রিযক ও তার অনুমোদিত উপকরণ


রিযক ও তার অনুমোদিত উপকরণ

بسم الله الرحمن الرحيم
রিযক ও তার অনুমোদিত উপকরণ
الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونتوب إليه ، ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا .. من يهده الله فلا مضل له ومن يضلل فلا هادي له ، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له ، وأشهد أن محمد عبده ورسوله : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اتَّقُواْ اللّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلاَ تَمُوتُنَّ إِلاَّ وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ (১০২ سورة آل عمران) . يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالاً كَثِيرًا وَنِسَاء وَاتَّقُواْ اللّهَ الَّذِي تَسَاءلُونَ بِهِ وَالأَرْحَامَ إِنَّ اللّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا (১ سورة النساء) . يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا * يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَن يُطِعْ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا (৭০-৭১ سورة الأحزاب) .
হামদ সালাতের পর…
প্রিয় লোক সকল, সকলেরই জানা যে অর্থ-প্রাচুর্য ও ধন-সম্পদ হচ্ছে জীবনের ভিত্তি ও সৌন্দর্য। মানুষ মাত্রই প্রতিটি সকালকে আলিঙ্গন করে, আর জীবনোপকরণ বিষয়ক ভাবনা থাকে তার অন্তর জুড়ে। মনন ও মানসে শুধু একই চিন্তা বার বার উঁকি দেয়… দৈন্যতাগ্রস্ত প্রয়াসী হয় দৈন্য গোচানোতে আর ঐশ্বর্য্যবান উদ্যোগী হয় প্রাচুর্য বৃদ্ধিতে। দু’অবস্থার মাঝে তার অবস্থান, হয়ত ধনবান যার ভেতরে থাকে অতুষ্টি আর প্রত্যাশা অথবা নি:স্ব যাকে তাড়া করে বেড়ায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এর মাঝামাঝি কেউ থেকে থাকলে তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য।
পার্থিব জীবনে জীবিকা বিষয়ে মানুষের চিন্তাধারা অভিন্ন নয় আর কর্মপদ্ধতিও প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন। রিয্‌ক ও তার অন্বেষণ বিষয়ে প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ ধারণা ও বিশ্বাস অনুযায়ী কর্ম পন্থা ও উপকরণ নিরূপণ করে থাকে। ইরশাদ হচ্ছে,
وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى * وَالنَّهَارِ إِذَا تَجَلَّى * وَمَا خَلَقَ الذَّكَرَ وَالْأُنثَى * إِنَّ سَعْيَكُمْ لَشَتَّى (১-৪ سورة الليل )
অর্থাৎ ‘কসম রাতের, যখন তা ঢেকে দেয়। কসম দিনের, যখন তা আলোকিত হয়। কসম তাঁর, যিনি নর ও নারী সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকারের। (সূরা আল-লাইল:১-৪)
অনেক মানুষ আছে প্রতিটি মুহূর্ত উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠিত অবস্থায় থাকে, ঘুমিয়ে একটু আরাম উপভোগ করার ফুরসত পায় না, দু চোখের পাতা এক করে না… শ্বাসরুদ্ধ হয়ে খাবার-পানীয় গলাধ:করণ করে বরং সহজে গিলতেও পারে না, কারণ রিযকের দুশ্চিন্তা ও ভয় তার ওপর ভয়ানক প্রভাব বিস্তার করে আছে, অন্তরকে ভয়াচ্ছন্ন করে রেখেছে। কোনো প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভর করতে পারে না সে, আল্লাহর নির্ধারিত তাকদিরকেও স্মৃতিতে জাগরূক করে রাখতে পারে না এবং কোনো রাস্তাতেই নিরাপদ বোধ করে না। নিজেকে কেবল জীবন ও মৃত্যুর মাঝেই প্রত্যক্ষ করে। তাই রিযকের পেছনে জিহ্বা বের করে উর্ধ্ব শ্বাসে দৌড়ায় এতে কোনো বিধি-বিধান ও নিয়ম-নীতির অনুসরণের ধার ধারে না। জীবনোপকরণ জমা করণে বৈধ-অবৈধ সব পন্থাই তার নিকট সমান। গোলমেলে গন্তব্য যতক্ষণ উপকরণকে সমর্থন করে। এ প্রকৃতির লোক রিযকের প্রথমাংশ দেখতে পেলে শেষাংশ পাবার লালসায় জিহ্বার লালা পড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে এমন হয় যে, খাবার খায় কিন্তু তৃপ্তি পায় না, পান করে তবে পিপাসা মিটে না।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী তাদের ব্যাপারেই যথার্থ প্রমাণিত হচ্ছে, তিনি বলেন,
” لو كان لابن آدم واديان من مال لابتغى واديًا ثالثاً ، ولا يملأ جوف ابن آدم إلا التراب ، ويتوب الله على من تاب ” رواه مسلم .
