রাসূল যেভাবে রমজান যাপন করেছেন (২য় পর্ব)


রাসূল যেভাবে রমজান যাপন করেছেন (২য় পর্ব)

১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
রমজানে প্রিয় সহধর্মিণীদের সাথে রাসূলের আচরণ
সহধর্মিণীদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আচরণ বিশ্লেষণ করলে আমাদের সামনে ফুটে উঠবে তার আচরণের অসাধারণ এক ভারসাম্য, জীবনের সূচনা থেকে সমাপ্তি অবধি যা তিনি বজায় রেখেছেন অত্যন্ত সার্থকতার সাথে। রাসূল নিজ গুণ সম্পর্কে বলেন :
إنَّ أتقاكم وأعلمكم بالله أنا.
তোমাদের মাঝে সর্বাধিক আল্লাহভীরু ও আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞাত হলাম আমি।[১৮৯]

ভিন্ন এক হাদিসে তিনি এরশাদ করেন :
قد علمتم أني أتقاكم لله وأصدقكم وأبركم.
তোমরা জেনেছ যে, আমি তোমাদের মাঝে সর্বাধিক আল্লাহভীরু, সত্যবাদী ও সৎ।[১৯০]
হাদিসে আরো এসেছে,
أنا أتقاكم لله وأعلمكم بحدود الله.
আমি তোমাদের মাঝে সর্বাধিক আল্লাহভীরু এবং আল্লাহ প্রবর্তিত সীমারেখা সম্পর্কে জ্ঞাত।[১৯১] আল্লাহর সাথে রাসূলের আচরণের আলোচনার নানা-পর্বে এ বিষয়ে পাঠককে ধারণা দিতে আমরা প্রয়াস পেয়েছি।
পক্ষান্তরে স্ত্রী ও সহধর্মিণীদের সাথে তার আচরণ কেমন ছিল্তসে সম্পর্কে রাসূলের হাদিস :
خيركم خيركم لأهله، وأنا خيركم لأهلي.
তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের নিকট উত্তম। আমি তোমাদের মাঝে আমার পরিবারের নিকট সর্বাধিক উত্তম ব্যক্তি।[১৯২]্তপর্যালোচনা করলেই আমরা জানতে পারব। রাসূল তার স্ত্রীদের সাথে কীরূপ আচরণ করতেন, বক্ষ্যমাণ পরিচ্ছেদে আমরা সে বিষয়ে আলোচনার প্রয়াস পাব।
শিক্ষাদান
রাসূল রমজান মাসে নানাভাবে তার স্ত্রী-গণকে শিক্ষা দান করতেন। হাদিসের পাঠক মাত্রই বিষয়টি স্বীকার করবেন, কারণ, রমজান বিষয়ক অধিকাংশ হাদিস তার স্ত্রী-গণ কর্তৃক বর্ণিত। স্ত্রীদের শিক্ষা ব্যাপারে রাসূলের গুরুত্বারোপের উত্তম প্রমাণ এগুলো। প্রমাণ স্বরূপ কয়েকটি হাদিস এ স্থানে উল্লেখ করা যেতে পাের্ত
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, ‘হে আল্লাহর রাসূল আপনার কি মত ? আমি যদি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জ্ঞাত হই, তাহলে আমি কি দোয়া পাঠ করব ?’্তএ প্রশ্ন করার পর রাসূল তাকে বললেন :
قولي: اَللّهُم إِنَّكَ عَفُوٌّ كَرِيْمٌ تٌحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْ.
তুমি দোয়া করবে ‘হে আল্লাহ ! আপনি ক্ষমাশীল সম্মানিত, আপনি ক্ষমা পছন্দ করেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন।[১৯৩]
জনৈকা নারী আয়েশা রা.-কে প্রশ্ন করল : যে হায়েজা নারী রোজার কাজা করে, সালাতের কাজা করে না, তার কী হুকুম ? তিনি বললেন : আমাদেরও এমন হয়েছিল, আমদেরকে কেবল রোজা কাজা করার আদেশ দেয়া হয়েছে, সালাত কাজা করার হুকুম দেয়া হয়নি।[১৯৪]
আয়েশা রা. অপর হাদিসে বর্ণনা করেন : বেলাল রাত থাকতেই আজান দিয়ে দিতেন, রাসূল তাই সকলকে বললেন ইবনে উম্মে মাকতুম আজান দেয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার করে যাও, কারণ, ফজর উদয় হওয়া ব্যতীত সে আজান দেয় না।[১৯৫]
এ দু প্রকার হাদিস থেকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যায়।
প্রথমত : শরিয়তের সাব্যস্ত নসের প্রতি সম্মান জ্ঞাপন ও সর্বান্তঃকরণে তা গ্রহণ আবশ্যক। এ, সন্দেহ নেই, দ্বীনের খুবই মৌলিক একটি বিষয়, মোমিনদের আবশ্যিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন :
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَن يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ [النور: ৫১]
যখন মোমিনদের মাঝে ফায়সালা করার জন্য তাদেরকে আল্লাহ ও তার রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয়, তখন তাদের উক্তি হয় এই্তআমরা শ্রবণ করালাম এবং আনুগত্য করলাম। আর তারাই সফলকাম।[১৯৬]
فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّىَ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُواْ فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجاً مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسْلِيماً [النساء:৬৫].
