ইসলামে দাস প্রথা!!!!!!!


ইসলামে দাস বিধি ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺍﻟﺮﺣﻴﻢ ভূমিকা সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি জনগণ ও রষ্ট্রের সংশোধন ও সংস্কারের জন্য শরী‘য়ত অবতীর্ণ করেছেন; সালাত ও সালাম তাঁর উপর, যিনি মানুষকে যুলুম ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছেন; শান্তি বর্ষিত হউক তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবী ও তাবে‘য়ীগণের উপর, যাঁরা যমীনে আল্লাহর একত্ববাদ, স্বাধীনতা ও জ্ঞানের নীতিমালা প্রচার করেছেন; তাঁদের প্রতিও শান্তি বর্ষিত হউক, যাঁরা কিয়মতের দিবস পর্যন্ত তাঁদের দা‘ওয়াত দ্বারা অন্যকে দা‘ওয়াত দান করেন এবং তাঁদের পথনির্দেশের দ্বারা যথাযথভাবে হেদায়েত লাভ করেন। অতঃপর: আমার ‘কিসসাতুল হিদায়াত’ [হিদায়াতের কাহিনী] নামক গ্রন্থটিতে কতগুলো মূল্যবান বক্তৃতা ( Lecture ) ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে … পাঠক সে হিদায়াতের কাহিনী গ্রন্থের তার প্রাসঙ্গিক স্থানে তা পাবে। অতঃপর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি আলোচনাগুলো একটার পর একটা বের করে আনব, অতঃপর তার মধ্যে যা কিছু আছে তা দেখব; অতঃপর যখন আলোচনাটিতে কোনো কিছু বৃদ্ধি করার প্রয়োজন হবে, তখন আমি তাতে বৃদ্ধি করব; আর যখন ঐখানে কোনো কিছু কাটছাট করা জরুরি মনে করব, তখন তা কাটছাট করবে … শেষ পর্যন্ত যখন আমি তার পরিমার্জন ও পুনর্বিন্যাসের কাজ শেষ করব, তখন আমি বক্তব্য বা আলোচনাটি ‘বাহুসুন ইসলামীয়াতুন হাম্মাহ’ ( ﺑﺤﻮﺙ ﺇﺳﻼﻣﻴﺔ ﻫﺎﻣﺔ ) [গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী আলোচনা] নামক সিরিজের অন্তর্ভুক্ত করব; আশা করা যায় “সিরিজ” -এর পাঠকগণ এসব বক্তৃতা ও আলোচনা থেকে উপকৃত হবেন এবং আরও আশা করা যায় যে, তারা এসবের মধ্যে এমন অনেক প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেয়ে যাবেন, যেগুলো ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে করা হয়ে থাকে। আর তা ইসলামের শত্রুদের অকপট সাক্ষ্যের মাধ্যমেই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়ে যাবে। আর এসব বক্তৃতাসমূহ (Lecturers) থেকে তার প্রাসঙ্গিক স্থানে দেওয়া আমার বক্তব্যের মধ্যে অন্যতম একটি বক্তৃতা হলো “আর-রিক্বু ফিল ইসলাম” ( ﺍﻟﺮﻕ ﻓﻲ ﺍﻹﺳﻼﻡ ) [ইসলামে দাস]; যে বক্তৃতাটি তার যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল যখন আবুল ফাতহ এর মত ব্যক্তিত্বদের উত্থান ঘটেছিল। আমার পাঠক ভাই! অবশ্যই আপনি “দাস” প্রবন্ধের আলোচনায় “দাস-প্রথা” কে কেন্দ্র করে ইসলামের শত্রুগণ কর্তৃক উত্থাপিত প্রত্যেকটি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেয়ে যাবেন অকাট্য দলীল, গ্রহণযোগ্য কারণ এবং সুন্দর ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনার মাধ্যমে। আমি আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন মুসলিম যুবকদেরকে সুপথ ও সঠিক বুঝ দান দান করেন, তাদেরকে ঈমান ও জিহাদের উষ্ণতার দ্বারা দা‘ওয়াতিমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত করেন … এবং এই উম্মতের প্রতি সম্মান, শক্তি ও জাগরণের উপায়সমূহ নির্দেশ করেন … যাতে আমরা আমাদের নিজ চোখে ইসলামের পতাকাকে উড্ডীন অবস্থায় এবং মুসলিমগণের রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় দেখতে পারি … আর এটা আল্লাহর জন্য কঠিন বা কষ্টকর কোনো কাজ নয়। লেখক * * * মুখবন্ধ ও ভূমিকা প্রাচীন ও আধুনিক কালে ইসলামের শত্রুগণ, বিশেষ করে তথাকথিত সাম্যবাদীগণ ইসলামের শাসনব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে অপবাদ ও অভিযোগের মরীচিকা এবং সন্দেহ ও সংশয়ের ফেনা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে …। এর লক্ষ্য হল: মুসলিম প্রজন্মের মধ্যে নাস্তিকতার বীজ বপন করা, আল্লাহর দেওয়া শাসনব্যবস্থার ব্যাপারে যুবকদের মধ্যে সন্দেহের ধূম্রজাল সৃষ্টি করা এবং মুসলিম জাতিকে অপরাধমূলক স্বেচ্ছাচারিতা, লাম্পট্য, নাস্তিকতা, কুফরী, নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দেওয়া …। আর বিদ্বেষমূলক প্ররোচনার মধ্য থেকে যেগুলোকে তারা শিক্ষিত সভ্য- সমাজের মধ্যে উস্কানি দিয়ে উল্লেখ করে থাকে তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ‘ইসলাম কর্তৃক দাসত্ব প্রথার বৈধতা প্রদান’। যা তাদের দৃষ্টিতে মানুষের স্বাধীনতার সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন; আর তারা এই ধরনের যুলুম মার্কা অভিযোগ এনে ইসলামের মধ্যে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টির পঁয়তারা করে থাকে। এর মাধ্যমে তারা ইসলামের মূলনীতিসমূহের মধ্যে অপবাদ দেওয়ার উপায় আবিষ্কার করে, যাতে তারা মুসলিম সমাজ ও ইসলামের অনুসারী প্রজন্মের মধ্যে নাস্তিকতা ও তথাকথিত ধর্মনিরেপক্ষ নীতিমালা প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে তাদের গুপ্ত উদ্দেশ্য ও নিকৃষ্ট লক্ষ্যে … পৌঁছতে সক্ষম হয়। আর যখন বেশ কিছু মুসলিম যুবক এসব উদ্দেশ্যমূলক অপবাদ ও অপরাধমূলক সন্দেহের দ্বারা প্রভাবিত হতে শুরু করল, তখন তারা আলেমদের নিকট এসব প্রশ্ন করা শুরু করে: কিভাবে ইসলাম দাসত্বকে বৈধ করেছে এবং তাকে তার নিয়মনীতির অন্তর্ভুক্ত করেছে? অথবা কিভাবে ইসলাম মানুষকে মনিব ও গোলাম বলে শ্রেণীবিভাগ করতে চায়? অথবা কিভাবে যে আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সম্মানিত করেছেন, তিনি তাকে দাস-দাসীর বাজারে ক্রয়- বিক্রয় করতে চান, যেমনিভাবে ব্যবসা- বাণিজ্যের বাজারে পণ্যসামগ্রী ক্রয়- বিক্রয় করা হয়? আর আল্লাহ তা‘আলা যখন এতে সম্মতই না হবেন, তাহলে তিনি কেন তাঁর সম্মানিত কিতাবে (আল-কুরআনুল কারীমে) দাস-দাসী প্রথা বাতিল করে সুস্পষ্ট বক্তব্য পেশ করেননি, যেমনিভাবে তিনি মদ, জুয়া, সুদ ও যিনা- ব্যভিচার … ইত্যাদি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বক্তব্য পেশ করেছেন, যা ইসলাম হারাম করে দিয়েছে? যদিও মুমিন যুবক ভালোভাবেই জানে যে, ইসলাম হলো সত্য ও স্বভাব দীন, কিন্তু তার অবস্থা ইবরাহীম খলিল আ. এর মত, কেননা আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন: ﴿ ﺃَﻭَ ﻟَﻢۡ ﺗُﺆۡﻣِﻦۖ ﻗَﺎﻝَ ﺑَﻠَﻰٰ ﻭَﻟَٰﻜِﻦ ﻟِّﻴَﻄۡﻤَﺌِﻦَّ ﻗَﻠۡﺒِﻲۖ ﴾ ‏[ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ٢٦٠ ] “তিনি বললেন, তবে কি আপনি ঈমান আনেন নি? তিনি বললেন, ‘অবশ্যই হাঁ, কিন্তু আমার মন যাতে প্র্রশান্ত হয় !”[1] আর কোনো সন্দেহ নেই যে, একজন বিবেকবান ও চিন্তাশীল মানুষ … যখন স্বজনপ্রীতি মুক্ত বা নিরপেক্ষ হয়, আর সাথে সাথে সে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্ত থাকে এবং তার অন্তরকে সত্য গ্রহণের জন্য, বিবেককে যুক্তি গ্রহণের জন্য ও দৃষ্টিকে আলো উপভোগ করার জন্য … উন্মুক্ত করে দেয়, তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে তার জন্য আবশ্যক হয়ে পড়ে সত্য ও বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়া এবং রব (প্রতিপালক) প্রদত্ত নিয়মনীতিকে গ্রহণ করে নেওয়া, যার সামনে ও পিছন থেকে অসত্য ও অকার্যকর কিছু আসবে না …। আল-কুরআনের ভাষায়: ﴿ ﻗَﺪۡ ﺟَﺎٓﺀَﻛُﻢۡ ﺭَﺳُﻮﻟُﻨَﺎ ﻳُﺒَﻴِّﻦُ ﻟَﻜُﻢۡ ﻛَﺜِﻴﺮٗﺍ ﻣِّﻤَّﺎ ﻛُﻨﺘُﻢۡ ﺗُﺨۡﻔُﻮﻥَ ﻣِﻦَ ﭐﻟۡﻜِﺘَٰﺐِ ﻭَﻳَﻌۡﻔُﻮﺍْ ﻋَﻦ ﻛَﺜِﻴﺮٖۚ ﻗَﺪۡ ﺟَﺎٓﺀَﻛُﻢ ﻣِّﻦَ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﻧُﻮﺭٞ ﻭَﻛِﺘَٰﺐٞ ﻣُّﺒِﻴﻦٞ ١٥ ﻳَﻬۡﺪِﻱ ﺑِﻪِ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﻣَﻦِ ﭐﺗَّﺒَﻊَ ﺭِﺿۡﻮَٰﻧَﻪُۥ ﺳُﺒُﻞَ ﭐﻟﺴَّﻠَٰﻢِ ﻭَﻳُﺨۡﺮِﺟُﻬُﻢ ﻣِّﻦَ ﭐﻟﻈُّﻠُﻤَٰﺖِ ﺇِﻟَﻰ ﭐﻟﻨُّﻮﺭِ ﺑِﺈِﺫۡﻧِﻪِۦ ﻭَﻳَﻬۡﺪِﻳﻬِﻢۡ ﺇِﻟَﻰٰ ﺻِﺮَٰﻁٖ ﻣُّﺴۡﺘَﻘِﻴﻢٖ ١٦ ﴾ ‏[ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ: ١٥، ١٦ ] “আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে, তিনি সে সবের অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করছেন এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিচ্ছেন। অবশ্যই আল্লাহর নিকট থেকে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের কাছে এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে, এ দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং তাদেরকে নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার হতে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান; আর তাদেরকে সরল পথের দিশা দেন।”[2] এই ভূমিকা পেশ করার পর আমি আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য নিয়ে ইসলাম দাস- প্রথার ব্যাপারে যে অবস্থান গ্রহণ করেছে তার বর্ণনা শুরু করছি … যাতে ঐ ব্যক্তি জানতে পারে, যে ব্যক্তি জানতে চায় যে, ইসলাম দাস- দাসীর সাথে কেমন ব্যবহার করেছে? আর কিভাবে তাকে মুক্ত করার ব্যাপারে ইতিবাচক উপায় বা পদ্ধতি প্রণয়ন করেছে? আর কিভাবে এমন নীতিমালা প্রবর্তন করেছে, দাস-দাসী বানানোর একটি অবস্থা ব্যতীত সকল উৎসকে বন্ধ করে দিয়েছে? কিছুক্ষণ পরেই আমরা তার আলোচনা করব। আর এ জন্য আমি দাসত্ব সম্পর্কিত আলোচনাটিকে সকল দিক থেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য নিম্নোক্ত পয়েন্টগুলোর আলোচনা করা ভালো মনে করছি: প্রথমত: দাসত্ববাদ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কিছু কথা দ্বিতীয়ত: দাসত্বের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান তৃতীয়ত: দাস-দাসী’র সাথে ইসলাম কেমন আচরণ করে? চতুর্থত: কিভাবে ইসলাম দাস- দাসীকে মুক্তি দিয়েছে? পঞ্চমত: কেন ইসলাম দাসত্ব প্রথাকে চূড়ান্তভাবে বাতিল করেনি? ষষ্ঠত: বর্তমান বিশ্বে দাসত্ব প্রথা আছে কি? সপ্তমত: বৈধভাবে দাস-দাসী গ্রহণের বিধান কী? উপরোক্ত সাতটি পয়েন্টেই আমি কিছু বিস্তারিত আলোচনার প্রয়াস পাব। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি আমাকে সাহায্য করুন। * * * দাসত্ববাদ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কিছু কথা ১. ইসলামের আগমন হয়েছে এমতাবস্থায় যে, দাস-দাসীর ব্যাপারটি ছিল গোটা বিশ্বের সকল প্রান্তে একটি স্বীকৃত প্রথা ও ব্যবস্থাপনা, বরং তা ছিল অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বা কর্মতৎপরতা এবং সামাজিক প্রচলন, যাকে কোনো মানুষ অস্বীকার করতে পারে না; আর কোনো মানুষ তার পরিবর্তনের সম্ভাব্যতার ব্যাপারে চিন্তাও করতে পারে না !! ২. ইসলামের পূর্বে বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে দাস করার উৎস ছিল বিভিন্ন ধরনের: – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম একটি হলো, যুদ্ধসমূহের মধ্যে দাস- দাসী বানানোর প্রবৃত্তি এবং জনগোষ্ঠীর রক্ত শোষণ করা …। – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হলো দারিদ্রতার কারণে অথবা ঋণ পরিশোধ করতে না পারার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দাস-দাসীতে পরিণত করা …। – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হলো, চুরি অথবা হত্যার মত মারাত্মক ধরনের অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দাস- দাসীতে পরিণত করা …। – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হলো মাঠের মধ্যে কাজ করা এবং তাতে অবস্থান করার জন্য কোনো ব্যক্তিকে দাস-দাসীতে পরিণত করা …। – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হলো ছিনতাই বা অপহরণ এবং বন্দী করার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে দাস- দাসীতে পরিণত করা …। – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হলো অভিজাত শ্রেণী ও বড় লোকদের সাথে অসদ্ব্যবহার করার কারণে কোনো ব্যক্তিকে দাস- দাসীতে পরিণত করা …। এগুলো ছাড়াও আরও নানা ধরনের উৎস রয়েছে, যেগুলোকে তারা মানুষের স্বাধীনতা হরণ করার জন্য ন্যায়সঙ্গত কারণ বলে বিবেচনা করে এবং তাকে মনিবদের সামনে অনুগত দাস বা গোলামে পরিণত করে !! ৩. রোমান, পারস্য, ভারত, চীন, গ্রীক প্রভৃতি রাজ্যে দাস-দাসীর সাথে আচরণ ছিল বর্বর ও নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে; সেখানে তার মানবতা ছিল উপেক্ষিত, তার সম্মান ছিল ভূলুণ্ঠিত এবং কাজের ক্ষেত্রে তার জবাবদিহীতা ছিল অত্যন্ত কঠিন …, যদিও এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার পরিধির মধ্যে কম বেশি পার্থক্য ছিল। রোমান সমাজে দাস-দাসীর সাথে আচরণের কিছু নমুনা আপনাদের সামনে তুলে ধরা হল: রোমন জাতির নিকট যুদ্ধ বা আগ্রাসন ছিল জনগোষ্ঠীকে দাস-দাসী বানানোর অন্যতম মূল উৎস বা উৎপত্তিস্থল; আর এই আগ্রাসন কোনো সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত ও নীতির উপর ভিত্তি করে সংঘটিত হতো না, বরং তার একমাত্র কারণ ছিল অন্যদেরকে গোলাম বানানো এবং তাদেরকে তাদের বিশেষ স্বার্থে ও ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের জন্য নিজেদের অধীনস্থ করা, যেমনটি ‘আশ- শুবহাত’ ( ﺍﻟﺸﺒﻬﺎﺕ ) নামক গ্রন্থের লেখক উল্লেখ করেছেন। আর তা এ জন্যে যে, যাতে রোমানরা অহঙ্কারী ও বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে পারে; আর শীতল ও উষ্ণ গোসলখানাসমূহ দ্বারা (আরাম) উপভোগ করতে পারে; আরও উপভোগ করতে পারে অহঙ্কারী পোষাক এবং রং বেরং -এর সুস্বাদু খাবারসমূহ; বরং তারা ডুবে থাকবে অহঙ্কারময় ভোগবিলাসে এবং মদ, নারী, নৃত্য, অনুষ্ঠানাদি এবং বিভিন্ন পর্ব ও উৎসবের মত পাপ-পঙ্কিলময় আমোদ-প্রমোদে। … এই জন্যই অপর জনগোষ্ঠীকে দাস- দাসী বানানো, তাদের রক্ত শোষণ করা এবং তাদের নারী ও পুরুষদেরকে দাস- দাসী হিসেবে মালিকানা গ্রহণ করাটা আবশ্যক ছিল !! … এই পাপ-পঙ্কিলময় কামনা-বাসনার পথ ধরেই গড়ে উঠে রোমানীয় উপনিবেশবাদ এবং দাসত্ব প্রথা, যার উৎপত্তি এই উপনিবেশ থেকেই। রোমানীয় রাষ্ট্রে দাস-দাসীদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ চিত্র: – দাস-দাসীগণ মাঠে কাজ করত এমতাবস্থায় যে, তাদেরকে ভারী বেড়ি পরিয়ে বন্দী করে রাখা হত, যা তাদের পালিয়ে যাওয়া থেকে বাধা প্রদানে যথেষ্ট ছিল। – তারা তাদেরকে শুধু এমন পরিমাণ খাবার দিত, যা কোনো রকমে তাদের জীবনটুকু বাঁচিয়ে রাখত, যাতে তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত অনুগত গোলাম হয়ে কাজ করতে পারে। – তারা কাজের মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই তাদেরকে চাবুক দ্বারা তাড়িয়ে বেড়াত; এসব মানব সৃষ্টিকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে মনিবগণ শুধু অন্যায় আমোদ-ফূর্তি অনুভব করত, যাদেরকে তাদের মায়েরা মুক্ত স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছিল। – তারা জেলখানার দুর্গন্ধময় অন্ধকার সেলে ঘুমাতো, যেখানে পোকামাকড় ও ইঁদুরের গোষ্ঠী অবাধে যা ইচ্ছা করতে থাকত, একটি সেলে পঞ্চাশ জন অথবা তার চেয়ে অধিক সংখ্যক দাস অবস্থান করত এবং তারা সেখানে বেড়ি পরানো অবস্থায় অবস্থান করত। – তাদেরকে তরবারী ও বর্শা (বল্লম) দ্বারা প্রতিযোগিতার আসরে ঠেলে দেওয়া হত …। তারপর সেই আসরে মনিবগণ সমবেত হত তাদের নিজ নিজ দাসের পারস্পরিক তরবারীর আক্রমন ও বর্শা নিক্ষেপ প্রতিযোগিতার দৃশ্য অবলোকন করার জন্য; আর এই ক্ষেত্রে তাদের নিহত হওয়ার ব্যাপারে কোনো প্রকার সাবধানতা ও সতর্কতা অবলম্বনের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হতো না; বরং মনিবগণের আনন্দ- উল্লাস চরম পর্যায়ে পৌঁছাতো, শ্লোগানে শ্লোগানে কণ্ঠস্বর প্রচণ্ড ধ্বনিতে পরিণত হত, হাততালিতে মুখর হয়ে উঠত পরিবেশ এবং যখন প্রতিযোগীদের কোনো একজন তার সঙ্গীর জীবন বিপন্ন করে দিতো, তখন তাদের সৌভাগ্যের অট্টহাসি দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়ত; তারপর তার নিষ্প্রাণ দেহকে যমীনের উপর নিক্ষেপ করত !! আর সর্বজন বিদিত যে, সেই সময়ে রোমানীয় আইন-কানুন এমন ছিল, যা মনিবকে তার গোলামকে হত্যা করা, শাস্তি দেওয়া, অধীনস্থ করা ও বেড়ি পরিয়ে রাখার ব্যাপারে সাধারণ ও অবাধ অধিকার প্রদান করেছে; এই ক্ষেত্রে গোলাম কর্তৃক অভিযোগ পেশ করার কোনো অধিকার ছিল না এবং সেখানে এমন কোনো পক্ষ ছিল না, যারা এই অভিযোগের প্রতি দৃষ্টি দিবে অথবা তা স্বীকার করে নেবে; কারণ, দাস-দাসীগণ ছিল রোমানীয় আইন-কানুনের দৃষ্টিতে জীব- জানোয়ার বা জীব-জানোয়ারের চেয়ে অধম; ফলে মনিব তার কর্মকাণ্ডের কোনো প্রকার জবাবদিহিতার তোয়াক্কা না করেই তার সাথে খেয়াল-খুশি মত আচরণ করত; তারা মনে করত, গোলামের ব্যাপারে তাদেরকে আবার কিসের জিজ্ঞাসাবাদ !! … এ হচ্ছে ইসলাম পূর্ববর্তী সময়কার দাস- দাসীর অবস্থা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা; আমার পাঠক ভাই! অচিরেই আপনি এই ধরনের বর্বর নিষ্ঠুর আচরণের মধ্যে এবং ইসলামী শরীয়ত নির্দেশিত হৃদ্যতাপূর্ণ কোমল আচরণের মধ্যে একটা বড় ধরনের পার্থক্য দেখতে পাবেন। কারণ বলা হয়ে থাকে, ” ﻭ ﺑﻀﺪﻫﺎ ﺗﺘﻤﻴﺰ ﺍﻷﺷﻴﺎﺀ … ” অর্থাৎ- “বিপরীতটি দ্বারাই জিনিসসমূহের মধ্যকার শ্রেষ্ঠটি বেরিয়ে আসবে … ”। * * * দাসত্বের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান অল্প কিছুক্ষণ পূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি যে, ইসলামের আগমন ঘটেছে এমন অবস্থায় যে, দাসত্ব একটি আন্তর্জাতিক প্রথা, যা বিশ্বের সকল রাষ্ট্র ও জাতির নিকট স্বীকৃত; বরং দাসত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং সামাজিকভাবে প্রচলিত জরুরি বিষয়, যাকে কোনো মানুষ অপছন্দ করত না এবং তা রদবদল করার সম্ভাব্যতার ব্যাপারে কেউ চিন্তাও করত না। আর পূর্বে আমরা আরও আলোচনা করেছি যে, ইসলামপূর্ব সময়ে বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহে দাসত্বের উৎসধারা বা উৎপত্তিস্থলসমূহ ছিল বিভিন্ন প্রকৃতির, বিভিন্ন পদ্ধতির এবং ঐক্যবদ্ধ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সংবলিত !! এমতাবস্থায় ইসলাম কী করেছে? ইসলাম প্রাচীনকালের দাসত্বের উৎস্থলসমূহ থেকে একটি ব্যতীত বাকী সবগুলোকে বন্ধ করে দিয়েছে; আর সে একটি উৎস বন্ধ না করার কারণ হচ্ছে, এ উৎসটি বন্ধ করা তার আওতাধীন ছিল না; কারণ, সে সময়ে যুদ্ধবিগ্রহের ময়দানে আন্তর্জাতিকভাবে বহুল স্বীকৃত ছিল যুদ্ধের মাধ্যমে প্রাপ্ত দাসত্বের প্রথাটি। আর তাই যে উৎসটি ইসলামে অবশিষ্ট ছিল, তা হলো যুদ্ধের মাধ্যমে সংঘটিত দাসত্ব। এখন আমরা সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব: ‘কিতাবুশ্ শুবহাত’ ( ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺸﺒﻬﺎﺕ ) নামক গ্রন্থের লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী সেই সময় বহুল প্রচলিত ও প্রভাব বিস্তারকারী প্রথা ছিল, যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানো অথবা তাদেরকে হত্যা করা।[3] আর এই প্রথা ছিল খুবই প্রাচীন, যা ইতিহাসের অন্ধকার যুগেরে গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। তা প্রথম মানুষ পর্যন্ত প্রত্যাবর্তনের উপক্রম হতে পারে; কিন্তু তা মানবতার জন্য তার বিভিন্ন ধাপে নিত্য সঙ্গী হয়ে পড়ে। মানুষের এই পরিস্থিতিতে ইসলামের আগমন ঘটল এবং ইসলাম ও তার শত্রুগণের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হল; ফলে মুসলিম যুদ্ধবন্দীগণ ইসলামের শত্রুদের নিকট গোলাম বা দাসে পরিণত হলো, অতঃপর হরণ করা হলো তাদের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি এমন দুঃখ-কষ্ট ও যুলুমের শিকার হতে লাগল, যে আচরণ ঐ সময় দাস-দাসীদের সাথে করা হত !! ইসলামের পক্ষে সেই সময় সম্ভব ছিল না যে, তার হাতে শত্রুদের মধ্য থেকে যারা যুদ্ধবন্দী হবে তাদেরকে সাধারণভাবে ছেড়ে দেওয়া; আর এটা সুন্দর রাজনৈতিক দর্শনও নয় যে, তুমি তোমার শত্রুকে তার যুদ্ধবন্দীদের ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে তোমার ব্যাপারে আরও উৎসাহিত করবে, যখন তোমার পরিবার, তোমার আত্মীয়-স্বজন ও তোমার দীন-ধর্মের অনুসারীগণ ঐসব শত্রুগণের নিকট লাঞ্ছনা, অপমান ও শাস্তির শিকার। এমতাবস্থায় সেখানে সমান নীতি অবলম্বন করাটাই অধিক ন্যায়সঙ্গত নিয়ম, যার প্রয়োগ শত্রুতা প্রতিরোধে সক্ষম হবে, বরং এটাই একমাত্র ও অনন্য নিয়ম। * * * আর ইসলামের দৃষ্টিতে যে যুদ্ধ যুদ্ধবন্দীদের দাস-দাসীতে পরিণত করাকে বৈধ করে দেয়, তা হলো শরী‘য়ত সম্মত যুদ্ধ; আর শরী‘য়ত সম্মত যুদ্ধ হলো সেই যুদ্ধ, যা নিম্নোক্ত মৌলিক শর্তের উপর ভিত্তি করে সংঘটিত হয়: ১. আল্লাহর পথে শত্রুর সাথে লড়াই হবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা’র কথাকে বাস্তবায়ন করার জন্য: তিনি বলেন: ﴿ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺀَﺍﻣَﻨُﻮﺍْ ﻳُﻘَٰﺘِﻠُﻮﻥَ ﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﭐﻟﻠَّﻪِۖ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ٧٦ ] “যারা মুমিন তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে।”