মানুষের উপর জ্বিনের আছর! কারণ, প্রতিকার সুরক্ষার উপায়!


মানুষের উপর জিনের আছর : কারণ, প্রতিকার
ও সুরক্ষার উপায়
Jinn
প্রথম কথা
একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে বসা ছিলাম। তার
স্ত্রীও একজন ভাল ডাক্তার। উভয়ে ধর্মপ্রাণ। হজ
করেছেন এক সাথেই। দুটো মেয়েকেই
তানজীমুল উম্মাহ মাদরাসাতে ভর্তি করিয়েছেন।
আমাকে বললেন, তানজীমুল উম্মাহ মাদরাসা আরবী
মিডিয়ামের স্কলাস্টিকা তাই না? আমি বললাম, হ্যা। উদ্দেশ্য
তার উৎসাহকে স্বাগত জানানো।
মানে তারা দুটো সন্তানকেই মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে
গর্ববোধ করেন। কতখানি ধর্মপ্রাণ হলে এমন হতে
পারে তা আপনার ভেবে দেখার বিষয় বটে।
রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে আমার সাথে গল্প
করছেন। শুধু আমার সাথেই নয়। আলেম-উলামাদের
কাউকে কাছে পেলে আন্তরিকতার সাথেই আলাপ
করেন। জানতে চান। জানাতে চান।
একজন মহিলা আসল, সাথে তার মেয়ে। সে
রোগের বিবরণ দিয়ে বলল, কয়েকদিন আগে
ওকে জিনে আছর করেছিল। ওঝা-ফকিরেরা জিন
তাড়িয়েছে।
এ কথা শুনে ডাক্তার সাহেব রেগে গেলেন।
বললেন, কিসের জিন? জিন বলতে কিছু আছে নাকি?
জিন আবার মানুষকে ধরে নাকি? যত সব অন্ধ বিশ্বাস!
জিন-ভূত বলতে কোন কিছু নেই। জিনে মানুষ
ধরে না। মানুষকে আছর করে না। এটা মানসিক
রোগ দ্বারা সৃষ্ট একটি কল্পনা। এ কল্পনার কারণে
সৃষ্টি হয়েছে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা।
তার আবেগ কমে গেলে আমি তাকে এ বিষয়টি
বুঝাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু এতে তার কোন
আগ্রহ দেখলাম না। আমি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা
করতে চাইলেই সে অন্য প্রসঙ্গের অবতারণা
করে। আমি বুঝলাম, এ বিষয়ে আলোচনা তার পছন্দ
নয়। সে যা বুঝেছে, সেটাকেই সে চুরান্ত বলে
বিশ্বাস করে নিয়েছে। বিশ্বাসটা যে সংশোধন করার
প্রয়োজন এটা তিনি বুঝতে চাচ্ছেন না।
আসলে কি জিন আছে? জিন কী? ইসলাম কী
বলে? জিনদের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করা ইসলামে
কতখানি গ্রহণযোগ্য? জিন কি মানুষকে আছর করে?
এ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী? এ
বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব এ
এখানে।
যে সকল বিষয় এখানে আলোচনা করব
সেগুলো হল:
এক. জিনের পরিচয়
দুই. জিনের প্রকার
তিন. জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস ঈমানের দাবি
চার. জিন কি মানুষকে আছর করে?
পাঁচ. জিন ও ভূতের মধ্যে পার্থক্য
ছয়. মানসিক রোগী আর জিনে-ধরা রোগীর
মধ্যে পার্থক্য
সাত. কি কারণে জিন চড়াও হয়?
আট. জিনের আছরের প্রকারভেদ
নয়. জিনের আছর থেকে বাঁচতে হলে যা করতে
হবে
দশ. জিনের আছরের চিকিৎসা
এগার. জিনের অধিকার রক্ষায় আমাদের করণীয়
জিনের পরিচয়
জিন আল্লাহ তাআলার একটি সৃষ্টি। যেমন তিনি
ফেরেশ্তা, মানুষ সৃষ্টি করেছেন তেমনি সৃষ্টি
করেছেন জিন। তাদের বিবেক, বুদ্ধি, অনুভূতি শক্তি
রয়েছে। তাদের আছে ভাল ও মন্দের মধ্যে
পার্থক্য করার ক্ষমতা। তাদের মধ্যে আছে ভাল জিন
ও মন্দ জিন। আল কুরআনে জিনদের বক্তব্য
উল্লেখ করে বলা হয়েছে:
ﻭَﺃَﻧَّﺎ ﻣِﻨَّﺎ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤُﻮﻥَ ﻭَﻣِﻨَّﺎ ﺩُﻭﻥَ ﺫَﻟِﻚَ ﻛُﻨَّﺎ ﻃَﺮَﺍﺋِﻖَ ﻗِﺪَﺩًﺍ
আর নিশ্চয় আমাদের কতিপয় সৎকর্মশীল এবং
কতিপয় এর ব্যতিক্রম। আমরা ছিলাম বিভিন্ন মত ও পথে
বিভক্ত। (সূরা আল জিন : ১১)
এ গোষ্ঠির নাম জিন রাখা হয়েছে, কারণ জিন
শব্দের অর্থ গোপন। আরবী জিন শব্দ থেকে
ইজতিনান এর অর্থ হল ইসতেতার বা গোপন হওয়া।
যেমন আল কুরআনে আল্লাহ বলেছেন :
ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺟَﻦَّ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞُ
অতঃপর যখন রাত তার উপর আচ্ছন্ন হল … (সূরা আল
আনআম : ৭৬)
এখানে জান্না অর্থ হল, আচ্ছন হওয়া, ঢেকে যাওয়া,
গোপন হওয়া।
তারা মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপন থাকে বলেই
তাদের নাম রাখা হয়েছে জিন। যেমন আল্লাহ রাব্বুল
আলামীন বলেন:
ﺇِﻧَّﻪُ ﻳَﺮَﺍﻛُﻢْ ﻫُﻮَ ﻭَﻗَﺒِﻴﻠُﻪُ ﻣِﻦْ ﺣَﻴْﺚُ ﻟَﺎ ﺗَﺮَﻭْﻧَﻬُﻢْ
নিশ্চয় সে ও তার দলবল তোমাদেরকে দেখে
যেখানে তোমরা তাদেরকে দেখ না। (সূরা আল
আরাফ : ২৭)
জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন দিয়ে। মহান
সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ বলেন:
ﻭَﺍﻟْﺠَﺎﻥَّ ﺧَﻠَﻘْﻨَﺎﻩُ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞُ ﻣِﻦْ ﻧَﺎﺭِ ﺍﻟﺴَّﻤُﻮﻡِ
আর ইতঃপূর্বে জিনকে সৃষ্টি করেছি উত্তপ্ত
অগ্নিশিখা থেকে। (সূরা আল হিজর : ২৭)
এ আয়াত দ্বারা আমরা আরো জানতে পারলাম যে,
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষ সৃষ্টি করার পূর্বে জিন
সৃষ্টি করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:
ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺧَﻠَﻘْﻨَﺎ ﺍﻟْﺈِﻧْﺴَﺎﻥَ ﻣِﻦْ ﺻَﻠْﺼَﺎﻝٍ ﻣِﻦْ ﺣَﻤَﺈٍ ﻣَﺴْﻨُﻮﻥٍ ﴿
26 ﴾ ﻭَﺍﻟْﺠَﺎﻥَّ ﺧَﻠَﻘْﻨَﺎﻩُ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞُ ﻣِﻦْ ﻧَﺎﺭِ ﺍﻟﺴَّﻤُﻮﻡِ ﴿27 ﴾
আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুকনো
ঠনঠনে, কালচে কাদামাটি থেকে। আর এর পূর্বে
জিনকে সৃষ্টি করেছি উত্তপ্ত অগ্নিশিখা থেকে।
(সূরা আল হিজর : ২৬-২৭)
আল্লাহ তাআলা যে উদ্দেশ্যে মানুষ সৃষ্টি
করেছেন সে-ই উদ্দেশ্যেই জিনকে সৃষ্টি
করেছিলেন। তিনি বলেন:
ﻭَﻣَﺎ ﺧَﻠَﻘْﺖُ ﺍﻟْﺠِﻦَّ ﻭَﺍﻟْﺈِﻧْﺲَ ﺇِﻟَّﺎ ﻟِﻴَﻌْﺒُﺪُﻭﻥِ
আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি
যে, তারা আমার ইবাদাত করবে। (সূরা আয যারিয়াত : ৫৬)
জিনদের কাছেও তিনি নবী ও রাসূল প্রেরণ
করেছিলেন। তিনি বলেন:
ﻳَﺎ ﻣَﻌْﺸَﺮَ ﺍﻟْﺠِﻦِّ ﻭَﺍﻟْﺈِﻧْﺲِ ﺃَﻟَﻢْ ﻳَﺄْﺗِﻜُﻢْ ﺭُﺳُﻞٌ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻳَﻘُﺼُّﻮﻥَ
ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﺁَﻳَﺎﺗِﻲ ﻭَﻳُﻨْﺬِﺭُﻭﻧَﻜُﻢْ ﻟِﻘَﺎﺀَ ﻳَﻮْﻣِﻜُﻢْ ﻫَﺬَﺍ ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﺷَﻬِﺪْﻧَﺎ
ﻋَﻠَﻰ ﺃَﻧْﻔُﺴِﻨَﺎ ﻭَﻏَﺮَّﺗْﻬُﻢُ ﺍﻟْﺤَﻴَﺎﺓُ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﻭَﺷَﻬِﺪُﻭﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﻧْﻔُﺴِﻬِﻢْ
ﺃَﻧَّﻬُﻢْ ﻛَﺎﻧُﻮﺍ ﻛَﺎﻓِﺮِﻳﻦَ
হে জিন ও মানুষের দল, তোমাদের মধ্য থেকে
কি তোমাদের নিকট রাসূলগণ আসেনি, যারা
তোমাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ বর্ণনা করত এবং
তোমাদের এই দিনের সাক্ষাতের ব্যাপারে
তোমাদেরকে সতর্ক করত? তারা বলবে, আমরা
আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলাম। আর দুনিয়ার জীবন
তাদেরকে প্রতারিত করেছে এবং তারা নিজেদের
বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, তারা ছিল কাফির। (সূরা
আল আনআম : ১৩০)
এ আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, বিচার দিবসে
মানুষের যেমন বিচার হবে তেমনি জিন জাতিকেও
বিচার ও জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে।
তারা বিবিধ রূপ ধারণ করতে পারে বলে হাদীসে
এসেছে। এমনিভাবে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য
স্থানে যেতে পারে বলে আল কুরআনের সূরা
আন নামলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসমানী কিতাবে যারা বিশ্বাসী-ইহুদী, খৃষ্টান ও
মুসলমান- তারা সকলে জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস
করে। তারা কেউ জিনের অস্তিত্ব অস্বীকার
করে না। পৌত্তলিক, কতিপয় দার্শনিক, বস্তুবাদী
গবেষকরা জিনের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না।
দার্শনিকদের একটি দল বলে থাকে, ফেরেশ্তা ও
জিন রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়। সুন্দর চরিত্রকে
ফেরেশ্তা আর খারাপ চরিত্রকে জিন বা শয়তান শব্দ
দিয়ে বুঝানো হয়। অবশ্য তাদের এ বক্তব্য
কুরআন ও সুন্নাহর সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
জিন তিন প্রকার
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সম্পর্কে
বলেছেন :
ﺍﻟﺠﻦ ﺛﻼﺛﺔ ﺃﺻﻨﺎﻑ : ﺻﻨﻒ ﻳﻄﻴﺮ ﻓﻲ ﺍﻟﻬﻮﺍﺀ، ﻭﺻﻨﻒ
ﺣﻴﺎﺕ ﻭﻛﻼﺏ، ﻭﺻﻨﻒ ﻳﺤﻠﻮﻥ ﻭﻳﻈﻌﻨﻮﻥ ‏) . ﺭﻭﺍﻩ
ﺍﻟﻄﺒﺮﺍﻧﻲ، ﻭﺍﺑﻦ ﺣﺒﺎﻥ ﻭﺍﻟﺤﺎﻛﻢ ﺃﻧﻈﺮ ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺠﺎﻣﻊ
ﺍﻟﺼﻐﻴﺮ ﻟﻸﻟﺒﺎﻧﻲ ﺭﻗﻢ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ 3114 (
জিন তিন প্রকার।
এক. যারা শূন্যে উড়ে বেড়ায়।
দুই. কিছু সাপ ও কুকুর।
তিন. মানুষের কাছে আসে ও চলে যায়।
(সূত্র : তাবারানী। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ শায়খ
আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
দেখুন, সহীহ আল জামে আস সাগীর, হাদীস নং
৩১১৪, আবু সালাবা আল খাশানী রা. থেকে বর্ণিত।)
(মুজামু আলফাজ আল-আকীদাহ)
জিন বিভিন্ন প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারে। কিন্তু
তাদের একটি গ্রুপ সর্বদা সাপ ও কুকুরের বেশ ধারণ
করে চলাফেরা করে মানব সমাজে। এটা তাদের
স্থায়ী রূপ।
জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস ঈমানের দাবী
একজন মুসলিমকে অবশ্যই জিনের অস্তিত্ব
স্বীকার করতে হবে। যদি সে জিনের অস্তিত্ব
অস্বীকার করে, তাহলে সে মুমিন থাকবে না।
জিনের অস্তিত্ব স্বীকার ঈমান বিল গাইব বা
অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনার অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ
রাব্বুল আলামীন আল কুরআনের প্রায় পঞ্চাশ বার
জিনের আলোচনা করেছেন। জিনজাতির সৃষ্টি,
সৃষ্টির উদ্দেশ্য, তাদের ইসলাম গ্রহণ, মানুষের
পূর্বে তাদের সৃষ্টি করা, ইবলীস জিনের
অন্তর্ভূক্ত, সূরা আর রাহমানে জিন ও মানুষকে এক
সাথে সম্বোধন, নবী সুলাইমান আলাহিসসালাম এর
আমলে জিনদের কাজ-কর্ম করা, তাদের মধ্যে
রাজমিস্ত্রী ও ডুবুরী থাকার কথা, তাদের রোজ
হাশরে বিচার শাস্তি ও পুরস্কারের সম্মুখীন হওয়া
ইত্যাদি বহু তথ্য আল কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল
আলামীন উল্লেখ করেছেন। তাদের সম্পর্কে
বলতে যেয়ে সূরা আল-জিন নামে একটি পূর্ণাঙ্গ
সূরা নাযিল করেছেন। তাই কোন মুসলমান জিনের
অস্তিত্বকে অস্বীকার করে আল্লাহর কালামকে
অস্বীকার করার মত কাজ করতে পারে না। তেমনি
জিনকে রূপক অর্থে ব্যবহার করার কথাও ভাবতে
পারে না। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা
এটাই। বিভ্রান্ত ও বিলুপ্ত মুতাযিলা ও জাহমিয়্যা সমপ্রদায়
জিনের অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
জিন কি মানুষকে আছর করে?
