মহানবীর সর্বশেষ ওসিয়ত: আস-সালাত, আস-সালাত


মহানবীর সর্বশেষ ওসিয়ত: আস-সালাত, আস-সালাত
ভূমিকা
حمدالله وصلاة وسلاماعلى سيدنا محمد بن عبد الله……………..
হামদ ও সালাতের পর।
ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে কালেমার পরই সালাতের স্থান। কালেমার পর এটি সর্বোত্তম আমল। ইসলামের স্তম্ভসমূহের মধ্যে সবচেয়ে মজবুত স্তম্ভ এটি। সুতরাং সালাত ব্যতীত মুসলমানের ইসলাম পরিপূর্ণ হয় না। কেননা সালাত স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে সেতুবন্ধন। এটি শারীরিক ইবাদাতের মূল। সালাতই সকল উম্মাতের দীন। আসমানী শরীয়াতের কোনটিই সালাতমুক্ত ছিল না। কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার মাধ্যমে এটি ফরজে আঈন। আল্লাহ তা’আলা মিরাজ রজনীতে আসমানে সালাত ফরজ করেছেন। অন্যান্য ইবাদাত এমনটি নয়। অতএব সালাতের মর্যাদা সহজেই অনুমেয়। এটি সকল প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের উপর ফরজ। কোন অবস্থায়ই এটি ছাড়া যাবে না। অন্যান্য রোকনগুলোর ব্যাপারে অবশ্য কিছুটা সহজ করা হয়েছে।[১]

নিশ্চয় সালাতের রয়েছে বিশেষ এক মর্যাদা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদের সম্মানিত করেছেন। মহান আল্লাহ যা কিছু বান্দার উপর ফরজ করেছেন তার মধ্যে সালাত সবচে’ বড়। কেননা অন্য সকল ইবাদাত ফরজ হয়েছে করা হয়েছে যমীনে। আর সালাত ফরজ হয়েছে সুউচ্চ স্থান সিদরাতুল মুনতাহাতে, যেখানে ইতিপূর্বে সৃষ্টির কেউ পৌঁছতে পারেনি।
পবিত্র কুরআনে সালাত শব্দটি ৬৬ বার এসেছে। আর এ ধাতু থেকে নির্গত শব্দসমূহ এসেছে ৩৩ বার। সর্বমোট ৯৯ বার। এছাড়া সালাতের সমার্থবোধক ও তার প্রতি ইঙ্গিতসূচক শব্দও এসেছে বহুবার। যেমন-‘রুকূকারী’, ‘সিজদাকারী’, ‘আল্লাহর জন্য সিজদা করে’ ইত্যাদি। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে আমি যেমন সালাতের ফযীলত বর্ণনা করেছি, তেমনি উল্লেখ করেছি সালাত ত্যাগ করা কিংবা অবহেলা করার পরিণতিও। যেমনটি উল্লিখিত হয়েছে অনেক হাদীসে। সেসব হাদীস আমি বরাতসহ উদ্বৃত করার চেষ্টা করেছি এ বইটিতে। আর সবই করেছি সালাতের মর্যাদা বর্ণনা করা ও তা আঁকড়ে ধরার প্রতি উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে।
আমার এ বই থেকে কেউ যদি বিন্দুমাত্র উপকৃত হন তার প্রতি বিনীত অনুরোধ রইল, তিনি যেন এ গুনাহগার ও তার পিতা-মাতা, উস্তাদবর্গ এবং সকল মুসলমানের জন্য দু’আ করেন।
ইসলামে সালাতের মর্যাদা
সালাত একটি আদি ইবাদাত যা সকল ধর্মেই ছিল। সালাত ঈমানের দাবি। কোন শরিয়তই সালাত থেকে খালি ছিল না। কারণ যে ধর্মে সালাত নেই তা পূর্ণ কল্যাণবাহী হতে পারে না। কিতাব ও সুন্নাহ্‌তে সালাতের আদেশ করা হয়েছে। ইসলাম সালাতের বিষয়টি কঠিনভাবে নিয়েছে। আর সালাত তরককারীদের সতর্ক করেছে বারবার। কিয়ামত দিবসে সর্বাগ্রে হিসাব নেয়া হবে সালাতের। এ কারণেই সকল নবী-রাসূল সালাতের ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করেছে। পবিত্র কুরআনে ইবরাহীম আ.-এর দু’আতে সালাতের বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ ﴿إبراهيم:৪০﴾
“হে আল্লাহ, তুমি আমাকে সালাত কায়েমকারী বানাও এবং আমার পরিবারকেও”।[২]
আর সালাতের কারণে ইসমাঈল আ.-এর প্রশংসা করছেন। ইরশাদ হয়েছে-
وَكَانَ يَأْمُرُ أَهْلَهُ بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ وَكَانَ عِنْدَ رَبِّهِ مَرْضِيًّا ﴿مريم:৫৫﴾
“আর সে তার পরিবারকে সালাত ও যাকাতের আদেশ করত এবং সে ছিল তার রবের নিকট সন্ত্তুুষ্টিপ্রাপ্ত”।[৩]
আল্লাহ তা’আলা ওহী নাযিলের প্রথমভাগেই মূসা আ.- কে সালাত কায়েম করার আদেশ দিয়েছেন।
ইরশাদ হয়েছে-
وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَى. إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي ﴿طه:১৩-১৪﴾
