বছরের শ্রেষ্ঠ 10 দিনে করণীয় 10 আমল।


বছরের শ্রেষ্ঠ ১০ দিনে করণীয় ১০ আমলআল্লাহ তা‘আলা দয়ালু। তাই তিনি আপনবান্দাদের তওবার সুযোগ দিতেভালোবাসেন। তিনি চান বান্দারা ইবাদতেরমাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভ করুক। এ উদ্দেশ্যেতিনি আমাদের জন্য বছরে কিছু বরকতময় ওকল্যাণবাহী দিন রেখেছেন- যাতে আমলেরসওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়। আমরাপরীক্ষার দিনগুলোতে সর্বোচ্চ চেষ্টাচালাই সবচে ভালো ফলাফল অর্জন করারজন্য। তবে কেন আখেরাতের জন্য এসবপরীক্ষার দিনগুলোতেও সর্বাধিক প্রচেষ্টাব্যয় করব না? এ দিনগুলোতে আমল করা তোবছরের অন্যান্য দিনের তুলনায় অনেক বেশিনেকী ও কল্যাণ বয়ে আনে। এমন দিনগুলোরমধ্যে উল্লেখযোগ্য যিলহজ মাসের এই প্রথমদশদিন। এ দিনগুলো এমন রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামযেগুলোকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দিন বলেআখ্যায়িত করেছেন। তাতে আমলের প্রতিতিনি সবিশেষ উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ দিনগুলোরশ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে শুধু এতটুকুই যথেষ্ট যেআল্লাহ তা‘আলা এর কসম করেছেন।যে কারণে এই দশ দিন বছরের শ্রেষ্ঠ দশদিন১ . আল্লাহ তা‘আলা এর কসম করেছেন: আল্লাহ তা‘আলা যখন কোনো কিছুর কসমকরেন তা কেবল তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদাইপ্রমাণ করে। কারণ, মহা সত্তা শুধু মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয়েরই কসম করেন। আল্লাহতা‘আলা বলেন,‘কসম ভোরবেলার। কসম দশ রাতের।’ {সূরা আল-ফাজর, আয়াত : ১-২} আয়াতে ‘কসম দশরাতের’ বলে যিলহজের দশকের প্রতিই ইঙ্গিতকরা হয়েছে। এটিই সকল মুফাসসিরের মত।ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন,এ মতটিই সঠিক।২ এসবই সেই দিন আল্লাহ যাতে তাঁরজিকিরের প্রবর্তন করেছেন : আল্লাহ তা‘আবলেন, ‘যেন তারা নিজদের কল্যাণেরস্থানসমূহে হাযির হতে পারে এবং তিনিতাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যে রিজিকদিয়েছেন তার ওপর নির্দিষ্ট দিনসমূহেআল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।’ {সূরা আল-হজ, আয়াত : ২৮} জমহূর উলামার মতে, আয়াতেনির্দিষ্ট দিনসমূহ বলে যিলহজ মাসের প্রথমদশ দিনকে বুঝানো হয়েছে। এটিই ইবন উমর ওইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুমার মত।৩. রাসূলুল্লাহ দিনগুলোকে শ্রেষ্ঠ দিনবলে আখ্যায়িত করেছেন : যিলহজের এইদিনগুলোকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দিনবলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমন জাবিররাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,‘পৃথিবীর দিনগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠদিনগুলো হলো দশকের দিনসমূহ। অর্থাৎযিলহজের (প্রথম) দশদিন। জিজ্ঞেস করাহলো, আল্লাহর পথে জিহাদেও কি এর চেয়েউত্তম দিন নেই? তিনি বললেন, আল্লাহর পথেজিহাদেও এর চেয়ে উত্তম দিন নেই।হ্যা, কেবল সে-ই যে (জিহাদে) তারচেহারাকে মাটিতে মিশিয়েদিয়েছে।’ [মুসনাদ বাযযার : ১১২৮; মুসনাদআবী ই‘আলা : ২০৯০]৪. এই দিনগুলোর মধ্যে রয়েছে আরাফারদিন : আরাফার দিন হলো বড় হজের দিন।এটি ক্ষমা ও মাগফিরাতের দিন। জাহান্নামথেকে মুক্তি ও নাজাতের দিন। যিলহজের এইদশকে যদি ফযীলতের আর কিছু না থাকত তবেএ দিবসটিই তার মর্যাদার জন্য যথেষ্ট হত। এদিনের ফযীলত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,‘আরাফা দিবসই হজ’। [তিরমিযী : ৮৯৩;নাসায়ী : ৩০১৬]৫. এতে রয়েছে কুরবানীর দিন : কোনোকোনো আলিমের মতে কুরবানীর দিনটিবছরের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন। রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদকরেন,‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ দিনহলো কুরবানীর দিন অতপর স্থিরতার দিন’।