হযরত হুসাইন রাঃ এর জীবনী


★ হযরত ইমাম হোসাইন বিন আলীহযরত ইমাম হোসাইন বিন আলী আএই অনন্য ব্যক্তিত্ব। যিনি দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাস ও ঐতিহাসিকদের চিন্তাচেতনাকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে আসছেন। ভবিষ্যতেও এ আলোড়ন অব্যাহতথাকবে। তিনি এমন এক মহানচরিত্র যিনি ইসলামের ইতিহাসকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে আছেন। যখনইতাঁর কথা আলোচনা করা হয় তখনই বিশ্বাসী মুসলমান নর নারীর অন্তর তাঁর প্রতিগভীর ভালবাসা ও অসীমশ্রদ্ধায় ভরে যায়। তিনি হচ্ছেন আল্লাহ্র হাবীব হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৌহিত্র মা ফাতিমার দ্বিতীয় পুত্র রায়হানা (অতীবপ্রিয়),বেহেশতে যুবকদের সরদার, হযরত ইমাম হোসাইন বিন আলী (রা.) বিন আবি তালিববিন আবদুল মুত্তালিব বিন হাশিম বিন আবদ মুনাফ আল কোরাইশি আল হাশিমী।মুমিনদের চোখে তিনি এমন এক কিংবদন্তীতুল্য বীর পুরুষ যিনি দ্বীন ও আদর্শেরজন্য আপন জীবনকে কুরবানী করে দিয়েছেন। তিনি ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও ত্যাগেরউজ্জ্বল প্রতীক।তিনি সেই বহুল প্রচলিত প্রবাদবাক্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি যাতে বলা হয়েছে,‘‘মৃত্যুকে আলিঙ্গন কর তাহলে জীবনকে ফিরে পাবে।” তিনি মহান শহীদী মৃত্যুকামনা করেছিলেন আরহয়েছেন অনন্ত জীবনের অধিকারী। মানুষের স্মৃতিপটে তিনি আপন মহিমায়ভাস্বর। মুসলমানদের অন্তরে তিনি চিরদিনের জন্য ঠাঁই করে নিয়েছেন।আত্মোৎসর্গের এক মহান প্রতীকতিনি।শুভ আবির্ভাবহযরত ইমাম হাসান (রা.) এর বয়স তখনও দু’বছর পূর্ণ হয়নি। আল্লাহ্র নবী রাসূলেমকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট খবর এল অচিরেই তাঁরদ্বিতীয় নাতি দুনিয়ায়আসছেন। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বকালকে আইয়ামে জাহেলিয়া অর্থাৎঅন্ধকার যুগ বলা হয়। সে যুগে ‘হাসান’ ‘হোসাইন’ এ সমস্ত নাম কারো জানা ছিলনা। কোথাও চালুও ছিল না।হযরত উমর বিন সোলাইমান (রা.) হতে বর্ণিত, ‘হাসান’ ‘হোসাইন’ নামসমূহবেহেশতবাসিদের মধ্যে হতে এসেছে, জাহেলি যুগে এ সমস্ত নাম কারো জানাছিল না। (উসদুল গাবাহ, ২য়খন্ড)চতুর্থ হিজরির ৩ শা’বান মাসে (৮ জানুয়ারি ৬২৬ইং) তাঁর জন্ম। তাঁর জন্মের শুভসংবাদে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই আনন্দিতহয়েছিলেন। তিনি তাঁর তাহনিক(তাহনিকঃ একটি ইসলামি প্রথা। খেজুর ইত্যাদি জাতীয় ফল চিবিয়ে তার রসনবজাতকের প্রথম খাবার রূপে মুখে দেয়া এবং পরে তার কানে আযান দেয়া)করলেন ও তাঁর কানে আযান দিলেন।(আত তিরমীযি) এবং তিনিই নবজাতকের নাম হোসাইন রাখেন। হাদিস শরীফেরবর্ণনায় এর প্রমাণ আছে।হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর চেহারা ছিল খুবই আকর্ষণীয় ও সুন্দর। হুজুর করীমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র চেহারা মোবারকের সাথে তাঁরচেহারার মিল ছিল।যেভাবে মিল ছিল তাঁর বড় ভাই হযরত হাসান (রা.) এর চেহারা। জন্মেরসাতদিনের দিন স্বয়ং রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটিমেষ (কোন কোন বর্ণনায় দুটো)জবেহ করে তাঁর আকীকা (আকীকাঃ ইসলামী প্রথা। শিশুর জন্মের পর আল্লাহ্তা’য়ালার প্রতি শুকরিয়া হিসাবে একটি বা দুটো মেষ অথবা এ জাতীয় পশুজবেহ করা। ছেলের জন্য দুটো ওমেয়ের জন্য একটি) দেন। এরপর তিনি হযরত ইমাম হাসান (রা.) এর বেলায় যেমননির্দেশ দিয়েছিলেন তেমনি হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এর মাথার চুল কামিয়েতার ওজনের সমপরিমাণরৌপ্য গরীবদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন।দু’সহোদরহযরত ইমাম হাসান (রা.) ও হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এ দু’সহোদরের নাম এমনওৎপ্রোতভাবে জড়িত যে, অনেকেই ভুলক্রমে তাঁদেরকে যমজ ভাই মনে করেথাকে। অবশ্য তাঁদেরদু’ভাইয়ের মধ্যে ভালবাসা, বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতি এতই গভীর ছিল যে, তা অনেকযমজ ভাইয়ের মাঝেও দেখা যায় না। তাঁদের উভয়ের মধ্যে বয়সের ব্যবধানদু’বছরেরও কম। হযরত হোসাইন(রা.) যখন বুকের দুধ খাচ্ছেন তখন হযরত হাসান (রা.) এর ভালো করে মুখের বুলিওফোটেনি। তাঁরা দু’জন ছিলেন একাত্ম্য। একসাথে খেতেন তাঁরা, একসাথেখেলতেন। দু’জনের স্মৃতিও এক।কোথাও যেতে হলে একসাথে যেতেন তাঁরা। তাঁদের দু’জনের মধ্যে ভালবাসারযে গাঢ় বন্ধন তার পেছনকার রহস্য ছিল তাঁরা দু’জনই মহান পুরুষের পিতৃস্নেহেলালিত পালিত হয়েছিলেন।পেয়েছিলেন তাঁদের উষ্ণ সান্নিধ্য। তাঁদের পারিবারিক পরিবেশও ছিল খুবইচমৎকার, উন্নত ও সদাচরণের অনুকূল। উভয়ের প্রতি উভয়ের ছিল প্রবল অনুরাগ,আচার আচরণে ছিলেন খুবইবিনম্র ও শালীন।আগেই উল্লেখ করা হয়েছে তাঁরা উভয়ে কখনো একে অন্যের কাছ থেকেবিচ্ছিন্ন হতেন না। পবিত্র হাদিস শরীফে যেখানে হযরত হাসান (রা.) এর নামউচ্চারিতহয়েছে সেখানে অনিবার্যভাবে হযরত হোসাইন (রা.) এর কথাও উল্লেখিতহয়েছে। নিম্নোক্ত হাদিস শরীফেও এ কথার প্রমাণ মেলে।হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘হাসান এবংহোসাইন বেহেশতে যুবকদের সরদার…….।”(তিরমীজি)হযরত ওসামা বিন যায়েদ (রা.) হতে বর্ণিত একটি হাদিস শরীফে বলা হয়েছে,হুজুর করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘এরা দু’জন আমার বংশএবং আমার কন্যার সন্তান,হে আল্লাহ্! আমি তাদেরকে ভালবাসি, আপনিও তাঁদের ভালবাসুন, আরতাদেরকেও ভালবাসুন যারা এদের দু’জনকে ভালবাসে।”(তিরমীজী)হযরত হোজাইফা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘‘হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেছেন, ‘হে হোজাইফা! এই মাত্র হযরত জিবরাঈল (আ.) এসে আমাকে সুসংবাদদিয়ে গেলেন, হাসানহোসাইন হবে বেহেশতে যুবকদের সরদার।” (আহমদ)হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.) এর নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে এমনহাদিসের সংখ্যা অসংখ্য। হযরত হোসাইন (রা.) এর জীবনী বর্ণনাকালে আমরাআরও কিছু হাদিসেরউল্লেখ করব।বস্ত্তত তাঁদের উভয়কে সবসময় একই সাথে দেখা যেত। বাইরে গেলেও তাঁরাএকসাথে বের হতেন। একদিন তাঁরা ঘর হতে বের হয়ে অনেক দূরে চলেগিয়েছিলেন। হারিয়ে ফেলেছিলেন পথেরদিশা। মা জননী ফাতিমা (রা.) তাঁদের অনুপস্থিতিতে পাগলপারা হয়ে পড়লেন।ভাবলেন তাঁদের কোথাও কোন বিপদ ঘটেছে। তিনি দ্রুত আল্লাহ্র নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরদরবারে এসে কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘‘হাসান হোসাইন দু’জনই বাইরে চলে গেছে।আমি জানি না তারা কোথায় আছে।” তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘নিশ্চয়ইযিনি তাদের সৃষ্টি করেছেনতিনি তাদের প্রতি তোমার চাইতেও বেশি দয়ালু ও যত্নবান।’