প্রচলিত বিভিন্ন খতম : তাৎপর্য. পর্যালোচনা (প্রথম পর্ব)


প্রচলিত বিভিন্ন খতম: তাৎপর্য ও  পর্যালোচনা (১ম পর্ব)  সূচিপত্র  বিষয়  ভূমিকা  সুন্নাতের পরিচয় ও গুরুত্ব  সুন্নাতের পরিচয়  সুন্নাতের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব  বিদআতের পরিচয় ও পরিণাম:  বিদআতের সংজ্ঞা  বিদআতের পরিণাম  খতম শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ  খতমে কুরআন  খতমে ইউনুস  খতমে বুখারী  খতমে না-রী  খতমে ইয়াসিন  খতমে শিফা  খতমে তাহলিল  খতমে তাসমিয়াহ  খতমে খাজেগান  খতমে জালালী  খতমে দুরুদে মাহি  ইখলাস দ্বারা কুরআন খতম  অভিজ্ঞতা বনাম ধর্মীয় বিশ্বাস  পরিশেষ  গ্রন্থপঞ্জি তালিকা  প্রচলিত বিভিন্ন খতম: তাৎপর্য ও  পর্যালোচনা  ভূমিকা  সমস্ত প্রশংসা মহান রাব্বুল  আলামিনের, যিনি আমাদেরকে তাঁর  শ্রেষ্ঠ মাখলুক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।  অতঃপর তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মুহাম্মদ r এর  উম্মত বানিয়েছেন। দিয়েছেন সর্বশ্রেষ্ঠ  চিরস্থায়ী কিতাব আল-কুরআন। এ দুইয়ের  মাধ্যমে আমাদেরকে সর্বদা ও সর্বত্র  কার্যকর বিধানের ধারক বাহক  বানিয়েছেন। আমাদের উপর মহান  আল্লাহর এসব নেয়ামত অপরিসীম। এক  নবীর পর যখন আরেক নবী নতুন দীন  নিয়ে আসেন, এক কিতাবের পর যখন  আরেক কিতাব নতুন কিছু বিধান  নিয়ে অবতীর্ন হয়, তখন স্বভাবত উম্মতের  মধ্যেই দুই  শ্রেণি হয়ে যেতে দেখে যায়। এক  শ্রেণি নতুন নবীর উপর ঈমান আনেন,  ফলে তারা মুমিনই থাকেন। আরেক  শ্রেণি নতুন নবীকে মিথ্যুক আখ্যায়িত  করে বেঈমান বা কাফের হয়ে যায়।  আল্লাহর কৃপায় সর্বশেষ নবীর উম্মত হওয়ার  সৌভাগ্যে আমরা এমন পরীক্ষামুক্ত।  না নতুন নবী আসবেন, না কোনো নতুন  বিধান আসবে। নতুন কোনো দীন  বা পদ্ধতির অনুসরণ করব কি করব না এই  ঝামেলায় আমাদেরকে কখনো পড়তে হয়  না। যে নবীর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর  দীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন সেই  নবীর উম্মত হতে পারা কতই বড়  সোভাগ্যের কথা তা পূর্বের উম্মতের  ইতিহাস নিয়ে একটু চিন্তা করলেই  বুঝে আসবে। তাই আল্লাহ  আমাদেরকে এই বড় নেয়ামত প্রদানের  জন্য আবারো তাঁর শুকরিয়া আদায় করছি।  রাসূল r এর দীন, তাঁর তরিক্বা, তাঁর  আদর্শ প্রচারে সাহাবায়ে কেরাম  থেকে নিয়ে যুগে যুগে একশ্রেণি  তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।  ফলে ইবাদত সংক্রান্ত  যেকোনো খুটিনাটি বিষয়ে রাসূল r এর  আদর্শ আমাদের মাঝে বিদ্যমান। এখন  আমাদের দায়িত্ব শুধুমাত্র তাঁর  রেখে যাওয়া দীনের অনুসরণ। দীন  পালনে তাঁর পদ্ধতির অনুসরণ। সালাত,  যাকাত, সওম, হজ্জ, তেলাওয়াত দো‘আ,  দুরূদ, যিকর সর্বক্ষেত্রে তাঁর  রেখে যাওয়া পদ্ধতির অনুসরণ অনূকরণই  একজন মুমিনের কর্তব্য। এমন কোনো ইবাদত  বা নেক আমল নেই যেখানে তাঁর আদর্শ  নেই। ইবাদত সংক্রান্ত সব বিষয় বিবেক  কর্তৃক নির্ধারণের উর্ধ্বের বিষয়,  যা একমাত্র ওহীর মাধ্যমেই জানা যায়,  জ্ঞানের শেষ সীমা থেকেই ওহীর  সুচনা, সুতরাং তাঁর আদর্শ, পদ্ধতি, উদ্দেশ্য  যেখানে নেই তা ইবাদত বা নেক আমল  বলে গণ্য হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।  