ইসলামে সুন্নাহ’র অবস্থান


ইসলামে সুন্নাহ’র অবস্থান

 

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين, و الصلاة و السلام على نبينا محمد خاتم النبين, القائل: « ألا و إني أتيت القرآن و مثله معه » ( أخرجه احمد في مسنده)
(সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য; আর সালাত ও সালাম আমাদের নবী সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, যিনি বলেছেন: “জেনে রাখ, নিশ্চয়ই আমাকে আল-কুরআন দেয়া হয়েছে এবং তার সাথে তারই সদৃশ বিষয় তথা সুন্নাহ দেয়া হয়েছে।”[1])।

 

অতঃপর:
নিশ্চয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য দীনসহ সুসংবাদদানকারী, সতর্ককারী ও উজ্জ্বল প্রদীপ হিসেবে এমন সময় প্রেরণ করেছেন, যখন রাসূল প্রেরণের বিরতিকাল চলছিল এবং হেদায়াত পাওয়ার সকল পথ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল; অতঃপর তিনি তার মাধ্যমে অজ্ঞতার অন্ধকারকে আলোকিত করেছেন এবং ভ্রষ্টতা থেকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন; আর তিনি সবকিছু স্পষ্টভাবে পৌঁছিয়ে দিয়েছেন, এমনকি শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর উম্মতকে সমুজ্জ্বল পথের উপর রেখে গেছেন, তার রাত্রি যেন দিনের আলোর মত; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« إنى تارك فيكم ما إن تمسكتم به لن تضلوا بعدى كتاب الله و سنتي .» ( أخرجه الإمام مالك )
“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি, তা যদি তোমরা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে পার, তবে আমার পরে তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট হবে না, তা হল আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ বা জীবনপদ্ধতি।”[2] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন:
« … فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِى فَسَيَرَى اخْتِلاَفًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِى وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَةٌ.» (أخرجه أبو داود) .
“… কারণ, তোমাদের মধ্য থেকে যে আমার পরে জীবনযাপন করবে (বেঁচে থাকবে), সে অচিরেই বহু ধরনের মতবিরোধ দেখতে পাবে; সুতরাং তোমাদের উপর আমার সুন্নাত এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শের উপর অবিচল থাকা অপরিহার্য। তোমরা তা শক্তভাবে আঁকড়িয়ে ধরে থাকবে। সাবধান! তোমরা নতুন উদ্ভাবিত জিনিস (বিদ‘আত) পরিহার করবে। কারণ, প্রত্যেক বিদ‘আতই গুমরাহী।”[3]
এই বরকতময় অধিবেশনে আপনাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ চায়তো আমরা যে বিষয়ে আলোচনা করব, তা হল: ‘সুন্নাতে নববী ও ইসলামে তার অবস্থান’।
আভিধানিক অর্থে সুন্নাত: সুন্নাত ( السنة ) শব্দটি আভিধানিক অর্থে তরিকা বা পদ্ধতি অর্থে ব্যবহৃত; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ فَهَلۡ يَنظُرُونَ إِلَّا سُنَّتَ ٱلۡأَوَّلِينَۚ فَلَن تَجِدَ لِسُنَّتِ ٱللَّهِ تَبۡدِيلٗاۖ وَلَن تَجِدَ لِسُنَّتِ ٱللَّهِ تَحۡوِيلًا ٤٣ ﴾ [فاطر: ٤٣]