অতঃপর তিনি মহান আল্লাহ্র দরবারে তাঁদের নিরাপত্তার জন্য এই বলে দোয়াকরলেন, ‘‘ইয়া আল্লাহ্! তারা জলে ও স্থলে যেখানেই থাকুক না কেন, তাদেরকেনিরাপদে ফিরিয়ে দিন ওসুরক্ষা দান করুন।” তারপর আল্লাহ্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরকাছে তাঁদের সম্পর্কে খবর পৌঁছল। তাঁদের এক জায়গায় পাওয়া গেল যেখানেতাঁরা একে অন্যেরবাহুতে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসেখানে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন এবং তাঁদেরকে চুমু খেলেন। তিনি হযরতহাসান (রা.) কে ডান কাঁধে ও হযরতহোসাইন (রা.) কে বাম কাঁধে তুলে নিলেন। আর বললেন, ‘আল্লাহ্র কসম, আমিতোমাদের প্রতি সেভাবেই দৃষ্টি রাখব যেভাবে মহান সম্মানিত ও গৌরবেরঅধিকারী আল্লাহ্ তোমাদেরপ্রতি দৃষ্টি রাখেন।’পথিমধ্যে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর সাথে নবী করীম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাক্ষাৎ হল। তিনি বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ্! একজনকেআমায় দিন যাতে আপনারবোঝা কিছু হালকা হয়।’ কিন্তু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামজবাব দিলেন, ‘‘কি চমৎকার বাহন তাদের আর কি চমৎকার আরোহীই না তারা!আর তাদের পিতা তাদেরচেয়ে উত্তম।” এভাবে তিনি তাঁদেরকে মসজিদ পর্যন্ত বহন করে নিয়ে এলেন।”(মাজমা’উজ জাওয়ায়েদ কৃত আল হাইতামি, খন্ড ৯, পৃ: ১৮২)হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.) দু’জনও আল্লাহ্র হাবীব নবী করীমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গভীরভাবে ভালবাসতেন। তিনিযেখানেই থাকতেন তাঁকে তাঁরা খুঁজে বেরকরতেন।একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা দিচ্ছিলেন।সেখানে হযরত হাসান ও হযরত হোসাইন (রা.) উপস্থিত হলেন। তাঁদের পরনে ছিললাল পোশাক। তাঁরা একবারহোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন আবার উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটছিলেন। তিনি খুতবারজায়গা থেকে নেমে এলেন এবং তাঁদেরকে সামনে নিয়ে রাখলেন। এবং বললেন,‘‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্তা’য়ালা সত্য কথাই বলেছেন, ‘‘তোমাদের ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততি তোমাদেরজন্য পরীক্ষা স্বরূপ।’ (সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১৫) আমি দু’বালককে দেখার পর আরঅপেক্ষা করতে পারিনি। এরপর তিনি আবার খুতবা দিতে শুরু করলেন।”(মুসনাদ আহমদ, সুনান আবু দাউদ ও ইবনে মাজা)আল্লাহ্র হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বড়ই জ্ঞানী। তিনিউভয়ের উপর খুবই প্রভাব বিস্তার করতেন। তাঁদের উভয়ের জন্য ছিল তাঁর গভীরমমত্ববোধ। তাঁরা এমন একপ্রেমময় পরিবারে বেড়ে উঠেছেন যেখানে একের প্রতি অন্যের ছিল অফুরন্তদরদ, ভালবাসা ও সহানুভূতি। তাই তাঁদের মাঝে এমন অনুভূতি জাগ্রত হয়েছিল যে,তাঁরা যেন দু’জনে মিলে একজন।হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন কালো পশমের চাদর পরে বাইরে এলেন। তাতেউটের জিনের ছবি অঙ্কিতছিল। তখন হযরত ফাতিমা (রা.) এলেন। তিনি তাঁকে চাদরের মধ্যে ঢুকালেন।এরপর হযরত হাসান বিন আলী (রা.) এলেন। তাঁকেও চাদরের নিচে নেয়া হল।তারপর এলেন হযরত হোসাইন(রা.)। তাঁকেও চাদরের নিচে নেয়া হল। সবশেষে এলেন হযরত আলী (রা.)।তাঁকেও চাদরের নিচে ঢুকালেন। তারপর বললেন, ‘‘হে আহলে বায়ত (নবীপরিবারের সদস্য)! আল্লাহ্ শুধু চাহেনতোমাদের থেকে সর্বপ্রকার অমঙ্গল ও পাপ বিদূরিত করতে।” (আল আহযাব ৩৩ঃ৩৩) এ কারণে তাঁদেরকে চাদরের সাহাবা বলা হয়।