সালাম ও তার বিধি-বিধান


সালাম ও তার বিধি-বিধান

 

ভূমিকা
 

 

الحمد لله رب العالمين وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله  وعلى آله وأصحابه أجمعين،

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সমগ্র সৃষ্টিকুলের রব্ব। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ক ইলাহ নেই তিনি একক তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। সালাত ও সালাম নাযিল হোক তার উপর তার পরিবার-পরিজন ও সকল সাহাবীর উপর।

হে পাঠক ভাইয়েরা! ‘আসসালামু আলাইকুম ওরাহ মাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’ আল্লাহ তোমাদের দয়া করুক!

তোমরা অবশ্যই একটি কথা মনে রাখবে, মুসলিমদের মধ্যে সালামের প্রচার-প্রসার ইসলামের একটি মহান ঐতিহ্য ও বিশেষ সৌন্দর্য। আর সালাম পরস্পর সালাম বিনিময় করা একজন মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের অধিকার ও দায়িত্ব। এ ছাড়াও সালাম বিনিময় করা ঈমানের জন্য আবশ্যকীয় বিষয়-মুসলিমদের মধ্যে পরস্পর মহব্বত ও ভালোবাসা- যা একজন মুসলিমকে জান্নাতে নিয়ে যায়, তা সৃষ্টির কারণ হয়। যেমন- আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,
«لا تدخلوا الجنة حتى تؤمنوا، ولا تؤمنوا حتى تحابوا، ألا أدلكم على شيء إذا فعلتموه تحاببتم؟ أفشوا السلام بينكم» رواه مسلم
“তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একে অপরকে ভালবাসবে না, আর আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি জিনিস বাতলায়ে দেব যা করলে তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালো বাসবে? এ কথার উত্তরে তিনি বলেন, তোমারা বেশি বেশি করে সালামকে প্রসার কর”। [বর্ণনায় মুসলিম]