কিন্তু না, আপনার প্রতিপালকের শপথ ! যতক্ষণ না তারা তাদের বিবাদের বিচারের দায়িত্ব আপনার উপর অর্পণ না করে, অত:পর আপনার সিদ্ধান্ত বিষয়ে তাদের মনে কোন-রূপ দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তঃকরণে তা মেনে নেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা মোমিন হবে না।[১৯৭]
এ বিষয়টি সাহাবিদের জীবন ও জীবনাচারে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সাহাবি আব্দুল্লাহ বিন মুগাফ্‌ফাল একবার দেখতে পেলেন জনৈক সাহাবি পাথর ছুঁড়ে মারছে। তিনি বললেন, তুমি পাথর ছুঁড়ে মের না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথর ছুঁড়ে মারতে নিষেধ করেছেন, কিংবা তিনি একে অপছন্দ করতেন। কিন্তু এরপরও তিনি দেখতে পেলেন যে, উক্ত সাহাবি পাথর ছুঁড়ে মারছে। তাই তিনি বললেন, আমি তোমাকে হাদিস বর্ণনা করছি যে, রাসূল পাথর ছোঁড়া হতে নিষেধ করেছেন, কিংবা তিনি একে অপছন্দ করেছেন, অথচ তুমি পাথর ছুঁড়ছ! তোমার সাথে এ ব্যাপারে আর কিছুই বলব না।[১৯৮] ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বললেন্ত
تمتع النبي صلي الله عليه و سلم، فقال عروة: نهى أبو بكر وعمر عن المتعة، فقال: أراهم سيهلكون، أقول: قال النبي صلي الله عليه و سلم، ويقولون: نهى أبو بكر وعمر.
রাসূল তামাত্তু হজ পালন করেছেন। তার বিরোধিতা করে উরওয়া মন্তব্য করেন যে, আবু বকর ও উমর রা. তামাত্তুর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। উত্তরে ইবনে আব্বাস বলেন যে, আমি দেখছি তারা ধ্বংস হবে। আমি বলছি রাসূল বলেছেন। আর তারা বলছে যে, আবু বকর ও উমর নিষেধ করেছেন।[১৯৯]
দ্বিতীয়ত : ফজরের আজানের মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে সকলকে ফজরের উদয় সম্পর্কে সচেতন করা। মুয়াজ্জিনের আজানের সূচনার পর কোনভাবে পানাহার বৈধ নয়, তবে যদি নিশ্চিত হওয়ার যায় যে, মুয়াজ্জিন ফজর উদয়ের পূর্বেই আজান দিচ্ছেন, তবে অবৈধ নয়। যে ব্যক্তি ফজর উদয়ের ক্ষেত্রে মুয়াজ্জিনের আজানের মাধ্যমে সচেতন হয় না, তার কথা ভিন্ন ; তার রোজা হবে কি-না সন্দেহ। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।
তৃতীয়ত : মাগরিবের ক্ষেত্রে সূর্যাস্তের পরও আজানে কিছুটা বিলম্ব করার যে রীতি ক্যালেন্ডার ও কোন কোন মুয়াজ্জিনের ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়, তার শরয়ি কোন ভিত্তি নেই। এমনিভাবে, সতর্কতা বশত: ফজরে সাদেক উদিত হওয়ার পূর্বেই যে আজান দেওয়া হয়, তারও কোন বৈধতা পাওয়া যায় না। এ ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন খুবই অসিদ্ধ একটি বিষয়। কারণ, এর ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে অসময়ে সালাত আদায় করে, পানাহার ত্যাগ করে সময় শেষ হওয়ার পূর্বে। নাজাত প্রত্যাশী ব্যক্তি মাত্রই যেন এ বিষয়গুলো এড়িয়ে যায় সযত্নে। দ্বীনের ক্ষেত্রে এগুলো বাড়াবাড়িতুল্য, রাসূলের স্পষ্ট উক্তির মাধ্যমে যার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। রাসূল এরশাদ করেন্ত
هلك المتنطعون، قالها ثلاثاً .