শৈশব হতেই তিনি তাঁদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন ছোটরা যাতে বড়দের শ্রদ্ধা ওসেবা করে। কারণ যে ভালবাসার পেছনে সম্মানবোধ থাকে না সে ভালবাসাঅপূর্ণ। সম্মানবোধ ভালবাসারসাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাই হযরত হোসাইন (রা.) সবসময় হযরত হাসান (রা.)কে সম্মান করে চলতেন। তাঁকে উচ্চ মর্যাদা দিতেন। তাঁর যে কোন কথানির্দ্বিধায় মেনে চলতেন।যদি না তা অসঙ্গত কোন কাজ হত। কিন্তু হযরত হাসান (রা.) এর পক্ষ হতে কোনধরনের অসঙ্গত কাজের নির্দেশ দেয়া অভাবনীয় ছিল।তাই হযরত হাসান (রা.) যখন হযরত মুয়াবিয়া (রা.) এর পক্ষে খিলাফতের দাবিপরিত্যাগ করতে চাইলেন তখন হযরত হোসাইন (রা.) তা মেনে নিতে পারলেন না।কিন্তু যখন দেখলেন হযরতহাসান (রা.) তাঁর সিদ্ধান্তে অটল, তখন তিনি বললেন, ‘‘আপনি আমার চেয়ে বড়,আপনি খলিফা আর আমার গুরুজন, আপনাকে মানার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি,অতএব আপনারকাছে যা উত্তম বলে মনে হয় তাই করুন।” (তাহজিবুল কামাল ৬ষ্ঠ খন্ড)বস্ত্তত আমরা দেখি হযরত হাসান (রা.) এর ইন্তিকালের পরও হযরত হোসাইন (রা.)বড় ভাইয়ের নির্দেশ পালন করতে কুণ্ঠিত হননি। হযরত হাসান (রা.) নসিহত করেগিয়েছিলেনযাতে তাঁকে হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজামোবারকের পাশে দাফন করা হয়। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)ও এতে সম্মতিদিয়েছিলেন। কিন্তু মদীনারগভর্নর মারওয়ান বিন হাকাম এ বিষয়ে প্রবল আপত্তি করেন। তাতে হযরতহোসাইন (রা.) খুবই মর্মাহত হন। তিনি বিষয়টি ফয়সালার জন্য তলোয়ার বেরকরেন। বনু হাশিম গোত্রেরকিছু যুবকও তাঁর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। প্রিয় ভাইয়ের নসিহত পালনেতিনি শক্তি প্রয়োগের জন্যও প্রস্ত্তত ছিলেন। কিন্তু হযরত আবদুল্লাহ্ বিন উমর(রা.) তাঁকে স্মরণকরিয়ে দিলেন যে হযরত হাসান (রা.) তাঁর দাফন নিয়ে কোন ফিতনা সৃষ্টি ওরক্তপাত না ঘটাতে উপদেশ দিয়ে গেছেন। এ কথা শুনে হযরত হোসাইন (রা.)অস্ত্র সংবরণ করেন।তিনি ভাইয়ের অসিয়ত পালনের উদ্দেশ্যেই অস্ত্র ধারণে প্রস্ত্তত ছিলেন আবারসেই ভাইয়ের অসিয়তের কারণেই অস্ত্র ত্যাগে রাজি হন।এতে প্রকাশ পেয়েছে বড় ভাইয়ের প্রতি ছোট ভাইয়ের ভালবাসার গভীরতা। আরপ্রকাশ পেয়েছে কীভাবে ভালবাসার সাথে শ্রদ্ধার সংমিশ্রণ ঘটে থাকে তাও।নানাজান নবী করীম (সা.) এর দৃষ্টিতে হযরত হোসাইন (রা.) এর মর্যাদানবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত হাসান (রা.) ও হযরতহোসাইন (রা.) কে গভীরভাবে ভালবাসতেন।হযরত আবু আইউব আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি একদিন আল্লাহ্র হাবিবসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে উপস্থিত হয়ে দেখেন হযরতহাসান (রা.) এবং হযরতহোসাইন (রা.) দু’জন তাঁর পবিত্র বুকের ওপর খেলছেন। তিনি তাঁকে বললেন, ‘‘ইয়ারাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি কী তাঁদেরকেভালবাসেন?” তিনি জবাব দিলেন,‘‘আমি কীভাবে তাদের ভাল না বেসে পারি, যেখানে পার্থিব জীবনে তারাআমার রায়হানা!” (আত-তাবারানি)হযরত ই’য়ালা আল-‘আমিরি (রা.) বলেন, তিনি একদিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে দাওয়াতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দেখলেন হযরতহোসাইন (রা.) কিছু ছেলেরসাথে খেলছেন। তিনি তাঁকে সাথে নিতে চাইলেন। কিন্তু শিশু হোসাইন একবারএদিকে আরেকবার ওদিকে ছোটাছুটি করতে থাকলেন। আল্লাহ্র নবী(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)ওযে পর্যন্ত তাঁকে কব্জা করতে না পারলেন সে পর্যন্ত তাঁর সাথে ছোটাছুটিকরতে থাকলেন। হাসান তাঁর ছোট্ট এক হাত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম এর ঘাড় মোবারকেরনিচে রাখলেন। আর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মুখের ওপরমুখ রেখে চুমু খেতে বললেন, ‘‘হোসাইন আমার থেকে আর আমি হোসাইন থেকে।