(অর্থাৎ কুরবানীর পরবর্তী দিন। কারণ,যেদিন মানুষ কুরবানী ইত্যাদির দায়িত্বপালন শেষ করে সুস্থির হয়।) [নাসায়ী :১০৫১২; ইবন খুযাইমা, সহীহ : ২৮৬৬]৬. এ দিনগুলোতে মৌলিক ইবাদতগুলোরসমাবেশ ঘটে :হাফেয ইবন হাজর রহিমাহুল্লাহ তদীয় ফাতহুলবারী গ্রন্থে বলেন,‘যিলহজের দশকেরবৈশিষ্ট্যের কারণ যা প্রতীয়মান হয় তাহলো, এতে সকল মৌলিক ইবাদতের সন্নিবেশঘটে। যথা : সালাত, সিয়াম, সাদাকা, হজইত্যাদি। অন্য কোনো দিন এতগুলো ইবাদতেরসমাবেশ ঘটে না।’ [ফাতহুল বারী : ২/৪৬০]এই দশটি দিনের আমল আল্লাহর কাছেঅধিক প্রিয়ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকেবর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘এমন কোনো দিননেই যার আমল যিলহজ মাসের এই দশ দিনেরআমল থেকে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।সাহাবায়ে কিরাম বললেন, হে আল্লাহররাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদওনয়? রাসূলুল্লাহ বললেন, আল্লাহর পথেজিহাদও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান-মালনিয়ে আল্লাহর পথে যুদ্ধে বের হল এবং এরকোনো কিছু নিয়েই ফেরত এলো না (তারকথা ভিন্ন)।’ [বুখারী : ৯৬৯; আবূ দাউদ : ২৪৪০;তিরমিযী : ৭৫৭]আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকেবর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেন,‘ এ দশ দিনে নেক আমলকরার চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ওমহান কোন আমল নেই। তাই তোমরা এ সময়েতাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর(আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি করে পড়।’ [মুসনাদআমহদ : ১৩২; বাইহাকী, শুআবুল ঈমান : ৩৪৭৪;মুসনাদ আবী আওয়ানা : ৩০২৪]অন্য বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যিলহজের(প্রথম) দশদিনের মতো আল্লাহর কাছেউত্তম কোনো দিন নেই। সাহাবীরাবললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহর পথেজিহাদেও কি এর চেয়ে উত্তম দিননেই? তিনি বললেন, হ্যা, কেবল সে-ই যে(জিহাদে) তার চেহারাকে মাটিতে মিশিয়েদিয়েছে।’ [সহীহুত তারগীব ওয়াত তারহীব :২/১৫; মুসনাদ আবী আওয়ানা : ৩০২৩]এ হাদীসগুলোর মর্ম হল, বছরে যতগুলোমর্যাদাপূর্ণ দিন আছে তার মধ্যে এ দশদিনের প্রতিটি দিনই সর্বোত্তম।রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম এ দিনসমূহে নেক আমল করারজন্য তাঁর উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। তাঁরএ উৎসাহ প্রদান এ সময়টার ফযীলত প্রমাণকরে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম এ দিনগুলোতে বেশি বেশি করেতাহলীল ও তাকবীর পাঠ করতে নির্দেশদিয়েছেন। যেমন ওপরে ইবন উমররাদিআল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে উল্লেখহয়েছে।ইবন রজব রহিমাহুল্লাহ বলেন, উপরোক্তহাদীসগুলো থেকে বুঝা যায়, নেক আমলেরমৌসুম হিসেবে যিলহজ মাসের প্রথম দশক হলসর্বোত্তম, এ দিবসগুলোয় সম্পাদিত নেক আমলআল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। হাদীসেরকোনো কোনো বর্ণনায় ﺃَﺣَﺐُّ (‘আহাব্বু’তথাসর্বাধিক প্রিয়) শব্দ এসেছে আবার কোনোকোনো বর্ণনায় ﺃَﻓْﻀَﻞُ (‘আফযালু’ তথাসর্বোত্তম) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। অতএব এ সময়েনেক আমল করা বছরের অন্য যে কোনো সময়েনেক আমল করার থেকে বেশি মর্যাদা ওফযীলতপূর্ণ। এজন্য উম্মতের অগ্রবর্তীপুণ্যবান মুসলিমগণ এ সময়গুলোতে অধিকহারেইবাদতে মনোনিবেশ করতেন। যেমন আবূছিমান নাহদী বলেন,‘তাঁরা অর্থাৎ সালাফ তথা পূর্বসূরীগণদিনটি দশককে অনেক বেশি মর্যাদাবানজ্ঞান করতেন : রমযানের শেষ দশক,যিলহজের প্রথম দশক এবং মুহাররমের প্রথমদশক।’