রাসূল যেভাবে রমজান যাপন করেছেন (১ম পর্ব)


রাসূল যেভাবে রমজান যাপন করেছেন (১ম পর্ব)

পূর্ব কথা
তাকওয়া অর্জন সিয়াম সাধনার মুখ্য উদ্দেশ্য। আত্মার পরিশুদ্ধি, পার্থিবতায় সর্বাঙ্গ আরোপণ থেকে চেতনা ও মনোজগত বিমুক্তিকরণ, বস্তুকেন্দ্রিকতার রাহুগ্রাস থেকে নিজেকে স্বাধীন করে পরকালমুখীনতার সার্বক্ষণিক চর্চা ও লালন সুগম করে দেয় তাকওয়া অর্জনের পথ-পথান্তর। তবে, তার জন্য শর্ত হল, সিয়াম সাধনার প্রতিটি ক্ষণ যাপিত হতে হবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রোজা-যাপন ও সিয়াম-সাধনার উসওয়া-আদর্শ চেতনায়, অনুভূতিতে, আন্তর ও বহির আচরণে জাগ্রত রেখে, সার্বক্ষণিকভাবে।

রোজা যাপন অবস্থায় মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বীয় প্রতিপালকের সান্নিধ্যে নিজের আবেগ-অনুভূতি-আচরণ উন্মীলিত করার আকার-প্রকৃতি, উম্মত বিষয়ে তাঁর পদক্ষেপ ও কর্মচাঞ্চল্যের ধরন-ধারণ, রোজা যাপনকালে পবিত্র স্ত্রীদের বিষয়ে নানাবিধ কর্মযজ্ঞ্তইত্যাদির পথ ধরে সিয়াম-সাধনার যে পূর্ণাঙ্গ নববী রূপ মূর্তিমান হয়েছে তার জন্য প্রাজ্ঞ লেখক ও বিদগ্ধ শরিয়তবিদ ফায়সাল বিন আলী আল বাদানিকে ধন্যবাদ জানিয়ে খাটো করতে চাই না। প্রখ্যাত গ্রন্থ : হজ পালন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নান্দনিক আচরণ-এর আদলে রচিত গ্রন্থ ‘যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান যাপন করেছেন’ মাহে রমজান বিষয়ে একটি অভূতপূর্ব রচনা যা রোজা পালন অবস্থায় নববী জীবনের অজানা বহু অধ্যায় উন্মীলিত করেছে মনোজ্ঞ ভাষায়। তারুণ্যদীপ্ত শক্তিমান বঙ্গানুবাদক কাউসার বিন খালেদের ভাষান্তরে বইটি বাংলা ভাষাভাষী পাঠকের হাতে তুলে দিতে পেরে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।
বিদগ্ধ গবেষক নোমান বিন আবুল বাশার, প্রাজ্ঞ আলেমে দ্বীন আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান অনুবাদকর্ম পরিমার্জনে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, আল্লাহ তাদেরকে জাযায়ে খায়ের দান করুন।
পবিত্র মাহে রমজান যাপন ও সিয়াম সাধনায় নববী আদর্শের অনুসরণ-অনুবর্তনের অনুভূতি জাগ্রত করণে বইটি যদি সামান্যতম ভূমিকাও পালন করে তবে আমাদের মেহনত সার্থক হয়েছে বলে মনে করব। আল্লাহ আমাদের শ্রম কবুল করুন। আমিন।
১৩/৯/২০০৭
মুহাম্মদ শামছুল হক সিদ্দিক
মহা-পরিচালক
আবহাস এডুকেশনাল এন্ড রিসার্চ সোসাইটি
বাড়ী নং -১৪, রোড নং -১৫, সেক্টর – ৪, উত্তরা,
ঢাকা, বাংলাদেশ।
সূচি
প্রথম পরিচ্ছেদ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রমজান-পূর্ব সময় যাপন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রমজান-পূর্ব সময় যাপন
অন্যান্য সময়ের তুলনায় শাবান মাসে অধিক-হারে রোজা রাখা
নবী সা. কর্তৃক সাহাবিগণকে রমজান আগমনের সুসংবাদ প্রদান
রমজানের বিধান বর্ণনা
চাঁদ দেখার সাক্ষ্য কিংবা পূর্ণ শাবান অতিবাহিত ব্যতীত রোজা পালন আরম্ভ না করা
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
রমজানে রবের সাথে রাসূলের আচরণ
রমজানে আল্লাহ তাআলার সাথে রাসূল সা.-এর আচরণ
রাসূল যেভাবে রোজা পালন করতেন
ইফতার কালে রাসূল সা.-এর দোয়া
রোজা অবস্থায় মেসওয়াক
রাতে অপবিত্র অবস্থায় রোজার নিয়ত করা
তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে মাথায় পানি দেয়া
