ইসলামে দাস প্রথা!!!!!!!


ইসলামে দাস বিধি ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﺍﻟﺮﺣﻴﻢ ভূমিকা সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি জনগণ ও রষ্ট্রের সংশোধন ও সংস্কারের জন্য শরী‘য়ত অবতীর্ণ করেছেন; সালাত ও সালাম তাঁর উপর, যিনি মানুষকে যুলুম ও দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছেন; শান্তি বর্ষিত হউক তাঁর পরিবার-পরিজন, সাহাবী ও তাবে‘য়ীগণের উপর, যাঁরা যমীনে আল্লাহর একত্ববাদ, স্বাধীনতা ও জ্ঞানের নীতিমালা প্রচার করেছেন; তাঁদের প্রতিও শান্তি বর্ষিত হউক, যাঁরা কিয়মতের দিবস পর্যন্ত তাঁদের দা‘ওয়াত দ্বারা অন্যকে দা‘ওয়াত দান করেন এবং তাঁদের পথনির্দেশের দ্বারা যথাযথভাবে হেদায়েত লাভ করেন। অতঃপর: আমার ‘কিসসাতুল হিদায়াত’ [হিদায়াতের কাহিনী] নামক গ্রন্থটিতে কতগুলো মূল্যবান বক্তৃতা ( Lecture ) ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে … পাঠক সে হিদায়াতের কাহিনী গ্রন্থের তার প্রাসঙ্গিক স্থানে তা পাবে। অতঃপর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমি আলোচনাগুলো একটার পর একটা বের করে আনব, অতঃপর তার মধ্যে যা কিছু আছে তা দেখব; অতঃপর যখন আলোচনাটিতে কোনো কিছু বৃদ্ধি করার প্রয়োজন হবে, তখন আমি তাতে বৃদ্ধি করব; আর যখন ঐখানে কোনো কিছু কাটছাট করা জরুরি মনে করব, তখন তা কাটছাট করবে … শেষ পর্যন্ত যখন আমি তার পরিমার্জন ও পুনর্বিন্যাসের কাজ শেষ করব, তখন আমি বক্তব্য বা আলোচনাটি ‘বাহুসুন ইসলামীয়াতুন হাম্মাহ’ ( ﺑﺤﻮﺙ ﺇﺳﻼﻣﻴﺔ ﻫﺎﻣﺔ ) [গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী আলোচনা] নামক সিরিজের অন্তর্ভুক্ত করব; আশা করা যায় “সিরিজ” -এর পাঠকগণ এসব বক্তৃতা ও আলোচনা থেকে উপকৃত হবেন এবং আরও আশা করা যায় যে, তারা এসবের মধ্যে এমন অনেক প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেয়ে যাবেন, যেগুলো ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে করা হয়ে থাকে। আর তা ইসলামের শত্রুদের অকপট সাক্ষ্যের মাধ্যমেই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়ে যাবে। আর এসব বক্তৃতাসমূহ (Lecturers) থেকে তার প্রাসঙ্গিক স্থানে দেওয়া আমার বক্তব্যের মধ্যে অন্যতম একটি বক্তৃতা হলো “আর-রিক্বু ফিল ইসলাম” ( ﺍﻟﺮﻕ ﻓﻲ ﺍﻹﺳﻼﻡ ) [ইসলামে দাস]; যে বক্তৃতাটি তার যথাযথ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল যখন আবুল ফাতহ এর মত ব্যক্তিত্বদের উত্থান ঘটেছিল। আমার পাঠক ভাই! অবশ্যই আপনি “দাস” প্রবন্ধের আলোচনায় “দাস-প্রথা” কে কেন্দ্র করে ইসলামের শত্রুগণ কর্তৃক উত্থাপিত প্রত্যেকটি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পেয়ে যাবেন অকাট্য দলীল, গ্রহণযোগ্য কারণ এবং সুন্দর ও আকর্ষণীয় উপস্থাপনার মাধ্যমে। আমি আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন মুসলিম যুবকদেরকে সুপথ ও সঠিক বুঝ দান দান করেন, তাদেরকে ঈমান ও জিহাদের উষ্ণতার দ্বারা দা‘ওয়াতিমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ধাবিত করেন … এবং এই উম্মতের প্রতি সম্মান, শক্তি ও জাগরণের উপায়সমূহ নির্দেশ করেন … যাতে আমরা আমাদের নিজ চোখে ইসলামের পতাকাকে উড্ডীন অবস্থায় এবং মুসলিমগণের রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত অবস্থায় দেখতে পারি … আর এটা আল্লাহর জন্য কঠিন বা কষ্টকর কোনো কাজ নয়। লেখক * * * মুখবন্ধ ও ভূমিকা প্রাচীন ও আধুনিক কালে ইসলামের শত্রুগণ, বিশেষ করে তথাকথিত সাম্যবাদীগণ ইসলামের শাসনব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে অপবাদ ও অভিযোগের মরীচিকা এবং সন্দেহ ও সংশয়ের ফেনা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে …। এর লক্ষ্য হল: মুসলিম প্রজন্মের মধ্যে নাস্তিকতার