“আর আমি তোমাকে বেছে নিয়েছি অতএব তুমি ভালভাবে ওহী শ্রবণ কর। নিশ্চয় আমিই আল্লাহ। আমি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। সুতরাং আমার ইবাদাত কর এবং আমার স্মরণে সালাত কায়েম কর”।[৪]
ফেরেশতাগণ ঈসা আ.-এর মাতা মরিয়মকে ডেকে এ ব্যাপারে তাকিদ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে-
يَا مَرْيَمُ اقْنُتِي لِرَبِّكِ وَاسْجُدِي وَارْكَعِي مَعَ الرَّاكِعِينَ ﴿آل عمران:৪৩﴾
”হে মরিয়ম, তুমি তোমার রবের ইবাদাত কর এবং সিজদা ও রুকূ কর রুকূকারীদের সাথে”।[৫] ঈসা আ. স্বীয় রবের নিয়ামত বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন-
وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ ‎وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا ﴿مريم:৩১﴾
”আর তিনি আমাকে বরকতপূর্ণ বানিয়েছেন যেখানেই আমি থাকি না কেন এবং আমাকে অসিয়ত করেছেন সালাত ও যাকাতের- আমি যতদিন জীবিত থাকি”।[৬] লোকমান আ. তাঁর ছেলেকে অসিয়ত করতে গিয়ে বলেন-
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ ﴿لقمان:১৭﴾
“হে বৎস, সালাত কায়েম কর। সৎ কাজের আদেশ কর ও অসৎ কাজে নিষেধ কর এবং তোমার উপর আগত মুসিবতে ধৈর্যধারণ কর। নিশ্চয় এটি দৃঢ় সংকল্পের অন্তর্ভুক্ত”।[৭]
আল্লাহ তা’আলা বনী ইসরাঈল থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন এবং সালাতকে অঙ্গীকারকৃত বিষয়াবলীর মধ্যে সবচে’ গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইরশাদ হয়েছে-
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ إِلَّا اللَّهَ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَقُولُوا لِلنَّاسِ حُسْنًا وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآَتُوا الزَّكَاةَ ﴿البقرة:৮৩﴾
“আর আমি যখন বনী ইসরাঈলের থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত করবে না। পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম ও মিসকীনদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। আর মানুষকে ভাল কথা বলবে, সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে”।[৮]
আল্লাহ তা’আলা এই সালাত কায়েমের নির্দেশ দিয়েছেন তদীয় আখেরী নবীকেও-
اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ وَأَقِمِ الصَّلَاةَ ﴿العنكبوت:৪৫﴾
“যে কিতাব আপনার উপর ওহী হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে আপনি তা তিলাওয়াত করুন এবং সালাত কায়েম করুন”।[৯]
আর আল্লাহ তা’আলা একে মুমিনের জন্য অপরিহার্য গুণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন গায়েবের প্রতি বিশ্বাসের পর। ইরশাদ হয়েছে-
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ ﴿البقرة:৩﴾
”যারা গায়েবের প্রতি ঈমান এনেছে এবং সালাত কায়েম করেছে”।[১০] সফল মুমিনদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তা’আলা সালাত দ্বারা শুরু করে সালাত দ্বারাই শেষ করেছেন। ইরশাদ করেছেন-
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ. الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ ﴿المؤمنون:১-২﴾
“ওই সকল মুমিন সফল যারা তাদের সালাতে বিনম্র থাকে…. “[১১]
وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ ﴿المؤمنون:৯﴾
“যারা তাদের সালাতের হিফাযত করে”।[১২]
সফরে-বাড়িতে, নিরাপদে-ভয়ে, শান্তিতে-যুদ্ধে-সর্বাবস্থায়ই এর প্রতি যত্নবান হওয়ার তাকিদ এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতকে ঈমানের উপর চলার প্রথম প্রমাণ এবং কাফির-মুসলিম পৃথক করার বা (চেনার) উপায় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। জাবের রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি-
إن بين الرجل وبين الشرك والكفر ترك الصلاة.