কুলকুচা করা ও নাকে পানি দেয়া
রাসূল সা.-এর সওমে ওসাল
রমজানে সফর করা, রোজা রাখা কিংবা ভঙ্গ করা
চাঁদ দেখা কিংবা ত্রিশ দিন পূর্ণ করার মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করণ
রমজানে রাসূল সা.-এর এবাদতে রাত্রি জাগরণ
রাসূলের রাত্রিকালীন সালাতের দৈর্ঘ্য
এতেকাফে আল্লাহর একান্ত-সান্নিধ্য যাপন
রমজানে রাসূল সা.-এর শেষ দশ দিন যাপন
লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান ও তাতে রাত্রি-জাগরণ
জিবরাইল আ:-এর সাথে রাসূলের কোরআন অনুশীলন
রাসূলের বিনয় ও যুহুদ
অধিক-হারে সদকা ও সৎ কাজে আত্মনিয়োগ
রমজান মাসে রাসূলের জেহাদ
রমজানের আমলে আহলে কিতাবিদের সাথে বৈপরিত্ব
জীবন সায়া‎েহ্ন আমলের আধিক্য
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
রমজানে প্রিয় সহধর্মিণীদের সাথে রাসূলের আচরণ
রমজানে প্রিয় সহধর্মিণীদের সাথে রাসূলের আচরণ
শিক্ষাদান
রাসূল সম্পর্কে তার সহধর্মিণীদের অবগতি
কল্যাণ কর্মে উৎসাহ প্রদান
রাসূলের সাথে এতেকাফ যাপনে অনুমতি প্রদান
রাসূলের সাথে সম্মিলিত এবাদত পালন
স্ত্রী-গণের সাথে রাসূলের বান্ধব সুলভ আচরণ ও সম্পর্ক
এতেকাফগাহে রাসূলের সাথেতার স্ত্রী-গণের সাক্ষাৎ ও কথোপকথন
রাসূলের উদ্দেশ্য তার স্ত্রীদের সেবার্ঘ্য
রমজানে রাসূলের বিবাহ
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
রমজানে উম্মতের সাথে রাসূলের আচরণ
রমজানে উম্মতের সাথে রাসূলের আচরণ
সাহাবিদের তালিম দান
সাহাবিদের উদ্দেশ্য রাসূলের ওয়াজ ও বয়ান
সৎকর্মে সাহাবিদেরকে রাসূলের সর্বাত্মক নিয়োগ
রমজানে রাসূলের বিভিন্ন সমস্যার শরয়ি সমাধান প্রদান
রাসূলের ইমামতি
সালাত শেষে রাসূলের আলোচনা ও খুতবা প্রদান
রোজার আহকাম ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে রাসূলের নির্দেশনা
লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানে উৎসাহ প্রদান
নিষিদ্ধ কর্মে বাঁধা দান
না-ছোড়দের শিক্ষাদান
ফিতরা আদায়ের আদেশ
কোন কোন কাজে অন্যদের দায়িত্ব দেওয়া
রমজানের পরও এবাদত অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদান
উপসংহার
ভূমিকা
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد الأنبياء وإمام المرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين، وبعد:
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তার প্রেরিত নবি মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণের আদেশ প্রদান করেছেন, আবশ্যক করেছেন তার আনুগত্য। পবিত্র কোরানে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا آَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا.
রাসূল তোমাদের যা প্রদান করেছেন, তা গ্রহণ কর, যে বিষয়ে নিষেধ করেছেন, তা বর্জন কর।[১]
অপর স্থানে বলেছেন,
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ وَمَنْ تَوَلَّى فَمَا أَرْسَلْنَاكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا.
যে ব্যক্তি রাসূলের অনুসরণ করবে, সে আল্লাহরই অনুসরণ করবে, আর যে পিছু হটব্তেআমি আপনাকে তাদের রক্ষাকারী হিসেবে প্রেরণ করিনি।[২]
রাসূলের অনুসরণ ও তার আনুগত্য-এতাআতকে আল্লাহ পাক তার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন ও ঘোষণা স্বরূপ নিরূপণ করেছেন। কোরআনে এসেছে,
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ.