বীজ বপন করা, আল্লাহর দেওয়া শাসনব্যবস্থার ব্যাপারে যুবকদের মধ্যে সন্দেহের ধূম্রজাল সৃষ্টি করা এবং মুসলিম জাতিকে অপরাধমূলক স্বেচ্ছাচারিতা, লাম্পট্য, নাস্তিকতা, কুফরী, নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডের দিকে ঠেলে দেওয়া …। আর বিদ্বেষমূলক প্ররোচনার মধ্য থেকে যেগুলোকে তারা শিক্ষিত সভ্য- সমাজের মধ্যে উস্কানি দিয়ে উল্লেখ করে থাকে তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ‘ইসলাম কর্তৃক দাসত্ব প্রথার বৈধতা প্রদান’। যা তাদের দৃষ্টিতে মানুষের স্বাধীনতার সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন; আর তারা এই ধরনের যুলুম মার্কা অভিযোগ এনে ইসলামের মধ্যে সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টির পঁয়তারা করে থাকে। এর মাধ্যমে তারা ইসলামের মূলনীতিসমূহের মধ্যে অপবাদ দেওয়ার উপায় আবিষ্কার করে, যাতে তারা মুসলিম সমাজ ও ইসলামের অনুসারী প্রজন্মের মধ্যে নাস্তিকতা ও তথাকথিত ধর্মনিরেপক্ষ নীতিমালা প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে তাদের গুপ্ত উদ্দেশ্য ও নিকৃষ্ট লক্ষ্যে … পৌঁছতে সক্ষম হয়। আর যখন বেশ কিছু মুসলিম যুবক এসব উদ্দেশ্যমূলক অপবাদ ও অপরাধমূলক সন্দেহের দ্বারা প্রভাবিত হতে শুরু করল, তখন তারা আলেমদের নিকট এসব প্রশ্ন করা শুরু করে: কিভাবে ইসলাম দাসত্বকে বৈধ করেছে এবং তাকে তার নিয়মনীতির অন্তর্ভুক্ত করেছে? অথবা কিভাবে ইসলাম মানুষকে মনিব ও গোলাম বলে শ্রেণীবিভাগ করতে চায়? অথবা কিভাবে যে আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সম্মানিত করেছেন, তিনি তাকে দাস-দাসীর বাজারে ক্রয়- বিক্রয় করতে চান, যেমনিভাবে ব্যবসা- বাণিজ্যের বাজারে পণ্যসামগ্রী ক্রয়- বিক্রয় করা হয়? আর আল্লাহ তা‘আলা যখন এতে সম্মতই না হবেন, তাহলে তিনি কেন তাঁর সম্মানিত কিতাবে (আল-কুরআনুল কারীমে) দাস-দাসী প্রথা বাতিল করে সুস্পষ্ট বক্তব্য পেশ করেননি, যেমনিভাবে তিনি মদ, জুয়া, সুদ ও যিনা- ব্যভিচার … ইত্যাদি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বক্তব্য পেশ করেছেন, যা ইসলাম হারাম করে দিয়েছে? যদিও মুমিন যুবক ভালোভাবেই জানে যে, ইসলাম হলো সত্য ও স্বভাব দীন, কিন্তু তার অবস্থা ইবরাহীম খলিল আ. এর মত, কেননা আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন: ﴿ ﺃَﻭَ ﻟَﻢۡ ﺗُﺆۡﻣِﻦۖ ﻗَﺎﻝَ ﺑَﻠَﻰٰ ﻭَﻟَٰﻜِﻦ ﻟِّﻴَﻄۡﻤَﺌِﻦَّ ﻗَﻠۡﺒِﻲۖ ﴾ ‏[ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ٢٦٠ ] “তিনি বললেন, তবে কি আপনি ঈমান আনেন নি? তিনি বললেন, ‘অবশ্যই হাঁ, কিন্তু আমার মন যাতে প্র্রশান্ত হয় !”[1] আর কোনো সন্দেহ নেই যে, একজন বিবেকবান ও চিন্তাশীল মানুষ … যখন স্বজনপ্রীতি মুক্ত বা নিরপেক্ষ হয়, আর সাথে সাথে সে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে মুক্ত থাকে এবং তার অন্তরকে সত্য গ্রহণের জন্য, বিবেককে যুক্তি গ্রহণের জন্য ও দৃষ্টিকে আলো উপভোগ করার জন্য … উন্মুক্ত করে দেয়, তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে তার জন্য আবশ্যক হয়ে পড়ে সত্য ও বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়া এবং রব (প্রতিপালক) প্রদত্ত নিয়মনীতিকে গ্রহণ করে নেওয়া, যার সামনে ও পিছন থেকে অসত্য ও অকার্যকর কিছু আসবে না …। আল-কুরআনের ভাষায়: ﴿ ﻗَﺪۡ ﺟَﺎٓﺀَﻛُﻢۡ ﺭَﺳُﻮﻟُﻨَﺎ ﻳُﺒَﻴِّﻦُ ﻟَﻜُﻢۡ ﻛَﺜِﻴﺮٗﺍ ﻣِّﻤَّﺎ ﻛُﻨﺘُﻢۡ ﺗُﺨۡﻔُﻮﻥَ ﻣِﻦَ ﭐﻟۡﻜِﺘَٰﺐِ ﻭَﻳَﻌۡﻔُﻮﺍْ ﻋَﻦ ﻛَﺜِﻴﺮٖۚ ﻗَﺪۡ ﺟَﺎٓﺀَﻛُﻢ ﻣِّﻦَ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﻧُﻮﺭٞ ﻭَﻛِﺘَٰﺐٞ ﻣُّﺒِﻴﻦٞ ١٥ ﻳَﻬۡﺪِﻱ ﺑِﻪِ ﭐﻟﻠَّﻪُ ﻣَﻦِ ﭐﺗَّﺒَﻊَ ﺭِﺿۡﻮَٰﻧَﻪُۥ ﺳُﺒُﻞَ ﭐﻟﺴَّﻠَٰﻢِ ﻭَﻳُﺨۡﺮِﺟُﻬُﻢ ﻣِّﻦَ ﭐﻟﻈُّﻠُﻤَٰﺖِ ﺇِﻟَﻰ ﭐﻟﻨُّﻮﺭِ ﺑِﺈِﺫۡﻧِﻪِۦ ﻭَﻳَﻬۡﺪِﻳﻬِﻢۡ ﺇِﻟَﻰٰ ﺻِﺮَٰﻁٖ ﻣُّﺴۡﺘَﻘِﻴﻢٖ ١٦ ﴾ ‏[ﺍﻟﻤﺎﺋﺪﺓ: ١٥، ١٦ ] “আমাদের রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে, তিনি সে সবের অনেক কিছু তোমাদের নিকট প্রকাশ করছেন এবং অনেক কিছু ছেড়ে দিচ্ছেন। অবশ্যই আল্লাহর নিকট থেকে এক জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের কাছে এসেছে। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে, এ দ্বারা তিনি তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং তাদেরকে নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার হতে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান; আর তাদেরকে সরল পথের দিশা দেন।”[2] এই ভূমিকা পেশ করার পর আমি আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য নিয়ে ইসলাম দাস- প্রথার ব্যাপারে যে অবস্থান গ্রহণ করেছে তার বর্ণনা শুরু করছি … যাতে ঐ ব্যক্তি জানতে পারে, যে ব্যক্তি জানতে চায় যে, ইসলাম দাস- দাসীর সাথে কেমন ব্যবহার করেছে? আর কিভাবে তাকে মুক্ত করার ব্যাপারে ইতিবাচক উপায় বা পদ্ধতি প্রণয়ন করেছে? আর কিভাবে এমন নীতিমালা প্রবর্তন করেছে, দাস-দাসী বানানোর একটি অবস্থা ব্যতীত সকল উৎসকে বন্ধ করে দিয়েছে? কিছুক্ষণ পরেই আমরা তার আলোচনা করব। আর এ জন্য আমি দাসত্ব সম্পর্কিত আলোচনাটিকে সকল দিক থেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য নিম্নোক্ত পয়েন্টগুলোর আলোচনা করা ভালো মনে করছি: প্রথমত: দাসত্ববাদ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কিছু কথা দ্বিতীয়ত: দাসত্বের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান তৃতীয়ত: দাস-দাসী’র সাথে ইসলাম কেমন আচরণ করে? চতুর্থত: কিভাবে ইসলাম দাস- দাসীকে মুক্তি দিয়েছে? পঞ্চমত: কেন ইসলাম দাসত্ব প্রথাকে চূড়ান্তভাবে বাতিল করেনি? ষষ্ঠত: বর্তমান বিশ্বে দাসত্ব প্রথা আছে কি? সপ্তমত: বৈধভাবে দাস-দাসী গ্রহণের বিধান কী? উপরোক্ত সাতটি পয়েন্টেই আমি কিছু বিস্তারিত আলোচনার প্রয়াস পাব। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি আমাকে সাহায্য করুন। * * * দাসত্ববাদ সম্পর্কে ঐতিহাসিক কিছু কথা ১. ইসলামের আগমন হয়েছে এমতাবস্থায় যে, দাস-দাসীর ব্যাপারটি ছিল গোটা বিশ্বের সকল প্রান্তে একটি স্বীকৃত প্রথা ও ব্যবস্থাপনা, বরং তা ছিল অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বা কর্মতৎপরতা এবং সামাজিক প্রচলন, যাকে কোনো মানুষ অস্বীকার করতে পারে না; আর কোনো মানুষ তার পরিবর্তনের সম্ভাব্যতার ব্যাপারে চিন্তাও করতে পারে না !! ২. ইসলামের পূর্বে বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে দাস করার উৎস ছিল বিভিন্ন ধরনের: – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম একটি হলো, যুদ্ধসমূহের মধ্যে দাস- দাসী বানানোর প্রবৃত্তি এবং জনগোষ্ঠীর রক্ত শোষণ করা …। – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হলো দারিদ্রতার কারণে অথবা ঋণ পরিশোধ করতে না পারার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দাস-দাসীতে পরিণত করা …। – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হলো, চুরি অথবা হত্যার মত মারাত্মক ধরনের অপরাধে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দাস- দাসীতে পরিণত করা …। – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হলো মাঠের মধ্যে কাজ করা এবং তাতে অবস্থান করার জন্য কোনো ব্যক্তিকে দাস-দাসীতে পরিণত করা …। – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হলো ছিনতাই বা অপহরণ এবং বন্দী করার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে দাস- দাসীতে পরিণত করা …। – এই উৎসসমূহের মধ্য থেকে অন্যতম আরেকটি হলো অভিজাত শ্রেণী ও বড় লোকদের সাথে অসদ্ব্যবহার করার কারণে কোনো ব্যক্তিকে