সৎ মানুষের হৃদয়ে শয়তান প্রবেশের ধরণ ও প্রকৃতি


সত মানুষের হৃদয়ে শয়তান প্রবেশের ধরণ ও প্রকৃতি

 

ভূমিকা
সমস্ত প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ তা‘আলার জন্য। শুভ পরিণতি মুত্তাকীদের জন্য। সালাত ও সালাম প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবার বর্গ, সঙ্গী-সাথীদের ওপর এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা অনুসরণ করবেন তাঁর পথ,  তাদের ওপর।
হামদ ও সালাতের পরে…
সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিম উম্মাহর বিপর্যয়ের কারণ মূলত: জাতির কতিপয় প্রগতিশীল ব্যক্তির চিন্তাগত দৃষ্টিভঙ্গি। ইলমে দ্বীনের সাথেও এদের কেউ কেউ সম্পৃক্ত।
জ্ঞান-বিজ্ঞান ও গবেষণা ক্ষেত্রের মতই এরা দর্শন ও চিন্তা- চেতনার ক্ষেত্রেও যুগোপযোগী ও আধুনিক পশ্চাত্য সভ্যতার উদগীরণ করা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী ও ইসলামের মাঝে ‘সমন্বয়’ সাধনের প্রয়াস তারা চালিয়ে যাচ্ছে।
এ উদ্যোগের সুস্পষ্টতম লক্ষ্য হল নিজেদের ‘বুঝ ও সমঝমত’ ইসলামী নির্দেশনাসমূহের ‘যৌক্তিকিকরণের’ প্রয়াস চালানো।
যে কারণে কুরআন-সুন্নাহ কর্তৃক প্রমাণিত ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বহু বিষয়ে তারা হস্তক্ষেপ করেছে। যাতে করে জোর-পূর্বক সেগুলোর অপব্যাখ্যা করতে পারে এবং ইসলামী নির্দেশনাসমূহের এমন যৌক্তিক ব্যাখ্যা জুড়ে দিতে পারে, যা আধুনিক সভ্যতা গ্রহণ করবে।
মতবাদটিতে যদিও আদর্শিক অর্থাৎ ‘শর‘য়ী বিকৃতি’ এবং ‘নছ’ তথা কুরআন ও সুন্নাহর ভাষ্য ব্যবহারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত অনুসৃত পদ্ধতি পরিত্যাগ জনিত মৌলিক ভুল রয়েছে। তবুও এ আলোচনায় আমরা যে বিষয়টি উত্থাপন করব তা হল, এ নয়া মতবাদ ইসলামের ক্ষতি করেছে। যার ব্যপ্তি দাওয়াতী অঙ্গন জুড়ে। উপরন্তু মতবাদটি তাদের প্রত্যাশার নূন্যতম সাফল্যও বয়ে আনে নি। উল্টো ইসলামী মানসিকতা ও দ্বীনের বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। অথচ ইউরোপিয়ান মানসিকতাকে ইসলাম ও ঐশী প্রত্যাদেশের এক কদমও কাছে আনে নি।
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত শয়তান সম্পর্কিত আলোচনাকে বিকৃত ব্যাখ্যা পেশ করা এ মতবাদের একটা বিষয়। তাদের একপক্ষ বৈশিষ্টের ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে শয়তানের অস্তিত্ব অস্বীকার করে বলে, ‘শয়তান অশুভ শক্তির রূপক প্রতীক। অন্যপক্ষ বলে, ‘শয়তান আত্মমন্ত্রণার ব্যঙ্গময় প্রকাশ। এ ছাড়াও তারা ধর্ম বিশ্বাসের মূলনীতি ও আল্লাহর কিতাব বুঝা ও গবেষণার ক্ষেত্রে অনুপযুক্ত। তাদের কর্মকাণ্ড উদ্ভট ব্যাখ্যা আর অভিনব ধ্যান-ধারণার উদ্ভব ঘটিয়েছে।
এ বিকৃত ব্যাখ্যার ফলস্বরূপ অনেক মুসলিমের কাছে শয়তানের সম্পর্ক সচেতনতা হ্রাস পেয়েছে। অথচ আল্লাহ বলেন,
 ﴿ إِنَّ ٱلشَّيۡطَٰنَ لَكُمۡ عَدُوّٞ فَٱتَّخِذُوهُ عَدُوًّاۚ ﴾ [فاطر: ٦]
‘‘নিশ্চয় শয়তান তোমাদের শত্রু, তোমরা তাকে শত্রুরূপেই গ্রহণ কর।’’