“ব্যক্তির মাঝে ও শিরক- কুফরের মাঝে পার্থক্যকারী বিষয় হল সালাত ত্যাগ করা”।[১৩] বুরাইদা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة، فمن تركها فقد كفر.
“আমাদের আর তাদের মাঝে মূল অঙ্গীকার হল সালাত, যে ব্যক্তি তা তরক করল সে কুফরী করল”।[১৪]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেন-
من فاتته صلاة فكأنما وتر أهله و ماله.
“যে ব্যক্তির সালাত ছুটে গেল তার পরিবার-পরিজন ও মাল-সম্পদ যেন কেড়ে নেয়া হল”।[১৫]
এক ওয়াক্ত সালাত ছুটে গেলে যদি এই হয় তাহলে যে ব্যক্তি মোটেও সালাত আদায় করে না তার ব্যাপারে কী রকম ফয়সালা হবে?
সালাত সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহর উপরে উল্লিখিত সতর্কবাণী ও কঠোরতার প্রতি লক্ষ্য করে ইমামদের একটি দল নিম্নোক্ত অভিমত পোষণ করা আশ্চর্যের কিছু নয়। সালাত ত্যাগকারী কাফির এবং দ্বীন থেকে বহিস্কৃত। অপর একদল আলেম বিষয়টি একটু হালকাভাবে দেখেছেন। তাদের মতে, সালাত ত্যাগকারী ফাসেক। তার ঈমান হারানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
ইসলামে সালাতের মর্যাদা এমনটিই। এহেন গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাতটি সর্বপ্রথম মুসলমানদের উপর ফরয হয়। সরকার যেমনিভাবে চিঠি-পত্রের মাধ্যমে যথেষ্ট মনে না করে রাষ্ট্রদূতদের সরাসরি ডেকে পাঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তেমনিভাবে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর পরে আগত সকল মানুষের জন্য দূত। আল্লাহ তা’আলা সালাতের পয়গাম দেয়ার জন্য তাঁকে আসমানের উপর ডেকে পাঠালেন। অতএব আল্লাহর নিকট সালাতের গুরুত্ব ও মর্যাদা কতটুকু তা সহজেই অনুমেয়।
সালাত যেমন হওয়া উচিৎ :

ইসলাম যে সালাত চায় তা শুধু কতগুলো বাক্য নয়, যা মুখে মুখে আওড়ানো হয় কিংবা শুধু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নড়াচড়ারও নাম নয় যাতে মস্তিষ্কের ভাবনা নেই এবং অন্তরের একাগ্রতা নেই। যে সালাতে মোরগের মত ঠোকর মারা হয়, কাকের মত ছোঁ মারা হয় কিংবা শিয়ালের মত এদিক সেদিক তাকানো হয়। না কখনো এ সালাত শরিয়তে কাম্য নয়। বরং শুধু এমন সালাতই গ্রহণযোগ্য যাতে চিন্তা-ফিকির, বিনম্রতা-একাগ্রতা এবং মাবুদের মাহাত্ম্যের প্রতি খেয়াল রাখা হয়।
আর প্রকৃত পক্ষে সালাতের বরং সকল ইবাদতের প্রধান উদ্দেশ্য হল বান্দাকে মহান রাব্বুল আলামীনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া, যিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন ও হিদায়াত করেছেন। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي ﴿طه:১৪﴾
“আর তুমি আমার স্মরণে সালাত কায়েম কর”। [১৬]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সালাত ফরজ হওয়া ও হজের কার্যাদি পালনের আদেশ একমাত্র আল্লাহর যিকির প্রতিষ্ঠার জন্যই।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের রূহের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন: ‘সালাত হল বিনম্রতা, একাগ্রতা ও কাকুতি-মিনতি করা এবং দু’হাত তুলে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলার নাম। যার সালাত এমন নয় সেটা ধোঁকা অর্থাৎ অসম্পূর্ণ।[১৭]