দাস- দাসীতে পরিণত করা …। এগুলো ছাড়াও আরও নানা ধরনের উৎস রয়েছে, যেগুলোকে তারা মানুষের স্বাধীনতা হরণ করার জন্য ন্যায়সঙ্গত কারণ বলে বিবেচনা করে এবং তাকে মনিবদের সামনে অনুগত দাস বা গোলামে পরিণত করে !! ৩. রোমান, পারস্য, ভারত, চীন, গ্রীক প্রভৃতি রাজ্যে দাস-দাসীর সাথে আচরণ ছিল বর্বর ও নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে; সেখানে তার মানবতা ছিল উপেক্ষিত, তার সম্মান ছিল ভূলুণ্ঠিত এবং কাজের ক্ষেত্রে তার জবাবদিহীতা ছিল অত্যন্ত কঠিন …, যদিও এক রাষ্ট্র থেকে অন্য রাষ্ট্রের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার পরিধির মধ্যে কম বেশি পার্থক্য ছিল। রোমান সমাজে দাস-দাসীর সাথে আচরণের কিছু নমুনা আপনাদের সামনে তুলে ধরা হল: রোমন জাতির নিকট যুদ্ধ বা আগ্রাসন ছিল জনগোষ্ঠীকে দাস-দাসী বানানোর অন্যতম মূল উৎস বা উৎপত্তিস্থল; আর এই আগ্রাসন কোনো সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত ও নীতির উপর ভিত্তি করে সংঘটিত হতো না, বরং তার একমাত্র কারণ ছিল অন্যদেরকে গোলাম বানানো এবং তাদেরকে তাদের বিশেষ স্বার্থে ও ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের জন্য নিজেদের অধীনস্থ করা, যেমনটি ‘আশ- শুবহাত’ ( ﺍﻟﺸﺒﻬﺎﺕ ) নামক গ্রন্থের লেখক উল্লেখ করেছেন। আর তা এ জন্যে যে, যাতে রোমানরা অহঙ্কারী ও বিলাসবহুল জীবন যাপন করতে পারে; আর শীতল ও উষ্ণ গোসলখানাসমূহ দ্বারা (আরাম) উপভোগ করতে পারে; আরও উপভোগ করতে পারে অহঙ্কারী পোষাক এবং রং বেরং -এর সুস্বাদু খাবারসমূহ; বরং তারা ডুবে থাকবে অহঙ্কারময় ভোগবিলাসে এবং মদ, নারী, নৃত্য, অনুষ্ঠানাদি এবং বিভিন্ন পর্ব ও উৎসবের মত পাপ-পঙ্কিলময় আমোদ-প্রমোদে। … এই জন্যই অপর জনগোষ্ঠীকে দাস- দাসী বানানো, তাদের রক্ত শোষণ করা এবং তাদের নারী ও পুরুষদেরকে দাস- দাসী হিসেবে মালিকানা গ্রহণ করাটা আবশ্যক ছিল !! … এই পাপ-পঙ্কিলময় কামনা-বাসনার পথ ধরেই গড়ে উঠে রোমানীয় উপনিবেশবাদ এবং দাসত্ব প্রথা, যার উৎপত্তি এই উপনিবেশ থেকেই। রোমানীয় রাষ্ট্রে দাস-দাসীদের সাথে নিষ্ঠুর আচরণের কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ চিত্র: – দাস-দাসীগণ মাঠে কাজ করত এমতাবস্থায় যে, তাদেরকে ভারী বেড়ি পরিয়ে বন্দী করে রাখা হত, যা তাদের পালিয়ে যাওয়া থেকে বাধা প্রদানে যথেষ্ট ছিল। – তারা তাদেরকে শুধু এমন পরিমাণ খাবার দিত, যা কোনো রকমে তাদের জীবনটুকু বাঁচিয়ে রাখত, যাতে তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত অনুগত গোলাম হয়ে কাজ করতে পারে। – তারা কাজের মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই তাদেরকে চাবুক দ্বারা তাড়িয়ে বেড়াত; এসব মানব সৃষ্টিকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে মনিবগণ শুধু অন্যায় আমোদ-ফূর্তি অনুভব করত, যাদেরকে তাদের মায়েরা মুক্ত স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছিল। – তারা জেলখানার দুর্গন্ধময় অন্ধকার সেলে ঘুমাতো, যেখানে পোকামাকড় ও ইঁদুরের গোষ্ঠী অবাধে যা ইচ্ছা করতে থাকত, একটি সেলে পঞ্চাশ জন অথবা তার চেয়ে অধিক সংখ্যক দাস অবস্থান করত এবং তারা সেখানে বেড়ি পরানো অবস্থায় অবস্থান করত। – তাদেরকে তরবারী ও বর্শা (বল্লম) দ্বারা প্রতিযোগিতার আসরে ঠেলে দেওয়া হত …। তারপর সেই আসরে মনিবগণ সমবেত হত তাদের নিজ নিজ দাসের পারস্পরিক তরবারীর আক্রমন ও বর্শা নিক্ষেপ প্রতিযোগিতার দৃশ্য অবলোকন করার জন্য; আর এই ক্ষেত্রে তাদের নিহত হওয়ার ব্যাপারে কোনো প্রকার সাবধানতা ও সতর্কতা অবলম্বনের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হতো না; বরং মনিবগণের আনন্দ- উল্লাস চরম পর্যায়ে পৌঁছাতো, শ্লোগানে শ্লোগানে কণ্ঠস্বর প্রচণ্ড ধ্বনিতে পরিণত হত, হাততালিতে মুখর হয়ে উঠত পরিবেশ এবং যখন প্রতিযোগীদের কোনো একজন তার সঙ্গীর জীবন বিপন্ন করে দিতো, তখন তাদের সৌভাগ্যের অট্টহাসি দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়ত; তারপর তার নিষ্প্রাণ দেহকে যমীনের উপর নিক্ষেপ করত !! আর সর্বজন বিদিত যে, সেই সময়ে রোমানীয় আইন-কানুন এমন ছিল, যা মনিবকে তার গোলামকে হত্যা করা, শাস্তি দেওয়া, অধীনস্থ করা ও বেড়ি পরিয়ে রাখার ব্যাপারে সাধারণ ও অবাধ অধিকার প্রদান করেছে; এই ক্ষেত্রে গোলাম কর্তৃক অভিযোগ পেশ করার কোনো অধিকার ছিল না এবং সেখানে এমন কোনো পক্ষ ছিল না, যারা এই অভিযোগের প্রতি দৃষ্টি দিবে অথবা তা স্বীকার করে নেবে; কারণ, দাস-দাসীগণ ছিল রোমানীয় আইন-কানুনের দৃষ্টিতে জীব- জানোয়ার বা জীব-জানোয়ারের চেয়ে অধম; ফলে মনিব তার কর্মকাণ্ডের কোনো প্রকার জবাবদিহিতার তোয়াক্কা না করেই তার সাথে খেয়াল-খুশি মত আচরণ করত; তারা মনে করত, গোলামের ব্যাপারে তাদেরকে আবার কিসের জিজ্ঞাসাবাদ !! … এ হচ্ছে ইসলাম পূর্ববর্তী সময়কার দাস- দাসীর অবস্থা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা; আমার পাঠক ভাই! অচিরেই আপনি এই ধরনের বর্বর নিষ্ঠুর আচরণের মধ্যে এবং ইসলামী শরীয়ত নির্দেশিত হৃদ্যতাপূর্ণ কোমল আচরণের মধ্যে একটা বড় ধরনের পার্থক্য দেখতে পাবেন। কারণ বলা হয়ে থাকে, ” ﻭ ﺑﻀﺪﻫﺎ ﺗﺘﻤﻴﺰ ﺍﻷﺷﻴﺎﺀ … ” অর্থাৎ- “বিপরীতটি দ্বারাই জিনিসসমূহের মধ্যকার শ্রেষ্ঠটি বেরিয়ে আসবে … ”। * * * দাসত্বের ব্যাপারে ইসলামের অবস্থান অল্প কিছুক্ষণ পূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি যে, ইসলামের আগমন ঘটেছে এমন অবস্থায় যে, দাসত্ব একটি আন্তর্জাতিক প্রথা, যা বিশ্বের সকল রাষ্ট্র ও জাতির নিকট স্বীকৃত; বরং দাসত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম এবং সামাজিকভাবে প্রচলিত জরুরি বিষয়, যাকে কোনো মানুষ অপছন্দ করত না এবং তা রদবদল করার সম্ভাব্যতার ব্যাপারে কেউ চিন্তাও করত না। আর পূর্বে আমরা আরও আলোচনা করেছি যে, ইসলামপূর্ব সময়ে বিশ্বের রাষ্ট্রসমূহে দাসত্বের উৎসধারা বা উৎপত্তিস্থলসমূহ ছিল বিভিন্ন প্রকৃতির, বিভিন্ন পদ্ধতির এবং ঐক্যবদ্ধ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সংবলিত !! এমতাবস্থায় ইসলাম কী করেছে? ইসলাম প্রাচীনকালের দাসত্বের উৎস্থলসমূহ থেকে একটি ব্যতীত বাকী সবগুলোকে বন্ধ করে দিয়েছে; আর সে একটি উৎস বন্ধ না করার কারণ হচ্ছে, এ উৎসটি বন্ধ করা তার আওতাধীন ছিল না; কারণ, সে সময়ে যুদ্ধবিগ্রহের ময়দানে আন্তর্জাতিকভাবে বহুল স্বীকৃত ছিল যুদ্ধের মাধ্যমে প্রাপ্ত দাসত্বের প্রথাটি। আর তাই যে উৎসটি ইসলামে অবশিষ্ট ছিল, তা হলো যুদ্ধের মাধ্যমে সংঘটিত দাসত্ব। এখন আমরা সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব: ‘কিতাবুশ্ শুবহাত’ ( ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺸﺒﻬﺎﺕ ) নামক গ্রন্থের লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী সেই সময় বহুল প্রচলিত ও প্রভাব বিস্তারকারী প্রথা ছিল, যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস- দাসী বানানো অথবা তাদেরকে হত্যা করা।[3] আর এই প্রথা ছিল খুবই প্রাচীন, যা ইতিহাসের অন্ধকার যুগেরে গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। তা প্রথম মানুষ পর্যন্ত প্রত্যাবর্তনের উপক্রম হতে পারে; কিন্তু তা মানবতার জন্য তার বিভিন্ন ধাপে নিত্য সঙ্গী হয়ে পড়ে। মানুষের এই পরিস্থিতিতে ইসলামের আগমন ঘটল এবং ইসলাম ও তার শত্রুগণের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হল; ফলে মুসলিম যুদ্ধবন্দীগণ ইসলামের শত্রুদের নিকট গোলাম বা দাসে পরিণত হলো, অতঃপর হরণ করা হলো তাদের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তি এমন দুঃখ-কষ্ট ও যুলুমের শিকার হতে লাগল, যে আচরণ ঐ সময় দাস-দাসীদের সাথে করা হত !! ইসলামের পক্ষে সেই সময় সম্ভব ছিল না যে, তার হাতে শত্রুদের মধ্য থেকে যারা যুদ্ধবন্দী হবে তাদেরকে সাধারণভাবে ছেড়ে দেওয়া; আর এটা সুন্দর রাজনৈতিক দর্শনও নয় যে, তুমি তোমার শত্রুকে তার যুদ্ধবন্দীদের ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে তোমার ব্যাপারে আরও উৎসাহিত করবে, যখন তোমার পরিবার, তোমার আত্মীয়-স্বজন ও তোমার দীন-ধর্মের অনুসারীগণ ঐসব শত্রুগণের নিকট লাঞ্ছনা, অপমান ও শাস্তির শিকার। এমতাবস্থায় সেখানে সমান নীতি অবলম্বন করাটাই অধিক ন্যায়সঙ্গত নিয়ম, যার প্রয়োগ শত্রুতা প্রতিরোধে সক্ষম হবে, বরং এটাই একমাত্র ও অনন্য নিয়ম। * * * আর ইসলামের দৃষ্টিতে যে যুদ্ধ যুদ্ধবন্দীদের দাস-দাসীতে পরিণত করাকে বৈধ করে দেয়, তা হলো শরী‘য়ত সম্মত যুদ্ধ; আর শরী‘য়ত সম্মত যুদ্ধ হলো সেই যুদ্ধ, যা নিম্নোক্ত মৌলিক শর্তের উপর ভিত্তি করে সংঘটিত হয়: ১. আল্লাহর পথে শত্রুর সাথে লড়াই হবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা’র কথাকে বাস্তবায়ন করার জন্য: তিনি বলেন: ﴿ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺀَﺍﻣَﻨُﻮﺍْ ﻳُﻘَٰﺘِﻠُﻮﻥَ ﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﭐﻟﻠَّﻪِۖ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ : ٧٦ ] “যারা মুমিন তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে।”[4] এর অর্থ হল: ইসলামে যুদ্ধের বিষয়টি বিজয় লাভের আকাঙ্খা, সুবিধা ভোগ করার লোভ এবং খ্যাতি ও সম্মান লাভের উদ্দেশ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়; আরও প্রতিষ্ঠিত নয় উপনেশবাদ ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যের উপর। যুদ্ধের এই বিষয়টি বিধিসম্মত করা হয় মূলত মানবজাতির হিদায়েত ও তাদেরকে সংশোধন করার জন্য, মানুষকে মানুষের গোলামী করা থেকে বের করে আল্লাহর ইবাদত করার দিকে নিয়ে আসার জন্য, দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে বের করে তার প্রশস্ততার পথ দেখানোর জন্য এবং (বাতিল) ধর্মসমূহের অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি থেকে বের করে ইসলামের ন্যায়পরায়ণতা ও ইনসাফের দিকে নিয়ে আসার জন্য। আল্লাহর পথে লড়াই হতে হবে নিম্নোক্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের অধীনে: (ক) মুসলিমদের পক্ষ থেকে আগ্রাসন প্রতিরোধ করার জন্য: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﻗَٰﺘِﻠُﻮﺍْ ﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﭐﻟﻠَّﻪِ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳُﻘَٰﺘِﻠُﻮﻧَﻜُﻢۡ ﻭَﻟَﺎ ﺗَﻌۡﺘَﺪُﻭٓﺍْۚ ﺇِﻥَّ ﭐﻟﻠَّﻪَ ﻟَﺎ ﻳُﺤِﺐُّ ﭐﻟۡﻤُﻌۡﺘَﺪِﻳﻦَ ١٩٠ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ : ١٩٠ ] “আর যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; কিন্তু সীমালংঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারীদেরকে ভালবাসেন না।”[5] (খ) বিদ্রোহী শক্তিকে ধ্বংস করার জন্য, যারা জোর জবরদস্তি করে মানুষকে তাদের দীনের ব্যাপারে ফিতনা বা বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﻗَٰﺘِﻠُﻮﻫُﻢۡ ﺣَﺘَّﻰٰ ﻟَﺎ ﺗَﻜُﻮﻥَ ﻓِﺘۡﻨَﺔٞ ﻭَﻳَﻜُﻮﻥَ ﭐﻟﺪِّﻳﻦُ ﻛُﻠُّﻪُۥ ﻟِﻠَّﻪِۚ ﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﻔﺎﻝ: ٣٩ ] “আর তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে থাকবে যতক্ষণ না ফেৎনা দুর হয় এবং দ্বীন পূর্ণরূপে আল্লাহর জন্য হয়ে যায়।”