[তবে কি এরা প্রতীক্ষা করছে পূর্ববর্তীদের প্রতি প্রযুক্ত পদ্ধতির? কিন্তু আপনি আল্লাহর পদ্ধতিতে কখনও কোন পরিবর্তন পাবেন না এবং আল্লাহর পদ্ধতির কোন ব্যতিক্রমও লক্ষ্য করবেন না। – (সূরা ফাতির: ৪৩)]; অর্থাৎ পদ্ধতি অথবা স্বভাব বা রীতি, যার উপর ভিত্তি করে রাসূলদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী বিরোধীদের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার বিধান জারি হয়; সুতরাং তাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলার বিধান হল: তাদেরকে শাস্তি প্রদান করা এবং তাদের কর্তৃক রাসূলদের বিরুদ্ধাচরণ করার কারণে তাদেরকে শাস্তির মাধ্যমে পাকড়াও করা।

 

আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
« لتتبعن سنن من كان قبلكم .» ( أخرجه البخاري و مسلم )
“তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের রীতিনীতির অনুসরণ করবে।”[4] অর্থাৎ তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের রীতিনীতি; সুতরাং এটা প্রমাণ করে যে, আভিধানিক অর্থে সুন্নাত ( السنة ) শব্দটি পদ্ধতি বা রীতিনীতিকে বুঝায়।
আর শরীয়তের আলেম, মুহাদ্দিস, উসূলবীদ ও ফকীহগণের পরিভাষায় সুন্নাত ( السنة ) শব্দটি দ্বারা উদ্দেশ্য হল: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে স্বীকৃত ও প্রমাণিত কথা, অথবা কাজ, অথবা মৌনসম্মতি; তাঁদের কেউ কেউ আরও একটু বৃদ্ধি করে বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলীকেও সুন্নাত ( السنة ) বলা হয়; সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এসব বিষয় থেকে যা প্রমাণিত হয়, তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত (سنة الرسول) বলা হয়; আর সুন্নাতের এই সংজ্ঞাটি শরী‘য়তের বিষয়ে প্রাজ্ঞ আলেমগণের পক্ষ থেকে প্রদত্ত।
ইসলামে সুন্নাতের গুরুত্ব ও অবস্থান: ইসলামে তার অবস্থান ও মর্যাদা খুবই মহান ও তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ, আল-কুরআনের পরেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের (দ্বিতীয়) অবস্থান; কেননা, দীনের প্রথম মূলনীতি হল আল্লাহ তা‘আলার কিতাব, যা তিনি নাযিল করেছেন তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর হিদায়াত ও ব্যাখ্যাসহ।
দ্বিতীয় উৎস: শরী‘য়তের দ্বিতীয় উৎস হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ; আর কুরআন ও সুন্নাহ’র পরে যেসব দলিল-প্রমাণ মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃত, সেগুলো এতদুভয়ের দিকেই প্রত্যাবর্তিত; সুতরাং ইসলামে দলিল-প্রমাণসমূহের মূলনীতির ভিত্তি হল এই দু’টি মহান উৎস: তন্মধ্যে একটি হল আল্লাহর কিতাব এবং অপরটি হল তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ; আর এই জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দু’টিকে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন;  সুতরাং তিনি বলেন:
« إنى تارك فيكم ما إن تمسكتم به لن تضلوا بعدى كتاب الله و سنتي .» ( أخرجه الإمام مالك )
“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি, তা যদি তোমরা দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে পার, তবে আমার পরে তোমরা কখনও পথভ্রষ্ট হবে না, তা হল আল্লাহর কিতাব এবং আমার সুন্নাহ বা জীবনপদ্ধতি।”[5] আর এটা এই জন্য যে, সুন্নাতে নববী হল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত এক প্রকারের ওহী; যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ ٣ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤ ﴾ [النجم: ٣،  ٤]
“আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না। তা তো কেবল ওহী, যা তার প্রতি ওহীরূপে প্রেরিত হয়।” – (সূরা আন-নজম: ৩, ৪);
সুতরাং সুন্নাহ হল আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে প্রেরীত এক ধরনের ওহী, যা তিনি তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি প্রত্যাদেশ করেন; আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও মানুষের নিকট বিভিন্ন কাজের আদেশ ও নিষেধ করার মাধ্যমে এই ওহী পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তাছাড়া সুন্নাহ আল-কুরআনকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে এবং তার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে; অতঃপর তার মোটামুটি ও সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত বিষয়গুলোকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে; তার সাধারণভাবে বর্ণিত বিষয়গুলোকে সুনির্দিষ্ট করে; তার ব্যাপক (‘আম) অর্থে বর্ণিত বিষয়গুলোকে নির্দিষ্ট (খাস) করে; আবার কখনও কখনও তার কোন কোন বিধানকে মানসূখ (রহিত) করে; আবার কখনও কখনও আল-কুরআনের মধ্যে যা বর্ণিত আছে, তার উপর বর্দ্ধিত হুকুম (বিধান) নিয়ে আসে।
আর এখান থেকেই আমাদের নিকট সুন্নাহ’র গুরুত্ব সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে; যেমন তা (সুন্নাহ) হল আল-কুরআনের তাফসীর বা ব্যাখ্যা, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكَ ٱلذِّكۡرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيۡهِمۡ وَلَعَلَّهُمۡ يَتَفَكَّرُونَ ٤٤ ﴾ [النحل: ٤٤]
“আর তোমার প্রতি যিকির (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি, মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য, যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছিল, যাতে তারা চিন্তা করে।” – (সূরা আন-নাহল: ৪৪); সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআন নাযিল করেছেন এবং তা বয়ান (ব্যাখ্যা) করার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি; আর এই বয়ানই (ব্যাখ্যা) হল সুন্নাহ, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوۡمِهِۦ لِيُبَيِّنَ لَهُمۡۖ ﴾ [ابراهيم: ٤]
“আর আমরা প্রত্যেক রাসূলকে তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।” – (সূরা ইবরাহীম: ৪); সুতরাং এই হল সেই উম্মত (জাতি), যার নিকট তার রাসূল এসেছে তাকে বর্ণনা করে শুনানোর জন্য; সুতরাং এই বয়ান (বর্ণনা)-র কিছু দৃষ্টান্ত হল: আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআনের মধ্যে সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু তিনি বর্ণনা করে দেন নি ফজর, যোহর, আসর, মাগরিব ও এশা’র সালাতের রাকাতসমূহের সংখ্যা; বরং আল্লাহ তা‘আলা মোটামুটি সংক্ষিপ্তভাবে তার নির্দেশ দিয়েছেন, যেমন তিনি বলেন:
﴿وَأَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَۖ إِنَّ ٱلصَّلَوٰةَ تَنۡهَىٰ عَنِ ٱلۡفَحۡشَآءِ وَٱلۡمُنكَرِۗ ﴾ [العنكبوت: ٤٥]
“আর তুমি সালাত প্রতিষ্ঠা কর, নিশ্চয় সালাত বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে।” – (সূরা আল-‘আনকাবুত: ৪৫); তিনি আরও বলেন:
﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ ﴾ [البينة: ٥]
“আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে এবং সালাত কায়েম করে।” – (সূরা আল-বায়্যিনাহ: ৫); তিনি আরও বলেন:
﴿ فَإِن تَابُواْ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ ﴾ [التوبة: ٥]
“সুতরাং তারা যদি তাওবা করে এবং সালাত কায়েম করে …।” – (সূরা আত-তাওবা: ৫); এই প্রসঙ্গে আয়াতের সংখ্যা অনেক; অনুরূপভাবে আল্লাহ্‌ তা‘আলা সালাত কায়েম করার নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু তিনি তার সময়সমূহ বর্ণনা করে দেন নি, যদিও তিনি সালাতের সময়সমূহ সাধারণভাবে উল্লেখ করেছেন, যেমন তিনি বলেন:
﴿أَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ لِدُلُوكِ ٱلشَّمۡسِ إِلَىٰ غَسَقِ ٱلَّيۡلِ وَقُرۡءَانَ ٱلۡفَجۡرِۖ إِنَّ قُرۡءَانَ ٱلۡفَجۡرِ كَانَ مَشۡهُودٗا ٧٨ ﴾ [الاسراء: ٧٨]
“সূর্য হেলে পরার পর থেকে রাতের ঘন অন্ধকার পর্যন্ত সালাত কায়েম করবে এবং কায়েম করবে ফজরের সালাত। নিশ্চয়ই ফজরের সালাত (ফেরেশতাদের) উপস্থিতির সময়।” – (সূরা আল-ইসরা: ৭৮); তিনি আরও বলেন:
﴿ فَسُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ حِينَ تُمۡسُونَ وَحِينَ تُصۡبِحُونَ ١٧ وَلَهُ ٱلۡحَمۡدُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ وَعَشِيّٗا وَحِينَ تُظۡهِرُونَ ١٨ ﴾ [الروم: ١٧،  ١٨]
“কাজেই তোমরা আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর যখন তোমরা সন্ধ্যা কর এবং যখন তোমরা ভোর কর, আর বিকেলে এবং যখন তোমরা দুপুরে উপনীত হও। আর তাঁরই জন্য সমস্ত প্রশংসা আসমানে ও যমীনে।” – (সূরা আর-রূম: ১৭, ১৮); সুতরাং এই হল সালাতের সময়সমূহের উল্লেখকরণ, তবে তা হল সাধারণ উল্লেখ; আর এই ইজমালী বা সাধারণ বর্ণনাটিকে সুস্পষ্ট করে ব্যাখ্যামূলকভাবে বর্ণনা করেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ; কারণ, তিনি তাঁর সাহবীদেরকে সাথে করে সালাত আদায় করেছেন এবং বলেছেন:
«صلوا كما رأيتموني أصلي » ( أخرجه البخاري )
“তোমরা এমনভাবে সালাত আদায় কর, যেমনিভাবে তোমরা আমাকে সালাত আদায় করতে দেখ।”[6]
এভাবে এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের রাকাতসমূহের সংখ্যা বর্ণনা করে দিয়েছেন; সুতরাং আমরা সালাত আদায় করি, যেমনিভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত করেছেন; আমরা যোহরের সালাত আদায় করি চার রাকাত এবং সফরের মধ্যে কসর করে দুই রাকাত আদায় করি; আর আসরের সালাত আদায় করি চার রাকাত এবং সফরের মধ্যে কসর করে দুই রাকাত আদায় করি; আর মাগরিবের সালাত আদায় করি তিন রাকাত সফরের মধ্যে এবং বাসস্থানে অবস্থানকালীন সময়ে, তাতে কসর করা হয় না; আর এশা’র সালাত আদায় করি চার রাকাত এবং সফরের মধ্যে কসর করে দুই রাকাত আদায় করি; আর ফজরের সালাত আদায় করি দুই রাকাত সফরের মধ্যে এবং বাসস্থানে অবস্থানকালীন সময়ে। আর সালাতের ওয়াক্ত বা সময়সমূহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করে দিয়েছেন, যখন তিনি যোহরের সালাত আদায় করেছেন তার জন্য নির্ধারিত সময়ে, আসরের সালাত আদায় করেছেন তার জন্য নির্ধারিত সময়ে, মাগরিবে সালাত আদায় করেছেন তার জন্য নির্ধারিত সময়ে, এশা’র সালাত আদায় করেছেন তার জন্য নির্ধারিত সময়ে এবং ফজরের সালাত আদায় করেছেন তার জন্য নির্ধারিত সময়ে, যেমনটি সাব্যস্ত হয়েছে বিশুদ্ধ (সহীহ) হাদিসের মধ্যে: জিবরাঈল আ. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাতের ইমামতি করেছেন (দুই দিন) সালাতের প্রথম সময়ে ও শেষ সময়ে এবং তিনি বলেছেন:
« الصلاة بين هذين الوقتين . » ( أخرجه أبو داود و الترمذي )
“সালাতের সময় হচ্ছে এই দুই সময়ের মাঝামাঝি।”[7] সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য সালাতের রাকাত সংখ্যা, পদ্ধতি ও সময় বর্ণনা করেছেন; আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ব্যতীত আমরা সালাতের পদ্ধতি ও সময় সম্পর্কে জানতে পারব না, যদিও আমরা তার আবশ্যকতা সম্পর্কে আল-কুরআনুল কারীম থেকে জানতে পেরেছি; যা আমাদেরকে নির্দেশনা প্রদান করে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তা বয়ান (ব্যাখ্যা) করার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা হল কথা ও কাজের মাধ্যমে বয়ান বা ব্যাখ্যা করা; আর এ জন্যই যখন খারেজী সম্প্রদায়ের যারা সুন্নাহকে অস্বীকার করে, তাদের মধ্য থেকে এক দল ওমর ইবন আবদুল আজিজ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’র নিকট আসল এবং তারা তাঁর সাথে সুন্নাহ’র মাধ্যমে প্রমাণ পেশের আবশ্যকতার প্রশ্নে বিতর্ক করল, তখন ওমর ইবন আব্দিল আযীয  রাহেমাহুল্লাহ তাদের উদ্দেশ্যে বলেন:
” الله جل و علا أمرنا بالصلاة في القرآن فكيف نصلي؟ هاتوا لي آية من القرآن تبين كيفية الصلاة “
(আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে আল-কুরআনের মধ্যে সালাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন, সুতরাং আমরা কিভাবে সালাত আদায় করব? তোমরা আমার নিকট আল-কুরআন থেকে একটি আয়াত নিয়ে আস তো, যা সালাত আদায়ের পদ্ধতি বর্ণনা করে।) অতঃপর তারা স্তম্ভিত হয়ে গেল এবং তাদের বিতর্ক থেমে গেল; আর তিনি তাদেরকে সুন্নাহ’র মাধ্যমে প্রমাণ পেশের আবশ্যকতাকে মেনে নিতে বাধ্য করলেন।
আর সালাতের দৃষ্টান্তের মত যাকাতের বিষয়টিও: আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআনে যাকাত দানের নির্দেশ দিয়েছেন; অতঃপর আমরা কিভাবে ঐ সম্পদ সম্পর্কে জানতে পারব, যাতে যাকাত আবশ্যক হবে? সুন্নাহ ব্যতীত এই সম্পর্কে জানা সম্ভব হবে না; আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতের বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেছেন; নিশ্চয়ই তা আবশ্যক হবে স্বর্ণ, রৌপ্য, শস্য, ফলমূল, চতুষ্পদ জন্তু এবং ব্যবসায়ীক পণ্যে এবং তা প্রত্যেক মাল-সম্পদে ওয়াজিব (আবশ্যক) হবে না; বরং তা ওয়াজিব হবে শস্য, ফলমূল, নগদ টাকাপয়সা ও মুক্তভাবে বিচরণশীল চতুষ্পদ জন্তুর মত বর্দ্ধনশীল সম্পদের মধ্যে, যেমনিভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকাতের ক্ষেত্রে কি পরিমাণ গ্রহণ করা হবে, তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ: উৎপাদন উপকরণ সরবরাহ করা বা না করার বিবেচনায় শস্য, ফলমূল ও জমি থেকে উৎপন্ন ফসলের যাকাত হিসেবে উৎপাদিত ফসলের এক দশমাংশ (ওশর) অথবা বিশ ভাগের একভাগ ( نصف العشر ) গ্রহণ করা হবে।
আর স্বর্ণ ও রৌপ্য থেকে গ্রহণ করা হবে চল্লিশ ভাগের একভাগ বা শতকরা ২.৫%।
আর ছাগলের ক্ষেত্রে প্রতি চল্লিশটি ছাগলের জন্য একটি ছাগল যাকাত হিসেবে দিতে হবে এবং অনুরূপভাবে নেসাবের সাথে সংশ্লিষ্ট বাকি সংখ্যার মধ্যেও (প্রতি চল্লিশটির জন্য একটি হারে) এই বিধান প্রযোজ্য হবে।
