কসর ও জমা করে সালাত আদায় সম্পর্কেকিছু বিধান


কসর ও জমা করে সালাত আদায় সম্পর্কেকিছু বিধানআলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর প্রশংসা ও নবীসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরদুরূদ পাঠের পর আজকের আলোচনা শুরু করছি।ইবাদতের ব্যাপারে একটি মৌলিক নীতিহচ্ছে, প্রতিটি ইবাদতের জন্যশরী‘আতপ্রবর্তক আল্লাহ তা‘আলা একটিনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন যাসে সময়েই আদায় করতে হয়, যদি না সেটাকেতার সময় থেকে বিশেষ আবশ্যকতা বাপ্রয়োজনের কারণে বের করে অন্য সময়েকরার ব্যাপারে দলীল-প্রমাণাদি পাওয়াযায়।আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴿ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻫُﻢۡ ﻋَﻦ ﺻَﻠَﺎﺗِﻬِﻢۡ ﺳَﺎﻫُﻮﻥَ ٥ ﴾ ‏[ﺍﻟﻤﺎﻋﻮﻥ : ٥ ]“যারা তাদের সালাত সম্পর্কে বেখবর” [সূরাআল-মা‘উন, ৫] অর্থাৎ তারা সালাতকে তারসময় থেকে পিছিয়ে দেয়।অনুরূপভাবে বুখারী, মুসলিম, সুনানগ্রন্থকারগণ, মালেক এবং আহমাদ সহঅন্যান্যগণ আবদুল্লাহ ইবন মাসউদরাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন,তিনি বলেন,ﺳَﺄَﻟْﺖُ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﺃَﻯُّ ﺍﻟْﻌَﻤَﻞِﺃَﻓْﻀَﻞُ ؟ ﻗَﺎﻝَ : ‏« ﺍﻟﺼَّﻼَﺓُ ﻟِﻮَﻗْﺘِﻬَﺎ ‏» .“আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, কোনকাজটি সর্বোত্তম? রাসূল বললেন, সময়মতসালাত আদায় করা”।কিন্তু হাদীসের দলীল দ্বারাই আবার যে সবরুখসত বা ছাড় দেওয়া হয়েছে তন্মধ্যে অন্যতমহচ্ছে দু’ সালাতকে জমা করে এক সালাতেরসময়ে আদায় করা।আর এ জমা করা যোহর ও আসরের মাঝে হয়েথাকে। সুতরাং যোহরকে দেরী করে আসরেরসময়ে নিয়ে যাওয়া অথবা আসরকে এগিয়েনিয়ে এসে যোহরের সময়ে আদায় করার ছাড়শরী‘আত আমাদেরকে দিয়েছে।অনুরূপভাবে এ জমা করার সুযোগ রয়েছেমাগরিব ও ইশার মাঝে, সুতরাং মাগরিবকেদেরী করে ইশার সময়ে নিয়ে গিয়ে দু’টোকেআদায় করা, অথবা ইশাকে এগিয়ে নিয়ে এসেমাগরিবের সময়ে মাগরিবের পরেই আদায়করে নেওয়ার সুযোগ ইসলামী শরী‘আতআমাদেরকে দিয়েছে।কিন্তু ফজরের সালাত, আলেমগণের ঐকমত্যেতাকে এগিয়ে নেওয়া কিংবা পিছিয়েদেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।বস্তুত: সফর অবস্থায় দু’সালাত জমা করেআদায় করার মাসআলাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ।অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করে থাকে;অনেকেই আবার এর অনেক মাসআলা সম্পর্কেসম্যক ধারণা রাখে না, অথচ বিষয়টিরপ্রয়োজন অনস্বীকার্য। তাই এখানে এ বিষয়েকিছু মাসআলার অবতারণা করার প্রয়াসপাবো।প্রথমেই এটা জানা দরকার যে, মহানআল্লাহর রহমত, তিনি মুসাফিরের জন্যসালাত জমা তথা একত্র করা বিধিবদ্ধকরেছেন। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ওছাড়। কারণ মুসাফির এমন কিছু অবস্থা ওপরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন যাতেপ্রতিটি সালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়েআদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে।আলেমগণ এ ব্যাপারে ইজমা‘ বা ঐকমত্যপোষণ করেছেন যে আরাফার দিন যোহর ওআসরকে এগিয়ে নিয়ে যোহরের সময়ে জমাকরে আদায় করা শরী‘আতসম্মত। অনুরূপভাবেতারা এ ব্যাপারেও একমত পোষণ করেছেনযে, আরাফার দিন সূর্য ডুবার পর নাহরেররাতে মুযদালিফায় মাগরিব এবং ‘ইশা একত্রকরে ইশার সময়ে পড়া শরী‘আতসম্মত। [দেখুন,আল-ইজমা‘ ইবনুল মুনযির, পৃ. ৩৮; মারাতিবুলইজমা‘ পৃ. ৪৫] তবে এর বাইরে অন্য সময়েসালাত একত্রে আদায় করার ব্যাপারেআলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।