি অর্জন করতে পারবে না। এবাদতের বৃত্তিগুলোকে প্রখর ও শক্তিশালী করার উপায় হচ্ছে, স্রষ্টার পরাক্রম, সম্পূর্ণাঙ্গতা, প্রতিদান ইত্যাদি সিফাতগুলো ভেবে তাঁর বড়ত্ব, দুনিয়ার তুচ্ছতা ও আখেরাতে গুরুত্ব এই সব ভাবনা মনে দৃঢ় করা এবং জান্নাতের নেয়ামত্তযা আল্লাহ মোমেনদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন, যা দেখেনি কোন চোখ, শোনেনি কোন কান এবং কোন মানুষের কল্পনাতেও যা কখনো উদিত হয়ন্তিএবং যে তাঁর জিকির থেকে উদাসীন থাকে তার উচিত তিনি যে ভয়ংকর জীবন এবং তপ্ত অগ্নি প্রস্তুত করে রেখেছেন তার বিশ্বাস মনে বদ্ধ মূল করবে। এই ভাবে বান্দার মনে আল্লাহর ভালোবাসা এবং তার ভয় বৃদ্ধি পাবে।
স্থায়ী লাগাতার এবাদতের শক্তি অর্জনের আরেকটি উপায় হচ্ছে এবাদতকে উপভোগ্য করে তোলা। মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় করা যে, এবাদতই হচ্ছে তার প্রশান্তি ও আনন্দের প্রধান অনুষঙ্গ। কারণ মানুষ যখন কোন কিছুকে পছন্দ করে তখন তা তার জন্য উপভোগ্য বিষয় হিসেবে হাজির হয় এবং তা বেশি বেশি করা তার জন্য কষ্টকর হয় না। মূলত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য এবাদত এমন উপভোগ্য ও শান্তিদায়ক ছিল। তাই তিনি বেলাল (রা:)-কে বলেছিলেন :
يا بلال: أقم الصلاة، أرحنا بها.
‘বেলাল ! নামাজের ব্যবস্থা কর এবং তার মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি দাও’।[৩৭৪]
তিনি আরো বলেছেন :
وجعلت قرة عيني في الصلاة.
‘আমার নয়নের শীতলতা রাখা হয়েছে নামাজে’।[৩৭৫] অনুরূপ এক রাতে তিনি তার স্ত্রীকে বলেছিলেন,
يا عائشة ذريني أتعبد لربي، قالت: والله إني لأحب قربك، وأحب ما سرَّك، قالت: فقام فتطهر ثم قام يصلي.
‘আয়েশা, ছাড় ! আমি আমার রবের এবাদত করব। তখন তিনি বললেন : আল্লাহ কছম আমি আপনার সান্নিধ্য পছন্দ করে এবং যা আপনাকে আনন্দ দেয় তাও পছন্দ করি। তিনি বলেন, তখন তিনি উঠে গিয়ে উজু করে নামাজ পড়তে লাগলেন।'[৩৭৬] এরপর বিস্মিত আয়েশা রাসূলের নামাজ, তার খুশু, কান্নার বিবরণ দিয়েছেন।
যে এবাদত উপভোগ করে আর যে নিছক দায়িত্ব পালনের জন্য বাধ্য হয়ে, কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তা আদায় করে তাদের উভয়ের পার্থক্য খুবই স্পষ্ট।
‘এবাদতের মৌসুম’-গুলো ছাড়া অন্য সময়ে, আলসেমি ও উদাসীনতার ফলে, আমরা যে সময় অপচয় করি সম্ভাবনার অপব্যবহার করি, তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক-জাতীয় শুমারি নিলে দেখা যাবে এতে আমাদের ক্ষতির পরিমাণ কি ভয়ানক-প্রকাণ্ড।
বস্তুত আমরা অনেক সময়েই অলস কর্মহীন সময় কাটাচ্ছি। অথচ কেয়ামতের দিন প্রতিটি বান্দাই কামনা করবে : তার সঞ্চয়ে যদি আরো কিছু পুণ্য থাকত !! যা দিয়ে কোন পাপ মোচন করতে পারে বা স্তর উন্নতি ঘটাতে পারে।
‘এবাদতের মৌসুম’ ছাড়া অন্যান্য মৌসুমে এবাদত, দাওয়াত, ও অন্যান্য দ্বীনী তৎপরতায় উদাসীনতা ও আলসেমির ফলে ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে আমারা যে কি ভীষণ অপরাধ করছি, এর ফলে আমরা কি পরিমাণ সময় ও অপার সম্ভাবনা নষ্ট করছি এবং উম্মাহর কল্যাণে, দাওয়াতি এলাকায় বা অন্য ক্ষেত্রে তার যথার্থ প্রয়োগ হলে তার কি ইতিবাচক ফল ফলত্ততার হিসেব আমাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে যাবে।
রমজানে সবচেয়ে বড় পাওনা হচ্ছে, তা আমাদেরকে এই আত্মবিশ্বাস দান করে যে, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় রাখতে পারলে, তাঁর সহযোগিতা পেলে এবং যথার্থ চেষ্টা করলে আমরা অনেক অনেক কাজ করতে পারি।
রমজানে আমাদের তৎপরতাই হতে পারে অন্যান্য সময়ের জন্য আমাদের সবচেয়ে কার্যকর আদর্শ। রমজানে আমরা এই এই… কাজগুলো করেছি, অর্থ হচ্ছে আমরা ইচ্ছে ও চেষ্টা করলে অন্য সময়ে তা করতে পারি। তা আমাদের সক্ষমতার মধ্যেই আছে। অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। অন্য সময়ে নানা প্রতিবন্ধকতার দোহাই দেওয়া যাবে না। ব্যক্তিগত বা সামাজিক এই সব প্রতিবন্ধকতা রমজানে যদি আমরা অতিক্রম করতে পারি, তাহলে, সেই উদ্দীপনা টিকিয়ে রাখলে অন্য সময়ে আমরা তা অতিক্রম করতে পারব। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু সর্বদা আমাদের দেখছেন। জান্নাত জাহান্নামও প্রস্তুত এবং সেই সাথে প্রস্তুত হচ্ছে তার নাগরিকরা।
সুতরাং রমজান ও তার বরকত এবং জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত ও জাহান্নামে দ্বার বন্ধ এবং শয়তান মুক্ত হয়ে যাওয়ার পূর্বে আমাদেরকে সেই ম্যাপ ও প্ল্যান তৈরি করে নিতে হবে, পরবর্তী পাথেয় অর্জনের স্টেশনে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত কল্যাণের প্রতি যাত্রায় যার উপর দিয়ে আমরা হেঁটে যাব্তসম্পূর্ণ উদ্যমের সাথে, আল্লাহর সাহায্য নিয়ে। কারণ তিনি ছাড়া আর কোন শক্তি নেই। আমরা তার মুখাপেক্ষী বান্দা।
শাওয়ালের রোজা সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু বলেছেন من صام رمضان যে রমজানের রোজা রাখল… এই থেকে বুঝা যায়, কারো যদি রমজানের কোন রোজা কাজা হয়ে যায় তাহলে সেই কাজা আদায় করেই সে শাওয়ালের রোজা রাখা শুরু করবে। কারণ, যার উপর কাজা আছে তার ক্ষেত্রে বলা যায় না যে, সে রমজানের রোজা রেখেছে। কাজা আদায়ের পর সে শাওয়ালের ছয় রোজা রাখব্তেলাগতার বা বিরতি দিয়ে, মাসের যে কোন দিনে। তবে শুরুতে, তাড়া-তাড়ি রাখাই উত্তম। সপ্তাহের যে কোন দিনে এই রোজা রাখতে পারে। তবে সোমবার ও বৃহস্পতিবার এবং আইয়ামে বিজ-এ (মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখ) এই রোজা অন্য সময়ে রাখার তুলনায় উত্তম। আল্লাহ ভাল জানেন।
আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথে রাখুন। আমাদেরকে যথার্থ পথ প্রদর্শন করুন। আমাদেরকে আপনার রহমত দান করুন, আমাদেরকে বেশ বেশি অনুগ্রহ করুন্তহে সবচেয়ে বড় দয়ালু, হে মহান দাতা।
উপসংহার
এতক্ষণ, পিছনের পৃষ্ঠাগুলোতে, আমরা ইতিহাসের এক বরকতময় অধ্যায় পাঠ করেছি, সৌরভময় যে অধ্যায়ে আছে আমাদের হাবিব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন চরিত। আমরা কিছু সময় তার সুশীতল ছায়ায় অবস্থান করেছি। জানতে পেরেছি এই পবিত্র মাসের আগমন ঘনিয়ে এলে তিনি কেমন আনন্দিত হয়ে উঠতেন, উদ্বেল হতেন অপার মহিমায়, যথার্থভাবে তা যাপনের প্রস্তুতি নিতেন এবং এই মাসে তিনি কি গভীর একনিষ্ঠা ও স্থায়িত্বের সাথে তার রবের এবাদত করতেন।
সাথে সাথে আদায় করে যেতেন তার স্ত্রীদের যাবতীয় হক্ততাদের সামাজিক-পারিবারিক চাহিদা পূর্ণ করতেন, তাদের শিক্ষা দিতেন, নির্দেশনা দান করতেন।
সব কিছুর পর, এত সব কিছুর সাথে সাথে তিনি, গোটা একটি জাতির সংর্স্কাতমুর্খদের শিক্ষা, জ্ঞানীদের সঠিক নির্দেশনা প্রদান, তা পরিচালন্তাতার যে মহান ও কঠিন দায়িত্ব ছিল্তপালন করতেন সম্পূর্ণভাবে। এক কাজ অন্য কাজ থেকে তাকে সরিয়ে দিতে পারত না। এক দিকে নজর দিতে গিয়ে তিনি অন্য দিকের প্রতি কোন ধরনের উদাসিনতা প্রদর্শন করেননি।
মূলত তিনি হচ্ছেন মানবীয় পূর্ণতার এক পরম পরাকাষ্ঠা, আলো ছড়িয়ে মানবীয় আদর্শের সর্বোচ্চ আদর্শ নির্মাণ করেছেন তিনি। তিনি উম্মতের জ্ঞানী, দায়ি ও সর্ব সাধারণ্তসবার জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ ও প্রমাণ।
সুতরাং আমাদের যাবতীয় সফলতার অনিবার্য শর্ত হচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতের নির্মল-শীতল ছায়ায় জীবন যাপন কর্তাতিনি কেমন জীবন যাপন করতেন, কীভাবে তিনি তাঁর জীবনের পথে আদর্শ নির্মাণ করেছেন তা জানা এবং সে অনুসারে জীবন পরিচালনা কারা। কারণ, এই পথই হচ্ছে সর্বাধিক সরল ও সঠিক পথ এবং একমাত্র এই পথেই চলার মাধ্যমে মহান স্রষ্টার ভালোবাসা ও নৈকট্য অর্জন করা যাবে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
قل إن كنتم تحبون الله فاتبعوني يحببكم الله و يغفر لكم ذنوبكم و الله غفور رحيم.
আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবেসে থাক তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু।
আমি বিশ্বাস করি, যদি আমরা তা বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে দ্বীন যাপনের ক্ষেত্রে তার প্রকাশ্য ফলাফল দেখতে পাব। এবং বুঝতে পারব এই মাস যাপনের ক্ষেত্রে উম্মতের অধিকাংশ ব্যক্তির বাস্তবতা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের মাঝে ব্যবধান কত সুদূর। এর বিভিন্ন কারণ রয়েছে, তার অন্যতম :
১. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে রমজান যাপন করেছেন এবং তার সৌরভময় সিরাত এই ক্ষেত্রে কেমন ছিল তার সম্পর্কে অজ্ঞতা।
২. রোজার হেকমত এবং এই মাসে নির্ধারিত বিশেষ এবাদতগুলোর লক্ষ্য সম্পর্কে উদাসীনতা।
৩. অনেক মানুষের এই ধারণা যে, রোজা হচ্ছে কিছু বর্জনমুখী কর্ম। তারা রোজার সে সব করণমুখী বিষয়গুলো বেমালুম ভুলে যান, যা ছাড়া রোজার লক্ষ্য ও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব নয়।
৪. বিভিন্ন পাপ ও গোনাহ যে রোজাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে, সে সম্পর্কে উদাসিনতা। এই ধরনের গোনাহ রোজা ভঙ্গ না করলেও তার প্রতিদানকে কমিয়ে দেয়। এমনকি, যদি তা বড় আকার ধারণ করে তাহলে রোজাদারের ক্ষুৎ-পিপাসার কষ্ট বরণ করা সত্ত্বেও সে রোজা দ্বারা কোন ধরনের সওয়াব অর্জন করতে পারে না।
৫. এমন বিষয়ে লিপ্ত থাকা, য্তাজায়েজ হওয়া সত্ত্বেও্তরোজার লক্ষ্য অর্জনের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, অতিরিক্ত ও সুস্বাদু খাবার নিয়ে ব্যস্ত থাকা, অযথা রাত জেগে দিনে ঘুমানো, অর্থহীনভাবে সময় অপচয় করা, নানা সামাজিক সম্পর্ক গড়া ও রক্ষা করা, আখেরাতের প্রতি শিথিলতা করা এবং দুনিয়া ও স্বার্থ উদ্ধারে অতিরিক্ত লিপ্ত হয়ে পড়া।
এই সংকটগুলো এবং এই ধরনের সংকটময় পরিস্থিতিগুলো কাটিয়ে উঠা ও অনিষ্টকর পরিণতি থেকে মুক্তির জন্য যা করতে হবে তার অন্যতম :
প্রথমত : উম্মাহকে সঠিক পরিগঠন এবং তাদেরকে সঠিক নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে আলেম ও দায়িদের যে দায়িত্ব, তারা যথার্থভাবে তা পালন করবেন। বিভিন্ন পদ্ধতিতে তারা এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন। উদাহরণত, তাদেরকে শিক্ষাদানের লক্ষ্যে জনসাধারণের সাথে মিশতে পারেন। কিংবা, তারা তাদের উদ্দেশ্যে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ সম্ভব এবং শরীয়তে বিধানাবলী পালন উপযোগী জীবন্ত কিছু জীবনাদর্শ উপস্থিত করতে পারেন। কিংবা এই কাজ তারা করতে পারেন বিভিন্ন ধরনের প্রচার মাধ্যম বা নানা ধরনের যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
দ্বিতীয়ত : যারা আসলেই নিষ্ঠার সাথে জীবনের সাফল্য চান, ব্যক্তিগতভাবে তারা প্রত্যেকে এই জীবনে তার যে দায়িত্ব ও পালনীয় কর্তব্য রয়েছে, তা সঠিকভাবে পালন করে যাবে। এইভাবে তার মাঝে কর্মনিষ্ঠা তৈরি হবে এবং উদাসীনতা কেটে যাবে। এবং তার পক্ষে যে-যে ধর্মীয় কাজ ও এবাদত আদায় করা সম্ভব তার তুলনামূলক বিচার করে তার শ্রেষ্ঠগুলোর একটি তালিকা তৈরি করবে। যাতে সে, তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে না জড়িয়ে মূল ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ ও এবাদত চর্চা করতে পারে এবং তার সময়ের সর্বাধিক ফলপ্রসূ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। এবং সবাই নিজেকে, প্রথম ওয়াক্তে নামাজ পড়া, ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করে এবাদতে মগ্ন থাকা… এই জাতীয় এবাদতে নিজকে অভ্যস্ত করে তুলবে, যাতে পরেও এইগুলোর চর্চা অব্যাহত রাখতে পারে।
তৃতীয়ত : জীবনের সব ক্ষেত্রে এবং সব সময়, বিশেষত: রমজানে এবং রোজা পালনের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের অনুসরণকে সপ্রাণ ও সতেজ করে তোলা। এর জন্য প্রয়োজন রমজানের সঠিক শিক্ষা, তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঠিক জ্ঞান চর্চা ও তার প্রচার এবং সমাজের সেই বস্তুগত শর্ত তৈরি করা, যার ফলে আত্মিক পবিত্রতা অর্জন, কল্যাণের চর্চা ও প্রচার এবং অকল্যাণ থেকে বিরত থাকা এবং তার বিরোধিতা করা সহজ হয়।
চতুর্থত : মিডিয়া, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, দাওয়াত… ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে সব দ্বীনী প্রতিষ্ঠান আছে, যারা দ্বীনসম্মত এবং আধুনিক জীবন ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম, তাদের সামনে এমন নির্দেশনা হাজির করতে হবে, যাতে উম্মাহর প্রতিটি সদস্য, এমনকি, যুবক এবং বিশেষত: যুবতীরাও সঠিকভাবে এবং পূর্ণাঙ্গভাবে দ্বীন পালন করতে পারে।
পঞ্চমত : ব্যক্তিগতভাবে দায়িরা এবং দায়ি সংগঠনগুলো এই ক্ষেত্রে তার কর্মপদ্ধতি ও তৎপরতার পুনর্বিবেচনা করবেন, যাতে তারা, পরিমাণ ও মান উভয় ক্ষেত্রে তার সীমাবদ্ধতাগুলো চি‎িহ্নত করতে পারেন এবং এই সংকট মোকাবিলায় আরো কার্যকরী কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে পারেন। যাতে আমাদের তাকওয়া বাস্তব রূপ লাভ করে এবং আমাদের ইমান আরো মজবুত হয়ে উঠে।
আল্লাহ আমাদের তওফিক দান করুন।
সমাপ্ত
——————————————————————————–
[১] সূরা হাশর : আয়াত্ত৭
[২] সূরা নিসা : আয়াত্ত৮০
[৩] সূরা আলে ইমরান : আয়াত্ত৩১
[৪] মুসলিম্ত১৭১৮
[৫] বোখাির্ত৭২৮০
[৬] সূরা নিসা : আয়াত্ত৬৫
[৭] ইবনে কাসির : তাফসিরুল কোরআনিল আযিম ; খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫২১
[৮] ইবনে হাজার : ফতহুল বারি ; খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫৯
[৯] সূরা আহযাব : আয়াত্ত২১
[১০] সূরা ইউনুস : আয়াত্ত৫৮
[১১] ইমাম তাবারী : জামেউল বায়ান, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ৫৬৮
[১২] সূরা কাসাস : আয়াত্ত৭৬
[১৩] সূরা গাফের : আয়াত্ত৮৩
[১৪] আল্লামা সাদী : তাইসীরুল কারিমির রহমান, পৃষ্ঠা : ৩৬৭