আপনি বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন, তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।[৩]
রাসূল আমাদের জানিয়েছেন্তআল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং ফলশ্রুতিতে তার প্রেরিত রাসূলের আদেশ-নিষেধের অনুবর্তন বান্দার যাবতীয় আমল কবুল হওয়া এবং জান্নাত লাভের জন্য শর্ত। হাদিসে এসেছে,
من عمل عملا ليس عليه أمرنا فهو رد.
কোন ব্যক্তি যদি এমন কাজ করে, যা আমাদের দ্বীন সমর্থিত নয়, তা পরিত্যাজ্য।[৪]
অপর স্থানে এসেছে,
كل أمتي يدخلون الجنة إلا من أبى, قالوا : يا رسول الله و من يأبى ؟ قال : من أطاعني دخل الجنة, و من عصاني فقد أبى.
আমার উম্মতের সকলে জান্নাতে প্রবেশ করব্তেঅস্বীকারকারী ব্যতীত। সকলে প্রশ্ন করল : হে আল্লাহর রাসূল ! অস্বীকারকারী কে ? রাসূল বললেন: যে ব্যক্তি আমার অনুসরণ করল, সে জান্নাতে প্রবেশ করল, আর যে আমার অবাধ্য হল, সে-ই অস্বীকার করল।[৫]
রাসূলের প্রতি এ আত্মিক সমর্পণ, তার সর্বৈব অনুসরণ-অনুবর্তন, নিরঙ্কুশ সম্মতি, পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ব্যতীত কোনভাবেই সম্ভব নয়্তজীবনের সকল ক্ষেত্রে, সকল অনুষঙ্গে : প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে; বাধামুক্ত হয়ে, বিরোধিতা-প্রতিরোধহীনভাবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا.
আল্লাহর শপথ ! তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধপূর্ণ বিষয়ে আপনাকে বিধায়ক (ফায়সালাকারী) হিসেবে মান্য করা, এবং তৎপরবর্তী অবস্থায় তাদের মনে আপনার বিধানের প্রতি খেদ জন্মানো ও পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ব্যতীত তাদের ইমান পূর্ণাঙ্গ হবে না।[৬]
রাসূলের প্রতি এই আত্মিক সমর্পণ, তার আদেশ-নিষেধের অনুবর্তনের মৌলিক চালক হবে তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপন, ও স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসাকে আশ্রয় করে। কারণ, হাদিসে এসেছে, রাসূল বলেছেন,
لا يؤمن أحدكم حتى أكون أحب إليه من والده و ولده والناس أجمعين.
পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও তাবৎ মানুষের তুলনায় আমি তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হওয়া ব্যতীত তোমাদের কারো ইমান পূর্ণাঙ্গ হবে ন্তা হাদিসটির ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে হাফেজ ইবনে রজব মন্তব্য করেন্তবিশুদ্ধ প্রেম ও ভালোবাসা প্রিয় বিষয়গুলো পছন্দ করা এবং অপ্রিয় বিষয়গুলোকে সর্বান্তঃকরণে ঘৃণা করার ক্ষেত্রে অনুসরণ-অনুবর্তন ও অবিকলতার দাবি করে।[৭] ইবনে হাজার বলেন্তমহব্বত ও ভালোবাসা হিসেবে এ স্থানে উদ্দেশ্য নিরঙ্কুশ ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ভালোবাসা। স্বভাবত ও প্রাকৃত যে ভালোবাস্তাতা উদ্দেশ্য নয়, ইমাম খাত্তাবি এ মতই পোষণ করতেন।[৮]
সে মহান ও সৌভাগ্য-মণ্ডিত স্তরে উন্নীত হওয়ার একমাত্র পথ ও পাথেয় হচ্ছে জীবনের সর্বক্ষেত্রে, যাবতীয় আনুষঙ্গিকতায় রাসূলের পূর্ণাঙ্গ জীবন-পদ্ধতি ও বিশুদ্ধ নীতিমালা সম্পর্কে জানা ও পালন করার অভ্যাস গড়ে তোলা। রাসূলের হেদায়েতের সাথে বান্দার ক্রমান্বয় নৈকট্য অর্জন ও তার সুন্নত অনুসারে দ্বীন-আমল সম্পাদন উঁচু ও সম্মানিত স্থান লাভের মজবুত সিঁড়ি, যা বেয়ে মানুষ তার মনুষ্য জীবনের পূর্ণতায় আরোহণ করে। তাই, এ মৌলনীতির ভিত্তিতে আল্লাহ তাআলা রাসূলকে মানুষের জন্য ইমাম ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছেন্তআল্লাহ তাআলা বলেন :
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآَخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا.