‘আস-সালাম’ আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ হতে একটি অন্যতম নাম এবং এটি জান্নাতের নামসমূহ হতে একটি জান্নাতের নাম। জান্নাতিরা জান্নাতে পরস্পরকে সালাম দ্বারা সম্বোধন করবেন এবং তাদের পরস্পরের শুভেচ্ছা বিনিময় হবে ‘সালাম’। মনে রাখবে, তুমি যখন একজন মুসলিম ভাইকে (السلام عليكم ورحمة الله وبركاته) বললে, এ কথার অর্থ হল, তুমি তোমার একজন মুসলিম ভাইয়ের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি, রহমত ও বরকতের জন্য দো‘আ করলে এবং তার জন্য যাবতীয় কল্যাণ কামনা করলে। সালামের আদান-প্রদান দ্বারা মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হয় এবং পারস্পরিক মহব্বত বৃদ্ধি পায়। তাদের মধ্য হতে পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ও দুশমনি দূর হয়। সালামের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে মিল-মহব্বত ও ভালোবাসার বীজ বপন করা হয়। সালাম ব্যাপক করা দ্বারা একজন মুসলিম বিনয়ী হয়; তার মধ্যে কোন প্রকার অহংকার থাকে না। সে কারো উপর বড়াই করে না। যে ব্যক্তি সালাম দেয়, সে ছোট বড়, ধনী দরিদ্র, সম্মানী অসম্মানী, চেনা অচেনা সবাইকে সালাম দেয়। ফলে তার মধ্যে কোন প্রকার অহংকার থাকতে পারে না। কিন্তু যে অহংকারী সে সবাইকে সালাম দেয় না এবং সবার সালামের উত্তর দেয় না। ইসলামে সালামের অর্থ হল, নিরাপত্তা ও শান্তি। অর্থাৎ, তুমি যখন কোন ব্যক্তিকে সালাম দিলে এবং সে তোমার সালামের উত্তর দিল, এর অর্থ হল, সে তোমার জিম্মাদারী ও নিরাপত্তার অন্তর্ভুক্ত হল। তুমি এখন তার কোন ক্ষতি করবে না এবং তাকে কোন বিপদে ঠেলে দেবে না। সালাম বিনিময় করা ও সালামের উত্তর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আমরা দেখি অধিকাংশ মানুষ সালাম দেয়া ও সালামের উত্তর দেয়ার বিষয়ে একেবারেই অমনোযোগী; সালাম বিনিময় করার ক্ষেত্রে তারা সম্পূর্ণ উদাসীন। এ সব দিক বিবেচনা করে, মুসলিম ভাইদের সালামের গুরুত্ব, ফযিলত ও সালামের বিধানগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়া আমার দায়িত্ব। আমি আমার দায়িত্ব আদায়ের উপলব্ধি থেকে এ পুস্তিকাটিতে সালামের বিধান, ফযিলত ও গুরুত্বসহ বিভিন্ন দিক তুলে ধরছি; যাতে মুসলিম ভাইয়েরা এ দ্বারা উপকৃত হয়। এখানে যে সব বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে, সালামকে প্রচার-প্রসার করার নির্দেশ সম্বলিত হাদিস, সালাম দেয়ার নিয়ম, সালাম দেয়ার আদব, একাধিক বার দেখা হলে একাধিক বার সালাম দেয়া উত্তম হওয়া,  ঘরে প্রবেশ করার সময় সালাম দেয়া মোস্তাহাব হওয়া, বাচ্চাদের সালাম দেয়ার প্রচলন, স্বামী তার স্ত্রীকে সালাম দেয়ার বিধান, নারীদের জন্য তার মুহরিম নিকট আত্মীয়কে সালাম দেয়া, কাফের ও অমুসলিমদের সালাম দেয়া হারাম হওয়া এবং তারা সালাম দিলে তার উত্তর দেয়ার নিয়ম, মজলিস থেকে উঠার সময় সালাম দেয়া মোস্তাহাব হওয়া, সাথীদের বিদায় দেয়ার সময় সালাম দেয়া মোস্তাহাব হওয়া, কারো ঘরে প্রবেশ করার পূর্বে অনুমতি চাওয়ার সময় সালামের প্রচলন ও সালাম দেয়ার নিয়ম, অনুমতি প্রার্থনাকারীকে যখন বলা হয়, তুমি কে? সে যেন বলে আমি অমুক, এ বিষয়ের উপর আলোচনা, যখন কোনো ব্যক্তি হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলে, তার উত্তর দেয়া, কারো সাথে দেখা হলে, তার সাথে মুসাফাহা করা ও হাসি মুখে সাক্ষাত করা মুস্তাহাব হওয়া, সালাম দেয়া ও সালামের উত্তর দেয়ার বিধান সম্পর্কে আলোচনা, কোন সময় সালাম দেয়া মাকরূহ তার আলোচনা, কার সালামের উত্তর দিতে হবে, আর কার সালামের উত্তর দিতে হবে না তার বিধান, সালামের উপকারিতা ও ফলাফলের আলোচনা, সালামের সাথে সম্পৃক্ত বিধানগুলোকে কাব্য আকারে আলোচনা করা ইত্যাদি। আমি এ পুস্তিকাটিকে “تذكير الأنام بأحكام السلام” করে নাম রেখেছি। পুস্তিকাটিকে আল্লাহর কালাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর হাদিস ও ইসলামী শরিয়তের জ্ঞানে সমৃদ্ধ জ্ঞানী গুণী ও গবেষকদের কথা দ্বারা সাজানো হয়েছে। আল্লাহর নিকট আমাদের কামনা, আল্লাহ্ তা‘আলা যেন এ পুস্তিকা দ্বারা আমাদের সবাইকে উপকার পৌছায়। বিশেষ করে, যারা এ কিতাবটি সংকলন করেছেন, চাপিয়েছেন, যারা প্রচার করার জন্য চেষ্টা করেছেন এবং যারা শুনেছেন ও তদনুযায়ী আমল করেছেন। আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা এই যে, আল্লাহ যেন, আমাদের এ রিসালাটিকে তার সন্তুষ্টির কারণ হিসেবে আখ্যায়িত করেন, আল্লাহর জান্নাত লাভে ধন্য হওয়ার উপকরণ বা মাধ্যম বানায়। তিনিই আমাদের বিধায়ক, তিনিই সর্বোত্তম অভিভাবক। আমাদের নিজেদের কোন ক্ষমতা বা শক্তি নাই। যাবতীয় শক্তি ও ক্ষমতা কেবলই আল্লাহর। আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর উপর, তার পরিবার পরিজনের উপর এবং তার সমগ্র সাহাবীদের উপর।
সংকলক
4/ 4/ 1411 হিজরী