এই সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগানোর ১০টিউপায়প্রতিটি মুসলিমের উচিত ইবাদতেরমৌসুমগুলোকে সুন্দর প্রস্তুতির মাধ্যমেস্বাগত জানানো। যিলহজ মাসকে আমরাস্বাগত জানাতে পারি নিচের কাজগুলোরমধ্য দিয়ে : এ দশ দিন যে আমলগুলো বেশিবেশি করা উচিতঃ১. এই দশটি দিন কাজে লাগাতে দৃঢ়সংকল্প গ্রহণ করা :শুরুতেই যা করা সবার উচিত তা হল, এইদিনগুলোকে পুণ্যময় কাজ ও কথায় সুশোভিতকরার দৃঢ় প্রত্যয় গ্রহণ করা। যে ব্যক্তিকোনো কাজের সংকল্প করে আল্লাহ তাকেসাহায্য করেন। তার জন্য সাহায্যকারী উপায়ও উপকরণ প্রস্তুত করে দেন। যে আল্লাহরসঙ্গে সত্যবাদিতা দেখায় আল্লাহ তাকেসততা ও সফলতায় ভূষিত করেন। আল্লাহতা‘আলা বলেন, ‘আর যারা আমার পথেসর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকেআমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব।আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেইআছেন।’ {সূরা আল-আ‘নকাবূত, আয়াত : ৬৯}২. হজ ও উমরা সম্পাদন করা : হজ ও উমরা এদুটি হলো এ দশকের সর্বশ্রেষ্ঠ আমল। যারা এদিনগুলোতে হজ আদায়ের সুযোগ পেয়েছেনতারা যে অনেক ভাগ্যবান তাতে কোনোসন্দেহ নেই। আল্লাহ যাকে তাঁর নির্দেশিতএবং রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পন্থায় হজবা উমরা করার তাওফীক দান করেন তারপুরস্কার শুধুই জান্নাত। কারণ, আবূ হুরায়রারাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন,‘এক উমরা থেকে আরেক উমরাএতদুভয়ের মাঝের গুনাহগুলোর কাফফারাএবং মাবরূর হজের প্রতিদান কেবলইজান্নাত।’[বুখারী : ১৭৭৩; মুসলিম : ৩৩৫৫]আর মাবরূর হজ সেটি যা পরিপূর্ণভাবেসম্পাদিত হয় রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিতপন্থায়। যাতে কোনো রিয়া বা লোকদেখানো কিংবা সুনাম বা মানুষের প্রশংসাকুড়ানোর মানসিকতা নেই। নেই কোনোঅশ্লীলতা বা পাপাচারের স্পর্শ। যাকেবেষ্টন করে থাকে নেক কাজ ও পুণ্যময় আমল।৩. সিয়াম পালন করা : মুসলমানের জন্য উচিতহবে যিলহজ মাসের এই মুবারক দিনগুলোতেযত বেশি সম্ভব সিয়াম পালন করা। সাওমআল্লাহর অতি প্রিয় আমল। হাদীসে কুদসীতেসিয়ামকে আল্লাহ নিজের সঙ্গে সম্পৃক্তকরেছেন। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহুথেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহবলেছেন, সিয়াম ছাড়া আদম সন্তানেরপ্রতিটি কাজই তার নিজের জন্য; শুধুসিয়াম ছাড়া। কারণ, তা আমার জন্য। তাইআমিই এর প্রতিদান দেব। সিয়াম ঢালস্বরূপ।’[বুখারী : ১৯০৪; মুসলিম : ২৭৬২]সাওম যে এক বড় মর্যাদাসম্পন্ন ও আল্লাহরকাছে প্রিয় আমল তা আমরা অনুধাবন করতেপারি আমরাএ হাদীস থেকে। তবে রাসূলুল্লাহরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম আরাফার দিনের সাওমের প্রতিবিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন এবং এরমর্যাদা বর্ণনা করেছেন। আবূ কাতাদারাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আরাফার দিনের সাওমআল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিগত ও আগতবছরের গুনাহের কাফফারা হিসেবে গ্রহণকরে থাকেন।’ [মুসলিম : ১১৬৩]এ হাদীসের ভিত্তিতে যিলহজের নয় তারিখসাওম পালন করা সুন্নত। ইমাম নববীরহিমাহুল্লাহ বলেন, এসব দিনে সাওম পালনকরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুস্তাহাব। কোনোকোনো দেশের সাধারণ মানুষ, বিশেষ করেমহিলাদের মাঝে একটি ধারণা প্রচলিতআছে যে, যিলহজ মাসের সাত, আট ও নয়তারিখে সাওম পালন করা সুন্নত। কিন্তুসাওমের জন্য এ তিন দিনকে নির্দিষ্ট করারকোনো প্রমাণ বা ভিত্তি নেই। যিলহজের ১থেকে ৯ তারিখে যে কোনো দিন বা পূর্ণ নয়দিন সাওম পালন করা যেতে পারে।৪. সালাত কায়েম করা : সালাত অন্যতমগুরুত্বপূর্ণ, সম্মানীত ও মর্যাবান আমল। তাই এদিনগুলোতে আমাদের সবার চেষ্টা করাউচিত ফরয সালাতগুলো জামাতে আদায়করতে। আরও চেষ্টা করা দরকার বেশি বেশিনফল সালাত আদায় করতে। কারণ, নফলসালাতের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সবচেবেশি নৈকট্য হাসিল করে। আবূ হুরাইরারাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনিবলেন, রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমারকোনো অলির সঙ্গে শত্রুতা রাখে, আমি তারসাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার বান্দা ফরযইবাদতের চাইতে আমার কাছে অধিক প্রিয়কোনো ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভকরতে পারে না। আমার বান্দা নফল ইবাদতদ্বারাই সর্বদা আমার নৈকট্য অর্জন করতেথাকে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমারএমন প্রিয়পাত্র বানিয়ে নেই যে,আমি তারকান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমি তারচোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আরআমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে।আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে।সে আমার কাছে কোনো কিছু চাইলে আমিঅবশ্যই তাকে তা দান করি। আর যদি সেআমার কাছে আশ্রয় চায় আমি তাকে অবশ্যইআশ্রয় দেই। আমি যে কোনো কাজ করতেচাইলে তাতে কোনো রকম দ্বিধা-সংকোচকরি না, যতটা দ্বিধা-সংকোচ করি মুমিনবান্দার প্রাণহরণে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করেথাকে অথচ আমি তার বেঁচে থাকাকে অপছন্দকরি।’ [বুখারী : ৬৫০২]৫. দান-সাদাকা করা : এ দিনগুলোতে যেআমলগুলো বেশি বেশি দরকার তার মধ্যেঅন্যতম হলো সাদাকা। আল্লাহ তা‘আলামানুষকে সাদাকা দিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।ইরশাদ হয়েছে : ‘হে মুমিনগণ, আমিতোমাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা হতেব্যয় কর, সে দিন আসার পূর্বে, যে দিনথাকবে না কোনো বেচাকেনা, নাকোনো বন্ধুত্ব এবং না কোনো সুপারিশ।আর কাফিররাই যালিম।’ {সূরা আল-বাকারা,আয়াত : ২৫৪}আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকেবর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেন,‘সাদাকা সম্পদকে কমায়না, ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার মর্যাদাবৃদ্ধি করেন এবং কেউ আল্লাহর জন্য বিনয়ীহলে আল্লাহ তাকে উঁচু করেন।’ [মুসলিম :৬৭৫৭]৬. তাকবীর, তাহমীদ ও তাসবীহ পড়া : এসবদিনে তাকবীর (আল্লাহু আকবার), তাহমীদ(আলহামদু লিল্লাহ), তাহলীল (লা ইলাহাইল্লাল্লাহ) ও তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ) পড়াসুন্নত। এ দিনগুলোয় যিকর-আযকারের বিশেষগুরুত্ব রয়েছে, হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহইবন উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকেবর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এ দশ দিনে নেক আমলকরার চেয়ে আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ওমহান কোনো আমল নেই। তাই তোমরা এসময়ে তাহলীল (লা-ইলাহাইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ওতাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশিকরে পড়।’ [বাইহাকী, শুআবুল ঈমান : ৩৪৭৪;মুসনাদ আবী আওয়ানা : ৩০২৪]তাকবীরের শব্দগুলো নিম্নরূপ : (আল্লাহুআকবার, আল্লাহু আকবার লা ইলাহাইল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিলহামদ।) উল্লেখ্য, বর্তমানে তাকবীর হয়েপড়েছে একটি পরিত্যাক্ত ও বিলুপ্তপ্রায়সুন্নত। আমাদের সকলের কর্তব্য এ সুন্নতেরপুনর্জীবনের লক্ষ্যে এ সংক্রান্ত ব্যাপকপ্রচারণা চালানো। হাদীসে উল্লিখিতহয়েছে,‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নতসমূহ থেকে একটিসুন্নত পুনর্জীবিত করল, যা আমার পর বিলুপ্তহয়ে গিয়েছে, তাকে সে পরিমাণ সওয়াবদেওয়া হবে, যে পরিমাণ তার ওপর (সেসুন্নতের ওপর) আমল করা হয়েছে। এতে(আমলকারীদের) সওয়াব হতে বিন্দুমাত্রকমানো হবে না।’ [তিরমিযী : ৬৭৭]যিলহজ মাসের সূচনা থেকে আইয়ামেতাশরীক শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ তাকবীরপাঠ করা সকলের জন্য ব্যাপকভাবেমুস্তাহাব। তবে বিশেষভাবে আরাফাদিবসের ফজরের পর থেকে মিনার দিনগুলোরশেষ পর্যন্ত অর্থাৎ যেদিন মিনায় পাথরনিক্ষেপ শেষ করবে সেদিন আসর পর্যন্তপ্রত্যেক সালাতের পর এ তাকবীর পাঠ করারজন্য বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আবদুল্লাহইবন মাসঊদ ও আলী রাদিআল্লাহু আনহুমাথেকে এ মতটি বর্ণিত। ইবন তাইমিয়া রহ.একে সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত বলেছেন।উল্লেখ্য, যদি কোনো ব্যক্তি ইহরামবাঁধে, তবে সে তালবিয়ার সাথে মাঝেমাঝে তকবীরও পাঠ করবে। হাদীস দ্বারা এবিষয়টি প্রমাণিত। [ইবন তাইমিয়াহ,মজমু‘ ফাতাওয়া : ২৪/২২০]৭. পশু কুরবানী করা : এ দিনগুলোর দশম দিনসামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কুরবানী করাসুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। আল্লাহ রাব্বুলআলামীন তাঁর নবীকে কুরবানী করতেনির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আপনিআপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাতআদায় করুন ও কুরবানী করুন।’ {সূরা আল-কাউসার, আয়াত : ০২}এই দশদিনের অন্যতম সেরা প্রিয় আমল হলোকুরবানী। কুরবানীর পশু জবাই ও গরিবদেরমধ্যে এর গোশত বিতরণের মাধ্যমে আল্লাহরবিশেষ নৈকট্য লাভ হয়। এর দ্বারা গরিবদেরপ্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ পায় এবং তাদেরকল্যাণ সাধন হয়।৮. গুনাহ থেকে দূরত্ব অবলম্বন করা : সৎকর্মের মাধ্যমে যেমন আল্লাহর নৈকট্যঅর্জিত হয়, গুনাহের কাজের মাধ্যমে তেমনআল্লাহ থেকে আল্লাহর রহমত ও করুণা থেকেদূরত্ব সৃষ্টি হয়। মানুষ তার নিজের করাঅপরাধের কারণে কখনো আল্লাহর রহমতথেকে বঞ্চিত হয়। তাই আমরা যদি অপরাধমার্জনা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তিরপ্রত্যাশী হই, তাহলে এ দিনগুলোতে এবং এরশিক্ষা কাজে লাগিয়ে বছরের অন্যদিনগুলোতে গুনাহ পরিত্যাগ করতে হবে। কেউযখন জানতে পারেন কী বড় অর্জনই না তারজন্য অপেক্ষা করছে, তার জন্য কিন্তু যেকোনো কষ্ট সহ্য করা সহজ হয়ে যায়।৯. একনিষ্ঠ মনে তওবা : তওবার অর্থপ্রত্যাবর্তন করা বা ফিরে আসা। যে সব কথাও কাজ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অপছন্দকরেন তা বর্জন করে যেসব কথা ও কাজতিনি পছন্দ করেন তার দিকে ফিরে আসা।সাথে সাথে অতীতে এ ধরনের কাজে লিপ্তহওয়ার কারণে অন্তর থেকে অনুতাপ ওঅনুশোচনা ব্যক্ত করা। যিলহজের শুভাগমনেরআগে সবচে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার এতওবা তথা সকল গুনাহ থেকে ফিরে আসারপ্রতি। স্বার্থক তওবা সেটি যার মধ্যেতিনটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। যথা- প্রথম.