সালাত বর্জনকারীর বিধান


সালাত বর্জনকারীর বিধান

নিশ্চয় এই বিষয়টি অত্যন্ত জ্ঞানপূর্ণ বিষয়সমূহের মধ্য থেকে অন্যতম বড় একটি বিষয়, যার ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল যুগের আলেমগণ বিতর্ক বা মতবিরোধ করেছেন; ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল র. বলেন:

“সালাত বর্জনকারী মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কার হয়ে যাওয়ার মত কাফির; সে তাওবা করে সালাত আদায় করা শুরু না করলে তাকে হত্যা করা হবে।

আর ইমাম আবূ হানিফা, মালেক ও শাফে‌য়ী র. বলেন: “সে ফাসিক হবে, কাফির হবে না।”

অতঃপর তাঁরা (তিনজন) তার শাস্তির ব্যাপারে মতবিরোধ করেছেন; ইমাম মালেক ও শাফে‌য়ী র. বলেন: “তাকে হদ তথা শরী‘য়ত নির্ধারিত শাস্তি হিসেবে হত্যা করা হবে।

আর ইমাম আবূ হানিফা র. বলেন: “তাকে তা‘যীরী তথা শাসনমূলক শাস্তি প্রদান করা হবে, হত্যা করা হবে না”আর এই মাসআলাটি (বিষয়টি) যখন একটি বিরোধপূর্ণ মাসআলা, তখন                     আবশ্যকহল এটাকে আল্লাহ তা‘আলার কিতাব এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর সামনেকরা; কেননা, আল্লাহ তা‘আলা বলেছ

 আর তোমরা যে বিষয়েই মতভেদ কর না কেন, তার ফয়সালা তো আল্লাহরই কাছে।” – (সূরা আশ-শুরা, আয়াত: ১০); আল্লাহ তা‘আলা আরো                                                                                  বেলন:                                                                                                                                                        “অতঃপর কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপিত কর আল্লাহ্ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ্ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক। এ পন্থাই উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর।” – (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৫৯)।

 তাছাড়া মতভেদকারীগণের একজনের কথাকে অপরজনের জন্য দলীল হিসেবে পেশ করা যায় না; কারণ, তাদের প্রত্যেকেই নিজের মতকে সঠিক মনে করে এবং তাদের একজন মত গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে অপরজনের মতের চেয়ে অধিক উত্তম নয়; ফলে এই ব্যাপারে তাদের মাঝে মীমাংসা করার মত একজন মীমাংসাকারীর দিকে প্রত্যাবর্তন করা আবশ্যক হয়ে পড়ে; আর সেই মীমাংসাকারী হল আল্লাহ তা‘আলার কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ।

 আর আমরা যখন এই বিরোধটিকে কুরআন ও সুন্নাহর নিকট উপস্থাপন করব, তখন আমরা দেখতে পাব যে, কুরআন ও সুন্নাহর মত শরী‘য়তের উভয় উৎসই সালাত বর্জনকারী ব্যক্তির কাফির হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা ও প্রমাণ পেশ করে, যা এমন মারাত্মক পর্যায়ের কুফরী, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ (বহিষ্কার) করে দেয়।

 প্রথমত: আল-কুরআন থেকে দলীল-প্রমাণ:
আল্লাহ তা‘আলা সূরা তাওবার মধ্যে বলেন:

١]“অতএব তারা যদি তাওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে দ্বীনের মধ্যে তারা তোমাদের ভাই।” – (সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ১১); আর সূরা মারইয়ামের মধ্যে তিনি বলেন:

                                                                             “তাদের পরে আসল অযোগ্য উত্তরসূরীরা, তারা সালাত নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হল। কাজেই অচিরেই তারা ক্ষতিগ্রস্ততার সম্মুখীন হবে। কিন্তু তারা নয়, যারা তাওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে; তারা তো জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না।” – (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৫৯ – ৬০)।

