অন্তরের আমল: দ্বীনদারি


অন্তরের আমল: দ্বীনদারি

 
 
 
ভূমিকা
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على نبينا محمد، وعلى آله وصحبه أجمعين.
যাবতীয় প্রশংসা মহান রাব্বুল আলামীনের যিনি সমগ্র জাহানের প্রতিপালক। আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর, যিনি সমস্ত নবীগণের সেরা ও সর্বশ্রেষ্ঠ। আরও সালাত ও সালাম নাযিল হোক তার পরিবার, পরিজন ও সাথী-সঙ্গীদের উপর।

অন্তরের আমলসমূহের অন্যতম আমল হল, পরহেজগারি ও দ্বীনদারি। পরহেজগারি ও দ্বীনদারি হল, দ্বীনের খুঁটিসমূহ তথা ভিত্তিসমূহের একটি অন্যতম ভিত্তি ও খুটি। তাকওয়া, পরহেজগারি ও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর ভয় ছাড়া ঈমানদারি চলে না। মনে রাখতে হবে, দ্বীনদারি মানবাত্মা ও অন্তরকে যাবতীয় নাপাকী-অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করে এবং বিভিন্ন ধরনের মানবিক ব্যাধি-হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রিকাতরাতা ইত্যাদি হতে মুক্ত করে। পরহেজগারি ও দ্বীনদারি হল, ঈমানী বৃক্ষের ফল এবং ঈমানের সৌন্দর্য। দ্বীনদারি ছাড়া ঈমান, ফল ছাড়া বৃক্ষের মত। ঈমানের পরিপূর্ণতার জন্য দ্বীনদারি আবশ্যক। তবে দ্বীনদারি কি তা আমাদের অবশ্যই জানা থাকতে হবে। আমরা অনেকেই পরহেজগারি ও দ্বীনদারি কি তা জানি না। এ জন্য পরহেজগারি ও দ্বীনদারি সম্পর্কে আলোচনা খুবই জরুরি। যাতে আমরা কোনটি দ্বীনদারি আর কোন গোড়ামি তা জানতে ও বুঝতে পারি।

আমরা এ কিতাবে দ্বীনদারি- ورع- এর সংজ্ঞা, হাকীকত, উপকারিতা ও ফলাফল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করব। সাথে সাথে এখানে থাকবে কিভাবে আমরা দ্বীনদারি অর্জন করতে পারি তার আলোচনা, মুত্তাকী ও পরহেজগার হিসাবে আমরা নিজেকে কিভাবে গড়ে তুলতে পারি তার আলোচনা। আর আমার এ রিসালাটি, অন্তরের আমলসমূহের ধারাবাহিক আলোচনারই একটি অংশ বিশেষ। একটি ইলমী প্রশিক্ষণ সেন্টারে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে আলোচনা করার সুযোগ দিয়েছিলেন, তখন আমি এ বিষয়টির উপর আলোচনা করি। আমার আলোচনাটিকে রিসালা-পুস্তিকা- আকারে রূপ দেয়া হয়। আমার সাথে কিছু আহলে ইলম সাথী ছিল, যারা আমাকে বিভিন্নভাবে এ বিষয়ে সহযোগিতা করেন।
আমরা তাদের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট কামনা করি, তিনি যেন তাদের ও আমাদের সবার জন্য যাবতীয় কল্যাণ ও কামিয়াবিকে সহজ করে দেন এবং ইলম ও আমলের পথকে উন্মুক্ত করে দেন। নিশ্চয় তিনি আমাদের প্রার্থনা শোনেন এবং কবুল করেন। আমীন।
মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জেদ

বিষয়ের গুরুত্ব

 

আল্লামা তাউস রহ. বলেন, ঈমানের দৃষ্টান্ত হল, বৃক্ষের মত, তার মূল, কাণ্ড ও ডাল-পালা হল, এ কথার সাক্ষ্য দেয়া, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নাই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর রাসূল। আর ঈমান বৃক্ষের ফল হল, পরহেজগারি ও দ্বীনদারি। যে বৃক্ষের ফল নাই তার মধ্যে কোন উপকারিতা নাই। আর যে লোকের মধ্যে দ্বীনদারি নাই তার মধ্যে কোন কল্যাণ নাই[1]।