অনেক দিন থেকেই মনে প্রশ্ন ছিল যে,  কুরআন তেলাওয়াত একটি নেক আমল,  হাদীস চর্চা একটি নেক আমল। অনুরূপ দো  ‘আ, দুরূদ, যিকর সবই নেক আমল। তাই এগুলোর  মাঝে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন,  বিয়োজন করা, অথবা এগুলোকে রাসূল r  এর উদ্দেশ্য বর্জিত অর্থাৎ  তিনি এগুলোকে যে উদ্দেশ্যে করেন  নি সে উদ্দেশ্যে করার সুযোগ  থাকে কীভাবে? আমাদের সমাজের  প্রচলিত ‘খতম’ কি এর ব্যতিক্রম? খতমের  নামে রাসূল r এর সুন্নাত পদ্ধতির ব্যত্যয়  ঘটানো,  তিনি যে উদ্দেশ্যে এগুলো করেন  নি তা করা কতটুকু সিদ্ধ? আল-হামদু  লিল্লাহ, দেখা যায় অনেক প্রজ্ঞাবান  আলেম যারা যুক্তির উর্ধ্বে রাসূল r এর  সুন্নাতকে স্থান দেন, পূর্ণাঙ্গ সুন্নাতের  অনুসরণের সর্বদা চেষ্টা করেন, তারা সব  সময়ই এসবের বিরোধিতা করে আসছেন।  বাংলাদেশে এদের মাঝে অন্যতম  বিশিষ্ট মুফতি, সবার কাছেই যার  সুন্নাতের পাবন্দির কথা প্রসিদ্ধ,  মুফতি ফয়জুল্লাহ রাহ.-আল্লাহ  তাকে মাগফেরাত ও রাহমাত  দিয়ে ঢেকে নিন- তিনি সর্বদা এসবের  কঠোর বিরোধিতা করতেন। তাঁর রচিত  কাব্যের কিতাব ‘পান্দে নামাহ খাকী  ’তে প্রচলিত খতম সম্পর্কে একটি পাঠ  লিখেছেন, যাতে সর্বপ্রকার খতম বিদ‘আত  ও সুন্নাহ বহির্ভূত আখ্যা দিয়ে এসব  বিদ‘আত কুসংস্কার পরিহার  করে সুন্নাতকে আকড়ে ধরার নসীহত  করেছেন।[1] তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা  ‘হামিউস্-সুন্নাহ’ মেখল, চট্টগ্রামে অধ্যয়ন  থেকেই মূলত সুন্নাত এবং সুন্নাতের ধারক  আলেমদের প্রতি মহব্বত এবং বিদ‘আতের  প্রতি ঘৃণা জন্ম নেয়।  আসাতিযায়ে কেরাম সব সময় তাঁর  একটি মূল্যবান নসীহত শুনাতেন।  নসীহতটি ছিল,  ” ﻧﯿﺴﺖ ﺣﺠﺖ ﻗﻮﻝ ﻭ ﻓﻌﻞ ﮬﯿﭻ ﭘﯿﺮ * ﻗﻮﻝ ﺣﻖ ﮔﻮ ﻓﻌﻞ  ﺍﺣﻤﺪ ﺭﺍ ﺑﮕﯿﺮ ”  ‘‘কোন পীরের কথা ও কর্ম দলীল  নয় * হক্ব বল, আহমদ এর কর্মকে ধর।’’  যদিও শয়তানের ধোঁকায়  বা না জেনে অনেক সময় সুন্নাত  বিরোধি বিদআতি কর্মে লিপ্ত হয়ে যাই।  আল্লাহর কাছে তার  জন্যে সর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করি।  সুন্নাহ বহির্ভূত এসব খতম পদ্ধতির  প্রতি অনীহা থাকা সত্বেও অনেক সময়  ঈমানী দুর্বলতা বা পরিবেশ  পরিস্থিতিতে নিজেকে এসবের  মধ্যে জড়িয়েছি। জড়িয়ে থাকার  কারণে এসবের আরো অনেক না-জায়েয  দিক সামনে আসলে দিন দিন এগুলোর  প্রতি আরো বেশি অনীহা ও সাধারণ  জনগণের অজ্ঞতার উপর আফসোস জন্ম  নেয়। সহজভাবে সুন্নাহর পদ্ধতিতে নেক  আমল পালন  করা ছেড়ে দিয়ে অযথা এসবে লিপ্ত  হয়ে নিজের সময়, টাকা পয়সা কেন ব্যয়  করি? এতে আমার কী লাভ? আমার  অজ্ঞতার কারণে এক গোত্রের  দুনিয়াবী কিছু স্বার্থ অর্জন হচ্ছে, এই যা।  এই কি আমার চাওয়া পাওয়া?  একে কি আমি একবারও নবীর সুন্নাতের  সাথে মিলিয়ে দেখেছি? আমাদের  এসব কর্ম কতটুকু গ্রহণযোগ্য এই  কথাটি উপলব্ধি করার জন্য এ বিষয়ে কিছু  লিখার ইচ্ছা দীর্ঘ দিন থেকে লালন  করে আসছিলাম। সর্বশেষ মহান আল্লাহর  ইচ্ছায় এই ক্ষুদ্র রচনাটি লিখতে সক্ষম  হয়েছি। এতে যা কিছু ভাল সবই আল্লাহর  পক্ষ থেকে, আর যা মন্দ সব আমি অধমের।  এতে কিছু মানুষের উপকার হলে এটাই  আমার স্বার্থকতা। এ বিষয়ে সামান্য  হলেও আলোচনা করতে পারায়  আবারো আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।  হাদীসে রয়েছে :  ‘‘যে ব্যক্তি মানুষের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন  করেনি সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন  করেনি।’’ [2] তাই সর্বপ্রথম আমার পিতার  জন্য দো‘আ করি, আল্লাহ যেন  তাকে মাগফিরাত ও রাহমাত  দ্বারা বেষ্টন করে নেন। যার সর্বাত্মক  চেষ্টার ফলেই হয়ত আল্লাহ তাঁর  রহমতে দ্বীনি ইলমের  সাথে নিজেকে সংশ্লিষ্ট রাখার  তওফিক্ব দিয়েছেন। যিনি দীর্ঘ দিন  সরকারী মাদ্রাসায় হাদীসের খেদমাত  করলেও আমাকে শুধু এজন্য কওমি মাদ্রাসায়  পড়িয়েছেন যাতে করে আমার  মাঝে ইলমি দক্ষতা ও সুন্নাতের  পাবন্দি এই দুটি জিনিস অর্জিত হয়।  জানি না তাঁর এ আশা কতটুকু কার্যকর  হয়েছে। আজ তিনি জীবিত থাকলে এই  ক্ষুদ্র মেহনতটি দেখলে হয়ত অত্যন্ত  খুশি হতেন। আল্লাহ যেন এই খেদমাতটুকু  ক্ববুল করেন। ক্ববুল হলে হাদীসের ভাষায়  তিনি অবশ্যই এর ছওয়াবের অংশ পাবেন।  এরপর শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি আমার সকল  উস্তাদদের যাদের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের  ফলেই আমার মাঝে যেটুকুই হোক ইলমের  বীজ বপন হয়েছে। তাদের  ইলমি অনুদানের সাথে সাথে বিভিন্ন  জনের আরো বিভিন্ন ধরণের অনুদান  রয়েছে, ছোট পরিসরে বিস্তারিত  আলোচনার অবকাশ নেই। এক কথায়  জীবিত সবার কৃতজ্ঞতা, দীর্ঘ বরকতময়  হায়াত কামনা এবং মৃতদের জন্য রাহমাত ও  মাগফিরাতের দো‘আ করছি।  একজনের নাম নিলেই আরেকজনের  অবমূল্যায়ন নয়, এর আলোকে যার নাম  উল্লেখ না করে পারছি না, তিনি হলেন  আমার উস্তায মুহতারাম মুফতি আবুল কালাম  যাকারিয়া। যার ইলমি সহ বিভিন্ন অনুদান  আমার রক্তের প্রতিটি কণায় কণায়। তাঁর  ঋন পরিশোধ করা আমার পক্ষে কখনোই  সম্ভব নয়। দ্বীনি ইলমের কিঞ্চিত  যা কিছুই অর্জন করেছি তার সিংহভাগই  মূলত তাঁর সাথে দীর্ঘ দিনের সুহবতের  ফসল বলে মনে করি। হক্ব বোঝার পর  কারো দোহাই দিয়ে এক ইঞ্চি না সরার  চেষ্টা মূলত তাঁরই দীক্ষা। আরো কিছু  লিখার ইচ্ছা থাকলেও এ  কথাগুলো লিখতেই চক্ষু ছলছল করায় আর  লিখতে পারছি না। আশাকরি তিনি আমার  এই ক্ষুদ্র রচনা দেখে আনন্দিত হবেন  এবং এটিকে আমার মাঝে তাঁর নিজের  দীক্ষার প্রকাশ মনে করে আমার জন্য দো  ‘আ করবেন। দো‘আ করি আল্লাহ তাঁর  হায়াতকে বরকতময় করে তুলুন।  জাতিকে তাঁর থেকে উপকৃত হওয়ার  ধারাবাহিকতা দীর্ঘ করে দিন।  রচনাটি লিখার  ক্ষেত্রে আরো যারা উৎসাহ  উদ্দীপনা দিয়ে সাহস দিয়েছেন তাদের  সবার শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। বিশেষ  করে মাওলানা আব্দুল্লাহ মানসুর ও আমার  অত্যন্ত স্নেহভাজন ছাত্র হাফেজ  মাওলানা ইয়াহ্ইয়া রচনাটির প্রুফ দেখার  কষ্ট বরণ করায় তাদেরকে অসংখ্য  ধন্যবাদের সাথে সাথে তাদের  কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। আল্লাহ  তাদেরকে জাযায়ে খাইর দান করুন।  রচনাটি লিখতে হাদীসের  ক্ষেত্রে একমাত্র সহীহ হাদীসের  উপরেই নির্ভর করা হয়েছে। দু-  একটি হাসান পর্যায়ের হাদীস উল্লেখ  করা হয়েছে যা মুহাদ্দিসীনে কেরামের  নিকট গ্রহণযোগ্য। দ‘য়িফ বা দুর্বল  কোনো হাদীসের উপর নির্ভর করা হয় নি  ।  নির্ভুল তথ্য প্রদানের লক্ষে,  প্রতিটি হাদীস, অন্যান্য তথ্য,  কারো উদ্ধৃতির উপর নির্ভর না করে মূল  কিতাব দেখে সেখান  থেকে বর্ণনা করা হয়েছে।  সাথে সাথে প্রতিটি হাদীসের অধ্যায়,  অনুচ্ছেদ উল্লেখ করার  চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে মুদ্রনের  কমবেশের কারণে হাদীস বা অন্যান্য তথ্য  অনুসন্ধান করে বের করতে বেগ  পেতে না হয়।  হাদীস সহ অন্যান্য তথ্যসূত্র  টিকা আকারে বাংলায় উল্লেখের  সাথে সাথে আলেমগণের  সুবিধার্থে মূল মতনের  পাশাপাশি আরবীতে তা উল্লেখ  করা হয়েছে।  প্রতিটি তথ্যসূত্র উল্লেখের  পাশাপাশি সাধ্যানূযায়ী বর্ণিত  কিতাবের লিখকের নাম, তাঁর জন্ম-মৃত্যু  বা শুধু মৃত্যু সন মূল বইয়ে অথবা টিকায়  উল্লেখ করার চেষ্টা করা হয়েছে।  