(বিকৃত ব্যাখ্যার ফলে) পবিত্র এ আয়াতখানির মর্ম গোলমেলে, দুর্বোধ্য ও অধিক সংশয়পূর্ণ হয়ে গেছে। কারণ, শয়তান যেসব স্খলন, ধ্বংসাত্মক ও মন্দকর্মের উদ্ভব ঘটাচ্ছে আর ঘটিয়েছে, মুসলিম চরিত্রে তার প্রভাব অপ্রতিহত। কারণ, মুসলিম অনুভূতি শয়তানের বাস্তব অস্তিত্ব নির্ভর। যা-তার সাথে ‘লড়াইয়ের’ মনোভাব তৈরী করে। আর এ মনোভাব ভ্রান্তপথ, রিপু ও ফেতনাসমূহের মুখে টিকে থাকার স্পৃহা যোগায়। কিন্তু শয়তানের বাস্তব অস্তিত্বের এ অনুভূতি যখন থাকবে না, লড়াইয়ের মনোভাবও থাকবে না, তখন এসব শয়তানী চক্রান্তের মুখে টিকে থাকার স্পৃহা হ্রাস পাবে বা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
এ পুস্তিকাটি বিশেষ কিছু ইসলামপন্থীর উপলব্ধির এ বিকৃত প্রবণতা সংশোধনের অম্ল মধুর এক প্রয়াস। উপরন্তু এর মূল মিশন ও লেখকের (আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন এবং তাকে সীমাহীন নেকী দান করুন) উদ্দেশ্য হল, শয়তানের আত্মমুখী প্রবেশপথগুলো সম্পর্কে মুসলিমদেরকে সচেতন করা।
এ পথগুলো ব্যক্তির স্বভাব, ঈমানী শক্তি, আমলের পরিমাণ, ইবাদাতের সততা ও অন্যান্য অবস্থা, প্রকার অনুপাতে বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে।
সহজ-সরলভাষায় লেখক সেগুলোকে সফলতার সাথে উন্মোচিত করেছেন। সুক্ষ্ম বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছেন এবং প্রতিকারের কিছু পথও তুলে ধরেছেন।
গ্রন্থটির উপকারিতা ব্যাপক হোক, এবং এর সৌরভে বিশ্বাসী অন্তরগুলো সুরভিত হোক- এ প্রত্যাশায়…
আল্লাহ তা‘আলা তাওফীক ও হেদায়াত দানকারী। তিনিই আমদের জন্য যথেষ্ট এবং উত্তম কার্য সম্পাদনাকারী।
জামাল সুলতান
শয়তান কী ?
আক্বীদার ক্ষেত্রে এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন যে, শয়তান মূলত কী? বাস্তব কোনো বস্তু না রূপক কিছু? না মন্দ চিন্তা আর কুমন্ত্রণাই শুধু। যেমন অনেকের ধারণা। না জীবানু, যেমন অন্য অনেকের ধারণা। না মন্দের প্রতীকী চরিত্র? আলোচনার স্বার্থে আমরা একে মন্দের প্রতীকই ধরে নেব।
এ ব্যাপারে আহলে সুন্নত ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা কী?
আমাদের আক্বীদা, শয়তান (বাস্তব) ও সে জিন-জাতির অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেনঃ
﴿ وَإِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلَٰٓئِكَةِ ٱسۡجُدُواْ لِأٓدَمَ فَسَجَدُوٓاْ إِلَّآ إِبۡلِيسَ كَانَ مِنَ ٱلۡجِنِّ فَفَسَقَ عَنۡ أَمۡرِ رَبِّهِۦٓۗ﴾ [الكهف: ٥٠]
‘‘আর স্মরণ কর, আমি যখন ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম, ‘আদমকে সিজদা কর’, তখন সকলেই সিজদা করল ইবলীস ব্যতীত; সে জিনদেরই একজন। সে তার প্রতিপালকের আদেশ অমান্য করল।’’ (সূরা আল-কাহাফ : ৫০)
তাই, আমরা জিন-ইনসানের অস্তিত্বে বিশ্বাস করি। আর শয়তান জিনের প্রকারভুক্ত এবং তারা প্রত্যেকটি মানুষের সাথে রয়েছে।
ইমাম মুসলিম রহ. সূত্রে ইবনে মাসউদ রা. বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র বাণী একথার স্বপক্ষে প্রমাণ-
«وَمَامِنْكُمْ مِنْ أحَدٍ إلاَّ وَقَدْ وُكِلَ قَرِيْنُهُ مِنَ الْجِنِّ وَقَرِيْنُهُ مِنَ الملَائِكَةِ، قالوا: وإياك يا رسول الله؟ قال: وَإيّاي، ولكِنَّ الله َ عز و جل- أَعَانَنِيْ  عَلَيْهِ، فَلَا يَأمُرُنِي إلا بِحَقٍّ». (رواه مسلم في صفات المنافقين، برقم : ২৮১৪)
‘‘তোমাদের প্রত্যেকের সাথেই জিন ও ফিরিশতাদের মধ্য হতে একজন একজন করে সঙ্গী নির্ধারণ করা হয়েছে’’। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার সাথেও কী?