‘আদম সন্তান যদি ধন-সম্পদে ভর্তি দু’টো উপত্যকার মালিক হয় তাহলে অবশ্যই সে তৃতীয়টির প্রার্থনা করবে। আদম সন্তানের মুখ একমাত্র মাটিই পূর্ণ করতে পারে। আর যে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে আল্লাহ তার দিকে ধাবিত হন। (সহিহ মুসলিম)

সুতরাং এমন অবস্থা যার, অতি লোভ ও তীব্র লালসা তাকে এমন করে ফেলে যে অল্পে যথেষ্ট হয় না এবং বেশিতে তুষ্ট হয় না। নিজের কাছে থাকা সম্পদ তার যথেষ্ট হয় না ফলে অন্যের সম্পদের প্রতি হাত বাড়ায়। পঞ্জীভূতকারীর স্বভাবে আক্রান্ত হয়। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ওয়াজিব আদায় থেকে বিরত থাকা এবং যা তার অধিকার নয় তা পেতে চাওয়া কে কঠোর ভাবে নিষেধ করেছেন। আর তার স্বভাব হয়ে যায় দাও আর দাও।

অপর পক্ষে মানুষের মাঝে কিছু লোক আছে, যাদের অবস্থান এর সম্পূর্ণ বিপরীত। চেষ্টা-শ্রম ও যাবতীয় ঝামেলা এড়িয়ে নিজেকে কষ্ট-ক্লেশহীন আরাম প্রিয় বানিয়ে নিয়েছে, সহনশীলতা ও কষ্টসহিষ্ণতার পথকে গ্রহণ করেছে। কোনো নড়াচড়া নেই, কোনো আওয়াজ নেই, ঘরে বসে অপেক্ষা করে কখন আকাশ স্বর্ণ কিংবা রূপার বৃষ্টি বর্ষণ করবে.. এমন দর্শন লালন করে যে জীবিকার জন্য চেষ্টা করা আর চেষ্টাহীন বসে থাকা এক কথাই বরং এটিই ভাল। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে তাদের ধারণায় রিযক অন্বেষণে শ্রম ব্যয় করা মানে অনর্থক কষ্ট করা এবং এমন ত্রুটি সৃষ্টি করা যা তাওক্কুল ও পরিতুষ্টি গুণকে ক্ষত-বিক্ষত ও ত্রুটিযুক্ত করে…। সম্মানিত আল্লাহর বান্দাবৃন্দ, বাস্তবতা হচ্ছে এমন বিশ্বাসের নাম তাওক্কুল ও পরিতুষ্টি নয় বরং এর নাম হচ্ছে পরনির্ভরতা ও মুখোশাবৃত করণ।
তাদের প্রতারিত হবার একটি ঢাল হলো আপনি যদি তাদের এ বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে দলিল তলব করেন তাহলে বলবে, আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী শুনেননি? নবীজী বলেছেন,
” لو أنكم تتوكلون على الله حق توكله لرزقكم كما يرزق الطير تغدو خماصاً وتروح بطاناً ” رواه أحمد والترمذي .
‘তোমরা যদি যথার্থভাবে আল্লাহর ওপর ভরসা-তায়াক্কুল করতে পার তাহলে আল্লাহ তোমাদের রিযক দেবেন যেমনি রিযিক দিয়ে থাকেন পাখিকুলকে, পাখি সকালে শূন্য উদরে বের হয় আর সন্ধ্যায় নীড়ে ফিরে আসে উদরপূর্তি করে ‘। (আহমাদ ও তিরমিজি)
হে মেধাবী ভ্রাতৃবর্গ, লক্ষ্য করে দেখুন পরজীবি-অকর্মন্যদের দলিল উপস্থাপনের ভগ্নদশার দিকে। হাদিস থেকে পাখিদের তায়াক্কুলের শিক্ষা কত নিপুনভাবে গ্রহণ করল আর পাখিরা যে সকালে বের হয় ও সন্ধ্যায় ফিরে আসে সে দিকটি বে-মালুম ভুলে গেল।
অনেক মানুষ কানাআতের অর্থানুধাবনে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে। তারা কানাআত বলতে শুধু অল্পে পরিতুষ্টি ও সন্তোষকেই বুঝে থাকে। তাই এর ভিন্ন অর্থ উদ্ঘাটন-অনুধাবনে অন্ধ ও বধির হয়ে আছে আরও অন্ধ-বধির হয়ে আছে এ ভুল শুদ্ধির ক্ষেত্রে। ফলে একদিকে কার্যক্ষেত্রে উচ্চতর স্তরে পৌঁছার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছে অন্যদিকে উপবাস ও দারিদ্র বিমোচনের সাহসও হ্রাস পেয়েছে। সমাজে এ ধরনের মানসিকতা সম্পন্ন লোকের সংখ্যা যুগে যুগে যদিও নগণ্য তবে তাদের এ শ্লোগান মাঝে মাঝে উচ্চকন্ঠেই উচ্চারিত হয়।