অতিরঞ্জনকারীরা ধ্বংস হয়েছ্তেতিনি এটি তিন বার বললেন।[২০০]
কল্যাণকর ও পূর্ণাঙ্গ হেদায়েতের একমাত্রিক নিদর্শন হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হেদায়েত। বেদআত মাত্রই বিভ্রান্তির নামান্তর, যে কোন বিভ্রান্তির অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি জাহান্নাম। রাসূল ও তার সম্মানিত সাহাবিগণ যখন সূর্যাস্তের ব্যাপারে প্রবল ধারণায় উপনীত হতেন্তএমনকি, মেঘলা দিনেও, খোঁজ-অনুসন্ধানের বাহুল্য ছাড়াই দ্রুত ইফতার করে নিতেন। আসমা বিনতে আবু বকর রা.-এর হাদিসে পাওয়া যায়, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত থাকাকালীন একবার মেঘলা দিনে আমরা ইফতার করার পর সূর্যোদয় হল।[২০১]
তার বর্ণিত অপর এক হাদিসে পাওয়া যায়, তিনি বলেন :
أن النبي صلي الله عليه و سلم قال: إن ابن أم مكتوم يؤذن بليل، فكلوا واشربوا حتى يؤذن بلال، وكان بلال يؤذن حين يرى الفجر.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইবনে উম্মে মাকতুম রাতে আজান দেয়, সুতরাং তোমরা বেলালের আজান অবধি পানাহার কর। বেলাল রা. ফজর দেখে অত:পর আজান দিতেন।[২০২]
ভিন্ন এক হাদিসে তিনি বর্ণনা করেন, রাসূল এরশাদ করেছেন:
مـن مـات وعليه صيام صام عنه وليه.
রোজার দায়িত্ব রেখে কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার পক্ষ হতে তার উত্তরাধিকারী রোজা আদায় করে নিবে।[২০৩]
হাফসা রা. বর্ণনা করেন :
أن رسول الله صلي الله عليه و سلم قال: من لم يُجمع الصيام قبل الفجر فلا صيام له.
রাসূল বলেছেন, যে ফজরের পূর্বেই রোজার সূচনা না করে, তার রোজা নেই।[২০৪] বর্তমান সময়ের নারী সমাজের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, তারা নানা রকম মূর্খতা ও বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত, এমন কিছু বিষয় সম্পর্কে তারা অনবগত, যা কোনভাবেই বরদাশত করা যায় না। যদিও এর দায়-দায়িত্ব পুরোটাই নারীর উপর বর্তে, যেহেতু রাসূল এরশাদ করেছেন :
من عمل عملاً ليس عليه أمرنا فهو رد.
যে এমন কাজ করবে, যা আমাদের ধর্মে নেই, তা পরিত্যাজ্য।্তকিন্তু পরিবারের কর্তাব্যক্তি যে, তার পক্ষে কখনো দায় এড়ানো যাবে না। সন্দেহ নেই, আমানত নষ্ট ও দায়িত্ব পালনে অবহেলার পুরো দায় চাপবে তার ঘাড়ে। এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার জন্য রাসূলের এ উক্তিই যথেষ্ট :
كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته، فالرجل راع في بيته وهو مسؤول عن رعيته.
তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে, ব্যক্তি তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে।[২০৫]
অপর হাদিসে এসেছে, রাসূল বলেন :
كفى بالمرء إثماً أن يضيع من يقوت.