যাতে তাঁর যুগ দেখে আসলাফিয়্যাত  তথা সিনিয়ারিটির মূল্যায়ণ করা হয়।  হাদীসের বর্ণনায় বিষয়বস্তু এক  থাকা সত্বেও অনেক সময় শব্দের সামান্য  ব্যতিক্রম থাকে। তাই অনেক হাদীস  একাধিক কিতাবে থাকা সত্বেও একাধিক  কিতাবের উদ্ধৃতি দেওয়া হয় নি।  বরং যে হাদীসটি উল্লেখ  করা হয়েছে তা হাদীসের  যে কিতাবে হুবহু রয়েছে শুধুমাত্র সেই  কিতাবের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।  নিজের ইলমি ও ভাষাগত  দুর্বলতা থাকা সত্বেও এ বিষয়ে রচনার  কাজে হাত দেওয়ার সাহস যোগার কারণ  পাঠকগণ আশাকরি বুঝতে পেরেছেন। ভুল  হতে পারে এই আশায় কোনো কিছু  না লিখলে আজ  পৃথিবীতে কোনো রচনাই থাকত না।  ভুলের উর্ধ্বে থাকার মু‘জিযা একমাত্র  আল্লাহর কালামের। ‘মানুষ মাত্রই ভুল’ এই  প্রবাদ যিনি বিশ্বাস করেন, তিনি ভুলের  সমালোচনা করেন না। নবীগণ  ছাড়া কেউই যেখানে ভুলের উর্ধ্বে নয়,  সেখানে আমার মত দুর্বলের  কথা কী হতে পারে। তাই ভুল থাকবেই।  আপনার কাজ হচ্ছে ‘‘দীন উপদেশের নাম’’  হিসেবে বাস্তব ভুলের সংশোধনের পথ  খোঁজা। যথাসাধ্য বিশুদ্ধ কথা লিখার  চেষ্টা করেছি, তবুও ভুল হওয়াই  স্বাভাবিক। তাই যে কোনো ইলমি,  ভাষাগত, তথ্যগত ভুল কারো দৃষ্টিগোচর  হলে আমাকে অবগত করা আপনার  ইলমি আমানত মনে করবেন। আপনার সঠিক  পরামর্শ শ্রদ্ধার সাথে সাদরে গ্রহণ  করে পরবর্তী সংস্করণে তা সংশোধনের  চেষ্টা করা হবে। ইনশা-আল্লাহ।  বিনীত: মোস্তফা সোহেল হিলালী  সুন্নাতের পরিচয় ও গুরুত্ব  সুন্নাতের পরিচয় ও গুরুত্ব অনেক  জরুরী ও দীর্ঘ বিষয়। শরয়ী বিধানের  দ্বিতীয় উৎস এই সুন্নাত, তাই তা অনেক  দীর্ঘ হওয়ার কথা। উলামায়ে কেরাম এ  বিষয়ের উপর অনেক কিতাব  রচনা করেছেন। [3] আমাদের মূল  আলোচনা সুন্নাত বা বিদ‘আত নিয়ে নয়।  তাই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করার  কথা নয়। তথাপি প্রচলিত বিভিন্ন খতম  যা আমাদের মূল আলোচনার বিষয়  তা বুঝতে সুন্নাত ও বিদ‘আত বোঝার  বিকল্প নেই। তাই অত্যন্ত  সংক্ষেপে দুটি বিষয়েই একেবারেই  সামান্য আলোচনার চেষ্টা করব  ইনশা আল্লাহ। যাতে করে খতমের তাৎপর্য  বুঝা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়। বাস্তব  কথা হলো, যিনি প্রকৃতপক্ষ সুন্নাত ও  বিদ‘আত চিনে নিয়েছেন তার  কাছে প্রচলিত খতমের তাৎপর্য  আলোচনা করে বোঝাবার প্রয়োজন  নেই। যাই হোক, অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত  আলোচনার মাধ্যমে সুন্নাত ও বিদ‘আত  দুটি বিষয়কে একটু বোঝার চেষ্টা করব  ইনশাআল্লাহ। আল্লাহর তওফিক কাম্য।  সুন্নাতের পরিচয়  সুন্নাত শব্দের শাব্দিক বা আভিধানিক  অর্থ: ছবি, প্রতিচ্ছবি, প্রকৃতি, জীবন পদ্ধতি,  কর্মধারা, রীতি, আদর্শ ইত্যাদি। [4]  শরয়ী পারিভাষিক অর্থ উল্লেখ  করতে ইবনু মানযুর [5] লিখেন:  ” ﻭﺇﺫﺍ ﺃﻃﻠﻘﺖ ﻓﻲ ﺍﻟﺸﺮﻉ ﻓﺈﻧﻤﺎ ﻳﺮﺍﺩ ﺑﻬﺎ ﻣﺎ  ﺃﻣﺮ ﺑﻪ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻭﻧﻬﻰ  ﻋﻨﻪ ﻭﻧﺪﺏ ﺇﻟﻴﻪ ﻗﻮﻻ ﻭﻓﻌﻼ ﻣﻤﺎ ﻟﻢ ﻳﻨﻄﻖ ﺑﻪ  ﺍﻟﻜﺘﺎﺏ ﺍﻟﻌﺰﻳﺰ ﻭﻟﻬﺬﺍ ﻳﻘﺎﻝ ﻓﻲ ﺃﺩﻟﺔ ﺍﻟﺸﺮﻉ  ﺍﻟﻜﺘﺎﺏ ﻭﺍﻟﺴﻨﺔ ﺃﻱ ﺍﻟﻘﺮﺁﻥ ﻭﺍﻟﺤﺪﻳﺚ.”  ‘‘তবে যখন শরীয়তে সুন্নাত  শব্দটি প্রয়োগ করা হয় তখন এর  দ্বারা উদ্দেশ্য হয়,  নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সব  বিষয়ের আদেশ করেছেন,  যে সব থেকে নিষেধ  করেছেন, কথা ও কর্মের  মাধ্যমে যে দিকে আহ্বান  করেছেন, যা সম্মানিত কিতাব  কুরআনে বলা হয় নি। এ জন্যই  বলা হয়, শরীয়তের দলীল  কিতাব ও সুন্নাত। অর্থাৎ  হাদীস এবং কুরআন’’ [6]  উসূলে ফিকহের  কিতাবাদিতে সুন্নাতের  সংজ্ঞায় বলা হয়েছে:  ” ﺍﻟﺴﻨﺔ ﻓﻲ ﺍﺻﻄﻼﺡ ﺍﻷﺻﻮﻟﻴﻴﻦ ﻫﻲ “ﻣﺎ  ﺻﺪﺭ ﻋﻦ ﺍﻟﻨﺒﻲ – ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ –  ﻏﻴﺮ ﺍﻟﻘﺮﺁﻥ” ﻭﻫﺬﺍ ﻳﺸﻤﻞ : ﻗﻮﻟﻪ -: ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ  ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ- ، ﻭﻓﻌﻠﻪ، ﻭﺗﻘﺮﻳﺮﻩ، ﻭﻛﺘﺎﺑﺘﻪ،  ﻭﺇﺷﺎﺭﺗﻪ، ﻭﻫﻤﻪ، ﻭﺗﺮﻛﻪ .”) ﻣﻌﺎﻟﻢ ﺍﺻﻮﻝ  ﺍﻟﻔﻘﺔ ﻋﻨﺪ ﺍﻫﻞ ﺍﻟﺴﻨﺔ ﻭﺍﻟﺠﻤﺎﻋﺔ 118-1 ‏)  ‘‘উসূলীদের পরিভাষায় সুন্নাত  হচ্ছে, ‘‘কুরআন ছাড়া যা কিছুই  নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম  থেকে প্রকাশ পেয়েছে’’ এই  সংজ্ঞায় নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা,  কর্ম, স্বীকৃতি, লিখা, ইঙ্গিত,  প্রতিজ্ঞা ও বর্জন সুন্নাতের  অন্তর্ভুক্ত।’’ [7]  আল্লামা শাওকানী[8] রাহ.  সুন্নাতের  সংজ্ঞাটি যেভাবে বর্ণনা করেন:  ” ﻭﺃﻣﺎ ﻣﻌﻨﺎﻫﺎ ﺷﺮﻋًﺎ: ﺃﻱ: ﻓﻲ ﺍﺻﻄﻼﺡ ﺃﻫﻞ  ﺍﻟﺸﺮﻉ ﻓﻬﻲ: ﻗﻮﻝ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻪِ  ﻭَﺳَﻠَّﻢَ ﻭﻓﻌﻠﻪ ﻭﺗﻘﺮﻳﺮﻩ، ﻭﺗﻄﻠﻖ ﺑﺎﻟﻤﻌﻨﻰ ﺍﻟﻌﺎﻡ  ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻮﺍﺟﺐ ﻭﻏﻴﺮﻩ ﻓﻲ ﻋﺮﻑ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﻠﻐﺔ  ﻭﺍﻟﺤﺪﻳﺚ، ﻭﺃﻣﺎ ﻓﻲ ﻋﺮﻑ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﻔﻘﻪ ﻓﺈﻧﻤﺎ  ﻳﻄﻠﻘﻮﻧﻬﺎ ﻋﻠﻰ ﻣﺎ ﻟﻴﺲ ﺑﻮﺍﺟﺐ، ﻭﺗﻄﻠﻖ ﻋﻠﻰ  ﻣﺎ ﻳﻘﺎﺑﻞ ﺍﻟﺒﺪﻋﺔ ﻛﻘﻮﻟﻬﻢ: ﻓﻼﻥ ﻣﻦ ﺃﻫﻞ  ﺍﻟﺴﻨﺔ .” ‏(ﺍﺭﺷﺎﺩ ﺍﻟﻔﺤﻮﻝ ﺍﻟﻰ ﺗﺤﻘﻴﻖ ﺍﻟﺤﻖ  ﻣﻦ ﻋﻠﻢ ﺍﻻﺻﻮﻝ ، ﺍﻟﻔﺼﻞ ﺍﻻﻭﻝ، ﻓﻲ ﻣﻌﻨﻰ  ﺍﻟﺴﻨﺔ ﻟﻐﺔ ﻭﺷﺮﻋﺎ 95-1 ‏)  ‘‘শরয়ী পরিভাষায় সুন্নাতের  অর্থ, অর্থাৎ শরীয়তবিদদের  পরিভাষায় সুন্নাত হচ্ছে:  নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা,  কাজ ও সমর্থন। ভাষাবিদ ও  হাদীস বিশারদদের নিকট  ব্যাপক অর্থে তা ওয়াজিব  এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর  প্রয়োগ করা হয়।  তবে ফিক্ব্হবিদদের পরিভাষায়  তারা ওয়াজিব নয় এমন বিষয়ের  উপর সুন্নাতের প্রয়োগ  করে থাকেন। এর  বিপরীতে বিদ‘আত  শব্দটি ব্যবহার হয়, যেমন বলা হয়:  অমুক আহলুস্-সুন্নাহ।’’ [9]  উপরের  সংজ্ঞা থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি  যে, ফিক্বহের পরিভাষায় সুন্নাতের  একটি অর্থ, ফরয এবং ওয়াজিব ব্যতীত  অন্যান্য আমল।  তবে সুন্নাতের মৌলিক অর্থ, রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  সার্বিক জীবন আদর্শ। ফরয, ওয়াজিব ও নফল  সবকিছুর উপর সুন্নাতের ব্যবহার  হাদীসে প্রসিদ্ধ।  মোটকথা, রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন আদর্শই  দীন। জীবনাদর্শের বিভিন্ন দিকের  গুরুত্বের তারতম্য থেকে বা রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  কথা থেকে ফরয, ওয়াজিব, নফল  ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে।  ইবাদতের মধ্যে সুন্নাতের ব্যতিক্রম  মানেই দীনের মধ্যে তাহরিফ  বা পরিবর্তন। দীনকে আল্লাহ তা  ‘আলা পরিপূর্ণ করার ঘোষণা[10] এবং রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  জীবনাদর্শই সর্বোচ্চ আদর্শ বলে ঘোষণা  [11] দিয়ে দিয়েছেন। তাই  কোনো ধরণের কম-বেশি, যোগ-বিয়োগ  করার সুযোগ নেই। নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন যে ইবাদত  যেভাবে করেছেন তা তখন  সেভাবে করতে হবে। এর ব্যতিক্রম  করলে তা খেলাফে সুন্নাত বলে অগ্রাহ্য  হবে।  সুন্নাতের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব  নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের  জীবনাদর্শকে পূর্ণাঙ্গরূপে মেনে  নেওয়াই একজন মুমিনের কর্তব্য। তার  জীবনাদর্শের বাইরে যাওয়ার  চিন্তা করা মুমিন কল্পনা করতে পারেন  না। সুন্নাতের  বাইরে যাওয়াকে তিনি তার  আখিরাতের ঝুঁকি মনে করেন। মুমিন  জায়েয না-জায়েযের বাহাসে লিপ্ত  না হয়ে হুবহু নবীর আদর্শের উপর  থাকাকেই কর্তব্য মনে করেন।  নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস  তাকে এক সুঁতো পরিমাণ  বাইরে যেতে দেয় না। কদাচিৎ এমন  হয়ে গেলে তিনি আল্লাহর  কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  এরশাদ করেন:  ‏«ﻣﺎ ﻣﻦ ﻧﺒﻰ ﺑﻌﺜﻪ ﺍﻟﻠﻪ ﻓﻰ ﺃﻣﺔ ﻗﺒﻠﻰ ﺇﻻ ﻛﺎﻥ  ﻟﻪ ﻣﻦ ﺃﻣﺘﻪ ﺣﻮﺍﺭﻳﻮﻥ ﻭﺃﺻﺤﺎﺏ ﻳﺄﺧﺬﻭﻥ  ﺑﺴﻨﺘﻪ ﻭﻳﻘﺘﺪﻭﻥ ﺑﺄﻣﺮﻩ ﺛﻢ ﺇﻧﻬﺎ ﺗﺨﻠﻒ ﻣﻦ  ﺑﻌﺪﻫﻢ ﺧﻠﻮﻑ ﻳﻘﻮﻟﻮﻥ ﻣﺎ ﻻ ﻳﻔﻌﻠﻮﻥ  ﻭﻳﻔﻌﻠﻮﻥ ﻣﺎ ﻻ ﻳﺆﻣﺮﻭﻥ ﻓﻤﻦ ﺟﺎﻫﺪﻫﻢ ﺑﻴﺪﻩ  ﻓﻬﻮ ﻣﺆﻣﻦ ﻭﻣﻦ ﺟﺎﻫﺪﻫﻢ ﺑﻠﺴﺎﻧﻪ ﻓﻬﻮ ﻣﺆﻣﻦ  ﻭﻣﻦ ﺟﺎﻫﺪﻫﻢ ﺑﻘﻠﺒﻪ ﻓﻬﻮ ﻣﺆﻣﻦ ﻭﻟﻴﺲ ﻭﺭﺍﺀ  ﺫﻟﻚ ﻣﻦ ﺍﻹﻳﻤﺎﻥ ﺣﺒﺔ ﺧﺮﺩﻝ ‏». )ﺻﺤﻴﺢ  ﻣﺴﻠﻢ، ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻻﻳﻤﺎﻥ، ﺑﺎﺏ ﻛﻮﻥ ﺍﻟﻨﻬﻲ ﻋﻦ  ﺍﻟﻤﻨﻜﺮ ﻣﻦ ﺍﻻﻳﻤﺎﻥ … ، ﺭﻗﻢ 188: ‏)  ‘‘আল্লাহ তা‘আলা আমার  পূর্বে যখনই কোনো জাতির  মাঝে নবী প্রেরণ করেছেন  তখনই উম্মাতের মধ্যে তার এমন  হাওয়ারী ও সাথী দিয়েছেন,  যারা তাঁর আদর্শ অনুসরণ  করে চলতেন, তার নির্দেশ  অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন।  অনন্তর তাদের পরে এমনসব  লোক তাদের স্থলাভিষিক্ত  হয়েছে,  যারা মুখে যা বলে বেড়াত  কাজে তা পরিণত করত না, আর  সেসব কর্ম সম্পাদন করত  যেগুলোর জন্য তারা আদিষ্ট  ছিল না। এদের  বিরুদ্ধে যারা হাত  দ্বারা জিহাদ  করবে তারা মুমিন, যারা এদের  বিরুদ্ধে মুখের  কথা দ্বারা জিহাদ  করবে তারাও মুমিন  এবং যারা এদের  বিরুদ্ধে অন্তরের  ঘৃণা দ্বারা জিহাদ  করবে তারাও মুমিন। এর  বাইরে সরিষার দানা পরিমানও  ঈমান নেই।’’ [12]  সাহাবায়ে কেরাম, তাবিঈন,  তাব‘য়ি তাবিঈন, অনুসৃত চার ইমাম সহ  কল্যাণের সাক্ষ্যপ্রাপ্ত যুগের আলেমগণ  উপরোক্ত হাদীসের যথাযথ  মর্যাদা রক্ষা করেছেন। আল্লাহ তাঁর দীন  তথা নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদর্শ রক্ষা করার  জন্যই নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন নায়েব  তৈরী করেছেন। যুক্তি বা বিবেক  দ্বারা দীনের মধ্যে নতুন কিছুর সংযোজন,  ইবাদতে নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার ইত্যাদির  বিরুদ্ধে সজাগ  থেকে সর্বদা নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত সংরক্ষন  করার চেষ্টা করেছেন এবং সক্ষম  হয়েছেন। সুন্নাতের  বাইরে যাওয়া মানেই ভ্রান্তির পথ  উম্মুক্ত করা এ কথা বুঝতে তাদেরকে বেগ  পেতে হয় নি। সর্বযুগেই আল্লাহ তা  ‘আলা এমন একদল লোকের মাধ্যমে তার  নবীর সুন্নাতকে রক্ষা করবেন যারা নবীর  হুবহু সুন্নাতের উপর থাকার চেষ্টা করবেন।  সুন্নাতের বাইরে কিছু দেখলেই যথাসাধ্য  তা প্রতিহত করার চেষ্টা করবেন। আল্লাহ  তা‘আলা আমাদেরকে এই দল বা তাদের  সহযোগী হিসেবে কবুল করুন।  শাহওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী[13]  রাহ. সুন্নাতের উপর থাকার গুরুত্ব  বুঝাতে উপরোক্ত হাদীস সহ আরো কিছু  হাদীস উল্লেখের পূর্বে লিখেন,  ” ﻗﺪ ﺣﺬﺭﻧﺎ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ  ﻣﺪﺍﺧﻞ ﺍﻟﺘﺤﺮﻳﻒ ﺑﺄﻗﺴﺎﻣﻬﺎ . ﻭﻏﻠﻆ ﺍﻟﻨﻬﻲ  ﻋﻨﻬﺎ ، ﻭﺃﺧﺬ ﺍﻟﻌﻬﻮﺩ ﻣﻦ ﺃﻣﺘﻪ ﻓﻴﻬﺎ ، ﻓﻤﻦ  ﺃﻋﻈﻢ ﺃﺳﺒﺎﺏ ﺍﻟﺘﻬﺎﻭﻥ ﺗﺮﻙ ﺍﻷﺧﺬ ﺑﺎﻟﺴﻨﺔ .”  ‘‘নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম  আমাদেরকে সর্বপ্রকার  তাহরিফ তথা দীনের  বিকৃতি প্রবেশ  করানো থেকে সতর্ক  করেছেন, তাহরিফ  থেকে কঠোর নিষেধ  করেছেন, উম্মত থেকে এ  ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি  নিয়েছেন, এ  ব্যাপারে শিথিলতার  সবচেয়ে বড় কারণ  হলো সুন্নাতের উপর আমল  ছেড়ে দেওয়া…’’ [14]  এরপর তিনি হুবহু সুন্নাতের অনুকরণ  না করার সতর্কতা সম্বলিত বিভিন্ন হাদীস  উল্লেখ করেন। আলোচনা দীর্ঘ  হয়ে যাবে বিধায় তা উল্লেখ করছি না।  পাঠকের কাছে তার এই  আলোচনাটি দেখে নিতে অনুরোধ রইল।  সারকথায় তিনি সুন্নাতের মধ্যে কম বেশ,  সংযোজন, বিয়োজন,  বাড়াবাড়ি সবকিছুকেই দীনের তাহরীফ  বা বিকৃতি গণ্য করেছেন এবং তা বিভিন্ন  হাদীস দ্বারা প্রমাণ করেছেন।  সারকথা হলো, নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামগ্রিক  জীবন-পদ্ধতিই সুন্নাত। যা তিনি ফরয  হিসেবে করেছেন তা ফরয  হিসেবে পালন করা সুন্নাত। যা নফল  হিসেবে করেছেন তা নফল  হিসেবে পালন করা সুন্নাত।  যা সর্বদা করেছেন তা সর্বদা করা,  যা মাঝে মাঝে করেছেন  তা মাঝে মাঝে করা সুন্নাত।  যা সর্বদা বর্জন করেছেন তা সর্বদা বর্জন  করা, যা মাঝে মাঝে বর্জন করেছেন  তা মাঝে মাঝে বর্জন করা সুন্নাত। যেই  কাজ যেই পদ্ধতিতে করেছেন তা সেই  পদ্ধতিতে পালন করাই সুন্নাত।  কোনো কিছুতে বেশ কম হলেই  খেলাফে সুন্নাত বলে গণ্য হবে। করণীয়  বর্জনীয় সকল ক্ষেত্রে তাঁরই  পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। আনাস ইবনু  মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত  একটি হাদীস দেখুন:  “ﺟﺎﺀ ﺛﻼﺙ ﺭﻫﻂ ﺇﻟﻰ ﺑﻴﻮﺕ ﺃﺯﻭﺍﺝ ﺍﻟﻨﺒﻲ  ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻳﺴﺄﻟﻮﻥ ﻋﻦ ﻋﺒﺎﺩﺓ  ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻓﻠﻤﺎ ﺃﺧﺒﺮﻭﺍ  ﻛﺄﻧﻬﻢ ﺗﻘﺎﻟﻮﻫﺎ ﻓﻘﺎﻟﻮﺍ ﺃﻳﻦ ﻧﺤﻦ ﻣﻦ ﺍﻟﻨﺒﻲ  ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ؟ ﻗﺪ ﻏﻔﺮ ﺍﻟﻠﻪ ﻟﻪ ﻣﺎ  ﺗﻘﺪﻡ ﻣﻦ ﺫﻧﺒﻪ ﻭﻣﺎ ﺗﺄﺧﺮ ﻗﺎﻝ ﺃﺣﺪﻫﻢ ﺃﻣﺎ ﺃﻧﺎ  ﻓﺈﻧﻲ ﺃﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻴﻞ ﺃﺑﺪﺍ ﻭﻗﺎﻝ ﺁﺧﺮ ﺃﻧﺎ ﺃﺻﻮﻡ  ﺍﻟﺪﻫﺮ ﻭﻻ ﺃﻓﻄﺮ ﻭﻗﺎﻝ ﺁﺧﺮ ﺃﻧﺎ ﺃﻋﺘﺰﻝ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ  ﻓﻼ ﺃﺗﺰﻭﺝ ﺃﺑﺪﺍ ﻓﺠﺎﺀ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ  ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻓﻘﺎﻝ ‏( ﺃﻧﺘﻢ ﺍﻟﺬﻳﻦ ﻗﻠﺘﻢ ﻛﺬﺍ  ﻭﻛﺬﺍ ؟ ﺃﻣﺎ ﻭﺍﻟﻠﻪ ﺃﺗﻲ ﻷﺧﺸﺎﻛﻢ ﻟﻠﻪ ﻭﺃﺗﻘﺎﻛﻢ  ﻟﻪ ﻟﻜﻨﻲ ﺃﺻﻮﻡ ﻭﺃﻓﻄﺮ ﻭﺃﺻﻠﻲ ﻭﺃﺭﻗﺪ  ﻭﺃﺗﺰﻭﺝ ﺍﻟﻨﺴﺎﺀ ﻓﻤﻦ ﺭﻏﺐ ﻋﻦ ﺳﻨﺘﻲ ﻓﻠﻴﺲ  ﻣﻨﻲ .” ‏(ﺻﺤﻴﺢ ﺍﻟﺒﺨﺎﺭﻱ، ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﻨﻜﺎﺡ،  ﺑﺎﺏ ﺍﻟﺘﺮﻏﻴﺐ ﻓﻲ ﺍﻟﻨﻜﺎﺡ، ﺭﻗﻢ 4776: ‏)  ‘‘তিন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের  স্ত্রীদের নিকট গিয়ে তাঁর  ইবাদত  সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। যখন  তাদেরকে তাঁর ইবাদত  সম্পর্কে জানানো হলো  প্রশ্নকারী সাহাবীগণ  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের  ইবাদত কিছুটা কম ভাবলেন  বলে মনে হলো।  তারা বললেন: রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের  সাথে কি আমাদের  তুলনা হতে পারে? আল্লাহ  তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল  গোনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।  (তাঁর কোনো গোনাহ নেই,  আর আমরা গোনাহ্গার উম্মত,  আমাদের উচিৎ তাঁর  চেয়ে বেশি ইবাদত করা) তখন  তাদের একজন বললেন:  আমি সর্বদা সারা রাত  জেগে নামায পড়ব। অন্যজন  বললেন:  আমি সর্বদা রোজা রাখব, কখনই  রোজা ভাঙ্গব না। অন্যজন  বললেন: আমি আজীবন  নারী সংসর্গ পরিত্যাগ করব,  কখনো বিবাহ করব না।  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের  কথা জানতে পেরে তাদের  কাছে এসে বললেন: তোমরাই  কি এমন এমন কথা বলেছ?  তোমরা জেনে রাখ!  আমি তোমাদের সকলের  চেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয়  করি, আমি তোমাদের  মধ্যে সর্বোচ্চ তাক্বওয়াবান।  তা সত্বেও  আমি মাঝে মাঝে নফল  রোজা রাখি, আবার  মাঝে মাঝে নফল  রোজা রাখা পরিত্যাগ করি।  রাতে কিছু সময় নফল সালাত  আদায় করি আবার কিছু সময়  ঘুমাই। আমি বিবাহ করি।  যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত অপছন্দ  করল তার সাথে আমার  কোনো সম্পর্ক নেই।’’ [15]  পাঠক, একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করুন।  এখানে তিনজন সাহাবীর কেউই  নাজায়েয কোনো কাজের ইচ্ছা পোষণ  করেন নি। প্রত্যেকেই ভালো কাজের  নিয়ত করেছেন। নফল নামায কতই না উত্তম  ইবাদত, নফল সালাতের মাধ্যমে সময়  কাটানো মুমিনের উত্তম  ব্যবস্থা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলেছেন  বলে উল্লেখ রয়েছে।[16] নফল সিয়াম  পালন করা কতই না উত্তম কাজ।  বেশি বেশি ইবাদতের জন্য বিবাহ  শাদিতে নিজেকে জড়িত না করা কতই  না উত্তম নিয়ত বা কল্পনা। তথাপি এই  কর্মগুলোকে নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাত অপছন্দ  বলে আখ্যায়িত করলেন তার কারণ কি?  সাধারণ অপছন্দ নয়, এমন অপছন্দ যার  কারণে তাঁর উম্মতের অন্তর্ভুক্ত হওয়া যায়  না। বাহ্যত তাদের এমন নিয়তের উপর  নবীজীর বাহবা দেওয়ার কথা ছিল।  মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, এমন  অনেক বাহবামুলক শব্দ প্রয়োগ করে,  আমি যা পারি না তোমরা তা করছ  বলে তাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরার কথা।  আমাদের যুক্তি বা সমাজের বাস্তব চিত্র  এমনটিরই দাবী রাখে। কিন্তু  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  উল্টো তাদের উপর রাগ করলেন কেন?  বাহ্যত বিষয়টি একটু উল্টো মনে হলেও  একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে আমাদের  জন্য এর রহস্য  বুঝতে কোনো সমস্যা হবে না।  কেননা ইবাদত মূলত কম বা বেশি করার নাম  নয়। বরং আল্লাহর হুকুম তাঁর রাসূলের  পদ্ধতির পূর্ণ অনুসরণ করে পালনের নাম।  এখানে যদিও মূল ইবাদতের মধ্যে পূর্ণ  অনুসরণের বৈপরিত্য নেই, তথাপি রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  জীবনাদর্শের সাথে বৈপরিত্য আবশ্যই।  কেননা, রাত কাটাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত হচ্ছে,  কিছু সময় সালাত আদায় করা, কিছু সময়  ঘুমানো। যিনি সারা রাত  সালাতে কাটাচ্ছেন তাঁর আমল  বেশি হলেও রাত কাটানোটি রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  সুন্নাত মোতাবেক নয়। ঠিক  এমনিভাবে সিয়াম ও বিবাহের বিষয়টিও।  এমন আমলকারীর  মনে ধীরে ধীরে সুন্নাতের  প্রতি অবজ্ঞা জন্ম নেয়। সুন্নাত  মোতাবেক চলা