কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে রাতের সালাত


কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে রাতের সালাত

প্রথম অধ্যায়: তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল
 প্রথম: তাহাজ্জুদের আভিধানিক অর্থ:
আরবিতে বলা হয়: “هجد الرجل” লোকটি রাতে ঘুমিয়েছে। “هجد” রাতে সালাত আদায় করেছে। আর “المتهجِّد” হচ্ছে ঘুম থেকে উঠে সালাতে দণ্ডায়মান ব্যক্তি।[1]
 দ্বিতীয়: তাহাজ্জুদের হুকুম:
তাহাজ্জুদের সালাত সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ।[2] কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মতের ইজমা দ্বারা তা প্রমাণিত। আল্লাহ তা‘আলা রহমানের বান্দাদের গুণাগুণ সম্পর্কে বলেন:
﴿ وَٱلَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمۡ سُجَّدٗا وَقِيَٰمٗا ٦٤ ﴾ [الفرقان: ٦٤]
“আর যারা তাদের রবের জন্য সিজদারত ও ‎‎দণ্ডায়মান হয়ে রাত্রি যাপন করে”। [সূরা ফুরকান: (৬৪)]‎ অন্যত্র তিনি মুত্তাকীদের গুণাগুণ আলোচনায় বলেন:
﴿ كَانُواْ قَلِيلٗا مِّنَ ٱلَّيۡلِ مَا يَهۡجَعُونَ ١٧ وَبِٱلۡأَسۡحَارِ هُمۡ يَسۡتَغۡفِرُونَ ١٨ ﴾ [الذاريات: ١٧،  ١٨]
“রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাত। ‎আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত”। [সূরা যারিয়াত: (১৭-১৮)] আল্লাহ তা‘আলা পূর্ণ ইমানদার বান্দাদের সম্পর্কে বলেন:
﴿ تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمۡ عَنِ ٱلۡمَضَاجِعِ يَدۡعُونَ رَبَّهُمۡ خَوۡفٗا وَطَمَعٗا وَمِمَّا رَزَقۡنَٰهُمۡ يُنفِقُونَ ١٦ فَلَا تَعۡلَمُ نَفۡسٞ مَّآ أُخۡفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعۡيُنٖ جَزَآءَۢ بِمَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ١٧ ﴾ [السجدة : ١٦،  ١٧]
“তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়। তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। আর আমি তাদেরকে ‎‎যে রিযক দান করেছি, তা থেকে তারা ব্যয় করে।‎ অতঃপর কোন ব্যক্তি জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কি জিনিস লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তারা যা করত, তার ‎বিনিময়স্বরূপ”। [সূরা সেজদাহ: (১৬-১৭)‎] তিনি অন্যত্র বলেন:
﴿ يَتۡلُونَ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ ءَانَآءَ ٱلَّيۡلِ وَهُمۡ يَسۡجُدُونَ ١١٣ ﴾ [ال عمران: ١١٣]
“তারা ‎রাতের বেলায় আল্লাহর আয়াতসমূহ ‎তিলাওয়াত করে এবং তারা সিজদা করে”। [সূরা আলে-ইমরান: (১১৩)] তিনি আরো বলেন:
﴿ وَٱلۡمُسۡتَغۡفِرِينَ بِٱلۡأَسۡحَارِ ١٧ ﴾ [ال عمران: ١٧]
“এবং শেষ রাতে ক্ষমাপ্রার্থনাকারী”। [সূরা আলে-ইমরান: (১৭)]‎ আল্লাহ তা‘আলা সেসব পরিপূর্ণ মুমিনদের ইলম ও মর্যাদার উচ্চ শিখরে ভূষিত করেছেন, যারা রাতে সালাত আদায় করে। তিনি বলেন:
﴿ أَمَّنۡ هُوَ قَٰنِتٌ ءَانَآءَ ٱلَّيۡلِ سَاجِدٗا وَقَآئِمٗا يَحۡذَرُ ٱلۡأٓخِرَةَ وَيَرۡجُواْ رَحۡمَةَ رَبِّهِۦۗ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِي ٱلَّذِينَ يَعۡلَمُونَ وَٱلَّذِينَ لَا يَعۡلَمُونَۗ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ ٩ ﴾ [الزمر: ٩]