বললেন, ‘‘হাঁ আমার সাথেও। তবে মহান আল্লাহ আমাকে তার বিরুদ্ধে জয়ী করেছেন। তাই সে আমাকে কেবল হকেরই নির্দেশ দেয়।’’ (বর্ণনায়ঃ মুসলিম, হাদীস নং ২৮১৪)
তাহলে বোঝা গেল, প্রত্যেকের সাথেই একজন করে জিন সঙ্গী রয়েছে। (যে তাকে কুমন্ত্রণা দেয়) এমনকি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথেও। তবে তাঁর সঙ্গীর বিরুদ্ধে আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে জয়ী করেছেন। তাই সে তাঁকে একমাত্র হকের নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন-
﴿ قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ ١ مَلِكِ ٱلنَّاسِ ٢ إِلَٰهِ ٱلنَّاسِ ٣ مِن شَرِّ ٱلۡوَسۡوَاسِ ٱلۡخَنَّاسِ ٤ ٱلَّذِي يُوَسۡوِسُ فِي صُدُورِ لنَّاسِ ٥ مِنَ ٱلۡجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ 6 ﴾ [الناس: ١،  ٦]
‘‘বল, আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানুষের প্রতিপালকের, মানুষের অধিপতির, মানুষের মাবুদের কাছে; আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জিনের মধ্য হতে কিংবা মানুষের মধ্য হতে।’’ [সূরা আন-নাছ ১-৬]
কুমন্ত্রণা কখনো মন্দমানুষের থেকে, কখনো জীনের থেকে হয়। ‘জিন শয়তান’ ও মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়।
শয়তানের সন্তান-সন্ততিও আছে এরা বংশ বিস্তার করে।
﴿أَفَتَتَّخِذُونَهُۥ وَذُرِّيَّتَهُۥٓ أَوۡلِيَآءَ﴾ [الكهف: ٥٠]
‘‘তবে কি তোমরা শয়তানকে এবং তার বংশধরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করছ?’’ (সূরা আল-কাহাফ : ৫০)
পার্থিব জগতে মানুষকে ভ্রষ্ট করতে শয়তানের বংশধর ও অনুসারীরা অবিরাম প্রয়াস চালাচ্ছে।
শয়তানের কৌশল
শয়তান দাওয়াতের কর্মপদ্ধতি কিংবা দাওয়াতের বিষয়বস্তু উভয় ক্ষেত্রেই এমন কৌশল অবলম্বন করে, যাতে সে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়।
ইবনুল কাইয়্যেম আল-জাওযিয়্যাহ্‌ রহ. বলেন, শয়তানের দাওয়াতের বিষয় বস্তুতে অগ্রসর হওয়ার ছয়টি ধাপ রয়েছে। এ ছয়টি ধাপে শয়তান মানুষকে আহবান জানায় কুপথে চলতে।
প্রথম ধাপ :
মানুষ শির্ক কিংবা কুফরে লিপ্ত হোক, শয়তান সর্বপ্রথম এ প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু ব্যক্তি যদি মুসলিম হয়, তাহলে সে (তাকে বিভ্রান্ত করতে) পরবর্তী ধাপ অবলম্বন করে।
দ্বিতীয় ধাপ :
‘বিদ‘আত’। ‘ব্যক্তি যদি মুসলিম হয়, তাহলে সে যেন নিজে বিদ‘আত উদ্ভাবন করে এবং এর প্রচলন করে’ দ্বিতীয় পর্যায়ে শয়তান এ-প্রয়াসই চালায়। কিন্তু ব্যক্তি যদি সুন্নতের পাবন্দ হয়, তাহলে শয়তান তৃতীয় কৌশল অবলম্বন করে।
তৃতীয় ধাপ :
‘কবীরা গুনাহ’ বড় পাপ বা নাফরমানীর স্তর। শয়তান মানুষকে কবীরা গুনাহে লিপ্ত করার প্রয়াস চালায়। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা যদি তাকে এসব থেকেও মুক্ত রাখেন, তবুও শয়তান হতোদ্যম হয় না। তখন সে চতুথ কৌশল অবলম্বন করে।
চতুর্থ ধাপ :
‘ছগীরা গুনাহ’, ব্যক্তিকে কবীরা গুনাহে লিপ্ত করতে না পারলে শয়তান ছগীরা গুনাহে লিপ্ত করার প্রয়াস চালায়। কিন্তু ব্যক্তি যদি এর থেকেও মুক্ত হয়, তাহলে শয়তান তাকে বিভ্রান্ত করতে ভিন্ন কৌশলে লিপ্ত রাখার চেষ্টা করে। যা পরবর্তীতে দু’টি ধাপে উল্লেখিত হচ্ছে।
পঞ্চম ধাপ :
