মানুষের উপর জ্বিনের আছর! কারণ, প্রতিকার সুরক্ষার উপায়!


মানুষের উপর জিনের আছর : কারণ, প্রতিকার
ও সুরক্ষার উপায়
Jinn
প্রথম কথা
একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে বসা ছিলাম। তার
স্ত্রীও একজন ভাল ডাক্তার। উভয়ে ধর্মপ্রাণ। হজ
করেছেন এক সাথেই। দুটো মেয়েকেই
তানজীমুল উম্মাহ মাদরাসাতে ভর্তি করিয়েছেন।
আমাকে বললেন, তানজীমুল উম্মাহ মাদরাসা আরবী
মিডিয়ামের স্কলাস্টিকা তাই না? আমি বললাম, হ্যা। উদ্দেশ্য
তার উৎসাহকে স্বাগত জানানো।
মানে তারা দুটো সন্তানকেই মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে
গর্ববোধ করেন। কতখানি ধর্মপ্রাণ হলে এমন হতে
পারে তা আপনার ভেবে দেখার বিষয় বটে।
রোগী দেখার ফাঁকে ফাঁকে আমার সাথে গল্প
করছেন। শুধু আমার সাথেই নয়। আলেম-উলামাদের
কাউকে কাছে পেলে আন্তরিকতার সাথেই আলাপ
করেন। জানতে চান। জানাতে চান।
একজন মহিলা আসল, সাথে তার মেয়ে। সে
রোগের বিবরণ দিয়ে বলল, কয়েকদিন আগে
ওকে জিনে আছর করেছিল। ওঝা-ফকিরেরা জিন
তাড়িয়েছে।
এ কথা শুনে ডাক্তার সাহেব রেগে গেলেন।
বললেন, কিসের জিন? জিন বলতে কিছু আছে নাকি?
জিন আবার মানুষকে ধরে নাকি? যত সব অন্ধ বিশ্বাস!
জিন-ভূত বলতে কোন কিছু নেই। জিনে মানুষ
ধরে না। মানুষকে আছর করে না। এটা মানসিক
রোগ দ্বারা সৃষ্ট একটি কল্পনা। এ কল্পনার কারণে
সৃষ্টি হয়েছে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা।
তার আবেগ কমে গেলে আমি তাকে এ বিষয়টি
বুঝাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু এতে তার কোন
আগ্রহ দেখলাম না। আমি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা
করতে চাইলেই সে অন্য প্রসঙ্গের অবতারণা
করে। আমি বুঝলাম, এ বিষয়ে আলোচনা তার পছন্দ
নয়। সে যা বুঝেছে, সেটাকেই সে চুরান্ত বলে
বিশ্বাস করে নিয়েছে। বিশ্বাসটা যে সংশোধন করার
প্রয়োজন এটা তিনি বুঝতে চাচ্ছেন না।
আসলে কি জিন আছে? জিন কী? ইসলাম কী
বলে? জিনদের অস্তিত্বে বিশ্বাস না করা ইসলামে
কতখানি গ্রহণযোগ্য? জিন কি মানুষকে আছর করে?
এ সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী? এ
বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব এ
এখানে।
যে সকল বিষয় এখানে আলোচনা করব
সেগুলো হল:
এক. জিনের পরিচয়
দুই. জিনের প্রকার
তিন. জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস ঈমানের দাবি
চার. জিন কি মানুষকে আছর করে?
পাঁচ. জিন ও ভূতের মধ্যে পার্থক্য
ছয়. মানসিক রোগী আর জিনে-ধরা রোগীর
মধ্যে পার্থক্য
সাত. কি কারণে জিন চড়াও হয়?
আট. জিনের আছরের প্রকারভেদ
নয়. জিনের আছর থেকে বাঁচতে হলে যা করতে
হবে
দশ. জিনের আছরের চিকিৎসা
এগার. জিনের অধিকার রক্ষায় আমাদের করণীয়
জিনের পরিচয়
জিন আল্লাহ তাআলার একটি সৃষ্টি। যেমন তিনি
ফেরেশ্তা, মানুষ সৃষ্টি করেছেন তেমনি সৃষ্টি
করেছেন জিন। তাদের বিবেক, বুদ্ধি, অনুভূতি শক্তি
রয়েছে। তাদের আছে ভাল ও মন্দের মধ্যে
পার্থক্য করার ক্ষমতা। তাদের মধ্যে আছে ভাল জিন
ও মন্দ জিন। আল কুরআনে জিনদের বক্তব্য
উল্লেখ করে বলা হয়েছে:
ﻭَﺃَﻧَّﺎ ﻣِﻨَّﺎ ﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤُﻮﻥَ ﻭَﻣِﻨَّﺎ ﺩُﻭﻥَ ﺫَﻟِﻚَ ﻛُﻨَّﺎ ﻃَﺮَﺍﺋِﻖَ ﻗِﺪَﺩًﺍ
আর নিশ্চয় আমাদের কতিপয় সৎকর্মশীল এবং
কতিপয় এর ব্যতিক্রম। আমরা ছিলাম বিভিন্ন মত ও পথে
বিভক্ত। (সূরা আল জিন : ১১)