সালাম ইসলামের চিরন্তন অভিবাদন:

সালাম হল, মুসলিম উম্মাহর অভিবাদন ও সম্ভাষণ। এ অভিবাদনের পূর্ণতা ও সম্পূর্ণতা হল-(السلام عليكم ورحمة الله وبركاته) – এ কথা বলা। আর সালামের উদ্দেশ্য হল, একজন মুসলিমের জন্য শান্তি, রহমত ও বরকতের জন্য দো‘আ করা।

সালাম আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ হতে আল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। সালাম ইসলামের সৌন্দর্য, একজন মুসলিম ভাইয়ের উপর অপর মুসলিম ভাইয়ের হক ও অধিকার। কারও সাথে সাক্ষাত হলে, তাকে চিনি বা না চিনি প্রথমে সালাম দেয়া সুন্নত। ছোট হোক বা বড় হোক, ধনি হোক গরীব হোক, সম্মানী হোক বা অসম্মানী হোক সবাইকে সালাম দেবে। সালামের মধ্যে একজন মুসলিমের বিনয় নিহিত; যে সালাম দেয় সে কারও সাথে অহংকার করে না। আর যে আগে সালাম দেয়, সে অহংকার হতে মুক্ত । আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম ব্যক্তি যে মানুষকে আগে সালাম দেয় । সবচেয়ে কৃপণ যে সালাম দিতে কার্পণ্য করে। সালামের প্রসার দ্বারা মুসলিমদের পরস্পরের মধ্যে মহব্বত ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়। আর মুসলিমদের মধ্যে পরস্পর মহব্বত ও ভালোবাসা ঈমানের অন্যতম দাবি; যা একজন মুসলিমকে জান্নাতে প্রবেশ করা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হয়। যেমন- রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,
«لا تدخلوا الجنة حتى تؤمنوا ولا تؤمنوا حتى تحابوا ألا أدلكم على شيء إذا فعلتموه تحاببتم؟ أفشوا السلام بينكم»
“তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একে অপরকে ভালবাসবে না, আমি কি তোমাদের এমন একটি জিনিস বাতলায়ে দেব, যা করলে তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালো বাসবে? এ কথার উত্তরে তিনি বললেন, তোমারা বেশি বেশি করে সালামকে প্রসার কর। মুসলিম”  ।
একজন মুসলিম যখন অপর মুসলিমকে সালাম দেবে, তখন তার জবাবে লোকটি তার মতই সালাম দ্বারা উত্তর দেবে অথবা তার চেয়ে উত্তম কথা দ্বারা সালামের উত্তর দেবে। তার উপর তার অপর ভাইয়ের সালামের উত্তর দেয়া ওয়াজিব। আল্লাহ্ তা‘আলা এ বিষয়ে বলেন,
﴿وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٖ فَحَيُّواْ بِأَحۡسَنَ مِنۡهَآ أَوۡ رُدُّوهَآۗ ٨٦﴾ [النساء: ٨٦]
“আর যখন তোমাদেরকে সালাম দেয়া হবে তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে। অথবা জবাবে তাই দেবে”। [সূরা নিসা, আয়াত: ৮৬]
এটি হল, মুসলিম উম্মাহর অভিবাদন ও সম্ভাষণ যা ইসলাম মুসলিম উম্মাহর জন্য নিয়ে এসেছে।

আল্লাহ্ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿تَحِيَّةٗ مِّنۡ عِندِ ٱللَّهِ مُبَٰرَكَةٗ طَيِّبَةٗۚ ٦١﴾ [النور: ٦١]
আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতপূর্ণ ও পবিত্র অভিবাদনস্বরূপ। [সূরা নূর, আয়াত: ৬১]