এর উত্তর হল, অবশ্যই জিন মানুষকে আছর করতে
পারে। স্পর্শ দ্বারা পাগল করতে পারে। মানুষের
উপর ভর করতে পারে। তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে
পারে। তার জীবনের স্বাভাবিক কাজ-কর্ম ব্যাহত
করতে পারে।
এটা বিশ্বাস করতে হয়। তবে এ বিষয়টি কেহ
অবিশ্বাস করলে তাকে কাফের বলা যাবে না। সে
ভুল করেছে, এটা বলা হবে।
জিন যে মানুষকে আছর করে তার কিছু প্রমাণ:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳَﺄْﻛُﻠُﻮﻥَ ﺍﻟﺮِّﺑَﺎ ﻟَﺎ ﻳَﻘُﻮﻣُﻮﻥَ ﺇِﻟَّﺎ ﻛَﻤَﺎ ﻳَﻘُﻮﻡُ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﻳَﺘَﺨَﺒَّﻄُﻪُ
ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤَﺲِّ
যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় দাড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ
করে পাগল বানিয়ে দেয়। (সূরা আল বাকারা : ২৭৫)
এ আয়াত দ্বারা যে সকল বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝা যায়:
এক. যারা সূদ খায় তাদের শাস্তির ধরণ সম্পর্কে ধারণা।
দুই. শয়তান বা জিন মানুষকে স্পর্শ দ্বারা পাগলের মত
করতে পারে।
তিন. মানুষের উপর শয়তান বা জিনের স্পর্শ একটি
সত্য বিষয়। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
চার. জিন-শয়তানের এ স্পর্শ দ্বারা মানুষ যেমন
আধ্যাত্নিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি
শারীরিক দিক দিয়েও অস্বাভাবিক হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ﻭَﻣَﻦْ ﻳَﻌْﺶُ ﻋَﻦْ ﺫِﻛْﺮِ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦِ ﻧُﻘَﻴِّﺾْ ﻟَﻪُ ﺷَﻴْﻄَﺎﻧًﺎ ﻓَﻬُﻮَ ﻟَﻪُ
ﻗَﺮِﻳﻦٌ
আর যে পরম করুণাময়ের জিকির থেকে বিমুখ
থাকে আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি,
ফলে সে হয়ে যায় তার সঙ্গী। (সূরা যুখরুফ : ৩৬)
এ আয়াত দ্বারা যা স্পষ্ট হল : মহান রাহমান ও রহীম
আল্লাহ তাআলার জিকির থেকে বিরত থাকা জিন
শয়তানের স্পর্শ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার একটি কারণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ﻭَﺍﺫْﻛُﺮْ ﻋَﺒْﺪَﻧَﺎ ﺃَﻳُّﻮﺏَ ﺇِﺫْ ﻧَﺎﺩَﻯ ﺭَﺑَّﻪُ ﺃَﻧِّﻲ ﻣَﺴَّﻨِﻲَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ
ﺑِﻨُﺼْﺐٍ ﻭَﻋَﺬَﺍﺏٍ
আর স্মরণ কর আমার বান্দা আইউবকে, যখন সে তার
রবকে ডেকে বলেছিল, শয়তান তো আমাকে
কষ্ট ও আযাবের ছোঁয়া দিয়েছে। (সূরা সাদ : ৪১)
এ আয়াত দ্বারা আমরা স্পষ্টভাবে বুঝলাম:
এক. শয়তান নবী আইউব আলাহিস সালামকে স্পর্শ
করে শারীরিক রোগ-কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছিল।
দুই. তিনি শয়তানের স্পর্শ থেকে বাঁচার জন্য
আল্লাহ তাআলার কাছেই প্রার্থনা করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ﺇِﻥَّ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺍﺗَّﻘَﻮْﺍ ﺇِﺫَﺍ ﻣَﺴَّﻬُﻢْ ﻃَﺎﺋِﻒٌ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﺗَﺬَﻛَّﺮُﻭﺍ
ﻓَﺈِﺫَﺍ ﻫُﻢْ ﻣُﺒْﺼِﺮُﻭﻥَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন
তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন
কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ
করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। (সূরা আল
আরাফ : ২০১)
এ আয়াত থেকে যা বুঝে আসে তা হল:
এক. যারা মুত্তাকী বা আল্লাহ ভীরু তাদেরকেও
জিন বা শয়তান স্পর্শ করতে পারে। তারা মুত্তাকী
হয়েও জিন বা শয়তানের আছরে নিপতিত হতে
পারে।
দুই. যারা মুত্তাকী তাদের শয়তান বা জিন স্পর্শ
করলে তারা আল্লাহ-কেই স্মরণ করে। অন্য
কোন কিছুর দ্বারস্থ হয় না।
তিন. মুত্তাকীগণ জিন বা শয়তান দ্বারা স্পর্শ হয়ে
আল্লাহকে স্মরণ করলে তাদের সত্যিকার দৃষ্টি
খুলে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ﻭَﺇِﻣَّﺎ ﻳَﻨْﺰَﻏَﻨَّﻚَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﻧَﺰْﻍٌ ﻓَﺎﺳْﺘَﻌِﺬْ ﺑِﺎﻟﻠَّﻪِ ﺇِﻧَّﻪُ ﺳَﻤِﻴﻊٌ
ﻋَﻠِﻴﻢٌ
আর যদি শয়তানের পক্ষ হতে কোন প্ররোচনা
তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে তুমি আল্লাহর
আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা
আল আরাফ : ২০০)
এ আয়াতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল:
এক. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও
জিন-শয়তান আছর করতে পারে।
দুই. জিন আছর করলে বা শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুভব
করলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে নির্দেশ
দেয়া হয়েছে।
তিন. সূরা আল ফালাক ও সূরা আন-নাছ হল জিন শয়তানের
আছর থেকে আশ্রয় প্রার্থনার অতি মুল্যবান বাক্য।
এ আয়াতের তাফসীর দ্বারা এটা প্রমাণিত।
হাদীসে এসেছে –
ﻋﻦ ﻋﺎﺋﺸﺔ – ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﺎ- ﺃﻧﻬﺎ ﻗﺎﻟﺖ : ﻗﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ
-ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ :- ﺇﻥ ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ ﻳﺠﺮﻱ ﻣﻦ ﺍﺑﻦ ﺁﺩﻡ
ﻣﺠﺮﻯ ﺍﻟﺪﻡ . ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱُّ ﻭﻣﺴﻠﻢ .
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, অবশ্যই শয়তান
মানুষের রক্তের শিরা উপশিরায় চলতে সক্ষম।
(বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)
হাদীসে আরো এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন বললেন,
ﺇﻥ ﻋﻔﺮﻳﺘﺎ ﻣﻦ ﺍﻟﺠﻦ ﺗﻔﻠﺖ ﻋﻠﻲ ﺍﻟﺒﺎﺭﺣﺔ ﻟﻴﻘﻄﻊ ﻋﻠﻲ
ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻓﺄﻣﻜﻨﻨﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﻨﻪ
গত রাতে একটি শক্তিশালী জিন আমার উপর চড়াও
হতে চেয়েছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল আমার নামাজ
নষ্ট করা। আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে শক্তি
দিলেন। (বর্ণনায় : বুখারী, সালাত অধ্যায়)
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এ হাদীসের
ব্যাখ্যায় বলেছেন, আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত
নাসায়ীর বর্ণনায় আরো এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তাকে
ধরে ফেললাম। আছার দিলাম ও গলা চেপে ধরলাম।
এমনকি তার মুখের আদ্রতা আমার হাতে অনুভব
করলাম।
এ হাদীস থেকে আমরা যা জানতে পারলাম :
এক. জিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লামকেও আছর করতে চেয়েছিল।
দুই. জিনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর
নামাজ নষ্ট করার জন্য তাঁর কাছে এসেছিল।
তিন. ইফরীত শব্দের বাংলা অর্থ হল ভূত। জিনদের
মধ্যে যারা দুষ্ট ও মাস্তান প্রকৃতির তাদের ইফরীত
বলা হয়।
চার. জিন দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম কোন ভয় পাননি। তিনি তার সাথে লড়াই করে
পরাস্ত করেছেন।
পাঁচ. জিনদের শরীর বা কাঠামো আছে যদিও তা
সাধারণত আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না।
জিন ও ভূতের মধ্যে পার্থক্য
জিন আরবী শব্দ। বাংলাতেও জিন শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু ভূত বাংলা শব্দ। এর আরবী হল ইফরীত,
বহুবচনে আফারীত। আল কুরআনে সূরা আন-
নামলের ৩৯ নং আয়াতে ইফরীত কথাটি এসেছে
এভাবে :
ﻗَﺎﻝَ ﻋِﻔْﺮﻳﺖٌ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺠِﻦِّ ﺃَﻧَﺎ ﺁَﺗِﻴﻚَ ﺑِﻪِ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﺗَﻘُﻮﻡَ ﻣِﻦْ
ﻣَﻘَﺎﻣِﻚَ ﻭَﺇِﻧِّﻲ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻟَﻘَﻮِﻱٌّ ﺃَﻣِﻴﻦٌ
এক শক্তিশালী জিন বলল, আপনি আপনার স্থান
থেকে উঠার পূর্বেই আমি তা এনে দেব। আমি
নিশ্চয়ই এই ব্যাপারে শক্তিমান, বিশ্বস্ত।
এ আয়াতে ইফরীতুম মিনাল জিন অর্থ্যাৎ জিনদের
মধ্যে থেকে এক ইফরীত বা ভূত .. কথাটি
এসেছে। এমনিভাবে উপরে বর্ণিত হাদীসেও
ইফরীতুম মিনাল জিন কথাটি এসেছে।
তাফসীরবিদগণ বলেছেন, জিনদের মধ্যে যারা
অবাধ্য, বেয়ারা, মাস্তান, দুষ্ট প্রকৃতির ও শক্তিশালী
হয়ে থাকে তাদের ইফরীত বলা হয়। (আল মুফরাদাত
ফী গারিবিল কুরআন)
ইফরীত শব্দের অর্থ বাংলাতে ভূত।
অতএব দেখা গেল ইফরীত বা ভূত, জিন ছাড়া আর
কিছু নয়। সব ভূতই জিন তবে সব জিন কিন্তু ভূত নয়।
মানসিক রোগী আর জিনে ধরা রোগীর
মধ্যে পার্থক্য
অনেক সময় আমরা এ সমস্যায় পড়ে যাই। ঠিক
করতে পারি না রোগটা কি মানসিক না-কি পাগল, না কি
জিনের আছর থেকে রোগ দেখা দিয়েছে।
অনেক সময় তাই আমরা মানসিক-রোগীকে জিনে-
ধরা রোগী বলে থাকি। তেমনি জিনে-ধরা
রোগীকে মানসিক রোগী বলে চালাতে
চেষ্টা করি। বিশেষ করে ডাক্তার ও মনোরোগ
বিশেষজ্ঞরা কোনভাবেই জিনের আছরকে
স্বীকার করতে চান না। তারা এ জাতীয় সকল
রোগীকে মানসিক রোগী বলে সনাক্ত করে
থাকেন।
পাগলামী-কে আরবীতে বলা হয় জুনুন। আর
পাগল-কে বলা হয় মাজনূন। আরবীতে এ জুনুন ও
মাজনূন শব্দ দুটো কিন্তু জিন শব্দ থেকেই
এসেছে।
যেমন আল কুরআনে এসেছে :
ﺇِﻥْ ﻫُﻮَ ﺇِﻟَّﺎ ﺭَﺟُﻞٌ ﺑِﻪِ ﺟِﻨَّﺔٌ ﻓَﺘَﺮَﺑَّﺼُﻮﺍ ﺑِﻪِ ﺣَﺘَّﻰ ﺣِﻴﻦٍ
সে কেবল এমন এক লোক, যার মধ্যে পাগলামী
রয়েছে। অতএব তোমরা তার সম্পর্কে কিছুকাল
অপেক্ষা কর।
এ কথাটি নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের
লোকেরা তার সম্পর্কে বলেছিল। এ আয়াতে
জিন্নাতুন শব্দের অর্থ হল পাগলামী।
কাজেই কাউকে পাগলামীর মত অস্বাভাবিক আচরণ
করতে দেখলে সেটা যেমন জিনের আছরের
কারণে হতে পারে, আবার তা মানসিক রোগের
কারণেও হতে পারে। তবে এ বিষয়ের
বিশেষজ্ঞরা অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু বিষয়
নির্ধারণ করেছেন, যার মাধ্যমে মানসিক রোগী
আর জিনে-ধরা রোগীর মধ্যে পার্থক্য করা যায়।
এগুলো হল:
এক. জিনে-ধরা রোগী কিছুক্ষণের জন্য বেহুশ
হয়ে যায়। মানসিক রোগী বেহুশ হয়ে পড়ে না।
দুই. কখনো কখনো জিনে-ধরা রোগীর মুখ
থেকে ফেনা বের হয়। দাতে খিল লেগে যায়।
মানসিক রোগীর মুখ থেকে ফেনা বের হয় না।
তিন. জিনে ধরা রোগী প্রায়ই সপ্নে সাপ, কুকুর,
বিচ্ছু, বানর, শিয়াল, ইঁদুর ইত্যাদি দেখে থাকে।
কখনো কখনো সপ্নে দেখে সে অনেক উচু
স্থান থেকে পড়ে যাচ্ছে।
চার. জিনে ধরা রোগীর সর্বদা ভীতু ভাব থাকে।
সর্বদা তার ভয় লাগে। মানসিক রোগীর তেমন ভয়
থাকে না।
পাঁচ. জিনে ধরা রোগী নামাজ পড়া, কুরআন
তেলাওয়াত, আল্লাহর যিকির ইত্যাদি পছন্দ করে না। বরং
এগুলো তার অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়।
ছয়. জিনে ধরা রোগী কখনো কখনো ভিন্ন ভাষা
ও ভিন্ন ভঙ্গিতে কথা বলে।
সাত. জিনে ধরা রোগী অধিকাংশ সময় স্বাভাবিক
থাকে। মাঝে মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করে।
আট. জিনে-ধরা রোগী থেকে অনেক সময়
আশ্চর্যজনক বিষয় প্রকাশ হয়ে থাকে। যেমন
অল্প সময়ে সে বহু দূরে চলে যায়। গাছে উঠে
সরু ডালে বসে থাকে ইত্যাদি।
নয়. জিনে ধরা রোগীর কাছে স্বামী, ঘর-সংসার,
স্ত্রী-সন্তানদের ভাল লাগে না।
দশ. জিনে ধরা রোগীর উপর যখন জিন চড়াও হয়
তখন ক্যামেরা দিয়ে তার ছবি তুললে ছবি ধোঁয়ার
মত অস্পষ্ট হয়। স্পষ্ট হয় না। দেখা গেছে
আশে পাশের সকলের ছবি স্পষ্টভাবে উঠেছে
কিন্তু রোগীর ছবিটি ধোয়াচ্ছন্ন। এটা কারো
কারো নিজস্ব অভিজ্ঞতা। মনে রাখতে হবে
অভিজ্ঞতা সর্বদা এক রকম ফলাফল নাও দিতে পারে।
কিন্তু বড় সমস্যা হবে তখন, যখন রোগীটি
নিজেকে জিনে ধরা বলে অভিনয় করে কিন্তু
তাকে জিনেও আছর করেনি আর সে মানসিক
রোগীও নয়। সে তার নিজস্ব একটি লক্ষ্য
পূরণের জন্য জিনে ধরার অভিনয় করছে।
এ অবস্থায় অভিভাবকের করণীয় হল, তারা তাকে তার
দাবী পুরণের আশ্বাস দেবে। তাহলে তার জিন
ছেড়ে যাবে। পরে তার দাবীটি যৌক্তিক হলে
পূরণ করা হবে আর অযৌক্তিক হলে পূরণ করা হবে
না। এরপর যদি সে আবার জিনে ধরার অভিনয় করে
তাহলে তাকে জিনে ধরা রোগী বলে আর
বিশ্বাস করার দরকার নেই। অনেক সময় শারিরিক
শাস্তির ভয় দেখালে এ ধরনের বাতিল জিন চলে যায়।
কি কারণে জিন চড়াও হয়
কিছু বিষয় রয়েছে যার উপস্থিতির কারণে মানুষকে
জিনে আছর করে।
এক. প্রেম। কোন পুরুষ জিন কোন নারীর
প্রেমে পড়ে যায়, অথবা কোন নারী জিন যদি
কোন পুরুষের প্রেমে পড়ে তাহলে জিন তার ঐ
প্রিয় মানুষটির উপর আছর করে।
দুই. কোন মানুষ যদি কোন জিনের প্রতি জুলুম-
অত্যাচার করে বা কষ্ট দেয় তাহলে অত্যাচারিত জিনটি
সেই মানুষের উপর চড়াও হয়। যেমন জিনের গায়ে
আঘাত করলে, তার গায়ে গরম পানি নিক্ষেপ করলে,
কিংবা তার খাদ্য-খাবার নষ্ট করে দিলে জিন সেই
মানুষটির উপর চড়াও হয়।
তিন. জিন খামোখা জুলুম-অত্যাচার করার জন্য মানুষের
উপর চড়াও হয়। তবে এটি পাঁচটি কারণে হতে পারে :
(ক) অতিরিক্ত রাগ
(খ) অতিরিক্ত ভয়
(গ) যৌন চাহিদা লোপ পাওয়া
(ঘ) মাত্রাতিরিক্ত উদাসীনতা।
(ঙ) নোংড়া ও অপবিত্র থাকা।
কারো মধ্যে এ স্বভাবগুলো থাকলে জিন তাকে
আছর করে অত্যাচার করার সুযোগ পেয়ে যায়।
জিনের আছরের প্রকারভেদ
মানুষের উপর জিন চড়াও হওয়ার ধরনটি চার প্রকারের
হতে পারে।
এক. জিন মানুষের পুরো শরীরে প্রভাব বিস্তার
করে কিছু সময়ের জন্য।
দুই. আংশিকভাবে শরীরের এক বা একাধিক অংশে
সে প্রভাব বিস্তার করে কিছু সময়ের জন্য। যেমন
হাতে অথবা পায়ে কিংবা মুখে।
তিন. স্থায়ীভাবে জিন মানুষের শরীরে চড়াও
হতে পারে। এর মেয়াদ হতে পারে অনেক
দীর্ঘ।
চার. মানুষের মনের উপর কিছু সময়ের জন্য প্রভাব
বিস্তার করে। মানুষ যখন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা শুরু
করে তখন চলে যায়।
জিনের আছর থেকে বাঁচতে হলে যা করতে
হবে
এক. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে ও
ইসলামী শরিয়তের অনুসরণ করতে হবে।
কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
ﻭَﻣَﻦْ ﻳَﻌْﺶُ ﻋَﻦْ ﺫِﻛْﺮِ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦِ ﻧُﻘَﻴِّﺾْ ﻟَﻪُ ﺷَﻴْﻄَﺎﻧًﺎ ﻓَﻬُﻮَ ﻟَﻪُ
ﻗَﺮِﻳﻦٌ
আর যে পরম করুণাময়ের জিকির থেকে বিমুখ
থাকে আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি,
ফলে সে হয়ে যায় তার সঙ্গী। (সূরা যুখরুফ : ৩৬)
হাদীসে এসেছে –
ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗﺎﻝ : ﻳﻌﻘﺪ
ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ ﻋﻠﻰ ﻗﺎﻓﻴﺔ ﺭﺃﺱ ﺃﺣﺪﻛﻢ ﺇﺫﺍ ﻫﻮ ﻧﺎﻡ ﺛﻼﺙ ﻋﻘﺪ
، ﻳﻀﺮﺏ ﻛﻞ ﻋﻘﺪﺓ ﻣﻜﺎﻧﻬﺎ : ﻋﻠﻴﻚ ﻟﻴﻞ ﻃﻮﻳﻞ ﻓﺎﺭﻗﺪ ،
ﻓﺈﻥ ﺍﺳﺘﻴﻘﻆ ﻓﺬﻛﺮ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻧﺤﻠﺖ ﻋﻘﺪﺓ ، ﻓﺈﻥ ﺗﻮﺿﺄ ﺍﻧﺤﻠﺖ
ﻋﻘﺪﺓ ، ﻓﺈﻥ ﺻﻠﻰ ﺍﻧﺤﻠﺖ ﻋﻘﺪﻩ ﻛﻠﻬﺎ ، ﻓﺄﺻﺒﺢ ﻧﺸﻴﻄﺎ
ﻃﻴﺐ ﺍﻟﻨﻔﺲ ، ﻭﺇﻻ ﺃﺻﺒﺢ ﺧﺒﻴﺚ ﺍﻟﻨﻔﺲ ﻛﺴﻼﻥ . ﺭﻭﺍﻩ
ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭﻣﺴﻠﻢ ﻭﺍﻟﻠﻔﻆ ﻟﻠﺒﺨﺎﺭﻱ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
তোমাদের কেহ যখন ঘুমিয়ে যায় শয়তান তখন তার
মাথার কাছে বসে তিনটি গিরা লাগায়। প্রতিটি গিরা দেয়ার
সময় একটি কথা বলে: তোমার সামনে আছে
দীর্ঘ রাত, তুমি ঘুমাও। যখন সে নিদ্রা থেকে
উঠে আল্লাহর জিকির করে তখন একটি গিরা খুলে
যায়। এরপর যখন সে অজু করে তখন আরেকটি গিরা
খুলে যায়। এরপর যখন নামাজ পড়ে তখন শেষ গিরাটি
খুলে যায়। ফলে সে সারাদিন কর্মতৎপর ও সুন্দর মন
নিয়ে দিন কাটায়। আর যদি এমন না করে, তাহলে
সারাদিন তার কাটে খারাপ মন ও অলসভাব নিয়ে। (বর্ণনায়
: বুখারী ও মুসলিম)
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হল:
(১) ঠিকমত অজু করলে, নামাজ আদায় করলে
শয়তানের চড়াও থেকে মুক্ত থাকা যায়।
(২) খারাপ মন নিয়ে থাকা ও অলসতা শয়তানের
কুমন্ত্রণার ফল।
(৩) রীতিমত নামাজ আদায় করলে শরীর ও মন
প্রফুল্ল থাকে। কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পায়। অলসতা দূর
হয়ে যায়।
(৪) ঘুম থেকে উঠার সাথে সাথে অজু গোসল
করার আগেই আল্লাহর জিকির করা উচিত। ঘুম থেকে
জাগ্রত হওয়ার নির্দিষ্ট দুআ আছে। এটি পাঠ করা
সুন্নত। এতে শয়তানের কুপ্রভাব দূর হয়ে যায়।
দুই. ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দুআ পাঠ করা
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বলেছেন :
ﻣﻦ ﻗﺎﻝ ﺇﺫﺍ ﺧﺮﺝ ﻣﻦ ﺑﻴﺘﻪ ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻮﻛﻠﺖ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ
ﻭﻻ ﺣﻮﻝ ﻭﻻ ﻗﻮﺓ ﺇﻻ ﺑﺎﻟﻠﻪ، ﻳﻘﺎﻝ ﻟﻪ : ﻛﻔﻴﺖ ﻭﻭﻗﻴﺖ
ﻭﻫﺪﻳﺖ ﻭ ﺗﻨﺤﻰ ﻋﻨﻪ ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ
যে ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলবে,
বিছমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি অলা হাওলা অলা
কুওআতা ইল্লা বিল্লাহি (আল্লাহরই নামে আল্লাহর উপর
নির্ভর করে বের হলাম। আর তার সামর্থ ব্যতীত
পাপ থেকে বাচাঁর উপায় নেই এবং তার শক্তি ব্যতীত
ভাল কাজ করা যায় না) তখন তাকে বলা হয়, তোমার
জন্য এটা যথেষ্ট, তোমাকে সুরক্ষা দেয়া হল এবং
তোমাকে পথের দিশা দেয়া হল। আর শয়তান তার
থেকে দূরে চলে যায়। (বর্ণনায়: আবু দাউদ ও
তিরমিজী)
তিন. পেশাব পায়খানাতে যাওয়ার সময় দুআ পাঠ করা:
হাদীসে এসেছে-
ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺇﺫﺍ ﺩﺧﻞ ﺍﻟﺨﻼﺀ ﻗﺎﻝ :
ﺍﻟﻠﻬﻢ ﺇﻧﻲ ﺃﻋﻮﺫ ﺑﻚ ﻣﻦ ﺍﻟﺨﺒﺚ ﻭﺍﻟﺨﺒﺎﺋﺚ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন পেশাব
পায়খানায় প্রবেশ করতেন, তখন বলতেন আল্লাহুম্মা
ইন্নী আউজুবিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িছ (হে
আল্লাহ আমি আপনার কাছে জিন নর ও জিন নারী
থেকে আশ্রয় নিচ্ছি) (বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি
ওয়া সাল্লাম বলেছেন : এ সকল পেশাব পায়খানার
স্থানে জিন শয়তান থাকে। অতএব তোমাদের
কেহ যখন এখানে আসে সে যেন বলে,
আল্লাহুম্মা ইন্নী আউজু বিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িছ।
(বর্ণনায় : ইবনে হিব্বান)
চার. প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় এ দুআটি তিনবার পাঠ
করা
ﺃﻋُﻮْﺫُ ﺑِﻜَﻠِﻤَﺎﺕِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺍﻟﺘَّﺎﻣَّﺎﺕِ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺧَﻠَﻖَ
(আউজু বিকালি মাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা)
অর্থ: আমি আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ বাক্যাবলীর
মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির সকল অনিষ্টতা থেকে আশ্রয়
নিচ্ছি। (বর্ণনায় : মুসলিম, তিরমিজী, আহমাদ)
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
ﺟﺎﺀ ﺭﺟﻞ ﺇﻟﻰ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻓﻘﺎﻝ : ﻳﺎ
ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ! ﻣﺎ ﻟﻘﻴﺖ ﻣﻦ ﻋﻘﺮﺏ ﻟﺪﻏﺘﻨﻲ ﺍﻟﺒﺎﺭﺣﺔ . ﻗﺎﻝ ”
ﺃﻣﺎ ﻟﻮ ﻗﻠﺖ ﺣﻴﻦ ﺃﻣﺴﻴﺖ : ﺃﻋﻮﺫ ﺑﻜﻠﻤﺎﺕ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺘﺎﻣﺎﺕ
ﻣﻦ ﺷﺮ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ ، ﻟﻢ ﺗﻀﺮﻙ ” .