‘মুবাহ’ যা করলে ছাওয়াব নেই, না করলে গুনাহ নেই। এ ধরনের মুবাহ কাজে ব্যক্তিকে শয়তান এমনভাবে লিপ্ত রাখে যে, এতেই সে পূর্ণ সময় নিঃশেষ করে। কিন্তু যে সব জরুরী বিষয়ে আমরা আদিষ্ট, তাতে সময় দেয় না।
ষষ্ঠ ধাপ :
শয়তান মানুষকে অধিক ফযীলতের আমল থেকে বিরত রেখে, অপেক্ষাকৃত কম ফযীলতের একটা নির্দিষ্ট ভাল আমলে লিপ্ত রাখে। আর সে ব্যক্তিও উত্তম ও সুন্দরতম আমল থেকে বিরত থেকে এতেই নিবিষ্ট থাকে।
যেমন : ফরয ছেড়ে সুন্নত নিয়ে ব্যস্ত থাকা। অদ্ভুত! ফরয ছুটে যাচ্ছে অথচ সুন্নত নিয়েই ব্যস্ত!!
শয়তান কিন্তু তার দাওয়াতে তৎপর। ক্রমান্বয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছে যাচ্ছে। শ্লথগতিতে উপর্যুপরি পদক্ষেপ গ্রহণের কৌশলে মানুষকে কাবু করছে সে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন-
﴿كُلُواْ مِمَّا رَزَقَكُمُ ٱللَّهُ وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَٰتِ ٱلشَّيۡطَٰنِۚ إِنَّهُۥ لَكُمۡ عَدُوّٞ مُّبِينٞ ١٤٢ ﴾ [الانعام: ١٤٢]
‘‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে যে রিযিক দান করেছেন তা থেকে খাও এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’’ (সূরা আল-আন‘আম : ১৪২)
মানুষের পেছনে শয়তান প্রথমে অল্প-অল্প প্রচেষ্টা চালায় এবং ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে।
সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে সে তাদের জন্য উপযোগী পন্থায় ও পদ্ধতিতে দাওয়াত দেয়। তাপসীর কাছে যায় কাছে তাপস্যের পথে, বিদ্যানের কাছে বিদ্যার পথে, অজ্ঞের কাছে যায় অজ্ঞতার পথে যায়।
শয়তানের প্রবেশপথ
অসংখ্য অগনিত প্রবেশ পথ রয়েছে শয়তানের, যার কয়েকটি উল্লেখ করছি।

এক : মুসলিমদের পরস্পরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়া এবং অন্যের সম্পর্কে কু-ধারণা সৃষ্টি করা।
ইমাম মুসলিম রহ. বর্ণিত পবিত্র হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
«إنَّ إبْلِيْسَ قَدْ يَئِسَ أنْ يَعْبُدُهُ الصَّالِحُوْنَ… وَلَكِن يَسْعَى بَيْنَهُمْ فِي التَّحْرِيشِ».  مسلم ২৮১৬
‘‘আল্লাহ ওয়ালারা ইবলীসের বন্দেগী করবে এর থেকে সে নিরাশ হয়ে গেছে, তবে সে তাদের পরস্পরকে পরস্পরের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে।’ (বর্ণনায় মুসলিম : ২৮১৬)
অর্থাৎ পরস্পরের মাঝে কলহ-বিদ্বেষ- গোলযোগ সৃষ্টির প্রয়াস চালায় এবং পরস্পরকে পরস্পরের পিছনে লাগায়।
ভিন্নসূত্রে বণিত হয়েছে
«أنه قد يئس الشيطان أن يعبده المصلون في جزيرة العرب. . .»
‘‘আরব উপদ্বীপে ইবাদত গুজার ব্যক্তিরা শয়তানের উপাসনা করবে, এ থেকে সে নিরাশ হয়ে গেছে।’’
কু ধারণার উৎস মূলত শয়তান।
উম্মুল মু’মিনীন সফিয়্যা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে এতেকাফরত ছিলেন। রাতে তাঁর সাথে সাক্ষাতে এলাম। কথা বললাম। বাড়ি ফেরার জন্য উঠলাম, তিনিও বিদায় দেবার জন্য আমার সাথে উঠলেন। দু’জন আনসারী সাহাবী রা. তখন আমাদেরকে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। যখন তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলেন, চলার গতি দ্রুত করলেন। রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাললাম বললেন,
«على رسلكما، إنها صفية بنت حيي».