কিন্তু ইয়াহূদী ও খৃষ্টানদের অভিবাদন মুসলিমদের অভিবাদনের চেয়ে ভিন্ন ও ব্যতিক্রম। ইয়াহূদীদের অভিবাদন হল, হাতের আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করা আর খৃষ্টানদের অভিবাদন হল, হাতের তালু দিয়ে ইশারা করা। আর আমাদেরকে খৃষ্টান ও ইয়াহূদীদের অনুকরণ ও তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং সালাম দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,
«ليس منا من تشبه بغيرنا، لا تشبهوا باليهود ولا بالنصارى فإن تسليم اليهود الإشارة بالأصابع وتسليم النصارى الإشارة بالأكف»
“যে ব্যক্তি অমুসলিমদের সাথে সাদৃশ্য রাখে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। তোমরা ইয়াহূদী ও খৃষ্টানদের সাথে সদৃশ অবলম্বন করো না। কারণ ইয়াহূদীদের অভিবাদন হল, আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করা আর খৃষ্টানদের অভিবাদন হল, হাতের তালু দিয়ে ইশারা করা”  ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ আরও বলেন,
«لا تبدءوا اليهود ولا النصارى بالسلام»
“তোমরা ইয়াহূদী ও খৃষ্টানদের প্রথমে সালাম দেবে না”  ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ আরও বলেন,
«من تشبه بقوم فهو منهم»
“যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের লোকদের সাথে সদৃশ রাখে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত ।”
আর আল্লাহ্ তা‘আলা নিজে সালাম; তার থেকেই সালাম। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতে মুসলিম উম্মাহর অভিবাদন হল সালাম। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,
﴿تَحِيَّتُهُمۡ يَوۡمَ يَلۡقَوۡنَهُۥ سَلَٰمٞۚ وَأَعَدَّ لَهُمۡ أَجۡرٗا كَرِيمٗا ٤٤﴾ [الاحزاب: ٤٤]
“যেদিন তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে সেদিন তাদের অভিবাদন হবে: ‘সালাম’। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন সম্মানজনক প্রতিদান”। [সূরা আহযাব, আয়াত: ৪৪]
﴿ لَا يَسۡمَعُونَ فِيهَا لَغۡوٗا وَلَا تَأۡثِيمًا ٢٥ إِلَّا قِيلٗا سَلَٰمٗا سَلَٰمٗا ٢٦ ﴾ [الواقعة: ٢٥،  ٢٦]
“তারা সেখানে শুনতে পাবে না কোন বেহুদা কথা, এবং না পাপের কথা; শুধু এই বাণী ছাড়া, সালাম, সালাম”। [সূরা ওয়াকেয়া, আয়াত: ২৫, ২৬]
জান্নাতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও ফেরেশতারা মুমিনদের সালাম দেবেন। এ ছাড়া মুমিনরাও জান্নাতে একে অপরকে সালাম দেবে। অথচ সেখানে তারা যাবতীয় বিপদ-আপদ থেকে মুক্ত। কোনো এক কবি বলেন,
الدار دار سلامة وخطابهم فيها سلام

واسم ذي الغفران

“ঘরটি হল, শান্তির ঘর, তারপরও তাতে তাদের সম্ভাষণ হবে সালাম এবং মহা ক্ষমাশীল আল্লাহর নাম”।
হে মুসলিম ভাইয়েরা! যেহেতু ইসলাম হল, মহব্বত, ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, উত্তম পরিণতি, স্থায়ী শান্তি ও পরিপূর্ণ সম্মান লাভের দ্বীন, সেহেতু আমরা যারা মুসলিম তাদের জন্য ইসলামের শিক্ষাকে বাস্তবায়ন করা, ইসলামের বিধান অনুযায়ী আমল করা এবং ইসলামের প্রদর্শিত পথ ও নির্দেশনা অনুযায়ী জীবনকে পরিচালনা করা খুবই জরুরি। হে আল্লাহ ! তুমি নিজেই শান্তি, তোমার থেকেই শান্তি। হে প্রভু! তুমি আমাদের শান্তিতে বেঁচে থাকার তাওফিক দাও, যাবতীয় অপকর্ম ও অপরাধ থেকে আমাদের রক্ষা কর। আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর উপর, তার পরিবার-পরিজনের উপর এবং তার সমগ্র সাহাবীদের উপর ।

সালাম অধ্যায়

প্রথম পরিচ্ছেদ: 

সালাম দেয়ার ফযিলত ও সালামকে প্রসার করার উপকারিতা:

কুরআনের বাণী:
আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,
﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَا تَدۡخُلُواْ بُيُوتًا غَيۡرَ بُيُوتِكُمۡ حَتَّىٰ تَسۡتَأۡنِسُواْ وَتُسَلِّمُواْ عَلَىٰٓ أَهۡلِهَاۚ ذَٰلِكُمۡ خَيۡرٞ لَّكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُونَ ٢٧ ﴾ [النور: ٢٧]
“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজদের গৃহ ছাড়া অন্য কারও গৃহে প্রশে করো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নেবে এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম দেবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর”। [সূরা নূর, আয়াত: ২৭]

আল্লাহ্ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿فَإِذَا دَخَلۡتُم بُيُوتٗا فَسَلِّمُواْ عَلَىٰٓ أَنفُسِكُمۡ تَحِيَّةٗ مِّنۡ عِندِ ٱللَّهِ مُبَٰرَكَةٗ طَيِّبَةٗۚ ٦١ ﴾ [النور: ٦١]
“তবে তোমরা যখন কোন ঘরে প্রবেশ করবে তখন তোমরা নিজদের উপর সালাম করবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতপূর্ণ ও পবিত্র অভিবাদনস্বরূপ”। [সূরা নূর, আয়াত: ৬১]

আল্লাহ্ তা‘আলা আরও বলেন,
﴿وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٖ فَحَيُّواْ بِأَحۡسَنَ مِنۡهَآ أَوۡ رُدُّوهَآۗ٨٦﴾ [النساء: ٨٦]
“আর যখন তোমাদেরকে সালাম দেয়া হবে তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে। অথবা জবাবে তাই দেবে”। [সূরা নিসা, আয়াত: ৮৬]

আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন,
﴿هَلۡ أَتَىٰكَ حَدِيثُ ضَيۡفِ إِبۡرَٰهِيمَ ٱلۡمُكۡرَمِينَ ٢٤ إِذۡ دَخَلُواْ عَلَيۡهِ فَقَالُواْ سَلَٰمٗاۖ قَالَ سَلَٰمٞ قَوۡمٞ مُّنكَرُونَ ٢٥﴾ [الذاريات: ٢٤،  ٢٥]
“তোমার কাছে কি ইবরাহীমের সম্মানিত মেহমানদের বৃত্তান্ত এসেছে? যখন তারা তার কাছে আসল এবং বলল, সালাম, উত্তরে সেও বলল, সালাম। এরা তো অপরিচিত লোক”। [সূরা জারিয়াত, আয়াত: ২৫, ২৬]

হাদিসের বাণী:
এক- আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
أن رجلاً سأل رسول الله  أي الإسلام خير؟ قال: «تطعم الطعام، وتقرأ السلام على من عرفت ومن لم تعرف» متفق عليه.
“এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামে কোন আমলটি সর্ব উত্তম? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বললেন, মানুষকে খানা খাওয়ানো এবং তুমি যাকে চিনো আর যাকে চিনো না সবাইকে সালাম দেয়া”  । [বুখারি ও মুসলিম]।

দুই- আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,
«لما خلق الله تعالى آدم»  قال: «اذهب فسلم على أولئك -نفر من الملائكة جلوس- فاستمع ما يحيونك، فإنها تحيتك وتحية ذريتك» فقال: السلام عليكم، فقالوا: السلام عليك ورحمة الله، فزاده ورحمة الله متفق عليه .
“আল্লাহ্ তা‘আলা আদম আ. কে সৃষ্টি করার পর বললেন, যাও! তুমি ঐ সব ফেরেশতার জামাত যারা বসে আছে তাদের সালাম দাও। তারা তোমাকে কি উত্তর দেয়, তা মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ কর। কারণ, তারা যা উত্তর দেবে তা হবে তোমার ও তোমার বংশধরদের সালাম। তখন আদম আ. গিয়ে ফেরেশতাদের বলল,  السلام عليكم، অর্থাৎ ‘তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক’ এর উত্তরে তারা বলল, السلام عليك ورحمة الله ‘তোমার উপর শান্তি ও আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক’ তারা উত্তর দিতে গিয়ে আল্লাহর রহমত শব্দটিকে বাড়াল”  । [বুখারি ও মুসলিম]

