মোবাইল ফোন বেবহার: বৈধতার সীমা কতটুকু? পার্ট -1:


মোবাইল ফোন ব্যবহার: বৈধতার সীমা কতটুকু? লেখকের কথা মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে একটি বই লিখার ইচ্ছা বহুদিন থেকেই আমার ছিল। এই বই প্রকাশের মাধ্যমে সে ইচ্ছা পূরণ হতে যাচ্ছে। তাই মহান আল্লাহর দরবারে জানাই লাখো- কোটি শুকরিয়া। যুগে যুগে বিজ্ঞানীগণ যত নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করেছেন হক্বানী উলামায়ে কেরাম নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে কোরআন- হাদিস মন্থন করে সেসব ক্ষেত্রে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি ও তৎসম্পর্কিত যাবতীয় মাসআলা-মাসায়েল অত্যন্ত সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। ভবিষ্যতেও যত নতুন জিনিস আবিষ্কার হবে উলামায়ে কেরাম কোরআন ও সুন্নাহের আলোকে তার সঠিক সমাধান পেশ করে যাবেন, ইনশাআল্লাহ। বর্তমান বিশ্বে যেসব নতুন আবিষ্কার অতি দ্রুত শহর-বন্দর ও গ্রাম-গঞ্জের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে তন্মধ্যে মোবাইল ফোন একটি উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার। ধনী-গরীব, পুরুষ-মহিলা, যুবক-বৃদ্ধ- সকলের হাতেই এখন মোবাইল ফোন শোভা পায়। ক্ষুদ্র এই যন্ত্রটি আবিষ্কারের ফলে একদিকে যেমন সুযোগ-সুবিধার বিশাল দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে তেমনি মোবাইলের মাধ্যমে মহামূল্যবান সময় নষ্টসহ নানাবিধ গুনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ারও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে মারাত্মকভাবে। অনেকে মোবাইলকে প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করছে বেশি। আবার অনেকে ব্যবহার করছে অন্যায় কাজে। টেলিভিশন, সিনেমা ইত্যাদি দেখা গুনাহের কাজ- একথা সবার জানা থাকার কারণে উচুঁ পর্যায়ের দীনদার লোকেরা তো বটেই, অসংখ্য সাধারণ দীনদার লোকেরাও অন্তত লোক-লজ্জার ভয়ে হলেও এসব থেকে দূরে থাকত। কিন্তু মোবাইল ফোন আবিষ্কারের পর উহার বৈধতার সুযোগ নিয়ে অনেক লোক তাকে ‘জায়েয ও বৈধ ব্যবহারের পাশাপাশি নানাবিধ অবৈধ ও গুনাহের কাজে’ ব্যবহার করছে। যেমন, গান শোনা, ছবি তোলা, ছবি দেখা, ভিডিও করা ইত্যাদি। মোবাইলের মাধ্যমে এসব গুনাহের কাজ ইচ্ছা করলে লোকচক্ষুর অন্তরালেও করা সম্ভব বিধায় এসবের পরিমাণ ও মাত্রা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপরন্তু মোবাইল ও তার বিভিন্ন বিষয়ের শরয়ি বিধান সম্পর্কে না জানার কারণে অসংখ্য লোক বুঝতেই পারছে না যে, মোবাইল দ্বারা কিভাবে তাদের গুনাহ হয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছে না, মোবাইল ব্যবহারের কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে অহরহ তাদের ভুল- ত্রুটি সংঘটিত হচ্ছে। মোবাইল ফোন ব্যবহার: বৈধতার সিমা কতটুকু? – এই বইখানা আমি এজন্য লিখেছি, যাতে পাঠকবৃন্দ বুঝতে পারেন, মোবাইল নামক এই বৈধ যন্ত্রটির বৈধতারও একটি সিমা আছে। যতক্ষণ এই সিমার ভিতর থেকে তা ব্যবহার করা হবে ততক্ষণই তা আমাদের জন্য কল্যাণ ও মঙ্গল বয়ে আনবে। কিন্তু যখনই সিমা অতিক্রম করা হবে- তখনই তা আমাদের জন্য কল্যাণের না হয়ে অকল্যাণের বস্তু হিসেবে পরিগণিত হবে। যার অনিবার্য ফল হিসেবে আমাদের জন্য বরাদ্দ হবে- ফেতনা-ফাসাদ, অশান্তি ও পেরেশানি। সেই সাথে পরকালীন কঠিন শাস্তি তো আছেই! পূর্ববর্তী বইগুলোতে এই বইয়ের এলানে এর নাম দেওয়া হয়েছিল মোবাইল ফোন : বৈধতার সিমা কতুটুক? কিন্তু পরে বড়দের সাথে পরামর্শ করে উক্ত নামটির মধ্যে সামান্য পরিবর্তন করে বর্তমান নামটি রাখা হয়েছে। আমি এই গ্রন্থে মোবাইল সংক্রান্ত ৩টি ঘটনা ও প্রয়োজনীয় মাসায়েলগুলো খুব সহজ ভাষায় লিপিবদ্ধ করে কয়েকজন মুফতী সাহেবকে দেখিয়েছি। তাদের পরামর্শ নিয়েছি। চেষ্টা করেছি, এই বইটি যেন মোবাইল ফোন বিষয়ক একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের রূপ লাভ করে। এক্ষেত্রে মাসিক আল কাউসারসহ বেশকিছু পত্র- পত্রিকা আমার যথেষ্ট উপকারে এসেছে। সত্যি বলতে কি, এসব পত্র-পত্রিকার সহায়তা না নিলে এই বইয়ের সমাপ্তি হয়তো আরো অনেক পরে হতো। মোবাইল সংক্রান্ত আরও কয়েকটি শিক্ষণীয় ঘটনা এই বইয়ে লিপিবদ্ধ করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু স্থান সংকুলান না হওয়ায় সেই ইচ্ছার বাস্তবায়ন সম্ভব হলো না। তবে এসব ঘটনা পরবর্তী বই আদর্শ যুবক-যুবতী-২-এর মধ্যে অবশ্যই লিখব, ইনশাআল্লাহ। একই কারণে অর্থাৎ জায়গার অভাবে পাঠকের মতামতও মাত্র এক পৃষ্ঠায় দেওয়া হলো। আশা করি পাঠকবৃন্দ এ বিষয়টিকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। বই প্রকাশের ক্ষেত্রে আমাকে যারা নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের মধ্যে মুফতী শফীউল্লাহ, মুফতী হুযাইফা, মুফতী জহিরুল ইসলাম ও মাস্টার আব্দুল হালীমের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা তাদের সবাইকে জান্নাতুল ফিরদাউসের আ’লা মাকাম নসীব করুন এবং এই বইকে লেখক, প্রকাশক ও সম্পাদকসহ সকলের নাজাতের ওসিলা হিসেবে কবুল করুন। আমীন। দোয়াপ্রার্থী মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম ……………………………………………………………. …………………………………………….. সূচির পাতা প্রথম অধ্যায় মোবাইল ফোন ও বর্তমান সমাজ : আমাদের করণীয় মোবাইল ফোন ও নামাজ নামাজরত অবস্থায় রিং বেজে উঠলে কী করবেন? দু’হাত ব্যবহার ব্যতীত রিং বন্ধ করা সম্ভব না হলে… রিং বন্ধ করতে সিজদা থেকে উঠা যাবে কি? একই নামাজে কতবার রিং বন্ধ করা যাবে? স্ক্রীনে প্রাণীর ছবি সেভ করা মোবাইল সামনে রেখে নামাজ পড়া মোবাইল ফোন ও মসজিদ মসজিদে প্রবেশের পূর্বেই কি মোবাইল/রিংটোন বন্ধ করা জরুরি? মসজিদের ভিতর মোবাইলে ভাইব্রেশন দিয়ে রাখা উচিত হবে কি? মসজিদে একজনের মোবাইলে রিং বেজে উঠলে অন্যরা কী করবে? মসজিদের ভিতর মোবাইলে দুনিয়াবি কথাবার্তা বলা যাবে কি? মসজিদে এতেকাফ অবস্থায় মোবাইল ব্যবহার না করাই ভালো মসজিদের ছাদে মোবাইলের টাওয়ার বসানো জায়েয নয় মসজিদের বিদ্যুৎ দ্বারা মোবাইল চার্জ করা যাবে কি? মসজিদে অবস্থানরত এতেকাফকারীর মোবাইল দ্বারা ব্যবসা করা মোবাইল ফোন ও সালাম আগে হ্যালো নাকি সালাম? মোবাইলে আগে সালাম দিবে কে? উভয়ের সালাম এক সাথে হয়ে গেল করণীয় কি? বারবার ফোন করার প্রয়োজন হলে প্রতিবারই সালাম দেওয়া সুন্নত ম্যাসেজের মাধ্যমে সালাম : জবাব দিবেন যেভাবে মোবাইলে গাইরে মাহরাম মহিলাদেরকে সালাম দেওয়া জায়েয হবে কি? মোবাইলে কাউকে সালাম পৌঁছানোর জন্য বলা মোবাইলে কি শুধু ছোটরা বড়দেরকে সালাম দিবে? না জেনে মোবাইলে অমুসলমানকে সালাম দিলে গুনাহ হবে কি? মোবাইল ফোন ও রিংটোন রিংটোন হিসেবে আজানের ব্যবহার নাজায়েয রিংটোন হিসেবে গান ও মিউজিক কখনোই ব্যবহার করবেন না রিংটোন হিসেবে সালামের ব্যবহার নাজায়েয নয় বাচ্চাদের কান্না থামানোর জন্য রিংটোন বাজানো মারাত্মক অন্যায় মোবাইল ফোন ও মিসড্কল অযথা মিসড্কল দিয়ে কাউকে বিরক্ত করা জায়েয নেই কখন মিসড্কল দেওয়া জায়েয? মোবাইল ফোন ও ওয়েলকাম টিউন ওয়েলকাম টিউন হিসেবে গানের ব্যবহার শক্ত গুনাহ ওয়েলকাম টিউন হিসেবে তিলাওয়াতের ব্যবহারও জায়েয নয় মোবাইল ফোন ও ফ্লেক্সিলোড ফ্লেক্সিলোড করে ফ্লেক্সিকৃত অর্থের চেয়ে বেশি গ্রহণ করা জায়েয ফ্লেক্সিলোড করার সময় টাকা অন্যত্র চলে গেলে… অজ্ঞাত স্থান থেকে ফ্লেক্সি এসে গেলে কী করবেন? ভুল ফ্লেক্সিকারীর দেওয়া ছাড় গ্রহণ করা যাবে কি? মোবাইল ফোন ও জাকাত ব্যালেন্সে অবস্থিত টাকার জাকাত দিতে হবে কি? সিকিউরিটি ডিপোজিটের জাকাত দিতে হবে ফ্লেক্সি ব্যবসায়ীদের জমাকৃত টাকার জাকাত মোবাইল ফোনের ক্রয়-বিক্রয় ক্যামেরাযুক্ত মোবাইলের ক্রয়- বিক্রয় নাজায়েয নয়, তবে… চুরি ও ছিনতাইকৃত মোবাইল সেট ক্রয় করা জায়েয নেই সাধারণ সেট নামিদামি কোম্পানির নামে চালানোও নাজায়েয মোবাইল ফোন : বিবিধ তালিবে ইল্মদের হাতে মোবাইল! মোবাইলে কোরআন তিলাওয়াত রেকর্ড করা মোবাইলে লিখিত কোরআন রেকর্ড করা মোবাইল স্ক্রীনে ছবি সেভ করে রাখা/ মোবাইল স্ক্রীনে আয়াত, জিকির বা এগুলোর ক্যালিগ্রাফী সেভ করা ম্যাসেজের মাধ্যমে ছবি প্রেরণ মোবাইল দ্বারা ছবি তোলা বা ভিডিও করা নির্ধারিত সময়ে খরচের শর্তে বোনাস ঘোষণা ও তার হুকুম সর্বোচ্চ এসএমএসকারীকে পুরস্কার প্রদান ইনকামিং কলের উপর প্রাপ্ত বোনাস বৈধ ডাউনলোড ব্যবসা কি জায়েয? কল রিসিভের সুবিধা দিয়ে বিনিময় নেওয়া কল রিসিভের আগের সময়ের বিল নেওয়া জায়েয নয় ভুল নাম্বারে কল চলে গেলে বিল দেবে কে? পরবর্তী মিনিটের ১/২ সেকেণ্ড হলেও পুরো মিনিটের বিল নেওয়া জায়েয মোবাইল কার্ড নির্ধারিত মূল্য থেকে কম-বেশিতে বিক্রয় করা জায়েয হবে কি? ভুল ব্যালেন্স : শরিয়তের দৃষ্টিতে নির্ধারিত বিলের চেয়ে বেশি বিল করলে… ইন্টারনেটে মোবাইল সার্চ করার হুকুম মেমোরী কার্ড ও ডাটা ক্যাবল ক্রয়-বিক্রয় জায়েয পণ্যসামগ্রীর দোকান থেকে প্রাপ্ত ছাড় গ্রহণ করা জায়েয বোনাস টকটাইম ব্যবহার করা বৈধ মোবাইল ফোনে ভিডিও গেমস্ মোবাইল থেকে গান শুনা বা মোবাইল দিয়ে ছবি তোলা মোবাইলে ক্রিকেট, ফুটবল ইত্যাদি খেলা দেখা বিনা অনুমতিতে কারো কথা মোবাইলে রেকর্ড করা যাবে কি? মোবাইল থেকে দীনি আলোচনা শুনা কোনো স্টেশনে মোবাইল চার্জ করা মোবাইল ফোনে বিয়ে মোবাইল ফোনে বন্ধুত্ব পাওনাদারের তাগাদা থেকে বাঁচার জন্য মোবাইল বন্ধ রাখা জায়েয নয় উলামায়ে কেরামের হাতে ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল মোবাইল ফোনে তালাক ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল : পাশ্চাত্যের যড়যন্ত্র ক্লাস চলাকালে মোবাইলে কথা বলা মহিলা কর্তৃক মোবাইল রিসিভ করা অটো রিসিভ করে রাখা জায়েয আছে কি? গভীর রাতে কল করা দুষ্টুমী করেও মোবাইলে কাউকে হুমকি দেওয়া নাজায়েয অহেতুক অন্যের মোবাইল টিপাটিপি করা জায়েয নেই একই সাথে কতবার রিং দেওয়া যাবে? কেউ ক্যামেরাযুক্ত সেট উপহার দিলে… মোবাইল যেন ফ্যাশন না হয়! বিনা অজুতে কোরআন শরিফ রেকর্ডকৃত মোবাইল স্পর্শ করা মানুষের সামনে স্ত্রীর সাথে কথা বলা মোবাইলে রোগীর খোঁজ-খবর লওয়া বা বুযুর্গদের কাছে দোয়া চাওয়া বারবার সিম পরিবর্তন অপছন্দনীয় মোবাইল কোম্পানির বোনাস অফার! মোবাইল ফোনে কথা বলার নিয়ম মোবাইলে কথা বলার সময় প্রথমে যা করতে হবে সতর্কতা সত্ত্বেও ভুল নম্বরে কল চলে গেলে যদি আপনার কাছে কারো কল ভুলে চলে আসে মোবাইলে কথা বলার সময় ২য় পর্যায়ে যা করতে হবে মোবাইলে কথা বলার সময় ৩য় পর্যায়ে যা করতে হবে মোবাইলে কথা বলার সময় ৪র্থ পর্যায়ে যা করতে হবে মোবাইলে কথা বলার সময় ৫ম পর্যায়ে যা করতে হবে মোবাইলে কথা বলার সময় সবশেষে যা করতে হবে মোবাইল ফোনে কথা বলার আরো কিছু প্রাসঙ্গিক নিয়ম সালামের জবাব শেষ হওয়ার পূর্বে লাইন কেটে দিবেন না বড়দের সাথে কথা বলার সময় আগে ফোন রাখবেন না ভদ্রতার সুযোগ না নেওয়াই ভদ্রতার পরিচয়! কাউকে ডেকে দেওয়ার জন্য যেভাবে বলা উচিত যদি অন্য সময় ফোন করতে বলে ভুলে চাপ পড়ে আপনার মোবাইলে কল চলে এলে উলামায়ে কেরামের সাথে যেভাবে কথা বলবেন জামাতের সময় কল করবেন না ফজরের জামাত শেষ হতেই কল না করা উচিত যথাসময়ে কল করুন আমাদের যেন এমন ভুল কখনো না হয় সব প্রয়োজন মোবাইলে সারার চেষ্টা করা উচিত নয় যানবাহনে যেভাবে কথা বলবেন ফ্রী অফার পেলে অপ্রয়োজনীয় কথা বলা যাবে কি? রিং কেটে দিলে কী করবেন? মোবাইল ফোন : কিছু জরুরি পরামর্শ দ্বিতীয় অধ্যায় : শিক্ষণীয় ঘটনাবলী হায় মোবাইল ফোন! বন্ধুত্ব নষ্ট হলো স্বপ্নের সংসার! ……………………………………………………………. …………………………………………….. জরুরি জ্ঞাতব্য এই বইয়ে বর্ণিত বেশিরভাগ মাসআলায় বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য কিতাবাদির উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো মূলতঃ কোরআন, হাদিস ও ফিক্হের ওইসব নীতিমালার উদ্ধৃতি যার আলোকে এই সমাধানগুলো পেশ করা হয়েছে। কেননা উল্লেখিত প্রাচীন