“‎যে ব্যক্তি রাতের প্রহরে সিজদাবনত হয়ে ও ‎‎দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ‎ভয় করে এবং তার রব-এর রহমত প্রত্যাশা ‎করে (সে কি তার সমান যে এরূপ করে না) ‎বল, ‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি ‎সমান?’ বিবেকবান লোকেরাই কেবল ‎উপদেশ গ্রহণ করে”। [সূরা যুমার: (৯)‎] আল্লাহ তা‘আলার নিকট রাতের সালাতের গুরুত্ব অধিক, তাই তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡمُزَّمِّلُ ١ قُمِ ٱلَّيۡلَ إِلَّا قَلِيلٗا ٢ نِّصۡفَهُۥٓ أَوِ ٱنقُصۡ مِنۡهُ قَلِيلًا ٣ أَوۡ زِدۡ عَلَيۡهِ وَرَتِّلِ ٱلۡقُرۡءَانَ تَرۡتِيلًا ٤ ﴾ [المزمل: ١،  ٤]
“হে চাদর আবৃত! ‎রাতের সালাতে দাঁড়াও কিছু অংশ ছাড়া।‎ রাতের অর্ধেক কিংবা তার চেয়ে কিছুটা কম। ‎অথবা তার চেয়ে একটু বাড়াও। আর ‎‎স্পষ্টভাবে ধীরে ধীরে কুরআন আবৃত্তি কর”। [সূরা মুয্‌যাম্মিল: (১-৪)] ‎তিনি আরো বলেন:
﴿ وَمِنَ ٱلَّيۡلِ فَتَهَجَّدۡ بِهِۦ نَافِلَةٗ لَّكَ عَسَىٰٓ أَن يَبۡعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامٗا مَّحۡمُودٗا ٧٩ ﴾ [الاسراء: ٧٩]
“আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় কর ‎‎তোমার অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে। আশা করা ‎যায়, তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত অবস্থানে ‎প্রতিষ্ঠিত করবেন”। [সূরা ইসরা: (৭৯)‎] তিনি আরো বলেন:
﴿ إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡقُرۡءَانَ تَنزِيلٗا ٢٣ فَٱصۡبِرۡ لِحُكۡمِ رَبِّكَ وَلَا تُطِعۡ مِنۡهُمۡ ءَاثِمًا أَوۡ كَفُورٗا ٢٤ وَٱذۡكُرِ ٱسۡمَ رَبِّكَ بُكۡرَةٗ وَأَصِيلٗا ٢٥ وَمِنَ ٱلَّيۡلِ فَٱسۡجُدۡ لَهُۥ وَسَبِّحۡهُ لَيۡلٗا طَوِيلًا ٢٦ ﴾ [الانسان: ٢٣،  ٢٦]
“নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি পর্যায়ক্রমে আল-‎কুরআন নাযিল করেছি। অতএব তোমার রবের হুকুমের জন্য ধৈর্য ‎ধারণ কর এবং তাদের মধ্য থেকে কোন ‎পাপিষ্ঠ বা অস্বীকারকারীর আনুগত্য করো ‎না।‎ আর সকাল-সন্ধ্যায় তোমার রবের নাম স্মরণ ‎কর, আর রাতের একাংশে তার উদ্দেশ্যে ‎সিজদাবনত হও এবং দীর্ঘ রাত ধরে তাঁর ‎তাসবীহ পাঠ কর”। [সূরা ইনসান/দাহার: (২৩-২৬)] তিনি আরো বলেন:
﴿ وَمِنَ ٱلَّيۡلِ فَسَبِّحۡهُ وَأَدۡبَٰرَ ٱلسُّجُودِ ٤٠ ﴾ [ق: ٤٠]
“এবং রাতের একাংশেও তুমি তাঁর তাসবীহ ‎পাঠ কর এবং সালাতের পশ্চাতেও”। [সূরা কাফ: (৪০)] তিনি আরো বলেন:
﴿ وَمِنَ ٱلَّيۡلِ فَسَبِّحۡهُ وَإِدۡبَٰرَ ٱلنُّجُومِ ٤٩ ﴾ [الطور: ٤٨]
“আর রাতের কিছু অংশে এবং নক্ষত্র ‎অস্ত যাবার পর তার তাসবীহ পাঠ ‎কর”। [সূরা তুর: (৪৯)‎] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও রাতের সালাতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে বলেন:
«أفضل الصيام بعد رمضان شهر الله المحرم، وأفضل الصلاة بعد الفريضة صلاة الليل».
