ইমাম ও ইমামতি পর্ব -5ম


ইমাম ও ইমামতি (৫ম পর্ব) আব্দুর রাকীব (মাদানী) মুক্তাদী সংক্রান্ত মাস্আলা-মাসাইলঃ যদিও আমাদের আলোচনা ইমাম ও ইমামতিকে কেন্দ্র করে কিন্তু যেহেতু মুক্তাদী ছাড়া ইমাম ধারণা করা যায় না অর্থাৎ ইমাম ও মুক্তাদী একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত তাই এ পর্যায়ে আমরা মুক্তাদীর মাস্আলা- মাসাইল নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। ১-মুক্তাদীগণ নামাযের উদ্দেশ্যে কখন কাতারবদ্ধ হবেন? নামায শুরু হওয়ার সময় ইমাম যদি মসজিদের ভিতরে পূর্ব থেকে অবস্থান না করেন; বরং তাঁর বাসস্থান থেকে এসে ইমামতির স্থানে দাঁড়ায় তবে (নামাযের সময় হয়ে গেলে) মুক্তাদীগণ ইমামকে মসজিদে আসতে দেখলেই নামাযে দাঁড়াবেন এবং মুয়াযযিন ইকামত দিবেন, যদিও এখনও ইমাম তাঁর ইমামতির স্থানে না পৌঁছে থাকেন। আবু হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, ‘নামাযের জন্যে ইকামত দেয়া হত, আর লোকেরা কাতারে অবস্থান নিত, নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্থানে অবস্থান নেয়ার পূর্বে’। [মুসলিম, মাসাজিদ অধ্যায়, নং ১৩৬৮] অবশ্য ইমাম তাঁর স্থানে অবস্থান নেয়ার সময়ও মুয়াযযিন ইকামত দিতে পারে, তাতে নিষেধের কিছু নেই। উল্লেখ থাকে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ফরয নামায সমূহের আগে ও পরের সুন্নতগুলি তাঁর গৃহেই আদায় করতেন। তাই তাঁর মসজিদে আসাটাই ফরয নামায শুরু করার সময় ও অনুমতি ধরে নেওয়া হত। আর যদি ইমাম মসজিদেই থাকেন, তাহলে তিনি যখন মুয়াযযিনকে অনুমতি দিবেন বা নামায আরম্ভ করার নির্ধারিত সময় হবে, তখন বাকি মুসাল্লীরা কাতারবদ্ধ হবেন। কিন্তু ঠিক ইকামতের কোন্ শব্দের সময় উপস্থিত মুসাল্লীরা কাতারবদ্ধ হওয়ার জন্য দাঁড়াবেন, তা নিয়ে কিছু মতামত পাওয়া যায়। কেউ বলেনঃ ইকামত শেষ হওয়ার সময় মুসাল্লীরা দাঁড়াবেন। কেউ বলেনঃ মুয়াযযিন যখন ‘‘ক্বাদ ক্বামাতিস্ স্বালাহ” বলবেন, তখন দাঁড়াবেন। কেউ বলেনঃ আল্লাহু আকবার বলার সময় দাঁড়াবেন। আসলে এ বিষয়ে বিভিন্ন দলীলের দিকে লক্ষ্য করলে বুঝা যায় যে, মুসাল্লীগণ ইমামকে ইমামতির স্থানে আসতে দেখলে, বা তাঁর স্থানে অবস্থান নিলে, মুয়াযযিন ইকামত দেওয়া শুরু করবেন এবং মুক্তাদীরা তাদের সাধ্যমত কাতারবদ্ধ হতে শুরু করবে, একটু আগে বা পরে হলে সমস্যার কিছু নেই, তবে নেকীর কাজে দ্রুতগামী হওয়াই বেশী ভাল। ইমাম মালেক (রহঃ) বলেনঃ ‘নামাযের ইকামতের সময় মুক্তাদীদের দাঁড়ানোর বিশেষ সময়সীমা সম্পর্কে আমি কিছু শুনিনি। তাই আমি লোকদের সাধ্যানুযায়ী এটা প্রজোয্য মনে করি; কারণ তাদের মধ্যে অনেকে ভারী শরীর-স্বাস্থ্যের লোক থাকেন আর অনেকে হাল্কা স্বাস্থ্যের’।