‘‘আরে তোমরা থাম! সে তো (আমার স্ত্রী) সফিয়্যা বিনতে হুয়াই।’’
ছাহাবাদ্বয় (সসংকোচে) বললেন, ছুবহানাল্লাহ! ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!!
-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
«إن الشيطان يجري من بني آدم مجرى الدم، وإني خفت أن يقذف في قلوبكما شرا، فيقال شيئا»
‘শয়তান মানবদেহে রক্ত প্রবাহের ন্যায় শিরা-উপশিরায় চলাচল করে। তাই আশংকা করলাম যে, তোমাদের অন্তরে সে কু-ধারণা ঢেলে দিতে পারে, যার ফলে কোন কিছু বলা হতে পারে। (বর্ণনায়ঃ বুখারী ও মুসলিম)
রাতে একজন পুরুষ একজন নারীর সাথে চলছে, স্বভাবতই এখানে সন্দেহ ও কুধারণার সম্ভাবনা রয়েছে। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্দ ধারণার সম্ভাবনা দূর করার জন্য বললেন- তোমরা থাম, ইনিতো (আমার স্ত্রী) সফিয়্যা রা.। এ কারণেই সন্দেহের সম্ভাবনা আছে, এমন অবস্থার সম্মুখীন হলে, দর্শন শ্রোতাদের কাছে অবস্থান এমনভাবে সুস্পষ্ট করা আবশ্যক, যাতে কু-ধারণার কোনো অবকাশই না থাকে।
মন্দ ধারণা শয়তানের অন্যতম প্রবেশপথ। তাই সর্বদা সে আপনাকে এ মনোভাবাপন্ন করবে যে, কোন কথা শুনলেই যেন আপনি তার নেতিবাচক ব্যাখ্যা করেন।
শয়তান মানুষের মাঝে উস্কানিও দেয়। সুলাইমান ইবন সরদ রা. বর্ণিত হাদীস এর প্রমাণ। তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (স.) এর সাথে বসা ছিলাম। দু’ব্যক্তি পরস্পরে গালাগালি করছিল। ইতোমধ্যে একজনের মুখমন্ডল ক্রোধে রক্তিমবর্ণ ধারণ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ইরশাদ করলেন- ‘আমি এমন একটা কালেমা জানি, যদি সে তা বলত, তাহলে তার ক্রোধ দূরীভূত হয়ে যেত। যদি সে বলত
«أعوذ بالله من الشيطان الرجيم».
বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি।
দুই : বিদ‘আতকে মানুষের জন্য সুসজ্জিত করা।
বিদ‘আতকে সুসজ্জিত করে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে শয়তান মানুষের কাছে এসে বলে, আজকাল লোকেরা দ্বীন-ধর্ম পরিত্যাগ করেছে। তাদেরকে দ্বীনের পথে প্রত্যাবর্তন করানো দুস্কর। তাই কোনো কোনো ‘ইবাদত যদি আমরা বাড়িয়ে করতাম, তাহলে হয়ত লোকেরা পূণরায় ‘ইবাদতে লিপ্ত হত।
কখনো আবার সে হাদীসে বর্ণিত ‘ইবাদাতের উপর বর্ধিত কোনো পদ্ধতি নিয়ে এসে বলে, ‘ভালোর বৃদ্ধিও ভাল’, তাই বাড়িয়ে কর। এ বৃদ্ধি তখন এ ‘ইবাদতের আদলেই বা নয়া সংযোজন রূপে অস্তিত্ব লাভ করে।
আবার কেউ কেউ বলে, লোকেরা দ্বীন থেকে দূরে সরে গেছে তাই ভীতি সঞ্চারক[1] কিছু হাদীস সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এই বলে মনগড়া হাদীস তৈরী করে রাসূলের নামে বর্ণনা করে। আর বলে, আমরা মিথ্যা বলি, তবে রাসূলের বিরুদ্ধে নয়; পক্ষে।
অদ্ভুত যুক্তি! রাসূলের পক্ষে (?) মিথ্যা বলে! তাই মনগড়া হাদীস তৈরী করে তা দ্বারা লোকদেরকে জাহান্নামের ভয় দেখায়। অভিনব পন্থায় জাহান্নামের চিত্রায়ন করে;
আমরা জানি যে, ইবাদাতসমূহ শরী‘আত নির্ধারিত। অর্থাৎ আল্লাহর থেকে রাসূলের কাছে যেভাবে এসেছে, রাসূলের থেকে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, আমরা হুবহু সেভাবেই গ্রহণ করব। কোনো বৃদ্ধি-সংযোজন ইচ্ছামাফিক পরিবর্তনের অবকাশ নেই। যদি করি, তবে সেটাই বিদ‘আত যা শয়তানের কাজ। অনেক লোক এমন আছেন স্বীকার করেন কাজটি বিদ‘আত। তারপরও করেন এ যুক্তি দিয়ে যে এর দ্বারা আল্লাহ মানুষকে হেদায়েত করতে পারেন। এর দ্বারা মানুষকে ডেকে কিছু ভাল কথা শুনানো যায়। এতে মন্দের কি আছে?