সুতরাং সূরা মারইয়াম থেকে (আলোচ্য প্রবন্ধে) উল্লেখিত দ্বিতীয় আয়াত সালাত বর্জনকারীর কুফরী এইভাবে প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা‘আলা সালাত বিনষ্টকারী ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার অনুসরণকারীদের সম্পর্কে বলেন:                                                                 “কিন্তু তারা নয়, যারা তাওবা করেছে, ঈমান এনেছে।” – (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৬০); সুতরাং এর দ্বারা বুঝা যায় যে, তারা সালাত বিনষ্ট করার সময় এবং মনের কামনা-বাসনার অনুসরণ কালে মুমিন ছিল না।

 আর সূরা তাওবা থেকে (আলোচ্য প্রবন্ধে) উল্লেখিত প্রথম আয়াত সালাত বর্জনকারীর কুফরী এইভাবে প্রমাণ করে যে, এতে আল্লাহ তা‘আলা আমাদের এবং মুশরিকদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সাব্যস্ত করার জন্য তিনটি শর্ত আরোপ করেছেন:

১. শির্ক থেকে তাওবা করে ফিরে আসা;২. সালাত আদায় করা;৩. যাকাত প্রদান করা।

 সুতরাং তারা যদি শির্ক থেকে তাওবা করে, কিন্তু সালাত আদায় না করে এবং যাকাত প্রদান না করে, তাহলে তারা আমাদের ভাই নয়। আর তারা যদি সালাত আদায় করে, কিন্তু যাকাত প্রদান না করে, তবুও তারা আমাদের ভাই নয়।

 আর দীনী ভ্রাতৃত্ব তখনই পুরোপুরিভাবে নির্বাসিত হয়, যখন মানুষ দীন থেকে সম্পূর্ণভাবে খারিজ হয়ে যায়। ফাসেকী ও ছোট কুফরীর কারণে দীনী ভ্রাতৃত্ব খতম হতে পারে না।

 তুমি কি দেখ না যে, হত্যার প্রসঙ্গে বর্ণিত আল্লাহ তা‘আলার বাণী, যাতে তিনি বলেছেন:

“তবে তার ভাইয়ের পক্ষ থেকে কোন ক্ষমা প্রদর্শন করা হলে যথাযথ বিধির অনুসরণ করা ও সততার সাথে তার রক্ত-বিনিময় আদায় করা কর্তব্য।” – (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭৮); এখানে আল্লাহ তা‘আলা ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির ভাই বলে আখ্যায়িত করেছেন, অথচ ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে অন্যতম বড় ধরনের কবীরা গুনাহ; কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

“আর কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে লা‘নত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন।” – (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৯৩)।

অতঃপর তুমি দেখ আল্লাহ তা‘আলার ঐ বাণীর দিকে, যাতে মুমিনগণের দুই দলের মধ্যে সংঘটিত পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে; তিনি বলেছেন:

“আর মুমিনদের দু’দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও; অতঃপর তাদের একদল অন্য দলের বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করলে, যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ কর, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারপর যদি তারা ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ইনসাফের সাথে আপোষ মীমাংসা করে দাও এবং ন্যায়বিচার কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ ন্যায়বিচারকদেরকে ভালবাসেন। মুমিনগণ তো পরস্পর ভাই ভাই; কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে দাও।” – (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৯ – ১০)। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা সংস্কারপন্থী গ্রুপ এবং পরস্পর যুদ্ধরত দুই দলের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অবশিষ্ট থাকার কথা ঘোষণা করেছেন, অথচ মুমিন ব্যক্তির সাথে লড়াই করা কুফরী কাজের অন্তর্ভুক্ত, যা সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত; ইমাম বুখারী র. এবং অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে হাদিস বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“মুসলিমকে গালি দেয়া পাপ কাজ এবং তার সাথে মারামারি করা কুফরী।”[1] কিন্তু তা এমন কুফরী, যা তাকে মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ করে না; কেননা, যদি তা মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কারকারী হত, তাহলে তার সাথে ঈমানী ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক অটুট থাকত না, অথচ উক্ত আয়াতটি মারামারিতে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও ঈমানী ভ্রাতৃত্ব বহাল থাকা প্রমাণ করে।

