সফর ও জমা করা সালাত বা নামাজের বিধিবিধান


কসর ও জমা করে সালাত আদায় সম্পর্কে কিছু বিধান ভূমিকা আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর প্রশংসা ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ পাঠের পর আজকের আলোচনা শুরু করছি। ইবাদতের ব্যাপারে একটি মৌলিক নীতি হচ্ছে, প্রতিটি ইবাদতের জন্য শরী‘আতপ্রবর্তক আল্লাহ তা‘আলা একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা সে সময়েই আদায় করতে হয়, যদি না সেটাকে তার সময় থেকে বিশেষ আবশ্যকতা বা প্রয়োজনের কারণে বের করে অন্য সময়ে করার ব্যাপারে দলীল- প্রমাণাদি পাওয়া যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻫُﻢۡ ﻋَﻦ ﺻَﻠَﺎﺗِﻬِﻢۡ ﺳَﺎﻫُﻮﻥَ ٥ ﴾ ‏[ ﺍﻟﻤﺎﻋﻮﻥ : ٥ ] “যারা তাদের সালাত সম্পর্কে বেখবর” [সূরা আল-মা‘উন, ৫] অর্থাৎ তারা সালাতকে তার সময় থেকে পিছিয়ে দেয়। অনুরূপভাবে বুখারী, মুসলিম, সুনান গ্রন্থকারগণ, মালেক এবং আহমাদ সহ অন্যান্যগণ আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ﺳَﺄَﻟْﺖُ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﺃَﻯُّ ﺍﻟْﻌَﻤَﻞِ ﺃَﻓْﻀَﻞُ ؟ ﻗَﺎﻝَ : ‏« ﺍﻟﺼَّﻼَﺓُ ﻟِﻮَﻗْﺘِﻬَﺎ ‏» . “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, কোন কাজটি সর্বোত্তম? রাসূল বললেন, সময়মত সালাত আদায় করা”। কিন্তু হাদীসের দলীল দ্বারাই আবার যে সব রুখসত বা ছাড় দেওয়া হয়েছে তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দু’ সালাতকে জমা করে এক সালাতের সময়ে আদায় করা। আর এ জমা করা যোহর ও আসরের মাঝে হয়ে থাকে। সুতরাং যোহরকে দেরী করে আসরের সময়ে নিয়ে যাওয়া অথবা আসরকে এগিয়ে নিয়ে এসে যোহরের সময়ে আদায় করার ছাড় শরী‘আত আমাদেরকে দিয়েছে। অনুরূপভাবে এ জমা করার সুযোগ রয়েছে মাগরিব ও ইশার মাঝে, সুতরাং মাগরিবকে দেরী করে ইশার সময়ে নিয়ে গিয়ে দু’টোকে আদায় করা, অথবা ইশাকে এগিয়ে নিয়ে এসে মাগরিবের সময়ে মাগরিবের পরেই আদায় করে নেওয়ার সুযোগ ইসলামী শরী‘আত আমাদেরকে দিয়েছে। কিন্তু ফজরের সালাত, আলেমগণের ঐকমত্যে তাকে এগিয়ে নেওয়া কিংবা পিছিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বস্তুত: সফর অবস্থায় দু’সালাত জমা করে আদায় করার মাসআলাটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করে থাকে; অনেকেই আবার এর অনেক মাসআলা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখে না, অথচ বিষয়টির প্রয়োজন অনস্বীকার্য। তাই এখানে এ বিষয়ে কিছু মাসআলার অবতারণা করার প্রয়াস পাবো। প্রথমেই এটা জানা দরকার যে, মহান আল্লাহর রহমত, তিনি মুসাফিরের জন্য সালাত জমা তথা একত্র করা বিধিবদ্ধ করেছেন। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও ছাড়। কারণ মুসাফির এমন কিছু অবস্থা ও পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে থাকেন যাতে প্রতিটি সালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে। আলেমগণ এ ব্যাপারে ইজমা‘ বা ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে আরাফার দিন যোহর ও আসরকে এগিয়ে নিয়ে যোহরের সময়ে জমা করে আদায় করা শরী‘আতসম্মত। অনুরূপভাবে তারা এ ব্যাপারেও একমত পোষণ করেছেন যে, আরাফার দিন সূর্য ডুবার পর নাহরের রাতে মুযদালিফায় মাগরিব এবং ‘ইশা একত্র করে ইশার সময়ে পড়া শরী‘আতসম্মত। [দেখুন, আল- ইজমা‘ ইবনুল মুনযির, পৃ. ৩৮; মারাতিবুল ইজমা‘ পৃ. ৪৫] তবে এর বাইরে অন্য সময়ে সালাত একত্রে আদায় করার ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সালাত একত্র করে পড়ার বিধান আলেমগণ সফরের কারণে দু’সালাত একত্রে আদায় করার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন: ১. অধিকাংশ আলেম যেমন মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলীগণ এ মত পোষণ করেছেন যে, সফরের কারণে যোহর এবং আসর অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার সালাতকে একত্রে আদায় করা জায়েয। [আশ-শারহুল কাবীর, ১/৩৬৮; মুগনিল মুহতাজ, ১/৫২৯, কাশশাফুল কিনা‘, ২/৫] ২. হানাফী আলেমগণ বলেন, আরাফা ও মুযদালিফা ব্যতীত দু’ ফরয সালাতকে একত্র করে আদায় করা যাবে না। তবে আকৃতিগতভাবে একত্রিত করা যাবে, আর তা হচ্ছে যোহরকে তার শেষ সময় পর্যন্ত দেরী করে আদায় করা তারপর আসরকে তার প্রথম ওয়াক্তে আদায় করা। [আদ-দুররুল মুখতার ওয়া হাশিয়া ইবন আবেদীন, ১/৩৮১] প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত: জামহূর তথা অধিকাংশ আলেমগণের মতটি এখানে বিশুদ্ধ। কারণ; এর উপর দলীল প্রমাণাদি রয়েছে; তন্মধ্যে: ১- আরাফার দিন ও মুযদালিফার রাতে সকলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে দু’সালাতকে একত্রিত করে পড়া জায়েয হওয়া। আর তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অকাট্যভাবে সাব্যস্ত হওয়া। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত দীর্ঘ হাদীসসহ অন্যান্য হাদীসে। [মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮] ২- অসংখ্য হাদীসে বর্ণনা এসেছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিভিন্ন সফরে একত্রে সালাত আদায় করেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম হাদীস হচ্ছে: • আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বর্ণিত হাদীস, ” ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﺠﻤﻊ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﺇﺫﺍ ﺟﺪّ ﺑﻪ ﺍﻟﺴﻴﺮ ” “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও ইশার সালাতকে একসময়ে পড়তেন, যখন সফর চলমান হতো”। [বুখারী, ১০৫৫; মুসলিম, ৭০৩] • সাঈদ ইবন জুবাইর রহ. বলেন, ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, ” ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺟﻤﻊ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﻓﻲ ﺳﻔﺮﺓ ﺳﺎﻓﺮﻫﺎ ﻓﻲ ﻏﺰﻭﺓ ﺗﺒﻮﻙ، ﻓﺠﻤﻊ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﻈﻬﺮ ﻭﺍﻟﻌﺼﺮ، ﻭﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ .” ﻗﺎﻝ ﺳﻌﻴﺪ : ﻓﻘﻠﺖ ﻻﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ : ﻣﺎ ﺣﻤﻠﻪ ﻋﻠﻰ ﺫﻟﻚ، ﻗﺎﻝ : ﺃﺭﺍﺩ ﺃﻥ ﻻ ﻳﺤﺮﺝ ﺃﻣﺘﻪ “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবুকের যুদ্ধের এক সফরে সালাতকে জমা (একত্রিত) করে আদায় করেছেন। সুতরাং তিনি যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ইশাকে একত্র করে আদায় করেছেন। সা‘ঈদ বলেন, তখন আমি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে জিজ্ঞেস করলাম, তাকে একাজ করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করল? তিনি বললেন, তিনি চেয়েছেন তাঁর উম্মত যেন সংকীর্ণতায় না ভোগে।” [মুসলিম, ৭০৫] বস্তুত সালাতকে একত্রে পড়ার বিধানের দ্বারা ইসলামের সহজ হওয়া এবং মহানুভবতার প্রমাণ। জমা করার হাদীসগুলোকে প্রতিটি সালাত তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করার পক্ষে আগত দলীল দ্বারা পরিত্যাগ করার কোনো কারণ নেই। কারণ সফর অবস্থায় সালাত একত্রে আদায় করা সাধারণ মূলনীতির বিপরীতে একটি প্রমাণিত পদ্ধতি। তাছাড়া তখন উভয় সময় সালাত আদায়ের সময়ে পরিণত হয়ে যায়। • সালাত একত্রে আদায় করা রুখসত বা ছাড় তবে তা স্থায়ী নিয়ম নয়: ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম বলেন, জমা তথা সালাতকে একত্রিত করে আদায় করা সাধারণ নিয়মের পর্যায়ে নয় যেমনটি অনেক মুসাফির মনে করে থাকে যে সফরের নিয়ম হচ্ছে একত্রিত করা, ওযর থাকুক বা না থাকুক। বরং সফরে জমা তথা একত্র করে আদায় করা হচ্ছে রুখসত বা ছাড়। আর সফরে কসর করা হচ্ছে স্থায়ী নিয়ম- নীতি। সুতরাং সে হিসেবে বলা যায় যে, মুসাফিরের জন্য স্থায়ী নিয়ম হচ্ছে চার রাকা‘আত সালাতকে দু’রাকা‘আত আদায় করা, সেখানে ওযর থাকুক বা না থাকুক। পক্ষান্তরে দু নামাযকে একত্রিত করে আদায় করার বিধান প্রয়োজনের তাগিদে এবং রুখসত বা ছাড় হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এটা এক ধরনের অপরটি অন্য ধরনের। [আল-ওয়াবিলুস সাইয়্যেব, পৃ. ১৪] আর এজন্য মালেকী মাযহাবের লোকদের মতে সফরে দু’ সালাত একত্রে আদায় করা উত্তমের বিপরীত; কারণ প্রত্যেক সালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত করাই হচ্ছে উত্তম। তাই উত্তম হচ্ছে তা না করা। যদি তা করা মাকরূহ নয়। মালেকী মাযহাবের লোকগণ এটাকে ‘জাওয়ায মুস্তাওয়ীত ত্বারফাইন’ বা এমন জায়েয যার উভয় দিক সমান, এ নামে নামকরণ করে থাকে। [মিনাহুল জালীল, ১/৪১৬; শারহুল খুরাশী, ২/৬৭] পক্ষান্তরে হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণের মতে, জমা করা মুস্তাহাব নয়, বরং ত্যাগ করাই উত্তম। জমা বা একত্রিত করে আদায় করার নিয়ত থাকা কী যরূরী? অর্থাৎ জমা বা একত্রিত করে আদায় করার জন্য প্রথম সালাত আদায়ের সময়েই জমা করে পড়ার নিয়্যত থাকা যরুরী? আলেমগণের মধ্যে এ ব্যাপারে কয়েকটি মত রয়েছে: • শাফে‘ঈ ও হাম্বলীদের নিকট যদি দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে এসে প্রথম ওয়াক্তে দু’সালাতকে একত্রে পড়ে তবে সেখানে দ্বিতীয় সালাতকে আদায় করার নিয়্যত প্রথম সালাত আদায়ের সময়েই থাকতে হবে। অবশ্য যদি প্রথম সালাতকে দেরী করে দ্বিতীয় সালাতের সময়ে নিয়ে যায় তখন প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে একত্রিত করার নিয়্যত লাগবে না। সে হিসেবে যদি প্রথম সালাত আদায় করার সময় দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আদায় করার নিয়্যত না করে তবে তার জমা বা একত্রিত করে আদায় করা শুদ্ধ হবে না। [রাওদাতুত তালেবীন, ১/৩৯৬; কাশশাফুল কিনা‘ ২/৮] কারণ কখনও কখনও দ্বিতীয় সালাতকে প্রথম সালাতের সময়ে আদায় করা হয় একত্রিত করার জন্য, আবার কখনও তা করা হতে পারে ভুলবশতঃ। সুতরাং এতদোভয়ের মধ্যে পার্থক্য করার জন্য নিয়্যতের প্রয়োজন অবশ্যম্ভাবী। • পক্ষান্তরে মালেকী মাযহাবের আলেমগণের মতে, প্রথম সালাত আদায় করার সময়ে দ্বিতীয় সালাতকে তার সাথে জমা করার নিয়্যত করা ওয়াজিব কিন্তু শর্ত নয়। (আর তা দ্বিতীয় সালাতকে এগিয়ে নিয়ে আসা বা প্রথম সালাতকে দেরীতে আদায় করা উভয় ক্ষেত্রেই সমান) সুতরাং যদি কেউ প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাতকে জমা নিয়্যত করা ছেড়ে দিল, তবে তাতে সালাত বাতিল হবে না। [হাশিয়াতুল আদাওয়ী (১/৩৩৫)] • আর এক বর্ণনায় ইমাম আহমাদ, ইমাম মুযানী এবং ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, প্রথম সালাত আদায়ের সময় দ্বিতীয় সালাত তার সাথে একত্রিত করার নিয়্যতের বাধ্য-বাধকতা নেই। [আল-মুহাযযাব, (১/১৯৭); আল-ইনসাফ:২/৩৪১] ইবন তাইমিয়্যা রহ. বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাঁর সাথীদের নিয়ে দু’ সালাত জমা ও কসর করে আদায় করছিলেন তখন তিনি তার সাথীদের কাউকে জমা ও কসর করার নিয়্যত করার জন্য আলাদা নির্দেশনা দেন নি। বরং তিনি মদীনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন এ পুরো সময় তিনি দু’ রাকাআত কসর করেছেন কোনোরূপ জমা করা ব্যতীতই। তারপর তিনি আরাফায় যোহর আদায় করেছেন তখন তিনি সাহাবীগণকে জানিয়ে দেন নি যে, তিনি এর পরেই আসরকে আদায় করে নিতে চান। কিন্তু তিনি আসরও আদায় করলেন আর সাহাবীগণেরও কেউই যোহরের সালাতের পূর্বে আসরকে তার সাথে পড়ার নিয়্যত করেন নি। [মাজমু‘ ফাতাওয়া: ২৪/৫০] সুতরাং এটাই হচ্ছে প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত। কারণ প্রথম সালাতের সময় দ্বিতীয় সালাতকে তার সাথে আদায় করার নিয়্যত করার বাধ্য-বাধকতার কোনো দলীল পাওয়া যাচ্ছে না, বরং দলীল তার উল্টোটাই প্রমাণ করে। • জমা করার সময়ের ব্যাপকতা: বস্তু জমা করে সালাত আদায় করার বিধানটি দেওয়া হয়েছে মুসলিমদের উপর রুখসত বা ছাড় ও মহানুভবতার জন্য। সুতরাং প্রথম সালাতের শুরু থেকে এ জমা করার সময় দ্বিতীয় সালাতের শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ হবে। ইবন তাইমিয়্যা বলেন, সালাতের সময় সাধারণ অবস্থায় পাঁচটি, আর ওযর ও প্রয়োজনের সময় তার সময় তিনটি। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ ﺃَﻗِﻢِ ﭐﻟﺼَّﻠَﻮٰﺓَ ﻟِﺪُﻟُﻮﻙِ ﭐﻟﺸَّﻤۡﺲِ ﺇِﻟَﻰٰ ﻏَﺴَﻖِ ﭐﻟَّﻴۡﻞِ ﻭَﻗُﺮۡﺀَﺍﻥَ ﭐﻟۡﻔَﺠۡﺮِۖ﴾ ‏[ ﺍﻻﺳﺮﺍﺀ : ٧٨ ] “তোমরা সালাত আদায় করো সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে রাতের অন্ধকার হওয়া পর্যন্ত এবং ফজরের কুরআন পাঠ”। [সূরা বনী ইসরাঈল, ৭৮] আর নিয়মনীতিও এভাবে চলে এসেছে যে ওযরের সময় এ ওয়াক্তগুলোতেই আদায় করত হয়, আর তাই যোহর ও আসরকে সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্য ডুবে যাওয়া পর্যন্ত পড়ার বৈধতা রয়েছে। আর মাগরিব ও ইশাকে সূর্য ডুবে যাওয়ার পর থেকে সুবহে সাদিক উদিত হওয়া পর্যন্ত পড়া বৈধ। আর এটাই হচ্ছে দু’ সালাতকে একত্রে আদায় করার বাস্তবতা। [ইবন তাইমিয়্যাহ, শারহুল উমদা, পৃ. ২৩০-২৩১] আর তাই এটা প্রমাণিত হলো যে, – প্রথম সালাতটি আদায় করার সময় দ্বিতীয় সালাতটি তার সাথে জমা করার নিয়্যত থাকা জরুরী নয়। কারণ এর উপর কোনো দলীল নেই। – মুসাফিরের সালাতের সময় তিনটি, সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে সূর্য ডুবা পর্যন্ত যোহর ও আসরের সময়। আর সূর্য ডুবার পর থেকে সুবহে সাদিক উদিত হওয়া পর্যন্ত মাগরিব ও ইশার সময়। আর সুবহে সাদিক উদিত হওয়া থেকে শুরু করে সূর্য উঠা পর্যন্ত ফজরের সময়। দু’ সালাত জমা করে আদায় করার জন্য কী সফরের অবস্থায় থাকা শর্ত? • সফর অবস্থায় জমা করার কথা যারাই বলেছেন, তারা সবাই এ ব্যাপারে একমত যে, জমা করা তখন জায়েয, যখন মুসাফির সালাতের সময়ে সফরে ভ্রমণরত ও রাস্তা অতিক্রমরত অবস্থায় থাকবেন। • কিন্তু মুসাফির কোনো শহরে অবস্থানরত অবস্থায় যদি সালাত কসর আদায় করতে থাকেন তখনও কি তিনি দু’ সালাত জমা করে আদায় করতে পারবেন? এ ব্যাপারে আলেমগণের মধ্যে দু’টি মত রয়েছে: – ইমাম মালেক, কাযী আবু ইয়া‘লা আল- হাম্বলী, ইবনুল কাইয়্যেম এবং ইবনে তাইমিয়্যার কথা থেকে বুঝা যায় যে তাদের মত হচ্ছে, দু’ সালাতকে জমা করা কেবল সফররত অবস্থাতেই জায়েয, সফরে কোথাও অবস্থান করলে জায়েয নয়। [আল-মুদাওয়ানাহ ১/২০৫, আল-মুবদি‘ ২/১২৫, আল-ওয়াবিলুস সাইয়্যিব পৃ. ১৪, মাজমূ ফাতাওয়া ২০/৩৬০, ২২/২৯০] কারণ আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বর্ণিত হাদীসে তা-ই এসেছে, তিনি বলেন, ” ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﺠﻤﻊ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﺇﺫﺍ ﺟﺪّ ﺑﻪ ﺍﻟﺴﻴﺮ ” “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাগরিব ও ইশার সালাতকে একসময়ে পড়তেন, যখন সফর চলমান হতো”। [বুখারী, ১০৫৫; মুসলিম, ৭০৩] – অন্যদিকে শাফে‘য়ী মাযহাবের আলেমগণ এবং হাম্বলী মাযহাবের আলেমগণ, আর তার সাথে ইমাম মালেক এর একটি মতও রয়েছে, তাদের মতে, যে সফরে সালাত কসর করে পড়া হয় সে সফরেই জমা করা জায়েয। সফর চলমান হোক কিংবা কোথাও অবস্থান করে হোক। তবে সফরের বিধান থেকে বের হয়নি এমন হতে হবে। এর বাইরে যতক্ষণ তাকে মুসাফির বলা হবে ততক্ষণই সে জমা করতে পারবে। [মুগনিল মুহতাজ ১/৫২৯; কাশশাফুল কিনা‘ ২/৫; আল-বায়ান ওয়াত তাহসীল ১৮/১১০] ইবন কুদামা বলেন, যদি দু সালাতকে প্রথম সালাতের সময়ে আদায় করতে চায় তবে তাও জায়েয, চাই কোথাও অবতরণকারী অবস্থায় হোক বা সফর চলাকালীন অবস্থায় হোক অথবা এমন কোনো এলাকায় অবস্থানকারী হয় যেখানে অবস্থানের কারণে সালাতকে কসর করে পড়তে বাধা হয় না। এর এটাই আতা ইবন আবি রাবাহ, অধিকাংশ আহলে মদীনা, শাফে‘ঈ, ইসহাক ও ইবনুল মুনযিরের মত। [আল-মুগনী ২/২০১] বস্তুত এটাই প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত, এর সপক্ষে প্রমাণ হচ্ছে: • মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীস, তিনি বলেন, ” ﺧﺮﺟﻨﺎ ﻣﻊ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻋﺎﻡ ﻏﺰﻭﺓ ﺗﺒﻮﻙ، ﻓﻜﺎﻥ ﻳﺠﻤﻊ ﺍﻟﺼﻼﺓ، ﻓﺼﻠﻰ ﺍﻟﻈﻬﺮ ﻭﺍﻟﻌﺼﺮ ﺟﻤﻴﻌًﺎ، ﻭﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﺟﻤﻴﻌًﺎ، ﺣﺘﻰ ﺇﺫﺍ ﻛﺎﻥ ﻳﻮﻣًﺎ ﺃﺧّﺮ ﺍﻟﺼﻼﺓ، ﺛﻢ ﺧﺮﺝ ﻓﺼﻠﻰ ﺍﻟﻈﻬﺮ ﻭﺍﻟﻌﺼﺮ ﺟﻤﻴﻌًﺎ، ﺛﻢ ﺩﺧﻞ، ﺛﻢ ﺧﺮﺝ ﺑﻌﺪ ﺫﻟﻚ، ﻓﺼﻠﻰ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﺟﻤﻴﻌًﺎ ” “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাবুকের যুদ্ধে বের হলাম, রাসূল সালাতে জমা করতেন, সুতরাং তিনি যোহর ও আসরকে জমা করতেন, আবার মাগরিব ও ইশাকেও জমা করতেন। একদিন তিনি সালাত আদায়ে দেরী করলেন, সুতরাং তিনি যোহর ও আসরকে জমা করলেন, তারপর তিনি তার তাঁবুতে প্রবেশ করলেন, তারপর বেশ কিছু পরে বের হলেন অতঃপর মাগরিব ও ইশাকে জমা করে আদায় করলেন। [মুসলিম, ৭০৬] ইবন কুদামা বলেন, এ হাদীসটি তাদের কথার উত্তরে স্পষ্ট দলীল ও শক্তিশালী প্রমাণ, যারা বলে থাকেন যে দু’ সালাত কেবল তখনই জমা করা যাবে যখন কেউ ভ্রমণরত অবস্থায় থাকবে; কারণ এটা প্রমাণ করে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভ্রমণরত অবস্থা ছাড়াও যখন তিনি কোথাও অবতরণ করেছিলেন তখনও জমা করেছেন, তিনি তখন তাঁর তাঁবুতে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেখান থেকে তিনি বের হয়েছিলেন এবং দু’সালাতকে জমা করে আদায় করেছেন। তারপর আবার নিজের তাঁবুতে ফিরে গিয়েছিলেন। আর এ হাদীসটি গ্রহণ করা সুনির্দিষ্ট। কারণ হাদীসটি সাব্যস্ত হয়েছে এবং বিধান প্রদানে তা সুস্পষ্ট আর তার বিপরীতে কোনো কিছু নেই। তাছাড়া জমা করা হচ্ছে সফরের রুখসত বা ছাড়সমূহের একটি; সুতরাং তা কেবল ভ্রমণরত অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট হবে না, যেমনিভাবে কসর ও মাসেহ করার বিধানকে শুধু ভ্রমণরত অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট করা যায় না। তবে উত্তম হচ্ছে দেরী করার জমা করা, (দ্বিতীয়টির ওয়াক্তে প্রথমটি ও দ্বিতীয়টি পড়া) কারণ এর মাধ্যমে জমা করার ব্যাপারে মতভেদকারীদের মতভেদ থেকে বের হওয়া যায় এবং সকল হাদীসের উপরই আমল করা যায়।” [আল- মুগনী, ২/২০২] তারপরও মুসাফিরের উচিত নয় যে সে কোনো নগর বা শহরে অবতরণ করা অবস্থায় সালাতকে জমা করে আদায় করাকে তার অভ্যাসে পরিণত করে নিবে। বরং জমা তো তখনই করবে যখন তার প্রয়োজন পড়বে এবং তার উপর প্রত্যেক সালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়াবে। সুতরাং বুঝা গেল যে, – যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও ইশার সালাতকে জমা করে আদায় করা আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসাফিরের জন্য রুখসত বা ছাড় এবং সহজীকরণ আর তা আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। – জমা করা হচ্ছে রুখসত বা ছাড়; যা মুসাফির তার প্রয়োজনে কাজে লাগাবে তবে তা এমন সাধারণ নিয়ম নয় যা সর্বদা করতে হবে। – আলেমগণের প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত অনুযায়ী জমা করার সময় প্রথম সালাত আদায় করার সময়েই জমা করার নিয়্যত থাকা শর্ত নয়। যে সব কারণে দু’ সালাত জমা করা যায় যে সব কারণে জমা করার কথা হাদীসের ভাষ্যের উপর ভিত্তি করে আলেমগণ বলেছেন তা হচ্ছে, ভ্রমণ ও বৃষ্টি। তবে কোনো কোনো আলেম অন্যান্য কিছু বিষয়কে বৃষ্টি ও ভ্রমণের অর্থে হওয়ার কারণে এবং ব্যাপকার্থে সেগুলোর অধীন করে জমা করার কথা বলেছেন। • তন্মধ্যে বৃষ্টির ব্যাপারে হাদীসের নস হচ্ছে, যা বুখারী ও মুসলিম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, ﺃﻥ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺟﻤﻊ ﻓﻲ ﺍﻟﻤﺪﻳﻨﺔ ﺑﻴﻦ ﺍﻟﻈﻬﺮ ﻭﺍﻟﻌﺼﺮ ﻭﺑﻴﻦ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﻭﺯﺍﺩ ﻣﺴﻠﻢ ﻣﻦ ﻏﻴﺮ ﺧﻮﻑ ﻭﻻ ﻣﻄﺮ ﻭﻻ ﺳﻔﺮ ﻭ ﻭﻗﻊ ﻋﻨﺪ ﻣﺴﻠﻢ ﻓﻲ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻣﻦ ﻃﺮﻳﻖ ﺳﻌﻴﺪ ﺑﻦ ﺟﺒﻴﺮ ﻗﺎﻝ : ﻓﻘﻠﺖ ﻻﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﻟﻢ ﻓﻌﻞ ﺫﻟﻚ ؟ ﻗﺎﻝ : ﺃﺭﺍﺩ ﺃﻥ ﻻ ﻳﺤﺮﺝ ﺃﺣﺪﺍ ﻣﻦ ﺃﻣﺘﻪ. “নিশ্চয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে যোহর ও আসরের সালাতকে এবং মাগরিব ও ইশার সালাতকে জমা করে অর্থাৎ একত্রে আদায় করেছেন”। মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, কোনো প্রকার ভয় বা বৃষ্টি বা সফর ব্যতীতই। মুসলিমের অপর বর্ণনায় সাঈদ ইবন জুবাইর থেকে এসেছে, তিনি বলেন, আমি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেনো রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা করলেন? উত্তরে তিনি বললেন, তিনি চেয়েছেন যেন তাঁর উম্মতের কাউকে সমস্যায় পড়তে না হয়। • আর সফর সালাত জমা করার একটি কারণ, তার প্রমাণ, বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীস, « ﺃﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺟﻤﻊ ﻓﻲ ﺣﺠﺔ ﺍﻟﻮﺩﺍﻉ ﺍﻟﻤﻐﺮﺏ ﻭﺍﻟﻌﺸﺎﺀ ﺑﺎﻟﻤﺰﺩﻟﻔﺔ » “নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জের দিন মাগরিব ও ইশাকে মুযদালিফায় জমা করে আদায় করেছেন।” শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘সালাতকে কসর করে পড়ার বিশেষ কারণ হচ্ছে সফর। সফর ব্যতীত তা করা জায়েয নেই। কিন্তু জমা করে আদায় করা, তার কারণ হচ্ছে প্রয়োজন ও ওযর। সুতরাং যখনই তার প্রয়োজন হবে তখনই জমা করা যাবে সে সফর দীর্ঘ হোক কিংবা সংক্ষিপ্ত। অনুরূপভাবে বৃষ্টি ইত্যাদির জন্য জমা করে আদায় করার বিষয়টি। তদ্রূপ রোগ-ব্যাধি ও অনুরূপ কাজের জন্য জমা করা, তাছাড়া অন্য কারণেও জমা করে আদায় করা যাবে। কারণ এর দ্বারা উদ্দেশ্য উম্মতের উপর থেকে সমস্যা নিরসণ করা। আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সফরে কোথাও (সাময়িক) অবস্থানকালে জমা করেছেন বলে প্রমাণিত হয় নি তবে কেবল একটি হাদীসে তা এসেছে। আর এ জন্যই জমা করা জায়েয যারা বলেছেন যেমন মালেক, শাফে‘ঈ ও আহমদ তারা সফর অবস্থায় কোথাও সাময়িক অবস্থানকালে জমা করার ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। তাদের মধ্য থেকে মালেক ও আহমাদ এক বর্ণনায় তা থেকে নিষেধ করেছেন, আর শাফে‘ঈ ও আহমাদ অন্য বর্ণনায় তা জায়েয বলেছেন। অবশ্য আবু হানিফা আরাফা ও মুযদালিফা ছাড়া আর কোথাও জমা করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং সফররত মুসাফিরের জন্য (যিনি কোথাও সাময়িক অবস্থানকারী নন) দু’ সালাত একত্রে জমা করে আদায় করার ব্যাপারে (আবু হানিফা ব্যতীত) অন্যদের কারও মতভেদ নেই। কারণ সফর হচ্ছে আযাবের একটি টুকরো; যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে। আর দু’ সালাতকে জমা করে আদায় করার সুযোগ দানের মাধ্যমে সহজীকরণের দ্বারা মুসাফিরের সমস্যা দূর করা হয়েছে। আর তা দীনে ইসলামের একটি সাধারণ নীতির অন্তর্গত, তা হচ্ছে এ উম্মত থেকে সমস্যা ও সংকীর্ণতা দূর করা হয়েছে। আর যেভাবে সফরে কসর করা শরীয়ত নির্দেশিত পন্থা বরং সফর হচ্ছে কসর করার কারণ, তেমনিভাবে জমা করাও জায়েয। যদিও জমা করা হচ্ছে রুখসত বা ছাড় আর কসর হচ্ছে শরীয়তের বিধিবদ্ধ নির্দেশনা, তবুও উভয়টিই উক্ত সাধারণ নীতির অন্তর্ভুক্ত। তবে যে মুসাফির তার নিজের দেশ ছাড়া অন্য কোথাও সাময়িক অবস্থান নিয়েছে, নিজের বাসস্থান নির্ধারণ না করে, বরং সেখানে প্রয়োজনের খাতিরে অবতরণ করেছে, তারপর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আবার তার সফর চালিয়ে যাবে, এ মুসাফিরের জন্য কি দু’ সালাত একটির সময়ে জমা করে আদায় করা যাবে এ ব্যাপারে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। আবু হানিফা রহ. এর ধরনের জমা করাকে নিষেধ করেছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আরাফাহ ও মুযদালিফায় জমা করার বিষয়টিকে সে দু’ স্থানের সাথে বিশেষিত বলে প্রকাশ করেছেন। সুতরাং তার মতে অন্য কোথাও জমা করা যাবে না। আর শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. বলেন, ‘আর যখন তা প্রমাণিত হলো, তখন দু’সালাতকে জমা বা একত্রিত করে আদায় করার বিষয়ে এটা বলা যায় যে, তার কারণ হচ্ছে, নুসুক বা হাজ্জ যেমনটি হানাফী আলেমগণ এবং ইমাম আহমদের একদল সাথী বলে থাকেন। আর তা ইমাম আহমদের সরাসরি ভাষ্যের দাবিও বটে। কারণ তিনি মক্কী হাজীকে আরাফার মাঠে কসর করতে নিষেধ করতেন কিন্তু তাকে জমা করতে নিষেধ করতেন না। তাছাড়া ইমাম আহমাদ মুসাফির কর্তৃক সালাত জমা করে আদায় করার ব্যাপারে বলেছেন যে, কসর করার মতই দীর্ঘ সফরে জমা করবে। আর যদি বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক জমা করার বিষয়টি ছিল হাজ্জের কারণে, তাহলে সেখানে দু’টি মত রয়েছে, এক. আরাফাহ্ ও মুজদালিফাহ্ ছাড়া কোথাও জমা করা যাবে না, যেমনটি হানাফীগণ বলেছেন। দুই. হাজ্জ ব্যতীত জমা করার অন্যান্য কারণেও জমা করা যাবে যদিও সফর না হয়, আর তা হচ্ছে বাকী তিন ইমামের মত। আর সত্য হচ্ছে, • যখন কেউ সফর-রত অরস্হায় থাকবে, তখন দুই সালাতকে এগিয়ে এনে বা পিছিয়ে নিয়ে জমা করে আদায় করা যাবে। • অনুরূপভাবে যখন কেউ সফরে কোথাও সাময়িক অবস্হান করে সেখানেও যদি জমা করে সালাত আদায় করার প্রয়োজন দেখা দেয় তবে তাও করবে। যাতে করে সমস্যা মুক্ত হওয়া যায়। • তদ্রূপ মুকীম অবস্থা বা সফর ব্যতীত নিজ জায়গায় অবস্হানকারী ব্যক্তিগণও প্রয়োজনে দু’ সালাতকে জমা করে পড়তে পারেন। যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজন থাকার কারণেই মুজদালিফায় জমা করেছিলেন। অথচ প্রয়োজন না থাকায় মীনায় তা করেননি। যদি প্রয়োজন না থাকলেও তা বৈধ হতো তবে রাসূল সেখানে তা করতেন, কারণ তা করার চাহিদা ও দাবী তো ছিলই অর্থাৎ তিনি সফরে ছিলেন। তারপরও তিনি তা করেন নি, অর্থাৎ সফরে কোথাও অবতরণ অবস্থায় দু সালাত জমা করে আদায় করাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রয়োজন ও আবশ্যকতার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। মোটকথা: মুসাফির কোথাও সাময়িক অবস্থান নিলে সেখানে দু’সালাত জমা করার বিষয়টি প্রয়োজন ও আবশ্যকতার সাথে সম্পৃক্ত, যেমনিভাবে এ জমা করার বিধান মুকীম বা স্থায়ী আবাসস্থলেও প্রয়োজনে করার বিধান শরী‘আতে রয়েছে। কিন্তু সফরে কসর করার বিধান এর ব্যতিক্রম তা স্বাভাবিক নিয়ম, শুধু ছাড় নয়। আর এ জন্যই সফরে কসর করা সর্বাবস্থায় নিয়মসিদ্ধ বিষয়, সফর চলতে থাকুক বা কোথাও সাময়িক অবস্থানে থাকুক। কারণ সাহাবীগণ থেকে তা প্রমাণিত হয়েছে, আর সেটা মারফূ‘ হাদীসের অন্তর্ভুক্ত, উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, « ﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟﺴَّﻔَﺮِ ﺭَﻛْﻌَﺘَﺎﻥِ ﻭَﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟْﺠُﻤُﻌَﺔ ﺭَﻛْﻌَﺘَﺎﻥِ ﻭَﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟْﺄَﺿْﺤَﻰ ﺭَﻛْﻌَﺘَﺎﻥِ ﻭَﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟْﻔِﻄْﺮِ ﺭَﻛْﻌَﺘَﺎﻥِ ﺗَﻤَﺎﻡٌ ﻏَﻴْﺮُ ﻗَﺼْﺮٍ ﻋَﻠَﻰ ﻟِﺴَﺎﻥِ ﻧَﺒِﻴِّﻜُﻢْ » “সফরের সালাত দু’ রাকা‘আত, ঈদুল আদহার সালাত দু’ রাকাআত, ঈদুল ফিতরের সালাত দু’ রাকাআত, এগুলো তোমাদের নবীর মুখ নিঃসৃ্ত পরিপূর্ণ সালাত, কসর সালাত নয়।” অনুরূপভাবে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেন, « ﺍﻟﺼَّﻠَﺎﺓُ ﺃَﻭَّﻝُ ﻣَﺎ ﻓُﺮِﺿَﺖْ ﺭَﻛْﻌَﺘَﻴْﻦِ ﻓَﺄُﻗِﺮَّﺕْ ﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟﺴَّﻔَﺮِ ﻭَﺃُﺗِﻤَّﺖْ ﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟْﺤَﻀَﺮِ » “সালাত যখন প্রথম ফরয হয়েছিল তখন দু’ রাকা‘আতই ফরয হয়েছিল, অতঃপর সফরের সালাতকে স্থির রাখা হয়েছে আর অবস্থানের সালাতে পূর্ণতা আনা হয়েছে”। ইমাম যুহরী বলেন, আমি ‘উরওয়াকে বললাম, তবে যে আমি স্বয়ং আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকেই সফরে পূর্ণ সালাত আদায় করতে দেখেছি? তখন উরওয়া জবাবে বললেন, আয়েশা সে ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছেন যে ব্যাখ্যার আশ্রয় উসমান নিয়েছেন (অর্থাৎ তিনি হয়ত সেখানে অবস্থানের নিয়ত করেছেন)। তদ্রূপ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, « ﺻَﻠَﺎﺓُ ﺍﻟﺴَّﻔَﺮِ ﺭَﻛْﻌَﺘَﺎﻥِ ﻣَﻦْ ﺧَﺎﻟَﻒَ ﺍﻟﺴُّﻨَّﺔَ ﻛَﻔَﺮَ » “সফরের সালাত দু’ রাকাআত, যে কেউ সুন্নাতের বিরোধিতা করবে সে কাফের হয়ে যাবে”। মুসাফিরের সালাত ও অন্যান্য বিধি- বিধান নিয়ে কিছু প্রশ্নোত্তর প্রশ্ন- ১: কত দূরত্বের সফর করলে কেউ মুসাফির বলে গণ্য হবে এবং সফরের রুখসত পেতে পারে? উত্তর: মানুষের দৃষ্টিতে যদি উদ্দেশ্যকৃত স্থানটি সফর হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে তাই তাকে মুসাফির বানাবে। আর তখনই সফরের চারটি রুখসত বা ছাড়ের অধিকারী হবে। সে চারটি বস্তু হচ্ছে: – কসর তথা চার রাকা‘আত বিশিষ্ট সালাতকে কসর করে দু’ রাকা‘আত পড়া – জমা তথা দুই সালাতকে এগিয়ে নিয়ে অথবা পিছিয়ে নিয়ে যে কোনো এক ওয়াক্তে আদায় করা। – মোজার উপর মাসেহ করা, তিন-দিন তিন-রাত্রি পর্যন্ত। – রমযানের দিনের বেলায় সাওম ভঙ্গ করা। আর যদি স্থানটি সফরের দূরত্ব কী না এ ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গীগত পার্থক্য দেখা দেয়, অথবা সন্দেহ হয়, তখন দূরত্বের দিকে খেয়াল করতে হবে। তাই দেখতে হবে যদি তোমাদের যাওয়ার স্থানটি তোমাদের সহর থেকে আশি (৮০) কিলোমিটারের অধিক হয়, তাহলে তোমরা মুসাফির বলে বিবেচিত হবে; আর তখন তোমরা উপরোক্ত চারটি রুখসতের অধিকারী হবে। অর্থাৎ দুই সালাতকে জমা করার সুযোগ, চার রাকা‘আত বিশিষ্ট সালাতকে দু’ রাকা‘আতে কসর করার সুযোগ, মোজার উপর তিন-দিন তিন রাত মাসেহ করার সুযোগ এবং রমযানের দিনের বেলায় সাওম ভঙ্গ করার সুযোগ। আর সফর অবস্থায় কোথাও অবতরণ করলেও তোমরা জমা করা এবং কসর করার সুযোগ পাবে, যদিও তোমরা ভ্রমণরত না থাক। কারণ তোমরা তখনও মুসাফির হিসেবেই খ্যাত থাক, সুতরাং তোমরা সফরের চারটি রুখসত ও ছাড়ের সুযোগ লাভের অধিকারী হবে, যদিও কোথাও সাময়িকভাবে অবস্থান করে থাক। যখন তোমরা জামাআতের সাথে তা আদায় করবে। এর মধ্যে একটি পার্থক্য এই যে, কসর করা তোমাদের জন্য উত্তম হবে, আর জমা না করা তোমাদের জন্য উত্তম হবে, যদি জমা না করার কারণে কষ্ট অনুভূত না হয়। তবে কষ্ট না থাকলেও জমা করতে দোষ নেই; কারণ তোমাদেরকে তখনও মুসাফিরই বলা হয়ে থাকে। প্রশ্ন: ২ কারও উপর যদি মুসাফির অবস্থায় সালাত পড়ার আবশ্যকতা এসে যায়, কিন্তু সে নিজ অবস্থানস্থলে যাওয়া পর্যন্ত যদি সেটা আদায় না করে তবে সে কি উক্ত সালাতটি পূর্ণ আদায় করবে নাকি কসর করবে? উত্তর: তার উপর কর্তব্য হচ্ছে সে সালাতকে পূর্ণরূপে আদায় করা। সালাত আদায় করার অবস্থাই এখানে ধর্তব্য হবে। কারণ সে এখন মুকীম বা অবস্থানকারী। তাছাড়া সফরের কারণ তার কাছ থেকে তিরোহিত হয়েছে। আর এটাই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. এর পছন্দনীয় মত। প্রশ্ন: ৩ কারও উপর যদি মুকীম অবস্থায় সালাত পড়ার আবশ্যকতা এসে যায়, কিন্তু সে মুসাফির হয়ে যাওয়া পর্যন্ত যদি সেটা আদায় না করে তবে সে কি উক্ত সালাতটি পূর্ণ আদায় করবে নাকি কসর করবে? উত্তর: তার জন্য কসর করা বিধি-সম্মত। কারণ সে সালাত আদায়ের সময় মুসাফির অবস্থায় আছে। আর এটাই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যার পছন্দ করা মত। প্রশ্ন: ৪ যখন কোনো মুসাফির কোনো মুকীম (অবস্থানকারী) এর পিছনে সালাত আদায় করবে তখন সে কী করবে? উত্তর: তখন মুসাফিরের উপর কর্তব্য হবে সে সালাতটি পূর্ণরূপে আদায় করা। সে সালাতের শুরু থেকে পেলো নাকি কেবল এক রাকা‘আত পেলো অথবা দুই রাকা‘আত বা তিন রাকা‘আত পেলো এতে কোনো তারতম্য হবে না। তখন মুসাফিরের জন্য কসর করা জায়েয হবে না। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যেমনটি বুখার ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, « ﺇﻧﻤﺎ ﺟﻌﻞ ﺍﻹﻣﺎﻡ ﻟﻴﺆﺗﻢ ﺑﻪ ﻓﻼ ﺗﺨﺘﻠﻔﻮﺍ ﻋﻠﻴﻪ » “ইমাম তো নির্ধারণ করা হয়েছে তাকে অনুসরণ অনুকরণ করার জন্য, সুতরাং তোমরা তার সাথে ভিন্নমত করো না”। তাছাড়া ইমাম মুসলিম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণনা করেন, যখন তাক জিজ্ঞেস করা হলো, মুসাফিরের বিধান এমন কেনো যে সে যখন একা পড়ে তখন কসর করে কিন্তু (মুকীম) ইমামের পিছনে চার রাকা‘আত পড়ে? তখন তিনি বললেন, « ﺗﻠﻚ ﻫﻲ ﺍﻟﺴﻨﺔ » “এটাই হচ্ছে সুন্নাহ তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ”। প্রশ্ন: ৫ যখন কোনো মুকীম কোনো মুসাফিরের পিছনে সালাত আদায় করবে তখন সে কী করবে? উত্তর: তার উপর কর্তব্য হচ্ছে সে সালাত পরিপূর্ণরূপে আদায় করা। সুতরাং যখন মুসাফির ইমাম দু’ রাকা‘আত আদায় করে সালাম ফিরাবে তখন মুকীমের উপর আবশ্যক হচ্ছে বাকী দু’ রাকা‘আত নিজে আদায় করা; যাতে সে তার সালাতকে চার রাকা‘আত বিশিষ্ট করতে পারে। এখানে একটি নিয়মনীতি জানা দরকার তা হচ্ছে, মুক্তাদী সর্বাবস্থায় তার ইমামের সাথে পূর্ণ সালাত আদায় করবে। তাই – যদি ইমাম মুকীম হয় আর মুক্তাদীও মুকীম হয় তবে মুক্তাদীর উপর সালাত পূর্ণরূপ আদায় করা ওয়াজিব। – যদি ইমাম মুকীম হয় আর মুক্তাদী মুসাফির হয়, তবে মুক্তাদীর উপর সালাত পূর্ণরূপ আদায় করা ওয়াজিব। – যদি ইমাম মুসাফির হয় আর মুক্তাদী হয় মুকীম, তবে মুক্তাদীর উপর ওয়াজিব হচ্ছে পূর্ণ সালাত আদায় করা। – তবে এক অবস্থা এর ব্যতিক্রম, তা হচ্ছে, যদি ইমাম মুসাফির হয় আর মুক্তাদীও মুসাফির হয় আর তারা উভয়ে কসর করতে চান, তখন মুক্তাদী কসর করবেন। প্রশ্ন: ৬ যখন কেউ মসজিদে প্রবেশ করে দেখতে পায় যে ইমাম সাহেব ইশা পড়ছেন, অথচ মসজিদে প্রবেশকারী মাগরিব পড়ে নি, তখন সে কী করবে? উত্তর: বিশুদ্ধ মত হচ্ছে যে, তিনি ইমামের সাথে ইশার সালাতে প্রবেশ করবেন তবে তিনি নিয়্যত করবেন মাগরিবের সালাতের। এখানে ইমাম ও মুক্তাদীর মধ্যকার নিয়্যতের ভিন্নতা হলেও তাতে কোনো ক্ষতি নেই। সুতরাং যখন ইমাম সাহেব তিন রাকা‘আত আদায় করে চতুর্থ রাকা‘আতের জন্য দাঁড়াবেন, তখন মুক্তাদী বসে পড়বে এবং তাশাহহুদ পড়ে নিবে, আর এমতাবস্থায় তার জন্য দু’টি কাজের একটি করার এখতিয়ার থাকবে, হয় সে বসা অবস্থায় ইমামের অপেক্ষা করবে অতঃপর যখন ইমাম চতুর্থ রাকা‘আত পড়ে এসে সালাম ফিরাবে তখন সেও সালাম ফিরাবে অথবা তার জন্য ইমামের পূর্বেই সালাম ফিরিয়ে ফেলা বৈধ হবে। আর এটি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা এর পছন্দনীয় মত। প্রশ্ন: ৭ যখন কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে এমতাবস্থায় যে সে যোহর আদায় করে নি, কিন্তু ইমামকে সে আসর আদায়রত অবস্থায় পাবে, এমতাবস্থায় তার করণীয় কি? উত্তর: সে ইমামের সাথে যোহরের সালাতের নিয়তে প্রবেশ করবে, আর সে সে সালাতকে পরিপূর্ণরূপে আাদায় করবে, কোনোরূপ কসর করে নয়। কারণ এ দু’ সালাতের মধ্যে কার্যগত কোনো পার্থক্য নেই। উভয়ের রাকা‘আত সংখ্যা একই, আর তাদের মধ্যে পদ্ধতিগত কোনো পার্থক্যও নেই। আর শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. এ মতটি পছন্দ করেছেন। প্রশ্ন: ৮ যদি কেউ সালাতে প্রবেশের সময় নিয়্যত করে পূর্ণ সালাত আদায় করবে, কিন্তু সালাত আদায়ের সময় তার স্মরণ হলো যে সে তো মুসাফির, এমতাবস্থায় সে কি কসর আদায় করবে? উত্তর: এমতাবস্থায় তার উপর পূর্ণরূপ সালাত আদায় করা আবশ্যক নয়, বরং সে কসর করবে, যদিও সে সালাতের শুরু থেকে কসরের নিয়্যত করে নি। কারণ মুসাফিরের সালাতের ব্যাপারে মূল কথা হচ্ছে কসর করা। যেমন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, « ﻓﺮﺿﺖ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺭﻛﻌﺘﻴﻦ ﺭﻛﻌﺘﻴﻦ ﻓﻲ ﺍﻟﺤﻀﺮ ﻭﺍﻟﺴﻔﺮ ﻓﺄﻗﺮﺕ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﺴﻔﺮ ﻭﺯﻳﺪ ﻓﻲ ﺻﻼﺓ ﺍﻟﺤﻀﺮ » “সালাত প্রথমে ভ্রমণ ও অবস্থানকালীন অর্থাৎ সর্বাবস্থায় দু’ রাকা‘আত দু’রাকা‘আত করে ফরয হয়েছিল, অতঃপর সফরের সালাতকে তার অবস্থায় রেখে দেওয়া হয় কিন্তু অবস্থানকালীন সময়ের সালাতে বৃদ্ধি ঘটে।” আর এ মতটি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. পছন্দ করেছেন। প্রশ্ন: ৯ যে কেউ কসর করার নিয়্যতে সালাতে প্রবেশ করল, কিন্তু পরে ভুলে গিয়ে তৃতীয় রাকা‘আতের জন্য দাঁড়িয়ে গেল, এমতাবস্থায় সে কি দ্বিতীয় রাকা‘আতের বসায় ফিরে যাবে নাকি চার রাকা‘আত আদায় করবে? উত্তর: তার উপর কর্তব্য হচ্ছে দ্বিতীয় রাকাআতের বসায় ফিরে যাওয়া। কারণ এ লোকটি দু’ রাকা‘আত সালাত আদায় করার জন্যই সালাতে প্রবেশ করেছে, সুতরাং সে দু’ রাকা‘আতই পড়বে, এর বেশি করা তার জন্য জায়েয নেই। সুতরাং তার উপর কর্তব্য হচ্ছে তৃতীয় রাকা‘আত থেকে ফিরে গিয়ে সালাত ফিরানো এবং সালামের পরে সাজদায়ে সাহু প্রদান করবে, কারণ সে সালাতে বর্ধিত কাজ করেছে। আর এটা শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা রহ. এর অভিমত। প্রশ্ন ১০ যদি কেউ যোহর ও আসর অথবা মাগরিব ও ইশা আগাম জমা করে পড়ে নিল, তারপর সে তার শহরে এমন সময়ে প্রবেশ করলো যে আসর কিংবা ইশার সালাতের ইকামত হচ্ছে, অথবা সেগুলোর আযানের পূর্বেই সে তার জায়গায় প্রবেশ করলো, এমতাবস্থায় সে কি সালাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের সাথেও সালাত আদায় করবে? উত্তর: তাদের সাথে সালাতে প্রবেশ করার আবশ্যকতা তার উপর নেই। কারণ সে সালাত আদায় করে নিয়েছে এবং নিজের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে পেরেছে। সুতরাং তার উপর কর্তব্য নয় তাদের সাথে সালাত আদায় করা; কারণ সে তা আদায় করে নিয়েছে এবং পূর্ববর্তী সালাতে সাথে আগাম জমা করেছে। তবে যদি সে তাদের সাথে নফল সালাতের নিয়্যতে প্রবেশ করে এবং তার থেকে সন্দেহ-সংশয় দূর করতে চায় তবে তা উত্তম। আর এ মতটি শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. পছন্দ করেছেন। প্রশ্ন: ১১ আসরের সালাতকে জুম‘আর সালাতের সাথে জমা তথা একত্র করে আদায় করার বিধান কী? উত্তর: আসরের সালাতকে জুম‘আর সালাতের সাথে জমা করা যাবে না। আর জুম‘আকে যোহরের উপর কিয়াস করাও শুদ্ধ হবে না। কারণ যোহর ও জুম‘আর মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। সুতরাং মুসাফির যদি জুম‘আর সালাত আদায় করে তবে তার জন্য জায়েয নয় তার সাথে আসরকে জমা করে আদায় করা। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয় নি যে তিনি আসর ও জুম‘আকে একত্রে জমা করে আদায় করেছেন। আর ইবাদতের ব্যাপারে মূল হচ্ছে নিষিদ্ধ হওয়া, যতক্ষণ না দলীল- প্রমাণাদিতে তা সাব্যস্ত না হবে। প্রশ্ন: ১২ জুম‘আর দিনে কী সফর করা জায়েয? উত্তর: জুম‘আর দিনে জুম‘আর সালাতের দ্বিতীয় আযান হয়ে গেলে সফরের উদ্দেশ্যে বের হওয়া হারাম। কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ ﻳَٰٓﺄَﻳُّﻬَﺎ ﭐﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺀَﺍﻣَﻨُﻮٓﺍْ ﺇِﺫَﺍ ﻧُﻮﺩِﻱَ ﻟِﻠﺼَّﻠَﻮٰﺓِ ﻣِﻦ ﻳَﻮۡﻡِ ﭐﻟۡﺠُﻤُﻌَﺔِ ﻓَﭑﺳۡﻌَﻮۡﺍْ ﺇِﻟَﻰٰ ﺫِﻛۡﺮِ ﭐﻟﻠَّﻪِ﴾ ‏[ ﺍﻟﺠﻤﻌﺔ : ٩ ] “হে যারা ঈমান এনেছ, যখন তোমাদেরকে জুম‘আর দিনে সালাতের জন্য ডাকা হয় তখন তোমরা আল্লাহর যিকর এর দিকে ধাবিত হও”। [সূরা আল-জুম‘আহ: ৯] কিন্তু যদি দ্বিতীয় আযানের পূর্বে সফর শুরু করে তবে তা জায়েয। তবে কোনো কোনো আলেম বলেছেন এ সময়েও তার জন্য সফর করা মাকরূহ; যাতে করে কোনো মানুষের জন্য জুম‘আর উপস্থিত হওয়ার যে ফযীলত রয়েছে তা থেকে সে মাহরূম না হয়। প্রশ্ন: ১৩ যে দু’ সালাতকে জমা করে আদায় করার ইচ্ছা করা হচ্ছে সে দু’টো সালাত কী কোনো প্রকার বিচ্ছেদ ব্যতীত পরপর আদায় করে নিতে হবে? উত্তর: এ দু’ সালাতের মধ্যে পরপর হওয়া শর্ত নয়। আর এটিই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা রহ. পছন্দ করেছেন। প্রশ্ন: ১৪ যখন কেউ দু সালাতকে জমা করে আদায় করার ইচ্ছা পোষণ করে তখন কি প্রতি সালাতের জন্য আযান ও ইকামত দিবে? উত্তর: বস্তুত মুসাফিরের জন্য নির্দেশনা হচ্ছে এক আযান দেওয়া এবং প্রত্যকে সালাতের জন্য ইকামত দেওয়া। আর এ মতটিকেই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা রহ. পছন্দ করেছেন। প্রশ্ন: ১৫ যখন কেউ দু’ সালাত জমা করে আদায় করবে তখন সালাতের পরের যিকরগুলোর অবস্থা কী হবে? উত্তর: উত্তম হচ্ছে, সে ব্যক্তি উভয় সালাত আদায়ের পর উক্ত যিকরগুলোর মধ্যে প্রথমে প্রথম সালাতের পরের যিকর পড়ে নিবে তারপর দ্বিতীয় সালাতের পরের যিকরগুলো পড়ে নিবে। (অর্থাৎ যিকরগুলো ধারাবাহিকভাবে পরপর দু’বার করে নিবে) তবে যদি সর্বশেষ সালাতের যিকর আদায় করে তবে তাতে প্রথম সালাতের যিকরও আদায় হয়ে যাবে। প্রশ্ন: ১৬ মসজিদের একই সময়ে দু’টি জামা‘আত অনুষ্ঠানের বিধান উত্তর: একই সময়ে মসজিদে দু’টি জামা‘আত অনুষ্ঠিত করা জায়েয নেই। কারণ এটি মুসলিমদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও তাদের ঐক্যে ফাটল ধরাবে। জামা‘আত তো কেবল মুসলিমদের ঐক্যের উপর প্রমাণ হিসেবে ফরয করা হয়েছে। আর এ মতটিই শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা রহ. পছন্দ করেছেন। প্রশ্ন: ১৭ যদি সফরে কারও মনে পড়ে যে সে মুকীম অবস্থায় যে সালাত পড়েছিল তা কোনো কারণে বিশুদ্ধ হয় নি, যেমন তার অজু ছিল না, তাহলে সে এখন কত রাকা‘আত আদায় করবে? অনুরূপভাবে মুকীম অবস্থায় কারও যদি মনে পড়ে যে সে সফর অবস্থায় যে সালাত পড়েছিল তা কোনো কারণে বিশুদ্ধ হয় নি, তাহলে সে এখন কত রাকা‘আত সালাত আদায় করবে? উত্তর: এসব অবস্থায় তাকে পূর্ণ সালাতই পড়তে হবে, কসর নয়। [ইবন বায রহ.] প্রশ্ন: ১৮ সালাত জমা করা বলতে কী বুঝায়? উত্তর: জমা করতে বলতে বুঝায়, মুসল্লী এগিয়ে এনে যোহরের সময়ে প্রথম যোহর তারপর আসর আদায় করা। অথবা যোহরকে এমনভাবে দেরী করা যে যোহরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাবে, তারপর আসরের ওয়াক্ত আসলে প্রথমে যোহর আদায় করে তারপর আসরের সালাত আদায় করা। অনুরূপভাবে মাগরিব ও ইশার ক্ষেত্রেও যোহর ও আসরের মত আদায় করা। অর্থাৎ মাগরিবের সময়ে ইশাকে এগিয়ে এনে প্রথমে মাগরিব তারপর ইশার সালাত আদায় করবে। অথবা মাগরিবকে এমনভাবে পিছিয়ে দিবে যে মাগরিবের সময় শেষ হয়ে যাবে, তারপর ইশার ওয়াক্ত হলে সেখানে প্রথমে মাগরিব আদায় করে তারপর ইশার সালাত আদায় করে নিবে। এভাবে এগিয়ে এনে কিংবা পিছিয়ে নিয়ে পড়াকে জমা তাকদীম ও জমা তা‘খীর বলা হয়। প্রশ্ন: ১৯ মুসাফির তার সালাত কখন জমা করা শুরু করতে পারবে? উত্তর: যখন মুসাফির তার নিজের স্থানে থাকবে তখন যদি তার সালাতের সময় হয়ে যায়, তখন তার জন্য কসর করা বৈধ হবে না। অনুরূপভাবে জমাও করতে পারবে না, তবে যদি সে ভয় করে যে এ অবস্থায় বের হয়ে পড়লে দ্বিতীয় সালাতের ওয়াক্ত পার হয়ে যাবে, সে সেটাকে তার সময়মত আদায় করতে পারবে না, বা সালাত আদায়ের জন্য অবতরণ করতে পারবে না, যেমন কেউ যোহরের সালাতের সময় বিমানের সফর করল, বা আন্তজেলা গাড়ীতে ভ্রমণ শুরু করল, এমতাবস্থায় তার জন্য বৈধ রয়েছে আসরকে কোনো প্রকার কসর ব্যতীতই যোহরের সাথে আদায় করে নেওয়া। (অর্থাৎ তখন যোহরের সাথে আসরকে চার রাকা‘আত পড়ে নিবে)। প্রশ্ন: ২০ যদি কেউ দেরী করে সালাত জমা করার নিয়ত করার পর যখন সে বাড়ী ফিরে গেল তখন দেখল যে দ্বিতীয়টির সময় এখনও হয়নি এমতাবস্থায় সে কী করবে? উত্তর: যখন কেউ জমা তা‘খীর বা দ্বিতীয় সালাতের সাথে দেরী করে জমা করে আদায় করার নিয়্যত করে সফর শুরু করার পর দেখল যে সে দ্বিতীয় সালাতটির সময় আসার আগেই বাড়ীতে ফিরে গেলো এমতাবস্থায় সে দ্বিতীয় সালাতটিকে প্রথম সালাতের সাথে মিলিয়ে আদায় করবে না, বরং প্রত্যেক সালাতকে তার নির্দিষ্ট সময়ে পূর্ণরূপে আদায় করে নিবে। (চার রাকা‘আত); যদিও সেখানে অবশিষ্ট সময় খুব সামান্যই হয়। কারণ কসর ও জমা করার মূল কারণ ছিল সফর, তা তো চলে গেছে। এ ফতোয়াটির ভিত্তি হচ্ছে জমা তা‘খীর বা দেরী করে জমা করে আদায় করার ক্ষেত্রে প্রথম ওযরটিকে চলমান থাকার শর্ত অবশিষ্ট থাকার বাধ্য-বাধকতা আরোপ করা। কিন্তু যদি কেউ জমা তা‘খীর বা দেরী করে পরবর্তী সালাতের সাথে আদায় করার নিয়তে সফরে বের হলো, কিন্তু যে স্থানের উদ্দেশ্যে সফর বের হয়েছে সেখানে গিয়ে দেখল যে এখনও প্রথম সালাতের সামান্য সময় বাকী আছে তারপর দ্বিতীয় সালাতের সময় প্রবেশ করবে, তখন কী করবে? বস্তুত এখানে তার কয়েকটি অবস্থা থাকতে পারে: প্রথম অবস্থা: যদি সে কোনো মসজিদে না থাকে তবে তার জন্য উত্তম হচ্ছে অপেক্ষা করা যাতে করে দ্বিতীয় সালাতের ওয়াক্ত হয়ে যায়, তারপর সে দু’ সালাতকে জমা ও কসর করে একসাথে আদায় করবে। তবে যদি ভিন্ন ভিন্নভাবেও আদায় করে তাহলে তাও জায়েয। দ্বিতীয় অবস্থা: যদি সে দ্বিতীয় সালাতের আযানের পরে কিন্তু সেটার ইকামতের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করে তাহলে সে প্রথমে কসর করে প্রথম সালাতটি আদায় করে নিবে তারপর