“রমযানের পর সর্বোত্তম সিয়াম হচ্ছে মুহররমের সিয়াম, আর ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হচ্ছে রাতের সালাত”।[3]
 তৃতীয়: রাতের সালাতের ফযিলত ও তার কারণ:
১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের সালাতের জন্য খুব পরিশ্রম করতেন, এমনকি তার কদম মুবারক ফেটে যেত। তিনি রাতের কিয়ামে প্রচুর কষ্ট করতেন।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে এত কিয়াম করতেন যে, তার দু’পা ফেটে যেত। আয়েশা তাকে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল আপনি কেন এরূপ করেন, অথচ আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সব গুনাহ মাফ করে দিয়েছেন? তিনি বললেন:
«أفلا أحبُّ أن أكون عبداً شكُوراً»
“আমি কি আল্লাহর শোকর গুজার বান্দা হতে পছন্দ করব না!”।[4] মুগিরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«قام النبي صلى الله عليه وسلم‎ حتى تورَّمت قدماه، فقيل له: غفر الله لك ما تقدم من ذنبك وما تأخر؟ قال: «أفلا أكون عبداً شكوراً».
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়াম করলেন, ফলে তার দু’পা ফুলে গিয়েছিল, তাকে বলা হল: আপনার পূর্বাপর সব গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন? তিনি বললেন:
«أفلا أكون عبداً شكوراً».
“আমি কি শোকর গুজার বান্দা হবো না”।[5] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনৈক সাহাবি খুব সুন্দর বলেছেন:
وفينا رسول الله يتلو كتابه = إذا انشق معروف من الفجر ساطع
يبيت يجافي جنبه عن فراشه = إذا استثقلت بالكافرين المضاجع
“আমাদের মাঝে আল্লাহর রাসূল রয়েছেন, যিনি তার কিতাব তিলাওয়াত করনে যখন উজ্জ্বল ফজর উদিত হয়। তিনি বিছানা থেকে পার্শ্বদেশ পৃথক রেখে রাত যাপন করেন, যখন কাফেররা গভীর ঘুমে নিমজ্জিত থাকে”।[6]
২. জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম উপায় রাতের সালাত।
আব্দুল্লাহ ইব্‌ন সালাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করেন, তখন লোকেরা তার দিকে ছুটে গেল। আর চারদিকে ধ্বনিত হল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন তিনবার। আমি মানুষের সাথে তাকে দেখতে আসলাম। আমি যখন তার চেহারা ভালভাবে দেখলাম, পরিষ্কার বুঝলাম তার চেহারা কোন মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। আমি সর্বপ্রথম তাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন:
«يا أيها الناس، أفشوا السلام، وأطعموا الطعام، وصِلوا الأرحام، وصلُّوا بالليل والناسُ نيام، تدخلوا الجنة بسلام».
“হে লোকেরা, তোমরা সালামের প্রসার কর, খাদ্য দান কর, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখ ও রাতে সালাত আদায় কর যখন মানুষের ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে”।[7] জনৈক কবি খুব সুন্দর বলেছেন:
ألهتك لذةُ نومةٍ عن خير عيشٍ = مع الخيرات في غرف الجنان
تعيش مُخلَّداً لا موت فيها = وتنعم في الجنان مع الحسان
تيقظ من منامك إنَّ خيراً = من النوم التهجدُ بالقران
“ঘুমের স্বাদ তোমাকে উত্তম চরিত্রবতী হুরদের সাথে জান্নাতের বালাখানার উত্তম জীবন থেকে বঞ্চিত করছে। জান্নাতে তুমি সর্বদা থাকবে, সেখানে কোন মৃত্যু নেই, অনিন্দ্য সুন্দরীদের নিয়ে মত্ত থাকবে। অতএব ঘুম থেকে জাগ্রত হও, নিশ্চয় কুরআন তিলাওয়াত করে তাহাজ্জুত আদায় করা ঘুম থেকে অধিক উত্তম”।[8]
৩. রাতে সালাত আদায়কারীদের জন্য জান্নাতের উঁচু প্রাসাদসমূহ তৈরি করা হয়েছে।
আবু মালেক আশা’আরি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إن في الجنة غُرفاً يُرى ظاهرُها من باطنها، وباطنها من ظاهرها، أعدَّها الله تعالى لمن أطعم الطعام، وألانَ الكلام، وتابع الصيام، وأفشى السلام، وصلى بالليل والناس نيام».