এ গোষ্ঠির নাম জিন রাখা হয়েছে, কারণ জিন
শব্দের অর্থ গোপন। আরবী জিন শব্দ থেকে
ইজতিনান এর অর্থ হল ইসতেতার বা গোপন হওয়া।
যেমন আল কুরআনে আল্লাহ বলেছেন :
ﻓَﻠَﻤَّﺎ ﺟَﻦَّ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﺍﻟﻠَّﻴْﻞُ
অতঃপর যখন রাত তার উপর আচ্ছন্ন হল … (সূরা আল
আনআম : ৭৬)
এখানে জান্না অর্থ হল, আচ্ছন হওয়া, ঢেকে যাওয়া,
গোপন হওয়া।
তারা মানুষের দৃষ্টি থেকে গোপন থাকে বলেই
তাদের নাম রাখা হয়েছে জিন। যেমন আল্লাহ রাব্বুল
আলামীন বলেন:
ﺇِﻧَّﻪُ ﻳَﺮَﺍﻛُﻢْ ﻫُﻮَ ﻭَﻗَﺒِﻴﻠُﻪُ ﻣِﻦْ ﺣَﻴْﺚُ ﻟَﺎ ﺗَﺮَﻭْﻧَﻬُﻢْ
নিশ্চয় সে ও তার দলবল তোমাদেরকে দেখে
যেখানে তোমরা তাদেরকে দেখ না। (সূরা আল
আরাফ : ২৭)
জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে আগুন দিয়ে। মহান
সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ বলেন:
ﻭَﺍﻟْﺠَﺎﻥَّ ﺧَﻠَﻘْﻨَﺎﻩُ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞُ ﻣِﻦْ ﻧَﺎﺭِ ﺍﻟﺴَّﻤُﻮﻡِ
আর ইতঃপূর্বে জিনকে সৃষ্টি করেছি উত্তপ্ত
অগ্নিশিখা থেকে। (সূরা আল হিজর : ২৭)
এ আয়াত দ্বারা আমরা আরো জানতে পারলাম যে,
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষ সৃষ্টি করার পূর্বে জিন
সৃষ্টি করেছেন। ইরশাদ হয়েছে:
ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﺧَﻠَﻘْﻨَﺎ ﺍﻟْﺈِﻧْﺴَﺎﻥَ ﻣِﻦْ ﺻَﻠْﺼَﺎﻝٍ ﻣِﻦْ ﺣَﻤَﺈٍ ﻣَﺴْﻨُﻮﻥٍ ﴿
26 ﴾ ﻭَﺍﻟْﺠَﺎﻥَّ ﺧَﻠَﻘْﻨَﺎﻩُ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞُ ﻣِﻦْ ﻧَﺎﺭِ ﺍﻟﺴَّﻤُﻮﻡِ ﴿27 ﴾
আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শুকনো
ঠনঠনে, কালচে কাদামাটি থেকে। আর এর পূর্বে
জিনকে সৃষ্টি করেছি উত্তপ্ত অগ্নিশিখা থেকে।
(সূরা আল হিজর : ২৬-২৭)
আল্লাহ তাআলা যে উদ্দেশ্যে মানুষ সৃষ্টি
করেছেন সে-ই উদ্দেশ্যেই জিনকে সৃষ্টি
করেছিলেন। তিনি বলেন:
ﻭَﻣَﺎ ﺧَﻠَﻘْﺖُ ﺍﻟْﺠِﻦَّ ﻭَﺍﻟْﺈِﻧْﺲَ ﺇِﻟَّﺎ ﻟِﻴَﻌْﺒُﺪُﻭﻥِ
আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি
যে, তারা আমার ইবাদাত করবে। (সূরা আয যারিয়াত : ৫৬)
জিনদের কাছেও তিনি নবী ও রাসূল প্রেরণ
করেছিলেন। তিনি বলেন:
ﻳَﺎ ﻣَﻌْﺸَﺮَ ﺍﻟْﺠِﻦِّ ﻭَﺍﻟْﺈِﻧْﺲِ ﺃَﻟَﻢْ ﻳَﺄْﺗِﻜُﻢْ ﺭُﺳُﻞٌ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻳَﻘُﺼُّﻮﻥَ
ﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﺁَﻳَﺎﺗِﻲ ﻭَﻳُﻨْﺬِﺭُﻭﻧَﻜُﻢْ ﻟِﻘَﺎﺀَ ﻳَﻮْﻣِﻜُﻢْ ﻫَﺬَﺍ ﻗَﺎﻟُﻮﺍ ﺷَﻬِﺪْﻧَﺎ
ﻋَﻠَﻰ ﺃَﻧْﻔُﺴِﻨَﺎ ﻭَﻏَﺮَّﺗْﻬُﻢُ ﺍﻟْﺤَﻴَﺎﺓُ ﺍﻟﺪُّﻧْﻴَﺎ ﻭَﺷَﻬِﺪُﻭﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﻧْﻔُﺴِﻬِﻢْ
ﺃَﻧَّﻬُﻢْ ﻛَﺎﻧُﻮﺍ ﻛَﺎﻓِﺮِﻳﻦَ
হে জিন ও মানুষের দল, তোমাদের মধ্য থেকে
কি তোমাদের নিকট রাসূলগণ আসেনি, যারা
তোমাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ বর্ণনা করত এবং
তোমাদের এই দিনের সাক্ষাতের ব্যাপারে
তোমাদেরকে সতর্ক করত? তারা বলবে, আমরা
আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলাম। আর দুনিয়ার জীবন
তাদেরকে প্রতারিত করেছে এবং তারা নিজেদের
বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে যে, তারা ছিল কাফির। (সূরা
আল আনআম : ১৩০)
এ আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, বিচার দিবসে
মানুষের যেমন বিচার হবে তেমনি জিন জাতিকেও
বিচার ও জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে।