একদিন জুমুআর নামাযের পর ওমর ফারুক -রাদিয়াল্লাহু আনহু- দেখতে পেলেন একদল লোক মসজিদের এক কোনে বসে আছে। তিনি তাদের পরিচয় জানতে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কারা তোমরা? উত্তরে তারা বললেন, আমরা আল্লাহর উপর ভরসাকারী সম্প্রদায়। শুনে ওমর -রাদিয়াল্লাহু আনহু- ছড়ি উঁচিয়ে কড়া ধমক লাগালেন এবং বললেন, তোমাদের কেউ যেন জীবিকা অন্বেষণ ছেড়ে অকর্ম বসে না থাকে আর আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে যে ‘হে আল্লাহ আমাকে জীবিকা দান কর’ অথচ তার জানা আছে আকাশ স্বর্ণ বা রূপার বৃষ্টি বর্ষাবে না এবং আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন,
‘সালাত আদায়ান্তে তোমরা যমিনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ কর’। (সূরা জুমুআ)
সুফিয়ান ছাওরি রহ. এক দিন মসজিদুল হারামে বসা একদল লোকদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা এখানে এভাবে বসে আছেন কেন? তারা বলল, তাহলে আমরা কি করব? বললেন, আল্লাহর অনুগ্রহ অন্বেষণ করুন অপর মুসলমানদের পোষ্য ও বোঝা হবেন না।
প্রকৃত অর্থে সফল ও সুখী মুসলমানতো তিনিই, জীবন চলার রাস্তা যিনি ঠিক করেছেন জীবিকা অন্বেষণের মাঝে। সুতরাং মানুষের উচ্ছিষ্ট ভোগ ও অকর্মন্য-অলস হয়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাবার তাগিদে পরিশ্রম করেন, শরীরের রক্ত ঝরান এবং পবিত্র ও হালাল রিযক উপার্জন করেন। কেননা মুসলমান আশ্রম কিংবা এতেকাফস্থলে অবস্থানকারী কোনো দরবেশ বা বৈরাগীর নাম নয় যে কর্ম ও উপার্জন নেই। বরং ইসলাম মুসলমান হিসাবে কেবল তাকেই স্বীকৃতি দেয় যে এ পার্থিব জীবনে কর্মঠ, পরিশ্রমী। নিয়ম-রীতি মেনে যে উপার্জন ও ব্যয় করে। ইরশাদ হচ্ছে,
هُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ ذَلُولًا فَامْشُوا فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُوا مِن رِّزْقِهِ وَإِلَيْهِ النُّشُورُ (১৫) سورة الملك .
‘তিনিই তো তোমাদের জন্য যমিনকে সুগম করে দিয়েছেন, কাজেই তোমরা এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ কর এবং তাঁর রিযক থেকে আহার কর। আর তাঁর নিকটই পুনরুত্থান।, (সূরা আল-মুলক:১৫)
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময় দারিদ্র থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন এবং নিজ উম্মতকেও সে বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ ইসলাম তার অনুসারীদের কাছে সবল ও স্বাবলম্বী হওয়া প্রত্যাশা করে, তাদের দুর্বল ও বেকার হিসাবে দেখতে চায় না। স্বাবলম্বী হওয়ার অর্থ হচ্ছে, মানুষের দারে দারে ভিক্ষাবৃত্তি করে বেড়ানোর ন্যায় দরিদ্র না হওয়া। সুতরাং ইসলাম তার অনুগামীদের জন্য অবমাননাকর দারিদ্র কামনা করে না যেমনি করে সে তাদের জন্য অবাধ্যতায় লিপ্তকারী প্রাচুর্যও প্রত্যাশা করে না। ইসলাম ধূর্ত-ফন্দিবাজ অলসদের সাথেও নেই আবার তাদেরকেও গ্রহণ করে না যারা ধন-সম্পদের মোহে এতই বুদ হয়ে যায় যে ধনৈশ্বর্য তাদেরকে স্বীয় দীন ও আখলাক হতে অন্ধ ও বধির করে ফেলে।
তাছাড়া প্রাচুর্য কোনো স্থির বস্তু নয় বরং আসা-যাওয়ার মাঝে থাকে। এক দল অর্জন করে ধনী হয় অপর দল না থাকার কারণে দরিদ্র ও মোহতাজ হয়।
আল্লাহ বলেন,
وَاللّهُ فَضَّلَ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ فِي الْرِّزْقِ فَمَا الَّذِينَ فُضِّلُواْ بِرَآدِّي رِزْقِهِمْ عَلَى مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَهُمْ فِيهِ سَوَاء (৭১ سورة النحل) .