সালাতে অন্তর স্থির রাখার জন্য এটি একটি সতর্কবাণী। আর অন্তর স্থির রাখা বলতে কী বুঝায় তা জানার জন্য আল্লাহর এ বাণীই যথেষ্ট-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ ﴿النساء:৪৩﴾
“হে মুমিনগণ, তোমরা মাতাল অবস্থায় সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না। যতক্ষণ না তোমরা কী বল তা বুঝতে পার”।[১৮]
এ আয়াতে বিবেক-বুদ্ধি সজাগ রাখার ব্যাপারে সর্তক করা হয়েছে। এমন অনেক মুসল্ল্লী রয়েছে যারা সালাতে কী বলছে তাও জানতে পারে না অথচ তারা মদপান করেনি। মূলত অজ্ঞতা, গাফলতি, দুনিয়ার ভালবাসা ও প্রবৃত্তির অনুসরণই তাদেরকে মাতাল করে দিয়েছে।
ইবনে আব্বাস রা. বলতেন, জিকির ও ফিকিরের সাথে দুই রাক’আত সালাত আদায় করা অন্যমনস্ক হয়ে পূর্ণ রাত ইবাদতের চেয়ে উত্তম।
এ সালাতই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চক্ষুশীতল করত। এর জন্যই তাঁর অন্তর কাঁদত এবং এর দ্বারাই তাঁর অন্তর প্রশান্তি লাভ করত। বিলাল রা. বলতেন, আমাদের এর দ্বারা অর্থাৎ সালাতের দ্বারা শান্তি দাও। এটিই হচ্ছে মুহাব্বত ও ভালবাসার সালাত। অধিকাংশ মানুষ যেভাবে মোরগের ঠোকর মারা ও কাকের ছোঁ মারার মত সালাত আদায় করে তা এমনটি নয়। যারা বলে, “আমাদেরকে সালাতের মাধ্যমে শান্তি দাও” তাদের ও ওদের মাঝে কতইনা ব্যবধান![১৯]
সালাত রহমানের পক্ষ থেকে বিশেষ হিফাযত :

যে ব্যক্তি সময়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে একাগ্রতার সাথে জামাআতে সালাত আদায় করে আল্লাহ তা’আলা সেদিন তার হিফাযত করবেন, যেদিন অন্যান্য মানুষ ধ্বংস হয়ে যাবে।
উমর রা. অন্তিম শয্যায় শায়িত। তাঁর চোখ থেকে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে। তিনি বললেন, তোমরা সালাতের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। যে ব্যক্তি সালাত তরক করে ইসলামে তার কোন অংশ নেই।[২০]
যে ব্যক্তি সালাতের হিফাযত করবে, আল্লাহ তাকে হিফাযত করবেন। আর যে ব্যক্তি সালাত নষ্ট করবে আল্লাহ তাকে ধ্বংস করবেন। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, প্রতিদান কর্ম অনুযায়ী হয়ে থাকে।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ ﴿البقرة:৪০﴾
“তোমরা আমার সাথে-কৃত ওয়াদা পূর্ণ কর, আমি তোমাদের সাথে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করব”।[২১] আর এ এখানে সংরক্ষণ সালাত ও মুসল্লীর মাঝে পরস্পরে হয়ে থাকে। যেমন যেন বলা হয়েছে, তুমি সালাতের হিফাযত কর যাতে সালাত তোমাকে হিফাযত করে। তবে সালাত কর্তৃক মুসল্লীর হিফাযত কয়েকভাবে হয়ে থাকে। যথা-
১. গুনাহ থেকে হিফাযত। যেমন ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ ﴿العنكبوت:৪৫﴾
“নিশ্চয় সালাত অশালীন ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত রাখে। সুতরাং যে সালাতের হিফাযত করবে সালাত তাকে অশালীন কাজ থেকে হিফাযত করবে”।[২২]
২. বালা-মুসীবত থেকে হিফাযত। যেমন ইরশাদ হয়েছে-
اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ﴿البقرة:১৫৩﴾
“তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও”।[২৩]
৩. কবরে ও কিয়ামত দিবসে জাহান্নামের আগুন থেকে হিফাযত। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