তারা বিবিধ রূপ ধারণ করতে পারে বলে হাদীসে
এসেছে। এমনিভাবে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য
স্থানে যেতে পারে বলে আল কুরআনের সূরা
আন নামলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসমানী কিতাবে যারা বিশ্বাসী-ইহুদী, খৃষ্টান ও
মুসলমান- তারা সকলে জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস
করে। তারা কেউ জিনের অস্তিত্ব অস্বীকার
করে না। পৌত্তলিক, কতিপয় দার্শনিক, বস্তুবাদী
গবেষকরা জিনের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না।
দার্শনিকদের একটি দল বলে থাকে, ফেরেশ্তা ও
জিন রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়। সুন্দর চরিত্রকে
ফেরেশ্তা আর খারাপ চরিত্রকে জিন বা শয়তান শব্দ
দিয়ে বুঝানো হয়। অবশ্য তাদের এ বক্তব্য
কুরআন ও সুন্নাহর সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
জিন তিন প্রকার
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সম্পর্কে
বলেছেন :
ﺍﻟﺠﻦ ﺛﻼﺛﺔ ﺃﺻﻨﺎﻑ : ﺻﻨﻒ ﻳﻄﻴﺮ ﻓﻲ ﺍﻟﻬﻮﺍﺀ، ﻭﺻﻨﻒ
ﺣﻴﺎﺕ ﻭﻛﻼﺏ، ﻭﺻﻨﻒ ﻳﺤﻠﻮﻥ ﻭﻳﻈﻌﻨﻮﻥ ‏) . ﺭﻭﺍﻩ
ﺍﻟﻄﺒﺮﺍﻧﻲ، ﻭﺍﺑﻦ ﺣﺒﺎﻥ ﻭﺍﻟﺤﺎﻛﻢ ﺃﻧﻈﺮ ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺠﺎﻣﻊ
ﺍﻟﺼﻐﻴﺮ ﻟﻸﻟﺒﺎﻧﻲ ﺭﻗﻢ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ 3114 (
জিন তিন প্রকার।
এক. যারা শূন্যে উড়ে বেড়ায়।
দুই. কিছু সাপ ও কুকুর।
তিন. মানুষের কাছে আসে ও চলে যায়।
(সূত্র : তাবারানী। প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ শায়খ
আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
দেখুন, সহীহ আল জামে আস সাগীর, হাদীস নং
৩১১৪, আবু সালাবা আল খাশানী রা. থেকে বর্ণিত।)
(মুজামু আলফাজ আল-আকীদাহ)
জিন বিভিন্ন প্রাণীর রূপ ধারণ করতে পারে। কিন্তু
তাদের একটি গ্রুপ সর্বদা সাপ ও কুকুরের বেশ ধারণ
করে চলাফেরা করে মানব সমাজে। এটা তাদের
স্থায়ী রূপ।
জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস ঈমানের দাবী
একজন মুসলিমকে অবশ্যই জিনের অস্তিত্ব
স্বীকার করতে হবে। যদি সে জিনের অস্তিত্ব
অস্বীকার করে, তাহলে সে মুমিন থাকবে না।
জিনের অস্তিত্ব স্বীকার ঈমান বিল গাইব বা
অদৃশ্যের প্রতি ঈমান আনার অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ
রাব্বুল আলামীন আল কুরআনের প্রায় পঞ্চাশ বার
জিনের আলোচনা করেছেন। জিনজাতির সৃষ্টি,
সৃষ্টির উদ্দেশ্য, তাদের ইসলাম গ্রহণ, মানুষের
পূর্বে তাদের সৃষ্টি করা, ইবলীস জিনের
অন্তর্ভূক্ত, সূরা আর রাহমানে জিন ও মানুষকে এক
সাথে সম্বোধন, নবী সুলাইমান আলাহিসসালাম এর
আমলে জিনদের কাজ-কর্ম করা, তাদের মধ্যে
রাজমিস্ত্রী ও ডুবুরী থাকার কথা, তাদের রোজ
হাশরে বিচার শাস্তি ও পুরস্কারের সম্মুখীন হওয়া
ইত্যাদি বহু তথ্য আল কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল
আলামীন উল্লেখ করেছেন। তাদের সম্পর্কে
বলতে যেয়ে সূরা আল-জিন নামে একটি পূর্ণাঙ্গ
সূরা নাযিল করেছেন। তাই কোন মুসলমান জিনের
অস্তিত্বকে অস্বীকার করে আল্লাহর কালামকে
অস্বীকার করার মত কাজ করতে পারে না। তেমনি
জিনকে রূপক অর্থে ব্যবহার করার কথাও ভাবতে
পারে না। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা
এটাই। বিভ্রান্ত ও বিলুপ্ত মুতাযিলা ও জাহমিয়্যা সমপ্রদায়
জিনের অস্তিত্ব স্বীকার করে না।
জিন কি মানুষকে আছর করে?