সালাত একত্র করে পড়ার বিধানআলেমগণ সফরের কারণে দু’সালাত একত্রেআদায় করার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন:১. অধিকাংশ আলেম যেমন মালেকী,শাফেয়ী, হাম্বলীগণ এ মত পোষণ করেছেনযে, সফরের কারণে যোহর এবং আসরঅনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার সালাতকেএকত্রে আদায় করা জায়েয। [আশ-শারহুলকাবীর, ১/৩৬৮; মুগনিল মুহতাজ, ১/৫২৯,কাশশাফুল কিনা‘, ২/৫] ২. হানাফী আলেমগণবলেন, আরাফা ও মুযদালিফা ব্যতীত দু’ ফরযসালাতকে একত্র করে আদায় করা যাবে না।তবে আকৃতিগতভাবে একত্রিত করা যাবে, আরতা হচ্ছে যোহরকে তার শেষ সময় পর্যন্তদেরী করে আদায় করা তারপর আসরকে তারপ্রথম ওয়াক্তে আদায় করা। [আদ-দুররুল মুখতারওয়া হাশিয়া ইবন আবেদীন, ১/৩৮১]প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত:জামহূর তথা অধিকাংশ আলেমগণের মতটিএখানে বিশুদ্ধ। কারণ; এর উপর দলীলপ্রমাণাদি রয়েছে; তন্মধ্যে:১- আরাফার দিন ও মুযদালিফার রাতেসকলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে দু’সালাতকেএকত্রিত করে পড়া জায়েয হওয়া। আর তারাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম থেকে অকাট্যভাবে সাব্যস্তহওয়া। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে জাবেররাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসসহঅন্যান্য হাদীসে। [মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮]২- অসংখ্য হাদীসে বর্ণনা এসেছে যে, নবীসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁরবিভিন্ন সফরে একত্রে সালাত আদায়করেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম হাদীস হচ্ছে:• আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাবর্ণিত হাদীস,“ ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﺠﻤﻊ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﺇﺫﺍ ﺟﺪّ ﺑﻪ ﺍﻟﺴﻴﺮ ”“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামমাগরিব ও ইশার সালাতকে একসময়ে পড়তেন,যখন সফর চলমান হতো”। [বুখারী, ১০৫৫; মুসলিম,৭০৩] • সাঈদ ইবন জুবাইর রহ. বলেন, ইবনআব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন,“ ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺟﻤﻊ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﺼﻼﺓﻓﻲ ﺳﻔﺮﺓ ﺳﺎﻓﺮﻫﺎ ﻓﻲ ﻏﺰﻭﺓ ﺗﺒﻮﻙ، ﻓﺠﻤﻊ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﻈﻬﺮﻭﺍﻟﻌﺼﺮ، ﻭﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ .” ﻗﺎﻝ ﺳﻌﻴﺪ : ﻓﻘﻠﺖ ﻻﺑﻦﻋﺒﺎﺱ : ﻣﺎ ﺣﻤﻠﻪ ﻋﻠﻰ ﺫﻟﻚ، ﻗﺎﻝ : ﺃﺭﺍﺩ ﺃﻥ ﻻ ﻳﺤﺮﺝ ﺃﻣﺘﻪ“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধের এক সফরেসালাতকে জমা (একত্রিত) করে আদায়করেছেন। সুতরাং তিনি যোহর ও আসর এবংমাগরিব ও ইশাকে একত্র করে আদায়করেছেন। সা‘ঈদ বলেন, তখন আমি ইবন আব্বাসরাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে জিজ্ঞেস করলাম,তাকে একাজ করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করল?তিনি বললেন, তিনি চেয়েছেন তাঁর উম্মতযেন সংকীর্ণতায় না ভোগে।” [মুসলিম, ৭০৫]বস্তুত সালাতকে একত্রে পড়ার বিধানেরদ্বারা ইসলামের সহজ হওয়া এবং মহানুভবতারপ্রমাণ। জমা করার হাদীসগুলোকে প্রতিটিসালাত তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করারপক্ষে আগত দলীল দ্বারা পরিত্যাগ করারকোনো কারণ নেই। কারণ সফর অবস্থায়সালাত একত্রে আদায় করা সাধারণমূলনীতির বিপরীতে একটি প্রমাণিত পদ্ধতি।তাছাড়া তখন উভয় সময় সালাত আদায়েরসময়ে পরিণত হয়ে যায়।