কুরআন সুন্নাহর আলোকে নামাযের কাতারে দাড়ানো / জামায়াতে সালাত পড়তে দাড়ানো:


কুরআন সুন্নাহর আলোকে নামাযের
কাতারে দাড়ানো / জামায়াতে সালাত পড়তে
দাড়ানো:
সহীহ বুখারী শরীফে আনাস (রাঃ)
থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি রাসূল (সঃ)
থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূল (সঃ)
বলেছেন, “তোমরা তোমাদের কাতার
সোজা করো, কেননা, আমি
তোমাদিগকে আমার পিঠের পিছন থেকে
(বাঁকা অবস্থায়) দেখতে পাই। আনাস (রাঃ)
বলেন: (রাসূল (সঃ) এর নির্দেশের
পরিপ্রেক্ষিতে) আমাদের একজন তাঁর কাঁধ
ও পা তাঁর পার্শ্বের জনের কাঁধ ও পায়ের
সাথে মিলিয়ে রাখতো।” (বুখারী, প্রাগুক্ত;
কিতাবুল আ-যান, বাব নং ৪৭, হাদীস নং ৬৯২,
১/২৫৪; ইবনে হাজার, ফতহুল বারী; কিতাবুল
আ-যান, বাব নং ৭৬, হাদীস নং ৭২৫, ২/২১১)
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ
(সঃ) তাঁর সাহাবীগণকে নামাযে কাতার সোজা
করার ব্যাপারে নির্দেশ করেছিলেন। তিনি
তাঁর সাহাবীগণকে এজন্য পরস্পরের
সাথে কাঁধে কাঁধ ও পায়ে পা লাগিয়ে দাঁড়াতে
না বললেও তাঁরা কাতার সোজা করার জন্য
এমনটি করেছিলেন। তবে ইবনে ‘উমার (রাঃ)
থেকে বর্ণিত অপর একটি হাদীস দ্বারা
প্রমাণিত হয় যে, তাঁরা রাসূল (সঃ) এর এ সংক্রান্ত
অপর একটি নির্দেশ পালন করতে যেয়েই
এমনটি করেছিলেন। রাসূল (সঃ) বলেছেনঃ
“কাতার সোজা করো, কাঁধের সাথে কাঁধ
বরাবর করো, ফাঁক বন্ধ করো, শয়তানের
জন্য কোন ফাঁক রাখবে না। যে ব্যক্তি
কাতারের সংযোগ স্থাপন করে আল্লাহও
তার সাথে সংযোগ স্থাপন করেন, আর যে
কাতার ছিন্ন করে, আল্লাহও তার সাথে
সংযোগ ছিন্ন করেন।” (আবু দাউদ, প্রগুক্ত,
কিতাবুস সালাত, বাব নং ৯৫, হাদীস নং ৬৬৬,
১/১৭৮)
এই হাদীসটি ইমাম ইবনে খুযায়মাঃ ও ইমাম হাকিম
সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন। (ইবনে
হাজার আসক্বলানী, ফাতহুল বারী; প্রগুক্ত;
২/২১১)
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ
(সঃ) কাতার সোজা করে দাঁড়ানোর নির্দেশ
করার পাশাপাশি দু’জনের পায়ের মধ্যখানে
কোন ফাঁক না রাখার ব্যাপারেও তাঁর
সাহাবীদের প্রতি নির্দেশ করেছিলেন।
আর সে জন্যেই তাঁরা পরস্পরের সাথে
কাঁধে কাঁধ বরাবর করার পাশাপাশি পায়ের সাথে
পা ও মিলিয়ে দাঁড়াতেন। এত প্রমাণিত হয় যে,
নামাযের কাতারে পরস্পরের সাধে কাঁধ ও পা
যথাসম্ভব লাগিয়ে দাঁড়ানো সুন্নাত। এ বিষয়টি
অন্যান্য মাযহাব দ্বারা সমর্থিত হলেও হানাফী
মাযহাবে শুধু পরস্পর মিলিয়ে ও কাঁধের
সাথে কাঁধ বরাবর করে দাঁড়ানোর বিষয়টি
সমর্থিত হয়েছে। পায়ের সাথে পা
মিলানোর বিষয়টি সমর্থিত হয়নি। যেমন,
হানাফী মাযহাবের ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ
‘বাদাই’উস সানাএ’-তে এ প্রসঙ্গে বলা
হয়েছেঃ
“আর যখন কাতারে দাঁড়াবে তখন পরস্পর
মিলে দাঁড়াবে এবং কাঁধের সাথে কাঁধ বরাবর
করবে কেননা; রাসূল (সঃ) বলেছেন:
তোমরা পরস্পর মিলে দাঁড়াও এবং কাঁধের
সাধে কাঁধ মিলাও।”
(আল-কা-সানী, ‘আলাউদ্দীন আবু বকর ইবন