তোমাদের জন্য আল্লাহর প্রেরিত রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ্তযে আল্লাহ ও পরকাল দিবসের কামনা করে, এবং আল্লাহকে অধিক-হারে স্মরণ করে।[৯]
ইসলামে রমজান মাস যেহেতু এবাদত ও এবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলার একটি উত্তম ও কার্যকরী সময়, বান্দার জন্য আল্লাহ তাআলার নৈকট্য প্রাপ্তির সুবর্ণ সুযোগ্তমানুষ যা রাসূলের অনুসরণ ও ইত্তেবার মাধ্যমে হাসিল করতে পারে, তাই এ বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞানার্জনের জন্য রাসূলের নীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞানলাভ অতীব প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। রাসূল তার জীবনে যে নয়টি রমজান পালন করেছেন, রমজান পালন ও তাতে এবাদত সংক্রান্ত যাবতীয় খুঁটিনাটি বিষয় বান্দাদের সামনে তুলে ধরেছেন ; আমাদের তাই কর্তব্য, এ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান লাভ করা, এবং সে অনুসারে আমলে ব্রতী হওয়া।
রাসূলের রমজান পালন ও তাতে এবাদত পালন সম্পর্কে জ্ঞাতব্য বিষয়গুলোকে আমরা চারটি পরিচ্ছেদে ভাগ করতে পারি। যথা :
● রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রমজান-পূর্ব সময় যাপন
● রমজানে রব তাআলার সাথে রাসূলের আচরণ
● রমজানের স্ত্রী ও সহধর্মিণীদের সাথে আচরণ
● রমজানে উম্মতের সাথে আচরণ
বইটি রচনার ক্ষেত্রে আমি যে বিষয়টির প্রতি অধিক মনোযোগ প্রদান করেছ্তিবলা যায়, নীতিমালা হিসেবে মান্য করেছি, তা এই যে, পুরো বইয়ে হাদিসের রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখের ক্ষেত্রে পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হাদিস ব্যতীত অন্য কোন হাদিস স্থান দেইনি। যুগের সেরা ও সর্ব-মান্য হাদিসবেত্তার্দেতযেমন শায়েখ আলবানী, শায়েখ শুয়াইব্তকর্তৃক স্বীকৃত ও উল্লেখিত হওয়ার পরই কেবল আমি তাকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছি। তবে, এক্ষেত্রে, সচেতনভাবেই বাহুল্য বর্জন করেছি, কলেবর বৃদ্ধি ও টীকা-টিপ্পনিতে জর্জরিত না করে পাঠকের জন্য সহজ-পাঠ্য করাই ছিল আমার লক্ষ্য।
যারা আমাকে এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন, তাদের সকলের প্রতি আমি সবিশেষ কৃতজ্ঞ। আল্লাহ তাআলার কাছে, সহযোগিতা, সৎপথ ও তওফিক কামনা করি, সার্বিকভাবে, আমার যাবতীয় কর্ম, এবং বিশেষভাবে এই কিতাব কবুলের জন্য তার কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা জানাই। নিশ্চয় তিনি দানশীল, দয়ার্দ্র, মহানুভব।
و صلي الله على محمد و على آله و صحبه أجمعين.
