রহমানের বান্দাদের গুণাবলী


রহমানের বান্দাদের গুণাবলী

 
﴿ وَعِبَادُ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلَّذِينَ يَمۡشُونَ عَلَى ٱلۡأَرۡضِ هَوۡنٗا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ ٱلۡجَٰهِلُونَ قَالُواْ سَلَٰمٗا ٦٣ وَٱلَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمۡ سُجَّدٗا وَقِيَٰمٗا ٦٤ وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا ٱصۡرِفۡ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَۖ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا ٦٥ إِنَّهَا سَآءَتۡ مُسۡتَقَرّٗا وَمُقَامٗا ٦٦ وَٱلَّذِينَ إِذَآ أَنفَقُواْ لَمۡ يُسۡرِفُواْ وَلَمۡ يَقۡتُرُواْ وَكَانَ بَيۡنَ ذَٰلِكَ قَوَامٗا ٦٧ وَٱلَّذِينَ لَا يَدۡعُونَ مَعَ ٱللَّهِ إِلَٰهًا ءَاخَرَ وَلَا يَقۡتُلُونَ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِي حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّ وَلَا يَزۡنُونَۚ وَمَن يَفۡعَلۡ ذَٰلِكَ يَلۡقَ أَثَامٗا ٦٨ يُضَٰعَفۡ لَهُ ٱلۡعَذَابُ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ وَيَخۡلُدۡ فِيهِۦ مُهَانًا ٦٩ إِلَّا مَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ عَمَلٗا صَٰلِحٗا فَأُوْلَٰٓئِكَ يُبَدِّلُ ٱللَّهُ سَيِّ‍َٔاتِهِمۡ حَسَنَٰتٖۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ٧٠ وَمَن تَابَ وَعَمِلَ صَٰلِحٗا فَإِنَّهُۥ يَتُوبُ إِلَى ٱللَّهِ مَتَابٗا ٧١ وَٱلَّذِينَ لَا يَشۡهَدُونَ ٱلزُّورَ وَإِذَا مَرُّواْ بِٱللَّغۡوِ مَرُّواْ كِرَامٗا ٧٢ وَٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُواْ بِ‍َٔايَٰتِ رَبِّهِمۡ لَمۡ يَخِرُّواْ عَلَيۡهَا صُمّٗا وَعُمۡيَانٗا ٧٣ وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ أَزۡوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعۡيُنٖ وَٱجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِينَ إِمَامًا ٧٤ أُوْلَٰٓئِكَ يُجۡزَوۡنَ ٱلۡغُرۡفَةَ بِمَا صَبَرُواْ وَيُلَقَّوۡنَ فِيهَا تَحِيَّةٗ وَسَلَٰمًا ٧٥ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ حَسُنَتۡ مُسۡتَقَرّٗا وَمُقَامٗا ٧٦ قُلۡ مَا يَعۡبَؤُاْ بِكُمۡ رَبِّي لَوۡلَا دُعَآؤُكُمۡۖ فَقَدۡ كَذَّبۡتُمۡ فَسَوۡفَ يَكُونُ لِزَامَۢا ٧٧ ﴾ [الفرقان: ٦٢،  ٧٦]
অর্থ:- রাহমান-এর বান্দা তারাই যারা জমীনের উপর বিনয়ী হয়ে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলে তারা বলে ‘সালাম’। এবং যারা রাত কাটায় তাদের রবের উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে। এবং যারা বলে হে আমাদের রব- পালনকর্তা! আমাদের কাছ থেকে জাহান্নামের শাস্তিকে সরিয়ে দাও। নিশ্চয় এর শাস্তি নিরবচ্ছিন্ন। বসবাস ও আবাসস্থল হিসেবে এটি কতইনা নিকৃষ্ট! এবং তারা যখন খরচ করে তখন অপচয় করে না, কৃপণতাও করে না বরং এতদুভয়ের মাঝামাঝি ভারসাম্যপূর্ণ এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্যকোন ইলাহের ইবাদত করে না। আল্লাহ যার হত্যা অবৈধ করেছে সঙ্গত কারণ ব্যতীত তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না। যারা এ কাজ করে তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং তথায় লাঞ্ছিত অবস্থায় চিরকাল বসবাস করবে। তবে যারা তাওবা করে, ঈমান আনে এবং নেক আমল করে আল্লাহ তাদের অপরাধগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। যে তাওবা করে ও নেক আমল করে সে সত্যিকার অর্থে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন অর্থহীন ও অনর্থক কাজকর্মের সম্মুখীন হয় তখন নিজ সম্মান-মর্যাদা রক্ষা কের ভদ্রভাবে চলে যায় এবং যাদেরকে তাদের পালনকর্তার আয়াতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়া হলে বধির ও অন্ধের মত আচরণ করে না। এবং যারা বলে হে আমাদের প্রভু! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের চোখের শীতলতাস্বরূপ বানিয়ে দাও এবং আমদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দাও। তাদেরকে তাদের ধৈর্যের প্রতিদান জান্নাতের কক্ষ প্রদান করা হবে। সেখানে তারা চিরকাল বসবাস করবে। বসবাস ও আবাসস্থল হিসেবে তা কতইনা উত্তম! বল! আমার প্রভু তোমাদেরকে পরোয়া করেন না যদি তোমরা তাকে না ডাক, তোমরা মিথ্যা বলছ। অতএব শীঘ্র তোমরা সম্মুখীন হবে অনিবার্য শাস্তির।’ (৬৩-৭৭ : ফুরকান)

 

প্রাসঙ্গিক কথা :
সূরা ‘ফুরকান’ মক্কী সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ৭৭টি। সুরাটিতে আকীদার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মক্কার মুশরিকদের সন্দেহ ও সংশয়ের অপনোদন করা হয়েছে।
কুরআন মজীদের আলোচনা দিয়েই সূরাটি শুরু হয়েছে। মুশরিকরা কখনো বলতো এটি প্রাচীন যুগের কল্পকাহিনী, আবার কখনো বলতো এটি মুহাম্মদের বানানো কিছু কথা। কখনো বা বলতো এটি তো সুস্পষ্ট যাদু। আল্লাহ তাদের এসব ধারণাকে খন্ডন করে জানালেন যে, এটি তিনিই তাঁর বান্দার উপর নাযিল করেছেন। এটি ফুরকান- সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণকারী। সূরার মাঝে মাঝে আল্লাহর ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনা করা হয়েছে কয়েকজন নবী-রাসূলের ও তাঁদের জাতির। নবী-রাসূলদের অবাধ্যতা করায় তাদের যে ভয়াবহ পরিণতি হয়েছিল তার বর্ণনাও দেয়া হয়েছে।
সূরার শেষ দিকে আলোচনা করা হয়েছে আল্লাহর নেক বান্দাহদের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী।
মূল আলোচনা :
সূরায়ে ‘ফুরকানে’র শেষ ১৫টি আয়াতে আল্লাহর নেক বান্দাদের গুণাবলী ও তাদের পুরস্কারের আলোচনা করা হয়েছে। নিম্নে পর্যায়ক্রমে আয়াতসমুহের সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করা হলো:
আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেছেন :
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
শব্দার্থ :  عِبَادُ  বান্দাগণ (এক বচন عبد বান্দা)  الرَّحْمَنِ  দয়ালু, করুণাময়   يَمْشُونَ তারা চলাফেরা করে الْأَرْضِ পৃথিবী, জমিন  هَوْنًا নম্রতা, বিনয়, خَاطَب কথা বলে, সম্বোধন করে  الْجَاهِلُونَমূর্খরা (এক বচন جاهل মূখ) سَلَامًا শান্তি।
‘এবং রাহমান-এর বান্দা তারাই, যারা জমিনের উপর বিনয়ী হয়ে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলে তখন তারা বলে ‘সালাম’।
আয়াতের শুরুতে বলা হয়েছে- وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ  রাহমান এর বান্দারা। আরবী ‘ইবাদ’ শব্দটি ‘আবদ’ এর বহুবচন। ‘আবদ’ শব্দটির মূল অর্থ গোলামী ও দাসত্ব করা। আর যে দসত্ব ও গোলামী করে সে হচ্ছে ‘আবিদ’। ‘আবদ’ শব্দটিও এ অর্থে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। মানে আবদ হচ্ছে দাস ও গোলাম। আল্লাহ তাঁর অনুগতদের ‘আবদ’ বলে সম্বোধন করতে ভালবাসেন। কুরআন মজীদে যত জায়গায় ‘আবদ’ ও এর বহুবচন ‘ইবাদ’ শব্দটির ব্যবহার হয়েছে সকল জায়গাতেই আল্লাহর ভালবাসার সুস্পষ্ট ছাপ ফুটে উঠেছে। তিনি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাতটি জায়গায় ‘আবদ’ বলে সম্বোধন করেছেন। কোথায়ও বলেছেন ‘আবদুহু- তাঁর বান্দা’ কোথাও বলেছেন ‘আবদানা- আমার বান্দা’। তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকেই আবদ ও ইবাদ বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি মুমিনদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘ইবাদী- আমার বান্দারা।’ কোথাও তিনি তাদেরকে সম্বোধন করেছেন ‘ইয়া ইবাদী’ বলে- মানে ‘হে আমার বান্দারা’।