এর উত্তর হল, অবশ্যই জিন মানুষকে আছর করতে
পারে। স্পর্শ দ্বারা পাগল করতে পারে। মানুষের
উপর ভর করতে পারে। তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে
পারে। তার জীবনের স্বাভাবিক কাজ-কর্ম ব্যাহত
করতে পারে।
এটা বিশ্বাস করতে হয়। তবে এ বিষয়টি কেহ
অবিশ্বাস করলে তাকে কাফের বলা যাবে না। সে
ভুল করেছে, এটা বলা হবে।
জিন যে মানুষকে আছর করে তার কিছু প্রমাণ:
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন:
ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳَﺄْﻛُﻠُﻮﻥَ ﺍﻟﺮِّﺑَﺎ ﻟَﺎ ﻳَﻘُﻮﻣُﻮﻥَ ﺇِﻟَّﺎ ﻛَﻤَﺎ ﻳَﻘُﻮﻡُ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﻳَﺘَﺨَﺒَّﻄُﻪُ
ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤَﺲِّ
যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় দাড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ
করে পাগল বানিয়ে দেয়। (সূরা আল বাকারা : ২৭৫)
এ আয়াত দ্বারা যে সকল বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝা যায়:
এক. যারা সূদ খায় তাদের শাস্তির ধরণ সম্পর্কে ধারণা।
দুই. শয়তান বা জিন মানুষকে স্পর্শ দ্বারা পাগলের মত
করতে পারে।
তিন. মানুষের উপর শয়তান বা জিনের স্পর্শ একটি
সত্য বিষয়। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
চার. জিন-শয়তানের এ স্পর্শ দ্বারা মানুষ যেমন
আধ্যাত্নিক দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি
শারীরিক দিক দিয়েও অস্বাভাবিক হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ﻭَﻣَﻦْ ﻳَﻌْﺶُ ﻋَﻦْ ﺫِﻛْﺮِ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦِ ﻧُﻘَﻴِّﺾْ ﻟَﻪُ ﺷَﻴْﻄَﺎﻧًﺎ ﻓَﻬُﻮَ ﻟَﻪُ
ﻗَﺮِﻳﻦٌ
আর যে পরম করুণাময়ের জিকির থেকে বিমুখ
থাকে আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি,
ফলে সে হয়ে যায় তার সঙ্গী। (সূরা যুখরুফ : ৩৬)
এ আয়াত দ্বারা যা স্পষ্ট হল : মহান রাহমান ও রহীম
আল্লাহ তাআলার জিকির থেকে বিরত থাকা জিন
শয়তানের স্পর্শ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার একটি কারণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ﻭَﺍﺫْﻛُﺮْ ﻋَﺒْﺪَﻧَﺎ ﺃَﻳُّﻮﺏَ ﺇِﺫْ ﻧَﺎﺩَﻯ ﺭَﺑَّﻪُ ﺃَﻧِّﻲ ﻣَﺴَّﻨِﻲَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ
ﺑِﻨُﺼْﺐٍ ﻭَﻋَﺬَﺍﺏٍ
আর স্মরণ কর আমার বান্দা আইউবকে, যখন সে তার
রবকে ডেকে বলেছিল, শয়তান তো আমাকে
কষ্ট ও আযাবের ছোঁয়া দিয়েছে। (সূরা সাদ : ৪১)
এ আয়াত দ্বারা আমরা স্পষ্টভাবে বুঝলাম:
এক. শয়তান নবী আইউব আলাহিস সালামকে স্পর্শ
করে শারীরিক রোগ-কষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছিল।
দুই. তিনি শয়তানের স্পর্শ থেকে বাঁচার জন্য
আল্লাহ তাআলার কাছেই প্রার্থনা করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ﺇِﻥَّ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺍﺗَّﻘَﻮْﺍ ﺇِﺫَﺍ ﻣَﺴَّﻬُﻢْ ﻃَﺎﺋِﻒٌ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﺗَﺬَﻛَّﺮُﻭﺍ
ﻓَﺈِﺫَﺍ ﻫُﻢْ ﻣُﺒْﺼِﺮُﻭﻥَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন
তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন
কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ
করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। (সূরা আল
আরাফ : ২০১)
এ আয়াত থেকে যা বুঝে আসে তা হল:
এক. যারা মুত্তাকী বা আল্লাহ ভীরু তাদেরকেও
জিন বা শয়তান স্পর্শ করতে পারে। তারা মুত্তাকী
হয়েও জিন বা শয়তানের আছরে নিপতিত হতে
পারে।
দুই. যারা মুত্তাকী তাদের শয়তান বা জিন স্পর্শ
করলে তারা আল্লাহ-কেই স্মরণ করে। অন্য
কোন কিছুর দ্বারস্থ হয় না।
তিন. মুত্তাকীগণ জিন বা শয়তান দ্বারা স্পর্শ হয়ে
আল্লাহকে স্মরণ করলে তাদের সত্যিকার দৃষ্টি
খুলে যায়।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
ﻭَﺇِﻣَّﺎ ﻳَﻨْﺰَﻏَﻨَّﻚَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥِ ﻧَﺰْﻍٌ ﻓَﺎﺳْﺘَﻌِﺬْ ﺑِﺎﻟﻠَّﻪِ ﺇِﻧَّﻪُ ﺳَﻤِﻴﻊٌ
ﻋَﻠِﻴﻢٌ
আর যদি শয়তানের পক্ষ হতে কোন প্ররোচনা
তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে তুমি আল্লাহর
আশ্রয় চাও। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সূরা
আল আরাফ : ২০০)
এ আয়াতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল:
এক. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও
জিন-শয়তান আছর করতে পারে।
দুই. জিন আছর করলে বা শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুভব
করলে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে নির্দেশ
দেয়া হয়েছে।
তিন. সূরা আল ফালাক ও সূরা আন-নাছ হল জিন শয়তানের
আছর থেকে আশ্রয় প্রার্থনার অতি মুল্যবান বাক্য।
এ আয়াতের তাফসীর দ্বারা এটা প্রমাণিত।
হাদীসে এসেছে –
ﻋﻦ ﻋﺎﺋﺸﺔ – ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﺎ- ﺃﻧﻬﺎ ﻗﺎﻟﺖ : ﻗﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ
-ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ :- ﺇﻥ ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ ﻳﺠﺮﻱ ﻣﻦ ﺍﺑﻦ ﺁﺩﻡ
ﻣﺠﺮﻯ ﺍﻟﺪﻡ . ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱُّ ﻭﻣﺴﻠﻢ .