ব্যক্তির জন্য পাপ হিসেবে এ-ই যথেষ্ট যে, যার ভোরণ-পোষণ তার দায়িত্ব তাকে সে বিনষ্ট করে দেয়।[২০৬]
সাহাবায়ে কেরামের আদর্শের সাথে তুলনা বা বিচার করলে আমাদের পরিবার ও তার ব্যবস্থাপনার দৈন্যের প্রকট রূপ ধরা পড়বে। রাসূলের সাহাবিগণ তাদের নারীদের প্রতি লক্ষ্য রাখার পাশাপাশি শিশুদের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতেন। রুবাইয়ি বিনতে মুআউয়িজ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আশুরার ভোরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার প্রান্তিক এলাকায় অবস্থিত আনসারদের গ্রামে বার্তা পাঠালেন : যে ব্যক্তি রোজা রেখেছে, সে যেন রোজা পূর্ণ করে নেয়, আর পানাহার করছে যে, সে যেন পূর্ণ দিবস এভাবেই অতিবাহিত করে। এরপর আল্লাহ চাহে তো নিশ্চয় আমরা রোজা পালন করব, ছোট ছোট শিশুদেরও রোজা রাখতে বলব। তাদের নিয়ে আমরা মসজিদে গমন করব, তাদের হাতে তুলে দেব পশমের খেলনা। খাবারের জন্য কেউ যদি কাঁদে, তবে ইফতারের সময়ে তাদের খেতে দেব।[২০৭]
শিশুদের এই দিকটি সম্পর্কে আমরা খুবই অবহেলা প্রবণ। আমাদের কেউ কেউ বরং, শিশুদের আগ্রহ সত্ত্বেও, তাদের রোজা, রাত-জাগরণ ও এবাদত হতে বিরত রাখে। শিশুরা ক্লান্ত হয়ে পড়বে, এ ভয়ে তারা ভীত। তাদেরকে নিরাপদ ও বিপদমুক্ত রাখার এ হচ্ছে ভুল ও বিভ্রান্তিকর কৌশল। আল্লাহই ভাল জানেন।
রাসূল সম্পর্কে তার সহধর্মিণীদের অবগতি
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী-গণ হতে বর্ণিত বিভিন্ন হাদিস ও উক্তি থেকে প্রমাণ হয়, তার জীবন-যাপন, আচার-পদ্ধতি ও অভ্যাস বিষয়ে তারা ছিলেন পূর্ণ অবগত-সজাগ। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত,
… كان نبي الله صلي الله عليه و سلم إذا صلى صلاة أحب أن يداوم عليها، وكان إذا غلبه نوم أو وجع عن قيام الليل صلى من النهار ثنتي عشرة ركعة، ولا أعلم نبي الله صلي الله عليه و سلم قرأ القرآن كله في ليلة، ولا صلى ليلة إلى الصبح، ولا صام شهراً كاملاً غير رمضان.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন সালাত আদায় করতেন, পছন্দ করতেন তাতেই অতিবাহিত করতে, যখন নিদ্রা প্রবল হত, রাত-জাগরণের ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন, তখন দিবসে বার রাকাত সালাত আদায় করে নিতেন। আমি রাসূলকে রমজান ব্যতীত এক রাতে[২০৮] পূর্ণ কোরআন তেলাওয়াত করতে, কিংবা পূর্ণ রাত্রি সালাতে কাটিয়ে দিতে অথবা পূর্ণ মাস রোজায় অতিবাহিত করতে দেখিনি।[২০৯]
তাকে রাসূলের সালাতের ধরন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন : রমজান কিংবা অন্য সময়ে তিনি (রাতে) এগারো রাকাতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। তিনি (প্রথমে) চার রাকাত আদায় করতেন, তা হত খুবই অতুলনীয় ও দীর্ঘ। অত:পর আদায় করতেন চার রাকাত, সেটিও হত অতুলনীয় ও দীর্ঘ। অত:পর তিন রাকাত আদায় করতেন। আমি (একবার) বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ! আপনি বিতিরের পূর্বে নিদ্রা যাবেন ? তিনি এরশাদ করলেন : হে আয়েশা ! আমার দু-চোখ নিদ্রা যায়, কিন্তু অন্তর থাকে বিনিদ্র।[২১০]
আয়েশা রা. রাসূলের রমজানের কয়েকটি রাতের সালাত সম্পর্কে বলেন :্ত …রাসূল নিরলস রাত্রি যাপন করলেন, লোকেরা যার যার অবস্থানে স্থির থাকল, এমনকি ফজর ঘনিয়ে এল।[২১১]
রাসূলের সাথে তার পুণ্যবতী স্ত্রী-গণের সময় যাপন, জ্ঞানার্জন অত:পর উম্মতকে সে বিষয়ে অবগত করা ছিল রমজান সম্পর্কে রাসূলের হেদায়েত সম্পর্কের জানার অন্যতম মাধ্যম ও উৎস। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন :
كان النبي صلي الله عليه و سلم إذا دخل العشر شدَّ مئزره وأحيا ليله وأيقظ أهله.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শেষ দশ দিবসে প্রবেশ করতেন, পূর্ণভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন, রাত জাগতেন এবং জাগিয়ে তুলতেন পরিবার-পরিজনকে।[২১২]
আয়েশা ও উম্মে সালামা রা. হতে বর্ণিত,
إن كان رسول الله صلي الله عليه و سلم لَيصبح جُنباً من جماع غير احتلام في رمضان ثم يصوم.