[১৫] শাবান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক রোজা পালনের হিকমত কি ছিল ?্তএ ব্যাপারে তত্ত্বানুসন্ধানকারী উলামাদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। উল্লেখিত মতটি তার অন্যতম। ভিন্ন একটি মত হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি মাসে তিনটি রোজা পালন করতেন, এ মাসে তার কাযাগুলো আদায় করতেন। ভিন্ন কারো মত এই যে, তার স্ত্রীগণ রোমজানের কাযা রোজাগুলো এ মাসে পালন করতেন, তাই তিনিও তাদের সাথে রোজা রাখতেন। ইবনে হাজার তার ফাতহ গ্রন্থে (খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ২৫৩) বলেন, এ ব্যাপারে সর্বোত্তম ব্যাখ্যা এই যে, উসামা বিন যায়েদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে লক্ষ্য করে বললাম : হে আল্লাহর রাসূল ! শাবান মাসে আপনি যে পরিমাণ রোজা পালন করেন, অন্য কোন মাসে এতটা পালন করতে দেখি না ! রাসূল উত্তর করলেন, রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী মাস হওয়ার কারণে মানুষ এ মাসের ব্যপারে উদাসীন থাকে। এ এমন মাস, যে মাসে রবের নিকট আমল তুলে ধরা হয়। আমি চাই যে, রোজা পালনরত অবস্থায় আমার আমল তার নিকট পেশ করা হোক। হাদিসটি নাসায়ি বর্ণনা করেছেন (২৩৫৭) হাদিসটি হাসান। উল্লেখিত বিভিন্ন মতামতের মাঝে একটি মতকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেয়া যায় না।
[১৬] বোখারি : ১৯৬৯।
[১৭] মুসলিম : ১১৫৬।
[১৮] মাজমুঊ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমিন : খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ২২, ২৩।
[১৯] বোখারি : ১৮৯৯।
[২০] তিরমিজি : ৬৮৩, হাদিসটি সহি।
[২১] নাসায়ি : ২১০৬।
[২২] বোখারি : ১৭৯৭।
[২৩] আবু দাউদ : ২৩৪২। হাদিসটি সহি।
[২৪] আবু দাউদ : ২৩৪০।
[২৫] নাসায়ি : ২১১৬, হাদিসটি সহি।
[২৬] বোখারি : ১৮০৮।
[২৭] নাসায়ি : ২১৩০, হাদিসটি সহি।
[২৮] মুসলিম : ২০৮২।
[২৯] সন্দেহের দিন রোজা রাখার ব্যাপারে আলেমদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মত এই যে, তা নিষিদ্ধ। তবে যারা নিষিদ্ধ বলেছেন্তনিষেধটি কি হারাম ও মাকরূহ ?্তএ নিয়ে তাদের মাঝে বিরোধ রয়েছে। কোন কোন হাম্বলী ইমাম এ দিন রোজা রাখা ওয়াজিব বলেছেন। অপর কেউ বলেন, সতর্কতামূলক এ দিন রোজা পালন করা জায়েজ। ইমাম আবু হানিফা এ মত অবলম্বন করেছেন। ইমাম আহমদ থেকেও এই মত পাওয়া যায়। সাহাবি ও তাবেইনের বৃহৎ একটি দল, কিংবা তাদের অধিকাংশের মত এরূপই। ইবনে তাইমিয়া একই মত পোষণ করেছেন। দ্র : মাজমুঊ ফাতাওয়া : খণ্ড : ২৫, পৃষ্ঠা : ৯৮-১০০।
[৩০] তিরমিজি : ৬৮৬, হাদিসটি সহি।
[৩১] মাজমুউল ফাতাওয়্তাইবনে তাইমিয়া : খণ্ড : ২৫, পৃষ্ঠ : ১০১।
[৩২] ইবনে উসাইমিন : মাজমূঊ ফাতাওয়া : খণ্ড : ১৯, পৃষ্ঠা : ৩৬-৩৭।
[৩৩] তিরমিজি : ৬৯৭, হাদিসটি সহি।
[৩৪] কোন ব্যক্তি একাকী রোজার বা ঈদের চাঁদ দেখল, এবং মানুষ তার কথা গ্রহণ করল ন্তাতার ক্ষেত্রে কীভাবে সমাধান প্রদান করা হবে, এ ব্যাপারে আলেমগণ তিন মতে বিভক্ত হয়েছেন। একদলের মত এই যে, সে রোজা রাখবে, এবং যেহেতু সে নিচে চাঁদ প্রত্যক্ষ করেছে, তাই গোপনে রোজা ভঙ্গ করবে এবং আহার করবে। অপরদলের মত : রোজা পালন করবে এবং সকলের সাথে সম্মিলিতভাবে পরাদিন ঈদ পালন করবে। তৃতীয় মত হল : সে রোজা রাখবে সম্মিলিতভাবে সকলের সাথে, এবং ভাঙবেও তাদের অনুসারে। এটিও, উপরোক্ত হাদিসের আলোকে, উত্তম ও গ্রহণযোগ্য মত। ইবনে তাইমিয়ার মাজমুউ ফাতাওয়া দৃষ্টব্য। খণ্ড : ২৫, পৃষ্ঠা : ২১৪-২১৮।
[৩৫] নানা মতের মাঝে অধিক গ্রহণযোগ্য বক্তব্য অনুসারে এ সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে। ভূমিগত পার্থক্যের কারণে চাঁদ কখনো এক স্থানে দেখা দেয়, অপর স্থানে দেখা দেয় না। যদিও অন্যান্য ভূমির সাথে পার্থক্য হয়, তবু নির্দিষ্ট ভূমির অধিবাসীরা তাদের দেখার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। কোন ভূমিতে এক ব্যক্তি যদি চাঁদ দেখে, তবে সকলের উপর রোজা রাখা বা ঈদ পালন ওয়াজিব হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে কোরআনের বর্ণনা উল্লেখ করা যেতে পারে। কোরআনে এসেছ্তেشَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ }[البقرة: ১৮৫]، অর্থাৎ, রমজান মাস, যাতে কোরান নাজিল হয়েছে মানুষের জন্য হেদায়েত ও সত-অসত্যের পার্থক্যকারীরূপে। তোমাদের মাঝে যে মাস প্রত্যক্ষ করবে, সে যেন রোজা রাখে। রাসূল বলেছেন্ততোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ, এবং ভঙ্গ কর। শারের পক্ষ হতে মাসে উপস্থিত হওয়া, এবং চাঁদ দেখার সাথে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। তবে, চাঁদ উদিত হওয়ার স্থান ভূমিগত পার্থক্যের ফলে পৃথক হওয়াই স্বাভাবিক।
তবে এখানে ভিন্ন একটি মত রয়েছে, গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে যা খুবই শক্তিশালী। যদি কোথাও, একটি মাত্র স্থানে, শরিয়ত সিদ্ধ উপায়ে চাঁদ দেখা যায়, তবে সকল মুসলমানের উপর সে অনুসারে আমল আবশ্যক হবে। এর প্রমাণ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্তি ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ, এবং ভঙ্গ কর।’ উক্ত হাদিসে সম্বোধন ব্যাপক রাখা হয়েছে, সুতরাং, সকলের জন্য এর অনুবর্তন জরুরী। দ্র : মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমিন : খণ্ড : ১৯, পৃষ্ঠা : ৪৪-৪৭।
[৩৬] বোখারি : ৪৮৩৭।
[৩৭] আবু দাউদ : ৯০৪। হাদিসটি সহি।
[৩৮] ইবনে হিব্বান : ৬২০। সনদটি বর্ণিত মুসলিমের শর্ত অনুসারে।
[৩৯] তিরমিজি : ৬৯৬, হাদিসটি সহি। উপরোক্ত কিছুই যদি না থাকে, তবে রোজাদার যে কোন হালাল খাদ্য দিয়ে ইফতার করে নিবে। তবে, খাদ্যই যদি না থাকে, তাহলে ইফতারের নিয়ত করবে। ইফতারের নিয়তই হবে তার জন্য ইফতার।
[৪০] মুসলিম : ১০৯৯।
[৪১] বোখারি : ১৯৪১, মুসলিম : ১১০১।
[৪২] নাসায়ি : ২১৬২, হাদিসটি সহি।
[৪৩] বোখারি : ১৯২১।
[৪৪] আবু দাউদ : ২৩৪৫, হাদিসটি সহি।
[৪৫] নাসায়ি : ২১৬৭, হাদিসটি সহি।
[৪৬] ইবনে হিব্বান : ৩৫০৪, শাইখাইনের শর্ত অনুসারে হাদিসটির সূত্র বর্ণিত।
[৪৭] ইবনে হিব্বান : ৩৪৭৬, হাদিসটি হাসান।
[৪৮] আব্দুর রাজ্জাক : ৭৫৯১
[৪৯] আবু দাউদ : ২৩৭৫, হাদিসটি হাসান।
[৫০] ইফতারের পূর্বে অপেক্ষাকালীন সময়ে এই দোয়া পাঠ করব্তে
اللّهُمَّ اِنِّيْ اَسْأَلُكَ بِرَحْمَتِكَ الَّتِيْ وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ أَنْ تَغْفِرَ لِيْ
হে আল্লাহ ! আমি আপনার করুণার মাধ্যম্তেযে করুণা পরিব্যাপ্ত করে আছে সব কিছ্তুআপনার মাগফেরাত কামনা করছি। (ইবনে মাজা : খণ্ড : ১, হাদিস নং ৫৫৭)
ইফতার অন্যান্য খাবার গ্রহণকালীন অনুরূপ بسم الله বলে আরম্ভ করবে। যদি কারো মেহমানদারিতে উপস্থিত হয়, তবে এই দোয়া পাঠ করবে,
أَفْطَرَ عِنْدَكُمْ الصَّائِمُوْنَ وَ أَكَلَ طَعَامَكُمْ الأَبْرَارُ وَ صَلَّتْ عَلَيْكُمْ المَلاَئِكَةُ