আর এর দ্বারা বুঝা গেল যে, সালাত ত্যাগ করা এমন কুফরী কাজ, যা সালাত বর্জনকারী ব্যক্তিকে দীন ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়; কেননা, তা যদি ফাসেকী অথবা যেনতেন নিম্নমানের কুফরী হত, তাহলে ঈমানী ভ্রাতৃত্ব সালাত বর্জনের কারণে নির্বাসিত হয়ে যেত না, যেমনিভাবে তা (ঈমানী ভ্রাতৃত্ব) বিলুপ্ত হয়ে যায় না মুমিনকে হত্যা করা এবং তার সাথে মারামারি করার কারণে।

আর যদি কোনো প্রশ্নকারী প্রশ্ন করে যে, আপনারা কি যাকাত আদায় না করার কারণে কেউ কাফির হয়ে যাবে বলে মনে করেন? যেমনটি সূরা তাওবার আয়াত থেকে বুঝা যায়।

 জবাবে আমরা বলব: কতিপয় আলেমের মতে, যাকাত আদায় না করা ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে; আর এটা ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল র. এর থেকে বর্ণিত দু‘টি মতের একটি।

 কিন্তু আমাদের নিকট জোরালো মত হল, সে কাফির হবে না, তবে তাকে ভয়ানক শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে, যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবের মধ্যে আলোচনা করেছেন; আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন তাঁর সুন্নাহর মধ্যে; তন্মধ্যে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসের মধ্যে আছে, তাতে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাত দানে বিরত থাকা ব্যক্তির শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন; আর সেই হাদিসের শেষ অংশে রয়েছে:

“অতঃপর তাকে তার পথ দেখানো হবে- হয় জান্নাতের দিকে অথবা জাহান্নামের দিকে।” ইমাম মুসলিম র. হাদিসটি “যাকাতে বাধাদানকারীর অপরাধ” ( باب إِثْمِ مَانِعِ الزَّكَاةِ ) নামক পরিচ্ছেদে দীর্ঘ আকারে বর্ণনা করেছেন।”[2] আর এই হাদিসটি প্রমাণ করে যে, সে কাফির হবে না; কারণ, সে যদি কাফির হয়ে যেত, তাহলে তার জন্য জান্নাতে যাওয়ার কোনো পথ থাকত না।

 অতএব, এই হাদিসটির সরাসরি বক্তব্য সূরা তাওবার আয়াতের ভাবার্থের উপর প্রাধান্য পাবে; কারণ, সরাসরি বক্তব্য ভাবার্থের উপর প্রাধান্য পায়, যেমনটি জানা যায় ফিকহ শাস্ত্রের মূলনীতিমালার মধ্যে।

দ্বিতীয়ত: আস-সুন্নাহ থেকে দলীল-প্রমাণ:
১. নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“কোনো লোক এবং শির্ক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত পরিত্যাগ করা।” ইমাম মুসলিম র. হাদিসটি কিতাবুল ঈমান অধ্যায়ে জাবির ইবন আবদিল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন।”[3]

২. বুরাইদা ইবন হোসাইব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:

“আমাদের ও তাদের মাঝে অঙ্গীকার বা চুক্তি হল সালাতের, সুতরাং যে ব্যক্তি তা বর্জন করল, সে কুফরী করল।” – (আহমদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনু মাজাহ)।”[4]

 খানে কুফর (الكفر) দ্বারা উদ্দেশ্য হল, এমন কুফরী যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মুসলিম মিল্লাত (সম্প্রদায়) থেকে বের করে দেয়; কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুমিন ও কাফিরদের মাঝে সালাতকে পৃথককারী সূচক বানিয়ে দিয়েছেন; আর এটা সকলের নিকট সুবিদিত যে, কাফির মিল্লাত এবং মুসলিম মিল্লাত একে অপরের বিপরীত; ফলে যে ব্যক্তি এই (সালাতের) অঙ্গীকার পূরণ করবে না, সে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

৩. আর সহীহ মুসলিমের মধ্যে উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেচ্“অচিরেই এমন কতক আমীরের (নেতার) উদ্ভব ঘটবে, তোমরা তাদের কিছু কর্মকাণ্ডের ভালো-মন্দ চিনতে পারবে, আর কিছু কর্মকাণ্ড অপছন্দ করবে; সুতরাং যে ব্যক্তি স্বরূপ চিনে নিল, (কোনোরূপ সন্দেহে পতিত না হয়ে তা থেকে বাঁচার জন্য কোনো উপায় বেছে নিল) সে মুক্তি পেল; আর যে ব্যক্তি তাদেরকে অপছন্দ করল, সে (গুনাহ থেকে) নিরাপদ হল; কিন্তু যে ব্যক্তি তাদের পছন্দ করল এবং অনুসরণ করল (সে ক্ষতিগ্রস্ত হল)। সাহাবীগণ জানতে চাইলেন: আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করব না? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলরেন: না, যতক্ষণ তারা সালাত আদায় করবে।” – (মুসলিম)।”[5]

৪. আর সহীহ মুসলিমের মধ্যে ‘আউফ ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন“তোমাদের সর্বোত্তম নেতা হচ্ছে তারাই, যাদেরকে তোমরা ভালবাস এবং তারাও তোমাদেরকে ভালবাসে; আর তারা তোমাদের জন্য দো‘আ করে এবং তোমরাও তাদের জন্য দো‘আ কর। পক্ষান্তরে তোমাদের নিকৃষ্ট নেতা হচ্ছে তারাই, যাদেরকে তোমরা ঘৃণা করা এবং তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে; আর তোমরা তাদেরকে অভিশাপ দাও, আর তারাও তোমাদেরকে অভিশাপ দেয়। বলা হল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাদেরকে তরবারী দ্বারা প্রতিহত করব না? তখন তিনি বললেন: না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম রাখবে।” – (মুসলিম)।”[6]

সুতরাং এই শেষ দু‘টি হাদিসের মধ্যে একথা প্রমাণিত হয় যে, নেতাগণ যখন সালাত কায়েম করবে না, তখন তাদেরকে তরবারি দ্বারা প্রতিহত করা আবশ্যক হবে; আর ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বা যুদ্ধ করা বৈধ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা প্রকাশ্য কুফরীতে লিপ্ত হবে। এ ব্যাপারে আমাদের নিকট আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে; কেননা, ওবাদা ইবন সামেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ডাকলেন, তারপর আমরা তাঁর নিকট বায়‘আত গ্রহণ করলাম; তিনি তখন আমাদেরকে যে শপথ গ্রহণ করান, তার মধ্যে ছিল: আমরা আমাদের সুখে ও দুঃখে, বেদনায় ও আনন্দে এবং আমাদের উপর অন্যকে অগ্রাধিকার দিলেও পূর্ণঙ্গরূপে শোনা ও মানার উপর বায়‘আত করলাম। আরো (বায়‘আত করলাম) আমরা ক্ষমতা সংক্রান্ত বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হব না। তিনি বলেন: তবে যদি তোমরা এমন সুস্পষ্ট কুফরী দেখ, যে বিষয়ে তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান, তাহলে ভিন্ন কথা।” – (বুখারী ও মুসলিম)।”[7]

আর এর উপর ভিত্তি করে বলা যায়- তাদের সালাত বর্জন করা সুস্পষ্ট কুফরী বলে বিবেচিত হবে, যার সাথে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে তরবারী নিয়ে লড়াই করার বিষয়টিকে শর্তযুক্ত করে দিয়েছেন, যে ব্যাপারে আল্লাহর নিকট থেকে আমাদের জন্য জ্বলন্ত প্রমাণ রয়েছে।

আর কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে কোথাও বর্ণিত হয় নি যে, সালাত বর্জনকারী ব্যক্তি কাফির নয় অথবা সে মুমিন; বড়জোর এই ব্যাপারে (কুরআন ও সুন্নায়) এমন কতগুলো ভাষ্য এসেছে, যা তাওহীদ তথা আল্লাহর একত্ববাদের ফযীলত এবং এর সাওয়াবের প্রমাণ বহন করে; আর সে তাওহীদ হল: এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই, আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। তবে এ ভাষ্যগুলোরও রয়েছে কয়েকটি অবস্থা,