[4] এর অর্থ হল: ইসলামে যুদ্ধের বিষয়টি বিজয় লাভের আকাঙ্খা, সুবিধা ভোগ করার লোভ এবং খ্যাতি ও সম্মান লাভের উদ্দেশ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়; আরও প্রতিষ্ঠিত নয় উপনেশবাদ ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যের উপর। যুদ্ধের এই বিষয়টি বিধিসম্মত করা হয় মূলত মানবজাতির হিদায়েত ও তাদেরকে সংশোধন করার জন্য, মানুষকে মানুষের গোলামী করা থেকে বের করে আল্লাহর ইবাদত করার দিকে নিয়ে আসার জন্য, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে বের করে তার প্রশস্ততার পথ দেখানোর জন্য এবং (বাতিল) ধর্মসমূহের অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি থেকে বের করে ইসলামের ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফের দিকে নিয়ে আসার জন্য। আল্লাহর পথে লড়াই হতে হবে নিম্নোক্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের অধীনে: (ক) মুসলিমদের পক্ষ থেকে আগ্রাসন প্রতিরোধ করার জন্য: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﻗَٰﺘِﻠُﻮﺍْ ﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳُﻘَٰﺘِﻠُﻮﻧَﻜُﻢۡ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻌۡﺘَﺪُﻭٓﺍْۚ ﺇِﻥَّ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻟَﺎ ﻳُﺤِﺐُّ ﭐﻟۡﻤُﻌۡﺘَﺪِﻳﻦَ ١٩٠ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ١٩٠ ] “আর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; কিন্তু সীমালংঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে ভালবাসেন না।”[5] (খ) বিদ্রোহী শক্তিকে ধ্বংস করার জন্য, যারা জোর জবরদস্তি করে মানুষকে তাদের দীনের ব্যাপারে ফিতনা বা বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﻗَٰﺘِﻠُﻮﻫُﻢۡ ﺣَﺘَّﻰٰ ﻟَﺎ ﺗَﻜُﻮﻥَ ﻓِﺘۡﻨَﺔٞ ﻭَﻳَﻜُﻮﻥَ ﭐﻟﺪِّﻳﻦُ ﻛُﻠُّﻪُۥ ﻟِﻠَّﻪِۚ ﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﻔﺎﻝ: ٣٩ ] “আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেৎনা দুর হয় এবং দ্বীন পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।”[6] (গ) তাগূতকে অপসারণ ও পথভ্রষ্ট স্বৈরাচারী শক্তিকে উৎখাত করার জন্য, যা ইসলামী দা‘ওয়াতের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং জনগণের নিকট যাতে তা না পৌঁছাতে পারে সে জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻛَﻔَﺮُﻭﺍْ ﻳُﻘَٰﺘِﻠُﻮﻥَ ﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﭐﻟﻄَّٰﻐُﻮﺕِ ﻓَﻘَٰﺘِﻠُﻮٓﺍْ ﺃَﻭۡﻟِﻴَﺎٓﺀَ ﭐﻟﺸَّﻴۡﻄَٰﻦِۖ ﺇِﻥَّ ﻛَﻴۡﺪَ ﭐﻟﺸَّﻴۡﻄَٰﻦِ ﻛَﺎﻥَ ﺿَﻌِﻴﻔًﺎ ٧٦ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ: ٧٦ ] “আর যারা কাফের, তারা তাগূতের পথে যুদ্ধ করে। কাজেই তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; শয়তানের কৌশল অবশ্যই দুর্বল।”[7] (ঘ) চুক্তি সম্পাদন করার পর তা ভঙ্গ করার কারণে: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﺇِﻥ ﻧَّﻜَﺜُﻮٓﺍْ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨَﻬُﻢ ﻣِّﻦۢ ﺑَﻌۡﺪِ ﻋَﻬۡﺪِﻫِﻢۡ ﻭَﻃَﻌَﻨُﻮﺍْ ﻓِﻲ ﺩِﻳﻨِﻜُﻢۡ ﻓَﻘَٰﺘِﻠُﻮٓﺍْ ﺃَﺋِﻤَّﺔَ ﭐﻟۡﻜُﻔۡﺮِ ﺇِﻧَّﻬُﻢۡ ﻟَﺎٓ ﺃَﻳۡﻤَٰﻦَ ﻟَﻬُﻢۡ ﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢۡ ﻳَﻨﺘَﻬُﻮﻥَ ١٢ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ: ١٢ ] “আর যদি তারা তাদের চুক্তির পর তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং তোমাদের দ্বীন সম্বন্ধে কটুক্তি করে, তবে কুফরের নেতাদের সাথে যুদ্ধ কর; এরা এমন লোক যাদের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই; যেন তারা নিবৃত্ত হয়।”[8] ২. মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য কোনো জাতির সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া বৈধ হবে না যতক্ষণ না তারা তাদেরকে সতর্ক করবে এবং তার নিকট তিনটি বিষয় পেশ করবে: (ক) ইসলাম; (খ) জিযিয়া; (গ) যুদ্ধ। – যদি তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে এবং সত্য দীনের অনুসরণ করে, তাহলে পরস্পরের মধ্যে কোনো প্রকার যুদ্ধ, ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা করার অবকাশ নেই; বরং তাদের অবস্থা মুসলিমগণের অবস্থার মত হয়ে যাবে; আমাদের জন্য যা থাকবে, তাদের জন্যও তাই থাকবে; আমাদের উপর যে দায়-দায়িত্ব থাকবে, তাদের উপরও সে দায়-দায়িত্ব থাকবে; তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) ও সৎ কাজের মানদণ্ড ব্যতীত একজনের উপর অন্য জনের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব থাকবে না। – আর তারা যদি ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করে এবং ইসলামী শাসনের ছায়ায় থেকে তাদের আকিদা- বিশ্বাসকে লালন করতে চায়, তবে মুসলিমগণ কর্তৃক তাদের নিরাপত্তা বিধানের বিনিময়ে ‘জিযিয়া’ কর প্রদানের শর্তে কারও পক্ষ থেকে কোনো প্রকার চাপ অথবা জোর জবরদস্তি ছাড়াই তাদের জন্য এই ধরনের স্বাধীনতা থাকবে।[9] আর এই ব্যাপারটি বিস্তৃত হবে ইসলামে প্রবেশ করা এবং তাদের ধর্মকর্ম পালনের ক্ষেত্রে, যে ব্যাপারটিকে তাগিদ করে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলার বাণী: ﴿ ﻟَﺎٓ ﺇِﻛۡﺮَﺍﻩَ ﻓِﻲ ﭐﻟﺪِّﻳﻦِۖ ﻗَﺪ ﺗَّﺒَﻴَّﻦَ ﭐﻟﺮُّﺷۡﺪُ ﻣِﻦَ ﭐﻟۡﻐَﻲِّۚ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ: ٢٥٦ ] “দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জোর- জবরদস্তি নেই; সত্য পথ সুস্পষ্ট হয়েছে ভ্রান্ত পথ থেকে।”[10] ইসলামী বিশ্বে ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানগণ কর্তৃক তাদের ধর্মের উপর বর্তমান সময় পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকা এমন একটি অকাট্য দলিল যাতে কোনো বিতর্ক করার সুযোগ নেই যে, ইসলাম বল প্রয়োগ ও তরবারীর জোরে অন্যকে তা (ইসলাম) গ্রহণ করতে বাধ্য করেনি। আর এর পক্ষে ইউরোপীয় খ্রিষ্টান ‘স্যার আরনুলদ’ তার ‘আদ-দা‘ওয়াত ইলাল ইসলাম ( ﺍﻟﺪﻋﻮﺓ ﺇﻟﻰ ﺍﻹﺳﻼﻡ ) [ইসলামের দিকে আহ্বান] – নামক গ্রন্থের মধ্যে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। – আর যদি তারা ইসলাম গ্রহণ ও ‘জিযিয়া’ কর প্রদান করতে অস্বীকার করে, তাহলে তারা হবে অবাধ্য ও অপরাধী; বরং তারা ইসলামী দা‘ওয়াত জনগণের নিকট পৌঁছাবার রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতে তৎপর ও সংকল্পবদ্ধ গোষ্ঠী। কেবল তখন, ও সে সময়ে তাদেরকে রাস্তা থেকে অপসারণ করার জন্য লড়াইয়ের পালা এসে যায়। কিন্তু তারা (মুসলিমগণ) তাদেরকে ‘জিযিয়া’ কর প্রদান অথবা রক্তপাত হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়ার সর্বশেষ সুযোগ দানের জন্য যুদ্ধের সতর্কবাণী উচ্চারণ না করা পর্যন্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় না। ৩. যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের মধ্যে যখন শত্রুগণ সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়বে, তখন মুসলিমগণের উচিৎ হবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলার বাণী বাস্তবায়নের জন্য সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়া; তিনি বলেন: ﴿ ﻭَﺇِﻥ ﺟَﻨَﺤُﻮﺍْ ﻟِﻠﺴَّﻠۡﻢِ ﻓَﭑﺟۡﻨَﺢۡ ﻟَﻬَﺎ ﻭَﺗَﻮَﻛَّﻞۡ ﻋَﻠَﻰ ﭐﻟﻠَّﻪِۚ ﺇِﻧَّﻪُۥ ﻫُﻮَ ﭐﻟﺴَّﻤِﻴﻊُ ﭐﻟۡﻌَﻠِﻴﻢُ ٦١ ﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﻔﺎﻝ: ٦١ ] “আর তারা যদি সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে আপনিও সন্ধির দিকে ঝুঁকবেন এবং আল্লাহ্র উপর নির্ভর করুন; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”[11] তবে শর্ত হলো ঐ সন্ধি বা শান্তিচুক্তি এমন না হওয়া, যাতে শত্রুর জন্য কল্যাণ রয়েছে এবং মুসলিমগণের জন্য ক্ষতিকারক। আর এগুলো হলো ইসলামের দৃষ্টিতে শর‘য়ী যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যাবলী এবং এগুলো হলো সেই যুদ্ধের সর্বোৎকৃষ্ট শর্তাবলী ও উদ্দেশ্য- লক্ষ্য। সুতরাং এসব শর‘ঈ বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে মুসলিম শাসকগণের পক্ষ থেকে যখন যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে, (যার বৈশিষ্ট্যগুলোর আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে) আর যখন তারা (মুসলিমগণ) তাদের থেকে যুদ্ধাদেরকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটকাবে, তখন তাদেরকে তাদের (যুদ্ধবন্দীদের) সাথে আচার-আচরণের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়ে স্বাধীনতা দেওয়া হবে: ১. কোনো বিনিময় ছাড়াই তাদেরকে মুক্তি দিয়ে দেওয়া, আর এটা হলো অনুগ্রহ বা অনুকম্পা। ২. বিনিময় গ্রহণ করে তাদেরকে মুক্তি দিয়ে দেওয়া, আর এটা হলো মুক্তিপণ। ৩. হত্যা করা। ৪. দাস হিসেবে গ্রহণ করা। * অনুগ্রহ ও মুক্তিপণ (প্রথম দু’টি) গ্রহণের বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলার বাণীর কারণে, তিনি বলেছেন: ﴿ ﻓَﺈِﻣَّﺎ ﻣَﻨَّۢﺎ ﺑَﻌۡﺪُ ﻭَﺇِﻣَّﺎ ﻓِﺪَﺍٓﺀً ﺣَﺘَّﻰٰ ﺗَﻀَﻊَ ﭐﻟۡﺤَﺮۡﺏُ ﺃَﻭۡﺯَﺍﺭَﻫَﺎۚ ﴾ ‏[ ﻣﺤﻤﺪ: ٤ ] “তারপর হয় অনুকম্পা, নয় মুক্তিপণ। যতক্ষণ না যুদ্ধের ভার (অস্ত্র) নামিয়ে না ফেলে।”[12] * আর হত্যা করার বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার এই বাণীর কারণে, তিনি বলেছেন: ﴿ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﻟِﻨَﺒِﻲٍّ ﺃَﻥ ﻳَﻜُﻮﻥَ ﻟَﻪُۥٓ ﺃَﺳۡﺮَﻯٰ ﺣَﺘَّﻰٰ ﻳُﺜۡﺨِﻦَ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽِۚ ﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﻔﺎﻝ: ٦٧ ] “কোন নবীর জন্য সংগত নয় যে তার নিকট যুদ্ধবন্দী থাকবে, যতক্ষণ না তিনি যমীনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন।”[13] * আর দাস-দাসী বানানোর বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে সুন্নাহ’র মধ্যে; নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কোনো যুদ্ধে নারী ও শিশুদেরকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যেমন তিনি বনু কুরাইযার যুদ্ধে নারী ও তাদের সন্তানদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করেছেন। আর এর উপর ভিত্তি করে মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতার জন্য সাধারণ ক্ষমতা থাকবে যে, সে পছন্দ বা নির্বাচন করবে: অনুকম্পা, অথবা মুক্তিপণ, অথবা হত্যা করা, অথবা দাস- দাসী বানানো। আর তার জন্য অধিকার থাকবে যে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ের বিদ্যমান অবস্থার দুর্বলতা অথবা শক্তিমত্তার প্রতি নজর দিবেন … এবং তার জন্য এই অধিকার থাকবে যে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি মুসলিম যুদ্ধবন্দীদের সাথে শত্রুগণের আচরণের বিষয়টির প্রতিও লক্ষ্য করবেন, যাতে তিনি তাদের (শত্রুগণের) যুদ্ধবন্দীদের সাথে মূলনীতির ভিত্তিতে আচরণ করতে পারেন; আর (শত্রুর সাথে) আচার-আচরণের মূলনীতি হলো তাদের আচরণের অনুরূপ আচরণ করা, যে নীতি আল-কুরআনুল কারীম প্রণয়ন করেছে, যখন তিনি বলেছেন: ﴿ ﻭَﺟَﺰَٰٓﺅُﺍْ ﺳَﻴِّﺌَﺔٖ ﺳَﻴِّﺌَﺔٞ ﻣِّﺜۡﻠُﻬَﺎۖ ﴾ ‏[ﺍﻟﺸﻮﺭﺍ : ٤٠ ] “আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ।”[14] অনুরূপভাবে তার অধিকার রয়েছে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অনুকম্পা ও মুক্তিপণের বুনিয়াদের উপর ভিত্তি করে যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচরণের ব্যাপারে ইসলামী উদারতার দিকে লক্ষ্য করবেন, যাতে তিনি শক্তি-সামর্থ্য থাকার পরেও (প্রতিশোধ না নিয়ে) মহানুভবতা প্রদর্শন ও ক্ষমার ব্যাপারে শত্রুদেরকে মহান শিক্ষা দান করতে পারেন, যেমনটি করেছেন ‘সালাহ উদ্দিন আইয়ুবী’ যখন তিনি হিত্তিনের সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধে খ্রিষ্টানদের উপর জয় লাভ করার পরে যুদ্ধবন্দীদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন ও মুক্তিপণ গ্রহণ করার মাধ্যমে অনুকম্পা প্রদর্শন করেছেন; আর তিনি যদি তাদেরকে হত্যা করার ইচ্ছা করতেন, তাহলে এটাই হত সম- আচরণের নীতিমালায় ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ; কারণ, খ্রিষ্টানগণ প্রথম ক্রুশের যুদ্ধে একদিনে সত্তর হাজারেরও বেশি মুসলিম যুদ্ধবন্দীকে হত্যা করেছে; আর আল্লাহ ঐ ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যিনি বলেছেন: ﻣﻠﻜﻨﺎ ﻓﻜﺎﻥ ﺍﻟﻌﺪﻝ ﻣﻨﺎ ﺳﺠﻴﺔ ﻓﻠﻤﺎ ﻣﻠﻜﺘﻢ ﺳﺎﻝ ﺑﺎﻟﺪﻡ ﺃﺑﻄﺢ ﻭﺣﻠﻠﺘﻢ ﻗﺘﻞ ﺍﻷﺳﺎﺭﻯ ﻭﻃﺎﻟﻤﺎ ﻏﺪﻭﻧﺎ ﻋﻠﻰ ﺍﻷﺳﺮﻯ ﻧﻤﻦّ ﻭ ﻧﺼﻔﺢ ﻓﺤﺴﺒﻜﻢ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺘﻔﺎﻭﺕ ﺑﻴﻨﻨﺎ ﻭ ﻛﻞ ﺇﻧﺎﺀ ﺑﺎﻟﺬﻱ ﻓﻴﻪ ﻳﻨﻀﺢ অর্থাৎ- “আমরা যখন ক্ষমতা লাভ করেছি, তখন ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন ছিল আমাদের নীতি ও স্বভাব। আর যখন তোমরা ক্ষমতা লাভ করেছ, তখন রক্তে সয়লাব হয়েছে উপাত্যকা। আর তোমরা যুদ্ধবন্দীদের হত্যা করাকে বৈধ করে নিয়েছ, অথচ যতবার আমাদের সকাল হয়েছে যুদ্ধবন্দীদের উপর, আমরা অনুকম্পা ও ক্ষমা প্রদর্শন করেছি ততবার। সুতরাং এটাই আমাদের ও তোমাদের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়ে যথেষ্ট। বস্তুত: প্রত্যেকটি পাত্র তাই প্রদান করে যা তাতে রক্ষিত আছে।” আমরা যা পর্যালোচনা করলাম, তা থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতার জন্য যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার-আচরণ ও লেনদেনের ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা ও ক্ষমতা রয়েছে: অনুকম্পা প্রদর্শন, অথবা মুক্তিপণ আদায়, অথবা হত্যা করা, অথবা দাস-দাসী বানানো (এই চারটি বিকল্প বিষয়) থেকে যেই বিষয়টির মধ্যে কল্যাণ আছে বলে তিনি মনে করবেন, তিনি তাই করতে পারবেন। সুতরাং যখন মুসলিমদের নেতা মনে করবেন বর্তমানে দাস- দাসী বানানোর শরণাপন্ন হওয়ার দরকার নেই; কারণ বর্তমান বিশ্বে দাস- দাসী নিষিদ্ধ; তাছাড়া ইসলামের সাধারণ লক্ষ্যসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি হলো গোলামদেরকে আযাদ করে দেওয়া এবং তাদেরকে স্বাধীনা দান করা; অনুরূপভাবে অনুকম্পা প্রদর্শন ও মুক্তিপণ আদায়ের বুনিয়াদের উপর ভিত্তি করে যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার- আচরণ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে মহানুভবতার কুরআনিক নির্দেশ সংক্রান্ত নীতি গ্রহণের জন্য… তখন তিনি তার সামর্থ্যের আলোকে দাসত্বকে বাদ দিয়ে অপর যে কোনো একটিকে বাছাই করবেন, যাতে যুদ্ধের ভার (অস্ত্র) নামিয়ে ফেলার পর আমাদের হাতে আসা যুদ্ধবন্দীদের উপর তিনি সমাধানমূলক সিদ্ধান্ত পেশ করতে পারেন। আর এটাই করেছেন ওসমানী খলিফা সুলাতান ‘মুহাম্মদ আল- ফাতেহ’, যখন তিনি যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানোর প্রথা বাতিল করার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় সন্ধি- চুক্তিতে বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন; আর ঐ সময় থেকেই রাষ্ট্রসমূহ এ পরিভাষা সম্পর্কে অবগত হয় এবং যুদ্ধের মধ্যে দাস-দাসী বানানোর প্রথা নিষিদ্ধ হয়ে যায় !! তবে এর অর্থ এই নয় যে, দাসত্ব প্রথা চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে গেছে এবং শর‘য়ীভাবে সেই অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে, যেমনটি কেউ কেউ ধারণা করে থাকে; বরং এর অর্থ হলো যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার-আচরণ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে ইমাম তার ক্ষমতাকে প্রয়োগ করেছে তার দাস- দাসী বানানোর ইচ্ছার উপরে অনুকম্পা প্রদর্শন ও মুক্তিপণ আদায়ের ইচ্ছা গ্রহণের দ্বারা; যা ইসলামী রাজনীতির অনবদ্য অংশ। আবার কখনও কখনও এমন দিন আসতে পারে, যেদিন বিশ্বের মধ্যে সামাজিক শাসন প্রণালী আবারও নতুন করে যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানো বৈধ করার দাবি উত্থাপন করতে পারে; অবস্থা যখন এটা দাঁড়াবে তখন ইসলাম এ নতুন ঘটনা ও আন্তর্জাতিক বৈধতার নীতির সামনে তার দু হাত বাঁধা অবস্থায় থমকে দাঁড়িয়ে থাকবে (আবার যুদ্ধ- বন্দী নীতি গ্রহণ করবে না) এটা কোনো বিবেকবান মেনে নিতে পারে না। বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী ইসলামকেও সে অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে; আর কোনো সন্দেহ নেই— তখন পারস্পরিক আচার-আচরণ ও লেনদেনটি হবে সমানে সমান বা অনুরূপ। সারকথা: ইসলাম প্রাচীনকালের দাসত্বের উৎস্থলসমূহ সামগ্রিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে; তবে একটি মাত্র উৎস ছাড়া, আর তা হলো শরীয়ত সম্মত যুদ্ধে বন্দী হওয়া যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী হিসেবে গ্রহণ করার উৎস, যখন মুসলিমগণের ইমাম এই দাস- দাসী বানানোর মধ্যে কল্যাণ আছে বলে মনে করেন। আর ইমামের জন্য সুযোগ বা অধিকার রয়েছে যে, তিনি (যুদ্ধবন্দীদেরকে) দাস-দাসী হিসেবে গ্রহণ করার পরিবর্তে অনুকম্পা প্রদর্শন অথবা মুক্তিপণ গ্রহণের নীতি অনুসরণ করতে পারবেন, যখন যুদ্ধসমূহে দাস-দাসী বানানোর প্রথাকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে বিশ্ব সন্ধি-চুক্তি করবে, যেই কাজটি করেছেন ওসমানী সুলতান ‘মুহাম্মদ আল-ফাতেহ’ র. এই বিবেচনায় যে, ইসলাম তাকে যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার-আচরণ ও লেনদেনের ব্যাপারে চারটি বিষয়ে সুযোগ দান করেছে: অনুকম্পা প্রদর্শন, অথবা মুক্তিপণ আদায় করা, অথবা হত্যা করা, অথবা দাস- দাসী বানানো। সুতরাং মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান ইসলাম, মুসলিম ও সমস্ত মানবতার কল্যাণের দিক বিবেচনা করে এর মধ্য থেকে যে কোনো একটিকে নির্বাচন করার এখতিয়ার রাখেন। আর আল্লাহই সবচেয়ে বেশি ভাল জানেন। * * * দাস-দাসী’র সাথে ইসলাম কেমন আচরণ করে? বিশ্বে সামাজিক নিয়মনীতি ও শাসনব্যবস্থাসমূহের মধ্য থেকে একটি শাসননীতিও পাওয়া যায়নি, যা ইসলাম যেমন করে আচরণ করেছে, তার মত করে দাস-দাসীর সাথে মানবতাসুলভ সম্মানজনক আচার-আচরণ করেছে। আর আমরা দাস-দাসীর সাথে এই আচার- আচরণ ও লেনদেনকে ইসলামী শাসনব্যবস্থার ছায়াতলে তিনটি মৌলিক ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে পারি। প্রথম ধারা: দাস-দাসীকে মানব সৃষ্টি বলে বিবেচনা করা, যার সম্মান পাওয়ার ও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। দ্বিতীয় ধারা: অধিকার ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে মানব জাতির মধ্যে দাস- দাসীকে সমান বলে গণ্য করা। তৃতীয় ধারা: দাস-দাসীর সাথে মানবতাসুলভ আচরণ করা, বিশেষ করে জনগণের সাথে তার মেলামেশার ক্ষেত্রে তাকে মানুষ বলে মনে করা। * দাস-দাসীকে মানব সৃষ্টি বলে বিবেচনা করা, যার সম্মান পাওয়ার ও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে — এই ধারার সাথে যা সম্পর্কিত, তা হল: যখন ইসলাম এসেছে, তখন তার আগমন ঘটেছে মানুষের জাতিভেদ ও বর্ণবৈষম্য এবং তাদের শ্রেণী, অবস্থা … ও আসল বা শিকড়ের ভিন্নতা বা বৈপরীত্য দূর করার জন্য; আর তাদের জন্য একই মূল, উৎপত্তিস্থল ও প্রত্যাবর্তনস্থলের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। তার আগমন হয়েছে এই কথা বলার জন্য (আল-কুরআনের ভাষায়): ﴿ ﻳَٰٓﺄَﻳُّﻬَﺎ ﭐﻟﻨَّﺎﺱُ ﺇِﻧَّﺎ ﺧَﻠَﻘۡﻨَٰﻜُﻢ ﻣِّﻦ ﺫَﻛَﺮٖ ﻭَﺃُﻧﺜَﻰٰ ﻭَﺟَﻌَﻠۡﻨَٰﻜُﻢۡ ﺷُﻌُﻮﺑٗﺎ ﻭَﻗَﺒَﺎٓﺋِﻞَ ﻟِﺘَﻌَﺎﺭَﻓُﻮٓﺍْۚ ﺇِﻥَّ ﺃَﻛۡﺮَﻣَﻜُﻢۡ ﻋِﻨﺪَ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﺃَﺗۡﻘَﻯٰﻜُﻢۡۚ﴾ ‏[ﺍﻟﺤﺠﺮﺍﺕ: ١٣] “হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশি মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশি তাকওয়াসম্পন্ন।”