তোমাদের নিকট রোজাদারগণ ইফতার করেছে, এবং তোমাদের খাবার গ্রহণ করেছে সজ্জনগণ, আর ফেরেশতাগণ তোমাদের জন্য রহমতের দোয়া করেছে। (আবু দাউদ : ৩৩৫৬)
[৫১] তিরমিজি : ৭২৫, হাদিসটিকে তিনি হাসান বলেছেন। হাদিসটি অনুসারেই আমল করা হবে। রোজা অবস্থায় মেসওয়াককে কেউ দুষণীয় মনে করেননি। তবে, কেউ কেউ কাঁচা ডাল দিয়ে মেসওয়াককে মাকরূহ মনে করেছেন। এমনিভাবে, মাকরূহ মনে করেছেন দিবস শেষে মেসওয়াক করাকে।
[৫২] আহমদ : ৭, হাদিসটি সহি লিগায়রিহ।
[৫৩] আহমদ : ২২/৩।
[৫৪] আহমদ : ৯৯৩০।
[৫৫] মুসলিম : ২৫২।
[৫৬] ইবনে আব্দুল বার, আত তামহিদ : খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ১৯৮।
[৫৭] বোখারি।
[৫৮] ইবনে খুযাইমা : খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ২৪৭।
[৫৯] বোখারি : ১৮০৫। এ হাদিসটির ফলে একদল মনে করেন, দিবসের শেষে মুখের দুর্গন্ধ যাতে দূর না হয় তাই মেসওয়াক করা মাকরূহ। দীর্ঘক্ষণ অভুক্ত থাকার ফলে দিবসের শেষান্তে রোজাদারের মুখ দুর্গন্ধে ভরে যায়। রোজাদারের ক্ষেত্রে মেসওয়াকের মাসআলায় উলামাগণ বিভক্ত হয়ে পড়েছেন, কেউ মনে করেন : শর্তহীনভাবেই রোজাদার ব্যক্তি মেসওয়াক করতে পারবেন। কেউ বলেন : সূর্য হেলে পড়ার পর মেসওয়াক করা মাকরূহ, এরপূর্বে মোস্তাহাব। কেউ বলেন : কেবল আসরের পরই মেসওয়াক করা মাকরূহ হবে, অন্য সময় নয়। অপর কারো মত এই যে, বিষয়টিকে ফরজ ও নফলের ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে দেখা হবে। রোজা যদি ফরজ হয়, তবে সূর্য হেলে পড়ার পর হবে মাকরূহ, নফলের ক্ষেত্রে মাকরূহ হবে না। কারণ, এ পদ্ধতিটিই রিয়া হতে অধিক মুক্ত। প্রথম মতটিই অধিক যুক্তিযুক্ত। দ্র : ইবনে আব্দুল বার রচিত তামহিদ ১৯/৫৭, আইনি রচিত উমদাতুল ক্বারী ১৬/৩৮৪।
[৬০] ইবনে আবি শায়বা : ৯১৭১।
[৬১] ইবনে আব্দুল বার : তামহিদ ৭/১৯৯
[৬২] বোখারি : ১৮২৯, মুসলিম : ১১০৯।
[৬৩] বোখারি : ১৯২৬
[৬৪] আবু দাউদ : ২৩৬৫। হাদিসটি সহি।
[৬৫] বোখারি : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৬৮০-৬৮১
[৬৬] ইবনে তাইমিয়া : মাজমুউল ফাতাওয়া : খণ্ড : ২৫, পৃষ্ঠা : ২৮১-২৮২
[৬৭] আবু দাউদ : ১৪২, হাদিসটি সহি।
[৬৮] দ্র : ইবনে কায়্যিম, যাদুল মাআদ : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৩২
[৬৯] বোখারি : ১৯৬১।
[৭০] বোখারি : ১৯৬৫।
[৭১] বোখারি : ১৮৬২।
[৭২] বোখারি : ১৮৫৬।
[৭৩] ইবনে হাজার : ফাতহুল বারি : খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ২২৯
[৭৪] বোখারি : ৪২৮৯।
[৭৫] মুসলিম : ১১২২্‌
[৭৬] আহমদ : ৫৮৬৬, হাদিসটি সহি।
[৭৭] বোখারি : ৪২৭৫।
[৭৮] বোখারি : ২৭৩৩।
[৭৯] মুসলিম : ১১১৪।
[৮০] আবু দাউদ : ২৪০৭।
[৮১] মুসলিম : ১১২০।
[৮২] যাদুল মাআদ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৫৫-৫৬। পূর্ণ উদ্ধৃতিটি এরূপ…সাহাবিগণ যখন সফরের সূচনা করতেন, গৃহ প্রাঙ্গন অতিক্রম ব্যতীতই পানাহার করে নিতেন। তারা একে রাসূলের সুন্নত মনে করতেন। … মোহাম্মদ বিন কাব হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি রমজানে আনাস বিন মালেকের নিকট আগমন করলে দেখতে পেলাম তিনি সফরে মনস্থ হয়েছেন, তার ঘোড়া প্রস্তুত হয়েছে, পরিধান করেছেন তিনি সফরের পোশাক। তিনি খাবারের নির্দেশ দিলেন এবং খাদ্য গ্রহণ করলেন, আমি বললাম : এটাই কি সুন্নত ? তিনি বললেন, হ্যা, সুন্নত। অত:পর তিনি সফরে বের হলেন।
[৮৩] সূরা বাকারা : ১৮৪।
[৮৪] নাসায়ি : ২১১৬। উক্ত হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণ হয়, মাসের সূচনা-সমাপ্তির ক্ষেত্রেও মৌলিক নীতিমালা হচ্ছে দু ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা। মুসনাদে (১৮৯১৫) ভিন্ন শব্দে হাদিসটি এভাবে এসেছ্তে وإن شهد شاهدان مسلمان فصوموا وأفطروا। কিন্তু, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে উমর রা.-এর একক সাক্ষ্যের মাধ্যমে রোজার সূচনা ঘোষণা দেন, আরেকবার কেবল একজন গ্রাম্য ব্যক্তির সাক্ষ্যের মাধ্যমেই সকলকে রোজার আদেশ প্রদান করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ভিন্ন কোন সাক্ষীর তলব করেননি। এ কারণেই, কেউ কেউ মাসের সূচনা ও সমাপ্তির সাক্ষীর সংখ্যা তারতম্যের কথা বলেছেন। আল্লাহ ভাল জানেন।
[৮৫] বোখারি : ৬৫০২
[৮৬] বোখারি : ৬০৫৭
[৮৭] বোখারি : ১১৪৭।
[৮৮] বোখারি : ১১৬৪।
[৮৯] বোখারি : ৯৯০।
[৯০] রমজানের কিয়ামুল লাইলের মাঝে রয়েছে তারাবীহের নামাজ যা জামাতে আদায় করা হয়। এটা স্বীকৃত সুন্নত যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং পালন করেছেন ; আবার কখনো কখনো ছেড়েছেন উম্মতের উপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। অতঃপর এটা পুনর্জীবিত করেছেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর বিন খাত্তাব রা.।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, এক রাত্রিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নামাজ পড়লেন, তার সাথে লোকজনও নামাজ পড়ল। পরের রাত্রিতে আবার নামাজ আদায় করলেন লোকজন পূর্বের তুলনায় বেড়ে গেল। অতঃপর তৃতীয় ও চতুর্থ রাত্রিতেও লোকজন জমায়েত হলো কিন্তু রাসূল স. বের হলেন না। ভোরে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
قد رأيت الذي صنعتم، فلم يمنعني من الخروج إليــكم إلا أني خشيت أن تفرض عليكم، وذلك في رمضان. متفق عليه
তোমরা যা করেছ আমি দেখেছি। তোমাদের উপর ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আমি বের হইনি। আর এ ঘটনা ঘটেছিল রমজান মাসে। (বোখারি ১২৯, মুসলিম ১৭৭)
আবু যর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমরা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে রমজানের রোজা পালন করেছি। তিনি আমাদেরকে নিয়ে কিয়ামুল লাইল করেননি (জামাত সহকারে)। অথচ মাসের আর মাত্র সাত দিন বাকি ছিল। অতঃপর আমাদেরকে নিয়ে কিয়ামুল লাইল করলেন, রাতের এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত। ষষ্ঠ রাত্রিতে কিয়ামুল করেননি। পঞ্চম রাত্রিতে আমাদের নিয়ে কিয়ামু ললাইল করেছেন অর্ধরাত্রি পর্যন্ত। আমি বললাম : হে আল্লাহর রাসূল যদি আমাদেরকে নিয়ে পুরো রাত্রি কিয়ামুল লাইলে কাটাতেন ? তিনি বললেন :
إن الرجل إذا صلى مع الإمام حتى ينصرف حسبت له قيام ليلة. أبوداود، الترمذي ، النسائي ،ابن ماجة .أحمد في المسند.