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, অবশ্যই শয়তান
মানুষের রক্তের শিরা উপশিরায় চলতে সক্ষম।
(বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)
হাদীসে আরো এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ
আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন বললেন,
ﺇﻥ ﻋﻔﺮﻳﺘﺎ ﻣﻦ ﺍﻟﺠﻦ ﺗﻔﻠﺖ ﻋﻠﻲ ﺍﻟﺒﺎﺭﺣﺔ ﻟﻴﻘﻄﻊ ﻋﻠﻲ
ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻓﺄﻣﻜﻨﻨﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﻨﻪ
গত রাতে একটি শক্তিশালী জিন আমার উপর চড়াও
হতে চেয়েছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল আমার নামাজ
নষ্ট করা। আল্লাহ তার বিরুদ্ধে আমাকে শক্তি
দিলেন। (বর্ণনায় : বুখারী, সালাত অধ্যায়)
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. এ হাদীসের
ব্যাখ্যায় বলেছেন, আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত
নাসায়ীর বর্ণনায় আরো এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি তাকে
ধরে ফেললাম। আছার দিলাম ও গলা চেপে ধরলাম।
এমনকি তার মুখের আদ্রতা আমার হাতে অনুভব
করলাম।
এ হাদীস থেকে আমরা যা জানতে পারলাম :
এক. জিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লামকেও আছর করতে চেয়েছিল।
দুই. জিনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর
নামাজ নষ্ট করার জন্য তাঁর কাছে এসেছিল।
তিন. ইফরীত শব্দের বাংলা অর্থ হল ভূত। জিনদের
মধ্যে যারা দুষ্ট ও মাস্তান প্রকৃতির তাদের ইফরীত
বলা হয়।
চার. জিন দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম কোন ভয় পাননি। তিনি তার সাথে লড়াই করে
পরাস্ত করেছেন।
পাঁচ. জিনদের শরীর বা কাঠামো আছে যদিও তা
সাধারণত আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় না।
জিন ও ভূতের মধ্যে পার্থক্য
জিন আরবী শব্দ। বাংলাতেও জিন শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু ভূত বাংলা শব্দ। এর আরবী হল ইফরীত,
বহুবচনে আফারীত। আল কুরআনে সূরা আন-
নামলের ৩৯ নং আয়াতে ইফরীত কথাটি এসেছে
এভাবে :
ﻗَﺎﻝَ ﻋِﻔْﺮﻳﺖٌ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺠِﻦِّ ﺃَﻧَﺎ ﺁَﺗِﻴﻚَ ﺑِﻪِ ﻗَﺒْﻞَ ﺃَﻥْ ﺗَﻘُﻮﻡَ ﻣِﻦْ
ﻣَﻘَﺎﻣِﻚَ ﻭَﺇِﻧِّﻲ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻟَﻘَﻮِﻱٌّ ﺃَﻣِﻴﻦٌ
এক শক্তিশালী জিন বলল, আপনি আপনার স্থান
থেকে উঠার পূর্বেই আমি তা এনে দেব। আমি
নিশ্চয়ই এই ব্যাপারে শক্তিমান, বিশ্বস্ত।
এ আয়াতে ইফরীতুম মিনাল জিন অর্থ্যাৎ জিনদের
মধ্যে থেকে এক ইফরীত বা ভূত .. কথাটি
এসেছে। এমনিভাবে উপরে বর্ণিত হাদীসেও
ইফরীতুম মিনাল জিন কথাটি এসেছে।
তাফসীরবিদগণ বলেছেন, জিনদের মধ্যে যারা
অবাধ্য, বেয়ারা, মাস্তান, দুষ্ট প্রকৃতির ও শক্তিশালী
হয়ে থাকে তাদের ইফরীত বলা হয়। (আল মুফরাদাত
ফী গারিবিল কুরআন)
ইফরীত শব্দের অর্থ বাংলাতে ভূত।
অতএব দেখা গেল ইফরীত বা ভূত, জিন ছাড়া আর
কিছু নয়। সব ভূতই জিন তবে সব জিন কিন্তু ভূত নয়।
মানসিক রোগী আর জিনে ধরা রোগীর
মধ্যে পার্থক্য
অনেক সময় আমরা এ সমস্যায় পড়ে যাই। ঠিক
করতে পারি না রোগটা কি মানসিক না-কি পাগল, না কি
জিনের আছর থেকে রোগ দেখা দিয়েছে।