কাসেম ইবনে উসমান রহ. বলেন, পরহেজগারি ও দ্বীনদারি হল, দ্বীনের খুঁটি[2]। আরো মনে রাখতে হবে, আসল ইবাদতই হল, দ্বীনদারি অর্জন করা। হারেস ইবন আসাদ আল-মুহাসেবী রহ. বলেন, আসল ইবাদত হল, দ্বীনদারি। কাসেম আল-জুয়ী রহ. বলেন, দ্বীনের মূল হল, পরহেজগারি ও দ্বীনদারি অবলম্বন করা। দ্বীনদারি হল একজন বান্দার যোগ্যতার আসল প্রমাণ[3]। ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তারা উভয়ে বলেন,
« لا تنظروا إلى صلاة أحد ولا صيامه، وانظروا إلى صدق حديثه إذا حدث، وإلى أمانته إذا ائتمن، وإلى ورعه إذا أشفى»
“তোমরা কোন মানুষের সালাত ও সাওমের দিকে দেখে তার দ্বীনদারি বিচার করবে না। যখন সে কথা বলে তখন সত্য বলে কিনা তা দেখবে, যখন তার নিকট আমানত রাখা হয়, তখন তার আমানতদারিতার প্রতি লক্ষ্য করবে এবং যখন অসুস্থ হয়, তখন তার দ্বীনদারির প্রতি লক্ষ্য করবে”[4]।
সালফে সালেহীনগণ দ্বীনদারি কিভাবে অর্জন করতে হয়, তা শিখতো। আল্লামা জাহহাক রহ. বলেন,
“আমাদের যুগে আমরা দ্বীনদারি শিখতাম। তিনি আরও বলেন, আমরা আমাদের সাথীদের দেখতাম তারা কিভাবে দ্বীনদারি অর্জন করা যায় তা শিখতো”।
দ্বীনদারির সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থ: অভিধানে এর অর্থ হল, সংকোচ বোধ করা।
কিন্তু শব্দটির মূল অর্থ হল, হারাম থেকে বিরত থাকা, তারপর শব্দটিকে রূপক অর্থে ব্যবহার করা হলে, তার দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মুবাহ ও হালাল বস্তু থেকে বিরত থাকা[5]।
পারিভাষিক অর্থ:
শব্দটি পারিভাষিক অর্থ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।
আল্লামা ফুজাইল ইবনে আয়াজ রহ. বলেন,
الورع: اجتناب  المحارم
“الورع তথা দ্বীনদারি হল, নিষিদ্ধ বিষয় হতে বিরত থাকা”[6]।
আল্লামা ইবরাহীম ইবনে আদহাম রহ. বলেন,
الورع: ترك كل شبهة، وترك ما لا يعنيك، وترك الفضلات
“পরহেজগারি ও দ্বীনদারি হল, সন্দেহযুক্ত বস্তু, অনর্থক কর্মকাণ্ড ও অতিরঞ্জিত কোন কাজ করা হতে বিরত থাকা”।[7]
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম দ্বীনদারির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন,
الورع: ترك  ما يُخشى ضرره في الآخرة
“দ্বীনদারি হল, যে কাজ করলে আখিরাতের ক্ষতির আশংকা রয়েছে, তা পরিহার করা”[8]।
আবু বকর মুহাম্মদ ইবন আলী আল কাতানী রহ. বলেন,
الورع:  هو ملازمة الأدب، وصيانة النفس
“দ্বীনদারি হল, শিষ্টাচারিতা অবলম্বন করা এবং আত্মার হেফাজত করা”[9]।
আল্লামা যুরকানী রহ. বলেন,
الورع: ترك ما لا بأس به حذراً من الوقوع مما به بأس
“দ্বীনদারি হল, যাতে কোন ক্ষতি নাই তা ছেড়ে দেয়া যাতে যে কাজে ক্ষতি আছে তা হতে বাঁচা যায়”[10]।
আল্লামা জুরজানী রহ. বলেন,
الورع: اجتناب الشبهات خوفاً من الوقوع في المحرمات
“দ্বীনদারি হল, সন্দেহযুক্ত বিষয়সমূহ হতে বেঁচে থাকা, যাতে হারামে লিপ্ত না হতে হয়”[11]।
কোন কোন আলেম দ্বীনদারির সংজ্ঞা দিয়ে বলেন,
الورع :كله في ترك ما يريب إلى ما لا يريب
“যে সব বস্তু তোমাকে সন্দেহ সংশয়ের দিকে নিয়ে যায়, তা ছেড়ে যেসব বস্তু তোমাকে সন্দেহ সংশয়ের দিকে নিয়ে যায় না, তার প্রতি ঝুঁকে পড়াকে পরহেজগারি বলে”[12]।
অপর একজন বিজ্ঞ আলেম বলেন,
حقيقة الورع: توقي كل ما يحذر منه، وغايته: تدقيق النظر في طهارة الإخلاص من شائبة الشرك الخفي