যে হোসাইনকে ভালবাসে আল্লাহ্ তাকে ভালবাসেন। সে আমার দৌহিত্রেরমধ্যে একজন। যে আমাকে ভালবাসে সে যেন হোসাইনকে ভালবাসে।”(তারিখ বিন আসাকির। ইবনে মাজাহ কর্তৃক বর্ণিত। ইয়ালা বিন মুররাহ আততাকাফি (রা.) এর বরাতে)প্রিয় দৌহিত্রের প্রতি হযরত রাসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর ভালবাসা কত গভীর ছিল এ হাদিস শরীফে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনিতাঁকে সাথে সাথেই রাখতেন।এমনকি দাওয়াতেও শরীক করতেন। তাঁর শিশুসুলভ চপলতাকে সহাস্যে সহ্য করেযেতেন। স্নেহ মমতায় তাঁকে চুমু খেতেন। তাঁর সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণকরতেন। বলতেন, ‘‘সে ‘সিবতুলমিনাল আসবাত’।” অর্থাৎ উত্তম জাতির অংশ। তিনি তাঁর পক্ষে আল্লাহ্ রাববুলআলামীনের দরবারে ফরিয়াদ জানাতেন। তিনি মুসলিম জাতির প্রতি আহবানজানিয়েছেনতাঁকে ভালবাসতে। এটা এমন এক ভালবাসা যা সহজেই আমাদের মনপ্রাণ ছুঁয়েযায়।হযরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) বলেন, ‘‘আমি এক বিশেষ প্রয়োজন বশত একবাররাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে যাই। তিনি বাইরেআসলেন। তাঁর পবিত্র হাতমোবারকে কিছু একটা ধরা ছিল কিন্তু তা কী আমি বুঝতে পারছিলাম না।প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে আমি জানতে চাইলাম, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম। আপনারবাহুতে কাকে ধারণ করে আছেন? অতঃপর তিনি তা প্রকাশ করলেন। আমিদেখলাম হাসান এবং হোসাইন তাঁর পিঠের ওপর। তিনি বললেন, ‘এরা আমারসন্তান এবং আমার কন্যার সন্তান।হে আল্লাহ্! আপনি জানেন যে, আমি তাদের ভালবাসি। অতএব, আপনিও তাদেরভালবাসুন।’ এবং তিনি এ কথা দু’বার বললেন।”(তারিখ বিন আসাকির, ৪র্থ খন্ড)হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আববাস (রা.) বলেন, আল্লাহ্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লাম হাসান হোসাইনের জন্য আল্লাহ্র কাছে পানাহ চেয়ে বলতেন,‘‘আল্লাহ্র পরিপূর্ণ বাক্যেরমাধ্যমে আমি তোমাদের পানাহ চাই, সমস্ত শয়তান, বিষাক্ত, নীচাশয় জীব ওঈর্ষাপরায়ণ নজর হতে।” (তিরমীজি)একদিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী (রা.) এর গৃহেরপাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হযরত হোসাইন (রা.) এর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন।তিনি হযরতফাতিমা আয যাহরা (রা.) কে ডেকে বললেন, ‘‘হে যাহরা! তুমি কি জান না তারকান্না আমাকে পীড়া দেয়?”হযরত হোসাইন (রা.)ও রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এঅতুলনীয় ভালবাসাকে যথাযথ মর্যাদা দিতেন। তিনি কখনো তাঁর কাছ ছাড়াহতেন না। এমনকি আল্লাহ্র হাবীবসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুতবা দিতে মিম্বরে দাঁড়াতেন তখনওতিনি তাঁর কাছে থাকতেন। এ কথা আমরা পূর্বেই জেনেছি যে, রাসূলে পাকসাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়াসাল্লামএর সান্নিধ্য ও ভালবাসা পেয়ে তিনি তাঁকে অনেক সময় সম্বোধন করতেন ‘‘হেআমার পিতা” বলে।