‘আর আল্লাহ রিযকের ক্ষেত্রে তোমাদের কতককে কতকের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন; কিন্তু যাদেরকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, তারা তাদের রিযক দাসদাসীদের ফিরিয়ে দেয় না। (এই ভয়ে যে,) তারা তাতে সমান হয়ে যাবে। তবে তারা কি আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করছে? (সূরা নাহল:৭১)
সর্ব শক্তিমান আল্লাহতে বিশ্বাসী মুমিনবান্দার দায়িত্ব কেবল কার্যকারণ ও উপকরণ প্রয়োগ করা এবং রিযক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করা। অর্থাৎ কাজ করে যাওয়া এবং ফলাফল আল্লাহর কাছে চাওয়া। কারণ তার জানা নেই আল্লাহ তার রিযক কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন। রিযকের উৎস সব এক সমান নয়। আর মানুষ জীবন যাপনে সামগ্রীর প্রয়োজন অনুভব করে পালাক্রমে। এবং পর্যায়ক্রমিকভাবেই সে সেটি অন্বেষণ করে, এর উপর কেবলমাত্র আল্লাহ তাআলাই ক্ষমতা রাখেন।
أَهُمْ يَقْسِمُونَ رَحْمَةَ رَبِّكَ نَحْنُ قَسَمْنَا بَيْنَهُم مَّعِيشَتَهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَرَفَعْنَا بَعْضَهُمْ فَوْقَ بَعْضٍ دَرَجَاتٍ لِيَتَّخِذَ بَعْضُهُم بَعْضًا سُخْرِيًّا وَرَحْمَتُ رَبِّكَ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ (৩২ سورة الزخرف)
‘তারা কি তোমার রবের রহমত ভাগ-বন্টন করে? আমিই দুনিয়ার জীবনে তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করে দেই এবং তাদের একজনকে অপর জনের উপর মর্যাদায় উন্নীত করি যাতে একে অপরকে অধিনস্থ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। আর তারা যা সঞ্চয় করে তোমার রবের রহমত তা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট।’ (সূরা যুফরুফ:৩২) …
আর আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে মানুষকে ক্ষমতা দিয়েছেন যাতে তাদের জীবিকার উৎস বিবিধ হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করছেন,
وَلَقَدْ مَكَّنَّاكُمْ فِي الأَرْضِ وَجَعَلْنَا لَكُمْ فِيهَا مَعَايِشَ قَلِيلاً مَّا تَشْكُرُونَ (১০ سورة الأعراف).
‘আর অবশ্যই আমি তোমাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দিয়ে-প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং তোমাদের জন্য তাতে রেখেছি (নানা) জীবনোপকরণ। তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞ হও। (সূরা আ’রাফ:১০)
সুতরাং আল্লাহ তাআলা জীবনোপকরণ বণ্টন করেছেন এবং রিযক তিনিই নির্ধারণ করেছেন। মানুষ সকলে মিলে আপনাকে কিছু দেবারও ক্ষমতা রাখে না, এমনিকরে কিছু রোধ করারও না। মানুষ কেবলমাত্র মাধ্যম, তারা আপনাকে যা দেবে সেটি আল্লাহর নির্ধারণের কারণেই আর যা দেবে না তাও তাঁরই নির্ধারণের কারণে। অতএব আপনার জন্য যা নির্ধারিত, শত দুর্বলতা সত্ত্বেও তা আসবেই। আর যা অন্যের জন্য শত শক্তি প্রয়োগ করেও আপনি তা অর্জন করতে পারবেন না।
وَإِن يَسْلُبْهُمُ الذُّبَابُ شَيْئًا لَّا يَسْتَنقِذُوهُ مِنْهُ ضَعُفَ الطَّالِبُ وَالْمَطْلُوبُ (৭৩) سورة الحـج .