[নায়লুল আউত্বার,৩/২৪৪] ২-ইমামের অনুসরণ করা মুক্তাদীদের অবশ্য কর্তব্য : নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “ ﺇﻧﻤﺎ ﺟُﻌﻞ ﺍﻹﻣﺎﻡُ ﻟﻴﺆﺗَﻢَّ ﺑﻪ، ﻓﺈﺫﺍ ﺻﻠﻰّ ﻗﺎﺋﻤﺎ ﻓﺼﻠﻮﺍ ﻗﻴﺎﻣﺎ، ﻓﺈﺫﺍ ﺭﻛﻊَ ﻓﺎﺭﻛﻌﻮﺍ، ﻭ ﺇﺫﺍ ﺭﻓﻊ ﻓﺎﺭﻓﻌﻮﺍ ” “ইমাম নির্ধারণ করা হয়, তার অনুসরণ করার জন্য, তাই যখন সে দাঁড়িয়ে নামায পড়বে, তখন তোমরাও দাঁড়িয়ে নামায পড়, যখন সে রুকূ করবে, তখন তোমরাও রুকূ করো আর যখন সে উঠবে, তখন তোমরাও উঠো” [বুখারী, আযান অধ্যায়, নং৬৮৯] ইমামের অনুসরণের ক্ষেত্রে মুক্তাদীদের অবস্থা চার ভাগে বিভক্তঃ ১-মুত্বাবাআ’হ বা অনুসরণঃ নামাযের কাজ সমূহ ইমামের পরে পরে করা; ইমামের সাথে সাথে নয়। এটাই সুন্নাত এবং মুক্তাদীগণ এমন করতেই আদিষ্ট, যা উপরের হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। ২-মুআফাকা’হ বা ইমামের সাথে সাথে করাঃ ইমামের সাথে সাথে করা আবার দুই ভাগে বিভক্ত। যথা: (১) নামাযের কর্ম বিষয়ক অংশগুলি তার সাথে সাথে সম্পাদন করা যেমন, ইমাম রুকূ করলে তার সাথে একই সময়ে রুকূ করা। (২) নামাযের কাউল বা বচন বিষয়ক অংশগুলি তার সাথে সাথে করা যেমন, ইমাম আল্লাহু আকবার বললে তার সাথে সাথে বরাবর সময়ে আল্লাহু আকবার বলা। বাচনিক বিষয়গুলিতে তাকবীরে তাহরীমা এবং সালাম ব্যতীত বাকি বিষয়গুলি ইমামের সাথে সাথে বা পরে করলে কোন সমস্যা নেই। উদাহরণ স্বরূপ, ইমামের রুকুতে ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আ’যীম’ বলার সময় মুক্তাদীর ইমামের আগে বা পরে কিংবা সাথে সাথে তা বললে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু তকবীরে তাহরীমা ইমামের আগে হলে কিংবা ইমামের ‘আল্লাহু আকবার’ বলা শেষ হওয়ার পূর্বেই মুক্তাদীর তা বলা হলে নামায শুদ্ধ হবে না। এই ভাবে ইমামের সালামের সাথে সাথে সালাম ফিরালে উলামাগণ এমন করাকে মাকরূহ বলেছেন। আর মুক্তাদীদের নামাযের কর্ম বিষয়ক অংশগুলিতে ইমামের সাথে সাথে করা মাকরূহ। উদাহরণ স্বরূপ ইমাম যখন আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যান, তখন ইমামের সাথে সাথে মুক্তাদীর একই সময়ে ঝুকে রুকুতে যাওয়া। এটা ঠিক নয়। কারণ হাদীসে ইমামের পরে তা করতে আদেশ করা হয়েছে; সাথে সাথে নয়। ৩-তাখাল্লুফ্ বা ইমামের পরে দেরীতে করাঃ এটা দুই ভাগে বিভক্ত। যথা: (১) দেরীতে করায় ওজর থাকা, যেমন কোন মুক্তাদী কিয়াম অবস্থায় আছে অন্য দিকে ইমাম রুকুতে গেছেন কিন্তু সে ইমামের তাকবীর শুনতে পাই নি, যখন শুনতে পাচ্ছে তখন ইমাম সামিয়াল্লাহুলিমান্ হামিদাহ বলছেন। এমতাবস্থায় সেই মুক্তাদী তাৎক্ষণাত রুকু করবে এবং ইমামের বাকি কাজে অনুসরণ করবে; কারণ এখানে তার ওজর রয়েছে। (২) বিনা ওজরে দেরী করা, যেমন ইমাম রুকুতে গেছে আর মুক্তাদী দাঁড়িয়েই আছে। যখন ইমাম রুকু থেকে উঠছে, তখন সে রুকুতে যাচ্ছে। এই ভাবে অন্যান্য ক্ষেত্র। এমতাবস্থায় মুক্তাদী যদি নামাযের কোন রুকনকে জেনে-বুঝে ইমামের সেই রোকন শেষ হওয়ার পর করে, তাহলে তার নামায বাতিল হয়ে যাবে। ৪-মুসাবাক্বাহ বা ইমামের পূর্বে করাঃ যেমন ইমামের পূর্বে রুকূ/ সাজদা করা কিংবা ইমামের পূর্বে রুকূ/ সাজদা থেকে উঠা। যদি কেউ জেনে- বুঝে স্বেচ্ছায় এমন