• সালাত একত্রে আদায় করা রুখসত বা ছাড়তবে তা স্থায়ী নিয়ম নয়:ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, জমা তথাসালাতকে একত্রিত করে আদায় করা সাধারণনিয়মের পর্যায়ে নয় যেমনটি অনেক মুসাফিরমনে করে থাকে যে সফরের নিয়ম হচ্ছেএকত্রিত করা, ওযর থাকুক বা না থাকুক। বরংসফরে জমা তথা একত্র করে আদায় করাহচ্ছে রুখসত বা ছাড়। আর সফরে কসর করাহচ্ছে স্থায়ী নিয়ম-নীতি। সুতরাং সেহিসেবে বলা যায় যে, মুসাফিরের জন্যস্থায়ী নিয়ম হচ্ছে চার রাকা‘আত সালাতকেদু’রাকা‘আত আদায় করা, সেখানে ওযর থাকুকবা না থাকুক। পক্ষান্তরে দু নামাযকেএকত্রিত করে আদায় করার বিধানপ্রয়োজনের তাগিদে এবং রুখসত বা ছাড়হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এটা এক ধরনেরঅপরটি অন্য ধরনের। [আল-ওয়াবিলুস সাইয়্যেব,পৃ. ১৪] আর এজন্য মালেকী মাযহাবেরলোকদের মতে সফরে দু’ সালাত একত্রেআদায় করা উত্তমের বিপরীত; কারণ প্রত্যেকসালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিতকরাই হচ্ছে উত্তম। তাই উত্তম হচ্ছে তা নাকরা। যদি তা করা মাকরূহ নয়। মালেকীমাযহাবের লোকগণ এটাকে ‘জাওয়াযমুস্তাওয়ীত ত্বারফাইন’ বা এমন জায়েয যারউভয় দিক সমান, এ নামে নামকরণ করে থাকে।[মিনাহুল জালীল, ১/৪১৬; শারহুল খুরাশী, ২/৬৭]পক্ষান্তরে হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণেরমতে, জমা করা মুস্তাহাব নয়, বরং ত্যাগ করাইউত্তম।জমা বা একত্রিত করে আদায় করার নিয়তথাকা কী যরূরী?অর্থাৎ জমা বা একত্রিত করে আদায় করারজন্য প্রথম সালাত আদায়ের সময়েই জমা করেপড়ার নিয়্যত থাকা যরুরী?আলেমগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কয়েকটি মতরয়েছে:• শাফে‘ঈ ও হাম্বলীদের নিকট যদি দ্বিতীয়সালাতকে এগিয়ে নিয়ে এসে প্রথম ওয়াক্তেদু’সালাতকে একত্রে পড়ে তবে সেখানেদ্বিতীয় সালাতকে আদায় করার নিয়্যত প্রথমসালাত আদায়ের সময়েই থাকতে হবে। অবশ্যযদি প্রথম সালাতকে দেরী করে দ্বিতীয়সালাতের সময়ে নিয়ে যায় তখন প্রথম সালাতআদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে একত্রিতকরার নিয়্যত লাগবে না।সে হিসেবে যদি প্রথম সালাত আদায় করারসময় দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আদায়করার নিয়্যত না করে তবে তার জমা বাএকত্রিত করে আদায় করা শুদ্ধ হবে না।[রাওদাতুত তালেবীন, ১/৩৯৬; কাশশাফুলকিনা‘ ২/৮] কারণ কখনও কখনও দ্বিতীয়সালাতকে প্রথম সালাতের সময়ে আদায় করাহয় একত্রিত করার জন্য, আবার কখনও তা করাহতে পারে ভুলবশতঃ। সুতরাং এতদোভয়েরমধ্যে পার্থক্য করার জন্য নিয়্যতের প্রয়োজনঅবশ্যম্ভাবী।• পক্ষান্তরে মালেকী মাযহাবেরআলেমগণের মতে, প্রথম সালাত আদায় করারসময়ে দ্বিতীয় সালাতকে তার সাথে জমাকরার নিয়্যত করা ওয়াজিব কিন্তু শর্ত নয়।(আর তা দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়েআসা বা প্রথম সালাতকে দেরীতে আদায়করা উভয় ক্ষেত্রেই সমান) সুতরাং যদি কেউপ্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয়সালাতকে জমা নিয়্যত করা ছেড়ে দিল, তবেতাতে সালাত বাতিল হবে না। [হাশিয়াতুলআদাওয়ী (১/৩৩৫)] • আর এক বর্ণনায় ইমামআহমাদ, ইমাম মুযানী এবং ইবন তাইমিয়্যাহবলেন, প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয়সালাত তার সাথে একত্রিত করার নিয়্যতেরবাধ্য-বাধকতা নেই। [আল-মুহাযযাব, (১/১৯৭);আল-ইনসাফ:২/৩৪১] ইবন তাইমিয়্যা রহ. বলেন,‘নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনতাঁর সাথীদের নিয়ে দু’ সালাত জমা ও কসরকরে আদায় করছিলেন তখন তিনি তারসাথীদের কাউকে জমা ও কসর করার নিয়্যতকরার জন্য আলাদা নির্দেশনা দেন নি। বরংতিনি মদীনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে বেরহয়েছেন এ পুরো সময় তিনি দু’ রাকাআত কসরকরেছেন কোনোরূপ জমা করা ব্যতীতই।