“দ্বীনদারির হাকিকত হল, যে বস্তুকে মানুষ আশঙ্কাযুক্ত মনে করে, তা হতে বিরত থাকা। আর তার শেষ গন্তব্য হল, ছোট শিরকের আশঙ্কা হতে নিয়তকে পুত-পবিত্র করার প্রতি সূক্ষ্ম দৃষ্টি দেয়া”[13]।
উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা বুঝা যায়, দ্বীনদারি ও পরহেজগারির সংজ্ঞায় বিভিন্ন ধরনের মতামত পরিলক্ষিত। সবার মতামতকে একত্র করার লক্ষ্যে আমরা বলব, পরহেজগারি ও দ্বীনদারির চারটি স্তর আছে:
এক- সাধারণ লোকের দ্বীনদারি: আর তা হল, হারাম বস্তু হতে বিরত থাকা।
দুই- নেককার লোকদের দ্বীনদারি: যে সব কাজে হারামের সম্ভাবনা রয়েছে, তা হতে বিরত থাকা।
তিন- মুত্তাকীদের দ্বীনদারি: যে সব কাজে কোন ক্ষতি নাই সেসব কাজকে ক্ষতি হয় এমন কোন কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় ছেড়ে দেয়া।
চার- সত্যবাদীদের দ্বীনদারি: এমন কর্মকাণ্ড হতে বিরত থাকা, যাতে বিন্দু পরিমাণও ক্ষতি নাই। কিন্তু সে আশঙ্কা করে, না জানি কাজটি গাইরুল্লাহর উদ্দেশ্যে হয়ে যায় অথবা না জানি কাজটি অপছন্দনীয় বা অপরাধের অন্তর্ভুক্ত হয়। এ আসংঙ্কা থেকে সে এ ধরনের কাজ করা হতে বিরত থাকে।
উপরে যে চারটি স্তরের কথা আলোচনা করা হয়েছে, তার কোন না কোন একটির ভিত্তিতে ওলামাগণ দ্বীনদারির সংজ্ঞা তুলে ধরেছেন।

পরহেজগারি বা দ্বীনদারির গুরুত্ব ও ফজিলত:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিল করার হিকমত অসংখ্য ও অগণিত; এসব হিকমতের বর্ণনা দিয়ে শেষ করা যাবে না। তবে হিকমতসমূহের অন্যতম হিকমত হল, মানুষকে পরহেজগার ও মুত্তাকী বানানো। অর্থাৎ, মানুষ যাতে তাকওয়া, পরহেজগারি ও দ্বীনদারির গুণে গুণান্বিত হতে পারে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় কল্যাণ হাসিলে সক্ষম হয়, তার জন্যই কুরআন নাযিল করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে করীমে এরশাদ করে বলেন,
﴿ وَمَن يَعۡمَلۡ مِنَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَلَا يَخَافُ ظُلۡمٗا وَلَا هَضۡمٗا ١١٢ وَكَذَٰلِكَ أَنزَلۡنَٰهُ قُرۡءَانًا عَرَبِيّٗا وَصَرَّفۡنَا فِيهِ مِنَ ٱلۡوَعِيدِ لَعَلَّهُمۡ يَتَّقُونَ أَوۡ يُحۡدِثُ لَهُمۡ ذِكۡرٗا ١١﴾ [سورة طه: 113[.
“আর এ ভাবেই আমি আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করেছি এবং তাতে বিভিন্ন সতর্কবাণী বর্ণনা করেছি, যাতে তারা মুত্তাকী হতে পারে অথবা তা হয় তাদের জন্য উপদেশ”। [সূরা তাহা, আয়াত: ১১৩]
আল্লামা ক্বাতাদাহ রহ. আল্লাহর বাণীতে জিকির শব্দের ব্যাখ্যায় বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, দ্বীনদারি, পরহেজগারি ও তাকওয়া[14]।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে করীমে দ্বীনদার লোকদের কামিয়াবি লাভ ও সফলতার একাধিক দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন, যাতে তারা তাদের প্রশংসনীয় অবস্থার উপর অটল ও অবিচল থাকে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
﴿ أَفَلَمۡ يَهۡدِ لَهُمۡ كَمۡ أَهۡلَكۡنَا قَبۡلَهُم مِّنَ ٱلۡقُرُونِ يَمۡشُونَ فِي مَسَٰكِنِهِمۡۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَأٓيَٰتٖ لِّأُوْلِي ٱلنُّهَىٰ ١٢ ﴾  [سورة طه: 128[.