”যে ব্যক্তি এসবের (সালাতের) হিফাযত করবে কিয়ামত দিবসে এসব তার জন্য নূর, প্রমাণ ও নাজাতের কারণ হবে”।[২৪] এছাড়া সালাতের চাবি তথা পবিত্রতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- ”কেবল মুমিন ব্যক্তিই ওযুর হিফাযত করে”।
৪. মুসল্লী আল্লাহর হিফাযত ও রক্ষণাবেক্ষণে থাকে। যেমন- জুনদুব ইবনে সুফিয়ান রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করে সে আল্লাহর জিম্মায় থাকে”। অতএব আল্লাহর হিফাযতের মধ্যে কেউ যেন সে ব্যক্তির পিছনে না পড়ে।[২৫]
এ হাদীসে সে ব্যক্তিকে কঠিন হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে যে ফজরের নামাযে উপস্থিত মুমিনকে কষ্ট দেয়। কেননা সে আল্লাহর নিরাপত্তার মধ্যে আগত ব্যক্তির সম্মান নষ্ট করতে চেয়েছে। আর আল্লাহ কর্তৃক বান্দাকে হিফাযত করাটা দুইভাবে হতে পারে:
এক. দুনিয়াবী ব্যাপারে তাকে হিফাযত করা। যেমন- দেহ সুস্থ রাখা; সন্তানাদি, পরিবার-পরিজন ও মাল-সম্পদ রক্ষা করা। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :
لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ ﴿الرعد:১১﴾
“তার সামনে ও পিছনে আছে পরপর আগমনকারী ফেরেশতাগণ যারা তাকে আল্লাহর নির্দেশে রক্ষা করেন”[২৬]। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, তারা হলেন ফেরেশতা যারা তাকে আল্লাহর হুকুমে হিফাযত করেন। অতঃপর যখন তাকদির চলে আসে, তখন তারা তাকে ছেড়ে চলে যায়। কখনো কখনো আল্লাহ তা’আলা ভাল কাজ করার কারণে বান্দার মৃত্যুর পর তার সন্তানদের যান মালের হেফাযত করেন। যেমনিভাবে ইরশাদ হয়েছে :
وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا ﴿الكهف:৮২﴾
আর তাদের পিতামাতা ছিল নেককার। তাদের পিতা-মাতার নেককার হওয়ার কারণে তাদেরকে হিফাযত করা হয়েছে।
সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব র. তার ছেলেকে বলেন, আমি তোমার জন্য আমার সালাত বাড়িয়ে দেই; তোমার হেফাযতের আশায়। অতঃপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন-
وَكَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا ﴿الكهف:৮২﴾
“আর তাদের পিতা-মাতা নেককার ছিল”[২৭]। মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির রহ. বলেন, আল্লাহ মুমিন বান্দাকে তার সন্তান ও বংশের মধ্যে সংরক্ষণ করে রাখেন।[২৮]
দ্বিতীয় প্রকার হিফাযত হল, আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাকে দীন ও ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখা। তিনি তাকে সকল প্রকার সন্দেহ ও গোমরাহী থেকে হিফাযত করেন। তার দ্বীনকে সংরক্ষণ করেন। মৃত্যুর সময় তার ঈমান নসীব করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে বলতেন,
হে আল্লাহ, তুমি যদি আমার রূহ আটকিয়ে রাখ, তাহলে তার উপর তুমি রহম কর, আর যদি তা ছেড়ে দাও, তাহলে তুমি তোমার খাস বান্দাদেরকে যেভাবে হিফাযত কর, তেমনিভাবে তা হিফাযত কর।[২৯]
মসজিদের জামাআত থেকে দূরে থাকার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি :

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إن أثقل صلاة على المنافقين صلاة العشاء وصلاة الفجر. ولو يعلمون ما فيهما لأتوهما ولو حبوا، ولقد هممت أن آمر بالصلاة فتقام، ثم آمر رجلا فيصلي بالناس، ثم انطلق هي برجال معهم حزم من حطب، إلى قوم لايشهدون الصلاة فأحرق عليهم بيوتهم بالنار.