কিতাবাদিতে স্পষ্টভাবে মোবাইল ফোনের কথা যে থাকবে না তা বলাই বাহুল্য। ……………………………………………………………. …………………………………………….. মূল বই শুরু বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম প্রথম অধ্যায় মোবাইল ফোন ও বর্তমান সমাজ : আমাদের করণীয় মোবাইল ফোন আধুনিক জ্ঞান- বিজ্ঞানের এক অনন্য উপহার যা মানুষের জীবনকে করেছে আরো গতিময়। যে কাজের জন্য আগে এক সপ্তাহ সময় লাগতো সেই কাজ এখন মোবাইলের মাধ্যমে মহূর্তের মধ্যে হয়ে যাচ্ছে। বলতে গেলে, পৃথিবীকে এখন আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে- মোবাইল ফোন। তাই মোবাইল ফোন আমাদের বন্ধু। আমাদের জীবন চলার সহায়ক। কিন্তু একথা সত্য যে, মোবাইল ফোন আমাদের বন্ধু হলেও এর কিছু অপব্যবহারের ফলে এটি আজ কারো কারো জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণী ও ছাত্র- ছাত্রীরা এর করুণ শিকার। তাদের জন্য মোবাইল ফোনকে অনেক ক্ষেত্রে অভিশাপই বলা যায়। কেননা আধুনিক এই ক্ষুদ্র যন্ত্রটি তাদের সমস্ত সময়কে গ্রাস করে নিয়েছে। ঘরে, বাইরে, ক্লাসে ও হলে সব জায়গায় তাদের ফোন আর ফোন। মোবাইল ফোনের কল্যাণে (?) তারা অনেকেই যথাসময়ে ক্লাসে উপস্থিত হতে পারে না। পারে না ঠিকমত ঘুমোতেও। কোম্পানির অফার পেয়ে রাত জেগে জেগে তারা প্রিয়জনদের (?) সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে। ফলে একদিকে যেমন তাদের নৈতিক অবক্ষয় ও চারিত্রিক অধঃপতন ঘটছে, ঠিক তেমনি দৈনন্দিন জরুরি কাজেও ব্যাঘাত ঘটছে চরমভাবে!! প্রত্যেক পিতা-মাতা অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে স্বীয় সন্তানের ভালো লেখাপড়া আশা করেন। তারা স্বপ্ন দেখেন, তাদের ছেলে- মেয়েরা লেখাপড়া শিখে অনেক বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। এজন্য সিমাহীন কষ্ট ও নিদারুণ ত্যাগ স্বীকার করেন তারা। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্নকে ভেঙ্গেচুরে নিঃশেষ করে দেয়- মোবাইল ফোন। মোবাইল ফোন একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষার উজ্জ্বল আলো থেকে বঞ্চিত করে মূর্খতার ঘোর অন্ধকারে নিয়ে যায়। নিভিয়ে দেয় তার আশার প্রদীপ। ধ্বংস করে দেয় তার মূল্যবান জীবন। উইপোকা যেমন ধীরে ধীরে কাঠ খেয়ে ফেলে তেমনি মোবাইল ফোন একটি মেধাবী শিক্ষার্থীকে কুড়ে কুড়ে খায়। ফলে একসময় মোবাইল পাগল শিক্ষার্থীটি হয়ে যায় একটি জীবন্ত লাশ! আজকাল উঠতি বয়সের ছেলে- মেয়েদের হাতে-হাতে মোবাইল ফোন দেখা যায়। কার চাইতে কে কত দামী ও উন্নত সেট ব্যবহার করতে পারে- এ নিয়ে অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলছে নিয়মিত! নিত্য নতুন ডিজাইন ও কোয়ালিটির পিছনে যুবক-যুবতী ভাই- বোনেরা কত টাকা যে নষ্ট করছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই!! মোবাইল ফোনের এই ভয়াবহ ক্ষতি থেকে ছাত্র, যুবক ও তরুণ সমাজকে বাঁচানোর জন্য আমাদের অনেক কিছু করণীয় আছে। বিশেষ করে সরকার ও অভিভাবক শ্রেণীর দায়-দায়িত্ব অনেক বেশি। প্রতিটি সচেতন অভিভাবককে সর্বদা খেয়াল রাখতে হবে, আমার স্কুল-কলেজ ও মাদরাসা পড়ুয়া প্রিয় সন্তানটির মোবাইল ফোন ব্যবহারের আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা, প্রয়োজন থাকলে সে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার করছে কিনা? সেই সাথে মনে রাখতে হবে, শয়তান সর্বদা মানুষের পিছনে লেগে আছে। তাই মানুষ ভালো’র পরিবর্তে খারাপের দিকেই সহজে ধাবিত হয়। তাছাড়া কম বুদ্ধির কারণে হোক বা সঙ্গ দোষের কারণে হোক, কিশোর ও তরুণ বয়সে মানুষের নৈতিক অবক্ষয় বেশি হয়ে থাকে। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! বিশ্বাস করুন, মোবাইল কোম্পানি ও মোবাইল সেট নির্মাতাদের কথা আজ আমার ভাবতেও কষ্ট হয়! কেন কষ্ট হয়, তা আপনাদেরও অজানা নয়। আমার মনে হয়, আমার মতো অবস্থা প্রতিটি সচেতন মানুষেরই হয়। মোবাইল কোম্পানি ও সেট নির্মাতাদের অবস্থা দেখে অনুধাবন করা যায়, তারা যেন আজ অশ্লীলতা ছড়ানোর ভূমিকায় পাল্লা দিয়ে লেগেছে। তাদের নির্লজ্জ অর্থলিপ্সার কাছে সমাজের নৈতিক চরিত্রকে বলি দেওয়া হচ্ছে। তাই আজ সঙ্গত কারণেই অপরাধ প্রবণতা বেড়েই চলেছে। ধর্ষণ, সন্ত্রাস, হাইজ্যাক ইত্যাদি আজ নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। সংবাদপত্রের পাতায় এসব খবর নিয়মিতই আমাদের দেখতে হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সকলকে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি অভিভাবককে সচেতন হতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে আল্লাহ তাআলার হুকুম ও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে। ক্যামেরা ও ভিডিও সেট আমদানী সরকারীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। সেই সাথে গভীর রাতে মোবাইল ফোন কোম্পানিসমূহ হ্রাসকৃত কলরেটের যেসব অফার দিয়ে থাকে তাও আইন করে বন্ধ করতে হবে। কারণ এ সময় অনেক ছাত্র- ছাত্রী ও তরুণ-তরুণী সন্ধ্যা ও রাতের পড়ালেখায় মনোযোগ না দিয়ে রাত জেগে অপ্রয়োজনীয় ও অনৈতিক ফোনালাপেই ব্যস্ত থাকে। এতে পড়ালেখা ও স্বাভাবিক কাজকর্মে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। তাছাড়া রাত ১২টা থেকে সকাল ৭ টা বা ৯টা পর্যন্ত সময়টা কথা বলার জন্য এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সময় নয় যে, এ সময় কলরেট হ্রাস করা খুবই উপকারী মনে হতে পারে। বরং সময়টা হচ্ছে শান্তিতে ঘুমানো এবং ইবাদত-বন্দেগি ও কোরআন তিলাওয়াত করার উপযুক্ত সময়। মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর এসময়ে কলরেট হ্রাস করার উদ্দেশ্য কি তাহলে আমাদের আরামের ঘুম নষ্ট করা এবং ইবাদত- বন্দেগি থেকে বিরত রাখা? অবস্থাদৃষ্টে তো তাই মনে হয়! সে যা-ই হোক মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো যাতে এ সময়ে কলরেটের সুযোগ না দিয়ে অন্য সময় দেয় সেদিকেও সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাছাড়া মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো গ্রাহক যাতে পর্ণো সাইটে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোকে সরকার কর্তৃক বাধ্য করতে হবে। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি ও মাদরাসার কর্তৃপক্ষবৃন্দ ছাত্র- ছাত্রীদের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তাদেরকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছাত্র- ছাত্রীরা যাতে সহজে পিতা- মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, সে ব্যবস্থা চালু করতে পারেন। অভিভাবকগণও নিজ নিজ সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া তাদেরকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দিবেন না। একান্ত প্রয়োজনে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দিলেও সবসময় খেয়াল রাখবেন, আপনার প্রিয় সন্তান পড়ালেখা নষ্ট করে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার করছে কিনা? এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, আজকে যোগাযোগের চরম উৎকর্ষতা ও ব্যস্ততার দিনে মোবাইল ফোনের ব্যবহারকে যেমন বাদ দেওয়া যাবে না, তেমনি এর যত্রতত্র ব্যবহার হচ্ছে কিনা সেদিকটিও খেয়াল রাখতে হবে। আমরা প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে যদি এ ব্যাপারে সতর্ক থাকি, তাহলে হয়তো মোবাইলের অনেক ক্ষতি থেকে ব্যক্তি, সমাজ ও দেশকে বাঁচানো সম্ভব হবে। আল্লাহ পাক আমাদের তাওফিক দিন। আমীন। মোবাইল ফোন ও নামাজ নামাজরত অবস্থায় রিং বেজে উঠলে কী করবেন? নামাজ ভঙ্গের যেসব কারণ আছে তন্মধ্যে একটি হলো- আমলে কাসীর। আমলে কাসীর বলা হয়, নামাজি ব্যক্তির এমন কোনো কাজে লিপ্ত হয়ে যাওয়া যা অন্য কেউ দেখলে মনে করবে সে নামাজে নেই। আর নামাজি ব্যক্তির প্রতি অন্য ব্যক্তির এরূপ ধারণা তখনই সৃষ্টি হয় যখন সে দু’হাত ব্যবহার করে কোনো কাজ করে। এক হাত নামাজে ব্যস্ত রেখে অন্য হাত দিয়ে কাজ করলে এমন ধারণা মোটেও সৃষ্টি হয় না। এ কারণেই ফিকাহবিদগণ নামাজের মধ্যে প্রয়োজনে একহাত ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন। তারা বলেছেন- নামাজরত অবস্থায় টুপি উঠানো, জামার হাতা নামানো, সিজদার স্থানের কঙ্কর সরানো, শরীর চুলকানো এবং এ জাতীয় অন্যান্য কাজ করার জন্য এক হাত ব্যবহার করা যাবে। কোনো অবস্থাতেই দু’হাত ব্যবহার করা যাবে না। উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে একথা বলা যায় যে, নামাজের মধ্যে রিং বেজে উঠলে দু’হাত ব্যবহার না করে এক হাতের সাহায্যে মোবাইল পকেটে রেখেই যে কোনো বাটন চেপে রিং বন্ধ করে দিবেন। আর পকেট থেকে মোবাইল বের করার প্রয়োজন হলেও একহাত দ্বারাই করবেন। মোবাইল বের করে পকেটের কাছে রেখে, না দেখে দ্রুত বন্ধ করে আবার পকেটে রেখে দিবেন। মনে রাখবেন, একহাত দ্বারা মোবাইল বন্ধ করতে গিয়ে মোবাইল পকেট থেকে বের করে দেখে দেখে বন্ধ করা যাবে না। কারণ দেখে দেখে বন্ধ করা অবস্থায় কেউ নামাজি ব্যক্তিকে দেখলে সে নামাজে আছে বলে মনে করবে না। ফলে তা আমলে কাসীরের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়ায় নামাজ ভেঙ্গে যাবে। [খুলাসাতুল ফাতওয়া, খণ্ড : ১ পৃষ্ঠা : ১২৯ # ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১০৫ # শরহে নববী, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২০৫ # রদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৬২৪, ২৬৪, ২৬৫ # আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১১-১২ # ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫৬৪ # শরহুল মুনিয়াহ, পৃষ্ঠা : ৪৪৩] র দু’হাত ব্যবহার ব্যতীত রিং বন্ধ করা সম্ভব না হলে… যদি কখনো এমন অবস্থা হয় যে, দু’হাত ব্যবহার ব্যতীত মোবাইল বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না তখন আপনি কী করবেন? তখন কি নিজের নামাজ নষ্ট করে মোবাইল বন্ধ করবেন? নাকি মুসল্লিদের নামাজে বিঘ্নতা ঘটলেও নিজের নামাজকে রক্ষার জন্য রিং বন্ধ করা থেকে বিরত থাকবেন? নামাজে খুশু-খুযু তথা একাগ্রতার গুরুত্ব অনেক বেশি। এজন্যেই ফিকাহ্বিদগণ নামাজরত অবস্থায় প্রস্রাব- পায়খানার বেগ হলে এবং এর দ্বারা খুশু-খুযু বিঘ্নিত হলে নামাজি ব্যক্তিকে নামাজ ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। শুধু অনুমতিই দেননি বরং এ অবস্থায় নামাজ ছেড়ে দেওয়াকে তারা উত্তম বলে আখ্যায়িত করেছেন। কেউ কেউ আবার ওয়াজিব পর্যন্ত বলেছেন। নামাজের মধ্যে রিং বেজে উঠলে যার মোবাইল তার নামাজেই কেবল বিঘ্নতা ঘটে না বরং আশেপাশের অন্যান্য মুসল্লিদের নামাজেও বিঘ্নতা ঘটে। সুতরাং এক্ষেত্রে একহাত দ্বারা রিং বন্ধ করা সম্ভব না হলে নামাজ ছেড়ে দিয়ে অবশ্যই রিং বন্ধ করবেন। এরূপ করা শুধু জায়েযই নয়, কর্তব্যও বটে। আর রিংটোন যদি গান বা মিউজিকের হয় (আল্লাহ আমাদের এ থেকে হেফাজত করুন) তবে তো এর খারাবী আরো বেশি। মোটকথা, নামাজের যে কোনো অবস্থায় আমলে কালীল বা অল্প কাজের দ্বারা রিং বন্ধ করা সম্ভব না হলে নামাজ ছেড়ে দিয়ে রিং বন্ধ করবেন এবং মাসবুকের ন্যায় আবার নতুন করে জামাতে শরিক হবেন। [তাহতাবী আলাল মারাকী, পৃষ্ঠা : ১৯৮ # ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১০৭ # আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৮৭ # রদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৬৫৪-৬৫৫] র রিং বন্ধ করতে সিজদা থেকে উঠা যাবে কি? জামাতে নামাজ পড়ার সময় সিজদারত অবস্থায় রিং বেজে উঠলে কেউ কেউ সিজদা থেকে উঠে বসার প্রায় কাছাকাছি গিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে রিং বন্ধ করে থাকে। অথচ তখনো ইমাম মুসল্লি সকলেই সিজদাতেই থাকে। এভাবে রিং বন্ধ করার দ্বারা তিন তাসবীহ পরিমাণ সময় ব্যয় না হলেও নামাজ ভেঙ্গে যাবে। কারণ যেখানে দুই হাতের ব্যবহারকেই নামাজ ভঙ্গের কারণ বলা হয়েছে সেখানে