তাঁর প্রতি সাহাবাগণ (রা.) এর ভালবাসা ও সম্মানবোধরাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাগণ (রা.) হযরতহাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.) এর প্রতি গভীর ভালবাসা পোষণ করতেন।তাঁদেরকে মর্যাদারচোখে দেখতেন। তাঁদের কাছাকাছি থাকতে ভালবাসতেন। এর অন্যথা হওয়ারকোন উপায়ও ছিল না। কারণ মহানবী রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়াসাল্লামই তাঁদের শিক্ষা দিয়েছিলেন।তিনি বলেছেন, ‘‘যে আমাকে ভালবাসে সে যেন তাদেরকে ভালবাসে।”সাহাবাগণ (রা.) এর পক্ষে সেটাই ছিল শোভন ও স্বাভাবিক। কারণ রাসূলে করীমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামমহান আল্লাহ্ রাববুল আলামীনের দরবারে তাঁদেরকে ভালবাসার জন্য প্রার্থনাজানিয়েছিলেন। আর মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু তা’য়ালা যাকে ভালবাসেনপৃথিবীর সকল সৎকর্মশীল বান্দাইতাঁকে ভালবাসে। হযরত হোসাইন (রা.) এর চেহারা রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা মোবারকের সাথে মিল ছিল। তাই তাঁরউপস্থিতি সাহাবাগণকে (রা.) আল্লাহ্রপ্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথা মনে করিয়ে দিত। এতেতাঁর প্রতি তাঁদের ভালবাসা আরো বেড়ে যেত।হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.) কেগভীরভাবে ভালবাসতেন। তাঁদের নৈকট্য কামনা করতেন। কারণ তিনিতাঁদেরকেই বেশি ভালবাসতেনযাঁদেরকে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালবাসতেন। হযরতআবু বকর সিদ্দিক (রা.) লোকজনকে আহবান জানাতেন যেন তারা রাসূলে করীমসাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারের সদস্যদের ভালবাসে ও যথাযথ মর্যাদা দেয়।তিনি বলতেন, ‘‘হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারেরসদস্যদের সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করো।” তিনিআরো বলতেন, ‘‘সেইসত্বার শপথ! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমার কাছে আমার নিজের আত্মীয়েরচেয়ে হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আত্মীয়গণবেশি প্রিয়।”হযরত উমর বিন খাত্তাব (রা.) হযরত হোসাইন (রা.) ও তাঁর ভাইকে খুবই সম্মানেরচোখে দেখতেন। তাঁদেরকে যথাযথ মর্যাদা দিতেন। তাঁদের সাথে ঘনিষ্ঠতাবজায় রেখে চলতেন। হযরতউমর (রা.) বায়তুলমাল প্রতিষ্ঠার পর হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.) সহবদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেককে পাঁচ হাজার দিরহাম করে ভাতারব্যবস্থা করেন।হযরত হোসাইন (রা.) বলেন, আমি উমরের মিম্বরে আরোহণ করে বললাম, ‘‘আমারপিতার মিম্বর ছেড়ে আপনার পিতার মিম্বরে গিয়ে উপবেশন করুন।” তিনিবললেন, ‘‘আমার পিতারকোন মিম্বর নেই।” অতঃপর তিনি আমাকে তাঁর পাশে বসালেন। যখন তিনি মিম্বরহতে নেমে এলেন তখন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘হে আমার ছেলে! কে এসবআপনাকে শিখিয়েছে?”আমি বললাম, ‘‘কেউ আমাকে এটা শিখিয়ে দেয়নি।” তিনি বললেন, ‘‘হে আমারসন্তান! আল্লাহ্ এবং আপনারা ছাড়া আমাদের মাথায় এ চুল গজিয়েছেন কে?”তারপর তিনি তাঁর মাথায় হাতবুলালেন এবং বললেন, ‘‘হে আমার সন্তান! আপনি যদি আমাদের সাথেনিয়মিতভাবে সাক্ষাৎ করতেন…….।”(‘তারিখে বাগদাদ’ আল-খাতিব আল বাগদাদী কর্তৃক বর্ণিত এবং সিয়ার আলমআন নুবালা, খন্ড ৩, পৃ: ২৬৫)একবার হযরত উমর (রা.) এর কাছে ইয়েমেন থেকে কিছু কাপড় চোপড় এসেছিল।