* সে সকল ভাষ্যে রয়েছে এমন কিছু শর্ত, যে শর্তের কারণেই সালাত ত্যাগ করা যায় না;

* অথবা তা এমন এক বিশেষ অবস্থার সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়ে বর্ণিত হয়েছে, যাতে সালাত ত্যাগ করার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মা‘যুর বা অপারগ বলা যেতে পারে;

* অথবা ভাষ্যগুলো ব্যাপক (عام), যা সালাত বর্জনকারী কাফির হওয়ার দলীলসমূহের উপর প্রযোজ্য হবে; কারণ, সালাত বর্জনকারী কাফির হওয়ার দলীলসমূহ বিশেষ ( خاص ) দলীল; আর খাস (বিশেষ দলীল) ‘আমের (ব্যাপকতাপূর্ণ দলীলের) উপর অগ্রাধিকার পাবে।

সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি বলে: এই কথা বলা কি সঠিক হবে না যে, যেসব দলীল সালাত বর্জনকারী কাফির হওয়া প্রমাণ করে, সেগুলো ঐ ব্যক্তির বেলায় প্রযোজ্য হবে, যে ব্যক্তি সালাতের আবশ্যকতাকে অস্বীকারকারী হিসেবে তা বর্জন করে?

জবাবে আমরা বলব: এটা সঠিক নয়; কারণ, তা দু’টি কারণে নিষিদ্ধ:

প্রথম কারণ: সেই গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে উপক্ষো করা, যাকে শরী‘য়তপ্রবর্তক গুরুত্বারোপ করেছেন এবং তার সাথে বিধান সংশ্লিষ্ট করেছেন।

কারণ, শরী‘য়তপ্রবর্তক সালাত ত্যাগ করাকেই কুফরী বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, যা সালাত অস্বীকার করার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের। তাছাড়া সালাত প্রতিষ্ঠার উপর দীনী ভ্রাতৃত্ব স্থাপিত হয়, সালাতের আবশ্যকতার স্বীকৃতির প্রদানের উপর নয়; কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন নি: সুতরাং তারা যদি তাওবা করে এবং সালাতের আবশ্যকতাকে স্বীকার করে …; আর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামও বলেননি: বান্দা এবং শির্ক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হল সালাতের আবশ্যকতাকে অস্বীকার করা, অথবা তিনি বলেন নি: আমাদের ও তাদের মাঝে অঙ্গীকার বা চুক্তি হল সালাতের আবশ্যকতার স্বীকৃতি প্রদান করা, সুতরাং যে ব্যক্তি তার আবশ্যকতাকে অস্বীকার করল, সে কুফরী করল[8]।

আর যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্য এটা[9]ই হতো, তাহলে তা থেকে অন্য দিকে প্রত্যাবর্তন করাটা সেই কথার পরিপন্থি হত, যে বক্তব্য আল-কুরআনুল কারীম নিয়ে এসেছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

“আমি প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি।” – (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৮৯)। তাছাড়া আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন:

“আর আমি তোমার প্রতি যিকির (আল-কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে বুঝিয়ে দিতে পার সেসব বিষয়, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছিল।” – (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৪)। দ্বিতীয় কারণ: এমন এক গুণ বা বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনায় রাখা, যার উপর শরী‘য়তপ্রবর্তক কোনো বিধানের ভিত্তি রাখেননি।

কেননা, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের অপরিহার্যতাকে অস্বীকার করা কুফরি; যদি না সে ব্যক্তির পক্ষে এ বিষয়টি না জানার কোনো গ্রহণযোগ্য ওজর না থাকে, চাই সে সালাত আদায় করুক অথবা ত্যাগ করুক। অতএব, যদি কোনো ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে এবং তার নির্ধারিত শর্তাবলী, আরকান (ফরয), ওয়াজিব ও মুস্তাহাবসমূহসহও যথাযথভাবে আদায় করে, কিন্তু সে তার (সালাতের) ফরয হওয়ার বিষয়টিকে বিনা ওজরে অস্বীকার করে, তাহলে সে সালাত বর্জন না করা সত্ত্বেও কাফির বলে বিবেচিত হবে।