করে তাহলে তার নামায বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি অজ্ঞতা বশতঃ কিংবা ভুলে করে, তাহলে তার নামায শুদ্ধ। এমন আচরণকারীর জন্য কঠোর শাস্তির উল্লেখ করে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “সে ব্যক্তি কি ভয় করে না যে তার ইমামের পূর্বে নিজের মাথা উত্তলন করে, আল্লাহ তায়ালা চাইলে তার মাথাকে গাধার মাথায় পরিবর্তন করে দিবেন কিংবা তার আকৃতিকে গাধার আকৃতির ন্যায় করে দিবেন”। [বুখারী, আযান অধ্যায়, নং ৬৯১, মুসলিম, স্বালাত অধ্যায়ঃ নং ৪২৭] এ বিষয়ে একটি ফেকহী মুলনীতিও রয়েছে, ‘ইবাদতে ইচ্ছাকৃত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা, ইবাদতকে বাতিল করে দেয়’। [উপরোক্ত প্রকারগুলি বিস্তারিত দেখুন, আশ্ শারহুল মুমতী, ইবনু উসায়মীন, ৪/১৮০-১৯০] ৩- ইমামের পিছনে মুক্তাদীগণের সূরা ফাতিহা পাঠঃ এটি একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার সম্পর্কে আহলুস্ সুন্নাহ ওয়াল্ জামায়াতের উলামাগণ মতভেদ করেছেন। আমরা খুবই সংক্ষিপ্তাকারে এ স্থানে দলীল সহ তাঁদের মতামতের বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। ইমামের পিছনে মুক্তাদী হয়ে নামায আদায়কারীকে সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে কি না? এ বিষয়ে প্রধান তিনটি মত বিদ্যমান। যথা: ১ম মতঃ ইমামের পিছনে মুক্তাদী হয়ে নামায আদায়কারীকেও অবশ্যই সুরা ফাতেহা পাঠ করতে হবে। এই মতের প্রধান দলীলাদিঃ ক-নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ [ ﻻ ﺻﻼﺓَ ﻟﻤﻦ ﻟﻢ ﻳﻘﺮﺃ ﺑﻔﺎﺗﺤﺔ ﺍﻟﻜﺘﺎﺏ ] “তার নামায হয় না যে সূরা ফাতেহা পড়ে না”। [বুখারী, অধ্যায়, আযান, অনুচ্ছেদঃ প্রত্যেক নামাযে ইমাম ও মুক্তাদী সকলের প্রতি কিরাআত জরূরী, নং ৭৫৬] প্রমাণিত হয় যে, সূরা ফাতেহা ব্যতীত কোন নামাযই হয় না, চাই তা ফরয হোক বা নফল বা একা একা পড়া হোক বা ইমামের পিছনে; কারণ এখানে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণী ব্যাপকার্থ বোধক। খ-নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেনঃ [ ﻣَﻦ ﺻﻠّﻰ ﺻﻼﺓً ﻟﻢ ﻳﻘﺮﺃ ﻓﻴﻬﺎ ﺑﺄﻡّ ﺍﻟﻘﺮﺁﻥ ﻓﻬﻲ ﺧِﺪﺍﺝٌ ﺛﻼﺛﺎ ﻏﻴﺮ ﺗﻤﺎﻡ .] “যে ব্যক্তি এমন কোন নামায পড়ল, যাতে সে সূরা ফাতিহা পড়লো না, তাহলে সেই নামায অসম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ -অপূর্ণাঙ্গ”। [মুসলিম, অধ্যায়ঃ নামায, অনুচ্ছেদঃ প্রত্যেক রাকাআতে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব, নং৮৭৬] প্রমাণিত হল যে, সূরা ফাতেহা ছাড়া কোন নামাযই পূর্ণাঙ্গ নয়, চাই সে নামায একা পড়া হোক বা ইমামের সাথে। উল্লেখ্য যে, অসম্পূর্ণ শব্দটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাগীদের সাথে তিন বার বলেন। গ-একদা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাদের নিয়ে ফজরের নামায পড়ালেন। নামায শেষে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কে তার পিছনে কুরআন পড়ছে? কিংবা বললেনঃ তোমরা কি তোমাদের ইমামের পিছনে কিছু পড়ে থাক? তারা বললেনঃ হ্যাঁ, আল্লাহর রাসূল। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ সূরা ফাতিহা ব্যতীত এমনটি করো না; কারণ যে সূরা ফাহিতা পাঠ করে না তার নামাজ হয় না”। [আবু দাঊদ, নং ৮২৩, তিরমিযী, নামায অধ্যায়ঃ অনুচ্ছেদঃ ইমামের পিছনে কিরআত, নং ৩১০/আহমদ/হাকেম, সূত্র হাসান, দেখুন তুহফাতুল আহওয়াযী,২/১৯৩-১৯৪] প্রমাণিত হল যে, ইমামের পিছনে মুক্তাদীদের কেবল সূরা ফাতিহা পড়তে হবে; অন্য কিছু নয়। ২য় মতঃ ইমামের পিছনে মুক্তাদীদের কখনও সূরা ফাতিহা বা অন্য কোন সূরা পড়তে হবে না বরং চুপ থেকে ইমামের কিরাআত শুনতে হবে। এই মতের দলীলাদিঃ ক- আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ ( ﻭَ ﺇﺫﺍ ﻗُﺮِﺉَ ﺍﻟﻘﺮﺁﻥُ ﻓﺎﺳْﺘﻤِﻌﻮﺍ ﻟﻪ ﻭَ ﺃﻧﺼِﺘﻮﺍ ﻟﻌﻠﻜﻢ ﺗُﺮﺣﻤﻮﻥ ‏) ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ 204/ “যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ কর ও চুপ থাক।” [সূরা আরাফ/২০৪] বুঝা গেল, কুরআন পড়া হলে চুপ থেকে ভালভাবে শুনতে হবে। তাই ইমাম যেহেতু নামাযে কুরআন পড়েন, সেহেতু মুক্তাদীদের চুপ থেকে শুনতে হবে। কোন সূরা পড়া যাবে না। আপত্তিঃ (১) যদি এই আয়াতের মর্ম এই হয় যে, ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহাও পড়া যাবে না, তাহলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কেন বললেন যে, সূরা ফাতিহা ছাড়া কোন নামায হয় না বা তোমরা সূরা ফাতিহা ব্যতীত অন্য কিছু পড়বে না? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি তাহলে কুরআনের বিপরীত আদেশ দিলেন? (নাউযু বিল্লাহ।) আপত্তি (২) যদি এই আয়াতকে ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা না পড়ার দলীল ধরেও নেওয়া হয়, তাহলে যুহর ও আসর নামাযে যখন ইমাম চুপি চুপি কিরআত করেন, তখন তো মুক্তাদীরা কুরআন পাঠ শোনে না, এমতাবস্থায় তারা কী করবে? তাই এই আয়াত উপরোক্ত মতের পূর্ণাঙ্গ দলীল হয় না। খ-নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “যার ইমাম রয়েছে, তার ইমামের কিরাআত তার কিরাআত হিসাবে গণ্য হবে”। [ইবনু মাজাহ, অধ্যায়, ইকামাতুস স্বালাহ, নং৮৪০] বুঝা গেল, মুক্তাদীকে কোন কিছু পাঠের প্রয়োজন নেই। কারণ ইমামের কিরাআত করাটা তারও কিরাআত ধরা হবে। আপত্তিঃ (১) হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল- যয়ীফ। অবশ্য কেউ কেউ হাসান বলার চেষ্টা করেছেন। ইবনে হাজার (রহঃ) বলেনঃ এই হাদীসটি সকল হাদীস বিদ্বানদের নিকট যয়ীফ (দুর্বল) বলে পরিচিত। [ফাতহুল বারী,২/৩১৪, তালখীসুল হাবীর,১/৫৬৯] (২) এই রকম একটি দুর্বল হাদীসের মুকাবিলায় উপরোক্ত বুখারী, মুসলিম সহ অন্যান্য সুনান গ্রন্থের সহীহ হাদীসকে কিভাবে প্রত্যাখ্যান করা যায়? ৩য় মতঃ জেহরী অর্থাৎ যে সব নামাযে ইমাম সরবে সূরা পাঠ করেন (যেমন ফজর, মাগরিব ও ইশা) এসব