“এটি কি তাদেরকে সৎপথ প্রদর্শন করল না যে, আমি তাদের পূর্বে কত মানবগোষ্ঠিকে ধ্বংস করে দিয়েছি, যাদের বাসভূমিতে তারা বিচরণ করে? নিশ্চয় এর মধ্যে রয়েছে বিবেক সম্পন্নদের জন্য নির্দশন”। [সূরা তাহা, আয়াত: ১২৮]
আল্লামা ক্বাতাদাহ রহ. বলেন,
أولو النهى هم أهل الورع
“জ্ঞানী তারাই যারা দ্বীনদার ও পরহেজগার”[15]।
মানুষ যাতে পরহেজগার ও দ্বীনদার হয়, তার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার স্বীয় কিতাব মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল করেন এবং কুরাআনে বিভিন্ন ধরনের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন। এতে স্পষ্ট প্রমাণিত হয়, দ্বীনদারি অবলম্বন করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি।
মনে রাখতে হবে, আমরা যে তাকওয়া বা দ্বীনদারিকে ওয়াজিব বলছি তা হল উল্লেখিত দ্বীনদারির স্তরসমূহের সর্বনিম্ন স্তর।

দ্বীনদারি অবলম্বন করার ফজিলত:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন হাদিসে দ্বীনদারি অবলম্বন করার অনেক  ফজিলত বর্ণনা করেন। এখানে কিছু ফজিলত তুলে ধরা হল। যেমন-
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« يَا هُرَيْرَةَ، كُنْ ورًِعا تَكْن أَْعبَدَ الناَّسِ أَبَا» 
“হে আবু হুরাইরা তুমি মুত্তাকী ও পরহেজগার হও, তাহলে তুমি সমগ্র মানুষের চেয়ে বড় ইবাদতকারী বলে বিবেচিত হবে”[16]। সায়াদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« خَيْردِينِكُمُ الَورَُع»
“তোমাদের উত্তম দ্বীন হল তোমাদের দ্বীনদারি”[17]।
হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতেও অনুরূপ হাদিস বর্ণিত[18]। আমর ইব্ন ক্বাইস আল মালায়ী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« مَلَاكُ دِينِكُم الَورَُع »
“তোমাদের দ্বীনের রাজত্ব হল, দ্বীনদারি”[19]।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
« ما أعجب رسول الله صلى الله عليه وسلم شيءٌ من الدنيا، ولا أعجبه منها إلا وَرِعاً »
“দুনিয়ার কোন বস্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুগ্ধ করতে পারেনি। পরহেজগারি ও দ্বীনদারি ছাড়া কোন কিছুই তাকে সে পরিমাণ আনন্দ দিতে পারেনি যে পরিমাণ আনন্দ তাকে তাকওয়া দিয়েছে”[20]।
মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিন্দু পরিমাণ আগ্রহ ছিল না। তাই যখন তার নিকট দুনিয়ার কোন ধন-সম্পত্তি আসত, তখন তিনি সেগুলোকে তাড়াতাড়ি বণ্টন করে দিতেন। নিজের কাছে কিছুই রাখতেন না। তিনি ইলম, আমল ও দ্বীনদারিকে অধিক গুরুত্ব দিতেন। হারাম ও হালালের বরখেলাফ করাকে তিনি কোন ক্রমেই মেনে নিতেন না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে দ্বীনদারি অবলম্বনের গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অনুরূপভাবে আমাদের সালফে সালেহীনগণও দ্বীনদারি অবলম্বনের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন এবং তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। তারা তাদের কথা ও কাজের মাধ্যমে মানুষকে তাকওয়া অর্জন ও দ্বীনদারি অবলম্বন করার জন্য উৎসাহ প্রদান করেন। বিভিন্নভাবে মানুষদের দ্বীনদারি অর্জনের দিকে আহ্বান করতেন। যেমন-
ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন,
শেষ রাতে নড়াচড়া করা অর্থাৎ তাহাজ্জদ পড়া বা জিকির আজকার করার নাম কিন্তু দ্বীন নয়, দ্বীন হল, দ্বীনদারি এ পরহেজগারি অবলম্বন করা[21]।