অর্থ : যে ব্যক্তি ইমামের সাথে প্রস্থান করা অবধি সালাত আদায় করবে (কিয়ামুল লাইল করবে) তাকে পুরো রাত কিয়ামুল লাইলের ছাওয়াব দান করা হবে। রাসূল আমাদের নিয়ে চতুর্থ রাত্রিতে কিয়ামুল লাইল করেননি। তৃতীয় রাতে তার পরিবার, স্ত্রী গণ, ও লোকজনকে জমা করলেন এবং আমাদের সাথে নিয়ে সেহরির শেষ সময় পর্যন্ত কিয়ামুল লাইল করলেন, এমনকি আমরা চিন্তিত ছিলাম সেহরি খেতে পারব কিনা ? অতঃপর মাসের বাকি রজনিগুলোতে আমাদের নিয়ে আর কিয়ামুল লাইল করেননি। (আবু দাউদ, তিরমিযি, নাসায়ি, ইবনে মাজা, আহমদ)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাত সহকারে কিয়ামুল লাইল অর্থাৎ তারাবীহ আদায় করেছেন পাঁচ কিংবা ছয় রজনি। রমজানের শুরুতে দুই বা তিন রজনি এবং শেষে তিন রজনি। দ্র: ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া, তারাবীহ সংক্রান্ত আলোচনা।
আব্দুর রহমান বিন আব্দুল কারী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি ওমর বিন খাত্তাব রা.-এর সাথে রমজানের এক রজনিতে মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হলাম। লক্ষ্য করলাম মানুষ বিক্ষিপ্তভাবে একাকী, আবার কেউ কয়েকজনকে নিয়ে নামাজ পড়ছে। ওমর রা. বললেন :
إني أرى لو جمعت هؤلاء على قارئ واحد لكان أمثل . (البخاري ৪/২৫০/ح২০১০)
অর্থ : আমার মনে হচ্ছে সকলকে একজন কারীর (ইমাম) অধীনে জমায়েত করে দিলে তা হবে উৎকৃষ্টতর। অতঃপর সবাইকে উবাই বিন কাআব-এর সাথে জমায়েত করে দিলেন। অতঃপর অন্য এক রজনিতে আমি তার সাথে বের হলাম, লোকজন তাদের কারীর পেছনে নামাজ পড়ছিল, ওমর রা. বললেন : এই নতুন পদ্ধতি কতইনা চমৎকার। আর যারা শেষ রজনিতে কিয়ামুল লাইল করে তারা উত্তম প্রথম রজনিতে কিয়ামুল লাইলকারীদের তুলনায়। (বোখারি- ২০১০/২৫০/৪) মুসলামানদের কর্তব্য : রমজান জুড়ে কিয়ামুল লাইলের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়া। এ ক্ষেত্রে তারা অন্তরে আল্লাহ কর্তৃক প্রতিশ্রুত সওয়াবের প্রতি বিশ্বাস রাখবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভই হবে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। ফলত: সে রাসূলের বর্ণিত পুরস্কারে নিজেকে ভূষিত করতে সক্ষম হবে। রাসূল রমজান আদায়ের মাধ্যমে পূর্বাপর যাবতীয গোনাহ ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তারাবীহের নামাজ ইমামের সাথে আদায় করা, ইমাম নামাজ শেষ না করা পর্যন্ত তার সাথে থাকা বিশেষভাবে বাঞ্ছনীয়। তাহলে সে পুরো রাত কিয়ামুল লাইল করার সওয়াব পাবে, যেমন আবু যর রা.-এর হাদিস জানা যায়।
তারাবীর নামাজের রাকাত সংখ্যা নিয়ে আলেমদের বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। কারো মত : ৪১ রাকাত, কারো মত : ৩৯ রাকাত, কারো মত : ২৩ রাকাত, কারো মত : ১৩ রাকাত, কারো মত : ১১ রাকাত। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন :
ما كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يزيد في رمضان ولا غيره على إحدى عشرة ركعة، يصلي أربعا فلا تسأل عن حسنهن وطولهن، ثم يصلي أربعا فلا تسأل عن حسنهن وطولهن، ثم يصلي ثلاثا…( متفق عليه)
অর্থ্তরাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান কিংবা অন্য কোন সময়ে এগারো রাকাতের অধিক (রাতে) আদায় করতেন না। (প্রথমে) তিনি চার রাকাত আদায় করতেন, তার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য হত অতুলনীয়। অত:পর চার রাকাত আদায় করতেন, তারও সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য হত অতুলনীয়। অত:পর আদায় করতেন তিন রাকাত…। (বোখারি ১১৪৭, মুসলিম ১২৫)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এগারো রাকাত পড়েছেন তা বিশুদ্ধ বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের হাদিস (বোখারি : ১২৫/২ ২১২/১, মুসলিম: ৫২৬, ৫২৫/১.) যায়েদ বিন খালেদের হাদিস (মুসলিম: ৫৩১/১.) থেকেও জানা যায়। ইমাম মালেক সহ অন্যান্য বিদ্বানগণ সায়িব বিন ইয়াযিদ রা. হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন :
أمر عمربن الخطاب أبي بن كعب وتميما الداري أن يقوما للناس بإحدى عشرة ركعة وكان القارئ يقرأ بالمئين حتى كنا نعتمد على العصي من طول القيام (الموطأ ১/১১৫/ح৪
অর্থ : ওমর বিন খাত্তাব উবাই বিন কাআব এবং তামীমুদ্দারীকে আদেশ করেছেন, তারা যেন লোকজনকে নিয়ে এগারো রাকাতে কিয়ামুল লাইল করেন। প্রতি রাকাতে কিরাত পড়তেন দুই শত আয়াতের মত, এতো দীর্ঘ কেয়াম করতেন যে আমরা লাঠিতে ভর করতাম। মুয়াত্তা ইমাম মালেক ১১৫/১ সনদ বিশুদ্ধ।
সংখ্যায় যারা অল্প রাকাত আদায় করবে, তাদের জন্য লক্ষণীয় হল, তারাবীহে তারা দীর্ঘ কেরাত পড়বে। দ্র : ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া।
সায়িব বিন ইয়াযিদ হতে রমজান মাসে বিশ রাকাত পড়ার বর্ণনাও বিশুদ্ধ সনদে পাওয়া যায়। বাইহাকি ৪৯৬/২
তার বর্ণনা মতে বিশুদ্ধ সনদে আরো পাওয়া যায় যে, ওমর রা. উবাই বিন কাআব ও তামীমুদ্দারীর অধীনে লোকজনকে একুশ রাকাতে জামায়াত করেছিলেন। মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাক ২৬০/২
ইয়াযিদ বিন রূমান হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : লোকজন ওমর রা.-এর আমলে তেইশ রাকাতে কিয়ামুল লাইল করতেন। মুয়াত্তা ইমাম মালেক:১১৫/১/হা:৫.