ইশা ও ফজরের সালাত মুনাফিকদের নিকট বেশি ভারী বলে মনে হয়। তারা যদি ইশা ও ফজরে কি ফযীলত নিহিত আছে তা জানত, হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তারা এ দু’টি সালাতে শামিল হত। আমার ইচ্ছে হয় আমি সালাতের নির্দেশ দেই অতঃপর জামাআত শুরু করা হোক। আর এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দেই লোকদের সালাত পড়াবার। অতঃপর যাদের কাছে জ্বালানি কাঠ আছে ওদের সাথে ওই সকল লোকের নিকট গিয়ে তাদের ঘরবাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেই যারা সালাতে হাজির হয় না।
ইবনে উম্মে মাকতুম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিবেদন করলাম, ‘আমি বৃদ্ধ ও অন্ধ। আমার বাসস্থানও একটু দূরে। উপরন্তু আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার মত কেউ নেই। এমতাবস্থায় আপনি কী আমাকে জামাআত ত্যাগ করার অনুমতি দিবেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন- তুমি কি আযান শুনতে পাও? বললাম, জি হ্যাঁ। তিনি বললেন, তোমাকে আমি অনুমতি দেয়ার কোন পথ দেখছি না।
ইবনে আব্বাস রা. কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, এক ব্যক্তি সারা দিন রোযা রাখে এবং সারা রাত্র নফল সালাত পড়ে, কিন্তু জুমু’আ ও জামাআতে হাজির হয় না। তার সম্পর্কে আপনার মতামত কী? তিনি বললেন, লোকটি জাহান্নামী।
পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে যখন জানা গেল যে, যারা ঘরে সালাত পড়ে; মসজিদে হাজির হয় না তাদের ব্যাপারে হুমকি ও কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। এরূপ সতর্কবাণী থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি ঘরে সালাত পড়ে সে অসুস্থ হৃদয় ও অশুদ্ধ ঈমানের অধিকারী। আর মসজিদের জামাআত ত্যাগ করা মুনাফেকির লক্ষণ। পথ-ভ্রষ্টতার নিদর্শন। যেমন এক রেওয়ায়াতে এসেছে- একমাত্র প্রকাশ্য মুনাফিকই জামাআতে সালাত ত্যাগ করে। বাস্তব কথা হল, পূর্ববর্তী মনীষীগণ এর বাস্তব অর্থ বুঝেছেন। এ কারণেই তাদের প্রত্যেকেই অসুস্থতা সত্ত্বেও মসজিতে যেতেন। মসজিদে নিয়ে যাবার ব্যাপারে অন্যের সহায়তা চাইতেন। হাফেজ আবুবকর ইবনে মুনজেরী রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একাধিক সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি আযান শুনল অতঃপর ওজর ছাড়া উত্তর দিল না, তার সালাতই হবে না। তাদের মধ্যে ইবনে মাসঊদ ও আবু মূসা আশআরী রা.-ও রয়েছেন। আর যাদের মতে, জামাআতে হাজির হওয়া ফরজ তারা হলেন- আতা, আহমদ ইবনে হাম্বল ও আবু সাওর র.। শাফেয়ী রহ. বলেন, ওজর ছাড়া যে ব্যক্তি জামাআতে সালাত পড়ার শক্তি রাখে আমি তাকে জামাআত ত্যাগ করার অনুমতি দেই না। আওযায়ী রহ. বলেন, জুমু’আ ও জামাআত ত্যাগ করার ব্যাপারে কোন পিতা-মাতার আনুগত্য চলবে না। এসবের প্রমাণ, ইমাম মুসলিম রহ. তার সহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা. থেকে যা উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি কাল কিয়ামতের দিন মুসলমানরূপে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করতে চায় সে যেন সালাত সমূহ এমন স্থানে আদায় করার এহতেমাম করে যেখানে আযান হয়। কেননা আল্লাহ তা’আলা তোমাদের নবীর জন্য এমনসব সুন্নত জারি করেছেন যেগুলো