তিন : এক দিককে অন্যদিকের তুলনায় অধিক প্রাধান্য দেয়া, এটা দু’ভাবে হতে পারে; সামাজিক পর্যায়ে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে।
(ক) সামাজিক পর্যায়
কোনো ব্যক্তি অসংখ্য পাপাচার ও নাফরমানী করে, পাশাপাশি নামাযও পড়ে। গুনাহসমূহের ব্যাপারে মনকে এই বলে প্রবোধ দেয় যে, নামায দ্বীনের স্তম্ভ; কেয়ামতের দিন মানুষের আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম দৃষ্টি দেয়া হবে নামাযের প্রতি। আর তুমি তো নামায পড়ছই, তাই সামান্য কিছু পাপাচার নাফরমানিতে কোনো অসুবিধা নেই ।
তখন সে অন্যান্য ইবাদতের ত্রুটিগুলোর বৈধতা দানের জন্য নামাযকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় এবং অন্য বিষয়সমূহের হিসাবের তুলনায় নামাযকেই বড় করে দেখে।
নামাযই দ্বীনের স্তম্ভ, কথা সত্য, তবে পূর্ণাঙ্গ দ্বীন নয়। তাই শয়তান তার ত্রুটিসমূহের বৈধতা দানের জন্য এ পথ অবলম্বন করে, যাতে সে বিভ্রান্ত হয়।
অন্য এক ব্যক্তি এসে বলে, ইসলাম হল ‘মু‘আমালা’ বা ভাল আচরণের নাম। ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়তো এটাই যে, তুমি লোকদের সাথে সদাচারী হবে। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা রটনা করবে না, তাদেরকে ধোকা দেবে না। নামায না পড়, না পড়, কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন ‘‘দ্বীন হল ভাল আচার-আচরণ’’ অর্থাৎ নামাযের তুলনায় মু‘আমালাত বা ভাল আচার-ব্যবহার অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তাই নামাযের উদাসীন হলেও মু‘আমালার ব্যাপারে সচেতন থেকো।
এমনিভাবে পাবেন অনেক এমন ব্যক্তিকে, যে মনে করে নামায-রোযা করলে নিজের উপকার। আর মানব সেবা করলে মানুষের কল্যাণ সাধিত হয়। আল্লাহও খুশী হন। আল্লাহ নিজেও মানুষের কল্যাণের জন্য সব কিছু করেছেন। তাই সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মানব কল্যাণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো বলেছেনঃ ‘‘দ্বীন হলো কল্যাণ কামনা।’’ এটা মনে করে সে নামায-রোযার গুরুত্ব দেয় না। মানব কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে ব্যস্ত। এটাও শয়তানের একটি প্রবেশ পথ।
অপর এক ব্যক্তি নেক আমলসমূহ বর্জন করে শুধু সুন্দর নিয়্যতের উপর নির্ভর করে এবং বলে, ‘দ্বীনের জরুরী বিষয়তো পরিশুদ্ধ নিয়্যত’। তাই তো আমি হিংসা বিদ্বেষমুক্ত পরিচ্ছন্ন অন্তরে রাত যাপন করি।
অনেকে কুরআন শিক্ষাদান, কিরাত ও তাজভীদে গুরুত্ব দেন। তাই অন্য বিষয়ের তুলনায় এ বিষয়টিকে তারা শ্রেষ্ঠত্ব দেন। আর একটি বিষয় তাদের কাছে গুরুত্ব পাওয়ায় অন্য অনেক বিষয় তারা পরিত্যাগ করেন। সন্দেহ নেই যে, এটাই ইসলামের একমাত্র বিষয় নয়। আবার এ বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়াও ভুল নয়; বরং ভুল তো হল, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের তুলনায় একটি বিষয় নিয়ে আদিখ্যেতা।
(খ) সামাজিক পর্যায়
সামাজিকভাবেও বিশেষ একটি দিককে প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে। তাই সমাজে এ কথা বলার একটা ‘হুজুগ’ প্রত্যক্ষ করবেন যে, সবচে’ বেশী গুরুত্বের বিষয় তো মুসলিম ও মুসলিমদের দুশমনদের অবস্থা অবহিত হওয়া। আর রাজনৈতিক বিষয়াবলীতো আরো গুরুত্বের। কারণ, বর্তমানে আমরা যে যুগে বাস করছি তা শুধু সুফি দরবেশদের যুগ নয়।