“নিশ্চয় জান্নাতে কতক বালাখানা রয়েছে, যার বাহির ভেতর থেকে ও ভেতর বাহির থেকে দেখা যাবে। যা আল্লাহ তৈরি করেছেন তাদের জন্য যারা খাদ্যদান করে, বিনয়াবনত কথা বলে, সিয়ামের পর সিয়াম পালন করে[9], সালামের প্রসার করে এবং রাতে সালাত আদায় করে যখন লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে”।[10]
৪. রাতে নিয়মিত সালাত আদায়কারীগণ আল্লাহর মুহসিন বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত, যারা আল্লাহর রহমত ও জান্নাতের হকদার।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ كَانُواْ قَلِيلٗا مِّنَ ٱلَّيۡلِ مَا يَهۡجَعُونَ ١٧ وَبِٱلۡأَسۡحَارِ هُمۡ يَسۡتَغۡفِرُونَ ١٨ ﴾ [الذاريات: ١٧،  ١٨]
“রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাত। ‎আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকত”। [সূরা যারিয়াত: (১৭-১৮)]
৫. আল্লাহ তা‘আলা নেককার ও রহমানের বান্দাদের প্রশংসার মধ্যে রাতে সালাত আদায়কারীদেরও প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন:
﴿ وَٱلَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمۡ سُجَّدٗا وَقِيَٰمٗا ٦٤ ﴾ [الفرقان: ٦٤]
“আর যারা তাদের রবের জন্য সিজদারত ও ‎‎দণ্ডায়মান হয়ে রাত্রি যাপন করে”। [সূরা ফুরকান: (৬৪)]‎
৬. আল্লাহ তা‘আলা সাক্ষ্য দিয়েছেন রাতে সালাত আদায়কারীগণ পূর্ণ ইমানদার।
তিনি বলেছেন:
﴿ إِنَّمَا يُؤۡمِنُ بِ‍َٔايَٰتِنَا ٱلَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُواْ بِهَا خَرُّواْۤ سُجَّدٗاۤ وَسَبَّحُواْ بِحَمۡدِ رَبِّهِمۡ وَهُمۡ لَا يَسۡتَكۡبِرُونَ۩ ١٥ تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمۡ عَنِ ٱلۡمَضَاجِعِ يَدۡعُونَ رَبَّهُمۡ خَوۡفٗا وَطَمَعٗا وَمِمَّا رَزَقۡنَٰهُمۡ يُنفِقُونَ ١٦ ﴾ [السجدة : ١٥،  ١٦]
“আমার আয়াতসমূহ কেবল তারাই বিশ্বাস ‎করে, যারা এর দ্বারা তাদেরকে উপদেশ দেয়া ‎হলে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের রবের ‎প্রশংসাসহ তাসবীহ করে। আর তারা অহঙ্কার ‎করে না।‎ তাদের পার্শ্বদেশ বিছানা থেকে আলাদা হয়। ‎তারা ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবকে ডাকে। ‎আর আমি তাদেরকে যে রিযক দান করেছি, ‎তা থেকে তারা ব্যয় করে”। সূরা আস-সাজদাহ: (১৫-১৬)
৭. যারা রাতে সালাত আদায় করে ও যারা করে না তারা উভয় সমান নয়।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ أَمَّنۡ هُوَ قَٰنِتٌ ءَانَآءَ ٱلَّيۡلِ سَاجِدٗا وَقَآئِمٗا يَحۡذَرُ ٱلۡأٓخِرَةَ وَيَرۡجُواْ رَحۡمَةَ رَبِّهِۦۗ قُلۡ هَلۡ يَسۡتَوِي ٱلَّذِينَ يَعۡلَمُونَ وَٱلَّذِينَ لَا يَعۡلَمُونَۗ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ ٩ ﴾ [الزمر: ٩]
“‎যে ব্যক্তি রাতের প্রহরে সিজদাবনত হয়ে ও ‎‎দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ‎ভয় করে এবং তার রব-এর রহমত প্রত্যাশা ‎করে (সে কি তার সমান যে এরূপ করে না) ‎বল, ‘যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি ‎সমান?’ বিবেকবান লোকেরাই কেবল ‎উপদেশ গ্রহণ করে”। [সূরা যুমার: (৯)‎]
৮. রাতের সালাত গুনাহের কাফ্‌ফারা ও পাপ মোচনকারী।
আবু উমামা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«عليكم بقيام الليل فإنه دأب الصالحين قبلكم، وهو قُربة إلى ربكم، ومكفِّر للسيئات، ومنهاة للآثام».