নামাযে পড়তে হবে না কিন্তু যে সব নামাযে সূরা নিরবে পাঠ করা হয় (যেমন, যুহর ও আসর) তাতে পাঠ করা আবশ্যিক। এই মতের দলীলঃ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “যখন তোমরা নামায আদায় করবে, তখন কাতার সোজা করে নিবে, তোমাদের মধ্যে কেউ ইমামতি করবে, যখন সে তকবীর দিবে তখন তোমরাও দিবে ….. আর যখন সে পাঠ করবে, তখন তোমরা চুপ থাকবে”। [মুসলিম, স্বালাত অধ্যায়, স্বালাতে তাশাহ্হূদের বর্ণনা, নং ৪০৪/ নাসাঈ নং৯১২] আপত্তিঃ হাদীসটির সনদ সহীহ হলেও হাদীসের যেই অংশ থেকে এই মতের দলীল দেয়া হচ্ছে অর্থাৎ যখন সে পাঠ করবে, তখন তোমরা চুপ থাকবে সেই অংশটিকে উঁচু পর্যায়ের মুহাদ্দিসগণের অনেকেই গাইর মাহফূয (অসংরক্ষিত) বলেছেন। যেমন ইমাম বুখারী, ইয়াহইয়া বিন মাঈন, আবু দাঊদ, আবু হাতিম, হাকেম, দারা কুত্বনী, ইবনু খুযাইমাহ, হাফেয আবু আলী নীসাপূরী, বায়হাক্বী, ইমাম নবভী প্রমুখ। [দেখুন, তাহকীকুল কালাম, সাহেবে তুহফা, ২/৮৭] ইমাম নবভী বলেনঃ ‘এই বাক্যটির দুর্বল হওয়ার ব্যাপারে হাদীসের পণ্ডিতদের একমত হওয়া মুসলিমের সিহ্হাতের উপর প্রধান্য পাবে। বিশেষ করে যখন তিনি তাঁর সহীহ মুসলিমে বর্ণনাটি মুসনাদাকারে বর্ণনা করেন নি’। [শারহু মুসলিম, নভবী, ৪/১২৮, রিয়াদে ছাপা] উল্লেখ্য, হাদীস বিশারদদের নিকট গাইর মাহফূয বাক্য যয়ীফ হওয়ার কারণে অগ্রহণীয়। তাই এই অংশ দলীল যোগ্য নয়। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতঃ প্রথম মত। অর্থাৎ মুক্তাদীদেরকে ইমামের পিছনে অবশ্যই সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে। আর ফাতিহার পর ইমাম যা পাঠ করবেন তা শুনতে হবে। কারণঃ ১- প্রথম মতের দলীলগুলো বেশী স্পষ্ট ও বেশী শুদ্ধ। তাই দলীলের বিবেচনায় ১ম মত প্রাধান্যযোগ্য। ২-“যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ কর ও চুপ থাক।” [সূরা আরাফ/২০৪] এবং ‘যখন ইমাম পাঠ করবে তখন তোমরা চুপ থাক’ এদুটি সূরা ফাতিহা সহ বাকি কুরআনের ক্ষেত্রে আম বা ব্যাপক আদেশ যা, ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পড়ার দলীল দ্বারা নির্দিষ্ট বা খাস করা হবে। যেন উভয় মতের দলীলাদির প্রতি আমল করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ কুরআন পড়াকালে চুপ থেকে শোনা সাধারণ সময়ের জন্য প্রযোজ্য হবে এমনকি নামাযের সময়ে সূরা ফাতিহার অতিরিক্ত কিরাআতের জন্য প্রযোজ্য হবে কিন্তু সূরা ফাতিহা পাঠকালে তা প্রযোজ্য হবে না বরং মুক্তাদীরাও তা পাঠ করবে। ৩-যে সব দলীলে ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা না পড়ার কথা এসেছে, সে সব দলীলের অর্থ হবে উচ্চ স্বরে পড়া নিষেধ। কারণ উচ্চ স্বরে পড়লে ইমামের কিরাআতে বিঘ্ন ঘটে কিন্তু নিরবে পড়লে তা হয় না। তাই যখন সাহাবী আবু হুরায়রা (রাযিঃ) কে ইমামের পিছনে থাকলে কি করবো প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি বলেনঃ “মনে মনে পড়ে নিবে।” [ মুসলিম, নামায