অনেক সময় তাই আমরা মানসিক-রোগীকে জিনে-
ধরা রোগী বলে থাকি। তেমনি জিনে-ধরা
রোগীকে মানসিক রোগী বলে চালাতে
চেষ্টা করি। বিশেষ করে ডাক্তার ও মনোরোগ
বিশেষজ্ঞরা কোনভাবেই জিনের আছরকে
স্বীকার করতে চান না। তারা এ জাতীয় সকল
রোগীকে মানসিক রোগী বলে সনাক্ত করে
থাকেন।
পাগলামী-কে আরবীতে বলা হয় জুনুন। আর
পাগল-কে বলা হয় মাজনূন। আরবীতে এ জুনুন ও
মাজনূন শব্দ দুটো কিন্তু জিন শব্দ থেকেই
এসেছে।
যেমন আল কুরআনে এসেছে :
ﺇِﻥْ ﻫُﻮَ ﺇِﻟَّﺎ ﺭَﺟُﻞٌ ﺑِﻪِ ﺟِﻨَّﺔٌ ﻓَﺘَﺮَﺑَّﺼُﻮﺍ ﺑِﻪِ ﺣَﺘَّﻰ ﺣِﻴﻦٍ
সে কেবল এমন এক লোক, যার মধ্যে পাগলামী
রয়েছে। অতএব তোমরা তার সম্পর্কে কিছুকাল
অপেক্ষা কর।
এ কথাটি নূহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের
লোকেরা তার সম্পর্কে বলেছিল। এ আয়াতে
জিন্নাতুন শব্দের অর্থ হল পাগলামী।
কাজেই কাউকে পাগলামীর মত অস্বাভাবিক আচরণ
করতে দেখলে সেটা যেমন জিনের আছরের
কারণে হতে পারে, আবার তা মানসিক রোগের
কারণেও হতে পারে। তবে এ বিষয়ের
বিশেষজ্ঞরা অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু বিষয়
নির্ধারণ করেছেন, যার মাধ্যমে মানসিক রোগী
আর জিনে-ধরা রোগীর মধ্যে পার্থক্য করা যায়।
এগুলো হল:
এক. জিনে-ধরা রোগী কিছুক্ষণের জন্য বেহুশ
হয়ে যায়। মানসিক রোগী বেহুশ হয়ে পড়ে না।
দুই. কখনো কখনো জিনে-ধরা রোগীর মুখ
থেকে ফেনা বের হয়। দাতে খিল লেগে যায়।
মানসিক রোগীর মুখ থেকে ফেনা বের হয় না।
তিন. জিনে ধরা রোগী প্রায়ই সপ্নে সাপ, কুকুর,
বিচ্ছু, বানর, শিয়াল, ইঁদুর ইত্যাদি দেখে থাকে।
কখনো কখনো সপ্নে দেখে সে অনেক উচু
স্থান থেকে পড়ে যাচ্ছে।
চার. জিনে ধরা রোগীর সর্বদা ভীতু ভাব থাকে।
সর্বদা তার ভয় লাগে। মানসিক রোগীর তেমন ভয়
থাকে না।
পাঁচ. জিনে ধরা রোগী নামাজ পড়া, কুরআন
তেলাওয়াত, আল্লাহর যিকির ইত্যাদি পছন্দ করে না। বরং
এগুলো তার অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়।
ছয়. জিনে ধরা রোগী কখনো কখনো ভিন্ন ভাষা
ও ভিন্ন ভঙ্গিতে কথা বলে।
সাত. জিনে ধরা রোগী অধিকাংশ সময় স্বাভাবিক
থাকে। মাঝে মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করে।
আট. জিনে-ধরা রোগী থেকে অনেক সময়
আশ্চর্যজনক বিষয় প্রকাশ হয়ে থাকে। যেমন
অল্প সময়ে সে বহু দূরে চলে যায়। গাছে উঠে
সরু ডালে বসে থাকে ইত্যাদি।
নয়. জিনে ধরা রোগীর কাছে স্বামী, ঘর-সংসার,
স্ত্রী-সন্তানদের ভাল লাগে না।
দশ. জিনে ধরা রোগীর উপর যখন জিন চড়াও হয়
তখন ক্যামেরা দিয়ে তার ছবি তুললে ছবি ধোঁয়ার
মত অস্পষ্ট হয়। স্পষ্ট হয় না। দেখা গেছে
আশে পাশের সকলের ছবি স্পষ্টভাবে উঠেছে
কিন্তু রোগীর ছবিটি ধোয়াচ্ছন্ন। এটা কারো
কারো নিজস্ব অভিজ্ঞতা। মনে রাখতে হবে
অভিজ্ঞতা সর্বদা এক রকম ফলাফল নাও দিতে পারে।
কিন্তু বড় সমস্যা হবে তখন, যখন রোগীটি
নিজেকে জিনে ধরা বলে অভিনয় করে কিন্তু
তাকে জিনেও আছর করেনি আর সে মানসিক
রোগীও নয়। সে তার নিজস্ব একটি লক্ষ্য
পূরণের জন্য জিনে ধরার অভিনয় করছে।
এ অবস্থায় অভিভাবকের করণীয় হল, তারা তাকে তার
দাবী পুরণের আশ্বাস দেবে। তাহলে তার জিন
ছেড়ে যাবে। পরে তার দাবীটি যৌক্তিক হলে
পূরণ করা হবে আর অযৌক্তিক হলে পূরণ করা হবে
না। এরপর যদি সে আবার জিনে ধরার অভিনয় করে