“তোমরা রাতের সালাত আঁকড়ে ধর, কারণ এটা তোমাদের পূর্বের নেককার লোকদের অভ্যাস এবং তোমাদের রবের নৈকট্য দানকারী, গুনাহের কাফ্‌ফারা ও পাপ মোচনকারী”।[11]
৯. ফরয সালাতের পর রাতের সালাত সর্বোত্তম সালাত।
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে ‘মারফূ’ হাদিসে এসেছে:
«أفضل الصيام بعد رمضان شهر الله المحرم، وأفضل الصلاة بعد المكتوبة صلاة الليل».
“রমযানের পর সর্বোত্তম সিয়াম মুহররম মাসের সিয়াম এবং ফরয সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত রাতের সালাত”।[12]
১০. কিয়ামুল লাইল মুমিনদের সম্মান।
সাহাল ইব্‌ন সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আগমন করলেন, অতঃপর বললেন:
«يا محمد عش ما شئت فإنك ميت، وأحببْ من شئت فإنك مفارقه، واعمل ما شئت فإنك مجزيٌّ به» ثم قال: «يا محمد شرف المؤمن قيام الليل، وعزُّه استغناؤه عن الناس».
“হে মুহাম্মদ যত দিন পার বেঁচে নেও, অতঃপর অবশ্যই তুমি মৃত্যু বরণ করবে; যাকে ইচ্ছা মহব্বত কর অবশ্যই তার থেকে তুমি বিচ্ছেদ হবে; যা ইচ্ছা আমল কর তার প্রতিদান অবশ্যই তোমাকে দেয়া হবে। অতঃপর বলেন: হে মুহাম্মদ মুমিনের সম্মান হচ্ছে রাতের সালাত, আর তার ইজ্জত হচ্ছে মানুষ থেকে অমুখাপেক্ষিতা”।[13]
১১. রাতে সালাত আদায়কারী ঈর্ষার পাত্র, কারণ এর সওয়াব অধিক। এ সালাত দুনিয়া ও তার মধ্যে বিদ্যমান সবকিছু থেকে উত্তম।
আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لا حسد إلا في اثنتين:رجل آتاه الله القرآن فهو يقوم به آناء الليل وآناء النهار، ورجل آتاه الله مالاً فهو ينفقه آناء الليل وآناء النهار»
“দু’জন ব্যতীত কোন ঈর্ষা নেই: এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ কুরআন দান করেছেন, সে কুরআন নিয়ে রাত ও দিনের বিভিন্ন সময় কিয়াম করে। অপর ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, সে তা রাত ও দিনের বিভিন্ন সময় খরচ করে”।[14] আব্দুল্লাহ ইব্‌ন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لا حسد إلا في اثنتين: رجل آتاه الله مالاً فسلَّطه على هلكته في الحق، ورجل آتاه الله الحكمة فهو يقضي بها ويعلِّمها».
“দু’জন ব্যতীত কোন ঈর্ষা নেই: এক ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সম্পদ দিয়েছেন, সে তা সত্য পথে খুব খরচ করে। অপর ব্যক্তি যাকে আল্লাহ হিকমত দান করেছেন, সে তার মাধ্যমে ফয়সালা করে ও মানুষকে তা শিক্ষা দেয়”।[15]
১২. রাতের সালাতে কুরআন তিলাওয়াত করা বড় গণিমত ও সৌভাগ্যের বিষয়।
আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«من قام بعشر آيات لم يكتب من الغافلين، ومن قام بمائة آية كتب من القانتين، ومن قام بألف آية كتب من المقنطرين».