সংক্ষিপ্ত এ আলোচনা থেকে বুঝা গেল যে, ‘আবদ’ ও ‘ইবাদ’ শব্দের ব্যবহার খুবই সম্মানজনক। এর ব্যবহার তাদের জন্যই করা হয় যারা আল্লাহর খুব প্রিয়। এখানে عباد الله আল্লাহর বান্দা না বলে عِبَادُ الرَّحْمَنِ রাহমান এর বান্দা বলার কারণ, সম্ভবত এটি যে, এর দুই আয়াত আগে আল্লাহ এরশাদ করেছেন :
﴿ وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ ٱسۡجُدُواْۤ لِلرَّحۡمَٰنِ قَالُواْ وَمَا ٱلرَّحۡمَٰنُ﴾ [الفرقان: ٥٩]
‘যখন তাদেরকে বলা হলো রাহমান-এর উদ্দেশ্য সিজদা কর। তখন তারা বলল, রাহমান আবার কী?
কাফির- মুশরিকরা আল্লাহকে ‘রাহমান’ হিসেবে মানতে অস্বীকৃতি জানালে আল্লাহ এখানে তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় দিলেন  َعِبَادُ الرَّحْمَنِ রাহমান এর বান্দা হিসেবে।
এখানে মুমিনদের গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য আলোচনার শুরুতে মুমিনদের পরিচয়ে বলা হয়েছে ‘ইবাদুর রহমান- রাহমান-এর বান্দাগণ’। আয়াতের এ অংশের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী বলেন,
لما ذكر جهالات المشركين وطعنهم في القرآن والنبوة ذكر عباده المؤمنين وذكر صفاتهم وأضافهم إلى عبوديته تشريفا لهم كما قال: سبحان الذي أسرى بعبده فمن أطاع الله وعبده وشغل سمعه وبصره ولسانه وقلبه بما أمره فهو الذي يستحق اسم العبودية ومن كان بعكس هذا شمله قوله تعالى أولئك كالأنعام بل هم أضل.
(ইতোপূর্বের আয়াতগুলোতে) মুশরিকদের অজ্ঞতা এবং কুরআন ও (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) নবুওয়াতকে আক্রমণ বিষয়ের আলোচনার পর (আল্লাহ) তাঁর মুমিন বান্দা ও তাদের গুণাবলীর আলোচনা করেছেন এবং তাদের প্রতি সম্মান ও মর্যাদা দেখিয়ে তাদেরকে নিজের বান্দাহ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যেমনটি তিনি (তাঁর রাসূল সম্পর্কে) বলেছেন, ‘পবিত্র ঐ সত্তা যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন।’ যে আল্লাহর আনুগত্য করে, তাঁর দাসত্ব করে এবং কান, চোখ, জিহবা ও হৃদয়কে আল্লাহ যে বিষয়ে আদেশ করেছেন সে বিষয়ে ব্যস্ত রাখে, ‘বান্দা’ নামটির প্রয়োগ তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আর যে এর বিপরীত সে আল্লাহর বাণী ‘তারা চতুষ্পদ জন্তু। শুধু তাই নয়, বরং তার চেয়েও অধম’ এর অন্তর্ভুক্ত।
(তাফসীরে কুরতবী, খ: ১৩, পৃ: ৬৭)
বুঝা গেল সকল মানুষ এমনকি সকল মুমিন আল্লাহর বান্দা নয়। আল্লাহর বান্দা তারাই যারা কান, চোখ, মুখ ও অন্তর দিয়ে আল্লাহর বিধান মানে। যারা আল্লাহর যথাযথ আনুগত্য ও দাসত্ব করে। আর আল্লাহর বান্দা হওয়া সত্যিই সম্মানের ও বড় ভাগ্যের ব্যাপার। আল্লাহর বান্দাহদের অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি বৈশিষ্ট্য হলো :
﴿يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا﴾
‘তারা জমীনের উপর বিনয়ী হয়ে চলাফেরা করে।’
هون শব্দটির অর্থ প্রশান্ত, ধীরস্থিরতা, নিরহংকারিতা। আল্লাহর প্রিয় বান্দা যখন হাঁটবে তখন সে বিনয়ী হয়ে হাঁটবে। তার পথ চলায় থাকবে না কোন ধরণের অহংকার ও আত্মম্ভরিতা।
আল্লামা ইবনে কাসীর বলেছেন :
أي بسكينة ووقار من غير جبرية ولا استكبار.