[15] ইসলাম এসেছে রিসালাতের অধিকারী মুহাম্মদ ইবন আবদিল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভাষায় এই কথা পরিষ্কার করার জন্য যে, গোলামের উপর মনিবের, কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের এবং অনারবের উপর আরবের তাকওয়ার মানদণ্ড ব্যতীত অন্য কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। ইমাম মুসলিম ও তাবারী র. বিদায় হাজ্জে মিনাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট থেকে যাঁরা শুনেছেন, তাঁদের থেকে বর্ণনা করেন, তিনি মানুষের মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে বলেন: « ﺃﻧﺘﻢ ﺑﻨﻮ ﺁﺩﻡ ﻭ ﺁﺩﻡ ﻣﻦ ﺗﺮﺍﺏ , ﻭ ﺃﻧﻪ ﻻ ﻓﻀﻞ ﻟﻌﺮﺑﻲ ﻋﻠﻰ ﺃﻋﺠﻤﻲ , ﻭﻻ ﻟﻌﺠﻤﻲ ﻋﻠﻰ ﻋﺮﺑﻲ ، ﻭﻻ ﺃﺳﻮﺩ ﻋﻠﻰ ﺃﺣﻤﺮ ، ﻭﻻ ﺃﺣﻤﺮ ﻋﻠﻰ ﺃﺳﻮﺩ ﺇﻻ ﺑﺎﻟﺘﻘﻮﻯ » . “তোমরা আদমের সন্তান, আর আদম মাটি থেকে সৃষ্টি; আর তাকওয়ার (আল্লাহকে ভয় করার) মানদণ্ড ব্যতীত অনারবের উপর আরবের, আরবের উপর অনারবের, শ্বেতাঙ্গের উপর কৃষ্ণাঙ্গের এবং কৃষ্ণাঙ্গের উপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।” এসব বক্তব্য থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থার ছায়াতলে দাস-দাসী হলো এমন এক সৃষ্ট জীব, যার জন্য সম্মান পাওয়ার ও বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে অপর যে কোনো মানুষের মত সমানভাবে; সুতরাং যখন তার জাতীয়তা ও মান-মর্যদা সমুন্নত হয়েছে, তখন তার মাঝে এবং অন্য কোনো মানুষের মাঝে তাকওয়া ও সৎকাজ ব্যতীত অন্য কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। * অধিকার ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে মানব জাতির মধ্যে দাস-দাসীকে সমান বলে গণ্য করা— এই ধারার সাথে যা সম্পর্কিত, তা হল: ইসলাম দাস-দাসী ও অপর যে কোনো মানুষের মধ্যে যাবতীয় অধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যে সমতা বিধান করেছে, তবে কিছু কিছু বিশেষ অবস্থা থেকে দাস- দাসীকে তার উপর অর্পিত দায়িত্বের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে ইসলাম অব্যাহতি দান করেছে; যেমন জুম‘আর সালাত ও হাজ্জের বাধ্যবাধকতা অব্যাহতি দান। আর ইসলাম গোলামদের জন্য যে সমতা দান করেছে, তার নীতি নির্ধারণের উপর ভিত্তি করে (বলা যায়): – ইসলাম তাদের জন্য সাধারণ শাস্তি ও শরী‘য়ত নির্ধারিত শাস্তিসমূহের ক্ষেত্রে সমতার নীতি নির্ধারণ করেছে; ইমাম বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ ও তিরমিযী র. বর্ণনা করেছেন, সামুরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: « ﻣﻦ ﻗﺘﻞ ﻋﺒﺪﻩ ﻗﺘﻠﻨﺎﻩ , ﻭﻣﻦ ﺟﺪﻉ ﻋﺒﺪﻩ ﺟﺪﻋﻨﺎﻩ , ﻭ ﻣﻦ ﺧﺼﻰ ﻋﺒﺪﻩ ﺧﺼﻴﻨﺎﻩ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭ ﻣﺴﻠﻢ ﻭ ﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ ﻭ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ ) . “যে ব্যক্তি তার গোলামকে হত্যা করবে, আমরা তাকে হত্যা করব; আর যে ব্যক্তি তার গোলামের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন করবে, আমরা তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কর্তন করব; আর যে ব্যক্তি তার গোলামকে খোজা করবে, আমরা তাকে খোজা করব।” [বুখারী, মুসলিম, আবূ দাউদ ও তিরমিযী ] এমন কি জেনে রাখা দরকার যে, ইসলাম গোলামদের ব্যাপারে শরী‘য়ত নির্ধারিত শাস্তিকে হালকা করে দিয়েছে; ফলে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও মানবিক দিক বিবেচনা করে গোলামের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে স্বাধীন ব্যক্তির শাস্তির অর্ধেক। – ইসলাম গোলামদের জন্য ইসলামী ভ্রাতৃত্বের অর্থবহ ও অতি উৎকৃষ্ট ধরনের নীতি নির্ধারণ করেছে; সুতরাং তারা মনিবদের সাথে পরস্পর ভাই ভাই, একে অপরকে মহব্বতকারী ও পরস্পর পরস্পরের সাহায্যকারী। ইমাম বুখারী র. বিশুদ্ধ ও ধারাবাহিক সনদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: « ﺇﺧﻮﺍﻧﻜﻢ ﺧﻮﻟﻜﻢ ﺟﻌﻠﻬﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﺤﺖ ﺃﻳﺪﻳﻜﻢ , ﻓﻤﻦ ﻛﺎﻥ ﺃﺧﻮﻩ ﺗﺤﺖ ﻳﺪﻩ ﻓﻠﻴﻄﻌﻤﻪ ﻣﻤﺎ ﻳﺄﻛﻞ , ﻭﻟﻴﻠﺒﺴﻪ ﻣﻤﺎ ﻳﻠﺒﺲ , ﻭﻻ ﺗﻜﻠﻔﻮﻫﻢ ﻣﻦ ﺍﻷﻋﻤﺎﻝ ﻣﺎ ﻻ ﻳﻄﻴﻘﻮﻧﻪ , ﻓﺈﻥ ﻛﻠﻔﺘﻤﻮﻫﻢ ﻓﺄﻋﻴﻨﻮﻫﻢ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ) . “তোমাদের দাসরা তোমাদেরই ভাই; আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করে দিয়েছেন। সুতরাং যার ভাই তার অধীনে থাকবে, সে যেন তাকে নিজে যা খায় তাকে তা-ই খাওয়ায় এবং নিজে যা পরে, তাকে তা- ই পরায়। আর তাদের উপর এমন কোনো কাজ চাপিয়ে দিও না, যা করার সামর্থ্য তাদের নেই। যদি এমন কষ্টকর কাজ করতে দাও, তাহলে তোমরাও তাদের সে কাজে সাহায্য করবে।” [ বুখারী ] – ইসলাম দাস-দাসীর জন্য পরকালীন সাওয়াবের নীতি নির্ধারণ করেছে; সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা স্বাধীন ব্যক্তিদের জন্য যে জান্নাত ও স্থায়ী নিয়ামতের ব্যবস্থা করেছেন, তারাও স্বাধীন ব্যক্তিদের মত তার অধিকারী হতে পারবে, যদি তারা ঈমানের উপর অটল থাকতে পারে এবং সৎ কাজ করে; আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ﴿ ﻣَﻦۡ ﻋَﻤِﻞَ ﺳَﻴِّﺌَﺔٗ ﻓَﻠَﺎ ﻳُﺠۡﺰَﻯٰٓ ﺇِﻟَّﺎ ﻣِﺜۡﻠَﻬَﺎۖ ﻭَﻣَﻦۡ ﻋَﻤِﻞَ ﺻَٰﻠِﺤٗﺎ ﻣِّﻦ ﺫَﻛَﺮٍ ﺃَﻭۡ ﺃُﻧﺜَﻰٰ ﻭَﻫُﻮَ ﻣُﺆۡﻣِﻦٞ ﻓَﺄُﻭْﻟَٰٓﺌِﻚَ ﻳَﺪۡﺧُﻠُﻮﻥَ ﭐﻟۡﺠَﻨَّﺔَ ﻳُﺮۡﺯَﻗُﻮﻥَ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺑِﻐَﻴۡﺮِ ﺣِﺴَﺎﺏٖ ٤٠ ﴾ ‏[ﻏﺎﻓﺮ : ٤٠ ] “আর যে পুরুষ কিংবা নারী মুমিন হয়ে সৎকাজ করবে তবে তারা প্রবেশ করবে জান্নাতে, সেখানে তাদেরকে দেওয়া হবে অগণিত রিযিক।”[16] আর আয়াতের মধ্যকার শব্দগুলো ব্যাপক অর্থে সকল পুরুষ ও নারীর জন্য, চাই তারা গোলাম হউক অথবা স্বাধীন ব্যক্তি হউক, দরিদ্র হউক অথবা সম্পদশালী হউক। – ইসলাম দাস-দাসীর জন্য মানবিক মর্যাদা দানের নীতি নির্ধারণ করেছে; সুতরাং মানুষের মূল ইউনিট (একক) হিসেবে তারা স্বাধীন ব্যক্তিদের মত; আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﻣَﻦ ﻟَّﻢۡ ﻳَﺴۡﺘَﻄِﻊۡ ﻣِﻨﻜُﻢۡ ﻃَﻮۡﻟًﺎ ﺃَﻥ ﻳَﻨﻜِﺢَ ﭐﻟۡﻤُﺤۡﺼَﻨَٰﺖِ ﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖِ ﻓَﻤِﻦ ﻣَّﺎ ﻣَﻠَﻜَﺖۡ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨُﻜُﻢ ﻣِّﻦ ﻓَﺘَﻴَٰﺘِﻜُﻢُ ﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖِۚ ﻭَﭐﻟﻠَّﻪُ ﺃَﻋۡﻠَﻢُ ﺑِﺈِﻳﻤَٰﻨِﻜُﻢۚ ﺑَﻌۡﻀُﻜُﻢ ﻣِّﻦۢ ﺑَﻌۡﺾٖۚ … ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ: ٢٥ ] “আর তোমাদের মধ্যে কারো মুক্ত ঈমানদার নারী বিয়ের সামর্থ্য না থাকলে তোমরা তোমাদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার দাসী বিয়ে করবে; আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত। তোমরা একে অপরের সমান; …।”[17] আর আয়াতটি যে ব্যক্তি স্বাধীনা ঈমানদার নারীকে বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, সেই ব্যক্তির জন্য মুমিন দাসীকে বিয়ে করার বৈধতা দানের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হয়েছে; আর আয়াতটি স্বীকৃতি দিয়েছে যে, স্বাধীন নারী ও দাসীগণের সাথে আযাদ পুরুষ ও গোলামদের মধ্য থেকে যাদের বিয়ে হবে, তারা একে অপরের অংশ এবং তাদের মধ্যে বংশের মূল শিকড়, উৎপত্তিস্থল ও প্রত্যাবর্তনস্থল এক হওয়ার ব্যাপারে কোনো পার্থক্য নেই। আর এসব নীতিমালা, যাকে ইসলাম দাস- দাসীদের জন্য তাদের মধ্যে ও মনিবদের মধ্যে ইসলাম কর্তৃক পরিপূর্ণ মানবিক সমতার চিন্তাধারা ও দর্শন স্থির করার উপর স্পষ্ট দলিল হিসেবে নির্ধারণ করেছে; আর এগুলো প্রকৃতপক্ষে পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী নীতিমালা, যেগুলোর ধারে কাছেও মানব রচিত কোনো নিয়মকানুন ও বিশ্ব শাসনব্যবস্থা যুগ যুগ ধরে কখনও পৌঁছতে পারেনি, যা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। এই কথা সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণিত যে, ইসলাম হচ্ছে বাস্তববাদী জীবনব্যবস্থা … ঐ সময় পর্যন্ত, যখন আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবী ও তার উপর যারা থাকবে তাদের উত্তরাধিকারী হবেন। * * * * দাস-দাসীর সাথে মানবতাসুলভ সম্মানজনক আচরণ করা— এই ধারার সাথে যা সম্পর্কিত, তা হল: ইসলাম দাস-দাসীর সাথে ভাল আচরণ করার ব্যাপারে শিক্ষামূলক সিলেবাস ও ইসলামী উপদেশমালা প্রণয়ন করেছে, যাকে নিয়ে মুসলিম প্রজন্মসমূহ ঐতিহাসিক সময়কাল ধরে গর্ব-অহঙ্কার করে: – ঐসব উপদেশমালা থেকে অন্যতম একটি হল, মনিব তাকে ঐ খাবার থেকে খাওয়াবে, যা থেকে সে নিজে খায় এবং সে তাকে তা-ই পরাবে, যা সে পরিধান করে। কিছুক্ষণ পূর্বে আমরা হাদিস উল্লেখ করেছি (নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন): « ﻓﻤﻦ ﻛﺎﻥ ﺃﺧﻮﻩ ﺗﺤﺖ ﻳﺪﻩ ﻓﻠﻴﻄﻌﻤﻪ ﻣﻤﺎ ﻳﺄﻛﻞ , ﻭﻟﻴﻠﺒﺴﻪ ﻣﻤﺎ ﻳﻠﺒﺲ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ) . “সুতরাং যার ভাই তার অধীনে থাকবে, সে যেন তাকে নিজে যা খায়, তাকে তা-ই খাওয়ায় এবং নিজে যা পরে, তাকে তা-ই পরায়।” [ বুখারী ] – ঐসব উপদেশমালার অন্যতম আরেকটি হল, মনিব তার উপর এমন কোনো কাজ চাপিয়ে দিবে না, যা করার সামর্থ্য তার নেই। পূর্বে আমরা এই হাদিসটিও উল্লেখ করেছি (নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন): « ﻭﻻ ﺗﻜﻠﻔﻮﻫﻢ ﻣﻦ ﺍﻷﻋﻤﺎﻝ ﻣﺎ ﻻ ﻳﻄﻴﻘﻮﻧﻪ , ﻓﺈﻥ ﻛﻠﻔﺘﻤﻮﻫﻢ ﻓﺄﻋﻴﻨﻮﻫﻢ ‏» . ‏(ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ) . “আর তাদের উপর এমন কোনো কাজ চাপিয়ে দিও না, যা করার সামর্থ্য তাদের নেই। যদি এমন কষ্টকর কাজ করতে দাও, তাহলে তোমরা তাদের সে কাজে সাহায্য করবে।” [ বুখারী ] – আর ঐসব উপদেশমালার অন্যতম আরেকটি হল, দাস- দাসীকে এমনভাবে সম্বোধন করা, যাতে সে অনুভব করে যে, সে তার পরিবার-পরিজন ও আপনজনদের মধ্যেই আছে: বিশুদ্ধ হাদিসের ভাষ্য, যা বলে: « ﻻ ﻳﻘﻞ ﺃﺣﺪﻛﻢ : ﻫﺬﺍ ﻋﺒﺪﻱ , ﻭ ﻫﺬﻩ ﺃﻣﺘﻲ , ﺑﻞ ﻳﻘﻞ : ﻓﺘﺎﻱ ﻭ ﻓﺘﺎﺗﻲ » . “তোমদের কেউ যেন না বলে: এটা আমার দাস এবং এটা আমার দাসী; বরং সে যেন বলে: আমার যুবক ও আমার যুবতী।” – আর ঐসব নির্দেশাবলীর মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হল, তাদের মধ্যে থেকে কেউ গোলাম ও দাসীদের কাউকে বিয়ে করার আগ্রহ প্রকাশ করলে, তার বিয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ﴿ ﻭَﻣَﻦ ﻟَّﻢۡ ﻳَﺴۡﺘَﻄِﻊۡ ﻣِﻨﻜُﻢۡ ﻃَﻮۡﻟًﺎ ﺃَﻥ ﻳَﻨﻜِﺢَ ﭐﻟۡﻤُﺤۡﺼَﻨَٰﺖِ ﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖِ ﻓَﻤِﻦ ﻣَّﺎ ﻣَﻠَﻜَﺖۡ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨُﻜُﻢ ﻣِّﻦ ﻓَﺘَﻴَٰﺘِﻜُﻢُ ﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖِۚ ﻭَﭐﻟﻠَّﻪُ ﺃَﻋۡﻠَﻢُ ﺑِﺈِﻳﻤَٰﻨِﻜُﻢۚ ﺑَﻌۡﻀُﻜُﻢ ﻣِّﻦۢ ﺑَﻌۡﺾٖۚ ﻓَﭑﻧﻜِﺤُﻮﻫُﻦَّ ﺑِﺈِﺫۡﻥِ ﺃَﻫۡﻠِﻬِﻦَّ ﻭَﺀَﺍﺗُﻮﻫُﻦَّ ﺃُﺟُﻮﺭَﻫُﻦَّ ﺑِﭑﻟۡﻤَﻌۡﺮُﻭﻑِ … ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ: ٢٥ ] “আর তোমাদের মধ্যে কারো মুক্ত ঈমানদার নারী বিয়ের সামর্থ্য না থাকলে তোমরা তোমাদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার দাসী বিয়ে করবে; আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত। তোমরা একে অপরের সমান; কাজেই তোমরা তাদেরকে বিয়ে করবে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে এবং তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দেবে ন্যায়সংগতভাবে। …।”[18] – আর এই নিয়মনীতি ও নির্দেশাবলীর মধ্যে আরেকটি হল, তার সাথে এমন আচরণ করা, যেমনিভাবে কোনো মুসলিম তার পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে আচার-আচরণ ও লেনদেন করে। কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ﴿ … ﻭَﺑِﭑﻟۡﻮَٰﻟِﺪَﻳۡﻦِ ﺇِﺣۡﺴَٰﻨٗﺎ ﻭَﺑِﺬِﻱ ﭐﻟۡﻘُﺮۡﺑَﻰٰ ﻭَﭐﻟۡﻴَﺘَٰﻤَﻰٰ ﻭَﭐﻟۡﻤَﺴَٰﻜِﻴﻦِ ﻭَﭐﻟۡﺠَﺎﺭِ ﺫِﻱ ﭐﻟۡﻘُﺮۡﺑَﻰٰ ﻭَﭐﻟۡﺠَﺎﺭِ ﭐﻟۡﺠُﻨُﺐِ ﻭَﭐﻟﺼَّﺎﺣِﺐِ ﺑِﭑﻟۡﺠَﻨۢﺐِ ﻭَﭐﺑۡﻦِ ﭐﻟﺴَّﺒِﻴﻞِ ﻭَﻣَﺎ ﻣَﻠَﻜَﺖۡ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨُﻜُﻢۡۗ ﺇِﻥَّ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻟَﺎ ﻳُﺤِﺐُّ ﻣَﻦ ﻛَﺎﻥَ ﻣُﺨۡﺘَﺎﻟٗﺎ ﻓَﺨُﻮﺭًﺍ ٣٦ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ: ٣٦ ] “আর পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দুর-প্রতিবেশী, সংগী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক, অহংকারীকে।”[19] – আর এই নিয়মনীতি ও নির্দেশাবলীর মধ্যে অন্যতম আরেকটি হল, দাসত্ব মোচনে কার্যকরী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা; অচিরেই সামনের আলোচনায় এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত বিবরণ আসছে ইনশাআল্লাহ। * * * ইসলামী শরী‘য়তে দাস-দাসীর সাথে মর্যাদপূর্ণ ব্যবহার প্রসঙ্গে এসেছে যে, ইসলাম গোলামকে তার মনিবের পক্ষ থেকে অশোভনীয়ভাবে শুধু চড় মারার কারণে বিধি মোতাবেক মুক্ত করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে, যেমনটি অচিরেই দাসত্ব থেকে দাস- দাসীকে মুক্ত করে দেওয়ার প্রাসঙ্গিক আলোচনা আসবে। বরং সদ্ব্যবহার ও মানবিক মূল্যবোধ ফিরেয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রায়োগিক বাস্তবতায় ইসলাম আশ্চর্যজনক অবস্থানে পৌঁছেছে। আপনাদের উদ্দেশ্যে তার কিছু নমুনা পেশ করা হল, যেমনটি প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুব ‘কিতাবুশ শুবহাত’ ( ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺸﺒﻬﺎﺕ ) নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন: – রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু সংখ্যক গোলাম এবং কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় কিছু স্বাধীন ব্যক্তির মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করে দিয়েছিলেন: তিনি বিলাল ইবন রাবাহ রা. ও খালিদ ইবন রুওয়াইহা আল-খাস‘আমী রা. এর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছেন। আরও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছেন যায়েদ ইবন হারেসা রা. ও তাঁর চাচা হামযা ইবন আবদিল মুত্তালিব রা. এর মাঝে। তিনি যায়েদ রা. ও আবূ বকর সিদ্দিক রা. এর মধ্যেও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করে দিয়েছিলেন …। এসব ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রকৃত অর্থে রক্তের বন্ধন ও বংশের সম্পর্কের মত ছিল এবং তা মিরাসের (উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ) মধ্যে শামিল করার পর্যায়ে উপনিত হয়েছিল। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতটুকুতেই তুষ্ট হননি … – বরং তিনি তাঁর ফুফুর কন্যা (ফুফাতো বোন) যয়নব বিনতে জাহাস রা. কে তাঁর গোলাম যায়েদ ইবন হারেসা রা. এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন !! আর বিয়ের প্রসঙ্গটি খুবই সংবেদনশীল, বিশেষ করে নারীর পক্ষ থেকে; কেননা, সে তার চেয়ে মর্যাদাবান ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে রাজি হয়, কিন্তু তার স্বামী তার চেয়ে বংশগত ও সম্পদের দিক থেকে নীচু মানের হওয়াটাকে সে মেনে নেয় না …; আর সে অনুভব করে যে, এটা তার মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে এবং তার গৌরবকে নীচু বা খাট করে। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উদ্দেশ্য ছিল এসব কিছুর চেয়ে আরও অধিক উচ্চাঙ্গের তাৎপর্যপূর্ণ; আর তা হলো দাসী-দাসীকে ঐ গর্ত থেকে উঠিয়ে আরবের কুরাইশ বংশের নেতৃবৃন্দের চেয়েও উচ্চমানে নিয়ে আসা, যেই গর্তে অত্যাচারী মানবগোষ্ঠী তাকে ঠেলে দিয়েছে; বরং তার লক্ষ্য ছিল জাহেলী সমাজ থেকে জাহেলী জাতীয়তাবাদ বা স্বজনপ্রীতির মূলোৎপাটন করা এবং আরব জাতি থেকে বংশ নিয়ে অহংকার করার মত পচন বা ক্ষত দূর করা। আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতটুকুতেই তুষ্ট হননি … – বরং তিনি ‘মূতার যুদ্ধে’ তাঁর গোলাম যায়েদকে রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সেনাবাহিনীর সামনে প্রেরণ করেছিলেন, যেই বাহিনীতে ছিলেন আনসার ও কুরাইশ নেতৃবৃন্দ মুহাজিরগণ; আর তিনি তার (যায়েদের) পুত্র ‘উসামা ইবন যায়েদ’ কে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন, আর তার নেতৃত্বের অধীনে ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই উজির (মন্ত্রী) ও তাঁর পরবর্তী কালের দুই খলিফা আবূ বকর ও ওমর রা.। সুতরাং তিনি এর দ্বারা গোলামকে শুধু মানবিক সমতাই দান করেননি, বরং তাকে স্বাধীন ব্যক্তিদের উপর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের অধিকার দান করেছেন; আর এই ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীর বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে, যে প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী র. ধারাবাহিক বিশুদ্ধ সনদে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: « ﺍﺳﻤﻌﻮﺍ ﻭﺃﻃﻴﻌﻮﺍ ﻭﺇﻥ ﺍﺳﺘﻌﻤﻞ ﻋﻠﻴﻜﻢ ﻋﺒﺪ ﺣﺒﺸﻲ ﻛﺄﻥ ﺭﺃﺳﻪ ﺯﺑﻴﺒﺔ ‏( ﻣﺎ ﺃﻗﺎﻡ ﻓﻴﻜﻢ ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﺒﺎﺭﻙ ﻭ ﺗﻌﺎﻟﻰ ‏) ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ) . “যদি তোমাদের উপর এরূপ কোনো হাবশী দাসকেও শাসক নিযুক্ত করা হয়, যার মাথাটি কিসমিসের মত, তবুও তোমরা তার কথা শোন এবং তার আনুগত্য কর (যতক্ষণ সে তোমাদের মাঝে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলার কিতাবের বিধান প্রতিষ্ঠিত রাখে)।” [বুখারী] সুতরাং এর দ্বারা তিনি গোলামদেরকে (যোগ্যতার ভিত্তিতে) সকল উচ্চপদের অধিকার দান করেছেন, আর তা হলো মুসলিমগণের খিলাফত, যতক্ষণ সে তার জন্য যোগ্য ও লাগসই হবে। … আর ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. খলিফা নিয়োগ করার সময় বলেন: « ﻭﻟﻮ ﻛﺎﻥ ﺳﺎﻟﻢ ﻣﻮﻟﻰ ﺃﺑﻲ ﺣﺬﻳﻔﺔ ﺣﻴﺎً ﻟﻮﻟّﻴﺘﻪ » . “আবূ হুযায়ফা’র গোলাম সালেম যদি জীবিত থাকত, তাহলে আমি তাকে শাসক নিয়োগ করতাম।” সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে নীতি প্রণয়ন করেছেন, ওমর রা. ঠিক নেই নীতির উপরই পরিভ্রমণ করেন !! … আর কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসলামের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পরবর্তীতে তাঁর খোলাফায়ে রাশেদীনের পক্ষ থেকে এই হস্তক্ষেপের কল্যাণে তা দাস-দাসীদের মান- মর্যাদাকে সমুন্নত করেছে, বংশগত গৌরবের দাবিকে মূলোৎপাটন করেছে এবং তা পদসমূহকে তাদের বংশগত অথবা জাতিগত অথবা বর্ণগত দিকে ভ্রূক্ষেপ না করে যোগ্যতার বিচারে শক্তিশালী ব্যক্তিদের সাথে সম্পৃক্ত করেছে …। আর এই বিষয়টিকে আরও বেশি মজবুত ও সুদৃঢ় করে যখন মুনাফিকদের কেউ কেউ ‘উসামা ইবন যায়েদ’ –এর নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল, তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: « ﺇﻥ ﻳﻄﻌﻨﻮﺍ ﺑﺈﻣﺎﺭﺓ ﺃﺳﺎﻣﺔ ﻓﻘﺪ ﻃﻌﻨﻮﺍ ﺑﺈﻣﺎﺭﺓ ﺃﺑﻴﻪ ﻣﻦ ﻗﺒﻞ ؛ ﻓﻮﺍﻟﻠﻪ ﺇﻥ ﺇﺳﺎﻣﺔ ﻟﺠﺪﻳﺮ ﺑﺎﻹﻣﺎﺭﺓ ﻛﻤﺎ ﺃﻥ ﺃﺑﺎﻩ ﻟﺠﺪﻳﺮ ﺑﻬﺎ » . “তারা যদি উসামার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে থাকে, তাহলে তারা ইতিপূর্বে তাঁর পিতার নেতৃত্বকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল; আল্লাহর কসম! নিশ্চয়ই উসামা নেতৃত্বের উপযুক্ত, যেমনিভাবে তাঁর পিতাও তার উপযুক্ত।” * * * আর এসব নীতিমালা, নির্দেশাবলী ও নমুনাসমূহ, যা দাস-দাসীর সাথে আচার ব্যবহার, তাকে সম্মান দান ও তার প্রতি ইহসানের … ব্যাপারে ইসলাম প্রবর্তন করেছে, তার উদ্দেশ্য ছিল- যেমনটি খুব শীঘ্রই দাস-দাসী মুক্ত করার পয়েন্টে আসবে— দাস-দাসীর ব্যাপারে ঘোষণা করা যে, নিশ্চয়ই সে অস্তিত্বসম্পন্ন, সম্মান ও মানবতার অধিকারী মানুষ … এমনকি যখন সে তার বিদ্যমান অস্তিত্ব থেকে অনুভব করবে যে, নিশ্চয়ই তার সম্মান পাওয়ার ও বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তখন সে তার স্বাধীনতা দাবি করবে, বরং সে দাসত্ব ও গোলামী থেকে স্বাধীনতা অর্জন করা পর্যন্ত স্বাধীনতা লাভের পথে পথ চলবে, এমনকি চেষ্টার শেষ ধাপে গিয়ে স্বাধীন ব্যক্তিদের একজন হয়ে যাবে !! ইসলামের আগে ও পরে অপরাপর জাতিসমূহের মধ্যে দাস-দাসীর সাথে স্বৈরাচার যালেমগণ কর্তৃক আচার- ব্যবহারের মধ্যে এই বিষয়গুলো কোথায়, যেখানে তারা দাস- দাসীকে মর্যাদাবান ও সৌভাগ্যবান জাতি ভিন্ন অন্য কোনো জাতি বলে বিবেচনা করত … বরং তার প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে গোলামী ও দাসত্ব করার জন্য; আর শরীফ অথবা মনিব অথবা ধনী ব্যক্তির জন্য বশীভূত হয়ে থাকার জন্য? !! আর সেখান থেকেই তাদের অন্তরসমূহ কখনও তাকে হত্যা করাকে, শাস্তি দেওয়াকে, তাকে আগুন দ্বারা সেক দেওয়াকে এবং তাকে অতি কষ্টকর ও নোংরা কাজে বাধ্য করাকে অপরাধ বা পাপ মনে করে না !! * * * কিভাবে ইসলাম দাস- দাসীকে মুক্তি দিয়েছে? কিছুক্ষণ পূর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, ইসলাম যখন দাস-দাসীর মান সমুন্নত করা, তার সাথে উত্তম ব্যবহার করা, তাকে সম্মান করা এবং তার প্রতি ইহসান করার ব্যাপারে নিয়মনীতি ও নির্দেশমালা প্রণয়ন করেছে, তখন তার উদ্দেশ্য ছিল দাস-দাসীর মানবিক অস্তিত্ব ও সম্মানকে অনুভব করা … এমন কি যখন সে বাস্তবে তার এই অস্তিত্ব বা অবস্থানকে অনুভব করবে এবং এই সম্মানের বাস্তবতা উপভোগ করবে, তখন সে দাসত্ব থেকে তাকে মুক্ত করার আবেদন করবে এবং মুক্ত করার পথে পথ চলবে ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণে সে পূর্ণ স্বাধীনতার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনিত হবে। আর এর অর্থ হল, ইসলাম কর্তৃক দাস- দাসীকে মুক্ত করার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য প্রণীত শর‘য়ী নিয়মনীতির মাধ্যমে কার্যতঃ দাস-দাসীকে মুক্ত করার পূর্বে তাকে মনের ভিতর ও হৃদয়ের গভীরতা থেকে মুক্ত করে দিয়েছে, যাতে সে তার অস্তিত্বকে অনুভব করতে পারে এবং যথার্থতা ও বলিষ্ঠতার সাথে স্বাধীনতা দাবি করতে পারে; আর এটাই হলো স্বাধীনতার প্রকৃত গ্যারান্টি !! আর প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুবের বক্তব্যের আলোকে বলা যায়, আদেশ বা ফরমান জারি করার মাধ্যমে দাস-দাসী মুক্ত করার দ্বারা আসলেই দাস-দাসীর মুক্তি অর্জিত হয়নি … আর আমরা যা বলি, তার পক্ষে উৎকৃষ্ট প্রমাণ হলো ‘আব্রাহাম লিংকন’ এর হাতের কলমের নির্দেশ (লেখার) দ্বারা দাস-দাসী মুক্ত করে দেওয়ার ব্যাপারে আমেরিকান অভিজ্ঞতা; কারণ, বাহ্যিকভাবে আইনের দ্বারা লিংকন যেসব গোলামদেরকে মুক্ত করে দিয়েছিল, তারা স্বাধীন হতে পরেনি এবং ভিতরে ভিতরে তারা তাদের মনিবদের কাছেই ফিরে এসেছে— পরবর্তীতেও তারা স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি ! ! কেন? কেননা, চিরস্থায়ী দাসত্বের ছায়াতলে তাদের জীবন তার মানসিক ও অনুভূতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে এসব অবস্থা ও প্রেক্ষাপটের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করে; ফলে আনুগত্য ও বশ্যতার প্রক্রিয়া চূড়ান্তভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং চূড়ান্তভাবে অস্তিত্বগত ও সম্মানবোধকে দুর্বল করে ফেলে ! ! আর আল্লাহ প্রদত্ত বিধান ও মানব রচিত বিধানের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে; আল্লাহ প্রদত্ত শাসনব্যবস্থা হলো এমন, যা মানুষকে স্বাধীনতা লাভে অনুপ্রাণিত করে এবং তা লাভের জন্য উপায়সমূহ ঠিক করে দেয়; অতঃপর তাদেরকে তা প্রদান করে ঐ মুহূর্তে, যখন তারা নিজেরাই তা দাবি করে। অপরদিকে মানব রচিত শাসনব্যবস্থা হলো এমন, যা বিষয় বা ব্যাপারসমূহকে জটিলতা ও সংকটের দিকে ঠেলে দেয়, শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত হয়, যেখানে শত শত ও হাজার হাজার প্রাণহানি ঘটে; অতঃপর তা স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীকে অপছন্দনীয় বাধ্যবাধকতা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না ! ! আর দাস-দাসীর প্রশ্নে ইসলামের অন্যতম মহান বৈশিষ্ট্য হল, সে প্রকৃত স্বাধীনতার ব্যাপারে তাকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে অনুপ্রাণিত করে। অভ্যন্তরীণ দিক হল: স্বাধীনতার মত নিয়ামত সম্পর্কে এবং যে কোনো মূল্যে তা পাওয়ার জন্য চেষ্টাসাধনার ব্যাপারে খুব গভীর থেকে তার অনুভূতি জাগ্রত করা। আর বাহ্যিক দিক হল: এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য শরী‘য়ত সম্মত উপায়সমূহ উদ্ভাবন করা। আর এই অর্থে দাস-দাসী মুক্ত করার জন্য ভাল নিয়ত বা মানুসিকতাকেই ইসলাম যথেষ্ট মনে করে না, যেমন কাজ করেছেন ‘আব্রাহাম লিংকন’ তিনি এমন আইন জারি করেছেন যে আইনের ব্যাপারে মানুষের অন্তরে কোনো আবেদন তৈরী হয়নি। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, মানব প্রকৃতির ব্যাপারে ইসলামের উপলব্ধি ও বিচক্ষণতা কত গভীর; আর তাই ইসলাম তার সমস্যা নিরসনের ব্যাপারে সর্বোত্তম পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এর পাশাপাশি ইসলাম প্রত্যেক হকদারকে তার হক প্রদান করেছে, তাকে যথার্থ লালন করেছে, সে হক ধারণ করার ও হকের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিকে বহন করার যোগ্য করে গড়ে তুলেছে। এসবই করেছে ইসলাম সে হক বা অধিকার নিয়ে হানাহানি ও মারামারি পর্যায়ে যাওয়ার পূর্বেই। অথচ মধ্য যুগের ইউরোপে সে হানাহানি ও মারামারিই সংঘটিত হয়েছে। এটি এমন ঘৃণিত লড়াই, যা মানুষের অনুভূতি ভোঁতা করে দিয়েছে, জন্ম দিয়েছে হিংস-বিদ্বেষের; ফলে মানুষের জীবনের চলার পথে কল্যাণ লাভের যে সম্ভাবনা ছিল, সেসব সম্ভাবনাকে তা ধ্বংস করে দিয়েছে ! ! দাস-দাসীকে মুক্ত করার জন্য মানসিকভাবে তৈরী করার বিষয়টির গুরুত্ব বুঝানোর এ দৃষ্টি আকর্ষণীর পর আমি ফিরে যাচ্ছি বাহ্যিকভাবে দাস- দাসীকে মুক্ত করার ব্যাপারে শর‘য়ী নিয়মকানুন বর্ণনার করার দিকে, যাতে ঐ ব্যক্তি জানতে পারে, যে ব্যক্তি জানতে চায় যে, গোলামীর বন্দী দশা থেকে দাস-দাসীদের স্বাধীন ও মুক্ত করার ব্যাপারে ইসলামের একটি শরী‘য়তসম্মত ব্যবস্থাপনা বা পদ্ধতি রয়েছে। দাস-দাসী মুক্ত করার ব্যাপারে ইসলাম যে শরী‘য়ত সম্মত পদ্ধতি প্রণয়ন করেছে, তা নিম্নোক্ত পদ্ধতি বা ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে: ক. উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান; খ. কাফ্ফারা প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান; গ. লিখিত চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি দান; ঘ. রাষ্ট্রীয় তত্ত্ববধানে মুক্তি দান; ঙ. সন্তানের মা (উম্মুল অলাদ) হওয়ার কারণে মুক্তি দান; চ. নির্যাতনমূলক প্রহারের কারণে মুক্তি দান। * * * • উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান: আর তা হলো, পুরস্কার ও সাওয়াব অর্জনের নিয়তে মনিবদের পক্ষ থেকে তাদের অধীনে থাকা দাস-দাসীদের মুক্ত করে দেওয়া, যাতে মুক্তি দানকারী ব্যক্তি জান্নাত পাওয়ার মাধ্যমে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করতে পারে; যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿ ﻓِﻲ ﻣَﻘۡﻌَﺪِ ﺻِﺪۡﻕٍ ﻋِﻨﺪَ ﻣَﻠِﻴﻚٖ ﻣُّﻘۡﺘَﺪِﺭِۢ ٥٥ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻘﻤﺮ: ٥٥ ] “যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহাঅধিপতি (আল্লাহ)র সান্নিধ্যে।”[20] আর ইসলাম মনিবদেরকে দাস-দাসী মুক্ত করে দেওয়ার ব্যাপারে প্রচণ্ডভাবে এবং যথেষ্ট পরিমাণে মনিবদেরকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছে; আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻓَﻠَﺎ ﭐﻗۡﺘَﺤَﻢَ ﭐﻟۡﻌَﻘَﺒَﺔَ ١١ ﻭَﻣَﺎٓ ﺃَﺩۡﺭَﻯٰﻚَ ﻣَﺎ ﭐﻟۡﻌَﻘَﺒَﺔُ ١٢ ﻓَﻚُّ ﺭَﻗَﺒَﺔٍ ١٣ … ﴾ ‏[ﺍﻟﺒﻠﺪ : ١١، ١٣ ] “তবে সে তো বন্ধুর গিরিপথে প্রবেশ করেনি। আর কিসে আপনাকে জানাবে যে, বন্ধুর গিরিপথ কী? এটা হচ্ছে দাসমুক্তি …।”[21] অন্যদিকে যেসব হাদিসে দাস-দাসী মুক্ত করার ফযিলত ও মর্যাদা বর্ণনা এসেছে এবং দাস- দাসী মুক্তিদানকারী ব্যক্তির জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছে, সেগুলোর সংখ্যা অনেক বেশি, গণনার বাইরে; আমরা উদাহরণস্বরূপ তন্মধ্য থেকে সাধ্যমত কিছু উপস্থাপন করেছি: — ইবনু জারির রহ. আবূ নাজীহ রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: « ﺃَﻳُّﻤَﺎ ﺭَﺟُﻞٍ ﻣُﺴْﻠِﻢٍ ﺃَﻋْﺘَﻖَ ﺭَﺟُﻠًﺎ ﻣُﺴْﻠِﻤًﺎ ﻓَﺈِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻋَﺰَّ ﻭَﺟَﻞَّ ﺟَﺎﻋِﻞٌ ﻭَﻓَﺎﺀَ ﻛُﻞِّ ﻋَﻈْﻢٍ ﻣِﻦْ ﻋِﻈَﺎﻣِﻪِ ﻋَﻈْﻤًﺎ ﻣِﻦْ ﻋِﻈَﺎﻡِ ﻣُﺤَﺮَّﺭِﻩِ ﻣِﻦْ ﺍﻟﻨَّﺎﺭِ ؛ ﻭَﺃَﻳُّﻤَﺎ ﺍﻣْﺮَﺃَﺓٍ ﻣُﺴْﻠِﻤَﺔٍ ﺃَﻋْﺘَﻘَﺖْ ﺍﻣْﺮَﺃَﺓً ﻣُﺴْﻠِﻤَﺔً ﻓَﺈِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻋَﺰَّ ﻭَﺟَﻞَّ ﺟَﺎﻋِﻞٌ ﻭَﻓَﺎﺀَ ﻛُﻞِّ ﻋَﻈْﻢٍ ﻣِﻦْ ﻋِﻈَﺎﻣِﻬَﺎ ﻋَﻈْﻤًﺎ ﻣِﻦْ ﻋِﻈَﺎﻡِ ﻣُﺤَﺮَّﺭِﻫَﺎ ﻣِﻦْ ﺍﻟﻨَّﺎﺭِ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺣﻤﺪ ) . “যে কোনো মুসলিম পুরুষ কোনো মুসলিম পুরুষ (গোলাম) কে আযাদ করবে, আল্লাহ তা‘আলা তার প্রত্যেকটি অস্থির বিনিময়ে তার এক একটি অস্থিকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন। আর যে কোনো মুসলিম নারী কোনো মুসলিম দাসীকে আযাদ করবে, আল্লাহ তা‘আলা তার প্রত্যেকটি অস্থির বিনিময়ে তার এক একটি অস্থিকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করবেন।” – [মুসনাদে আহমদ]। — ইমাম আহমদ র. ‘আমর ইবন ‘আনবাসা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি তাদের নিকট হাদিস বর্ণনা করে বলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: « ﻣﻦ ﺑﻨﻰ ﻟﻠﻪ ﻣﺴﺠﺪﺍ ﻟﻴﺬﻛﺮ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﺰ ﻭ ﺟﻞ ﻓﻴﻪ ﺑﻨﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻟﻪ ﺑﻴﺘﺎ ﻓﻲ ﺍﻟﺠﻨﺔ , ﻭﻣﻦ ﺃﻋﺘﻖ ﻧﻔﺴﺎ ﻣﺴﻠﻤﺔ ﻛﺎﻧﺖ ﻓﺪﻳﺘﻪ ﻣﻦ ﺟﻬﻨﻢ , ﻭﻣﻦ ﺷﺎﺏ ﺷﻴﺒﺔ ﻓﻲ ﺳﺒﻴﻞ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﺰ ﻭ ﺟﻞ ﻛﺎﻧﺖ ﻟﻪ ﻧﻮﺭﺍ ﻳﻮﻡ ﺍﻟﻘﻴﺎﻣﺔ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺣﻤﺪ ) . “যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি মাসজিদ নির্মাণ করবে যাতে আল্লাহ তা‘আলার যিকির (স্মরণ) করা হবে, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জান্নাতের মধ্যে একটি ঘর নির্মাণ করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো একজন মুসলিম গোলামকে আযাদ করবে, তা জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য তার মুক্তিপণ হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার পথে শুভ্রকেশী (বৃদ্ধ) হবে, তা তার জন্য কিয়ামতের দিনে আলো হবে।” – [মুসনাদে আহমদ] — ইমাম আবূ দাউদ ও নাসায়ী র. ‘আমর ইবন ‘আনবাসা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: « ﻣﻦ ﺃﻋﺘﻖ ﺭﻗﺒﺔ ﻣﺆﻣﻨﺔ ﺃﻋﺘﻖ ﺍﻟﻠﻪ ﺑﻜﻞ ﻋﻀﻮ ﻣﻨﻬﺎ ﻋﻀﻮﺍ ﻣﻨﻪ ﻣﻦ ﺍﻟﻨﺎﺭ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ ﻭ ﺍﻟﻨﺴﺎﺋﻲ ) . “যে ব্যক্তি একজন মুমিন গোলামকে আযাদ করবে, আল্লাহ তা‘আলা সেই গোলামের প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে জাহান্নামের আগুন থেকে তার প্রতিটি অঙ্গকে মুক্ত করবেন।” – [আবূ দাউদ ও নাসায়ী]। — ইমাম আহমদ র. বারা ইবন ‘আযেব রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: « ﺟﺎﺀ ﺃﻋﺮﺍﺑﻲ ﺇﻟﻰ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻓﻘﺎﻝ : ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ! ﻋﻠﻤﻨﻲ ﻋﻤﻼ ﻳﺪﺧﻠﻨﻲ ﺍﻟﺠﻨﺔ , ﻓﻘﺎﻝ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ : ﺃﻋﺘﻖ ﺍﻟﻨﺴﻤﺔ , ﻭﻓﻚ ﺍﻟﺮﻗﺒﺔ . ﻓﻘﺎﻝ : ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ! ﺃﻭ ﻟﻴﺴﺘﺎ ﺑﻮﺍﺣﺪﺓ ؟ ﻗﺎﻝ : ﻻ , ﺇﻥ ﻋﺘﻖ ﺍﻟﻨﺴﻤﺔ ﺃﻥ ﺗﻔﺮﺩ ﺑﻌﺘﻘﻬﺎ , ﻭﻓﻚ ﺍﻟﺮﻗﺒﺔ ﺃﻥ ﺗﻌﻴﻦ ﻓﻲ ﻋﺘﻘﻬﺎ ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺣﻤﺪ ) . “জনৈক বেদুঈন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগমন করল এবং তারপর বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন একটি কাজের প্রশিক্ষণ দিন, যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে; তখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তুমি দাস- দাসী আযাদ কর এবং দাস মুক্ত কর। তারপর সে বলল: এই দু’টি কাজই কি এক জাতীয় কাজ নয়? জবাবে তিনি বললেন: না। দাস- দাসী আযাদ করা মানে হল, তুমি তাকে মুক্ত করার মাধ্যমে পৃথক করে দেবে; আর দাস মুক্ত করা মানে হল, তুমি তার মুক্তির ব্যাপারে সহযোগিতা করবে।” – [মুসনাদে আহমদ]। — ইমাম বুখারী ও মুসলিম র. প্রমূখ সা‘ঈদ ইবন মারজানা র. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে বলতে শুনেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: « ﻣَﻦْ ﺃَﻋْﺘَﻖَ ﺭَﻗَﺒَﺔً ﻣُﺆْﻣِﻨَﺔً ﺃَﻋْﺘَﻖَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﺑِﻜُﻞِّ ﺇِﺭْﺏٍ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﺇِﺭْﺑًﺎ ﻣِﻨْﻪُ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺎﺭِ , ﺣﺘﻰ ﻟﻴﻌﺘﻖ ﺑﺎﻟﻴﺪ ﺍﻟﻴﺪ , ﺑﺎﻟﺮﺟﻞ ﺍﻟﺮﺟﻞ , ﻭﺍﻟﻔﺮﺝ ﺍﻟﻔﺮﺝ … ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭ ﻣﺴﻠﻢ ﻭ ﻏﻴﺮﻫﻤﺎ ) . “যে ব্যক্তি একজন মুমিন গোলামকে আযাদ করবে, আল্লাহ তা‘আলা সেই গোলামের প্রতিটি অঙ্গের বিনিময়ে জাহান্নামের আগুন থেকে তার প্রতিটি অঙ্গকে মুক্ত করবেন; এমন কি তিনি হাতের বিনিময়ে হাত, পায়ের বিনিময়ে পা এবং গুপ্তাঙ্গের বিনিময়ে গুপ্তাঙ্গকে মুক্ত করবেন …।” [বুখারী ও মুসলিম প্রমূখ]। আলী ইবন হাসান র. হাদিসের বর্ণনাকারী সা‘ঈদ ইবন মারজানা র. কে উদ্দেশ্য করে বললেন: তুমি কি এই হাদিসটি আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র নিকট থেকে শুনেছ? জবাবে সা‘ঈদ ইবন মারজানা র. বললেন: হ্যাঁ। অতঃপর আলী তাঁর এক গোলামকে লক্ষ্য করে বললেন: তুমি ‘মাতরাফ’ (তাঁর গোলামদের একজন) –কে ডাক, অতঃপর সে যখন তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালো, তখন তিনি বললেন: যাও, তুমি আল্লাহর ওয়াস্তে মুক্ত। আর দাস-দাসী মুক্তি দাতাদের মর্যাদা প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বর্ণিত এসব দৃষ্টিভঙ্গির ফলে মুসলিমগণ দাস- দাসীদের মুক্ত করার বিষয়টিকে সততা ও নিষ্ঠার সাথে তাদের মনের আনন্দ দানকারী এবং চোখের প্রশান্তি দাতা হিসেবে গ্রহণ করেছে, যাতে তারা ঐ দিন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর জান্নাতের অধিকারী হতে পারে, যেই দিন ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্তুতি কোনো উপকারে আসবে না। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে অতি উত্তম নমুনা বা আদর্শ পেশ করেছেন, যেহেতু তিনি তাঁর মালিকানায় থাকা সকল গোলামকে মুক্ত করে দিয়েছেন। আর এই ক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণ করছেন তাঁর সাহাবীগণ ঈমান ও বিশ্বাসের সাথে এবং স্বপ্রণোদিত হয়ে। আর আবূ বকর সিদ্দিক রা. মক্কার কুরাইশ নেতাদের নিকট থেকে গোলামদের ক্রয় করার জন্য অনেক সম্পদ খরচ করেছেন, যাতে তিনি তাদেরকে মুক্ত করে দিতে পারেন এবং তাদেরকে দিতে পারেন পূর্ণ স্বাধীনতা। আর ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একটি বিরাট সংখ্যক দাস-দাসীকে মুক্ত করা হয়েছে ঈমানের বলে বলিয়ান হয়ে আল্লাহর নিকট থেকে পুরস্কার লাভের আশায় স্বেচ্ছায় স্বপ্রণোদিত হয়ে মুক্ত করার পদ্ধতিতে। আর ইসলামের আগে ও পরে এই বিরাট সংখ্যক দাস-দাসীকে মুক্ত করার কোনো দৃষ্টান্ত মানবতার ইতিহাসে নেই, যেমনিভাবে তাদের মুক্তি দানের কার্যক্রম ছিল নিরেট ও নির্ভেজাল মানবতার প্রতীক, যা মানুষের হৃদয় ও ঈমান থেকে বেরিয়ে এসেছে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে এবং আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি ও তাঁর জান্নাত ব্যতীত অন্য কিছু অর্জনের উদ্দেশ্যে নয় ! ! * * * • কাফ্ফারা প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান: আর দাস-দাসী মুক্ত করার ক্ষেত্রে শরীয়ত সম্মত উপায়সমূহের মধ্য থেকে এটা একটা অন্যতম মহান উপায়; আল-কুরআনুল কারীম কাফ্ফারা স্বরূপ দাস- দাসী মুক্ত করার জন্য অনেক বিষয়ে বক্তব্য পেশ করেছে, শরীয়ত বিরোধী কর্মকাণ্ড ও প্রকাশ্য এসব গুনাহের মধ্য থেকে কোনো একটিতে মুসলিম ব্যক্তি জড়িয়ে গেলে (তার উপর এই ধরনের কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে)। আর অধিকাংশ অপরাধ ও শরীয়ত বিরোধী কর্মকাণ্ড এমন, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন ও বাস্তব জীবনকে পরিবেষ্টন করে আছে!! … সুতরাং যখন দাস-দাসী মুক্ত করে দেওয়া হবে এসব অপরাধ ক্ষমার অন্যতম উপায়, তখন এর অর্থ হবে- ইসলামী সমাজে দাস-দাসীদের একটা বিরাট সংখ্যার মুক্তির ব্যাপারে ইসলাম দ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে !! … আপনাদের সামনে আল-কুরআনুল কারীমের বক্তব্যের আলোকে কাফ্ফারার মাধ্যমে দাস- দাসী আযাদ করার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় তুলে ধরা হল: – ভুলবশত হত্যার কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন দাস মুক্ত করা এবং তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা; আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﻣَﻦ ﻗَﺘَﻞَ ﻣُﺆۡﻣِﻨًﺎ ﺧَﻄَٔٗﺎ ﻓَﺘَﺤۡﺮِﻳﺮُ ﺭَﻗَﺒَﺔٖ ﻣُّﺆۡﻣِﻨَﺔٖ ﻭَﺩِﻳَﺔٞ ﻣُّﺴَﻠَّﻤَﺔٌ ﺇِﻟَﻰٰٓ ﺃَﻫۡﻠِﻪِۦٓ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ٩٢ ] “আর কেউ কোনো মুমিনকে ভুলবশত হত্যা করলে এক মুমিন দাস মুক্ত করা এবং তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা কর্তব্য ।”[22] – যদি এমন সম্প্রদায়ের কাউকে হত্যা করা হয়, যাদের সাথে আমরা পরস্পর অংগীকারাবদ্ধ, তবে সে ক্ষেত্রে হত্যার কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন দাস মুক্ত করা; আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﺇِﻥ ﻛَﺎﻥَ ﻣِﻦ ﻗَﻮۡﻡِۢ ﺑَﻴۡﻨَﻜُﻢۡ ﻭَﺑَﻴۡﻨَﻬُﻢ ﻣِّﻴﺜَٰﻖٞ ﻓَﺪِﻳَﺔٞ ﻣُّﺴَﻠَّﻤَﺔٌ ﺇِﻟَﻰٰٓ ﺃَﻫۡﻠِﻪِۦ ﻭَﺗَﺤۡﺮِﻳﺮُ ﺭَﻗَﺒَﺔٖ ﻣُّﺆۡﻣِﻨَﺔٖۖ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ٩٢ ] “আর যদি সে এমন সম্প্রদায়ভুক্ত হয় যাদের সাথে তোমরা অংগীকারাবদ্ধ, তবে তার পরিজনবর্গকে রক্তপণ আদায় করা এবং সাথে মুমিন দাস মুক্ত করা কর্তব্য।”[23] – ইচ্ছাকৃত শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন দাস মুক্ত করা; আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন: ﴿ … ﻭَﻟَٰﻜِﻦ ﻳُﺆَﺍﺧِﺬُﻛُﻢ ﺑِﻤَﺎ ﻋَﻘَّﺪﺗُّﻢُ ﭐﻟۡﺄَﻳۡﻤَٰﻦَۖ ﻓَﻜَﻔَّٰﺮَﺗُﻪُۥٓ ﺇِﻃۡﻌَﺎﻡُ ﻋَﺸَﺮَﺓِ ﻣَﺴَٰﻜِﻴﻦَ ﻣِﻦۡ ﺃَﻭۡﺳَﻂِ ﻣَﺎ ﺗُﻄۡﻌِﻤُﻮﻥَ ﺃَﻫۡﻠِﻴﻜُﻢۡ ﺃَﻭۡ ﻛِﺴۡﻮَﺗُﻬُﻢۡ ﺃَﻭۡ ﺗَﺤۡﺮِﻳﺮُ ﺭَﻗَﺒَﺔٖۖ … ﴾ ‏[ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ: ٨٩ ] “… কিন্তু যেসব শপথ তোমরা ইচ্ছে করে কর, সেগুলোর জন্য তিনি তোমাদেরকে পাকড়াও করবেন। তারপর এর কাফ্ফারা দশজন দরিদ্রকে মধ্যম ধরনের খাদ্য দান, যা তোমরা তোমাদের পরিজনদেরকে খেতে দাও, বা তাদেরকে বস্ত্রদান, কিংবা একজন দাস মুক্তি …।”[24] – যিহারের[25] কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে একজন দাস মুক্ত করা, যখন সে তার শব্দগুলো উচ্চারণ করবে, অতঃপর সেই কথা থেকে ফিরে আসবে; আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳُﻈَٰﻬِﺮُﻭﻥَ ﻣِﻦ ﻧِّﺴَﺎٓﺋِﻬِﻢۡ ﺛُﻢَّ ﻳَﻌُﻮﺩُﻭﻥَ ﻟِﻤَﺎ ﻗَﺎﻟُﻮﺍْ ﻓَﺘَﺤۡﺮِﻳﺮُ ﺭَﻗَﺒَﺔٖ ﻣِّﻦ ﻗَﺒۡﻞِ ﺃَﻥ ﻳَﺘَﻤَﺎٓﺳَّﺎۚ … ﴾ ‏[ﺍﻟﻤﺠﺎﺩﻟﺔ : ٣ ] “আর যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে যিহার করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তবে একে অন্যকে স্পর্শ করার আগে একটি দাস মুক্ত করতে হবে, …।”[26] – রমযান মাসে ইচ্ছাকৃত সাওম ভঙ্গের কাফ্ফারা নির্ধারণ করা হয়েছে দাস মুক্ত করা, আর এটা সাব্যস্ত হয়েছে সহীহ সুন্নাহর মধ্যে। এ ছাড়াও আল-কুরআনুল কারীম নির্দেশিত আবশ্যকীয় কাফ্ফারাসমূহ ভিন্ন অন্যান্য ব্যাপারে মুসলিম ব্যক্তি কর্তৃক সম্পাদন করা যে কোনো গুনাহ থেকে মাফ পাওয়ার জন্য মুস্তাহাব হিসেবে দাস- দাসী মুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে, এই কাজের জন্য একটি বিরাট সংখ্যক দাস- দাসীকে মুক্ত করা সম্ভব: [আরও সুন্দর হয় ভুলজনিত হত্যার কাফ্ফারার প্রতি আমাদের বিশেষ ইঙ্গিত করলে; কারণ, আমরা আলোচনা করেছি যে, তার (ভুলজনিত হত্যার) কাফ্ফারা হলো নিহত ব্যক্তির পরিবারকে রক্তপণ আদায় করা এবং সাথে একজন দাস মুক্ত করা; আর যে নিহত ব্যক্তি ভুলজনিত কারণে নিহত হয়েছে, সে হলো মানব আত্মা, যাকে কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই তার পরিবার-পরিজন হারিয়েছে, যেমনিভাবে হারিয়েছে তার সমাজ। এই জন্য ইসলাম দুই দিক থেকে তার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করেছে: তার পরিবারকে রক্তপণ আদায় করার মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ দেওয়া; আর একজন মুমিন দাস মুক্ত করে দেওয়ার মাধ্যমে সমাজকে ক্ষতিপূরণ দান!? কারণ, দাস মুক্ত করে দেওয়ার মানে যেন ভুলজনিত হত্যার মাধ্যমে যে প্রাণটি চলে গেছে, তার বিনিময় স্বরূপ একটি প্রাণকে বাঁচিয়ে দেওয়া। আর এর উপর ভিত্তি করে ইসলামের দৃষ্টিতে দাসত্ব হলো মৃত্যু অথবা মৃত্যুর সাথে তুলনীয় একটি বিষয়; তা সত্ত্বেও দাস-দাসীকে বেষ্টন করে আছে প্রতিটি নিরাপত্তা বিষয়ক দায়-দায়িত্ব; আর এই জন্যই ইসলাম দাস- দাসীদেরকে (সত্যিকারের) জীবন দানের জন্য তাদেরকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করার প্রতিটি সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ][27]। * * * • লিখিত চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি দান: এটা দাস-দাসীর জন্য মুক্তি পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ, যখন সে নিজেই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে মুক্ত হওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হবে এবং সেই অর্থের ব্যাপারে গোলাম ও মনিব ঐক্যমত পোষণ করবে যে, গোলাম কিস্তিতে তা মনিবকে পরিশোধ করে দেবে; অতঃপর যখন সে তা পরিশোধ করবে, তখন সে স্বাধীন হয়ে যাবে; আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ … ﻭَﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳَﺒۡﺘَﻐُﻮﻥَ ﭐﻟۡﻜِﺘَٰﺐَ ﻣِﻤَّﺎ ﻣَﻠَﻜَﺖۡ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨُﻜُﻢۡ ﻓَﻜَﺎﺗِﺒُﻮﻫُﻢۡ ﺇِﻥۡ ﻋَﻠِﻤۡﺘُﻢۡ ﻓِﻴﻬِﻢۡ ﺧَﻴۡﺮٗﺍۖ ﻭَﺀَﺍﺗُﻮﻫُﻢ ﻣِّﻦ ﻣَّﺎﻝِ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﭐﻟَّﺬِﻱٓ ﺀَﺍﺗَﻯٰﻜُﻢۡۚ … ﴾ ‏[ﺍﻟﻨﻮﺭ: ٣٣ ] “… আর তোমাদের মালিকানাধীন দাস- দাসীদের মধ্যে কেউ তার মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি চাইলে, তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হও, যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে বলে জানতে পার। আর আল্লাহ্ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে তোমরা তাদেরকে দান কর।”[28] ফকীহগণের দু’টি অভিমত: গোলাম কর্তৃক মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তির আবেদনে সাড়া দেওয়া মনিবের উপর ওয়াজিব (আবশ্যক) হবে কি? প্রথম অভিমত: এই ধরনের আবেদনে সাড়া দেওয়া ওয়াজিব নয়, বরং মুস্তাহাব; আর এটাই হলো বিভিন্ন নগর ও শহরের আলেমদের মধ্য থেকে অধিকাংশ ফকীহ’র অভিমত। তাঁদের দলীল: আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿ ﺇِﻥۡ ﻋَﻠِﻤۡﺘُﻢۡ ﻓِﻴﻬِﻢۡ ﺧَﻴۡﺮٗﺍۖ ﴾ [যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে বলে জানতে পার] [29] সুতরাং ” ﺇِﻥۡ ﻋَﻠِﻤۡﺘُﻢۡ ﻓِﻴﻬِﻢۡ ﺧَﻴۡﺮٗﺍۖ ” বাক্যটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে যে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ” ﻓَﻜَﺎﺗِﺒُﻮﻫُﻢۡ …” [তবে তোমরা তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হও …] আয়াতের মধ্যকার ‘আমর’ বা নির্দেশটি ওয়াজিব থেকে মুস্তাহাবে রূপান্তরিত হয়েছে। সুতরাং যখন গোলাম তার মনিবকে বলবে: এই পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে আপনি আমাকে মুক্ত করে দেওয়ার চুক্তিপত্রে সই করে দিন, আর মনিব যখন বলবে: তোমার মাঝে কোনো কল্যাণ আছে বলে আমার জানা নেই, তখন মনিবের কথাই গ্রহণযোগ্য হবে; কারণ, আমানতদারীতা ও সততার দিক থেকে তার গোলামের ব্যাপারে তিনিই সবচেয়ে বেশি ভাল জানেন। দ্বিতীয় অভিমত: মনিবের উপর আবশ্যক হলো গোলাম কর্তৃক তার মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তির আবেদন করলে তা গ্রহণ করা এবং তার উপর ওয়াজিব হলো যখন সে উভয়ের ঐক্যমতের ভিত্তিতে নির্ধারিত অর্থ আদায় করে দিবে তখন তাকে মুক্ত করে দেওয়া। আর কুরতুবী’র বক্তব্য অনুযায়ী যাঁরা এই অভিমতের প্রবক্তা, তাঁরা হলেন: ‘ইকরিমা, ‘আতা, মাসরুক, ‘আমর ইবন দিনার, দাহ্হাক ইবন মুযাহেম এবং আহলে যাওয়াহের মধ্য থেকে একদল আলেম। আর তাঁরা ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র কর্মকাণ্ডকে যুক্তি হিসেবে পেশ করেছেন; আর তা হলো সিরীন আবূ মুহাম্মদ ইবন সিরীন আনাস ইবন মালেক রা. এর নিকট তার মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তির আবেদন করেছিলেন, আর তিনি (আনাস রা.) ছিলেন তার মনিব (মাওলা); অতঃপর আনাস রা. অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিলেন, ফলে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু দোররা উত্তোলন করে তাঁকে সতর্ক করলেন এবং আল্লাহ তা‘আলা’র বাণী তিলাওয়াত করলেন: ﴿ ﻓَﻜَﺎﺗِﺒُﻮﻫُﻢۡ ﺇِﻥۡ ﻋَﻠِﻤۡﺘُﻢۡ ﻓِﻴﻬِﻢۡ ﺧَﻴۡﺮٗﺍۖ ﴾ ‏[ﺍﻟﻨﻮﺭ : ٣٣ ] “তাহলে তোমরা তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হও, যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে বলে জানতে পার।”