লেখক
২০/৬/১৪২৮ হিজরি, রিয়াদ।
প্রথম পরিচ্ছেদ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রমজান-পূর্ব সময় যাপন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন পার্থিব বিষয়ে পরিপূর্ণ যুহুদ অবলম্বনকারী, আল্লাহ ও পরকাল দিবসে যা গচ্ছিত ও সংরক্ষিত সে ব্যাপারে খুবই আকাঙ্ক্ষী। রাসূল, তাই, অসন্ন এবাদতকাল উপলক্ষ্যে অত্যন্ত আনন্দিত হতেন এবং বিভিন্ন সময়ে রহমত-বরকত ও কল্যাণ বর্ষণ এবং অবতরণের উপলক্ষ্য ও অনুষঙ্গগুলোর কারণে ব্যাকুল হতেন। কোরআনে এসেছে,
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ
আপনি বলুন, আল্লাহর ফজল ও করুণায় এ হয়েছে। এর মাধ্যমেই তারা যেন আনন্দিত হয়। তারা যা সঞ্চয় করে, সে তুলনায় তা উত্তম।[১০]
আয়াতটি প্রমাণ করে মানুষের পার্থিব অর্জিত ধন-সম্পদ বা সঞ্চিত ব্যবহার্য নয়; আনন্দের উপকরণ হল আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ কোরআন, ইসলামের ফরজ বিধি-বিধান, ও আনুষঙ্গিক সম্পূরক সমূহ্তযার অন্যতম সিয়াম।[১১]
আল্লামা ইমাম সাদি বলেন : ইহকালীন ও পরকালীন বিপুল নেয়ামত-রাজির সাথে পার্থিব জগতের অর্জনের কোন তুলনা নেই ; পার্থিব সঞ্চয়্ততা যতই অঢেল ও বিচিত্র হোক না কেন, একদিন অবশ্যই বিবর্ণ আকার ধারণ করবে, বিলুপ্ত হবে অচিরে। আল্লাহ তাআলা তাই, তার প্রদত্ত ফজিলত ও করুণাকে আনন্দের উপকরণ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন-নির্দেশ দিয়েছেন তাকে স্ফূর্তির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করতে।
কারণ, এর মাধ্যমেই আত্মার স্ফুরণ হয়, উদ্বেলিত হয় অপার এক উদ্যমে, কৃতজ্ঞতায় নতজানু হয় আল্লাহর দরবারে, সঞ্চারিত হয় তার মাঝে এক অমিত শক্তি, সূচিত হয় জ্ঞান ও ঈমান প্রাপ্তির পরম আকাঙ্ক্ষা। সন্দেহ নেই্তবান্দার এ মনোবৃত্তি প্রশংসনীয়। আনন্দ ও চিত্ত-স্ফূর্তির এ মাধ্যম খুবই গ্রহণযোগ্য।
পক্ষান্তরে, ইহকাল প্রবৃত্তি ও তার আস্বাদ জন্ম দেয় যে আনন্দের, কিংবা যে স্ফূর্তি ডাল-পালা মেলেছে অসিদ্ধ পথের বদান্যতায়, তা ঘৃণিত, বর্জনীয়। যেমন আল্লাহ তাআলা কারুন গোত্রের প্রসঙ্গে এরশাদ করেছেন,
لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ
তুমি আনন্দিত হয়ও না, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা (অনৈতিক উপায়ে) আনন্দিতদের পছন্দ করেন না।[১২]
অনুরূপ আল্লাহ তাআলা একই উক্তি করেছেন এমন ব্যক্তিদের সম্পর্কে, যারা আনন্দিত হয়েছে অগ্রহণযোগ্য অনৈতিক বিষয়ের প্রতি দৃকপাত র্কতেযা রাসূলদের আনীত বিষয়ের পূর্ণ পরিপন্থী।
কোরআনে এসেছে,
فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُمْ بِالْبَيِّنَاتِ فَرِحُوا بِمَا عِنْدَهُمْ مِنَ الْعِلْمِ
রাসূলগণ যখন তাদের নিকট আগমন করলেন স্পষ্ট নিদর্শনা সহকারে, তারা আনন্দ অনুভব করল তাদের নিকট যে ইলম ছিল তা নিয়ে।[১৩] [১৪]
আল্লাহ তাআলার নৈকট্যলাভ ও কল্যাণ-কর্মের বিভিন্ন উপলক্ষের অনুবর্তন ও তাতে সর্বস্ব নিয়োগ বান্দাকে দ্রুত আল্লাহর নিকটবর্তী করতে সহায়তা করে, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও রেজা লাভের মাধ্যমে বান্দা উন্নীত হয় উঁচু মর্যাদায়, এগিয়ে যায় দ্রুত সম্মুখ-পানে। নৈকট্য ও কল্যাণ-কর্মের মৌসুমগুলোর উত্তম অনুবর্তনের ফলে সবকিছুই হয় ফলদায়ক, আত্মায় ও দেহে, আন্তর ও বাহ্য সম্পর্কের যাবতীয় সজাগ অনুভূতি নিয়োগ করে আল্লাহর আনুগত্যে সে নিজেকে বিলীন করে দেয়।