“যে ব্যক্তি দশ আয়াত দ্বারা কিয়াম করল, তাকে গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হবে না। আর যে একশত আয়াত দ্বারা কিয়াম করল, তাকে কানেতিনদের অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হবে। আর যে এক হাজার আয়াত দ্বারা কিয়াম করল, তাকে মুকানতিরিনদের[16] অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হবে”।[17] আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«أيحب أحدكم إذا رجع إلى أهله أن يجد فيه ثلاث خَلِفاتٍ عظام سمانٍ؟» قلنا: نعم، قال: «ثلاث آيات يقرأ بهن أحدكم في صلاته خير له من ثلاث خلفات عظام سمان».
“তোমাদের কেউ কি পছন্দ করে, যখন সে বাড়িতে যাবে সেখানে সে তিনটি মোটা তাজা গাভীন উট (তার মালিকানাধীন) দেখবে? আমরা বললাম: হ্যাঁ, তিনি বললেন: তোমাদের কারো নিজ সালাতে তিনটি আয়াত তিলাওয়াত করা তিনটি মোটা তাজা উট হতে উত্তম”।[18]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন খতমের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআন খতম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন, তখন তিনি বলেন:
«في أربعين يوماً»،ثم قال: «في شهر»،ثم قال:«في خمس عشرة» ثم قال:«في عشر»،ثم قال:«في سبع». قال: إني أقوى من ذلك، قال: «لا يفقه من قرأه في أقل من ثلاث».
“চল্লিশ দিনে, অতঃপর বলেন: এক মাসে, অতঃপর বলেন: পনেরো দিনে, অতঃপর বলেন: দশ দিনে, অতঃপর বলেন: সাত দিনে[19]। তিনি বলেন: আমি এর চেয়ে অধিকের সামর্থ্য রাখি। তিনি বললেন: তিন দিনের কমে যে খতম করবে, সে কুরআন বুঝবে না”।[20]
 চতুর্থ: কিয়ামুল লাইলের সর্বোত্তম সময় রাতের শেষ তৃতীয়াংশ।
রাতের সালাত রাতের শুরু, শেষ ও মধ্যখানে আদায় করা বৈধ, তবে উত্তম হচ্ছে শেষ তৃতীয়াংশ। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«كان رسول الله صلى الله عليه وسلم‎ يفطر من الشهر حتى نظن أن لا يصوم منه، ويصوم حتى نظن أن لا يفطر، وكان لا تشاء أن تراه من الليل مصلياً إلا رأيته، ولا نائماً إلا رأيته».
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন মাসে পানাহার করতেন, এক সময় আমরা মনে করতাম তিনি এ মাসে সিয়াম পালন করবেন না। আবার কোন মাসে সিয়াম পালন করতেন, এক সময় আমরা মনে করতাম এ মাসে তিনি পানাহার করবেন না। তিনি এমন ছিলেন, যদি তুমি তাকে রাতে সালাত আদায়কারী দেখতে চাও দেখতে পাবে, আর যদি তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে চাও, তাও দেখতে পাবে”।[21]
এ থেকে রাতের সালাতের সহজ নিয়ম বুঝে আসে, যার যখন সুবিধা উঠে সালাত আদায় করবে। হ্যাঁ রাতের শেষ অংশে সালাত আদায় করা উত্তম। আমর ইব্‌ন আবাসা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন:
«أقرب ما يكون الربُّ من العبد في جوف الليل الآخر، فإن استطعت أن تكون ممن يذكر الله في تلك الساعة فكن».
“রাতের শেষ ভাগে বান্দা তার রবের সবচেয়ে নিকটবর্তী হয়, যদি তুমি সে সময়ে আল্লাহর যিকিরকারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পার, তাহলে তাদের অন্তর্ভুক্ত হও”।[22] এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিস দ্বারা, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«ينزل ربنا تبارك وتعالى كل ليلة إلى السماء الدنيا حين يبقى ثلث الليل الآخر فيقول: من يدعوني فأستجيب له؟ من يسألني فأعطيه؟ من يستغفرني فأغفر له؟ [فلا يزال كذلك حتى يضيء الفجر]».