[30] অতঃপর আনাস রা. চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন; আর ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আনাস রা. এর উপর তাঁর উপর ওয়াজিব না হওয়া কেবল কোনো বৈধ কর্মের ব্যাপারে দোররা উত্তোলন করেন নি। আর ওয়াজিব হওয়ার বিষয়টিকে আরও মজবুত করে নিম্নোক্ত আয়াতের শানে নুযুল (আয়াত নাযিলের কারণ)। ﴿ ﻭَﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳَﺒۡﺘَﻐُﻮﻥَ ﭐﻟۡﻜِﺘَٰﺐَ ﻣِﻤَّﺎ ﻣَﻠَﻜَﺖۡ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨُﻜُﻢۡ … ﴾ [মালিকানাধীন দাস-দাসীদের মধ্যে কেউ তার মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি চাইলে …][31] কুরতুবী’র বর্ণনা অনুযায়ী আয়াতটি হুয়াইতিবের ‘সবীহ’ নামক গোলামের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে; সে তার মনিবের নিকট তাকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য লিখিত চুক্তির আবেদন করে, কিন্তু ‘হুয়াইতিব’ সে আবেদন নামঞ্জুর করে; অতঃপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এই আয়াতটি নাযিল করেন; তারপর হুয়াইতিব তাকে একশত দিনারের বিনিময়ে মুক্ত করে দেওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হলেন এবং তাকে বিশ দিনার দান করলেন; অতঃপর ‘সবীহ’ তা পরিশোধ করলে তাকে মুক্ত করে দেওয়া হয়। ইসলাম কর্তৃক প্রবর্তিত কতগুলো বিধি- বিধানের মাধ্যমে গোলামের উপর ‘মুকাতাবা’ চুক্তিকে সহজ করে দেওয়া হয়েছে; তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিয়মনীতি হল: ১. ইসলাম যাকাতের মাল থেকে ‘মুকাতিব’ গোলামকে মুক্ত করার সুযোগ করে দিয়েছে; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা সাধারণভাবে বলেছেন: ﴿ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﭐﻟﺼَّﺪَﻗَٰﺖُ ﻟِﻠۡﻔُﻘَﺮَﺍٓﺀِ … ﻭَﻓِﻲ ﭐﻟﺮِّﻗَﺎﺏِ … ﴾ ‏[ ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ : ٦٠ ] “সদকা তো শুধু ফকীরদের জন্য … এবং দাসমুক্তিতে …।”[32] ২. গোলাম যে অর্থ মনিবকে প্রদান করবে, তা বিভিন্ন কিস্তিতে পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দিয়েছে; কেননা, ইমাম বুখারী ও আবূ দাউদ র. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন: « ﺟﺎﺀﺗﻨﻲ ﺑﺮﻳﺮﺓ ﻓﻘﺎﻟﺖ ﻛﺎﺗﺒﺖ ﺃﻫﻠﻲ ﻋﻠﻰ ﺗﺴﻊ ﺃﻭﺍﻕ ﻓﻲ ﻛﻞ ﻋﺎﻡ ﺃﻭﻗﻴﺔ ﻓﺄﻋﻴﻨﻴﻨﻲ … ‏» . ‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭ ﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ ) . “বারীরা রা. আমার কাছে এসে বলল, আমি আমার মালিক পক্ষের সাথে নয় উকিয়া দেওয়ার শর্তে ‘মুকাতাবা’ নামক দাস-দাসী আযাদ করার লিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছি— প্রতি বছর যা থেকে এক উকিয়া করে দেওয়া হবে; সুতরাং আপনি আমাকে (এই ব্যাপারে) সাহায্য করুন।” – [ বুখারী ও আবূ দাউদ ]। ৩. মনিবের উপর কর্তব্য হলো তার গোলামের মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি বাস্তবায়নের অর্থের যোগান দানে সহযোগিতা করা, যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআনের মধ্যে তাকে এই ব্যাপারে নির্দেশ করেছেন; আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ﴿ … ﻓَﻜَﺎﺗِﺒُﻮﻫُﻢۡ ﺇِﻥۡ ﻋَﻠِﻤۡﺘُﻢۡ ﻓِﻴﻬِﻢۡ ﺧَﻴۡﺮٗﺍۖ ﻭَﺀَﺍﺗُﻮﻫُﻢ ﻣِّﻦ ﻣَّﺎﻝِ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﭐﻟَّﺬِﻱٓ ﺀَﺍﺗَﻯٰﻜُﻢۡۚ ﴾ ‏[ﺍﻟﻨﻮﺭ : ٣٣ ] “… তাহলে তোমরা তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হও, যদি তোমরা তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে বলে জানতে পার। আর আল্লাহ্ তোমাদেরকে যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে তোমরা তাদেরকে দান কর।”[33] সহযোগিতার দু’টি পর্যায়: – হয় সে (মনিব) তাকে তার হাতে যা আছে, তা থেকে কিছু প্রদান করবে। – নতুবা সে চুক্তি মোতাবেক গোলাম কর্তৃক প্রদেয় অর্থ থেকে অংশবিশেষ ছাড় দিয়ে দেবে। আর আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু চুক্তি মোতাবেক অর্থের এক-চতুর্থাংশ ছাড় দেওয়াকে উত্তম মনে করেছেন; আর আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তার এক-তৃতীয়াংশ ছাড় দেওয়াকে উত্তম মনে করেছেন; আর এই ধরনের সহযোগিতাকে কেউ কেউ ওয়াজিব মনে করেন। ইমাম শাফে‘য়ী র. বলেন: সহযোগিতার জন্য মনিবকে বাধ্য করা হবে; আর মনিব যদি মারা যায় এবং সে তার ‘মুকাতিব’ গোলামকে অর্থিক সহযোগিতা না করে থাকে, তাহলে বিচারক তার ওয়ারিসদেরকে তাকে সহযোগিতার জন্য নির্দেশ প্রদান করবে। ৪. যখন গোলাম চুক্তি মোতাবেক নির্ধারিত অর্থ তার মনিবকে পরিশোধ করে দিবে, তখন সে তাৎক্ষণিকভাবে মুক্ত হয়ে যাবে এবং মনিব কর্তৃক আযাদ বা মুক্ত করার অর্থবোধক কোনো শব্দ উচ্চারণের প্রয়োজন হবে না। ৫. কুরতুবী র. তাঁর তাফসীরের মধ্যে পূর্ববর্তী কোনো কোনো আলেমের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন: যখন গোলামের মুক্তির জন্য তার ও মনিবের মধ্যকার চুক্তি সম্পাদনের কাজ সম্পন্ন হবে, তখন এই চুক্তির কারণে সে মুক্ত হয়ে যাবে এবং সে আর কখনও দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবে না; আর এই অবস্থায় সে তার মনিবের নিকট আর্থিকভাবে ঋণী হবে, যেই পরিমাণ অর্থের ব্যাপারে তাদের উভয়ের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এসব বিধিবিধানকে ইসলাম ‘মুকাতিব’ গোলামের জন্য তার মুক্তির ব্যাপারে অপরাপর শরীয়তসম্মত উপায় হিসেবে প্রণয়ন করেছে; বরং এগুলো মুক্তির দরজা উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তির জন্য বড় ধরনের উপায়সমূহের অন্তর্ভুক্ত, দাস-দাসীদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি তার মনের ভিতরে মুক্তির আগ্রহ অনুভব করে; আর সে তার মনিব কর্তৃক অদূর ভবিষ্যতে স্বেচ্ছায় তাকে মুক্ত করার সুযোগ দিবে কি দিবে না, সেই অপেক্ষা করবে না; কারণ, গোলাম যখন মনিবের নিকট তাকে মুক্তি দানের চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার জন্য আবেদন করবে, তখন মনিব কর্তৃক সেই চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া আবশ্যক হবে। * * * • রাষ্ট্রীয় তত্ত্ববধানে মুক্তি দান: দাস-দাসীর মুক্তির ক্ষেত্রে এটাও অন্যতম মহান উপায়, বরং এটা হলো ইসলামী সমাজে এখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার দাস-দাসীর মুক্তির ব্যাপারে শ্রেষ্ঠ উপায়সমূহের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়। আর ইসলাম রাষ্ট্রের জন্য যাকাতের অর্থ থেকে দাস-দাসীর মুক্তির জন্য বিশেষ খাত নির্ধারণ করে দিয়েছে; এই খাতকে আল-কুরআনুল কারীম ” ﻭَﻓِﻲ ﭐﻟﺮِّﻗَﺎﺏِ ” (দাসমুক্তির) খাত নামে নামকরণ করেছে; মুসলিম রাষ্ট্রে দাস-দাসীদের মুক্ত করার জন্য এই খাত সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﭐﻟﺼَّﺪَﻗَٰﺖُ ﻟِﻠۡﻔُﻘَﺮَﺍٓﺀِ ﻭَﭐﻟۡﻤَﺴَٰﻜِﻴﻦِ ﻭَﭐﻟۡﻌَٰﻤِﻠِﻴﻦَ ﻋَﻠَﻴۡﻬَﺎ ﻭَﭐﻟۡﻤُﺆَﻟَّﻔَﺔِ ﻗُﻠُﻮﺑُﻬُﻢۡ ﻭَﻓِﻲ ﭐﻟﺮِّﻗَﺎﺏِ ﻭَﭐﻟۡﻐَٰﺮِﻣِﻴﻦَ ﻭَﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﻭَﭐﺑۡﻦِ ﭐﻟﺴَّﺒِﻴﻞِۖ ﻓَﺮِﻳﻀَﺔٗ ﻣِّﻦَ ﭐﻟﻠَّﻪِۗ ﻭَﭐﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠِﻴﻢٌ ﺣَﻜِﻴﻢٞ ٦٠ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ: ٦٠ ] “সদকা তো শুধু ফকীর, মিসকীন ও সদকা আদায়ের কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের জন্য, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তিতে, ঋণ ভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”[34] সুতরাং ইসলামের ইতিহাসের গৌরবময় দিকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অন্যতম একটি দিক হল: খলিফাদের যুগে যখনই দরিদ্র ও অভাবীদের অভাব পূরণ করে বাইতুল মালের অর্থ অতিরিক্ত হত, তখনই বাইতুল মালের কোষাধ্যক্ষ দাস- দাসী বিক্রেতাদের হাট থেকে গোলামদেরকে ক্রয় করতেন এবং তাদেরকে মুক্ত করে দিতেন। ইয়াহইয়া ইবন সা‘ঈদ বলেন: ” ﺑﻌﺜﻨﻲ ﻋﻤﺮ ﺑﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﻌﺰﻳﺰ ﻋﻠﻰ ﺻﺪﻗﺎﺕ ﺇﻓﺮﻗﻴﺔ , ﻓﺠﻤﻌﺘﻬﺎ ﺛﻢ ﻃﻠﺒﺖ ﻓﻘﺮﺍﺀ ﻧﻌﻄﻬﺎ ﻟﻬﻢ ﻓﻠﻢ ﻧﺠﺪ ﻓﻘﻴﺮﺍ , ﻭﻟﻢ ﻧﺠﺪ ﻣﻦ ﻳﺄﺧﺬﻫﺎ ﻣﻨﺎ , ﻓﻘﺪ ﺃﻏﻨﻰ ﻋﻤﺮﺑﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﻌﺰﻳﺰ ﺍﻟﻨﺎﺱ , ﻓﺎﺷﺘﺮﻳﺖ ﺑﻬﺎ ﻋﺒﻴﺪﺍ ﻓﺄﻋﺘﻘﺘﻬﻢ ” . “আমাকে ওমর ইবন আবদিল আযীয র. আফ্রিকাবাসীদের যাকাত বিষয়ে দায়িত্ব দিয়ে পাঠান, অতঃপর আমি যাকাত সংগ্রহ করলাম, তারপর তা বন্টন করে দেওয়ার জন্য দরিদ্র লোক খোঁজ করলাম, কিন্তু একজন দরিদ্র লোকও খুঁজে ফেলাম না এবং এমন কাউকে ফেলাম না, যে আমাদের নিকট থেকে যাকাত গ্রহণ করবে; কারণ, ওমর ইবন আবদিল আযীয র. জনগণকে সম্পদশালী ও অভাবমুক্ত করে দিয়েছেন; অতঃপর আমি তার (যাকাতের অর্থ) দ্বারা কতগুলো গোলাম ক্রয় করলাম এবং তাদেরকে মুক্ত করে দিলাম।” এছাড়াও যাকাতের অর্থ থেকে ‘মুকাতিব’ গোলামদের মুক্ত করার মূল্য পরিশোধের জন্য তাদেরকে সাহায্য করা, যখন তারা তা পরিশোধ করার জন্য বিশেষ উপার্জনে অক্ষম হয়, যা পূর্বে আলোচনা হয়েছে ! ! আর এই প্রসঙ্গে কথা বলেছেন প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুব, ইসলাম দাস-দাসী মুক্ত করার ব্যাপারে বাস্তবসম্মত ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে; আর সেই কর্মসূচী নিয়ে কমপক্ষে সাতশত বছর পরিপূর্ণভাবে ঐতিহাসিক অগ্রগতি হয়েছে এবং এই অগ্রগতির সাথে আরও অতিরিক্ত সংযোজন হয়েছে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতার মত উপাদানসমূহ, যার দিকে বিশ্বের অন্যান্যরা কেবল আধুনিক ইতিহাসের শুরুর দিকে যেতে সমর্থ হয়েছে… !! ইসলাম আরও যেসব নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, সেই দিকে বিশ্ব ফিরে তাকায়নি কখনও, চাই দাস-দাসীর সাথে সদ্ব্যবহারের ব্যাপারে হউক, অথবা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি ও বিবর্তনের চাপ ব্যতিরেকে স্বেচ্ছায় তাকে মুক্ত করার প্রসঙ্গে হউক; যা পশ্চিমাদেরকে বাধ্য করেছে দাস-দাসী মুক্ত করে দেওয়ার জন্য !! এটা বা ওটা যাই হোক এর মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক গোষ্ঠী ও তাদের প্রচারকগণের ছেড়ে দেওয়া যাবতীয় নকলতত্ত্ব ভূপাতিত হয়েছে, যারা মনে করেছে যে, ইসলাম হচ্ছে অর্থনৈতিক উন্নতির অস্ত্রসমূহের মধ্যে একটি অস্ত্র, যা তার স্বাভাবিক সময়ে এসেছে দ্বান্দ্বিক বস্তুগত নিয়মনীতির মাধ্যমে; অনুরূপভাবে এর মাধ্যমে তাদের দাবীও অগ্রহণযোগ্য প্রমাণিত হয়েছে যারা মনে করে যে, প্রতিটি ব্যবস্থাপনা, নিয়মনীতি ও মতবাদই এমনকি ইসলামও তার আবির্ভাবের সময়কার অর্থনৈতিক উন্নতির প্রতিফলন মাত্র; আর তার প্রতিটি বিশ্বাস ও চিন্তাধারা এই অর্থনৈতিক উন্নতির অনুকূলেই পরিচালিত হয়ে থাকে এবং তাকে স্বীকৃতি প্রদান করে থাকে; সুতরাং তাদের মতে, কোনো নিয়মনীতি বা ব্যবস্থা অর্থনৈতিক চিন্তাকে ছাড়িয়ে যাবে এমনটি হতে পারে না[35]।!! বস্তুত ইসলাম তার প্রশাসনিক আইন ও শর‘ঈ আইনের ক্ষেত্রে যার অন্যতম হচ্ছে, দাস- দাসী মুক্ত করার নিয়মনীতি, তা তথাকথিত প্রাকৃতিক বিবর্তনের সাতশত বছর পূর্বেই অতিক্রম করেছে; তখন সে (ইসলাম) তৎকালীন আরব উপ-দ্বীপ ও গোটা বিশ্বের কোনো প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভর করে গড়ে উঠে নি, সে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ছাপ না ছিল দাস-দাসীর সাথে আচার-ব্যবহারের ক্ষেত্রে, আর না ছিল সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে; আর না ছিল শাসকের সাথে শাসিতের সম্পর্কের ব্যাপারে কিংবা মালিকের সাথে শ্রমিকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে … বরং তার (ইসলামের) অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক … রীতিনীতির উৎপত্তি ও স্বয়ংক্রিয়তা ছিল আসমানী শরী‘আতের মূলশক্তি ওহীর মাধ্যমে; যার কোনো নযীর ইতিহাসে পাওয়া যায় না। বরং ইসলাম তার নিয়মনীতি ও বিধিবিধানের ক্ষেত্রে যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠা অন্যান্য নিয়মনীতির উপর অনন্য স্বকীয়তার উপর প্রতিষ্ঠিত!! * * * • সন্তানের মা (উম্মুল অলাদ) হওয়ার কারণে মুক্তি দান: অনুরূপভাবে এটাও দাস-দাসী মুক্ত করার উপায়সমূহের মধ্য থেকে অন্যতম একটি উপায় এবং নারী জাতিকে সম্মান দানের ব্যাপারে ইসলামের কৃতিত্বপূর্ণ কাজসমূহের মধ্যে অন্যতম মহান কীর্তি। আর এটা দাস-দাসী মুক্ত করার উপায়সমূহের মধ্য থেকে অন্যতম একটি উপায়; কারণ, দাসী যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তির মালিকানাধীন থাকে, তখন সেই মুসলিম ব্যক্তির জন্য তার সাথে স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করার মত মেলামেশা করা বৈধ আছে; ফলে যখন দাসী তার (মনিবের) জন্য সন্তান প্রসব করবে এবং সেও সন্তানকে তার সন্তান বলে স্বীকৃতি দেবে, তখন সে শরী‘য়তের দৃষ্টিতে ‘উম্মুল অলাদ’ (সন্তানের মা) হয়ে যাবে; আর এই অবস্থায় মনিবের উপর তাকে বিক্রি করা হারাম হয়ে যাবে; আর যখন সে তার জীবদ্দশায় তাকে আযাদ না করে মৃত্যুবরণ করবে, তখন তার মৃত্যুর পর সে সরাসরি স্বাধীন হয়ে যাবে। আর পূর্ববর্তী যুগসমূহের মধ্যে কত দাসীই না এই পদ্ধতিতে (দাসত্ব থেকে) মুক্তি লাভ করেছে? ! আর কত নারী দাসীই না স্বাধীনতা অর্জনের মত নি‘য়ামত দ্বারা ধন্য হয়েছে, যখন তারা ‘উম্মুল অলাদ’ বা সন্তানের মা হয়েছে? ! অনুরূপভাবে এটা নারী জাতিকে সম্মান দানের ব্যাপারে ইসলামের কৃতিত্বপূর্ণ কাজসমূহের মধ্যে অন্যতম মহান কীর্তি; কারণ, নারী যখন অমুসলিম রাষ্ট্রে যুদ্ধের সময় বিপক্ষ শক্তির মালিকানায় চলে আসে, তখন তার সম্মান লুটের মালের মত ব্যভিচারের পন্থায় প্রত্যেক প্রার্থীর জন্য বৈধ হয়ে যায়, বরং সে হয়ে যায় সম্মান হারা, সস্তা পণ্য ও অধিকার বঞ্চিত …। আর তাকে ইসলামী শাসনব্যবস্থার ছায়াতলে দাসী বানানোর দ্বারা ইসলামের পূর্বে সে যেসব অপমান, অপদস্থ ও অসম্মানের শিকার হয়েছে, তা পরিবর্তন হয়ে গেছে … সুতরাং ইসলাম তার অধিকার সংরক্ষণ করেছে এবং তার মান-সম্মান ও মর্যাদাকে রক্ষা করেছে। – সে শুধু তার মালিকের বৈধ মালিকানায় থাকেবে, তার মনিব ব্যতীত অন্য কারও জন্য তার সাথে বসবাস করা এবং তার সাথে স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করার মত মেলামেশা করা বৈধ হবে না; তবে সে (মনিব) যখন তাকে বিয়ে করার অনুমতি প্রদান করে এবং তারপর সে বিয়ে করে, তখন তার মনিবের জন্য তার নিকটবর্তী হওয়া এবং তার সাথে নির্জনে বসবাস করা বৈধ হবে না। – আর তাকে স্বাধীনতা অর্জন করার অধিকার দেওয়া হয়েছে, ইচ্ছা করলে সে ‘মুকাতাবা’ তথা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবে। – আর সে তার মনিবের মৃত্যুর পর স্বাধীন হয়ে যাবে যখন সে ‘উম্মুল অলাদ’ তথা সন্তানের মা হবে এবং তার সাথে তার সন্তানও মুক্ত হয়ে যাবে। – তাছাড়া আবশ্যকীয়ভাবে সে মনিবের নিকট থেকে উত্তম আচরণ ও সম্মানজনক ব্যবহার পাবে, যেমনিভাবে এই ব্যাপারে ইসলামী শরী‘য়ত নির্দেশ প্রদান করেছে। আর এই অর্থ ও তাৎপর্যের মাধ্যমেই নারী তার অস্তিত্ব ও স্বকীয়তার ঘোষণা প্রদান করবে, অনুভব করবে তার সত্ত্বাগত উপস্থিতি এবং ইসলামের নিয়মনীতির ছায়াতলে সে সম্মান ও মর্যাদাবান হিসেবে গৌরব প্রকাশ করবে। * * * • নির্যাতনমূলক প্রহারের কারণে মুক্তি দান: আর কোনো ফকীহ তথা ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞের মতে এটাও দাস-দাসী মুক্ত করার উপায়সমূহের মধ্য থেকে অন্যতম একটি উপায়; আর তাদের মধ্যে হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণও রয়েছেন। আর আমরা পূর্বে এমন নিয়মনীতি আলোচনা করেছি, যা দাস- দাসীর সাথে আচার-ব্যবহারের পদ্ধতি হিসেবে ইসলাম প্রণয়ন করেছে; সুতরাং মনিবের জন্য তার ও তার দাস- দাসীর মাঝে সুন্দর সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে এই মজবুত নিয়মনীতি থেকে বের হয়ে যাওয়া বৈধ হবে না; বরং এই সম্পর্কটি ভালবাসা, অনুকম্পা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক হবে … যাতে দাস-দাসী তার নিজস্ব অস্তিত্ব ও মানবতাকে অনুভব করতে পারে এবং সে জানতে পারে যে , সে অন্যান্য মানুষের মতই সৃষ্ট মানুষ, তার সম্মান পাওয়া ও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের কাউকে যখন তার গোলামকে নির্যাতন ও প্রহার করতে এবং তাকে অপমান-অপদস্থ করতে দেখতেন, তখন তিনি তার প্রতিবাদ করতেন; সহীহ হাদিসের মধ্যে রয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আবূ মাস‘উদ রা. কর্তৃক তার গোলামকে প্রহার করতে দেখলেন, তারপর তিনি তাকে নিন্দা করে বললেন: « ﺍﻋﻠﻢ ﻳﺎ ﺃﺑﺎ ﻣﺴﻌﻮﺩ ﺃﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﺰ ﻭ ﺟﻞ ﺃﻗﺪﺭ ﻋﻠﻴﻚ ﻣﻦ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﻐﻼﻡ » . “হে আবূ মাস‘উদ! জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা এই গোলামের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নিতে তোমার উপর সর্বশক্তিমান।” আর যখন ইসলাম গোলাম খারাপ কাজ করলে তার মনিব কর্তৃক তাকে শিক্ষামূলক শাস্তি দেওয়ার বিষয়টিকে বৈধ করে দিয়েছে, তখন ইসলামের দৃষ্টিতে এই শাস্তির জন্য একটা নির্ধারিত সীমারেখা রয়েছে; সুতরাং মনিবের জন্য সেই সীমা অতিক্রম করা বৈধ হবে না; আর যখন সে তা লংঘন করবে, যেমন: মনিব কর্তৃক তার গালে চপোটাঘাত করা, অথবা তার শরীরের সংবেদনশীল কোনো স্থানে আঘাত করা … তখন এই সীমালংঘনটি দাসত্ব থেকে তার মুক্তির জন্য শরী‘য়ত সম্মত ও ন্যায়সঙ্গত কারণ হয়ে দাঁড়াবে। বায়হাকী র. কর্তৃক বর্ণিত হাদিসের মধ্যে আছে: « ﻛُﻨَّﺎ ﺑَﻨِﻲ ﻣُﻘَﺮِّﻥٍ ﻋَﻠَﻰ ﻋَﻬْﺪِ ﺭَﺳُﻮﻝِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻟَﻴْﺲَ ﻟَﻨَﺎ ﺧَﺎﺩِﻡٌ ﺇِﻟَّﺎ ﻭَﺍﺣِﺪَﺓٌ , ﻓَﻠَﻄَﻤَﻬَﺎ ﺃَﺣَﺪُﻧَﺎ , ﻓَﺒَﻠَﻎَ ﺫَﻟِﻚَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻲَّ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻓَﻘَﺎﻝَ: ﺃَﻋْﺘِﻘُﻮﻫَﺎ . ﻗَﺎﻟُﻮﺍ : ﻟَﻴْﺲَ ﻟَﻬُﻢْ ﺧَﺎﺩِﻡٌ ﻏَﻴْﺮُﻫَﺎ , ﻗَﺎﻝَ : ﻓَﻠْﻴَﺴْﺘَﺨْﺪِﻣُﻮﻫَﺎ , ﻓَﺈِﺫَﺍ ﺍﺳْﺘَﻐْﻨَﻮْﺍ ﻋَﻨْﻬَﺎ ﻓَﻠْﻴُﺨَﻠُّﻮﺍ ﺳَﺒِﻴﻠَﻬَﺎ » . “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে বনী মুকাররিন গোত্রের লোক ছিলাম, একজন দাসী ছাড়া আমাদের আর কোনো খাদেম ছিল না; সুতরাং ঐ দাসীকে আমাদের একজন চপোটাঘাত করল, তারপর এই বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পৌঁছলে তিনি বললেন: তোমরা তাকে মুক্ত করে দাও। তারা বললেন যে, সে ব্যতীত তাদের আর অন্য কোনো খাদেম নেই; তখন তিনি বললেন: (এই অবস্থায়) তারা যেন তার সেবা গ্রহণ করে; তারপর যখন তাদের নিকট তার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়, তখন তারা যেন তাকে মুক্ত করে দেয়।” আর ইমাম মুসলিম র. তাঁর সনদে শো‘বা র. থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি ফারাস র. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: « ﺳَﻤِﻌْﺖُ ﺫَﻛْﻮَﺍﻥَ ﻳُﺤَﺪِّﺙُ ﻋَﻦْ ﺯَﺍﺫَﺍﻥَ ﺃَﻥَّ ﺍﺑْﻦَ ﻋُﻤَﺮَ ﺩَﻋَﺎ ﺑِﻐُﻼَﻡٍ ﻟَﻪُ , ﻓَﺮَﺃَﻯ ﺑِﻈَﻬْﺮِﻩِ ﺃَﺛَﺮًﺍ , ﻓَﻘَﺎﻝَ ﻟَﻪُ : ﺃَﻭْﺟَﻌْﺘُﻚَ ؟ ﻗَﺎﻝَ : ﻻَ , ﻗَﺎﻝَ : ﻓَﺄَﻧْﺖَ ﻋَﺘِﻴﻖٌ . ﻗَﺎﻝَ : ﺛُﻢَّ ﺃَﺧَﺬَ ﺷَﻴْﺌًﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻷَﺭْﺽِ , ﻓَﻘَﺎﻝَ : ﻣَﺎ ﻟِﻰ ﻓِﻴﻪِ ﻣِﻦَ ﺍﻷَﺟْﺮِ ﻣَﺎ ﻳَﺰِﻥُ ﻫَﺬَﺍ ؛ ﺇِﻧِّﻰ ﺳَﻤِﻌْﺖُ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳَﻘُﻮﻝُ : ‏« ﻣَﻦْ ﺿَﺮَﺏَ ﻏُﻼَﻣًﺎ ﻟَﻪُ ﺣَﺪًّﺍ ﻟَﻢْ ﻳَﺄْﺗِﻪِ , ﺃَﻭْ ﻟَﻄَﻤَﻪُ ؛ ﻓَﺈِﻥَّ ﻛَﻔَّﺎﺭَﺗَﻪُ ﺃَﻥْ ﻳُﻌْﺘِﻘَﻪُ ». “আমি যাকওয়ান র. কে যাযান র. এর নিকট থেকে হাদিস বর্ণনা করতে শুনেছি যে, আবদুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহ ‘আনহু তাঁর এক গোলামকে ডাকালেন; এরপর তার পৃষ্ঠদেশে (প্রহারের) দাগ দেখতে পেলেন। অতঃপর তিনি তাকে বললেন: আমি কি তোমাকে ব্যথা দিয়েছি? সে বলল: না। তখন তিনি বললেন: তুমি মুক্ত। বর্ণনাকারী বললেন: অতঃপর তিনি মাটি থেকে কোনো বস্তু হাতে নিয়ে বললেন: তাকে আযাদ করার মধ্যে এতটুকু পুণ্যও মিলেনি। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “যে ব্যক্তি আপন গোলামকে বিনা অপরাধে প্রহার করল কিংবা চপোটাঘাত করল, তাহলে তার কাফ্ফারা হলো তাকে মুক্ত করে দেওয়া।” জেনে রাখুন, ইসলামের শরী‘য়ত তথা আইনকানুন দাস-দাসীর প্রতি সদয় হওয়ার নির্দেশ প্রদানে এবং তাকে সম্মান দান ও তার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য উৎসাহ প্রদানে কত মহান? আর তা কত উচ্চমানসম্পন্ন, যখন তা অত্যাচারীর (গোলামের উপর) সীমালংঘন করাটাকে দাসত্বের শৃঙ্খল ও গোলামীর জিল্লতি থেকে তার মুক্তির জন্য শরী‘য়ত সম্মত ও ন্যায়সঙ্গত কারণ বলে ঠিক করেছে? !! * * * এটাই হলো দাস-দাসীদের মুক্ত করার ব্যাপারে ইসলাম কর্তৃক প্রনীত মূলনীতির শ্রেষ্ঠত্ব ও অন্যতম বৈশিষ্ট্য …। আর অধিকাংশের মূল্যায়নে দেখা যায় যে, ইসলাম যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, তার মত করে গোটা বিশ্বের মধ্যে (প্রচলিত) সামাজিক শাসননীতিসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি শাসনতন্ত্রও পাওয়া যাবে না, যা ইতিবাচক ও বাস্তবসম্মত উপায়ে দাস-দাসী মুক্ত করার দিকে আহ্বান করে ! ! আমার পাঠক ভাই ! আপনি লক্ষ্য করেছেন যে, এই পদ্ধতির অন্যতম মূলনীতি হল: উৎসাহ বা অনুপ্রেরণার মাধ্যমে (গোলাম) আযাদ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা। তার আরেকটি মূলনীতি হল: গুনাহ ও ভুলত্রুটি থেকে মাফ পাওয়ার উদ্দেশ্যে (গোলাম) আযাদ করা। তার অপর আরেকটি মূলনীতি হল: গোলাম কর্তৃক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে মুক্ত হওয়ার জন্য তার মনিবের সাথে ঐক্যমতের ভিত্তিতে লিখিতভাবে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার দ্বারা মুক্তি লাভ করা। অন্যতম আরেকটি মূলনীতি হল: যাকাতের অর্থ ব্যয় করার মাধ্যমে এবং রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে (গোলাম) আযাদ করা। অপর আরেকটি মূলনীতি হল: স্বাধীন ব্যক্তির অধীনস্থ দাসী কর্তৃক সন্তান জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে মুক্তি লাভ করা। আরও একটি মূলনীতি হল: (মনিব কর্তৃক গোলামকে) প্রহার করা ও নির্যাতনমূলক সীমালংঘন করার কারণে (গোলাম) আযাদ করা। দাস-দাসীদেরকে মুক্ত করার ব্যাপারে যখন ইসলাম এসব মূলনীতি প্রণয়ন করে, তখন ইসলামী ভূ-খণ্ডের উপর একজন দাস-দাসীও কি অবশিষ্ট থাকবে বলে মনে হয়? আর আমরা যখন দাসত্ব প্রথাকে এমন একটি নদীর সাথে তুলনা করি, যার একটি দুর্বল উৎস রয়েছে এবং একই সময়ে এখানে সেখানে যার একাধিক শক্তিশালী প্রবল স্রোতসম্পন্ন মোহনা বা মুখ রয়েছে; সুতরাং কোনো মানুষ কি কল্পনা করতে পারে যে, সেই নদীর পানি থেকে এতটুকুন পানি অবশিষ্ট থাকবে? ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় দাসত্বের বিষয়টিও এমনই; কারণ, তারও একটি দুর্বল উৎস[36] রয়েছে; আর তা হলো শুধু যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস-দাসী বনানো, যখন ইমাম এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিবেন। আর (দাস-দাসী) মুক্ত করার স্রোতধারা অনকেগুলো এবং বহু রকমের, যার বর্ণনা ইতিপূর্বে অতিবাহিত হয়েছে। আর এসব স্রোতধারা, যেগুলো শরী‘য়ত সম্মত প্রবাহ সৃষ্টি করেছে, তার ফলে যুগ যুগ ধরে চূড়ান্তভাবে দাসত্ব প্রথার পরিসমাপ্তি ঘটেছে; আর তার উৎসস্থল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে এবং তার মোহনার সংখ্যাধিক্যের ফলে ইসলামী সমাজে তার কোনো চিহ্ন অবিশিষ্ট নেই …। আর এটাই আল্লাহর বিধান; সুতরাং আপনারা আমাকে দেখান তো, যারা তাঁকে বাদ দিয়ে নিয়মনীতি প্রণয়ন করেছে, (তাদের পরিণতি); কিন্তু যালিমগণ আল্লাহর আয়াতকে অস্বীকার করে ! ! * * * ইসলাম কেন দাসত্ব প্রথাকে চূড়ান্তভাবে বাতিল করেনি? পূর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, ইসলাম তথাকথিত দাসপ্রথার সকল উৎস আরব উপ-দ্বীপ ও অন্যান্য স্থানে একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে; আর তার দ্বারা সম্ভব ছিল সুস্পষ্ট বক্তব্যের মাধ্যমে দাসত্ব প্রথাকে চূড়ান্তভাবে বাতিল বলে ঘোষণা করা, যেমনিভাবে বাতিল করে দিয়েছে মাদকদ্রব্য, সুদ প্রথা ও যিনা-ব্যভিচারকে … যদি (দাসপ্রথার) একটি মূল উৎসস্থল (ঝর্ণা) না থাকত, তাহলে দাসত্ব প্রথা সকল স্থানেই ছড়িয়ে যেত এবং সকল জাতি ও রাষ্ট্র প্রত্যেক ফোটায় ফোটায় তার দ্বারা পরস্পর ব্যবসা-বাণিজ্য করত; সেই মূল উৎসস্থল (ঝর্ণা) হলো যুদ্ধের কারণে দাসত্ব … আর ইসলাম প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের কারণে দাসত্বের এই উৎসস্থলটিকে সুস্পষ্ট ও অকাট্য বক্তব্যের দ্বারা বাতিল করেনি অনেকগুলো দিক বিবেচনা করে; তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হল: ১. আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি; ২. রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি; ৩. আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি; ৪. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি; ৫. শর‘য়ী দৃষ্টিভঙ্গি। অচিরেই আমরা এই পাঁচটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রত্যেকটির ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা পেশ করব; আর আল্লাহর কাছেই সরল পথ: • আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি: আমরা পূর্বেই যখন দাসত্বের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনার উদ্যোগ নেই, তখন আলোচনা করেছি যে, ইসলামের আগমন ঘটেছে এমতাবস্থায় যে বিশ্বের সকল শাসন ব্যবস্থায় দাসত্ব প্রথা স্বীকৃত; বরং তা ছিল বহুল প্রচলিত অর্থনৈতিক মুদ্রাসদৃশ এবং গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রয়োজন … যা কেউ অপছন্দ করত না এবং তা পরিবর্তন করার সম্ভাব্যতার ব্যাপারে চিন্তা করা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। আর যে স্তরে এসে আজ দাসত্ব প্রথাকে বাতিল করা হলো, তার পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে কে জানে? সম্ভবত এমন একদিন আসবে, যেদিন দাস- দাসী বানানোর প্রথা বিশ্বে আবার ফিরে আসবে; বিশেষ করে যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানোর প্রথা— আর দাসত্ব হয়ে যাবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রথা, বহুল প্রচলিত একটি অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং সামাজিকভাবে খুব প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। সুতরাং উক্ত অবস্থায় এটা কোনোভাবেই বিবেকসম্মত হবে না যে, এর মোকাবিলায় ইসলাম হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। বরং অচিরেই ইসলামকেও অনুরূপ নীতিরর পুণঃপ্রচলন করতে হবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যা এই ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে দিবে অথবা বাতিল করে দিবে। আর এর জন্য অনেক দীর্ঘ ও লম্বা সময়ের প্রয়োজন হবে; আরও প্রয়োজন হবে জনগণ কর্তৃক ইসলামের প্রকৃত বাস্তবতা এবং সৃষ্টি, জীবন ও মানুষের … ব্যাপারে তার সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি ও দর্শন সম্পর্কে অনুধাবন করা; আরও জরুরি হলো দাস-দাসীগণ কর্তৃক মানবিক সম্মানের তাৎপর্য এবং মানবিক মর্যাদা ও সম্মানের অধিকার উপভোগ করা … যাতে তারা এই উপভোগ ও উপলব্ধির পরে অপমান ও অসম্মান থেকে তাদের স্বাধীনতা দাবি করতে পারে এবং তারা আরও দাবি করতে পারে গোলামী থেকে তাদের মুক্তির …। বস্তুত বিংশ শতাব্দীতে দাসত্ব অন্য আরেক রং বা রূপ ধারণ করেছে, যার বিবরণ অচিরেই আসছে; সুতরাং (বর্তমানে) দাসত্ব মানে ভূখণ্ডের মলিকানা গ্রহণ, যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানো এবং প্রভাবশালীগণ কর্তৃক দুর্বল শ্রেণীর লোকদেরকে গোলাম বানানো … থেকে পরিবর্তন হয়ে গোটা জনগোষ্ঠীকে দাস- দাসী বানানোর দিকে পরিবর্তিত হয়েছে বলে বুঝায় … যেমনটি বিদ্বেষী উপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলো এবং নাস্তিক্যবাদী সমাজতান্ত্রিক সকরকারগুলো করছে … কারণ, তারা জনগণের মধ্যে ব্যাপক হৃদয়বিদারক ধ্বংসযজ্ঞ পরিচালনা করে, অতঃপর তারা তাদের ইচ্ছা- আকাঙ্খাকে হরণ করে এবং তাদেরকে তাদের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে; আর তাদেরকে আগ্নেয়াস্ত্রের শক্তির বলে শাসন করে … ফলে তারা কোনো মাথাকে উঁচু হয়ে দাঁড়ানোর এবং কোনো কণ্ঠকে কথা বলার সুযোগ দেয় না … আর এসব জনগোষ্ঠীর নিকট যে সম্পদরাশি আছে এবং তারা কর্মক্ষেত্রে ও অর্থনীতির ময়দানে যে শ্রম বিনোয়াগ করে … সেসব কিছু উপনিবেশবাদী অথবা সমাজতান্ত্রিক স্বৈরাচার সরকারগণের নিকট সমর্পন করা আবশ্যক হয়ে পড়ে … যাতে জাতিসমূহকে দাস- দাসী বানানো, জনগোষ্ঠীকে বশীভূত করা, স্বাধীনতাকে অপদস্থ করা এবং মানবিক সম্মান ও মর্যাদাকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে তারা তা ব্যয় করতে পারে। আর এই অবস্থায় অসম্ভব নয় যে, উপনিবেশিক শাসকবর্গ অথবা সমাজতান্ত্রিক শাসকগণ তাদের দাসত্ব প্রথা চাপিয়ে দিবে ব্যক্তি, অথবা পরিবার, অথবা গ্রাম, অথবা কোনো পুরো জাতি বা গোষ্ঠীর উপর… যাতে সকলকে আধুনিক দাস-দাসীর হাটে সম্পদ বা স্বার্থের বিনিময়ে ক্রয়- বিক্রয় করতে পারে … তাদেরকে বশীভূত ও গোলামে পরিণত করার জন্য !! এ কারণেই ইসলাম অকাট্য ‘নস’ তথা বক্তব্যের মাধ্যমে দাসত্ব প্রথাকে চূড়ান্তভাবে বাতিল করেনি[37]। • রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি: আর আমরা পূর্বে এটাও আলোচনা করেছি যে, ইসলাম মুসলিমদের ইমাম তথা নেতাকে যুদ্ধবন্দীদের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে অনুকম্পা প্রদর্শন, অথবা মুক্তিপণ গ্রহণ, অথবা হত্যা করা, অথবা দাস- দাসী বানানো ইত্যাদি বাছাইয়ের ব্যাপারে নিঃশর্ত ক্ষমতা প্রদান করেছে। আর কোনো সন্দেহ নেই যে, ইমাম যখন কোনো বিষয়ে প্রকৃত হিকমত ও কল্যাণ লক্ষ্য করবেন এবং যখন গভীর ও ব্যাপক রাজনৈতিক সংকট লক্ষ্য করবেন, তখন তিনি যুদ্ধবন্দীদের সাথে সে অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যশীল মূলনীতির উপর ভিত্তি করে আচার-আচরণ ও লেনদেন করবেন … কারণ তাকে তো শেষ পর্যন্ত একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান ও গ্রহণযোগ্য স্বার্থকেই গ্রহণ করে নিতে হবে। সুতরাং তিনি যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার- ব্যবহারের ক্ষেত্রে হত্যা করার নীতি অবলম্বন করা থেকে দূরে সরে যাবেন না, যখন তিনি মুসলিমদেরকে নড়বড়ে ও দুর্বল … অবস্থার মধ্যে দেখবেন; আর তিনি যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার- ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুকম্পা প্রদর্শন অথবা মুক্তিপণ গ্রহণ করার নীতি অবলম্বন করা থেকে দূরে সরে যাবেন না, যখন তিনি মুসলিমদেরকে সুসংগঠিত ও শক্তিশালী … অবস্থার মধ্যে দেখবেন; আর তিনি যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার- ব্যবহারের ক্ষেত্রে দাস- দাসী বানানোর নীতি অবলম্বন করা থেকে দূরে সরে যাবেন না, যখন তিনি শত্রুদেরকে দেখবেন তারা আমাদের যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী হিসেবে গ্রহণ করছে, যাতে পরস্পরের আচরণ সমান সমান হয়। এভাবেই ইমাম রাজনৈতিক কল্যাণ, যুদ্ধ কেন্দ্রীক আবশ্যকতা ও অর্থনৈতিক প্রয়োজন লক্ষ্য করে তাঁর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। সুতরাং কিভাবে ইসলাম সুস্পষ্ট ও অকাট্য ‘নস’ তথা বক্তব্যের মাধ্যমে দাসত্ব প্রথাকে বাতিল করবে, অথচ শত্রুদের পক্ষ থেকে যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানোর বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা রয়েছে; আর এই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন প্রায় আসন্ন হয়ে পড়েছে! ! • আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি: অনুরূপভাবে আমরা পূর্ববর্তী আলোচনায় বর্ণনা করেছি যে, ইসলাম যখন দাস-দাসীর সাথে সদ্ব্যবহার এবং তার চারিত্রিক, সামাজিক ও মানবিক মর্যাদাকে সমুন্নত রাখার ব্যাপারে পরিপূর্ণ নিয়মকানুন প্রণয়ন করেছে … তখন এর পিছনে উদ্দেশ্য ছিল, দাস- দাসী কর্তৃক তার মানবিক মার্যাদা, অস্তিত্ব ও অবস্থান উপলব্ধি করা … যাতে সে পরবর্তীতে দাসত্ব থেকে তার মুক্তি দাবি করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে। আর আমরা পূর্বে এটাও দেখিয়েছি যে, ইসলাম বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা থেকে দাস- দাসীকে মুক্ত করার পূর্বে তাকে তার মনের ভিতর ও হৃদয়ের গভীর থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করেছে … যাতে সে তার অস্তিত্ব ও মান-সম্মানকে অনুভব করতে পারে; ফলে সে নিজে নিজেই স্বাধীনতা দাবি করবে এবং সে যখন তা দাবি করবে, তখন সে শরী‘য়তকে এই স্বাধীনতার জন্য সর্বোত্তম নিশ্চয়তা বিধানকারী এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সর্বোত্তম অভিভাবক হিসেবে পাবে; আর এটা আমরা ‘মুকাতাবা’ তথা লিখিত চুক্তির মাধ্যমে গোলাম আযাদ করার প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আর আদেশ বা ফরমান জারি করার মাধ্যমে দাস-দাসী মুক্ত করার দ্বারা আসলেই দাস-দাসীর মুক্তি অর্জিত হয়নি, যেমন তার আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে; আর আমরা যা বলি, তার পক্ষে উৎকৃষ্ট প্রমাণ হলো ‘আব্রাহাম লিংকন’ এর হাতের কলমের নির্দেশ (লেখার) দ্বারা দাস- দাসী মুক্ত করে দেওয়ার ব্যাপারে আমেরিকান অভিজ্ঞতা; কারণ, বাহ্যিকভাবে আইনের দ্বারা লিংকন যেসব গোলামদেরকে মুক্ত করে দিয়েছিল, তারা স্বাধীন হতে পারেনি বরং তারা তাদের মনিবদের কাছেই ফিরে গেছে, তারা তাদের নিকট আশা করে যে, তারা তাদেরকে গোলাম হিসেবে পুনরায় গ্রহণ করে নেবে, যেমন তারা (গোলাম হিসেবে) ছিল; কারণ, (স্বাধীন করে দেওয়ার পরেও) তারা মন স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি এবং পারেনি তারা তাদের অপ্রত্যাশিত মুক্তি পাওয়ার দ্বারা মানবিক সুখ ও মর্যাদা অনুভব করতে …। অন্যদিকে ইসলামের নীতি ও অপরাপর সামাজিক শাসন ব্যবস্থাসমূহে দাস- দাসী নীতির রয়েছে বিস্তর ফারাক। কারণ, ইসলাম দাসত্বের ছায়ায় দাস- দাসীর সাথে মানবিক ও উদার আচরণ করে থাকে (যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে), এমন কি সে যখন এই সদ্ব্যবহার (যথাযথভাবে) উপভোগ ও উপলব্ধি করে, তখন সে শরী‘য়তের ছায়াতলে তার স্বাধীনতা দাবি করে এবং তার গোলামীর অবস্থা থেকে সে বেরিয়ে যায়; আর তখন সে হয় সম্মানিত মানুষ, সর্বোচ্চ আবেগ ও অনুভূতিসম্পন্ন ব্যক্তি এবং সর্বোত্তম সম্মান, মর্যাদা ও অস্তিত্বসম্পন্ন ব্যক্তি …। আর এখানেই ইসলাম কর্তৃক দাস- দাসীকে দাসত্বের উপর অবশিষ্ট রাখার তাৎপর্য স্পষ্ট হয়ে উঠে, যেখানে সে তার নিজস্ব সত্ত্বা ও অস্তিত্বকে অনুভব ও উপলব্ধি করবে; আর তখনই সে তার ইচ্ছামত সময় ও যথাযথ পরিবেশ-পরিস্থিতির মধ্যে ‘মুকাতাবা’ (লিখিত চুক্তি) পদ্ধতির মাধ্যমে তার স্বাধীনতা দাবি করবে !! এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই ইসলাম কোনো স্পষ্ট ফরমান জারি ও অকাট্য ‘নস’ তথা বক্তব্যের মাধ্যমে দাসত্ব প্রথাকে চূড়ান্তভাবে বাতিল করেনি। • সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: কখনও কখনও দাসত্ব প্রথা বিদ্যমান থাকার মধ্যে বড় ধরনের সামাজিক কল্যাণ নিহিত থাকে, যেমন: তার (দাসত্ব প্রথার) উপস্থিতি জাতিগত বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্যবাদ ও অবক্ষয়ের প্রবাহ থেকে সমাজকে পবিত্র রাখার ব্যাপারে ভূমিকা রাখে … সুতরাং উদাহরণস্বরূপ যে ব্যক্তি অতিরিক্ত মোহরের কারণে কোনো স্বাধীন নারীকে বিয়ে করতে অক্ষম হয়, তখন সে কোনো দাসীকে বিয়ে করবে অথবা ক্রয় সূত্রে তার মালিক হবে, যাতে সে বৈধ উপায়ে তার স্বভাগত চাহিদা পূরণ করতে পারে এবং বৈধ মালিকানার মাধ্যমে সে নিজেকে পাপমুক্ত রাখতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﻣَﻦ ﻟَّﻢۡ ﻳَﺴۡﺘَﻄِﻊۡ ﻣِﻨﻜُﻢۡ ﻃَﻮۡﻟًﺎ ﺃَﻥ ﻳَﻨﻜِﺢَ ﭐﻟۡﻤُﺤۡﺼَﻨَٰﺖِ ﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖِ ﻓَﻤِﻦ ﻣَّﺎ ﻣَﻠَﻜَﺖۡ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨُﻜُﻢ ﻣِّﻦ ﻓَﺘَﻴَٰﺘِﻜُﻢُ ﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨَٰﺖِۚ ﻭَﭐﻟﻠَّﻪُ ﺃَﻋۡﻠَﻢُ ﺑِﺈِﻳﻤَٰﻨِﻜُﻢۚ ﺑَﻌۡﻀُﻜُﻢ ﻣِّﻦۢ ﺑَﻌۡﺾٖۚ ﻓَﭑﻧﻜِﺤُﻮﻫُﻦَّ ﺑِﺈِﺫۡﻥِ ﺃَﻫۡﻠِﻬِﻦَّ ﻭَﺀَﺍﺗُﻮﻫُﻦَّ ﺃُﺟُﻮﺭَﻫُﻦَّ ﺑِﭑﻟۡﻤَﻌۡﺮُﻭﻑِ ﻣُﺤۡﺼَﻨَٰﺖٍ ﻏَﻴۡﺮَ ﻣُﺴَٰﻔِﺤَٰﺖٖ ﻭَﻟَﺎ ﻣُﺘَّﺨِﺬَٰﺕِ ﺃَﺧۡﺪَﺍﻥٖۚ ﻓَﺈِﺫَﺍٓ ﺃُﺣۡﺼِﻦَّ ﻓَﺈِﻥۡ ﺃَﺗَﻴۡﻦَ ﺑِﻔَٰﺤِﺸَﺔٖ ﻓَﻌَﻠَﻴۡﻬِﻦَّ ﻧِﺼۡﻒُ ﻣَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﭐﻟۡﻤُﺤۡﺼَﻨَٰﺖِ ﻣِﻦَ ﭐﻟۡﻌَﺬَﺍﺏِۚ ﺫَٰﻟِﻚَ ﻟِﻤَﻦۡ ﺧَﺸِﻲَ ﭐﻟۡﻌَﻨَﺖَ ﻣِﻨﻜُﻢۡۚ ﻭَﺃَﻥ ﺗَﺼۡﺒِﺮُﻭﺍْ ﺧَﻴۡﺮٞ ﻟَّﻜُﻢۡۗ ﻭَﭐﻟﻠَّﻪُ ﻏَﻔُﻮﺭٞ ﺭَّﺣِﻴﻢٞ ٢٥ ﻳُﺮِﻳﺪُ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﻟِﻴُﺒَﻴِّﻦَ ﻟَﻜُﻢۡ ﻭَﻳَﻬۡﺪِﻳَﻜُﻢۡ ﺳُﻨَﻦَ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻣِﻦ ﻗَﺒۡﻠِﻜُﻢۡ ﻭَﻳَﺘُﻮﺏَ ﻋَﻠَﻴۡﻜُﻢۡۗ ﻭَﭐﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠِﻴﻢٌ ﺣَﻜِﻴﻢٞ ٢٦ ﻭَﭐﻟﻠَّﻪُ ﻳُﺮِﻳﺪُ ﺃَﻥ ﻳَﺘُﻮﺏَ ﻋَﻠَﻴۡﻜُﻢۡ ﻭَﻳُﺮِﻳﺪُ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳَﺘَّﺒِﻌُﻮﻥَ ﭐﻟﺸَّﻬَﻮَٰﺕِ ﺃَﻥ ﺗَﻤِﻴﻠُﻮﺍْ ﻣَﻴۡﻠًﺎ ﻋَﻈِﻴﻤٗﺎ ٢٧ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ: ٢٥، ٢٧ ] “আর তোমাদের মধ্যে কারো মুক্ত ঈমানদার নারী বিয়ের সামর্থ্য না থাকলে তোমরা তোমাদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার দাসী বিয়ে করবে; আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্পর্কে পরিজ্ঞাত। তোমরা একে অপরের সমান; কাজেই তোমরা তাদেরকে বিয়ে করবে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে এবং তাদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দেবে ন্যায়সংগতভাবে। তারা হবে সচ্চরিত্রা, ব্যভিচারিণী নয় ও উপপতি গ্রহণকারিণীও নয়। অতঃপর বিবাহিতা হওয়ার পর যদি তারা ব্যভিচার করে, তবে তাদের শাস্তি মুক্ত নারীর অর্ধেক; তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারকে ভয় করে এগুলো তাদের জন্য; আর ধৈর্য ধারণ করা তোমাদের জন্য মংগল। আল্লাহ ক্ষমাপরায়ণ, পরম দয়ালু। আল্লাহ ইচ্ছে করেন তোমাদের কাছে বিশদভাবে বিবৃত করতে, তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতি তোমাদেরকে অবহিত করতে এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করতে। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করতে চান। আর যারা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তারা চায় যে, তোমরা ভীষণভাবে পথচ্যুত হও।”[38] আর জনকল্যাণকর অনেক কাজ রয়েছে, যাতে সমাজ পর্দাবিহীন নারীদের প্রয়োজন অনুভব করে; আর দাসীরাই হলো এই শ্রেণী; কেননা, ইসলাম দাসীর উপর স্বাধীন নারীর মত পরিপূর্ণভাবে পর্দা করাকে ফরয করেনি; বরং শরী‘য়তের দৃষ্টিতে তার বুক থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রাখাই যথেষ্ট, তবে তার ব্যাপারে যখন আশঙ্কা করা হবে, তখন (পাপের) উপলক্ষ বন্ধ করার জন্য পরিপূর্ণ পর্দা করা আবশ্যক হয়ে যাবে। আর কখনও কখনও যুদ্ধের মাধ্যমে প্রাপ্ত নারীকে দাসী বানানো তার পবিত্রতা রক্ষা, অভিভাবকত্ব এবং তার মানবিক সম্মান রক্ষার জন্য একটা সফল প্রতিষেধক বিবেচিত হতে পারে; কারণ, যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর যে ব্যক্তি তার দায়ভার গ্রহণ করবে, সে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার সাথে তার স্বামী অথবা তার ভাইয়ের মত আচরণ করবে; অথচ তাকে ছেড়ে দেওয়ার মানেই হলো তাকে নিশ্চিত ধ্বংস ও ক্ষতির দিকে ঠেলে দেওয়া। আর এটা জানা কথা যে, ইসলামী শাসন ব্যবস্থার ছায়াতলে নারীকে দাসী বানানোর মানে হলো তাকে তার মনিবের জন্য শুধু মালিকানা সাব্যস্ত করে দেওয়া, সে ব্যতীত অন্য কেউ তাকে ভোগ করতে পারবে না; আর ইসলাম ‘মুকাতাবা’ পদ্ধতির মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করার বিষয়টিকে তার অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছে এবং অনুরূপভাবে সে তার মনিবের মৃত্যুর পর সরাসরি স্বাধীন হয়ে যাবে, যখন সে তার মনিবের জন্য কোনো সন্তানের জন্ম দিবে; তাছাড়া সে তার মনিবের ঘরে ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে সার্বিক তত্ত্ববধান, আদর-যত্ন ও উত্তম ব্যবহার … পাবে। পক্ষান্তরে অমুসলিম রাষ্ট্রে তাকে দাসী হিসেবে গ্রহণ করার উদ্দেশ্য হলো তার ইজ্জত নষ্ট করা এবং তার মান- মর্যাদাকে অবজ্ঞা করা, বরং তার ইজ্জত- আব্রু প্রত্যেক আকাঙ্খীর ব্যভিচারের মাধ্যমে লুণ্ঠিত হওয়া। তাছাড়াও সে অসদাচরণ ও প্রকাশ্য অনুভবযোগ্য অপমান-অপদস্থের শিকার হয় ! … অতএব দাস-দাসী বানানোটা কখনও কখনও সামাজিকভাবে কল্যাণকর হবে, আবার কখনও নৈতিকতার দিক বিবেচনায় হবে এবং কখনও মানবিক অনুকম্পার বাস্তবায়নার্থে দায়িত্ব গ্রহণের ফায়দা দিবে … যা সচেতন আলেমগণ ব্যতীত অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারবে না … এই দিক বিবেচনা করেই ইসলাম কোনো স্পষ্ট ফরমান জারি ও অকাট্য ‘নস’ তথা বক্তব্যের মাধ্যমে দাসত্ব প্রথাকে চূড়ান্তভাবে বাতিল করেনি। * * * • শর‘য়ী দৃষ্টিভঙ্গি: প্রত্যেক বিবেকবান ও বুদ্ধিমান ব্যক্তির নিকট এ কথা পরিষ্কার যে, ইসলামের শাসন ব্যবস্থায় দাসত্বের ব্যাপারটি এক লাফেই সমাধান হয়নি; আর তাকে নিষিদ্ধ করে আসমান থেকে কোনো অকাট্য বক্তব্যও অবতীর্ণ হয়নি … বরং তার সমাধান হয় ক্রমান্নয়ে শর‘য়ী বিধানের মাধ্যমে এবং সময়ের বিবর্তনে, যা শেষ পর্যায়ে কোনো প্রকার গণ্ডগোলের উস্কানি অথবা সঙ্কট ছাড়াই বাতিল হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। কিভাবে এটা সম্ভব হলো? আমরা পূর্বেই যখন দাসত্ব প্রথা বাতিল না করার ব্যাপারে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনার উদ্যোগ গ্রহণ করি তখন আলোচনা করেছি যে, ইসলামের আগমন ঘটেছে এমতাবস্থায় যে