‘আর যদি মাছি তাদের কাছ থেকে কিছু ছিনিয়ে নেয়, তারা তার কাছ থেকে তাও উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষণকারী ও যার কাছে অন্বেষণ করা হয় উভয়েই দুর্বল।’ (সূরা আল-হজ্জ:৭৩)
হে মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ, আপনার দায়িত্ব কেবল চেষ্টা ও কাজ করে যাওয়া, পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘুরে ফেরা এবং রিযকের উপকরণাদি গ্রহণ করা। কারণ যে চেষ্টা করে সে (ফল) প্রাপ্ত হয় আর যে বীজ বপন করে সে ফসল কাটতে সক্ষম হয়। কাজ ছাড়া উপার্জন হয় না এবং চাষাবাদ ছাড়া ফসল কাটা যায় না। ইমাম আহমাদ রহ. বর্ণনা করেন, দু’জন সাহাবি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলেন, নবীজী কিছু একটি মেরামত করছিলেন তারা সে কাজে তাঁকে সহযোগিতা করলেন। এরপর তিনি তাদেরকে বললেন, রিযক বিষয়ে নিরাশ হবে না যতক্ষন তোমাদের মাথা নড়া-চড়া করে। কারণ মানুষকে তার জননী জন্মদান করে লাল; তার উপর কোনো আবরণ বা ত্বক থাকে না অত:পর আল্লাহ তাকে রিযক দান করেন।
রিযকের ব্যাপারটি -হে আল্লাহর বান্দাবৃন্দ- অতিশয় সূক্ষ্ণ, তার গভীরতা উপলব্ধি করা খুবই কঠিন। এতে বিদ্যমান আল্লাহর হিকমত ও প্রজ্ঞা অনুধাবনের উর্ধ্বে, কারণ তিনিই রিযকদাতা, তিনি শক্তিধর, পরাক্রমশালী। সূক্ষ্ণদর্শী চিন্তা ও সর্বজ্ঞ আল্লাহর হিকমত প্রত্যক্ষ করার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আমরা যদি রিযকের আবেদন-উৎসগুলো নিয়ে একটু গভীরভাবে ভাবি তাহলে মহা মহিমের অতি বিস্ময়কর বহু প্রজ্ঞা দেখতে পাব। উদাহরণ স্বরূপ, বহু মানুষের রিযক লেখা হয়েছে গভীর সমুদ্রাভ্যন্তরে-পানির নীচে যেমন ডুবুরি সম্প্রদায়, অথবা আকাশ-যমীনের মাঝে মহাশূন্যে যেমন বৈমানিক সম্প্রদায়, এমনি করে অনেকে নিজেদের জীবিকা খুঁজে পায় ভূমি অভ্যন্তরে শক্ত-কঠিন শীলা ভাঙ্গচুর করার মাঝে যেমন খনিজ কারবারী। আরো আশ্চর্য ও বিস্ময়কর হচ্ছে, কতক মানুষের রিযক রক্ষিত আছে হিংস্র নেকড়ের চোয়ালদ্বয়ের মাঝে। যেমন এদের লালন-পালন কারী, অথবা হাতির দাঁত বা শূঁড়ের মধ্যে যেমন হাতি পরিচালনা কারী। অনুরূপভাবে সে পালোয়ানের বিষয়টিও কম বিস্ময়কর নয় যে শূন্যে সাঁটানো রসিতে হেঁটে যাওয়ার মত রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বেছে নিয়েছে শুধু দু’মুঠো খাবারের জন্য।
হে আল্লাহর বান্দা সকল, আমরা কি ভেবে দেখেছি যে ক্যান্সার রোগের মাঝেও অনেক মানুষের জীবিকা রক্ষিত আছে -আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন- আচ্ছা, ক্যান্সারের কি ডাক্তার নেই? এ রোগের কি ইনজেকশন নেই? তাহলে এ ডাক্তার ও ঔষধ বাজারজাতকারী ব্যক্তির জীবিকা কি এ মারাত্মক রোগের ভেতর তুলে রাখা হয়নি? আমরা কি জানি না যে অনেক মানুষের খাদ্য-খাবার (জীবিকা) ন্যস্ত করা হয়েছে তীব্র শীতের মাঝে? যাতে সে লেপ ও এ জাতীয় শীত নিবারক সামগ্রী বিক্রয় করতে পারে। আবার অনেকের রিযক রাখা হয়েছে প্রচন্ড গরমের মাঝে যাতে সে বরফ, ফ্রিজ, জেনারেটর ও এ জাতীয় ঠান্ডাকরণ সামগ্রী বিক্রয় করতে পারে। অনেক লোক কি এমন নেই? যাদের জীবিকা অর্পণ করা হয়েছে স্বামী কিংবা স্ত্রীর আনন্দিত হবার মাঝে। যেমন আনন্দদায়ক সামগ্রীর সাহায্যে তাদের আনন্দিত কারী ব্যক্তি। অনেক লোক কি এমন নেই? যাদের রিযক ন্যস্ত করা হয়েছে মানুষদের দু:খিত ও পেরেশান হবার উপর। যেমন গোর খোদক ও কাফন-দাফন সামগ্রী বিক্রেতা। জল্লাদ, কারারক্ষী, মৃত্যুদন্ড কার্যকরকারী ও চোরের হাত কর্তনকারী ইত্যাদির ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য।
এগুলো হচ্ছে আল্লাহর হিকমত, তাঁর বড়ত্ব এবং কতক বান্দার মাধ্যমে অপর কতককে তাঁর বশীভূতকরণ প্রক্রিয়া।