অর্থাৎ প্রশান্তি ও আত্মমর্যাদার সাথে, দম্ভ ও অহংকারের সাথে নয়। (তাফসীরে ইবন কাসীর, খ: ৩, পৃ: ৩৩৪)
তবে এর অর্থ এ নয় যে, অসুস্থ ও দুর্বল রোকের মত পথ চলবে। আত্মমর্যাদার সাথে বিনয়ী হয়ে হাঁটা চলা আর কৃত্রিম বিনয় এক জিনিস নয়। কৃত্রিম বিনয়কে ইসলাম অপছন্দ করে। বরং এটিও এক ধরনের রিয়া অর্থাৎ প্রদর্শনেচ্ছা।
ওমর রা. এক যুবককে দেখলেন যে, সে খুবই আস্তে আস্তে হাঁটছে। তিনি তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন যে, তোমার হয়েছে কী? তুমি অসুস্থ? যুবকটি বলল, না, হে আমীরুল মুমেনীন। ওমর রা. তাকে বেত্রাঘাত করে জোরে হাঁটার আদেশ করলেন। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, খ: ৩, পৃ: ৩৩৪)
যিনি রাহমান-এর বান্দা হবেন তিনি বিনয়ী হয়ে হাঁটা-চলা করবেন। তবে তার এ বিনয়ে আত্মমর্যাদা থাকবে। থাকবে না অহংকার ও দম্ভ। অনুরূপ থাকবে না কোন ধরনের দুর্বলতা ও হীনতা। আল্লাহ দম্ভভরে পথ চলতে নিষেধ করেছেন।
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَنْ تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَنْ تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا ﴿37﴾
‘জমীনে দম্ভভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয় তুমি তো কখনো জমীনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না। এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড়সম হতে পারবে না।’ (৩৭ : বনী ইসরাঈল)
وَلَا تُصَعِّرْ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ ﴿18﴾
‘জমীনে গর্বভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিক- অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (১৮: লোকমান)
আল্লাহর প্রিয় বান্দার পথচলায় কোন ধরনের দম্ভ ও অহংকার থাকবে না। অনুরূপ থাকবে না কোন ধরনের হীনমন্যতা, ভীরুতা ও জড়তা। বরং তার মধ্যে থাকবে বিনয়, শালীনতা আত্মমর্যাদা। এটি রহমান-এর বান্দাদের প্রথম বৈশিষ্ট্য।
তাদের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো-
﴿وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا﴾
‘তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলবে, তখন তারা বলবে ‘সালাম’।
আল্লাহর বান্দা বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদার সাথে পথ চলবে। পথ চলতে গিয়ে মূর্খ ও নির্বোধদের সাতে কোন ধরনের আলোচনায় জড়িয়ে নিজের সময় নষ্ট করবে না। তাদের সাথে কোন ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে পড়বে না। যদি এ ধরনের কেউ গায়ে পড়ে তার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় এবং তাকে কোন ধরনের মন্দ কথা বলে, সে তাকে অনুরূপ মন্দ বলবে না, বরং বলবে ‘সালাম’। এ সালামের অর্থ কী?
তাফসীরে ফতহুল কাদীরে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-
لَيْسَ هَذَا السَّلَامُ مِنَ التَّسْلِيمِ إِنَّمَا هُوَ مِنَ التَّسَلُّمِ تَقُولُ الْعَرَبُ سَلَامًا: أَيْ: تَسَلُّمًا مِنْكَ، أَيْ: بَرَاءَةً مِنْكَ.