অর্থাৎ, যারা দ্বীনদারি অবলম্বন করে তারাই হল, সত্যিকার দ্বীনদার। অনেকে আছে ভোর রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়ে, কিন্তু হারাম হালালের মধ্যে কোন পার্থক্য করে না, মানুষের হকের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করে না, ন্যায় অন্যায়ের কোন বিচার বিশ্লেষণ করে না। এরা সত্যিকার দ্বীনদার নয়।  তাদের তাহাজ্জুদ দ্বারা তারা কোন উপকৃত হতে পারবে না
হাসান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, সর্বোত্তম ইবাদত হল, চিন্তা-ফিকির করা ও দ্বীনদারি অবলম্বন করা[22]। তিনি আরও বলেন, হিকমত ও বুদ্ধিমত্তা হল, দ্বীনদারি[23]।
অর্থাৎ, যারা চিন্তা-ফিকির করে, তাদের মধ্যে সত্যিকার মানবতা জাগ্রত হয়। তখন তারা তাদের নিজেদের ব্যাপারে এবং মানুষের ব্যাপারে সতর্ক হয়। মানুষের হক তারা নষ্ট করে না এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর হকও তারা নষ্ট করে না। তাদের দ্বারা কোন প্রকার অন্যায় অনাচার সংঘটিত হয় না। তার হারাম থেকে বিরত থাকে। চিন্তা-ফিকির করার গুরুত্ব এতই বেশি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিন্তা ফিকির করাকে ইবাদত বলে আখ্যায়িত করেন।
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যেব রহ. বলেন, ইবাদত হল, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা হারাম করেছেন, তা হতে বিরত থাকা এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিদর্শনসমূহের চিন্তা করা[24]।
হারাম থেকে বিরত থাকা যে ইবাদত এতে কোন সন্দেহ নাই। কারণ, একটি হাদিসে বর্ণিত স্ত্রীর সাথে সহবাস করাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবাদত বলে আখ্যায়িত করলে একজন সাহাবী তাকে জিজ্ঞাসা করে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! একজন লোক তার স্ত্রীর সাথে যৌন চাহিদা নিবারণ করল তা কিভাবে ইবাদত হতে পারে? তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, যদি লোকটি যৌবিক চাহিদা তার স্ত্রীর সাথে না মিটিয়ে অন্য কোন মহিলার সাথে ব্যভিচার করত, তাহলে তাতে কি তার গুনাহ হত? সাহাবী বলল, অবশ্যই গুনাহ হত। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যেহেতু সে হারামে না গিয়ে হালাল উপায়ে প্রয়োজন মেটালো এবং হারাম থেকে বিরত থাকল, এটা তার জন্য অবশ্যই ইবাদত।
আল্লামা মুতাররফ ইবনে শিখির রহ. বলেন, তোমাদের সর্বোত্তম দ্বীন হল, তোমাদের পরহেজগারি ও দ্বীনদারি[25]। দ্বীনদারি ছাড়া দ্বীনদারির কোন দাম নাই। একজন ব্যক্তি তখন ঈমানদার হতে পারবে যখন তার মধ্যে দ্বীনদারি থাকবে।
তিনি আরও বলতেন, তোমরা দুইজন লোকের সাথে সাক্ষাৎ করলে দেখবে, একজন অনেক সালাত ও সাওম আদায় করে এবং বেশি বেশি আল্লাহর রাস্তায় দান করে। আর অপর ব্যক্তি যে বেশি সালাত বা সাওম আদায় করে না এবং বেশি বেশি সদকাও করে না। সে তার থেকে উত্তম। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল তা কিভাবে সম্ভব? তখন সে বলল, লোকটি তার অপর ভাইয়ের তুলনায় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেসব বিষয়ে নিষেধ করছেন, সে বিষয়ে অধিক সতর্ক ও পরহেজগার[26]।
এখানে একটি কথা স্পষ্ট হয়, শুধু সালাত, সাওম ও দান-খয়রাত দিয়ে দ্বীনদার হওয়া যায় না। দ্বীনদার হওয়ার জন্য তোমাকে অবশ্যই হারাম থেকে বেঁচে থাকতে হবে। হারাম থেকে বেঁচে থাকা নফল ইবাদত বন্দেগী হতে অধিক উত্তম। আল্লামা ইয়াহয়া ইবনে কাসীর রহ. বলেন, সর্বোত্তম আমল হল, পরহেজগারি ও দ্বীনদারি[27]। মানুষ যখন হারাম থেকে বেঁচে থাকবে তখনই তার মধ্যে দ্বীনদারি পাওয়া যাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুত্তাকীদের অধিক ভালোবাসেন। আর মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যা নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকে এবং যা করতে বলছেন তা পালন করেন। তারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের হক আদায় করেন এবং আল্লাহ  রাব্বুল আলামীন এর মাখলুকের হকও আদায় করেন। প্রত্যেক হকদারকে তাদের পাওনা যথাযথভাবে আদায় করেন।