إِنَّ اللّهَ يَحْكُمُ مَا يُرِيدُ (১) سورة المائدة
‘নিশ্চয় আল্লাহ যা ইচ্ছা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন’ (সূরা মায়েদা:১) আর খুবই সত্য বলেছেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম:
” وجعل رزقي تحت ظل رمحي “
‘আমার জীবিকা আমার বর্শার ছায়াতলে রাখা হয়েছে’।
আল্লাহ রহম করুন সে বান্দার প্রতি, যিনি উপার্জন করলেন এবং (সে ক্ষেত্রে) পঙ্কিলমুক্ত থাকলেন, সঞ্চয় করলেন এবং তাতে ভারসাম্য রক্ষা করলেন। স্বীয় রবের স্মরণ করলেন এবং দুনিয়া হতে নিজ অংশ বিস্মৃত হলেন না।
অপর দিকে ন্যাক্কার জনক পরাজয় ও ব্যর্থতা সে ব্যক্তির, প্রাচুর্যের প্লাবন বয়ে গেল এবং তার উপর জীবিকা নির্বাহ করল কিন্তু নিজ দীন ভুলে গিয়ে মর্যাদাকে কলুষিত করল এবং তাদের কাতারে গিয়ে শামিল হল যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
وَإِذَا رَأَوْا تِجَارَةً أَوْ لَهْوًا انفَضُّوا إِلَيْهَا وَتَرَكُوكَ قَائِمًا (১১) سورة الجمعة
‘আর তারা যখন ব্যবসায় অথবা ক্রীড়া-কৌতুক দেখে তখন তার দিকে ছুটে যায়, আর তোমাকে দাঁড়ানো অবস্থায় রেখে যায়। ( সূরা জুমুআ:১১)
সত্যিকার মুমিন সে-ই যে আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত রিযকের প্রতি পরিতুষ্ট। এবং রিযক বণ্টন-নির্ধারণ ক্ষেত্রে প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ ন্যায়ানুগতায় দৃঢ় বিশ্বাসী, তাঁর ইনসাফ ও নিরপেক্ষতায় শতভাগ আস্থাশীল। আরোও বিশ্বাস করে, এ ক্ষেত্রে পরিদৃষ্ট তারতম্য বিবিধ হিকমতের কারণেই হয়েছে, যা কেবলমাত্র আল্লাহ তাআলাই জানেন।
وَلاَ يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِّنْ عِلْمِهِ إِلاَّ بِمَا شَاء (২৫৫) سورة البقرة
‘আর তারা তাঁর জ্ঞান সামান্য পরিমাণও আয়ত্ব করতে পারে না, তবে তিনি যা চান তা ছাড়া।’ (সূরা বাকারা:২৫৫)
আল্লামা ইবনুল জাওযী রহ. জনৈক ইবন রাওবেন্দী -হিজরি তৃতীয় শতকে প্রখর মেধা ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী হিসাবে প্রসিদ্ধি প্রাপ্ত এক বিপথগামী লোক- সম্পর্কে উদ্ধৃত করেছেন, সে একদিন মারাত্মক ক্ষুধার্ত হয়ে একটি পোলের উপর গিয়ে বসল। ক্ষুধার যন্ত্রণায় তাকে কাতর করে ফেলেছিল। এক সময় মিহি ও মোটা রেশমি কাপড়ে সজ্জিত কিছু ঘোড়া তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাচ্ছিল। সে জিজ্ঞেস করল, এগুলো কার জন্যে? লোকেরা জবাব দিল, -খলিফার ছেলে- আলী ইবন বলতাকের জন্য। এরপর কয়েকজন সুন্দরী রমণী সেখান দিয়ে গেল। সে জিজ্ঞেস করল, এরা কার জন্যে? লোকেরা বলল, -খলিফার ছেলে- আলী ইবন বলতাকের জন্য। এর কিছুক্ষণ পর জনৈক পথিক তার দূরাবস্থা দেখে দুটি রুটি তার দিকে ফিকে মারল। রুটি দু’টো হাতে নিয়ে দূরে ছুড়ে মারল আর উষ্মা প্রকাশ করে বলল, ঐ সব (নামী-দামী) জিনিষ আলী ইবন বলতাকের জন্য আর আমার জন্য এ দুই রুটি!। বুঝতে পারল না যে, এ ধরণের আপত্তি-অভিযোগের কারণেই মূলত: এরূপ অনাহার-উপবাস-ক্ষুধার উপযুক্ত হয়েছে সে। হাফেজ যাহাবি রহ. বলেন, মহান আল্লাহ ঈমান বিহীন মেধার প্রতি রুষ্ট হয়ে অভিসম্পাৎ করেছেন আর তাকওয়া সম্বলিত সারল্যের প্রতি তুষ্ট হয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
সুতরাং -হে আল্লাহর বান্দাবৃন্দ- রিযক ব্যক্তির মেধা ও বুদ্ধি বিচার-বিবেচনা করে নয়। বহু বুদ্ধিমানকে দেখা গিয়েছে জীবিকা নিয়ে লড়াই-সংগ্রামের মাঝে নিজ জীবন শেষ করেছে অথচ তার থেকে কম মেধা ও বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি সম্পদ ও প্রাচুর্যের ক্ষেত্রে অনেক অগ্রসর হয়েছে।
অতি চমৎকার বলেছেন ইমাম শাফেয়ী রহ.