সুতরাং এর মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, উপরে বর্ণিত (সালাত ত্যাগকারী কাফের হওয়া বিষয়ক) শরী‘য়তের ভাষ্যসমূহকে যে ব্যক্তি সালাতের অপরিহার্যতাকে অস্বীকার করে- তার জন্য নির্ধারণ করা সঠিক নয়; বরং সঠিক কথা হল, (এগুলোকে সালাত পরিত্যাগকারীর উপর প্রয়োগ করা হবে, সে হিসেবে) সালাত বর্জনকারী এমন কাফির হিসেবে গণ্য হবে, যা তাকে মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ করে দেয়; যেমনটি পরিষ্কারভাবে এসেছে ইবনু আবি হাতিম কর্তৃক তাঁর সুনানে বর্ণিত হাদিসের মধ্যে, তিনি ‘উবাদা ইবন সামেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:  “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এই বলে উপদেশ দিয়েছেন: তোমরা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত বর্জন করো না; কারণ, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত বর্জন করবে, সে ব্যক্তি মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ হয়ে যাবে।”

আর আমরা যদি উপরোক্ত কুরআন ও হাদিসের ভাষ্যসমূহকে (যাতে সালাত পরিত্যাগকারীকে কাফের বলা হয়েছে) সালাতের আবশ্যকতা অস্বীকারকারীর জন্য নির্ধারণ করি, তাহলে কুরআন ও হাদিসের বক্তব্যের মধ্যে বিশেষভাবে সালাতকেই উল্লেখ করার কোন অর্থ হয় না; কারণ, এই বিধান সাধারণভাবে যাকাত, সাওম ও হাজ্জকেও শামিল করে; কেননা যে ব্যক্তি এগুলোর মধ্য থেকে কোনো একটিরও আবশ্যকতাকে অস্বীকারকারী হয়ে তা বর্জন করবে, সে কাফির হয়ে যাবে, যদি না সেটা না জানার ব্যাপারে তার কোনো ওজর থাকে[10]।

আর যেমনিভাবে সালাত বর্জনকারীর কাফির হওয়ার বিষয়টি কুরআন ও হাদিসের দলীলসম্মত, ঠিক তেমনিভাবে তা জ্ঞান ও যুক্তিসম্মতও। কারণ, এমন সালাত ত্যাগ করার পরেও কিভাবে কোনো ব্যক্তির ঈমান থাকতে পারে, যে সালাত হচ্ছে দীনের খুঁটি? যার ফযীলত ও মাহাত্মের বর্ণনা এমনভাবে হয়েছে, যাতে প্রত্যেক জ্ঞানী মুমিন ব্যক্তি তা প্রতিষ্ঠার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে অগ্রসর হবে; আর সেই সালাত বর্জন করার অপরাধে এমন শাস্তির হুমকি এসেছে, যাতে প্রত্যেক জ্ঞানী মুমিন ব্যক্তি তা বর্জন ও বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকবে। অতএব, এই পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সালাত বর্জন করলে বর্জনকারীর ঈমান অবশিষ্ট থাকতে পারে না।

তবে কোনো প্রশ্নকর্তা যদি প্রশ্ন করে বলে: সালাত বর্জনকারীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কুফর ( الكفر ) শব্দটির অর্থ কি কুফরে মিল্লাত (দীন অস্বীকার) না হয়ে কুফরে নিয়ামত (নিয়ামতের অকৃতজ্ঞতা) হওয়ার সম্ভাবনা রাখে না? অথবা তার অর্থ কি বৃহত্তর কুফরী না হয়ে ক্ষুদ্রতর কুফরী হতে পারে না? তা কি হতে পারে না নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণীর মত, যাতে তিনি বলেছেন:

“দু’টি স্বভাব মানুষের মাঝে রয়েছে, যে দু’টি কুফর বলে গণ্য: (১) বংশের প্রতি কটাক্ষ করা এবং (২) উচ্চস্বরে বিলাপ করা।”[11] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন:

“মুসলিমকে গালি দেয়া পাপ কাজ এবং তার সাথে মারামারি করা কুফরী।”[12] অনুরূপ আরও অন্যান্য হাদিস।

তার জবাবে আমরা বলব: সালাত ত্যাগকারীর কুফরীর বিষয়ে এ ধরনের সম্ভাবনা ও উপমা প্রদান কয়েকটি কারণে সঠিক নয়:

প্রথমত: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতকে কুফর ও ঈমানের মাঝে এবং মুমিনগণ ও কাফিরদের মাঝে পৃথককারী সীমানা বানিয়ে দিয়েছেন। আর সীমানা তার অন্তর্ভুক্ত এলাকাকে অন্যান্য ক্ষেত্রে থেকে পৃথক করে এবং এক এলাকাকে অন্য এলাকা থেকে বের করে দেয়; কারণ, নির্ধারিত ক্ষেত্র দু’টির একটি অপরটির বিপরীত, যাদের একটি অপরটির মধ্যে অনুপ্রবেশ করবে না।

দ্বিতীয়ত: সালাত হচ্ছে ইসলামের রুকনসমূহের (স্তম্ভসমূহের) একটি অন্যতম রুকন; কাজেই সালাত বর্জনকারীকে যখন কাফির বলা হয়েছে, তখন পরিস্থিতির দাবি করে যে, সেই কুফরী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়; কারণ, সে ব্যক্তি ইসলামের রুকনসমূহের একটি রুকনকে ধ্বংস করল; কিন্তু যে ব্যক্তি কুফরী কর্মসমূহের কোন কাজ করে ফেলল, তার উপর কুফর শব্দের প্রয়োগ করার বিষয়টি এর (সালাতের বিধানের) চেয়ে ভিন্ন রকম।

তৃতীয়ত: এই ব্যাপারে অনেক দলীল রয়েছে, যা থেকে স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে, সালাত বর্জনকারী এমন কুফরীতে আক্রান্ত, যা তাকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়; তাই কুফরীর সেই অর্থই নেয়া আবশ্যক, যা দীললসমূহ প্রমাণ করে, যেন এসব দলীল একে অপরের অনুকুলে এবং সম্মিলিতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

চতুর্থত: কুফর ( الكفر ) শব্দের ব্যাখ্যা বা প্রকাশ-রীতি বিভিন্ন রকম; সুতরাং সালাত বর্জনের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«  إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاَةِ » .

“বান্দা এবং শির্ক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে সালাত পরিত্যাগ করা।”[13] এখানে আল-কুফর (الكفر) শব্দটি আলিফ লাম ( ال ) যোগে ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, কুফরের অর্থ হচ্ছে প্রকৃত কুফরী। কিন্তু আলিফ লাম (ال) ছাড়া কুফর (كفر ) শব্দটি যখন নাকেরা (অনির্দিষ্ট) হিসেবে ব্যবহৃত হয় অথবা কাফারা ( كَفَرَ ) শব্দটি ফেল (ক্রিয়া) হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা প্রমাণ করে যে, এটা কূফরীর অন্তর্ভুক্ত অথবা সে এই কাজের ক্ষেত্রে কুফরী করেছে; আর সেই সাধারণ কুফরী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে খারিজ (বের) করে দেয় না।

শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যা র. (আস-সুন্নাতুল মুহাম্মাদীয়া প্রকাশনা কর্তৃক মুদ্রিত) ‘ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম‌’ ( اقتضاء الصراط المستقيم ) নামক গ্রন্থের ৭০ পৃষ্ঠায় এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন: :

« اثْنَتَانِ فِى النَّاسِ هُمَا بِهِمْ كُفْرٌ » . ( رواه مسلم ) .