দ্বীনদারির সাথে শরীয়তের জ্ঞান একত্র হওয়ার ফজিলত:
একজন জ্ঞানী লোকের দ্বীনদারি সাধারণ মানুষের দ্বীনদারির মত নয়। যারা জ্ঞানী তাদের তাকওয়া ও দ্বীনদারি অধিক শক্তিশালী হয়ে থাকে। কারণ, তাদের তাকওয়া দ্বারা তারা যে উপকার লাভ করে অন্যরা তা লাভ করতে সক্ষম নয়। কোন কোন কবি বলেন,
وَإنَ فقِيهاً وَاحِداً مُتَوَِّرعاً
أَشَدُّ عَلَى الشَّيْطَانِ مِنْ أَلْفِ عَابدِِ
“নিশ্চয় একজন দ্বীনদার জ্ঞানী শয়তানের জন্য এক হাজার আবেদ হতে অধিক শক্তিশালী”[28]।
এ কারণেই আলেমগণ শর্তারোপ করেন, একজন বিচারক যিনি মানুষের মধ্যে বিচার ফায়সালা করবে, তাকে অবশ্যই শরিয়তের বিধান সম্পর্কে জ্ঞানী হতে হবে। সে যদি শরিয়তের বিষয়ে জ্ঞানী না হয়, তাহলে সে কিভাবে ন্যায় বিচার করবে। কারণ, ন্যায় বিচারের উৎসই হল একমাত্র কুরান ও সুন্নাহ। সুতরাং, যারা বিচারক হবে তাদের অবশ্যই কুরান ও সুন্নাহ সম্পর্কে ইলম থাকতে হবে। অন্যথায় তাদের দ্বারা ন্যায় বিচার সংঘটিত হবে না। তাদের থেকে ন্যায় বিচারের আশা করা আকাশ কুসুম সমতুল্য।
দুনিয়াতে মানুষের মধ্যে বিচার ফায়সালা করা, একটি মহৎ কাজ, এতে রয়েছে বড় ধরনের ইজ্জত ও সম্মান। এছাড়া এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও কর্তব্য, যারা বিচারক কিংবা হাকিম হয়ে থাকে, তাদের অবশ্যই সতর্ক হতে হয় এবং জ্ঞানে পরিপূর্ণ হতে হয়। অন্যথায় তারা বিচার কাজ পরিচালনায় ভুল করতে পারে যা একজন মানুষের জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনবে। দুইজন মানুষের মধ্যে আর্থিক, সামাজিক ও নৈতিক সমস্যা নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ, মারা-মারি, কাটা-কাটি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং বর্তমান যুগে সমাজে ও দেশে এগুলো প্রতিনিয়তই সংঘটিত হচ্ছে। এ সব ঝগড়া-বিবাদ ও মতবিরোধের বিচার ফায়সালা বা সমাধানের স্থান হল, বিচারালয় ও আদালত। বিচারালয় ও আদালত হল, মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান। এটাই মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। এখানে এসে মানুষ ন্যায় বিচার পাওয়ার আশা করে। কিন্তু এখান থেকে যদি ন্যায় বিচার না পায় তাহলে তার আর কোন উপায় থাকে না। সুতরাং এখানে যারা বিচার করবে তাদের অবশ্যই জ্ঞানী ও সৎ হতে হবে। তারা যদি জ্ঞানী না হয় এবং অসৎ হয় তাহলে মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার হতে বঞ্চিত হবে এবং মানবতা ধুলায় মিশে যাবে। এ কারণেই বলা যায় যে, যারা মানুষের মাঝে বিচার-ফায়সালা করবে তাদের অবশ্যই দ্বীনদার ও জ্ঞানী হতে হবে। তাদের দ্বীনদার ও জ্ঞানী হওয়ার কোন বিকল্প নাই।


দ্বীনদারির হাকিকত
সন্দেহযুক্ত বিষয়গুলো ছেড়ে দেয়া:
একটি কথা মনে রাখতে হবে, হালাল হারামের মাঝে কিছু সন্দেহযুক্ত বস্তু আছে, যেগুলো হারাম কি হালাল তা স্পষ্ট নয়। এ ধরনের সন্দেহযুক্ত বস্তু হতে বেঁচে থাকা হল, সত্যিকার দ্বীনদারি। যারা এ সব সন্দেহযুক্ত বস্তু হতে বেঁচে থাকে না তারা হারামে লিপ্ত হতেও কোন প্রকার ভ্রূক্ষেপ করে না। 
নুমান ইবনে বাশির রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, 