আর উটের যাকাতের ক্ষেত্রেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নেসাব বর্ণনা করে দিয়েছেন; সুতরাং পাঁচটি উটের ক্ষেত্রে একটি ছাগল যাকাত হিসেবে দিতে হবে; আর দশটির ক্ষেত্রে দু’টি ছাগল যাকাত হিসেবে দিতে হবে; আর পনেরটির ক্ষেত্রে তিনটি ছাগল যাকাত হিসেবে দিতে হবে; আর বিশটির ক্ষেত্রে চারটি ছাগল যাকাত হিসেবে দিতে হবে; আর পঁচিশটির ক্ষেত্রে একটি এক বছর বয়সী উট যাকাত হিসেবে দিতে হবে; আর ছত্রিশটি উটের ক্ষেত্রে একটি দুই বছর বয়সী উট যাকাত হিসেবে দিতে হবে; আর অনুরূপভাবে উটের যাকাতের অবশিষ্ট নেসাবের মধ্যে যাকাত হিসেবে যা আবশ্যক হবে, তা দিতে হবে; যেমনিভাবে তিনি যাকাতের ক্ষেত্রে যাকাত হিসেবে আবশ্যকীয় উটের বয়স বর্ণনা করে দিয়েছেন; সুতরাং যদি হাদিসে নববী’র অস্তিত্ব না থাকত, তাহলে আমরা জানতে পারতাম না যে, কিভাবে আমরা যাকাত দেব, যদিও আমরা আল-কুরআন থেকে যাকাতের আবশ্যকতার বিষয়ে জানতে পেরেছি; কিন্তু সুন্নাহ যাকাতের পরিমাণ এবং যাকাতযোগ্য মালের ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছে, যেমনিভাবে সুন্নাহ সুস্পষ্টভাবে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে, যাতে যাকাত ওয়াজিব (আবশ্যক) হবে; কারণ, কোন মালের উপর ততক্ষণ পর্যন্ত যাকাত আবশ্যক হবে না, যতক্ষণ না তার উপর এক বছর অতিবাহিত হবে; তবে জমিন থেকে উৎপাদিত ফসলের উশরের ব্যাপারটি ভিন্ন; সুতরাং তাতে যাকাত ওয়াজিব (আবশ্যক) হবে, যখন তার উপযুক্ততা প্রকাশ পায়; যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَءَاتُواْ حَقَّهُۥ يَوۡمَ حَصَادِهِۦۖ ﴾ [الانعام: ١٤١]
“আর ফসল তোলার দিন সে সবের হক প্রদান করে দাও।” – (সূরা আল-আন‘আম: ১৪১)।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলা রমযান মাসে সিয়াম (রোযা) পালনের নির্দেশ দিয়েছেন, আর তা হচ্ছে ইসলামের অন্যতম একটি রুকন; কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা সিয়ামের সীমারেখা বর্ণনা করেন নি এবং আরও বর্ণনা করেন নি তা বিনষ্টকারী ও বাতিলকারক বিষয়সমূহ; আর ঐসব বিষয়গুলোও বর্ণনা করেন নি, যেগুলো সিয়াম পালনকারীকে (রোযাদারকে) বর্জন করে চলতে হবে; আর সুন্নাতে নববী এসব বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে এসেছে।
অনুরূপভাবে সম্মানিত ঘর বাইতুল্লাহ’র উদ্দেশ্যে হজ্জের বিষয়টিও; আল্লাহ তা‘আলা তার আবশ্যকতার বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
﴿ وَلِلَّهِ عَلَى ٱلنَّاسِ حِجُّ ٱلۡبَيۡتِ مَنِ ٱسۡتَطَاعَ إِلَيۡهِ سَبِيلٗاۚ ﴾ [ال عمران: ٩٧]
“আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ্জ করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য।” – (সূরা আলে ইমরান: ৯৭); সুতরাং এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, বাইতুল্লায় হজ্জ করাটা আবশ্যকীয় বিষয়, কিন্তু আয়াতটি তার সময় ও পদ্ধতি স্পষ্ট করে কিছুই বলে নি; আর এই হজ্জ আদায়ের পদ্ধতি সামগ্রিকভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করে দিয়েছেন, যখন তিনি জনসাধারণকে নিয়ে বিদায় হজ্জ পালন করেন এবং তিনি বলেছেন:
« خذوا عني مناسككم. » ( أخرجه مسلم )
“তোমরা আমার নিকট থেকে তোমাদের হজ্জ আদায়ের পদ্ধতি গ্রহণ কর।”[8] অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জ আদায়ের পদ্ধতিসমূহ একটি একটি করে বর্ণনা করে দিয়েছেন এবং তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে আমরা তাঁর নিকট থেকে পদ্ধতিসমূহ গ্রহণ করি, যেমনটি আমাদের জন্য বর্ণনা করেছেন এমন বর্ণনাকারী, যিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজের মধ্য থেকেই হজ্জ আদায়ের পদ্ধতিসমূহ প্রত্যক্ষ করেছেন।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলা চোরের হাত কেটে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন; সুতরাং তিনি বলেন:
﴿ وَٱلسَّارِقُ وَٱلسَّارِقَةُ فَٱقۡطَعُوٓاْ أَيۡدِيَهُمَا جَزَآءَۢ بِمَا كَسَبَا نَكَٰلٗا مِّنَ ٱللَّهِۗ ﴾ [المائ‍دة: ٣٨]
“আর পুরুষ চোর ও নারী চোর, তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও; তাদের কৃতকর্মের ফল ও আল্লাহর পক্ষ থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হিসেবে।” – (সূরা আল-মায়িদা: ৩৮) …; কিন্তু হাত কাটার জন্য অনেকগুলো শর্ত রয়েছে, যেগুলো আল-কুরআনের মধ্যে উল্লেখ করা হয় নি; আর সুন্নাহ সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিয়ে এসেছে, যেমন সুন্নাহ বর্ণনা করে দিয়েছে যে, চোরের হাত কাটা যাবে না, যতক্ষণ না সে নেসাব পরিমাণ সম্পদ চুরি করবে, আর তা হল এক দিনারের এক চতুর্থাংশ অথবা তিন দিরহাম অথবা তার সমমূল্য মানের সম্পদ; আর আয়াতটি হাতের[9] বিষয়টিও স্পষ্ট করে নি এবং চুরির ক্ষেত্রে হাতের কোন জায়গায় কাটা হবে, তাও স্পষ্ট করে বলা হয় নি; কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিষয়টি স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, আর তা হল, ডান হাতের তালুর গ্রন্থি থেকে কাটা হবে, আর তাকে কবজির হাঁড় বলা হয়।
এখানে অনুসন্ধান করার মাধ্যমে আল-কুরআনের ব্যাখ্যায় সুন্নাহ’র অনুসরণের সবকিছু লেখা আমাদের উদ্দেশ্য নয়; আমরা তো শুধু এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছি মাত্র; নতুবা আল-কুরআনের ব্যাখ্যায় সুন্নাহ’র অনুসরণের বহু বর্ণনা বিদ্যমান রয়েছে।
আর আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল; সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَۖ ﴾ [النساء: ٨٠]
“কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।” – (সূরা আন-নিসা: ৮০); রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য মানে তাঁর নিকট থেকে সুন্নাহ হিসেবে যা প্রমাণিত, তা মেনে নেয়া এবং সে অনুযায়ী কাজ করা; আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ ﴾ [الحشر: ٧]
“রাসূল তোমাদেরকে যা দেয়, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে, তা থেকে বিরত থাক” – (সূরা আল-হাশর: ৭); সুতরাং আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যেসব আদেশ, নিষেধ ও শরী‘য়ত দান করেছেন, তা যাতে আমরা যথাযথভাবে গ্রহণ করি এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যেসব বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে যেন আমরা বিরত থাকি।
আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশ এসেছে;
     ·        কখনও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের সাথে তাঁর আনুগত্য করাকে সংযুক্ত করে দেন, যেমন তিনি বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ ﴾ [النساء: ٥٩]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, আরও আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীলদের।” – (সূরা আন-নিসা: ৫৯); তিনি আরও বলেন:
﴿ قُلۡ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَۖ ﴾ [ال عمران: ٣٢]
“বল, তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর।” – (সূরা আলে ইমরান: ৯৭); সুতরাং তিনি তাঁর আনুগত্য করার আবশ্যকতার সাথে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করার আবশ্যকতাকে মিলিয়ে দিয়েছেন।
     ·        আবার কখনও কখনও আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করার বিষয়টি এককভাবে উল্লেখ করেছেন; যেমন তিনি বলেন:
﴿ مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَۖ ﴾ [النساء: ٨٠]
“কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।” – (সূরা আন-নিসা: ৮০); আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ ٥٦ ﴾ [النور: ٥٦]
“আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমাদের উপর রহমত করা যায়।” – (সূরা আন-নূর: ৫৬); আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন:
﴿ وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذۡنِ ٱللَّهِۚ ﴾ [النساء: ٦٤]
“আল্লাহর অনুমতিক্রমে কেবলমাত্র আনুগত্য করার জন্যই আমরা রাসূলদের প্রেরণ করেছি।” – (সূরা আন-নিসা: ৬৪)।
     ·        যেমনিভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সময় তাঁর কিতাব আল-কুরআন ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ’র দিকে ফিরে আসার নির্দেশ দিয়েছেন; সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَطِيعُواْ ٱللَّهَ وَأَطِيعُواْ ٱلرَّسُولَ وَأُوْلِي ٱلۡأَمۡرِ مِنكُمۡۖ فَإِن تَنَٰزَعۡتُمۡ فِي شَيۡءٖ فَرُدُّوهُ إِلَى ٱللَّهِ وَٱلرَّسُولِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۚ ذَٰلِكَ خَيۡرٞ وَأَحۡسَنُ تَأۡوِيلًا ٥٩ ﴾ [النساء: ٥٩]
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, আরও আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যকার ক্ষমতাশীলদের, অতঃপর কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটলে তা উপস্থাপন কর আল্লাহ ও রাসূলের নিকট, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান এনে থাক। এ পন্থাই উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর।” – (সূরা আন-নিসা: ৫৯);
আর আয়াতে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেয়ার মানে আল্লাহর কিতাবের দিকে ফিরিয়ে দেয়া; আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে ফিরিয়ে দেয়ার মানে তিনি জীবিত থাকাকালীন অবস্থায় স্বয়ং তাঁর দিকে ফিরিয়ে দেয়া, আর তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সুন্নাহ’র দিকে ফিরিয়ে দেয়া।
আর আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ’র দিকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশটি সাধারণভাবে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী, তার প্রমাণ হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর তাঁর দিকে ফিরিয়ে দেয়ার মানে তাঁর সুন্নাহ’র দিকে ফিরিয়ে দেয়া; আর এটাই প্রমাণ করে যে, উম্মতের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ফয়সালার উৎস হল সুন্নাহ, যখন তারা আহকাম তথা বিধানসমূহের কোনো একটি বিধান নিয়ে বিতর্ক করবে, চাই তারা ইবাদতসমূহের মধ্য থেকে কোনো একটি ইবাদত বিষয়ে দীনী বিধানের ব্যাপারে মতবিরোধ করুক, অথবা জনগণের অধিকার প্রশ্নে তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ সৃষ্টি হউক; আর এই ক্ষেত্রে সমাধানের জন্য আল্লাহর কিতাব