স্বপ্নদোষে নয়, সহবাস জনিত কারণে রাসূল রমজান দিবসের সূচনা করতেন, অত:পর রোজা পালন করতেন।[২১৩]
আয়েশা রা. হতে আবু সালামা বিন আব্দুর রহমান বর্ণনা করেন : রাসূল রোজা অবস্থায় কোন কোন স্ত্রীকে চুম্বন করতেন। আমি আয়েশাকে বললাম, ফরজ ও নফল রোজায় ? তিনি বললেন : ফরজ ও নফল্তসকল ক্ষেত্রেই।[২১৪]
আত্মিক ও অনুভবীয় প্রাপ্তি ছাড়াও এ হাদিসগুলো জুড়ে আছে নানা কল্যাণ ; পরিবারের জন্য তাতে রয়েছে শিক্ষা ও তরবিয়ত, এবং রাসূলের অনুবর্তন-অনুসরণের জন্য উৎসাহ ও প্রেরণা।
পরিবার-পরিজনকে দূরে রেখে, সমাজ থেকে বিলগ্ন হয়ে যারা যাপন করছে দাওয়াতি ও ইলমি জীবন, এ হাদিসগুলোর আলোকে তাদের পরিণতি সহজেই অনুমেয়। আল্লাহর কাছে আমরা কায়মনোবাক্যে সঠিক পথের দিশা প্রার্থনা করি।
কল্যাণ কর্মে উৎসাহ প্রদান
‘হিস’ বা উৎসাহ হচ্ছে প্রতিদান ও ফলাফল বিষয়ে উদ্দীপনা ও প্রেরণ প্রদান করা, শিক্ষার পাশাপাশি এ বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আলী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন্তরাসূল তার পরিবারকে রমজানের শেষ দশ দিনে রাতে জাগিয়ে দিতেন।[২১৫] রাসূল তার পরিবারকে কতটা গুরুত্ব প্রদান করতেন, এ হাদিসটি থেকে তা প্রমাণিত হয়, কারণ, তিনি এ সময়ে গৃহে অবস্থান করতেন না, মসজিদে এতেকাফরত থাকতেন।
আয়েশা রা. বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিন অনেককে সাথে নিয়ে যাপন করতেন। বলতেন : রমজানের শেষ দশ দিনে তোমরা কদরের রাত অনুসন্ধান কর।[২১৬]
আবু যর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : …অত:পর মাসের তিন দিন অবশিষ্ট অবধি তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন না। তৃতীয় দিনে তিনি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন, তার পরিবার ও স্ত্রী-গণকে আহ্বান করলেন, এতটা দীর্ঘ সময় তিনি জাগরণ করলেন যে, আমরা সেহরি পরিত্যাগের আশঙ্কা করলাম।[২১৭] অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে : চার দিন অবশিষ্ট থাকা পর্যন্তও তিনি আমাদের নিয়ে রাত্রি যাপন করলেন না। অত:পর যখন অবশিষ্ট ছিল মাত্র তিন দিন, তখন তিনি তার কন্যা ও স্ত্রীদের নিকট সংবাদ পাঠালেন, এবং লোকেরা জমায়েত হল। তিনি আমাদের নিয়ে এতটা সময় জাগরণ করলেন যে, সেহরি ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা হল।[২১৮]
জয়নব বিনতে উম্মে সালামা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : যখন মাসের মাত্র দশ দিন অবশিষ্ট থাকত, তখন পরিবারের সক্ষম সকলকে রাসূল রাত্রি জাগরণ করাতেন।[২১৯]
তারাবীহের জামাতে নারীদের অংশ গ্রহণের বৈধতা সম্পর্কে হাদিসগুলো স্পষ্ট প্রমাণ ; তবে ‘তাদের গৃহই তাদের জন্য উত্তম’।[২২০]
গৃহে যে নারী সালাত আদায়ে পূর্ণ মনোযোগি নয়, তার জন্য মসজিদে উপস্থিত হওয়া আবশ্যক, অনৈতিকতা ও ফেতনা আশঙ্কা না হলে, নারী যদি শালীনভাবে, উগ্রতা পরিহার করে পর্দা আবৃত হয়ে গমন করে, তবে, এ ক্ষেত্রে নারীর অভিভাবক তাতে বাধা প্রদান করতে পারবে না। রাসূলের হাদিসে এসেছে :
لا تمنعوا إماء الله مساجد الله.