তিনি জনসাধারণের মাঝে সে সব বিতরণ করে দিলেন। এমন সময় সেখানে হযরতহাসান (রা.) ও হযরতহোসাইন (রা.) উপস্থিত হলেন। তখন ইয়েমেনি কাপড়ের আর কিছুই অবশিষ্ট ছিলনা। এতে হযরত উমর (রা.) খুবই ব্যথিত হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ইয়েমেনিপ্রতিনিধির কাছে অতিসত্বরআরো কাপড় পাঠানোর জন্য খবর পাঠালেন। সেখান হতে পুনরায় কাপড় এলে তাথেকে দু’খন্ড হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.) এর কাছে পাঠিয়েদিলেন। তারপর বললেন, ‘‘এখনআমি স্বস্তি পাচ্ছি।”হযরত হোসাইন (রা.) বলেন, একদিন আমি হযরত উমর (রা.) এর কাছে গেলাম। তিনিতখন হযরত মুয়াবিয়া (রা.) এর সাথে একাকি ছিলেন। দরজায় হযরত আবদুল্লাহ্ইবনে উমর (রা.) এরসাথে সাক্ষাৎ হল। তিনি বেরিয়ে আসছিলেন। আমিও তাঁর সাথে বেরিয়েএলাম। পরে তাঁর {হযরত উমর (রা.)}সাথে আমার দেখা হল; তিনি বললেন, ‘‘বহুদিনআপনার সাথে আমার দেখা হয়না।” আমি বললাম, ‘‘ইয়া আমীরুল মোমেনীন! আমি আপনার কাছে গিয়েছিলাম,আপনি হযরত মুয়াবিয়া (রা.) এর সাথে একাকি ছিলেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর(রা.) সেখানে ছিলেন।তিনি ফিরে আসছিলেন আমিও তাঁর সাথে ফিরে এসেছি।” তিনি বললেন, ‘‘ইবনেউমরের (আব্দুল্লাহ্র) চাইতে আমার কাছে আসার হক আপনার বেশি। আমাদেরমাথায়যা গজিয়েছে তা আল্লাহ্রই অনুগ্রহে আর আপনাদের পরিবারের উছিলায়।”(তাহজিবুল কামাল, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ: ৪০৪)আল আইজার বিন হুরায়িশ বলেন, হযরত আমর বিন আল আ’স (রা.) একদিন কা’বারছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সে সময় হযরত হোসাইন (রা.) কে দেখে তিনিবললেন, ‘‘বেহেশতবাসিদেরচোখে আজকের দিনে পৃথিবীর পৃষ্ঠে বিচরণকারি মানুষের মধ্যে তিনিই হচ্ছেনপ্রিয়তম মানুষ।”(সিয়ার আ’লম আন নুবালা, ৩য় খন্ড)হযরত ইবনে আববাস (রা.) বহনকারী পশুদের তাঁদের {হযরত হাসান (রা.) ও হযরতহোসাইন (রা.) এর} কাছে নিয়ে আসতেন। এ কাজকে তিনি নিজের জন্য সৌভাগ্যবলে মনে করতেন।তাঁরা দু’জন যখন আল্লাহ্র ঘর তওয়াফ করতেন লোকজন তাঁদের অভিনন্দনজানানোর জন্য ঘিরে ধরতেন। মনে হত লোকজনের ভিড়ে তাঁরা পিষ্ট হয়েযাবেন। মহান আল্লাহ্ তাঁদেরপ্রতি সন্তুষ্ট থাকুন, তাঁরাও সন্তুষ্ট আছেন মহান আল্লাহ্র প্রতি।(আল বিদায়াহ আন নিহায়া ৪র্থ খন্ড)আল্লাহ্র নবীর সাহাবায়ে কেরামগণ হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হোসাইন (রা.)কে তাঁদের বাল্য অবস্থা থেকেই ভালবাসতেন। তাঁদের বয়স বাড়ার সাথে সাথেতাঁদেরপ্রতি সাহাবা কেরামগণের ভালবাসাও বাড়তে থাকে। কারণ তাঁরা ছিলেন পূতপবিত্র চরিত্রের অধিকারী। তাঁদের মহত্ব ও চরিত্র মাধুর্য সবারই মনোযোগআকর্ষণ করত।সর্বোপরি আল্লাহ্র হাবীব রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামতাঁদের খুবই ভালবাসতেন। আর সাহাবায়ে কেরামগণ (রা.) সব কাজে রাসূলেকরীম সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লামকেই অনুসরণ করতেন।হযরত ইমাম আল বুখারি (রা.) হযরত আবু হোরায়রা (রা.) এর বরাতে বলেন, তিনিবলেছেন, আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে একদিনমদীনার বাজারে ছিলাম।তিনি বাজার থেকে ফিরলেন, আমিও তাঁর সাথে ফিরলাম। তিনি জানতেচাইলেন, ‘‘ছোট শিশুটি কই?” তারপর বললেন, ‘‘হাসান বিন আলীকে ডাক।” হাসানবিন আলী আসলেন। তাঁর গলায়ছিল একটা হার। আল্লাহ্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে হাতবাড়িয়ে দিলেন, হাসানও তাই করলেন। তিনি তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘‘ইয়াআল্লাহ্! আমি তাকে ভালবাসি,আপনিও মেহেরবানি করে তাঁকে ভালবাসুন, আর ভালবাসুন তাদের যারা তাকেভালবাসে।”