এ ধরনের হুজুগ প্রবণদের দেখবেন, তারা সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মাসুনিয়াহ, বাহাই ও কাদিয়ানী সব মতবাদ আত্মস্থ করেছে। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করুন, দেখবেন, ঠুটো জগন্নাথ’ কিছু জানে না। এরা সমকালীন বিষয়কে অধিক প্রাধান্য দেয়। অন্যদিকে একপক্ষ ‘ইবাদতকেই অধিক প্রাধান্য দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহর সাথে সম্পর্কই চূড়ান্ত বিষয়; নামায, দুনিয়া বিমুখতা ও তাকওয়াই মূখ্য এবং আত্মিক বিষয় ছাড়া অন্যসব বিষয় মূল্যহীন।
অপর একদল পাবেন, যারা  বলে, মুসলিম উম্মাহর ঐক্যই আসল বিষয়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَٱعۡتَصِمُواْ بِحَبۡلِ ٱللَّهِ جَمِيعٗا وَلَا تَفَرَّقُواْۚ ﴾ [ال عمران: ١٠٣]
‘‘এবং তোমরা সবে আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধর, আর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’’ [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]
এ মতকেই তারা প্রতিপাদ্য বিষয় সাব্যস্ত করে, এমনকি আক্বীদার ওপরও! তাই তারা বিপরীত আক্বীদা পোষণকারীদের সাথেও আলাপ-আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়, এ দাবী তুলে যে, যখন শত্রুরা আমাদের বিরুদ্ধে কুকুরের মত ঝাঁপিয়ে পড়েছে এমন মুহুর্তে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হব, এটাই সময়ের প্রধান দাবী। অথচ সঠিক ছিল তো বুনিয়াদের ওপর, দ্বীনের ওপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া। নৈরাজ্য ও আক্বীদা বিশ্বাসে ভিন্নতার ওপরে নয়।
অতএব আলোচ্যবিষয়গুলো ও অন্যান্য বিষয়ের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরী। মোটকথা, বিশেষ কোনো দিককে ভিন্ন দিকের তুলনায় প্রাধান্য প্রদান, এটাই শয়তানের বহুল ব্যবহৃত পথ।

চার : করব-করছি, এরকম কাল বিলম্ব করা
করব-করছি, কাল বিলম্ব করা, প্রলম্বিত আশা, বা অনেকে যে বলে, ‘কঠিন সমস্যায় আছি’ ইত্যাদি সবই শয়তানের প্রবেশ পথ।
অনেকেই সাধারণ কোনো একটা বিষয়কে ‘প্রতিবন্ধক’ সাব্যস্ত করে। যেমন বলে, ‘পড়া-লেখা শেষ করে ইনশাআল্লাহ’ তাওবা করব। এটা পড়া লেখার প্রতিবন্ধকতা। পড়া-লেখার পাঠ চুকিয়ে বলে, ঐ চাকরিটা পেলে ‘তাওবা’ করব, যখন ‘বিবাহ’ করব, যখন… যখন… আর যখন! এ যখন শেষ হয় না কখনো।
মানুষ সর্বদা সামনে একটা কল্পিত বাঁধা দাঁড় করিয়ে রাখে। করব- করছি, ধীর-সুস্থে করে-করে প্রলম্বিত আশা নিয়ে জীবন যাপন করে। এভাবেই বেঁচে থাকে। অতঃপর মৃত্যুবরণ করে। কিছুই করতে পারে না। প্রকৃত জীবন শুরুই করে না।
আপনার কাছে শয়তানের চূড়ান্ত প্রত্যাশা, আপনাকে আমল থেকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা কিংবা আমল বিলম্বিত করা। আর এটা আল্লাহ ওয়ালাদের জন্য শয়তানের অবলম্বিত ভয়ংকর পথ।
শয়তান এসে আপনাকে কু-মন্ত্রণা দেবে যে, তুমি এখনও অন্যকে শিক্ষা দেয়া বা দাওয়াত দেয়ার মত উপযুক্ত নও, তাই নিজে শেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। অথচ একটি আয়াত জানলেও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য আমরা আদিষ্ট। তাই যখনই কিছু শিখবেন অন্যকে তা শেখান! হোক তা একটি আয়াত!!