এই ‘সালাম’ অর্থ সালাম দেয়া নয় বরং এর অর্থ নিরাপদে এড়িয়ে যাওয়া। আরবরা বলে থাকে ‘সালাম’- মানে আমি তোমার থেকে দূরে সরে পড়লাম। (ফতহুল কাদীর, খ: ৪, পৃ: ৮৫)
ইমাম ইবনে কাসীর আয়াতের এ অংশের ব্যাখ্যায় বলেন-
إذا سفه عليهم الجهال بالقول السيء لم يقابلوهم عليه بمثله بل يعفون ويصفحون ولا يقولون إلا خيرا.
মূর্খ ও নির্বোধরা যদি আল্লাহর বান্দাদের সাথে মন্দ কথা বলে, আল্লাহর বান্দারা তাদের সাথে অনুরূপ মন্দ কথা বলে না। বরং ক্ষমা করে দেয় ও তাদের প্রতি উদারতা দেখায়। মন্দ কথার পরিবর্তে তারা বরং ভাল কথাই বলে।
এরপর ইমাম ইবনে কাসীর ইমাম আহমাদের সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। হাদীসটি হলো : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এক লোক আরেক লোককে গালি দিল। যাকে গালি দেয়া হলো সে গালি দেয়া লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বলল, তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : ‘তোমাদের দু’জনের মাঝে একজন ফেরেশতা অবস্থান করছিলেন। যখনি এ লোকটি তোমাকে গালি দিচ্ছিল ফেরেশতা তোমার পক্ষ হয়ে তাকে বলছিলেন বরং এ গালি তোমারই প্রাপ্য। আর যখন তুমি তাকে বললে, তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক তখন তিনি (ফেরেশতা) বললেন, না বরং শান্তি তোমারই উপর বর্ষিত হোক। শান্তি তোমারই প্রাপ্য।’
(তাফসীরে ইবন কাসীর, খ: ৩, পৃ: ৩২৪-৩২৫)
আল্লাহর বান্দা মূর্খ ও নির্বোধ লোকদের সাথে নিজ থেকে তো কোন ধরনের বাক-বিতন্ডায় জড়াবে না, এমনকি তারা যদি গায়ে পড়ে তার সাথে ঝগড়া করে তার সাথে অশালীন কথা বলে অভদ্র আচরণ করে, তাহলে এ ক্ষেত্রে তার করণীয় হলো তাদেরকে এড়িয়ে চলা। আর এ এড়িয়ে চলা মোটেই দুর্বলতা প্রদর্শন নয়, বরং এর মাধ্যমে সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা পায় আর অনর্থক সময় নষ্ট হয় না। আল্লাহ তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বান্দাহ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ হেদায়েতই দিয়েছিলেন :
وَاصْبِرْ عَلَى مَا يَقُولُونَ وَاهْجُرْهُمْ هَجْرًا جَمِيلًا ﴿10﴾
‘তারা (কাফেররা) যা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং সুন্দরভাবে তাদেরকে পরিহার করে চল।’ (১০ : মুযযাম্মিল)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ যে হেদায়েত দিয়েছেন, তা তার অনুসারীদের জন্যও প্রযোজ্য। তাই যারাই আল্লাহর পথে চলে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার মর্যাদা অর্জন করতে চায়, তারা তাদের বিরোধীদের কঠোর সমালোচনা, অপবাদ, নিন্দা, অশালীন কথা, বিদ্রূপ, সাজানো ভিত্তিহীন কথায় ধৈর্য ধারণ করবে ও তাদের এ ধরনের আক্রমণকে এড়িয়ে চলবে।
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا ﴿64﴾ وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا ﴿65﴾ إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا
শব্দার্থ : يَبِيتُونَ তারা রাত কাটায় لِرَبِّهِمْ তাদের প্রভুর উদ্দেশ্যে سُجَّدًا সেজদাবনত হয়ে قِيَامًا দাঁড়ানো অবস্থায় يَقُولُونَ   তারা বলে, رَبَّنَاহে আমাদের পালনকর্তা اصْرِفْ সরিয়ে দাও  عَذَابَ শাস্তি غَرَامًا  অবিচ্ছিন্ন  سَاءَتْ মন্দ হয়েছে مُسْتَقَرًّا  অবস্থান স্থল مُقَامًاঅবস্থান স্থল।
‘এবং যারা রাত কাটায় তাদের রবের উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়েও দাঁড়িয়ে এবং যারা বলে, হে আমাদের রব- পালনকর্তা! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিকে সরিয়ে দাও। নিশ্চয় এর শাস্তি নিরবচ্ছিন্ন। বসবাস ও আবাসস্থল হিসেবে এটি কতইনা নিকৃষ্ট!’