দ্বিতীয় সালাতটি জামা‘আতের সাথে আদায় করবে। তৃতীয় অবস্থা: যদি সে মসজিদে প্রবেশ করে দেখল যে লোকেরা দ্বিতীয় সালাত আদায় করছে এমতাবস্থায় তাদের সাথে প্রথম সালাতের নিয়্যত করে সালাতের জামা‘আতে প্রবেশ করবে, তারপর যেভাবে পূর্বে বর্ণিত হয়েছে সেভাবে আদায় করবে, অর্থাৎ উপরোক্ত ৬ নং প্রশ্নোত্তরের মত করে আদায় করবে। আর যদি জমা তাকদীম বা অগ্রীম জমা করে নেওয়ার পরে এমন সময় নিজ শহরে প্রবেশ করল যে তখনও প্রথম সালাতের সময়ও বাকী আছে, এমতাবস্থায় সে কসর ও জমা করে যা আদায় করে নিয়েছে তা-ই তার জন্য বিশুদ্ধ হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। অর্থাৎ তাকে আর সেটা আদায় করতে হবে না। প্রশ্ন: ২১ নৌকা, লঞ্চ কিংবা বিমানে কীভাবে সালাত আদায় করবে? উত্তর: নৌকা লঞ্চ-স্টিমার কিংবা বিমানে যেভাবে মুসল্লির জন্য সহজ হয় সেভাবে সালাত আদায় করতে পারবে। তা মাকরূহ হবে না। কারণ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পানির জাহাজে সালাত আদায় করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছেন, ( ﺻﻞ ﻓﻴﻬﺎ ﻗﺎﺋﻤﺎ ﺇﻻ ﺃﻥ ﺗﺨﺎﻑ ﺍﻟﻐﺮﻕ ‏) ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺪﺍﺭ ﻗﻄﻨﻲ ﻭﺍﻟﺤﺎﻛﻢ ﻋﻠﻰ ﺷﺮﻁ ﺍﻟﺸﻴﺨﻴﻦ “তুমি তাতে দাঁড়িয়ে সালাত আদা করো, তবে যদি ডুবে যাওয়ার ভয় কর তাহলে ভিন্ন কথা”। দারা-কুতনী ও হাকিম বুখারী ও মুসলিমের শর্তানুযায়ী তা চয়ন করেছেন। বিমানে সালাত আদায়ের বিবিধ অবস্থা: বিমানে সালাত আদায় দু’ প্রকার: নফল সালাত ও ফরয সালাত। ক) যদি সে সালাতটি হয় নফল, তবে: আরোহী যেভাবে যে অবস্থায় আছে সেভাবে সে অবস্থায় আদায় করতে পারবে। রুকু ও সাজদা ইঙ্গিত করে আদায় করতে পারবে, সেটা যেদিকেই ফিরে থাকুক না কেন। কিবলার দিকে মুখ করে থাকা শর্ত নয়। অনুরূপ বিধান গাড়ীতে থাকার ব্যপারেও প্রযোজ্য। কারণ আমের ইবন রাবী‘আহ বর্ণিত হাদীসে এসেছে, ( ﺭﺃﻳﺖ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻳﺼﻠﻲ ﻋﻠﻰ ﺭﺍﺣﻠﺘﻪ ﺣﻴﺚ ﺗﻮﺟﻬﺖ ﺑﻪ ‏) ﻣﺘﻔﻖ ﻋﻠﻴﻪ “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার বাহনের উপর যেদিকেই বাহন ফিরছে সেদিকেই সালাত আদায় করতে দেখেছি”। [বুখার ও মুসলিম] আর বুখারীর বর্ণনায় অতিরিক্ত এসেছে, ( ﻳﻮﻣﺊ ﺑﺮﺃﺳﻪ ﻭﻟﻢ ﻳﻜﻦ ﻳﺼﻨﻌﻪ ﻓﻲ ﺍﻟﻤﻜﺘﻮﺑﺔ ) “তিনি (রুকু ও সাজাদার সময়) তার মাথা দিয়ে ইঙ্গিত করেছেন, কিন্তু তিনি ফরয সালাতের ক্ষেত্রে তা করতেন না”। আর মুসলিমের বর্ণনায় অতিরিক্ত এসেছে, ( ﻳﻮﺗﺮ ﻋﻠﻴﻬﺎ ) “তিনি বাহনের উপর ওয়িতর সালাতও আদায় করেছেন”। তবে উত্তম হচ্ছে তাকবীরে তাহরীমার সময় কিবলামুখী হয়ে তা করা। খ) কিন্তু যদি সালাতটি হয় ফরয কোনো সালাত, তখন তার চারটি অবস্থা থাকতে পারে: এক. যদি বিমানের আরোহনের পূর্বে বা বিমান থেকে নামার পরে সে ফরয সালাতটিকে তার নির্দিষ্ট ওয়াক্তে বা জমা তাকদীম অগ্রীম আদায় করে বা জমা তা‘খীর বা পিছিয়ে পড়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে তবে তাকে সেভাবেই আদায় করতে হবে। দুই. যদি সময় হওয়ার পূর্বেই বিমানে প্রবেশ করে ফেলে, এবং যদি সালাতটি এমন হয় যা পরবর্তী সালাতের সাথে জমা করে আদায় করা সম্ভব, আর তার অধিক ধারণা হয় যে বিমান প্রথম সালাতটির ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পরেই কেবল ভূমিতে অবতরণ করবে, তখন আরোহীর উচিত হবে জমা তা‘খীর বা পিছিয়ে নিয়ে জমা করার নিয়্যত করা। যেমন যোহরকে আসরের সময়ে পিছিয়ে নিয়ে জমা করে আদায় করা, অনুরূপভাবে মাগরিবকে ইশার সময়ে পিছিয়ে নিয়ে জমা করে আদায় করা। তিন. আর যদি সময় হওয়ার পূর্বেই বিমানে উঠে পড়ে, আর তার প্রবল ধারনা হয় যে দু’ সালাত জমা করা যায় এমন সালাতের পুরো সময় চলে যাওয়ার পর কিংবা সালাতটি যদি এমন হয় যা পরবর্তী সালাতের সাথে জমা করা যায় না যেমন ফজরের সালাত, তাহলে তার উপর ওয়াজিব হবে বিমানের সালাত আদায়ের স্থান যদি পাওয়া যায় তাতে তা আদায় করা যদি তা করতে সম্ভব হয়, যদি না পাওয়া যায় তো চলাচল পথে, যদি তাও সম্ভব না হয় তবে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবে কিন্তু রুকু ও সাজদা তার চেয়ারে বসা অবস্থায় ইঙ্গিত করে আদায় করবে। কোনোভাবেই সালাতের সময় চলে যাওয়া পর্যন্ত দেরী করা তার জন্য বৈধ হবে না। চার. যদি বিমানে সালাত আাদায়ের স্থান থাকে এবং সেখানে যথাযথভাবে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে, রুকু করে ও সিজদা করে সালাত আদায় করা সম্ভব হয় তবে তাকে সেভাবেই সালাত আদায় করতে হবে, যদি তাতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। প্রশ্ন: ২২ ইশার সালাতকে মাগরিবের সালাতের সাথে জমা করে আদায় করার ফলে ওয়িতর এর সালাতকে কখন আদায় করবে? উত্তর: যখন মুসাফির মাগরিবের সাথে ইশাকে এগিয়ে এনে আদায় করবে তখন তার জন্য জায়েয রয়েছে ওয়িতর সালাতকে ইশার সালাতের পরেই আদায় করে নেওয়া। তাকে ইশার সালাতের সময় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না। কারণ ওয়িতরের ব্যাপারে ধর্তব্য হচ্ছে ইশার সালাতের পরে হওয়া, ইশার সালাতের ওয়াক্ত আসা নয়। আর এটাই অধিকাংশ আলেমের মত। প্রশ্ন: ২৩ বৃষ্টির জন্য মুকীম ও মুসাফির সর্বাবস্থায় জমা করার বিধান উত্তর: সহী হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃষ্টির কারণে মাগরিব ও ইশাকে জমা করে আদায় করেছেন। [বুখারী] সুতরাং বৃষ্টির কারণে জমা করা জায়েয। তবে তা শুধু তাদের জন্যই বৈধ, যারা মসজিদের বাইরে এবং মসজিদে আসতে কষ্ট হবে। কিন্তু যারা মসজিদে রয়েছেন বা মসজিদে যেতে কষ্ট হবে না তারা জমা করবে না। প্রশ্ন: ২৪ রোগ কিংবা ওযর বা বিশেষ প্রয়োজনের কারণে জমা করার বিধান উত্তর: প্রাধান্যপ্রাপ্ত মতে রোগ কিংবা শরী‘আত গ্রহণযোগ্য ওযরের কারণে এবং বিশেষ প্রয়োজনে জমা করে সালাত আদায় করা জায়েয। বিশেষ ওযরের উদাহরণ হচ্ছে সময় না হওয়া। যেমন কোনো কোনো দেশে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের ওয়াক্ত হয় না, কারণ সূর্য আবার উঠে যায় বা রাত লম্বা হয়। সেসব দেশেও জমা করে সালাত আদায় করা জায়েয। প্রশ্ন: ২৫ ভয়ের কারণে জমা করার বিধান উত্তর: প্রাধান্য প্রাপ্ত মতে ভয়ের কারণে জমা করা জায়েয। সংকলন: আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া সূত্র: ইসলামহাউজ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s