নৈকট্য লাভের বিবিধ মাহেন্দ্রক্ষণ এবং রমজানের সদ্‌ব্যবহারের উত্তম প্রমাণ হল এ ব্যাপারে রাসূলের সর্বাত্মক প্রস্তুতি, মানসিক ও আত্মিকভাবে রমজানকে স্বাগত জানানোর জন্য ব্যাকুলতা ; যেন তা পূর্ণাঙ্গভাবে কল্যাণব্রতী হয়, উদ্যমী হয় আনুগত্যের চরম পরাকাষ্ঠা উত্তরণের, সময়গুলো কাজে লাগে পূর্ণাঙ্গভাবে।
এভাবে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, যিনি উভয় জগতের নেতা, রমজান-পূর্ব সময় যাপন করতেন, সমাধা করতেন প্রস্তুতির নানা পর্ব। নিম্নে তার প্রস্তুতির উল্লেখযোগ্য কিছু উদাহরণ পেশ করা হল্ত
অন্যান্য সময়ের তুলনায় শাবান মাসে অধিক-হারে রোজা রাখা
রমজানে দীর্ঘদিন রোজা রাখার দৈহিক ও মানসিক প্রস্তুতির জন্য তিনি শাবান মাসে অধিক-হারে রোজা পালন করতেন।[১৫] আয়েশা রা: হতে বর্ণিত একটি হাদিস বিষয়টির প্রমাণ বহন করে। হাদিসে এসেছে, আয়েশা রা: বলেন,
كان رسول الله صلى الله عليه و سلم يصوم حتى نقول: لا يفطر، ويفطر حتى نقول: لا يصوم، فما رأيت رسول الله صلي الله عليه و سلم استكمل صيام شهر إلا رمضان، وما رأيته أكثر صياماً منه في شعبان
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো এমনভাবে রোজা পালন করতেন যে আমাদের মনে হত, তিনি রোজা ত্যাগ করবেন না। আর কখনো এত দীর্ঘ সময় রোজা ত্যাগ করতেন যে, আমাদের মনে হত তিনি আর রোজা পালন করবেন না। রমজান মাস ব্যতীত পূর্ণ কোন মাস তাকে আমি রোজা পালন করতে দেখিনি। এবং
শাবানের তুলনায় ভিন্ন কোন মাসে এত রোজা পালন করতেও দেখিনি।[১৬]
অন্য হাদিসে এসেছে,
ولم أره صائما من شهر قط أكثر من صيامه من شعبان، كان يصوم شعبان كله كان يصوم شعبان إلا قليلاً.
শাবানের তুলনায় অন্য কোন মাসে আমি তাকে এত অধিক-হারে রোজা পালন করতে দেখিনি। তিনি শাবানের প্রায় পুরোটাই রোজায় অতিবাহিত করতেন। কিছু অংশ ব্যতীত তিনি পুরো শাবান মাস রোজা রাখতেন।[১৭]
সুতরাং, উক্ত হাদিসের প্রতি লক্ষ্য রেখে, ধর্মপ্রাণ মুসলমান মাত্ররই কর্তব্য, শাবান মাসে অধিক-হারে রোজা পালন করা। বিদগ্ধ উলামাদের মতামত এই য্তেশাবানের রোজা হচ্ছে ফরজ সালাতের আগে ও পরে পালিত সুন্নতে মোয়াক্কাদার অনুরূপ এবং তা রমজান মাসের ভূমিকাতুল্য। অর্থাৎ, তা যেন রমজানের পূর্বে পালিত প্রস্তুতিমূলক এবাদত। এ কারণেই শাবান মাসে রোজা পালন সুন্নত করা হয়েছে। এবং সুন্নত করা হয়েছে শাওয়াল মাসের ছয় রোজা। ফরজ নামাজের পূর্বের ও পরের সুন্নতের অনুরূপ।[১৮]
সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বর্তমান পরিস্থিতির সানুপুঙ্খ বিচারক মাত্রই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন্তনববী এই আদর্শ বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে সমাজ হতে, গুটি কয় ব্যক্তি ব্যতীত এর উপস্থিতি কোনভাবেই নজরে পড়ে না আমাদের। নববী পদাঙ্ক অনুসরণ করে যারা আরোহণ করতে ব্যাকুল-আগ্রহী উচ্চ সম্মানের স্তরে, রাত্রি-দিন যে ব্যক্তি পরকালিন সাফল্য লাভের ধ্যানে মজ্জমান, নিজেকে এর জন্য গড়ে নিচ্ছে নিপুণভাবে, কোথায় সে মহা পুরুষগণ ! জীবনের সবগুলো বসন্তের অনুরূপ, হারিয়ে যাবে এক সময় বরকতময় কল্যাণ লাভের এ মাস্তরমজান মাস। আল্লাহ আমাদেরকে এর পুরো সার গ্রহণ করার তৌফিক দান করুন।
নবী সা. কর্তৃক সাহাবিগণকে রমজান আগমনের সুসংবাদ প্রদান
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবিগণকে রমজানের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য নানাভাবে উৎসাহিত-উদ্দীপিত করতেন, পরামর্শ প্রদান করতেন সর্বস্ব নিয়োগ করে তাতে কল্যাণ আহরণের জন্য আত্মনিয়োগের। এ বিষয়ে নানা হাদিস রয়েছ্তেযেমন :
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
إذا دخل شهر رمضان فتحت أبواب السماء و غلقت أبواب جهنم وسلسلت الشياطين.