এ আয়াতগুলোর বক্তব্যের সাথে পূর্ববর্তী আয়াতের বক্তব্যের সম্পর্ক বিষয়ে শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব রহ. বলেন-
هذا نهارهم مع الناس، فأما ليلهم فهو التقوى، ومراقبة الله، والشعور بجلاله، والخوف من عذابه.
এতো তাদের (আল্লাহর বান্দাদের) দিনের বেলায় মানুষের সাথে সম্পর্ক। আর তাদের রাতের বেলা- তা তো কাটে আল্লাহভীতি, আল্লাহ (তারেদ সবকিছু) পর্যবেক্ষণ করছেন- এ অনুভূতি, আল্লাহর মহত্ত্বের অনুভূতি ও তার শাস্তি থেকে ভয়- ভীতির মাধ্যমে।
(ফী যিলালিল কুরআন, খ: ৫, পৃ: ২৫৭৮)
এ আয়াতগুলোতে রাহমান- এর বান্দাদের দু’টি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা হয়েছে। একটি হলো তারা সেজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাত কাটায়। আরেকটি হলো তারা জাহান্নামের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে পরিত্রাণ চায়।
‘এবং যারা রাত কাটায় তারেদ ‘রব’ (প্রভুর) উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে।’ তাদের দিনের বেলা কাটে আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে। বিনয়ের মাধ্যমে তারা রাতও কাটায় আল্লাহর অনুগত হয়ে। সিজদার মাধ্যমে। আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে থেকে। সিজদা ও দাঁড়ানো বলতে নামায বুঝানো হয়েছে। সরাসরি নামায না বলে সিজদা ও দাঁড়ানো বলা হল কেন? এ প্রসঙ্গে শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব রহ. বলেন :
সালাত (নামায)- এর পরিবর্তে সিজদা ও দাঁড়ানো বলা হয়েছে। রাতের গভীরে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন রাহমান- এর বান্দাদের নড়াচড়াকে চিত্রায়িত করার জন্য। এরা এমন লোক যারা তাদের প্রভুর উদ্দেশ্যে সিজদা করে ও দাঁড়িয়ে রাত কাটায়। তাদের লক্ষ্য একমাত্র তাদের রব। শুধু তাঁর উদ্দেশ্যেই তারা দাঁড়ায়। শুধু তার জন্যই তারা সিজদাবনত হয়। তারা এমন লোক যারা সুখের নিদ্রা বাদ দিয়ে তারচেয়েও বেশি সুখ ও মজার বিষয় নিয়ে ব্যস্ত।
তারা তাদের প্রভুর প্রতি একনিষ্ঠ হওয়াতে ব্যস্ত। তারা তাদের আত্মা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত হতে ব্যস্ত। মানুষ ঘুমায় অথচ তারা দন্ডায়মান ও সিজদাবনত। মানুষ ভূ-পৃষ্ঠে অবস্থান করছে অথচ তাদের দৃষ্টি মহিমান্বিত করুণাময়ের আরশের দিকে। (ফী যিলালিল কুরআন, খ: ৫, পৃ: ২৫৭৮)
বান্দা নানামুখী কর্মব্যস্ততার মধ্যদিয়ে দিনের সময় কাটাবে। রাতের নিস্তব্ধতায় তার মহান প্রভুর সামনে একাগ্রচিত্তে দাঁড়াবে। তাঁর সামনে মাথা নত করবে। তাঁকে সিজদা করবে। এটি আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় এ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা হয়েছে :
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ ﴿16﴾
‘তাদের পার্শ্বদেহ বিছানা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের প্রভুকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযক দিয়েছি তা থেকে খরচ করে।’ (১৬ : সিজদা)
أَمْ مَنْ هُوَ قَانِتٌ آَنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَائِمًا يَحْذَرُ الْآَخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ (سورة الزمر : 9)
‘যে ব্যক্তি রাতের বেলা সিজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদত করে, পরকালকে ভয় করে এবং তার রবের রহমত প্রত্যাশা করে (সে কি তার সমান যে এরূপ করে না)।’ (৯: যুমার)
كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ ﴿17﴾ وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ ﴿18﴾
‘তারা তাদের সামান্য অংশই নিদ্রা যেত। রাতের শেষ প্রহরে তারা (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (১৭-১৮ : যারিয়াত)
রাতের বেলা ঘুম থেকে উঠে নামায পড়া, গুনাহ থেকে ইস্তিগফার করা (ক্ষমা চাওয়া), কান্নাকাটি করা আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন :
وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَكَ عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا ﴿79﴾
‘রাতের কিছু অংশ কুরআন পাঠসহ জাগ্রত থাক। এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত। তোমার রব-প্রভু তোমাকে উত্তম মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন।’ (৯৭ : বনী ইসরাঈল)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত রাত্রে জাগতেন ও নামায আদায় করতেন। এ প্রসঙ্গে আয়শা রা. বলেছেন :
كان النبي صلى الله عليه وسلم يقوم من الليل حتى تتفطر قدماه، فقلت له لم تصنع هذا يا رسول الله؟ وقد غفرلك ما تقدم من ذنبك وما نأخر، قال: أفلا أكون عبدا شكورا. (متفق عليه)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বেলায় নামাযে (এত দীর্ঘ সময়) দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তার পা দু’টো  যেন ফেটে যেত। আমি তাকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এমনটি করছেন কেন? অথচ আপনার পূর্ব ও পরের সব গুনাহ মাফ হয়ে গিয়েছে। তিনি বললেন, ‘আমি কি (আল্লাহর) কৃতজ্ঞ বান্দাহ হব না?’ (বুখারী ও মুসলিম)
রাতের নামাযের ফজীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে অনেক হাদীস আছে। এখানে কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করা হলো :
عن أبى هريرة رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم:  أفضل الصيام بعد رمضان شهر الله المحرم، وأفضل الصلاة بعد الفريضة صلاة الليل. (رواه مسلم)
আবু হোরাইরা রা. থেকে বর্ণিত , রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘রমযানের পর সর্বোত্তম রোযা আল্লাহর মাস মহররমে রোযা ও ফরজ নামাযের পর সর্বোত্তম নামায রাতের নামায।’ (মুসলিম)
عن عبد الله بن سلام رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : أيها الناس أفشوا السلام، وأطعموا الطعام، وصلوا الأرحام، وصلوا والناس نيام، تدخلوا الجنة بـسلام. (رواه الترمذي)
আবদুল্লাহ ইবন সালাম থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘হে লোকসকল! তোমরা সালামের প্রসার ঘটাও, খাবার খাওয়াও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর এবং মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামায পড়। (এগুলো করে) তোমরা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ কর।’ (তিরমিযী)
عن أبى هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : رحم الله رجلا قام من الليل فصلى وأيقظ امرأته، فإن أبت نضح في وجهها الماء، رحم الله امرأة قامت من الليل فصلت وأيقظت زوجها، فإن أبى نضحت في وجهه الماء. (روا أبوداود)
আবু হোরাইরা রা. থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘আল্লাহ করুণা করুন ঐ ব্যক্তির উপর, যে রাতে উঠে নামায পড়ে এবং তার স্ত্রীকে জাগিয়ে দেয়। স্ত্রী যদি উঠতে না চায় তাহলে তার মুখমন্ডলে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ করুণা করুন ঐ নারীর প্রতি, যে রাতে উঠে নামায পড়ে এবং তার স্বামীকে জাগিয়ে দেয়। স্বামী যদি উঠেতে না চায় তাহলে তার মুখমন্ডলে পানি ছিটিয়ে দেয়।’ (আবু দাউদ)
عن ابن مسعود رضي الله عنه قال ذكر عند النبي صلى الله عليه وسلم رجل نام ليلة حتى أصبح قال: ذاك رجل بال الشيطان في أذنيه. أو قال : في أذنه. (متفق عليه)
ইবন মাসউদ থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এমন একজন লোকের আলোচনা করা হল যে, ব্যক্তি সকাল পর্যন্ত ঘুমায়। তিনি বললেন, ‘এ লোকটি তো এমন লোক, শয়তান যার কানে প্রস্রাব করেছে। (বুখারী ও মুসলিম)
আল্লাহর প্রিয় বান্দারা পুরো রাত ঘুমিয়ে কাটায় না। তারা ঘুমায় ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে যায়। নামায পড়ে। বিনয়ী হয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে। রাতে যে কোন সময় নামায পড়া যায়। তবে সর্বোত্তম সময় হচ্ছে রাতের শেষ তৃতীয় প্রহর। এ অংশটি খুবই মর্যাদার। রাতের এ অংশ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