এক ব্যক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এর কাছে এসে বলল, গত রাতে আমাকে
একটি বিচ্ছুতে দংশন করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন, আমি কি
তোমাকে বলিনি যখন সন্ধ্যা হবে তখন তুমি বলবে,
আউজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা।
তাহলে তোমাকে কোন কিছু ক্ষতি করতে পারত
না। (বর্ণনায় : মুসলিম, হাদীস নং ২৭০৯)
অন্য আরেকটি বর্ণনায় এসেছে- একটি জিন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আছর
করতে চেয়েছিল। তার সাথে আরেকটি জিন ছিল।
জিব্রাইল এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বললেন, আপনি এ বাক্যটি বলুন তাহলে ওরা আপনাকে
কিছু করতে পারবে না। (বর্ণনায় : ইবনে আবি
হাতেম)
এমনিভাবে কেউ যখন কোন স্থানে যায় আর এ
দুআটি পাঠ করে তাহলে তাকে কোন কিছু ক্ষতি
করতে পারবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
ﻣﻦ ﻧﺰﻝ ﻣﻨﺰﻻ ﺛﻢ ﻗﺎﻝ : ﺃﻋﻮﺫ ﺑﻜﻠﻤﺎﺕ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻟﺘﺎﻣﺎﺕ ﻣﻦ
ﺷﺮ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ ، ﻟﻢ ﻳﻀﺮﻩ ﺷﻲﺀ ، ﺣﺘﻰ ﻳﺮﺗﺤﻞ ﻣﻦ ﻣﻨﺰﻟﻪ
ﺫﻟﻚ
যে ব্যক্তি কোন স্থানে অবতরণ করল অতঃপর
বলল: আউজু বিকালি মাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা
(আমি আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ বাক্যাবলীর মাধ্যমে
তাঁর সৃষ্টির সকল অনিষ্টতা থেকে আশ্রয় নিচ্ছি) তখন
তাকে কোন কিছু ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষণ
সে ওখানে অবস্থান করবে। (বর্ণনায় : মুসলিম,
খাওলা বিনতে হাকীম থেকে)
পাঁচ. প্রতিদিন নিদ্রা গমনকালে আয়াতুল কুরসী পাঠ করা
হাদীসে এসেছে –
ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﻫﺮﻳﺮﺓ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﻭﻛﻠﻨﻲ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ
ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺑﺤﻔﻆ ﺯﻛﺎﺓ ﺭﻣﻀﺎﻥ ، ﻓﺄﺗﺎﻧﻲ ﺁﺕ ،
ﻓﺠﻌﻞ ﻳﺤﺜﻮ ﻣﻦ ﺍﻟﻄﻌﺎﻡ ، ﻓﺄﺧﺬﺗﻪ ﻭﻗﻠﺖ : ﻭﺍﻟﻠﻪ
ﻷﺭﻓﻌﻨﻚ ﺇﻟﻰ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ، ﻗﺎﻝ :
ﺇﻧﻲ ﻣﺤﺘﺎﺝ ﻭﻋﻠﻲ ﻋﻴﺎﻝ ﻭﻟﻲ ﺣﺎﺟﺔ ﺷﺪﻳﺪﺓ ، ﻗﺎﻝ :
ﻓﺨﻠﻴﺖ ﻋﻨﻪ ، ﻓﺄﺻﺒﺤﺖ ﻓﻘﺎﻝ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ
ﻭﺳﻠﻢ : ‏( ﻳﺎ ﺃﺑﺎ ﻫﺮﻳﺮﺓ ﻣﺎ ﻓﻌﻞ ﺃﺳﻴﺮﻙ ﺍﻟﺒﺎﺭﺣﺔ ‏) . ﻗﺎﻝ :
ﻗﻠﺖ : ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ، ﺷﻜﺎ ﺣﺎﺟﺔ ﺷﺪﻳﺪﺓ ، ﻭﻋﻴﺎﻻ
ﻓﺮﺣﻤﺘﻪ ﻓﺨﻠﻴﺖ ﺳﺒﻴﻠﻪ ، ﻗﺎﻝ : ‏( ﺃﻣﺎ ﺇﻧﻪ ﻗﺪ ﻛﺬﺑﻚ ،
ﻭﺳﻴﻌﻮﺩ ‏) . ﻓﻌﺮﻓﺖ ﺃﻧﻪ ﺳﻴﻌﻮﺩ ، ﻟﻘﻮﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ
ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ : ‏( ﺇﻧﻪ ﺳﻴﻌﻮﺩ ‏) . ﻓﺮﺻﺪﺗﻪ ، ﻓﺠﺎﺀ
ﻳﺤﺜﻮ ﻣﻦ ﺍﻟﻄﻌﺎﻡ ، ﻓﺄﺧﺬﺗﻪ ﻓﻘﻠﺖ : ﻷﺭﻓﻌﻨﻚ ﺇﻟﻰ ﺭﺳﻮﻝ
ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ، ﻗﺎﻝ : ﺩﻋﻨﻲ ﻓﺈﻧﻲ ﻣﺤﺘﺎﺝ
ﻭﻋﻠﻲ ﻋﻴﺎﻝ ، ﻻ ﺃﻋﻮﺩ ، ﻓﺮﺣﻤﺘﻪ ﻓﺨﻠﻴﺖ ﺳﺒﻴﻠﻪ ،
ﻓﺄﺻﺒﺤﺖ ﻓﻘﺎﻝ ﻟﻲ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ :
‏( ﻳﺎ ﺃﺑﺎﻫﺮﻳﺮﺓ ﻣﺎ ﻓﻌﻞ ﺃﺳﻴﺮﻙ ‏) . ﻗﻠﺖ : ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ
ﺷﻜﺎ ﺣﺎﺟﺔ ﺷﺪﻳﺪﺓ ﻭﻋﻴﺎﻻ ، ﻓﺮﺣﻤﺘﻪ ﻓﺨﻠﻴﺖ ﺳﺒﻴﻠﻪ ،
ﻗﺎﻝ : ‏( ﺃﻣﺎ ﺇﻧﻪ ﻛﺬﺑﻚ ، ﻭﺳﻴﻌﻮﺩ ‏) . ﻓﺮﺻﺪﺗﻪ ﺍﻟﺜﺎﻟﺜﺔ ،
ﻓﺠﺎﺀ ﻳﺤﺜﻮ ﻣﻦ ﺍﻟﻄﻌﺎﻡ ، ﻓﺄﺧﺬﺗﻪ ﻓﻘﻠﺖ : ﻷﺭﻓﻌﻨﻚ ﺇﻟﻰ
ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ، ﻭﻫﺬﺍ ﺁﺧﺮ ﺛﻼﺙ ﻣﺮﺍﺕ ﺗﺰﻋﻢ ﻻ ﺗﻌﻮﺩ ، ﺛﻢ
ﺗﻌﻮﺩ ، ﻗﺎﻝ : ﺩﻋﻨﻲ ﺃﻋﻠﻤﻚ ﻛﻠﻤﺎﺕ ﻳﻨﻔﻌﻚ ﺍﻟﻠﻪ ﺑﻬﺎ ، ﻗﻠﺖ
ﻣﺎ ﻫﻮ ؟ ﻗﺎﻝ : ﺇﺫﺍ ﺃﻭﻳﺖ ﺇﻟﻰ ﻓﺮﺍﺷﻚ ، ﻓﺎﻗﺮﺃ ﺁﻳﺔ
ﺍﻟﻜﺮﺳﻲ : } ﺍﻟﻠﻪ ﻻ ﺇﻟﻪ ﺇﻻ ﻫﻮ ﺍﻟﺤﻲ ﺍﻟﻘﻴﻮﻡ { . ﺣﺘﻰ
ﺗﺨﺘﻢ ﺍﻵﻳﺔ ، ﻓﺈﻧﻚ ﻟﻦ ﻳﺰﺍﻝ ﻋﻠﻴﻚ ﻣﻦ ﺍﻟﻠﻪ ﺣﺎﻓﻆ ، ﻭﻻ
ﻳﻘﺮﺑﻨﻚ ﺷﻴﻄﺎﻥ ﺣﺘﻰ ﺗﺼﺒﺢ ، ﻓﺨﻠﻴﺖ ﺳﺒﻴﻠﻪ ﻓﺄﺻﺒﺤﺖ ،
ﻓﻘﺎﻝ ﻟﻲ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ : ‏( ﻣﺎ ﻓﻌﻞ
ﺃﺳﻴﺮﻙ ﺍﻟﺒﺎﺭﺣﺔ ‏) . ﻗﻠﺖ : ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ، ﺯﻋﻢ ﺃﻧﻪ
ﻳﻌﻠﻤﻨﻲ ﻛﻠﻤﺎﺕ ﻳﻨﻔﻌﻨﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﺑﻬﺎ ﻓﺨﻠﻴﺖ ﺳﺒﻴﻠﻪ ، ﻗﺎﻝ :
‏( ﻣﺎ ﻫﻲ ‏) . ﻗﻠﺖ : ﻗﺎﻝ ﻟﻲ : ﺇﺫﺍ ﺃﻭﻳﺖ ﺇﻟﻰ ﻓﺮﺍﺷﻚ ،
ﻓﺎﻗﺮﺃ ﺁﻳﺔ ﺍﻟﻜﺮﺳﻲ ﻣﻦ ﺃﻭﻟﻬﺎ ﺣﺘﻰ ﺗﺨﺘﻢ : } ﺍﻟﻠﻪ ﻻ ﺇﻟﻪ ﺇﻻ
ﻫﻮ ﺍﻟﺤﻲ ﺍﻟﻘﻴﻮﻡ { . ﻭﻗﺎﻝ ﻟﻲ : ﻟﻦ ﻳﺰﺍﻝ ﻋﻠﻴﻚ ﻣﻦ ﺍﻟﻠﻪ
ﺣﺎﻓﻆ ، ﻭﻻ ﻳﻘﺮﺑﻚ ﺷﻴﻄﺎﻥ ﺣﺘﻰ ﺗﺼﺒﺢ – ﻭﻛﺎﻧﻮﺍ
ﺃﺣﺮﺹ ﺷﻲﺀ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺨﻴﺮ – ﻓﻘﺎﻝ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ
ﻭﺳﻠﻢ : ‏( ﺃﻣﺎ ﺇﻧﻪ ﻗﺪ ﺻﺪﻗﻚ ﻭﻫﻮ ﻛﺬﻭﺏ ، ﺗﻌﻠﻢ ﻣﻦ
ﺗﺨﺎﻃﺐ ﻣﻨﺬ ﺛﻼﺙ ﻟﻴﺎﻝ ﻳﺎ ﺃﺑﺎ ﻫﺮﻳﺮﺓ ‏) . ﻗﺎﻝ : ﻻ ، ﻗﺎﻝ :
ﺫﺍﻙ ﺷﻴﻄﺎﻥ .
‏( ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻓﻲ ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﻮﻛﺎﻟﺔ، ﺑﺎﺏ ﺇﺫﺍ ﻭﻛﻞ ﺭﺟﻼ
ﻓﺘﺮﻙ ﺍﻟﻮﻛﻴﻞ ﺷﻴﺌﺎ ﻓﺄﺟﺎﺯﻩ ﺍﻟﻤﻮﻛﻞ ﻓﻬﻮ ﺟﺎﺋﺰ )
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক
রমজান মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম
আমাকে যাকাতের সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব দিলেন।
দেখলাম, কোন এক আগন্তুক এসে খাদ্যের
মধ্যে হাত দিয়ে কিছু নিতে যাচ্ছে। আমি তাকে
ধরে ফেললাম। আর বললাম, আল্লাহর কসম! আমি
অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এর কাছে নিয়ে যাবো। সে বলল, আমি খূব
দরিদ্র মানুষ। আমার পরিবার আছে। আমার অভাব
মারাত্নক। আবু হুরাইরা বলেন, আমি তাকে ছেড়ে
দিলাম। সকাল বেলা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি
ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসলাম, তখন তিনি বললেন,
কী আবু হুরাইরা! গত রাতের আসামীর খবর কি? আমি
বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তার প্রচন্ড
অভাবের কথা আমার কাছে বলেছে। আমি তার উপর
দয়া করে তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অবশ্য সে
তোমাকে মিথ্যা বলেছে। দেখবে সে আবার
আসবে।
আমি এ কথায় বুঝে নিলাম সে আবার আসবেই। কারণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
সে আবার আসবে। আমি অপেক্ষায় থাকলাম। সে
পরের রাতে আবার এসে খাবারের মধ্যে হাত
দিয়ে খুঁজতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম।
আর বললাম, আল্লাহর কসম আমি অবশ্যই তোমাকে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে
নিয়ে যাবো। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও।
আমি খুব অসহায়। আমার পরিবার আছে। আমি আর
আসবো না। আমি এবারও তার উপর দয়া করে তাকে
ছেড়ে দিলাম। সকাল বেলা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসলাম, তিনি বললেন,
কী আবু হুরাইরা! গত রাতে তোমার আসামী কী
করেছে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে তার
চরম অভাবের কথা আমার কাছে বলেছে। তার
পরিবার আছে। আমি তার উপর দয়া করে তাকে
ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বললেন, অবশ্য সে তোমাকে মিথ্যা
বলেছে। দেখো, সে আবার আসবে।
তৃতীয় দিন আমি অপেক্ষায় থাকলাম, সে আবার
এসে খাবারের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে খুঁজতে লাগল।
আমি তাকে ধরে ফেললাম। আর বললাম, আল্লাহর
কসম আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে নিয়ে যাবো। তুমি তিন
বারের শেষ বার এসেছ। বলেছ, আসবে না।
আবার এসেছ। সে বলল, আমাকে ছেড়ে দাও।
আমি তোমাকে কিছু বাক্য শিক্ষা দেবো যা
তোমার খুব উপকারে আসবে। আমি বললাম কী
সে বাক্যগুলো? সে বলল, যখন তুমি নিদ্রা যাবে
তখন আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে। তাহলে আল্লাহর
পক্ষ থেকে তোমাকে একজন রক্ষক পাহাড়া
দেবে আর সকাল পর্যন্ত শয়তান তোমার কাছে
আসতে পারবে না। আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। সকাল
বেলা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম
এর কাছে আসলাম, তখন তিনি বললেন, কী আবু
হুরাইরা! গত রাতে তোমার আসামী কী করেছে?
আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে আমাকে কিছু
উপকারী বাক্য শিক্ষা দিয়েছে, তাই আমি তাকে
ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে সে কী
শিক্ষা দিয়েছে? আমি বললাম, সে বলেছে, যখন
তুমি নিদ্রা যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে।
তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাকে একজন
রক্ষক পাহাড়া দেবে আর সকাল পর্যন্ত শয়তান
তোমার কাছে আসতে পারবে না।
আর সাহাবায়ে কেরাম এ সকল শিক্ষণীয় বিষয়ে খুব
আগ্রহী ছিলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বললেন, সে তোমাকে সত্য বলেছে
যদিও সে মিথ্যাবাদী। হে আবু হুরাইরা! গত তিন রাত
যার সাথে কথা বলেছো তুমি কি জানো সে কে?
আবু হুরাইরা বলল, না, আমি জানি না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে হল শয়তান। (বর্ণনায়
: বুখারী)
এ হাদীস থেকে আমরা যা শিখতে পেলাম তা
হল:
(১) জনগণের সম্পদ পাহাড়া দেয়া ও তা রক্ষা করার
জন্য আমানতদার দায়িত্বশীল নিয়োগ দেয়া কর্তব্য।
আবু হুরাইরা রা. ছিলেন একজন বিশ্বস্ত আমানতদার
সাহাবী।
(২) আবু হুরাইরা রা. দায়িত্ব পালনে একাগ্রতা ও
আন্তরিকতার প্রমাণ দিলেন। তিনি রাতেও না ঘুমিয়ে
যাকাতের সম্পদ পাহাড়া দিয়েছেন।
(৩) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এটি
একটি মুজেযা যে, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না
থেকেও আবু হুরাইরার কাছে বর্ণনা শুনেই বুঝতে
পেরেছেন শয়তানের আগমনের বিষয়টি।
(৪) দরিদ্র অসহায় পরিবারের বোঝা বাহকদের প্রতি
সাহাবায়ে কেরামের দয়া ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দয়াকে স্বীকৃতি দিলেন। তিনি
আবু হুরাইরা রা. কে বললেন না, তাকে কেন
ছেড়ে দিলে? কেন দয়া দেখালে?