ইয়াযিদ বিন রূমান ‘মুনকাতে’, কারণ তিনি ওমর রা.-কে পাননি। তবে তার এ বর্ণনার পক্ষে পূর্বের বর্ণনা থেকে সমর্থন পাওয়া যায়। এবিষয় আরো বর্ণনা আছে, এসব প্রমাণ করে যে ওমর রা.-এর যুগে বিশ রাকাতের প্রচলন ছিল। ঐ ব্যক্তি এর বিরোধী, যে মনে করে এই বর্ণনা দুর্বল এবং ১১ রাকাতের বেশি কিয়ামুল লাইল করা যাবে না। বিস্তারিত দেখুন : আল্লামা আলবানী রহ. সালাতুত তারাবীহ এবং ইসমাইল আল আনসারী প্রমুখের জবাব।
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ র. উল্লেখ করেছেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামে রমজানের রাকাত সংখ্যা নির্ধারণ করেননি। অতঃপর সালাফে সালেহীন হতে বর্ণিত কিয়ামুল লাইলের রাকাত সংখ্যাগুলো উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি বলেন :
وهذا كله سائغ فكيفما قام في رمضان من هذه الوجوه فقد أحسن. الفتاوي২২/৩৭২
অর্থ : এ সবই চলে। যে কোন একটি অনুকরণ করে কিয়ামুল লাইল করলে সে উত্তম কাজ করল। এবং বলেন : এগুলো হতে কোনটিই অপছন্দ করা যাবে না। ইমাম আহমদ প্রমুখ হতে এরূপ বিবরণ রয়েছে। তিনি আরো বলেন :
ومن ظن أن قيام رمضان فيه عدد مؤقت عن النبي صلى الله عليه سلم لا يزاد فيه ولا ينقص منه فقد أخطأ. الفتاوي ২২/২৭২
যে মনে করে, কিয়ামে রমজানে নির্দিষ্ট সংখ্যার বিবরণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে প্রমাণিত এবং তাতে তারতম্য করা যাবে না, সে অবশ্যই ভুল করেছে। (ফতওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ ২৭২/২২)
ফাতাওয়ায়ে আল-লাজনা আদ-দায়েমা গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে য্তে
فلم يحدد صلاة الله و سلامه عليه ركعات محدودة و لأن عمر رضي الله عنه و الصحابة رضي الله عنهم صلوها في بعض الليالي عشرين سوى الوتر و هم أعلم الناس بالسنة.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তারাবীহের ক্ষেত্রে) নির্দিষ্ট কোন রাকাত সংখ্যা নির্ধারণ করেননি। এবং উমর রা. এবং অন্যান্য সাহাবি বৃন্দ কোন কোন রাত্রিতে বিতির ব্যতীতই বিশ রাকাত তারাবীহ আদায় করেছেন। সুন্নত সম্পর্কে সকলের তুলনায় তারাই অধিক জ্ঞাত। ফাতাওয়ায়ে আল-লাজনা আদ-দায়েমা, খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ১৯৮।
এ আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করতে গিয়ে ১১ অথবা ১৩ রাকাত নামাজ পড়ল, সে ভালো করেছে এবং নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাবে। আর যে, তেইশ রাকাত পড়ল ওমর রা.-এর আমলে মুসলমানদের অনুকরণ করে, সেও ভালো করেছে। তবে মুক্তাদীর উচিত ইমাম যত রাকাতই পড়ুক, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার সাথে থাকা, যাতে পুরো রাত কিয়ামুল লাইলের ছাওয়াব অর্জন করতে পারে।
[৯১] বিষয়টি বিস্তারিতে জানার জন্য দ্রষ্টব্য : আতিয়া মোহাম্মদ সালেম রচিতمع الرسول في رمضان
[৯২] আহমদ : ২৪২৬। সহিহাইনের শর্ত মোতাবেক তার সূত্রটি শুদ্ধ।
[৯৩] বোখারি : ১৯০২।
[৯৪] মুসলিম : ১১০৪।
[৯৫] বোখারি : ১১২৯। মুসলিম : ৭৬১।
[৯৬] তিরিমিজি : ৮০৬, হাদিসটি সহি।
[৯৭] সূরা তওবা : আয়াত, ১২৮।
[৯৮] বোখারি : ১৯০৬।
[৯৯] ইবনে আবিদ্দুনয়া : ফাজায়েলুল কোরআন : ৩০।
[১০০] নাসায়ি : ৩৬৪।
[১০১] বোখারি : ২০১৩।
[১০২] নাসায়ি : ১৬১৬, হাদিসটি সহি।
[১০৩] মুয়াত্তা মালেক : ২৫০।
[১০৪] সুনানে কুবরা : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪৯৬।
[১০৫] বোখারি : ৭০৩।
[১০৬] বোখারি : ২০৪১।
[১০৭] মুসলিম : ১১৬৭।
[১০৮] বোখারি : ২০২৬।
[১০৯] ইবনে মাজা : ১৭৭৫।
[১১০] মুসলিম : ১১৭১।
[১১১] যাদুল মাআদ : ইবনে কায়্যিম, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৯০।
[১১২] বোখারি : ১৯১৪।
[১১৩] মুসলিম : ১১৭৩।
[১১৪] বোখারি : ১৯৩৬।
[১১৫] মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমিন : খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ১৮৪।
[১১৬] বোখারি : ২৯৬।
[১১৭] ফাতহুল বারি : খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা : ৩২০।
[১১৮] আবু দাউদ : ২৪৭৩।
[১১৯] বোখারি : ৩০৩৯।
[১২০] বোখারি : ১৮৯৭।
[১২১] সূরা আনফাল : আয়াত : ২৭।
[১২২] আহমদ : ৬৪৯৫।
[১২৩] বোখারি : ২০২৯।
[১২৪] বোখারি : ৩২৮১।
[১২৫] বোখারি : ১৮৯০।
[১২৬] ইবনে হিব্বান : ৩৬৬৩।
[১২৭] দ্র : আল্লামা আইনি, উমদাতুল ক্বারি : খণ্ড : ১১, পৃষ্ঠা : ১৪৮।
[১২৮] তিরমিজি : ৮০৩, হাদিসটি সহি।
[১২৯] ইবনে হিব্বান : ৩৬৬৩। তার বর্ণিত সূত্র ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুসারে।
[১৩০] ইবনে হাজার : ফাতহুল বারি : খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৩৩৪।
[১৩১] ইবনে উসাইমিন তার রচিত মাজমুউ ফাতাওয়া-তে উল্লেখ করেন (খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ১৫৮) এতেকাফকারী পার্থিব যাবতীয় বিষয় হতে নিজেকে মুক্ত রাখবে, সুতরাং, বেচা-কেনা ও ব্যবসায় নিজেকে জড়াবে না।
[১৩২] ইবনে উসাইমিন, মাজমুউ ফাতাওয়া : খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ১৮০।
[১৩৩] বোখারি : ৬৫০৩।
[১৩৪] ইবনে উসাইমিন, মাজমুউ ফাতাওয়া : খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ১৫৯।
[১৩৫] ইবনে উসাইমিন, মাজমুউ ফাতাওয়া : খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ১৬৭।
[১৩৬] আবু দাউদ : ১৩৭৪, হাদিসটি সহি।
[১৩৭] মুসলিম : ১১৭৫।
[১৩৮] মুসলিম : ১১৭৪।
[১৩৯] আয়েশা রা. হতে বর্ণিত এক যইফ হাদিসে (মুসনাদ : খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ১৪৬) এসেছ্তেপ্রথম বিশ দিনে রাসূল ঘুম ও এবাদতে কাটাতেন। শেষ দশ দিনে পুর্ণভাবে প্রস্তুতি নিয়ে এবাদতে নিমগ্ন হতেন।
[১৪০] মুসলিম : ১১৬৭।
[১৪১] মাওয়াযি : কেয়ামে রমজান : পৃষ্ঠা : ৯২।
[১৪২] বাইহাকি : সুনানে কুবরা : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪৯৪।
[১৪৩] আব্দুর রাজ্জাক : ২৫/৫।
[১৪৪] বোখারি : ১৯০২।
[১৪৫] বেখারি : ৩৬২৪।
[১৪৬] ফাতহুল বারি : খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪২।
[১৪৭] তবে, কেউ যদি মনে করে যে, দিবসে কোরআন তেলাওয়াত তার জন্য অধিক উপকারি, তাহলে তাই তার জন্য অধিক ফজিলতপূর্ণ।
[১৪৮] ফাতহুল বারি : খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৪৫।
[১৪৯] ইবনে বাত্তাল : শরহে বোখারি : খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১৩।
[১৫০] সূরা সোয়াদ : আয়াত ২৯।
[১৫১] ইবনে আব্দুল বার : আত তামহীদ : খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ১১১।
[১৫২] ইবনে রজব : লাতায়েফুল মাআরেফ : পৃষ্ঠা : ১৮৩।
[১৫৩] ইবনে রজব : লাতায়েফুল মাআরেফ : পৃষ্ঠা : ১৮৩।
[১৫৪] ইবনে হিব্বান : ৭৫৮, হাদিসটি সহি।
[১৫৫] আব্দুর রাজ্জাক : ৬০১০।
[১৫৬] সূয়ূতী : ইতকান : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪৬৮।