মাস’উদ, বাদই’উস সানাএ; (করাচী: এস.এম.সাঈদ
কমআপনী, ১ম সংস্করণ, ১৯১০ ইং), ১/১৫৯)
এ হাদীসে পায়ের সাথে পা মিলাও, এ কথাটি
না থাকায় আমাদের মাযহাবে পায়ের সাথে পা
মিলানোর বিষয়টি কোন গুরুত্ব পায়নি। যদিও তা
উপর্যুক্ত আনাস ও ইবনে ‘উমার (রাঃ) এর
হাদীসদ্বয় দ্বারা প্রমাণিত।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, মাযহাবে
যেটুকু করার নির্দেশ রয়েছে আমাদের
সমাজে সেটুকু করারও প্রচলন নেই।
নামাযে দাঁড়ালে প্রতি দু’জন নামাযীর
মাঝখানে বিস্তর ফাঁক পরিলক্ষিত হয়। কাঁধের
সাথে কাঁধ মিলানো তো দূরের কথা একটু
কাছে আসতে বললেও তারা আসতে চান
না। উল্লেখ্য যে, ‘সাহাবীগণ পায়ের
সাথে পা লাগাতেন’ এ-কথাটিকে আমাদের
মাযহাবের কোন কোন বিদ্বান ‘পায়ের
গোড়ালির সাথে গোড়ালি মিলাতেন’ মর্মে
ব্যাখ্যা করেছেন। সে-কারণেই আমরা
পায়ের সাথে পা মিলাতে চাই না। যদিও ইমাম
ইবনে হাজার ‘আসক্বলানী এ বর্ণনানুযায়ী
এ-ব্যাখ্যাটি একটি অনুল্লেখযোগ্য মত, যা
মাযহাবের মুহাক্কিক বিদ্বানদের দ্বারা সমর্থিত
নয়।
(ইবনে হাজার আসক্বলানী, ফতহুলবারী;
২/২১১)
জাবির ইব্ন সামুরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি
বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) আমাদের নিকট
আগমন করে বললেন তোমরা চঞ্চল
ঘোড়ার লেজের মত হাত উঠাচ্ছ কেন?
সালাতের মধ্যে নিশ্চল থাকবে। একবার তিনি
আমাদেরকে দলে দলে বিভক্ত দেখে
বললেন, তোমরা পৃথক পৃথক রয়েছ
কেন? আরেকবার আমাদের সামনে এসে
বললেন, তোমরা কেন ফিরিশতাদের মত
কাতার বেঁধে দাঁড়াচ্ছ না যেভাবে তারা তাদের
প্রভুর সামনে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়ায়?
আমরা জিজ্ঞাসা করলাম ইয়া রাসূলুল্লাহ্!
ফিরিশতাগণ তাদের রবের সামনে কিভাবে
কাতারবন্দী হন? তিনি বললেন, ফিরিশতাগণ
সামনের কাতারগুলি আগে পূর্ণ করেন এবং
গায়ে গায়ে লেগে দাঁড়ান । (মুসলিম-
ই:ফা:৮৫১)
উপর্যুক্ত হাদীস সমূহের বিভিন্ন শব্দ ও
বাক্যের প্রতি লক্ষ্য করলে পায়ের সাথে
পা মিলানোর কথাই সঠিক বলে প্রমাণিত হয়।
কেননা, রাসূল (সঃ) দু’জনের মধ্যে
শয়তানের দাঁড়ানোর স্থান রাখতে নিষেধ
করেছেন। কাঁধের সাথে কাঁধ বরাবর বরে
দাঁড়ালে রাসূল (সঃ) এর উক্ত নির্দেশটি
আংশিকভাবে পালিত হলেও পায়ের সাথে পা
লাগিয়ে দাঁড়ালে তা পূর্ণভাবে পালিত হয়। এছাড়া
সহীহ বুখারী শরীফে নু’মান ইবনে
বশীর (রহঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি
বলেন:
“আমি আমাদের একজনকে তাঁর পাশের
জনের র গ্রন্থির সাথে তাঁর পায়ের গ্রন্থি
মিলাতে দেখেছি।” (বুখারী, প্রগুক্ত;
কিতাবুল আযান, বাব নং ৪৭; ১/১৫৪)
বস্তুত পায়ের সাথে পা মিলানো কথাটি
হাদীসে সুস্পষ্টভাবে থাকা সত্বেও
গোড়ালির সাথে গোড়ালি মিলানোর দ্বারা
এর ব্যাখ্যা করা আদৌ সমীচীন নয়। কেননা,
‘কা’ব শব্দটির আভিধানিক অর্থ: টাখনু বা গ্রন্থি।
তা পায়ের গোড়ালির অর্থ প্রকাশ করার কথা
কোন অভিধানে পাওয়া যায়না। তা ছাড়া এর দ্বারা
যদি গোড়ালির অর্থই উদ্দেশ্য হয়ে