(৫) সাহাবায়ে কেরামের কাছে ইলম বা বিদ্যার মূল্য
কতখানি ছিল যে, অপরাধী শয়তান যখন তাকে কিছু
শিখাতে চাইল তখন তা শিখে নিলেন ও তার মূল্যায়নে
তাকে ছেড়েও দিলেন।
(৬) খারাপ বা অসৎ মানুষ ও জিন শয়তান যদি ভাল কোন
কিছু শিক্ষা দেয় তা শিখতে কোন দোষ নেই।
তবে কথা হল তার ষড়যন্ত্র ও অপকারিতা সম্পর্কে
সচেতন থাকতে হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, সে তোমাকে সত্য
বলেছে, তবে সে মিথ্যুক। এ বিষয়টিকে শিক্ষার
একটি মূলনীতি হিসাবে গ্রহণ করা যায়।
(৭) জিন শয়তান মানুষের খাদ্য-খাবারে হাত দেয়। তা
থেকে গ্রহণ করে ও নষ্ট করে।
(৮)আয়াতুল কুরসী একটি মস্তবড় সুরক্ষা। যারা আমল
করতে পারে তাদের উচিত এ আমলটি ত্যাগ না করা।
রাতে নিদ্রার পূর্বে এটি পাঠ করলে পাঠকারী সকল
প্রকার অনিষ্টতা থেকে মুক্ত থাকবে ও জিন শয়তান
কোন কিছু তার উপর চড়াও হতে পারবে না।
(৯) আয়াতুল কুরসী হল সূরা আল বাকারার ২৫৫ নং এই
আয়াত :
ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻟَﺎ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻟَّﺎ ﻫُﻮَ ﺍﻟْﺤَﻲُّ ﺍﻟْﻘَﻴُّﻮﻡُ ﻟَﺎ ﺗَﺄْﺧُﺬُﻩُ ﺳِﻨَﺔٌ ﻭَﻟَﺎ ﻧَﻮْﻡٌ ﻟَﻪُ
ﻣَﺎ ﻓِﻲ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﻭَﺍﺕِ ﻭَﻣَﺎ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺄَﺭْﺽِ ﻣَﻦْ ﺫَﺍ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﻳَﺸْﻔَﻊُ
ﻋِﻨْﺪَﻩُ ﺇِﻟَّﺎ ﺑِﺈِﺫْﻧِﻪِ ﻳَﻌْﻠَﻢُ ﻣَﺎ ﺑَﻴْﻦَ ﺃَﻳْﺪِﻳﻬِﻢْ ﻭَﻣَﺎ ﺧَﻠْﻔَﻬُﻢْ ﻭَﻟَﺎ
ﻳُﺤِﻴﻄُﻮﻥَ ﺑِﺸَﻲْﺀٍ ﻣِﻦْ ﻋِﻠْﻤِﻪِ ﺇِﻟَّﺎ ﺑِﻤَﺎ ﺷَﺎﺀَ ﻭَﺳِﻊَ ﻛُﺮْﺳِﻴُّﻪُ
ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﻭَﺍﺕِ ﻭَﺍﻟْﺄَﺭْﺽَ ﻭَﻟَﺎ ﻳَﺌُﻮﺩُﻩُ ﺣِﻔْﻈُﻬُﻤَﺎ ﻭَﻫُﻮَ ﺍﻟْﻌَﻠِﻲُّ
ﺍﻟْﻌَﻈِﻴﻢُ
অর্থ: আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি
চিরঞ্জীব, সুপ্রতিষ্ঠিত ধারক। তাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা
স্পর্শ করে না। তাঁর জন্যই আসমানসমূহে যা
রয়েছে তা এবং যমীনে যা আছে তা। কে সে,
যে তাঁর নিকট সুপারিশ করবে তাঁর অনুমতি ছাড়া? তিনি
জানেন যা আছে তাদের সামনে এবং যা আছে
তাদের পেছনে। আর তারা তাঁর জ্ঞানের সামান্য
পরিমাণও আয়ত্ব করতে পারে না, তবে তিনি যা চান তা
ছাড়া। তাঁর কুরসী আসমানসমূহ ও যমীন পরিব্যাপ্ত
করে আছে এবং এ দুটোর সংরক্ষণ তাঁর জন্য
বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ, মহান।
ছয়. খাবার সময় বিসমিল্লাহ বলা ও ঘরে প্রবেশের
সময় দুআ পাঠ করা :
হাদীসে এসেছে
ﺇﺫﺍ ﺩﺧﻞ ﺍﻟﺮﺟﻞ ﺑﻴﺘﻪ ، ﻓﺬﻛﺮ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﺪ ﺩﺧﻮﻟﻪ ﻭﻋﻨﺪ
ﻃﻌﺎﻣﻪ ، ﻗﺎﻝ ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ : ﻻ ﻣﺒﻴﺖ ﻟﻜﻢ ﻭﻻ ﻋﺸﺎﺀ . ﻭﺇﺫﺍ
ﺩﺧﻞ ﻓﻠﻢ ﻳﺬﻛﺮ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﺪ ﺩﺧﻮﻟﻪ ، ﻗﺎﻝ ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ : ﺃﺩﺭﻛﺘﻢ
ﺍﻟﻤﺒﻴﺖ . ﻭﺇﺫﺍ ﻟﻢ ﻳﺬﻛﺮ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﺪ ﻃﻌﺎﻣﻪ ، ﻗﺎﻝ : ﺃﺩﺭﻛﺘﻢ
ﺍﻟﻤﺒﻴﺖ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ . ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ، ﺭﻗﻢ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ 2018
যখন কোন ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করার সময় ও
খাবার গ্রহণের সময় আল্লাহর জিকির করে তখন
শয়তান বলে, তোমাদের সাথে আমার খাবার নেই ও
রাত্রি যাপনও নেই। আর যখন ঘরে প্রবেশের
সময় আল্লাহর জিকির করে না, তখন শয়তান বলে,
তোমার সাথে আমার রাত যাপন হবে। আর যখন খাবার
সময় আল্লাহর জিকির করে না, তখন শয়তান বলে,
তোমাদের সাথে আমার রাত যাপন ও খাবার দুটোরই
ব্যবস্থা হল। (বর্ণনায় : মুসলিম হাদীস নং ২০১৮)
ঘরে প্রবেশের সময় নির্দিষ্ট দুআ আছে সেটি
পাঠ করবে। দুআ মুখস্থ না থাকলে কমপক্ষে
বিছমিল্লাহ . . বলে ঘরে প্রবেশ করবে।
এমনিভাবে খাবার সময় বিছমিল্লাহ . . বলে খাওয়া শুরু
করবে।
সাত. হাই তোলার সময় মুখে হাত দেয়া :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ﺇﺫﺍ ﺗﺜﺎﺀﺏ ﺃﺣﺪﻛﻢ ﻓﻠﻴﻤﺴﻚ ﻋﻠﻰ ﻓﻴﻪ ، ﻓﺈﻥ ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ
ﻳﺪﺧﻞ
যখন তোমাদের কেউ হাই তোলে তখন সে
যেন তার মুখে হাত দিয়ে বাধা দেয়। কারণ হাই
তোলার সময় শয়তান প্রবেশ করে। (বর্ণনায় :
মুসলিম ও আবু দাউদ)
আট. পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করা :
খারাপ জিন শয়তান অপবিত্র ও নাপাক স্থানে বিচরণ
করে থাকে। জিনের আছর থেকে বাঁচতে সর্বদা
অপবিত্র ময়লাযুক্ত স্থান থেকে দূরে থাকতে
হবে। বাচ্চাদের ময়লা আবর্জনা ও নোংড়া অবস্থা
থেকে সর্বদা পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
যেমন :
ﻓﻲ ﺣﺪﻳﺚ ﺯﻳﺪ ﺑﻦ ﺃﺭﻗﻢ ﺍﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﺔ
ﻭﺳﻠﻢ ﻗﺎﻝ : ﺇﻥ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﺤﺸﻮﺵ ﻣﺤﺘﻀﺮﺓ ﻓﺎﺫﺍ ﺍﺗﻲ
ﺃﺣﺪﻛﻢ ﺍﻟﺨﻼﺀ ﻓﻠﻴﻘﻞ : ﺍﻟﻠﻬﻢ ﺇﻧﻲ ﺃﻋﻮﺫ ﺑﻚ ﻣﻦ ﺍﻟﺨﺒﺚ
ﻭﺍﻟﺨﺒﺎﺋﺚ ” ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ
যায়েদ ইবনে আরকাম থেকে বর্ণিত হাদীসে
এসেছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বলেছেন, এ সকল প্রস্রাব পায়খানার নোংড়া
স্থানগুলোতে শয়তানরা উপস্থিত থাকে। যখন
তোমাদের কেহ এখানে আসবে তখন যেন সে
বলে, আল্লাহুম্মা ইন্নী আউজুবিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল
খাবায়িছ (হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে জিন নর ও
জিন নারী থেকে আশ্রয় নিচ্ছি) বর্ণনায় : আবু দাউদ
অতএব আমরা এ হাদীস থেকে বুঝলাম জিন, ভূত,
শয়তান নোংড়া স্থানে অবস্থান করে। এ সকল
নোংড়া স্থান থেকে সকলের দূরে থাকা উচিত।
ﻗﺎﻝ ﺷﻴﺦ ﺍﻹﺳﻼﻡ ﺍﺑﻦ ﺗﻴﻤﻴﻪ : ﻭﻏﺎﻟﺐ ﻣﺎ ﻳﻮﺟﺪ ﺍﻟﺠﻦ
ﻓﻲ ﺍﻟﺨﻮﺍﺏ ﻭﺍﻟﻔﻮﺍﺕ ﻓﻲ ﻣﻮﺍﺿﻊ ﺍﻟﻨﺠﺎﺳﺎﺕ ﻛﺎﻟﺤﻤﺎﻣﺎﺕ
ﻭﺍﻟﺤﺸﻮﺵ ﻭﺍﻟﻤﺰﺍﻳﻞ ﻭﺍﻟﻤﻘﺎﻣﻴﻦ ﻭﺍﻟﻤﻘﺎﺑﺮ
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, সাধারণত
জিনেরা ময়লা আবর্জনা, মল-মুত্র ত্যাগের স্থান
ডাষ্টবিন ও কবর স্থানে অবস্থান করে। (মজমুআল
ফাতাওয়া)
নয়. ঘরে আল কুরআন তেলাওয়াত করা বিশেষ
করে সূরা আল বাকারা পাঠ করা :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ﻻ ﺗﺠﻌﻠﻮﺍ ﺑﻴﻮﺗﻜﻢ ﻣﻘﺎﺑﺮ . ﺇﻥ ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ ﻳﻨﻔﺮ ﻣﻦ ﺍﻟﺒﻴﺖ
ﺍﻟﺬﻱ ﺗﻘﺮﺃ ﻓﻴﻪ ﺳﻮﺭﺓ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ . ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ 780
তোমরা ঘর-কে কবরে পরিণত করো না। যে
ঘরে সূরা আল বাকারা তেলাওয়াত করা হয় শয়তান সে
ঘর থেকে দূরে থাকে। (বর্ণনায়: মুসলিম, হাদীস
নং ৭৮০)
এ হাদীস থেকে আমরা ঘরে আল কুরআন
তেলাওয়াত করার নির্দেশ জানলাম। ঘরকে কবরে
পরিণত করবে না, এর মানে হল ঘরে কুরআন
তেলাওয়াত করবে। আর সূরা আল বাকারা ঘরে
তেলাওয়াত করলে শয়তান ঘর থেকে পালিয়ে যায়।
আমরা জানি সূরা আল বাকারাতেই রয়েছে আয়াতুল
কুরসী।
দশ. কোন গর্তে পেশাব-পায়খানা না করা:
হাদীসে এসেছে –
ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻧﻬﻰ ﺃﻥ ﻳﺒﺎﻝ ﻓﻲ
ﺍﻟﺠﺤﺮ . ﻗﻴﻞ ﻟﻘﺘﺎﺩﺓ : ﻣﺎ ﻳﻜﺮﻩ ﻣﻦ ﺍﻟﺒﻮﻝ ﻓﻲ ﺍﻟﺠﺤﺮ ؟
ﻗﺎﻝ : ﻛﺎﻥ ﻳﻘﺎﻝ : ﺇﻧﻬﺎ ﻣﺴﺎﻛﻦ ﺍﻟﺠﻦ .
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম গর্তে
পেশাব করতে নিষেধ করেছেন। কাতাদাহ রা. কে
জিজ্ঞস করা হল এ নিষেধের কারণ কি? তিনি
বললেন, বলা হয়ে থাকে গর্ত হল জিনদের থাকার
জায়গা। (বর্ণনায় : আবু দাউদ)
এগার. ঘরে কোন সাপ দেখলে তা মারতে
তাড়াহুড়ো না করা :
যদি ঘরে কোন সাপ দেখা যায় তবে সাথে সাথে
তাকে না মেরে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা। তাকে
ঘর ছেড়ে যেতে বলা। তারপর যদি না যায় তাহলে
মেরে ফেলা।
হাদীসে এসেছে –
ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﺍﻟﺴﺎﺋﺐ ﻣﻮﻟﻰ ﻫﺸﺎﻡ ﺑﻦ ﺯﻫﺮﺓ ، ﺃﻧﻪ ﻗﺎﻝ :
ﺩﺧﻠﺖ ﻋﻠﻰ ﺃﺑﻲ ﺳﻌﻴﺪ ﺍﻟﺨﺪﺭﻱ ، ﻓﻮﺟﺪﺗﻪ ﻳﺼﻠﻲ ،
ﻓﺠﻠﺴﺖ ﺃﻧﺘﻈﺮﻩ ﺣﺘﻰ ﻗﻀﻰ ﺻﻼﺗﻪ ، ﻓﺴﻤﻌﺖ ﺗﺤﺮﻳﻜﺎ
ﺗﺤﺖ ﺳﺮﻳﺮ ﻓﻲ ﺑﻴﺘﻪ ، ﻓﺈﺫﺍ ﺣﻴﺔ ، ﻓﻘﻤﺖ ﻷﻗﺘﻠﻬﺎ ، ﻓﺄﺷﺎﺭ
ﺃﺑﻮ ﺳﻌﻴﺪ ﺃﻥ ﺍﺟﻠﺲ ، ﻓﻠﻤﺎ ﺍﻧﺼﺮﻑ ﺃﺷﺎﺭ ﺇﻟﻰ ﺑﻴﺖ ﻓﻲ
ﺍﻟﺪﺍﺭ ، ﻓﻘﺎﻝ : ﺃﺗﺮﻯ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺒﻴﺖ ؟ ﻓﻘﻠﺖ : ﻧﻌﻢ ، ﻗﺎﻝ :
ﺇﻧﻪ ﻗﺪ ﻛﺎﻥ ﻓﻴﻪ ﻓﺘﻰ ﺣﺪﻳﺚ ﻋﻬﺪ ﺑﻌﺮﺱ ، ﻓﺨﺮﺝ ﻣﻊ
ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺇﻟﻰ ﺍﻟﺨﻨﺪﻕ ، ﻓﺒﻴﻨﺎ ﻫﻮ
ﺑﻪ ﺇﺫ ﺃﺗﺎﻩ ﺍﻟﻔﺘﻰ ﻳﺴﺘﺄﺫﻧﻪ ، ﻓﻘﺎﻝ : ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ! ﺍﺋﺬﻥ
ﻟﻲ ﺃﺣﺪﺙ ﺑﺄﻫﻠﻲ ﻋﻬﺪﺍ ، ﻓﺄﺫﻥ ﻟﻪ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ
ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ، ﻭﻗﺎﻝ : ﺧﺬ ﻋﻠﻴﻚ ﺳﻼﺣﻚ ، ﻓﺈﻧﻲ ﺃﺧﺸﻰ
ﻋﻠﻴﻚ ﺑﻨﻲ ﻗﺮﻳﻈﺔ ، ﻓﺎﻧﻄﻠﻖ ﺍﻟﻔﺘﻰ ﺇﻟﻰ ﺃﻫﻠﻪ ، ﻓﻮﺟﺪ
ﺍﻣﺮﺃﺗﻪ ﻗﺎﺋﻤﺔ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﺒﺎﺑﻴﻦ ، ﻓﺄﻫﻮﻯ ﺇﻟﻴﻬﺎ ﺑﺎﻟﺮﻣﺢ ﻟﻴﻄﻌﻨﻬﺎ
، ﻭﺃﺩﺭﻛﺘﻪ ﻏﻴﺮﺓ ، ﻓﻘﺎﻟﺖ : ﻻ ﺗﻌﺠﻞ ﺣﺘﻰ ﺗﺪﺧﻞ ﻭﺗﻨﻈﺮ
ﻣﺎ ﻓﻲ ﺑﻴﺘﻚ ، ﻓﺪﺧﻞ ﻓﺈﺫﺍ ﻫﻮ ﺑﺤﻴﺔ ﻣﻨﻄﻮﻳﺔ ﻋﻠﻰ
ﻓﺮﺍﺷﻪ ، ﻓﺮﻛﺰ ﻓﻴﻬﺎ ﺭﻣﺤﻪ ، ﺛﻢ ﺧﺮﺝ ﺑﻬﺎ ﻓﻨﺼﺒﻪ ﻓﻲ
ﺍﻟﺪﺍﺭ ، ﻓﺎﺿﻄﺮﺑﺖ ﺍﻟﺤﻴﺔ ﻓﻲ ﺭﺃﺱ ﺍﻟﺮﻣﺢ ، ﻭﺧﺮ ﺍﻟﻔﺘﻰ
ﻣﻴﺘﺎ ، ﻓﻤﺎ ﻳﺪﺭﻱ ﺃﻳﻬﻤﺎ ﻛﺎﻥ ﺃﺳﺮﻉ ﻣﻮﺗﺎ ، ﺍﻟﻔﺘﻰ ﺃﻡ
ﺍﻟﺤﻴﺔ ؟ ﻓﺬﻛﺮ ﺫﻟﻚ ﻟﺮﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ
ﻓﻘﺎﻝ : ﺇﻥ ﺑﺎﻟﻤﺪﻳﻨﺔ ﺟﻨﺎ ﻗﺪ ﺃﺳﻠﻤﻮﺍ ، ﻓﺈﺫﺍ ﺭﺃﻳﺘﻢ ﻣﻨﻬﻢ
ﺷﻴﺌﺎ ﻓﺂﺫﻧﻮﻩ ﺛﻼﺛﺔ ﺃﻳﺎﻡ ، ﻓﺈﻥ ﺑﺪﺍ ﻟﻜﻢ ﺑﻌﺪ ﺫﻟﻚ ﻓﺎﻗﺘﻠﻮﻩ ،
ﻓﺈﻧﻤﺎ ﻫﻮ ﺷﻴﻄﺎﻥ . ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ ﻓﻲ ﻛﺘﺎﺏ ﻗﺘﻞ ﺍﻟﺤﻴﺎﺕ
ﻭﻏﻴﺮﻫﺎ .