গোটা দেহকে নামাজের অবস্থা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা নিঃসন্দেহে নামাজ ভঙ্গের কারণ হবে। তাছাড়া এ অবস্থায় কেউ তাকে দেখলে সে নামাজে নেই বলেই মনে করবে। যা আমলে কাসীরের অন্তর্ভুক্ত। আর একথা পূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, আমলে কাসীর নামাজ ভঙ্গের অন্যতম কারণ। [আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ১১-১২ # খুলাসাতুল ফাতওয়া, খণ্ড : ১ পৃষ্ঠা : ১২৯ # ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১০৫ # শরহে নববী, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২০৫ # রদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৬২৪, ২৬৪, ২৬৫] র একই নামাজে কতবার রিং বন্ধ করা যাবে? অনেক সময় দেখা যায়, নামাজরত অবস্থায় একবার রিংটোন বন্ধ করার পর আবার বাজতে থাকে। এমনকি দ্বিতীয়বার বন্ধ করার পর তৃতীয়বারও বাজতে থাকে। কোনো কোনো সময় এই সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়। প্রশ্ন হলো, নামাজে থেকে এভাবে কতবার রিংটোন বন্ধ করা যাবে? হ্যাঁ, অনেক মোবাইল ব্যবহারকারীকেই এই সমস্যায় পড়তে দেখা যায়। এক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান হলো, তিনবার বিশুদ্ধভাবে ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আযীম’ বা ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আলা’ বলা যায় এ পরিমাণ সময়ের ভিতর দুইবার পর্যন্ত উপরে বর্ণিত নিয়মে রিংটোন বন্ধ করা যাবে। দুইবারের বেশি বন্ধ করা যাবে না। যদি কেউ দুইবারের বেশি বন্ধ করে তবে তার নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। তবে একবার বা দুইবার বন্ধ করার পর তিন তাসবীহ পরিমাণ বিলম্বে আবার রিং বেজে উঠলে তখন বন্ধ করা যাবে এবং এতে নামাজও নষ্ট হবে না। মোটকথা তিন তাসবীহ বলা যায় এতটুকু সময়ের মধ্যে তিনবার রিং বন্ধের জন্য (দুই হাত তো নয়ই) একহাতও ব্যবহার করা যাবে না। কেউ করলে তার নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। [খুলাসাতুল ফাতওয়া, খণ্ড : ১ পৃষ্ঠা : ১২৯ # রদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৬২৫ # আহসানুল ফাতাওয়া, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ৪১৮-৪১৯] স্ক্রীনে প্রাণীর ছবি সেভ করা মোবাইল সামনে রেখে নামাজ পড়া কেউ যদি স্ক্রীনে প্রাণীর ছবি সেভ করা মোবাইল সামনে রেখে নামাজ পড়ে তাহলে তার নামাজ শুদ্ধ হবে কিনা তা একটু ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বিষয়। কারণ সেভ করা প্রাণীর ছবিটি দু’ধরনের হতে পারে। ১. অতি ছোট আকারের ছবি যা মাটিতে রাখা অবস্থায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখা যায় না। নাক, কান, চোখ, কপাল ইত্যাদি পৃথকভাবে বুঝা যায় না। এ ধরনের ছবি সম্বলিত মোবাইল সেট সামনে রেখে নামাজ আদায় করলে নামাজের কোনো ক্ষতি হবে না। তবে ছবি তোলা ও সেভ করে রাখার গুনাহ অবশ্যই হবে। যা নামাজ শুদ্ধ-অশুদ্ধ হওয়ার সাথে সম্পর্কিত কোনো বিষয় নয়। ২. ছবিটি যদি বড় হয় এবং মাটিতে রাখা অবস্থায় দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখা যায় অথবা অস্পষ্ট দেখা গেলেও কল আসার কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণে স্ক্রীনে আলো জ্বলে উঠার দরুণ ছবিটি স্পষ্ট হয়ে উঠে তবে নামাজ মাকরূহে তাহরীমি হবে। হ্যাঁ, পূর্ণ নামাজে যে কোনোভাবে একবারও যদি অস্পষ্ট ছবিটি স্পষ্ট না হয়ে উঠে তাহলে নামাজের কোনো ক্ষতি হবে না। [ইমদাদুল ফাতওয়া, খণ্ড : ৪ পৃষ্ঠা : ১৬৭ ফতোয়ায়ে শামী, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৫২০ # ফতহুল কাদীর, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪২৭ # আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪৮-৫০ # ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১০৭] মোবাইল ফোন ও মসজিদ মসজিদে প্রবেশের পূর্বেই কি মোবাইল/রিংটোন বন্ধ করা জরুরি? নামাজ অন্যান্য ইবাদত থেকে একটু ভিন্নতর ইবাদত। এই ইবাদত হলো সরাসরি মহান আল্লাহর সাথে কথা বলার এক চমৎকার মাধ্যম। এ কারণেই নামাজ অবস্থায় একাগ্রতা ও খুশু-খুযুর প্রতি যেরূপ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে অন্য কোনো ইবাদতের বেলায় তেমনটি করা হয়নি। যেমন, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ﻗَﺪْ ﺃَﻓْﻠَﺢَ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨُﻮﻥَ ﴿১ ﴾ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻫُﻢْ ﻓِﻲ ﺻَﻠَﺎﺗِﻬِﻢْ ﺧَﺎﺷِﻌُﻮﻥَ ﴿ ২ ﴾ ( ﺍﻟﻤﺆﻣﻨﻮﻥ : ১-২) ঐসব ঈমানদার সফলতা লাভ করেছে, যারা স্বীয় নামাজে একাগ্রচিত্ত ও বিনয়- নম্র। (সূরা মুমিনুন: ১-২) অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ﻓَﻮَﻳْﻞٌ ﻟِﻠْﻤُﺼَﻠِّﻴﻦَ ﴿ ৪ ﴾ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻫُﻢْ ﻋَﻦْ ﺻَﻠَﺎﺗِﻬِﻢْ ﺳَﺎﻫُﻮﻥَ ﴿৫ ﴾ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻫُﻢْ ﻳُﺮَﺍﺀُﻭﻥَ ﴿ ৬ ﴾ ( ﺍﻟﻤﺎﻋﻮﻥ :৪-৬) যেসব নামাজি স্বীয় নামাজের ব্যাপারে অমনোযোগী এবং লোক দেখানো নামাজ পড়ে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। (সূরা মাঊন: ৪-৬) হাদিস শরিফে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যারা খুশু-খুযু অর্থাৎ আল্লাহর ভয় অন্তরে ধারণ করে একাগ্রচিত্তে বিনয়ের সাথে নামাজ আদায় করে তাদের জন্য আকাশের দরজা খুলে যায় এবং নামাজির জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করে। মোটকথা নামাজের খুশু-খুযুর প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। তাই প্রতিটি মুসলির জন্য মসজিদে প্রবেশের আগেই মোবাইল একেবারে বন্ধ না করলেও রিংটোন বন্ধ করে দেওয়া আবশ্যক। কারণ, মসজিদের ভিতর রিংটোন বেজে উঠলে শুধু স্বীয় একাগ্রতাই নষ্ট হবে না, অন্য নামাজিদের একাগ্রতাও নষ্ট হবে। [মাসিক আল কাউসার, মে’০৮ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ১৮] মসজিদের ভিতর মোবাইলে ভাইব্রেশন দিয়ে রাখা উচিত হবে কি? মসজিদের ভিতর মোবাইলে ভাইব্রেশন দিয়ে রাখাও ঠিক নয়। কারণ এতে অন্যের ক্ষতি না হলেও নিজের খুশু-খুযু তথা মনোযোগ নষ্ট হয়। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো মোবাইলের ভাইব্রেশনের ক্ষীণ আওয়াজ পাশ্ববর্তী লোকদের কানেও পৌঁছে। তদুপরি ভাইব্রেশন চলাকালে মোবাইলটি যদি কোনোভাবে অন্যের গা স্পর্শ করে তবে তো কোনো কথাই নেই। তখন তো অবশ্যই উভয়ের মনোযোগ নষ্ট হবে। তাই মোবাইল নিয়ে মসজিদে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হলো, হয়তো মোবাইল একেবারে বন্ধ করে দেয়া নয়তো আওয়াজ সাইলেন্ট করে রাখা। যাতে নামাজ শেষ করার পর বুঝা যায়, কে কল করেছে। [মাসিক আল কাউসার, মে’০৮ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ১৮] মসজিদে একজনের মোবাইলে রিং বেজে উঠলে অন্যরা কী করবে? পূর্বে বলা হয়েছে, মসজিদের ভিতর যেন রিংটোন না বাজে এবং কারো নামাজে কোনোরূপ বিঘ্নতা সৃষ্টি না হয় সেজন্য প্রত্যেকের উচিত মসজিদে প্রবেশের পূর্বেই মোবাইল বন্ধ করা এবং এ ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থাকা। কিন্তু এ বিষয়ে পূর্ণ সতর্কতা বজায় রাখা সত্ত্বেও কোনো কোনো সময় ভুলবশতঃ মোবাইল বন্ধ না করার কারণে তাতে রিং বেজে উঠে। আর এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই এক্ষেত্রে অন্যান্য মুসল্লিদের উচিত হলো, নামাজ শেষে তাকে এভাবে বুঝিয়ে দেওয়া যে- ‘ভাই! মসজিদে ঢুকার পূর্বে অনুগ্রহপূর্বক খেয়াল করে মোবাইলটা বন্ধ করে আসলে ভালো হয়’। এরূপ বলাই নিয়ম। এভাবে বলাই সুন্নত ও ভদ্রতা। মসজিদের ভিতরে একজন মুসলমানকে সতর্ক করার জন্য এর চেয়ে বেশি বলার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আশ্চর্যের কথা হলো, কারো দ্বারা এমন ভুল ঘটে গেলে মসজিদে অধিকাংশ সময় এমনকিছু আপত্তিকর কথা বলা হয় যা সত্যিই দুঃখজনক ও অনাকাক্মিখত। অথচ মনে রাখা দরকার, অন্যায় বা অসৎ কাজের প্রতিকারও অবশ্যই ন্যায়সঙ্গতভাবে হতে হবে। অন্যথায় লাভের চেয়ে ক্ষতিই হবে বেশি। আচ্ছা বলুন তো, সতর্ক থাকা সত্ত্বেও ভুলক্রমে কোনো কোনো সময় মোবাইল বন্ধ না করাটা কি অন্যায়? আমি মনে করি, এটা মোটেও অন্যায় নয়। কেননা ভুল করা বা ভুলে যাওয়া মানুষের স্বভাব। আর যদি ধরেও নিই যে, এটা অন্যায় তাই বলে কি অন্যায়ের প্রতিকার এভাবে করা যাবে যদ্বারা আরো বড় অন্যায় হয়ে যাওয়া সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়? চিন্তা করে দেখুন তো, মসজিদের ভিতর নামাজের মাঝে যে লোকটির মোবাইল বেজে উঠে, যার অসতর্কতার বিষয়টি হঠাৎ মুসল্লিদের কাছে প্রকাশ পেয়ে যায়, লজ্জায় ও অনুশোচনায় তো এমনিতেই তিনি সংকোচিত হয়ে যান, নামাজ শেষে তার দিকে কে কী ভাবে তাকাবে, কে কী বলবে- এই চিন্তায়ই তো তার মনটা ছোট হয়ে আসে; এর উপর কোনো ভদ্রলোক যদি গোটা মসজিদ কাঁপিয়ে চিৎকার করে তাকে ধমক দিতে শুরু করেন, তাহলে ওই লোকটির অবস্থা কী দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। ভেবে দেখা দরকার, সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃতভাবে, হঠাৎ অসতর্কতার কারণে কোনো মুসলমানের প্রতি এমন আচরণ অমানবিক ও দুঃখজনক নয় কি? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি আমাদেরকে এ শিক্ষাই দিয়ে গেছেন? না, মোটেই নয়। তিনি আমাদেরকে এমনটি কখনো শিক্ষা দেননি। বরং তিনি এরূপ ক্ষেত্রে এমন উত্তম ও কালজয়ী শিক্ষা দিয়ে গেছেন যা চিরদিন অমর -অক্ষয় হয়ে থাকবে। যেমন হাদিস শরিফে আছে- একদিন এক গ্রাম্য লোক মসজিদের ভিতর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে পেশাব করতে শুরু করল। এমতাবস্থায় বারণ করার জন্য উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম দৌড়ে ছুটলেন। কিন্তু নবীজি তাদেরকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, তাকে তার কাজ শেষ করতে দাও। যখন পেশাব করা শেষ হলো নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিলেন। বললেন, এটা নামাজের জায়গা। ইবাদত-বন্দেগীর জায়গা, পেশাবের জায়গা নয়। অবশেষে মসজিদের যে জায়গায় সে পেশাব করেছে তা পবিত্র করে নেওয়ার জন্য সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন। মোটকথা অসতর্কতার দরুণ মসজিদের ভিতর কারো মোবাইলে রিং বেজে উঠলে আশেপাশের মুসল্লিদের করণীয় হলো, প্রথমত: ধৈর্যধারণ করা এবং পরে সঠিক মাসআলা জানা থাকলে সুযোগমতো সুন্দরভাবে তার সম্মানের প্রতি লক্ষ্য রেখে (কোনো আলেমের বরাত দিয়ে) মাসআলা বলে দেওয়া। তা না করে তাৎক্ষণিকভাবে হৈ চৈ করে বকাঝকা শুরু করে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়, শরিয়তও এমন কাজ সমর্থন করে না। কেননা এভাবে হৈ চৈ করার দ্বারা একদিকে যেমন মসজিদের আদব চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়, তেমনি একজন মুসলমানকেও অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়া হয়। তাই সবাইকে এরূপ অন্যায় থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন। মসজিদের ভিতর মোবাইলে দুনিয়াবী কথাবার্তা বলা যাবে কি? মসজিদ আল্লাহর ঘর। পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট জায়গা। নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির, তালীম প্রভৃতি ইবাদতের জন্যই মসজিদের সৃষ্টি। এখানে অন্য ইবাদতকারীর ক্ষতি করে বৈধ কথাবার্তা বলাও নাজায়েয। তাই মসজিদে অবস্থানকালে সরাসরি কিংবা মোবাইলে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা না বলাই উচিত। মসজিদকে দুনিয়াবী কথাবার্তা ও কাজকর্মের স্থান বানানো অথবা এ উদ্দেশ্যে মসজিদে একত্রিত হওয়া মারাত্মক পাপ। কারো মতে মাকরূহে তাহরীমি, কারো মতে হারাম। অবশ্য ইবাদতের উদ্দেশ্যে এসে অন্য ইবাদতকারীর ক্ষতি না করে সরাসরি বা মোবাইলে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করা