বিশ্বের সকল শাসন ব্যবস্থায় দাসত্ব প্রথা স্বীকৃত; বরং তা ছিল অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং সামাজিকভাবে খুব জরুরি ও প্রয়োজনীয় … আর আমরা দেখিয়েছিলাম যে, এই ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করা অথবা বিলুপ্ত করে দেওয়া খুব সহজ কাজ নয়; বরং তার জন্য প্রয়োজন সাধারণ ক্রমধারা অবলম্বন এবং দীর্ঘ সময় …। এই ক্রমধারা কেমন ছিল? ১. পূর্বে আলোচনা হয়েছে যে, ইসলাম বিশ্বের দেশে দেশে দাসত্বের একটি উৎস ছাড়া বাকি সকল উৎসকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে; আর সে একটি উৎস হলো যুদ্ধবন্দীদের দাসত্ব। – (ইসলাম) যুদ্ধে দাস-দাসী বানানো ও জনগোষ্ঠীর রক্ত শোষণ করার লোভে দাস-দাসী বানানোর ধারা বন্ধ করে দিয়েছে। – দরিদ্রতা অথবা ঋণ পরিশোধ করতে না পারার অজুহাতে দাস- দাসী বানানোর ধারাও বন্ধ করে দিয়েছে। – একটা নির্দিষ্ট জাতি ও প্রকৃতির লোকজনের মধ্যে জন্মগত উত্তরাধিকারের কারণে দাস- দাসী বানানোর ধারাও বন্ধ করে দিয়েছে। – অভিজাত ও অহঙ্কারী শ্রেণীর লোকজনের প্রতি দুর্ব্যবহার করার কারণে দাস-দাসী বানানোর ধারাও বন্ধ করে দিয়েছে। ইত্যাদি ধরনের দাস-দাসী বানানোর উৎস ও ধারাগুলো ইসলাম বন্ধ করে দিয়েছে, যা ছিল বিশ্বের মধ্যে প্রভাব বিস্তারকারী। ২. ইসলাম শর্ত করে দিয়েছে যে, ঐ যুদ্ধটি শরী‘য়তসম্মত যুদ্ধ হতে হবে, যা যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানোর দিকে নিয়ে যায়; পূর্বে আমরা এসব শরী‘য়তসম্মত যুদ্ধের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করেছি, যেসব যুদ্ধ যুদ্ধবন্দীকে দাস-দাসী বানানোর জন্য ন্যায়সঙ্গত ও যথাযথ। ৩. যুদ্ধের ভার (অস্ত্র) নামিয়ে ফেলার পর যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলাম ইমাম বা সেনাপতিকে ব্যাপক ক্ষমতা দান করেছে, তিনি যা কল্যাণকর মনে করবেন তাই করতে পারবেন; বরং ইসলাম তাকে (যুদ্ধবন্দীদের ক্ষেত্রে) অনুকম্পা প্রদর্শন অথবা মুক্তিপণ গ্রহণ অথবা হত্যা করা অথবা দাস- দাসী বনানোর ব্যাপারে স্বাধীনতা দিয়েছে ! সুতরাং তিনি যদি রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানো থেকে বিরত থাকবেন বলে মনে করেন, তবে তিনি তাই করবেন, যেমনটি করেছেন সুলতান মুহাম্মদ আল- ফাতেহ। ৪. দাসত্ব বিদ্যমান থাকা অবস্থায়ও ইসলাম দাস-দাসী মুক্ত করার মোহনাসমূহ খুলে দিয়েছে, যা সেই প্রথাটিকে বিলুপ্ত করার দায়িত্ব পালন করে একটি সময় কালের মধ্যে, যে সময়টি কখনও দীর্ঘ হয় অথবা কখনও সংক্ষিপ্ত হয়। আর আমরা পরিপূর্ণ পদ্ধতি পূর্বে আলোচনা করেছি অথবা এমন বর্ণনা পেশ করেছি, যা ইসলামী শরী‘য়তের ছায়াতলে দাস- দাসী মুক্ত করার ব্যাপারে অনেক মোহনার (ধারার) কথা স্পষ্ট করেছে। আর এর ফলে মানব সমাজে দাসত্ব প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল; আর ইসলাম দাস-দাসী মুক্ত করার পদ্ধতি প্রণয়নে রাষ্ট্রসমূহের জন্য একটি আদর্শ নমুনা পেশ করেছে, বরং তাকে মুক্ত করার ব্যাপারে সাত শতাব্দী পূর্বেই জাতিসমূকে পিছনে ফেলে দিয়েছে !! সারকথা: ইসলাম দাসত্ব প্রথাকে এক লাফেই অকাট্য ‘নস’ বা বক্তব্যের মাধ্যমে নিষেধ করে দেয়নি; বরং তার উৎস বা ধারাসমূহ বন্ধ করার মাধ্যমে তার চারপশের বেষ্টন সংকীর্ণ করে এনেছে এবং তা থেকে মুক্ত করার জন্য অনেক মোহনা খুলে দিয়েছে; অতঃপর ভবিষ্যতে তা শেষ করে দেওয়া বা বলবৎ রাখার লাগামটি ইমামের হাতে তুলে দিয়েছে, তিনি সমান আচরণ নীতি অথবা রাষ্ট্রীয় সন্ধি-চুক্তির ভিত্তিতে নির্দেশনা প্রদান করবেন … শরী‘য়ত তার জন্য যতটুকু ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে, তিনি তার আলোকে যা কল্যাণকর মনে করবেন, তাই তিনি (বাস্তবায়ন) করবেন। বস্তুত: দাসত্বের বিষয়টি বিলুপ্ত করার ক্ষেত্রে এই ক্রমধারা অবলম্বন বিবিধ সমস্যা সমাধান ও বিভিন্ন বিষয়ের প্রতিবিধান করার ক্ষেত্রে ইসলামী শরী‘য়তের মহত্বই প্রকাশিত হয়; আর এ ক্রমধারা অবলম্বনের মাধ্যমে সময় ও কালের প্রসারতায় ইসলামের বৈশিষ্ট্যাবলী, ব্যাপকতা ও আন্তর্জাতিকতার ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত দীনের বৈশিষ্ট্যসমূহ খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে!! সুতরাং তারা এর পর আর কোন্ কথায় ঈমান আনবে? * * * হে আমার পাঠক ভাই! এই বর্ণনা ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরার পর আপনি বুঝতে পেরেছেন যে, ইসলাম যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস-দাসী বানানোর ধারাকে বাতিল করেনি আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত, সামাজিক ও শরী‘য়তের বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে। আর এসব দৃষ্টিভঙ্গি তাগিদ করে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা মানবতার জন্য শাসনব্যবস্থা ও বিধিবিধান প্রবর্তন করেছেন, তিনি ব্যক্তির বাস্তব অবস্থা, সমাজের ক্রমবিকাশ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, শরী‘য়তের তাৎপর্য এবং জাতিসমূহের অবস্থাদি … সম্পর্কে খুব ভালভাবেই জ্ঞাত; আর তিনি সে অবস্থা সম্পর্কেও জানেন, যখন সমকালীন অবস্থা কিংবা তাৎক্ষণিক কোনো প্রয়োজন বা চাহিদার দোহাই দিয়ে সে এই ব্যবস্থাকে বাতিল করা কিংবা পরিবর্তন করার দাবী উঠবে!! সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা যদি জানতেন যে, মদপান হারাম করার ব্যাপারে একবারে বিধান জারি করলেই তা বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে, তাহলে তিনি তা হারাম করতে কয়েক বছর সময় নিতেন না; আর তিনি যদি জানতেন যে, দাসত্ব প্রথা বাতিল করার মাধ্যমে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে শেষ করে দেওয়ার জন্য একটা নির্দেশ জারি করলেই যথেষ্ট হয়ে যেত, তাহলে তিনি এই প্রথাকে শেষ করার ক্ষেত্রে সেখানে থেমে থাকতেন না !! কিন্তু আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জান না। আল-কুরআনের ভাষায়: ﴿ ﺃَﻟَﺎ ﻳَﻌۡﻠَﻢُ ﻣَﻦۡ ﺧَﻠَﻖَ ﻭَﻫُﻮَ ﭐﻟﻠَّﻄِﻴﻒُ ﭐﻟۡﺨَﺒِﻴﺮُ ١٤ ﴾ ‏[ﺍﻟﻤﻠﻚ : ١٤ ] “যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।”[39] * * * আজকের বিশ্বে দাসত্ব প্রথা আছে কি? এই কথা সত্য যে, ফ্রান্স বিপ্লব ইউরোপে দাসত্ব প্রথা উচ্ছেদে করেছে, আর ‘আব্রাহাম লিংকন’ আমেরিকাতে দাসত্ব প্রথা বাতিল করেছে; অতঃপর এটা এবং ওটার পরে বিশ্ব দাসত্ব প্রথা বাতিল করার ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে !! এ সবই অর্জন হয়েছে সত্য, কিন্তু আমাদের জন্য উচিৎ হলো নাম দ্বারা প্রতারিত না হওয়া এবং শ্লোগান দ্বারা ধোঁকা না খাওয়া … আর যদি তা না হয়, তাহলে যে দাসত্বকে বাতিল করা হয়েছে তা কোথায়? আর আজকাল বিশ্বের সকল প্রান্তে যা ঘটছে, আমরা তার কী নাম রাখতে পারি? আর ইসলামী মরক্কোতে ফ্রান্স যা করছে, তার নাম কী? আর কালোদের সাথে আমেরিকানরা যে আচরণ করছে, দক্ষিন আফ্রিকার ভিন্ন বর্ণের লোকদের সাথে বৃটেন যা করছে তার নাম কী হবে? আর রাশিয়া তার শাসনাধীন ইসলামী দেশসমূহে যা করছে, তার নামই বা কী হবে? দাসত্বের প্রকৃত অর্থ কি এক সম্প্রদায়কে অপর সম্প্রদায়ের অধীন করে দেওয়া এবং মানুষের এক দল কর্তৃক অপর দলকে বৈধ অধিকার থেকে বঞ্চিত করার নাম নয়? যেমনটি প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুব বলেছেন; নাকি তা এটা ছাড়া অন্য কোনো কিছুর নাম? আর এটা যদি হয় দাসত্বের নামে অথবা স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব ও সমতার নামে, তাহলে তার অর্থ কি হবে? আর চকচকে নাম দিয়ে কি লাভ হবে, যখন বাস্তবতার আড়ালে থাকে নিকৃষ্ট বিষয়, যা মানবতা উপলব্ধি করেছে দীর্ঘ ইতিহাসের বাস্তবতা থেকে? ইসলাম তার নিজের সাথে ও জনগণের সাথে খুবই স্পষ্ট, সুতরাং সে বলে: এটা দাসত্ব এবং তার একমাত্র কারণ এই রকম, আর তার থেকে মুক্তি লাভের পথ উন্মুক্ত এবং তা শেষ করে ফেলার পথও বর্তমান থাকবে, যখন তার প্রয়াজন হবে। আজকের দিনে আমরা যে নকল সভ্যতার কোলে বসবাস করছি, তার মধ্যে আপনি এ স্পষ্টতা পাবেন না; এ নকল সভ্যতা বাস্তব বিষয়কে জাল বলে ঘোষণা করার ব্যাপারে এবং (প্রকৃত অবস্থা গোপন করার জন্য) ঝকঝকে তকতকে বড় বড় শ্লোগানই শুধু প্রয়োগ করতে সক্ষম!! সুতরাং তিউনেশিয়া, আলজিরিয়া ও মরক্কোর মধ্যে লক্ষ মানুষের (মুসলিমের) নিহত হওয়া … এর পিছনে কোনো কারণ ছিল না, বরং তারা শুধু স্বাধীনতা ও মানিবক মর্যাদা ও মূল্যবোধ দাবি করেছিল !! আর আফ্রিকাতে নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য লক্ষ মানুষের নিহত হওয়া, তাদের লক্ষ্য ছিল, তারা যাতে তাদের দেশে মাথা উঁচু করে সম্মানের সাথে বসবাস করতে পারে, তাদের নিজস্ব আকিদার প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারে, কথা বলতে পারে তাদের নিজস্ব ভাষায় এবং তারা তাদের নিজেদের সেবা-যত্ন নিজেরা করতে পারে !! আর রাশিয়াতে লক্ষ মুসলিমের নিহত হওয়া, তার কারণ ছিল, তারা রাশিয়ার নাস্তিক্যবাদী আকিদা বা মতবাদ এবং তার মার্কসবাদী সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে পারেনি … ঐসব নির্দোষ মুসলিমদেরকে হত্যা করা হয়েছে, তাদেরকে খাদ্য ও পানি না দিয়ে নোংরা কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে, তাদের মান- সম্মানকে বিনষ্ট করা হয়েছে এবং তাদের নারীদের উপর চড়াও হয়েছে, তাদেরকে উলঙ্গ অবস্থায় হত্যা করা হয়েছে এবং তাদের পেটকে চিড়ে ফেলা হয়েছে তাদের গর্ভস্থ ভ্রূণের শ্রেণী বিন্যাসে বাজি ধরার জন্য ! ! বিংশ শতাব্দীতে এটাকেই তারা স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব ও সমতা … ইত্যাদি নকল শ্লোগানের ছত্রছায়ায় সভ্যতা ও নগরায়ণ বলে নামকরণ করে; আর আমরা তাকে এক অভিনব কায়দার গোলামী, নির্যাতন ও দাস- দাসী বানানো বলে অবহিত করি। ইসলাম দাস-দাসীর জন্য স্বেচ্ছায় তার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য সম্মান প্রদানস্বরূপ তার সকল অবস্থায় তেরশ বছর পূর্বে সম্মানজনক ও দৃষ্টান্তমূলক আচার- ব্যবহার উপহার দিয়েছে … আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের দৃষ্টিতে এর নাম হচ্ছে পশ্চাৎপদতা, অধপতন ও বোকামি। – যখন আমেরিকাবাসী কর্তৃক তাদের হোটেল ও ক্লাবসমূহের সামনে প্লাকার্ড (placard) স্থাপন করেছে, যা বলে: “ শুধু শ্বেতাঙ্গদের জন্য ”, অথবা আরও নির্লজ্জতা ও নিকৃষ্টতার সুরে বলে: “ কৃষ্ণাঙ্গ ও কুকুরের প্রবেশ নিষেধ ”। – যখন সাদা রঙের একদল মানুষ ভিন্ন রঙের এক ব্যক্তির উপর অতর্কিত আক্রমন করে তাকে তাদের জুতা দ্বারা আঘাত করতে থাকে, শেষ পর্যন্ত সে প্রাণ হারায়, অথচ পুলিশ লোকটি দাঁড়িয়ে থাকে, কোনো নড়াচড়া করে না এবং কোনো হস্তক্ষেপ করে না; আর সেই পুলিশ দেশ, দীন-ধর্ম ও ভাষা … সম্পর্কিত তার ভাইয়ের সহযোগিতার জন্য গুরুত্ব প্রদান করে না, আর এর প্রত্যেকটির পিছনে কারণ হল- সে ভাইটি (তার ভিন্ন) বর্ণযুক্ত; সে (পুলিশ) স্পর্ধা দেখায় এবং সে নির্লজ্জভাবে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের পক্ষ অবলম্বন করে … আর এটা বিংশ শতাব্দীতে এসে চূড়ান্ত পর্যায়ের সভ্যতা, প্রগতি ও অগ্রগতি বলে স্বীকৃত হয়ে গেছে ! ! – আর আফ্রিকাতে ভিন্ন রঙের অধিকারী ব্যক্তিদের কাহিনী, তাদেরকে তাদের মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা এবং তাদেরকে হত্যা করা অথবা ইংরেজি পত্রিকাসমূহের প্রকাশিত নির্লজ্জ ভাষ্য অনুযায়ী “তাদেরকে শিকার করা”; (কারণ, তারা সাহসী হয়ে উঠেছে, অতঃপর তাদের সম্মান ও মর্যাদাকে উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং তারা তাদের স্বাধীনতা দাবি করেছে …) এটিই বৃটিশদের নিকট সর্বোচ্চ আদল (ন্যায়) ও ইনসাফ বলে স্বীকৃত; আর তারা তাদের এ মিথ্যা শ্লোগান দিতে কোনো প্রকার দ্বিধা করছে না, বিশ্বের বুকে নিজেদের মিথ্যা, শঠতা ও ধোকাবাজীর অভিভাবকত্ব পেশ করতে পিছপা হচ্ছে না (সেটাকে আমরা কী বলতে পারি?) !! – আর সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কর্তৃক তার জনগোষ্ঠীকে দাস-দাসী বানানো, অথবা তার ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধীনে বিদ্যমান মুসলিমগণের সন্তানদেরকে দাস-দাসী বানানো; বস্তুত তা হচ্ছে মানবতার ললাটে অপমান ও অসম্মানের কালিমা লেপন, বরং তা হলো এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, মানুষকে গোলামীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, যার নজির ইতিহাসে নেই !! তারা যে সব বিশৃঙ্খলা, গোলামী এবং অবৈধ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য… গণকবরসমূহ ও রক্তের গঙ্গা বইয়ে দিয়েছে সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখ… যার উপর ভর করে আজকে সমাজতন্ত্র এখানে সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। (সেটাকে তোমরা কী স্বাধীনতা বলবে ?) – সমাজতান্ত্রিক চীন ও রাশিয়া প্রতি বছর গড়ে এক মিলিয়ন করে ষোল মিলিয়ন মুসলিমকে নিধন বা নির্মূল করেছে। (সেটাও কী স্বাধীনতা?) – সমাজবাদী যুগোশ্লাভিয়া মুসলিম সম্প্রদায়কে কঠিনভাবে বিপদগ্রস্ত বা শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আজকের দিন পর্যন্ত যে সময়ের মধ্যে সে দেশটিতে সাম্যবাদী সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত আছে, সে সময়ে দেশটি এক মিলিয়ন মুসলিমের জীবনহানি করেছে এবং নির্মূল করার কাজ ও বর্বর শাস্তি দানের ব্যাপারটি এখন পর্যন্ত অবিরাম চলছে। – যুগোশ্লাভিয়ায় যা চলছে, এই যুগের সকল সমাজতান্ত্রিক দেশে এখন তাই চলছে। – আর কত হৃদয়বিদারক সমাজতান্ত্রিক কসাইখানার কথা আমরা শুনেছি, যা ঘটেছে দক্ষিণ ইয়ামেনে এবং এখন ঘটছে আফগানিস্তানে; আর এ ধরনের ঘটনা এমন প্রত্যেক স্থানে সংঘটিত হচ্ছে, যেখানে তাদের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা রয়েছে? ! (সেগুলোকে কি স্বাধীনতা বলব?) – আর আমরা অতীতে ইরাকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধ্বজাধারীদের কত কসাইখানার কথা শুনেছি, আরও শুনেছি আবদুল করীম কাসেমের যুগে মসুল শহরে তাদের পরিচালিত ধ্বংসযজ্ঞ ও অপরাধের কথা; আরও শুনেছি সেখানকার মুমিন দা‘য়ী (আল্লাহর দিকে আহ্বানকারী) ও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বন্দী ও কারারুদ্ধ করা এবং হত্যা ও পঙ্গু করে দেওয়ার মত ঘটনাবলীর কথা? ! – আল-কুরআনের ভাষায়: ﴿ ﻭَﻣَﺎ ﻧَﻘَﻤُﻮﺍْ ﻣِﻨۡﻬُﻢۡ ﺇِﻟَّﺎٓ ﺃَﻥ ﻳُﺆۡﻣِﻨُﻮﺍْ ﺑِﭑﻟﻠَّﻪِ ﭐﻟۡﻌَﺰِﻳﺰِ ﭐﻟۡﺤَﻤِﻴﺪِ ٨ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﺮﻭﺝ: ٨ ] [আর তারা তাদেরকে নির্যাতন করেছিল শুধু এ কারণে যে, তারা ঈমান এনেছিল পরাক্রমশালী ও প্রশংসার যোগ্য আল্লাহর উপর][40]। আর “আল্লাহ আমাদের প্রভু” – এই কথা বলা ছাড়া তাদের আর কোনো অপরাধ ছিল না? আর তারা এই কথা বলা ছাড়া অন্য কোনো অপরাধ করেনি, তারা বলেছিল: নিশ্চয়ই আমরা নাস্তিক্য মতবাদ ও নীতিমালা এবং ধর্ম বিরোধী শাসনব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করি? সুতরাং এটাই ছিল তাদের পরিণতি এবং এটাই ছিল তাদের প্রতিদান বা পুরস্কার !! তাদের কর্মকাণ্ডকে কেউ কেউ কি চমৎকারভাবে তুলনা করেছে: ﻗﺘﻞ ﺍﻣﺮﺉ ﻓﻲ ﻏﺎﺑﺔ ﺟﺮﻳﻤﺔ ﻻ ﺗﻐﺘﻔﺮ ﻭ ﻗﺘﻞ ﺷﻌﺐ ﺁﻣﻦ ﻣﺴﺄﻟﺔ ﻓﻴﻬﺎ ﻧﻈﺮ অর্থাৎ: “জঙ্গলের মধ্যে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ, আর নিরাপদ জনগোষ্ঠীকে হত্যা করা এমন বিষয়, যা ভেবে দেখার মত।” এ হচ্ছে চিন্তা ও বিশ্বাসকে গোলাম বানানোর সাথে সংশ্লিষ্ট; পক্ষান্তরে যা স্বাধীনতা ও ইচ্ছাকে দাস বনানোর সাথে সংশ্লিষ্ট, সে প্রসঙ্গে যদি কথা বলি তবে তো বলাই যাবে তার তো কোনো কুল কিনারা নেই … যেই মানুষটি সমাজতান্ত্রিক শাসনের অধীনে যে কোনো স্থানে বসবাস করে, সে তার ইচ্ছামত পেশা ও কর্মক্ষেত্র বেছে নেওয়ার মত স্বাধীনতার অধিকারী হতে পারে না; আর অধিকার নেই তার নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করার; আর অধিকার নেই তার দেখা যে কোনো বক্রতা অথবা ব্যর্থ নিয়মকানুন ও ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করার; আর অধিকার নেই তার কোনো কিছুর মালিকানা গ্রহণের এবং কোথাও ভ্রমণ করার; আর তার কোনো কথা বলার অধিকার নেই, এমনকি ‘কেন’? কথাটি উচ্চারণ করারও অধিকার নেই। সুতরাং সেক্ষেত্রে সে হলো সংকীর্ণতায় আবদ্ধ শৃংখলিত গোলাম, যার কোনো ধরনের স্বাধীনতা, পছন্দ-অপছন্দ ও ইচ্ছা-আকাঙ্খা নেই …। আর যখন কর্তৃপক্ষ তার ব্যাপারে অনুভব করতে পারবে যে, সে ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে, অথবা কোনো কথা ও কাজের মাধ্যমে কোনো পরিস্থিতি, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করেছে … তাহলে তার নিশ্চিত পরিণতি হবে মৃত্যু অথবা করাবাস অথবা সাইবেরিয়ায় নির্বাসন … !! এই হলো সুস্পষ্ট দাসত্বের রং, যা বিশ্বে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে “সভ্যতা”, “প্রগতি” এবং “বৈপ্লবিক নীতিমালা” … এর নামে। দাসত্বের এসব রং এমন, যা জনসাধারণকে তাদের অধিকার দাবি করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং তাদেরকে এর অনুসরণে বাধ্য করেছে; আর তা তাদেরকে লোহা ও আগুনের শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এই নতুন দাসত্ব প্রথাকে স্বীকৃতি প্রদানে এবং তার কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার প্রতি অনুগত থাকতে বাধ্য করেছে !! সুতরাং আমাদের কর্তব্য হল, আমরা রংবেরঙের নাম ও শ্লোগান দ্বারা প্রতারিত হব না; কারণ, এত কিছুর পরেও প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য বিশ্বে দাসত্ব প্রথা বাতিল বা বিলুপ্ত হয়নি; বরং নতুন নতুন রং, পদ্ধতি ও কৌশল গ্রহণ করেছে মাত্র, (যা সাধারণ মানুষ বুঝে উঠতে পারে না); আল-কুরআনের ভাষায়: ﴿ ﻭَﻟَٰﻜِﻦَّ ﺃَﻛۡﺜَﺮَ ﭐﻟﻨَّﺎﺱِ ﻟَﺎ ﻳَﻌۡﻠَﻤُﻮﻥَ ٢١ ﴾ ‏[ ﻳﻮﺳﻒ: ٢١ ] “ … কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।”[41] * * * বৈধভাবে দাস-দাসী গ্রহণের বিধান কী? ইসলামে দাসত্ব প্রথার ব্যাপারে জানা কথা হল, ইসলাম মনিবের জন্য বৈধ করে দিয়েছে যে, তার নিকট যুদ্ধ বন্দীদের থেকে কিছু সংখ্যক দাসী থাকতে পারবে এবং সে এককভাবে তাদেরকে উপভোগ করতে পারবে; আর ইচ্ছা করলে সে কখনও কখনও তাদের মধ্য থেকে কাউকে বিয়ে করতে পারবে; আর আল-কুরআনুল কারীম এই ধরনের ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ … ﻭَﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻫُﻢۡ ﻟِﻔُﺮُﻭﺟِﻬِﻢۡ ﺣَٰﻔِﻈُﻮﻥَ ٥ ﺇِﻟَّﺎ ﻋَﻠَﻰٰٓ ﺃَﺯۡﻭَٰﺟِﻬِﻢۡ ﺃَﻭۡ ﻣَﺎ ﻣَﻠَﻜَﺖۡ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨُﻬُﻢۡ ﻓَﺈِﻧَّﻬُﻢۡ ﻏَﻴۡﺮُ ﻣَﻠُﻮﻣِﻴﻦَ ٦ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻤﺆﻣﻨﻮﻥ: ٥، ٦ ] “ … আর যারা নিজেদের যৌন অংগকে রাখে সংরক্ষিত, নিজেদের স্ত্রী বা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ছাড়া, এতে তারা হবে না নিন্দিত।”