বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলা‌ইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ (২য় পর্ব)


বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলা‌ইহি ওয়াসাল্লামের জীবনাদর্শ (২য় পর্ব)
(ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম রহ. এর যাদুল মা‘আদ হতে সংক্ষেপিত)

(১২) হাদী, কুরবানী ও ‘আকীকাহ্ প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা[90]

(ক) হাদী প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা[91]:
১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উট ও ছাগলপাল হাদী হিসেবে প্রেরণ করেন এবং তাঁর স্ত্রীদের পক্ষ হতে হাদী হিসেবে গরু প্রেরণ করেন। তিনি হজ্জ ও ওমরার সময় এবং (হুদায়বিয়ার সন্ধি কালে) অবস্থান স্থলে হাদী যবেহ্ করেন।
২. তাঁর আদর্শ ছিল, হাদী হিসেবে প্রেরিত ছাগলপালের গলায় বেড়ি লাগানো, সেগুলোর গলায় ছুরির আঘাতে দাগ করা নয়। তিনি স্বীয় হাদী প্রেরণের পর (ইহরাম বাঁধার পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত) কোনো হালাল বিষয়াদিকে নিজের উপর হারাম মনে করেন নি।
৩. তিনি হাদি হিসেবে উট প্রেরণ করলে সেগুলিকে ‘তাক্বলীদ’-গলায় বেড়ী লাগাতেন, বা ‘এশআর’ করতেন- অর্থাৎ উটের ডান কুজেঁ ছুরির আঘাতে সামান্য দাগ লাগাতেন।
৪. তিনি হাদী প্রেরণ করার সময় দূতকে বলে দিতেন যে, কোনো হাদী মৃত্যুমুখী হলে সেটি যবেহ্ করে দেবে, অতঃপর তার রক্তে স্বীয় জুতা রঙ্গিন করে তার উপরিভাগে রেখে দেবে, সে নিজে কিংবা সাথীবর্গের কেউ সে পশুর গোশ্‌ত ভঙ্গন করবে না, অতঃপর গোশ্‌ত অন্য লোকদের মাঝে বন্টন করে দেবে।
৫. তিনি হাদীতে সাহাবীদের অংশীদার করে দিতেন, উটে সাতভাগ এবং গরুতে সাত ভাগ।
৬. তিনি রাখালকে বিশেষ প্রয়োজনে অন্য সওয়ারী পাওয়া পর্যন্ত হাদীতে আরোহণ করার অনুমতি দেন।
৭. তাঁর আদর্শ ছিল: উটকে দাঁড়ানো ও বাম পা বাঁধানো অবস্থায় নহর করা, তিনি নহর করার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবর’ বলতেন।
৮. তিনি নিজ হাতেই কুরবানীর পশু যবেহ্ করেন, আবার কখনো অন্যকে অবশিষ্টগুলো যবেহ্ করার দায়িত্ব প্রদান করেন।
৯. তিনি ছাগল-দুম্বা যবেহ্ করার সময় তাঁর এক পা দিয়ে ছাগল-দুম্বার পাঁজর দাবিয়ে রাখতেন, অতঃপর ‘বিসমিল্লাহি-আল্লাহু আকবর’ বলে যবেহ্ করতেন।
১০. তিনি উম্মতকে কুরবানী ও হাদীর গোশ্‌ত খাওয়া ও জমা রাখার অনুমতি দিয়েছেন।
১১. তিনি কখনো হাদীর গোশ্‌ত বন্টন করে দিতেন, আবার কখনো বলেন: যার ইচ্ছা কিছু অংশ রেখে দেবে।
১২. তাঁর আদর্শ ছিল ওমরার হাদী যবেহ্ করা মারওয়া পাহাড়ের নিকটে, আর হজ্জে কেরানের হাদী যবেহ্ করা মিনাতে।
১৩. তিনি কখনও ইহরাম থেকে হালাল হওয়ার পূর্বে স্বীয় হাদী নহর করেননি, বরং তিনি শুধুমাত্র সূর্যোদয়ের পর এবং জমরাতে কংকর নিক্ষেপের পরই হাদী নহর করেন এবং সূর্যোদয়ের পূর্বে হাদী নহর করার অনুমতি কখনও তিনি দেননি।”

(খ) কুরবানী প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা[92]:
১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও কুরবানী করা পরিত্যাগ করেননি এবং তিনি দু’টি দুম্বা দিয়ে কুরবানী করতেন এবং ঈদের সালাতের পর সেগুলো যবেহ্ করতেন। তিনি বলেন: “আইয়্যামে তাশরীক্ব তথা ১১, ১২, ১৩ তারিখও কুরবানীর পশু যবেহ করার দিবস।”[93]
২. তিনি আরো বলেন: যে কেউ ঈদের সালাতের পূর্বে কুরবানী করলো, তার কুরবানী বলতে কিছুই হলো না, বরং সেটা কেবল খাবার গোশ্‌ত হলো, যা সে নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য আগাম ব্যবস্থা করলো।”[94]
৩. তিনি ছাগল-মেষ জাতীয় পশুর ছয় মাসের ছানা এবং পাঁচ বছর উত্তীর্ণ উট, আর দু’বছর উত্তীর্ণ গরু কুরবানী করার নির্দেশ দেন।
৪ তাঁর আদর্শ ছিল কুরবানীর জন্য সুন্দর ও ত্রুটিমুক্ত পশু বাচাই করা। তিনি কান-কাটা, শিং-ভাঙ্গা, এক চোখ-কানা, নেংড়া, পা ভাঙ্গা, ও অতি দুর্বল পশু দিয়ে কুরবানী করতে নিষেধ করেন এবং তিনি চোখ-কান ত্রুটিমুক্ত হওয়ার প্রতি লক্ষ্য রাখার নির্দেশ দেন।
৫. তিনি আরো নির্দেশ দেন, যে ব্যক্তি কুরবানী করার ইচ্ছা রাখে সে যেন যিল-হাজ্জ মাসের প্রথম দশক প্রবেশের পর নিজের নখ-চুলের কিছুই না কাটে।
৬. তাঁর আদর্শ ছিল ঈদগাহে কুরবানী করা।”[95]
৭. তাঁর আদর্শ ছিল একটি ছাগল এক পরিবারের পক্ষ হতে যথেষ্ট হবে বলে মনে করা, যদিও সংখ্যায় তারা একাধিক হয়ে থাকে।”

(গ) আক্বীকা প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা:[96]
১. সহীহ্ সনদে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেন: “প্রত্যেক নবজাত শিশু তার আক্বীকার সাথে দায়বন্ধ থাকে, যেটি তার পক্ষ থেকে সপ্তম দিনে যবেহ্ করা হয় এবং তার মাথা-মুণ্ডন করা হয় ও নাম রাখা হয়।”[97]
২. তিনি আরো বলেছেন: “ছেলের পক্ষ থেকে দু’টি ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে একটি ছাগল যবেহ্ করা হবে।”[98]

(১৩) ক্রয়-বিক্রয় ও লেন-দেন প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা[99]

১. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্রয় ও বিক্রয় করেন, তবে নবুওয়াত লাভের পর তাঁর ক্রয় অধিক ছিল বিক্রয় অপেক্ষা, তিনি মজুরী করেন[100] এবং অন্যকে মজুর নিয়োগ করেন, তিনি উকীল-প্রতিনিধি নিয়োগ করেন এবং অন্যের প্রতিনিধিত্ব করেন, তবে তাঁর প্রতিনিধি নিয়োগ অধিক ছিল তাঁর প্রতিনিধিত্ব করা অপেক্ষা।
২. তিনি নগদ মূল্যে ও বাকী মূল্যে ক্রয় করেন, তিনি নিজে সুপারিশ করেন এবং তাঁর নিকট সুপারিশকরা হয়, তিনি বন্ধক দিয়ে এবং বন্ধক ছাড়া ঋণ গ্রহণ করেন এবং তিনি ধার নেন।
৩. তিনি দান-খায়রত করেন করেন এবং দান গ্রহণ করেন, তিনি নিজে উপহার-উপঢৌকন প্রদান করেন এবং উপহার গ্রহণ করেন এবং তার প্রতিদান প্রদান করেন, আর উপহার গ্রহণের ইচ্ছা না হলে প্রদানকারীর নিকট অপারগতা প্রকাশ করেন, রাজা-বাদশাগণ তাঁর নিকট হাদীয়া-উপঢৌকন প্রেরণ করতো, তিনি তাদের হাদীয়া গ্রহণ করতেন এবং তা সাহাবীদের মাঝে বন্টন করে দিতেন।
৪. তাঁর লেন-দেন সর্বাধিক উত্তম ছিল, তিনি কারো থেকে কিছু ঋণ হিসেবে গ্রহণ করলে তার চেয়ে উত্তম পরিশোধ করতেন এবং তার ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজনের জন্য বরকতের দু‘আ করতেন, তিনি একবার ঋণ হিসেবে একটি উট গ্রহণ করেন, অতঃপর তার মালিক কর্কশ ভাষায় তাঁর নিকট মূল্য পরিশোধের দাবী করলে সাহাবীগণ তাকে মার-ধর করার ইচ্ছা করেন, তখন তিনি বলেন: তাকে ছেড়ে দাও, কেননা হকদারের কথা বলার অধিকার রয়েছে।”[101]
৫. অজ্ঞ-মুর্খদের কঠোরতা তাঁর দৈর্ঘ-ক্ষমাশীলতাকে আরো বৃদ্ধি করতো, তিনি রাগাম্বিত ব্যক্তিকে নির্দেশ দেন, সে যেন নিজের রাগের অগ্নিষ্ফুলিঙ্গকে অযুর পানির দ্বারা নিবিয়ে ফেলে এবং বসে পড়ে যদি সে দাঁড়ানো থাকে এবং শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে।
৬. তিনি কারো উপর গর্ব-অহংকার করতেন না, বরং সাথীদের সামনে বিনয় নম্রতা প্রকাশ করতেন এবং ছোট-বড় সবাইকে সালাম দিতেন।
৭. তিনি কখনো কৌতুক ও রসিকতা করতেন, তবে তিনি কৌতুক ও রসিকতায় সত্য বলতেন, তিনি কখনো ‘তাওরিয়া’ বা ইঙ্গিতে কথা প্রকাশ করতেন, তবে তিনি তাতে সত্য ছাড়া বলতেন না।
৮. তিনি একদা নিজেই দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করেন, নিজ হাতেই জুতা সেলাই করেন, নিজ হাতেই কাপড় বহন করেন, পানির ঢোলে তালি লাগান, ছাগলের দুধ দোহন করেন, কাপড় সেলাই করেন, নিজের ও পরিবার-পরিজনের খেদমত করেন এবং সাহাবীদের সঙ্গে মসজিদে নির্মাণ কাজে ইট বহন করেন।
৯. তাঁর বক্ষ কল্যাণের জন্য সৃষ্টির মধ্যে সর্বাধিক উন্মুক্ত ছিল, তাঁর অন্তর সর্বাধিক পবিত্র ছিল।
১০. তাঁকে দুটি বিষয়ের যে কোনো একটি গ্রহণ করার এখতিয়ার দেওয়া হলে তিনি সর্বদাই অপেক্ষাকৃত সহজতরটি গ্রহণ করতেন, যদি না হয় তা গুনাহর বিষয়।
১১. তিনি ব্যক্তিগত কোনো বিষয়ে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি, তবে আল্লাহর বিধান লঙ্ঘিত হলে শুধু আল্লাহর জন্যই প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন। ১২. তিনি পরামর্শ দিতেন এবং পরামর্শ গ্রহণ করতেন, রোগীর দেখা-শুনা করতেন এবং জানাযায় শরীক হতেন, লোকদের দাওয়াত গ্রহণ করতেন এবং বিধবা, অভাবগ্রস্ত দুর্বলদের অভাব পূরণের লক্ষ্যে তাদের সাথে হেঁটে যেতেন।
১৩. কেউ তাঁকে পছন্দনীয় কোনো বস্তু উপহার দিলে তিনি তার জন্য দু‘আ করতেন এবং বলতেন: যে কেউ কারো প্রতি সদাচরণ করলো, অতঃপর সে ঐ আচরণকারীকে বললো:
«جزاك الله خيراً».
‘জাযাকা-ল্লাহু খাইরান’
“আল্লাহ্ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুক, তাহলে সে তার অত্যধিক প্রশংসা করেছে।”[102]

(১৪) বিবাহ-শাদী ও পারিবারিক জীবন-যাপন প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা[103]

১. সহীহ্ সনদে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেন: দুনিয়ার বস্তসমূহ হতে নারী ও সুগন্ধিকে আমার নিকট পছন্দনীয় করা হয়েছে এবং সালাতের মধ্যে আমার চোখের প্রশান্তি রাখা হয়েছে।”[104]
তিনি আরো বলেছেন: “হে যুব সমাজ ! তোমাদের মধ্যে যে সাধ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে।”[105]
তিনি আরো বলেছেন: “তোমরা অত্যধিক মমতাময়ী ও অধিক সন্তান প্রসবকারিণী নারী বিবাহ করো।”[106]
২. তাঁর আদর্শ ছিল স্ত্রীদের সাথে সদয় ব্যবহার ও মহৎ চরিত্রময় জীবন-যাপন করা। তিনি বলতেন: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে নিজের পরিবারের নিকট সর্বোত্তম, আর আমি আমার পরিবারের নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম।”[107]
৩. স্ত্রীদের কেউ অবৈধ নয় এমন কোনো বিষয় কামনা করলে তিনি তার সে বাসনা পূরণ করতেন। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার নিকট আনসারী মেয়েদেরকে গোপনে প্রবেশ করাতেন, যারা তাঁর সাথে খেলা-ধুলা করতো। উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা পান করার পর তিনি পাত্র হাতে নিয়ে সে স্থানে মুখ রেখে পান করেন যেখানে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা মুখ রেখে পান করেছিলেন, তিনি কখনো কখনো তার কোলে ঠেস লাগাতেন এবং কখনো তাঁর মাথা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা-এর কোলে রেখে কুরআন তেলাওয়াত করতেন, অথচ কখনো তিনি হায়েয অবস্থায় হতেন, আবার কখনো তাকে হায়েয অবস্থায় পায়জামা পরিধান করতে আদেশ করতেন, অতঃপর তিনি পায়জামার উপর সহবাস করতেন।
৪. তিনি আসরের সালাত শেষে তাঁর স্ত্রীদের নিকট গমন করে তাদের খোজ-খবর নিতেন, অতঃপর রাতে যার পালা তার সাথে রাত্রি যাপন করতেন।
৫. তিনি স্ত্রীগণের মাঝে রাত যাপন এবং খোর-পোষ সমান করে বন্টন করতেন, কখনো কখনো তিনি তাঁর কোনো এক স্ত্রীর প্রতি হাত প্রসারিত করতেন অন্য স্ত্রীদের উপস্থিতিতে।
৬. তিনি স্ত্রীদের সাথে রাতের শেষভাগে ও প্রথমভাগে যৌন-মিলন করতেন, আর রাতের প্রথমাংশে স্ত্রী-সহবাস করলে কখনো গোসল করে ঘুমিয়ে যেতেন, আবার কখনো অযু করে ঘুমিয়ে পড়তেন। তিনি বলেন: “সে ব্যক্তি অভিশপ্ত বা আল্লাহর রহমত থেকে বহিষ্কৃত, যে নিজের স্ত্রীর পশ্চাতভাগ দিয়ে যৌনসঙ্গম করে।”[108] তিনি আরো বলেন: “তোমাদের কেউ যদি স্ত্রী-সহবাসের পূর্বে বলে:
«اللهم جنبنا الشيطان وجنب الشيطان ما رزقتنا».
‘আল্লা-হুম্মা জান্নিবনাশ শায়ত্বা-না, ওয়া জান্নিবিশ শায়তানা মিম্মা রাযাক্বতানা।
“হে আল্লাহ! তুমি আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখো, আর আমাদেরকে তুমি (এ মিলনের ফলে) যে সন্তান দান করবে তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখো। তাহলে যদি সে মিলনের মাধ্যমে সন্তান গর্ভধারণ নির্ধারিত থাকে, তবে শয়তান কখনো তার ক্ষতি করতে পারবে না।”[109]
৭. তিনি বলেন: যখন তোমাদের কেউ কোনো নারীকে বিবাহ করে অথবা দাসক্রয় করে কিংবা চতুষ্পদ জন্তু ক্রয় করে, তখন তার ললাট ধারণ করে ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে এবং আল্লাহর নিকট তাতে বরকতের জন্যে দু‘আ করে বলে:
«اللهم إني أسألك خيرها وخير ما جبلت عليه وأعوذ بك من شرها ومن شر ما جبلت عليه».
“আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকা খাইরাহা, ওয়া খাইরামা জুবিলাত্ আলাইহি, ওয়া আয়ুযুবিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররিমা জুবিলাত্ আলাইহি।”
“তোমার নিকট এর কল্যাণের প্রার্থনা জানাই এবং তার সেই কল্যাণময় স্বভাবেরও আহ্বান জানাই যার উপর তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর আমি তোমার আশ্রয় চাই তার অনিষ্ট হতে এবং তার প্রবৃত্তির অকল্যাণ হতে যার উপর তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে।”[110]
৮. তিনি বিবাহিতদের জন্যে দু‘আ করে বলতেন:
«بارك الله لك وبارك عليك وجمع بينكما في خير».
‘বারকাল্লাহু লাকা, ওয়া বারাকা ‘আলাইকা, ওয়া জামা‘আ বাইনাকুমা ফী খাইরিন।”
“আল্লাহ তোমার জন্য বরকত দিন, আর তোমার উপর বরকত নাযিল হোক এবং তোমাদের দু’জনকে কল্যাণে একত্রিত করুন।”[111]
৯. তিনি সফরকালে স্ত্রীদের মাঝে লটারী দিতেন, লটারীতে যার নাম উঠতো সে তাঁর সঙ্গে যেতো, অন্যদের জন্য সেই সময়টি গণনা করতেন না।
১০. তাঁর আদর্শ ছিল না গৃহ-বাসভবনের প্রতি অতিশয় মনোযোগ প্রদান করা, উচ্চতা বিশিষ্ট-দীর্ঘ করা, সাজিয়ে-নক্স করা এবং সম্প্রসারিত করা।
১১. তিনি[112] তালাক প্রদান করেছিলেন, অতঃপর তালাক প্রত্যাহার করে নেন, তিনি নিজের স্ত্রীদের নিকট এক মাস গমণ করবেন না বলে শপথ করে ঈলায়ে মুয়াক্কাত (বা নির্ধরিত সময়ের ঈলা) করেন, তবে তিনি কখনই ‘যিহার’ করেন নি।”[113]

(১৫) পানাহার প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা[114]

(ক) আহার প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালার বিবরণ:
১. যা কিছু খাবার উপস্থিত করা হতো তা তিনি ফিরিয়ে দিতেন না, আর যা কিছু মওজুদ নেই তার জন্য ভনিতা বা কৃত্রিমতা করতেন না, বরং পবিত্র-হালাল বস্তুসমূহ হতে যা কিছু তাঁর সামনে পেশ করা হতো তা থেকে খেয়ে নিতেন। কিন্তু তাঁর রুচিসম্মত না হলে হারাম না বলে তা পরিত্যাগ করতেন, রুচিসম্মত না হওয়া সত্ত্বেও কোনো কিছু নিজের উপর জরবদস্তি করে খেতেন না। তিনি কখনই কোনো খাবারে দোষ প্রকাশ করেন নি, খাবার তাঁর রুচিসম্মত হলে খেয়েছেন, আ রুচিসম্মত না হলে পরিত্যাগ করেছেন, যেমন তিনি অভ্যস্ত না হওয়ায় ‘দ্বাব্ব’[115] খাননি।
২. যা কিছু মওজুদ থাকতো তা হতে তিনি আহার করতেন, আর কিছুই না পেলে তিনি ধৈর্যধারণ করতেন, এমনকি তিনি ক্ষুধার কারণে পেটে পাথর বাঁধেন, এক চাঁদ, দু’চাঁদ ও তিন চাঁদ অতিবাহিত হতো, কিন্তু তার ঘরে আগুন প্রজ্বলন করা হতো না।
৩. তাঁর আদর্শ ছিল না যে, নিজেকে একই প্রকার খাবারের উপর অভ্যস্ত করে নেওয়া এমনভাবে যে, তা ছাড়া অন্য কিছুই খাবেন না।
৪. তিনি ভেঁড়া, দুম্বা ও মুরগীর গোশ্‌ত এবং হুবারা পাখির গোশ্‌ত, জঙ্গলী গাধার গোশ্‌ত, খারগোশ ও সামুদ্রিক খাদ্য এবং ভূনা খাদ্য খেয়েছেন। কাঁচা খেজুর ও শুকনা খেজুর খেয়েছেন। তিনি ‘সারীদ’- অর্থাৎ গোশ্‌ত ও রুটি মেশানো এক প্রকার উপাদেয় খাবার খেয়েছেন। তিনি যায়তুনের তৈল দিয়ে রুটি খেয়েছেন। তিনি তাজা খেজুরের সাথে খিরা খেয়েছেন। তিনি রান্নাকৃত কদু খেয়েছেন এবং তিনি সেটি পছন্দ করতেন। তিনি ডেকচিতে অবশিষ্ট শুকনা গোশতের টুকরো খেয়েছেন এবং তিনি দুধের সর দিয়ে খেজুর খেয়েছেন।
৫. তিনি গোশ্‌ত পছন্দ করতেন এবং তাঁর নিকট অত্যধিক পছন্দনীয় ছিল বকরীর বাহু ও অগ্রবর্তী অংশ।
৬. তিনি স্বদেশের নবাগত ফল খেতেন এবং তা থেকে ‍আত্মরক্ষা করতেন না।
৭. অধিকাংশ সময় তাঁর খাবার যমীনের উপর দস্তরখানে রাখা হতো।
৮. তিনি ডান-হাতে আহার করার নির্দেশ দিতেন এবং বাম-হাতে খেতে নিষেধ করতেন। এবং বলতেন: “শয়তান বাম-হাতে খায় এবং বাম হাতে পান করে।”[116]
৯. তিনি তিন আঙ্গুলে আহার করতেন এবং তিনি আহার শেষে আঙ্গুল চেটে খেতেন।”[117]
১০. তিনি হেলান দিয়ে খাবার খেতেন না।”[118]
আর হেলান বা ঠেস্ লাগানো তিন প্রকারে হয়ে থাকে : – ১. একপার্শ্বে ঝুঁকে আহার করা, ২. চারজানু হয়ে বসে আহার করা, ৩. এক হাতের উপর ঠেস্ দিয়ে বসে অপর হাতে আহার করা, উক্ত তিন প্রকারই নিন্দিত। তিনি উভয় হাঁটু খাড়া অবস্থায় পাছার উপর বসে আহার করতেন এবং বলতেন: “আমি বসি যেভাবে একজন দাস বসে আর আহার করি যেভাবে একজন দাস আহার করে।
১১. যখন তিনি খাবারে হাত রাখতেন তখন
«بسم الله».
‘বিসমিল্লাহ্’ বলতেন এবং তিনি আহারকারীকে ‘বিসমিল্লাহ্’ বলার নির্দেশ দিতেন, তিনি আরো বলেন: “যখন তোমাদের কেউ খাবার খায় তখন শুরুতে যেন ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে, আর যে শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ্’ বলতে ভুলে গেলো সে যেন বলে:
«بسم الله في أوله وآخره»
‘বিসমিল্লাহি ফী আওয়ালিহী ওয়া আখিরীহী।”
“শুরুতে ও শেষে আল্লাহর নামে।”[119]
১২. তিনি বলেন: “যে খাবারে আল্লাহর নাম নেয়া হয় না, শয়তান তাকে নিজের জন্য হালাল করে নেয়।”[120]
১৩. তিনি খাবার খেতে বসে মেহমানদের সাথে কথা বলতেন এবং তাদের উপর বারংবার খাবার উঠিয়ে দিতেন, যেমনটি অতি আপ্যায়ণকারী লোকেরা করে থাকে।
১৪. যখন তার সামনে থেকে খাবার খাওয়ার পর বাকী অংশ উঠিয়ে নেওয়া হতো তখন তিনি বলতেন:
«الحمد لله حمداً كثيراً طيباً مباركا فيه غير مكفي ولا مودع ولا مستغنى عنه ربنا».
‘আল-হামদু লিল্লাহি হামদান কাসিরান ত্বাইয়েবান মুবারাকান ফীহি, গাইরা মুকফিয়্যীন, ওয়ালা-মুয়াদ্দা‘য়ীন, ওয়ালা-মুসতাগনান ‘আনহু রাব্বানা।”
“পাক-পবিত্র, বরকতময় অনেক অনেক প্রশংসা আল্লাহর জন্য, হে আমাদের প্রভু! যে খাদ্য হতে নির্লিপ্ত হতে পারবো না, আর যা থেকে কখনই চিরতরে বিদায় নিতে পারবো না এবং তা হতে অমুখাপেক্ষীও হবো না।”[121]
১৫. তিনি কারো নিকট পানাহার করলে তাদের জন্যে দু‘আ না করা পর্যন্ত বের হতেন না এবং বলতেন:
«أفطر عندكم الصائمون وأكل طعامكم الأبرار وصلت عليكم الملائكة».
‘আফতারা ইন্দাকুমুস সায়েমূন, ওয়া-‘আকালা ত্বা‘আমাকুমুল আবরার, ওয়া-স্বাল্লাত্ আলাইকুমুল মালাইকা।”
“তোমাদের সাথে ইফতার করলো রোযাদারগণ, তোমাদের আহার গ্রহণ করলো সৎ লোকগণ এবং তোমাদের জন্য শান্তি কামনা করলো ফেরেশতাগণ।”[122]
১৬. যদি কেউ মিসকীন-অভাবগ্রস্ত লোকদের মেহমানদারী করতো তিনি তার জন্যে দু‘আ করতেন এবং তার প্রশংসা করতেন।
১৭. তিনি ছোট কিংবা বড়, স্বাধীন কিংবা ক্রীতদাস, বেদুঈন কিংবা মুহাজির বা ভিনদেশী যে কারো সাথে বসে পানাহার করতে ঘৃণা করতেন না।
১৮. রোযারত অবস্থায় তাঁর সামনে খাবার পেশ করা হলে তিনি বলতেন: আমি রোযাদার।”[123] এবং মেহমানের প্রতি নির্দেশ জারী করেন যে, যদি সে রোযাদার হয়, তাহলে যেন মেজবানের জন্যে দু‘আ করে, আর যদি সে রোযাদার না হয় তাহলে যেন আহার করে।”[124]
১৯. কেউ বিশেষভাবে খাবার তৈরী করে তাঁকে দাওয়াত দিলে, তখন তার সাথে অন্য কেউ এসে শামিল হলে, তিনি মেজবানকে তার সম্পর্কে অবহিত করে বলতেন: এই ব্যক্তি আমাদের সাথে এসেছে, তোমার ইচ্ছা হলে তাকে অনুমতি দিতে পার, নতুবা তুমি চাইলে সে চলে যাবে।”[125]
২০. সাহাবীদের কেউ কেউ তাঁর নিকট অভিযোগ করলো যে, তারা পানাহার করে পরিতৃপ্তি লাভ করে না, তখন তিনি তাদেরকে নির্দেশ প্রদান করেন যে, তোমরা বিচ্ছিন্নভাবে না হয়ে একত্রে খাবার খাও এবং আল্লাহর নাম নিবে, এতে তোমাদের খাদ্যে বরকত হবে।”[126]
২১. তিনি বলেছেন : “আদম-সন্তান পেটের চেয়ে অধিক নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করেনি, তার জন্যে কয়েকটি লোকমাই যথেষ্ট ছিল, যদ্বারা স্বীয় পিঠ সোজা রাখবে, আর অত্যধিক প্রয়োজন হলে এক -তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য।”[127]
২২. এক রাত্রে তিনি ঘরে প্রবেশ করে খাবার তালাশ করে কিছুই পেলেন না, তখন তিনি বললেন:
«اللهم أطعم من أطعمني واسق من سقاني».
‘আল্লা-হুম্মা আত্বয়িম মান আত্বআমানী, ওয়াসকি মান-সাক্বানী।”
“হে আল্লাহ! যে আমাকে আহার করাবে তুমি তাকে আহার করাও, আর যে আমাকে পান করাবে তুমি তাকে পান করাও।’[128]

(খ) পান করা প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালার বিবরণ[129]
১. পান করা প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালা ছিল সর্বাপেক্ষা পূর্ণাঙ্গ, যাতে স্বাস্থ্যের হেফাযত হয়। ঠান্ডা-মিষ্টি পানীয় তাঁর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয় ছিল। তিনি কখনো খালেস দুধ পান করতেন, আবার কখনো পানি-মিশ্রিত দুধ, তিনি দুধ পান করে বলতেন:
«اللهم بارك لنا فيه وزدنا منه».
‘আল্লা-হুম্মা বারিক লানা-ফিহ্, ওয়াযিদনা-মিনহু,
“হে আল্লাহ্ ! তুমি আমাদের এ খাদ্যে বরকত দাও এবং তা আরো বেশী করে দাও, নিঃসন্দেহে এমন কোনো বস্তু নেই যা খানা-পিনার জন্য যথেষ্ট হতে পারে একমাত্র দুধ ব্যতীত।”[130]
২. খাবারের উপর পান করা তাঁর আদর্শ ছিল না, তাঁর জন্যে রাতের প্রথমভাগে ‘নবীয’ বানানো হতো এবং তিনি তা সকালে এবং আগামী রাতে এবং দ্বিতীয় দিনে ও রাতে এবং তৃতীয় দিন আসর পর্যন্ত পান করতেন, অতঃপর অবশিষ্টগুলি খাদেমকে পান করাতেন অথবা ঢেলে দিতে নির্দেশ দিতেন।
‘নাবীয’ মানে পানিতে পাকা খেজুর ঢেলে রেখে তা মিষ্টি করা, তিন দিন পর নেশাদ্রব্যে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় তিনি তা পান করতেন না।
৩. তাঁর অভ্যাসগত আদর্শ ছিল বসাবস্থায় পান করা এবং যে দাঁড়ানো অবস্থায় পান করে তাকে তিনি ধমক দেন, তবে তিনি একদা দাঁড়ানো অবস্থায় পান করেন, কেউ বলেন: তা বিশেষ প্রয়োজনে ছিল, আর কেউ বলেন: নিষেধাজ্ঞা রহিত করার জন্য ছিল, আবার কেউ বলেন : উভয়টি জায়েয ঘোষণা করার জন্য ছিল।
৪. তিনি পানি পান করতে তিনবার নিঃশ্বাস নিতেন এবং বলতেন: “এটি অধিক তৃপ্তিদায়ক, অধিক হযমকারী এবং অধিক উপকারী।”[131] এখানে তিনি তিনবার ‘নিঃশ্বাস নিতেন’ এর অর্থ হচ্ছে, তিনি পাত্রের বাইরে নিঃশ্বাস ফেলতেন, যেরূপ অন্য বর্ণনায় রয়েছে, তিনি বলেছেন: “যখন তোমাদের কেউ পান করে তখন যেন পাত্রের মধ্যে নিঃশ্বাস না ফেলে, বরং নিঃশ্বাস ফেলার সময় মুখ থেকে পাত্র সরিয়ে নিবে।”[132] তিনি পাত্রের ফাটল দিয়ে কিংবা মশকের মুখে মুখ লাগিয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন।
৫. আর তিনি ‘আল-হামদুলিল্লাহ্’ বলতেন যখন পান শেষ করতেন এবং বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ্ সেই বান্দার উপর রাযী হন যে খাবার আহার করলে ‘আল-হামদুলিল্লাহ্’- বলে এবং পানীয় পান করলে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’, বলে।”[133]
৬. তাঁর জন্যে মিষ্টি পানি আনা হতো, ভাল-উত্তম পানি যা লবণাক্ত নয় এবং তা থেকে তিনি গতকালের পুরানোটি গ্রহণ করতেন।
৭. তিনি পান করার পর অবশিষ্ট অংশ ডানে উপস্থিত ব্যক্তিকে দিতেন যদিও তাঁর বামে কোনো প্রবীণ ব্যক্তি থাকে।
৮. তিনি খাবার পাত্র ঢেকে রাখতে এবং মুখ বন্ধ করতে নির্দেশ দিতেন, যদিও এক টুকরা কাঠ দিয়ে হয় এবং যেন সে সময় ‘বিসমিল্লাহ্’ বলা হয় সে নির্দেশনা দিতেন।”

(১৬) ইসলামের দাওয়াত প্রসঙ্গে তাঁর আদর্শমালার বিবরণ[134]

১. তিনি দিনে ও রাত্রে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেন, তিনি নবুওয়াতের প্রথমভাগে তিন বছর মক্কায় গোপনীয়ভাবে আল্লাহর প্রতি আহ্বান করেন, অতঃপর আল্লাহর বাণী:
﴿ فَٱصۡدَعۡ بِمَا تُؤۡمَرُ وَأَعۡرِضۡ عَنِ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ٩٤ ﴾ [الحجر: ٩٤]
‘‘তুমি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছো, তা প্রকাশ্যে প্রচার করো এবং মুশরিকদের উপেক্ষা কর।”[135] এই আয়াত অবতীর্ণ হলে তিনি প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগ আরম্ভ করেন এবং আল্লাহর পথে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করেন নি, বরং ছোট -বড়, স্বাধীন-ক্রীতদাস, নারী-পুরুষ ও জ্বিন-ইনসান সবাইকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন।
২. মক্কায় তাঁর সাহাবীদের উপর নিপীড়ন কঠোরতর হয়ে উঠলে তিনি তাদেরকে হাবশায় হিজরত করার অনুমতি প্রদান করেন।
৩. তিনি তায়েফ গমন করেন এ আশায় যে, তায়েফবাসী ইসলাম গ্রহণ করে তাঁর সাহায্য করবে, তাই তিনি সেখানে পৌঁছে তাদেরকে দ্বীনের প্রতি দাওয়াত দেন, কিন্তু তিনি সাহায্য-সহযোগিতাকারীরূপে কাউকে পেলেন না, বরং তারা তাঁকে সর্বাপেক্ষা কঠিন কষ্ট দিলো এবং তারা তাঁর সাথে এরূপ মন্দ আচরণ করলো যা তিনি তাঁর নিজের কাওম থেকেও পান নি। অবশেষে তারা তায়েফ থেকে তাঁকে মক্কার দিকে বহিষ্কার করলো, অতঃপর তিনি মুত‘আম ইবনে আদীর আশ্রয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন।
৪. তিনি মক্কায় দশ বছর পর্যন্ত প্রকাশ্যে দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকেন, তিনি প্রত্যেক বছর হজ্জের মৌসুমে নতুন উদ্যমে ইসলামের দাওয়াত শুরু করতেন এবং হাজীদের তাঁবুতে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিতেন এবং ‘ওকায, মাজিন্নাহ ও যিল-মজায’ প্রভৃতি মেলা মৌসুমে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিতেন, এমনকি তিনি আরবের বিভিন্ন গোত্র ও তাদের অবস্থান-স্থল প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করে তাদের কাছে দাওয়াত পৌঁছাতেন।
৫. অতঃপর মিনার পাহাড়ী এলাকার ‘আকাবা’য় মদীনার ‘খাযরাজ’ গোত্রের ছয় জন লোকের সাথে দেখা হয়, তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হয়, অতঃপর তারা মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে লোকদেরকে ইসলামের পথে দাওয়াত দিতে থাকে, ফলে মদীনার ঘরে ঘরে দ্বীনের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ে, বস্তুত মদীনায় এমন কোনো ঘর বাকী ছিল না যাতে ইসলাম প্রবেশ করেনি।
৬. পরবর্তী বছর হজ্জ মৌসুমে তাদের ১২ জন লোক আসে, তিনি তাদেরকে মিনার ‘আকাবা’র কাছে বাই‘আত চান। তারা আল্লাহর রাসূলের নিকট বাই‘আত করেন। সে বাই‘য়াতের দফাসমূহ ছিল: তারা তাঁর কথা শুনবে এবং মানবে, তাঁর জন্যে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করবে, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ হতে বারণ করবে, আল্লাহর জন্য দাওয়াতের কথা বলবে, এ ব্যাপারে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া তারা করবে না, তারা তাঁর সাহায্য করবে এবং নিজেদের প্রাণ, সন্তান-সন্তুতি এবং পরিবারের হেফযতের মতোই তাঁর হেফাযত করবে এবং পুরষ্কার স্বরূপ তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। অতঃপর তারা মদীনায় ফিরে যায়, তখন তিনি তাদের সাথে ‘আব্দুল্লাহ্ ইবনে উম্মে মাকতূম ও মুস্‘আব ইবনে ওমাইর, রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা-কে কুরআন শিক্ষা ও আল্লাহর দিকে দ্বীনের দাওয়াত প্রদানের জন্যে মদীনায় প্রেরণ করেন, ফলে তাদের দাওয়াতে অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল উছাইদ ইবনে হুদাইর ও সা‘দ ইবনে মু‘আয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা।
৭. অতঃপর তিনি মুসলিমদের মদীনায় হিজরত করে চলে যাওয়ার অনুমতি প্রদান করেন, তখন মুসলিমগণ দ্বীন রক্ষার্থে জন্মভুমি মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় হিজরত শুরু করে, অবশেষে তিনি ও তাঁর সাথী আবু বকর হিজরত করেন।
৮. তিনি মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থ