অধ্যায়, অনুচ্ছেদঃ প্রত্যেক রাকাআতে কিরাআত জরূরী] ৪- ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ের সশব্দে আমীন বলাঃ জাহরী তথা সশব্দিক নামাযে ইমাম যখন আমীন বলবেন তার পর মুক্তাদীদেরকেও জোর শব্দে আমীন বলতে হবে। “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ যখন ইমাম আমীন বলবে তখন তোমরাও আমীন বলো; কেননা যার আমীন ফেরেশতাদের আমীনের সাথে খাপ খেয়ে যাবে, তার বিগত পাপ ক্ষমা করা হবে”। ইবনু শিহাব বলেনঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আ— মীন বলতেন। [আ টেনে বলতেন] [বুখারী ও মুসলিম, বুখারী, আযান অধ্যায়ঃ নং ৭৮০] উপরের হাদীসে যেমন ইমাম ও মুক্তাদী উভয়ের আমীন বলা প্রমাণিত হয়, তেমন উভয়ের তা জোরে বলাও প্রমাণিত হয় কারণ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আদেশ যে, যখন ইমাম আমীন বলবে, তখন তোমরাও বলবে। অর্থাৎ যখন তোমরা ইমামের আমীন বলা শুনতে পাবে নচেৎ সির্রী বা নিরব নামাযে ইমাম কখন আমীন বলে তা শোনা অসম্ভব। আর ইমাম জোরে আমীন বললে মুক্তাদীকেও জোরে বলতে হবে। এমন নয় যে ইমাম জোরে বলবে আর মুক্তাদীরা নিরবে। ওয়ায়েল বিন হুজ্ র হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ “আমি নবীজীকে পড়তে শুনেছি, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়লেনঃ (গায়রিল মাগ্ যূবি আলাইহিম্ ওয়া লায্ যা-ল্লীন) এবং বললেনঃ আমীন। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর শব্দকে টেনে পড়লেন”। [তিরমিযী, নামায অধ্যায়, অনুচ্ছেদ আমীন প্রসঙ্গ/আবু দাঊদ, আহমদ, বায়হাক্বী] ৫- ইমামের ভুল হলে মুক্তাদীদের সংকেত দেওয়াঃ ইমামের ভুল হওয়া মানবীয় স্বভাব। তাই তার ভুল হলে মুক্তাদীগণ তার ভুলের সংকেত দিবে। যেন সে তার ভুল বুঝতে পারে ও তা শুধরে নেয়। যেমন ইমাম তিন রাকাআত বিশিষ্ট নামাযে যদি চার রাকাআতের জন্য উঠে কিংবা ৩ বা ৪ রাকাআত বিশিষ্ট নামাযে প্রথম তাশাহহুদ শেষে বসে থাকে… ইত্যাদি। এ সম্পর্কে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “নামাযে কারো কিছু ঘটলে সে যেন তাসবীহ পড়ে (সুব্হানাল্লাহ বলে)। কেননা যখন সুবহানাল্লাহ বলা হবে, তখন সে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ দিবে। আর তালি দেয়া কেবল মহিলাদের জন্য”। [বুখারী, আযান অধ্যায়, নং৬৮৪] তবে ইমাম যদি ভুলে চার রাকাআত বিশিষ্ট নামাযে পঞ্চম রাকাআতের জন্য উঠে দাঁড়ান কিংবা দুই রাকাআত বিশিষ্ট নামাযে তৃতীয় রাকাআতের জন্য কিংবা তিন রাকাআত বিশিষ্ট নামাযে চতুর্থ রাকাআতের জন্য দাঁড়িয়ে যান আর পিছনে তাসবীহ বলার পরেও তিনি না ফিরেন এমতবস্থায় সেই মুক্তাদী কি করবে? কারণ, এটা নিশ্চিত যে তার ইমাম নির্ধারিত রাকাআতের অতিরিক্ত পড়াচ্ছেন। এমন সময় সেই মুক্তাদী ইমামের সাথে অতিরিক্ত রাকায়াত আদায় না করে বসে তাশাহ্হুদের দুআ-যিকর পাঠ করবে এবং ইমাম যখন অতিরিক্ত রাকাআত শেষে সালাম ফিরাবেন, তখন সেও তাদের সাথে সালাম