তাহলে তাকে জিনে ধরা রোগী বলে আর
বিশ্বাস করার দরকার নেই। অনেক সময় শারিরিক
শাস্তির ভয় দেখালে এ ধরনের বাতিল জিন চলে যায়।
কি কারণে জিন চড়াও হয়
কিছু বিষয় রয়েছে যার উপস্থিতির কারণে মানুষকে
জিনে আছর করে।
এক. প্রেম। কোন পুরুষ জিন কোন নারীর
প্রেমে পড়ে যায়, অথবা কোন নারী জিন যদি
কোন পুরুষের প্রেমে পড়ে তাহলে জিন তার ঐ
প্রিয় মানুষটির উপর আছর করে।
দুই. কোন মানুষ যদি কোন জিনের প্রতি জুলুম-
অত্যাচার করে বা কষ্ট দেয় তাহলে অত্যাচারিত জিনটি
সেই মানুষের উপর চড়াও হয়। যেমন জিনের গায়ে
আঘাত করলে, তার গায়ে গরম পানি নিক্ষেপ করলে,
কিংবা তার খাদ্য-খাবার নষ্ট করে দিলে জিন সেই
মানুষটির উপর চড়াও হয়।
তিন. জিন খামোখা জুলুম-অত্যাচার করার জন্য মানুষের
উপর চড়াও হয়। তবে এটি পাঁচটি কারণে হতে পারে :
(ক) অতিরিক্ত রাগ
(খ) অতিরিক্ত ভয়
(গ) যৌন চাহিদা লোপ পাওয়া
(ঘ) মাত্রাতিরিক্ত উদাসীনতা।
(ঙ) নোংড়া ও অপবিত্র থাকা।
কারো মধ্যে এ স্বভাবগুলো থাকলে জিন তাকে
আছর করে অত্যাচার করার সুযোগ পেয়ে যায়।
জিনের আছরের প্রকারভেদ
মানুষের উপর জিন চড়াও হওয়ার ধরনটি চার প্রকারের
হতে পারে।
এক. জিন মানুষের পুরো শরীরে প্রভাব বিস্তার
করে কিছু সময়ের জন্য।
দুই. আংশিকভাবে শরীরের এক বা একাধিক অংশে
সে প্রভাব বিস্তার করে কিছু সময়ের জন্য। যেমন
হাতে অথবা পায়ে কিংবা মুখে।
তিন. স্থায়ীভাবে জিন মানুষের শরীরে চড়াও
হতে পারে। এর মেয়াদ হতে পারে অনেক
দীর্ঘ।
চার. মানুষের মনের উপর কিছু সময়ের জন্য প্রভাব
বিস্তার করে। মানুষ যখন আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা শুরু
করে তখন চলে যায়।
জিনের আছর থেকে বাঁচতে হলে যা করতে
হবে
এক. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে ও
ইসলামী শরিয়তের অনুসরণ করতে হবে।
কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
ﻭَﻣَﻦْ ﻳَﻌْﺶُ ﻋَﻦْ ﺫِﻛْﺮِ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦِ ﻧُﻘَﻴِّﺾْ ﻟَﻪُ ﺷَﻴْﻄَﺎﻧًﺎ ﻓَﻬُﻮَ ﻟَﻪُ
ﻗَﺮِﻳﻦٌ
আর যে পরম করুণাময়ের জিকির থেকে বিমুখ
থাকে আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি,
ফলে সে হয়ে যায় তার সঙ্গী। (সূরা যুখরুফ : ৩৬)
হাদীসে এসেছে –
ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗﺎﻝ : ﻳﻌﻘﺪ
ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ ﻋﻠﻰ ﻗﺎﻓﻴﺔ ﺭﺃﺱ ﺃﺣﺪﻛﻢ ﺇﺫﺍ ﻫﻮ ﻧﺎﻡ ﺛﻼﺙ ﻋﻘﺪ
، ﻳﻀﺮﺏ ﻛﻞ ﻋﻘﺪﺓ ﻣﻜﺎﻧﻬﺎ : ﻋﻠﻴﻚ ﻟﻴﻞ ﻃﻮﻳﻞ ﻓﺎﺭﻗﺪ ،
ﻓﺈﻥ ﺍﺳﺘﻴﻘﻆ ﻓﺬﻛﺮ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻧﺤﻠﺖ ﻋﻘﺪﺓ ، ﻓﺈﻥ ﺗﻮﺿﺄ ﺍﻧﺤﻠﺖ
ﻋﻘﺪﺓ ، ﻓﺈﻥ ﺻﻠﻰ ﺍﻧﺤﻠﺖ ﻋﻘﺪﻩ ﻛﻠﻬﺎ ، ﻓﺄﺻﺒﺢ ﻧﺸﻴﻄﺎ
ﻃﻴﺐ ﺍﻟﻨﻔﺲ ، ﻭﺇﻻ ﺃﺻﺒﺢ ﺧﺒﻴﺚ ﺍﻟﻨﻔﺲ ﻛﺴﻼﻥ . ﺭﻭﺍﻩ
ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ ﻭﻣﺴﻠﻢ ﻭﺍﻟﻠﻔﻆ ﻟﻠﺒﺨﺎﺭﻱ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
তোমাদের কেহ যখন ঘুমিয়ে যায় শয়তান তখন তার
মাথার কাছে বসে তিনটি গিরা লাগায়। প্রতিটি গিরা দেয়ার
সময় একটি কথা বলে: তোমার সামনে আছে
দীর্ঘ রাত, তুমি ঘুমাও। যখন সে নিদ্রা থেকে
উঠে আল্লাহর জিকির করে তখন একটি গিরা খুলে
যায়। এরপর যখন সে অজু করে তখন আরেকটি গিরা