“দু’টি স্বভাব মানুষের মাঝে রয়েছে, যে দু’টি তাদের মধ্যে কুফর বলে গণ্য।”[14]

ইবনু তাইমিয়্যা র. বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: « هُمَا بِهِمْ كُفْرٌ » [ তাদের মধ্যকার স্বভাব দু’টি কুফরী ] এর অর্থ হল: মানুষের মধ্যে বিদ্যমান এই স্বভাব দু’টি কুফরী; সুতরাং এখানে প্রকৃতপক্ষে স্বভাব দু’টি কুফরীর অর্থ হল কাজ দু’টি কুফরী, যা মানুষের মধ্যে বিদ্যমান; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, যে কোন ব্যক্তির মধ্যে কুফরীর কোনো শাখা পাওয়া যাবে, সে সম্পূর্ণরূপে কাফির হয়ে যাবে, যতক্ষণ না তার মধ্যে প্রকৃত কুফরী বিদ্যমান থাকবে। যেমনিভাবে যে কোনো ব্যক্তির মধ্যে ঈমানের কোনো একটি শাখা পাওয়া গেলে, তাতেই সেই মুমিন হতে পারে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে তার মধ্যে মূল ঈমান না আসবে। আর আলিফ লাম (ال) দ্বারা নির্দিষ্টভাবে যে কুফর (كفر ) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে- যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্তি:

« ليس بين العبد وبين الشرك أو الكفر إلا ترك الصلاة » .

“বান্দা এবং শির্ক অথবা কুফরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে শুধু সালাত বর্জন করা।”[15] (এর মধ্যকার ال সম্বলিত ‘আল-কুফর’ শব্দ) এবং যে হাঁ সূচক বাক্যে আলিফ লাম (ال) ব্যতীত অনির্দিষ্টভাবে যে কুফর (كفر) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে- এই দু’টির মাঝে অনেক পার্থক্য রয়েছে।

অতঃপর যখন উপরোক্ত দলীলসমূহের দাবি অনুযায়ী একথা পরিষ্কার হয়ে গেল যে, শরীয়তসম্মত কোন ওযর ব্যতীত, সালাত বর্জনকারী ব্যক্তি মুসলিম মিল্লাত থেকে খারিজ করে দেওয়ার মত কাফির হিসেবে গণ্য হবে, তখন সে মতটিই সঠিক, যা ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল র. অবলম্বন করেছেন; আর এটা ইমাম শাফেয়ী র. এর দু’টি মতের অন্যতম একটি মত, যেমনটি ইবনু কাছীর র. এই আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ করেছেন, যেখানে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:

﴿ فَخَلَفَ مِنۢ بَعۡدِهِمۡ خَلۡفٌ أَضَاعُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَٱتَّبَعُواْ ٱلشَّهَوَٰتِۖ ﴾ [مريم: ٥٩]

“তাদের পরে আসল অযোগ্য উত্তরসূরীরা, তারা সালাত নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুবর্তী হল।” – (সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৫৯)। আর ইবনুল কাইয়্যেম র. ‘কিতাবুস সালাত‌’ (كتاب الصلاة) এর মধ্যে উল্লেখ করেছেন যে, এটা হচ্ছে ইমাম শাফেয়ী র. এর দু’টি মতের অন্যতম; আর ইমাম ত্বাহাভী র. তা স্বয়ং ইমাম শাফেয়ী থেকেই বর্ণনা করেছেন।

আর এই মতামত বা বক্তব্যের উপরই অধিকাংশ সাহাবী একমত ছিলেন; এমনকি অনেকে এর উপর সাহাবীদের ইজমা সংঘটিত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

আবদুল্লাহ ইবন শাকীক রাহেমাহুল্লাহ বলেন:

“মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ সালাত ব্যতীত অন্য কোনো আমল বর্জন করাকে কুফরী বলে মনে করতেন না।” [ইমাম তিরমিযী ও হাকেম র. হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং হাকেম হাদিসটিকে বুখারী ও মুসলিমের শর্তের ভিত্তিতে সহীহ বলেছেন ]।[16]

 প্রখ্যাত ইমাম ইসহাক ইবন রা