তিন- আবু উমারা-আল বারা ইব্‌ন আযেব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«أمرنا رسول الله  بسبع: بعيادة المريض، واتباع الجنائز، وتشميت العاطس، ونصر الضعيف، وعون المظلوم، وإفشاء السلام، وإبرار المقسم»، متفق عليه.
“রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ আমাদের সাতটি বিষয়ে নির্দেশ দেন: রুগীকে দেখতে যাওয়া, জানাযার সালাতে অংশ গ্রহণ করা, হাঁচির উত্তর দেয়া, দুর্বলদের সাহায্য করা, অত্যাচারিত লোককে সহযোগিতা করা, সালামের প্রসার করা, শপথকারীকে মুক্ত করা” । বুখারি ও মুসলিম।

চার- আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,
«لا تدخلوا الجنة حتى تؤمنوا ولا تؤمنوا حتى تحابوا، أولا أدلكم على شيء إذا فعلتموه تحاببتم؟ أفشوا السلام بينكم» رواه مسلم.
“তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একে অপরকে ভালবাসবে না, আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি জিনিস বাতলেয়ে দেব যা করলে, তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালো বাসবে? তারপর তিনি বললেন, তোমারা বেশি বেশি করে সালামকে প্রসার কর” । [মুসলিম]  ।

পাঁচ- আবু ইউসুফ আব্দুল্লাহ ইবন সালাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
سمعت رسول الله  يقول: «يا أيها الناس أفشوا السلام، وأطعموا الطعام، وصلوا الأرحام، وصلوا والناس نيام، تدخلوا الجنة بسلام» رواه الترمذي وقال: حديث حسن صحيح.
“আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, হে মানব সকল! তোমরা সালামের প্রসার কর, মানুষকে খানা খাওয়াও, আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখ, আর মানুষ যখন ঘুমায়, তখন তুমি সালাত আদায় কর। তাহলে তুমি নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে। বর্ণনায় তিরমিযী । আর ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদিসটি হাসান ও সহীহ।

ছয়- তুফাইল ইব্‌ন উবাই ইব্‌ন কা‘আব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত,
أنه كان يأتي عبد الله بن عمر فيغدو معه إلى السوق، قال: فإذا غدونا إلى السوق، لم يمر عبد الله على سقاط ولا صاحب بيعة، ولا مسكين، ولا أحد إلا سلم عليه، قال الطفيل: فجئت عبد الله بن عمر يومًا فاستتبعني إلى السوق، فقلت له: ما تصنع بالسوق؟ وأنت لا تقف على البيع، ولا تسأل عن السلع، ولا تسوم بها، ولا تجلس في مجالس السوق؟ وأقول: اجلس بنا ههنا نتحدث، فقال: يا أبا بطن وكان الطفيل ذا بطن إنما نغدو من أجل السلام، فنسلم على من لقيناه، رواه مالك في الموطأبإسناد صحيح.
তিনি আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ এর নিকট আসা যাওয়া করতেন। আর প্রায় সময় তাকে সাথে নিয়ে বাজারে যেতেন। তুফাইল বলেন, আমরা যখন বাজারে যেতাম আমি দেখতাম, আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ যত প্রকার ব্যবসায়ী, গরীব, মিসকিন ও টোকাইর নিকট দিয়ে অতিক্রম করত,  সবাইকে সালাম দিত। একদিন আমি আব্দুল্লাহ ইব্‌ন ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ এর নিকট আসলে, তিনি আমাকে তার সাথে বাজারে যাওয়ার কথা বললে, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি বাজারে গিয়ে কি করবেন? আপনিতো কোন দোকানে বসেন না, কোন সামগ্রী সম্পর্কে কাউকে জিজ্ঞাসা করেন না, কোন কিছু দাম-ধর করেন না এবং বাজারের কোন অনুষ্ঠানেও শরিক হন না। আমি আপনাকে বলি, আমাদের নিয়ে এখানে বসেন আমরা আলাপ করি। [কিন্তু আপনি তো তা করেন না] তখন তিনি আমাকে বললেন, “হে পেট ওয়ালা!  (আবু তুফাইলের পেট বড় ছিল) আমি বাজারে গমন করি সালাম দেয়ার উদ্দেশ্যে। যার সাথে আমি সাক্ষাত পাই তাকেই সালাম দেই”। ইমাম মালেক মুয়াত্তাতে হাদিসটিকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেন।

সালাম কিভাবে দেবে?

যে সালাম দেবে, তার জন্য মোস্তাহাব হল, «السلام عليكم ورحمة الله وبركاته» বলা। অর্থাৎ, তোমাদের উপর শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। এখানে বহুবচন অর্থাৎ, ‘তোমাদের’ শব্দ ব্যবহার করা সুন্নত। যদিও যাকে সালাম দেবে, সে একা বা একজন হয়। এটাই উত্তম। আর সালামের উত্তর দাতা বলবে, “وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته” অর্থাৎ, তোমাদের উপরও শান্তি, আল্লাহর রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। উত্তর দেয়ার সময় وعليكم… বলবে। এখানে و [ওয়াও] নিয়ে আসবে।
এক- ইমরান ইব্‌ন হুছাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
جاء رجل إلى النبي  فقال: «السلام عليكم» فرد عليه ثم جلس فقال النبي  «عشر» ثم جاء آخر، فقال: السلام عليكم ورحمة الله، فرد عليه فجلس، فقال: «عشرون» ثم جاء آخر، فقال السلام عليكم ورحمة الله وبركاته، فرد عليه فجلس، فقال: «ثلاثون» رواه أبو داود والترمذي وقال: حديث حسن.
“এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর নিকট এসে বলল, «السلام عليكم» রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ তার সালামের উত্তর দিলে লোকটি বসল। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলল “দশ”। তারপর অপর এক ব্যক্তি এসে বলল, السلام عليكم ورحمة الله রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ তার সালামের উত্তর দেয়ার পর লোকটি বসল। তার সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বললেন, “বিশ”। তারপর অপর এক ব্যক্তি এসে বলল, السلام عليكم ورحمة الله وبركاته، রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ তার সালামের উত্তর দিয়ে বলল, “ত্রিশ”। বর্ণনায় আবু-দাউদ ও তিরমিযী। ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান বলে আখ্যায়িত করেন।
দুই- আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
قال لي رسول الله  «هذا جبريل يقرأ عليك السلام» قالت: قلت: «وعليه السلام ورحمة الله وبركاته» متفق عليه( ).
“রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ আমাকে বলেন, ‘এ হল, জিবরীল তোমাকে সালাম দিয়েছে’। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা’ বলেন, আমি বললাম, «وعليه السلام ورحمة الله وبركاته»। “তার উপর সালাম রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক”। [বুখারি ও মুসলিম] বুখারি ও মুসলিমের বিভিন্ন বর্ণনায় এ রকমই বর্ণিত। তবে কোন কোন বর্ণনায় “وبركاته” কে বাদ দেয়া হয়েছে। তবে উভয় বর্ণনাতে কোন অসুবিধা নাই। কারণ, নির্ভরযোগ্যদের বর্ধিত করণ গ্রহণযোগ্য।
তিন- আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«أن النبي  كان إذا تكلم بكلمة أعادها ثلاثًا حتى تفهم عنه، وإذا أتى على قوم فسلم عليهم سلم عليهم ثلاثًا» رواه البخاري.
“রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ যখন কোনো বিষয়ে কথা বলতেন, তিনবার বলতেন, যাতে তার কথা স্পষ্ট হয়। আর যখন কোন কাওমের কাছে আসতেন, তাদের তিনি তিনবার সালাম দিতেন” । বর্ণনায় বুখারি। (তিনবার সালাম দেওয়ার) বিষয়টি তখন প্রযোজ্য, যখন সে কাওমের লোক বেশী হয়।
চার- মিকদাদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ এর স্বীয় বর্ণনায় বর্ণিত, দীর্ঘ হাদিসটিতে তিনি বলেন,
«كنا نرفع للنبي  نصيبه من اللبن، فيجيء من الليل فيسلم تسليمًا لا يوقظ نائمًا، ويسمع اليقظان، فجاء النبي  فسلم كما كان يسلم»، رواه مسلم.
“আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর জন্য তার দুধের ভাগটি তুলে রাখতাম। তিনি রাতে এসে এমনভাবে সালাম দিতেন, যাতে কোনো ঘুমন্ত ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগত না, তবে যারা জাগ্রত তারা তার সালাম শুনতে পেত। একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ আমাদের মাঝে আসলেন এবং তিনি এসে যেভাবে সালাম দেয়ার সেভাবে সালাম দিল” । বর্ণনায় মুসলিম।
পাঁচ- আসমা বিনতে ইয়াযিদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«أن رسول الله  مر في المسجد يومًا وعصبة من النساء قعود، فألوى بيده بالتسليم» رواه الترمذي، وقال: حديث حسن.
“একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ মসজিদের ভিতরে এক দল নারীর মজলিস দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি তাদের সালাম দিলেন এবং হাত দিয়ে ইশারা করলেন”। বর্ণনায় তিরমিযী । এবং তিনি বলেন, হাদিসটি হাসান।
এ হাদিসটির অর্থ, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ মুখে উচ্চারণ ও ইশারা দুটিই করেন। আবু-দাউদ এর বর্ণনা এ অর্থটি সমর্থন করে। কারণ, তাতে বলা হয়, “فسلم علينا” ‘তিনি আমাদের সালাম দেন’।
ছয়: আবু জুরাই আল হুজাইমী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
أتيت رسول الله  فقلت عليك السلام يا رسول الله، قال: «لا تقل عليك السلام، فإن عليك السلام تحية الموتى» رواه أبو داود، والترمذي وقال: حديث حسن صحيح.
“আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এর দরবারে এসে বললাম, عليك السلام يا رسول الله،  ‘হে আল্লাহর রাসূল তোমার উপর সালাম’। তিনি বললেন, عليك السلام، বলবে না, কারণ, عليك السلام মৃত লোকের অভিবাদন” । বর্ণনায় তিরমিযী ও আবু-দাউদ; ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান ও সহীহ বলে আখ্যায়িত করেন এবং পুরো হাদিস উল্লেখ করেন ।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ
সালামের আদব