তারপর তিনি আরাফায় যোহর আদায় করেছেনতখন তিনি সাহাবীগণকে জানিয়ে দেন নিযে, তিনি এর পরেই আসরকে আদায় করেনিতে চান। কিন্তু তিনি আসরও আদায় করলেনআর সাহাবীগণেরও কেউই যোহরেরসালাতের পূর্বে আসরকে তার সাথে পড়ারনিয়্যত করেন নি। [মাজমু‘ ফাতাওয়া: ২৪/৫০]সুতরাং এটাই হচ্ছে প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত।কারণ প্রথম সালাতের সময় দ্বিতীয়সালাতকে তার সাথে আদায় করার নিয়্যতকরার বাধ্য-বাধকতার কোনো দলীল পাওয়াযাচ্ছে না, বরং দলীল তার উল্টোটাই প্রমাণকরে।• জমা করার সময়ের ব্যাপকতা:বস্তু জমা করে সালাত আদায় করার বিধানটিদেওয়া হয়েছে মুসলিমদের উপর রুখসত বা ছাড়ও মহানুভবতার জন্য। সুতরাং প্রথম সালাতেরশুরু থেকে এ জমা করার সময় দ্বিতীয়সালাতের শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ হবে।ইবন তাইমিয়্যা বলেন, সালাতের সময় সাধারণঅবস্থায় পাঁচটি, আর ওযর ও প্রয়োজনের সময়তার সময় তিনটি। কারণ আল্লাহ তা‘আলাবলেন,﴿ ﺃَﻗِﻢِ ﭐﻟﺼَّﻠَﻮٰﺓَ ﻟِﺪُﻟُﻮﻙِ ﭐﻟﺸَّﻤۡﺲِ ﺇِﻟَﻰٰ ﻏَﺴَﻖِ ﭐﻟَّﻴۡﻞِ ﻭَﻗُﺮۡﺀَﺍﻥَﭐﻟۡﻔَﺠۡﺮِۖ﴾ ‏[ ﺍﻻﺳﺮﺍﺀ : ٧٨ ] “তোমরা সালাত আদায়করো সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে রাতেরঅন্ধকার হওয়া পর্যন্ত এবং ফজরের কুরআনপাঠ”। [সূরা বনী ইসরাঈল, ৭৮] আর নিয়মনীতিওএভাবে চলে এসেছে যে ওযরের সময় এওয়াক্তগুলোতেই আদায় করত হয়, আর তাইযোহর ও আসরকে সূর্য হেলে যাওয়ার পরথেকে সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত পড়ার বৈধতারয়েছে। আর মাগরিব ও ইশাকে সূর্য ডুবেযাওয়ার পর থেকে সুবহে সাদিক উদিত হওয়াপর্যন্ত পড়া বৈধ। আর এটাই হচ্ছে দু’সালাতকে একত্রে আদায় করার বাস্তবতা।[ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহুল উমদা, পৃ. ২৩০-২৩১]আর তাই এটা প্রমাণিত হলো যে,– প্রথম সালাতটি আদায় করার সময় দ্বিতীয়সালাতটি তার সাথে জমা করার নিয়্যতথাকা জরুরী নয়। কারণ এর উপর কোনো দলীলনেই।– মুসাফিরের সালাতের সময় তিনটি, সূর্যহেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্য ডুবা পর্যন্তযোহর ও আসরের সময়। আর সূর্য ডুবার পরথেকে সুবহে সাদিক উদিত হওয়া পর্যন্তমাগরিব ও ইশার সময়। আর সুবহে সাদিক উদিতহওয়া থেকে শুরু করে সূর্য উঠা পর্যন্ত ফজরেরসময়।দু’ সালাত জমা করে আদায় করার জন্য কীসফরের অবস্থায় থাকা শর্ত?• সফর অবস্থায় জমা করার কথা যারাইবলেছেন, তারা সবাই এ ব্যাপারে একমত যে,জমা করা তখন জায়েয, যখন মুসাফিরসালাতের সময়ে সফরে ভ্রমণরত ও রাস্তাঅতিক্রমরত অবস্থায় থাকবেন।• কিন্তু মুসাফির কোনো শহরে অবস্থানরতঅবস্থায় যদি সালাত কসর আদায় করতেথাকেন তখনও কি তিনি দু’ সালাত জমা করেআদায় করতে পারবেন? এ ব্যাপারেআলেমগণের মধ্যে দু’টি মত রয়েছে:– ইমাম মালেক, কাযী আবু ইয়া‘লা আল-হাম্বলী, ইবনুল কাইয়্যেম এবং ইবনেতাইমিয়্যার কথা থেকে বুঝা যায় যে তাদেরমত হচ্ছে, দু’ সালাতকে জমা করা কেবলসফররত অবস্থাতেই জায়েয, সফরে কোথাওঅবস্থান করলে জায়েয নয়। [আল-মুদাওয়ানাহ১/২০৫, আল-মুবদি‘ ২/১২৫, আল-ওয়াবিলুসসাইয়্যিব পৃ. ১৪, মাজমূ ফাতাওয়া ২০/৩৬০,২২/২৯০] কারণ আবদুল্লাহ ইবন উমররাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বর্ণিত হাদীসে তা-ইএসেছে, তিনি বলেন,“ ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﺠﻤﻊ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﺇﺫﺍ ﺟﺪّ ﺑﻪ ﺍﻟﺴﻴﺮ ”“নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামমাগরিব ও ইশার সালাতকে একসময়ে পড়তেন,যখন সফর চলমান হতো”। [বুখারী, ১০৫৫; মুসলিম,৭০৩] – অন্যদিকে শাফে‘য়ী মাযহাবেরআলেমগণ এবং হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ,আর তার সাথে ইমাম মালেক এর একটি মতওরয়েছে, তাদের মতে, যে সফরে সালাত কসরকরে পড়া হয় সে সফরেই জমা করা জায়েয।