ومن الدليل على القضاء وكونه *** بؤس اللبيب وضيق عيش الأحمق )
তাকদির ও ভাগ্যের উপর একটি উদাহরণ হচ্ছে, বুদ্ধিমান-মেধাবীদের আর্থিক দৈন্যতা ও দুর্ভোগ আর নির্বোধ-আহম্মকদের সুপ্রসন্ন হওয়া।
সুতরাং মেধা আর বুদ্ধি ধনৈশ্বর্যের উপকরণ নয় যেমনটি নয় নির্বুদ্ধিতা দারিদ্রের কারণ।
قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاء وَيَقْدِرُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ (৩৬) سورة سبأ .
‘বল, আমার রব যার জন্য ইচ্ছা রিযক প্রশস্ত করেন অথবা সঙ্কচিত করেন। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।’ (সূরা সাবা:৩৬)
দ্বিতীয় খোৎবা
হামদ সালাতের পর…
হে আল্লাহর বান্দাগণ, আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করে চলুন। এবং জেনে রাখুন, ইসলাম অতিরঞ্জন ও অবহেলার মাঝামাঝি একটি মধ্যপন্থী ধর্ম। এ ধর্মে কোনো কিছুতে অতিরিক্ত বাড়াবাড়িও নেই আবার একেবারে ছাড়াছাড়িও নেই। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে জীবিকা অন্বেষণের নির্দেশ দেয় এবং চেষ্টা-শ্রম ব্যয় করার জন্য উৎসাহ প্রদান করে। একই সাথে জীবিকার ব্যাপারে উদাসীন থাকা, পরনির্ভর জীবনযাপন ও ভিক্ষাবৃত্তির প্রতি চরম নিন্দা জানিয়েছে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
” اليد العليا خير من اليد السفلى ” رواه الشيخان
‘উপরের হাত নীচের হাত অপেক্ষা উত্তম।’ (বোখারি ও মুসলিম)
ইবনু কোতাইবা রহ. বলেন, ‘উপরের হাত মানে দাতা বা প্রদানকারী হাত।’ সেসব সম্প্রদায় সম্পর্কে আমি অতিশয় বিস্মিত যারা এর অর্থ করেছে গ্রহণকারী হাত বলে। আমার বিশ্বাস, এসব ব্যাখ্যা সে লোকদেরই যারা ভিক্ষাবৃত্তি পছন্দ করে।
কাজ যত ছোটই হোক না কেন বেকারত্ব ও অলসতা থেকে উত্তম। কারণ সোয়াল ও ভিক্ষা না করে মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখা ভিক্ষা করে বেইজ্জত হওয়া থেকে অনেক ভাল। ইসলাম তার অনুবর্তীদের প্রতি অর্থবহ দৃষ্টি দিয়েছে। যেমন তাদেরকে কাজের ময়দানে অবতীর্ণ হবার আহ্বান করেছে এবং যে কোনো কাজে নিজেকে জড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। শ্রমিক হিসাবে হোক বা মালিক হিসাবে, স্বতন্ত্র-স্বাধীনভাবে হোক কিংবা যৌথভাবে, এক কথায় কাজের উপর থাকতে উৎসাহিত করেছে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হল,
সর্বোত্তম উপার্জন কোনটি? বললেন, ‘ব্যক্তির নিজ হাতের উপার্জন এবং প্রতিটি অনুমোদিত ব্যবসা।’ তিনি আরো বলেন, ‘ কোনো ব্যক্তি নিজ হাতের কামাই অপেক্ষা উত্তম আর কোনো খাবার খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ নিজ হাতের কামাই খেতেন মানে জীবিকা নির্বাহ করতেন। বর্ণনায় বোখারি।