যখন রমজান মাস আগত হয়, আকাশের দরজাগুলো উন্মুক্ত হয়, বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের কপাটগুলো, এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয় শৃঙ্খলে।[১৯]
অপর হাদিসে এসেছে,
إذا كان أول ليلة من شهر رمضان صفدت الشياطين ومردة الجن، وغلقت أبواب النار فلم يفتح منها باب، وفتحت أبواب الجنة فلم يغلق منها باب، وينادي منادٍ: يا باغي الخير أقبل، ويا باغي الشر أقصر!، ولله عتقاء من النار، وذلك كل ليلة.
রমজানের প্রথম রাত্রিতে শয়তান ও দুষ্ট জিনদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের কপাটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়্ততার একটি দরজাও খোলা হয় না। উন্মুক্ত করে দেয়া হয় জান্নাতের দরজাগুলো, বন্ধ করা হয় না তার একটিও। একজন আহ্বানকারী আহ্বান জানিয়ে বলেন : হে কল্যাণের প্রত্যাশী ! অগ্রসর হও। আর যে অকল্যাণের প্রত্যাশী, বিরত হও। আল্লাহ জাহান্নাম হতে অনেককে মুক্তি দিবেন, এবং তা প্রতি রাতেই।'[২০] ভিন্ন এক হাদিসে এসেছে,
أتاكم رمضان؛ شهر مبارك، فرض الله عز وجل عليكم صيامه، تفتح فيه أبواب السماء، وتغلق فيه أبواب الجحيم، وتُغَلُّ فيه مردة الشياطين، لله فيه ليلة خير من ألف شهر، من حرم خيرها فقد حرم.
রমজান্তবরকতময় মাস্ততোমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে। পুরো মাস রোজা পালন আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়, বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। দুষ্ট শয়তানদের এ মাসে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেয়া হয়। এ মাসে আল্লাহ কর্তৃক একটি রাত প্রদত্ত হয়েছে, যা হাজার মাস হতে উত্তম। যে এর কল্যাণ হতে বঞ্চিত হল, সে বঞ্চিত হল (মহা কল্যাণ হতে)।[২১]
হাদিসে এসেছে,
إن في الجنة بابا يقال له: الريان، يدخل منه الصائمون يوم القيامة، لا يدخل منه أحد غيرهم، يقال: أين الصائمون؟، فيقومون لا يدخل منه أحد غيرهم، فإذا دخلوا أغلق فلن يدخل منه أحد
জান্নাতের একটি দরজা রয়েছে রইয়ান নামে। কেয়ামত দিবসে রোজাদারগণ উক্ত দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবিষ্ট হবেন ; তারা ব্যতীত কেউ তা দিয়ে প্রবেশ করার সুযোগ পাবে না। বলা হবে : রোজাদারগণ কোথায় ? তখন তারা দণ্ডায়মান হবেন, তারা ব্যতীত এ দরজা দিয়ে অপর কেউ প্রবেশ করবে না। তারা প্রবিষ্ট হওয়ার পর সে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। অপর কেউ তাতে প্রবেশের সুযোগ পাবে না [২২]
সত্য পথের আহ্বানকারী যারা, যারা সর্বক্ষণে, সর্বক্ষেত্রে কল্যাণ ও ফজিলত পিয়াসি, তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হল : এ মহান সুন্নত চৌদিকে ছড়িয়ে দেয়া, মানুষের মাঝে এর কল্যাণ বিস্তারে আত্মনিয়োগ করা। তাদের দায়িত্ব হল, মানুষকে তারা রমজানের সুসংবাদ প্রদান করবে, তার ফজিলত ও বরকত সম্পর্কে অবগত করাবে, সময়ের সর্বোত্তম ও উপযোগী ব্যবহার, ও উপকার হাসিলের মাধ্যমে লাভবান হওয়ার পথ বাতলে দেবে। সুসংবাদ ও সৌভাগ্যের বাণী-মাধুর্যে বিধৌত করবে মানুষের মন-মানস। রমজান যাপনের মাধ্যমে উদ্বেল হবে একে-অপরে, আবদ্ধ হবে সম্প্রীতির বন্ধনে। যে কোন বিষয়ের তুলনায় এর জন্য অধিক প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।