হিশাম ইবনে যাহরার মুক্ত দাস আবু সায়েব থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু সায়ীদ খুদরি রা. এর
সাথে দেখা করার জন্য গেলাম। তাকে নামাজ পড়া
অবস্থায় পেলাম। আমি তার নামাজ শেষ হওয়ার
অপেক্ষায় বসে থাকলাম। এমন সময় তার ঘরের
খাটের নীচে কিছু একটা নড়াচড়া করার শব্দ পেলাম।
চেয়ে দেখি একটি সাপ। আমি সেটাকে মেরে
ফেলতে উঠে দাঁড়ালাম। আবু সায়ীদ রা. আমাকে
বসতে ইশারা দিলেন। যখন নামাজ শেষ করলেন
তখন আমাকে বাড়ীর একটি ঘরের দিকে ইশারা
করে বললেন, তুমি কি এ ঘরটি দেখছো? আমি
বললাম হ্যাঁ, দেখছি। তিনি বললেন, এ ঘরে বসবাস
করত একজন যুবক। সে নববিবাহিত ছিল। একদিন সে
খন্দকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এর সাথে যোগ দিল। যেহেতু সে নব
বিবাহিত যুবক, তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এর কাছে অনুমতি চেয়ে বলল, হে রাসূল!
আমি নববিবাহিত। আমাকে আমার স্ত্রীর কাছে
যাওয়ার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম তাকে অনুমতি দিলেন, আর বললেন, সাথে
অস্ত্র নিয়ে যেও। আমি তোমার উপর বনু কুরাইযার
হামলার আশঙ্কা করছি। যুবকটি তার স্ত্রীর
উদ্দেশ্যে রওয়ানা হল। ঘরে পৌছে দেখল, তার
স্ত্রী ঘরের বাহিরে দরজার দু পাটের মাঝে
দাঁড়ানো। এ অবস্থা দেখে তার আত্নসম্মান
বোধে আঘাত লাগল। সে বর্শা দিয়ে তাকে আঘাত
করতে উদ্যত হল। স্ত্রী বলল, তাড়াহুড়ো করো
না। আগে ঘরে প্রবেশ করে দেখ তোমার
ঘরের মধ্যে কি? সে ঘরে ঢুকে দেখল, তার
বিছানায় একটি সাপ গোল হয়ে শুয়ে আছে। যুবকটি
বর্শা দিয়ে সাপের গায়ে আঘাত করল। এরপর
এটাকে ঘরের বাহিরে নিয়ে আসল। সাপটি বর্শার
মাথায় ছটফট করছিলো। আর যুবকটি তখন মরে
পড়ে গেল। কেহ জানে না, কে আগে
মরেছে, যুবকটি না সাপটি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এ ঘটনা বর্ণনা করা হল।
তিনি বললেন, মদীনাতে কিছু জিন আছে যারা ইসলাম
গ্রহণ করেছে। যদি তোমাদের কেহ তাদের
কাউকে দেখে তাহলে তাকে তিন দিনের সময়
দেবে। তিন দিনের পরও যদি তাকে দেখা যায়
তাহলে তাকে হত্যা করবে। কারণ, সে শয়তান।
(বর্ণনায় : মুসলিম, সাপ হত্যা অধ্যায়।)
এ হাদীস থেকে আমরা যা শিখতে পেলাম তা
হল:
১- সাহাবায়ে কেরাম অন্যকে ইসলামী বিধি-বিধান ও
নবী কারীম সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর
সুন্নাত শিক্ষা দিয়েছেন অত্যন্ত যত্ন সহকারে।
২- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর
সাহাবায়ে কেরাম ও উম্মতের প্রতি কত দয়াশীল
ছিলেন যে, যুদ্ধকালীন সময়ে কেউ স্ত্রীর
কাছে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তা তিনি সাথে সাথে
দিয়ে দিতেন। কখনো দেখা গেছে তিনি তার
সাহাবীদের নিজের পক্ষ থেকেই জিজ্ঞেস
করতেন, কত দিন হল তুমি বিবাহ করেছ? তোমার
বাড়ীতে কে আছে? তোমাকে ছুটি দিলাম তুমি
বাড়ীতে স্ত্রীর কাছে যাও।
৩- ঘরে কোন সাপ দেখলে সাথে সাথে হত্যা
করতে নেই। হতে পারে সে জিন। তবে যদি সাপ
দেখে বা এর আচার-আচরণ, আলামত দেখে বুঝে
আসে এটা জিন নয়, সাপ। তখন হত্যা করা দোষণীয়
নয়। আলোচ্য হাদীসে দেখুন, সাপটি বিছানার উপর
শুয়ে ছিল। যদি সে সাপ হয়, তাহলে বিছানার উপর তার
কী প্রয়োজন? সে ইঁদুর বা পোকা-মাকর
খুঁজবে।
৪- ঘরে এ রকম সন্দেহ জনক সাপ দেখলে
তাকে উচ্চস্বরে ঘর ছেড়ে যেতে বলবে।
এভাবে তিন দিন বলার পরও সে না গেলে তাকে
হত্যা করে ফেলবে।
৫- বনে জঙ্গলে, পাহাড়ে-পর্বতে, রাস্তায় কোন
সাপ দেখলে জিন মনে করার কোন কারণ নেই।
তাকে মেরে ফেলতে হবে। শুধু ঘরের
সাপকে জিন বলে সন্দেহ করা যায়। একটি সহীহ
হাদীসে এটি স্পষ্ট বলা আছে।
৬- সাপটি জিন ছিল বিধায় সে নিজেকে হত্যা করার
অপরাধে হত্যাকারীকে আঘাত করে হত্যা
করেছে। কিন্তু সাপটি কিভাবে যুবকটিকে আঘাত
করল তা কেউ দেখেনি।
৭- সাপটি মুসলিম জিন ছিল বলে রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি
ওয়া সাল্লাম এর কথায় ইশারা পাওয়া যায়। সে শুরুতেই
তাকে আঘাত করেনি। বা তার স্ত্রীর কোন ক্ষতি
করেনি।
৮- রাসূলুল্লা সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন
রহমাতুললিল আলামীন বা সৃষ্টিকুলের জন্য করুণা। তাই
তিনি জিনের প্রতিও করুণা-রহমত দেখিয়েছেন। এ
হাদীসটি ছাড়াও অন্যান্য অনেক হাদীস রয়েছে এ
বিষয়ে।
৯- কারণ সে শয়তান রাসলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এর এ কথার অর্থ হল, সে জিন নয়, সে
প্রাণীদের মধ্যে দুষ্ট ও ক্ষতিকর। তাকে হত্যা
করো।
১০. জিনকে অযথা হত্যা করা অন্যায়।
বার. স্ত্রীর সাথে মিলনের সময় দুআ পাঠ করা :
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ﻟﻮ ﺃﻥ ﺃﺣﺪﻫﻢ ﺇﺫﺍ ﺃﺭﺍﺩ ﺃﻥ ﻳﺄﺗﻲ ﺃﻫﻠﻪ ﻗﺎﻝ : ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ،
ﺍﻟﻠﻬﻢ ﺟﻨﺒﻨﺎ ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ ، ﻭﺟﻨﺐ ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ ﻣﺎ ﺭﺯﻗﺘﻨﺎ ، ﻓﺈﻧﻪ
ﺇﻥ ﻳﻘﺪﺭ ﺑﻴﻨﻬﻤﺎ ﻭﻟﺪ ﻓﻲ ﺫﻟﻚ ﻟﻢ ﻳﻀﺮﻩ ﺷﻴﻄﺎﻥ ﺃﺑﺪﺍ .
তোমাদের কেহ যখন নিজ স্ত্রীর সাথে মিলিত
হতে ইচ্ছে করে তখন যদি বলে, বিছমিল্লাহ,
আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইতান, অজান্নিবিশ শাইতান মা
রাযাকতানা (আল্লাহর নামে আমরা মিলিত হচ্ছি, হে
আল্লাহ আমাদের শয়তান থেকে দূরে রাখুন আর
আমাদের যে সন্তান দান করবেন তাকেও শয়তান
থেকে দূরে রাখুন) তাহলে এ মিলনে সন্তান জন্ম
নিলে সে সন্তানকে শয়তান কখনো ক্ষতি করতে
পারবে না। (বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)
তের. সন্ধ্যার সময় বাচ্চাদেরকে বাহিরে বের
হতে না দেয়া:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ﺇﺫﺍ ﻛﺎﻥ ﺟﻨﺢ ﺍﻟﻠﻴﻞ، ﺃﻭ ﺃﻣﺴﻴﺘﻢ ، ﻓﻜﻔﻮﺍ ﺻﺒﻴﺎﻧﻜﻢ ، ﻓﺈﻥ
ﺍﻟﺸﻴﺎﻃﻴﻦ ﺗﻨﺘﺸﺮ ﺣﻴﻨﺌﺬ ، ﻓﺈﺫﺍ ﺫﻫﺒﺖ ﺳﺎﻋﺔ ﺍﻟﻠﻴﻞ
ﻓﺨﻠﻮﻫﻢ ، ﻭﺃﻏﻠﻘﻮﺍ ﺍﻷﺑﻮﺍﺏ ﻭﺍﺫﻛﺮﻭﺍ ﺍﺳﻢ ﺍﻟﻠﻪ ، ﻓﺈﻥ
ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ ﻻ ﻳﻔﺘﺢ ﺑﺎﺑﺎً ﻣﻐﻠﻘﺎً .
যখন রাত্রি ডানা মেলে অথবা তোমরা সন্ধ্যায়
উপনীত হও, তখন সন্তানদের প্রতি খেয়াল
রাখবে। বাহিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখবে। কারণ,
তখন শয়তানেরা ছড়িয়ে পড়ে। যখন রাতের কিছু অংশ
অতিবাহিত হয়ে যায় তখন তাদের ছেড়ে দিতে
পারো। আর দরজা বন্ধ করে দেবে। আল্লাহর নাম
স্মরণ করবে। জেনে রাখো, শয়তান বন্ধ দরজা
খুলতে পারে না। (বর্ণনায় : বুখারী)
এ হাদীস থেকে আমরা নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো
জানতে পারলাম :
১- সন্ধ্যার সময় বাচ্চাদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়ার
নির্দেশ।
২- সন্ধ্যার আগে বাচ্চাদের ঘরে আসার জন্য
বলতে হবে। তখন তাদের ঘর থেকে বের
হতে বারণ করবে।
৩- সন্ধ্যার কিছু পরে এ আশঙ্কা থাকে না। তখন
বাচ্চাদের বের হতে বারণ নেই।
৪- সন্ধ্যার সময় ঘরের দরজা বন্ধ করার নির্দেশ।
৫- আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এ হাদীস থেকে
জানা গেল যে, জিন বা শয়তান ঘরের বন্ধ দরজা
খুলতে পারে না।
৬- দরজা খোলা ও বন্ধের সময় আল্লাহর নাম স্মরণ
করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
চৌদ্দ. জিনদের কাছে আশ্রয় চাওয়া বা তাদের সাহায্য
না নেয়া:
মানুষ যদি জিনদের কাছে কোন কিছু চায় বা তাদের
সাহায্য গ্রহণ করে তাহলে তাদের ঔদ্ধত্য বেড়ে
যায়। তারা মানুষের উপর চড়াও হতে উৎসাহ পায়। যেমন
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন-
ﻭَﺃَﻧَّﻪُ ﻛَﺎﻥَ ﺭِﺟَﺎﻝٌ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺈِﻧْﺲِ ﻳَﻌُﻮﺫُﻭﻥَ ﺑِﺮِﺟَﺎﻝٍ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺠِﻦِّ
ﻓَﺰَﺍﺩُﻭﻫُﻢْ ﺭَﻫَﻘًﺎ
আর নিশ্চয় কতিপয় মানুষ কতিপয় জিনের আশ্রয় নিত,
ফলে তারা তাদের অহংকার বাড়িয়ে দিয়েছিল। (সূরা
আল জিন : ৬)
অনেক ওঝা ফকীর-কে দেখা যায় তারা তাবীজ-
তদবীরের ক্ষেত্রে জিনের সাহায্য নেয়। এটা
অন্যায়।
জিনের আছরের চিকিৎসা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে
জিনের আছর করা রোগীর চিকিৎসা করেছেন।
হাদীসে এসেছে –
ﻋﻦ ﻳﻌﻠﻰ ﺍﺑﻦ ﻣﺮﺓ ﻗﺎﻝ : ﺭﺃﻳﺖ ﻣﻦ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ
ﻭﺳﻠﻢ ﻋﺠﺒﺎ ﺧﺮﺟﺖ ﻣﻌﻪ ﻓﻲ ﺳﻔﺮ ﻓﻨﺰﻟﻨﺎ ﻣﻨﺰﻻ ﻓﺄﺗﺘﻪ
ﺍﻣﺮﺃﺓ ﺑﺼﺒﻲ ﻟﻬﺎ ﺑﻪ ﻟﻤﻢ ، ﻓﻘﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ
ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ : ﺃﺧﺮﺝ ﻋﺪﻭ ﺍﻟﻠﻪ ﺃﻧﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ، ﻗﺎﻝ : ﻓﺒﺮﺃ
ﻓﻠﻤﺎ ﺭﺟﻌﻨﺎ ﺟﺎﺀﺕ ﺃﻡ ﺍﻟﻐﻼﻡ ﺑﻜﺒﺸﻴﻦ ﻭﺷﻲﺀ ﻣﻦ ﺃﻗﻂ
ﻭﺳﻤﻦ ، ﻓﻘﺎﻝ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ : ﻳﺎ ﻳﻌﻠﻰ !