«إن الَحَلَال بَيِّن وَالحَراَم بِين، وَبَيْنهَمَا مُشَبَّهَاتٌ لَا يَعْلُمهَا كَثيٌر مِنْ النَّاسِ، فَمَنْ اتَّقَى المُشَبَّهَاتِ اسْتَبْرأَ لدِِينهِِ وَِعرْضِهِ، وَمَن وقَع فِي الشُّبُهَاتِ كَرَاعٍ يَرْعَى حَوْلَ الحِمَى أَوْشَكَ أَنْ يُواقَعهُ، أَلَا وَإنَِّ لكِلِّ مَلكٍِ حمىً، أَلَا وَإنَِّ حِمَى الله في أْرضِهِ مَحَارِمُهُ، أَلَا وَإِنَّ فِي الجَسِد مُضْغَةً إذَِا صلَحتْ صَلَح الجَسَدُ كُلُه، وإذَِا فَسَدتْ فَسَد الجَسَدُ كُلُّهُ، أَلَا وَهِيَ القَلْب »
“হালাল ও হারাম উভয়টি স্পষ্ট। তবে উভয়ের মাঝে কিছু সন্দেহযুক্ত বস্তু আছে, যা অধিকাংশ মানুষ জানে না। যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বস্তু হতে বেঁচে থাকবে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জত-সম্মানকে অটুট রাখল। আর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বস্তু হতে বেঁচে থাকল না, তার জন্য সমূহ সম্ভাবনা আছে যে, সে হারামে পতিত হবে। যেমন- একজন রাখাল সে ক্ষেতের পাশে ছাগল চরায় তার মধ্যে এ আশঙ্কা থাকে, সে ক্ষেত নষ্ট করবে। আর একটি কথা মনে রাখতে হবে প্রত্যেক বাদশার জন্য একটি নির্ধারিত ময়দান রয়েছে, আর জমিনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ময়দান হল, তার নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ। আর একটি কথা মনে রাখতে হবে, মানুষের দেহের মধ্যে একটি গোস্তের টুকরা রয়েছে, যখন তা সংশোধন হয়, তাহলে পুরো দেহটি ঠিক থাকে আর যখন তার মধ্যে যে টুকরা রয়েছে, তা নষ্ট হয়, তাহলে তার পুরো দেহটাই নষ্ট হয়। আর তা হল মানুষের অন্তর[29]।                
ওয়াবেছাতা ইবনে মাবাদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« الإِثْمُ: مَا حَاكَ فِي القَلْبِ، وَتَرََّددَ فِي الصَّدْرِ، وَإنِْ أَفْتَاكَ النَّاسُ وََأفْتَوْكَ »
“গুনাহ হল, যা তোমার অন্তরে সংকোচ মনে হয়, এবং মনের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্ধ সৃষ্টি করে। আর যদি মানুষ ফতওয়া দেয়, তখন ….[30]
হাসান ইবনে আবি সিনান রহ. বলেন, দ্বীনদারি হল, যখন কোন কিছু তোমাকে সন্দেহে ফেলে, তাকে তুমি ছেড়ে দেবে। এটাই হল, তোমার পরহেজগারি ও দ্বীনদারি[31]।


কতক মুবাহ ও হালাল বস্তু হতে বিরত থাকা:
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, দ্বীনদারি হল, যেসব কর্ম-কাণ্ড তোমার ক্ষতির কারণ হয়, তা হতে বিরত থাকা। মানবজাতিকে যেমনিভাবে হারাম হতে বিরত থাকতে হবে, অনুরূপভাবে সন্দেহযুক্ত বস্তুসমূহ হতেও বিরত থাকতে হবে। কারণ, সন্দেহযুক্ত বস্তুও অনেক সময় ক্ষতির কারণ হয়। যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত কর্মকাণ্ড হতে বিরত থাকে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জত-সম্ভ্রমের হেফাজত করল। আর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত কর্ম-কাণ্ডে লিপ্ত হল, সে অবশ্যই হারামে পতিত হল। যেমন- একজন রাখাল সে ফসলের ক্ষেতের পাশে ছাগল চরাচ্ছিল, তার জন্য আশঙ্কা থাকে, তার ছাগলটি ফসলে গিয়ে পতিত হবে এবং ফসলের ক্ষতি করবে।
সুতরাং, একজন মুসলিমের  কর্তব্য হল, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যেসব কাজ করতে নিষেধ করেছেন তার কাছে যাওয়া হতে বিরত থাকা। কারণ, তার নিকট যাওয়াতে তোমাদের জন্য হারামে লিপ্ত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,
﴿ تِلۡكَ حُدُودُ ٱللَّهِ فَلَا تَقۡرَبُوهَاۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ ءَايَٰتِهِۦ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمۡ يَتَّقُونَ ١٨٧﴾  [سورة البقرة: 187[.