ফিরাবে। কারণ জেনে-বুঝে স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত রাকাআত পড়লে নামায বাতিল হয়ে যাবে। [সউদী স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড,৭/১৩৭, ফতোয়া নং ৯৫২৬] এই ভাবে ইমাম যদি জানতে পারে যে, সে অতিরিক্ত রাকাআতের জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে কিংবা তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তার জন্য জরুরি যে, তিনি সেই রাকাআত না পড়ে বসে পড়বেন। [সউদী স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড, ফতোয়া নং১৭১৫৮] ৫- ইমামের ফাতিহা কিংবা অন্য কিরাআতে ভুল হলে স্মরণ করিয়ে দেওয়াঃ ইমাম যদি কোন আয়াত ভুল পড়ে, তাহলে তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া বৈধ। [সউদী স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড,৬/৩৯৯] তবে বহু ইসলামী বিদ্বানের মতে ফাতেহার ক্ষেত্রে তা ওয়াজিব আর অন্য তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে তা মুস্তাহাব। [মাজমূ, নবভী, ৪/২৩৯] নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একদা নামায পড়ান এবং সেই নামাযে কিরাআতের সময় তাঁর জটিলতা সৃষ্টি হয়, নামায শেষে তিনি উবাই বিন কাআব (রাযিঃ) কে বললেনঃ তুমি আমাদের সাথে নামাযে ছিলে? সে বললঃ হ্যাঁ। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তাহলে তোমাকে কি নিষেধ করলো? (অর্থাৎ স্মরণ করিয়ে দিতে কিসে বাধা দিল?) [আবু দাঊদ, নামায অধ্যায়, অনুচ্ছেদঃ ইমামকে লোকমা দেওয়া] ৬- মুক্তাদীদের ভুল-ত্রুটিঃ • প্রথম কাতার কিংবা সামনের কাতার পূরোন না করেই আলাদা কাতার বানানো । [সহীহ ইবনু মাজাহ, নং৮১৪] • প্রথমকাতারে দাঁড়াতে অলসতা করা। অথচ প্রথম কাতারের ফযীলত জানলে তারা পরষ্পরে লটারি করতে হলেও করতো। [বুখারী, নং২৫৪৩] • কাতার সোজা না করা বরং বাঁকা থাকা সত্ত্বেও নামায শুরু করে দেওয়া। [মুসলিম নং৪৩২] • বিনা ওজরে একাই এক কাতারে নামায আদায় করা। (এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা আগামীতে আসবে, ইনশাআল্লাহ) • (একান্ত প্রয়োজন ছাড়া) খুঁটি তথা পিলারের মাঝে কাতার তৈরি করা; অথচ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা নিষেধ করেছেন। [সহীহ ইবনে মাজাহ, নং৮২১] • নামাযের কাজগুলি ইমামের পূর্বে কিংবা তার সাথে সাথে করা। [ইতিপূর্বে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে) • ইমামের পিছনে জ্ঞানী ও বড়দের অবস্থান না করা; অথচ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “তোমাদের জ্ঞানবান ও সাবালোকরা যেন আমার নিকটে থাকে, অতঃপর তার পরের স্তরের লোকেরা, অতঃপর তার পরের স্তরের লোকেরা”। [মুসলিম, নং ৯৭৩] (চলবে ইনশাআল্লাহ) লেখক: আব্দুর রাকীব (মাদানী) দাঈ, দাওয়াহ সেন্টার খাফজী, সউদী আরব। Email- a.raquib1977@yaohoo.com সম্পাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s