সম্পূর্ণ হিদায়াত। আর ওই সকল সুন্নাতের মধ্যে জামাআতের সাথে সালাত আদায় করাও রয়েছে। যদি তোমরা অমুক ব্যক্তির ন্যায় ঘরে সালাত আদায় করে নাও তবে তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নত ত্যাগ করবে, আর যদি তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নত ত্যাগ কর তবে অবশ্যই তোমরা পথ ভ্রষ্ট হয়ে যাবে। এক সময় আমাদের অবস্থা এমন ছিল যে, একমাত্র প্রকাশ্য মুনাফিক ছাড়া আর কেউ জামাআতে সালাত আদায় করা থেকে বিরত থাকত না। এমন কি যে ব্যক্তি দুইজনের উপর ভর করেও যেতে পারত তাকেও জামাআতের সাথে কাতারে দাঁড় করে দেওয়া হত।
পাঁচ ওয়াক্ত সালতের ফযীলত
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى. وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى ﴿الأعلى:১৪-১৫﴾
“নিশ্চয় সে সাফল্য লাভ করবে যে পবিত্রতা অবলম্বন করে এবং তার পালনকর্তার নাম স্মরণ করে অতঃপর সালাত আদায় করে”।[৩০]
আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন-
إِنَّ الْإِنْسَانَ خُلِقَ هَلُوعًا. إِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ جَزُوعًا. وَإِذَا مَسَّهُ الْخَيْرُ مَنُوعًا. إِلَّا الْمُصَلِّينَ. الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَاتِهِمْ دَائِمُونَ ﴿المعارج:১৯-২৩﴾
“নিশ্চয় মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে ভীরুরূপে। যখন তাকে বিপদ স্পর্শ করে তখন সে হা-হুতাশ করে। আর যখন তাকে কল্যাণ স্পর্শ করে তখন সে কৃপণতা দেখায়। তবে মুসল্লীরা এমন নয়- যারা তাদের সালাতে সার্বক্ষণিক কায়েম থাকে।[৩১]
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এক জুমু’আ থেকে অন্য জুমু’আ পর্যন্ত তার মধ্যবর্তী গুনাহের জন্য কাফ্‌ফারাস্বরূপ, যতক্ষণ না সে ব্যক্তি কবীরা গুনাহে লিপ্ত হয়।
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি তিনি ইরশাদ করেন, বলতো যদি কারো বাড়ির সামনে একটি নদী থাকে আর তাতে সে দৈনিক পাঁচবার গোছল করে তবে কি তার শরীরে কোন ময়লা থাকবে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, কোন কিছ অবশিষ্ট থাকবে না। তিনি বললেন, এরকমই পাঁচ ওয়াক্ত সালতের দৃষ্টান্ত যার দ্বারা আল্লাহ বান্দার গুনাহ সমূহ মুছে দেন।[৩২]
আমর ইবনে মুররা আল জুহানী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, বলুন তো যদি আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই, আপনি আল্লাহর রাসূল এবং পাঁচ ওয়াক্ত সালাত পড়ি, যাকাত আদায় করি, রমযানের রোযা রাখি, রাত্রি জাগরণ করি, তবে আমি কোন দলের অর্ন্তভুক্ত। তিনি বললেন, তুমি সিদ্দীক ও শহীদগণের অন্তর্ভুক্ত।[৩৩]
উসমান ইবনে আফ্‌ফান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে একটি হাদীস বলব, যদি আল্লাহর কিতাবে একটি আয়াত না থাকত তাহলে আমি তা তোমাদের বলতাম না। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি উত্তমরূপে ওযু করবে অতঃপর সালাত পড়বে আল্লাহ তা’আলা তার এ সালাত ও পরবর্তী সালতের মধ্যবর্তী গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দিবেন।