গুনাহটি সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা। দ্বিতীয়.গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। এবং তৃতীয়. এইগুনাহটি ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করা।”বাস্তবেই এটি তওবার সুবর্ণ সময়। দয়াময়খোদা এ সময় বেশি বেশি তওবার তাওফীকদেন এবং অধিক পরিমাণে বান্দার তওবাকবুল করেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘তবে যেতাওবা করেছিল, ঈমান এনেছিল এবংসৎকর্ম করেছিল, আশা করা যায় সেসাফল্য অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্তহবে।’ (কাসাস : ৬৭)”তিনি আরও ইরশাদ করেন, ‘বল, ‘হে আমারবান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়িকরেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকেনিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনিক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ {যুমার : ৫৩}অতএব হে মুসলিম ভাই ও বোন, আপনি এদিনগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতেসচেষ্ট হোন। সময় চলে যাওয়ার পর আফসোসনা করতে চাইলে যিলহজ মাস আসার আগেইএতে অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নিন।অন্য সাধারণ আমল বেশি বেশি করা :উপরে যে নেক আমলগুলোর কথা উল্লেখ করাহলো এসব ছাড়াও কিছু নেক আমল আছেযেগুলো দিনগুলোতে বেশি করা যায়ঃযেমন : কুরআন তেলাওয়াত, জিকির, দু‘আ, দান-সাদাকা,পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচার, আত্মীয়তার হকআদায় করা, মা-বাবার সখী-সখার প্রতিশ্রদ্ধা দেখানো,সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা,সালামের প্রচার ঘটানো,মানুষকে খাবার খাওয়ানো, প্রতিবেশিদেরপ্রতি সদয় আচরণ করা, মেহমানকে সম্মানকরা,পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা,অন্যকে কষ্ট না দেওয়া,অপর ভাইয়ের প্রয়োজন পুরা করা,অসাক্ষাতে অন্য ভাইয়ের জন্য দু‘আ করা,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ পড়া, পরিবার ওসন্তানদের জন্য অর্থ ব্যয় করা,আরও যেসকল আমল করতে পারেন সেগুলো হল;অধিনস্তদের প্রতি সদয় হওয়া,ওয়াদা ও আমানত রক্ষা করা, হারাম জিনিসথেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়া,সালাতগুলোর পরে আল্লাহর জিকিরকরা, সুন্দরভাবে অযূ করা, আযান ও ইকামতেরমাঝখানে দু‘আ করা,জুমাবারে সূরাতুল কাহফ পড়া, মসজিদে গমনকরা, সুন্নত সালাতগুলো দায়িত্বশীলতারসঙ্গে আদায় করা,ঈদগাহে গিয়ে ঈদুল আযহার সালাত আদায়করা, হালাল উপার্জন করা,মুসলিম ভাইদের আনন্দ দেওয়া, দুর্বলদেরপ্রতি দয়ার্দ্র হওয়া, কৃপণতা পরিহার করা,ভালো কাজে পথ দেখানো, ছেলে-মেয়েদের ‌সুশিক্ষা দেওয়া, কল্যাণকাজেমানুষকে সহযোগিতা করা ইত্যাদি।এসবের প্রতিটিই ঈমান ও আল্লাহর মুহাব্বতবৃদ্ধি করে ফলে আল্লাহও তাকে বেশিভালোবাসেন। এসবই একজন মুমিনের চরিত্রমাধুরীর অংশ। এসবের মাধ্যমে একজন মানুষপ্রকৃত মানুষে পরিণত হয়। আল্লাহ এসবেরমাধ্যমে দান করেন আত্মিক প্রশান্তি-প্রতিটি আল্লাহ-ভোলা মানুষই যার শূন্যতায়ভোগে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকেসেসব ব্যক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন যারা এইসুবর্ণ সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার করে।আমীন।——————————————————————–মূল :যিলহজের প্রথম দশক : ফযীলত ও আমললেখক : আলী হাসান তৈয়বসম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া