খুলে যায়। এরপর যখন নামাজ পড়ে তখন শেষ গিরাটি
খুলে যায়। ফলে সে সারাদিন কর্মতৎপর ও সুন্দর মন
নিয়ে দিন কাটায়। আর যদি এমন না করে, তাহলে
সারাদিন তার কাটে খারাপ মন ও অলসভাব নিয়ে। (বর্ণনায়
: বুখারী ও মুসলিম)
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হল:
(১) ঠিকমত অজু করলে, নামাজ আদায় করলে
শয়তানের চড়াও থেকে মুক্ত থাকা যায়।
(২) খারাপ মন নিয়ে থাকা ও অলসতা শয়তানের
কুমন্ত্রণার ফল।
(৩) রীতিমত নামাজ আদায় করলে শরীর ও মন
প্রফুল্ল থাকে। কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পায়। অলসতা দূর
হয়ে যায়।
(৪) ঘুম থেকে উঠার সাথে সাথে অজু গোসল
করার আগেই আল্লাহর জিকির করা উচিত। ঘুম থেকে
জাগ্রত হওয়ার নির্দিষ্ট দুআ আছে। এটি পাঠ করা
সুন্নত। এতে শয়তানের কুপ্রভাব দূর হয়ে যায়।
দুই. ঘর থেকে বের হওয়ার সময় দুআ পাঠ করা
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া
সাল্লাম বলেছেন :
ﻣﻦ ﻗﺎﻝ ﺇﺫﺍ ﺧﺮﺝ ﻣﻦ ﺑﻴﺘﻪ ﺑﺴﻢ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻮﻛﻠﺖ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ
ﻭﻻ ﺣﻮﻝ ﻭﻻ ﻗﻮﺓ ﺇﻻ ﺑﺎﻟﻠﻪ، ﻳﻘﺎﻝ ﻟﻪ : ﻛﻔﻴﺖ ﻭﻭﻗﻴﺖ
ﻭﻫﺪﻳﺖ ﻭ ﺗﻨﺤﻰ ﻋﻨﻪ ﺍﻟﺸﻴﻄﺎﻥ
যে ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলবে,
বিছমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহি অলা হাওলা অলা
কুওআতা ইল্লা বিল্লাহি (আল্লাহরই নামে আল্লাহর উপর
নির্ভর করে বের হলাম। আর তার সামর্থ ব্যতীত
পাপ থেকে বাচাঁর উপায় নেই এবং তার শক্তি ব্যতীত
ভাল কাজ করা যায় না) তখন তাকে বলা হয়, তোমার
জন্য এটা যথেষ্ট, তোমাকে সুরক্ষা দেয়া হল এবং
তোমাকে পথের দিশা দেয়া হল। আর শয়তান তার
থেকে দূরে চলে যায়। (বর্ণনায়: আবু দাউদ ও
তিরমিজী)
তিন. পেশাব পায়খানাতে যাওয়ার সময় দুআ পাঠ করা:
হাদীসে এসেছে-
ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺇﺫﺍ ﺩﺧﻞ ﺍﻟﺨﻼﺀ ﻗﺎﻝ :
ﺍﻟﻠﻬﻢ ﺇﻧﻲ ﺃﻋﻮﺫ ﺑﻚ ﻣﻦ ﺍﻟﺨﺒﺚ ﻭﺍﻟﺨﺒﺎﺋﺚ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন পেশাব
পায়খানায় প্রবেশ করতেন, তখন বলতেন আল্লাহুম্মা
ইন্নী আউজুবিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িছ (হে
আল্লাহ আমি আপনার কাছে জিন নর ও জিন নারী
থেকে আশ্রয় নিচ্ছি) (বর্ণনায় : বুখারী ও মুসলিম)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি
ওয়া সাল্লাম বলেছেন : এ সকল পেশাব পায়খানার
স্থানে জিন শয়তান থাকে। অতএব তোমাদের
কেহ যখন এখানে আসে সে যেন বলে,
আল্লাহুম্মা ইন্নী আউজু বিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িছ।
(বর্ণনায় : ইবনে হিব্বান)
চার. প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় এ দুআটি তিনবার পাঠ
করা
ﺃﻋُﻮْﺫُ ﺑِﻜَﻠِﻤَﺎﺕِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺍﻟﺘَّﺎﻣَّﺎﺕِ ﻣِﻦْ ﺷَﺮِّ ﻣَﺎ ﺧَﻠَﻖَ
(আউজু বিকালি মাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন শাররি মা খালাকা)
অর্থ: আমি আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ বাক্যাবলীর
মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির সকল অনিষ্টতা থেকে আশ্রয়
নিচ্ছি। (বর্ণনায় : মুসলিম, তিরমিজী, আহমাদ)
অন্য বর্