إن فى الليل لساعة لا يوافقها رجل مسلم يسأل الله تعالى خيرا من أمر الدنيا والأخرة إلا أعطاه إياه. (رواه مسلم عن جابر رضي الله)
‘রাতে এমন একটি সময় আছে যে সময়টিতে কোন মুসলমান ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কোন কল্যাণ চাইলে আল্লাহ তাকে সেটি প্রদান করেন।’ (মুসলিম)
আর এ পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ সময়টি হচ্ছে শেষ তৃতীয় প্রহর।
عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: ينتزل ربنا تبارك وتعالى كل ليلة إلى السماء الدنيا حين يبقى ثلث الليل الآخر فيقول : من يدعونى فأستجيب له، من يسألنى فأعطيه، من يستغفرني فأغفرله. (رواه البخاري)
হযতর আবু হোরাইরা রা. থেকে বর্নিত যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘‘আমাদের মহান প্রভু প্রতিরাতে নিচের আকাশে অবতরণ করেন, যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকী থাকে। তিনি বলেন, কে আছ আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। কে আছ আমার কাছে চাও, আমি তাকে (যা চায় তাই) দেব। কে আছ আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তাকে ক্ষমা করব।’ (বুখারী)
যে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে চায়, সে এমন মর্যাদাপূর্ণ সময়ে ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। বিশ্ব জাহানের মালিক ও প্রভু যখন পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করে তার বান্দাদের ডেকে ডেকে তাঁর কাছে চাইতে বলে, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলে আর তিনি তাদের আশ্বস্ত করেন যে, তিনি  বান্দার ডাকে সাড়া দেবেন, যা চায় তাই দেবেন, ক্ষমা করে দেবেন, তখন তাঁর কোন বান্দা কি ঘুমিয়ে থাকতে পারে?
রাহমান- এর বান্দারা এ সময়ে উঠবে। তাদের প্রভুর উদ্দেশ্যে দাঁড়াবে। সেজদাবনত হবে। তাঁকে ডাকবে। তিনি তাদের ডাকে সাড়া দেবেন। তাঁর কাছে দুনিয়া-আখিরাতের সকল ধরনের কল্যাণ চাইবে, তিনি তাদেরকে তা দেবেন। সকল ধরণের গুনাহ, ভুল-ত্রুটি থেকে ক্ষমা চাইবে। তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। রাহমান- এর বান্দা হঠাৎ করে কোন এক রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নয় বরং প্রতিরাতেই জাগবে। কেননা তার প্রভু তো প্রতিরাতেই নিচের আকাশে অবতরণ করেন আর ডাকেন কে আছো আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব। কে আছো আমার কাছে চাও, আমি দেব। কে আছো আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি ক্ষমা করে দেব।
রাহমান- এর বান্দারা রাতে উঠে তাদের প্রভুর সামনে দাঁড়ায়। তাঁকে সিজদা করে। শুধু তাই নয়, তারা বলে, ‘হে আমাদের রব- পালনকর্তা। আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিকে সরিয়ে দাও।’
তারা তাদের মহান প্রভুর একান্ত অনুগত হওয়া সত্ত্বেও জাহান্নামের শাস্তিকে তারা ভয় পায়। তারা জাহান্নাম কখনো দেখেনি। তবু তারা জাহান্নাম বিশ্বাস করে। জাহান্নামের কঠিন ও নির্মম শাস্তিকে বিশ্বাস করে। তাদের মহান প্রভুর মহান কিতাবে জাহান্নামের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সে চিত্র তাদেরকে ভীত- সন্ত্রস্ত করে তোলে তাই তারা ফরিয়াদ জানায়, ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তিকে সয়য়ে দাও।’ তারা বলে, ‘আমাদেরকে জা‎হান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা কর।’ তারা বলে, ‘ হে আল্লাহ জাহান্নামের শাস্তি থেকে তোমার আশ্রয় চাই।’
আল্লাহর সত্যিকার বান্দা কখনো নিজের নেক আমলের উপর নির্ভর করে নিজেকে জাহান্নাম থেকে নিরাপদ মনে করে না। তার বিশ্বাস সে যতই নেক আমল করুন, এ নেক আমলের পরিমাণ যত বেশিই হোক না কেন আল্লাহর অনুগ্রহ ও মেহেরবাণী ছাড়া জাহান্নাম থেকে বা