বা প্রয়োজনীয় কোনো কথা বলা দোষণীয় নয়। [ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৩২১ # আপ কি মাসায়িল আউর উনকা হল, খণ্ড : ২ পৃষ্ঠা : ১১৩ # ফতোয়ায়ে শামী, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৬৬২ # এলামুস সাজিদ, পৃষ্ঠা : ৩২৬ # আল মুহাল্লা, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১৬০ # শরহুল মুনইয়া, পৃষ্ঠা : ৬১০ # আল মাসনূ ফী মাআরিফাতিল হাদীসিল মাওজু, পৃষ্ঠা : ৯২ # ফতহুল বারী, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৬৫৩] মসজিদে এতেকাফ অবস্থায় মোবাইল ব্যবহার না করাই ভালো দুনিয়ার সমস্ত ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন থেকে তার প্রিয়পাত্র হওয়ার উদ্দেশ্যেই ইতিকাফ করা হয়। তাই ইতিকাফকারীর জন্য পূর্ণ সময় অর্থাৎ খানাপিনা, ঘুম ও ইস্তেঞ্জার সময়টুকু বাদ দিয়ে বাকী সময় নামাজ, জিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদি ইবাদতে মশগুল থাকাই কাম্য। সুতরাং খুব বেশি প্রয়োজন না হলে এতেকাফ অবস্থায় মোবাইল ব্যবহার না করাই ভাল। তবে একান্ত ঠেকায় পড়ে প্রয়োজনীয় কথা বলার জন্য মোবাইল যদি ব্যবহার করতেই হয় তাহলে খুব ভালো করে খেয়াল রাখতে হবে যাতে অন্য কোনো মুসল্লি বা ইবাদতকারীর ক্ষতি না হয়। মোটকথা এতেকাফ অবস্থায় মোবাইলে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলার অবকাশ আছে। [আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৩০৪ ফাতাওয়া তাতারখানিয়া, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪১২] মসজিদের ছাদে মোবাইলের টাওয়ার বসানো জায়েয নয় মোবাইল কোম্পানিগুলো তাদের নিজ নিজ টাওয়ার স্থাপনের জন্য বিল্ডিংয়ের ছাদ ভাড়া নিয়ে থাকে। অনেক সময় তারা মসজিদ কমিটিকেও মসজিদের ছাদ ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এখন জানার বিষয় হলো, টাওয়ার স্থাপনের জন্য মসজিদের ছাদ ভাড়া দেওয়ার অনুমতি আছে কি- না? এ ব্যাপারে শরিয়তের ফয়সালা হলো, টাওয়ার স্থাপনের জন্য মসজিদের ছাদ ভাড়া দেওয়া জায়েয নয় এবং কোনো কোম্পানি কর্তৃক মসজিদের ছাদে মোবাইল টাওয়ার স্থাপনও জায়েয নয়। কেননা, মসজিদ আল্লাহর ঘর। এর যথাযথ সম্মান করা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। সবচেয়ে বড় কথা হলো, কোনো স্থানে মসজিদ হয়ে গেলে তার উপর নিচ সম্পূর্ণটাই মসজিদে পরিগণিত হয়ে যায়। মসজিদের ছাদও যেহেতু মসজিদের অংশবিশেষ তাই তা ভাড়া দেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। [আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ২৫০ ফাতাওয়া খানিয়া, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ২৯৩ আল মুহীতুল বুরহানী, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ১২৭ রদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ৪ পৃষ্ঠা : ৩৫৮ ফাতাওয়া হিন্দিয়া : খণ্ড : ২ পৃষ্ঠা : ৪৫৫] মসজিদের বিদ্যুৎ দ্বারা মোবাইল চার্জ করা যাবে কি ? মসজিদের বিদ্যুৎ মসজিদের প্রয়োজন ও ইবাদতের সময় ছাড়া অন্য সময় বা অন্য ক্ষেত্রে ব্যবহার করা জায়েয নেই। তাই মসজিদের বিদ্যুৎ দিয়ে মোবাইল চার্জ না করাই ভালো। তবে একান্ত অপারগ হয়ে মোবাইল চার্জ করতে হলে চার্জ করার পর কিছু টাকা মসজিদ ফাণ্ডে জমা করে দেওয়া আবশ্যক। এই হুকুম মুকীম (স্থানীয় লোক) ও মুসাফির উভয়ের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। [ফাতাওয়ায়ে শামী : খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৫৬৭ ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১১০] মসজিদে অবস্থানরত এতেকাফকারীর মোবাইল দ্বারা ব্যবসা করা মসজিদে এতেকাফ অবস্থায় মোবাইলের সাহায্যে ব্যবসায়িক লেনদেন করা জায়েয আছে। অনুরূপভাবে এতেকাফকারীর কাছ থেকে তার ম্যানেজার বা কর্মচারী ব্যবসায়িক কোনো বিষয়ে পরামর্শ বা সম্মতি নেওয়াতেও কোনো অসুবিধা নেই। তবে এতেকাফে বসে মসজিদের মধ্যে এ ধরনের দুনিয়াবী লেনদেন না করাই উত্তম। [বাহরুর রায়েক, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৩০৩] মোবাইল ফোন ও সালাম আগে হ্যালো নাকি সালাম? শরিয়তের বিধান হলো, পরস্পর কথা বলার সময় আগে সালাম দিয়ে কথা শুরু করা। তাই মোবাইলেও কথা বলার সময় আগে হ্যালো না বলে সালাম দিয়ে তারপর কথা বলা শুরু করতে হবে। হ্যালো বা অন্য কোনো শব্দ দিয়ে কথা শুরু করলে নিঃসন্দেহে তা সুন্নত পরিপন্থি কাজ হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে যাবতীয় কাজ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত অনুযায়ী পালন করার তাওফিক দান করুন। আমীন। [তিরমিযি শরিফ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৯৯ ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৩২৫ আহসানুল ফাতাওয়া, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ২১ আদ্দুররুল মুখতার, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ২৬৬] মোবাইলে আগে সালাম দিবে কে? ‘আস্সালামু কাব্লাল কালাম’- অর্থাৎ সালাম হবে কথার পূর্বে- এই নিয়মের ভিত্তিতে মোবাইলে কথা বলার সময় যিনি আগে কথা বলবেন তিনিই সালাম দিবেন। মোবাইলে কথা বলার ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়, যিনি ফোন রিসিভ করেন তিনিই আগে কথা বলে থাকেন। কারণ রিসিভ করার পর কথা না বললে অনেক সময় রিসিভ হয়েছে কি না তা বুঝা যায় না। অতএব রিসিভকারী যেহেতু আগে কথা বলে থাকেন তাই তিনিই প্রথমে সালাম দিবেন। অবশ্য কখনো রিসিভকারী যদি রিসিভ করে কথা না বলেন কিংবা কথা বললেও কোনো কারণে কল প্রদানকারী তা শুনতে না পায় তখন কল প্রদানকারীই আগে কথা বলে থাকেন। এমতাবস্থায় কল দানকারী যেহেতু আগে কথা বলছেন তাই কথা শুরুর আগে তিনিই প্রথমে সালাম দিবেন। এখানে একটি বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, নিয়মানুযায়ী প্রথমে যে-ই সালাম প্রদান করুক না কেন, অপরজনকে কিন্তু অবশ্যই সালামের উত্তর দিতে হবে। নচেৎ তিনি গুনাহের ভাগী হবেন। কেননা সালাম দেওয়া সুন্নত হলেও উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। [তিরমিযি, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৯৯] উভয়ের সালাম এক সাথে হলে করণীয় কি? অনেক সময় দেখা যায়, রিসিভকারী এবং কলকারী একই সাথে সালাম দেয়। এক্ষেত্রে শরয়ি বিধান হলো, উভয়কেই সালামের জবাব দিতে হবে। কিন্তু উভয়ের সালাম যদি একত্রে না হয়ে সামান্য আগে পরে হয় তাহলে পরে সালাম দানকারীকে পুনরায় উত্তর দিতে হবে। যদি সে পুনরায় উত্তর না দেয় তাহলে অর্থের দিক দিয়ে তার সালামটি প্রথম ব্যক্তির সালামের জবাব হয়ে যাবে এবং এর দ্বারা জবাব প্রদানের ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু শব্দের দিক থেকে সুন্নত তরিকায় জবাব আদায় হবে না। কারণ তার এ জবাবটি ইচ্ছাকৃতভাবে হয়নি। অথচ কোরআনে কারীমে বলা হয়েছে- ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺣُﻴِّﻴﺘُﻢْ ﺑِﺘَﺤِﻴَّﺔٍ ﻓَﺤَﻴُّﻮﺍ ﺑِﺄَﺣْﺴَﻦَ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﺃَﻭْ ﺭُﺩُّﻭﻫَﺎ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻛَﺎﻥَ ﻋَﻠَﻰ ﻛُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﺣَﺴِﻴﺒًﺎ ﴿৮৬ ﴾ ( ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ :৮৬) আর যখন তোমাদেরকে সালাম দেওয়া হয় তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম পন্থায় (অর্থাৎ একটু বাড়িয়ে) সালামের জবাব দাও অথবা সালামদাতার সালামের মতোই জবাব দাও। (সূরা নিসা: ৮৬)। উক্ত আয়াতে নতুন করে ইচ্ছাকৃতভাবে সালামের জবাব প্রদানের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে। [শরহুল মুহায্যাব, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৪৬৩ রদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ৪৯৬ ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৩২৫ তাফসীরে রুহুল মাআনী, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১০২ ] বারবার ফোন করার প্রয়োজন হলে প্রতিবারই সালাম দেওয়া সুন্নত হাদিস শরিফে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালামের ব্যাপারে অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন- “কেউ যদি তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে তাহলে যেন তাকে সালাম দেয়। অতঃপর যদি কোনো গাছ বা পাথর (অল্প সময়ের জন্য হলেও) দু’জনের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করার পর পুনরায় তাদের সাক্ষাৎ হয় তাহলে যেন আবার সালাম দেয়।” এ হাদিস দ্বারা বুঝা গেল, কেউ যদি কারো সাথে বারবার সাক্ষাৎ করে তাহলে প্রতিবারই সালাম দিয়ে কথাবার্তা শুরু করা সুন্নত। মোবাইলে কথাবার্তা বলাটা যেহেতু অনেকটা সাক্ষাতে কথাবার্তা বলার মতোই তাই যতবার কথাবার্তা বলবে ততবারই পরস্পর সালাম বিনিময় করা সুন্নত। [মাসায়েলে মোবাইল, পৃষ্ঠা : ৩৭] ম্যাসেজের মাধ্যমে সালাম : জবাব দিবেন যেভাবে অনেক সময় দেখা যায়, মোবাইলে যেসব ম্যাসেজ পাঠানো হয় তাতে সালাম জানানো হয়। অর্থাৎ ম্যাসেজের শুরুতে সালাম লিখে তারপর অন্যান্য কথা লিখা হয়। এমতাবস্থায় সালামের জবাব কিভাবে দিবেন? মুখে দিবেন, নাকি সালামের উত্তর লিখে ফিরতি ম্যাসেজ পাঠাবেন? ম্যাসেজের মধ্যে লিখিত সালাম চিঠির মধ্যে লিখিত সালামের মতোই। অর্থাৎ উভয় প্রকার সালামের হুকুম একই। যেমনিভাবে চিঠিতে লিখিত সালামের জবাব মুখে বা জবাবী চিঠিতে লিখে দেওয়া যায় অনুরূপভাবে ম্যাসেজে লিখিত সালামের জবাবও মুখে বা ফিরতি ম্যাসেজের মাধ্যমে দেওয়া যায়। মোটকথা মুখে কিংবা লিখে যে কোনোভাবে উত্তর দিলেই ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে উত্তম হলো, সাথে সাথে মুখে উত্তর দিয়ে দেওয়া। কারণ, এমনও হতে পারে যে, ফিরতি ম্যাসেজ পাঠানোর সময় পেল না কিংবা ভুলে গেল। তখন তো ওয়াজিব আদায় না করার গুনাহ ঘাড়ে বর্তাবে। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে শরিয়তের ছোট বড় সকল হুকুম পরিপূর্ণরূপে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন। [সূরা নিসা, আয়াত : ৮৬ আল ফিকহুল হানাফী, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৪০৮] মোবাইলে গাইরে মাহরাম মহিলাদেরকে সালাম দেওয়া জায়েয হবে কি? যদি ফেতনার আশঙ্কা না থাকে তাহলে পর্দায় থেকে গাইরে মাহরাম মহিলাদের সাথে কথা বলা এবং কথা শুরুর আগে সালাম দেওয়া জায়েয। আর নিয়ম যেহেতু যিনি আগে কথা শুরু করবেন তিনিই প্রথমে সালাম দিবেন তাই যে আগে কথা বলবে সেই সালাম দিবে। অর্থাৎ মহিলা আগে কথা বললে সে আগে সালাম দিবে আর পুরুষ আগে কথা বললে সে আগে সালাম দিবে। [তিরমিযি, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৯৯] মোবাইলে কাউকে সালাম পৌঁছানোর জন্য বলা মোবাইলে কথা বলার সময় একজন অপরজনকে বলল, অমুকের নিকট আমার সালাম পৌঁছে দিবেন। এমতাবস্থায় সে যদি সালাম পৌঁছানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে তার জন্য সালাম পৌঁছানো ওয়াজিব। যদি সে না পৌঁছায় তাহলে গুনাহগার হবে। আর যদি সালাম পৌঁছানোর ব্যাপারে কোনোভাবে সে অক্ষমতা প্রকাশ করে কিংবা চুপ থাকে তাহলে তার উপর সালাম পৌঁছানো ওয়াজিব নয়। এই নিয়ম শুধু মোবাইলে কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রেই নয়, সরাসরি কথা বলার সময়ও একই নিয়ম প্রযোজ্য। অর্থাৎ দায়িত্ব নিলে সালাম অবশ্যই পৌঁছাতে হবে, আর দায়িত্ব না নিলে পৌঁছানো জরুরি নয়। [মোবাইল ফোনের শরয়ি আহকাম, পৃষ্ঠা : ২৯-৩০] মোবাইলে কি শুধু ছোটরা বড়দেরকে সালাম দিবে? অনেক সময় দেখা যায়, কোনো বড় ও সম্মানী ব্যক্তির কাছে কল করার পর তিনি রিসিভ করে সালাম দিলে তার সালামের জবাব না দিয়ে তাকে পুনরায় কলদানকারী সালাম দেয়। এটা ভুল নিয়ম। সঠিক নিয়ম হলো, বড় ও সম্মানী ব্যক্তি কল রিসিভ করে সালাম দিলে অপর প্রান্ত