ইবনুল জাওযী রহ. ‘তালবীসে ইবলীস’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘শয়তান প্রচেষ্টায় দৃঢ় সংকল্প কত ব্যক্তিকে করব-করছির টালবাহানায় ফেলেছে! অর্থাৎ এই তো করব বলিয়েছে। উৎকর্ষের পথে ধাবমান কত ব্যক্তির সময় ক্ষেপন করিয়েছে! অনেক সময় বিদ্যান ব্যক্তি পাঠ পূর্ণ অধ্যয়নের ইচ্ছা করেন, তখন শয়তান বলে, ‘খানিক বিশ্রাম নিন’ এভাবেই সে অলসতাকে বানাচ্ছে প্রিয়, আর কাল ক্ষেপন করাচ্ছে বিরামহীনভাবে।
অনেক সময় রাতে নামাযে অভ্যস্ত ‘আবেদের কাছে এসে শয়তান বলে, রাত এখনও অনেক বাকী! এভাবেই সকাল হয়ে যায়, কিন্তু ‘আবেদের আর নামায আদায় করা হয় না।

পাঁচ : কৃত্রিম পূর্ণতা
‘তুমি পরিপূর্ণ’- মানুষের সমাজে এ অনুভূতি জাগিয়ে তোলে শয়তান। বলে, তুমি অন্যদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। তুমি নামায পড়, অন্যরা অনেকেই নামায পড়ে না। তুমি রোযা রাখ, অন্যরা অনেকেই রোযা রাখে না। এভাবে নেক আমলের ক্ষেত্রে সে আপনাকে অধস্তনদের প্রতি তাকাতে শেখায়। এ সব কিছু সে আপনাকে আমল থেকে দূরে সরানোর জন্য করে, যখন আপনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবেন, তখন বিভ্রান্ত হয়ে অনেক আমল-ভালকাজ থেকে দূরে সরে যাবেন।
তোমার আমলই তোমার জন্য সুপারিশ করবে বলে ব্যক্তিকে শয়তান মুবাহ আমলে লিপ্ত রাখে। তারপর বলে খানিক বিশ্রাম নিন; আপনিতো ব্যস্ত, আপনি তো অন্যদের তুলনায় ভালো। এসব বলে কালক্ষেপণ করায় এবং ভালকাজ ও আমল থেকে তাকে বিরত রাখে।
উচিততো ছিল উল্টোটা, নেক আমলের ক্ষেত্রে যারা অগ্রগামী তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করা, অর্থাৎ এক ব্যক্তি সোম-বৃহঃ- রোজা রাখে, কিন্তু আপনি রাখেন না; এক ব্যক্তি তাহাজ্জুদের নামায আদায় করে, আপনি করেন না। এক ব্যক্তি অধিক নফল আমল করে, কিন্তু আপনি করেন না… তার প্রতি দৃষ্টিপাত করা আপনার কর্তব্য ছিল।

ছয় : নিজের সত্ত্বা ও তার সামর্থ্যের সঠিক মূল্যায়ন না করা।
সত্ত্বার মূল্যানের ক্ষেত্রে শয়তানের দু’টো দৃষ্টিভঙ্গি আছে
দৃষ্টিভঙ্গি-১. আত্মতুষ্টি ও অহমিকাঃ
প্রথমত শয়তান মানুষকে নিজ সত্ত্বার প্রতি বিমুগ্ধদৃষ্টি প্রদানে প্রবৃত্ত করে। তুমি নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ, কত কী-ই না করেছ। তখন ঐ ব্যক্তির (মনস্তাত্তিক) পরিবর্তন ঘটে; ক্রমশ সে অহংকারী হয়, অহমিকা তাকে আচ্ছন্ন করে। অন্যদের সে তখন অবজ্ঞা করে, সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং ভুল করলে সংশোধনে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদের থেকে শিখতে, ইলমের আলোচনায় বসতে অনীহা প্রদর্শন করে। এ জাতীয় কোনো কোনো হালকায় (আলোচনা সভায়) আমি প্রত্যক্ষ করেছি যে, পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতে যখন কোনো ব্যক্তি ভুল করে, তখন ভুল শুদ্ধ হওয়া পর্যন্ত হালকাগুলো অবধারিত করে নেয়ার পরিবর্তে সে তৎক্ষনাৎ হালকাগুলোর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। জন সমক্ষে লজ্জিত হবে, এ ভয়ে গোটা জিন্দেগী সে শেখে না।
একটু চিন্তা করলেই সে বুঝত, যে ভালভাবে পড়তে সক্ষম সে ব্যক্তিও কোনো একদিন তার মতই ছিল। (পড়তে জানতো না) তারপর শিখেছে। ঐ ব্যক্তির এ গুণটি যতদিন রইবে ততদিন তার সঙ্গ দেবে। তার উপকারে আসবে। কব