[১৫৭] বাইহাকি : শুআবুল ঈমান : ১৮০৭।
[১৫৮] কুরতবি, আল জামে লি আহকামিল কোরআন : খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫৩।
[১৫৯] গাজ্জালী : ইহয়াউ উলুমিদ্দীন : খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৭৫।
[১৬০] সূরা কেয়ামত : আয়াত : ১৭, ১৮।
[১৬১] ইবনে উসাইমিন : মাজমুঊ ফাতাওয়া : খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ৭৮।
[১৬২] আবু দাউদ : ১৩৭৪, হাদিসটি হাসান।
[১৬৩] ইবনে মাজা : ১৭৭৫, হাদিসটি সহি।
[১৬৪] আহমদ : ৫৩৪৯, হাদিসটি সহি।
[১৬৫] বোখারি : ২০১৮।
[১৬৬] তিরমিজি : ৬৯৬, হাদিসটি সহি।
[১৬৭] নাসায়ি : ২১৬৭, হাদিসটি সহি।
[১৬৮] আবু দাউদ : ১৩৭৯, হাদিসটি হাসান।
[১৬৯] বোখারি : ৩২২০।
[১৭০] ফাতহুল বারি : ইবনে হাজার : খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪১।
[১৭১] ইবনে উসাইমিন : মাজমুউ ফাতাওয়া : খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ২৬২।
[১৭২] ফাতহুল বারি : ইবনে হাজার : খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা : ১৩৯।
[১৭৩] বাইহাকি, মারেফাতুন সুনানি ওয়াল আসার : খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ৩০৭।
[১৭৪] রাসূল স্বশরীরে যে যুদ্ধে অংশ নিয়ে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন, তাকে বলা হয় ‘গাযওয়া’। আর যেখানে কেবল সেনাদল প্রেরণ করেই যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, স্বশরীরে অংশ নেননি, তাকে বলা হয় ‘সারিয়া’।
[১৭৫] মুসিলম : ১১১৬।
[১৭৬] তিমমিজি : ৭১৪।
[১৭৭] ইবনে সাদ : তাবাকাত : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১৬৫-১৬৭।
[১৭৮] ওয়াকিদি, মাগাযি : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা : ৯। তাবাকাত ইবনে সাদ : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৬।
[১৭৯] ওয়াকিদি, মাগাযি : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা : ১৭৪। তাবাকাত ইবনে সাদ : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২৭।
[১৮০] ওয়াকিদি, মাগাযি : খণ্ড ১, পৃষ্ঠা : ৩৯৫। তাবাকাত ইবনে সাদ : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৯১।
[১৮১] সূরা আল মায়েদা : আয়াত ৫৪।
[১৮২] সূরা তওবা : আয়াত ২৪।
[১৮৩] আবু দাউদ : ২৩৫৩, হাদিসটি হাসান।
[১৮৪] ইবনে মাজা : ১৬৯৭, হাদিসটি সহি।
[১৮৫] মুসলিম : ১০৯৬।
[১৮৬] বোখারি : ১৯০৩।
[১৮৭] বোখারি : ৩৬২৪।
[১৮৮] বোখারি : ৪৯৯৮।
[১৮৯] বোখারি : ২০।
[১৯০] বেখারি : ৭৩৬৭।
[১৯১] আহমদ : ৫/৪৩৪।
[১৯২] তিরমিজি : ৩৮৯৫।
[১৯৩] তিরমিজি : ৩৪৩৫।
[১৯৪] মুসলিম : ৩৩৫।
[১৯৫] বোখারি : ১৮১৯।
[১৯৬] সূরা নূর : আয়াত ৫১।
[১৯৭] সূরা নিসা : আয়াত ৬৫।
[১৯৮] বোখারি : ৫১৬২।
[১৯৯] ইবনে আব্দুল বার : জামে বায়ানিল ওয়া ফাজলিহি : ২৩৮১।
[২০০] মুসলিম : ২৬৭০।
[২০১] বোখারি : ১৮৫৮। ইবনে উসাইমিন : মাজমুউ ফাতাওয়া : খণ্ড : ১৯, পৃষ্ঠা : ২৬৯।
[২০২] ইবনে হিব্বান : ২৪৭৩, তার সূত্র খুবই শক্তিশালী। প্রসিদ্ধ হল, রাতের অংশে প্রথম আজান ছিল বেলাল রা. প্রদত্ত, উম্মে মাকতুমের নয়। দ্র : মুসলিম : ১০৯২। সুতরাং, এ হাদিসটি এক ধরনের আপাত বিরোধ তৈরি করে। তবে, বিষয়টি তলিয়ে দেখলে এমন মনে হবে না। কারণ, রাসূল তাদের উভয়ের মাঝে আজানের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছিলেন। সুতরাং, বেলাল রা. কখনো কখনো ফজরের নয়, নিদ্রাগ্রহণকারী ও রাত জাগরণকারীদের সতর্ক করার জন্য আজান দিতেন রাতের অংশে। একে বলা হত প্রথম আজান। এ সময়ে দ্বিতীয় আজান দিতেন উম্মে মাকতুম। কখনো কখনো রাতের অংশের আজান দিতেন উম্মে মাকতুম, বেলাল রা. দিতেন ফজরের আজান। সুতরাং উভয় হাদিসের মাঝে আপাত বিরোধ মনে হলেও মৌলিকভাবে তাতে কোন বিরোধ নেই। সহি ইবনে হিব্বান : খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা : ২৫২-২৫৩।
[২০৩] বোখারি : ১৯৫২।
[২০৪] আবু দাউদ : ২৪৫৪, হাদিসটি সহি।
[২০৫] বোখারি : ৮৫৩।
[২০৬] আহমদ : ৬৪৯৫, হাদিসটি সহি লিগায়রিহ।
[২০৭] মুসলিম : ১১৩৬।
[২০৮] রাসূল জীবিতাবস্থায় পূর্ণ কোরআন সহ রমজান যাপনের সুযোগ তিনি পাননি। তিনি প্রতি বছর রমজান অবধি যা নাজিল হত, তা এবং ইতিপূর্বে যা নাজিল হয়েছ্তেসবই রমজানের রাতে তেলাওয়াত করতেন।
[২০৯] মুসলি : ৭৪৬।
[২১০] বোখারি : ২০১৩।
[২১১] আহমদ : ২৬৩০, হাদিসটি সহি লিগায়রিহ।
[২১২] বোখারি : ২০২৪।
[২১৩] মুসলিম : ১১০৯।
[২১৪] ইবনে হিব্বান : ৩৫৪৫, হাদিসটি সহি।
[২১৫] তিরমিজি : ৭৯৫।
[২১৬] বোখারি : ২০২০।
[২১৭] তিরমিজি : ৮০৬, হাদিসটি সহি।
[২১৮] নাসায়ি ১৩৬৪, হাদিসটি সহি।
[২১৯] মারওয়াজি : কিয়ামু রমজান : ৩১।
[২২০] আবু দাউদ : ৫৬৭, হাদিসটি সহি।
[২২১] বোখারি : ৮৫৮।
[২২২] আবু দাউদ : ৫৬৭, হাদিসটি সহি।
[২২৩] বোখারি : ২০৪৫।
[২২৪] আব্দুর রাজ্জাক : ৮০৩১, হাদিসটি সহি।
[২২৫] আলবানি, কেয়ামু রমজান : ২৯।
[২২৬] তিরমিজি : ৮০৬, হাদিসটি সহি।
[২২৭] বোখারি : ৩০৯।
[২২৮] বোখারি : ২০৩৮।
[২২৯] বোখারি : ২০৩৪।
[২৩০] বোখারি : ২০২৬।
[২৩১] বোখারি : ২০৩৩।
[২৩২] ইবনে হাজার : ফতহুল বারি : খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৩২৪।
[২৩৩] বাজি : আল মুনতাকা : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৮৩।
[২৩৪] মুসলিম : ২৯৭।
[২৩৫] বোখারি : ৩০১।
[২৩৬] মুসলিম : ১১০৬।
[২৩৭] মুসলিম : ১১০৬।
[২৩৮] আহমদ : ২৫০২২, সূত্রটি শুদ্ধ।
[২৩৯] মুসলিম : ১১০৭।
[২৪০] আহমদ : ২৬৪৪৫।
[২৪১] আহমদ : ২৬৭৬২।
[২৪২] আহমদ : ২৫২৯০।
[২৪৩] মুসলিম : ১১০৬।
[২৪৪] মুসলিম : ১১০৬।
[২৪৫] আহমদ : ২৪৩১৪, হাদিসটি সহি।
[২৪৬] সূরা তাগাবুন : আয়াত : ১৪।
[২৪৭] মুসিলম : ১১০৯।
[২৪৮] বোখারি : ১৯২৬।
[২৪৯] মুসলিম : ১১০৯।
[২৫০] বোখারি : ২০২৪।
[২৫১] ফতহুল বারি : ইবনে হাজার : খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৩১৬।
[২৫২] বাইহাকি : আস সুনানুল কুবরা : খণ্ড : ৪, পষ্ঠা : ৩১৪।
[২৫৩] বোখারি : ৬১৩৯।
[২৫৪] বোখারি : ৬২১৯।
[২৫৫] বোখারি : ২০৩৮।
[২৫৬] বোখারি : ২০৩৫।
[২৫৭] বোখারি : ২০৩৮।
[২৫৮] বোখারি : ২০৩৯।
[২৫৯] বেখারি : ২৯৬।
[২৬০] বোখারি : ২০৩১।
[২৬১] বোখারি : ২০৩৩।
[২৬২] আবু দাউদ : ১৩৭৪।
[২৬৩] আহমদ : ২৬৩০৭।
[২৬৪] মুসলিম : ১১৬৬।
[২৬৫] ইবনে সাদ : তাবাকাত : খণ্ড : ৮, পৃষ্ঠা : ১১৫।
[২৬৬] তাবারির ইতিহাস : খণ্ড : ৮, পৃষ্ঠা : ৫৪৫।
[২৬৭] ইবনে আম্মাদ : সাযারাতুয যাহাব : খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১১৪। উহুদের যুদ্ধের পূর্বে হিজরি একত্রিশতম মাস শাবানে হাফসার সাথে রাসূল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
[২৬৮] সূরা শুআরা : আয়াত ২১৪।
[২৬৯] সূরা জুমআ : আয়াত : ২।
[২৭০] সূরা তওবা : আয়াত ১২৮।
[২৭১] মুসলিম : ১০৯৪।
[২৭২] বেখারি : ১৮৫৩। দ্র : ইবনে উসাইমিন, মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমিন।