এক- আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,
«يسلم الراكب على الماشي، والماشي على القاعد، والقليل على الكثير» متفق عليه.
আরোহী ব্যক্তি পায়ে হাটা ব্যক্তিকে সালাম দেবে আর পায়ে হাটা ব্যক্তি বসা ব্যক্তিকে সালাম দেবে। আর অল্প ব্যক্তি বেশি ব্যক্তিকে সালাম দেবে। বুখারি ও মুসলিম । বুখারির অপর এক বর্ণনায় বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন, والصغير على الكبير”  ছোটরা বড়দেরকে সালাম দেবে।
দুই- আবু উমামা ছুদাই ইব্‌ন ‘আজলান আল বাহেলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,
«إن أولى الناس بالله من بدأهم بالسلام» رواه أبو داود بإسناد جيد.
“আল্লাহর নিকট সর্ব উত্তম ব্যক্তি সে, যে মানুষকে আগেই সালাম দেয়”। বর্ণনায় আবু-দাউদ উত্তম সনদে।
ইমাম তিরমিযী আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,
قيل: يا رسول الله الرجلان يلتقيان، أيهما يبدأ بالسلام؟ قال: «أولاهما بالله تعالى». قال الترمذي: هذا حديث حسن.
“রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ কে জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! দুইজন ব্যক্তির মধ্যে যখন সাক্ষাত হবে, তখন কোন লোকটি প্রথমে সালাম দেবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বললেন, ‘তাদের দুই জনের মধ্যে যে আল্লাহর অধিক কাছের লোক সে আগে সালাম দেবে’। ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদিসটি হাসান সহীহ।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ
একাধিক বার সালাম দেয়া

যার সাথে বার বার দেখা হয়, তাকে একাধিক বার সালাম দেয়া মোস্তাহাব। যেমন, একজন ব্যক্তি ঘরে প্রবেশ করল, তারপর ঘর থেকে বের হল। তারপর একই সময় আবার প্রবেশ করল। অথবা উভয়ের মাঝে গাছ বা অন্য কিছু আড়াল হল, তারপর আবার দেখা হল, তখন একজন অপর জনকে পুনরায় সালাম দেবে।
এক- সালাতে ত্রুটি-কারী সাহ