থাকতো, হা হলে আনাস (রাঃ) ও নু’মান ইবনে
বশীর এর হাদীসে বর্ণিত ‘ক্বাদাম’ ও ‘কা’ব
শব্দের পূর্বের ক্রিয়াপদটি ‘ইয়ালঝিকা’ না
হয়ে ‘ইউছাও-ওয়াই” ব্যবহ্রত হতো। অর্থাৎ
কথাটি এভাবে হতো: ‘আমাদের একজন তাঁর
পায়ের গোড়ালী অপরজনের গোড়ালির
বরাবর করতো।” কিন্তু কথাটি এভাবে না হয়ে
হয়েছে: ‘আমাদের একজন তাঁর পা
অপরজনের পায়ের সাথে লাগাতেন’।
এতে প্রমাণিত হয় যে, সাহাবীগণ আসলে
পায়ের সাথেই পা মিলাতেন। কেননা, এদে
দু’জনের মাঝে ফাঁক না রাখা সংক্রান্ত রাসূল (সঃ)
এর নির্দেশ পূর্ণভাবে পালিত হয়; যা
গোড়ালির সাথে গোড়ালি বরাবর করলে
সঠিকভাবে পালিত হয়না। তবে আশ্চর্যজনক
হলেও সত্য যে, এক ব্যাখ্যাটি হাদীস
বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও এবং মাযহাবের
সকলের দ্বারা সমর্থিত না হয়ে কারো
কারো দ্বারা সমর্থিত হওয়া সত্ত্বেও এটাই
আমাদের নিকট অনুসরণীয় হয়ে
রয়েছে। যা আদৌ উচিত নয়।
আসুন আমরা নামাযের কাতারে দাড়ানো /
জামায়াতে সালাত পড়তে দাড়ানো র সময়
আমাদের পার্শ্ববর্তী মুক্তাদীর সাথে
কাঁধে কাঁধ এবং পায়ের সাথে পা মিলিয়ে ফাঁকা
জায়গা বন্ধ করে দাঁড়াই।
অনেকে বলেন, পাশের ব্যক্তি বয়সে
বড়; ওনার পায়ের সাথে পা লাগলে
আদবের খেলাফ হবে। একবার ভাবুনতো;
সাহাবীগণ কিভাবে একজনের পায়ের
সাথে পা লাগিয়ে দাঁড়াতেন? নামাজে কোন
ছোট -বড়, ধনী-গরীব নাই, এখানে
আমরা সবাই আল্লাহর দাস; এখানে কোন
অহংকার নিয়ে দাঁড়ানো যাবে না; পাশের
ব্যক্তি ভিখারী হলেও তার সাথে মিলে
মিশে দাঁড়াতে হবে। কাল কেয়ামতের
মাঠে কারো গায়েই দামী পোশাক বা
গলায় দামী নেকলেস থাকবে না, যা দ্বারা
আভিজাত্য প্রকাশ পাবে। সবাই আল্লাহর
সামনে বিবস্ত্র অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকব।
ভয়ে সবার অবস্থা এমন হবে যে, কেউ
কারো দিকে তাকানোর সময় পাবে না।
ইয়অ নফসী, ইয়া নফসী করতে করতে
গলা কাঠ হয়ে যাবে!!!
আসুন আমরা অন্ধ গোঁড়ামি থেকে
নিজেদের মুক্ত করে এক কুরআন-সুন্নাহর
পতাকা তলে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করি।
পরিশেষে কিছু কোরআনের আয়াত
দিয়ে আজকের কিস্তি শেষ করছি:
তোমরা অনুসরণ কর, যা তোমাদের প্রতি
পালকের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ
হয়েছে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য
সাথীদের অনুসরণ করো
না।“(Al-‘A`rāf:2-2-3)
“আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে
সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো
না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ
কর, যা আল্লাহ তোমাদিগকে দান
করেছেন।”(আল-ইমরান:১০৩)
“নিশ্চয় যারা স্বীয় ধর্মকে খন্ড-বিখন্ড
করেছে এবং অনেক দল হয়ে গেছে,
তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই।
তাদের ব্যাপার আল্লাহ তা’আয়ালার নিকট
সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দেবেন যা কিছু
তারা করে থাকে। [সূরা আনাআম ১৫৯]

Advertisements