ﺧﺬ ﺃﺣﺪ ﺍﻟﻜﺒﺸﻴﻦ ، ﻭﺭﺩ ﻋﻠﻴﻬﺎ ﺍﻵﺧﺮ ، ﻭﺧﺬ ﺍﻟﺴﻤﻦ
ﻭﺍﻷﻗﻂ ، ﻗﺎﻝ : ﻓﻔﻌﻠﺖ
ইয়ালা ইবনে মুররা বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন,
এক বার আমি যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এর সাথে এক সফরে গেলাম তখন আমরা
এক স্থানে অবস্থান করলাম তখন একটি আশ্চর্যজনক
ঘটনা দেখলাম। এক মহিলা নিজের একটি বাচ্চা নিয়ে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে
উপস্থিত হল। বাচ্চাটি অস্বাভাবিক আচরণ করছিলো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে
আল্লাহর দুশমন বের হয়ে যা! আমি আল্লাহর রাসূল।
তিনি বলেন, এ কথা বলার পর বাচ্চাটি সুস্থ হয়ে গেল।
যখন আমরা সে স্থান থেকে ফিরে আসছিলাম, তখন
বাচ্চাটির মা দুটো ভেড়া, কিছু ঘি ও ছানা নিয়ে আসল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে
ইয়ালা! ভেড়া দুটোর মধ্যে একটি রেখে দাও।
অন্যটি মহিলাটিকে ফেরত দাও। আর ঘি ও ছানা রেখে
দাও। ইয়ালা বলেন, আমি তাই করলাম। (বর্ণনায় :
বুখারী, দালায়েলুন নবুওয়াহ)
হাদীসটি থেকে আমরা জানতে পারলাম :
(১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাচ্চাটিকে
জিন মুক্ত করেছেন। আমি আল্লাহর রাসূল এ কথা
শুনেই জিন চলে গেছে।
(২) বাচ্চাটির মা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
কে হাদীয়া দিলেন। কেহ উপকার করলে তাকে
হাদীয়া দেয়া যায়। এমনিভাবে জিন মুক্ত করার
তদবীর করলে এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেয়া যায়।
(৩) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীয়ার
কিছু অংশ ফেরত দিলেন। হতে পারে মহিলাটি নিজ
সামর্থের চেয়ে বেশী দিয়েছে। হয়ত এ
কারণে তাদের কষ্ট হবে, এ জন্য রাহমাতুললিল
আলামীন হাদীয়ার কিছু অংশ ফেরত দিলেন।
জিনের রোগীর কাছে কুরআনের বিশেষ
বিশেষ আয়াত তেলাওয়াত করা :
আল কুরআন পুরোটাই শিফা বা আরোগ্য লাভের
মাধ্যম। আল কুরআনের বহু স্থানে আল্লাহ রাব্বুল
আলামীন কুরআন-কে শিফা বলেছেন। আল
কুরআন শারিরিক ব্যাধির চিকিৎসা নয়, বরং আধ্যাত্নিক ব্যাধির
চিকিৎসা এ ধরনের খন্ডিত ব্যাখ্যা কখনো
গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, আল-কুরআনকে আল্লাহ
তাআলা সাধারণভাবে শিফা বলেছেন। তিনি বা তাঁর রাসূল
কখনো বলেননি যে, শিফা বা আরোগ্য বলতে
আধ্যাত্নিক রোগের শিফা বুঝানো হয়েছে। তাই
যারা বলবেন, আল কুরআনকে শারিরিক ব্যাধির জন্য
শিফা বলা যাবে না তারা সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছতে
পারেননি। যাই হোক জিনে ধরা রোগীর কাছে
আল কুরআনের বিশেষ বিশেষ কিছু আয়াত
তেলাওয়াত করা হলে জিন ছেড়ে যায় আর
রোগী ভাল হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে ইমাম মুহাম্মাদ
ইবনে সীরিন রহ. কর্তৃক আব্দুল্লাহ বিন উমার রা.
থেকে তেত্রিশটি আয়াতের কথা বর্ণিত আছে।
যদিও হাদীসের সনদটি সহীহ নয় কিন্তু আল
কুরআনের আয়াতের প্রভাব অস্বীকার করার উপায়
নেই। আমি নিজেও একাধিকবার দেখেছি সুন্নাতের
পাবন্দ একজন আলেমের কাছে জিনে ধরা
রোগী নিয়ে আসা হল। তিনি তেত্রিশটি আয়াত পাঠ
করে তাকে শুনালে জিন চলে যায় এবং রোগী
সুস্থ হয়ে যায়। এ রকম দৃশ্য বহুবার প্রত্যক্ষ
করেছি। কুরআনের বরকত ও প্রভাব কত যে
ব্যাপক তা কি আমরা সকলে অনুধাবন করতে পারি?
আর সে তেত্রিশটি আয়াত হল : সূরা ফাতেহা পর, সূরা
আল বাকারার ১ থেকে ৪ আয়াত, সূরা আল বাকারার ২৫৫
থেকে ২৫৭ আয়াত, যার মধ্যে আয়াতুল কুরসী
রয়েছে। সূরা আল বাকারার ২৮৪ থেকে ২৮৬
আয়াত। সূরা আল আরাফের ৫৪ থেকে ৫৬ আয়াত।
সূরা আল ইসরার (বনী ইসরাইল) ১১০ থেকে ১১১
আয়াত। সূরা আস সাফফাতের ১ আয়াত থেকে ১১ নং
আয়াত। সূরা আর রাহমানের ৩৩ আয়াত থেকে ৩৫ নং
আয়াত। সূরা জিন এর ১ নং আয়াত থেকে ৪ নং আয়াত।
এভাবে তেত্রিশটি আয়াত হয়।
কোন কোন বর্ণনায় এর সাথে সূরা হাশরের ২১ নং
আয়াত থেকে ২৪ নং আয়াত পাঠ করার কথা এসেছে।
আবার সূরা ইখলাছ, সূরা কাফেরূন, সূরা আল ফালাক ও সূরা
আন নাছ পাঠ করার কথাও এসেছে।
তবে মূল কথা হল তেত্রিশ আয়াত পাঠ করতে হবে
এমন কোন বিধান নেই। আগেই বলেছি এ সংক্রান্ত
হাদীসটির সনদ সহীহ বলে প্রমাণিত নয়। বরং এ
আয়াতগুলো ও এর সাথে অন্যান্য যে সকল
আয়াতের কথা আলোচনা হয়েছে এগুলো
সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে খূবই অর্থবহ, তৎপর্যপূর্ণ,
বরকতময়। আর অভিজ্ঞতায় এর কার্যকারিতা প্রমাণিত।
যেমন সূরা ফাতেহার কথা সকলে কাছে সুবিদিত যে
তার এক নাম হল সূরা শিফা। আয়াতুল কুরসীর ফজিলত
সম্পর্কে সকলের জানা। সূরা বাকারার শেষ
আয়াতসমূহের ফজিলত সম্পর্কে সহীহ হাদীস
রয়েছে। সূরা সাফফাত পাঠে জিন শয়তান ভয় পেয়ে
যায় বলে হাদীসে এসেছে। সূরা ফালাক ও সূরা নাছ
সকল প্রকার যাদু টোনা ক্ষতি থেকে রক্ষা করে
ইত্যাদি।
তাই জিনে ধরা রোগীর কাছে এ সকল আয়াত
তেলাওয়াত করা হলে জিন ছেড়ে যায় ও রোগী
সুস্থ হয় বলে অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত। এবং এটি মহান
আল্লাহর কালামের একটি বরকত ও শিফা।
জিনে ধরা রোগীর চিকিৎসার জন্য তাবীজ-কবচ
ব্যবহার, লোহা পড়া, ঘর বন্ধক দেয়া ইত্যাদি তদবীর
করা ঠিক নয়। তবে কুরআন বা হাদীসে বর্ণিত দুআ-
জিকির দিয়ে ঝাড়-ফুঁক, তেল পড়া, পানি পড়া ইত্যাদি
ব্যবহারের অনুমতি আছে।
জিনের অধিকার রক্ষায় আমাদের করণীয়
হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম
জিনদের ব্যাপারে তোমাদের ভাই শব্দ ব্যবহার
করেছেন। অর্থাৎ মুসলিম জিনেরা হল আমাদের
ভাই। তাদের অধিকার রক্ষায় যত্নবান হতে রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের দিক-নির্দেশনা
দিয়েছেন। যেমন হাদীসে এসেছে –
ﻗﺎﻝ ﻋﻠﻘﻤﺔ : ﺃﻧﺎ ﺳﺄﻟﺖ ﺍﺑﻦ ﻣﺴﻌﻮﺩ . ﻓﻘﻠﺖ : ﻫﻞ ﺷﻬﺪ
ﺃﺣﺪ ﻣﻨﻜﻢ ﻣﻊ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻟﻴﻠﺔ
ﺍﻟﺠﻦ ؟ ﻗﺎﻝ : ﻻ، ﻭﻟﻜﻨﺎ ﻛﻨﺎ ﻣﻊ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ
ﻭﺳﻠﻢ ﺫﺍﺕ ﻟﻴﻠﺔ . ﻓﻔﻘﺪﻧﺎﻩ، ﻓﺎﻟﺘﻤﺴﻨﺎﻩ ﻓﻲ ﺍﻷﻭﺩﻳﺔ
ﻭﺍﻟﺸﻌﺎﺏ . ﻓﻘﻠﻨﺎ : ﺍﺳﺘﻄﻴﺮ ﺃﻭ ﺍﻏﺘﻴﻞ، ﻗﺎﻝ ﻓﺒﺘﻨﺎ ﺑﺸﺮ
ﻟﻴﻠﺔ ﺑﺎﺕ ﺑﻬﺎ ﻗﻮﻡ . ﻓﻠﻤﺎ ﺃﺻﺒﺤﻨﺎ ﺇﺫﺍ ﻫﻮ ﺟﺎﺀ ﻣﻦ ﻗﺒﻞ
ﺣﺮﺍﺀ . ﻗﺎﻝ ﻓﻘﻠﻨﺎ : ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ! ﻓﻘﺪﻧﺎﻙ ﻓﻄﻠﺒﻨﺎﻙ ﻓﻠﻢ
ﻧﺠﺪﻙ ﻓﺒﺘﻨﺎ ﺑﺸﺮ ﻟﻴﻠﺔ ﺑﺎﺕ ﺑﻬﺎ ﻗﻮﻡ . ﻓﻘﺎﻝ ” ﺃﺗﺎﻧﻲ ﺩﺍﻋﻲ
ﺍﻟﺠﻦ . ﻓﺬﻫﺒﺖ ﻣﻌﻪ . ﻓﻘﺮﺃﺕ ﻋﻠﻴﻬﻢ ﺍﻟﻘﺮﺁﻥ ” ﻗﺎﻝ
ﻓﺎﻧﻄﻠﻖ ﺑﻨﺎ ﻓﺄﺭﺍﻧﺎ ﺁﺛﺎﺭﻫﻢ ﻭﺁﺛﺎﺭ ﻧﻴﺮﺍﻧﻬﻢ . ﻭﺳﺄﻟﻮﻩ ﺍﻟﺰﺍﺩ .
ﻓﻘﺎﻝ ” ﻟﻜﻢ ﻛﻞ ﻋﻈﻢ ﺫﻛﺮ ﺍﺳﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻳﻘﻊ ﻓﻲ ﺃﻳﺪﻳﻜﻢ
، ﺃﻭﻓﺮ ﻣﺎ ﻳﻜﻮﻥ ﻟﺤﻤﺎ . ﻭﻛﻞ ﺑﻌﺮﺓ ﻋﻠﻒ ﻟﺪﻭﺍﺑﻜﻢ ” . ﻓﻘﺎﻝ
ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ” ﻓﻼ ﺗﺴﺘﻨﺠﻮﺍ ﺑﻬﻤﺎ
ﻓﺈﻧﻬﻤﺎ ﻃﻌﺎﻡ ﺇﺧﻮﺍﻧﻜﻢ .” ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ
আলকামা বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.