সফর চলমান হোক কিংবা কোথাও অবস্থানকরে হোক। তবে সফরের বিধান থেকে বেরহয়নি এমন হতে হবে। এর বাইরে যতক্ষণ তাকেমুসাফির বলা হবে ততক্ষণই সে জমা করতেপারবে। [মুগনিল মুহতাজ ১/৫২৯; কাশশাফুলকিনা‘ ২/৫; আল-বায়ান ওয়াত তাহসীল১৮/১১০] ইবন কুদামা বলেন, যদি দু সালাতকেপ্রথম সালাতের সময়ে আদায় করতে চায় তবেতাও জায়েয, চাই কোথাও অবতরণকারীঅবস্থায় হোক বা সফর চলাকালীন অবস্থায়হোক অথবা এমন কোনো এলাকায়অবস্থানকারী হয় যেখানে অবস্থানেরকারণে সালাতকে কসর করে পড়তে বাধা হয়না। এর এটাই আতা ইবন আবি রাবাহ,অধিকাংশ আহলে মদীনা, শাফে‘ঈ, ইসহাক ওইবনুল মুনযিরের মত। [আল-মুগনী ২/২০১] বস্তুতএটাই প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত, এর সপক্ষে প্রমাণহচ্ছে:• মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুবর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন,“ ﺧﺮﺟﻨﺎ ﻣﻊ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻋﺎﻡ ﻏﺰﻭﺓﺗﺒﻮﻙ، ﻓﻜﺎﻥ ﻳﺠﻤﻊ ﺍﻟﺼﻼﺓ، ﻓﺼﻠﻰ ﺍﻟﻈﻬﺮ ﻭﺍﻟﻌﺼﺮ ﺟﻤﻴﻌًﺎ،ﻭﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﺟﻤﻴﻌًﺎ، ﺣﺘﻰ ﺇﺫﺍ ﻛﺎﻥ ﻳﻮﻣًﺎ ﺃﺧّﺮﺍﻟﺼﻼﺓ، ﺛﻢ ﺧﺮﺝ ﻓﺼﻠﻰ ﺍﻟﻈﻬﺮ ﻭﺍﻟﻌﺼﺮ ﺟﻤﻴﻌًﺎ، ﺛﻢ ﺩﺧﻞ،ﺛﻢ ﺧﺮﺝ ﺑﻌﺪ ﺫﻟﻚ، ﻓﺼﻠﻰ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﺟﻤﻴﻌًﺎ ”“আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামের সাথে তাবুকের যুদ্ধে বেরহলাম, রাসূল সালাতে জমা করতেন, সুতরাংতিনি যোহর ও আসরকে জমা করতেন, আবারমাগরিব ও ইশাকেও জমা করতেন। একদিনতিনি সালাত আদায়ে দেরী করলেন, সুতরাংতিনি যোহর ও আসরকে জমা করলেন, তারপরতিনি তার তাঁবুতে প্রবেশ করলেন, তারপরবেশ কিছু পরে বের হলেন অতঃপর মাগরিব ওইশাকে জমা করে আদায় করলেন। [মুসলিম,৭০৬] ইবন কুদামা বলেন, এ হাদীসটি তাদেরকথার উত্তরে স্পষ্ট দলীল ও শক্তিশালীপ্রমাণ, যারা বলে থাকেন যে দু’ সালাতকেবল তখনই জমা করা যাবে যখন কেউভ্রমণরত অবস্থায় থাকবে; কারণ এটা প্রমাণকরে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম ভ্রমণরত অবস্থা ছাড়াও যখনতিনি কোথাও অবতরণ করেছিলেন তখনওজমা করেছেন, তিনি তখন তাঁর তাঁবুতেঅবস্থান নিয়েছিলেন, সেখান থেকে তিনিবের হয়েছিলেন এবং দু’সালাতকে জমা করেআদায় করেছেন। তারপর আবার নিজেরতাঁবুতে ফিরে গিয়েছিলেন। আর এ হাদীসটিগ্রহণ করা সুনির্দিষ্ট। কারণ হাদীসটিসাব্যস্ত হয়েছে এবং বিধান প্রদানে তাসুস্পষ্ট আর তার বিপরীতে কোনো কিছু নেই।তাছাড়া জমা করা হচ্ছে সফরের রুখসত বাছাড়সমূহের একটি; সুতরাং তা কেবল ভ্রমণরতঅবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট হবে না,যেমনিভাবে কসর ও মাসেহ করার বিধানকেশুধু ভ্রমণরত অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট করাযায় না। তবে উত্তম হচ্ছে দেরী করার জমাকরা, (দ্বিতীয়টির ওয়াক্তে প্রথমটি ওদ্বিতীয়টি পড়া) কারণ এর মাধ্যমে জমাকরার ব্যাপারে মতভেদকারীদের মতভেদথেকে বের হওয়া যায় এবং সকল হাদীসেরউপরই আমল করা যায়।” [আল-মুগনী, ২/২০২]তারপরও মুসাফিরের উচিত নয় যে সে কোনোনগর বা শহরে অবতরণ করা অবস্থায় সালাতকেজমা করে আদায় করাকে তার অভ্যাসেপরিণত করে নিবে। বরং জমা তো তখনইকরবে যখন তার প্রয়োজন পড়বে এবং তারউপর প্রত্যেক সালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়েআদায় করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে।সুতরাং বুঝা গেল যে,– যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ইশারসালাতকে জমা করে আদায় করা আল্লাহরপক্ষ থেকে মুসাফিরের জন্য রুখসত বা ছাড়এবং সহজীকরণ আর তা আল্লাহ তা‘আলারপক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ।– জমা করা হচ্ছে রুখসত বা ছাড়; যা মুসাফিরতার প্রয়োজনে কাজে লাগাবে তবে তা এমনসাধারণ নিয়ম নয় যা সর্বদা করতে হবে।– আলেমগণের প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত অনুযায়ীজমা করার সময় প্রথম সালাত আদায় করারসময়েই জমা করার নিয়্যত থাকা শর্ত নয়।যে সব কারণে দু’ সালাত জমা করা যায়যে সব কারণে জমা করার কথা হাদীসেরভাষ্যের উপর ভিত্তি করে আলেমগণ বলেছেনতা হচ্ছে, ভ্রমণ ও বৃষ্টি। তবে কোনো কোনোআলেম অন্যান্য কিছু বিষয়কে বৃষ্টি ওভ্রমণের অর্থে হওয়ার কারণে এবংব্যাপকার্থে সেগুলোর অধীন করে জমা করারকথা বলেছেন।• তন্মধ্যে বৃষ্টির ব্যাপারে হাদীসের নসহচ্ছে, যা বুখারী ও মুসলিম ইবন আব্বাসরাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন,ﺃﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺟﻤﻊ ﻓﻲ ﺍﻟﻤﺪﻳﻨﺔ ﺑﻴﻦﺍﻟﻈﻬﺮ ﻭﺍﻟﻌﺼﺮ ﻭﺑﻴﻦ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﻭﺯﺍﺩ ﻣﺴﻠﻢ ﻣﻦﻏﻴﺮ ﺧﻮﻑ ﻭﻻ ﻣﻄﺮ ﻭﻻ ﺳﻔﺮ ﻭ ﻭﻗﻊ ﻋﻨﺪ ﻣﺴﻠﻢ ﻓﻲ ﻫﺬﺍﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻣﻦ ﻃﺮﻳﻖ ﺳﻌﻴﺪ ﺑﻦ ﺟﺒﻴﺮ ﻗﺎﻝ : ﻓﻘﻠﺖ ﻻﺑﻦﻋﺒﺎﺱ ﻟﻢ ﻓﻌﻞ ﺫﻟﻚ ؟ ﻗﺎﻝ : ﺃﺭﺍﺩ ﺃﻥ ﻻ ﻳﺤﺮﺝ ﺃﺣﺪﺍ ﻣﻦﺃﻣﺘﻪ .“নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম মদীনাতে যোহর ও আসরেরসালাতকে এবং মাগরিব ও ইশার সালাতকেজমা করে অর্থাৎ একত্রে আদায় করেছেন”।মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, কোনো প্রকার ভয়বা বৃষ্টি বা সফর ব্যতীতই।মুসলিমের অপর বর্ণনায় সাঈদ ইবন জুবাইরথেকে এসেছে, তিনি বলেন, আমি ইবনআব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে জিজ্ঞেসকরলাম, কেনো রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম তা করলেন? উত্তরে তিনিবললেন, তিনি চেয়েছেন যেন তাঁর উম্মতেরকাউকে সমস্যায় পড়তে না হয়।• আর সফর সালাত জমা করার একটি কারণ,তার প্রমাণ, বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, ইবনউমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিতহাদীস,« ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺟﻤﻊ ﻓﻲ ﺣﺠﺔﺍﻟﻮﺩﺍﻉ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﺑﺎﻟﻤﺰﺩﻟﻔﺔ »“নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জের দিন মাগরিব ওইশাকে মুযদালিফায় জমা করে আদায়করেছেন।”শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহবলেন, ‘সালাতকে কসর করে পড়ার বিশেষকারণ হচ্ছে সফর। সফর ব্যতীত তা করাজায়েয নেই। কিন্তু জমা করে আদায় করা,তার কারণ হচ্ছে প্রয়োজন ও ওযর। সুতরাংযখনই তার প্রয়োজন হবে তখনই জমা করাযাবে সে সফর দীর্ঘ হোক কিংবাসংক্ষিপ্ত। অনুরূপভাবে বৃষ্টি ইত্যাদির জন্যজমা করে আদায় করার বিষয়টি। তদ্রূপ রোগ-ব্যাধি ও অনুরূপ কাজের জন্য জমা করা,তাছাড়া অন্য কারণেও জমা করে আদায় করাযাবে। কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য উম্মতের উপরথেকে সমস্যা নিরসণ করা। আর নবীসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেসফরে কোথাও (সাময়িক) অবস্থানকালে জমাকরেছেন বলে প্রমাণিত হয় নি তবে কেবলএকটি হাদীসে তা এসেছে। আর এ জন্যই জমাকরা জায়েয যারা বলেছেন যেমন মালেক,শাফে‘ঈ ও আহমদ তারা সফর অবস্থায় কোথাওসাময়িক অবস্থানকালে জমা করার ব্যাপারেমতভেদ করেছেন। তাদের মধ্য থেকে মালেকও আহমাদ এক বর্ণনায় তা থেকে নিষেধকরেছেন, আর শাফে‘ঈ ও আহমাদ অন্য বর্ণনায়তা জায়েয বলেছেন। অবশ্য আবু হানিফাআরাফা ও মুযদালিফা ছাড়া আর কোথাওজমা করতে নিষেধ করেছেন।