[42] প্রাচ্যবিদ কিংবা পাশ্চাত্যবিদ অথবা নাস্তিকদের মধ্য থেকে যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তারা বলে: কিভাবে ইসলাম দাসী ব্যবস্থাকে বৈধ করে? আর কিভাবে সে মনিবকে একাধিক নারী থেকে তার মনোরঞ্জন ও যৌন ক্ষুধা মিটানোর অবকাশ দেয়? বান্দী বা দাসী ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে তৈরি করা যে সন্দেহ- সংশয়টিকে ইসলামের শত্রুগণ উস্কিয়ে দেয়, আমি তার জবাব দেওয়ার পূর্বে এই দু’টি’র বাস্তবতা তুলে ধরতে চাই: ১. একজন মুসলিমের জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধবন্দীদের মধ্য থেকে কোনো বন্দীনী’র সাথে তার মনোবাঞ্ছা পুরণ করা বৈধ হবে না, যতক্ষণ না বিচারক কর্তৃক তাদের বান্দী বা দাসী হওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। ২. মুসলিম ব্যক্তির জন্য (কোনো বন্দীনী’র সাথে) তার মনোবাঞ্ছা পুরণ করা বৈধ হবে না, তবে বৈধভাবে তার মালিক হওয়ার পর তার জন্য তা বৈধ হবে। যুদ্ধবন্দীনীকে দাসী বানানোর পর দুই অবস্থায় ছাড়া সে কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ মালিকানায় আসবে না: প্রথমত: মহিলাটি তার গণিমতের অংশ হওয়া। দ্বিতীয়ত: অন্যের নিকট থেকে তাকে ক্রয় করা, যখন সে তার মালিকানাভুক্ত হয়। আর সে তার মালিকানাভুক্ত হওয়ার পর পরই তার জন্য তাকে স্পর্শ করা বৈধ হবে না, গর্ভের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য সে কমপক্ষে এক ‘হায়েয’ তথা একটি মাসিকের মাধ্যমে তার গর্ভাশয় পবিত্র করে নেয়ার পর তাকে স্পর্শ করতে পারবে … অতঃপর সে ইচ্ছা করলে তার নিকট গমন করতে পারবে, যেমনিভাবে সে তার স্ত্রীর নিকট গমন করে। এই বাস্তব বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পর আমি ঐ সন্দেহের ব্যাপারে জবাব দিব, যা ইসলামের শত্রুগণ বৈধ পন্থায় দাস- দাসী হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে উস্কে দিয়েছে: পূর্বে আমরা আলোচনা করেছি যে, দাসী যখন কোনো মুসলিম ব্যক্তির মালিকানাধীন থাকে, তখন তার মালিকের জন্য তার সাথে স্ত্রীদের সাথে মেলামেশা করার মত মেলামেশা করা বৈধ আছে; ফলে যখন দাসী তার (মনিবের) জন্য সন্তান প্রসব করবে, তখন সে শরী‘য়তের দৃষ্টিতে ‘উম্মুল অলাদ’ (সন্তানের মা) হয়ে যাবে; আর এই অবস্থায় মনিবের উপর তাকে বিক্রি করা হারাম হয়ে যাবে; আর যখন সে তার জীবদ্দশায় তাকে আযাদ না করে মৃত্যুবরণ করবে, তখন তার মৃত্যুর পর সে সরাসরি স্বাধীন হয়ে যাবে। আর অনুরূপভাবে তার জন্য ‘মুকাতাবা’ পদ্ধতির মাধ্যমে তার স্বাধীনতা দাবি করার অধিকার থাকবে, যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে এবং সে তার দাবি অনুসারে স্বাধীন ও বন্ধন মুক্ত হয়ে যাবে। * * * অতএব ইসলাম যখন মনিবের জন্য দাসীর ব্যবস্থাকে বৈধ করেছে, তখন সে এর আড়ালে দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করা এবং তাদেরকে দাসত্ব থেকে মুক্ত করে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে; আরও পরিকল্পন গ্রহণ করেছে তাদেরকে গৃহহীন হওয়া ও ব্যভিচারের হাত থেকে রক্ষা করার … যে সময়ে অমুসলিম সমাজ ব্যবস্থায় যুদ্ধবন্দীনীদেরকে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অশ্লিলতার আস্তাকুড়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয় এই কথা বলে যে, তাদের কোনো পরিবার নেই; কারণ, তাদের মনিবগণ তাদের আত্মমর্যাদা ও সম্মান রক্ষার ব্যাপারে কোনো কিছু উপলব্ধি করে না; বরং তারা যুদ্ধবন্দীনীদেরকে দাসী হিসেবে গ্রহণ করার পর যিনা- ব্যভিচারের পেশায় নিয়োগ করে দেয়; আর তারা তাদের পিছনে এই নোংরা ব্যবসার দ্বারা তাদের মান- সম্মানকে উপার্জনের পণ্যদ্রব্য বানায় এবং মান-সম্মান নষ্ট করে !! কিন্তু সভ্যতা সংস্কৃতির ধারক মহান ইসলাম ব্যভিচার প্রথাকে গ্রহণ করেনি এবং দাসীদের সাথে এই ধরনের নোংরা আচরণ করেনি; বরং ইসলাম তাদের সুনাম-সুখ্যাতি ও নৈতিক চরিত্রের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে, যেমনিভাবে যিনা-ব্যভিচারের কলঙ্ক এবং স্বেচ্ছাচারিতা ও নৈরাজ্যবাদ ছড়িয়ে পড়া থেকে সমাজের পবিত্রতা রক্ষা করার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে; সুতরাং এসব দাসীদেরকে শুধু তাদের মনিবের জন্য সীমাবদ্ধ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই; তার দায়িত্ব হলো তাদের খাবারদাবার ও পোষাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করা, আর তাদেরকে অপরাধ বা পাপ থেকে হেফাজত করা এবং তাদের শ্রেণীগত প্রয়োজনসমূহ পূরণ করা; আর সে তাদের নিকট থেকে ক্রমান্বয়ে তার প্রয়োজন পূরন করবে, তবে (এই ক্ষেত্রে) তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করতে হবে, যাতে শেষ পর্যন্ত তারা যখন তাদের মনের ভিতর থেকে তাদের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবে, তখন তারা ইসলাম কর্তৃক প্রণীত ‘মুকাতাবা’ পদ্ধতির চাহিদা মোতাবেক তাদের মনিবদের নিকট থেকে স্বাধীনতা দাবি করবে; আর যখন সে তার মনিবের নিকট বিদ্যমান থেকে যাবে এবং গর্ভবতী হবে, তখন সে “উম্মু অলাদ” (সন্তানের মা) হয়ে যাবে এবং তা তার মুক্তির পথে ভূমিকা রাখে, বরং সে স্ত্রীর অবস্থানে পৌঁছে যায়, যার দ্বারা সে তার (মনিবের) নিকট অধিকার ও সম্মান লাভ করে। * * * অপরাপর সামাজিক শাসন ব্যবস্থায় এই ধরনের ব্যবহার কোথায়, যে শাসন ব্যবস্থায় ব্যভিচারে বাধ্য করার মাধ্যমে দাসীর প্রতি অবজ্ঞা ও হেয় প্রতিপন্ন করার দৃষ্টিতে তাকানো হয় এবং যাতে অপরাধীরা তাদের সাথে মজা উপভোগের কার্যাবলী পরিচালিত করে এবং তাদেরকে লাম্পট্যের সস্তা উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করে? আর আজকে ইউরোপীয় ও প্রাচ্যের রাষ্ট্রসমূহ নারীকে দাসী বানানোর অন্য এক কর্মপন্থা অনুসরণ করেছে; এই কর্মপন্থার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হল, সেখানে এই নীতিমালা ব্যভিচারকে বৈধ করে দিয়েছে এবং আইনের তত্ত্বাবধানে তাকে অনুমোদন দিয়েছে; আর প্রত্যেকটি দেশে তার পদক্ষেপসমূহ উপনিবেশিক প্রভাব বিস্তারকারী কায়দায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে … সুতরাং কিসে দাসত্ব প্রথার পরিবর্তন করবে, যখন তার শিরোনাম পরিবর্তন হয়? আর খোলস পাল্টানো ব্যভিচারের মহত্ত্ব কোথায়, অথচ সে ধর্ষণকারীকে প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাখে না? আর তাকে এমন নোংরা উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ কামনা করে না, যাতে মানবতা তার কাছে ভূলুণ্ঠিত হয়? এসব ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও নোংরামীর সাথে কি ইসলামের মধ্যে দাসী ও মনিবদের মধ্যকার সম্পর্কের কোনো তুলনা চলে? হ্যাঁ, ইসলাম ব্যক্তি ও জনগণের সাথে সুস্পষ্টভাষী ছিল, ফলে সে বলেছে: এটা দাসত্ব, আরা এরা দাসী; আর তাদের সাথে আচার-ব্যবহারের সীমারেখা এই রকম এই রকম; কিন্তু সে বলেনি যে, এটা মানবতার জন্য স্থায়ী দৃষ্টিভঙ্গি, আর এটা এমন দৃষ্টিভঙ্গিও নয় যা ভবিষ্যতে তার মান-মর্যাদার সাথে মানানসই হবে; বরং এটা যুদ্ধের প্রয়োজনে, যখন মানুষ যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানোর ব্যাপারে পরস্পরে জানবে। [কিন্তু বর্তমান যুগে নকল সভ্যতার মধ্যে আপনি এই নির্ভেজাল বিষয় পাবেন না, কেননা এই সভ্যতা ব্যভিচারকে দাসত্ব নামে আখ্যায়িত করে না, বরং তারা তাকে বলে: “সামাজিক প্রয়োজন”! কেন এই প্রয়োজন? কারণ, একজন ইউরোপীয় সংস্কৃতিবান ব্যক্তি অথবা প্রাচ্যবাদী মুক্ত চিন্তার অধিকারী ব্যক্তি কারও দায়িত্ব নিতে চায় না: না স্ত্রীর, আর না সন্তান- সন্ততীর … সে চায় কোনো প্রকার দায়- দায়িত্ব বহন না করেই মজা লুটতে, সে নারীর দেহ কামনা করে তাতে বংশের বিষবাষ্প ঢেলে দিতে; আর এই নারীর কোনো কিছুই তাকে চিন্তিত করে না; আর পুরুষ কেন্দ্রিক নারীর অনুভূতি যেমন তাকে ব্যস্ত করে না, তেমনি নারী কেন্দ্রিক পুরুষের অনুভূতিও তাকে ব্যস্ত করে না; কারণ, পরুষ হলো এমন এক শরীর, যে চতুষ্পদ জন্তুর মত আসক্ত ও অনুরক্ত হয়, আর নারী হলো এমন এক শরীর, যে বাধ্য হয়ে এই আসক্তি ও কুর্দনকে গ্রহণ করে এবং সে তা মূলত একজনের পক্ষ থেকেই গ্রহণ করে না, বরং সে যে কোনো পথিকের পক্ষ থেকেই তা গ্রহণ করে !! এটাই হলো তাদের সামাজিক প্রয়োজন, যা আধুনিক যুগে পাশ্চাত্যে অথবা প্রাচ্যে নারীদেরকে দাসী হিসেবে গ্রহণের বৈধতা দেয়; যদি ইউরোপীয় অথবা প্রাচ্যবাদী ব্যক্তি “মানবতা” এর স্তরে উন্নীত হয় এবং তার অধীনস্থ প্রত্যেককে তার কামনা ও বাসনার জন্য নির্ধারণ না করে, তাহলে সেটাকে জরুরি বা প্রয়োজন বলা যায় না। আর সভ্যতার দাবিদার পশ্চিমা বিশ্বে যেসব রাষ্ট্র ব্যভিচার প্রথাকে বাতিল করে দিয়েছে, সেসব রাষ্ট্র তা এই জন্য বাতিল করেনি যে, তা তার মান-মর্যাদাকে নষ্ট করে দিয়েছে, অথবা এই জন্য নয় যে, তার নৈতিক, মানসিক ও আত্মিক মান অপরাধ প্রবণতা, জাতিগত সম্পর্কসহ … সকল দিক থেকে উন্নত হয়ে গেছে ! বরং তারা তা বাতিল করেছে শ্রেণীগত কামনা-বাসনা ও কুপ্রবৃত্তির পূজা করার ক্ষেত্রে আসক্তির সূচনা পেশাদারিত্বে রূপ নেওয়া এবং রাষ্ট্র তাতে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন আছে বলে মনে না করার কারণে !! আর এর পরেও অহংকারের কারণে পশ্চিমাগণ এমন কিছু পায়, যার দ্বারা তারা তেরশ বছর পূর্বে ইসলামে যে দাস-দাসী প্রথা ছিল, তাকে দোষারোপ করে; অথচ তা ছিল একটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং পরিবর্তনবান্ধব, অনেক কারণেই সম্মানজনক এবং অনেক কারণেই পবিত্র ঐ ব্যবস্থা থেকে, যা বিংশ শতাব্দীতে প্রতিষ্ঠিত আছে, আর যাকে নগরসভ্যতা অগ্রগতি ও প্রগতিবাদ বলে আখ্যায়িত করে, যাকে কেউ অপছন্দ করে না এবং তা পরিবর্তনের ব্যাপারে কেউ চেষ্টাও করে না; আর জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তা অবশিষ্ট বা বিদ্যমান থাকার ব্যাপারেও কেউ বাধা প্রদান করে না, যতক্ষণ পর্যন্ত জাতির মধ্যে এসব কারণ বিদ্যমান থাকবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত মজা ও কুপ্রবৃত্তির পচা কাদামাটির মধ্যে এই বেপরোয়াভাবে ঝাঁপিয়ে পড়া অব্যাহত থাকবে !! আর কোনো প্রবক্তা এই কথা বলে না: এসব “পতিতাগণ” কারও পক্ষ থেকে কোনো প্রকার বল প্রয়োগ ছাড়াই স্বেচ্ছায় অশ্লীলতার পথ বেছে নিয়েছে, অথচ তারা তাদের পূর্ণ স্বাধীনতার মালিক; কেননা, সেখানে অনেক গোলাম ছিল (যা পূর্বে আলোচনা হয়েছে), যারা তাদের মঞ্জুর করা স্বাধীনতা চাচ্ছিল, অথচ তারা কোনো প্রকার বল প্রয়োগ ছাড়াই স্বেচ্ছায় গোলামীর পথ বেছে নিয়েছে; কিন্তু আমরা এটাকে ইসলাম এবং ইসলাম ভিন্ন অন্য ধর্মের দাসত্বের জন্য যুক্তিসঙ্গত বলে বিবেচনা করি না; আর এখানে বিবেচ্য বিষয় হলো এমন একটি ব্যবস্থাপনা, যা মানুষকে তার অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও চারিত্রিক … দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দাসত্বকে গ্রহণ করতে অথবা তাতে অবস্থান করতে বাধ্য করে ! কোনো সন্দেহ নেই যে, ইউরোপীয় সভ্যতার মধ্যে যে খারাপ দৃষ্টিভঙ্গি ও পাপাচারমূলক পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে, তা ব্যভিচারের দিকে ঠেলে দেয় এবং তাকে স্বীকৃতি প্রদান করে, চাই সেই ব্যভিচারটি নিয়মানুসারে হউক, অথবা তা স্বেচ্ছাচারিতামূলক ব্যভিচার হউক ! এই হচ্ছে বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপ ও ইউরোপ ভিন্ন অন্যান্য দেশে প্রচলিত দাসত্বের কাহিনী: পুরুষদের দাসত্ব, নারীদের দাসত্ব, জাতি বা গোষ্ঠীসমূহের দাসত্ব, বিভিন্ন শ্রেণীর মানষের দাসত্ব … প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে দাসত্বের বিভিন্ন উৎস ও নতুন নতুন প্রবেশদারসমূহ খুলে দেওয়া … এগুলো হলো পাশ্চাত্য ও প্রচ্যের হীনতা ও নীচুতা, কর্তৃত্ব করার ক্ষেত্রে তাদের নিকৃষ্ট উদ্দেশ্য, স্বেচ্ছাচারিতার পথে তাদের নেমে আসা এবং মানুষের সম্মান নষ্ট করা … ]।[43] * * * অতএব, হে বাস্তবতার অনুসন্ধানীগণ ! এটাই হলো ইসলামের দাসত্ব নীতি; মানব জাতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল পৃষ্ঠা এবং মানবতার রেজিষ্ট্রারে এক মহাগৌরবময় অধ্যায়; কারণ, আপনারা দেখেছেন যে, ইসলাম বিভিন্ন ইতিবাচক উপায়ে এবং শরী‘য়তের মূলনীতিমালার মাধ্যমে দাস- দাসীকে মুক্ত করার জন্য চেষ্টা- সাধনা করেছে … আর দাসত্বের প্রচীন ধারা বা উৎসসমূহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছে, যাতে এগুলো আর নবায়ন না হয়; আর একটি মাত্র উৎস চালু রেখেছে, তা হলো যুদ্ধকে কেন্দ্র করে দাস-দাসী বানানো, যখন সেই যুদ্ধটি হবে শরী‘য়তসম্মত যুদ্ধ …; দাসত্বের এই উৎসটিকে বন্ধ করা হয়নি যুদ্ধ সংক্রান্ত আবশ্যকতার কারণে, কখনও কখনও যার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না এবং সামাজিক স্বার্থের জন্য, যা বাস্তবায়িত হওয়ার মধ্যে কল্যাণ রয়েছে বলে মনে করা হয়; কারণ, তার সম্পর্ক বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন কতগুলো রাষ্ট্র ও সম্প্রদায়ের সাথে, যাদের উপর ইসলামের কোনো কর্তৃত্ব নেই এবং তার সম্পর্ক রয়েছে জাতির স্বার্থের সাথে, যা তার পুরুষ ও নারীদের জন্য সমানভাবে কল্যাণ ও উপকার বয়ে আনবে …। আর আপনারা নিশ্চয়ই দাসত্ব নীতির ব্যাপারে ইসলামী শরী‘য়তের মহত্ব অনুধাবন করেছেন যে, নিশ্চয়ই তা মুসলিমগণের ইমামকে (নেতাকে) এ ব্যাপারে ব্যাপক ক্ষমতা দান করেছে যে, তিনি ইচ্ছা করলে যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার ব্যবহারের ক্ষেত্রে চারটি বিষয় থেকে কোনো একটিকে পছন্দ করতে পারবেন; সুতরাং তিনি পছন্দ করবেন: অনুকম্পা প্রদর্শন অথবা মুক্তিপণ গ্রহণ অথবা হত্যা করা অথবা দাস- দাসী বানানো; আর এর উপর ভিত্তি করে ইমাম বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের সাথে সকল যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে বন্দী হওয়া যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে চুক্তি করতে পারবেন, যেমনিভাবে সুলতান ‘মুহাম্মদ আল- ফাতেহ’ তাঁর সমকালীন সময়ের রাষ্ট্রসমূহের সাথে দাস- দাসী প্রথা বিলুপ্ত করার ব্যাপারে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন !! আর যে সময়ের মধ্যে এই মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ইসলাম তার প্রধান মূলনীতির দিকে প্রত্যাবর্তন করে, যাকে সে সুস্পষ্ট ভাষায় পুরাপুরিভাবে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে: ‘সবার জন্য স্বাধীনতা’; ‘সকলের জন্য সমতা’ এবং মানবিক সম্মান ও মর্যাদার অধিকার সবার জন্য’ !! এই কথা দৃঢ়তার সাথে বলা যায় যে, নিশ্চয়ই ইসলাম দাস-দাসী মুক্ত করার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে সাতশত বছর পূর্বে, ইউরোপে দাস-দাসী মুক্ত করার দ্বারা ফ্রান্স বিপ্লবের অহমিকা প্রকাশ করার পূর্বে, আমেরিকাতে ‘আব্রাহাম লিংকন’ কর্তৃক দাস-দাসী মুক্ত করার দ্বারা বাকপটুতা প্রকাশ করার পূর্বে এবং ‘জাতিসংঘ’ কর্তৃক বিশ্ব মানবাধিকারের মূলনীতি ঘোষণা করার পূর্বে …। আর এটা বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তির দৃঢ়তা আরও বাড়িয়ে দিবে যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক যমীন ও তার উপর বসবাসকারীদের উত্তরাধিকারী হওয়ার দিন তথা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত ইসলাম হচ্ছে স্বাধীনতা ও মুক্তিদান করার ধর্ম এবং সম্মান ও জীবনঘনিষ্ঠ … শরী‘য়ত বা জীবনবিধান !! জেনে রখুন! প্রাচ্যবিদ, পাশ্চাত্যবিদ, সামাজতান্ত্রিক ও নাস্তিক্যবাদীগণের … মধ্য থেকে ইসলামের শত্রুগণের বুঝা উচিৎ যে, নিশ্চয়ই এই মহান ইসলাম আল্লাহ তা‘আলার চিরস্থায়ী দীন, সার্বজনীন শরী‘য়ত তথা জীবনবিধান এবং সর্বাধুনিক শাসনব্যবস্থা … আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর তা নাযিল করেছেন স্বাধীনতা, ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের মূলনীতিমালার ছায়াতলে ব্যক্তির মান- মর্যাদা, পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধি, সমাজের ঐক্য এবং মানবতার শান্তিপূর্ণ অবস্থান … সুনিশ্চিত করার জন্য? সুতরাং প্রত্যেক স্থানে ইসলামের দা‘য়ী তথা প্রচারকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো সকল মানুষের নিকট ইসলামের বাস্তবতা তুলে ধরার ব্যাপারে তৎপর হওয়া এবং চোখের উপর থেকে সন্দেহের পর্দাসমূহ ও অপবাদ- অভিযোগের মরীচিকা দূর করা … শেষ পর্যন্ত যখন চোখের সামনে সুস্পষ্ট সত্যের মাইল ফলক স্পষ্ট হয়ে উঠবে, বিষয়টি প্রকাশ পাবে এবং দলীলটি সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে … তখন দ্বিধাগ্রস্ত প্রাণগুলো ঈমানের বাগানে প্রবেশ করবে, বিশ্বাসের উদ্যানে দাখিল হবে এবং সাহসিকতায়, উদ্দীপনায়, কাজে-কর্মে, প্রচার- প্রচারণায় ও জিহাদ লড়াই সংগ্রমে শক্তিশালী মুমিনগণের কাতারে শামিল হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে যখন ঈমানের প্রফুল্লতা হৃদয়ের সাথে মিশে যাবে, তখন তা তার সাথীকে পরিপূর্ণতার উচ্চস্তরে উঠিয়ে দেবে, পৌঁছিয়ে দেবে সাহসী মানুষদের শ্রেষ্ঠতম অবস্থানে এবং পরিচালিত করবে খোদভীরু সত্যপথের অনুসারীগণের সর্বোত্তম পথে …। বের করে আনবে জগৎশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গকে, যেমনিভাবে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম ঈমানীয়া মাদরাসা (বিদ্যালয়) বের করে দিয়েছিল আবূ বকর, ওমর, খালিদ, উসামা ও উম্মে ‘আম্মারের … মত মানুষদেরকে। অতএব, হে ইসলামের আহ্বায়কগণ! দা‘ওয়াতী কাজ ও প্রচারাণামূলক তৎপরতা বৃদ্ধি করুন, অচিরেই আমরা মুসলিম যুবকদেরকে ইসলামের দিকে ফিরে আসতে দেখতে পাব; আর আশা করা যায় যে, আমরা দিগন্তে ইসলামের অগ্রগামী সৈনিকদের কুঁসকাওয়াজ দেখতে পাব; আর মুসলিম জাতি ফিরে পাবে তাদের হারানো সম্মান ও মান-মর্যাদা; আরো ফিরে পাবে তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি, কালের চাকা যাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল … আর এটা আল্লাহর জন্য মোটেই কঠিন বা কষ্টকর কাজ নয়। পরিশেষে আল-কুরআনের ভাষায়: ﴿ ﻭَﻗُﻞِ ﭐﻋۡﻤَﻠُﻮﺍْ ﻓَﺴَﻴَﺮَﻯ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻤَﻠَﻜُﻢۡ ﻭَﺭَﺳُﻮﻟُﻪُۥ ﻭَﭐﻟۡﻤُﺆۡﻣِﻨُﻮﻥَۖ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ : ١٠٥ ] “আর বলুন, ‘তোমরা কাজ করতে থাক; আল্লাহ তো তোমাদের কাজকর্ম দেখবেন এবং তাঁর রাসূল ও মুমিনগণও।”[44] [ ﻭَﺀَﺍﺧِﺮُ ﺩَﻋۡﻮَﺍﻧﺎ ﺃَﻥِ ﭐﻟۡﺤَﻤۡﺪُ ﻟِﻠَّﻪِ ﺭَﺏِّ ﭐﻟۡﻌَٰﻠَﻤِﻴﻦَ . ] (আর আমাদের শেষ ধ্বনি হল: ‘সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর প্রাপ্য’)। * * * সূচীপত্র বিষয়সমূহ ভূমিকা মুখবন্ধ দাসত্ববাদ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কিছু কথা দাসত্বের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান দাস-দাসী’র সাথে ইসলাম কেমন আচরণ করে? কিভাবে ইসলাম দাস- দাসীকে মুক্তি দিয়েছে? – উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান; – কাফ্ফারা প্রদানের মাধ্যমে মুক্তি দান; – লিখিত চুক্তির মাধ্যমে মুক্তি দান; – রাষ্ট্রীয় তত্ত্ববধানে মুক্তি দান; – সন্তানের মা (উম্মুল অলাদ) হওয়ার কারণে মুক্তি দান; – নির্যাতনমূলক প্রহারের কারণে মুক্তি দান। ইসলাম কেন দাসত্ব প্রথাকে চূড়ান্তভাবে বাতিল করেনি? * আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি; * রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি; * ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি; * সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি; * শর‘য়ী দৃষ্টিভঙ্গি। আজকের বিশ্বে দাসত্ব প্রথা আছে কি? বৈধভাবে দাস-দাসী গ্রহণের বিধান কী? অতএব, হে বাস্তবতার অনুসন্ধানীগণ ! * * * _________________________________________________ ______________________________________ [1] সূরা আল-বাকারা: ২৬০ [2] সূরা আল-মায়িদা: ১৫ – ১৬ [3] ‘তারীখুল ‘আলম’ ( ﺗﺎﺭﻳﺦ ﺍﻟﻌﺎﻟﻢ ) নামক ঐতিহাসিক বিশ্বকোষের ২২৭৩ পৃষ্ঠায় এসেছে, যার ভাষ্য হল: “৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে রোমানীয় সম্রাট ‘মুরীস’ তার অর্থলোভের কারণে ‘খান আল- আওয়ার’ এর হাতে বন্দী হাজার হাজার যুদ্ধবন্দীকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছাড়িয়ে আনতে অস্বীকার করে; ফলে ‘খান আল-আওয়ার’ তাদের সকলকে হত্যা করে। [4] সূরা আন-নিসা: ৭৬ [5] সূরা আল-বাকারা: ১৯০ [6] সূরা আল-আনফাল: ৩৯ [7] সূরা আন-নিসা: ৭৬ [8] সূরা আত-তাওবা: ১২ [9] মুসলিমগণ যদি তাদের নিরাপত্তা বিধানে অক্ষম হয়, তাহলে তাদের কর্তব্য হল তাদের প্রদত্ত ‘জিযিয়া’ কর তাদের নিকট ফেরত দেয়া, ‘হীরা’ এর পার্শ্ববর্তী শহরবাসীদের সাথে যেমন ব্যবহার করেছিলেন আবূ ‘উবায়দা রা.। [10] সূরা আল-বাকারা: ২৫৬ [11] সূরা আল-আনফাল: ৬১ [12] সূরা মুহাম্মদ: ৪ [13] সূরা আল-আনফাল: ৬৭ [14] সূরা আশ-শুরা: ৪০ [15] সূরা আল-হুজরাত: ১৩ [16] সূরা গাফের: ৪০ [17] সূরা আন-নিসা: ২৫ [18] সূরা আন-নিসা: ২৫ [19] সূরা আন-নিসা: ৩৬ [20] সূরা আল-কামার: ৫৫ [21] সূরা আল-বালাদ: ১১ – ১৩ [22] সূরা আন-নিসা: ৯২ [23] সূরা আন-নিসা: ৯২ [24] সূরা আল-মায়িদা: ৮৯ [25] যিহার ( ﺍﻟﻈﻬﺎﺭ ) হল: স্বামী কর্তৃক তার স্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলা: “তুমি আমার উপর আমার মায়ের পিঠের মত হারাম”। সুতরাং এই শব্দের কারণে তার উপর তার স্ত্রী হারাম হয়ে যাবে, যেমনিভাবে তার উপর তার মা হারাম। [26] সূরা আল-মুজাদালা: ৩ [27] শহীদ সায়্যিদ কুতুব, ‘আনিল ‘আদালত আল-‘ইজতিমা‘য়ীয়্যাহ ফিল ইসলাম ( ﻋﻦ ﺍﻟﻌﺪﺍﻟﺔ ﺍﻻﺟﺘﻤﺎﻋﻴﺔ ﻓﻲ ﺍﻹﺳﻼﻡ ) [ইসলামে সামাজিক ন্যায়নীতি]। [28] সূরা আন-নূর: ৩৩ [29] সূরা আন-নূর: ৩৩ [30] সূরা আন-নূর: ৩৩ [31] সূরা আন-নূর: ৩৩ [32] সূরা আত-তাওবা: ৬০ [33] সূরা আন-নূর: ৩৩ [34] সূরা আত-তাওবা: ৬০ [35] ধর্মকে তারা অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং সবকিছুকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উপর বিচার করেছে। এটা অবশ্যই ভুল চিন্তার ফসল। বিশেষ করে ইসলামের মত আল্লাহ প্রদত্ত জীবনবিধানের ব্যাপারে এ ধরণের চিন্তা করাও কুফরী। [সম্পাদক] [36] আমরা যুদ্ধবন্দীদের দাস- দাসী বানানোর উৎসকে দুর্বল উৎস বলে বর্ণনা করেছি দু’টি কারণে: প্রথমত: স্বাভাবিকভাবে যুদ্ধের স্বল্পতা। দ্বিতীয়ত: ইসলাম কর্তৃক ইমাম বা নেতাকে যুদ্ধবন্দীদের সাথে আচার- আচরণ ও লেনদেনের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়ে (ক্ষমতা প্রয়োগে) স্বাধীনতা দান: অনুকম্পা প্রদর্শন অথবা মুক্তিপণ গ্রহণ অথবা হত্যা করা অথবা দাস- দাসী বানানো; আর অধিকাংশ সময় দাস- দাসী বানানোর বিষয়টিকে বাদ রেখে বাকি অন্যান্য ক্ষেত্রে তার স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ হয়। [37] অর্থাৎ প্রয়োজনে যেন আবার তা ব্যবহার করতে পারে। যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে এ ধরণের দাসত্ব পরিচালিত করবে ইসলামও যেনো তাদের বিরুদ্ধে তা ব্যবহার করতে পারে। [সম্পাদক] [38] সূরা আন-নিসা: ২৫ – ২৭ [39] সূরা আল-মুলক: ১৪ [40] সূরা আল-বুরুজ: ৮ [41] সূরা ইউসুফ: ২১ [42] সূরা আল-মুমিনুন: ৫ – ৬ [43] প্রফেসর দা‘য়ী মুহাম্মদ কুতুব কর্তৃক লিখিত ‘শুবহাতু হাওলাল ইসলাম’ ( ﺷﺒﻬﺎﺕ ﺣﻮﻝ ﺍﻹﺳﻼﻡ ) নামক গ্রন্থের ‘আল-ইসলাম ওয়ার রিক্ক’ ( ﺍﻹﺳﻼﻡ ﻭ ﺍﻟﺮﻕ ) [ ইসলাম ও দাসত্ব ] শীর্ষক আলোচনা বা অধ্যায় থেকে কিছুটা পরিবর্তন করে উদ্ধৃত। [44] সূরা আত-তাওবা: ১০৫ _________________________________________________ ________________________________ লেখক: আবদুল্লাহ নাসেহ ‘উলওয়ান অনুবাদ: মোঃ আমিনুল ইসলাম সম্পাদনা: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া উৎস: ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলবেন না কিন

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s