কে জিজ্ঞেস করলাম, জিনের রাতে আপনাদের
মধ্যে কি কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এর সাথে ছিলেন? তিনি বললেন, না। কিন্তু
ঘটনা হল, আমরা এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি
ওয়া সাল্লাম এর সাথে ছিলাম। তাকে আমরা পেলাম না।
আমরা তাকে বিভিন্ন ঘাটি ও পাহাড়ে খোঁজ করতে
থাকলাম। আমরা বলতে লাগলাম তিনি উধাও হয়ে
গেছেন অথবা কেউ তাকে অপহরণ করেছে।
আসলে সে রাতটি আমরা অত্যন্ত খারাপভাবে
কাটিয়েছি। যখন সকাল হল তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেরা পর্বতের দিক দিয়ে
আমাদের কাছে হাজির হলেন। আমরা বললাম, হে
আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনাকে হারিয়েছিলাম।
অনেক খোঁজা-খোঁজি করেছি। আপনাকে না
পেয়ে আমরা খুব দু:চিন্তায় (খুব খারাপ) রাত কাটিয়েছি।
তিনি বললেন, জিনদের মধ্য থেকে একজন
আহবানকারী এসেছিল আমার কাছে। আমি তার সাথে
গেলাম। আমি তাদের কুরআন পাঠ করে শুনালাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের
নিয়ে সে স্থানের দিকে চললেন। তিনি আমাদের
তাদের পদচিহ্নগুলো দেখালেন। তাদের
আগুনের আলামতগুলোও দেখালেন। তারা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে তাদের
খাদ্য-খাবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল। তিনি
তাদের বললেন, তোমাদের খাবার হল সে সকল
জন্তু জানোয়ারে হাড্ডি যা আল্লাহর নাম নিয়ে
জবেহ করা হয়েছে। এর মধ্যে যা তোমাদের
নাগালে আসে তা তোমরা খাবে। এটা তোমাদের
জন্য গোশ্ত বলে গণ্য হবে। আর তোমাদের
পালিত জানোয়ারের গোবরও তোমাদের খাদ্য।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম
আমাদের বললেন, তোমরা এগুলো দিয়ে
কখনো ইসতেনজা (শৌচ কর্মে ব্যবহার) করবে না।
কেননা এটা তোমাদের ভাইদের (জিনদের) খাদ্য।
হাদীস থেকে আমরা যা শিখতে পারলাম :
১- জিনদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম এর ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। হাদীসে
বর্ণিত ঘটনার সমর্থনে নিম্নোক্ত আয়াত আমরা
উল্লেখ করতে পারি।
ﻭَﺇِﺫْ ﺻَﺮَﻓْﻨَﺎ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ﻧَﻔَﺮًﺍ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺠِﻦِّ ﻳَﺴْﺘَﻤِﻌُﻮﻥَ ﺍﻟْﻘُﺮْﺁَﻥَ ﻓَﻠَﻤَّﺎ
ﺣَﻀَﺮُﻭﻩُ ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﺃَﻧْﺼِﺘُﻮﺍ ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﻗُﻀِﻲَ ﻭَﻟَّﻮْﺍ ﺇِﻟَﻰ ﻗَﻮْﻣِﻬِﻢْ
ﻣُﻨْﺬِﺭِﻳﻦَ . ﺳﻮﺭﺓ ﺍﻷﺣﻘﺎﻑ، 29
আর যখন আমি জিনদের একটি দলকে তোমার
কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তারা কুরআন পাঠ শুনছিল।
যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হল, তখন তারা বলল, চুপ
করে শোন। তারপর যখন পাঠ শেষ হল, তখন তারা
তাদের কওমের কাছে সতর্ককারী হিসেবে
ফিরে গেল। (সূরা আল আহকাফ, আয়াত ২৯)
২- সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম-কে কত ভালোবাসতেন। তাদের মন্তব্য
দ্বারাই বুঝা যায় যে, তাকে না পেয়ে সে দিন তারা
জীবনের সবচেয়ে খারাপ রাত অতিবাহিত
করেছে।
৩- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে
কেরাম রা. কে শিক্ষা দিতে বা তথ্য জানাতে কোন
ধরনের কার্পণ্য বা শিথিলতা করেননি। তাঁর বক্তব্যই
তাদের জন্য যথেষ্ঠ ছিল। তা সত্বেও তিনি তাদের
ঘটনাস্থলে নিয়ে গেছেন। তাদের আলামতগুলো
দেখিয়েছেন।
৪- এ হাদীস থেকে জিনদের দুটো খাদ্যের
বিষয় জানতে পারলাম। একটি হল হাড্ডি অন্যটি হল
গোবর।
৫- তাদের খাদ্য সংরক্ষণ করার জন্য রাসুলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দুটো বস্তুকে
শৌচকর্মে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছেন। এটা জিনদের
অধিকার রক্ষার একটি বিষয় হিসাবে গণ্য হলো।
৬- জিনদেরকে আমাদের ভাই বলে তাদের
অধিকারের প্রতি লক্ষ্য রাখতে নির্দেশ দেয়া
হয়েছে। কাজেই জিন মানেই আমাদের শত্রু নয়।
তাদের মধ্যে যারা মানুষকে কষ্ট দেয় বা বিভ্রান্ত
করে তারাই মানুষের শত্রু ।
কয়লা কি জিনদের খাদ্য?
অনেক ফিকাহের কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে,
কয়লা দিয়ে ইস্তেন্জা (শৌচ কর্ম) করা যাবে না। কারণ
কয়লা হল জিনদের খাদ্য।
এ প্রসঙ্গে অবশ্য একটি হাদীস এসেছে।
হাদীসটি হল :
ﻗﺪﻡ ﻭﻓﺪ ﺍﻟﺠﻦ ﻋﻠﻰ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ
ﻓﻘﺎﻟﻮﺍ ﻳﺎ ﻣﺤﻤﺪ ﺍﻧﻪ ﺃﻣﺘﻚ ﺃﻥ ﻳﺴﺘﻨﺠﻮﺍ ﺑﻌﻈﻢ ﺃﻭ ﺭﻭﺛﺔ ﺃﻭ
ﺣﻤﻤﺔ ﻓﺈﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﺟﻌﻞ ﻟﻨﺎ ﻓﻴﻬﺎ ﺭﺯﻗﺎ ﻗﺎﻝ : ﻓﻨﻬﻰ
ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻋﻦ ﺫﻟﻚ .
ﺍﻟﺮﺍﻭﻱ : ﻋﺒﺪﺍﻟﻠﻪ ﺑﻦ ﻣﺴﻌﻮﺩ ﺍﻟﻤﺤﺪﺙ : ﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ –
ﺍﻟﻤﺼﺪﺭ : ﺳﻨﻦ ﺃﺑﻲ ﺩﺍﻭﺩ – ﺍﻟﺼﻔﺤﺔ ﺃﻭ ﺍﻟﺮﻗﻢ : 39
ﺧﻼﺻﺔ ﺍﻟﺪﺭﺟﺔ : ﺳﻜﺖ ﻋﻨﻪ ‏[ﻭﻗﺪ ﻗﺎﻝ ﻓﻲ ﺭﺳﺎﻟﺘﻪ ﻷﻫﻞ
ﻣﻜﺔ ﻛﻞ ﻣﺎ ﺳﻜﺖ ﻋﻨﻪ ﻓﻬﻮ ﺻﺎﻟﺢ ]
জিনদের একটি প্রতিনিধ দল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে আসল। তারা বলল, হে
মুহাম্মাদ! আপনার উম্মত হাড্ডি, গোবর ও কয়লা দ্বারা
ইসতেন্জা করে থাকে। অথচ আল্লাহ তাআলা এ
গুলোকে আমাদের জন্য খাদ্য হিসাবে নির্ধারণ
করেছেন। হাদীসের বর্ণনাকারী আব্দুল্লাহ
ইবনে মাসউদ রা. বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে এ সকল বস্তু দিয়ে
ইসতেন্জা করতে নিষেধ করেছেন। (বর্ণনায় :
আবু দাউদ)
সনদ সূত্রের দিকে দিয়ে হাদীসের মান হল :
ﻗﺎﻝ ﺍﻹﻣﺎﻡ ﺍﻟﻨﻮﻭﻱ ﻓﻲ ﺷﺮﺡ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻓﻲ ﺍﻟﻤﺠﻤﻮﻉ
ﺷﺮﺡ ﺍﻟﻤﻬﺬﺏ :
ﺭﻭﺍﻩ ﺃﺑﻮ ﺩﺍﻭﺩ ﻭﺍﻟﺪﺍﺭﻗﻄﻨﻲ ﻭﺍﻟﺒﻴﻬﻘﻲ ﻭﻟﻢ ﻳﻀﻌﻔﻪ ﺃﺑﻮ
ﺩﺍﻭﺩ ، ﻭﺿﻌﻔﻪ ﺍﻟﺪﺍﺭﻗﻄﻨﻲ ﻭﺍﻟﺒﻴﻬﻘﻲ
ﻭﺍﻟﺤﻤﻤﺔ ﺑﻀﻢ ﺍﻟﺤﺎﺀ ﻭﻓﺘﺢ ﺍﻟﻤﻴﻤﻴﻦ ﻣﺨﻔﻔﺘﻴﻦ ﻭﻫﻲ
ﺍﻟﻔﺤﻢ ، ﻛﺬﺍ ﻗﺎﻟﻪ ﺃﺻﺤﺎﺑﻨﺎ ﻓﻲ ﻛﺘﺐ ﺍﻟﻔﻘﻪ ، ﻭﻛﺬﺍ ﻗﺎﻟﻪ
ﺃﻫﻞ ﺍﻟﻠﻐﺔ . ﻭﻗﺎﻝ ﺍﻟﺨﻄﺎﺑﻲ : ﺍﻟﺤﻤﻢ ﺍﻟﻔﺤﻢ ﻭﻣﺎ ﺃﺣﺮﻕ
ﻣﻦ ﺍﻟﺨﺸﺐ ﻭﺍﻟﻌﻈﺎﻡ ﻭﻧﺤﻮﻫﻤﺎ ، ﻗﺎﻝ : ﻭﺍﻻﺳﺘﻨﺠﺎﺀ ﺑﻪ
ﻣﻨﻬﻲ ﻋﻨﻪ ﻷﻧﻪ ﺟﻌﻞ ﺭﺯﻗﺎ ﻟﻠﺠﻦ ﻓﻼ ﻳﺠﻮﺯ ﺇﻓﺴﺎﺩﻩ ﻋﻠﻲ .
ইমাম নববী রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় আল মাজমু
শারহুল মুহাজ্জাব গ্রন্থে লিখেন, এ হাদীসটি আবু
দাউদ, দারে কুতনী ও বায়হাকী বর্ণনা করেছেন।
আবু দাউদ হাদীসটিকে যয়ীফ (দুর্বল সুত্র)
বলেননি। কিন্তু দারে কুতনী ও বায়হাকী হাদীসটি
দুর্বল সুত্রের বলে অভিমত দিয়েছেন।
হাদীসে বর্ণিত হামামা শব্দের অর্থ হল কয়লা।
আমাদের সাথীরা ফিকাহ শাস্ত্রে এ রকম
লিখেছেন। আর অভিধানবিদরাও এ অর্থ করেছেন।
ইমাম আল খাত্তাবী রহ. বলেন, আল হামাম শব্দের
অর্থ আল ফাহাম বা কয়লা। যা সৃষ্টি হয় কাঠ, হাড্ডি ইত্যাদি
পোড়ালে। এ দিয়ে ইস্তেনজা করতে নিষেধ করা
হয়েছে। কারণ এটাকে জিনদের খাদ্য হিসাবে
নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই এটা অপবিত্র করা জায়েজ
নয়।
জিন যেমন মুসলমান আছে তেমনি আছে কাফের।
এ ব্যাপারে জিনদের বক্তব্য আল্লাহ উল্লেখ
করেছেন এভাবে :
ﻭَﺃَﻧَّﺎ ﻣِﻨَّﺎ ﺍﻟْﻤُﺴْﻠِﻤُﻮﻥَ ﻭَﻣِﻨَّﺎ ﺍﻟْﻘَﺎﺳِﻄُﻮﻥَ ﻓَﻤَﻦْ ﺃَﺳْﻠَﻢَ ﻓَﺄُﻭﻟَﺌِﻚَ
ﺗَﺤَﺮَّﻭْﺍ ﺭَﺷَﺪًﺍ
আর নিশ্চয় আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক আছে
মুসলিম এবং আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক
সীমালংঘনকারী। কাজেই যারা ইসলাম গ্রহণ
করেছে, তারাই সঠিক পথ বেছে নিয়েছে। (সূরা
আল জিন, আয়াত ১৪)
কাজেই মুসলিম জিনেরা সে সকল অধিকার পাবে যা
একজন মুসলিম মানুষ ইসলামের কারণে পেয়ে
থাকে ।
জিনদের কুরআন তেলাওয়াত শোনা ও তার উত্তর
প্রদান :
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বলেছেন :
ﻟﻘﺪ ﻗﺮﺃﺗﻬﺎ , ﺳﻮﺭﺓ ‏( ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ‏) ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺠﻦ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺠﻦ ,
ﻓﻜﺎﻧﻮﺍ ﺃﺣﺴﻦ ﻣﺮﺩﻭﺩﺍ ﻣﻨﻜﻢ، ﻛﻨﺖ ﻛﻠﻤﺎ ﺃﺗﻴﺖ ﻋﻠﻰ ﻗﻮﻟﻪ
‏( ﻓﺒﺄﻱ ﺁﻻﺀ ﺭﺑﻜﻤﺎ ﺗﻜﺬﺑﺎﻥ ‏) , ﻗﺎﻟﻮﺍ : ﻻ ﺑﺸﻲﺀ ﻣﻦ ﻧﻌﻤﻚ
ﺭﺑﻨﺎ ﻧﻜﺬﺏ , ﻓﻠﻚ ﺍﻟﺤﻤﺪ .
ﻗﺎﻝ ﺍﻷﻟﺒﺎﻧﻲ ﻓﻲ ” ﺍﻟﺴﻠﺴﻠﺔ ﺍﻟﺼﺤﻴﺤﺔ ” 5 / 183 :
ﺃﺧﺮﺟﻪ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ ﻓﻲ ” ﺳﻨﻨﻪ ” ‏( 2 / 234 )
আমি জিনদের সাথে সাক্ষাতের রাতে তাদের সূরা
আর রাহমান পাঠ করে শোনালাম। তারা তেলাওয়াত
শুনে তোমাদের চেয়ে উত্তম জওয়াব দিত। যখন
এ আয়াত পাঠ করতাম সুতরাং তোমাদের রবের
কোন্ নিআমতকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার
করবে? তখন তারা এর উত্তরে বলত, হে আমাদের
রব! আমরা আপনার কোন নিআমতকে অস্বীকার
করি না। সকল প্রশংসা তো আপনারই।
হাদীসটি ইমাম তিরমিজী বর্ণনা করেছেন।
আলবানী রহ. এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
দেখুন আস সিলসিলাতুস সহীহা ১৮৩/৫
এ হাদীস থেকে আমরা যা শিখতে পারলাম :
১- জিনদের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম কুরআনের কিছু অংশ তেলাওয়াত করেছেন
তার মধ্যে সূরা আর রাহমানও ছিল।
২- এ জিন সাহাবীরা সূরা আর রাহমান শুনে আল্লাহ
তাআলার প্রশ্নের উত্তরে যা বলেছে তা মানুষ
সাহাবীদের চেয়ে সুন্দর উত্তর ছিল বলে
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ
করেছেন।
৩- কোন কোন ক্ষেত্রে জিনেরা মানুষের
চেয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করলেও তারা মানুষের
চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। ক্ষেত্র বিশেষে কেহ
শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করলে সর্বক্ষেত্রে তার
শ্রেষ্ঠত্ব পাওয়াটা জরূরী নয়।
৪- আল কুরআন পাঠ করে বা তার পাঠ শুনে সে
মোতাবেক উত্তর দেয়া সুন্নাত। যেমন আলোচ্য
হাদীসে দেখা গেল। আল্লাহ তাআলার কোন
প্রশ্ন আসলে তার উত্তর সাথে সাথে প্রদান করা,
এমনিভাবে যখন জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের কথা
আসে তখন তা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয়
প্রার্থনা করা। আর যখন জান্নাত ও জান্নাতীদের কথা
আসে তখন জান্নাত কামনা করা ইত্যাদি হল আল্লাহ
তাআলার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ
ও আল কুরআন তেলাওয়াতের আদব।
লেখক : আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান
সম্পাদনা : আবু শুআইব মুহাম্মদ সিদ্দিক
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ,
সৌদিআরব