মোটকথা জীবিকা তালাশ এবং তা অর্জনে শ্রম ব্যয় করা প্রতিটি মুসলিমের ওপর আবশ্যক। যেমন আবশ্যক আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত রিযকের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। প্রাচুর্য ও দারিদ্রকে দুটি বাহন জ্ঞান করা, কোনটি তার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করা। যদি দারিদ্র ও স্বল্পতা হয় তাহলে এক সময় সেটি বৃদ্ধি পাবে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছিল মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বল্পতা। এছাড়াও তাতে রয়েছে সবর ও সওয়াব অর্জনের সুযোগ। আর যদি প্রাচুর্য হয়, তাহলে মনে রাখতে হবে প্রাচুর্যও কোনো এক সময় নি:শেষ হয়ে যায় যেমনটি হয়েছিল কারূনের ক্ষেত্রে, তার প্রাচুর্য এক সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। যেমনিকরে সেটি একই সময় আল্লাহর অনুগ্রহ ব্যয় করার মাহেন্দ্রক্ষণ। নবীজীর নিম্নোক্ত বাণীতে সবগুলোকে একসাথে পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
” إن روح القدس نفث في روعي أن نفسًا لن تموت حتى تستكمل أجلها وتستوعب رزقها ؛ فاتقوا الله وأجملوا في الطلب ، ولا يحملن أحدكم استبطاء الرزق أن يطلبه بمعصية الله .. فإن الله تعالى لا يُنال ما عنده إلا بطاعته ” .. رواه الطبراني والحاكم وصححه .
‘নিশ্চয় রূহুল কুদস আমার অন্তরে ফুঁকে দিয়েছেন যে কোনো প্রাণীই নিজ হায়াত ও রিযক পরিপূর্ণ করা অবধি মৃত্যু রবণ করবে না। সুতরং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সুন্দররূপে তা অন্বেষণ কর। রিযকের উপস্থিতি ধিরুজ ও বিলম্বিত হলে তোমাদের কাউকে যেন সেটি আল্লাহর অবাধ্য হয়ে-অবৈধ পথে অন্বেষণে প্ররোচিত না করে। কারণ আল্লাহর কাছে থাকা করুনা কেবলমাত্র তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই অর্জন করা যায়। (বর্ণনায় তবরাণী ও হাকেম, তিনি এটিকে সহীহ বলে প্রমাণ করেছেন।)
আমার বক্তব্য এতটুকুই… দরূদ পড়ুন -আল্লাহ আপনাদের প্রতি রহম করুন- শাফাআত ও হাউজের অধিকারী মানবশ্রেষ্ঠ মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব-এর প্রতি। আল্লাহ তাআলা সে নির্দেশই আপনাদের দিয়েছেন যার বাস্তবায়ন প্রথমে নিজে করেছেন, সার্বক্ষণিক তাঁর প্রশংসায় নিয়োজিত ফেরেশাদের মাধ্যমে করিয়েছেন এবং আপনাদেরকেও অনুপ্রাণিত করেছেন। আল্লাহ বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (৫৬) سورة الأحزاب
‘হে মুমিনগণ, তোমরা নবীর উপর দরূদ পাঠ কর এবং তাকে যথযথভাবে সালাম জানাও।’ (সূরা আহযাব:৫৬)
اللهم صلِّ وسلِّم وزِدْ وباركْ على عبدك ورسولك محمد صاحب الوجه الأنور والجبين الأزهر ،
হে আল্লাহ তুমি সন্তুষ্ট হও নবীজীর প্রিয় চার খলিফার প্রতি – আবু বকর, ওমর, ওসমান এবং আলী – তাঁর সকল সাহাবির প্রতি, তাঁদের অনুবর্তীদের প্রতি এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তাদের অনুসরন করবে তাঁদের প্রতি। এবং আমাদেরকেও তোমার ক্ষমা-অনুগ্রহ-দয়ায় তাদের সাথে শামিল করে নাও। হে পরম দয়ালু।
(রিযক ও তা আহরণের অনুমোদিত উপায়-উপকরণ সম্পর্কে শায়খ সউদ আশ-শুরাইমের খুতবার অনুবাদ এটি। খুতবাটি তিনি ২৩ বরিউল আউয়াল ১৪৩০ মসজিদুল হারামে প্রদান করেন।)
মূল : শায়খ সাউদ বিন ইবরাহীম আশ শুরাইম
অনুবাদক : ইকবাল হুসাইন মাসুম
সম্পাদনা : সানাউল্লাহ নজির আহমদ
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ,