প্রচলিত বিভিন্ন খতম : তাৎপর্য ও পর্যালোচনা (তৃতীয় পর্ব)


প্রচলিত বিভিন্ন খতম :তাৎপর্য ও পর্যালোচনা :(তৃতীয় পর্ব) ঈসালে ছওয়াবে সঠিক পদ্ধতি  ঈসালে ছওয়াবের সঠিক পদ্ধতি এই  যে, মৌখিক এবং শারীরিক  ইবাদতের মধ্যে প্রত্যেক  ব্যক্তি নিজ  ঘরে একাকীভাবে যে ইবাদত  করে, নফল নামায পড়ে, নফল  রোজা রাখে, তাসবীহ আদায়  করে, তেলাওয়াত করে, নফল  হজ্ব বা উমরা করে, তাওয়াফ  করে এগুলোতে শুধু এই নিয়্যাত  করে নিবে যে, এর ছওয়াবটুকু  আমাদের অমুক দোস্তের  কাছে পৌঁছুক।  তা পৌঁছে যাবে। এটাই  হচ্ছে ঈসালে সওয়াব।  যে ছওয়াবটুকু তোমার নিজের  পাবার কথা তা তোমার জন্য  অর্জিত  হয়ে যাবে এবং যে সমস্ত  লোকদের নিয়্যাত  করা হয়েছে তারাও এর  পুরো ছওয়াব পেয়ে যাবে।  আর্থিক সাদাকা খায়রাতের  সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হলো  , নিজের সামর্থানুযায়ী নগদ  অর্থ কোনো কল্যাণমূলক  কাজে লাগিয়ে দিবে অথবা  কোনো মিসকিনকে দিয়ে  দিবে।  এই পদ্ধতি এ জন্য উত্তম যে  , এতে মিসকিন নিজের  প্রয়োজন পুরা করতে পারে।  যদি আজ তার কোনো প্রয়োজন  না হয় তবে কালকের জন্য  রাখতে পারে। তা ছাড়া এই  ব্যবস্থাটি লোকদেখানো হতে  মুক্ত। হাদীসে গোপনে  সাদাকাকারীর এই ফযিলত  বর্ণিত হয়েছে যে, এমন  ব্যক্তিকে আল্লাহ কিয়ামত  দিবসে নিজের রহমতের ছায়ায়  জায়গা দিবেন, যখন আর  কোনো ছায়া থাকবে না এবং  গরমের কারণে মানুষ  ঘামে ডুবে যাবে।  ফযিলতের দিক থেকে দ্বিতীয়  শ্রেণির সাদাকা হচ্ছে  , মিসকিনের প্রয়োজন  অনুসারে তাকে সাদাকা করবে।  অর্থাৎ প্রয়োজন  দেখে তা পুরা করবে।  ঘর ও দোকানের বরকতের জন্যও  মালিক নিজে উপরোক্ত  ব্যবস্থাগুলো অবলম্বন করবে।  ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺳﺒﺤﺎﻧﻪ ﻭﺗﻌﺎﻟﻰ ﺃﻋﻠﻢ  ১৪ রবিউল আওয়াল ১৪১৭ হিজরী।  পাঠক, এই হলো উনার বক্তব্য।  আমরা লক্ষ্য করেছি যে, উনার লেখায়  অসংখ্য কিতাব ও ফকীহের বক্তব্য ও তথ্য  রয়েছে। এই লেখা পড়ার পর  আশা করি সত্যসন্ধানী আলেমের জন্য  বিষয়টি বুঝতে কোনো সমস্যা পেতে  হবে না। একমাত্র পেটপূজারী আলেম  ছাড়া কেউই হিলার বাহানা তালাশ  করে উনার লিখার বিরুদ্ধে কলম ধরবেন  না। শরীয়তে বৈধ বা হালাল থাকা এক  কথা, আর বৈধ বানানো আরেক কথা।  কুরআন হাদীসে কোনো জিনিসের  বৈধতা থাকা এক কথা, কুরআন হাদীস  দিয়ে বৈধ বানানো আরেক কথা।  তবে প্রথমটি আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল  জামাতের আলেমদের গুণ। আর  দ্বিতীয়টি গুমরাহ  পেটপূজারী আলেমদের গুণ।  বিষয়টি সহজে  বোঝার জন্য  একটি উপমা পেশ করছি। যেমন ধরুন, রাসূল  আলিমুল গাইব নন বিষয়টি কুরআন ও  হাদীসে দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ  করা হয়েছে। যিনি বলছেন রাসূল আলিমুল  গাইব নন, তার দলীল কুরআন ও হাদীসের  একাধিক জায়গায় রয়েছে।  পক্ষান্তরে যে আলেম দাবী করছেন  রাসূল আলিমুল গাইব, তিনি কুরআন হাদীস  থেকেই তার মতের স্বপক্ষে দলীল  দিচ্ছেন। তবে তার দাবীর  পক্ষে কোনো দলীল কুরআন  বা হাদীসে নেই। তিনি কিছু দ্ব্যর্থবোধক  আয়াত ও হাদীসকে তার মতের  পক্ষে দলীল বানাচ্ছেন। এই দ্বিতীয়  বৈশিষ্ট্যের আলেম ছাড়া কেউই প্রচলিত  খতমে কুরআনের  স্বপক্ষে ওকালতি করতে পারেন না  , কেননা এসবের অস্তিত্ব  কুরআন, হাদীস, সাহাবা জীবনে নেই,  এমনকি খাইরুল কুরুন তথা সোনালী প্রজন্ম  (রাসূল, সাহাবা ও তাবে‘ঈ) এর  কোনো যুগেও এর অস্তিত্ব  খোঁজে পাবেন না।  প্রচলিত খতমের অস্তিত্ব খাইরুল  কুরুনে না থাকায় বিষয়টি বিদ‘আত হওয়ার  সাথে সাথে লেখক আরো অনেক  খারাবী তুলে ধরেছেন, যা উনার  অভিজ্ঞতার আলোকে। দীর্ঘ  অভিজ্ঞতার আলোকে উল্লেখিত কারণ  ছাড়াও আরো যে সমস্ত  খারাবী রয়েছে তার  কয়েকটি নিম্নে তুলে ধরছি। এই  অভিজ্ঞতা সবার নাও থাকতে পারে।  আমি অধমের কাছে যে বাস্তব  অভিজ্ঞতা হয়েছে তার  কয়েকটি উল্লেখ করব।  1. পরস্পর হিংসা বিদ্বেষ সৃষ্টি।  মনের হিংসার জ্বালা প্রকাশ্যে রুপ  নিতে অনেকের বেলায় দেখা গেছে।  যেমন, একজন কোথাও দশজন নিয়ে যাওয়ার  কথা। বাস্তবতা হলো, দশজন হলে এক  প্রতিষ্ঠানের সবাইকে খতমের তালিকায়  রাখা সম্ভব নয়। এ থেকেই হিংসা ও  সমালোচনার সুত্রপাত। যা খতমের দু একদিন  পর্যন্ত বা আরো বেশি চলতে থাকে।  2. অন্যের মনে জ্বালা সৃষ্টির জন্য  অযথা ঠাট্টাস্বরূপ খতমের কথা বলা। অথচ  হাদীসের  দৃষ্টিতে মিথ্যা বলা কাজে হোক  বা ঠাট্টায় হোক সর্বাবস্থায় হারাম।  সাধারণ নিমণ শ্রেণির উস্তাদ নয়  বরং অনেক শ্রদ্ধাভাজন আলেম  যারা দাওরায়ে হাদীসে পড়ান তাদের  অনেকের কাছ থেকেও এ সব আচরণ  পাওয়া যায়, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক।  3. মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া। যেমন  অনেক সময় খতম না করেই খতমের  আয়োজককে মিথ্যা বলা।  4. কুরআনের সাথে ব্যবসায়িক  পণ্যের মত লেনদেনের আচরণ  করা এবং কুরআন নিয়ে বেয়াদবীমূলক  কথা বলা। যেমন, অহরহ  একথা বলতে শুনা গেছে  , সিলেটি ভাষায় ‘যেলা পয়সা ওলা খতম’  অর্থাৎ টাকা হিসেবে খতমের মান নির্ণয়  করা হয়।  অনেককে আগেই ‘কয়টেকি খতম’ অর্থাৎ  কত টাকার খতম, একথা বলতে শুনা যায়।  এভাবে টাকার উপর কুরআন পড়ার মান  নির্ণয় করা কুরআনের সাথে কতটুকু  বেয়াদবী? তা পাঠক নিজেই বলুন।  অসতর্কতায় আমার মুখ থেকেও দু-একদিন  এমন কথা বের হয়েছে। আল্লাহর  কাছে তওবা করেছি। আবারো করছি  , তিনি যেন আমাকে মাফ করেন।  5. কুরআন সামনে নিয়ে হাসি  , তামাশা, গল্পগুজবের মধ্য  দিয়ে তেলাওয়াত করা। আয়োজক  সামনে থাকলে তার ভয়ে একটু মনোযোগ  দিয়ে পড়া। এ থেকে স্পষ্ট যে, টাকাই  প্রচলিত খতমের মূল টার্গেট।  6. টাকাই যে মূল টার্গেট তা সবার  মনে জানা রয়েছে। সবার  আচরণে একথা স্পষ্ট। মূল টার্গেট  টাকা থাকাবস্থায় আল্লাহর কাছে এসব  খতমের  কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই, আলেম  বলতেই একথা জানেন।  একথা জানা থাকা সত্বেও নিজের পেট  পালার তাগিদে দীন সম্পর্কে অজ্ঞ  ব্যক্তির  অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে  ধোঁকা দেয়া। তাকে রাসূলের শিক্ষার  আদেশ না দিয়ে খতমের কথা বলা  , অথবা নিজ থেকে না বললেও  তাকে তার অজ্ঞতার উপর রাখা। সঠিক  সুন্নাতের দিশা না দেওয়া। অথচ সঠিক  ইলম প্রকাশের সুযোগ  থাকা সত্বে তা গোপন রাখা অবৈধ।  হাদীসে এর উপর ধমকি এসেছে।  এছাড়া সমাজিকভাবে আরো অনেক  বিষয় রয়েছে যা আলেমদের জন্য  লজ্জাজনক ও তাদের মান  সম্মানে আঘাত, এই খতমকে কেন্দ্র  করে হয়ে থাকে।  আহসানুল ফাতওয়ার লিখাটি অনুবাদ  করার পর এ বিষয়ে নিজ থেকে কিছু  লিখার প্রয়োজন ছিল না। যা নিজেই  পূর্বে উল্লেখ করেছি, তথাপি দু-  একটি কথা না লিখে পারলাম না। আল্লাহ  প্রথমে আমাকে এবং আমাদের  সবাইকে হেদায়াতের উপর পরিচালিত  করুন। সহীহ সুন্নাহ মোতাবেক জীবন  পরিচালনার তওফীক দান করুন। আমীন ।  খতমে ইউনুস  ইউনুস আলাইহিস সালাম আল্লাহর  প্রেরিত একজন নবী। আল্লাহর  নির্দেশের পূর্বে তিনি তাঁর গোত্র  থেকে হিজরত করে চলে যান। আল্লাহর  কাছে তাঁর এ কাজ অপছন্দনীয় হলে ইউনুস  আলাইহিস সালামকে মাছের  পেটে যেতে হয়। যার বিবরণ কুরআন  পাকে আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। কমবেশ  আমাদের সবারই ঘটনাটি জানা আছে।  বিপদে পড়ে যে কেউ নিজের  গোনাহের  স্বীকারোক্তি বা তওবা করে  আন্তরিকভাবে আল্লাহকে ডাকলে  আল্লাহ তাঁর ডাক শুনেন। ইউনুস আলাইহিস  সালামের মাছের পেটে পড়ার বিপদ  থেকে উদ্ধারের এই  কাহিনিটি থেকে আল্লাহ  আমাদেরকে এই খবরটি দেন। উদ্ধারের  কাহিনিটি আল্লাহ যেভাবে উল্লেখ  করেন তাতে বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট।  যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহ  আলাইহি সাল্লামকে লক্ষ্য করে আল্লাহ  তা‘আলা কয়েকজন নবীর কথা স্মরণ  করিয়ে দিতে গিয়ে বলেন,  ﴿ ﻭَﺫَﺍ ﺍﻟﻨُّﻮﻥِ ﺇِﺫ ﺫَّﻫَﺐَ ﻣُﻐَﺎﺿِﺒًﺎ ﻓَﻈَﻦَّ ﺃَﻥ ﻟَّﻦ  ﻧَّﻘْﺪِﺭَ ﻋَﻠَﻴْﻪِ ﻓَﻨَﺎﺩَﻯ ﻓِﻲ ﺍﻟﻈُّﻠُﻤَﺎﺕِ ﺃَﻥ ﻻ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻻ  ﺃَﻧﺖَ ﺳُﺒْﺤَﺎﻧَﻚَ ﺇِﻧِّﻲ ﻛُﻨﺖُ ﻣِﻦَ  ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴﻦَ ﻓَﺎﺳْﺘَﺠَﺒْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﻭَﻧَﺠَّﻴْﻨَﺎﻩُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻐَﻢِّ  ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧُﻨﺠِﻲ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ ﴾ ‏( ﺳﻮﺭﺓ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ :  88-87 ‏)  ‘‘আর আপনি মাছওয়ালার  কথা স্মরণ করুন, তিনি ক্রুদ্ধ  হয়ে চলে গিয়েছিলেন,  অতঃপর মনে করেছিলেন যে  , আমি তাকে আটকাবো না।  অতঃপর তিনি অন্ধকারের  মধ্যে আহ্বান  করে বললেন, তুমি ব্যতীত  কোনো উপাস্য নেই।  তুমি দোষমুক্ত, নিশ্চয়  আমি গোনাহগার। অতঃপর  আমি তার  আহ্বানে সাড়া দিলাম।  এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে  মুক্তি দিলাম।  আমি এমনিভাবে মুমিনদের  মুক্তি দিয়ে থাকি’’ ।  এই  ঘটনা থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই? একটু  চিন্তা করলেই যে কেউ  বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবে। অর্থাৎ  যে কোনো বিপদে আল্লাহর  দিকে প্রত্যাবর্তনই একজন মুমিনের করণীয়।  সকাতরে আল্লাহকে ডাকলে তিনি তাঁর  ডাকে অবশ্যই সাড়া দিবেন।  এবার আমরা দেখি হাদীসে এ দো  ‘আর ব্যাপারে আমাদের জন্য  কী দিকনির্দেশনা রয়েছে। রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:  ” ﺩﻋﻮﺓ ﺫﻱ ﺍﻟﻨﻮﻥ ﺇﺫﺍ ﺩﻋﺎ ﻭﻫﻮ ﻓﻲ ﺑﻄﻦ  ﺍﻟﺤﻮﺕ ﻻ ﺇﻟﻪ ﺇﻻ ﺃﻧﺖ ﺳﺒﺤﺎﻧﻚ ﺇﻧﻲ ﻛﻨﺖ  ﻣﻦ ﺍﻟﻈﺎﻟﻤﻴﻦ ﻓﺈﻧﻪ ﻟﻢ ﻳﺪﻉ ﺑﻬﺎ ﺭﺟﻞ ﻣﺴﻠﻢ  ﻓﻲ ﺷﻲﺀ ﻗﻂ ﺇﻻ ﺍﺳﺘﺠﺎﺏ ﺍﻟﻠﻪ ﻟﻪ .”  ‏( ﺳﻨﻦ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ،ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺪﻋﻮﺍﺕ ﻋﻦ ﺭﺳﻮﻝ  ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ، ﺑﺎﺏ 82 ، ﺭﻗﻢ :  3505 ، ﻣﺴﻨﺪ ﺍﺣﻤﺪ، ﻣﺴﻨﺪ ﺳﻌﺪ ﺑﻦ ﺃﺑﻲ  ﻭﻗﺎﺹ، ﺭﻗﻢ: 1462 ‏)  ‘‘মাছওয়ালা যখন মাছের  পেটে থাকাবস্থায় দো‘আ  করেছিলেন তখন তার দো‘আ  ছিল,  ﻻ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻻ ﺃَﻧﺖَ ﺳُﺒْﺤَﺎﻧَﻚَ ﺇِﻧِّﻲ ﻛُﻨﺖُ ﻣِﻦَ  ﺍﻟﻈَّﺎﻟِﻤِﻴﻦَ  (তুমি ব্যতীত কোনো উপাস্য  নেই। তুমি দোষমুক্ত, নিশ্চয়  আমি গোনাহগার) অতএব যখনই  কোনো মুসলিম  ব্যক্তি কোনো বিষয়ে এর  মাধ্যমে দো‘আ  করেছে আল্লাহ তার  ডাকে সাড়া দিয়েছেন।’’  কুরআন হাদীসের  শিক্ষা থেকে যে বিষয়টি উপলব্ধি হয়  তা অত্যন্ত স্পষ্ট। সাধারণ ব্যক্তিও  চিন্তা করলে বিষয়টি বুঝতে পারবেন।  কুরআন হাদীসের  শিক্ষা থেকে আমরা বুঝলাম, যে কোনো  ব্যক্তি যে কোনো বিপদে পড়লে এই দো  ‘আটি করতে পারে। এই দো‘আ  করলে আল্লাহ তাকে বিপদ মুক্ত করবেন  বলে আমরা পূর্ণ আশাবাদী হতে পারি।  কিন্তু কে বা কারা প্রথমে কুরআন  হাদীসের এই শিক্ষার পরিবর্তন  ঘটিয়ে খতমে ইউনুস নামে খতম আবিষ্কার  করেছে তার ইতিহাস আমাদের  কাছে না থাকলেও অভিজ্ঞতার  নামে আমরা কুরআন হাদীসের শিক্ষার  বিপরীত চলছি। সাধারণ মানুষের  অজ্ঞতাকে পূঁজি করে আমাদের স্বার্থ  উদ্ধার করার জন্য  রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার প্রচার  না করা কতটুকু  আমানতদারী তা প্রশ্নযোগ্য। বিবেকের  কাছে কি আমরা কখনো প্রশ্নের সম্মুখীন  হই না? না কি পেটের  তাগিদে আমাদের বিবেকই নষ্ট  হয়ে গেছে?  এই খতমের বিবরণ  যেভাবে দেওয়া হয়েছে:  ‘‘কঠিন বিপদ মামলা-  মোকাদ্দমা ও সঙ্কটের সময় এই  দো‘আ সোয়া লক্ষ বার  পড়িবে। প্রত্যেক একশতবার  পড়া হইলে শরীর  বা মুখে পানি দিবে। পাক  অবস্থায় পাক বিছানায়  বসিয়া কেবলামুখী হইয়া  পড়িবে। ৩,৭ কিংবা ৪০  দিনে শেষ করিবে। মাছের  পেটের ভিতর অন্ধকারের এই  দোয়া জন্মলাভ  করিয়াছে বলিয়া অন্ধকারে  বসিয়া পড়িলে আরও সত্বর ফল  লাভ হয়। খতম শেষ হইলে একবার  এই আয়াত পড়িবেঃ  } ﻓَﺎﺳْﺘَﺠَﺒْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﻭَﻧَﺠَّﻴْﻨَﺎﻩُ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻐَﻢِّ ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ  ﻧُﻨْﺠِﻲ ﺍﻟْﻤُﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ ‏(ﺍﻻﻧﺒﻴﺎﺀ : 88 ‏) {  উচ্চারণঃ ফাসতাজাবনা লাহু  ওয়া নাজ্জাইনাহু মিনাল  গাম্মি ওয়া কাযালিকা নুনজিল  মুমিনীন। (১৭ পারা  , সূরা আম্বিয়া, আয়াত:৮৮)  অর্থঃ ‘‘তৎপর আমি তাঁহার (হযরত  ইউনুস নবীর) দোয়া কবুল  করিয়াছিলাম  এবং তাঁহাকে কঠিন বিপদ  হইতে উদ্ধার করিয়াছিলাম  এবং এইরূপে আমি  বিশ্বাসীগণকে উদ্ধার  করিয়া থাকি।’’ এই  তাদবীরকে খতমে ইউনুস  বলা হয়। ইহা প্রত্যেক  ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী ও  অব্যর্থ ফলপদ বলিয়া প্রমাণিত  হইয়াছে।’’ [71]  এখানে আমরা কুরআন হাদীসের  শিক্ষার সাথে দুই ধরণের বৈপরীত্য  দেখতে পাই।  এক: নির্দিষ্ট সংখ্যার ব্যাপারটি।  যা কুরআন হাদীসের শিক্ষার বিপরীত।  দুই: বিপদে যিনি পড়েন  তিনি আল্লাহর কাছে প্রত্যাবর্তন  করে দো  ‘আটি না পড়ে অন্যকে দিয়ে পড়ানো।  যার কোনো শিক্ষা কুরআন বা রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  জীবন থেকে আমরা পাই না।  সবচেয়ে হাসির ব্যাপার হলো  , বিপদে পড়লাম আমি, আর  আরেকজনকে এনে তাকে দিয়ে দো‘আ  পড়াচ্ছি, সে তার দো‘আয় বলছে ‘নিশ্চয়  আমি গোনাহগার’ আমি বিপদে পড়ে  অন্যকে গোনাহগার বলানোর  মাধ্যমে আমার নিজের কী লাভ?  একটু ভেবে দেখলাম না। একদিন একজন  সাধারণ মানুষ  আমাকে কথাটি বলে হাসিয়ে  দিয়েছেন। আলেম না হয়েও তার এই  উপলব্ধি দেখে অত্যন্ত আনন্দিত হলাম  এবং নিজেকে ধিক্কার দিলাম এই  বলে যে, বুঝেও কেন এতে জড়িত  রয়েছি। আল্লাহ আমাকে মাফ করুন।  এভাবে এসব খতমের  মাধ্যমে সমাজে ‘পুরোহিততন্ত্র’ চালু  হয়েছে। ইসলামের  নির্দেশনা মোতাবেক বিপদগ্রস্ত  ব্যক্তি নিজে সুন্নাত সম্মত দো‘আ  পড়ে মনের আবেগ নিয়ে আল্লাহর  কাছে কাঁদবে এবং বিপদমুক্তি প্রার্থনা  করবে। নেককার মানুষের কাছে দো‘আ  চাওয়া যাবে। তিনি তার মত করে তার  জন্য দো‘আ করবেন।  অভিজ্ঞতার দোহাই দিয়ে বৈধ করা  এসব খতম বৈধ করার  স্বার্থে অভিজ্ঞতার  কথা বলে ফতোয়া চালিয়ে দিতে দেখা  যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষার  বিপরীত কার অভিজ্ঞতা বা কার কথার  এত মূল্যায়ন যা রাসূলের শিক্ষাকেও হার  মানায়? আর যিনি এ নির্দিষ্ট সংখ্যার  অভিজ্ঞতার  কথা বললেন, তিনি নিজে পড়ার  কথা বললেন, না কি অন্যকে দিয়ে  পড়ানোর? যাই হোক এর কোনটিই  যেহেতেু রাসূলের শিক্ষা নয় তাই  আমরা এ সবের পিছনে পড়ার প্রয়োজন  বোধ করি না। এ সব কথাবার্তা কখনোই  গ্রহণযোগ্য নয়। এতে করে শরীয়ত  পরিবর্তন হয় বলে আমরা স্পষ্ট  দেখতে পাচ্ছি। একটি সহজ উদাহরণ  দিলে বিষয়টি বুঝতে সহজ  হবে বলে আশা করছি। যেমন ধরুন, রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  হাদীসের আলোকে আমরা জানি  , সাদাকা বা দানের  মাধ্যমে বালা মুসিবত দূর হয়। এবার  মনে করুন কোনো ব্যক্তি কোনো এক  তারিখের নির্দিষ্ট সময়ে, যেমন  সে শাওয়াল মাসের ৬ তারিখ শনিবার  বিকাল ৫টার সময় ১০ টাকা দান করল।  আল্লাহর অনুগ্রহে তার একটি মুসিবত দূর  হলো। আমরা বলতে পারি এই সাদাকার  ওসীলায় হয়ত আল্লাহ তাঁর মুসিবত দূর  করেছেন। কেননা সাদাকায় মুসিবত দূর হয়  বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস  থেকে আমরা পেয়েছি। এমন কয়েকবার  হলে সে বলতে পারে, অভিজ্ঞতার  আলোকে দেখা গেছে সাদাকায়  মুসিবত দূর হয়। কিন্তু এ  দানকারী লোকটি যদি বলে, অভিজ্ঞতার  আলোকে দেখা গেছে ১০ টাকা দান  করলে মুসিবত দূর হয় তাই সবাই দশ টাকা দান  করাকে আমল বানান। আরেকটু  এগিয়ে যদি বলে, শাওয়াল মাসে দশ  টাকা দান করলে মুসিবত দূর  হয়, আরো বাড়িয়ে যেমন, শাওয়াল  মাসের ৬ তারিখ দশ টাকা দান  করলে মুসিবত দূর হয়, আরেকটু  এগিয়ে যেমন, শাওয়াল মাসের ৬ তারিখ  শনিবার বিকাল ৫টার সময় ১০ টাকা দান  করলে মুসিবত দূর হয়। তাই সবাই  এভাবে আমল করুন। তাঁর এই  কথাগুলো একেবারে মুর্খ ছাড়া কেউ  গ্রহণ করবেন বলে জানি না। যদিও  সে তার আমলের ফলাফল  এভাবে পেয়েছে। কিন্তু তার এই  অনুভূতি রাসূলের শিক্ষা বিবর্জিত।  এতে শরীয়তের মূল শিক্ষা পরিবর্তন  হয়, তাই তার অনুভূতি কখনো গ্রহণ করা যায়  না বা অভিজ্ঞতার নাম দিয়ে এ ধরণের  আমল শুরু করা যায় না। এবার এর  আলোকে আমরা ‘খতমে ইউনুস’ নামের  খতমের কথাটি চিন্তা করি।  আশাকরি এসবের অসারতা বুঝতে আর  কারো কোনো দ্বিধা থাকবে না।  এতো হলো খতমের নামে রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  শিক্ষার পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তন  থেকেই খতমকে কেন্দ্র করে অন্যান্য  খারাবী ও নাজায়েযের সুচনা।  যে কোনো সুন্নাতকেই তার স্বাভাবিক  অবস্থা তথা রাসূল সাল্লাল্লাহু  ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলের  রূপরেখা থেকে সরিয়ে দিলে সুন্নাত  নিমজ্জিত হওয়ার  সাথে সাথে আরো অনেক নাজায়েয  যোগ হয়। যার  অনেকটা আমরা ইতোপূর্বে খতমে  কুরআনের শেষে উল্লেখ করেছি। অধিক  সংখ্যক পড়া নিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া  , খতম পাঠকারী হুজুর ও খতমের  আয়োজকের মাঝে সন্দেহ, মন কষাকষির  সৃষ্টি হওয়া, টাকার পরিমাণ  হিসেবে খতমের সংখ্যায় কমবেশ করা  , আলেমদের সাথে জাহেলের  বেয়াদবীমূলক আচরণ ইত্যাদি। টাকার  স্বার্থে বুঝে না বোঝার ভান  করে অনেক শ্রদ্ধাভাজন আলেমকে তাঁর  সম্মান বা নিজ অবস্থানের অনেক  নিচে নামতে দেখা যায়। আল্লাহ  আমাদের সবাইকে এ সব থেকে পরিত্রাণ  দান করুন এবং হুবহু রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরীক্বার উপর  চলার তওফিক দান করুন।  খতমে বুখারী  মুমিন ব্যক্তির জীবনে হাদীসের  গুরুত্ব অপরিসীম। হাদীস ছাড়া মুমিন তাঁর  ইসলামী জীবন কল্পনা করতে পারে না।  কুরআন হাদীস উভয় মিলেই তাঁর জীবন  পরিচালিত। তাই কুরআনের মতই হাদীস  শিক্ষা করা, হাদীস চর্চা করা মুমিনের  জন্য অপরিহার্য। প্রতিটি মুমিনের জন্য  জ্ঞান শিক্ষা করা ফরয। আর কুরআন ও  হাদীসই হচ্ছে মুসলিমের মূল জ্ঞান  ভাণ্ডার। এই হাদীস শিক্ষা, চর্চা, মুখস্থ  রাখা, সংরক্ষণ করা ও প্রচার  প্রসারে সাহাবায়ে কেরাম থেকে শুরু  করে উম্মতের একদল আলেম তাদের  জীবনের পুরো অংশটিই ব্যয়  করে দিয়েছেন। যাদের মেহনত, শ্রমের  বদৌলতে রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস  সঠিকভাবে আমাদের পর্যন্ত পৌছেছে।  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন,  ‏« ﻧﻀﺮ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻣﺮﺃ ﺳﻤﻊ ﻣﻨﺎ ﺣﺪﻳﺜﺎ ﻓﺤﻔﻈﻪ  ﺣﺘﻰ ﻳﺒﻠﻐﻪ ﻓﺮﺏ ﺣﺎﻣﻞ ﻓﻘﻪ ﺇﻟﻰ ﻣﻦ ﻫﻮ  ﺃﻓﻘﻪ ﻣﻨﻪ ﻭﺭﺏ ﺣﺎﻣﻞ ﻓﻘﻪ ﻟﻴﺲ ﺑﻔﻘﻴﻪ ‏».  ‏(ﺳﻨﻦ ﺃﺑﻲ ﺩﺍﻭﺩ، ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﻌﻠﻢ، ﺑﺎﺏ ﻓﻀﻞ  ﻧﺸﺮ ﺍﻟﻌﻠﻢ، ﺭﻗﻢ : 3662 ، ﺳﻨﻦ ﺍﻟﺘﺮﻣﺬﻱ،  ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﻌﻠﻢ ﻋﻦ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ  ﻭﺳﻠﻢ، ﺑﺎﺏ ﺍﻟﺤﺚ ﻋﻠﻰ ﺗﺒﻠﻴﻎ ﺍﻟﺴﻤﺎﻉ، ﺭﻗﻢ :  3656 ‏)  ‘‘আল্লাহ তাঁর  চেহারাকে উজ্জল করুন  যে আমার কাছ  থেকে কোনো হাদীস  শুনল, অতঃপর সে তা সংরক্ষন  করল, এমনকি তা অন্যের  কাছে পৌছাল। অনেক ফিক্বহ  (হাদীস) এর ধারক এমন রয়েছে  , সে যার কাছে পৌছায় সেই  ব্যক্তি তাঁর চেয়ে অধিক  ফক্বীহ। আর অনেক ফিক্বহের  ধারক নিজে ফক্বীহ নয়।’’ [72]  হাদীসটির মর্ম হচ্ছে, অনেক সময়  এমনও হয় যে, যার কাছে পৌছানো হয়  সে হাদীসের মর্ম বা ভাব  যিনি পৌছিয়েছেন তার  চেয়ে বেশি বুঝেন। আবার এমনও অনেক  রয়েছেন যিনি শুধুমাত্র হাদীসটি মুখস্থ  রাখতে পেরেছেন কিন্তু তার তাৎপর্য  উপলব্ধি করতে পারেন নি  , হতে পারে যার কাছে পৌছাবেন  তিনি এর তাৎপর্য  উপলব্ধি করতে পারবেন, তাই রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  হাদীসকে বেশি বেশি পৌছানো ও  প্রচারের দিকে উৎসাহিত করেছেন।  উলামায়ে কেরামের এই দল উক্ত  হাদীসের পুরোপুরি হক্ব আদায় করার  চেষ্টা করেছেন।  এদিকে নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় তাঁর  নামে মিথ্যা বানিয়ে বলার দু  একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা পাওয়া গেলেও  সাধারণত কেউই সে সময় তাঁর  নামে মিথ্যা কথা বলার সাহস পেত না।  কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর  মিথ্যা বানিয়ে বলা শুরু হয়।  মুনাফেক, ফাসেক্ব, স্বার্থান্বেষী  তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য রাসূলের  নামে মিথ্যা বানিয়ে বলত। রাসূল  সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন বলে সরলমনা মুসলিমদের  ধোকা দেওয়া সহজ ছিল। কিন্তু হাদীস  গ্রহণে সাহাবিদের সতর্কতা ও যাচাইয়ের  কারণে তা তাদের মধ্যে খুব প্রসার লাভ  করতে পারে নি। প্রখ্যাত  তাবিয়ী মুজাহিদ (রহ.) [73] বলেন:  “ﺟﺎﺀ ﺑﺸﻴﺮ ﺍﻟﻌﺪﻭﻯ ﺇﻟﻰ ﺍﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﻓﺠﻌﻞ  ﻳﺤﺪﺙ ﻭﻳﻘﻮﻝ ﻗﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ -ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ  ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ – ﻗﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ -ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ  ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ- ﻓﺠﻌﻞ ﺍﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﻻ ﻳﺄﺫﻥ  ﻟﺤﺪﻳﺜﻪ ﻭﻻ ﻳﻨﻈﺮ ﺇﻟﻴﻪ ﻓﻘﺎﻝ ﻳﺎ ﺍﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ  ﻣﺎ ﻟﻰ ﻻ ﺃﺭﺍﻙ ﺗﺴﻤﻊ ﻟﺤﺪﻳﺜﻰ ﺃﺣﺪﺛﻚ ﻋﻦ  ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ – ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ – ﻭﻻ  ﺗﺴﻤﻊ. ﻓﻘﺎﻝ ﺍﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﺇﻧﺎ ﻛﻨﺎ ﻣﺮﺓ ﺇﺫﺍ  ﺳﻤﻌﻨﺎ ﺭﺟﻼ ﻳﻘﻮﻝ ﻗﺎﻝ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ – ﺻﻠﻰ  ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ – ﺍﺑﺘﺪﺭﺗﻪ ﺃﺑﺼﺎﺭﻧﺎ ﻭﺃﺻﻐﻴﻨﺎ  ﺇﻟﻴﻪ ﺑﺂﺫﺍﻧﻨﺎ ﻓﻠﻤﺎ ﺭﻛﺐ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﺍﻟﺼﻌﺐ  ﻭﺍﻟﺬﻟﻮﻝ ﻟﻢ ﻧﺄﺧﺬ ﻣﻦ ﺍﻟﻨﺎﺱ ﺇﻻ ﻣﺎ ﻧﻌﺮﻑ .”  ‏(ﺻﺤﻴﺢ ﻣﺴﻠﻢ، ﻣﻘﺪﻣﺔ , ﺑﺎﺏ ﺍﻟﻨﻬﻲ ﻋﻦ  ﺍﻟﺮﻭﺍﻳﺔ ﻋﻦ ﺍﻟﻀﻌﻔﺎﺀ، 10-1 ‏)  ‘‘(তাবিয়ী) বুশাইর আল-  আদাবী ইবনে আব্বাসের (রা)  কাছে আগমন করেন  এবং হাদীস বলতে শুরু করেন।  তিনি বলতে থাকেন:  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন, রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন। কিন্তু ইবনে আব্বাস  (রা) তার দিকে কর্ণপাত  করলেন না। তখন বুশাইর বলেন:  হে ইবনু আব্বাস, আমার  কি হলো!  আমি আপনাকে আমার হাদীস  শুনতে দেখছি না  ? আমি আপনার  কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর  হাদীস বর্ণনা করছি, অথচ  আপনি কর্ণপাত করছেন  না!? তখন ইবনু আব্বাস (রা)  বলেন: একসময় ছিল যখন  আমরা যদি কাউকে বলতে  শুনতাম: ‘রাসুলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন’, তখনই আমাদের  দৃষ্টিগুলো তাদের দিকে আবদ্ধ  হয়ে যেত এবং আমরা পূর্ণ  মনোযোগ দিয়ে তাঁর  প্রতি কর্ণপাত করতাম। কিন্তু  যখন মানুষ খানাখন্দক ভালমন্দ সব  পথেই চলে গেল তখন  থেকে আমরা আর শুধুমাত্র  সুপরিচিত ও পরিজ্ঞাত বিষয়  ব্যতীত মানুষদের  থেকে কোনো কিছু গ্রহণ  করি না।’’ [74]  মুসলিম উম্মাহর  ভিতরে মিথ্যাবাদী হাদীস  বর্ণনাকারীর উদ্ভব  হবে বলে নবী আলাইহি  ওয়াসাল্লাম উম্মতকে এ  ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক করেন। তার  থেকে কিছু শুনেই যাচাই  ছাড়া নির্বিচারে গ্রহণ করা  , বর্ণনা করা থেকে উম্মতকে  সর্বোচ্চ সতর্ক ও সাবধান করে দেন।  মিথ্যা বা সন্দেহযুক্ত হাদীস  বর্ণনা করতে নিষেধ আরোপ করেন।  আবু হুরাইরা (রা.)  থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেনে:  ‏« ﺳَﻴَﻜُﻮﻥُ ﻓِﻰ ﺁﺧِﺮِ ﺃُﻣَّﺘِﻰ ﺃُﻧَﺎﺱٌ ﻳُﺤَﺪِّﺛُﻮﻧَﻜُﻢْ  ﻣَﺎ ﻟَﻢْ ﺗَﺴْﻤَﻌُﻮﺍ ﺃَﻧْﺘُﻢْ ﻭَﻻَ ﺁﺑَﺎﺅُﻛُﻢْ ﻓَﺈِﻳَّﺎﻛُﻢْ  ﻭَﺇِﻳَّﺎﻫُﻢْ ‏» ‏(ﺻﺤﻴﺢ ﻣﺴﻠﻢ، ﺍﻟﻤﺮﺟﻊ ﺍﻟﺴﺎﺑﻖ ‏)  ‘‘শেষ যুগে আমার উম্মতের কিছু  মানুষ তোমাদেরকে এমন সব  হাদীস বলবে যা তোমরা বা  তোমাদের পিতামহগণ  কখনো শুনেন নি। খবরদার!  তোমরা তাদের  থেকে সাবধান থাকবে  , তাদের  থেকে দূরে থাকবে।’’ [75]  আবু হুরাইরা (রা.)  থেকে আরেকটি হাদীসে বর্ণিত,  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:  ‏« ﻛﻔﻰ ﺑﺎﻟﻤﺮﺀ ﻛﺬﺑﺎ ﺃﻥ ﻳﺤﺪﺙ ﺑﻜﻞ ﻣﺎ ﺳﻤﻊ  ‏»  ‘‘একজন মানুষের  মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকু  যথেষ্ট যে, সে যা শুনবে তাই  বর্ণনা করবে।’’ [76]  এভাবে অগণিত  হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার থেকে হাদীস  গ্রহণের ক্ষেত্রে উম্মতকে সর্বোচ্চ সতর্ক  করেছেন।        একদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের সতর্কবাণী  , অপরদিকে জালিয়াতদের  জালিয়াতী উম্মতের এই শ্রেষ্ঠ  জাতি উলামাদল তথা মুহাদ্দিসীনের  শ্রমকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।  নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে বর্ণিত  অগণিত হাদীসের মধ্য হতে প্রকৃত  হাদীসটি  খোঁজে বের  করতে তাদেরকে অনেক শ্রম  দিতে হয়েছে। হাদীস মূলত কুরআনের  ব্যাখ্যা বা প্রজ্ঞা হিসেবে কুরআনের  মতই তার হেফাযত করতে আল্লাহ তা  ‘আলা এ ধরণের আলেমের এক ঝাঁক  তৈরী করে দেন। যারা তাদের  জীবনের সিংহভাগই হাদীস চর্চার  পিছনে ব্যয় করে রাসূলের প্রকৃত  বাণীটি উম্মতের  হাতে তুলে দিতে সক্ষম হন। আর একেই  আমরা সহীহ হাদীস বা বিশুদ্ধ হাদীস  বলে জানি।  উলামায়ে উম্মতের এই শ্রেণির  অন্যতম ছিলেন ইমাম বুখারী রাহ.। আরব  রীতি অনুযায়ী বংশধারা সহ তার  পুরো নাম হলো, মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল ইবন  ইবরাহীম ইবন মুগীরাহ ইবন বারদিযবাহ। তার  মূল নাম মুহাম্মদ। তিনি ১৯৪ হিজরীর  শাওয়াল মাসের ১৩ তারিখ রোজ শুক্রবার  (৮১০ খ্রিস্টাব্দ) খোরাসানের  বুখারা এলাকায়  (বর্তমানে উজবেকিস্তানের অংশ)  জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র ৯ বৎসর বয়সে কুরআন  মুখস্থ শেষ করেই ১০ বৎসর বয়স  থেকে হাদীস মুখস্থ, হাদীসের চর্চা  , হাদীস সংরক্ষণ করতে বিভিন্ন  মুহাদ্দিসের কাছে যাতায়াত শুরু করেন।  তার মেধা ছিল বর্ণনাতীত। তার মেধা  , হাদীস গ্রহণে সতর্কতার বিভিন্ন  ঘটনা কিতাবাদিতে উল্লেখ রয়েছে।  তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম কর্ম ‘সহীহুল  বুখারী’ নামে প্রসিদ্ধ হাদীসের এই  গ্রন্থটির রচনা বলে উল্লেখ করেছেন  উলামায়ে কেরাম। হাদীসের উপর পূর্ণ  পাণ্ডিত্য অর্জনের পর ২১৭  হিজরী সনে তার বয়স যখন ২৩, তখন  তিনি এই গ্রন্থটির রচনা শুরু করেন।  গ্রন্থটিতে শুধুমাত্র সহীহ হাদীসকেই  স্থান দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি দীর্ঘ ষোল  বছর সাধনার মধ্য দিয়ে ২৩৩  হিজরী সনে এর কাজ সমাপ্ত করেন।  রচনাকালে তিনি সর্বদা সওম পালন  করতেন এবং প্রতিটি হাদীস  লিখতে গোসল করে দু রাক‘আত সালাত  আদায় করতেন বলে জানা যায়। বিশুদ্ধতার  উপর নিশ্চিত হওয়ার আগে কোনো হাদীস  লিখতেন না। বর্ণনায় আরো জানা যায়  যে, তিনি বিশুদ্ধ থেকে বিশুদ্ধতম  হাদীসের সংকলনের ইচ্ছায় তার মুখস্থ  অনুমানিক ছয় লক্ষ হাদীস থেকে বাছাই  করে একেবারে সহীহ বা বিশুদ্ধ  হাদীসটিকেই এই গ্রন্থে স্থান দেন। এত  সংখ্যক হাদীস থেকে বিভিন্ন হাদীস  বারবার বর্ণনা সহকারে মাত্র ৭২৭৫  বা তার সামান্য কমবেশ [77] হাদীস তার  কিতাবে স্থান পেয়েছে। সহীহুল  বুখারী হিসেবে কিতাবটির নাম  সর্বজনের কাছে পরিচিত। তবে তার মূল  নাম হচ্ছে ‘আল-জামি‘উস্-সহীহ’ ।  ২৫৬ হিজরীর ১লা শাওয়াল, মোতাবেক  ৩১ আগষ্ট ৮৭০ খ্রিস্টাব্দ শুক্রবার দিবাগত  রাত্রে ৬২ বৎসর বয়সে এই মহান ব্যক্তিত্ব  মারা যান। [78]  উলামায়ে উম্মতের মূলধারার আলেম  তথা আহলুস্সুন্নাহ ওয়াল জামাতের  আলেমদেরকে সর্বদা সহীহ হাদীসকেই  গ্রহণ করতে এবং অন্যান্য ভেজালযুক্ত  হাদীসকে চিহ্নিত করে প্রত্যাখ্যান  করতে দেখা গেছে। জানা অবস্থায়  কেউই সহীহ হাদীস ছাড়া অন্য  কোনো হাদীস গ্রহণ করতেন না। সহীহ  হাদীস ছাড়া শরীয়তের বিষয়াদি প্রমাণ  করতেন না। ইমাম বুখারী তাঁর এই রচনায়  সহীহ গ্রহণের প্রচেষ্টায় পূর্