নারীদের মসজিদ গমনে বাধা প্রদান কর না।[২২১]
উমর রা. অতুলনীয় পদ্ধতিতে আল্লাহর বিধান পালনে প্রয়াস চালিয়েছেন। ইবনে উমর বর্ণনা করেন : উমর রা.-এর কালে এক নারী এশা ও ফজরের সালাত মসজিদে এসে জামাতের সাথে আদায় করত। তাকে বলা হল : উমরের অপছন্দ ও মর্যাদাহানীকর মনে করা সত্ত্বেও কেন তুমি বের হও ? নারী বলল : সে আমাকে বাধা দিচ্ছে না কেন ? লোকটি বলল : কেননা, রাসূলের স্পষ্ট হাদিস আছে যে : তোমরা নারীদের মসজিদে গমনে বাধা প্রদান কর না।[২২২]
স্ত্রীদের সাথে রাসূলের আচরণ, তাদের শিক্ষা, নসিহত ও উপদেশ দান দ্বীনের ক্ষেত্রে ক্রমশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়্তাইত্যাদি হাদিসের মাধ্যমে তার অধিক সংখ্যক স্ত্রী গ্রহণের হিকমত আমরা অনুধাবন করতে পারি। অন্যান্য ক্ষেত্রে উম্মতকে দিক নির্দেশনা প্রদানের পাশাপাশি নারীদের সাথে ব্যবহার, আচার-পদ্ধতি, দিক নির্দেশনা প্রদানও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল যদি তাদের ব্যাপারে এমন ব্যাপক গুরুত্ব প্রদান না করতেন, তবে সামগ্রিকভাবে ইসলামকে নারীগণ কখনোই অনুধাবন করতে সক্ষম হতেন না।
রাসূলের সাথে এতেকাফ যাপনে অনুমতি প্রদান
রাসূল তার স্ত্রী-গণকে তার সাথে এতেকাফ পালনের অনুমতি প্রদান করতেন। আয়েশা রা. বর্ণিত আছে : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশ দিনে এতেকাফের উল্লেখ করলেন, আয়েশা অনুমতি চাইলে তাকে অনুমতি দিলেন। হাফসা আয়েশা রা.-কে তার জন্য অনুমতির কথা বললে তিনি অনুমতি নিলেন…।[২২৩]
অন্য রেওয়ায়েতে আছে : আমি তার কাছে অনুমতি চাইলে আমাকে অনুমতি দিলেন। হাফসাও অনুমতি প্রার্থনা করল, তিনি তাকেও অনুমতি দিলেন।[২২৪]
অনুমতি গ্রহণের এই পর্ব হতে দায়বদ্ধতার বিষয়টি প্রবলভাবে ধরা পড়ে। মুসলিম পরিবার ও তার কাঠামো এ দায়বদ্ধতা ও অনুমতি গ্রহণের নীতির উপর অনেকটাই নির্ভর করে, এর মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের মাঝে পারস্পরিক সম্মান, স্থিরতা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
এতেকাফের ক্ষেত্রে উম্মাহাতুল মোমিনীনদের অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে প্রমাণ হয়, এতেকাফ কেবল পুরুষের জন্য নয়, বরং নারীদের জন্যও বৈধ। নারীদের জন্য শর্ত হচ্ছে অভিভাবকের অনুমতি লাভ্তহাদিস থেকে যেমন প্রমাণ হয়। নারীদের এতেকাফের পরিবেশ হতে হবে ফেতনার যাবতীয় সম্ভাবনা হতে মুক্ত, পর পুরুষের সংস্পর্শ হতে নিরাপদ। কারণ, কল্যাণ আনয়নের পূর্বে মন্দের অপনয়ন আবশ্যক।[২২৫]
রাসূলের সাথে সম্মিলিত এবাদত পালন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মিলিতভাবে তার স্ত্রী-গণের সাথে এবাদত পালন করতেন। রমজানের কিছু কিছু রাতে তার সাথে স্ত্রী-গণ জামাতের সাথে সালাত আদায় করতেন। আবু যর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : …অত:পর তিনি মাসের তিন দিন অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন না, তৃতীয় দিন আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। ডেকে নিলেন তার পরিবার ও স্ত্রী-গণকে। এত দীর্ঘ সময় আমাদের নিয়ে রাত্রি জাগরণ করলেন যে, আমাদের ভয় হল সেহরির সময় অতিক্রান্তের।[২২৬]
রাসূলের স্ত্রী-গণ তার সাথে এতেকাফ পালন করতেন। আয়েশা রা. বর্ণিত হাদিসে আছে, রাসূলের সাথে তার একজন স্ত্রী হায়েজা অবস্থায় এতেকাফ পালন করল, সে স্রাব দেখতে পাচ্ছিল, এবং নিম্নদেশে একটি পাত্র রেখে দিল।[২২৭]