থেকে কলদানকারী শুধু উত্তর দিবে। পাল্টা সালাম দিবে না। মনে রাখতে হবে, এরূপ পরিস্থিতিতে ছোট-বড় বলে কোনো কথা নেই। এখানে বরং বিবেচ্য বিষয় হলো, যিনি আগে কথা শুরু করবেন তিনিই আগে সালাম দিবেন। আর এক পক্ষ থেকে সালাম দেওয়ার পর অপর পক্ষ থেকে শুধু উত্তর দিবেন। পুনরায় সালাম দিবেন না। এক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় এমনও অবস্থা হয় যে, উভয় পক্ষ থেকে শুধু সালামই দেওয়া হয়, উত্তর দেয় না কেউই। যা নিয়মের খেলাফ ও গুনাহের কাজ। [তিরমিযি শরিফ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৯৯] না জেনে মোবাইলে অমুসলমানকে সালাম দিলে গুনাহ হবে কি? কল রিসিভ করার সময় যদি রিসিভকারী জানতে না পারে যে, কলদানকারী মুসলমান না অমুসলমান এবং সে না জেনেই অমুসলমান কলকারীকে সালাম দিয়ে দেয় তাহলে তাতে কোনো গুনাহ হবে না। কারণ জেনেশুনে অমুসলমানকে সালাম দেওয়া নিষেধ। ভুলে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে দিয়ে ফেললে গুনাহ হয় না। [আল ইমদাদ স্মারক’ ০৮, পৃষ্ঠা : ১৮২] মোবাইল ফোন ও রিংটোন রিংটোন হিসেবে আজানের ব্যবহার নাজায়েয আজকাল অনেককে রিংটোন হিসেবে আজান, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ইত্যাদি ব্যবহার করতে দেখা যায়। দীনদার ও ধার্মিক শ্রেণীর লোকদের দ্বারাই এ কাজটি সাধারণত বেশি হয়। আমার মনে হয়, তারা এ কাজটি এ ধারণায় করে থাকেন যে- অন্যেরা যখন গান, বাজনা ইত্যাদিকে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করে, আমরাও তাদের মোকাবেলায় আজান, কোরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি ভালো জিনিসকে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করব। যাতে মোবাইল ফোনের রিংটোনের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও গান- বাদ্যের পরিমাণ হ্রাস পায়! এসব লোকের নিয়ত ভালো। এমন সুন্দর নিয়তের কারণে তারা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু যেহেতু বেশ কয়েকটি কারণে শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে রিংটোন হিসেবে এগুলোর ব্যবহার জায়েয নেই তাই এসব থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। নিম্নে আজান ইত্যাদি রিংটোন হিসেবে ব্যবহার নাজায়েয হওয়ার কারণগুলো তুলে ধরা হলো। (ক) আজান আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ, বড়ত্ব ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্য সম্বলিত কিছু বাক্যের সমষ্টি যা ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিআর বা প্রতীক। অনুরূপভাবে পবিত্র কোরআনের আয়াত ও আল্লাহ তাআলার নামের জিকির যে কত মর্যাদাপূর্ণ বিষয় তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। এদিকে মোবাইলে রিং আসার অর্থ হলো, আপনাকে একথা অবহিত করা যে, কেউ আপনার সাথে কথা বলতে চায়। এখন ‘কেউ আপনার সাথে কথা বলতে চায়’ এই খবরটুকু দেওয়ার জন্য কি মহান আল্লাহর বড়ত্ব সম্বলিত আজান ও মহামর্যাদাপূর্ণ কোরআনের আয়াত বা জিকির ব্যবহার করা সমীচীন? এসব আওয়াজকে এই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করাটা পবিত্র শব্দসমূহকে অবমাননা ও অপাত্রে ব্যবহার করার শামিল নয় কি ? কোনো বিক্রেতা যদি ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য জোরে জোরে সুবহানাল্লাহ বলে কিংবা কোনো পাহারাদার যদি জোরে জোরে জিকির করার মাধ্যমে নিজের জাগ্রত থাকার বিষয়টি লোকজনকে অবহিত করে তাহলে ফিকাহবিদগণ একেও পবিত্র শব্দসমূহের অপব্যবহার বলে আখ্যা দিয়েছেন। এবার আপনারাই চিন্তা করে দেখুন, এসব ক্ষেত্রে যদি জিকিরের ব্যবহার ‘পবিত্র শব্দসমূহের অপব্যবহার’ হয়ে থাকে তাহলে ‘মোবাইলে কল এসেছে’- এ খবর দেওয়ার জন্য কোরআন তিলাওয়াত, আজান ইত্যাদির ব্যবহার কেমন হবে? (খ) মোবাইল নিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করার পর রিং আসলে অপবিত্র স্থানে পবিত্র তিলাওয়াত, আজান, জিকির ইত্যাদি বেজে উঠবে। এতে এগুলোর পবিত্রতা কত মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। (গ) রিংটোন হিসেবে কোরআন তিলাওয়াত ব্যবহার করলে অনেক সময় এমন হওয়া স্বাভাবিক যে, কে কল করেছে তা দেখা ও কল রিসিভ করার ব্যস্ততার দরুণ তিলাওয়াতের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার সুযোগ হয় না। অথচ আদব হলো, কোরআন তিলাওয়াত চলতে থাকলে কাজ বন্ধ করে মনোযোগ দিয়ে তিলাওয়াত শ্রবণ করা। (ঘ) কারো মোবাইলে রিং আসলে সে যেহেতু রিসিভের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং রিসিভ করাই তার মূল উদ্দেশ্য থাকে তাই আয়াতের যে কোনো স্থানেই তিলাওয়াত চলতে থাকে সেদিকে খেয়াল না করে রিসিভ করে ফেলে। ফলে অনেক সময় উচ্চারিত অংশের বিবেচনায় আয়াতের অর্থ বিকৃত হয়ে যায়। আর পবিত্র কোরআনের অর্থ বিকৃতি যে কত বড় গুনাহের কাজ তা বলাই বাহুল্য! মোটকথা বহু কারণেই আজান, জিকির, তিলাওয়াত ইত্যাদিকে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমীন। [আল আশবাহ ওয়ান্ নাযায়ের, পৃষ্ঠা : ৩৫ আল কাফী, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৭৬ ফাতাওয়ায়ে আলমগীরি, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৩১৫ আত্ তিবইয়ান ফি আদাবি হামালাতিল কোরআন, পৃষ্ঠা : ৪৬ রদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫১৮] রিংটোন হিসেবে গান ও মিউজিক কখনোই ব্যবহার করবেন না ইসলামি শরিয়তে গানবাদ্য করা, শুনা নাজায়েয ও হারাম। বাজনা- মিউজিক ইত্যাদি গানের সাথে শুনা কবীরা গুনাহ। গান ছাড়া পৃথকভাবে শুনাও গুনাহ। তাই যে কোনো ধরনের গান-বাজনা, মিউজিক টোন ইত্যাদি মোবাইলের রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা নাজায়েয ও গুনাহের কাজ। তাছাড়া এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়, মিউজিক বা গান রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করলে নিজে শুনার গুনাহ তো আছেই, সেই সাথে যেখানে রিংটোন বেজে উঠে সেখানকার আশেপাশের লোকদেরকে গান-বাদ্য শুনানোর গুনাহও হয়। তদুপরি এমন রিংটোন মসজিদে বেজে ওঠলে মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুন্ন হয়। অথচ অনেক ভাইকে দেখা যায়, তারা মোবাইলের রিংটোন হিসেবে গানের টোন, মিউজিক ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকেন। কেউ কেউ আবার মোবাইল কোম্পানি, কম্পিউটার বা অন্য মোবাইল থেকে পছন্দের গান, মিউজিক ইত্যাদি নিজের মোবাইলে ডাউনলোড করে তাকে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করেন। আশ্চর্যের কথা হলো, ওদের ভাবসাব দেখে মনে হয়, এসব অন্যায় ও শরিয়ত বিরোধী কাজ করতে পেরে তারা বেশ খুশি! হায়রে মুসলমান! তোমরা যদি এই অন্যায়ের অপকারিতা ও ক্ষতি সম্পর্কে জানতে এবং তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে তাহলে কখনো এহেন গর্হিত কাজ করতে সাহস পেতে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রিংটোন হিসেবে গানের টোন, মিউজিক ইত্যাদি ব্যবহার করা থেকে হেফাজত করুন। আমীন। [সূরা লোকমান, আয়াত : ৬ বোখারি শরিফ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৮৩৭ তিরমিযি শরিফ, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৪১ সুনানে ইবনে মাজাহ, পৃষ্ঠা : ৩০০ আত্ তারগীব ওয়াত্ তারহীব, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ১৮৪ শামী, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৫৬৬ আল গিনা ফিল ইসলাম, পৃষ্ঠা : ৮৭ ফতহুল কাদীর, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ৪৮২] রিংটোন হিসেবে সালামের ব্যবহার নাজায়েয নয় কারো মোবাইলে কল আসলে তা মোবাইলধারীকে অবহিত করার জন্য যে আওয়াজটি বেজে উঠে তা আমাদের সবার কাছে ‘রিংটোন’ হিসেবে পরিচিত। অনেকে স্বীয় মোবাইলে সালাম ডাউনলোড বা রেকর্ড করার পর তাকে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করে। এরূপ করায় শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সমস্যা নেই। অর্থাৎ সালামকে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা জায়েয। কেননা সালামের দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো, সালামকে অপরের জন্য দোয়া বা অভিবাদন হিসেবে ব্যবহার করা; আর অপরটি হলো, কারো ঘরে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনার জন্য ব্যবহার করা। মোবাইলের রিংটোনও এ দ্বিতীয় প্রকারের সাথে কিছুটা মিলে যায় বিধায় রিংটোন হিসেবে সালামের ব্যবহার নাজায়েয নয়। [মোবাইল ফোনের শরয়ি আহকাম, পৃষ্ঠা : ২৯] বাচ্চাদের কান্না থামানোর জন্য নাজায়েয রিংটোন বাজানো মারাক অন্যায় অনেক মা-বোনকে দেখা যায় তারা বাচ্চাদের কান্না থামানোর জন্য মোবাইলে গানের রিংটোন বাজিয়ে থাকেন। আমার ধারণা, এর মারাত্মক পরিণতি ও গুনাহের বিষয়টি অজানা থাকার কারণেই তারা এমনটি করে থাকেন। তারা হয়তো মনে করেন, বাচ্চাদের তো শরিয়তের বিধি-নিষেধ পালন করা জরুরি নয়! অথচ তারা জানেন না যে, শরিয়তের হুকুম আহকাম বাচ্চাদের জন্য পালন করা জরুরি না হলেও বড়দের জন্য এটা জায়েয নেই যে, তারা বাচ্চাদের দ্বারা শরিয়ত বিরোধী কোনো কাজ করাবেন। যেমন, ফেকাহবিদগণ বলেছেন, বয়স্ক ব্যক্তিরা যদি ছোটদেরকে পশ্চিম দিকে ফিরিয়ে প্রস্রাব করায় তাহলে এর দ্বারা বাচ্চাদের কোনো গুনাহ হবে না ঠিকই, কিন্তু বয়স্করা অবশ্যই গুনাহগার হবেন। অনুরূপভাবে কোনো ছোট বাচ্চার ছবি উঠালে বাচ্চাটির কোনো গুনাহ না হলেও যিনি ছবি উঠালেন তার নিশ্চয়ই গুনাহ হবে। এমনিভাবে বাচ্চাদেরকে গানের বাজনা শুনানোর একই হুকুম। অর্থাৎ যিনি শুনাবেন তিনি গুনাহগার হবেন। এখানে আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, যে গান-বাজনায় অন্তর গাফেল হয়, হৃদয়ে মুনাফেকী সৃষ্টি হয়, মন শক্ত হয়ে যায়, আল্লাহর ভয় লোপ পায় সে গান- বাজনা কী করে আমরা আমাদের কলিজার টুকরা বাচ্চাদের কান্না থামানোর জন্য ব্যবহার করছি? আমরা কি একটি বারও খেয়াল করে দেখেছি যে, এই গান-বাদ্য শুনানোর দ্বারা কোমলমতি বাচ্চাদের অন্তরে আমরা পাপ-প্রবণতার বীজ বপন করছি? অথচ আমরা ইচ্ছা করলে কান্না থামানোর জন্য অন্য কোনো পদ্ধতি যেমন পশু-পাখির টোন, রেকর্ডকৃত হামদ-নাত ইত্যাদি শুনাতে পারি। আসলে আমাদের মধ্যে আজ পাপ ও পাপের ভয়াবহ পরিণতির উপলব্ধি অনেকাংশে কমে গেছে। যার ফলে অনেক সময় আমাদের মধ্যে এ চিন্তাটুকুও আসে না যে, আমরা যা করছি তাতে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো পাপ নেই তো? তাতে আল্লাহ তাআলা নারাজ হবেন না তো? মুসলমান হিসেবে এই কাজটি আমাদের জন্য অশোভনীয় নয় তো? ইত্যাদি। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে গুনাহের মারাত্মক পরিণতি ও কঠিন শাস্তির কথা চিন্তা করে যাবতীয় গুনাহ থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। [মোবাইল ফোনের শরয়ি আহকাম, পৃষ্ঠা : ৫২] মোবাইল ফোন ও মিসড্কল অযথা মিসড্কল দিয়ে কাউকে বিরক্ত করা জায়েয নেই বিনা প্রয়োজনে কাউকে মিস্ডকল দেওয়া গুনাহ ও নাজায়েয। কেননা বিনা প্রয়োজনে মিস্ডকল দেওয়ার দ্বারা যাকে মিস্ডকল দেওয়া হচ্ছে তাকে বিরক্ত করা হয়। তার একাগ্রতায় ব্যাঘাত ঘটানো হয়। তার খাওয়া-দাওয়া, আরাম- নিদ্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অথচ হাদিস শরিফে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি যার হাত ও মুখের অনিষ্ট থেকে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে’। তদুপরি অযথা মিস্ডকল দিলে কোনো কারণ ছাড়াই মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যস্ত রাখা হয়। ফলে প্রয়োজনীয় কথার জন্য অনেকের সংযোগ পেতে কষ্ট হয়। এভাবে মিস্ডকল দিয়ে নেটওয়ার্ক ব্যস্ত রাখাও জায়েয নেই। কেননা এতে কোম্পানির কোনো লাভ নেই। বরং ক্ষতি আর ক্ষতি। মিস্ডকলকে নিরুৎসাহিত করার জন্য কিছুদিন আগে এক মোবাইল কোম্পানি ‘ভালো জিনিস বিনষ্টকারী পোকা’র সাথে মিস্ডকলকারীকে তুলনা করে একটি বিজ্ঞাপনচিত্র পত্রিকায় দিয়েছিল। যা মিস্ডকল দেওয়ার ক্ষতির বিষয়টি উত্তমভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। মোটকথা যেহেতু মিস্ডকল দিয়ে কাউকে বিরক্ত করা, অপর মুসলমান ভাইকে কষ্ট দেওয়ার শামিল এবং এরদ্বারা মোবাইল কোম্পানিরও ক্ষতি হয় তাই যখন তখন যেখানে সেখানে মিস্ড কল দেওয়া থেকে বিরত থাকা একান্ত জরুরি। মিস্ডকল দেওয়া ভদ্রতা পরিপন্থী ছোট মন- মানসিকতার পরিচায়কও বটে। মিস্ডকল দেওয়ার দ্বারা নিজের মান-মর্যাদা ক্ষুন্ন হয়। ইচ্ছে করেই নিজকে অপরের চোখে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। যা শরিয়তের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘অন্যের চোখে নিজেকে হেয় প্রতিপন্ন করা কোনো মুমিনের উচিত নয়’। এটা কেমন কথা যে, প্রয়োজন হলো একজনের আর টাকা খরচ হবে আরেক জনের। যার প্রয়োজন সেই কল করবে- এই তো ইনসাফের কথা! আর যদি প্রয়োজন না থাকে তাহলে অহেতুক তাকে বিরক্ত করব কেন? কেন তার কাজ-কর্ম ও মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাব? মনে রাখবেন, বয়োজ্যেষ্ঠ, আলেম, বুযুর্গ, সম্মানী ও মুরুব্বীশ্রেণীর লোকদেরকে মিস্ডকল দেওয়া আদবের খেলাফ এবং অধীনস্থ ও ছোটদেরকে মিসড্কল দেওয়া আত্মমর্যাদার পরিপন্থি। মিস্ডকল দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমরা অনেক সময় নিজে কথা বলি, মোবাইল কোম্পানির দেওয়া অফার ও সুযোগ গ্রহণ করে কিন্তু অপরকে মিসড্কল দিয়ে কল ব্যাক করতে বাধ্য করি স্বাভাবিক সময়ে; যখন মিনিট প্রতি দুই/আড়াই টাকা খরচ হয়! চিন্তা করে দেখুন তো, এটা ভদ্রতা ও ইনসাফের কোন্ পর্যায়ে পড়ে!! আল্লাহ তাআলা এ ধরনের মন-মানসিকতার লোকদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন। [সহিহ বোখারি তিরিমিজি ইবনে মাজাহ বাইহাকী তরজমানুস্ সুন্নাহ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২৪৪ মাসিক আল কাউসার, এপ্রিল, ২০০৮ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ২৫] কখন মিসড্কল দেওয়া জায়েয? পূর্বে বলা হয়েছে যে, অযথা মিস্ডকল দিয়ে কাউকে পেরেশান বা বিরক্ত করা জায়েয নেই। এতে বুঝা গেল, প্রয়োজন হলে মিস্ডকল দেওয়া জায়েয ও বৈধ। যেমন, কেউ কারো প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে পূর্বেই বলে রেখেছে যে, তুমি কল করে টাকা খরচ করো না। প্রয়োজন হলে মিস্ডকল দিও। আমি ব্যাক করব। অথবা বলল যে, তুমি তৈরী হলে কিংবা অমুক স্থানে পৌঁছলে কিংবা অমুক জিনিস পেলে কিংবা অমুক ব্যক্তি আসলে আমাকে মিস্ডকল দিও। অথবা কারো মোবাইলে রিং এসেছে , কিন্তু নামাজ বা অন্য কোনো বিশেষ কারণে মোবাইল রিসিভ করা তার পক্ষে তৎক্ষনাৎ সম্ভব হয়নি। পরে নামাজ ও ব্যস্ততা থেকে অবসর হয়ে সে কলকারীকে এ কথা জানানোর জন্য মিস্ডকল দিল যে, আমি এখন অবসর, আপনি পুনরায় কল করতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে মিস্ডকল দেওয়ার দ্বারা কিছুটা উপকার পাওয়া যায়। মোটকথা, কারো কোনো ক্ষতি বা বিরক্তির কারণ না হলে মিস্ডকল দেওয়ায় কোনো অসুবিধা নেই। [মাসিক আল কাউসার, এপ্রিল, ২০০৮ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ২৫] মোবাইল ফোন ও ওয়েলকাম টিউন ওয়েলকাম টিউন হিসেবে গানের ব্যবহার শক্ত গুনাহ আমরা সবাই জানি যে, কারো কাছে ডায়াল করার পর তার মোবাইলে রিং হচ্ছে কি না তা বুঝানোর জন্য ডায়ালকারীর মোবাইলে একটি টোন বা আওয়াজ ক্ষণকাল অন্তর অন্তর প্রায় ৩০ সেকেণ্ড সময় পর্যন্ত বাজতে থাকে। এই টোন বা আওয়াজকে ওয়েলকাম টিউন বলে। কেউ কেউ এই টোনের পরিবর্তে গান বা মিউজিক ডাউনলোড করে। ফলে যে কেউ তার কাছে ডায়াল করে সে-ই ডাউনলোডকৃত গান বা মিউজিক শুনতে পায়। যেহেতু ওয়েলকাম টিউনে গান বা মিউজিক ডাউনলোড করলে এই নম্বরের সাথে যোগাযোগকারী সকলকেই বাধ্য হয়ে গান বা মিউজিক শুনতে হয় এবং এতে অপরকে গান বা মিউজিক শুনানো তথা গুনাহের কাজে বাধ্য করার গুনাহ হয় তাই এটিও নাজায়েয। অবশ্য ওয়েলকাম টিউন হিসেবে যিনি তার মোবাইলে গান সেট করে রেখেছেন যদি তার সাথে কথাবার্তা বলা অন্য কোনো লোকের জন্য জরুরি হয়ে পড়ে তাহলে ঐ ব্যক্তি অপারগ হয়ে গান শুনার কারণে গুনাহগার হবেন না। এরূপ পরিস্থিতিতে একটি কাজ এই করা যেতে পারে যে, ডায়াল করার পর যখনই গানের আওয়াজ কানে ভেসে আসবে তখনই কান থেকে মোবাইল সরিয়ে সামনে নিয়ে আসবে এবং যখনই বুঝা যাবে যে, মোবাইল রিসিভ করা হয়েছে তখনই পুনরায় মোবাইল কানের কাছে নিয়ে যাবে। এ কাজটি অবশ্য ঐসব মোবাইল সেট দিয়েই সম্ভব যেগুলোর স্ক্রীনে রিসিভ করার পর থেকে কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত সময় প্রদর্শিত হয়। আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন। [সূরা লোকমান, আয়াত : ৬ বোখারি শরিফ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৮৩৭ ফতহুল কাদীর, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ৪৮২] ওয়েলকাম টিউন হিসেবে তিলাওয়াতের ব্যবহারও জায়েয নয় গান, মিউজিক ইত্যাদির ব্যবহার নাজায়েয হওয়ার কারণে অনেকেই ওয়েলকাম টিউন হিসেবে কোরআন তিলাওয়াত, আজান ইত্যাদি ডাউনলোড করে থাকে। এবং এক্ষেত্রে তাদের উদ্দেশ্যও ভালো থাকে। তারা মনে করে, এরূপ করার ফলে ডায়ালকারী লোকেরা কিছু সময়ের জন্য হলেও কোরআনে কারিমের তিলাওয়াত শুনল, আজানের সুমধুর ধ্বনিতে তাদের হৃদয়-মন পরিতৃপ্ত হলো। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে এরূপ করা ভালো মনে হলেও এর বেশ কয়েকটি খারাপ দিক রয়েছে। যার একটিই এ থেকে বিরত থাকার জন্য যথেষ্ট। যেমন- ১. পবিত্র কোরআন মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলার কালাম। তাঁর এই কালামকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্যই পড়া ও শুনার বিধান রয়েছে। এ উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার নিঃসন্দেহে কোরআনুল কারিমের শান ও মর্যাদার পরিপন্থী। ২. যার কাছে কল করা হলো তার সাথে সংযোগ সৃষ্টি হয়েছে কিনা তা বুঝার জন্যই ওয়েলকাম টোন ব্যবহৃত হয়। আচ্ছা আপনারাই বলুন তো, আল্লাহর মহান কালামকে কি এই কাজে ব্যবহার করা উচিত? এই কাজে তিলাওয়াতের ব্যবহার কি অপাত্রে পবিত্র কোরআনের ব্যবহার নয়? অনুরূপভাবে শরিয়তের বড় এক নিদর্শন- আজানকে এই কাজে ব্যবহার করা কি সমীচীন? এ কি আজানের মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করা নয়? ৩. যিনি ফোন করেন তিনিই ওয়েলকাম টোন শুনেন, যিনি রিসিভ করেন তিনি শুনেন না। ফলে এমন হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, রিসিভকারী তেলাওয়াতের এমন স্থানে রিসিভ করে বসবেন যেখানে থেমে গেলে আয়াতের অর্থই বদলে যায়। যেমন, পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতে আছে- ‘লা তাক্বরাবুস্ সালাতা ওয়া আনতুম সুকারা’ যার অর্থ হলো, তোমরা নামাজের ধারে কাছেও যেও না যে অবস্থায় তোমরা মাতাল থাক। এখানে ‘লা তাক্বরাবুস্ সালাতা’ অর্থ- তোমরা নামাজের ধারে কাছেও যেও না, আর ‘ওয়া আনতুম সুকারা’ অর্থ- যে অবস্থায় তোমরা মাতাল থাক। এখন ‘লা তাক্বরাবুস্ সালাতা’ বলার সাথে সাথে যদি মোবাইল রিসিভ করা হয় তাহলে আয়াতের অর্থের মধ্যে কেমন বিকৃতি ঘটে তা আপনারাই একটু চিন্তা করে দেখুন। অনুরূপভাবে ওয়েলকাম টিউন্স হিসেবে আজান চলাকালে কেউ যদি ‘লা ইলাহা’ পর্যন্ত উচ্চারিত হওয়ার পর ফোন রিসিভ করে ফেলে তাহলে অর্থ দাঁড়ায়- ‘কোনো মাবুদ নেই’। যা অর্থের মারাত্মক বিকৃতি। এ সমস্যার কারণেও কোরআন তিলাওয়াত ও আজানকে ওয়েলকাম টিউন হিসেবে ব্যবহার করা জায়েয নেই। ৪. ব্যস্ততার সময় ফোনে কথা বললে কানে তিলাওয়াতের ধ্বনি আসলেও তা মনোযোগ সহকারে শোনা হয় না। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন- যখন কোরআন পড়া হয় তখন তোমরা মনোযোগ সহকারে শোনো ও চুপ থাকো। মোটকথা এক্ষেত্রে তিলাওয়াতের হক আদায় করা সম্ভব হয় না বিধায় ওয়েলকাম টিউন হিসেবে তিলাওয়াতের ব্যবহার জায়েয নয়। [আলাতে জাদীদাহ কি শরয়ি আহকাম, পৃষ্ঠা : ১৭১ আত্ তিবইয়ান ফি আদাবি হামালাতিল কোরআন, পৃষ্ঠা : ৪৬ আলমগীরি খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৩১৫ রদ্দুল মুহতার, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫১৮ হককুত্ তিলাওয়াহ, পৃষ্ঠা : ৪০১ আল মুগনী, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ৪৮২] মোবাইল ফোন ও ফ্লেক্সিলোড ফ্লেক্সিলোড করে ফ্লেক্সিকৃত অর্থের চেয়ে বেশি গ্রহণ করা জায়েয ফ্লেক্সিলোড করে ফ্লেক্সিকৃত অর্থের চেয়ে বেশি টাকা গ্রহণ করা ব্যবসায়ীর জন্য জায়েয। এরূপ করা সুদ নয়। কেননা এটা মূলত কম টাকার বিনিময়ে বেশি টাকা গ্রহণ নয়। বরং এটা হচ্ছে, নির্ধারিত অঙ্কের আউটগোয়িং সেবা যা বিক্রয়যোগ্য। তাই এটা নির্ধারিত অঙ্কের বেশিতে লেনদেন করা সুদ নয়। কিন্তু কোম্পানির পক্ষ থেকে লোডকারী ব্যবসায়ীকে যেহেতু নির্ধারিত হারে কমিশন দেওয়া হয় এবং গ্রাহক থেকে এ বাবদ কোনো টাকা লওয়া কোম্পানি কর্তৃক নিষিদ্ধ তাই ব্যবসায়ীর জন্য ফ্লেক্সিকৃত অর্থের চেয়ে বেশি লওয়া উচিত নয়। [ফতহুল কাদীর, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ১৫৯ তাকমিলাতু ফাতহুল মুলহিম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৪০০] ফ্লেক্সিলোড করার সময় টাকা অন্যত্র চলে গেলে… ফ্লেক্সিলোড করার সময় পূর্ণ সতর্কতার সাথে নম্বর টিপতে হয়। কেননা নম্বর টিপতে ভুল করলে ফ্লেক্সিকৃত টাকা ভুল নম্বরে চলে যায়। ফলে অনেক সময় দোকানী ও গ্রাহকের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এমনকি কোনো কোনো সময় তা মারাত্মক ঝগড়ায় রূপ নেয়। যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত। যাহোক, ভুলক্রমে যদি ফ্লেক্সিকৃত টাকা অন্য মোবাইলে চলেই যায় তাহলে এর ক্ষতিপূরণ কে দিবে? দোকানী, না গ্রাহক? এক্ষেত্রে শরিয়তের ফয়সালা হলো, যিনি ভুল করেছেন তিনিই ক্ষতির এই দায়ভার বহন করবেন। সাধারণত দেখা যায়, ফ্লেক্সিলোডকারী ব্যবসায়ীরা গ্রাহকের নম্বরটি নির্দিষ্ট একটি খাতায় নিজের হাতে নোট করে নেয়। কোনো কোনো সময় গ্রাহককে দিয়েও লিখায়। যদি ব্যবসায়ী লিখে তাহলে গ্রাহকের জন্য স্বীয় নম্বরের সাথে খাতায় লিখিত নম্বরটিকে মিলিয়ে নেওয়া কর্তব্য। এরপর ব্যবসায়ী যদি খাতায় নোটকৃত নম্বর টিপতে গিয়ে ভুল করে এবং টাকা অন্য মোবাইলে চলে যায় তাহলে এই ক্ষতির দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে। এ বাবদ গ্রাহক থেকে কিছুই নিতে পারবে না। হ্যাঁ, গ্রাহক যদি স্বেচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিছু দিতে চায় তবে ব্যবসায়ী তা নিতে পারবে। আর যদি নম্বর বলার সময়ই গ্রাহক ভুল করে থাকে অথবা নিজ হাতে ভুল নম্বর লিখে এবং দোকানী সে নম্বরেই ফ্লেক্সি করে তবে এ ভুলের ক্ষতিপূরণ গ্রাহককে বহন করতে হবে। অবশ্য দোকানী তার খাতায় ভুল নম্বর নোট করেছে একথা প্রমাণিত হলে এ ভুলের দায়-দায়িত্ব দোকানীর, গ্রাহকের নয়। [মাসিক আল কাউসার, এপ্রিল ‘০৮ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ২৬] অজ্ঞাত স্থান থেকে ফ্লেক্সি এসে গেলে কী করবেন ? যদি কখনো অজানা নম্বর থেকে মোবাইলে টাকা চলে আসে তাহলে প্রথমে তাকে নিশ্চিত হতে হবে যে, তার কোনো পরিচিত মানুষ তার মোবাইলে টাকা পাঠিয়েছে কিনা কিংবা এটা মোবাইল কোম্পানির বোনাস কিনা? যদি তা না হয় তাহলে এই টাকা ব্যবহার করা তার জন্য জায়েয হবে না। এমতাবস্থায় এ টাকা মূল মালিকের কাছে পাঠিয়ে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে। সাধারণত দেখা যায়, যে নম্বর থেকে টাকা এসেছে সে নম্বরধারী ব্যক্তি কল করে থাকে। এমনটি হলে তো মূল মালিকের সন্ধান মিলেই গেল! আর যদি এমন না হয় তাহলে সে স্বীয় মোবাইল অপারেটরের সাথে যোগাযোগ করে অথবা অন্য কোনো উপায়ে টাকা পাঠাতে চেষ্টা করবে। যদি এই চেষ্টায় সে সফল হয় এবং এ বাবদ তার কিছু