কি উপায়ে সর্বাত্মক কল্যাণ আহরণ হয়, এবং ভরিয়ে তোলা যায় আত্মাক্তেঅনুসন্ধান করবে এ বিষয়ে। পার্থিব ভোগ-বিলাস ও উত্তম পানাহারকে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসবে না যে, মনে হয়, এগুলোই রমজানের একমাত্র উদ্দেশ্য। কারণ, এর মাধ্যমে রমজানের উদ্দেশ্য চূড়ান্তভাবে ব্যাহত হয়, বাধা প্রাপ্ত হয় কল্যাণ-ধারা। পরিতাপের বিষয় এই যে, অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই রমজান অতিবাহিত হয় তার অগোচর-সন্তর্পণে। আল্লাহ আমাদের হেদায়াত করুন, প্রদান করুন সঠিক পথের দিশা।
রমজানের বিধান বর্ণনা
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে সাহাবিদের নানা বিধান সম্পর্কে অবগত করাতেন, সঠিক দিক-নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে ঋজু পথ আঁকড়ে ধরতে উৎসাহিত করতেন। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে উল্লেখিত অনেক হাদিস ও হাদিসাংশ এ বিষয়ের উত্তম প্রমাণ।
বর্তমান সময়ে, রাসূলের উক্ত কর্মপন্থা অনুসারে, আমাদের দায়িত্ব হল : যারা উম্মতের মহান আলেম ও বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, সম্মানিত দায়ি, তারা সাধারণ মানুষকে রমজানের যাবতীয় হুকুম সম্পর্কে জ্ঞাত করাবেন, রমজান-পূর্ব ও মধ্যবর্তী সময়ে মানুষের মাঝে ব্যাপক দাওয়াতি কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন। প্রত্যেকে সাধ্য ও সামর্থ্যের সবটুকু ব্যয় করবেন, যে উপায়ে বিষয়টির বাস্তবায়ন সম্ভব, অবলম্বন করবেন সে সকল উপায়। কারণ, মানুষের মাঝে মূর্খতা ছড়িয়ে পড়েছে, দ্বীনের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকট অভাব গোচরীভূত হচ্ছে সাধারণ মুসলমান্তকখনো কখনো বিশেষ শ্রেণির মাঝেও্তসমাজে।
সাধারণ মুসলমান্তনারী হোক কিংবা পুরুষ্তনির্বিশেষে, সকলের কর্তব্য : পবিত্র রমজানে পালিত যাবতীয় এবাদত ও জিকির-আজকার বিষয়ক বিধি-বিধান সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি লাভ করা। সুতরাং, তারা রমজান বিষয়ক বই-পত্র অধ্যয়ন করবে, অডিও প্রোগ্রাম শ্রবণ করে স্বচ্ছ ধারণা লাভে প্রয়াস চালাবে। হাজির হবে ইলম ও জ্ঞানের মজলিস সমূহে।
কারণ, যে কোন বিষয়ের মৌলিক খুঁটি হচ্ছে সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি লাভ করা, এবং পরবর্তীতে সে অনুসারে আমল করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক অনুমোদিত নয়্তএমন আমল পরিত্যাজ্য সর্বার্থে। গ্রহণযোগ্য কেবল সে আমলই, যার ভিত্তি অতি মজবুত, যার আচরিত কর্মপন্থা সঠিক ও নির্ভুল।
ইলম, আমল, ও দাওয়াতি ক্ষেত্রে যে