“আমাদের রব প্রতি রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন, যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকে। অতঃপর তিনি বলেন: কে আমাকে আহ্বান করবে, আমি যার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার নিকট প্রার্থনা করবে, আমি যাকে প্রদান করব? কে আমার নিকট ইস্তেগফার করবে, আমি যাকে ক্ষমা করব? ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত অনুরূপ বলতে থাকেন”।[23]
জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
«إن في الليل لساعةً لا يوافقها عبدٌ مسلم يسأل الله خيراً من أمر الدنيا والآخرة إلا أعطاه إياه، وذلك كل ليلة».
“নিশ্চয় রাতে এমন একটি সময় রয়েছে, সে সময় যদি বান্দা আল্লাহর নিকট দুনিয়া ও আখেরাতের কোন কল্যাণ প্রার্থনা করে, তাকে অবশ্যই তা প্রদান করা হয়। আর এটা প্রত্যেক রাতে হয়”।[24]
আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আমর ইব্‌ন ‘আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন:
«أحبُّ الصلاة إلى الله صلاةُ داود عليه السلام، وأحبُّ الصيام إلى الله صيامُ داود، وكان ينام نصفَ الليل، ويقوم ثلثَه، وينام سُدسَه، ويصوم يوماً ويُفطر يوماً، ولا يفرُّ إذا لاقى».
“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় সালাত হচ্ছে দাউদের সালাত, তিনি রাতের অর্ধেক সময় ঘুমাতেন, এক তৃতীয়াংশ কিয়াম করতেন ও এক ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন। তিনি এক দিন সিয়াম পালন করতেন ও একদিন পানাহার করতেন। তিনি শত্রুদের মুখোমুখি হলে কখনো পলায়ন করতেন না”।[25]
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কোন আমল রাসূলুল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয় ছিল? তিনি বলেন: নিয়মতান্ত্রিকতা। আমি বললাম: তিনি কখন দাঁড়াতেন? তিনি বললেন: যখন মুরগির ডাক শুনতেন, তিনি দাঁড়াতেন”।[26] তার থেকে অপর হাদিসে এসেছে: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ রাতে জাগিয়ে দিতেন, তার ওযিফা শেষ করার আগে সেহরির সময় হত না”।[27]
 পঞ্চম: কিয়ামুল লাইলের রাকাত সংখ্যা।
কিয়ামুল লাইলের নির্দিষ্ট কোন রাকাত সংখ্যা নেই। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«صلاة الليل مثنى مثنى، فإذا خشي أحدكم الصبح صلى ركعة واحدة توتر له ما قد صلى».
“রাতের সালাত দু’রাকাত, দু’রাকাত, যখন তোমাদের কেউ ভোর হওয়ার আশংকা করবে, সে এক রাকাত সালাত আদায় করবে, যা তার পূর্বের সালাতগুলো বেজোড় করে দিবে”।[28] কিন্তু এগারো বা তেরো রাকাতে সীমাবদ্ধ থাকাই উত্তম, যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাকাত সংখ্যা ছিল অনুরূপ। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«كان رسول الله صلى الله عليه وسلم‎ يصلي ما بين أن يفرغ من صلاة العشاء إلى الفجر إحدى عشرة ركعة يسلِّم بين كل ركعتين ويوتر بواحدة» ؛ ولحديثها الآخر: «ما كان رسول الله صلى الله عليه وسلم‎ يزيد في رمضان ولا في غيره على إحدى عشرة ركعة».
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতুল এশা শেষ করে ফজর পর্যন্ত এগারো রাকাত সালাত আদায় করতেন, প্রত্যেক দু’রাকাত পর সালাত ফিরাইতেন এবং এক রাকাত দ্বারা বেতের আদায় করতেন”।[29] তার থেকে অপর হাদিসে এসেছে: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান ও গায়রে রমযানে এগারো রাকাতের অধিক পড়তেন না”।[30]
ষষ্ঠ: কিয়ামুল লাইলের আদব:
১. ঘুমের সময় কিয়ামুল লাইলের নিয়ত করা। আর ঘুমের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ইবাদাতে শক্তি অর্জন করা, তাহলে ঘুমেও সওয়াব হবে।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«ما من امرئ تكون له صلاة بليل فغلبه عليها نوم إلا كتب الله له أجر صلاته، وكان نومُه صدقةً عليه»
“এমন কোন ব্যক্তি নেই, যার রাতে সালাত আদায়ের অভ্যাস ছিল, অতঃপর তার ওপর ঘুম প্রবল হল, আল্লাহ তার জন্য অবশ্যই সালাতের সওয়াব লিখবেন, আর তার ঘুম হবে তার জন্য সদকা”।[31] আবু দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«من أتى فراشه وهو ينوي أن يقوم يصلي من الليل فغلبتْهُ عيناه حتى أصبح، كُتبَ له ما نوى، وكان نومُهُ صدقةً عليه من ربه تعالى».