[৩৪] আবু উমামা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সালাতের উদ্দেশ্যে ওযু করে অতঃপর তার হাতের কব্জি ধৌত করে তখণ পানির প্রথম ফোঁটার সাথে তার হাত দ্বারা কৃত গোনাহসমূহ ঝরে পড়ে। যখন মুখমণ্ডল ধৌত করে তখন পানির প্রথম ফোঁটার সাথে তার চোখ ও মুখ থেকে গুনাহসমূহ ঝরে পরে। যখন কনুই পর্যন্ত দু’হাত ও টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত করে তখন তার আশপাশের সকল গুনাহ থেকে সে নিরাপদ হয়ে যায়, ফলে সেদিনের মত নিষ্পাপ হয়ে যায় যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছে। যখন সে সালাতে দাঁড়ায় তখন আল্লাহ তার মর্যাদা উঁচু করেন[৩৫]।
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহর নিকট ফযীতলপূর্ণ সালাত জুমু’আর দিন ফজরের সালাত জামাআতের সাথে আদায় করা[৩৬]।
সালাত সাহায্য, দৃঢ়তা, ইহকাল ও পরকালের সফলতার অন্যতম মাধ্যম :
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ. الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ ﴿المؤمنون:১-২﴾
“মুমিনগণ সফলকাম হয়েছে, যারা নিজদের সালাতে বিনয়ী”।[৩৭]
আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন :
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى. وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى ﴿الأعلى:১৪-১৫﴾
“নিশ্চয় সে সাফল্য লাভ করবে যে পবিত্রতা অবলম্বন করে এবং তার পালনকর্তার নাম স্মরণ করে অতঃপর সালাত আদায় করে”।[৩৮]
সালাতকে কল্যাণ নামকরণ করা হয়েছে। তার প্রতি আহ্বানকে করা হয়েছে কল্যাণের প্রতি আহ্বান। যেমন- حي على الصلاةএসো সালাতের দিকে। حي على الفلاح এসো কল্যাণের দিকে। ফালাহ বলা হয়, উদ্দেশ্যে জয়লাভ করা, কল্যাণ স্থায়ী হওয়া।
সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলার কাছে সাহায্য চাওয়া হয়। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :
اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ﴿البقرة:১৫৩﴾
“তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও”[৩৯]।
আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا لَقِيتُمْ فِئَةً فَاثْبُتُوا وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴿الأنفال:৪৫﴾
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন কোন দলের সাথে সংঘাতে মিলিত হও, তখন সুদৃঢ় থাক এবং আল্লাহকে স্মরণ কর যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার”।[৪০]
সম্ভবত যুদ্ধের ময়দানে সশস্ত্র অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও সালাতুল খাওফের বিধান দেওয়া হয়েছে যাতে সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য লাভ করা যায়।
সা’দ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা এ উম্মতের সাহায্য করবেন দুর্বলদের দ্বারা। তাদের দাওয়াত, তাদের সালাত ও তাদের ইখলাসের দ্বারা।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-
إِنِّي مَعَكُمْ لَئِنْ أَقَمْتُمُ الصَّلَاةَ وَآَتَيْتُمُ الزَّكَاةَ ﴿المائدة:১২﴾
“আমি তোমাদের সঙ্গে আছি যদি তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত আদায় কর”[৪১]।
এ আয়াতের ব্যাখ্যা হল, আমি তোমাদের সঙ্গে আছি সাহায্য সহায়তার জন্য যদি তোমরা সালাত কায়েম কর ও যাকাত আদায় কর। আল্লাহ যার সাথে থাকবেন, তার দায়িত্ব নিবেন। আল্লাহর সাথে যে শত্রুতা করব