রাসূল যদি গভীরভাবে তার স্ত্রী-গণের প্রতি লক্ষ্য না রাখতেন, প্রচেষ্টা না করতেন তাদের পরকালীন মুক্তির, তবে এবাদত ও কল্যাণের ক্ষেত্রে এ পারস্পরিক সম্মিলন কখনো সম্ভব হত না। এবাদতে রাসূলের সাথে তাদের এ অংশগ্রহণ কোন অর্থেই প্রতিযোগিতামূলক ছিল না, বরং, তার ভিত্তির পুরোটাই গড়ে উঠেছিল ব্যক্তিগত আগ্রহকে কেন্দ্র করে। নারীর সম্ভাবনা, প্রকৃতিভেদ, একে অপরের সাথে স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যগত মৌলিক পার্থক্য্তইত্যাদির সফল উন্মোচন পাওয়া যায় এতে।
এ কারণেই, উদাহরণত:, আমরা দেখতে পাই রাসূলের অধিকাংশ স্ত্রীই তার সাথে এতেকাফ পালন করেননি, সাফিয়া বর্ণিত হাদিসে আছে : রাসূল মসজিদে অবস্থান করছিলেন, তার স্ত্রী-গণ তার সংসর্গে আনন্দ যাপন করছিল, তিনি সাফিয়া বিনতে হাই-কে লক্ষ্য করে বললেন : তুমি তাড়াহুড়ো কর না, আমি তোমার সাথে বেরুব।[২২৮]
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল এতেকাফের ইচ্ছা পোষণ করলেন। যে স্থানে এতেকাফের ইচ্ছা করেছিলেন, তথায় পৌঁছে অনেকগুলো তাঁবু দেখতে পেলেন : আয়েশা, হাফসা ও জয়নবের তাঁবু। তিনি বললেন : (সাহাবিদের উদ্দেশ্যে) তোমরা কি একে নারীদের জন্য পুণ্যের কাজ মনে কর ? অত:পর তিনি এতেকাফ পালন না করেই প্রস্থান করলেন। পরবর্তীতে শাওয়ালের দশ দিন তিনি এতেকাফে (কাজা স্বরূপ) অতিবাহিত করেছিলেন।[২২৯]
দেখা যাচ্ছে, মাত্র তিন জন স্ত্রী তথায় তাঁবু টানিয়ে ছিলেন। অথচ, রাসূলের তিরোধানের পর তার সকল স্ত্রীই এতেকাফ পালন করেছেন। আয়েশা রা. বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাত পর্যন্ত রমজানের শেষ দশ দিন এতেকাফ পালন করেছেন। তার মৃত্যুর পর তার স্ত্রী-গণ এতেকাফ পালন করেছেন।[২৩০]
এগুলো প্রমাণ করে, পরিবারের যে কর্তা ও অভিভাবক, তার দায়িত্ব পরিবার-ভুক্ত সকলের আগ্রহ ও প্রবণতাকে শনাক্ত করা। তাদের কেউ হয়তো সালাতে অধিক আগ্রহী, কারো আকর্ষণ এতেকাফে, অপর কেউ হয়তো কোরআন তেলাওয়াত ও জিকিরে মগ্নতাই অধিক পছন্দ করে, কেউ কেউ নিজেকে পরিব্যাপ্ত রাখে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞানার্জন ও দাওয়াতে। নারীর এ প্রবণতা ও আগ্রহের কেন্দ্রগুলো শনাক্ত করতে সক্ষম না হলে, তার মাধ্যমে এবাদত ও সম্ভাবনার উন্মেষ কোনভাবেই সম্ভব হবে না।
স্ত্রী-গণের সাথে রাসূলের বান্ধব সুলভ আচরণ ও সম্পর্ক
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রী-গণের সাথে খুবই বান্ধব সুলভ আচরণ করতেন, অভ্যাস-আচরণের এ বৈশিষ্ট্য আজীবন তিনি বজায় রেখেছেন। রমজান মাসের সাথে সম্পৃক্ত করে এ বৈশিষ্ট্যের যে কয়টি হাদিস ও বর্ণনা পাওয়া যায়, তার উদাহরণ নিম্নরূপ :
রাসূল তাদের প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখতেন, সচেষ্ট থাকতেন পরিবারের ভিতকে দৃঢ় রাখতে ; তিনি পরিবারকে পরিচালনা করতেন এমন এক আবহে, যা হত লোক-দেখানো চাকচিক্য, ঘৃণা-বিদ্বেষ ও রিয়া হতে মুক্ত। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রী-গণের মাঝে ন্যুনতম অহংকার সৃষ্টির ভয়ে এতেকাফ বর্জন করেছিলেন।
আয়েশা রা. হতে বর্ণিত : তিনি বলেন,
كان النبي صلى الله عليه و سلم يعتكف في العشر الأواخر من رمضان؛ فكنت أضرب له خباء فيصلي الصبح ثم يدخله، فاستأذنت حفصة عائشة أن تضرب خباء فأذنت لها فضربت خباء؛ فلما رأته زينب بنت جحش ضربت خباء آخر؛ فلما أصبح النبي صلى الله عليه و سلم رأى الأخبية، فقال: ما هذا؟ فأُخْبِر فقال النبي صلى الله عليه و سلم: آلبر تُرَونَ بهن؟ فترك الاعتكاف ذلك الشهر، ثم اعتكف عشراً من شوال.