“যে ব্যক্তি তার বিছানায় আসল, যার নিয়ত ছিল রাতে উঠে সালাত আদায় করা, কিন্তু তার ওপর ঘুম প্রবল হল, অতঃপর ভোর করল, তার নিয়ত অনুযায়ী তার জন্য লেখা হবে। আর তার ঘুম হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য সদকা স্বরূপ”।[32]
২. জাগ্রত হয়ে হাত মলে চেহারা থেকে ঘুম দূর করা, আল্লাহর যিকির করা ও মিসওয়াক করা, এবং বলা:
«لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد، وهو على كل شيء قدير، سبحان الله، والحمد لله، ولا إله إلا الله، والله أكبر، ولا حول ولا قوة إلا بالله العلي العظيم، ربِّ اغفر لي»
কারণ উবাদা ইব্‌ন সামেত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি রাতে ঘুম থেকে আড়মোড়া দিয়ে উঠে বলল:
لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد، وهو على كل شيء قدير، الحمد لله، وسبحان الله، ولا إله إلا الله، والله أكبر، ولا حول ولا قوة إلا بالله، ثم قال: اللهم اغفر لي، أو دعا استجيب [له]([33]»).
অতঃপর সে বলল: হে আল্লাহ আমাকে মাফ কর, অথবা দোয়া করল, তার দোয়া কবুল করা হবে”।[34] ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: “… রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হয়ে হাত দ্বারা চেহারা থেকে ঘুম মুছতে ছিলেন, অতঃপর সূরা আলে-ইমরানের শেষ দশ আয়াত তিলাওয়াত করলেন…”।[35] হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
«كان النبي صلى الله عليه وسلم‎ إذا قام من الليل يشوص فاه بالسواك»،
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে যখন ঘুম থেকে উঠতেন, মিসওয়াক দ্বারা তার মুখ দাঁতন করতেন”।[36] অতঃপর জাগ্রত হওয়ার অন্যান্য যিকির পড়া,[37] এবং আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক ওযু করা।
৩. হালকা দু’রাকাত সালাত দ্বারা তাহাজ্জুদ আরম্ভ করা। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা ও কর্ম দ্বারা অনুরূপ প্রমাণিত হয়।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন:
«كان رسول الله صلى الله عليه وسلم‎ إذا قام من الليل ليصلي افتتح صلاته بركعتين خفيفتين» ؛
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রাতে সালাত আদায়ের জন্য উঠতেন, তিনি হালকা দু’রাকাত সালাত দ্বারা তার সালাত আরম্ভ করতেন”।[38] আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إذا قام أحدكم من الليل فليفتتح صلاته بركعتين خفيفتين».
“যখন তোমাদের কেউ রাতে সালাতের জন্য উঠে, সে যেন তার সালাত হালকা দু’রাকাত দ্বারা আরম্ভ করে”।[39]
৪. ঘরে তাহাজ্জুদ আদায় করা মোস্তাহাব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন।
যায়েদ ইব্‌ন সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«…فعليكم بالصلاة في بيوتكم، فإن خير صلاة المرء في بيته إلا المكتوبة».
“… তোমরা ঘরে সালাত আদায় কর, কারণ ব্যক্তির উত্তম সালাত হচ্ছে তার ঘরে ফরয ব্যতীত”।[40]
৫. নিয়মিত কিয়ামুল লাইল আদায় করা, কখনো ত্যাগ না করা। নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত নিয়মিত পড়া মোস্তাহাব। যদি শরীর চাঙ্গা ও মন প্রফুল্ল থাকে, তাহলে দীর্ঘ কিরাত করবে, অন্যথায় হালকা কিরাতে সালাত আদায় করবে, আর কখনো ছুটে গেলে কাযা করবে।
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«خذوا من الأعمال ما