[২৭৩] সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৭।
[২৭৪] বোখারি : ১৮৫৩। দ্র : মাজমুউ ফাতাওয়ায়ে ইবনে উসাইমিন।
[২৭৫] আবু দাউদ : ২৩৬৯। হাদিসটি সহি।
[২৭৬] ইবনে খুযাইমা : ১৯৯০, ইবনে হিব্বান : ৩৫২১, সূত্রটি হাসান।
[২৭৭] বোখারি : ৬২৯২।
[২৭৮] আবু দাউদ : ১৩৭৫, হাদিসটি সহি।
[২৭৯] মুসলিম : ১১০১।
[২৮০] আহমদ : ১০৪৬৮, হাদিসটি সহি।
[২৮১] মুসলিম : ১৪৭৮।
[২৮২] বোখারি : ৬৭৩৪।
[২৮৩] মুসলিম : ৭৩৫।
[২৮৪] আহমদ : ৫৩৫৯, হাদিসটি সহি।
[২৮৫] সূরা আত তাহরিম, আয়াত ৬।
[২৮৬] বোখারি : ১৮৯৪।
[২৮৭] মুসলিম : ১১৫১।
[২৮৮] ইবনে মাজা : ১৬৩৯, হাদিসটি সহি।
[২৮৯] আহমদ : ৯২১৪, সূত্রটি হাসান।
[২৯০] বোখারি : ২৬৮৫।
[২৯১] বাইহাকি, শুআবুল ঈমান অধ্যায় : ১৯৩৮, হাদিসটি সহি।
[২৯২] বোখারি : ১৯০১।
[২৯৩] মুসলিম : ৭৫৯।
[২৯৪] বোখারি : ২০১৮।
[২৯৫] বোখারি : ৮১৩।
[২৯৬] বোখারি : ৪৯।
[২৯৭] আহমদ : ৮০৪৩।
[২৯৮] সহি আত তারগিব ওয়াত তারহীব : ১০০২।
[২৯৯] ইবনে মাজা : ১৭৪৬।
[৩০০] আহমদ : ১৪৩৭।
[৩০১] ইবনে মাজা : ১৬৪৩, হাদিসটি হাসান।
[৩০২] বোখারি : ৬৮।
[৩০৩] তালবিসে ইবলিস : ইবনে জাওজি, ১৫০।
[৩০৪] মুসলিম : ১১১১।
[৩০৫] বোখারি : ১৯৩৫, মুসলিম : ১১১২।
[৩০৬] ظهر শব্দের অর্থ পৃষ্ঠদেশ। জাহেলি যুগে আরব সমাজে কোন ব্যক্তি যদি তার স্ত্রীকে বলত, তুমি আমার জন্য আমার মাতার পৃষ্ঠসদৃশ, তাহলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যেত, তারা এভাবে বিবাহ বন্ধনকে ছিন্ন করাকে জেহার বলত। ইসলামে এর দ্বারা বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয় না, তবে কাফ্‌ফারা আদায় করতে হয়।
[৩০৭] ত্রিশ কেজি ছয় শত গ্রাম সমপরিমাণ।
[৩০৮] তিরমিজি : ৩২৯৯।
[৩০৯] বোখারি : ১৮১৭, আবু দাউদ : ২৩৪৯।
[৩১০] শরিয়তের নুসুসের প্রতি লক্ষ্যকারী মাত্রই জানবেন, তিন শর্ত ব্যতীত রোজা বিনষ্ট হয় না : প্রথমত, জানা। সুতরাং কোন ব্যক্তি যদি রোজা ভঙ্গের কারণ ভুলে সংঘটিত করে, তবে তার উপর কিছু ওয়াজিব হবে না। রোজা বিনষ্টের কারণটি সম্পর্কে সে অনবগত থাকুক, কিংবা অবগত হয়েও যদি তার সময় জ্ঞান না থাক্তে যেমন, সময় ভুলে ফজরের পরও সে খাবার গ্রহণ করল।
দ্বিতীয়ত, রোজা বিষয়ে স্মরণ থাকা। সুতরাং, যদি কেউ বিস্মৃত হয় যে, সে রোজাদার, রোজা ভঙ্গের কারণ ঘটলে তার রোজা ভঙ্গ হবে না। তবে, তার আশেপাশে সংশ্লিষ্ট লোকদের দায়িত্ব তাকে জানিয়ে দেয়া।
তৃতীয়ত, স্বেচ্ছায় রোজা ভঙ্গের কারণ ঘটানো। যাকে বাধ্য করা হবে, তার রোজা ভাঙবে না। দ্র : মাজমুউ ফাতাওয়ায়ে ইবনে উসাইমিন : খণ্ড : ১৯, পৃষ্ঠা : ২৭৭-২৮১।
[৩১১] বোখারি : ৬৮২২।
[৩১২] বোখারি : ২২০।
[৩১৩] মুসলিম : ৫৩৭।
[৩১৪] আহম : খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২২২, তার সূত্রটি শুদ্ধ।
[৩১৫] মুসলিম : ১১০৮।
[৩১৬] আবু দাউদ : ১৩৭৯, হাদিসটি সহি।
[৩১৭] ইবনে হিব্বান : ২৫৪৯।
[৩১৮] মুসলিম : ১১৬৮।
[৩১৯] বোখারি : ৯২৪।
[৩২০] আবু দাউদ : ১৩৭৫, হাদিসটি সহি।
[৩২১] বোখারি : ৭২৯, মুসলিম : ৭৬১।
[৩২২] বোখারি : ১১২৯, মুসলিম : ৭৬১।
[৩২৩] বোখারি : ২০১৬।
[৩২৪] নাসায়ি : ১৩৫৬, হাদিসটি সহি।
[৩২৫] বোখারি : ৬০৫৭।
[৩২৬] আহমদ : ৮৮৫৬।
[৩২৭] বোখারি : ১৮৯৪।
[৩২৮] ইবনে খুযাইমা : ১৯৯৪, সূত্রটি শুদ্ধ।
[৩২৯] সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৩।
[৩৩০] রাজি : মাফাতিহুল গায়েব : খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৭০।
[৩৩১] ইবনে জাওজি, সিফাতুস সাফওয়া : খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ২২৫।
[৩৩২] … : সিফাতুল আসার ওয়াল মাফাহিম : খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ৮৩।
[৩৩৩] ইবনে আবি শায়বা : ৮৮৮০।
[৩৩৪] বাইহাকি : শুআবুল ঈমান : ৩৬৪৪।
[৩৩৫] মুসলিম : ১১৫১।
[৩৩৬] যাদুল মাআদ : ইবনে কায়্যিম : খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২৯।
[৩৩৭] বোখারি : ৫২।
[৩৩৮] মুসলিম : ২৫৬৪।
[৩৩৯] মুসলিম : ৮২।
[৩৪০] তিরমিজি : ২৬২১, হাদিসটি সহি।
[৩৪১] আল্লামা ইবনে উসাইমিন তার ফাতাওয়া গ্রন্থে (খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ৮৭) এ বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ ফতওয়া প্রদান করেছেন। তার মন্তব্য : যে ব্যক্তি রোজা রেখে সালাত আদায় করে না, তার রোজা কোন কাজে দিবে না, তার রোজা কবুল হবে না। সে তার জিম্মা হতে মুক্তি পাবে না, বরং, সালাত আদায় না করলে তার উপর এ দায় থেকে যাবে। কারণ, যে ব্যক্তি সালাত আদায় করে না, সে ইহুদি ও নাসারার মত হয়ে যায়। কোন ইহুদি কিংবা নাসারা যদি রোজা রাখে, তা কি কবুল করা হবে ? তোমার কি মত ? নিশ্চয় তার রোজা কবুল করা হবে না। সুতরাং, তুমি সালাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট তওবা কর, এবং রোজা রাখ। যে আল্লাহর কাছে তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।
[৩৪২] দ্র : মুহাল্লা : ইবনে হাযম, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ১৭৮।
[৩৪৩] বোখারি : ১৮০২।
[৩৪৪] বোখারি : ২০২০।
[৩৪৫] বোখারি : ২০১৭।
[৩৪৬] মুসলিম : ২৮২২।
[৩৪৭] আহমদ : ৬৪৭৪।
[৩৪৮] মুসলিম : ১৮২২।
[৩৪৯] বোখারি : ২০১৮।
[৩৫০] মুসলিম : ২৮৩২।
[৩৫১] আহমদ : ৯৪৫৯।
[৩৫২] মুসলিম : ২৩৩।
[৩৫৩] বোখারি : ৩৭।
[৩৫৪] মুসলিম : ২৮৪৫।
[৩৫৫] আবু দাউদ : ১৩৭৭০, হাদিসটি সহি।
[৩৫৬] মুসলিম : ১১১৪।
[৩৫৭] দ্র : ইমাম নববী লিখিত মুসলিমের ব্যাখ্যা : খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ২৩২।
[৩৫৮] মুসলিম : ১৯।
[৩৫৯] মুসলিম : ১১০৮।
[৩৬০] বোখারি : ১৯৬৫।
[৩৬১] মুসলিম : ১১০৪।
[৩৬২] বোখারি : ৩৯।
[৩৬৩] বোখারি :১৫০৩।
[৩৬৪] আবু দাউদ : ১৬২১, আব্দুর রাজ্জাক : ৫৭৮৫।
[৩৬৫] বোখারি : ১৪৩৯।
[৩৬৬] ইবনে মাজা : ১৮২৭, হাদিসটি হাসান।
[৩৬৭] দ্র : মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে উসাইমিন : খণ্ড : ২০, পৃষ্ঠা : ১১২।
[৩৬৮] বোখারি : ৫০১০।
[৩৬৯] ইবনে মাজা : ২৪৩৩, হাদিসটি সহি।
[৩৭০] বোখারি : ৬১০১, আবু দাউদ : ১৩৭০।
[৩৭১] মুসলিম : ৭৪৬।
[৩৭২] বোখারি : ৬, মুসলিম : ২৩০৮।
[৩৭৩] মুসলিম : ১১৭৫, তিরমিজি : ৭৯৬।
[৩৭৪] আবু দাউদ : ৪৯৮৫, হাদিসটি সহি।
[৩৭৫] নাসায়ি : ৩৯৩৯।
[৩৭৬] ইবনে হিব্বান : ৬২০।
_________________________________________________________________________________


সংকলন : ফায়সাল বিন আলী আল বা’দানী
فيصل بن علي البعداني
অনুবাদক : কাউসার বিন খালেদ
ترجمة: كوثر بن خالد
সম্পাদনা : মুহাম্মদ শামসুল হক সিদ্দিক
নুমান বিন আবুল বাশার
مراجعة: محمد شمس الحق صديق
نعمان بن أبو البشر
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব

পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না কিন্তু।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s