রাসূল রমজানের শেষ দশ দিনে এতেকাফ পালন করতেন। আমি তার জন্য একটি তাঁবু টানালাম, তিনি ফজরের সালাত আদায় করে তাতে প্রবেশ করলেন। হাফসা তাঁবু টানানোর জন্য অনুমতি চাইলে তিনি তাকে অনুমতি দিলেন, এবং হাফসা আরেকটি তাঁবু টানালেন। জয়নব বিনতে জাহাশ দেখতে পেয়ে তার নিজের জন্য আরেকটি তাঁবু টানালেন। সকালে রাসূল অনেকগুলো তাঁবু দেখে বললেন : এগুলো কি ? তাকে বলা হলে তিনি এরশাদ করলেন : তোমরা (সাহাবিদের উদ্দেশ্যে) কি একে পুণ্যের মনে কর ? সে মাসে তিনি এতেকাফ পরিত্যাগ করলেন, অত:পর (কাজা স্বরূপ) শাওয়ালের দশ দিন এতেকাফ করলেন।[২৩১]
ইবনে হাজার রহ. বলেন : রাসূল হয়তো আশঙ্কা করেছিলেন যে, তাদের এবাদত হবে রাসূলের দৃষ্টি ও ভালোবাসা লাভের ক্ষেত্রে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা এবং অহংকারের কারণে, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়। ফলে এতেকাফ তার মৌলিকত্ব হারাবে। এ কারণেই তিনি তথা হতে প্রস্থান করেছিলেন।[২৩২]
আল্লামা বাজি বলেন : হয়তো রাসূল তাদের সকলকে প্রত্যাবর্তন করাতে চেয়েছিলেন, বিধায় নিজেই প্রস্থান করেছেন। তার প্রস্থানকেই সকলের জন্য কল্যাণকর, শিক্ষণীয় ও সন্তুষ্টির কারণ মনে করেছিলেন। মোমিনদের প্রতি তিনি ছিলেন খুবই দয়ার্দ্র।[২৩৩]
বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাই যে, অনেক মহান (!) ব্যক্তিবর্গ, বিশেষভাবে রমজান মাসে উমরা, রাত্রি জাগরণ, ও এতেকাফ ইত্যাদি এবাদতে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন, অথচ পরিবার-পরিজনকে রেখে আসেন সম্পূর্ণ অরক্ষিতে। এ ব্যাপারে রাসূলই আমাদের সর্বোচ্চ আদর্শ, মোস্তাহাব এবাদত পরিত্যাগ করে তিনি পরিবারের প্রতি মনোযোগ দেয়াকেই শ্রেয় মনে করেছেন।
রমজানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনকি এতেকাফ সত্ত্বেও, আপন বেশ-ভূষা ও দেহে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন হয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন :
كان النبي صلي الله عليه و سلم إذا اعتكف يدني إلي رأسه فأرجله، وكان لا يدخل البيت إلا لحاجة الإنسان.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতেকাফকালীন আমার নিকট মস্তক এগিয়ে দিতেন, আমি তার কেশবিন্যাস করে দিতাম, মানবিক প্রয়োজন ব্যতীত তিনি গৃহে প্রবেশ করতেন না।[২৩৪]
অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে : এতেকাফকালীন তিনি তার মস্তক আমার নিকট এগিয়ে দিতেন, আমি হায়েজা অবস্থাতেও তা ধৌত করে দিতাম।[২৩৫] স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সম্পর্ক ও প্রীতির এর চেয়ে উ