সুতরাং সফররত মুসাফিরের জন্য (যিনিকোথাও সাময়িক অবস্থানকারী নন) দু’সালাত একত্রে জমা করে আদায় করারব্যাপারে (আবু হানিফা ব্যতীত) অন্যদেরকারও মতভেদ নেই। কারণ সফর হচ্ছেআযাবের একটি টুকরো; যেমনটি নবীসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকেবর্ণিত হয়েছে। আর দু’ সালাতকে জমা করেআদায় করার সুযোগ দানের মাধ্যমেসহজীকরণের দ্বারা মুসাফিরের সমস্যা দূরকরা হয়েছে। আর তা দীনে ইসলামের একটিসাধারণ নীতির অন্তর্গত, তা হচ্ছে এ উম্মতথেকে সমস্যা ও সংকীর্ণতা দূর করা হয়েছে।আর যেভাবে সফরে কসর করা শরীয়তনির্দেশিত পন্থা বরং সফর হচ্ছে কসর করারকারণ, তেমনিভাবে জমা করাও জায়েয।যদিও জমা করা হচ্ছে রুখসত বা ছাড় আর কসরহচ্ছে শরীয়তের বিধিবদ্ধ নির্দেশনা, তবুওউভয়টিই উক্ত সাধারণ নীতির অন্তর্ভুক্ত।তবে যে মুসাফির তার নিজের দেশ ছাড়াঅন্য কোথাও সাময়িক অবস্থান নিয়েছে,নিজের বাসস্থান নির্ধারণ না করে, বরংসেখানে প্রয়োজনের খাতিরে অবতরণকরেছে, তারপর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলেআবার তার সফর চালিয়ে যাবে, এমুসাফিরের জন্য কি দু’ সালাত একটির সময়েজমা করে আদায় করা যাবে এ ব্যাপারেআলেমগণ মতভেদ করেছেন। আবু হানিফা রহ.এর ধরনের জমা করাকে নিষেধ করেছেন।তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম কর্তৃক আরাফাহ ও মুযদালিফায়জমা করার বিষয়টিকে সে দু’ স্থানের সাথেবিশেষিত বলে প্রকাশ করেছেন। সুতরাং তারমতে অন্য কোথাও জমা করা যাবে না।আর শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ.বলেন, ‘আর যখন তা প্রমাণিত হলো, তখনদু’সালাতকে জমা বা একত্রিত করে আদায়করার বিষয়ে এটা বলা যায় যে, তার কারণহচ্ছে, নুসুক বা হাজ্জ যেমনটি হানাফীআলেমগণ এবং ইমাম আহমদের একদল সাথীবলে থাকেন। আর তা ইমাম আহমদের সরাসরিভাষ্যের দাবিও বটে। কারণ তিনি মক্কীহাজীকে আরাফার মাঠে কসর করতে নিষেধকরতেন কিন্তু তাকে জমা করতে নিষেধকরতেন না। তাছাড়া ইমাম আহমাদ মুসাফিরকর্তৃক সালাত জমা করে আদায় করারব্যাপারে বলেছেন যে, কসর করার মতই দীর্ঘসফরে জমা করবে। আর যদি বলা হয় যে,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম কর্তৃক জমা করার বিষয়টি ছিলহাজ্জের কারণে, তাহলে সেখানে দু’টি মতরয়েছে, এক. আরাফাহ্ ও মুজদালিফাহ্ ছাড়াকোথাও জমা করা যাবে না, যেমনটিহানাফীগণ বলেছেন। দুই. হাজ্জ ব্যতীত জমাকরার অন্যান্য কারণেও জমা করা যাবেযদিও সফর না হয়, আর তা হচ্ছে বাকী তিনইমামের মত।আর সত্য হচ্ছে,• যখন কেউ সফর-রত অরস্হায় থাকবে, তখন দুইসালাতকে এগিয়ে এনে বা পিছিয়ে নিয়েজমা করে আদায় করা যাবে।• অনুরূপভাবে যখন কেউ সফরে কোথাওসাময়িক অবস্হান করে সেখানেও যদি জমাকরে সালাত আদায় করার প্রয়োজন দেখাদেয় তবে তাও করবে। যাতে করে সমস্যা মুক্তহওয়া যায়।• তদ্রূপ মুকীম অবস্থা বা সফর ব্যতীত নিজজায়গায় অবস্হানকারী ব্যক্তিগণওপ্রয়োজনে দু’ সালাতকে জমা করে পড়তেপারেন।যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম প্রয়োজন থাকার কারণেইমুজদালিফায় জমা করেছিলেন। অথচপ্রয়োজন না থাকায় মীনায় তা করেননি।যদি প্রয়োজন না থাকলেও তা বৈধ হতোতবে রাসূল সেখানে তা করতেন, কারণ তাকরার চাহিদা ও দাবী তো ছিলই অর্থাৎতিনি সফরে ছিলেন। তারপরও তিনি তাকরেন নি, অর্থাৎ সফরে কোথাও অবতরণঅবস্থায় দু সালাত জমা করে আদায় করাকেরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম প্রয়োজন ও আবশ্যকতার সাথেসম্পৃক্ত করেছেন।