[6] (গ) তাগূতকে অপসারণ ও পথভ্রষ্ট স্বৈরাচারী শক্তিকে উৎখাত করার জন্য, যা ইসলামী দা‘ওয়াতের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং জনগণের নিকট যাতে তা না পৌঁছাতে পারে সে জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻛَﻔَﺮُﻭﺍْ ﻳُﻘَٰﺘِﻠُﻮﻥَ ﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﭐﻟﻄَّٰﻐُﻮﺕِ ﻓَﻘَٰﺘِﻠُﻮٓﺍْ ﺃَﻭۡﻟِﻴَﺎٓﺀَ ﭐﻟﺸَّﻴۡﻄَٰﻦِۖ ﺇِﻥَّ ﻛَﻴۡﺪَ ﭐﻟﺸَّﻴۡﻄَٰﻦِ ﻛَﺎﻥَ ﺿَﻌِﻴﻔًﺎ ٧٦ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ: ٧٦ ] “আর যারা কাফের, তারা তাগূতের পথে যুদ্ধ করে। কাজেই তোমরা শয়তানের বন্ধুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর; শয়তানের কৌশল অবশ্যই দুর্বল।”[7] (ঘ) চুক্তি সম্পাদন করার পর তা ভঙ্গ করার কারণে: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ ﻭَﺇِﻥ ﻧَّﻜَﺜُﻮٓﺍْ ﺃَﻳۡﻤَٰﻨَﻬُﻢ ﻣِّﻦۢ ﺑَﻌۡﺪِ ﻋَﻬۡﺪِﻫِﻢۡ ﻭَﻃَﻌَﻨُﻮﺍْ ﻓِﻲ ﺩِﻳﻨِﻜُﻢۡ ﻓَﻘَٰﺘِﻠُﻮٓﺍْ ﺃَﺋِﻤَّﺔَ ﭐﻟۡﻜُﻔۡﺮِ ﺇِﻧَّﻬُﻢۡ ﻟَﺎٓ ﺃَﻳۡﻤَٰﻦَ ﻟَﻬُﻢۡ ﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢۡ ﻳَﻨﺘَﻬُﻮﻥَ ١٢ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ: ١٢ ] “আর যদি তারা তাদের চুক্তির পর তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং তোমাদের দ্বীন সম্বন্ধে কটুক্তি করে, তবে কুফরের নেতাদের সাথে যুদ্ধ কর; এরা এমন লোক যাদের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই; যেন তারা নিবৃত্ত হয়।”[8] ২. মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য কোনো জাতির সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া বৈধ হবে না যতক্ষণ না তারা তাদেরকে সতর্ক করবে এবং তার নিকট তিনটি বিষয় পেশ করবে: (ক) ইসলাম; (খ) জিযিয়া; (গ) যুদ্ধ। – যদি তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে এবং সত্য দীনের অনুসরণ করে, তাহলে পরস্পরের মধ্যে কোনো প্রকার যুদ্ধ, ঝগড়া-বিবাদ ও শত্রুতা করার অবকাশ নেই; বরং তাদের অবস্থা মুসলিমগণের অবস্থার মত হয়ে যাবে; আমাদের জন্য যা থাকবে, তাদের জন্যও তাই থাকবে; আমাদের উপর যে দায়-দায়িত্ব থাকবে, তাদের উপরও সে দায়-দায়িত্ব থাকবে; তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) ও সৎ কাজের মানদণ্ড ব্যতীত একজনের উপর অন্য জনের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব থাকবে না। – আর তারা যদি ইসলামকে প্রত্যাখ্যান করে এবং ইসলামী শাসনের ছায়ায় থেকে তাদের আকিদা- বিশ্বাসকে লালন করতে চায়, তবে মুসলিমগণ কর্তৃক তাদের নিরাপত্তা বিধানের বিনিময়ে ‘জিযিয়া’ কর প্রদানের শর্তে কারও পক্ষ থেকে কোনো প্রকার চাপ অথবা জোর জবরদস্তি ছাড়াই তাদের জন্য এই ধরনের স্বাধীনতা থাকবে।[9] আর এই ব্যাপারটি বিস্তৃত হবে ইসলামে প্রবেশ করা এবং তাদের ধর্মকর্ম পালনের ক্ষেত্রে, যে ব্যাপারটিকে তাগিদ করে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলার বাণী: ﴿ ﻟَﺎٓ ﺇِﻛۡﺮَﺍﻩَ ﻓِﻲ ﭐﻟﺪِّﻳﻦِۖ ﻗَﺪ ﺗَّﺒَﻴَّﻦَ ﭐﻟﺮُّﺷۡﺪُ ﻣِﻦَ ﭐﻟۡﻐَﻲِّۚ ﴾ ‏[ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ: ٢٥٦ ] “দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জোর- জবরদস্তি নেই; সত্য পথ সুস্পষ্ট হয়েছে ভ্রান্ত পথ থেকে।”[10] ইসলামী বিশ্বে ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানগণ কর্তৃক তাদের ধর্মের উপর বর্তমান সময় পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকা এমন একটি অকাট্য দলিল যাতে কোনো বিতর্ক করার সুযোগ নেই যে, ইসলাম বল প্রয়োগ ও তরবারীর জোরে অন্যকে তা (ইসলাম) গ্রহণ করতে বাধ্য করেনি। আর এর পক্ষে ইউরোপীয় খ্রিষ্টান ‘স্যার আরনুলদ’ তার ‘আদ-দা‘ওয়াত ইলাল ইসলাম ( ﺍﻟﺪﻋﻮﺓ ﺇﻟﻰ ﺍﻹﺳﻼﻡ ) [ইসলামের দিকে আহ্বান] – নামক গ্রন্থের মধ্যে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। – আর যদি তারা ইসলাম গ্রহণ ও ‘জিযিয়া’ কর প্রদান করতে অস্বীকার করে, তাহলে তারা হবে অবাধ্য ও অপরাধী; বরং তারা ইসলামী দা‘ওয়াত জনগণের নিকট পৌঁছাবার রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিতে তৎপর ও সংকল্পবদ্ধ গোষ্ঠী। কেবল তখন, ও সে সময়ে তাদেরকে রাস্তা থেকে অপসারণ করার জন্য লড়াইয়ের পালা এসে যায়। কিন্তু তারা (মুসলিমগণ) তাদেরকে ‘জিযিয়া’ কর প্রদান অথবা রক্তপাত হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়ার সর্বশেষ সুযোগ দানের জন্য যুদ্ধের সতর্কবাণী উচ্চারণ না করা পর্যন্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় না। ৩. যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের মধ্যে যখন শত্রুগণ সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়বে, তখন মুসলিমগণের উচিৎ হবে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলার বাণী বাস্তবায়নের জন্য সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়া; তিনি বলেন: ﴿ ﻭَﺇِﻥ ﺟَﻨَﺤُﻮﺍْ ﻟِﻠﺴَّﻠۡﻢِ ﻓَﭑﺟۡﻨَﺢۡ ﻟَﻬَﺎ ﻭَﺗَﻮَﻛَّﻞۡ ﻋَﻠَﻰ ﭐﻟﻠَّﻪِۚ ﺇِﻧَّﻪُۥ ﻫُﻮَ ﭐﻟﺴَّﻤِﻴﻊُ ﭐﻟۡﻌَﻠِﻴﻢُ ٦١ ﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﻔﺎﻝ: ٦١ ] “আর তারা যদি সন্ধির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে আপনিও সন্ধির দিকে ঝুঁকবেন এবং আল্লাহ্র উপর নির্ভর করুন; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”[11] তবে শর্ত হলো ঐ সন্ধি বা শান্তিচুক্তি এমন না হওয়া, যাতে শত্রুর জন্য কল্যাণ রয়েছে এবং মুসলিমগণের জন্য ক্ষতিকারক। আর এগুলো হলো ইসলামের দৃষ্টিতে শর‘য়ী যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যাবলী এবং এগুলো হলো সেই যুদ্ধের সর্বোৎকৃষ্ট শর্তাবলী ও উদ্দেশ্য- লক্ষ্য। সুতরাং এসব শর‘ঈ বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে মুসলিম শাসকগণের পক্ষ থেকে যখন যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে, (যার বৈশিষ্ট্যগুলোর আলোচনা পূর্বে অতিবাহিত হয়েছে) আর যখন তারা (মুসলিমগণ) তাদের থেকে যুদ্ধাদেরকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটকাবে, তখন তাদেরকে তাদের (যুদ্ধবন্দীদের) সাথে আচার-আচরণের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়ে স্বাধীনতা দেওয়া হবে: ১. কোনো বিনিময় ছাড়াই তাদেরকে মুক্তি দিয়ে দেওয়া, আর এটা হলো অনুগ্রহ বা অনুকম্পা। ২. বিনিময় গ্রহণ করে তাদেরকে মুক্তি দিয়ে দেওয়া, আর এটা হলো মুক্তিপণ। ৩. হত্যা করা। ৪. দাস হিসেবে গ্রহণ করা। * অনুগ্রহ ও মুক্তিপণ (প্রথম দু’টি) গ্রহণের বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলার বাণীর কারণে, তিনি বলেছেন: ﴿ ﻓَﺈِﻣَّﺎ ﻣَﻨَّۢﺎ ﺑَﻌۡﺪُ ﻭَﺇِﻣَّﺎ ﻓِﺪَﺍٓﺀً ﺣَﺘَّﻰٰ ﺗَﻀَﻊَ ﭐﻟۡﺤَﺮۡﺏُ ﺃَﻭۡﺯَﺍﺭَﻫَﺎۚ ﴾ ‏[ ﻣﺤﻤﺪ: ٤ ] “তারপর হয় অনুকম্পা, নয় মুক্তিপণ। যতক্ষণ না যুদ্ধের ভার (অস্ত্র) নামিয়ে না ফেলে।”[12] * আর হত্যা করার বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার এই বাণীর কারণে, তিনি বলেছেন: ﴿ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻥَ ﻟِﻨَﺒِﻲٍّ ﺃَﻥ ﻳَﻜُﻮﻥَ ﻟَﻪُۥٓ ﺃَﺳۡﺮَﻯٰ ﺣَﺘَّﻰٰ ﻳُﺜۡﺨِﻦَ ﻓِﻲ ﭐﻟۡﺄَﺭۡﺽِۚ ﴾ ‏[ ﺍﻻﻧﻔﺎﻝ: ٦٧ ] “কোন নবীর জন্য সংগত নয় যে তার নিকট যুদ্ধবন্দী থাকবে, যতক্ষণ না তিনি যমীনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন।”[13] * আর দাস-দাসী বানানোর বিষয়টি সাব্যস্ত হয়েছে সুন্নাহ’র মধ্যে; নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কোনো যুদ্ধে নারী ও শিশুদেরকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যেমন তিনি বনু কুরাইযার যুদ্ধে নারী ও তাদের সন্তানদেরকে দাস-দাসীতে পরিণত করেছেন। আর এর উপর ভিত্তি করে মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতার জন্য সাধারণ ক্ষমতা থাকবে যে, সে পছন্দ বা নির্বাচন করবে: অনুকম্পা, অথবা মু