টাকা খরচ হয় তাহলে খরচ পরিমাণ টাকা রেখে বাকী টাকা পাঠালেই চলবে। আর যদি এক্ষেত্রেও সে কামিয়াব না হয় অর্থাৎ মূল মালিকের কাছে কোনোভাবেই টাকা ফেরত পাঠানো সম্ভব না হয় তাহলে সে ঐ পরিমাণ টাকা উক্ত ব্যক্তির নামে কোনো গরীব- মিসকীনকে দান করে দিবে। অবশ্য পরে যদি টাকার মালিক পাওয়া যায় তাহলে তাকে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে টাকা দান করার কথা জানাবে। যদি সে মেনে নেয় তবে তো ভালো। অন্যথায় সে পরিমাণ টাকা তাকে ফেরত দিতে হবে। [আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ১৫২, ২৫৭ ফাতাওয়া তাতারখানিয়া, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৫৮৫ বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ২৯৮] ভুল ফ্লেক্সিকারীর দেওয়া ছাড় গ্রহণ করা যাবে কি? কারো নম্বরে ভুলক্রমে ফ্লেক্সিলোডের টাকা চলে গেলে দোকানী যদি তাকে কিছু ছাড় দিয়ে বাকীটা পাঠাতে বলে, যেমন ৩০০ টাকা ভুলে অন্য নম্বরে চলে গিয়ে থাকলে যার নম্বরে টাকা চলে গেল তাকে ফোন করে দোকানী বলল, ভাই! তুমি ২০ টাকা রেখে বাকী ২৮০ টাকা আমার মোবাইলে পাঠিয়ে দাও তাহলে ঐ ব্যক্তির জন্য এ ছাড় গ্রহণ করা জায়েয হবে কি? হ্যাঁ, এ ছাড় যদি সে স্বেচ্ছায় খুশি হয়ে দেয় তবে তা নেওয়া জায়েয। কিন্তু ছাড় না দিলে বাকী টাকাও পাঠাবে না এ আশঙ্কা করে যদি ছাড় দিতে চায় তবে তা গ্রহণ করা যাবে না। তাই ছাড়টা খুশি হয়ে সন্তুষ্টচিত্তে দিচ্ছে কিনা তা যে কোনো উপায়েই হোক, যাচাই করে নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। [আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ৩, পৃষ্ঠা : ১৫৪ আদ্দুররুল মুখতার, খণ্ড : ৪, পৃষ্ঠা : ২৮০] মোবাইল ফোন ও জাকাত ব্যালেন্সে অবস্থিত টাকার জাকাত দিতে হবে কি ? জাকাত হলো ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি। যা অত্যাবশ্যকীয় ও সম্পূর্ণ নিশ্চিত একটি বিধান। জাকাত দরিদ্রদের অধিকার, সম্পদশালীদের কোনো অনুদান নয়। আল্লাহ তাআলা স্বীয় অনুগ্রহে নিজ বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে ইচ্ছা সম্পদ দিয়েছেন এবং এই সম্পদের সামান্য অংশ গরীব-দুঃখীদের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন। মানুষ যখন জাকাত আদায় করে তখন তার অবশিষ্ট সম্পদ নির্মল ও পবিত্র হয়ে যায়। পক্ষান্তরে কেউ যদি জাকাত না দেয় তাহলে তার সমুদয় সম্পদ অপবিত্র ও বরকতহীন হয়ে যায়। তদুপরি যারা জাকাত আদায় করবে না পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳَﻜْﻨِﺰُﻭﻥَ ﺍﻟﺬَّﻫَﺐَ ﻭَﺍﻟْﻔِﻀَّﺔَ ﻭَﻟَﺎ ﻳُﻨْﻔِﻘُﻮﻧَﻬَﺎ ﻓِﻲ ﺳَﺒِﻴﻞِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻓَﺒَﺸِّﺮْﻫُﻢْ ﺑِﻌَﺬَﺍﺏٍ ﺃَﻟِﻴﻢٍ ﴿ ৩৪ ﴾ ﻳَﻮْﻡَ ﻳُﺤْﻤَﻰ ﻋَﻠَﻴْﻬَﺎ ﻓِﻲ ﻧَﺎﺭِ ﺟَﻬَﻨَّﻢَ ﻓَﺘُﻜْﻮَﻯ ﺑِﻬَﺎ ﺟِﺒَﺎﻫُﻬُﻢْ ﻭَﺟُﻨُﻮﺑُﻬُﻢْ ﻭَﻇُﻬُﻮﺭُﻫُﻢْ ﻫَﺬَﺍ ﻣَﺎ ﻛَﻨَﺰْﺗُﻢْ ﻟِﺄَﻧْﻔُﺴِﻜُﻢْ ﻓَﺬُﻭﻗُﻮﺍ ﻣَﺎ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ﺗَﻜْﻨِﺰُﻭﻥَ ﴿ ৩৫ ﴾ ( ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ : ৩৪-৩৫) যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জিভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, (হে নবী!) তাদেরকে আপনি কঠিন শাস্তির সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। (সেদিন তাদের অবস্থা কেমন হবে) যেদিন জাহান্নামের আগুনে সেই স্বর্ণ রৌপ্যকে উত্তপ্ত করে ঐগুলো দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে এবং বলা হবে এ হলো ঐ জিনিস যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করে রেখেছিলে। অতএব এখন তোমরা পুঞ্জীভূত করার শাস্তি আস্বাদন করো। [সূরা তাওবা: ৩৪-৩৫] প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ মস্তিস্কসম্পন্ন কোনো মুসলমান নর-নারীর যদি নিসাব পরিমাণ মাল এক বছর তার মালিকানায় থাকে তাহলে তার উপর জাকাত ফরজ হবে। অর্থাৎ যেদিন সে নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হবে, এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ঠিক সেদিন যদি সে নিসাব পরিমাণ মালের মালিক থাকে (মাঝখান দিয়ে কমবেশি হওয়া ধর্তব্য নয়) তাহলে তার জাকাত আদায় করা ফরজ হবে। এখন প্রশ্ন হলো, যেদিন তার উপর জাকাত ফরজ হলো সেদিন যদি তার প্রি-পেইড মোবাইলের ব্যালেন্সে টাকা থাকে তাহলে ঐ টাকার জাকাত দিতে হবে কি না? ব্যালেন্সে অবস্থিত টাকা মূলত টাকা নয়। বরং এটি হচ্ছে ঐ টাকার সমপরিমাণ আউটগোয়িং সেবা। আর ব্যালেন্সে অবস্থিত টাকা যেহেতু মূলত টাকা নয় বরং ক্রয়কৃত একটি সেবাপণ্য যা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে; তাই অন্যান্য ব্যবহৃত সম্পদের ন্যায় ব্যালেন্সে অবস্থিত সম্পদেরও জাকাত দিতে হবে না। [ফাতাওয়া তাতারখানিয়া, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২৪৫ ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১৭২ হেদায়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১৮৬] সিকিউরিটি ডিপোজিটেরও জাকাত দিতে হবে যেসব লোক পোস্ট-পেইড তথা বিল অগ্রিম পরিশোধ করে মোবাইল ব্যবহার করেন তাদের বিল যদি নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি হয়ে যায় তখন কোম্পানির পক্ষ থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। কিন্তু মোবাইল কোম্পানির কাছে অতিরিক্ত টাকা সিকিউরিটি হিসেবে জমা রাখলে নির্ধারিত পরিমাণ বিলের সুযোগ থাকে। এক্ষেত্রে বিলের পরিমাণ সাধারণ বিলের চেয়ে বেশি হলেও কোম্পানির পক্ষ থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় না। কোম্পানির কাছে সিকিউরিটি হিসেবে জমাকৃত এই টাকাকে সিকিউরিটি ডিপোজিট বলা হয়। সিকিউরিটি ডিপোজিটের এ টাকা জাকাতযোগ্য সম্পদ। নিসাবের মালিকের জন্য অবশ্যই এর জাকাত দিতে হবে। কেননা ইচ্ছা করলেই এ টাকা ক্যাশ করা যায়। মোটকথা সিকিউরিটি ডিপোজিটের টাকা যেহেতু অন্যান্য জমাকৃত টাকার মতোই তাই অন্যান্য টাকার সাথে মিলিয়ে এই টাকারও জাকাত দিতে হবে। [ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ১৭৪ আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২০২, ২০৬] ফ্লেক্সি ব্যবসায়ীদের জমাকৃত টাকার জাকাত ফ্লেক্সি ব্যবসায়ীরা প্রথমে কোম্পানির নির্দিষ্ট জায়গায় টাকা জমা দেয়। তারপর এ জমাকৃত টাকা থেকে ধীরে ধীরে গ্রাহকের নিকট ফ্লেক্সি বিক্রি করে। এখন এ টাকা তাদের হাতে ক্যাশ হওয়ার আগেই যদি জাকাতের বর্ষ পূর্ণ হয়ে যায় তাহলে এ জমাকৃত টাকার জাকাত দিতে হবে। যদি কিছু টাকা হাতে ক্যাশ হয় আর কিছু টাকা কোম্পানির কাছে জমা থেকে যায় তাহলেও জমাকৃত টাকার জাকাত দিতে হবে। আর যে টাকা হাতে এসে গেছে সে টাকার জাকাত তো অন্যান্য টাকার সাথে মিলিয়ে হার মত দিতেই হবে। উল্লেখ্য যে, কোম্পানির কাছে জমাকৃত টাকার ফ্লেক্সি বিক্রি করে যে লাভ হবে তার জাকাত এখন দিতে হবে না। কারণ সে লাভ তো এখনো হয়নি। মোটকথা কোম্পানির কাছে জমাকৃত টাকা নিজের কাছে রক্ষিত টাকার মতোই। নিসাবের মালিক কোনো ব্যবসায়ীর এক বছর পূর্ণ হলেই সে টাকার উপর জাকাত ফরজ হবে। [মাসিক আল কাউসার, মে ২০০৮ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ১৭-১৮] মোবাইল ফোনের ক্রয়-বিক্রয় ক্যামেরাযুক্ত মোবাইলের ক্রয়- বিক্রয় নাজায়েয নয়, তবে… ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে শরিয়তের একটি নিয়ম হলো, যেসব জিনিস সবসময় কিংবা বেশির ভাগ সময় গুনাহের কাজেই ব্যবহার করা হয় এবং যা দ্বারা গুনাহের কাজ ছাড়া অন্য কোনো ভালো বা জায়েয কাজ করা সম্ভব হয় না তা ক্রয়-বিক্রয় হারাম ও নাজায়েয। ইসলামি শরিয়তে কোনো প্রাণীর ছবি তোলা বা অঙ্কন করা হারাম ও নাজায়েয। কিন্তু কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য বা প্রাণহীন বস্তু যেমন- পাহাড়- নদী, গাছপালা, তরুলতা, আকাশ- সমুদ্র ইত্যাদির ছবি তোলা বা অঙ্কন করা হারাম বা নাজায়েয নয়। ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল দ্বারা যেহেতু নিষ্প্রাণ বস্তু ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের স্থির ছবিও উঠানো যায় তাই তার ক্রয়-বিক্রয় নাজায়েয নয়। তবে তাকে নাজায়েয কাজে ব্যবহার করাকেই না জায়েয বলা হবে। অর্থাৎ এর দ্বারা কোনো প্রাণীর ছবি উঠানোকেই নাজায়েয বলা হবে। ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমার (লেখকের) পরামর্শ হলো, প্রাণীর ছবি না উঠালেও খুব বেশি প্রয়োজন না হলে এ ধরনের মোবাইল সেট ক্রয় থেকে বিরত থাকাই ভালো। কারণ, হাতের কাছে গুনাহের সরঞ্জমাদি থাকলে গুনাহ হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা নফ্স কিছুক্ষণের জন্য সাধু সাজলেও সুযোগ পেলে গুনাহ করে ফেলতে পারে। যখন তখন ফিরে যেতে পারে আপন স্বভাবে। এজন্যেই নবী ইউসুফ আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, ﻭَﻣَﺎ ﺃُﺑَﺮِّﺉُ ﻧَﻔْﺴِﻲ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻨَّﻔْﺲَ ﻟَﺄَﻣَّﺎﺭَﺓٌ ﺑِﺎﻟﺴُّﻮﺀِ ﺇِﻟَّﺎ ﻣَﺎ ﺭَﺣِﻢَ ﺭَﺑِّﻲ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲ ﻏَﻔُﻮﺭٌ ﺭَﺣِﻴﻢٌ ﴿ ৫৩ ﴾ ( ﻳﻮﺳﻒ : ৫৩) আমি আমার নফ্সকে নির্দোষ মনে করি না। কারণ নফ্স অধিক পরিমাণে খারাপ কাজের নির্দেশপ্রদানকারী, তবে আমার রব যাকে রহম করেন, নিশ্চয় আমার রব অধিক ক্ষমাশীল, অতীব দয়ালু [সূরা ইউসুফ, আয়াত ৫৩] তাছাড়া শয়তান তো আমাদের প্রকাশ্য শত্রু। পাপ কাজ করানোর জন্য সর্বদাই সে মানুষের পিছনে লেগে থাকে। তাই আজ হয়তো আপনার দৃঢ় একিন আছে যে, আপনি কখনোই প্রাণীর ছবি তুলবেন না। কিন্তু ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল হাতে থাকলে শয়তান হয়তো এক সময় সুযোগ পেয়ে আপনার অন্তরে একথার ওয়াস্ওয়াসা ঢেলে দিতে পারে যে, আরে! দু’একবার ছবি তুললে এমন কি পাপ হবে! দু’একবারের গুনাহ তো আল্লাহও ক্ষমা করেন!! তাছাড়া তাওবার দরজা তো খোলাই আছে ! তাই এখন একটু ছবি তুলে নাও। পরে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিও। অথবা বাসায় ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল থাকলে আপনি হয়তো প্রাণীর কোনো ছবি তুললেন না, কিন্তু আপনার পরিবারের দুর্বল ঈমানওয়ালা কাউকে দিয়ে শয়তান হয়তো প্রাণীর ছবি তোলাতে পারে। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা! উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা আমি যেকথাটি বুঝাতে চাচ্ছি তাহলো- যেহেতু গুনাহের উপকরণ না থাকলে গুনাহের সম্ভাবনাও কম থাকে তাই ক্যামেরা সেট মোবাইল- যা দিয়ে যে কোনো সময় ছবি তোলা যায়, গান শোনা যায়- তা ক্রয় করা বা নিজের কাছে রাখা থেকে বিরত থাকাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। তাই আবারো বলছি, একান্ত ঠেকা না হলে, ক্যামেরা ও ভিডিও সুবিধাযুক্ত মোবাইল সেট ক্রয় না করাই শ্রেয় এবং অধিক তাকওয়ার বিষয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বুঝার ও আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন। [ইমদাদুল ফাতওয়া, খণ্ড : ৪ পৃষ্ঠা : ২৪৯ # আল আশবাহ ওয়ান্ নাযায়ের, পৃষ্ঠা : ৫৩ জাওয়াহিরুল ফিক্হ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৪৪৬ বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যাহ, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩৫৯ আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ৮, পৃষ্ঠা : ২০২ আদ্দুররুল মুহতার, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ৩৯১] র চুরি ও ছিনতাইকৃত মোবাইল সেট ক্রয় করা জায়েয নেই আজকাল মোবাইল ফোনের ব্যবহার অত্যধিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে মোবাইল সেট চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এখন কোনো চোর বা ছিনতাইকারী বা তাদের কোনো লোক যদি এ ধরনের মোবাইল সেট বিক্রি করে তাহলে অন্যের জন্য জেনেশুনে ইচ্ছাকৃতভাবে তা ক্রয় করা জায়েয হবে না। অনুরূপভাবে কারো মোবাইল যদি হারিয়ে যায় এবং অন্য কেউ পেয়ে তা বিক্রি করে তাহলে তাও জেনেশুনে ক্রয় করা জায়েয হবে না। [আপ কা মাসায়েল আউর উন কা হল, খণ্ড : ২ পৃষ্ঠা : ১১৩] সাধারণ সেট নামীদামী কোম্পানির নামে চালানোও নাজায়েয অনেক সময় দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে সাধারণ ও কমদামী মোবাইল সেট নামীদামী কোম্পানি যেমন নকিয়া, স্যামসং ইত্যাদির লেভেল লাগিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে। এভাবে এক কোম্পানির মাল অন্য কোম্পানির লেভেল দিয়ে বিক্রি করা হারাম ও নাজায়েয। কারণ এরদ্বারা মানুষকে ধোকা দেওয়া হয় এবং অন্যায়ভাবে অন্যের মাল হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আল্লাহ আমাদেরকে এ থেকে হেফাজত করুন। আমীন। [মুসলিম শরিফ, খণ্ড : ২ পৃষ্ঠা : ২] মোবাইল ফোন : বিবিধ তালিবে ইল্মদের হাতে মোবাইল! তালিবে ইল্ম তথা ছাত্রদের কাছে মোবাইল রাখা মোটেও উচিত নয়। কেননা তাদের কাছে মোবাইল রাখার দ্বারা যতটা না লাভ হয়, তার চেয়ে ক্ষতি হয় কয়েকশ গুণ বেশি। তাই তো এক মনীষী বলেছেন- “তালেবে ইল্মের কাছে মোবাইল থাকার অর্থই হলো, তার তলবের মাদ্দা ও জ্ঞানার্জনের আগ্রহ খতম হয়ে যাওয়া এবং ধীরে ধীরে ধ্বংস ও বরবাদির পথে এগিয়ে যাওয়া। সুতরাং ছাত্ররাই এবার সিদ্ধান্ত নিক্ তারা কি জ্ঞানার্জনের স্পৃহা নিঃশেষ করে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে? নাকি জ্ঞানার্জনের স্পৃহা বাকী রেখে প্রকৃত আলেম হওয়ার চেষ্টা করবে?” লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ বিশেষ কোনো প্রয়োজন ছাড়াই কেবল ফ্যাশন হিসেবে মোবাইল ব্যবহার করে অর্থের চেয়ে অধিক মূল্যবান জিনিস ‘সময়’ অপচয়ে লিপ্ত। আক্ষেপের বিষয় হলো, আমাদের তালেবে ইল্ম ভাইয়েরাও এই মহামারি থেকে নিরাপদ নয়। আজকাল তাদের অনেকের হাতেই মোবাইল ফোন দেখা যায়। কেউ গোপনে রাখে, কেউ প্রকাশ্যে ব্যবহার করে। অথচ আমার বুঝে আসে না যে, ইল্ম চর্চার প্রতি গভীর মনোনিবেশের সাথে ‘মোবাইল চর্চা’ একত্র হয় কীভাবে? তদুপরি এটা নিশ্চিত যে, তালেবে ইল্মের জন্য এই ‘বস্তুটা’ প্রয়োজনের আওতায় পড়ে না। বরং এটা তাদের জন্য একটা অতিরিক্ত জিনিস। তাই এর পেছনে পড়ার মানে একথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আমি তালেবে ইল্ম নই। তাই তালেবে ইল্মরা যদি নিজেদের কল্যাণ চায়, তাহলে তাদেরকে সর্বপ্রথম মোবাইল পরিত্যাগ করতে হবে। পাশাপাশি সর্বপ্রকার ব্যস্ততা ও প্রতিবন্ধকতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে একাগ্রতার সাথে ইল্ম চর্চায় নিমগ্ন হতে হবে। এছাড়া দীনের সঠিক বুঝ ও ইল্মি ময়দানে পাকা-পোক্ত হওয়ার আশা করা যায় না। মোবাইলে কোরআন তিলাওয়াত রেকর্ড করা লিখিত কোরআনের ন্যায় কোরআন তিলাওয়াতও ডাউনলোড কিংবা রেকর্ড করা জায়েয। এতে কোনো সমস্যা নেই। এর হুকুম অন্যান্য রেকর্ডারের মতোই। তবে যখন তিলাওয়াত অন করা হবে তখন খুব মনোযোগ সহকারে তিলাওয়াত শুনতে হবে। এমন যেন কখনোই না হয়, একদিকে তিলাওয়াত চলছে আর অপর দিকে সে অন্য কাজে ব্যস্ত। কেননা এরূপ করা তিলাওয়াতের আদব পরিপন্থী কাজ। [মাসিক আল কাউসার, এপ্রিল, ২০০৮ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ২৪] মোবাইলে লিখিত কোরআন রেকর্ড করা অনেকে লিখিত কোরআন শরিফ বা তার অংশবিশেষ ডাউনলোড করে মেমোরিতে সংরক্ষণ করে রাখে। এমনিভাবে কেউ কেউ আবার হাদিস বা হাদিসের টুকরোও স্বীয় মোবাইলে সেভ করে রাখে। এরূপ করা জায়েয। তবে যখন তা স্ক্রীনে আনা হয় তখন খুব ভালো করে সতর্ক থাকতে হবে যাতে কোরআন বা হাদিসের সাথে কোনো ধরনের বেআদবী না হয়। যেমন, এ অবস্থায় বাথরুম বা কোনো নাপাক স্থানে যাওয়া। উল্লেখ্য যে, কোরআন শরিফ স্ত্রীনে কিংবা মেমোরীতে থাকা অবস্থায় বিনা অজুতে মোবাইল ধরা বা স্পর্শ করা যাবে। [ফাতাওয়া শামী, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৫১৯ মাসিক আল কাউসার, এপ্রিল, ২০০৮ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ২৪] মোবাইল স্ক্রীনে ছবি সেভ করা মোবাইলের যে অংশে নম্বর, নাম, লেখা ইত্যাদি দেখা যায় তাকে মোবাইল স্ক্রীন বা ডিসপ্লে ইউনিট বলে। অনেককে দেখা যায় মোবাইল স্ক্রীনে নিজের ছবি, বাচ্চাদের ছবি, বন্ধু-বান্ধবদের ছবি, প্রিয়জনদের ছবি বা অন্য কোনো প্রাণীর ছবি সেভ করে রাখে। এরূপ করা সম্পূর্ণ নাজায়েয। কারণ শরয়ি ওজর ছাড়া কোনো মানুষ বা প্রাণীর ছবি উঠানো যেমন গুনাহ তেমনি সেভ করে রাখাও গুনাহ ও নাজায়েয। মোবাইল স্ক্রীনে ছবি সেভ করে রাখার আরেকটি খারাবি এই যে, এর দ্বারা ছবির প্রদর্শনী হয় এবং ছবি খুলে রাখা হয়। যা রহমতের ফেরেশতা আগমনের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। হাদিস শরিফে আছে, ঐ ঘরে রহমতের ফেরেশ্তা প্রবেশ করে না যেখানে কুকুর বা প্রাণীর ছবি থাকে। আর স্ক্রীনের ছবিটি যদি কোনো মহিলার হয় তবে তো গুনাহের পরিমাণ আরো অনেক বেশি হবে। কেননা এক্ষেত্রে গাইরে মাহরামদের জন্য ছবিটি দেখা এবং অন্যদের দেখানোর ভিন্ন গুনাহ হবে। মোটকথা মোবাইল স্ক্রীনে কোনো অবস্থাতেই মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর ছবি সেভ করে রাখা যাবে না। [বোখারি শরিফ, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ৮৮০ মুসলিম শরিফ খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২০০ ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড : ৫, পৃষ্ঠা : ৩৫৯ আল বাহর্রু রায়েক, খণ্ড : ৬, পৃষ্ঠা : ১৭২ শামী, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৫১৯ আল মাদখাল ইবনুল হাজ, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৭৩ বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৩০৪] মোবাইল স্ক্রীনে আয়াত, জিকির বা এগুলোর ক্যালিগ্রাফী সেভ করা মোবাইল স্ক্রীনে পবিত্র কোরআনের আয়াত, আল্লাহ তাআলার নাম, জিকির বা এগুলোর ক্যালিওগ্রাফী সেভ করে রাখা ঠিক নয়। কেননা ক্ষেত্রবিশেষে এসব মর্যাদাপূর্ণ জিনিসের সাথে বেয়াদবি হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া সাধারণত দেখা যায়, মোবাইল খুব একটা সম্মানের সাথে ব্যবহার করা হয় না। বরং অধিক ব্যবহারের ফলে যত্রতত্র রাখা হয়। অনেক সময় ফ্লোরে, নীচে কিংবা বসার স্থানে রাখা হয়। চার্জের প্রয়োজনেও কোনো কোনো সময় নীচে রাখতে হয়। তদুপরি মোবাইল ব্যবহারকারী মোবাইল নিয়ে বাথরুমে যায়, পায়জামা বা প্যান্টের পকেটে রাখে। মোটকথা, যেহেতু স্ক্রীনে দৃশ্যমান অবস্থায় এসব সম্মানিত বস্তুর সম্মান বজায় রাখা পুরোপুরি সম্ভব হয়ে ওঠে না, তাই মোবাইল স্ক্রীনে এগুলো সেভ করে রাখা উচিত নয়। [ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৫০ শামী, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৫১৯] ম্যাসেজের মাধ্যমে ছবি প্রেরণ ম্যাসেজের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য, ফুল, ফল বা অন্যান্য বস্তুর ছবি পাঠাতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর ছবি পাঠানো জায়েয নেই। কেননা এক্ষেত্রে প্রয়োজন ছাড়া ছবির ব্যবহার হচ্ছে। আর ছবিটি যদি কোনো গাইরে মাহরাম মহিলার হয় তবে তো পর্দার হুকুম লঙ্ঘন করার গুনাহ হবে। সাধারণত দেখা যায়, এ ধরনের ছবি যার কাছে পাঠানো হচ্ছে সে তো দেখেই, সেই সাথে আশেপাশের অন্যান্য পুরুষও দেখে। এতে ব্যাপকভাবে পর্দা লঙ্ঘনের গুনাহ হয়। তাই এ থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি। [সহীহ মুসলিম, খণ্ড : ২, পৃষ্ঠা : ২০০ আল মাদখাল, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৭৩] মোবাইল দ্বারা ছবি তোলা বা ভিডিও করা মোবাইল দ্বারা কোনো মানুষ বা প্রাণীর ছবি উঠানো এবং তা সংরক্ষণ করে রাখা সম্পূর্ণ নাজায়েয ও হারাম। অনুরূপভাবে মোবাইলের সাহায্যে ভিডিও করাও হারাম ও নাজায়েয। মুফতী শফী রহ. বলেন, কলমের সাহায্যে যেমন জীব- জন্তুর ছবি আঁকা জায়েয নেই অনুরূপভাবে কোনো মেশিনের সাহায্যেও ছবি তৈরি করা বা প্রেসে ছাপা জায়েয নেই। [তাসভীর কি শরয়ি আহকাম, পৃষ্ঠা : ৬১ শামী, খণ্ড : ৯, পৃষ্ঠা : ৫১৯ উমদাতুল ক্বারী, খণ্ড : ১২, পৃষ্ঠা : ৩৯] নির্ধারিত সময়ে খরচের শর্তে বোনাস ঘোষণা ও তার হুকুম বর্তমানে মাঝে মাঝে প্রায় সব ক’টা মোবাইল কোম্পানি নির্ধারিত পরিমাণ টাকা রিচার্জ করলে এর উপর একটা আকর্ষণীয় বোনাস টক টাইমের অফার দেয়। তবে এক্ষেত্রে তারা অনেক সময় শর্ত জুড়ে দেয় যে, এতদিনের মধ্যে এই বোনাস টকটাইম খরচ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, মোবাইল কোম্পানিগুলোর এধরনের বোনাস ঘোষণা করা এবং গ্রাহক কর্তৃক এরূপ বোনাস প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে রিচার্জ করার হুকুম কি? আসলে মোবাইল কোম্পানিগুলো গ্রাহককে স্বল্প সময়ে অধিক মোবাইল ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করে বেশি মুনাফা লাভের জন্য এ ধরনের অফার দিয়ে থাকে। এটা মূলত গ্রাহকদেরকে প্রলোভন দেখানো ছাড়া আর কিছুই নয়। যেহেতু মোবাইল কোম্পানিগুলোর শর্ত থাকে, নির্ধারিত মেয়াদের ভিতর বোনাস টকটাইম খরচ করতে হবে, অন্যথায় বোনাসের সুযোগ হারাতে হবে। ফলে গ্রাহকরা বাধ্য হয়ে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কথা বলে এই বোনাস টকটাইম শেষ করে। এতে নিঃসন্দেহে গ্রাহকের সময়ের অপচয় ও অর্থের অপব্যয় হয়। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা এবং অধিকমাত্রায় কথা বলার খারাবি তো আছেই। ব্যবসার এমন পলিসি শরিয়ত পছন্দ করে না। তাই মোবাইল কোম্পানিগুলোকে এ ধরনের অফার দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। হ্যাঁ, বোনাস যদি দিতেই চায় তবে তা খরচের জন্য পর্যাপ্ত সময়ও দিতে হবে। যাতে ব্যবহারকারীরা অপ্রয়োজনীয় খরচে বাধ্য না হয়। এবার রইল গ্রাহকদের বিষয়টি। এ ব্যাপারে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, যে গ্রাহক এই অফার গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় কাজেই খরচ করবে, অপ্রয়োজনীয় কথা বলবে না বা বলতে বাধ্য হবে না তার জন্য এ অফার গ্রহণ করা জায়েয। কিন্তু এ অফার গ্রহণ করার কারণে যদি অপ্রয়োজনীয় কল করতে হয় কিংবা অহেতুক লম্বা আলাপ জুড়তে হয় তাহলে সময় ও অর্থ অপচয়ের গুনাহ হবে। তাই এমন গ্রাহকের জন্য এই অফার বর্জন করা জরুরি। [সহায়তায়, মোবাইল ও সাক্ষাৎ : আদাব ও মাসায়েল- মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক] সর্বোচ্চ এসএমএসকারীকে পুরস্কার প্রদান অনেক সময় দেখা যায়, নির্ধারিত মেয়াদের ভিতর সর্বোচ্চ এসএমএসকরীকে কোনো কোনো মোবাইল কোম্পানি পুরস্কৃত করে থাকে। এই পুরস্কার ঐ ব্যক্তির জন্য গ্রহণ করা জায়েয যে প্রয়োজনে এসএমএস করে থাকে। কিন্তু কেউ যদি পুরস্কার লাভের আশায় বিনা প্রয়োজনে এসএমএস করে থাকে এবং পুরস্কারও পেয়ে যায় তাহলে এমন ব্যক্তির জন্য ঐ পুরস্কার গ্রহণ করা ঠিক হবে না। [সূত্র : বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যা মুআছারা, ২/২২৯ কারযাবী ২/৪২০] ইনকামিং কলের উপর প্রাপ্ত বোনাস বৈধ বাংলালিংক, টেলিটক ইত্যাদি কোম্পানি ইনকামিং কলের উপর বোনাস দিয়ে থাকে। গ্রাহকদের জন্য এই বোনাস গ্রহণ করা বৈধ। ইনকামিং কলে রিসিভকারীর যদিও কোনো খরচ হয় না তথাপি বোনাস গ্রহণ করতে কোনো অসুবিধা নেই। কেননা এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মোবাইল কোম্পানি আন্ত:সংযোগ ফী বাবদ অন্য কোম্পানি থেকে বিল পেয়ে থাকে। মূলত সেটির বৃদ্ধির লক্ষ্যেই কোনো কোনো মোবাইল কোম্পানি এমন সুবিধা দিয়ে থাকে। তাছাড়া কোনো কোম্পানি যদি তার গ্রাহকদেরকে কোনো শর্ত বা কারণ ছাড়াই কোনো টকটাইম ফ্রী দেয় তবে সেটিও গ্রহণ করা জায়েয। এটা গ্রাহকদের জন্য বাড়তি সুবিধা বলে বিবেচিত হবে। [সূত্র : বুহুস ফি কাযায়া ফিকহিয়্যা মুআছারা, ২/২২৯ কারযাবী ২/৪২০]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s