মোটকথা: মুসাফির কোথাও সাময়িক অবস্থাননিলে সেখানে দু’সালাত জমা করার বিষয়টিপ্রয়োজন ও আবশ্যকতার সাথে সম্পৃক্ত,যেমনিভাবে এ জমা করার বিধান মুকীম বাস্থায়ী আবাসস্থলেও প্রয়োজনে করারবিধান শরী‘আতে রয়েছে। কিন্তু সফরে কসরকরার বিধান এর ব্যতিক্রম তা স্বাভাবিকনিয়ম, শুধু ছাড় নয়। আর এ জন্যই সফরে কসরকরা সর্বাবস্থায় নিয়মসিদ্ধ বিষয়, সফর চলতেথাকুক বা কোথাও সাময়িক অবস্থানে থাকুক।কারণ সাহাবীগণ থেকে তা প্রমাণিতহয়েছে, আর সেটা মারফূ‘ হাদীসেরঅন্তর্ভুক্ত, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু‘আনহু বলেন,« ﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟﺴَّﻔَﺮِ ﺭَﻛْﻌَﺘَﺎﻥِ ﻭَﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟْﺠُﻤُﻌَﺔ ﺭَﻛْﻌَﺘَﺎﻥِ ﻭَﺻَﻠَﺎﺓُﺍﻟْﺄَﺿْﺤَﻰ ﺭَﻛْﻌَﺘَﺎﻥِ ﻭَﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟْﻔِﻄْﺮِ ﺭَﻛْﻌَﺘَﺎﻥِ ﺗَﻤَﺎﻡٌ ﻏَﻴْﺮُ ﻗَﺼْﺮٍﻋَﻠَﻰ ﻟِﺴَﺎﻥِ ﻧَﺒِﻴِّﻜُﻢْ »“সফরের সালাত দু’ রাকা‘আত, ঈদুল আদহারসালাত দু’ রাকাআত, ঈদুল ফিতরের সালাত দু’রাকাআত, এগুলো তোমাদের নবীর মুখ নিঃসৃ্তপরিপূর্ণ সালাত, কসর সালাত নয়।”অনুরূপভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাবলেন,« ﺍﻟﺼَّﻠَﺎﺓُ ﺃَﻭَّﻝُ ﻣَﺎ ﻓُﺮِﺿَﺖْ ﺭَﻛْﻌَﺘَﻴْﻦِ ﻓَﺄُﻗِﺮَّﺕْ ﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟﺴَّﻔَﺮِﻭَﺃُﺗِﻤَّﺖْ ﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟْﺤَﻀَﺮِ »“সালাত যখন প্রথম ফরয হয়েছিল তখন দু’রাকা‘আতই ফরয হয়েছিল, অতঃপর সফরেরসালাতকে স্থির রাখা হয়েছে আরঅবস্থানের সালাতে পূর্ণতা আনা হয়েছে”।ইমাম যুহরী বলেন, আমি ‘উরওয়াকে বললাম,তবে যে আমি স্বয়ং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু‘আনহাকেই সফরে পূর্ণ সালাত আদায় করতেদেখেছি? তখন উরওয়া জবাবে বললেন,আয়েশা সে ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছেন যেব্যাখ্যার আশ্রয় উসমান নিয়েছেন (অর্থাৎতিনি হয়ত সেখানে অবস্থানের নিয়তকরেছেন)।তদ্রূপ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকেবর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,« ﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟﺴَّﻔَﺮِ ﺭَﻛْﻌَﺘَﺎﻥِ ﻣَﻦْ ﺧَﺎﻟَﻒَ ﺍﻟﺴُّﻨَّﺔَ ﻛَﻔَﺮَ »“সফরের সালাত দু’ রাকাআত, যে কেউসুন্নাতের বিরোধিতা করবে সে কাফের হয়েযাবে”।মুসাফিরের সালাত ও অন্যান্য বিধি-বিধাননিয়ে কিছু প্রশ্নোত্তরপ্রশ্ন- ১: কত দূরত্বের সফর করলে কেউমুসাফির বলে গণ্য হবে এবং সফরের রুখসতপেতে পারে?উত্তর: মানুষের দৃষ্টিতে যদি উদ্দেশ্যকৃতস্থানটি সফর হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে তাইতাকে মুসাফির বানাবে। আর তখনই সফরেরচারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সেচারটি বস্তু হচ্ছে:– কসর তথা চার রাকা‘আত বিশিষ্টসালাতকে কসর করে দু’ রাকা‘আত পড়া– জমা তথা দুই সালাতকে এগিয়ে নিয়েঅথবা পিছিয়ে নিয়ে যে কোনো একওয়াক্তে আদায় করা।– মোজার উপর মাসেহ করা, তিন-দিন তিন-রাত্রি পর্যন্ত।– রমযানের দিনের বেলায় সাওম ভঙ্গ করা।আর যদি স্থানটি সফরের দূরত্ব কী না এব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গীগত পার্থক্য দেখা দেয়,অথবা সন্দেহ হয়, তখন দূরত্বের দিকে খেয়ালকরতে হবে। তাই দেখতে হবে যদি তোমাদেরযাওয়ার স্থানটি তোমাদের সহর থেকে আশি(৮০) কিলোমিটারের অধিক হয়, তাহলেতোমরা মুসাফির বলে বিবেচিত হবে; আরতখন তোমরা উপরোক্ত চারটি রুখসতেরঅধিকারী হবে। অর্থাৎ দুই সালাতকে জমাকরার সুযোগ, চার রাকা‘আত বিশিষ্টসালাতকে দু’ রাকা‘আতে কসর করার সুযোগ,মোজার উপর তিন-দিন তিন রাত মাসেহ করারসুযোগ এবং রমযানের দিনের বেলায় সাওমভঙ্গ করার সুযোগ।আর সফর অবস্থায় কোথাও অবতরণ করলেওতোমরা জমা করা এবং ক