এই যেখানে ছিল আল্লাহ্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরঅভিপ্রায়, তাই আমার কাছে হাসানের চাইতে প্রিয় আর কেউ ছিল না।তাঁর দয়াহযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। তাঁর দানশীলতা ছিলপ্রশংসাযোগ্য। তিনি কারো অনুরোধ উপেক্ষা করতেন না। দরিদ্রতার ভয়ে দানকরা থেকে তিনি বিরত থাকতেননা। এতে অবশ্য আশ্চর্য হবার কিছু নেই। কারণ তার নানাজান হযরত রাসূলে করীমসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দয়ালু মানুষদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁরদানশীলতা ছিল বাতাসেরপ্রবাহের মত।একবার এক ভিক্ষুক মদীনা শরীফের অলি গলি ঘুরে হযরত হোসাইন (রা.) এরদরজায় এসে উপস্থিত হয়ে বলতে লাগল-‘‘আজকের দিনে যে কেউ আপনার কাছে হাত পাতবেসে কখনো নিরাশ হবে না,যে আপনার দরোজায় করাঘাত হানবে,আপনি হচ্ছেন উদার হস্ত, বদান্যতার প্রতীকআপনার মহান পিতা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে করেছেন লড়াই।”হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) তখন প্রার্থনারত ছিলেন। ভিক্ষুকের হাঁক ডাক শুনেতিনি তাড়াতাড়ি নামায শেষ করে বাইরে এলেন। দেখলেন সাহায্যপ্রার্থীরচোখেমুখে দরিদ্রতার ছাপ।তিনি তাঁর চাকর কাম্বারকে ডেকে পাঠালেন। কাম্বার বলল, ‘‘হে আল্লাহ্র নবীসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সন্তান! আমি হাযির।” তিনি তাঁকেবললেন, ‘‘আমাদের হাতে আরকতটুকু জমা আছে?” সে বলল, ‘‘আপনার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিলি করার মত২০০ দিরহাম মাত্র অবশিষ্ট আছে।” তিনি বললেন, ‘‘তা নিয়ে এসো, কারণ এমনএকজনএখানে উপস্থিত হয়েছে যার প্রয়োজন আমার পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনেরচাইতে বেশি।” তিনি সেই অর্থ বেদুইনের হাতে তুলে দিয়ে বললেনঃ-‘‘এটা রেখো, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই,আমার অন্তর তোমার জন্য বিগলিতআমার যদি আরো থাকত, তাই আমি তোমাকে দিয়ে দিতাম।উন্মুক্ত আকাশ হতে সম্পদের বারিপাত ঝরুকতোমার মাথার পরেকিন্তু ভাগ্যের ওপর সন্দেহ আমাদেরঅসুখি করে রাখে।”বেদুইন তাঁর দান গ্রহণ করে যেতে যেতে বললঃ‘‘তাঁরা পাক পবিত্র, যেমন পবিত্র তাঁদের সম্পদ, তাঁদের নাম যেখানেই উচ্চারিতহয় সেখানেই নাযিল হয় আল্লাহ্র অবারিত রহমত।আর আপনি হচ্ছেন সুমহান, উচ্চশির, আপনার রয়েছে আল্লাহ্র কিতাবের জ্ঞান,আয়াতে কি বলা আছে তা আপনি জানেন উত্তমরূপে, আলীর পরিবার ছাড়াকারো অধিকার নেইঅহংকারের।” (তারিখ ইবনে আসাকির, ৪র্থ খন্ড)হযরত ইমাম হোসাইন বিন আলী (রা.) এর দুয়ার হতে কেউ কোনদিন খালি হাতেফিরে যায়নি। এমনকি কবিদেরও তিনি বিমুখ করতেন না। কবিদের দান করারব্যাপারে একবার হযরত হাসান(রা.) তাঁকে আপত্তি জানালে হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) বলেন, ‘‘সেই অর্থইসর্বোত্তম যা একজন মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে।”(তাহজিবুল কামাল)একবার মুহাম্মদ বিন বশির আল হাযরামির পুত্র বন্দী হন। তাঁর পিতা এ খবর শুনেবললেন, ‘‘আমি তার জন্য এবং আমার জন্য আল্লাহ্র তরফ হতে পুরস্কার আশা করি।আমি তারবন্দী জীবন চাই না। তার অবর্তমানে আমি বেঁচে থাকতেও চাই না।”হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) ত