“এটা আল্লাহর সীমারেখা, সুতরাং তোমরা তার নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তার আয়াতসমূহ মানুষের জন্য স্পষ্ট করেন, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন”। [সূরা বাকারাহ, আয়াত, ১৮৭]
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন,
﴿ فَإِنۡ خِفۡتُمۡ أَلَّا يُقِيمَا حُدُودَ ٱللَّهِ فَلَا جُنَاحَ عَلَيۡهِمَا فِيمَا ٱفۡتَدَتۡ بِهِۦۗ تِلۡكَ حُدُودُ ٱللَّهِ فَلَا تَعۡتَدُوهَاۚ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ ٱللَّهِ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ٢٢٩﴾ [سورة البقرة: 229[.
“সুতরাং তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে, তারা আল্লাহর সীমারেখা কায়েম রাখতে পারবে না। তাহলে স্ত্রী যা দিয়ে নিজকে মুক্ত করে নেবে তাতে কোন সমস্যা নেই। এটা আল্লাহর সীমারেখা। সুতরাং তোমরা তা লঙ্ঘন করো না। আর যে আল্লাহর সীমারেখাসমূহ লঙ্ঘন করে, বস্তুত তারাই যালেম”। [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ২২৯]
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর সীমানা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, হালালের শেষ প্রান্ত যার নিকট যেতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে নিষেধ করেছেন। আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর সীমা-রেখার অপর অর্থ, হারামের প্রাথমিক অবস্থা। তখন অর্থ হবে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তোমাদের জন্য যা হালাল বা বৈধ করছেন, তা অতিক্রম করো না। আর তোমাদের জন্য যা হারাম করেছে, তার কাছেও তোমরা যেও না। সুতরাং, দ্বীনদারি হল, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর বিধানের সীমা রেখার কাছে যাওয়া ও অতিক্রম করা হতে নিরাপদ থাকা। হালাল বিষয়ে সীমা অতিক্রম করা দ্বারা বড় কবিরা গুনাহ ও কঠিন হারামে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
সালফে সালেহীনদের থেকে বর্ণিত, তারা অনেক সময় হারাম ও নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন ধরনের হালাল ও বৈধ কাজ হতেও বিরত থাকতেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমি আমার মাঝে এবং হারামের মাঝে হালাল দ্বারা একটি প্রাচীর তৈরি করতে চাই, যাকে আমি হারাম মনে করি না[32]।
আল্লামা সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহ রহ. বলেন, একজন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানের হাকীকত উপভোগ করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার মাঝে এবং হারামের মাঝে হালাল দ্বারা প্রতিরোধ গড়ে না তুলে। আর যতক্ষণ পর্যন্ত সে গুনাহ ও গুনাহের সাদৃশ্য বিষয়গুলো না ছাড়বে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না[33]।
মাইমুন ইবন মাহরান রহ. বলেন, একজন মানুষ যতদিন পর্যন্ত তার মাঝে ও হারামের মাঝে হালাল দ্বারা প্রতিরোধ গড়ে না তুলে, ততদিন পর্যন্ত সে ঈমানদার হতে পারবে না[34]।
কোন কোন সালফে সালেহীনগণ বলেন, একজন বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত তাকওয়ার সাধ গ্রহণ করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে ক্ষতি নাই এমন বস্তুকে যে বস্তুতে ক্ষতি আছে তার থেকে বাঁচার জন্য পরিহার করবে না[35]।  
কোন কোন মনীষী বলেন, আমরা হালাল বিষয়ের সত্তরটি বিষয় ছেড়ে দিতাম যাতে আমরা হারাম থেকে বাঁচতে পারি[36]।
উপরের আলোচনা থেকে একটি কথা স্পষ্ট হয়, তা হল, দ্বীনদার